image_pdfimage_print

সংশোধিত ভূমি কমিশন আইনে বাংলাদেশের সংবিধান ও শান্তিচুক্তি লংঘিত হয়েছে

ভূমি কমিশন

♦ নির্মল বড়ুয়া মিলন ♦

জাতিগত বঞ্চনার সমাধান হিসাবেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি – বাঙ্গালী বহুমূখী বঞ্চনা বিদ্যামান। কিছু ক্ষেত্রে তা প্রশাসনিকভাবেও। এর উৎস কাপ্তাই বাঁধ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়নকালে এর প্রস্তাবনায়ও বলা হয়েছিল, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে। কিন্তু সাম্য-মৈত্রী- স্বাধীনতার কথিত ওই ধারণাটিকে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে পারেনি।
এর প্রমাণ হলো ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খণ্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন। তবু এই চুক্তিতে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে বা একটি সম্প্রদায়কে প্রধান্য দেয়া হয়েছে।

মুক্তমত

কিন্তু চুক্তির পর র্দীঘ ১৯ বছর যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ভিতর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে কোন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি বা পার্বত্য জনপদের সকল জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে সম-ভুমিকা রাখতে পারেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, কথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ ১৯ বছরের মধ্যে একবারও পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এর কোন সাধারন পাহাড়ি – বাঙ্গালীদের এক সাথে নিয়ে বৈঠক করেনি (অদ্যবধি যাদের নিয়ে পিসিজেএসএস নেতৃবৃন্দ বৈঠক করেছেন এসব পাহাড়ি – বাঙ্গালীরা তাদের পকেটের লোকজন)।

পার্বত্য চুক্তির পর ১৯ বছরে ডাকঢোল পিটিয়ে, কিছু সংখ্যক সভা – সেমিনার করে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ধোঁয়া তোলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা হয়নি।

এমন কি চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তার নিজস্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত করার মতো উল্লেখযোগ্য নজিরও নাই, বরং তাদের বিরুদ্ধে নিজ জনগোষ্ঠীর লোকজনদের উপর প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন,অপহরণ, হত্যা, কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

পিসিজেএসএসের কেন্দ্রীয় নেতা এখন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার একজন তথাকথিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি স্থানীয় সংসদ সদস্য, অদ্যাবধি তার মুখ থেকে জেলার উন্নয়নমূলক কোন কর্মকাণ্ডের বুলি বের হয়নি। এ সংসদ সদস্য যখন জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় প্রশাসনে অথবা কোন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, তখন তার কথা শুনে মনে হয় তারা ও তার পরামর্শকরা আমাদের দেশের বাইরের, অন্য কোন দেশের মানুষ!

আমি বা আমার লেখা সরকার, কোন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল বা পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে নয়, সাম্য- মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধারণা পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় যে কোন সময়ের চেয়ে বেশী এসময় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর সরকার গেজেটের মাধ্যমে আইন আকারে প্রকাশ করেছে।

এ আইন অনুসারে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেমন; আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সদস্য সংখ্যা ছিলো কমিশনের চেয়ারম্যানসহ (অবসরপ্রাপ্ত ১ জন বিচারপতি) ৭ জন, সংশোধন করে এ কমিশনের সদস্য সংখ্যা করা হয়েছে ৯ জন।

কমিশনের চেয়ারম্যান ১ জন (অবসরপ্রাপ্ত ১ জন বিচারপতি), পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি কমিশনের সদস্য ১ জন, রাঙামাটি (চাকমা), খাগড়াছড়ি (ত্রিপুরা) ও বান্দরবান (মারমা) পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি সদস্য ৩ জন, রাঙামাটি (চাকমা সার্কেল চীফ), খাগড়াছড়ি (মং সার্কেল চীফ) ও বান্দরবান (বোমাং সার্কেল চীফ) সার্কেল চীফ/প্রতিনিধি সদস্য ৩ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার সদস্য ১ জন।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে রাখা হয়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধি।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে বলা হয়েছে, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

এছাড়া ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। ২০১৬ সালের সংশোধীত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে ৩টি জনগোষ্ঠীকে প্রধান্য দেয়া হচ্ছে, লঙ্ঘিত করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান এবং ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

আগের আইনে ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যান যে কোন সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারবেন, এখন সংশোধীত আইনে কমিশনের সে ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রস্তাবে নতুন আইনে বলা হয়েছে, কমিশনের সকল সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ এবং ২০০১ সানের ৫৩ নং আইন এর ধারা ৩ এর ৬ নং উপ ধারায় বলা হয়েছে, “ কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :

(ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা;

(খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল;

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ(রিজার্ভ ফরেস্ট) কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

তবে শর্ত থাকে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।

এ আইনের উপধারার ব্যাখা অস্পষ্ট এতে করে যুগ যুগ ধারে পার্বত্য অঞ্চলে যে সব সরকারী ও স্বায়ত্বসাশিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বিশেষ করে রক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেষ্ট) তারা তাদের ভুমির মালিকানা হারাবে এতে কোন ধরনের সন্দেহ নাই। এতে সমস্যার সমুখিন হবে, সরকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও ভুমি জরিপ বিভাগ ইত্যাদি।

সরকার চাইলেই আগের মতো করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে যে কারো ভুমি/ জায়গা অধিগ্রহণ করতে পারবে না। খোদ সরকারকে অনুমতি নিতে হবে বা পূর্বেই অনুমোদন নিতে হবে অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কাছ থেকে।

পার্বত্য অঞ্চলের জনসাধারনকে এ আইনের সারমর্ম কি এবং কাদের স্বার্থে এই আইন বা প্রবিধানের সংযোজন করা হয়েছে এটা পরিস্কার করে জানিয়ে দেয়া এখন সময়ের দাবি। আমাদের দেশের সরকার প্রধান, পিসিজেএসএস প্রধান এবং পার্বত্য অঞ্চলের নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন পার্শ্বের বাড়িতে আগুন লাগলে নিজের বাড়িও তছনছ হয়।

৩ নং ধারার নং উপধারা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপস্থি বলা হয়েছে,“২০। সরল বিশ্বাসে কৃত কাজ-কর্ম সংরক্ষণ : এই আইন বা প্রবিধানের অধীন সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কাজের ফলে কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোন আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না”।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধন) ২০১৬ করা হয়েছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা জন্য।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধন) ২০১৬ বাস্তবায়ন করে কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের রেগুলেসন আইন পুর্ণ বলবৎ করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (উপজাতীয়) রীতি ও প্রথায় ভুমি বন্দোবস্তী দেয়া হবে, আসলে সেই রীতি ও প্রথা কি ?

সহজ ও সরল ভাবে বলতে গেলে; প্রথমত কোনো ভুমির মালিক তার খাস জায়গা বা ভুমি নিজের নামে বন্দোবস্তী করতে চাইলে বা আবেদন করলে প্রথম যেতে হবে তার এলাকার/গ্রামের কার্বারীর কাছে, সে কার্বারীর সুপারিশ নিয়ে ভুমির মালিক যাবে ২য় পর্য়ায়ে মৌজা হেডম্যানের কাছে, কিন্তু (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি)’র পক্ষ থেকে গ্রাম প্রধান কার্বারীকে আগে থেকে বলা আছে, কোন বাঙ্গালী (মুসলিম, হিন্দু ও বড়ুয়া পার্বত্য অঞ্চলে এরা হচ্ছে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী) যদি ভুমি/ জায়গার সুপারিশ নিতে আসে তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

ভুমির মালিক যদি কয়েক মাস দৌঁড়-ঝাঁপ করে তাহলে হয়তো মিলেও যেতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি।

ভুমির মালিক ২য় পর্য়ায়ে মৌজা হেডম্যানের কাছে গেলে সবার আগে হেডম্যান চাইবে সার্কেল চীফের স্থানীয় নাগরিকের সনদপত্র, (পার্বত্য চুক্তিতে এ ক্ষমতা জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চীফদের প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু সার্কেল চীফ, হেডম্যান ও কারর্বারীদের কাছে জেলা প্রশাসক প্রদত্ত স্থানীয় নাগরিকত্ব সনদপত্র গ্রহণযোগ্য নয়) যদি থাকে তো ভালো, না হলে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে সেই সার্কেল চীফের সনদপত্রের জন্য।

সার্কেল চীফদের কার্যালয়ে গিয়ে দেখবেন তাদের কার্যালয়ে পাহাড়িরদের জন্য ১টি ফাইল আর বাঙ্গালীদের জন্য ১টি ফাইল। পাহাড়িদের ফাইলে দেখবেন ৩০টি সনদপত্রের জন্য আবেদন আর বাঙ্গালীদের ফাইলে দেখবেন ১-২টি সনদপত্রের জন্য আবেদন। এ সনদের জন্য পাহাড়িদের কাছ থেকে নেয় ১শত টাকা ফি আর বাঙ্গালীদের কাছ থেকে নেয়া হয়(যদি সনদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়) হাজার টাকা ফি, যা চরম বৈষম্য ও সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।

যাক ধরে নিন, ভুমির মালিক সার্কেল চীফের কাছ থেকে স্থানীয় নাগরিকের সনদপত্র নিতে পেরেছেন, এবার মৌজা হেডম্যানের কাছে সুপারিশ নিয়ে ৩য় পর্যায়ে ভুমির মালিক যাবে সার্কেল চীফের সুপারিশ নিতে, ভাগ্য ভাল হলে সার্কেল চীফের সুপারিশ পেয়ে যাবে, না হলে দিনের পর দিন ঘুরেও ভুমি/ জায়গার মালিক সার্কেল চীফের কাছ থেকে সুপারিশ পাবে না।

ভুমি/ জায়গার মালিককে কেন সার্কেল চীফ সুপারিশ করছে না অথবা সমস্যা কি জানতে ভুমি/জায়গার মালিক সেই সার্কেল চীফের সাথে দেখা করতে চাইলে সার্কেল চীফ দেখা করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন বর্তমানে। সার্কেল চীফের কার্যালয় থেকে সে ভুমির মালিককে বলা হয় আপনার সমস্যা জানিয়ে সার্কেল চীফের কাছে আবেদন করতে। একবার, দুইবার ও তিনবার আবেদন করেও কোন ফল পাওয়া যায় না।

একদিকে ভুমির মালিকের দখলে থাকা ভুমি/জায়গা বন্দোবস্তীর জন্য সুপারিশ করবে না অন্যদিকে সার্কেল চীফ সেই ভুমি/জায়গার মালিকের সাথে দেখাও করেন না।(এই কাজটি বেশী করেন এক আইনজীবী সার্কেল চীফ)।

ধরা যাক, ভুমির মালিক সার্কেল চীফের সুপারিশ পেয়ে গেছেন, ৪র্থ পর্যায়ে যেতে হবে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড)’র কাছে। উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) অফিসে সেই কয়েক মাস পড়ে থাকার পর যাচাই – বাচাই করে, ৫ম পর্যায়ে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা সুপারিশ করে সেই ভুমি বন্দোবস্তীর ফাইল পাঠাবেন জেলা প্রশাসকের কাছে, সেই ফাইল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) যাচাই – বাছাই করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৬ষ্ঠ পর্যায়ে সেই ভুমি বন্দেবস্তীর ফাইল পাঠাবেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে অনুমোদনের জন্য।

জেলা পরিষদে সেই ভুমি বন্দোবস্তীর ফাইল কয়েক মাস পড়ে থাকার পর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমোদন পেলে সেই ভুমি/ জায়গা বন্দোবস্তীর ফাইল চলে যাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে, সেখানে কয়েক মাস শুনানী করার পর খাস ভুমি/জায়গার মালিককে অফিসিয়াল পত্র দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে ভুমি বন্দোবস্তীর সেলামীর টাকা (রাজস্ব) জমা দেয়ার জন্য। এখানে কেবলমাত্র মৌজার জায়গা/ভুমি বন্দোবস্তীর বিষয়ে বলা হয়েছে।

পার্বত্য তিন জেলায় রয়েছে বাজার ফান্ড নামক আরো একটি গোদের উপর বিষফোঁড়া।

এছাড়া বিএনপি সরকারের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান তিন পার্বত্য জেলায় এক পরিপত্র জারি করিয়েছেন, এতে বলা হয়েছে, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য তিন জেলার জেলা শহরের মৌজা বা পৌরসভা এলাকার মধ্যে একজন ব্যাক্তিকে ৩০ শতকের বেশী ভুমি/ জায়গা বন্দোবস্তী জন্য জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চীফের কার্যালয় থেকে সুপারিশ দেয়া বা গ্রহণ করা যাবে না।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহ, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, উপজেলা ভুমি কর্মকর্তার কার্যালয়,সার্কেল চীফ কার্যালয়, হেডম্যান কার্যালয় ও কার্বারীদের ভিতর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অবস্থান ক্ষীণ।

বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ১০০% কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গড়ে ২-৩ %।

এছাড়া পার্বত্য এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী (এনজিও) প্রতিষ্ঠানে ১০০% কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাঙ্গালীর সংখ্যা গড়ে ১% ও নয়।স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর ভবিষৎ কি?

লেখক: প্রধান সম্পাদক, সিএইচটি মিডিয়া টুয়েন্টিফোর ডটকম

কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না, ভূমি কমিশনের উপর আস্থা রাখুন- বিচারপতি আনোয়ারুল হক

khagrachari-picture-27-10-2016

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ার-উল-হক সকল পক্ষকে শঙ্কিত ও আতংকিত না হয়ে কমিশনের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখার পাশাপাশি সহনশীল হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, কমিশন বিরোধ নিস্পত্তি করবে, কেউ উচ্ছেদ হবে না।

তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে খাগড়াছড়িতে কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, কমিশন বিরোধ নিস্পত্তি করবে, বিচার করবে না। কমিশন প্রতিটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিন মাঠে যাবে। একপক্ষীয় কোন রায় হবে না।

আইনের বিধিমালা প্রনয়ন প্রসঙ্গে কমিশন চেয়ারম্যান বলেন, আইন প্রয়োগ করতে গেলে যদি প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয় তার উপর ভিত্তি করে বিধিমালা প্রনয়ন হবে। নতুন করে আবার আবেদনপত্র জমা নেওয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ার-উল-হক বলেন, বৈঠকে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কাউকে বঞ্চিত করা হবে না। পূর্ব চেয়ারম্যানের মেয়াদে জমা পড়া ৪৪০৮টি আবেদনও আমলে নেওয়া হবে তিনি জানান।

পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ার-উল-হকের খাগড়াছড়ি সফরকে কেন্দ্র করে শহরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, গতকাল বুধবার পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের এক সমাবেশ থেকে খাগড়াছড়িতে পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যানকে অবাঞ্চিত ও সকল কার্যক্রম প্রতিহতের ঘোষনাসহ ভূমি কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ না হলে আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে লাগাতার কর্মসূচীর হুমকি দেওয়া হয়।

পাহাড়ে ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ক্ষতিগ্রস্তদের ৪৫দিনের মধ্যে আবেদন চেয়ে জারি করা গণবিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে প্রায় ১৪ হাজার ৮শ ব্যক্তি আবেদনপত্র পড়ে। পাশাপাশি আগামী ৩০ অক্টোবর পার্বত্য ভূমি কমিশনের দ্বিতীয় বৈঠক আহবান করা হয়েছে।

গত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদেও আরো এক দফা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সে সময় ৪৪০৮টি দআবেদন কমিশনে জমা পড়ে।

১৯৯৭ সালে সম্পাদিক পার্বত্য চুক্তির আলোকে গঠিত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন-২০০১। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা শুরু থেকে এ আইনের বিরোধিতা করে আসছিলেন।

অবশেষে চলতি বছরের ১ লা আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ভেটিং সাপেক্ষে ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগতভাবে অনুমোদন ও ৯ আগষ্ট তা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গেজেট আকারে প্রকাশের পর গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদের পাশ হয়। বাঙালি সংগঠনগুলো আইন সংশোধনের পর থেকে আইনটি বাতিলের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে।

৪ সেপ্টেম্বর পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের বৈঠক

সংশোধিত কমিশন আইন বাতিলের দাবীতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খাগড়াছড়ি বাঙালি ছাত্র পরিষদের স্বারকলিপি

Khagrachari Picture(02) 28-08-2016

নিজস্ব প্রতিবেদক::

আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন বৈঠকে বসছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কমিশনের সচিব মো: রেজাউল করিম। তবে এখনো এ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু হয়নি।একইভাবে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী ও জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দুই বছর পর এটি হবে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের ৫ম চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার-উল হকের প্রথম বৈঠক। ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের এই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পার্বত্য ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই মাসে ১৩(সেপ্টেম্বর) তিনি খাগড়াছড়ি এসে যোগদান করেন। তবে আইন সংশোধনের পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদসহ পাহাড়ি সংগঠনগুলোর দাবীর মুখে তিনি এতোদিন কাজ শুরু করতে পারেন নি।


ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন সংক্রান্ত আরো খবর

  1. ♦  আদিবাসী প্রসঙ্গ এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন
  2.  ভূমি কমিশন আইন: পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাঙালী উচ্ছেদের হাতিয়ার
  3.  ভূমি কমিশন আইন-২০১৬ কার্যকর হলে জুম্ম ল্যান্ডের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে- মে. জে.(অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম বীরপ্রতীক
  4.  ভূমি কমিশন আইন পাশের নামে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র চলছে- ওয়াদুদ ভুঁইয়া
  5.  ‘ভূমি কমিশন (সংশোধীত) আইনে অনিশ্চয়তার মুখে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও বাঙালীর ভবিষ্যৎ’
  6.  কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?
  7.  পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন?
  8.  পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন- ২০১৬ অধ্যাদেশ জারি
  9.  ভূমি কমিশন আইন সংস্কার: আদালতের কার্যপরিধি খর্ব হওয়ার আশংকা
  10.  ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন: নীরব বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো
  11.  ভূমি কমিশন আইন সংশোধনে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার খর্ব
  12.  পার্বত্য ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অচল!

অবশেষে গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ভেটিং সাপেক্ষে ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ৯ আগস্ট তা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

Khagrachari Picture(01) 28-08-2016

এদিকে সংশোধিত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন বাতিলের দাবীতে আজ রবিবার সকালে পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বারকলিপি দিয়েছেন। বেলা ১১টায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামানের মাধ্যমে এ স্বারকলিপি দেওয়া হয়।

এ সময় পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি মাইন উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক এস এম মাসুম রানা, যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম,সাংগঠনিক সম্পাদক মো: মোসতফা কামাল উপস্থিত ছিলেন।

বাঙালী সংগঠনগুলোর দাবী সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন বাস্তবায়ন হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, সরকারের কর্তৃৃত্ব খর্ব হবে। এই ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ১৯৯৯ সালের ৩ জুন গঠিত ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরী কার্যভার গ্রহণের আগেই মারা যান। ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল পুনর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আবদুল করিম কার্যভার গ্রহনের কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন।

২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় দফায় পুনর্গঠিত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মাহমুদুর রহমান ২০০৭ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(জেএসএসের) বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেননি। জেএসএসের দাবী ছিল আইন সংশোধন।

২০০৯ সালের ১৬ জুলাই বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে তিন বছরের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন,কমিশনের ৪র্থ চেয়ারম্যান। তার মেয়াদ শেষ হয় ২০১২ সালের ১৮ জুলাই। এর টানা প্রায় দুই বছর কমিশন ছিল শুন্য।

বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহনের পর প্রথম দিকে পার্বত্য জেলায় ভূমি জরিপের জন্য উদ্যোগ নিলে সন্তু লারমাসহ কমিটির সদস্যও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে পিছু হটেন। পরবর্তীতে তিনি বিরোধ নিস্পত্তির জন্য গণবিজ্ঞপ্তি জারি করলে প্রায় সাড়ে চার হাজার আবেদন জমা পড়ে। আবারও আপত্তির মুখে পড়েন।

কিন্তু চেয়ারম্যান তার অবস্থানে অনঢ় থাকলে কমিশনের আইন সংশোধন ও পাহাড়িদের প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার দাবীতে কমিটির অন্যতম সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির(জেএসএস) একাংশের প্রধান ও আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা কমিশনের আইন সংশোধনের দাবীতে বৈঠক বর্জন শুরু করে। এর পর থেকে অপরাপর পাহাড়ি সদস্যরাও ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশনের বৈঠক বর্জন শুরু করলে কমিশন অকার্যকার হয়ে পড়ে।

পাশাপাশি ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ) ও জুম্ম প্রতিনিধি সংসদসহ পাহাড়ি সংগঠনগুলোও একই দাবীতে আন্দোলনে নামে। কিন্তু কমিশন চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী আইনের বিশেষ বিধান বলে শুনানী অব্যাহত রাখেন।

আদিবাসী প্রসঙ্গ এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন

পার্বত্য-চট্টগ্রাম11

♦ মুন্শী আবদুল মাননান ♦

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। এতে বক্তব্যে রাখেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবীর, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম প্রমুখ।

ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে আধিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে জোর চেষ্টা চলছে। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছে, তেমনি কিছু মহলও একই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত আদিবাসী ফোরাম গঠনের লক্ষ্যই হলো, ওইসব জনগোষ্ঠীর আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানাদির আয়োজনের লক্ষ্যও মূলত একই। এখানে স্মরণ করা দরকার, অতীতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা একযোগে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দাবি করছে কেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। সাধারণ অর্থে কোনো দেশ বা অঞ্চলের বা ভূখ-ের সর্বপ্রাচীন অধিবাসীদের আদিবাসী বলে অভিহিত করা হয়।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের আদিবাসী দাবি করে এটা প্রমাণ করতে চাইছে, বাংলাদেশের বা তার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের তারাই সর্বপ্রাচীন আদিবাসী। এই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশের বা ওইসব অঞ্চলের ভূমি বা সম্পদের ওপর তাদের একটি বিশেষ অধিকার জন্মে এবং সেই অধিকার কায়েমের পথ প্রশস্ত হয়। অথচ ইতিহাসের সাক্ষ্য এই যে, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, হাজংসহ কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন আধিবাসী নয়। তারা মাত্র কয়েকশ বছরের ব্যবধানে অন্যান্য দেশ থেকে এসে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে বাঙালিরাই সর্বপ্রাচীন অধিবাসী বা আদিবাসী।

ইতিহাসের এই সাক্ষ্য এখন স্বীকার বা মান্য করতে চাইছে না উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো এবং কিছু মহল। তারা যে কোনো মূল্যে নিজেদের বা উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন সময় ইতিহাসের অকাঠ্য তত্ত্ব-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি (আরো অনেকে দেখিয়েছেন) বাংলাদেশে যেসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে তাদের কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয়। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন তেমন দেশের চিহ্নিত কিছু মহল সেটা মানতে নারাজ। তারা লাগাতার তাদের লক্ষ্য হাসিলে কাজ করে যাচ্ছে। ঘটা করে আদিবাসী দিবস পালন ওই তৎপরতারই অংশ।

লক্ষ্যণীয়, ওই দিনের অনুষ্ঠানে পূর্বে উল্লিখিত বক্তারা সবাই উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী অভিধায় চিহ্নিত করে তাদের অধিকার সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন। সন্তু লারমার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। সন্তু লারমা সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, সরকার ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের প্রশ্নে আন্তরিক নয়। এটা নানাভাবে নানা যৌক্তিকতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের পক্ষে কাজ না করে জনসংহতি সমিতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘আদিবাসীদের’ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এর প্রতিকার চেয়েছেন এবং সবাইকে সংগ্রামী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের সবাইকে নিজেদের প্রয়োজনেই সংগ্রামী হতে হবে। সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে দেশ স্বাধীন হলেও ‘আদিবাসীরা’ শোষণমুক্ত হওয়া তো দূরের কথা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ই পাননি। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে তথা রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই ‘আদিবাসীদের’ মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের অধিকার দিতে হবে। আদিবাসী স্বীকৃতি সরকারি তরফ থেকে না আসায় অত্যন্ত মনোবেদনা প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, আমাদের দেশে এখনো ‘আদিবাসীরা’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো তাদের শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটা অত্যন্ত বেদনার ও হতাশার কথা।

ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। সে রাষ্ট্রটি মাথা উঁচু করেও বিশ্বের দরবারে দাঁড়াতে পারে না। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দার্শনিক ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্ত অধিকার দেয়া। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ‘আদিবাসীরা’ সে সুযোগ পায়নি। পার্বত্য শান্তি চুক্তি প্রণয়নের পর ‘আদিবাসীরা’ তাদের ভূমির অধিকার সংরক্ষণের জন্য যে দাবি জানিয়ে আসছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বা সংরক্ষিত হয়নি। মামুনুর রশীদ বলেছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে যে নিয়ম-কানুন হয়েছে, তার কোনোটিই তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। অথচ তা হলে ‘আদিবাসীদের’ বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন মান আরো উন্নত হতো। অন্যদের বক্তব্য প্রায় একই রকম। কাজেই তাদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না। যাদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো : কথিত আদিবাসীদের অধিকার অনর্জিত রয়েছে। ভাবটা এরকম যেন উপজাতীয় বাদে দেশের সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, উপজাতীয়দের চেয়েও দেশের বহু মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি-বাকরি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তারা উপজাতীয়দের অধিকার অনর্জিত থাকার জন্য সরকারকেই দায়ী করেছেন। সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সরকার কেন উপজাতিদের আদিবাসী বলে না, এ জন্য। তাদের এই ক্ষোভ একটি অযৌক্তিক ও অনৈতিক দাবির প্রতি সমর্থনেরই নামান্তর। সরকার বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশে তথাকথিত কোনো আদিবাসী নেই। এটাই রাষ্ট্রের অবস্থান। বস্তুত, তারা রাষ্ট্রের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নির্দিষ্ট করেছেন। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে অনেকেই আলোকপাত করেছেন।

যে সন্তু লারমা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বানানোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতিও বটেন, তিনি এক সময় তথাকথিত শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই ‘শান্তি বাহিনী’ বছরের পর বছর ধরে দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। ‘শান্তি বাহিনীর’ লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা। গত শতকের ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘শান্তি বাহিনী’র দৌরাত্ম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন সরকার দু’টি পন্থা অবলম্বন করে।

প্রথমত, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যথাসম্ভব এই বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দমন করা। দ্বিতীয়ত, শান্তি স্থাপনের জন্য ‘শান্তিবাহিনী’র সঙ্গে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা। ‘শান্তি বাহিনী’ সে সময় আলোচনায় পাঁচ দফা দাবিনামা পেশ করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক তার একটি লেখায় ওই পাঁচ দফা দাবির প্রথম দফাটি উল্লেখ করেছেন। দফাটি এই : ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙামাটি। ২টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে, ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম অতঃপর লিখেছেন: ‘শান্তি বাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের কাছে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতিকিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অংকন করা।’ বলা বাহুল্য, এ দাবিনামা মানা সম্ভব ছিল না এবং মানাও হয়নি।

‘শান্তি বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে তার দাবিনামা পেশ করে ১৯৮৭ সালে। এর দশ বছর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মধ্যে একটি চুক্তি হয় যা ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই চুক্তির পর এত বছর অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বলা যাবে না। জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠাকামীরা তাদের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে, এমন দাবিও জোর দিয়ে কেউ করতে পারে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, তারা এখনো তৎপর ও সক্রিয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা হত্যা, চাঁদাবাজি ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ সংশোধিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ গত ৮ আগস্ট প্রণয়ন ও জারি করেছেন মাননীয় প্রেসিডেন্ট।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে ৩ জুন বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে সরকার ল্যান্ড কমিশন গঠিত করে। ২০০১ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ প্রণীত হয়। ওই সময়ই এই আইন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালীদের ভূমি অধিকার এই আইনে খর্ব হয়েছে। জনসংহতি সমিতিও এ আইনের ব্যাপারে আপত্তি তোলে। তার মতে, এতে উপজাতীয়দের ভূমি অধিকার নিরংকুশ হয়নি। কমিশনের নিয়ন্ত্রণও রয়ে গেছে সরকারের হাতে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। শুধু এটুকু বলবো যে, জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আইনের ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করে। এই সংশোধনীগুলো পেশ করা হয় বাঙালীদের ভূমি অধিকার আরো খর্ব ও অনিশ্চিত করে উপজাতীয়দের অধিকার নিশ্চিত ও সংহত করার জন্য এবং কমিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার জন্য।

যতদূর জানা গেছে, আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আসা জনসংহতি সমিতির সংশোধনী প্রস্তাবগুলো সংশোধিত আইনে গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে কম; সংক্ষেপে দুয়েকটি বিষয় ও প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করছি। এক : মূল আইন বা ২০০১ সালে প্রণীত ৫৩ নং আইনের ৪ ধারার ২ উপধারায় উল্লিখিত ‘যে কোনো পার্বত্য জেলায়’ শব্দগুলোর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে ‘যে কোনো পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোনো স্থানে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। ৪ নং ধারাটি কমিশনের কার্যালয় সংক্রান্ত। দেখা যাচ্ছে, মূল আইনে এর শাখা কার্যালয় যে কোনো পার্বত্য জেলায় স্থাপন করার কথা থাকলেও সংশোধিত আইন অনুযায়ী অন্য কোনো স্থানেও স্থাপন করা যাবে। অর্থাৎ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও দেশের যে কোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে। দুই : ২০০১ সালের আইনের ৬ ধারার উপধারা (১) এর (ক) দফা (ক) এর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে দফা (ক) প্রতিস্থাপিত হয়েছে এভাবে : (ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা; (খ) দফা (খ) তে উল্লিখিত ‘আইন ও রীতি’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ শব্দগুলি ও কমা প্রতিস্থাপিত হইবে; (গ) দফা (গ) এর পরিবর্তে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা এরকম : (গ) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন। নীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে চলে আসা ভূমিসহ (ঋৎরহমব খধহফ) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিল করণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল; তবে শর্ত থাকে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত এবং বসতবাড়িসহ জলে ভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা এবং বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’

উল্লেখ করা দরকার, মূল আইনে এই ‘শর্তের’ অংশটি ছিল এরকম। ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত (জবংবৎাবফ) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া। ভূ-উপগ্রহ এলাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’ এখানে বিবেচ্য বিষয় এই যে, ‘আইন ও রীতি’র জায়গায় ‘আইনে, রীতি ও পদ্ধতি’ প্রতিস্থাপিত হলো যেন তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অন্যদিকে ‘শর্তের’ জায়গায় বনাঞ্চল, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি বাদ গেল কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেকের অভিমত, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমিই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখন এই বনাঞ্চলের ভূমির দাবীও যে উপজাতীয়রা করতে পারবে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের কথা নিয়ে আমরা ইতি টানবো এই নিবন্ধের। তিনি আগে উল্লেখিত নিবন্ধের শেষাংশে বলেছেন; ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে।

যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না ? যদি থাকে, তাহলে কত সংখ্যক ও কোন কোন শর্তে ?’

এক মানববন্ধনে তিনি বলেছেন : ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ, যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড, যার রাজধানী রাঙামাটি। এই দুটি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হয়নি। কিন্তু বর্তমান ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে বিদ্রোহীদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

ভূমি কমিশন আইন: পার্বত্যাঞ্চল থেকে বাঙালী উচ্ছেদের হাতিয়ার

ইবনে-রহমত

সৈয়দ ইবনে রহমত

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা নতুন করে তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করার আন্দোলনে নেমেছে। নানা বিষয়ে ভিন্ন মত থাকলেও বাঙালিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে একত্রিত হয়ে আন্দোলনের যৌথ কর্মসূচিও দিয়েছে। ফলে যেকোন সময় পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এসব কিছু হচ্ছে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তথা সন্তু লারমার চাহিদা মতো ‘পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধনের উদ্যোগের কারণে।

গত ১ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনের যে ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করা হয়েছে তা কার্যকর হলে ভূমি কমিশনের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের হাতে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদ করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা। আর কমিশনকে ব্যবহার করে সন্তু লারমা কোনো বাঙালি পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করলেও কোনো আইন-আদালত কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিকার করার ক্ষমতা থাকবে না।

ভূমি কমিশন আইনের ১৬ নং অনুচ্ছেদেই বলা আছে যে, ‘ধারা ৬(১)-এ বর্ণিত কোন বিষয়ে দাখিলকৃত আবেদনের উপর কমিশন প্রদত্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ানী আদালতের ডিক্রী বলিয়া গণ্য হইবে, তবে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন আদালত বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল বা রিভিশন দায়ের বা উহার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ এ অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি পরিবার তাদের ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।

গত ১ আগস্ট ২০১৬ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১৬’ চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের সংবাদ ব্রিফিং এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে পরদিন ২ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের ১৪টি সংশোধনীর অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। আর সংসদ যেহেতু দুই মাস পরে বসবে, তাই জরুরি বিবেচনায় এটাকে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই আন্দোলনে উত্তাল হতে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম।

ভূমি কমিশন আইন সংশোধনের ফলে পার্বত্য বাঙালিদের উদ্বেগের মূল কারণটি স্পষ্ট হয়েছে গত ৪ আগস্ট এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে দেওয়া মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীকের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড যার রাজধানী রাঙাগামাটি। এই দু’টি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হইনি। কিন্তু বর্তমান এই ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে দেশদ্রোহীদের সেই সপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

ব্যাপারটি আরও ভালোভাবে উপলব্ধির জন্য পার্বত্য ভূমি কমিশন, কমিশন আইন এবং কমিশন আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোকপাত করা দরকার। ভূমি কমিশন : পার্বত্যাঞ্চলে ভূমি সমস্যাটি নতুন কোনো বিষয় নয়। এটিই এখানকার সব চেয়ে জটিল সমস্যা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ভূমিবিরোধ সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য একটি ল্যান্ড কমিশন গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ‘ঘ’ খণ্ডের ৪, ৫ ও ৬ ধারা মতে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে ৩ জুন ১৯৯৯ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ল্যান্ড কমিশন গঠন করে। এরপর তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে ২০০১ সালের ৫৩ নং আইন তথা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ পাস করে।

এই আইনটিতেই পার্বত্য বাঙালিদের ভূমির অধিকার খর্ব করার যাবতীয় ব্যবস্থা করা আছে। কিন্তু এতে সন্তু লারমার একক কর্তৃত্ব করার সুযোগ কিছুটা কম থাকায় তিনি নাখোশ হন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১-এর ব্যাপারে আপত্তি তোলে সংশোধনের দাবি জানায়। তারা তাদের দাবির পক্ষে সরকারের পাসকৃত আইনের ২০টি ধারার বিপরীতে আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে প্রথমে ১৯ দফা সুপারিশ প্রেরণ করে। পরবর্তী সময়ে সুপারিশ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩-এ। আঞ্চলিক পরিষদের সুপারিশ সমূহকে উদ্দেশ্য অনুসারে আমরা দুই ভাগে বিভক্ত করতে পারি।

প্রথমত, এমন কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে এগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভূমির উপর পার্বত্য বাঙালিদের অধিকারকে খর্ব করে উপজাতীয়দের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়।

দ্বিতীয়ত, অবশিষ্ট সুপারিশগুলো করা হয়েছে, যাতে ভূমি কমিশনের ওপর থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে আঞ্চলিক পরিষদ তথা জেএসএসের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। বাংলাদেশ সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে যেসব সংশোধনী গৃহীত হয়েছে তাতে জেএসএসের উভয়বিধ সিদ্ধান্তই হাসিল হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সভায় বারবার ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনী : ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ পাসের পর থেকে গত দেড়যুগ ধরে সরকারের নানা পর্যায়ে এ আইন সংশোধন নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। একাধিকবার মন্ত্রিপরিষদ সভাতেও আইনটির সংশোধনী উত্থাপিত হয়েছে, এমনকি উত্থাপিত সংশোধনী পাসের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।

গত ৩০ জুলাই ২০১২ মন্ত্রিপরিষদ সভা ভূমি কমিশন আইনের ১৩টি সংশোধনী পাসের জন্য অনুমোদন দিয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর করা যায়নি। এরপর ২০১৩ সালের ২৭ মে মন্ত্রিপরিষদ সভা ভূমি কমিশন আইনে আগের গৃহীত ১৩টি থেকে কমিয়ে ৬টি সংশোধনী গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। যা সংসদের মাধ্যমে পাস করার কথা ছিল। কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি। এরপর বেশকিছু দিন নীরব থেকে হঠাৎ করেই ১৪টি সংশোধনী অনুমোদন করেছে মন্ত্রিপরিষদ। আর সংসদ বসতে দুই মাস বিলম্ব থাকায় তড়িগড়ি করে তা অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস এবং সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের বিবেচনা 

গত ৮ মে ২০১৬ রাজধানীর বেইলী রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স নির্মাণের ভিত্তিফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধনের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘২০০১ সালে আমরা যে আইনটা করেছিলাম, সেখানে তারা (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তথা সন্তু লারমা) কিছু সংশোধন চেয়েছেন। সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যতটুকু করা সম্ভব, সেটা আমরা করে দেব।’

প্রধানমন্ত্রীর সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে আইন সংশোধনের সেই আশ্বাস এবার মন্ত্রিপরিষদ সভায় কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অমূলক হবে না। কারণ এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সভায় প্রথম দফায় ১৩টি এবং পরে ৬টি সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পরেও সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নেই তা কার্যকর করা যায়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে যে, আগে যেসব সংশোধনী দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে কার্যকর করা যায়নি, কোন বিবেচনায় এবার সেসব সংশোধনী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে মান উতীর্ণ হয়ে গেল?

তারপরেও কথা থাকে, সংসদ বসতে দুই মাসের বিলম্ব দেখিয়ে তড়িগড়ি করে এটিকে অধ্যাদেশ আকারে জারির সিদ্ধান্তটিও প্রশ্নসাপেক্ষ। ধারণা করা যায়, কোনো একটি পক্ষ দ্রুততার সাথে সংসদকে পাশ কাটিয়ে সব কিছু করে ফেলার ব্যাপারে অতিউৎসাহী মনোভাব দেখাচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা দরকার।

তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেও যার বা যাদের পরামর্শে তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধন করছেন তারা এদেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কতটা অনুগত তা নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে।

১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর ১৯৯৯ সালের ১২ মে সন্তু লারমা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করেন। সেই থেকে অদ্যাবধি একই পদে তিনি বহাল আছেন। গাড়িতে পতাকাসহ রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করছেন। অথচ আজ পর্যন্ত তিনি কোনো দিন এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনারে গিয়েছেন বলে শোনা যায় না। তাছাড়া, সন্তু লারমার দল পার্বত্য জনসংহতি সমিতি সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিয়মিতই অংশ নেয় এবং তাতে জয় লাভও করে। অথচ দলটির প্রধান সন্তু লারমা আজ পর্যন্ত এদেশের নাগরিকত্বের প্রতীক জাতীয় পরিচয়পত্রটি পর্যন্ত গ্রহণ করতে সম্মত হননি। রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেও এতটা ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ যিনি করতে পারেন, সেই তারই পরামর্শে ‘পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, ২০০১’ সংশোধন করার পরিণতি কী হতে পারে তা অনুমান করে দেশবাসীর মনে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হওয়াটা কি অমূলক?

ভূমিকমিশন আইনের কিছু সংশোধনী প্রস্তাবের পর্যালোচনা

পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে গৃহীত ১৩টি (এবার এর সাথে আরও একটি সংশোধনী যোগ করা হয়েছে) সংশোধনীর মধ্যে ২নং প্রস্তাবে আছে- আইনের (২০০১ সালের ৫৩ নম্বর আইন) তৃতীয় অনুচ্ছেদে ‘পার্বত্য জেলাসংক্রান্ত জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির’-এর স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ প্রতিস্থাপিত হবে। জেএসএস সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। তাদের সেই আকাক্সক্ষা তারা কখনই পরিত্যাগ করেনি। যা বিভিন্ন সময় তাদের বক্তব্য, আচার-আচরণ থেকে প্রমাণিত। সরকারের সাথে চুক্তি করার সময় যেহেতু স্বাধীন দেশের দাবি তোলা অপ্রাসঙ্গিক ছিল, তাই তারা প্রথমে ফেডারেল রাষ্ট্র এবং পরে স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিল।

কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সরকার এ দাবি মেনে না নেয়ায় তারা সংবিধানের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেই চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে। তাই বলে তাদের মনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে যায়নি। সে কারণে পার্বত্য চুক্তির শুরুতেই পার্বত্যাঞ্চলের পরিচয়কে তারা ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। আর এর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে পার্বত্যাঞ্চলকে পৃথক করে ফেলা। যাতে ধীরে ধীরে এই স্বতন্ত্র পরিচয়টাকেই বড় করে তাদের পুরনো উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে।

পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ই এই বিষয়টির ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলোকপাত করেছিলেন। কিন্তু সরকার তখন এর প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি। বোঝা যায় সরকার এর ভয়াবহতা সম্পর্কে উদাসীন ছিল এবং এখনো উদাসীন আছে। যা ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীর দুই নং প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমেও প্রমাণিত। সরকার উদাসীন থাকলেও জেএসএস তাদের লক্ষ্যে যে অবিচল এখানে সেটাই স্পষ্ট। যার ফলে তারা ‘পার্বত্য জেলা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’র স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপনের দাবি আদায় করেছে। ‘জেলা’ বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ তাই এই শব্দটি জেএসএস মানতে পারেনি। তাদের প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে এই অঞ্চলের নতুন একটি পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা, তারা সেটি করতে পেরেছে। আর আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বুঝেই হোক কিংবা না বুঝেই হোক এই প্রস্তাব গ্রহণ করে জেএসএসের খায়েশ পূরণে সহায়তা করছে।

এই একটি সংশোধনীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেই অপর প্রস্তাবগুলোর উদ্দেশ্যও বোঝা সম্ভব। কেননা প্রতিটি প্রস্তাবই এসেছে জেএসএসের কাছ থেকে। আর তারা যে এসব প্রস্তাব তাদের মূল উদ্দেশ্য সামনে রেখেই দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সংশোধনীর ৪ এবং ৫নং প্রস্তাব নিম্নরূপ: ৪। ৬ (১) (ক) ধারায় ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’-এর স্থলে ‘পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া জায়গাজমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণসহ সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি চুক্তির পরিপন্থী নয় এমন সকল বিষয়ে চুক্তির ধারা (ঘ) ৪ মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা’ প্রতিস্থাপিত হবে। ৫। ৬ (১) (খ) ধারায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী’ শব্দাবলির স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী’ হবে।

উপরের দুটি প্রস্তাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী’ বিরোধ মীমাংসা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ বলতে আসলে কী বোঝায় তার ব্যাখ্যা কি সরকারের কাছে আছে? আমরা আসলে জানি না, তা ছাড়া সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যা থাকার কথাও না। কারণ ৪নং প্রস্তাবেই অবৈধ বন্দোবস্ত জমির প্রসঙ্গ এসেছে। এর অর্থ হলো সরকার অবৈধভাবে কাউকে না কাউকে জমি বন্দোবস্ত দিয়েছে! বিষয়টি কি আসলে তাই? রাষ্ট্রের আইনেই বৈধ কিংবা অবৈধতা নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দেখছি ভিন্ন বিষয়।

সরকারের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ বলে ঘোষণা করারও বিধান আছে! কিন্তু সেই বিধানটি আসলে কী, এর প্রয়োগকারীই বা কারা? আমরা আসলে বোঝতে পারছি না, এর মাধ্যমে সরকার পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি বন্দোবস্ত দেয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা অন্য কারো হাতে ছেড়ে দিচ্ছে কি না। আর যদি তাই হয় তাহলে এর পরিণতি কী হতে পারে, সংশ্লিষ্টদের তা ভেবে দেখার জন্য অনুরোধ রইল।

সংশোধনীর ৬নং প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে- ৬ (১) (গ) ধারায় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইনবহির্ভূতভাবে কোনো বন্দোবস্ত দেয়া হয়ে থাকলে তা বাতিল এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল’-এর স্থলে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিজল্যান্ড (জলেভাসা জমি)সহ কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হয়ে থাকলে তা বাতিল এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল’ প্রতিস্থাপিত হবে।

ধারা ৬(১)(গ) এর শর্তাংশ ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পকারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হবে না’ শব্দাবলি বিলুপ্ত হবে। এই সংশোধন প্রস্তাবটির দ্বিতীয় অংশ পার্বত্য চুক্তিতে ছিল। অর্থাৎ শান্তি চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বহাল রাখা হয়েছিল। কিন্তু এখানে তা বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। কারণটা কী? শান্তি চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের উপর সরকারের কর্তৃত্ব বহাল রাখা সম্ভব হলেও আজ কেন তা বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছে না?

বর্তমানে এমনকি পরিবেশ তৈরি হলো, তার ব্যাখ্যা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা দরকার। কেননা রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিক শুধু সরকার নয়, মূল মালিক এই দেশের ১৬ কোটি জনগণ। অতএব, তাদের সম্পদ অন্যকারো হাতে ছেড়ে দেয়ার ব্যাখ্যা জানার অধিকার দেশের জনগণের আছে। ৯নং প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ৭(৫) ধারায় ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১) বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে’-এর স্থলে ‘চেয়ারম্যান উপস্থিত অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়াদিসহ এর এখতিয়ারভুক্ত অন্যান্য বিষয়ে সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের গৃহীত সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে’-শব্দাবলি প্রতিস্থাপিত হবে।

এ প্রস্তাবে কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতাকে খর্ব করে উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের স্বেচ্ছাচারিতার নিকট ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কারণ চেয়ারম্যানসহ পাঁচজনকে নিয়ে কমিশন। ১. সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি (চেয়ারম্যান), যিনি বর্তমানে একজন বাঙালি হলেও ভবিষ্যতে উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সদস্য হওয়া সম্ভব। ২. আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। ৩. সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। ৪. সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ (অবশ্যই উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হবেন)। এবং ৫. চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (যিনি উপজাতীয় তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির হওয়া খুব সম্ভব)। এই যখন কমিশনের অবস্থা তখন অধিকাংশের মতামত কোন দিকে যাবে- এটা কি সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভেবে দেখেছেন?

১১নং প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ধারা ১০(৩)-এর পরে নতুন উপধারা ১০(৪) নিম্নবর্ণিতভাবে সন্নিবেশিত হবে: ‘(৪) কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যে কোনো সময় ন্যায়বিচারের স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবেন’ এ সংশোধনীর মর্মার্থ হলো, ইতিপূর্বে দেখা গেছে ভূমি কমিশনে উপজাতীয়রা যেসব আবেদন করেছে তার অধিকাংশই ভিত্তিহীন এবং অযৌক্তিক। তাই সেসব বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু ন্যায় বিচারের স্বার্থে বলা হলেও উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের মূল উদ্দেশ্য ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি নয়, বরং কলেকৌশলে বাঙালিদের ভূমি হস্তগত করা। তাই কোনো ভূমিকে নিজের বলে দাবি করার পর তা আইনগত কারণে বাতিল হয়ে গেলে সেই জমি নিয়ে নতুন করে তালবাহানা করে বাঙালিদের হেনস্থা করার সুযোগ থাকে না। সেকারণেই উপরের সংশোধনীটি নেওয়া হয়েছে যাতে, যখনই কোনো আবেদন বাতিল হয়ে যাবে বলে মনে হবে, তখনই যেন তা আবার নতুন আবেদন করে বিষয়টি জিইয়ে রাখা যায় এবং শেষ পর্যন্ত কমিশনকে ব্যবহার করে জমিটি হস্তগত করা যায়।

১২নং প্রস্তাবে বলা হয়েছে- ধারা ১৩(২)-এর পরে নতুন উপধারা ১৩(৩) নিম্নবর্ণিতভাবে সন্নিবেশিত হবে: ‘১৩(৩) এই ধারার অধীন কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলায় উপজাতীয়দের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হবে’। ভূমিকমিশনের অধিকাংশ সদস্য উপজাতীয়, অন্যদিকে পার্বত্য বাঙালিদের পক্ষ থেকে কোনো সদস্য সেখানে নেই। তার উপর কমিশনের সকল পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা, কর্মচারীও যদি উপজাতীয় হন তাহলে সেই কমিশন থেকে পার্বত্য বাঙালিরা সুবিচার আশা করতে পারে-এটা কি ভাবা যায়? যারা বিশ্বাস করেন পার্বত্যাঞ্চলে বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্ব বা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার নেই এবং সেখানে বসবাসের অধিকার বাঙালিদের নেই, সেই উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কর্তৃত্বাধীন ভূমিকমিশন বাঙালিদের উপর সুবিচার করবে এটা কি সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন?

বাঙালিদের ভূমি এবং ভোটাধিকার হরণ

পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ৪নং ধারার ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্যগণ জনসাধারণ কর্তৃক প্রত্যক্ষভাবে এই আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচিত হইবেন।’ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভোটার তালিকা প্রয়োজন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সুষ্ঠু ভোটার তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যাতে জটিলতা সৃষ্টি করা যায়, সম্ভবত সেই উদ্দেশ্যই পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৯নং ধারার ৪নং উপ-ধারায় কোনো ব্যক্তির ভোটার হওয়ার ব্যাপারে একটি বিতর্কিত এবং সংবিধান পরিপন্থী শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই উপধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।’ যা পরে ১৯৯৮ সালে জেলা পরিষদ আইনসমূহ সংশোধন করে ১৭নং ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আবার অ-উপজাতীয়দের ক্ষেত্রে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে পার্বত্য চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা বলিতে- যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণত বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।’ অর্থাৎ পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে ভোটার হতে হলে বৈধ জমির মালিক হতে হবে।

কিন্তু বাঙালিরা যাতে বৈধ জায়গা সম্পত্তির মালিক হতে না পারে সে জন্যও সকল পদক্ষেপ নিয়ে রাখা হয়েছে। যেমন- খাস জমি বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিক্রয় বা অন্যান্যভাবে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদকে অবহিত করে বা জেলা পরিষদের অনুমতি নেয়াকে শর্ত করে দেয়ায় বাঙালিদের ভূমির মালিক হওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে গঠিত ল্যান্ড কমিশনকে অকার্যকর করে রাখার জন্য আঞ্চলিক পরিষদ বিভিন্ন অযৌক্তিক দাবি দিয়ে রেখেছে। আসলে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের উদ্দেশ্য সরকারে নিকট যাই থাকুক উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে এর উদ্দেশ্য পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের ভূমিহীন করা। কেননা পার্বত্য বাঙালিদের ভূমিহীন করতে পারলে সংবিধান পরিপন্থীভাবে (পার্বত্য জেলা পষিদ আইনের ক্ষমতা বলে) তাদের ভোটাধিকার হরণ করা যাবে। আর সেটা সম্ভব হলে বাঙালিরা পার্বত্যাঞ্চলে ভূমির অধিকার, ভোটাধিকার হারিয়ে এক সময় হতাশ হতে বাধ্য হবে। আর মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব মানুষ হয়তো পার্বত্যাঞ্চল ছেড়ে যেতে শুরু করবে। ক্রমান্বয়ে বাঙালির সংখ্যা কমতে থাকলে তারা পার্বত্যাঞ্চলে জাতিসংঘের উপস্থিতিতে পূর্বতিমূরের মতো স্বাধীনতার দাবিতে গণভোটের আয়োজন করবেন। সে ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাবে তা-তো আগেই থেকেই নির্ধারণ করা থাকছে। অতএব, পরিণতিটা সহজেই অনুমেয়।

সরকারি কর্তাব্যক্তিরা চাকরি রক্ষার্থে যত গালভরা যুক্তিই দেখাক না কেন, ভূমি কমিশন আইন সংশোধন, আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়, জেলা পরিষদের মাধ্যমে পুলিশের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের প্রচেষ্টাসহ পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দ প্রতিটি পদেক্ষেপই নিচ্ছে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই। ভূমিকমিশন আইন সংশোধনীর প্রতিটি প্রস্তাবই তাদের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্যই আনা হয়েছে। এবার যেসব সংশোধনী মন্ত্রিপরষদের সভা অনুমোদন করা হয়েছে তা কার্যকর হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের হাতিয়ার তুলে দেওয়া হবে সন্তু লারমার হাতেই। এখন সরকার যদি এসব বুঝতে অপারগ হয় তাহলে এর দায় শুধু তাদের ওপর বর্তাবে তা নয়, বরং এদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককেই ভবিষ্যতের কাঠগড়ায় এর খেসারত দিতে হবে।

অতএব, সময় থাকতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যেকোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে ভাবতে হবে সরকারকে, ভাবতে হবে সচেতন দেশবাসীকেও।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক

বিচারপতি আনোয়ার উল হক পার্বত্য ভূমি কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান: রোববার খাগড়াছড়ি আসছেন

ima

পার্বত্যনিউজ প্রতিবেদক :

সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক’কে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিস্পত্তি কমিশন‘র (ল্যান্ড কমিশন) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

তিনি ভূমি নিস্পত্তি কমিশন‘র ৬ষ্ট চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী‘র স্থলাভিষিক্ত হবেন।ভূমি মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব মুর্শিদা শারমিন স্বাক্ষরিত এক স্মারক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।

এদিকে দায়িত্বভার গ্রহনের পরপরই সদ্য নিযুক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিস্পত্তি কমিশন‘র (ল্যান্ড কমিশন) চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক আগামী রোববার তিন দিনের সফরে খাগড়াছড়ি আসছেন। তিনদিনের সফর শেষে আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার উদ্দেশ্যে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করবেন।

জানা গেছে, কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আলোকে পার্বত্য চট্রগ্রামের দীর্ঘ দিনের ভুমি সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন।

তারও আগে ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিস্পত্তি কমিশন‘র (ল্যান্ড কমিশন) ৫ম চেয়ারম্যান হিসেবে সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো: খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি ২০১২ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ‘সফরকালে কমিশনের অন্য সদস্য, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে স্বাক্ষাৎ করবেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিস্পত্তি কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের ৩ জুন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আনোয়ারুল হক চেীধুরীকে কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু তিনি কার্যভার গ্রহনের আগে মৃত্যু বরণ করেন। অত:পর ২০০০ সালের ৫ এপ্রিল নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি আব্দুল করিম-কে। তিনি ১২ জুন ২০০০ সালে দায়িত্বভার গ্রহন করে একবার খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। তারপর তিনি শারিরীক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রায় দেড় বছর চেয়ারম্যান পদ শূণ্য থাকার পর ২০০১ সালের ২৯ নভেম্বর চার দলীয় জোট সরকার বিচারপতি মাহমুদুর রহমানকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। টানা দুইবার দায়িত্ব থাকা অবস্থায় তিনিও ২০০৭ সালে নভেম্বর মাসে মারা যান। এরপর তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আর কোন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়নি।

আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চেীধুরীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিস্পত্তি কমিশন’র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। তিনি ২০১২ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত তিনি দ্বায়িত্ব পালন করেন। এরপর প্রায় দুই বছর পরে বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়াউল হক’কে কমিশনের ৬ষ্ঠ চেয়ারম্যানের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির “ঘ” এর ৪ ধারা মোতাবেক জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিস্পত্তি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠনের বিধান রয়েছে। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন সার্কেল চীপ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা), পার্বত্য জেলা পরিষদ‘র চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার।

এ সংক্রান্ত আরো খবর:

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ :
বান্দরবানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনজিও ব্যুরো। নির্দেশ পাওয়ার পরপরই ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ও কার্যালয়ের আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। বান্দরবান ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়স্থ এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বান্দরবান জেলায় ওয়ার্ল্ড ভিশন আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সে পত্র মোতাবেক বান্দরবান শহরের বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক কি কারণে বান্দরবানে তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো পক্ষই মুখ খুলছে না।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক এই এনজিওটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় উসকানী প্রদান, পক্ষপাতদুষ্টু কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী অধিবাসীরা। বিভিন্ন সরকারি ও গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে সেসব রিপোর্টে। সে কারণে পার্বত্য বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ধরনের এনজিওর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করে আসছিলো। ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবানে ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বা সরাসরি কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ তারই অংশ বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র উল্লেখ করেছে। শুধু ওয়ার্ল্ড ভিশন নয় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাকেই সরকার একে একে নিয়ন্ত্রেণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবান এডিপি ম্যানেজার টিমথি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, আশির দশকের আগে থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বান্দরবান জেলায় জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নবায়ন না করে বরং  কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর ফলে ওই মেয়াদের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যেই আমরা বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আরো জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতায় সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার বলেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাই বাংলাদেশে সরাসরি সংস্থাটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তবে ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় এনজিওর সাথে পার্টনারশীপে জনহিতকর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশনে ৮ জন কর্মকর্তা ও ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সীমিত আকারে বান্দরবান সদর উপজেলার সদর, কুহালং ও সুয়ালক এই তিনটি ইউনিয়ন ও বান্দরবান পৌরএলাকায় কৃষি বিষয়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও দুর্যোগকালীন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করে আসছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ২৮০ জন ওয়ার্ল্ড ভিশনের স্পন্সর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থিক ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছিল।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সংস্থাটির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসময় দেখা যায়, ওই মাঠে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাই এসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সরাসরি কর্মকাণ্ড বান্দরবানে বন্ধ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বান্দরবানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। একই সাথে তারা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অন্যসব এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এ খবরে আলোচ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিও’র কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা সরকারি আদেশ, বড় মাপের একটি সিদ্ধান্ত। বর্তমান সরকার বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। জাতীয় স্বার্থে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
 
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত না করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপণের ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার নানা ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সেখানে চিহ্নিত করে দেশবাসী বিশেষ করে গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের ‘আদিবাসী’ শব্দ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বর্তমান সরকারের এ দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সরাসরি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর সুফল ঘরে তুলতে পারেনি সরকার। এর কারণ সরকারের কিছু উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, মহাজোটের শরীক কিছু নেতার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড। সরকারের দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তিবর্গ এমন কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। জনসংখ্যা সীমিত হলেও জনবৈচিত্র্য বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সম্পদে সে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজার ও এর পদচুমে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বের দৃষ্টিতে লোভনীয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বশক্তির রয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও লোলুপ দৃষ্টি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সেনসেটিভ ভূখণ্ড এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেকারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কাছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুদুরপ্রসারী।
 
ooo 
 
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এডহক নীতি ও অনেকক্ষেত্রে খামখেয়ালীপনার ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির সময় যেমন পুনর্বাসনের কথা চিন্তা করেননি, ঠিক তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তৈরির সময় ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি মৃত আইন- হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়ালকে জীবিত করেছেন। এমনকি এ আইন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, কর্তৃত্ব ও সংবিধানকে সুবিবেচনা করা হয়নি। সে কারণেই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটে উচ্চ আদালত জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছেন। এরশাদের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে জেএসএস’র সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন সেই শান্তিচুক্তি করেছে বিএনপি তাকে ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষমতায় গেলে তা বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে প্রবল আন্দোলন করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও যখন শান্তিচুক্তি করেছে তখন সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের চেয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তিকেই হয়ত বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে আদালতের স্টে অর্ডারের স্যালাইন দিয়ে শান্তিচুক্তিকে এখন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে কিন্তু ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বাতিল করেনি, বরং তারাই এচুক্তি সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে।
 
‘আদিবাসী’ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে এক ধরনের সমর্থন ছিল সবসময়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও এই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগই। এ বিষয়ে ভারতীয় সমর্থন পাওয়ার ফলেই সরকারের পক্ষে এমন শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের পার্বত্য নীতি স্পষ্ট হলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক বন্ধু পাওয়া সম্ভব।(যদিও সিএইচটি নিয়ে ভারতের সব নীতিই আমাদের স্বার্থানুকূল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই)।  কিন্তু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে ঢালাওভাবে বহু নিরাপত্তা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন কার্যত পাহাড়ী চাঁদাবাজ, অপহরণকারী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেকারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদটি পাহাড়ীদের দখলে থাকলেও সচিব পদটিতে বাঙালি আমলার পদায়ন হয়েছে সব সময়। ফলে সরকারী কার্যক্রম ও নীতিতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মন্ত্রীর পাশাপাশি সচিব পদেও পাহাড়ী পদায়ন করায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যত, একটি ভারসাম্যহীন একপেশে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানে।
 
এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী নীতি পরিবর্তন হয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের সাথে সাথেও সেখানে নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২-৩ বছরের দায়িত্ব পালনকালে যে নীতি অনুসরণ করেন পরবর্তী কর্মকর্তা এসে তা সম্পূর্ণ উল্টে দেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও সহাবস্থান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা। আদালত শান্তিচুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বেশিরভাগই অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়ার পর ভূমি কমিশনও অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে, এমনটাই মতামত ছিল দেশের প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের। বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অতি আগ্রহে যখন ভূমি কমিশন একতরফাভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন স্বভাবতই বাঙালিরা ভূমি কমিশন বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দালন গড়ে তোলে। সেসময় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করলেন, সরকারেরও মুখ রক্ষা করা দরকার। ব্যাস, বাঙালিদের একটি অংশের হাতে ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের একটি ড্রাফট তুলে দিয়ে সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসিয়ে দিলেন। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা, সংবিধান, সরকারি কর্তৃত্ব, আদালতের এখতিয়ার বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠান বাতিল না হয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি হলো। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক নৈরাজ্য, বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। এমনও দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বপালনকালে কোনো এক সরকারী কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালবেসে এর উপর দুটি বই লিখে ফেলেন ছদ্মনামে। তথ্যবহুল ও গবেষণামূলক এই বইটি প্রচারে তখন সরকারীভাবে ব্যাপক প্রমোট করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বইটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ বইটিই অত্যন্ত মেধাবী এ কর্মকর্তার চাকুরী অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় প্রায় সকল সরকারী অফিসেই বইটি অনুসৃত হয়। এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভালবেসে কিছু করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতি না থাকার কুফল এটি।
 
সিএইচটি নিয়ে যে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ভারতের সেভেন সিস্টার্সও তার অন্তর্ভূক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সরকার সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সরাসরি কার্যক্রম বা ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বন্ধ করে দিয়েছে।  সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত সরকার বা ভারতীয় এনজিও। কিন্তু বাংলাদেশে এসব আন্তর্জাতিক এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কার্যক্রম ও অর্থ পরিচালনার কোনো হিসেব বাংলাদেশ সরকারকে দেয় না। এমনকি তাদের মিটিংগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ঢুকতে দেয় না। কেউ ঢুকলেও পরিচয় পেলে অপমান করে বের করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যান্য এনজিও ও দাতা সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাম্য। অথচ একই সময়ে সরকারের কোনো কোনা মন্ত্রী ইউএনডিপির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল বিতর্কিত দাতা সংস্থার কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধির জন্য ডিও লেটার পাঠাচ্ছে তাদের আবাসিক কার্যালয়ে এবং তা সাথে সাথে গৃহীতও হয়েছে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতির অভাবেই এমনটি ঘটছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদের কথাই কেবল দেশবাসী জেনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আট লক্ষাধিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড়জোর হাজার দশেক লোক এই বিভেদের সাথে জড়িত। এরা ইউপিডিএফ, জেএসএস’র সন্ত্রাসী ও মতলববাজ এনজিও কর্মী। বাকি সকল উপজাতি সদস্য কিন্তু শান্তিপ্রিয়, পাহাড়ী বাঙালি সহাবস্থানে বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। কিন্তু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য হয় সন্ত্রাসীদের সেখানো বুলি প্রচার করতে, তাদের গাইডেড পথে চলতে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাঙালীদের থেকেও বেশি ঘৃণা করে। কারণ বাঙালিদের থেকে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসের/ চাঁদাবাজির শিকার। সিএইচটিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা নানা কায়দার বিভেদ ছড়িয়ে দিয়ে একটি বাঙালী বিদ্বেষী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে অপচেষ্ট। অথচ এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়ে, ভালবেসে কাছে টানা হয়নি কখনো।বরং উপজাতি বলে সন্ত্রাসীদের পাল্লায় তুলে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভেদের দশভূজা জাগ্রত কিন্তু শান্তির বীণাপাণি নিদ্রা যায়। কোনো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সম্প্রীতি মিছিল চোখে পড়লেও সরকারী লোকেরা যেভাবে সে মিছিল চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে তাতে সম্প্রীতির থেকে সংশয় চোখে পড়ে বেশী।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে বেশি। এদের বেশিরভাগই মনে করেন বাঙালি ও সেনাবাহিনী সেখানে যত সমস্যার মূল। সন্দেহ নেই, তাদের বিভ্রান্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু সে বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা রাষ্ট্রিয় পর্যায় থেকে কি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে? ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে সেখানে মিডিয়া টিম পাঠানো হয়, বুদ্ধিজীবীদের কাউকে অনুরোধ করে লেখানো হয়। কিন্তু এ দেশের কতজন মানুষ জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে? কতজন জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অবস্থানের গুরুত্ব? কতজন জানে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কি করে? তাদের সেবা, ত্যাগ, কমিটমেন্টের কথা কতো জনের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে? কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে বলিউডে অনেক সিনেমা হয়েছে, হলিউডের কথা বললে তো একটি বই লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের অনেক ঘটনা গল্প ও ছবিকে হার মানায়। কিন্তু তার কথা দেশের কতজন মানুষ জানে। একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
 
কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো এডহক সিদ্ধান্তে সমাধান না খুঁজে একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি প্রণয়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ,  সিভিল ও সামরিক প্রশাসন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এ পার্বত্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে- যা সব সরকার ও সব ব্যক্তির জন্য অনুসরণযোগ্য ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখনই সময়। কারণ লেটার ইজ বেটার দ্যান নেভার।  
Email:palash74@gmail.com, সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব। (ইষৎ পরিবর্তিত)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক-২

মেহেদী হাসান পলাশ

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-  Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107),  আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) ,  এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে  The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.
এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention . অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী  বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি  নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে।-  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)–  এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’’. অর্থাৎ  একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিষ্কার বোঝা যায় এরা উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ্র উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে।

এখন আমরা ইনডিজিন্যাসের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করবো।  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)– এর আর্টিকল ১-এর (b)তে ইনডিডজিন্যাস বা আদিবাসীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, `peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions’.
অর্থাৎ আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে। এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে।
আইএলও কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টি পূর্ব থেকে বসবাস। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি এক। অর্থাৎ একজন উপজাতি আদিবাসী হবেন বা হবেন না উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে। এছাড়াও রয়েছে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples চার্টার। এটি এক্সক্লুসিভলি আদিবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, উপজাতিদের নয়।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)-  ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্য দিকে  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- – ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের  মাত্র ২২টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ যে দেশগুলো র‌্যাটিফাই করেছে তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশ যাদের প্রধান বা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত।
অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্টপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭, ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারের সিগনেটরি বা ভোটদানকারী নয়। এ থেকেই নিজ দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের নিজেদের অবস্থান এবং অন্যদেশের ‘আদিবাসীদের’ জন্য কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। উল্লিখিত চারটি দেশ শুধু ইউএন চার্টারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাই নয় বরং অধিবেশনে তাদের প্রতিনিধিরা এই চার্টারের প্রবল সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছে।

এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যেসকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার। কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR  শব্দদ্বারা বা অথবা শব্দ দ্বারা বিভক্ত।
আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখ- ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তর বঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারামা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিÍত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়।

অন্যদিকে উয়ারী বটেশ্বরের সমৃদ্ধ নাগরিক সভ্যতার কথা কিম্বা মেগাস্থিনিস ও টলেমির কিতাবে গ্রীক বীর আলেকজাণ্ডরের মনে ভীতি ছড়ানো গঙ্গরিড়ঢ়ী সভ্যতার কথা যারা জানেন তারা কখনোই চাকমা মারমা সাঁওতালদের প্রি-কলোনিয়াল বলতে পারেন না। চাকমাদের আলোচনায় অনেকে বৌদ্ধ-মুসলিম ইতিহাস টানেন যা অপ্রয়োজনীয় কুতর্ক। সেন রাজাদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে বাংলায় মুসলিম আগমন বৌদ্ধ সম্প্রদায় কর্তৃক স্বাগত হয়েছিল। এক কথায় বাংলাদেশের প্রি কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে এখানকার অনার্য জনগোষ্ঠী, ইতিহাসবিদরা যাকে প্রাকৃতজন বা প্রাকৃত জনগোষ্ঠী বলে আখ্যা দিয়েছেন। শত শত বছর ধরে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান নানা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যদিয়ে পরিবর্তিত হয়ে নানা ধর্মে বিভক্ত হয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি পরিচয়ে টিকে থাকা মূল জনগোষ্ঠী।

এখন খুব সংক্ষেপে আইএলও কনভেনশনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, আইন ও রাজনৈতিক বিষয়ের দিকে আলোকপাত করা যাক। বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলো শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক ও আইনি কাঠামো মেনে চলছে না। একই সাথে পরির্বতন এসেছে ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ধারাতেও। রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানেরও পরিবর্তন হয়েছে। শুরুতেই চাকমাদের নিয়ে কথা বলা যায়। চাকমাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক কাঠামো কোনো কালে ছিল বলে ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। বর্তমানে চাকমারা প্রাচীনকালের বিভিন্ন চাকমা রাজার নানা বীরত্বগাথার কথা বলে থাকেন। চাকমাদের লেখা বইতেই বলা হচ্ছে, এগুলো কিংবদন্তী। কিংবদন্তী ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে কিন্তু ইতিহাস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত নয়। মোগল আমলে বিভিন্ন মুসলিম নামধারী চাকমা রাজার ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু তারা মোগল সুবাদার, চাকমা নয়। চাকমারা তাদের রাজা মেনে নিয়েছিল ও মানতে বাধ্য হয়েছিল। আজকের চাকমা রাজার কাঠামোটি ব্রিটিশদের দেয়া। এর প্রকৃত নাম সার্কেল চিফ। কার্যত তা কালেক্টর বা প্রধান খাজনা আদায়কারী। মোগল বা ব্রিটিশরা তাদের রাজা বলে কোনো সনদ দেয়নি। ব্রিটিশ সরকার সমতলের জমিদারদের জমিদারী দিলেও সার্কেল চিফদের জমির মলিক ছিল ডিস্ট্রিক্ট সুপরিন্টেন্ড তথা সরকার। কিন্তু খাজনা আদায়ের দায়িত্ব পেয়ে চাকমা সার্কেল চিফ নিজেকে সামন্ত রাজায় পরিণত করেন খাজনা আদায়ের নানা আচার যোগ করে। সাম্যবাদী এমএন লারমা শুরুতে এই সামন্ততন্ত্রের শোষণ থেকে উপজাতীয় জনগণকে মুক্তি দিতে সমাজতান্ত্রিক (বামধারা) আন্দোলন শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিক ভুল না করলে এমএন লারমাকে বিশ্ব হয়তো সাম্যবাদী নেতা হিসেবেই চিনতো। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধান ইতিহাসের গতি পাল্টে দিলেও সন্তু লারমা ও দেবশীষ রায়ের সেই দূরত্ব এখনো বিদ্যমান ভেতরে ভেতরে। কিন্তু এমএন লারমার প্রতিষ্ঠিত জেএসএস বা পরবর্তীকালের ইউপিডিএফ কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক কাঠামো নয়, এটি অঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো। তাছাড়া সকল উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এখন বিএনপি, আওয়ামী লীগের মতো বাংলাদেশের মূল ধারার রাজনীতির সাথে জড়িত। এভাবেই চাকমা সমাজদেহেও নানা পরিবর্তন এসেছে।

অন্যদিকে উপজাতীয় সংস্কৃতি প্রধানত ধর্ম থেকে উৎসারিত। কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা বাদে অন্যান্য উপজাতীয় জনগোষ্ঠী গড়ে ৯০ ভাগ ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। মারমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যেও প্রায় ৫০ ভাগ খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। চাকমাদের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা কম। কিন্তু চাকমাদের আদি ধর্ম বৌদ্ধ নয়। ব্রিটিশ আমলে রানী কালিন্দী রায়ের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করার আগে চাকমা রাজারা মুসলমান ছিল। মোগল আমলের পূর্বে তাদের নিজস্ব ধর্ম পালন করতো। এভাবে ধর্ম পরিবর্তনের সাথে সাথে উপজাতি জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আচার, রীতিতে পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তির প্রভাবেও পাল্টে গেছে জীবনযাপনও। কয়েকটি অনুষ্ঠান ছাড়া নাগরিক ও সচ্ছল উপজাতিদের নিজস্ব পোশাকের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় না। সেখানকার মিশনারীরাও ধর্মান্তরিত উপজাতিদের পূজা আর্চায় বাধা দেয় না ‘আদিবাসী’ তকমা ধরে রাখার জন্য।

মাইকেল সঞ্জীব দ্রং আদিবাসী নেতা হতে পারেন কিন্তু কোনো উপজাতি যদি ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন তাহলে তিনি আদিবাসী হওয়ায় যোগ্যতা হারান। যদিও খ্রিস্ট ও বৌদ্ধ ধর্ম সংখ্যাতাত্তিক বিচারে ইসলামের থেকে বৃহৎ ধর্ম। একইভাবে নিজস্ব বর্ণমালার কথা বলে বাংলা বর্ণমালা বর্জন করলেও ইউরোপীয় বর্ণমালাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। যদি আদিম পদ্ধতিতে জীবনযাপনের কথা বলা হয়, তাহলে পৃথিবীর আদিম পেশা হচ্ছে কৃষি ও শিকার। সে বিচারে বাংলার কৃষক ও জেলেদের আদিবাসী বলতে হয়। এককথায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিচারেও বাংলাদেশের উপজাতিরা আদিবাসী নয়।

এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটা বিপুল অংশ নিজেদের আদিবাসী মনে করেন না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ এই আদিবাসী তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। তারা আদিবাসী দিবস পালনও করে না। ইউপিডিএফ’র অন্যতম শীর্ষ নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা এক সাক্ষাৎকারে আমাকে একথা পরিষ্কার করে বলেছিলেন তারা আদিবাসী কনসেপ্টে বিশ্বাসী নন। তবে উপজাতি শব্দের প্রতিও তাদের আপত্তি আছে। তাদের মতে বাংলাদেশে অনেক জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। যেমন বাঙালি একটি জাতি তেমনি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতিও এক একটি জাতি। সন্তু লারমার ঘনিষ্ঠদের সাথে কথা বলে জেনেছি, তিনিও শুরুতে এই আদিবাসী কনসেপ্টের সাথে একমত ছিলেন না। এখনও তার কাছে এটি মুফতে পাওয়ার মতো একটি বিষয়। আদিবাসী বিষয়টি একান্তভাবে সার্কেল চীফ দেবাশীষ রায়ের কনসেপ্ট।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চাটার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে মেনে নিলে সমস্যা কোথায়? কিম্বা এই আদিবাসী বিতর্কের সমাধানই বা কিভাবে সম্ভব? সেটা এক বিস্তর আলোচনা হবে অন্য কোনো দিন।

সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

 

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মেহেদী হাসান পলাশ

আগামীকাল ৩ আগস্ট এ বছরের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের মূল অনুষ্ঠান পালিত হবে বাংলাদেশে। ঈদের ছুটির কারণে কেন্দ্রীয়ভাবে ৯ আগস্টের বদলে আদিবাসী দিবসের কর্মসূচি কিছুটা এগিয়ে এনে পালন হচ্ছে। জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী দিবসে এবারের শ্লোগান হচ্ছে, “আদিবাসী জাতিসমূহের অধিকার সংক্রান্ত সকল চুক্তি ও অঙ্গীকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন!”

ঢাকা রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটে দিবসের কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন রাশেদ খান মেনন, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আদিবাসী ফোরামের সভাপতি ও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা।

বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি। বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর এক দশকের। ইস্যুটি পুরাতন না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি।

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর যে অংশটি নিজেদের হঠাৎ আদিবাসী বলে দাবী করতে শুরু করছে তারা কিন্তু বছর দশেক আগেও নিজেদের এ পরিচয়ে পরিচিত করাতে চায়নি। উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা নিজ জাতির পরিচয়েই তারা পরিচিত হতে চেয়ে দাবী করে আসছিল দীর্ঘ দিন ধরে। এরকম হঠাৎ করে আদিবাসী হয়ে যাওয়ার নজির বিশ্বে আর নেই। আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসাবে বিশ্বে যারা সুপরিচিত, যেমন, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা প্রভৃতি সুপ্রাচীন কাল থেকেই আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে সুপরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু অংশ যারা ১৯৯৭ সালেও নিজেদের উপজাতি বলে জাতীয়ভাবে পরিচিত করিয়েছে তারা হঠাৎ করে সেলফ প্রমোশন নিয়ে একবিংশ শতকের শুরু থেকে নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করতে শুরু করে। এমনকি দেশের মধ্যে বসবাসকারী যাযাবর ও তফসিলী সম্প্রদায়গুলোকেও তারা আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত করে নিয়েছে। আর এভাবে দাবী করা হচ্ছে বাংলাদেশে ৭৫টি (মতান্তরে ৪৫টি) আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

বাংলাদেশের  আত্মঘাতী মিডিয়া ও সুশীল সমাজের একটি অংশের জোরালো সমর্থন ও আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তারা এরই মধ্যে সরকারের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে একক বাঙালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী সরকারও তাদের দাবীর কাছে আংশিক নতি স্বীকার করে সংবিধানে তাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর এই সুযোগে তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী (উপজাতি বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হবার বৈশিষ্ট্যধারী নয়) নিজেদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা হিসেবে স্বীকৃতি মুফতে পেয়ে গেছে। অথচ একই জনগোষ্ঠীগুলো মূল অংশ ভারতে এখনো সাংবিধানিকভাবে তফসিলী সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত ও সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

আদিবাসী বিতর্কের সমাধানে প্রথমেই আমাদের আদিবাসীর সংজ্ঞা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। আদিবাসী বিষয়ে দুধরণের সংজ্ঞা পাওয়া যায়। একটি আভিধানিক সংজ্ঞা এবং অন্যটি জাতিসংঘের অধীনস্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সংজ্ঞা- যা জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত। প্রথমেই আমরা আভিধানিক সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

 আদিবাসীর সংজ্ঞা কী?

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people.  অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine  শব্দের অর্থ বলা হয়েছে Ôa member of a race of people who were the original living in a country, especially AustraliaÕ. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:

Aborigine: noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous: belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/ indigenous area. Aborigine: earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous: adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).

 অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে: দেশী, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছেÑ যার অর্থ বহিরাগত। অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশী, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র।

 এখন ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার বাংলাদেশে যারা নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করছেন তারা কতোটা ‘স্বদেশজাত’ বা ‘ভূমিপুত্র’।

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে দেশী বিদেশী অনেক পুস্তকের রেফরেন্স নেওয়া যায়, কিন্তু এ আলোচনায় মাত্র দুটি পুস্তককে রেফরেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হলো। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলা পিডিয়া এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের আদিবাসীঃ এথনোগ্রাফীয় গবেষণা।

এ বই দুটি নির্বাচনের কারণটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়াতে এ সংক্রান্ত এন্ট্রির শিরোনাম ‘আদিবাসী’- রচয়িতা বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক, আদিবাসী বিষয়ক জাতীয় কোয়ালিশনের মুখপাত্র, আন্তর্জাতিক সিএইচটি কমিশনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। অন্যদিকে দাতা সংস্থা অক্সফামের সহায়তায় বাংলাদেশের আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রকাশিত তিন খণ্ডের বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা বইটির প্রথম খণ্ডের গবেষণা ও সম্পাদনা করার কাজটি করেছেন, মঙ্গল কুমার চাকমা, জেমস ওয়ার্ড খকশী, পল্লব চাকমা, মংসিংঞো মারমা, হেলেনা বাবলি তালাং। পুস্তকটির ৫ সদস্যের রিভিউ কমিটির মধ্যে আছেন বাংলাদেশে আদিবাসী আন্দোলনের প্রবর্তক ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং। লেখার পরিসর চিন্তা করে এ লেখায় শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠিগুলোর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।

 চাকমা

1356_487607401320978_1904084497_n

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী দাবীদার জুম্ম জনগোষ্ঠীর অন্যতম চাকমা জনগোষ্ঠী।  তিন পার্বত্য জেলাতেই চাকমাদের বসবাস রয়েছে। চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপজাতীয় জনগোষ্ঠী। তবে রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সবচেয়ে অধিক চাকমা বসবাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন পার্বত্য জেলায় চাকমাদের  মোট জনসংখ্যা ২,৩৯,৪১৭ জন । ঐ সময় রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ভারতের  ত্রিপুরা  রাজ্যে প্রায় ৬০ হাজার চাকমা শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছিল বলে অভিযোগ করা হয়ে থাকে- যাদের গণনায় অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। বাংলাপিডিয়া মতে, আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিষ্টব্দের দিকে পর্তুগিজ মানচিত্র প্রণেতা লাভানহা অঙ্কিত বাংলার সর্বাপেক্ষা পুরাতন ও এ পর্যন্ত অস্তিত্বশীল মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই চাকমাদের সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়। কর্ণফুলীর নদীর তীর বরাবর চাকমাদের বসতি ছিল। চাকমাদের আরো আগের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি তাত্ত্বিক অভিমত প্রচলিত। উভয় অভিমতে মনে করা হয়, চাকমারা বাইরে থেকে এসে তাদের বর্তমান আবাসভূমিতে বসতি স্থাপন করে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তাত্ত্বিক অভিমত অনুযায়ী, চাকমারা মূলত ছিল মধ্য মায়ানমারের আরাকান এলাকার অধিবাসী। তবে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, কিংবদন্তী অনুযায়ী অতীতে চাকমারা চম্পকনগর নামে একটি রাজ্যে বাস করত। চম্পক নগর ত্রিপুরা রাজ্যেরই কাছাকাছি কোন জায়গায় অবস্থিত ছিল।  এ ব্যাপারে নানা সাক্ষ্যও পাওয়া যায়। অশোক কুমার দেওয়ানের অনুমানে উত্তর ত্রিপুরার কোন স্থানে বসবাসকারী চাকমারা সেখানে আনুমানিক দুশ থেকে আড়াইশ বছর কাল অতিবাহিত করার পর পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ত্রিপুরা থেকে দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পূর্বদিকে সরে আসতে থাকে এবং পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকেই পার্বত্য চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এবং তার উপনদীসমূহের উপত্যকা ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই হিসাব অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের আগমন ৫০০ বছরের বেশি নয়।

চাকমা রাজবংশের ইতিহাস অনুযায়ী বিজয়গিরিকে ১ম রাজা ধরলে ৩২/৩৩ তম রাজা হচ্ছেন অরুণযুগ (ইয়াংজ )। তার শাসনকাল আনুমানিক ১৩১৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। চাকমা ঐতিহাসিকদের মতে অরুণ যুগের পতনের পরপরই অর্থাৎ ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে চাকমারা বার্মা থেকে চট্টগ্রামে বা পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করেন ।

খুমি

পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এই তিন উপজেলায় খুমীরা বসবাস করে। ২০০৬ সালে সিঅং খুমী ( একজন সাংস্কৃতিক কর্মী) এর নেতৃত্বে এক জরিপ পরিচালনা হয়েছিল। সে জরিপ অনুযায়ী খুমী জনসংখ্যা  ছিল ২০৯৪ জন ।

বাংলাপিডিয়া মতে, সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে খুমিরা আরাকান থেকে বাংলাদেশে আসে। খ্যাং উপজাতি তাদেরকে আরাকান থেকে বিতাড়ন করে। তবে এখনো কিছু খুমি আরাকানের কোলাদাইন নদীর তীরে বসবাস করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, খুমি আদিবাসীরা মূলত মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীভুক্ত একটি দল। তারা তিব্বতি বার্মিজ-কুকি-চীন ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশে খুমি নৃ-গোষ্ঠীর আগমন বার্মার চীন প্রদেশ থেকে। এই চীন হিলস প্রদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ সালে আরাকান প্রদেশ থেকে আলাদা হয়ে নামকরণ করা হয় চায়না হিলস। অনেকের মতে, সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে খুমীরা চায়না হিল (তৎকালীন সময়ে আরাকান প্রদেশ নামে পরিচিত) থেকে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করে। খুমি আদিবাসীরা সার্মথাং(Samthang) গোত্রের পূর্ব-পুরুষদের মৌখিক (অলিখিত) ইতিহাস থেকে জানা যায় যে খুমিরা বাংলাদেশে আট পুরুষ(বংশধর) ধরে বসবাস করছে ।

চাক

বান্দরবান পার্বত্য জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে সর্বদক্ষিণ প্রান্তে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের সীমানা বরাবর অবস্থিত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় চাকদের আবাসস্থল। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদন অনুসারে চাকদের লোকসংখ্যা ২০০০ জন । বাংলাপিডিয়া মতে, কয়েক শতাব্দি আগে মায়ানমারের ইরাবতী নদীর উজান অঞ্চল থেকে এরা আরাকান দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, বাংলাদেশের বাইরেও বিভিন্ন দেশে যেমন: ভারতের মনিপুর ও অরুণাচল, মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ, মধ্য বার্মা (রোহমা পর্বতের পাদদেশে ), উত্তর ও দক্ষিণ বার্মা এবং লাওসে বিচ্ছিন্নভাবে চাক জনগোষ্ঠীর বংশভুক্ত প্রাচীন আদিবাসী আছে। ইতিহাসে জানা যায়, হিমালয়ের দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের পামির মালভূমি চাকদের উৎপত্তিস্থল । ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে চাকরা বংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। প্রায় তিনশত বছর আগে (সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ্বে) ক্যউ বলী নামে এক পরাক্রমশালী চাক ব্যক্তির নেতৃত্বে গুটিকয়েক পরিবার নিয়ে বর্তমান বাইশারীতে চাষাবাদ ও ক্ষেত খামার শুরু করে। পরবর্তীতে  ম্রাসাঅং রোয়াজা, ধুংরী মহাজন, ক্যজরী মহাজন, থোয়াইঅং মহাজন, অংগাইজাই চাক প্রমুখ ব্যক্তিগণ ও বাইশারীতে এসে ক্যউ বলীর সাথে একত্রিত হয় এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজ পর্যন্ত ঐ খানে বাস করছে।

ত্রিপুরা

বাংলাদেশের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস করে। তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী সমতল এলাকার কুমিল্লা, সিলেট, বৃহত্তর চট্টগামের বিভিন্ন উপজেলা, রাজবাড়ি, চাঁদপুর, ফরিদপুর ইত্যাদি অঞ্চলেও বর্তমানে বসবাস করে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে একসময় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী যে সবর্ত্র ছিল ১৮৭২ ও ১৮৮১ সালের আদমশুমারী প্রতিবেদন পরীক্ষা করলে তার প্রমাণ মেলে। ১৮৭২ সালে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যা ছিল ১৫,৬৩২ জন যা ১৮৮১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮,৫০৯ জনে। বর্তমানে বাংলাদেশে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা অনেকেই মনে করেন দুই লক্ষের কাছাকাছি। তার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ত্রিপুরাদের জনসংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। বাংলাপিডিয়া মতে, এরা ছিল বর্তমান বারীয় রাজ্য ত্রিপুরার পার্বত্য এলাকার অধিবাসী। পরবর্তীতে এরা নিজ এলাকা ছেড়ে বাংলাদেশের মূলত কুমিল্লা, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করে। অনেকের মতে, টিপরারা আসাম, বার্মা এবং থাইল্যাণ্ডের অধিবাসী সাধারণ এক উপজাতির পূর্বপুরুষ বডো জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, এ জাতির মূল অংশ বাস করছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে। ত্রিপুরা রাজ্য ছাড়াও ভারতের মিজোরাম , আসাম প্রভৃতি প্রদেশেও অনেক ত্রিপুরা বাস করে। মিয়ানমারেও ত্রিপুরাদের জনবসতি আছে বলে জানা যায়। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস থেকে জানা যায় আনুমানিক ৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুই বংশের সময়কালে পশ্চিম চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যাকা হচ্ছে এদের প্রাচীন আবাসস্থল। পরবর্তীতে এই জনগোষ্ঠী ভারতের আসাম হয়ে বর্তমান বসতি অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে এবং রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে  বলে ইতিহাস সূত্রে জানা যায়।

 পাঙ্খো

 সাধারণত পাঙ্খোয়ারা উঁচু পাহাড়ের উপরে বসবাস করতে পছন্দ এবং সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় বিলাইছড়ি ইউনিয়নে পাঙ্খোয়া পাড়া এবং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার সাইজাম পাড়া ও নানখারপাড়া (বড়থুলী) প্রভৃতি স্থানে পাংখোয়াদের বসবাস রয়েছে। রাঙ্গামাটি সদর থানার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব পাড়ে ১৬১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বসন্তমোন- এ অবস্থিত পাংখোয়া পাড়াটি সবচেয়ে পুরোনো। ২০০ বছরেরও আগে তারা এখানে বসতি স্থাপন করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী পাংখোয়া জনসংখ্যা ৩২২৭ জন। তবে বর্তমানে পাংখোয়াদের মোট জনসংখ্যা ৪০০০ জন হতে পারে  বলে পাংখোয়ারা মনে করে। 

বাংলাপিডিয়া মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উপজাতিকে মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর একটি উপশাখা বলে মনে করা হয়। এদের আদি নিবাস সম্ভবত ব্রহ্মদেশ(মায়ানমার)। সেখান থেকে কোনো কারণে বিতাড়িত হয়ে কয়েকশ’ বছর আগে তারা এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, পাংখোয়াদের বিশ্বাস অতীতে তারা লুসাই পাহাড়ের পাংখোয়া নামক কোন গ্রাম থেকে এসেছিল। মিজোরাম প্রাদেশিক দলিলপত্র ও মানচিত্রে ৫৬১১ নং পাংখোয়া গ্রামটির চিহ্ন উল্লেখ পাওয়া  যায়।  তারা বিশ্বাস করে যে, তারা বার্মার শান জাতির অংশ এবং দক্ষিণ দিক থেকে তারা এসেছিল।  তাদের মূল আবাসভূমি বর্তমান মিয়ানমারের চীন প্রদেশ। পণ্ডিতদের মতে, পাংখোয়ারা সেই অঞ্চল থেকে সরে এসে ক্রমান্বয়ে আরাকান ওলুসাই হিলসে বসতি স্থাপন করে এবং কালক্রমে ধীরে ধীরে  জীবন জীবিকার সন্ধানে পাংখোয়াদের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে।

 মগ

মারমা সম্প্রদায়ের অনেকের মতে মগ কোনো সতন্ত্র উপজাতি নয়, আরাকানবাসীর একটি উচ্ছৃঙ্খল দল মাত্র। ১৭৮৪ সালে বার্মা কর্তৃক স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মগদের বসতি গড়ে ওঠে। বার্মার সাথে আরাকানের সংযুক্তির পর বার্মার রাজা বোদাওপা এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। এর ফলে আরাকানের জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে দেশান্তরিত হয়। ব্রিটিশ সরকার তাদের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বার্মার এক সাবেক নৌ অফিসার ক্যাপ্টেন এইচ কক্সকে মগ বসতির জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়। তার নামানুসারে বাংলাদেশের সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের নামকরণ করা হয়। মগদের এরূপ আশ্রয় দান, ও তাদের লুটতরাজের ফলে ১৯২৪-১৯২৫ সালে প্রথম ইঙ্গ বার্মিজ যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যাতে বার্মা পরাজিত হয় এবং ১৮২৬ সালের ইয়ানদাবু চুক্তির ফলে আরাকান ও তেনাসারিম অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনভুক্ত হয়। এর ফল স্বরূপ, আরাকান থেকে দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে আগত শরণার্থীরা চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে একটা স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেয়। ক্রমে মাতামুহুরী উপত্যকার মধ্য দিয়ে তারা বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়ে। তৃতীয় দলটি সীতাকুণ্ডু অঞ্চল থেকে খাগড়াছড়িতে প্রবেশ করে। চতুর্থ দলটি বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে বৃহত্তর পটুয়াখালীর দক্ষিণ অঞ্চলে পৌছে এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলে।

 মারমা

 তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে মারমাদের সবচেয়ে বেশি লোক বান্দরবান জেলায় বাস করে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মারমা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হচ্ছে ১,৪২,৩৩৪ জন।  বাংলাপিডিয়া মতে, মারমা শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বার্মিজ শব্দ ‘মায়ানমা’ থেকে, যার অর্থ বার্মার অধিবাসী। মারমা জনগণের পূর্ব পুরুষগণ বার্মার পেগু নগরে বসবাস করতেন। আরাকান রাজার সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মহাপিন্নাগি ১৫৯৯ সালে বার্মায় একটি আগ্রাসন পরিচালনা করেন। তখন তারা বঙ্গীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা শ্রী সুধাম্মার ( শ্রীসুধর্ম ) মৃত্যুর পর তার এক অমাত্য নরপতি আরাকানের সিংহাসন দখল করে রাজপরিবারের সদস্য ও পণ্ডিতদেরকে মৃতুদণ্ড দিতে থাকলে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাতে থাকে। দেশের এই রাজনৈতিক দুর্যোগের সময় রাজার পুত্র নাগাথোয়াইখিন রাজপরিবারের সদস্যবর্গ ও পণ্ডিতদের নিয়ে রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যান। এসময় তিনি চট্টগ্রামের কাইসাঁ জায়গায় আশ্রয় নেন। প্রায় ৫০০০০ সৈন্য তাকে অনুসরন করে। কাইসাঁ  বা কর্ণফুলী নদীর তীরে বাস করতে থাকে।  নাগাথোয়াইখিন কাইঁসা অঞ্চলের শাসক  হিসেবে  বা  ম্রাইমাগ্রি মাঙঃ বা ম্রাইমাগ্রিদের রাজা  হিসেবে পরিচিতি পান। আরাকানের নতুন রাজা নাগাথোয়াইখিন এর অবস্থান জানার পর শত্রুতার পথে না গিয়ে তাকে কাইসাঁ অঞ্চলের শাসক হিসেবে স্বীকিৃতি দেন।১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা থেকে আরাকানি শাসনের পতন হলে মোগল শাসণাধীনে মারমাদের পেলেংসা: গোত্র মোগলদের কর প্রদানের  মাধ্যমে নিজেদের স্থায়ী আবাসভূমি গড়ে তুলেছিল। ১৭৮২  সালের দিকে তারা পেলেংসা: রাজবংশের পূর্বসূরী ম্রাচাই ধাবইং এর নেতৃত্বে সীতাকুন্ড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ধাবইং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে কার্পাস মহলের কর আদায়ের চুক্তি অনুসারে ঐ এলাকার চিফ পদ লাভ করেন।

 মুরং

তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে ম্রোরা শুধু বান্দরবান জেলায় বাস করে। মুরংরা ছিল আরাকানের একটি সুপরিচিত জনগোষ্ঠী। দুই মুরং রাজা আ-মিয়া-থু(৯৫৭)এবং পাই ফ্যু(৯৬৪) দশম শতাব্দিতে আরাকান শাসন করেন। সে সময় আরাকানের রাজধানী ছিল ওয়াথালি। কোলাদাইন নদীর তীরে খুমি উপজাতির সঙ্গে মুরংদের এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। যুদ্ধে খুমিরা মুরংদের পরাজিত করে আরাকান থেকে বিতাড়ন করে। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে মুরংরা পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে আসে। আরাকন রাজাদের ধারা বিবরণী রাজওয়াং-এ বলা হয়েছে দ্বাদশ শতাব্দিতে আরাকানের রাজা দা থা রাজাকে(১১৫৩-১১৬৫) ‘মহামুণি মূর্তির’ অবস্থান খুঁজে বের করতে দু’জন ম্রো সাহায্য করেছিলেন। চতুর্দশ শতকে খুমি নামে একটি শক্তিশালী উপজাতি ম্রোদের আরাকান থেকে বিতাড়িত করলে তারা বান্দরবানের পার্বত্য অঞ্চলে চলে আসে এবং মাতামুহুরী নদীর তীর বরাবর সাঙ্গু উপত্যকার পশ্চিমে বসতি স্থাপন শুরু করে। তৎকালীন বার্মা রাজা কর্তৃক চট্টগ্রামের জেলা প্রধানের কাছে লিখিত এক চিঠিতে এর সমর্থন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকের মতে,  ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, ম্রো (মুরং) নামে একটি জনজাতি যারা পূর্বে আরাকান হিলস-এ বাস করত তারা প্রধানত এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সাঙ্গু নদীর পশ্চিমে এবং মাতামুহুরী নদী বরাবর বাস করে। তারা নিশ্চিত করে খুমিরা তাদের আরাকান থেকে বের করে দেয়।  মুরংরা বর্তমানে বোমাং রাজার প্রজা। বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক স্যার আর্থার ফেইরি তার বিখ্যাত  ‘বার্মার ইতিহাস’ গ্রন্থে জানান যে, এটা একটি জনজাতি বর্তমানে তাদের প্রাচীন রাজ্য থেকে কমে গেছে। তারা এক সময় কোলদান নদী ও এর উপনদীতে বাস করত। কিন্তু খুমি জনজাতি কর্তৃক ধীরে ধীরে বিতাড়িত হয়ে তারা পশ্চিমে স্থানান্তর হয়েছিল এবং আরাকান  ও চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী এলাকায় বসতি গড়ে তোলে।

 লুসাই

লুসাইগণ বর্তমানে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি থানার সাজেক উপত্যাকায় বাস করে। তবে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায়ও খুব অল্প সংখ্যক লুসাই বাস করে। সিলেট জেলাতে ও লুসাইদের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের লুসাইদের সংখ্যা আনুমানিক ১০০০-এর মত। বাংলাপিডিয়া মতে, লুসাইদের পূর্বপুরুষরা মিজোরামে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে, সেখান থেকেই তাদের কোনো কোনো দল বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিল। একই সময়ে তাদের স্বগোত্রীয় লোকজন বার্মায়ও গিয়ে পৌঁছে। বাংলাদেশের আদিবাসী: এথনোগ্রাফিয় গবেষণা পুস্তকে লুসাইদের বিষয়ে বলা হয়েছে, লুসাই হিল লুসাই জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এককালে লুসাই হিল বর্তমানে মিজোরাম নামে পরিচিত । লুসাইদের পূর্বপুরুষেরা চিনলুং থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয় এবং নিজেদেরকে তারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর বলেই পরিচয় দেন।

অহমিয়া

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা যথাক্রমে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় অরণ্যময় পরিবেশে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর লোকজন সুদীর্ঘকাল ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে। এই অহমিয়া জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে আসাম হিসেবে বলা হয়ে থাকে। অহমিয়া বা অসমদের মূল জনগোষ্ঠী ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল আসাম রাজ্যে বাস করছে। মূলত অহমিয়া জনগোষ্ঠীর নামে ভারতের উক্ত প্রদেশের নাম আসাম নামকরণ হয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃক আসাম দখলের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তার শাসনকার্য পারচালনা এবং আরো বেশি বেশি পার্বত্যাঞ্চলে দুর্ধষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে আয়ত্তে আনার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর  অংশ হিসেবে অধীনস্থ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোক নিয়ে বিভিন্ন রেজিমেন্ট গঠন করে। তার মধ্যে আসাম রেজিমেন্ট ছিল অন্যতম । এই আসাম রেজিমেন্টের সৈনিক হিসেবে বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী অহমিয়া জনগোষ্ঠীর পূর্বসুরিরা এ অঞ্চলে আগমন করে ।

 খিয়াং

রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাজস্থলি, কাপ্তাই এবং বান্দরবান জেলার সদর, রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় খিয়াং জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৮১ এবং ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুসারে খিয়াং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা যথাক্রমে ৫৪৫৩ এবং ১৯৫০। দক্ষিণের টেম- চিন  বা উত্তরের ওয়াইল্ড চিন নামে অবহিত আরাকান ইয়োমা উপত্যাকার অববাহিকায় খিয়াংদের আদি নিবাস ছিল বলে অনেকে অভিমত ব্যক্ত করেন। প্রথম মতবাদে খিয়াংরা আরাকানের উত্তর ও দক্ষিণের ইয়োমা পর্বত হতে জীবন জীবিকা আরম্ভ করে। বার্মার (বর্তমান মিয়ানমারে) আকিয়াব, ক্যকপু এবং সানডোওয়ে জেলার পশ্চিমে তাদের বসবাস রয়েছে বলে জানা যায়। অন্য মতবাদে জানা যায়, বার্মার চীন হিলসের অধিবাসীদের খিয়াং বলা হয়। বার্মিজরা এদের চিনস আর আরাকানিরা  খিয়াং বলে ডাকে।

গুর্খা

গুর্খা জনগোষ্ঠীর লোকেরা রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার অর্ন্তগত মাঝের বস্তি, আসাম বস্তি, জেল রোড , কন্ট্রাক্টর পাড়া প্রভৃতি এলাকায় বাস করে। বান্দরবান জেলায় ও ৪/৫ টি গুর্খা পরিবার রয়েছে। সরকারি আদমশুমারীতে গুর্খা জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ নেই। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে গুর্খাদের সম্ভাব্য জনসংখ্যা ৩০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হয় । পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও বাংলাদেশের ঢাকা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট,  খুলনা, পটুয়াখালী প্রভৃতি  জেলায় অনেক গুর্খা বাস করে। গুর্খারা  তাদের  নাম গ্রহণ করে  ৮ম শতাব্দীর আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ গুরু গোরকনাথ থেকে। অতীতে দুর্গম পাহাড়-পর্বতময় জনপদের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশরা ছিল অসহায়। এমন অবস্থায় কৌশল হিসেবে তখন বাধ্য হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ নেপাল ও ভারত থেকে ২য় গুর্খা রেজিমেন্টকে লুসাই বিদ্রোহ দমনের জন্য এই এলাকায় নিয়ে আসে। প্রশিক্ষিত গুর্খাদের অসীম সাহস, দুধর্ষ তৎপরতা ও যুদ্ধ কৌশলের সামনে লুসাইরা তাদের অসহায়ত্ব বুঝতে পারে ও বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হয়। আর ব্রিটিশরাও পরবর্তীতে গুর্খাদের পার্বত্য এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়।

 তঞ্চঙ্গ্যা

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান বসতিগুলো রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার উত্তর পূর্বাংশে এবং  কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বসতি রয়েছে। ১৯৯১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রদর্শিত তঞ্চঙ্গ্যা জনসংখ্যা ১৯,২১৭ জন।

 তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্তমান বসতি স্থানসমূহের দিকে লক্ষ্য করলে অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে তারা দীর্ঘকাল আগে থেকে তাদের মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। বার্মার ইতিহাস, দান্যাওয়াদি আরে তবুং বা আরাকান ইতিহাস (অনেকে লেখেন দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং) অনুসারে এবং নৃতাত্ত্বিকদের গবেষণা থেকে এই সিদ্ধান্ত পাওয়া গিয়েছে যে, তঞ্চঙ্গ্যারা দাইনাক পরিচয়ে দান্যাওয়াদির (আরাকান) মূল অধিবাসী ছিল। তারা প্রথমে মাতামুহুরী নদীর উপনদী তৈনছং এ (তৈনছড়ি-মারমাদের  তৈনছং ) প্রথম বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে তারা কালক্রমে মাতামুহুরী অববাহিকা ধরে পশ্চিম দিকে সরে গিয়ে কিছু দক্ষিণে এবং কিছু পশ্চিমে চট্টগ্রামের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে উত্তর পূর্বদিকে স্থানান্তরিত হয়ে রাঙ্গুনিয়া অঞ্চলে এবং অবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে স্থায়ী হয়ে যায়।

 বম

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এবং মিয়ানমারের চীন প্রদেশে বম জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদর উপজেলায় এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় ৭০টি গ্রামে বমরা বাস করে। ২০০৩ সালের বম সোশাল কাউন্সিল বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত জরিপ অনুসারে বম আদিবাসীদের মোট সংখ্যা ৯৫০০ জন।

উনবিংশ শতকের পূর্বে এবং বিংশ শতকের বিভিন্ন লেখালেখিসমূহে বমদেরকে চীন জাতির উপশাখা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফায়েব, লুইন, বার্বি মিলস হাচিনসন গ্রীয়ারসনও অন্যান্য লেখকগণও একই মত পোষণ করেন। বমদের আদি নিবাস নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। বলা হয় চীনের চিনলুং এলাকার এক গুহা থেকে তারা এসেছে। বর্তমান স্থানে বমদের আগমন সপ্তদম শতকে। সবচেয়ে বড় কথা বছর দুয়েক আগে, সাবেক বোমাং রাজা চ্যানেল আই-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, বাংলাদেশে তারা আদিবাসী নন, তাদের পূর্ব পুরুষ আরাকান থেকে এসেছে।

 একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন, সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশত বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আগমন ঘটে। কাজেই উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়।

 এখন আদিবাসীর আরেকটি সংজ্ঞা, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ অনুসারে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ আদিবাসী হিসাবে পরিচিত হতে পারে কিনা তার বিবেচনা বাকি রইল। আগামী পর্বে ইনশাল্লাহ সে আলোচনা করা হবে।

Email: palash74@gmail.com

 সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব(পরিবর্ধিত আকারে)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

মে হে দী  হা সা ন  প লা শ

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলেই সমতলের অনেক বিজ্ঞজনকে বলতে শোনা যায়, ওটা তো পাহাড়িদের এলাকা। ওখানে বাঙালি নেয়া হলো কেন? বাঙালিরাই ওখানে যত সমস্যা সৃষ্টি করছে এবং এ কারণে তারা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকেও দায়ী করে থাকেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সমস্যার মূলে কি বাঙালিরা? প্রেসিডেন্ট জিয়াই কি একা বাঙালি পুনর্বাসনের ‘অপরাধ’ করেছেন?

আলোচনার প্রথমেই একটি কথা বলা প্রয়োজন, বাঙালিরা ‘তাড়া খেয়ে’, ‘পালিয়ে’, ‘যাযাবর হয়ে’ বা কারো ‘দয়ায়’ পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়নি। কারণ, বাঙালিদের জীবনধারণের উপযোগী স্থান সেটি নয়। কাজেই স্বেচ্ছায় তাদের সেখানে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তা সত্ত্বেও আদিকাল থেকে সেখানে বাঙালীদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল। অত:পর বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে নেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালিরা সেখানে বসবাস করতে গিয়েছে। গিয়ে মশা, ম্যালেরিয়া ও সাপের কামড়ে, শান্তিবাহিনীর আক্রমণে অনেকেই জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। পাহাড়কে আবাদ করেছে, মানুষের বাসযোগ্য করেছে, পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় করেছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেছে। বাঙালিরা যদি এই ত্যাগ স্বীকার করে সেখানে না যেতো, না থাকতো তা হলে কি হতো?

সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল নুরউদ্দীন সংসদে পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশের এই অংশ বহু পূর্বেই হাতছাড়া হয়ে যেত। শুধু এরা দু’জনই নন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকের আরো অনেকে এ কথা বলেছেন। কাজেই এ কথা পরিষ্কার যে, বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে গমন, অবস্থান ও আত্মদান রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্বের স্বার্থে।

ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে প্রাচীন মানচিত্র সেখানে বাঙালিরা সুপ্রাচীন কাল থেকেই বসবাস করতো। এর বাইরেও মোগল আমলে, ব্রিটিশ আমলে বাঙালিদের সেখানে গমনের ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে ১৯০০ সালের শাসন বিধি পাস হওয়ার পর বাঙালিদের আর সেখানে গিয়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ ছিল না। পাকিস্তান আমলে উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা বিশেষ করে কাপ্তাই বাঁধের কাজ করার জন্য প্রচুর সংখ্যক সেনা সদস্যও বাঙালিকে সেখানে পুনর্বাসন করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান তো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার মুখের উপর তাদের দাবিনামা ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘লারমা বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। তোরা কি মনে করেছিস, তোদের সংখ্যা ৪-৫ লাখ। প্রয়োজনে পনেরো, বিশ লাখ বাঙালি পাঠিয়ে তোদের উচ্ছেদ করে দেবো। …তোরা সব বাঙালি হয়ে যা।’ দলিলপত্র ঘাটলে দেখা যায়, পাকিস্তান আমলের মতো করে সেসময়ও বাঙালি ও সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিল।

কিন্তু পার্থক্য এই যে, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় তা ব্যাপকভাবে হয়েছিল এবং জিয়াউর রহমানকেও সেটা করতে হয়েছিল রাষ্ট্রের বিশেষ প্রয়োজনে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী ভারতের অভ্যন্তরে শান্তিবাহিনীর প্রশ্রয় ও মদদ বৃদ্ধি করেন। নতুন পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তিশালী হয়ে শান্তিবাহিনী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেরালো যুদ্ধ শুরু করে। তাছাড়া ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যখন ভারত ভাগ হয় তখন পার্বত্য প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী রাঙামাটিতে ভারতীয় পতাকা ও বান্দরবানে বার্মার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে পতাকা বেশ কিছুদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে উড়েছিল। ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রেয়োদাদ রায় প্রকাশিত হবার পর ২১ আগস্ট পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেই পতাকা নামিয়ে ফেলে। ১৭ আগস্ট র‌্যাডক্লিফের রায়ের পরও পাহাড়িরা প্রতিবাদ জানিয়েছিল রায়ের বিরুদ্ধে। সেই বিশেষ প্রেক্ষাপটে সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিয়াউর রহমানের পক্ষে ইতিহাসের এ ঘটনাবলী বিবেচনায় না নিয়ে উপায় ছিল না। এ প্রেক্ষাপটে বাধ্য হয়েই জিয়াউর রহমানকে অতিরিক্ত সৈন্য ও বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রেরণ করতে হয়েছিল।

এছাড়াও জিয়াউর রহমান এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করেন। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিক প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহীন পাহাড় অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক সরকারের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও পারতো না শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে। কারণ পাহাড়িরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বিরোধী ছিল।

অনেক ক্ষেত্রেই সে পরিস্থিতি আজো বদলায়নি। সন্তু লারমা এখনো পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু উন্নয়ন কর্মকা-ের বিরোধিতা করছেন। বাঙালি ছাত্র ও শিক্ষকরা পড়তে যাবে এই ভয়েই তার এ বাধা। এখনো সরকারি উন্নয়ন কর্মকা-ে কিছু পাহাড়ি ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার পাওয়া গেলেও শ্রমিকদের অধিকাংশই বাঙালি। বাঙালি শ্রমিক ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। কাজেই আজকে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে দেশি বিদেশি পর্যটকরা মুগ্ধ হন তার পেছনে রয়েছে বাঙালির শ্রম, ঘাম, রক্ত ও আত্মদান। এখানেই শেষ নয়; শিক্ষা, বৃক্ষরোপণ, উন্নত চাষাবাদ ও নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতাও পাহাড়িরা পেয়েছে বাঙালির কাছ থেকেই।

সরকার যদি বাঙালিদের সেখান থেকে ফিরিয়ে আনে তাতে বাঙালিদের ক্ষতি সামান্যই। কারণ সরকারকেই তাদের সকল সুবিধা ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমতলে পুনর্বাসন করতে হবে। কিন্তু পাহাড় থেকে যদি বাঙালিরা চলে আসে, তাহলে সেখানে সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকা- থেমে যাবে। পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ‘জুম্ম’ নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিদার সন্ত্রাসীদের হাতে। কাজেই বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান তাদের নিজেদের স্বার্থে ও প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেÑ একথা যারা বুঝতে চান না তাদের দেশপ্রেমিক বলার খুব বেশি সুযোগ নেই।

যাইহোক, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও চেষ্টা করেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধান করতে। ১৯৭৭ সালে তিনি ট্রাইবাল কনভেনশন গঠন করেছিলেন। তিনি এমএন লারমা ও সন্তু লারমার ভগ্নীপতি ও সংসদ সদস্য উপেন্দ্রলাল চাকমাকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছিলেন জনসংহতির সাথে আলোচনার জন্য। তিনি রাঙামাটিতে এ নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনাও করেছিলেন। শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও বন্দি সন্তু লারমাকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন ১৯৮০ সালে। কিন্তু মুক্ত সন্তু লারমা শান্তির পথে না গিয়ে মুক্তি পেয়েই ভারতে পালিয়ে যান এবং সেনাবাহিনী ও বাঙালিদের উপর আক্রমণ শুরু করেন। ফলে জিয়াউর রহমানের আমলে শান্তির সুবর্ণ সুযোগটি নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ দেয়াই যথেষ্ট। জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহীদ হন আর পরের মাসে ২০ হাজার পাহাড়ি ভারতে চলে যায় বলে অভিযোগ করা হয়। অর্থাৎ সাধারণ পাহাড়িদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তিনি সতর্ক ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ভারত পার্বত্য সমস্যাটির আন্তর্জাতিককীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করে। ফলে প্রয়োজন হয় শরণার্থীর। ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিবাহিনী আরো আক্রমণ শুরু করে পাহাড়ি ও বাঙালি গ্রামগুলোতে। শান্তিবাহিনী পাহাড়িদের ভারতে শরণার্থী হয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। যারা যেতে রাজি হয়নি তাদের পার্শবর্তী গ্রামগুলোতে এমনভাবে হামলা করে যাতে বাঙালিরা পাল্টা আঘাত দিতে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে হামলা চালাতে বাধ্য হয়। এভাবেই শান্তিবাহিনী নিরীহ পাহাড়িদের ভারতে শরণার্থী হতে বাধ্য করে।

শান্তিবাহিনীর এ প্রক্রিয়া রোধ করতেই এরশাদ সরকার গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে নিরাপত্তার আওতায় বাঙালি ও পাহাড়িদের নিয়ে আসে। এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের এক লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এতে বাঙালিরা নিরাপত্তা পেলেও সরকার প্রদত্ত তাদের বসত ভিটা ও চাষের জমি হারাতে হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই বসত ভিটা ও আবাদী জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল সত্ত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত করা, আবাদ করা সম্ভব হয় না। কারণ জমিতে চাষাবাদে গেলেই পাহাড়িরা তাদের উপর হামলা করে। পাহাড়ীদের মতে, পাহাড়ের সকল জমিই তাদের। বাঙালীদের অনেক জমি পাহাড়িরা দখল করে নিয়েছে। কোনো জমি দখল করে উঠেছে বৌদ্ধদের কিয়াং- যা সরানোর ক্ষমতা বাঙালি তো দূরের কথা রাষ্ট্রের পক্ষে দুঃসাধ্য। কারণ সে দিকে চোখ দিলেই ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, থাইল্যা-, বার্মা, ই-িয়াতে মিছিল শুরু হয়ে যাবে সাথে সাথে। বাঙালিদের ভূমিহীন করার কৌশল হিসাবে তাদের জমির খাজনা আবার পাহাড়ি হেডম্যানরা নেয় না, ডিসি অফিসে দিতে হয়।

এরশাদ সরকার শান্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষাকল্পে গুচ্ছগ্রামের আদলে চাকমাদের জন্য ১৬টি শান্তিগ্রাম ও মারমা, ত্রিপুরাদের জন্য ৮০টি বড়গ্রাম স্থাপন করেছিল। কিন্তু শান্তিবাহিনীর অব্যাহত হুমকির মুখে সেসব গ্রামের উপজাতীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ ভারতে শরণার্থী হয়ে যেতে বাধ্য হয়, অন্যদের কেউ অন্যত্র, কেউ নিজ জমিতে ফিরে বসতি স্থাপন করে। তবে রেশন দেবার দিন এসে রেশন গ্রহণ করতো বহুদিন। ১৯৫০-৬০ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা মালয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। সেই মডেল থেকেই এরশাদ সরকার গুচ্ছগ্রামের ধারণা নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।

গুচ্ছগ্রামে সরকার পরিবার প্রতি একটি ২০ ফুট বাই ২০ ফুট ঘর, মাসিক ৮৫ কেজি চাল বরাদ্দ দিয়েছিল ১৯৮৮ সালে। তারপর থেকে সেই পরিবার ভেঙে পুত্র ও নাতির পরিবার হয়েছে। ঘর ও রেশন সেই একই রয়ে গেছে। এখন ৮৫ কেজি চালের পরিবর্তে ৩০ কেজি চাল ও ৫৫ কেজি গম দেয়া হয়। তাও আবার ৩ মাস পরপর। গুচ্ছগ্রামের ২০ ফিট বাই ২০ ফিট ঘরের মধ্যে বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূ, জামাই, নাতিদের নিয়ে একসাথে জেলখানার ‘ইলিশ ফাইলের’ মতো করে বসবাস করে বাঙালিরা। এরমধ্যে আবার বাঁধা থাকে গবাদি পশু। বাইরে রাখলে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের দ্বারা চুরি হবার ভয়ে ঐ ছোট্ট ঘরের মধ্যেই রাখতে হয় তাদের।

gussagram 1

বসতবাড়ি ও ভিটার জমিতে খাজনা দিয়েও তাদের এই মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। পরিবার যতোই আলাদা হোক ৮৫ কেজি চাল/গমের বরাদ্দ ও কার্ড সংখ্যা এখনো শুরুর দিনের মতোই। জরুরি প্রয়োজনে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা কারো কাছে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্ড বন্ধকি রেখে টাকা নেয়। ফলে ঐ সময় কার্ডের রেশন সুবিধা গ্রহণ করে কার্ড বহনকারী। সেই দিনগুলো ঐ পরিবারের কাটে অমানবিক কষ্টে। শিক্ষা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য- জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলোর নূন্যতম উপস্থিতি নেই গুচ্ছগ্রামে।

প্রতি মাসেই একাধিক আন্তর্জাতিক টিম পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করে কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের কথা শোনার কোনো আগ্রহ নেই তাদের। এমনকি সক্রিয় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও মিশনারী সংস্থাগুলোরও গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পাহাড়িদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, ও অর্থ নিয়ে ঘুরছে ইউএনডিপি, এমএসএফ, ড্যানিডা, ডিএফএইডি প্রভৃতি। কিন্তু গুচ্ছ গ্রামের বাঙালিদের নিয়ে কোনো প্রকল্প করলে অর্থ দেয় না কোনো দাতা সংস্থা বা এনজিও। অর্থ পেলেও এমন এনজিও’র রেজিস্ট্রেশন দেয় না আঞ্চলিক পরিষদ। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে পাতার পর পাতা ভরে পাহাড়িদের দুঃখ কষ্টের কথা লেখা হলেও তার একটি শব্দও খরচ হয় না গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের জন্য। তারা যেন মানুষ নয়, তাদের যেন কোনো মানবাধিকার থাকতে নেই। তবে হ্যাঁ, যদি তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়, তাহলে প্রচুর টাকা মিলবে সে ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে এইসব মতলববাজ, একচোখা ও চক্রান্তকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। কারণ তাতে তাদের আসল উদ্দেশ্য সফল হবে।

শুধু বিদেশিদের দোষ দিয়ে কি লাভ! পার্বত্য বাঙালিদের জন্য বিমাতাসুলভ আচরণে পিছিয়ে নেই সরকারও। যে সরকার নিজের প্রয়োজনে একদিন সমতল থকে বাঙালিদের নিয়ে পাহাড়ে পুনর্বাসন করেছিল, আজ সেই সরকারই তাদের সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে।
সমতলের বাঙালীরা খুব খুশী মনে সেখানে যায়নি। কারণ পাহাড়ের জলবায়ু, ভূমিরূপ ও ফুড চেইন তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী নয়। পাহাড়ীদের খাবার তাদের বাসস্থানের পাশের পাহাড়ের জঙ্গলের লতা পাতা, পশুপাখি, পোকামাকড়ে চলে যায়। কিন্তু বাঙালীরা তো এমন খাবারে অভ্যস্ত নয়। কাজেই সমতলের বাঙালীদের পূনর্বাসনের পর প্রথমদিকে পাহাড়ে বসবাস কতোটা কষ্টষাধ্য ছিল তা বিবেকবান মানুষমাত্রই অনুধাবন করবেন। তবু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে তারা সেখানে থেকে গেছে। কিন্তু সেই রাষ্ট্রই যখন তাদের জাতীয় পরিচিতি কেড়ে নিল, তখন পাহাড়ের বাঙালীরা প্রকৃতপক্ষে নিজভূমে পরবাসী হয়ে পড়ল। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের ‘বাঙালী’ পরিচয় মুছে দিয়ে অদ্ভুত নতুন এক পরিচয়ে লিখল ‘অউপজাতীয়’।  এ পরিচয়ে পাহাড়ে তারা অচ্ছুৎ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। আরো বিস্ময়ের কথা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২৪ বছর সংগ্রাম করে যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যে বঙ্গবন্ধু পাহাড়িদের বাঙালি হতে বলেছিলেন, তার কন্যা শেখ হাসিনার হাতে পার্বত্য বাঙালিদের ‘বাঙালি’ পরিচয়ের অপমৃত্যু ঘটেছে। বঙ্গবন্ধু পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীগুলো থেকে তাদের পরিচয় কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন এই অজুহাতে ৪২ বছর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে হাজার দশেক পাহাড়ি সন্ত্রাসী। কিন্তু বাঙালিত্ব হারিয়ে বাঙালিরা বেদনায় মূহ্যমান হলেও পাহাড়িদের মতো অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি। তারপরও বাঙালিদের প্রতি সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ এতোটুকু কমেনি।

পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না। উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারী ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয়। পাহাড়ে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সকল চাকরির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। জাতীয়ভাবেও চাকুরীতে ৫% কোটা তাদের জন্য। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে একই অবস্থা। বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও ও বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ ফাইভ পেয়েও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে এ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়িরা বুয়েট-মেডিক্যালে চান্স পাচ্ছে। নানা সুবিধায় ওদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির দ্বার অবারিত। কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালি শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে অর্ধেক বই পড়ে, বাকি অর্ধেক বইয়ের সরকারি বরাদ্দ নেই। মাদ্রাসা/স্কুলের বেতন দিতে হয় রেশনের চাল/গম থেকে। পাহাড়ের সরকারি চাকরি পাহাড়িদের একচেটিয়া অধিকার। পার্বত্য বাঙালিদের বঞ্চনার কথা লিখতে গেলে একটা বই হয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকারের মুখে পাহাড়িদের পুনর্বাসনে নানা উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা শোনা যায়, কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের পুনর্বাসনে কোনো কথা শোনা যায় না কারো মুখে। সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর স্বার্থ দেখভালের জন্য একটা মন্ত্রণালয় করেছে। তারাও দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী পাহাড়িদের পুনর্বাসনে গলদঘর্ম। কিন্তু দেশের স্বার্থে আত্মদানকারী বাঙালিদের পুনর্বাসনে কোনো উদ্যোগ নেই সেখানে। উল্টো ভূমি কমিশনের নামে এমন এক ব্যবস্থা চালু করেছে যাতে বাঙালিরা পাহাড় ছেড়ে একবারে চলে আসতে বাধ্য হয়। গত ২৫ বছরে গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের আবাদী জমি, বসতভিটা ফিরিয়ে দেয়ার কোনো উদ্যোগ সরকারকে নিতে দেখা যায়নি। এমনকি তাদের মানবিক ও মৌলিক জীবন যাপনের সুবিধা নিশ্চিত করতেও কেউ এগিয়ে আসেনি।

পার্বত্য বাঙালিদের এই বঞ্চনার কথা সমতলের বাঙালি তথা দেশবাসী খুব সামান্যই জানে। ফলে জাতীয় ইস্যুতে, জাতীয় রাজনীতিতে তাদের বঞ্চনার কথা বলা হয় না। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে পার্বত্য বাঙালিদের ঠাঁই হয় না। এমনকি স্থানীয় কমিটির উচ্চপদে তার ঠাঁই খুব বেশী হয়না। এমনকি যে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়েছিল বাঙালিরা, সেই জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলার ৫ জন নেতা ঠাঁই পেলেও তার একজনও বাঙালি নয়। ফলে বাঙালির স্বার্থে অন্যদলগুলোতো বটেই বিএনপির বাঙালি নেতারাও কথা বলতে পারে না সিনিয়রদের চাপে। ঢাকায় পার্বত্য বাঙালিদের সেমিনারে কোনো বিএনপি নেতা আসতে ভয় পান এজন্য যে, পাহাড়ি নেতারা এসে যদি তার বিরুদ্ধে নেত্রীর কাছে নালিশ করে। যদিও খুব সামান্য পাহাড়িরাই বিএনপিতে ভোট দেয়।

সমতলের ‘রাজাকারদের’ গাড়িতে পতাকা তোলা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের আমৃত্যু রাজাকারের পুত্রের গাড়িতে পতাকা উঠেছে, এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী, বাঙালি ও সেনাবাহিনী হত্যাকারী সন্ত্রাসীদের গাড়িতে পতাকা উড়েছে, তা নিয়ে কোনো কথা বলা হয় না।
 দু’একটি গণমাধ্যম ছাড়া দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম বাঙালীদেরকে পার্বত্যাঞ্চলের আপদ বলেই ভাবে। বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগ অংশই বিদেশ সফর, ‘সুশীল’ খাতায় নাম তোলার প্রয়োজনে ও টুয়েসডে, থার্সডে পার্টিতে নিমন্ত্রণ হারানোর ভয়ে বাঙালির পক্ষে কথা বলতে নারাজ। বাংলাদেশের খুব বিখ্যাত একজন রাজনীতিক ও কলামিস্ট আমাকে একবার বলেছিলেন, একটি জাতীয় সেমিনারে পার্বত্য বাঙালিদের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বাসায় ফেরার সাথে সাথে একটি প্রভাবশালী পাশ্চাত্য দেশের দূতাবাস থেকে তার কাছে ফোন করে জানতে চাওয়া হয় তিনি বাঙালিদের পক্ষে ঐ সেমিনারে কোনো কথা বলেছিলেন কিনা?

বাঙালিদের বিরুদ্ধে লিখলে সাংবাদিকদের বিদেশ সফরসহ নানা সুবিধা মেলে সেখানে, পক্ষে লিখলে ততোটাই অবহেলা ও ঝুঁকির শিকার হতে হয়। সেখানে দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তাদের প্রমোশন ও বিদেশে পোস্টিং মেলে না বাঙালি ঘেঁষা হলে। এক কথায় যে রাষ্ট্রের স্বার্থে বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থান সেই রাষ্ট্র তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

পার্বত্য বাঙালিরা শুধু রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নয়, এখনো নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অবস্থানের জন্য। অনেকে প্রকাশ্যে স্বীকার করতে না চাইলেও এ কথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও সেনাবাহিনী একে অন্যের সম্পূরক ও পরিপূরক। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী না থাকলে যেমন বাঙালির অবস্থান অনিশ্চিত, ঠিক তেমনি বাঙালি না থাকলে সেনাবাহিনীর অবস্থান কষ্টসাধ্য। বাঙালিরা সেখানে সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত একটি ডিফেন্স লাইন তৈরি করেছে- যার গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত জোট সরকারের আমলে বাঙালী নেতা ওয়াদুদ ভুঁইয়া উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে কিছু বাঙালিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, বিশেষ করে প্রধান সড়কের বিশেষ বিশেষ স্থানে বসতির অনুমতি দেয়া হয়। এতে করে পার্বত্য অধিবাসী, সরকারি কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী ও পর্যটকদের উপর অতর্কিত হামলা (এমবুশ), অপহরণ অনেকাংশে হ্রাস পায়।

তবে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী কিছু বাঙালি আমাকে বহুবার এ কথা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী না থাকলে ‘সন্তুবাহিনী’ হয় আমাদের কাছে অস্ত্র সারেন্ডার করে মিলে মিশে থাকবে, না হয় ভারতে পালাবে। সম্প্রতিকালে ক্রমাগত সরকার, দাতা সংস্থা ও এনজিওগুলোর বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক কর্মকা-ের কারণে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগোষ্ঠী। উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অত্যাচার, উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের বাঙালি বিদ্বেষমূলক কর্মকা- এবং সেই সাথে সরকার, এনজিও ও দাতা সংস্থারগুলোর একপেশে নীতির কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সমাজের মূল স্রোতধারা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে তাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সহিংস প্রতিবাদের দিকে এগুচ্ছে। উল্লিখিত উক্তিটি তাদের সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ।

email: palash74@gmail.com

সৌজন্যে: দৈনিক ইনকিলাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩