বান্দরবানে মারমা স্বাস্থ্য কর্মীর লাশ উদ্ধার, আটক-১

Bandarban las pic-7.6

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির এলাকার ব্যাঙছড়ি সড়ক থেকে উপ্রু মারমা (২৩) বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকে স্বাস্থ্য কর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।

এ ঘটনায় সন্দেহজনক দেবং (বিজয়) তঞ্চঙ্গ্যা নামে এক যুবকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করছেন পুলিশ সুপার দেবদাশ ভট্টাচার্য্য।

স্থানীয় ও পুলিশ জানায়, শুক্রবার রোয়াংছড়ি বাজার থেকে অঞ্জয় পাড়া বাড়ী ফেরার মাঝ পথে কতিপয় দুস্কৃত তাকে ধর্ষণ শেষে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে। রাতে বাড়ী না ফেরায় পরিবারের লোকজন খোঁজাখুজি করে শনিবার সকালে ব্যাঙছড়ি সড়কের নারেসাতং পাহাড়ের পাদদেশে থেকে ঐ যুবতির লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। পরে লাশ উদ্ধার করা হয়।

রোয়াংছড়ি থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, গতকাল শুক্রবার ঐ যুবতী বাড়ী না ফেরায় পরিবারের লোকজন খোঁজাখুজির নারেসাতং পাহাড়ের পাদদেশে লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে বলে তিনি জানান।

উপ্রু মারমা বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকে স্বাস্থ্য কর্মীর পাশাপাশি অঞ্জয় পাড়া বেসরকারী আনন্দ স্কুলের শিক্ষকতা করতেন বলে পরিবার সূত্রে জানা যায়।

বান্দরবানে মারমা স্বাস্থ্যকর্মীর লাশ উদ্ধার, আটক-১

2412121356338274Untitled-2

স্টাফ রিপোর্টার:

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির এলাকার ব্যাঙছড়ি সড়ক থেকে উপ্রু মারমা (২৩) বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকে স্বাস্থ্য কর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা ধর্ষণ শেষে তাকে হত্যা করা হয়েছে।

 

 

এ ঘটনায় সন্দেহজনক বিজয় তঞ্চঙ্গ্যা নামে এক যুবকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার রোয়াংছড়ি বাজার থেকে অঞ্জয় পাড়া বাড়ী ফেরার মাঝ পথে ধর্ষন শেষে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ভবে পুলিশ সন্দেহ করছেন। আজ শনিবার সকালে ব্যাঙছড়ি সড়কের নারেসাতং পাহাড়ের পাদদেশে থেকে ঐ যুবতির লাশ উদ্ধার করা হয়।

রোয়াংছড়ি থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দু সাত্তার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, গতকাল শুক্রবার ঐ যুবতী বাড়ী না ফেরায় পরিবারের লোকজন খোজাখুজির নারেসাতং পাহাড়ের পাদদেশে লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে বলে তিনি জানান।

উপ্রু মারমা বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকে স্বাস্থ্য কর্মীর পাশাপাশি অঞ্জয় পাড়া আনন্দ স্কুলের শিক্ষকতা করতেন বলে পরিবার সূত্রে জানাযায়।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত!

kk

ডেস্ক নিউজ:

মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠী ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ভারতের উত্তরপূর্বাংশ বা দক্ষিণপূর্ব এশীয় তিব্বতি-বার্মা ভাষীদের চেয়ে তিব্বতি-বার্মা ভাষাভাষী এসব বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতের মূল ভূখণ্ডের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট উপাদান বিদ্যমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) ও সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি) এর একটি যৌথ গবেষণায় এ তথ্য  বেরিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নুরুন নাহার গাজী সুলতানা ও   সিএসআইআরের কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজের নেতৃত্বাধীন এ গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘পিএলওএস ওয়ান’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

সিএসআইআর-সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলেকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি)-এর কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজ বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নৃ-গোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা) বংশগতি নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ চালিয়েছি যারা তিব্বতি-বার্মা ভাষা বর্গের একটি  শাখা ভাষা কথা বলেন। ভারত ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী তিব্বতি-বার্মাভাষীদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে তাদের তথ্যের তুলনা করেছি। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, ভারতের উত্তরপূর্বাংশ বা দক্ষিণপূর্ব এশীয় তিব্বতি-বার্মা ভাষীদের চেয়ে তিব্বতি-বার্মা ভাষাভাষী এসব বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতের মূল ভূখণ্ডের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট উপাদান তাদের মধ্যে বিদ্যমান।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, সিনো-তিব্বতীয় ভাষা পরিবারের একটি ভাষা হচ্ছে তিব্বতো-বার্মা ভাষা। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উচুভূমিতে ও মায়ানমারের (পূর্বে বার্মা নামে পরিচিত ছিল) নিম্নভূমিতে তিব্বতো-বার্মা বর্গের ৪০০টি ভাষা প্রচলিত। প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ বার্মিজ ভাষায় ও ৮০ লাখ মানুষ তিব্বতি ভাষা কথা বলে।

নুরুন নাহার ‍গাজী সুলতানা ও থাঙ্গারাজের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বংশগতির সকল উপাদান (মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ, ওয়াই ক্রোমোজোম ও অটোজম) ব্যবহার করে বাংলাদেশের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও সাদৃশ্যে নিয়ে গবেষণা চালালেন।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল পূর্ব ভারত, উত্তর ও পূর্বাঞ্চল উত্তরপূর্ব ভারত দিয়ে ঘেরা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কিছুটা মায়ানমারের সীমান্তের সঙ্গে লাগোয়া। কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজ বলেন, বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থানই তুলে ধরে যে, এটি (বাংলাদেশ) ভাষা সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল।

তিনি জানান, বাংলাদেশের চতুর্দিকে বাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ওপর পুরোপুরিভাবে গবেষণা চালানো হলেও উপকূল ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চালানো হয়নি। ভারত ও মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসব নৃ-গোষ্ঠীর স্থানান্তর সম্পর্কেও বলা হয়েছে তাদের গবেষণায়।

দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশীয় জনগণের ওপর চালানো বংশগতি গবেষণাটিতে দেখা গেছে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে ভারতে খুব সম্প্রতি তিব্বতো-বার্মাভাষীদের বিস্তরণ হয়েছে।

সূত্র: বাংলানিউজ

বান্দরবানে আতশবাজির আলোর ঝলকানি, রং-বেরঙের ফানুস আর রথ টানার মধ্যদিয়ে ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে পালন

Bandarban roth 21.10

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আতশবাজির আর আলোর ঝলকানি, রং-বেরংয়ের বর্ণিল ফানুস, মহারথ টানাসহ বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে দিয়ে বান্দরবানের ৭টি উপজেলার বৌদ্ধ অনুসারী মারমাদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ওয়াগ্যোয়াই পোয়েঃ উৎযাপন করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবের মূল আয়োজন ছিল রোববার রাতে। সন্ধ্যার পর থেকে শহরের রাজার মাঠ ও মারমা পাড়াগুলোর আনাচে-কানাচে ফানুস উত্তোলনে মেতে উঠে মারমা’রা। শহরের প্রধান বৌদ্ধ ক্যায়াং (মন্দির) থেকে বিশাল আকৃতির রথ টেনে মধ্যম পাড়া এলাকার প্রধান সড়কে ঘুরানো হয়। রোববার মধ্যরতে শহরের সাঙ্গু নদীতে রথ বিসর্জন দেওয়ার মধ্যে দিয়ে ইতি টানা হয় মারমাদের বর্ণিল এই ধর্মীয় উৎসবের মূল আয়োজন। অন্যদিকে পাহাড়ের বৌদ্ধ অনুসারী বড়ুয়া’রা মারমাদের একদিন আগে এই উৎসব পালন করেন।

শহরের পুরাতন রাজবাড়ির মাঠ থেকে ‘ছংরাসিহ্ ওয়াগ্যোয়াই লাহ্ রাথা পোয়েঃ লাগাইমে’ (সবাই মিলে মিশে রথযাত্রায় যায়) মারমা’রা এই বিশেষ গানটি পরিবেশন করে মহারথ টানে মারমা তরুন-তরুনীরা। এ সময় পাংখো নৃত্য পরিবেশন আর রথ টানতে শত শত উপজাতিরা রাস্তায় নেমে আসে।
বৌদ্ধধর্মালম্বীরা রথে মোমবাতি জ্বালিয়ে ঈশ্বরের কাছে আর্শিবাদ কামনা করে। পার্বত্য জেলার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মারমা’রা ওয়াগ্যোয়াই পোয়েঃ নামে প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করে থাকে। আর এই উৎসব আনন্দে ভাসার জন্য বছরের এই দিনটির আগমনের জন্য মুখিয়ে থাকে মারমা সম্প্রদায়।

উৎসব উৎযাপন কমিটির সূত্র জানায়, এর আগে স্থানীয় রাজার মাঠে শত শত ফানুস উড়িয়ে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বীর বাহাদুর এমপি। উক্ত অনুষ্ঠানের অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় মন্ত্রনালয়ের সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহিদ খান, রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফ সিদ্দিকি, পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা, জেলা প্রশাসক কে এম তারিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার দেবদাস ভট্টাচার্য্, অতিরক্ত জেলা মেজিষ্ট্রট ঈসরাত জামান, জোন কমান্ডার কমান্ডার লে. কর্ণেল ইরফানুল ইসলাম, বিগ্রেড মেজর মশিউরসহ সরকারী-বেসরকারী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী বিভিন্ন শ্রেণীর জনগন উপস্থিত ছিলেন।

ওয়াগ্যোয়াই পোয়েঃ উৎযাপন কমিটির সভাপতি অংচ মং মারমা বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও নির্বিগ্নে ওয়াগ্যোয়াই পালন করছি। তবে অর্থের অভাবে ওয়াগ্যোয়াই পোয়ের আগের জুলুস হারিয়ে যাচ্ছে।
রোববার সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শহরের ধর্মীয় ক্যাং বা বিহারগুলোতে প্রার্থনা এবং ছোয়াইং দানের জন্য পূণ্যার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। রাতে মন্দিরে হাজার প্রদীপ বাতি জ্বালিয়ে মারমারা আনন্দে মেতে উঠে। মারমা অধ্যুষিত পাড়ায় পাড়ায় তৈরি করা হয় বিভিন্ন ধরনের পিঠা-পুলি।

গত ৯ অক্টোবর হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ওয়াগ্যোয়াই পোয়েঃ এর অনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়।  অনুষ্ঠানের শুভ উদ্ভোধন করেন বোমাং রাজা প্রকৌশলী উচ প্রু। গত শুক্রবার থেকে পাহাড়ের আকাশে বর্নিল ফানুসে ঢেকে যেতে শুরু করে। রোববার মধ্যরতে শহরের সাঙ্গু নদীতে রথ বিসর্জন দেওয়া হয় এবং এর মধ্যে দিয়ে ইতি টানা হয় মারমাদের বর্ণিল এই ধর্মীয় উৎসবের মূল আয়োজন।

বৌদ্ধ অনুসারীরা তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাস শেষ করে এবং শীল পালনকারীরা পূর্ণিমার দিনে বৌদ্ধ বিহার থেকে নিজ সংসারে ফিরে যান আর এই কারণে বৌদ্ধধর্মালম্বীদের কাছে এই দিনটি বেশ তৎপর্যপূর্ণ।

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ :
বান্দরবানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনজিও ব্যুরো। নির্দেশ পাওয়ার পরপরই ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ও কার্যালয়ের আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। বান্দরবান ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়স্থ এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বান্দরবান জেলায় ওয়ার্ল্ড ভিশন আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সে পত্র মোতাবেক বান্দরবান শহরের বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক কি কারণে বান্দরবানে তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো পক্ষই মুখ খুলছে না।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক এই এনজিওটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় উসকানী প্রদান, পক্ষপাতদুষ্টু কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী অধিবাসীরা। বিভিন্ন সরকারি ও গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে সেসব রিপোর্টে। সে কারণে পার্বত্য বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ধরনের এনজিওর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করে আসছিলো। ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবানে ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বা সরাসরি কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ তারই অংশ বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র উল্লেখ করেছে। শুধু ওয়ার্ল্ড ভিশন নয় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাকেই সরকার একে একে নিয়ন্ত্রেণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবান এডিপি ম্যানেজার টিমথি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, আশির দশকের আগে থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বান্দরবান জেলায় জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নবায়ন না করে বরং  কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর ফলে ওই মেয়াদের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যেই আমরা বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আরো জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতায় সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার বলেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাই বাংলাদেশে সরাসরি সংস্থাটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তবে ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় এনজিওর সাথে পার্টনারশীপে জনহিতকর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশনে ৮ জন কর্মকর্তা ও ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সীমিত আকারে বান্দরবান সদর উপজেলার সদর, কুহালং ও সুয়ালক এই তিনটি ইউনিয়ন ও বান্দরবান পৌরএলাকায় কৃষি বিষয়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও দুর্যোগকালীন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করে আসছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ২৮০ জন ওয়ার্ল্ড ভিশনের স্পন্সর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থিক ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছিল।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সংস্থাটির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসময় দেখা যায়, ওই মাঠে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাই এসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সরাসরি কর্মকাণ্ড বান্দরবানে বন্ধ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বান্দরবানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। একই সাথে তারা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অন্যসব এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এ খবরে আলোচ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিও’র কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা সরকারি আদেশ, বড় মাপের একটি সিদ্ধান্ত। বর্তমান সরকার বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। জাতীয় স্বার্থে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
 
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত না করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপণের ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার নানা ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সেখানে চিহ্নিত করে দেশবাসী বিশেষ করে গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের ‘আদিবাসী’ শব্দ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বর্তমান সরকারের এ দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সরাসরি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর সুফল ঘরে তুলতে পারেনি সরকার। এর কারণ সরকারের কিছু উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, মহাজোটের শরীক কিছু নেতার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড। সরকারের দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তিবর্গ এমন কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। জনসংখ্যা সীমিত হলেও জনবৈচিত্র্য বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সম্পদে সে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজার ও এর পদচুমে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বের দৃষ্টিতে লোভনীয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বশক্তির রয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও লোলুপ দৃষ্টি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সেনসেটিভ ভূখণ্ড এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেকারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কাছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুদুরপ্রসারী।
 
ooo 
 
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এডহক নীতি ও অনেকক্ষেত্রে খামখেয়ালীপনার ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির সময় যেমন পুনর্বাসনের কথা চিন্তা করেননি, ঠিক তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তৈরির সময় ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি মৃত আইন- হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়ালকে জীবিত করেছেন। এমনকি এ আইন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, কর্তৃত্ব ও সংবিধানকে সুবিবেচনা করা হয়নি। সে কারণেই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটে উচ্চ আদালত জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছেন। এরশাদের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে জেএসএস’র সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন সেই শান্তিচুক্তি করেছে বিএনপি তাকে ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষমতায় গেলে তা বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে প্রবল আন্দোলন করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও যখন শান্তিচুক্তি করেছে তখন সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের চেয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তিকেই হয়ত বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে আদালতের স্টে অর্ডারের স্যালাইন দিয়ে শান্তিচুক্তিকে এখন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে কিন্তু ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বাতিল করেনি, বরং তারাই এচুক্তি সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে।
 
‘আদিবাসী’ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে এক ধরনের সমর্থন ছিল সবসময়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও এই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগই। এ বিষয়ে ভারতীয় সমর্থন পাওয়ার ফলেই সরকারের পক্ষে এমন শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের পার্বত্য নীতি স্পষ্ট হলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক বন্ধু পাওয়া সম্ভব।(যদিও সিএইচটি নিয়ে ভারতের সব নীতিই আমাদের স্বার্থানুকূল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই)।  কিন্তু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে ঢালাওভাবে বহু নিরাপত্তা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন কার্যত পাহাড়ী চাঁদাবাজ, অপহরণকারী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেকারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদটি পাহাড়ীদের দখলে থাকলেও সচিব পদটিতে বাঙালি আমলার পদায়ন হয়েছে সব সময়। ফলে সরকারী কার্যক্রম ও নীতিতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মন্ত্রীর পাশাপাশি সচিব পদেও পাহাড়ী পদায়ন করায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যত, একটি ভারসাম্যহীন একপেশে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানে।
 
এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী নীতি পরিবর্তন হয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের সাথে সাথেও সেখানে নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২-৩ বছরের দায়িত্ব পালনকালে যে নীতি অনুসরণ করেন পরবর্তী কর্মকর্তা এসে তা সম্পূর্ণ উল্টে দেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও সহাবস্থান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা। আদালত শান্তিচুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বেশিরভাগই অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়ার পর ভূমি কমিশনও অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে, এমনটাই মতামত ছিল দেশের প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের। বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অতি আগ্রহে যখন ভূমি কমিশন একতরফাভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন স্বভাবতই বাঙালিরা ভূমি কমিশন বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দালন গড়ে তোলে। সেসময় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করলেন, সরকারেরও মুখ রক্ষা করা দরকার। ব্যাস, বাঙালিদের একটি অংশের হাতে ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের একটি ড্রাফট তুলে দিয়ে সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসিয়ে দিলেন। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা, সংবিধান, সরকারি কর্তৃত্ব, আদালতের এখতিয়ার বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠান বাতিল না হয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি হলো। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক নৈরাজ্য, বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। এমনও দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বপালনকালে কোনো এক সরকারী কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালবেসে এর উপর দুটি বই লিখে ফেলেন ছদ্মনামে। তথ্যবহুল ও গবেষণামূলক এই বইটি প্রচারে তখন সরকারীভাবে ব্যাপক প্রমোট করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বইটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ বইটিই অত্যন্ত মেধাবী এ কর্মকর্তার চাকুরী অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় প্রায় সকল সরকারী অফিসেই বইটি অনুসৃত হয়। এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভালবেসে কিছু করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতি না থাকার কুফল এটি।
 
সিএইচটি নিয়ে যে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ভারতের সেভেন সিস্টার্সও তার অন্তর্ভূক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সরকার সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সরাসরি কার্যক্রম বা ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বন্ধ করে দিয়েছে।  সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত সরকার বা ভারতীয় এনজিও। কিন্তু বাংলাদেশে এসব আন্তর্জাতিক এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কার্যক্রম ও অর্থ পরিচালনার কোনো হিসেব বাংলাদেশ সরকারকে দেয় না। এমনকি তাদের মিটিংগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ঢুকতে দেয় না। কেউ ঢুকলেও পরিচয় পেলে অপমান করে বের করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যান্য এনজিও ও দাতা সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাম্য। অথচ একই সময়ে সরকারের কোনো কোনা মন্ত্রী ইউএনডিপির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল বিতর্কিত দাতা সংস্থার কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধির জন্য ডিও লেটার পাঠাচ্ছে তাদের আবাসিক কার্যালয়ে এবং তা সাথে সাথে গৃহীতও হয়েছে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতির অভাবেই এমনটি ঘটছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদের কথাই কেবল দেশবাসী জেনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আট লক্ষাধিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড়জোর হাজার দশেক লোক এই বিভেদের সাথে জড়িত। এরা ইউপিডিএফ, জেএসএস’র সন্ত্রাসী ও মতলববাজ এনজিও কর্মী। বাকি সকল উপজাতি সদস্য কিন্তু শান্তিপ্রিয়, পাহাড়ী বাঙালি সহাবস্থানে বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। কিন্তু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য হয় সন্ত্রাসীদের সেখানো বুলি প্রচার করতে, তাদের গাইডেড পথে চলতে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাঙালীদের থেকেও বেশি ঘৃণা করে। কারণ বাঙালিদের থেকে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসের/ চাঁদাবাজির শিকার। সিএইচটিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা নানা কায়দার বিভেদ ছড়িয়ে দিয়ে একটি বাঙালী বিদ্বেষী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে অপচেষ্ট। অথচ এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়ে, ভালবেসে কাছে টানা হয়নি কখনো।বরং উপজাতি বলে সন্ত্রাসীদের পাল্লায় তুলে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভেদের দশভূজা জাগ্রত কিন্তু শান্তির বীণাপাণি নিদ্রা যায়। কোনো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সম্প্রীতি মিছিল চোখে পড়লেও সরকারী লোকেরা যেভাবে সে মিছিল চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে তাতে সম্প্রীতির থেকে সংশয় চোখে পড়ে বেশী।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে বেশি। এদের বেশিরভাগই মনে করেন বাঙালি ও সেনাবাহিনী সেখানে যত সমস্যার মূল। সন্দেহ নেই, তাদের বিভ্রান্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু সে বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা রাষ্ট্রিয় পর্যায় থেকে কি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে? ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে সেখানে মিডিয়া টিম পাঠানো হয়, বুদ্ধিজীবীদের কাউকে অনুরোধ করে লেখানো হয়। কিন্তু এ দেশের কতজন মানুষ জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে? কতজন জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অবস্থানের গুরুত্ব? কতজন জানে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কি করে? তাদের সেবা, ত্যাগ, কমিটমেন্টের কথা কতো জনের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে? কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে বলিউডে অনেক সিনেমা হয়েছে, হলিউডের কথা বললে তো একটি বই লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের অনেক ঘটনা গল্প ও ছবিকে হার মানায়। কিন্তু তার কথা দেশের কতজন মানুষ জানে। একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
 
কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো এডহক সিদ্ধান্তে সমাধান না খুঁজে একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি প্রণয়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ,  সিভিল ও সামরিক প্রশাসন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এ পার্বত্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে- যা সব সরকার ও সব ব্যক্তির জন্য অনুসরণযোগ্য ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখনই সময়। কারণ লেটার ইজ বেটার দ্যান নেভার।  
Email:palash74@gmail.com, সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব। (ইষৎ পরিবর্তিত)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

উপজাতিরা নয় বাঙালিরাই আদিবাসী – একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রফেসর ড. আবদুর রব

আদিবাসী, উপজাতি, ক্ষুুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী, পাহাড়ী, পার্বত্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূরাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড, আবদুর রব বলেছেন, এদেশে ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী উপজাতীয় জাতিসত্তাগুলো আমাদেরই অংশ, বাংলাদেশের নাগরিক, বাংলাদেশী। এদেশের সম্পদে-সম্মানে, বিপদে-সুদিনে, সমৃদ্ধিতে-সৌহার্দ্যে সবকিছুতেই তাদের রয়েছে সমান অধিকার। কিন্তু তারা কোনোক্রমেই এদেশের আদিবাসী হতে পারে না। এটা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক ও ভুল তত্ত্ব। এদেশের অকাট-মূর্খ পণ্ডিতদের (জ্ঞানপাপী) জানিয়ে দেয়া উচিত, কারা উপজাতি (Tribals) আর কারা আদিবাসী (Aboriginals) আর একই সঙ্গে তথাকথিত মানবাধিকারের ধ্বজাধারী বিদেশি আদিবাসী শক্তির এজেন্ট এনজিও চক্রকেও আদিবাসী উপজাতীয় বির্তক না ছড়াতে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দেয়া উচিত। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও মাত্র কিছুদিন পূর্বে এসব জাতিতাত্ত্বিক বিভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদ উস্কে দেয়ার জন্য অনেকগুলো খ্রিস্টবাদী এনজিও চক্রকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে ভারতীয় সরকার।

প্রশ্ন : আদিবাসী ও উপজাতি বিতর্কের কারণ কি?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : উপজাতি এবং আদিবাসী। আদিবাসী বলতে ইংরেজিতে Aboriginals বা   indigenous people-ও  বলে। উপজাতি হলো Tribe এটা উপনিবেশিক শব্দ। আমাদের দেশে বাঙালি মূলধারার বাইরে যারা আছে তারা আদিবাসী নয়। তাদের আমরা উপজাতি  বলতেও নারাজ। বরং তাদেরকে বলা যেতে পারে ethnic বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ।

নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস’রা হচ্ছেÑ ‘কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil।’ প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খর্বাকৃতির স্ফীত চ্যাপ্টা নাক কুঁকড়ানো কেশবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণের ‘বুমেরাংম্যান’রা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা যথার্থ এবোরিজিন্যালস। তারা ওখানকার ভূমিপুত্রও বটে। ঠিক একইভাবে মাউরি নামের সংখ্যালঘু পশ্চাৎপদ প্রকৃতিপূজারী নিউজিল্যান্ডের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সেখানকার আদিবাসী। আমেরিকার বিভিন্ন নামের মঙ্গোলীয় ধারার প্রাচীন জনগোষ্ঠী যাদেরকে ভুলক্রমে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (উত্তর আমেরিকা) বলা হয় এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা, আজটেক, মায়ান, আমাজানসহ আরো অসংখ্য ক্ষুদ্র বিল্প্তু কিংবা সঙ্কটাপন্ন (Extinct or Endangered Groups) জনগোষ্ঠীকে সঠিক ‘এবোরিজিন্যালস’ বলে চিহ্নিত করা যায়। তথাকথিত সভ্য সাদা, ইউরোপীয় নতুন বসতি স্থাপনকারী অভিবাসীরা (A New Settlers and Immegrants) ঐসব মহাদেশের আদিবাসীদের নির্মম বিদ্বেষ, হিংস্র প্রবঞ্চনা, লোভ আর স্বার্থপর আগ্রাসনের দ্বারা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোসহ সেন্ট্রাল ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, ফরাসি, পর্তুগীজ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী শক্তি বিগত ৩/৪টি শতক ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে জাতিগত নির্মূল তৎপরতার মাধ্যমে (Ethnical Cleansing) এসব মুক্ত স্বাধীন আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে পৃথিবী থেকে প্রায় নির্মূল করে দিয়েছে। আজ ঐ শ্বেতাঙ্গ মার্কিন, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলীয় এবং ইউরোপীয় তথাকথিত সুশিক্ষিত, ধ্বজাধারী সাবেক উপনিবেশবাদীদের নব্য প্রতিনিধিরা তাদের নব্য উপনিবেশবাদী অর্থাৎ তথাকথিত মুক্ত অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রসমূহের জন্য ‘আদিবাসী সংরক্ষণ’ (Conservation of Aboriginal)-এর ধুয়া তুলে তাদের অর্থের মদদপুষ্ট এনজিও এবং মিশনারী চক্রের সুনিপুণ প্রচারণায় ও ষড়যন্ত্রে উপজাতিগুলোর জন্য মায়াকান্না শুরু করেছে। আরম্ভ করেছে ভয়ানক সূক্ষ্ম সম্প্রসারণবাদী ষড়যন্ত্র আর আধিপত্যবাদী চাণক্য চাল।

এসব উপজাতি, আদিবাসী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর এই মায়াকান্নার পেছনে মূলত ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক, ভূ-অর্থনীতিক এবং সর্বোপরি আধিপত্যবাদী স্বার্থই প্রবলভাবে কাজ করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় প্রকৃত আদিবাসীদের তারা যেখানে গণহত্যা, জাতিগত নির্মূলসাধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেখানে তারা এখন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সম্ভাবনাময় স্বাধীনচেতা উঠতি শক্তিÑ বিশেষ করে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে এসব  উপজাতি (Tribals) ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পক্ষে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন, জাতিসত্তার বিকাশ, আদিবাসী সংরক্ষণ’ ইত্যাদির কথা বলে ভাষাগত, বর্ণগত, ধর্মগত, সাংস্কৃতিক বিভাজন ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রেক্ষাপট তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীদের ঐ হীন চক্রান্তের ফলশ্রুতিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ইত্যাদি এককালীন ঔপনিবেশিক শক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও আজ্ঞাবহ জাতিসংঘের (ইউএনও) সহযোগিতায় বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার যৌক্তিক সার্বভৌম অঞ্চল তিমুর দ্বীপের পূর্বাঞ্চলকে (ইস্ট-তিমুর) বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ইস্ট-তিমুরের এই বিচ্ছিন্নতার পেছনে আসলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাজ করেছে এবং এখানেও আদিবাসী, উপজাতি ইত্যাদি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে সর্বনাশা খ্রিস্টবাদী এনজিও চক্র, মিশনারি গ্রুপ এবং তথাকথিত মানবাধিকার সংরক্ষণ (Human Rights Activists) চক্র। এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র (Emerging Tiger of Asia) ২০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপের কাছের দক্ষিণেই হালকা জনসংখ্যা অধ্যুষিত শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত অস্ট্রেলিয়াসহ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং অস্ট্রেলিয়া এই কৌশলগত ও অবস্থানগত দুর্বলতাকে চিরতরে দূর করাতেই খ্রিস্টবাদী পরাশক্তিসমূহ জাতিসংঘকে ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে স্বাধীন করে দেয়। আর ঐ একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশেও একই খ্রিস্টবাদী সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের আধিপত্যবাদী ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে (Geo-Political and Strategical Interests) সংরক্ষণ ও চরিতার্থ করার জন্য তাদের সেই কৌশলকে বাস্তবায়িত করতে চাচ্ছে। এ জন্য তারা বেছে নিয়েছে দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা, মার্মা, ত্রিপুরা, মগসহ বিভিন্ন বসতি স্থাপনকারী উপজাতীয় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে। একই সাথে এই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের অর্থপুষ্ট এনজিও চক্র বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন : সিলেটের খাসিয়া, মণিপুরী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের গারো, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরের বনাঞ্চলের কুচ রাজবংশীয় বহিরাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এদেশের আদিবাসী বলে প্রচার-প্রপাগাণ্ডা চালাতে শুরু করেছে এবং এর মাধ্যমে এদের এসব সংশ্লিষ্ট বৃহদায়তনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভূমিপুত্র (Son of the Soil) বলে প্রতিষ্ঠিত করার এক হীন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে বাংলাদেশে বসবাসরত কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বরং তারা পার্শ্ববর্তী কিংবা বিভিন্ন দূরবর্তী স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসিত হয়ে ক্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করে আসছে। কিন্তু কোনোক্রমেই বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, খাসিয়া কিংবা কুচ রাজবংশীয় সাঁওতালরা এদেশের আদিবাসী হতে পারে না।

প্রশ্ন: তাহলে বাংলাদেশে  আদিবাসী কারা?

প্রফেসর ড. আবদুর রব :  বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরা। কারণ তারাই প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড ধারার বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র বা শংকর জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত সেখানে ককেশীয়, মঙ্গোলীয়, অস্ট্রিক জাতিধারার সাথে ভেড্ডাইট, নিগ্রোয়েড, দ্রাবিড়ীয় এবং অন্যান্য বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ ও নৃতাত্ত্বিক মিথষ্ক্রিয়া সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশে সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অনুদঘাটিত ও অজানা এবং স্মরণাতীতকালের হাজার হাজার বছর আগে থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই নদীবিধৌত পলল সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তাদেরকে অর্থাৎ বাঙালিরাই  Son of the Soil বা আদিবাসী বলা যায়। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষকবৃন্দই এ ব্যাপারে একমত।

প্রশ্ন: এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যে আদিবাসী নয় এর প্রমাণ কি?

প্রফেসর আবদুর রব : বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়Ñ তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Huchinson (1906) T H Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬), J. Jaffa (1989) এবং N Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হবার যুক্তি-প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগংএ লিখেছেন, ‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে  বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’ এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে, “A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

ব্যোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতার ফলে এদের অধিকাংশই বর্তমানে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। লুসাইরাও এখন অধিকাংশই খ্রিস্টান। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী মুরং। এদের বেশির ভাগই এখন পর্যন্ত প্রকৃতি পূজারী এবং এদের কোনো ধর্মগ্রন্থও নেই (Bernot, 1960) চাকমারা এখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ভাষার দিক দিয়ে তারা ত্রিপুরা, মারমা বা অন্য যে কোনো পার্বত্য জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এদের ভাষা এখন অনেকটা বাংলা ভাষার কাছাকাছি। মারমা (মগ)গণ আরাকানী বর্মীয় উপভাষায় কথা বলে এবং ত্রিপুরাগণ ত্রিপুরি তিব্বতিধর্মী উপভাষায় কথা বলে। বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ধর্মপ্রচারের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত-সংলগ্ন মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরার বেশিরভাগ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ঐ অঞ্চলে ঐসব বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মের ছত্রছায়ায় একত্রিত করে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্য ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাংশের যুক্তরাষ্ট্রে ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসরাইলের মতো একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

শুধুমাত্র ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান। এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহরীতি, আত্মীয়তা সম্পর্কে (Keenship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টনরীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত (Denise and Bernot, 1957)। পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলোর প্রায় সবাই যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতি স্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছ। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেব এদেশে প্রবেশ করেছে (Hutchinson, 1909, Bernot, 1960 and Risley, 1991)। বর্তমানেও এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992)। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙামাটি অঞ্চলে বাস করে। মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামে দণিাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দল বেঁধে থাকে। ম্রো, খ্যাং, খুমী এবং মুরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা। বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলোর সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসাবস করে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মণিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর-দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুণ্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রামণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মণিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া জয়ন্তী পাহাড়, মণিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অšে¦ষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে। নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না। ঠিক একইভাবে, ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানরা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড।  কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের আদিবাসী হতে পারে না। আরো বলা যায়, মাত্র ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’, সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোনো কোনো নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমনÑ ছোট নাগপুরের বীরভূম, সীঙভূম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চলÑ যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেব স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে।

একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বাসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকামণ্ডিত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ ও রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এরা সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেব বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলগুলোর আদিবাসী বা ভূমিপত্র হিসেব চিহ্নিত হতে পারে না। উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে একীভূত (Assemilated) হয়ে গেছে। এটা দোষের কিছু না বরং ভালো। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায়  এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোন্ বিবেচনায় ুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।

প্রশ্ন: : আদিবাসী ইস্যু নিয়ে বর্তমানে হৈচৈ-এর কারণ কি?

প্রফেসর আবদুর রব : আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেছি। তারপরও আরো একটু বলার তাগিদ অনুভব করছি। এর উত্তরে আমি বলবো তিমুরের দিকে চোখ তুলেন। পূর্ব তিমুর হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিকে থেকে ইন্দোনেশিয়ার জন্য। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিমরাষ্ট্র। বিশ কোটি জনসংখ্যার দেশ। এরমধ্যে ১৮ কোটি মুসলমান। এ মুসলমান দেশের উপস্থিতি মাত্র তিনকোটি মানুষের দেশ অস্ট্রেলিয়া হুমকি মনে করে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার উত্তরেই হলো ইন্দোনেশিয়া। আর অস্ট্রেলিয়ার নিকটতম দ্বীপ হলো তিমুর। ইস্ট তিমুর ছিল পুর্তগীজ কলোনি আর ওয়েস্ট তিমুর ছিল দাজ কলোনি। গোটা ইন্দোনেশিয়া দাজ শুধু ওয়েস্ট তিমুর ছিল পুর্তগীজ। এই ইস্ট তিমুরের জনগণকে খ্রিস্টান করে ফেলে তারা। আর ওয়েস্ট তিমুরসহ গোটা ইন্দোনেশিয়া মুসলমান। বালিতে কিছু হিন্দু আছে। পুর্তগীজরা চলে যাওয়ার পর তিমুর ইন্দোনেশিয়ার সাথে থাকতো পারতো। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া জিও পলিটিকসের মাধ্যমে এখাকার জনগণকে সংগঠিত করে বিদ্রোহকে উস্কে দিয়েছে। কারণ এখানে স্বাধীন ইন্দোনেশিয়া থাকলে যে কোন সময় ঘনবসতিপূর্ণ মুসলমানরা অস্ট্রেলিয়া দখল করে নিতে পারে এ আতংকে তারা এ ভূ-রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে জাতিসংঘের ব্যানারে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে,  ইউরোপের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর সাহায্যে পূর্বতিমুর নামে স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এখন সে রাষ্ট্র পাহারা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনী। সুতরাং ভূরাজনৈতিক কারণ এখানে নৃতাত্ত্বিক কারণের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ঠিক একইভাবে দেখুন সুদান বহুজাতি তাত্ত্বিক দেশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আফ্রিকার একটি বড় দেশ। সেটার দারফুর অংশে উপজাতির ভিত্তিতে মুসলমানদের বিভাজন সৃষ্টি করেছে। তারপর সবচেয়ে সম্পদ সমৃদ্ধ দক্ষিণ সুদান যেখানে রয়েছে তেল সমৃদ্ধ অ্যাবে অঞ্চল। এ অঞ্চলে আমেরিকার সিআইএ ও ইসরাইল অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। আশপাশের খ্রিস্ট রাষ্ট্রগুলো জনবল ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিয়ে গণভোটের নাটক মঞ্চস্থ করে স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরির নামে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। অপর দিকে পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেমন ফিলিপাইনের মুরোদের মিন্দানাও, সেখানে গোটা মিন্দানাও এর একটা অংশজুড়ে তারা। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা এখনকার কয়েকটা রাজ্যে যেমন সুলু মিন্দানাও, কিন্তু সেখানে তারা কোন স্বাধীনতা দিচ্ছে না। কাশ্মীরেও স্বাধীনতা দিচ্ছে না। ভাষা তাত্ত্বিক নৃতাত্ত্বিক সবদিক দিয়ে কাশ্মীরীরা আলাদা। সেখানে জাতিসংঘ ডাবলস্ট্যান্ডার্ড করছে। এভাবে চেচনিয়া, মিন্দানাওসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ ডাবলস্ট্যান্ডার্ড করছে। এসব দেশে গণভোট হলে সবাই স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিবে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে পূর্ব তিমুর ও সুদানের মতো ভয়ংকর খেলা চলছে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ তাদের গত টার্মে শান্তিচুক্তি করেছে, এতে কতটুকু লাভ ক্ষতি হয়েছে?

প্রফেসর আবদুর রব : আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি অবশ্যই জনমতের প্রতিফলন নয়। ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ এ কাজ করেছে তা ঠিক। কিন্তু এ বিষয়ের ওপর গণভোট হলে অবশ্যই ৯০ ভাগ মানুষ বিরুদ্ধে ভোট দিতো। এ চুক্তি আমাদের অস্তিত্ব সংবিধান ও স্বার্থের বিরুদ্ধে। এ চুক্তির কিছু কিছু ধারা এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার দু’বার ক্ষমতায় আসার পরও। পারবেও না। শান্তিচুক্তি যেদিন বাস্তবায়িত হবে সেদিন এখনকার অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাস্তহারা হবে। তাদেরে সন্তু লারমার সন্ত্রাসীরা বের করে দিবে। এ চুক্তি আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ৩৬,৩৮ ও ৪২ নং ধারার সাথে সাংঘর্ষিক।

প্রশ্ন: সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের যে সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার নিয়েছে, তা কতটা যুক্তিসংগত।

প্রফেসর আবদুর রব : সেনাবাহিনী এদেশের রক্ষক। সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনী সমূহ দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে। এখানে দুস্কৃতিকারীদের দু’টি গ্রুপ হয়ে গেছে তারা নিজেরা নিজেরা মারামারি হানাহানি করছে। প্রায় প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে, রক্ত ঝরছে। সন্তু লারমা গ্রুপ আর মানবেন্দ্র লারমার গ্রুপ শান্তিচুক্তির পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধ করছে।

এ অস্থিরতা এবং এদের রক্ষা করতে সেখানে সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। তাছাড়া এখানে আমাদের সীমান্ত আছে। এটা বিচ্ছিন্নতাবাদপ্রবণ এলাকা। এখান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার আমাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

এমনও রিপোর্ট আছে দেশের বাইরে থেকে ট্রেনিং নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা ঢুকছে। তাদের হাতে হাজার হাজার অস্ত্র আছে। এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে এসব অস্ত্রে ভারতের ট্রেডমার্ক রয়েছে। অতএব এমন একটা অঞ্চলে সেনাবাহিনী থাকতেই হবে। যদি সিলেটে, ঢাকায়, রাজশাহীতে সেনাবাহিনী থাকতে পারে সেখানে পারবে না কেন? এটা তো আরো গুরুত্বপূর্ণ ও বিপন্ন এলাকা। আমাদের দেশের দশভাগের একভাগ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য, আমাদের পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বনজ খনিজ সম্পদের নিরাপত্তার এবং উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অুণœ পাবর্ত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। সর্বোপরি সেখানে যারা বসবাস করছেন তারাও আমাদের দেশের সম্মানিত নাগরিক তাদের নিরাপত্তা দেয়া আামদের পবিত্র দায়িত্ব। সুতরাং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সংবিধানের অধীনেই সেনাবাহিনী এখানে থাকবে। যত সংখ্যক প্রয়োজন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যা করা দরকার করবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ভারত তার ১৪ লাখ সেনা সদস্যের ৬ লাখই কাশ্মীরে রেখেছে, ৪ লাখ রেখেছে উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। সেদেশে এ নিয়ে কেউ কোন কথা বলছে না। অথচ বাংলাদেশের বিদেশি মদদপুষ্ট একশ্রেণীর মিডিয়া এ নিয়ে হৈচৈ করে। এখান থেকে সেনাপ্রত্যাহর বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

প্রশ্ন : উপজাতিদেরকে আলাদা রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে আনার কোন প্রকল্প জাতিসংঘের আছে কি?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : ব্রিটিশের ১৮৯৯ অথবা ১৯০০সালের একটি এ্যাক্ট ছিল যে চট্টগ্রাম পাবর্ত্য অঞ্চলকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের শাসন কাজের সুবিধার জন্য এ এ্যাক্ট জারি করেছিল। আমাদের স্বাধীন দেশে আমরা বাংলাদেশের সকল নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। যারা সেই এ্যাক্টের আলোকে দেশের কোন অঞ্চলের অথবা অধিবাসীর আলাদা গুরুত্বের কথা বলেন তারা ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মূর্খের মতো এ কথা বলেন। সুতরাং এটার কোন ভিত্তি নেই। স্বাধীন দেশ চলবে তার সংবিধান অনুযায়ী। ঐ এ্যাক্টের দোহাই দিয়ে তাদের আলাদা স্ট্যাটাস দেয়া যায় না। বাংলাদেশ পৃথিবীর ঘন জনবসতি পূর্ণ দেশ। চট্টগ্রাম পাবর্ত্য এলাকা দেশের এক দশমাংশ অর্থাৎ ১৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার বা ৫ হাজার বর্গ মাইল। এখানে মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বসবাস করে। দেশের জনসংখ্যা অনুসারে সেখানে দুই কোটি মানুষ বসবাস করতে পারে।

 প্রশ্ন : আমার প্রশ্ন ছিলে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন আছে কিনা?

প্রফেসর ড. আবদুর রব :  আছে , তবে সেটা বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয় কারণ এখানে কোন আদিবাসী নেই। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, ভারত, নিউজিল্যান্ডসহ যেসব দেশে আদিবাসী আছে তাদের জন্য। তবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়, আলাদা স্ট্যাটাস দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা আদিবাসী  হিসেবে কোথাও স্বীকৃত নয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। কোন সরকারই করেনি। এরা আদিবাসী হলে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা মানতাম, কিন্তু আসলে এরা তো আদিবাসী নয়। বাংলাদেশে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাÑ যারা প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। তাছাড়া আর কেউ আদিবাসী নয়। সুতরাং জাতিসংঘের এ রেজুলেসন আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

কিছুদিন আগে জাতিসংঘের একজন রিপোর্টার এদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য কোন উৎসসূত্র থেকে ইতিহাস ঐতিহ্য, রাজনীতি, নৃতাত্ত্বিক বিষয় না জেনে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তা পক্ষপাতদুষ্ট, অজ্ঞানতা প্রসূত এবং ভুল। তিনি কিছু বিদেশী মদদপুষ্ট এনজিও এর প্রকাশিত বই ও বিভিন্ন সোর্স থেকে ভুল তথ্য পেয়ে তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ রিপোর্ট দিয়েছেন। তাদের সঠিকভাবে দালিলিক তথ্য প্রমাণ দিয়ে বুঝাতে হবে। আসল বিষয়টি তাদের সামনে উপস্থান করতে হবে। যাদের তারা আদিবাসী বলছে আসলে তারা সেটেলার। তার কথার প্রতিবাদ করাও হচ্ছে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এর প্রতিবাদ করে বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই।

আমিও বলছি বাংলাদেশে অভিবাসী এসব ক্ষুদ্রজনগোষ্ঠী আমাদের সমান নাগরিক সুবিধা সম্মান পাবে। জাতিসংঘের এ রেজুলেশন যেসব দেশে প্রকৃত আদিবাসী আছে তাদের জন্য।  কিন্তু কিছুতেই জাতিসংঘ ঘোষিত বাড়তি সুবিধা পেতে পারে না । কারণ তারা আদিবাসী নয়  অভিবাসী, বিভিন্ন দেশ থেকে এ দেশে এসেছে। শান্তিচুক্তিতে যে দেয়া হয়েছে সেটাও ভুল।

প্রশ্ন : কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি রিপোর্ট দেয়া হয়েছে সরকারের নিকট, পাবর্ত্য এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চলছে, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : সেনাবাহিনীর মেধাবী কর্মকর্তাগণ যে রিপোর্ট দিয়েছেন, অবশ্যই তা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করেছেন তা মোকাবেলায় অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। শান্তি বাহিনীর সদস্যরা ভারতে ট্রেনিং নিচ্ছে এবং সেখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র পায়। শান্তিবাহিনীর সদস্যরা ভারত থেকে এসে পুর্নবাসিত হয়েছে। তাদের হাতেও হাজার হাজার বাঙালি এবং ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর লোক মারা গেছে। আগে ষড়যন্ত্র হয়েছে এখনো হচ্ছে। শান্তি বাহিনীর সন্তু লারমা এখনো বিচ্ছিন্নতাবাদ চাচ্ছে। এদের উস্কে দিচ্ছে বিদেশিরা। কারণ এখানে খ্রীস্টান মিশনারীদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চলছে। কিন্তু ইসলামের দাওয়াতের কাজ নেই। যদিও বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছানো। কিন্তু সরকার এমন অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছে যে সেখানে তাবলীগ জামায়াতের কাজও নিষিদ্ধ। যদিও মুসলমানদেরকে এ এলাকায় মিশনারি কাজ করতে দেয়া গণতন্ত্রেরও দাবি, কিন্তু সরকার তা করতে দিচ্ছে না। খ্রিস্টান মিশনারিরা হাসপাতাল চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন জাতিসংঘের ইউএনডিপির আবরণে পাশ্চাত্য খ্রীস্টান এনজিও ধর্মান্তরের কাজ করছে। ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে। এখানকার মিজোরাম, মণিপুরের, নাগাল্যান্ড ৯০/ ৮০ ভাগ খ্রিস্টান। বাংলাদেশের এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর সেটেলারদের খ্রিস্টান করে এখানে এরা একটা খ্রিস্টান রাষ্ট্র করার পরিকল্পনা করছে। সেনাবাহিনী সে দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছে। পূর্ব তিমুরের মতো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এ বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন করতে সেনাবাহিনী এ্যাকশনে গেলে তারা বলবে অত্যাচার নির্যাতন করছে। কিন্তু আমি বলছি শুধু পাবর্ত্য কেন দেশের রাজশাহী, সিলেট যে কোন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সেনা বাহিনী কঠোর হাতে দমন করবে, এটাই স্বাভাবিক। তখন উচিত সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা। এমন কি ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর নাগরিককেও দেশের অখণ্ডতার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

প্রশ্ন: একশ্রেণীর মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে, এরা কারা?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : এক কথায় বললে এরা মূর্খ। এদের কারো এনথ্রোপলজি, সোসোলজি, ইতিহাস, ভূগোল এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও আদিবাসী উপজাতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। আর যারা জেনে বুঝে এ কাজ করছে তারা বিভিন্ন পারিতোষিক,বৃত্তি, উচ্চ বেতনের চাকরি প্রভৃতির লোভে করছে। প্রিন্ট ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা এনজিও কর্মীসহ বিভিন্ন  শ্রেণীর প্রভাবশালীরা লোভের বশে দেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এমন মিথ্যাচার করছে।

প্রশ্ন: দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কি?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : চট্টগ্রামের পাবর্ত্য এলাকা আমদের মোট ভূ-খণ্ডের দশভাগের একভাগ। এ এলাকায় জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে যারা উস্কে দিতে তারা জানে না ওখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী-ভাষাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক তিন দিক থেকেই অভিবাসী। বাংংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো  এখানকার  আদিবাসীও বাঙালিরা। তবে আমি মনে করি সকল নাগরিকের মতো এ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরাও বাংলাদেশের নাগরিক বাংলাদেশী। তারাও প্রত্যেক বাংলাদেশীর মতো সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত আমাদের এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র পবিত্র দায়িত্ব তাদেরও। বনজ সম্পদ, গ্যাসসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ, পানি সম্পদ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অফুরন্ত সম্পদের ভাণ্ডার এ এলাকায় পর্যটন শিল্প, স্কুল কলেজ নির্মাণ, হাসপাতাল, বিভিন্ন একাডেমী , ক্যাডেট কলেজ ও মসজিদ মাদরাসা নির্মাণ করে আরো ব্যাপক জনবসতি গড়ে তুলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় লেবাননের মাত্র একটি ভ্যালি বেকাভ্যালি যেখানে বাস করে ৪৮ লাখ, এর আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার।  আমাদের পার্বত্য  এলাকার আয়তন ১৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার, অথচ এখানে বাস করে মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লাখ লোক। এখানে চেংগুভ্যালি, সাংগুভ্যালি, মাতামুহুরিভ্যালি, কাচালংভ্যালিসহ ১২/১৩টি ভ্যালি আছে। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য এটা একটা সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বার। এ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন রিসোর্ট নির্মাণ করলে বাংলাদেশ বিশ হাজার কোটি টাকা অর্জন করতে পারবে। আমাদের বাজেটের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এখান থেকে আসতে পারে বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন।

সূত্র: সোনার বাংলা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ