কুকিছড়ার বুদ্ধ মন্দির ও মূর্তি ভাঙার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে

মেহেদী হাসান পলাশ

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে স্যোশাল মিডিয়া খুলতেই চোখ আটকে গেলো খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলার কুকিছড়া এলাকার একটি ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত একটি সচিত্র সংবাদের দিকে। ঐ সব পোস্টে বলা হয়েছে, গুইমারা উপজেলার কুকিছড়ার একটি বৌদ্ধ মন্দিরে গত গভীর রাতে সেনাবাহিনী প্রবেশ করে বৌদ্ধ মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে ভাঙচুর করেছে এবং মন্দিরে স্থাপিত মুর্তিটিও ভাংচুর করেছে। ফেসবুক ঘাটাঘাটি করে দেখলাম ইতোমধ্যেই সিন্ডিকেট ওয়েতে নিউজটি ভাইরাল করা হয়েছে। পাহাড়ীদের পরিচালিত বিভিন্ন আইডি, পেইজ ও গ্রুপ থেকে এই ভাংচুরের ছবিসহ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক নানা বক্তব্য দিয়ে অসংখ্য পোস্ট করা হয়েছে।

একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এভাবে দেবতাসহ ভাঙচুর দেখে যেকোনো বিবেকবান মানুষের মতো আমার মন বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন জাগে, সেনাবাহিনীর মতো একটি ডিসিপ্লিন ফোর্স এই ঘটনা কিভাবে ঘটাতে পারে? তারা যে আদৌ ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার প্রমাণ কি? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা পোস্ট দিয়েছে, তাদের কয়েকজনকে ইনবক্সে প্রশ্ন করলাম, মূর্তি ও মন্দির ভাঙা হয়েছে তার প্রমাণ আছে, কিন্তু আর্মি যে এই কাজ করেছে তার প্রমাণ কি? তাদের কাছে কোনো প্রমাণ নেই। সকলের একই জবাব অমুক পোস্ট দিয়েছে, তমুক পোস্ট দিয়েছে। কিন্তু কারো কাছেই কোনো প্রমাণ নেই।


এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন:

 পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী


আমি তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় দুয়েকজন সাংবাদিকদের ফোন করলাম, তারাও ফেসবুকে দেখেছেন, বিষয়টি এর বেশী কিছু জানেন না বলে জানালেন। তাদেরকে পরামর্শ দিলাম, সাংবাদিক হিসাবে ঘটনার সরেজমিন তদন্ত করে সত্য বের করে আনা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

এবার কুকিছড়ার এই ঘটনার দিকে তাকাই:

কুকিছড়ার এই বৌদ্ধ মন্দিরটি আদৌ কোনো বৌদ্ধ মন্দির নয়। এটি একটি পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্প। এ বিষয়ে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত সংবাদ ছিলো এরকম:

‌‌”মাটিরাঙ্গার কুকিছড়া এলাকায় গত ২৪ জুন ২০১৮ তারিখে সেনাবাহিনীর পরিত্যাক্ত ক্যাম্পের জায়গায় একটি কিয়াং ঘর নির্মাণ করছে শুনে নাইক্যাপাড়া আর্মি ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনা স্থলে গিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, পাড়ার কারবারীদের নিকট জানতে চান, কেন কোন প্রকার অনুমতি বা তথ্য ছাড়া এই কিয়াং ঘর নির্মাণ করা হয়েছে? তখন স্থানীয় উপজাতীয়রা অনুমতিপত্র ছাড়া কাজ করবে না মর্মে জানালেও পরবর্তীতে ২০-২১ মে ২০১৮ উক্ত পরিত্যক্ত ক্যাম্পে কিয়াং ঘর স্থাপনের কাজ পুণরায় শুরু করে।


এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন:

 খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের ভূমি দখল মিশন: বাদ যাচ্ছে না সংখ্যালঘুর জমিও


ইতোমধ্যে কিয়াং ঘরের নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্ত হয়েছে এবং উক্ত কিয়াং ঘরে ৮ (আট) ফুট উচ্চতার একটি বৌদ্ধমূর্তিও স্থাপন করেছে তারা। কিন্তু কিয়াং ঘরটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহার এখনও শুরু হয়নি। নির্মাণাধীন উপাসনালয়টির প্রায় ৩০০ গজ রেডিয়াসের ভেতর আরো ২ টি উপাসনালয় রয়েছে। তাছাড়া দূর্গম পাহাড়ী এলাকাটি এত ঘনবসতি নয় যে সেখানে আরো উপাসনালয় নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত পরিত্যক্ত এই সেনাক্যাম্পের জায়গাটি দখল করে তাদের আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহারের জন্যই এই কিয়াংটি নির্মাণ করা হয়েছে।”

অর্থাৎ অসৎ উদ্দেশ্যে তৈরি করা একটি বৌদ্ধ মন্দির নামক স্থাপনা কে বা কারা রাতের অন্ধকারে লুটিয়ে দিয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঘটনাপঞ্জীর দিকে তাকালে এরকম অনেক ঘটনা চোখে পড়ে যাতে, কোনো ঘটনা ঘটিয়েই তার দায় সেনাবাহিনী, বাঙালীদের উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। সুদীর্ঘ ইতিহাসের কথা বাদ দিলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ইতিহাসের কথা আলোচনা করা যায়।

গত ২১ জানুয়ারি রাঙামাটি উপজেলার বিলাইছড়িতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দুই মারমা বোনের কথিত ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সেনাবাহিনী বিরোধী অপপ্রচার চালানো হয়। পরে তদন্তে ও ডাক্তারী পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়, উক্ত দুই কিশোরী ধর্ষিতা ছিলো না।


এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন:

  •  মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  •  পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  •  বিলাইছড়িতে কথিত নির্যাতিত দুই কিশোরীর নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত বিশেষ মহল
  •  পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  •  বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি
  •  দেববাক্য কি কভু অবিশ্বাস্য হতে পারে: প্রেক্ষিত দুই মারমা বোন
  •  আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি: দু’মারমা কিশোরী

এরপর গত ২২ আগস্ট বান্দরবানের লামায় দুই ত্রিপুরা কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ করা হয় বিজিবির তিন সদস্যের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু বান্দরবানে ও চট্টগ্রামে দুই দফা ডাক্তারী পরীক্ষায় প্রমাণ পাওয়া যায়, উক্ত দুই ত্রিপুরা কিশোরী ধর্ষিতা ছিলো না। শুধু তাই নয়, যে তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে তারা মামলা করেছে ধর্ষণের অভিযোগে। বিজিবির থেকে বলা হয়, ওই নামে কোনো বিজিবি সদস্যই ছিলো না ওই ক্যাম্পে।


এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন:


এ দুটো তদন্তের পর পাহাড়ীরা আর উচ্চবাচ্য করেনি। কারণ তারা তাদের টার্গেট পূর্ণ করতে পেরেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কী ছিলো তাদের টার্গেট?

১. গত ডিসেম্বরে সন্তু লারমা রাজধানীতে শান্তিচুক্তি পুর্ণ বাস্তবায়ন করা না হলে সশস্ত্র আন্দোলনের হুমকি দেয়। এরপরই রাঙামাটি সদরে এবং বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর ধারাবাহিকভাবে হামলা করে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এ ঘটনায় ভয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন থেকে দলে দলে পাহাড়ী নেতাকর্মীরা গণ পদত্যাগ করতে শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সরকারের পক্ষে থেকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী বিশেষ অভিযান পরিচালনা শুরু করে। এতে অনেক পাহাড়ী সন্ত্রাসী ধরা পড়তে শুরু করে। পরে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এই অভিযান বন্ধ করার জন্যই ওই দুই মারমা কিশোরী ধর্ষণের নাটক সৃষ্টি করা হয়। কেননা, এ ধর্ষণের অভিযোগের পর যৌথবাহিনী রাতের অভিযান বন্ধ করে দেয়। এভাবেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা তাদের কাঙ্ক্ষিত টার্গেট পুরণ করে।

২. গত ২১ আগস্ট বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের ত্রিপুরা পাড়ায় দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয় স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে এ ঘটনায় ২২ আগস্ট লামা থানায় ওই বিজিবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করে স্থানীয় থানায়। তাদের অভিযোগে ভিত্তিতে বান্দরবানে ওই দুই কিশোরীর ডাক্তারী পরীক্ষা করা হয়। পরে অধিকতর পরীক্ষা করা হয় চট্টগ্রামে। দুইটি ডাক্তারী পরীক্ষাতেই ওই দুই ত্রিপুরা কিশোরী ধর্ষিতা নয় বলে প্রমাণিত হয়।

এমনকি এই মামলায় কিশোরী দ্বয়ের বর্ণনায় একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী জানেরুং ত্রিপুরাকে পুলিশ গ্রেফতার করলে সেও অভিযোগ অস্বীকার করে।

লামার ঘটনার অন্তনির্হিত কারণ কী ছিলো? তদন্তে দেখা যায়, লামায় স্থানীয় ত্রিপুরা সন্ত্রাসী ও বান্দরবানের মগ বিচ্ছিন্নবাদী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিজিবি সদস্যরা তাদের টহল বৃদ্ধি করেছিল, যা সন্ত্রাসীদের নির্ভয় চলাফেরায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। ফলে তারা চাইছিল, বিজিবির ওই ক্যাম্পটি প্রত্যাহার করা হোক। এ ঘটনার পর বিজিবি ক্যাম্প প্রত্যাহার না করা হলেও তাদের টহল কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে সন্ত্রাসীরা তাদের টর্গেট পুর্ণ করতে সক্ষম হয়।

কুকিছড়ায় কী ঘটতে পারে?
কুকিছড়ায় কী ঘটতে পারে সেটা অধিকতর তদন্তে প্রমাণিত হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সাংবাদিকরা ঘটনার সরেজমিন তদন্তে ঘটনাস্থলে গিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সম্প্রতি গুইমারা, রামগড়, মাটিরাঙ্গা, মানিকছড়ি, লক্ষ্ণীছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বাঙালীদের জমি, বসতভিটা এবং সেনাবাহিনীর পরিত্যাক্ত সেনাক্যাম্পের জায়গা দখল করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা অনেক ধর্মীয় মন্দির স্থাপন করেছে। অনেক স্থানে দুর্গম এলাকা থেকে পাহাড়ীদের এনে ওইসব জমিতে বসতি স্থাপন করিয়েছে।


এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখুন:

  •  নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা
  •  রামগড়ে ভূমি দখলের আড়ালে ইউপিডিএফের নেতৃত্বে চলছে বাঙালী উচ্ছেদ মিশন
  •  খাগড়াছড়িতে স্কুল উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্প ও বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখল

এ বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে। তারা বিষয়টির তদন্ত শুরু করে। এরফলে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা প্রমাদ গুণতে শুরু করে। ঘটনার পরম্পরা প্রমাণ করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা তাদের এই দখলবাজি বহাল রাখতে ও স্থানীয় প্রশাসনের দখল বিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে রাতের অন্ধকারে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনা পেছনে আগামী নির্বাচনী নানা সমীকরণও কাজ করে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে সেনাবাহিনীকে ব্যাকফুটে রাখা উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

ঘটনা যাই ঘটুক, যারাই ঘটাক, যারা এ ধরণের হীন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক গণমাধ্যমে প্রমাণ ছাড়া এই ঘটনায় যারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা নারী, সংখ্যালঘু, ধর্মীয় প্রভৃতি স্পর্শকাতর ইস্যুকে অপব্যবহার করে একের পর এক নিরাপত্তা বাহিনীকে জিম্মী করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করবে এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। এ ধরণের কাজ কঠোরভাবে দমন করতে হবে।

তবে স্থানীয়ভাবে যদি একটি মন্দির প্রয়োজন হয়, তাহলে গ্রহণযোগ্য স্থানে একটি মন্দির নির্মাণ করে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের দখলবাজী কার্যক্রমকে ছাড় দেয়া চলবে না। সকল অবৈধ দখল উচ্ছেদ কার্যক্রম বহাল রাখতে হবে।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা