বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

রাঙামাটির বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে ডাক্তারী পরীক্ষায় পুরুষ শুক্রানুর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের শরীরে নির্যাতনেরও কোনো আলামত খুঁজে পায়নি তাদের পরীক্ষাকারী ডাক্তারগণ। তবে অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট, সনোলজিস্ট ও ফরেনসিক মেডিক্যাল এক্সপার্টের অভাবে ডাক্তারগণ চুড়ান্ত মন্তব্য করেননি। আল্ট্রা সনোগ্রাম রিপোর্টের জন্য বড় বোনের  জরায়ু ও তলপেটের রিপোর্ট পেন্ডিং রাখা হয়েছে।

এদিকে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর বয়সও ডাক্তারগণ নিশ্চিত হতে পারেননি। তাই উন্নত পরীক্ষার জন্য অভিযুক্ত কিশোরীদ্বয়কে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করার সুপারিশ করা হয়েছে। পার্বত্যনিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এই মেডিকেল রিপোর্টের ব্যাপারে মুখ খুলতে চায়নি কোনো পক্ষই।

রাঙামাটির ডেপুটি সিভিল সার্জন  নীহার রঞ্জন নন্দী জানান, দুই কিশোরীর পরিক্ষার রিপোর্ট  আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া এ রিপোর্টের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না বলে তিনি জানান। সিভিল সার্জন জানান, ওই কিশোরী পুলিশী হেফাজতে রাঙামাটি সদর হাসপতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, কিশোরীদের বয়স নির্ধারণের জন্য রাঙামাটিতে এক্সরে মেশিন বা উন্নতমানের ফরেনসিক মেশিন না থাকায় বয়স নির্ধারণের জন্য পুলিশি হেফাজতে কিশোরীদের চট্টগ্রামে রোববার প্রেরণের সম্ভবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ সাফিউল সারোয়ার জানান, বিজ্ঞ আদালত ওই দু’কিশোরীর বয়স নির্ধারণের জন্য রাঙামাটি সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছে। আমরা শুধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পারি বলে তিনি জানান।

এদিকে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় নির্যাতিত দুই কিশোরীর শুনানীর দিন ৭ফেব্রুয়ারী ধার্য করেছে আদালত।

বুধবার সকালে তাদের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট  সাইফুদ্দীন খালেদের আদালতে তোলা হলে শুনানি শেষে আদালত এ তারিখ ঘোষণা করেন।

রাঙামাটি ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: নীহার  রঞ্জন নন্দী জানান, ওই দুই কিশোরী পরিক্ষার রিপোর্ট আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) রুহুল আমীন সিদ্দিকী জানান, ওই দুই কিশোরীর বয়স নির্ধারণের জন্য আদালতে আবেদন করা হলেও এ ব্যাপারে আদালত কোন শুনানী না করে পরবর্তী ৭ফেব্রুয়ারী শুনানীর দিন ধার্য করে।

উল্লেখ্য চলতি বছরের ২২জানুয়ারী গভীর রাতে বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের ধরতে একটি অভিযান পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী।

এরপর ওইদিন  গভীর রাতে মারমা দুই কিশোরী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযাগ তুলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায়  পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  (জেএসএস)।

এদিকে ঘটনার পরের দিন ২৩ জানুয়ারী কে বা কারা ওই মারমা কিশোরীকে দূর্গম বিলাইছড়ি থেকে এনে রাঙামাটি জেনারেল হাসপতালে ভর্তি করায়।

ছবি- প্রতিকী

পাহাড় ধসে রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রামে নিহত ৮৬ : সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত

স্টাফ রিপোর্টার: 

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ৮৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটিতে ২ সেনা কর্মকর্তাসহ ৫৪ জন, বান্দরবানে ৯ জন এবং চট্টগ্রামে ২৩ জন মারা গেছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এখনও মাটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছেন। সোমবার মধ্য রাতে থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত প্রাণহানির এ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট:

রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে মৃত ৪৫

রাঙামাটি শহর ও বিভিন্ন উপজেলায় প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে রাঙামাটি সদরে দুই সেনা কর্মকর্তা ও দুই সেনা সদস্যসহ ২০ জন, কাপ্তাইয়ে ১১ জন ও কাউখালীতে ২১ জন, বিলাইছড়িতে ২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রাঙামাটি সদর হাসপাতালে আহত ৫৬ জন ভর্তি রয়েছেন।

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. শহীদ তালুকদার জানান, চার সেনা সদস্যসহ সদর হাসপাতালে ২০টি মৃতদেহ আছে। এই সংখ্যা বাড়তে পারে।

সকালে শহরের যুব উন্নয়ন, ভেদভেদী, শিমুলতলি, রাঙাপানিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড় ধসের খবর আসতে থাকে। দুপুর ১টা পর্যন্ত রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাঙামাটি সদর হাসপাতালে ১১ জনের মৃতদেহ এসেছে। এরা সবাই বিভিন্নস্থানে বাড়ীর উপর পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

নিহতরা হলেন- রুমা আক্তার,নুরিয়া আক্তার,হাজেরা বেগম,সোনালি চাকমা,অমিত চাকমা, আইয়ুশ মল্লিক,লিটন মল্লিক, চুমকি দাশ এবং আরো তিনজনের নাম তাৎক্ষনিকভাবে জানা যায়নি।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলায় ১১ জন, কাউখালী উপজেলায় ২১ জন মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কারো নাম জানা যায়নি ।

সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি শহর থেকে ২ কি. মি দুরে শহরের প্রবেশমুখে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের পাহাড় ধ্বসের কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে আছে এমন খবরের ভিত্তিতে রাঙামাটি সদর জোনের সেনাবাহিনীর ১৬ সদস্যের একটি দল উদ্ধার কাজ চালাতে যায়। দলটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। এসময় অকষ্মাৎ নতুন করে পাহাড় ধস শুরু হলে সেনা সদস্যরা ৩০ ফুট নিচে পড়ে মাটি চাপা পড়ে এ দূর্ঘটনা ঘটে।

 রাঙামাটি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, সকালে রাঙামাটি মানিকছড়ি সেনা ক্যাম্পের সামনে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক যান চলাচল স্বাভাবিক করতে গিয়ে ক্যাম্পের পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম জানিয়েছেন, রাঙামাটিতে পাহাড় ধসের ঘটনায় কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এখনও তাদের উদ্ধার কাজ চলছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

নিহত সেনা কর্মকর্তাগণ হলেন, মেজর মাহফুজ (৪৪ লং কোর্স), ক্যাপ্টেন তানভির (৬৪ লং কোর্স)। এবং আহত অপর দুই সেনা সদস্য হলেন কর্পোরাল আজিজ ও সৈনিক শাহীন। মেজর মাহফুজের ৫ বছরের একটি সন্তান রয়েছে এবং ক্যাপ্টেন তানভির সালমান নববিবাহিত।

এ ঘটনায় আরো ১০-১২ জন সেনা সদস্য আহত ও ১ জন নিখোঁজ রয়েছে। নিখোঁজ সৈনিকের নাম আজিজ। আশঙ্কাজনক পাঁচ সেনা সদস্য হচ্ছেন সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম। তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকার সিএমএইচে নেয়া হয়েছে। বাকিরা মানিকছড়ি রিজিয়ন সিএমএইচে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে কাপ্তাই উপজেলার রাইখালি ইউনিয়নের কারিগরপাড়া এলাকায় মাটিচাপা পড়ে উনু চিং মারমা এবং নিকি মারমা মারমা নামের দুইজন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন রাইখালি ইউপি চেয়ারম্যান ছায়ামং মারমা।

কাপ্তাই উপজেলার নতুন বাজার এলাকায় গাছ চাপা পড়ে আবুল হোসেন (৪৫) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন এবং ইকবাল নামের এক ব্যক্তি কর্ণফুলি নদীতে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন।

এদিকে প্রবল বর্ষণে রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে মাটিচাপা পড়েছে অসংখ্য মানুষ। ফায়ার সার্ভিসের রাঙামাটি টিমকে সহযোগিতা করতে চট্টগ্রামের হাটহাজারি থেকেও বাড়তি ইউনিট আসছে বলে জানিয়েছেন ফায়ারসার্ভিস কর্মকর্তারা। রাঙামাটি শহরে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

রাঙামাটির কোতয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ মুহম্মদ রশীদ জানিয়েছেন, এটা একটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বাড়বে। অনেক স্থানেই এখনো মানুষ মাটি চাপা পড়ে আছে।

বান্দরবানে পাহাড় ধ্বসে শিশুসহ ৯ জনের মৃত্যু

আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় মোরা’র ক্ষত শুকাতে না শুকাতে নিম্নচাপে টানা তিন দিনের বর্ষণে ও পাহাড়ী ঢলে বান্দরবানে পাহাড় ধ্বসে মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ ৯ জন নিহত হয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বান্দরবানের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

দমকল বাহিনী ও স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাতে প্রবল বর্ষণে ৩টার দিকে কালাঘাটার কবরস্থানের পাশে, জেলেপাড়া ও লেমুঝিরি আগাপাড়া পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটে। এসময় ঘুমন্ত অবস্থায় তিন শিশুসহ ৬জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছে ৪জন। আহতদের উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

কালাঘাটার কবরস্থানের পাশে পাহাড় ধ্বসে রেবা ত্রিপুরা (১৮) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী মাটি চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। জেলে পাড়ায় মা-মেয়ে কামুরন নাহার ও সুফিয়া বেগম মাটি চাপায় নিখোঁজ রয়েছেন এবং লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিন শিশু শুভ বড়ুয়া (৮), মিঠু বড়ুয়া (৬), লতা বড়ুয়া (৫) নিহত হয়েছেন। আহতরা হলেন পসান ত্রিপুরা (২২), বীর বাহাদুর ত্রিপুরা (১৬) ও দুজাকিন ত্রিপুরাসহ (২৬) আরও দু’জন।

এছাড়া মঙ্গলবার সকালে কুহালং ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার সম্বুনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধসে একই পরিবারের ঘুমন্ত অবস্থায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, মংকাউ খেয়াং (৫৫) মেম্রউ খেয়াং (১৩) ও ক্যসা খিয়াং (৭) বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এসময় চাইহ্লাউ (৩৫) ও সানু খেয়াং (১৮) নামে দু’জন আহত হয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার মো. তারেক জানান, পাহাড় ধ্বসে এ পর্যন্ত ৪জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গভীর মাটির নিচে মা ও মেয়ের লাশ পড়ে থাকায় এবং প্রবল বর্ষণের কারণে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এ দু’জনের লাশ উদ্ধারে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কুহালং ইউনিয়নের পূর্ব ধোপাছড়ি এলাকার সম্বুনিয়া পাড়ায় পাহাড় ধ্বসে ঘটনা তার জানা নেই।

জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। এছাড়া জেলা সদর ও ছয় উপজেলায় পাহাড় ধ্বসে প্রায় একশ’র উপরে পাহাড় ধ্বসে ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে মঙ্গলবার ভোরে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড় ধসে একটি শিশুসহ ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন একজন।

টানা বর্ষণে বান্দরবানের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

রাঙামাটিতে সোমবার থেকে শুরু হওয়া বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ধসে পড়ে। ধসে পড়া মাটির নিচে এখনও অনেকে চাপা পড়েছেন। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে বৃষ্টি কারণে উদ্ধার কাজ চালাতে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম প্রধান সড়ক যান চলাচল স্বাভাবিক করতে গিয়ে ক্যাম্পের পাহাড় ধসে চার সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, মেজর মাহফুজ, ক্যাপ্টেন তানভীর, করপোরাল আজিজ, সৈনিক শাহীন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি সেনাবাহিনীর আঞ্চলিক মুখপাত্র। এছাড়া আহত ৫ সেনা সদস্যকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। তারা হচ্ছেন, এরা হচ্ছেন, সৈনিক আজমল, মামুন, ফিরোজ, মোজাম্মেল ও সেলিম।

এদিকে, টানা বর্ষণে বান্দরবানের কালাঘাটা এলাকায় তিনটি স্থানে পাহাড় ধসে পড়েছে। এতে তিন শিশুসহ ৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২ জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন। সোমবার রাত ৩টার দিকে প্রবল বর্ষণের সময় কালাঘাটা এলাকার কবরস্থানের পাশে, জেলেপাড়া ও লেমুঝিরি আগাপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

পাহাড় ধসের কারণে বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত

টানা বর্ষণ ও ভয়াবহ পাহাড় ধসে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যহত হয়েছে।নানান স্থানে নতুন করে পাহাড় ধসের ও সড়ক বন্ধের সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় বেসামরিক ব্যক্তিবর্গকে যথাসাধ্য সাহায্য করছে। অতিবৃষ্টিপাত উদ্ধার কার্যক্রম ব্যহত করছে। বিশেষ করে খারাপ মোবাইল নেটওয়ার্কের কারণে সর্বত্র যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে পাহাড় ধসের কারণে নানান স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়ক ভূমিধ্বসে বন্ধ রয়েছে। বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ সড়ক চালুর চেষ্টা করছে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে ব্যহত হচ্ছে।

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসের ঘটনা বা হতাহতের কোনো খবর না পাওয়া গেলেও তবে গুইমারাতে রাস্তা বন্ধের কারণে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রাম-গুইমারা সড়ক গাড়িটানা পয়েন্টে (মানিকছড়ি ক্যাম্প থেকে ৭ কিমি দূরে) বন্ধ রয়েছে। ৩টি গাছ হাই-টেনশন তার আছড়ে পড়ে রাস্তার উপরে পড়ে রয়েছে। পিডিবি ও স্থানীয় প্রশাসন কার্যক্রম শুরু করেছে।

বান্দরবানে বান্দরবান-রুমা সড়ক পাহাড় ধসে কাটা পাহাড় এলাকায় (Y-জংশনের কাছে) বন্ধ রয়েছে।বান্দরবান-রুয়াংছড়ি সড়কে রামজাদি মন্দিরের কাছে ব্রিজ ডুবে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে তিন পার্বত্য জেলার বেশির ভাগ স্থানে গত ৪৮-৭২ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেকাংশে অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পেতে ও উদ্ধার তৎপরতা চালাতে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সাংবাদিকরা খবর পাঠাতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে অব্যহত পাহাড় ধসে মৃতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

 

রাঙামাটিতে রেকর্ডকৃত ইত্যাদি আজ প্রচারিত হবে বিটিভিতে

8

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন স্থানগুলোতে গিয়ে ‘ইত্যাদি’র মূল অনুষ্ঠান ধারণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকেই। ‘ইত্যাদি’র এই দেশ পরিক্রমার ধারাবাহিকতায় আগামী পর্ব ধারণ করা হয়েছে মূলতঃ পার্বত্য জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত রাঙ্গামাটিতে। সব শ্রেণী পেশার মানুষের প্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র আগামী পর্ব একযোগে বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে-এ প্রচারিত হবে ৩০ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাত ৮ টার বাংলা সংবাদের পর।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাঙ্গামাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিজিবি সেক্টর হেড কোয়ার্টারের অভ্যন্তরে লেক, সবুজ বনানী-পাহাড় আর অসাধারণ নৈসর্গিক দৃশ্য পরিবেষ্টিত সুউচ্চ হেলিপ্যাডে ধারণ করা হয় এবারের ‘ইত্যাদি’। পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনার জেলা এই রাঙ্গামাটি। বাংলাদেশের যখন যে স্থানে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হয় সেই স্থানটির বৈশিষ্ট্যকে কেন্দ্র করেই সেট নির্মাণ করা হয়। ফলে দর্শকরা যেমন ঐ স্থানটি সম্পর্কে জানতে পারেন, তেমনি নিত্য-নতুন লোকেশনের কারণে প্রতিবারই সেট নির্মাণেও বৈচিত্র্য আসে।

টেলিভিশন অনুষ্ঠানকে স্টুডিওর চার দেয়ালের ভিতর থেকে বাইরে এনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে অনুষ্ঠান করার এই ধারণাটি এখন অনেকেই গ্রহণ করেছেন। ফলে টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণেও বৈচিত্র্য এসেছে। রাঙ্গামাটির ঐতিহ্যের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে নির্মাণ করা আলোকিত মঞ্চের সামনে হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে এবার ধারণ করা হয় গণমানুষের অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’।

10

সব সময় রাতের আলোকিত মঞ্চে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটির এই প্রাকৃতিক রূপ রাতের বেলায় দেখানো সম্ভব নয় বলে এবার দিনের আলো থাকতেই ‘ইত্যাদি’র ধারণ শুর“ হয়। ‘ইত্যাদি’র ধারণ উপলক্ষে পাহাড় কন্যা রাঙ্গামাটিতে ছিল উৎসবের আমেজ। অত্যন্ত সুশৃক্সখলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে বিজিবি’র তত্ত্বাবধানে আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে প্রবেশ করলেন অনুষ্ঠানস্থলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় অনুষ্ঠানস্থল। আমন্ত্রিত দর্শক ছাড়াও হাজার হাজার মানুষ ভাপসা গরমের মধ্যেও আশেপাশের পাহাড়, গাছ ও লেকের পাড়ে দাঁড়িয়ে ‘ইত্যাদি’র ধারণ উপভোগ করেন। ‘ইত্যাদি’র এই ধারণ অনুষ্ঠান চলে বিকাল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।

শেকড় সন্ধানী ইত্যাদিতে সবসময়ই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রচার বিমুখ, জনকল্যাণে নিয়োজিত মানুষদের খুঁজে এনে তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। যাতে তাদের এসব কাজ দেখে অন্যেরাও অনুপ্রাণিত হতে পারেন। এবারের পর্বে রয়েছে ফেসবুক এর ভিন্নতর ব্যবহারের মাধ্যমে অসহায় মানুষকে সেবা দিতে এগিয়ে আসা সিরাজগঞ্জের এক যুবক মামুন বিশ্বাসের উপর একটি প্রতিবেদন। রয়েছে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনাচার এবং রাঙ্গামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত, দর্শনীয় ও পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানগুলোর উপর তথ্য ভিত্তিক প্রতিবেদন।

12

আসলে রাঙ্গামাটিতে এমন এমন দুর্গম অঞ্চলও রয়েছে যেখানে টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণতো দুরের কথা-কোন টিভি ক্যামেরাও কখনও পৌঁছেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতায় সেসব স্থানে গিয়েও অনেক চিত্র ধারণ করা হয়েছে। এবারের বিদেশী প্রতিবেদন করা হয়েছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্বের সর্ববৃহৎ বাঁধ ও বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্প নেদারল্যান্ডস্ এর ডেল্টা ওয়ার্কসের উপর।
এবারের ইত্যাদিতে মুল গান রয়েছে একটি।

উল্লেখ্য ইত্যাদিতে সবসময় ভিন্ন আঙ্গিকে বিষয় ভিত্তিক গান প্রচার করার চেষ্টা করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের ইত্যাদিতে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশ বৈচিত্র্য, আর রাঙ্গামাটির চোখ জুড়ানো রঙ নিয়ে একটি বহুশ্র“ত জনপ্রিয় গান গেয়েছেন চট্টগ্রামের জনপ্রিয় শিল্পী রবি চৌধুরী এবং রাঙ্গামাটির চমচমি দেওয়ান। সাথে ছিল স্থানীয় শিল্পীবৃন্দ।

এছাড়াও এবারের অনুষ্ঠানে রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী নাচ। যাতে অংশগ্রহণ করেছেন স্থানীয় বিভিন্ন পাহাড়ী সম্প্রদায় এবং বাঙালী নৃত্যশিল্পীরা। এই নাচটিতে অংশগ্রহণ করেছেন প্রায় শতাধিক স্থানীয় নৃত্যশিল্পী। নাচটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত চারিদিকে লেক পরিবেষ্টিত অসাধারণ সুন্দর লোকেশান আরন্যক রিসোর্টে এবং অংশবিশেষ মঞ্চে দর্শকদের সামনে ধারণ করা হয়।

2

দর্শক পর্বের নিয়ম অনুযায়ী যেই স্থানে ইত্যাদি ধারণ করা হয় সেই স্থানকে ঘিরে দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয় এবং সঠিক উত্তর দাতাদের দিয়ে করা হয় ২য় পর্ব। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাঙ্গামাটিকে ঘিরে করা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে হাজার হাজার দর্শকের মাঝখান থেকে ৪ জন দর্শক নির্বাচন করা হয়। স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচিতি ও স্থানীয় গানের মিউজিক শুনে সেই গান পরিবেশনের মাধ্যমে ২য় পর্বে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়। যা ছিল বেশ উপভোগ্য।

নিয়মিত পর্ব হিসেবে এবারও রয়েছে যথারীতি মামা-ভাগ্নে, নানী-নাতি ও চিঠিপত্র বিভাগ। রয়েছে বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে বেশ কিছু সরস অথচ তীর্যক নাট্যাংশ। নতুন ভাবনার প্রকাশক, বিয়ের দাওয়াতে প্রযুক্তি, আদব-কায়দার একাল সেকাল, বিজ্ঞাপন বিরতির যন্ত্রণা, আবাসন ব্যবসার ভবিষ্যৎ রূপ, ফেসবুক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, তিরস্কারকে পুরস্কার ভাবাসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর রয়েছে বেশ কয়েকটি নাট্যাংশ। বরাবরের মত এবারও ইত্যাদির শিল্প নির্দেশনা ও মঞ্চ পরিকল্পনায় ছিলেন ইত্যাদির নিয়মিত শিল্প নির্দেশক মুকিমুল আনোয়ার মুকিম।

15

এবারের ইত্যাদিতে উলে­খযোগ্য শিল্পীরা হলেন-এসএম মহসীন, নাজমুল হুদা বাচ্চু, মাসুম আজিজ, সোলায়মান খোকা, কে.এস ফিরোজ, শবনম পারভীন, জিয়াউল হাসান কিসলু, আব্দুল কাদের, আফজাল শরীফ, সুভাশিষ ভৌমিক, জিল্লুর রহমান, আমিন আজাদ, বিলু বড়ুয়া, কামাল বায়েজিদ, মুকুল সিরাজ, শেলী আহসান, জামিল, জাহিদ চৌধুরী, নজর“ল ইসলাম, সজল, ফাহিম, সাজ্জাদ সাজু, রবিন, ফরিদ, বাহারসহ আরো অনেকে।

পরিচালকের সহকারী হিসাবে ছিলেন যথারীতি রানা সরকার ও মামুন মোহাম্মদ। সব শ্রেণী পেশার মানুষের প্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র আগামী পর্ব একযোগে বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে-এ প্রচারিত হবে ৩০ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার রাত ৮ টার বাংলা সংবাদের পর। ‘ইত্যাদি’র রচনা, পরিচালনা ও উপস্থাপনা করেছেন হানিফ সংকেত। নির্মান করেছে ফাগুন অডিও ভিশন। ‘ইত্যাদি’ স্পন্সর করেছে যথারীতি কেয়া কস্মেটিকস্ লিমিটেড।

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে

সাখাওয়াত হোসেন

এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় সাত বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম কয়েকটা দিন কাটাতে। গিয়েছি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে। খাগড়াছড়ি, কাপ্তাই, রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-বান্দরবান পাহাড়ি রাস্তা ধরে পৌঁছেছিলাম খাগড়াছড়ি থেকে বান্দরবান।

প্রায় এক যুগ আগে রাঙামাটি থেকে বান্দরবান যেতে হলে চট্টগ্রাম ঘুরে যেতে হতো। কাপ্তাই যেতে হলেও একইভাবে অথবা রাঙামাটি থেকে জলযানে কাপ্তাই পৌঁছাতে হতো। সময়ও লাগত অনেক। এই রাস্তাটি এখন তিনটি জেলাকেই সংযুক্ত করেছে। রাস্তাটির নির্মাণকাজ নব্বইয়ের দশকে শেষ হয়েছিল, কিন্তু তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেটা খুব ব্যবহার করা হতো না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টে যায়। ফলে এখন এ রাস্তা কার্যকর বলে বিবেচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার সর্বসাধারণের এখন চট্টগ্রাম ঘুরে নয়, সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর ২০০৮ এবং ২০০৯–এ নির্বাচন কমিশনের কাজে গিয়েছিলাম এই তিন জেলা সদরে। তারপর আর যাওয়া হয়নি। ১৯৯০-৯২-এ কর্তব্যরত ছিলাম বান্দরবান সেনা রিজিয়নে, কমান্ডার হিসেবে। ওই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চলছিল। পার্বত্য চুক্তি অন্তত সে পরিস্থিতির ইতি টেনেছে।

১৯৯৭ সালে যে পার্বত্য চুক্তি বাংলাদেশের সরকার এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিল, তার প্রচেষ্টা চলেছিল আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। তবে সে প্রচেষ্টা তেমন ফলপ্রসূ না হলেও চুক্তির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ওই সময়ের সরকার এই চুক্তি সম্পাদন করে। অবশ্যই চুক্তি সম্পাদনের কৃতিত্বের দাবিদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার। ওই সময়ে ওই চুক্তির বিরোধিতা করলেও পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় ছিল।

পার্বত্য চুক্তির পর যোগাযোগব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে এলাকার ১১টি ছোট-বড় নৃগোষ্ঠী। বর্তমানে প্রতিটি জেলা সদরের সঙ্গে সব উপজেলার সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে, যা এক দশক আগেও সম্ভব ছিল না।

হালে বান্দরবান জেলা সদরের সঙ্গে সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা থানচির সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। থানচি থেকে আলীকদম, লামা উপজেলাও এখন অভ্যন্তরীণ সড়ক দিয়ে যুক্ত হয়েছে। বছর দুই আগেও এই দুই উপজেলা প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বান্দরবান সদর থেকে কক্সবাজার সড়ক হয়ে যেতে হতো এই দুই উপজেলায়। সংক্ষেপে বলতে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে যেসব জায়গায় হেলিকপ্টার ছাড়া হাঁটাপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন লেগে যেত, সেসব জায়গায় বর্তমানে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছাতে পেরেছি।

যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে বাজারব্যবস্থার যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে দক্ষিণের জেলা বান্দরবানে পর্যটনের যে দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তা অচিন্তনীয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে যে কয়েকটি জায়গা পর্যটনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ সেসব জায়গায় প্রতিদিন শত শত লোকের পদচারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এদের সমাগম। পর্যটনকে কেন্দ্র করে আশপাশের উপজাতীয় গ্রামগুলোতে হস্তশিল্প গড়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র। এরই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

একই সঙ্গে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখরিত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটগুলো। চাকমা অধ্যুষিত রাঙামাটি জেলা পুরোনো ও বৃহত্তর জেলা শহর। যোগাযোগের ব্যবস্থা অন্যান্য জায়গার তুলনায় ভালো থাকলেও একটি মাত্র কলেজ ছিল সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে। তবে এ পর্যন্ত ওই জেলার ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭৯ জন (২০১১) জনসংখ্যার জন্য রয়েছে ২৯১টি সরকারি এবং ১২০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২২টি জুনিয়র স্কুল, ৬টি সরকারি ও ৪৫টি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ২টি সরকারি ও ১৩টি বেসরকারি কলেজ, ৭টি কারিগরি স্কুল, ১টি মেডিকেল কলেজ এবং হালে প্রতিষ্ঠিত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের বিরোধিতা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। বান্দরবান জেলায় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৫ জন (২০১১) জনসংখ্যার জন্য দুটি সরকারি ও দুটি বেসরকারি কলেজ এবং প্রায় হাজার খানেক প্রাথমিক স্কুলের মধ্যে একটি মুরং বা ম্রো আবাসিক হাইস্কুলও রয়েছে। অনুরূপভাবে খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।

একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতে শুধু রাঙামাটি বা কাপ্তাইকে ধারণায় নেওয়া হতো, এখন তেমন নেই। খাগড়াছড়ি, মংসার্কেল, ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ, রাঙামাটি চাকমা সার্কেল এবং বান্দরবান মারমা সংখ্যাগরিষ্ঠ বোমাং সার্কেল আলাদা আলাদা সত্তায় গড়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্থানীয় নৃগোষ্ঠী নেতৃত্ব, যাদের বেশির ভাগ সহ-অবস্থানে উন্নয়নের পক্ষে।

এত সব উন্নয়নের ভিত পার্বত্য চুক্তি হলেও সম্ভব হয়েছে বিগত দিনগুলোতে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর প্রচেষ্টায়। অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানে সমগ্র দেশের তুলনায় সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। তবে ইউপিডিএফ নামে যে গোষ্ঠীটি পার্বত্য চুক্তির বিরোধী, তাদের তৎপরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বলপূর্বক চাঁদা তোলার ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ঠ।

এত উন্নয়নের পরও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মনঃকষ্ট রয়ে গেছে। তার প্রধান কারণ ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্বত্বাধিকার নিয়ে। এখনো চলছে ভূমি জবরদখলের ঘটনা, যার সঙ্গে শুধু প্রভাবশালী বাংলা ভাষাভাষীরাই নয়, স্থানীয় প্রভাবশালী নৃগোষ্ঠীর নেতারাও রয়েছেন। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রধান সমস্যাও ভূমি–সংক্রান্ত, যা তিনটি আইনের, যার মধ্যে একটি স্থানীয় প্রচলিত প্রথাগত ডামাডোলে আরও জটিল হয়েছে। এ সংকট সহজে সমাধান হওয়ার নয়। যদিও চুক্তি মোতাবেক যেকোনো অধিগ্রহণের পূর্বানুমতি জেলা পরিষদের, তথাপি জেলা পরিষদ এ বিষয়ে অকার্যকর রয়েছে। সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি অন্তরায় নয়, অন্তরায় ভূমির বিষয়ে দ্বৈত বেসামরিক প্রশাসন। যেসব জায়গায় স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থাকার কথা, সেগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধা হয়ে রয়েছে।

পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে প্রথম নির্বাচনের পর আর নির্বাচন হয়নি, যার কারণে প্রায় ২৪টি বিষয় হস্তান্তরিত হলেও পরিষদ কার্যকর করতে পারছে না। জেলা পরিষদগুলো নির্বাচিত ও কার্যকর হলে চুক্তি বাস্তবায়নে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। একইভাবে কাউন্সিলের নির্বাচনও এখন হয়নি নানা জটিলতার কারণে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোকে ক্ষমতায়ন করলে অনেক ছোটখাটো সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়েই সম্ভব। সে কারণেই অন্তত এসব পরিষদের নির্বাচনের অন্তরায়গুলো দূর করা আবশ্যক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় যথেষ্ট স্থিতিশীল। তবে নতুন উপসর্গ ইউপিডিএফের নামে সংঘটিত সশস্ত্র তৎপরতাকে রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পার্বত্য চুক্তির পক্ষগুলো এবং যারা পক্ষের বাইরে রয়েছে সেসব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি যা এখন দৃশ্যমান, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সবার কর্তব্য। ওই অঞ্চলের কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর মানুষগুলোর জীবনযাত্রা অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন প্রয়োজন। যেকোনো উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে নৃগোষ্ঠীর মানুষদের সম্পৃক্ততা কাম্য। উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নয়, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের মাধ্যমে অনেক জটিল বিষয়ের সুরাহা সম্ভব। আমার চাকরিকাল ১৯৯০-৯২-এর এতগুলো বছর পরও সাধারণ নাগরিক হিসেবে বান্দরবানে সর্বসাধারণের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব উষ্ণতা পেয়েছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে আন্তরিক হলে সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা যেমন করা যায়, তেমনি ছোট-বড় সমস্যার সমাধানও সম্ভব।

এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

♦ সূত্র: প্রথম আলো

রাঙামাটি আওয়ামী লীগের সাধরাণ সম্পাদকে প্রাণ নাশের হুমকি

স্টাফ রিপোর্টার:

রাঙামাটি আওয়ামী লীগের সাধরাণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য মো. মুছা মাতব্বরকে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়েছে দূর্বৃত্তরা। গত মঙ্গলবার রাত ১১টায় তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নং- ০১৮১৫-৯৫৭৭৮৭ এই নম্বরে হুমকি দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি আওয়ামী লীগের সাধরাণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সদস্য মো. মুছা মাতব্বর বলেন, গত মঙ্গলবার রাত ১১টায় তাঁর ব্যবহারিত মোবাইল ফোনে অজ্ঞাত নম্বর থেকে কল আসে, তিনি কল রিসিভ করতেই কে বা কারা তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ফোন বন্ধ করে দেয়। এছাড়া তাঁর ব্যবসা পরিচালনাকারী ও অফিস সহকারী মো. জয়নাল আবেদীনকেও প্রাণ নাশের হুমকি দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচন রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মেয়র নির্বাচীত হওয়ার পর কিছু মুষ্ঠিমেয় গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে আসছে। এ হুমকির কারণ হতে পারে, নির্বাচনী পরবর্তী সময় সহিংসতা। এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার।

বুধবার এব্যাপারে মুছা মাতব্বরের সহকারী মো. জয়নাল আবেদীন বাদী হয়ে রাঙামাটি কোতয়ালী থানায় একটি সাধরাণ ডায়রী করেন। যার জিডি নং-৫৩৫।

রাঙামাটিতে যুবদল, ছাত্রদলসহ আট নেতাকে বহিষ্কার

বহিস্কার

নিজস্ব প্রতিনিধি:
রাঙামাটি জেলা যুবদলের সভাপতি,সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা ছাত্রদলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জেলা যুবদলের চার নেতা এবং জেলা ছাত্রদলের চার নেতাসহ আট নেতাকে বহিষ্কার করেছে রাঙামাটি যুবদল,ছাত্রদল। মঙ্গলবার বিকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।

জেলা যুবদলের বহিস্কৃত নেতারা হলেন, জেলা যুবদলের ত্রাণ ও পূর্ণবাসন সম্পাদক মোঃ আজিজ, সহতথ্য ও গবেষণা সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, সদস্য মোঃ ইউনুচ, সদস্য মোঃ মহসিন এবং জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক দেলোয়র হোসেন,পৌর ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক জয়নাল উদ্দীন, সদর থানা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বায়োজিদ রণি,রাঙামাটি কলেজ ছাত্রদলের সদস্য ও ২নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি মোশারফ হোসেন ফয়সাল।

তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে তথা ধানের শীষ প্রতীক মেয়র প্রার্থী মেয়র ভূট্টোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তথ্য প্রমাণাদি সাপেক্ষে যুবদল এবং ছাত্রদল এবং দলের সাধারণ সদস্য পদ থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে।

জেলা যুবদল এবং ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দলীয় জৈষ্ঠ নেতাদের নির্দেশে এবং জেলা যুবদল এবং ছাত্রদলের সম্পাদক মন্ডলীর সভার সিন্ধান্ত মোতাবেক বিকালে দলীয় কার্যালয়ে আলোচনা সভার মাধ্যমে তাদের বহিষ্কার করা হয়।

রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে প্রস্তুতি সম্পন্ন: পৌঁছানো হয়েছে ২৮টি ভোট কেন্দ্রে নির্বাচনী সরঞ্জামাদি

পৌরসভা নির্বাচন

স্টাফ রিপোর্টার:

৩০ ডিসেম্বর রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ ভোটগ্রহণে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষে নির্বাচন সংক্রান্ত এক জরুরি আদেশ জারি করেছেন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সামসুল আরেফিন।

মঙ্গলবার সকালে রাঙামাটি জেলা রিটানিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মোস্তফা জামান কেন্দ্রের ২৮জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের হাতে নির্বাচনের ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্সসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তুলে দেন। তাছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিপি) ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা কড়া নিরাপত্তায় স্ব-স্ব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে রাঙামাটি রির্টানিং অফিসার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো.মোস্তফা জামান বলেন, রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচন প্রভাবমুক্ত, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে শহরে সব ধরনের নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে অতিরিক্ত নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাত ১২টা হতে ৩০ ডিসেম্বর মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত এ পৌর এলাকায় অটোরিকশা, ট্যাক্সিক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক, টেম্পো যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

তিনি আরও বলেন, এ পৌর এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বা স্পর্শকাতর এলাকা বলতে তেমন কোনো কিছুই নেই। তবে কেউ যদি কোনো নাশকতা বা প্রতিকূলতার সৃষ্টির চেষ্টা চালায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বহিরাগতদের ব্যাপারে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে বলে জানান রিটানিং কর্মকর্তা। নির্বাচন রিটানিং অফিসার আরো জানান নির্বাচনী সকল সরঞ্জাম এসে পৌছে গেছে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে স্ব-স্ব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, রাঙামাটি শহরে র‌্যাব ও বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী এলাকায় ভ্রাম্যমান আদালতের কাজ করছে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের বেশ কয়েকটি টিম।

জেলা প্রশাসনের আদেশে বলা হয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর মধ্যরাত ১২টা হতে ১ জানুয়ারি মধ্যরাত ১২টা পর্যন্ত এ নির্বাচনী এলাকায় কোন ব্যক্তি জনসভা, অনুষ্ঠান বা তাতে যোগদান এবং কোনো মিছিল বা শোভাযাত্রার আয়োজন করতে পারবেন না। এছাড়া নির্বাচন প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে সোমবার দুপুর ১২টার মধ্যে হোটেলে অবস্থানকারী বহিরাগতদের অবস্থান ত্যাগ করে চলে যেতে বলা হয়েছে আদেশে।

তাছাড়া ৩০ ডিসেম্বর এ পৌরসভার নির্বাচনে ভোটাররা কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য অনুরোধ করা হয়। আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে সর্বশেষ পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আকবর হোসেন চৌধুরী (নৌকা), বিএনপির সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভূট্টো (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির শিব প্রসাদ মিশ্র (লাঙ্গল), পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. গঙ্গা মানিক চাকমা (নারকেল গাছ) ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রবিউল আলম রবি (কম্পিউটার)।

এছাড়া ৯ ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর (পুরুষ) পদে ৩৯ এবং সংরক্ষিত (নারী) ৩ আসনে ৭ কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। জেলা নির্বাচন অফিস জানায়, এবার এ পৌরসভায় মোট ২৮টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন ৫৮ হাজার ৩৯৭ ভোটার। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩২ হাজার ১৬৯ এবং নারী ২৬ হাজার ২১৮ ভোটার। মোট ভোট কক্ষের সংখ্যা ১৯৩টি।

প্রসঙ্গত, এবার রাঙামাটি পৌরসভার ১৮তম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

রাঙামাটিতে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী রবি’র উপর হামলা

robi

নিজস্ব প্রতিনিধি:

রাঙামাটি পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী ও বহিস্কৃত জেলা শ্রমিক দলের সহ-সভাপতি রবিউল আলম রবি’র উপর একদল দুষ্কৃতকারী অতর্কিত হামলা চালিয়েছে।

সোমবার রাত দশটায় শহরের আসামবস্তীর নারকেল ফার্ম এলাকায় প্রচারণা শেষে ফেরার পথে আনুমানিক ১০-১২ অজ্ঞাত যুবক রবি’র গাড়ি বহরে হামলা করে। এসময় রবি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

দুস্কৃতকারীর হামলায় মেয়র প্রার্থী রবি বুকে ও পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। হামলার ব্যাপারে রবি পার্বত্যনিউকে জানান, আমি শেষ দিনে আসামবস্তির নারকেল ফার্ম এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে আসার সময় রাতের অন্ধকারে একদল অজ্ঞাত যুবক নারকেল ফার্ম এলাকা থেকে পাথর ও ইট ছুঁড়তে থাকে। অতর্কিত হামলায় কয়েকটি ইট আমার বুক এবং পায়ে এসে লাগে।

এসময় আমার সাথে থাকা কর্মীরা ভয়ে দিশেহারা হয়ে উঠে। তাদের হামলায় আমার প্রচারণার গাড়ির গ্লাস ভেঙ্গে যায় এবং গাড়ির পিছনের কভার ফেটে যায়। এ ঘটানার পর আমি রাতে অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে কোতয়ালী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছি।

রাঙামাটি কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রশিদ পার্বত্যনিউজকে জানান, মেয়র প্রার্থী রবি গতকাল রাতে থানায় এসে অভিযোগ দায়ের করেছে। আমি সর্বাত্বক চেষ্টা চালাচ্ছি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, পায়ে এবং বুকে আঘাতজনিত কারণে রাতের বেলায় হাসপাতালে আসেন রবিউল আলম রবি। পরে তার অবস্থা বিবেচনায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি দেওয়া হয়েছে।

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

ম্যালেরিয়া জ্বরের কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

ম্যালেরিয়া

দিদারুল আলম রাফি:

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং ৩ পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় ম্যালেরিয়া ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়াবহ আকার ধারণ করছে এই রোগ।

তিন পার্বত্য জেলায় কয়েক বছর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ রোধ করা গেলেও তা আবারো জনমনে আতংক দেখা দিয়েছে। গত কয়েকবছর তা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও চলতি বছরে, পাহাড়ের মানুষের কাছে ফের মহামারী হিসেবে দেখা দিয়েছে ম্যালেরিয়া।

ম্যালেরিয়া মূলত প্লাজমোডিয়াম, ফেলসিপেরাম, ভাইভক্স, ওভালে অথবা ম্যালেরি-এর যেকোনো একটি জীবানু বহনকারী মশার দংশন থেকে এ রোগ হয়।

ম্যালেরিয়ার লক্ষণ:
ম্যালেরিয়ার সাধারণ লক্ষণ হল শীত লাগা এবং কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা। এটা বড়দের মধ্যেই অধিকহারে দেখা যায়। বাচ্চাদের অনেক সময় জ্বরের সঙ্গে পেটের গোলমাল, শ্বাসজনিত অসুবিধা ইত্যাদি দেখা যায়। ছয় মাস
থেকে পাঁচ বছরের বাচ্চাদের মধ্যে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা ভাবটি লক্ষ্য করা যায় না। এর পরিবর্তে খিটখিটে ভাব, ঝিমুনি, খাওয়ার অনীহা, বমি, মাথাব্যথা, খুব বেশী জ্বর প্রভৃতি দেখা দিয়ে থাকে। পাঁচ বছরের বেশী বয়সীরা ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হলে প্রথমে শীত ও কাঁপুনি অনুভব করে, তারপর জ্বর ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। সেই সঙ্গে প্রচন্ড মাথাব্যথা ও তারপর ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লে রোগী খুব দুর্বল বোধ করে। ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া ভয়াবহ আর জটিল আকার ধারণ করতে পারে শুরু থেকেই।
খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, রক্তস্বল্পতা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, কোমায় আচ্ছন্ন হওয়া ইত্যাদি জটিলতার লক্ষণ।

প্রাথমিক বিপদ সংকেত 
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখলে অতি দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে:

পানি অথবা খাবারের প্রতি খুব বেশী অনীহা, ঘন ঘন বমি হওয়া, খিঁচুনি ও ঝিমুনিভাব দেখা দিলে বা অজ্ঞান হয়ে পড়লে এবং রোগীর মাঝে অত্যধিক ক্লান্তি দেখা দিলে।

রোগ নির্ণয়ের উপায় 
রক্ত পরীক্ষার মধ্যে ম্যালেরিয়ার জীবাণু খুঁজে বের করা রোগ নির্ণয়ের সর্বেোত্তম উপায়। ম্যালেরিয়া সন্দেহ করলে যে কোন সময়ই রোগীর রক্ত পরীক্ষা করা যাবে। তবে তা অবশ্যই ওষুধ শুরু করার আগে। যদি প্রথম পরীক্ষায় কিছু না পাওয়া যায়, তবে পরপর তিনদিন পরীক্ষা করা উচিত। মাইক্রোস্কোপ ছাড়াও এখন
ম্যালেরিয়ার এন্টিজেন পরীক্ষা করা হয়। এ ধরনের পরীক্ষায় কম সময় লাগে।

ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা                                                                                                                    রক্তের ব্লাড ফিল্ম নামক পরীক্ষাটি দ্বারা জীবাণু নিশ্চিত করা যায়। 

জটিলতা                                                                                                                                রক্ত শুন্যতা, প্লিহা (Spleen) বড় হয়ে যাওয়া, কোমাসহ মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

চিকিৎসা 
ম্যালেরিয়া রোগের চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ ও আরোগ্য লাভ। চিকিৎসা নির্ভর করে রোগী কী ধরনের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে, ভাইভ্যাক্স না ফ্যালসিপেরামে। ম্যালেরিয়ার জন্য ক্লোরোকুইন সবচেয়ে কার্যকরী ওষুধ। কিন্তু পুরো কোর্স খেতে হবে। তবে এখন আরও ভাল ভাল ওষুধ দেশে আছে।
ম্যালেরিয়ার জটিলতা দেখা দিলে সত্বর চিকিৎসা শুরু করতে হবে। সব রকম সুব্যবস্থা আছে এমন হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা করা উচিত।

ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধের উপায় 
ম্যালেরিয়াবাহী মশা মূলত সন্ধ্যা থেকে ভোরের মধ্যে কামড়ায়। এ সময়টাকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। সন্ধ্যা থেকে শোয়ার আগে আর শোয়ার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বিছানায় যাওয়ার আগে শরীরের খোলা অংশগুলোতে মশা তাড়ানোর ক্রিম লাগানো যেতে পারে; কিন্তু এ ক্রিমগুলোর কার্যকারিতা স্বল্পস্থায়ী। মশারি ব্যবহার না করলে মশা তাড়ানোর ধুপ ও ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়িঘর ও আশপাশে যাতে মশা বংশবৃদ্ধি করতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কোথাও অবাঞ্ছিত পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ওষুধ খেয়ে ম্যালেরিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার পদ্ধতিটি যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য নয়। কোনো অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার
প্রাদুর্ভাব থাকলে সে স্থানে যাবার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কলোরোকুইন বা প্রগুয়ানিল জাতীয় ঔষধে এ রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচা যায়।