চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত

আবদুস সাত্তার

আবদুস সাত্তার

পার্বত্য চট্রগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মগ, মুরং, কুকি, বনজোগী, পাঙ্খো, লুসাই, তংচঙ্গা, টিপরা (ত্রিপুরা) এবং সেন্দুজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। টিপরারা হিন্দুধর্মাবলম্বী, মগ ও চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং অপরাপর জাতির মধ্যে কেউ কেউ  নিজেদেরকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে স্বীকার করলেও ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক জীবনের রীতিনীতিতে তাদের বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্রগ্রাম পূর্বে চট্রগ্রামের সাথে যুক্ত ছিল। পাহাড়ি জাতিদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের দাবিতে ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ১ আগস্ট পার্বত্য চট্রগ্রাম স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে।[i]

চাকমারা কোথা থেকে এখানে এসেছে এবং এদের উৎপত্তিই-বা কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। উপজাতিদের উদ্ভব ও বসতি বিস্তার সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব না হলেও এ সম্পর্কে আমাদের মন সব সময়েই কৌতূহলী ও উৎসুক। চাকমা জাতি যে এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল, সে সম্বন্ধে কর্নেল ফেইরী আলোকপাত করেছেন।[ii] ব্রক্ষ্মদেশে পুরাবৃত্ত ‘চুইজং ক্য থং’ এবং আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ নামক গ্রন্থদ্বয়েও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।

‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ গ্রন্থেও বর্ণনা অনুযায়ী ৪৮০ মগাব্দে (খ্রীষ্টীয় ১১১৮-১৯ সালে) চাকমাদের সর্বপ্রথম উল্লেখ পরিদৃষ্ট হয়। ‘‘ এ সময়ে পেগো (আধুনিক পেগু) দেশে আলং চিছু নামে জনৈক রাজা ছিলেন। পশ্চিমের বাঙালিদিগের সহিত মিলিত হয়ে চাকমাগণ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ উপস্থিত করে। পেগো রাজা স্বীয় প্রধানমন্ত্রী কোরেংগরীকে সেনাপতি পদে বরণ করিয়া যুদ্ধার্থে প্রেরণ করিলেন। তিনি যুদ্ধ স্থলে উপনীত হইলে একটি সারসপক্ষী একখানি মৃত প্রাণীর চর্ম মুখে লইয়া তাঁহার সম্মুখে পতিত হইল। তিন তাহাকে ধরিয়া রাজার শিবিরে লইয়া গেলেন এবং বুঝিয়া দিলেন যে, এই সারস বাঙালি ও চর্মখানি-চাকমা, উভয়ের মিত্রতা ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের এই যুদ্ধে নিশ্চয়ই বাঙালি ও চাকমাগণ এই সারসের ন্যায় বশ্যতা স্বীকার করিবে।

‘‘রাজা মন্ত্রীর এহেন যুক্তিগর্ভ আশ্বাস বাক্যে অতিশয় আহলাদিত হইয়া তাহাকে একটি হস্তী উপহার প্রদান করেন। অনন্তর হঠাৎ চতুর্দিকে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিল, পবিত্র ‘মহামুনি’ মূর্তি স্বেদসিক্ত হইলেন। ঘন ঘন অশনি নিপাত, অকাল বৃষ্টি সমন্তাৎ হাহাকার পড়িয়া গেল। রাজা যুদ্ধে ক্ষান্ত হইয়া এই অমঙ্গল শান্তির নিমিত্ত পুরোহিতকে শতমুদ্রা প্রদান করিলেন।

‘‘ এই ঘটনার বহুকাল পরে আনালুম্বা নামক পেগু রাজার শাসন সময়ে পুনরায় বাঙালি ও চাকমাগণ মিলিয়া উত্থিত হয়। রাজা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য লইয়া দাম্বাজিয়াকে সেনাপতি করিয়া পাঠাইলেন। দাম্বাজিয়া যাত্রা করিয়া সম্মুখে দেখিলেন একটি বক ও একটি কাক ঝগড়া করিতেছে, অবশেষে বক কাকের ডানা ভাঙ্গিয়া দিল। তিনি রাজার নিকট আসিয়া ইহা বিবৃত ককরিলেন। মন্ত্রী বুঝিয়া দিলেন, এই কাক বাঙালি এবং বক আমরা। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছে, এই যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ নিশ্চিত। ‘‘সেনাপতি অমিত-উৎসাহে যুদ্ধারম্ভ করিলেন। পাঁচদিন অবিরাম যুদ্ধের পর বাঙালি ও চাকমাগণ পলায়ন করে।’’[iii]

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত রাজমালায়ও[iv] একই কথার প্রতিধ্বনি বর্তমান। এ সম্বন্ধে ১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের ২জুন তারিখে চট্রগ্রামের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে লিখিত ব্রক্ষ্মরাজের একটি চিঠির উদ্ধৃতি থেকেই আমাদের বক্তব্যের যথার্থতার কিছুটা প্রমাণ মিলবে:

‘আমরা পরস্পর এতদিন বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিলাম এবং এক দেশের অধিবাসীরা অন্য দেশের অধিবাসীদের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে পারতো। …ত্রুটি নামে এক ব্যক্তি আমাদের সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে আপনার সাম্রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে জোরপূর্বক আনার ইচ্ছে আমাদের ছিল না বলেই তাকে ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ করে আমরা আপনাদের কাছে বিনয়সহকারে চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আপনারা তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেন। আমাদের সাম্রাজ্যের পরিধি নেহাৎ কম নয় এবং ত্রুটি তার অবাধ্য আচরণে আমাদের রাজশক্তির অবমাননা ও শান্তি ভঙ্গ করেছে।…ডোমকান, চাকমা, কিরুপা, লেইস, মুরং এবং অন্যান্য জাতির লোকও আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে ও আপনাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে তারা সীমান্তবর্তী উভয়দেশের অধিবাসীদের উপর অত্যাচার ও লুটতরাজ করেছে। তাছাড়া, তারা নাফ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের একজন খ্রীস্টানকে হত্যা করে তার যথাসর্বস্ব হরণ করে নিয়ে গেছে। এই কথা শুনে আমি একদল সৈন্য নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এসেছি তাদের ধরে নেবার জন্যে। যেহেতু, তারা আমাদের সাম্রাজ্যের অধিবাসী এবং আমাদের রাজশক্তির অবমাননা করে বর্তমানে ডাকাতি বৃত্তি গ্রহণ করেছে। …তাদেরকে আশ্রয় দেয়া আমাদের পক্ষে মোটেই সমীচীন নয় এবং মগরা যারা আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাদেরকেও ফেরত পাঠাতে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন। এতে আমাদের পরস্পরেরর বন্ধুত্বসূত্র আরও দৃঢ় হবে এবং দুই দেশের পথিক এবং ব্যবসায়ীরাও ডাকাতির হাত থেকে অব্যাহতি পাবে।… মোহাম্মদ ওয়াসিমের মারফত এই চিঠি পাঠাচ্ছি। চিঠি পেয়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন এবং অনুগ্রহ করে চিঠিটার উত্তরও তাড়াতাড়ি দিবেন।…’

এ চিঠির উত্তরে কি বলা হয়েছিল তা অবশ্য আমাদের প্রতিপাদ্য নয়, তবে চিঠিটার ঐতিহাসিক মূল্য যে যথেষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে চাকমারা কি করে ব্রক্ষ্মদেশ থেকে চট্রগ্রামে আগমন করেছিল তার হদিস পাওয়া যায়।

শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের পহেলা সেপ্টেম্বর[v] এই বিস্তৃত পার্বত্যভূমিকে তিনটি সার্কেল যথা: চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল ও মঙ সার্কেলে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন রাজা বা প্রধান নিযুক্ত করেন। চাকমা সার্কেলের (২৪২১ বর্গমাইল) রাজা রাঙামাটিতে, বোমাং সার্কেলের (২০৬৪ বর্গমাইল) রাজা বান্দরবানে, এবং মঙ সার্কেলের (৬৫৩ বর্গমাইল) রাজা রামগড় মহকুমার মানিকছড়িতে  অবস্থান করেন। উল্লিখিত জাতিদের মধ্যে চাকমারা সংখ্যার দিক থেকে রাঙামাটিতেই সর্বাধিক এবং অন্যান্য জায়গায়ও এদেরকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের এসব উপজাতি যে এখানকার ভূমিজ সন্তান নয় তা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, উপমহাদেশের আদিম অধিবাসী মাত্রই বাইরে থেকে এখানে আগমন করেছে এবং ভাষাতত্ত্ববিদরাও বিভিন্ন আদিম জাতির ভাষা বিশ্লেষণ করে একই কথার সমর্থন জানিয়েছেন। ‘সুদূর অতীতে অন্যান্য ভূখণ্ডের মত এই উপমহাদেশের মাটিতেও হয়তো এক শ্রেণীর দ্বিপদ বৃক্ষচর প্রাণী নিতান্ত জন্তুদশা থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে নরদশা লাভ করেছে।’ নৃতত্ত্ববিদ ড. জে এইচ হাটনও[vi] এখানকার আদি অধিবাসী সম্বন্ধে এই মতপোষণ করেন এবং তাঁর ধারণা ক্রমবিবর্তন ও বিভিন্ন সময়ের বংশানুক্রমিক রক্তের মিশ্রণে এইসব আদি মানব নিজেদের আদিম অবস্থা হারিয়ে ফেলেছে[vii]

পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের বেলায় এই যুক্তি আংশিক সত্য। এদের ধর্ম ভাষ্য আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক জীবনের রীতিনীতি বিভিন্ন ধর্মের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের আদিম বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা অসম্ভব।

চাকমারা মূলত কি ছিল কিংবা কোন জাতি থেকে এদের উৎপত্তি, সে বিষয়টি জানা নিতান্ত কষ্টসাধ্য হলেও অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। কোনও জাতির সঠিক পরিচয় নির্ণয়ে সে জাতির অতীত ইতিহাস অনেকটা সহায়ক। ইতিহাসের অভাবে সেসব মানবগোষ্ঠির আকৃতি-প্রকৃতি, বেশ-ভূষা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-কর্ম, ভাব-ভাষা ইত্যাদির সাথে সম্যক পরিচয় কিংবা তাদের কালস্থায়ী পরিবেশের গূঢ় উবলব্ধি না থাকলে সেসব জাতি সম্বন্ধে কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্যার রিজলীর মতে, ব্রক্ষ্ম ভাষার ‘সাক’ বা ‘সেক’ জাতি থেকে চাকমাদের উৎপত্তি। ক্যাপ্টেন লুইন বলেন:

‘…the name chakma is given to this tribe in general by the inhabitants of the Chittagong District, and the largest and dominant section of the tribe recognizes this as its rightful appellation. It is also sometimes spelt Tsakma or Tsak, or as it called in Burmese Thek’[viii].

এই মন্তব্যে চাকমা কথাটি যে মূলত পার্বত্য চট্রগ্রামের নয় সম্ভবত এ কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।

আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী নগরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সাক বা সেক জাতি এককালে খুব প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের সাহায্যে ব্রক্ষ্মরাজ ন্যা সিং ন্যা থৈন ৩৫৬ মগাব্দে (৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন।

কর্নেল ফেইরী এর মতে[ix], তখন সেই অঞ্চলে পশ্চিম দেশের বিভিন্ন লোক বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগমন করে এবং পরিশেষে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের উপাধি ছিল ‘সাক’ বা ‘সক’।

কেউ কেউ অনুমান করেন, তখন আরব-ইরান তুরস্ক  থেকে বহু মুসলমান সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যর উদ্যেশে আগমন করে এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে না গিয়ে সে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অতএব বোঝা যাচ্ছে, এইসব সাক বা সেক শব্দ ইসলামি শব্দের অপভ্রংশ।

এখনও ব্রক্ষ্মদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানে এই সাক সম্প্রদায় দেখা যায়। ধর্মীয় রীতিনীতিতে তাদের সাথে পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের মিল না খাকলেও আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে চাকমারা সাকদেরই উত্তর পুরুষ। মগদের মতে, চাকমারা মুঘলদের বংশধর[x]। কোন এক সময়ে মুঘলরা আরাকান রাজ্যের হাতে পরাজয়বরণ করে; ফলে বহু মূঘল সৈন্য বন্দিদশায় আরাকানে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। আরাকান রাজ তাদেরকে স্বদেশের মেয়েদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হবার আদেশ জানিয়ে আরাকানেই অন্তরীণ করে রাখেন। এসব মুঘল সৈন্যদের ঔরসে এবং আরাকানি নারীদের গর্ভে যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই ‘সেক’ বা ‘সাক’।

জে. পি. মিলস্-ও একই মত পোষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘‘চাকমাগণ মগনারী ও মুঘল সৈন্যদের সমন্বরজাত। সপ্তদশ শতাব্দীতে চাকমাদের অনেকেই মুঘল ধর্ম গ্রহণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তখনকার চাকমা প্রধানগণও মুসলমানী নাম ধারণ করেন। অতঃপর সেখানে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ফলে তারা হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয় এবং হিন্দু ধর্ম অন্তর্হিত হয়[xi]।’’

ক্যাপ্টেন হার্বার্ট লুইন এর মন্তব্যেও এই উক্তির সমর্থন মিলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন চাকমারা মুঘলদের বংশধর না হলেও এককালে এরা মুসলমান ছিল। কালের বিবর্তনে হয়তো ধর্মীয় ধারা পরিবর্তিত হয়েছে। এই মন্তব্যের সমর্থনে শ্রী সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রতিপন্ন করেছেন যে, ‘১৭১৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জামুল খাঁ, সেরমুস্ত খাঁ, সের দৌলত খাঁ, জান বক্স খাঁ, জব্বার খাঁ, টব্বার খাঁ, ধরম বক্স খাঁ প্রভৃতি চাকমা ভূপতিবর্গ ‘খাঁ’ উপাধি পরিগ্রহ করতেন। তদানুসষঙ্গিক ইহাও উল্লিখিত হইতে পারে যে, এই সময়ে তাঁহাদের কুলবধূগণেরও ‘বিবি’ খেতাব প্রচলিত ছিল। এখনও অশিক্ষিত সাধারণে ‘সালাম’ শব্দে অভিবাদন করে এবং আশ্চর্য বা খেদসূচক আবেগে ‘খোদায়’ নাম স্বরণ করিয়া থাকে[xii]।’

কেউ কেউ অনুমান করেন তখন মুসলিম (মুঘল শাসন) শাসনের প্রাধান্য ছিল বলে চাকমা রাজারা তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মুসলমানী নাম, ‘খা’ খেতাব[xiii] ইত্যাদি গ্রহণ করেছিলেন, ফলে তাদের চাল-চলনে মুসলমানী ভাব এবং কথা-বার্তায়ও অনেক আরবী-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ‘খাঁ’ উপাধি গ্রহণের বেলায় এই মতবাদ কতকটা শিথিল বলে ধরা যেতে পারে; কেননা, মধ্যপ্রদেশের কোন কোন স্থানে হিন্দুরাজাদের মধ্যেও ‘খাঁ’ খেতাব পরিলক্ষিত হয় এবং বাংলাদেশেরও কোন কোন হিন্দু পরিবারের ‘খাঁ’ পদবী দেখা যায়। কিন্তু মুসলমানী নাম আচার-ব্যবহার এবং কথা-বার্তায় ইসলামী ভাবগ্রহণ করে এভাবে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেবার প্রমাণ একমাত্র চাকমা সমাজেই দেখা গেছে। অনুরূপ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার আর কোন জাতির ইতিহাসে দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত আরও উল্লেখযোগ্য যে, চাকমা রাজাদের মুদ্রার প্রতিকৃতি খাস ফরাসী ভাষায় উৎকীর্ণ ছিল। মুদ্রাগুলোর মধ্যে একটিতে খোদিত আছে ‘আল্লাহ রাব্বী’[xiv]। এমনকি চাকমা রাজাদের কামানগুলোও ‘ফতেহ খাঁ’ ‘কালু খাঁ’ নামে পরিচিত।

‘শ্রী শ্রী জয়কালী জয়নারায়ণ                      জব্বর খাঁ ১১৬৩’

[রাজা জব্বর খাঁর আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ (১১৬৩ মগাব্দ) মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জান বখশ্ খাঁ                                       জামেনদার’

[চাকমা রাজা জান বখ্শ খাঁ জমিদারের আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ মুদ্রার প্রতিকৃতি]

চাকমা রাজাদের মধ্যে শের দৌলত খাঁর (১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ) উপসনা পদ্ধতি ছিল খাঁটি ইসলামী ভাবধারার সম্ভূত এবং মারেফতের শিক্ষাই ছিল তার সাধনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই সাধনার বলে তিনি এতদূর উন্নীত হয়েছিলেন বলে জানা যায় যে, নিজের নাড়ীভূড়ি পর্যন্ত বের করে পানিতে পরিষ্কার করে পুনরায় তা যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারতেন। গৃহের এক নিভৃত কক্ষে তিনি আরাধনায় রত থাকতেন। তাঁর উপাসনাকালে কেউ যাতে তাঁর গৃহে প্রবেশ না করে এমন নির্দেশও দেওয়া থকতো। কিন্তু একদিন তাঁর স্ত্রী কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সেই সাধনা কক্ষের ছিদ্র পথে  দৃষ্টি দিতেই দেখতে পান যে, রাজা তাঁর নিজের অন্ত্র বের করে পরিষ্কার করছেন। এই দৃশ্য অবলোকন করে রাণী অবাক হয়ে চীৎকার দিয়ে ওঠেন, ফলে রাজার ধ্যান ভেঙে যায়। কথিত আছে তিনি সবগুলো অন্ত্র যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারেননি, যার ফলে তিনি উম্মাদ হয়ে যান। এ সম্পর্কে এখনও চাকমা সমাজে একটা গান প্রচলিত আছে:

   মুনি দরবেশ ধ্যান করে

  পাগলা রাজা আপন চিৎ-কল্জা খৈ-নাই স্যান গরে।

[সাধু-দরবেশ যেমন ধ্যান ধরে থাকে, সেই রকম পাগলা রাজা নিজের কলজে বের করে স্নান করাতেন]

এ ছাড়াও চাকমা রাজারা যে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন তার আরও অনেক প্রমাণ উপস্থিত করা যায়।

চাকমা রাজমহিষী প্রীমতী কালিন্দী রাণী প্রথমদিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলামের অনেক অনুশাসনও তিনি মেনে চলতেন। রাজানগরে বিরাট মসজিদ তাঁর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মসজিদ তদারক ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের ইমামত করার জন্য তিনি একজন মৌলানা নিযুক্ত করেন। কথিত আছে, রাণী সেই মৌলানার কাছ থেকে অনেক সময় ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করতেন। চাকমা রাজ পরিবারের মহিলাদের অবরোধ প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও শ্রীমতী কালিন্দী রাণী পরবর্তীকালে ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করেন। তিনি প্রথমে হিন্দু ধর্ম এবং পরিশেষে বৌদ্ধ ধর্মগ্রহণ করেন।

এসব প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয় যে, চাকমারা হয়ত বা মুসলমান ছিল। মুঘল বংশধর না হলেও এরা যে ব্রক্ষ্ম দেশের সাক বা সেক জাতির (ইসলামী শায়েখ বা শেখ থেকে) অন্তর্ভুক্ত ছিল তা অনুমান করা যায়।

কিন্তু চাকমাদের নিজেদের মতে, উপরোক্ত যুক্তিসমূহ সর্বৈব মিথ্যা। মুসলমানী নাম গ্রহণ এবং তাদের মধ্যে মুসলিম প্রভাবের কারণ সম্পর্কে তারা শুধু এই বলতে চায় যে, অতীতকালে কোন এক চাকমা রাজা জনৈক মুসলমান নবাব কন্যার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেন। সেই নবাব কন্যার প্রভাবে চকমা রাজ ইসলামী ভাবধারার সমর্থক হয়ে ওঠে। যার ফলে পরবর্তীকালে তাঁদের নামকরণ উপাধি গ্রহণ আচার-ব্যবহার প্রভৃতিতেও ইসলামী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়[xv]। এক সময় চাকমা সমাজে কোনও রমণীর মৃত্যু ঘটলে তাকে রীতিমত কাফন পরিবৃত করে উত্তর শিয়রে কবরস্থ করা হতো এরূপ ঘটনাও বিরল নয়।

কোন জাতির আদি পরিচয় উদঘাটনে প্রাচীন সংস্কারের দান অপরিসীম। এ দিক দিয়ে বিচার করলে চাকমাদের এই যুক্তি অনেকটা শিথিল মনে হয়। কিন্তু চাকমারা কোনক্রমেই মানতে রাজি নয় যে, তারা কোনকালে মুসলমান ছিল। চাকমারাজ শ্রী ভুবনমোহন রায় (মৃত্যু ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) দেখাতে চেয়েছেন যে, চাকমারা আসলে শাক্য বংসম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর[xvi]। পুরাকালে যে তাঁরা পৈতাধারী ক্ষত্রিয় ছিলেন- একথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

মগভাষায় ‘শাক্য’ অর্থ ‘সাক’ আর যারা রাজবংশম্ভূত তাঁদেরকে বলা হয় ‘সাকমাং’ (মাং রাজা অর্থে)। এই ‘সাকমাং’ থেকে ‘চাকমা’। এই বিশেষ কথাটির উপর চাকমারা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে থাকেন। চাকমাদের এই নিজস্ব মতামত এবং মগদের এই ভাষাগত অর্থের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা প্রমাণ করতে চান যে, তাঁরা শাক্য বংশম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর।

চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে চাকমা সমাজে দুটি পুরাকাহিনী প্রচলিত আছে- ‘রাধামহন-ধনপতি’ উপাখ্যান এবং ‘চাটিগাঁ ছাড়া’। এই কাহিনী দুটি মূলত এক এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির দ্বিতীয় অধ্যায় মাত্র। উক্ত কাহিনীতে রাজা সাধ্বিংগিরির উল্লেখ রয়েছে। রাজা সাধ্বিংগিরি চম্পকনগরে (মতান্তরে চম্পানগরে) বাস করতেন। এই চম্পক বা চম্পা থেকে না-কি চাকমা জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সেকালে চম্পনগরে বিজয়গিরি হরিশচন্দ্র নামে আরও দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন। তাঁরা সবাই চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়। চাকমারা নিজেদের এঁদেরই বংশধর বলে দাবি করে। ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’ অবশ্য উক্ত কাহিনী দুটি সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এই চম্পকনগর বা চম্পানগরের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থিত করা যায় কি-না। কেউ কেউ অনুমান করেন, চম্পানগর বিহারে অবস্থিত। আবার চীনা পর্যটক ফা-হিয়েনের (৪২৯ খ্রীষ্টাব্দ) বর্ণনায় পাওয়া যায় চম্পানগর ছিল তখনকার সময়ে ভাগলপুরের কর্ণপুর রাজ্যের রাজধানী। ক্যাপ্টেন থমাস হার্বার্ট লুইন বলেন, চম্পানগর মালাক্কার নিকটবর্তী একটি শহর।’ এ থেকে কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন যে, চাকমারা ‘মালয় বংশজ’। অবশ্য এ সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে।

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’য় চম্পা বা চম্পকনগরের সরাসরি কোন উল্লেখ নাই। তবে চাকমা সমাজে প্রচলিত একটি গানে চম্পানগর নয় নুর নগরের উল্লেখ রয়েছে। গানটির রচনাকাল জানা যায়নি, তবে চাকমা রাজাদের কেউ হয়তো একবার নিজ দেশ ছেড়ে ব্রক্ষ্ম দেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার ফলে দেশে ফিরে আসার অভিলাষ জ্ঞাপন করে তাঁরা ছড়া কেটে গান করতেন (আনুমানিক ৭০০ মগাব্দ):

ডোমে বাজায় দোল্ দগর          ফিরে যাইয়ম্ নুরনগর

(বাদ্যকেরা ঢোল-ডগরা বাজায়। আমাদের নুরনগর ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়)

এই নুরনগর পার্বত্য ত্রিপুরায় অবস্থিত। চাকমারা আগে (বর্তমানেও আছে) পার্বত্য ত্রিপুরায় ছিল। ত্রিপুরা জেলায় অবস্থিত গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে চাকমা সমাজে এখনও তা পবিত্র জ্ঞান করা হয়। পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসূত্র প্রাচীনকাল থেকেই। বস্তুত, এই নুরনগরই আসলে চম্পানগর কি-না তাও অবশ্য গবেষণার বিষয়।

সুতরাং এসব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে একটা জাতির আসল পরিচয় উদঘাটন সম্ভব নয়। চাকমাদের ধর্মভাবের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রসঙ্গত আরও একটি প্রমাণ উপস্থিত করা যায়। নিম্নে কয়েকজন চাকমা রাজার নাম এবং তাঁদের সিংহাসন লাভের সময়কাল উল্লেখ করা হলো:

জব্বার খান ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দ

বেল্লাল খান ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ

জালাল খান ১৭০৬ খ্রীষ্টাব্দ

শেরমুস্ত খান ১৭৩১ খ্রীষ্টাব্দ

শের দৌলত খান ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ

জান বখ্স খান ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দ

ধরম বখ্স খান ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দ ইত্যাদি।

শেষের নামটির ‘ধরম’ (সংস্কৃত) কথাটি সম্ভবত বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ‘বখ্স কথাটি খাঁটি ফরাসি ভাষার শব্দ।

‘ফতেহ্ খাঁ ১১৩৩’- [চাকমা রাজা ফতেহ্ খাঁর আমলের (১১৩৩ হিজরী) ফরাসীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা]

‘শুকদের রায় ১২১০ হিজরী’ [চাকমা রাজা শুকদের রায় (১২১০ হিজরী) এর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জয়কালী সহায় ধরম্ বখ্শ খাঁ’ [রাজা ধরম বখ্শ খাঁর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘সিংহ চিহ্নিত চাকমা মুদ্রা’

ধরম বখশের স্ত্রী শ্রীমতী কালিন্দী রাণী এই সময়েই হিন্দু ভাবাপন্ন হন। পূর্বে চাকমা রাজাদের মুদ্রায় আরবী ফারসী শব্দের প্রতিকৃতি ‘আল্লাহ’ ‘খোদা’ ইত্যাদি লেখা থাকতো; কিন্তু এই ধরম বখ্শ খান তাঁর মুদ্রার মধ্যে ‘জয়কালী সহায়’ খুদিত করেন।

পরে শ্রীমতী কালিন্দী রাণী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাজানগরে বাংলা ১২৭৬ সালের ৮ চৈত্র ‘মহামুনি’ সংস্থাপন করেন। মন্দিরগাত্রে সর্বসাধারণের জ্ঞাপনার্থে একটি প্রস্তরফলক স্থাপিত হয়। নিম্নে প্রস্তর ফলকটির হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

শ্রী শ্রী ভোক্ত

ফড়া

বিজ্ঞাপন

সর্বসাধারণের অবগতার্থে এ বিজ্ঞাপন প্রচার করিতেছি যে, অত্র চট্রগ্রামস্থ পার্বত্যাধিপতি আদৌ রাজা শেরমস্থ খাঁ তৎপর রাজা শুকদের রায় অতঃপর রাজা সের দৌলত খাঁ পরে রাজা জানবকস্ খাঁ অপরে রাজা টর্বর খাঁ অনন্তর রাজা জব্বর খাঁ আর্য্যপুত্র রাজা ধরম বকস্ খাঁ তৎসহধর্মিনী আমি শ্রীমতী কালিন্দী রাণী আপোন অদৃষ্ট সাফল্যাভিলাসে তাহানদ্বিগের প্রতি কৃতাজ্ঞাতাসূচক নমস্কার প্রদান করিলাম যদিও পূর্ববর্তীর ধর্মার্থে বৌদ্ধ ধর্মের শ্রীবৃদ্ধিসাধন জন্য দ্বিগদ্বেসিয় অনেকানেক ষুধিগণ কর্তৃক সাস্ত্রানুসারে ১২৭৬ বাংলার ৮ই চৈত্র দিবস অত্র রাজানগর মোকামে স্থলকুল রত্নাকর ‘চিঙ্গঁ’ সংস্থাপন হইয়াছে তাহাতে আজাবধি বিনা করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বি ঠাকুর হইতে পারিবেক উল্যেকিত পৃণ্যক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে শ্রী শ্রী ছাইক্য মুনি স্থাপিত হইয়া তদুপলক্ষ্যে প্রত্যেক সনাখেরিতে মহাবিষুর যে সমারোহ হইয়া থাকে ঐ সমারোহতে ক্রয়-বিক্রয় করণার্থে যে সমস্ত দোকানি ব্যাপারি আগমন করে ও মঙ্গলময় মুনি দর্শনে যে যাত্রিক উপনিত হয়, তাহারার দ্বিগ হইতে কোন প্রকারের মহাষুল অর্থাৎ কর গ্রহণ করা জাইবেক না ইদানিক কি করে বা করায় তব এই জর্ন্মে ঐ জর্ন্মে এবং জর্ন্মে জর্ন্মে মহাপতিকিপাত্র পরিগণিত হইবেন।

কিমাধিক মিতি … কালিন্দী রাণী

শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর হস্তলিপি

শ্রীমতী কালিন্দী রাণী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন এই অনুশাসন লিপির প্রতিটি অক্ষর তিনি যথাযথ প্রতিপালন করে গিয়েছেন। শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর সময়ই চাকমারা পুরোপুরি বৌদ্ধ ধর্মের শাসনে চলে যায়।

চাকমাদের আদি উৎস নির্ণয় সম্পর্কে যেসব যুক্তি ও প্রমাণাদির উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে তার ধর্মীয় বিষয়াদিও জড়িত। পাহাড়ি জাতি মাত্রই অপেক্ষাকৃত সরল। এদের মনোভাবও বিশেষ কোমল। এ কারণে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও স্থৈর্য লক্ষ্য করা যায় না। বর্তমানে অবশ্য মিশনারীদের প্রচেষ্টায় অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায়ও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে; কাজেই প্রবহমান ধর্মনীতির উপর নির্ভর করে কোন জাতির উৎস নির্ণয় সবক্ষেত্রে সঠিক ও নিরাপদ নয়।

তথ্যসূত্র

[i]  Vide Bengal Govt. Act XXIII dt. 1.8.1860.

[ii] Colonel Phayre : The History of Burma, p 39.

[iii]  দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং, পৃ ১৭-১৯।

[iv]  ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং’, এবং ‘রাজমালা’র বর্ণণায় যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র রাজা-বাদশাহদের নামের মধ্যে কিছু কিছু তফাৎ দেখা যায়। যথা: রাজমালা দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফং অরুণযুগ (চাকমা-রাজা ৬৯৬ মগাব্দ) ইয়াংজ (৬৯৬ মগাব্দ) মইসাং রাজা প্রি ৯৮ মংছুই রাজা প্রি ১১২ মারিক্যা রাজা প্রি ৫৭ মরেক্যজ রাজা প্রি ৫৫ জনু রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৩৯ চনুই রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৫৮ সাজেম্বী(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ২৩ সাজাইয়ু(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ৫৯ ইত্যাদি।

[v]  Vide letter No. 1985/797 LR dt. 1. 9. 1881.

[vi] সুবোধ ঘোষ: ভারতের আদিবাসী(উদ্ধৃত), ‍পৃ ৪।

[vii] Census Report Of Bengal 1931.

[viii] T. H. Lewin: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein, p. 62.

[ix] Colonel Phayre: Journal of Asiatic Society of Bengal, No. 145, 1844, pp. 201-202.

[x] সতীশ চন্দ্র ঘোষ: চাকমা জাতি, পৃ ৫।

[xi]  J. P. Mills: Notes on a Tour: In the Chittagong Hill Tracts in 1926:  Census of India 1931.

[xii]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬।

[xiii]  ড. দীনেশ চন্দ্র সেন: ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। ‘সেকালের উপাধিগুলি কিছু অদ্ভুত রকমের ছিল।‘পুরন্দর খাঁ’ ‘গুণরাজ খাঁ’ এসব রাজদত্ত খেতাব।’

[xiv]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬৯।

[xv]  শ্রী মাধবচন্দ্র চাকমাধর্মী: শ্রী শ্রী রাজনামা, পৃষ্ঠা, ভূমিকা e/o.

[xvi] ভুবন মোহন রায়: চাকমা রাজবংশের ইতিহাস,(১৯১৯) পৃ ৩৭।

♦ আবদুস সাত্তার: কবি, গবেষক ও আরণ্য জনপদের লেখক।

বৌদ্ধদের হামলার আশঙ্কায় শ্রীলঙ্কায় স্বস্তিতে জুমার নামাজ পড়তে পারলেন না মুসল্লিরা

2bedaa629e1e4bb8fd628261

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

শ্রীলঙ্কার চরমপন্থি বৌদ্ধদের হামলার আশঙ্কায় মুসলমানেরা আজ পবিত্র জুমার নামাজ সংক্ষিপ্ত করতে বাধ্য হয়েছেন। সাম্প্রতিক হামলায় চার মুসলমান নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। যে কোনো সময় আবারও হামলা হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

আজ জুমার দিন মুসলমানদের ওপর হামলা হতে পারে, এ আশঙ্কায় দেশটির মুসলিম কাউন্সিল-এমসিএসএল জুমার মূল নামাজের আগে ও পরের বিভিন্ন এবাদত সংক্ষেপ করতে মসজিদের ইমাম ও মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। নামাজ শেষে মুসল্লিরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে মসজিদ থেকে ঘরে ফিরে যান, সে আহ্বানও জানানো হয়েছিল। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে মসজিদের ইমামেরা আজ নামাজের সময় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের খুতবা শুরু করেন এবং দ্রুত নামাজ শেষ করে নিরাপদে মুসলমানদের বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন।

এমসিএসএল’র সভাপতি এন.এম. আমিন বলেছেন, তাদের আহ্বানের প্রতি আলেমরাও সমর্থন জানিয়েছিলেন। এসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপের কারণে শ্রীলঙ্কায় আজ কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে জানা গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- শ্রীলঙ্কার মুসলমানেরকে কি সব সময় আতঙ্কের মধ্যেই থাকতে হবে নাকি সরকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেবে?

গত ১৫ জুন শ্রীলঙ্কার আলুথগামা শহরের একটি মসজিদের কাছে চরমপন্থি বৌদ্ধদের হামলায় অন্তত চার মুসলমান নিহত হয়। এ সময় উগ্র বৌদ্ধদের দেয়া আগুনে পুড়ে যায় শত শত ঘর-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসন মুসলমানদের রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে গতকাল (বৃহস্পতিবার) দেশটির মুসলিম ব্যবসায়ীরা রাজধানী কাবুলে ধর্মঘট পালন করেছে। বৌদ্ধ অধ্যুষিত শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ হচ্ছে মুসলমান। কয়েক জন বিশ্লেষক বলেছেন, তালেবান, আল-কায়েদা ও আইএসআইএলের মতো কিছু উগ্র গোষ্ঠীর ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন দেশে ইসলামভীতি ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সব মুসলমানই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সূত্র: আইআরআইবি, ছবি- বৌদ্ধদের সাম্প্রতিক হামলার চিহ্ন

হিন্দু থেকে মুসলিম হলেন একই পরিবারের ৫ জন

image_90650_0

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

শহরের হাজীগঞ্জের পরিমল চন্দ্র শীলের পরিবারের ৫ সদস্য রোববার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। নারায়ণগগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদের আদালতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে তাদের সহযোগিতা করেন নেদায়ে ইসলাম।

অ্যাডভোকেট শাহাজাহান মোড়ল জানান, পরিমল চন্দ্র শীলের পরিবারের সদস্যরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে আমার কাছে আসে। পরিবারের পাঁচ সদস্য সবাই ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে আদালত তাদের আদেশ দেন।

পরিমল চন্দ্র শীল বর্তমানে আহমদ আবু বাকার জানান, নিউ হাজীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সড়কে বাসার পাশে মসজিদে এক বছর ধরে বিভিন্ন ওয়াজ ও ধর্মের দাওয়াতে আমার পরিবারের সদস্যরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণে ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরপর রোববার সব সদস্য আদালতে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের অনুমতি নেয়।
 
তিনি আরো জানান, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর থেকে পরিমল চন্দ্র শীল বর্তমানে আহমাদ আবু বাকার, স্ত্রী দিপালী রানি বর্তমানে আমিনা মোতমাইন্না, বড় ছেলে অপু চন্দ্র শীল বর্তমানে আহমাদ আবু আরশাদ, মেজো মেয়ে রেখা রানি শীল বর্তমানে আয়িশা সিদ্দিকা ও ছোট ছেলে অমিত চন্দ্র শীল বর্তমানে আহমাদ আবু আরদিল্লাহ হিসেবে সমাজে পরিচিতি লাভ করবে।
 
অপরদিকে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর আদালতে তাদের অভিনন্দন জানায় জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা এমপি হোসেনে আরা বাবলী, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন ও অ্যাডভোকেট সুলতান উদ্দিন নান্নু।

 আরও খবর পড়ুন

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মুসলিমরা নির্মম নির্যাতনের শিকার

উপজাতীয় নওমুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান মিশনারীদের দৌরাত্ম

মুসলিম হচ্ছেন বলিউডের সেক্স সিম্বল নায়িকা মমতা কুলকার্নি

নায়িকা শাবনাজের বদলে যাওয়ার গল্প

আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি আর ওড়না খুলবো না- ভীনা মালিক(ভিডিওসহ)

ইসলামকে জানার চেষ্টায় আমার চোখ খুলে গেল- মার্কিন সঙ্গীত শিল্পী জেনিফার(ভিডিওসহ)

চলচ্চিত্রে নিজের অভিনীত চরিত্র দেখলে এখন নিজেই বিব্রত হন শাবানা

খাগড়াছড়িতে অর্ধসমাপ্ত মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলেন জেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা

বান্দরবানের পাহাড়ে চলবে ট্রেন

 

খাগড়াছড়িতে অর্ধসমাপ্ত মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলেন জেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা

SAMSUNG CAMERA PICTURES

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

“তিনি কি মুসলমান! মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর ভেঙ্গে সাইন বোর্ড  নিয়ে গেল। কোন যুগ আসল! আমাদের মসজিদ নির্মানে অনুমতি দিয়ে মধ্যপথে রহস্যজনক কারনে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হ’ল। আল্লাহ যেন উনাকে হেদায়েত দেন। এভাবে আর কোন মুসলিম যেন মসজিদ নির্মাণে বাঁধা না দেয়”- ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধের বর্ণনা দিল খাগড়াছড়ি সদরের হেরিটেজ পার্ক মসজিদ পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি ইব্রাহিম ভূইয়া, সাধারন সম্পাদক মো: শামসুল আলম ও এলাকার কয়েকজন।

এখানে কোন মিলাদ পড়া যাবে না। যারা এখানে মিলাদ পড়বে তাদের গ্রেফতার করা হবে, অবাধ্য হয়ে মসজিদের কোন কাজ করা হলে সৈনিক নামিয়ে আক্রমণ করা হবে। মসজিদের চেয়েও এ জায়গার অনেক দাম বলে জেলা কমান্ডারের কথাগুলো এভাবে ব্যক্ত করেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, হেরিটেজ পার্ক মসজিদটি নির্মাণকাজ চলাবস্থায় রহস্যজনক কারনে হঠাৎ করে জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মো: আব্দুল মজিদ মৌখিক নির্দেশক্রমে বন্ধ করে দেন। মসজিদের নির্মাণ কাজ হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়ার পর এলাকাবাসী জেলা কার্যালয়ে দেখা করলেও তিনি এলাকাবাসীর কাছে মসজিদের চেয়েও উক্ত জায়গার দাম অনেক বেশী ও মসজিদ নির্মাণ করতে দেয়া হবে না বলে মন্তব্য করায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসী মসজিদ নির্মাণে সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লিখিত আবেদন করার পরও শুধুমাত্র জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা বিরোধিতা করায় চলমান নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। এ কারণে যে কোন সময় এলাকাবাসীকে নিয়ে গণ আন্দোলনে যাবে বলে জানান নির্মাণ কাজে সম্পৃক্ত পরিচালনা কমিটির লোকজন ও এলাকাবাসী।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রাস্তার পাশে পর্যটন মোটেল সংলগ্ন এলাকায় হেরিটেজ পার্কের ভূমির মধ্যে প্রায় ৫২ ফুট দৈর্ঘ্য ও বারান্দা সহ ৩৮ফুট প্রস্ত জায়গায় ফাউন্ডেশন করা মসজিদের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ বন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। ইতোমধ্যে বেজ ঢালাই, গ্রেড ভিম ও কলম সহ যাবতীয় নির্মাণ সম্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। নির্মাণকৃত স্থানে প্রায় আড়াই হাজার ইট স্তুপ রয়েছে। পাশে আনসার ক্যান্টিনে ১১ বস্তা সিমেন্ট ও নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিও জমা পড়ে আছে। মসজিদটি এ পর্যন্ত নির্মানে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান, নির্মান কাজে সহযোগী মো: মাহবুব মাস্টার ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল এলাকা, বলপিয়া আদাম ও খাগড়াছড়ি আনসার বাহিনীর জন্য শুধুমাত্র একটি মসজিদ রয়েছে। উক্ত মসজিদটি আনসার বাহিনীর ক্যাম্পের ভিতরে। চেঙ্গী নদীর কুলঘেঁষে। যা পর্যটনে আসা ব্যক্তিবর্গ ও মেইন সড়ক থেকে দেখা যায় না। খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল ও আনন্দ  এনজিওকে ঘিরে সম্প্রতি সময়ে এ এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন বসতি স্থাপনা।

এলাকাবাসীর সূত্র মতে, এ এলাকায় প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবার রয়েছে। তবে আশপাশ এলাকায় কোন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নেই। পর্যটনে আসা লোকজন ও এলাকাবাসীর নামাজ আদায়ে চরম অসুবিধায় পড়ায় ২০১৩ সালে আনসার ক্যাম্পের মসজিদটি স্থানান্তর করে হেরিটেজ পার্কের ক্যান্টিনের পাশে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এলাকাবাসী ও আনসার বাহিনীর যৌথ  উদ্যোগে গত ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর  মসজিদ নির্মানের প্রস্তাবিত জমিতে আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা, বিশিষ্ট সমাজ সেবক নুর নবী চৌধুরী খাগড়াছড়ি পৌর মেয়র আলহাজ মো: রফিকুল আলম খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো: শানে আলম, মাওলানা মাহবুবসহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

উক্ত সভায় মসজিদটি স্থানান্তর করে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের বড়ই বাগানের পার্শ্বে মুসল্লীদের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তা সংলগ্ন খালি জায়গা মসজিদর নাম হেরিটেজ মসজিদ নামকরণ করে নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় বলে জানা যায়। এছাড়াও সদর উপজেলা আনসার ভিডিপি অফিসার মো. আবু তাহেরকে সভাপতি করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট মসজিদ পরিচালনা কমিটিও গঠন করা হয়।

এছাড়াও ১৪ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও মসজিদ নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর করেন তৎকালীন জেলা আনসার ভিডিপি কমান্ডার আজীম উদ্দিন। এসময় এসব ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ১৫ নভেম্বর মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরুর পর পরই গত ২১ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে জেলা কমান্ডার  আজীম উদ্দিন বদলী হলে ১৭ নভেম্বর বর্তমান জেলা কমান্ডার আ: মজিদ খাগড়াছড়িতে যোগদান করেন বলে এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়।

তিনি যোগদানের পর প্রায় ৪মাস অতিবাহিত হলেও প্রায় এক মাস পূর্বে তিনি নির্মাণ কাজ বন্ধ করার মৌখিক নির্দেশ প্রদান করেন।  হঠাৎ করে মৌখিক নির্দেশক্রমে মসজিদ নির্মাণের কাজ বন্ধ করার ঘোষণায় হতাশা প্রকাশ করে মসজিদ পরিচালনা কমিটির মো: শামসুল ইসলাম বলেন, বর্তমান আনসার ভিডিপি কর্মকর্তার কর্মস্থলে থাকাবস্থায় মসজিদের নির্মাণ কাজটি শুরু করা হয়। তিনি মসজিদ নির্মাণকালে দুইবার মিলাদে যোগদান করেন এবং মসজিদ নির্মাণে কাজ সুষ্ঠুভাবে করার বিভিন্ন পরামর্শও দেন।

সূত্র জানায়, এর আগে হেরিটেজ পার্ক পরিদর্শনে এসে খাগড়াছড়ি রিজিয়নের সাবেক রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মামুনুর রশিদ পিএসসি ও  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরুন্নবী চৌধুরী হেরিটেজ মসজিদটি নদী ভাঙ্গনে পড়ায় মসজিদটি স্থানান্তরের কথা বলেন।

এলাকাবাসী মো. নুরুল আলম জানান, অত্র এলাকায় প্রায় ৭০টি মুসলিম পরিবার রয়েছে। অথচ এ এলাকায় কোন মক্তব, কবরস্থান, মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নাই। একটি মসজিদ রয়েছে তাও আনসার বাহিনীর সংরক্ষিত এলাকায় ক্যাম্পের ভিতরে এবং মসজিদটি চেঙ্গী নদীর ভাঙ্গনের কবলে। নির্মানাধীন মসজিদটি নির্মাণ করা হলে এলাকাবাসী ও পর্যটন মোটেল এবং হেরিটার্জ পার্কে আগত জনসাধারনের নামাজ আদায়ে সুবিধা হবে।

এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরনবী চৌধুরী বলেন, নির্মানাধীন হেরিটেজ পার্ক মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ করা দু:খজনক। মুসলিম পরিবারের নামায আদায় এবং ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মক্তব পাঠের জন্য এটির কাজ পূনরায় চালু করার আহবান করছি। এছাড়াও তিনি আরও বলেন, পর্যটন মোটেল এলাকার আশ-পাশে মসজিদ নাই এবং হেরিটেজ পার্কের ভিতর যে মসজিদটি রয়েছে তা চেঙ্গী নদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়েছে।  নির্মাণাধীন মসজিদটি নির্মিত হলে এলাকার ৬০-৭০টি মুসলিম পরিবার উপকৃত হবে। তিনি মসজিদটি নির্মাণে আনসার বাহিনীর উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

নির্মাণের মাঝ পথে মসজিদের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার প্রসঙ্গে জেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে আমি ব্যক্তিগতভাবে কোন বক্তব্য দিতে রাজি নই, তবে উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে বক্তব্য দেয়া যাবে। পরবর্তীতে জেলা আনসার কার্যালয়ে ৩ দিন এ প্রতিনিধি গেলেও কর্মকর্তা আব্দুল মজিদকে ষ্টেশনে উপস্থিত পাওয়া যায়নি।

তবে আজ রাত ৯ টায় পার্বত্যনিউজ প্রধান কার্যালয় থেকে আবদুল মজিদের কাছে টেলিফোনে মসজিদের কাজ বন্ধ করে দেয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পূর্বের সিনিয়র অফিসার আজিমুদ্দিন বদলী হওয়ার আগে এই মসজিদের কাজ শুরু করতে সহায়তা করেছিলেন। তবে এখানে কাজ করতে যে ধরনের অনুমোদন নেয়া প্রয়োজন তা নেয়া হয়নি। তাছাড়া একই স্থানে আরেকটি মসজিদ রয়েছে এবং সে মসজিদে সবাই নামাজ পড়তে পারে। এলাকায় জনবসতি কম হওয়ায় সেখানে নামাজি খুব একটা হয়না। একই স্থানে আরেকটি মসজিদ করার ব্যাপারে  উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই মসজিদের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বলতে কোন লেভেল বোঝাচ্ছেন- এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, হেড অফিস থেকেই এখানে আরেকটি মসিজদ নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে। 

আরও খবর পড়ুন

বান্দরবানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সুরের মুর্ছনায় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের ২৫ বছর পূর্তি

পর্যটন শিল্প ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরী- মেনন

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলেই পাহাড়ের কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়ন হবে- বীর বাহাদুর

পাহাড়ে উপত্যকায় অসহায় বাঙালির কান্না

10155403_706022802772172_9049515200200666589_n

মনযূরুল হক ::

অসহায় বাঙালির কান্না পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। প্রতিবছর হাজারো মানুষ নিজেদের সুন্দর সময়গুলো কাটাতে পাহাড়কেই বেছে নেয় পর্যটনের জন্য তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে। কিন্তু মানুষ যেখানে যায় বিনোদনের জন্য, সেখানকার সেই পর্যটন অঞ্চলখ্যাত এলাকার মানুষেরা আসলে কতটা ‘আনন্দে’ আছে, তা সব সময়ই রয়ে যায় পর্যটকদের দৃষ্টির আড়ালে। পাহাড়ের বাইরে সাধারণ সমতল অঞ্চলে যেমন সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে, পার্বত্য অঞ্চলে সেটা সাদা চোখেই কেবল অনুমান করা যায়। নইলে ধর্মবর্ণ যাই হোক, শতবছরের ইতিহাসে নৈসর্গিক পাহাড় এমন এক বিভাজনের জন্ম দিয়েছে, যা কেবল ধর্মের দৃষ্টিতে নয়, মানবতার দৃষ্টিতেও অমার্জনীয় অপরাধ বলেই বিবেচিত হওয়ার কথা।

একই পাহাড়ের অলিন্দে বাস করলেও এবং কখনো কখনো একই বর্ণের দেখতে হলেও সেখানে রয়েছে অলঙ্ঘনীয় এক অন্তরায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ বলেই চিহ্নিত করা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। অথচ তা সংবিধানের ১৯ নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিষ্কার পরিপন্থি। এই বিভাজনই একই দেশের মানুষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর একটার পর একটা সংঘর্ষের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে। একসময় সেটা ‘ভূমিবিরোধ’ বলে চালিয়ে দেয়া হলেও ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, আসলে এই ভূমিবিরোধের পর্দায় ঢেকে রাখা হচ্ছে অন্য এক রহস্য।

পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মুসলিম ওপর নির্যাতন চললেও পাহাড়ে চলছে সম্পূর্ণ অন্যরকম পরিস্থিতি। সেখানে শুধু যে মুসলিমরা অসহায় তাই নয়, বরং তাদের মানবেতর জীবনযাপন যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোকেও হার মানাচ্ছে।

ভূমিবিরোধের কথা
পাহাড়ি নেতাদের বক্তব্যে ‘শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভূমিহীনরা ভূমি ফিরে পাবে’ বলা হলেও ভূমিবিরোধ নিষ্পপত্তি আইনটি বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ে বাঙালিদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা বাঙালি সংগঠনগুলোর নেতাদের। যদিও সরকার বলছে, ভূমি নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘাত এড়াতেই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে সৃষ্ট সংঘাতে প্রতিবেশীদেশ ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী, দুর্গম পাহাড়ে চলে যাওয়া পাহাড়ি এবং নিজ ভূমিতে পুনর্বাসনের সুযোগবঞ্চিত বাঙালিদের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে পরপর চারটি কমিশন গঠন করা হয়, কিন্তু কোনো কমিশনই পাহাড়িদের বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেনি। সর্বশেষ জুলাই ২০০৯ ভূমি কমিশন পুনর্গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ মীমাংসার জন্য সরকার জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়। তবে জনসংহতি সমিতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন, সুশীল সমাজ, তিনটি সার্কেলের প্রধানরা (তিন রাজাসহ) এটার বিরোধিতা করেন। কিন্তু এবার পাহাড়িরা বিরোধিতা না করলেও প্রতিবাদ করছে বাঙালিরা, বিশেষ করে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমরা।
পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিসমস্যা নিরসনে ২০০১ সালে প্রণীত আইনটি সংশোধনের জন্য ২৭ মে মন্ত্রিসভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে বাঙালি সংগঠনগুলো। তবে ৩ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (সংশোধন) ২০১৩ এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ১৬ জুন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) বিল ২০১৩ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। উত্থাপনের পর বিলটি সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ভূমিমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

কী আছে কমিশনে?
সংশোধিত ভূমিনিষ্পত্তি আইনের ধারা ৬ (১) এর ক-তে আছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্তি ও বেদখল হওয়া সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। বাঙালি নেতারা আশঙ্কা করছেন, সংশোধনী প্রস্তাবে ‘সমস্ত ভূমি’ শব্দসমূহ যুক্ত হওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সরকারি ব্যবস্থাপনা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া সংশোধনীতে প্রচলিত আইন ও রীতির সঙ্গে ‘পদ্ধতি’ শব্দটি যুক্ত হওয়ায় ভূমির ওপর বাঙালিদের অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। ধারা ৬ (১) এর গ-তে আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল হয়ে থাকলে এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল।

এখানে আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি বাস্তবায়িত হলে বাঙালিদের ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) অন্যান্য বন্দোবস্তে যেসব ভূমি দেয়া হয়েছে, তার মালিকানা হারাবে। এছাড়া পাঁচসদস্যবিশিষ্ট কমিশনের মধ্যে তিনটি সদস্যপদ পাহাড়িদের জন্য সংরক্ষিত এবং বাকি দুই সদস্যের মধ্যে একজন হলেন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও অন্যজন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। এক্ষেত্রে বাঙালিদের যৌক্তিক আশঙ্কা হচ্ছে, কমিশনে পাহাড়িদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং সেইসঙ্গে প্রতিটি রায় বাঙালিদের বিপক্ষে যাবে। এছাড়া আইনে কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের বিধান থাকায় বাঙালিরা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ধারা ১০ এ আছে, কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যেকোনো ন্যায্য বিচারের স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবে। এর ফলে বিচারকাজ প্রভাবিত হওয়া ছাড়াও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে।

গোড়ায় গলদ না আগায়?
১৯৭৫ সালের পরে পাহাড়ে গেরিলা গ্রুপ শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। ওই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার বিদ্রোহ দমনে ব্যবস্থা নেয়। পাশাপাশি পাহাড়ে পাহাড়ী ও বাঙালি জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। সে লক্ষে সমতলের অনেক ‘সেটেলার’ পরিবারকে দুই একর আবাদি জমি ও পাঁচ একর পাহাড়ি জমি দেয়ার কথা বলে সরকারি উদ্যোগে তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পাহাড়ি একটি বাঙালি- এভাবে পুরো পার্বত্যাঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার সুদূরপ্রসারী ইচ্ছা ছিলো- এভাবে দীর্ঘসময় ধরে পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করার ফলে তাদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে যাবে, সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং একসময় চিরকালের মতো বিরোধ-মীমাংসা তারা নিজেরাই করে নিতে পারবে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিদের উপস্থিতি একান্তই জরুরি ছিলো। কেননা কেবল সেনাবাহিনী দিয়ে পার্বত্য এলাকার সীমান্ত রক্ষা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বন্দোবস্তীর নিয়ম ভেঙে সেটেলারদের জমির কবুলিয়ত দেয়। এ কারণেই নাকি ভূমিবিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর এরশাদ সরকার এসে বাঙালিদের জন্য পূর্বের সরকারের বরাদ্দকৃত জমির কবুলিয়ত প্রত্যাখ্যান করে বিরোধ-মীমাংসার উসিলায় বাঙালিদের পাহাড় থেকে সরিয়ে এনে ছোট ছোট গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ করে ফেলে। সেখানে বাঙালিদের জন্য বন্দোবস্ত দেয়া হয় মাত্র এক একর করে অনাবাদি জমি। মূলত ভূমির বিরোধটা শুরু হয় সে কারণেই। এরপর থেকে বাঙালিরা পাহাড়ে পড়ে থাকা তাদের ৫ একর জমি ফিরে পেতে চাইলেও কোনো সরকারই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। খালেদা জিয়ার সরকার হয়ে শান্তিচুক্তির পর শেখ হাসিনা, তারপর খালেদা জিয়া হয়ে আবারো শেখ হাসিনার সরকার এলো। কিন্তু এখনো আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেই গুচ্ছগ্রামবন্দি ৮ লাখ বাঙালি মুসলিমদের।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সইয়ের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা বিলুপ্ত শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্য। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এরমধ্যে পাহাড়ে ভূমির সমস্যা সমাধান এখনো হয়নি।

সেনাদের প্রতি বিষোদগার
‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশনি সংকেত! নামে ‘পাহাড়ি ব্যাটেলিয়ন’, আসল লক্ষ্য পাহাড়ি নিধন, সজাগ হোন সংগ্রামি জনতা’। সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি সেনাবাহিনীর নতুন ব্যাটেলিয়ন মোতায়েনকে কেন্দ্র করে পার্বত্য অঞ্চলের সবচে’ সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল খাগড়াছড়ির মহালছড়ি দীঘিনালাসহ পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে সাঁটা এ ধরণের অসংখ্য পোস্টার। পোস্টারের নিচে লেখা আছে ‘গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম’ ও ‘ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’সহ আটটি সংগঠনের নাম। এর মধ্যে উল্লিখিত দুটি সংগঠনের নেপথ্যে নামে বেনামে রয়েছে বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বোঝা যায়, সেনা ক্যাম্প স্থাপনাকে নিয়ে কোন্দলে প্রকাশ্যই ঘৃতাহুতি দিচ্ছে বাম দলগুলো। পাহাড়ি অঞ্চলের সেনারা নিজেদের স্বার্থেই সবসময় পাহাড়িদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করলেও পাহাড়িরা সেনাদেরকে নিজেদের প্রতিপক্ষভাবে বরাবরই। পাহাড়ের পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বান্দরবান জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বা ক্যবা মার্মা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে কেন? অন্য কোনো জেলায় তো দরকার হয় না। সেনাবাহিনী কেন সমাধান হবে’? একই মনোভাব ব্যক্ত করেন রাঙামাটির শুভলং উপজেলার বাসিন্দা কলেজ ছাত্র সুপণ চাকমা। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে তারাই ( সেনাবাহিনী) অশান্তির কারণ হয়ে ওঠেছে পাহাড়ে বারবার। যে বিরোধের শুরু হয় সামান্য বাকবিতণ্ডা দিয়ে, তার শেষে রক্ত গড়ায় কেন? অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যারা ব্যর্থ, তারা কীভাবে সীমান্ত রক্ষা করবে’?

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফেসবুক ও ব্লগেও বামঘেঁষা বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের পক্ষ থেকে পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনকৃত সেনাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। ‘বামপন্থা’ নামের একটি ওয়েবে দেখা গেছে, সেখানে ‘আদিবাসী’ নাম নিয়ে জনৈক ব্লগার লিখেছেন, এটি হচ্ছে সেনা কর্মকর্তাদের খুশি রেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা ক্ষমতায় যাওয়ার ভোটবাজির এক বিচিত্র রাজনীতি। গণতন্ত্রের খোলসে পাহাড়ে বন্দুকের শাসন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভূমিবিরোধ নাকি মুসলিম বিরোধ?
বিরোধের ব্যাপারে সবসময় মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হয়ে থাকে যে, বিরোধ হয়েছে ভূমি নিয়ে। কিন্তু এই বিরোধ চলাকলীন সময়ে পাহাড়িদের হাতে যে অস্ত্র দেখা যায়, সেই অস্ত্র এলো কোত্থেকে- এমন প্রশ্ন সাধারণের মনে উঁকি দেয় হরহামেশাই। কেন বিরোধের পরে ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত করা হয়? আসলেই কি কেবল ভূমিবিরোধের ফলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে, নাকি আরো কিছু জড়িয়ে আছে? সাপ্তাহিক লিখনীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য।

পার্বত্য এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ ছাড়াও বিভিন্ন অবৈধ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অত্যাচার-নিপীড়নে প্রতিনিয়তই সেখানকার বাঙালিদের জীবনযাত্রা কাটছে অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থায়। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠীর অনেকেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ ১১টি উপজাতীয় গোষ্ঠীর যে কেউ চাইলেই রাজধানী ঢাকার লাক্সারিয়াস জোন গুলশান, বারিধারা কিংবা বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের খুলশি, নাসিরাবাদে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট ইত্যাদির মালিক হতে পারছে অনায়াসেই। অথচ কোনো বাঙালি মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও জমি কিনতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারে না।

এর সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোনো উপজাতীয় নাগরিকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে বিশেষ উপজাতীয় কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সুবাদে বর্তমানে চাকমা উপজাতির মধ্যে শিক্ষার হার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ। অন্যান্য উপজাতির শিক্ষার হার সমতল অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর থেকেও অনেক বেশি। অথচ পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কোটা কিংবা অন্য কোনো ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি মুসলিমদের শিক্ষার হার কমতে কমতে বর্তমানে ২০ শতাংশেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও উপজাতি বিশেষ কোটায় চাকরি লাভের সুযোগ রয়েছে অবারিত। এতে করে চাকরিতে যথেষ্ট হারে উপজাতি গোষ্ঠীর লোক সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান নাগরিকরা এক্ষেত্রে সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে। কেবল চাকরিক্ষেত্রে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, কৃষি-খামার, পোলট্রি থেকে শুরু করে হ্রদে মাছ শিকারের মতো যে কোনো পেশা নিয়েও পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা এ ধরনের যে কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে গিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা বা ট্যাক্স দিতে হচ্ছে।

নির্যাতনের শিকার নওমুসলিমরা
পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে উপজাতি জাতিগোষ্ঠীর নওমুসলিমরা। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে নিজেদের সমাজ গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেও রেহাই পাচ্ছে না তারা। জানা গেছে মুসলিম হওয়ার ফলে সামজের চাপের মুখে পড়ে অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন সমতল জেলাস্থ মসজিদ ও মাদরাসায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ ও র‌্যাবে নিয়োজিত খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতীয় সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের পাশাপাশি থানায় সোপর্দ করে। পার্বত্যাঞ্চলের খ্রিস্টান মিশনারিদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সে হানা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে থাকা উপজাতীয় সদস্যরা। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর বাসাবো এলাকার একটি মাদরাসায় হানা দিয়ে পুলিশ উপজাতি ৫ মুসলিম এবং তাদের ১১ সন্তানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা সেসময় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত কনস্টেবল লালমিয়া এ প্রতিবেদকের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

এসব মুসলিম জানান, পাহাড়ে থাকলে চলে শান্তি বাহিনীর অত্যাচার আর নির্যাতন। অন্যকোথাও গেলেও আশ্রয় জোটে না আমাদের। কোনো মসজিদ কিংবা মাদরাসায় ঠাঁই নিলেও ভাগ্যে জোটে পুলিশ ও র‌্যাবের নির্যাতন। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমাদের কি বাঁচার অধিকারও নেই? ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর মিরপুরের একটি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালক আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার সদস্য খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে। অথচ উপজাতীয়দের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় মুসলমান হলেই তার আর রক্ষা নেই। এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি রাঙামাটির সাংড়াছড়ি এলাকার মো. করিম হোসেন (পূর্বনাম হামাজং ত্রিপুরা), মো. নূর ইসলাম (পূর্বনাম সুবামং ত্রিপুরা) সহ উপজাতীয় ৫ মুসলমান তাদের ১১ সন্তানকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি মাদরাসায় ভর্তি করাতে ঢাকায় পাড়ি জমান। পরদিন বাসাবো আবুজর গিফারী কমপ্লেক্সে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে অভিভাবকসহ সব ছাত্রকে আটক করে নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, মুসলমান হওয়ার এফিডেভিটসহ যাবতীয় কাগজপত্র সঙ্গে না থাকায় তাদের বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ফাউন্ডেশনের এককর্মকর্তা জানান, এফিডেভিটসহ মুসলমান হওয়ার সব কাগজপত্র পুলিশকে দেখানোর পরও পুলিশ তাদের সন্তানদের মুক্তি দেয়নি। বরং ঢাকায় ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি উদয় ত্রিপুরাসহ ১০-১২ জন উপজাতীয় তরুণ থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে দেনদরবার করে।

তিনি আরো জানান, ভিকটিম সেন্টারে আটক এসব ছাত্রছাত্রীকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য একটি ক্যাথলিক চার্চ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। ঢাকায় আশ্রয় নেয়া উপজাতীয় তরুণ একজন মুসলমান আল-আমীনের সঙ্গে লিখনীর এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো স্কুল কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। কেবল খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি মিশনারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। বাধ্য হয়েই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এসব মুসলমান শিক্ষার্থীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের উপরে বিজিবির একটি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যদের আজানের আওয়াজ ও নামাজ দেখে আমাদের খুবই ভালো লেগে যায়। পরে শহরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাত করার পর তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি ঢাকায় আবুজর গিফারী ট্রাস্টসহ আরও কিছু সরকার অনুমোদিত সংস্থার ঠিকানা দেন, যারা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ইসলামিক রীতিনীতি শেখাতে সহযোগিতা করে। আমাদের অনুসরণ করে গ্রামের হেডম্যানসহ অনেকেই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন।

এছাড়া অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্নরকম এক তথ্য। পাহাড়ে অনেকসময়ই বাঙালি ও পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেমের ঘটনা ঘটে। যা কখনো কখনো বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু দেখা যায়, যেখানেই বাঙালি মেয়ে ও উপজাতি ছেলের বিয়ে হয়েছে, দু’একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া প্রতিক্ষেত্রেই বিয়ের সময় উপজাতীয়রা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। তাদেরকে তাদের পরিবার আর মেনে না নিলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মুসলিমদের ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় নি। এই আক্ষেপের ফলেও হয়তো সময়-অসময় বাঙালি মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে- বলেছেন খাগড়া শহরের এক মাদরসা শিক্ষক। খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত উপজাতিদের বা চার্চের বিরুদ্ধে মুসলিমরা তেমন কোন অভিযোগ না করলেও মুসলিমরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে।

অভিযোগ আছে, মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত তিনটি পরিবারকে গত ২০১২ সালে ঢাকায় উপজাতি পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করিয়েছে পুলিশের তৎকালীন এডিশনাল আইজি (বর্তমান সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নবোর্ডের এর চেয়ারম্যান) নব বিক্রম ত্রিপুরা। একই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক উপজাতি ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়, সমতলের বাঙালি ছেলের সাথে প্রেম করার অপরাধে।

‘আদিবাসী’ তাই কদরের শেষ নেই
পার্বত্য এলাকায় বেড়াতে গিয়ে গভীরভাবে নজর করলেই একটি বিষয় প্রায় স্পষ্টভাবেই চোখে ধরা পড়ে। পাহাড়িরা একে তো অমুসলিম এবং দ্বিতীয়ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হওয়ার সুবাদে সংখ্যালঘুতার দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করুণা পেয়ে আসছে সবসময়ই। সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিমরা অনেকটাই অসহায়। মুসলিমদের জন্য একটা এনজিও তো দূরে থাক, মসজিদ করে দেয়ার মতো লোকবল পাওয়া যায় না বললেই চলে। এরই সাথে পাহাড়িরা সর্বত্রই প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, তারা বাংলাদেশের সবচে’ পুরাতন জাতি তথা ‘আদিবাসী’। চাকমাদের মতে, বাঙালিরা সেখানে ‘সেটেলার’। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্তিক বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করলেও প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে তারা সংখ্যায় কম ছিল।

গবেষণায় জানা যায়, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠির কেউই আদিবাসী নয়।
সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে চাওয়াটা কিছুতেই যৌক্তিক হতে পারে না। অথচ সরকার যেনো এখানে নিজেই তাদেরকে পরোক্ষ শেল্টার দিয়ে যাচ্ছে। গত টার্মে আওয়ামী সরকারের আমলেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এ প্রেস কনফারেন্সে ‘বাঙালিদেরকেই আদিবাসী’ বলে উপজাতীয়দের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বললেই খোদ সরকারের ভেতর থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেসময় নানা মহলের চাপে বিষয়টি আমূল চেপে যায় সরকার।

পাহাড়ী নেতা হিসেবে কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। সন্তু বাবু থাকছেন কোন আইন বলে? শান্তি চুক্তির পর থেকে ঢাকায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া থাকছেন, যার ব্যয় বহন করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্ট এইচ টি ইমাম বান্দরবানের এক মতবিনিময় সভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি সেখানে বলেন, পাহাড়ে যেসকল পাহাড়িরা বসবাস করছেন, এখানে উন্নয়ন করেছেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স¤পদকে ব্যবহার করে এই জেলাকে উঁচিয়ে রেখেছেন তাদের কোনো ক্ষতি হোক এটি আমরা কখনও গ্রহণ করতে পারি না। জননেত্রী শেখ হাসিনাও এটি কামনা করেন না, তিনি আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত আছেন। এই ‘ক্ষতি’র মানে কি- সেটা এখন প্রায় স্পষ্ট।

পাহাড়ের বাঙালিদের ছাত্র সংগঠন পিবিসিপির খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা লিখনীকে বলেন, আমাদের এখানে সবসময়ই সরকার ও প্রশাসন পাহাড়িদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। আমাদের ওপর পাহাড়িরা আক্রমণ চালানোর পরে আমরা থানায় মামলা নিয়ে গেলেও দেখা যায় উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের অঞ্চলে ভূমি বিরোধ নিরসনের জন্য এলেও কেবল পাহাড়িদের বাধার কারণেই সেটা সম্পন্ন করতে পারেন নি। অথচ মিডিয়া বলছে কেবল আমাদের প্রতিবাদের কথা।

পাহাড়ে মুসলিম বাঙালিদের দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সেখানকার মুসলিমরা সবসময়ই যেনো একটা ভয়ের মধ্যে বাস করছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও অনেকেই তা প্রকাশও করেছেন। অনেকেই বলেছেন, কোনোক্রমইে যেনো পত্রিকায় তাদের নাম প্রকাশ করা না হয়, তাহলে যেকোনো সময় তারা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। একই দেশের মধ্যে, যে দেশকে আমরা মুসলিম দেশ বলে প্রচার করে থাকি, আসলেই কি মুসলিম হিসেবে পাহাড়ের বাঙালি মুসলিমরা বসবাস করতে পারছেন? যারা এখনো সকল নির্যাতনের পরেও টিকে আছেন, তারাই বা কতদিন টিকতে পারবেন, জানেন না সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠি। মুসলিম হিসেবে না হোক অন্তত মানুষ হিসেবেও তারা যে মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন, এর দায় কার- সে প্রশ্ন এদেশের নাগরিকদের অভিভাবক সরকার ও সমাজপতিদের কাছে রইলো।

সূত্র: সাপ্তাহিক লিখনী

 

আরও প্রবন্ধ পড়ুন

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ : প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা

আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বিতর্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

পর্যটক ছদ্মবেশে মিশনারি কাজের অভিযোগে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য হলো ১২ দেশি- বিদেশি নাগরিক

পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

 

মুসলিম নিধন শুরু হয়েছে আসামে: মৃত অসংখ্য

140502171145_assam_kokrajhar_killings_512x288_ap

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পার্বত্যনিউজ:

আসামে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় বাকসা জেলার নারায়ণগুড়ি গ্রামে হানা দিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে সন্দেহভাজন বোড়ো জঙ্গীরা। পুলিশ বলছে মাত্র ৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা গেছে, তবে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে যা জানা যাচ্ছে, তাতে মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির মধ্যে ৫জন মহিলা রয়েছেন। সকলেই মুসলমান। ৩৬টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে এই তথ্য দিয়েছেন বাকসা জেলায় অবস্থানরত পুলিশের অতিরিক্ত মহানির্দেশক আর এম সিং। তিনি বলেন, ‘এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম। সন্ধ্যার পরে ওখানে পৌঁছন প্রায় অসম্ভব। কয়েকজন গ্রামবাসী পালিয়ে এসে পুলিশকে ঘটনার খবর দিয়েছে।“

এর আগে কাল রাত থেকে ওই বাকসা আর পার্শ্ববর্তী কোকড়াঝাড় জেলায় সন্দেহভাজন বোড়ো জঙ্গীদের হামলায় নিহত হয়েছিলেন দশজন। সকলেই বাংলাভাষী মুসলমান। পুলিশ বলছে বাকসা জেলার দুর্গম গ্রাম নারায়ণগুড়িতে শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রায় চল্লিশটি বাড়িতে প্রথমে আগুন ধরিয়ে দেয় জঙ্গীরা আর তার ফলে মানুষজন যখন প্রাণভয়ে পালাচ্ছিলেন, তখন জঙ্গীরা শুরু করে গুলিবর্ষণ। প্রায় ৪০ জন সদস্য ছিল ওই জঙ্গীদলে।

ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় মুসিলম নেতা ইব্রাহিম আলি ওই গ্রামে গিয়েছিলেন, তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, ”অনেকগুলি দেহ শনাক্ত করা যায় নি, আবার অনেক দেহ সম্ভবত নদীতে পড়ে ভেসে গেছে।” তিনি নিজেই ১২টি মৃতদেহ উদ্ধার হতে দেখেছেন। চারজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ আর সেনাবাহিনী পৌঁছেছে। বাকসা সহ বোড়োল্যান্ড এলাকার জেলাগুলিতে সান্ধ্য কার্ফু জারি করা হয়েছে।

140502163142_assam_kokrajhar_violence_624x351_afp

হামলা শুরু বৃহস্পতিবার

বোড়ো বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হামলায় দুজন শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের দশজন । উত্তরপূর্ব ভারতের রাজ্য আসামের পুলিশ বলছে গত ১২ ঘন্টায় সন্দেহভাজন বোড়ো জঙ্গীদের গুলিতে বাকসা আর কোকরাঝাড় জেলাগুলিতে অন্তত ১০জন নিহত হয়েছেন – যারা সকলেই মুসলমান। এদের মধ্যে দুটি শিশু আর ছয়জন মহিলা রয়েছেন। আহত হয়েছেন চারজন।

বোড়োল্যান্ড এলাকার পুলিশ আই জি এল আর বিশনোই বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, “কাল সন্ধ্যায় প্রথম ঘটনাটা বাকসা জেলার নরসিংগাঁওতে ঘটেছে। তিনজন মারা গেছেন আর তিনজন আহত হয়েছেন। এরপরে প্রায় মধ্যরাতে কোকড়াঝাড় জেলার বালাপাড়াতে দ্বিতীয় হামলা হয়, যাতে সাতজন মারা গেছেন।“ তিনি আরও জানিয়েছেন যে বোড়ো জঙ্গী গোষ্ঠী – ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট অফ বোড়োল্যান্ড বা এন ডি এফ বি-র সঙবিজিৎ গোষ্ঠীই এই হামলার জন্য দায়ী বলে পুলিশের সন্দেহ।

কোকড়াঝাড় জেলার তামুলপুরে এক বোড়ো যুবক আহত হয়েছেন, তবে এটা এখনও নিশ্চিত নয়, যে মুসলিমদের গ্রামগুলোর ওপরে হামলার প্রতিশোধ নিতেই ওই যুবকের ওপরে হামলা হয়েছে কী না। এছাড়াও কোকড়াঝাড় শহরের মধ্যেই রাতে এক স্থানীয় সাংবাদিককে পিস্তলের বাঁট দিয়ে মেরে আহত করেছে সন্দেহভাজন জঙ্গীরা। স্থানীয় সূত্রগুলি জানাচ্ছে হত্যার দুটি ঘটনাই প্রায় একই ভাবে ঘটানো হয়েছে। মুসলিমদের বাড়িগুলি ঘিরে ধরে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে।

কোকরাঝাড়ের যে বালাপাড়া গ্রামে সাতজন নিহত হয়েছেন, সেখানকার বাসিন্দা মুহম্মদ উকিল আলি টেলিফোনে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন বৃহস্পতিবার রাতে কী হয়েছিল। “ভোটের পর থেকেই সেনা আর পুলিশ গ্রামের ছেলেদের আটক করে হেনস্থা করছে। তাই রাতে যুবকরা কেউ বাড়িতে থাকে না, জঙ্গলে থাকে। কালও কেউ বাড়িতে ছিল না। বারোটার একটু আগে হঠাৎই বোড়ো জঙ্গীরা আক্রমণ করে। তিন চারটি বাড়ির দরজা লাথি মেরে ভেঙ্গে ফেলে আর গুলি চালাতে শুরু করে। বেশীরভাগই বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থাতেই মারা গেছেন – কেউ উঠতে পারেন নি। গুলি চালানোর পরে কোপানোও হয় দেহগুলির ওপরে,” বলছিলেন মি. আলি।

তিনি আরও জানান যে কাছেই একটা বিএসএফ ক্যাম্প আছে। সেখানকার রাত-পাহারাদার দল গ্রামে ঘুরছিল। কিন্তু তারা একদিক থেকে অন্যদিকে চলে যাওয়ার পরেই জঙ্গীরা আক্রমণ করে। একটা পরিবারে শুধু বছর পঁচিশেকের এক যুবক বেঁচে আছেন, বাকী সকলেই মারা গেছেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ময়না তদন্তের পরে দেহগুলি গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জানাজার পরে সেগুলি কবর দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। মুসলিম নেতারা বলছেন, ২৪শে এপ্রিল ওই এলাকায় লোকসভার ভোট নেওয়া হয়, আর তারপর থেকেই ভীতিপ্রদর্শন চলছিল। অ-বোড়ো সংগঠনগুলি এবারই প্রথম জোটবদ্ধ হয়ে একজন প্রাক্তন আলফা কমান্ডার হীরা শরণিয়াকে প্রার্থী হিসাবে দাঁড় করিয়েছিলেন।

“এবারের ভোটে যেহেতু অ-বোড়ো সংগঠনগুলো এক হয়ে একজন প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিলাম, তাই বোড়ো জঙ্গীরা বদলা নিল। ভোটের পর থেকেই গ্রামে গ্রামে সন্ত্রাস চালাচ্ছিল। আর কাল রাতে এই দুটো ঘটনা হয়ে গেল,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অল বোড়োল্যান্ড মুসলিম স্টুডেন্টস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রকিবুল ইসলাম।

বাংলাভাষী মুসলিমদের ছাত্রসংগঠন এবিএমএসইউ-র কোকড়াঝাড়ের জেলা সম্পাদক জায়দুল ইসলাম বলছিলেন, “স্থানীয় বোড়ো বিধায়ক প্রমীলা রাণী ব্রহ্মর এরকম একটা বিবৃতি ছাপা হয় বৃহস্পতিবার সকালেই। আর রাতেই এই আক্রমণ হয়।“

অন্যদিকে, বোড়ো ছাত্র ইউনিয়ন আবসুর প্রেসিডেন্ট প্রমোদ বোড়ো বলছিলেন, “নির্বাচন নিয়ে কিছু নেতা নেত্রী উস্কানি তো দিচ্ছেনই। সেটাও এই ঘটনার পেছনে একটা কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে অন্যদিকে আসাম সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারও দায় এড়াতে পারে না। বোড়োল্যান্ড এলাকা এতটাই উত্তেজনা প্রবণ – সেখানে কেন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক খবর জোগাড় করতে পারছে না যে আক্রমণ হতে পারে? কেন নিরাপত্তা দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে না?”

তবে আসাম পুলিশের মহানির্দেশক খগেন শর্মা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে এনডিএফবি-র সঙবিজিৎ গোষ্ঠীর এই আক্রমণ আসলে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মি. শর্মার কথায়, “গত দু-তিন মাসে ওই গোষ্ঠীর যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে – ১৮জন মারা গেছেন, ৪০-এরও বেশী জঙ্গী আত্মসমর্পণ করেছেন। ওদের অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সেনা বা পুলিশবাহিনীর ওপরে আক্রমণ করা কঠিন। অন্য জঙ্গীগোষ্ঠীগুলিকে আক্রমণ করলে তারা পাল্টা আঘাত হানবে। তাই সবথেকে সুবিধাজনক টার্গেট নিরীহ পরিবারগুলো। রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র মানুষের ওপরে হামলা করে জানান দিতে চাইল যে তারা এখনও অভিযান করার ক্ষমতা রাখে।“ বোড়োল্যান্ড স্বশাসিত এলাকায় ৭০% মানুষই অবোড়ো – যাঁদের একটা বড় অংশ বাংলাভাষী মুসলমান।

বোড়োল্যান্ড এলাকার জেলাগুলিতে ২০১২ সাল থেকেই বোড়ো আর মুসলিমদের মধ্যে জাতি দাঙ্গা চলেছে – যাতে একশোরও বেশি মানুষ মারা গেছেন আর গৃহহীন হয়েছেন কয়েক লক্ষ মানুষ। বোড়ো সংগঠনগুলির অভিযোগ, তাঁদের জমি, জঙ্গল দখল করে নিচ্ছে বাংলাদেশ থেকে আগত অনুপ্রবেশকারীরা। আর বাংলাভাষী মুসলমানদের কথায়, তাঁদের পূর্বপুরুষরা বহু দশক আগে থেকেই আসামে চলে এসেছিলেন কৃষিকাজ করতে।

ত্রাণ শিবির থেকে অনেকে সাহস করে গ্রামে ফিরে যেতে পারলেও এখনও বহু মানুষ অন্য এলাকায় বসবাস করছেন। ২০১২-র দাঙ্গার পরে সেনাবাহিনী ও আসাম পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে বে-আইনী অস্ত্র উদ্ধার করতে শুরু করেছিল। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন যে বেশীরভাগ বে-আইনী অস্ত্রই ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে মুসলিম সংগঠনগুলির অভিযোগ, যেসব জঙ্গীগোষ্ঠী আত্মসমর্পণ করেছে অথবা সরকারের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গেছে, তাদের অস্ত্রভান্ডার সরকারের কাছে জমা দেয় নি। যৌথ অভিযানের পরেও অনেক অস্ত্র রয়ে গেছে আর সেই সব অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়েই হামলা হচ্ছে মুসলিমদের ওপরে। সূত্র: বিবিসি।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মুসলিম সম্প্রদায় নির্মম নির্যাতনের শিকার

307334_345929635520832_227022273_n

পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মম নির্যাতনের শিকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানরা ঢাকায় এসে বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় আশ্রয় নিয়েও রেহাই পাচ্ছেন না। পুলিশ ও র্যাবে নিয়োজিত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের পাশাপাশি থানায় সোপর্দ করছে। পার্বত্যাঞ্চলের খ্রিস্টান মিশনারিদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সে হানা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে থাকা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওইসব সদস্য। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর বাসাবো এলাকার একটি মাদরাসায় হানা দিয়ে পুলিশ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৫ মুসলিম এবং তাদের ১১ সন্তানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। একই মাদরাসায় অধ্যয়নরত আরও ৫ জনকেও আটক করে তেজগাঁও থানা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে সোপর্দ করা হয়। এর আগে গত জুলাই মাসে গাজীপুরের একটি মাদরাসা থেকে ৮ জন ও ঢাকার অপর একটি মাদরাসা থেকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৩ মুসলিম ছাত্রকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে পুলিশ। আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
বর্বর নির্যাতনের শিকার এসব মুসলিম আমার দেশ-কে জানান, পাহাড়ে থাকলে শান্তি কমিটির অত্যাচার আর নির্যাতন। ঢাকায় এসেও আশ্রয় পাচ্ছি না। কোনো মসজিদ কিংবা মাদরাসায় আশ্রয় নিলেও ভাগ্যে জোটে পুলিশ ও র্যাবের নির্যাতন। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমাদের কি বাঁচার অধিকারটুকুও নেই? ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর মিরপুরের একটি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালক আক্ষেপ করে আমার দেশ-কে বলেন, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার সদস্য খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে। অথচ উপজাতীয়দের মধ্যে কেউ নিজ উপলব্ধি থেকে মুসলমান হলেই তার আর রক্ষা নেই। এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১ জানুয়ারি রাঙামাটির সাংড়াছড়ি এলাকার মো. করিম হোসেন (আগের নাম হামাজং ত্রিপুরা), মো. নূর ইসলাম (আগের নাম সুবামং ত্রিপুরা), মো. সোহেল (আগের নাম বিন্দুলাল চাকমা)সহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ৫ মুসলমান তাদের ১১ সন্তানকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি মাদরাসায় ভর্তি করাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। ঢাকায় আগে থেকে পড়ালেখা করে এমন ৫ মুসলিম ছাত্রছাত্রীও তাদের সঙ্গে ছিলেন। পরদিন ২ জানুয়ারি ভোরে তারা ঢাকায় পৌঁছে বাসাবো আবুজর গিফারী কমপ্লেক্সে পৌঁছেন। কিছুক্ষণ পরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে অভিভাবকসহ সব ছাত্রকে আটক করে নিয়ে আসে। পরে অবশ্য পুলিশ নতুন ভর্তি হওয়া ১১ ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের ছেড়ে দেয়। অবশিষ্ট ৫ ছাত্রছাত্রীকে অভিভাবক সঙ্গে না থাকার কারণ দেখিয়ে সবুজবাগ থানা কর্তৃপক্ষ ঢাকার আদালতে সোপর্দ করে। আদালত তাদের তেজগাঁও থানাধীন ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে হস্তান্তর করে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের কাছে তাদের হস্তান্তর করার নির্দেশ দেয় আদালত। এ বিষয়ে সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. বাবুল মিয়া আমার দেশ-কে বলেন, আমরা একটি তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করেছিলাম। তাদের সঙ্গে থাকা ৫ অভিভাবকের মুসলমান হওয়ার এফিডেভিটসহ যাবতীয় কাগজপত্র ছিল। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১১ ছাত্রছাত্রীসহ তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৫ ছাত্রছাত্রীর মা-বাবা সঙ্গে ছিল না বিধায় তাদের বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
এদিকে তেজগাঁও থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের ৫ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ২ জনকে ওইদিনই গাজীপুর শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল তাদের মা-বাবা তেজগাঁও থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে এসে দিনভর অপেক্ষা করেন। এফিডেভিটসহ মুসলমান হওয়ার সব কাগজপত্র পুলিশকে দেখানোর পরও পুলিশ তাদের সন্তানদের মুক্তি দেয়নি। খাওয়া-খাদ্য ভুলে সারাদিন তারা তেজগাঁও থানা চত্বরে কাটিয়ে দেয় প্রাণপ্রিয় সন্তানদের মুক্তির অপেক্ষায়।
এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকায় ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি উদয় ত্রিপুরাসহ ১০-১২ জন উপজাতীয় তরুণ ভিকটিম সেন্টারে এসে ভিড় করে। তারা থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে দেনদরবার করে। শেষপর্যন্ত পুলিশ এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের কারও কাছেই হস্তান্তর না করে আজ (মঙ্গলবার) উভয় পক্ষকে আসতে বলে। এ বিষয়ে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (তদন্ত) মেরিন সুলতানা আমার দেশ-কে বলেন, গত ৩ জানুয়ারি সবুজবাগ থানা পুলিশ অভিভাবকহীন এই ৫ শিশুকে আমাদের কাছে রেখে যায়। এখান থেকে ২ জনকে সবুজবাগ থানায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সেন্টারের সহকারী পুলিশ কমিশনার রওনক আমার দেশ-কে বলেন, আমাদের আশ্রয় সেন্টারে থাকা ৩ জনের মধ্যে ১২ বছরের রবিউল ইসলাম ও ৯ বছরের মতিউল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়েছে। রবিউল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে বলে আমাকে জানিয়েছে। সে আরবি ভাষা শিখেছে।
গতকাল বিকালে মতিউল ইসলামের মা রংবেতির সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি (অন্যের সহযোগিতা নিয়ে) আমার দেশ-কে জানান, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে ঢাকায় মাদরাসায় পড়ালেখা করছে। পুলিশ কী কারণে তাদের আটক করেছে জানি না। পাড়ার একজন মুরব্বি আমাদের খবর দিলে আমরা ঢাকায় আসি। ছেলেমেয়ের আটকের খবর শোনার পর থেকেই খাওয়া ও ঘুম নেই। ঢাকায় এসেও আমাদের আদরের সন্তানদের মুখ দেখার সুযোগ পাইনি। এ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রংবেতি। কথা বলার একপর্যায়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর যুবকরা অভিভাবকদের আশ্রয় দেয়ার কথা বলে দ্রুত থানা এলাকা ত্যাগ করে। ভিকটিম সেন্টারে আটক এসব ছাত্রছাত্রীকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য একটি ক্যাথলিক চার্চ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার দেশ-কে বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানদের হয়রানি নির্যাতনের ঘটনা এখন প্রতিনিয়তই ঘটছে। তারা ঢাকায় এলেই অদৃশ্য কারণে পুলিশ প্রতিবারই তাদের গ্রেফতার করে। এর আগেও একই এলাকার জুতিরাং ত্রিপুরা ওরফে জালাল ত্রিপুরা তার সন্তান ও ছোট ভাইকে মাদরাসায় ভর্তি করাতে ঢাকায় এসে বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই একজন চাকমা কমান্ডারের নেতৃত্বে র্যাবের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। তাকে বেদম প্রহার করে সারা শরীর রক্তাক্ত করে ফেলে। তাদের ছাড়িয়ে আনতে গেলে মিরপুরের সংশ্লিষ্ট মাদরাসার ২ শিক্ষককেও সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে গত জুলাই মাসে ১১ শিক্ষার্থীকে পুলিশ আটক করে। গাজীপুর মিয়াপাড়ার দারুল হুদা ইসলামীয়া মাদরাসায় অধ্যয়নরত ৮ শিক্ষার্থীকে একটি খ্রিস্টান মিশনারির ইন্ধনে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঢাকায় আশ্রয় নেয়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একজন মুসলমান আমার দেশ-কে জানান, ‘আমি রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া এলাকার দুমদুমিয়া গ্রামের বাসিন্দা। আমাদের এলাকায় কোনো স্কুল কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। কেবল খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি মিশনারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। বাধ্য হয়েই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এসব মুসলমান শিক্ষার্থীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। রাঙামাটি শহর থেকে আমাদের গ্রামে যেতে হয় কখনও হেঁটে, কখনও ইঞ্জিনচালিত নৌকায়। শুকনো মৌসুমে যেতে প্রায় তিনদিন এবং বর্ষাকালে দু’দিন লাগে।’ তিনি বলেন, ‘দুমদুমিয়া গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের উপরে বিজিবির একটি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পে লাকড়ি সাপ্লাইয়ের কাজ করতাম আমি। বিজিবি সদস্যদের আজানের সুমধুর আওয়াজ এবং সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া দেখে তার মনে পরিবর্তন আসে। প্রায়ই আজানের জন্য অপেক্ষা করতাম এবং নামাজরত ব্যক্তিদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। স্ত্রীকে বিষয়টি জানালে সেও একই অনুভূতি প্রকাশ করে। পরে পুরো বিষয়টি গ্রামের সবার সঙ্গে আলাপ করলে তারাও মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন।
তিনি বলেন, ২০০৮ সাল থেকে দু’বছরেরও বেশি সময় তারা মুসলমান হওয়ার জন্য বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করে ব্যর্থ হন। কাপ্তাই উপজেলার তত্কালীন ইউএনওর কাছে বিষয়টি জানালে তিনি তাদের রুম থেকে বের করে দেন। ২০১০ সালে রাঙামাটি শহরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জানতে পারি। কোনো ধরনের পূর্বযোগাযোগ ছাড়াই নারী-পুরুষ মিলে প্রায় ১৫-১৬ জনের একটি দল তাদের পোষা শূকর এবং ছাগল বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে রাঙামাটির উদ্দেশে রওনা দেন। শুকনো মৌসুম থাকায় কখনও হেঁটে, কখনও বোটে চড়ে প্রায় তিনদিন পর তারা রাঙামাটি এসে পৌঁছান। শহরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাত্ করার পর তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি যদিও ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য করা হয়েছে, তবু এখানে মানুষকে মুসলমান করার কোনো কার্যক্রম নেই। তবে ঢাকায় আবুজর গিফারী ট্রাস্টসহ আরও কিছু সরকার অনুমোদিত সংস্থা রয়েছে, যারা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ইসলামিক রীতিনীতি শেখাতে সহযোগিতা করে। তবে আগে এফিডেভিট করে মুসলমান না হলে ওই ট্রাস্টও সহযোগিতা করে না। ফলে তারা নিজ উদ্যোগে এফিডেভিট করে মুসলমান হয়ে পরে ঢাকায় গিয়ে নামাজ-রোজাসহ ইসলামের কিছু রীতিনীতি শিখে আসেন। পরে তাদের অনুসরণ করে ওই গ্রামের হেডম্যানসহ সব লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ক্রমান্বয়ে পার্শ্ববর্তী সাংগ্রছড়ি গ্রামের লোকজনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করেন।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এসব মুসলমানের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি সেন্টারের পরিচালক আমার দেশ-কে জানান, পার্বত্য এলাকায় একসময় সবাই বৌদ্ধধর্মের অনুসারী ছিলেন। খ্রিস্টান মিশনারিরা বিভিন্ন লোভ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের অধিকাংশকেই খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছে। মন ও প্রাণের টানে অথবা মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে তাদের মধ্যে কেউ মুসলমান হলে তার আর রক্ষা নেই। নিজ বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পাশাপাশি তাদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়। ঢাকায় এসে আশ্রয় নিলেও তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। ভিকটিম সেন্টারে আটক ছাত্রছাত্রীদের অবিলম্বে তাদের মা-বাবার হাতে তুলে দেয়ার জন্য তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, তাদের খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দিলে এটা হবে ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে বড় অবমাননা। এটা মুসলমানরা সহ্য করবে না।

  সৌজন্যে: দৈনিক আমার দেশ৤

আরও খবর পড়ুন

হিন্দু থেকে মুসলিম হলেন একই পরিবারের ৫ জন

নায়িকা শাবনাজের বদলে যাওয়ার গল্প

উপজাতীয় নওমুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান মিশনারীদের দৌরাত্ম

মুসলিম হচ্ছেন বলিউডের সেক্স সিম্বল নায়িকা মমতা কুলকার্নি

আমি আল্লাহর কাছে তওবা করেছি আর ওড়না খুলবো না- ভীনা মালিক(ভিডিওসহ)

ইসলামকে জানার চেষ্টায় আমার চোখ খুলে গেল- মার্কিন সঙ্গীত শিল্পী জেনিফার(ভিডিওসহ)

চলচ্চিত্রে নিজের অভিনীত চরিত্র দেখলে এখন নিজেই বিব্রত হন শাবানা

খাগড়াছড়িতে অর্ধসমাপ্ত মসজিদ নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিলেন জেলা আনসার ভিডিপি কর্মকর্তা

বান্দরবানের পাহাড়ে চলবে ট্রেন