শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তার যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত জরুরি

মেহেদী হাসান পলাশ |

আজ পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২১ বছরপূর্তি। প্রতিবছর তিন পার্বত্য জেলায় নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে ঢাকায় সভা সেমিনার হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়, টেলিভিশনে টকশোতে আলোচনা হয়। বস্তুত এ সকল আলোচনার মূল লক্ষ্য থাকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা ও নিরূপণ করা।

শান্তিচুক্তি একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক সরকারের কৃতীত্ব নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। তিনি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করে তার দলের সাথে এই আলোচনার জন্য তাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ তার স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারার কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারের, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তথা জেএসএস ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা গত ২৯ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক সাংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে এক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান হাজির করে সরকারের দাবি, বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করে ফেলেছে। বাকি অল্প কিছু ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। শান্তিচুক্তিতে ৪ খণ্ডে সর্বমোট ৭২টি ধারা রয়েছে। সরকারের দাবি মতে, এর মধ্যে মোট ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জেএসএস সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, সরকার শান্তিচুক্তির মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়াও ১৩টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করেছে এবং ৩৪টি ধারা অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তিনি আরো দাবি করেছে, শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহের দুই তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত রয়েছে। একই সাথে সন্তু লারমা আরো দাবি করে থাকেন, লিখিত শান্তিচুক্তির পাশাপাশি এর একটি অলিখিত রূপ বা প্রতিশ্রুতি ছিল। সন্তু লারমা লিখিত শান্তিচুক্তির চেয়েও শান্তিচুক্তির সমঝোতা বা প্রতিশ্রুতি বা অলিখিত রূপ বাস্তবায়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

শান্তিচুক্তির সাফল্য বা সুফল শান্তিচুক্তির ধারা বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধারা বাস্তবায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শান্তিচুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামো, জীবনযাপন, পরিবেশ, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুতায়ন, শান্তি ও স¤প্রীতি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পরিবর্তন। এসব ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উন্নয়ন হয়েছে তা এককথায় অভূতপূর্ব। এককালের পানিশমেন্ট জোন পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ট্যুরিস্ট জোন, এন্টারটেইনমেন্ট জোন- এটাই পার্বত্য চুক্তির অনত্যম বড় সাফল্য। শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এটাই ছিলো। চুক্তির শুরুতে লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে ‌’পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে’ এ চুক্তি। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে সন্দেহ নেই। (এ বিষয়ে আমার পূর্বের লেখা ‘ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক: পুনর্মূল্যায়ন জরুরি’ তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ নীল রঙিন শিরোনামে ক্লিক করে পরে নিতে পারেন।)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচ্য, সেটা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ২১ বছরের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনকারী সরকার প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও শান্তিচুক্তির কিছু ধারা অবাস্তবায়িত, বাস্তবায়নাধীন বা আংশিক বাস্তবায়িত কেন থাকল? প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কি শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়? আওয়ামী লীগ শাসন আমলের বিগত ১৫ বছরের বিশেষ করে শেষ ৫ বছরের সরকারের কার্যক্রম বক্তৃতা-বিবৃতি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিবৃতি, উদ্যোগ, আন্তরিকতা বিশ্লেষণ করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে মোটেই অনাগ্রহী নয় বরং অত্যন্ত আন্তরিক। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই দীর্ঘ সময়ে শান্তিচুক্তি কেন পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হলো না? এর উত্তর দীর্ঘ ও বহুমুখী, এই লেখায় বিস্তারিতভাবে তা আলোচনা করা সম্ভব নয়। খুব সংক্ষেপে যদি আলোচনা করতে হয় তাহলে বলতে হয়, এই চুক্তিতে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে, সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে, জাতীয় চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ। শান্তিচুক্তিকালে তাড়াহুড়ো, অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণে এই ত্রুটিগুলো রয়ে যায়। মানুষের সৃষ্টি কোনো বিধানই একবারে বা শুরুতেই ত্রুটিমুক্ত করা সম্ভব নয়। এটা সেরূপ একটা ভ্রম। এই অসচেতন ভুলগুলোই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। নিম্নে এ লেখায় সেগুলো ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রথমেই শান্তিচুক্তির মুখোবন্ধের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। আলোচনার সুবিধার্থে অথবা বলার সুবিধার্থে কিংবা রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এ চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালোচুক্তি’, ‘দেশ বিরোধী চুক্তি’- নানা নামে আখ্যা দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে- এই চুক্তির নাম ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালো চুক্তি’- কোনোটিই নয়। সরকারি গেজেট অনুসারে এই চুক্তির নাম বলা হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সহিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি’। সম্পাদনকালীন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নন। তিনি সংসদ সদস্য মাত্র। তাহলে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সাথে জনসংহতি সমিতির চুক্তিকে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি বলে আখ্যা দেয়া কতটা সঠিক হবে? এ ছাড়া শান্তিচুক্তি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস করা হয়নি। যদিও শান্তিচুক্তির আলোকে গঠিত বিভিন্ন আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে, সংশোধিত হয়েছে। শান্তিচুক্তির এটি একটি অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতা।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অপরপক্ষ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ বা এর সভাপতি সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, এমনকি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিও নন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালি, সন্তু লারমা কোনভাবেই তাদের প্রতিনিধি নন। বরং তিনি প্রচণ্ড বাঙালি বিদ্বেষী। বাঙালিদের দাবি, তিনি ত্রিশ হাজার বাঙালি হত্যার নেতৃত্বদানকারী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে চুক্তি করে, সেই চুক্তি বাঙালিদের মেনে নিতে বলা অর্থহীন। কারণ, বাঙালিরা তো তাকে মানেই না। কেবল সন্তু লারমাই নন, পার্বত্য চুক্তিও প্রবলভাবে বাঙালি বিদ্বেষী ও বাঙালি স্বার্থ বিরোধী। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা বলে আখ্যা দিয়ে এখানকার অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালির অবস্থানকে অস্বীকার করা হয়েছে।

যে জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতির জন্য বাঙালি জাতি বহু শতাব্দি সংগ্রাম করেছে, চুক্তিতে সেই বাঙালিদেরকে ‘অউপজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। চুক্তিতে বাঙালির নাগরিকত্ব ও নির্বাচনের অধিকার উপজাতীয় সার্কেল চিফের করুণাধীন করা হয়েছে। এ চুক্তির ফলে সৃষ্ট সরকারি ও স্থানীয় সরকারের শীর্ষ পদে বাঙালিদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য পদেও বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যানুপাতে না করে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা এজন্য করা হয়নি যে, পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আওতায় করা হয়েছে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া উপজাতীয় নাগরিকদেরও এই চুক্তিতে অবহেলা করে সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি চাকমা আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সকল পদ উপজাতীয়দের এবং অন্যান্য পদেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সকল ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও সুবিধায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের দায়িত্ব শুধু উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ একই কারণে বিপুল সংখ্যক বাঙালি উদ্বাস্তু হলেও তাদের এই চুক্তির আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি।

শান্তিবাহিনীর খুনী ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসীদের ক্ষমা করে তাদের ২০ দফা প্যাকেজের আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও তাদের কারণে হতাহত হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাঙালিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি। তাদের স্বজনের হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভূমি কমিশন আইনে শুধু শরণার্থীদের বা বাস্তচ্যুত উপজাতীয়দের জমি প্রত্যার্পনের পরিবর্তে সকল ভূমির বিরোধ নিষ্পত্তি এবং তা মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেয়ায় সেখানকার বাঙালিরা ভূমিহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে উপনীত হয়েছে। এভাবে ছত্রে ছত্রে এই চুক্তিতে বাঙালিদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এমন একটা চুক্তি বাঙালিরা কেন মানবে বা তাদের মানতে বলা হবে? এ চুক্তিতো বাঙালীর আত্মহত্যার দলিল। কোনো মানুষ কি নিজে তার আত্মহত্যার সনদে স্বাক্ষর করতে পারে?

শুধু বাঙালি নয়, সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠিরও প্রতিনিধি নন। তার দল জনসংহতি সমিতি চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করে না বা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠি জনসংহতি সমিতি করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চারটি আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তার একটি। বাকীরা জনসংহতি সমিতির(সন্তু) গ্রুপের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে বা জেএসএসের সাথে চুক্তি করে সন্তু বিরোধী এ সমস্ত উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনকে সেই চুক্তি মেনে নিতে বলা কতটা যুক্তি সঙ্গত তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সাধারণ পাহাড়ি, যারা কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়, কিন্তু হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ইত্যাদির কারণে সন্তু লারমা ও জনসংহতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও সমিতিকে ঘৃণা করে। তাদেরও জনসংহতি সমিতিকে প্রতিষ্ঠাদানকারী সন্তু লারমার সাথে কৃত চুক্তি মেনে নিতে বলা যুক্তিযুক্ত নয়।

হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন, তখন তো চারটি সংগঠন ছিল না। একটি সংগঠন ছিল- জনসংহতি সমিতি। এ কথা ঠিক যে, তখন চারটি আঞ্চলিক সংগঠন ছিল না। কিন্তু জনসংহতি সমিতি সম্পূর্ণভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। কাজেই সরকার যখন জেএসএসের একটি অংশের সাথে সংলাপ করে তার সাথে চুক্তি করেছে, তখন অপর অংশ এর বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ নামে নতুন সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। যারা শান্তিচুক্তির আলাপ ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ছিলেন তারা আরেকটু সতর্ক হলে বিষয়টি এড়ানো যেতো। সন্তু লারমাও এ চুক্তির ব্যাপারে তার দলের প্রতিবাদী অংশের সাথে কোনোরূপ আলোপ-আলোচনা করা, তাদের মতামত নেয়া, তাদের পুনর্বাসনের আওতাভুক্ত করার কাজটি করেনি। কাজেই সন্তু লারমা অস্ত্র সমর্পণ করে পুনর্বাসিত হলেও তার বিরোধী অংশ অস্ত্র সমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে সন্তু লারমা অংশের লোকেরাও সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর পূর্ণ আস্থাশীল হতে না পারায় শান্তিবাহিনীর একাংশকে ভারী ও উন্নত অস্ত্রসহ জঙ্গলে রেখে ভাঙাচোরা অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিবাহিনী অফিসিয়ালি অবলুপ্ত করার ঘোষণা দিলেও কার্যত শান্তিবাহিনী বহাল থাকে। এই দুই অংশের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা শান্তিচুক্তির পর দুই দশকে নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বণ্দ্বে এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, নির্যাতন চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত করেছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পূর্বে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩, বিজিবি ৯৬, পুলিশ ৬৪, আনসার ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে অফিসার ৫ জন, জেসিও ৩ জন, বাকিরা সৈনিক। এছাড়াও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ, ভূমিধস প্রভৃতি কারণে মারা গেছে আরো অনেকে। এর মধ্যে শান্তিচুক্তির পূর্বে শুধু ম্যালেরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬০ জন এবং পরে ৮১ জন মারা গেছে। উভয় কারণে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে শান্তিচুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ৯৬ জন সদস্য মারা গেছে। এর মধ্যে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে মারা গেছে ১১ জন, ৫ জন রাঙামাটির ভূমিধসে।

শান্তিচুক্তির পূর্বে নিরাপত্তা বাহিনী ১৬ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে গ্রেনেড ৩৫৯টি, মর্টার ৭০টি, মাইন ১৩টি এবং অন্যান্য গোলাবারুদ সাড়ে ৪ লক্ষ। এক পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পরে ২০০৫ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৭৩০টি অস্ত্র ও ১ লক্ষ ৮৬ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। শান্তিচুক্তির পূর্বে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ২৩৮ জন উপজাতি, ১০৫৭ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৮১ জন উপজাতি ও ৬৮৭ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ২৭৪ জন উপজাতি ও ৪৬৮ জন বাঙালি।

একই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শান্তিচুক্তির পরে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ৪৭৪ জন উপজাতি, ১৮৬ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৬৪৬ জন উপজাতি ও ৬৪২ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ৯১০ জন উপজাতি ও ৩৮৪ জন বাঙালি। এমতাবস্থায় শান্তিচুক্তিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষে সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার সম্ভব হয়নি (আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস ও কৌশলগত ঝুঁকির কথা এখানে বিবেচিত হয়নি)। তবু শান্তিচুক্তির ২১ বছরে সরকার একটি ব্রিগ্রেডসহ ২৪০টি নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর যেসকল ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, ওই সকল এলাকা উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলোর অনেকগুলো বিভিন্ন নামে সন্ত্রাসীরা দখল করেছে। ফলে স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পুনরায় নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানানো হয়েছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একপাক্ষিক বিষয় নয়, দ্বিপাক্ষিক। সন্তু লারমা অফিসিয়ালি শান্তিবাহিনী অবলুপ্ত ঘোষণা করলেও একথা সূর্যের মতো সত্য যে, শান্তিবাহিনী বিদ্যমান এবং এই বাহিনীর হাতে ভয়ানক মারণাস্ত্র রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ করেননি তিনিই আবার সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে শান্তিচুক্তি করেও সন্তু লারমা নিজে এখনো বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় থেকেও তিনি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন করেননি। সরকারকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করার দাবি জানানোর পূর্বে তাকে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ছাড়তে হবে। কেননা, বাংলাদেশের সংবিধানে প্রাদেশিক কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। আঞ্চলিক সংগঠন যদি শান্তিচুক্তি মানতোই তাহলে তাদের মনে জুম্মল্যান্ডের স্বপ্ন কেন? জুম্মল্যান্ডের পতাকা, মানচিত্র, জাতীয় সঙ্গীত, প্রতীক, সেনাবাহিনী কেন?

অনেকেই জানেন, শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। এই রিটে উচ্চ আদালত শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারাকে সংবিধান বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বর্তমানে এই রিটটির আপিল বিভাগে শুনানি চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আদালতের এই অবর্জাভেশনগুলোরও সমাধান হওয়া জরুরি। এ চুক্তিতে যে আঞ্চলিক পরিষদের কথা বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত তাকে সংবিধান ও বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠনের সুযোগ রাখা হয়নি। সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠির জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বিশেষ উপজাতীয় গোষ্ঠিকে নয়। আদালতের রায়ে এ বিষয়েও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কোনো পদ কোনো জাতির জন্য বারিত রাখার সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদগুলো বাঙালিদের জন্য বারিত করা হয়েছে। চুক্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সাব ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদগুলোতে নিয়োগ ও বদলীর দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের হাতে দেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এসব পদে উপজাতীয়দের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ ধারা বাস্তবায়ন তো দূরেরর কথা, এ ধারার আওতায় ইতোমধ্যে মিশ্র পুলিশ সৃষ্টি করে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় পুলিশের আনুগত্য প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসকল কারণেও সরকারের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে।

আজ সময় এসেছে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। শান্তিচুক্তিতে বিদ্যমান অসংঙ্গতি, বৈষম্যমূলক বিধান ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ধারা বজায় রেখে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশে সংবিধান যদি ১৭ বার সংশোধিত হতে পারে তবে শান্তিচুক্তি কেন যুগোপযোগী হতে পারবে না? এমনকি শান্তিচুক্তি দ্বারা গঠিত বিভিন্ন আইন ইতোমধ্যে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। তাহলে শান্তিচুক্তি কেন আপডেইট করা যাবে না? এখানে সংশোধন শব্দটি পরিহার করে আপডেইট শব্দটি ব্যবহার করা হলো যার সুপ্রযুক্ত বাংলা হতে পারে যুগোপযোগীকরণ। সময়ের ব্যবধানে সন্তু লারমা নিজেও কিছু নতুন নতুন দাবি তুলেছেন, অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠিরও কিছু দাবি রয়েছে, বাঙালিদের দাবি রয়েছে। কাজেই সকলের দাবি আলোচনা করে সংবিধানের ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন দাবিগুলো বিবেচনা করে শান্তিচুক্তি যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থেই এই যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, শান্তিচুক্তি ও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? সংক্ষেপে উত্তর, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলেই কি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? উত্তর, কোনোভাবেই নয়। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিই এই শান্তিচুক্তির আওতার বাইরে রয়েছে। বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিকে বাইরে রেখে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? সন্তু লারমার চুক্তি প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু কিম্বা তরু চাকমাকে মেনে চলতে বললে তারা তা কখনোই মানবে না। কারণ তারা কেউ সন্তু লারমাকে মানেন না? অন্যদিকে শান্তিচুক্তি করে সন্তু লারমা পতাকা উড়িয়ে চলবেন, জেএসএস নেতারা সরকারি বিভিন্ন পদ-পদবী অলঙ্কৃত করে সুবিধা ভোগ করবেন আর প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু, জলেয়াদের লোকেরা জঙ্গলে অনিশ্চিত জীবন কাটাবে যে চুক্তিতে সে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সে কারণে শান্তিচুক্তির যুগোপযোগীকরণে এদেরও অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

আমরা আন্তরিকভাবে মনে করি, সরকার যদি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করতে পারে তবে প্রসীত, সুধাসিন্ধু, তরুর সাথে আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়? তারা কী এমন করেছেন যা সন্তু লারমা করেননি? পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসন দাবি? সে তো সংবিধান মেনে চুক্তি করেও সন্তু লারমা দাবি করছে? হয়তো পূর্ণাঙ্গ শব্দটি ব্যবহার করেননি। কাজেই তারা পাপী হলে সন্তু লারমাকে পূণ্যবান ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

দীর্ঘদিন পুলিশ, র‌্যাব দিয়েও যা পারা যায়নি, বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরবনের বনদস্যু, মহেশখালীর জলদস্যুদের সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসনের আওতায় অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সেসব এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। শুধু সুন্দরবন বা মহেশখালী নয়, বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়ন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এমএনপির বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র সন্ত্রাসীর অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উপর জোর দিয়ে বলেছেন, এ সমস্যার সামরিক সমাধান নেই। তাহলে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেএসএসের(সন্তু) বাইরে বিদ্যমান সকল উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন ও তাদের সামরিক শাখার সাথে আলোচনা করে তাদের নায্য দাবিগুলো সংবিধানের আলোকে বিবেচনা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের এ সকল আঞ্চলিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আমার পেশাগত যেসব আলোচনার সুযোগ হয়েছিল তাতে আমি দেখেছি, তারা নিজেরাও সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী এবং আলোচনায় বসলে তাদের নায্য দাবিগুলো বিবেচনা করলে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী দাবিগুলোতে তারাও ছাড় দিতে প্রস্তুত বলেই আমার মনে হয়েছে। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালিদেরকে, তাদের স্বীকৃতি ও দাবিগুলোকেও শান্তিচুক্তির আওতাভুক্ত করে বিদ্যমান শান্তিচুক্তিকে যুগোপযোগী করা সময়ের দাবি। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের স্বার্থে এর কোনো বিকল্পও নেই।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

শান্তিচুক্তির ক্ষীর খাচ্ছেন সন্তুু বাবুরা: পার্বত্য বাঙালিদের অস্তিত্ব ঠেকেছে তলানীতে

মনিরুজ্জামান মনির ॥

অনেক আশা আকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বা তথাকথিত শান্তিচুক্তি। কিন্তু বাস্তবে এই শান্তিচুক্তি নামকরণ মোটেও কার্যকরী হয় নাই। বরং এই চুক্তির বলে সন্তুবাবুরা বিগত ২১টি বছর শান্তিচুক্তির ক্ষীর, মাখন একতরফাভাবে খেয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের নিরীহ নির্যাতিত ও বঞ্চিত বাঙালি জনগোষ্ঠির অস্তিত্ব আজ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীন ও স্বার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আজ হুমকির মুখে। কেননা, তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলায় পাহাড়, জঙ্গল, অরণ্য, বন বনানীতে বাঙালিদের কোন বাক স্বাধীনতা নেই।

দূর্গম পাহাড়ী এলাকায় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা অবাধে চাঁদাবাজী, খুন, গুম, মুক্তিপণ আদায়, বন্দুকযুদ্ধ, এলাকায় বিচার-আচারসহ যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। আমাদের পুলিশ বাহিনী নানারূপ কারণে দুর্গম এলাকায় অপারেশন পরিচালনা করতে পারে না। কারণ তাদের সেই প্রশিক্ষণও নেই এবং মন মানুষিকতা আছে কি না সেই প্রশ্ন দুর্গম এলাকাবাসী উপজাতি ও বাঙালি ভূক্তভোগী জনগণ পদে পদে অনুধাবন করছেন। নিজের ভাগ্যকে শান্তনা দিচ্ছেন এই বলে: কেন আজ এই পাহাড়ে এসে সন্তান সন্ততি নিয়ে বসতি গড়লাম?। কি অপরাধ করেছি আমরা এই পাহাড়ে এসে। কেন আজ আমাদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, স্বাস্থ্য, সুখ ও সমৃদ্ধি হুমকির মুখে? দেশের হতদরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সরকার এই প্রশ্নের কি জবাব দিবেন?

পরিচয় সংকটে পাহাড়ের উপজাতি জনগোষ্ঠি
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠিকে সরকারিভাবে উপজাতি কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই পরিচিতি উপজাতীয় নেতাদের বড় একটি অংশ মেনে না নিয়ে নিজেদেরকে আদিবাসী হিসেবে জাহির করে চলেছেন। নিরীহ সরলপ্রাণ উপজাতিরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, পাংখু, তংচঙ্গা, লুসাই ইত্যাদি পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। কিন্তু সন্তু বাবুরা তাদের শত বছরের ঐতিহ্য কেড়ে নিয়ে নিজেদের পরিচিতি দিচ্ছেন জুম্ম জাতি বলে।

বিগত তিন যুগে তারা গেরিলা যুদ্ধের নামে ত্রিশ হাজার বাঙালি হত্যা করেছেন, পাহাড়ে লিফলেট বিতরণ করে বলেছেন- ঘরে ঘরে দুর্গ গড়, জুম্মল্যান্ড কায়েম কর। তারা খুনী শান্তি বাহিনীর নাম দিয়েছিলেন জুম্ম লিবারেশন আর্মি। তথাকথিত জুম্ম জাতির জনক হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন এম.এন লারমাকে। অথচ তাদেরই বিদ্রোহী গোষ্ঠির হাতে ভারতের আগরতলায় জীবন হারাতে হয়েছে লারমাকে।

এছাড়া অনেক উপজাতি নেতা আদিবাসী কিংবা জুম্ম জাতি এর কোনটিই সমর্থন করছেন না। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিংবা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে বাংলাদেশের একজন সম্মানীত নাগরিক হয়ে বেঁচে থাকতে চান। কিন্তু এসব উপজাতি নেতাদেরকেও সন্তু বাবুদের আদর্শের প্রতি আনুগত্য না থাকায় নির্বিচারে গোপনীয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে।

উরিমহন ত্রিপুরা, চাবাই মগ, সুবিনয় চাকমা, শান্তিময় দেওয়ান, চুনিলাল চাকমা, মেজর পিউর, অঞ্জনা চাকমা, এলথাংগা পাঙ্খু, বংকিম দেওয়ানসহ শত শত উপজাতীয় নেতাকে সন্তুলারমা বাহিনী হত্যা করেছে। অথচ তাদের কি অপরাধ ছিল? পাহাড়ের নতুন প্রজন্মের উপজাতীয় যুব সমাজের কাছে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এজন্যই অহরহ জেএসএস বনাম ইউপিডিএফ চলে বন্দুক যুদ্ধ।

নেতৃত্বের সংকট চলছে উপজাতিদের মধ্যে
উপজাতীয় সমাজে হেডম্যান, কারবারি, সার্কেল চীফ ইত্যাদি দীর্ঘকাল থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম এ ধরণের নেতৃত্বকে মেনে নিতে পারছেন না। তাছাড়া সন্তু বাবু ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের কাছে বন্দি হয়ে পরে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের প্রতি সমর্থনের মুচলেকা দিয়ে মুক্তি আদায় করেছিলেন। কিন্তু তিনি পরে আর সেই ওয়াদা রক্ষা করেন নাই। সন্তু বাবুকেও পাহাড়ের উপজাতি জনগোষ্ঠী নেতা হিসেবে মেনে নেয় নাই।

বর্তমানে সন্তু বাবুর নেতৃত্বে জনসংহতি সমিতি ছাড়াও বিদ্রোহী ইউপিডিএফ, জনসংহতি সমিতি (এম.এন লারমা), ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, হিল ওমেন ফেডারেশন, বোরকা পার্টি ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পাহাড়ে বন্দুকযুদ্ধ চাঁদাবাজি, খুন, গুম আধিপত্য বিস্তারসহ নানাভাবে জনগণের উপর অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে চটকদার দাবীদাওয়া তুলে বিগত ২ দশক যাবত প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় সন্তুবাবু আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ক্ষমতার হালুয়ারুটি ভোগ করে চলছেন। প্রতি বছর ২ ডিসেম্বর এলেই তিনি নানারূপ দাবী দাওয়া ঘোষণা দিয়ে ঢাকার বড় বড় হোটেলে সভা-সমিতির মাধ্যমে মিডিয়াকে ব্যতিব্যস্ত রাখেন। তার প্রতি পাহাড়ের জনগণের নেতৃত্ব আছে কি না সেটিও আজ প্রশ্নের মুখে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়ে জাতীয় নেতৃবৃন্দের অভিমত
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম বীর প্রতীক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা দেশের অন্য বাঙালিদের অধিকারের দিক দিয়ে বঞ্চিত জনগোষ্ঠি। দেশের বড় একটি বুদ্ধিজীবী গ্রুপ তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে। বুদ্ধিজীবী গ্রুপকে দেশের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষায় সম্পৃক্ত করানোর জন্য উপজাতি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। কারো হাতিয়ার হওয়া যাবে না। আওয়ামীলীগের শান্তিচুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন- আওয়ামী লীগ আজ দেশকে ডিজিটাল করার জন্য বলছে, কিন্তু ৭৫ এর আগে কী করছে তা তারা বলে না। তাদের সময় থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি শুরু হয়। সেই অশান্তি আজো বিরাজ করছে। তাই এই সরকারের কাছ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি আশা করা যায় না (সূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত)।

কলামিস্ট এরশাদ মজুমদার বলেন- পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারত, পাকিস্তান আমলে সমস্যার সৃষ্টি করে। এই ধারাবাহিকতায় ভারত আজও সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে চলছে। এ জন্য দেশের জনগণকে সচেতন হতে হবে।

নিউ নেশন সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, আমাদের দেশে যা বলা হয় তার উল্টো বর্ণনা করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারেও বহির্বিশ্বে বিপরীত বর্ণনা করা হয়। তাই সব ভুল ভাঙিয়ে দেশ রক্ষার জন্য কাজ করতে হবে।

কবি ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার বলেন- এই সরকার নিজেদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন, দেশকে অস্থিতিশীল ও ভারতের মনোরঞ্জন করার কাজে ব্যস্ত। তাদের কাছ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের শান্তি আশা করাটা বড় ভুল। এ জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের প্রধান কাজ হবে দেশের জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নেতৃবৃন্দ অনেক পরামর্শ ও সুপারিশ করেছেন যা আজো বাস্তবায়িত হয় নাই। বিচারপতি আব্দুর রউফ, বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী, শিক্ষাবিদ ড. এরশাদুল বাড়ি, প্রফেসার এমাজ উদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী, আতাউস সামাদ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ পার্বত্যবাসী জনগণের মধ্যে ঐক্য শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার জন্য সরকারের কাছে যে সব পরামর্শ দিয়েছিলেন সেগুলোকে আদৌ বাস্তবায়িত করা হয় নাই।

বরং ঐ সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দের পরামর্শকে পাশ কাটিয়ে ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং চমক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কিংবা নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আশায় অনেক জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্চলী দিয়ে বৈসম্যমূলক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল যার ৯৯ভাগ বাস্তবায়ন হওয়া সত্ত্বেও সন্তু বাবুদের পাওয়ার খুধা আজো মিটে নাই। কোন দিন মিটবে কি না সে প্রশ্ন জাতির বিবেকের কাছে। কেননা এখন শুধুমাত্র জুম্মল্যান্ড নামে পৃথক পতাকা উড়ানো ছাড়া সন্তু বাবুদের আর কোন কাজ বাকি আছে বলে মনে হয় না।

দেশের এক ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেলিপ্ত মুক্তিবাহিনীকে দমন করতে না পেরে নিরিহ ৩০ লাখ বাঙালীকে হত্যার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ করেছিল। একই কায়দায় বাংলাদেশের হৃদপিন্ড পার্বত্য চট্টগ্রামকে ছিনিয়ে নিয়ে স্বাধীন জুমল্যান্ড বানাবার নামে বিগত ৩ যুগ যাবত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না পেরে ৩০ হাজার নিরীহ পার্বত্যবাসী বাঙালীকে হত্যার মাধ্যমে আরেকটি যুদ্ধাপরাধ করেছেন সন্তুলারমা বাহিনী। যা আজৌ অব্যাহত আছে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল ৫৫৫৯৮ বর্গ মাইলে বসবাসরত বাঙালী উপজাতি সকল নাগরিকের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বিগত ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির বিনিময়ে পার্বত্যবাসী বাঙালিরা সাংবিধানিক সমঅধিকার হারিয়েছে। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, স্বাস্থ্য, সুখ-সমৃদ্ধিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালীদেরকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিনত করা হয়েছে। “ঘরে তাদের খুধার জ্বালা, বাহিরে প্রাণের ভয়”-মরহুম সাংবাদিক নাজিম উদ্দিন মোস্তানের এই পর্যবেক্ষনকে স্মরণ করে এবং সম্মান জানিয়ে ২ রা ডিসেম্বরকে বরন করে নেয়া ছাড়া পাহাড়ের জনগণের বিকল্প কোন পথ খোলা নেই। আসুন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে রক্ষা করি। জুমল্যান্ড প্রতিরোধ করি।

লেখক: মনিরুজ্জামান মনির, মহাসচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন, কেন্দ্রীয় কমিটি

পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ প্রচারণা ও বাস্তবতা

মাহের ইসলাম

খোদ চট্রগ্রাম শহরে তরুণ-বৃদ্ধ নির্বিশেষে অসংখ্য উপজাতি আর বাঙালি আনন্দ-উল্লাসমুখর পরিবেশে ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড, ব্যানারসহ একই কন্ঠে শ্লোগান দিচ্ছে-

‘পাহাড়ী-বাঙালি ভাই ভাই, যুদ্ধ নয়- শান্তি চাই’
‘পাহাড়ী-বাঙালি ভাই ভাই, আমরা সবাই শান্তি চাই’,
‘পাহাড়ী-বাঙালি ভাই ভাই, এক সাথে থাকতে চাই’।

হেমন্তের এক বিকেলে চট্রগ্রাম নগরীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরের সমাবেশ শেষে নারী-পুরুষের বর্ণাঢ্য মিছিল লালদীঘি, কোতোয়ালী থানা, নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড, এনায়েত বাজার ইত্যাদি এলাকা প্রদক্ষিণ করার সময় হাজার হাজার মানুষের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত শ্লোগানে শ্লোগানে কম্পিত হচ্ছিল সমগ্র এলাকা।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে কারো কারো কাছে আপাতদৃষ্টিতে উপরের ঘটনা নিতান্তই কাল্পনিক মনে হতে পারে। কিন্তু যতই কাল্পনিক আর অবিশ্বাস্য মনে হোক না কেন, উপরের ঘটনা পুরোপুরিই সত্য। ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের কয়েকদিন আগে চট্রগ্রামের তৎকালীন মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে আর অন্যান্যদের মধ্যে বান্দরবান স্থানীয় পরিষদের চেয়ারম্যান থোয়াইং প্রু মাস্টার এর উপস্থিতিতে এই সমাবেশ এবং মিছিল হয়েছিল। উপজাতি-বাঙালি নির্বিশেষে দেশের আপামর জনসাধারনের কাছে পার্বত্য চট্রগ্রামে সংঘাতের সমাপ্তি আর শান্তির সম্ভাবনা কতটা কাঙ্ক্ষিত ছিল– এই ঘটনা তার একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। (আলী, ১৯৯৮, পৃ. ৫৯)

এর পরে অনেকটা সময় পার হয়েছে। এক-দুই বছর হয়ে এখন দুই দশকের বেশী সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে যখন এক পক্ষে অভিযোগের আওয়াজ উঠে যে, ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ বিষয়ই অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়ে গেছে’, বা ‘সরকার চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি’ অথবা ‘একের পর এক চুক্তি বিরোধী ও জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব বিলুপ্তির কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলছে’ – তখন পুরো বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ না করে উপায় থাকে না। সঙ্গত কারণেই এমন অভিযোগের যথার্থতা নিরূপণের প্রচণ্ড তাগিদ জেগে ওঠে আপনা-আপনিই, নিজের ভিতর থেকেই।

চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করার জন্যে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এড়ানোর অভিপ্রায়ে, চুক্তির দুই দশক পূর্তি উপলক্ষ্যে উভয় পক্ষের প্রকাশিত বুকলেটকে তথ্যের মূল উৎস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে, যথাঃ

১। পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগিতায় আইসিএলডিএস কর্তৃক প্রকাশিত
‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের দুই দশক’।
২। পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি কর্তৃক প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ২০১৭’।

জেএসএস এবং সরকারের পূর্বোক্ত দুটি প্রকাশনের আলোকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রসঙ্গে উভয় পক্ষের মতভিন্নতা নিচের টেবিলে দেখানো হলোঃ

পরিসরের স্বল্পতা বিবেচনায় সঙ্গত কারণেই প্রতিটি ধারার ব্যাপারে উভয় পক্ষের বক্তব্যের বিস্তারিত আলোচনা পরিহার করা হচ্ছে। তবে, উভয় পক্ষের দাবীর মতভিন্নতার উপর আলোকপাত না করলে, দাবীর যথার্থতা নির্ণয় করা নিতান্তই দুরুহ বিধায় শুধুমাত্র প্রথম খণ্ডের ৪টি ধারা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার প্রয়াস নেয়া হলো।

চুক্তির প্রথম খণ্ডে উপজাতি অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, বিভিন্ন আইন প্রণয়ন ও সংশোধন, চুক্তি বাস্তবায়নে পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন এবং চুক্তির মেয়াদ সংক্রান্ত বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নের অগ্রগতির একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র নিম্নরূপঃ

১ম (ক.১) ধারাঃ “উভয়পক্ষ পার্বত্য চট্রগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করিয়া এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছে।”

বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ
সরকারী দাবী মোতাবেক – বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যথাঃ
২০১১ সালে বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও জাতিসত্বাসমুহের ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ও সংরক্ষণের বিষয়াদি নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়াও পার্বত্যাঞ্চলের বৈশিস্ট্য সংরক্ষণ এবং সার্বিক উন্নয়নের পরিকল্পনার রূপরেখা বর্তমান সরকারের রূপকল্প ভিশন ২০২১ এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

তবে, জেএসএস এর দাবী মতে, এই ধারাটি এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে।

২য় (ক.২) ধারাঃ “উভয় পক্ষ এই চুক্তির আওতায় যথাশীঘ্র ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐক্যমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমুহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হইবে বলিয়া স্থিরিকৃত করিয়াছেন।”

বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ
সরকারী দাবী মোতাবেক– বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যথাঃ
পার্বত্য চুক্তির ধারা অনুযায়ী ১৯৮৯ সালের তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ১৯৯৮ সালে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
এছাড়াও উপজাতিদের দাবী মেনে নিয়ে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১ এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন, ২০১৬ সংসদে অনুমোদনের পরে ১৩ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশ গেজেট আকারে জারী করা হয়েছে।

তবে, জেএসএস এর দাবী মতে, এই ধারাটি এখনো অবাস্তবায়িত রয়েছে। কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে যে, আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা হলেও “পার্বত্য চুক্তির সাথে সংগতি বিধানকল্পে পুলিশ এক্ট, বাংলাদেশ পুলিশ রেগুলেশন ও পার্বত্য চট্রগ্রাম রেগুলেশন ইত্যাদিসহ পার্বত্য চট্রগ্রামে প্রযোজ্য অর্ধ-শতাধিক আইন, প্রবিধান বা বিধিমালা সংশোধন করা হয়নি।“

৩য় (ক.৩) ধারাঃ “এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করিবার লক্ষ্যে নিম্নে বর্ণিত সদস্য সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হইবেঃ
(ক) আহবায়কঃ প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য।
(খ) সদস্যঃ এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান।
(গ) সদস্যঃ পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি।

বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ
সরকারী দাবী মোতাবেক – বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের মাননীয় উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে আহবায়ক করে ২৫ মে ২০০৯ তারিখে তিন সদস্য বিশিষ্ট চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে এই কমিটির সভাপতি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। মন্ত্রীর পদমর্যাদায় গত ৮ মার্চ ২০১৮ তারিখে নিযুক্ত করা হয়েছে।

তবে, জেএসএস এর দাবী মতে, এই ধারাটি আংশিক বাস্তবায়িত রয়েছে।

৪র্থ (ক.৪) ধারাঃ “এই চুক্তি উভয়পক্ষ কর্তৃক সম্পাদিত ও সহি করিবার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।“

বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ
সরকারী দাবী মোতাবেক – বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চুক্তির কার্যকারিতার মেয়াদ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্বাক্ষরের তারিখ হতেই এটি কার্যকর হবে। তবে ২০০০ এবং ২০০৭ সালে পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তি, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন এবং আঞ্চলিক পরিষদ আইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মামলা দায়েরের প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল তারিখে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের কতিপয় ধারা সংবিধান বিরোধী মর্মে ঘোষিত রায়ের প্রেক্ষিতে সরকার মামলা দু’টি নিস্পত্তির লক্ষ্যে সর্বাত্নক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে, এই ধারার বাস্তবায়নের ব্যাপারে জেএসএস এর পক্ষ হতে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে উভয় পক্ষের দাবীর মধ্যে মতভিন্নতা লক্ষ্যণীয়, যেখানে নিজেদের দাবীর সপক্ষে ধারা এবং বিষয়ের আলোকে বাস্তবায়নের অগ্রগতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে শুধুমাত্র চুক্তির প্রথম খণ্ড যেখানে ৪টি ধারা রয়েছে, তার অগ্রগতির মতভিন্নতার দাবীসমূহের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। অবশিস্ট তিন খণ্ডে আরো ৬৮টি ধারার বাস্তবায়নের অগ্রগতির ব্যাপারেও যথারীতি মতভিন্নতা রয়েছে।

সরকারী দাবী অনুযায়ী চুক্তির ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ ও ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে,অবশিস্ট ৯টি ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

অপরপক্ষে পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তির ২১তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি গত ২৯ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে ঢাকায় হোটেল সুন্দরবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। উক্ত সম্মেলনে বিতরণকৃত প্রচারপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “৭২ টি ধারার মধ্যে মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং মৌলিক বিষয় সমুহসহ দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।”
উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জেএসএস মোট ৩৮ টি ধারার বাস্তবায়নের ব্যাপারে মতামত প্রকাশ করলেও অবশিষ্ট ৩৪টি ধারার বাস্তবায়নের ব্যাপারে কোন মতামত প্রকাশ করেনি।

এমতাবস্থায়, উভয় পক্ষের দাবীর যথার্থতা নির্ণয়ের দায়িত্ব সচেতন পাঠককুলের হাতেই ন্যস্ত করা শ্রেয়। পাঠককুলের সুবিধার্থে, পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়নের কয়েকটি বিশেষ দিক নিচের তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছেঃ

  • ১। ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে।
    ২। ১৯৯৯ সালের ৭ মে পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
    ৩। পার্বত্য চট্রগ্রামের তিনটি জেলাতেই ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে এবং জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীনে ২৮ – ৩০টি বিষয় হস্তান্তর করা হয়েছে।
    ৪। ১৯৯৯ সালে ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়েছে। পাহাড়িদের দাবীর প্রেক্ষিতে ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এ সংশোধনী এনে ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন ২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে।
    ৫। ভারত হতে প্রত্যাগত ১২,২২৩ টি উপজাতি শরণার্থী পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
    ৬। শান্তি বাহিনীর সদস্যদেরকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে।
    ৭। ৭১৫ জন শান্তি বাহিনী সদস্যকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
    ৮। ২৫২৪ জনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ৯৯৯টি মামলার তালিকার মধ্যে ৮৮৪টি মামলা যাচাই-বাছাই এবং তন্মধ্যে ৭২০টি মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া চলমান।
    ৯। একটি পদাতিক ব্রিগেডসহ ২৪০টি নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে।
    ১০। ‘পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। যার দায়িত্বে রয়েছেন চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী স্বয়ং।
    ১১। পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক ‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
    ১২। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে সরকার উপজাতিদের নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার জন্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ‘সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিল ২০১০’ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইন্সটিউট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভাষা সংরক্ষণের অভিপ্রায়ে মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিনামুল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে।
    ১৩। সরকারী চাকুরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নির্ধারিত কোটা/অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে।
    ১৪। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের জন্যে কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
    ১৫। পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং পার্বত্য চট্রগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের শীর্ষস্থানীয় পদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্য হতে প্রতিনিধি নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।
    ১৬। পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ‘সম্প্রদায়ের একজন সংসদ সদস্যকে প্রতিমন্ত্রী সমমর্যাদায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
    ১৭। ১৯৯৮ সালের পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।
    ১৮। ১৯৭৬ সালে জারীকৃত ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ অধ্যাদেশ বাতিল করে ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০১৪ ‘ জাতীয় সংসদে পাশ করা হয়েছে।
    ১৯। ২০১৮ সালে ঢাকার বেইলী রোডে ১.৯৪ একর জমিতে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতিদের জন্যে ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম কমপ্লেক্স’ নির্মাণ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্রগ্রামের ১৬ লাখ অধিবাসীর প্রায় অর্ধেক বাঙালি হলেও উপরোল্লিখিত তালিকার সুবিধাভোগী প্রায় শতভাগই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অন্তর্গত।

এছাড়াও পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর হতে বিগত ২১ বছরে পার্বত্য অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যে যে সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে – তার সুফল কারা ভোগ করছে সেটা বলাই বাহুল্য। পার্বত্য চট্রগ্রামের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের একটা খণ্ড চিত্র নিচে তুলে ধরা হলোঃ

  • ১। পার্বত্য চুক্তির পূর্বে ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৫০.৫৭ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে উন্নয়ন বাজেটে বরাদ্দ করা হয়েছে ৯১৫.৮৩ কোটি টাকা।
    ২। চুক্তি স্বাক্ষরের পরে পার্বত্য চট্রগ্রামে ১৭৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ কোটার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রতি বছর ৩২৫ জন উপজাতি ছাত্রছাত্রী বিশেষ কোটা সুবিধা ভোগ করছে।
    ৩। সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রেও উপজাতিদের জন্যে বিশেষ কোটা সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
    উল্লেখ্য যে, শুধুমাত্র আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্রগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এবং মন্ত্রনালয়ে কর্মকর্তা – কর্মচারী মিলিয়ে প্রায় চার শত উপজাতি চাকুরীতে নিয়োজিত রয়েছে।
  • ৪। পার্বত্য চট্রগ্রামের জনসংখ্যার ৫১% উপজাতি আর ৪৯% বাঙালি। এতদসত্তেও, শিক্ষা বৃত্তির ৭৭% বরাদ্দ করা হয়েছে উপজাতি শিক্ষার্থীদের জন্যে। অথচ, বাঙালীদের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে ২৩% শিক্ষা বৃত্তি।
    ৫। পার্বত্য চুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্রগ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যাপ্ত ছিল না। চুক্তির পরে ইতোমধ্যেই তিন জেলায় ৫০৭ কিমি (৩৩কেভি), ৯৮৩ কিমি (১১কেভি) এবং ১,৩৫৫ কিমি (৪কেভি) বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। উপরোন্ত, তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ উন্নয়নের জন্যে ৮৭৯.৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
    ৬। জাতীয় গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয়, এমন প্রত্যন্ত এলাকায় ৫০৫০টি পরিবারকে সৌর বিদ্যুৎ সরবরাহের এক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। অথচ, পার্বত্য চুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্রগ্রামের কোথাও সৌর বিদ্যুৎ সুবিধাদি ছিল না।
    ৭। মাত্র ২০০ কিমি পাকা রাস্তা ছিল সমগ্র পার্বত্য চট্রগ্রামে, শান্তি চুক্তির পূর্বে। চুক্তির পরে ইতোমধ্যেই প্রচুর ব্রিজ, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করা ছাড়াও ১৫৩২কিমি পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও ১০৫কিমি পাকা রাস্তা নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ৮৬০কিমি রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য ব্রিজের মধ্যে নির্মিত থানচি ব্রিজ এবং নির্মাণাধীন নানিয়ারচর ব্রিজ অন্যতম।
    ৮। শান্তি চুক্তির পরে টেলিযোগাযোগ, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট সুবিধাদির আওতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।
    ৯। তিন পার্বত্য জেলায় কৃষি ও কৃষি অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যে বিভিন্ন স্কিমের আওতায় ২৯৯ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
    ১০। চুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় স্থানীয়দের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে চুক্তি পরবর্তী সময়ে ১৩০টির অধিক দেশি ও বিদেশি এনজিও বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তন্মধ্যে ইউএনডিপি এককভাবে বিগত ১০ বছরে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এছাড়াও ৭ বছর মেয়াদি দুই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
    ১১। পার্বত্য চট্রগ্রামে উপজাতিরা প্রভূত আর্থিক সুবিধাদি ভোগ করছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
    যেমনঃ
    ক। উপজাতিদের আর্থিক সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় ২ লাখ টাকার মধ্যে হলে ১০০% উপজাতিদের জন্যে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ২ লাখ টাকার বেশী হলে ১০% উপজাতিদের জন্যে সংরক্ষিত আর ৯০% উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।
    খ। উপজাতি জনগোষ্ঠীর আয়কর দিতে হয় না। তাই, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পে তারা বাঙালীদের তুলনায় কম দর বিড করে কাজ বাগিয়ে নেয়।
    গ। পার্বত্য চট্রগ্রামে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে উপজাতিরা ৫% আর বাঙালিরা ১৬% হারে সুদ প্রদান করে।
    ঘ। বিশেষ অঞ্চল এবং অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে যেসব সুযোগ সুবিধা স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের মাধ্যমে বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে, তার পুরোটাই উপজাতিরা ভোগ করে।
    ১২। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় উপজাতিদের বিভিন্ন ধরণের সুবিধাদি নিয়মিতভাবে প্রদান করা হচ্ছে। যেমনঃ
    ক। ৪১,৮৪৭ জনকে বয়স্ক ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
    খ। ২২,৪১০ জনকে বিধবা ভাতা প্রদান করা হয়েছে।
    গ। ৭,৩১১ জনকে প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ৯৮১ জনকে প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।
    ঘ। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় ৫২,১৭২ জনের দারিদ্র বিমোচন তথা জীবন মান উন্নয়ন করা হয়েছে।
    ঙ। ৬২৩টি পরিবারকের পুনর্বাসনের জন্যে আশ্রয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
    ১৩। চুক্তি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্রগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিগত বছরগুলোতে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটছে। এতে স্থানীয় জনসাধারনের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে এবং জীবনমানের দ্রুত সার্বিক উন্নয়ন ঘটছে।

১৯৯৯ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম প্রসঙ্গ’ বইয়ে সালাম আজাদ এক কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, “সম্প্রতি বান্দরবানের এই জনসভায় সন্তু লারমা পাহাড়ি জনগণকে পুনরায় আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হতে আহবান জানিয়ছেন।“(আজাদ, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা. ১৯)। পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের মাত্র দুই বছরের মাথায় চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে তৎকালীন সরকারের আন্তরিকতার অভাবের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন সন্তু লারমা। অথচ, তখনো চুক্তি স্বাক্ষরকারী সরকার ক্ষমতাসীন ছিল। সন্তু লারমার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। অথচ, তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের দুই বছরের মধ্যেই আন্দোলনের প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলেন।

মনীষ দেওয়ান নামে শান্তি বাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট অস্ত্রসমর্পণের প্রেক্ষাপটে আজাদের জিজ্ঞাসার উত্তরে জানিয়েছিলেন, “চুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়নের জন্য কমপক্ষে আট/দশ বছর লাগবে”। (আজাদ, শান্তিবাহিনী ও শান্তিচুক্তি, ২০১৩, পৃ. ১১)। শান্তিবাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট যেখানে বুঝতে পারেন যে, এই চুক্তি বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন। সেখানে শান্তিবাহিনীর সর্বোচ্চ নেতা সন্তু লারমা যখন চুক্তি স্বাক্ষরের বছর খানেকের মাথায় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে আহবান জানান– তখন চুক্তির প্রতি তাদের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক হওয়াই স্বাভাবিক।

এই সন্দেহ দৃঢ়তা পায় যখন দেখা যায় যে, শান্তিবাহিনীর অপেক্ষাকৃত তরুণ ও শিক্ষিত অংশ চুক্তির বিরোধিতা করে অস্ত্র সমর্পণের অনুষ্ঠানে খোদ খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামেই ব্যানার উচিয়ে ধরে। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয় না, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং পাহাড়ি গণ পরিষদ এর নেতা কর্মীরা যখন প্রকাশ্যে চুক্তির বিরোধিতা করতে শুরু করে। অথচ, এরা কিছুদিন আগেও শান্তিবাহিনীর অন্য সকলের সাথেই একত্রে সংগ্রামে নিয়োজিত ছিল।

পার্বত্য চট্রগ্রামে সশস্ত্র দলের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সর্বজনবিদিত। চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা, গুম, ধর্ষণ ইত্যাদি পার্বত্য চট্রগ্রামের নিরীহ জনসাধারনের জীবনে নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই সমস্ত অনাচার, অত্যাচার এবং আইন-শৃংখলা পরিপন্থী কাজের সাথে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই উপজাতিরাই জড়িত। এরাই, যাদের একাংশ প্রকাশ্য চুক্তির বিরোধিতা করছে, শুরু থেকেই। আর, অন্য অংশ প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও শুরু থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে আসছে – যে ঘোষণা প্রতি বছর নবায়ন করা হচ্ছে।

সেই সাথে, পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতিদের আর্থ-সামাজিক ও জীবন-মান উন্নয়নে এবং চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গৃহীত উপরে বর্ণিত পদক্ষেপসমূহের বিপরীতে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলসমুহের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বিবেচনার আবশ্যকীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন।
এর বিপরীতে সরকার একতরফাভাবে চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে– যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ঢাকার বুকে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ‘পার্বত্য চট্রগ্রাম কমপ্লেক্স‘ উদ্বোধন। অথচ অপরপক্ষে অনুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বরং অস্ত্রের ঝনঝনানি ক্রমশ বাড়ছে, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর প্রচেষ্টা প্রতিনয়তই চোখে পড়ছে। সরকার যেখানে চেষ্টা করছে সাধারণ উপজাতির ভাগ্যোন্নয়নের, সেখানে আরেক পক্ষ সর্বদাই তাদের দুর্দশা বাড়িয়ে চলছে। এমনকি, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সমুহের সুফল ভোগ করা সত্ত্বেও প্রতি বছরই তোতাপাখির মত বুলি আওড়িয়ে যাচ্ছে যে, চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

এমতাবস্থায়, চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতার মাত্রার বিপরীতে কিছু উপজাতীয় দলের আন্তরিকতা এবং চুক্তি শতভাগ বাস্তবায়নের দেরীর পিছনে কার দায় কত বেশী বা কম সেটা পাঠককুলের সুবিবেচনার হাতে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে।

  • তথ্যসুত্রঃ
    ১। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তির ২১তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংবাদ সম্মেলন, ২৯ নভেম্বর ২০১৮, হোটেল সুন্দরবন, ঢাকা।
    পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়, (২০১৭), পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতিঃ শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের দুই দশক, ঢাকা, ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল এন্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ।
    ২। পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি, (২০১৭), পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ২ ডিসেম্বর ২০১৭, রাঙামাটি।
    ৩। সালাম আজাদ, (১৯৯৯), পার্বত্য চট্রগ্রাম প্রসঙ্গ, ঢাকা, আফসার ব্রাদার্স।
    ৪। সালাম আজাদ, (২০১৩), শান্তি বাহিনী ও শান্তিচুক্তি, ঢাকা, আফসার ব্রাদার্স।
    ৫। মোহাম্মদ সা’দাত আলী (সম্পাদনায়), (১৯৯৮), পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তিচুক্তি, ঢাকা, বনলতা প্রকাশনী।

লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে উপজাতিরা কতটুকু আন্তরিক?


সন্তোষ বড়ুয়া:
২ ডিসেম্বর ২০১৮ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের ২১তম বছর পূর্তি। প্রতি বছর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর দিবসে পার্বত্য চট্টগ্রামের কতিপয় উপজাতি নেতৃবৃন্দ শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে সরকারের প্রতি অংগুলি প্রদর্শন করে একতরফাভাবে দোষারোপ করে থাকেন। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে বিগত ২১ বছরে এর বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিলেও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাদের পক্ষ হতে আন্তরিকতার লেশমাত্র পাওয়া যায়নি। শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন কি সরকারের একার দায়িত্ব?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যে দেখা যায় যে, চুক্তির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়/দফতর হস্তান্তর করা হয়েছে।

শান্তিচুক্তির অবশিষ্ট অংশ বাস্তবায়িত না হওয়ার পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া আদালতে শান্তিচুক্তির বেশ কিছু ধারা চ্যালেঞ্জ করে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সমস্ত বিষয়সহ শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে যে সমস্ত অন্তরায় রয়েছে সেগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।

অপরপক্ষে, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করা নিয়ে উপজাতি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠন শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগীতা না করে উল্টো সরকারকে দোষারোপ করে দেশে-বিদেশে নানা ধরনের নেতিবাচক কর্মসূচি পালন করে আসছে। এমনকি তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো শুরু করেছে। এ নিয়ে তারা নানা রকম অপতৎপরতাও চালাচ্ছে।

গত বছর (২০১৭ সালে) “পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে স্বার্থান্বেষী উপজাতি সংগঠনগুলো” শিরোনামে আমার লেখাতে সরকার কর্তৃক শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে গৃহিত নানামূখী উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরেছিলাম। আমার আজকের লেখাতে শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়নে উপজাতি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনগুলো কতটুকু আন্তরিক তা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। লেখাটি নাতিদীর্ঘ করার লক্ষ্যে আমি শুধুমাত্র শান্তিচুক্তির শুরুর অংশ তুলে ধরে আলোচনা করবো।

শান্তিচুক্তির শুরু হয়েছে যে বক্তব্য দিয়ে তা হলোঃ “বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খন্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন।”

এখন প্রশ্ন হলো উপজাতিরা কি শান্তিচুক্তির শুরুর এই অংশ অনুযায়ী কাজ করছে? তারা কি বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী চলছে? বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখছে? এর উত্তরে নানা জনে নানা মত ব্যক্ত করবেন। তবে আমার সোজা সাপ্টা উত্তর হলো—না। উপজাতিরা শান্তিচুক্তির শুরুর এই অংশ অনুযায়ী কাজ করছে না। তারা বাংলাদেশের সংবিধান মান্য করছে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্যও রাখছে না। কারণঃ

ক। সরকারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর নেতা সন্তু লারমা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু পিসিজেএসএস’র একটা অংশ প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবী করে সশস্ত্র আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। অথচ সন্তু লারমার পক্ষ হতে ঐ সশস্ত্র দলকে বিপথ থেকে সুপথে আনার কোন প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি। এ থেকে কি অনুমিত হয় না যে সন্তু লারমার নির্দেশেই প্রসীত বিকাশ খীসা ঐ সশস্ত্র দল গঠন করেছে? সরকারকে চাপে রাখতে এবং নিজেদের গোপন অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই কি তাহলে সন্তু লারমা এই সশস্ত্র শাখার সৃষ্টি করেছে?

খ। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের তিন মাসের মাথায় শান্তিচুক্তির বিরোধীতা করে ইউপিডিএফ নামে সশস্ত্র শাখার সৃষ্টিই কি প্রমাণ করে না যে উপজাতিরা শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চায় না?

গ। পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র ‘জুম্মল্যান্ড’ গঠনের দাবী করে উপজাতি নেতা আর সংগঠনগুলো কি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রেখেছে? ইতোমধ্যে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’ গঠনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’-এর পতাকা, মানচিত্র, মুদ্রা, পরিচয়পত্র, জাতীয় সংগীত, রেডিও চ্যানেল প্রকাশ করে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা কোনদিন ভুলেও তো এর বিরোধীতা করেনি। তার মানে কি এই নয় যে- সন্তু লারমা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখছে না?

ঘ। বাংলাদেশের মত একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও সন্তু লারমা এখনো জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। এটাই কি তার রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ?

ঙ। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ এবং শান্তিচুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই; বরং মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিপরীতে এই অ-বাঙালি জনসমষ্টিকে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী নামে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী স্বয়ং সেই সন্তু লারমা এবং উপজাতি বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের সংবিধান এবং শান্তিচুক্তি অমান্য করে নিজেদেরকে হঠাৎ করে ‘আদিবাসী’ দাবী করা শুরু করেছে। এর মাধমে কি উপজাতিরা শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করলো না?

চ। শান্তিচুক্তির শুরুর অংশে বলা হয়েছে- পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা হবে। যদি তাই হয় তাহলে রাঙ্গামাটি মেডিকেল কলেজ, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন কেন্দ্র, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মানে কেন উপজাতিরা বাঁধা দিচ্ছে? কেন উপজাতি জনসাধারণকে মূলধারার রাজনীতি করলে অপহরণ বা খুন করা হচ্ছে? কেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের প্রতি তাদের এত হিংসা-ক্ষোভ?

আসলে উপজাতিরা নিজেরাই শান্তিচুক্তির পূর্ণাংগ বাস্তবায়ন চায় না। যদি চাইতো তাহলে তারা সত্যিই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখতো। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে সহযোগিতা করতো। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সেখানকার পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন চাইতো।

উপজাতিদের কাছে শান্তিচুক্তি আসলে অনেকটা সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের মতো। নিজেরাই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আগ্রহ না দেখিয়ে উল্টো বাঁধার সৃষ্টি করছে এবং দেশে-বিদেশে প্রচার করছে যে সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করছে না। এভাবে তারা তাদের অনুকূলে দেশি-বিদেশি মহলের সহানুভূতি আদায় করে চলেছে আর নিজেদেরকে অবহেলিত ও অনগ্রসর প্রমাণ করে বিভিন্ন এনজিও এবং সংস্থা থেকে বিশাল অংকের ত্রাণ ও অনুদান সংগ্রহ করছে। এর সাথে পাহাড়ে তাদের চাঁদাবাজির বিশাল নেটওয়ার্কও সচল রেখেছে। যার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ উপজাতি-বাঙালিরা উপজাতি তিন সশস্ত্র দলের ক্রমাগত নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছে আর মাঝখান থেকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছে কতিপয় স্বার্থান্বেষী উপজাতি নেতারা।

  • লেখক: রাঙামাটি থেকে

শরণার্থি ও উদ্বাস্তুদের তালিকা তৈরি ও যাচাইয়ের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আলোচনা

আমরা যদি প্রথম টাস্কফোর্সের দেয়া হিসাবকে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাই, ১৯৮৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ১, ০৪,৯৯৪ জন শরণার্থি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছে। ২৯ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তিচুক্তির পর ৬ দফায় মোট ভারত থেকে ১২,২২২ পরিবারের ৬৮,৪৩৩জন শরণার্থিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এটি ছিলো টাস্কফোর্সের আওতাধীন পুনর্বাসন। এই পুনর্বাসন সম্পন্ন হওয়ার পর সরকারী সকল রেকর্ডে শান্তিচুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পরিবারের সংখ্যা ২১,৯০০ বলে দাবী করা হয়েছে। ৯ম সভাতেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ২১,৯০০ পরিবার পূর্বের ১২,২২২ পরিবারের অতিরিক্ত। পূর্বের হিসাব অনুযায়ী যদি পরিবার প্রতি ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়, তাহলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১,০৯৫০০।  এ থেকে দেখা যায়, ইনসার্জেন্সির পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া শরণার্থির সংখ্যা দাঁড়ায় মোট (১, ০৪,৯৯৪+ ১,০৯৫০০)= ২,১৪,৪৯৪ জন। এই পরিসংখ্যান ভারতও কোনোদিন দাবী করেনি। তাহলে টাস্কফোর্স কীভাবে আবিস্কার করলো?


এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন এখানে


অন্যদিকে গত ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় যে, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৯,২৮০ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়। এই সভায় ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো বক্তব্য সমর্থন করা হয়। অর্থাৎ ৮৯,২৮০ পরিবারের অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পরিবারের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে। এই ‘অধিকাংশ’ শব্দের অর্থ আমরা যদি ৮০% ধরি, তাহলে ধরে নিতে পারি আনুমানিক ৭১,৪২৪ পরিবার কমপক্ষে পুনর্বাসিত হয়েছে।

এদিকে ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির দেয়া তালিকা অনুসারে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নতুন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৮১,৭৭৭ পরিবার। ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় এই সংখ্যাকে অনুমোদন দেয়া হয়। সে হিসাবে মোট অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায়(৭১,৪২৪+৮১,৭৭৭)=১,৫৩,২০১ পরিবার। পরিবার প্রতি ৫ জন করে জনসংখ্যা ধরলে মোট অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭,৬৬,০০৫ জন। শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা একসাথে যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯,৮০,৪৯৯জন।

প্রশ্ন হলো: সর্বশেষ জরীপ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা ১৬ লাখ। ২১ বছর আগে শান্তিচুক্তির সময় এই জনসংখ্যা কতো ছিলো? যুক্তির খাতিরে ধরে নিই ১০ লাখ। এর ৫০% বাঙালী হলে উপজাতীয় জনসংখ্যা ছিলো ৫ লাখ। কিন্তু উপরের হিসাব অনুযায়ী ২,১৪,৪৯৪ জন শরণার্থি এবং ৪,৮০,৩০৯ জন অভ্যন্তরীণ উস্তাস্তুর সংখ্যা যোগ করলে আমরা দেখতে পাই উপজাতীয় বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯,৮০,৪৯৯জন- যা মোট উপজাতীয় সংখ্যার থেকে বহু বেশী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় পরিবারকে বাস্তচ্যুত ধরলেও এই পরিসংখ্যান মেলানো যায় না। এই পরিসংখ্যানই এই তালিকার অসারতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

আমরা পূর্বের হিসাবেই দেখেছি, বান্দরবান জেলায় শরণার্থি নেই। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যাও নগণ্য। রাঙামাটিতে এই সংখ্যা কিছু বেশী হলেও অধিকাংশ বাস্তচ্যুতির ঘটনাই ঘটেছে খাগড়াছড়িতে। তাহলে সে সময় খাগড়াছড়ি জেলার উপজাতীয় জনসংখ্যা কতো ছিলো?

ভূ প্রাকৃতিক কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা বাস করে জেলা, উপজেলা সদর বা এ ধরণের বার্ধিষ্ণু এলাকাগুলোতে। অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সির সময় জেলা, উপজেলা ও বর্ধিষ্ণু এলাকাগুলোতে বাস্তচ্যুতির ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। কেননা, এই এলাকাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ও তৎপরতার কারণে অপেক্ষাকৃত অনেক নিরাপদ ছিলো। বাস্তচ্যুতির প্রায় সকল ঘটনাই ঘটেছে প্রত্যন্ত ও দূর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে জনবসতি খুবই কম। কাজেই প্রশ্ন উঠতে পারে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে জনবসতির সংখ্যা কতো? এ ধরণের আরো অনেক যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে- যাতে উল্লিখিত বাস্তচ্যুতির সংখ্যাকে বালখিল্য করে তোলে।

এখন টাস্কফোর্সের রিপোর্ট যদি সত্য ধরে নিই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, এই লাখ লাখ অতিরিক্ত জনসংখ্যা কোথা থেকে এলো? তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক?

বাংলাদেশ সরকার জনসংখ্যার সুষম বন্টনের নীতিমালায় ৫৫৫১৭ বাঙালী পরিবারকে ১৩০ টি গ্রামে সমতল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্যাটেল করে। এরমধ্যে শান্তিবাহিনীর হুমকি, আক্রমণ ও পরিবেশগত প্রতিকূলতার কারণে ২৩৫১১ পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে সমতলে চলে আসে। থাকে ৩২০০৬ পরিবার।  এর মধ্যে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার ৬৮টি গুচ্ছগ্রাম/শান্তিগ্রাম সৃষ্টি করে ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে তাদের স্বভূমি, বসতভিটা ও চাষের জমি ফেলে রেখে গুচ্ছগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। সেই থেকে তারা সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এই গুচ্ছগ্রামে প্রত্যাবাসিত ২৬ হাজার পরিবার এবং শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসা ২৩৫১১ পরিবার ও আদি বাঙালীদের একটা বড় সংখ্যক ইনসার্জেন্সির কারণে বাস্তচ্যুত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগের মতে এই সংখ্যা ৬১,২০২ পরিবার। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার মতে এই সংখ্যা ৫৭,৬৯২ পরিবার। তবে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৩৮,১৫৬ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও এই সংখ্যাগুলো মধ্যে ব্যবধান বিশাল। তবে এর মধ্যে যে ২৬ হাজার পরিবারকে সরকার গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত হতে বাধ্য করেছে তাদের কাছে সরকার তথা রাষ্ট্রের কমিটমেন্ট হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরকার বা রাষ্ট্র তাদের কবুলিয়ত প্রদত্ত ভিটামাটিতে ফেরত নিয়ে আসবে। পরিস্থিতি বহু পূর্বেই স্বাভাবিক হলেও রাষ্ট্র তার কমিটমেন্ট রক্ষা করেনি। রাষ্ট্রের উচিত, রাষ্ট্রের দায়, জনগনের কাছে দেয়া তার কমিটমেন্ট রক্ষা করা। সেজন্য প্রয়োজনে আইন করে হলেও অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদেরকে টাস্কফোর্সের আওতায় পুনর্বাসন সম্পন্ন করা উচিত। সরকার সময়ের প্রয়োজনে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে গঠিত অনেকগুলো আইন সংশোধন করেছে। কাজেই সরকার চাইলেই প্রজ্ঞাপন জারী করে অউপজাতীয় শরণার্থিদের পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত করতে পারে।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন

টাস্কফোর্স যখন পূর্বেই ঘোষণা করেছে, সম্পূর্ণ শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে, তখন ২০১৬ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম ও ৯ম সভায় নতুন করে এই ২১৯০০ পরিবার শরণার্থি ও ৮৮৭৭৭ পরিবার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু অর্থাৎ ১,১০,৬৭৭ পরিবার বা ৫,৫৩,৩৭০জন বাস্তচ্যুত উপজাতীয় জনগণকে কোথা থেকে আবিস্কার করলো? এরা কি বাংলাদেশের নাগরিক? পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, ভারতীয়দের তালিকা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের সন্ধান পেয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পরিচয়ে লুকিয়ে থাকা বিদেশী নাগরিকদের এই তালিকার মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে? এরমধ্যে সীমান্তের ওপারে থাকা বিদেশী নাগরিকদের বিশেষ কায়দায় পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা যারা কেবল পুনর্বাসন সুবিধা ভোগ করে, বরাদ্দকৃত জমি বিক্রি করে পুণরায় নিজ দেশে চলে যাবে, আবার ভোটের সময় এসে বিশেষ দলের প্রার্থিদের ভোট দিয়ে আবার সীমান্তের ওপারে ফিরে যাবে, কিম্বা অপরাধমূলক কাজে আন্তঃসীমান্ত যাতায়াত করবে- খতিয়ে দেখা জরুরী। রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় লোকদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে বা অর্থ আদায়ের উপলক্ষ হিসাবে সাধারণ মানুষকে এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী।

করণীয়

১. ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের বিতর্কিত তালিকা এবং টাস্কফোর্স থেকে বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাদ দেয়ার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে সকল বাঙালী আঞ্চলিক সংগঠন বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তিন পার্বত্য জেলা ও রাজধানীতে এর প্রতিবাদে বাঙালী সংগঠনগুলো একের পর এক কর্মসূচী পালন করছে। সামাজিক গণমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে প্রবল প্রতিবাদ। পার্বত্য বাঙালী কমিউনিটিতে এ প্রতিবাদ ও দাবী যেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তাতে সরকারের উর্দ্ধতন মহল থেকে এ বিষয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা জরুরী বলে সচেতন মহলের অভিমত। নচেত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষের নেতিবাচক প্রচারণার মুখে সরকারদলীয় প্রার্থিদের বাঙালী ভোটপ্রাপ্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পতিত হতে পারে।

২. ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় ও অউপজাতীয় উদ্বাস্তুদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপনের দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিতে হতে। একই সাথে অনুমোদিত তালিকা যাচাই ও বাছাইয়ের কাজও সেনাবাহিনীকে দিতে হবে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় সকল শরণার্থি ও উদ্বাস্তুদের আদিবাস, স্থানান্তর বা বাস্তচ্যুতি, বাংলাদেশে আগমন, বর্তমান বাসস্থানে আগমন, পুনর্বাসন, বাদ পড়া প্রভৃতি বিষয়ে একটি ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে। এনআইডি প্রকল্প ও রোহিঙ্গা শরণার্থিদের ডাটাবেইজ তৈরিতে সেনাবাহিনীর বিপুল সাফল্য এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। খুব সহজেই এ কাজটি করা যায়। কেননা, বর্তমান টাস্কফোর্সে সেনাবাহিনীর তথা ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অংশগ্রহণ রয়েছে। টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকেই এ কাজের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেয়া যেতে পারে বা সেনাবাহিনীকে কাজটি করার জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারী করতে পারে। যেহেতু টাস্কফোর্সের নিজস্ব লোকবল নেই এবং এই তালিকাও টাস্কফোর্সের নিজস্ব নয়। তারা তালিকার জন্য সিভিল প্রশাসন ও জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির কাছে আহ্বান জানিয়েছে কাজেই একই আহ্বান সেনাবাহিনীর কাছেও জানাতে পারে।

৩. অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের একইসাথে পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শান্তিচুক্তি থেকে সৃষ্ট ভূমি কমিশন আইন, জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা গেলে টাস্কফোর্সের কার্যপরিধিও সংশোধন করা যাবে না কেন। এ ক্ষেত্রে আইনী জটিলতার সম্ভাবনা দেখা দিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইনী জটিলতা দুর করা যেতে পারে। কেননা, এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরই পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

৪. যেহেতু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি ও টাস্কফোর্স ইতোমধ্যেই এইমর্মে মতপ্রকাশ করেছে যে, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারীভাবে শান্তিচুক্তির এই ধারা পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে ঘোষণা করা হয়েছে তাই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থানে দৃঢ়তা দেখাতে হবে। তবে এর বাইরেও যদি কেউ বাদ পড়ে যায় অথবা পুনর্বাসনের ২০ দফা প্যাকেজের কোনো কোনো দফা বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ থাকে তবে সে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

৫. টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের ২১,৯০০ পরিবার ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের ৮১,৭৭৭ পরিবারের যে তালিকা চুড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে এই তালিকাকে সম্পূর্ণ নতুন তালিকা হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অন্তর্ভূক্ত অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু অথবা শান্তিচুক্তির আওতায় প্রদত্ত ২০ দফা পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায় তাদের বিবেচনা করা যাবে না।

৬. এই নতুন ২১,৯০০ পরিবার ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও ৮১,৭৭৭ পরিবার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের তালিকা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে যদি প্রকৃতভাবে কেউ বাস্তচ্যুত হয়ে থাকে তবে মানবিক বিবেচনায় তাদেরকে সম্মানজনক ও সন্তষ্টিজনকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৭. পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় লেবাসে ছদ্মবেশে থাকা বিদেশী নাগরিকদেরকে এই তালিকার আওতায় পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

৮. শান্তিচুক্তির পর উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও অপারেশনাল কাজে সহায়তার জন্য, গণলাইন সৃষ্টির জন্য প্রত্যন্ত ও দূর্গম এলাকার পাহাড়ী বাসিন্দাদের এনে পরিত্যাক্ত সেনা ক্যাম্প, সড়কের দু’পাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে, সরকারী, খাস, রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় বসতি স্থাপন করিয়েছে। তাদেরকে এই তালিকার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী।

৯. চুক্তি পরবর্তী পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বিভিন্ন সময় যেসকল নিরীহ উপজাতি ও অউপজাতীয়/বাঙালী সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাস্তচ্যুত হয়ে অন্যত্র বসতি গড়েছে তাদেরকেও এই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের মধ্যে ফেলা হয়েছে কিনা দেখা জরুরী। যদি এ ধরণের কোনো কোনো বাস্তচ্যুত পরিবার বা সদস্য পাওয়া যায় তাদের অবশ্যই তাদের নিজ বসতভিটায় পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তা শান্তিচুক্তির আওতায় গঠিত ২০ দফা পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় নয়।

১০. শান্তিচুক্তি পূর্ববর্তীকালে যেসকল বাঙালী সদস্যদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিজ বসতভিটা থেকে সরিয়ে গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছিল তাদেরকে তাদের নিজ বসত ভিটায় সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা। সরকার কর্তৃক তাদের কবুলিয়ত দেয়া জমির দখল ফিরিয়ে দেয়া।

১১. শান্তিচুক্তির পূর্বে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বা হুমকির মুখে যেসকল বাঙালী পরিবার নিজ বসতভিটা ত্যাগ করতে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল তাদের নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবাসন করা।

১২. এই বিপুল পরিমাণ লোককে কোথায় পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এখানে বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমি, সরকারী ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে যে সমস্তু প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের পুনর্বাসন করা হয়েছে, বাঙালীদের অভিযোগ অনেকস্থানে তাদের ফেলে আসা কবুলিয়তভুক্ত ভূমি দখল করে তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি সত্যিই বাঙালীদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে শরণার্থিদের পুনর্বাসন করা হয়ে থাকে তাহলে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে অনত্র কোনো উপযুক্ত ভূমিতে পুনর্বাসন করতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে বাঙালীদের জন্য সমপরিমাণ উপযুক্ত জমি ক্ষতিপুরণ হিসাবে অন্যত্র বন্দোবস্তি দিতে হবে।

সমাপ্ত।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

জেএসএসের আপত্তির কারণে টাক্সফোর্স থেকে বাঙালী উদ্বাস্তুদের বাদ দেয়া হয়

(গতকাল প্রকাশিতের পর)

বাঙালী বা অউপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তের সংখ্যা কতো?

অভ্যন্তরীণ বাঙালী বা অউপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পূর্বোল্লেখ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনায়নের প্রচেষ্টার বিভিন্ন উদ্যোগ অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের প্রাথমিক তালিকা পাওয়া ১৯৯৭ সালের ১২ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে।

অর্থাৎ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন জনাব মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় উদ্বাস্তু পরিবারের সংখ্যা ৬১,২০২। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ১৫,৬৭৩ পরিবার, বান্দরবানে ২৫৯ পরিবার এবং খাগড়াছড়িতে ৪৫,২৭০ পরিবার। এ তালিকা অনুসারে উপজাতীয় ও অউপজাতীয় মোট উদ্বাস্তুর সংখ্যা ১,৪৯,৩৪০ পরিবার। যদিও শান্তিচুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সে কেবলমাত্র  অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।

তবু কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ সকল জাতিগোষ্ঠীর মঙ্গল চিন্তায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পাশাপাশি অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শান্তিচুক্তির পূর্ব থেকেই এবং পরবর্তীকালেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। সেকারণে উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য গঠিত টাস্কফোর্স অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই নয়, টাস্কফোর্সের বিভিন্ন কমিটিতে বাঙালি সদস্যদের অন্তর্ভূক্তির নজির দেখা যায়- যা এখনো বহাল আছে।


এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন এখানে


টাস্কফোর্সের প্রথম কমিটি ৩৮ হাজার ১৫৬টি বাঙালী পরিবারকে অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় উদ্বাস্তু হিসাবে চিহ্নিত করে। ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৩৮,১৫৬ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে খাগড়াছড়িতে ২২৩৬৭, রাঙামাটিতে ১৫৫১৬ বান্দরবানে ২৬৯ পরিবার।

এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুর তালিকা ৬১,২০২ থেকে কী করে একলাফে ৩৮,১৫৬ তে নেমে আসলো তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেননা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই  প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় ছিলেন এবং এতে স্বাক্ষর করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, তৎকালীন পরিচালক প্রশাসন হিসাবে।

তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৫৭,৬৯২ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে খাগড়াছড়িতে ৪১,৯০৭ পরিবার, রাঙামাটিতে ১৫,৫১৬ পরিবার এবং বান্দরবানে ২৬৯ পারিবার বলে উল্লেখ রয়েছে। ২০০৭ সালের তালিকা থেকে ২০০৯ সালের তালিকায় রাঙামাটি ও বান্দরবানে বাঙালী উদ্বাস্তুর সংখ্যা সঠিক থাকলেও খাগড়াছড়িতে তা বেড়ে যায়। এই টাস্কফোর্সে সদস্য হিসাবেও অউপজাতীয় বা বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসাবে এসএম সফি অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। তিনি এখনো আছেন, তবে অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়।

২৭ জানুয়ারী ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় সভায় জেএসএস প্রতিনিধি লক্ষীপ্রসাদ চাকমা অউপজাতীয় পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে অন্তর্ভূক্ত না করার দাবী জানান।  এসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক অউপজাতীয়দের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরে তাদের অন্তর্ভূক্তি যথাযথ হয়েছে মর্মে অভিমত প্রদান করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের প্রতিনিধি বলেন, যিনি বাস্তু থেকে উৎখাত হয়েছেন তিনিই উদ্বাস্তু। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত উপজাতীয় ও অউপজাতীয় সকলকে রাখা বাঞ্ছনীয়।

জেএসএসর আপত্তির কারণে বৈঠকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পাওয়ার জন্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির নির্দেশনা চাওয়ার অভিমত গৃহীত হয়। ২৬ জানুয়ারি ২০১১ তে অনুষ্ঠিত কমিটির তৃতীয় বৈঠকেও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হয় এবং শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে এই টাস্কফোর্সের চতুর্থ সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।  এরমধ্যে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা নির্ধারণে প্রথম টাস্কফোর্সের অধীনে ১৯৯৮ সালের ২৭ জুন অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত রয়েছে মর্মে জানানো হয়। এবং পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত রয়েছে মর্মে জানার পর সভায় এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই মর্মে মতামত ব্যক্ত করা হয় এবং উক্ত সিদ্ধান্তের আলোকে কার্যক্রম পরিচালনা করার বিষয়ে সকলে একমত পোষণ করেন।

উল্লেখ্য, এই টাস্কফোর্সের প্রণীত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা হলো: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত যে সকল উপজাতীয় ও বাঙালী নিজ গ্রাম, মৌজা ও অত্র অঞ্চল ত্যাগ করিয়া দেশের মধ্যে অন্যত্র চলিয়া যায় বা চলিয়া যাইতে বাধ্য হয়, তাহারাই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু।’ ইত্তেফাক: ২৯-১১-২০০০ দ্রষ্টব্য।

কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই কমিটি অউপজাতীয় উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে স্ববিরোধী একটি সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় শরণার্থিগণকে সরকার ভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে’। এটি স্পষ্টতঃই পূর্বের সিদ্ধান্তের বিপরীত।

তবে ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরার নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের ৫ম সভায় আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা অউপজাতীয় শরণার্থিদের পুনর্বাসনের বিষয়ে জোরালো আপত্তি তোলে এবং তার আপত্তির কারণে টাস্কফোর্সের কার্যতালিকা থেকে অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বাদ দেয়া হয়। এরপর থেকে আর অভ্যন্তরীণ বাঙালী উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের উদ্যোগ হারিয়ে যায়। ফলে গুচ্ছগ্রামে ও গুচ্ছগ্রামের বাইরে বাস্তচ্যুত বাঙালীদের নিজ বসতভিটায় পুনর্বাসনের স্বপ্ন ভেঙে যায়।

শরণার্থি প্রত্যাবাসন বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা বা ২০ দফা পুনর্বাসন কর্মসূচী

১৯৯৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ এবং ৬-৯ মার্চ ১৯৯৭ সালের ত্রিপুরায় অবস্থিত উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তৎকালীন চিফ হুইপ হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের শরণার্থি প্রত্যাবাসন বিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০ দফা চুক্তি হিসাবে এই চুক্তি খ্যাত হয়। এই চুক্তি উপজাতীয় প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের পুণর্বাসনের জন্য ২০ দফা প্যাকেজ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগ এ ব্যাপারে ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে এই প্রজ্ঞাপন ১২ নভেম্বর ১৯৯৭ সালে সংশোধন করে আরো একটি প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়।

এই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, গৃহ নির্মাণ ও কৃষি অনুদান বাবদ পরিবার প্রতি এককালীন ১৫ হাজার টাকা প্রদান, শরণার্থি প্রতি পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক সদস্য প্রতি মাসে ৫ কেজি চাল, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ২.৫ কেজি চাউল, ২ কেজি তেল, ৪ কেজি ডাল, ২ কেজি লবণ এক বছর পর্যন্ত রেশন হিসাবে দেয়া হবে। গৃহ নির্মাণ বাবদ পরিবার প্রতি ২ বাণ্ডিল ঢেউটিন, চাষাবাদ যোগ্য জমি রয়েছে এমন পরিবারের জন্য হালের বলদ কেনার জন্য ১০ হাজার টাকা, ভূমিহীন পরিবারের জন্য গাভী কেনার জন্য ৩ হাজার টাকা, ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, অন্যান্য সরকারী ব্যাংকে ঋণ থাকলে তা মওকুফ, উন্নয়ন বোর্ড থেকে নেয়া ঋণ থাকলে তা মওকুফ করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ ক্ষমা বলবৎ করা হবে, ইনসার্জেন্সি সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানার ক্ষেত্রেও একটি প্রয়োজ্য হবে। প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের মালিকানাধীন জমি তাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। তাদের গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হবে না। দেশত্যাগের পূর্বে যেসব শরণার্থি সরকারী/আধা সরকারী সংস্থায় কর্মরত ছিলেন তাদের চাকুরি বিধি অনুযায়ী তাদের জৈষ্ঠ্যতা ও সুবিধাসহ পুনর্বহাল করা হবে। শরণার্থি ক্যাম্পে স্থাপিত উচ্চ বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট আনবে তাদের সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অধীনে বিশেষ পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। শরণার্থি ক্যাম্পের ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হবে। শরণার্থি প্রতি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠের পারমিট প্রদান করা হবে।

প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারের তরুণ তরুণীদের যোগ্যতা সাপেক্ষে উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরীতে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।ত্রিপুরায় শরণার্থি ক্যাম্পে অবস্থানকালে যেসকল বাংলাদেশী শরণার্থি চাকুরির বয়সসীমা অতিক্রম করেছে তাদের বয়স সীমা শিথিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের কারণে শাস্তি ঘোষিত হয়েছে তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ব্যবস্থা করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে বেসামরিক এলাকা থেকে ক্যাম্পসমূহ তুলে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। উপজাতীয় হেডম্যানদের স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল করা হবে।

চলবে…

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা কতো?

(গতকাল প্রকাশিতের পর)

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা কতো?

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পুনর্বাসনের প্রশ্ন নিরসনের আগে এটা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে, ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৭ সালে পর্যন্ত ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী উপজাতি ভারতে গিয়েছিল? কী পরিমাণ উপজাতি বাংলাদেশে ফেরত এসেছে? কারা, কখন এসেছে? কিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে? তবে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ও শান্তিচুক্তির পূর্বে ইনসার্জেন্সির সময় ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী উপজাতীয় পরিবার বা সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল এবং কী পরিমাণ সদস্য বাংলাদেশে ফিরে এসেছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আর্কাইভে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া বিভিন্ন সরকারী ডকুমেন্ট ও টাস্কফোর্সের বিভিন্ন ডকুমেন্টে শরণার্থিদের সংখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।


গতকালের অংশ পড়ুন এখানে

শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাকে পুনর্বাসিত করতে চাইছে টাস্কফোর্স


মেজর জেনারেল(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ পুস্তকে লিখেছেন, ১৯৮৯ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ৪৩,৭৮৬ জন শরণার্থি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৯,৯২০জন। একই বছর স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন বানচাল করার চক্রান্তের অংশ হিসাবে শান্তিবাহিনী বন্দুকের মুখে জোরপূর্বক কিছু উপজাতীয়কে ভারতে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। আনুমানিক এই সংখ্যা ১৫ হাজার জন ধরা হয়। হয়। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা- ১৬০ দ্রষ্টব্য)। সে হিসাবে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার।

১৯৮৬ সালের ৩১ মে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রামগড়ে ১০,৩১০জন শরণার্থির তালিকা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে। একই বছরের ৩১ আগস্ট একই স্থানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২৬,৯০৩জন শরণার্থির তালিকা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে।  বাংলাদেশ পক্ষ এ তালিকার ব্যাখ্যা চাইলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২৭,১০১ জনের সংশোধিত তালিকা দেয়। ১৯৮৭ সালের ৩০ মে রামগড়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে ৫০,৫২৭জন শরণার্থির নতুন তালিকা হস্তান্তর করে। তবে বাংলাদেশ সরেজমিনে তদন্ত চালিয়ে ঐ সংখ্যার মধ্যে ২৯,৯২০জনকে বাংলাদেশী নাগরিক বলে চিহ্নিত করে। ১৯৮৯ সালের ১৭ মে আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৪৩,৭৪৬ জন শরণার্থির কথা বলে। এর মধ্যে ২৯-১২-৮৬ থেকে ২২-৫-৯২ পর্যন্ত ২৮,৩৮৪জন শরণার্থি দেশে ফিরে এসেছে। (প্রাগুক্ত- পৃষ্ঠা: ১৬১-১৬২ দ্রষ্টব্য)।

উপরের অন্তত দুইটি ডকুমেন্ট থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেয়া তালিকাকে সম্পূর্ণ নির্ভূল ও নির্মোহ প্রমাণ করা যায় না। বরং ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানো বা পুনর্বাসনের যে অভিযোগ বর্তমানে বাঙালি সংগঠনগুলো করছে তার কিছু প্রচেষ্টা যে সেসময়ই ছিলো তা লক্ষ্যণীয়।

এদিকে ১৯৯৩ সালে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী উপজাতীয় শরণার্থিদের একটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। এই তালিকা অনুযায়ী ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী রেজিস্টার্ড শরণার্থির সংখ্যা ১১,৮০৬ পরিবাবের ৫৬, ৪৯৬ জন। এরমধ্যে রাঙামাটি জেলার ৫১ পরিবারের ২০৫ সদস্য বাদে বাকি সকল সদস্যই খাগড়াছড়ি জেলার। এই তালিকা অনুযায়ী বান্দরবান জেলা থেকে কোনো উপজাতীয় শরণার্থি উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে গমন করেনি।

একই সময়ে দেয়া অপর এক তালিকায় ঐ রাজ্যে বসবাসকারী আন রেজিস্টার্ড শরণার্থিদের সংখ্যা ৪০৩ পরিবারের ১৪৫৭জন বলে দাবী করা হয়। অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত তালিকায় ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী মোট বাংলাদেশী উপজাতি শরণার্থির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১২,২০৯ পরিবারের ৫৭,৯৬৩ জন। জেনারেল ইব্রাহীমের বইয়ে উল্লিখিত তথ্য বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই সংখ্যা ইতোপূর্বে পুনর্বাসিত ২৮,৩৮৪ জনের অতিরিক্ত।

তবে ‘ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য হইতে উপজাতীয় শরণার্থিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাবাসন কর্মপরিকল্পনা-১৯৯৭’ শীর্ষক এক ডকুমেন্টে দেখা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ও স্বেচ্ছায় ১৭৯৫ পরিবারের ৮১৭৭ জন বাংলাদেশে আগমন করেছেন ও প্রত্যাবাসিত হয়েছে।

এরপর ১৯৯৭ সালের মার্চে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানকারী শরণার্থিদের আরেকটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। ঐ তালিকায় দেখা যায়, সে সময় ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী উপজাতীয় শরণার্থির সংখ্যা ৯২৬৭ পরিবারের ৪৯,৮৯২ জন। এই সংখ্যাটিও ১৯৮৬-৯২ সালে প্রত্যাবাসিত ২৮৩৮৪ এবং ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রত্যাবাসিত ৮১৭৭ জনের সংখ্যাতিরিক্ত।

তবে দৈনিক ভোরের কাগজে ২৮ অক্টোবর ১৯৯৪ সালে সন্তু লারমার দুই কিস্তির একটি স্বাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়।  সাংবাদিক সলিম সামাদ দুদুকছড়িতে শান্তিবাহিনীর গোপন আস্তানায় জেএসএস নেতার এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এ সাক্ষাৎকারের প্রশ্নোত্তরে সন্তু লারমা জুম্ম কল্যাণ সমিতির রিপোর্টের বরাত দিয়ে জানান, ভারতে সে সময় ৫১,৩৭৯জন রেজিস্টার্ড এবং ৭১২২জন আন রেজিস্টার্ড শরণার্থি রয়েছে।

২৯ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তিচুক্তির পর ৬ দফায় মোট ভারত থেকে ১২,২২২ পরিবারের ৬৮,৪৩৩জন শরণার্থিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার কার্য বিবরণীতে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা বলা হয় ১২,২২২ পরিবার, সদস্য সংখ্যা ৬৪,৬১২ জন।

একই কার্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, সরকার ইতোমধ্যে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সম্পন্ন করেছে। কার্যত এই তালিকায় অপুনর্বাসিত উপজাতীয় সর্বশেষ ২১ পরিবারকে দিঘীনালার জামতলায় পুনর্বাসন করা হয়েছে ফখরুদ্দীন সরকারের সময়। এরপর থেকে মন্ত্রণালয় ও সরকারী বিভিন্ন ডকুমেন্টে শান্তিচুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে।

একই কমিটির ২০০৭ সালের ৩১ জুন প্রদত্ত আরেকটি তালিকাতেও ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা বলা হয় ১২,২২২ পরিবার, সদস্য সংখ্যা ৬৪,৬১২ জন বলে উল্লেখ করা হয়। আমরা যদি প্রথম টাস্কফোর্সের দেয়া হিসাবকে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাই, ১৯৮৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ১, ০৪,৯৯৪ জন শরণার্থি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছে।

কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পরিবারের সংখ্যা ২১,৯০০ বলে দাবী করা হয়েছে। ৯ম সভাতেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ২১,৯০০ পরিবার পূর্বের ১২,২২২ পরিবারের অতিরিক্ত।

উল্লেখ্য, আগের সকল তালিকায় পরিবারের সাথে সদস্য সংখ্যা উল্লেখ করা হলেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সাথে জড়িত সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। এই ২১,৯০০ পরিবার কবে, কিভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল, কবে কিভাবে ফিরে এসেছে তা বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ‘স্বেচ্ছায়’ প্রত্যাগত। এই ‘স্বেচ্ছায়’ সমাসবদ্ধ শব্দের কী ব্যাখ্যা তা কোনো কার্যবিবরণীতেই উল্লেখ করা হয়নি।

কাজেই প্রশ্ন উঠেতে পারে, শান্তিচুক্তির পরে যে ১২,২২২ পরিবার বাংলাদেশে এসেছিল তাদের কি জোর করে আনা হয়েছিল? যদি ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দ বলতে অনানুষ্ঠানিক বলে দাবী করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন দাঁড়ায় তা হলো, ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশকে সে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী শরণার্থিদের যে তালিকা সরবরাহ করেছে সেই তালিকাতে অতিরিক্ত এই বিপুল সংখ্যক অর্থাৎ ২১,৯০০ পরিবারের কথা উল্লেখ নেই কেন?

তাহলে এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থি ভারতের কোথায় অবস্থান করছিল? ভারত সরকারই বা কেন এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থিদের ব্যাপারে বেখবর ছিলো? এটা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য? ভারত সরকার যাদেরকে বাংলাদেশী শরণার্থি বলে স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার কেন তাদের গ্রহণ করবে? তাহলে এরা কারা?

পূর্বোল্লিখিত তালিকা হিসাবে পরিবার প্রতি গড়ে যদি ৫ জন সদস্য ধরা হয় তাহলে নতুন করে এই ২১,৯০০ পরিবারের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১,০৯,৫০০জন। এর সাথে পূর্বেই প্রত্যাবাসিত ১ লাখ ৫ হাজার শরণার্থি যোগ করলে ভারতে মোট বাংলাদেশী শরণার্থির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার।

এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা কবে, বাংলাদেশের কোথায়, কিভাবে বসবাস করতো, কবে, কিভাবে তারা ভারত গিয়েছে, ভারত সরকারের নোটিশে তারা কেন ছিলো না, কবে, কিভাবে তারা বাংলাদেশে এসেছে এবং বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের পর কিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে- টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করার পূর্বে এসব প্রশ্নের নিরোপেক্ষ তদন্ত ও সমাধান হওয়া জরুরী। এই বিপুল পরিমাণ উপজাতীয় শরণার্থি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছে এমন দাবী কখনই কেউ করেনি।

উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তের সংখ্যা কতো?

উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পূর্বেই দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ তারিখে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অন্তর্ভূক্ত অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুরাই কেবল এই টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত হিসাবে বিবেচিত হবে। এর আগে ও পরের নানা কারণে ডিসপ্লেসড হওয়া পরিবার ও সদস্যদের ব্যাপারে মানবিক বিবেচনায় অন্য সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের প্রাথমিক তালিকা পাওয়া ১৯৯৭ সালের ১২ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্যোশাল এফেয়ার্স বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে। অর্থাৎ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন জনাব মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৮,১৩৮ পরিবার। এরমধ্যে রাঙামাটিতে ৩৩,৭১৯ পরিবার, বান্দরবানে ৭,৬৫১ পরিবার, খাগড়াছড়িতে ৪৬,৭৫৮ পরিবার রয়েছে। তবে এই পরিবারের আওতাভূক্ত সদস্যের সংখ্যা কতো তা এই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৯০,২০৮ হাজার পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৯,২৮০ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে ঐ সভায় রাঙামাটি জেলা পরিষদের প্রতিনিধি এই তালিকা নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, অনেকে উদ্বাস্তু না হয়েও পদ্ধতিগত শিথিলতার সুযোগে এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। টাস্কফোর্সের ৫ম সভায়ও বৈঠকের সভাপতি অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকায় ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে বলে জানান। তবে ঐ সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতিকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা করে টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সমিতির নেতা হিসাবে এই টাস্কফোর্সের সদস্য হচ্ছেন, সন্তোষিত চাকমা(বকুল)।

বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, সন্তোষিত চাকমা ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের নেতা, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের কেউ নন। তাকে কিসের ভিত্তিতে এই তালিকা করার দায়িত্ব দেয়া হলো? অন্যদিকে, এই তালিকা করার দায়িত্ব সরকারী বডি হিসাবে স্বয়ং টাস্কফোর্সের। জনবল সঙ্কটের কারণে টাস্কফোর্সের সেই সক্ষমতা না থাকলে টাস্কফোর্স স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিতে পারতো। কিন্তু টাস্কফোর্স নিজে তালিকা না করে বা প্রশাসনের সহায়তা না নিয়ে সন্তোষিত চাকমার ঘাড়ে এই দায় চাপিয়ে দেয়।

২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির দেয়া তালিকা অনুসারে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নতুন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৮১,৭৭৭ পরিবার। তবে এই তালিকা তারা কিভাবে সংগ্রহ করেছে তার কোনো বয়ান ঐ সভার কার্য বিবরণীতে নেই বা কোনো সদস্যও এ ব্যাপারে সমিতিকে প্রশ্ন করেনি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গত ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় যে, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস নেতা সন্তু লারমা এই কমিটির অন্যতম সদস্য। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার কার্য বিবরণীর মন্তব্যেও এ কথা সূত্র হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন থাকে, প্রায় ৯০ হাজার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশের পুনর্বাসন যদি সম্পন্ন হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে নতুন করে আরো প্রায় ৮২ হাজার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু কী করে এলো? শান্তিচুক্তির পূর্বে তাদের বাসস্থান কোথায় ছিলো এবং সেখান থেকে তারা কবে, কোথায় গিয়েছিল? বর্তমান ঠিকানায় কবে থেকে তারা বসবাস করছে? শান্তিচুক্তির পরবর্তী বিভিন্ন তালিকায় কেন তারা বাদ পড়েছিল? এসকল প্রশ্ন খতিয়ে দেখা জরুরী।

চলবে…

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাকে পুনর্বাসিত করতে চাইছে টাস্কফোর্স

সরকারি অর্থায়নে পুনর্বাসনের আওতায় আসছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলার ৮২ হাজার উদ্বাস্তু পরিবার। এ জন্য এ তিন পার্বত্য জেলার ৮১ হাজার ৭৭৭ উদ্বাস্তু পরিবারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে সরকার গঠিত টাস্কফোর্স। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর নগরের সার্কিট হাউসে আয়োজিত ‘ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন’ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স এর ৯ম সভায় এ তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন টাস্কফোর্সের সভাপতি ও সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি।

সভায় পুনর্বাসনের জন্য ভারত থেকে প্রত্যাগত ২১ হাজার ৯০০ শরণার্থী পরিবারের তালিকাও অনুমোদন দিয়েছে টাস্কফোর্স। এছাড়াও উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের ‍ঋণ মওকুফ, ফৌজদারী মামলা প্রত্যাহার, প্রত্যাগত শরণার্থীদের চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা প্রদান, রেশন দেওয়া এবং টাস্কফোর্স সদস্যদের সম্মানি ভাতা নিয়ে আলোচনা করেন টাস্কফোর্স সদস্যরা।‍

ঋণ মওকুফের বিষয়ে টাস্কফোর্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র চাকমা সভায় জানান, উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের ‍ঋণ মওকুফ করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে ‍ঋণদাতা সোনালি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক এবং বিআরডিবির ব্যাবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে।

উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ৪৫১টি ফৌজদারী মামলা রয়েছে বলে সভায় জানান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, এসব মামলার মধ্যে ৪৪৬টি মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলোতে কিছু জটিলতা থাকলেও তা নিরসন করে দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে।সূত্র: বাংলানিউজ২৪.কম, তারিখ: ২৫-০৯-২০১৮।

এদিকে এই সভার পরপরই তিন পার্বত্য জেলার বাঙালি সংগঠনগুলো টাস্কফোর্সের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। ঢাকায় ও তিন পার্বত্য জেলায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, স্মারকলিপি প্রদান করেছে। সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বাঙালী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের কারণ দুইটি। এক. ভারত প্রত্যাগত ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শরণার্থিদের সংখ্যা নিয়ে আপত্তি। দুই. পুনর্বাসনের তালিকা থেকে অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের তালিকা বাদ দেয়া।

বাঙালী সংগঠনগুলো দাবী করছে, নতুন করে বিপুল সংখ্যক ভারত প্রত্যাগত ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে ভারতীয় ও মিয়ানমারের নাগরিকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে নিরাপত্তার অজুহাতে গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তাদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমিতে পুনর্বাসন করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে নানাভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এই নতুন সঙ্কটের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য অনুসন্ধান শুরু করি।

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স

শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ১ ধারায় বলা হয়েছে,

১) ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ’৯৭ ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।

২) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন। শান্তিচুক্তির এই ধারা ‘ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন’ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স এর মূল উৎস।

শান্তিচুক্তির পর প্রথম টাস্কফোর্স গঠিত হয় ১৯৯৮ সালের ২০ জানুয়ারি। প্রথম কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন রাঙামাটিতে থেকে নির্বাচিত তৎকালীন এমপি দীপঙ্কর তালুকদার।  সেই কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন:

  • বীর বাহাদুর- এমপি
  • প্রতিনিধি- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
  • প্রতিনিধি- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
  • প্রতিনিধি- রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
  • প্রতিনিধি- জিওসি, ২৪ পদাতিক ডিভিশন, সেনাবাহিনী
  • প্রতিনিধি- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি
  • প্রতিনিধি- প্রত্যাগত শরণার্থি কল্যাণ সমিতি।
  • সদস্য সচিব- চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার। ২০ আগস্ট ২০০১ সাল পর্যন্ত এই টাস্কফোর্সের মেয়াদ ছিলো।

চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় কমিটি গঠিত হয় ২০০৩ সালের ২৯ অক্টোবর।  দ্বিতীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পান সমীরণ দেওয়ান। এই টাস্কফোর্সে বান্দরবান জেলা পরিষদের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জেএসএসের পক্ষ থেকে সুধাসিন্ধু খীসা এবং প্রত্যাগত শরণার্থি কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে এর সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা(বকুল) অন্তর্ভূক্ত হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় কমিটিতে জাফর আহমদ নামে একজন পার্বত্য বাঙালী প্রতিনিধিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সেই থেকে টাস্কফোর্সে বাঙালি প্রতিনিধি প্রতিনিধিত্ব করছে।

বর্তমান টাস্কফোর্সে বাঙালি প্রতিনিধি রয়েছেন, খাগড়াছড়ির আওয়ামী লীগ নেতা এসএম সফি। তবে অসুস্থ থাকায় বর্তমানে তিনি নিষ্ক্রিয়।  ২০০৯ সালের ২৩ মার্চ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপিকে টাস্কফোর্সের নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয় এবং ২৭ আগস্ট পূর্ণাঙ্গরূপে টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়। ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান হিসাবে যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে সরিয়ে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি দায়িত্ব দেয়া হয়। এখনো তিনিই দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদটি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার।

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি কি?

স্বাধীনতার পর ’৭০ এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সি শুরু হওয়ার পর এবং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পূর্বে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা ভীতগ্রস্ত হয়ে যেসকল উপজাতি পরিবার বা সদস্য নিজ বসত ভিটা ত্যাগ করে ভারতে গমন করেছিল এবং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ভারত থেকে ফিরে এসেছে তারা ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি।

শান্তিচুক্তির পূর্ববর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবল উত্তাল দিনগুলোতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ব্রিগ্রেড কমান্ডার হিসাবে দায়িত্বপালনকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ পুস্তকে লিখেছেন, ‘ প্রতিষ্ঠিত সরকারকে নিজেদের দাবী মানতে বাধ্য করতে চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ইনসার্জেন্টদের গৃহীত অন্যতম কৌশল হচ্ছে, নিজেদের সমস্যার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আর আন্তর্জাতিকীকরণের অন্যতম উপায় হচ্ছে, নিজেদের সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকহারে উদ্বাস্তু করে শরণার্থি হিসাবে সহানুভূতিশীল কোনো দেশে আশ্রয় গ্রহণ করানো।

শান্তিবাহিনীও একই কৌশলে তাদের সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে বিদেশের মাটিতে উপজাতীয় শরণার্থি নামক একটি সমস্যার সৃষ্টি করে। শান্তিবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাঙালীদের উপর হামলা চালিয়ে তাদের উত্তেজিত করে উপজাতীয়দের উপরে প্রতিশোধ গ্রহণে বাধ্য করে। এতে উপজাতীয়রা আতঙ্কে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থি হিসাবে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়। কখনো কখনো শান্তিবাহিনী অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক উপজাতীয়দের শরণার্থি হতে বাধ্য করে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সহানুভূতিশীল দেশের সবুজ সঙ্কেত অবশ্যই প্রয়োজন।’ (প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা- ১৫৯ দ্রষ্টব্য)।

অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু

স্বাধীনতার পর ’৭০ এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সি শুরু হওয়ার পর এবং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পূর্বে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা ভীতগ্রস্ত হয়ে যেসকল উপজাতি পরিবার বা সদস্য নিজ বসতভিটা ত্যাগ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্যত্র বসতি স্থাপন করেছিলেন তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। ১৯৯৮ সালের জুন মাসে দীপঙ্কর তালুকদারের নেতৃত্বাধীন প্রথম টাস্কফোর্সের তৃতীয় বৈঠক অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা চুড়ান্ত করা হয় সর্বসম্মতিক্রমে।

এই টাস্কফোর্সের প্রণীত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা হলো: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত যে সকল উপজাতীয় ও বাঙালী নিজ গ্রাম, মৌজা ও অত্র অঞ্চল ত্যাগ করিয়া দেশের মধ্যে অন্যত্র চলিয়া যায় বা চলিয়া যাইতে বাধ্য হয়, তাহারাই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু।’ ইত্তেফাক: ২৯-১১-২০০০ দ্রষ্টব্য।

২২ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, ২ বছরের বেশীকাল স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে শুমারী শেষে মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৩১৪ পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে চুড়ান্ত তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ৯০ হাজার ২০৮টি উপজাতীয় পরিবার, ৩৮ হাজার ১৫৬টি অউপজাতীয় বা বাঙালী পরিবার রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ বাঙালী উদ্বাস্তু

শান্তিচুক্তির পূর্বে যুদ্ধকালীন অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩০টি গ্রাম থেকে ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে সরকার নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে নিজ বসত ভিটা সরিয়ে নিয়ে ৬৮টি গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়াও গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির আগে ও পরে অনেক বাঙালী সংঘর্ষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা আতঙ্কিত হয়ে নিজ বসত ভিটা ত্যাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশের অন্যস্থানে পুনর্বাসিত হয়েছে। প্রথম টাস্কফোর্স কমিটির সংজ্ঞা ও বাস্তবতার বিবেচনায় এই বাঙালীরাও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু।

তবে শুরু থেকেই জেএসএস নেতা সন্তু লারমা টাস্কফোর্সের আওতায় অভ্যন্তরীণ বাঙালী উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের বিরোধিতা করতে থাকে।  কিন্তু টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার এর প্রতিবাদে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদের অস্তিত্বের কথা সমিতি চুক্তিতেই স্বীকার করিয়া নিয়াছে। আঞ্চলিক পরিষদের এক তৃতীয়াংশ সদস্যই হইল বাঙালী। অতএব এক তৃতীয়াংশ বাঙালীতো উদ্বাস্তু হইতেই পারে।’ ইত্তেফাক: ২৯-১১-২০০০ দ্রষ্টব্য।  তবে শন্তিচুক্তিতে ‘আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের’ কথায় বলা হয়েছে কেবলমাত্র।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, শান্তিচুক্তিতে সরকার ঘোষণা করেছে, শান্তিবাহিনীর যেসকল সদস্য অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে তাদেরকে সরকার বিভিন্নভাবে সুবিধা দিয়ে পুনর্বাসন করবে। সেমতে, সরকার অস্ত্র সমর্পণকারীদের পুনর্বাসন করেছে। শান্তিচুক্তির এ ধারা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে।  প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার পূর্বে বা শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে অস্ত্র সমর্পন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কেউ অস্ত্র সমর্পন করে বা শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন শেষ হওয়ার ভারত থেকে ফিরে আসে- তিনিও কি একই সুবিধা পাবেন?

শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া, অস্ত্র সমর্পন করা বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কোনো উপজাতীয় সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুত ২০ দফা পুনর্বাসন প্যাকেজ সুবিধা দেয়নি। সেই বিবেচনা থেকে বলা যায়, পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই ড্যামের কারণে ও মুক্তিযুদ্ধকালে এবং শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে নানা কারণে যেসকল উপজাতীয় পরিবার ভারতে চলে গিয়েছেন অথবা অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়েছেন বা হতে বাধ্য হয়েছেন, তারা শান্তিচুক্তিতে উল্লিখিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থির আওতায় পড়ে না। যদি এমন কেউ থেকে থাকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা ব্যাপারে রাষ্ট্রের অপর সিদ্ধান্ত থাকা উচিত।

একইভাবে ‘পার্বত্য চুক্তির আওতাভূক্ত প্রত্যাবাসিত শরণার্থি’ বলতে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত চুক্তিতে যে শরণার্থিদের উল্লেখ করা হয়েছে তাদের পুনর্বাসনই কেবল এই টাস্কফোর্সের বিবেচ্য। এই তালিকার বাইরে যেসকল শরণার্থি যেকোনোভাবে বাংলাদেশে এসে থাকেন তারা যদি প্রকৃতই বাংলাদেশী শরণার্থি হয়ে থাকেন তবে তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশের দায়িত্ব। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই আগরতলায় করতঃ ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় নয় এবং টাস্কফোর্সের বিবেচ্য নয়।

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পুণর্গঠিত টাস্কফোর্সের চতুর্থ সভায় এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত আসে। এতে বলা হয়, ‘পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে প্রত্যাগত উপজাতীয়দেরকে পার্বত্য চুক্তির আওতায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনকারী হিসাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই বিধায় তারা টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত নয়। সুতরাং তাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই’।

একই মত প্রকাশ করা হয়েছে, টাস্কফোর্সের ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম সভায়। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের কার্যবিবরণী পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘টাস্কফোর্সের কার্যপরিধির আওতায় প্রত্যাগত শরণার্থিদের মধ্যে যারা পার্বত্য চুক্তির আওতাভূক্ত পূনর্বাসনের ক্ষেত্রে কেবল তারাই বিবেচনার যোগ্য হবেন। পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে প্রত্যাগত শরণার্থিদের মানবিক বিবেচনায় তাদেরকে অন্য কোনোভাবে পুনর্বাসিত করা যেতে পারে।’ টাস্কফোর্সের এই মত নিয়ে কারো কোনো আপত্তি নেই এবং বাংলাদেশ সরকারও শান্তিচুক্তির পূর্বে স্বেচ্ছায় ও আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন সময় আগত প্রত্যাগত শরণার্থিদের মানবিক বিবেচনায় ১৬ দফা ও ১৯ দফা প্যাকেজের আওতায় পুনর্বাসন করেছে- যার কিছু তথ্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলবে…


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস

32

মেহেদী হাসান পলাশ:

আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস। ১৯৯৮ সালের এই দিনে অর্থাৎ ৯ জুন পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে তৎকালীন ও আজকের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাষ্টীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পরই তৎকালীন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একে দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রবল গণ- আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। বেশ কয়েকটি হরতালসহ নানা কর্মসূচী দেয়া হয়। এরই এক পার্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহাসিক লংমার্চ।

34

১৯৯৮ সালের ৯জুন সংঘটিত ঐতিহাসিক সেই লংমার্চের আজ ১৬ বছর পূর্তি। যে শান্তিচুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবীতে সেই ঐতিহাসিক লংমার্চ হয়েছিল ১৬ বছর পর  পার্বত্য চুক্তির অধীন নানা বঞ্চনা ও বৈষম্য নিয়ে বাঙালীরা আজো আন্দোলন করে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।

l-2

যদিও এই লংমার্চের কথা লংমার্চ পালনকারী বিরোধী দলীয় জোট ও পার্বত্য বাঙালীদৈর অনেকেই ভুলে গেছে। বিরোধী দল সরে গেছে লংমার্চের চেতনা থেকে। কারণ, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট সেই লংমার্চে পরিস্কার ঘোষণা করেছিল তারা ক্ষমতায় গেলে দেশবিক্রির পার্বত্য কালো চুক্তি বাতিল করবে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গিয়ে সেই চুক্তি বাতিল তো দুরে থাক বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী এক সন্ত্রাসীকে(মেজর রাজেশ-মণি স্বপন দেওয়ান) নমিনেশন দিয়ে এমপি ও মন্ত্রী বানায়। আর এখন বিএনপি পার্বত্য বাঙালী বর্জিত দলে পরিণত হয়েছে।

40

প্রেক্ষাপট ও বিশালতা বিবেচনায় এই লংমার্চটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে বড় লংমার্চ। ৯ জুন ১৯৯৮ সাল সকাল ৮ টায় পল্টন ময়দান থেকে হাজার হাজার গাড়িতে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমূখে ঐতিহাসিক সেই লংমার্চ যাত্রা। লংমার্চ শুরুর কিছু পর কাঁচপুরে বাধাগ্রস্ত হয় শাসক দলের সন্ত্রাসীদের দ্বারা। আগের রাতেই নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান কাঁচপুর এলাকায় গুলি করে বেশকিছু গাড়ীর চাকা পাংচার করে রাস্তা আটকে দেয় ও রাস্তায় সশস্ত্র অবস্থান নেয়।। ফলে রাস্তায় সৃষ্টি হয় প্রবল যানজট। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা আটকে পড়া গাড়িতে লুটপাট চালায়, তাদের হাতে বেশ কিছু মহিলা ধর্ষিত হয় বলে পত্রপত্রিকায় খবর বের হয়েছিল।  অনেক ট্রাক, বাস রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হয়। সশস্ত্র শামীম ওসমান বাহিনী রাস্তায় অবস্থান নেয়। ফলে আটকে যায় বিশাল লংমার্চ। এদিকে লংমার্চটি যখন কাঁচপুরে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তখনও লংমার্চের গাড়ি বহরের শেষ প্রান্ত পল্টন ময়দানে অবস্থান করছিল। এই একটি ঘটনায় প্রমাণ করে কি বিশাল ছিল সেই লংমার্চের ব্যাপ্তি।

46

এদিকে বাধাগ্রস্ত হবার পর ৭ দলীয় জোটে অবস্থানকারী সরকারী দালালরা লংমার্চ সেখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করে ফিরিয়ে নেবার ষড়যন্ত্র শুরু করে। কিন্তু ৭ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সে ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, যতদিন না পর্যন্ত এই সরকার রাস্তার বাঁধা সরিয়ে নিয়ে লংমার্চ সচল করার উদ্যোগ না নেবে ততদিন পর্যন্ত তিনি রাস্তায় অবস্থান করবেন। জোট নেত্রীর এ ঘোষণায় মুহুর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। লংমার্চকারীদের মধ্যে নতুন প্রণোদনা সৃষ্টি হয়।

39

লংমার্চ অবস্থানকারী রাস্তার আশেপাশের গ্রামবাসীরা খাবার সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। মুহুর্তেই রাস্তার পাশে বড় বড় চুলা তৈরী হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ লংমার্চকারীদের জন্য কোথাও খিচুড়ি, কোথাও গরু জবাই করে রান্না শুরু হয়। শুকনা খাবার, খিচুড়ি ইত্যাদি খেয়ে লংমার্চকারীরা রাস্তায় অবস্থান করে। নেতৃবৃন্দ মাইকে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতে থাকেন।

বিভিন্ন স্থানে মাইকে জাতীয় পর্যাযের শিল্পীরা সংগ্রামী সঙ্গীত, ছড়া, কবিতা পাঠ করে লংমার্চকারীদের চাঙ্গা করে রাখেন। বর্তমান লেখক সেই লংমার্চেল আট সদস্য বিশিষ্ট প্রচার কমিটির সদস্য ছিলেন- যার নেতৃত্বে ছিলেন, রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী ও অভিনেতা ওয়াসীমুল বারী রাজিব(মৃত)। লেখকের রচিত বেশ কয়েকটি ছড়া, কবিতা ও প্যারোডি সঙ্গীত লংমার্চ জুড়ে গাওয়া হয়।

37

অবশেষে বার ঘন্টা পর সন্ধ্যায় সরকার অবরোধ সরিয়ে নেয়। নতুন করে যাত্রা শুরু করে লংমার্চ। লংমার্চকারীদের কাছে রাখা শুকনো খাবার এরই মধ্যে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন খাবার সংগ্রহের কোনো সুযোগ তাদের ছিলনা। গভীর রাতেও ঢাকা চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ রাস্তার পাশে দাড়িয়ে লংমার্চকে স্বাগত জানায়। জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কয়েকটি স্থানে গভীর রাতেরই পথসভায় ভাষণ দেন। রাস্তায় বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ লোক গাড়ী নিয়ে লংমার্চে শরীক হয়।

লংমার্চে শাসকদলীয় সন্ত্রাসীদের হামলা

সারারাত বিরামহীন সফরের পর ফরজরের নামাজের সময় লংমার্চ চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। সেই সকালেও হাজার হাজার চট্টগ্রামবাসী রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে লংমার্চ বহরকে স্বাগত জানায়। সেখানে চট্ট্রগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বিশাল এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ৭ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে লংমার্চ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশ খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে , জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন অংশ রাঙামাটির উদ্দেশ্যে এবং জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন অংশ বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। লংমার্চ পার্বত্য এলাকায় প্রবেশ করলে মোড়ে মোড়ে বাঙালীরা পাহাড়ী লেবুর শরবত, লেবু, কলা, কাঁচা আম দিয়ে লংমার্চকারীদের ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটানোর জন্য আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে বর্ণণা করে বিশ্বাস করানো কঠিন।

৭ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে স্থানে পার্বত্য চুক্তির আওতায় শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পনের নাটক করেছিল সেই খাগড়ছড়ি স্টেডিয়ামে লাখো লাখো লোকের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার দেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব অন্যদেশের হাতে তুলে দিয়েছে। ৭ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, তাদের সরকার ক্ষমতায় এলে এই দেশবিরোধী পার্বত্য চুক্তি বাতিল করা হবে। কিন্তু দেুঃখের বিষয় চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে এই প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়।

আজকে যখন আবার সেই শান্তিচুক্তির অধীনে ভূমি কমিশন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোট মুখে কুলুপ এটে বসে রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় বিএনপির পাহাড়ি নেতারা বাঙালীদের আন্দোলনে যেতে বাধা দিচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিস্ময়কর নীরবতা দেখে প্রশ্ন জাগে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়?

 

সন্তু লারমা’র হুংকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা

%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বেশ কিছু জ্বালাময়ী মন্তব্য করেন।শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে যে আলোচনা সভা হয়েছে ঢাকায়,সেখানে সন্তু লারমা যেসব মন্তব্য করেছেন মূলত তার আলোকেই পার্বত্য সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে এই পোস্টে।সাথে প্রাসঙ্গিক আরো কয়েকজনের মন্তব্যও যোগ হয়েছে।

শান্তিচুক্তি ও অস্ত্র তুলে নেয়ার হুমকি

১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনার উদ‌্যোগেই পরের বছর শান্তিচুক্তি হয়। জনসংহতি সমিতির পক্ষে তাতে সই করেছিলেন সন্তু লারমা। সে সময় যে ‘আবেগ ও অনুভূতির আবেশ’ ছিল ১৯ বছর পর এসে তা ‘নিঃশেষ’ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন এই পাহাড়ি নেতা।

প্রধানমন্ত্রী এসে বললেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না যে চুক্তির সবগুলো ধারা বাস্তবায়িত হবে। কারণ গত ১৯ বছরে বিশ্বাসভঙ্গের অনেক ঘটনা ঘটেছে, অনেক প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা আমাদের দাবি আদায়ে কাজ করব। সরকার যদি অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে, অবদমনে তৎপর থাকে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা এভাবে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।(১)

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ ছেড়ে আসা এই পাহাড়ি নেতা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ফের অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন।

চুক্তি কেন বাস্তবায়ন হয় না, তা আমার কাছের দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই সরকারের উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; সরকারের মধ্যে অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইসলামিক সাম্প্রদায়িকতাবোধ রয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেক গণবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি আছে; যে কারণে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে দ্বিধা করছে।

আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই, আমরা পাহাড়িরা মানুষের মত বাঁচতে চাই। যদি সেটা আমাদের করতে না দেওয়া হয়, যদি সরকার আমাদের বাধ্য করে, যে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দ্বিধা করব না।১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বলেছিল, যেহেতু সংসদে আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই, তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও চুক্তির আলোকে যে আইনগুলো তা আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন তো দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি সংখ্যা গরিষ্ঠতা আছে; তাহলে সরকার এই আইন, এই চুক্তি সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করতে এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? (২)

সরকার ওই চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ এবং ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়নের কথা বললেও জনসংহতি সমিতি তাকে ‘অসত্য প্রচার’ বলে আসছে। তাদের ভাষ‌্য, বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২৫টি ধারা।

অন্যমিডিয়া

প্রশাসন ও দলীয়করণ

“আজকে আমাদের দেশের সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে নেই। আমি আঞ্চলিক চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী আছে না আছে, আমার জানা হয়ে গেছে। কোথায় এখানে দুর্নীতি, কোথায় এখানে মিথ্যা, কোথায় প্রতারণা- তা নতুন করে জানার আমার আর কোনো দরকার নেই।” (২)

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয়করণের নগ্ন প্রতিফলন ঘটেছে। সেখানে তো কোনো সরকার আমি দেখি না! যেখানে যাই সেখানে একটা সরকার। রাজা দেবাশীষ রায় একটা সরকার, প্রতিমন্ত্রী নববিক্রম ত্রিপুরা একটা সরকার; বহুমুখী শাসনব্যবস্থা সেখানে। কে কার কথা শুনে কাজ করবে- সেটাই বোঝা যায় না। আইনশৃঙ্খলাসহ সব কর্মকাণ্ড চালায় সেনাবাহিনী। তারপরে আছেন জেলা প্রশাসক, এসপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনে একজন কর্মকর্তাও নেই যারা শান্তিচুক্তির প্রতি সংবেদশীলন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন উত্তরণ’ বন্ধের দাবি জানিয়ে সন্তু লারমা বলেন, দেশেতো সেনা শাসন জারি নেই। তাহলে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডে এভাবে সেনা শাসন থাকবে কেন? (১)

‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে যাচ্ছে

পাহাড়ে ‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে’। প্রশাসন ও সরকার নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে, ‘হয় দেশ ছেড়ে চলে যাও, নয়তো নতজানু হয়ে থাকো’।(১) আজকে ‘আদিবাসী’ শব্দটাও ব্যবহার করা যাবে না; অথচ এই ‘আদিবাসী’ শব্দ ও বিষয়বস্তু নিয়ে আজকের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের অনেকেই আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সাথে ছিলেন, জোরালো ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। (২) [কারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে আদিবাসী? বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী মনে করেন প্রফেসর আবদুর রব।পড়ুন বিস্তরিতঃ আদিবাসী-উপজাতি বিতর্ক ]

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিকল্পিতভাবে ‍সেটেলার বাঙালিদের সংখ্যাগুরু বানানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি এক ধরনের এথনিক ক্লিনজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেটা বিশ্বব্যাপী অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।পার্বত‌্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাসিন্দারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিকে না গেলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ ধারায় চলে যেত।”

রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ করার বিরোধিতায় সন্তু লারমা বলেন, “যারা আমাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, তাদের পক্ষ হয়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ করা যাচ্ছে। উদ্দেশ্য তাদেরকে নতুনভাবে পুনর্বাসন করা। আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি যে উন্নয়ন, সেটা আমরা চাই না। আমরা চাই, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন।” (১)

photo-bipf-kf-discussion

ভূমি সমস্যা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নিষ্ক্রিয় ভূমিকার পেছনে দেশের আমলা ও নীতিনির্ধারকদের নানা ‘ষড়যন্ত্র’কে দায়ী করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।তিনি বলেন, “সরকার প্রধানকে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, দয়া করে অসত্য, অপূর্ণ, অস্বচ্ছ, মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রদান থেকে নিজেদের বিরত রাখুন।” আলোচনা অনুষ্ঠানে ভূমি সমস্যাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে তুলে ধরে মিজানুর রহমান বলেন,

“আমি তো বলি আমার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করার দরকার নেই। শুধু একটি মাত্র বাস্তবায়ন করো- সেটি হচ্ছে সকল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করো; অন্য সকল সমস্যা আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের দাবি জানান জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা (২)

নোটঃ

(১) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, পাহাড় এরকম নাও থাকতে পারে: সন্তু লারমা, ০২ ডিসেম্বে ২০১৬

(২)বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী: সন্তু লারমা, ০১ ডিসেম্বর ২০১৬

প্রাসঙ্গিক বিষয়

২০০৮ সালে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন।সেখানে একটি লিখিত প্রতিবেদনও পেশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনে ভূমি সমস্যা, বাঙালী সেটেলারদের ভূমি দান, রিফিউজি সমস্যা, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরে হয়েছিল। প্রফেসর অজয় রয় সেখানকার জনসংখ্যার অনুপাতে পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন;

Press conference of eminent citizens at the National Press Club, February 11, 2008
As per regional council leaders, there are over one lakh hill refugees, but there is none to address the problem, adding that Bangalees are also occupying the religious structures. The present ratio of hill people and Bangalees is now 52:48, but in the next census it will be tilted towards Bangalees. Hill people think the number of voters will also override the number of the hill people in future, which is a threat to them.

On the other hand, the government is also helping the Rohingya Muslims who fled from Myanmar to settle at Naikkhangchhari, Ruma, Lama, and Alikadam in Bandarban. “Does the government then want to form a new CHT with Bangalee and Rohingya Muslims?” Prof Ajoy posed a question.

In the report, the citizens said the number of Jumma people will come down for various initiatives when CHT will be considered extension of the plain Chittagong.

“Colonial attitude of the government, army and Bangalees cannot resist the movement of hill people. We must accept the CHT hill people. So, sooner the Bangalee settlers are removed from the CHT, better is the result,” the report said. (Daily Star, Present CHT situation threat for future, February 11, 2008, last accessed 06.12.2016 http://www.thedailystar.net/news-detail-22929 ).

সূত্র: মূলধারা বাংলাদেশ