নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রধান উৎসব বৈসাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি:
ভোরে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক ও প্রাণের উৎসব ‘বৈসাবি’। ফুল বিঝুকে কেন্দ্র করে আজ শুক্রবার সকাল থেকে নদীর পাড়গুলো হাজারো তরুণ-তরুণীর মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈসাবি উৎসব উপভোগ করতে বিপুল সংখ্যক পর্যটক এখন খাগড়াছড়িতে।

পাহাড়ি সম্প্রদায়ের তরুণ-তরুণী, কিশোরী-ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা হল্লা করে ফুল তুলে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে নদী-খালে ভাসিয়ে পুরাতন বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরের শুভ কামনায় নিজেদের পবিত্রতা কামনা করে। এছাড়া ফুল দিয়ে ঘরের প্রতিটি দরজার মাঝখানে মালা গেঁথে সাজানো হয়।

ত্রিপুরা ও চাকমা সম্প্রদায় আজ ফুল বিজু পালন করছে। আগামীকাল শনিবার মূল বিঝু আর পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করবে। ঐদিন ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন।ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের হারিবৈসু, বিযুমা, বিচিকাতাল। ফুল বিজু, মূলবিজু ও বিচিকাতাল নামে নিজস্ব বৈশিষ্টতায় এ উৎসবে আনন্দের আমেজ ছড়ায়। ত্রিপুরা ভাষায় এ উৎসবকে বৈসু ও চাকমা ভাষায় বিজু বলা হয়।

রবিবার মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাইং উৎসবে ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা পানি খেলা ও জেলা প্রশাসনে উদ্যোগে হবে বর্ষবরণের র‌্যালী। ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা এই তিন সম্প্রদায়ের উৎসবের নাম একত্র করে বৈসাবি শব্দটির উৎপত্তি।

পাশিপাশি তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খিয়াং, লুসাই, পাংখোয়া, ম্রো, খুমি, আসাম, চাক ও রাখাইনসহ ১৩ ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী তাদের ভাষা-সংস্কুতি ও অবস্থানকে বৈচিত্রময় করে করে তুলতে প্রতি বছর চৈত্রের শেষ দিন থেকে ‘বৈসাবি’ উৎসব পালন করে থাকে।

বৈসাবি উৎসবের মধ্য দিয়ে পাহাড়ী-বাঙ্গালীর মধ্যে শান্তি- স¤প্রীতি ও ঐক্য আরো সু-দৃঢ় হোক এই প্রত্যাশা সকলের।

বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে খাগড়াছড়িতে ব্যাপক প্রস্তুতি


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি:

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রাণের উৎসব “বৈসাবি”-কে ঘিরে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পাহাড়ি গ্রামগুলো এখন সাজ-সাজ রব। পুরাতন বছরকে বিদায় আর নতুন বছরকে বরণকে সামনে রেখে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামগুলোতে চলছে নানা প্রস্তুতি। হাট-বাজারগুলোতে পড়েছে কেনা-কাটার ধুম।

এদিকে বৈসাবি উৎসবকে সামনে রেখে খাগড়াছড়ির হোটেল-মোটেল আগাম বুকিং হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রতিটি জনপদ এখন উৎসবের জোয়ারে ভাসছে। আগামী ১২ এপ্রিল নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে মূল উৎসব শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ১লা এপ্রিল থেকে উৎসব শুরু হয়েছে। গ্রামে-গ্রামে চলছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর ঐতিহ্যবাহী নানা খেলা-ধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি।

এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান পর্যাক্রমে আনন্দ র‌্যালি, মারমাদের ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টটি বল বা পানি উৎসব ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় গড়িয়া নৃত্য’র আয়োজন করেছে।
বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে খাগড়াছড়ির হোটেল-মোটেলগুলো আগাম বুকিং হয়ে গেছে। আয়োজক ও জনপ্রতিনিধিদের মতে খাগড়াছড়িতে এবার উৎসব মখুর পরিবেশে বৈসাবী পালিত হবে।

১৯৮৫ সাল থেকে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত তিন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে ‘বৈসাবি’ নামে এ উসব পালন করে আসছে। যা সময়ের ব্যবধানে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ‘বৈসাবি’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব নামে ‘ত্রিপুরা ভাষায় বৈসুক, মারমা ভাষায় সাংগ্রাই এবং চাকমা ভাষায় বিজু’ নামে এ উৎসব পালন হয়ে থাকে। এ তিন সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষার নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে ‘বৈসাবি’ নামকরণ করা হয়।

ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খিয়াং, লুসাই, পাংখোয়া, ম্রো, খুমি, আসাম, চাক ও রাখাইনসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাদের ভাষা-সংস্কৃতি ও অবস্থানকে বৈচিত্রময় করে তুলতে প্রতি বছর চৈত্রের শেষ দিন থেকে ‘বৈসাবি’ উৎসব পালন করে থাকে।

মঙ্গলবার(৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী বৈসাবি উৎসব। উপজাতীয় শরনার্থী ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি এ উৎসবের উদ্বোধন করবেন।

এ দিকে বাংলা নববর্ষ এবং পাহাড়ের ১১টি জাতিসত্ত্বার প্রাণের উৎসব ‘বিজু-সাংগ্রাই-বিসু (বৈসাবি) উপলক্ষে বুধবার(১০ এপ্রিল) বিকালে শুরু হবে প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি শহরে সপ্তাহব্যাপী ত্রিপুরা সংস্কৃতি মেলা।

বিকালে খাগড়াছড়ি শহরের খাগড়াপুর মাঠে বর্ণাঢ্য আনুষ্ঠানিকতায় মেলার উদ্বোধন করবেন খাগড়াছড়ি রিজিয়নের আঞ্চলিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হামিদুল হক।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ সদস্য ও ত্রিপুরা সংস্কৃতি মেলার অন্যতম সংগঠক পার্থ ত্রিপুরা জুয়েল জানান, জাতি-ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত এই মেলায় প্রতিদিনই সৃজনশীলতার ভিন্নতায় পরিপূর্ন থাকবে।

বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি নলেন্দ্র লাল ত্রিপুরা জানান, ১০ এপ্রিল শুরু প্রথমবারের মতো খাগড়াছড়ি শহরে শুরু হওয়া সপ্তাহব্যাপী ত্রিপুরা সংস্কৃতি মেলা ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে ভারতের খ্যাতনামা ত্রিপুরা সাংস্কৃতিক দলের মনোজ্ঞ পরিবেশনা হবে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী জানান, জেলা পরিষদেরে উদ্যোগে ১১ এপ্রিল বর্ণাঢ্য র‌্যালীর মধ্য দিয়ে পুরাতন বছর বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হবে। কর্মসূচীর উদ্বোধন করবেন উপজাতীয় শরনার্থী ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি।
বৈসাবি উৎসবের মধ্য দিয়ে পাহাড়ি-বাঙ্গালীর মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি ও ঐক্য আরও সু-দৃঢ় হোক এই প্রত্যাশা সকলের।

পাহাড়ের উৎসব: ‘বৈসাবি’ থেকে হোক ‘বৈসাবিন’

মেহেদী হাসান পলাশ:
১৪শ’ বছরেরও অধিককালের পুরাতন বাংলা নববর্ষ এবারো এসেছে আমাদের জাতীয় জীবনে। কর্পোরেট ধামাকা তাতে এনেছে নতুন জৌলুস। পূর্বে বাংলা নববর্ষ পূর্বে পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। প্রথমে একে ফসলী সন বলা হতো। কৃষিকাজের সুবিধার্থে মুঘল স¤্রাট আকবর ১৫৮৪ ঈসাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন চালু করেন। ১৫৫৬ ঈসাব্দের ৫ নভেম্বর আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময়কাল থেকে হিজরী চান্দ্র সনকে ভিত্তি করে বাংলা সৌরসন প্রবর্তিত হয়। এ সময় এটি বঙ্গাব্দ বলে পরিচিত হতে থাকে।

জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উৎসব পালিত হতো। তখন বাংলার কৃষকেরা চৈত্রমাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার ও ভূ-স্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতো। পরদিন বা নববর্ষে জমিদারগণ কৃষক বা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে জমিদার বাড়ি প্রাঙ্গণে মেলা বসত। মেলায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সকলপ্রকার হস্তশিল্পজাত, মৃৎশিল্পজাত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির পসরা বসতো।

অন্যদিকে মেলা উপলক্ষে জমিদার বাড়ির আঙিনায় যাত্রা, পালাগান, জারীগান, কবিগান, বিচার গান, গাজীর গানসহ বিভিন্ন লোক সঙ্গীতের আসর বসতো। এছাড়াও পুতুল নাচ, নাগর দোলা, নৌকা বাইচ, ঘোড় দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা প্রতিযোগিতা চলতো নববর্ষের উৎসবকে ঘিরে। এককথায় নববর্ষকে ঘিরে সমগ্র বাংলা জেগে উঠতো উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে।

বাংলা নববর্ষের উৎসবে আরেকটি মাত্রা যুক্ত করে ব্যবসায়ীদের হাল খাতা। গ্রামগঞ্জের হাট বাজারের ব্যবসায়ীরা এদিন তাদের একটি বছরের পুরাতন ব্যবসায়িক লেনদেনের হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খোলেন। এ উৎসব তাদের কাছে হালখাতা নামে পরিচিত। হালখাতা উৎসবে ব্যবসায়ীরা ক্রেতারদের আমন্ত্রণ করেন তাদের দোকানে। ক্রেতাগণ এদিন গত এক বছরের বাকী পরিশোধ করেন আর ব্যবসায়ীগণ ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্ক নবায়নের নতুন খাতা- হালখাতা খোলেন। এভাবেই পহেলা বৈশাখ সার্বজনীন বাংলাভাষীদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

কালের বিবর্তন, ঋতুর পরিবর্তন আর প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের লোকজ আঙ্গিকে কিছু পরিবর্তন হয়তো এসেছে কিছু তাতে উৎসবের উদ্দামতা কমেনি এতোটুকু বরং বেড়েছে বহুগুণে। তাইতো নববর্ষের উৎসবে ফায়দা লুটতে এগিয়ে এসেছে আধুনিক বাজার অর্থনীতির ধারক কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। পহেলা বৈশাখে তারা বাজারে আনে নতুন ফ্যাশনের পোশাক, প্যাকেজ ইত্যাদি। এভাবেই বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপনে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে শত শত বছর ধরে।

কিন্তু রাজধানীতে রমনাপার্কে অশ্বত্থবৃক্ষের বেদীমূলে মাঙ্গলিক গান গেয়ে নববর্ষ বরণের যে কালচার অথবা রেওয়াজ চলছে তার ইতিহাস খুব বেশি দিন নয়। ১৯৬৭ (মতান্তরে ১৯৬৫) সালে ছায়ানট শিল্পীগোষ্ঠী এর প্রবর্তন করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকে পাকিস্তানে রবীন্দ্র চর্চা নিয়ে বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে বিভেদ তৈরি হয়। এই বিভেদের মধ্যেই ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদসহ কয়েকটি সংগঠনের উদ্যোগে পূর্বপাকিস্তানে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়।

রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের পর আয়োজক কিছু রবীন্দ্রভক্তের উদ্যোগে সেবছরই ছায়ানট প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। ১৯৬৭ সালে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিওতে রবীন্দ্র সঙ্গীত বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। খাজা শাহাবুদ্দিনের এই ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্র চর্চা নিয়ে চলমান বিভেদ নতুন করে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মূলতঃ তৎকালীন সরকারের রবীন্দ্র চর্চা নিষিদ্ধ নীতির বিরোধিতা করেই ছায়ানট রমনার অশ্বত্থমূলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে ১৯৬৭ সালে।

পহেলা বৈশাখ সার্বজনীন সর্ববৃহৎ বাঙালি উৎসব। সারাদেশে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালিরা এই উৎসবে শামিল হয় প্রাণের টানে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে। কেননা, একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিগুলোর সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠান বৈসাবি শুরু হয়ে যায়। ত্রিপুরাদের বৈসু,  মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসবের নামের অদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’ শব্দ। তবে এ উৎসবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিই অংশ নিয়ে থাকে।

যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালি। কিন্তু অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকায় বাঙালির উৎসব চাপা পড়ে যায় প্রচারের অন্ধকারে। যদিও এসময় বাঙালিরা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে নানা আয়োজনের। বিভিন্ন স্থানে র‌্যালি, মেলা, খেলাধুলার মতো আয়োজন চোখে পড়ে। কিন্তু বৈসাবির প্রচারের আলোয় তা ম্রিয়মান হয়ে পড়ে বাঙালিদের সকল আয়োজন। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠিসমূহের মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগ, সম্পর্ক, সৌহার্দ, সম্প্রীতি, সহাবস্থান, মেলবন্ধন ও মিথস্ক্রিয়ায় চ্ছেদ পড়ে।

এই ব্যবধান ও দূরত্ব কমাতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়কে এক সুঁতোর মালায় গাঁথতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন ২০১৫ সাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির বৈসাবি ও বাঙালির নববর্ষ এক সাথে পালনের জন্য ‘বৈসাবিন’ নামে উদযাপনের জন্য বিভিন্ন স্তরে জনমত গঠনের কাজ চালিয়ে আসছে।

প্রথমদিকে সামাজিক গণমাধ্যমে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা এ প্রসঙ্গটি প্রকাশ্যে নিয়ে এলে ধারণাটি বিভিন্ন মহলে আলোচিত ও সমাদৃত হয়। এর মধ্যেই বেশ কয়েকটি স্থানে ‘বৈসাবিন’ উদযাপিতও হয়েছে। বিশেষ করে বাংলা ১৪২২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গুইমারা রিজিয়ন বৈসাবি অনুষ্ঠান বৈসাবিন নামে উদযাপন করলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়।

অন্যদিকে সরকারি অনুষ্ঠানগুলো আগে যেখানে শুধু বৈসাবি অনুষ্ঠান নাম দিয়ে পালিত হতো তারাও বৈসাবি ও নববর্ষ শিরোনামে একসাথে উদযাপন শুরু করে। গত বছর তিন পার্বত্য জেলার প্রায় সকল সরকারি অনুষ্ঠান বৈসাবি ও নববর্ষ শিরোনামে একসাথে উদযাপিত হয়েছে। আমরা এটিকে শুভ লক্ষণ মনে করি। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্তঃসম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস ও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের উদ্যোগ বেশি বেশি ও আরো বৃহৎ পরিসরে পালনের আহ্বান জানাই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পারিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহাবস্থান, আস্থা সৃষ্টি করতে সকলকে এক সুঁতোর মালার বন্ধনে জড়াতে হবে। তাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ভাইবোনদের বৈসাবি ও বাঙালির নববর্ষ যুথবদ্ধ হয়ে পালিত হোক বৈসাবিন নামে এ প্রত্যাশা সকলের।

♦ লেখক: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজডটকম ও পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ।


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

  17.  রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

  18. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতি-কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন

পানছড়ি সেজেছে বৈসাবি সাজে: চলছে খুশীর জোয়ার

8-4-14 PIC

পানছড়ি প্রিতিনিধি, খাগড়াছড়ি:

পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি ঘিরে পানছড়ির সর্বত্র লেগেছে উৎসবের আমেজ।  প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় বাজছে উৎসবের সূর। ধনী-গরিব সকলের ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। আর যেন বসে থাকার সময় নেই, খুব কাছাকাছি তাই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাদের মাঝে বিরাজ করছে খুশীর জোয়ার। উৎসবের আনন্দে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আর মুসলিম যেন জাতিগত সব বিভেদ ভুলে মিলবে এক কাতারে- এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে? তাই পাহাড়ের এই উৎসব ভুলিয়ে দেয় জাতিগত বিভেদ। সবাই ভুলে যায় কে পাহাড়ী বা কে বাঙ্গালী। সবাই মেতে উঠে উৎসবের অনাবিল এক আনন্দ আয়োজনের জোয়ারে। তৈরী হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। সব মিলে জাতিগত ভেদাভেদের শেকড়কে উপড়ে সকলের আন্তরিক উপস্থিতিতে আরো প্রানবন্ত হয়ে উঠে বৈ-সা-বি’ উৎসব।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই ও চাকমা সম্পদায়ের বিজু নিয়েই বৈ-সা-বি। আগামী ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে বৈ-সা-বি উৎসব। ১২এপ্রিল ফুল বিজুর মধ্যে সূচনা পর্ব শুরু হবে বৈ-সা-বি’র। ১৩ এপ্রিল নববর্ষের আগের দিন হারি বৈসু পালন করে বর্ষবরণ করবে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী আর নববর্ষের প্রথম দিন থেকে মারমা সম্প্রদায় সূচনা করে সাংগ্রাইয়ের।

এ নিয়ে উপজেলা সদর বাজারে কেনা কাটারও ধুম লগেছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মনে লেগেছে খুশীর আমেজ সবার আবদার বাহারী ও রঙিন পোশাক  চাই। তাই উপজেলা সদর বাজারের দোকানগুলোতে লেগেছে কেনা-কাটার ধুম।  বাজারের নোয়াখালী মার্কেটের কসমেটিকস ও জুয়েলারী দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভীড়। তাই দোকানীরাও যেন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

বৈ-সা-বি’তে আরো জমজমাট চলছে পানছড়ি সবজি ও শুটকি বাজার। হরেক রকম তরকারী দিয়ে পাঁচন রাধতে কাঁচা সবজির জুড়ি নেই। যে যত বেশী সবজি দিতে পারবে ততই মজা তাই কাঁচা সবজি, সাথে কাঁচা কাঁঠাল ও শুটকি কেনা প্রতিযোগিতার দৃশ্যগুলো চোখে পড়ার মত। পানছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ঝর্ণা চাকমার সাথে সবজি বাজারে আলাপকালে তিনি জানান কমপক্ষে ত্রিশটি কাঁচা সবজি মিশিয়ে পাঁচন রান্না করবেন।

এনিয়ে বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন চলছে বিভিন্ন খেলাধুলার। ঐতিহ্যবাহী খেলা-ধুলা নিয়ে মেতে উঠবে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষরা। তাই আনন্দের সীমা নেই চলছে খেলা-ধুলা প্রাথমিক প্রস্তুতি। সরেজমিনে পানছড়ি চৌধুরী পাড়ায় দেখা যায় ক্যাপ্রুচাই মারমা, ল্যাপ্রুচাই মারমা ও অংজ মারমারা  নববর্ষ  মারমা ভাষায় (নঅজ) প্রস্তুতি পর্ব সেরে নিচ্ছে। চেংগী নদীতে ফুল ভাসিয়ে (খিয়াংমা প্রেং রইতে) মারমা ভাষায় বর্ষ বরণ করার ওয়ার্মআপ করে নিচ্ছে উখেচিং চৌধুরী, মাসাতিং চৌধুরী, ম্রাসানু মারমা, পাইনুপ্রু মারমা, পেংক্রাচিং মারমা ও চোয়াপ্রু মারমারা। সেই সংগে থাকছে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী “দ” খেলা “পানি” খেলা, “খুয়াং” খেলা।

এই বর্ষবরণে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাদের পাশাপাশি বাঙ্গালীরাও করে থাকে ব্যাপক আয়োজন। বিশেষ করে পাঁচন রান্নায় বাঙ্গালী বধুরাও যথেষ্ট পারদর্শী। সব মিলেয়ে এবারের বৈ-সা-বি’তে পানছড়ি যেন সাজছে এক বর্ণিল সাজে। যা শুরুর আগেই পাড়ায়-পাড়ায় বইছে আনন্দের জোয়ার। এ ব্যাপারে সকলের আন্তরিকতা সহযোগিতা কামনা করছেন পানছড়ির অভিজ্ঞ মহল।