image_pdfimage_print

রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

মেহেদী-হাসান-পলাশ1

মেহেদী হাসান পলাশ :

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য শাখের করাত। তিন দিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য শ্বাস নেবার মুক্ত জানালা দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ২৭২ কি.মি. মিয়ানমার সীমান্ত। ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসী নীতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদী নীতির তুফানে বাংলাদেশের ‘খড় কুটো’ এই সীমান্ত তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এড়িয়ে স্থলপথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগেরও একমাত্র বিকল্প এই সীমান্ত। অন্যদিকে মিয়ানমারের জন্যও ভারতের মূল ভূখ- হয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার স্থল যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম বাংলাদেশ।

এই যখন অবস্থা তখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক মধুরেনু হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা দাবা খেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে কখনো বসন্ত বাতাসের হিল্লোল পরিলক্ষিত হয়নি। বরং পৌষী-শীতলতা এবং থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝঞ্ঝা পরিলক্ষিত হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিকভাবে বললে বলতে হয়, এর জন্য বহুলাংশে মিয়ানমারের জাতীয় নীতিই দায়ী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির প্রধান কাঁটার নাম ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’। এটা এমন এক সমস্যা যা বাংলাদেশকে গিলতেও বাধছে, উগড়াতেও।

জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিবেশী দেশের লাখ লাখ শরণার্থী গ্রহণ সম্ভব নয় এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি পূর্ণ একটি দেশে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর অবস্থানের মতো ভূমির অভাব প্রকট। তাছাড়া ইতোপূর্বে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। অফিসিয়ালি যাই বলা হোক, নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন কখনো বন্ধ হয়নি। যখন ব্যাপকভাবে এসেছে কেবল তখনই গণমাধ্যমে ব্যাপক  ভাবে আলোচিত হয়েছে।

এর বাইরে প্রতিনিয়ত দুই চার পাঁচ জন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে সব সময়। এদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গার শরণার্থী ক্যাম্পে ঠাঁই মিললেও বাকিরা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে আবার বিভিন্ন সূত্রে সরাসরি সমাজে মিশে গেছে। যারা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে তারাও ধীরে ধীরে ক্যাম্প থেকে সরে সমতলে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের মধ্যে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেয়া আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কাজের সন্ধানে সমতলে এসে মূল স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন ও মূল স্রোত ধারায় মিশে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের প্রবল বিরোধিতা রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ, যত্রতত্র রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং বিশেষ করে টেকনাফের সৌন্দর্য হারিয়ে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশী টাকার মান বেশী হওয়ায় রোহিঙ্গারা কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি হওয়ায় স্থানীয় বাঙালি শ্রমিকেরা বেকারে পরিণত হচ্ছে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা অল্প মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ায় বাঙালি শ্রমিকদের কাজে নিতে চান না। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গা পিতামাতা তাদের কন্যাদের যে কোনোভাবে বাঙালি পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হওয়ায় অনেক ঘরে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের প্রবেশ ঘটছে যা সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে এটা লক্ষ্য করা যায়। এতে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের একাংশ মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশী শ্রম মার্কেট ভাগ বসাচ্ছে। এ ধরনের নানা কারণে স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তারপরও রোহিঙ্গাদের এই চরম দুর্দিনে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব ‘দরোজা বন্ধ করে’ বা ‘মুখ ফিরিয়ে থাকা’? কিংবা মুখ ফিরিয়ে থাকলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? বাংলাদেশ তো চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুর্গম সীমান্ত, দুর্বল নিরাপত্তা প্রহরা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অসহায় রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সংবাদপত্রের খবর, যতটা না গোপনে এসেছে, তার চেয়ে বেশী এসেছে স্থানীয় দালাল ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘুষ দিয়ে। সামাজিক গণমাধ্যমে এসব ঘুষ প্রদানের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। সামনে আরো আসবে তার আলামতও স্পষ্ট।

তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হলে চলবে না। কারণ এর সাথে বাংলাদেশের সুনামের প্রশ্ন জড়িত। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার হয়। দালালদের হাতে পড়ে শিশুরা পাচার হয়। কাজের লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গা নারীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক অভিভাবক ভবিষ্যতের শঙ্কা কাটাতে স্থানীয় বৃদ্ধদের সাথেও কিশোরীদের বিবাহ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয় না। রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা যেন কোনোভাবেই নির্যাতনের শিকার না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।

আরাকান শব্দটি এসেছে আরবী আল রুকুন শব্দ থেকে। তবে পি ফ্যায়রের মতে, প্রাচীন রাখাইং গোত্রের নামানুসারে এর নাম হয়েছে আরাকান। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের শেষ রাজধানী ছিল ম্রোহাং। ম্রোহাংকে বাংলা কবিরা রোসাঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। এই রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। আরাকানে রোহিঙ্গাদের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীনকালে আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। এর আয়তন ছিল ২০ হাজার কি.মি.। তবে বর্তমানে এর আয়তন ১৪ হাজার বর্গ কি.মি.।

প্রাচীনকালেই আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। তখন আগমন ঘটেছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে, কিছু জলদস্যু আক্রমণের শিকার হয়ে ও জাহাজ ডুবির শিকার হয়ে। পরবর্তীকালে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে বিপুল পরিমাণ মুসলিম আরাকানে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি গড়ে।

পঞ্চদশ শতাব্দী আরাকানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শতাব্দীর শুরুতে আরাকান রাজ মিন সাউ মুন বার্মার উপর আক্রমণ পরিচালনা করে ব্যর্থ হন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মা রাজ তার রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাকে বহিষ্কার করলে তিনি বঙ্গদেশে চলে আসেন। বঙ্গরাজার সহায়তায় ১৪৩০ সালে রাজা মিন সাউ মুন কয়েক হাজার মুসলিম সৈন্যের সহায়তায় পুনরায় আরাকান গমন করেন এবং যুদ্ধে বার্মারাজকে পরাজিত করে পুনরায় রাজ্য উদ্ধার করেন। এ সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে রাজা সুলাইমান শাহ নাম ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেন। এ সময় আরাকান অনেকাংশে বঙ্গরাজের সালতানাতের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

আরাকান রাজসভায় মুসলিম আমাত্যরা উচ্চপদ লাভ করেন। এদের একজন মাগন ঠাকুর। তার পিতা বড় ঠাকুর আল্লাহর কাছে অনেক মানত করে পুত্র লাভ করেন। তাই তার নাম মাগন রাখা হয়। মাগন ঠাকুর ইসলামের প্রথম খালিফা আবু বকরের (রা.) বংশধর। তার মন্ত্রিসভা অনেক বাঙালি কবি ও গুণী ব্যক্তি অলঙ্কৃত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মহাকবি আলাওল। মাগন ঠাকুরের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। পদ্মাবতী, সতী ময়না লোর চন্দ্রানী, সিকান্দার নামা, সায়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, তোহফা, হপ্ত পয়কর প্রভৃতি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো এ সময় রচিত হয়।

১৭৮৫ সালে বর্মী রাজ বদা উপ্যা আরাকান দখল করে পুনরায় বার্মার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সরকার আরাকানের জমিগুলো চাষযোগ্য করতে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বহু লোক আরাকানে নিয়ে যায়। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, মায়ানমারের মিনবিয়া এবং ম্রোক-ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থীরা প্রায় ৫,০০০ মুসলমানকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। জাপানীদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থী অস্ত্রধারী মুসলমানদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল। জাপানীরা হাজার হাজার রোহিঙ্গারে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল।

এই সময়ে প্রায় ২২,০০০ রোহিঙ্গা সংঘর্ষ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। জাপানী এবং বর্মীদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।

ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে যখন আদমশুমারি হয় তখন ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদের গণনা করেনি। রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু সেখান থেকে। স্বাধীনতার পর মিয়ানমার সরকার জাতীয়তার তিন স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করায়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে জানা গেছে জাতীয়, সহযোগী ও আনুগত্যশীল -এই তিন প্রকারের নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস ঘোষণা করা হয়। যারা ব্রিটিশ শাসনের আগে এসেছে তাদের জাতীয় নাগরিক বলা হয়।

স্বাধীনতার পর সহযোগী ও আনুগত্যশীল নাগরিকদের আবেদন করতে বলা হলে রোহিঙ্গারা তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ তারা আগে থেকেই সেখানে আছে। এই গণনার পরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে স্ট্যাটাসহীন হয়ে পড়ে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তার বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়।

বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।

১৯৭৮ সালে পরিচালিত কিং ড্রাগন অপারেশনে ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এদের মধ্যে ৩ লাখ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশে ফিরে যায়, ২ লাখ সৌদী আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে চলে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে।

এদের মধ্যে ২ লাখ রোহিঙ্গা দেশে ফিরে গেলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিতদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে এমন অভিযোগে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে যায়। তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় দুইটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবী।

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে মংডুর বেশ কয়েকটি বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা হামলা করে ৯ বিজিপি সদস্যকে খুন, ৬৪ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায়। মিয়ানমার সরকার এই হামলার জন্য রোহিঙ্গাভিত্তিক স্বাধীনতাকামী সংগঠন আরএসওকে দায়ী করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা শুরু করে। হেলিকপ্টার গানশিপ, মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলায় ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

এ ছাড়াও ১২ শত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। শিশু ও নারীদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। মিয়ানমারের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এই হামলার খবর শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্ন তথ্য উপত্তের মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে তাদের মতে, এটা রোহিঙ্গাদের জাতিগত দাঙ্গা।

এদিকে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী সু চি এই হামলায় একেবারে নীরবতা পালন করায় বহির্বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে ব্যাপকভাবে। আসলে গণতন্ত্র আসলেও মিয়ানমার সরকার এখনো ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনাবাহিনীর লে. জে. পদমর্যাদার একজন অফিসার। সেনাবাহিনী সুকৌশলে সু চির আন্তর্জাতিক শান্তিবাদী ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করে দিচ্ছে এটা তিনি বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না।

মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা গণহত্যায় আন্তর্জাতিক বিশ্ব রহস্যময় ও বেদনাদায়ক নীরবতা পালন করছে। জাতিসংঘসহ কোনো কোনো সংস্থা মুখ খুললেও যতটা কঠোর হলে মিয়ানমারকে এই হামলা বন্ধে বাধ্য করা যেত তা তারা করছে না।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারি গ্রসম্যান আমাকে মিয়ানমার সমস্যা ব্রিটিশের সৃষ্টি বলে দায়ী করে তা বন্ধে তিনটি উপায়ের কথা বলেন। তার মতে, এই মানবিক বিপর্যয় কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তিনটি উপায় অবলম্বন করতে হবে। ১. রোহিঙ্গা সমস্যাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইউরাথু ভিক্ষু ও তার ৯৬৯ আন্দোলনকে টেরোরিস্ট ঘোষণা করতে হবে এবং ৩. মিয়ানমারের থেকে সকল প্রকার সহায়তা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি, আরবলীগসহ প্রভাবশালী মুসলিম দেশ ও সংস্থা সমূহের নীরবতা নীল কষ্টের মতো মেনে নেয়া যায় না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বাংলাদেশ চাইলেই রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না। রোহিঙ্গারা আসছে, অথচ বাংলাদেশ অফিসিয়ালি তা অস্বীকার করে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবী করার সুযোগ হারাচ্ছে। শরণার্থীদের প্রতিপালনে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। কাজেই অবলিম্বে সরকারীভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমণের সত্যতা স্বীকার করে সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে।

রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের জন্য যতই দুর্ভার হোক মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের সাগরে ঠেলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ বারবার ঘোষণা করেছে, এ দেশের মাটিতে প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসীদের কোনো প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কিন্তু রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী নয়, মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশই পারে স্বল্প সময়ের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।

সিরীয় শরণার্থীরা যখন ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল তখন আমরা ইইউ রাষ্ট্রগুলোর মানবিকতা প্রদর্শন প্রত্যাশা করেছি। আজ রোহিঙ্গাদের সাথে কেন আমরা একই মানবিকতা প্রদর্শন করবো না? বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেদিন ভারত আশ্রয় না দিলে বাংলাদেশীদের পরিণতি কি হতো তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের এই এক কোটি শরণার্থীই সেদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বিশ্বমঞ্চে কথা বলা সুযোগ করে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনা চাইলেই, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভার হয়ে বসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রসঙ্গ টেনে ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলতে পারেন। এই শরণার্থীদের প্রতিপালনে ও ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে পারেন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। এতে বিশ্বনেত্রী হিসাবে তার ভাবমর্যাদা ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি পারেন না মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজের ও দেশের জন্য গৌরবের সেই মহান উপলক্ষ হতে?
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

বিজিপি ফাঁড়িতে হামলা: নিহত ১৬

বিজিপি

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের মংডুতে অজ্ঞাতনামা গোষ্ঠির হামলায় মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ বিজিপির অন্তত ৯ জন সদস্য এবং ৭ জন হামলাকারী নিহত হবার পর টেকনাফে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা নেয়া হয়েছে।- বিবিসি।

মিয়ানমারের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলছেন, রোববার ভোররাতে রাখাইন প্রদেশের মংডুতে বর্ডার গার্ড পুলিশের তিনটি পোস্টে হামলা চালায়।

টেকনাফে বিজিবির কমান্ডিং অফিসার লেফট্যানেন্ট কর্নেল আবু জর আল জাহিদ জানিয়েছেন, রাতে গোলাগুলির শব্দ শোনার পর তারা দোভাষীর মাধ্যমে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী থেকেও তাদের জানানো হয়েছে যে তাদের কিছু আউটপোস্টে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে এবং সন্ত্রাসীরা যাতে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

স্থানীয় কিছু সূত্র বিবিসির বার্মিজ সার্ভিসকে বলেছে, এই হামলার সাথে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও জড়িত রয়েছে। তবে মিয়ানমার সরকার থেকে এটি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

তবে বাংলাদেশের একটি নিরাপত্তা সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্যনিউজকে বলেন, বর্তমানে আরএসও’র যে সামরিক শক্তি রয়েছে তাতে একসাথে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর এতোগুলো ক্যাম্পে হামলার সক্ষমতা রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সূত্রের কাছে প্রাপ্ত তথ্য মতে, নাসাকা বাহিনী ভেঙে মিয়ানমার বিজিপি গঠন করে। এসময় নাসাকার সদস্যরা বিজিপিতে যোগ দিলেও সব নাসাকা সদস্য বিজিপিতে যোগ দিতে পারেনি। এই যোগ দিতে না পারা নাসাকা সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ রয়েছে। এই বিক্ষুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট নাসাকা সদস্যরা এ হামলা চালাতে পারে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেও জানায় এই সূত্রটি।

সীমান্তের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সশস্ত্র হামলার পরপরই মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় জরুরী অবস্থা জারী করা হয়েছে। চলানো হচ্ছে ব্যাপক ধরপাকড়। শুরু হয়েছে রাখাইন এলাকায় দফায় দফায় দাঙ্গা হাঙ্গামা। বহু লোক নিহত হয়েছে বলে অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে।

সর্বশেষ খবরে জানা যায়, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের ৪৮ কিলোমিটার জুড়ে মায়ানমারের সেনাবাহিনী মোতায়েন সহ টহল দিচ্ছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বিজিবি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ সহ বাড়তি নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত সতর্কাবস্থা জারি করেছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকায় অবস্থান করে আরএসও তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করে মিয়ানমার।

এর আগে এবছরের মে মাসে টেকনাফের একটি আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা এবং ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি লুটের ঘটনায়ও আরএসও জড়িত ছিল বলে বাংলাদেশের পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

বিজিবি ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করছে

bgb camp 3

মেহেদী হাসান পলাশ:

ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে নতুন বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট(বিওপি) নির্মাণ করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)। বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব সুসম্পর্কের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত এবং ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত ৬ টি বিওপি নির্মাণে ভারতের ভুমি ও সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিজিবির পুণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় এ নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। একই রূপরেখার আওতায় বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিওনের আওতায় দুইটি নতুন সেক্টর ও ৫ ব্যাটালিয়ান স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন করে ১০৪টি বিওপির মধ্যে ৫২টি বিওপি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্তের ২১৫ কি.মি. সীমান্ত সুরক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। শুরু হয়েছে বিজিবির এয়ার উইং। এর ফলে দূর্গম ও অরক্ষিত সীমান্তের অপরাধ এখন আগের থেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে বলে বিজিবি সূত্রের দাবী।

জানা গেছে, সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি বাংলাদেশের ৪,৪২৭ কিঃ মিঃ সীমানা দিবা-নিশি প্রহরার মাধ্যমে নিশ্চিত করছে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। ২০০৯ পিলখানার ভয়াবহ বিপর্যয়ের দুঃসহ স্মৃতি পেরিয়ে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখে বিজিবির সদর দপ্তর পিলখানায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিজিবি’র পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় বিজিবি’র নব অভিযাত্রা। সে সাথে শুরু হয় এ বাহিনী ঢেলে সাজানোর মহাযজ্ঞ। এর অংশ হিসাবে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে শুরু হয় বিজিবি’র ৪ টি রিজিয়ন এর আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড। এসময় খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, গুইমারা, বান্দরবান ও কক্সবাজার সেক্টর ও এর অধীনস্থ ইউনিটগুলো নিয়ে দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন সদর দপ্তর চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

bgb camp 1

দূর্গম পাহাড় ও অনিষ্পন্ন সীমান্তের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিওনের আওতাধীন ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি সীমান্ত অরক্ষিত ছিলো। ফলে অরক্ষিত এই সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, মানব ও মাদক পাচার, অপহরণ, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর স্বর্গরাজ্য ছিলো অরক্ষিত সীমান্ত। এ সকল অপরাধ দমনে বাংলাদেশ ও সীমান্ত সংলগ্ন অন্যান্য দেশগুলোরও দাবী ছিলো বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষিত করা।

সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিজিবি পূণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন, চট্টগ্রাম এর দায়িত্বপূর্ণ পাহাড় ও নদী বেষ্টিত ৮১০ কিঃ মিঃ সীমান্ত এলাকায় অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্ত এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু তদারকির লক্ষ্যে বর্তমান সীমান্ত চৌকির অতিরিক্ত সর্বমোট ১০৪টি নতুন বিওপি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

বিজিবি সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় সর্বমোট ৫২টি বিওপি’র নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২৯ টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ২৮১ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ১৩০ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ – মিয়ানমার সীমান্তে ২৩টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ১৯৮   কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ৮৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সর্বমোট ৪৭৯ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ২১৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষাসহ বিজিবি’র নজরদারী ও আধিপত্য বিস্তারের আওতায় আনা হয়েছে।

তবে বিজিবির এই নবযাত্রা কুসুমাস্তৃর্ণ ছিলো না। পদে পদে তাকে নানা প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে এগুতে হয়েছে। সূত্র মতে, পাহাড়ি এলাকায় বিওপি নির্মাণের জন্য সরকার কর্তৃক ৫ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিমালা রয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের বেশির ভাগ এলাকাই পাহাড়ি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ৫ একর জমিতে বিওপি স্থাপন করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কারণ পাহাড়ি ঢাল ও ভূমি বিন্যাসের ভিন্নতার কারণে জরুরী স্থাপনা সমূহও নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে সাধারণ জনগণ তাদের জমি অধিগ্রহণের জন্য বিজিবিকে হস্তান্তর করতে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। বিশেষ করে বিজিবির এই অগ্রসর ভূমিকার কারণে যেসমস্ত সীমান্ত অপরাধীদের তৎপরতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে তারা বিজিবি সম্প্রসারণের পথে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। অস্ত্রের মুখে, হুমকি, ধামকি দিয়ে সাধারণ পাহাড়ীদের বাধ্য করেছে বিজিবিরি প্রতিপক্ষ হতে।

ফলে এখনো খাগড়াছড়ি ও রাংগামাটি জেলার অনেক অবস্থানে বিওপি নির্মাণের জন্য বিজিবি কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়নি। ভূমি বিরোধের কারণে এখন পর্যন্ত বাঘাইছড়িতে অবস্থিত ৫৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপন করা সম্ভবপর হয়নি। এছাড়াও আলীকদমে ৫৭ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন তাদের ব্যাটালিয়ন সদর নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অথচ দেখা গেছে, দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিওপি স্থাপিত হলে নিকটস্থ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দারুণভাবে উপকৃত হয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, খাগড়াছড়িস্থ উত্তর লক্কাছড়া বিওপি সংলগ্ন উপজাতীয় পাড়ায় ডায়রিয়ার প্রকোপে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করলে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিওপিতে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। হেলিকপ্টার যোগে ক্যাম্পে জরুরী ঔষধ ও চিকিৎসক প্রেরণ করা হয়। বিজিবি’র সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে রুগীদের শুশ্রষা করে এবং এলাকাবাসীকে এক ভয়াবহ মহামারী থেকে উদ্ধার সম্ভব হয়।

সূত্রে জানা গেছে, বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত অধিকাংশ অবস্থানই দূর্গম পার্বত্য এলাকায় হওয়ায় অরক্ষিত সীমান্তে কিছু কিছু স্থানে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমি ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করা অত্যন্ত দুষ্কর। হেলিকপ্টার সহায়তা ব্যতীত সেসকল অবস্থানে নির্মাণ সামগ্রী কিংবা প্রাত্যহিক রশদ সামগ্রী প্রেরণ কষ্টকর।

অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্তে বিজিবি’র আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্মূলের অংশ হিসেবে বিজিবি কর্তৃক ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে দূর্গম পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় নতুন বিওপি স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়; যা যুগোপযোগী ও আধুনিক চিন্তা চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। বিজিবি’র অনুরোধে সরকার কর্তৃক প্রেরিত প্রস্তাবে ভারত সরকার উক্ত পরিকল্পনায় সম্মতি প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় দূর্গম পার্বত্য এলাকার অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার জন্য ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং ভারত দু‘দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গত ৬-৭ জুন ২০১৫ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় “নতুন প্রজন্ম নয়া দিশা” নামে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

bgb camp 2

ইতিমধ্যে ৬টি নতুন বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। অতিশীঘ্রই উক্ত বিওপি সমূহ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে। বিওপিগুলো হচ্ছে, খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় লাক্কাছড়া বিওপি, দিপুছড়ি বিওপি ও ডুপশিল বিওপি এবং রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাস্থ ৫৪ বিজিবি ব্যাটালিয়েনের আওতায় কাসালং-১ বিওপি, কাসালং-২ বিওপি এবং সাজচিলুই বিওপি।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে বিজিবি’র দুটি রেকিদল নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়, পরিবহন ও নির্মাণ কাজের প্রস্তুতির নিমিত্তে বাংলাদেশ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অংশে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

বিজিবির এই অগ্রসর অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্তে বিশেষ করে খাগড়াছড়ি সীমান্তের বিপরীতে যে সকল অংশে বিভিন্ন ভারতীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অরক্ষিত সীমান্তের সুযোগ নিতো, বর্তমানে ঐ সকল সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন বিওপি নির্মাণের ফলে সীমান্তে নজরদারী বৃদ্ধি পাওয়ায় সকল প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসএফ কর্তৃকও কোন প্রকার প্রতিবাদ করা হয়নি।

একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ পার্বত্য এলাকার বান্দরবান জেলার সীমান্ত এলাকার দক্ষিণাংশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া পাহাড়  এবং দূর্গম এলাকা। উঁচু পাহাড়ের গা ঘেঁষেই রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। ভুপ্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে বিগত ৪ মাসেরও কম সময়ে উক্ত দূর্গম এলাকায় বিজিবি কর্তৃক নতুন ৬টি বিওপি নির্মাণ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রায়ই আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী দলের আস্তানা কিংবা তাদের অবাধ চলাচলের ব্যাপারে বিজিবি কর্তৃপক্ষের কাছে তারা প্রতিবাদ লিপি প্রেরণ করতো। কিন্তু বর্তমানে উক্ত এলাকার বেশির ভাগ অংশে বিজিবি’র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন এ ধরনের পত্রালাপ অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। সে সাথে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত ও সূচিহ্নিত হয়েছে দু’দেশের সীমানা।

এদিকে বর্তমানে নতুনভাবে নির্মিত সকল বিওপিগুলোই হেলি সাপোর্টেড। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী সমূহের মধ্যে বিজিবিরই রয়েছে সর্বাধিক ৭৮ টি হেলি সাপোর্টেড ক্যাম্প। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো স্বল্পতার মধ্যেও বিজিবির বিওপিগুলোতে হেলি সহায়তা প্রদানে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, হেলির প্রয়োজনীয়তা ও দ্রুত সাপোর্ট নিশ্চিতের বিষয়টি বিবেচনা করে সদর দপ্তর বিজিবি হেলি উইং এর সকল অবকাঠামো সাতকানিয়ায় বিজিবি’র একমাত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বিজিটিসিএন্ডএস সংলগ্ন স্থানে ইতিমধ্যে স্থাপন করেছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ৫ জুন ২০১৬ তারিখ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর হেলি উইং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি। খুব শীঘ্রই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে নতুন হেলিকপ্টার সংযোজিত হবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে বিজিবি হেলি উইং কাজ শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।এতে নতুন বিওপি নির্মাণ কার্যক্রমসহ অপারেশনাল দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ হাবিবুল করিম পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে আর কোন সীমান্ত অরক্ষিত থাকবে না। বিজিবি’র বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ এর সার্বিক দিক নির্দেশনা ও সহায়তার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

ভূমি বিরোধের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিজিবির বিওপির স্থাপনে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, আশা করা যায় খুব শীঘ্রই এ সকল সমস্যা দূর করে ব্যাটালিয়নগুলো তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন করতে পারবে।

মিয়ানমারে নারী পাচারের অভিযোগে বান্দরবানে বৌদ্ধ ভিক্ষু আটক

ততততত

স্টাফ রিপোর্টার:

বিনা খরচে উপজাতীয় দরিদ্র মেযেদের শিক্ষার নামে বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে এসে মিয়ানমারে পাচার করার অভিযোগে  বান্দরবানে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আটক করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার দুপুরে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দির থেকে উঃ স্বীরি ভিক্ষু(৩৬) নামের এই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আটক করেছে যৌথ বাহিনীর একটি দল।বর্তমানে তিনি বান্দরবান সদর থানায় আটক রয়েছেন।

উঃ স্বীরি ভিক্ষুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৪/১৫ জন উপজাতীয় দরিদ্র তরুণী মেয়েকে বিনা মূল্যে শিক্ষার কথা বলে মন্দিরে নিয়ে এসে পরে তাদের মিয়ানমারে পাচার করেছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, শুক্রবার জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তালুকদার পাড়া গ্রামের মংপ্রু হ্লা মারমা(৪২) থানায় অভিযোগ করেন যে, তার মেয়ে নুচিং মারমা(১৫) কে উঃ স্বীরি ভিক্ষু নামের এক ব্যক্তি বিনা খরচে লেখাপড়া করার কথা বলে গত ১০ জানুয়ারি কাপ্তাইয়ের মিতিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন উক্ত বৌদ্ধ ভিক্ষু রোয়াংছড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে আরো ১৪/১৫ জন উপজাতীয় তরুনীকে বিনা মূল্যে শিক্ষার কথা বলে মিয়ানমারে পাচার করে দিয়েছে। খবর শুনে তিনি উক্ত বৌদ্ধ মন্দিরে মেয়েকে দেখতে গেলে সেখানে তার মেয়েকে পাননি। ফলে তিনি মেয়েকে উদ্ধারের জন্য থানায় মামলা করেন। মামলা নং- ১/ ১১-৩-২০১৬।

vante

মামলা হওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে উঃ স্বীরি ভিক্ষুর অবস্থান সনাক্ত করে বান্দরবান জেলা পুলিশের নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর একটি দল কাপ্তাই থানা পুলিশের সহায়তায় মিটিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দিরে অভিযান চালিয়ে আটক করে। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উক্ত ভিক্ষুর বসতবাড়ির চারদিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দ্বারা সুরক্ষিত দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়।

সূত্র জানিয়েছে, উঃ স্বীরি ভিক্ষুর বাড়ি মিয়ানমার। তিনি সেদেশের পটুক জেলার ছাইংদাম থানার সিত্তিয়া পাড়া গ্রামের অং সুই উ মারমার সন্তান। তার মাতার নাম সাই আ প্রু মারমা। ২০০৪ সালে তিনি প্রথম মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের রামুতে এসে বসবাস শুরু করেন। এরপর ২০০৭ সালে বর্তমান স্থানে এসে বসবাস করেন। তিনি এখন এই মন্দিরের প্রধান ভিক্ষু। বাংলাদেশে অবস্থানে তার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। নিজেকে স্থানীয় নাগরিক দাবী করলেও তার কাছে কোনো পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয় পত্র পাওয়া যায়নি।

পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঃ স্বীরি ভিক্ষু জানান, মায়ানমারের মংন্ডু শহরতলীর কাছে নেজাদো মন্দিরে রোয়াংছড়ির ১১ জন মেয়েকে ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়ার হুয়াইক্ষ্যং দিয়ে ওপারে মেয়েদের পাঠান। তবে তিনি পাচার করেননি বলে জানিয়েছেন। তারা ফিরে আসবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বান্দরবান সদর থানায় শুক্রবার রাতে অভিযুক্ত ঐ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: রফিক উল্লাহ জানান, রোয়াংছড়ির তারাছাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে ১৩/১৪ জন মারমা যুবতী মেয়েকে বিনা পয়সায় পড়ালেখা করানোর প্রলোভন দেখিয়ে কাপ্তাই এর মিতিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে যায় বৌদ্ধ ভান্তে।

রোয়াংছড়ি থানার এসআই এবং উক্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মোস্তফা পার্বত্যনিউজকে জানান, আত্মরক্ষার জন্য উঃ স্বীরি ভিক্ষু একেক সময় একেক কথা বলছেন। ভিক্ষুটি এ পর্যন্ত ১৪/১৫ জন উপজাতীয় মেয়েকে মিয়ানমারে পাচার করেছে। তবে সে একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে এমনটা মনে করছেন না তিনি। তার মতে, উঃ স্বীরি ভিক্ষুর সাথে একটি বড় ধরণের চক্র কাজ করছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো নেটওয়ার্কের খোঁজ পাওয়া যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

বোয়াংছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হ্লাথোয়াইহ্রী মারমা জানান, নিখোঁজ মেয়েদের অভিভাবকরা নিরূপায় হয়ে মানবপাচারের মামলা করেছে। একই সাথে ১৩ জন মেয়ে নিখোঁজ হওয়া রহস্যজনক বলে তিনি জানান।

আরাকান আর্মির হামলায় ৩০ বার্মিজ সেনা নিহত: সীমান্তে সেনা-বিজিবি বিশেষ অভিযান

বার্মিজ সেনা

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি দাবী করেছে তাদের অতর্কিত হামলায় ৩০ বার্মিজ সেনা সদস্য নিহত হয়েছে। যদিও মিয়ানমার সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এ প্রাণহানীর বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। ৩ মার্চ বিকাল ৫ টার দিকে আরাকানের বুচিডং নামক স্থানে সংঘটিত ওই সংঘর্ষে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুইটি ট্রাকও ভষ্মিভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে এই হামলার পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপারেশন শুরু করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে না পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা বিজিবি চট্টগ্রাম অঞ্চল কমান্ডারকে অনুরোধ জানায়। বিজিপি’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিজিবি ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে যাতে সেদেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাড়া খেয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়তে না পারে।

খিং থুখা নামে আরাকান আর্মির এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৫৬ লাইটেনিং ব্যাটালিয়নের একটি কনভয়ের উপর আরাকানের বুচিডং টাউনশিপের কাছে এম্বুশে আরাকান আর্মির ৫ম ব্রিগ্রেডের একটি দল রকেট প্রপেলড গ্রেনেড লঞ্চারসহ ভারী অস্ত্র দ্বারা হামলা করে এই সেনাসদস্যদের হত্যা করে। এসময় আরো বেশ কিছু সেনাসদস্য আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে মেজর ও ক্যপ্টেন পদমর্যাদার দুইজন অফিসার রয়েছে বলে জানা গেছে। এসময় তাদের হামলায় সেনাবাহিনীর দুইটি ট্রাক ভষ্মিভূত হয়।

খিং থুখা আরো জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি, ১ মার্চ, ২ মার্চ ও ৩ মার্চ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির ৫ম ব্রিগ্রেডের কয়েকদফা সংঘর্ষ হয়। ফলে সেনাবাহিনী অত্র এলাকায় অতিরিক্ত শক্তিবৃদ্ধি করে। তারা সেনাবাহিনীর এই বাড়তি শক্তি ধংস করে দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে তার দাবী।

মুখপাত্র দাবী করেন, সেনাবাহিনীর সাথে বন্দুক যুদ্ধে আরাকান আর্মির বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবে তারা এই অতর্কিত হামলা চালায়।

বৃহস্পতিবার বুথিডঙের একটি আদালত আরাকান আর্মির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪ ব্যক্তির ফাঁসির রায় দিয়েছে।এই নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে ৩০ জনকে একই অভিযোগে শাস্তি দিয়েছে আদালত।

এদিকে উক্ত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ৮ মার্চ থেকে বান্দরবানের মায়ানমার সীমান্তে সেনা-বিজিবির আবারো যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবি’র প্রায় আড়াইশত সদস্য এই অপারেশনে অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা ঠেকাতে আলীকদমের পুয়ামুহুরী সীমান্তের ৬২ নং পিলার থেকে শুরু করে ৬৮ নং পিলার পর্যন্ত এলাকায় চলছে এই অভিযান।

সীমান্ত দিয়ে যাতে মায়ানমারের কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী এদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে লক্ষে সীমান্তে চিরুনী অভিযান চালানো হচ্ছে বলে।

সন্ত্রাসীরা যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য মায়ানমার সরকার বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তা চেয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া অভিযানে সেনাবাহিনীর হেলিকাপ্টারে করে সীমান্তে বিপুল সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি’র কর্মকর্তরা জানিয়েছেন, সীমান্ত অনেকটাই সিল করে দেয়া হয়েছে। যাতে কোন সন্ত্রাসীই এদেশে প্রবেশ করতে না পারে।

উল্লেখ্য গত বছরের ২৬ আগষ্ট বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড় মদক এলাকায় নাছালং পাড়ায় আরাকান আর্মির সদস্যরা বিজিবির উপর গুলিবর্ষণ করলে ২ বিজিবি সদস্য আহত হয়। অন্যদিকে রাঙ্গামাটির বড় থলি এলাকার সেপ্রু পাড়ায় আরাকান লিবারেশন আর্মির (এএলপি) সদস্যদের হামলায় ১ আনসার ভিডিপি সদস্য নিহত হয়। সন্ত্রাসীরা ঢাকার দুই পর্যটককে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এখনো তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সাজাভোগ শেষে ৩ বাংলাদেশিকে ফেরত দিল মিয়ানমার

Capture

টেকনাফ প্রতিনিধি:

মিয়ানমারের কারাগারে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাভোগের পর ৩ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। এরা সবাই সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী যাত্রী। মিয়ানমারে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করায় তাদের আটক করা হয়েছিল।

কারাগারে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাভোগের পর ফেরত আসা বাংলাদেশিরা হচ্ছেন, কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থানার লেদা গ্রামের মো. সুলতান আহমদের ছেলে মো. সালেহ আহমেদ, উখিয়া থানার দরগাহ বিল হাতিমোড়ার মো. কালুর ছেলে আবু কালাম ও বরগুনা জেলার তালতলা থানার সুলাপাড়া গ্রামের সানু গাজীর ছেলে মো. আবদুর রব গাজী।

মিয়ানমানমারের অভ্যন্তরে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-বিজিপি পর্যায়ে মংডুস্থ ১ নং পয়েন্ট অব এন্ট্রি এন্ড এক্সিট এলাকায় বৈঠক শেষে তাদের ফেরত আনা হয়েছে। এই উপলক্ষে রবিবার সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে ঘন্টা ব্যাপী পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের ১০সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ২ বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী।

এ সময় সাথে ছিলেন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ ইকবাল, পুলিশের এডিআইও মাজাহারুল হক। আর মিয়ানমারের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন জেলা অফিসার সহকারী পরিচালক ইউ মউ মাইন এনউএ।

এদিকে সকাল পৌনে ১২ টায় সদর বিওপির মিলনায়তনে ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল ছিদ্দিকী সংবাদ সম্মেলনে জানান, মিয়ানমারের সাথে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং আন্তরিক পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মানব ও মাদকপাচারসহ সীমান্তের বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনা হয়েছে। তিনি আরো জানান, মিয়ানমারের কারাগারে বর্তমানে কতজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার সংখ্যা সম্পর্কে মিয়ানমার কোন তথ্য সরবরাহ করেনি। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ফেরত আসা টেকনাফের লেদা গ্রামের মো. সালেহ আহমদ জানান, নাফনদীতে মাছ শিকারে গিয়ে তৎকালীন নাসাকার হাতে আটক হয়ে দীর্ঘ ৪ বছর ৫ মাস কারাভোগ করেছেন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিজিবি প্রচেষ্টায় দেশে ফিরতে পারায় সন্তুষ্টি এবং বিজিবিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারমত আরও শতশত বাংলাদেশি নাগরিক মিয়ানমারের কারাগারে মুক্তির প্রহর গুনছে। সে দেশের কারাগারে অমানুষিক যন্ত্রনা ভোগ করছে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযত যোগাযোগ এবং তৎপরতার অভাবে তারা দেশে ফিরতে পারছেনা বলে দাবি করেন। তাছাড়া ফেরত আসা মালয়েশিয়াগামী যাত্রী আবু কালাম জানান, ২০১১ সালের ৮০ জন মালয়েশিয়াগামী যাত্রী বোঝাই টেকনাফের কাটাবনিয়া ঘাট থেকে রওয়ানা দিয়ে মিয়ানমারের আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিল। ৩৬ মাস মাস কারাভোগের পর তাদের দলের ১১ জন ফেরত আসলেও বাকিদের ব্যাপারে তারা কিছুই জানেনা তিনি।

নাইক্ষ্যংছড়িতে আটক মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি

DSC09540

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার আশারতলী সীমান্ত থেকে আটকের পর লাটুনা (২০) নামে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সদস্যকে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই মিয়ানমারে ফেরত দিয়েছে বিজিবি।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮ টায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৪৬-৪৭ নম্বর আর্ন্তজাতিক পিলার থেকে প্রায় দুই কি: মি: বাংলাদেশের অভ্যান্তরে আশারতলী বিদ্যালয় এলাকা থেকে সেই বিজিপি সদস্যকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কক্সবাজার সেক্টরে নেওয়ার হলে বুধবার সকালে ঘুমধুমে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মিয়ানমারের সিকদারপাড়া ২নম্বর বিজিপি ব্যাটালিয়ানের সদস্য লাটুনা (২০) মঙ্গলবার সকালে সীমান্ত পিলার অতিক্রম করে বাংলাদেশের আশারতলী ভূ-খন্ডে চলে আসে। এ সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তাকে আটক করে বিজিবি ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়। পরে সে নিজেকে মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার বাসিন্দা পরিচয় দেয় এবং মিয়ানমারের বিজিপির সদস্য হিসেবে কর্মরত রয়েছে বলে জানায়।

বহুল আলোচিত আরাকান আর্মি ‘নেতা’ ডা. রেনিন সোয়ের রহস্যময় জীবন

390781_242972929103146_1338977904_n

স্টাফ রিপোর্টার:

ডা. রেনিন সোয়ে তালুকদার। বাংলাদেশের মিডিয়ায় তিনি আরাকান আর্মির নেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছেন। কিন্তু আসলে কে এই রেনিন সোয়ে? কি তার আসল পরিচয়- এ নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তার পরিচয় বের করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও হতে হচ্ছে গলদঘর্ম। রাঙামাটি জেলার রাজস্থলীর প্রত্যন্ত এলাকায় সুরম্য অট্টালিকা, বাড়ির চারপাশে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাসহ বিশেষ ধরণের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হাতে স্যাটেলাইট ফোন, দামী দামী গাড়ি, কখনো ডাক্তার, কখনো ব্যবসায়ী, কখনো খনিজ সম্পদ কোম্পানী কর্মকর্তা, কখনো এনজিও কর্মকর্তা নানা পেশাজীবী পরিচয় রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মন্ত্রী এমপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সমাজের নেতাদের সাথে তার একান্ত সমপর্ক রয়েছে। অনেকের কাছেই তিনি দানবীর।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। তাদেরকে তিনি রাঙামাটিতে নিয়ে আসতেন। সম মিলিয়ে রাঙামাটির এক রহস্যময় পুরুষ তিনি। এই রহস্য ঘিরেই স্থানীয়দের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল আগ্রহ। সকলের সাথে এতোই অমায়িক ব্যবহার করতেন যে কারো মনে কখনো খারাপ কিছু আসেইনি।

তবে গত ২৭ আগস্ট বান্দরবানের থানচি উপজেলার বড় মোদকে বিজিবি’র উপর মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ আরাকান আর্মি আক্রমণ করলে সেনাবাহিনী এই ঘরটি ঘিরে ফেলে আটক করে রেনিন সোয়ে এক সহযোগীকে আটক করে। তার কাছ থেকে বাড়ির মালিক ডা. রেনিন সোয়ের নাম ও পরিচয় জানা গেলে রাতামাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন তিনি। বহুল আলোচিত আরাকান আর্মির নেতা ডা. রেনিন সোয়ের রয়েছে এক বিশাল বর্ণাঢ্য ও রহস্যময়। পার্বত্যনিউজ অনুসন্ধান করে তার রহস্য ও বর্ণাঢ্যময় জীবনের কিছু তথ্য জানতে পেরেছে।

rennin soe

তার পুরো নাম ডা. রেনিন সোয়ে তালুকদার। জন্মসূত্রে রাখাইন ও বুদ্ধিস্ট। গণমাধ্যমে তাকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবে উপস্থাপন করা হলেও তিনি নিজে বরাবরই সে সকল দাবী প্রত্যাখ্যান করে দাবী করেছেন তিনি মিয়ানমারের নয় বাংলাদেশের নাগরিক। প্রমাণ হিসাবে তিনি সামাজিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের জন্মসনদ উপস্থাপন করেন। জন্মসনদ ছাড়াও তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট রয়েছে- যা ১৪ অক্টোবর আটক হওয়ার সময় জব্দ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বাংলাদেশী পাসপোর্ট ও জন্মসনদের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান।

জন্ম সনদ অনুয়ায়ী ১৯৬৯ সালের ৭ জানুয়ারী রাজস্থলীর কলেজ পাড়ায় তার জন্ম। তার পিতার নাম উ সান সোয়ে তালুকদার মিয়ানমারে মারা যান। মাতার নাম মা তুন সেইন তালুকদার। ১০-১২ বছর পূর্বে রাঙামাটির রাজস্থলীতে মারা যান। রেনিন সোয়ের শৈশবের কিছুকাল কাটে পটুয়াখালীর রাখাইন পল্লীতে। তবে তার পরিবার কিভাবে বা কেন পটুয়াখালীতে গিয়েছিলেন সে কারণ জানা যায়নি। ১৯৭০-৭১ সালের দিকে সোয়ের পরিবার পটুয়াখালী থেকে মিয়ানমারের স্যালুলে গমণ করেন। তার পূর্ব পুরুষেরা মিয়ানমারের নাগরিক। সেইসূত্রে সেখানে তাদের সম্পদ ও সম্পত্তিও ছিল। সোয়ে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে স্কুল পর্যায়ে পড়াশোনা করে ইয়াঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৯০ সালে অং  সাং সুকির দল এনডিপিকে বার্মিজ সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে সামরিক সরকার বিরোধী আন্দোলনের সাথে তিনি যোগদান করেন। এভাবেই  তিনি মিয়ানমারের গনতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন।

রেনিন সোয়ে 1

ছাত্রাবস্থায় মায়ানমারের একাধিকবার তিনি রাজনৈতিক কারণে কারাবরণ করেন।  কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৯০ সালের দিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে রাঙামাটিতে বসবাস শুরু করেন ডা. রেনিন সোয়ে। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের পেট্রোবাংলার  ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার হিসেবে সিলেটে কর্মরত ছিলেন বলে তিনি দাবী করেছেন। জানা যায়, ১৯৯৭ সালে গ্যাসের খনির সন্ধানের কথা বলে তিনি রাজস্থলীতে আসেন।  ১৯৯৮ সালে তিনি রাঙামাটিতে অংসাই প্রু মারমার মেয়েকে বিয়ে করেন। তার স্ত্রীর নাম হাসি নু মারমা। তার দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বিবাহের পর থেকে তিনি রাজস্থলীতে আসতেন এবং লোকজনকে বলতেন, তিনি বিদেশের একজন চিকিৎসক। এভাবেই তিনি নানা পরিচয়ে আড়ালে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন রাঙামাটিতে অবস্থান করেন।

২০০৪ সালের দিকে রাজস্থলী তাইতং পাড়া কলেজ সংলগ্ন এলাকার পশ্চিম তাইতং পাড়া কার্বারি রেনেজু রাখাইন এর শালিকার জামাতা অনুমং মারমার নিকট থেকে ৫০ শতক জায়গা ক্রয় করে আনুমানিক তিন কোটি টাকা খরচ করে তিনতলা বিশিষ্ট বিলাসবহুল বাড়িটি নির্মাণ করেন। কিন্তু বর্তমান তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, জায়গাটি এখনো অনুমং মারমার নামেই রয়েছে। বাড়িটিতে ঢুকতে এবং গেস্টরুমে রয়েছে দুইটি অত্যাধুনিক আইপি সিস্টেম সিসি ক্যামেরা। গত কয়েকমাস আগে রাজস্থলী উপজেলার প্রায় ২০০ ভান্তে নিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রবজ্জ্যা পালন করেন। যেটি একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ২-৩ হাজার মানুষকে আপ্যায়ন করেন। অথচ উপজেলার অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি অনূষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন না। তিনি ২০০১ সালে বাংলাদেশ থেকে নেদারল্যান্ড গমন করেন। সেখানে নিউরো সার্জারি বিষয় পড়াশুনা করেন। এসময় তিনি নেদারল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০০৬ সালে তিনি স্ত্রী সন্তানদের নেদারল্যান্ড  নিয়ে যান। তার স্ত্রী নেদারল্যান্ডের একটি ব্যাংকে চাকরী করেন এবং সন্তানদের নিয়ে সেখানেই বসবাস করেন।

125624

আরাকান আর্মি নেতা হিসাবে তাকে বলা হলেও তিনি এ বাহিনীর কোনো নেতা নন। বরং ২০১৪ সালে রেনিন সোয়ে আরাকান আর্মির এডভাইজার নিযুক্ত হন। তার ইউরোপীয় কানেকশেনের জন্যই আরাকান আর্মি তাকে এ পদে নিয়োগ দেয়। বাংলাদেশে থাকলে বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকাতেই থাকতেন বলে তার দাবী। বাংলাদেশ বিজনেস সেন্টার বা বিবিসি নামে তার একটি ব্যবসা কোম্পানী রয়েছে। তবে এ বিষয়ে অধিক কিছু জানা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপি. রাজা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার দহরম মহরম ছিল। এ সম্পর্কের কিছু ছবি তিনি নিজেই তার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কৌশলগত কোনো বিনিময় ও সহযোগিতা ছিল কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রেনিন সোয়ে’র বাড়ি থেকে উদ্ধারকৃত ল্যাপটপ থেকে পাওয়া এক চিঠিতে দেখা গেছে, তিনি এম এন লারমা নামে পার্বত্য জন সংহতি সমিতির এক শীর্ষ নেতার কাছে নিজেকে আরাকান আর্মির নেতা পরিচয় দিয়ে লিখেছেন।

পডসস

চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ২৪ জুলাই ২০১৫ তারিখে আরাকান আর্মির সদস্য আই থোয়াইকে শান্তি বাহিনীর সদস্য সাই থোয়াই আটক করে তার উপর নির্যাতন চালিয়েছে। তার উপর নির্যাতন না চালিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে আরাকান আর্মির সাথে সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান করা হয়। অন্যথায় পিসিজেএসএসকে পরিণতি ভোগ করার হুমকিও দেয়া হয়েছে চিঠিতে। চিঠিটি এম এন লারমার কাছে পাঠানো হলেও এমএন লারমা অনেক আগেই মারা গেছে। তবে এমএন লারমা সাংকেতিক নাম দিয়ে পিসিজেএসএস’র কোনো শীর্ষ নেতার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। এতে প্রমাণিত হয় পিসিজেএসএসের কোনো কোনো নেতা রেনিন সোয়ের আরাকান আর্মির সম্পৃক্ততা জানতো।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট বান্দরবানের থানচির তিন্দু ও আন্দারমানিক এলাকায় আরাকান আর্মির জন্য ক্রয়কৃত দুই দফায় ১৩টি ঘোড়া আটক করে বিজিবি। এ ঘটনার জের ধরে ২৭ আগস্ট সকালে বড় মদকের দোলিয়ান পাড়া বিজিবি ক্যাম্পে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি (এ, এ) সদস্যরা হামলা চালায়। এতে জাকির হোসেন ও আহম্মদ গনি আহত হন। বিজিবির সদস্যরাও পাল্টা গুলি এবং মর্টারশেল ছোঁড়েন। বিমান বাহিনীর ৫টি হেলিকপ্টার ও জঙ্গী বিমান এ হামলায় ব্যবহৃত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও বিজিবির তীব্র প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটে।

এ ঘটনার পর আলোচনায় আসেন ডা. রেনিন সোয়ে। জানা যায়, রেনিন সোয়ে আরাকান আর্মির জন্য এই ঘোড়াগুলো ক্রয় করে বান্দরবানে পাঠিয়েছিলেন। একই দিন অর্থাৎ ২৭ আগস্ট গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি দল রাজস্থলীর কলেজ পাড়া এলাকার স্থানীয় রেনিন সোয়ের বাসায় অভিযান চালায়। এসময় তাকে আটক করা না গেলেও মিয়ানমারের নাগরিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সহযোগী অং ইউ ইয়াং রাখাইনকে আটক করে সেনাবাহিনীর দলটি। বাড়ীতে তল্লাশী চালিয়ে তিনটি আরাকান আর্মির পোশাক, পোশাক তৈরির ৩০ গজ কাপড়, তিনটি ল্যাপটপ, মোডেম, দুইটি ডিজিটাল ক্যামেরা, একটি হেন্ডিক্যাম, দুইটি ঘোড়া, তিনটি মটরসাইকেল, মোবাইল ও পার্সপোট পাওয়া যায়।

ঐ দিন ডা রেনিন সোয়েসহ তার সহযোগি ও কেয়ারটেকারের বিরুদ্ধে রাজস্থলী থানায় সন্ত্রাস দমন আইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। ঐ দুই মামলার পলাতক আসামী ছিলেন ডা. রেনিন সোয়ে।

rennin

জানা যায়, আটকের আগ মুহুর্তে রেনিন সোয়ে তার বাড়ি থেকে পালাতে সক্ষম হন। এর পর তিনি বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে বিবৃতি, ছবি, ডকুমেন্ট ও ভিডিওবার্তার মাধ্যমে তার কাজের সপক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। ভাইবার ও স্কাইপি’র মাধ্যমে একাধিক বার্তা সংস্থার কাছে স্বাক্ষাৎকার দেন। তিনি পার্বত্যনিউজকেও একটি সাক্ষাৎকার দেন যা অনিবার্য কারণে প্রকাশ করা হয়নি।  একটি স্যাটেলাইট ফোন নম্বরের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে তিনি গণমাধ্যমকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানান, তিনি চীনে অবস্থান করছেন। তার এই দাবী সংশ্লিষ্ট কেউই বিশ্বাস করেনি। তবে তিনি ঠিক কোথায় অবস্থান করছিলেন তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। কারো মতে, এই সময়ে তিনি ভারতের দিল্লীতে গিয়ে আবার ফিরে আসেন। আবার কারো মতে, বেনপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাবার চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।  চলমান রিমান্ডে তার সঠিক অবস্থান জানা যাবে। এভাবে দীর্ঘ দেড় মাস পলাতক থাকার পর মঙ্গলবার ভোর রাতে পুলিশ ও বিজিরি হাতে রাজস্থলীতে আটক হন তিনি।

১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার রাত প্রায় সাড়ে তিন টায় দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বর্ডার গাড বাংলাদেশ বিজিবির মেজর শাব্বির আহমেদ, মেজর কামাল পাশা ও রাজস্থলী থানার পুলিশসহ যৌথ অভিযান চালিয়ে ইসলামপুরের একটি নির্মানাধীন মসজিদ আত্মগোপন করে থাকা অভিযুক্ত মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মীর নেতা রেনিন সুয়ে মারমাকে আটক করা হয়েছে। এসময় তল্লাশী চালিয়ে তার কাছ থেকে ৫০টি ৫০০ টাকার নোটের ভারতীয় রুপি, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডের পার্সপোট, একটি ল্যাপটপ কম্পিউটার,  ২টি মোবাইল সেট, তিনটি ক্রেডিট কার্ড আর একটি ব্যাগে ব্যবহৃত পোশাক উদ্ধার করা হয়েছে। আটকের পর বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশ আরাকন আর্মির নেতা ডা. রেনিন সোয়েকে আদালতে হাজির করে তার বিরুদ্ধে ১০দিনের রিমান্ডের আবেদন করে। তবে রাঙামাটি জজ আদালতের অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট সাবরিনা আলী’র শুনানী শেষে ৫দিনে রিমান্ড আদেশ প্রদান করেন। বর্তমানে তিনি রিমান্ডাধীন।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অস্থিরতার নেপথ্যে

images-ববব

সালিম অর্ণব

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংঘাত ও সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল শিকড়টা খুঁজতে গেলে প্রথমে চোখ বুলাতে হয় ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উগ্রবাদী বৌদ্ধ আর স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলিম গোষ্ঠীর সংঘাত চলতে থাকে যুগের পর যুগ।

অন্যদিকে সামরিক শাসনের কষাঘাতে জর্জরিত মিয়ানমারের মানুষ শান্তি বলতে সত্যিকার অর্থে কী বোঝায়, সেটা প্রত্যক্ষ করতে পারেনি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে। একের পর এক সামরিক জান্তার দুর্বিষহ শোষণ আর গণনিপীড়নে অস্থির জনজীবনে আরেক বিভীষিকার নাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বিশ্বজুড়ে গণমানুষের মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বৌদ্ধমাত্রই শান্তিপ্রিয়, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকা মুণ্ডিত মস্তকের বিদ্বান ব্যক্তি; যা মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধদের সঙ্গে একটুও মেলানো যাবে না। বেসামরিক জনতার ওপর সামরিক সরকারের দলনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষের প্রাণ যেখানে ওষ্ঠাগত, সেখানে যুক্ত হয়েছে মাদকের কালো ছোবল। পক্ষান্তরে আনুষঙ্গিক নানা দুরবস্থায় মিয়ানমারের উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্ত উত্তেজনার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।

বলতে গেলে বিগত এক দশকে মিয়ানমারের কোনো সংবাদপত্রের পাতায় এক দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাদে উল্লেখযোগ্য সংবাদ ছাপা হয়নি, যাতে মানুষ আশাবাদী হতে পারে। অং সাং সু চি নামমাত্র শান্তির বারতা নিয়ে মিডিয়া স্টান্ট হাজির করে নোবেল জিততে পেরেছেন ঠিকই। কিন্তু আমজনতার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দিতে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ— এটা এখন বলা যেতেই পারে।

সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবিরোধ, যার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বলতে গেলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের এ সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদির আগমন, দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে রুশ-মার্কিন-চৈনিক ভাবনার বিপ্রতীপে ভারতীয় বিদেশনীতি— সবই অবস্থাবিশেষে গুরুত্বের দাবি রাখে।

দৈনিক সংবাদপত্রগুলো থেকে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৮ মে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান নিহত হন। এ সময় দখল-সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলায় দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘসময় গুলি বিনিময় হয়। এ গুলি বিনিময়ে হতাহতের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। মিজানের মৃত্যুর পর সাময়িক বিরতি দিয়ে ৩ জুন ওই সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, আবার গোলাগুলির খবর শোনা যায় সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ৫ জুন মিয়ানমারের মংডুতে বিজিবি ও বিজিপির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ বৈঠকে তারা সুবেদার মিজানের হত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু ঠিক তার পরদিনও সীমান্তে গুলিবর্ষণ অব্যাহত ছিল বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে।

হঠাৎ করে অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত মিয়ানমারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সীমান্তরক্ষীদের বিজিবির ওপর চড়াও হওয়াটা কোনো আশার কথা বলে না। এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে অনেক প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ সীমান্তে হঠাৎ করে উত্তেজনা বাড়ল কেন? মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীইবা কোন দুঃসাহসে এবং কার ইন্ধনে কোনো হুঁশিয়ারি ছাড়া গুলি করে হত্যা করল বিজিবি সদস্যকে? অনেক বিশ্লেষক এটাকে নিছক দুর্ঘটনা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির ফল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবেন, যেটা কোনো অংশেই ঠিক নয়; উপরন্তু এ-জাতীয় বিভ্রান্তিকর চিন্তা ওইসব বিশ্লেষকের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রজ্ঞা ও শিষ্টাচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একটু খেয়াল করলে সাধারণ্যেই স্পষ্ট হয়, এ গোলাগুলি কোনো ভুল বোঝাবুঝির ফল নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কারো উসকানির ফল। বিশেষ করে এই গুলি ছোড়া যদি ভুল বোঝাবুঝিই হবে, তাহলে দ্বিতীয়বার মিয়ানমারের বিজিপি বাংলাদেশী বিজিবির ওপর গুলি ছুড়ত না।

পররাষ্ট্রনীতির কিছু বিষয় ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করাটা বাংলাদেশের জন্য খুব জরুরি। অন্যদিকে সে বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারও বেশ ওয়াকিবহাল। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই বিমসটেকের সদস্য। পাশাপাশি বিসিআইএম নামক উপআঞ্চলিক জোটেও মিয়ানমার রয়েছে। এর থেকে ধরে নেয়াই যেতে পারে মিয়ানমারের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী নীতিতে সাফল্যের মুখ দেখবে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের চলমান সীমান্ত উত্তেজনা আর যা-ই হোক, দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশেষ টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে; যা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশেরই ক্ষতির কারণ। যেমন— কুনমিং-কক্সবাজার সড়কের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ থাকলেও সীমান্ত সংঘাতে সৃষ্ট শীতল সম্পর্ক মিয়ানমারের পক্ষে এ সড়কের অনুমতি প্রদানের অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়কের মাধ্যমে কুনমিংয়ের সংযুক্তির কথা থাকলেও তা এখন ঝুলে পড়েছে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনীতির পুরোটাই সেনাশাসকদের অধীনে পর্যুদস্ত। নোবেলজয়ী নেত্রী সু চি শুধু মুখে মুখে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললেও পর্দার আড়ালে কাজ করে সেখানে একটি মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছেন। আর এজন্য সুকৌশলে কিংবা সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে আদিবাসী মুসলিমদের উত্খাত করাটা তাদের জন্য খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জেনারেল নে উইনের আমলে আরাকানে জাতিগত আন্দোলন দমনের নামে ১৯৭৮ সালে যে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালানো হয়েছিল, তার কালো থাবা আরো বেশি করে উসকে দেয় জাতিগত দাঙ্গাকে। তখনকার আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে হত্যা করা হয় হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষ, শিশুকে। তাদের আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নিপীড়ন ও ধর্ষণে বাধ্য হয়ে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর মিয়ানমারের সামরিক শাসক থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী নেত্রী সু চি সবাই এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যত বেশি অত্যাচার করা হবে, তারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটতে থাকবে, প্রকারান্তরে অনেক পরিষ্কার হয়ে যাবে মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ।

রোহিঙ্গাদের ক্রমাগত আগমন জনসংখ্যার ভারে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য উটকো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথম প্রথম বাংলাদেশের কিছু মানুষ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে উপস্থিত হয়। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে এবং তার ফলও লাভ করে বেশ দ্রুত। ১৯৭৯ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি কিছু শরণার্থী রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরার পথ করে দেয়। এ সময় বাদ সাধে নাগরিকত্ব আইন। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ১৯৮৩ সালের পর মিয়ানমারে আগত রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে। বলতে গেলে এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ চলাচল একরকম নিষিদ্ধই হয়ে যায়। পাশাপাশি এ আইনও করা হয় যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে গিয়ে বাস করতে পারবে না। উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকার পাশাপাশি দুই সন্তানের বেশি হলে পিতামাতার ওপর নির্যাতন চালায় সামরিক বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে শিশুসন্তানকে হত্যাও করে তারা। রোহিঙ্গাদের বিয়েতে পর্যন্ত আরোপ করা হয় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। ফলে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকে বাংলাদেশ সীমান্তে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা চাইছে না রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। উপরন্তু তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারেরই রাজনৈতিক সমস্যা, যার অংশ বাংলাদেশ নয়। কিন্তু তারা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট, আরাকান ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন— এসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশইন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তত্পর থাকায় মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার কাজ অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তাই বিশেষ গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থায়ী উত্তেজনা বজায় রাখার পথ সুগম করতেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে মিয়ানমারের লুন্থিন বাহিনী।

গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল বলা যেতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠকও করেন। তখন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক বৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, তখন বাংলাদেশের সহযোগী হতে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল মিয়ানমার। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সবার মনে এখন একটিই প্রশ্ন মাত্র দুটি মাসের ব্যবধানে এমন কী ঘটে গেছে, যা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে রক্ত ঝরাচ্ছে? আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলতে চাইছেন নিছক ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। তবে তার বাইরে আরো কিছু কারণ আছে, যেটা কোনো আশার কথা বলছে না।

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত শান্ত আছে, এমনটি নয়। বিশেষত আদিবাসী রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশ পাঠানো, নাফ নদী থেকে বাংলাদেশী জেলেদের পাকড়াও করা, নাইক্ষ্যংছড়ির অরণ্যে কাঠুরিয়াদের নির্যাতন দুটি দেশের শীতল সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিধ্বস্ত মিয়ানমার গ্রাস করতে চাইছে বাংলাদেশকে। সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা প্রাণঘাতী ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের চোরাচালানিদের নিয়ে আসা ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের ড্রাগস আটকে দিতে সদাতত্পর আমাদের সাহসী সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এগুলোর পাশাপাশি অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর কাজে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারেও বাধা দেয় বিজিবি সদস্যরা। সম্প্রতি কোস্টগার্ডের সহায়তায় নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়া বেশ কয়েকটি বহর আটকে দেয় তারা। বলতে গেলে নিছক দুর্ঘটনা তো নয়ই বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমান্তে ত্রাস সৃষ্টির জন্য বিজিবির মিজানুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে লুন্থিন বাহিনী। একে তাই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ না করে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রক্ষার প্রয়োজনে অনর্থক সংঘাত ও উত্তেজনা কাম্য নয়।

নাইক্ষ্যংছড়িতে গুপ্তচর সন্দেহে ভারতীয় নাগরিক আটক

1402327323.

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:

গুপ্তচর সন্দেহে বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তে এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করেছে ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয় ( বিজিবি) ।

গত ৮ জুন সন্ধ্যা ৭.০০ টায় সোমবার চাকঢালা সীমান্ত এলাকার আমতলা থেকে আটকের পর উক্ত ব্যাক্তিকে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় সোপর্দ করা হয়। স্থানীয় চাকঢালা বিজিবি সদস্যরা গোপন সংবাদে ভিত্তিতে ওই ভারতীয় নাগরিককে আটক করে ।

চাকঢালা বিওপির কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার আব্দু খালেক ওই ব্যক্তিকে আটকের পর বাদী হয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় পাসপোর্ট আইনের অবৈধ নাগরিক অনুপ্রবেশ আইনে মামলা দায়ের করে । । মামলা নং ০৪(০৯/০৬/২০১৪ইং) ।

জানা গেছে, জগলু সিং (৫০) নামে এক ব্যাক্তি বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের চাকঢালা এলাকায় ঘুরাঘুরির সময় গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চাকঢালা বিওপি টহলদল ঐ ব্যাক্তিকে আটক করে। সে নিজের নাম জগলু সিং প্রকাশ আরান্দা সিং ও তাঁর বাবার নাম মিটু সিং নাম উল্লেখ করলেও অন্য কোন তথ্য পাওয়া যায়নি । পুলিশের জিঞ্জাসাবাদে সে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের নাগরিক বলে জানায়।

বিজিবি আটকের পর ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞাবাদপূর্বক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান নাইক্ষ্যংছড়ি থানা অফিসার ইনচার্জ মো: রফিকুল ইসলাম ।

উল্লেখ যে,সম্প্রতি মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) সাথে সৃষ্ট সমস্যার পর মায়ানমার ও ভারত সীমান্ত এলাকায় গুপ্তচর নিয়োগ করে । গত সপ্তাহে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা থেকে এক মায়ানমার গুপ্তচরক নাগরিককে বিজিবি আটক করে উখিয়া থানা পুলিশের কাছে সোর্পদ করে ।