পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

মেহেদী হাসান পলাশ, mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ
গত ১৬ জুন পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৩ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা। বিলটি উপস্থাপনের আগে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বিলের উপর আপত্তি দিয়ে বিলটি সংসদে উপস্থাপন না করার জন্য স্পিকারকে অনুরোধ করেন। সংসদ সদস্যের আপত্তির মুখে স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী বিলটি কণ্ঠ ভোটে দেন। বিলটিতে সরকার দলীয় সংসদীয় সদস্যরা হ্যাঁ ভোট ও বিরোধী দলীয় জোট সদস্যরা না ভোট দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতায় হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হলে বিলটি সংসদে উপস্থাপন করেন ভূমিমন্ত্রী।

বিলটি উপস্থাপনের পর বিলটি পরীক্ষা নীরিক্ষা করে ৭দিন পর সংসদে উপস্থাপনের জন্য  ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরনের জন্য স্পিকার কণ্ঠভোটে দেন। বিরোধী দলীয় সদস্যরা না ভোট দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিলটি ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে প্রেরিত হয়। সে হিসাবে আগামী ২৩ জুন সংসদে পরীক্ষিত বিলটি চুড়ান্তভাবে পাশের জন্য উপস্থাপিত হওয়ার কথা।

১৭৫৭ সালের এই ২৩ জুনে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল। ২৫৫ বছর পর আরেক ২৩ জুনে পার্বত্য বাঙালীর ভাগ্য নির্ধারিত হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে। শুধু বাঙালীর নয় বাংলাদেশের ভাগ্যও হয়তো এ দিনেই লেখা হতে পারে। কারণ এই সংশোধনী প্রস্তাবে এমন কিছু ধারা রয়েছে যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

পার্বত্য চুক্তির ঘ খন্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল চলিবেনা’। অন্যদিকে ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে,‘ উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে এবং একই সাথে তা সংবিধান বিরোধী। কারণ বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার খণ্ডে ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’ কিন্তু পার্বত্য চুক্তি ও ভূমি কমিশন আইনের ফলে সেখানকার অধিবাসীরা কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করতে পারবেন না। কমিশন ও এর আইন উপজাতি ঘেঁষা হওয়ায় সেখানে বৈষম্যের শিকার হবেন পার্বত্য বাঙালীরা।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী ও পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেনা।’ কিন্তু কমিশনে সদস্য, সচিব ও কর্মচারী নিয়োগের বেলায় এই বৈষম্য প্রকটাকারে পরিদৃষ্ট।

এখানে কেউ কেউ হয়তো সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদ, ২৯(৩)(ক) ধারা উল্লেখ করে ‘নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের’ জন্য সংবিধানের উল্লিখিত ধারার বিশেষ রেয়াতের সুবিধা নিতে চাইবেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘নাগরিকদের যে কোনো অনগ্রসর অংশের’ মধ্যে ৮৭% শিক্ষিত চাকমারা পড়েন কিনা তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখতে হবে। একই সাথে যুগ যুগ ধরে বৈষম্যের শিকার পার্বত্য বাঙালীরা কোন বিবেচনায় ‘অগ্রসর’ জনগোষ্ঠীভুক্ত হলেন তাও রাষ্ট্রকে তদন্ত করে দেখতে হবে। কারণ, শিক্ষাদীক্ষা, চাকুরী ও অবস্থানগত সুবিধার কারণে শুধু বাঙালী নয় উপজাতীয় অন্যসকল গোত্র শোষিত হচ্ছে চাকমাদের দ্বারা। পার্বত্যাঞ্চলের জন্য রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাকিতভাবে বরাদ্দকৃত কোটাসহ সকল প্রদত্ত সুবিধা ভোগ করছে চাকমা জনগোষ্ঠী। পারফেক্টলি বললে বলতে হয়, চাকমা সমাজের কয়েকটি গোত্র মাত্র। অন্যসকল উপজাতি এ সুবিধার সামান্যই ভোগ করতে পারে।

একইভাবে পার্বত্য চুক্তি ও ভূমি কমিশনের উল্লিখিত ধারা বাংলাদেশ হাইকোর্ট ও সুপ্রীম কোর্টের এখতিয়ারকে খর্ব করে। সংবিধানের ১০১, ১০২(২) এর উপধারা (অ), (আ), ও ১০৯ ধারার সাথে তা সরাসরি সাংঘর্ষিক।

শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডে ৪ নং ধারায় কেবলমাত্র ‘ পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি’র কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ভূমি কমিশন আইনের ৬(ক) ধারায়ও ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তি ও আইন অনুযায়ী কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করাই এ কমিশনের দায়িত্ব। এখানে পার্বত্য অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। কাজেই বাঙালীদের কোনো কোনো সংগঠন তাদের দাবীতে ভূমি কমিশনে সমানুপাতিক হারে বাঙালী সদস্য রাখার যে দাবী তুলছে তা, হয় আইন না জানা কিংবা না বোঝার ফল অথবা আপসকামিতার দৃষ্টান্ত। ভূমি কমিশনে সমানুপাতিক হারে কেন, সকল সদস্যই বাঙালী হলেও তাতে বাঙালীদের উল্লসিত হওয়ার কিছু নেই যদি বিদ্যমান আইন বহাল থাকে। অর্থাৎ কমিশন সদস্যরা বিচার করবেন যে আইনে, সে আইন যতক্ষণ পর্যন্ত বাঙালী ও দেশের স্বার্থের অনুকূল না হবে, সে পর্যন্ত এই কমিশন বাঙালীর স্বার্থ বিরোধী হয়েই থাকবে। অন্য কথায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’ উপজাতীয়দের ‘ঐতিহ্য’ ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ অনুযায়ী বিচার পরিচালিত হলে কমিশনের সদস্য বাঙালী হলেও তাদের কিছুই করার থাকবে না। কারণ বিচার আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।  

চুক্তির ৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’, ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন’। আবার কমিশন আইনের ৬(গ) ধারায় বলা হয়েছে,  ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভুতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল।’ সংশোধনীর ধারা ৬(১)(গ) তে বলা হয়েছে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভুতভাবে ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল শব্দাবলী প্রতিস্থাপন করা’।

অর্থাৎ এই ভূমি কমিশন কাজ করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। বাংলাদেশর আইন অনুযায়ী নয়। এর সাথে স্থানীয় ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দটিও যুক্ত করা হয়েছে। এখানে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’, ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, সরকারের কৃর্তৃত্ব ও বাঙালীর অস্তিত্বের স্বার্থে খুবই গুরুত্বপুর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন বলতে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের ২(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রচলিত আইন বলিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে এই আইন বলবৎ হইবার পূর্বে যে সমস্ত আইন, ঐতিহ্য, বিধি, প্রজ্ঞাপন প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেইগুলিকে বুঝাইবে।’অর্থাৎ ২০০১ সালের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বোঝাবে।

এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন বলতে আমরা কয়েকটি আইনের অস্তিত্ব দেখতে পাই। এর মধ্যে ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি- পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বপ্রথম আইন। দুটি বিশেষ কারণে ব্রিটিশ সরকার এই আইন করেছিল বলে মনে করা হয়। ১. পার্বত্য জনগোষ্ঠীর বিশেষ প্রবণতার প্রতি লক্ষ্য করে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও ২. কর আদায়।
প্রথম কারণে বিট্রিশ সরকার এ আইনে বিপুল ক্ষমতা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সুপারিন্টেন্ডেট নামে একটি পদ সৃষ্টি করে-যা পরে ডেপুটি কমিশনার নামে পরিচিত হয়। দ্বিতীয় কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি সার্কেল প্রধান বা রাজার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া হয়। যদিও সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদটি  এসেছে ১৮৬০ সালের আইন থেকে, ১৮৮১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত পুলিশ বিধি প্রণয়েনের মাধ্যমে পাহাড়ীদের মধ্য থেকে একটি পুলিশ বাহিনী গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয়।
এ সব মিলেই ১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি প্রণয়ন করা হয। মূলত কর আদায়ের সুবিধার্থে সেখানে রাষ্ট্রিয় কাঠামোর মধ্যে কারবারী আদালত, হেডম্যান আদালত ও সার্কেল চীফ আদালত গঠন করা হয়। কর, ভূমি ও সামাজিক সমস্যা নিরসনে পার্বত্য বাসিন্দারা প্রথম কারবারী আদালতে বিচার প্রার্থনা করবে, কারবারী আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হেডম্যান আদালতে এবং হেডম্যান আদালতের বিরুদ্ধে সার্কেল চীফের আদালতে আপীল করার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার সার্কেল চীফের রায়ের বিরুদ্ধে ডেপুটি কমিশনারের কাছে আপীল করা যাবে। তবে ডেপুটি কমিশনারকে পার্বত্য রীতি, ঐতিহ্য ও পদ্ধতি সম্পর্কে সার্কেল চীফের পরামর্শ গ্রহণ করার বিধান রাখা হয়। তবে ব্রিটিশদের এই আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামে হেডম্যানের অনুমতি ছাড়া অস্থানীয় কাউকে ভূমি বরাদ্দ বা ভূমি অধিগ্রহণ করার সুযোগ রাখা হয়নি।

ব্রিটিশদের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল একটি বহির্ভূত রাজ্য এলাকা। কর আদায়ই ছিল তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য। ফলে ১৯০০ সালে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবিধানে তার প্রভাব পড়ে। ব্রিটিশ আইনটি পাহাড়ী জনগোষ্ঠী জন্য কোনো অনুকূল আইন ছিলনা। কারণ এই আইনের মাধ্যমেই পাহাড়ের ভূমি পাহাড়ীদের হাত থেকে দলিল ও বন্দোবস্তির নামে সরকারের হাতে চলে যায়। অর্থাৎ পাহাড়ের মালিকানা পাহাড়িদের পরিবর্তে সরকারের হাতে চলে যায়। কিন্তু রাজা হিসাবে সার্কেল চীফরা বহাল থাকায় তারা এই আইনের প্রতিবাদ করেনি। এটি ছিল ব্রিটিশের ডিভাইড এ- রুল পলিসির অংশ বিশেষ। 

প্রতিকূল আইন হওয়া সত্ত্বেও আজ পাহাড়ীরা ১৯০০ সালের ব্রিটিশ প্রবিধানকে ধন্য ধন্য করছেন তার একমাত্র কারণ এই আইনে পাহাড়ে বাইরের লোকদের পাহাড়ে পুনর্বাসন ও জমির বন্দোবস্তি পাহাড়ীদের হাতে ছিল বলে। এ ছাড়া এই আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন স্বীকার করে নেয়া হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এটি যখন রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয় তখন এই আইন তাদের পক্ষে আত্মিকরণ করা সম্ভব ছিলনা। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যখন ভারত ভাগ হয় এবং পার্বত্য প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা ও  বান্দরবানে বার্মার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে পতাকা বেশ কিছুদিন যাবত পাকিস্তানে উড়েছিল।

১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রায় প্রকাশিত হবার পর ২১ আগস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই পতাকা নামিয়ে ফেলে। ১৭ আগস্ট রায়ের পরও পাহাড়ীরা প্রতিবাদ জানিয়েছিল রায়ের বিরুদ্ধে। এ প্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ১৯০০ সালে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবিধানমালা- পাকিস্তানের রাষ্ট্রিয় কাঠামোতে অনুমোদন দেননি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনকে মেনে নেননি। বরং ১৯৫৮ সালে ভূমি অধিগ্রহণের নিমিত্তে আরেকটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারী করেন। এই প্রজ্ঞাপনের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণ করে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরী করা হয়। এটিও পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন।   

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বেশ কিছু উপজাতীয় সদস্য অংশগ্রহণ করলেও বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের পিতা ত্রিদিব রায় ও বোমাং রাজার এক ভাই পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন। ত্রিদিব রায় আজীবন পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য পোষণ করে গত বছর পাকিস্তানেই মারা গেছেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানেও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি- ১৯০০ কে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। তবে এরশাদ সরকারের শাসনামলে ১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ বিধি অনুসরণে জেলা পরিষদ আইন সৃষ্টি করা হয়। এ আইনে জমি বন্দোবস্তি হেডম্যানদের হাত থেকে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের হাতে অপর্ণ করা হয়। তবে আইন অনুযায়ী জেলা পরিষদ চেয়াম্যান অবশ্যই একজন উপজাতীয় হবেন।

তবে অনেকেই  এখন ১৯০০ সালে প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন বলে প্রচার করতে চাইছেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামোতে এই বিধি গ্রহণের সুযোগ নেই। প্রথমত, এই বিধি একটি উপনিবেশিক ধারণা সঞ্জাত আইন। দ্বিতীয়ত, এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। সেকারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোতে এই বিধিকে গ্রহণ করা হয়নি। এখন যদি এই বিধি অনুসরণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান করা হয় তাহলে আইনগতভাবেই পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বায়ত্বশাসনের পথে এগিয়ে যাবে। কারণ এ বিধির উৎস ও পরিণতি সন্ধান করলেই এ কথা পরিস্কার বোঝা যাবে। এ বিষয়ে তথ্য প্রমাণ আমাদের হাতে রয়েছে। তবে এ লেখায় সেই দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ নেই।

এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত ‘রীতি’, ‘পদ্ধতি’ ও ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত ‘রীতি’, ‘পদ্ধতি’ ও ‘ঐতিহ্য’ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও লিখিত কোনো দলিল পাওয়া যায়না। মূলত এটি কতকগুলো ধারণা ও আচারের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত রীতি, পদ্ধতি ও ‘ঐতিহ্য’ বলতে উপজাতীয়দের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি, পদ্ধতি ও ঐতিহ্যকে বোঝায়। ভূমির ক্ষেত্রে এই রীতি, ঐতিহ্য ও পদ্ধতি হচ্ছে: পাহাড়ীরা ভূমির ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানা, দলিল দস্তাবেজে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে ভূমি সামষ্টিক অধিকার। পাহাড়ের জমি হচ্ছে সর্বসাধারণের সম্পত্তি। যার মালিক হচ্ছে জনগোষ্ঠী, জ্ঞাতিগোষ্ঠী এমনকি তাদের প্রেত লোকের সদস্যরাও। একক পরিবারগুলো জমি ব্যবহারের অধিকার ভোগ করে থাকে মাত্র। ফলে পাহাড়ীরা মনে করে জমি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এর মালিক তারাই।

জুম চাষের জন্য তারা প্রত্যেক বছর এক স্থান থেকে অন্য স্থনে বসতি স্থানান্তর করে থাকে। কাজেই বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন স্থানে যেখানে তারা জুম চাষ করেছে, বসতি গড়েছে সে জমি তাদের, আগামীতেও যে সকল জমি তাদের চাষের আওতায় আসতে পারে সে সকল জমিও তাদের। পাহাড়ের রীতি অনুযায়ী যে জমিতে তারা চাষাবাদ করেছে/করবে, যে জমি/পাহাড়/বন থেকে তারা আহার সংগ্রহ করেছে, করে বা করবে। যে জমিতে তারা বসতি স্থাপন করেছিল/করেছে/করতে পারে, যে জমি দিয়ে তারা চলাচলের জন্য ব্যবহার করে থাকে, যে জমি থেকে তাদের পোষা প্রাণী খাবার সংগ্রহ করে থাকে, যে জমি তার দৃষ্টি সীমায়, স্বপ্ন ও কল্পনায় তা তাদের সকলের। এখানে নির্দিষ্ট মালিকানা বা দলিলের অস্তিত্ব নেই।
কাজেই এই রীতি বা ঐতিহ্য বা পদ্ধতি অনুযায়ী যদি ভূমি কমিশন বিচার করে সে ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর অস্তিত্ব ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য।

আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে।’ দেওয়ানী আদালত একটি সাংবিধানিক আদালত। এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান রক্ষায় শপথবদ্ধ থাকেন। অন্যদিকে কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্যরা কেউই শপথবদ্ধ নন। চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হওয়ায় তিনিও শপথবদ্ধ নন, আবার বাকি সদস্যরা সাধারণ উপজাতীয় যারা হয়তো চুক্তির আগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এমন কেউ হতে পারে। বিশেষ করে জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ থেকে যাদের নাম আসবে তাদের ক্ষেত্রে সাবেক শান্তিবাহিনীর সদস্য আসা স্বাভাবিক অথচ তারা শপথবদ্ধ নন। হতে পারে তারা ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর সামরিক শাখার গোপন সদস্য।

এছাড়াও অতীতে কোনো মামলা যদি দেওয়ানী আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে, বা দেওয়ানী আদালতে চলমান কোনো মামলা যদি এই কমিশনের দৃষ্টিগোচর হয় তাহলে কমিশনের ভূমিকা কি হবে তা স্পষ্ট নয়। কিম্বা একই মামলা একপক্ষ কমিশনে এবং অন্যপক্ষ দেওয়ানী আদালতে বিচার প্রার্থনা করলে কমিশনের ভূমিকা কি হবে তাও স্পষ্ট নয়। দেওয়ানী আদালত ও কমিশনের মধ্যে কার অবস্থান ঊর্ধ্বে তাও পরিষ্কার নয়। সাংবিধানিক আদালতকে অসাংবিধানিক চুক্তির আওতায় গঠিত কমিশনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া যায় কিনা সে প্রশ্নটিও বিশাল।
 
তাহলে সরকার কি করবে? শান্তিচুক্তির মধ্যে কিছু অসাংবিধানিক ধারা যে বিদ্যমান তা উচ্চ আদালতের রায় দ্বারা স্বীকৃত। যদিও সে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত অবস্থায় রয়েছে। তবে উপরিউক্ত আলোচনায় এ কথা প্রমাণিত যে, ভূমি কমিশন তেমনি একটি ধারা বা আইন। বিষয়টি উচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে নিলে তা বাতিল হতে বাধ্য বলে অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা মোকাবেলায় সরকারের করণীয় হলো, শান্তিচুক্তির ভূমি কমিশন সংক্রান্ত ধারা ও ভূমি কমিশন আইন বাতিল করে দেশের প্রচলিত দেওয়ানী আদালতে এ সমস্যার সমাধান করা। মামলা দ্রুততর করা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে সরকার একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ঘোষণা করতে পারে। তবে তার আগে অবশ্যই ভূমি জরীপের মাধ্যমে ভূমির সীমানা ও মালিকানা নির্ধারণ করতে হবে। নিরাপত্তার অজুহাতে যদি ভূমি জরীপ না করা হয়, বা করা সম্ভব না হয় তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তার জন্য বিশাল আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

মনে রাখা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অংশ। এখানে যা কিছু করা হবে তা দেশের প্রচলিত সংবিধান ও আইন মেনেই করতে হবে।

♦ Email: palash74@gmail.com

সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ
সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ‘সার্বভৌমত্ব বিরোধী’ পার্বত্য চুক্তি করে আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য বাঙালীর মনে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল ‘আদিবাসী’ বিষয়ে সরকারের কঠোর ও সঠিক অবস্থান সেই ক্ষতে প্রলেপ লাগিয়েছিল অনেকখানি। কিন্তু গত ৩ জুন হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগ সরকার জেএসএস নেতা সন্তু লারমার দাবী পার্বত্য ভ’মি কমিশনের সংশোধনী প্রস্তাব পাশ করে ক্ষতটি খুচিয়ে আবার রক্তাক্ত করে দিল। ফলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীরা। ইতোমধ্যে তারা ৫ দিন নজিরবিহীন সফল হরতাল পালন করছে। সামনে আরো কঠিন কর্মসূচী আসছে।

এদিকে বাঙালীদের এই কর্মসূচীর বিরুদ্ধে প্রথমে চুপচাপ থাকলেও ধীরে ধীরে মাঠে নামতে শুরু  করেছে পাহাড়ী বিভিন্ন সংগঠন। ফলে আগামী দিনে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে পরিস্থিতি ধাবিত হচ্ছে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার শেষ দিকে এসে হঠাৎ করে সরকার কেন এই ধরনের একটি বিতর্কিত ও সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিল? পাহাড় সংশ্লিষ্টদের ধারণা, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে ও এর  আওতায় ভূমি কমিশন আইন সংশোধনী অনুমোদন বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিভিন্ন পাশ্চাত্যের দেশ, দাতা সংস্থা ও খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রবল চাপ ছিল। ড. ইউনূস, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে কোণঠাসা সরকার পাশ্চাত্যে তার আন্তর্জাতিক ভাবমর্যাদা উদ্ধার করতেই ক্ষমতার শেষদিকে এসে এ ধরণের একটি সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার মধ্যে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় প্রত্যাবাসিত উপজাতীয়দের পুনর্বাসনের সহায়তায় তাদের ভূমির মালিকানা ফিরিয়ে দিতে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ভূমি কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয় এবং ২ নং ধারায় ‘যথাশীঘ্র সম্ভব ভূমি জরীপ কাজ শুরু’ করার কথা বলা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় এই চুক্তি ও আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাপাঠ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আলোচনার সুবিধার্থে এই আইনের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো:
শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে,
‘জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন(ল্যান্ডকমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবত যেইসব জায়গা জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপীল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ডের(জলে ভাসা জমি) ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।’
৬(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।’
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূমির বৈশিষ্ট বিবেচনায় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে ভূমি জরীপ সম্পন্ন হওয়া জরুরী ছিল। ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে একাধিকবার এ বিষয়ে সরকারকে তাগিদ দেয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল আগে ভূমি জরীপ করে ভূমির সীমানা ও মালিকানা নির্ধারণ করার পর বিরোধিত জমির সিদ্ধান্ত ভূমি কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হোক। কিন্তু উপজাতীয় সংগঠনগুলোর প্রবল বিরোধিতার কারণে ভূমি জরীপ নিষ্পন্ন করা যায়নি। এভাবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলে সরকার বিভিন্ন পক্ষের চাপের মুখে ভূমি জরীপ ছাড়াই ২০০১ সালের ১৭ জুলাই ভূমি কমিশন আইন পাস করে। এরপরও ভূমি জরীপ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিন্তু নিরাপত্তার কারণে বা অজুহাতে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

এখানে পরবর্তী আলোচনার সুবিধার্থে ভূমি কমিশন আইনের কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো:

‘৩। কমিশনের গঠন : (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নামে একটি কমিশন থাকিবে।
(২) নিম্নবর্ণিত সদস্যগণ সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হইবে, যথা :
(ক) বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, যিনি উহার চেয়ারম্যানও হইবেন,
(খ) সার্কেল চীফ (সংশ্লিষ্ট),
(গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তাহার প্রতিনিধি হিসেবে তৎকর্তৃক মনোনীত উক্ত পরিষদের একজন সদস্য,
(ঘ) সংশ্লিষ্ট পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পদাধিকারবলে,
(ঙ) চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কশিনার বা তৎকর্তৃক মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার।
ব্যাখ্যা : দফা (গ) এবং (ঘ)-এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ‘সংশ্লিষ্ট’ অর্থ বিরোধীয় ভূমি যথাক্রমে যে পার্বত্য জেলা এবং যে সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত সেই পার্বত্য জেলা এবং সেই সার্কেল।
৬। কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :
(ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা,
(খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল,
(গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন-বহির্ভূতভাবে কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল :
তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত (Reserved) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন শিল্প কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।
১৬। কমিশনের সিদ্ধান্তের আইনগত প্রকৃতি এবং চূড়ান্ত।                                                                    ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত কোনো বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রি বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।
১৭। কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন।- (১) অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন কমিশনের সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রি বা ক্ষেত্রমতো আদেশের ন্যায় উহার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মাধ্যমে বা প্রয়োজনবোধে সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করিতে বা করাইতে পারিবে।’

কিন্তু শুরু থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে আসছিলেন জেএসএস নেতা সন্তু লারমাসহ কিছু উপজাতীয় নেতা। তাদের বিরোধিতার কারণেই সরকার গঠিত চারটি ভূমি কমিশন কার্যকর হতে পারেনি। সন্তু লারমার দাবী, শান্তি চুক্তির একটি লিখিত ফর্ম ও একটি অলিখিত ফর্ম(সাধারণ সমঝোতা) ছিল। তিনি সেভাবেই ভূমি কমিশন সংস্কারের লক্ষ্যে ২৩ দফা সংস্কার প্রস্তাব করেন। অনেক আলাপ আলোচনার পর ২০১২ সালের ৩০ জুলাই সরকার এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এর ১৩টি প্রস্তাব গ্রহণ করে।
কিন্তু সে সময় পার্বত্য বাঙালীরা এর বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তুললে সরকার সে সংশোধনী অনুমোদন করা থেকে বিরত থাকে। এ ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর পার্বত্য সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে নতুন করে এ সংশোধনী অনুমোদনের উদ্যোগ নেয়। ফলে ২৭ মে মন্ত্রী সভায় সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাব ও ৩ জুন চূড়ান্ত প্রস্তাব পাশ করা হয়।

উল্লেখযোগ্য সংশোধনীসমূহ:
ধারা ৬(১)ক : “পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া জায়গা জমি ও পাহাড়ের মালিকানাস্বত্ত্ব বাতিলকরণসহ সমস্ত ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা।”
 ধারা ৬(১)(গ) : “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:” শব্দাবলী প্রতিস্থাপন করা।
ধারা ৭ এর (৫) : “চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়টিসহ উহার এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করিবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত সম্ভব না হইলে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলিয়া গণ্য হইবে;।”
১৩(২) ধারার পরে নতুন উপধারা সংযোজন : “(৩) এই ধারার অধীন কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হইবে।”

এ সংশোধনী পাশের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালীরা হরতাল অবোরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছে। তাদের দাবী, এই প্রস্তাব পাশ করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর অবস্থান ও অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এসকল কর্মসূচী সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিপূল স্বতস্ফুতর্তার সাথে পালিত হয়েছে তাতে প্রমাণ করে দলমত নির্বিশেষে পার্বত্য বাঙালীরা কিভাবে দেখছে এই আইনকে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের হাইকোর্টে শান্তিচুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রীট দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানীর পর ২০০৯ সালে আদালত সম্পূর্ণ চুক্তিকে বাতিল না করে এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ধারাকে বাংলাদেশের সংবিধান, ও সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা বিরোধী বলে তা বাতিল ঘোষণা করে। কিন্তু সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীল করলে সুপ্রীমকোর্ট আপীল গ্রহণ করে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত ঘোষণা করে। সংবাদপত্রের রিপোর্ট সূত্রে জানা গিয়েছিল, সেই রীটের শুনানীতে আদালতে ভূমি কমিশন প্রসঙ্গ এলে সরকার পক্ষ থেকে বলা হয়ছিল, এখনো সরকার ভূমি কমিশন বাস্তবায়ন করছেনা বরং ভূমি জরিপের পর কমিশন কাজ করবে। কাজেই এটা নিয়ে এখনই আলোচনার কিছু নেই। এ কথার প্রেক্ষিতে আদালতও যখন ভূমি কমিশন বাস্তবায়ন হবে তখন এ বিষয় নিয়ে ভাবা যাবে বলে মন্তব্য।

পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধনী বিশ্লেষণের আগে  শান্তি চুক্তি ও ভুমি কমিশন আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
১.    শান্তিচুক্তিতে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসাবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির কথা বলা হলেও ভূমি কমিশন আইনে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির কথা বলা হয়।
২.    শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় কেবলমাত্র ‘ পুনর্বাসিত শরণার্থিদের জমি জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি’র কথা বলা হয়েছে। একইভাবে ভূমি কমিশন আইনের ৬(ক) ধারায়ও ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী কেবল পুনর্বাসিত শরণার্থিদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এর দায়িত্ব। এখানে পার্বত্য অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ নেই।
৩. শান্তিচুক্তির ৬(খ). ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন। আবার আইনের ৬(গ) ধারায় বলা হয়েছে,  পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভুতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল। সংশোধনীতে তা বলা হয়েছে, ধারা ৬(১)(গ) : “পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভুতভাবে ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:” শব্দাবলী প্রতিস্থাপন করা।
অর্থাৎ এই ভূমি কমিশন কাজ করবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। বাংলাদেশর আইন অনুযায়ী নয়। এর সাথে স্থানীয় ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দটিও যুক্ত করা হয়েছে। এখানে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন’, ‘রীতি’ ও ‘পদ্ধতি’ শব্দগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, সরকারের কৃর্তৃত্ব ও বাঙালীর অস্তিত্বের স্বার্থে খুবই গুরুত্বপুর্ণ।
৪. চুক্তির ঘ খন্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল চলিবেনা’। অন্যদিকে ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘ উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এখানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের কর্তৃত্ব, ক্ষমতা ও এখতিয়ারকে খর্ব করা হয়েছে।
৫. আইনের ১৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে।’ দেওয়ানী আদালত একটি সাংবিধানিক আদালত। এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধান রক্ষায় শপথবদ্ধ থাকেন। অন্যদিকে কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্যরা কেউই শপথবদ্ধ নন। চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হওয়ায় তিনি শপথবদ্ধ নন, আবার বাকি সদস্যরা সাধারণ উপজাতীয়, যারা হয়তো চুক্তির আগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এমন কেউ হতে পারেন, অথচ তারা শপথবদ্ধ নন। প্রকৃতপক্ষে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদ থেকে যে নামগুলো আসবে তাদের জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র  বর্তমান বা সাবেক ও প্রকাশ্য বা গোপন সদস্য হবার সম্ভাবনাই বেশী।

Email: palash74@gmail.com

সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

   

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

cht Map

সৈয়দ ইবনে রহমত
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রবল বিরোধীতা সত্বেও গত ২৭ মে, ২০১৩ কেবিনেটে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক মিটিংয়ে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’-এর ৬টি ধারা সংশোধনের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। ফলে ভূমির মালিকানা হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে যাচ্ছে পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালি লাখ লাখ পরিবার। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ করার পরিকল্পনারই অংশ হিসেবেই পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের এ সংশোধনী আদায় করেছে জেএসএস। এই সংশোধনী কার্যকর হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের জীবনে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা কল্পনারও অতীত। এর ফলে পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন হয়ে পড়বে সন্তু লারমার ইচ্ছা বাস্তবায়নের হাতিয়ার। সরকারের দেয়া ভূমি বন্দোবস্ত ও মালিকানা অবৈধ বলে তা বাতিল করার ক্ষমতাও রয়েছে এ কমিশনের। তাছাড়া যেহেতু এ কমিশন কোন ভুল সিদ্ধান্ত দিলেও তার বিরুদ্ধে অন্য কোন আদালতে আপিল করা যাবে না তাই এর মাধ্যমে বাংলাদেশের এক দশমাংশ আয়তনের পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির উপর সন্তু লারমার একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। আর পার্বত্যাঞ্চলে বাঙালিদের অস্তিত্বে বিশ্বাসহীন সন্তু লারমার রাজত্বে বাঙালিরা তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে।

ধারণা করা হচ্ছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদের ব্যাপারে এতদিন যে ‘অলিখিত চুক্তি’র কথা বলা হচ্ছিল ভূমি কমিশন আইনের এ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব এখন সন্তু লারমার হাতেই তুলে দিতে যাচ্ছে সরকার।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)’র সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে জেএসএস নেতা সন্তু লারমাকে বারবার জোর দিয়ে বলতে শোনা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের সরিয়ে নিয়ে সমতলে পুনর্বাসন করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে তাদের এক ‘অলিখিত চুক্তি’ আছে। সে চুক্তি অনুযায়ী বাঙালিদের উচ্ছেদের ব্যাপারে জেএসএস-এর পক্ষ থেকে নানা সময় সরকারকে চাপ দেওয়া হয়েছে। এমনকি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাঙালি মুক্ত করতে আর্থিক বা অন্য যত প্রকার সহায়তা লাগে তা তারা দিতে প্রস্তুত। শুধু তাই নয় ফেনী, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন উপকূলীয় জেলার চরাঞ্চলে (ঘূর্ণিঝর ও জলোচ্ছ্বাসে যেসব এলাকা ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত পানির নিচে তলিয়ে যায়) পার্বত্য বাঙালিদের পুনর্বাসনের জন্যও তাদের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল! যদিও জনরোষের ভয়ে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এ বিষয়টি কখনো স্বীকার করেনি। তাই তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপও এতোদিন গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার এটা স্বীকার না করলেও জেএসএস তার অবস্থানে শুরু থেকেই অনড় রয়েছে এবং ক্রমাগত তারা এ ব্যাপারে সরকারকে চাপ দিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে যাতে বাঙালিদের উচ্ছেদ করা যায় তার যাবতীয় আয়োজনও কৌশলে সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে। ভূমি কমিশনের আইন সংশোধন তারই একটি অংশ।

আইনের সংশোধন : গত ২৭ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভায় পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী অনুমোদন সম্পর্কে বৈঠক শেষে মন্ত্রী পরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া’র বরাত দিয়ে পরের দিন বিভিন্ন পত্রিকায় যে সংবাদ ছাপা হয়েছে তার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, “পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূমি শান্তিচুক্তির আলোকে শরণার্থীদের পুনর্বাসনে ব্যবহৃত হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিরসন কমিশন (সংশোধনী) আইন-২০১৩-এর খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। কমিশনকে আরও সক্রিয় এবং কার্যকর করার লক্ষ্যে এ আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। এ খসড়া আইনে জমি ব্যবহারের এ প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

মন্ত্রিসভা মনে করে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিরসন কমিশন আইন সংশোধনের পর এটি সক্রিয় ও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হবে। এ খসড়া আইনে বলা আছে, কমিশনের সদস্যসচিব পদে একজন উপজাতীয় অথবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোককে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন সার্কেল প্রধান কমিশনের সদস্য হিসেবে বৈঠকে উপস্থিত হতে না পারলে তিনি একজন প্রতিনিধি পাঠাতে পারবেন। তবে যেকোনো বিষয়ের আলোচনায় সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য ওই প্রতিনিধিকে পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব দেয়া হবে।
বর্তমান আইনে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে কমিশনের সর্বসম্মতির প্রয়োজন হয় বা চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে ধরা হয়। আইন সংশোধন হলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে কমিশনের সর্বসম্মতি বা চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন প্রয়োজন হবে। কমিশনের পাঁচ সদস্যর মধ্যে চেয়ারম্যানসহ তিনজনের সিদ্ধান্ত এক হলেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। সংশোধিত আইনের খসড়ায় কমিশনে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রচলিত আইনে কোনো বৈধ মালিকের ভূমি বলতে শুধু জমি বোঝানো হলেও সংশোধিত আইনে ভূমি বলতে জমি ও জলাভূমিও বোঝানো হবে।”

ভূমি কমিশন 

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি ল্যান্ড কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ৪, ৫ ও ৬ ধারা মতে একজন অবসর প্রাপ্ত বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করে। চেয়ারম্যান সহ পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিশনের সদস্য সচিব চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার অথবা অতিরিক্ত কমিশনার (নতুন সংশোধনীর ফলে তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত উপজাতীয়দের মধ্য থেকে এ পদে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে)। এছাড়া কমিশনের অপর তিন জন সদস্য হিসেবে আছেন যথাক্রমে সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ (অবশ্যই উপজাতীয়), আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান অথবা প্রতিনিধি (অবশ্যই উপজাতীয়) এবং সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (অবশ্যই উপজাতীয়)। অর্থাৎ পাঁচ জনের কমিশনে ৪ জনই হবেন উপজাতীয়দের মধ্য থেকে। আর যেকোন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে এ কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। উপজাতীয় ৪ জনের মধ্যে অন্তত ৩ জন একমত হওয়াটা কোন ব্যাপার নয়। কারণ তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য একই। তাই অধিকাংশের মতামতকে উপেক্ষা করা চেয়ারম্যানের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাছাড়া কমিশনের কর্মচারীরাও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজনের মধ্য থেকে নিয়োগ পাবে।

সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট যেমন রাবার স্ট্যাম্পের মত ভূমিকা পালন করেন, আইন সংশোধনের ফলে উপজাতীয় কর্মচারী সমৃদ্ধ এই অসম কমিশনে চেয়ারম্যানের ভূমিকাও হবে অনেকটাই তদ্রুপ। সংসদে আইন প্রণেতারা যে বিষয়ে একমত হন, প্রেসিডেন্ট তা সত্যায়ন করেন মাত্র। তারপরেও সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় আস্থা রাখা যায়, কারণ আইন প্রণেতাগণ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাই জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতার বিষয়টি তাদের মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়। কিন্তু পার্বত্য ভূমি কমিশনের যারা সদস্য তারা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। তাছাড়া তাদের অনেকেই বাঙালি বিদ্বেষী। তাই তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ভূমিহীন করে বাঙালিদের উচ্ছেদ করতে এই কমিশনকে ব্যবহার করবে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

ঘোর আপত্তি জানিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় বলেছিল, এই সংশোধনী আনা হলে পুনর্বাসিত শরণার্থী ছাড়াও এ অঞ্চলে বসবাসরত অন্যান্য জনসাধারণ এবং এ অঞ্চলের সকল বন্দোবস্ত ও অন্যান্য ভূমি বিরোধের বিষয় এ কমিশনের আওতায় চলে আসবে। এতে একদিকে চুক্তির ধারাবাহিকতায় কমিশন গঠনের মূল স্পিরিট ব্যাহত হবে এবং অপরদিকে পার্বত্য জেলাসমূহে স্থাপিত দায়রা আদালতের কার্যপরিধি খর্ব হতে পারে।

কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, এ প্রস্তাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী’ বিরোধ মীমাংসার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি’ বলতে আসলে কি বোঝায় তার ব্যাখ্যা কি সরকারের কাছে আছে? আমরা আসলে জানি না, তাছাড়া সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যা থাকার কথাও না। কারণ এখানে অবৈধ বন্দোবস্ত জমির প্রসঙ্গ এসেছে। এর অর্থ হলো সরকার অবৈধভাবে কাউকে না কাউকে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছে! অথচ রাষ্ট্রসীমার মধ্যকার সমস্ত ভূমির মালিকানা রাষ্ট্রের। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় আইনেই বৈধ কিংবা অবৈধতা নির্ধারিত হয়। কিন্তু এখানে দেখছি সরকারের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ বলে ঘোষণা করারও বিধান আছে! কিন্তু সেই বিধানটি আসলে কি, এর প্রয়োগকারীই-বা কারা? যতদূর জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি বলতে অনেক উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ ভূমির মৌখিক মালিকানাকেই বুঝিয়ে থাকেন। কিন্তু একুশ শতকের এই আধুনিক যুগে এসে সরকারি বন্দোবস্তকে অবৈধ বলা এবং মৌখিক মালিকানাকে বৈধ বলাটা মূর্খতার পরিচয় নয় কি?

যাইহোক পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনে এ সংশোধনী কার্যকর হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোন জমির মালিকানা দলিল অবৈধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভূমির মালিকানা কেড়ে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ করার জন্যই যে এ সংশোধনীটি আনা হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তথা অফিস-আদালত, কর্ণফুলী পেপার মিল, কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা সহ অন্যান্য শিল্প কারখানা ও বিভিন্ন স্থানের অবস্থিত সেনা, বিজিবি, পুলিশ ক্যাম্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিও যদি হাত ছাড়া হয়ে যায় তাহলেও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছুই করার থাকবে না।

তবে সরকার ইতিপূর্বে নিজের দেয়া বন্দোবস্তকে অবৈধ বলে স্বীকার করে নেয়ায় সব চেয়ে মারাত্মক যে ক্ষতিটা হলো তা হচ্ছে, ইতিপূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সরকারের সকল কর্মকাণ্ডকেই ক্রমান্বয়ে অবৈধ বলার পথ তৈরি হলো। যা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে সরকারের নৈতিক অবস্থানকেই দুর্বল করে দিয়েছে। তাই এভাবে আইন সংশোধন হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরকারের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে এবং সরকারের সাংবিধানিক এখতিয়ারও ক্ষুণ্ন হতে পারে।

বাঙালিদের ভূমি এবং ভোটাধিকার হরণ

পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৪নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যগণ জনসাধারণ কর্তৃক প্রত্যক্ষভাবে এই আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত হইবেন।’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভোটার তালিকা প্রয়োজন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যাতে জটিলতা সৃষ্টি করা যায়, সম্ভবত সেই উদ্দেশ্যই পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৯নং ধারার ৪নং উপ-ধারায় কোন ব্যক্তির ভোটার হওয়ার ব্যাপারে একটি বিতর্কিত এবং সংবিধান পরিপন্থী শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই উপধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।’ যা পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে জেলা পরিষদ আইনসমূহ সংশোধন করে ১৭নং ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আবার অ-উপজাতীয়দের ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা বলিতে- যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।’

অর্থাৎ পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ভোটার হতে হলে বৈধ জমির মালিক হতে হবে। কিন্তু বাঙালিরা যাতে বৈধ জায়গা সম্পত্তির মালিক হতে না পারে সে জন্যও সকল পদক্ষেপ নিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন- খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। বিক্রয় বা অন্যান্যভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদকে অবহিত করে বা জেলা পরিষদের অনুমতি নেয়াকে শর্ত করে দেয়ায় বাঙালিদের ভূমির মালিক হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে গঠিত ল্যান্ড কমিশন আইন সংশোধনের নামে কমিশনকে বাঙালিদের ভূমিহীন করার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।

আসলে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের উদ্দেশ্য সরকারে নিকট যাই থাকুক উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে এর উদ্দেশ্য পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের ভূমিহীন করা। কেননা পার্বত্য বাঙালিদের ভূমিহীন করতে পারলে সংবিধান পরিপন্থীভাবে (পার্বত্য জেলা পষিদ আইন বলে) তাদের ভোটাধিকার হরণ করা যাবে। আর সেটা সম্ভব হলে বাঙালিরা পার্বত্যাঞ্চলে ভূমির অধিকার, ভোটাধিকার হারিয়ে এক সময় হতাশ হতে বাধ্য হবে। আর মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব মানুষ হয়তো পার্বত্যাঞ্চল ছেড়ে যেতে শুরু করবে। ক্রমান্বয়ে বাঙালির সংখ্যা কমতে থাকলে তারা পার্বত্যাঞ্চলে জাতিসংঘের উপস্থিতিতে পূর্বতিমূরের মত স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটের আয়োজন করবে। সে ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাবে তা-তো আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকছে। অতএব পরিণতিটা সহজেই অনুমেয়।

সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যত গালভরা যুক্তিই দেখাক না কেন, ভূমিকমিশন আইন সংশোধন, আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা, জেলা পরিষদের মাধ্যমে পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রচেষ্টাসহ পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ প্রতিটি পদক্ষেপই নিচ্ছে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই। ভূমিকমিশন আইন ২০০১-এর সংশোধনীর প্রতিটি প্রস্তাবই তাদের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই আনা হয়েছে। এখন সরকার যদি এসব বুঝতে অপারগ হয় তাহলে এর দায় শুধু তাদের ওপরই বর্তাবে তা নয়, বরং এদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককেই ভবিষ্যতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। অতএব সময় থাকতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যেকোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভাবতে হবে সরকারকে, ভাবতে হবে সচেতন দেশবাসীকেও।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে যে শেষ সময়ে এসে সরকার কেন এসব বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে গেল? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, শেষ সময়ে এসে দেশের ভেতরে এবং বাইরে সরকারের অবস্থান নাজুক হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তারা সন্তু লারমার চাহিদা মিটিয়ে দাতাদের মন জয় এবং সামনের নির্বাচনে পাহাড়িদের সমর্থন আদায়ের কৌশল নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো দাতাদের মন জয় করতে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতার প্রশ্নে কোনভাবেই আপস করা চলবে না। অন্যদিকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সারা বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িরা ভোট দেয়নি। এমনকি গত চারটি নির্বাচনের ভোটের ফলাফল বিবেচনা করলেও আওয়ামী লীগ ধারণা করতে পারবে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ভোট তারা পাবে কিনা। একই সাথে ড. ইউনুস, পদ্মা সেতু বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় একঘরে হয়ে পড়েছিল। এই আইন পাশের উদ্যোগ নিয়ে সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থনকে নিজের দিকে টেনে নেয়ার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ সরকার তার ব্যাক্তিগত ইমেজ ও ক্ষমতার ধারাবাহিকতায় পার্বত্য বাঙালীদের সন্তুর হাড়িকাঠে বলি দিয়ে দিল।
তাছাড়া ভূমি কমিশনের আইন সংশোধনের ফলে ইতোমধ্যে বাঙালিরা ফুঁসে ওঠেছে। সরকার এটা নিয়ে অগ্রসর হলে বাঙালিদের প্রতিরোধ আন্দোলন আরও বেগবান হবে। শেষ মুহুর্তে বাঙালিদের ক্ষেপিয়ে দেওয়াটা সরকারের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে তাও ভেবে দেখতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

sayedibnrahmat@gmail.com

 

অারও প্রবন্ধ পড়ুন

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ: প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি উচ্ছেদের আয়োজন চূড়ান্ত

বিদেশী সংস্থার চাপে ভূমি আইনের সংশোধনী আসছে

তারেক মোরতাজা

সরকার বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইনে বেশ কিছিু সংশোধনী চূড়ান্ত করেছে। এসব সংশোধনী কার্যকর হলে সেখান থেকে বাঙালিরা উচ্ছেদ হয়ে যাবে আর পার্বত্য ভূমির ওপর সরকারের কর্তৃত্ব বলতে কিছুই থাকবে না।
এ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি ঠিক কবে হবে সেটি নিশ্চিত করে সরকারের তরফে কেউ বলতে পারছেন না। তবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একটি সূত্র মতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকার এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে যাবে।
গত বছরের ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদ শেষের পর সরকার এ পদে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেয়নি। একই সাথে কমিশনের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ৯ মাস ধরে কমিশনে কোনো কাজই হচ্ছে না।
গত বছরের জুলাই মাসের শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইনের সংশোধনী চূড়ান্ত করা নিয়ে সরকারের ভেতরে বিরোধ দেখা দেয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভূমি আইনের ১৩টি সংশোধনী আনা হয়েছে উল্লেখ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, এ আইন কার্যকর করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের বেরিয়ে আসতে হবে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুসারে সেখানে বৈধ নাগরিকদের থাকার কথা। তার মতে, কেবল বাঙালি নয় সেখানে সরকারও অনেকটা কার্যকরহীন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে সরকারের ভূমির সার্বভৌমত্ব বা কর্তৃত্ব থাকবে না। তার ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জলে ভাসা ভূমি, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে স্থাপিত রাষ্ট্রের প্রথম ভূ-উপগ্রহের জমির ওপরও সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে না। এ দিকে বোমাং সার্কেলের ১৭তম রাজা হিসেবে নির্বাচিত উ চ প্রু বলেছেন, পাহাড়ে বাঙালি-পাহাড়ি বিভেদ তৈরি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। ভূমি সমস্যার সমাধানে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে।
ভূমি আইনের সংশোধনী সম্পর্কে ভূমি সচিব মোখলেসুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এখনো পার্বত্য ভূমি আইন চূড়ান্ত হয়নি। এটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি নিয়ে সরকারের ভেতরে বিরোধ চলছে। এ বিরোধ মেটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী তার তরফে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, আলোচিত সংশোধনী যদি চূড়ান্ত করা হয় তাহলে পাহাড়ে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। রাষ্ট্রের মোট ভূমির ১০ শতাংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, সরকারের ওপর বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চাপে রাজনৈতিকভাবে আইনটি সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে এখানে সে রকম কোনো কিছুর দরকার নেই। জনসংহতি সমিতি সরকারকে এ আইন সংশোধনে বাধ্য করতে বিদেশীদের দ্বারস্থ হচ্ছে।
সূত্র মতে, রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের আদল গড়ে তুলবে এ আইন। তাই তারা এ আইনটি সংশোধনের বিপক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য খুব একটা আমলে নিচ্ছে না সরকারের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। তারা মনে করছেন, সমস্যা চুকিয়ে ফেলার জন্য আইনটির প্রস্তাবিত ১৩টি সংশোধনীই চূড়ান্ত করতে হবে।
২০০১ সালে এ আইনটি আওয়ামী লীগ সরকারই করেছিল। যেটাকে কালো আইন উল্লেøখ করে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। তাকে সহযোগিতা করছেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি দেশে ও দেশের বাইরের পাহাড়িদের বিষয়টি সবার নজরে আনার কাজটি করে থাকেন। আইন সংশোধনে সর্বশেষ যে যৌথ সভা সরকার করেছিল তিনি সেখানেও হাজির ছিলেন।
সরকারের দাবি ও নৃবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ মতে, দেশে কোনো আদিবাসী না থাকলেও ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বাংলাদেশের হয়েও জাতিসঙ্ঘের আদিবাসীবিষয়ক ফোরামে আদিবাসী সদস্য। রাজা দেবাশীষ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদের পক্ষে জনমত তৈরি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা মনিরুজ্জামান।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, পাহাড় থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদে সবাই এখন শোর তুলেছে ভূমি আইন সংশোধনের। এ আইন সংশোধন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকতে পারবে না। অথচ যুগের পর যুগ ধরে সেখানে বাঙালিরা বসবাস করে আসছেন।
অন্য দিকে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা নয়া দিগন্তকে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য বাঙালি বিতাড়ন নয়। তারা পাহাড়িদের ভূমি মালিকানা বুঝে পেতে কাজ করছেন।
এতে অবশ্য আশ্বস্ত হতে পারছে না বাঙালিরা। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, সরকার এখানে যে ভূমি কমিশন করেছিল তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ। দু’আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে বিবাদ করলেও বাঙালিদের বিষয়ে তাদের অবস্থান অভিন্ন উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান বলেন, এখানে বাঙালি খেদাও আন্দোলন চলছে। এটা চলতে দেয়া উচিত হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন পুনর্গঠন করে নতুন করে বিচারপতি খাদেমুল ইাসলামকে নিয়োগ দেয়। তবে জনসংহতি সমিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলের প্রধানরা তাকে বয়কট করেন। এ রকম পরিস্থিতিতেও তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার কাজের প্রতি স্থানীয় পাহাড়িদের আস্থা ছিল উল্লেøখ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হচ্ছে, আস্থার প্রমাণ হলো ৫ হাজার পাহাড়ি কমিশনে তাদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আবেদন করেছিল। সে আবেদন কেবল আঞ্চলিক পরিষদ ও পাহাড়ি সার্কেল চিফদের অসহযোগিতার কারণে নিষ্পত্তি করা যায়নি।

courtesy by- the daily naya digonta, 24-4-2013.

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আরো কিছু প্রবন্ধ

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস