রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার এবং পার্বত্যাঞ্চলে বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার

মাহের ইসলাম:

সম্প্রতি ফেসবুকের উদ্যোক্তা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ স্বীকার করেছেন যে, মায়ানমারের চলমান রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের ভূমিকা রয়েছে। এই স্বীকারোক্তি এসেছে তখনই, যখন রাখাইনে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার প্রেক্ষাপট তৈরিতে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী কাজে ফেসবুকই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থা অভিযোগ করছে।

উল্লেখ্য, গত ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ তারিখে লন্ডনে ১৫৯টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর প্রকাশিত ‘দ্য স্টেস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স হিউম্যান রাইটস’- শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে যে, বিশ্বনেতাদের ছড়িয়ে দেয়া ঘৃণা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ সিরিয়া ও মিয়ানমারে সংখ্যালঘু নির্যাতন উস্কে দিয়েছে। মিয়ানমারের পাশাপাশি ইরাক, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হয়েছে। (দি গার্ডিয়ান, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)

মায়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের “ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন” এর চেয়ারম্যান মারজুকি দারুসমান একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাবের জন্য বহুলাংশে অবদান রাখছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “মায়ানমারে সামাজিক মাধ্যম মানেই ফেসবুক, এবং বিভিন্ন বিরূপ মন্তব্য সেখানে বর্তমান”।

অন্যদিকে, মিয়ানমার মানবাধিকার পরিস্থিতির একজন দূত বলেন, “আমরা জানি জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের নিজস্ব ফেসবুক একাউন্ট রয়েছে এবং তারা রোহিঙ্গা বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অনেক সহিংসতা এবং ঘৃণা ছড়াচ্ছে”।(আল জাজিরা, ১৪ মার্চ, ২০১৮)

ইতোমধ্যেই এটা সবারই জানা হয়ে গেছে যে, খবরের নামে গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে মায়ানমারে মুসলিম ও রোহিঙ্গাবিদ্বেষী মনোভাবে উসকানি ও প্রণোদনা জোগানোর কাজে ফেসবুককে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই, মিয়ানমার সেনা ও উগ্রবৌদ্ধদের বর্বরতার খবর মুছে দিয়ে এবং রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ নির্যাতনের সত্য খবরও আড়াল করেছে ফেসবুক। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাবিদ্বেষী প্রচারণায় প্রচণ্ড বর্ণবাদী রাজনৈতিক কার্টুন, মিথ্যা ছবি এবং বানোয়াট সংবাদ সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। পরবর্তীতে, এগুলো প্রায়ই ভাইরাল করে ছড়িয়ে দেয়া হয় সাধারন মানুষের মাঝে।

ফলে, মায়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গা বিদ্বেষ এবং অনেকেই আরাকান রাজ্যের এই সংখ্যালঘু মুসলিম মানুষদের দেখতে শুরু করেছে ঘৃণার চোখে। অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে, মায়ানমারের অনলাইন জগতে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ, উসকানি, সহিংসতা এবং ঘৃণা প্রচারণা অনেকটা উৎসবে পরিণত হয়।

চূড়ান্ত পরিণতিতে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে, ১২ এপ্রিল ২০১৮ পর্যন্ত শুধুমাত্র বাংলাদেশেই আশ্রয়প্রার্থী নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১,০২,৬৩২ জন; জাতিগত নিধন, হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা শিকার হওয়া দুর্ভাগাদের প্রকৃত সংখ্যা হয়ত কোনদিনও জানা যাবে না।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলেও প্রায় অনুরূপ ক্ষেত্র সৃস্টির অপচেষ্টার আশংকা দেখা দিয়েছে, কিছু কিছু পাহাড়ির ফেসবুক পোস্ট দেখে। যেখানে, প্রতিনিয়তই বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার চালিয়ে ঘৃণা, অবিশ্বাস আর সন্দেহের বীজ বপনের কাজে ফেসবুক ক্রমেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে, বেছে বেছে শুধুমাত্র বাঙ্গালীদেরকে টার্গেট করা হচ্ছে, তাই নয়। বরং, অনেক ক্ষেত্রেই সাম্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি এসব পোস্টে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন এমনকি সরকার এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী উপাদানও থাকে।

পাহাড়ে সংঘটিত হলেতো কথাই নেই, এমনকি সমতলে সংঘটিত ঘটনাকে পুঁজি করেও এমন অপপ্রচেষ্টা অহরহ দেখা যায়। এক্ষেত্রে, বেশীরভাগ সময়ই যে কোন বাস্তব ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়; তবে প্রকৃত ঘটনা গোপন করে, কিছুটা মিথ্যে মিশ্রণ করে বা আংশিক সত্য প্রকাশ করে এবং ছবি এডিট করে প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও অতীতে ঘটে যাওয়া ভিন্ন কোন ঘটনার ছবি ব্যবহার করে, সাম্প্রতিক বা আলোচ্য ঘটনার ছবি হিসেবে চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। এ ধরণের প্রচেষ্টার নিয়মিত শিকার হলো পাহাড়ে বসবাসরত বাঙ্গালীরা। ইচ্ছে করেই পজিটিভ সংবাদগুলো আড়াল করে শুধুমাত্র নেগেটিভ সংবাদগুলোই সামনে এনে এবং অবশ্যই কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়; বাঙ্গালীর প্রতি ঘৃণা আর পাহাড়ীর প্রতি সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে।

উপরের ছবিটি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে কিশোরী বিউটি আক্তারের, যাকে হত্যা করা হয় গত মার্চের ১৬ তারিখে। ঘটনার পরপরই, বাঙ্গালী বিদ্বেষী পোস্ট চলে আসে ফেসবুকে। ২০১২ সালের সবিতা চাকমার ঘটনা উল্লেখ করে এক উস্কানিমূলক পোস্ট আপলোড করা হয়, যেখানে ব্যবহার করা হয় ২০১৮ সালের বিউটি আক্তারের মৃতদেহের ছবি। প্রকৃতপক্ষে, ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী সবিতা চাকমার লাশ নিজ বাড়ির পাশে পাওয়ার পর বিভিন্ন পাহাড়ী সংগঠনগুলো থেকে সবিতা চাকমা বাঙালী ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপার কর্তৃক গণধর্ষিতা হয়ে মারা গেছে বালে দাবী করে ব্যাপক প্রচারণা, প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। এমনকি শাহবাগেও সবিতা চাকমা ‘ধর্ষণ’ ও খুনের ঘটনায় মানবন্ধন হয়েছে। কিন্তু পরে ময়না তদন্তে প্রমাণ হয় যে, তাকে ধর্ষণ করা হয়নি।

‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ : বিচার কামনার চেয়েও বাঙালিকে ধর্ষক প্রমাণ করাটা যখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ শিরোনামের নাজমুল আহসান এর ব্লগ থেকে জানতে পারি যে, “বাংলাদেশে মিডিয়া ক্যু’র সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে পার্বত্য বাঙালিরা।” তিনি আরো জানিয়েছেন, “অনেক অপরাধের বোঝা বইতে হয়েছে পার্বত্য বাঙালিদের, যেটার জন্য আদৌ তারা কোনোকালেই দায়ী ছিল না।” পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ ও তার প্রতিবাদের শুধুমাত্র ২০১৪ সালের ৫টি ঘটনাকে কেস স্টাডি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, “কেউ কেউ আসলে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের বিচার চায় না, কিন্তু বাঙালিই ধর্ষক সেটাই প্রমাণ করতে চায়। বিচার এখানে মূখ্য নয়, ধর্ষণকে কেন্দ্র করে আমি কতোটুকু রাজনীতি করতে পারলাম, সেটাই মূখ্য বিষয়।” (https://www.istishon.com/?q=node/19537)

দেবী ত্রিপুরা, বিশাখা চাকমা, উ প্রু মারমা, আয়না চাকমা, দিপা ত্রিপুরা, ফাতেমা বেগম, এবং সবিতা চাকমা এর মতো অনেক ঘটনা আছে যেখানে ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বাঙ্গালী বিদ্বেষী প্রচারণা ও ঘৃণা সৃষ্টিতে।

অনেক পাহাড়ী মেয়ের জন্যে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক। বাঙ্গালী ছেলের সাথে মেলামেশা করলে বা এক সাথে ছবি তুললেই পাহাড়ী মেয়েরা পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত যুবকদের দ্বারা হেনস্তার শিকার হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে এবং সরাসরি।

অনেক ক্ষেত্রেই, মেয়ের বিস্তারিত পরিচয় উল্লেখ করে এসব ছবি ফেসবুকে চলে আসছে; বিভিন্ন ধরনের হুমকি, এমন কি নিলামে তোলা বা প্রাণনাশের হুমকিসহ। পাহাড়ী মেয়েদের ছবি, নাম, পিতার নামে এমনকি ঠিকানা পর্যন্ত ফেসবুকে পোস্ট করে, তাদেরকে সর্বত্র হেয় করার পাশাপাশি তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। বাঙ্গালী বিদ্বেষী মনোভাব এমনই প্রকট যে, এখানে ‘পতিতাবৃত্তি’ কেও গ্রহণযোগ্য বলা হচ্ছে, কিন্তু বাংগালী ছেলের সাথে পাহাড়ি মেয়ের ‘প্রেম, ভালোবাসা এবং বিয়ে’ গ্রহণযোগ্য নয়।

পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালিদের প্রতি ঘৃণার প্রকটতা এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মৃতকে পর্যন্ত রেহাই দেয়া হয়নি। রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসের অব্যবহিত পরেই সেনাসদস্যরা জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পরে। অথচ, এই উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদের মৃত্যতে ও কিছু পাহাড়িকে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তারচেয়েও বেদনাদায়ক হলো এই যে, তারা তাদের এই ঘৃণা ও উল্লাস প্রকাশে কোন রাখ ঢাকের ধার ধারেনি, বরং প্রকাশ্যেই জানান দিয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে। 

২০১৭ সালের জুন মাসে রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত হয় স্মরণ কালের অন্যতম ভয়াবহ পাহাড় ধস। তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় একজন মেজর ও একজন ক্যাপ্টেনসহ ৫ জন সেনাসদস্য শাহাদাত বরণ করার পরেও ঘৃণা প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত মিথ্যামিশ্রিতভাবে উপস্থাপন করতে দেখা যায়।মৃত সেনাসদস্যদের ‘অত্যাচারি এবং নরপিশাচ’ বলে উপস্থাপন করা হয়। অথচ, উক্ত পাহাড় ধসের ঘটনা পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় রাঙ্গামাটিতে সেনা সদস্যরা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ৮ টি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, যেখানে দুই মাসের বেশি সময় ধরে সর্বমোট ৯৩,৩৮১ জনের খাবারের ব্যবস্থা করে এবং ২২৫৭ জনকে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা প্রেদান করে। আর, বাঙ্গালিদের প্রতি ঘৃণা এমনই তীব্র যে, শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত সহানুভূতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে !

২ জুন ২০১৭, সকালে রাঙ্গামাটির লংগদুতে পাহাড়িদের প্রায় শতাধিক বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। অনুমান করা হচ্ছে, পাহড়ি দুই যুবকের হাতে নিহত বাঙ্গালী মটর সাইকেল চালক নয়নের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ মিছিল হতে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল তরুণ এই অগ্নিকান্ডের জন্য দায়ী। ফলে, কয়েকশত নিরীহ পাহাড়ি পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে রাতারাতি সহায় সম্বলহীন হয়ে মানবেতর দিনযাপনে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীতে, স্থানীয় রাজনীতির জটিলতায়, নারী ও শিশুসহ এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই সরকারী ত্রাণ এমনকি চিকিৎসা সহায়তা পর্যন্ত নিতে বাধার সম্মুখীন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ফেসবুকের কল্যাণে ঘটনাটি অতি দ্রুত লংগদুর বাইরে ছড়িয়ে দেয়া হয়, দেশে এবং বিদেশে; তবে একটু ভিন্ন ভাবে। জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক, এই ভয়াবহ সংবাদটি কয়েকটি দেশি এবং বিদেশী পত্রিকাতেও খানিকটা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

যে তিনটি ছবিকে লংগদুর অগিকান্ডের ছবি বলে চালানো হলো, দেশবাসি এবং বিশ্ববাসীর সমবেদনা প্রাপ্তি এবং বাঙ্গালীদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যে, সেগুলো আসলে এদেশেই ঘটে যাওয়া টঙ্গীতে বয়লার বিস্ফোরণ (১০/৯/১৬), গাইবান্ধায় সাঁওতাল পল্লি (৭/২/১৭) এবং বরিশালে বিস্কুটের গোডাউন (৪/২/১৭) এর আগুনের ছবি। অনলাইনে গিয়ে ‘লংগদুতে আদিবাসীদের উপর হামলা: কিছু ভুল ছবি’ (https://www.jaachai.com/posts/post-807) শিরোনামের এক পেজ থেকে জানা যায় যে, লংগদুতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সত্য হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সকল ছবি এসেছে তার সব ছবিই এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট নয়।ভিন্ন ঘটনার ছবি ব্যবহার করে বাঙ্গালীদের দোষারোপ করা হয়েছে অত্যন্ত সুচারুভাবে।

একদিকে বাঙ্গালিদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি আর অন্যদিকে পাহাড়িদের প্রতি সমবেদনা আদায় করার এই পন্থা শুধুই পুরাতনই নয় বরং কিছু পাহাড়ির কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাংলাদেশ সংক্রান্ত যে কোন সংবাদের মধ্যে দেশ বিরোধী বা দেশের জন্যে অবমাননাকর উপাদান যোগ করে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। যে কোন কিছুর সাথে কিছুটা মিথ্যে যোগ করে বা কোন নেতিবাচক সংবাদ এর সাথে বাঙ্গালী বিদ্বেষী মতামত যোগ করে পোস্ট আপলোড করা নৈমিত্তিক ব্যাপার।

একটু খেয়াল করলেই এ ধরনের হাজার হাজার পোস্ট চোখে পড়বে যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পাহাড়ের সরল মনের মানুষদের বাঙ্গালী বিদ্বেষী মনোভাব গড়ে তোলার চেস্টা চলছে। সরকার যখন পাহাড়ে পাহাড়ি- বাঙ্গালীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং শান্তি আর উন্নতির চেস্টায় আন্তরিকভাবে নিবেদিত, তখন এ ধরনের ফেসবুক পোস্ট সরকারের সমস্ত প্রচেস্টার বিরুদ্ধে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের চোখের আড়ালে ঘটছে বলে, অনেকেই এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে হয়ত কিছুটা সময় নিতে পারে।

কিন্তু, চরম বাস্তবতা হলো, ফেসবুকের এই ঘৃণা ছড়ানো এবং বাঙ্গালী বিদ্বেষী প্রচারণা পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি অশান্তি এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প পাহাড়ের বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিরীহ এবং সরল মানুষগুলো প্রকৃত সত্যের পরিবর্তে মিথ্যের জালে ক্রমাগত আষ্টপৃষ্টে বাঁধা পড়ছে; না বুঝেই পরস্পরের শত্রু হয়ে মুখোমুখি হয়ে পড়ছে একই সমাজের মানুষগুলো। ষড়যন্ত্রকারীদের কুটচালে ব্যহত হচ্ছে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি; অকার্যকর হয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় আন্তরিকতা, দেশবাসীর উদারতা আর জাতির ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। দেশের বাইরে ভুলন্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সম্মান ও মর্যাদা।

রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে, মার্চের শেষ সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ আর বিহার রাজ্যে মোট দশটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছিল। বিবিসির হিন্দি বিভাগ তাদের সংবাদ দাতাদের প্রেরিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই মতামত ব্যক্ত করছে যে, “এ অশান্তি, হিংসা বা অগ্নিসংযোগ কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই, অনিয়ন্ত্রিতভাবে, হঠাৎ ঘটে গেছে – ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে এরকমটা মনে করা কঠিন।”

এ নিয়ে ১২ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত, ‘ভারতে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গা ‘পরিকল্পিত’ মনে করার ৯টি কারণ’ সংবাদে বিস্তারিত আলোচনা করার সময়, ‘সামাজিক মাধ্যমে গুজব’ ছড়ানোকে একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই, মায়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার আর ভারতে মুসলিম বিরোধি দাঙ্গায় সামাজিক মাধ্যমের গুজব ছড়ানোকে মাথায় রেখে পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে ফেসবুকে ধর্মীয় উস্কানিমূলক ও বাঙ্গালী বিরোধী প্রচারণা ও ঘৃণা ছড়ানো বন্ধের পদক্ষেপ এক্ষুণি নিতে হবে। এ নিয়ে কালক্ষেপণের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বরং এ বিষয়ে লাগাম টানতে যত দেরি হবে, তত বেশি জ্যামিতিক হারে এর ক্ষতির শিকার হতে পারে আমাদের সকলকে।

• লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক ও লেখক।

maherislm@gmail.com


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)
  8. অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?

 

রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

মেহেদী-হাসান-পলাশ1

মেহেদী হাসান পলাশ :

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য শাখের করাত। তিন দিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য শ্বাস নেবার মুক্ত জানালা দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ২৭২ কি.মি. মিয়ানমার সীমান্ত। ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসী নীতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদী নীতির তুফানে বাংলাদেশের ‘খড় কুটো’ এই সীমান্ত তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এড়িয়ে স্থলপথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগেরও একমাত্র বিকল্প এই সীমান্ত। অন্যদিকে মিয়ানমারের জন্যও ভারতের মূল ভূখ- হয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার স্থল যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম বাংলাদেশ।

এই যখন অবস্থা তখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক মধুরেনু হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা দাবা খেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে কখনো বসন্ত বাতাসের হিল্লোল পরিলক্ষিত হয়নি। বরং পৌষী-শীতলতা এবং থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝঞ্ঝা পরিলক্ষিত হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিকভাবে বললে বলতে হয়, এর জন্য বহুলাংশে মিয়ানমারের জাতীয় নীতিই দায়ী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির প্রধান কাঁটার নাম ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’। এটা এমন এক সমস্যা যা বাংলাদেশকে গিলতেও বাধছে, উগড়াতেও।

জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিবেশী দেশের লাখ লাখ শরণার্থী গ্রহণ সম্ভব নয় এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি পূর্ণ একটি দেশে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর অবস্থানের মতো ভূমির অভাব প্রকট। তাছাড়া ইতোপূর্বে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। অফিসিয়ালি যাই বলা হোক, নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন কখনো বন্ধ হয়নি। যখন ব্যাপকভাবে এসেছে কেবল তখনই গণমাধ্যমে ব্যাপক  ভাবে আলোচিত হয়েছে।

এর বাইরে প্রতিনিয়ত দুই চার পাঁচ জন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে সব সময়। এদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গার শরণার্থী ক্যাম্পে ঠাঁই মিললেও বাকিরা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে আবার বিভিন্ন সূত্রে সরাসরি সমাজে মিশে গেছে। যারা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে তারাও ধীরে ধীরে ক্যাম্প থেকে সরে সমতলে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের মধ্যে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেয়া আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কাজের সন্ধানে সমতলে এসে মূল স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন ও মূল স্রোত ধারায় মিশে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের প্রবল বিরোধিতা রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ, যত্রতত্র রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং বিশেষ করে টেকনাফের সৌন্দর্য হারিয়ে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশী টাকার মান বেশী হওয়ায় রোহিঙ্গারা কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি হওয়ায় স্থানীয় বাঙালি শ্রমিকেরা বেকারে পরিণত হচ্ছে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা অল্প মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ায় বাঙালি শ্রমিকদের কাজে নিতে চান না। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গা পিতামাতা তাদের কন্যাদের যে কোনোভাবে বাঙালি পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হওয়ায় অনেক ঘরে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের প্রবেশ ঘটছে যা সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে এটা লক্ষ্য করা যায়। এতে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের একাংশ মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশী শ্রম মার্কেট ভাগ বসাচ্ছে। এ ধরনের নানা কারণে স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তারপরও রোহিঙ্গাদের এই চরম দুর্দিনে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব ‘দরোজা বন্ধ করে’ বা ‘মুখ ফিরিয়ে থাকা’? কিংবা মুখ ফিরিয়ে থাকলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? বাংলাদেশ তো চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুর্গম সীমান্ত, দুর্বল নিরাপত্তা প্রহরা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অসহায় রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সংবাদপত্রের খবর, যতটা না গোপনে এসেছে, তার চেয়ে বেশী এসেছে স্থানীয় দালাল ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘুষ দিয়ে। সামাজিক গণমাধ্যমে এসব ঘুষ প্রদানের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। সামনে আরো আসবে তার আলামতও স্পষ্ট।

তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হলে চলবে না। কারণ এর সাথে বাংলাদেশের সুনামের প্রশ্ন জড়িত। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার হয়। দালালদের হাতে পড়ে শিশুরা পাচার হয়। কাজের লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গা নারীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক অভিভাবক ভবিষ্যতের শঙ্কা কাটাতে স্থানীয় বৃদ্ধদের সাথেও কিশোরীদের বিবাহ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয় না। রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা যেন কোনোভাবেই নির্যাতনের শিকার না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।

আরাকান শব্দটি এসেছে আরবী আল রুকুন শব্দ থেকে। তবে পি ফ্যায়রের মতে, প্রাচীন রাখাইং গোত্রের নামানুসারে এর নাম হয়েছে আরাকান। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের শেষ রাজধানী ছিল ম্রোহাং। ম্রোহাংকে বাংলা কবিরা রোসাঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। এই রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। আরাকানে রোহিঙ্গাদের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীনকালে আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। এর আয়তন ছিল ২০ হাজার কি.মি.। তবে বর্তমানে এর আয়তন ১৪ হাজার বর্গ কি.মি.।

প্রাচীনকালেই আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। তখন আগমন ঘটেছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে, কিছু জলদস্যু আক্রমণের শিকার হয়ে ও জাহাজ ডুবির শিকার হয়ে। পরবর্তীকালে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে বিপুল পরিমাণ মুসলিম আরাকানে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি গড়ে।

পঞ্চদশ শতাব্দী আরাকানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শতাব্দীর শুরুতে আরাকান রাজ মিন সাউ মুন বার্মার উপর আক্রমণ পরিচালনা করে ব্যর্থ হন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মা রাজ তার রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাকে বহিষ্কার করলে তিনি বঙ্গদেশে চলে আসেন। বঙ্গরাজার সহায়তায় ১৪৩০ সালে রাজা মিন সাউ মুন কয়েক হাজার মুসলিম সৈন্যের সহায়তায় পুনরায় আরাকান গমন করেন এবং যুদ্ধে বার্মারাজকে পরাজিত করে পুনরায় রাজ্য উদ্ধার করেন। এ সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে রাজা সুলাইমান শাহ নাম ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেন। এ সময় আরাকান অনেকাংশে বঙ্গরাজের সালতানাতের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

আরাকান রাজসভায় মুসলিম আমাত্যরা উচ্চপদ লাভ করেন। এদের একজন মাগন ঠাকুর। তার পিতা বড় ঠাকুর আল্লাহর কাছে অনেক মানত করে পুত্র লাভ করেন। তাই তার নাম মাগন রাখা হয়। মাগন ঠাকুর ইসলামের প্রথম খালিফা আবু বকরের (রা.) বংশধর। তার মন্ত্রিসভা অনেক বাঙালি কবি ও গুণী ব্যক্তি অলঙ্কৃত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মহাকবি আলাওল। মাগন ঠাকুরের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। পদ্মাবতী, সতী ময়না লোর চন্দ্রানী, সিকান্দার নামা, সায়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, তোহফা, হপ্ত পয়কর প্রভৃতি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো এ সময় রচিত হয়।

১৭৮৫ সালে বর্মী রাজ বদা উপ্যা আরাকান দখল করে পুনরায় বার্মার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সরকার আরাকানের জমিগুলো চাষযোগ্য করতে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বহু লোক আরাকানে নিয়ে যায়। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, মায়ানমারের মিনবিয়া এবং ম্রোক-ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থীরা প্রায় ৫,০০০ মুসলমানকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। জাপানীদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থী অস্ত্রধারী মুসলমানদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল। জাপানীরা হাজার হাজার রোহিঙ্গারে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল।

এই সময়ে প্রায় ২২,০০০ রোহিঙ্গা সংঘর্ষ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। জাপানী এবং বর্মীদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।

ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে যখন আদমশুমারি হয় তখন ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদের গণনা করেনি। রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু সেখান থেকে। স্বাধীনতার পর মিয়ানমার সরকার জাতীয়তার তিন স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করায়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে জানা গেছে জাতীয়, সহযোগী ও আনুগত্যশীল -এই তিন প্রকারের নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস ঘোষণা করা হয়। যারা ব্রিটিশ শাসনের আগে এসেছে তাদের জাতীয় নাগরিক বলা হয়।

স্বাধীনতার পর সহযোগী ও আনুগত্যশীল নাগরিকদের আবেদন করতে বলা হলে রোহিঙ্গারা তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ তারা আগে থেকেই সেখানে আছে। এই গণনার পরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে স্ট্যাটাসহীন হয়ে পড়ে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তার বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়।

বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।

১৯৭৮ সালে পরিচালিত কিং ড্রাগন অপারেশনে ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এদের মধ্যে ৩ লাখ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশে ফিরে যায়, ২ লাখ সৌদী আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে চলে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে।

এদের মধ্যে ২ লাখ রোহিঙ্গা দেশে ফিরে গেলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিতদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে এমন অভিযোগে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে যায়। তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় দুইটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবী।

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে মংডুর বেশ কয়েকটি বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা হামলা করে ৯ বিজিপি সদস্যকে খুন, ৬৪ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায়। মিয়ানমার সরকার এই হামলার জন্য রোহিঙ্গাভিত্তিক স্বাধীনতাকামী সংগঠন আরএসওকে দায়ী করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা শুরু করে। হেলিকপ্টার গানশিপ, মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলায় ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

এ ছাড়াও ১২ শত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। শিশু ও নারীদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। মিয়ানমারের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এই হামলার খবর শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্ন তথ্য উপত্তের মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে তাদের মতে, এটা রোহিঙ্গাদের জাতিগত দাঙ্গা।

এদিকে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী সু চি এই হামলায় একেবারে নীরবতা পালন করায় বহির্বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে ব্যাপকভাবে। আসলে গণতন্ত্র আসলেও মিয়ানমার সরকার এখনো ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনাবাহিনীর লে. জে. পদমর্যাদার একজন অফিসার। সেনাবাহিনী সুকৌশলে সু চির আন্তর্জাতিক শান্তিবাদী ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করে দিচ্ছে এটা তিনি বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না।

মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা গণহত্যায় আন্তর্জাতিক বিশ্ব রহস্যময় ও বেদনাদায়ক নীরবতা পালন করছে। জাতিসংঘসহ কোনো কোনো সংস্থা মুখ খুললেও যতটা কঠোর হলে মিয়ানমারকে এই হামলা বন্ধে বাধ্য করা যেত তা তারা করছে না।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারি গ্রসম্যান আমাকে মিয়ানমার সমস্যা ব্রিটিশের সৃষ্টি বলে দায়ী করে তা বন্ধে তিনটি উপায়ের কথা বলেন। তার মতে, এই মানবিক বিপর্যয় কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তিনটি উপায় অবলম্বন করতে হবে। ১. রোহিঙ্গা সমস্যাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইউরাথু ভিক্ষু ও তার ৯৬৯ আন্দোলনকে টেরোরিস্ট ঘোষণা করতে হবে এবং ৩. মিয়ানমারের থেকে সকল প্রকার সহায়তা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি, আরবলীগসহ প্রভাবশালী মুসলিম দেশ ও সংস্থা সমূহের নীরবতা নীল কষ্টের মতো মেনে নেয়া যায় না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বাংলাদেশ চাইলেই রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না। রোহিঙ্গারা আসছে, অথচ বাংলাদেশ অফিসিয়ালি তা অস্বীকার করে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবী করার সুযোগ হারাচ্ছে। শরণার্থীদের প্রতিপালনে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। কাজেই অবলিম্বে সরকারীভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমণের সত্যতা স্বীকার করে সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে।

রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের জন্য যতই দুর্ভার হোক মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের সাগরে ঠেলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ বারবার ঘোষণা করেছে, এ দেশের মাটিতে প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসীদের কোনো প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কিন্তু রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী নয়, মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশই পারে স্বল্প সময়ের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।

সিরীয় শরণার্থীরা যখন ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল তখন আমরা ইইউ রাষ্ট্রগুলোর মানবিকতা প্রদর্শন প্রত্যাশা করেছি। আজ রোহিঙ্গাদের সাথে কেন আমরা একই মানবিকতা প্রদর্শন করবো না? বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেদিন ভারত আশ্রয় না দিলে বাংলাদেশীদের পরিণতি কি হতো তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের এই এক কোটি শরণার্থীই সেদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বিশ্বমঞ্চে কথা বলা সুযোগ করে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনা চাইলেই, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভার হয়ে বসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রসঙ্গ টেনে ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলতে পারেন। এই শরণার্থীদের প্রতিপালনে ও ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে পারেন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। এতে বিশ্বনেত্রী হিসাবে তার ভাবমর্যাদা ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি পারেন না মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজের ও দেশের জন্য গৌরবের সেই মহান উপলক্ষ হতে?
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শুমারি সফল করতে কক্সবাজারে উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুুষ্ঠিত

01

নিজস্ব প্রতিনিধি:

সরকারের চলমান ‘অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শুমারি’ সফল করতে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন জায়গায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সাথে মতবিনিময় ও উদ্বুদ্ধকরণ সভা করেছে জেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা।

সোমবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত হিমছড়ি কাইন্দাভাঙা, কলাতলীর শুকনাছড়ি এবং মুজিবনগর এলাকায় পৃথকভাবে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আরাকানী রোহিঙ্গা শরনার্থী কল্যাণ পরিষদ আয়োজিত এ সভায় প্রচুর পরিমাণ অনিবন্ধিত আরাকানী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণ করেন।

সভায় শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুফল নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যানব্যুরো কক্সবাজার স্ট্যাটিস্টিক অফিসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওয়াহিদুর রহমান ও আন্তর্জাতিক অভিভাসন সংস্থা (আইওএম) এর কর্মকর্তা মোবাশশের আলম।

সরকারের এই শুমারি সফল করতে সবাইকে নিবন্ধন কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সবদিক দিয়ে সুরক্ষিত করার অনুরোধ জানিয়ে বক্তব্য রাখেন আরাকানী রোহিঙ্গা শরনার্থী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি এ্যাডভোকেট নুরুল আমিন, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার শাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ছিদ্দিক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাঈদ প্রমূখ। এছাড়া সভায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত ছিলেন।

মতবিনিময়সভা আরাকানী রোহিঙ্গা শরনার্থী কল্যাণ পরিষদ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশে অবস্থানরত আরাকানি রোহিঙ্গাদের সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা শরণার্থী কল্যাণ পরিষদ’ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম কানুন মেনে চলার তাগিদ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের মনোভাব সৃষ্টি, সর্বোপরী মৌলবাদ জঙ্গীবাদ অসম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত একটি নিরাপদ রোহিঙ্গা সমাজ বিনির্মাণের চেষ্টা করছে তারা।

উল্ল্যেখ, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে প্রাথমিক তালিকা সংগ্রহের কাজ। চলবে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই পাঁচ দিনে সংগ্রীহিত তালিকা যাচাই বাছাই করে মার্চের শেষ সপ্তাহেই চূড়ান্ত হবে শুমারীর কাজ। এই শুমারী কার্যক্রম জাতিসংঘের সার্বিক তত্ত্বাবধানে হচ্ছে।

সভায় সাধারণ রোহিঙ্গরা দারি তুলেন, শুমারী পরবর্তীতে যে পরিচয়পত্র তাদের প্রদান করা হবে তাতে অবশ্যই রোহিঙ্গা জাতিসত্ত্বার পরিচয় থাকতে হবে।

টেকনাফে নিয়ন্ত্রণহীন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলো : বিপাকে স্থানীয়রা

রোহিঙ্গা ক্যাম্প
মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান, টেকনাফ :

নিয়ন্ত্রহীন হয়ে পড়েছে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণে বিপাকে পড়েছে স্থানীয়রা। উখিয়া-টেকনাফে যে সমস্ত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে তাদের সম্প্রতি সময়ের কার্যকলাপে এই ধারণা করছেন বিশ্লেষক মহল।

 

সরকার বিরোধী সহিংসতায় অর্থের বিনিময়ে ক্যাম্প গুলোর রোহিঙ্গারা অংশ নিতে পারে বলেও মনে করে তারা। বোদ্ধাদের রোহিঙ্গাদের প্রতি সন্দেহের তীর ছুঁড়ার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে শরর্ণার্থীরা ক্যাম্পের ভেতরে বাইরে অবাধ বিচরণ করার মতো সুযোগ থাকার কারণে। উখিয়া টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অনেকটা অপ্রতিরুদ্ধ। ক্যাম্পের থেকে যখন ইচ্ছে বের হতে পারে বাংলাদেশে আশ্রিত এসব ভিনদেশী নাগরিক। আর এ কারণে যেকোন কাজে ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা যাচ্ছে অর্থের বিনিময়ে।

এমতাবস্থায় দেশের চলমান অস্থিরতায় রোহিঙ্গাদের যে কোন সহিংসতামুলক কর্মকাণ্ডে অল্প পারিশ্রমিকে সন্তুষ্ট রোহিঙ্গাদের ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

একাধিক সূত্র মতে, ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামু এবং ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়াসহ জেলার বৌদ্ধ মন্দিরে হামলায় রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততার রয়েছে মর্মে খবর বেরিয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। এছাড়াও ১৫ ফ্রেব্রুয়ারী কক্সবাজার শহরে জামায়াত শিবিরের সহিংসতায় তিন জনের মৃত্যু হয় পুলিশ- জামায়াত সংঘর্ষে। আর এ ঘটনায় পুলিশ ৬ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে। এ সহিংসতায় অংশগ্রহনের অভিযোগে এসব রোহিঙ্গাদের আটক করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এছাড়া বিভিন্ন সয়ম টেকনাফের লেদা, নয়াপড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বেশ কয়েকবার পরিত্যক্ত অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয় বিজিবি পুলিশ। এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প গলোতে খুন খারাবির ঘটনাও ঘটে অনেক সময়। তবুও থেমে তারা এখনো অপারাধ করে আসছে ভয়ঙ্কর রোহিঙ্গারা।

স্থানীয়রা বলছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো নিয়ন্ত্রণে না থাকার কারণে যেনতেন ভাবে রোহিঙ্গারা নিজেদের পরিচালিত করছেন। ক্যাম্পের চারদিকে দীর্ঘদিন সীমানা প্রাচীর না থাকার কারণে তারা অপরাধমুলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারছে যখন তখন।

জানা যায়, উপজেলায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর থেকে দিন দিন নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে প্রশাসন। মানবিক বিপর্যস্তের অজুহাতে টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আশ্রিত বার্মাইয়ারা এখন প্রতিদিন অপরাধ জগতে ঢুকে পড়ছে।

এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প থেকে স্থানীয় লোকালয়ে অবাধ বিচরণের স্বাধীনতা দেয়া। বলা হচ্ছে পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে আছে দীর্ঘদিন থেকে টেকনাফ শরণার্থী শিবিরগুলো। মিয়ানমার থেকে নানা কারণে বিতাড়িত এসব রোহিঙ্গারা অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাসের জায়গা হিসেবে ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়ম বেঁধে দেয়া হলেও সেখানে যা ইচ্ছে তাই করছে এসব ভিনদেশীরা। আশ্রিত হিসেবে তাদের জীবনযাত্রায় সীমাবদ্ধতার কোন কিছুই মানছেনা রোহিঙ্গারা।

অভিযোগ আছে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে বিভিন্ন এনজিও সংস্থার প্রত্যক্ষ মদদে নানা অপরাধ কর্মকান্ডের প্রাক্টিস করে থাকে। এছাড়া অস্ত্র বানানো, মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন অপকর্মের পশরা বসায় তারা সেখানে। সব চেয়ে মারাত্বক ও ঝূঁকিপূর্ণতা হচ্ছে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে যে কোন সময় আসা যাওয়া করতে পারে। এভাবে যখন তখন যেখানে সেখানে আসা যাওয়ার ফলে তারা ইচ্ছামত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পুনর্বাসিত হচ্ছে।

তাছাড়া সেখানে সন্দেহভাজন অপরচিত মানুষের আনা গোনা চলে প্রতিদিন। দীর্ঘদিন থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গাইড ওয়াল বা কাঁটা তাঁরের বেড়া না থাকার কারণে তাদের এই অবাধ বিচরণ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অরক্ষিত এমনকি প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারী না থাকার কারণে এখানে নানা ঘটনার সূত্রপাত ঘটছে। শুধু তাই নয় রোহিঙ্গারা ব্যবহার হচ্ছে রাজনীতিতে।

নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরের ক্যাম্প ইনচার্জ জালাল উদ্দিন এ প্রতিবেদককে জানান, কোন রোহিঙ্গা যদি কোথাও জরুরী কাজে যেতে চায় তবে তাকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু ক্যাম্পের চারিদিকে কোন গাইড ওয়াল বা কাটাতাঁরের বেড়া না থাকায় কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

টেকনাফের নায়াপাড়া, মোছনি, লেদা পৃথক ৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প রয়েছে। যেখানে প্রায় লক্ষাধিক মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা বসবাস করছে। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে আসায় মানবিক কারণে তাদের বাংলাদেশ সরকার আশ্রয় দেয় ওই সব ক্যাম্পে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নানাভাবে সেবা দিয়ে আসছে বিভিন্ন এনজিও সংস্থা। এরপরও আরো বেশি সুযোগ সুবিধার জন্য রোহিঙ্গারা বাইরে বের হয়ে নানা অপরাধমুলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে টাকার বিনিময়।

তড়িতভাবে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলো প্রশাসনের কঠোর নজরদারীতার মধ্যে নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন এখানকার সচেতন মানুষেরা।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অস্থিরতার নেপথ্যে

images-ববব

সালিম অর্ণব

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংঘাত ও সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল শিকড়টা খুঁজতে গেলে প্রথমে চোখ বুলাতে হয় ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উগ্রবাদী বৌদ্ধ আর স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলিম গোষ্ঠীর সংঘাত চলতে থাকে যুগের পর যুগ।

অন্যদিকে সামরিক শাসনের কষাঘাতে জর্জরিত মিয়ানমারের মানুষ শান্তি বলতে সত্যিকার অর্থে কী বোঝায়, সেটা প্রত্যক্ষ করতে পারেনি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে। একের পর এক সামরিক জান্তার দুর্বিষহ শোষণ আর গণনিপীড়নে অস্থির জনজীবনে আরেক বিভীষিকার নাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বিশ্বজুড়ে গণমানুষের মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বৌদ্ধমাত্রই শান্তিপ্রিয়, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকা মুণ্ডিত মস্তকের বিদ্বান ব্যক্তি; যা মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধদের সঙ্গে একটুও মেলানো যাবে না। বেসামরিক জনতার ওপর সামরিক সরকারের দলনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষের প্রাণ যেখানে ওষ্ঠাগত, সেখানে যুক্ত হয়েছে মাদকের কালো ছোবল। পক্ষান্তরে আনুষঙ্গিক নানা দুরবস্থায় মিয়ানমারের উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্ত উত্তেজনার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।

বলতে গেলে বিগত এক দশকে মিয়ানমারের কোনো সংবাদপত্রের পাতায় এক দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাদে উল্লেখযোগ্য সংবাদ ছাপা হয়নি, যাতে মানুষ আশাবাদী হতে পারে। অং সাং সু চি নামমাত্র শান্তির বারতা নিয়ে মিডিয়া স্টান্ট হাজির করে নোবেল জিততে পেরেছেন ঠিকই। কিন্তু আমজনতার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দিতে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ— এটা এখন বলা যেতেই পারে।

সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবিরোধ, যার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বলতে গেলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের এ সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদির আগমন, দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে রুশ-মার্কিন-চৈনিক ভাবনার বিপ্রতীপে ভারতীয় বিদেশনীতি— সবই অবস্থাবিশেষে গুরুত্বের দাবি রাখে।

দৈনিক সংবাদপত্রগুলো থেকে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৮ মে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান নিহত হন। এ সময় দখল-সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলায় দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘসময় গুলি বিনিময় হয়। এ গুলি বিনিময়ে হতাহতের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। মিজানের মৃত্যুর পর সাময়িক বিরতি দিয়ে ৩ জুন ওই সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, আবার গোলাগুলির খবর শোনা যায় সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ৫ জুন মিয়ানমারের মংডুতে বিজিবি ও বিজিপির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ বৈঠকে তারা সুবেদার মিজানের হত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু ঠিক তার পরদিনও সীমান্তে গুলিবর্ষণ অব্যাহত ছিল বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে।

হঠাৎ করে অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত মিয়ানমারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সীমান্তরক্ষীদের বিজিবির ওপর চড়াও হওয়াটা কোনো আশার কথা বলে না। এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে অনেক প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ সীমান্তে হঠাৎ করে উত্তেজনা বাড়ল কেন? মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীইবা কোন দুঃসাহসে এবং কার ইন্ধনে কোনো হুঁশিয়ারি ছাড়া গুলি করে হত্যা করল বিজিবি সদস্যকে? অনেক বিশ্লেষক এটাকে নিছক দুর্ঘটনা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির ফল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবেন, যেটা কোনো অংশেই ঠিক নয়; উপরন্তু এ-জাতীয় বিভ্রান্তিকর চিন্তা ওইসব বিশ্লেষকের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রজ্ঞা ও শিষ্টাচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একটু খেয়াল করলে সাধারণ্যেই স্পষ্ট হয়, এ গোলাগুলি কোনো ভুল বোঝাবুঝির ফল নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কারো উসকানির ফল। বিশেষ করে এই গুলি ছোড়া যদি ভুল বোঝাবুঝিই হবে, তাহলে দ্বিতীয়বার মিয়ানমারের বিজিপি বাংলাদেশী বিজিবির ওপর গুলি ছুড়ত না।

পররাষ্ট্রনীতির কিছু বিষয় ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করাটা বাংলাদেশের জন্য খুব জরুরি। অন্যদিকে সে বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারও বেশ ওয়াকিবহাল। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই বিমসটেকের সদস্য। পাশাপাশি বিসিআইএম নামক উপআঞ্চলিক জোটেও মিয়ানমার রয়েছে। এর থেকে ধরে নেয়াই যেতে পারে মিয়ানমারের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী নীতিতে সাফল্যের মুখ দেখবে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের চলমান সীমান্ত উত্তেজনা আর যা-ই হোক, দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশেষ টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে; যা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশেরই ক্ষতির কারণ। যেমন— কুনমিং-কক্সবাজার সড়কের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ থাকলেও সীমান্ত সংঘাতে সৃষ্ট শীতল সম্পর্ক মিয়ানমারের পক্ষে এ সড়কের অনুমতি প্রদানের অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়কের মাধ্যমে কুনমিংয়ের সংযুক্তির কথা থাকলেও তা এখন ঝুলে পড়েছে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনীতির পুরোটাই সেনাশাসকদের অধীনে পর্যুদস্ত। নোবেলজয়ী নেত্রী সু চি শুধু মুখে মুখে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললেও পর্দার আড়ালে কাজ করে সেখানে একটি মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছেন। আর এজন্য সুকৌশলে কিংবা সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে আদিবাসী মুসলিমদের উত্খাত করাটা তাদের জন্য খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জেনারেল নে উইনের আমলে আরাকানে জাতিগত আন্দোলন দমনের নামে ১৯৭৮ সালে যে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালানো হয়েছিল, তার কালো থাবা আরো বেশি করে উসকে দেয় জাতিগত দাঙ্গাকে। তখনকার আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে হত্যা করা হয় হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষ, শিশুকে। তাদের আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নিপীড়ন ও ধর্ষণে বাধ্য হয়ে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর মিয়ানমারের সামরিক শাসক থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী নেত্রী সু চি সবাই এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যত বেশি অত্যাচার করা হবে, তারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটতে থাকবে, প্রকারান্তরে অনেক পরিষ্কার হয়ে যাবে মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ।

রোহিঙ্গাদের ক্রমাগত আগমন জনসংখ্যার ভারে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য উটকো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথম প্রথম বাংলাদেশের কিছু মানুষ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে উপস্থিত হয়। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে এবং তার ফলও লাভ করে বেশ দ্রুত। ১৯৭৯ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি কিছু শরণার্থী রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরার পথ করে দেয়। এ সময় বাদ সাধে নাগরিকত্ব আইন। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ১৯৮৩ সালের পর মিয়ানমারে আগত রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে। বলতে গেলে এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ চলাচল একরকম নিষিদ্ধই হয়ে যায়। পাশাপাশি এ আইনও করা হয় যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে গিয়ে বাস করতে পারবে না। উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকার পাশাপাশি দুই সন্তানের বেশি হলে পিতামাতার ওপর নির্যাতন চালায় সামরিক বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে শিশুসন্তানকে হত্যাও করে তারা। রোহিঙ্গাদের বিয়েতে পর্যন্ত আরোপ করা হয় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। ফলে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকে বাংলাদেশ সীমান্তে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা চাইছে না রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। উপরন্তু তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারেরই রাজনৈতিক সমস্যা, যার অংশ বাংলাদেশ নয়। কিন্তু তারা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট, আরাকান ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন— এসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশইন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তত্পর থাকায় মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার কাজ অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তাই বিশেষ গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থায়ী উত্তেজনা বজায় রাখার পথ সুগম করতেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে মিয়ানমারের লুন্থিন বাহিনী।

গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল বলা যেতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠকও করেন। তখন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক বৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, তখন বাংলাদেশের সহযোগী হতে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল মিয়ানমার। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সবার মনে এখন একটিই প্রশ্ন মাত্র দুটি মাসের ব্যবধানে এমন কী ঘটে গেছে, যা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে রক্ত ঝরাচ্ছে? আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলতে চাইছেন নিছক ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। তবে তার বাইরে আরো কিছু কারণ আছে, যেটা কোনো আশার কথা বলছে না।

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত শান্ত আছে, এমনটি নয়। বিশেষত আদিবাসী রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশ পাঠানো, নাফ নদী থেকে বাংলাদেশী জেলেদের পাকড়াও করা, নাইক্ষ্যংছড়ির অরণ্যে কাঠুরিয়াদের নির্যাতন দুটি দেশের শীতল সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিধ্বস্ত মিয়ানমার গ্রাস করতে চাইছে বাংলাদেশকে। সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা প্রাণঘাতী ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের চোরাচালানিদের নিয়ে আসা ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের ড্রাগস আটকে দিতে সদাতত্পর আমাদের সাহসী সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এগুলোর পাশাপাশি অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর কাজে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারেও বাধা দেয় বিজিবি সদস্যরা। সম্প্রতি কোস্টগার্ডের সহায়তায় নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়া বেশ কয়েকটি বহর আটকে দেয় তারা। বলতে গেলে নিছক দুর্ঘটনা তো নয়ই বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমান্তে ত্রাস সৃষ্টির জন্য বিজিবির মিজানুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে লুন্থিন বাহিনী। একে তাই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ না করে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রক্ষার প্রয়োজনে অনর্থক সংঘাত ও উত্তেজনা কাম্য নয়।

রাঙামাটির লংগদুতে ৪২ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ও অবৈধ বসতি স্হাপন

রোহিঙ্গা রাঙামাটিতে

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

পার্বত্য রাংগামাটি জেলার লংগদু উপজেলার বগাচত্তর এবং গুলশাখালীতে ৭ রোহিঙ্গা পরিবারের ৪২ জন সদস্যের অবৈধ বসতি স্হাপনের খবর পাওয়া গেছে । অনুসন্ধানে জানা যায়, আরাকানের পকতু এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা মহেশখালীর ধলঘাটায় কিছুদিন পালিয়ে অবস্হান করার পর কৌশলে পার্বত্য জেলা রাংগামাটির লংগদুতে অনুপ্রবেশ করে ।
 
সরেজমিনে ঘটনাস্হলে গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায় । এসময় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী ৪২ রোহিঙ্গার দলপতি মো. হোসেনের সাথে আলাপকালে তিনি প্রথমে নিজেদের রোহিঙ্গা পরিচয় দিতে অস্বীকার করেন । এসময় তাদের জাতীয় পরিচয় পত্র অছে কিনা জানতে চাইলে পরক্ষণেই তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে আরাকানের পকতু এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মগরা তাদের বাড়ি ঘর জালিয়ে দেয় এবং অসংখ্য রোহিঙ্গা নর নারী ও শিশুদের হত্যা করে । এ সময় তারা জীবন বাচানোর তাগিদে ইঞ্জিন চালিতে বোটে করে নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে । বাংলাদেশে তাদের জন্য নির্ধারিত আশ্রয় কেন্দ্র টেকনাফের নয়াপাড়া কিংবা উখিয়ার কুতুপালং শরনার্থী ক্যাম্পে না গিয়ে সরাসরি মহেশখালীর ধলঘাটা ও চকরিয়া চলে আসে এবং কিছুদিন পালিয়ে বসবাস করে । এরপর দীর্ঘদিন যাবত রাংগামাটির কাট্টলী বিলে ভূয়া পরিচয়ে জেলে সেজে মাছ দরার কাজে নিয়োজিত অপর এক রোহিঙ্গার সহায়তায় তারা রাংগামাটির কাট্টলী বিলে চলে আসে । কাট্টলী বাজারের সংকীর্ণ স্হানে বসবাসের সুবিধাজনক স্হান না পাওয়ায় তারা লংগদু উপজেলার বাঙালী অধ্যুষিত এলাকা বগাচতর এবং গুলশাখালীতে প্রবেশ করে এবং স্হায়ীভাবে বসবাস করার উদ্দেশ্য তারা ইতোমধ্যই উক্ত এলাকায় কিছু পরিমাণ জমি ক্রয় করে অবৈধ বসতি স্হাপন করার চেষ্টা করছে ।
 
জানা গেছে, সিদ্দীক মাস্টার নামে স্হানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাদের কাছে ৪০ শতক জমি বিক্রয় করে । বর্তমানে রোহিঙ্গারা তাদের ক্রয়কৃত ঐ জমিতেই ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে । এমন কি বেশ কিছু রোহিঙ্গা শিশুকে নিকটস্হ প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ভর্তিও করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করা গেছে।
 
এ ব্যাপারে গুলশাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুর রহিম বলেন, বিষয়টা আমি জানতাম না। পরে শুনেছি, আমাদের এলাকার সিদ্দিক মাস্টার নামে এক ব্যাক্তি কাঠাপ্রতি ২৫ হাজার টাকা দাম নিয়ে ৮ কাঠা জমি বিক্রয় করেছে। জানার পর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নানা ব্যস্ততায় আমি সময় পাইনি। এখন ডেকে জিজ্ঞাসা করবো।
 
স্থানীয় জমি বিক্রেতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিক মাস্টার টেলিফোনে পার্বত্যনিউজকে বলেন, তারা আমার কাজে জমি ক্রয়ের আগ্রহ প্রকাশ করলে আমি তাদের কাছে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট দেখতে চাই। তারা আমাকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এক চেয়ারম্যানের সার্টিফিকেট এনে দেখায়। কাজেই তারা রোহিঙ্গা বলে আমি জানি না। বাঁশখালী থানার কোন ইউনিয়ন পরিষদের সার্টিফিকেট দেখিয়েছে জানতে চাইলে সিদ্দিক মাস্টার পার্বত্যনিউজকে বলেন, সেটা এই মুহুর্তে আমার মনে নেই। আমি কাগজ দেখে আপনাকে পরে জানাবো।
 
স্থানীয় বাঙালীদের দাবী, জনসংখ্যার সুষম বিন্যাস হিসাবে যদি বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক এখানে এসে বসবাস করতো আমাদের আপত্তি ছিল না। কিন্তু ঘনসবতিপূর্ণ এই দেশে বিদেশী নাগরিকদের বসতি গড়তে দেয়ার মতো জায়গা নেই। একবার এই সুযোগ পেলে দলে দলে ওরা এই অঞ্চলে এসে জমা হবে। খোঁজ নিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে এভাবে বিপুল রোহিঙ্গার বসতি স্থাপনের খবর চাওয়া যাবে। তাছাড়া রোহিঙ্গাদের অন্যান্য রেকর্ড বিশ্লেষণ করে স্থানীয় প্রশাসনকে মানবিক দিক ও বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে একটি  সিদ্ধান্ত নিতে হবে।  
 
 

কক্সবাজার-বান্দরবান নিয়ে স্বাধীন আরাকান!

kk

রহমান মাসুদ ও ইলিয়াস সরকার:

বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রণপ্রস্তুতি নিচ্ছে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। নতুন লোকবল, প্রশাসনিক শক্তি ও ভারী অস্ত্র সংগ্রহের মাধ্যমে ক্রমেই ভয়ঙ্কর শক্তিধর হয়ে উঠছে মায়ানমারের এই বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠন।

এই জঙ্গি সংগঠনের তৎপরতা রোধে বাংলাদেশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রায়ই কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মায়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রায়ই বাংলাদেশ সীমান্তে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে আরএসও’র। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠী।

বাংলানিউজের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট রহমান মাসুদ ও স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ইলিয়াস সরকার এর দীর্ঘ সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এ বিষয়ে নানা চাঞ্চল্যকর ও ভয়ঙ্কর সব তথ্য। ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ পড়ুন প্রথম পর্ব।
 
বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত থেকে ফিরে: ২০১২ সালের জুন মাসের শুরুতে মায়ানমারের আরাকান রাজ্যে সংঘটিত সহিংসতায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)। ফলস্বরূপ, ৮ জুন (শুক্রবার) মংডু জেলার কোয়ারবিল মাদ্রাসায় জুম্মার নামাজের খুতবায় স্বাধীন ইসলামী আরাকান রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তারা।

দলের সামরিক শাখার প্রধান ও বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থানরত হাফেজ সালাউল ইসলাম ও তার ভাই কোয়ারবিল মাদ্রাসার মোহাতামিম হাফেজ হুজ্জাত স্বাধীনতার এ ঘোষণা দেন।

আরএসও’র এই স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্রের কল্পিত সীমানা মায়ানমারের সীমান্ত রেখা ছাড়িয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডেও ঢুকে পড়েছে বলে  দাবি করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। সূত্রের দাবি, বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাকে স্বাধীন আরাকান রাজ্যের ভূখণ্ড হিসেবে পেতে চায় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা।

আর এই আরএসও’র সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (আরএনও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা ডেমোক্রেটিক অর্গানাইজেশন (এআরডিও)।
 
বাংলাদেশে বসে স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন আরএসও’র সামরিক শাখার প্রধান সালাউল। সালাউলের আছে তিনটি বাংলাদেশি পাসপোর্ট। এসব পাসপোর্ট দিয়ে তিনি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব, দুবাই, ইয়েমেন, কাতার, ইরান, ইরাক, লিবিয়া, ওমান, মিশর, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন।
 
পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও কয়েকটি আরব দেশে তার জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, আরএসওকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, লস্কর-ই-তৈয়্যবা ও আল কায়েদাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন।
 
গত বছর কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদকে ধরতে কক্সবাজার পুলিশের সাদা পোশাকের একটি দল অভিযান চালায় চলতি বছরের এপ্রিলে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযানের এক পর্যায়ে কক্সবাজার পুলিশের এ বিশেষ দলটি বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির কুরিক্যং এলাকার ডলিঝিরির এক পাহাড়ে অবস্থিত জনৈক জিয়াবুলের বাড়িতে দুপুরের খাবার খায়। এরপর পুলিশের দলটি নিচে নামার সময় মসজিদের কাছে এসে পৌঁছালে চারদিক থেকে সশস্ত্র আরএসও সদস্যরা তাদের ঘিরে ফেলে এবং হাত-পা বেঁধে অস্ত্র কেড়ে নেয়। এ অবস্থায় চোখ বাঁধা পুলিশ দলটিকে নিয়ে যাওয়া হয়, পাহাড়ের আরএসও ক্যাম্পে। আটক পুলিশ সদস্যদের বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করেন স্থানীয় এক ইউপি সদস্য। পরে অস্ত্রসহ ছাড়া পায় আটকরা। বর্তমানে এ দলের দুই সদস্য (এএসআই) টেকনাফের রোহিঙ্গা অধ্যূষিত একটি ফাঁড়িতে কর্মরত।
 
নাইক্ষ্যংছড়ির গর্জনিয়া এলাকার কচ্ছপিয়া গ্রামে বসবাসরত আরএসও’র সাবেক এক কমান্ডার বাংলানিউজকে জানান,  অপহৃত পুলিশ সদস্যদের আরএসও’র যে ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাও ওই কুরিক্যং অঞ্চলে অবস্থিত। এ ঘাঁটির দক্ষিণ-পূর্বে ওয়াইচ্চাখালি, পশ্চিম-দক্ষিণে আবু তালেব হাজির বাগান। পশ্চিমে ইটের রাস্তা, পূর্বে কোয়ানজিরি মুখ, উত্তরপূর্বে বাঁশখোলা, উত্তরে কালিনজিরির সীমানা। প্রায় ৪/৫ কিলোমিটার জুড়ে এই ক্যাম্প এলাকা অবস্থিত। এ ক্যাম্প থেকে গর্জনিয়া বাজারে প্রতিদিন সকালে বাজার করতে আসে আরএসও’র সদস্যরা। এ বাজারে ওষুধের দোকানের মালিক (রোহিঙ্গা) ডা. সোনা মিয়ার দোকানে অবস্থান নেন তারা।

তাদের বাজার করে দেন স্থানীয় এক সাবেক মেম্বর এবং জনৈক রহিম ও আব্দুল আজিজ নামে স্থানীয় দুই ব্যক্তি। তিনি জানান, বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠন জমিউতুল আরাকানের নেতা মওলানা ছলিমও (৫৫) গর্জনিয়ায় বাড়ি করে আছেন।
 
আরএসও’র সাবেক এই কমান্ডার আরো জানান, টেকনাফের বাহারছাড়া ও শাপলাপুর, উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প, রামুর পোকখালী, লেঙ্গুরছড়ি, কাউয়ারখোপ, জোয়ারিয়া নালায় রয়েছে আরএসও’র সশস্ত্র অবস্থান। এছাড়া মায়ানমারের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদমে রয়েছে আরএসও’র সশস্ত্র ঘাঁটি।
 
এসব ঘাঁটিতে সব মিলিয়ে দুই হাজারের মতো সশস্ত্র সদস্য রয়েছেন। গত জুনে মায়ানমার থেকে সাগরপথে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের শাপলাপুরে আসেন ২৫০ জনের একটি সশস্ত্র গ্রুপ। সামরিক পোশাক পরিহিত এই দলটি পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে অবস্থান নেয় বলে স্থানীয় একটি সূত্র বাংলানিউজকে নিশ্চিত করে।
 
স্থানীয় শাপলাপুর পুলিশ ফাঁড়ির এক এএসআই বলেন, `স্থানীয়দের কাছে এ খবর শুনে আমরা দ্রুত পাহাড়ের দিকে যাই। কিন্তু, তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত তারা পাহাড় থেকে বের হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তারা সম্ভবত নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্তবর্তী জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন।`
 
কক্সবাজার পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, `আমরা শুনেছি আরএসও নতুন করে মায়ানমার থেকে লোকবল সংগ্রহের কাজ করছে। একই সঙ্গে চীন থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে নতুন নতুন ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করছে। কয়েকটি চালান অবশ্য ভারতে আটক হয়েছে।`
 
তিনি বলেন, `কুরিক্যংয়ে পুলিশ আটকের পর আরএসও’র পক্ষ থেকে কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে টেলিফোন করে জনৈক ইউনুস ওই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। এ সময় পুলিশকে জানানো হয়, মায়ানমারের গোয়েন্দা সংস্থার লোক অনুমান করে বাংলাদেশি পুলিশকে অপহরণ করেছিল আরএসও।
 
আরএসও’র এক সদস্য বলেন, `যতদিন পর্যন্ত স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র গঠিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত বাংলাভাষী আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলমানদের মগদের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।`

সৌজন্যে: বাংলানিউজ

টেকনাফে এক রোহিঙ্গা দালালসহ আটক-৫

মুহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান, টেকনাফ:
টেকনাফ উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়া মানব পাচারকালে এক রোহিঙ্গা দালালসহ ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ২১ অক্টোবর সোমবার ভোরে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশের এএসআই নূরুন্নবীর নেতৃত্বে শাহরীরদ্বীপ পশ্চিম পাড়া সাগর পাড়ের ভাঙ্গন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে আটক করে। আটককৃতরা হচেছ মিয়ানমার মংডু নয়াপাড়া এলাকার আব্দুস সালামের ছেলে দালাল লালু(২৮), কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি গরিপুর, নোয়াগাঁও এলাকার মোঃ হারুন মিয়ার ছেলে মোঃ সবুজ মিয়া(২২), একই এলাকার মোঃ সাদেকের ছেলে মোঃ শরীফ মিয়া(২৭), মকবুল হোসেনের ছেলে রুবেল(২৫), মৃত লালু মিয়ার ছেলে আনর আলী(৪৮)। আটককৃতদের আইনী ব্যবস্থা ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মানব পাচার আইনে মামলার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ।

এদিকে পাচারকারী সিন্ডিকেট থানায় মামলা ও লোকজনকে ছাড়িয়ে নিতে মোটা অংকের মিশন নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচেছ বলে জানাগেছে। স্থানীয়রা জানান, শাহপরীরদ্বীপ ডাঙ্গর পাড়ার  ফিরোজ,ঘোলা পাড়ার কবিরা, মিস্ত্রিপাড়ায় বার্মায়া নূর হাকিম, বাজারপাড়ার  ,শাহাব মিয়া, জালিয়া পাড়ার কালাম, আব্দুল গনি, মানব পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে। এ সব মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে থানায় একাধীক মামলা থাকলেও তারা আইনের আওতায় আসছেনা বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ রয়েছে।