নাইক্ষ্যংছড়ির বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসা ধর্মীয় দ্বন্দ্বে খুন হতে পারেন

IMG_3215

গাজী ফিরোজ ও বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে:

কেন ও কী কারণে ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসারকে খুন করা হয়েছে, তা জানতে পারেনি পুলিশ। নিহত বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসার (উ গাইন্দ্যা) ছোট ছেলে মামলার বাদী অং চা থোয়াই বলেন, ‘খুনের ঘটনায় আইএসকে সন্দেহ করতে পারছি না। সন্দেহ হওয়ায় এজাহারে তিনজনের নাম দিয়েছি। বাবার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল না। তিনি শান্তপ্রিয় ছিলেন।’

কারা খুন করতে পারে বলে ধারণা করছেন এই প্রশ্নে বাদী বলেন, বাবার ভিক্ষু হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় দ্বন্দ্বে এ খুন হতে পারে। বাবা আগে উপরচাকপাড়া বৌদ্ধবিহারে ছিলেন। সেখান থেকে এসে দুই বছর আগে নিজের জায়গায় পাহাড়ের পাদদেশে বৌদ্ধবিহার গড়ে তোলেন। চাক সম্প্রদায় থেকে আগে কেউ কখনো ভিক্ষু হননি। বাবা ভিক্ষু হয়ে বৌদ্ধবিহার তৈরি করায় ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ এ কাজ করতে পারেন।

অন্যমিডিয়া

তিনি বলেন, ‘ডাকাতির ঘটনা হলে তারা কোনো জিনিসপত্র কেন নেয়নি? টাকা-পয়সাও তো নেয়নি। আর জঙ্গিগোষ্ঠী এ দুর্গম পাহাড়ে এসে কেন মারবে?’

এ বিষয়ে ভিক্ষু ধাম্মাতেজা ভান্তে প্রথম আলোকে বলেন, নিহত ধাম্মা ওয়াসার তাঁর শিষ্য ছিলেন। তাঁকে কেন তিনি মারতে যাবেন। আসল ঘটনা ধামাচাপা দিতে এসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ঘটনার দিন তিনি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ছিলেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাইশারী তদন্তকেন্দ্রের প্রধান উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান বলেন, জঙ্গিগোষ্ঠী, জমি নিয়ে বিরোধ, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে কি না, সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি কে বা কারা এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, চারজনকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। খুনের দায় স্বীকার করে আইএসের বিবৃতি প্রসঙ্গে বলেন, সব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত করা হচ্ছে। ধর্মীয় দ্বন্দ্বে খুনের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। এটিকে পরিকল্পিত খুন উল্লেখ করে এসপি বলেন, খুনিরা ঘটনাস্থলে কোনো আলামত রেখে যায়নি।


সরেজমিন

কাঠের খুঁটির ওপর টিনের চালার ঘর। স্থানীয় লোকজন এই ঘরকে বলে ‘মাচান’। ঘরে ওঠার সিঁড়িতে বসে আছেন নিহত বৌদ্ধ ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসার (উ গাইন্দ্যা) ছোট ছেলে অং চা থোয়াই চাক। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই বলেন, ‘কখন কারা কী করে ফেলে আতঙ্কে থাকি। কাজ করতে যেতেও ভয় হয়। যেদিন বাবাকে খুন করা হয়েছে সেদিন থেকে ঘর থেকে বের হই না।’

খাবার কিনতে বাজারে যান না, এই প্রশ্নে অং চা থোয়াই চাক বলেন, ‘চাল আগে থেকে ছিল। কোনো রকমে আছি। খাওয়ার চাইতে প্রাণে বেঁচে থাকাটা জরুরি।’ গত মঙ্গলবার দুপুরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের দুর্গম উপরচাকপাড়া গ্রামের নিজ ঘরে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। গত ১৪ মে ভোরে তাঁর বাবা ভিক্ষু ধাম্মা ওয়াসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলায় ও ঘাড়ে কুপিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।
পুলিশ বলছে, জঙ্গি হামলা, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব বা জমিসংক্রান্ত বিরোধ এই হত্যার পেছনে কাজ করেছে কি না সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুবছর আগে ধাম্মা ওয়াসার নতুন ভিক্ষু হওয়ার কারণে এ নিয়ে তৈরি হওয়া ধর্মীয় দ্বন্দ্বকেও হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে কেউ কেউ মনে করছেন।

AT-15

ভিক্ষু খুনের পর থেকে আতঙ্কে রয়েছেন গ্রামবাসী। তাঁরা রাত জেগে পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। দিনেও গ্রামে অপরিচিত কাউকে ঢুকতে দেখলে কয়েকজন মিলে তাঁর (আগন্তুকের) পরিচয় জানতে চান।
উপরচাকপাড়ার কার্বারি (গ্রামপ্রধান) মং কৈলা চাক বলেন, ধাম্মা ওয়াসার খুনের পর চাকপাড়াবাসীর মধ্যে ভয় কাজ করছে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। লোকজনের আতঙ্ক দূর করতে পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রশাসনকে বলেছেন তাঁরা।

বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ভিক্ষু খুনের ঘটনার পর থেকে লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।

হানাহানি ও খুনখারাবির ঘটনা উপরচাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা স্বাধীনতার ৪৫ বছরে কখনো দেখেনি বলে জানান চাক সম্প্রদায়ের নেতা চিং হ্লা মং চাক। তিনি বলেন, দেশে চাক সম্প্রদায়ের বাস কেবল নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। এই সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এর মধ্যে বাইশারী ইউনিয়নের চারটি চাক পাড়ায় একসঙ্গে প্রায় এক হাজার ব্যক্তি থাকে। অন্যরা উপজেলা সদর ও বিভিন্ন ইউনিয়নে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

ভিক্ষু হত্যার ২২ দিন পর ৫ জুন জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) হত্যার দায় স্বীকার করেছে। জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’ আইএসের সংবাদ সংস্থা আমাকের বরাত দিয়ে এক টুইটার বার্তায় এ খবর প্রচার করে। হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত ব্যক্তির ছেলে অং চা থোয়াই চাক বাদী হয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পর রোহিঙ্গা আবদুর রহিম ও জিয়াউল হক এবং ছামং চাক ও সরোয়ার নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ছামং চাকের খালু আলুমং দাবি করেন, ছামং এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। প্রকৃত আসামিকে না ধরে পুলিশ নিরীহ লোকজনকে হয়রানি করছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের রামু উপজেলার ঈদগাহ এলাকা থেকে ২২ কিলোমিটার পূর্বে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের বাজার। এখান থেকে মোটরসাইকেল বা টমটমে চড়ে সাত কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে গেলে উপরচাকপাড়া গ্রাম। প্রবেশমুখে উপরচাকপাড়া বৌদ্ধবিহার। গ্রামের নামে এই বিহারের নাম। এখান থেকেই গ্রামের শুরু। সেখান থেকে উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ চলে গেছে গ্রামের ভেতরে।

পুরো গ্রামে হাঁটা ছাড়া যাতায়াতের আর কোনো উপায় নেই। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে একটি পাহাড়ের পাদদেশে দুই বছর আগে নতুন আরেকটি বিহার গড়ে তোলেন ধাম্মা ওয়াসার। নতুন বিহারটি গড়ে তোলার আগে ধাম্মা ওয়াসার উপরচাকপাড়া বিহারের ভিক্ষুর সঙ্গে থাকতেন।

মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, বৌদ্ধবিহারটির ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মোমবাতি, কাপড়, মশারিসহ নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্র। বিহারের পাশে ইট দিয়ে ধ্যানের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল চার হাত দৈর্ঘ্য ও দেড় হাত প্রস্থ একটি ছোট্ট ঘর। কিন্তু ঘরটি তৈরি হওয়ার আগেই দুর্বৃত্তরা খুন করে ধাম্মা ওয়াসারকে।

বিহারটির আশপাশে কোনো বসতি নেই। ৬০০ গজ পূর্বে বসতি (উপরচাকপাড়া) রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে বৌদ্ধবিহার ও উপরচাকপাড়ায় কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। স্থানীয় লোকজন জানান, ঘটনার দিন পুলিশ এসেছিল। এ ছাড়া কয়েকবার তদন্তের জন্য এসেছে। কিন্তু এলাকার নিরাপত্তায় কোনো টহল পুলিশ থাকে না।

উপরচাকপাড়ায় খুনের ঘটনা ঘটলেও বাকি তিনটি চাকপাড়ার বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে বলে জানান হেডম্যান চাকপাড়ার বাসিন্দা রবিন চাক। তিনি বলেন, দিনে লোকজন প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হলেও সন্ধ্যার আগেই ঘরে ঢুকে পড়ে।

উপরচাকপাড়া বৌদ্ধবিহারের ভিক্ষু ধাম্মাতেজা ভান্তে মঙ্গলবার দুপুরে বিহারের সামনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে বিহারে একা থাকতাম। এখন বাইরে লোকজন থাকে। এলাকাবাসী রাত জেগে পালাক্রমে পাহারায় থাকেন।’ বিহার ও চাকপাড়াবাসীর নিরাপত্তা জোরদারেরও দাবি জানান তিনি।

উপরচাকপাড়া গ্রামের কৃষক ক্যাহ্লা অং চাক বলেন, ‘প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকি। আমাদের নিরাপত্তা বাড়ানো উচিত।’

স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য থোয়াই ছালা চাক বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও চাকপাড়ায় কোনো খুনাখুনি হয়নি। খুনের ঘটনায় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার পর পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। দিনে কোনো পাহারা না থাকলেও রাতে পালাক্রমে পুলিশি টহল থাকে এলাকায়।

– সূত্র: প্রথম আলো