মুক্তিযুদ্ধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভূমিকা

মাহের ইসলাম

পাহাড়িদের অবিসংবাদিত নেতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা’র নেতৃত্বের গুণাবলী এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেক পাহাড়িই এম এন লারমাকে জুম্ম জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বলে মনে করেন এবং শ্রদ্ধা করে। পার্বত্য সমাজে তার অবস্থান নিরূপণ করতে গিয়ে, উৎপল খীসা তার ‘ ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ: স্বপ্নের অপমৃত্যু’ বইয়ে মন্তব্য করেছেন, “সাধারণ চোখে তাঁকে নিয়ে জুম্মদের ভক্তি শ্রদ্ধা করার ধরণ, মাত্রা দেখলে মনে হয় যেন তিনি স্বয়ং এক দেবদূত – ঈশ্বর !” ( (খীসা উ. , ২০১৬, পৃষ্ঠা-১৫ দ্রষ্টব্য)।

প্রতিভাবান এই নেতার অনেক গুণাবলীর পাশাপাশি অন্যতম গুণ ছিল সুন্দর করে গুছিয়ে আবেগ মিশিয়ে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করার নিপুণতা। পার্বত্য চট্রগ্রামের পাহাড়িদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এম এন লারমার অবদান শুধু সুপরিকল্পিত ছিল তাই নয়, বরং অনেক দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই আন্দোলনকে সুসংগঠিত করেছিলেন। তার সবচেয়ে বড় অর্জন – পাহাড়িদের বোঝাতে সক্ষম হওয়া যে, অধিকারের আদায়ের জন্যে আন্দোলন এবং ত্যাগ স্বীকারের কোন বিকল্প নেই। 

১৯৬৯ সালে এল এল বি পাশ করলেও পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতা। মুলত পাহাড়িদের সংগঠিত করে তাদের মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যেই এ পেশা বেছে নেয়া। তবে, এডভোকেট হিসেবে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন ১৯৭৪ সালে গ্রেফতারকৃত পাহাড়ি নেতা চারু বিকাশ চাকমা’র মামলার আইনজীবীর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তৎকালীন পাহাড়ী নেতৃবৃন্দের মধ্যে দুই ধারা লক্ষণীয়। তন্মধ্যে এক দল ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়ের পক্ষে। তবে, অন্যদল, যাদের মধ্যে এম এন লারমা ছিলেন অন্যতম, সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জোর করে অধিকার আদায়ের পক্ষে ছিলেন। দ্বিতীয় পক্ষের মতে, “বন্দুকের নল থেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতা বেরিয়ে আসে। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়েই জোর করে বুর্জোয়া সরকারের কাছ থেকে অধিকার ছিনিয়ে আনা সম্ভব।” (ইব্রাহিম, ২০১১, পৃষ্ঠা-৮৬)।

বস্তুত এম এন লারমার এই মতাদর্শের প্রতিফলন শুধুমাত্র শান্তি বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হয়েছে তাই নয়। বরং পাহাড়ি ছাত্র সংঘের বিলুপ্তির সাথেও সম্পর্ক টানা যেতে পারে। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ পরবর্তী পরিস্থিতিতে উদ্ভুত রাজনৈতিক সচেতনতার প্রেক্ষিতে শিক্ষিত চাকমা যুবক সম্প্রদায় ১৯৬২ সালে ‘পাহাড়ী ছাত্র সমিতি’ গঠন করে। প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মধ্যে নিজেদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। ফলে এই সমিতি ‘পাহাড়ি ছাত্র সমিতি’ ও ‘পাহাড়ি ছাত্র সংঘ’ নামে দুই গ্রূপে বিভক্ত হয়ে যায়- যা ছিল যথাক্রমে এম এন লারমা এবং পংকজ কুমার দেওয়ানের অনুগত। 

এম এন লারমার সাথে অন্যান্যদের মধ্যে ছিলেন প্রীতি কুমার চাকমা, চাবাই মগ, উষাতন তালুকদার, রুপায়ন দেওয়ান প্রমুখ। অপরদিকে, পঙ্কজ কুমার দেওয়ানের সাথে ছিলেন নিবারণ চন্দ্র দেওয়ান, চাঁদ রায় প্রমুখ।

‘পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন’  গ্রন্থে উক্ত ঘটনাবলীর উপর আলোকপাত করতে গিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম মন্তব্য করেছেন, “পঙ্কজ কুমার দেওয়ান  লারমার সশস্ত্র আন্দোলনের পক্ষপাতি ছিলেন না। ……………. পরবর্তীতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শান্তি বাহিনী গঠন করলে বিভিন্ন হুমকি ও চাপের মুখে পাহাড়ি ছাত্র সঙ্ঘের বিলুপ্তি ঘটে।“ (ইব্রাহিম, ২০১১, পৃষ্ঠা-৭৩)।

১৯৫৬ সালে স্কুল জীবনেই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এম এন লারমা। ১৯৫৭ সালে অনুষ্ঠিত পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত, পাহাড়ি ছাত্র সমিতির নেতৃত্বের মাধ্যমে ১৯৬০ সাল হতেই নেতা হিসেবে তার পথ চলা শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে, তার নেতৃত্বেই ১৯৬২ সালের পাহাড়ি ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। রাস্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ১৯৬২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হয়ে দুই বছর জেল খাটেন তিনি। ১৯৬৫ সালে চট্রগ্রাম কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগে  বি এ পাশ করে, ১৯৬৮ সালে অর্জন করেন বি এড ডিগ্রী। ১৯৬৯ সালে এল এল বি পাশ করে আইনজীবী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন চট্রগ্রাম বার এ্যাসোসিয়েশনে। 

তবে জুম্ম জাতির মুক্তি আন্দোলনে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত করার অভিপ্রায়ে সহকারী স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাহাড়ি সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা এবং  শিক্ষকতার মাধ্যমে মানুষের কাছে যাওয়ার অনন্য সুযোগ কাজে লাগানো ছিল পেশা হিসেবে শিক্ষকতা বেছে নেয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে, ছোট ভাই সন্তু লারমাকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘হিল ট্র্যাক্টস টিচার্স এ্যাসোসিয়েশন’। পার্বত্য চট্রগ্রামের আন্দোলনে শিক্ষকদের অপিরিসীম ভুমিকার পিছনে লারমা ভ্রাতৃদ্বয়ের  অবদান তাই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। 

ভারতীয় উপমহাদেশের বিভক্তি পরবর্তী রাজনৈতিক জটিলতা ও পাকিস্তান সরকারের পাহাড়িদের প্রতি অবিশ্বাস পূর্ণ আচরণ, কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষোভ, ক্রমান্বয়ে শিক্ষিত হয়ে উঠা চাকমা সমাজে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক সচেতনতা ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে উপজাতীয় স্বাতন্ত্র এবং জুম্ম জাতির মুক্তির স্বপ্ন পাহাড়ের মানুষের মধ্যে গেঁথে দিয়ে, তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ফলশ্রুতিতে, ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। 

মুক্তিযুদ্ধে এম এন লারমার ভূমিকা নিয়ে দু’টি ভিন্ন ধারা লক্ষ্যণীয়। এক পক্ষের মতে, তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর, অন্যপক্ষের মতে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কোনো পক্ষাবলম্বন করেননি, বরং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। বিতর্ক এড়ানোর  অভিপ্রায়ে, সঙ্গত কারনেই, এখানে এই দুই ধারার দাবীদারদের শুধুমাত্র কিছু বইয়ের বক্তব্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন দাবীর সত্যতা প্রতিপাদন করার  ভার পাঠকের উপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর আছে বলে মনে হয় না।  

১৯৭৪ সালের ২১ মে তারিখে এম এন লারমার সাথে সাক্ষাৎকারের সুত্রোল্লেখ করে আফতাব আহমেদ এক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে, এম এন লারমা বাংলাদেশের স্বাধিকারের দাবীকে সমর্থন করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। তার আশা ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভবিষ্যতে পার্বত্য অঞ্চলের স্বায়ত্বশাসন অর্জনে সহায়তা করবে। (Manabendra supported the Bangalee autonomists and joined the liberation war in the hope that this would ultimately pave the way for the establishment of an autonomous CHT)।

এক নির্ভরযোগ্য চাকমা সুত্রের উল্লেখ করে, একই প্রবন্ধে তিনি এও উল্লেখ করেছেন যে, স্বাধীনতা যুদ্ধে মানবেন্দ্র পাহাড়িদের নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হন এবং কোনো পরিষ্কার অবস্থান গ্রহণ করেননি। তিনি স্বাধীনতার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেননি, আবার সমর্থনও করেননি। তার ভূমিকা ছিল পরস্পরবিরোধী। নেতৃত্বের সাথে মতভিন্নতায় আর সি পি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা পংকজ দেওয়ান, পূর্ব পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোরস (EPCAF) এ যোগদান করেন। (Manabendra failed to provide leadership to the pahadis and come up with a clear-cut stand on the liberation war. He neither opposed nor supported the liberation efforts. His role was ambivalent. Pankaj Dewan a co-founder of the RCP later differed with the leadership and joined the para-military EPCAF। (Ahmed, 1993)।

প্রদীপ্ত খীসা, তার পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা (১৯৯৬) বইয়ে জানিয়েছেন যে, একাত্তরে পার্বত্য চট্রগ্রামের প্রগতিশীল ছাত্র নেতাদের তত্বাবধানে রাঙামাটি কলেজ মাঠে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে স্থানীয় ছাত্র ও যুবকদের ট্রেনিং শুরু হয়েছিল। সে প্রশিক্ষণের সাথে এম এন লারমা প্রত্যক্ষভাবে  জড়িত ছিলেন।  (খীসা প. , পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, ১৯৯৬)।

বিপ্লব রহমান তার ‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ (২০১৫) বইয়ে উল্লেখ করেছেন, “মং রাজা মং প্রু সেইন, কে কে রায় ও এম এন লারমা প্রমুখ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁরা তরুণ পাহাড়িদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য সংগঠিত করার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। (রহমান ব. , ২০১৫, পৃষ্ঠা-২২)। 

তবে আরেক দল গবেষক এবং লেখকের মতে, এম এন লারমা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখেছিলেন। এই ধারার বক্তব্য ফুটে উঠেছে, সিদ্ধার্থ চাকমা (১৯৮৬),মিজানুর রহমান শেলী (১৯৯২),খালেদ বেলাল (১৯৯২), সৈয়দ মুর্তাজা আলী ( ১৯৯৬), মাহফুজ পারভেজ (১৯৯৯), জামাল উদ্দিন (২০১৪), মেজর জেনারেল (অবঃ)  ইবরাহিম, বীর প্রতীক (২০০১), আতিকুর রহমান ( ২০০৭) প্রমুখের লেখনীতে। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এম এন লারমার ভূমিকা নির্ণয় করতে গিয়ে মেজর জেনারেল ইবরাহিম (অব.) জানিয়েছেন, “ পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা মুক্তিযুদ্ধে উপজাতীয়দের ভূমিকা কি হবে বা কি হওয়া বাঞ্ছনীয় – এ প্রসঙ্গে পরিস্কার বক্তব্য  রাখতে ব্যর্থ হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকেন।”

সিদ্ধার্থ চাকমাকে (১৯৮৬) উদ্ধৃত করে ইবরাহিম আরো জানিয়েছেন, “তিনি এসময় নিজের সংগঠন মজবুত করতে এবং উপজাতীয় জনগণের মাঝে সংগঠন বিস্তৃত করতেই ব্যস্ত ছিলেন” (ইব্রাহিম, ২০১১, পৃষ্ঠা-৭৮)।

মুক্তিযুদ্ধকালীন এম এন লারমা’র ভূমিকা নিয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি, এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়। তন্মধ্যে পার্বত্য অঞ্চল ও পাহাড়িদের নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে, এমন স্বনামধন্য কিছু ব্যক্তিও রয়েছেন। বস্তুত, তুমুল জনপ্রিয় একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ‘নিরপেক্ষ’ ভূমিকা উল্লেখ করার চেয়ে কিছু উল্লেখ না করাই শ্রেয় মনে করে অথবা তাঁর উল্লেখযোগ্য ভুমিকা না থাকায়, এমনটি ঘটার সম্ভাবনা থাকতে পারে। 

গোলাম মোর্তোজা তার ‘শান্তিবাহিনী : গেরিলা জীবন’ (২০১০), বইয়ে এম এন লারমার জীবনের উল্লেখযোগ্য সমস্ত ঘটনাবলী উল্লেখ করলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি। বস্তুত, ১৯৫৬ সাল থেকে সংঘটিত সকল ঘটনাবলী উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি ১৯৭০ এর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের পরেই ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের গণ পরিষদের অধিবেশনের ঘটনা তুলে আনেন। 

 জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা লিখিত ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ’ (১৯৯৩) বইয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্রগ্রাম’ অধ্যায়ে চাকমা রাজ পরিবারের সদস্য কে কে রায় এবং মং রাজা মং প্রু সাইনের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা বিধৃত হয়েছে। তিনি ত্রিদিব রায়ের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভুমিকারও উল্লেখ করেছেন। তবে, তিনি অন্য কারো নাম উদ্ধৃত করে বিশেষত এম এন লারমার ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি।  

উল্লেখ্য যে, তিনি জানিয়েছেন,  “মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয় ছাত্র ও যুবকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করে । (চাকমা জ. ব., ১৯৯৩, পৃ. ৪৫)।

আমেনা মহসিন কর্তৃক পার্বত্য চট্রগ্রামের উপর লিখিত গবেষণা গ্রন্থ ‘দি পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজম’ ( ২০০২) বইটি  শুধুমাত্র তথ্যবহুলই নয় বরং অন্যতম বহুল প্রচলিত একটি বই। এই বইয়ে তিনি  মন্তব্য করেছেন যে, পাহাড়িরা সাধারনভাবে কোন পক্ষাবলম্বন করেনি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতাও করেনি। তবে, তিনি এম এন লারমার ভূমিকা নিয়ে আলাদাভাবে কিছু উল্লেখ করেননি। 

শরদিন্দু শেখর চাকমা তার ‘পার্বত্য চট্রগ্রামের সেকাল একাল’ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন তিন সার্কেল চীফ, জেলা প্রশাসকসহ অন্যান্য অনেকের ভূমিকা উল্লেখ করলেও এম এন লারমার ব্যাপারে কিছু বলেননি। 

ত্রিদিব রায়ের উপর লিখিত গবেষণাগ্রন্থ ‘দি লাস্ট রাজা অব ওয়েস্ট পাকিস্তান’ (২০১৬) বইয়ে  প্রিয়জিত দেবসরকার ত্রিদিব রায়ের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কার্যকলাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পাশাপাশি, মুক্তিযুদ্ধে  চাকমাদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে বলেন, “সাধারণ চাকমারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক এবং প্রতি সহযোগিতাপরায়ণ ছিলেন।“ উদাহরণ টানতে গিয়ে কায়েথিং (কক্সবাজার সিটি কলেজের অধ্যক্ষ), মান রি প্রু (মহেশখালী দ্বীপের রাখাইন উন্নয়ন সম্প্রদায়ের সহ-সভাপতি, রতন বড়ুয়া (রাঙামাটি পার্বত্য জেলা মুক্তিবাহিনীর জেলা উপ-অধিনায়ক), উকে চিং প্রমুখের নাম উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে, উকে চিং এর ‘বীরবিক্রম’ খেতাব প্রাপ্তির প্রেক্ষাপটও তিনি উল্লেখ করেছেন। তবে, এম এন লারমা’র ব্যাপারে কোন কিছু উল্লেখ করেননি। (দেবসরকার-২০১৬)।  

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের পাকিস্তানের পক্ষে চাকমা যুবকদের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণে প্রেক্ষাপটে অনেক চাকমা যুবক রাজাকার, সি এ এফ ইত্যাদি বাহিনীতে যোগ দিলেও, এম এন লারমা এর বিরোধিতা করেননি। অথচ তিনি একজন নির্বাচিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি ছিলেন। 

সহজেই অনুমেয় যে, তৎকালীন একজন নির্বাচিত জন প্রতিনিধি ও অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে তিনি পাহাড়ীদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উৎসাহিত না করলেও অন্তত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা  বা পাকিস্তান বাহিনীকে সহায়তা করতে নিষেধ করতে পারতেন । এতে অন্তত দু’টো লাভ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল – ত্রিদিব রায়ের প্ররোচনায় চাকমা যুবকেরা দলে দলে রাজাকার আর সি এ এফ বাহিনীতে যোগ দিত না এবং পাহাড়িদের গায়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীর তকমা লাগতো না। আর, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে তার গ্রহণযোগ্যতা বেশী থাকত। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ত্রিদিব রায় বিশ্বাস করতেন, “পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক আমলাতান্ত্রিক কতৃপক্ষ নির্দয়ভাবে বাঙালিকে দমন করবে। তার অনুমান ছিল ভারত সরাসরি এই দ্বন্দ্বে যুক্ত হবে না। সে কারণে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বিজয় অনেকটা সুনিশ্চিত। ” (দেবসরকার, ২০১৬, পৃষ্ঠা-৯৬)।

সুতরাং, চাকমা যুবকদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী  ভুমিকায় প্রতিরোধ না করার পিছনে কি কারণ ছিল, তা জানার উপায় নেই। তবে,  এম এন লারমার বিশ্বাস কি ছিল সেটা না জানা গেলেও তার গৃহীত পদক্ষেপ কিন্তু ত্রিদিব রায়ের বিশ্বাসের সমর্থক বলা যেতেই পারে। তাই, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরপরই পার্বত্য চট্রগ্রামে যে পাহাড়িবিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল সেটা প্রতিরোধে তার নির্লিপ্ততার দায় কিছুটা হলেও অস্বীকার করার উপায় নেই।

এম এন লারমার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং প্রতিভা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। তাই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন এবং পার্বত্য অঞ্চলের গণমানুষের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয়তার প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবেন – এমনটা বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন।

গোলাম মোর্তোজার ভাষায়, “পাহাড়ি জাতির নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন। এই প্রতিরোধ গড়ার কাজে হুট কর বেপরোয়াভাবে কোনো সিদ্ধান্ত তিনি নেননি। তিনি তার প্রতিভার প্রমাণ রেখে গেছেন কৃতকর্মে। “ (মোর্তোজা, ২০০০,পৃষ্ঠা-২৪)।

এই সব বিবেচনায় অনুমেয় যে,  বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের দীক্ষায়  দিক্ষীত মুক্তিযোদ্ধারা যখন পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর তাদের স্থানীয় দোসরদের বিরুদ্ধে  মরণপণ লড়াইয়ে লিপ্ত,  এম এন লারমা তখন কোন পক্ষকে সমর্থন করেননি।  বরং নিবেদিত ছিলেন জুম্ম জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটানো এবং পাহাড়ি জাতির মুক্তির স্বপ্ন  বাস্তবায়নের প্রস্তুতি গ্রহণে।

যার প্রতিফলন ঘটেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরেই পার্বত্য চট্রগ্রামের জন্যে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে। বস্তুত স্বাধীনতা উত্তর কিছু ঘটনাবলী এই ধারণাকে আরো দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে। যা আতিকুর রহমান তার পার্বত্য তথ্য কোষ, তৃতীয় খন্ডে (২০০৭) তুলে ধরেছেন, এভাবে, 

“১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে লারমা জিতে যান। জয়ের সাফল্যে ঐতিহ্য প্রীতি ও স্থানীয় আধিপত্য লাভের আকাঙ্ক্ষা আরো জোরদার হয়ে ওঠে। কিন্তু আকস্মিক সংঘটিত স্বাধীনতা যুদ্ধ, তাদেরকে সাময়িক স্তম্ভিত করে দেয়। তবে উক্ত বিরতিকালেও নতুন উৎসাহের সংযোগ ঘটে। তারা মিজো স্বাধীনতাকামী ও স্থানীয় উপজাতীয় রাজাকারদের সংস্পর্শে আসেন। রাজনৈতিক সশস্ত্র আন্দোলনের একটি শিক্ষা ও সূত্র তাদের নাগালে এসে যায়। 

পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ায়, অসহায় রাজাকার ও মিজো বাহিনী, বিমুঢ অবস্থায় পতিত হয়। লারমা ও তার সহযোগীগণ এই সুযোগে তাদেরকে রাইংখ্যং বনের সীমান্তবর্তী বিতর্কিত এক জুম ক্ষেত্রে আত্নগোপন করার সুযোগ করে দেন, যে ক্ষেত্রটি বার্মা ও মিজোরামের সংযোগস্থলে অবস্থিত। তথাকার বেআইনি চাকমা জুমিয়াগণ নিজেদের জুম ও বসতি  রক্ষার জন্যে সংসদ সদস্য লারমার উপর নির্ভরশীল ছিল। লারমা প্রেরিত মিজো ও রাজাকারদের আগমনকে তারা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি ধরে নেয় এবং ঐ বাহিনীদ্বয়ের আশ্রয় ও রসদ যোগাতে নিয়োজিত হয়। 

ভারতীয় বাহিনীর ভয়ে মিজোরা কিছুদিনের ভিতর চীন পাহাড়ের দিকে সরে যায় ও আত্নগোপন করে। উপজাতীয় রাজাকারগণ, যাদের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার, লারমার তত্বাবধানে সেখানেই থেকে যায়। অতঃপর পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত ও লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার এবং বাহিনীর সংখ্যাগত শক্তি বৃদ্ধির জন্যে নতুন নিয়োগ ও ট্রেনিং দান শুরু হয়। এই সশস্ত্র লারমা বাহিনী পরিশেষে শান্তি বাহিনী নাম ধারণ করে, এবং এর পরিচালক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠা ঘটে।“ (রহমান আ. , পার্বত্য তথ্য কোষ, ২০০৭, পৃ-.১৩)।

এখান থেকেই এমএন লারমার মুক্তিযুদ্ধে আসল ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কেননা, এমএন লারমা যদি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেন বা সমর্থন করতেন তাহলে তিনি কখনই স্বাধীনতা বিরোধী বা রাজাকার বা পাকিস্তানী বাহিনীর সহায়তাকারীদের আশ্রয় দিতেন না।

স্মরণযোগ্য, ১৯৭০ সালে ১৬ মে এম এন লারমার নেতৃত্বে ‘রাঙামাটি কম্যুনিস্ট পার্টি’ (আরসিপি)  গঠন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই পার্টির সশস্ত্র অঙ্গ ‘গণমুক্তি ফৌজ’ গঠিত হয়, যার ব্যাপক গুপ্ত তৎপরতা ছিল লক্ষ্যনীয়। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের ১৬ মে, পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) গঠিত হয়, যে দলে রাঙামাটি  কম্যুনিস্ট পার্টির সকল নেতা পুরো দলসহ যোগদান করে। বস্তুত, আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা আরসিপি’র বাহ্যিক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই  ‘জেএসএস’ এর আত্নপ্রকাশ ঘটে।

কিছু উপজাতীয় নেতা আর যুবকদের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক ভাবেই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি মুক্তিযোদ্ধারা। অধিকন্তু, চাকমা যুবকদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী  ভুমিকা প্রতিরোধে কোন ভূমিকা রাখার পরিবর্তে জনপ্রিয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মুক্তিযুদ্ধে এমন নির্লিপ্ততা আর বিরোধিতা বাংলাদেশের প্রতি উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের আনুগত্য ও আন্তরিকতার প্রতি সন্দেহের উদ্রেক হওয়া স্বাভাবিক। এই সন্দেহ দৃঢ় হয়, স্বাধীনতা লাভের মাস খানেকের মধ্যেই আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবী উত্থাপন করার মাধ্যমে। সঙ্গত কারণেই, পার্বত্য চট্রগ্রামের প্রতিনিধিদের সমস্ত দাবী এক বাক্যে মেনে নেয়া হয়নি। একই প্রেক্ষাপটে, সংসদে এম এন লারমার দাবী যথাযথ আবেদন সৃষ্টিতেও ব্যর্থ হয়েছে বলে অনুমেয়।

তথ্যসূত্র

  • ১। জাতীয় সংহতির প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপ, হারুন অর রশিদ, দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৭-২০ জুলাই ১৯৯৮।
  • ২। সিদ্ধার্থ চাকমা, প্রসঙ্গ পার্বত্য চট্রগাম, ১৯৮৬, কলকাতা, নাথ ব্রাদার্স।
  • ৩। Mizanur Rahman Shelley (Editor), 1992, The Chittagong Hill Tracts of Bangaldesh: The Untold Story, Dhaka, Centre for Development Research, Bangladesh (CDRB).
  • 4. Khaled Belal (Edited), Mirza Zillur Rahman & G.M. Mesbah Uddin (Bahar), 1992, The Chittagong Hill Tracts: Falconry in the Hills, Chittagong.
  • ৫। Syed Murtaza Ali, 1996, The Hitch in the Hills: CHT Diary, Chittagong, Dil Monowara Begum.
  • ৬। মাহফুজ পারভেজ, ১৯৯৯, বিদ্রোহী পার্বত্য চট্রগ্রাম ও শান্তিচুক্তি, ঢাকা, সন্দেশ।
  • ৭। প্রদীপ্ত খীসা, তার পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, ১৯৯৬, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ।
  • ৮। বিপ্লব রহমান, ২০১৫, পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ, ঢাকা, সংহতি প্রকাশন।
  • ৯। Priyajit Debsarkar, 2016, The Last Raja of West Pakistan, Roman Books, Kolkata.
  • ১০। জামাল উদ্দিন, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও চাকমা জাতি, ২০১৪, চট্রগ্রাম,  নন্দন প্রকাশন।
  • ১১। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, ১৯৯৩, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটি, স্থানীয় সরকার পরিষদ।
  • ১২। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ  ইবরাহিম, বীর প্রতীক,পার্বত্য চট্রগ্রামঃ শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন,  ২০০১, ঢাকা, মাওলা ব্রাদার্স।
  • ১৩। আতিকুর রহমান,  ২০০৭, পার্বত্য তথ্য কোষ – তৃতীয় খন্ড, সিলেট, পর্বত প্রকাশনী।
  • ১২। Ahmed, Aftab, Ethnicity and Insurgency in the Chittagong Hill Tracts Region: A Study of the Crisis of Political Integration in Bangladesh, 1993, Journal of Commonwealth & Comparative Politics, Vol. 31, No.3 (November 1993), pp-32-66, Published by Frank Cass, London.

♦ লেখক- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা হত্যার বিচার দাবী উচ্চকিত নয় কেন?

পারভেজ হায়দার

১০ নভেম্বর ২০১৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সন্তু লারমার ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের পরিক্রমা পরিবর্তনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ওরফে এমএন লারমা একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র । উপজাতীদের একাংশ তাকে জুম্ম জাতির পিতার ন্যায় শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে, অপর অংশ এমএন লারমা সংক্রান্ত বিষয়দি সব সময়ে এড়িয়ে যেতে চায় । এমএন লারমাকে উপজাতিদের বড় অংশ সব সময়ে আলোচনার বাহিরে রাখতে পারলেই প্রশান্তি বোধ করে, আর এটাও ঠিক বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এমএন লারমার হাত ধরেই “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দলটি গড়ে উঠেছিল, আবার এমএন লারমার হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন “শান্তি বাহিনী” গড়ে উঠেছিল ।

ব্যক্তি জীবনে এমএন লারমা উপজাতীদের অধিকার আদায়ে একজন প্রথম সারির নেতা ছিলেন, তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন । তিনি কেন বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ পূনর্গঠনে ব্যস্ত তৎকালীন সরকারকে তাদের দাবি দাওয়া সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট সময় না দিয়ে, সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিক পথ অর্থাৎ সশস্ত্র দল গঠন করে স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ জনগনের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সূচনা করেছিলেন সে বিষয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে ।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে এমএন লারমার বির্তকিত ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনার আগে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক । তার জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে রাঙ্গামাটি’র চাকমা উপজাতির একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে । তিনি ১৯৫৬ সালে রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন । পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৬৩ সালে একই কলেজ থেকে তিনি বিএ পাশ করেন । তিনি ১৯৬৮ সালে কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে থেকে বিএড ডিগ্রী অর্জন করেন ।

পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং চট্টগ্রাম জেলা বার এর একজন সদস্য আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন ।

পড়াশুনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই এমএন লারমা উপজাতিদের বিভিন্ন অধিকার সুরক্ষাজনিত আন্দোলনে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতেন । তিনি ১৯৫৬ সালে “জুমিয়া স্টুডেন্ট মুভমেন্ট” গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে পার্বত্য অঞ্চলের যুবকদের নিয়ে একটি সংগঠন “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি” গঠন করেন ।

১৯৬০ সালে কাপ্তাই হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হবার পর এমএন লারমার পরিবার রাঙ্গামাটি থেকে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়িতে স্থানান্তরিত হয় । তাকে ১৯৬৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী তারিখে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণে গ্রেফতার করে ।

পরবর্তীতে দুই বছর পর তিনি ৮ মার্চ ১৯৬৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে উপজাতিদের অধিকার সমুন্নত রাখার আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে তার অনুসারীদের এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায়কে একত্রিত করতে সচেষ্ট হন। নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে এমএন লারমা’র জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে । ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেন ।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চাকমা সম্প্রদায়ের বিতর্কিত ভূমিকা সর্বজনবিদিত । তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে রাজাকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন । তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।

সে প্রেক্ষিতে এমএন লারমা চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকমা এলাকাগুলোতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলিত হতে থাকে । পরবর্তীতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে মুক্তিযোদ্ধাগণ সেখানে গিয়ে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিলেন ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন । দেশে ফেরার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করে একযোগে কাজ করা শুরু করেন । পুরো জাতি যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনগঠনে ব্যস্ত তখন এমএন লারমা ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৯৭২ সালে “পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি” দল গঠন করেন ।

নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির এই পরিক্রমায় হঠাৎ করেই এমএন লারমা ১৯৭৩ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র শাখা “শান্তিবাহিনী” গঠন করেন । বিষয়টি নিয়ে একটি জনশ্রুতি ছিল যে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গঠিত পিস কমিটির কমিটির চিন্তাধারা থেকেই এর বাংলা প্রতিশব্দ “শান্তিবাহিনী” নামটির উৎপত্তি হতে পারে । “শান্তিবাহিনী” নামকরণের পিছনে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য বেশকিছু মতামত রয়েছে । কোন কোন গবেষক মনে করেন এটি এমএন লারমার ছোট ভাই সন্তু লারমা’র নামের প্রথম অংশ ‘সন্তু’ তথা শান্তি থেকে এ নামকরণ করা হয়েছে । কবি ও লেখক আহমদ ছফা’র মতে “শান্তিবাহিনী” অনেকটা তৎকালীন চরমপন্থী তথা “সর্বহারা পার্টি” দ্বারা প্রভাবিত ।

তখন চীনাপন্থী বিভিন্ন চরমপন্থী দলের নেতাকর্মী পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে থাকতেন । পার্বত্য জনগোষ্ঠীর নেতারা তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন । সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার তার “জনযুদ্ধের পটভূমি” নামক কবিতার বই এ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের গেরিলা সংগ্রামে নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেছিলেন ।

এমএন লারমা গোপনে “শান্তিবাহিনীর” সশস্ত্র দলের প্রস্তুতির পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিও  চালিয়ে যাচ্ছিলেন । ১৯৭৩ সালে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কর্তৃক বাকশাল গঠন করা হলে এমএন লারমা বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন । অর্থাৎ তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি দেশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন ।

এমএন লারমা চীনাপন্থী কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু তার সহযোদ্ধা ও অনুসারীরা সকলেই একই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না । তাই ১৯৭৬ সালেই শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয় ।

শান্তিবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রীতি কুমার চাকমা চীনাপন্থী কমিউনিজম এর সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন । ১৯৭৬ সালে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯৮১ সালের মধ্যে শান্তিবাহিনীর বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে । সেপ্টেম্বর ১৯৮১, আগস্ট ১৯৮২, এবং জুলাই ১৯৮৩ সালে এমএন লারমা গ্রুপ এবং প্রীতি গ্রুপের মধ্যে বেশ কয়েকবার বড় ধরণের সংঘর্ষ হয় । ঐ সংঘর্ষসমূহে শতাধিক শান্তিবাহিনী সদস্য নিহত হয়েছিলেন ।

এরই মধ্যে  ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে সীমান্তের ওপারে ইমারা গ্রামের বাঘমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যাণপুর ক্যাম্পে প্রীতি গ্রুপের সদস্যদের হামলায় এমএন লারমা নিহত হন । এমএন লারমার সাথে সে সময়ে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অর্পণা চরণ চাকমা, কল্যাণময় চাকমা এবং লে. রিপনসহ শান্তিবাহিনীর ৮জন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান । একই সময়ে শান্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ৬-৭ জন কেন্দ্রীয় নেতাও এ হামলায় আহত হয়েছিলেন ।

কল্যাণপুর ক্যাম্পের অপারেশন এর ঘটনা সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, প্রীতি গ্রুপের ক্যাপ্টেন এলিন এর নেতৃত্বে ৮-১০ জনের একটি সশস্ত্র দল লারমা গ্রুপের ক্যাম্পে অতর্কিত সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায় । ঐ সময়কার ঘটনাবলী সম্পর্কে আরও জানা যায়, একই দিনে মতিবান পুলিশ ক্যাম্প হতে ১ মাইল পূর্বে প্রীতি গ্রুপ এমএন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমণ চালায়, যদিও এ আক্রমণে কেউ হতাহত হয়নি ।

এমএন লারমা হত্যাকাণ্ডে পর তার অনুজ সন্তু লারমা জন সংহতি সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন । তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আজ অবধি কোথাও কোন মামলা হয়নি অথবা লারমা গ্রুপ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোন প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি । এমএন লারমাকে হত্যা করার বিষয়টির সত্যতা থাকার পরও এ বিষয়ে কোন আন্দোলন অথবা প্রতিবাদের ঘটনা ঘটেনি ।

অন্যদিকে কল্পনা চাকমার বিষয়টির প্রচারিত গল্পের কোন সত্যতা বা ভিত্তি না থাকলেও বিষয়টিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর কল্পনা চাকমা অপহরণ দিবস ও বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে যা উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর স্ববিরোধী ভূমিকারই বহিঃপ্রকাশ ।

তবে কি এমএন লারমার বিষয়ে উপজাতি নেতৃবৃন্দ তাদের নেতৃত্বের আন্তঃকলহকে দায়ী করছেন? নাকি এমএন লারমা’র হত্যার পর যেসকল উপজাতি ব্যক্তিবর্গ উচ্চ নেতৃত্বের স্বাদ পেয়েছেন, তাদেরও কিছুটা পরোক্ষ ইন্ধন ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর পরবর্তী সময়ই বলে দিবে ।

এভাবেই এমএন লারমার মত একজন প্রতিভাবান উপজাতি নেতা হত্যাকাণ্ডের সাথে সাথে একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে । তবে তার মাধ্যমে সৃষ্ট শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র কার্যক্রম এবং এর ফলশ্রুতিতে অসংখ্য জীবনহানির ঘটনা ইতিহাসের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত থাকবে ।

যে সময়টাতে এমএন লারমা “শান্তিবাহিনী” গঠন করে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করেছিলেন সে সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের ভাষায় তথাকথিত সেটেলার বাংগালীগণ অবস্থান করতে শুরু করেনি । “শান্তিবাহিনী”র ব্যনারে গেরিলা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার পূর্বে এমএন লারমা এবং তার অনুসারীদের উচিত ছিলো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি দাওয়া তুলে ধরা।

এমএন লারমা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ বিরোধী কাজ করেলেও তিনি যেহেতু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন, তার উচিত ছিলো সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকারকে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া । কিন্তু তিনি তা না করে, বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নিজ দেশের জনগণ ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু করেছিলেন যা তাকে “গ্রেট লিডার” বলাতো দুরের কথা তাকে ইতিহাসের একজন “খল নায়ক” হিসেবে পরিগণিত করাই সমীচীন হবে ।

উপজাতী ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও তার মৃত্যু দিবস পালনে যথেষ্ট বিতর্ক ও বিভক্তি রয়েছে । তার আপন ভাই পার্বত্য জনসংহতি সমিতি এর সভাপতি সন্তু লারমাসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং ইউপিডিএফ নেতৃবৃন্দদের মধ্যে কাউকে তার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়া এবং তার সম্পর্কে আলোচনা করতে খুব একটা দেখা যায় না । শুধুমাত্র জেএসএস (সংস্কার) দলটি জেএসএস (এমএন লারমা) হিসাবে নিজেদের পরিচিত করে “এমএন লারমার” নামের ব্যানার ব্যবহার করে বিভিন্ন দিবসে কর্মসূচি দিয়ে থাকে এবং এ দিবস পালনের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকে।

এমএন লারমার জীবনের সার্বিক বিষয় মূল্যায়নে বলা যায় তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব যিনি দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি সশস্ত্র সংগ্রামের জন্ম দিয়েছেন, যার প্রতিফল হিসাবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশকে চরমভাবে মূল্য দিতে হয়েছে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ।

এমএন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাহাড়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজী চলছে

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্ত্র নারায়ন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় বেপরোয়া চাঁদাবাজী শুরু করেছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ। তিন পার্বত্য জেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে, সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) এর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের এই দিনে তিনি নিজ দলের বিদ্রোহী সশস্ত্র শাখার গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এই দিনটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের একটি অংশ জুম্মজাতির শোক দিবস হিসেবে পালন করে ।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সকল নাগরিকদের কাছে জাতির পিতা “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব” হলেও, উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের ঐ গ্রুপ দাবী করে এম এন লারমা তাদের  জাতির পিতা। কিন্তু, তারা যাকে তাদের জাতির পিতা বলে মান্য করে ৩৪ বছর পার হয়ে গেলেও তারা তাদের সেই জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার চায়নি কখনও।

অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন উপজাতি ব্যক্তি খুন হলে অথবা ছোটখাট অনেক বিষয় নিয়ে তারা দেশে-বিদেশে সরকার, সেনাবাহিনী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের ঘাড়ে মিথ্যা দোষ চাপিয়ে নানান ধরণের প্রচার প্রচারণা চালালেও নিজ জাতির পিতা বলে খ্যাত এত বড় একজন নেতার হত্যাকারী কারা, তিনি কেন মারা গিয়েছিলেন, হত্যাকারীরা এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে এ সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে তারা কখনই দাবি বা আন্দোলন করেনি। উপজাতিদের এই নীরবতা জনমনে প্রশ্ন এবং সন্দেহের উদ্রেক সৃষ্টি করে।

ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে জানা যায় যে, এম এন লারমা পাহাড়ি ছাত্র সমিতির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত তরুণদের সংগঠিত করেন এবং ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সাবেক সংসদ সদস্য মি. রোয়াজা ছিলেন উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং এম এন লারমা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

এম এন লারমা সংসদ সদস্য হিসাবে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিচালনাকালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতিসহ কতিপয় তরুণদের সাথে তার ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ১৯৭৩ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, পরে তা শান্তিবাহিনী রূপে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭৬ সালে ক্ষমতার লোভ, স্বার্থপরতা, দলীয় মতাদর্শসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। এ সময় এম এন লারমা চীনাপন্থী ও প্রীতি কুমার চাকমা ভারতপন্থী নীতি গ্রহণ করেন।

১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ রূপে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময় দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে যার ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি আর হানাহানিতে শান্তিবাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়।

এই ঘটনার জের ধরেই ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর আন্তঃদলীয় কোন্দল আর ক্ষমতার লোভের বলি হিসেবে প্রতিপক্ষ প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় নিহত হন এম এন লারমা।

এ প্রসংগে ১৮ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় যে, “তথাকথিত শান্তিবাহিনীর প্রধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিহত হইয়াছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়া গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত্রে আমাদের রাংগামাটি সংবাদদাতা জানান, মি: লারমা গত ১০ই নভেম্বর সীমান্তের অপর পারে ভারতে ইমারা গ্রামে বাগমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যানপুর ক্যাম্পে প্রতিদ্বন্দ্বী শান্তিবাহিনীর ‘প্রীতি’ গ্রুপের সদস্যদের হামলায় নিহত হইয়াছেন”।

বিভিন্ন তথ্য বিবরণী এবং ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, শান্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন এলিনের নেতৃত্বে প্রীতিগ্রুপের আট-দশজনের একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড এম এন লারমা গ্রুপের শিবিরে সশস্ত্র অভিযান চালায়। উক্ত হামলায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাথে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অপর্ণা চরম চাকমা, কল্যানময় চাকমা ও স্বঘোষিত লেফটেনেন্ট রিপনসহ শান্তিবাহিনীর মোট আটজন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান।

ঘটনার পরপর প্রীতি কুমার চাকমা তার দলবল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় এম এন লারমা গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হত্যা করার জন্য খুঁজে বেড়াতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে একই দিনে প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা খাগড়াছড়ির তৎকালীন লতিবান পুলিশ ক্যাম্পের এক মাইল পূর্বে এম এন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমন চালায়। কিন্তু উক্ত আক্রমনে অবশ্য কেউ হতাহত হয়নি।

এম এন লারমার মৃত্যুর পর জনসংহতি সমিতির পূর্ণ নেতৃত্ব চলে যায় তার আপন ভাই সন্তু লারমার হাতে যিনি বর্তমানে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। সন্তু লারমার পাশাপাশি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য উপজাতি নেতার মধ্যে আছেন সাবেক শান্তিবাহিনী কমান্ডার ঊষাতন তালুকদার যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একজন নির্বাচিত সাংসদ এবং জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য। এম এন লারমার মৃত্যুর ৩৪ বছর হয়ে গেলেও জনসংহতি সমিতির নেতারা কখনই তাদের অবিসংবাদিত নেতা এম এন লারমার হত্যার বিচার চায়নি।

১০ নভেম্বর উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তারা তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই মৃত্যুর ইতিহাস চাপা দিয়ে রেখে শুধুমাত্র দিবসটিকে জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কারণ এই ঘটনার মধ্যে তাদের জাতিগত হিংস্রতা আর বিভেদের চিত্র প্রকাশ পায়।

তাই এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে তারা কৌশলে গোপন করে রাখে। প্রতি বছর এই দিবসকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি  সশস্ত্র সংগঠণগুলোর চাঁদাবাজির তৎপরতা বেপরোয়াভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল শ্রেণী-পেশার সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিরা ঐসব সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। প্রাণভয়ে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

চলতি বছরও ১০ নভেম্বরকে সামনে রেখে পাহাড়ে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি, যানবাহন মালিক সমিতি, ব্রিকফিল্ড সমিতি, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, ব্যাংক, এনজিও, সরকারি/বেসরকারি অফিস ইত্যাদি থেকে চিঠি দিয়ে রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায়ের এরকম একটি রশিদ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। মূলতঃ ১০ নভেম্বরকে পুঁজি করে উপজাতি সংগঠণগুলো ব্যাপক চাঁদাবাজি করে নিজেদেরকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট করছে। ১০ নভেম্বর এখন আর জুম্ম জাতির শোক দিবস নয় বরং অবৈধ চাঁদা আদায়ের বাণিজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পাহাড়ের স্থাণীয় ভূক্তভোগীরা জানান।