মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কৌশলগত ঘাঁটি আরাকান আর্মির দখলে।। আটক ১১

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:
সোমবার বিকেলে আরাকান আর্মি ঘোষণা করেছে, ৯ মার্চ একটি সংঘর্ষের পর তারা মিয়ানমার আর্মির একটি কৌশলগত অস্থায়ী ঘাঁটি দখল করেছে। উত্তর রাখাইনে বুথিডঙে সংঘটিত এই সংঘর্ষে আরাকান আর্মি ১১জন মিয়ানমার সেনা সদস্যকে যুদ্ধ বন্দি হিসেবে আটক করেছে।

আরাকান আর্মির মুখপাত্র উ খিন থুখা ইরাবতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটক সৈন্যরা
বর্তমানে আপার পেলেটাও শহরে মোতায়েনকৃত ৫ লাইট ইনফেন্ট্রি ডিভিশনের আওতাধীন এবং দক্ষিণ রাখাইন রাজ্যের গুয়া শহরে মোতায়েনকৃত ৫৬৩ লাইট ইনফেন্ট্রি ব্যাটালিয়নের সদস্য বলে জানা গেছে।

উ খিন থুখা জানিয়েছেন, আমরা তাদের খাবার দিয়েছি এবং তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করছি।
তিনি আরো বলেন, আরাকান আর্মির সিনিয়র অফিসাররা সিদ্ধান্ত নেবেন, আটক এই সৈন্যদের রেডক্রসের মাধ্যমে কোথায়, কখন ছাড়া হবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন অথবা অন্য কোনো সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।

সেনাপ্রধানের অফিসের মুখপাত্র এ হামলার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, বুথিডং শহরের বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমানায় কাঁটাতার বসানো একটি প্রকল্পের স্থানে ৯ মার্চ প্রায় ২০০ আরাকান আর্মির সৈন্যরা আক্রমণ করেছে। নির্মাণ প্রকল্পটি সীমান্তের ৬৭-৬৮ পিলারের মধ্যবর্তী অবস্থানে বলে তিনি জানিয়েছেন। এর চেয়ে বেশী জানাতে তিনি অস্বীকার করেছেন।

মিয়ানমার সরকার ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করেছে এবং এ পর্যন্ত ১২০ কি.মি. পর্যন্ত বেড়া নির্মাণ শেষ করেছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে পাচারের পথে এক কোটি ইয়াবা আটক

ডেস্ক রিপোর্ট:

মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে চলতি সপ্তাহে বেশ বড় দুটি ইয়াবার চালান আটক করেছে পুলিশ। মাগুয়ে প্রশাসনিক অঞ্চল ও রাখাইন রাজ্যের মংডু থেকে এ দুটি চালান আটক করা হয়। দুটি চালানে এক কোটির ইয়াবা বড়ি ছিল, যা বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছিল বলে গতকাল সোমবার জানিয়েছে পুলিশ।

আটক করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১২ কোটি টাকা। পুলিশের কর্নেল উইন কো কো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, চলতি বছর মিয়ানমারে এটি সবচেয়ে বড় মাদকের চালান আটকের ঘটনা। রাখাইনের মংডু এলাকার ইতিহাসে এত বড় মাদকের চালান এর আগে আটক হয়নি।

ইয়াবার মূল উপাদান মেথামফেটামিন। এটি বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে ‘মাদক’ হিসেবে নিষিদ্ধ। মেথামফেটামিন উৎপাদনকারী বিশ্বের শীর্ষ দেশ মিয়ানমার। মেথামফেটামিন দুই ধরনের। একটি দেখতে স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো; যা মাদকের দুনিয়ায় ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’ (বরফ) নামে পরিচিত। এই উচ্চ মানের মাদক মিয়ানমার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশের বাজারে যায়।

আরেকটি নিম্নমানের মেথামফেটামিন, যার সঙ্গে ক্যাফেইন মেশানো হয়। এটিই এ অঞ্চলে ‘ইয়াবা’ নামে পরিচিত। একে ক্রেজি মেডিসিন (পাগল ওষুধ) বা ‘ঘোড়ার ওষুধ’ বলা হয়ে থাকে। থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের বাজারে মিয়ানমারের ইয়াবা সবচেয়ে বেশি পাচার হয়ে থাকে।

মিয়ানমারের অধিকাংশ মাদক উৎপাদিত হয় পূর্বাঞ্চলীয় শান রাজ্যে; যা রাখাইনের অন্য প্রান্তে অবস্থিত। সহিংসতা-জর্জর ওই রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন গোষ্ঠী সেসব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। ওই অঞ্চলে পপি চাষ হয়। বিশ্বে আফগানিস্তানের পরে মিয়ানমারই সবচেয়ে বেশি পপি উৎপাদন করে। পপি আফিম ও হেরোইনের উপাদান।

শানের পপিঘেরা পাহাড়গুলো মেথামফেটামিনের গবেষণাগারের জন্য আদর্শ স্থান। কারণ মিয়ানমারেও এটি নিষিদ্ধ। চীন থেকে এর রাসায়নিক উপাদান বন্যার পানির মতো আমদানি হয়ে থাকে।

 

সূত্র: সাউথ এশিয়ান মনিটর

বান্দরবানের রুমা সীমান্তে ২ শতাধিক উপজাতীয় শরণার্থীর অনুপ্রবেশ!

নিজস্ব প্রতিনিধি:
বান্দরবানের রুমা উপজেলার রেমাক্রী প্রানসা সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর দুই শতাধিক শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে!

বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ নিয়ে সীমান্তের চাইক্ষাংপাড়ায় শরণার্থীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০৩ জনে। এই শরণার্থি দলের সদস্যরা রোহিঙ্গা বা মুসলিম নয়, খুমী ও রাখাইন, ধর্মে খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ।

তারা সবাই বর্তমানে সীমান্তের চাইক্ষাংপাড়ায় খোলা জায়গায় ত্রিপল টেনে তাঁবুর মতো করে বসবাস করছে। তীব্র শীতের মধ্যে শরণার্থীদের শিশু ও বৃদ্ধরা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

এদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৫০ জনের বেশী। এছাড়াও বম সম্প্রদায়ের প্রায় ১৫টি পরিবার রুমা সীমান্ত দিয়ে ঢুকে নিজ সম্প্রদায়ের বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।

বিজিবি ও স্থানীয়রা জানায়, মিয়ানমারের চীন রাজ্যের প্লাতোয়া জেলায় সম্প্রতি মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ আরাকান আর্মির সঙ্গে সে দেশের সেনাবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সীমান্তের ওপারে খামংওয়া, তরোয়াইন, কান্তালিন, এলাকাগুলোর বিভিন্ন পাড়ায় ব্যাপক গোলাগুলি এবং হেলিকাপ্টার থেকে বোমাবর্ষণ করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

ঘরে ঘরে তল্লাশি করে লোকজনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে সেনারা। আতঙ্কে শরণার্থীরা মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবানের চাইক্ষাংপাড়া, নেপুপাড়াসহ কয়েকটি পাড়ায় অবস্থানের জন্য অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির সদস্যদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় সীমান্তে আরো মিয়ানমারের উপজাতীয় শরণর্থিরা প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমারের চীন ও আরাকান প্র্রদেশের বিপুল পরিমাণ উপজাতি সম্প্রদায়ের লোক গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তারাও বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রুমা উপজেলার দুর্গম রেমাক্রী পাংসা ইউনিয়নের চাইক্ষাংপাড়ার অপর প্রান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরও মিয়ানমারের শরণার্থী অবস্থান করছে। তারাও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য অগ্রসর হচ্ছে। শরণার্থীদের পার্শ্ববর্তী এলাকার পাড়াগুলো থেকে খাদ্য দিয়ে সহায়তা করছে স্থানীয়রা।

এদিকে সীমান্তের শরণার্থীদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষেণ করতে সেখানে সেনাবাহিনী ও বিজিবির সমন্বয়ে একটি পর্যবেক্ষণ টিম পাঠানো হয়েছে। পর্যবেক্ষণটি টিমটি বুধবার ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে প্রশাসন। এ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকটি টহলদল সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বুধবার হেলিকপ্টারে সদস্যদের মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিজিবির কক্সবাজার রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহেদুর রহমান জানান, সীমান্ত এলাকায় শরণার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর টিম পাঠানো হয়েছে। শরণার্থীদের মনোভাব জানার পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন ও চীন রাজ্যে সেখানকার শক্তিশালী বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ আরাকান আর্মি সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি ও সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি স্থাপনায় হামলা করে। এরপর থেকে সেখানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে।

অপরদিকে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক সংঘর্ষের পর সেখান থেকে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়।

আরসার আক্রমণে মিয়ানমার পুলিশের তিন অফিসার আহত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, পার্বত্যনিউজ:

আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি(আরসা) ছোঁড়া আর্টিলারি গোলার আঘাতে তিন পুলিশ অফিসার আহত হয়েছে বলে মিয়ানমার সরকারের জেনারেল এমিনিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্ট দাবী করেছে। বৃহস্পতিবার(২৪ জানুয়ারি) সকাল ৭ টায় রাখাইন স্টেটের মংডু টাউনশিপের কাছে দুই ঘণ্টা ব্যাপী এক বন্দুক যুদ্ধে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে বার্মিজ অনলাইন ইরাবতি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরসার এটি দ্বিতীয় আক্রমণ বলে দাবী করা হয়েছে।

উত্তর মংডুতে মিয়ানমার সরকারের উ হ্লা তুন তিন নামের একজন মুখপাত্র ইরাবতি অনলাইনকে জানান, আরসার ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল বাংলাদেশ সীমান্তের ৪১ নং পিলারের নিকট দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে সীমান্ত থেকে ২০০ মিটার দুরের একটি পুলিশ পোস্ট আর্টিলারি গোলা বর্ষণ করে দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু কাছের পোস্ট থেকে অতিরিক্ত সৈন্য যোগদান করে ২ ঘণ্টা যুদ্ধের পর আরসার আক্রমণ রুখে দেয় এবং পোস্টটি দখলে রাখতে সমর্থ হয়। তবে এর মধ্যেই আরসার পোস্টটির বেশ কিছু কাঠামো ধংস করতে সক্ষম হয়।

এদিকে বাংলাদেশ সব সময়ই বলে আসছে, সে দেশের মাটিতে আরসা বা প্রতিবেশী কোনো ধরণের জঙ্গী গোষ্ঠীর আশ্রয় নেয়ার সুযোগ নেই। বর্তমান বাংলাদেশ সরকার সব ধরণের জঙ্গী তৎপরতার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কাজেই মিয়ানমারের ‘বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে আক্রমণের’ অভিযোগরে বাস্তবতা থাকতে পারে না। যদিও বাংলাদেশ সরকার অফিসিয়ালি এ ব্যাপারে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

উ হ্লা তুন তিন আরো বলেন, গত ১৬ জানুয়ারি মংডুর ওয়াট কিন গ্রামে আরসা সম্প্রতিকালে তাদের প্রথম আক্রমণ চালায়। মিয়ানমার ধারণা করেছিল, আরাকান আর্মি এই আক্রমণ করেছে। কিন্তু পরে তারা নিশ্চিত হয়েছে, আরসা এই আক্রমণে জড়িত ছিলো। এ আক্রমণে ৬ পুলিশ আহত হয়েছিল। তবে আরসার পক্ষ থেকে এই আক্রমণগুলো বা অভিযোগ সম্পর্কে এখনো কোনো জবাব দেয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মিয়ানমার সরকার আরাকান আর্মির আক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিদেশীদের সহায়তা ও সহানুভুতি পাওয়ার জন্য আরাকান আর্মির হামলাগুলোকে আরসার হামলা বলে চালিয়ে দিচ্ছে।

আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী

পার্বত্যনিউজ:

রাখাইন রাজ্যের বৌদ্ধ বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মিকে  সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।

সম্প্রতি গ্রুপটি বড় ধরনের একটি অভিযান পরিচালিত করার প্রেক্ষাপটে শুক্রবার(১৮ জানুয়ারি) এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সামরিক বাহিনী।

রাজধানী নেপিডোতে এক সংবাদ সম্মেলনে সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে নেত্রী আং সান সু চি নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, এই রাখাইনেই ২০১৭ সালে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী নৃশংস হামলা চালিয়েছিল। এতে করে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম পালিয়ে বাংলাদেশে যেতে বাধ্য হয়।

বিদ্রোহী গ্রুপটি অনেকদিন ধরেই কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে স্বায়াত্তশাসন দাবি করে আসছে।  ৪ জুন তাদের আক্রমণে ১৩ পুলিশ কর্মকর্তা নিহত ও ৯ জন আহত হয়।  মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট অফিসে ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়।

সু চি বলেন, আরাকান আর্মি কেবলমাত্র একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ। তাদেরকে পরাজিত করতে হবে দ্রুত ও সুস্পষ্টভাবে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর তথ্য কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল নিয়ি নিয়ি তুন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি তাদের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রাখার কথাও বলেন।

তিনি বলেন, সু চি বলেছেন, তিনি যদি আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করার নির্দেশ না দেন, তবে পাশ্চাত্য মনে করবে, মুসলিম বলেই ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে তিনি আরসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। কারণ উভয় গ্রুপই একই ধরনের অপরাধ করেছে।

বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযান চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, আরাকান আর্মির সাথে সামরিক বাহিনীর ২০১৫ সালে ১৫ বার, ২০১৬ সালে ২৬ বার, ২০১৭ সালে ৫৬ বার, ২০১৮ সালে ৬১ বার সংঘর্ষ হয়েছে।  তারা বলেন, চলতি বছর অন্তত আটবার তাদের মধ্যে মোকাবিলা হয়েছে। এই দলের গেরিলারা অন্য গ্রুপগুলোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ লাভ করে। বিশেষ করে কচিন রাজ্য থেকে তারা ভালো সুবিধা পেয়ে থাকে।

আরাকান আর্মি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালে। তাদের কয়েক হাজার সুসজ্জিত ও পোশাকধারী সদস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে রোহিঙ্গা গেরিলারা একেবারেই হীন অবস্থায় রয়েছে।

ডিসেম্বরে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ৫টি রাজ্যে যুদ্ধরীতি ঘোষণা করে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে রাখাইনকে রাখা হয়নি। কর্মকর্তারা বলেন, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাও মিন তুন বলেন, তিনি মনে করেন, আরাকান আর্মির সাথে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটবে না।

মিয়ানমার সীমান্তে তুমব্রু খালের সেতু সংস্কার নিয়ে উত্তেজনা

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার:

মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু খালে সেতু সংস্কার করা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে জানাগেছে। এতে নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের মাঝে আতঙ্কের কথাও জানাগেছে। এরই প্রেক্ষিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কর্মকর্তারা এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন।

সোমবার(১৪ জানুয়ারি) সকালে কক্সবাজার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম বায়েজিদ খান তুমব্রু সীমান্ত পরিদর্শন করেন বলে জানাগেছে।

তুমব্রু বাজারের কাছে নো-ম্যান্স ল্যান্ডের তুমব্রু খালের ওপর পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা নিয়ে গত কয়েক দিন থেকে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। স্থাপনাটি সেতু নাকি বাঁধ এটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ছিল অস্পষ্টতা। এছাড়াও আতঙ্ক দেখা দেয় নো-ম্যান্স ল্যান্ডে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে। এর প্রেক্ষিতে সোমবার বিজিবির কর্মকর্তারা এলাকাটি পরিদর্শন করেন।

বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল এস এম বায়েজিদ খান জানান, তুমব্রু খালের ওপর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কাঁটাতারের বেড়া সংস্কার করছে। খালের ওপর আগে কাঠের খুঁটি ছিল, সেটি পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেখানে আরসিসি পাকা পিলার দেয়া হচ্ছে। এটি কোনো সেতু বা বাঁধ নির্মাণ নয়।

তবে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে কেন তারা এটি নির্মাণ করছে তা জানতে চেয়ে সোমবার মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপিকে চিঠি দিয়েছে বিজিবি। সোমবার দুপুরের দিকে এ চিঠি দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে চিঠির জবাব আসলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বায়েজিদ খান জানান, বর্তমানে সীমান্তের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

তুমব্রু এলাকার ইউপি সদস্য আবদুর রহিম ও বাজার এলাকার স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন থেকেই খালের পাশে তারা (বিজিপি) পাকা স্থাপনা ও পিলার তৈরি করছে। এটির কারণে বর্ষা মৌসুমে পানিতে তুমব্রু বাজার ও কোনা পাড়া তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে এটি সেতু নাকি বাঁধ তা সঠিক করে বলা যাচ্ছে না।

স্থানীয়রা জানান,  এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তে বিজিবি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নো-ম্যান্স ল্যান্ডের রোহিঙ্গারা জানান, তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার আবারো সেনা টহল বাড়িয়েছে।

এদিকে, গত মাস থেকে বান্দরবান সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের আরাকান ও চিন রাজ্যে সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ আরাকান আর্মির সাথে দেশটির সেনাবাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। গোলযোগের কারণে রাখাইন রাজ্যের বুথিডং, রাথিডং ও মংডুসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন ও রোহিঙ্গারা আতঙ্কে নিরাপদ জায়গায় সরে যাচ্ছে। সেখানে গত কয়েকদিন থেকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

মেহেদী-হাসান-পলাশ1

মেহেদী হাসান পলাশ :

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য শাখের করাত। তিন দিকে ভারত পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের জন্য শ্বাস নেবার মুক্ত জানালা দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ২৭২ কি.মি. মিয়ানমার সীমান্ত। ভারতীয় আধিপত্যবাদী আগ্রাসী নীতি বিশেষ করে অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদী নীতির তুফানে বাংলাদেশের ‘খড় কুটো’ এই সীমান্ত তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ভারতকে এড়িয়ে স্থলপথে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগেরও একমাত্র বিকল্প এই সীমান্ত। অন্যদিকে মিয়ানমারের জন্যও ভারতের মূল ভূখ- হয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার স্থল যোগাযোগের সর্বোত্তম মাধ্যম বাংলাদেশ।

এই যখন অবস্থা তখন দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক মধুরেনু হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা দাবা খেলায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্কে কখনো বসন্ত বাতাসের হিল্লোল পরিলক্ষিত হয়নি। বরং পৌষী-শীতলতা এবং থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝঞ্ঝা পরিলক্ষিত হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিকভাবে বললে বলতে হয়, এর জন্য বহুলাংশে মিয়ানমারের জাতীয় নীতিই দায়ী। বাংলাদেশ-মিয়ানমার আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির প্রধান কাঁটার নাম ‘রোহিঙ্গা সমস্যা’। এটা এমন এক সমস্যা যা বাংলাদেশকে গিলতেও বাধছে, উগড়াতেও।

জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিবেশী দেশের লাখ লাখ শরণার্থী গ্রহণ সম্ভব নয় এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতি পূর্ণ একটি দেশে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর অবস্থানের মতো ভূমির অভাব প্রকট। তাছাড়া ইতোপূর্বে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তারা স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি করেছে। অফিসিয়ালি যাই বলা হোক, নব্বই দশক থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আগমন কখনো বন্ধ হয়নি। যখন ব্যাপকভাবে এসেছে কেবল তখনই গণমাধ্যমে ব্যাপক  ভাবে আলোচিত হয়েছে।

এর বাইরে প্রতিনিয়ত দুই চার পাঁচ জন করে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে সব সময়। এদের মধ্যে ৫০ হাজারের মতো রোহিঙ্গার শরণার্থী ক্যাম্পে ঠাঁই মিললেও বাকিরা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান নিয়েছে। অনেকে আবার বিভিন্ন সূত্রে সরাসরি সমাজে মিশে গেছে। যারা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছে তারাও ধীরে ধীরে ক্যাম্প থেকে সরে সমতলে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে ক্যাম্পের মধ্যে বসবাসকারীদের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর দেয়া আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা কাজের সন্ধানে সমতলে এসে মূল স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আগমন ও মূল স্রোত ধারায় মিশে যাওয়া নিয়ে স্থানীয় বাঙালিদের প্রবল বিরোধিতা রয়েছে। স্থানীয় বাঙালিদের অভিযোগ, যত্রতত্র রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে পর্যটন শহর কক্সবাজার এবং বিশেষ করে টেকনাফের সৌন্দর্য হারিয়ে নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশী টাকার মান বেশী হওয়ায় রোহিঙ্গারা কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে রাজি হওয়ায় স্থানীয় বাঙালি শ্রমিকেরা বেকারে পরিণত হচ্ছে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা অল্প মজুরিতে শ্রমিক পাওয়ায় বাঙালি শ্রমিকদের কাজে নিতে চান না। এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গা পিতামাতা তাদের কন্যাদের যে কোনোভাবে বাঙালি পুরুষের সাথে বিয়ে দিতে আগ্রহী হওয়ায় অনেক ঘরে দ্বিতীয়, তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে রোহিঙ্গা নারী ও কিশোরীদের প্রবেশ ঘটছে যা সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করছে।

সবচেয়ে বড় কথা, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা ও কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন স্থানে এটা লক্ষ্য করা যায়। এতে স্থানীয়দের মনে ক্ষোভ বাড়ছে। বাংলাদেশে চলে আসা রোহিঙ্গাদের একাংশ মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ আছে। অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশী শ্রম মার্কেট ভাগ বসাচ্ছে। এ ধরনের নানা কারণে স্থানীয় বাঙালিদের মধ্যে রোহিঙ্গা বিরোধী মনোভাব রয়েছে।

প্রশ্ন হলো, তারপরও রোহিঙ্গাদের এই চরম দুর্দিনে বাংলাদেশের পক্ষে কি সম্ভব ‘দরোজা বন্ধ করে’ বা ‘মুখ ফিরিয়ে থাকা’? কিংবা মুখ ফিরিয়ে থাকলেই কি আমরা পার পেয়ে যাবো? বাংলাদেশ তো চেষ্টা করেছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

কিন্তু বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। দুর্গম সীমান্ত, দুর্বল নিরাপত্তা প্রহরা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অসহায় রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। সংবাদপত্রের খবর, যতটা না গোপনে এসেছে, তার চেয়ে বেশী এসেছে স্থানীয় দালাল ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘুষ দিয়ে। সামাজিক গণমাধ্যমে এসব ঘুষ প্রদানের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। সামনে আরো আসবে তার আলামতও স্পষ্ট।

তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ব্যর্থ হলেও অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হলে চলবে না। কারণ এর সাথে বাংলাদেশের সুনামের প্রশ্ন জড়িত। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা বাংলাদেশে নির্যাতনের শিকার হয়। দালালদের হাতে পড়ে শিশুরা পাচার হয়। কাজের লোভ দেখিয়ে রোহিঙ্গা নারীদের পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। অনেক অভিভাবক ভবিষ্যতের শঙ্কা কাটাতে স্থানীয় বৃদ্ধদের সাথেও কিশোরীদের বিবাহ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয় না। রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা যেন কোনোভাবেই নির্যাতনের শিকার না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।

আরাকান শব্দটি এসেছে আরবী আল রুকুন শব্দ থেকে। তবে পি ফ্যায়রের মতে, প্রাচীন রাখাইং গোত্রের নামানুসারে এর নাম হয়েছে আরাকান। স্বাধীন আরাকান রাজ্যের শেষ রাজধানী ছিল ম্রোহাং। ম্রোহাংকে বাংলা কবিরা রোসাঙ্গ বলে অভিহিত করেছেন। এই রোসাঙ্গ থেকেই রোহিঙ্গা নামের উৎপত্তি। আরাকানে রোহিঙ্গাদের রয়েছে প্রাচীন ইতিহাস। প্রাচীনকালে আরাকান স্বাধীন রাজ্য ছিল। এর আয়তন ছিল ২০ হাজার কি.মি.। তবে বর্তমানে এর আয়তন ১৪ হাজার বর্গ কি.মি.।

প্রাচীনকালেই আরাকানে মুসলমানদের আগমন ঘটেছিল। তখন আগমন ঘটেছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে, কিছু জলদস্যু আক্রমণের শিকার হয়ে ও জাহাজ ডুবির শিকার হয়ে। পরবর্তীকালে মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে বিপুল পরিমাণ মুসলিম আরাকানে প্রবেশ করে স্থায়ী বসতি গড়ে।

পঞ্চদশ শতাব্দী আরাকানের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ শতাব্দীর শুরুতে আরাকান রাজ মিন সাউ মুন বার্মার উপর আক্রমণ পরিচালনা করে ব্যর্থ হন। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মা রাজ তার রাজ্য কেড়ে নিয়ে তাকে বহিষ্কার করলে তিনি বঙ্গদেশে চলে আসেন। বঙ্গরাজার সহায়তায় ১৪৩০ সালে রাজা মিন সাউ মুন কয়েক হাজার মুসলিম সৈন্যের সহায়তায় পুনরায় আরাকান গমন করেন এবং যুদ্ধে বার্মারাজকে পরাজিত করে পুনরায় রাজ্য উদ্ধার করেন। এ সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করে রাজা সুলাইমান শাহ নাম ধারণ করে রাজ্য পরিচালনা করেন। এ সময় আরাকান অনেকাংশে বঙ্গরাজের সালতানাতের অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

আরাকান রাজসভায় মুসলিম আমাত্যরা উচ্চপদ লাভ করেন। এদের একজন মাগন ঠাকুর। তার পিতা বড় ঠাকুর আল্লাহর কাছে অনেক মানত করে পুত্র লাভ করেন। তাই তার নাম মাগন রাখা হয়। মাগন ঠাকুর ইসলামের প্রথম খালিফা আবু বকরের (রা.) বংশধর। তার মন্ত্রিসভা অনেক বাঙালি কবি ও গুণী ব্যক্তি অলঙ্কৃত করেন। তাদের অন্যতম ছিলেন মহাকবি আলাওল। মাগন ঠাকুরের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। পদ্মাবতী, সতী ময়না লোর চন্দ্রানী, সিকান্দার নামা, সায়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, তোহফা, হপ্ত পয়কর প্রভৃতি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো এ সময় রচিত হয়।

১৭৮৫ সালে বর্মী রাজ বদা উপ্যা আরাকান দখল করে পুনরায় বার্মার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে নেয়। ব্রিটিশ সরকার আরাকানের জমিগুলো চাষযোগ্য করতে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে বহু লোক আরাকানে নিয়ে যায়। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ, মায়ানমারের মিনবিয়া এবং ম্রোক-ইউ শহরে রাখাইন জাতীয়তাবাদী এবং কারেইনপন্থীরা প্রায় ৫,০০০ মুসলমানকে হত্যা করে। ইতোমধ্যে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২০,০০০ মুসলমানকে হত্যা করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জাপানীরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্হ বার্মায় আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। জাপানীদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থী অস্ত্রধারী মুসলমানদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করে। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় মিত্রপক্ষকে সমর্থন করেছিল এবং জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল। জাপানীরা হাজার হাজার রোহিঙ্গারে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করেছিল।

এই সময়ে প্রায় ২২,০০০ রোহিঙ্গা সংঘর্ষ এড়াতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলায় চলে গিয়েছিল। জাপানী এবং বর্মীদের দ্বারা বারংবার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।

ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে যখন আদমশুমারি হয় তখন ব্রিটিশ সরকার রোহিঙ্গাদের গণনা করেনি। রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু সেখান থেকে। স্বাধীনতার পর মিয়ানমার সরকার জাতীয়তার তিন স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করায়। উইকিপিডিয়ার তথ্যে জানা গেছে জাতীয়, সহযোগী ও আনুগত্যশীল -এই তিন প্রকারের নাগরিকত্বের স্ট্যাটাস ঘোষণা করা হয়। যারা ব্রিটিশ শাসনের আগে এসেছে তাদের জাতীয় নাগরিক বলা হয়।

স্বাধীনতার পর সহযোগী ও আনুগত্যশীল নাগরিকদের আবেদন করতে বলা হলে রোহিঙ্গারা তাতে সাড়া দেয়নি। কারণ তারা আগে থেকেই সেখানে আছে। এই গণনার পরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে স্ট্যাটাসহীন হয়ে পড়ে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তার বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়।

বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।

১৯৭৮ সালে পরিচালিত কিং ড্রাগন অপারেশনে ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এদের মধ্যে ৩ লাখ জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দেশে ফিরে যায়, ২ লাখ সৌদী আরব, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশে চলে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন দাঙ্গায় প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে।

এদের মধ্যে ২ লাখ রোহিঙ্গা দেশে ফিরে গেলেও মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিতদের উপর অত্যাচার করা হচ্ছে এমন অভিযোগে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়ে যায়। তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় দুইটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। তবে এই ক্যাম্পের বাইরে আরো দুই লাখ রোহিঙ্গা নানাভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবী।

২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাতে মংডুর বেশ কয়েকটি বিজিপি ক্যাম্পে সন্ত্রাসীরা হামলা করে ৯ বিজিপি সদস্যকে খুন, ৬৪ আগ্নেয়াস্ত্র ও ১০ হাজার রাউন্ড গুলি লুট করে নিয়ে যায়। মিয়ানমার সরকার এই হামলার জন্য রোহিঙ্গাভিত্তিক স্বাধীনতাকামী সংগঠন আরএসওকে দায়ী করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের উপর হামলা শুরু করে। হেলিকপ্টার গানশিপ, মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে এই হামলায় ইতোমধ্যে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

এ ছাড়াও ১২ শত ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। শিশু ও নারীদের উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে। মিয়ানমারের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এই হামলার খবর শুরুতে অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্ন তথ্য উপত্তের মুখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে তাদের মতে, এটা রোহিঙ্গাদের জাতিগত দাঙ্গা।

এদিকে মিয়ানমারের নোবেল বিজয়ী নেত্রী সু চি এই হামলায় একেবারে নীরবতা পালন করায় বহির্বিশ্বে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে ব্যাপকভাবে। আসলে গণতন্ত্র আসলেও মিয়ানমার সরকার এখনো ব্যাপকভাবে সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেনাবাহিনীর লে. জে. পদমর্যাদার একজন অফিসার। সেনাবাহিনী সুকৌশলে সু চির আন্তর্জাতিক শান্তিবাদী ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করে দিচ্ছে এটা তিনি বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না।

মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা গণহত্যায় আন্তর্জাতিক বিশ্ব রহস্যময় ও বেদনাদায়ক নীরবতা পালন করছে। জাতিসংঘসহ কোনো কোনো সংস্থা মুখ খুললেও যতটা কঠোর হলে মিয়ানমারকে এই হামলা বন্ধে বাধ্য করা যেত তা তারা করছে না।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী ব্যারি গ্রসম্যান আমাকে মিয়ানমার সমস্যা ব্রিটিশের সৃষ্টি বলে দায়ী করে তা বন্ধে তিনটি উপায়ের কথা বলেন। তার মতে, এই মানবিক বিপর্যয় কাটাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে তিনটি উপায় অবলম্বন করতে হবে। ১. রোহিঙ্গা সমস্যাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ২. ইউরাথু ভিক্ষু ও তার ৯৬৯ আন্দোলনকে টেরোরিস্ট ঘোষণা করতে হবে এবং ৩. মিয়ানমারের থেকে সকল প্রকার সহায়তা বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত সকল প্রকার সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে হবে।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ওআইসি, আরবলীগসহ প্রভাবশালী মুসলিম দেশ ও সংস্থা সমূহের নীরবতা নীল কষ্টের মতো মেনে নেয়া যায় না।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বাংলাদেশ চাইলেই রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারবে না। রোহিঙ্গারা আসছে, অথচ বাংলাদেশ অফিসিয়ালি তা অস্বীকার করে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার দাবী করার সুযোগ হারাচ্ছে। শরণার্থীদের প্রতিপালনে আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। কাজেই অবলিম্বে সরকারীভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমণের সত্যতা স্বীকার করে সঠিক পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে।

রোহিঙ্গাদের আগমন বাংলাদেশের জন্য যতই দুর্ভার হোক মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের সাগরে ঠেলে দিতে পারে না। বাংলাদেশ বারবার ঘোষণা করেছে, এ দেশের মাটিতে প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসীদের কোনো প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কিন্তু রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী নয়, মানবিক বিপর্যয়ের শিকার এক জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশই পারে স্বল্প সময়ের জন্য রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।

সিরীয় শরণার্থীরা যখন ইউরোপে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল তখন আমরা ইইউ রাষ্ট্রগুলোর মানবিকতা প্রদর্শন প্রত্যাশা করেছি। আজ রোহিঙ্গাদের সাথে কেন আমরা একই মানবিকতা প্রদর্শন করবো না? বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেদিন ভারত আশ্রয় না দিলে বাংলাদেশীদের পরিণতি কি হতো তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের এই এক কোটি শরণার্থীই সেদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বিশ্বমঞ্চে কথা বলা সুযোগ করে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনা চাইলেই, বাংলাদেশের জন্য দুর্ভার হয়ে বসা লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রসঙ্গ টেনে ইস্যুটি নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কথা বলতে পারেন। এই শরণার্থীদের প্রতিপালনে ও ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইতে পারেন। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন। এতে বিশ্বনেত্রী হিসাবে তার ভাবমর্যাদা ভিন্ন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি পারেন না মানবিকতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নিজের ও দেশের জন্য গৌরবের সেই মহান উপলক্ষ হতে?
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

বিজিপি ফাঁড়িতে হামলা: নিহত ১৬

বিজিপি

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের মংডুতে অজ্ঞাতনামা গোষ্ঠির হামলায় মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ বিজিপির অন্তত ৯ জন সদস্য এবং ৭ জন হামলাকারী নিহত হবার পর টেকনাফে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা নেয়া হয়েছে।- বিবিসি।

মিয়ানমারের কর্মকর্তারা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলছেন, রোববার ভোররাতে রাখাইন প্রদেশের মংডুতে বর্ডার গার্ড পুলিশের তিনটি পোস্টে হামলা চালায়।

টেকনাফে বিজিবির কমান্ডিং অফিসার লেফট্যানেন্ট কর্নেল আবু জর আল জাহিদ জানিয়েছেন, রাতে গোলাগুলির শব্দ শোনার পর তারা দোভাষীর মাধ্যমে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী থেকেও তাদের জানানো হয়েছে যে তাদের কিছু আউটপোস্টে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে এবং সন্ত্রাসীরা যাতে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

স্থানীয় কিছু সূত্র বিবিসির বার্মিজ সার্ভিসকে বলেছে, এই হামলার সাথে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন বা আরএসও জড়িত রয়েছে। তবে মিয়ানমার সরকার থেকে এটি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।

তবে বাংলাদেশের একটি নিরাপত্তা সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্যনিউজকে বলেন, বর্তমানে আরএসও’র যে সামরিক শক্তি রয়েছে তাতে একসাথে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর এতোগুলো ক্যাম্পে হামলার সক্ষমতা রয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সূত্রের কাছে প্রাপ্ত তথ্য মতে, নাসাকা বাহিনী ভেঙে মিয়ানমার বিজিপি গঠন করে। এসময় নাসাকার সদস্যরা বিজিপিতে যোগ দিলেও সব নাসাকা সদস্য বিজিপিতে যোগ দিতে পারেনি। এই যোগ দিতে না পারা নাসাকা সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ রয়েছে। এই বিক্ষুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট নাসাকা সদস্যরা এ হামলা চালাতে পারে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলেও জানায় এই সূত্রটি।

সীমান্তের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সশস্ত্র হামলার পরপরই মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় জরুরী অবস্থা জারী করা হয়েছে। চলানো হচ্ছে ব্যাপক ধরপাকড়। শুরু হয়েছে রাখাইন এলাকায় দফায় দফায় দাঙ্গা হাঙ্গামা। বহু লোক নিহত হয়েছে বলে অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে।

সর্বশেষ খবরে জানা যায়, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের ৪৮ কিলোমিটার জুড়ে মায়ানমারের সেনাবাহিনী মোতায়েন সহ টহল দিচ্ছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বিজিবি বিষয়টি পর্যবেক্ষণ সহ বাড়তি নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত সতর্কাবস্থা জারি করেছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম এলাকায় অবস্থান করে আরএসও তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ করে মিয়ানমার।

এর আগে এবছরের মে মাসে টেকনাফের একটি আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা এবং ১১টি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি লুটের ঘটনায়ও আরএসও জড়িত ছিল বলে বাংলাদেশের পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।

বিজিবি ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করছে

bgb camp 3

মেহেদী হাসান পলাশ:

ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে নতুন বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট(বিওপি) নির্মাণ করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)। বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব সুসম্পর্কের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত এবং ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত ৬ টি বিওপি নির্মাণে ভারতের ভুমি ও সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিজিবির পুণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় এ নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। একই রূপরেখার আওতায় বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিওনের আওতায় দুইটি নতুন সেক্টর ও ৫ ব্যাটালিয়ান স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন করে ১০৪টি বিওপির মধ্যে ৫২টি বিওপি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্তের ২১৫ কি.মি. সীমান্ত সুরক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। শুরু হয়েছে বিজিবির এয়ার উইং। এর ফলে দূর্গম ও অরক্ষিত সীমান্তের অপরাধ এখন আগের থেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে বলে বিজিবি সূত্রের দাবী।

জানা গেছে, সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি বাংলাদেশের ৪,৪২৭ কিঃ মিঃ সীমানা দিবা-নিশি প্রহরার মাধ্যমে নিশ্চিত করছে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। ২০০৯ পিলখানার ভয়াবহ বিপর্যয়ের দুঃসহ স্মৃতি পেরিয়ে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখে বিজিবির সদর দপ্তর পিলখানায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিজিবি’র পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় বিজিবি’র নব অভিযাত্রা। সে সাথে শুরু হয় এ বাহিনী ঢেলে সাজানোর মহাযজ্ঞ। এর অংশ হিসাবে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে শুরু হয় বিজিবি’র ৪ টি রিজিয়ন এর আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড। এসময় খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, গুইমারা, বান্দরবান ও কক্সবাজার সেক্টর ও এর অধীনস্থ ইউনিটগুলো নিয়ে দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন সদর দপ্তর চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

bgb camp 1

দূর্গম পাহাড় ও অনিষ্পন্ন সীমান্তের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিওনের আওতাধীন ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি সীমান্ত অরক্ষিত ছিলো। ফলে অরক্ষিত এই সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, মানব ও মাদক পাচার, অপহরণ, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর স্বর্গরাজ্য ছিলো অরক্ষিত সীমান্ত। এ সকল অপরাধ দমনে বাংলাদেশ ও সীমান্ত সংলগ্ন অন্যান্য দেশগুলোরও দাবী ছিলো বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষিত করা।

সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিজিবি পূণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন, চট্টগ্রাম এর দায়িত্বপূর্ণ পাহাড় ও নদী বেষ্টিত ৮১০ কিঃ মিঃ সীমান্ত এলাকায় অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্ত এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু তদারকির লক্ষ্যে বর্তমান সীমান্ত চৌকির অতিরিক্ত সর্বমোট ১০৪টি নতুন বিওপি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

বিজিবি সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় সর্বমোট ৫২টি বিওপি’র নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২৯ টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ২৮১ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ১৩০ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ – মিয়ানমার সীমান্তে ২৩টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ১৯৮   কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ৮৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সর্বমোট ৪৭৯ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ২১৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষাসহ বিজিবি’র নজরদারী ও আধিপত্য বিস্তারের আওতায় আনা হয়েছে।

তবে বিজিবির এই নবযাত্রা কুসুমাস্তৃর্ণ ছিলো না। পদে পদে তাকে নানা প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে এগুতে হয়েছে। সূত্র মতে, পাহাড়ি এলাকায় বিওপি নির্মাণের জন্য সরকার কর্তৃক ৫ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিমালা রয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের বেশির ভাগ এলাকাই পাহাড়ি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ৫ একর জমিতে বিওপি স্থাপন করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কারণ পাহাড়ি ঢাল ও ভূমি বিন্যাসের ভিন্নতার কারণে জরুরী স্থাপনা সমূহও নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে সাধারণ জনগণ তাদের জমি অধিগ্রহণের জন্য বিজিবিকে হস্তান্তর করতে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। বিশেষ করে বিজিবির এই অগ্রসর ভূমিকার কারণে যেসমস্ত সীমান্ত অপরাধীদের তৎপরতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে তারা বিজিবি সম্প্রসারণের পথে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। অস্ত্রের মুখে, হুমকি, ধামকি দিয়ে সাধারণ পাহাড়ীদের বাধ্য করেছে বিজিবিরি প্রতিপক্ষ হতে।

ফলে এখনো খাগড়াছড়ি ও রাংগামাটি জেলার অনেক অবস্থানে বিওপি নির্মাণের জন্য বিজিবি কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়নি। ভূমি বিরোধের কারণে এখন পর্যন্ত বাঘাইছড়িতে অবস্থিত ৫৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপন করা সম্ভবপর হয়নি। এছাড়াও আলীকদমে ৫৭ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন তাদের ব্যাটালিয়ন সদর নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অথচ দেখা গেছে, দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিওপি স্থাপিত হলে নিকটস্থ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দারুণভাবে উপকৃত হয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, খাগড়াছড়িস্থ উত্তর লক্কাছড়া বিওপি সংলগ্ন উপজাতীয় পাড়ায় ডায়রিয়ার প্রকোপে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করলে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিওপিতে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। হেলিকপ্টার যোগে ক্যাম্পে জরুরী ঔষধ ও চিকিৎসক প্রেরণ করা হয়। বিজিবি’র সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে রুগীদের শুশ্রষা করে এবং এলাকাবাসীকে এক ভয়াবহ মহামারী থেকে উদ্ধার সম্ভব হয়।

সূত্রে জানা গেছে, বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত অধিকাংশ অবস্থানই দূর্গম পার্বত্য এলাকায় হওয়ায় অরক্ষিত সীমান্তে কিছু কিছু স্থানে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমি ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করা অত্যন্ত দুষ্কর। হেলিকপ্টার সহায়তা ব্যতীত সেসকল অবস্থানে নির্মাণ সামগ্রী কিংবা প্রাত্যহিক রশদ সামগ্রী প্রেরণ কষ্টকর।

অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্তে বিজিবি’র আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্মূলের অংশ হিসেবে বিজিবি কর্তৃক ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে দূর্গম পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় নতুন বিওপি স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়; যা যুগোপযোগী ও আধুনিক চিন্তা চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। বিজিবি’র অনুরোধে সরকার কর্তৃক প্রেরিত প্রস্তাবে ভারত সরকার উক্ত পরিকল্পনায় সম্মতি প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় দূর্গম পার্বত্য এলাকার অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার জন্য ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং ভারত দু‘দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গত ৬-৭ জুন ২০১৫ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় “নতুন প্রজন্ম নয়া দিশা” নামে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

bgb camp 2

ইতিমধ্যে ৬টি নতুন বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। অতিশীঘ্রই উক্ত বিওপি সমূহ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে। বিওপিগুলো হচ্ছে, খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় লাক্কাছড়া বিওপি, দিপুছড়ি বিওপি ও ডুপশিল বিওপি এবং রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাস্থ ৫৪ বিজিবি ব্যাটালিয়েনের আওতায় কাসালং-১ বিওপি, কাসালং-২ বিওপি এবং সাজচিলুই বিওপি।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে বিজিবি’র দুটি রেকিদল নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়, পরিবহন ও নির্মাণ কাজের প্রস্তুতির নিমিত্তে বাংলাদেশ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অংশে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

বিজিবির এই অগ্রসর অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্তে বিশেষ করে খাগড়াছড়ি সীমান্তের বিপরীতে যে সকল অংশে বিভিন্ন ভারতীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অরক্ষিত সীমান্তের সুযোগ নিতো, বর্তমানে ঐ সকল সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন বিওপি নির্মাণের ফলে সীমান্তে নজরদারী বৃদ্ধি পাওয়ায় সকল প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসএফ কর্তৃকও কোন প্রকার প্রতিবাদ করা হয়নি।

একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ পার্বত্য এলাকার বান্দরবান জেলার সীমান্ত এলাকার দক্ষিণাংশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া পাহাড়  এবং দূর্গম এলাকা। উঁচু পাহাড়ের গা ঘেঁষেই রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। ভুপ্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে বিগত ৪ মাসেরও কম সময়ে উক্ত দূর্গম এলাকায় বিজিবি কর্তৃক নতুন ৬টি বিওপি নির্মাণ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রায়ই আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী দলের আস্তানা কিংবা তাদের অবাধ চলাচলের ব্যাপারে বিজিবি কর্তৃপক্ষের কাছে তারা প্রতিবাদ লিপি প্রেরণ করতো। কিন্তু বর্তমানে উক্ত এলাকার বেশির ভাগ অংশে বিজিবি’র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন এ ধরনের পত্রালাপ অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। সে সাথে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত ও সূচিহ্নিত হয়েছে দু’দেশের সীমানা।

এদিকে বর্তমানে নতুনভাবে নির্মিত সকল বিওপিগুলোই হেলি সাপোর্টেড। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী সমূহের মধ্যে বিজিবিরই রয়েছে সর্বাধিক ৭৮ টি হেলি সাপোর্টেড ক্যাম্প। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো স্বল্পতার মধ্যেও বিজিবির বিওপিগুলোতে হেলি সহায়তা প্রদানে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, হেলির প্রয়োজনীয়তা ও দ্রুত সাপোর্ট নিশ্চিতের বিষয়টি বিবেচনা করে সদর দপ্তর বিজিবি হেলি উইং এর সকল অবকাঠামো সাতকানিয়ায় বিজিবি’র একমাত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বিজিটিসিএন্ডএস সংলগ্ন স্থানে ইতিমধ্যে স্থাপন করেছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ৫ জুন ২০১৬ তারিখ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর হেলি উইং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি। খুব শীঘ্রই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে নতুন হেলিকপ্টার সংযোজিত হবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে বিজিবি হেলি উইং কাজ শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।এতে নতুন বিওপি নির্মাণ কার্যক্রমসহ অপারেশনাল দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ হাবিবুল করিম পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে আর কোন সীমান্ত অরক্ষিত থাকবে না। বিজিবি’র বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ এর সার্বিক দিক নির্দেশনা ও সহায়তার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

ভূমি বিরোধের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিজিবির বিওপির স্থাপনে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, আশা করা যায় খুব শীঘ্রই এ সকল সমস্যা দূর করে ব্যাটালিয়নগুলো তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন করতে পারবে।

মিয়ানমারে নারী পাচারের অভিযোগে বান্দরবানে বৌদ্ধ ভিক্ষু আটক

ততততত

স্টাফ রিপোর্টার:

বিনা খরচে উপজাতীয় দরিদ্র মেযেদের শিক্ষার নামে বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে এসে মিয়ানমারে পাচার করার অভিযোগে  বান্দরবানে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আটক করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার দুপুরে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দির থেকে উঃ স্বীরি ভিক্ষু(৩৬) নামের এই বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আটক করেছে যৌথ বাহিনীর একটি দল।বর্তমানে তিনি বান্দরবান সদর থানায় আটক রয়েছেন।

উঃ স্বীরি ভিক্ষুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ১৪/১৫ জন উপজাতীয় দরিদ্র তরুণী মেয়েকে বিনা মূল্যে শিক্ষার কথা বলে মন্দিরে নিয়ে এসে পরে তাদের মিয়ানমারে পাচার করেছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, শুক্রবার জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তালুকদার পাড়া গ্রামের মংপ্রু হ্লা মারমা(৪২) থানায় অভিযোগ করেন যে, তার মেয়ে নুচিং মারমা(১৫) কে উঃ স্বীরি ভিক্ষু নামের এক ব্যক্তি বিনা খরচে লেখাপড়া করার কথা বলে গত ১০ জানুয়ারি কাপ্তাইয়ের মিতিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন উক্ত বৌদ্ধ ভিক্ষু রোয়াংছড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে আরো ১৪/১৫ জন উপজাতীয় তরুনীকে বিনা মূল্যে শিক্ষার কথা বলে মিয়ানমারে পাচার করে দিয়েছে। খবর শুনে তিনি উক্ত বৌদ্ধ মন্দিরে মেয়েকে দেখতে গেলে সেখানে তার মেয়েকে পাননি। ফলে তিনি মেয়েকে উদ্ধারের জন্য থানায় মামলা করেন। মামলা নং- ১/ ১১-৩-২০১৬।

vante

মামলা হওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে উঃ স্বীরি ভিক্ষুর অবস্থান সনাক্ত করে বান্দরবান জেলা পুলিশের নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর একটি দল কাপ্তাই থানা পুলিশের সহায়তায় মিটিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দিরে অভিযান চালিয়ে আটক করে। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উক্ত ভিক্ষুর বসতবাড়ির চারদিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দ্বারা সুরক্ষিত দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়।

সূত্র জানিয়েছে, উঃ স্বীরি ভিক্ষুর বাড়ি মিয়ানমার। তিনি সেদেশের পটুক জেলার ছাইংদাম থানার সিত্তিয়া পাড়া গ্রামের অং সুই উ মারমার সন্তান। তার মাতার নাম সাই আ প্রু মারমা। ২০০৪ সালে তিনি প্রথম মিয়ানমার থেকে কক্সবাজারের রামুতে এসে বসবাস শুরু করেন। এরপর ২০০৭ সালে বর্তমান স্থানে এসে বসবাস করেন। তিনি এখন এই মন্দিরের প্রধান ভিক্ষু। বাংলাদেশে অবস্থানে তার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। নিজেকে স্থানীয় নাগরিক দাবী করলেও তার কাছে কোনো পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয় পত্র পাওয়া যায়নি।

পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঃ স্বীরি ভিক্ষু জানান, মায়ানমারের মংন্ডু শহরতলীর কাছে নেজাদো মন্দিরে রোয়াংছড়ির ১১ জন মেয়েকে ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়ার হুয়াইক্ষ্যং দিয়ে ওপারে মেয়েদের পাঠান। তবে তিনি পাচার করেননি বলে জানিয়েছেন। তারা ফিরে আসবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বান্দরবান সদর থানায় শুক্রবার রাতে অভিযুক্ত ঐ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: রফিক উল্লাহ জানান, রোয়াংছড়ির তারাছাসহ বেশ কয়েকটি এলাকা থেকে ১৩/১৪ জন মারমা যুবতী মেয়েকে বিনা পয়সায় পড়ালেখা করানোর প্রলোভন দেখিয়ে কাপ্তাই এর মিতিঙ্গাছড়ি বৌদ্ধ মন্দিরে নিয়ে যায় বৌদ্ধ ভান্তে।

রোয়াংছড়ি থানার এসআই এবং উক্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মোস্তফা পার্বত্যনিউজকে জানান, আত্মরক্ষার জন্য উঃ স্বীরি ভিক্ষু একেক সময় একেক কথা বলছেন। ভিক্ষুটি এ পর্যন্ত ১৪/১৫ জন উপজাতীয় মেয়েকে মিয়ানমারে পাচার করেছে। তবে সে একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে এমনটা মনে করছেন না তিনি। তার মতে, উঃ স্বীরি ভিক্ষুর সাথে একটি বড় ধরণের চক্র কাজ করছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো নেটওয়ার্কের খোঁজ পাওয়া যাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

বোয়াংছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হ্লাথোয়াইহ্রী মারমা জানান, নিখোঁজ মেয়েদের অভিভাবকরা নিরূপায় হয়ে মানবপাচারের মামলা করেছে। একই সাথে ১৩ জন মেয়ে নিখোঁজ হওয়া রহস্যজনক বলে তিনি জানান।