নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবির অভিযানে বিপুল চোরাই কাঠ আটক

Bgb Kat atok-05-02-16
নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি : 
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বন বিভাগ অলস সময় পার করলেও কাঠ পাচার বিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছে বর্ডার গার্ড ব্যটালিয়ন। সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন অবৈধ মালামাল আটকের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার ৪ ফেব্রুয়ারী দোছড়ি ইউনিয়নের কোলাচিঘাট ও পক্ষিঝিরি নামক এলাকা থেকে এসব চোরাই কাঠ আটক করা হয়।

৩১ বিজিবি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ৩১ বিজিবির নিয়ন্ত্রণাধীন লেম্বুছড়ি বিওপির নায়েব সুবেদার মো. শাহ আলম এর নেতৃত্বে বিজিবি’র একটি টহল দল কোলাচিঘাট ও পক্ষিঝিরি এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় চোরাই কাঠ পাচারকারীরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ৬০৮.৯ ঘনফুট এবং জ্বালানী কাঠ ১ হাজার ২শত ঘনফুট কাঠ আটক করতে সক্ষম হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৪ লক্ষ ৯১ হাজার টাকা। আটককৃত কাঠ মামলা নং ইউডিওআর-২১ এবং ২২ রুজু করে ৪ ফেব্রুয়ারি তুলাতুলী বনবিট অফিসে জমা করছে বিজিবি।

অভিযানে কাঠ আটকের সত্যতা নিশ্চিত করে বেআইনী সব ধরনের কার্যক্রম প্রতিরোধে বিজিবি তৎপর রয়েছে বলে জানান, ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জোন কমান্ডার লে.কর্ণেল হাসান মোরশেদ চৌধুরী।

নাইক্ষ্যংছড়িতে আটক মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি

DSC09540

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার আশারতলী সীমান্ত থেকে আটকের পর লাটুনা (২০) নামে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সদস্যকে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই মিয়ানমারে ফেরত দিয়েছে বিজিবি।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮ টায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৪৬-৪৭ নম্বর আর্ন্তজাতিক পিলার থেকে প্রায় দুই কি: মি: বাংলাদেশের অভ্যান্তরে আশারতলী বিদ্যালয় এলাকা থেকে সেই বিজিপি সদস্যকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কক্সবাজার সেক্টরে নেওয়ার হলে বুধবার সকালে ঘুমধুমে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মিয়ানমারের সিকদারপাড়া ২নম্বর বিজিপি ব্যাটালিয়ানের সদস্য লাটুনা (২০) মঙ্গলবার সকালে সীমান্ত পিলার অতিক্রম করে বাংলাদেশের আশারতলী ভূ-খন্ডে চলে আসে। এ সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তাকে আটক করে বিজিবি ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়। পরে সে নিজেকে মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার বাসিন্দা পরিচয় দেয় এবং মিয়ানমারের বিজিপির সদস্য হিসেবে কর্মরত রয়েছে বলে জানায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তে বিজিবি ৪০টি নতুন ফাঁড়ি নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছে

বিজিবি লোগো

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

বিজিবি ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে ৪০ টি নতুন ফাঁড়ি বিওপি নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছে। জঙ্গী তৎপরতা ও পাচার রোধে এই ফাঁড়ি নির্মাণ করতে সম্মতি জানিয়েছে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ বিজিবি, এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিএসএফ মহাপরিদর্শক ভোলা নাথ শর্মা সোমবার এ কথা জানান।

 

তার ভাষায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যগুলোতে যে সন্ত্রাসী ও অন্তর্ঘাতী তৎপরতা পরিচালিত হয় তার অধিকাংশই পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই স্থানসমূহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বলে তিনি মন্তব্য করেন যেখানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেও জঙ্গীরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে থাকে।

এদিকে ত্রিপুরার তিন সীমান্ত জেলার তিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও বাংলাদেশের চার সীমান্ত জেলার ৪ জেলা প্রশাসক আজ ২৪ জুন চট্টগ্রামে বৈঠকে মিলিত হবেন। কর্মকর্তারা সীমান্ত অপরাধ দমনের উপায় হিসেবে বেড়া নির্মাণ ও আরো ভালো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা খাড়া করার বিষয়ে মতবিনিময় ও আলোচনা করে চূড়ান্ত কৌশল গ্রহণ করবেন।

গত ৮ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মেঘালয়ের শিলংয়ে বিজিবি ও বিএসএফ এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যাতে সন্ত্রাসবাদ ও অন্তর্ঘাত নির্মূলের যৌথ কর্মকৌশল ও আরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ছাড়া সীমান্ত সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাও আলোচনায় স্থান পায়। নতুন ফাঁড়ি নির্মাণে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পথ ও অধিকাংশ স্থানে চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় বিজিবি ভারতের রাস্তা-ঘাট ব্যবহারের অনুমতি চাইলে বিএসএফ পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।

এই বিএসএফ কর্মকর্তা আরো জানান, দেশ দু’িটর অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে আন্ত:সীমান্ত অপরাধ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপসমূহের অপতৎপরতা বন্ধে উভয় দেশ একযোগে কাজ করে যাবারও আশাবাদ ব্যক্ত করে এই বৈঠকে।

 

বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

mehadi Hassan palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ
 

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তাপ ও উত্তেজনার কালো মেঘ এখনো কাটেনি। বরং তা আরো বিস্তৃত হয়ে রাজধানী তথা সারাদেশ এমনকি আন্তর্জাতিক আকাশেও ছায়া ফেলেছে।

 
গত ২-৫ জুলাই সিএইচটি কমিশনের এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনকে বিতর্কিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন আখ্যা দিয়ে এই সফরকালে ঘিরে ৬ বাঙালি সংগঠন তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ডাকে। অবরোধের মধ্যেই সফর অব্যাহত রেখে ২ জুলাই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের টিম খাগড়াছড়ি গমন করে। খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপনের পর ৩ জুলাই প্রবল উত্তেজনা ও প্রশাসনের ডাকা ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই দিঘীনালায় বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা স্থানীয় স্কুলে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিদার ২১ পরিবারের সাথে কথা বলেন। এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়িদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।
 
এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। এসময় বাবুছড়া বিজিবি জোন কর্মকর্তারা তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩-৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে বিজিবিকে অধিগ্রহণকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য বিজিবি স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করে। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকেলে একদল মহিলা বিজিবির হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদের বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেঁধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালোই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না। এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ি মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। 
 
এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়িদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারির কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে, বনবিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। কমিশনের সদস্যরা খাগড়াছড়ি অবস্থানকালে দফায় দফায় পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্নস্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে থাকেন। কমিশনের এরূপ একতরফা আচরণ ও পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের কারণে স্থানীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত ও উত্তেজিত হয়ে আধঘণ্টার মধ্যে কমিশনকে খাগড়াছড়ি ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। অবশেষে আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই কমিশন তার পূর্বনির্ধারিত রাঙামাটি সফর বাতিল করে পুলিশ প্রহরায় খাগড়াছড়ি ত্যাগ করে। অবশ্য শহর ত্যাগের পথে বাঙালিরা কমিশনের গাড়িতে বৃষ্টির মতো জুতা নিক্ষেপ করে ঘৃণার প্রকাশ ঘটায়।
 
এদিকে কমিশনের রাঙামাটি কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণা জানতে পেরে রাঙামাটির বাঙালি সংগঠনগুলো তাদের অবরোধ তুলে নেয়। এখবর জানতে পেরে কমিশন গোপনে রাঙামাটি প্রবেশ করে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এতে করে রাঙামাটির বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারাও কমিশনকে বাঙালি বিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে রাঙামাটি ত্যাগের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে শহরে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওযার আশঙ্কা করে স্থানীয় প্রশাসন কমিশন সদস্যদের রাঙামাটি ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করলে তারা রাজি হন। দুপুরে পুলিশ প্রহরায় তারা রাঙামাটি ত্যাগ করার পথে বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা পাহাড়ের উপর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অতর্কিত এ হামলায় পুলিশ ও কমিশন সদস্যরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৪ কমিশন সদস্য এ ঘটনায় আহত হয়। তাদের বহনকারী গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কমিশনের সদস্যরা প্রশাসনের দেয়া গাড়িতে করে নিরাপত্তা প্রহরায় রাঙামাটি ত্যাগ করেন। এরপর কমিশনের তরফে চট্টগ্রাম শহরে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করা হয় শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য রাঙামাটির অভিজ্ঞতা থেকে তারা তাদের বান্দরবান সফরসূচি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর কমিশন সমর্থিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমে শুরু হয় একতরফা প্রচারণা।
 
বিবাদের কারণ 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১২৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা অংশে রয়েছে ৪৭ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে বিজিবির কোনো নজরদারি না থাকায় দুই দেশের সন্ত্রাসী, পাচারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। গহীন পাহাড় ও বন সমৃদ্ধ অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক রক্ষা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অঞ্চলে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। বিজিবির ভারতীয় কাউন্টারপার্ট বিএসএফের তরফ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে নয়টি নতুন সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি (বিওপি) করতে যাচ্ছে বিজিবি- যারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় কাজ করবেন। বিজিবি সূত্র মতে, সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, টেক্কাছড়া, শিলছড়ি, উত্তর শিলছড়ি, লালতারান, দিপুছড়ি, লক্কাছড়া, উত্তর লক্কাছড়া, ধূপশীল ও আড়ানীছড়া এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলো বসানো হবে। দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালে ব্যাটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন- বিজিবি গঠন করা হয়।
 
মূলত ৫টি কারণে এই নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমত : দীঘিনালা অংশের এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের সীমানা কখনো অরক্ষিত থাকতে পারে না। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা প্রদানে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি, দ্বিতীয়ত : এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত অপরাধীরা এই সীমান্ত দিয়ে তাদের নির্ভয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অস্ত্র, মানব, মাদক পাচারসহ সব ধরনের পাচারকাজ এবং অবৈধ যেকোনো ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এ ব্যাটালিয়নের কাজ। তৃতীয়ত : উত্তরপূর্ব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই তাদের নানাবিধ অপরাধ কাজে এই মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে থাকে। ফলে বিএসএফের তরফ থেকে তা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ আসতে থাকে। বাংলাদেশ অন্যদেশের অপরাধীদের নিজ সীমান্তে প্রশ্রয় না দিতে বদ্ধ পরিকর। চতুর্থত : বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই দুর্গম সীমান্তে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয়স্থল ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। তারা অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে এই অঞ্চলে আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। পঞ্চমত : দুর্গম এই সীমান্ত মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সম্পদের সুরক্ষা প্রদান এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এখানে কোনো বাঙালি বসতি নেই। কিন্তু নিরীহ পাহাড়ি জনগণের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানাপ্রকার নির্যাতন চালায় তা বন্ধ করতে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি।
 
এদিকে সরকার যখন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৭ কিমি. অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের মদদে বাবুছড়ায় বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতাসহ বিজিবির নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের অখ-তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন পাহাড়ের রাজনীতি সচেতন মহল। নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন হলে জনগণের সুবিধা হলেও অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অসুবিধা হবে। তাই স্থানীয়ভাবে যারা এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে তারা ঐ সকল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রশ্রয়দাতা। সিএইচটি কমিশন তাদেরই অন্যতম।
 
ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা
সাজেকের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের পেছনে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা রয়েছে বলে বাঙালিদের অভিযোগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন এবং অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলোর দাবি ঘটনার একদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বাঘাইছড়ি এলাকার চাকমা নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করে এবং তারপর তারা চলে আসার পরই বাঙালিদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরে যায়।
এরশাদ সরকারের সামরিক সাশনের দুর্বলতার সুযোগে ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একের পর এক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেয়া শুরু করে। ১৯৮৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী কোপেনহেগেনের ড্যানিস পার্লামেন্টের সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক কমিশনকে স্বাগত জানানোর ঘোষণা দেয়। দশমাস পর আমস্টার্ডামে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিস্থিতি তদন্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠিত হয়। শুরুতে এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন কানাডার আইনের অধ্যাপক স্যার ডগলাস স্যান্ডারস ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহসভাপতি জার্মানির উইলফ্রিড টেলকেম্পার। এছাড়াও কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার রোজ মুরে, নরওয়ের লীফ ডানফিল্ড, গ্রীনল্যান্ডের হ্যান্স পাভিয়া রোজিং। কমিটি গঠনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য এলাকার মানবাধিকার ও ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করা।
 
কিন্তু এ কমিটির গঠন, স্থান ও সদস্যদের তালিকা থেকে শুরুতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা। বিষয়টি ভারত সরকারও অনুধাবন করতে পারায় কমিটি ১০ দিনের জন্য ত্রিপুরা সফরের অনুমতি চাইলে তাদেরকে ৫ দিনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কমিটি ১৯৯০ সালের ২১-২৫ নভেম্বর ত্রিপুরাস্থ বাংলাদেশী উপজাতীয় শরণার্থী শিবির এবং একই বছরের ৮-২৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা সফর করে সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে এবং এ সময় তারা দোভাষী হিসেবে চাকমাদের সহায়তা নেয়। ত্রিপুরা সফরকালে ভারত সরকার কমিটির সাথে সার্বক্ষণিক তাদের লোক মারফত পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদেকে কোনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে দেয়নি। সফরে প্রাপ্ত তথ্য বলে দাবি করে এ কমিটি ১৯৯১ সালের ২৩ মে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ‘Life is not ours : land human rights in the Chittagong hill tracts’  শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এ কমিটি ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে পরপর চারটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রিপোর্টে কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাঙালি, ইসলাম, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে নানা মিথ্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করে। রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, গণধর্ষণ প্রভৃতির জন্য বাঙালি বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই মিশনারিদের তৎপরতায় নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি ছেড়ে খ্রিস্টান হয়ে গেলেও কমিটি তাদের রিপোর্টে উপজাতীয়দের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে এবং নাম না জানা ৭ জন মারমার মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করে। তাদের মতে, গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ অব্যহত থাকার দাবি করে বলে, মাইক্রোফোনে ভেসে আসা মসজিদের আজানের শব্দে কমিশনের কাজকর্ম অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। 
 
২০০০ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকার পর ২০০৮ সালের ৩১ মে-১ জুন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দুইদিন ব্যাপী এক সম্মেলনে নতুন করে সিএইচটি কমিশন গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ১২ সদস্যের এই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হন ব্রিটিশ নাগরিক লর্ড এরিক এভাব্যুরি, বাংলাদেশের সুলতানা কামাল ও ডেনমার্কের ড. আইডা নেকোলাইসেন। লর্ড এরিক এবাব্যুরি ১৯৬২-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি এবং ১৯৭১ সাল থেকে ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এই সভার সভাপতি। তিনি পূর্ব তিমুরকে (স্বাধীন বা আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন) বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বর্তমানে লর্ড এরিক এভাব্যুরি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামের আন্তর্জাতিক প্রচার সেলের প্রধান হিসাবে কাজ করছেন। 
 
পুনর্গঠিত কমিশন ২০০৮ সালের ৬-১৪ আগস্ট এবং ২০০৯ সালের ১৬-২২ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। সাজেক এলাকাটি এই কমিশনের কাছে সবসময়ই বিশেষ আগ্রহের ছিল। ২০০৮ সালের সফরকালে এ কমিশনের বিতর্কিত কর্মকা- ও বাঙালিদের কথা না শোনার কারণে তারা সুলতানা কামালকে অবরোধ করে। তার সামনে ঝাড়ু ও জুতা মিছিল করে। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কমিশনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অন্যতম অভিযোগ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করার পরপরই পাহাড়ে বড় ধরনের হিংসাত্মক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
 
২০১০ সালের ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশন বাঘাইছড়ি সফর করে ও সেখানে রাত্রিযাপন করে। এর পরদিনই বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের ঘরে আগুন লাগে। এর দায় বাঙালিদের উপর চাপিয়ে পাহাড়িরাও বাঙালিদের ঘরে আগুন লাগায়, তাদের জায়গা-জমি দখল করে। শুরু হয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। সেসময় সাজেকের চেয়ারম্যান লাল থাঙ্গা পাঙ্খো দৈনিক ইনকিলাবের জন্য আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, চাকমারা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাঙালিদের দোষ দিচ্ছে। বাঙালিরা অভিযোগ করেছিল সিএইচটি কমিশনের গোপন উসকানিতে পাহাড়িরা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে।
২০০৮ সালে কমিশন তাদের পার্বত্য সফরকালে বাঙালিদের পাহাড় ছেড়ে সমতলে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা পূরণের প্রলোভন দেখায়। বাঙালিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ২০০৯ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয় যে, বাঙালিদের পাহাড় থেকে সমতলের সরকারি খাস জমিতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এর জন্য যত অর্থের প্রয়োজন ইইউ, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
 
২০১০ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানায়, বাঙালিদের জোর করে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তাদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে, গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দিতে হবে। এছাড়াও কমিশন তাদের প্রত্যেক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অনুদান বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের অধিকার হরণের কাজে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। কাজেই যতদিন বাংলাদেশ সরকার তাদের নির্দেশিত সুপারিশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন না করবে ততদিন যেন তারা বাংলাদেশ সরকারকে সবধরনের সহায়তা প্রদান বন্ধ রাখে- এ মর্মেও কমিশন বিদেশি দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে। এভাবে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
 
সিএইচটি কমিশনের সকল রিপোর্টই একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরকালে একতরফা উপজাতিদের সাথে কথা বলে। কখনো কখনো বাঙালিদের সাথে কথা বললেও তা তাদের নির্বাচিত বাঙালি। যারা সন্তু লারমার উপকারভোগী। সে কারণে তাদের সেখানো বুলি মতে, তারা কমিশনের সামনে মত প্রকাশ করে, সরকার তাদের সমতলে পুনর্বাসন করতে চাইলে তাদের আপত্তি নেই। সিএইচটি কমিশন পাহাড়ে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে শতশত পৃষ্ঠা রিপোর্ট করলেও তাতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতনের কোনো কথা উঠে আসেনি। 
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত যে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা শুধু বাংলাদেশ সরকার কতটুকু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করলো না তা নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু সন্তুবাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য এখনো অস্ত্র সারেন্ডার না করে হিংসা, হানাহানি ও অপরাধ বিস্তার কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে তাদের বেলায় কমিশনের কোনো বক্তব্য নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকার অন্যতম দাবি। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধ হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে কারণে বাঙালিরাই এ অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। অথচ কমিশন উপজাতিদের তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি রেখে বাকি সকল ক্ষমতা প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ব্যাপক স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ বানাতে সুপারিশ করেছে। এসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায় সিএইচটি কমিশনের প্রতি বিক্ষুদ্ধ।
 
একটি রাষ্ট্রের সীমান্তে কোথায় নিরাপত্তা ক্যাম্প বসবে এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ভাবনা। এ নিয়ে নাগরিকের চাহিদা বাধা থাকতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। সেখানে কারো ব্যক্তিগত জমি বা সম্পদ অধিগৃহীত হলে সে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে, কিন্তু বাধা দিতে পারে না। যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজেই আমরা এ ধরনের অধিগ্রহণ সারা দেশেই দেখছি। পদ্মা সেতুর কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। কিন্তু পাহাড়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি চিহ্নিত পাহাড়ি গ্রুপ সকল প্রকার উন্নয়নেই বাধা সৃষ্টি করে থাকে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হোক। কখনো আর্মি চাই না, কখনো বিজিবি চাই না, কখনো র‌্যাব চাই না বলে, এমনকি অবকাঠামো, পর্যটন, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিয়ারিং ইউনিভার্সিটিসহ সকল ধরনের উন্নয়নের তারা বিরোধিতা করে আসছে। আসলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মুখে স্বায়ত্বশাসনের কথা বললেও বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক রাষ্ট্র বানাতে চায়। সে কারণেই তারা গঠন করেছে জুম্ম লিবারেশন আর্মি (জেএলএ), স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের পতাকা। আর এই কাজে তাদের গোপনে, প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সিএইচটি কমিশনের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় শতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও, দাতা দেশ ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে অচিরেই নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সিএইচটি কমিশনের মতো রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সকল দেশি-বিদেশি এনজিও এবং দাতাসংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ কাজে সময় ক্ষেপণের বা শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই।
Email: palash74@gmail.com. (দৈনিক ইনকিলাবের সৌজন্যে)
 
লেখকের পার্বত্যচট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা
 
 
 
 

ইউপিডিএফের সাথে সিএইচটি কমিশনের বৈঠক অপহরণ-চাঁদাবাজিকে উস্কে দিতে পারে

04.07.2014_Cht Comision & Updf Sitting NEWS

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন পাহাড়ী সংগঠনের সাথে খাগড়াছড়ি সফররত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে নানামুখী আলোচনার ঝড় উঠেছে জেলাবাসীর মধ্যে। এ বৈঠক কিসের ইঙ্গিত বহন করে এমন প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে সচেতন মহলে। ইউপিডিএফ ছাড়াও খাগড়াছড়ি জেলার চার পাহাড়ী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে এ কমিশন

পাহাড়ের নাম প্রকাশে একাধিক মহল প্রশ্ন রেখে বলেন, বিভিন্ন সময় বাঙ্গালীরা নির্যাতনের শিকার হলে সিএইচটি কমিশন কোথায় যায়। তখন তো তাদের কোন ভুমিকা লক্ষ্য করা যায় না। অথচ পাহাড়ীরা যে কোন কাল্পনিক অভিযোগ করলেই তথাকথিত সিএইচটি কমিশনসহ অনেকেই শালিস বিচার করতে চলে আসেন বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একপেশে বৈঠক পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো ঘটনাকে উস্কে দিতে পারে। তাছাড়া অতীতে সিএইচটি কমিশিন পাহাড় ত্যাগ করার পর বড় ধরণের দাঙ্গা হয়েছে কয়েকবার। কাজেই এবারের বৈঠক নিয়েও জনমনে নানা সন্দেহ বিরাজ করছে।

 বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বৈঠকের সচিত্র সংবাদ প্রকাশের পর সিএইচটি কমিশনের পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলার সচেতন মহল। তাদের মতে সুলতানা কামালের নেতৃত্বে সিএইচটি কমিশন বিশেষ মহলের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে পাহাড়ের পথে পাড়ি জমিয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সুত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি নেতৃবৃন্দ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে খাগড়াছড়ি সদরে ইউপিডিএফের ঘাটি হিসেবে পরিচিত স্বনির্ভস্থ হুয়াঙ বোইও-বা হলরুমে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ‘র সাথে সাক্ষাত ও মতবিনিময় করেছেন। কমিশনের নেতৃবৃন্দ একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় টঙ রেস্টুরেন্ট এন্ড কনভেনশন সেন্টারে হিল উইমেন্স ফেডারেশন সহ ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথেও মতবিনিময় করে।

পৃথক পৃথক ভাবে মতনিবিময়কালে সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারম্যান ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, কমিশনের সদস্য খুশী কবীর, স্বপন আদনান, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও হানা শামস আহমেদ কমিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন।

ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের জন্য সিএইচটি কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতন আগের চেয়ে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসবের সাথে যুক্ত থাকায় পরিস্থিতির তেমন কোন পরিবর্তন ঘটছে না বলেও অভিযোগ করা হয় ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে।

কমিশনের নেতৃবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়ন-নির্যাতন, ভূমি বেদখলের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এর থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় নির্ধারণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বলে সিএইচটিনিউজডটকম-এ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত এবং এর থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানো যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

পৃথক পৃথক মতবিনিময়কালে ইউপিডিএফের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা, প্রদীপন খীসা, সদস্য নিরন চাকমা, রিকো চাকমা ও অংগ্য মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাদ্রী চাকমা, সাংঠনিক সম্পাদক রিনা চাকমা, সাজেক নারী সমাজের সভাপতি নিরূপা চাকমা ও জ্যোৎস্না রাণী চাকমা, ঘিলাছড়ি নারী সমাজের নেত্রী কাজলী ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের নেত্রী অপরাজিতা খীসা ও সোহেলী চাকমা।

সিএইচটি কমিশন ফিরে যাওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার

khagrachari pbcp pic 2 04-07-14

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর অবরোধের মুখে ফিরে গেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন)। ফলে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে আহুত সংগঠনগুলো।

কমিশনের কর্মসুচী প্রতিহতের ঘোষনা দিয়ে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসুচী নিয়ে মাঠে নামার ফলে কমিশনের পূর্বনির্ধারিত রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সফর বাতিল করে চট্টগ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এদিকে কমিশন তাদের কর্মসুচী বাতিল করায় রাঙ্গামাটিতে শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া দুই দিনের সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। শুক্রবার ছয় বাঙ্গালী সংগঠনের নেতারা দুপুর ১ টায় শহরের ভেদভেদী শুল্কফাঁড়ি এলাকায় তাৎক্ষনিক এক সংবাদ সম্মেলন করে অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহারের ঘোষনা দেয়।

ছয় বাঙ্গালী সংগঠনের পক্ষে সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এসময় জালাল উদ্দিন চৌধুরী আলমগীর, এডভোকেট আবছার আলী, নূরজাহান বেগম, মোহাম্মদ ইব্রাহীম, আল আমিন ইমরানসহ বিভিন্ন সংগঠনের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনকে ‘বিতর্কিত’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে পার্বত্য এলাকায় অবাঞ্চিত ঘোষণা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলন, বাঙ্গলী ছাত্র ঐক্য পরিষদ এবং পার্বত্য গণ পরিষদ বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে রাঙ্গামাটিতে ৪ ও ৫ জুলাই দুইদিনের সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়।

টানা দুইদিনের অবরোধের শুরুতেই রাঙ্গামাটি শহরে আভ্যন্তরীণ যান চলাচল অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হলেও জেলা শহরের সাথে অন্যান্য জেলার সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ ছিলো। সকাল থেকে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের মানিকছড়ি এবং রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের বগাছড়ি এলাকায় বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা পিকেটিং করেছে। শহরের প্রবেশমুখ ভেদভেদী এলাকাতে বেশকিছু গাড়ী আটক করে পিকেটাররা। পিকেটিংয়ের ফলে শহরের প্রবেশমুখে বিপুল সংখ্যক গাড়ী আটকে পড়ে। শহর থেকে কোন যানবাহনকেই বাইরে যেতে দেয়নি অবরোধকারিরা।

সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান জানিয়েছেন, পক্ষপাততুষ্ট সিএইচটি কমিশন খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে যাওয়ায় আমরা আমাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তারা যখনই পার্বত্য চট্টগ্রামে আসবে তখনই তাদেরকে প্রতিহত করা হবে। একই সময় নতুন কর্মসুচীও ঘোষণা করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) মুখপাত্র হানা শামস জানিয়েছেন,আমরা খাগড়াছড়ি থেকে বর্তমানে চট্টগ্রামে আছি। এখানেই আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একটি প্রতিনিধি দল গত ৩ জুলাই থেকে ৬ দিনের সফরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আসে। দীঘিনালা ও খাগড়াছড়িতে বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ বিক্ষোভের মুখেই তারা খাগড়াছড়ির বাবুছড়া ও দুইটিলার বিরোধপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন। ৪ থেকে ৬ জুলাই তাদের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সফরের কথা ছিলো। বান্দরবানে টানা ৪ দিন এবং রাঙ্গামাটিতে টানা ২ দিন অবরোধের ডাক দিয়েছে স্থানীয় বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। এবং অবশেষে বাঙ্গালীদের প্রবল অবরোধের মুখে প্রতিনিধি দলটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

আল্টিমেটাম ও জুতা বৃষ্টির মুখে খাগড়াছড়ি ছাড়তে বাধ্য হলো সিএইচটি কমিশন


দিঘীনালা উপজেলার উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে প্রায় ১২৯ কিঃ অরিক্ষত সীমান্ত রক্ষায় বাধাঁ দিচ্ছে কতিপয় পাহাড়ি আর তাদের দোসর সিএইচটি কমিশন- অভিযোগ পিবিসিপি’র

রর

নিজস্ব প্রতিনিধি:

পার্বত্যঞ্চল নিয়ে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ এনে খাগড়াছড়িতে সিএইচটি কমিশনের গাড়ী বহরে জুতো নিক্ষেপ করেছে পার্বত্য বাঙালি ছাত্রপরিষদের বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা।

আজ শুক্রবার সকালে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের গাড়ী বহর ঢাকায় চলে যাওয়ার সময় এ জুতো নিক্ষেভের ঘটনা ঘটে।

সমপ্রতি খাগড়াছড়ি দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিজিবির ক্যাম্পে স্থানীয় পাহাড়ি ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠির সাথে সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের কো-চেয়ারপাসন ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামালের নেতৃত্বে পাচঁ সদস্যের প্রতিনিধি দল।

সিএইচি কমিশনের এ প্রতিনিধি দলটি শুধু পাহাড়িদের পক্ষে কাজ করে,বাঙালিদের এখান থেকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করছে, বাবুছড়ায় বিজিবি ক্যাম্পে পাহাড়িরা হামলা করে উল্টো বিজিবিদের উপর দোষ চাপানোর ষড়যন্ত্র করছে এক তরফাভাবে তারা শুধু পাহাড়ীদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে- এই মর্মে অভিযোগ করে পার্বত্যঞ্চলে সিএইচটি কমিশনের সদস্যদের বহিস্কারের দাবীতে শুক্রবার সকালে জেলা চেঙ্গী স্কোয়ারে বিশাল মানব-বন্ধন করে বাঙালি ছাত্রপরিষদ।

সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধিরা পর্যটন মোটেলে অবস্থান করছে জানতে পেরে বাঙালি ছাত্রপরিষদের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে মোটেলের সামনে অবস্থান করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রপরিষদের নেতারা কমিশনের প্রতিনিধিদের খাগড়াছড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্যে আধা ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। আল্টিমেটামের দশ মিনিট অতিক্রম হওয়ার পরে নেতারা তাদের প্রতিরোধের হুমকি দিলে সাথে সাথেই পুলিশ পাহারায় সিএইচি কমিশনের প্রতিনিধি দল ঢাকা উদ্দেশে রওয়ানা হন। এর আগে কমিশনের টং রেস্টুরেন্টে সাংবাদিক সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাঙালী ছাত্র পরিষদের বিক্ষোভের কথা জানতে পেরে সাংবাদিক সম্মেলন পর্যটনেই করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পর্যটন থেকে বিকাল ৩টায় রাঙামাটির উদ্দেশ্যে অবরোধ ভেঙেই যাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।

কিন্তু বাঙালী ছাত্র পরিষদ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার শক্ত অবস্থানের মুখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে পুলিশ পাহারায় পর্যটন মোটেল থেকে বের হয়ে মূল গেইটে গাড়ি পৌছালে বিক্ষুদ্ধ বাঙালি নেতাকর্মীরা তাদের গাড়ি বহরে এলোপাতারী জুতো নিক্ষেপ করতে থাকে। এসময় বেশ কিছু জুতা তাদের গাড়িতে এসে পড়ে।  খাগড়াছড়ি সফর করে তারা রাঙামাটি, বান্দরবান যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তারা চট্টগ্রামের উদ্দ্যেশে খাগড়াছড়ি ছেড়ে চলে যান।

বিক্ষোভ সমাবেশে বাঙালি ছাত্রপরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ বলেন, পার্বত্যঞ্চলে এ সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধিরা বার বার এসে শুধু পাহাড়িদের পক্ষে দালালি করে। আর পাহাড়ের স্থায়ী শান্তি বিনষ্ট করতে তাদেরকে কু-বুদ্ধি দিয়ে গন্ডগোল সৃষ্টি করে। অবৈধ এ সিএইচি কমিশনের সদস্যরা বিদেশীদের এজেন্ট।তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব চায়না। দিঘীনালা উপজেলার উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে প্রায় ১২৯ কিঃ অরিক্ষত সীমান্ত রয়েছে। এ দীর্ঘ আর্ন্তজাতিক সীমানা রক্ষার জন্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তিনটি নতুন ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাবুছড়া সীমান্ত রক্ষায় বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। আর এতে বাধাঁ দিচ্ছে কতিপয় পাহাড়ি আর তাদের দোসর সিএইচটি কমিশন। সরকারের সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ করেছে। তাই এদেরকে পাহাড়ে আর আসতে দেয়া হবেনা।

সিএইচটি কমিশনের প্রেসব্রিফিং

দুই দিনে সফর শেষে সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধি দলের সদস্যরা খাগড়াছড়ি দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিজিবির ক্যাম্পে স্থানীয় পাহাড়ি ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠির সাথে সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বিজিবি কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসনের সাথে মতবিনিময় শেষে খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলে শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথেও মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়ে কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সংঘর্ষের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সেখানে ক্ষতিগ্রস্থ ২১পরিবারের সাথে কথা হয়েছে। তিনি ঘটনাস্থলের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা সাংবাদিকদের কাছে বর্ণনা করেন। সিএইচটি কমিশন বিদেশীদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে বলে অভিযোগ আছে বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তারা কোন উত্তর দেননি।

সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের নেতৃত্বে আরো উপস্থিত ছিলেন, কমিটির সদস্য ও টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, খুশী কবীর, কমিশনের সদস্য ড. স্বপন আদনান, ও কমিশনের বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েটের সমন্বয়কারী হানা শামস আহমেদ।

এদিকে বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে একই সময়ে ও একই স্থান বিবদমান দুটি পক্ষের মানববন্ধনসহ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনার করায় দুই দিন ধরে খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় জারি করা ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকলেও এখন থেকে ১৪৪ ধারার প্রত্যাহার করে নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।

সন্ত্রাস ও অপরাধ নির্বিঘ্ন রাখতেই দিঘীনালায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের বিরোধিতা করা হচ্ছে

khagrachari pic-(02), 11-06-2014 (khagrachari) pic-(01), 11-06-2014 111

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১২৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা অংশে রয়েছে ৪৭ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে বিজিবি র কোনো নজরদারী না থাকায় দুই দেশের সন্ত্রাসী, পাচারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

গহীন পাহাড় ও  বন সমৃদ্ধ অত্যন্ত দূর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক রক্ষা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অঞ্চলে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই। নিজ অফিসে পার্বত্যনিউজের নিজস্ব প্রতিনিধি আল আমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে দীঘিনালায় নবসৃষ্ট ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে এভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. আবুল কালাম আজাদ।

তিনি আরো বলেন, বিজিবি’র ভারতীয় কাউন্টারপার্ট বিএসএফ’র তরফ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে নয়টি নতুন সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি (বিওপি) করতে যাচ্ছে বিজিবি- যারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় কাজ করবে।

বিজিবি সূত্র মতে, সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, টেক্কাছড়া, শিলছড়ি, উত্তর শিলছড়ি, লালতারান, দিপুছড়ি, লক্কাছড়া, উত্তর লক্কাছড়া, ধূপশীল ও আড়ানীছড়া এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলো বসানো হবে। দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালে ব্যটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি গঠন করা হয়।

পার্বত্যনিউজের দিঘীনালা প্রতিনিধি রাফি পাটোয়ারি জানিয়েছেন,  খাগড়াছড়ি সেক্টরের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার মেইন পিলার ২২৭০/৩ এস হতে ২২৮৪/৩ এস পর্যন্ত ৪৭ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্তের সুরক্ষা, আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন কল্পে দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় একটি স্থায়ী বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপনের জন্য ২০০৪ সালে এল এ মামলা নং ০২ (ডি)/২০০৫ মূলে ব্যক্তি মালিকানাধীন ১৩.৯০ একর এবং খাস ৩১.১০ একরসহ সর্বমোট ৪৫.০০ একর ভূমি হুকুম দখল করা হয় এবং সে অনুযায়ী ২০০৪ সালে ৪৫ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব প্রেরণ করা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২৯ ডিসেম্বর ২০০৪ তারিখ প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করা হয়। কিন্তু, সরেজমিনে ভূমি পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় কতিপয় উপজাতি নারী-পুরুষ ঐ জমির মালিকানা দাবি করে। সর্বশেষ খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ৪৫ একরের মধ্যে ব্যক্তি মালিকানা জমি বাদ দিয়ে ২৯.৮১ একর জমি বিজিবি‘র অনুকূলে অধিগ্রহণ করার জন্য ১৬ জুলাই ২০১৩ কার্যক্রম গ্রহণ করেন। ভূমি অফিসের রেকর্ড অনুযায়ী এর মধ্যে  ২.২০ একর ব্যক্তি মালিকানা জমি রয়েছে। মালিক তিন ব্যক্তি হচ্ছেন বীর সেন চাকমা (১.৫০ একর), পিদিয়া চাকমা (০.৭০ একর) ও রবিজর চাকমা (০.৭০ একর)।

সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে তাদের মালিকানাধীন জমির অধিগ্রহণ বাবদ ক্ষতিপূরণের টাকা বিজিবি থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর ছাড় কারানো হয়েছে। গত ১৬ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা (এলএ শাখা) বরাবর অধিগ্রহণকৃত ২৯.৮১ একর ভূমির ক্ষতিপূরণ বাবদ পনের লাখ আটত্রিশ হাজার দুই শ’ আটষট্টি টাকা সেক্টর সদর দফতর থেকে খাগড়াছড়িতে প্রেরণ করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন এই টাকা গ্রহণের জন্য উক্ত তিন ব্যক্তিকে নোটিশ দিলেও একটি বিশেষ মহলের চাপে তারা টাকা নিতে আসছেন না।

এদিকে প্রস্তাবিত ভূমির ২৭.৬১ একর জায়গার কিছু অংশের মধ্যে একটি পাহাড়ে সেনাবাহিনী ও আনসার ক্যাম্প, একটি পাহাড়ে সেনাবাহিনীর হেলিপ্যাড, একটি পাহাড় পতিত অবস্থায় রয়েছে। অবশিষ্ট কিছু অংশে ৯৩৪, ৯৩৫, ৯৩৬ দাগে অধিগ্রহণের পর রহস্যজনকভাবে ৭টি পরিবার টিনের চালযুক্ত বেড়ার ঘড় নির্মাণ করে বসবাস করছে। অধিগ্রহণের সময়ে বা আগে তাদের এখানে কোনো অবস্থান ছিল না। বসবাসকারী পরিবার প্রধানগণ হচ্ছেন নতুন চন্দ্র কার্বারী, প্রদীপ চাকমা, সুকুমার চাকমা, প্রিয় রঞ্জন চাকমা, বাবুল চাকমা, বিনয় চাকমা ও জ্ঞানেন্দ্র চাকমা। 

গত ১৫ মে ২০১৪ তারিখে বাবুছড়ায় অধিগ্রহণকৃত জমি গ্রহণ করে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি তাদের কার্যক্রম শুরু করে। বিজিবি‘র কার্যক্রম শুরুর প্রথম থেকেই স্থানীয় পাহাড়িরা একটি বিশেষ আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মদদে পার্বত্য খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতা করে আসছে।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় বিজিবির জোন সদর সদপ্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে গত ১০ জুন বিজিবি-পুলিশ ও উপজাতিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ ও বিজিবির ৬ সদস্যসহ মোট ২২ জন আহত হয়। এ ঘটনাকে পুঁজি করে ভূমি রক্ষা কমিটিসহ ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। এবার তারা নতুন কৌশলে নতুন আন্দোলনে যাবে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে

বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙ্গচুরের ঘটনায় বিজিবি›র নায়েক গোলাম রাসুল বাদী হয়ে ১১২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৬ জন জেলা হাজতে ও ৪ জন জামিনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন দীঘিনালা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: সাহাদাত হোসেন টিটো। মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান দীঘিনালা পুলিশের এ কর্মকর্তা।

৫১ বিজিবি কমান্ডার লে. ক. আবুল কালাম আজাদ পার্বত্যনিউজকে বলেন, মূলত ৫টি কারণে এই নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমতঃ দীঘিনালা অংশের এই ৪৭ কি.মি. সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের সীমানা কখনো অরক্ষিত থাকতে পারে না। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা প্রদানে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরী, দ্বিতীয়ত: এই ৪৭ কি.মি সীমান্ত অত্যন্ত দূর্গম হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত আন্ত:সীমান্ত অপরাধীরা এই সীমান্ত দিয়ে তাদের নির্ভয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অস্ত্র, মানব, মাদক পাচারসহ সব ধরনের পাচারকাজ এবং অবৈধ যেকোনো ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এ ব্যাটালিয়নের কাজ। তৃতীয়ত: উত্তরপূর্ব ভারতীয়  বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শ: তাদের নানাবিধ অপরাধ কাজে এই মুক্ত সীমান্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে থাকে। ফলে বিএসএফ’র তরফ থেকে তা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ আসতে থাকে। বাংলাদেশ অন্যদেশের অপরাধীদের নিজ সীমান্তে প্রশ্রয় না দিতে বদ্ধ পরিকর। চতুর্থত: বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই দূর্গম সীমান্তে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয়স্থল ও ঘাঁটি নিমার্ণ করেছে। তারা অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে এই অঞ্চলে আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। পঞ্চমত: দূর্গম এই সীমান্ত মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সম্পদের সুরক্ষা প্রদান এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এখানে কোনো বাঙালী বসতি নেই। কিন্তু নিরীহ পাহাড়ী জনগণের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানাপ্রকার নির্যাতন চালায় তা বন্ধ করতে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরী।

এদিকে সরকার যখন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৭ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ’র মদদে বাবুছড়ায় বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতাসহ বিজিবির নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন পাহাড়ের রাজনীতি সচেতন মহল। তারা এসব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলারও অভিমত প্রদান করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একটি সূত্র পার্বত্যনিউজকে বলেন, নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন হলে জনগণের সুবিধা হলেও অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অসুবিধা হবে। তাই স্থানীয়ভাবে যারা এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে তারা ঐ সকল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রশ্রয়দাতা।

তারা স্থানীয় পাহাড়ী নিরীহ জনগণকে জিম্মি করে ইস্যুটিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের পাঁয়তারা করছে। সূত্র আরো জানায়, একটি রাষ্ট্রের সীমান্তে কোথায় নিরাপত্তা ক্যাম্প বসবে এটা রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা সংস্থার ভাবনা। এনিয়ে নাগরিকের চাহিদা বাঁধা থাকতে পারে না।  কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। সেখানে কারো ব্যক্তিগত জমি বা সম্পদ অধিগৃহীত হলে সে উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ দাবী করতেই পারে, কিন্তু বাঁধা দিতে পারে না। যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজেই আমরা এ ধরনের অধিগ্রহণ সারা দেশেই দেখছি। পদ্মা সেতুর কথা উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়। কিন্তু পাহাড়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ  ভিন্ন। এখানে একটি চিহ্ণিত পাহাড়ী গ্রুপ সকল প্রকার উন্নয়নেই বাঁধা সৃষ্টি করে থাকে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হোক। কখনো আর্মি চাই না, কখনো বিজিবি চাই না, কখনো র‌্যাব চাই না বলে আসলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় এ বিষয়টি জাতীয়ভাবে তুলে ধরা দরকার বলেও সূত্রটি অভিমত প্রকাশ করেন।

 

এ সংক্রান্ত আরও খবর

দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা ও উপজাতি কর্তৃক হামলার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলেন ঢাকা থেকে আগত সাংবাদিকবৃন্দ

দীঘিনালার বাবুছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে ২১ পরিবার: ষড়যন্ত্রের অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের

দীঘিনালার বাবুছড়ায় বিজিবি জোন সদরে উপজাতিদের হামলা: আহত ২০

দীঘিনালা বিজিবি দফতরে হামলা ও ভাঙ্গচুরের ঘটনায় মামলা

দিঘীনালায় উপজাতি হামলাকারীরা বিজিবি’র স্থাপনা, তাঁবু ও দুটি অস্ত্র ভেঙে ফেলেছে

দীঘিনালায় জোন সদরদপ্তর স্থাপন নিয়ে বিরোধ মেটাতে পাহাড়ী প্রতিনিধিদের সাথে বিজিবি’র বৈঠক

দীঘিনালায় ভূমি রক্ষা কমিটির বিক্ষোভ: ১৫ জুন অর্ধ দিবস অবরোধ

দীঘিনালায় বিজিবি’র ৫১ ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরু

 

 

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হবে- মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ

Bjb satkania pic-24.6

স্টাফ রিপোর্টার:

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সুরক্ষা ও চোরাচালান রোধে ১১৭ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি স্থলপথে পাকা সড়ক নির্মাণেরও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাইতুল ইজ্জত ট্রেনিং সেন্টারে বিজিবির ৮৪তম ব্যাচের সমাপনী কুজকাওয়াজ শেষে বিজিবির মহাপিরচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহম্মেদ সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

মঙ্গলবার সমাপনী কুচকাওয়াজে অনুষ্ঠানে এসময় বিজিবির চট্টগ্রাম দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহম্মদ আলী, বান্দরবান সেনা বাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী, বিজিবির ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের কমান্ড্যান্ট কর্নেল মো. আশরাফুল আলম, কর্নেল একেএম সাইফুল ইসলামসহ সেনাবাহিনী ও বিজিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে বিজিবি অত্যন্ত আন্তরিক। বাংলাদেশের সঙ্গে তারা চোরাচালান রোধে ভুমিকা রাখবে বলে দাবি করে তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় ইয়াবা চোরাচালান ঠেকাতে ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের দেশে ইয়াবা তৈরির কোনো কারখানা নেই।

তিনি আরও জানান, সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জোরদার করার জন্য সারাদেশে আরও চারটি সেক্টর ও ছয়টি ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সীমান্তে ৮৫টি নতুন বিওপি স্থাপন করা হচ্ছে। আরো ৬৫টি বিওপি স্থাপানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ-ভারত ও মায়ানমার সীমান্তে ৯৩৫ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক ও ২৮৫ কিলোমিটার কাঁটা তারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বিজিবির আধুনিকায়নের কথা উল্লেখ করে মহাপরিচালক বলেন, আধুনিক প্রক্ষিণের মাধ্যমে বিজিবিকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ১৪ হাজার ৯৩৮ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে এবং গত চার বছরে ১৬ হাজার ৯৮৬ নবীন সৈনিক নেয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার সকালে কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন বিজিবির মহাপরিচালক। পরে ৮৪ তম ব্যাচের ১১৪৪ জন নবীন সৈনিকদের মধ্যে থেকে পাঁচজনকে শ্রেষ্ঠ সৈনিককে পুরস্কার দেয়া দেন মহাপরিচালক। এবার সর্ববিষয়ে সেরা সৈনিক নির্বাচিত হন এম আরাফাত হোসেন।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অস্থিরতার নেপথ্যে

images-ববব

সালিম অর্ণব

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংঘাত ও সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল শিকড়টা খুঁজতে গেলে প্রথমে চোখ বুলাতে হয় ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উগ্রবাদী বৌদ্ধ আর স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলিম গোষ্ঠীর সংঘাত চলতে থাকে যুগের পর যুগ।

অন্যদিকে সামরিক শাসনের কষাঘাতে জর্জরিত মিয়ানমারের মানুষ শান্তি বলতে সত্যিকার অর্থে কী বোঝায়, সেটা প্রত্যক্ষ করতে পারেনি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে। একের পর এক সামরিক জান্তার দুর্বিষহ শোষণ আর গণনিপীড়নে অস্থির জনজীবনে আরেক বিভীষিকার নাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বিশ্বজুড়ে গণমানুষের মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বৌদ্ধমাত্রই শান্তিপ্রিয়, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকা মুণ্ডিত মস্তকের বিদ্বান ব্যক্তি; যা মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধদের সঙ্গে একটুও মেলানো যাবে না। বেসামরিক জনতার ওপর সামরিক সরকারের দলনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষের প্রাণ যেখানে ওষ্ঠাগত, সেখানে যুক্ত হয়েছে মাদকের কালো ছোবল। পক্ষান্তরে আনুষঙ্গিক নানা দুরবস্থায় মিয়ানমারের উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্ত উত্তেজনার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।

বলতে গেলে বিগত এক দশকে মিয়ানমারের কোনো সংবাদপত্রের পাতায় এক দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাদে উল্লেখযোগ্য সংবাদ ছাপা হয়নি, যাতে মানুষ আশাবাদী হতে পারে। অং সাং সু চি নামমাত্র শান্তির বারতা নিয়ে মিডিয়া স্টান্ট হাজির করে নোবেল জিততে পেরেছেন ঠিকই। কিন্তু আমজনতার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দিতে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ— এটা এখন বলা যেতেই পারে।

সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবিরোধ, যার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বলতে গেলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের এ সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদির আগমন, দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে রুশ-মার্কিন-চৈনিক ভাবনার বিপ্রতীপে ভারতীয় বিদেশনীতি— সবই অবস্থাবিশেষে গুরুত্বের দাবি রাখে।

দৈনিক সংবাদপত্রগুলো থেকে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৮ মে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান নিহত হন। এ সময় দখল-সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলায় দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘসময় গুলি বিনিময় হয়। এ গুলি বিনিময়ে হতাহতের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। মিজানের মৃত্যুর পর সাময়িক বিরতি দিয়ে ৩ জুন ওই সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, আবার গোলাগুলির খবর শোনা যায় সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ৫ জুন মিয়ানমারের মংডুতে বিজিবি ও বিজিপির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ বৈঠকে তারা সুবেদার মিজানের হত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু ঠিক তার পরদিনও সীমান্তে গুলিবর্ষণ অব্যাহত ছিল বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে।

হঠাৎ করে অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত মিয়ানমারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সীমান্তরক্ষীদের বিজিবির ওপর চড়াও হওয়াটা কোনো আশার কথা বলে না। এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে অনেক প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ সীমান্তে হঠাৎ করে উত্তেজনা বাড়ল কেন? মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীইবা কোন দুঃসাহসে এবং কার ইন্ধনে কোনো হুঁশিয়ারি ছাড়া গুলি করে হত্যা করল বিজিবি সদস্যকে? অনেক বিশ্লেষক এটাকে নিছক দুর্ঘটনা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির ফল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবেন, যেটা কোনো অংশেই ঠিক নয়; উপরন্তু এ-জাতীয় বিভ্রান্তিকর চিন্তা ওইসব বিশ্লেষকের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রজ্ঞা ও শিষ্টাচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একটু খেয়াল করলে সাধারণ্যেই স্পষ্ট হয়, এ গোলাগুলি কোনো ভুল বোঝাবুঝির ফল নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কারো উসকানির ফল। বিশেষ করে এই গুলি ছোড়া যদি ভুল বোঝাবুঝিই হবে, তাহলে দ্বিতীয়বার মিয়ানমারের বিজিপি বাংলাদেশী বিজিবির ওপর গুলি ছুড়ত না।

পররাষ্ট্রনীতির কিছু বিষয় ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করাটা বাংলাদেশের জন্য খুব জরুরি। অন্যদিকে সে বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারও বেশ ওয়াকিবহাল। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই বিমসটেকের সদস্য। পাশাপাশি বিসিআইএম নামক উপআঞ্চলিক জোটেও মিয়ানমার রয়েছে। এর থেকে ধরে নেয়াই যেতে পারে মিয়ানমারের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী নীতিতে সাফল্যের মুখ দেখবে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের চলমান সীমান্ত উত্তেজনা আর যা-ই হোক, দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশেষ টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে; যা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশেরই ক্ষতির কারণ। যেমন— কুনমিং-কক্সবাজার সড়কের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ থাকলেও সীমান্ত সংঘাতে সৃষ্ট শীতল সম্পর্ক মিয়ানমারের পক্ষে এ সড়কের অনুমতি প্রদানের অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়কের মাধ্যমে কুনমিংয়ের সংযুক্তির কথা থাকলেও তা এখন ঝুলে পড়েছে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনীতির পুরোটাই সেনাশাসকদের অধীনে পর্যুদস্ত। নোবেলজয়ী নেত্রী সু চি শুধু মুখে মুখে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললেও পর্দার আড়ালে কাজ করে সেখানে একটি মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছেন। আর এজন্য সুকৌশলে কিংবা সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে আদিবাসী মুসলিমদের উত্খাত করাটা তাদের জন্য খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জেনারেল নে উইনের আমলে আরাকানে জাতিগত আন্দোলন দমনের নামে ১৯৭৮ সালে যে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালানো হয়েছিল, তার কালো থাবা আরো বেশি করে উসকে দেয় জাতিগত দাঙ্গাকে। তখনকার আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে হত্যা করা হয় হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষ, শিশুকে। তাদের আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নিপীড়ন ও ধর্ষণে বাধ্য হয়ে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর মিয়ানমারের সামরিক শাসক থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী নেত্রী সু চি সবাই এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যত বেশি অত্যাচার করা হবে, তারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটতে থাকবে, প্রকারান্তরে অনেক পরিষ্কার হয়ে যাবে মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ।

রোহিঙ্গাদের ক্রমাগত আগমন জনসংখ্যার ভারে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য উটকো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথম প্রথম বাংলাদেশের কিছু মানুষ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে উপস্থিত হয়। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে এবং তার ফলও লাভ করে বেশ দ্রুত। ১৯৭৯ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি কিছু শরণার্থী রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরার পথ করে দেয়। এ সময় বাদ সাধে নাগরিকত্ব আইন। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ১৯৮৩ সালের পর মিয়ানমারে আগত রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে। বলতে গেলে এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ চলাচল একরকম নিষিদ্ধই হয়ে যায়। পাশাপাশি এ আইনও করা হয় যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে গিয়ে বাস করতে পারবে না। উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকার পাশাপাশি দুই সন্তানের বেশি হলে পিতামাতার ওপর নির্যাতন চালায় সামরিক বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে শিশুসন্তানকে হত্যাও করে তারা। রোহিঙ্গাদের বিয়েতে পর্যন্ত আরোপ করা হয় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। ফলে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকে বাংলাদেশ সীমান্তে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা চাইছে না রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। উপরন্তু তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারেরই রাজনৈতিক সমস্যা, যার অংশ বাংলাদেশ নয়। কিন্তু তারা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট, আরাকান ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন— এসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশইন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তত্পর থাকায় মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার কাজ অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তাই বিশেষ গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থায়ী উত্তেজনা বজায় রাখার পথ সুগম করতেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে মিয়ানমারের লুন্থিন বাহিনী।

গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল বলা যেতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠকও করেন। তখন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক বৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, তখন বাংলাদেশের সহযোগী হতে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল মিয়ানমার। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সবার মনে এখন একটিই প্রশ্ন মাত্র দুটি মাসের ব্যবধানে এমন কী ঘটে গেছে, যা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে রক্ত ঝরাচ্ছে? আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলতে চাইছেন নিছক ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। তবে তার বাইরে আরো কিছু কারণ আছে, যেটা কোনো আশার কথা বলছে না।

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত শান্ত আছে, এমনটি নয়। বিশেষত আদিবাসী রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশ পাঠানো, নাফ নদী থেকে বাংলাদেশী জেলেদের পাকড়াও করা, নাইক্ষ্যংছড়ির অরণ্যে কাঠুরিয়াদের নির্যাতন দুটি দেশের শীতল সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিধ্বস্ত মিয়ানমার গ্রাস করতে চাইছে বাংলাদেশকে। সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা প্রাণঘাতী ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের চোরাচালানিদের নিয়ে আসা ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের ড্রাগস আটকে দিতে সদাতত্পর আমাদের সাহসী সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এগুলোর পাশাপাশি অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর কাজে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারেও বাধা দেয় বিজিবি সদস্যরা। সম্প্রতি কোস্টগার্ডের সহায়তায় নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়া বেশ কয়েকটি বহর আটকে দেয় তারা। বলতে গেলে নিছক দুর্ঘটনা তো নয়ই বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমান্তে ত্রাস সৃষ্টির জন্য বিজিবির মিজানুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে লুন্থিন বাহিনী। একে তাই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ না করে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রক্ষার প্রয়োজনে অনর্থক সংঘাত ও উত্তেজনা কাম্য নয়।