ভূষণছড়াঃ যেখানে শুধু কুকুরই বেঁচে ছিল!

মাহের ইসলাম:
পৃথিবীর সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ছবি কোনটি অথবা পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ ছবি কোনটি? মস্তক বিচ্ছিন্ন করা এক মহিলার কোলে স্তন্যপানরত এক মৃত শিশু– ছবিটি কেমন হতে পারে?  প্রশ্নের উত্তর বের করতে গিয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে অনেক ধরণের ছবি পেলাম। সেগুলোর বর্ণনা বা ব্যাখায় না গিয়ে কেন এই ধরণের ছবির অনুসন্ধান প্রয়োজন হলো, সেটা ব্যক্ত করাই বেশী প্রাসঙ্গিক।

পার্বত্য অঞ্চলের বিষয়াদির প্রতি ব্যক্তিগত আগ্রহের কারণে সোশ্যাল মিডিয়াতে এ সংক্রান্ত কিছু থাকলে মনোযোগ দিয়ে পড়া হয়। যার ধারাবাহিকতাই, সর্বশেষ যে ঘটনা নজর কেড়েছে, তা হল – বরকল এলাকার ভূষণছড়ার গণহত্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় গণহত্যা বলে অভিহিত করা হয় এই হত্যাকাণ্ডকে।

এই গণহত্যা সংক্রান্ত একটা লেখা পড়েই, আমার মনে উপরোক্ত প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। তাই আরো কিছু তথ্যের জন্যে কিছুটা ঘাটাঘাটি করতে রীতিমত বাধ্য হয়েছি। এই ঘটনা নিয়ে বেশী পোস্ট এবং লেখা পেয়েছি পাহাড়িদের সমর্থক বা সমমনা বেশ কিছু কিছু পেজে। যেখানে বক্তব্য প্রায় একই– ৩১ মে বাঙ্গালী, সেটলার, সেনাবাহিনী এবং তৎকালীন বিডিআর এর সহায়তায় নারী ও শিশুসহ প্রায় ৪০০ পাহড়িকে হত্যা করা হয়; শুধু তাই নয়, অনেক নারী গণধর্ষণের শিকার এবং অনেক শিশুও নারকীয় অত্যাচারের শিকার পর্যন্ত হয়েছিল।

এমনি এক লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. আমেনা মোহসিনের দ্য পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজম বইয়ের সুত্র উল্লেখ করা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই, বইটি খুঁজে দেখা হলো, সত্যিই, বইয়ের পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “এতে ১১০ জন পাহাড়ি শিশু ও নারী-পুরুষ নিহত হন। অনেক পাহাড়ি নারীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।” ( আমেনা মহসিন, দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম – দি কেস অফ চিটাগং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ, প্রকাশ ১৯৯৭, পৃষ্ঠা- ১৮২ দ্রষ্টব্য) ।

উল্লেখ না করে পারছি না যে, এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর সংগৃহিত তালিকা অনুযায়ী এই হামলায় শিশুসহ সর্বমোট ৬৭ জন উপজাতীয় নিহত হয়েছিল। (এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা-১৩-১৯।)

অর্থাৎ, পাহাড়িদের বর্তমানকালের তরুণ এবং শিক্ষিত প্রজন্মের কাছে ৩১ মে’র দিনটি একটি ভয়াবহ দিন হিসেবেই চিহ্নিত হতে থাকবে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বাঙ্গালীদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়েই এই প্রজন্ম বড় হতে থাকবে। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ, যার সবচেয়ে বড় উৎস সোশ্যাল মিডিয়া, এই দিনের বিষয়ে তাতে বাঙ্গালী কর্তৃক পাহাড়িদের উপর অত্যাচারের সাক্ষ্যই বহন করছে।


এ সংক্রান্ত আরো লেখা পড়ুন:


মুদ্রার যেমন অন্য পিঠ আছে, এই ঘটনারও আরেকটা ভার্সন আছে। যা পাওয়া যাবে যৎসামান্যই। কারণ, এই ঘটনার উপর সামান্য কিছু পোস্ট চোখে পড়েছে বাঙ্গালীদের সমর্থক বা সমমনা কিছু পেজে।

অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়ানোর জন্যে মাত্র দুইটি সুত্র উল্লেখ করা হবে, দুইজন ব্যক্তির দুটি বই, যেখানে ভূষণছড়ার গণহত্যার বিবরণ পাওয়া যায়।

প্রথমজন হলেন, সৈয়দ মুরতজা আলী যার সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হয় ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালীন সময়ে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা ‘ডন’ এ যোগদানের মাধ্যমে। বাংলাদেশ অবজারভার এর সাথে কাজ করার সময় একজন জেলের ছদ্মবেশে তিনি ভূষণছড়ায় গিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালের ৩ জুন। ভূষণছড়ার গণহত্যার পরবর্তী তিনিই ছিলেন প্রথম সাংবাদিক যিনি ঐ স্থানে গিয়েছিলেন। তবে যেতে পেরেছিলেন, ঘটনার তিনদিন পরে।

১৯৯৬ সালে প্রকাশিত ‘ দি হিচ ইন দি হিলস’ বইয়ে সৈয়দ মুরতজা আলী তার সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। যেহেতু সরকারী কর্তৃপক্ষ ভূষণছড়ার গণহত্যার ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করতে চাচ্ছিলেন না, তাই কোন সাংবাদিকের ঐখানে যেতে পারছিলেন না।

কাগজ, কলম, মিনি রেকর্ডার আর কিছু ব্যক্তিগত জিনিস পত্র পলিথিনে পেঁচিয়ে নৌকার পাটাতনের তলায় লুকিয়ে, তিনি জেলের ছদ্মবেশে ময়লা গেঞ্জি আর ছেড়া লুঙ্গি পরে গিয়েছিলেন। কাপ্তাই লেকের জায়গায় জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় ছিল না। তিনি যেদিন পৌঁছেছিলেন, সেদিন সেখানে তিনটি হেলিকপ্টার এসেছিল। যার একটাতে ছিলেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ।

ঘটনার তিনদিন পরে গিয়েও তিনি অনেক মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এগুলো পড়ে ছিল, কারণ এগুলোর দাফন কার্যের জন্যে কোন নিকটজনকে পাওয়া যাচ্ছিল না। আব্দুল করিম নামের ৬৮ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে, সেহেরী খেয়ে লোকজন তখনো একটু ঘুমের জন্য বিছানায়, এমন সময় হঠাৎ গুলির শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শান্তিবাহিনীর গুলি আর যুদ্ধের হুংকার শুনতে পেল তারা। শান্তি বাহিনীর গুলি বিদীর্ণ করে দেয় ভয়ে কম্পমান এমনকি পলায়নরত বাঙ্গালীদেরকেও। অনেক বাঙালিকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে, আবার অনেকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এমনকি, শিশুদেরকে হত্যার জন্যে টেনে টুকরো করে ফেলে পর্যন্ত।

বীভৎস আর লোমহর্ষক কিছু দৃশ্যের বর্ণনার পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন যে, ৩৪ জন নারী, ২৬ জন শিশুসহ ঐ ঘটনায় ১২০ জনকে হত্যা করা হয়, আহত হয়েছিল প্রায় ২০০ জনের মত। তখন পর্যন্ত ৩৫ জন নিখোঁজ ছিল। প্রস্থানের পূর্ব মুহূর্তে, শান্তি বাহিনী বাঙ্গালীদের বাড়ীঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়, ফলে ২০০ পরিবার গৃহহীন হয়ে পরে। অগণিত গৃহপালিত পশু-পাখি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। (সৈয়দ মুরতজা আলী, দি হিচ ইন দি হিলস, প্রকাশ ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-৫৩-৫৬ দ্রষ্টব্য)

দ্বিতীয়জন হলেন, পার্বত্য গবেষক জনাব আতিকুর রহমান। যিনি দীর্ঘদিন পার্বত্য চট্রগ্রাম নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং শুধুমাত্র পার্বত্য চট্রগ্রামের উপরেই যার ১০টির উপরে বই আছে। পার্বত্য তথ্য কোষ, তৃতীয় খণ্ডে ভূষণছড়া গণহত্যার উপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তিনি এই গণহত্যার মর্মন্তুদ ও হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেছেন।

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেগামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিতে বাহির দিক থেকে …… ধ্বনিত হয়ে উঠল …… ঐ গুলির শব্দটি।

তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্ত জনপদ।

হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে । লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা, পথ ঘাট ও পাড়া। সবাই ভীত বিহবল। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান।

অদৃষ্টপূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধ্বংসাত্মক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করেন। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড়ঝাঁপ, আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া।

ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটেলারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, পরার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই, চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরুপায় জীবিতরা। লাশ গোজানো ছাড়া করার কিছু নেই । দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগিতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

“ ভূষণ ছড়া গণহত্যা পরিদর্শনে প্রেসিডেন্ট এরশাদ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। ওসি, ডিসি, এস,পি, ব্রিগেডিয়ার, কমিশনার, ডি আই জি, জিওসি ইত্যাদি কর্মকর্তারাও হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। কিন্তু সবাই তৎপর ছিলেন ঘটনাটি চাঁপা দিতে ও লাশ লুকাতে।

কয়েকদিন যাবৎ একটানা গণকবর রচনার প্রক্রিয়া চলেছে। তজ্জন্য জীবিত সেটেলারদের আহার, নিদ্রা ও বিশ্রামের ফুরসত ছিলো না। গর্তে গর্তে গণকবর রচনা করে, একেক সাথে ৩০/৪০টি লাশকে চাপা দেয়া হয়েছে। এভাবে লোকালয়গুলো পচা লাশ ও দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত হলেও, পাহাড়ে ও বনে অবস্থিত বিক্ষিপ্ত লাশগুলো দাফন কাফনহীন অবস্থায় পচতে থাকে ও শিয়াল কুকুরের খাদ্য হয়। দুর্গত পরিবারগুলো পোড়া ভিটায় খাদ্য ও আচ্ছাদনহীন দিনযাপনে বাধ্য হয়।”

ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সাহায্য নিয়ে, তিনি মোট ৩৭০ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা উক্ত বইয়ে সন্নিবেশিত করেছেন। তিনি আরো জানিয়েছেন যে, গুরুতর আহত ৮৫ জনকে চিকিৎসার জন্যে চট্রগ্রামের সি এম এইচে পাঠানো হয়েছিল।( পার্বত্যকোষ, তৃতীয় খণ্ড, আতিকুর রহমান, প্রকাশ ২০০৭, পৃষ্ঠা-১৪৬-১৫৪ দ্রষ্টব্য)।

উল্লেখ না করে পারছি না যে, এক অনুসন্ধানী ও তথ্যবহুল ফিচারে সাংবাদিক সৈয়দ ইবনে রহমত, জুলাই ১, ১৯৮৪ তারিখে বাংলাদেশ ইকোনোমিস্ট এ প্রকাশিত মইনুদ্দিন নাসেরের ‘ম্যাসাকার এট ভূষণছড়া’ শীর্ষক প্রতিবেদনকে সুত্র হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছেন, “Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-
Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.”

“Nasser সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই ৪ শতের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।“ (ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ, পার্বত্যনিউজ, ৩১ মে, ২০১৪)।

স্মরণযোগ্য যে, প্রাক্তন বিডিআর মহাপরিচালক, মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান (অবসরপ্রাপ্ত) ঐ এলাকায় জোন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তার ভাষ্যমতে, “ ১৯৮৪ সালের ৩১মে শান্তিবাহিনীর প্রীতি গ্রুপের মেজর মণিস্বপনের নেতৃত্বে একশত পঞ্চাশ জনের একটি আর্মড গ্রুপ ভোর চারটার দিকে ভূষণছড়ার বাঙালি বসতি এবং জারুলছড়ির বিডিআর ক্যাম্প আক্রমণ করে। শান্তিবাহিনীর এই আক্রমণে বিডিআরসহ চারশত জন নিহত এবং পাঁচশতের মতো আহত হয় । (পার্বত্য চট্রগ্রামে আমার অভিজ্ঞতা- ২২, পার্বত্যনিউজ, ২৪ অক্টোবর ২০১৬ দ্রষ্টব্য)।

প্রাসঙ্গিক মনে করে স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে যে, ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত আমেনা মোহসিনের পূর্বোক্ত বইয়ে, পাহাড়ি ও সমমনা সুত্রের বরাতে ১৯৮০ হতে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত (১৫ বছর) মোট ১১টি গণহত্যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে, যেখানে ৯২৯ জনের বেশী (কিছু ক্ষেত্রে আনুমানিক সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে) পাহাড়ী নিহত হয়েছে। লেখিকার ভাষ্য মোতাবেক, এগুলোর সবই বাঙ্গালী সেটলার ও নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হয়েছে। অপরপক্ষে, তিনি শুধু এক লাইনে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৮০ – ১৯৯১ সালে (১১ বছর) শান্তিবাহিনী ৯৫২ জন বাঙ্গালী ও ১৮৮ জন পাহাড়িকে হত্যা করে (নির্দিষ্ট সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে)। কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি কোন ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিতে পারেন নি, এমন কি ভূষণছড়ার বাঙ্গালী গণহত্যারও নয়। (আমেনা মহসিন, দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম, দি কেস অফ চিটাগং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ, প্রকাশ- ১৯৯৭, পৃষ্ঠা: ১৮২-১৮৫ দ্রষ্টব্য)।

সৈয়দ মুরতজা আলীর লেখায় উল্লেখ আছে যে, তিনি ফিরে আসার পরে শুনেছিলেন যে, বাঙ্গালী সেটলাররা প্রতিশোধের স্পৃহায় ঐ এলাকার ১০০ হতে ২০০ পাহাড়িকে হত্যা করেছে। ( সৈয়দ মুরতজা আলী, দি হিচ ইন দি হিলস, প্রকাশ ১৯৯৬, পৃষ্ঠা-৫৬ দ্রষ্টব্য)।

মেজর জেনারেল ইব্রাহিম (অব.) এর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, উত্তেজিত বাঙালিরা ৩১ মে এবং তার পরদিন বরকল এলাকার ভূষণছড়া ও অন্যান্য কিছু গ্রামে উপজাতীয় পরিবারগুলোর উপর হামলা চালায়। তিনি এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর সুত্রে উক্ত ঘটনায় ৬৭ জন উপজাতীয় নিহত হয় বলে জানিয়েছেন।( মেজর জেনারেল )অব.) ইব্রাহিম, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর মূল্যায়ন, মাওলা ব্রাদার্স, প্রকাশ-২০১১, পৃষ্ঠা ২০১১ দ্রষ্টব্য।)

অর্থাৎ, পাহাড়িদেরকে হত্যা করা হয়েছে বাঙ্গালীরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পরে, প্রতিশোধের স্পৃহায়, উত্তেজিত হয়ে; শান্তিবাহিনীর মত পরিকল্পিতভাবে, ঠাণ্ডা মাথায় নয়। যদিও, যে পরিস্থিতিতেই করা হোক না কেন – কোন হত্যাকাণ্ডই সমর্থন যোগ্য নয়; বরং যে কোন হত্যাকাণ্ডই ঘৃণ্য এবং শাস্তিযোগ্য। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে, প্রায় সব লেখাতেই শুধুমাত্র হয় পাহাড়ি নতুবা বাঙ্গালীদের হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেয়া আছে– দুই দুইটা হত্যাকাণ্ড যে এখানে ঘটেছে, সেটা উল্লেখ করা হয়নি।

স্বাভাবিক ভাবেই, ব্যথিত হয়েছি এই ভেবে যে, পাহাড়ের এই তরুণ সমাজ হয়ত কোনদিনও জানতে পারবে না যে, তাকে জন্মের পর হতেই ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে, প্রকৃত সত্য আড়াল করে বা ঘটনার একপেশে বিবরণে কিংবা আংশিক বা পুরোপুরি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে। তাই, অজ্ঞাতসারেই তাদের বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠছে এবং তাদের একাংশ ক্রমেই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী মনোভাব পোষণ ও কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে দ্বিধাবোধ করছে না।

অন্যদিকে, দেশ ও সমাজের বেশীরভাগ মানুষেরই অগোচরেই পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে আজ জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম বিরোধী ও বাঙালি বিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায়, অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে, কৌশলে। একারণেই, পাহাড়িদের আপন করে নেয়ার অভিপ্রায়ে দেশের সাধারণ মানুষের উদারতা আর তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যে সরকারের আন্তরিক প্রচেস্টার পরেও কিছু কিছু পাহাড়ির দেশ ও সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ দেখে অনেকে হতাশ হয়ে ভাবে- মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কী করে হতে পারে! ফলশ্রুতিতে, একদিকে আমাদের সমাজে ক্রমান্বয়ে ঘৃণা আর বিদ্বেষ বাড়ছে, আর অপরদিকে বিভেদের বেড়াজালে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে যেখানে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এ ধরণের ভয়াবহ রকমের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে যে মিথ্যাচার করা হচ্ছে; সেই মিথ্যাচারের দায়ভার, পাপাচারের দায়ভার (দুনিয়ার কোন ধর্মই মিথ্যাচার সমর্থন করেনি) এবং এই পশুসুলভ মানসিকতার দায়ভার যে উদ্দেশ্যেই করা হোক না কেন; এতে আর যাই হোক, ভালো কিছু হবে না। মিথ্যা আর পাপ কখনো, কারো জন্যে, কোথায়ও মঙ্গল বয়ে আনেনি। বরং সত্যই সর্বদা জয়ী হয়েছে।

লেখক- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)
  8. অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?
  9. রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার এবং পার্বত্যাঞ্চলে বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার
  10. পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে জিম্মি সমাজ ও রাষ্ট্র
  11. ব্যাক্তিগত বিশ্বাস, সংবাদ মাধ্যম ও নৈতিকতার মানদণ্ড
  12. কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের ক্ষতিপূরণঃ ব্যক্তি স্বার্থের রাজনীতির শিকার নিরীহ পাহাড়ি

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের কবরগুলোর একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।- সম্পাদক।)

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে।সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।)