শরণার্থি ও উদ্বাস্তুদের তালিকা তৈরি ও যাচাইয়ের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আলোচনা

আমরা যদি প্রথম টাস্কফোর্সের দেয়া হিসাবকে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাই, ১৯৮৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ১, ০৪,৯৯৪ জন শরণার্থি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছে। ২৯ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তিচুক্তির পর ৬ দফায় মোট ভারত থেকে ১২,২২২ পরিবারের ৬৮,৪৩৩জন শরণার্থিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এটি ছিলো টাস্কফোর্সের আওতাধীন পুনর্বাসন। এই পুনর্বাসন সম্পন্ন হওয়ার পর সরকারী সকল রেকর্ডে শান্তিচুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পরিবারের সংখ্যা ২১,৯০০ বলে দাবী করা হয়েছে। ৯ম সভাতেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ২১,৯০০ পরিবার পূর্বের ১২,২২২ পরিবারের অতিরিক্ত। পূর্বের হিসাব অনুযায়ী যদি পরিবার প্রতি ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়, তাহলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১,০৯৫০০।  এ থেকে দেখা যায়, ইনসার্জেন্সির পর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া শরণার্থির সংখ্যা দাঁড়ায় মোট (১, ০৪,৯৯৪+ ১,০৯৫০০)= ২,১৪,৪৯৪ জন। এই পরিসংখ্যান ভারতও কোনোদিন দাবী করেনি। তাহলে টাস্কফোর্স কীভাবে আবিস্কার করলো?


এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন এখানে


অন্যদিকে গত ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় যে, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৯,২৮০ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়। এই সভায় ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো বক্তব্য সমর্থন করা হয়। অর্থাৎ ৮৯,২৮০ পরিবারের অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু পরিবারের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে। এই ‘অধিকাংশ’ শব্দের অর্থ আমরা যদি ৮০% ধরি, তাহলে ধরে নিতে পারি আনুমানিক ৭১,৪২৪ পরিবার কমপক্ষে পুনর্বাসিত হয়েছে।

এদিকে ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির দেয়া তালিকা অনুসারে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নতুন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৮১,৭৭৭ পরিবার। ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় এই সংখ্যাকে অনুমোদন দেয়া হয়। সে হিসাবে মোট অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায়(৭১,৪২৪+৮১,৭৭৭)=১,৫৩,২০১ পরিবার। পরিবার প্রতি ৫ জন করে জনসংখ্যা ধরলে মোট অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭,৬৬,০০৫ জন। শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা একসাথে যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৯,৮০,৪৯৯জন।

প্রশ্ন হলো: সর্বশেষ জরীপ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যা ১৬ লাখ। ২১ বছর আগে শান্তিচুক্তির সময় এই জনসংখ্যা কতো ছিলো? যুক্তির খাতিরে ধরে নিই ১০ লাখ। এর ৫০% বাঙালী হলে উপজাতীয় জনসংখ্যা ছিলো ৫ লাখ। কিন্তু উপরের হিসাব অনুযায়ী ২,১৪,৪৯৪ জন শরণার্থি এবং ৪,৮০,৩০৯ জন অভ্যন্তরীণ উস্তাস্তুর সংখ্যা যোগ করলে আমরা দেখতে পাই উপজাতীয় বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯,৮০,৪৯৯জন- যা মোট উপজাতীয় সংখ্যার থেকে বহু বেশী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় পরিবারকে বাস্তচ্যুত ধরলেও এই পরিসংখ্যান মেলানো যায় না। এই পরিসংখ্যানই এই তালিকার অসারতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

আমরা পূর্বের হিসাবেই দেখেছি, বান্দরবান জেলায় শরণার্থি নেই। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যাও নগণ্য। রাঙামাটিতে এই সংখ্যা কিছু বেশী হলেও অধিকাংশ বাস্তচ্যুতির ঘটনাই ঘটেছে খাগড়াছড়িতে। তাহলে সে সময় খাগড়াছড়ি জেলার উপজাতীয় জনসংখ্যা কতো ছিলো?

ভূ প্রাকৃতিক কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দা বাস করে জেলা, উপজেলা সদর বা এ ধরণের বার্ধিষ্ণু এলাকাগুলোতে। অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সির সময় জেলা, উপজেলা ও বর্ধিষ্ণু এলাকাগুলোতে বাস্তচ্যুতির ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। কেননা, এই এলাকাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ও তৎপরতার কারণে অপেক্ষাকৃত অনেক নিরাপদ ছিলো। বাস্তচ্যুতির প্রায় সকল ঘটনাই ঘটেছে প্রত্যন্ত ও দূর্গম এলাকাগুলোতে, যেখানে জনবসতি খুবই কম। কাজেই প্রশ্ন উঠতে পারে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে জনবসতির সংখ্যা কতো? এ ধরণের আরো অনেক যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে- যাতে উল্লিখিত বাস্তচ্যুতির সংখ্যাকে বালখিল্য করে তোলে।

এখন টাস্কফোর্সের রিপোর্ট যদি সত্য ধরে নিই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠবে, এই লাখ লাখ অতিরিক্ত জনসংখ্যা কোথা থেকে এলো? তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক?

বাংলাদেশ সরকার জনসংখ্যার সুষম বন্টনের নীতিমালায় ৫৫৫১৭ বাঙালী পরিবারকে ১৩০ টি গ্রামে সমতল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্যাটেল করে। এরমধ্যে শান্তিবাহিনীর হুমকি, আক্রমণ ও পরিবেশগত প্রতিকূলতার কারণে ২৩৫১১ পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে সমতলে চলে আসে। থাকে ৩২০০৬ পরিবার।  এর মধ্যে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার ৬৮টি গুচ্ছগ্রাম/শান্তিগ্রাম সৃষ্টি করে ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে তাদের স্বভূমি, বসতভিটা ও চাষের জমি ফেলে রেখে গুচ্ছগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। সেই থেকে তারা সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এই গুচ্ছগ্রামে প্রত্যাবাসিত ২৬ হাজার পরিবার এবং শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসা ২৩৫১১ পরিবার ও আদি বাঙালীদের একটা বড় সংখ্যক ইনসার্জেন্সির কারণে বাস্তচ্যুত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগের মতে এই সংখ্যা ৬১,২০২ পরিবার। ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার মতে এই সংখ্যা ৫৭,৬৯২ পরিবার। তবে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৩৮,১৫৬ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

যদিও এই সংখ্যাগুলো মধ্যে ব্যবধান বিশাল। তবে এর মধ্যে যে ২৬ হাজার পরিবারকে সরকার গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত হতে বাধ্য করেছে তাদের কাছে সরকার তথা রাষ্ট্রের কমিটমেন্ট হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরকার বা রাষ্ট্র তাদের কবুলিয়ত প্রদত্ত ভিটামাটিতে ফেরত নিয়ে আসবে। পরিস্থিতি বহু পূর্বেই স্বাভাবিক হলেও রাষ্ট্র তার কমিটমেন্ট রক্ষা করেনি। রাষ্ট্রের উচিত, রাষ্ট্রের দায়, জনগনের কাছে দেয়া তার কমিটমেন্ট রক্ষা করা। সেজন্য প্রয়োজনে আইন করে হলেও অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদেরকে টাস্কফোর্সের আওতায় পুনর্বাসন সম্পন্ন করা উচিত। সরকার সময়ের প্রয়োজনে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে গঠিত অনেকগুলো আইন সংশোধন করেছে। কাজেই সরকার চাইলেই প্রজ্ঞাপন জারী করে অউপজাতীয় শরণার্থিদের পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত করতে পারে।

উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন

টাস্কফোর্স যখন পূর্বেই ঘোষণা করেছে, সম্পূর্ণ শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়েছে, তখন ২০১৬ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম ও ৯ম সভায় নতুন করে এই ২১৯০০ পরিবার শরণার্থি ও ৮৮৭৭৭ পরিবার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু অর্থাৎ ১,১০,৬৭৭ পরিবার বা ৫,৫৩,৩৭০জন বাস্তচ্যুত উপজাতীয় জনগণকে কোথা থেকে আবিস্কার করলো? এরা কি বাংলাদেশের নাগরিক? পূর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি, ভারতীয়দের তালিকা পরীক্ষা করে বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের সন্ধান পেয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পরিচয়ে লুকিয়ে থাকা বিদেশী নাগরিকদের এই তালিকার মাধ্যমে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে? এরমধ্যে সীমান্তের ওপারে থাকা বিদেশী নাগরিকদের বিশেষ কায়দায় পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা যারা কেবল পুনর্বাসন সুবিধা ভোগ করে, বরাদ্দকৃত জমি বিক্রি করে পুণরায় নিজ দেশে চলে যাবে, আবার ভোটের সময় এসে বিশেষ দলের প্রার্থিদের ভোট দিয়ে আবার সীমান্তের ওপারে ফিরে যাবে, কিম্বা অপরাধমূলক কাজে আন্তঃসীমান্ত যাতায়াত করবে- খতিয়ে দেখা জরুরী। রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় লোকদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে বা অর্থ আদায়ের উপলক্ষ হিসাবে সাধারণ মানুষকে এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী।

করণীয়

১. ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের বিতর্কিত তালিকা এবং টাস্কফোর্স থেকে বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাদ দেয়ার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে সকল বাঙালী আঞ্চলিক সংগঠন বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। তিন পার্বত্য জেলা ও রাজধানীতে এর প্রতিবাদে বাঙালী সংগঠনগুলো একের পর এক কর্মসূচী পালন করছে। সামাজিক গণমাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে প্রবল প্রতিবাদ। পার্বত্য বাঙালী কমিউনিটিতে এ প্রতিবাদ ও দাবী যেভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তাতে সরকারের উর্দ্ধতন মহল থেকে এ বিষয়ে দ্রুতই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা জরুরী বলে সচেতন মহলের অভিমত। নচেত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষের নেতিবাচক প্রচারণার মুখে সরকারদলীয় প্রার্থিদের বাঙালী ভোটপ্রাপ্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পতিত হতে পারে।

২. ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় ও অউপজাতীয় উদ্বাস্তুদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপনের দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দিতে হতে। একই সাথে অনুমোদিত তালিকা যাচাই ও বাছাইয়ের কাজও সেনাবাহিনীকে দিতে হবে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় সকল শরণার্থি ও উদ্বাস্তুদের আদিবাস, স্থানান্তর বা বাস্তচ্যুতি, বাংলাদেশে আগমন, বর্তমান বাসস্থানে আগমন, পুনর্বাসন, বাদ পড়া প্রভৃতি বিষয়ে একটি ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরি করতে হবে। এনআইডি প্রকল্প ও রোহিঙ্গা শরণার্থিদের ডাটাবেইজ তৈরিতে সেনাবাহিনীর বিপুল সাফল্য এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। খুব সহজেই এ কাজটি করা যায়। কেননা, বর্তমান টাস্কফোর্সে সেনাবাহিনীর তথা ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অংশগ্রহণ রয়েছে। টাস্কফোর্সের পক্ষ থেকেই এ কাজের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেয়া যেতে পারে বা সেনাবাহিনীকে কাজটি করার জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারী করতে পারে। যেহেতু টাস্কফোর্সের নিজস্ব লোকবল নেই এবং এই তালিকাও টাস্কফোর্সের নিজস্ব নয়। তারা তালিকার জন্য সিভিল প্রশাসন ও জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির কাছে আহ্বান জানিয়েছে কাজেই একই আহ্বান সেনাবাহিনীর কাছেও জানাতে পারে।

৩. অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের একইসাথে পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শান্তিচুক্তি থেকে সৃষ্ট ভূমি কমিশন আইন, জেলা পরিষদ আইন সংশোধন করা গেলে টাস্কফোর্সের কার্যপরিধিও সংশোধন করা যাবে না কেন। এ ক্ষেত্রে আইনী জটিলতার সম্ভাবনা দেখা দিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আইনী জটিলতা দুর করা যেতে পারে। কেননা, এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরই পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।

৪. যেহেতু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি ও টাস্কফোর্স ইতোমধ্যেই এইমর্মে মতপ্রকাশ করেছে যে, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারীভাবে শান্তিচুক্তির এই ধারা পূর্ণ বাস্তবায়িত বলে ঘোষণা করা হয়েছে তাই এ বিষয়ে সরকারের অবস্থানে দৃঢ়তা দেখাতে হবে। তবে এর বাইরেও যদি কেউ বাদ পড়ে যায় অথবা পুনর্বাসনের ২০ দফা প্যাকেজের কোনো কোনো দফা বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ থাকে তবে সে বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

৫. টাস্কফোর্সের ৯ম সভায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের ২১,৯০০ পরিবার ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের ৮১,৭৭৭ পরিবারের যে তালিকা চুড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে এই তালিকাকে সম্পূর্ণ নতুন তালিকা হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অন্তর্ভূক্ত অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু অথবা শান্তিচুক্তির আওতায় প্রদত্ত ২০ দফা পুনর্বাসন প্যাকেজের আওতায় তাদের বিবেচনা করা যাবে না।

৬. এই নতুন ২১,৯০০ পরিবার ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও ৮১,৭৭৭ পরিবার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের তালিকা সেনাবাহিনীর মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে যদি প্রকৃতভাবে কেউ বাস্তচ্যুত হয়ে থাকে তবে মানবিক বিবেচনায় তাদেরকে সম্মানজনক ও সন্তষ্টিজনকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৭. পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় লেবাসে ছদ্মবেশে থাকা বিদেশী নাগরিকদেরকে এই তালিকার আওতায় পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে।

৮. শান্তিচুক্তির পর উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও অপারেশনাল কাজে সহায়তার জন্য, গণলাইন সৃষ্টির জন্য প্রত্যন্ত ও দূর্গম এলাকার পাহাড়ী বাসিন্দাদের এনে পরিত্যাক্ত সেনা ক্যাম্প, সড়কের দু’পাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে, সরকারী, খাস, রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় বসতি স্থাপন করিয়েছে। তাদেরকে এই তালিকার মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা জরুরী।

৯. চুক্তি পরবর্তী পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বিভিন্ন সময় যেসকল নিরীহ উপজাতি ও অউপজাতীয়/বাঙালী সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাস্তচ্যুত হয়ে অন্যত্র বসতি গড়েছে তাদেরকেও এই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের মধ্যে ফেলা হয়েছে কিনা দেখা জরুরী। যদি এ ধরণের কোনো কোনো বাস্তচ্যুত পরিবার বা সদস্য পাওয়া যায় তাদের অবশ্যই তাদের নিজ বসতভিটায় পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তা শান্তিচুক্তির আওতায় গঠিত ২০ দফা পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় নয়।

১০. শান্তিচুক্তি পূর্ববর্তীকালে যেসকল বাঙালী সদস্যদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিজ বসতভিটা থেকে সরিয়ে গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছিল তাদেরকে তাদের নিজ বসত ভিটায় সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন করা। সরকার কর্তৃক তাদের কবুলিয়ত দেয়া জমির দখল ফিরিয়ে দেয়া।

১১. শান্তিচুক্তির পূর্বে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে বা হুমকির মুখে যেসকল বাঙালী পরিবার নিজ বসতভিটা ত্যাগ করতে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল তাদের নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবাসন করা।

১২. এই বিপুল পরিমাণ লোককে কোথায় পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তাব করা হচ্ছে সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এখানে বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমি, সরকারী ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জমি ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ইতোপূর্বে যে সমস্তু প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের পুনর্বাসন করা হয়েছে, বাঙালীদের অভিযোগ অনেকস্থানে তাদের ফেলে আসা কবুলিয়তভুক্ত ভূমি দখল করে তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি সত্যিই বাঙালীদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে শরণার্থিদের পুনর্বাসন করা হয়ে থাকে তাহলে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে অনত্র কোনো উপযুক্ত ভূমিতে পুনর্বাসন করতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে বাঙালীদের জন্য সমপরিমাণ উপযুক্ত জমি ক্ষতিপুরণ হিসাবে অন্যত্র বন্দোবস্তি দিতে হবে।

সমাপ্ত।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

জেএসএসের আপত্তির কারণে টাক্সফোর্স থেকে বাঙালী উদ্বাস্তুদের বাদ দেয়া হয়

(গতকাল প্রকাশিতের পর)

বাঙালী বা অউপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তের সংখ্যা কতো?

অভ্যন্তরীণ বাঙালী বা অউপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পূর্বোল্লেখ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনায়নের প্রচেষ্টার বিভিন্ন উদ্যোগ অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের প্রাথমিক তালিকা পাওয়া ১৯৯৭ সালের ১২ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে।

অর্থাৎ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন জনাব মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় উদ্বাস্তু পরিবারের সংখ্যা ৬১,২০২। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ১৫,৬৭৩ পরিবার, বান্দরবানে ২৫৯ পরিবার এবং খাগড়াছড়িতে ৪৫,২৭০ পরিবার। এ তালিকা অনুসারে উপজাতীয় ও অউপজাতীয় মোট উদ্বাস্তুর সংখ্যা ১,৪৯,৩৪০ পরিবার। যদিও শান্তিচুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সে কেবলমাত্র  অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে।

তবু কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ সকল জাতিগোষ্ঠীর মঙ্গল চিন্তায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পাশাপাশি অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শান্তিচুক্তির পূর্ব থেকেই এবং পরবর্তীকালেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। সেকারণে উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য গঠিত টাস্কফোর্স অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়। শুধু তাই নয়, টাস্কফোর্সের বিভিন্ন কমিটিতে বাঙালি সদস্যদের অন্তর্ভূক্তির নজির দেখা যায়- যা এখনো বহাল আছে।


এই সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন এখানে


টাস্কফোর্সের প্রথম কমিটি ৩৮ হাজার ১৫৬টি বাঙালী পরিবারকে অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় উদ্বাস্তু হিসাবে চিহ্নিত করে। ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালি উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৩৮,১৫৬ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে খাগড়াছড়িতে ২২৩৬৭, রাঙামাটিতে ১৫৫১৬ বান্দরবানে ২৬৯ পরিবার।

এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুর তালিকা ৬১,২০২ থেকে কী করে একলাফে ৩৮,১৫৬ তে নেমে আসলো তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেননা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই  প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারই ক্ষমতায় ছিলেন এবং এতে স্বাক্ষর করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, তৎকালীন পরিচালক প্রশাসন হিসাবে।

তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় অউপজাতীয় বা বাঙালী অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৫৭,৬৯২ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে খাগড়াছড়িতে ৪১,৯০৭ পরিবার, রাঙামাটিতে ১৫,৫১৬ পরিবার এবং বান্দরবানে ২৬৯ পারিবার বলে উল্লেখ রয়েছে। ২০০৭ সালের তালিকা থেকে ২০০৯ সালের তালিকায় রাঙামাটি ও বান্দরবানে বাঙালী উদ্বাস্তুর সংখ্যা সঠিক থাকলেও খাগড়াছড়িতে তা বেড়ে যায়। এই টাস্কফোর্সে সদস্য হিসাবেও অউপজাতীয় বা বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসাবে এসএম সফি অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। তিনি এখনো আছেন, তবে অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়।

২৭ জানুয়ারী ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় সভায় জেএসএস প্রতিনিধি লক্ষীপ্রসাদ চাকমা অউপজাতীয় পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে অন্তর্ভূক্ত না করার দাবী জানান।  এসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি ও খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক অউপজাতীয়দের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এর প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব তুলে ধরে তাদের অন্তর্ভূক্তি যথাযথ হয়েছে মর্মে অভিমত প্রদান করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের প্রতিনিধি বলেন, যিনি বাস্তু থেকে উৎখাত হয়েছেন তিনিই উদ্বাস্তু। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত উপজাতীয় ও অউপজাতীয় সকলকে রাখা বাঞ্ছনীয়।

জেএসএসর আপত্তির কারণে বৈঠকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পাওয়ার জন্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির নির্দেশনা চাওয়ার অভিমত গৃহীত হয়। ২৬ জানুয়ারি ২০১১ তে অনুষ্ঠিত কমিটির তৃতীয় বৈঠকেও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা হয় এবং শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য অপেক্ষার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে এই টাস্কফোর্সের চতুর্থ সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।  এরমধ্যে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা নির্ধারণে প্রথম টাস্কফোর্সের অধীনে ১৯৯৮ সালের ২৭ জুন অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত রয়েছে মর্মে জানানো হয়। এবং পূর্ববর্তী সভার সিদ্ধান্ত রয়েছে মর্মে জানার পর সভায় এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই মর্মে মতামত ব্যক্ত করা হয় এবং উক্ত সিদ্ধান্তের আলোকে কার্যক্রম পরিচালনা করার বিষয়ে সকলে একমত পোষণ করেন।

উল্লেখ্য, এই টাস্কফোর্সের প্রণীত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা হলো: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত যে সকল উপজাতীয় ও বাঙালী নিজ গ্রাম, মৌজা ও অত্র অঞ্চল ত্যাগ করিয়া দেশের মধ্যে অন্যত্র চলিয়া যায় বা চলিয়া যাইতে বাধ্য হয়, তাহারাই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু।’ ইত্তেফাক: ২৯-১১-২০০০ দ্রষ্টব্য।

কিন্তু বিস্ময়করভাবে এই কমিটি অউপজাতীয় উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে স্ববিরোধী একটি সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘অভ্যন্তরীণ অউপজাতীয় শরণার্থিগণকে সরকার ভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারে’। এটি স্পষ্টতঃই পূর্বের সিদ্ধান্তের বিপরীত।

তবে ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরার নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের ৫ম সভায় আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা অউপজাতীয় শরণার্থিদের পুনর্বাসনের বিষয়ে জোরালো আপত্তি তোলে এবং তার আপত্তির কারণে টাস্কফোর্সের কার্যতালিকা থেকে অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের বিষয়টি বাদ দেয়া হয়। এরপর থেকে আর অভ্যন্তরীণ বাঙালী উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের উদ্যোগ হারিয়ে যায়। ফলে গুচ্ছগ্রামে ও গুচ্ছগ্রামের বাইরে বাস্তচ্যুত বাঙালীদের নিজ বসতভিটায় পুনর্বাসনের স্বপ্ন ভেঙে যায়।

শরণার্থি প্রত্যাবাসন বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা বা ২০ দফা পুনর্বাসন কর্মসূচী

১৯৯৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ এবং ৬-৯ মার্চ ১৯৯৭ সালের ত্রিপুরায় অবস্থিত উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তৎকালীন চিফ হুইপ হাসানাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের শরণার্থি প্রত্যাবাসন বিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০ দফা চুক্তি হিসাবে এই চুক্তি খ্যাত হয়। এই চুক্তি উপজাতীয় প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের পুণর্বাসনের জন্য ২০ দফা প্যাকেজ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল এফেয়ার্স বিভাগ এ ব্যাপারে ১৯৯৭ সালের ২৫ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তবে এই প্রজ্ঞাপন ১২ নভেম্বর ১৯৯৭ সালে সংশোধন করে আরো একটি প্রজ্ঞাপন জারী করা হয়।

এই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, গৃহ নির্মাণ ও কৃষি অনুদান বাবদ পরিবার প্রতি এককালীন ১৫ হাজার টাকা প্রদান, শরণার্থি প্রতি পরিবারের প্রাপ্ত বয়স্ক সদস্য প্রতি মাসে ৫ কেজি চাল, অপ্রাপ্ত বয়স্কদের ২.৫ কেজি চাউল, ২ কেজি তেল, ৪ কেজি ডাল, ২ কেজি লবণ এক বছর পর্যন্ত রেশন হিসাবে দেয়া হবে। গৃহ নির্মাণ বাবদ পরিবার প্রতি ২ বাণ্ডিল ঢেউটিন, চাষাবাদ যোগ্য জমি রয়েছে এমন পরিবারের জন্য হালের বলদ কেনার জন্য ১০ হাজার টাকা, ভূমিহীন পরিবারের জন্য গাভী কেনার জন্য ৩ হাজার টাকা, ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফ, অন্যান্য সরকারী ব্যাংকে ঋণ থাকলে তা মওকুফ, উন্নয়ন বোর্ড থেকে নেয়া ঋণ থাকলে তা মওকুফ করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ ক্ষমা বলবৎ করা হবে, ইনসার্জেন্সি সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানার ক্ষেত্রেও একটি প্রয়োজ্য হবে। প্রত্যাবাসিত শরণার্থিদের মালিকানাধীন জমি তাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। তাদের গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হবে না। দেশত্যাগের পূর্বে যেসব শরণার্থি সরকারী/আধা সরকারী সংস্থায় কর্মরত ছিলেন তাদের চাকুরি বিধি অনুযায়ী তাদের জৈষ্ঠ্যতা ও সুবিধাসহ পুনর্বহাল করা হবে। শরণার্থি ক্যাম্পে স্থাপিত উচ্চ বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট আনবে তাদের সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অধীনে বিশেষ পরীক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। শরণার্থি ক্যাম্পের ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করা হবে। শরণার্থি প্রতি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠের পারমিট প্রদান করা হবে।

প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারের তরুণ তরুণীদের যোগ্যতা সাপেক্ষে উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকুরীতে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।ত্রিপুরায় শরণার্থি ক্যাম্পে অবস্থানকালে যেসকল বাংলাদেশী শরণার্থি চাকুরির বয়সসীমা অতিক্রম করেছে তাদের বয়স সীমা শিথিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের কারণে শাস্তি ঘোষিত হয়েছে তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ব্যবস্থা করা। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি রেখে বেসামরিক এলাকা থেকে ক্যাম্পসমূহ তুলে নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। উপজাতীয় হেডম্যানদের স্ব স্ব পদে পুনর্বহাল করা হবে।

চলবে…

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা কতো?

(গতকাল প্রকাশিতের পর)

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা কতো?

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পুনর্বাসনের প্রশ্ন নিরসনের আগে এটা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন যে, ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৯৭ সালে পর্যন্ত ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী উপজাতি ভারতে গিয়েছিল? কী পরিমাণ উপজাতি বাংলাদেশে ফেরত এসেছে? কারা, কখন এসেছে? কিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে? তবে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ও শান্তিচুক্তির পূর্বে ইনসার্জেন্সির সময় ঠিক কী পরিমাণ বাংলাদেশী উপজাতীয় পরিবার বা সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল এবং কী পরিমাণ সদস্য বাংলাদেশে ফিরে এসেছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আর্কাইভে অনুসন্ধান চালিয়ে পাওয়া বিভিন্ন সরকারী ডকুমেন্ট ও টাস্কফোর্সের বিভিন্ন ডকুমেন্টে শরণার্থিদের সংখ্যায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।


গতকালের অংশ পড়ুন এখানে

শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাকে পুনর্বাসিত করতে চাইছে টাস্কফোর্স


মেজর জেনারেল(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ পুস্তকে লিখেছেন, ১৯৮৯ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী ৪৩,৭৮৬ জন শরণার্থি ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তবে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ২৯,৯২০জন। একই বছর স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন বানচাল করার চক্রান্তের অংশ হিসাবে শান্তিবাহিনী বন্দুকের মুখে জোরপূর্বক কিছু উপজাতীয়কে ভারতে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। আনুমানিক এই সংখ্যা ১৫ হাজার জন ধরা হয়। হয়। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা- ১৬০ দ্রষ্টব্য)। সে হিসাবে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার।

১৯৮৬ সালের ৩১ মে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ রামগড়ে ১০,৩১০জন শরণার্থির তালিকা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে। একই বছরের ৩১ আগস্ট একই স্থানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২৬,৯০৩জন শরণার্থির তালিকা বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে।  বাংলাদেশ পক্ষ এ তালিকার ব্যাখ্যা চাইলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ২৭,১০১ জনের সংশোধিত তালিকা দেয়। ১৯৮৭ সালের ৩০ মে রামগড়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে ৫০,৫২৭জন শরণার্থির নতুন তালিকা হস্তান্তর করে। তবে বাংলাদেশ সরেজমিনে তদন্ত চালিয়ে ঐ সংখ্যার মধ্যে ২৯,৯২০জনকে বাংলাদেশী নাগরিক বলে চিহ্নিত করে। ১৯৮৯ সালের ১৭ মে আগরতলায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ৪৩,৭৪৬ জন শরণার্থির কথা বলে। এর মধ্যে ২৯-১২-৮৬ থেকে ২২-৫-৯২ পর্যন্ত ২৮,৩৮৪জন শরণার্থি দেশে ফিরে এসেছে। (প্রাগুক্ত- পৃষ্ঠা: ১৬১-১৬২ দ্রষ্টব্য)।

উপরের অন্তত দুইটি ডকুমেন্ট থেকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেয়া তালিকাকে সম্পূর্ণ নির্ভূল ও নির্মোহ প্রমাণ করা যায় না। বরং ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পাঠানো বা পুনর্বাসনের যে অভিযোগ বর্তমানে বাঙালি সংগঠনগুলো করছে তার কিছু প্রচেষ্টা যে সেসময়ই ছিলো তা লক্ষ্যণীয়।

এদিকে ১৯৯৩ সালে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী উপজাতীয় শরণার্থিদের একটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। এই তালিকা অনুযায়ী ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী রেজিস্টার্ড শরণার্থির সংখ্যা ১১,৮০৬ পরিবাবের ৫৬, ৪৯৬ জন। এরমধ্যে রাঙামাটি জেলার ৫১ পরিবারের ২০৫ সদস্য বাদে বাকি সকল সদস্যই খাগড়াছড়ি জেলার। এই তালিকা অনুযায়ী বান্দরবান জেলা থেকে কোনো উপজাতীয় শরণার্থি উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে গমন করেনি।

একই সময়ে দেয়া অপর এক তালিকায় ঐ রাজ্যে বসবাসকারী আন রেজিস্টার্ড শরণার্থিদের সংখ্যা ৪০৩ পরিবারের ১৪৫৭জন বলে দাবী করা হয়। অর্থাৎ ১৯৯৩ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত তালিকায় ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী মোট বাংলাদেশী উপজাতি শরণার্থির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১২,২০৯ পরিবারের ৫৭,৯৬৩ জন। জেনারেল ইব্রাহীমের বইয়ে উল্লিখিত তথ্য বিবেচনা করলে দেখা যায়, এই সংখ্যা ইতোপূর্বে পুনর্বাসিত ২৮,৩৮৪ জনের অতিরিক্ত।

তবে ‘ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য হইতে উপজাতীয় শরণার্থিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাবাসন কর্মপরিকল্পনা-১৯৯৭’ শীর্ষক এক ডকুমেন্টে দেখা যায়, ১৯৯৩-৯৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ও স্বেচ্ছায় ১৭৯৫ পরিবারের ৮১৭৭ জন বাংলাদেশে আগমন করেছেন ও প্রত্যাবাসিত হয়েছে।

এরপর ১৯৯৭ সালের মার্চে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানকারী শরণার্থিদের আরেকটি তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে হস্তান্তর করে। ঐ তালিকায় দেখা যায়, সে সময় ত্রিপুরা রাজ্যে বসবাসকারী উপজাতীয় শরণার্থির সংখ্যা ৯২৬৭ পরিবারের ৪৯,৮৯২ জন। এই সংখ্যাটিও ১৯৮৬-৯২ সালে প্রত্যাবাসিত ২৮৩৮৪ এবং ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রত্যাবাসিত ৮১৭৭ জনের সংখ্যাতিরিক্ত।

তবে দৈনিক ভোরের কাগজে ২৮ অক্টোবর ১৯৯৪ সালে সন্তু লারমার দুই কিস্তির একটি স্বাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়।  সাংবাদিক সলিম সামাদ দুদুকছড়িতে শান্তিবাহিনীর গোপন আস্তানায় জেএসএস নেতার এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। এ সাক্ষাৎকারের প্রশ্নোত্তরে সন্তু লারমা জুম্ম কল্যাণ সমিতির রিপোর্টের বরাত দিয়ে জানান, ভারতে সে সময় ৫১,৩৭৯জন রেজিস্টার্ড এবং ৭১২২জন আন রেজিস্টার্ড শরণার্থি রয়েছে।

২৯ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার বলেন, শান্তিচুক্তির পর ৬ দফায় মোট ভারত থেকে ১২,২২২ পরিবারের ৬৮,৪৩৩জন শরণার্থিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার কার্য বিবরণীতে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা বলা হয় ১২,২২২ পরিবার, সদস্য সংখ্যা ৬৪,৬১২ জন।

একই কার্য বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, সরকার ইতোমধ্যে ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সম্পন্ন করেছে। কার্যত এই তালিকায় অপুনর্বাসিত উপজাতীয় সর্বশেষ ২১ পরিবারকে দিঘীনালার জামতলায় পুনর্বাসন করা হয়েছে ফখরুদ্দীন সরকারের সময়। এরপর থেকে মন্ত্রণালয় ও সরকারী বিভিন্ন ডকুমেন্টে শান্তিচুক্তির এই ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে।

একই কমিটির ২০০৭ সালের ৩১ জুন প্রদত্ত আরেকটি তালিকাতেও ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের সংখ্যা বলা হয় ১২,২২২ পরিবার, সদস্য সংখ্যা ৬৪,৬১২ জন বলে উল্লেখ করা হয়। আমরা যদি প্রথম টাস্কফোর্সের দেয়া হিসাবকে গ্রহণ করি তাহলে দেখতে পাই, ১৯৮৬- ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে ১, ০৪,৯৯৪ জন শরণার্থি ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছে এবং পুনর্বাসিত হয়েছে।

কিন্তু ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় স্বেচ্ছায় ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের পরিবারের সংখ্যা ২১,৯০০ বলে দাবী করা হয়েছে। ৯ম সভাতেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সংখ্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ২১,৯০০ পরিবার পূর্বের ১২,২২২ পরিবারের অতিরিক্ত।

উল্লেখ্য, আগের সকল তালিকায় পরিবারের সাথে সদস্য সংখ্যা উল্লেখ করা হলেও এই ২১,৯০০ পরিবারের সাথে জড়িত সদস্যদের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়। এই ২১,৯০০ পরিবার কবে, কিভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল, কবে কিভাবে ফিরে এসেছে তা বলা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ‘স্বেচ্ছায়’ প্রত্যাগত। এই ‘স্বেচ্ছায়’ সমাসবদ্ধ শব্দের কী ব্যাখ্যা তা কোনো কার্যবিবরণীতেই উল্লেখ করা হয়নি।

কাজেই প্রশ্ন উঠেতে পারে, শান্তিচুক্তির পরে যে ১২,২২২ পরিবার বাংলাদেশে এসেছিল তাদের কি জোর করে আনা হয়েছিল? যদি ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দ বলতে অনানুষ্ঠানিক বলে দাবী করা হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন দাঁড়ায় তা হলো, ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার বাংলাদেশকে সে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী শরণার্থিদের যে তালিকা সরবরাহ করেছে সেই তালিকাতে অতিরিক্ত এই বিপুল সংখ্যক অর্থাৎ ২১,৯০০ পরিবারের কথা উল্লেখ নেই কেন?

তাহলে এই বিপুল পরিমাণ শরণার্থি ভারতের কোথায় অবস্থান করছিল? ভারত সরকারই বা কেন এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থিদের ব্যাপারে বেখবর ছিলো? এটা কতোটা বিশ্বাসযোগ্য? ভারত সরকার যাদেরকে বাংলাদেশী শরণার্থি বলে স্বীকৃতি দেয়নি বাংলাদেশ সরকার কেন তাদের গ্রহণ করবে? তাহলে এরা কারা?

পূর্বোল্লিখিত তালিকা হিসাবে পরিবার প্রতি গড়ে যদি ৫ জন সদস্য ধরা হয় তাহলে নতুন করে এই ২১,৯০০ পরিবারের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১,০৯,৫০০জন। এর সাথে পূর্বেই প্রত্যাবাসিত ১ লাখ ৫ হাজার শরণার্থি যোগ করলে ভারতে মোট বাংলাদেশী শরণার্থির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার।

এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা কবে, বাংলাদেশের কোথায়, কিভাবে বসবাস করতো, কবে, কিভাবে তারা ভারত গিয়েছে, ভারত সরকারের নোটিশে তারা কেন ছিলো না, কবে, কিভাবে তারা বাংলাদেশে এসেছে এবং বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের পর কিভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে- টাস্কফোর্সের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন করার পূর্বে এসব প্রশ্নের নিরোপেক্ষ তদন্ত ও সমাধান হওয়া জরুরী। এই বিপুল পরিমাণ উপজাতীয় শরণার্থি বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছে এমন দাবী কখনই কেউ করেনি।

উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তের সংখ্যা কতো?

উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা পূর্বেই দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ তারিখে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় অন্তর্ভূক্ত অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুরাই কেবল এই টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত হিসাবে বিবেচিত হবে। এর আগে ও পরের নানা কারণে ডিসপ্লেসড হওয়া পরিবার ও সদস্যদের ব্যাপারে মানবিক বিবেচনায় অন্য সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের প্রাথমিক তালিকা পাওয়া ১৯৯৭ সালের ১২ নভেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্যোশাল এফেয়ার্স বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে। অর্থাৎ শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন জনাব মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত এই প্রজ্ঞাপনে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৮,১৩৮ পরিবার। এরমধ্যে রাঙামাটিতে ৩৩,৭১৯ পরিবার, বান্দরবানে ৭,৬৫১ পরিবার, খাগড়াছড়িতে ৪৬,৭৫৮ পরিবার রয়েছে। তবে এই পরিবারের আওতাভূক্ত সদস্যের সংখ্যা কতো তা এই তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে ২০০৭ সালের ৩১ জুলাই টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত অপর এক তালিকায় অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ৯০,২০৮ হাজার পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় উপজাতীয় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৮৯,২৮০ পরিবার বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে ঐ সভায় রাঙামাটি জেলা পরিষদের প্রতিনিধি এই তালিকা নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, অনেকে উদ্বাস্তু না হয়েও পদ্ধতিগত শিথিলতার সুযোগে এই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। টাস্কফোর্সের ৫ম সভায়ও বৈঠকের সভাপতি অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকায় ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে বলে জানান। তবে ঐ সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতিকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তালিকা করে টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সমিতির নেতা হিসাবে এই টাস্কফোর্সের সদস্য হচ্ছেন, সন্তোষিত চাকমা(বকুল)।

বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো, সন্তোষিত চাকমা ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের নেতা, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের কেউ নন। তাকে কিসের ভিত্তিতে এই তালিকা করার দায়িত্ব দেয়া হলো? অন্যদিকে, এই তালিকা করার দায়িত্ব সরকারী বডি হিসাবে স্বয়ং টাস্কফোর্সের। জনবল সঙ্কটের কারণে টাস্কফোর্সের সেই সক্ষমতা না থাকলে টাস্কফোর্স স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিতে পারতো। কিন্তু টাস্কফোর্স নিজে তালিকা না করে বা প্রশাসনের সহায়তা না নিয়ে সন্তোষিত চাকমার ঘাড়ে এই দায় চাপিয়ে দেয়।

২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের ৮ম সভায় ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থি কল্যাণ সমিতির দেয়া তালিকা অনুসারে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নতুন সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৮১,৭৭৭ পরিবার। তবে এই তালিকা তারা কিভাবে সংগ্রহ করেছে তার কোনো বয়ান ঐ সভার কার্য বিবরণীতে নেই বা কোনো সদস্যও এ ব্যাপারে সমিতিকে প্রশ্ন করেনি।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গত ১৯ আগস্ট ২০০৯ সালে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয় যে, অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশেরই পুনর্বাসন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেএসএস নেতা সন্তু লারমা এই কমিটির অন্যতম সদস্য। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুণর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত নির্দিষ্টকরণ-পৃথক পুণর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুনগঠিত টাস্কফোর্সের প্রথম সভার কার্য বিবরণীর মন্তব্যেও এ কথা সূত্র হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন থাকে, প্রায় ৯০ হাজার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের অধিকাংশের পুনর্বাসন যদি সম্পন্ন হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে নতুন করে আরো প্রায় ৮২ হাজার অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু কী করে এলো? শান্তিচুক্তির পূর্বে তাদের বাসস্থান কোথায় ছিলো এবং সেখান থেকে তারা কবে, কোথায় গিয়েছিল? বর্তমান ঠিকানায় কবে থেকে তারা বসবাস করছে? শান্তিচুক্তির পরবর্তী বিভিন্ন তালিকায় কেন তারা বাদ পড়েছিল? এসকল প্রশ্ন খতিয়ে দেখা জরুরী।

চলবে…

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

শরণার্থি ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাকে পুনর্বাসিত করতে চাইছে টাস্কফোর্স

সরকারি অর্থায়নে পুনর্বাসনের আওতায় আসছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান জেলার ৮২ হাজার উদ্বাস্তু পরিবার। এ জন্য এ তিন পার্বত্য জেলার ৮১ হাজার ৭৭৭ উদ্বাস্তু পরিবারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে সরকার গঠিত টাস্কফোর্স। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর নগরের সার্কিট হাউসে আয়োজিত ‘ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন’ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স এর ৯ম সভায় এ তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন টাস্কফোর্সের সভাপতি ও সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি।

সভায় পুনর্বাসনের জন্য ভারত থেকে প্রত্যাগত ২১ হাজার ৯০০ শরণার্থী পরিবারের তালিকাও অনুমোদন দিয়েছে টাস্কফোর্স। এছাড়াও উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের ‍ঋণ মওকুফ, ফৌজদারী মামলা প্রত্যাহার, প্রত্যাগত শরণার্থীদের চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা প্রদান, রেশন দেওয়া এবং টাস্কফোর্স সদস্যদের সম্মানি ভাতা নিয়ে আলোচনা করেন টাস্কফোর্স সদস্যরা।‍

ঋণ মওকুফের বিষয়ে টাস্কফোর্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র চাকমা সভায় জানান, উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের ‍ঋণ মওকুফ করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে ‍ঋণদাতা সোনালি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক এবং বিআরডিবির ব্যাবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে।

উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ৪৫১টি ফৌজদারী মামলা রয়েছে বলে সভায় জানান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম। তিনি জানান, এসব মামলার মধ্যে ৪৪৬টি মামলা ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলোতে কিছু জটিলতা থাকলেও তা নিরসন করে দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে।সূত্র: বাংলানিউজ২৪.কম, তারিখ: ২৫-০৯-২০১৮।

এদিকে এই সভার পরপরই তিন পার্বত্য জেলার বাঙালি সংগঠনগুলো টাস্কফোর্সের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। ঢাকায় ও তিন পার্বত্য জেলায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, স্মারকলিপি প্রদান করেছে। সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বাঙালী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের কারণ দুইটি। এক. ভারত প্রত্যাগত ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু শরণার্থিদের সংখ্যা নিয়ে আপত্তি। দুই. পুনর্বাসনের তালিকা থেকে অউপজাতীয় বা বাঙালী উদ্বাস্তুদের তালিকা বাদ দেয়া।

বাঙালী সংগঠনগুলো দাবী করছে, নতুন করে বিপুল সংখ্যক ভারত প্রত্যাগত ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর নামে ভারতীয় ও মিয়ানমারের নাগরিকদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে নিরাপত্তার অজুহাতে গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তাদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমিতে পুনর্বাসন করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে নানাভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এই নতুন সঙ্কটের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য অনুসন্ধান শুরু করি।

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্স

শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ১ ধারায় বলা হয়েছে,

১) ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ’৯৭ ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।

২) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন। শান্তিচুক্তির এই ধারা ‘ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন’ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স এর মূল উৎস।

শান্তিচুক্তির পর প্রথম টাস্কফোর্স গঠিত হয় ১৯৯৮ সালের ২০ জানুয়ারি। প্রথম কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন রাঙামাটিতে থেকে নির্বাচিত তৎকালীন এমপি দীপঙ্কর তালুকদার।  সেই কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন:

  • বীর বাহাদুর- এমপি
  • প্রতিনিধি- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
  • প্রতিনিধি- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
  • প্রতিনিধি- রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
  • প্রতিনিধি- জিওসি, ২৪ পদাতিক ডিভিশন, সেনাবাহিনী
  • প্রতিনিধি- পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি
  • প্রতিনিধি- প্রত্যাগত শরণার্থি কল্যাণ সমিতি।
  • সদস্য সচিব- চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার। ২০ আগস্ট ২০০১ সাল পর্যন্ত এই টাস্কফোর্সের মেয়াদ ছিলো।

চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় কমিটি গঠিত হয় ২০০৩ সালের ২৯ অক্টোবর।  দ্বিতীয় কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পান সমীরণ দেওয়ান। এই টাস্কফোর্সে বান্দরবান জেলা পরিষদের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। জেএসএসের পক্ষ থেকে সুধাসিন্ধু খীসা এবং প্রত্যাগত শরণার্থি কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে এর সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা(বকুল) অন্তর্ভূক্ত হয়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, টাস্কফোর্সের দ্বিতীয় কমিটিতে জাফর আহমদ নামে একজন পার্বত্য বাঙালী প্রতিনিধিকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। সেই থেকে টাস্কফোর্সে বাঙালি প্রতিনিধি প্রতিনিধিত্ব করছে।

বর্তমান টাস্কফোর্সে বাঙালি প্রতিনিধি রয়েছেন, খাগড়াছড়ির আওয়ামী লীগ নেতা এসএম সফি। তবে অসুস্থ থাকায় বর্তমানে তিনি নিষ্ক্রিয়।  ২০০৯ সালের ২৩ মার্চ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপিকে টাস্কফোর্সের নতুন চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয় এবং ২৭ আগস্ট পূর্ণাঙ্গরূপে টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়। ১০ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান হিসাবে যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে সরিয়ে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি দায়িত্ব দেয়া হয়। এখনো তিনিই দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদটি প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার।

ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি কি?

স্বাধীনতার পর ’৭০ এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সি শুরু হওয়ার পর এবং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পূর্বে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা ভীতগ্রস্ত হয়ে যেসকল উপজাতি পরিবার বা সদস্য নিজ বসত ভিটা ত্যাগ করে ভারতে গমন করেছিল এবং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ভারত থেকে ফিরে এসেছে তারা ভারত প্রত্যাগত শরণার্থি।

শান্তিচুক্তির পূর্ববর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবল উত্তাল দিনগুলোতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে ব্রিগ্রেড কমান্ডার হিসাবে দায়িত্বপালনকারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম তার ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিপ্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ পুস্তকে লিখেছেন, ‘ প্রতিষ্ঠিত সরকারকে নিজেদের দাবী মানতে বাধ্য করতে চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ইনসার্জেন্টদের গৃহীত অন্যতম কৌশল হচ্ছে, নিজেদের সমস্যার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আর আন্তর্জাতিকীকরণের অন্যতম উপায় হচ্ছে, নিজেদের সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকহারে উদ্বাস্তু করে শরণার্থি হিসাবে সহানুভূতিশীল কোনো দেশে আশ্রয় গ্রহণ করানো।

শান্তিবাহিনীও একই কৌশলে তাদের সমস্যাটিকে আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে বিদেশের মাটিতে উপজাতীয় শরণার্থি নামক একটি সমস্যার সৃষ্টি করে। শান্তিবাহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাঙালীদের উপর হামলা চালিয়ে তাদের উত্তেজিত করে উপজাতীয়দের উপরে প্রতিশোধ গ্রহণে বাধ্য করে। এতে উপজাতীয়রা আতঙ্কে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থি হিসাবে আশ্রয় গ্রহণে বাধ্য হয়। কখনো কখনো শান্তিবাহিনী অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক উপজাতীয়দের শরণার্থি হতে বাধ্য করে। তবে এই প্রক্রিয়ায় সহানুভূতিশীল দেশের সবুজ সঙ্কেত অবশ্যই প্রয়োজন।’ (প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা- ১৫৯ দ্রষ্টব্য)।

অভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তু

স্বাধীনতার পর ’৭০ এর দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইনসার্জেন্সি শুরু হওয়ার পর এবং শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পূর্বে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা ভীতগ্রস্ত হয়ে যেসকল উপজাতি পরিবার বা সদস্য নিজ বসতভিটা ত্যাগ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অন্যত্র বসতি স্থাপন করেছিলেন তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। ১৯৯৮ সালের জুন মাসে দীপঙ্কর তালুকদারের নেতৃত্বাধীন প্রথম টাস্কফোর্সের তৃতীয় বৈঠক অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা চুড়ান্ত করা হয় সর্বসম্মতিক্রমে।

এই টাস্কফোর্সের প্রণীত অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা হলো: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট পর্যন্ত যে সকল উপজাতীয় ও বাঙালী নিজ গ্রাম, মৌজা ও অত্র অঞ্চল ত্যাগ করিয়া দেশের মধ্যে অন্যত্র চলিয়া যায় বা চলিয়া যাইতে বাধ্য হয়, তাহারাই অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু।’ ইত্তেফাক: ২৯-১১-২০০০ দ্রষ্টব্য।

২২ নভেম্বর ২০০০ সালে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, ২ বছরের বেশীকাল স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে শুমারী শেষে মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ৩১৪ পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসাবে চুড়ান্ত তালিকাভূক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে ৯০ হাজার ২০৮টি উপজাতীয় পরিবার, ৩৮ হাজার ১৫৬টি অউপজাতীয় বা বাঙালী পরিবার রয়েছে।

অভ্যন্তরীণ বাঙালী উদ্বাস্তু

শান্তিচুক্তির পূর্বে যুদ্ধকালীন অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩০টি গ্রাম থেকে ২৬ হাজার বাঙালী পরিবারকে সরকার নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে নিজ বসত ভিটা সরিয়ে নিয়ে ৬৮টি গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়াও গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির আগে ও পরে অনেক বাঙালী সংঘর্ষের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বা আতঙ্কিত হয়ে নিজ বসত ভিটা ত্যাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বাংলাদেশের অন্যস্থানে পুনর্বাসিত হয়েছে। প্রথম টাস্কফোর্স কমিটির সংজ্ঞা ও বাস্তবতার বিবেচনায় এই বাঙালীরাও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু।

তবে শুরু থেকেই জেএসএস নেতা সন্তু লারমা টাস্কফোর্সের আওতায় অভ্যন্তরীণ বাঙালী উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের বিরোধিতা করতে থাকে।  কিন্তু টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান দীপঙ্কর তালুকদার এর প্রতিবাদে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদের অস্তিত্বের কথা সমিতি চুক্তিতেই স্বীকার করিয়া নিয়াছে। আঞ্চলিক পরিষদের এক তৃতীয়াংশ সদস্যই হইল বাঙালী। অতএব এক তৃতীয়াংশ বাঙালীতো উদ্বাস্তু হইতেই পারে।’ ইত্তেফাক: ২৯-১১-২০০০ দ্রষ্টব্য।  তবে শন্তিচুক্তিতে ‘আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের’ কথায় বলা হয়েছে কেবলমাত্র।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, শান্তিচুক্তিতে সরকার ঘোষণা করেছে, শান্তিবাহিনীর যেসকল সদস্য অস্ত্র সমর্পন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে তাদেরকে সরকার বিভিন্নভাবে সুবিধা দিয়ে পুনর্বাসন করবে। সেমতে, সরকার অস্ত্র সমর্পণকারীদের পুনর্বাসন করেছে। শান্তিচুক্তির এ ধারা বাস্তবায়িত হয়ে গেছে।  প্রশ্ন হচ্ছে, স্বাধীনতার পূর্বে বা শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে অস্ত্র সমর্পন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কেউ অস্ত্র সমর্পন করে বা শরণার্থিদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন শেষ হওয়ার ভারত থেকে ফিরে আসে- তিনিও কি একই সুবিধা পাবেন?

শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া, অস্ত্র সমর্পন করা বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কোনো উপজাতীয় সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশ সরকার প্রতিশ্রুত ২০ দফা পুনর্বাসন প্যাকেজ সুবিধা দেয়নি। সেই বিবেচনা থেকে বলা যায়, পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই ড্যামের কারণে ও মুক্তিযুদ্ধকালে এবং শান্তিচুক্তি পরবর্তীকালে নানা কারণে যেসকল উপজাতীয় পরিবার ভারতে চলে গিয়েছেন অথবা অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়েছেন বা হতে বাধ্য হয়েছেন, তারা শান্তিচুক্তিতে উল্লিখিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থির আওতায় পড়ে না। যদি এমন কেউ থেকে থাকে তাদেরকে ফিরিয়ে আনা ব্যাপারে রাষ্ট্রের অপর সিদ্ধান্ত থাকা উচিত।

একইভাবে ‘পার্বত্য চুক্তির আওতাভূক্ত প্রত্যাবাসিত শরণার্থি’ বলতে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে চুক্তি স্বাক্ষরিত চুক্তিতে যে শরণার্থিদের উল্লেখ করা হয়েছে তাদের পুনর্বাসনই কেবল এই টাস্কফোর্সের বিবেচ্য। এই তালিকার বাইরে যেসকল শরণার্থি যেকোনোভাবে বাংলাদেশে এসে থাকেন তারা যদি প্রকৃতই বাংলাদেশী শরণার্থি হয়ে থাকেন তবে তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশের দায়িত্ব। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই আগরতলায় করতঃ ২০ দফা প্যাকেজ চুক্তির আওতায় নয় এবং টাস্কফোর্সের বিবেচ্য নয়।

৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পুণর্গঠিত টাস্কফোর্সের চতুর্থ সভায় এ ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত আসে। এতে বলা হয়, ‘পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে প্রত্যাগত উপজাতীয়দেরকে পার্বত্য চুক্তির আওতায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তনকারী হিসাবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই বিধায় তারা টাস্কফোর্সের আওতাভূক্ত নয়। সুতরাং তাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই’।

একই মত প্রকাশ করা হয়েছে, টাস্কফোর্সের ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ৫ম সভায়। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের কার্যবিবরণী পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘টাস্কফোর্সের কার্যপরিধির আওতায় প্রত্যাগত শরণার্থিদের মধ্যে যারা পার্বত্য চুক্তির আওতাভূক্ত পূনর্বাসনের ক্ষেত্রে কেবল তারাই বিবেচনার যোগ্য হবেন। পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে প্রত্যাগত শরণার্থিদের মানবিক বিবেচনায় তাদেরকে অন্য কোনোভাবে পুনর্বাসিত করা যেতে পারে।’ টাস্কফোর্সের এই মত নিয়ে কারো কোনো আপত্তি নেই এবং বাংলাদেশ সরকারও শান্তিচুক্তির পূর্বে স্বেচ্ছায় ও আনুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন সময় আগত প্রত্যাগত শরণার্থিদের মানবিক বিবেচনায় ১৬ দফা ও ১৯ দফা প্যাকেজের আওতায় পুনর্বাসন করেছে- যার কিছু তথ্য পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলবে…


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস

32

মেহেদী হাসান পলাশ:

আজ ঐতিহাসিক পার্বত্য লংমার্চ দিবস। ১৯৯৮ সালের এই দিনে অর্থাৎ ৯ জুন পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে তৎকালীন ও আজকের বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ করে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর রাষ্টীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পরই তৎকালীন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একে দেশ বিক্রির কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে এ চুক্তির বিরুদ্ধে প্রবল গণ- আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। বেশ কয়েকটি হরতালসহ নানা কর্মসূচী দেয়া হয়। এরই এক পার্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় এই ঐতিহাসিক লংমার্চ।

34

১৯৯৮ সালের ৯জুন সংঘটিত ঐতিহাসিক সেই লংমার্চের আজ ১৬ বছর পূর্তি। যে শান্তিচুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবীতে সেই ঐতিহাসিক লংমার্চ হয়েছিল ১৬ বছর পর  পার্বত্য চুক্তির অধীন নানা বঞ্চনা ও বৈষম্য নিয়ে বাঙালীরা আজো আন্দোলন করে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে।

l-2

যদিও এই লংমার্চের কথা লংমার্চ পালনকারী বিরোধী দলীয় জোট ও পার্বত্য বাঙালীদৈর অনেকেই ভুলে গেছে। বিরোধী দল সরে গেছে লংমার্চের চেতনা থেকে। কারণ, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট সেই লংমার্চে পরিস্কার ঘোষণা করেছিল তারা ক্ষমতায় গেলে দেশবিক্রির পার্বত্য কালো চুক্তি বাতিল করবে। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় গিয়ে সেই চুক্তি বাতিল তো দুরে থাক বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী এক সন্ত্রাসীকে(মেজর রাজেশ-মণি স্বপন দেওয়ান) নমিনেশন দিয়ে এমপি ও মন্ত্রী বানায়। আর এখন বিএনপি পার্বত্য বাঙালী বর্জিত দলে পরিণত হয়েছে।

40

প্রেক্ষাপট ও বিশালতা বিবেচনায় এই লংমার্চটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে বড় লংমার্চ। ৯ জুন ১৯৯৮ সাল সকাল ৮ টায় পল্টন ময়দান থেকে হাজার হাজার গাড়িতে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমূখে ঐতিহাসিক সেই লংমার্চ যাত্রা। লংমার্চ শুরুর কিছু পর কাঁচপুরে বাধাগ্রস্ত হয় শাসক দলের সন্ত্রাসীদের দ্বারা। আগের রাতেই নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান কাঁচপুর এলাকায় গুলি করে বেশকিছু গাড়ীর চাকা পাংচার করে রাস্তা আটকে দেয় ও রাস্তায় সশস্ত্র অবস্থান নেয়।। ফলে রাস্তায় সৃষ্টি হয় প্রবল যানজট। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা আটকে পড়া গাড়িতে লুটপাট চালায়, তাদের হাতে বেশ কিছু মহিলা ধর্ষিত হয় বলে পত্রপত্রিকায় খবর বের হয়েছিল।  অনেক ট্রাক, বাস রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হয়। সশস্ত্র শামীম ওসমান বাহিনী রাস্তায় অবস্থান নেয়। ফলে আটকে যায় বিশাল লংমার্চ। এদিকে লংমার্চটি যখন কাঁচপুরে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল তখনও লংমার্চের গাড়ি বহরের শেষ প্রান্ত পল্টন ময়দানে অবস্থান করছিল। এই একটি ঘটনায় প্রমাণ করে কি বিশাল ছিল সেই লংমার্চের ব্যাপ্তি।

46

এদিকে বাধাগ্রস্ত হবার পর ৭ দলীয় জোটে অবস্থানকারী সরকারী দালালরা লংমার্চ সেখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করে ফিরিয়ে নেবার ষড়যন্ত্র শুরু করে। কিন্তু ৭ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত সে ষড়যন্ত্র নস্যাত করে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, যতদিন না পর্যন্ত এই সরকার রাস্তার বাঁধা সরিয়ে নিয়ে লংমার্চ সচল করার উদ্যোগ না নেবে ততদিন পর্যন্ত তিনি রাস্তায় অবস্থান করবেন। জোট নেত্রীর এ ঘোষণায় মুহুর্তেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। লংমার্চকারীদের মধ্যে নতুন প্রণোদনা সৃষ্টি হয়।

39

লংমার্চ অবস্থানকারী রাস্তার আশেপাশের গ্রামবাসীরা খাবার সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। মুহুর্তেই রাস্তার পাশে বড় বড় চুলা তৈরী হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ লংমার্চকারীদের জন্য কোথাও খিচুড়ি, কোথাও গরু জবাই করে রান্না শুরু হয়। শুকনা খাবার, খিচুড়ি ইত্যাদি খেয়ে লংমার্চকারীরা রাস্তায় অবস্থান করে। নেতৃবৃন্দ মাইকে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতে থাকেন।

বিভিন্ন স্থানে মাইকে জাতীয় পর্যাযের শিল্পীরা সংগ্রামী সঙ্গীত, ছড়া, কবিতা পাঠ করে লংমার্চকারীদের চাঙ্গা করে রাখেন। বর্তমান লেখক সেই লংমার্চেল আট সদস্য বিশিষ্ট প্রচার কমিটির সদস্য ছিলেন- যার নেতৃত্বে ছিলেন, রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী ও অভিনেতা ওয়াসীমুল বারী রাজিব(মৃত)। লেখকের রচিত বেশ কয়েকটি ছড়া, কবিতা ও প্যারোডি সঙ্গীত লংমার্চ জুড়ে গাওয়া হয়।

37

অবশেষে বার ঘন্টা পর সন্ধ্যায় সরকার অবরোধ সরিয়ে নেয়। নতুন করে যাত্রা শুরু করে লংমার্চ। লংমার্চকারীদের কাছে রাখা শুকনো খাবার এরই মধ্যে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন খাবার সংগ্রহের কোনো সুযোগ তাদের ছিলনা। গভীর রাতেও ঢাকা চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ রাস্তার পাশে দাড়িয়ে লংমার্চকে স্বাগত জানায়। জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কয়েকটি স্থানে গভীর রাতেরই পথসভায় ভাষণ দেন। রাস্তায় বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ লোক গাড়ী নিয়ে লংমার্চে শরীক হয়।

লংমার্চে শাসকদলীয় সন্ত্রাসীদের হামলা

সারারাত বিরামহীন সফরের পর ফরজরের নামাজের সময় লংমার্চ চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। সেই সকালেও হাজার হাজার চট্টগ্রামবাসী রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে লংমার্চ বহরকে স্বাগত জানায়। সেখানে চট্ট্রগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বিশাল এক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ৭ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ। সমাবেশ শেষে লংমার্চ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন অংশ খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে , জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন অংশ রাঙামাটির উদ্দেশ্যে এবং জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন অংশ বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। লংমার্চ পার্বত্য এলাকায় প্রবেশ করলে মোড়ে মোড়ে বাঙালীরা পাহাড়ী লেবুর শরবত, লেবু, কলা, কাঁচা আম দিয়ে লংমার্চকারীদের ক্ষুধা তৃষ্ণা মেটানোর জন্য আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। চোখে না দেখলে বর্ণণা করে বিশ্বাস করানো কঠিন।

৭ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে স্থানে পার্বত্য চুক্তির আওতায় শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পনের নাটক করেছিল সেই খাগড়ছড়ি স্টেডিয়ামে লাখো লাখো লোকের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে পার্বত্য শান্তি চুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যা দিয়ে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে সরকার দেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব অন্যদেশের হাতে তুলে দিয়েছে। ৭ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দ দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, তাদের সরকার ক্ষমতায় এলে এই দেশবিরোধী পার্বত্য চুক্তি বাতিল করা হবে। কিন্তু দেুঃখের বিষয় চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে এই প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়।

আজকে যখন আবার সেই শান্তিচুক্তির অধীনে ভূমি কমিশন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোট মুখে কুলুপ এটে বসে রয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় বিএনপির পাহাড়ি নেতারা বাঙালীদের আন্দোলনে যেতে বাধা দিচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিস্ময়কর নীরবতা দেখে প্রশ্ন জাগে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়?

 

সন্তু লারমা’র হুংকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা

%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c%e0%a7%9c

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বেশ কিছু জ্বালাময়ী মন্তব্য করেন।শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিতে যে আলোচনা সভা হয়েছে ঢাকায়,সেখানে সন্তু লারমা যেসব মন্তব্য করেছেন মূলত তার আলোকেই পার্বত্য সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে এই পোস্টে।সাথে প্রাসঙ্গিক আরো কয়েকজনের মন্তব্যও যোগ হয়েছে।

শান্তিচুক্তি ও অস্ত্র তুলে নেয়ার হুমকি

১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনার উদ‌্যোগেই পরের বছর শান্তিচুক্তি হয়। জনসংহতি সমিতির পক্ষে তাতে সই করেছিলেন সন্তু লারমা। সে সময় যে ‘আবেগ ও অনুভূতির আবেশ’ ছিল ১৯ বছর পর এসে তা ‘নিঃশেষ’ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন এই পাহাড়ি নেতা।

প্রধানমন্ত্রী এসে বললেও আমি বিশ্বাস করতে পারব না যে চুক্তির সবগুলো ধারা বাস্তবায়িত হবে। কারণ গত ১৯ বছরে বিশ্বাসভঙ্গের অনেক ঘটনা ঘটেছে, অনেক প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা আমাদের দাবি আদায়ে কাজ করব। সরকার যদি অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করে, অবদমনে তৎপর থাকে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থা এভাবে থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি না।(১)

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করে সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ ছেড়ে আসা এই পাহাড়ি নেতা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ফের অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন।

চুক্তি কেন বাস্তবায়ন হয় না, তা আমার কাছের দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই সরকারের উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; সরকারের মধ্যে অগণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইসলামিক সাম্প্রদায়িকতাবোধ রয়েছে। এর বাইরেও আরও অনেক গণবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি আছে; যে কারণে সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে দ্বিধা করছে।

আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই, আমরা পাহাড়িরা মানুষের মত বাঁচতে চাই। যদি সেটা আমাদের করতে না দেওয়া হয়, যদি সরকার আমাদের বাধ্য করে, যে কোনো ব্যবস্থা নিতে আমরা দ্বিধা করব না।১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বলেছিল, যেহেতু সংসদে আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা নেই, তাই পার্বত্য শান্তি চুক্তি ও চুক্তির আলোকে যে আইনগুলো তা আইনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন তো দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি সংখ্যা গরিষ্ঠতা আছে; তাহলে সরকার এই আইন, এই চুক্তি সংবিধান অন্তর্ভুক্ত করতে এত দ্বিধাগ্রস্ত কেন? (২)

সরকার ওই চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণ এবং ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়নের কথা বললেও জনসংহতি সমিতি তাকে ‘অসত্য প্রচার’ বলে আসছে। তাদের ভাষ‌্য, বাস্তবায়িত হয়েছে মাত্র ২৫টি ধারা।

অন্যমিডিয়া

প্রশাসন ও দলীয়করণ

“আজকে আমাদের দেশের সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে নেই। আমি আঞ্চলিক চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী আছে না আছে, আমার জানা হয়ে গেছে। কোথায় এখানে দুর্নীতি, কোথায় এখানে মিথ্যা, কোথায় প্রতারণা- তা নতুন করে জানার আমার আর কোনো দরকার নেই।” (২)

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয়করণের নগ্ন প্রতিফলন ঘটেছে। সেখানে তো কোনো সরকার আমি দেখি না! যেখানে যাই সেখানে একটা সরকার। রাজা দেবাশীষ রায় একটা সরকার, প্রতিমন্ত্রী নববিক্রম ত্রিপুরা একটা সরকার; বহুমুখী শাসনব্যবস্থা সেখানে। কে কার কথা শুনে কাজ করবে- সেটাই বোঝা যায় না। আইনশৃঙ্খলাসহ সব কর্মকাণ্ড চালায় সেনাবাহিনী। তারপরে আছেন জেলা প্রশাসক, এসপি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনে একজন কর্মকর্তাও নেই যারা শান্তিচুক্তির প্রতি সংবেদশীলন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী পরিচালিত ‘অপারেশন উত্তরণ’ বন্ধের দাবি জানিয়ে সন্তু লারমা বলেন, দেশেতো সেনা শাসন জারি নেই। তাহলে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডে এভাবে সেনা শাসন থাকবে কেন? (১)

‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন’ হয়ে যাচ্ছে

পাহাড়ে ‘আদিবাসীরা’ ক্রমান্বয়ে ‘নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে’। প্রশাসন ও সরকার নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে, ‘হয় দেশ ছেড়ে চলে যাও, নয়তো নতজানু হয়ে থাকো’।(১) আজকে ‘আদিবাসী’ শব্দটাও ব্যবহার করা যাবে না; অথচ এই ‘আদিবাসী’ শব্দ ও বিষয়বস্তু নিয়ে আজকের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের অনেকেই আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের সাথে ছিলেন, জোরালো ভাষায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। (২) [কারা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে আদিবাসী? বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী মনে করেন প্রফেসর আবদুর রব।পড়ুন বিস্তরিতঃ আদিবাসী-উপজাতি বিতর্ক ]

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিকল্পিতভাবে ‍সেটেলার বাঙালিদের সংখ্যাগুরু বানানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি এক ধরনের এথনিক ক্লিনজিংয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেটা বিশ্বব্যাপী অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।পার্বত‌্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বাসিন্দারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিকে না গেলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ‘উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ফ্যাসিবাদী’ ধারায় চলে যেত।”

রাঙামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ করার বিরোধিতায় সন্তু লারমা বলেন, “যারা আমাদের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না, তাদের পক্ষ হয়ে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ করা যাচ্ছে। উদ্দেশ্য তাদেরকে নতুনভাবে পুনর্বাসন করা। আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি যে উন্নয়ন, সেটা আমরা চাই না। আমরা চাই, চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন।” (১)

photo-bipf-kf-discussion

ভূমি সমস্যা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নিষ্ক্রিয় ভূমিকার পেছনে দেশের আমলা ও নীতিনির্ধারকদের নানা ‘ষড়যন্ত্র’কে দায়ী করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।তিনি বলেন, “সরকার প্রধানকে যারা তথ্য দিচ্ছেন তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, দয়া করে অসত্য, অপূর্ণ, অস্বচ্ছ, মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রদান থেকে নিজেদের বিরত রাখুন।” আলোচনা অনুষ্ঠানে ভূমি সমস্যাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সমস্যার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে তুলে ধরে মিজানুর রহমান বলেন,

“আমি তো বলি আমার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করার দরকার নেই। শুধু একটি মাত্র বাস্তবায়ন করো- সেটি হচ্ছে সকল ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করো; অন্য সকল সমস্যা আপনা আপনি সমাধান হয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে একটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে এটিকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের দাবি জানান জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা (২)

নোটঃ

(১) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, পাহাড় এরকম নাও থাকতে পারে: সন্তু লারমা, ০২ ডিসেম্বে ২০১৬

(২)বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এই সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী: সন্তু লারমা, ০১ ডিসেম্বর ২০১৬

প্রাসঙ্গিক বিষয়

২০০৮ সালে বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করেন।সেখানে একটি লিখিত প্রতিবেদনও পেশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনে ভূমি সমস্যা, বাঙালী সেটেলারদের ভূমি দান, রিফিউজি সমস্যা, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরে হয়েছিল। প্রফেসর অজয় রয় সেখানকার জনসংখ্যার অনুপাতে পরিবর্তনকে সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন;

Press conference of eminent citizens at the National Press Club, February 11, 2008
As per regional council leaders, there are over one lakh hill refugees, but there is none to address the problem, adding that Bangalees are also occupying the religious structures. The present ratio of hill people and Bangalees is now 52:48, but in the next census it will be tilted towards Bangalees. Hill people think the number of voters will also override the number of the hill people in future, which is a threat to them.

On the other hand, the government is also helping the Rohingya Muslims who fled from Myanmar to settle at Naikkhangchhari, Ruma, Lama, and Alikadam in Bandarban. “Does the government then want to form a new CHT with Bangalee and Rohingya Muslims?” Prof Ajoy posed a question.

In the report, the citizens said the number of Jumma people will come down for various initiatives when CHT will be considered extension of the plain Chittagong.

“Colonial attitude of the government, army and Bangalees cannot resist the movement of hill people. We must accept the CHT hill people. So, sooner the Bangalee settlers are removed from the CHT, better is the result,” the report said. (Daily Star, Present CHT situation threat for future, February 11, 2008, last accessed 06.12.2016 http://www.thedailystar.net/news-detail-22929 ).

সূত্র: মূলধারা বাংলাদেশ

শান্তিচুক্তির ১৯বর্ষপূর্তি : বাস্তবায়ন নিয়ে নানা মত : বন্ধ হয়নি সংঘাত-সংঘর্ষ

khagrachari-picture06-01-12-2016

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

আজ ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৯তম বর্ষপূর্তি।প্রায় দুই দশকের সংঘাত বন্ধে ১৯৯৭ সালের এই দিনে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পর কেটে গেছে ১৮ বছর। কিন্তু এখনো এ চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্কের শেষ হয়নি।


সরকার পক্ষ বলছে, চুক্তির ৭২ টি ধারার মধ্যে ৪৮ টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত্ হয়েছে, ২৫ টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে, বাকি ধারাগুলোও বাস্তবায়নাধীন। কিন্তু সন্তু লারমার মতে, বাস্তবায়িত ধারার সংখ্যা ২৫।

অপর দিকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তিন সশস্ত্র সংগঠনের লড়াইয়ে রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড় । চুক্তির পর গত ১৮বছরে তিন পাহাড়ি সশস্ত্র গ্রুপের ভ্রাতিঘাতি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘাতে অন্তত সাড়ে ৬ শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক প্রাণ হারিয়েছে।

এছাড়াও এই তিন সংগঠনের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজিসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে। কখনো ভ্রাঘিাতি আবার কখনো খোদ নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সরাসরি সংঘাতে হতাহতের ঘটনা পাহাড়ে বাড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ¦ -উৎকন্ঠা।তিন সংগঠনের সহিংসতা মাঝে-মধ্যে পাহাড়ের সম্প্রতির উপরও আঘাত হানছে।

khagrachari-picture2-01-12-2016

চুক্তির স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৮ সালের ১০ ফ্রেরুয়ারী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর হাতে গেরিলা নেতা সন্তু লারমার অস্ত্র সমর্পনের মধ্য দিয়ে জনসংহতি সমিতির সদস্যরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলেও এখনো পাহাড়ে প্রকৃত শান্তি ফিরে আসেনি।

বরং চুক্তির পর পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ’র আধিপত্য লাড়াই এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত উভয়ের অন্তত সাড়ে ৬শ শতাধিক নিহত ও সহস্রাধিক আহত হয়েছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় গত ১৯ বছরে ৯০০ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে জনসংহতি সমিতির ৩শতাধিক ইউপিডিএফের ৩শজন, সংস্কারের ৪৫জন এবং বাঙ্গালী কমপক্ষে ১৩৫জন।নিহতদের মধ্যে অজ্ঞাতনামা লাশও রয়েছে।

এছাড়া উভয় পক্ষের মধ্যে আহত হয়েছে কমপক্ষে ১৬৫০ জন অপহরণের শিকার ১১শজন, উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে কমপক্ষে ৮শ ৫০বার। প্রতিপক্ষের দেওয়া আগুনে ৯শটি ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ সময়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৪০০ বার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

khagrachari-picture03-01-12-2016

সাধারন উপজাতীয়দের মধ্যেও চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। তাদের মতে, চুক্তিতে সাধারন মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং হানাহানি বেড়েছে। মানুষের জানমালের কোন নিরাপত্তা নেই। এছাড়াও এই তিন সংগঠনের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদাবাজিও অভিযোগ রয়েছে। ভ্রাতিঘাতি সংঘাতে অসংখ্য মানুষের হতাহতের ঘটনা পাহাড়ে বাড়িয়ে দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা।তিন সংগঠনের সহিংসতা মাঝে-মধ্যে পাহাড়ের সম্প্রতির উপরও আঘাত হানছে।

চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও পাহাড়ি নেতাদের রয়েছে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। সরকার পক্ষ চুক্তি বাস্তবায়নে কথা বললেও পাহাড়িরা নেতারা বলছে, সবই মিথ্যা ও বানোয়াট। অপর দিকে বাঙালি সংগঠনগুলো শুরু থেকে এ চুক্তিকে অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করে বাতিলের দাবী জানিয়ে আসছে।

শান্তিচুক্তি দুই পক্ষের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। দুই পক্ষেরই বাস্তবায়ন যোগ্য কিছু ধারা রয়েছে। এতে সরকার পক্ষে যেমন বাস্তবায়ন যোগ্য কিছু ধারা রয়েছে, তেমনি জেএসএসের পক্ষেও বাস্তবায়ন যোগ্য ধারা রয়েছে। এর মধ্যে জেএসএসকে সম্পূর্ণ রূপে অস্ত্র সমর্পন করার কথা থাকলেও এখনো সে শর্তের একটা বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। জেএসএস নেতারা সম্পূর্ণ রূপে অস্ত্র সমর্পন করতে পারেনি।

khagrachari-picture1-01-12-2016

শান্তিচুক্তিতে সন্তু লারমা নিজেদের উপজাতি বলে স্বীকার করলেও এখন তারা নিজেদের আদিবাসী দাবী করছেন। সন্তু লারমা নিজেই আদিবাসী দাবীকারী প্রধান সংগঠনের শীর্ষত্ব গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে শান্তিচুক্তির শুরুতেই বাংলাদেশের সংবিধান ও অখণ্ডতার প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সন্তু লারমা অনেক অসাংবিধানিক ধারা বাস্তবায়নের জন্য চাপ দিচ্ছেন।

আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, পার্বত্য চুক্তির নব্বই ভাগ এ সরকারের মেয়াদে বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যে ভূমি সমস্যা নিরসনের জন্য কমিশনের আইন সংশোধন করে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, চুক্তির পর পাহাড়ে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়নের দ্বার খুলে গেছে।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতির সমিতি (এমএন লারমা) সভাপতি সুধাসিন্দু খীসা পার্বত্যনিউজকে বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে এখনো অনেক বিষয় রয়ে গেছে। ভূমি কমিশন যদি যথাযথভাবে কাজ করে এবং কাজ করার জন্য যদি আন্তরিক হন তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ দিনের সমস্যা ঝুলে আছে তা কিছুটা হলেও পরিস্কার হবে। তিনি অনির্বাচিত জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত পরিচালনার দাবী জানিয়ে বলেন, সরকারের ভূমিকায় পাহাড়ে আবিশ্বাসের জম্ম দিয়েছে।

khagrachari-picture04-01-12-2016

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট আব্দুল মালেক মিন্টু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক আখ্যায়িত করে পার্বত্যনিউজকে বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানকে অস্বীকার করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়,এ অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাসকারী একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বাঙালিদের অধিকার হরণ করা হয়েছে। সম্প্রতি অবৈধ চুক্তির ফসল ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন করে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার পথ সুগম করেছে।

এ দিকে বর্ষপূর্তির দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ এবার বর্ণাঢ্য কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। ২ ডিসেম্বর(শুক্রবার) সকাল সাড়ে ৮টায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চত্বরে শান্তির পায়রা উড়িয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে।

খাগড়াছড়িতে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীরা নিজস্ব পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করবে। শোভাযাত্রাটি জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ খেতে শুরু হয়ে চেঙ্গী স্কোয়ার, শাপলা চত্বর হয়ে টাউন হল প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হবে। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ ডিসপ্লে’র আয়োজন রয়েছে।

একইদিন সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম চুক্তি পরবর্তী অস্ত্র সমর্পনস্থল খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন রয়েছে। এতে বাংলাদেশের অন্যতম ব্যান্ড সোলস দর্শকদের মাতাবেন বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। এছাড়াও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় স্থানীয় ও চট্টগ্রামের শিল্পীরাও অংশগ্রহণ করবেন।

অপরদিকে পার্বত্য চুক্তিকে কালে চুক্তি আখ্যায়িত করে ঐদিন সকাল ১১ টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবে।

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিকে ঘিরে কাউখালীতে জেএসএস’র কোটি টাকার চাঁদাবাজী

%e0%a6%a4%e0%a6%95%e0%a6%b9%e0%a6%ac

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পূর্তিকে ঘিরে কাউখালীতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও অংগসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক কোটি টাকা টার্গেট নির্ধারণ করে গত এক মাস যাবৎ ম্যারাথন কর্মসূচীর মাধ্যমে এ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তি। প্রতি বছর এ দিনে রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক শো’ডাউন করে থাকে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি। এ বছরও দিবসটি পালনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তাদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ।

এ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে শুধু কাউখালীতেই টার্গেট করা হয়েছে এক কোটি টাকা। এ টার্গেট পূরণ করতে চাঁদা আদায়ের ম্যারাথন কর্মসূচী হাতে নেয় তারা। এ লক্ষ্যে গত এক মাস যাবৎ কাউখালী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলো চষে বেড়াচ্ছেন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

কোটি টাকা আদায়ে সংগঠনটি যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো টার্গেট করেছে এর মধ্যে রয়েছে গাছ, বাঁশ, সরকারী চাকুরীজীবী, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্রিকফিল্ড। ইতোমধ্যেই উপজেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছ থেকে মাথাপিছু এক হাজার টাকা নির্ধারণ করে তা যথাসময়ে পাঠিয়ে দিতে মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

যথা সময়ে নির্ধারিত টাকা পাঠিয়ে দেয়া না হলে সেসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দূর্গম অঞ্চলে কর্মরত স্কুল শিক্ষকরা। জীবনের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বেশীরভাগ শিক্ষকই টাকা পৌঁছে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব শিক্ষকদের মতে পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা ঠিক হবেনা। আবার আতঙ্কিত অনেক শিক্ষক কাউখালী সেনা ক্যাম্পে মৌখিক অভিযোগও করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলমপতি, ঘাগড়া, বেতবুনিয়া ও ফটিকছড়ি ইউনিয়নের অসংখ্য শিক্ষক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি স্থানীয় সেনা ক্যাম্পকে অবগত করায় দাদারা ক্ষিপ্ত হয়েছেন।

উপজেলার সরকারী অফিসগুলো ঘুরে জানা গেছে, বেশীরভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে পদ ও পদবী হারে টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এসব সরকারী চাকুরীজিবীরা চাঁদা দেয়ার কথা স্বীকার করলেও নির্ধারিত চাঁদার পরিমাণ কত তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

কোটি টাকার লক্ষ পূরণের প্রধান টার্গেট হচ্ছে গাছ ও বাঁশ ব্যবসা। মৌসুমটি গাছ ও বাঁশ ব্যবসার হওয়ায় এসব ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা হবে অন্তত অর্ধ কোটি টাকা। এমন তথ্য পাওয়া গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

এছাড়াও তালিকায় রয়েছেন ঠিকাদার, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সড়কে চলাচলরত গাড়ীগুলো। তবে যেসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও সড়কে চলাচলরত গাড়ীগুলো জেএসএস থেকে বছর ব্যাপী টোকেন সংগ্রহ করেছেন তাদের কাছ থেকে চাঁদার পরিমাণ কম রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বক্তব্য বা নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় জেএসএস’র কেন্দ্রীয় তথ্য ও সহ প্রচার সম্পাদ সজীব চাকমার সাথে। তিনি জানান, সারাদেশে যেভাবে চলছে আমাদের নেতা কর্মীরাও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সেভাবে সহযোগিতা নিচ্ছে। এটাকে কোন ক্রমেই চাঁদাবাজি বলা যাবেনা।

তিনি আরো জানান, সবার সাথে আলোচনা স্বাপেক্ষে কর্মসূচী পালনের জন্য টাকা আদায় করা হচ্ছে। কাউকে জোর করে টাকা নেয়া হচ্ছেনা।

এ বিষয়ে জেএসএস কাউখালী উপজেলা সভাপতি সুবাষ চাকমার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জেএসএস’র লাগামহীন চাঁদাবাজীর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি মোঃ আব্দুল্লাহ তুহিন। তিনি জানান, জেএসএস’র চাঁদাবাজীর পরিধি আগের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোটি টাকা চাঁদার লক্ষ্য পূরণ করতে তারা এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও টার্গেট করে অসহায় শিক্ষকদের হয়রানি করছে। তিনি জেএসএস’র চাঁদাবাজী বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

কাউখালী থানার ওসি আব্দুল করিম জানান, বিষয়টি আমি অনেকের মুখে শুনেছি। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ না করলে সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু থাকে না।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ে সরকারের কোনো খাস ভূমি নেই- বান্দরবানে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি সহায়ক কমিটি গঠন সভায় অভিমত

bandarban-pic-1-10

নিজস্ব প্রতিবেদক

বান্দরবানে হেডম্যান কার্বারীদের নিয়ে ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে জেলা পরিষদের চেয়াম্যান ক্য শৈ হ্লা’র সভাপতিত্বে সভায় পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনকে সহায়তার জন্য ভূমি বিরোধ চিহ্নিতকরণ বিষয়ে হেডম্যানদের নিয়ে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়।


নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল আবসার, জেলা পরিষদের সদস্য ক্যসা প্রু মারমা, থোয়াইচা হ্লা মারমা, হেডম্যান এসোসিয়েসনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক টি মং প্রুসহ ১০৯টি মৌজার মৌজার হেডম্যানরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বান্দরবান ৩১৬ নং বেতছড়া মৌজার হেমডম্যান হ্লাথোইহ্রী বলেন, আমার মৌজায় ১৯৮৩-৮৪ সালে বন বিভাগ ৩ হাজার একর ভূমির আবেদন করলে ইউএনও বিনা খাজনায় ১৯৮৮ সালে বন্দোবস্তকরণ করেন। কিন্তু বন বিভাগ ১৯৮১ সাল থেকে বনায়ন শুরু করেন। এই জায়গার সাথে চৌহদ্দিরও কোন মিল নাই তাই এই জায়গা বাতিলের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনে পাঠানোর সুপারিশ করেন তিনি।

তিনি বলেন, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ে সরকারের খাস ভূমি নেই। কিন্তু পাহাড়ীরা কখনো না কখনো এইসব জায়গায় জুম চাষ করেছে। তাই এই ভূমির মালিক মৌজাবাসী।

৩৬৮ মৌজার হেডম্যান রুমার মুরংগো বাজারে খাস জমিতে স্থাপিত পুলিশ ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সীমানা বর্ধিত করে সেগুন গাছসহ ভূমি দখলের অভিযোগ করেন।

এছাড়া রুমা ও পলি মৌজায় বন বিভাগের প্রায় ৬ হাজার একর বন্দোবস্তি ভূমি বাতিলের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।

সভায় হেডম্যান,কারবারিরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় সম্প্রতিক সময়ে ভূমি দখলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, পাহাড়ের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠিরা দিন দিন ভূমি হারাচ্ছে, দ্রুত এসব বন্ধ না হলে সমস্যায় পড়বে।

নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি, বাইশারী লামাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ভূমি দখলদার চক্র নানাভাবে পাহাড়িদের ভূমি দখল করে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বাইশারী থেকে বেশ কয়েকটি পাড়া উচ্ছেদ হয়ে গেছে এবং লামার ফাসিয়াখালী এলাকায় ঢাকার একটি চক্র শত শত একর জায়গা দখল করেছে বলে হেডম্যানরা জানান।

সভায় হেডম্যানরা ভূমি দখলসহ নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন ও ভূমি কমিশনের মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধানের আবেদন জানান এবং  রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে ভূমি কমিশনের দুটি ইউনিট অফিস স্থাপনেরও দাবী জানান হেডম্যানরা।

সভা শেষে হেডম্যান হ্লাথোয়াই হ্লী মারমাকে আহ্বায়ক ও উনিহ্লা মারমাকে সদস্য সচিব করে ১২ সদস্য বিশিষ্ট ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি সহায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জুম্মল্যান্ডের অজানা গল্প এবং সামারি

জেনারেল ইব্রাহীম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

নোটশিট ও সামারি
দু’টি শব্দ এখানে লিখলাম। একটি শব্দ ‘সারসংক্ষেপ’, ইংরেজিতে সামারি। আরেকটি শব্দ ‘নোটশিট’। এই দু’টি শব্দের সাথে সরকারি চাকরিজীবীরা নিবিড়ভাবে পরিচিত। নোটশিট মানে ছাপানো কাগজ, যেখানে অফিসের কর্মকর্তারা কোনো বিষয়ে বা প্রস্তাবে তাদের মন্তব্য লিখে ওপরের দিকে পাঠান এবং আবার ওপরের দিক থেকে নিচের দিকে পাঠান। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি অফিসে এ ধরনের কাগজ এবং এ ধরনের নোট লেখা সুপ্রচলিত। সামরিক বাহিনীতে নোটশিট না বলে অনেক সময় বলা হয় মাইনিউটস (বা মিনিটস) লেখা তথা মিনিট-শিটে লেখা। নোট মানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। কারণ জ্যেষ্ঠ স্টাফ অফিসার বা অতি জ্যেষ্ঠ দায়িত্বশীলদের হাতে এত সময় থাকে না যে, তারা সব বিষয়ে বিস্তারিত শুনবেন বা পড়বেন। কোন কোন বিষয়ে বিস্তারিত জানা উচিত এবং কোন কোন বিষয়ে সারমর্ম বা সামারি জানলেই চলবে, এই সিদ্ধান্তটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকেই নিতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ এবং চলমান সন্ত্রাস ও সন্ত্রাস দমনের চেষ্টা প্রসঙ্গে আমার একটি প্রস্তাব এই কলামের শেষ অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করছি; কিন্তু কেন করছি সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য ইতিহাস থেকে একটি গল্প তুলে ধরলাম।

খাগড়াছড়িতে ব্রিগেড কমান্ডার হলাম
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎই জানানো হলো, আমাকে রাঙ্গামাটি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে খাগড়াছড়ি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে। ডিসেম্বরের ২০ তারিখ আমি খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং সাত দিন পর ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ রাঙ্গামাটি ব্রিগেডের দায়িত্ব অন্যের বরাবরে হস্তান্তর করেছিলাম। ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনী নামক জঙ্গি দল বা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত কর্মকাণ্ডের উত্তাপ চরমে ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে দু-মুখী চেষ্টা চলছিল। একমুখী চেষ্টা হলো নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যথাসম্ভব দমন করা। আরেকমুখী চেষ্টা ছিল, শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তি স্থাপনের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। আমার আগে যিনি খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন তিনি প্রক্রিয়াটি শুরু করে গিয়েছিলেন; কিন্তু আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সময়েই তিনি বদলি হয়ে যান। অতএব ওই অভিনব গুরুদায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ে। দায়িত্বটি কী? দায়িত্বটি হলো, শান্তি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা, পরিবেশ অব্যাহত রাখা এবং আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া।

বিস্তারিত বর্ণনা আমার লেখা দ্বিতীয় বইয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে বা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপগুলোর বিবরণ ও মূল্যায়ন এই বইয়ে আমি লিপিবদ্ধ করেছি। বইয়ের নাম : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন’। বইটির প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক; প্রকাশনী সংস্থার নাম মওলা ব্রাদার্স (০২-৭১৭৫২২৭)।

শান্তিবাহিনীর দাবিনামা : জুম্মল্যান্ড
সংক্ষেপে স্মৃতিচারণ করি। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিবাহিনীর সাথে চতুর্থ আনুষ্ঠানিক আলোচনা বৈঠক হয়। হাবভাব দেখে বুঝলাম, শান্তিবাহিনী আরেক দফা রক্তারক্তি করবে। উদ্দেশ্য, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেন, সরকার তাদের দাবিনামা মেনে নেয়। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির কথা বলছি। দাবিনামাটি ছিল পাঁচ দফা। পাঁচ দফার পুরোটাই এখানে লিখব না, স্থানাভাবে। শুধু প্রথম দফা লিখলাম। ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙ্গামাটি। দু’টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে; ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’

শান্তিবাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের বরাবরে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতি-কিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অঙ্কন করা। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ বছর যাবৎ শান্তিবাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই প্রথমবার, ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এসে তারা লিখিতভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করেছিল। দাবিগুলো সংবিধানবহির্ভূত হওয়ার কারণে, বাংলাদেশ সরকার তথা সরকারের প্রতিনিধিদল ওই দাবিনামার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছিল, সেহেতু শান্তিবাহিনী উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আরেকবার একটি বড় আকারের রক্তাক্ত নাটক তারা মঞ্চস্থ করবে। আমার সামরিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং গোয়েন্দাদের মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে আমিও উপসংহারে এলাম যে, শান্তি বাহিনী আসলেই আরো একবার বড় রকমের রক্তপাত ঘটাবে।

রক্তারক্তি এবং প্রেসিডেন্টের সফর
এটি ১৯৮৮-এর মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরুর কথা। আমি আমার মূল্যায়ন বা ফোরকাস্ট ওপরোস্থ কর্তৃপক্ষ এবং সরকারকে জানালাম। পরিষ্কার বললাম, সেটি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের মজুদ নেই। ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ, রমজান মাসের আট বা নয় এরকম একটি তারিখ; এশার নামাজের পর শুরু হলো শান্তিবাহিনীর আক্রমণ। ঘটনাক্রমে কিন্তু একান্তই অপরিকল্পিতভাবে, তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ম. হামিদ ক্যামেরাসহ খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছিলেন, পর্যটনমুখী একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর জন্য। ২৪ এপ্রিল রাত এবং পরবর্তী দু-তিন দিনের সব সন্ত্রাসী তৎপরতা বিটিভি ক্যামেরাবন্দী করে এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করে। শান্তিবাহিনীর আক্রমণে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বাঙালিদের হতাহত হওয়ার খবর জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গার কারণে পাহাড়ি মানুষের হতাহতের খবরও জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি মানুষ সীমান্তের অপর পারে শরণার্থী হওয়ার খবরও জনগণ পেতেন না। এই প্রথমবার, বিটিভির বদৌলতে বাংলাদেশের আপামর জনগণ শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে কম হোক বেশি হোক, ভালো হোক মন্দ হোক, একটি ধারণা পেলো। শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে ওইরূপ আগ্রাসী কর্মকাণ্ড পরবর্তী দিনগুলোতেও অব্যাহত ছিল।

ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ সরকার মানসিকভাবে চাপের মধ্যে পড়ে। চাপটি কী? পার্বত্য চট্টগ্রামে এত রক্তারক্তি কেন হচ্ছে? শান্তিবাহিনীর হাতে এত বাঙালি কেন মরছে? সরকার কী করছে? সেনাবাহিনী কী করছে? ইত্যাদি। এই প্রেক্ষাপটে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার জন্য এবং মূল্যায়নের জন্য খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। ওই দিন পর্যন্ত প্রায় চল্লিশটি বাঙালি গ্রাম শান্তিবাহিনীর গুলি ও আগুন-আক্রমণের শিকার হয়েছিল, শতাধিক বাঙালি নিহত হয়েছিল, শত শত বাঙালি আহত হয়েছিল, শত শত উপজাতীয় মানুষ ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্টের সফরের তারিখটি ছিল ৫ মে ১৯৮৮। প্রেসিডেন্টের সাথে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান এবং চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আব্দুস সালামও ছিলেন। এলাকা ঘুরে, রাষ্ট্রপতি তার দলবলসহ খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে আসেন। আমাদের অপারেশনস রুমে বসেন। আংশিকভাবে উত্তেজিত (ইংরেজিতে : এনয়ড), আংশিকভাবে বিমর্ষ রাষ্ট্রপতি জানতে চান শুনতে চান, কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? এই কলামের সম্মানিত পাঠক, এবার আলাপন বা ডায়ালগ অনুসরণ করুন। কথাবার্তা সব না, কিন্তু বেশির ভাগ ইংরেজিতে হয়েছিল। পাঠকের জন্য বাংলায় লিখলাম।

প্রেসিডেন্টকে ব্রিফিং দিতে দুই ঘণ্টা
প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘ইবরাহিম, বলো এসব কী হচ্ছে? হোয়াট দ্য হেল ইজ হ্যাপেনিং? হোয়াই সো মেনি পিপল আর বিইং কিলড? হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং?’ মানে : এত লোক মারা যাচ্ছে কেন? তোমরা কী করছ? কী ঘটছে? কর্নেল ইবরাহিম বলল, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনি এবং আমরা সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি যে, অনেক কম মারা গিয়েছে। আরো অনেক বেশি মারা যেতে পারত; কিন্তু আমরা বাঁচাতে পারিনি এটাই বাস্তবতা, আমি দুঃখিত।’ প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘পুরো জাতি উদ্বিগ্ন, আমাকে জবাব দিতে হচ্ছে। ইউ হ্যাভ টু এক্সপ্লেইন হোয়াই ইউ ফেইলড?’ আমি বললাম, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমি অবশ্যই ব্যাখ্যা করব; আমাকে সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট : ‘ঠিক আছে তুমি বলো, তোমাকে বিশ মিনিট সময় দিলাম।’ ইবরাহিম : ‘স্যার, আমি বিশ মিনিট সময়ে বলব না। কারণ, আমি বিশ মিনিটে বলে সারতে পারব না। আপনি আমাকে অন্তত দুই ঘণ্টা সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট যুগপৎ আশ্চর্য এবং রাগান্বিত হয়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি স্টাফ কলেজের ডিএস (ইন্সট্রাক্টর) ছিলে; তুমি সামারি করা শিখিয়েছ ছেলেদের; আর এখন তুমি বলছ, তুমি বিশ মিনিটে বলতে পারবে না। কেন পারবে না? তুমি আমাকে সামারি বলো।’

আমি আবারো বিনীতভাবে উত্তর দিলাম যে, ‘আমি অবশ্যই সামারি করতে পারি কিন্তু আমি এখন করব না, কারণ সামারিতে সমাধান হবে না।’ প্রেসিডেন্টের সাথে তার সামরিক সচিব উপস্থিত ছিলেন; র‌্যাংক ব্রিগেডিয়ার; আমার থেকে এমনিতেও সিনিয়র এবং আমার সুপরিচিত। প্রেসিডেন্টের হয়ে, প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী তৎকালীন সামরিক সচিব আমাকে বললেন, টঙ্গী খালের ওপরে দ্বিতীয় ব্রিজ উদ্বোধনের অনুষ্ঠান আছে; প্রেসিডেন্টকে ওখানে যেতে হবে। অতএব তোমাকে দুই ঘণ্টা সময় দেয়া যাবে না (পাঠকের জন্য একটু ডাইভারশন। ঢাকা মহানগর থেকে উত্তর দিকে উত্তরা মডেল টাউন এবং টঙ্গী শিল্প শহরের মধ্যে সীমানা হলো টঙ্গী খাল। ওই খালের উপরে পুরনো একটি ব্রিজ ছিল। পুরনো ব্রিজ ট্রাফিক সামলাতে পারে না বিধায় সরকার একটি নতুন ব্রিজ বানিয়েছিল; ওই নতুন ব্রিজটির উদ্বোধনের কথাটিই বলা হচ্ছে)।

আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বললাম : ‘স্যার, আপনিই ঠিক করুন, টঙ্গী খালের ওপর ব্রিজ উদ্বোধন করবেন, নাকি আমার কাছ থেকে ব্রিফিং শুনবেন? ব্রিজ উদ্বোধন অন্য কোনো মাননীয় মন্ত্রী করলেও ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে অসুবিধা হবে না; কিন্তু আজ যদি পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা আপনার বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী শোনেন, তাতে কিন্তু আপনার চাহিদা মিটবে না।’ প্রেসিডেন্ট এরশাদ গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘দুই ঘণ্টা সময়ই তোমাকে দিলাম। আমাকে যেহেতু ঢাকা ফেরত যেতে হবে, সময় হিসাব করেই ব্রিফিং শেষ করবে।’

সামারি কেন করিনি?
এরপর আমি ঘড়ির কাঁটা ধরে, ম্যাপের সামনে দাঁড়িয়ে মহামান্য প্রেসিডেন্টকে দুই ঘণ্টাব্যাপী একটি ব্রিফিং দিলাম। স্থান খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে অবস্থিত ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের অপারেশন্স রুম; তারিখ ৫ মে ১৯৮৮; সময় অপরাহ্ণ সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা। ব্রিফিংয়ের মধ্যে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার ব্যাপ্তি, সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগগুলো, সমস্যা বাড়ানোর জন্য শান্তিবাহিনীর প্রচেষ্টা, শান্তিবাহিনীর প্রতি প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনের ব্যাপ্তি, শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও দুর্বলতা, বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলো এবং আমার পক্ষ থেকে সুপারিশমালা। দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্রিফিং শোনার পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত মন্তব্য শুনে, আমি দুষ্টুমি করতে বাধ্যই হয়েছিলাম। সিরিয়াস কণ্ঠে বললাম, ‘স্যার, আপনি এত কিছু জানতেন না; কারণ আপনি সব সময় সামারি শুনেছেন। সামারি শুনলে ওইটিই আপনি জানবেন যেটি সামারি-করনেওয়ালা আপনাকে জানায়। এর বাইরে যা কিছু সব আপনার অগোচরে থেকে যাবে।’ প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ‘আমি সব কিছু একলা সামলাতে পারব না, সরকারকে পূর্ণাঙ্গভাবে জড়িত হতে হবে।’ অতএব, প্রেসিডেন্টের আদেশে ১৯৮৮ সালের মে মাসের ৮ তারিখ বিকেলবেলা বঙ্গভবনে, সেনাসদরের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির ওপর একটি ব্রিফিং দেয়া হয়। কেবিনেটের সব সদস্য, সরকারের সব সচিব, ঢাকা অঞ্চলের সব জেনারেল এবং ডিআইজি ও ওপরস্থ সব পুলিশ অফিসার সেই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পূর্ণ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকে পাঁচ মিনিট করে সূচনা বক্তব্য রেখেছিলেন : মহামান্য প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী প্রধান মহোদয় এবং চট্টগ্রামের মাননীয় জিওসি। বাকি এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম আমি। আরো একটি ক্ষুদ্র স্মৃতির উল্লেখ করছি।

বেগম জিয়াকে ব্রিফিং
১৯৯১ সালের শুরুর দিকে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তিনিও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি বোঝার জন্য সেনাসদরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্টাফ অফিসাররা আমাকে বারবার বলেছিলেন, ইবরাহিম, সংক্ষেপে বলবে। দেড় ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল। আমাদের বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বাস্তবে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদ সাহেব প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও বলেছিলেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ বেগম জিয়ার তো আগের থেকে কোনো কিছু জানার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সে জন্যই তার স্টাফ অফিসারদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বেগম জিয়া দীর্ঘ সময় ব্রিফিং শুনেছেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব সম্পাদন করেছিলেন। বঙ্গভবনের ব্রিফিং বা বেগম জিয়ার প্রতি (১৯৯১) ব্রিফিংয়ের বিবরণ দেয়া আজকের কলামের উদ্দেশ্য নয়।

দৃষ্টি আকর্ষণ : বর্তমান সরকারপ্রধান
আজকের কলামের উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই মর্মে যে, দু’টি বিষয়ে তিনি যেন সামারি-নির্ভর হয়ে না চলেন। এখন প্রথম বিষয়টির উল্লেখ করছি। গতকাল ৯ আগস্ট ছিল তথাকথিত ‘আদিবাসী’ দিবস। স্থানের অভাবে, সময়ের অভাবে, শক্তির অভাবে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের অন্তর্নিহিত বিপদগুলো নিয়ে লিখতে পারছি না বা বলারও সুযোগ পাচ্ছি না। অনুমান করছি, কেউ না কেউ আপনাকে নিশ্চয়ই বলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট-দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে। যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না? যদি থাকে, তাহলে কতসংখ্যক ও কোন কোন শর্তে?’ এই অপ্রিয় প্রশ্নটি আড়াল করেই সব ডামাডোল।

দ্বিতীয় বিষয় : চলমান উগ্রবাদ বা চরমবাদ বা এক্সট্রিমিজম বা মিলিটেন্সি বা টেরোরিজম বা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস প্রসঙ্গ (যেই নামেই ডাকি না কেন)। সরকার অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে; সরকার তথা সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সরকারের দফতর-অধিদফতর, পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাব ইত্যাদি অনেকেই বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ঘোষিতভাবে, ওই পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্ত্রাস দমন বা দমনের সহায়তা। আমি আশা করব, এ প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান সামারি-নির্ভর হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করবেন না। সরকারপ্রধান যেন বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হন, এই অনুরোধ করছি। কারণ, যা কিছু হবে, সব কিছুর দায়দায়িত্ব সরকারপ্রধানের ওপরেই পড়বে। সরকারপ্রধান যেহেতু সরকার চালাচ্ছেন, সেহেতু তিনি অজস্র বিষয়ে অবশ্যই সামারি শুনবেন এবং সিদ্ধান্ত দেবেন; এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সন্ত্রাস দমন বা জঙ্গি দমনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো দেয়ার আগে এক বা একাধিকবার মেহেরবানি করে পূর্ণ বিষয়টি যেন তিনি জানতে চেষ্টা করেন এবং আবারো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সামারি-নির্ভর যেন তিনি না হন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ইমেইল : mgsmibrahim@gmail.com