বিজিবি ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করছে

bgb camp 3

মেহেদী হাসান পলাশ:

ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে নতুন বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট(বিওপি) নির্মাণ করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)। বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব সুসম্পর্কের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত এবং ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত ৬ টি বিওপি নির্মাণে ভারতের ভুমি ও সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিজিবির পুণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় এ নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। একই রূপরেখার আওতায় বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিওনের আওতায় দুইটি নতুন সেক্টর ও ৫ ব্যাটালিয়ান স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন করে ১০৪টি বিওপির মধ্যে ৫২টি বিওপি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্তের ২১৫ কি.মি. সীমান্ত সুরক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। শুরু হয়েছে বিজিবির এয়ার উইং। এর ফলে দূর্গম ও অরক্ষিত সীমান্তের অপরাধ এখন আগের থেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে বলে বিজিবি সূত্রের দাবী।

জানা গেছে, সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি বাংলাদেশের ৪,৪২৭ কিঃ মিঃ সীমানা দিবা-নিশি প্রহরার মাধ্যমে নিশ্চিত করছে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। ২০০৯ পিলখানার ভয়াবহ বিপর্যয়ের দুঃসহ স্মৃতি পেরিয়ে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখে বিজিবির সদর দপ্তর পিলখানায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিজিবি’র পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় বিজিবি’র নব অভিযাত্রা। সে সাথে শুরু হয় এ বাহিনী ঢেলে সাজানোর মহাযজ্ঞ। এর অংশ হিসাবে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে শুরু হয় বিজিবি’র ৪ টি রিজিয়ন এর আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড। এসময় খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, গুইমারা, বান্দরবান ও কক্সবাজার সেক্টর ও এর অধীনস্থ ইউনিটগুলো নিয়ে দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন সদর দপ্তর চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

bgb camp 1

দূর্গম পাহাড় ও অনিষ্পন্ন সীমান্তের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিওনের আওতাধীন ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি সীমান্ত অরক্ষিত ছিলো। ফলে অরক্ষিত এই সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, মানব ও মাদক পাচার, অপহরণ, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর স্বর্গরাজ্য ছিলো অরক্ষিত সীমান্ত। এ সকল অপরাধ দমনে বাংলাদেশ ও সীমান্ত সংলগ্ন অন্যান্য দেশগুলোরও দাবী ছিলো বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষিত করা।

সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিজিবি পূণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন, চট্টগ্রাম এর দায়িত্বপূর্ণ পাহাড় ও নদী বেষ্টিত ৮১০ কিঃ মিঃ সীমান্ত এলাকায় অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্ত এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু তদারকির লক্ষ্যে বর্তমান সীমান্ত চৌকির অতিরিক্ত সর্বমোট ১০৪টি নতুন বিওপি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

বিজিবি সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় সর্বমোট ৫২টি বিওপি’র নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২৯ টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ২৮১ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ১৩০ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ – মিয়ানমার সীমান্তে ২৩টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ১৯৮   কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ৮৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সর্বমোট ৪৭৯ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ২১৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষাসহ বিজিবি’র নজরদারী ও আধিপত্য বিস্তারের আওতায় আনা হয়েছে।

তবে বিজিবির এই নবযাত্রা কুসুমাস্তৃর্ণ ছিলো না। পদে পদে তাকে নানা প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে এগুতে হয়েছে। সূত্র মতে, পাহাড়ি এলাকায় বিওপি নির্মাণের জন্য সরকার কর্তৃক ৫ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিমালা রয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের বেশির ভাগ এলাকাই পাহাড়ি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ৫ একর জমিতে বিওপি স্থাপন করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কারণ পাহাড়ি ঢাল ও ভূমি বিন্যাসের ভিন্নতার কারণে জরুরী স্থাপনা সমূহও নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে সাধারণ জনগণ তাদের জমি অধিগ্রহণের জন্য বিজিবিকে হস্তান্তর করতে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। বিশেষ করে বিজিবির এই অগ্রসর ভূমিকার কারণে যেসমস্ত সীমান্ত অপরাধীদের তৎপরতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে তারা বিজিবি সম্প্রসারণের পথে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। অস্ত্রের মুখে, হুমকি, ধামকি দিয়ে সাধারণ পাহাড়ীদের বাধ্য করেছে বিজিবিরি প্রতিপক্ষ হতে।

ফলে এখনো খাগড়াছড়ি ও রাংগামাটি জেলার অনেক অবস্থানে বিওপি নির্মাণের জন্য বিজিবি কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়নি। ভূমি বিরোধের কারণে এখন পর্যন্ত বাঘাইছড়িতে অবস্থিত ৫৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপন করা সম্ভবপর হয়নি। এছাড়াও আলীকদমে ৫৭ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন তাদের ব্যাটালিয়ন সদর নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অথচ দেখা গেছে, দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিওপি স্থাপিত হলে নিকটস্থ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দারুণভাবে উপকৃত হয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, খাগড়াছড়িস্থ উত্তর লক্কাছড়া বিওপি সংলগ্ন উপজাতীয় পাড়ায় ডায়রিয়ার প্রকোপে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করলে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিওপিতে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। হেলিকপ্টার যোগে ক্যাম্পে জরুরী ঔষধ ও চিকিৎসক প্রেরণ করা হয়। বিজিবি’র সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে রুগীদের শুশ্রষা করে এবং এলাকাবাসীকে এক ভয়াবহ মহামারী থেকে উদ্ধার সম্ভব হয়।

সূত্রে জানা গেছে, বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত অধিকাংশ অবস্থানই দূর্গম পার্বত্য এলাকায় হওয়ায় অরক্ষিত সীমান্তে কিছু কিছু স্থানে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমি ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করা অত্যন্ত দুষ্কর। হেলিকপ্টার সহায়তা ব্যতীত সেসকল অবস্থানে নির্মাণ সামগ্রী কিংবা প্রাত্যহিক রশদ সামগ্রী প্রেরণ কষ্টকর।

অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্তে বিজিবি’র আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্মূলের অংশ হিসেবে বিজিবি কর্তৃক ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে দূর্গম পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় নতুন বিওপি স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়; যা যুগোপযোগী ও আধুনিক চিন্তা চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। বিজিবি’র অনুরোধে সরকার কর্তৃক প্রেরিত প্রস্তাবে ভারত সরকার উক্ত পরিকল্পনায় সম্মতি প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় দূর্গম পার্বত্য এলাকার অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার জন্য ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং ভারত দু‘দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গত ৬-৭ জুন ২০১৫ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় “নতুন প্রজন্ম নয়া দিশা” নামে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

bgb camp 2

ইতিমধ্যে ৬টি নতুন বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। অতিশীঘ্রই উক্ত বিওপি সমূহ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে। বিওপিগুলো হচ্ছে, খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় লাক্কাছড়া বিওপি, দিপুছড়ি বিওপি ও ডুপশিল বিওপি এবং রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাস্থ ৫৪ বিজিবি ব্যাটালিয়েনের আওতায় কাসালং-১ বিওপি, কাসালং-২ বিওপি এবং সাজচিলুই বিওপি।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে বিজিবি’র দুটি রেকিদল নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়, পরিবহন ও নির্মাণ কাজের প্রস্তুতির নিমিত্তে বাংলাদেশ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অংশে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

বিজিবির এই অগ্রসর অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্তে বিশেষ করে খাগড়াছড়ি সীমান্তের বিপরীতে যে সকল অংশে বিভিন্ন ভারতীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অরক্ষিত সীমান্তের সুযোগ নিতো, বর্তমানে ঐ সকল সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন বিওপি নির্মাণের ফলে সীমান্তে নজরদারী বৃদ্ধি পাওয়ায় সকল প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসএফ কর্তৃকও কোন প্রকার প্রতিবাদ করা হয়নি।

একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ পার্বত্য এলাকার বান্দরবান জেলার সীমান্ত এলাকার দক্ষিণাংশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া পাহাড়  এবং দূর্গম এলাকা। উঁচু পাহাড়ের গা ঘেঁষেই রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। ভুপ্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে বিগত ৪ মাসেরও কম সময়ে উক্ত দূর্গম এলাকায় বিজিবি কর্তৃক নতুন ৬টি বিওপি নির্মাণ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রায়ই আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী দলের আস্তানা কিংবা তাদের অবাধ চলাচলের ব্যাপারে বিজিবি কর্তৃপক্ষের কাছে তারা প্রতিবাদ লিপি প্রেরণ করতো। কিন্তু বর্তমানে উক্ত এলাকার বেশির ভাগ অংশে বিজিবি’র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন এ ধরনের পত্রালাপ অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। সে সাথে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত ও সূচিহ্নিত হয়েছে দু’দেশের সীমানা।

এদিকে বর্তমানে নতুনভাবে নির্মিত সকল বিওপিগুলোই হেলি সাপোর্টেড। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী সমূহের মধ্যে বিজিবিরই রয়েছে সর্বাধিক ৭৮ টি হেলি সাপোর্টেড ক্যাম্প। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো স্বল্পতার মধ্যেও বিজিবির বিওপিগুলোতে হেলি সহায়তা প্রদানে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, হেলির প্রয়োজনীয়তা ও দ্রুত সাপোর্ট নিশ্চিতের বিষয়টি বিবেচনা করে সদর দপ্তর বিজিবি হেলি উইং এর সকল অবকাঠামো সাতকানিয়ায় বিজিবি’র একমাত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বিজিটিসিএন্ডএস সংলগ্ন স্থানে ইতিমধ্যে স্থাপন করেছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ৫ জুন ২০১৬ তারিখ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর হেলি উইং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি। খুব শীঘ্রই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে নতুন হেলিকপ্টার সংযোজিত হবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে বিজিবি হেলি উইং কাজ শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।এতে নতুন বিওপি নির্মাণ কার্যক্রমসহ অপারেশনাল দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ হাবিবুল করিম পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে আর কোন সীমান্ত অরক্ষিত থাকবে না। বিজিবি’র বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ এর সার্বিক দিক নির্দেশনা ও সহায়তার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

ভূমি বিরোধের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিজিবির বিওপির স্থাপনে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, আশা করা যায় খুব শীঘ্রই এ সকল সমস্যা দূর করে ব্যাটালিয়নগুলো তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন করতে পারবে।

বিজিবির অভিযানে নাইক্ষ্যংছড়িতে চোরাই কাঠসহ চাদেঁর গাড়ি আটক

kjyttr

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড ৩১ ব্যাটালিয়ানের অভিযানে বিপুল পরিমাণ চোরাই কাঠসহ চাদেঁর গাড়ি আটক করেছে।

সোমবার ৬জুন দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ি সদরের বিছামারা এলাকা থেকে এসব কাঠ আটক করা হয়। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি বিজিবি।

জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের একটি বিশেষ টহল দল হাবিঃ মোঃ আবুল কালাম আজাদ এর নেতৃত্বে ব্যাটালিয়ন সদর হতে বিছামারা নামক স্থান হতে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিভিন্ন প্রকার ৫১.২২ সিএফটি অবৈধ কাঠ যার আনুমানিক মূল্য ১,৫৩,৬৬0/- টাকা এবং ১ টি চাঁন্দের গাড়ি আটক করতে সক্ষম হয় যার আনুমানিক মূল্য ১৪,০০,০০০/- টাকা। উদ্ধারকৃত কাঠ এবং গাড়ির আনুমানিক মূল্য ১৫,৫৩,৬৬০/- টাকা।

অভিযানের সময় বিজিবি টহলদলের উপস্থিতি টের পেয়ে কাঠ পাচারকারী দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে বিজিবি কতৃ্ক জব্দকৃত কাঠ ও গাড়ি  নাইক্ষ্যংছড়ি রেঞ্জ,লামা বনবিভাগ অফিসে জমা করা হয়েছে।

 

পার্বত্য এলাকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি- বিজিবি মহাপরিচালক

Dighinala 12-02-2016 pic (01)

দীঘিনালা প্রতিনিধি:

আমরা কারো প্রতিপক্ষ নই, সীমান্ত সুরক্ষার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অনেক সন্ত্রাসী গহীন জঙ্গল দিয়ে আনাগোনা করছে, সীমান্ত সুরক্ষা না থাকায়, এক দেশের সন্ত্রাসী অন্য দেশে যাতায়াত করছে। কিন্তু সীমান্তে টহল থাকলে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। সারা দেশের ন্যায় পার্বত্য এলাকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এক সময় সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার হয়ে থাকলেও বর্তমানে তা পুরো বন্ধ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ (বিজিবিএম, পিবিজিএম, পিএসসি, জি)।

এ সময় তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট সীমান্ত এলাকা ৪৭৯ কিলোমিটার। তার মধ্যে ৩৫ টি বিওপি’র আওতায় ২২৮ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রনে আনা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পার্বত্য এলাকার অরক্ষিত আরো ১৩২ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষার আওতায় আনা হবে।

গতকাল শুক্রবার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এর সদর দফতর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ (বিজিবিএম, পিবিজিএম, পিএসসি, জি) এসব কথা বলেন। এই উপলক্ষে দুপুরে বাবুছড়া বিজিবি সদর দফতরে পৌছলে ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে প্রথমে তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পরে তিনি ব্যাটালিয়নের রেস্ট হাউজ, সৈনিক ডাইনিং হল, কুক হাউজ, চিত্তবিনোদন কক্ষ উদ্বোধন করেন।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল হাবিবুল করিম, খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল স ম মাহাবুব আলম, বিজিবি’র খাগড়ছড়ি সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল সাজ্জাদ, দীঘিনালা জোন অধিনায়ক লে. কর্ণেল মহসিন রেজা ও বাবুছড়া ৫১ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল কামাল আহমেদ পিএসসি।

পরে তিনি চট্টগ্রাম ফেরার পথে ৫১ বিজিবি’র আওতায় শীলছড়ি বিওপি পরিদর্শন করেন।

টেকনাফে ৪৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য ধ্বংস করেছে বিজিবি

teknaf pic  (bgb) 11-2-16 (2)

টেকনাফ প্রতিনিধি:

টেকনাফস্থ ২ বিজিবির বিভিন্ন অভিযানে জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানে কক্সবাজাস্থ সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল এম এম আনিসুর রহমান বলেন, সীমান্তের মাদকদ্রব্য পাচারে এলাকার জনসাধারণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, অন্যথায় মাদক প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। মাদকদ্রব্যের কুফল সম্পর্কে তুলে ধরতে সকলের প্রতি আহবান জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে টেকনাফস্থ ২ বিজিবির সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ কার্যক্রমে তিনি এসব বলেন।

এ সময় ২৬ আগস্ট’১৫ থেকে জানুয়ারি ১৬ সনের বিভিন্ন বিওপি কর্তৃক আটককৃত ৪৯ কোটি ৬৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা মূল্যের ১৬ লাখ ১০ হাজার ৭’শ ৫৭ পিস ইয়াবা, ১৭ হাজার ৩’শ ৫৭ ক্যান আন্দামান গোল্ড বিয়ার, ৬’শ ৭১ ক্যান ডায়াব্লো বিয়ার ১২%, ২৭ ক্যান চেঞ্চ বিয়ার, ২ হাজার ৪’শ ৪ পিস কান্ট্রি ড্রাইজিন মদ, ২ হাজার ২’শ ৭৯ পিস ম্যান্ডেলা রাম মদ, ৪’শ ২৯ পিস গ্লান মাস্টার মদ, ৩’শ ৬৪ বোতল নন্দ মদ, ৪৮ বোতল হাইক্লাস মদ, ৩৬ মিয়ানমার মদ, ৩৬ বোতল ইয়াংগন মদ, ৩২ বোতল জামাইকা রাম মদ, ২১ বোতল লন্ডন রাম মদ, ১৬ বোতল জান্স ঈগল মদ, ১৬ বোতল গ্রীন রয়েল হুইকি মদ, ১৫ বোতল হিরো হুইসকি মদ, ১৩ বোতল কুইন হুইকি মদ, ১১ বোতল গ্লান রয়েল মদ, ৯ বোতল ডিং ডস মদ, ৪ বোতল ভিআইপি মদ, ৪ বোতল রেড লেবেল মদ, ২ বোতল সুপার এমপাইরাম রাম মদ, ১ বোতল হাই কমিশনার মদ, ১হাজার ৩’শ ৩০ লিটার চোলাই মদ, ৭৬ বোতল ফেন্সিডিল ও সাড়ে ৩২ কেজি গাঁজা ধ্বংস করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, ২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ ইকবাল, উপ-অধিনায়ক আবু রাসেল ছিদ্দিকী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টেকনাফ পরিদর্শক তপন কান্তি শর্ম্মা, শুল্ক বিভাগের পরিদর্শক সৈয়দ গোলাম রব্বানী, টেকনাফ মডেল থানার এসআই সুবীর পালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যামকর্মী।

নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবির অভিযানে বিপুল চোরাই কাঠ আটক

Bgb Kat atok-05-02-16
নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি : 
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে বন বিভাগ অলস সময় পার করলেও কাঠ পাচার বিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখেছে বর্ডার গার্ড ব্যটালিয়ন। সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন অবৈধ মালামাল আটকের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার ৪ ফেব্রুয়ারী দোছড়ি ইউনিয়নের কোলাচিঘাট ও পক্ষিঝিরি নামক এলাকা থেকে এসব চোরাই কাঠ আটক করা হয়।

৩১ বিজিবি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ৩১ বিজিবির নিয়ন্ত্রণাধীন লেম্বুছড়ি বিওপির নায়েব সুবেদার মো. শাহ আলম এর নেতৃত্বে বিজিবি’র একটি টহল দল কোলাচিঘাট ও পক্ষিঝিরি এলাকায় অভিযান চালায়। এসময় চোরাই কাঠ পাচারকারীরা বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ৬০৮.৯ ঘনফুট এবং জ্বালানী কাঠ ১ হাজার ২শত ঘনফুট কাঠ আটক করতে সক্ষম হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৪ লক্ষ ৯১ হাজার টাকা। আটককৃত কাঠ মামলা নং ইউডিওআর-২১ এবং ২২ রুজু করে ৪ ফেব্রুয়ারি তুলাতুলী বনবিট অফিসে জমা করছে বিজিবি।

অভিযানে কাঠ আটকের সত্যতা নিশ্চিত করে বেআইনী সব ধরনের কার্যক্রম প্রতিরোধে বিজিবি তৎপর রয়েছে বলে জানান, ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জোন কমান্ডার লে.কর্ণেল হাসান মোরশেদ চৌধুরী।

নাইক্ষ্যংছড়িতে আটক মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যকে ফেরত পাঠিয়েছে বিজিবি

DSC09540

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার আশারতলী সীমান্ত থেকে আটকের পর লাটুনা (২০) নামে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সদস্যকে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই মিয়ানমারে ফেরত দিয়েছে বিজিবি।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮ টায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৪৬-৪৭ নম্বর আর্ন্তজাতিক পিলার থেকে প্রায় দুই কি: মি: বাংলাদেশের অভ্যান্তরে আশারতলী বিদ্যালয় এলাকা থেকে সেই বিজিপি সদস্যকে আটক করা হয়েছিল। পরে তাকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কক্সবাজার সেক্টরে নেওয়ার হলে বুধবার সকালে ঘুমধুমে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মিয়ানমারের সিকদারপাড়া ২নম্বর বিজিপি ব্যাটালিয়ানের সদস্য লাটুনা (২০) মঙ্গলবার সকালে সীমান্ত পিলার অতিক্রম করে বাংলাদেশের আশারতলী ভূ-খন্ডে চলে আসে। এ সময় স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তাকে আটক করে বিজিবি ক্যাম্পে হস্তান্তর করা হয়। পরে সে নিজেকে মিয়ানমারের আকিয়াব জেলার বাসিন্দা পরিচয় দেয় এবং মিয়ানমারের বিজিপির সদস্য হিসেবে কর্মরত রয়েছে বলে জানায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তে বিজিবি ৪০টি নতুন ফাঁড়ি নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছে

বিজিবি লোগো

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

বিজিবি ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে ৪০ টি নতুন ফাঁড়ি বিওপি নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছে। জঙ্গী তৎপরতা ও পাচার রোধে এই ফাঁড়ি নির্মাণ করতে সম্মতি জানিয়েছে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ বিজিবি, এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বিএসএফ মহাপরিদর্শক ভোলা নাথ শর্মা সোমবার এ কথা জানান।

 

তার ভাষায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যগুলোতে যে সন্ত্রাসী ও অন্তর্ঘাতী তৎপরতা পরিচালিত হয় তার অধিকাংশই পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই স্থানসমূহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বলে তিনি মন্তব্য করেন যেখানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেও জঙ্গীরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে থাকে।

এদিকে ত্রিপুরার তিন সীমান্ত জেলার তিন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও বাংলাদেশের চার সীমান্ত জেলার ৪ জেলা প্রশাসক আজ ২৪ জুন চট্টগ্রামে বৈঠকে মিলিত হবেন। কর্মকর্তারা সীমান্ত অপরাধ দমনের উপায় হিসেবে বেড়া নির্মাণ ও আরো ভালো সীমান্ত ব্যবস্থাপনা খাড়া করার বিষয়ে মতবিনিময় ও আলোচনা করে চূড়ান্ত কৌশল গ্রহণ করবেন।

গত ৮ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত মেঘালয়ের শিলংয়ে বিজিবি ও বিএসএফ এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যাতে সন্ত্রাসবাদ ও অন্তর্ঘাত নির্মূলের যৌথ কর্মকৌশল ও আরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এ ছাড়া সীমান্ত সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাও আলোচনায় স্থান পায়। নতুন ফাঁড়ি নির্মাণে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পথ ও অধিকাংশ স্থানে চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় বিজিবি ভারতের রাস্তা-ঘাট ব্যবহারের অনুমতি চাইলে বিএসএফ পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।

এই বিএসএফ কর্মকর্তা আরো জানান, দেশ দু’িটর অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে আন্ত:সীমান্ত অপরাধ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় সন্ত্রাসী গ্রুপসমূহের অপতৎপরতা বন্ধে উভয় দেশ একযোগে কাজ করে যাবারও আশাবাদ ব্যক্ত করে এই বৈঠকে।

 

বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

mehadi Hassan palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ
 

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তাপ ও উত্তেজনার কালো মেঘ এখনো কাটেনি। বরং তা আরো বিস্তৃত হয়ে রাজধানী তথা সারাদেশ এমনকি আন্তর্জাতিক আকাশেও ছায়া ফেলেছে।

 
গত ২-৫ জুলাই সিএইচটি কমিশনের এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনকে বিতর্কিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন আখ্যা দিয়ে এই সফরকালে ঘিরে ৬ বাঙালি সংগঠন তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ডাকে। অবরোধের মধ্যেই সফর অব্যাহত রেখে ২ জুলাই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের টিম খাগড়াছড়ি গমন করে। খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপনের পর ৩ জুলাই প্রবল উত্তেজনা ও প্রশাসনের ডাকা ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই দিঘীনালায় বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা স্থানীয় স্কুলে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিদার ২১ পরিবারের সাথে কথা বলেন। এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়িদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।
 
এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। এসময় বাবুছড়া বিজিবি জোন কর্মকর্তারা তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩-৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে বিজিবিকে অধিগ্রহণকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য বিজিবি স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করে। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকেলে একদল মহিলা বিজিবির হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদের বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেঁধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালোই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না। এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ি মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। 
 
এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়িদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারির কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে, বনবিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। কমিশনের সদস্যরা খাগড়াছড়ি অবস্থানকালে দফায় দফায় পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্নস্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে থাকেন। কমিশনের এরূপ একতরফা আচরণ ও পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের কারণে স্থানীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত ও উত্তেজিত হয়ে আধঘণ্টার মধ্যে কমিশনকে খাগড়াছড়ি ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। অবশেষে আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই কমিশন তার পূর্বনির্ধারিত রাঙামাটি সফর বাতিল করে পুলিশ প্রহরায় খাগড়াছড়ি ত্যাগ করে। অবশ্য শহর ত্যাগের পথে বাঙালিরা কমিশনের গাড়িতে বৃষ্টির মতো জুতা নিক্ষেপ করে ঘৃণার প্রকাশ ঘটায়।
 
এদিকে কমিশনের রাঙামাটি কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণা জানতে পেরে রাঙামাটির বাঙালি সংগঠনগুলো তাদের অবরোধ তুলে নেয়। এখবর জানতে পেরে কমিশন গোপনে রাঙামাটি প্রবেশ করে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এতে করে রাঙামাটির বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারাও কমিশনকে বাঙালি বিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে রাঙামাটি ত্যাগের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে শহরে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওযার আশঙ্কা করে স্থানীয় প্রশাসন কমিশন সদস্যদের রাঙামাটি ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করলে তারা রাজি হন। দুপুরে পুলিশ প্রহরায় তারা রাঙামাটি ত্যাগ করার পথে বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা পাহাড়ের উপর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অতর্কিত এ হামলায় পুলিশ ও কমিশন সদস্যরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৪ কমিশন সদস্য এ ঘটনায় আহত হয়। তাদের বহনকারী গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কমিশনের সদস্যরা প্রশাসনের দেয়া গাড়িতে করে নিরাপত্তা প্রহরায় রাঙামাটি ত্যাগ করেন। এরপর কমিশনের তরফে চট্টগ্রাম শহরে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করা হয় শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য রাঙামাটির অভিজ্ঞতা থেকে তারা তাদের বান্দরবান সফরসূচি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর কমিশন সমর্থিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমে শুরু হয় একতরফা প্রচারণা।
 
বিবাদের কারণ 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১২৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা অংশে রয়েছে ৪৭ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে বিজিবির কোনো নজরদারি না থাকায় দুই দেশের সন্ত্রাসী, পাচারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। গহীন পাহাড় ও বন সমৃদ্ধ অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক রক্ষা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অঞ্চলে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। বিজিবির ভারতীয় কাউন্টারপার্ট বিএসএফের তরফ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে নয়টি নতুন সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি (বিওপি) করতে যাচ্ছে বিজিবি- যারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় কাজ করবেন। বিজিবি সূত্র মতে, সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, টেক্কাছড়া, শিলছড়ি, উত্তর শিলছড়ি, লালতারান, দিপুছড়ি, লক্কাছড়া, উত্তর লক্কাছড়া, ধূপশীল ও আড়ানীছড়া এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলো বসানো হবে। দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালে ব্যাটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন- বিজিবি গঠন করা হয়।
 
মূলত ৫টি কারণে এই নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমত : দীঘিনালা অংশের এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের সীমানা কখনো অরক্ষিত থাকতে পারে না। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা প্রদানে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি, দ্বিতীয়ত : এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত অপরাধীরা এই সীমান্ত দিয়ে তাদের নির্ভয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অস্ত্র, মানব, মাদক পাচারসহ সব ধরনের পাচারকাজ এবং অবৈধ যেকোনো ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এ ব্যাটালিয়নের কাজ। তৃতীয়ত : উত্তরপূর্ব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই তাদের নানাবিধ অপরাধ কাজে এই মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে থাকে। ফলে বিএসএফের তরফ থেকে তা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ আসতে থাকে। বাংলাদেশ অন্যদেশের অপরাধীদের নিজ সীমান্তে প্রশ্রয় না দিতে বদ্ধ পরিকর। চতুর্থত : বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই দুর্গম সীমান্তে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয়স্থল ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। তারা অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে এই অঞ্চলে আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। পঞ্চমত : দুর্গম এই সীমান্ত মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সম্পদের সুরক্ষা প্রদান এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এখানে কোনো বাঙালি বসতি নেই। কিন্তু নিরীহ পাহাড়ি জনগণের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানাপ্রকার নির্যাতন চালায় তা বন্ধ করতে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি।
 
এদিকে সরকার যখন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৭ কিমি. অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের মদদে বাবুছড়ায় বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতাসহ বিজিবির নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের অখ-তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন পাহাড়ের রাজনীতি সচেতন মহল। নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন হলে জনগণের সুবিধা হলেও অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অসুবিধা হবে। তাই স্থানীয়ভাবে যারা এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে তারা ঐ সকল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রশ্রয়দাতা। সিএইচটি কমিশন তাদেরই অন্যতম।
 
ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা
সাজেকের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের পেছনে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা রয়েছে বলে বাঙালিদের অভিযোগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন এবং অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলোর দাবি ঘটনার একদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বাঘাইছড়ি এলাকার চাকমা নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করে এবং তারপর তারা চলে আসার পরই বাঙালিদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরে যায়।
এরশাদ সরকারের সামরিক সাশনের দুর্বলতার সুযোগে ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একের পর এক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেয়া শুরু করে। ১৯৮৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী কোপেনহেগেনের ড্যানিস পার্লামেন্টের সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক কমিশনকে স্বাগত জানানোর ঘোষণা দেয়। দশমাস পর আমস্টার্ডামে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিস্থিতি তদন্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠিত হয়। শুরুতে এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন কানাডার আইনের অধ্যাপক স্যার ডগলাস স্যান্ডারস ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহসভাপতি জার্মানির উইলফ্রিড টেলকেম্পার। এছাড়াও কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার রোজ মুরে, নরওয়ের লীফ ডানফিল্ড, গ্রীনল্যান্ডের হ্যান্স পাভিয়া রোজিং। কমিটি গঠনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য এলাকার মানবাধিকার ও ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করা।
 
কিন্তু এ কমিটির গঠন, স্থান ও সদস্যদের তালিকা থেকে শুরুতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা। বিষয়টি ভারত সরকারও অনুধাবন করতে পারায় কমিটি ১০ দিনের জন্য ত্রিপুরা সফরের অনুমতি চাইলে তাদেরকে ৫ দিনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কমিটি ১৯৯০ সালের ২১-২৫ নভেম্বর ত্রিপুরাস্থ বাংলাদেশী উপজাতীয় শরণার্থী শিবির এবং একই বছরের ৮-২৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা সফর করে সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে এবং এ সময় তারা দোভাষী হিসেবে চাকমাদের সহায়তা নেয়। ত্রিপুরা সফরকালে ভারত সরকার কমিটির সাথে সার্বক্ষণিক তাদের লোক মারফত পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদেকে কোনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে দেয়নি। সফরে প্রাপ্ত তথ্য বলে দাবি করে এ কমিটি ১৯৯১ সালের ২৩ মে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ‘Life is not ours : land human rights in the Chittagong hill tracts’  শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এ কমিটি ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে পরপর চারটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রিপোর্টে কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাঙালি, ইসলাম, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে নানা মিথ্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করে। রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, গণধর্ষণ প্রভৃতির জন্য বাঙালি বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই মিশনারিদের তৎপরতায় নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি ছেড়ে খ্রিস্টান হয়ে গেলেও কমিটি তাদের রিপোর্টে উপজাতীয়দের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে এবং নাম না জানা ৭ জন মারমার মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করে। তাদের মতে, গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ অব্যহত থাকার দাবি করে বলে, মাইক্রোফোনে ভেসে আসা মসজিদের আজানের শব্দে কমিশনের কাজকর্ম অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। 
 
২০০০ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকার পর ২০০৮ সালের ৩১ মে-১ জুন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দুইদিন ব্যাপী এক সম্মেলনে নতুন করে সিএইচটি কমিশন গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ১২ সদস্যের এই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হন ব্রিটিশ নাগরিক লর্ড এরিক এভাব্যুরি, বাংলাদেশের সুলতানা কামাল ও ডেনমার্কের ড. আইডা নেকোলাইসেন। লর্ড এরিক এবাব্যুরি ১৯৬২-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি এবং ১৯৭১ সাল থেকে ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এই সভার সভাপতি। তিনি পূর্ব তিমুরকে (স্বাধীন বা আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন) বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বর্তমানে লর্ড এরিক এভাব্যুরি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামের আন্তর্জাতিক প্রচার সেলের প্রধান হিসাবে কাজ করছেন। 
 
পুনর্গঠিত কমিশন ২০০৮ সালের ৬-১৪ আগস্ট এবং ২০০৯ সালের ১৬-২২ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। সাজেক এলাকাটি এই কমিশনের কাছে সবসময়ই বিশেষ আগ্রহের ছিল। ২০০৮ সালের সফরকালে এ কমিশনের বিতর্কিত কর্মকা- ও বাঙালিদের কথা না শোনার কারণে তারা সুলতানা কামালকে অবরোধ করে। তার সামনে ঝাড়ু ও জুতা মিছিল করে। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কমিশনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অন্যতম অভিযোগ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করার পরপরই পাহাড়ে বড় ধরনের হিংসাত্মক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
 
২০১০ সালের ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশন বাঘাইছড়ি সফর করে ও সেখানে রাত্রিযাপন করে। এর পরদিনই বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের ঘরে আগুন লাগে। এর দায় বাঙালিদের উপর চাপিয়ে পাহাড়িরাও বাঙালিদের ঘরে আগুন লাগায়, তাদের জায়গা-জমি দখল করে। শুরু হয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। সেসময় সাজেকের চেয়ারম্যান লাল থাঙ্গা পাঙ্খো দৈনিক ইনকিলাবের জন্য আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, চাকমারা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাঙালিদের দোষ দিচ্ছে। বাঙালিরা অভিযোগ করেছিল সিএইচটি কমিশনের গোপন উসকানিতে পাহাড়িরা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে।
২০০৮ সালে কমিশন তাদের পার্বত্য সফরকালে বাঙালিদের পাহাড় ছেড়ে সমতলে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা পূরণের প্রলোভন দেখায়। বাঙালিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ২০০৯ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয় যে, বাঙালিদের পাহাড় থেকে সমতলের সরকারি খাস জমিতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এর জন্য যত অর্থের প্রয়োজন ইইউ, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
 
২০১০ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানায়, বাঙালিদের জোর করে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তাদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে, গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দিতে হবে। এছাড়াও কমিশন তাদের প্রত্যেক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অনুদান বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের অধিকার হরণের কাজে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। কাজেই যতদিন বাংলাদেশ সরকার তাদের নির্দেশিত সুপারিশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন না করবে ততদিন যেন তারা বাংলাদেশ সরকারকে সবধরনের সহায়তা প্রদান বন্ধ রাখে- এ মর্মেও কমিশন বিদেশি দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে। এভাবে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
 
সিএইচটি কমিশনের সকল রিপোর্টই একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরকালে একতরফা উপজাতিদের সাথে কথা বলে। কখনো কখনো বাঙালিদের সাথে কথা বললেও তা তাদের নির্বাচিত বাঙালি। যারা সন্তু লারমার উপকারভোগী। সে কারণে তাদের সেখানো বুলি মতে, তারা কমিশনের সামনে মত প্রকাশ করে, সরকার তাদের সমতলে পুনর্বাসন করতে চাইলে তাদের আপত্তি নেই। সিএইচটি কমিশন পাহাড়ে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে শতশত পৃষ্ঠা রিপোর্ট করলেও তাতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতনের কোনো কথা উঠে আসেনি। 
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত যে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা শুধু বাংলাদেশ সরকার কতটুকু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করলো না তা নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু সন্তুবাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য এখনো অস্ত্র সারেন্ডার না করে হিংসা, হানাহানি ও অপরাধ বিস্তার কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে তাদের বেলায় কমিশনের কোনো বক্তব্য নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকার অন্যতম দাবি। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধ হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে কারণে বাঙালিরাই এ অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। অথচ কমিশন উপজাতিদের তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি রেখে বাকি সকল ক্ষমতা প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ব্যাপক স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ বানাতে সুপারিশ করেছে। এসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায় সিএইচটি কমিশনের প্রতি বিক্ষুদ্ধ।
 
একটি রাষ্ট্রের সীমান্তে কোথায় নিরাপত্তা ক্যাম্প বসবে এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ভাবনা। এ নিয়ে নাগরিকের চাহিদা বাধা থাকতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। সেখানে কারো ব্যক্তিগত জমি বা সম্পদ অধিগৃহীত হলে সে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে, কিন্তু বাধা দিতে পারে না। যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজেই আমরা এ ধরনের অধিগ্রহণ সারা দেশেই দেখছি। পদ্মা সেতুর কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। কিন্তু পাহাড়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি চিহ্নিত পাহাড়ি গ্রুপ সকল প্রকার উন্নয়নেই বাধা সৃষ্টি করে থাকে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হোক। কখনো আর্মি চাই না, কখনো বিজিবি চাই না, কখনো র‌্যাব চাই না বলে, এমনকি অবকাঠামো, পর্যটন, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিয়ারিং ইউনিভার্সিটিসহ সকল ধরনের উন্নয়নের তারা বিরোধিতা করে আসছে। আসলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মুখে স্বায়ত্বশাসনের কথা বললেও বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক রাষ্ট্র বানাতে চায়। সে কারণেই তারা গঠন করেছে জুম্ম লিবারেশন আর্মি (জেএলএ), স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের পতাকা। আর এই কাজে তাদের গোপনে, প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সিএইচটি কমিশনের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় শতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও, দাতা দেশ ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে অচিরেই নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সিএইচটি কমিশনের মতো রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সকল দেশি-বিদেশি এনজিও এবং দাতাসংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ কাজে সময় ক্ষেপণের বা শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই।
Email: palash74@gmail.com. (দৈনিক ইনকিলাবের সৌজন্যে)
 
লেখকের পার্বত্যচট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা
 
 
 
 

ইউপিডিএফের সাথে সিএইচটি কমিশনের বৈঠক অপহরণ-চাঁদাবাজিকে উস্কে দিতে পারে

04.07.2014_Cht Comision & Updf Sitting NEWS

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন পাহাড়ী সংগঠনের সাথে খাগড়াছড়ি সফররত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে নানামুখী আলোচনার ঝড় উঠেছে জেলাবাসীর মধ্যে। এ বৈঠক কিসের ইঙ্গিত বহন করে এমন প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে সচেতন মহলে। ইউপিডিএফ ছাড়াও খাগড়াছড়ি জেলার চার পাহাড়ী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে এ কমিশন

পাহাড়ের নাম প্রকাশে একাধিক মহল প্রশ্ন রেখে বলেন, বিভিন্ন সময় বাঙ্গালীরা নির্যাতনের শিকার হলে সিএইচটি কমিশন কোথায় যায়। তখন তো তাদের কোন ভুমিকা লক্ষ্য করা যায় না। অথচ পাহাড়ীরা যে কোন কাল্পনিক অভিযোগ করলেই তথাকথিত সিএইচটি কমিশনসহ অনেকেই শালিস বিচার করতে চলে আসেন বলে অভিযোগ করেন তারা। তাদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একপেশে বৈঠক পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, খুন, গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজির মতো ঘটনাকে উস্কে দিতে পারে। তাছাড়া অতীতে সিএইচটি কমিশিন পাহাড় ত্যাগ করার পর বড় ধরণের দাঙ্গা হয়েছে কয়েকবার। কাজেই এবারের বৈঠক নিয়েও জনমনে নানা সন্দেহ বিরাজ করছে।

 বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বৈঠকের সচিত্র সংবাদ প্রকাশের পর সিএইচটি কমিশনের পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলার সচেতন মহল। তাদের মতে সুলতানা কামালের নেতৃত্বে সিএইচটি কমিশন বিশেষ মহলের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে পাহাড়ের পথে পাড়ি জমিয়েছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সুত্রে জানা গেছে, প্রতিনিধি দলটি নেতৃবৃন্দ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে খাগড়াছড়ি সদরে ইউপিডিএফের ঘাটি হিসেবে পরিচিত স্বনির্ভস্থ হুয়াঙ বোইও-বা হলরুমে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ‘র সাথে সাক্ষাত ও মতবিনিময় করেছেন। কমিশনের নেতৃবৃন্দ একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় টঙ রেস্টুরেন্ট এন্ড কনভেনশন সেন্টারে হিল উইমেন্স ফেডারেশন সহ ইউপিডিএফ সমর্থিত বিভিন্ন নারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথেও মতবিনিময় করে।

পৃথক পৃথক ভাবে মতনিবিময়কালে সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারম্যান ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, কমিশনের সদস্য খুশী কবীর, স্বপন আদনান, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও হানা শামস আহমেদ কমিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন।

ইউপিডিএফ’র কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা পার্বত্য শান্তি চুক্তির পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে নিপীড়ন-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের জন্য সিএইচটি কমিশনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ভূমি বেদখল, নারী নির্যাতন আগের চেয়ে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। সেনাবাহিনী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসবের সাথে যুক্ত থাকায় পরিস্থিতির তেমন কোন পরিবর্তন ঘটছে না বলেও অভিযোগ করা হয় ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে।

কমিশনের নেতৃবৃন্দ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়ন-নির্যাতন, ভূমি বেদখলের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এর থেকে উত্তরণের জন্য করণীয় নির্ধারণে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বলে সিএইচটিনিউজডটকম-এ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত এবং এর থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানো যায় সে বিষয়েও আলোচনা হয় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়।

পৃথক পৃথক মতবিনিময়কালে ইউপিডিএফের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা সচিব চাকমা, প্রদীপন খীসা, সদস্য নিরন চাকমা, রিকো চাকমা ও অংগ্য মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাদ্রী চাকমা, সাংঠনিক সম্পাদক রিনা চাকমা, সাজেক নারী সমাজের সভাপতি নিরূপা চাকমা ও জ্যোৎস্না রাণী চাকমা, ঘিলাছড়ি নারী সমাজের নেত্রী কাজলী ত্রিপুরা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের নেত্রী অপরাজিতা খীসা ও সোহেলী চাকমা।

সিএইচটি কমিশন ফিরে যাওয়ায় অবরোধ প্রত্যাহার

khagrachari pbcp pic 2 04-07-14

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর অবরোধের মুখে ফিরে গেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন (সিএইচটি কমিশন)। ফলে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে আহুত সংগঠনগুলো।

কমিশনের কর্মসুচী প্রতিহতের ঘোষনা দিয়ে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসুচী নিয়ে মাঠে নামার ফলে কমিশনের পূর্বনির্ধারিত রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সফর বাতিল করে চট্টগ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এদিকে কমিশন তাদের কর্মসুচী বাতিল করায় রাঙ্গামাটিতে শুক্রবার সকাল থেকে শুরু হওয়া দুই দিনের সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। শুক্রবার ছয় বাঙ্গালী সংগঠনের নেতারা দুপুর ১ টায় শহরের ভেদভেদী শুল্কফাঁড়ি এলাকায় তাৎক্ষনিক এক সংবাদ সম্মেলন করে অবরোধ কর্মসূচী প্রত্যাহারের ঘোষনা দেয়।

ছয় বাঙ্গালী সংগঠনের পক্ষে সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এসময় জালাল উদ্দিন চৌধুরী আলমগীর, এডভোকেট আবছার আলী, নূরজাহান বেগম, মোহাম্মদ ইব্রাহীম, আল আমিন ইমরানসহ বিভিন্ন সংগঠনের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনকে ‘বিতর্কিত’ ও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আখ্যা দিয়ে তাদেরকে পার্বত্য এলাকায় অবাঞ্চিত ঘোষণা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, সমঅধিকার ছাত্র আন্দোলন, বাঙ্গলী ছাত্র ঐক্য পরিষদ এবং পার্বত্য গণ পরিষদ বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে রাঙ্গামাটিতে ৪ ও ৫ জুলাই দুইদিনের সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দেয়।

টানা দুইদিনের অবরোধের শুরুতেই রাঙ্গামাটি শহরে আভ্যন্তরীণ যান চলাচল অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হলেও জেলা শহরের সাথে অন্যান্য জেলার সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ ছিলো। সকাল থেকে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের মানিকছড়ি এবং রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের বগাছড়ি এলাকায় বাঙ্গালী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা পিকেটিং করেছে। শহরের প্রবেশমুখ ভেদভেদী এলাকাতে বেশকিছু গাড়ী আটক করে পিকেটাররা। পিকেটিংয়ের ফলে শহরের প্রবেশমুখে বিপুল সংখ্যক গাড়ী আটকে পড়ে। শহর থেকে কোন যানবাহনকেই বাইরে যেতে দেয়নি অবরোধকারিরা।

সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা পেয়ার আহম্মেদ খান জানিয়েছেন, পক্ষপাততুষ্ট সিএইচটি কমিশন খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে যাওয়ায় আমরা আমাদের অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছি। তারা যখনই পার্বত্য চট্টগ্রামে আসবে তখনই তাদেরকে প্রতিহত করা হবে। একই সময় নতুন কর্মসুচীও ঘোষণা করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) মুখপাত্র হানা শামস জানিয়েছেন,আমরা খাগড়াছড়ি থেকে বর্তমানে চট্টগ্রামে আছি। এখানেই আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো।

প্রসঙ্গত, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) একটি প্রতিনিধি দল গত ৩ জুলাই থেকে ৬ দিনের সফরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আসে। দীঘিনালা ও খাগড়াছড়িতে বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ বিক্ষোভের মুখেই তারা খাগড়াছড়ির বাবুছড়া ও দুইটিলার বিরোধপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন। ৪ থেকে ৬ জুলাই তাদের রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান সফরের কথা ছিলো। বান্দরবানে টানা ৪ দিন এবং রাঙ্গামাটিতে টানা ২ দিন অবরোধের ডাক দিয়েছে স্থানীয় বাঙ্গালী সংগঠনগুলো। এবং অবশেষে বাঙ্গালীদের প্রবল অবরোধের মুখে প্রতিনিধি দলটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়।