ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের কবরগুলোর একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।- সম্পাদক।)

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে।সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।)

নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং কক্সবাজার নিয়ে

cht-map
ফারহান সাদিক :

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটিবান্দরবান জেলা এবং পার্শ্ববর্তী কক্সবাজার জেলা মিলে একটি নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে অতি সন্তর্পণে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে একটি দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র চলছে তা অনেকেই বিশ্বাস করলেও তার সাথে যে কক্সবাজারকেও সংযুক্ত করার আশঙ্কা আছে তা কিন্তু অনেকেই চিন্তা করছেন না।

এ অঞ্চলে কোনো নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে এবং তার সঙ্গে সমুদ্রসীমা না থাকলে তা হবে পরনির্ভরশীল রাষ্ট্র, যা হবে অতি দুর্বল। চীনকে সাইজ করার জন্য তার নিকটবর্তী দুর্বল রাষ্ট্র বাংলাদেশের গোলযোগপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে কোনো বেইজক্যাম্প স্থাপিত হলে তার সাথে গভীর সমুদ্রবন্দর থাকবে না বা সেখানে আমেরিকার নৌবহর ভিড়তে পারার পরিকল্পনা থাকবে না, এমনটা হতেই পারে না। এ কারণেই পশ্চিমাদের কল্পিত এ অঞ্চলে নতুন রাষ্ট্র স্থাপিত হলে দরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সাথে কক্সবাজার সমুদ্রসীমা

তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে যেমন পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্ব লাগিয়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তেমনি কক্সবাজারে বাংলাদেশী ও আরকানি মুসলিমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। আবার মাঝে মধ্যে ডুলাহাজারা খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতাল ও অন্যান্য পশ্চিমা এনজিও কতৃক ধর্মান্তরিত ও নিয়ন্ত্রিত খ্রিষ্টানদের সাথে মুসলিমদের ধর্মীয় বিরোধ সৃষ্টি করা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সংবাদ শিরোনাম করা যায়, যাতে পশ্চিমা বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থন নিয়ে খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করার উছিলা তৈরি হয়।

এ অঞ্চলে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির এই পরিকল্পনার সাথে আরকানি সংখ্যালঘুদের সম্পৃক্ত করতে ও তাদের সমর্থন পেতে তাদের শরণার্থী ক্যাম্পে লালন-পালন করা হচ্ছে এবং অল্প কয়েক শ’ শরণার্থীকে পশ্চিমা দেশে শ্রমিক হিসেবে স্থায়ীভাবে নিয়ে গিয়ে এক দিকে আরকানিদের বোঝাতে চায় যে, দেখো আমরা তোমাদের প্রতি তোমাদের বাঙালি মুসলিম ভাইবোনদের চেয়ে কত বেশি আন্তরিক, অন্য দিকে এ সবের আকর্ষণে আরো বেশি আরকানি এ দেশে চলে এসে এ এলাকায় যেন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। এমন এক সময় আসতে পারে যে দিন কক্সবাজারে মুসলিমদের থাকতে হবে আরকানি পরিচয় দিয়ে।

আরাকানকে স্বাধীন করে দেয়ার লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের সহজেই হাত করা যায়। এভাবে যেকোনো দেশে সংখ্যালঘুদের শক্তিশালীকরণের মাধ্যমেই কেবল মানচিত্র পৃথক করা সম্ভব হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করলে ভারত, মিয়ানমার, চীন ও পশ্চিমা বিশ্ব থাকবে উপজাতিদের পক্ষে। কক্সবাজারে আরকানিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে আরব বিশ্ব ও পশ্চিমা বিশ্ব থাকবে আরকানিদের পক্ষে। আরকানে মুসলিমদের সাথে মিয়ানমার সরকারের সমস্যা হলে বাংলাদেশ থাকবে আরকানিদের পক্ষে, চীন থাকবে মিয়ানমারের পক্ষে। সুতরাং সংখ্যালঘু উপজাতি ও রোহিঙ্গাদের যেকোনো অপতৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার কোনো ব্যবস্থা নিতে গেলেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ ও বিশ্ববাসী বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেবে। তখন তাদের জন্য পৃথক নতুন রাষ্ট্র করার দাবি জোরালো হবে এবং জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। যেমন পৃথক রাষ্ট্র করা হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানকে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও এ আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়। এ এলাকায় খ্রিষ্টান অধ্যুষিত একটি পৃথক নতুন রাষ্ট্র হলে ভারত, মিয়ানমার ও চীন কিন্তু ঝুঁকির মধ্যে পড়তে বাধ্য হবে। কারণ মিয়ানমার থেকে আরকান ও ভারত থেকে পূর্বাংশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার এবং চীন চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাবে। তবে লাভ হবে পশ্চিমা বিশ্বের। তারা এ এলাকার বাজার ও খনিজসম্পদ কব্জা করতে পারবে।

পার্বত্য উপজাতিদের যেমনি একাধিক সশস্ত্র সংগঠন আছে তেমনি আরকানিদেরও একাধিক আছে। তবে উপজাতিদের কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ থেকে পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করা অনেক সহজ হবে, আরকানিদের কাজে লাগিয়ে আরাকানকে স্বাধীন করার তুলনায়। কারণ বাংলাদেশ থেকে পৃথক করাটা ইন্দোনেশিয়া বা সুদান থেকে পৃথক করার চেয়ে কঠিন বিষয় নয়, কারণ তখন জন্ম হবে একটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত নতুন রাষ্ট্র

কিন্তু মিয়ানমার থেকে আরকানকে পৃথক করা ভারত থেকে কাশ্মীরকে পৃথক করার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন, কারণ তখন জন্ম হবে একটি মুসলিম দেশ। আরাকানিরা যদি মনে করে, পশ্চিমারা তাদের উপকার করবে, তবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। আর আরব বিশ্ব অর্থ সাহায্য প্রদান ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই করতে পারবে না। তাদের যদি কেউ কার্যকর সাহায্য করতে পারে তবে তা পারবে কেবল বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের সাহায্য পেতে হলে বাংলাদেশের সেবা করতে হবে… ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সার্বিক সহায়তা দেয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করেও শান্তি না আসা, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান ভূমিবিরোধ, কক্সবাজারে আরকানিদের মানবিক সহায়তা প্রদান করা, ডুলাহাজারার মালুমঘাটে জনমানবহীন পর্বত ও সমুদ্রের সংযোগস্থলে খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতাল করা এবং দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তার মাধ্যমে ধর্মান্তরিত করে সে এলাকায় খ্রিষ্টান বসতি স্থাপন করা ইত্যাদি একই সূত্রে গাঁথা। শান্তিচুক্তির জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার না দেয়ার কারণও কিন্তু একই, সে চুক্তিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের অঙ্কুর থাকলেও পৃথক একটি নতুন রাষ্ট্র করার শতভাগ নিশ্চয়তা না থাকা।

বাংলাদেশের জনগণ যতই পরস্পর বিপরীতমুখী থাক না কেন, অন্তত সবাই দেশের ঐক্য ও সংহতির ব্যাপারে একতাবদ্ধ। এ একতার প্রতীক হচ্ছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং এ দেশের আলেম সমাজ। কারণ এ দু’প্রকার লোকের জন্য ভারত বা মিয়ানমারে কোনো আশ্রয়স্থল নেই। তাই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব লাগিয়ে এবং আলেম সমাজের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অপবাদ দিয়ে উভয়কেই দুর্বল ও অকার্যকর করার অপচেষ্টা চলছে। দেশের অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে হলে এক দিকে সবার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, অন্য দিকে পশ্চিমাদের কথা শোনা যাবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ইউএনডিপি ( UNDP ), ইউনিসেফ (UNICEF), ইউরোপীয় কমিশন (EU) ইত্যাদি সংস্থা ও এনজিওর (NGO) কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। তারা সাহায্য করতে চাইলে বাংলাদেশ সরকার বা সেনাবাহিনীর মাধ্যমেই করতে পারে। তারা বাংলাদেশের যে সেনাবাহিনীকে বিশ্বের যেকোনো স্থানে শান্তি স্থাপনের জন্য বিশ্বাস করে নিয়োগ করতে পারে, তাদেরই নিজ দেশের শান্তি স্থাপনের জন্য বিশ্বাস করতে না পারাটাই হচ্ছে চক্রান্তের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

পশ্চিমাদের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হলে তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকা চলবে না। আমাদের স্বনির্ভর হতে হবে। এ জন্য সর্বপ্রথম দুর্নীতিমুক্ত হওয়া চাই। কাপ্তাই জলবিদুৎ করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে যে দুর্নীতি হয়েছিল সে কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি শুরু। তাদের বাঙালি হয়ে যেতে বলে সে অশান্তিতে ঘৃতাহুতি দেয়া হয়। শান্তিচুক্তি করে সে দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়। এখন সেখান থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের চেষ্টার মাধ্যমে পৃথক একটি নতুন রাষ্ট্র ঘোষণার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে মাত্র। তাই সময় থাকতেই হুঁশিয়ার হতে হবে তা না-হলে পরে আফসোস করার জন্যও সময় পাওয়া যাবে না। তাই আসুন আজ থেকেই আমরা ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা শুরু করি এবং অন্তত এ ব্যাপারে যেন কোনো দলাদলি না করি।

লেখক : গবেষক

আজ মাহাবুল হত্যা দিবস

photo-1
কামাল হোসেন সুজন
আজ ১৭ মে, শহীদ মাহাবুল হত্যা দিবস। ১৯৮৮ সালের এই দিনে শান্তিবাহিনীর ব্রাশ ফায়ারে নিহত হয়েছিলেন ভিডিপি সদস্য মাহাবুল। রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় এই নির্মম ঘটনাটি ঘটে। প্রতিবছর মাহাবুল হত্যা দিবস আসে, আবার চলেও যায়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের কোন তদন্ত বা বিচার হয় না। নিজের জীবন দিয়ে সেদিন মাহাবুল একটি পুরো গ্রামকে রক্ষা করেছিলেন। তার জীবনের যেন কোন মূল্যই দিতে পারেনি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা।

শুধু মাহাবুল হত্যার কথাই বা বলি কেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও অনেক বঞ্চনার মধ্যে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠির মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার মূল্যায়নে কতটুকু গুরুত্ব দিতে পেরেছে বাংলাদশে সরকার, তার প্রশ্নও শাসক গোষ্ঠীর কাছে রইল? পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর চরম বৈষম্যের কথা কেনইবা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ল সেটাও জানি না। বর্তমান সরকার দেশের কলংকজনক অধ্যায় যুদ্ধাপরাধের বিচার কাজ সম্পন্ন করে জাতীয় গৌরব ও সম্মান অর্জনের গর্বে গর্বিত। কিন্তু পার্বত্য ট্টগ্রামের মাহাবুল হত্যাসহ আলোচিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডেরও বিচারের ব্যাপারে উদ্যোগ নেই।যদিও তা হওয়া অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। তা না হলে জাতি হিসেবে আমরা শুধু যুদ্ধাপরাধীর বিচার না করে দায়মুক্ত হতে পারব না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম শহীদ মাহাবুল হত্যা। রাংগামাটি লংগদু উপজলার গুলশাখালী ইউপির র্পূব-জালালাবাদ গ্রামের অধিবাসী আফতাব উদ্দীনের বড় ছেলে মাহাবুল আলম ৪৮ নং ভিডিপি প্লাটুনের সদস্য ছিলেন। ১৭ মে, ১৯৮৮ইং ঈদুল ফিতরের র্পূব দিন, ঐ প্লাটুনের কমান্ডার আক্কাছ আলীসহ ১২ জন ভিডিপির সদস্য, যুবলক্ষীপাড়া আর্মি ক্যাম্প হতে অস্র নিয়ে র্পূব-জালালাবাদ মেম্বারবাড়ী ক্যাম্পে ডিউটির উদ্দেশ্যে পৌঁছান। বন্টিত ডিউটি লিষ্টে মাহাবুলের ছিল লাস্ট ডিউটি, কিন্তু কমান্ডারের নির্দেশে মাহাবুল সদস্য মোতালেবের পরিবর্তে সন্ধ্যার সময়ই একই ক্যাম্পের ৩নং পোস্টে কর্তব্য পালনের জন্য থ্রী-নট- থ্রী রাইফেল নিয়ে পোস্টের দিকে যেতে থাকেন। এমন সময়ই শত্রুদের এলএমজির ব্রাশ ফায়ারে লুটিয়ে পড়েন মাহাবুল।

পোস্টের পাশের ঘরেই থাকতো মাহাবুলের জননী জাহদো খাতুন। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে সেখান থেকেই প্রিয় সন্তান মাহাবুলকে ডেকেছিলেন, ‌‍‍”বাবা মাহাবুল, সারা দিন পরিশ্রম করেছো, ভাত খেয়ে যাও”। জবাবে মাহাবুল বলেছিল, “মা ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবো, সামান্য অপেক্ষা করো”।

কিন্তু ২০ ঘন্টা, ২০ দিন, ২০ মাস, ২০ বছর নয় ২৬ বছরেও ঐ ২০ মিনিটের অপেক্ষার প্রহর শেষ হল না। পোস্টে ঢোকার সাথে সাথে সামনে থেকে শত্রুর এলএমজি’র ব্রাশ ফায়ার মাহাবুলের বুকে বিদ্ধ হল, মাহাবুল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কালিমা পাঠ করতে করতে শাহাদাৎ বরণ করেন। সাথে সাথে ব্যাপক সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয় কমান্ডার আক্কাছের নেতৃত্বে, দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর ভিডিপি সদস্যদের সাথে টিকতে না পেরে পালিয়ে যায় শান্তিবাহিনীর হায়েনারা, শত্রু মুক্ত হয় গ্রাম। মাহাবুলের জীবনের বিনিময়ে বেঁচে যায় পুরো একটি গ্রাম।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত-বিচার কোনটাই এখন পর্যন্ত হয়নি। বরং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে ঐসব হত্যাকান্ডের খুনিরা সরকারি দায়মুক্তি পায়, কিন্তু পবিত্র সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৫ ধারায় সকল নাগরিকে বিচার পাবার মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

তাই রাষ্ট্র-সরকার-পার্লামেন্ট নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তিতে ঐসব খুনিদের দায়মুক্তি দিলেও তা অবৈধ।

অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামের মাহাবুল হত্যাসহ সকল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে খুনিদের বিচার করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ঐ আলোচিত হত্যাকান্ডগুলোর বিচার করতে হবে।

শুধু তাই নয়, আজও পাহাড়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তা ঘটছে মূলত আগের ঘটনাগুলোর বিচারহীনতার কারণেই।

উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস ও ইউপিডিএফ প্রতিনিয়ত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে হত্যা-গুম-নৈরাজ্য অব্যাহত রেখেছে। স্বাধীন সার্বভৌমত্ব এই বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে এমন অন্যায় চলতে দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ তা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভেবে দেখা দরকার। দেশে সরকার, আইন ও বিচার বিভাগ সক্রিয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের অপরাধীদের বিচার হচ্ছে কোথায়? অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে সারাসরি অভিযানের মাধ্যমে অবৈধ অস্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করতে হবে।

এখানে শুধু বাঙ্গালী নয়, শান্তিকামী প্রত্যেকটা উপজাতীয় জনগোষ্ঠির জীবন জীবিকা রুটি রোজগার কতিপয় উপজাতীয় সন্ত্রসী দ্বারা ঝুঁকিপূর্ণ।

আমরা শহীদ মাহাবুল হত্যাসহ সকল হত্যাকণ্ডের বিচার চাই, পার্বত্যবাসীর শান্তি চাই, পারস্পারিক সহমর্মিতা চাই, সহঅবস্থান চাই, ভ্রতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উভয় সম্প্রদায় শান্তিতে বসবাস করতে চাই।

পার্বত্যবাসীদের এই ডাক, আকুতি শোনার মত সময় সুযোগ কি সরকার বা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর আছে? যদি তা না থাকে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যর্থ হবে সরকার এবং রাষ্ট্র, স্বাধীন দেশের এ ব্যর্থতার বোঝা যেন আর জাতিকে বহন করতে না হয়, এই আকুতি সংশ্লিষ্টদের কাছে রইল।

লেখক : শহীদ মাহাবুলের ছোট ভাই, এলএলবি(শেষপর্ব), বঙ্গবন্ধু ‘ল’ টেম্পল, চট্টগ্রাম

পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়নের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে তিন পাহাড়ি সংগঠনের মানববন্ধন

Manikchari human chain program

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক :

পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়নের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আজ  বুধবার সকালে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের চেঙ্গী স্কোয়ার, পানছড়ি, মহালছড়ি, দীঘিনালা, গুইমারা, মানিকছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি এবং রাঙামাটি জেলার কুদুকছড়ি, কাউখালী, নান্যাচর, বাঘাইছড়ি ও সাজেকে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন এ মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে।

খাগড়াছড়ি জেলা:

খাগড়াছড়ি সদর: পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন করেছে। ‘আইন শৃংখলার নামে পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থার ক্রস ফায়ার-চাঁদাবাজি-অপহরণ-গ্রেফতার বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে পাহাড়ি-বাঙালি এক হও’ শ্লোগানে বুধবার সকাল ১০টায় জেলা শহরের চেঙ্গী স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি বিপুল চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)-এর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা ইউনিটের সংগঠক চরণসিং তঞ্চঙ্গ্যা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অংগ্য মারমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক বিজয় চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি মিশুক চাকমা প্রমূখ।

মানববন্ধনে ‘র‌্যাব মোতায়েন = ক্রস ফায়ার-অপহরণ বাণিজ্য সম্প্রসারণ’; ‘রাষ্ট্রীয় খুনী সংস্থা র‌্যাব বাতিল কর’ ; র‌্যাব মোতায়েন, ‘পার্বত্য চুক্তি’ বাস্তবায়ন???’ ইত্যাদি শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীসহ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩ শতাধিক নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন।

মহালছড়ি : ‘সরকারের জাতিসত্তা ধ্বংসের চক্রান্ত, প্রতিবাদ প্রতিরোধে এগিয়ে আসুন’ এই শ্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে মানববন্ধন করেছে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। সকাল ১০টায় উপজেলা চত্বরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের মহালছড়ি উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক নিদর্শন খীসা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মহালছড়ি থানা শাখার সভাপতি তপন চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মহালছড়ি কলেজ শাখার সাবেক সভাপতি তনয় চাকমা।

পানছড়ি: গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের উদ্যোগে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ‌‌”পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রস ফায়ারের হোলি খেলা দেখতে প্রস্তুত নই” শ্লোগানে সকাল সাড়ে ৯টায় পানছড়ি বাজারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সভাপতি বরুণ বিকাশ চাকমা, সাধারণ সম্পাদক বিবর্তন চাকমা প্রমুখ।

দীঘিনালা: পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) মোতায়নের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশন দীঘিনালায় মানববন্ধন করেছে। মানববন্ধন শেষে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ দীঘিনালা থানা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুরেশ চাকমার সভাপতিত্বে সাংগঠনিক সম্পাদক জহেল চাকমার সঞ্চালনায় লারমা স্কোয়ারে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

গুইমারা: পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনে সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়ে খাগড়াছড়ির গুইমারায় মানববন্ধন করেছে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় গুইমারা প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের মাটিরাংগা উপজেলা শাখার সভাপতি শান্তিময় চাকমার সভাপতিত্বে ও অমল ত্রিপুরার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক সর্বানন্দ চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রামগড় সরকারী কলেজ শাখার সভাপতি শুভ চাকমা।

মানিকছড়ি: ‘আইন শৃঙ্খলার নামে পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থার ক্রস ফায়ার-চাঁদাবাজি-অপহরণ-গ্রেফতার বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে পাহাড়ি-বাঙালি এক হও’ শ্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন। বুধবার সকাল ১০টায় উপজেলার ধর্মঘর এলাকায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফ’র উপজেলা সংগঠক এসটিঅং মারমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সদস্য আপ্রু মারমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের চিত্র চাকমা।

লক্ষ্মীছড়ি: ‘পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় খুনী লেলিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন এই শ্লোগানে’ সকাল সাড়ে ১০টায় লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা পরিষদ মাঠে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক রিপন চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাদ্রী চাকমা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক রতন স্মৃতি চাকমা।

রাঙামাটি জেলা:

কুদুকছড়ি: ‘আইন শৃংখলা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় সংস্থার চাঁদাবাজি, অপহরণ বাণিজ্য বরদাস্ত করবে না’ এই আহ্বানে পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে রাঙামাটির কুদুকছড়িতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ব্যানারে বুধবার সকাল ১০টায় কুদুকছড়ি বাজারে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের রাঙামাটি জেলা শাখার আহ্বায়ক সুপ্রীম চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার সভাপতি বাবলু চাকমা ও ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শান্তি প্রভা চাকমা প্রমূখ।

নান্যাচর: পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনে সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ব্যানারে রাঙামাটির নান্যাচর উপজেলায় মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘আইন শৃঙ্খলার নামে পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থার ক্রস ফায়ার-চাঁদাবাজি-অপহরণ-গ্রেফতার বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে পাহাড়ি-বাঙালি এক হও’ শ্লোগানে বুধবার সকাল ১০টায় উপজেলা রেস্ট হাউজ মাঠে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের রাঙামাটি জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নান্যাচর থানা শাখার আহ্বায়ক হিরা তালুকদার, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রণ বিকাশ চাকমা, সাবেক্ষ্যং ইউপি চেয়ারম্যান সুপন চাকমা প্রমূখ।

কাউখালী: ‘পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় খুনী লেলিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ এই শ্লোগানে শ্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সরকারী সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে রাঙামাটির কাউখালীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার সকাল পৌনে ১০টায় কাউখালী উপজেলা সদরের কৃষি ব্যাংকের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কাউখালী থানা শাখার সভাপতি কংচাই মারমার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক রূপন মারমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কাউখালী থানা শাখার সভাপতি মেমোরি চাকমা।

বাঘইছড়ি: পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার করঙাতলী বাজারে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত ঘন্টাব্যাপী মানবন্ধনে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি চিক্কোধন চাকমা ও সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোতির্ময় চাকমা।

সাজেক: বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে সকাল সাড়ে ৯টায় এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। সাজেক নারী সমাজ ও সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সাজেক ভূমি রক্ষা কমিটি সভাপতি জ্ঞানেন্দু চাকমা, সদস্য বিমল কান্তি চাকমা ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের সাজেক শাখার সভাপতি সুপন চাকমা।

এসব মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সারা দেশে র‌্যাব একটি খুনী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও সরকার এই রাষ্ট্রীয় খুনী বাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই খুনী বাহিনীকে মোতায়েন করা হলে সমতলের ন্যায় এখানেও খুন-গুম-ক্রসফায়ার ও নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাই র‌্যাব মোতায়েনের সরকারী সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের জন্য অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বক্তারা আরো বলেন, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে এক প্যানেল মেয়রসহ ৭ জনকে খুনের ঘটনায় র‌্যাব জড়িত রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে মাজার লুট থেকে শুরু করে প্রতিনিয়ত যে খুন, গুম, অপহরণ ও ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে এসবে সাথে র‌্যাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। যার ফলে র‌্যাব এখন রাষ্ট্রীয় খুনী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় র‌্যাব বিলুপ্ত করারও প্রস্তাব দিয়েছে।

তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের ন্যায্য আন্দোলনকে বলপূর্বক দমনের লক্ষে সরকার এখানে র‌্যাব মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত পাহাড়ি জনগণ কিছুতেই মেনে নেবে না। এর বিরুদ্ধে সকলকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।

বক্তারা অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাব মোতায়েনের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল, নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের ঘটনায় জড়িত র‌্যাব সদস্য ও কর্মকর্তার বিচার, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে খুন-গুম,ক্রস ফায়ারের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা ও নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

আরও খবর

রাঙ্গামাটিতে সংগীতশিল্পী অহৃত

মানিকছড়িতে দু’টি তাজা কার্তুজসহ ১ ইউপিডিএফ কর্মী আটক

রামগড়ে অস্ত্র ও গুলিসহ ২ উপজাতীয় সন্ত্রাসী আটক

বাঘাইছড়িতে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে দুইজন খুন

দীঘিনালায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক ইউপিডিএফকর্মী নিহত : আহত ১

দীঘিনালায় ১৯ ফেব্রুয়ারি অপহৃত মিন্টু চাকমাকে গুলি করে হত্যা : লাশ উদ্ধার

বাঘাইছড়িতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি

IMG_20140430_121448 copy

বাঘাইছড়ি সংবাদদাতা : রিজার্ভ ফরেস্টের সরকারী জায়গায় অবৈধভাবে বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের দুই টিলা রিজার্ভ ফরেষ্ট এলাকায় স্থানীয় চাকমারা একটি বনবিহার তৈরি করার জন্য একটি বুদ্ধমূর্তি এনে কাজ শুরু করে। কাজ শুরুর খবর পেয়ে বাঘাইহাট ফরেষ্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা সেখানে গিয়ে কাজ না করতে নিষেধ করেন। নিষেধ অমান্য করে কাজ করতে থাকেন স্থানীয় চাকমারা। নিষেধ অমান্য করায় রেঞ্জ কর্মকর্তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সহায়তা নেন এবং ২৯ এপ্রিল বাঘাইছড়ি নিবাহী কর্মকর্তা ও থানার ও,সি, এসে কাজ না করতে বলেন। এ সময় সেখানে স্থানীয় চাকমা নারীরা হাতে লাঠি, দা, কুড়াল নিয়ে জড়ো হয় এবং কাজে বাধাঁ প্রদানকারীদের মোকাবেলা করার চেষ্টা করেন আর কাজ চলিয়ে যান।

সমস্যা সমাধানের জন্য বাঘাইছড়ি উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা ৩০ এপ্রিল সেখানে  এসে স্থানীয় চাকমাদের সাথে সমন্বয় সভা করেন সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন  বাঘাইছড়ি উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাঘাইহাট জোনের প্রতিনিধি চাকমাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বজিৎ (হারিহাপ্পা) ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভার শেষে উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন কিন্তু চাকমারা কাজ চলিয়ে যাবে বলে জানায়।

পরবর্তীতে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিকাল ৪টা থেকে স্থানীয়ভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন।

কাপ্তাই হ্রদে ১মে থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি :

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলরাশি কাপ্তাই হ্রদে মাছের সুষ্ঠু ও প্রাকৃতিক প্রজনন, বংশ বৃদ্ধি, মজুদ এবং ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে আগামী ১মে মধ্যরাত থেকে সব ধরনের মৎস্য আহরণ, পরিবহন ও বিপণন সম্পূর্ণরুপে বন্ধ থাকবে। পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য হ্রদে মাছধরার ওপর এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। রোববার রাঙ্গামাটিতে জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ব্যাপারে সোমবার জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।

জানা গেছে, রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ মৎস্য কর্পোরেশন (বিএফডিসি) যৌথভাবে প্রতিবছরের মতো নিষেধাজ্ঞাটি জারি করে। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহায়তা চাওয়া হয়েছে।  

জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল জানান, দেশের সর্ববৃহৎ কৃত্রিম জলরাশি কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, পোনা মাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণসহ কাপ্তাই হ্রদের প্রাকৃতিক পরিবেশকে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত হ্রদ হতে সব প্রকার মৎস্য আহরণ, বাজারজাতকরণ এবং পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। মাছধরা বন্ধ মৌসুমে হ্রদের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তার আহবান করা হয়।

বরাবরের মতো এবারও মাছধরা বন্ধকালিন কাপ্তাই হ্রদে প্রায় ৩০ মেট্রিক টন কার্প জাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করা হবে। কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য অভয়াশ্রমগুলোর পাশাপাশি হ্রদের বিভিন্ন জায়গায় পর্যায়ক্রমে পোনাগুলো অবমুক্ত করা হবে।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলতি মৌসুমে ১মে মধ্যরাত থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে সব ধরনের মৎস্য আহরণ, বিপণন এবং পরিবহন করা যাবে না। ওই সময়ে হ্রদে কারেন্ট জাল, কাথা জাল, বেড়া জাল, মশারি জাল এবং ফাঁস জালসহ কোনো কিছু দিয়ে মাছ ধরা যাবে না। হ্রদ এলাকায় কচুরিপানা দিয়ে জাঁক তৈরির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

হ্রদে মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে রাঙ্গামাটি ফিশারিঘাট, জেলা পরিষদঘাট, লংগদু, বাঘাইছড়ি, কাপ্তাই, ডিসি বাংলোঘাটসহ সুবিধাজনক জায়গায় মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। হ্রদ এলাকার ছয়টি মৎস্য অভয়াশ্রমে সব মৌসুমে মাছ শিকার ও আহরণ বন্ধ থাকবে।
হ্রদে মৎস্য শিকার বন্ধকালিন পরিবার প্রতি মাসে ৩০-৪০ কেজি করে সব জেলে পরিবারকে ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে চাল বিতরণ করা হবে।

রাঙামাটিতে বন্দুক যুদ্ধ : পাহাড়ি দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত

bonduk juddho_0_0

স্টাফ রিপোর্টার :

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি দুই গ্রুপের মধ্যে রাঙামাটিতে বন্দুক যুদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় এ বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার ভোর ৫ টা থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত টানা তিন ঘন্টা জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ঘিলাছড়ির পূর্ণবাসন এলাকায় বিবদমান দুই পাহাড়ি গ্রুপের মধ্যে কয়েকশ রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে এঘটনা ঘটেছে কি না তা জানা যায়নি। তবে সংর্ঘষকারী সবাই উপজাতি বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে শুরু হওয়া জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ঘিলাছড়ির পূর্ণবাসন এলাকায় পাহাড়ি দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধে অমর কুমার চাকমা (৩৫) নামে এক পাহাড়ি যুবক নিহত হয়েছে বলে দাবী করেছে স্থানীয় গ্রামবাসী । তবে নিহতের লাশ খুঁজে পায়নি পুলিশ। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই সন্ত্রাসীরা নিহতের লাশ সরিয়ে ফেলেছে বলে আশংকা করছে গ্রামবাসী ।

উপজাতীয় বিবদমান গ্রুপগুলোর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে বন্দুক যুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে রাঙামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান জানান, গুলি বিনিময়ের খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সন্ত্রাসীরা গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ৬৮ রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের ধরতে পুনর্বাসন ও স্বনির্ভর এবং আশ পাশের এলাকায় তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

রাঙ্গামাটিতে প্রেমিকার মৃত্যুর শোকে ফাঁসিতে ঝুলে প্রেমিকের মৃত্যু

Rরাঙ্গামাটি সংবাদদাতা :

বুধবার রাত সোয়া আটটার সময় রাঙ্গামাটি শহররে বনরূপায় ভাইয়ের দোকানে ইলেকট্রিক তারের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করছেে আল আমিন (১৭) নামের এক যুবক। ছেলেটির বাসা খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার মোহাম্মদপুর এলাকায়। সে গত ১৪ এপ্রিল তার ভাই আলাউদ্দীনের কর্মস্থলে বেড়াতে আসে।

আলাউদ্দীনেরে সাথে আলাপকালে সে জানায়, তার ভাই কিছুদিন ধরে মানসিকভাবে অসুস্হ ছিল। কারণ তার এলাকার একটি মেয়ের সাথে আল আমিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

আমাদের পানছড়ি প্রতিনিধি সাজাহান কবির সাজু জানিয়েছেন, আল আমিনের পিতার নাম মতি মিয়া। মতি মিয়ার পাশের বাড়ীর নুর আহম্মেদের স্কুল পড়ুয়া মেয়ে মৌসুমীর সাথে আল আমিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এই প্রেম মেনে নিতে পারেনি পরিবার। ফলে তা নিয়ে গ্রাম্য শালিস বসে। শালিসে তাদের সম্পর্ককে অস্বীকার করা হয় এবং দুজনকে আলাদা হয়ে যাওযার নির্দেশ দেয়া হয়। তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দরের জন্য অনেক বোঝানো হয়। কিন্তু বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি মৌসুমী। তাই সে গত শনিবার নিজ ঘরের গলায় রশিতে ঝুলে আত্মহত্যা করে। প্রিয় বান্ধবীর এই প্রকারে মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি আল আমিন।

তাই এ ঘটনার পর  থেকে আল আমিন মানসিকভাবে অসুস্হ হয়ে পড়ে । তাই তার বাবা আল আমিনকে রাঙ্গামাটিতে তার ভাই আলাউদ্দিনের কাছে কিছুদিনের জন্য পাঠায়।গত কয়েক দিন সে ভালো ছিল।

আজ সন্ধ্যায়ও সে স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ করে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর থেকে আল আমিনকে দেখা যাচ্ছিল না। তারপর অনেক খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে তাদের দোকানের পিছনের রুমে তার লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সে দোকানের মালিক তুষার কান্তি দাশকে ডাকে । দোকানের মালিক আরো কয়েকজনকে নিয়ে পিছনের রুমে দিয়ে তার লাশ ঝুলন্ত দেখতে পায়।

পরে দোকানের মালিক পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার করে। ময়না তদন্তের জন্য লাশটি রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।  

ইউপিডিএফ রাঙ্গামাটিতে ঘাঁটি হারাচ্ছে নাকি নির্বাচনী সমঝোতা?

bow
আলমগীর মানিক, রাঙামাটি : ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভোটের হিসাব মিলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস এবং ইউপিডিএফ’র মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকার পরও নির্বাচনে ইউপিডিএফ’র  নীরবতা এবং নিষ্ক্রিয়তা অন্যদিকে সরকার দলের জাঁদরেল প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিপুল ব্যবধানে জেএসএস প্রার্থীর অভাবনীয় জয় নির্বাচন বিশ্লেষকদের দ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছে। নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় দলীয়  অবস্থান কি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে? নাকি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোন সমঝোতা হয়েছে আজন্ম শত্রু এই দুই সংগঠনের মধ্যে?

১৯৯৭ সনের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে জনসংহতি সমিতি থেকে বের হয়ে আসা বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী মিলে প্রসিত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে গঠন করে ইউপিডিএফ। তারা সরকারের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী জেএসএস নেতা সন্তু লারমাকে জাতীয় বেইমান আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলে দুর্বার সশস্ত্র আন্দোলন। এর পর থেকেই শুরু পার্বত্য চট্টগ্রামে ভাতৃঘাতী সংঘাত। এই সংঘাতে ইতোমধ্যে শত শত পাহাড়ি মায়ের বুক খালি হয়েছে। সংগঠন দুটির বিরুদ্ধে পরস্পরের নেতাকর্মীদের হত্যা গুম অপহরণের অভিযোগ এখনও চলছে থেমে।

কিন্তু এর মধ্যেই নির্বাচনকে সামনে রেখে এক দলের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া এবং অন্য দলের প্রার্থীর বিপুল জয় নিয়ে পাহাড়ারের রাজনীতি নিয়ে যারা চিন্তা-ভাবনা করেন তাদেরকে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে অনেক কিছুই। ধারণা করা হয় বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং প্রশিক্ষিত ক্যাডার বাহিনী সমৃদ্ধ সংগঠন ইউপিডিএফ। বিশেষ করে তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে যে সব এলাকায় সেখানে বলতে গেলেই তাদের কথাই শেষ কথা। যার ফলে ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রার্থী বাতিল হয়ে যাওয়ায় ইউপিডিএফ না ভোট দেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবং তারা তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে সারা দেশের মধ্যে না ভোটের রেকর্ড করেছিল রাঙ্গামাটিতে। তখন ৩২০৬৭টি না ভোট কাস্ট করে ইউপিডিএফ রাঙ্গামাটিকে তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে প্রমাণ করেছিল। কিন্তু পাঁচ বছরের এই নির্বাচনে এসে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে সুযোগ করে দেওয়ায় হিসাব মিলাতে পারছে না কেউ। তাহলে কি প্রভাবশালী এই সংগঠনটি রাঙ্গামাটিতে দিন দিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে? পরাজিত হয়েছে জেএসএস’র কাছে?  

সদ্য সমাপ্ত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি জেলার একমাত্র সংসদীয় আসনে ইউপিডিএফ এর কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমার করুণ পরাজয়ের পর এই প্রশ্ন এখন সকলের মুখে মুখে। বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি হতে ইউপিএফ যেখানে নিজেদের পক্ষে উল্লেখ যোগ্য ভোট কাস্ট করতে পেরেছিল সেখানে এইবার মাত্র ১২৪৩টি ভোট পেয়ে জামানত হারানোর কারণ কী? তাহলে কি ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী নামমাত্র নির্বাচনে অংশ নিয়ে অন্য কোন স্থানীয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে সমর্থিত দিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পরাজয়কে নিশ্চিত করেছে?

২০০১ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি আসনে ইউপিডিএফ প্রার্থীর সম্মানজনক ভোটপ্রাপ্তি এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের প্রার্থী না থাকায়  ৩২ হাজারেরও বেশি না ভোট কাস্ট হয়েছিল। এই বিচেনায় এইবারও ধারণা করা হয়েছিল ইউপিডিএফ এর শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত জেলার কয়েকটি উপজেলায় এবারও ইউপিডিএফ সমর্তিত প্রার্থী সচিব চাকমা উড়োজাহাজ প্রতীক নিয়ে সম্মানজনক ভোট অর্জন করতে সক্ষম হবে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ভোট গণনার পর দেখা যায় মোট ভোটের মাত্র ১ শতাংশের সামন্য বেশি ভোট পেয়েছে এই প্রার্থী, যেখানে ইউপিডিএফ এর প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সমার্থিত প্রার্থী ঊষাতন তালুকদার হাতি প্রতীকে ৯৬,২৩৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। পাশাপাশি অপর আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএনলারমা) সমর্থিত সুধাসিন্ধু খীসা ২৪,৩৫২ ভোট পেয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা জানান দিয়েছেন।

ইউপিডিএফ এর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলা। এছাড়া সদর উপজেলা, কাউখালী উপজেলা, বাঘাইছড়ি উপজেলা, লংগদু উপজেলা, কাপ্তাই উপজেলার একাধিক এলাকায় রয়েছে তাদের শক্ত অবস্থান। তাই এসব উপজেলায় ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী সচিব চাকমার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পাওয়ার কথা ছিল। নির্বাচনী ফলফলে দেখা যায় ইউপিডিএফ এর শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত নানিয়রারচর উপজেলায় ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৪১৩ ভোট। অথচ এই উপজেলায় সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত এমএনলারমা গ্র“পের সুধাসিন্ধু খীসার বই প্রতীক সর্বোচ্চ ৭৬৬৭ ভোট এবং জেএসএস প্রার্থীর হাতি প্রতীক ২৯৯০ ভোট পেয়েছে। ইউপিডিএফ এর অপরাপর শক্ত ঘাঁটিগুলোর মধ্যে রাঙ্গামাটি সদরে ১৩৩ ভোট, কাউখালীতে ১৪৯ ভোট, বাঘাইছড়িতে ৩২২ ভোট, লংগদুতে ৬৯ ভোট পায় উড়োজাহাজ প্রতীক।

রাঙ্গামাটি জেলায় সংসদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ প্রার্থীর কেন এই করুণ পরাজয়? এর মাদ্যমে কি এই শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের শক্তি কমে আসার সংকেত রয়েছে? নাকি এটি কোন নির্বাচনী সমঝোতা? নাকি স্থানীয় প্রধান দুটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মদ্যে ঐক্যে পৌঁছানোর প্রাথমিক সংকেত?

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেককদের ধারণা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান  ২টি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি এবং ইউপিডিএফ এর মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত এখানে এই ২টি দলের সংঘর্ষে উভয় দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এক দল অপর দলকে নিষ্দ্ধি করার দাবিতে সোচ্চার। এই অবস্থার মধ্যে নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম  জন সংহতি সমিতি সমর্থিত প্রার্থী চূড়ান্ত বিজয় নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে এই জেলার প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার নিশ্চিত করেছেন, সেখানে ইউপিডিএফ সমর্থিত প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা অবাক করার মতো বিষয়।

অনেকের ধারণা, এই আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে পরাজিত করার জন্যই ইউপিডিএফ’র এটি একটি কৌশল। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতেই এই কৌশল নির্ধারিত হয়েছে। আবার অনেকের ধারণা ইউপিডিএফ এর শক্তিশালী অবস্থান দখল করে নিচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্র“প হিসেবে পরিচিত এমএনলারমা গ্র“প। যার ফলে এতদিন যেখানে ইউপিডিএফ’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল সেসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে এমএন লারমা গ্রুপের হাতে। এসব এলাকার ইউপিডিএফ এর সমর্থকরাও মিশে যাচ্ছে নতুন সংগঠন জেএসএস (এমএন লারমা)’র সাথে, যার প্রমাণ ইউপিডিএফ এর শক্তিশালী ঘাঁটিগুলোতে এমএনলারমা গ্র“প সমর্থিত সুধাসিন্ধু খীসার উল্লেখ যোগ্য ভোট প্রাপ্তি।