রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

মেহেদী-হাসান-পলাশ1

মেহেদী হাসান পলাশ :

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য শাখের করাত। তিন দিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য শ্বাস নেবার মুক্ত জানালা দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ২৭২ কি.মি. মিয়ানমার সীমান্ত। ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসী নীতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদী নীতির তুফানে বাংলাদেশের ‘খড় কুটো’ এই সীমান্ত তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এড়িয়ে স্থলপথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগেরও একমাত্র বিকল্প এই সীমান্ত। অন্যদিকে মিয়ানমারের জন্যও ভারতের মূল ভূখ- হয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার স্থল যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম বাংলাদেশ।

এই যখন অবস্থা তখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক মধুরেনু হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা দাবা খেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে কখনো বসন্ত বাতাসের হিল্লোল পরিলক্ষিত হয়নি। বরং পৌষী-শীতলতা এবং থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝঞ্ঝা পরিলক্ষিত হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিকভাবে বললে বলতে হয়, এর জন্য বহুলাংশে মিয়ানমারের জাতীয় নীতিই দায়ী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির প্রধান কাঁটার নাম ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’। এটা এমন এক সমস্যা যা বাংলাদেশকে গিলতেও বাধছে, উগড়াতেও।

জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিবেশী দেশের লাখ লাখ শরণার্থী গ্রহণ সম্ভব নয় এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি পূর্ণ একটি দেশে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর অবস্থানের মতো ভূমির অভাব প্রকট। তাছাড়া ইতোপূর্বে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। অফিসিয়ালি যাই বলা হোক, নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন কখনো বন্ধ হয়নি। যখন ব্যাপকভাবে এসেছে কেবল তখনই গণমাধ্যমে ব্যাপক  ভাবে আলোচিত হয়েছে।

এর বাইরে প্রতিনিয়ত দুই চার পাঁচ জন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে সব সময়। এদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গার শরণার্থী ক্যাম্পে ঠাঁই মিললেও বাকিরা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে আবার বিভিন্ন সূত্রে সরাসরি সমাজে মিশে গেছে। যারা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে তারাও ধীরে ধীরে ক্যাম্প থেকে সরে সমতলে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের মধ্যে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেয়া আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কাজের সন্ধানে সমতলে এসে মূল স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন ও মূল স্রোত ধারায় মিশে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের প্রবল বিরোধিতা রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ, যত্রতত্র রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং বিশেষ করে টেকনাফের সৌন্দর্য হারিয়ে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশী টাকার মান বেশী হওয়ায় রোহিঙ্গারা কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি হওয়ায় স্থানীয় বাঙালি শ্রমিকেরা বেকারে পরিণত হচ্ছে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা অল্প মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ায় বাঙালি শ্রমিকদের কাজে নিতে চান না। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গা পিতামাতা তাদের কন্যাদের যে কোনোভাবে বাঙালি পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হওয়ায় অনেক ঘরে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের প্রবেশ ঘটছে যা সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে এটা লক্ষ্য করা যায়। এতে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের একাংশ মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশী শ্রম মার্কেট ভাগ বসাচ্ছে। এ ধরনের নানা কারণে স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তারপরও রোহিঙ্গাদের এই চরম দুর্দিনে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব ‘দরোজা বন্ধ করে’ বা ‘মুখ ফিরিয়ে থাকা’? কিংবা মুখ ফিরিয়ে থাকলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? বাংলাদেশ তো চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুর্গম সীমান্ত, দুর্বল নিরাপত্তা প্রহরা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অসহায় রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সংবাদপত্রের খবর, যতটা না গোপনে এসেছে, তার চেয়ে বেশী এসেছে স্থানীয় দালাল ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘুষ দিয়ে। সামাজিক গণমাধ্যমে এসব ঘুষ প্রদানের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। সামনে আরো আসবে তার আলামতও স্পষ্ট।

তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হলে চলবে না। কারণ এর সাথে বাংলাদেশের সুনামের প্রশ্ন জড়িত। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার হয়। দালালদের হাতে পড়ে শিশুরা পাচার হয়। কাজের লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গা নারীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক অভিভাবক ভবিষ্যতের শঙ্কা কাটাতে স্থানীয় বৃদ্ধদের সাথেও কিশোরীদের বিবাহ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয় না। রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা যেন কোনোভাবেই নির্যাতনের শিকার না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।

আরাকান শব্দটি এসেছে আরবী আল রুকুন শব্দ থেকে। তবে পি ফ্যায়রের মতে, প্রাচীন রাখাইং গোত্রের নামানুসারে এর নাম হয়েছে আরাকান। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের শেষ রাজধানী ছিল ম্রোহাং। ম্রোহাংকে বাংলা কবিরা রোসাঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। এই রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। আরাকানে রোহিঙ্গাদের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীনকালে আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। এর আয়তন ছিল ২০ হাজার কি.মি.। তবে বর্তমানে এর আয়তন ১৪ হাজার বর্গ কি.মি.।

প্রাচীনকালেই আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। তখন আগমন ঘটেছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে, কিছু জলদস্যু আক্রমণের শিকার হয়ে ও জাহাজ ডুবির শিকার হয়ে। পরবর্তীকালে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে বিপুল পরিমাণ মুসলিম আরাকানে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি গড়ে।

পঞ্চদশ শতাব্দী আরাকানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শতাব্দীর শুরুতে আরাকান রাজ মিন সাউ মুন বার্মার উপর আক্রমণ পরিচালনা করে ব্যর্থ হন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মা রাজ তার রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাকে বহিষ্কার করলে তিনি বঙ্গদেশে চলে আসেন। বঙ্গরাজার সহায়তায় ১৪৩০ সালে রাজা মিন সাউ মুন কয়েক হাজার মুসলিম সৈন্যের সহায়তায় পুনরায় আরাকান গমন করেন এবং যুদ্ধে বার্মারাজকে পরাজিত করে পুনরায় রাজ্য উদ্ধার করেন। এ সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে রাজা সুলাইমান শাহ নাম ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেন। এ সময় আরাকান অনেকাংশে বঙ্গরাজের সালতানাতের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

আরাকান রাজসভায় মুসলিম আমাত্যরা উচ্চপদ লাভ করেন। এদের একজন মাগন ঠাকুর। তার পিতা বড় ঠাকুর আল্লাহর কাছে অনেক মানত করে পুত্র লাভ করেন। তাই তার নাম মাগন রাখা হয়। মাগন ঠাকুর ইসলামের প্রথম খালিফা আবু বকরের (রা.) বংশধর। তার মন্ত্রিসভা অনেক বাঙালি কবি ও গুণী ব্যক্তি অলঙ্কৃত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মহাকবি আলাওল। মাগন ঠাকুরের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। পদ্মাবতী, সতী ময়না লোর চন্দ্রানী, সিকান্দার নামা, সায়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, তোহফা, হপ্ত পয়কর প্রভৃতি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো এ সময় রচিত হয়।

১৭৮৫ সালে বর্মী রাজ বদা উপ্যা আরাকান দখল করে পুনরায় বার্মার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সরকার আরাকানের জমিগুলো চাষযোগ্য করতে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বহু লোক আরাকানে নিয়ে যায়। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, মায়ানমারের মিনবিয়া এবং ম্রোক-ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থীরা প্রায় ৫,০০০ মুসলমানকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। জাপানীদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থী অস্ত্রধারী মুসলমানদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল। জাপানীরা হাজার হাজার রোহিঙ্গারে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল।

এই সময়ে প্রায় ২২,০০০ রোহিঙ্গা সংঘর্ষ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। জাপানী এবং বর্মীদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।

ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে যখন আদমশুমারি হয় তখন ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদের গণনা করেনি। রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু সেখান থেকে। স্বাধীনতার পর মিয়ানমার সরকার জাতীয়তার তিন স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করায়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে জানা গেছে জাতীয়, সহযোগী ও আনুগত্যশীল -এই তিন প্রকারের নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস ঘোষণা করা হয়। যারা ব্রিটিশ শাসনের আগে এসেছে তাদের জাতীয় নাগরিক বলা হয়।

স্বাধীনতার পর সহযোগী ও আনুগত্যশীল নাগরিকদের আবেদন করতে বলা হলে রোহিঙ্গারা তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ তারা আগে থেকেই সেখানে আছে। এই গণনার পরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে স্ট্যাটাসহীন হয়ে পড়ে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তার বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়।

বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।

১৯৭৮ সালে পরিচালিত কিং ড্রাগন অপারেশনে ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এদের মধ্যে ৩ লাখ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশে ফিরে যায়, ২ লাখ সৌদী আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে চলে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে।

এদের মধ্যে ২ লাখ রোহিঙ্গা দেশে ফিরে গেলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিতদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে এমন অভিযোগে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে যায়। তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় দুইটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবী।

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে মংডুর বেশ কয়েকটি বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা হামলা করে ৯ বিজিপি সদস্যকে খুন, ৬৪ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায়। মিয়ানমার সরকার এই হামলার জন্য রোহিঙ্গাভিত্তিক স্বাধীনতাকামী সংগঠন আরএসওকে দায়ী করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা শুরু করে। হেলিকপ্টার গানশিপ, মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলায় ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

এ ছাড়াও ১২ শত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। শিশু ও নারীদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। মিয়ানমারের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এই হামলার খবর শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্ন তথ্য উপত্তের মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে তাদের মতে, এটা রোহিঙ্গাদের জাতিগত দাঙ্গা।

এদিকে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী সু চি এই হামলায় একেবারে নীরবতা পালন করায় বহির্বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে ব্যাপকভাবে। আসলে গণতন্ত্র আসলেও মিয়ানমার সরকার এখনো ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনাবাহিনীর লে. জে. পদমর্যাদার একজন অফিসার। সেনাবাহিনী সুকৌশলে সু চির আন্তর্জাতিক শান্তিবাদী ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করে দিচ্ছে এটা তিনি বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না।

মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা গণহত্যায় আন্তর্জাতিক বিশ্ব রহস্যময় ও বেদনাদায়ক নীরবতা পালন করছে। জাতিসংঘসহ কোনো কোনো সংস্থা মুখ খুললেও যতটা কঠোর হলে মিয়ানমারকে এই হামলা বন্ধে বাধ্য করা যেত তা তারা করছে না।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারি গ্রসম্যান আমাকে মিয়ানমার সমস্যা ব্রিটিশের সৃষ্টি বলে দায়ী করে তা বন্ধে তিনটি উপায়ের কথা বলেন। তার মতে, এই মানবিক বিপর্যয় কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তিনটি উপায় অবলম্বন করতে হবে। ১. রোহিঙ্গা সমস্যাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইউরাথু ভিক্ষু ও তার ৯৬৯ আন্দোলনকে টেরোরিস্ট ঘোষণা করতে হবে এবং ৩. মিয়ানমারের থেকে সকল প্রকার সহায়তা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি, আরবলীগসহ প্রভাবশালী মুসলিম দেশ ও সংস্থা সমূহের নীরবতা নীল কষ্টের মতো মেনে নেয়া যায় না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বাংলাদেশ চাইলেই রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না। রোহিঙ্গারা আসছে, অথচ বাংলাদেশ অফিসিয়ালি তা অস্বীকার করে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবী করার সুযোগ হারাচ্ছে। শরণার্থীদের প্রতিপালনে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। কাজেই অবলিম্বে সরকারীভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমণের সত্যতা স্বীকার করে সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে।

রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের জন্য যতই দুর্ভার হোক মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের সাগরে ঠেলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ বারবার ঘোষণা করেছে, এ দেশের মাটিতে প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসীদের কোনো প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কিন্তু রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী নয়, মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশই পারে স্বল্প সময়ের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।

সিরীয় শরণার্থীরা যখন ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল তখন আমরা ইইউ রাষ্ট্রগুলোর মানবিকতা প্রদর্শন প্রত্যাশা করেছি। আজ রোহিঙ্গাদের সাথে কেন আমরা একই মানবিকতা প্রদর্শন করবো না? বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেদিন ভারত আশ্রয় না দিলে বাংলাদেশীদের পরিণতি কি হতো তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের এই এক কোটি শরণার্থীই সেদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বিশ্বমঞ্চে কথা বলা সুযোগ করে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনা চাইলেই, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভার হয়ে বসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রসঙ্গ টেনে ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলতে পারেন। এই শরণার্থীদের প্রতিপালনে ও ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে পারেন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। এতে বিশ্বনেত্রী হিসাবে তার ভাবমর্যাদা ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি পারেন না মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজের ও দেশের জন্য গৌরবের সেই মহান উপলক্ষ হতে?
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- শেখ হাসিনা

pm news

স্টাফ রিপোর্টার:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের টেকসই উন্নয়নের জন্য তাঁর সরকারের গৃহীত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথনৈতিক কার্যক্রমে গতি সঞ্চার হয়েছে। এতে এ অঞ্চলের জনগণের জন্য সুযোগ-সুবিধা বয়ে নিয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিশ্বাস করে যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী নির্বিশেষে সকলেই সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তুলতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্যে সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শারীরিক প্রতিবন্ধী থেকে সকল সদস্যের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

আজ প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাত্রবৃত্তি বিতরণকালে তিনি একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নে সরকারের সম্ভাব্য সকল সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

তিনি বলেন, সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকরা বাদ পড়ে যাওয়ায় এর আগে প্রকাশিত গেজেট সংশোধনের জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বিশেষ কার্যক্রমের অধীনে এ ছাত্রবৃত্তি প্রদান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার এবং সিলেট, মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজু দেশোয়ারা বক্তব্য রাখেন।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকারের কথা নিশ্চিত করা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা উপেক্ষিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কোন সরকার তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি অনেক স্কুল তাদের শিশুদের ভর্তি করেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকরা বাংলাদেশের নাগরিক, তাই তারা সত্যিকার নাগরিক হিসেবে দেশে বসবাস করবে এবং সকল অধিকার ভোগ করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর সরকার বিশেষ সহযোগিতা কার্যক্রম চালু করে। তবে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় সহযোগিতা কার্যক্রম চরম বাধার সম্মুখীন হয়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় সহযোগিতা কার্যক্রম চালু করে। এই কার্যক্রমের আওতায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে অথনৈতিকভাবে উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর সরকার তৃণমূল পর্যায়ে সুবিধাবঞ্চিত জনগণের অবস্থার উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে যোগ্য নাগরিক ও দক্ষ পেশাদার হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে শিক্ষাবৃত্তি প্রাপ্তদের নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান।

এ বছর ৩৫০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২০ জন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চেক গ্রহণ করেছে।

খবর- বাসস।

পার্বত্য সমস্যা সমাধানে খালেদা জিয়ার প্রচেষ্টা ও শান্তি চুক্তির শুরুর কথা

Untitled-110

(ছয়)

খালেদা জিয়া সরকারের প্রচেষ্টা
১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি আমলে শান্তিবাহিনীর সাথে সরকারের বৈঠক হয় ১৩ দফা। যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল অলি আহমেদের নেতৃত্বে একটি ‘জাতীয় শান্তি কমিটি’ এই আলোচনা পরিচালনা করে। বামপন্থী নেতা রাশেদ খান মেনন এ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে এসব বৈঠকে কোন ইতিবাচক সমাধান আসেনি। ১৯৯১ সালের মে মাসে সিএইচটি’র ‘লাইফ ইন নট আওয়ার্স’ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এ সময় বিভিন্ন স্থানে শান্তিবাহিনীর হামলায় ২০০ জন নিহত হয়। ৯ জুন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে পার্বত্য কাউন্সিল কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় সরকার পরিষদের আইন ১৯৮৯ মোতাবেক যাবতীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ২৩ অক্টোবর শান্তিবাহিনীর প্রতি সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। শান্তিবাহিনী সাধারণ ক্ষমা প্রত্যাখ্যান করে ২৪ অক্টোবর।

১৯৯২ সালে শান্তিবাহিনী গুচ্ছগ্রামে হামলা চালায়। ১৪ জন নিহত হয়। ১২ এপ্রিল লোগাং হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে শোক মিছিল হয়। ২৭ এপ্রিল শেখ হাসিনাও লোগাং পরিদর্শন করেন। প্যারিস কনসোর্টিয়াম বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। মে মাসে খালেদা জিয়া ভারত সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও-এর সাথে শরণার্থী নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী শরণার্থী প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত হন। জুলাই মাসে অলি আহমদের নেতৃত্বে সংসদ সদস্যদের নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক রাজনৈতিক কমিটি গঠন করা হয়।

৩০ জুলাই সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। শান্তিবাহিনীর সাথে সরকারের বৈঠকসমূহের পাশাপাশি ১৯৯২ সালের ১ আগস্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র বিরতি চলে। ১০ আগস্ট জনসংহতি সমিতি ৩ মাসের জন্য অস্ত্র বিরতি ঘোষণা করে। ১৩ অক্টোবর কার্ফ্যু জারি হয় কয়েকটি এলাকায়। ৫ নভেম্বর সরকার ও জনসংহতির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ ডিসেম্বর হয় দ্বিতীয় বৈঠক।
সরকার ১৯৯৩ সালে এ অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বন্ধে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ এর আওতায় নিয়োগ করে। ১৯৭৬ সাল হতে সেনাবাহিনী এ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার ইমারজেন্সি’ অভিযান শুরু করেছিল।
১৯৯৩ সালে যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বে ২ মে থেকে ৯ মে রাজনৈতিক কমিটি ত্রিপুরার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে। ২২ মে সরকার ও জনসংহতির তৃতীয় বৈঠকে অস্ত্র বিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। ৮ জুন প্রত্যাবাসনের দিন ধার্য হয়। কিন্তু শরণার্থীদের ১৩ দফা দাবি সরকার মেনে না নেয়ায় প্রর্ত্যাবাসন স্থগিত হয়। ১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে বৈঠকে শরণার্থীদের আংশিক দাবিনামা পূরণ করা হয়। ১৩ জুলাই সরকারি দল ত্রিপুরার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে। ১৪ জুলাই সরকার ও জনসংহতির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অস্ত্র বিরতি বর্ধিত হয় ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ১৮ সেপ্টেম্বর জনসংহতি সমিতি ও সরকারের মধ্যে পঞ্চম বৈঠক বসে। ২৩ সেপ্টেম্বর উপেন্দ্রলাল চাকমার নেতৃত্বে ১৮ সদস্য বিশিষ্ট পাহাড়িদের একটি দল খাগড়াছড়ির পাঁচটি থানা পরিদর্শন করে। ১৭ নভেম্বর নানিয়ার চরে নিহত হয় ৩০ জন। ১৬০ জন আহত হয়। অস্ত্র বিরতি ৩১ জানুয়ারি ১৯৯৪ পর্যন্ত বর্ধিত হয়।

১৯৯৪ সালের ১৬ জানুয়ারি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ত্রিপুরায়। ১৯৯৪ সালে উপেন্দ্রলাল চাকমা ঘোষণা করেন ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে। প্রথমাবস্থায় ৪০৫ পরিবার দেশে ফিরবে। ১৫-২২ ফেব্রুয়ারি ৪০৫ পরিবারের ১৯৭২ জন সদস্য দেশে ফিরে আসে। পাঁচ মাস পর দ্বিতীয় দফায় ৬৪৮ পরিবারের তিন হাজার ৩২৭ জন ফিরে আসে। সরকার শরণার্থীদের দাবি মানছে না বলে প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়ে যায়।
৫ মে সরকার ও জনসংহতির মধ্যে সপ্তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ জুলাই পর্যন্ত বর্ধিত হয় অস্ত্র বিরতি মেয়াদ। নতুন একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়। ৪ জুন সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে প্রথম বৈঠক শুরু হয়। ১ জুলাই হয় সাব কমিটি ও শরণার্থী কল্যাণ কমিটির প্রথম বৈঠক। ১০ জুলাই সাব কমিটি ও জনসংহতি সমিতির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় বৈঠক। ২৮ আগস্ট সাব কমিটি ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চতুর্থ বৈঠকে ৪টি বিষয়ের ঐক্যমত হয়। আবার ৩১ মার্চ ১৯৯৫ পর্যন্ত বাড়ে অস্ত্র বিরতির মেয়াদ।

১৯৯৫ সালে উপেন্দ্রলাল চকমা ও ভারতীয় কর্মকর্তারা খাগড়াছড়ি সফর করে। ১৫ মার্চ পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের জেলা সম্মেলন নিয়ে হরতাল হয় পার্বত্য তিন জেলায়। ১৭ মার্চ ত্রিপুরা শিবিরে বৈঠক শুরু হয়। দাবি না মানা হলে উপজাতীয়রা ফিরবেন না বলে ঘোষণা দেন উপেন্দ্রলাল চাকমা। ১৯৯৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত আরো এক দফা অস্ত্র বিরতির মেয়াদ বর্ধিত করা হয়। পরবর্তীতে তা ৩১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ৪ সেপ্টেম্বর সাবেক মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারী রবিন রাফেল পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। ১২ জুলাই সরকার ও জনসংহতি সমিতির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অস্ত্র বিরতি থাকবে। ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শরণার্থীদের দেশে ফিরে আসার আহবান জানান।
অস্ত্র বিরতির মেয়াদ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। রাঙ্গামাটিতে শান্তিবাহিনী ৩ জন পাহাড়ীকে অপহরণ করে। অস্ত্র বিরতির মেয়াদ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আবার বৃদ্ধি করা হয়। ১৫ এপ্রিল শান্তিবাহিনীর হামলায় ৩ জন নিহত হয়।
 
শান্তি চুক্তির বার্তা যেখান থেকে শুরু
বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৯৯৬ সালের ২৪ জুন শান্তিবাহিনীর ৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করে। ২৩ জুন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ২৮ জুন অস্ত্রবিরতির মেয়াদ ৩১ জুলাই পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ৬ জুলাই শান্তিবাহিনীর ৬ দফা চুক্তির বিপরীতে পিএসপিসিতে ১৪ দফা দাবি পেশ করে।
১১ জুন গভীর রাতে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি থানার লাইল্যাঘোনা থেকে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমা অপহৃত হন। কল্পনা চাকমার পরিবার অপহরণকারী হিসেবে নিকটবর্তী সেনাক্যাম্পে অবস্থানকারী লে. ফেরদৌস ও অপর ৩ বাঙ্গালি ভিডিপি সদস্যকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে। ২৩ জুলাই সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন থেকে এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, তারা এর সাথে জড়িত নন। অস্ত্র বিরতির মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় শান্তি বাহিনী। ২৬ জুলাই পানছড়ি থেকে ৯ জন বাঙ্গালি অপহৃত হয়। ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, কল্পনা রাণী চাকমার ঘটনা তদন্তে সংসদীয় কমিটি হবে। ৭ আগস্ট রাঙ্গামাটির কাউখালি থানায় ওসিসহ ৬০ জন বাসযাত্রী অপহৃত হন। ২৫ আগস্ট অপহরণের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে হরতাল হয়। ৯ সেপ্টেম্বর শান্তিবাহিনীর ৪ সদস্য আত্মসমর্পণ করে।
১১ সেপ্টেম্বর রাঙ্গামাটির লংগদু থানার পাকুয়াখালী এলাকার গভীর বনে ২৮জন বাঙ্গালি কাঠুরিয়া নিহত হন। স্থানীয় বাঙ্গালিরা এ ঘটনার জন্য শান্তিবাহিনীকে অভিযুক্ত করে। ১৪ সেপ্টেম্বর এ কারণে পার্বত্য এলাকায় হরতাল পালিত হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর জনসংহতি সমিতি একতরফাভাবে অস্ত্র বিরতির মেয়াদ ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বর্ধিত করে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আমলেই প্রথম ঢাকায় দু’পক্ষের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের জন্য জাতীয় সংসদের চীপ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, আওয়ামী লীগের অর্থনীতি বিষয়ক সম্পাদক আতাউর রহমান কায়সার, চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, কল্পরঞ্জন চাকমা এমপি, দীপংকর তালুকদার এমপি, বীর বাহাদুর এমপি প্রমুখ। জনসংহতি সমিতি বা শান্তি বাহিনীর পক্ষে এ সমস্ত বৈঠকে সন্তু লারমা নেতৃত্ব দেন। শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। প্রথম বৈঠক খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফা ২১ ডিসেম্বর, ২ দফা ২৪ ডিসেম্বর।

৬ অক্টোবর আওয়ামী লীগ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি খাগড়াছড়িতে বৈঠকে বসে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে। ১৪ অক্টোবর ১১ সদস্য বিশিষ্ট সংসদীয় কমিটির গঠন করা হয়। ৩০ নভেম্বর শান্তি বাহিনী বান্দরবনে ১০ জনকে অপহরণ করে। ২১ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতীয় কমিটির সাথে শান্তিবাহিনীর প্রথম বৈঠকে বসে।

১৯৯৭ সালে যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয় ৩১ মার্চ পর্যন্ত। ২৫ জানুয়ারি সরকার ও জনসংহতির মধ্যে প্রথমবারের মতো ঢাকায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের মেয়াদ বৃদ্ধির বিল পাস হয় সংসদে।
ত্রিপুরায় ১ মার্চ ১৯৯৭ শরণার্থীদের জন্য ২০ দফা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। ১২ মার্চ সরকার ও জনসংহতি সমিতির তৃতীয় বৈঠক ঢাকায় শুরু হয়। অস্ত্র বিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয় ৩০ জুন পর্যন্ত। ২৪ মার্চ তৃতীয় দফায় শরণার্থী প্রত্যাবাসন শুরু হয়। ৮ এপ্রিল কল্পরঞ্জন চাকমার নেতৃত্বে গঠিত হয় শরণার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স। ২৪ মার্চ বিএনপির ডাকে ঢাকায় পার্বত্য বিষয়ক জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মে সরকার ও জনসংহতি সমিতির চতুর্থ বৈঠক শুরু হয় ঢাকায়। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অস্ত্র বিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। ৫ জুলাই তিন পার্বত্য জেলার মেয়াদ শেষ হলে গঠন করা হয় অন্তবর্তীকালীন কমিটি। ১৪ জুলাই সরকার ও জনসংহতি সমিতির পঞ্চম বৈঠক শুরু হয় ঢাকায়। ৭ আগস্ট শরণার্থী প্রত্যাবাসন নিয়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের তৃতীয় বৈঠক হয় ত্রিপুরায়। বৈঠক ভেঙ্গে যায়। উপেন্দ্রলাল চাকমা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঢাকায় বৈঠক করেন। ১৩ সেপ্টেম্বর সরকার ও জনসংহতির ষষ্ঠ বৈঠক ঢাকায় শুরু হয়। ঘোষণা আসে ২১ নভেম্বর থেকে শরণার্থী প্রত্যাবাসন শুরু হবে। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অস্ত্র বিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। ১৬ নভেম্বর পরবর্তী বৈঠকের দিন ঘোষণা করে জনসংহতি সমিতি।

২ অক্টোবর ১৯৯৭ জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে অসংগঠনের আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের সভাপতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সংক্রান্ত নিম্নোক্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়:
জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়ে ভারতীয় মদদপুষ্ট তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সাথে সরকারের প্রণীত খসড়া চুক্তিতে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্বত্য এলাকার প্রায় ৬০% ভাগ অর্থাৎ ছয় লক্ষাধিক বাংলাভাষী অ-উপজাতীয়দের ভূমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত করে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে উপজাতীয়দের ভূমির মালিকানায় একচ্ছত্র অধিকার প্রদান, তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীদের নিয়ে পুলিশ বাহিনী এবং বৈষম্যমূলক আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের মত সংবিধান বিরোধী শর্তসমূহ সন্নিবেশিত করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এ ধরনের সংবিধান পরিপন্থী চুক্তি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করবে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সুস্পষ্টভাবে সরকারকে সতর্ক করে দিচ্ছে যে, দেশের জনগণ সংবিধান তথা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বিরোধী কোন চুক্তি মেনে নেবে না।
কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছে যে, আধিপত্যবাদের মদদপুষ্ট তথাকথিত শান্তিবাহিনীর সাথে আলোচনা গুরুতরভাবে গোপন রাখা হচ্ছে। এমনকি জাতীয় সংসদকেও এ ব্যাপারে পাশ কাটানো হচ্ছে। ১২ কোটি দেশবাসীকে রাখা হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এ ধরনের রহস্যময় গোপনীয়তা কোনক্রমেই সরকারের স্বচ্ছতায় প্রমাণ বহন করে না। কিছু লোকের জন্য দেশের একটা অংশের একচ্ছত্র মালিকানা আমাদের সংবিধান কোনক্রমেই অনুমোদন করে না। এ ধরনের কোন চুক্তি হলে এক দশমাংশের উপর  বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণ হারাবে। শতকরা প্রায় ষাট ভাগ বাংলাভাষী এবং শান্তিপ্রিয় উপজাতীয়দের জান-মাল ইজ্জত আব্রু আধিপত্যবাদী শক্তির মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বে। অল্পসময়ের ব্যবধানেই পার্বত্য অঞ্চলও বেরুবাড়ির মত হাত ছাড়া হয়ে যাবে।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিতে চায় যে, জনগণকে অন্ধকারে রেখে দেশ, জাতি, জনস্বার্থ এবং দেশের অখণ্ডতা বিরোধী কোন চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে তার পরিণাম কারো জন্যেই শুভ হবে না। এর কারণে উদ্ভুত অনাকাক্ষিত পরিস্থিতি এবং তার পরিণতির সকল দায়-দায়িত্ব এই সরকারকেই বহন করতে হবে।

২৪ নভেম্বর এক জরুরি জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে শান্তি চুক্তি সই হওয়ার আগেই বিশেষ অধিবেশন ডেকে চুক্তির খসড়া নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা করার জন্য সরকারকে আহবান জানান।
এরশাদের বারিধারাস্থ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর, প্রেসিডিয়াম সদস্য সরদার আমজাদ হোসেন ও মাহবুবুল হক দুলন, ভাইস চেয়ারম্যান ও তথ্য উপদেষ্টা ফকির আশরাফ, ঢাকা মহানগরী জাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সিনহা এম.এ. সাঈদ প্রমুখ।

এরশাদ বলেন, এ কথা আজ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি শান্তি চুক্তিতে উপনীত হওয়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। কিন্তু এ শান্তি চুক্তি নিয়ে দেশে তুলকালাম কাণ্ড শুরু হয়েছে। একটি দল দেশ বিক্রির অভিযোগ তুলেছে। তারা বলছে এ চুক্তি হলে চট্টগ্রাম বন্দর চলে যাবে, ফেনী ও সিলেট থাকবে না। এর ফলে জনমনে যে বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর হওয়া দরকার। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ের সংসদীয় কমিটিতে সংসদের সকল দলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আমি ও আমার দল সংসদীয় নিয়ম নীতির ওপর শ্রদ্ধাশীল। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের জন্যে যেমন সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে, ঠিক তেমনি শান্তি আলোচনার স্বচ্ছতার স্বার্থেই আমি জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সংসদে খসড়া চুক্তি পেশ করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাই। এ আলোচনার প্রয়োজনে এক দিনের জন্যে হলেও সংসদের বিশেষ অধিবেশন আহবান করা উচিত।

এরশাদ বলেন, সংবিধানে আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে পেশ করার বিধান লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এটি একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে যখন একে কেন্দ্র করে নানান ধরনের কথা ছড়ানো হচ্ছে, তখন সকল বিভ্রান্তি নিরসনের জন্যেই সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে সেখানে খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির অন্বেষায় জাতীয় পার্টির সরকারের আমলে তাঁর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের বর্ণনা দিতে গিয়ে এরশাদ বলেন, মনে করি একটি স্বাধীন দেশের কোন একটি এলাকায় একটানা হাঙ্গামা, খুনোখুনি চলতে থাকবে, এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। কারণ অশান্তি, হানাহানি, পারস্পরিক শত্র“তা জনগণের জন্যে কল্যাণকর নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে লাভজনক নয়, বরং দেশ ও জাতির জন্যে ধ্বংসাত্মক। বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের ৯০ভাগ মানুষ শান্তি চায় এবং দেশের ৭০ ভাগ জনমতই শান্তি চুক্তির সপক্ষে। ১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবরে প্রথম ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে আমার সরকার পার্বত্য সমস্যার সমাধানে শুভ উদ্যোগ শুরু করেন এবং ক্রমাগত যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে ১৯৮৫ সালের ২৯ এপ্রিল এ দেশে প্রথম সরকার ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৮৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রথম সরকার ও জনসংতির মধ্যে বৈঠক বসে। আজ দীর্ঘ একযুগ পরেও সেই আলোচনা অব্যাহত আছে। এমনকি বিগত সরকারের আমলেও একটি শান্তি চুক্তির জন্যে ১৩বার বৈঠক করা হয়েছে। সুতরাং বর্তমান সরকারও যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা পূর্বসুরিদের নিকট থেকে পেয়েছেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে এরশাদ প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও শান্তি চুক্তির ব্যাপারে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এরপরে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এরশাদ লিখিত বক্তব্যে বলেন,  “বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সমাধানের প্রক্রিয়ার প্রতি সমগ্র জাতির দৃষ্টি নিবন্ধ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। পার্বত্য জনগণও রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা, সমস্যা সমাধানে পারস্পরিক আস্থার অভাব এবং সমতল ভূমির সাথে পাহাড়ী জনগণের জীবন, জীবিকা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সৃষ্টি ব্যবস্থানের পরিণতিই বর্তমান সংকটের কারণ। বাংলাদেশের সর্ব পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত পাহাড় ও বন সম্পদে সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনিকভাবে ৩টি জেলা যথা, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়ি জেলার মর্যাদা লাভ করে ১৯৮৩ সালে। ১৯৪৭ সালে র‌্যাডক্লিফের রোয়েদাদ অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয় ১৯৪৭ সালের ২০ আগষ্ট। বৃটিশ আমলে ১৩টি উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনকার্য পরিচালিত হয়ে আসছিল ১৯০০ সালের হিল ম্যানুয়েল দ্বারা। এরপর প্রথমবারের মতো আমার সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক এলাকায় বিভক্ত করে।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার হিল ম্যানুয়েল বাতিল করেন। যাতে তাদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি ছিল এবং জমির উপর তাদের অধিকার প্রদান করা হয়েছিল। পাকিস্তান সরকারের একাধিক সিদ্ধান্ত উপজাতীয়দের ক্ষুব্ধ করে তোলে। কাপ্তাই বাঁধ হাজার হাজার পার্বত্যবাসীকে ভিটা মাটি থেকে উচ্ছেদ করে এবং কাপ্তাই হ্রদে ভেসে যায় চাকমা রাজার প্রাসাদ। এতে তারা খুবই বিক্ষুব্ধ হয়। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে ১৯৭০ সালে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য এমএন লারমা ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। শান্তিবাহিনী জনসংহতি সমিতিরই সশস্ত্র বাহিনী। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাহাড়ি বাঙ্গালি, জাতি-উপজাতির পার্থক্য ভুলে যাওয়ার আহবান জানিয়ে রাঙ্গামাটির স্টেডিয়ামে নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন। অবশ্য বাকশাল গঠনের পর এমএন লারমা এবং চানখোয়াই রোয়াজা, চারু বিকাশ চাকমা এবং অনন্ত বিহারী খীসা বাকশালে যোগদান করেন।

১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ আত্মগোপন করেন। এমএন লারমার নেতৃত্বে বিক্ষিপ্তভাবে সশস্ত্র আক্রমণ শুরু হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় সমতল ভূমির জনগণ বসতি স্থাপন কর্মসূচি শুরু করে। এরপরই শান্তিবাহিনী সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। দুই দশক ধরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জড়িয়ে পড়ে। যার ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার পাহাড়ি, বাঙ্গালি ও সেনা-পুলিশ-বিডিআর সদস্য নিহত হয়েছে এবং ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
…..পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশের একযুগ অতিবাহিত হয় উপজাতীয়দের সমস্যার গভীরতা উপলব্ধির অভাবে। বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ জনঅধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালির বসতির অনুপাত ৪২ ভাগ। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে দেশবাসীর অবগতির জন্যে আজ একথা তুলে ধরা অত্যন্ত প্রয়োজন মনে করি যে এদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এবং প্রত্যক্ষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সাথে জড়িত থেকে আমিই প্রথম উপলব্ধি করি-পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ অস্ত্র নয়; আলাপ-আলোচনা এবং সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান। পার্বত্যবাসীর সমস্যার এই উপলব্ধি থেকেই তাদের জীবনের মান উন্নয়ন শুরু করি। তাই একদিকে আলাপ-আলোচনা, পাশাপাশি সমগ্র এলাকায় উন্নয়নের নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করি।
১৯৮৩ সালে শতবর্ষের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে তিনটি প্রশাসনিক জেলায় রূপান্তরিত করি। ১৯৮৪ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্যে পাঁচসালা পরিকল্পনা ঘোষণা করি। আমার শাসনকালে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ মীমাংসার উদ্যোগ গ্রহণ করি। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার চালু করে জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয় এবং ৮টি সাবজেক্ট স্থানীয় সরকার পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো:
ক) চিরকালের অবহেলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্যে ৪৫০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করে এক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। রাঙ্গামাটি-দীঘিনালা, রাঙ্গামাটি-আলীকদম কক্সবাজার-টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের সাথে সকল পার্বত্য জেলার যোগাযোগের জন্যে রাস্তা নির্মাণ।
খ) পুনর্বাসন কর্মসূচি ও জরুরি সাহায্য প্রদান এবং আত্মসমর্পণকারীদের গৃহ নির্মাণসহ স্থায়ী বসবাসের সকল প্রকার সুযোগ দান।
গ) চাকরি প্রদান এবং ঐ এলাকার প্রায় ৫০০ শিক্ষিত যুবক-যুবতির ইন্টারভিউ ছাড়াই চাকরির সংস্থান। এদের অধিকাংশই বর্তমানে উচ্চ বেতনে চাকরিরত।
ঘ) টেলিফোন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশ-বিদেশের সাথে যুক্ত করা হয়।
ঙ) পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের নতুন জেয়ার সৃষ্টি করা।
চ) পার্বত্য চট্টগ্রাম কালচারাল একাডেমী গঠন করে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করা।
ছ) সাঙ্গু ভ্যালি প্রজেক্ট করা।
জ) পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকরিরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শতকরা ৩০ ভাগ বর্ধিত বেতন প্রদান করা হয়। এতে কর্মকর্তাগণ উৎসাহিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিতে নিজেদের নিয়োজিত করেন।”

এরশাদ বক্তব্যে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে চুক্তির খসড়া পেশ করার প্রস্তাব ছাড়াও অন্য কয়েকটি প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের জন্যে সরকার ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে সম্পাদিত যে কোন চুক্তি সংবিধানের আলোকে সম্পাদিত করাই হবে দেশবাসীর একান্ত কাম্য।
সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সেনাবাহিনীর অবস্থান নিশ্চিত করা শান্তির জন্যে একান্ত প্রয়োজন বলে মনে করি।
এই শান্তি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যে এবং পার্বত্য এলাকায় সকল শ্রেণীর মানুষের মন থেকে আতংক, ভীতি, সংশয় মোচনের জন্যে মাননীয় রাষ্ট্রপতি বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যগণ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে অস্ত্র সর্ম্পণ করবেন, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। সাথে সাথে সরকার দীর্ঘ উদ্বাস্তু জীবনের অবসান ঘটিয়ে তাদের স্থায়ীভাবে তাদের নিজস্ব আবাসভূমে পুনর্বাসন করবেন- এটাই আমাদের কামনা “
এরশাদ সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের যে উত্তর দেন তা প্রশ্নসহ সংক্ষিপ্তভাবে নিচে দেয়া হলো:

প্রশ্ন: পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে দেশ বিক্রি হয়ে যাবে বলে বিএনপি অভিযোগ করেছে। এ সম্পর্কে আপনি কি বলেন?
এরশাদ: আমি ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে আমার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও সর্বশেষ পরিস্থিতির উপর আলোকপাত করে বলেছি আজ এ সত্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি শান্তি চুক্তিতে উপনীত হওয়াই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ। আমরা দাবি করেছি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সংবিধান ও সমতার ভিত্তিতে এই চুক্তি হতে পারে। সেখানে বিএনপি দেশ বিক্রির অভিযোগ করেছে। শান্তি চুক্তি হলে কিভাবে দেশ বিক্রি হয়ে যাবে, একথা তারা বলছেন না। অথচ তাদের সরকারের আমলেও তারা শান্তি চুক্তি করার জন্যে কম চেষ্টা করেননি। তারা সফলকাম হননি, ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু দেশের মানুষ শান্তি চুক্তি চায়, জনমত এই চুক্তির পক্ষে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। সেখানে যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে শান্তি ছাড়া তা আহরণ করা সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণে বাধা প্রদান দেশপ্রেমিক কাজ নয়।
প্রশ্ন: আপনার লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে জিয়ার কিছু পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় শান্তিবাহিনী সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। আপনি ঐ সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে জিয়ার ভূমিকাকে কি সঠিক মনে করেছিলেন?
এরশাদ: সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেনারেল জিয়াই নীতি নির্ধারণ করতেন। গেরিলা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা প্রতিরোধ যুদ্ধ করার জন্যে জিয়া আমাদের নির্দেশ দেন। সেনা প্রধান হিসেবে আমি তা পালন করেছি। জিয়ার নীতি সঠিক ছিল কিনা বলতে পারবো না। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল পর্যায়ক্রমে অ-উপজাতীয়দের পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে সেটেল করানো। তাহলে ধীরে ধীরে পাহাড়িদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে যাবে। তিনি হয়তো ভালো উদ্দেশ্যেই এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগেনি। আরেকটি কথা, আমার শাসনামলে একজন অ-উপজাতীয়কেও সেখানে পুনর্বাসন করিনি।
প্রশ্ন: শান্তি চুক্তি সই হওয়ার পর অ-উপজাতীয় বাঙ্গালিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
এরশাদ: হিল ম্যানুয়েলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জমির ওপর পাহাড়িদের অধিকার স্বীকৃত ছিল। কিন্তু সরকার অ-উপজাতীয়দের খাস জমি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের জমি দেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে এ জমিতে বসবাস করে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছেন। তারা ভোটারও হয়েছেন। তাই তাদের মেইন ল্যান্ডে ফিরিয়ে আনা ঠিক হবে না।
প্রশ্ন: দীঘিনালা থেকে অনেক অ-উপজাতীয় বাঙ্গালিকে জোর করে উচ্ছেদ করার বিষয়ে কিছু বলেন?
এরশাদ: বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সেটলার অ-উপজাতীয়দের মনে এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। চুক্তি সই হলে তাদের কি হবে। এ বিষয়টি সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা বিধান সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাদের ওপর যেন কোন হুমকি সৃষ্টি না হয়। তাহলে সবার জন্যেই সমস্যা সৃষ্টি হবে।
প্রশ্ন: চুক্তি সই হওয়ার সুযোগে বিদেশি মদদে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতার লড়াই শুরু হবে বলে কি মনে করেন?
এরশাদ: আমার মনে হয় হবে না।
প্রশ্ন: শান্তিবাহিনীর সাথে ভারত জড়িত আছে কি?
এরশাদ: ভারত এর সাথে জড়িত বলে মনে করি না। অন্য দেশে ইনসার্জেন্সি করা বোকামী।
প্রশ্ন: সমতার ভিত্তিতে চুক্তি বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন?
এরশাদ: চুক্তিতে যেন পাহাড়ি ও অ-উপজাতীয়দের মধ্যে কোন বৈষম্য সৃষ্টি না হয়।
প্রশ্ন: চুক্তি সই হলেই কি পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্ত হবে?
এরশাদ: শান্ত হবে কি না এখনই বলা যাবে না। তবে শান্তি চুক্তি হওয়া উচিত।
 (সূত্র: দৈনিক জনতা ২৪ নভেম্বর ১৯৯৭)

২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ বিএনপি সমাবেশ করে পার্বত্য এলাকায়। শান্তি চুক্তির খসড়া চেয়ে চিঠি দেয় জনসংহতি সমিতি। বিএনপির চালায় হরতাল। পক্ষের কর্মসূচি হিসেবে সরকারের শান্তি সমাবেশ অব্যাহত থাকে।
স্বাধীনতার উত্তরকাল থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একনিষ্ঠ ও নিরলস প্রচেষ্টা, আত্মত্যাগ ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সফলভাবে বাংলাদেশের সার্বভৈামত্ব রক্ষা করে চলেছে। যার ফলশ্রুতিতে আন্দোলনকারীরা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় যুদ্ধ বিরতি পালন করে এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের ফলে সৃষ্ট অনুকূল পরিবেশে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারের সাথে শান্তি চুক্তি করতে বাধ্য হয়। এতে বলা হয়-
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার আদিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্ন বর্ণিত চারি খণ্ড (ক, খ, গ ও ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন:
ক) সাধারণ
১। উভয়পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করিয়া এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছে;
২। উভয়পক্ষ এই চুক্তির আওতায় যথাশীঘ্র ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐকমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হইবে বলিয়া স্থিরিকৃত করিয়াছেন;
৩। এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করিবার লক্ষ্যে নিম্নে বর্ণিত সদস্য সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হইবে;
(ক) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য :আহবায়ক
(খ) এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান : সদস্য
(গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি : সদস্য
৪। এই চুক্তি উভয়পক্ষের তরফ হইতে সম্পাদিত ও সহি করার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয়পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

খ) পার্বত্য জেলা স্থানীয় পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ
উভয় চুক্তিতে বলবৎ হওয়া পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, বান্দরবন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯) এবং এর বিভিন্ন ধারাসমূহের নিম্নে বর্ণিত পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করার বিষয়ে ও লক্ষ্যে একমত হইয়াছেন;
১। পরিষদের আইন বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকিবে।
২। ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ এর নাম সংশোধন করিয়া তদপরিবর্তে এই পরিষদ ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে অভিহিত হইবে।
৩। ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’ বলিতে তিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।
৪। ক) প্রতিটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মহিলাদের জন্য ৩ (তিন)টি আসন থাকিবে। এসব আসনের এক তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয়দের জন্য হইবে।
খ) ৪ নম্বর উপ-ধারা ১, ২, ৩ ও ৪- মূল আইন মোতাবেক বলবৎ থাকিবে।
গ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৫) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনারের’ শব্দগুলির পরিবর্তে যথাক্রমে ‘সার্কেল চিফ’ এবং ‘সার্কেল চিফের’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপিত হইবে।
ঘ) ৪ নম্বর ধারায় নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে। ‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌরসভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চিফ স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে সার্কেল চিফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসেবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হইতে পারিবেন না।
৫। ৭ নম্বর ধারায় বর্ণিত আছে যে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য পদে নির্বাচিত ব্যক্তি তাহার কার্যভার গ্রহণের পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন। ইহা সংশোধন করিয়া ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের’Ñএর পরিবর্তে ‘হাইকোর্ট ডিভিশনের কোন বিচারপতি’ কর্তৃক সদস্যরা শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন’ অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে।
৬। ৮ নম্বর ধারার চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের নিকট’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘নির্বাচন বিধি অনুসারে’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৭। ১০ নম্বর ধারার দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘তিন বৎসর’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘পাঁচ বৎসর’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৮। ১৪ নম্বর ধারায় চেয়ারম্যানের পদ কোন কারণে শূন্য হইলে বা তাহার অনুপস্থিতিতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
৯। বিদ্যমান ১৭নং ধারা নিম্নে উল্লেখিত বাক্যগুলি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইবে ঃ আইনের আওতায় কোন ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারিবেন যদি তিনি (১) বাংলাদেশের নাগরিক হন; (২) তাহার বয়স ১৮ বৎসরের কম না হয়; (৩) কোন উপযুক্ত আদালত তাহাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা না করিয়া থাকেন; (৪) তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।
১০। ২০ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারায় ‘নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ’ শব্দগুলি স্বতন্ত্রভাবে সংযোজন করা হইবে।
১১। ২৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এ পরিষদের সকল সভায় চেয়ারম্যান এবং তাহার অনুপস্থিতিতে অন্যান্য সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
১২। যেহেতু খাগড়াছড়ি জেলার সমস্ত অঞ্চল মং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত নহে, সেহেতু খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আইনে ২৬ নং ধারায় বর্ণিত ‘খাগড়াছড়ি মং চিফ’- এর পরিবর্তে ‘মং সার্কেলের চিফ এবং চাকমা সার্কেলের চিফ’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে। অনুরূপভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চিফেরও উপস্থিত থাকার সুযোগ রাখা হইবে। একইভাবে বান্দরবান জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চিফ ইচ্ছা করিলে বা আমন্ত্রিত হইলে পরিষদের সভায় যোগদান করিতে পারিবেন বলিয়া বিধান রাখা হইবে।
১৩। ৩১ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) ও উপ-ধারা (২) এ পরিষদে সরকারের উপ-সচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সচিব হিসেবে থাকিবেন এবং এই পদে উপজাতীয় কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৪। ক) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এ পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্তে পরিষদ সরকারের অনুমোদনক্রমে বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ সৃষ্টি করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
খ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) সংশোধন করিয়া নিন্মোক্তভাবে প্রণয়ন করা হইবেঃ ‘পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবে এবং তাহাদেরকে বদলী ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।’
গ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ পরিষদের অন্যান্য পদে সরকার পরিষদের পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী কর্তকর্তা নিয়োগ করিতে পারিবে এবং এই সকল কর্মকর্তাকে সরকার অন্যত্র বদলী, সাময়িক বরখাস্ত, অপসারণ অথবা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৫। ৩৩ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখ থাকিবে।
১৬। ৩৬ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১)-এর তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন প্রকারে’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
১৭। ক) ৩৭ নম্বর ধারার (১) উপ-ধারার চতুর্থত, এর মূল আইন বলবৎ থাকিবে।
খ) ৩৭ নম্বর ধারার (২) উপধারা (ঘ) তে বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লিখিত হইবে।
১৮। ৩৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) বাতিল করা হইবে এবং উপ-ধারা (৪) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ কোন অর্থ-বৎসর শেষ হইবার পূর্বে যে কোন সময় সেই অর্থ-বৎসরের জন্য, প্রয়োজন হইলে, একটি বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন করা হইবে।
১৯। ৪২ নম্বর ধারায় নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে: পরিষদ সরকার হইতে প্রাপ্য অর্থে হস্তান্তরিত বিষয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিতে পারিবে এবং জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিষদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করিবে।
২০। ৪৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পরিষদ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২১। ৫০, ৫১ ও ৫২ নম্বর ধারাগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে নিম্নোক্ত ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ এই আইনের উদ্দেশ্যের সহিত পরিষদের কার্যকলাপের সামঞ্জস্য সাধনের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে সরকার প্রয়োজনে পরিষদকে পরামর্শ প্রদান বা অনুশাসন করিতে পারিবেন। সরকার যদি নিশ্চিতভাবে এইরূপ প্রমাণ লাভ করিয়া থাকে যে, পরিষদ বা পরিষদের পক্ষে কৃত বা প্রস্তাবিত কোন কাজ-কর্ম আইনের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে অথবা জনস্বার্থের পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিষদের নিকট হইতে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাহিতে পারিবে এবং পরামর্শ বা নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।
২২। ৫৩ ধারার (৩) উপ-ধারা ‘বাতিল থাকার মেয়াদ শেষ হইলে’ শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘এই আইন’ শব্দটির পূর্বে ‘পরিষদ বাতিল হইলে নব্বই দিনের মধ্যে’ শব্দগুলি সন্নিবেশ করা হইবে।
২৩। ৬১ নম্বর ধারার তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মন্ত্রণালয়ের’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৪। ক) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপধারাটি প্রণয়ন করা হইবে ঃ আপাতঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্নস্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবে এবং পরিষদ তাহাদের বদলী ও প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।
খ) ৬২ নম্বর উপ-ধারা (৩) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘আপাতত বলবৎ অন্য সকল আইনের বিধান সাপেক্ষে’ শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘যথা আইন ও বিধি অনুযায়ী’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৫। ৬৩ নম্বর ধারার তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সহায়তা দান করা’ শব্দগুলি বলবৎ থাকিবে।
২৬। ৬৪ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারাটি প্রণয়ন করা হইবেঃ
ক) আপাতঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, সংরক্ষিত (জবংবৎাবফ) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
খ) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
গ) পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবে।
ঘ) কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাসা জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদের বন্দোবস্ত দেওয়া হইবে।
২৭। ৬৫ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবেঃ
আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জেলার ভূমি উন্নয়নকর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হস্তে ন্যস্ত থাকিবে এবং জেলায় আদায়কৃত উক্ত কর পরিষদের তহবিলে থাকিবে।
২৮। ৬৭ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবেঃ
পরিষদ এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বা পরিষদ নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করিবে এবং পরিষদ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাজের সমন্বয়ের বিধান করা যাইবে।
২৯। ৬৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিন্মোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে এবং কোন বিধি প্রণীত হওয়ার পরেও বিধি পুনর্বিবেচনার্থে পরিষদ কর্তৃক সরকারের নিকট আবেদন করিবার বিশেষ অধিকার থাকিবে।
৩০। ক) ৬৯ ধারার উপ-ধারা (১) এর প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে’ শব্দগুলি বিলুপ্ত এবং তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘করিতে পারিবে’ এই শব্দগুলির পরে নিন্মোক্ত অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে :
তবে শর্ত থাকে যে, প্রণীত প্রবিধানের কোন অংশ সম্পর্কে সরকার যদি মতভিন্ন পোষণ করে তাহা হইলে সরকার উক্ত প্রবিধান সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে বা অনুশাসন করিতে পারিবে।
খ) ৬৯ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২)-এর (জ) এ উল্লেখিত ‘পরিষদের কোন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অর্পণ’- এই শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩২। ৭৯ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে: পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য জাতীয় সংসদ বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত কোন আইন পরিষদের বিবেচনায় উক্ত জেলার জন্য কষ্টকর হইলে বা উপজাতীয়দের জন্য আপত্তিকর হইলে পরিষদ উহা কষ্টকর বা আপত্তিকর হওয়ার কারণ ব্যক্ত করিয়া আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করিবার জন্য সরকারের নিকট লিখিত আবেদন পেশ করিতে পারিবে এবং সরকার এই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিবে।
৩৩। ক) প্রথম তফসিলে বর্ণিত পরিষদের কার্যাবলীর ১ নম্বর ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটি পরে ‘তত্ত্বাবধান’ শব্দটি সন্নিবেশিত করা হইবে।
খ) পরিষদের কার্যাবলীর ৩ নম্বরে নিন্মোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন করা হইবে ঃ (১) বৃত্তিমূলক শিক্ষা; (২) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা ও (৩) মাধ্যমিক শিক্ষা।
গ) প্রথম তফসিলে পরিষদের কার্যাবলীর ৬ (খ) উপ-ধারায় সংরক্ষিত বা শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩৪। পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বাদির মধ্যে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত হইবে ঃ (ক) ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা; (খ) পুলিশ (স্থানীয়); (গ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার; (ঘ) যুব কল্যাণ; (ঙ) পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন; (চ) স্থানীয় পর্যটন; (ছ) পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান; (জ) স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদান; (ঝ) কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ ব্যতীত অন্যান্য নদী-নালা, খাল-বিলের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সেচ ব্যবস্থা; (ঞ) জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান সংরক্ষণ; (ট) মহাজনী কারবার; (ঠ) জুম চাষ।
৩৫। দ্বিতীয় তফসিলে বিবৃত পরিষদ কর্তৃক আরোপনীয় কর, রেইট, টোল এবং ফিস-এর মধ্যে নিম্নে বর্ণিত ক্ষেত্র ও উৎসাদি অন্তর্ভুক্ত হইবে ঃ (ক) অযান্ত্রিক যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন ফি; (খ) পণ্য ক্রয়-বিক্রেয়ের উপর কর; (গ) ভূমি ও দালানকোঠার উপর হোল্ডিং কর; (ঘ) গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের উপর কর, (ঙ) সামাজিক বিচার ফিস; (চ) সরকারি ও বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর হোল্ডিং কর; (ছ) বনজ সম্পদের উপর রয়্যালিটির অংশ বিশেষ; (জ) সিনেমা, যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদির উপর সম্পূরক কর;  (ঝ) খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিস্কর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুজ্ঞাপত্র বা পাট্টাসমূহ সূত্রে প্রাপ্ত রয়্যালিটির অংশ বিশেষ; (ঞ) ব্যবসার উপর কর; (ট) লটারীর উপর কর; (ঠ) মৎস্য ধরার উপর কর।

গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ
১। পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করিবার লক্ষ্যে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ইং (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১ নং আইন)-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজন সাপেক্ষে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হইবে।
২। পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন যাহার পদমর্যাদা হইবে একজন প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ এবং তিনি অবশ্যই উপজাতীয় হইবেন।
৩। চেয়ারম্যানসহ পরিষদ ২২ (বাইশ) সদস্য লইয়া গঠন করা হইবে। পরিষদের দুই/তৃতীয়াংশ সদস্য উপজাতীয়দের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইবে। পরিষদ ইহার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিবেন।
পরিষদের গঠন নিম্নরূপ হইবে:
চেয়ারম্যান                            ১ জন
সদস্য উপজাতীয় (পুরুষ)        ১২ জন
সদস্য উপজাতীয় (মহিলা)         ২ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (পুরুষ)    ৬ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (মহিলা)    ১ জন
উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ৫জন নির্বাচিত হইবেন চাকমা উপজাতি হইতে, ৩জন মার্মা উপজাতি হইতে, ২ জন ত্রিপুরা উপজাতি হইতে, ১ জন মুরং ও তনচৈঙ্গ্যা উপজাতি হইতে এবং ১ জন লুসাই, বোম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং উপজাতি হইতে।
অ-উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের মধ্য হইতে প্রত্যেক জেলা হইতে ২জন করিয়া নির্বাচিত হইবেন।
উপজাতীয় মহিলা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকমা উপজাতি হইতে ১জন এবং অন্যান্য উপজাতি হইতে ১জন নির্বাচিত হইবেন।
৪। পরিষদের মহিলাদের জন্য ৩ (তিন)টি আসন সংরক্ষিত রাখা হইবে। এক/তৃতীয়াংশ অ-উপজাতীয় হইবে।
৫। পরিষদের সদস্যগণ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হইবেন। তিন পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যানগণ পদাধিকার বলে পরিষদের সদস্য হইবেন এবং তাহাদের ভোটাধিকার থাকিবে। পরিষদের সদস্য প্রার্থীদের যোগ্যতা পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার অনুরূপ হইবে।
৬। পরিষদের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বৎসর হইবে। পরিষদের বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন, পরিষদ বাতিলকরণ, পরিষদের বিধি প্রণয়ন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয় ও পদ্ধতি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে প্রদত্ত ও প্রযোজ্য বিষয় ও পদ্ধতির অনুরূপ হইবে।
৭। পরিষদের সরকার যুগ্ম-সচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা থাকিবেন এবং এই পদে নিযুক্তির জন্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হইবে।
৮। ক) যদি পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয় তাহা হইলে অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য পরিষদের অন্যান্য উপজাতীয় সদস্যগণের মধ্য হইতে একজন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন।
খ) পরিষদের কোন সদস্যপদ যদি কোন কারণে শূন্য হয় তবে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে তাহা পূরণ করা হইবে।
৯। ক) পরিষদ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বয় সাধন করাসহ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন ও উহাদের উপর অর্পিত বিষয়াদি সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে। ইহা ছাড়া অর্পিত বিষয়াদির দায়িত্ব পালনে তিন জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কিংবা কোনরূপ অসংগতি পরিলক্ষিত হইলে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া পরিগণিত হইবে।
খ) এই পরিষদ পৌরসভা, স্থানীয় পরিষদসমূহ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে।
গ) তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিবে।
ঘ) পরিষদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ এনজিওদের কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে।
ঙ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে।
চ) পরিষদ ভারি শিল্পের লাইসেন্স করিতে পারিবে।
১০। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পরিষদের সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবে। উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন।
১১। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন বিধি ও অধ্যাদেশের সাথে ১৯৮৯ সনের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের যদি কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হয় তবে আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে সেই অসঙ্গতি আইনের মাধ্যমে দূর করা হইবে।
১২। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করিয়া তাহার উপর পরিষদের প্রদেয় দায়িত্ব দিতে পারিবেন।
১৩। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিতে গেলে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে ও উহার পরামর্শক্রমে আইন প্রণয়ন করিবেন। তিনটি পার্বত্য জেলার উন্নয়ন ও উপজাতীয় জনগণের কল্যাণের পথে বিরূপ ফল হইতে পারে এইরূপ আইনের পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে পরিষদ সরকারের নিকট আবেদন অথবা সুপারিশমালা পেশ করিতে পারিবেন।
১৪। নিন্মোক্ত উৎস হইতে পরিষদের তহবিল গঠন হইবে:
ক) জেলা পরিষদের তহবিল হইতে প্রাপ্ত অর্থ;
খ) পরিষদের উপর ন্যস্ত এবং তৎকর্তৃক পরিচালিত সকল সম্পত্তি হইতে প্রাপ্ত অর্থ বা মুনাফা;
গ) সরকার বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের ঋণ ও অনুদান;
ঘ) কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
ঙ) পরিষদের অর্থ বিনিয়োগ হইতে মুনাফা;
চ) পরিষদ কর্তৃক প্রাপ্ত যে কোন অর্থ;
ছ) সরকারের নির্দেশে পরিষদের উপর ন্যস্ত অন্যান্য আয়ের উৎস হতে প্রাপ্ত অর্থ।
ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী Ñ
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা পুনঃস্থাপন এবং এই লক্ষ্যে পুনর্বাসন, সাধারণ  ক্ষমা প্রদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কার্য এবং বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ নিম্নে বর্ণিত অবস্থানে পৌঁছিয়াছেন এবং কার্যক্রম গ্রহণে একমত হইয়াছেন:
১। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ১৯৯৭ইং তারিখ এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ১৯৯৭ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
২। সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন ও উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপকাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি ক্রয় সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চূড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভুক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।
৩। সরকার ভূমিহীন বা দুই একরের কম জমির মালিক উপজাতীয় পরিবারের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করিতে পরিবার প্রতি দুই একর জমি স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে বন্দোবস্ত দেওয়া নিশ্চিত করিবেন। যদি প্রয়োজনমত জমি পাওয়া না যায় তাহা হইলে সেই ক্ষেত্রে টিলা জমির (গ্রোভল্যান্ড) ব্যবস্থা করা হইবে।
৪। জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে।
৫। এই কমিশন নিম্নোক্ত সদস্যদের লইয়া গঠন করা হইবে:
ক) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
খ) সার্কেল চিফ (সংশ্লিষ্ট);
গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি;
ঘ) বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত কমিশনার;
ঙ) জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সংশ্লিষ্ট)
৬। ক) কমিশনের মেয়াদ তিন বৎসর হইবে। তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শক্রমে ইহার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাইবে।
খ) কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।
৭। যে উপজাতীয় শরণার্থীরা সরকারের সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন অথচ বিবদমান পরিস্থিতির কারণে ঋণকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
৮। রাবার চাষের ও অন্যান্য জমি বরাদ্দ: যে সকল অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিদের রাবার বা অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য জমি বরাদ্দ করা হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে যাহারা গত দশ বছরের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেন নাই বা জমি সঠিক ব্যবহার করেন নাই সে সকল জমির বন্দোবস্ত বাতিল করা হইবে।
৯। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করিবেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়িত করিবেন এবং সরকার এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করিবেন। সরকার এই অঞ্চলে পরিবেশ বিবেচনায় রাখিয়া দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ যোগাইবেন।
১০। কোটা সংরক্ষণ ও বৃত্তি প্রদান ঃ চাকুরী ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সরকার উপজাতীয়দের জন্য সরকারি চাকুরি ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখিবেন। উপরোক্ত লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য সরকার অধিক সংখ্যক বৃত্তি প্রদান করিবেন। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় বৃত্তিপ্রদান করিবেন।
১১। উপজাতীয় কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সচেষ্ট থাকিবেন। সরকার উপজাতীয় সংস্কৃতির কর্মকান্ডকে জাতীয় পর্যায়ে বিকশিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা করিবেন।
১২। জনসংহতি সমিতি ইহার সশস্ত্র সদস্যসহ সকল সদস্যের তালিকা এবং ইহার আয়ত্তাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫দিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করিবেন।
১৩। সরকার ও জনসংহতি সমিতি যৌথভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমাদানের জন্য দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করিবেন। জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমাদানের জন্য দিন তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করার পর তালিকা অনুযায়ী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারবর্গের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্য সব রকমের নিরাপত্তা প্রদান করা হইবে।
১৪। নির্ধারিত তারিখে যে সকল সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিবেন সরকার তাহাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করিবেন। যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা আছে সরকার ঐ সকল মামলা প্রত্যাহার করিয়া নিবেন।
১৫। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কেহ অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হইলে সরকার তাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
১৬। জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর তাহাদেরকে এবং জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপের সাথে জড়িত স্থায়ী বাসিন্দাদেরকেও ক্ষমা প্রদর্শন করা হইবে।
ক) জনসংহতি সমিতির প্রত্যাবর্তনকারী সকল সদস্যকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিবার প্রতি এককালীন ৫০,০০০/- টাকা প্রদান করা হইবে।
খ) জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া জারি অথবা অনুপস্থিতিকালীন সময়ে বিচারে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে, অস্ত্রসমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর যথাশীঘ্র সম্ভব তাহাদের বিরুদ্ধে সকল মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা এবং হুলিয়া প্রত্যাহার করা হইবে এবং অনুপস্থিতকালীন সময়ে প্রদত্ত সাজা মওকুফ করা হইবে। জনসংহতি সমিতির কোন সদস্য জেলে আটক থাকিলে তাহাকেও মুক্তি দেওয়া হইবে।
গ) অনুরূপভাবে অস্ত্র সমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর কেবলমাত্র জনসংহতি সমিতির সদস্য ছিলেন কারণে কাহারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা শাস্তি প্রদান বা গ্রেফতার করা যাইবে না।
ঘ) জনসংহতি সমিতির যে সকল সদস্য সরকারের বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু বিবদমান পরিস্থিতির জন্য গৃহীত ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই তাহাদের উক্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
ঙ) প্রত্যাগত জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মধ্যে যাহারা পূর্বে সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত ছিলেন তাহাদেরকে স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করা হইবে এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকুরীতে নিয়োগ করা হইবে। এইক্ষেত্রে তাহাদের বয়স শিথিল সংক্রান্ত সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হইবে।
চ) জনসংহতি সমিতির সদস্যদের কুটির শিল্প ও ফলের বাগান প্রভৃতি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের সহায়তার জন্য সহজশর্তে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে।
ছ) জনসংহতি সমিতির সদস্যগণের ছেলেমেয়েদের পড়াশুনার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হইবে এবং তাহাদের বৈদেশিক বোর্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট বৈধ বলিয়া গণ্য করা হইবে।
১৭। ক) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনাবাহিনী (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলী কদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হইবে এবং এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হইবে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীন সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাইবে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করিতে পারিবেন।
খ) সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে।
১৮। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারি, আধা-সরকারি পরিষদীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হইবে। তবে কোন পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী আদিবাসীদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকিলে সরকার হইতে প্রেষণে অথবা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে উক্ত পদে নিয়োগ করা হইবে।
১৯। উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য নিম্নে বর্ণিত উপদেষ্টা কমিটি গঠন হইবে।
১) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
২) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ
৩) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
৪) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
৫) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ
৬) সাংসদ, রাঙ্গামাটি
৭) সাংসদ, খাগড়াছড়ি
৮) সাংসদ, বান্দরবান
৯) চাকমা রাজা
১০) বোমাং রাজা
১১) মং রাজা।
১২) তিন পার্বত্য জেলা হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত পার্বত্য এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিনজন অ-উপজাতীয় সদস্য।

এই চুক্তি উপরোক্তভাবে বাংলা ভাষায় প্রণীত এবং ঢাকায় ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪০৪ সাল মোতাবেক ০২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং তারিখে সম্পাদিত ও সইকৃত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে            পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে
             স্বাক্ষর                                                         স্বাক্ষর
    আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ                             জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা
           আহবায়ক                                                    সভাপতি
    পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি               পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
    বাংলাদেশ সরকার।                                       

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ নভেম্বর খাগড়াছড়ি আসছেন : ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে

Sheikh-Hasina-Best-Pic

মুজিবুর রহমান ভুইয়া / মো: আবুল কাশেম :

আগামী ১১ নভেম্বর আওয়ামীলীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়ী জেলা খাগড়াছড়িতে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে। সফরকালে তিনি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ছাড়াও খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগ আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেবেন।

এদিকে একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী খাগড়াছড়িতে পৌছেই জালিয়াপাড়ায় নির্মিত ৫০ শয্যার বিজিবি হাসাপাতাল, মাটিরাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশনসহ কয়েকটি বাস্তবায়নকৃত উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন। তবে তবে এখনও পর্যন্ত সবকিছু চুড়ান্ত করা না হলেও আজ সোমবার জেলার সকল কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে সবকিছু চুড়ান্ত করা হবে বলেও সূত্রটি জানান।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সর্বশেষ গত ১৯৯৮ সালের ১০ জানুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তৎকালীন শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর তিনি আর খাগড়াছড়িতে আসেননি। তাই এবার তার খাগড়াছড়ি সফর অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী’র আগমনকে সফল ও স্বার্থক করার লক্ষ্যে গতকাল রবিবার বিকালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের রেস্ট হাউসে জেলা আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদক মন্ডলীর এক প্রস্তুতি সভায় অনুষ্ঠিত হয়। খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা‘র সভাপতিত্বে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক এস.এম শফিসহ সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শতাধিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিকাল তিনটায় শুরু হয়ে প্রস্তুতি সভাটি শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টার দিকে।

খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পাজেপ চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা পার্বত্যনিউজকে জানান, প্রধানমন্ত্রী’র খাগড়াছড়ি সফর উপলক্ষে জেলা আওয়ামীলীগ ও সকল সহযোগী সংগঠন ব্যাপক প্রস্ততি গ্রহণ করেছে এবং এ জনসভায় ব্যাপক লোক সমাগমের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সকল ইউনিটকে বলা হয়েছে। জেলা আওয়ামীলীগের একাধিক সুত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত জনসভার স্থান চুড়ান্ত করা না হলেও খাগড়াছড়ি সরকারি হাই স্কুল মাঠে জনসভা করার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে।

এদিকে ১১ নভেম্বর বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এদিন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি ও মহাজোট নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন খাগড়াছড়িবাসীর জন্য মাইলফলক বলে মন্তব্য করেন খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কে এম ইসমাইল হোসেন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘকাল যাবত পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির ১৭বছর প্রধানমন্ত্রী’র খাগড়াছড়ি সফরে আসছেন বলে আওয়ামীলীগের তৃনমুল নেতাকর্মীরা খুবই উজ্জীবিত। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাকালে নেতাকর্মীরা কিছুই না পেলেও প্রধানমন্ত্রীকে খাগড়াছড়ি পাবেন এটাই তাদের সবচেয়ে খুশির বিষয় বলে খাগড়াছড়ি জেলা যুবলীগের এ শীর্ষ নেতা মনে করেন।

বিএনপি ও খালেদা জিয়ার প্রতি সমর্থন জানালেন সঙ্গীত শিল্পী ন্যান্সি

76201_37

বিনোদন ডেস্ক:

সময়ের অন্যতম কণ্ঠ শিল্পী ন্যান্সির রাজনৈতিক স্ট্যাটাস নিয়ে সর্বত্র বইছে আলোচনার ঝড়। সোমবার রাতে তিনি ফেসবুক স্ট্যাটাসে এই প্রথম নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। সমর্থন জানিয়েছেন বিএনপির প্রতি, প্রশংসা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দেয়া সর্বশেষ বক্তব্যের। স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। আজ বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুনলাম। আমি এবং আমার পরিবার সব সময় বিএনপিকে সাপোর্ট করেছি। কিন্তু আজ বিএনপির পক্ষপাতিত্ব করে নয়, বাংলাদেশের একজন সাধারণ এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি বেগম খালেদা জিয়ার সুস্পষ্ট, সুচিন্তিত, জনহিতকর বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাই। সেসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে যারা অন্যায় করেছেন বা করছেন তাদের প্রতি তিনি (বেগম জিয়া) যে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দেখিয়েছেন সেটাও নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’

একই স্ট্যাটাসের পরের অংশে নাজমুন ন্যান্সি আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করে লিখেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহারকারী শেখ হাসিনার জন্য নয়, দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের কারণে যারা আওয়ামী লীগকে সাপোর্ট করেছেন, তাদের সকল অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করেছেন; এখনি সময় প্রতিবাদ করার। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের মিথ্যাচারের কবল থেকে মুক্তি চায়। তাই এবার শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বিএনপি জয়লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।’ এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমার আসল ফেসবুক আইডি। এ স্ট্যাটাস আমি লিখেছি। আমি জেনে-বুঝেই আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ করেছি। এবং যৌক্তিকভাবেই কিছু সমালোচনা করেছি। এটা নিয়ে চারদিকে এতো আলোচনার কি আছে?

ন্যান্সি বলেন, এ স্ট্যাটাস দেয়ার পর আমি সেই অর্থে কমেন্ট পাইনি ফেসবুকে। তবে অসংখ্য ফোন পাচ্ছি। যাদের সবাই আমার শুভাকাঙক্ষী। সবার একটাই কথা- এটা আমি কি লিখলাম! এটা আমি কেন লিখলাম? এটার কারণে আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। এ স্ট্যাটাস আমাকে এখনই ডিলিট করতে হবে। অনেকে আমাকে এমনও পরামর্শ দিয়েছেন, এখনই (মঙ্গলবার সকালে) আমি যেন সরি বলে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে স্ট্যাটাস লিখি। আমি আমার অতি ব্যক্তিগত বিষয়টাও প্রচার করবো অথচ আমার রাজনৈতিক ভাবনা প্রকাশ করলে রি রি পড়ে যাবে চারদিকে, এমন হিপোক্র্যাসি আমার পছন্দ নয়। ন্যান্সি বলেন, রাজনৈতিক মত প্রকাশের কারণে শ্রোতারা যদি আমার গান না শোনেন, আমাকে গান গাইতে না ডাকেন, যদি জাতীয় পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হই, যদি বিটিভির কালো তালিকায় পড়ে যাই, তাতে আমার কোন সমস্যা নেই। যারা আমাকে কাছ থেকে চেনেন, দেখেছেন, তারা জানেন আমি এমনই।