image_pdfimage_print

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা হত্যার বিচার দাবী উচ্চকিত নয় কেন?

পারভেজ হায়দার

১০ নভেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সন্তু লারমার ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের পরিক্রমা পরিবর্তনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ওরফে এমএন লারমা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । উপজাতীদের একাংশ তাকে জুম্ম জাতির পিতার ন্যায় শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে, অপর অংশ এমএন লারমা সংক্রান্ত বিষয়দি সব সময়ে এড়িয়ে যেতে চায় । এমএন লারমাকে উপজাতিদের বড় অংশ সব সময়ে আলোচনার বাহিরে রাখতে পারলেই প্রশান্তি বোধ করে, আর এটাও ঠিক বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমএন লারমার হাত ধরেই “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দলটি গড়ে উঠেছিল, আবার এমএন লারমার হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন “শান্তি বাহিনী” গড়ে উঠেছিল ।

ব্যক্তি জীবনে এমএন লারমা উপজাতীদের অধিকার আদায়ে একজন প্রথম সারির নেতা ছিলেন, তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন । তিনি কেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ পূনর্গঠনে ব্যস্ত তৎকালীন সরকারকে তাদের দাবি দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট সময় না দিয়ে, সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক পথ অর্থাৎ সশস্ত্র দল গঠন করে স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ জনগনের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সূচনা করেছিলেন সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে এমএন লারমার বির্তকিত ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনার আগে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক । তার জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে রাঙ্গামাটি’র চাকমা উপজাতির একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে । তিনি ১৯৫৬ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন । পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৬৩ সালে একই কলেজ থেকে তিনি বিএ পাশ করেন । তিনি ১৯৬৮ সালে কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে থেকে বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন ।

পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং চট্টগ্রাম জেলা বার এর একজন সদস্য আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ।

পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই এমএন লারমা উপজাতিদের বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষাজনিত আন্দোলনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতেন । তিনি ১৯৫৬ সালে “জুমিয়া স্টুডেন্ট মুভমেন্ট” গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে পার্বত্য অঞ্চলের যুবকদের নিয়ে একটি সংগঠন “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি” গঠন করেন ।

১৯৬০ সালে কাপ্তাই হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হবার পর এমএন লারমার পরিবার রাঙ্গামাটি থেকে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে স্থানান্তরিত হয় । তাকে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী তারিখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে গ্রেফতার করে ।

পরবর্তীতে দুই বছর পর তিনি ৮ মার্চ ১৯৬৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে উপজাতিদের অধিকার সমুন্নত রাখার আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে তার অনুসারীদের এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে সচেষ্ট হন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এমএন লারমা’র জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে । ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেন ।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের বিতর্কিত ভূমিকা সর্বজনবিদিত । তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন । তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

সে প্রেক্ষিতে এমএন লারমা চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকমা এলাকাগুলোতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হতে থাকে । পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে মুক্তিযোদ্ধাগণ সেখানে গিয়ে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন । দেশে ফেরার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে একযোগে কাজ করা শুরু করেন । পুরো জাতি যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনগঠনে ব্যস্ত তখন এমএন লারমা ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দল গঠন করেন ।

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির এই পরিক্রমায় হঠাৎ করেই এমএন লারমা ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র শাখা “শান্তিবাহিনী” গঠন করেন । বিষয়টি নিয়ে একটি জনশ্রুতি ছিল যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত পিস কমিটির কমিটির চিন্তাধারা থেকেই এর বাংলা প্রতিশব্দ “শান্তিবাহিনী” নামটির উৎপত্তি হতে পারে । “শান্তিবাহিনী” নামকরণের পিছনে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য বেশকিছু মতামত রয়েছে । কোন কোন গবেষক মনে করেন এটি এমএন লারমার ছোট ভাই সন্তু লারমা’র নামের প্রথম অংশ ‘সন্তু’ তথা শান্তি থেকে এ নামকরণ করা হয়েছে । কবি ও লেখক আহমদ ছফা’র মতে “শান্তিবাহিনী” অনেকটা তৎকালীন চরমপন্থী তথা “সর্বহারা পার্টি” দ্বারা প্রভাবিত ।

তখন চীনাপন্থী বিভিন্ন চরমপন্থী দলের নেতাকর্মী পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে থাকতেন । পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নেতারা তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন । সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার তার “জনযুদ্ধের পটভূমি” নামক কবিতার বই এ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের গেরিলা সংগ্রামে নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেছিলেন ।

এমএন লারমা গোপনে “শান্তিবাহিনীর” সশস্ত্র দলের প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও  চালিয়ে যাচ্ছিলেন । ১৯৭৩ সালে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কর্তৃক বাকশাল গঠন করা হলে এমএন লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন । অর্থাৎ তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি দেশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন ।

এমএন লারমা চীনাপন্থী কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তার সহযোদ্ধা ও অনুসারীরা সকলেই একই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না । তাই ১৯৭৬ সালেই শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয় ।

শান্তিবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রীতি কুমার চাকমা চীনাপন্থী কমিউনিজম এর সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন । ১৯৭৬ সালে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৮১ সালের মধ্যে শান্তিবাহিনীর বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে । সেপ্টেম্বর ১৯৮১, আগস্ট ১৯৮২, এবং জুলাই ১৯৮৩ সালে এমএন লারমা গ্রুপ এবং প্রীতি গ্রুপের মধ্যে বেশ কয়েকবার বড় ধরণের সংঘর্ষ হয় । ঐ সংঘর্ষসমূহে শতাধিক শান্তিবাহিনী সদস্য নিহত হয়েছিলেন ।

এরই মধ্যে  ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে সীমান্তের ওপারে ইমারা গ্রামের বাঘমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যাণপুর ক্যাম্পে প্রীতি গ্রুপের সদস্যদের হামলায় এমএন লারমা নিহত হন । এমএন লারমার সাথে সে সময়ে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অর্পণা চরণ চাকমা, কল্যাণময় চাকমা এবং লে. রিপনসহ শান্তিবাহিনীর ৮জন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান । একই সময়ে শান্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ৬-৭ জন কেন্দ্রীয় নেতাও এ হামলায় আহত হয়েছিলেন ।

কল্যাণপুর ক্যাম্পের অপারেশন এর ঘটনা সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, প্রীতি গ্রুপের ক্যাপ্টেন এলিন এর নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একটি সশস্ত্র দল লারমা গ্রুপের ক্যাম্পে অতর্কিত সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায় । ঐ সময়কার ঘটনাবলী সম্পর্কে আরও জানা যায়, একই দিনে মতিবান পুলিশ ক্যাম্প হতে ১ মাইল পূর্বে প্রীতি গ্রুপ এমএন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমণ চালায়, যদিও এ আক্রমণে কেউ হতাহত হয়নি ।

এমএন লারমা হত্যাকাণ্ডে পর তার অনুজ সন্তু লারমা জন সংহতি সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন । তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আজ অবধি কোথাও কোন মামলা হয়নি অথবা লারমা গ্রুপ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি । এমএন লারমাকে হত্যা করার বিষয়টির সত্যতা থাকার পরও এ বিষয়ে কোন আন্দোলন অথবা প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেনি ।

অন্যদিকে কল্পনা চাকমার বিষয়টির প্রচারিত গল্পের কোন সত্যতা বা ভিত্তি না থাকলেও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কল্পনা চাকমা অপহরণ দিবস ও বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে যা উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর স্ববিরোধী ভূমিকারই বহিঃপ্রকাশ ।

তবে কি এমএন লারমার বিষয়ে উপজাতি নেতৃবৃন্দ তাদের নেতৃত্বের আন্তঃকলহকে দায়ী করছেন? নাকি এমএন লারমা’র হত্যার পর যেসকল উপজাতি ব্যক্তিবর্গ উচ্চ নেতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন, তাদেরও কিছুটা পরোক্ষ ইন্ধন ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী সময়ই বলে দিবে ।

এভাবেই এমএন লারমার মত একজন প্রতিভাবান উপজাতি নেতা হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে । তবে তার মাধ্যমে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কার্যক্রম এবং এর ফলশ্রুতিতে অসংখ্য জীবনহানির ঘটনা ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত থাকবে ।

যে সময়টাতে এমএন লারমা “শান্তিবাহিনী” গঠন করে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করেছিলেন সে সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের ভাষায় তথাকথিত সেটেলার বাংগালীগণ অবস্থান করতে শুরু করেনি । “শান্তিবাহিনী”র ব্যনারে গেরিলা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার পূর্বে এমএন লারমা এবং তার অনুসারীদের উচিত ছিলো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরা।

এমএন লারমা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ করেলেও তিনি যেহেতু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন, তার উচিত ছিলো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকারকে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া । কিন্তু তিনি তা না করে, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিজ দেশের জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু করেছিলেন যা তাকে “গ্রেট লিডার” বলাতো দুরের কথা তাকে ইতিহাসের একজন “খল নায়ক” হিসেবে পরিগণিত করাই সমীচীন হবে ।

উপজাতী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তার মৃত্যু দিবস পালনে যথেষ্ট বিতর্ক ও বিভক্তি রয়েছে । তার আপন ভাই পার্বত্য জনসংহতি সমিতি এর সভাপতি সন্তু লারমাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং ইউপিডিএফ নেতৃবৃন্দদের মধ্যে কাউকে তার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া এবং তার সম্পর্কে আলোচনা করতে খুব একটা দেখা যায় না । শুধুমাত্র জেএসএস (সংস্কার) দলটি জেএসএস (এমএন লারমা) হিসাবে নিজেদের পরিচিত করে “এমএন লারমার” নামের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন দিবসে কর্মসূচি দিয়ে থাকে এবং এ দিবস পালনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকে।

এমএন লারমার জীবনের সার্বিক বিষয় মূল্যায়নে বলা যায় তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব যিনি দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্ম দিয়েছেন, যার প্রতিফল হিসাবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে চরমভাবে মূল্য দিতে হয়েছে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ।

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।)

চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

Yunus

বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত অজস্র হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোন হত্যাকান্ডের নৃসংশতা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোকেও হারমানায়। পাকুয়াখালী ট্রাজেডি এই নৃসংশ গণহত্যাগুলোরই একটি। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ঘটিয়েছিল পার্বত্য ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় পালিয়ে আসতে পেরেছিল মুহাম্মদ ইউনুছ মিয়া নামের এক ভাগ্যবান। সেদিনের সেই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা ইউনুছ মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সৈয়দ ইবনে রহমত।

প্রঃ কি করছিলেন?
উঃ গায়ে জ্বর, শুইয়া আছিলাম।

প্রঃ কতদিন যাবৎ জ্বর? ওষুধপত্র খাচ্ছেন না?
উঃ দুইদিন ধইরা জ্বর। ভাই, ওষুধপাতি খাইয়া কি অইব। জ্বরের লাগি ওষুধ খাইলেই কি আর না খাইলেই কি। এই বাড়ে-এই কমে, ওষুধ খাওন লাগব না, দুই দিন পরে এমনেই সাইরা যাইব।

প্রঃ আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো পাকুয়াখালী হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানা।
উঃ এইসব কইয়া লাভ কি? কতই তো কইলাম। আর্মি, পুলিশ, সিআইডির অফিসার, সাংবাদিক, আরো কতজনের লগে কইছি। কই, কিছুইতো অইল না। এইসব কইয়া আর মনের জ্বালাটা বাড়াইয়া লাভ কি?

প্রঃ আপনারা তো জানতেন যে, পাহাড়ে শান্তিবাহিনী আছে, তারা বাঙালির দেখা মাত্রই গুলি করে। তারপরও পাহাড়ে যাওয়ার সাহস পেলেন কিভাবে?
উঃ ভাই, শখ কইরা কেউ কী আর মরণের সামনে যায়? পেটের দায়ে যাওন লাগে। পাহাড়ে যাওন ছাড়া আর তো বাঁচনের পথ নাই। সামান্য জমি-জমা যা আছে এইডাও তো কোন বছর চাষ কইরা ঘরে তোলা যায় না। কাপ্তাই বান্ধের পানি আইসা ডুবাইয়া দেয়। তাই বাধ্য অইয়াই পাহাড়ে যাওন লাগে। আর পাকুয়াখালীর ঘটনার সময়তো কোন ভয় আছিল না। তখন শান্তিবাহিনীর লগে আমাদের চুক্তি আছিল। আমরা তাদেরকে ১ ফুট (এক ঘনফুট) গাছের বিনিময়ে ৪০/৫০ টাকা কইরা চান্দা দিতাম।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে কখন থেকে টাকার বিনিময়ে গাছ কাটার চুক্তি হয়েছিল?
উঃ পাকুয়াখালীর ঘটনার ৫/৬ বছর আগে একদিন বড় মাহিল্যার তক্তা নজরুল (লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের কারণে তাকে লোকজন তক্তা নজরুল নামে চিনত) আমাদের কইল, পাহাড়ে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহিনীরা আর বাঙালিরে গুলি করব না। কিন্তু তাদেরকে চান্দা দিতে অইব। তারপর থাইক্যা শুরু অইল গাছ কাটা। আগের থাইক্যাই চাকমাদের লগে নজরুল ভাইয়ের বালা সম্পর্ক আছিল। চাকমাদের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে হে যাইত, আবার চাকমারাও হের বাড়ীতে আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তারাই তক্তা নজরুলরে দিয়া চান্দার মাধ্যমে গাছ কাটার খবর দিছিল।

প্রঃ চাঁদা দিয়া যখন গাছ কাটতেন, তখন আপনাদের সাথে শান্তিবাহিনী কেমন আচরণ করত?
উঃ এমনিতে তারা কোন খারাপ আচরণ করত না। তবে তাদের আইন কানুন আছিল খুব কড়া। যেই দিন যা কইতো, তাই করতে অইতো। কেউ কথা না হুনলে মাইর-ধোর করতো, পাহাড়ে যাওন বন্ধ কইরা দিত।

প্রঃ আপনারা যেখানে গাছ কাটতে যেতেন, সেখানকার চাকমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ আমরা যেখানে গাছ কাটতে যাইতাম সেখানে অনেক চাকমা বসবাস করত। এদের কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তবে বেশির ভাগই ছিল আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তারাও আমাদের সাথে গাছ কাটত। স্থানীয় এইসব চাকমাদের লগে আমাদের বালা সম্পর্ক আছিল। তারা আমাদের ঈদ-পরবের সময় বেড়াইতে আইত। আমরাও বিজুর (চাকমাদের বাৎসরিক উৎসব) সময় তাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতাম। অনেক সময় পাহাড়ে কোন গন্ডগোলের ভাব থাকলে তারা আমাদেরকে আগেই জানাইয়া দিত।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে স্থানীয় চাকমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ শান্তিবাহিনীরা স্থানীয় চাকমাদের উপরেও অত্যাচার করতো, ওদের কাছ থাইকয়াও চান্দা নিত। সামান্য ভুল-ত্রুটি অইলে বা তাদের কথামতো না চললে মাইর-ধোর করতো। কতজনরে তো গুলি কইরা মাইরাও ফালাইছে। শান্তিবাহিনীর খাওন-খোরাক অনেক সময় বাজার থাইক্যা কিইন্যা পাহাড়ে গিয়া দিয় আইতে অইতো। তাই স্থানীয় চাকমারা কৌশলে শান্তিবাহিনীর কালেক্টরদেরকে বিপদে ফালাইয়া তাড়ানোর চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মদ-টদ খাওয়াইয়া মাইয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ফালাইতো, আবার কোন কোন সময় টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল লাগাইয়া শান্তিবাহিনীর বড় অফিসারের কাছে নালিশ করতো। এমনও সময় গেছে যখন এক মাসের মধ্যে তিন-চারজন কালেক্টর বদল হইছে।

প্রঃ দুই মাসের চাঁদা বাকি পড়ায় শান্তিবাহিনী ব্যবসায়ীদেরকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না যাওয়ায় তারা ক্ষেপে গিয়ে এই হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল বলে অনেকে মনে করে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
উঃ এইডা একটা ফালতু কথা। ব্যবসায়ীরা পাহাড়েও যায় না। পাহাড়ে গিয়া কখনো চান্দা দেয় না। পাহাড়ে যাই আমরা। কাঠ বলেন, বাঁশ বলেন, তার চান্দা প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় দিয়াই আনতে হইত। কোন দিনের চান্দাই বাকি থাকত না।

প্রঃ ব্যবসায়ীদের কথা বলছি-
উঃ ব্যবসায়ীরা তাদের মাল (কাঠ, বাঁশ) নেওনের সময় রাস্তায় রাস্তায় চান্দা দেয়। চান্দা ছাড়া ১ ফুট গাছ নেওনের ক্ষেমতাও ব্যবসায়ীদে নাই। চান্দা বাকী রাইখ্যা শান্তিবাহিনী গাছ নিতে দিছে এই কথা জীবনেও শুনি নাই। ব্যবসা করতে চাইলে তাদেরকে চান্দা দেওনই লাগবো। আর হেগোর লাইগ্যা আমাদের মতন গরীব মানুষেরে মারব ক্যান্?

প্রঃ এতগুলো মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
উঃ জানি না ভাই। কি জন্য যে মারল, হেইডাই তো কইতে পারি না। ওরা ভাই বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর, তক্তা নজরুলরে পর্যন্ত মাইরা ফালাইল। যে নিজে না খাইয়াও হেগোরে খাওয়াইছে, কত বিপদ থাইক্যা উদ্ধার করছে।

প্রঃ ঘটনার দিন পাহাড়ে গিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?
উঃ ঐদিন আমার পোলাগো মোসলমানির (খৎনা করার) কথা আছিল। তাছাড়া শরীরটাও বেশি বালা আছিলনা। কিন্তু আলাল ভাই (স্ত্রীর বড় ভাই) কইল, পাহাড়ে যাওনের লাগি। একরকম জোরের মধ্যেই আমি আলাল ভাইয়ের লগে রওনা হইলাম। অফিস ছড়া দিয়া পাহাড়ে ঢুকলাম। কেচিং (একটা জায়গার নাম) থাইক্যা সামান্য উপরে একটা দোকান। দোকানে দেখলাম তিনজন শান্তিবাহিনী অস্ত্র নিয়া বইসা আছে। এইডাতে অবশ্য সন্দেহ করি নাই। এই রকমতো মাঝে মধ্যেই দেখতাম। আলাল ভাইয়ের সাথে গ্যানো চাকমার ছোটখাট ব্যবসা আছিল। আলাল ভাই তার জন্য কিছু টাকা নিয়া গেছিল। টাকা দেওনের লাগি আলাল ভাই যখন গ্যানো চাকমার সাথে কথা কইতেছিল তখন কালু চাকমা এবং তার সাথের কয়েকজন আইসা কইল, মিটিং আছে, ভিতরে যাইতে অইব। তখন আলাল ভাই কইল, গ্যানো বদ্দা, তোমার টাকা মিটিং থাইক্যা আসার সময় দিব। কিন্তু গ্যানো চাকমা, টাকাটা তখনই লইতে চাইছিল। কালু চাকমা আলাল ভাইরে কইল, যাওনের সময় দিয়া যাওনের লাইগ্যা।

প্রঃ প্রথম কখন বুঝতে পারলেন যে, কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে?
উঃ কালু চাকমার সাথে কিছুদূর যাইতেই দেখি রাস্তার দুই পাশে চার জন করে মোট আট জন এসএম জি নিয়া বইসা আছে। আমরা কাছে যাওন মাত্রই আমাদেরকে ঘিরে ফালাইল। এই অবস্থা দেইখ্যাই আমার প্রথম মনে অইল যে, আজকে আমাদেরকে মাইরা ফালাইব। পকেট থাইক্যা টাকা পয়সা সব রাইখ্যা কালু চাকমা আর তার লগের একজন আমাদের হাত পিছ-মোড়া কইরা গাছের লতা দিয়া বানল। বান্ধার সময় কইল মিটিংয়ের জায়গা নিয়া বান ছাইড়া দিব। তখন আমি কইলাম ছাইড়াই যখন দিবা, তখন অত শক্ত কইরা বান্ধনের দরকার কী, আমরাতো পালাইতেছি না। আমিও হাত এমন ভাবে রাখলাম যাতে বান বেশি শক্ত না হয়।

প্রঃ আপনাদের বেঁধে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে কি দেখলেন?
উঃ ১৫/২০ মিনিট হাইট্টা ভিতরে যাওনের পর দেখলাম একাটা মেড়া গাছের লগে তক্তা নজরুলসহ ৪ জন বান্ধা। সামনেই অন্যান্য গাছের লগে আরো মানুষ বান্ধা। গুনে দেখলাম আমিসহ ২৯ জন। এলএমজি ও এসএমজি হাতে পাহাড়া দিতেছে ১৯ জন শান্তিবাহিনী। আর লাঠি, দা, কুইচ্যা মারা শিক হাতে আরো ১২ জন চাকমা আছে, এদের মধ্যে কয়েকজনরে আমি চিনি। তারা হল- লাম্পায়া চাকমা, ছিক্কা কারবারী, বলি চাকমা, শান্তিময় চাকমা, বাবুল চাকমা, গুলুক্যা চাকমা, তরুন চাকমা(কালেক্টর), কবির চাকমা, বাশি চাকমা, বিমল চাকমা এবং সমিতি রঞ্জন চাকমা। এক সময় শান্তিবাহিনীর একজন একটা খাতা ও কলম নিয়া আমাদের সবার নাম লিখল এবং কার কাছ থাইক্যা রাস্তায় কত টাকা এবং কি কি জিনিস পত্র রাখা হইছে তা লিখল।

প্রঃ বাঁধা অবস্থা থেকে আপনি পালালেন কিভাবে?
উঃ কিছুক্ষণ পর কালাপাকুইজ্যার ৫ জনরে গাছের থাইক্যা দড়ি খুইল্লা আরো সামনের দিকে লইয়া গেল। তাদের সাথে গেল ২ জন অস্ত্রধারী আর ৩ জন গেল দা, লাঠি, কুইচ্যা মারার শিক নিয়া। ১০/১২ মিনিট পর নজরুল ভাইসহ আরো ৫ জনরে নিয়া গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নজরুল ভাই আর যাইতে চাইতেছে না। তখন একজন তারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া নিয়া গেল। তখনই বুঝলাম যে, লোকজনেরে সামনে নিয়া মাইরা ফালাইতেছে। কারণ নজরুল ভাইরে ঘাড়ে ধরা দূরের কথা. তার লগে গরম অইয়াও চাকমাদেরকে কথা কইতে কোন দিন দেহি নাই। তখন আমি একজনরে কইলাম, দাদা আমি একটু পেশাব করব। উনি এবং আরেক জন আমাকে একটু দূরে নিয়া গেল। পেশাবের ছল কইরা কিছুক্ষণ বইসা থাইক্যা মনে মনে ঠিক করছিলাম খাড়াইয়াই দৌড় দিমু। কিন্তু যখন খাড়াইলাম, তখন ঠাস কইরা বাঁকা একটা বাঁশের লগে মাথাটা বাড়ি লাগল। তখন আমার সাথের শান্তিবাহিনী দুইজন সর্তক হইয়া গেল। আমি মাথা হাতাইতে হাতাইতে আবার আগের জায়গায় আইলাম। আমারে আবার অন্যদের লগে বানল। তখন খুব লুকাইয়া লুকাইয়া আমি আমার হাতের বান খুইলা ফালাইলাম এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেই জন্য হাতের নিচে চাইপ্যা রাখলাম। তারপর আল্লাহর নাম লইয়া দিলাম এক দৌড়।

কিন্তু সামনেই দেখি এলএমজি নিয়া একজন খাড়াইয়া রইছে। আমারে কইল, দৌড় দিবিনা, ব্রাশ কইরা দিমু, তখন আমি ডান পাশের ছড়ার দিকে লাফ দিলাম। লাফ দেয়ার সাথে সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম, আর শব্দ শুনতে শুনতেই গড়ায়ে পড়লাম নিচের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের গুড়ির দিকে গর্তমতো জাগা পাইলাম। সেইখানে বইসা মাথার উপরে জঙ্গল টাইন্যা ধইরা রাখলাম। ভয়ে তখন আমার বুকের মধ্যে এমন জোরে আওয়াজ অইতেছিল যে, মনে হইছিল এই শব্দ না জানি শান্তিবাহিনী শুইনা ফালায়। রাত হওয়ার পর ছড়া দিয়াই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ছড়ার মধ্যে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি, আবার কোথাও সাঁতার। ঘন জঙ্গলে ভরা ছড়া দিয়ে চলবার মত কোন পথ নাই। তার উপর আবার নিশি অন্ধকার। ছড়ার মধ্যে ঠান্ডা পানি, বেতের কাঁটা, বিষাক্ত সাপ, হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল। কিন্তু তখন এক শান্তিবাহিনী ছাড়া আর কিছুকেই ভয় হচ্ছিল না। সারা রাত হেঁটে হেঁটে অবশেষে ভোরের দিকে পাহাড় থেকে বের হই।

প্রঃ ১১ তারিখ সেনাবাহিনীর লাশ উদ্ধারের কথা কিছু বলুন।
উঃ বাড়িতে আসার পর আর্মিরা যহন জানল যে আমাকেও শান্তিবাহিনী ধরে নিয়া গেছিল। তহন তারা আমাকে সাথে নিয়া গেল পথ দেখানোর জন্য। আমি তাদের পাহাড়ে নিয়া গেলাম। তক্তা নজরুলরে যেইখানে ঘাড়ে ধাক্কা দিছিল, সেইখান থাইকা আরেকটু সামনে গিয়া দেখলাম, বাম দিকে প্রায় এক-দেড়’শ গজ পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া। নিচে নাইমা সেই বেড়া পার হইলাম। কিন্তু তারপর আর রাস্তার কোন চিহ্ন নাই। একটু দূরে দেখলাম, একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি আধা ভাঙ্গা অবস্থায় ঝুইলা রইছে। কঞ্চিটা সরানোর পর একটা ছোট পথ পাইলাম। এই পথ দিয়া সামনে গিয়া দেখি সরাফদ্দি ভাইয়ের টুপিটা একটা কঞ্চির লগে বাইজ্যা রইছে। এরপর সেন্ডেল, মদের টেংকি, বেশ কয়ডা লাঠিও দেখলাম। তারপর দেখলাম আলাল ভাইয়ের লাশ। আরেকটু সামনে গিয়া দেখি বিশাল জায়গা জুইড়া লাশ আর লাশ। কেউরে চিনা যায় না। বন্দুকের সামনে যে চাকুটা (বেয়নেট) থাকে এইডা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া মারছে। লাঠি দিয়া পিটাইয়া, দা দিয়া কুবাইয়া, কুইচ্যা মারার শিক দিয়া পারাইয়া, চোখ তুইলা, আরো কতভাবে যে কষ্ট দিয়া মারছে তা কইয়া শেষ করুন যাইব না। ঐকথা মনে অইলে আইজো শরীরের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐখানে লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের।

Pakuakhali-4

Pakuakhali-2

Pakuakhali-

pakuakhali-00

ছবি: পাকুয়াখালিতে নিহত কয়েকজন কাঠুরিয়ার লাশ

প্রঃ মানুষ মারা গিয়েছিল ৩৫ জন,  আপনি বলছেন লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের। বাকিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উঃ ঘটনার দিন আমি যাদেরকে বান্ধা অবস্থায় দেখছিলাম তাদের মধ্যে আমার পরিচিত আলী, দুলু দুই ভাইসহ ৪ জনের লাশ ঐখানে ছিল না। আর এমন তিনজনের লাশ পাইছি যারা ঐ দিন ঐখানে বান্ধা ছিল না। আমার মনে হয়, আমি পালানোর পরে আরো সাত জনরে শান্তিবাহিনীরা ধইরা নিয়া গেছিল। সাত জনরে মনে হয় অন্য কোন খানে নিয়া মারছে, আমরা তাদের লাশ খুইজ্জা বাইর করতে পারি নাই। আর বালা কইরা খুজবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।

প্রঃ শান্তিবাহিনী এতগুলো মানুষকে একসাথে হত্যা করল, অথচ তাদের কোন বিচার হল না। আপনারা কি সরকারের কাছে এর বিচার চান নাই?
উঃ আমরাতো বিচারের দাবী করছিই, আমি নিজে বাদী অইয়া মামলাও করছিলাম। তখন সরকারের মন্ত্রীরাও কইছিল বিচার করব। তদন্তও করছিল। হুনছি তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে আজ ১৪ বছর পার অইয়া গেল। কই, কিছুই তো অইল না। শুধু এইডাই না, শান্তিবাহিনী তো আরো অনেক বাঙালিরে মারছে। কোনডারই তো বিচা অয় নাই। চাকমারা মানুষ মারলে তো এই দেশে বিচার অয় না। বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে, তার। আর অহন তো চুক্তি কইরা শান্তিবাহিনীরাই সরকার (সাবেক শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা চুক্তির পর থেকে পার্বত্যচট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন) অইছে। তাইলে আর বিচার করব কেডা?

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবী, আপনার বাবাকেও মাইরা ফালাইছিল। বাবা হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। আর আপনি সেই হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। এই জন্য আপনাকেই বলি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকুয়াখালীতে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে তারাও তাদের বাবা হত্যার বিচার চায়, যারা সেখানে ভাই হারিয়েছে তারা তাদের ভাই হত্যার বিচার চায়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছে তারা সন্তান হত্যাকারীর বিচার চায়, যেসব মহিলা স্বামী হারিয়েছে তারা স্বামী হত্যার বিচার চায়। কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হইয়া আত্বীয়-স্বজনদের হত্যাকারীর বিচার করতে পারব না। তাই এই হত্যাকান্ডের বিচার আপনাকেই করতে হইব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী দেশের একমাত্র বীরউত্তম শহীদ লে. মুশফিকের আত্মত্যাগের কাহিনী

শহীদ লে মুশফিক

ডি এইচ খান:

৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯, রাত তখন আড়াইটা। লে. মুশফিকের রেডিয়াম হাত ঘড়িটা সময় জানান দিচ্ছে। ঠিক চার ঘন্টা আগে লক্ষীছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে ১৭ জন রেইডার্স নিয়ে চেলাছড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেছিলেন তিনি। ক্যাম্প থেকে আসতে আসতে অনেক চড়াই উতরাই পার হতে হয়েছে। পাহাড়ী পথ দুর্গম, বিপদসংকুল। কিন্তু অতি উৎসাহে স্বাভাবিক সময়ের অনেক আগেই তারা পৌঁছে গেলেন লক্ষ্যস্থলে। সেদিনের মেঘলা আবহাওয়াও যেন তাদেরই অনুকূলে। কিন্তু পরিস্থিতি যেন হাতছাড়া না হয়, সেজন্য সিন্দুকছড়ি ক্যাম্প থেকেও সেকেন্ড লেঃ সাইদ আর একটি দল নিয়ে উল্টাছড়ি গ্রামের পাশে পজিশন নেন। শত্রুর সাথে সংঘর্ষ এখন শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। সোর্সের সহায়তায় পাহাড়ের পাদদেশে আর চূড়ায় দুটি জুম ঘর শনাক্ত করলেন লে. মুশফিক।

সোর্সের ভাষ্যমতে, এ দুটি ঘরেই সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অবস্থান করার কথা। দুটো উপদলকে পাহাড়ের পাদদেশে পজিশন নিতে বলে নিজে ৫ জনসহ চলে গেলেন পাহাড়ের চূড়ায়। জুম ঘর থেকে মাত্র পাঁচ গজ দূরে লে. মুশফিক শুয়ে আছেন তার দলসহ। এখন শুধু প্রতিপক্ষের অপেক্ষা। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে দেখা হয়ে গেল দুই পক্ষের। মুহূর্তের মধ্যে রণক্ষেত্র হয়ে গেল সেই পাহাড়চূড়া। শুরু হয়ে গেল ভয়ানক যুদ্ধ। শত্রুর প্রথম বুলেটটাই নিজের বুকে নিলেন লে. মুশফিক। যুদ্ধ শেষ করে সবাই লে. মুশফিকের চারপাশে ডিফেন্স নিলো। উদ্ধার হলো শান্তিবাহিনীর ইউনিফর্ম পড়া তিনটি মৃতদেহ, দুটো রাইফেল, একটি এসএমজি। গোলাগুলির শব্দ পেয়ে লে. সাইদ ততক্ষণে লে. মুশফিকের কাছে পৌছে গেলেন। মুশফিকের মুখ দেখেই বুঝতে পারলেন সময় খুব কম।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির তরুণ অফিসার লে. মুশফিক। ১৯৮৯ সাল, ১ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত। প্রায় প্রতিদিনই শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্নস্থনে সংঘর্ষ চলছিল তখন। কিন্তু এত কিছু উপেক্ষা করেও দেশের জন্য জীবনবাজী রেখে দুঃসাহসী সেনাসদস্যরা নিয়মিত অপারেশন চালিয়ে গিয়েছে। প্রাণঘাতী এক একটা অপারেশন ছিল দুঃসাহসিক বীরত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এদিকে আঁধার কেটে গিয়ে দিবালোক যখন প্রখরতর হয়ে উঠছে, মুমুর্ষ মুশফিকের চারপাশে তখন নিকষ আঁধার ঘনিয়ে আসতে শুরু করেছে। প্রথমে মা, তারপর বাবার মুখ ভেসে উঠল; তারউপর আঁধার মেঘ ফুঁড়ে তিনটা চেনা মুখ উকি দেয়; হাতছানি দিয়ে ডাকে হাবিলদার হারুন, ল্যান্স নায়েক সুনিল আর ডিএমটি নাজমুল হুদা। তখন থেকে ঠিক নয় দিন আগে বাঘাইহাট থেকে ১০ নম্বর ক্যাম্পে যাবার পথে এই শান্তিবাহিনীর পুঁতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে এরা তিনজন প্রাণ হারিয়েছিল। কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে, তবু অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়া রানারকে সান্তনা দিতে গিয়ে মুশফিক বলে উঠেন, “তোমার তো সংসার আছে, পরিবার আছে, তুমি মারা গেলে তাদের কি হবে ? আমি মরলে এদেশের কারো কোন ক্ষতি হবে না।”

৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯, সকাল ৮টা বেজে ১৫ মিনিট । লে. সাইদ ছুটলেন হ্যালিপ্যাড বানাতে। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই হেলিকপ্টার ছুটে এলো। হলুদ উইন্ড শকসটা পতপত করে উড়ছে, দূর দিগন্তে হন্তদন্ত হয়ে উড়ে আসা হেলিকপ্টারটা ক্রমশ বড় দেখাচ্ছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে। মুশফিক ততক্ষণে হারুন, সুনীল আর নাজমুল হুদাদের সাথে মেঘেদের দেশে।

সাতক্ষীরার ছেলে মুশফিক সুদুর পার্বত্য চট্টগ্রামের অচেনা এক সবুজ পাহাড়ে তার রানারের কোলে মাথা রেখে মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। অসহায় রানার থেমে থেমে আক্ষেপে বলে উঠছে, “গুলিটা আমার গায়ে ক্যান লাগল না স্যার ?
৮ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯, দেশমাতৃকার অখন্ডতা রক্ষায় এভাবেই নিজের জীবন বিসর্জন দেন লে. মুশফিক। ২৪ সেপ্টেম্বর তাকে বীরউত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

অপারেশন উত্তরণের পূর্ব পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত ঝু্ঁকিপূর্ণ এবং আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করা। এজন্য সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তাবাহিনীর অনেক সদস্যকে জীবন দিতে হয়েছে। দেশের জন্য অখণ্ডতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সেসকল ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনে গিয়ে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। অনেকে বরণ করে নিয়েছে স্থায়ী পঙ্গুত্ব। এমনই একজন বীর সৈনিক হলেন শহীদ লেঃ মুশফিক বীরউত্তম।

ইনসার্জেন্সী অপারেশনের ইতিহাসে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উল্লে­খযোগ্য নাম। আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি এখন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মূলত এটি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর অতি ক্ষুদ্র অংশের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্টদের উৎখাত করার লক্ষ্যে ১৯৭৩ সাল থেকে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালিত হয়ে আসছে। এজন্য সেসময় থেকেই সেনাবাহিনী বিশেষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে মোতায়েন রয়েছে এবং সেসময় থেকেই তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করে আসছে। এ অপারেশন পরিচালনা করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল অসংখ্য নিরীহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী সম্প্রদায়ের মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। বর্তমানে একই ধরনের কার্যক্রম ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং সংস্কারবাদী দলের সন্ত্রাসীরা সবাই মিলে করছে। তথ্য মতে, শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের আক্রমণে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৫৩ জন প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৫২ জন এবং ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৫ জন। এদিকে ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০৯৬ জনকে হত্যা, ১৮৮৭ জনকে আহত এবং ২১৮৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা এবং শান্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এভাবেই প্রাণ দিয়ে গিয়েছেন আমাদের বীর সেনানিরা। তারা আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার। তাদের দেশপ্রেম, ত্যাগ, বীরত্বগাঁথা ও চেতনা বুকে লালন করে সামনে এগিয়ে যাওয়াই হোক প্রতিটি বাংলাদেশীর ব্রত।

পাকুয়াখালি গণহত্যা: মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-১

আতিকুর রহমান:

আজ পাকুয়াখালী গণহত্যার শোকাবহ স্মৃতি সম্বলিত দিন- ৯ সেপ্টেম্বর।  ১৯৯৬ সালের এই দিনে একদল নিরীহ বাঙ্গালী শ্রমজীবী লোককে বিনা কারণে নির্মমভাবে কুপিয়ে আর অঙ্গচ্ছেদ করে, অতি নৃশংসতার সাথে, শান্তিবাহিনী নামীয় উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা জনমানবহীন গহীন অরণ্যের ভিতর হত্যা করে। এই নিরীহ লোকদের সংখ্যা ছিলো মোট ৩৫ জন। শ্রমই ছিলো তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়। রুজি- রোজগারের সহজ বিকল্প কোন উপায় না থাকায় বনের গাছ, বাঁশ আহরণেই তারা বাধ্য ছিলো।

বনই হলো সন্ত্রাসী শান্তিবাহিনীর আখড়া। জীবিকার তাগিদে ঐ হিংস্র সন্ত্রাসীদের সাথে শ্রমিকরা গোপন সমঝোতা গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। তারা সন্ত্রাসীদের নিয়মিত চাঁদা ও আহরিত গাছ, বাঁশের জন্য মোটা অংকের সালামী দিতো। অনেক সময় মজুরীর বিনিময়ে শান্তিবাহিনীর পক্ষেও গাছ, বাঁশ কাটতো, এবং তা খরিদ বিক্রির কাজে মধ্যস্ততা করতো। ব্যবসায়ীরাও তাদের মাধ্যমে শান্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ ও লেনদেন সমাধা করতো। জীবিকার স্বার্থে তারা ছিলো রাজনীতিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক শ্রমিক মাত্র।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-২

 

শান্তিবাহিনীর রেশন, ঔষধ, পণ্য ও লেনদেন সংক্রান্ত যোগাযোগ ও আদান-প্রদান এদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। ঐ বাহিনীর অনেক গোপন ক্যাম্পে তাদের প্রয়োজনে আনাগোনা এবং ওদের কোন কোন সদস্যের ও শ্রমিক ঠিকানায় যাতায়াত ছিলো। এই যোগাযোগের গোপনীয়তা উভয়পক্ষ থেকেই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করা হতো। উভয় পক্ষই প্রয়োজন বশতঃ পরস্পরের প্রতি ছিলো বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল। এরূপ আন্তরিক সম্পর্কের কারণে পরস্পরের মাঝে বৈঠক ও যোগাযোগ নিঃসন্দেহে ও স্বাভাবিকভাবে ঘটতো। এ হেতু ৯ সেপ্টেম্বরের আগে মাহাল্যা অঞ্চলের নিকটবর্তী পাকুয়াখালি এলাকায় শান্তিবাহিনীর সাথে বৈঠকের জন্য নিহত ব্যক্তিদের ডাকা হয়। আহুত ব্যক্তিরা নিঃসন্দেহেই তাতে সাড়া দেয় এবং বৈঠকস্থলে গিয়ে পৌঁছে।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-৩

ঘটনাস্থল পাকুয়াখালি হলো, মাহাল্যাবন বীটভুক্ত বেশ কিছু ভিতরে পূবদিকে গহীন বন ও পাহাড়ের ভিতর জনমানবহীন অঞ্চল। মাহাল্যাসহ এতদাঞ্চল হলো উত্তরের বাঘাইছড়ি থানা এলাকা। আহুত লোকজন হলো দক্ষিণের ও নিকটবর্তী লংগদু থানা এলাকার বাসিন্দা। তাদের কিছু লোক হলো আদি স্থানীয় বাঙ্গালী আর অবশিষ্টরা হাল আমলের বসতি স্থাপনকারী। এই সময়কালটাও ছিলো শান্ত নিরূপদ্রব। স্থানীয়ভাবে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বিরোধ নিয়ে তখন কোন উত্তাপ উত্তেজনা ছিল না। এমন শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রতিশোধমূলক ও হিংসাত্মক কোন দুর্ঘটনা ঘটার কার্যকারণ ছিলো অনুপস্থিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চাঁদাবাজি ছিনতাই অগ্নিসংযোগ হত্যা উৎপীড়ন অহরহই ঘটে। তার কার্যকারণও থাকে। রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনা ছাড়াও স্বার্থগত রেষারেষি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ইত্যাদি জাতিগত প্রতিশোধ পরায়ণতাকে সহিংসতার কারণ রূপে ভাবা যায়। কিন্তু আলোচ্য সময়টিতে অনুরূপ পরিবেশ ছিলো না। তাই সম্পূর্ণ অভাবিতভাবে নৃশংস ঘটনাটি ঘটে যায়। খবর পাওয়া গেলোঃ বৈঠকের জন্য উপস্থিত শ্রমিকদের একজন বাদে অপর কেউ জীবিত নেই, নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। হাহাকারে ছেয়ে গেলো গোটা এলাকা। তাদের খোঁজে সেনা, পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও পাবলিকদের যৌথ তল্লাসী অভিযানে পাকুয়াখালির পাহাড় খাদে পাওয়া গেলো ২৮টি বিকৃত লাশ। বাকিরা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। এখনো তাদের সন্ধান মিলেনি। পালিয়ে প্রাণে বাঁচা একজনই মাত্র আছে যে এই গণহত্যা খবরের সূত্র।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-৪

এটি কার্যকারণহীন নির্মম গণহত্যা। এটি মানবতার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত নৃশংস অপরাধ। ন্যায় বিচার ও মানবতা হলো বিশ্ব সভ্যতার স্তম্ভ। জাতিসংঘ এ নীতিগুলো পালন করে। তাই তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মানদের হাতে গণহত্যার শিকার ইহুদীদের পক্ষে এখনো বিচার অনুষ্ঠিত হয়। এখনো ঘোষিত অপরাধীদের পাকড়াও করা হয়ে থাকে। অধুনা যুগোস্লাভিয়ায় অনুষ্ঠিত গৃহযুদ্ধে গণহত্যার নায়কদের পাকড়াও, বিচার অনুষ্ঠান ও শাস্তি বিধানের প্রক্রিয়া চলছে। কম্বডিয়ায় অনুষ্ঠিত পলপট বাহিনীর গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াটিও জাতিসংঘ ও কম্বডিয়া সরকারের প্রক্রিয়াধীন আছে। এই বিচার তালিকায় পাকুয়াখালি, ভূষণছড়া ইত্যাদি গণহত্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। সভ্য জগতে উদাহরণ স্থাপিত হওয়া দরকার যে, মানবতার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত প্রতিটি অপরাধ অবশ্যই বিচার্য। সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাতি তা অবহেলা করলেও জাতিসংঘ তৎপ্রতি অবিচল।

স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার দাবী-দাওয়ার পক্ষে, পরিচালিত রাজনীতি, আন্দোলন ও সশস্ত্র তৎপরতায়, নির্বিচারে গণহত্যা কোন মতেই অনুমোদন যোগ্য নয়। এখন স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশে গণহত্যার অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রামে এরূপ বিচারযোগ্য ঘটনা অনেকই আছে ও তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। সাধারণ ক্ষমার আওতা থেকে গণহত্যার অপরাধটি অবশ্যই বাদ যাবে।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-১

পার্বত্য ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে, আমার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ হলোঃ এই পর্বতাঞ্চলের প্রতিটি দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যা ও পীড়নের অগ্রপক্ষ হলো জনসংহতি সমিতি ও তার অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনী। বাঙ্গালীরা তাতে পাল্টাকারী পক্ষ মাত্র। এমতাবস্থায় জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দ হলেন আসল অপরাধী। মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠনে তাদের নির্দেশ ও অনুমোদন না থাকলে, তারা প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে অবশ্যই দমাতেন বা শাস্তি দিতেন। পাকুয়াখালি ঘটনা তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়নি, অনুরূপ অস্বীকৃতি আমলযোগ্য নয়। কারণ অনুরূপ ঘটনা ঘটাবার দ্বিতীয় কোন প্রতিষ্ঠান এই সময় অত্রাঞ্চলে উপস্থিত নেই। ভুক্তভোগীপক্ষ একমাত্র তাদেরকেই তজ্জন্য দায়ী করে। তাদের অস্বীকারের অর্থ নিজেদের সংগঠনভুক্ত অপরাধীদের অপরাধ ঢাকা। সুতরাং জনসংহতি নেতৃবৃন্দই অপরাধী।

এখন গণহত্যার অভিযোগটি বিদ্রোহী সংগঠনের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয লারমার উপরই পতিত হয়। তিনি অপরাধী না নির্দোষ তা বিচার প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

আমরা আইন-শৃংখলা মান্যকারী সাধারণ মানুষ, সরকারের কাছে এই দাবী করছি- পাক্যুয়াখালি সহ অন্যান্য গণহত্যার বিচার হোক। আন্তর্জাতিক আইন হলো: গণহত্যা ক্ষমাযোগ্য নয়। যদি পাক্যুয়াখালি, ভূষণছড়া ও অন্যান্য ঘটনাকে গণহত্যা রূপে ধরে নিতে সন্দেহ থাকে, তা হলে আন্তর্জাতিক মানে এর যথার্থতা যাচাই করা হোক। আমরা বিচার চাই, অবিচার নয়।

সন্তু বাবু এখন সরকারের নিরাপদ পক্ষপুটে আশ্রিত। তাই বলে তাকে অভিযুক্ত করা যাবে না, এমন পক্ষপাতিত্ব ন্যায় বিচারের বিরোধী। সন্তু বাবু নিজেকে নিরপরাধ মনে করলে, সরকারের পক্ষপুট ছেড়ে বিচার প্রক্রিয়ার কাছে নিজেকে সোপর্দ করুন। নিরপরাধ স্বজাতি হত্যার অনেক অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ঝুলে আছে। অধিকার আদায়ের সংগ্রাম মানে তো, মানুষ হত্যার অবাধ লাইসেন্স লাভ নয়। মানবতাবাদী সংগঠনের হিসাব মতে, তাদের হাতে অন্ততঃ ত্রিশ হাজার স্থানীয় অধিবাসীর প্রাণনাশ ঘটেছে। এটি গুরুতর অভিযোগ।

এ সংক্রান্ত আরো লেখা:

‘চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে’- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

১৭ বছর ধরে ফাইলবন্দি পাকুয়াখালীর ৩৫ কাঠুরিয়ার নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার

আগামীকাল ৯ সেপ্টেম্বর পাকুয়াখালী ট্রাজেডি দিবসঃ ১৭ বছরেও বিচার না হওয়া এক গণহত্যার শোকগাঁথা

কবর জেয়ারত ও দোয়ার মাধ্যমে স্মরণ, রাজনগর গণহত্যায় নিহতদের

SAM_0368 [1600x1200]

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট : ৪ জুন, রাজনগর গণহত্যা দিবস। ১৯৮৬ সালের এই দিন ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে গ্রামটিতে ঘুমন্ত সহায় নিরীহ মানুষের ওপর হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র শান্তিবাহিনী। তাদের হিংসার আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায় ৫০টি বাড়ি। বৃষ্টির মত গুলি চালিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় একই পরিবারের সকল সদস্যসহ এগারটি তাজা প্রাণ। যাদের মাঝে অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু।

সেদিন শান্তিবাহিনীর তাণ্ডবের কথা রাজনগরবাসী আজও ভুলতে পারেননি। তাই আজ (৪ জুন, ২০১৪) রাজনগর গণহত্যার দিবসটি গ্রামবাসী পালন করেছেন সেদিন নিহতদের কবর জেয়ারত ও তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করার মাধ্যমে। ১৯৮৬ সালের এই দিনে রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার রাজনগরে যারা শহিদ হয়েছিলেন তারা হলেন-

১. মো. ওমর আলী (৪৫)
২. বেগম ওমর আলী (৩০)
৩. আব্দুল মালেক (৭), পিতা ওমর আলী
৪. ফাতেমা বেগম (৪), পিতা ওমর আলী
৫. মালেকা বানু (২৮), স্বামী খৈয়র উদ্দিন
৬. নিলুফা আক্তার (১), পিতা খৈয়র উদ্দিন
৭. এরশাদ আলী মুন্সী (৬৫), পিতা নছরদ্দিন ফকির
৮. রেজিয়া খাতুন (২৫), স্বামী হাফিজ উদ্দিন
৯. আজিজুল ইসলাম (১০), পিতা হাফিজ উদ্দিন
১০. আলিমন বিবি (২৪), পিতা আব্দুর রহমান
১১. জামেলা খাতুন (২২), স্বামী সমর আলী

‘হে পথিক শোন’- রাজনগর গণহত্যা দিবসের আহ্বান

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে।সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।)

আজ মাহাবুল হত্যা দিবস

photo-1
কামাল হোসেন সুজন
আজ ১৭ মে, শহীদ মাহাবুল হত্যা দিবস। ১৯৮৮ সালের এই দিনে শান্তিবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছিলেন ভিডিপি সদস্য মাহাবুল। রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় এই নির্মম ঘটনাটি ঘটে। প্রতিবছর মাহাবুল হত্যা দিবস আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের কোন তদন্ত বা বিচার হয় না। নিজের জীবন দিয়ে সেদিন মাহাবুল একটি পুরো গ্রামকে রক্ষা করেছিলেন। তার জীবনের যেন কোন মূল্যই দিতে পারেনি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা।

শুধু মাহাবুল হত্যার কথাই বা বলি কেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও অনেক বঞ্চনার মধ্যে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠির মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার মূল্যায়নে কতটুকু গুরুত্ব দিতে পেরেছে বাংলাদশে সরকার, তার প্রশ্নও শাসক গোষ্ঠীর কাছে রইল? পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর চরম বৈষম্যের কথা কেনইবা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল সেটাও জানি না। বর্তমান সরকার দেশের কলংকজনক অধ্যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় গৌরব ও সম্মান অর্জনের গর্বে গর্বিত। কিন্তু পার্বত্য ট্টগ্রামের মাহাবুল হত্যাসহ আলোচিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডেরও বিচারের ব্যাপারে উদ্যোগ নেই।যদিও তা হওয়া অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা শুধু যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করে দায়মুক্ত হতে পারব না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম শহীদ মাহাবুল হত্যা। রাংগামাটি লংগদু উপজলার গুলশাখালী ইউপির র্পূব-জালালাবাদ গ্রামের অধিবাসী আফতাব উদ্দীনের বড় ছেলে মাহাবুল আলম ৪৮ নং ভিডিপি প্লাটুনের সদস্য ছিলেন। ১৭ মে, ১৯৮৮ইং ঈদুল ফিতরের র্পূব দিন, ঐ প্লাটুনের কমান্ডার আক্কাছ আলীসহ ১২ জন ভিডিপির সদস্য, যুবলক্ষীপাড়া আর্মি ক্যাম্প হতে অস্র নিয়ে র্পূব-জালালাবাদ মেম্বারবাড়ী ক্যাম্পে ডিউটির উদ্দেশ্যে পৌঁছান। বন্টিত ডিউটি লিষ্টে মাহাবুলের ছিল লাস্ট ডিউটি, কিন্তু কমান্ডারের নির্দেশে মাহাবুল সদস্য মোতালেবের পরিবর্তে সন্ধ্যার সময়ই একই ক্যাম্পের ৩নং পোস্টে কর্তব্য পালনের জন্য থ্রী-নট- থ্রী রাইফেল নিয়ে পোস্টের দিকে যেতে থাকেন। এমন সময়ই শত্রুদের এলএমজির ব্রাশ ফায়ারে লুটিয়ে পড়েন মাহাবুল।

পোস্টের পাশের ঘরেই থাকতো মাহাবুলের জননী জাহদো খাতুন। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে সেখান থেকেই প্রিয় সন্তান মাহাবুলকে ডেকেছিলেন, ‌‍‍”বাবা মাহাবুল, সারা দিন পরিশ্রম করেছো, ভাত খেয়ে যাও”। জবাবে মাহাবুল বলেছিল, “মা ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবো, সামান্য অপেক্ষা করো”।

কিন্তু ২০ ঘন্টা, ২০ দিন, ২০ মাস, ২০ বছর নয় ২৬ বছরেও ঐ ২০ মিনিটের অপেক্ষার প্রহর শেষ হল না। পোস্টে ঢোকার সাথে সাথে সামনে থেকে শত্রুর এলএমজি’র ব্রাশ ফায়ার মাহাবুলের বুকে বিদ্ধ হল, মাহাবুল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কালিমা পাঠ করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করেন। সাথে সাথে ব্যাপক সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয় কমান্ডার আক্কাছের নেতৃত্বে, দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর ভিডিপি সদস্যদের সাথে টিকতে না পেরে পালিয়ে যায় শান্তিবাহিনীর হায়েনারা, শত্রু মুক্ত হয় গ্রাম। মাহাবুলের জীবনের বিনিময়ে বেঁচে যায় পুরো একটি গ্রাম।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত-বিচার কোনটাই এখন পর্যন্ত হয়নি। বরং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে ঐসব হত্যাকান্ডের খুনিরা সরকারি দায়মুক্তি পায়, কিন্তু পবিত্র সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৫ ধারায় সকল নাগরিকে বিচার পাবার মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

তাই রাষ্ট্র-সরকার-পার্লামেন্ট নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তিতে ঐসব খুনিদের দায়মুক্তি দিলেও তা অবৈধ।

অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাহাবুল হত্যাসহ সকল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে খুনিদের বিচার করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ঐ আলোচিত হত্যাকান্ডগুলোর বিচার করতে হবে।

শুধু তাই নয়, আজও পাহাড়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তা ঘটছে মূলত আগের ঘটনাগুলোর বিচারহীনতার কারণেই।

উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফ প্রতিনিয়ত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে হত্যা-গুম-নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীন সার্বভৌমত্ব এই বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে এমন অন্যায় চলতে দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ তা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভেবে দেখা দরকার। দেশে সরকার, আইন ও বিচার বিভাগ সক্রিয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের অপরাধীদের বিচার হচ্ছে কোথায়? অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে সারাসরি অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করতে হবে।

এখানে শুধু বাঙ্গালী নয়, শান্তিকামী প্রত্যেকটা উপজাতীয় জনগোষ্ঠির জীবন জীবিকা রুটি রোজগার কতিপয় উপজাতীয় সন্ত্রসী দ্বারা ঝুঁকিপূর্ণ।

আমরা শহীদ মাহাবুল হত্যাসহ সকল হত্যাকণ্ডের বিচার চাই, পার্বত্যবাসীর শান্তি চাই, পারস্পারিক সহমর্মিতা চাই, সহঅবস্থান চাই, ভ্রতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উভয় সম্প্রদায় শান্তিতে বসবাস করতে চাই।

পার্বত্যবাসীদের এই ডাক, আকুতি শোনার মত সময় সুযোগ কি সরকার বা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর আছে? যদি তা না থাকে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যর্থ হবে সরকার এবং রাষ্ট্র, স্বাধীন দেশের এ ব্যর্থতার বোঝা যেন আর জাতিকে বহন করতে না হয়, এই আকুতি সংশ্লিষ্টদের কাছে রইল।

লেখক : শহীদ মাহাবুলের ছোট ভাই, এলএলবি(শেষপর্ব), বঙ্গবন্ধু ‘ল’ টেম্পল, চট্টগ্রাম

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ: প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা

PP

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সরোয়ার হোসেন, এইচডিএমসি, পিএসসি

জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ ও বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক মন্দাসত্ত্বেও প্রবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ও গার্মেন্টশিল্পে নিয়োজিত লাখ লাখ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই বিপুল জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা পূরণ করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম দায়িত্ব। এটা অনস্বীকার্য যে, এই বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য ও আবাসনসহ অন্যসব প্রয়োজনীয়তা মেটাতে প্রতিনিয়তই আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। তাই সার্বিক কল্যাণের জন্য আমাদের প্রতি ইঞ্চি জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। দুর্ভাগ্যবশত, ভাতৃঘাতী সশস্ত্র সংঘাত আর বিরাজমান ভূমি সমস্যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় অর্থনীতিতে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে না। ভূমি সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হওয়ার কারণে প্রত্যাশিত উন্নয়নও ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি ভূমি সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা শান্তিচুক্তির মতো ঐতিহাসিক অর্জনকে খানিকটা ম্লান করেছে। গত কয়েক শ বছর ধরে বিভিন্ন উপজাতি ও তাদের পূর্বপুরুষরা সীমান্ত অতিক্রম করে পার্বত্য এলাকায় প্রবেশ করে এবং বিশেষ বিধানের আওতায় এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ‘The Chittagong Hill Tracts Regulation-1900’ অনুযায়ী অত্র এলাকার জমির প্রকৃত মালিক জেলা প্রশাসক তথা সরকার। জমির ওপর উপজাতীয় জনগণের অধিকারের ভিত্তি বা যুক্তি যাই হোক না কেন, এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর এই সনাতনী চিন্তা-ভাবনা অত্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রভাব বিস্তার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়রা আজ থেকে কয়েক শ বছর আগে মূলত তৎকালীন বার্মা ও আরাকান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে সীমান্ত অতিক্রম করে এই অঞ্চলে আগমন করে। একই সময়ে অর্থাৎ ১৬৬০ দশকের দিকে মোগলরাও অত্র এলাকায় আগমন করে এবং বাণিজ্যিক প্রয়োজনে চট্টগ্রামের সমতল ভূমি থেকে বাঙালিদের এনে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। মোগল ও ব্রিটিশের পর পাকিস্তান সরকার পাহাড়িদের জমি এবং আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে। উচ্ছেদ-পরবর্তী সময়ে প্রদত্ত ক্ষতিপূরণের টাকা না পেলে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী প্রচণ্ডভাবে সংক্ষুব্ধ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে। যাই হোক, সার্বিক প্রেক্ষাপটে বিরাজমান ভূমি সমস্যাই এখন গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনার সঠিক নিয়মনীতির অভাব, এ বিষয়ে সনাতনী চিন্তা-চেতনা, একাধিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও সবশেষে সমতল ভূমি থেকে বাঙালিদের এনে পাহাড়ে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে।

ভূমি সমস্যা নিরসনকল্পে, বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে একটি আইন পাস করেছে এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে ভূমি কমিশন গঠন করেছে। পর পর চারটি কমিশন গঠিত হলেও অদ্যাবধি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। সম্প্রতি জনসংহতি সমিতি ‘CHT Land Dispute Settlement Commission Act 2001’ সংশোধনের কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে, যা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। অতি সম্প্রতি সরকার কিছু প্রস্তাবনা মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের মাধ্যমে ভূমি সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপৃর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তদুপরি, ভূমি সমস্যা সংশ্লিষ্ট অন্তরায়সমূহ সবার প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও সর্বোপরি দেশপ্রেম ছাড়া সমাধান করা কঠিন হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অনন্য সাধারণ ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল। যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও বিভিন্ন শ্রেণী-গোত্রের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর পাহাড়-লেক বেষ্টিত বৈচিত্র্যময় ভূমির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। জনসংখ্যার জীবনযাত্রার মান পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, গত কয়েক বছর অত্র অঞ্চল আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার মোট জনসংখ্যা ১৫,৯৮,২৯১ জন। বাঙালি ছাড়াও এখানে ভিন্ন ভিন্ন ১৩টি উপজাতি বসবাস করে। এরা হচ্ছে_ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, বোম, পাংখোয়া, খুমি, চাক, লুসাই, উসাই এবং রিয়াং। মোট জনসংখ্যার ৪৭% বাঙালি, ২৬% চাকমা, ১২% মারমা এবং ১৫% অন্যান্য উপজাতি। সব উপজাতীয়র মধ্যে চাকমা উপজাতি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধন-সম্পদে যথেষ্ট এগিয়ে আছে। ভূমি সমস্যা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য অত্র অঞ্চলে উপজাতীয় জনগণের আগমন, ধারাবাহিক প্রসার আর ঐতিহাসিক বিবর্তন সম্মন্ধে জানা প্রয়োজন। যার কিছুটা এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা যখন বঙ্গোপসাগর এলাকায় আগমন করে, তখন আরাকান সাম্রাজ্য তাদের সহজ শর্তে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেয়। এর মাধ্যমে রেভিনিউ সংগ্রহ ছাড়াও আরাকান রাজ্য-পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী মোগলদের বিরুদ্ধে সমরবিদ্যায় পারদর্শী পর্তুগিজ বাহিনীকে কাজে লাগায়। ১৬০০ সালের শুরুর দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কিছু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী খাগড়াছড়ি এলাকায় আগমন করে এবং সেখানে জুম চাষের মাধ্যমে জীবনযাপন শুরু করে। চাকমাদের আগমনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও কিছু কল্পকথা প্রচলিত রয়েছে। যার ব্যাপারে অনেক গবেষক একমত পোষণ করেন। ধারণা করা হয়, চাকমারা আরাকানের চম্পকনগর এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, ভারতবর্ষের বিহার থেকে আরাকান পর্যন্ত বেশ কয়েকটি চম্পকনগর রয়েছে। এমনকি রাঙামাটিতেও চম্পকনগর নামক একটি জায়গা রয়েছে। মোগলদের আগমনের পূর্ব-অবধি চাকমা জাতির ইতিহাস কল্পনাপ্রসূত হলেও তা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। পৌরাণিক সূত্র মোতাবেক, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজপুত্র বিজয়গিড়ী রাজ্য জয়ের জন্য একদা বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে পূর্ব দিকে রওনা দেন। তিনি মেঘনা নদী অতিক্রম করে আরাকান রাজ্য জয় করে সেখানে চাকমা বসতি গড়ে তোলেন। তখন এ অঞ্চলটি ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল থেকে প্রভাবশালী হিন্দু ও শক্তিশালী মুসলিম সভ্যতার প্রভাবে নিষ্পেষিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের আশ্রয়স্থল হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়া বিভিন্ন পর্তুগিজ কলোনি যেমন : গোয়া, সেলন, কোচিন, মালাক্কা ও অন্যান্য জায়গার ফেরারি আসামিদের জন্যও এটি ছিল স্বর্গরাজ্য। যাই হোক, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের পর বিভিন্ন রেকর্ড, দলিল-দস্তাবেজ, মুদ্রা, ছবি ও কাগজপত্র থেকে এ জাতির ইতিহাস আরও গ্রহণযোগ্যতা ও স্বাতন্ত্র্য লাভ করে। অত্র এলাকার প্রথম ব্রিটিশ জেলা প্রশাসক Captain T.H. Lewin রচিত ‘The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein’ এ লিপিবদ্ধ তথ্যাদি সে অর্থে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। ১৬৬০ সালের শুরুর দিকে বার্মা ও আরাকান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য চাকমারা নাফ নদীর অপর পাড়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত রামু পুলিশ স্টেশনের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৬৫৭ সালে যখন ভারতবর্ষের সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন সিংহাসন দখলের জন্য তার চার পুত্র ভাতৃঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬৫৮ সালে শাহজাহানপুত্র বাংলার সুবেদার শাহ সুজা তার বড় ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে ভারতের উত্তর প্রদেশের ‘খাওজা যুদ্ধে’ পরাজিত হয়ে চট্টগ্রামে পালিয়ে আসেন। তখনো চট্টগ্রাম তৎকালীন আরাকান রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীর জুমলা সুজাকে হত্যার জন্য পিছু নেন। সুজার সঙ্গে তার অনুসারী সেনাবাহিনীর ১৮ জন সেনাপতি এবং লক্ষাধিক সৈন্য আনোয়ারাতে অবস্থান নেয়। মীর জুমলা ঢাকা পৌঁছার পর সুজাকে আত্দসমর্পণের জন্য সংবাদ পাঠান। শাহ সুজা তার পরিবার ও অল্প কয়েকজন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে আরাকানের মোরোহং-এ আশ্রয় গ্রহণ করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন। মোগল বাহিনীর অন্য সহযোগীরা তখন রামুতে অবস্থান নিয়ে দিনাতিপাত শুরু করে। রমণী বিবর্জিত মোগল সৈন্য বাহিনীর সদস্যরা ধীরে ধীরে চাকমা রমণীদের সঙ্গে মিলেমিশে সংসার জীবন শুরু করে। তখন থেকে চাকমারা মোগল সেনাপতিদের রাজা হিসেবে গ্রহণ করে।

এদিকে আরাকানের বৌদ্ধ রাজা সান্ডা থুডাম্মা, সুজার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সুজা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন। এ নিয়ে আরাকান সীমান্তে পরিস্থিতির যথেষ্ট অবনতি ঘটে। বিয়ে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে বৌদ্ধ রাজা, সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। ফলে মোগল সৈন্য এবং আরাকান সৈন্যদের মধ্যে বহু খণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মোগল সৈন্যরা তখন কৌশলগত কারণে রামু ছেড়ে আলীকদমের গহিন অরণ্যে আবাসস্থল গড়ে তোলে এবং চাকমারাও তাদের সঙ্গে এ এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে। মোগল সৈন্যরা হজরত আলীর (রা.) অনুসারী ছিল, তারই নামানুসারে এ জায়গার নাম রাখা হয় আলীকদম, যা এখনো প্রচলিত।

সুজার সামরিক প্রধান ফতেহ খান, সপরিবারে সুজা হত্যার দুঃসংবাদ নিয়ে আলীকদম থেকে দিলি্ল গমন করেন। এ খবর শুনে আওরঙ্গজেব ভীষণ ক্ষীপ্ত হন এবং সুবেদার শায়েস্তা খানকে আরাকান রাজ্য আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন। শায়েস্তা খানের পুত্র উমেদ খানও আরাকান জয়ে তার সঙ্গী হন। মোগল গভর্নর শায়েস্তা খান বাংলায় আগমনের পর উপজাতি বিদ্রোহীদের পরাস্ত করার জন্য আত্দনিয়োগ করেন। তিনি আরাকান বাহিনীর হুমকি পর্যালোচনা করে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার ওপর মনোনিবেশ করেন। ধীরে ধীরে তিনি জাহাজের সংখ্যা বাড়িয়ে নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করেন।

অন্যদিকে তিনি সৈন্য ও রশদ দিয়ে আরাকান বাহিনীকে সাহায্য প্রদানকারী ডাচ ও পর্তুগিজ বাহিনীর সমর্থন লাভের জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। আরাকান এবং পর্তুগিজদের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরলে শায়েস্তা খান বেশ লাভবান হন। ওই বাহিনীর সমর্থনপুষ্ট হয়ে শায়েস্তা খানের নেতৃত্বাধীন মোগলবাহিনী আরাকানের দখল থেকে প্রথমে সন্দ্বীপ মুক্ত করে। ১৬৬৫ সালের ডিসেম্বরে শায়েস্তা খান আরাকান বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামে সামরিক অভিযান শুরু করে। এ সময় তিনি সীমান্তে নিরাপত্তার জন্য রাঙামাটি শহরসহ পুরানঘর (রাঙামাটির প্রাণকেন্দ্র) এবং কাঠঘর (দোহাজারীর সন্নিকটে) এলাকায় সেনাছাউনি স্থাপন করেন। এ সেনা ছাউনির আশপাশে প্রচুর বাঙালি বসতি স্থাপন করে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে, যাদের স্থানীয় উপজাতিরা আদিবাসী বাঙালি বলে জানে। তখন এ অঞ্চল ছিল হিংস্র জীবজন্তুর অভয়ারণ্য, যেখানে সুদূর চীনের পার্বত্য এলাকা থেকে কুকিরা আগমন করত। কুকিরা ছিল বন্যপ্রাণীদের মতোই ভবঘুরে প্রকৃতির এবং ফলমূল সংগ্রহ ও পশু শিকার করে জীবনধারণ করত। পরবর্তীতে আরাকান, মগ এবং পর্তুগিজ দস্যুরা চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশে আস্তানা গেড়ে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় লুটতরাজ শুরু করে। শায়েস্তা খানের ঐকান্তিক চেষ্টায় এ দস্যুদের নিমর্ূল করা হয়। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর উমেদ খান চট্টগ্রামের নবাব হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। সেই সময়ে আলীকদমে অবস্থিত মোগল সৈন্যরা উমেদ খানের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে নিয়মিত তুলা কর প্রদান করত। যদিও ১৬৬৬ থেকে ১৭২৪ সাল পর্যন্ত মোগল সেনাপতিরা জমিদারি পরিচালনা করেছে কিন্তু এদের মধ্যে জালাল খান চট্টগ্রামের নওয়াবের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে কর দিতে অস্বীকৃতি জানান। তাই চট্টগ্রামের নওয়াব দ্রুত জালাল খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। ফলে জালাল খান আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং মগদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে একপর্যায়ে মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধের ১৩ বছর পর ১৭৩৭ সালে জালাল খানের সহযোদ্ধা শের মস্ত খান চট্টগ্রামের নবাবের সঙ্গে দেখা করে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেন এবং পদুয়া কোদালা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। তিনি সেখানে একটি খামারবাড়ি স্থাপন করলে অনেক মগ ও চাকমা জনগোষ্ঠী এসে বসবাস শুরু করে। সেই সময়ে বিশ্বস্ততা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে মোগলরা উপজাতীয়দের ‘দেওয়ান’ ‘তালুকদার’ ইত্যাদি খেতাবে ভূষিত করেন- যা তাদের বংশধররা এখনো ব্যবহার করে থাকে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেক দিনের দুরভিসন্ধিমূলক পরিকল্পনা ছিল। সেই লক্ষ্যে কোম্পানি চট্টগ্রামে দুই-দুইবার যুদ্ধজাহাজ প্রেরণ করে কারখানা স্থাপনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ১৭১০ সালে বাংলার নবাব অন্যান্য এলাকার মতো চট্টগ্রাম জেলাকেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়। যদিও কোম্পানি দিলি্লর বাদশা শাহ আলমের কাছ থেকে ১৭৬৫ সালের পর রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। অতঃপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজস্ব আদায়ের জন্য দুজন রাজা নিয়োগ দেন। তারা হলেন চাকমা রাজা শের দৌলত খান এবং আরাকান বংশোদ্ভূত বোমাং রাজা পোয়াং। মগ এবং খুমি উপজাতিরা বোমাং রাজার অধীনে থাকে। এ রাজারা রাজস্ব আদায়ের জন্য নিজস্ব পদ্ধতি চালু করেন। যতই দিন যাচ্ছিল জনগণের ওপর কোম্পানির করের বোঝা ততই বেড়ে যাচ্ছিল, যা পরে জনগণের অসন্তোষের কারণ হয়। মোগল বাহিনীর চট্টগ্রাম জয়ের পর সীমান্তের ওপারে অস্থিতিশীলতা ও পুনঃপুনঃ সিংহাসন পরিবর্তনের কারণে আরাকানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান জয় করেন। ঠিক এ সময় অনেক মারমা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে। এদের বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য ক্যাপ্টেন কক্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যার নামানুসারে কক্সবাজারের নামকরণ করা হয়। বোধপায়া কর্তৃক ঐতিহাসিক আরাকান রাজ্য দখলের পর পৃথিবীর মানচিত্র থেকে এই রাজ্যটি একেবারে হারিয়ে যায়। অতঃপর বার্মার সৈন্যরা ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে, যা ১৭৮৫ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। পরিণামে অনেক চাকমা আরাকান ত্যাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আশ্রয় নেয়।

১৮৫৯ থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত কুকি উপজাতি সম্প্রদায় বহিরাগতদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে বিপুল লোক হতাহত হয়। ১৮৬০ সালে প্রশাসনিক সুবিধাসহ সফলভাবে উপজাতি আন্দোলন দমনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে পৃথক করা হয়। ১৮৮১ সালের শেষের দিকে রাঙামাটি শহরের ১৬৫৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে চাকমা সার্কেল, বান্দরবানের ১৪৪৪ বর্গমাইল নিয়ে বোমাং সার্কেল এবং ৬৫৩ বর্গমাইল নিয়ে রামগড়ে মং সার্কেল গঠিত হয়। চাকমা সম্প্রদায়ের ক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মং সার্কেল গঠন করে বলে জানা যায়। উপজাতি জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য ১৯০০ সালের মে মাসে CHT Regulation 1 of 1900 কার্যকর করার মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলার সার্কেল প্রধানদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এই রেগুলেশনের ৩৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী যে কোনো ধরনের জমি বন্ধক, বিক্রি, পরিবর্তন এবং অধিগ্রহণ জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারভুক্ত। যার অর্থ হচ্ছে জেলা প্রশাসকই হচ্ছে জমির প্রকৃত মালিক। ম্যানুয়েল অনুযায়ী সার্কেল প্রধান এর অধীনস্থ হেডম্যান এবং কারবারিরা মৌজা এবং পাড়ায় রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত, যা সংগ্রহের পর সার্কেলপ্রধান কর্তৃক জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রকৃতপক্ষে তিন সার্কেল প্রধান এবং তাদের অধীনস্থ হেডম্যান এবং কারবারিরা হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের জন্য সরকারের নির্দিষ্ট প্রতিনিধি। ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক সার্কেল প্রধানদের ওপর কর্তৃত্ব করে থাকেন। আরও পরে, ১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশরা অত্র উপ-মহাদেশকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করে, তখন চাকমারা নিজেদের পাকিস্তানি মুসলমানদের চেয়ে ভারতীয় হিন্দুদের নৈকট্য প্রত্যাশা করে এবং উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে একটি স্বাতন্ত্র্য ভূমির স্বপ্ন দেখে। কিন্তু সীমানা নির্ধারণী কমিশন চাকমাদের এই সুপ্ত বাসনার মূল্যায়ন করেনি। যাই হোক, ১৯৫৬ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের জন্য তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার কর্ণফুলী লেকের জমি অধিগ্রহণ করে। যার ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। এ ছাড়াও সংরক্ষিত বনাঞ্চল বিস্তারের জন্য পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল থেগামুখ, সুবলং এবং রাইংখিয়াং এলাকা থেকে ক্ষতিপূরণ ব্যতিরেকে উল্লিখিত এলাকার অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে, যা এই এলাকার জনগোষ্ঠীকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ওই সব এলাকার জনগণ এখনো বিশ্বাস করে যে, তাদের নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মার্চ-১৯৭১ সালে এক রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়সহ কতিপয় চাকমা এ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধাচরণ করে। পরবর্তীতে রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের প্রতি সংহতি ও একাত্মতা প্রকাশ করে আমৃত্যু পাকিস্তানে বসবাস করেন। তাই ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর, ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে অনেক উপজাতি ভারতে পালিয়ে যায়। আর সে সুযোগে দেশে থেকে যাওয়া উপজাতিরা অত্র অঞ্চলের জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তরুণ প্রতিবাদী পাহাড়ি নেতা এম এন লারমা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপন করে, যা জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থে গৃহীত হয়নি। অতঃপর ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা সপরিবারে নিহত হলে, সাংবিধানিক উপায়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবি আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসে। তাই ১৯৭৬ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। ওই সময় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। তখন সরকার কিছু ভূমিহীন বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য এলাকায় বসবাসের সুযোগ করে দেয়। পুনর্বাসিত প্রতিটি বাঙালি পরিবারকে পাঁচ একর করে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়, যা উপজাতিরা আজো নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। যাই হোক, সশস্ত্র আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে বাঙালি পরিবারগুলোকে নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে এনে বসবাস করতে দেওয়া হয়। এই সুযোগে উপজাতি জনগণ বাঙালিদের ছেড়ে যাওয়া জায়গা-জমি দখল করে বসবাস শুরু করে। এভাবেই পার্বত্য এলাকার ভূমি সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে।

“Hill District Council Act-1989” কার্যকর হওয়ার পর পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো ক্রয়, বিক্রয় পরিবর্তন বা অধিগ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ‘হিলট্রাক্টস ম্যানুয়েল-১৯০০’ কার্যকর থাকায় ভূমি সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে। ২ ডিসেম্বর-১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে অত্র এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয় এবং ভূমি সমস্যাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের জন্য সবাই নিজ জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আগ্রহী হলে বিভিন্ন জায়গায় জাতিগত সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

ইতোমধ্যে সরকার শান্তিচুক্তির আওতায় বেশির ভাগ দাবি-দাওয়া বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেছে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লক্ষণীয় যে, শান্তিচুক্তির পর পৃথিবীর অনেক দেশেই যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ হয়নি। যেমন সুদান (১৯৭২), সোমালিয়া (১৯৯০), এঙ্গোলা ১ ও ২ ( ১৯৯১ ও ১৯৯৪) এবং রুয়ান্ডা (১৯৯৩)। এমনকি পার্বত্য চুক্তির বহু বছর আগে স্বাক্ষরিত অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তি বাস্তবায়নের দিক থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সব ধরনের মামলা প্রত্যাহারসহ বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। সর্বমোট ১৯৮৯ জনকে আর্থিক অনুদান প্রদানসহ ৭০৫ জনকে পুলিশ বিভাগে চাকরি দেওয়া হয়েছে। ১২,২২২টি উপজাতি পরিবারকে ত্রিপুরা থেকে দেশে এনে পুনর্বাসিত করা হয়। ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে দীপঙ্কর তালুকদার এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সন্তু লারমার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত হলেও হাইকোর্টে এতদসংক্রান্ত বিষয়ে একটি মামলা চলমান থাকায় পরিষদ কার্যত স্থবির। হাইকোর্টে পার্বত্য শান্তিচুক্তির যৌক্তিকতা নিয়ে মামলা হয়েছে এবং এ জন্য হাইকোর্ট সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা চেয়েছেন। অবশ্য হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদ এবং সার্কেল প্রধানদের কতিপয় ক্ষমতা অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সরকার হাইকোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করলে আপীল বিভাগ হাইকোর্টে তা স্টে করেছেন। এই বিষয়টির স্থায়ী সুরাহা হলেই চেয়ারম্যান এবং মেম্বারদের নির্বাচনসহ সবার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যুর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৩২টি বিষয়ের মধ্যে ২২টি বিষয় পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় উপজাতি পুলিশদের বদলির বিষয়টি যখন প্রক্রিয়াধীন ছিল, ঠিক তখনই ঢাকায় কতিপয় উপজাতি পুলিশ সদস্যের গোলাবারুদ চুরির ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। যার ফলে বিষয়টি আর এগোয়নি। ভূমি সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৯৯ সালে ভূমি কমিশন গঠন করা হয় এবং “CHT Land Dispute Settlement Act- 2001’ প্রণয়ন করা হয়। ইতোমধ্যে পার্বত্য এলাকা থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ২৩৮টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় জেলা বিচারিক আদালত স্থাপিত হয়েছে। বেগম সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে প্রধান করে তিন সদস্যের পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন এবং পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। সরকার ১৯৯৭-এর শান্তিচুক্তির মাধ্যমে উপজাতি সম্প্রদায়ের অধিকার সংরক্ষণসহ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

উপজাতি সম্প্রদায় বিশ্বাস করে জমি, বন এবং পাহাড় হচ্ছে যৌথ সম্পত্তি। তাই সরকারিভাবে প্রচলিত ভূমি রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আর উপজাতিদের বংশানুক্রমিকভাবে প্রচলিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে তফাৎ রয়েছে। চাকমারা মনে করে এ অঞ্চলের ভূমি তাদের নিজস্ব সম্পত্তি। তাদের আবাসভূমি ছাড়া বাকি সব জমির ওপর যৌথ মালিকানা বহাল। চাকমা সম্প্রদায় মনে করে, যে কেউ যে কোনো জমিতে আবাস করতে পারবে এবং এর জন্য কোনো চুক্তি বা কাগজপত্রের প্রয়োজন নেই। ভূমির মালিকানা এবং ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন উপজাতি বিভিন্ন ধারণা পোষণ করে থাকে। চাক উপজাতি মনে করে অন্য কেউ আগে ব্যবহার না করলে, যে কোনো জমি চাষাবাদের জন্য ব্যবহার করা যাবে। কিয়াং জনগোষ্ঠী মনে করে সন্তান ও জমি হচ্ছে প্রকৃতির দান এবং প্রত্যেকের জমির ওপর সমান অধিকার রয়েছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির উন্মেষ ঘটলেও উপজাতি সম্প্রদায় এখনো জমির ব্যাপারে তাদের সনাতনী চিন্তাভাবনা আঁকড়ে ধরে আছে। এ ছাড়া CHT Regulation এর ৪২ ধারা অনুযায়ী জুম চাষের জন্য মালিকানার দরকার হয় না। ফলে উপজাতিরা নিবন্ধন ছাড়াই জমিতে বসবাস এবং চাষাবাদ করতে পারে এবং সার্কেল প্রধানকে খাজনা দিয়ে তারা নতুন জমির মালিকানা লাভ করে। বাস্তবতার নিরিখে উপজাতি সম্প্রদায়ের এই উপলব্ধি আধুনিক সময়োপযোগী মাত্রা পাবে এটাই কাম্য।

যেহেতু সাম্প্রতিককালে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো ভূমি জরিপ হয়নি, তাই এ অঞ্চলের মোট ভূমির পরিমাণ নিরূপণ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, পার্বত্য এলাকার মোট জমির পরিমাণ ৫০৯৩ বর্গমাইল, যার মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৭৭৫.৬৩ বর্গমাইল, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ১৪২৩ বর্গমাইল এবং অশ্রেণীভুক্ত রাষ্ট্রীয় বন ২৮৯৪.৩৭ বর্গমাইল। উল্লেখ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিল এবং সরকারি অধিভুক্ত জমি শান্তিচুক্তির আওতাধীন নয়। তিন জেলার ব্যক্তি মালিকানাধীন সর্বমোট জমির পরিমাণ হচ্ছে ১৪২৩ বর্গমাইল। বাকি ৩৬৭০ বর্গমাইল এলাকা সরকার নিয়ন্ত্রিত সম্পত্তি। শান্তিচুক্তির ৬৪ ধারা অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদকে ভূমি লিজ, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা মহামান্য হাইকোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যবিধি চূড়ান্তকরণে বিলম্ব এবং চেয়ারম্যানের অনাগ্রহের কারণে এই অঞ্চলের উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে একসঙ্গে জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ এবং সার্কেলপ্রধান নিয়ন্ত্রিত প্রচলিত পদ্ধতি দ্বারা ভূমি ব্যবস্থাপনা চলছে। জেলা প্রশাসক সার্কেলপ্রধানের পরামর্শক্রমে হেডম্যান নিয়োগ দেন। সার্কেলপ্রধানের অধীনে থেকে হেডম্যান তার মৌজার ভূমি এবং জুমচাষ থেকে রাজস্ব আদায় করে। ভূমি প্রশাসন বিশেষত ভূমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া যথেষ্ট সময়সাপেক্ষে ব্যাপার, যার ফলে দেখা যায় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে অনেকে মৃত্যুবরণ করে বা ক্ষেত্রবিশেষে আবেদনপত্র প্রত্যাহার করে নেন। ফলে অনেকেই অবৈধভাবে ক্রয়, বিক্রয়সহ অননুমোদিতভাবে ভূমির মালিক হয়ে থাকে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ও প্রতারক নিজ নামে ভূমি নিবন্ধন করে নিরীহ জনগোষ্ঠীকে প্রতারিত করছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতিগত দাঙ্গার জন্ম দিচ্ছে। অবৈধভাবে জমি দখল না করলে জমির মালিক হওয়া কঠিন- এমন বাস্তবতা পার্বত্যাঞ্চলে বিতর্ক এবং সংঘর্ষের জন্ম দিচ্ছে। এ ধরনের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি জটিলতা দীর্ঘসূত্রতা লাভ করছে।

অত্র অঞ্চলে টেকসই শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার স্বার্থে ভূমি সমস্যা সমাধান অতীব জরুরি। ভূমি কমিশনকে অবৈধভাবে দখলকৃত জমি এবং পাহাড়ের মালিকানা বাতিল করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বাস্তবিক সমস্যার কারণে কমিশন আশানুরূপভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ২৭ জানুয়ারি ২০১০ সালে খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত প্রথম ভূমি কমিশনের সভায় ভূমি সমস্যা সমাধানের আগে ভূমি জরিপের প্রয়োজনীয়তার কথা আলোচিত হয়। কিন্তু কমিশনের উপজাতীয় সদস্যরা সর্ব প্রথমে “CHT Land Dispute Settlement Commission Act-2001” সংশোধনের দাবি জানান। সে মোতাবেক আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ১৯টি ধারা সংশোধনের দাবি করেন। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি প্রথমে ২৩টি ধারা সংশোধন করার কথা বললেও পরে ১৩টি ধারা সংশোধনের দাবি জানান। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন এবং পর্যালোচনা কমিটি ২২ জানুয়ারি ২০১২ তারিখ ১২টি সংশোধনী করার পরামর্শ প্রদান করে। ২৮ মার্চ ২০১২ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় উল্লিখিত আইন সংশোধনের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার আহ্বান করে। ভূমি মন্ত্রণালয় ছয়টি সংশোধনের জন্য সর্বসম্মতভাবে একমত হয় এবং বাকি সাতটি সংবিধানের পরিপন্থী বলে অনুমোদন পায়নি।

এ সংশোধনসমূহের কিছু পদ্ধতিগতভাবে বেশ জটিল, কিছু অত্র অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরূপ, কিছু সংশোধন কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার পথে অন্তরায় ও কয়েকটি নীতিগতভাবে কার্যপ্রণালীর পরিপন্থী। এটা ধরে নেওয়া যায় যে, শান্তিচুক্তির আগে উভয়পক্ষই স্ব-স্ব অবস্থানে অনড় না থেকে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটি সর্বজনীন কর্মপন্থা নির্ধারণের ব্যাপারে একমত হয়েছে। আনীত সংশোধনীসমূহ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা সংগত ও শান্তিচুক্তির মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা যুৎসই তা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা প্রয়োজন।

দীর্ঘ সময় ধরে কমিশনের স্থবিরতার জন্য মূলত কমিশনের উপজাতীয় সদস্যবর্গের কমিশনকে তার কাজকর্মে সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদানের ব্যাপারে অনাগ্রহই দায়ী। এ ছাড়া কিছু গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের উপস্থাপনায় বস্তুনিষ্ঠতার অভাব মৌলিক বিষয়গুলোকে আড়াল করে রেখেছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে শান্তিচুক্তির পর থেকে এপ্রিল ২০১২ পর্যন্ত সর্বমোট ৫১৭ জন নিহত, ৮৭৭ জন আহত আর ৯৫৯ জন অপহৃত হয়েছেন। অথচ আঞ্চলিক নেতারা বিরাজমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন ব্যতিরেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সব সামরিক ক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন। এমনকি সিএইচটি কমিশন, United Nations Permanent Forum For Indigenous Issues (UNPFII), ইউরোপীয় ইউনিয়ন উপজাতিদের প্রতি অযৌক্তিকভাবে সমর্থন ব্যক্ত করে বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিভিন্ন বিদেশি ব্যক্তিবর্গ ও সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে উপজাতি ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে, যা পার্বত্য অঞ্চলকে একটি আলাদা রাষ্ট্র তৈরির বুনিয়াদ সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কমিশনের চেয়ারম্যান Lord Eric Ava bury একজন অভিজ্ঞ ব্রিটিশ সংসদ সদস্য। বৈশ্বিক নানা বিষয়ে তার প্রচুর অভিজ্ঞতা আছে; যেমন জনগণের অধিকার আদায়ে ইতিপূর্বে তিনি পেরু, ক্যামেরুন এবং ইরানে কাজ করেছেন। তিনি সুদান এবং পূর্ব তিমুরে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বেশ পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক উপজাতিদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার তথ্য রয়েছে, যা অত্র এলাকার উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। কমিশনের অপর সদস্য সুইডেন নাগরিক Mr. Lars Anders Bear বিভিন্ন দেশের আদিবাসী ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। তিনি UNFPII-এ স্পেশাল রেপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োজিত। UNFPII এর দশম অধিবেশনে Mr. Lars Anders Bear কর্তৃক উপস্থাপিত ‘Status of the  implementation of CHT Peace Accord of 1997’ যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন এবং তার সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত UNFPII এর স্বার্থে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অসামান্য অবদানের পরও তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সমালোচনা করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায় যে, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, ব্যক্তিবর্গ পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি ইস্যুটি বহির্বিশ্বে আমাদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে ব্যবহার করছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আদিবাসী জনগণের নিরাপত্তার জন্য জাতিসংঘ ১৯৫৭ সালে আইএলও ১০৭ প্রণয়ন করে। এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় এবং কোনো দেশের সার্বভৌমত্বকে খাটো করেনি, তাই বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আইএলও ১০৭ চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। কিন্তু বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে প্রণীত উপজাতিদের নিরাপত্তাবিষয়ক আইএলও ১৬৯ সনদ স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রয়েছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ২২টি দেশ এই সনদে স্বাক্ষর করলেও এশিয়ার নেপাল ছাড়া বাকি কোনো দেশ স্বাক্ষর করেনি। আইএলও ১৬৯ এর সনদ অনুযায়ী ঐতিহ্যগত, ব্যক্তিগত এবং সাম্প্রদায়িক মালিকানা ছাড়াও, রাষ্ট্র ভূমি রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহারের ক্ষমতা রাখে। আশ্চর্যজনকভাবে এই সনদে সরকারি খাসজমির ব্যাপারে কিছু উল্লেখ নেই। অথচ এই খাসজমিতে বাঙালিদের অভিবাসনের মাধ্যমে অত্র অঞ্চলের ভূমি সমস্যার জটিলতা বৃদ্ধিসহ নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সনদ মোতাবেক স্থানীয় আধিবাসীদের অনুমতিক্রমে সামরিক অভিযানসহ অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন বহিরাগত কেউ জমির মালিক হতে না পারে। সার্বিক প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ ইস্যুটি আজ আর কোনো আলাদা বিষয় নয়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ছাড়াও উপজাতি সম্প্রদায়গুলো ‘আদিবাসী’ শব্দটি ভূমি অধিকার সংরক্ষণের স্বার্থে ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মরহুম বোমাং সার্কেলপ্রধান অং সাং প্রু পরিষ্কারভাবে বলে গেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো আদিবাসীর অস্তিত্ব নেই। ২০০৮ সালে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় যখন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন তিনিও এমন দাবির সপক্ষে অবস্থান নেননি। এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার নেই। ভারতীয় সংবিধানের ৩৪১ এবং ৩৪২ নম্বর ধারা অনুযায়ী ভারতে scheduled cast I scheduled cast tribes রয়েছে। ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর শতকরা ২৪ ভাগ লোক বিভিন্ন গোত্রের হলেও তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে একসঙ্গে বসবাস করছেন। মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত ভূমিবিরোধ সংশোধন আইন এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গৃহীত বিশেষ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হবে, তবে এতদসঙ্গে বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনা ব্যতিরেকে এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা সহায়ক হবে তা সময়ই বলে দেবে। অন্তত পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন বাঙালি সংগঠনের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া থেকে এমনটিই লক্ষণীয়।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পর জাতি সফলভাবে সামাজিক অর্থনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রতিদিনই জমি এবং সম্পদ সংকুচিত হয়ে আসছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। তাই পার্বত্যাঞ্চলে বিরাজমান পরিস্থিতির সমাধানে কালক্ষেপণ বৈশ্বিক বাস্তবতায় কাম্য নয়। উপজাতি বিষয়ে আমাদের সুষমভাবে তাদের অধিকার এবং উত্তরাধিকার নিশ্চিতকরণসহ বাঙালিদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা জরুরি। সরকার পুনর্বাসিত বাঙালিদের অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্বটি সরকারকেই পালন করতে হবে। পার্বত্য এলাকার মোট জনসংখ্যার মোটামুটি অর্ধেক বাঙালি। সময়ের পরিক্রমায় পার্বত্য এলাকায় বাঙালিদের আগমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যার সুষ্ঠু সমাধান- বাঙালিদের ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং উভয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ নিশ্চিতকরণসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। এখনই সময় যেন সরকার গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং সর্বস্তরের মানুষকে এ বিষয়ে সম্পৃক্ত করে চুক্তি বাস্তবায়নের বাকি কাজ সম্পন্নের জন্য এগিয়ে যায়। অত্র অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়নের মাধ্যমে এখানকার অধিবাসীদের দেশের মূল স্রোতধারার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রেখে সরকারের পাশাপাশি উপজাতীয় নেতাদের এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সামনের দিনগুলোতে এই অঞ্চলের শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একযোগে কাজ করতে পারলেই দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ সুগম হবে।

লেখক : কমান্ডার, ৩০৫ পদাতিক ব্রিগেড(ব্রিগেড কমান্ডার, রাঙামাটি) বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

উপজাতীয় নওমুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান মিশনারিদের দৌরাত্ম্য

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

 

রাজনগর গণহত্যা দিবসের আহ্বান : ‘হে পথিক শোন’

Say

সৈয়দ ইবনে রহমত, বার্তা সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ডটকম :

আজ ৪ জুন, রাজনগর গণহত্যা দিবস। ১৯৮৬ সালের এই তারিখে ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে গ্রামটিতে ঘুমন্ত অসহায় নিরীহ মানুষের ওপর হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সশস্ত্র শান্তিবাহিনী। তাদের হিংসার আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায় ৫০টি বাড়ি। বৃষ্টির মত গুলি চালিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় একই পরিবারের সকল সদস্যসহ এগারটি তাজা প্রাণ। যাদের মাঝে অধিকাংশই ছিল নারী ও শিশু।

রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার একটি গ্রামের নাম রাজনগর। কেউ যদি যান, তাহলে গ্রামটির প্রবেশ পথেই দেখতে পাবেন ছোট্ট একটি বাজার। রাজনগর বাজার নামেই এটি পরিচিত। বাজার পার হলেই রাস্তার ডান পাশে মসজিদ আর বাম দিকে কবরস্থান। কবরস্থানের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে একটি স্মৃতি ফলক। শুরুতেই লেখা আছে, ‘হে পথিক শোন’। কিন্তু কি শুনবেন আপনি? হ্যাঁ, সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথাই আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে এই ফলক।

১৯৮৬ সালের ৩ জুন, প্রতিদিনকার মতই রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গিয়েছিল এই গ্রামের খেটে খাওয়া শান্তিপ্রিয় মানুষেরা। কিন্তু অন্যান্য দিনের মত অনাবিল শান্তির ঘুম শেষে তাদের জীবনে ফোটেনি ভোরের আলো। শান্তিবাহিনীর হিংস্রতায় মাত্র কয়েক ঘন্টায় সব শেষ হয়ে যায়; নিহতদের ছিন্নভিন্ন দেহ আর আহতদের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। রাজনগর গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো সর্বস্ব হারিয়ে নির্বাক। কিন্তু শোক প্রকাশের অবকাশও নেই। কারণ আগে তো জীবনটা বাঁচাতে হবে। কোথায় পাওয়া যাবে নিরাপদ আশ্রয়? জানা নেই কারো। যে যার মত ছুটছে আর ছুটছে।

আর প্রশাসন? হ্যাঁ, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। লংগদু উপজেলার তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান, থানার ওসি এবং মাইনী আর্মি জোনের কমান্ডার এসেছিলেন সকাল ৮টার দিকে। হামলার আগেই কেন গ্রামবাসী তাদের সহায় সম্পদ সব ফেলে অন্যত্র চলে গেল না, তার জন্য তারা হম্বিতম্বি করলেন। তারপর ফিরে গেলেন। তবে যাওয়ার আগে দিয়ে গেলেন কিছু কাফনের কাপড়। রাজনগর গণহত্যার শিকার মানুষগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কাফনের কাপড় পেল। এটাই-বা ক’জনের ভাগ্যে জোটে! সত্যিই কি সৌভাগ্য তাদের!!

রমজান মাস, সেহেরি খাওয়ার জন্য কেউ উঠেছেন, কেউ হয়তো খেয়ে শুয়েছেন। এই সময় হঠাৎ একটা গুলির শব্দ। তারপরেই এলএমজির ব্রাশ ফায়ার। এরপর চলছে তো চলছেই, বিরামহীন গুলির শব্দে কানপাতা দায়। গভীর রাতে এমন শব্দের সাথে পরিচিত নয় কেউ। কি হচ্ছে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না অনেকেই। কিন্তু বুঝতে বেশি সময়ও লাগেনি তাদের। ঘর থেকে বেরিয়েই যখন দেখলেন চারপাশের বাড়ি-ঘর জ্বলছে, আগুনের লেলিহান শিখায় বিদীর্ণ হয়ে গেছে রাতের অন্ধকার আকাশ। স্বজন হারানো এবং আহতদের গগনবিদারী চিৎকারে কাঁপছে ধরণী, তখন আর কারো বুঝতে বাকি ছিল না যে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র হামলায় ধ্বংস হচ্ছে তাদেরই গ্রাম। আতঙ্কিত মানুষ যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল, লুকিয়ে জীবন রক্ষা করল। কিন্তু যারা পারল না তাদের দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেল হায়েনাদের বন্দুকের গুলিতে।

সেদিন যারা রাজনগরে প্রাণ দিয়েছিল, তার মধ্যে ওমর আলীর পরিবারের ঘটনা ছিল সব চেয়ে মর্মান্তিক। একই সাথে তার পরিবারের সবাই ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়েছিল। তাদের জন্য কান্না করারও কেউ ছিল না। ওমর আলীর পরিবার সহ যারা এই গণহত্যার শিকার হয়েছে তাদের নামের তালিকা বুকে নিয়ে বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে রাজনগর কবরস্থানের এই স্মৃতি ফলক। বর্তমানে রাজনগরে একটি বিজিবি জোন আছে। আর তাদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই ফলকে অঙ্কিত তালিকায় সেদিনের শহীদেরা হলেন-
১. মো. ওমর আলী (৪৫)
২. বেগম ওমর আলী (৩০)
৩. আব্দুল মালেক (৭), পিতা ওমর আলী
৪. ফাতেমা বেগম (৪), পিতা ওমর আলী
৫. মালেকা বানু (২৮), স্বামী খৈয়র উদ্দিন
৬. নিলুফা আক্তার (১), পিতা খৈয়র উদ্দিন
৭. এরশাদ আলী মুন্সী (৬৫), পিতা নছরদ্দিন ফকির
৮. রেজিয়া খাতুন (২৫), স্বামী হাফিজ উদ্দিন
৯. আজিজুল ইসলাম (১০), পিতা হাফিজ উদ্দিন
১০. আলিমন বিবি (২৪), পিতা আব্দুর রহমান
১১. জামেলা খাতুন (২২), স্বামী সমর আলী

রাজনগর গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ছিল যুবলক্ষী পাড়া আর্মি ক্যাম্প। আর উত্তর দিকে ছোট মাহিল্যা আর্মি ক্যাম্প। কিন্তু দুটি ক্যাম্পই বেশ দূরে। মাঝখানের গ্রামটির পাহাড়ায় ছিল মাত্র কয়েকজন ভিডিপি সদস্য। কিন্তু সংঘবদ্ধ সশস্ত্র শান্তিবাহিনীর সাথে তাদের কুলিয়ে উঠা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। তাই শান্তিবাহিনী হামলা শুরু করার পর মাহিল্যা ক্যাম্প থেকে আর্মিরা এগিয়ে আসে। অন্যদিকে যুবলক্ষী পাড়া ক্যাম্প থেকে ক্যাপ্টেন আতিক তার সৈন্যদল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে শান্তিবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

তবে দূরত্বের কারণে আর্মিরা এসে পৌঁছার আগেই যা করার করে ফেলে শান্তিবাহিনী। ধ্বংস করে দিয়ে যায় স্বপ্নের মত সাজানো-গুছানো একটি গ্রাম। এরই মধ্যে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে, পূর্ব আকাশে রক্তিম সূর্যউদয় হয়। রাতের আক্রমণের পর সকলে খুঁজতে থাকেন তাদের স্বজনদের। এ সময় সকলের সামনে একে একে ভেসে উঠে এগারটি মৃতদেহ। সাবেক চেয়ারম্যান আবু নাছির নিজের তত্ত্বাবধানে রাজনগর কবরস্থানেই সমাহিত করেন মৃতদেহগুলো।

জনাব নাছির মৃতদেহগুলো সমাহিত করার ব্যাপারে শুধু তত্ত্বাবধান করেছেন, এটা বলা ঠিক হলো না। বরং নিজ হাতে প্রতিটি লাশের গোসল দিতে হয়েছে তাকেই। লাশের গোসল করানোর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কারো হাত খুলে আসে, কারো পা। ঠিক মত ধরাও যায় না, কোন রকমে পানি ঢেলে গোসল শেষ করতে হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের অবস্থা ছিল চরম ভয়ানক। এসব দৃশ্য দেখার পর এক সপ্তাহ পর্যন্ত কোন কিছু খেতে পারিনি।’ লাশের গোসল দেওয়া এবং কবরস্থ করতে তাকে সহায়তা করেছেন ইউপি মেম্বার আতাবউদ্দিন, মুরব্বীদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল কাদের মুন্সী, জাহের আলী, নবী হোসেন, নুরুল ইসলাম ব্যাপারী, রুহুল আমীনসহ আরও কয়েকজন।

রাজনগর গ্রামের পাহাড়ায় থাকা ভিডিপি প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন আমীর হামজা। তার অভিজ্ঞতা হলো, ‘রাতের অন্ধকার তো কেটেছে গুলি আর পাল্টা গুলির মধ্যে। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার পর যখন শান্তিবাহিনীর ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড দেখার জন্য বের হলাম, তখন এক জায়গায় দেখলাম কয়েকটি গরু মরে আছে, পাশেই শিশু সহ কয়েকজনের ক্ষতবিক্ষত লাশ। দৃশ্যটা এতই বিভৎস যে তা কোনভাবেই সহ্য করতে পারিনি। আমি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)র অঙ্গসংগঠন শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের ওপর রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্র্যাজেডি, ভূষণছড়া গণহত্যা, মাটিরাঙ্গা গণহত্যাসহ অসংখ্য গণহত্যা চালিয়েছে। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে তাদেরকে এসব হত্যাকাণ্ডের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সত্যিই দুঃখজনক এবং অসাংবিধানিক। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া আবশ্যক। কেননা, চুক্তির শর্ত হিসেবে শান্তিবাহিনী বিলুপ্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। চলমান সশস্ত্র কার্যক্রমের শিকার বাঙালিরা যেমন হচ্ছে, তেমনি শান্তিপ্রিয় সাধারণ পাহাড়িরাও হত্যা, গুম, খুনের শিকার হচ্ছে। কিন্তু হত্যাকারীদের যদি দায়মুক্তি না দিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যেত, তাহলে নতুন করে কেউ এসব অপরাধে জড়াতে সাহস পেত না।

 আরও খবর

চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

ফাইলবন্দি পাকুয়াখালীর ৩৫ কাঠুরিয়ার নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার