বৈষম্যের শিকার পাহাড়ের বাঙালিরা

পাহাড়ে অশান্তির আগুন-৪

ফারুক হোসাইন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে :

  খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের আব্দুল লতিফ (৭০) ছোট একটি ছাউনি ঘরে পরিবারের পাশপাশি গরু-ছাগল নিয়ে একইসাথে রাত্রি যাপন করেন। ৩০ বছর আগে সরকার তাকে পার্বত্য অঞ্চলে এনে বসতের জন্য ২৫ শতাংশ এবং চাষের জন্য চার একর জমি দিলেও তা কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। সব হারিয়ে সরকারি রেশন পেয়ে ছোট একটি ঘরে দিনাতিপাত করছেন তিনি। একদিন রেশন না দিলে বন্ধ থাকে খাওয়া-দাওয়া। আশপাশের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের ৪শ’ পরিবার সেই গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় নিয়ে একইভাবে জীবনযাপন করছেন।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান (টিন, কম্বল) বিতরণে গিয়ে একজন বাঙালিরও নাম খুঁজে পাননি সরকারি কর্মকর্তারা। পার্বত্য অঞ্চলকে অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, চাকরি, উচ্চশিক্ষা বৃত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা রকম কোটা ও সুযোগ-সুবিধা চালু করেছে সরকার। তবে একই এলাকায় বসবাস করে এবং জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হয়েও তা পাচ্ছেন না বাঙালিরা।

শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগিরা। অবিলম্বে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে জনসংখ্যানুপাতে সকল সুযোগ-সুবিধা বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে একজন বাঙালি প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়ার  দাবি জানান তারা।

তিন পার্বত্য জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই এলাকার বাঙালিরা সরকারি বরাদ্দের কোনো কিছুই পান না। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে যেসব সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ অঞ্চল এবং অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে যেসব বরাদ্দ দেয়া হয় তার পুরোটাই ভোগ করছে উপজাতিরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে উপজাতিরা নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং তারাই তালিকা করেন কাদেরকে বরাদ্দ দেয়া হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় প্রতিনিধিদের তালিকায় কোনো বাঙালির নাম থাকে না। ফলে জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়ায় চলতে হচ্ছে। অন্য দিকে উপজাতি জনগোষ্ঠী এককভাবে এর পুরোটা লাভ করছে।

%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80

জানা যায়, মেডিক্যাল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সকল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর কোটার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২৫ জন উপজাতি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে কোটাতেই। নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর সংখ্যা আরো বাড়ানো হয়েছে।

অন্য দিকে একই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বাঙালিদের জন্য তেমন কোনো সুযোগ এখনো তৈরি করা হয়নি। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী দু’টি জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রকম নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তাও সেটি পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের ফলে।

শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পাহাড়ের বাঙালিরা। উপজাতি জনগোষ্ঠী করের আওতামুক্ত হলেও বাঙালিদের কর দিতে হচ্ছে। পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আদায় করা চাঁদার ক্ষেত্রে বাঙালিদের কাছ থেকে অধিক হারে আদায় করা হয়। পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লাখ টাকার মধ্যে হলে ঠিকাদারী সম্পূণরূপে উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০ শতাংশ উপজাতিদের আর বাকি ৯০ শতাংশ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হলেও তার বেশির ভাগ পায় উপজাতিরাই।

আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র পাঁচ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় ১৬ শতাংশ।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তিতে বাঙালিরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জনসংখ্যার দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ৪৮ হলেও তাদের জন্য মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্য দিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫২ শতাংশ অধিবাসীদের জন্য ৭৭ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ করা হয়েছে। আর ২৩ শতাংশ বাঙালি শিক্ষার্থীদের তালিকায় মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু ও বড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও রাখা হয়েছে। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়েছে তারাও।

গতবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তি তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় সর্বমোট ৪৭৫ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উপজাতির সংখ্যা ৩৬৪ জন আর মাত্র ১১১ জন বাঙালি (মুসলিম, হিন্দু ও বডুয়া) শিক্ষার্থী। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় দেয়া ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১২১ জন, ৩৭ জন বাঙালি। রাঙামাটি জেলায় ১৫৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১১৩ জন আর মাত্র ৪৬ জন বাঙালি। বান্দরবান জেলায় ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষা বৃত্তি দেয়া হয়। এর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থীর  সংখ্যা ১৩০ জন, আর মাত্র ২৮ জন বাঙালি শিক্ষার্থীকে এই বৃত্তি দেয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেড় শতাধিক এনজিওর মাধ্যমে কয়েক হাজার খানেক প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই বাঙালি অধিবাসীরা সুযোগ পাচ্ছে না। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে তা দেয়া হচ্ছে। রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলায় এনজিওগুলোর ২২৫টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯টি ক্ষুদ্র প্রকল্প বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়।

পার্বত্য অঞ্চলের শহরের বাঙালিরা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলেও গ্রামের মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে বসতি ও চাষের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। তিন জেলাতে এরকম মোট  ৮৬টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এগুলো ২৬ হাজার পরিবার পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বাড়লেও রেশন কার্ড বাড়েনি একটিও।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাহাড়ি বাঙালিরা। থাকার জায়গার অভাবে একই ঘরে গরু, ছাগল এবং মানুষ বসবাস করছে। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে ৫৬টি পরিবারকে ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাসের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।

কিন্তু পাহাড়ি উপজাতিদের অব্যাহত বিরোধীতা ও আক্রমণের কারণে ১৯৮৮ সালে তাদেরকে একটি গ্রামে একত্রিত করে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ৫৬টি পরিবারকে ২৫ শতাংশ বসতি জমি এবং পৌনে চার একর চাষযোগ্য জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ৩০ বছর পর সেই ৫৬ পরিবার এখন ৪০০ পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশও বাড়েনি।

অন্য দিকে চাষযোগ্য যে পৌনে চার একর জমি তাদের দেয়া হয়েছিল তা পাহাড়ে হওয়ার কারণে উপজাতিদের বাধা ও অপহরণের ভয়ে সেগুলোতে চাষ তো দূরের কথা, পা পর্যন্ত ফেলতে পারে না বাঙালিরা। কেউ বাধা ডিঙিয়ে চাষ করার কথা চিন্তা করলেই রাতের অন্ধকারে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মুকুল হোসেন বলেন, ৩০ বছর আগে যে বসতি জমি দিয়েছিল, এখন সেই জমিতের আমাদের পরিবারদের আর জায়গা হয় না। মানুষ বেড়েছে পরিবার বেড়েছে কিন্তু জমিতো বাড়েনি। অন্য দিকে চাষের জন্য পাহাড়ে যে জমি দিয়েছে, সেই জমিতে তো আমরা যেতেই পারি না।

পুলিশের কাছে অভিযোগ এবং কোর্টের কাছে সুরাহা চাইলে বলা হচ্ছে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান কর। ৭০ বছর বয়সী মো: আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের যে চাষের জমি দিয়েছিল, সেখানে তো ভয়ে যেতে পারছি না। আর যে জমিতে প্রথমে বাড়ি করেছিলাম, সেখানে শান্তিবাহিনীর অত্যাচারে ছেড়ে আসতে হয়। আবুল হাসেন বলেন, কুলারাম পাড়া, লেম্বু ছড়িতে প্রথমে তাদের বসবাস ছিল। যখন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসের কারণে নিরাপত্তা দেয়া যাচ্ছিল না তখন ৮৮ সালে এই গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ৮২’ সালে বসবাস শুরু করার পর শান্তিবাহিনী অত্যাচার শুরু করে। রাতের বেলা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়। ফায়ার করে ভীতি তৈরি করা হয়। এই নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আশপাশের বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে নিয়ে এসে এই গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের প্রধান ও ১১ নম্বর সেক্টরের ২ এম এফ কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বলেন, এখানে বাঙালিরা ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গণতন্ত্র নাই, পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। নিকৃষ্ট, খুনি, রাজাকারের জাতি স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। আবার সরকারও নতজানু হয়ে তাদের সহযোগিতা করছে। আমাদের নিজেদের দেশে আমরা নাগরিক না, নতুন করে নাগরিক হতে হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, এনজিওগুলো বলছে- পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কনফিডেন্স তৈরিতে তারা কাজ করছে। এর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ের বাঙালিরা এর কোনো অর্থই পায় না, সহযোগিতা পায় না। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে বাঙালিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে স্বীকার করে।

বিএনপিতেও উপেক্ষিত পার্বত্য বাঙালী

বিএনপি

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বিএনপি পার্বত্য বাঙালীদের দল বলে প্রচারণা থাকলেও সদস্য ঘোষিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে পার্বত্য বাঙালীরা উপেক্ষিত হয়েছে। গত ৬ আগস্ট ঘোষিত বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৭ জন স্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর হলেও মাত্র ১ জন রয়েছে পার্বত্য বাঙালীর।

এই বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বেশিরভাগ বিএনপির বাঙালী নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফলে বিষয়টি পার্বত্যনিউজ তিন পার্বত্য জেলার শীর্ষ বাঙালী তিন নেতার সাথে কথা বলে। তাদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে হতাশা পরিলক্ষিত হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদের কেউ প্রয়োজন মনে করছে না- ওয়াদুদ ভুঁইয়া

বিএনপির নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়া সহ. কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক ও খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি এবং সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভুঁইয়া তার প্রতিক্রিয়ায় পার্বত্যনিউজকে বলেন, বিএনপির নতুন কমিটিতে অবশ্যই পার্বত্য বাঙালীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য পদে রবীন্দ্র লাল নামে যে স্থান পেয়েছে, সে তো আমাদের খাগড়াছড়ির ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা হওয়ারও যোগ্য নয়, আমরা তাকে খাগড়াছড়ির কোনো ইউপি কমিটির সভাপতিও করবো না। অবশ্যই এখানে বাঙালীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। আমাকেও তো বাদ দিতো, গতবার তো বাদ দিয়েছিলো। গতবার আপনারা লেখালেখি করেছেন, সেসব পেপার কাটিং লিফলেট হয়ে পার্টি অফিসে ও বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করা হয়েছে- যার কারণে একটা আওয়াজ উঠেছিলো।

পার্বত্য বাঙালীদের শীর্ষ এই নেতা বলেন, আমি নিজেও্ একাধিকবার ম্যাডামকে বলেছি, ম্যাডাম ওখানে তো বাঙালীদের বাদ দেয়া হলো। তিনি জানতে চাইলেন, কিভাবে? আমি বলেছিলাম, আমাকেও তো রাখা হয়নি। তিনি বললেন, এটা আর এমনকি, বাদ পড়ে গেছে কোনোভাবে, আছো তো তোমরা, তোমরা তো জেলাতে আছো তো, এখানে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

নিজের পদ নিয়ে অসন্তষ্ট ওয়াদুদ ভুঁইয়া আরো বলেন, আমার বক্তব্য হলো বাঙালীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। কেননা, রবীন্দ্র লাল যে নেতা হলো, তার চেয়ে যোগ্য অনেক বাঙালী নেতা পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে। সেখানে শুধু রবীন্দ্র লাল না তো, সেখানে ৭ জনকে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমি ৮০ সাল থেকে বিএনপির পলিটিক্স করি, সেই হিসাবেও তো আমাকে এদের চেয়ে এক গ্রেড উপরে রাখা উচিত ছিলো। কিন্তু আমাকে তো ওদের গ্রেডেই রাখলো। ৬ জনের সাথে ১ জন, সেই হিসাবেও আমাকে তো ওদের চেয়ে উপরে রাখা দরকার ছিলো, কিন্তু তাতে করলো না। আমার রাজনৈতিক বয়স, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমার পদ আরো উপরে যাওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু আমার থেকে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ লোক অনেক ভাল পদ পেয়েছে।

শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলে এমন অবস্থা কেন হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীদেরকে প্রয়োজন মনে করছে না, ভাবছে বাঙালীদের প্রয়োজন নেই। বিদেশীদের পছন্দ পাহাড়ীরা, বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো পছন্দও পাহাড়ীরা। বিএনপি- আওয়ামী লীগ এখন আর সে ভিন্নতা নেই।

তিনি আরো বলেন, অবশ্য একটা ভিন্নতা আছে। বিএনপি তিন জেলার এক জেলায় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদে বাঙালী রাখে, আওয়ামী লীগ এক জেলাতেও রাখে না। গতবার সমান ছিলো, এবার অবশ্য দুইটাতে আছে, আওয়ামী লীগ একটাতেও রাখেনি। এবার্ ট্রাডিশন ভেঙে রাঙামাটির সভাপতি পদে বাঙালী আমি ফাইট করে নিয়ে এসেছি। আবার বিএনপি এক জেলায় বাঙালী নমিনেশন দেয়, আওয়ামী লীগ তিন জেলায় পাহাড়ী নমিনেশন দেয়। লাস্ট ইলেকশনে বিএনপিও তিন জেলায় পাহাড়ী নমিনেশন দিয়েছিল। কাজেই এখন সেই পার্থক্য খুব একটা নেই। আস্তে আস্তে বিএনপিও আওয়ামী লীগের দিকে যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় কমিটিতে সমতার ভিত্তিতে পদ বন্টিত না হওয়ায় নেতাকর্মীরা হতাশ- শাহ আলম

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম পার্বত্যনিউজকে বলেন, বারবার আমরা ম্যাডামকে বলে এসেছি বিএনপির কমিটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অধিকহারে বাঙালী নেতাদের নেয়ার জন্য। ম্যাডাম আমাদের কমিটমেন্টও দিয়েছিলেন যে এবার তিনি সমতা রক্ষা করবেন। বিষয়টি আমাদের ওয়াদুদ ভাইও জানেন। কিন্তু কেন করলেন না সেটা তো বুঝতে পারছি না।

তিনি বলেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে অংশ নেয়ার মতো অনেক বাঙালী নেতা পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় রয়েছে। কিন্তু তাদের কমিটিতে স্থান না দেয়ায় তারা হতাশ। এর প্রভাব স্থানীয় বিএনপির কার্যক্রমে পড়বে বলেও তিনি ধারণা করছেন।

এথনিক মাইনোরিটিদের অধিক হারে কমিটিতে নেয়ার জন্য বিদেশীদের চাপ রয়েছে- ওসমান গণি

বান্দরবান জেলা বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ওসমান গণি বলেন, আমাদের এখানে অর্ধেক পাহাড়ী, অর্ধেক বাঙালী। কাজেই আমি মনে করি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিও অর্ধেক পাহাড়ী ও অর্ধেক বাঙালী নিশ্চিত হওয়া উচিত। সে হিসাবে আরো অধিক বাঙালী বিএনপির কমিটিতে থাকা উচিত ছিলো।

তিনি বলেন, নিজেদের কে আমরা অভিভাবক শূন্য মনে করছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম জিয়াউর রহমান ভূমিকা না রাখলে এতোদিন পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো। তাই এখানকার বাঙালীরা বিএনপির অধিক সহানুভুতি সম্পন্ন। সেটা আমরা যখন উপরের লেভেলে আলাপ করি, তখন তারা বলে, এথনিক মাইনোরিটিদের অধিক হারে কমিটিতে নেয়ার জন্য বিদেশীদের চাপ রয়েছে।

ওসমান গণি বলেন, সর্বত্র প্রতিনিধি অর্ধেক পাহাড়ী, অর্ধেক বাঙালী নিশ্চিত হওয়া উচিত। আমরা চাই সকল রাজনৈতিক দলে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালী জনসংখ্যার অনুপাত অর্ধেক নিশ্চিত হওয়া উচিত। এই জনসংখ্যার অনুপাতকে অস্বীকার করা মানে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অস্বীকার করা।
উল্লেখ্য, সদ্য ঘোষিত বিএনপির ৫০২ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে মাত্র ৭ জনের ঠাঁই হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৬ আগস্ট নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঘোষিত দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৭ জন মনোনীত হয়েছেন। এর মধ্যে বান্দরবানের ম্য ম্যাচিংকে উপজাতি বিষয়ক সম্পাদক, খাগড়াছড়ির আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়াকে সহ কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক, রাঙ্গামাটির কর্ণেল (অব.) মনিষ দেওয়ানকে সহ উপজাতি বিষয়ক সম্পাদক, দীপেন দেওয়ানকে সহ ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে কমিটিতে রাখা হয়েছে।

এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বান্দরবানের সা চিং প্রু জেরী, খাগড়াছড়ির সমিরণ দেওয়ান, রাঙ্গামাটির রবীন্দ্র লাল চাকমাকে সদস্য করা হয়েছে। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

চাঁদা না পেয়ে বাঙ্গালী ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে আহত করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা

Capture

নিজস্ব প্রতিনিধি:

খাগড়াছড়ির গুইমারাতে চাঁদা না পেয়ে এক বাঙ্গালী ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। স্থানীয়রা জানায়, রবিবার দুপুরে উপজেলার বড়পিলাক গ্রামের বাসিন্দা সানাউল্ল্যাহকে একদল উপজাতীয় সন্ত্রাসী বড়পিলাক এলাকা থেকে অপহরণ করে গহীন অরণ্যে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহতসহ হত্যার চেষ্টা করে।

খবরটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের বাঙ্গালীরা একজোট হয়ে শনখোলাপাড়া গ্রামে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে।

এদিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালী ব্যবসায়ীকে অপহরণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে স্থানীয় বাঙ্গালীপাড়া, বড়পিলাক ও জালিয়াপাড়া চৌরাস্তায় তাৎক্ষনিক বিক্ষোভ মিছিল করে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক অবরোধ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে।

পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।