বিজিবি-বিজিপি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত : অস্ত্র গোলাবারুদ ফেরত

 pic-9999

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

মিয়ানমারের মংডুতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এর মধ্যে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের সফল পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে নিহত বিজিবি সদস্য মিজানুর রহমানের লুট হওয়া এসএমজি, চারটি ম্যাগজিন ও ১২০ রাউন্ড গোলাবারুদ ফেরত দিয়েছে বিজিপি। ৫জুন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় পতাকা বৈঠক শেষে টেকনাফ ফিরে এসে বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান এ কথা জানান।

 

 পার্বত্যনিউজের কক্সবাজার, টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি ও রামু প্রতিনধিগণ জানিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল ৫টি এজেন্ডা নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলেন। এজেন্ডাগুলো হল- (১) ১৯৪৭ সালের জেনেভা কনভেনশন মোতাবেক সীমান্তের জিরো পয়েন্টে সেনা মোতায়েন নিষিদ্ধ থাকলেও মিয়ানমার কেন তা বারবার করে যাচ্ছে? (২) মিয়ানমার বাহিনী বিজিপি কেনই বা ২৮ মে বিনা কারণে ৫২ পিলারের অদূরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে টহল দেয়া বিজিবি সদস্যের ওপর গুলিবর্ষণ করে। যাতে নায়েক মিজান মারা যান (৩) ৩০ মে গুলিতে নিহত নায়েকের লাশ ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও তা না করে লাশ গ্রহণকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। এমনকি মর্টার শেলের মতো অস্ত্রের ব্যবহার করা। (৪) চোরাচালান, ইয়াবাসহ মাদকদ্রব্য পাচার (৫) উভয় দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে কর্মকৌশল প্রণয়ন ।

বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসান জানিয়েছেন, বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিরা সীমান্তে সেনা মোতায়েন, ২৮ মে বিনা কারনে ৫২ পিলারের অদূরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে টহল দেয়া বিজিবি সদস্যের উপর গুলি বষর্ণ করে নায়েক মিজান নিহত হওয়ার জোর প্রতিবাদ জানান। এসময় বিজিবি সদস্যের গুলি ও অস্ত্র ফেরত চাওয়া হয়। মিয়ানমার অস্ত্র এবং গুলি ফেরত দেয়। বাংলাদেশ পক্ষ এসময় নিহতের জন্য ক্ষতিপুরণ দেয়ার দাবী করলে মিয়ানমার তা যথাসম্ভব দেয়া হবে বলে জানিয়েছে। বৈঠকে উভয় পক্ষ চোরাচালান, ইয়াবাসহ মাদক দ্রব্য পাচার রোধ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা করেছে। জানা গেছে, পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি থাকার অভিযোগ তুলে বিজিপি। বিজিবি মিয়ানমারের অভিযোগ নাকচ করে দেয়। বাংলাদেশ পক্ষ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও মাদক পাচার বন্ধ করার দাবি জানায়। তিনি জানান, বৈঠকে সাম্প্রতিক ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে আখ্যা দেয় বিজিপি। ভবিষ্যতে যেকোনো সন্ত্রাসবাদ দমনে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।

SAM_0083

বৈঠকে মিয়ানমার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তার দেশের সন্ত্রাসীদের তৎপরতার কথা তুলে ধরে তা দমনে যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবী করে। কিন্তু বাংলাদেশ পক্ষ এ দাবী অস্বীকার করে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে তা সরবরাহের আহ্বান জানিয়ে বলে, বাংলাদেশ মিয়ানমারের দেয়া তথ্য মোতাবেক নিজেই অভিযান পরিচালনা করে অভিযোগ যাচাই করে দেখবে। বাংলাদেশের মাটিতে অন্য কোনো দেশের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর কোনো সুযোগ নেই বলেও বৈঠকে জানানো হয়েছে। এর সঙ্গে আগামী ১০-১৩ জুন বিজিবি ও বিজিপি’র মহাপরিচালক পর্যায়ে বৈঠকের কথাও রয়েছে।

 সীমান্তের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপে সকাল ১১ টার দিকে শুরু হয় । এ বৈঠকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় সীমান্তের লোকজনসহ দেশের মানুষের দৃষ্টি সারা দিন মিয়ানমারের মন্ডুর দিকে ছিল।

 এর আগে বৈঠকে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮ টা দিকে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসানের নেতৃতে¦ ২৩ সদস্যের প্রতিনিধি টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মিয়ানমারের মংডুতে যান। সেখানে বেলা ১১ টা থেকে টানা ৪ টা পর্যন্ত চলে বৈঠক। ২৩ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান এবং মিয়ানমারের পক্ষে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মিয়ানমারের মংডুস্থ ইমিগ্রেশন হেডকোয়ার্টাসের পরিচালক কর্নেল থিং কু কু। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল সফিকুর রহমান, রামু ৫০ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল তইয়ুমুর কায়কোবাদ, কক্সবাজার ১৭ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম, টেকনাফ ৪২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ প্রমুখ।

 এদিকে দুই দেশের মধ্যে পতাকা বৈঠক হলেও সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো থমথমে রয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তের কোনো কোনো পয়েন্টে নতুন করে আরো সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। বিজিবিও সীমান্তে সকল প্রস্তুতিসহ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল টিমকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে মিয়ানমারের বিজিপি। সেই সময় নিখোঁজ হন নায়েক মিজানুর রহমান। তাকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এ ঘটনায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ মায়ো মিন্টথানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছিল। সীমান্ত থেকে বিজিবির সদস্যকে আটক করায় কঠোর ভাষায় রাষ্ট্রদূতকে তিরস্কার করা হয়। একই সঙ্গে সীমান্তরক্ষীদের কাছে আটক বিজিবির নায়েক মিজানুর রহমানকে অতি দ্রুত ছেড়ে দেওয়ারও দাবি জানানো হয়। এরপর শুক্রবার নিখোঁজ বিজিবি সদস্য মিজানুর রহমানকে ফিরিয়ে দিতে বিজিবি ও মিয়ানমারের বিজিপির মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয় বৈঠক। এরপরই নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার বিকেলে বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমানের মরদেহ মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী ৫২ সিমান্ত পিলার পানছড়ি এলাকা দিয়ে ফেরত দেয়। তবে ফেরত দেয়নি নায়েক মিজানুর রহমানের সঙ্গে লুট হওয়া ১টি এসএমজি, ৪টি ম্যাগজিন ও ১২০ রাউন্ড গোলাবারুদ। মিয়ানমারের বিজিপি আজকের পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ওই অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দেবে বলে জানিয়েছিল।