ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: সরকারের মর্যাদা কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার ক্ষুণ্ন হতে পারে

অস্তিত্ব সংকটে পার্বত্য চট্টগ্রাম-১

land-comeetion-pic-30-10-16-03

মেহেদী হাসান পলাশ :

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এক দশমাংশ ভূখন্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। এর অন্যতম প্রধান কারণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধনী ২০১৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়ে কার্যকারিতা শুরু করা। স্থানীয় পার্বত্য বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই আইনের ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা, সরকারের মর্যাদা, কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কার তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে পাহাড়ী শীর্ষ নেতৃবৃন্দের নানা বক্তব্য ও তৎপরতায় এসবের আলামত ফুটে উঠেছে। স্থানীয় পার্বত্য বাসিন্দাদের সাথে সরকারী নানা সংস্থাও এ নিয়ে ইতোমধ্যে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে ঊর্ধ্বতন মহলকে অবগত করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, নিরাপত্তা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক ইনকিলাবকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন পক্ষের ব্যক্তিগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ বিরাজমান। এইরূপ দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারি ব্যবস্থা কাম্য। কিন্তু দুঃখজনক ও আতংকজনক বিষয় হলো যে, বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার নিমিত্তে যেই আইন করেছেন যথা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, সেই আইনের অনেকগুলো বিধান এবং সেই বিধানের বাস্তবায়নকে আমি বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করি। ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, বাংলাদেশের আগামীদিনের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব তথা ভৌগলিক অখ-তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।

গত ১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় ভেটিং সাপেক্ষে এই সংশোধনী পাস হওয়ার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী অধিকার নিয়ে সক্রিয় ৫ বাঙালী সংগঠন হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছে। এ পর্যন্ত মোট ৬ দিন হরতাল ও ১ দিন অবরোধ পালন করেছে। ইতোমধ্যে বাঙালী সংগঠনগুলো খাগড়াছড়িতে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।

গত রোববার একই দাবীতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে অবরোধ পালিত হয়েছে। এর কারণ গত রোববার রাঙামাটি সার্কিট হাউজে ভূমি কমিশনের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া দুই পার্বত্য জেলায় শান্তিপূর্ণভাবেই অবরোধ পালিত হয়েছে।

এদিকে রোববার সকাল ১০টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক-এর সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতি সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা, রাঙামাটির চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, খাগড়াছড়ির মং সার্কেল চিফ সাচিং প্রু চৌধুরী ও বান্দরবানের বোমাং সার্কেল উ ছ প্রু চৌধুরী, রাঙামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা, বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যা শৈ হ্লা, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মমিনুর রশিদ আমিন ও কমিশনের সচিব রেজাউল করিম উপস্থিত ছিলেন। তবে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরি চৌধুরী বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন।

land-comeetion-pic-30-10-16-02

বৈঠক সূত্র ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, বৈঠকে কমিশনের জনবল, লজিস্টিক ও আর্থিক বরাদ্দের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত সহায়তা চেয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভূমি কমিশনে অভিযোগ জমা দেয়ার সময় চলমান রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে ১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় ভেটিং সাপেক্ষে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস হওয়ার পর ভেটিং শেষে ৮ আগস্ট প্রেসিডেন্ট সংশোধনীতে স্বাক্ষর করেন এবং ৯ আগস্ট তা অধ্যাদেশ আকারে গেজেটে প্রকাশিত হয়। ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কাজ শুরু করে। এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী মন্ত্রিসভায় পাস হলেও পার্লামেন্টে পাস করতে না পারায় তা বাতিল হয়ে যায়।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন

শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, “জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলে ভাসা জমি)-এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।”

একই সাথে ৬ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন”। মূলত এই ধারাগুলোই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের মূল উৎস।

তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম বার ক্ষমতার একেবারে শেষ দিকে ২০০১ সালের ১৭ জুলাই জাতীয় সংসদে ভূমি কমিশন আইন পাস হয়। সেই আইনে পদ্ধতিগতভাবে অধিগ্রহণকৃত জমির পরিবর্তে প্রযোজ্য আইনের কথা বলা হয়।

এই চুক্তির ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :- (ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা; (খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল; (গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভূতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।

তবে সন্তু লারমা এই আইন মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তিনি সব সময় বলে থাকেন, শান্তিচুক্তির দুইটি রূপ রয়েছে। একটি লিখিত এবং অন্যটি অলিখিত বা মৌখিক সমঝোতা। সেই অলিখিত শান্তিচুক্তির বলে সন্তু লারমা ভূমি কমিশন আইনে ২৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।

এরই অংশ হিসাবে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপির মধ্যে এক যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে বৈঠকে সন্তু লারমা প্রস্তাবিত ২৩ দফার মধ্যে ১৩ দফা মেনে নেয়া হয়। ১ আগস্ট, ২০১৬ সালে মন্ত্রিসভায় যে সংশোধনী পাস করা হয়েছে তা মূলত ওই বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের অনুসরণ।

এই সংশোধনীর উল্লেখযোগ্য হলো: প্রচলিত আইন ও রীতির সাথে পদ্ধতি সংযুক্ত করা। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিগতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ যেকোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করিলে বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিল করণ এবং বন্দোবস্ত জনিত বা বেদখল জনিত কারণে কোনো বৈধ ভূমির মালিক বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

  তবে শর্ত থাকে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়িসহ জলে ভাসা ভূমি, টিলা পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না। এখানে লক্ষ্যণীয় হলো ২০০১ সালের আইন থেকে প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমিকে কমিশনের আওতা বহির্ভূত রেখে যে সুরক্ষা দেয়া ছিলো ২০১৬ সালের সংশোধনীতে তা তুলে দেয়া হয়েছে। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল প্রকার সরকারী স্থাপনা ভূমি কমিশন আইনের আওতায় চলে এসেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন মহলের অভিমত, সরকার এসকল ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের প্রযোজ্য আইন ব্যবহার করেছে। তারা হেডম্যানের সার্টিফিকেট নেয়নি। কিন্তু পদ্ধতিগত শব্দটি যুক্ত করায় প্রায় সকল প্রকার সরকারী স্থাপনা অবৈধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এদিকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার পর থেকেই বাঙালী সংগঠনগুলো বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা একের পর এক আন্দোলন করতে থাকে।

পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক এমপি ও উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভুঁইয়া ভূমি কমিশন আইনকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, এই আইনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, সরকারের মর্যাদা, কর্তৃত্ব ও অধিকার খর্ব হবে।

কিভাবে এই প্রশ্নের জবাবে ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, বর্তমান আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের সামাজিক আইন যাকে আইনে প্রচলিত রীতি ও পদ্ধতি বলা হয়েছে সে আইনে অধিগ্রহণ ব্যতিরেকে সকল ভূমি বন্দোবস্তী অবৈধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ এখন যেখানে ডিসি অফিস, এসপি অফিস বা অন্যান্য সরকারী অফিস রয়েছে তাতে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো অধিবাসী যদি বলে এই জমিতে তার দাদার বাবা গরু চরাতেন বা নানা জুম চাষ করতেন। হেডম্যান যদি সে মর্মে তাকে সত্যায়ন করে তাহলে তা বাতিল হয়ে যাবে।

এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পুলিশ ব্যারাক, ক্যান্টনমেন্ট, ভূমি অফিস, আদালত, এমনকি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন অফিস সব বাতিল হয়ে যাবে।

পার্বত্য বাঙালী অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত বাঙালী পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইন্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুইয়া ইনকিলাবকে বলেন, আমরা শুধু বাঙালীদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়ছি না, একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখ-তা ও সরকারের কর্তৃত্ব, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই করছি।

এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর ইনকিলাবকে বলেন, আইন হলো ভূমি সমস্যার সমাধান। ভূমি সমস্যা থাকলে অভিযোগ করবে, যাচাই বাছাই করবে, তথ্য প্রমাণ থাকলে বিচার করবে। এর মধ্যে যদি তারা কোনো অন্যায় পায় বিচার করবে নয়তো ডিসমিস হয়ে যাবে। কোনো ক্ষতির কিছু নেই। পদ্ধতিগতভাবে বলতে আসলে কি বোঝায় সেটা আগে জানতে হবে। না জেনে একটা উল্টাপাল্টা বললে তো হবে না। এগুলো নেয়া হয়েছে। হেডম্যান নিয়োগ দেন ডিসি সাহেব। ডিসি সাহেবরা কি এগুলো না দেখেই দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন। তারা হেডম্যানের রিপোর্ট নিয়েই করেছে বলে।

আগে ডিসি সাহেবরা সরাসরি দিতেন জানালে তিনি বলেন, ডিসি সাহেবরা হেডম্যানদের অনুমোদন নিয়েই দিয়েছেন। যদি এগুলো না দেয়া হয়ে থাকে তাহলে কে আগে দিলো কে পরে দিলো সেসব বিবেচনা করে বিচার করা হবে।

এ বিষয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলার মতো হয়নি। তিনি বলেন, আগে আমাদের সময় দিন, কাজ দেখুন, তারপর কাজ দেখে মন্তব্য করুন। এটা কার্যকরী করা হিউজ টাফ।

কিন্তু সংবিধান রক্ষার শপথহীন এইসব লোকদের বিচারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করা যাবে না বলে যে ধারা আছে তাতে কি উচ্চ আদালতের এখতিয়ার খর্ব করা হলো কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেয়ার ক্যান বি নো রঙ উইদাউট রেমিডি। এটাই বেসিক প্রিন্সিপ্যাল অভ ন্যাচারাল জাস্টিসের কথা।যদি কোনো রং থাকে দেয়ার মাস্ট বি এ রেমিডি। ন্যাচারাল জাস্টিসের একটা বিধান আছে এটা সর্বত্র ইমপ্লাইড।

কমিশন আইনের ৬-এর বিভিন্ন উপধারা উল্লেখ করে এর ফলে সকল সরকারী স্থাপনা অবৈধ হয়ে যায়নি এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি জানি, আমিও এই আইনগুলো আমি দেখেছি। এগুলো কতোটা আমাদের এখতিয়ারভুক্ত তা বিবেচনা করে দেখতে হবে। আমরা কি ডিসি অফিস ভেঙে ফেলবো? আইন দ্বারা কিভাবে রাখবেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এই বিষয়টি সামনাসামনি বলবো, টেলিফোনে বলা যাবে না।

সংশোধিত ভূমি কমিশন আইনে বাংলাদেশের সংবিধান ও শান্তিচুক্তি লংঘিত হয়েছে

ভূমি কমিশন

♦ নির্মল বড়ুয়া মিলন ♦

জাতিগত বঞ্চনার সমাধান হিসাবেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি – বাঙ্গালী বহুমূখী বঞ্চনা বিদ্যামান। কিছু ক্ষেত্রে তা প্রশাসনিকভাবেও। এর উৎস কাপ্তাই বাঁধ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়নকালে এর প্রস্তাবনায়ও বলা হয়েছিল, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে। কিন্তু সাম্য-মৈত্রী- স্বাধীনতার কথিত ওই ধারণাটিকে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে পারেনি।
এর প্রমাণ হলো ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খণ্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন। তবু এই চুক্তিতে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে বা একটি সম্প্রদায়কে প্রধান্য দেয়া হয়েছে।

মুক্তমত

কিন্তু চুক্তির পর র্দীঘ ১৯ বছর যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ভিতর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে কোন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি বা পার্বত্য জনপদের সকল জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে সম-ভুমিকা রাখতে পারেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, কথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ ১৯ বছরের মধ্যে একবারও পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এর কোন সাধারন পাহাড়ি – বাঙ্গালীদের এক সাথে নিয়ে বৈঠক করেনি (অদ্যবধি যাদের নিয়ে পিসিজেএসএস নেতৃবৃন্দ বৈঠক করেছেন এসব পাহাড়ি – বাঙ্গালীরা তাদের পকেটের লোকজন)।

পার্বত্য চুক্তির পর ১৯ বছরে ডাকঢোল পিটিয়ে, কিছু সংখ্যক সভা – সেমিনার করে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ধোঁয়া তোলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা হয়নি।

এমন কি চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তার নিজস্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত করার মতো উল্লেখযোগ্য নজিরও নাই, বরং তাদের বিরুদ্ধে নিজ জনগোষ্ঠীর লোকজনদের উপর প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন,অপহরণ, হত্যা, কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

পিসিজেএসএসের কেন্দ্রীয় নেতা এখন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার একজন তথাকথিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি স্থানীয় সংসদ সদস্য, অদ্যাবধি তার মুখ থেকে জেলার উন্নয়নমূলক কোন কর্মকাণ্ডের বুলি বের হয়নি। এ সংসদ সদস্য যখন জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় প্রশাসনে অথবা কোন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, তখন তার কথা শুনে মনে হয় তারা ও তার পরামর্শকরা আমাদের দেশের বাইরের, অন্য কোন দেশের মানুষ!

আমি বা আমার লেখা সরকার, কোন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল বা পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে নয়, সাম্য- মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধারণা পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় যে কোন সময়ের চেয়ে বেশী এসময় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর সরকার গেজেটের মাধ্যমে আইন আকারে প্রকাশ করেছে।

এ আইন অনুসারে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেমন; আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সদস্য সংখ্যা ছিলো কমিশনের চেয়ারম্যানসহ (অবসরপ্রাপ্ত ১ জন বিচারপতি) ৭ জন, সংশোধন করে এ কমিশনের সদস্য সংখ্যা করা হয়েছে ৯ জন।

কমিশনের চেয়ারম্যান ১ জন (অবসরপ্রাপ্ত ১ জন বিচারপতি), পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি কমিশনের সদস্য ১ জন, রাঙামাটি (চাকমা), খাগড়াছড়ি (ত্রিপুরা) ও বান্দরবান (মারমা) পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি সদস্য ৩ জন, রাঙামাটি (চাকমা সার্কেল চীফ), খাগড়াছড়ি (মং সার্কেল চীফ) ও বান্দরবান (বোমাং সার্কেল চীফ) সার্কেল চীফ/প্রতিনিধি সদস্য ৩ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার সদস্য ১ জন।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে রাখা হয়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধি।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে বলা হয়েছে, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

এছাড়া ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। ২০১৬ সালের সংশোধীত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে ৩টি জনগোষ্ঠীকে প্রধান্য দেয়া হচ্ছে, লঙ্ঘিত করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান এবং ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

আগের আইনে ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যান যে কোন সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারবেন, এখন সংশোধীত আইনে কমিশনের সে ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রস্তাবে নতুন আইনে বলা হয়েছে, কমিশনের সকল সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ এবং ২০০১ সানের ৫৩ নং আইন এর ধারা ৩ এর ৬ নং উপ ধারায় বলা হয়েছে, “ কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :

(ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা;

(খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল;

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ(রিজার্ভ ফরেস্ট) কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

তবে শর্ত থাকে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।

এ আইনের উপধারার ব্যাখা অস্পষ্ট এতে করে যুগ যুগ ধারে পার্বত্য অঞ্চলে যে সব সরকারী ও স্বায়ত্বসাশিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বিশেষ করে রক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেষ্ট) তারা তাদের ভুমির মালিকানা হারাবে এতে কোন ধরনের সন্দেহ নাই। এতে সমস্যার সমুখিন হবে, সরকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও ভুমি জরিপ বিভাগ ইত্যাদি।

সরকার চাইলেই আগের মতো করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে যে কারো ভুমি/ জায়গা অধিগ্রহণ করতে পারবে না। খোদ সরকারকে অনুমতি নিতে হবে বা পূর্বেই অনুমোদন নিতে হবে অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কাছ থেকে।

পার্বত্য অঞ্চলের জনসাধারনকে এ আইনের সারমর্ম কি এবং কাদের স্বার্থে এই আইন বা প্রবিধানের সংযোজন করা হয়েছে এটা পরিস্কার করে জানিয়ে দেয়া এখন সময়ের দাবি। আমাদের দেশের সরকার প্রধান, পিসিজেএসএস প্রধান এবং পার্বত্য অঞ্চলের নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন পার্শ্বের বাড়িতে আগুন লাগলে নিজের বাড়িও তছনছ হয়।

৩ নং ধারার নং উপধারা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপস্থি বলা হয়েছে,“২০। সরল বিশ্বাসে কৃত কাজ-কর্ম সংরক্ষণ : এই আইন বা প্রবিধানের অধীন সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কাজের ফলে কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোন আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না”।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধন) ২০১৬ করা হয়েছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা জন্য।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধন) ২০১৬ বাস্তবায়ন করে কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের রেগুলেসন আইন পুর্ণ বলবৎ করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (উপজাতীয়) রীতি ও প্রথায় ভুমি বন্দোবস্তী দেয়া হবে, আসলে সেই রীতি ও প্রথা কি ?

সহজ ও সরল ভাবে বলতে গেলে; প্রথমত কোনো ভুমির মালিক তার খাস জায়গা বা ভুমি নিজের নামে বন্দোবস্তী করতে চাইলে বা আবেদন করলে প্রথম যেতে হবে তার এলাকার/গ্রামের কার্বারীর কাছে, সে কার্বারীর সুপারিশ নিয়ে ভুমির মালিক যাবে ২য় পর্য়ায়ে মৌজা হেডম্যানের কাছে, কিন্তু (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি)’র পক্ষ থেকে গ্রাম প্রধান কার্বারীকে আগে থেকে বলা আছে, কোন বাঙ্গালী (মুসলিম, হিন্দু ও বড়ুয়া পার্বত্য অঞ্চলে এরা হচ্ছে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী) যদি ভুমি/ জায়গার সুপারিশ নিতে আসে তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

ভুমির মালিক যদি কয়েক মাস দৌঁড়-ঝাঁপ করে তাহলে হয়তো মিলেও যেতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি।

ভুমির মালিক ২য় পর্য়ায়ে মৌজা হেডম্যানের কাছে গেলে সবার আগে হেডম্যান চাইবে সার্কেল চীফের স্থানীয় নাগরিকের সনদপত্র, (পার্বত্য চুক্তিতে এ ক্ষমতা জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চীফদের প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু সার্কেল চীফ, হেডম্যান ও কারর্বারীদের কাছে জেলা প্রশাসক প্রদত্ত স্থানীয় নাগরিকত্ব সনদপত্র গ্রহণযোগ্য নয়) যদি থাকে তো ভালো, না হলে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে সেই সার্কেল চীফের সনদপত্রের জন্য।

সার্কেল চীফদের কার্যালয়ে গিয়ে দেখবেন তাদের কার্যালয়ে পাহাড়িরদের জন্য ১টি ফাইল আর বাঙ্গালীদের জন্য ১টি ফাইল। পাহাড়িদের ফাইলে দেখবেন ৩০টি সনদপত্রের জন্য আবেদন আর বাঙ্গালীদের ফাইলে দেখবেন ১-২টি সনদপত্রের জন্য আবেদন। এ সনদের জন্য পাহাড়িদের কাছ থেকে নেয় ১শত টাকা ফি আর বাঙ্গালীদের কাছ থেকে নেয়া হয়(যদি সনদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়) হাজার টাকা ফি, যা চরম বৈষম্য ও সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।

যাক ধরে নিন, ভুমির মালিক সার্কেল চীফের কাছ থেকে স্থানীয় নাগরিকের সনদপত্র নিতে পেরেছেন, এবার মৌজা হেডম্যানের কাছে সুপারিশ নিয়ে ৩য় পর্যায়ে ভুমির মালিক যাবে সার্কেল চীফের সুপারিশ নিতে, ভাগ্য ভাল হলে সার্কেল চীফের সুপারিশ পেয়ে যাবে, না হলে দিনের পর দিন ঘুরেও ভুমি/ জায়গার মালিক সার্কেল চীফের কাছ থেকে সুপারিশ পাবে না।

ভুমি/ জায়গার মালিককে কেন সার্কেল চীফ সুপারিশ করছে না অথবা সমস্যা কি জানতে ভুমি/জায়গার মালিক সেই সার্কেল চীফের সাথে দেখা করতে চাইলে সার্কেল চীফ দেখা করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন বর্তমানে। সার্কেল চীফের কার্যালয় থেকে সে ভুমির মালিককে বলা হয় আপনার সমস্যা জানিয়ে সার্কেল চীফের কাছে আবেদন করতে। একবার, দুইবার ও তিনবার আবেদন করেও কোন ফল পাওয়া যায় না।

একদিকে ভুমির মালিকের দখলে থাকা ভুমি/জায়গা বন্দোবস্তীর জন্য সুপারিশ করবে না অন্যদিকে সার্কেল চীফ সেই ভুমি/জায়গার মালিকের সাথে দেখাও করেন না।(এই কাজটি বেশী করেন এক আইনজীবী সার্কেল চীফ)।

ধরা যাক, ভুমির মালিক সার্কেল চীফের সুপারিশ পেয়ে গেছেন, ৪র্থ পর্যায়ে যেতে হবে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড)’র কাছে। উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) অফিসে সেই কয়েক মাস পড়ে থাকার পর যাচাই – বাচাই করে, ৫ম পর্যায়ে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা সুপারিশ করে সেই ভুমি বন্দোবস্তীর ফাইল পাঠাবেন জেলা প্রশাসকের কাছে, সেই ফাইল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) যাচাই – বাছাই করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৬ষ্ঠ পর্যায়ে সেই ভুমি বন্দেবস্তীর ফাইল পাঠাবেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে অনুমোদনের জন্য।

জেলা পরিষদে সেই ভুমি বন্দোবস্তীর ফাইল কয়েক মাস পড়ে থাকার পর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমোদন পেলে সেই ভুমি/ জায়গা বন্দোবস্তীর ফাইল চলে যাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে, সেখানে কয়েক মাস শুনানী করার পর খাস ভুমি/জায়গার মালিককে অফিসিয়াল পত্র দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে ভুমি বন্দোবস্তীর সেলামীর টাকা (রাজস্ব) জমা দেয়ার জন্য। এখানে কেবলমাত্র মৌজার জায়গা/ভুমি বন্দোবস্তীর বিষয়ে বলা হয়েছে।

পার্বত্য তিন জেলায় রয়েছে বাজার ফান্ড নামক আরো একটি গোদের উপর বিষফোঁড়া।

এছাড়া বিএনপি সরকারের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান তিন পার্বত্য জেলায় এক পরিপত্র জারি করিয়েছেন, এতে বলা হয়েছে, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য তিন জেলার জেলা শহরের মৌজা বা পৌরসভা এলাকার মধ্যে একজন ব্যাক্তিকে ৩০ শতকের বেশী ভুমি/ জায়গা বন্দোবস্তী জন্য জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চীফের কার্যালয় থেকে সুপারিশ দেয়া বা গ্রহণ করা যাবে না।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহ, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, উপজেলা ভুমি কর্মকর্তার কার্যালয়,সার্কেল চীফ কার্যালয়, হেডম্যান কার্যালয় ও কার্বারীদের ভিতর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অবস্থান ক্ষীণ।

বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ১০০% কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গড়ে ২-৩ %।

এছাড়া পার্বত্য এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী (এনজিও) প্রতিষ্ঠানে ১০০% কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাঙ্গালীর সংখ্যা গড়ে ১% ও নয়।স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর ভবিষৎ কি?

লেখক: প্রধান সম্পাদক, সিএইচটি মিডিয়া টুয়েন্টিফোর ডটকম

বিতর্কিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাতিলের দাবীতে ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে বাঙালী সংগঠনগুলো

হরতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিতর্কিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ সংশোধনী- ২০১৬ অবিলম্বে বাতিল এবং বান্দরবানের বাঙালী নেতা আতিকুর রহমানের মুক্তির দাবীতে ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে ৫ বাঙালী সংগঠন। ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা এবং ১৬ অক্টোবর রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মোট ৪৮ ঘন্টা হরতাল হরতাল ডেকেছে সংগঠন ৫ টি।

রবিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে-

‘পার্বত্য জনগণের আন্দোলনকে উপেক্ষা করে সরকার পার্বত্য চট্রগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন- ২০০১ ও তার সংশোধনী আইন-২০১৬ তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে পাস করার প্রতিবাদে এবং বান্দরবানের বাঙ্গালী নেতা আতিকুর রহমানের মুক্তির দাবিতে আগামী ১৩ অক্টোবর ও ১৬ অক্টোবর হরতাল ডেকেছে পাঁচ বাঙ্গালী সংগঠন ।

৯ অক্টোবর সকাল ১০টায় সংগঠনগুলোর ঢাকার অস্থায়ী কার্যালয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয় । এতে সভাপতিত্ব করেন পাঁচ বাঙ্গালী সংগঠনের আহবায়ক, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া ।

এতে আরো উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য সমধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কামাল, পার্বত্য গণ পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার, পার্বত্য গণ পরিষদের মহাসচিব এডভোকেট মোহাম্মদ আলম খান, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আহম্মেদ রাজু, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাব্বির আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার জাহান খান,পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আফছার হোসেন রনি, সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মুন্না তালুকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলাম খান।

সরকার গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০১৬ পাস করায় পাঁচ বাঙ্গালী সংগঠন নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, এই বিতর্কিত আইন পার্বত্য চট্রগ্রামে বাঙ্গালী এবং উপজাতীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সমুহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে । তাই এই বিতর্কিত আইন শীঘ্রই বাতিল এবং বান্দরবানের পাঁচ সংগঠনের শীর্ষ নেতা, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি আতিকুর রহমান মুক্তির দাবিতে তারা নিন্মোক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করে:

ক) ৯ অক্টোবর থেকে তিন পার্বত্য জেলায় বিক্ষোভ মিছিল, গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ এবং সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন।
খ) ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা এবং ১৬ অক্টোবর রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মোট ৪৮ ঘন্টা হরতাল’ ।

৪ সেপ্টেম্বর পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের বৈঠক

সংশোধিত কমিশন আইন বাতিলের দাবীতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খাগড়াছড়ি বাঙালি ছাত্র পরিষদের স্বারকলিপি

Khagrachari Picture(02) 28-08-2016

নিজস্ব প্রতিবেদক::

আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন বৈঠকে বসছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কমিশনের সচিব মো: রেজাউল করিম। তবে এখনো এ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু হয়নি।একইভাবে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দুই বছর পর এটি হবে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের ৫ম চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল হকের প্রথম বৈঠক। ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের এই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পার্বত্য ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই মাসে ১৩(সেপ্টেম্বর) তিনি খাগড়াছড়ি এসে যোগদান করেন। তবে আইন সংশোধনের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদসহ পাহাড়ি সংগঠনগুলোর দাবীর মুখে তিনি এতোদিন কাজ শুরু করতে পারেন নি।


ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সংক্রান্ত আরো খবর

  1. ♦  আদিবাসী প্রসঙ্গ এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন
  2.  ভূমি কমিশন আইন: পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাঙালী উচ্ছেদের হাতিয়ার
  3.  ভূমি কমিশন আইন-২০১৬ কার্যকর হলে জুম্ম ল্যান্ডের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে- মে. জে.(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম বীরপ্রতীক
  4.  ভূমি কমিশন আইন পাশের নামে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র চলছে- ওয়াদুদ ভুঁইয়া
  5.  ‘ভূমি কমিশন (সংশোধীত) আইনে অনিশ্চয়তার মুখে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালীর ভবিষ্যৎ’
  6.  কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?
  7.  পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন?
  8.  পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন- ২০১৬ অধ্যাদেশ জারি
  9.  ভূমি কমিশন আইন সংস্কার: আদালতের কার্যপরিধি খর্ব হওয়ার আশংকা
  10.  ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন: নীরব বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো
  11.  ভূমি কমিশন আইন সংশোধনে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার খর্ব
  12.  পার্বত্য ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অচল!

অবশেষে গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ভেটিং সাপেক্ষে ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ৯ আগস্ট তা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

Khagrachari Picture(01) 28-08-2016

এদিকে সংশোধিত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন বাতিলের দাবীতে আজ রবিবার সকালে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বারকলিপি দিয়েছেন। বেলা ১১টায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামানের মাধ্যমে এ স্বারকলিপি দেওয়া হয়।

এ সময় পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি মাইন উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক এস এম মাসুম রানা, যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম,সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মোসতফা কামাল উপস্থিত ছিলেন।

বাঙালী সংগঠনগুলোর দাবী সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন বাস্তবায়ন হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, সরকারের কর্তৃৃত্ব খর্ব হবে। এই ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ১৯৯৯ সালের ৩ জুন গঠিত ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী কার্যভার গ্রহণের আগেই মারা যান। ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল পুনর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুল করিম কার্যভার গ্রহনের কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন।

২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় দফায় পুনর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মাহমুদুর রহমান ২০০৭ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(জেএসএসের) বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেননি। জেএসএসের দাবী ছিল আইন সংশোধন।

২০০৯ সালের ১৬ জুলাই বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে তিন বছরের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন,কমিশনের ৪র্থ চেয়ারম্যান। তার মেয়াদ শেষ হয় ২০১২ সালের ১৮ জুলাই। এর টানা প্রায় দুই বছর কমিশন ছিল শুন্য।

বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহনের পর প্রথম দিকে পার্বত্য জেলায় ভূমি জরিপের জন্য উদ্যোগ নিলে সন্তু লারমাসহ কমিটির সদস্যও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে পিছু হটেন। পরবর্তীতে তিনি বিরোধ নিস্পত্তির জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করলে প্রায় সাড়ে চার হাজার আবেদন জমা পড়ে। আবারও আপত্তির মুখে পড়েন।

কিন্তু চেয়ারম্যান তার অবস্থানে অনঢ় থাকলে কমিশনের আইন সংশোধন ও পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবীতে কমিটির অন্যতম সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(জেএসএস) একাংশের প্রধান ও আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা কমিশনের আইন সংশোধনের দাবীতে বৈঠক বর্জন শুরু করে। এর পর থেকে অপরাপর পাহাড়ি সদস্যরাও ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের বৈঠক বর্জন শুরু করলে কমিশন অকার্যকার হয়ে পড়ে।

পাশাপাশি ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ) ও জুম্ম প্রতিনিধি সংসদসহ পাহাড়ি সংগঠনগুলোও একই দাবীতে আন্দোলনে নামে। কিন্তু কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী আইনের বিশেষ বিধান বলে শুনানী অব্যাহত রাখেন।

আদিবাসী প্রসঙ্গ এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন

পার্বত্য-চট্টগ্রাম11

♦ মুন্শী আবদুল মাননান ♦

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। এতে বক্তব্যে রাখেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবীর, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম প্রমুখ।

ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে আধিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে জোর চেষ্টা চলছে। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছে, তেমনি কিছু মহলও একই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত আদিবাসী ফোরাম গঠনের লক্ষ্যই হলো, ওইসব জনগোষ্ঠীর আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানাদির আয়োজনের লক্ষ্যও মূলত একই। এখানে স্মরণ করা দরকার, অতীতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা একযোগে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দাবি করছে কেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। সাধারণ অর্থে কোনো দেশ বা অঞ্চলের বা ভূখ-ের সর্বপ্রাচীন অধিবাসীদের আদিবাসী বলে অভিহিত করা হয়।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের আদিবাসী দাবি করে এটা প্রমাণ করতে চাইছে, বাংলাদেশের বা তার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের তারাই সর্বপ্রাচীন আদিবাসী। এই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশের বা ওইসব অঞ্চলের ভূমি বা সম্পদের ওপর তাদের একটি বিশেষ অধিকার জন্মে এবং সেই অধিকার কায়েমের পথ প্রশস্ত হয়। অথচ ইতিহাসের সাক্ষ্য এই যে, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, হাজংসহ কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন আধিবাসী নয়। তারা মাত্র কয়েকশ বছরের ব্যবধানে অন্যান্য দেশ থেকে এসে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে বাঙালিরাই সর্বপ্রাচীন অধিবাসী বা আদিবাসী।

ইতিহাসের এই সাক্ষ্য এখন স্বীকার বা মান্য করতে চাইছে না উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো এবং কিছু মহল। তারা যে কোনো মূল্যে নিজেদের বা উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন সময় ইতিহাসের অকাঠ্য তত্ত্ব-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি (আরো অনেকে দেখিয়েছেন) বাংলাদেশে যেসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে তাদের কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয়। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন তেমন দেশের চিহ্নিত কিছু মহল সেটা মানতে নারাজ। তারা লাগাতার তাদের লক্ষ্য হাসিলে কাজ করে যাচ্ছে। ঘটা করে আদিবাসী দিবস পালন ওই তৎপরতারই অংশ।

লক্ষ্যণীয়, ওই দিনের অনুষ্ঠানে পূর্বে উল্লিখিত বক্তারা সবাই উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী অভিধায় চিহ্নিত করে তাদের অধিকার সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন। সন্তু লারমার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। সন্তু লারমা সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, সরকার ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের প্রশ্নে আন্তরিক নয়। এটা নানাভাবে নানা যৌক্তিকতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের পক্ষে কাজ না করে জনসংহতি সমিতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘আদিবাসীদের’ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এর প্রতিকার চেয়েছেন এবং সবাইকে সংগ্রামী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের সবাইকে নিজেদের প্রয়োজনেই সংগ্রামী হতে হবে। সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে দেশ স্বাধীন হলেও ‘আদিবাসীরা’ শোষণমুক্ত হওয়া তো দূরের কথা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ই পাননি। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে তথা রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই ‘আদিবাসীদের’ মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের অধিকার দিতে হবে। আদিবাসী স্বীকৃতি সরকারি তরফ থেকে না আসায় অত্যন্ত মনোবেদনা প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, আমাদের দেশে এখনো ‘আদিবাসীরা’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো তাদের শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটা অত্যন্ত বেদনার ও হতাশার কথা।

ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। সে রাষ্ট্রটি মাথা উঁচু করেও বিশ্বের দরবারে দাঁড়াতে পারে না। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দার্শনিক ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্ত অধিকার দেয়া। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ‘আদিবাসীরা’ সে সুযোগ পায়নি। পার্বত্য শান্তি চুক্তি প্রণয়নের পর ‘আদিবাসীরা’ তাদের ভূমির অধিকার সংরক্ষণের জন্য যে দাবি জানিয়ে আসছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বা সংরক্ষিত হয়নি। মামুনুর রশীদ বলেছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে যে নিয়ম-কানুন হয়েছে, তার কোনোটিই তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। অথচ তা হলে ‘আদিবাসীদের’ বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন মান আরো উন্নত হতো। অন্যদের বক্তব্য প্রায় একই রকম। কাজেই তাদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না। যাদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো : কথিত আদিবাসীদের অধিকার অনর্জিত রয়েছে। ভাবটা এরকম যেন উপজাতীয় বাদে দেশের সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, উপজাতীয়দের চেয়েও দেশের বহু মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি-বাকরি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তারা উপজাতীয়দের অধিকার অনর্জিত থাকার জন্য সরকারকেই দায়ী করেছেন। সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সরকার কেন উপজাতিদের আদিবাসী বলে না, এ জন্য। তাদের এই ক্ষোভ একটি অযৌক্তিক ও অনৈতিক দাবির প্রতি সমর্থনেরই নামান্তর। সরকার বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশে তথাকথিত কোনো আদিবাসী নেই। এটাই রাষ্ট্রের অবস্থান। বস্তুত, তারা রাষ্ট্রের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নির্দিষ্ট করেছেন। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে অনেকেই আলোকপাত করেছেন।

যে সন্তু লারমা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বানানোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতিও বটেন, তিনি এক সময় তথাকথিত শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই ‘শান্তি বাহিনী’ বছরের পর বছর ধরে দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। ‘শান্তি বাহিনীর’ লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা। গত শতকের ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘শান্তি বাহিনী’র দৌরাত্ম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন সরকার দু’টি পন্থা অবলম্বন করে।

প্রথমত, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যথাসম্ভব এই বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দমন করা। দ্বিতীয়ত, শান্তি স্থাপনের জন্য ‘শান্তিবাহিনী’র সঙ্গে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা। ‘শান্তি বাহিনী’ সে সময় আলোচনায় পাঁচ দফা দাবিনামা পেশ করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক তার একটি লেখায় ওই পাঁচ দফা দাবির প্রথম দফাটি উল্লেখ করেছেন। দফাটি এই : ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙামাটি। ২টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে, ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম অতঃপর লিখেছেন: ‘শান্তি বাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের কাছে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতিকিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অংকন করা।’ বলা বাহুল্য, এ দাবিনামা মানা সম্ভব ছিল না এবং মানাও হয়নি।

‘শান্তি বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে তার দাবিনামা পেশ করে ১৯৮৭ সালে। এর দশ বছর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মধ্যে একটি চুক্তি হয় যা ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই চুক্তির পর এত বছর অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বলা যাবে না। জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠাকামীরা তাদের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে, এমন দাবিও জোর দিয়ে কেউ করতে পারে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, তারা এখনো তৎপর ও সক্রিয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা হত্যা, চাঁদাবাজি ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ সংশোধিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ গত ৮ আগস্ট প্রণয়ন ও জারি করেছেন মাননীয় প্রেসিডেন্ট।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে ৩ জুন বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে সরকার ল্যান্ড কমিশন গঠিত করে। ২০০১ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ প্রণীত হয়। ওই সময়ই এই আইন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালীদের ভূমি অধিকার এই আইনে খর্ব হয়েছে। জনসংহতি সমিতিও এ আইনের ব্যাপারে আপত্তি তোলে। তার মতে, এতে উপজাতীয়দের ভূমি অধিকার নিরংকুশ হয়নি। কমিশনের নিয়ন্ত্রণও রয়ে গেছে সরকারের হাতে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। শুধু এটুকু বলবো যে, জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আইনের ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করে। এই সংশোধনীগুলো পেশ করা হয় বাঙালীদের ভূমি অধিকার আরো খর্ব ও অনিশ্চিত করে উপজাতীয়দের অধিকার নিশ্চিত ও সংহত করার জন্য এবং কমিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার জন্য।

যতদূর জানা গেছে, আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আসা জনসংহতি সমিতির সংশোধনী প্রস্তাবগুলো সংশোধিত আইনে গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে কম; সংক্ষেপে দুয়েকটি বিষয় ও প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করছি। এক : মূল আইন বা ২০০১ সালে প্রণীত ৫৩ নং আইনের ৪ ধারার ২ উপধারায় উল্লিখিত ‘যে কোনো পার্বত্য জেলায়’ শব্দগুলোর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে ‘যে কোনো পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোনো স্থানে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। ৪ নং ধারাটি কমিশনের কার্যালয় সংক্রান্ত। দেখা যাচ্ছে, মূল আইনে এর শাখা কার্যালয় যে কোনো পার্বত্য জেলায় স্থাপন করার কথা থাকলেও সংশোধিত আইন অনুযায়ী অন্য কোনো স্থানেও স্থাপন করা যাবে। অর্থাৎ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও দেশের যে কোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে। দুই : ২০০১ সালের আইনের ৬ ধারার উপধারা (১) এর (ক) দফা (ক) এর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে দফা (ক) প্রতিস্থাপিত হয়েছে এভাবে : (ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা; (খ) দফা (খ) তে উল্লিখিত ‘আইন ও রীতি’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ শব্দগুলি ও কমা প্রতিস্থাপিত হইবে; (গ) দফা (গ) এর পরিবর্তে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা এরকম : (গ) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন। নীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে চলে আসা ভূমিসহ (ঋৎরহমব খধহফ) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিল করণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল; তবে শর্ত থাকে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত এবং বসতবাড়িসহ জলে ভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা এবং বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’

উল্লেখ করা দরকার, মূল আইনে এই ‘শর্তের’ অংশটি ছিল এরকম। ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত (জবংবৎাবফ) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া। ভূ-উপগ্রহ এলাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’ এখানে বিবেচ্য বিষয় এই যে, ‘আইন ও রীতি’র জায়গায় ‘আইনে, রীতি ও পদ্ধতি’ প্রতিস্থাপিত হলো যেন তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অন্যদিকে ‘শর্তের’ জায়গায় বনাঞ্চল, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি বাদ গেল কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেকের অভিমত, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমিই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখন এই বনাঞ্চলের ভূমির দাবীও যে উপজাতীয়রা করতে পারবে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের কথা নিয়ে আমরা ইতি টানবো এই নিবন্ধের। তিনি আগে উল্লেখিত নিবন্ধের শেষাংশে বলেছেন; ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে।

যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না ? যদি থাকে, তাহলে কত সংখ্যক ও কোন কোন শর্তে ?’

এক মানববন্ধনে তিনি বলেছেন : ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ, যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড, যার রাজধানী রাঙামাটি। এই দুটি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হয়নি। কিন্তু বর্তমান ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে বিদ্রোহীদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

ভূমি কমিশন আইন: পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাঙালী উচ্ছেদের হাতিয়ার

ইবনে-রহমত

সৈয়দ ইবনে রহমত

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা নতুন করে তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলনে নেমেছে। নানা বিষয়ে ভিন্ন মত থাকলেও বাঙালিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে একত্রিত হয়ে আন্দোলনের যৌথ কর্মসূচিও দিয়েছে। ফলে যেকোন সময় পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এসব কিছু হচ্ছে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তথা সন্তু লারমার চাহিদা মতো ‘পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধনের উদ্যোগের কারণে।

গত ১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনের যে ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করা হয়েছে তা কার্যকর হলে ভূমি কমিশনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের হাতে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা। আর কমিশনকে ব্যবহার করে সন্তু লারমা কোনো বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করলেও কোনো আইন-আদালত কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিকার করার ক্ষমতা থাকবে না।

ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং অনুচ্ছেদেই বলা আছে যে, ‘ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এ অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

গত ১ আগস্ট ২০১৬ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সংবাদ ব্রিফিং এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে পরদিন ২ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের ১৪টি সংশোধনীর অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। আর সংসদ যেহেতু দুই মাস পরে বসবে, তাই জরুরি বিবেচনায় এটাকে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই আন্দোলনে উত্তাল হতে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম।

ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের ফলে পার্বত্য বাঙালিদের উদ্বেগের মূল কারণটি স্পষ্ট হয়েছে গত ৪ আগস্ট এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে দেওয়া মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীকের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড যার রাজধানী রাঙাগামাটি। এই দু’টি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হইনি। কিন্তু বর্তমান এই ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে দেশদ্রোহীদের সেই সপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে উপলব্ধির জন্য পার্বত্য ভূমি কমিশন, কমিশন আইন এবং কমিশন আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোকপাত করা দরকার। ভূমি কমিশন : পার্বত্যাঞ্চলে ভূমি সমস্যাটি নতুন কোনো বিষয় নয়। এটিই এখানকার সব চেয়ে জটিল সমস্যা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ভূমিবিরোধ সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য একটি ল্যান্ড কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ৪, ৫ ও ৬ ধারা মতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে ৩ জুন ১৯৯৯ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ল্যান্ড কমিশন গঠন করে। এরপর তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে ২০০১ সালের ৫৩ নং আইন তথা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ পাস করে।

এই আইনটিতেই পার্বত্য বাঙালিদের ভূমির অধিকার খর্ব করার যাবতীয় ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু এতে সন্তু লারমার একক কর্তৃত্ব করার সুযোগ কিছুটা কম থাকায় তিনি নাখোশ হন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর ব্যাপারে আপত্তি তোলে সংশোধনের দাবি জানায়। তারা তাদের দাবির পক্ষে সরকারের পাসকৃত আইনের ২০টি ধারার বিপরীতে আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে প্রথমে ১৯ দফা সুপারিশ প্রেরণ করে। পরবর্তী সময়ে সুপারিশ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩-এ। আঞ্চলিক পরিষদের সুপারিশ সমূহকে উদ্দেশ্য অনুসারে আমরা দুই ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

প্রথমত, এমন কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভূমির উপর পার্বত্য বাঙালিদের অধিকারকে খর্ব করে উপজাতীয়দের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।

দ্বিতীয়ত, অবশিষ্ট সুপারিশগুলো করা হয়েছে, যাতে ভূমি কমিশনের ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে আঞ্চলিক পরিষদ তথা জেএসএসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। বাংলাদেশ সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে যেসব সংশোধনী গৃহীত হয়েছে তাতে জেএসএসের উভয়বিধ সিদ্ধান্তই হাসিল হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সভায় বারবার ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী : ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ পাসের পর থেকে গত দেড়যুগ ধরে সরকারের নানা পর্যায়ে এ আইন সংশোধন নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। একাধিকবার মন্ত্রিপরিষদ সভাতেও আইনটির সংশোধনী উত্থাপিত হয়েছে, এমনকি উত্থাপিত সংশোধনী পাসের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।

গত ৩০ জুলাই ২০১২ মন্ত্রিপরিষদ সভা ভূমি কমিশন আইনের ১৩টি সংশোধনী পাসের জন্য অনুমোদন দিয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর করা যায়নি। এরপর ২০১৩ সালের ২৭ মে মন্ত্রিপরিষদ সভা ভূমি কমিশন আইনে আগের গৃহীত ১৩টি থেকে কমিয়ে ৬টি সংশোধনী গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। যা সংসদের মাধ্যমে পাস করার কথা ছিল। কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি। এরপর বেশকিছু দিন নীরব থেকে হঠাৎ করেই ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করেছে মন্ত্রিপরিষদ। আর সংসদ বসতে দুই মাস বিলম্ব থাকায় তড়িগড়ি করে তা অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস এবং সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের বিবেচনা 

গত ৮ মে ২০১৬ রাজধানীর বেইলী রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স নির্মাণের ভিত্তিফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধনের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘২০০১ সালে আমরা যে আইনটা করেছিলাম, সেখানে তারা (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তথা সন্তু লারমা) কিছু সংশোধন চেয়েছেন। সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যতটুকু করা সম্ভব, সেটা আমরা করে দেব।’

প্রধানমন্ত্রীর সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে আইন সংশোধনের সেই আশ্বাস এবার মন্ত্রিপরিষদ সভায় কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অমূলক হবে না। কারণ এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সভায় প্রথম দফায় ১৩টি এবং পরে ৬টি সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পরেও সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নেই তা কার্যকর করা যায়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে যে, আগে যেসব সংশোধনী দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কার্যকর করা যায়নি, কোন বিবেচনায় এবার সেসব সংশোধনী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে মান উতীর্ণ হয়ে গেল?

তারপরেও কথা থাকে, সংসদ বসতে দুই মাসের বিলম্ব দেখিয়ে তড়িগড়ি করে এটিকে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্তটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। ধারণা করা যায়, কোনো একটি পক্ষ দ্রুততার সাথে সংসদকে পাশ কাটিয়ে সব কিছু করে ফেলার ব্যাপারে অতিউৎসাহী মনোভাব দেখাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা দরকার।

তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও যার বা যাদের পরামর্শে তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধন করছেন তারা এদেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কতটা অনুগত তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে।

১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর ১৯৯৯ সালের ১২ মে সন্তু লারমা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করেন। সেই থেকে অদ্যাবধি একই পদে তিনি বহাল আছেন। গাড়িতে পতাকাসহ রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করছেন। অথচ আজ পর্যন্ত তিনি কোনো দিন এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনারে গিয়েছেন বলে শোনা যায় না। তাছাড়া, সন্তু লারমার দল পার্বত্য জনসংহতি সমিতি সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিয়মিতই অংশ নেয় এবং তাতে জয় লাভও করে। অথচ দলটির প্রধান সন্তু লারমা আজ পর্যন্ত এদেশের নাগরিকত্বের প্রতীক জাতীয় পরিচয়পত্রটি পর্যন্ত গ্রহণ করতে সম্মত হননি। রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেও এতটা ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ যিনি করতে পারেন, সেই তারই পরামর্শে ‘পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধন করার পরিণতি কী হতে পারে তা অনুমান করে দেশবাসীর মনে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়াটা কি অমূলক?

ভূমিকমিশন আইনের কিছু সংশোধনী প্রস্তাবের পর্যালোচনা

পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে গৃহীত ১৩টি (এবার এর সাথে আরও একটি সংশোধনী যোগ করা হয়েছে) সংশোধনীর মধ্যে ২নং প্রস্তাবে আছে- আইনের (২০০১ সালের ৫৩ নম্বর আইন) তৃতীয় অনুচ্ছেদে ‘পার্বত্য জেলাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির’-এর স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ প্রতিস্থাপিত হবে। জেএসএস সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। তাদের সেই আকাক্সক্ষা তারা কখনই পরিত্যাগ করেনি। যা বিভিন্ন সময় তাদের বক্তব্য, আচার-আচরণ থেকে প্রমাণিত। সরকারের সাথে চুক্তি করার সময় যেহেতু স্বাধীন দেশের দাবি তোলা অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তাই তারা প্রথমে ফেডারেল রাষ্ট্র এবং পরে স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল।

কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সরকার এ দাবি মেনে না নেয়ায় তারা সংবিধানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেই চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। তাই বলে তাদের মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে যায়নি। সে কারণে পার্বত্য চুক্তির শুরুতেই পার্বত্যাঞ্চলের পরিচয়কে তারা ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। আর এর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে পার্বত্যাঞ্চলকে পৃথক করে ফেলা। যাতে ধীরে ধীরে এই স্বতন্ত্র পরিচয়টাকেই বড় করে তাদের পুরনো উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে।

পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ই এই বিষয়টির ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলোকপাত করেছিলেন। কিন্তু সরকার তখন এর প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি। বোঝা যায় সরকার এর ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন ছিল এবং এখনো উদাসীন আছে। যা ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীর দুই নং প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমেও প্রমাণিত। সরকার উদাসীন থাকলেও জেএসএস তাদের লক্ষ্যে যে অবিচল এখানে সেটাই স্পষ্ট। যার ফলে তারা ‘পার্বত্য জেলা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’র স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপনের দাবি আদায় করেছে। ‘জেলা’ বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ তাই এই শব্দটি জেএসএস মানতে পারেনি। তাদের প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে এই অঞ্চলের নতুন একটি পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা, তারা সেটি করতে পেরেছে। আর আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বুঝেই হোক কিংবা না বুঝেই হোক এই প্রস্তাব গ্রহণ করে জেএসএসের খায়েশ পূরণে সহায়তা করছে।

এই একটি সংশোধনীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেই অপর প্রস্তাবগুলোর উদ্দেশ্যও বোঝা সম্ভব। কেননা প্রতিটি প্রস্তাবই এসেছে জেএসএসের কাছ থেকে। আর তারা যে এসব প্রস্তাব তাদের মূল উদ্দেশ্য সামনে রেখেই দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সংশোধনীর ৪ এবং ৫নং প্রস্তাব নিম্নরূপ: ৪। ৬ (১) (ক) ধারায় ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’-এর স্থলে ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া জায়গাজমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণসহ সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি চুক্তির পরিপন্থী নয় এমন সকল বিষয়ে চুক্তির ধারা (ঘ) ৪ মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’ প্রতিস্থাপিত হবে। ৫। ৬ (১) (খ) ধারায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী’ শব্দাবলির স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী’ হবে।

উপরের দুটি প্রস্তাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী’ বিরোধ মীমাংসা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ বলতে আসলে কী বোঝায় তার ব্যাখ্যা কি সরকারের কাছে আছে? আমরা আসলে জানি না, তা ছাড়া সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যা থাকার কথাও না। কারণ ৪নং প্রস্তাবেই অবৈধ বন্দোবস্ত জমির প্রসঙ্গ এসেছে। এর অর্থ হলো সরকার অবৈধভাবে কাউকে না কাউকে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছে! বিষয়টি কি আসলে তাই? রাষ্ট্রের আইনেই বৈধ কিংবা অবৈধতা নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দেখছি ভিন্ন বিষয়।

সরকারের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ বলে ঘোষণা করারও বিধান আছে! কিন্তু সেই বিধানটি আসলে কী, এর প্রয়োগকারীই বা কারা? আমরা আসলে বোঝতে পারছি না, এর মাধ্যমে সরকার পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি বন্দোবস্ত দেয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা অন্য কারো হাতে ছেড়ে দিচ্ছে কি না। আর যদি তাই হয় তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে, সংশ্লিষ্টদের তা ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ রইল।

সংশোধনীর ৬নং প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে- ৬ (১) (গ) ধারায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইনবহির্ভূতভাবে কোনো বন্দোবস্ত দেয়া হয়ে থাকলে তা বাতিল এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল’-এর স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিজল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হয়ে থাকলে তা বাতিল এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল’ প্রতিস্থাপিত হবে।

ধারা ৬(১)(গ) এর শর্তাংশ ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হবে না’ শব্দাবলি বিলুপ্ত হবে। এই সংশোধন প্রস্তাবটির দ্বিতীয় অংশ পার্বত্য চুক্তিতে ছিল। অর্থাৎ শান্তি চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বহাল রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখানে তা বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। কারণটা কী? শান্তি চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বহাল রাখা সম্ভব হলেও আজ কেন তা বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছে না?

বর্তমানে এমনকি পরিবেশ তৈরি হলো, তার ব্যাখ্যা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা দরকার। কেননা রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিক শুধু সরকার নয়, মূল মালিক এই দেশের ১৬ কোটি জনগণ। অতএব, তাদের সম্পদ অন্যকারো হাতে ছেড়ে দেয়ার ব্যাখ্যা জানার অধিকার দেশের জনগণের আছে। ৯নং প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ৭(৫) ধারায় ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১) বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে’-এর স্থলে ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে’-শব্দাবলি প্রতিস্থাপিত হবে।

এ প্রস্তাবে কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতাকে খর্ব করে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের স্বেচ্ছাচারিতার নিকট ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কারণ চেয়ারম্যানসহ পাঁচজনকে নিয়ে কমিশন। ১. সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি (চেয়ারম্যান), যিনি বর্তমানে একজন বাঙালি হলেও ভবিষ্যতে উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সদস্য হওয়া সম্ভব। ২. আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। ৩. সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। ৪. সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। এবং ৫. চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (যিনি উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হওয়া খুব সম্ভব)। এই যখন কমিশনের অবস্থা তখন অধিকাংশের মতামত কোন দিকে যাবে- এটা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভেবে দেখেছেন?

১১নং প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ধারা ১০(৩)-এর পরে নতুন উপধারা ১০(৪) নিম্নবর্ণিতভাবে সন্নিবেশিত হবে: ‘(৪) কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যে কোনো সময় ন্যায়বিচারের স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবেন’ এ সংশোধনীর মর্মার্থ হলো, ইতিপূর্বে দেখা গেছে ভূমি কমিশনে উপজাতীয়রা যেসব আবেদন করেছে তার অধিকাংশই ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক। তাই সেসব বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু ন্যায় বিচারের স্বার্থে বলা হলেও উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের মূল উদ্দেশ্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি নয়, বরং কলেকৌশলে বাঙালিদের ভূমি হস্তগত করা। তাই কোনো ভূমিকে নিজের বলে দাবি করার পর তা আইনগত কারণে বাতিল হয়ে গেলে সেই জমি নিয়ে নতুন করে তালবাহানা করে বাঙালিদের হেনস্থা করার সুযোগ থাকে না। সেকারণেই উপরের সংশোধনীটি নেওয়া হয়েছে যাতে, যখনই কোনো আবেদন বাতিল হয়ে যাবে বলে মনে হবে, তখনই যেন তা আবার নতুন আবেদন করে বিষয়টি জিইয়ে রাখা যায় এবং শেষ পর্যন্ত কমিশনকে ব্যবহার করে জমিটি হস্তগত করা যায়।

১২নং প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ধারা ১৩(২)-এর পরে নতুন উপধারা ১৩(৩) নিম্নবর্ণিতভাবে সন্নিবেশিত হবে: ‘১৩(৩) এই ধারার অধীন কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলায় উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হবে’। ভূমিকমিশনের অধিকাংশ সদস্য উপজাতীয়, অন্যদিকে পার্বত্য বাঙালিদের পক্ষ থেকে কোনো সদস্য সেখানে নেই। তার উপর কমিশনের সকল পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা, কর্মচারীও যদি উপজাতীয় হন তাহলে সেই কমিশন থেকে পার্বত্য বাঙালিরা সুবিচার আশা করতে পারে-এটা কি ভাবা যায়? যারা বিশ্বাস করেন পার্বত্যাঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্ব বা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার নেই এবং সেখানে বসবাসের অধিকার বাঙালিদের নেই, সেই উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কর্তৃত্বাধীন ভূমিকমিশন বাঙালিদের উপর সুবিচার করবে এটা কি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন?

বাঙালিদের ভূমি এবং ভোটাধিকার হরণ

পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৪নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যগণ জনসাধারণ কর্তৃক প্রত্যক্ষভাবে এই আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত হইবেন।’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভোটার তালিকা প্রয়োজন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যাতে জটিলতা সৃষ্টি করা যায়, সম্ভবত সেই উদ্দেশ্যই পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৯নং ধারার ৪নং উপ-ধারায় কোনো ব্যক্তির ভোটার হওয়ার ব্যাপারে একটি বিতর্কিত এবং সংবিধান পরিপন্থী শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই উপধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।’ যা পরে ১৯৯৮ সালে জেলা পরিষদ আইনসমূহ সংশোধন করে ১৭নং ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আবার অ-উপজাতীয়দের ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা বলিতে- যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।’ অর্থাৎ পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ভোটার হতে হলে বৈধ জমির মালিক হতে হবে।

কিন্তু বাঙালিরা যাতে বৈধ জায়গা সম্পত্তির মালিক হতে না পারে সে জন্যও সকল পদক্ষেপ নিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন- খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিক্রয় বা অন্যান্যভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদকে অবহিত করে বা জেলা পরিষদের অনুমতি নেয়াকে শর্ত করে দেয়ায় বাঙালিদের ভূমির মালিক হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে গঠিত ল্যান্ড কমিশনকে অকার্যকর করে রাখার জন্য আঞ্চলিক পরিষদ বিভিন্ন অযৌক্তিক দাবি দিয়ে রেখেছে। আসলে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের উদ্দেশ্য সরকারে নিকট যাই থাকুক উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে এর উদ্দেশ্য পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের ভূমিহীন করা। কেননা পার্বত্য বাঙালিদের ভূমিহীন করতে পারলে সংবিধান পরিপন্থীভাবে (পার্বত্য জেলা পষিদ আইনের ক্ষমতা বলে) তাদের ভোটাধিকার হরণ করা যাবে। আর সেটা সম্ভব হলে বাঙালিরা পার্বত্যাঞ্চলে ভূমির অধিকার, ভোটাধিকার হারিয়ে এক সময় হতাশ হতে বাধ্য হবে। আর মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব মানুষ হয়তো পার্বত্যাঞ্চল ছেড়ে যেতে শুরু করবে। ক্রমান্বয়ে বাঙালির সংখ্যা কমতে থাকলে তারা পার্বত্যাঞ্চলে জাতিসংঘের উপস্থিতিতে পূর্বতিমূরের মতো স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটের আয়োজন করবেন। সে ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাবে তা-তো আগেই থেকেই নির্ধারণ করা থাকছে। অতএব, পরিণতিটা সহজেই অনুমেয়।

সরকারি কর্তাব্যক্তিরা চাকরি রক্ষার্থে যত গালভরা যুক্তিই দেখাক না কেন, ভূমি কমিশন আইন সংশোধন, আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়, জেলা পরিষদের মাধ্যমে পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রচেষ্টাসহ পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ প্রতিটি পদেক্ষেপই নিচ্ছে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই। ভূমিকমিশন আইন সংশোধনীর প্রতিটি প্রস্তাবই তাদের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই আনা হয়েছে। এবার যেসব সংশোধনী মন্ত্রিপরষদের সভা অনুমোদন করা হয়েছে তা কার্যকর হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের হাতিয়ার তুলে দেওয়া হবে সন্তু লারমার হাতেই। এখন সরকার যদি এসব বুঝতে অপারগ হয় তাহলে এর দায় শুধু তাদের ওপর বর্তাবে তা নয়, বরং এদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককেই ভবিষ্যতের কাঠগড়ায় এর খেসারত দিতে হবে।

অতএব, সময় থাকতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যেকোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভাবতে হবে সরকারকে, ভাবতে হবে সচেতন দেশবাসীকেও।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি

পার্বত্য শান্তিচুক্তি

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খন্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন:

(ক) সাধারণ
১) উভয়পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করিয়া এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন;
২) উভয়পক্ষ এ চুক্তির আওতায় যথাশিগগির ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐক্যমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হইবে বলিয়া স্থিরীকৃত করিয়াছেন;
৩) এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করিবার লক্ষ্যে নিম্নে বর্ণীত সদস্য সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হইবে;
ক) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য : আহ্বায়ক
খ) এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান : সদস্য
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি : সদস্য
৪) এই চুক্তি উভয়পক্ষের তরফ হইতে সম্পাদিত ও সহি করার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

(খ) পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ
উভয়পক্ষ এই চুক্তি বলবৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, বান্দরবন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯) এবং-এর বিভিন্ন ধারাসমূহের নিম্নে বর্ণীত পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করার বিষয়ে ও লক্ষ্যে একমত হইয়াছেন:
১) পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকিবে।
২) ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ এর নাম সংশোধন করিয়া তদপরিবর্তে এই পরিষদ ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে অভিহিত হইবে।
৩) ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’ বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণতঃ বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।
৪) (ক) প্রতিটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মহিলাদের জন্যে ৩ (তিন) টি আসন থাকিবে। এসব আসনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয়দের জন্যে হইবে।
(খ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা ১, ২, ৩ ও ৪ মূল আইন মোতাবেক বলবৎ থাকিবে।
(গ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৫)-এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনারের’ শব্দগুলি পরিবর্তে যথাক্রমে ‘সার্কেল চীফ’ এবং ‘সার্কেল চীফের’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপিত হইবে।
(ঘ) ৪ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে ‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌর সভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্যে প্রার্থী হইতে পারিবেন না।
৫) ৭ নম্বর ধারায় বর্ণীত আছে যে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য পদে নির্বাচিত ব্যক্তি তাহার কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন। ইহা সংশোধন করিয়া ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার’-এর পরিবর্তে ‘হাই কোর্ট ডিভিশনের কোন বিচারপতি’ কর্তৃক সদস্যরা শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন-অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে।
৬) ৮ নম্বর ধারার চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের নিকট’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘নির্বাচন বিধি অনুসারে’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৭) ১০ নম্বর ধারার দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘তিন বৎসর’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘পাঁচ বৎসর’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৮) ১৪ নম্বর ধারায় চেয়ারম্যানের পদ কোন কারণে শূন্য হইলে বা তাহার অনুপস্থিতিতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
৯) বিদ্যমান ১৭নং ধারা নিম্নে উল্লেখিত বাক্যগুলি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইবে: আইনের আওতায় কোন ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারিবেন, যদি তিনি- (১) বাংলাদেশের নাগরিক হন; (২) তাহার বয়স ১৮ বৎসরের কম না হয়; (৩) কোন উপযুক্ত আদালত তাহাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা না করিয়া থাকেন; (৪) তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।
১০) ২০ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারায় ‘নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ’ শব্দগুলি স্বতন্ত্রভাবে সংযোজন করা হইবে।
১১) ২৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এ পরিষদের সকল সভায় চেয়ারম্যান এবং তাহার অনুপস্থিতিতে অন্যান্য সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
১২) যেহেতু খাগড়াছড়ি জেলার সমস্ত অঞ্চল মং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত নহে, সেহেতু খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আইনে ২৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত ‘খাগড়াছড়ি মং চীফ’-এর পরিবর্তে ‘মং সার্কেলের চীফ এবং চাকমা সার্কেলের চীফ’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে। অনুরূপভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফেরও উপস্থিত থাকার সুযোগ রাখা হইবে। একইভাবে বান্দরবন জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করিলে বা আমন্ত্রিত হইলে পরিষদের সভায় যোগদান করিতে পারিবেন বলিয়া বিধান রাখা হইবে।
১৩) ৩১ নম্বর উপ-ধারা (১) ও উপ-ধারা (২) এ পরিষদে সরকারের উপ-সচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সচিব হিসাবে থাকিবেন এবং এই পদে উপজাতীয় কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৪) (ক) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এ পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত পরিষদ সরকারের অনুমোদনক্রমে, বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারির পদ সৃষ্টি করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
(খ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে প্রণয়ন করা হইবে ঃ ‘পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন এবং তাহাদেরকে বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে’।
(গ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ পরিষদের অন্যান্য পদে সরকার পরিষদের পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ করিতে পারিবে এবং এই সকল কর্মকর্তাকে সরকার অন্যত্র বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ অথবা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৫) ৩৩ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখ থাকিবে।
১৬) ৩৬ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এর তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন প্রকার’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
১৭) (ক) ৩৭ নম্বর ধারার (১) উপ-ধারার চতুর্থতঃ এর মূল আইন বলবৎ থাকিবে।
(খ) ৩৭ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারা (ঘ)-তে বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখিত হইবে।
১৮) ৩৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) বাতিল করা হইবে এবং উপ-ধারা (৪) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ কোন অর্থ-বৎসর শেষ হইবার পূর্বে যে কোন সময় সেই অর্থ-বৎসরের জন্যে, প্রয়োজন হইলে, একটি বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন করা যাইবে।
১৯) ৪২ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে: পরিষদ সরকার হইতে প্রাপ্য অর্থে হস্তান্তরিত বিষয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিতে পারিবে, এবং জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিষদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করিবে।
২০) ৪৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পরিষদ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২১) ৫০, ৫১ ও ৫২ নম্বর ধারাগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে নিম্নোক্ত ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্যের সহিত পরিষদের কার্যকলাপের সামঞ্জস্য সাধনের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে সরকার প্রয়োজনে পরিষদকে পরামর্শ প্রদান বা অনুশাসন করিতে পারিবে। সরকার যদি নিশ্চিতভাবে এইরূপ প্রমাণ লাভ করিয়া থাকে যে, পরিষদ বা পরিষদের পক্ষে কৃত বা প্রস্তাবিত কোন কাজ-কর্ম আইনের সহিত সংগতিপূর্ণ নহে অথবা জনস্বার্থের পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিষদের নিকট হইতে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাহিতে পারিবে এবং পরামর্শ বা নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।
২২) ৫৩ ধারার (৩) উপ-ধারার ‘বাতিল থাকার মেয়াদ শেষ হইলে’ শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘এই আইন’ শব্দটির পূর্বে ‘পরিষদ বাতিল হইলে নব্বই দিনের মধ্যে’ শব্দগুলি সন্নিবেশ করা হইবে।
২৩) ৬১ নম্বর ধারার তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মন্ত্রণালয়ের’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৪) (ক) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে : আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন স্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং পরিষদ তাহাদের বদলি ও প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।
(খ) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত আপাততঃ বলবৎ অন্য সকল আইনের বিধান সাপেক্ষে শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘যথা আইন ও বিধি অনুযায়ী’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৫) ৬৩ নম্বর ধারার তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সহায়তা দান করা’ শব্দগুলি বলবৎ থাকিবে।
২৬) ৬৪ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে :
(ক) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, রক্ষিত (Reserved বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
(খ) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
(গ) পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবে।
(ঘ) কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাষা (Fringe Land) জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্ত দেয়া হইবে।
২৭) ৬৫ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে। আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হস্তে ন্যস্ত থাকিবে এবং জেলায় আদায়কৃত উক্ত কর পরিষদের তহবিলে থাকিবে।
২৮) ৬৭ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পরিষদে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বা পরিষদ নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করিবে এবং পরিষদ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাজের সমন্বয় বিধান করা যাইবে।
২৯) ৬৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে এবং কোন বিধি প্রণীত হওয়ার পরেও উক্ত বিধি পুনর্বিবেচনার্থে পরিষদ কর্তৃক সরকারের নিকট আবেদন করিবার বিশেষ অধিকার থাকিবে।
৩০) (ক) ৬৯ ধারার উপ-ধারা (১) এর প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে’ শব্দগুলি বিলুপ্ত এবং তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘করিতে পারিবে’ এই শব্দগুলির পরে নিম্নোক্ত অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে ঃ তবে শর্ত থাকে যে, প্রণীত প্রবিধানের কোন অংশ সম্পর্কে সরকার যদি মতভিন্নতা পোষণ করে তাহা হইলে সরকার উক্ত প্রবিধান সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে বা অনুশাসন করিতে পারিবে।
(খ) ৬৯ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর (হ) এ উল্লেখিত ‘পরিষদের কোন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অর্পণ’ এই শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩১) ৭০ নম্বর ধারা বিলুপ্ত করা হইবে।
৩২) ৭৯ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য জাতীয় সংসদ বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ গৃহীত কোন আইন পরিষদের বিবেচনায় উক্ত জেলার জন্য কষ্টকর হইলে বা উপজাতীয়দের জন্যে আপত্তিকর হইলে পরিষদ উহা কষ্টকর বা আপত্তিকর হওয়ার কারণ ব্যক্ত করিয়া আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করিবার জন্যে সরকারের নিকট লিখিত আবেদন পেশ করিতে পারিবে এবং সরকার এই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিবে।
৩৩) (ক) প্রথম তফসিল বর্ণীত পরিষদের কার্যাবলীর ১ নম্বরে ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটির পরে ‘তত্ত্বাবধান’ শব্দটি সন্নিবেশ করা হইবে।
(খ) পরিষদের কার্যাবলীর ৩ নম্বরে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন করা হইবে: (১) বৃত্তিমূলক শিক্ষা, (২) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা, (৩) মাধ্যমিক শিক্ষা।
(গ) প্রথম তফসিলে পরিষদের কার্যাবলীর ৬(খ) উপ-ধারায় ‘সংরক্ষিত বা’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩৪) পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বাদির মধ্যে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত হইবে ঃ
ক) ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা;
খ) পুলিশ (স্থানীয়);
গ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার;
ঘ) যুব কল্যাণ;
ঙ) পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন;
চ) স্থানীয় পর্যটন;
ছ) পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাষ্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান;
জ) স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদান;
ঝ) কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ ব্যতীত অন্যান্য নদী-নালা, খাল-বিলের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সেচ ব্যবস্থা;
ঞ) জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান সংরক্ষণ;
ট) মহাজনী কারবার;
ঠ) জুম চাষ।
৩৫) দ্বিতীয় তফসীলে বিবৃত পরিষদ আরোপনীয় কর, রেইট, টোল এবং ফিস-এর মধ্যে নিম্নে বর্ণীত ক্ষেত্র ও উৎসাদি অন্তর্ভুক্ত হইবে:
ক) অযান্ত্রিক যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন ফি;
খ) পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের উপর কর;
গ) ভূমি ও দালান-কোঠার উপর হোল্ডিং কর;
ঘ) গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের উপর কর;
ঙ) সামাজিক বিচারের ফিস;
চ) সরকারী ও বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর হোল্ডিং কর;
ছ) বনজ সম্পদের উপর রয়্যালিটির অংশ বিশেষ;
জ) সিনো, যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদির উপর সম্পূরক কর;
ঝ) খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিষ্কর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুজ্ঞা পত্র বা পাট্টাসমূহ সূত্রে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশ বিশেষ;
ঞ) ব্যবসার উপর কর;
ট) লটারীর উপর কর;
ঠ) মৎস্য ধরার উপর কর।

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ
১) পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করিবার লক্ষ্যে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ ইং (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন)-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজন সাপেক্ষে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হইবে।
২) পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন যাহার পদমর্যাদা হইবে একজন প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ এবং তিনি অবশ্যই উপজাতীয় হইবেন।
৩) চেয়ারম্যানসহ পরিষদ ২২ (বাইশ) জন সদস্য লইয়া গঠন করা হইবে। পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপজাতীয়দের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইবে। পরিষদ ইহার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিবেন। পরিষদের গঠন নিম্নরূপ হইবে :
চেয়ারম্যান – ১ জন
সদস্য উপজাতীয় (পুরুষ)- ১২ জন
সদস্য উপজাতীয় মহিলা)- ­ ২ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (পুরুষ)- ৬ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (মহিলা)- ১ জন
উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ৫ জন নির্বাচিত হইবেন চাকমা উপজাতি হইতে, ৩ জন মার্মা উপজাতি হইতে, ২ জন ত্রিপুরা উপজাতি হইতে, ১ জন মুরং ও তনচৈঙ্গ্যা উপজাতি হইতে এবং ১ জন লুসাই, বোম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং উপজাতি হইতে।
অ-উপজাতি পুরুষ সদস্যদের মধ্যে হইতে প্রত্যেক জেলা হইতে ২ জন করিয়া নির্বাচিত হইবেন।
উপজাতীয় মহিলা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকমা উপজাতি হইতে ১ জন এবং অন্যান্য উপজাতি থেকে ১জন নির্বাচিত হইবেন।
৪) পরিষদের মহিলাদের জন্য ৩ (তিন) টি আসন সংরক্ষিত রাখা হইবে। এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয় হইবে।
৫) পরিষদের সদস্যগণ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হইবেন। তিন পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যানগণ পদাধিকারবলে পরিষদের সদস্য হইবেন এবং তাহাদের ভোটাধিকার থাকিবে। পরিষদের সদস্য প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার অনুরূপ হইবে।
৬) পরিষদের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বৎসর হইবে। পরিষদের বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন, পরিষদ বাতিলকরণ, পরিষদের বিধি প্রণয়ন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয় ও পদ্ধতি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে প্রদত্ত ও প্রযোজ্য বিষয় ও পদ্ধতির অনুরূপ হইবে।
৭) পরিষদে সরকারের যুগ্মসচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা থাকিবেন এবং এই পদে নিযুক্তির জন্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হইবে।
৮) (ক) যদি পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয় তাহা হইলে অন্তরবর্তীকালীন সময়ের জন্য পরিষদের অন্যান্য উপজাতীয় সদস্যগণের মধ্য হইতে একজন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন।
(খ) পরিষদের কোন সদস্যপদ যদি কোন কারণে শূন্য হয় তবে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে তাহা পূরণ করা হইবে।
৯) (ক) পরিষদ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বয় সাধন করাসহ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন ও উহাদের উপর অর্পিত বিষয়াদি সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে। ইহা ছাড়া অর্পিত বিষয়াদির দায়িত্ব পালনে তিন জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কিংবা কোনরূপ অসংগতি পরিলক্ষিত হইলে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলিয়া পরিগণিত হইবে।
(খ) এই পরিষদ পৌরসভাসহ স্থানীয় পরিষদসমূহ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে।
(গ) তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিবে।
(ঘ) পরিষদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ এনজিও’দের কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে।
(ঙ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে।
(চ) পরিষদ ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদান করিতে পারিবে।
১০) পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পরিষদের সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবে। উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন।
১১) ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও অধ্যাদেশের সাথে ১৯৮৯ সনের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের যদি কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হয় তবে আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে সেই অসংগতি আইনের মাধ্যমে দূর করা হইবে।
১২) পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার অন্তরবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করিয়া তাহার উপর পরিষদের প্রদেয় দায়িত্ব দিতে পারিবেন।
১৩) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিতে গেলে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে ও ইহার পরামর্শক্রমে আইন প্রণয়ন করিবেন। তিনটি পার্বত্য জেলার উন্নয়ন ও উপজাতীয় জনগণের কল্যাণের পথে বিরূপ ফল হইতে পারে এইরূপ আইনের পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে পরিষদ সরকারের নিকট আবেদন অথবা সুপারিশমালা পেশ করিতে পারিবেন।
১৪) নিম্নোক্ত উৎস হইতে পরিষদের তহবিল গঠন হইবে:
(ক) জেলা পরিষদের তহবিল হইতে প্রাপ্ত অর্থ;
(খ) পরিষদের উপর ন্যস্ত এবং তৎকর্তৃক পরিচালিত সকল সম্পত্তি হইতে প্রাপ্ত অর্থ বা মুনাফা;
(গ) সরকার বা অন্যান্য কর্তৃৃপক্ষের ঋণ ও অনুদান;
(ঘ) কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
(ঙ) পরিষদের অর্থ বিনিয়োগ হইতে মুনাফা;
(চ) পরিষদ কর্তৃক প্রাপ্ত যে কোন অর্থ;
(ছ) সরকারের নির্দেশে পরিষদের উপর ন্যস্ত অন্যান্য আয়ের উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ।

(ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা পুনঃস্থাপন এবং এই লক্ষ্যে পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কার্য এবং বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ নিম্নে বর্ণীত অবস্থানে পৌঁছিয়াছেন এবং কার্যক্রম গ্রহণে একমত হইয়াছেন:
১) ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ’৯৭ ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
২) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।
৩) সরকার ভূমিহীন বা দুই একরের কম জমির মালিক উপজাতীয় পরিবারের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করিতে পরিবার প্রতি দুই একর জমি স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে বন্দোবস্ত দেওয়া নিশ্চিত করিবেন। যদি প্রয়োজন মত জমি পাওয়া না যায় তাহা হইলে সেই ক্ষেত্রে টিলা জমির (গ্রোভল্যান্ড) ব্যবস্থা করা হইবে।
৪) জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলে ভাসা জমি)-এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।
৫) এই কমিশন নিম্নোক্ত সদস্যদের লইয়া গঠন করা হইবে :
(ক) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
খ) সার্কেল চীফ (সংশ্লিষ্ট);
গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি;
ঘ) বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত কমিশনার;
ঙ) জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সংশ্লিষ্ট)।
৬) (ক) কমিশনের মেয়াদ তিন বছর হইবে। তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শক্রমে উহার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাইবে।
(খ) কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।
৭) যে উপজাতীয় শরণার্থীরা সরকারের সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন অথচ বিবদমান পরিস্থিতির কারণে ঋণকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
৮) রাবার চাষের ও অন্যান্য জমি বরাদ্ধ ঃ যে সকল অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিদের রাবার বা অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য জমি বরাদ্দ করা হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে যাহারা গত দশ বছরের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেন নাই বা জমি সঠিক ব্যবহার করেন নাই সে সকল জমি বন্দোবস্ত বাতিল করা হইবে।
৯) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করিবেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করিবেন। এবং সরকার এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করিবেন। সরকার এই অঞ্চলের পরিবেশ বিবেচনায় রাখিয়া দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ যোগাইবেন।
১০) কোটা সংরক্ষণ ও বৃত্তি প্রদান: চাকরি ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সরকার উপজাতীয়দের জন্যে সরকারী চাকরি ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখিবেন। উপরোক্ত লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য সরকার অধিক সংখ্যক বৃত্তি প্রদান করিবেন। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় বৃত্তি প্রদান করিবেন।
১১) উপজাতীয় কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সচেষ্ট থাকিবেন। সরকার উপজাতীয় সংস্কৃতির কর্মকান্ডকে জাতীয় পর্যায়ে বিকশিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা করিবেন।
১২) জনসংহতি সমিতি ইহার সশস্ত্র সদস্যসহ সকল সদস্যের তালিকা এবং ইহার আওতাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করিবেন।
১৩) সরকার ও জনসংহতি সমিতি যৌথভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমাদানের জন্য দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করিবেন। জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমাদানের জন্য দিন তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করার জন্য তালিকা অনুযায়ী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারবর্গের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্যে সব রকমের নিরাপত্তা প্রদান করা হইবে।
১৪) নির্ধারিত তারিখে যে সকল সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিবেন সরকার তাহাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করিবেন। যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা আছে সরকার ঐ সকল মামলা প্রত্যাহার করিয়া নিবেন।
১৫) নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে কেহ অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হইলে সরকার তাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
১৬) জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর তাহাদেরকে এবং জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপের সাথে জড়িত স্থায়ী বাসিন্দাদেরকেও সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হইবে।
(ক) জনসংহতি সমিতির প্রত্যাবর্তনকারী সকল সদস্যকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিবার প্রতি এককালীন ৫০,০০০/- টাকা প্রদান করা হইবে।
(খ) জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া জারি অথবা অনুপস্থিতিকালীন সময়ে বিচারে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে, অস্ত্রসমর্পন ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর যথাশীঘ্র সম্ভব তাহাদের বিরুদ্ধে সকল মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া প্রত্যাহার করা হইবে এবং অনুপস্থিতকালীন সময়ে প্রদত্ত সাজা মওকুফ করা হইবে। জনসংহতি সমিতির কোন সদস্য জেলে আটক থাকিলে তাহাকেও মুক্তি দেওয়া হইবে।
(গ) অনুরূপভাবে অস্ত্র সমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর কেবলমাত্র জনসংহতি সমিতির সদস্য ছিলেন কারণে কাহারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা শাস্তি প্রদান বা গ্রেফতার করা যাইবে না।
(ঘ) জনসংহতি সমিতির যে সকল সদস্য সরকারের বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু বিবদমান পরিস্থিতির জন্য গৃহীত ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই তাহাদের উক্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
(ঙ) প্রত্যাগত জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মধ্যে যাহারা পূর্বে সরকার বা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন তাহাদেরকে স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করা হইবে এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরিতে নিয়োগ করা হইবে। এইক্ষেত্রে তাহাদের বয়স শিথিল সংক্রান্ত সরকারী নীতিমালা অনুসরণ করা হইবে।
(চ) জনসংহতি সমিতির সদস্যদের কুটির শিল্প ও ফলের বাগান প্রভৃতি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের সহায়তার জন্যে সহজশর্তে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে।
(ছ) জনসংহতি সমিতির সদস্যগণের ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হইবে এবং তাহাদের বৈদেশিক বোর্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট বৈধ বলিয়া গণ্য করা হইবে।
১৭) (ক) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলী কদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হইবে এবং এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হইবে। আইন-শৃঙ্খলা অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাইবে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করিতে পারিবেন।
(খ) সামরিক ও আধা-সামারিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে।
১৮) পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী, আধা-সরকারী, পরিষদীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হইবে। তবে কোন পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকিলে সরকার হইতে প্রেষণে অথবা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে উক্ত পদে নিয়োগ করা যাইবে।
১৯) উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য নিম্নে বর্ণিত উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হইবে।
(ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
(খ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ
(গ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঘ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঙ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদ
(চ) সাংসদ, রাঙ্গামাটি
(ছ) সাংসদ, খাগড়াছড়ি
(জ) সাংসদ, বান্দরবন
(ঝ) চাকমা রাজা
(ঞ) বোমাং রাজা
(ট) মং রাজা
(ঠ) তিন পার্বত্য জেলা হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত পার্বত্য এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিনজন অ-উপজাতীয় সদস্য।
এই চুক্তি উপরোক্তভাবে বাংলা ভাষায় প্রণীত এবং ঢাকায় ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪০৪ সাল মোতাবেক ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং তারিখে সম্পাদিত ও সইকৃত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে               পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের পক্ষে
(আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্)                               (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা)
আহ্বায়ক                                                            সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি                 পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
বাংলাদেশ সরকার।

বান্দরবানে জনসংহতি সমিতির বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (সংশোধিত) ১৩ বিল পাশের দাবীতে বান্দরবানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। মঙ্গলবার সকালে শহরের বঙ্গবন্ধু মুক্ত মঞ্চে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি সাধুরাম ত্রিপুরা মিল্টন সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য লয়েল ডেভিড বম, জেএসএসের জেলা সাধারণ সম্পাদক ক্যবামং মারমা, জেএসএসের সহ-সভাপতি চিং হ্লা মং চাক, পার্বত্য ভূমি অধিকার রক্ষা কমিটির আহবায়ক জোয়ান লিয়ান আমলাই, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি মস্তু মারমাসহ আরো অনেকে।

সমাবেশের আগে জেলা জনসংহতি সমিতির কার্যালয় থেকে খন্ড খন্ড  মিছিল বের হয়ে উজানি পাড়া, মধ্যম পাড়া ও শহর প্রদক্ষিণ শেষে বঙ্গবন্ধু মুক্ত মঞ্চের সভায় মিলিত হয়।