খাগড়াছড়িতে স্কুল উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্প ও বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখল

নিজাম উদ্দীন লাভলু:

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ও ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠাসহ নানা কৌশলে বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় জায়গা, নিরাপত্তাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্প ও সরকারি খাস খতিয়ানের ভূমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) এসব ভূমি দখল প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থাকার অভিযোগ উঠেছে। দখল করা জায়গায় অন্যত্র থেকে উপজাতীয় পরিবারদের এনে পুর্নবাসন এবং বৌদ্ধ বিহার, কিয়াং ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা হচ্ছে।

আশির দশকে তৎকালীন শান্তিবাহিনীর জ্বালাও পোড়াও এবং হত্যাযজ্ঞের মুখে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বসতবাগিচা ফেলে আসা বাঙ্গালি পরিবারদের ঐসব জায়গাগুলোর অধিকাংশই ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের হাতে দখল হওয়া ভূমি উদ্ধারে প্রশাসনের কোন সহানুভূতি- সহযোগিতাও তারা পাচ্ছেন না তারা। ফলে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে পার্বত্য এলাকা ছেড়ে সমতল জেলায় চলে গেছেন।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রামগড়ের দুর্গম এলাকা ছোট বেলছড়ি, গরু কাটা, লালছড়ি, সাতক্ষীরা পাড়া, তৈছাগাড়া, থানাচন্দ্র পাড়া, গৈয়াপাড়া প্রভৃতি এলাকায় বাঙ্গালীদের প্রায় দেড়শ একর রেকর্ডীয় জায়গা জোর করে দখল করে নেওয়া হয়েছে।



ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালিদের এসব ভূমি দখলে প্রত্যক্ষভাবে মদদ ও সহযোগিতা দিচ্ছে। দখল করা এসব জায়গার মধ্যে দক্ষিণ লালছড়িতে জগদীশ চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তির রেকর্ডীয় তিন একর ভূমি কথিত স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে।

জগদীশ পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০০৮ সালে ইলিয়াছ মিয়া নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে রামগড় মৌজার ১০২ নং হোল্ডিংয়ের তিন একর টিলা ভূমি কিনে নিজ নামে রেজিষ্ট্রি করার পর সেখানে বনজ গাছের বাগান সৃজন করেন। সম্প্রতি একটি উপজাতি সন্ত্রাসী গ্রুপের লোকজন বাগানের সমস্ত গাছগাছালি কেটে জায়গাটি জোরপূর্বক দখল করে। তারা স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে ঐ জায়গার উপর একটি ঘরও নির্মাণ করেছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা জগদীশেকে প্রাণ নাশের হুমকীও দিয়েছে’ বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হতে দুর্গম লালছড়ি এলাকায় সরেজমিন পরির্দশন করে দেখা যায়, জনবসতিহীন গভীর বনের মধ্যে পাহাড়ের চূড়ায় টিনের ছাউনীর একটি লম্বা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী এলাকার জনৈক ব্যক্তি জানায়, ‘ভিতরের পার্টি’র লোকেরা (পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপকে স্থানীয়রা ভিতরের পার্টি নামে আখ্যায়িত করে) রাতের আধাঁরে ঘরটি নির্মাণ করেছে।

তিনি আরও জানান, জায়গাটি দখল করার জন্যই স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে ঘরটি তৈরী করা হয়।

রামগড় উপজেলা নির্বাহি অফিসার(ভারপ্রাপ্ত) একেএম মোর্শেদ স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের জায়গা দখলের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কতিপয় উপজাতি যুবক স্কুল চালু করার অনুমতির জন্য তার কাছে এসেছিল। জায়গার বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তিনি অনুমতি দেননি।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে জানা যায়, লালছড়ি এলাকার পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরা পাড়া ও ছোট বেলছড়ি পাড়ার প্রায় ৩০টি বাঙ্গালী পরিবার সন্ত্রাসী গ্রুপের নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি, বাগানবাগিচা ফেলে অন্যত্র চলে গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের দুর্গম ছোট বেলছড়িতে ২০-২৫টি বাঙ্গালি পরিবার ছিল। ২০১৫’র মে মাসে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা দুটি বাঙ্গালি পরিবারের ওপর প্রথম হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা ঐদিন পরিবার দুটির তিনজন নারীকে গণধর্ষণসহ বেদম মারপিট করে ১০-১২জনকে আহত করে। তারা ঘরবাড়ি ভাংচুর ও মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

এ ঘটনায় রামগড় থানায় মামলা করার কারণে সন্ত্রাসীরা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরবর্তীতে বাঙ্গালী পরিবারগুলোর বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ, হামলাসহ লাগাতার নির্যাতন নিপীড়নের কারণে সবাই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। একই কায়দায় সাতক্ষীরা পাড়ার ৭টি পরিবারের ওপর নানা নির্যাতন চালিয়ে তাদের মধ্যে ছয়টি পরিবারকে এলাকা ছাড়া করা হয়।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সাতক্ষীরা পাড়ার ইমান আলীর ফেলে যাওয়া মাটির তৈরী দুটি বসতঘর পরিত্যক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়। জানা যায়, বাঙ্গালী পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে তাদের ফেলে যাওয়া জায়গাতে উপজাতীয় পরিবারদের এনে বসতি গড়ে দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, রামগড় ইউনিয়নের ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজার তৈচাগাড়া, থানা চন্দ্র পাড়া ও গৈয়াপাড়া এলাকায় ১৪টি বাঙ্গালী পরিবারের প্রায় ৭০ একর রেকডীয় টিলা ভূমির গাছপালা কেটে কাঁচাঘর নির্মাণ করে কতিপয় উপজাতি বসতি গড়ে তুলছে। ইতিমধ্যে ৫০-৬০টি উপজাতীয় পরিবার ঘর তৈরী করে সেখানে বসবাস শুরু করেছে।

ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে এসব উপজাতীয় পরিবারগুলোকে এনে বাঙ্গালীদের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছে।

উত্তর লামকু পাড়ার বাসিন্দা সৈয়দের রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, তৈচাগাড়া পাড়ায় তার নামে রেকর্ডীয় ৮৭৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে সাড়ে ৩ একর এবং ২২৮ খতিয়ানে দুই একর জায়গা রয়েছে। সম্প্রতি কতিপয় উপজাতি জায়গার গাছপালা কেটে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করে। বাধা দিলে ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা তাকে হুমকী দেয়।

তিনি বলেন, তৈচাগাড়া এলাকায় একইভাবে নজিরটিলার ফরিদ মিয়ার ২৩৭ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, সোনাইআগা গ্রামের নুরুল হকের ৭৪৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আবু সায়েদের ৫ একর, হানিফ মজুমদারের ৯২৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আবুল হোসেনের থানা চন্দ্র পাড়া এলাকায় ২০৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আব্দুল মালেকের ৫ একর, কালাডেবার নুরুল ইসলামের ৫ একর, বলিপাড়ার আবু আহম্মদের ৯৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আহম্মদ উল্লাহর ৭৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, হেদায়েত হোসেনের ৮৬১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, সোনাইপুলের মো: শাহ আলমের ৫ একর ও দক্ষিণ বালুখালীর সুলতান আহমেদের গৈয়াপাড়ার ১০ একর টিলা ভূমি উপজাতীয়রা দখল করে নিয়েছে।

সোনাই আগার আব্দুল মান্নান পার্বত্যনিউজকে বলেন, ৫০-৬০টি উপজাতীয় পরিবার তাদের এ রেকর্ডীয় জায়গার উপর বসতি স্থাপন করে দখল করে নিয়েছে। ইউপিডিএফের সদস্যরা লক্ষ্মীছড়ি ও মানিকছড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে এসব উপজাতি পরিবারগুলোকে এনে ঘর বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। জায়গা উদ্ধারের জন্য তারা জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন অভিযোগ করেও কোন ফল পাননি।

রামগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলগের আহবায়ক শাহ আলম মজুমদার পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালিদের উচ্ছেদ করে তাদের বসতবাগিচা দখল করে নিচ্ছে। তার ইউনিয়নের বহু বাঙ্গালি পরিবারবাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় জমি দখলের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে রামগড় উপজেলার সহকারি কমিশনার(ভূমি) পার্বত্যনিউজকে জানান, অভিযোগকারীদের জায়গার বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছ্বদের জন্য তাদেরকে আদালতে মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এদিকে, ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামেও বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন, নিরাপত্তাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্পসহ সরকারি খাস ভূমি কৌশলে দখল করার তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, রামগড় ভূমি অফিসের আওতাধীন কুকিছড়া এলাকায় গত জুনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় একটি ঘর নির্মাণ করে সেখানে বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

একইভাবে, গত জুলাইয়ে মহালছড়ি ভূমি অফিসের আওতাধীন সিন্ধুকছড়ির তিন্ধুকছড়ি নামক এলাকায় নিরাাপত্তা বাহিনীর আরেকটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায় কেয়াং ঘর নির্মাণ করে জায়গাটি দখল করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ৭টি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে জায়গাগুলো দখল করা হয়েছে।

তথ্যাভিজ্ঞমহল জানান, অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর প্রধান টার্গেট আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর এসব পরিত্যক্ত ক্যাম্প। আর ক্যাম্পের জায়গাগুলো দখলের হাতিয়ার হিসেবে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ধর্মীয় উপাসনালয়।

তন্মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীছড়ির কুতুবছড়ি বৌদ্ধ বিহার, নানিয়ারচরের জনবল বৌদ্ধ বিহার, জুরাছড়ি পাড়া, নাভাঙ্গাপাড়া বৌদ্ধ বিহার ও শিবের আগা। এছাড়া দীঘিনানলার সোনামিয়া টিলাসহ বাঙ্গালীদের অনেক জায়গাও উপাসনালয় প্রতিষ্টার নামে দখল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নানা কৌশলে বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখলের ব্যাপারে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো: শহিদুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে বলেন, তিনি এ জেলায় সদ্য যোগদান করেছেন। বিষয়টি এখনও পর্যন্ত কেউ তাকে জানায়নি। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি ও পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় স্কুল ও উপাসনালয় নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে ইউপিডিএফের(প্রসীত গ্রুপ) প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের সম্পাদক নিরন চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়িরা তাদের জায়গায় স্কুল ও উপাসনালয় নির্মাণ করছে। বাঙ্গালিরা ভূমির মালিকানার যেসব দলিলপত্র দেখাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন অনুযায়ী ঐসব কাগজপত্রের কোন বৈধতা নেই।

তিনি বলেন, পাহাড়ি ছেলে মেয়েরা যেন লেখাপড়া শিখতে না পারে সেজন্যই সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে প্রশাসন স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজেও বাঁধা দিচ্ছে। পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ক্যাম্পের জায়গার কোন দাবি করার সুযোগ নেই।

খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের ভূমি দখল মিশন: বাদ যাচ্ছে না সংখ্যালঘুর জমিও

দিদারুল আলম:
এখানে মাটির নিচে শুয়ে অাছে কোন না কোন বাঙ্গালী সন্তানের পিতা। যেখানে তাদের বংশ পরম্পরা বসবাস ছিলো। যে মাটিতে লেগে আছে বাঙ্গালী বাবা ভাইয়ের রক্ত সে মাটি কি সন্ত্রাসীদের আখড়ার জন্য ছেড়ে দিতে হবে- দু’চোখে বেদনার অশ্রুর প্লাবন ঝরিয়ে প্রতিনিধির কাছে ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বললেন পার্বত্য অধিকার ফোরাম নেতা মো. মাইনুদ্দীন।

সম্প্রতি গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও রামগড়ে বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত ও সরকারী খাস জমি ইউপিডিএফ কর্তৃক একের পর এক দখল কাণ্ডে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রশাসন এখানে অসহায়। ইউপিডিএফ একেরপর এক ভূমি দখল করেই যাচ্ছে আর প্রশাসন মাপজোখ, দলিল খতিয়ান চেক করার নামে সময়ক্ষেপণ করছে।

পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বাঙ্গালী বা সরকারী খাস জমি দখল করার চিরাচরিত পন্থা হচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নামে জোর করে জায়গা দখল ও পরে ভাগ করে নেয়া অথবা নিজেদের দলীয় কাজে ব্যবহার করা। কখনো এসব জমি নিজ দলীয় ক্যাডারদের মাঝে ভাগ করেও দেয়া হয়।

শুধু খাস জমি বা বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমিই নয়, এই ষড়যন্ত্রের কবল থেকে সেনা বাহিনীর পরিত্যাক্ত স্থাপনা বা ক্যাম্পগুলোও রক্ষা হচ্ছে না। অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের প্রধান আকর্ষণ পরিত্যাক্ত ক্যাম্পগুলো। আর ক্যাম্পের জায়গা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম। পাহাড়ের নিরস্ত্র, অসহায়, নিরীহ জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল নিরাপত্তা বাহিনী।



কিন্তু আজ তাদের ক্যাম্পের জায়গাই দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভেঙে পড়ছে সাধারণ মানুষের ভরসা ও নিরাপত্তার চিন্তা। সকলের মনে এখন একটিই প্রশ্ন, উপজাতীয় সন্ত্রসীদের এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি কীভাবে হবে? কবে পাওয়া যাবে মুক্তি?

খাগড়াছড়ির রামগড়ে সংখ্যালঘু পরিবারের একমাত্র জমি জোরপূর্বক দখল করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপ স্কুলের নামে নিজেদের ট্রেনিং সেন্টার বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মে (বুধবার) রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটা এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসিন্দা জগদীশ চন্দ্র নাথ (৫৫) এর জায়গা জোরপূর্বক দখল করে একটি স্কুল ঘর তুলেছে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র দলের কিছু সদস্য। এভাবে তারা পার্বত্য অঞ্চলে বহু বাঙ্গালীর বসতভিটা, বন্দবস্তকৃত বৈধ ভূমি জবর দখল করে নিয়েছে অস্ত্রের মুখে।

সম্প্রতি, রামগড় বিজিবি জোনের খাগড়াবিল সিআইও ক্যাম্প থেকে টহল দল ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়রা জানান, উক্ত জায়গায় স্কুল ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে রাতের আঁধারে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ স্কুল ঘরের ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে ফেলে।

এদিকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর (রবিবার) স্কুলের নামে তথাকথিত ট্রেনিং সেন্টারটি প্রশাসনের নজর এড়াতে স্কুলের নাম দিয়ে ৪ জন উপজাতি রামগড় উপজেলা শিক্ষা অফিসে একটি আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে অফিস সহকারী আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে আবেদনটি জমা দিতে বলেন। এরপর ঐ ৪ উপজাতি ব্যক্তি জগদীশ চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে ‘জমিটি স্কুলের নামে লিখে দিতে হবে- না হয় জীবন শেষ করে ফেলার’ হুমকি দেন। এই ভয়ে জগদীশ চন্দ্র কোন অভিযোগ দিতে বা হুমকিদাতাদের নাম বলতে রাজি হননি।

পরে ঐ ৪ উপজাতি ব্যক্তি কর্তৃক আবেদনটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট জমা দেওয়া হলে সেখান থেকে হুমকিদাতাদের সণাক্ত করতে সক্ষম হয় প্রশাসনসহ অন্যন্যরা। আবেদনে বিষু ত্রিপুরার নাম থাকায় রামগড় বিজিবি তাকে খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু বিষু পলাতক থাকায় তাকে খুঁজে পায়নি বলে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রামগড় বিজিবি জোন উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে। সংখ্যালঘুর জমি জোরকরে দখল করার কারণে উপজেলা প্রশাসন আবেদন গ্রহণ করেনি।

জগদীসের স্ত্রী মিনু বালা বলেন, জমি হারিয়ে শোকে তার স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রামগড় হাসপাতাল চট্রগ্রাম নিয়ে যেতে বলছেন। দুই সন্তান আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন। এই জমিটা ছাড়া তাদের অন্য কোন জমি নেই।

বিগত দশ বছর আগে অনেক কষ্টে নিজের হাতের বালাসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে জমিটি ক্রয় করেছিলেন তারা। আর সে জমি জোর করে নিয়ে যাচ্ছে সেটা জগদীস সইতে না পেরে রীতিমত অসুস্থ। এখন স্বমীকে চিকিৎসা করবে নাকি জমি রক্ষা করবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না মিনু বালা।

এ বিষয়ে স্কুল নির্মাণের মূল হোতা বিষু ত্রিপুরার নিকট মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি পার্বত্যনিউজকে ইউপিডিএফের ট্রেনিং সেন্টার তৈরির কথা অস্বীকার করে বলেন, আমাদের এলাকায় কোন স্কুল না থাকায় আমরা এলাকাবাসীরা এক হয়ে স্কুলটি করেছি। তবে জমির মালিকের নিকট থেকে লিখিত কাগজ না নেওয়ায় তাদের ভুল হয়েছে মর্মে জানান তিনি।

জমির মালিক মৌখিকভাবে জমি দিবে বলায় আমরা স্কুলের কাজ করেছি। ইউএনও অফিসে আবেদনও করা হয়েছে। কিন্তু বিজিবির সদস্যরা কেন আমাদের সাইনবোর্ড নিয়ে গেছে তারা জানে না। পার্বত্যনিউজের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, জমির মালিককে কোন ক্ষতিপূরণ দেননি। বর্তমানে স্কুলের কাজ বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে পতাছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, কারো যদি স্কুলের প্রয়োজন হয় তাহলে প্রশাসনসহ সকলের সহযোগিতা নিয়ে স্কুল তৈরি করবে। সরকারী খাস জায়গার কোন অভাব নেই পাতাছড়ায়। স্কুলের নামে জোর করে বাঙ্গালীদের জমি দখল করা কারো প্রত্যাশিত হতে পারে না। তিনি এসব জোরপূর্বক দখলের বিষয়ে নিন্দা জানান।

রামগড় থানার অফিসার ইনচার্জ এভাবে জোর করে জমি দখল করার বিষয়ে নিন্দা জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, ভুক্তভোগী কেউ থানায় আসেনি আসলে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, ৪জন উপজাতি ব্যক্তি স্কুলের নামে একটি আবেদন নিয়ে এসেছিলেন। রামগড় জোন সদর থেকে জানতে পেরেছি জগদীস চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তির জায়গায় জোর করে স্কুল তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি অবগত থাকায় স্কুলের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন থেকে কোন অনুমতি দেয়া হয়নি।

সাম্প্রতিক ভুমি দখলের আরো কিছু ঘটনা

১. জেলার মানিকছড়িতে গত ২৩ মে ২০১৮ তারিখে দুইজন বাঙ্গালী মো. জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারুল ইসলাম এর মালিকানাধীন জায়গায় উপজাতী রিপ্রুচাই মারমা (৪০) জোর করে জঙ্গল পরিস্কার করে ঘর নির্মাণ করলে উভয়পক্ষে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।

পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ফলে বৈধ কাগজপত্র না দেখানো পর্যন্ত উক্ত জমিতে উভয় পক্ষের কেও প্রবেশ করিবে না মর্মে সম্মত হয়।

২. সিন্দুকছড়ির তিন্দুকছড়িতে পরিত্যাক্ত আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন পাশ্ববর্তী টিলায় গত ৪ জুলাই ২০১৮ টিন দিয়ে একটি নতুন ঘর তৈরি করে এই সন্ত্রাসী দল।

ইউপিডিএফ সমর্থিত সিন্দুকছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রেদাক মারমা বলেন, প্রথমে তিনি নিজে এ ব্যাপারে অবগত নন। পরে বলেন, ভূলবশতঃ জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে, ঘরটি পরদিন সরিয়ে নেয়া হবে বলে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল সদস্যদের জানান। কিন্তু ৫ জুলাই ২০১৮ তারিখে, রাতের আধাঁরে উক্ত ঘরে ১০ ইঞ্চি উচ্চতার একটি বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করে জায়গাটি দখলে নেয় তারা।

পরবর্তীতে, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানিকছড়ি উপজেলার ভূমি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে উক্ত জায়গার মালিকানা যাচাইপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস কর্তৃক জায়গার মালিকানা যাচাই এর কার্যক্রম চলমান। সিন্দুকছড়ি জোন থেকে মহালছড়ি ভূমি অফিসকে সার্ভে করার জন্য পত্র লেখা হয়। মহালছড়ি ভূমি অফিস হতে ১টি সার্ভেয়ার টীম গত ২৮ আগষ্ট ২০১৮ তারিখে সিন্দুকছড়ি জোনের টহল দলের সাথে উক্ত স্থানে গমন করে এবং উক্ত এলাকা সার্ভে করে। সার্ভে টীম কর্তৃক সরেজমিনে সার্ভে করার পর জানানো হয় যে উক্ত জায়গাটি ৫৫ নং দাগের অর্ন্তভূক্ত এবং এটি সরকারী খাস জমি যা পাহাড়ীরা জোরপূর্বক দখল করেছে।

৩. মাটিরাঙ্গার কুকিছড়া এলাকায় গত ২৪ জুন ২০১৮ তারিখে সেনাবাহিনীর পরিত্যাক্ত ক্যাম্পের জায়গায় একটি কিয়াং ঘর নির্মাণ করছে শুনে নাইক্যাপাড়া আর্মি ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনা স্থলে গিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, পাড়ার কারবারীদের নিকট জানতে চান, কেন কোন প্রকার অনুমতি বা তথ্য ছাড়া এই কিয়াং ঘর নির্মাণ করা হয়েছে? তখন স্থানীয় উপজাতীয়রা অনুমতিপত্র ছাড়া কাজ করবে না মর্মে জানালেও পরবর্তীতে ২০-২১ মে ২০১৮ উক্ত পরিত্যক্ত ক্যাম্পে কিয়াং ঘর স্থাপনের কাজ পুণরায় শুরু করে।

ইতোমধ্যে কিয়াং ঘরের নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্ত হয়েছে এবং উক্ত কিয়াং ঘরে ৮ (আট) ফুট উচ্চতার একটি বৌদ্ধমূর্তিও স্থাপন করেছে তারা। কিন্তু কিয়াং ঘরটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহার এখনও শুরু হয়নি।নির্মাণাধীন উপাসনালয়টির প্রায় ৩০০ গজ রেডিয়াসের ভেতর আরো ২ টি উপাসনালয় রয়েছে। তাছাড়া দূর্গম পাহাড়ী এলাকাটি এত ঘনবসতি নয় যে সেখানে আরো উপাসনালয় নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত পরিত্যক্ত এই সেনাক্যাম্পের জায়গাটি দখল করে তাদের আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহারের জন্যই এই কিয়াংটি নির্মাণ করা হয়েছে।

৪. রামগড় তৈছাগাড়া, থানা চন্দ্রপাড়ায় গত ৩ জুন ২০১৮ তারিখ ১০ জন বাঙ্গালীর সর্বমোট ৭০.৫০ একর জায়গা উপজাতীয় ব্যক্তিবর্গ ছোট ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে দখলে নেয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালীরা উক্ত জায়গার মালিকানা দাবী করে তাদেরকে বাধা প্রদান করলে উপজাতীয়রা বলেন, এ এলাকার জায়গাসমূহ বেনামী (কারো নামে রেকর্ডভূক্ত নয়) এবং ইউপিডিএফ (মূলদল) এর সদস্যরা তাদের এখানে এনে বসিয়েছে। এ সময় ইউপিডিএফ (মূল দল) এর সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলেও জানা যায়।

অভিযোগ প্রাপ্তির পর রামগড় বিজিবি জোন থেকে টহল দল উক্ত স্থানসমূহে যায় এবং বাঙ্গালীদের নামে রেকর্ডকৃত জায়গা হওয়ায় উপজাতীয়দেরকে জবরদখলকৃত স্থান থেকে নিজের ভূমিতে ফেরত যাওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। তথাপি, ও উপজাতীয়রা ঘটনাস্থল ত্যাগ না করে উক্ত স্থানে এখনো বসবাস করছে।

৫. গত ১৮ জুলাই ২০১৮ রামগড় জোনের আওতাধীন
পাতাছড়া ইউনিয়নের গৈয়াপাড়া এলাকায় জনৈক বাঙ্গালী মো. সুলতান আহমেদ (৭০) এর মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর ইন্ধনে উপজাতীয়রা ৩/৪টি বাড়ী নির্মাণ করেছে মর্মে রামগড় জোন সদর জানতে পারে। উল্লেখ্য, উক্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাহিরে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় অবস্থিত।

পরবর্তীতে, আরো জানা যায় যে, উক্ত পাড়ার জনৈক চিকন কারবারী কর্তৃক লক্ষীছড়ি এলাকা হতে ৩টি উপজাতীয় পরিবারকে ঘর নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। রামগড় জোন সদর কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করা হয়।

মো. সুলতান আহমেদ রামগড় জোন সদরে উপস্থিত হয়ে বেআইনীভাবে বসবাসকারী উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর সহায়তায় তারা বাড়ী নির্মাণ করেছে মর্মে জানায়।

এই সময় রামগড় জোন সদরের পরামর্শ অনুয়ায়ী বাদী সুলতান আহমেদ রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দখলকারী তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার উক্ত স্থান হতে চলে গেলেও দুইটি পরিবার এখনও আছে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয় নাই। মো. সুলতান আহমদের ৫ একর জমির টিলা গাছ কেটে পরিস্কার করে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) সন্ত্রাসীরা ৩টি ঘর নির্মাণ করে পাহাড়ী পরিবারকে দিয়েছে।

উক্ত ঘটনাটি রামগড় জোনের অধীনস্থ খাগড়াবিল বিজিবি ক্যাম্প থেকে ৫ কি. মি. দক্ষিণে গৈয়াপাড়া মনকুমার চাকমাপাড়া। উক্ত ঘরগুলোতে এখনও পাহাড়ী পরিবার বসবাস করছে। সেখানে জমির মালিক সুলতান আহমেদ বসবাস করেন না। তিনি স্বপরিবারে পার্শ্ববর্তী দাতারামপাড়া এলাকায় বসবাস করেন।

৬. গত ২০ আগস্ট ২০১৮ রামগড় উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের আওতাধীন সোনাইআগা নোয়াপাড়া নামক স্থানে বসবাসকারী মো. আব্দুল মান্নান (৪২) কে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর ১০-১২ জন সন্ত্রাসী মারধর করে আহত করে। পরবর্তীতে, স্থানীয়রা আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

আব্দুল মান্নানের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর সন্ত্রাসীরা সোনাইআগা নোয়াপাড়া থেকে বাঙ্গালীদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে উক্ত এলাকা পাহাড়ীদের বলে দাবী করে। আব্দুল মান্নান কর্তৃক রামগড় থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করা হয়েছে এবং উক্ত বাড়ীতে আব্দুল মান্নান এখনও বসবাস করছেন। সন্ত্রাসীদের ভয়ে সে স্থান থেকে বের হতে সাহস করছে না।

এভাবেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি আগ্রাসন চালাচ্ছে। এ কাজে জনগণ ও মিডিয়ার সমর্থন পেতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও প্রাণের হুমকির ভয়ে ক্ষতিগ্রস্তরাও অসহায় ।

এ ব্যাপারে কথা বলতে ইউপিডিএফ প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের মুখপাত্র নিরন চাকমার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

তবে ইউপিএফ কেন্দ্রীয় নেতা ও সংগঠক মাইকেল চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, যে স্থানে স্কুলটি নির্মিত হয়েছে সেখানে মূলত কখনো কোন বাঙ্গালীর বসবাস ছিল না। যদি কেউ জমির মালিক হয়ে থাকে তাহলে সে আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। স্কুলটি এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত হলেও ইউপিডিএফের সহযোগিতা ছিলো বলে তিনি স্বীকার করেন।

তিনি আরো বলেন, সারা দেশে আওয়ামীলীগ, বিএনপি স্কুল তৈরি করে, আমরা কি সহযোগিতাও করতে পারবো না।

রামগড়ে ভূমি দখলের আড়ালে ইউপিডিএফের নেতৃত্বে চলছে বাঙালী উচ্ছেদ মিশন

সন্তোষ বড়ুয়া

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উপজাতি স্বার্থান্বেষী মহল নিয়মিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকা, মিছিল, মিটিং, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান, হরতাল, স্কুল-কলেজে ক্লাস বর্জনসহ নানা ধরণের পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করে থাকে। তাদের এই মিথ্যা অপপ্রচারের গণ্ডি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা এমনকি বিদেশেও তারা এই অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় এই যে, তাদের এই অপপ্রচারে সরাসরি সহযোগিতা করছে দেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

আমার আজকের লেখার বিষয় হল পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলাকে নিয়ে এমনই কিছু মিথ্যাচার আর সেখানে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ে।

রামগড়ে গত বেশ কিছুদিন যাবত ভূমি নিয়ে সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপজাতিদের অভিযোগ সেখানকার স্থানীয় বাঙালি এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে, তাদের বসত-ঘর ভেঙ্গে দিচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের এই অভিযোগসমূহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বেশ ঘটা করে তারা প্রচারও করছে। অভিযোগ যেহেতু গুরুতর তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি রামগড়ে সরেজমিনে তদন্তের জন্য রাঙামাটি থেকে ছুটে গেলাম।

সেখানকার স্থানীয় জনসাধারনের সাথে কথা বলে যে তথ্য সংগ্রহ করেছি তাতে একটা বিষয় পরিস্কার যে ভূমি নিয়ে উপজাতিদের উত্থাপিত সকল অভিযোগ মিথ্যা।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায় যে, রামগড় এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাটি মূলতঃ আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের আধিপত্যপূর্ণ এলাকা। সশস্ত্র ঐ সংগঠনটি রামগড় এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণসহ নানান ধরণের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত। তাদের এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রমে প্রধান বাধা নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। আর সে কারণেই তারা নিরাপত্তাবাহিনীকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বানোয়াট আর বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার করে গুজব সৃষ্টি করে আসছে। শুধু অপপ্রচারেই তারা ক্ষ্যান্ত নয়। সুযোগ পেলে তারা নিরাপত্তাবাহিনীর উপর হামলা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ৫ জুন ২০১৭ তারিখে পুলিশের ওপর ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের পেট্রোল বোমা ও ককটেল নিক্ষেপ, ৭ জুন ২০১৭ তারিখে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কর্মীদের কর্তৃক বিজিবি ও পুলিশের উপর হামলা, ৮ মার্চ ২০১৮ তারিখে ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল ইউমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক পুলিশের উপর হামলার চেষ্টা ইত্যাদি।


এ সংক্রান্ত আরো লেখা:
নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা


ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সশস্ত্র দলের অস্ত্রের মুখে স্থানীয় জনসাধারণও অতিষ্ঠ। কিন্তু প্রাণ ভয়ে তারা কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। নামপ্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় উপজাতি এবং বাঙালিরা ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সশস্ত্র দলের বেশ কিছু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঘটনার বর্ণনা করেছেন পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকেও এর সত্যতা পেয়েছি। এর কিছু উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১। ১৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, রামগড়ের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম অন্তুপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আকস্মিকভাবে এসে চাইন্দে মারমা নামক এক ব্যক্তির বসতঘর ও রান্নাঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়।

২। ২৭ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে, তৈচাগাড়া বাটনাশিবির নামক স্থানে মো. হানিফ মজুমদার (৬৫), মো. আবু সাইদ (৫৫) এবং মো. ওবাইদুল হক (৫০) নামক তিনজন বাঙালির মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের লোকজন জোরপূর্বক বসত-ঘর তৈরী করে। কিন্তু ইউপিডিএফ কর্তৃক তৈরীকৃত ঘরগুলো উক্ত জমির মালিকরা ভেঙ্গে দেয়। পরবর্তীতে, বাঙালিরা তাদের বসত-ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে মর্মে অপপ্রচার চালায় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা।

৩। ৪ মার্চ ২০১৮ তারিখে, পাকলাপাড়া নামক স্থানে নিজ বাসা থেকে অজ্ঞাতনামা উপজাতি অস্ত্রধারীরা (স্থানীয়দের দাবী ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ) চাইথুই মারমা (৫৫)নামক একজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

৪। ২১ মার্চ ২০১৮ তারিখে, পাতাছড়া ইউনিয়নের কলাবাড়ি নামক স্থানে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীদের গুলিতে সিএনজি চালিত অটো রিক্সার চালক শরীফুল ইসলাম(২৬) আহত হয়। একই স্থানে অপর একটি অটো রিক্সায় ছোঁড়া ইটের আঘাতে দেড় বছরের একটি শিশুও আহত হয়।

৫। ৪ জুন ২০১৮ তারিখে পার্বত্যনিউজ ডট কম পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায় যে, রামগড় ইউনিয়নের ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজার তৈচাগাড়া ও থানা চন্দ্র পাড়া এলাকায় সরকারিভাবে বন্দোবস্তী দেয়া ১৩টি বাঙালি পরিবারের প্রায় ৬০ একর টিলা ভূমি দখল করে বসতি স্থাপন করছে কতিপয় উপজাতিরা। ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদেরকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে অন্যত্র থেকে পাহাড়ি পরিবারগুলোকে এনে বাঙালিদের ওইসব জায়গায় বসতি তৈরী করে দিচ্ছে।

৬। ৩ জুন ২০১৮ তারিখে থানাচন্দ্রপাড়া নামক স্থানে ১০ জন বাঙালির সর্বমোট ৭০.৫০ একর জায়গা ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে দখলে নেয়। পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট বাঙালিরা উক্ত জায়গার মালিকানা দাবী করে তাদেরকে বাধা প্রদান করলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বাঙালিদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এ প্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি কর্তৃক উক্ত ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হয়।

৭। ১৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে গৈয়াপাড়া এলাকায় জনৈক বাঙালি মোঃ সুলতান আহমেদ (৭০) এর মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের এর ইন্ধনে উপজাতীয়রা ৩/৪টি বাড়ী নির্মাণ করে। পরবর্তীতে বাদী সুলতান আহমেদ রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

৮। ২৫ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, দাতারামপাড়া, রসলপুর নামক স্থানে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী নির্মাণাধীন রাস্তার কাজে নিয়োজিত চারজন শ্রমিকের কাছে চাঁদা দাবী করে। শ্রমিকরা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা তাদেরকে মারধর করে।

৯। ২০ আগষ্ট ২০১৮ তারিখে, চাঁদা না দেয়ায় সোনাইআগা নোয়াপাড়া নামক স্থানে বসবাসকারী মো. আব্দুল মান্নান (৪২) নামক এক বাঙালিকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের ১০/১২ জন সন্ত্রাসী মারধর করে আহত করে। আব্দুল মান্নান জানায় যে, ইউপিডিএফ (মূলদল) এর সন্ত্রাসীরা সোনাইআগা নোয়াপাড়া হতে বাঙালিদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে উক্ত এলাকা পাহাড়ীদের বলে দাবী করে।

১০. গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের গরুকাটা নামক দুর্গম এলাকায় চাঁদার টোকেন দেখাতে না পারায় এক বাঙালী অটো রিক্সা ড্রাইভারের গাড়ী ভাঙচুর করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। জানা যায়, সকালে খাগড়াবিল বাজার থেকে যাত্রী নিয়ে গরুকাটায় পৌঁছলে ৩-৪ জন সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসী অটোরিক্সাটি আটক করে। তারা চালকের কাছে চাঁদার টোকেন দেখতে চায়।

তাৎক্ষণিকভাবে টোকেন দেখাতে না পারায় সন্ত্রাসীরা অটোরিক্সার চাবি কেড়ে নিযে চালক ফজলুর রহমান(২৩)কে ধারালো দা দিয়ে কোপাতে চায়। এ সময় সে দৌঁড়ে পালিযে প্রাণ বাঁচায়। সন্ত্রাসীরা অটোরিক্সাটি রাস্তার পাশের জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে ব্যাপকভাবে ভাংচুর করে। পরে অটোরিক্সা চালক সমবায় সমিতির নেতারা ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ করে অটোরিক্সাটি উদ্ধার করেন।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটেছিল ৩০ জুন ২০১৭ তারিখে। সেদিন রামগড় উপজেলার বাঙালি অধ্যুষিত কালাডেবা নামক স্থানে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কতিপয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সদলবলে উপস্থিত হয়ে বাঙালিদের নিকট চাঁদা দাবী করে। এ ঘটনা জানার সাথে সাথে স্থানীয় এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাঙালিরা সমবেত হয়ে সে সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী মারমা উপজাতি অধ্যুষিত সোনাইআগা এলাকা দিয়ে চন্দ্র কারবারীপাড়া (ত্রিপুরা উপজাতি অধ্যুষিত) এলাকায় পালিয়ে যায় এবং পলায়নকালে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে।

এ সময় স্থানীয় সাধারণ উপজাতিরাও সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে বাঙালিদের সাথে যোগ দেয়। সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করার সময় স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার কিছুদিন পূর্বেও ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীরা উক্ত এলাকার বাঙালিদের নিকট চাঁদা দাবী করে এবং চাঁদা না দিলে এলাকা ছাড়া করবে এবং বাঙালি মেয়েদেরকে অপহরণ করে ধর্ষণ করবে বলেও হুমকি প্রদান করে বলে স্থানীয়দের নিকট হতে জানা যায়।

ঘটনার মীমাংসা করার জন্য গত ১ জুলাই ২০১৭ তারিখ ১১ ঘটিকায় সোনাইআগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালি গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে স্থানীয় এলাকাবাসী সবাই জানান যে, ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের একদল সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ব্যবসায়ী, কৃষক সবার কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে। তাদের অত্যাচারে গ্রামবাসিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বৈঠকে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে সকলে মতামত ব্যক্ত করেন। বৈঠকে উপস্থিত সকল জনপ্রতিনিধি ও পাহাড়ি-বাঙালি নেতৃবৃন্দ বলেন, গুজবের মাধ্যমে এলাকার শান্তি-সম্প্রীতি নষ্ট হয়, হিংসা ও হানাহানির মত বড় ধরনের ঘটনার সৃষ্টি হয়।

এ প্রসংগে রামগড় ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড মেম্বার ক্যাওরি মারমা বলেন, পাহাড়ি- বাঙালি সবাই মিলেই সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করা হয়েছে। এখানে কেউ কোন পাহাড়ির বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেনি। সোনাইআগার স্থানীয় বয়োঃবৃদ্ধ বাসিন্দা ক্যয়প্রু মারমা বলেন, সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে আমার ছেলে এবং ভাতিজিও যায়। এই সময় তিনি সোনাইআগা এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের দাবীও জানান।

কিন্তু, উপরোক্ত ঘটনাকে ইস্যু করে পাহাড়িদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক তথ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বনপূর্বক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তি কর্তৃক অপপ্রচার চালানো হয়।

উদাহরস্বরূপঃ পাহাড়ীদের প্রতি সহানুভুতিশীল সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন যে,  “একটু আগে মাত্র খবর পেয়েছি খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার ১ নং সদর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত সৌনায়া গা ও ব্রত চন্দ্র কারবারী পাড়াতে পার্শ্ববর্তী কালাডেবা নামক এলাকা থেকে শতাধিক সেটেলার সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালাচ্ছে। এই গ্রামগুলিতে ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাস। রাত এগারটার দিকে সৌনায়া গা গ্রামটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এগারটার দিকে ব্রত চন্দ্র কারবারী গ্রামটিতে চলছিল নির্বিচার হামলা, মারধর আর লুটপাট। সেটেলারদের সাথে এইসব হামলায় স্থানীয় চৌচালা বিজিবি ক্যাম্প থেকে বিজিবি সদস্যরাও অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। গ্রামের ত্রিপুরা আদিবাসী মানুষজন প্রাণভয়ে পালাচ্ছে বাড়িঘর ছেড়ে”।

এছাড়াও চাকমা সার্কেল চিফের স্ত্রী রাণী য়েন য়েন, Ajal Dewan, Mikel Changma Jummo, Thuikyaw Ching, CHT-jummaland, Chittagong Hill Tracts International Network for Human Rights নামক ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকেও এ সংক্রান্ত বিষয়ে অপপ্রচার চালানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারপূর্বক এ ধরণের উস্কানীমূলক অপপ্রচার পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রতিকে বিনষ্ট করে যে কোন সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে এবং নিয়ে থাকে। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল করার লক্ষ্যে এ ধরণের অপপ্রচার চালানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও ইমতিয়াজ মাহমুদ কর্তৃক মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখনী হতে প্রমাণ হয় যে, তিনি নির্দিষ্ট কোন স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ রক্ষা করছেন। ইতোপূর্বেও তিনি পার্বত্য চট্রগ্রামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ও মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখা প্রকাশ করেছিলেন। তার এই মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখনীর জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

তবে আশার কথা হল রামগড়ের উপজাতি-বাঙালি সকল জনসাধরণই এখন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাইতো, ২৯ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, রামগড়ে চাঁদাবাজির সময় প্রবীর ত্রিপুরা(২২) নামক ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের এক চাঁদাবাজকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দিয়ে বিজিবি’র কাছে সোপর্দ করে স্থানীয় জনসাধারণ। পাশাপাশি পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে এই সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করছে।

উদাহরণস্বরূপঃ ১৪ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে, সুজন চাকমা(২৮) ও আব্বাই মারমা(৩৩) নামক ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের দুই চাঁদাবাজকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক করে বিজিবি সদস্যরা।
২৫ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে চাঁদাবাজি করার সময় পাত্র চাকমা নামক ইউপিডিএফ’র এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করে বিজিবি সদস্যরা।

পুলিশ, বিজিবি আর স্থানীয় প্রশাসনের এমন তৎপরতার কারণে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র কার্যক্রম বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে। সে জন্য তারা নিয়মিতভাবে এইসব বাহিনী এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হল গত ১২ সেপ্টেম্বর রামগড় উপজেলায় সদর ইউনিয়নে ৬নং ওয়ার্ড নাঙ্গল আদামে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ কর্তৃক অবৈধভাবে ভূমি দখল করতে না পেরে নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার।

♦ লেখক- রাঙামাটি থেকে

নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা

মাহের ইসলাম

পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি বিরাজ করছে মর্মে একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। প্রায়শ, পার্বত্য চট্রগ্রামের অশান্তির পেছনে অনেকগুলো বিষয়কে দায়ী করা হয়। তন্মধ্যে, ভূমি সমস্যা সবচেয়ে জটিল বলে বিবেচিত। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন এলাকায় ভূমি সংক্রান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলীর সংবাদ সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচার পায়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, ধর্মীয় উস্কানিমূলক, এমনকি সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর মত কিছু জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে, মূলত ভূমি সমস্যার সুত্র ধরে।

নিঃসন্দেহে, এটি একটি জটিল সমস্যা। তবে, এই সমস্যার আপাতদৃষ্টিতে যে অনুঘটক চোখে পড়ে, তার পিছনের কুশীলবদের ভূমিকা বাস্তবিকভাবেই অত্যন্ত বেশী। এই কুশীলবগণ কুটকৌশলের মাধ্যমে সাধারণ নিরীহ পাহাড়ীদের তাদের ক্রীড়নকে পরিণত করেছে। যার চুড়ান্ত ফলশ্রুতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা ক্রমান্বয়ে জটিল হতে জটিলতর হতে হতে এখন প্রায় সমাধানের অতীত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিছু বাস্তবতা আর সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর উপর একটু ভালোভাবে খেয়াল করলেই এই কুশীলবদের পর্দার আড়ালের ভূমিকা চোখে পড়বে। মানবস্মৃতির বিশেষ বৈশিষ্টের কথা মাথায় রেখেই, অতি সাম্প্রতিক মাত্র কয়েকটা ঘটনা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সেই সাথে, তথ্যসুত্রে স্বনামধন্য ব্যক্তির লেখা উল্লেখ করা হচ্ছে।

সর্বজন শ্রদ্ধেয়া আমেনা মহসিনের ‘দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭) বইয়ের সুত্রে জানা জানা যায় যে, ১৮৭১ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন- চতুর্থাংশ এলাকাই সরকারী বনভুমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল (পৃষ্ঠা ৮৯-৯২)। বর্ণিত বইয়ের সুত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য অঞ্চলের রিজার্ভ ফরেস্টের পরিমাণ নিচের টেবিলে দেখানো হলঃ

বাংলাদেশ আমলেই জনসংহতি সমিতির ১৯৯৩ সালের দাবিনামায় পার্বত্য চট্রগ্রামের সর্বমোট  ৪৪৬.০৪ বর্গমাইল  এলাকা জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখ করা হয়েছে । এই প্রেক্ষাপটে, আমেনা মহসিন যথার্থই মন্তব্য করেছেন,

 “Most of the land in the HT fall under Government Reserve Forest (RF) and the Kaptai hydro-electric project, which actually leaves only ten per cent of the total area of the HT under the District Council’s jurisdiction.” (Mohsin, 1997, pp. 203-204).

পূর্বোক্ত বইয়ে ২০৪ পৃষ্ঠায় বাংলাদেশে সরকারী নিয়ন্ত্রিত ভূমির নিম্নোক্ত সারাংশ পাওয়া যায়:

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই  পার্বত্যাঞ্চলে সরকারী জমি ছিল।  বাংলাদেশ সরকারের আমলেই,  সমগ্র পার্বত্য চট্রগ্রামের  প্রায় ৯০% ভূমির মালিকানা সরকারেরই ছিল। যা সরকারী দলিল মোতাবেক প্রমাণিত ও পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে স্বীকৃত।তালিকা ১:  পার্বত্য চট্রগ্রামে সরকারী ভুমি, সুত্র: আমেনা মহসিন, ‘দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম’ (প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭), পৃ-২০৪।

বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ভুমি অধিকরণ করা স্বাভাবিক হিসেবেই গণ্য করা হয়। একইভাবে, বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন কারণে ভূমি অধিগ্রহণ করে থাকে। ইতিপূর্বে, যমুনা সেতু নির্মাণ, ঢাকা – চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণ, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, এমনকি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্যেও সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমি অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু এদেশেরই কিছু মানুষ যারা দারিদ্রতার কারণে অথবা নদীভাঙ্গনের দুর্ভাগ্যে ভূমিহীন হয়ে পড়েছিল, তাদেরকে  পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের জন্যে সরকার কোন পাহাড়ীর জমি অধিগ্রহণ করেনি। বরং খাস জমিতেই এদেরকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, সমতল হতে বাঙ্গালীদেরকে শুধুমাত্র সরকারী খাস জমিতেই যে পুনর্বাসন করা হয়েছিল- তার প্রমাণ পাওয়া যায়, বিভিন্ন সরকারী নথিপত্র থেকেই।

  • ১৯৮০ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জনাব সফিউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পরিস্কার বলা হয়েছে,

    “ It has been decided that landless/river erosion affected people from your district will be settled in the Chittagong Hill Tracts (CHTs). The settlement will be done in selected Zones and each family will be given Khas land free of cost according to the following scale:

  • Plain land – 2.50 acres.
  • Plain and bumpy mixed – 4.00 acres.
  • Hilly – 5.00 acres.” (Mohsin, 1997, Appendix I)

উল্লেখ্য, ১৫ সেপ্টেম্বরে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার জনাব আলী হায়দার খাঁন স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতেও পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে যে, প্রতিটি পরিবারকে খাস জমিতে পুনর্বাসিত করা হবে। (Mohsin, 1997, Appendix I)

আজ যেমন রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে অভিবাসনে বাধ্য হয়েছে, ঠিক তেমনি উপজাতিরাও ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করেছে। ঠিক কোন স্থান হতে এবং কবে, কোন কোন উপজাতি, কি পরিস্থিতিতে  অভিবাসন করেছে, তা নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও উপজাতিরা যে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করেছে – সেটা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই।

বাংলাদেশ সরকার যদি শুধুমাত্র মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের একটা নির্দিষ্ট এলাকায় সরকারী জমিতে পুনর্বাসিত করতে পারে, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব আর ভৌগোলিক অখণ্ডতার রক্ষার্থে নিজ নাগরিকদেরকে দেশের এক অংশে খাস জমিতে পুনর্বাসিত করার এখতিয়ার অবশ্যই আছে। বাস্তবে, বাঙ্গালীদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের পিছনে একাধিক যুক্তিসংগত কারণ ছিল। এই কারণসমুহের বিস্তারিত খুঁজতে চাইলে, লেখকের ‘পার্বত্য চট্রগ্রামে সেনাবাহিনী ও বাঙালী কেন এলো?’ (http://www.somewhereinblog.net/blog/MaherIslam/30245685) লেখাটি পড়ার বিনীত অনুরোধ রইল।

পরবর্তীতে, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের নিরিখে সরকার ভুমি সমস্যা সমাধান কল্পে ২০০১ সালে ‘পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন’ পাশ করে। উক্ত আইনের কিছু বিষয় চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় দাবী করে, জনসংহতি সমিতি উক্ত আইনের  সংশোধনী দাবী করে ২৩ দফা পেশ করে। তাদের সংশোধনী মেনে না নেওয়া পর্যন্ত ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় অকার্যকর করে রাখা হয়, নানা ধরণের অসহযোগিতার মাধ্যমে।  জনসংহতি  সমিতির দাবী এবং দফাসমুহ দীর্ঘদিন আলোচনা-পর্যালোচনার পরে ২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন (সংশোধনী) আইন -২০১৬’ পাশ করা হয়।

এই সংশোধনীর বেশ কিছু ধারার ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালীদের গুরুতর আপত্তি আছে, কারণ এই সংশোধিত আইন অনুযায়ী বাঙালীদের বঞ্চিত হওয়া; এমনকি  ভূমি হারানোর যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে বলে তাদের অনেকেই মত পোষণ করেন।

সঙ্গতকারণেই সংশোধিত ভূমি কমিশন আইনের গ্রহণযোগ্যতা পাহাড়িদের কাছে যতটা বেশী পার্বত্যাঞ্চলের বাংগালিদের  কাছে ততটাই কম। যার প্রতিফলন ঘটে কমিশন বরাবর আবেদনের সংখ্যায়। যেখানে ভূমি বিরোধ নিস্পত্তির জন্যে আগে পাহাড়ীদের কেউই ভূমি কমিশন বরাবর আবেদন করেনি, সেখানে ২০১৬ সালের সংশোধনী পাশ হওয়ার পরেই তারা আবেদন করতে শুরু করে। ৮ সেপ্টেম্বরে গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর হতে ৪৫ দিনের সময়সীমায় ১৫,৯৭৯ জন পাহাড়ীর বিপরীতে মাত্র  ৩.১২ % বাঙালী এবং  পরবর্তীতে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ তে ২২৯৭০ জন পাহাড়ীর বিপরীতে মাত্র  ২.৬১  % বাঙালী আবেদন করে।

এরই পাশাপাশি, পাহাড়ি নেতৃবৃন্দ সংশোধিত আইনের আলোকে বাঙালীদেরকে ক্রমান্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে বিতাড়িত করার কৌশল হিসেবে বাঙালীদের জমি অবৈধভাবে দখলের অপচেষ্টা বৃদ্ধি করে। এমনকি তারা সরকারী খাস জমিও দখল করতে শুরু করে। তাদের এই অপচেষ্টায় মূলত কয়েক ধরণের কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়েছে, যেমনঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মের নামে জমি দখল, বাঙ্গালীর বৈধ জমি জোরপূর্বক দখলে নেয়া,  কিংবা বাঙ্গালীর বৈধ জমিকে বিরোধপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে তার বৈধ জমি ভোগ করতে না দেয়া। এ ধরণের কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট উদাহরণ থাকলেও শুধুমাত্র বিগত কয়েক মাসে পরিলক্ষিত কিছু ঘটনার উপর আলোকপাত করা হচ্ছে, লেখার দৈর্ঘ্য  সংক্ষিপ্ত করার মানসে।

১। ২৩ মে ২০১৮ তারিখে,  খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটা এলাকায় জগদীশ চন্দ্র নাথ নামের এক বাঙ্গালীর মালিকানাধীন জমিতে এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় স্থানীয় পাহাড়িরা জোর করেই এক স্কুল ঘর নির্মাণের চেষ্টা করে। ভয়াবহ ব্যাপারটা হল, ঐ বাঙালী স্কুল নির্মাণের জন্যে জমি অনুদান হিসেবে দিতে রাজী হলেও স্থানীয় পাহাড়িরা জোরপূর্বক তাদের পছন্দমত জায়গায় স্কুল ঘর নির্মাণ শুরু করে। ভুক্তভোগী নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে মামলা পর্যন্ত করতে সাহস করেনি। উল্টোদিকে, ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধানের চেষ্টা করায়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্কুলটি ভাঙচুরের মিথ্যে অভিযোগ ফলাও করে স্থানীয় এক অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়।

২। একই তারিখে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি  উপজেলার জামতলায় মোঃ জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারুল ইসলাম নামের দুই বাঙ্গালীর জমিতে রিপ্রুচাই মারমা নামের এক উপজাতি জঙ্গল পরিস্কার করে ঘর নির্মাণ করে বিরোধের সুত্রপাত করে। পরবর্তীতে নিরাপত্তাবাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ফলে উভয়পক্ষ বৈধ কাগজপত্র না দেখানো পর্যন্ত ঐ জমি ব্যবহারে বিরত থাকতে সম্মত হয়। উল্লেখ্য, উভয় পক্ষই অদ্যবধি কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।

৩। গত জুনের ৩ তারিখে রামগড় উপজেলার থানাচন্দ্রপাড়ায় ১০ জন বাঙ্গালীর সর্বমোট ৭০.৫০ একর জমিতে একদল পাহাড়ী ছোট ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করে। বাঙ্গালীরা বাঁধা দিতে গেলে তারা  জানায়, এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের লোকজন তাদেরকে এখানে এনে বসিয়েছে। এমনকি উক্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সদস্যরা বাংগালিদেরকেও  ভয় দেখায় । ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন মামলা দায়ের করেছে বলে জানা যায়। কিন্তু জমিতে এখনো অবৈধ দখলদার পাহাড়িরাই রয়েছে।

৪। গত জুনের ২৪ তারিখে নিরাপত্তা বাহিনীর এক টহল দল গুইমারার উপজেলার হাফছড়া ইউনিয়নের কুকিছড়ায় স্থানীয় কারবারীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিত্যক্ত এক ক্যাম্পে এক কিয়াং ঘর নির্মাণ করতে দেখে। সরকারী খাস জমি হওয়ায়,  স্থানীয় সহকারী  ভুমি কমিশনার লিখিতভাবে উক্ত জমিতে নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও তারা তড়িঘড়ি করে কাজটি শেষ করে।

উল্লেখ্য, প্রায় ৮ ফুট উচ্চতার এক বুদ্ধ মূর্তি ইতোমধ্যেই সেখানে স্থাপন করা হয়েছে।  ইতোমধ্যেই, নিরাপত্তা বাহিনী ধর্মীয় উপাসানালয় ভেঙ্গে ফেলার আদেশ দিয়েছে মর্মে অপপ্রচার চালিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া গরম করে ফেলা হয়েছে।

৫। প্রায় একই তরিকায় গত ৪ জুলাই ২০১৮ তারিখে সিন্দুকছড়ি ইউনিয়নের তিন্দুকছড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিত্যাক্ত ক্যাম্পে নবনির্মিত এক টিনের ঘর দেখে স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে জমির মালিকানা নিশ্চিত হয়ে ঘর নির্মাণের কথা জানায় নিরাপত্তা বাহিনী। ফলশ্রুতিতে, রাতের আঁধারে সেখানে প্রায় ১০ ইঞ্চি উচ্চতার এক বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়। যদিও, নির্মাণকারীরা জমির মালিকানার স্বপক্ষে কোন প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে পারেনি।

৬। ১৮ জুলাই তারিখে রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়নের গৈয়াপাড়া এলাকায় মো. সুলতান আহমদের জমিতে, এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে লক্ষীছড়ি হতে গিয়ে ৩ উপজাতি পরিবার কয়েকটি ঘর নির্মাণ করে। আরো জানা যায় যে, স্থানীয় এক কারবারীর ইন্ধন রয়েছে এই ঘটনায়। সুলতান আহমেদ মামলা করেছে, কিন্তু জমির দখল এখনো পায়নি। বরং জোরপূর্বক দখল করে ঐ উপজাতি পরিবারগুলোই সেখানে বহাল তবিয়তে বসবাস করছে।

৭। ২০ আগস্ট ২০১৮ তারিখে এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের ১০/১২ জন সদস্য রামগড় ইউনিয়নের সোনাইগা নোয়াপাড়া এলাকার মোঃ আব্দুল মান্নানকে মারধর করে। চিকিৎসার জন্যে তাকে পরে রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। আহত ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, সোনাইগা নোয়াপাড়া এলাকাটিকে পাহাড়িদের দাবী করে ঐ এলাকা ছেড়ে বাঙালীদের চলে যাওয়ার জন্যে হুমকি দিয়ে তাকে মারধর করা হয়।

৮। ২৮ আগস্ট রামগড় ইউনিয়নের ফেনীরকুল এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধে ক্যাজাইলা মারমাকে মো. জয়নাল আবেদীন ধারালো দা দিয়ে আঘাত করলে সে আহত হয়। তার রক্তাক্ত ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল করে বাঙালী বিদ্বেষী প্রচারণা চালালেও ভুমি বিরোধের প্রকৃত কারণ কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। এই ঘটনা প্রচার করলেও ইতিপূর্বে বাঙালীদের জমি দখল বা বাঙ্গালীকে আহত করার ঘটনা স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ করেনি।

৯। সর্বশেষ ঘটনাটিও সোশ্যাল মিডিয়াতে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি প্রকৃত সত্য গোপন করেই প্রকাশে সচেষ্ট ছিল। গত ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি টহল দল রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটায় স্থানীয় পাহাড়িদের সহায়তায় কিছু বহিরাগত পাহাড়ি কর্তৃক বসত-ঘর তৈরির সরঞ্জামাদি জড়ো করতে দেখতে পায়। নিরাপত্তা বাহিনীর নিকট তারা স্বীকার করে যে, তারা বহিরাগত এবং তাদের কাছে মালিকানা বা নির্মাণের পক্ষে কোন ধরণের কিছু নেই। তখন, টহল দল তাদেরকে নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বলে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তি  প্রচার করে যে, নিরাপত্তা বাহিনী এক বিধবাকে তার ঘর নির্মাণে বাঁধা দিচ্ছে।

এখানে শুধু রামগড় উপজেলা ও তৎসংলগ্ন এলাকার গত পাঁচ মাসের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এমন অনেক ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়মিত ঘটছে, যার বেশীরভাগই রয়ে যায় অজ্ঞাত। তবে, যদি কোনভাবে পাহাড়ি কাউকে ভিক্টিম হতে হয়, তাহলে তা বহুল প্রচারিত ঘটনা হিসেবে অনেক মিডিয়াতেই স্থান অর্জন করে ফেলে। ঘটনাগুলির প্রায় সবগুলিতেই হয় বাঙ্গালীর বৈধ জমি অথবা খাস  জমি অবৈধ দখলের চেষ্টা হয়েছে। আর, সকল ক্ষেত্রেই হয় তারা জমি দখল করে ফেলেছে, আর না হয় বাঙ্গালি/সরকারকে তার বৈধ মালিকানাধীন জমি ব্যবহারে বিরত থাকতে বাধ্য করেছে।

এছাড়াও এভাবে অবৈধভাবে দখলের মাধ্যমে ভবিষ্যতে, ভুমি কমিশনের কাছে এই জমিগুলোর মালিকানা বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে নিজেদের পক্ষে মালিকানা দাবী করা হবে। যেখানে, বাঙালীদের ভয় যে, কমিশনের রায় তাদের বিপক্ষে চলে গেলে তাদের আর কিছুই করার থাকবে না। ইতোপূর্বে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ ভূমি অফিস, তহসিল অফিস পুড়িয়ে দিয়েছে যাতে করে বাঙালীরা তাদের জমির অরিজিনাল দলিল না পায়। একই সাথে বহু বছর আগে থেকেই পাহাড়ী হেডম্যানরা বাঙালীদের জমির খাজনা নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মূলত বাঙালীদের জমির মালিকানার দাবী দূর্বল করতেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সম্প্রতি আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে বাঙালীদের জমির খাজনা আদায় না করার নির্দেশ দিয়েছেন- যা তার এখতিয়ার বর্হিভূত। শুধু তাই নয়, ভূমি কমিশন আইন সংশোধন পাস হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো রিজার্ভ ফরেস্ট নেই, সরকারের কোনো খাস জমি নেই। তিনি সেনানিবাস থেকে খাজনা আদায় করার জন্য হেডম্যানদের প্রতি নির্দেশ দেয়ার মতো ধৃষ্টতাও দেখিয়েছেন। মূলত ভূমি কমিশনের কাছে বাঙালীদের ভূমির মালিকানা দাবী দূর্বল করতেই সুদুর প্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে তারা একাজ করে যাচ্ছেন।

জমি দখলের এই পন্থা অনুসরণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে বাঙ্গালী মালিকানাধীন অনেক জমি হয় পাহাড়িরা জোরপূর্বক দখল করছে, আর না হয় মালিকানাকে বিতর্কিত করছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই, পাহাড়ে ভূমি সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে আরো জটিল হচ্ছে। অথচ, এই সমস্যার জন্যে কেউ কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদের পুনর্বাসন কিংবা পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ার জিকির করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন।

মুলত, এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ইন্ধনেই এই বিষয়টি বর্তমানে এতটা জটিল আকার ধারণ করেছে। পার্বত্যাঞ্চলের ভূমির সরকারী মালিকানা এবং ঐতিহাসিক  বাস্তবতার নিরিখে বাঙালী পুনর্বাসন করার প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে, পাহাড়ি নেতৃবৃন্দই তৎকালীন ভূমি কমিশনকে কার্যকর হতে দেয়নি। পরবর্তীতে, যখন তাদের দাবী মেনে আইনের সংশোধনী করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের ইচ্ছে বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে, তখন বিভিন্ন স্থানে বাঙ্গালীর জমির পাশাপাশি সরকারী খাস জমিও জোর করে দখলের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এমতাবস্থায়, পাহাড়ের ভুমি সমস্যা সৃষ্টি এবং বৃদ্ধি করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জিইয়ে রাখার পরে এখন বাঙালী এবং সরকারী খাস জমি জোরপূর্বক দখলের চলমান প্রবণতা পরিহার না করে ভূমি সমস্যার সমাধান আশা করা করা যায় না।

♦ লেখক- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

গুইমারাতে ধর্মীয় উপাসনালয়ের নামে সরকারী খাস ভূমি দখল: নিরাপত্তা বাহিনীর নামে অপপ্রচার

দিদারুল আলম, গুইমারা, খাগড়াছড়ি:

খাগড়াছড়ির গুইমারার কুকিছড়ায় ধর্মীয় উপাসনালয় তৈরি করার নামে সরকারী খাস ভূমি জবর দখল করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের নিকট থেকে জানা যায়, গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়নের কুকিছড়ায় পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্পের সরকারী খাসভূমিতে ধর্মীয় উপসনালয় তৈরীর নামে ভূমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে একশ্রেণীর উপজাতীয় ভূমিদস্যুরা।

এ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি নিয়মিত টহল দল স্থানীয় কার্বারীসহ জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণকারী উপজাতীয়দের কাছে খাস ভূমিতে তড়িঘড়ি করে ঘর নির্মাণের কারণ জানতে চাইলে, তারা সেনাবাহিনীর কাছে উক্ত ভূমি তাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন বলে দাবি করেন, তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তাবাহিনী যথাযথ কর্তৃপক্ষ কিংবা ভূমির মালিকের অনুমতি নিয়ে ঘর নির্মাণ করার অনুরোধ করেন।

কিন্তু তা না করে উপজাতীয় ভূমি দস্যুরা তাদের পরিচালিত ওয়েব সাইট ও সামাজিক গণমাধ্যমে ‘সেনাবাহিনী ধর্মীয় উপাসনালয় ভেঙে দেয়া নির্দেশ দিয়েছে’ মর্মে প্রচার চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উষ্কানী ছড়িয়ে মানুষের সমর্থন আদায় ও সেনাবাহিনী সম্পর্কে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে।

খবর পেয়ে কুকিছড়ায় সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে এবং এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, উক্ত স্থানে পুর্বে সেনাক্যাম্প ছিলো । শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর শান্তিচুক্তির শর্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে ঐ সেনা ক্যাম্পটি প্রত্যাহার করা হয়। এরপর থেকে দীর্ঘদীন স্থানটি পরিত্যাক্ত ছিলো। মাঝে মাঝে সেনাবাহিনী এসে টহল দিয়ে যেতো। কিন্তু হঠাৎ করে ৩/৪ দিন আগে স্থানীয় কিছু লোক কোন কুচক্রি মহলের ইশারায় এই ভূমি দখল করে ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের নিমিত্তে একটি কাঠের ঘরের অবকাঠামো দাড় করায়।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে যে, নির্মাণাধীন উপাসনালয়টির প্রায় ৩০০ গজ রেডিয়াসের ভেতর আরো ২ টি উপাসনালয় রয়েছে। তাছাড়া দূর্গম পাহাড়ী এলাকাটি এত ঘনবসতি নয় যে সেখানে আরো উপাসনালয় নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে সেখানে কেন বা কী কারণে উপজাতীয়রা আরেকটি উপাসনালয় নির্মাণের নামে সরকারী ভূমি দখল করতে চাইছে এ নিয়ে গুইমারার বিভিন্ন মহলে সমালোচনা চলছে ।

স্থানীয় সমাজের সচেতনদের দাবি পাহাড়ের আঞ্চলিক একটি সশস্ত্র সংগঠন নিজেরা আড়ালে থেকে সাধারণ উপজাতীদের দিয়ে সরকারী এ খাস ভূমিটি দখল করাচ্ছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য কালা মার্মা জানান, নির্মিতব্য উপাসনালয়টির ভূমিটি মূলত সরকারী খাস। এখানে একটি পরিবার বসবাস করতো। দেবতাদের ভয়ে ঐ পরিবারটি ভয় পেত। তাই আমরা ঐখানে বুদ্ধ মূর্তি স্থাপন করেছি এর ফলে এখানে আর কোন দেবতার ভয়ের কারণ নাই।

একই স্থানে দুটি মন্দির স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন আছে বলেইতো তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনিক অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রশাসনকে আমরা অবগত করিনি। তবে প্রশাসন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কাজ করতে বলেছে। আমরা মন্দিরের কাজ শেষ করেছি।

যেখানে কুকিছড়ায় আরো দুটি উপাসনালয় রয়েছে সেখানে শুধু মাত্র একটি পরিবারের জন্য একটি উপাসনালয়ের নামে এ ভূমিটি দখলের কারণ জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট কিয়াংয়ের সংখ্যা ১৫৭৬ টি। এদের মধ্যে শান্তিচুক্তির আগে ছিলো ১১১৪টি এবং শান্তিচুক্তির পরে হয়েছে ৪৬২টি। এর মধ্যে ১০০৭ টি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে, ৪৯০ টি সরকারী খাস জমিতে, ৭৩ টি বন বিভাগের জমিতে অবস্থিত এবং ৬ টি নিরাপত্তা বাহিনীর পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্প দখল করে স্থাপন করা।

নিরাপত্তা বাহিনীর পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্প দখল করে নির্মাণ করা কিয়াংগুলো হলো: কুতুবছড়ি বৌদ্ধ বিহার লক্ষীছড়ি; জনবল বুদ্ধ বিহার নানিয়ারচর; জুড়াছড়ি পাড়া, নানিয়ারচর; নাভাঙ্গা পাড়া বৌদ্ধ বিহার রাঙামাটি এবং শিরের আগা, চাইল্যাতলা, রাজনগর।

এর বাইরেও বাঙালীদের কবুলিয়ত দেয়া ও পরে গুচ্ছগ্রামে চলে যাওয়ার পর পরিত্যাক্ত বেশ কিছু জমিতেও ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করে দখল হয়েছে। দিঘীনালার সোনামিয়া টিলা তার অন্যতম উদাহরণ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনী যখন কোনো ক্যাম্প স্থাপন করেছে তখন ওই এলাকার জনবসতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কৌশলগত অবস্থান বিবেচনা করেই করেছে। কিন্তু শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ওই স্থানগুলো ধর্মীয় স্থাপনার নামে দখল করেছে স্থানীয় উপজাতীয় কুচক্রি মহল। এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দখল করে তারা তাদের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজী, যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক ধর্মীয় স্থাপনার নামে সাম্প্রদায়িক্ উষ্কানী ছড়ানো, সন্ত্রাসীদের আশ্রয়, প্রশ্রয় ও প্রশিক্ষণ প্রদান, অস্ত্র ও তথ্য পাচার ও আদান প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। ধর্মীয় লেবাসধারী অনেক ব্যক্তি বিভিন্ন সময় অস্ত্র, মাদক ও নারী পাচার করতে গিয়ে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে।

কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় উপাসনালয়ের নামে যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মাণ শুধু ভূমি দখলই নয়, এর পেছনে রয়েছে সুদুর প্রসারী নীলনকশা বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। তারা এ বিষয়টি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় হাফছড়ি ইউপি’র চেয়ারম্যান চাইথোয়াই চৌধুরী বলেন, কুকিছড়ায় একটি বুদ্ধ মন্দির স্থাপন করার জন্য আমার কাছে সহযোগিতা চেয়েছে আমি সহযোগিতা করেছি। তবে কোন স্থানে আমি জানতাম না। পরে জানতে পারলাম সরকারী খাস ভূমি দখল করে স্থানীয়রা একটি বিহার নির্মাণ করার চেষ্টা করছে। এবিষয় নিয়ে ইউএনও স্যারসহ সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করার জন্য বলেছি।

গুইমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অ.দা) বিভিষণ কান্তি দাস জানান, কুকিছড়ায় সরকারী একটি খাস ভূমিতে অবৈধভাবে উপজাতীয়রা বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করছে খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা বিহার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দিয়েছি। মূলত ঐ ভুমিটি সরকারী খাস ভূমি, এছাড়া আপাতত বিহার নির্মাণের কাজ বন্ধ রয়েছে।