মেহেদী হাসান পলাশের কিছু লেখা

পার্বত্যনিউজের সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশের কিছু লেখার লিংক নিচে দেয়া হলো:

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা
  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য
  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে
  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?
  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে
  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী
  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক
  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ
  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১
  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২
  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩
  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে
  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই
  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী
  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ
  17.  রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?
  18. ♦ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতি-কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন
  19.  পাহাড়ের উৎসব: ‘বৈসাবি’ থেকে হোক ‘বৈসাবিন’
  20.  ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: সরকারের মর্যাদা কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার ক্ষুণ্ন হতে পারে
  21.  ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বৈষম্যমূলক ও বাঙালি বিদ্বেষী
  22.  ভারত ভাগের ৬৯ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসন দিবস পালন করে পাহাড়ী একটি গ্রুপ
  23.  বিজিবি ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করছে
  24.  বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার না করতে তথ্য বিবরণী জারী করেছে সরকার
  25.  বিজিবি’র মর্টার গোলার আঘাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ২ কর্মকর্তাসহ ৪ সেনাসদস্য নিহত: আহত ৩
  26.  বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলিতে আরো ৪ বিজিবি সদস্য নিখোঁজ (ভিডিওসহ)
  27.  নাইক্ষ্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চরম উত্তেজনা : মিয়ানমারের বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন, গুলিবর্ষণ
  28.  জেএসএস’র খাগড়াছড়ির পুনরুদ্ধার মিশন: দ্রুত অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রাম
  29.  পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা উচিত – ড. আনিসুজ্জামান
  30.  কাউন্টার টেরোরিজম

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতি-কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ

গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারি মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এ সকল পত্রিকার রিপোর্টার ও সিনিয়র সাংবাদিকগণের সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা এসব সরেজমিন প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত খবরের নিয়মিত পাঠক হিসাবে বলতে পারি, বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় দৈনিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখালেখির একটি কমন ট্রেন্ড রয়েছে। এই ট্রেন্ডের টার্গেট থাকে পুনর্বাসিত বাঙালি ও সেনাবাহিনী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অশান্তি ও অস্থিরতার জন্য এদেরকে দায়ী করা হয় এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র শাখার সন্ত্রাসী তৎপরতাকে সযত্মে আড়াল করা হয়। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনগুলোতে সেই ট্রেন্ড ছিল না। রিপোর্টারগণ সরেজমিন পরিদর্শন করে খোলা চোখে যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত এবং লুকানো বাস্তবতা উঠে এসেছে এই রিপোর্টগুলোতে। এতে সারাদেশের মানুষের মনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত চিত্রের উপর কিছুটা হলেও ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

গত ৯ জানুয়ারি সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়াতে সুপারিশ করা। একই সাথে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কমিটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ইতিবাচক রিপোর্টের সুফল।

স্বাধীন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের কালপঞ্জীকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। সত্তরের দশকে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠা, আশির দশকে বাঙালি পুনর্বাসন এবং ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি।  ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুধু রাজনীতি নয়; নিরাপত্তা, উন্নয়নসহ জনজীবনের সকল ক্ষেত্রেই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও দিকবদল। শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সন্ত্রাসী ও নিরাপত্তা বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি ও শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে ছিল। শান্তিবাহিনী যেখানে পেরেছে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের উপর অতর্কিত বা পরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোও হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত শান্তিবাহিনীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আটক করেছে।

শান্তিচুক্তির পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের একটি অংশ অস্ত্র জমা দিয়ে সাধারণ ক্ষমার আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসাই নয়, শান্তিচুক্তির পুনর্বাসনের আওতায় জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা অতিদ্রুতই মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদায় সরকারি পদে আসীন হয়। ফলে কিছুদিন আগেও যে সন্ত্রাসী হিসাবে রাষ্ট্রের ও সেই সুবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর শত্রু ছিল, চুক্তির বছরখানেকের মধ্যেই তারা একই অফিসের বস বা সহকর্মীদের পরিণত হয়। অনেকেই আবার রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন সুবিধার আওতায় ব্যবসা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ভাবে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে একথা সকলেই জানেন যে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে অস্ত্র সমর্পণ না করে রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। শান্তিচুক্তির দুই দশক পরেও এই তৎপরতা স্তিমিত না হয়ে ক্রমাগত বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিগত ২ বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসনীয় অর্জন রয়েছে। বিশেষ করে সাজেক, বাঘাইছড়ি, দিঘীনালা, মহালছড়ি, রাঙামাটি ও রুমাতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। অন্যদিকে আলীকদমে আলোচনার মাধ্যমে অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাস মোকাবেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে অতীতে বিস্তারিত লিখেছি বহুবার।

কিন্তু শান্তিচুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে শান্তিবাহিনী ও জেএসএসের যেসকল নেতাকর্মী পূর্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছে তাদের মোকাবেলার বিষয়টি আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, বর্তমান প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখলে এটা সহজেই প্রতিভাত হয়ে যে, শান্তিবাহিনী সশস্ত্র লড়াই করে যা অর্জন করতে পারেনি, শান্তিবাহিনীর সাবেক ও গুপ্ত সদস্যরা নিরস্ত্র লড়াই চালিয়ে তার চেয়ে ঢের বেশী অর্জন করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সশস্ত্র লড়াইয়ের ঝুঁকি ও কষ্টকর জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজাত, শিক্ষিত ও নিরীহ উপজাতীয় সমাজে যতটা থাবা বিস্তার করতে পেরেছিল, নিরস্ত্র লড়াই তার থাবা সহজেই অনেক গভীরে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে অফিস-আদালত, হাটে-মাঠে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প বাণিজ্য, মিডিয়া প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে শান্তিবাহিনীর নিরস্ত্র অনুসারীরা জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি অবস্থানে থেকে এই নিরস্ত্র অনুসারীরা প্রকাশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং গোপনে স্বাধীনতার জন্য বা স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন লক্ষ্যে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সামনে, বাংলাদেশের ইন্টিলিজেন্স এজেন্সিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নিরস্ত্র ও গুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলার উপায় বের করা।

আমরা জানি, রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক উপাদান হচ্ছে জাতীয়তা বা জাতীয়তাবোধের চেতনা। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা থেকেই দেশপ্রেমের জন্ম হয়। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা বা দেশপ্রেমের কারণেই ১৯৪৭ সালে এই ভূখ-ের নাগরিকেরা ভারতে যোগ না দিয়ে পাকিস্তান নামে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাস খুললে দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সামন্ত সমাজের বড় অংশটিই ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে এ ভূখ-ে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিল বা সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের একটি অংশ এখনো এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে চলেছে। তার প্রমাণ ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি থেকে ভারতীয় পতাকা নামানোর দিনকে উপজাতীয় এ সকল জনগোষ্ঠীর একাংশ কর্তৃক ‘পাকিস্তান আগ্রাসন দিবস’ পালন করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন না করা প্রভৃতি।

শুধু জাতীয় চেতনার সাথে অঙ্গীভূত না হওয়াই নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে এই জাতীয় চেতনার বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক, প্রতিহিংসামূলক ও ঘৃণাত্মক প্রচারণা চলানো হচ্ছে প্রবলভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা ও তাদের অনুসারীগণ ক্রমাগত বিভিন্নভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক, বিদ্বেষমূলক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ অপপ্রচারণায় সরলপ্রাণ, সাধারণ ও নিরীহ পাহাড়ি তরুণরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। এতে তাদের মনেও জন্ম নিচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি  ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র উপজাতীয়দের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিয়েছে বিশেষ কোটা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্যও দিয়েছে নানা প্রকার আর্থিক বিশেষ সুবিধা। এই কোটা ও আর্থিক সুবিধার আওতায় বড় হয়ে একটি পাহাড়ি তরুণের যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অপার দেশপ্রেম প্রদর্শন করার কথা, বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো।

পাহাড়ি সংগঠনগুলোর হেট্রেইট ক্যাম্পেইনের শিকার হয়ে আজ পাহাড়ের ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বিদ্বেষী তরুণ প্রজন্ম যাদের আনুগত্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি নয়, বরং জুম্মল্যান্ড নামক কল্পিত রাষ্ট্রের প্রতি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পলাতক (পরে ভারতে আটক) ক্যাপ্টেন উদ্ভাস চাকমা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উদ্ভাস চাকমা ইনফেন্ট্রি অফিসার হিসাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। পরে আর্টিলারি ও কমান্ডো অফিসারের কোর্সও করার সুযোগ পায় সে। এমন উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানিও তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে কল্পিত জুম্মরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জুম্ম লিবারেশনর আর্মির প্রশিক্ষক হিসাবে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গমন করে। উদ্ভাস চাকমা শুধু একজন নয়, রাষ্টের বিভিন্ন সেক্টরে এমন অনেক উদ্ভাস চাকমা আছে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপপ্রচারের প্রধান টার্গেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুনর্বাসিত বাঙালি। কারণও স্পষ্ট। কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের পক্ষে এ দুটিই প্রধান বাধা। পাহাড়ি সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থকরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এ দুটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।

এদের জন্য মঞ্চ, মিডিয়া, বই, জার্নাল, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন, আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা সবই রয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ সজ্ঞানে অথবা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে এই রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় সমর্থন জুগিয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা অনেকেই জানেন। কাজেই জুম্মরাষ্ট্রের সমর্থকদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণও স্পষ্ট। বাংলাদেশের তথাকথিত নাগরিক সমাজের সমর্থনের কারণও একই। দেখা যায়, নাগরিক সমাজের নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন দেশ ও সেসব দেশের এনজিও এবং দাতা সংস্থার সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত বা উপকারভোগী। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনীতিবিদদের জন্যও এ কথা সত্য। তবে এদের বেশিরভাগই আবার বামধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সাথে বাম ধারার রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নানা কারণে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সামগ্রিক এই সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, অপপ্রচারের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা গড়ে উঠতে পারেনি। সে কারণে রামপাল নিয়ে জাতীয়ভাবে যে আন্দোলন দেখেছি, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৬ এর বিরুদ্ধে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ গুরুত্ব বিচার করলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাংলাদেশের এক-দশমাংশ  ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর জন্য কে দায়ী? দায়ী রাষ্ট্র, দায়ী সরকারসমূহ, দায়ী দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো। কেননা তারা কখনই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় দৃষ্টিতে দেখেনি, জাতীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং এ অঞ্চলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করেনি। সে কারণে সরকারের সাথে সাথে পার্বত্য নীতি পরিবর্তিত হয়েছে, এমনকি অফিসার পরিবর্তনের সাথে সাথেও এ নীতি পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। অথচ প্রতিপক্ষ কিন্তু অর্ধ শতাব্দী ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং আজ তার সুফল পেতে শুরু করেছে।

একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সকল ইতিহাস ও যুক্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ও নাগরিক সমাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা হয়। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, ‘উপজাতি’ বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে এবং ‘আদিবাসী’ বললে তারা যদি সম্মানিত বোধ করে তাহলে সমস্যা কোথায়? কেউ কেউ এ নসিহতও করেন যে, বড় জাতি বাঙালিদের এতটুকু উদারতা দেখানো উচিত। অদ্ভুত এক সরল চিন্তা। কিন্তু ‘আদিবাসী’ উপমার আড়ালে যে ভয়াবহ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের আন্তর্জাতিক ব্লু প্রিন্ট লুকায়িত রয়েছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষই সে বিষয়ে অজ্ঞাত। কারণ রাষ্ট্র তাদের সচেতন করেনি।

রাষ্ট্র মিডিয়াকে দূষেছে, অথচ মিডিয়াকেও ডেকে, বুঝিয়ে বলা হয়নি, কেন ‘আদিবাসী’ থিওরিটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এবং কতটা ক্ষতিকর। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে শুধু পড়ানো হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বছরের পর বছর একই সিলেবাস পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীদের ধারণা জন্মে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন শুধু পাহাড়িদের আবাসস্থল। ফলে বড় হয়ে তাদের ধারণা জন্মে বাঙালিদের ও সেনাবাহিনীকে সেখানে পাঠানো ভুল সিদ্ধান্ত। আমাদের সিলেবাসে ’৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী ও সংগ্রামের কাহিনী পড়ানো হয় অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত সেনাসদস্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছে তাদের জীবনী পড়ানো হয় না। ফলে শহীদ লে. মুশফিক, ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীন, মেজর মহসিন রেজাদের আত্মত্যাগ আড়ালেই রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ’৭১ শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে জেলায় জেলায়। অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। ফলে পর্যটকরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হয়ে ফিরে আসেন, কিন্তু এই পার্বত্য চট্টগ্রামকে পর্যটনবান্ধব করে আজকের অবস্থায় আনতে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন তাদের কথা কেউ জানে না।

হলিউড বলিউডে রাষ্ট্রবিরোধীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন লড়াইয়ের বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে সিনেমা, নাটক তৈরি হয় কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সংগ্রাম নিয়ে কোনো ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি হয়নি। বলিউডে কারগিল নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে, সীমান্তে ফেলানীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে সিনেমা বানিয়েছে বজরঙ্গি ভাইজান। ওরা নিরাপত্তা বাহিনীর ত্যাগকে জাতীয়ভাবে গৌরবের উপাদান হিসাবে তুলে ধরছে কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনা, ভৌগোলিক গুরুত্বের বিষয়টি পড়ানো হয় না। পড়ানো হয় না পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানের গুরুত্ব। ফলে আমরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বৈসাবি, কোমর তাঁত, দোচুয়ানী, বাঁশ নৃত্য, বোতল নৃত্য প্রভৃতি উপজাতীয় সম্প্রদায়ের নাম, খাদ্য, পোশাক ও সংস্কৃতির বাইরে আর কিছুই জানতে পারছি না।

দেখা যায়, আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করতে এলে তাকে যে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য দেয়া হয় তা একটি পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টু। এমনকি তিনি/তারা যাদের সাথে কথা বলেন, সেই নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গও বিশেষ পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে ঐ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ফিরে গিয়ে যখন রিপোর্ট করেন তাও একদেশদর্শী হয়। এতে করে রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র তখন ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে। কিন্তু বাস্তবতা কী? রাষ্ট্র কি তার কাছে নিরপেক্ষ তথ্য গবেষণা পৌঁছে দিয়েছে? নাকি রাষ্ট্রের এ ধরনের কোন ইন্সট্রুমেন্ট বা থিংক ট্যাংক আছে? বিষয়গুলো ভেবে দেখার দাবি রাখে।

তাই আজ সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা সৃষ্টির উপায় বের করা। একই সাথে এ অঞ্চল নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বিভ্রান্তিকর, হিংসাত্মক, বিদ্বেষপ্রসূত ও ঘৃণাব্যঞ্জক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা মোকাবেলা করা। এই কাজটি খুব সহজ নয়। কেননা শান্তিচুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা যখন অস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে অবস্থান করছিলো তখন হয়তো তাদের অস্ত্র নিয়ে মোকাবেলা করা যেত। কিন্তু শান্তিবাহিনীর যে সাবেক সদস্য বা তাদের অনুসারী অফিসে, আদালতে, মিডিয়াতে, মঞ্চে, ময়দানে, এনজিওতে, আন্তর্জাতিক ফোরামে বসে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাকে তো অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাকে মোকাবেলার জন্য তার ক্ষেত্রেই উপায় ও ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করতে হবে।

ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যে ব্যক্তিটি সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে তাকে আইসিটি অ্যাক্ট দিয়ে মোকাবেলা করে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়, মিথুন চাকমা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সামাজিক গণমাধ্যমের অপপ্রচার যেমন সামাজিক গণমাধ্যমেই কাউন্টার করে জবাব দিতে হবে। তেমনি মিডিয়া, বই, পুস্তক, গবেষণা, সেমিনারের জবাব আইন ও শাসন দিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এগুলোর জবাবও মিডিয়া, বই, পুস্তক, জার্নাল, গবেষণা, তথ্য, উপাত্ত ও সেমিনার করেই দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আজ নিরাপত্তা টহলের চেয়েও অপপ্রচারের মোকাবেলা (কাউন্টার ক্যাম্পেইনিং) অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ফেসবুকের বিরুদ্ধে ফেসবুক, কলমের বিরুদ্ধে কলম, তথ্যের বিরুদ্ধে তথ্য, মিডিয়ার বিরুদ্ধে মিডিয়া, মঞ্চের বিরুদ্ধে মঞ্চ সৃষ্টি করতে হবে।

আগামী দিনের তরুণ ও যুবকেরা যেনো সন্ত্রাসবাদী, রাষ্ট্রবিরোধী ও তাদের অনুসারীদের খপ্পরে পড়ে রাষ্ট্রবিদ্বেষী না হয়ে পড়ে তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তাদের প্রবলভাবে জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করতে, দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর প্রতি পার্বত্যবাসীকে সচেতন ও আন্তরিক করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে ১৬ কোটি মানুষকে দেশের এই এক দশমাংশ ভূখ-ের প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ, অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এ কাজে কোনো গাফলতি, ধীরগতি কেবল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখ-তাকেই হুমকির মুখেই ফেলবে।
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

  17.  রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ :

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিদেশী দাতা সংস্থা ইউএনডিপি’র কার্যক্রম মনিটরিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা, সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তন, বিদেশী অতিথি ও কূটনীতিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ ও আনসারে যোগ দেয়া শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলীর মতো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্র দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রস্ফুটিত হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬ থেকে তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের নিকট ১১ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ফ্যাক্স পাঠানোর পর এ তথ্য জানা যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি লেখকের সংগ্রহে রয়েছে। বিজিবি’র একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি পরবর্তী পার্বত্য চট্রগ্রামের পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, আনসার ভিডিপি’র মহাপরিচালক, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবির কর্মকর্তাগণ।

সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একাধিক সংগঠন বিভিন্নভাবে শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমসহ চাঁদাবাজি, অপহরণ ও বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ি জনপদ ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামের উন্নয়নের নামে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার জবাবদিহিতা নেই বলললেই চলে। পার্বত্য জনপদে ইউএনডিপিসহ অন্যান্য এনজিও যেসব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে সেসব প্রকল্পের মনিটর করা দরকার। এছাড়া, তিন পার্বত্য জেলায় যেসব সংগঠন শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত এবং চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের সাথে যুক্ত তাদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামে গত দশ বছরে ইউএনডিপির মাধ্যমে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে মনিটর করা প্রয়োজন৤ তিনি বলেন, বিদেশী নাগরিকদের পার্বত্যাঞ্চল ভ্রমণে  Code of Conduct  প্রণয়ন করা দরকার। অনেক সময় বিদেশী নাগরিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে শুধু জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারকে জানিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে যায়, এটি সঠিক  নয়। জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের কাছে এধরণের কোন আবেদন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলে মন্ত্রণালয়ই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এদিকে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষায়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৪টি অধ্যায়ে ৭২টি ধারা রয়েছে। অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্ত লারমা) স্বীকার করেন না। উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার কারণে গত ২২ বছরেও তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তিচুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত ৩৩টি বিষয় /বিভাগসমূহের মধ্যে ৩০ টি সংস্থা/বিষয় ইতোমধ্যে হস্তান্তরিত হয়েছে। অবশিষ্ট তিনটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় হস্তান্তর কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, জেএসএস এবং ইউপিডিএফসহ আরও যে সব স্থানীয় সংগঠন আছে তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গ্রুপগুলো সব সময়ই সক্রিয় রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানীতেও কোন কোন সংগঠন জড়িত রয়েছে মর্মে অভিযোগ আছে। বিজিবি কর্তৃক বিওপি স্থাপনের জন্য বন বিভাগ থেকে জায়গা চাওয়া হলে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় হতে সহযোগিতা করা হবে মর্মে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক বলেন, উন্নয়নের নামে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কোথায় খরচ করা হলো তার হিসাব নেওয়া দরকার। ইউএনডিপির কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া যেতে পারে। তিনি  বলেন, বিদেশী পর্যটকগণ স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে গিয়ে থাকেন। ফলে বিষয়টি প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর অগোচরেই থেকে যায়। সভায় ডিজিএফআই প্রতিনিধি বলেন, বিদেশী নাগরিক মন্ত্রণালয় বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেলে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত কারোর মেহমান হিসাবে সাধারণ যানবাহনে গমন করে থাকে। সিএইচটি কমিশন সহ কিছু সংস্থা স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ব্যতিরেকে বৈঠক ও আলাপ আলোচনা বেশি পছন্দ করে। পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীয়দেরকে আদিবাসী হিসাবে ঘোষণা করা তাদের মূল উদ্দেশ্য। অন্যান্য বিষয়ে অনৈক্য থাকলেও এই পয়েন্টে সকল স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠন একমত পোষণ করে। বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়:

বিগত ১০ বছরে পার্বত্য চট্রগ্রামে ইউএনডিপি কর্তৃক ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের  উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ফলাফল প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়; শান্তিচুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সংগঠন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র চোরাচালান রোধকল্পে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার এর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; কোন আইনগত ভিত্তি না থাকায় সিএইচটি কমিশনের নাম সংশোধন করে ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ রেখে অন্য কোন নাম রাখার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়; কূটনৈতিকগণ ছাড়া সাধারণ বিদেশী নাগরিকগণ পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করতে চাইলে অন্তত একমাস পূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করবেন; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমতি প্রদান করবে; অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী নাগরিকগণ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারের নিকট তাদের উপস্থিতি/ভ্রমণসূচি দাখিল সাপেক্ষে ভ্রমণ করবেন; কূটনৈতিকগণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি গ্রহণ করে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করবেন; কোন দেশী-বিদেশী ব্যক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাত কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবি এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে; পার্বত্য চট্রগ্রামের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সাথে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ দায়িত্ব পালন করবে; ভারত ও বাংলাদেশের সাথে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্রগ্রামের ৪৭৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে ইতোমধ্যে গৃহীত/বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাসহ আবশ্যকীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব বিজিবি প্রেরণ করবে; পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান চেকপোস্টগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশ ও আনসার বাহিনীতে কর্মরত শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলীর সুপারিশ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। নিকট অতীতে এতো সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত, লক্ষ্যানুসারী সিদ্ধান্ত দৃষ্টিগোচর হয়নি। সন্দেহ নেই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত দেশবাসী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পাহাড়ী সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক, দেশী বিদেশী দাতা সংস্থা, এনজিও ও কূটনীতিকরা চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়েছে। তাই তারা সরকারী এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে তাদের অনুজীবী দেশীয় রাজনীতিবিদ, এনজিওকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মাঠে নামিয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহকে অগণতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক, নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতা, শান্তি চুক্তি বিরোধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরো বলেন, বিদেশী নাগরিকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে  যেতে অনুমতি লাগবে আবার যে কেউ সেখানকার ‘আদিবাসীদের’ সাথে দেখা করতে চাইলে সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে সাথে রাখতে হবে এইরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্বুদ্ধিতা ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দেয়’।

বিশিষ্ট কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সিএইসটি কমিশনের নাম পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের এ অধিকার স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কে দিয়েছে? এতদিন পর নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ কেন তোলা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অধিকার আছে দেশের বাইরে থেকে আসুক বা দেশের ভিতর থেকে কেউ আসুক সে বিষয়ে নজরদারী রাখা। তার মানে তো এই নয় যে, একজন বাঙালী পাহাড়ী কাউকে বিয়ে করতে হলে, বিয়ের বরযাত্রী নিয়ে পাহাড়ে যেতে হলে প্রশাসনের অনুমতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লাগবে। পাহাড়ীদের কি কোন বিদেশী মেহমান থাকতে পারে না’? এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা জানি জেলে কারোর সাথে দেখা করতে হলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে করতে হয়। তাহলে আমার প্রশ্ন, পার্বত্য চট্রগ্রাম কি তাহলে কারাগার যে এখানে বাইরের কেউ যেতে হলে অনুমতি নিতে হবে’। পংকজ ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাঙালি যে একটি উপনিবেশবাদী জাতি তা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা বর্ণবাদী, ইহুদী, জার্মানির মতো। এর মধ্য দিয়ে জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ্যে রূপ লাভ করেছে। পাহাড়ে সেনা শাসনের বিষয়টি এর মধ্য দিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো। এটাকে বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িকতা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তনের অনুরোধের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই কমিশনের সদস্য ব্যরিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংবিধান পরিপন্থী। তাছাড়া কোন একটি সংগঠনের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আছে কি? অধ্যাপক মেসবাহ কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে নির্লজ্জ সিদ্ধান্ত ও পার্বত্য চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক’ বলে অভিহিত করেন।

 উল্লেখ্য যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা বিরূপ মনোভাব ও মন্তব্য করেছেন তাদের সম্পর্কে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এরা কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন এনজিও সাথে জড়িত বা তা থেকে লাভবান। আর ঐ সকল এনজিও উল্লিখিত দাতা দেশ ও উন্নয়ন সংস্থা থেকে আর্থিকভাবে অনুদানপ্রাপ্ত বা লাভবান। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিকূলে যেকোনো সিদ্ধান্ত ও ঘটনাবলীতে তারা সবসময় সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার নয় বরং এর পেছনে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত।

 পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা সাম্প্রদায়িকতার বীজবপন তা ড. ইফতেখারুজ্জামানের স্বার্থের চোখে ধরা না পড়লেও তাকে প্রথম আলোর সাবেক ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্রের আর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশে, মহাদেশ নির্বিশেষে বিয়ে হচ্ছে সর্বত্র। কেবল বাংলাদেশের পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাছেই এটা মহা অপরাধ। যেকোনো কোনো পাহাড়ী মেয়ে কোনো বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করলে পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে থাকে। এমনকি পাহাড়ী মেয়েরা বাঙালী ছেলেদের সাথে প্রেম, বন্ধুত্ব, চলাফেরা করলে পাহাড়ী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে চাপ দেয় ফিরে আসতে। কিন্তু ফিরে না এলে জাতি রক্ষায় নামে উল্লিখিত শাস্তি দেয়া হয়। এটাই তাদের অঘোষিত শাস্তি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য  সাংবাদিক সৈকত ভদ্র। তিনি ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন খাগড়াছড়ির মেয়ে সহযোদ্ধা রেটিনা চাকমাকে। বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করায় রেটিনা চাকমার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। একই কারণে প্রথম আলো থেকে চাকুরী হারাতে হয় তাকে। পাহাড়ীদের চাপে তাকে চাকরী থেকে বহিস্কারের জন্য প্রথমআলোর সম্পাদক বরারব সুপারিশ করেছিলেন ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সৈকত ভদ্র সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামের মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন” । তিনি স্ত্রী রেটিনা চাকমাকে নিলামের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতীয় বিবেক ও মানবিকতার কাছে আর্তনাদ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ গণমাধ্যমের বিবেক ও মানবিকতায় সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ নিষ্ফল করাঘাত করেছে। এমনকি পাহাড়ীদের ব্যাপারে অতি স্পর্শকাতর গণমাধ্যমেও সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।

শুধু এক রেটিনা চাকমা নয়, গুইমারা উমাচিং মারমা, মাটিরাঙার সোনাবি চাকমা, রাঙামাটি কুতুকছড়ির রীনা ত্রিপুরা, রামগড়ের মণিকা ত্রিপুরা, এরকম আরো অসংখ্য পাহাড়ী মেয়েকে বাঙালী বিয়ে করায় অপহরণ, গণধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন নারকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে। অবশ্য সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনিও খাগড়াছড়ির জামাই। স্ত্রী চাকমা সম্প্রদায়ের। তাকে বা তার স্ত্রীকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন তথ্য লেখকের জানা নেই। বরং ঢাকায় তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের কাছে সর্বোচ্চ জামাই আদরই পেয়ে থাকেন। কিন্তু খাগড়াছড়িতে শশুরবাড়ী যেতে হয় রাতের অন্ধকারে। ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রায়ই বলে থাকেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসরাইলী শাসন চলছে। পঙ্কজ বাবুর ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না। তবে তিনি যদি পরিস্কার করে বলেন, ইসরাইলের স্যাটেলার ইহুদি শাসনে নিপীড়িত স্থানীয় মুসলিমদের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কীভাবে মেলালেন। এখানে কারা স্যাটলার, কারা স্থানীয়? কারা শোষক, কারা শাসক?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় দাতা সংস্থাগুলো অনেকটা স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এনজিও পরিচালনা সংক্রান্ত কোনো সরকারি নির্দেশনা তারা মানে না। তাদের কাজের ও খরচের কোনো বিবরণ/হিসাবও সরকারকে দেয় না। এ ব্যাপারে একাধিকবার বলা হলেও তারা তা পালন করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী দাতা সংস্থা, মিশনারী ও এনজিও’র কর্মকাণ্ড সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। এসব এনজিও ও দাতা সংস্থার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে সহায়তা, উস্কানী, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি, ধর্মান্তরকরণসহ নানা অভিযোগ বহুদিনের। সরকারি একাধিক তদন্তে একথা প্রমাণিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইস্ট তিমুর ও সাউথ সুদানের মতো আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর পশ্চিমা নীলনকশাও সকলের জানা। গত ১৩ মার্চ বান্দরবানের আলীকদমে  ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট’ নামে এক খ্রিস্টান মিশনারী লোভ দেখিয়ে অনেকটা গোপনেই স্থানীয় ৩৩ জন মুরুংকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে। পুলিশ এ অভিযোগে মিশনারীটির ৫ জন সদস্যকে গ্রেফতারও করেছে। গতবছর একই এলাকার চাক সম্প্রদায় মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। কাজেই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বৈদেশিক সাহায্যের নামে টাকা এনে এসব এনজিও ও দাতা সংস্থা কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করছে তা জানা জরুরি ও বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার।

এদিকে ১৯৮৯ সালে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন পর নতুন সিএইচটি কমিশন গঠিত হয়েছে। এর নামের আগে এখন আর ইন্টারন্যাশনাল লেখা হয় না। নতুন সংস্থাটি কবে, কোথায় গঠিত ও নিবন্ধিত হয়েছে, কোন আইনে নিবন্ধিত হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার আদৌও কোনো অনুমতি আছে কিনা সেসব খতিয়ে দেখে এই কমিশনকে নিষিদ্ধ করার দাবি পার্বত্যবাসী, বিশেষ করে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের। এই কমিশনের বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগ করে থাকে বাঙালিরা। সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অভিযোগে পার্বত্য বাঙালিরা ইতোমধ্যে এই কমিশনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের সফরকালে প্রায় সবসময় একই অভিযোগে বাঙালিদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান কি করে ‘কমিশন’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তা খতিয়ে দেখে মন্ত্রণালয় কেবল ‘কমিশন’ নামটি বাদ দিয়ে নতুন করে নিবন্ধিত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত সফট ডিসিশন বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে পাশ্চাত্যের স্বতন্ত্র খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র ও তৎপরতার কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশী নাগরিক ও কূটনীতিকদের চলাচলের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এমনিতেই কূটনীতিকদের সকল ভ্রমণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কর্মরত পশ্চিমা কূটনীতিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আইন অমান্য করে থাকেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় এ ঘটনা অহরহই ঘটে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে পরিচয় গোপন করে বা পর্যটকের ছদ্মাবরণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা পরিচালনার কথাও নতুন নয়।  এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের স্পেশ্যাল র‌্যাপোটিয়ার্স Mr. Lars Anders Bear এর কথা স্মরণ করা যেতে পারে।  সুইডেন নাগরিক Mr. Lars Anders Bear বিভিন্ন দেশের আদিবাসী ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। তিনি UNFPII-এ স্পেশাল রেপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োজিত। UNFPII এর দশম অধিবেশনে Mr. Lars Anders Bear কর্তৃক উপস্থাপিত ‘Status of the  implementation of CHT Peace Accord of 1997′ যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি জাতিসংঘের পরিচয় গোপন করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন এবং তার সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত UNFPII এর স্বার্থে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করতেও কসুর করেননি তিনি। এ ধরনের তৎপরতা রোধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নজরদারী করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেখানে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত অপহরণ ও জিম্মি করে হত্যা ও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে সেখানে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতেও নজরদারী প্রয়োজন।

 তবে একথা সত্য যে, এ ধরনের নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনাকে নিরুৎসাহিত করবে এবং একই সাথে সেখানে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের কাজে বাধার সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে সচেতন মহলের অভিমত এই যে, বিশেষ অঞ্চল হিসাবে বিবেচিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশীদের চাকরি ও অবস্থান নিরুৎসাহিত করে বাংলাদেশীদের মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন অঞ্চলে বিদেশীদের ভ্রমণে এ নিদের্শাবলীর শৈথিল্য প্রদর্শন এবং পর্যটন অঞ্চলের বাইরে বিদেশীদের ভ্রমণের এ নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়িভাবে আরোপ করা যেতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, চায়নাসহ বিশ্বের দেশে দেশের ইনসার্জেন্ট অঞ্চগুলোতে এভাবেই বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অন্যতম হচ্ছে, শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্য যারা পুলিশ ও আনসারে যোগদান করেছে এবং তাদের মাধ্যমে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত তাদের পার্ব্ত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলী করতে হবে। এটি অত্যন্ত সঠিক ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

 অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অনেক সদস্য ছাত্রজীবন শেষে নিরাপত্তাবাহিনীর চাকুরীতে যোগদান করে। কিন্তু সার্ভিসে যোগদানের পরেও  অনেকেই তাদের গোপন সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এ বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত পাহাড়ীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে একটি মহল ইউএনডিপি’র ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশ্র পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির নামে উপজাতীয় পুলিশ ও আনসারদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন শুরু করে। এই সুযোগে শান্তিবাহিনীর যেসকল সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে পুলিশ ও আনসারে চাকরী নিয়েছিল তারাও পদায়ন হয়। কিন্তু সার্ভিসে থাকলেও তারা সার্ভিসের গোপন খবর বিশেষ করে অপারেশনাল নানা তথ্যাদি উপজাতীয় সংগঠন ও সন্ত্রাসীদের কাছে পাচার করতো। এ বিষয়ে পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে রিপোর্ট করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাঙালীদের কাছে মদ একটি নিষিদ্ধ পানীয় হলেও পাহাড়ীদের জীবনে এটি খুবই সাধারণ পানীয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপজাতীয় পুলিশ দায়িত্ব পালনকালে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে, বা সন্ত্রাসীরা টার্গেট করে উপজাতীয় পুলিশদের পাহাড়ী মদ খাইয়ে মাতাল করে। মাতাল অবস্থায় সে অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পুলিশের অস্ত্র নিয়ে পলায়ন করে। এ কায়দায় গত দূর্গাপূজার সময় পানছড়িতে লক্ষ্ণীকুমার চাকমা নামের এক শান্তিবাহিনী ফেরত উপজাতীয় পুলিশের একে-৪৭ রাইফেল চুরি হয়। বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাজেই দেশী দাতা দেশ, সংস্থা ও তাদের অনুজীবী এনজিও, এনজিও’র মালিক, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে যত সমালোচনাই করুক, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে সরকারকে তার সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। জাতীয় প্রত্যাশাও এটাই।

Email:palash74@gmail.com

নোট: গত ২২ মার্চ ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে এই লেখাটি প্রকাশিত  হয়েছিল। তবে বর্তমান লেখাটি ঈষৎ পরিবর্ধিত। লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হয় তার পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৪ ফেব্রুয়ারীর আদেশ শিথিল করে।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

গত ৯ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হলো বিশ্ব আদিবাসী দিবস। যদিও বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের দুই দিন আগে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার।

 

৭ আগস্ট সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”

আদিবাসী দিবস উদযাপনে এই তথ্য বিবরণীর তেমন কোনো প্রভাব দেশের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি। বেশিরভাগ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিগণকে পূর্ববৎ তাদের সংবাদ, ভাষ্য, মন্তব্য, টকশোতে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সরকার এই পরিপত্র জারি করে সেই সরকারেরই অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন পদাধিকারিকগণ এই পরিপত্র অবজ্ঞা করে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা সরকারি পরিপত্রের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় গণমাধ্যম বিশেষ করে পত্রিকার সম্পাদকীয়/প্রবন্ধ/মন্তব্য ও টিভি চ্যানেলের টকশোতে একপাক্ষিকভাবে অর্থাৎ আদিবাসীদের পক্ষেই প্রচারণা চালানো হয়। তাদের বেশিরভাগই বর্তমান সরকারের অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, অবস্থান ও বাণীর রেফারেন্স দিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ‘উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের গোপনীয় প্রতিবেদনে (স্মারক : পাচবিম (সম-২)২৯/২০১০/২৫, তারিখ : ২৮/১/২০১০) বলা হয় : “বাংলাদেশে ৪৫টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের কোথাও ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। তথাপি কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ না বলে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করতে দেখা যাচ্ছে। এতদ বিষয়ে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশী সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এ সকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে তাদের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়তায় অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে তাদের অনেকেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। বাংলাদেশীয় উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ উল্লেখ না করার বিষয়ে ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সে নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চি‎হ্নিতকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে আদিবাসী মন্ত্রণালয় করার ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উত্থাপিত হচ্ছে বলে জানা যায়। ইউএনডিপি, ডানিডা, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সাথে উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে এবং সাংবাদিকরা বিভিন্ন লেখায় উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্ণিত করছে। এরূপ কাজ অব্যাহত রাখলে উপজাতীয়দের ভবিষ্যতে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে। বর্ণিত অবস্থায় বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই যেন ‘উপজাতি’ এর পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ না করা হয় এবং পার্বত্য অঞ্চলে যে সমস্ত এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বৃদ্ধিকরণসহ সতর্কতামূলক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

২০১১ সালের মে মাসে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআইআই) অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অধিবেশনে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক লার্স আন্দ্রেস বায়ের বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কোনো দেশের সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার আগে তাদের মানবাধিকার রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখারও সুপারিশ করেন বায়ের। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। তাদের এই দাবি পূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ইউএনপিএফআইআইর অধিবেশনে যোগদানকারী বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। নিউইয়র্কে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে (ইউএনপিএফআইআই) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দশম অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ফোরামের সাবেক সদস্য লার্স-অ্যান্ডার্সবায়ের এ সুপারিশ করেন বলে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জানানো হয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ১১৯ বার আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা ছাড়াও তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, লারস এন্ডারস পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে প্রতিবেদন তৈরি করেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে। বিষয়টি প্রতারণা ও উদ্দেশ্যমূলক।
অবশ্য জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি বায়েরের দেয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই দাবি করে তিনি বলেন, এ কারণে শান্তি চুক্তি নিয়ে এই ফোরামে আলোচনার কোনো অবকাশও নেই।

ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ঢাকায় বিদেশি মিশন প্রধানদের মাধ্যমে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সারাবিশ্বকে জানান, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী নয়। বাঙালি নৃগোষ্ঠীই এ ভূখ-ে ৪ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বসবাস করছে। আদিবাসী হিসেবে দাবি করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ১৬ শতকের আগে এ ভূখণ্ডে ছিল এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিদেশি মিশনগুলোর প্রধানদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীপু মনি বলেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর স্বার্থান্বেষী কিছু মহল উপজাতি শব্দকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘ ফোরাম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চাইছে।” পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শক্ত অবস্থান আঁচ করতে পেরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিগণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমণি তাদের দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। কাজেই ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকার কখনোই বাংলাদেশের উপজাতীয় বাসিন্দাদের ‘আদিবাসী’ বলে সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরকারি মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উপজাতিদের আদিবাসী বলে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও শুরু থেকেই পার্বত্য উপজাতিদের দাফতরিকভাবে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকার করেনি। সে কারণেই ব্যাপক দাবি সত্ত্বেও মানবাধিকার কমিশনেও ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ ‘উপজাতি’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ ব্যবহার করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে উপজাতিদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সরকারিভাবে জানানো হয় যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই এবং একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ না বলতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কতিপয় নেতা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে আর্থিক সহায়তাসহ তাদের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন ভারত এবং মিয়ানমারের বিশাল এলাকার বাসিন্দাদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সহায়তায় ব্যাপকহারে খ্রিস্টানকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ইসরাইল বা পূর্ব তিমুরের মতো স্বতন্ত্র খ্রিস্টান ‘বাফার স্টেট’ তৈরির পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘ তার সদস্যভুক্ত কোনো দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে এ মর্মে ক্লজ থাকায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই চার্টারে স্বাক্ষর দিতে আপত্তি জানায়। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের permanent forum for indigenous people-এর ৭ম অধিবেশনে বাংলাদেশ পরিষ্কারভাবে জানায় :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’ এরপর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে আদিবাসী প্রসঙ্গ থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে জানতে চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি লেখে। এর উত্তরে ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একই কথা জানায়। [(স্মারক নং : পাচবিম(সম-১)৩৭/৯৭-১১৭ তারিখ : ৯/৯/২০০৮) :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী বিষয়ে বাংলাদেশের পরপর তিনটি সরকারের নীতি অভিন্ন রয়েছে। নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ এক উজ্জ্বল ও ইতিবাচক ব্যতিক্রম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরা বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এসকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে’ বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। অবশ্য অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও সরল মনে কখনো বলে থাকেন, “উপজাতি বললে যদি তারা আহত হয় তবে আদিবাসী বলেন, কী এমন সমস্যা তাতে?” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল হলে উপজাতিদের আদিবাসী বলে মেনে নিতে এতটা আপত্তি হয়তো থাকত না ১৬ কোটি বাংলাদেশীর।

ঐতিহাসিক ভুল
আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ‘a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia’. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
Aborigine : noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous : belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/indigenous area. Aborigine : earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous : adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).
অন্যদিকে বাংলা একাডেমির অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে : দেশি, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে- যার অর্থ বহিরাগত। নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গান (Louis Morgan) মনে করেন, “The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil.\\\( Louis Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972.) অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশি, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র। তাহলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে তারা কী বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত?
এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা গত ১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত হয়েছে যারা ওয়েবলিংক (বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক)| । প্রয়োজনে পাঠকগণ তা দেখে নিতে পারেন।

সংক্ষেপে এখানে শুধু একটি কথা বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো উপজাতি ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গবেষকও এখন বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোকে ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলে দাবি করেন না। বরং তাদের রচিত ইতিহাসেই প্রমাণিত হয়েছে এরা বহিরাগত। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র হচ্ছে এদেশের মূল জনগোষ্ঠী বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাসে সে কথা নানাভাবে এসেছে। বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলো সে ইতিহাসকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, অনেক বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইন তথা আইএলও সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেটাও যে সবৈর্ব ভুল ব্যাখা তা জানতে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার আরো একটি লেখা দেখতে পারেন এই লিংক থেকে: (আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ).

অন্যদিকে বাংলাদেশের সকল উপজাতি সম্প্রদায় নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে না। বরং বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশের যারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সন্ত্রাসী কর্মকা- কিংবা এনজিও কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা তাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত তারাই কেবল নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উল্লিখিত শ্রেণীর জনগোষ্ঠীই এ দাবির মূল পরিচালক। তবে তাদের এ দাবিটি অতি অধুনা। অতীতে তারা নিজেদের উপজাতি পরিচয়ে পরিচিত করিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রথম শুরু হয় তখন তাদের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা মানবেন্দ্র লারমা সংসদে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করেছিলেন, আদিবাসী পরিচয়ের নয়। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বর্তমান নেতা নিজেকে উপজাতি পরিচয়েই পরিচিত করিয়েছিলেন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক প্রচারণার কী পার্সন। জনসংহতি সমিতি ও সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমাও শুরুতে আদিবাসী দাবির পক্ষে ছিলেন না। দেবাশীষ রায়ের দাবি বলে তিনি এর সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিদেশী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার সমর্থন এবং আর্থিক প্রলোভনে তিনি এই দাবিতে শরিক হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার গত শনিবার জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় বলেছেন, আমি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করেছিলাম, তখন সন্তু লারমা বলেছিলেন, এই দেশে কোনো আদিবাসী নেই। এখানে আমরা সবাই উপজাতি। জুম্ম জনগণের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আদিবাসী দিবস পালন করা হচ্ছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের সময়ে আমি সন্তু লারমাকে বলেছিলাম এ সময়ে উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ফেলি, তখনও সন্তু লারমা রাজি হননি। তখনও সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা আদিবাসী নই, আমরা উপজাতি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে প্রচলিত উপজাতি শব্দটি বহাল রাখা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অফিসিয়ালি লিখেছেন, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। কিছু জনগোষ্ঠী আছে উপজাতি। তাহলে এখন কেন আদিবাসী দাবিতে সংগ্রাম-সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে? এটি কোন দেশের ষড়যন্ত্রের আলামত? সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছেন, এখানে আদিবাসী আছে কি নেই গবেষণার দরকার, গবেষণায় প্রমাণ হলে আদিবাসী হবে, না হলে নেই। কিন্তু এ নিয়ে সংঘর্ষ, মারামারি হবে কেন ?

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিজেদের আদিবাসী বলে মনে করে না। প্রকাশ্যতঃ পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইউপিডিএফ নামক অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থকরা আদিবাসী দিবস পালনের ঘোর বিরোধী। তারা জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়- যা এম এন লারমার দাবির কাছাকাছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, ৯ আগষ্ট “বিশ্ব আদিবাসী দিবস” উদযাপন নিয়ে পাহাড়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে এ দিবসটি পালনে পাহাড়ের এনজিওগুলো অনেক আগ থেকেই তোড়জোড় শুরু করলেও এবার তেমনটি দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ সমর্থিত “গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম” আদিবাসী দিবস পালনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয়, সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী দিবস বিরোধী জনমত সংঘটিত করা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমার নেপথ্য সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জাতি-গোষ্ঠী আদিবাসী দিবস পালনের নাম করে সরকার ও বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ব্যাপক অর্থ পেয়ে থাকে এবং এ অর্থের সামান্য একটি অংশ দিয়ে র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়, বাকি অর্থ তারা নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা এবং সন্তু গ্রুপের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে।
বান্দরবানের প্রয়াত বোমাং রাজা ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা আদিবাসীও নয়, স্থানীয়ও নয়। তারা মিয়ানমার থেকে এখানে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে আদিবাসিন্দা বা ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতধারা বাঙালী ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারও সে কথা প্রমাণ করছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন শ্রীলঙ্কায়। ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) থেকে আমাদের এই মানব জাতির শুরু। কিন্তু হযরত নূহ (আ.)-এর সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে এক মহাপ্লাবন ঘটেছিল। এই মহাপ্লাবনে দুনিয়ার সকল কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ জীবিত ছিল না, শুধু নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণ করেছিলেন ৮০ জন নূহের ভক্ত; এই ৮০ জন থেকেই মানব জাতির আবার নতুন যাত্রা।”এই নতুন যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের মধ্যে ছিলেন হযরত নূহের এক পুত্র; নাম তার ‘হাম’। নূহ তার পুত্র হামকে বললেন, ‘তুমি মানব বসতি স্থাপনের জন্যে চলে যাও পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে’। পিতার নির্দেশ পেয়ে হাম চলে এলেন আমাদের এশিয়া মহাদেশের কাছাকাছি। সেখানে এসে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দকে পাঠালেন ভারতের দিকে। অনেকে মনে করেন, হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করে। সে হিসাবে বাঙালির আদি পুরুষ হচ্ছেন ‘বঙ্গ’।” প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড) থেকে ছোট্ট আর একটি উদ্ধৃতি : ‘ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ শব্দের সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া গিয়াছে। … যে সময়ে ঐতরের ব্রাহ্মণে বা আরণ্যকে আমরা বঙ্গ অথবা পুণ্ড্রজাতির উল্লেখ দেখিতে পাই সে সময়ে অঙ্গে, বঙ্গে অথবা মগধে আর্য্য জাতির বাস ছিল না।’ পবিত্র ঋগ্বেদে একইভাবে এই অঞ্চলে বঙ্গ নামে জাতির উল্লেখ আছে এবং এইসব কম-বেশি তিন হাজার বছর আগের কথা।’ মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত “Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature ” নামক অপ্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যায় : ‘বাংলার ইতিহাস এখনও এত পরিষ্কার হয় নাই যে কেহ নিশ্চয় বলিতে পারেন বাংলা Egypt হইতে প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা Ninevah ও Babylon হইতেও প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা চীন হইতেও প্রাচীন অথবা নতুন। যখন আর্য্যগণ মধ্য এশিয়া হইতে পাঞ্জাবে আসিয়া উপনীত হন, তখনও বাংলা সভ্য ছিল। আর্য্যগণ আপনাদের বসতি বিস্তার করিয়া যখন এলাহাবাদ পর্যন্ত উপস্থিত হন, বাংলার সভ্যতায় ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহারা বাঙালিকে ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।’ মেগাস্থিনিস ও টলেমি প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে শক্তিশালী গঙ্গরিড়হী রাজ্যের কথা বলা হয়েছে তার অবস্থান আজকের বাংলাদেশে। যার বিশাল হস্তিবাহিনীর কথা শুনে ভয় পেয়েছিলেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার। রামায়নে উল্লিখিত মহাবালী রাজাকে ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন বাংলার কোনো পরাক্রমশালী রাজা বলে শনাক্ত করেছেন।

নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত নৌকা দুটির আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর বলে তারা মনে করেন। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। তার চেয়েও প্রাচীন উয়ারী বটেশ্বরের সভ্যতাকে নৃবিজ্ঞানীগণ মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সমসাময়িক বলে দাবি করেন। প্রাচীন বাংলার স্বীকৃত সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু সে বৌদ্ধরা চাকমা ছিলেন না। ছিলেন বাঙালি। শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল বাঙালি ছিলেন। বাঙালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তাদের পাণ্ডিত্বে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সুদুর চীন পর্যন্ত আলো ছড়িয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন পুস্তিকা চর্যাপদও আবিস্কৃত হযেছে নেপালের রাজসভায়। উল্লেখ্য, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধগান।

অন্যদিকে লালমনিরহাটের মজদের আড়ায় ৬৯ হিজরীতে নির্মিত মসজিদের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এমনকি খোদ পার্বত্য চট্টগ্রামও প্রাচীন বাংলার হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় বাঙালিরা এ অঞ্চলে বসবাস করত। কিন্তু বৈরী ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভাস, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ বাঙালি সেখানে বসবাস করতে না পেরে সমতলের দিকে সরে আসে। এ সকল ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা আদিবাসিন্দা বা আদিবাসী কোনো চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, হাজং, ত্রিপুরা উপজাতি নয়,বরং বাঙালি।
Email: palash74@gmsil.com

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

 মেহেদী হাসান পলাশ

২০১৪ সালের প্রথম চতুর্ভাগে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় দুটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের ফলাফলের জাতীয় প্রবণতার সাথে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের ফলাফল ভিন্নতর। সেটা শুধু স্রেফ ভিন্নতা নয়, এর সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, জাতীয়তা, সংবিধানসহ নানা বিষয় জড়িত হয়ে পড়েছে।সে কারণে এ ভিন্নতাটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবী রাখে।

৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট বয়কট করেছিল।নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল শাসকদল আওয়ামী লীগ, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(সংস্কারপন্থী) ও ইউপিডিএফ। সে নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসনের মধ্যে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আওয়ামী লীগ এবং রাঙামাটিতে জেএসএস(সন্তু) প্রার্থি জয়লাভ করেছে।অভিযোগ রয়েছে রাঙামাটিতে বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামীলীগ প্রার্থিকে পরাজিত করাতে জেএসএস প্রার্থির পক্ষে গোপনে কাজ করেছে ও ভোট দিয়েছে। জেলা বিএনপি’র শীর্ষনেতা এ ব্যাপারে জোরালো ভুমিকা রেখেছেন বলে আওয়ামী লীগের তরফেও অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে খাগড়াছড়ি আসনেও বিএনপির বিপুল পরিমাণ সাধারণ ভোটার ইউপিডিএফ প্রার্থি প্রসীত বিকাশ খীসাকে ভোট দিয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে। যদিও প্রসীত বিকাশ খীসা পরাজিত হয়েছেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী শাসক দলের প্রার্থি কুজেন্দ্রলালের বিজয় নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে জেলাবাসীর মনে। তারা মনে করে নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা না থাকলে এখানেও ভোটের ফলাফল ভিন্নতর হতে পারতো।  

অন্যদিকে ৪র্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩টি, বিএনপি ৭, জামায়াত ১, ইউপিডিএফ ৪, জেএসএস(সন্তু) ৮ ও জেএসএস(সংস্কার) ২টি পদে বিজয়ী হয়েছে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলা আসনের মধ্যে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো ১১টি আসনে এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো ১৪টি আসনে জয়লাভ করেছে। অর্থাৎ ৬০ ভাগেরও বেশী উপজেলা আসন এখন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর দখলে।বাংলাদেশের সংবিধানে এককেন্দ্রীক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টতা ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের বৈধতা দানের সুযোগ না থাকায় স্বতন্ত্রপ্রার্থি হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো এ সংখ্যক আসনলাভ করেছে।এখানে উল্লেখ্য যে, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে একটি আসনে বাঙালী অধিকার আন্দালনের সংগঠন সমর্থিত প্রার্থি নির্বাচনে অংশ নিলেও তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

এতে আশঙ্কার কারণ হচ্ছে, এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে বাংলাদেশের এককেন্দ্রীক রাষ্ট্র কাঠামোর বৈশিষ্ট্য ভেঙে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলন করছে। কিন্তু অপ্রকাশ্যে বা গোপনে এই সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্মল্যান্ড নামে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছে। এ লক্ষ্যে তাদের রয়েছে গোপন সামরিক বাহিনী ও পতাকা ইত্যাদি।পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দুর ও নিকটবর্তী বিদেশী ষড়যন্দ্রকারী শক্তিসমূহের সাথে এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রযেছে গভীর আঁতাত। তারা অর্থ সমর্থনসহ নানাভাবে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে সমর্থন যুগিয়ে আসছে।কাজেই এ ধরণের রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যখন সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকে তখন দেশপ্রেমিক জনতা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এহেন রাষ্ট্র বিরোধী শক্তিগুলোকে দ্রুততার সাথে নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংস করার কোনো বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যে জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত, সুচিন্তিত ও সুগভীর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরী। তবে সেই পরিকল্পনা বিশ্লেষণের আগে তিন পার্বত্য জেলার উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ জরুরী।কিন্তু তার আগে এ কথা মনে রাখা জরুরী যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আর ৫০টি সমতল জেলার মতো নয়। ভৌগলিক অবস্থান, ভূরাজনীতি, ভূপ্রকৃতি, জীব ও জনবৈচিত্র প্রভৃতি বিচারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অনন্য বৈশিষ্ট সম্পন্ন অঞ্চল। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে যে কোনো বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, নীতিগ্রহণ ও বিবেচনার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োজন। 

উপজেলা নির্বাচনে তিন পার্বত্য জেলায় জাতীয় দলগুলোর আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত না হওয়ার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে, নিরাপত্তাহীনতা, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক দূর্বলতা, সাংগঠনিকভাবে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পার্বত্য চট্ট্রগ্রাম বিষয়ে বাংলাদেশের অখণ্ডতার নিরিখে বিশেষ দর্শন বা অবস্থান না থাকা, রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা, দ্বন্দ্ব, বাঙালী-পাহাড়ী নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা, শক্তিশালী বাঙালী নেতৃত্ব তৈরী না হওয়া, বাঙালী সংগঠনগুলোর বিভাজন, নেতৃত্বের দূর্বলতা ও জনসম্পৃক্ত হতে না পারার ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত প্রভৃতি।

উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মনোনয়নের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব এই দুটি দল তিন পার্বত্য জেলার বেশ কিছু আসনে মনোনয়নই দিতে পারেনি।রাঙমাটির ১০টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬টিতে, বিএনপি ৭টিতে, খাগড়াছড়ির ৮টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ সবগুলো উপজেলায় এবং বিএনপি ৬টিতে বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ সবগুলোতে এবং বিএনপি ৪টিতে ও জামায়াত একটিতে মনোনয়ন জমা দিয়েছিল। অর্থাৎ ২৫টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪টিতে ও বিএনপি ৮টি আসনে মনোনয়ন দিতে পারেনি বা মনোনয়ন দেয়ার মতো সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠেনি প্রভাবশালী জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের শাসনামলে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৬ জন করে জনপ্রতিনিধি প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার স্ট্যাটাস ও সুবিধা ভোগ করে থাকেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সবগুলো উপজেলায় মনোনয়ন দেয়ার মতো সাংগঠনিক অবস্থা তৈরী করতে পারেনি।মূলত পাহাড়ী অধ্যুষিত উপজেলাগুলোতে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো নমিনেশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে।অথচ এই দুই দলেরই শীর্ষ নেতৃত্বের পদগুলো পাহাড়ীদের দখলে ।অভিযোগ রয়েছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ দিনে বা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ/বিএনপি করলেও গোপনে জেএসএস বা ইউপিডিএফ’র সাপোর্টার। সবক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।আবার জেএসএস ও ইউপিডিএফও বিভিন্ন কৌশল ও লবিঙের মাধ্যমে তাদের সাবেক সহযোদ্ধাদের এ দুই দলের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত করিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে থাকে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের বিরোধীতা করে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর জন্ম হলেও জিয়াউর রহমানের নীতির কারণে তারা গা বাঁচাতে আওয়ামী লীগের সাথে মিত্রতা গড়ে তুলেছিল।এদিকে শান্তিচুক্তি করার কারণে জেএসএস ও তার প্রভাবে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বড় অংশটি আওয়ামী লীগের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে আর বিএনপি বাঙালী ঘেষাঁ রাজনৈতিক দল হিসাবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় বাঙালী হত্যাকান্ডের নায়ক শান্তিবাহিনীর মেজর রাজেশকে নমিনেশন ও ক্ষমতায় এসে প্রতিমন্ত্রী হিসাবে অধিষ্ঠিত করে। মেজর রাজেশ ওরফে মনি স্বপন দেওয়ান প্রতিমন্ত্রী হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিএনপিকে সংগঠিত করার চেয়ে জেএসএস’র স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিত ছিল। পরবর্তীকালে সংস্কারপন্থী হয়ে বিএনপি ত্যাগ করলেও তার জায়গায় রাঙামাটি জেলা বিএনপি’র নেতৃত্বে যিনি এসেছেন তিনি আরো বেশী জেএসএস ঘেঁষা বলে অভিযোগ রয়েছে।এই ব্যক্তির কারণে রাঙামাটিতে বিএনপি’র সাথে বাঙালী সংগঠনগুলোর ব্যাপক দুরত্ব তৈরী হয়েছে। বাঙালী অধিকার আদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কোনো অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতারা অংশ নিলে বা পৃষ্ঠপোষকতা দিলে তার তিরস্কার সইতে হয়। তিনি সুকৌশলে বিএনপি’র জেলা, উপজেলা কমিটি ও অংগ সংগঠনগুলোর কমিটিতে জেএসএস’র সাবেক ও গোপন সদস্যদের পুনর্বাসন করেছেন। ফলে বিগত সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনে নমিনেশন, প্রচার প্রচারণা ও ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে জেএসএসের জন্য সুবিধাজনক রাস্তা তৈরী করতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি।সেকারণে বিগত সংসদ নির্বাচনে জেএসএস’র সাবেক সামরিক কমান্ডার মেজর মলয়কে(উষাতন) সমর্থন দিতে তার একটুও কষ্ট পেতে হয়নি।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৫জন পাহাড়ী নেতা থাকলেও বাঙালী নেই একজনও। এই পাহাড়ী নেতাদের বেশিরভাগই বিগত দুটি নির্বাচনে জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র সমর্থনে প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজ করেছে। খাগড়াছড়ি বিএনপির একটি অংশ বিভিন্ন উপজেলায় প্রকাশ্যে ইউপিডিএফকে সমর্থন দিয়েছে।অন্যদিকে বান্দরবান জেলায় বিএনপি-জেএসএস আঁতাত ছিল প্রকাশ্য। দুইটি উপজেলার চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রকাশ্যে তারা জেএসএসকে সাপোর্ট করেছে। এমনকি নাইক্ষংছড়ি উপজেলায় জেএসএস-জামায়াত সমঝোতায় জামায়াত প্রার্থি জয়লাভ করেছে। তবে এর বাইরেও বিভিন্নস্থানে বিএনপি আওয়ামী লীগ একে অন্যকে ঠেকাতে জেএসএস ও ইউপিডিএফকে সাপোর্ট করেছে।

এদিকে রাজনৈতিক মাঠে জেএসএস-ইউপিডিএফ প্রবল প্রতিপক্ষ হলেও যেসকল উপজেলায় বাঙালী প্রার্থি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে সমন্বিতভাবে পাহাড়ী প্রার্থিকে সাপোর্ট করেছে। খাগড়াছড়ির দিঘীনালা ও রাঙামাটি সদর এভাবেই পারস্পারিক বিনিময়ের মাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাঙালী প্রার্থিকে জয়লাভ করতে দেয়নি তারা। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে পাহাড়ীদের সকল আন্দোলন ও দাবীকে সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা করে গেছে। সেকারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাহাড়ীদের উচ্চপদে দেখা গেলেও পার্বত্য বাঙালীদের বেলায় তা দেখা যায় না। অন্যদিকে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে জাতীয় পর্যায়ের বাম রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলো তাদের দাবীগুলোকে সবসময় সক্রিয় সমর্থন যুগিয়ে আসছে। এমনকি রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা ও সংহতির জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী দাবীগুলোতেও এই বামপন্থীরা পাহাড়ীদের সমর্থন করে থাকে। ফলে পাহাড়ী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাষ্ট্রঘাতী দাবীগুলোও সমগ্র দেশবাসীর মাঝে অনেক ক্ষেত্রেই অসচেতনভাবে সমর্থিত হয়ে থাকে। অথচ জাতি হিসাবে আমরা বাংলাদেশের ৯৯% সমতলবাসীকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনন্য বৈশিষ্টের কথা তুলে ধরতে পারিনি।এর ভৌগলিক অবস্থান ও ভুরাজনৈতিক গুরুত্ব, একে নিয়ে চলমান দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সচেতন করতে পারিনি। মূলত একটি স্থায়ী জাতীয় পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই এই বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের একক বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালী- মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ভাগ।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান সরকারী বৈষম্যমূলক নীতি, বিদেশী দাতা গোষ্ঠী ও এনজিও’র পক্ষপাতিত্বের কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হচ্ছে পার্বত্য বাঙালী সম্প্রদায়।এই বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি বাঙালী অধিকার আন্দোলনের সংগঠন রয়েছে। এদের মধ্যে সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য গণপরিষদ ইত্যাদি। কিন্তু নেতৃবৃন্দের নীতিহীনতা, সুবিধাবাদ, অনৈক্য, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে পার্বত্য বাঙালীদের সংগঠনগুলো শক্তিশালী, জনপ্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠেনি। দু’একজন নেতা এই আন্দোলনের মাধ্যমে বেরিয়ে আসলেও ক্ষমতার লোভে অতি দ্রুতই জাতীয় রাজনৈতিক দলে ঢুকে সেখানকার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাঙালীদের সাথে দুরত্ব তৈরী করতে বাধ্য হয়েছে।এর মধ্যে আবার সবচেয়ে সক্রিয় দুটি সংগঠনের একটি জামায়াতের অপরটি বিএনপি’র পকেট সংগঠনে পরিণত হওয়ায় পার্বত্য বাঙালীদের মাঝে সার্বজনীনতা পায়নি।এছাড়াও বাঙালী সংগঠনগুলো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ার কারণে সংগঠন ও নেতৃত্বের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ লাভ করেনি।

বিগত দুটি নির্বাচনে পাহাড়ী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর আশাতীত সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ শক্তি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। একথা সত্য যে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আয়োজন সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। একারণে প্রতিদিন সেখানে হত্যা, ধর্ষণ, অপরহণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে।চাঁদাবাজি সেখানে এতাটাই বাস্তব যে, সরকারী ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে হয়তো সেখানে পার পাওয়া যায় কিন্তু চাঁদাবাজদের চাঁদা না দিয়ে পার পাওয়ার কোনো ‍উপায় নেই। থানার পাশে, ক্যান্টনমেন্টের পাশে বসবাসকারীরাও চাঁদাবাজির কবল থেকে রেহাই পাননা। এমনকি সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীরাও চাঁদাবাজির আওতামুক্ত নয়। এসব অপরাধীদের দু’একজনকে মাঝে মধ্যে নামমাত্র গ্রেফতার করা হলেও বিচার করে তাদের কারোরই শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি।বিচারহীন অপরাধ সেখানে ফ্রি স্টাইলে চলে।এই অপরাধের শিকার শুধু বাঙালীরা নয়, নিরীহ পাহাড়ীরাও সমভাবে হচ্ছে।ফলে সন্ত্রাসীদের প্রতি পাহাড়ীরা ক্ষুদ্ধ হলেও জীবনের নিরাপত্তার হুমকির মুখে তারা এ সকল সন্ত্রাসীদের ভোট দিতে বাধ্য হয়।

এই নিরাপত্তাহীনতার একটি কারণ দূর্গমতা হলেও শুধু দূর্গমতার উপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। নিরাপত্তা বিষয়ক নীতি, পদ্ধতির ভ্রান্তি ও জটিলতা এর জন্য অন্যতম দায়ী। কেননা রাষ্ট্রের নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। দুর্গম বলে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দীর্ঘদিন ফেলে রাখতে পারেনা।

পার্বত্য বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাবিষয়ক নীতি, পদ্ধতিকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, অপরাধীরা যুগ যুগ ধরে বিচার বহিঃভূত থাকার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। সেখানে নিরাপত্তার জন্য বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনী থাকলেও তারা ‘In aid to civil power’ হওয়ার কারণে পুলিশ বিজিবি’র সহায়তা ছাড়া রাষ্ট্রই তাদের ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার প্রদান করা ও এককভাবে অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা প্রদান জরুরী। একইসাথে র‌্যাব দিয়ে যেভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বহারা সন্ত্রাসী দমন করা হয়েছে সেভবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের দমন করা জরুরী। অপরাধ নির্মূল করতে অপরাধী নির্মূল করতে হবে- নীতি গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে। তবে এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য ও সচেতনতা গড়ে তুলতে না পারলে এ ধরণের অভিযান সমালোচনার মুখে থুবড়ে পড়তে পারে। সেকারণে একটি স্থায়ী জাতীয় পার্বত্যনীতি প্রণয়ন অতি জরুরী এবং এ নীতির আওতায় জাতীয় জনমত গঠন থেকে শুরু করে সরকারী বেসরকারী, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সকল পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর গুপ্তচরদের ছেঁটে ফেলে দেশপ্রেমিক পাহাড়ী-বাঙালী নেতৃত্ব বিকাশে সর্বপ্রকার সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। পাহাড়ী- বাঙালী দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।পাহাড়ী নেতৃত্বের সমপর্যায়ে বাঙালী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে। জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন থেকে শুরু করে সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী-বিচি্‌ছন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য ও গোপন কর্মীরা যেন অনুপ্রবেশ না করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজে কোনো শৈথিল্য ও সময়ক্ষেপন করা চলবে না্। কারণ সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে এই সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো জাতীয় দৃষ্টির বাইরে থেকে, জাতীয় দৃষ্টির অগোচরে, উদাসীনতায় যেভাবে শক্তি বৃদ্ধি করে চলছে তাতে জাতীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি বিপন্ন হওয়ার মুখে উপনীত হয়েছে।

Email: palash74@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

আরও প্রবন্ধ

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

ডেলের আমন্ত্রণে মালয়শিয়া সফরে গেলেন মেহেদী হাসান পলাশ

palash

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক : বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পিসি নির্মাতা এবং সুপরিচিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘ডেল’ এর আমন্ত্রণে মালয়শিয়া সফরে গেলেন দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক ও পার্বত্যনিউজ ডটকমের প্রধান উপদেষ্টা মেহেদী হাসান পলাশ।

রোববার রাত দশটায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে মালয়শিয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। এই সফরে মেহেদী হাসান পলাশ এবং দৈনিক প্রথম আলো, ইত্তেফাক, কালের কন্ঠ, যুগান্তরসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার সিনিয়র ৮ জন সাংবাদিকসহ ১২ জনের একটি দল মালয়শিয়ায় ডেলের অফিস পরিদর্শনে গেছেন।