পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক

মাহের ইসলাম:

মশাল মিছিল ঠিক কবে, কোথায় এবং কি পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়েছিল, আমার জানা নেই। জানার জন্যে অল্প-স্বল্প চেষ্টা যে করিনি তা নয়, কিন্তু জানতে পারিনি। তবে উৎপত্তি যেভাবেই হোক না কেন, মশাল মিছিলকে আমার অন্য মিছিলের তুলনায় বেশি জীবন্ত মনে হয়। তাই আল জাজিরার মত একটা বিখ্যাত মিডিয়াতে যখন বাংলাদেশের একটা সংবাদের সাথে মশাল মিছিলের ছবি থাকে তখন আমার মনোযোগ আকর্ষণ না করে পারে না। আর যখন দেখলাম যে, সংবাদটি পার্বত্য চট্রগ্রামের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তখন একটু বাড়তি কৌতূহল নিয়েই সংবাদটি পড়তে শুরু করি।

২৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আল জাজিরার যে সংবাদটি আমার এক বন্ধু আমার সাথে শেয়ার করেছেন, সেটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়াতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুই মারমা বোনের কথিত ধর্ষণের ব্যাপারে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে, সংবাদটিতে বলা হয়েছে কিভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্রগ্রামে ধর্ষণ করে ঘটনাটি আড়ালের চেষ্টা করছে। মশাল মিছিলের ছবি দেখিয়ে দাবী করা হয়েছে যে সাধারন মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচারের দাবিতে।

সংবাদটি পড়ে আমি উপলব্ধি করলাম, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অপপ্রচার চালানোতে অভাবনীয় দক্ষতা অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশে এবং বিদেশে  মানুষের হৃদয় জয়ের পথে আমাদের দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে তারা সাথী হিসেবে পেয়েছে, যারা নিজেদেরকে সংবেদনশীল, ধর্মনিরপেক্ষ এবং নারীর অধিকার আদায়ের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে পরিচিত হতে পছন্দ করেন।


  1. এ সংক্রান্ত আরো খবর ও লেখা পড়ুন
  2. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  3. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন
  6. বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি
  7. আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি: দু’মারমা কিশোরী
  8. বিলাইছড়িতে কথিত নির্যাতিত দুই কিশোরীর নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত বিশেষ মহল

এই সংবাদটিতে  চাকমা জনগোষ্ঠীকে “দেশের অত্যাচারিত জনসংখ্যা” হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্রগ্রামকে পরিচিত করা হয়েছে এই বলে যে, কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের ১৩ টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর হালকা সংঘাত (Low Intensity Conflict) চলছে।  পুলিশ কর্তৃক আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দুই মারমা কিশোরীকে তাদের পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ এর তকমা লাগানো হয়েছে; এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের  উদ্ধৃতি দিয়েই অবশ্য এটি করা হয়েছে।এই খবরে মিসেস ইয়ান ইয়ানকে উপস্থাপন করা হয়েছে চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্যা হিসেবে যিনি “ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য লড়াই করছেন”।

আমি অবাক হবো না যদি ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করে থাকেন যে, কারা চাকমাদেরকে অত্যাচারিত জনগোষ্ঠী মনে করে, কারা বলতে পারে যে পার্বত্য চট্রগ্রামে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সাথে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর সংঘাত (Low Intensity Conflict) চলছে, এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ এর তকমা কারা দিতে পারে! সঙ্গত কারণেই আমি মনে করি যে, আল জাজিরার সংবাদটিতে যে শুধুমাত্র মুদ্রার একপাশকে বিকৃত করে দেখানো হয়েছে– তা বোঝার জন্যে একজন পাঠকের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট।

তেমনি একজন স্বাভাবিক পাঠকের দৃস্টিতেই এই নির্দিষ্ট সংবাদের কিছু কিছু অসংগতি তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি। এক্ষেত্রে, আমি যেসব সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমের তথ্য ব্যবহার করছি তার বেশিরভাগই পাহাড়ী ঘরানার বা ইতোমধ্যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে পরিচিত। ইচ্ছে করেই আমি এটি করছি, অন্যথায় বাঙ্গালীর প্রতি সহানুভূতি দেখায় এমন মিডিয়া উল্লেখ করলে আমার দাবিকে অনেকে দুর্বল ভাবতে পারেন। শুরুতেই বলে নেয়া ভাল যে, ২২ জানুয়ারি প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিলো তা প্রমাণ করার ইচ্ছা আমার নেই। সেই ভার যেহেতু মামলা হয়েছে তাই তা আদালতের বিচার্য অথবা সচেতন পাঠকের হাতেই রইল।

যৌন হয়রানির কোন ঘটনা ঘটলে, যে কোন বাবা-মা তাদের সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ করবে, এই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড, কিন্তু মারমা দুই বোনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কেন হয়নি, সেটির কোন উত্তর এই সংবাদে নেই। পাঠকদের কি জানানো উচিত নয় যে, কেন বাবা-মা তাদের হাসপাতালে ভর্তি করেনি বা কেন তারা পুলিশে যায়নি? মেয়ে দুইজনকে ২২ জানুয়ারি সকালে গ্রাম থেকে ‘কে বা কারা’ নিয়ে যাওয়ার পর ২৩ জানুয়ারী দুপুরের পরে রাঙ্গামাটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বাবা-মাকে ছাড়াই দুইজন নাবালিকাকে গ্রাম থেকে তুলে নেয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি করার মধ্যবর্তী ৩০ ঘণ্টায় কী ঘটেছে,  তা প্রকাশ করা হয়নি। কারা তাদেরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছিল, কোথায় তারা ছিল, এসময় তাদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছে- অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। চিকিৎসা করাই যদি উদ্দেশ্য হবে, তাহলে ভর্তির পরদিনই মেয়ে দুইজনকে নিজেদের জিম্মায় নেয়ার জন্যে কিছু স্থানীয় নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী এতটা উঠে পড়ে লেগেছিলো কেন– সেটি আজো অজানা রয়ে গেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়, এই মেয়েদের হাসপাতালে ভর্তি করার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, অনিচ্ছাকৃত হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই  সম্পূর্ণ সত্যের পরিবর্তে এখানে আংশিক সত্য প্রকাশ করা হয়েছে।

খেয়াল করে দেখুন, ২২ তারিখেই এটা পোস্ট করা হয়েছে। এই পোষ্টের অন্যান্য দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করার ভার পাঠকের উপরই রইল; বিশেষ করে, ঘরে কয়জন ঢুকেছিল এবং বাবা-মায়ের উপস্থিতির বিষয়টি।  এমন অনেক মনগড়া পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু জাতীয় দৈনিকে দেখা গেছে।

এখানে আরো লুকানো হয়েছে যে, মেয়ে দুটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ইচ্ছেমতো কাহিনী প্রচার শুরু হয়ে যায়; একই সাথে হাসপাতালের সামনেও অনেকে জড়ো হয়।

বাবা-মায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে, উচ্চ আদালত মেয়ে দু’জনকে তাদের  পিতামাতার কাছে হস্তান্তর ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দেয়। পুলিশ কর্তৃক আদালতের এই আদেশ বাস্তবায়নকে এই সংবাদে বলা হয়েছে, ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ (forced abduction) যা কিনা সশস্ত্র বাহিনী করেছে। অবশ্য এমন উদ্ভট দাবিকে জায়েজ করার জন্যে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর সুত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি আদালতের এই আদেশের বৈধতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে; কারণ অন্য আদালতে মেয়ে দু’জনকে চাকমা সার্কেল চিফের এখতিয়ারে নেয়ার জন্যে আগেই রীট করা হয়েছিল।

তবে দুইজন নাবালিকাকে পিতা-মাতার পরিবর্তে তার নিজের জিম্মায় নিতে চাইলেও  মিসেস ইয়ান ইয়ান ও তার দোসরদের পদক্ষেপগুলির কোন সমালোচনা করা হয় নি। এমনকি, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে বাঁধা দেয়া, এমনকি রীতিমত শারীরিক প্রতিরোধের পরেও প্রশ্ন উঠে নি যে, এখানে আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করা হয়েছে কিনা? এমনটি এই কারণেই সম্ভব যে, আল জাজিরার ঐ প্রতিনিধি শুধুমাত্র ইয়ান ইয়ান এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল সমর্থকদের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনেছেন। তাই অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় উপেক্ষা করে এমন একতরফা ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এটা করতে গিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন; যেমন, ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, যেখানে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, মেডিক্যাল বোর্ডের ৩ সদস্যার মধ্যে একজন বড়ুয়া ও একজন পাহাড়ি ডাক্তারও ছিলেন।

পুরো সংবাদটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল যে, এই সাংবাদিক অন্ধের মতো মিসেস ইয়ান ইয়ান এবং তার সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের বিশ্বাস করেছেন।এমনও মনে হয়েছে যে, তিনি প্রকৃত সত্য উপস্থাপন না করে, মিথ্যার সাথে  কিছু সত্য ও পর্যবেক্ষণ মিশ্রিত করার এবং মিথ্যা উপসংহার উপস্থাপনের জন্যে কোন ধরনের বাধ্যবাধকতার শিকার হয়ে  থাকতে পারেন। এই কারণেই হয়তবা বাবা-মায়ের দাবী এবং তাদের কথা কিছুটা কমই উল্লেখ করা হয়েছে। আমার অদ্ভুত লেগেছে যে, একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে খোলাখুলিভাবে বাবা-মা দাবি করেন যে, মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়নি– সেটি পর্যন্ত এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে, পুরো সংবাদ জুড়ে পিতামাতার দাবি কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ এমনকি মেয়ে দুইজনের পিতা-মাতার পরিবর্তে,  স্থানীয় কিছু নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার  কর্মীদেরকে কথা অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়ছে। তাই আমি অনুভব করছিলাম যে, এই প্রতিনিধি ও ঐসব স্থানীয় নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার  কর্মীদের মাঝে এক ধরনের বোঝাপড়া থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। পাশাপাশি, প্রকৃত গল্পটি খোঁজার পরিবর্তে হয়তো তিনি কোন বিশেষ ব্যক্তির বীরত্বপূর্ণ ইমেজ সৃষ্টির লক্ষ্যেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

আমি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছি যখন মেয়ে দুইজনের ছোট ভাইয়ের কথা বলা হয়েছে। সংবাদদাতা দাবি করেছেন যে, “প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত ছোট ভাই মার্মা ভাষায় বলেন যে, ‘এক নয়, তবে দুইজন লোক রুমটিতে প্রবেশ করেছে’।” অথচ, পাহাড়িদের ভিডিও ক্লিপে কিন্তু ‘একজন’ এর কথাই বলা হয়েছে। যেহেতু সাবটাইটেল সহ এই ভিডিওটি এমন একটি Facebook পেইজে  আপলোড করা হয়েছিল যা তার সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্যের জন্য সুপরিচিত, সেহেতু এই ক্লিপের সাবটাইটেল অবিশ্বাস করার কোন কারণ থাকতে পারে না। তাহলে, এই প্রতিবেদক ছোট ভাইয়ের কথার এমন মিথ্যে অনুবাদ কেন প্রচার করবেন? নাকি তিনি নিজেই পাহাড়িদের অপপ্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং মিথ্যে প্রচারে সর্বতোভাবে চেষ্টা করছেন?

যেকোনো নির্যাতিতার জন্যেই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া আতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুরু থেকেই কিছু নেতা-নেত্রী মেয়েদেরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেষ্টা ছিল। অজ্ঞাত কারণে, এই সত্যটি, প্রতিবেদকের মনে কোন ধরনের সন্দেহ উত্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে, প্রতিবেদক এটিকে সত্য বলে প্রমাণ করেছেন যে, “সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুরো হাসপাতালটিকে নজরদারির আওতায় রাখে এবং বহিরাগতদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না।” বাস্তবতা হলো, এই সংবাদেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বড় মেয়েটির স্বাক্ষর করা একটি চিঠি এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হস্তগত হয়েছে। আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিছু ভলান্টিয়ারসহ ইয়ান ইয়ান হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

এমন কি, মিসেস ইয়ান ইয়ানের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক শুরু থেকে হাসপাতালের মধ্যে মেয়েদের সাথে ছিল। সংবাদদাতা আরো লিখেছেন, “আল জাজিরার সাথে কথা বলার সময় ইয়্যান ইয়ান বলেন, ২২ জানুয়ারি ভোর বেলা নিরাপত্তা বাহিনীর চারজন সদস্য মারমা পরিবারের ঘরে প্রবেশ করেন”। সংবাদদাতা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছেন যে ‘দুইজন পুরুষ’ বাড়িতে প্রবেশ করেছিল।

শুরুতেই বলে নিয়েছি যে, উরাছড়িতে ২২ তারিখে কি ঘটেছিল, আমি তা প্রমাণ করতে চেষ্টা করছি না। তাই, এই ঘটনাটি নিয়ে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে কি প্রকাশিত হয়েছে- তা এখানে উল্লেখ করতে চাই না। উৎসুক যে কোন ব্যক্তিই সেগুলো দেখে নিতে পারবেন। যা নিশ্চিত, তা হলো এই যে, আল জাজিরার এই সংবাদে বেছে বেছে কিছু নির্বাচিত ঘটনা বিকৃত বা আংশিক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে। এটা দিবালোকের মতো পরিস্কার যে, এই সংবাদে প্রদত্ত বেশিরভাগ তথ্যই পক্ষপাতদুষ্ট, কারণ একটি বিশেষ ঘরনার কাছে থেকেই সকল তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে; প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয়নি বলে দৃশ্যমান। মূলত কিছু বিশেষ লক্ষ্যের দিকে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায় বা জনগণের মনোভাবকে প্রভাবিত করাই এই সংবাদের লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে।

– লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন

  • অর্পণা মারমা

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, পাহাড়ের অনেক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির মানবতা দেখে আমি এবং আমার মতো যারা পাহাড়ের বাইরে আছেন, তারা সবাই সত্যিই মুগ্ধ। যারা পারছেন, তাদের অনেকই সুদূর ঢাকা বা আরো দূরে থেকে তাদের সংহতি ও  সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন, রাঙ্গামাটি হাসপাতালে ‘অবরুদ্ধ’ বা কারো কারো ভাষায় ‘চিকিৎসাধীন’  দুই বোনের জন্যে। অনেকে মানববন্ধন করেছেন, আবহাওয়ার বৈরিতাকে উপেক্ষা করে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন, বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন, অনলাইনের যেখানে পারছেন পোস্ট দিচ্ছেন; সবই মানবতার খাতিরে।পার্বত্য অঞ্চলের অতি উঁচু পর্যায়ের বেশ কয়েকজনতো প্রায় প্রতিদিনই রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালের সামনে সময় কাটাচ্ছেন – শুধুমাত্র মেয়ে দুইজনের কল্যাণ্যের জন্যে, ‘নিজেদের মেয়েদের’ জন্যে।

এইসবের যে কোন একটি কাজই  ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা অর্জন করার জন্যে যথেষ্ট, সেখানে অনেকেই আরো বেশি করছেন, অনেক বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন। আন্তরিক ধন্যবাদ সেইসব ভলান্টিয়ারদের জন্যে যারা হাসপাতালে মেয়ে দুইজনকে সঙ্গ দিচ্ছেন, তাদের সাথে রাতে ঘুমাচ্ছেন, তাদেরকে পছন্দের মুভি বা গান, ভিডিও দেখাচ্ছেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছেন। সত্যি বলতে কি, ধন্যবাদ দেয়াটা অনেক অনেক কমই হয়ে যায়। অবশ্য এর বেশি আর কীই বা বলতে পারি।

অর্থাৎ, নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এখনও সমাজে শ্রদ্ধেয় বরং মানবতা শুধু জীবিতই নয় বরং মানবতা প্রদর্শনকে  বীরোচিত ও সম্মানিত আচার-ব্যবহার হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। তবে কেন জানি, আমার ক্ষুদ্র মন তাদের এই মহান কাজগুলির মধ্যে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং মানবতার চেয়ে অন্য কিছু খুঁজে পায়, যা আরো বেশি মাত্রায় উপস্থিত, যা মানবতাকে প্রায়ই লজ্জায় ফেলে দেয়। অবশ্য আমার এই লজ্জাজনক উপলব্ধির জন্যে যদিও আমিই দায়ী, তবুও কেন জানি মনে হয় ঐসকল মহান লোকদের নিজস্ব কার্যকলাপের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, আমার এই উপলব্ধির পিছনে।

নিজের দোষ ধরা কঠিন বলেই, বিচারের ভারটা আমি পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি। আমি শুধু আমার এহেন ঘৃণ্য উপলব্ধির প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি।

নিশ্চয় আমরা কেউই রাঙ্গামাটির ভুমিধ্বসের কথা ভুলে যাইনি। বিশেষ করে যারা পার্বত্য অঞ্চলের ব্যাপারে কিছুটা হলেও খোঁজ রাখেন, তাদের তো ভোলার প্রশ্নই ওঠে না। অনেকেরই ভুমিধ্বসের কথা খেয়াল থাকলেও শুধুমাত্র রাঙ্গামাটিতেই প্রায় ১২০ জন মারা গিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৬১ জনই ছিলো পাহাড়ি- সেই তথ্য হয়ত খেয়াল নেই। রাতারাতি সহায়-সম্বল হারিয়ে, পাহাড়ি– বাঙ্গালী মিলিয়ে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এসে উঠছিলেন। অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছিল প্রায় মাসাধিককাল। তখন এই সহায়-সম্বলহীন মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল কারা, সেটি আর সবাই ভুলে গেলেও আশ্রয়কেন্দ্রের ঐ মানুষগুলো ভোলেনি।

আমি জানি অনেক পাহাড়ি ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর সাহায্য করেছেন এবং সাহায্য আনার জন্যেও অনেক কাজ করেছেন। তবে, আমাদেরকে যা ব্যথিত করে তা হলো, আমরা যাদেরকে নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করি, যাদেরকে আমাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পূজনীয় জানি – তাদের অনেকেই ঐ সময় যথাযথ ভূমিকা রাখেননি। আজ দুইজন মারমা বোনের জন্যে চাকমা রাণীমাতার  এবং অন্যান্যদের যে প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে, তখন যদি এর ছিটেফোঁটাও থাকতো, পাহাড়ের এই পূজনীয় ব্যক্তিদের জন্যে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকারেও অনেকে কুণ্ঠাবোধ করতো বলে মনে হয় না।

আরেকটা তথ্য এখানে না দিলেই নয়, ঐ সময় প্রায় শ’খানেক বা এর কিছু কম ভলান্টিয়ার রাত-দিন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে কাজ করছিলো– তাদের মধ্যে অতি নগন্য কয়েকজন ছিলো পাহাড়ি, বাকি সবাই ছিল বাঙ্গালী। যাদের অনেকই ছিলো শিক্ষার্থী, এমনকি রাঙ্গামাটির বাসিন্দাও নয়– রোজার ছুটিতে বাড়িতে এসে মানব সেবার সুযোগ পেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বিপন্ন মানুষের পাশে।“ঈদের দিনে অন্য বন্ধুদের সাথে উৎসব উদযাপনের পরিবর্তে এরা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ব্যস্ত সময়” কাটিয়েছে আন্তরিকতার খাতিরে। আর যাই হোক, প্রচারের জন্যে বা লোক দেখানোর জন্যে তারা কিছু করেনি- বরং সত্যিকারের মানবতার জন্যেই তারা নিবেদিত ছিল।

তাই তো, শুধুমাত্র পাহাড়িদের জন্যে বৌদ্ধ বিহারে যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিলো, সেখানেও ঐ বাঙ্গালী ভলান্টিয়ারদের আন্তরিকতা, আগ্রহ আর প্রচেষ্টায় কখনই কোন কমতি ছিলো না। কেন জানিনা, হাজার খানেক বিপন্ন মানুষের ঐ কঠিন সময়গুলোতে আজকের দিনের এইসব ভলান্টিয়ার ও মানবতাবাদীদের এমন সরব উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, তাদের মানবতাবোধ কি পক্ষপাতদুষ্ট? নাকি লোক দেখানো  বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

কারণ যাই হোক না কেন, তাদের এই মানবতাবোধ বা ‘নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা’ যে মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা অথবা মনুষ্যত্বের কারণে নয়, সেটা অবশ্য বুঝতে কারো দেরি হওয়ার কথা নয়। মানুষের প্রতি ভালবাসার কারণে হলে, আমরা তাদেরকে আরো অনেক ঘটনার পরপরই একই রকম সরব হতে দেখতাম। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এই যে, এমনটা হয়নি; বরং পার্বত্য অঞ্চলের অন্য অনেক নারী নির্যাতনের ঘটনায় তারা প্রতিবাদ করেন নি।

এমনকি, কোন কোন অতি ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরেও তাদের কোন ধরণের প্রতিবাদ বা বক্তৃতা-বিবৃতি চোখে পড়ার মতো ছিলো না। কেন জানি না, তারা মানবতাকে ভিন্ন রঙ্গে রাঙ্গিয়ে ফেলেছেন, মানবতা এখন আর তাদের কাছে দল-মত-নির্বিশেষে একই রূপে নেই। আমার মনে হয়, কয়েকটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরলেই বুঝতে পারবেন, এমন কথা আমি কেন বলছি।

এক কিশোরীকে প্রকাশ্যে মারধোর করে, পরে ধরে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে এবং তা যদি মোবাইলে ধারণ করা হয়, তাহলে কি এই প্রতিবাদীদের প্রতিবাদ করার কথা নয়? এখন যদি বলি, ঐ কিশোরী একজন চাকমা, তাহলে? আর যদি বলি, তাকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নামের একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা গহীন জঙ্গলে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে এবং মোবাইলে ধারণ করেছে, তাহলে কি প্রতিবাদ হবে? প্রতিবাদ অবশ্য হয়েছিল; তবে, কারা করেছিলো জানেন? আজ যে সব মানবদরদী দেখছেন, উনারা নন। প্রতিবাদ করেছিল, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ; ঐ ঘটনায় পুলিশ কর্তৃক আটককৃত ‘নেতার মুক্তির দাবিতে হরতাল-অবরোধ ও বিক্ষোভ করে’।

বিশ্বাস করতে চাইবেন না, জানি। তাই অনুরোধ করবো, ২০১৬ সালের মে মাসের আয়না চাকমার ঘটনার ব্যাপারে একটু খোঁজ নেয়ার জন্যে। ঐ কিশোরীর অপরাধ- এক বাঙালি ছেলের দোকানে গিয়েছিল সে, কলেজে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে। মানবতা বা যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা এখানে প্রযোজ্য নয়; কারণ, এখানে পাহাড়ী বীরপুরুষরা নিজেরাই জড়িত, যাদের সাত খুন সব সময়ই মাফ বিশেষ করে পাহাড়ে!

৬ষ্ঠ শ্রেনিতে পড়তো এক বাঙ্গালী দিন মজুরের মেয়ে। খাগড়াছড়ির গামারীঢালার মেয়েটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির এক শনিবার সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পাশে গরু আনতে গেলে এক পাহাড়ি যুবক তাকে ধর্ষণের চেষ্টার মধ্যেই মেয়েটির চিৎকারে আশে-পাশের লোকজন চলে আসে এবং আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আমি অবশ্য ঢাকায় কাউকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে শুনিনি; কোন নারীবাদী সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা তো দুরের কথা।

হাসপাতালে ঐ মেয়েকে দেখতে কয়জন গিয়েছিলেন বা আদৌ গিয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্ন নিশ্চয় এখানে অবান্তর। কোন ক্লাশ বর্জন, কালো ব্যাজ ধারণ, মানব-বন্ধন বা স্মারকলিপি পেশ করার মতো কিছু করারও প্রয়োজন কেউ সম্ভবত বোধ করেননি। হয়তবা, দিনমজুর কিংবা পাহাড়ের বাঙ্গালিদের বা যাদেরকে আমরা ‘সেটেলার’ বলে জানি তাদের জন্যে মানবতা, ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ বা মানবাধিকারের মতো কঠিন বিষয় প্রযোজ্য নয়!

গত বছরের জানুয়ারিতে রাংগামাটিতে রীতিমত সংবাদ সম্মেলন করে, এক নির্যাতিতা জানিয়েছিলো তার উপর চালানো অন্যাচারের লোমহর্ষক ঘটনাবলী। ‘গলায় শেকল দিয়ে বেঁধে টানা প্রায় দুই মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি মেয়ে জোসনা চাকমার ওপর’। কারা করেছিল জানেন? আমাদের ইউপিডিএফ এর স্থানীয় যুব সমিতির কর্মীরা। ঘটনাস্থল তো এই রাঙ্গামাটিই ছিলো। তখন না ছিল কোন ভলান্টিয়ার তার পাশে, না অন্য কেউ!

পাহাড়ের বড় নেতা দূরে থাক, কোন পাতি নেতা বা নেত্রীও জোসনা চাকমার জন্যে সহানুভূতি দেখাননি। এমনকি, কোন প্রতিবাদও করেননি। মনে হয়, উনাদের প্রতিবাদের চর্চাটা অনেকটা এরকম যে, স্বগোত্রের দূর্বৃত্তরা যাই করুক না কেন, প্রতিবাদ করা যাবে না; কারণ প্রতিবাদ অপরাধ অনুযায়ী হবে না, অপরাধী অথবা নির্যাতিতার পরিচয় অনুযায়ী হবে।

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার ক্ষেত্রলাল ত্রিপুরার মেয়ে দীপা ত্রিপুরা ভালবেসেছিলো এক বাঙ্গালিকে। পাহাড়ে এর ফলালফল কি হতে পারে সেটা জানতো বলেই, যখন সে তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে পালাচ্ছিলো, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কিছু কর্মী তাদেরকে অপহরণ করে। পরের ঘটনাবলি পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠিত এমন অন্যান্য ঘটনাগুলোর মতোই। ছেলেটিকে  পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করা হয়। আর মেয়েটিকে শিকার হতে হয় একাধিকবার গণধর্ষণের, এমন কি তা মোবাইলে রেকর্ডও করা হয়। ঘটনাটি বেশি দিন আগের নয়, ২০১৫ সালের জুন মাসের।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতেও কোন ধরণের প্রতিবাদ করার সাহস কেউ দেখান নি। কারণ হয়তবা, পাহাড়ে নারীদের অধিকারের সংজ্ঞা ভিন্ন। আর এখানে প্রতিবাদতো করা হয় অপরাধী দেখে, অপরাধ দেখে নয়।  আয়না চাকমার মতো, দিপা ত্রিপুরার পাশেও কোন ভলান্টিয়ার ছিলো না তাকে মানসিক স্বস্তি দেয়ার জন্যে; আজ যেমন আছে বিলাইছড়ির দুই নির্যাতিতা বোনের জন্যে।

সাংগঠনিকভাবে পরিচিত রেটিনা চাকমাকে বিয়ে করায় দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা ও প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্র হয়ে যান প্রতিপক্ষ ‘বাঙালী’। অথচ দুজনই ছিলেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার।কিন্তু “চাকমাদের দৃষ্টিতে যা ভয়াবহ অন্যায় সেই পাহাড়ী-বাঙালী বিয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। সংগঠনের নেতারাও ‘বিশেষ স্বার্থে’ সৈকত-রেটিনার প্রেম-বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতার সমাধানে এগিয়ে আসেনি।

এমনকি উপজাতীয় অধিকারের পক্ষে সোচ্চার জাতীয় সংবাদপত্র প্রথমআলোও তার স্টাফ ফটোগ্রাফারের কোনো অন্যায় নেই জেনেও তার পক্ষে না দাঁড়িয়ে বরং বিশেষ মহলের চাপে চাকুরিচ্যুত করেছে।”। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, স্বয়ং সৈকত ভদ্রের ভাষ্য অনুযায়ী, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামে তোলার মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন।” ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ তারিখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনের যদি প্রচার সীমিত হয়ে থাকে বা ২০১৫ সালের এই ঘটনা যদি আপনি না জানেন, আমি অবাক হবো না, কারণ এমন ঘটনাতো প্রচার নাও পেতে পারে !

নারীবাদী যারা আছেন, তারা তো আর কোন সংগঠনের বাইরের কেউ না, তাই কোন অজ্ঞাত কারণে কোন বিশেষ ঘটনা নিয়ে তেমন কিছু না বলাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।একইভাবে কোন বিশেষ ঘটনা নিয়ে সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করা বা খুবই সরব হওয়াও স্বাভাবিক মনে হতেই পারে, কারো কারো বিশেষ বিবেচনায়।

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির ১১ পাহাড়ী মারমা কিশোরীর মিয়ানমারে পাচারের ঘটনায় কয়জন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো, মনে পড়ে না। সোশ্যাল মিডিয়াতে এ নিয়ে আদৌ কোন প্রতিবাদ বা পোস্ট ছিলো কিনা, সেটি নিয়েই আমার সন্দেহ আছে। অথচ, একজন বা দু’জন নয়, ১১ জন ‘শিশু কন্যাকে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ ও স্বাস্থ্যপরীক্ষা’ করতে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ৫ সদস্যের মেডিকেল টিম কাজ করেছিলো। ভয়াবহ বিষয় হলো, “উদ্ধারকৃত পাচার হওয়া ১১ মারমা কিশোরী পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, প্রতিদিন বৌদ্ধ ভিক্ষু উসিরি তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো।” তাদের মধ্যে কমপক্ষে দুজনকে দুপাশে নিয়ে বিছানায় যেতো।

কিন্তু, ঢাকার রাজপথে কয়জন মানববন্ধন করেছিলো বা বিবৃতি দিয়েছিলো? কয়টি জাতীয় দৈনিক এই সংবাদটিকে গুরুত্ব সহকারে ছেপেছিলো? রাজশাহী বা চট্টগ্রামে কি কেউ কোন প্রতিবাদের আয়োজন করেছিলো? পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে কাজ করেন এমন কয়জন বুদ্ধিজীবী এই ঘটনায় শাহবাগে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করেছিলেন বা বিবৃতি দিয়েছিলেন? যেহেতু এই ঘটনায় আটক করা হয়েছিলো একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ২ পাচারকারীকে, তাই তথাকথিত অনেক প্রতিবাদী, নারীবাদী বা বুদ্ধিজীবীগণ প্রতিবাদের প্রয়োজন মনে করেননি বোধ হয়। যেভাবে দুই মারমা বোনের জন্যে প্রচার হয়েছে আর আমরা প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছি, ঐ ১১ জনের জন্যে তা হয়নি আর আমরাও কিন্তু প্রতিবাদে এগিয়ে আসিনি। কারণ কি হতে পারে, তা নির্ণয়ের ভার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেয়া ছাড়া আমার কোন উপায় আসলেই নেই।

তাই মনে হচ্ছে, বিলাইছড়ির ঘটনা নিয়ে যত প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন, সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট, মানববন্ধন আর প্ল্যাকার্ডের ছবি দেখছি তার সবই করা হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে, শুধুমাত্র বিশেষ কাউকে ছোট করার জন্যে; নির্যাতিতার প্রতি প্রকৃত দরদ বা নারীর প্রতি আন্তরিকতা থেকে নয়। আর এজন্যেই যখন সংবাদ পাই যে, ‘বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি’– তখন  নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা ও মানবতার কারনে পাহাড়ের যে পূজনীয় ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে মাথা নোয়াতাম তাদের প্রতি ঘৃণা জন্ম হয় মনের গভীরে।

ভাবতে কস্ট হয় যে, দুইজন অসহায় মেয়ের কষ্ট আর বিশ্বাস উনারা কত সহজে নিজেদের স্বার্থে অপব্যবহার করলেন। মাটিরাঙ্গার কুলসুম আকতার, আলীকদমের  সেলতিপাড়ার পাখি আক্তার, মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম কিংবা খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণধর্ষণের শিকার হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসদের মতো অনেক লোমহর্ষক আর ভয়াবহ ঘটনাগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেছে।

আমি জানি, যে ঘটনাগুলো আমি তুলে ধরেছি, এর বাইরেও এমন অনেক অনেক ঘটনা আছে। সেগুলোর বেশিরভাগই পাঠককুলের অজ্ঞাত। কারণ, স্বগোত্রের দূর্বৃত্ররা নারীর প্রতি কোন অন্যায় করলে, ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়; ধর্ষকের বিচার চেয়ে কোন আন্দোলন হয় না, কোনো মিছিল হয় না, পত্রিকার পাতায়ও কোনো খবর হয় না।

যেহেতু পাহাড়ের বেশিরভাগ সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধি পাহাড়ি, তাই তাদের বিবেচনায় হয়ত এ ধরনের ঘটনা সংবাদ হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না। কারণ, হয় এই ঘটনাগুলোর শিকার মেয়েরা বাঙ্গালির সাথে প্রেমের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, নয়তো পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিদের এই ঘটনাগুলোর সাথে কোন সংশ্লিষ্টতা নেই বরং পাহাড়ের উপজাতি সন্ত্রাসিরাই এগুলো ঘটিয়েছে। এমনকি এটা যদি পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় কোন বিশেষ বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত কোন অপরাধ হতো, তাহলেতো এটা নিয়ে কোন নিউজ করারও হয়ত অনেকে সাহস করতো না। যেমনটি হয়েছে, রেটিনা চাকমা, আয়না চাকমা, দিপা ত্রিপুরা বা জোছনা চাকমার ক্ষেত্রে।

লেখিকা রোকেয়া লিটার ডুমুরের ফুল নামক অভিজ্ঞতা লব্ধ গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, কোনো পাহাড়ী ছেলে যখন কোনো পাহাড়ী মেয়েকে ধর্ষণ করে তখন তথাকথিত প্রথাগত বিচারের নামে দোষী সাব্যস্ত হলে ওই পাহাড়ী ছেলেকে একটি শুকর জরিমানা করে স্থানীয় হেডম্যান/কার্বারীরা। জরিমানাকৃত শুকর জবাই করে তার রক্ত পাড়াময় ছিটিয়ে পাড়া পবিত্র করা হয় এবং জবাইকৃত শুকরের মাংস রান্না করে পাড়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খাওয়ানো হয়। এতে ধর্ষিতা মেয়েটি কি পায় বা তার নারীত্বের যে অসম্মান করা হয় সে বিষয়ে প্রথাগত বিচারের প্রণেতা ও সর্বময় কর্তা রাজা বা রাণীরা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? বরং ধর্ষিতা নারী বা তার পরিবার যদি এই বিচারে সন্তষ্ট না হয়ে রাষ্ট্রীয় আইনের আশ্রয় নিতে চান তাদেরও নিবৃত করা হয় এই প্রথাগত বিচারের কথা বলেই। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা পাহাড়ের শত শত এনজিওগুলোও কোনোদিন এদিকে নজর দেননি।

বিলাইছড়িতে সেদিন আসলে কী ঘটেছিলো সেটা সময় হলে সবাই জানতে পারবে- তবে এখন পর্যন্ত অন্তত একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে গেছে; তা হলো, পাহাড়ে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা একই ধরণের কিন্তু আরো অনেক জঘন্য ও ভয়াবহ ঘটনার পরেও অনেক নেতা-নেত্রী ও ভলন্টিয়ারদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন বা হাসপাতালে ছুটোছুটি করতে দেখা যায়নি। সেখানে বিলাইছাড়ির দুই মারমা বোনের জন্যে উনাদের দৌঁড়াদৌঁড়ি আর যাই হোক আন্তরিকতাপ্রসূত হতে পারে না, মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে হতে পারে না। এই মায়াকান্নার মুখোশের আড়ালে, কী লূকানো আছে, সেটি উন্মোচিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আন্তরিকতার পরিবর্তে পক্ষপাতদুষ্ট, লোকদেখানো  বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বিশেষ বিশেষ ঘটনায় অন্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টাতে আর যাই হোক, ফায়দা হবে না। এসব করে, সরল পাহাড়িদের বেশিদিন বোকা বানানো সম্ভব হবে না। বরং সকলের সামনে মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে– সবাই বুঝে যাবে যে, মানবতা নয় বরং অন্য কিছুই এখানে মুল নিয়ামক, যার কারণে আপনি শুধুমাত্র নির্বাচিত কয়েকটা ঘটনার প্রতিবাদে এতটা সরব, এতই উচ্চকণ্ঠী।

তাই আসুন, পাহাড়ি রঙ্গে না রাঙ্গিয়ে মানবতাকে তার প্রকৃত রঙ্গে বিকশিত হতে সাহায্য করি। রাজনীতির স্বার্থে মানবদরদী না হয়ে, একজন মানুষ হিসেবে দল-মত নির্বিশেষে প্রকৃত মানবদরদী হতে চেষ্টা করি। নারীর প্রতি সংবেদনশীলতার মত একটা স্বর্গীয় বিষয়কে ব্যক্তিস্বার্থে অপব্যবহার না করে সকল নির্যাতিতার প্রতি সমানভাবে সহানুভূতিশীল হই। প্রকৃত ঘটনা না জেনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ করার পরিবর্তে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেই আসল অপরাধীকে ধরতে এবং তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে।

বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

রাঙামাটির বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে ডাক্তারী পরীক্ষায় পুরুষ শুক্রানুর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের শরীরে নির্যাতনেরও কোনো আলামত খুঁজে পায়নি তাদের পরীক্ষাকারী ডাক্তারগণ। তবে অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট, সনোলজিস্ট ও ফরেনসিক মেডিক্যাল এক্সপার্টের অভাবে ডাক্তারগণ চুড়ান্ত মন্তব্য করেননি। আল্ট্রা সনোগ্রাম রিপোর্টের জন্য বড় বোনের  জরায়ু ও তলপেটের রিপোর্ট পেন্ডিং রাখা হয়েছে।

এদিকে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর বয়সও ডাক্তারগণ নিশ্চিত হতে পারেননি। তাই উন্নত পরীক্ষার জন্য অভিযুক্ত কিশোরীদ্বয়কে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করার সুপারিশ করা হয়েছে। পার্বত্যনিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এই মেডিকেল রিপোর্টের ব্যাপারে মুখ খুলতে চায়নি কোনো পক্ষই।

রাঙামাটির ডেপুটি সিভিল সার্জন  নীহার রঞ্জন নন্দী জানান, দুই কিশোরীর পরিক্ষার রিপোর্ট  আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া এ রিপোর্টের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না বলে তিনি জানান। সিভিল সার্জন জানান, ওই কিশোরী পুলিশী হেফাজতে রাঙামাটি সদর হাসপতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, কিশোরীদের বয়স নির্ধারণের জন্য রাঙামাটিতে এক্সরে মেশিন বা উন্নতমানের ফরেনসিক মেশিন না থাকায় বয়স নির্ধারণের জন্য পুলিশি হেফাজতে কিশোরীদের চট্টগ্রামে রোববার প্রেরণের সম্ভবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ সাফিউল সারোয়ার জানান, বিজ্ঞ আদালত ওই দু’কিশোরীর বয়স নির্ধারণের জন্য রাঙামাটি সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছে। আমরা শুধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পারি বলে তিনি জানান।

এদিকে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় নির্যাতিত দুই কিশোরীর শুনানীর দিন ৭ফেব্রুয়ারী ধার্য করেছে আদালত।

বুধবার সকালে তাদের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট  সাইফুদ্দীন খালেদের আদালতে তোলা হলে শুনানি শেষে আদালত এ তারিখ ঘোষণা করেন।

রাঙামাটি ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: নীহার  রঞ্জন নন্দী জানান, ওই দুই কিশোরী পরিক্ষার রিপোর্ট আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) রুহুল আমীন সিদ্দিকী জানান, ওই দুই কিশোরীর বয়স নির্ধারণের জন্য আদালতে আবেদন করা হলেও এ ব্যাপারে আদালত কোন শুনানী না করে পরবর্তী ৭ফেব্রুয়ারী শুনানীর দিন ধার্য করে।

উল্লেখ্য চলতি বছরের ২২জানুয়ারী গভীর রাতে বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের ধরতে একটি অভিযান পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী।

এরপর ওইদিন  গভীর রাতে মারমা দুই কিশোরী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযাগ তুলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায়  পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  (জেএসএস)।

এদিকে ঘটনার পরের দিন ২৩ জানুয়ারী কে বা কারা ওই মারমা কিশোরীকে দূর্গম বিলাইছড়ি থেকে এনে রাঙামাটি জেনারেল হাসপতালে ভর্তি করায়।

ছবি- প্রতিকী