বাঙালীরাই এদেশের আদিবাসী

13620921_300898163589352_2372225373615898346_n

মোয়াজ্জেমুল হক

ভারতীয় উপমহাদেশে নেপাল ছাড়া অন্য কোন দেশে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত কোন আদিবাসী নেই। ভারত, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশে আছে ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী, উপজাতি। এসব ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও উপজাতীয়দের আদিবাসী ঘোষণার জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি তৎপরতা লক্ষণীয়। এবারও অনুরূপ তৎপরতা প্রতীয়মান। যদিও ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনকালে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নিজেদের উপজাতি হিসেবে স্বীকার করেই চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেছে।

কিন্তু বর্তমান চাকমা সার্কেল চীফ যিনি চাকমা রাজা নামে পরিচিত- দেবাশীষ রায় কয়েক বছর আগে আকস্মিকভাবে চাকমা উপজাতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্যদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের দাবি উত্থাপন করেন। এ দাবির সঙ্গে দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সমর্থন যোগাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গঠিত হয়েছে আদিবাসী ফোরাম। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘আদিবাসী মন্ত্রণালয়’ করার দাবিও তোলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কয়েকটি সাহায্য সংস্থা উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।

কিন্তু সরকার পক্ষে ২০১১ সালের ২১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে এই বলে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের মূল ভূখ-ের অধিবাসী নয়। বরং বাংলাদেশের ১৫ কোটি (ওই সময়) জনগণের সকলেই বাংলাদেশে আদি এবং প্রাচীন ভূখ-ে শাশ্বতকাল ধরে বসবাস করার সুবাদে এদেশে আদিবাসী। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী আদিবাসী হলে অবশিষ্ট জনগণ বিদেশী হিসেবে পরিগণিত হবে বলে মত ব্যক্ত করা হয়; যা কখনও হতে পারে না।

ওই সভায় বলা হয়, বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী বা উপজাতি কর্তৃক নিজেদের আদিবাসী হিসেবে দাবি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিতর্কের সৃষ্টি করছে। যাতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আদিবাসী শব্দটির ভুল ব্যবহারের ফলে শব্দটির সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ভৌগোলিক অখ-তার ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সভায় উল্লেখ করা হয়, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ যে এ ভূখণ্ডে আদিবাসী (ফার্স্ট নেশন) হিসেবে চার হাজার বছর ধরে বসবাস করছে।

অন্যপক্ষে, ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ক্ষুদ্র, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমন ঘটেছে ১৭২৭ সাল থেকে। তখন হতে তারা ওই অঞ্চলে অভিবাসী হিসেবে বসবাস করে আসছে। সঙ্গত কারণে তারা আদিবাসী নয়। প্রয়াত বোমাং সার্কেলের চীফ তথা বোমাং রাজা অং শু প্রু চৌধুরী ৯৬ বছর বয়সে স্বীকার করেছেন তারা আদিবাসী নন বরং প্রায় ৩শ’ বছর ধরে এদেশে বসবাস করে আসছেন।

জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট ফোরামসমূহে আদিবাসী (ইনডিজেনাস) ও উপজাতি (ট্রাইবাল) জনগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইনডিজেনাস পিপলস হচ্ছে তারাই যারা যুগ যুগ ধরে বর্তমান আবাসভূমিতে বাস করে আসছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ার এবোরিজিন্স। এ বিবেচনায় জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের পক্ষে এদেশে উপজাতি গোষ্ঠীকে ইনডিজেনাস বা আদিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত না করে ট্রাইবাল বা এথনিক মাইনরিটি গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। জাতিসংঘ ফোরামে ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশও তাদের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের কখনও ইনডিজেনাস হিসেবে আখ্যায়িত করে না।

বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম-সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে অনেকেই খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি ক্ষুদ্র উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বসবাস। এরমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে ১২টি উপজাতীয় সম্প্রদায়। এগুলো হচ্ছেÑ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, পাংখোয়া, চাক, খুমী, খিয়াং, লুসাই, তংচংগা, বম এবং রিয়াং; সিলেট অঞ্চলে রয়েছে মনিপুরী, খাসিয়া, ত্রিপুরা, পাত্র, হাজং; ময়মনসিংহ অঞ্চলে রয়েছে গারো, কুকি ও রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে রয়েছে সাঁওতালসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হলে আন্তর্জাতিক সমাজের সমর্থন নিয়ে সরকারের ওপর ক্রমাগত অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে এর অবস্থান ঘোষণা করেছে; যা ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস হিসেবে ঘোষিত। উপজাতীয়রা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের সমর্থনপুষ্ট বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন নিয়ে এরা কাক্সিক্ষত পথে এগিয়ে যাবে। পাশাপাশি পার্বত্য জেলাগুলো থেকে বাঙালীদের উচ্ছেদ এবং পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করবে। এরা পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নতাবাদের আন্দোলনে যে তৎপর হবে না তা কি নিশ্চিত বলা যায়?

সরকারী মতে, দেশের অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায়ের বিশাল জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে খ্রীস্টান হয়ে গেছে। চাকমাদের মধ্যে খ্রীস্টানদের সংখ্যা কম হলেও মারমাদের অনেকেই এবং গারো, কুকি, লুসাই, পাংখো, মনিপুরী ও সাঁওতালদের বড় একটি অংশ খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন ভারতীয় অংশের অবস্থাও অনুরূপ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তথা মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী উপজাতিরা খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষা নেয়ায় ইতোমধ্যে তারা তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

গোয়েন্দা সূত্রে এমন তথ্যও রয়েছে, যেহেতু ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং মিয়ানমারের একাংশ নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্যাঞ্চল ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেহেতু বিদেশী নানা চক্র পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীদের আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে ওই অঞ্চলকে ‘খ্রীস্টান রাষ্ট্র’ গঠনে তৎপর রয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ান এবোরিজিন, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, রাশিয়ার মেনেড, ফ্রান্স ও স্পেনের বাসকু, আরবের বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী প্রাচীনকাল থেকে আদিবাসী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক অতি সাম্প্রতিক সময়ে চালু হয়েছে। ভারতে এ জাতীয় নৃগোষ্ঠী ও উপজাতীদের তফসিলী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী বলে স্বীকৃতি রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানে তাদের সকল জাতিসত্তাকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৫৭ (নং-১০৭) সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭ দেশ এটি রেটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও রেটিফাই করেছিল। পরে কনভেনশন ১৬৯ পাস হওয়ার পর পূর্বোক্ত কনভেনশন ১০৭ তামাদি হয়ে যায়। বাংলাদেশ কনভেনশন ১৬৯ রেটিফাই করেনি। তাই এটি এদেশের জন্য পালনীয় নয়। লক্ষণীয় যে, এরই মধ্যে আটটি দেশ এ কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে, ইনডিজেনাস এ্যান্ড ট্রাইবাল পপুলেশনস কনভেনশন-১৯৮৯ (নং-১৬৯) পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২টি দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেছে। এ উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোন দেশ এ কনভেনশন রেটিফাই করেনি।

অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয় তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩ দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪ দেশ বিপক্ষে, ১১ দেশ বিরত এবং ৩৪ দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোটদানে বিরতদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র।

বাঙালী ও বাংলা ভাষীরাই এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাংলাদেশের এ অঞ্চলে বাঙালীরা বসবাস করে আসছে ৪ হাজার বছরেরও আগে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি-বটেশ্বর, সোনারগাঁ কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্ত্বিক প্রমাণাদি বিষয়টি নিশ্চিত করে। নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে, বাংলাদেশে বসবাসরত কোন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বিশ্বের তাবত শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকান। ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মারমারাও এসেছে মিয়ানমার (সাবেক বার্মা) থেকে। সে অর্থে তারা কেউ আদিবাসী নয়, বরং অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসী হয়ে আনুমানিক সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর থেকে এ ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। তাই কোনক্রমেই এসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি সদস্যরা আদিবাসী হতে পারে না। এর যথাযথ প্রমাণ রয়েছে প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ রবার্ট হেনরি ¯িœড হাচিনসনের বই ‘এ্যান্ড এ্যাকাউন্ট অব চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস (১৯০৬), ক্যাপ্টেন থমাস হার্বাট লেউইন (১৮৬৯) লেখা বই দি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস এ্যান্ড ডুয়েলার্স দেয়ার ইন (১৮৬৯), অমরেন্দ্র লাল খিসা প্রমুখের লেখা গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে এর প্রমাণ মেলে যে, বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকিজাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই বহু পরে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী। কুকিদের পাশাপাশি অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্রো, খিয়াং, পাংখো জনগোষ্ঠীর সদস্য উল্লেখযোগ্য। এরা সর্বোচ্চ ৫শ’ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাস শুরু করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ইতিহাস হচ্ছে এরা সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরনো আবাসস্থল থেকে এ অঞ্চলে পালিয়ে এসেছে। এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে। বিশিষ্ট চাকমা পণ্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিন অব চাকমা পিপলস অব হিল ট্র্যাক্টস চিটাগং’ বইতে লিখেছেন, চাকমারা এসেছে তৎকালীন বার্মার মংখেমারের আখড়া থেকে। পরবর্তীকালে আরাকান এবং মগদের দ্বারা তাড়িত হয়ে তারা বান্দরবানে প্রবেশ করে। আরও পরবর্তী সময়ে উত্তরদিকে রাঙ্গামাটিসহ সন্নিহিত এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকদের মতে, এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যা না দেয়ার যুক্তিতে রয়েছে, ইস্ট তিমুর, সাউথ সুদান, কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপিন্সের মিননাউসহ পৃথিবীর আরও কয়েকটি স্থানের বিরাজমান পরিস্থিতি। তাদের মতে, ইউনাইটেড নেশন ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র ২০০৭ অনুযায়ী তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি প্রদান করলে সে অনুযায়ী ওই জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়ে যায়। বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজন যুক্তিগ্রাহ্য হবে। অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতি বা অনুরোধ জ্ঞাপন না করে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে তাদের মতবাদও এক নয়। সবচেয়ে বড় উপজাতি চাকমারা পৃথক পৃথক জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মতবাদে বিশ্বাসী।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের সকল অঞ্চলের আদিবাসী বাঙালী। এদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও রয়েছেন। গত কয়েক বছর ধরে এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী বলে দাবিদাররা হঠাৎ করে আদিবাসী স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টার নেপথ্যে রয়েছে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার মূল কৌশল। এ কৌশলের ফাঁদে পা দেয়া ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক। আদিবাসী স্বীকৃতির বিপরীতে রয়েছে এদেশের ভৌগোলিক অখ-তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি ব্যাপকভাবে জড়িত। যেহেতু বাঙালীরাই এদেশের মূল আদিবাসী এবং উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা মূলত অভিবাসী। সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী পার্বত্য উপজাতীয় অধিবাসীরা আদিবাসী নয় এবং তাদের আদিবাসীর স্বীকৃতি আদায়ের অপচেষ্টা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অখ-তাকে বিপজ্জনক করার একটি অপকৌশল মাত্র।

সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ

আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

মেহেদী হাসান পলাশ 

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। অন্যসব বছরের মতো এ বছরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী সাড়ম্বরে দিনটি উৎযাপনের আয়োজন করেছে। এ বছর জাতিসংঘ দিনটির প্রতিপাদ্য ঠিক করেছে, Post : 2015 Agenda: Ensuring indigenous peoples’ health and well-being”. বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে সামনে রেখে আবার নতুন করে আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কটি।

বাংলাদেশে আদিবাসী কারা- এই বিতর্কটি খুব প্রাচীন নয়, বড়ো জোর দেড় দশকের। ইস্যুটি পুরনো না হলেও তা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে নাড়া দিয়েছে। জাতীয় সংহতির প্রশ্নে তাই এ বিতর্কের আশু সমাধান জরুরি। ইতোপূর্বে দৈনিক ইনকিলাবে একই বিষয়ে বর্তমান লেখকের তিনটি উপ-সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলো হচ্ছে, বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক, প্রকাশ, ২ আগস্ট ২০১৩; আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ, প্রকাশ ৩০ আগস্ট ২০১৩ এবং বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা, প্রকাশ, ১৫ আগস্ট ২০১৪। পঠনের পরম্পর্য রক্ষায় পাঠকগণ ইচ্ছে করলে উপরের হাইপার লিংক থেকে লেখাগুলো পড়ে নিতে পারবেন। বর্তমান লেখায় বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সলুক সন্ধান ও তাদের আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে প্রতিবন্ধকতা কোথায় তা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. . অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মোট ৪৫টি (কারো কারো মতে ৭৫) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে এরা উপজাতি ও তফশিলী সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। তবে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু মতলবাজগোষ্ঠী এ সম্প্রদায়গুলো আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আদিবাসী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করা শুরু করেছে।  জাতি ও উপজাতি সংজ্ঞা এসব জনগোষ্ঠীর অনেকগুলোর জন্যই প্রযোজ্য নয়। তাই তাদের তফশিলী সম্প্রদায় বলা হয়। ভারতবর্ষেও সহস্রাধিক সম্প্রদায় ‘তফশিলী’ হিসেবেই রাষ্ট্রকাঠামোতে স্বীকৃত রয়েছে। বাংলাদেশের সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল, গারো, হাজং, কোচ, মনিপুরী, খাসিয়া, রাখাইন প্রধান। এখানে এসব জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।(পূর্বের ‘বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক’ শিরোনামের লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাসিন্দাদের আদি নিবাস ও বাংলাদেশে আগমন নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। ইচ্ছে করলে পাঠকগণ উপরের হাইপার লিংকে ক্লিক করে সেসব তথ্য দেখে নিতে পারেন।)

ইতিহাসের এই বিশ্লেষণে সকল তথ্যের জন্য মাত্র তিনটি পুস্তককে রেফরেন্স ও তথ্যাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর একটি হলো বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত `বাংলাপিডিয়া’, একই প্রতিষ্ঠানের `বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা’ এবং বাংলাদেশ আদিবাসী অধিকার আন্দোলন কর্তৃক প্রণীত `বাংলাদেশের আদিবাসী : এথনোগ্রাফীয় গবেষণা’। এই পুস্তক তিনটি নির্বাচনের প্রধান কারণ বাংলাদেশে আদিবাসী অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়ে অধিক সোচ্চার ব্যক্তিগণ এই বই তিনটির রচনা ও সম্পাদনার সাথে তারা জড়িত।

সাঁওতাল

ভারতবর্ষের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাঁওতাল অন্যতম হলেও বাংলাদেশের তাদের আগমন মাত্র ব্রিটিশ আমলে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ব্রিটিশ সরকার রেল লাইন নির্মাণ কাজের জন্য ভারতের সাঁওতাল পরগণা থেকে সাঁওতালদের বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালায় বাংলাদেশে সাঁওতালদের আগমন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবাস করছিলেন। ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার তাদেরকে নির্বিঘ্নে বসবাসের জন্য একটি স্থায়ী এলাকা নির্ধারণ করে দেয়। এ এলাকা সাঁওতাল পরগণা নামে খ্যাত হয়। সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের অনেকে সাঁওতাল পরগণায় থাকা নিরাপদ মনে না করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। ড. পিয়ের বোসাইনেট উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সাঁওতালদের অধিকাংশই সাঁওতাল পরগণা থেকে এখানে আগমন করেছেন।

গারো

নৃতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদদের মতে, গারোরা মঙ্গোলয়েড মহাজাতির টিবেটো-বার্মান দলের টিবেটো-চাইনিজ পরিবারের সদস্য। গারোদের ঐতিহ্যবাহী গানের মধ্যে তাদের এদেশে আগমনের সময়কাল সম্পর্কে বলা হয়েছে \’Do reng noktopgita, kilding jakbogita\’ অর্থাৎ ‘সে সময় চিলগুলো ছিল একটি ছোট্ট কুটিরের মতো, আর মাকড়সার জালের সুতা ছিল এক হাতের মতো বড়।’ গারোদের পূর্ব পুরুষদের ধারণা মতে, তাদের পূর্ব-পুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল তিব্বত যা \’Torua\’ নামে পরিচিত ছিল। তিনটি পথ দিয়ে তিন দলে বিভক্ত হয়ে গারোদের পূর্ব-পুরুষরা এ উপমহাদেশে আসে। এর একটি দল দক্ষিণ দিকে সুরমা ও বরাক নদী হয়ে কাছাড় ও সিলেটে প্রবেশ করে। এই দলই পরবর্তীতে ‘বঙ্গে’ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হাজং

নৃবিজ্ঞানী মি. জে কে বোসের মতে, হাজং গরোদেরই একটি দল। বিভিন্ন লেখকের মতে, হাজংরা আসামের কামরূপ জেলার হাজো অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে এদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছে। প্রবীণ হাজংদের মতে, তাদের আদিনিবাস বিহারের অদূরে অবন্তিনগর (মালব) নামক স্থানে এবং নিজেদেরকে তারা সূর্যবংশীয় ক্ষত্রিয় বলে দাবি করে। হাজংরা সুদূর চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব), অবন্তিনগর থেকে প্রাগজ্যোতিষপুর (গৌহাটি) হাজোনগর এবং হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ইবাড়ি, বারহাজারী থেকে বাংলাদেশে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করে।

কোচ

কোচেরা নিজেদের কুচবিহারের নৃপতি নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের মতে, তাদের আদিনিবাস ছিল রাসান মৃকপ্রাক টারি (যে পাহাড়ে সূর্য প্রথম উদয় হয়) অথবা উদয়গিরি নামক স্থানে। সে আদিনিবাস ত্যাগ করে তারা প্রথমে কামরূপ অঞ্চলে বসতি গড়ে। কামরূপের পরে তারা হাজো অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। সেখান থেকে নানা পথ ঘুরে মেঘালয়ের পশ্চিম সমভূমি এলাকায় রাজ্য গড়ে তোলে যা কুচবিহার নামে পরিচিতি লাভ করে। এ কুচবিহার থেকেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে কোচেরা নানাদিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানের বাংলাদেশেও সেরকম কয়েকটি দল প্রবেশ করে, যাদের উত্তর পুরুষরাই বর্তমানে একাধিক গোষ্ঠীর নামকরণপূর্বক এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছে।

রাখাইন

নৃতাত্ত্বিক বিচারে এরা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক। রাখাইনদের আদিনিবাস ছিল আরাকান (বর্তমান মায়ানমারের অন্তর্ভুক্ত)। রাখাইনরা তাদের নিজ দেশকে ‘রক্ষইঙ্গি’ এবং নিজেদের ‘রাখাইন’ নামে পরিচয় দিত। রাখাইনদের অংশবিশেষ পনেরো শতক থেকে কক্সবাজারের রামু ও সংলগ্ন এলাকায় বসতি শুরু করলেও আঠারো শতকে আরকানের রাজনৈতিক দুর্যোগ তাদের অনেককেই স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ফলে তারা ক্রমান্বয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এবং বরগুনা ও পটুয়াখালীতে এসে বসবাস করতে থাকেন।

মণিপুরী

মণিপুরীরা উৎপত্তির ঊষালগ্নে ভারতের বৃহত্তর আসাম রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত বরাক নদীর অববাহিকায় পাতকায় উপত্যকাই অবস্থিত পার্বত্য রাজ্য, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ একদা স্বাধীন মণিপুর রাজ্যের অধিবাসী। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মণিপুরে প্রবেশ করে মণিপুরীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ইংরেজগণ মণিপুরীদের পরাস্ত করে মণিপুরের রাজা বীরবিক্রম টিকেন্দ্রজিৎ সিংহকে পরাস্ত ও বন্দি করে। পরবর্তীকালে ১৯৪৯ সালে মণিপুরকে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের করদরাজ্য বিবেচনায় ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত করে। প্রাণরক্ষার তাগিদে বহু দিশেহারা মণিপুরী [১৭৫৮, ১৭৬৫, ১৮৯১ খ্রি.] নানা দলে বিভক্ত হয়ে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সন্ধানে মণিপুর রাজ্য ছেড়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েন। তখন অনেক মণিপুরী লোক বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করে।

খাসিয়া

খাসিয়া বা খাসিমঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি। এদেশীয় খাসিয়ারা প্রায় ৫শ’ বছর পূর্বে আসাম থেকে এখানে এসে বসতি গড়েছে। তারা আসামে এসেছিল সম্ভবত তিব্বত থেকে। তাদের প্রধান আবাসস্থল উত্তরপূর্ব ভারত।

উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায়, ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠীই বহিরাগত। এটা আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মী ও গবেষকগণ স্বীকার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন। তবে এ কথা ভুললে চলবে না বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়ের অধিকাংশই এই ‘আদিবাসী’ দাবির সাথে সম্পৃক্ত নয়। দেশি-বিদেশি চিহ্নিত একটি মহলের ইন্ধন ও পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্চলিক ও সম্প্রদায়গত কিছু সংগঠন এবং এনজিওর সাথে জড়িত ব্যক্তিরা এই দাবির সাথে জড়িত। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আদিবাসী কনসেপ্ট সমর্থন করে না। তারা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা  মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)। শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

Email:palash74@gmail.com

৯ আগস্ট ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

অমিত সম্ভাবনার পার্বত্য চট্টগ্রাম : শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

bri. gen. tofayel ahmed

ব্রি. জে. মো. তোফায়েল আহমেদ, পিএসসি

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সুপ্রাচীন কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার জীবনযাত্রা সমতল এলাকার তুলনায় কঠিন ছিল বিধায় অতীতে খুব বেশিসংখ্যক লোকজন এই এলাকায় বাস করতে উৎসাহী হয়নি। বর্তমানে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আছেন তারা ইদানীং নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করেন এবং এদেশের কিছু মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবিগণ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন না করে, জেনে অথবা না জেনে বিভিন্ন সময়ে এ শব্দের প্রতিধ্বনি করে যাচ্ছে। আদিবাসী হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ার এ্যাবোরেজিনিয়াস, নেটিভ আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ান, ফ্রান্স ও স্পেন এর বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, আরব বেদুইন সম্প্রদায় ইত্যাদি যারা সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে আদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের একদশমাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় (১৩,২৯৫ বর্গ কিঃমিঃ/৫,১৩৩ বর্গ মাইল) যে মাত্র এক শতাংশ জনসংখ্যা (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) বাস করছে তার ৪৭% বাঙালী, ২৬% চাকমা, ১২% মারমা এবং ১৫% অন্যান্য পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা সিনলুন, চিন, আরাকান, ত্রিপুরা, বার্মা এবং অন্যান্য এলাকা থেকে আনুমানিক মাত্র তিনশ থেকে পাঁচশ বছর পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আবাস স্থাপন করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রথম আসে কুকীরা। পরবর্তীতে ত্রিপুরাগণ এবং ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আসে আরাকানী গোত্রভুক্ত চাকমা ও মার্মা সম্প্রদায়। অথচ এদেশে বাঙালী বা তাদের পূর্বপুরুষগণ বসবাস করতে শুরু করেছে প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে। কাজেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হবার দাবীর প্রশ্নটি এখানে অবান্তর এবং আবাসপত্তনের সময় হিসেব করলে বাঙালীরাই বাংলাদেশের আদিবাসী । আর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অবাঙালীরা এদেশের সংবিধানের স্বীকৃতি অনুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

দেশ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিকা
কালের পরিক্রমায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা দুইবার বড় ধরনের ভুল করে। প্রথমবার ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় তারা ভারতের অংশ হবার চেষ্টা করে এবং চাকমা নেতা কামিনী মোহন দেওয়ান ও স্নেহকুমার চাকমা রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় এবং বোমাং রাজা বান্দরবনে বার্মার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে রাজাকার এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এর মধ্যে রাজা ত্রিদিব রায় যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে পাকিস্তানে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে কখনোই আর তিনি বাংলাদেশে ফেরৎ আসেননি। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন মং সার্কেলের রাজা মং প্রু সাইন। তিনিই একমাত্র রাজা যিনি মুক্তিযুদ্ধে আখাউড়া ও ভৈরব এলাকায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর কর্ণেল পদমর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। রাজা মং প্রু সাইন নিজস্ব ৩৩টি অস্ত্র, ৪টি গাড়ী এবং অনেক অর্থ মুক্তিযুদ্ধের জন্য ব্যয় করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা মং রাজার ৮টি হাতি, ৭টি ঘোড়া, ১৭০টি মহিষ, ১৬৬৩টি গরু, গুদাম ঘরে রক্ষিত ৯০,০০০ আড়ি ধান, ২৭০০টি চেয়ারসহ অনেক মূল্যবান ফার্নিচার, দশহাজার অতিথিকে আপ্যায়ন করার মত সরঞ্জামাদি, ১৮টি পাওয়ারটিলার, ১০টি জেনারেটর, রাজ পরিবারের শত বছরের স্মৃতি বিজড়িত অজস্ত্র স্বর্ণালংকার ও কয়েক কোটি টাকার ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে এতবড় ত্যাগ এবং অবদান রাখার পরও তাঁকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এখনও পর্যন্ত করা হয়নি। আশা করা যায়, মুক্তিযুদ্ধে তার এবং এই রাজপরিবারের অবদান যথাসময়ে মূল্যায়ন করা হবে।

কাপ্তাই ড্যাম ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল
১৯৬২ সালের কাপ্তাই ড্যাম অধ্যায় যে ন্যাক্কারজনকভাবে সমাধান করা হয়েছে তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সত্যিই বিরল। হাজার হাজার মানুষ (তার মধ্যে অনেক বাঙালীও ছিল) যারা তাদের বসতবাড়ি হারালো অথচ তাদের যথাযথভাবে ক্ষতিপুরণ প্রদান এবং পূর্নবাসন করলো না তদানিন্তন পাকিস্তানি সরকার। ১৯৭০ সালে থেগামুখ, শুভলং এবং রাইনখিয়াং থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য অনেক পরিবারকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক একইভাবে যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হয়েছিল। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই পাকিস্তান সরকারের পক্ষেই অস্ত্র ধরলো ঐ পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বেশীর ভাগ  এবং হত্যা করলো ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের এই ভূমিকার কথা এদেশের আপামর জনসাধারণের ক’জনই বা জানে? এখন দেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য রাজাকারদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই অপরাধে তারা অপরাধী কিনা সময়ই তা বলে দিবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কার্যক্রম
মুক্তিযুদ্ধের ধকল কাটতে না কাটতেই এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই বিলাইছড়ি থানার তক্তানালার কাছে মালু মিয়া পাহাড়ের নিকটে সকাল ১১টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ পেট্রোলের উপর আক্রমণ পরিচালনার মধ্য দিয়ে আরেকটি অসম যুদ্ধের সূচনা হয়। এর পরবর্তী ইতিহাস রক্তের হোলি খেলার ইতিহাস। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল অসংখ্য নিরীহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। বর্তমানে একই ধরনের কার্যক্রম ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং সংস্কারবাদী দলের সন্ত্রাসীরা সবাই মিলে করছে। তথ্য মতে, ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০৯৬ জনকে হত্যা, ১৮৮৭ জনকে আহত এবং ২১৮৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। নিরাপত্তা বাহিনীকেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৫৩ জন প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৫২ জন এবং ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৫ জন।

শান্তিচুক্তি ও পরবর্তী অধ্যায়
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তির মাধ্যমে হত্যা, লুণ্ঠন, জ্বালাও, পোড়াও, নারী নির্যাতনসহ অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্য়ক্রমের অবসান হবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনসাধারণ ধারণা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে কি দেখা যাচ্ছে? শুধু বাঙ্গালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও অত্যাচারিত, নিপীড়িত এবং ভয়ংকর জিঘাংসার শিকার। জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী নামে গড়ে উঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মানুষদের কাছ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে জোর জবরদস্তি করে চাঁদা আদায় করে, আদায়কৃত চাঁদার টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে এবং সেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আরো বেশি চাঁদা আদায় করে। এ যেন এক সীমাহীন চলমান গোলক ধাঁধার বৃত্ত। এখানকার বিত্তহীন নিরীহ মানুষদের হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ফসল ধ্বংস, বাগান ধ্বংস, জ্বালাও-পোড়াও, ভয়ভীতি এবং নির্যাতন এখনও চলছে। ইদানীং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সংগঠিত সকল বিষয়ে তারা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, আদেশ নির্দেশ ও মিমাংসা না মানার জন্য ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে যা সংবিধান বিরোধী এবং দেশদ্রোহীতার নামান্তর। তারা পার্বত্য জনপদে সরকার ও প্রশাসনের একটি বিকল্প সরকার ও ছায়া প্রশাসন জোর করে এখানকার মানুষদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর প্রশাসন কখনো কখনো নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্যাতন ও অত্যাচারের ভয়ে এই সব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এত অমিত সম্ভবনাময় এই অঞ্চল অথচ এখানে সকলে আসতে ভয় পায় কেন? কেন সকল উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের চাঁদা দিতে হয়? কেন কলা, কচু, মুরগি, ছাগল, শুকর, গরু বিক্রি থেকে শুরু করে ধানিজমি, বাগান সব কিছুর জন্য চাঁদা দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?

শান্তিচুক্তি বাস্ততবায়নের অগ্রগতি
একটি অর্ধেক পানি ভর্তি গ্লাসকে অর্ধেক পুর্ণ বা অর্ধেক খালি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। শান্তি চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার বেশীর ভাগ অংশ এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি করেছিলেন এবং অবশ্যই তিনি তা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। চুক্তি অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক ক্যাম্প ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে অথচ সন্ত্রাসীরা তাদের সকল অস্ত্র এখনও পর্যন্ত সমর্পন করেনি। কিন্তু পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সাধারণ জনগন দাবী করেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী এখান থেকে চলে গেলে তারা আরও বেশী নিরপত্তা ঝুকিতে আবর্তিত হবে। শান্তিচুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভুমি ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে ভুমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভুমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকী সকল সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। বিষয়টির ব্যপকতা এবং জটিলতার কারণেই একটু বেশী সময় লাগছে সমাধান করতে। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙ্গালী উভয় পক্ষ খাগড়াছড়িতে ৩১০৫টি, রাঙ্গামাটিতে ৯৬৯টি এবং বান্দরবনে ৩৮৪টিসহ সর্বমোট ৪৪০৮টি ভুমি সংক্রান্ত মামলা করেছে। অগ্রগতি হিসেবে ইতোমধ্যে কমবেশী ৪০০০টি মামলার ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে, ৩৩টি মামলার শুনানী শেষ হয়েছে এবং বাকী মামলাগুলোর ব্যাপারে কার্যক্রম চলছে। দেখা গেছে, এখানকার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ভুমি সমস্যা সমাধান কার্যক্রমে সর্বদা বাধা প্রদান করে থাকে, কারণ ভূমি সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তাদের হাতে কোন ইস্যু থাকবেনা যা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ট্রাম কার্ড। একইভাবে যে সকল বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ অবৈধভাবে প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশী জমি দখল করে আছেন তারাও চান না ভূমি সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক। এছাড়া আর একটি জটিলতা হলো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিবর্গের ভূমির মালিকানার যথাযথ কাগজপত্র না থাকা। কারণ অতীতে তারা কোন প্রকার কাগজপত্র ব্যতিরেকেই জমি ভোগদখল করতো। এছাড়া শান্তিচুক্তির কিছু ধারা আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সেগুলোর সমাধানের বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে পৃথিবীর অনেক দেশে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হবার পরও তা নানান কারণে কার্যকর করা যায়নি বা সম্ভব হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ সুদান (১৯৭২), সোমালিয়া (১৯৯০), এঙ্গোলা (১৯৯১ ও ১৯৯৪), রুয়ান্ডা (১৯৯৩), নর্দান আয়ারল্যান্ড ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কাজেই শান্তি চুক্তির অনিষ্পন্ন বিষয়াবলির সামধানের জন্য ধৈর্য্যচ্যুতি কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও মানবতার কল্যাণে নিরাপত্তাবাহিনীর ভূমিকা  অনেকেই অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম সম্বন্ধে তেমনটা ওয়াকিবহাল নন। সন্ত্রাস দমন ও দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা নিশ্চিত করার সাথে সাথে নিরাপত্তা বাহিনী এই অশান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জনগনের জন্য আবাসন স্থাপনে সহযোগীতা, স্থানীয় জনগনকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান এবং প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরাসরি ভুমিকা রাখা; শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কুটির শিল্প স্থাপন; নিরাপদ হাইজিন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা; কৃষি, পশুপালন, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগী পালন, বৃক্ষ রোপন; ধর্মীয় ও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন, চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে নিরাপত্তাবাহিনীর সাফল্যের কথা কোন এক অজানা কারণে এদেশের মানুষ জানতে পারে না বা জানানো হয় না। আমাদের মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে তেমন কার্যকরী ভূমিকা নেয় না বলেই অভিযোগ রয়েছে। একটি বিষয় এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, পক্ষপাতহীন কার্যক্রমের জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসী ব্যক্তিবর্গ ছাড়া বাকী সকলের কাছে এখনও নিরাপত্তাবাহিনীই সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য।

সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের স্বপ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের অঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাওয়া এবং স্বপ্নগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরী। অবস্থাদৃষ্টে তাদের চাহিদাগুলো নিম্নরূপ বলে প্রতীয়মান হয়:

শিক্ষার উন্নয়নে বাধা প্রদান

তাদের প্রথম স্বপ্ন সম্ভবতঃ এই এলাকার পশ্চাৎপদ মানুষদের মূর্খ করে রাখা। রাঙ্গামটিতে মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বাধা প্রদান তার প্রমাণ। না হলে এখানকার নিরীহ জনগণ, যারা তাদের ভয়ে নিয়মিত চাঁদা দেয়, তাদের ছেলেমেয়রা স্কুল/কলেজে যেতে পারে না; অথচ তাদের দেয়া চাঁদার টাকায় সেই সব নেতানেত্রীদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করে শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজে এবং বিদেশে। সেসব নেতানেত্রীদের সন্তানেরা ইংরেজী মাধ্যমে লেখাপড়া করলেও তারা চান সাধারণ জনগণের সন্ত্রানেরা শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষা শিখে এবং বাংলা ও ইংরেজী না শিখে জংগলের আরও গভীরে চলে যাক। এখানে মায়ের ভাষা ভুলে যাবার কথা বলা হচ্ছে না, প্রগতি ও অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছে। ভারতে সবাইকে কমপক্ষে ৩টি ভাষা শিখতে হয়। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ইচ্ছা, এখানকার জনগণ মূর্খ থাকলে তাদের পক্ষে শোষণ করা সহজ; যেমনটি তারা এতকাল ধরে করে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার এই এলাকার শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছে। ১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ৬টি উচ্চ বিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রতি পাড়ায় পাড়ায়। এছাড়া ইতোমধ্যে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় (ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়েছে), একটি মেডিক্যাল কলেজ, ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাষ্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। অবশ্য এই তথ্যে সন্তুষ্ট হবার কিছু নেই। এখানে বসবাসরত মানুষদের জন্য আরও অনেক কিছু করার দরকার ছিল এবং আরও অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। অনেক কিছুই করা সম্ভব হয়নি এখানকার তথাকথিত সেইসব কল্যাণকামী (?) নেতানেত্রী এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বাঁধার কারণে।

জনগণের থেকে জোর করে আদায় করা চাঁদার টাকায় আরাম আয়েশে দিনযাপন করা

এটি তাদের দ্বিতীয় স্বপ্ন এবং বর্তমানে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জানা গেছে, যে শুধুমাত্র মাটিরাঙ্গা থেকে বছরে ৩২ কোটি টাকার মত এবং সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বছরে কমবেশী ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। কোথায় ব্যয় হয় সেই টাকা? কয়টা স্কুল, কয়টা কলেজ, কয়টা হাসপাতাল তৈরি করে দিয়েছে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংষ্কারবাদীরা? কত ফিট রাস্তা তারা এ পর্যন্ত নির্মাণ করে দিয়েছে? কি করেছে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা জবরদস্তী করে লুট করে নিয়ে? এখন সময় এসেছে এখানকার সন্ত্রাসী নেতাদের সম্পত্তির হিসাব নেয়ার কারণ জানা গেছে যে, নেতাদের অনেকেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, করেছেন বাড়ী/গাড়ী, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি। পাহাড়ে বসবারত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা সরকারকে কর প্রদান করে না। পক্ষান্তরে করের থেকে কয়েকগুণ বেশী চাঁদা দিতে বাধ্য হয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের। এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ সরকার সমতল ভূমির জনগণের কর থেকে অর্জিত অর্থ পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যয় করছে । পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিঃমিঃ রাস্তা ছিল। বাংলাদেশ সরকার নির্মাণ করেছে প্রায় ১,৫০০ কিঃমিঃ রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্টসহ সম্পন্ন করেছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম। কিন্তু রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণে এবং সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা সবসময়ে বাঁধা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজী এবং শ্রমিক অপহরণ ও বাঁধার সৃষ্টি না করলে উন্নয়ন কাজ আরও সহজে সম্পন্ন করা যেত। জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল নির্মাণ কাজে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী সন্ত্রাসীদের যথাক্রমে ১০%, ৫% ও ৩% অথবা আরোও বেশী হারে চাঁদা দিতে হয়। এখানে কোন বিত্তশালী কিংবা দেশী বিদেশী কোম্পানী পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান না কেন ? লক্ষীছড়ি থেকে বার্মাছড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ বন্ধ করে ঠিকাদার কেন পালিয়ে গেলেন? এই অত্যাচার থেকে এখানে বসবাসরত নিরীহ মানুষদের কবে মুক্তি মিলবে ?

স্বায়ত্বশাসন তথা পৃথক জম্মুল্যান্ড গঠন  

পার্বত্য সন্ত্রাসীদের তৃতীয় দিবা কিংবা অলীক স্বপ্ন হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্বশাসিত প্রকারান্তরে স্বাধীন একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা যার নাম হবে ‘জম্মুল্যান্ড’। বর্তমান বিশ্বে দুই জার্মানী এক হলো, দুই কোরিয়া এক হতে চেষ্টা করেছে, ইন্ডিয়া সিকিমকে যুক্ত করে আরও বড় হয়েছে, সমগ্র ইউরোপ অভিন্ন মুদ্রা ব্যবহার করছে এবং পাসপোর্টবিহীনভাবে ইউরোপের সব দেশে চলাচল করছে, হংকং চীনের সাথে অঙ্গীভুত হয়েছে, স্কটল্যান্ডের জনগন পৃথক দেশ গঠনের বিরুদ্ধে গণভোট প্রয়োগ করেছে; অর্থাৎ সবাই যখন যুক্তভাবে শক্তিশালী হতে চেষ্টা করেছে তখন পার্বত্য সন্ত্রাসীরা চেষ্টা করছে এদেশ ভেঙ্গে ছোট করতে; প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে টুকরো টুকরো করতে। তাদের স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধীন ভূ-খন্ডের এই অলীক ও অবাস্তব স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না, হতে পারে না। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে প্রায় সব দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। কিন্তু লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভূখণ্ডে নতুন করে আরেকটি দেশ তৈরী করা কখনোই সম্ভব হবে না। এখানে আরোও দুটি বিষয়ে আলোকপাত করা দরকারঃ

বর্তমান চাহিদামত নতুন ভূখণ্ড তথা ‘জম্মুল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের আরও এক বা একাধিকবার যুদ্ধ করতে হবে স্বতন্ত্র চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা ল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কারণ সবাই জানে যে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাদের মধ্যে শিক্ষা, সুযোগ সুবিধা, জীবনযাত্রার মানের বিভিন্ন সূচকে রয়েছে বিশাল বৈষম্য। অপর বিষয়টি হলো: ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, এক সাগর রক্তের দামে কেনা এদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথা রাজাকারদের কোন প্রচেষ্টা, এদেশের ১৬ কোটি মানুষ এবং এদেশের চৌকষ নিরাপত্তা বাহিনী সফল হতে দেবে কিনা তা বিবেচনার ভার পাঠকদের উপর থাকলো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে বিতাড়িত করা

এখানকার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আরেকটি স্বপ্ন এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অর্থাৎ বাঙালী সম্প্রদায়কে এখান থেকে বিতাড়িত করা। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকাকে বলা হয় ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীদের দেশ। আমেরিকাতে নেটিভদের বাদ দিলে শতকরা ৯৯% জনেরও বেশী মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে গিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা ও ইউরোপে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠি একত্রে বসবাস করছে। এখানকার অনেক নেতা নেত্রীদের সন্তান ও আত্বীয়/স্বজনেরা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেন এর স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন কিংবা নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা বাংলাদেশের যে কোন স্থানে বসতি স্থাপন করতে পারে এবং করছে। কিন্তু সমতলের বাংলাদেশীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করাতেই তাদের যত আপত্তি। তাদের এক অদ্ভুত দাবী। এখানে যার জন্ম হয়েছে, এই মাটির ধূলা মাখিয়ে যে বড় হয়েছে, এখানের বাতাসে যে নিশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করে বেঁচে আছে, তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। কি অদ্ভুত এবং অবাস্তব আবদার। শান্তিচুক্তিতেও কিন্তু একথা লেখা নেই যে এখানে বসবাসরত বাঙালীদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দাবী মোটেই বাস্তব সম্মত নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাসবাসরত জনসাধারনের করণীয় কি

একটু আগেই বলা হয়েছে যে এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর জীঘাংসার শিকার। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সাধারণ মানুষদের ইচ্ছা অনিচ্ছায় কিছু যায় আসে না। তাদের পালন করতে হয় এখানকার নেতৃত্ব ও সন্ত্রাসীদের নির্দেশ। এই প্রসঙ্গে নিম্নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে যেমন:

নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে

পৃথিবীর এমন কোন শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী নেই যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই এখানকার জনসাধারণের নিরাপত্তা নিজেদেরকে সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নিজ নিজ এলাকায়, প্রতিটি বাজারে এবং পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যথার্থ তথ্য দিলে যে সব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও দুস্কৃতিকারীরা এলাকায় শান্তি বিনষ্ট করছে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে।

চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে

যেকোন ভাবে সকলকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে এখানকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, আন্তঃজেলা বাসমালিক ও ব্যবসায়ীদেরকে সন্ত্রাসীদের চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। তাহলেই তারা অস্ত্র কেনা এবং অন্যান্য দলীয় কার্যক্রম সম্পাদনে অর্থ যোগানের জটিলতায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পরবে। তাই নিজ নিজ পাড়া ও বাজার এলাকাকে চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাস মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজদের পাকড়াও করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিত ভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের প্রতিরোধ করা সম্ভব।

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সচেষ্ট হতে হবে

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় এবং আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা শুধু “পাশের হার” এবং “জিপিএ”র হলে চলবে না। সত্যিকার অর্থে আত্মকর্মসংস্থান সম্ভব হবে এমন শিক্ষাগ্রহণ করতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ও উৎসাহিত করতে হবে। আর এজন্য যা দরকার তা হচ্ছে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। কৃষি, বৃক্ষরোপণ, পশুপালন, মাছ চাষ, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে সকলকে স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করতে হবে এবং জীবনযাত্রার মান এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম যে অবস্থায় আছে তার চেয়ে পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকতে পারে এই চেষ্টা বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকর্তা তাকেই সহযোগিতা করেন যিনি নিজেকে সাহায্য করতে সচেষ্ট থাকেন।

শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে                                                                 

সকলকে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বাঙালী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সকল ধর্মালম্বী ও সকল জাতি গোষ্ঠীদের পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতে হবে। কেউ যেন কখনই অন্য কারো কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদিতে আঘাত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার
স্বাধীনতার পর ৪২ বছরে বাংলাদেশের অর্জন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে সময় নষ্ট করা কারও কাম্য হতে পারে না। অতীতের হানাহানী ও বিবাদভূলে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হতে হবে। এখানকার ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর অধিকার, তাদের উত্তরাধিকারীদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নতির অধিকার সুষমভাবে নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। একই সাথে এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীরাও নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার। এই সমস্যার সমাধান তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মধ্যে নয় বরং উভয় পক্ষের স্বার্থ ও সম্প্রীতি রক্ষা করার মাধ্যমেই সম্ভব। এদেশের জনগণ কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ নিজের পরিবারের জন্য ব্যয় করতে চায়। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পরে শান্তিতে জীবন যাপন করতে চায়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুশিক্ষা এবং উন্নত জীবন চায়। অসুস্থ্য হলে সুচিকিৎসা চায়। এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কিছু সন্ত্রাসী কর্তৃক সৃষ্ট অশান্তি ও অস্ত্রের ঝনঝনানী সমূলে উৎপাটন করে সকলে মিলে একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত জীবন যাপন করা এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্য বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়াই সকলের স্বপ্ন। এদেশের অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য এলাকায় সকলে মিলে শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারলে উন্নয়ন এবং উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত হতে বাধ্য।

 লেখক: কমান্ডার, ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়ন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

দিনে দিনে পার্বত্য উপজাতীয়রা এলিট বাঙালীরা নিঃস্ব শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে

উপজাতি বাঙালী

মো: সাইফুল ইসলাম:

 পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপজাতীয়দের সকল প্রকার লেনদেন আয়কর মুক্ত। পার্বত্য এলাকায় যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লক্ষ টাকার মধ্যে সেগুলোর ঠিকাদারী সম্পূর্ণরূপে উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০% উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। বাকি ৯০% ঠিকাদারির সিংহভাগ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উপজাতীয়রাই দখল করে নেয়। কারণ তাদের আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র ৫ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় সারা দেশবাসীর মতই শতকরা ১৬ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। সরকারিভাবে গৃহীত এ ধরনের ভ্রান্তনীতির কারণে পার্বত্যাঞ্চলের বাঙালিরা উপজাতীয়দের তুলনায় প্রতিনিয়তই পিছিয়ে পড়ছে।

দিনে দিনে উপজাতীয়রা এলিট শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে আর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে হতে বাঙালিরা আজ অবহেলিত এবং উপজাতীয়দের অনুগত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। সরকারিভাবে এ ধরনের জাতিগত বৈষম্য তৈরি কখনোই কাম্য হতে পাওে না। আর এমন বৈষম্য নীতি কোন অঞ্চলের শান্তির জন্যও সহায়ক নয়। তাই এসব বৈষম্যের অবসান করে পার্বত্যাঞ্চলে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করার সময় এখনই।

চুক্তি পূর্ব বিশৃঙ্খল অবস্থায় যেসব উপজাতীয় নাগরিক ভারতে আশ্রয় গ্রহণকরেছিল তাদেরকে ফিরিয়ে এনে ২০দফা প্যাকেজ সুযোগ সুবিধা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এভাবে ৬০ হাজারেরও বেশি উপজাতীয় জনগণ বর্তমানে পুনর্বাসিত হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে।
অন্যদিকে ১৯৮৬ সাল থেকে ২৮ হাজারের বেশি বাঙালি পরিবারকে অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে গুচ্ছ গ্রামে এনে কার্যত বন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে। গুচ্ছ গ্রামগুলোতে পরিবার প্রতি একটি মাত্র ঘর তোলার জায়গা আর মাসিক ৮৬ কেজি চাল অথবা গম তাদের একমাত্র অবলম্বন। ২৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এসব গুচ্ছ গ্রামের এক একটি পরিবার ভেঙ্গে বর্তমানে ২টি, ৩টি বা তার চেয়েও বেশি পরিবারে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বাড়েনি তাদের ঘর তোলার জায়গা, মাসিক রেশনের পরিমাণও বাড়ানো হয়নি। তাছাড়া গুচ্ছ গ্রামগুলোতে সেনিটেশন ব্যবস্থাও নেই। নেই ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজ। চাষাবাদের জমিও তাদের নেই। ফলে তারা একমাত্র মাসিক ৮৬ কেজি রেশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে কোনো রকমে জীবন ধারণ করছে। মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ছেলের বউ, মেয়ের জামাই, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলসহ একই ঘরে গাদাগাঁদি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে গুচ্ছ গ্রামবাসী বাঙালি পরিবারগুলো। অথচ তাদের কবুলিয়ত ভুক্ত জমি-জমাগুলো দুস্কৃতিকারী উপজাতীয়রা দখল করছে নানা কৌশলে। কখনও বাঙালিদের জমিতে রাতারাতি কেয়াং নির্মাণ করে আবার কখনও চাষ করে দখল করছে বাঙালিদের জমি। সব কিছু দেখেও আমাদের সরকার এবং প্রশাসন নির্বিকার। তাদের যেন কিছুই করার নেই।
বাঙালিরা গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ হয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করতে থাকবে এটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু এ অমানবিক অবস্থা দীর্ঘ দিন চলতে পারে না। আর চললেও সরকার এবং উপজাতি কারো জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না। তা ছাড়া রেশন বাবদ প্রতিমাসে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব বিবেচনা করে গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙালিদেরকে তাদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে পুনর্বাসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
পার্বত্য চুক্তির ভূমিকার সাথে এর ধারা উপধারা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক অবস্থার মধ্যে সাংঘর্ষিক আরও অনেক বিষয় রয়েছে। আর এসব কিছুর ফলেই পার্বত্য চুক্তিকে শুরু থেকে সচেতন দেশবাসী মেনে নিতে পারেনি। ভবিষ্যতেও মেনে নেয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে গত ১৭ বছরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সরকার চুক্তির বিতর্কিত ধারা উপধারাগুলি নতুনভাবে বিবেচনা করতে পারে। এতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় সারা দেশই উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ :

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিদেশী দাতা সংস্থা ইউএনডিপি’র কার্যক্রম মনিটরিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা, সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তন, বিদেশী অতিথি ও কূটনীতিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ ও আনসারে যোগ দেয়া শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলীর মতো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্র দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রস্ফুটিত হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬ থেকে তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের নিকট ১১ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ফ্যাক্স পাঠানোর পর এ তথ্য জানা যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি লেখকের সংগ্রহে রয়েছে। বিজিবি’র একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি পরবর্তী পার্বত্য চট্রগ্রামের পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, আনসার ভিডিপি’র মহাপরিচালক, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবির কর্মকর্তাগণ।

সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একাধিক সংগঠন বিভিন্নভাবে শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমসহ চাঁদাবাজি, অপহরণ ও বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ি জনপদ ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামের উন্নয়নের নামে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার জবাবদিহিতা নেই বলললেই চলে। পার্বত্য জনপদে ইউএনডিপিসহ অন্যান্য এনজিও যেসব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে সেসব প্রকল্পের মনিটর করা দরকার। এছাড়া, তিন পার্বত্য জেলায় যেসব সংগঠন শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত এবং চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের সাথে যুক্ত তাদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামে গত দশ বছরে ইউএনডিপির মাধ্যমে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে মনিটর করা প্রয়োজন৤ তিনি বলেন, বিদেশী নাগরিকদের পার্বত্যাঞ্চল ভ্রমণে  Code of Conduct  প্রণয়ন করা দরকার। অনেক সময় বিদেশী নাগরিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে শুধু জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারকে জানিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে যায়, এটি সঠিক  নয়। জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের কাছে এধরণের কোন আবেদন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলে মন্ত্রণালয়ই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এদিকে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষায়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৪টি অধ্যায়ে ৭২টি ধারা রয়েছে। অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্ত লারমা) স্বীকার করেন না। উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার কারণে গত ২২ বছরেও তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তিচুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত ৩৩টি বিষয় /বিভাগসমূহের মধ্যে ৩০ টি সংস্থা/বিষয় ইতোমধ্যে হস্তান্তরিত হয়েছে। অবশিষ্ট তিনটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় হস্তান্তর কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, জেএসএস এবং ইউপিডিএফসহ আরও যে সব স্থানীয় সংগঠন আছে তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গ্রুপগুলো সব সময়ই সক্রিয় রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানীতেও কোন কোন সংগঠন জড়িত রয়েছে মর্মে অভিযোগ আছে। বিজিবি কর্তৃক বিওপি স্থাপনের জন্য বন বিভাগ থেকে জায়গা চাওয়া হলে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় হতে সহযোগিতা করা হবে মর্মে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক বলেন, উন্নয়নের নামে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কোথায় খরচ করা হলো তার হিসাব নেওয়া দরকার। ইউএনডিপির কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া যেতে পারে। তিনি  বলেন, বিদেশী পর্যটকগণ স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে গিয়ে থাকেন। ফলে বিষয়টি প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর অগোচরেই থেকে যায়। সভায় ডিজিএফআই প্রতিনিধি বলেন, বিদেশী নাগরিক মন্ত্রণালয় বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেলে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত কারোর মেহমান হিসাবে সাধারণ যানবাহনে গমন করে থাকে। সিএইচটি কমিশন সহ কিছু সংস্থা স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ব্যতিরেকে বৈঠক ও আলাপ আলোচনা বেশি পছন্দ করে। পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীয়দেরকে আদিবাসী হিসাবে ঘোষণা করা তাদের মূল উদ্দেশ্য। অন্যান্য বিষয়ে অনৈক্য থাকলেও এই পয়েন্টে সকল স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠন একমত পোষণ করে। বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়:

বিগত ১০ বছরে পার্বত্য চট্রগ্রামে ইউএনডিপি কর্তৃক ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের  উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ফলাফল প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়; শান্তিচুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সংগঠন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র চোরাচালান রোধকল্পে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার এর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; কোন আইনগত ভিত্তি না থাকায় সিএইচটি কমিশনের নাম সংশোধন করে ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ রেখে অন্য কোন নাম রাখার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়; কূটনৈতিকগণ ছাড়া সাধারণ বিদেশী নাগরিকগণ পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করতে চাইলে অন্তত একমাস পূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করবেন; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমতি প্রদান করবে; অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী নাগরিকগণ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারের নিকট তাদের উপস্থিতি/ভ্রমণসূচি দাখিল সাপেক্ষে ভ্রমণ করবেন; কূটনৈতিকগণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি গ্রহণ করে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করবেন; কোন দেশী-বিদেশী ব্যক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাত কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবি এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে; পার্বত্য চট্রগ্রামের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সাথে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ দায়িত্ব পালন করবে; ভারত ও বাংলাদেশের সাথে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্রগ্রামের ৪৭৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে ইতোমধ্যে গৃহীত/বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাসহ আবশ্যকীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব বিজিবি প্রেরণ করবে; পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান চেকপোস্টগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশ ও আনসার বাহিনীতে কর্মরত শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলীর সুপারিশ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। নিকট অতীতে এতো সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত, লক্ষ্যানুসারী সিদ্ধান্ত দৃষ্টিগোচর হয়নি। সন্দেহ নেই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত দেশবাসী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পাহাড়ী সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক, দেশী বিদেশী দাতা সংস্থা, এনজিও ও কূটনীতিকরা চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়েছে। তাই তারা সরকারী এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে তাদের অনুজীবী দেশীয় রাজনীতিবিদ, এনজিওকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মাঠে নামিয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহকে অগণতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক, নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতা, শান্তি চুক্তি বিরোধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরো বলেন, বিদেশী নাগরিকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে  যেতে অনুমতি লাগবে আবার যে কেউ সেখানকার ‘আদিবাসীদের’ সাথে দেখা করতে চাইলে সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে সাথে রাখতে হবে এইরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্বুদ্ধিতা ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দেয়’।

বিশিষ্ট কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সিএইসটি কমিশনের নাম পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের এ অধিকার স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কে দিয়েছে? এতদিন পর নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ কেন তোলা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অধিকার আছে দেশের বাইরে থেকে আসুক বা দেশের ভিতর থেকে কেউ আসুক সে বিষয়ে নজরদারী রাখা। তার মানে তো এই নয় যে, একজন বাঙালী পাহাড়ী কাউকে বিয়ে করতে হলে, বিয়ের বরযাত্রী নিয়ে পাহাড়ে যেতে হলে প্রশাসনের অনুমতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লাগবে। পাহাড়ীদের কি কোন বিদেশী মেহমান থাকতে পারে না’? এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা জানি জেলে কারোর সাথে দেখা করতে হলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে করতে হয়। তাহলে আমার প্রশ্ন, পার্বত্য চট্রগ্রাম কি তাহলে কারাগার যে এখানে বাইরের কেউ যেতে হলে অনুমতি নিতে হবে’। পংকজ ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাঙালি যে একটি উপনিবেশবাদী জাতি তা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা বর্ণবাদী, ইহুদী, জার্মানির মতো। এর মধ্য দিয়ে জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ্যে রূপ লাভ করেছে। পাহাড়ে সেনা শাসনের বিষয়টি এর মধ্য দিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো। এটাকে বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িকতা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তনের অনুরোধের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই কমিশনের সদস্য ব্যরিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংবিধান পরিপন্থী। তাছাড়া কোন একটি সংগঠনের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আছে কি? অধ্যাপক মেসবাহ কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে নির্লজ্জ সিদ্ধান্ত ও পার্বত্য চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক’ বলে অভিহিত করেন।

 উল্লেখ্য যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা বিরূপ মনোভাব ও মন্তব্য করেছেন তাদের সম্পর্কে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এরা কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন এনজিও সাথে জড়িত বা তা থেকে লাভবান। আর ঐ সকল এনজিও উল্লিখিত দাতা দেশ ও উন্নয়ন সংস্থা থেকে আর্থিকভাবে অনুদানপ্রাপ্ত বা লাভবান। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিকূলে যেকোনো সিদ্ধান্ত ও ঘটনাবলীতে তারা সবসময় সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার নয় বরং এর পেছনে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত।

 পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা সাম্প্রদায়িকতার বীজবপন তা ড. ইফতেখারুজ্জামানের স্বার্থের চোখে ধরা না পড়লেও তাকে প্রথম আলোর সাবেক ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্রের আর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশে, মহাদেশ নির্বিশেষে বিয়ে হচ্ছে সর্বত্র। কেবল বাংলাদেশের পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাছেই এটা মহা অপরাধ। যেকোনো কোনো পাহাড়ী মেয়ে কোনো বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করলে পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে থাকে। এমনকি পাহাড়ী মেয়েরা বাঙালী ছেলেদের সাথে প্রেম, বন্ধুত্ব, চলাফেরা করলে পাহাড়ী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে চাপ দেয় ফিরে আসতে। কিন্তু ফিরে না এলে জাতি রক্ষায় নামে উল্লিখিত শাস্তি দেয়া হয়। এটাই তাদের অঘোষিত শাস্তি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য  সাংবাদিক সৈকত ভদ্র। তিনি ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন খাগড়াছড়ির মেয়ে সহযোদ্ধা রেটিনা চাকমাকে। বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করায় রেটিনা চাকমার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। একই কারণে প্রথম আলো থেকে চাকুরী হারাতে হয় তাকে। পাহাড়ীদের চাপে তাকে চাকরী থেকে বহিস্কারের জন্য প্রথমআলোর সম্পাদক বরারব সুপারিশ করেছিলেন ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সৈকত ভদ্র সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামের মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন” । তিনি স্ত্রী রেটিনা চাকমাকে নিলামের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতীয় বিবেক ও মানবিকতার কাছে আর্তনাদ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ গণমাধ্যমের বিবেক ও মানবিকতায় সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ নিষ্ফল করাঘাত করেছে। এমনকি পাহাড়ীদের ব্যাপারে অতি স্পর্শকাতর গণমাধ্যমেও সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।

শুধু এক রেটিনা চাকমা নয়, গুইমারা উমাচিং মারমা, মাটিরাঙার সোনাবি চাকমা, রাঙামাটি কুতুকছড়ির রীনা ত্রিপুরা, রামগড়ের মণিকা ত্রিপুরা, এরকম আরো অসংখ্য পাহাড়ী মেয়েকে বাঙালী বিয়ে করায় অপহরণ, গণধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন নারকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে। অবশ্য সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনিও খাগড়াছড়ির জামাই। স্ত্রী চাকমা সম্প্রদায়ের। তাকে বা তার স্ত্রীকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন তথ্য লেখকের জানা নেই। বরং ঢাকায় তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের কাছে সর্বোচ্চ জামাই আদরই পেয়ে থাকেন। কিন্তু খাগড়াছড়িতে শশুরবাড়ী যেতে হয় রাতের অন্ধকারে। ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রায়ই বলে থাকেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসরাইলী শাসন চলছে। পঙ্কজ বাবুর ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না। তবে তিনি যদি পরিস্কার করে বলেন, ইসরাইলের স্যাটেলার ইহুদি শাসনে নিপীড়িত স্থানীয় মুসলিমদের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কীভাবে মেলালেন। এখানে কারা স্যাটলার, কারা স্থানীয়? কারা শোষক, কারা শাসক?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় দাতা সংস্থাগুলো অনেকটা স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এনজিও পরিচালনা সংক্রান্ত কোনো সরকারি নির্দেশনা তারা মানে না। তাদের কাজের ও খরচের কোনো বিবরণ/হিসাবও সরকারকে দেয় না। এ ব্যাপারে একাধিকবার বলা হলেও তারা তা পালন করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী দাতা সংস্থা, মিশনারী ও এনজিও’র কর্মকাণ্ড সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। এসব এনজিও ও দাতা সংস্থার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে সহায়তা, উস্কানী, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি, ধর্মান্তরকরণসহ নানা অভিযোগ বহুদিনের। সরকারি একাধিক তদন্তে একথা প্রমাণিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইস্ট তিমুর ও সাউথ সুদানের মতো আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর পশ্চিমা নীলনকশাও সকলের জানা। গত ১৩ মার্চ বান্দরবানের আলীকদমে  ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট’ নামে এক খ্রিস্টান মিশনারী লোভ দেখিয়ে অনেকটা গোপনেই স্থানীয় ৩৩ জন মুরুংকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে। পুলিশ এ অভিযোগে মিশনারীটির ৫ জন সদস্যকে গ্রেফতারও করেছে। গতবছর একই এলাকার চাক সম্প্রদায় মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। কাজেই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বৈদেশিক সাহায্যের নামে টাকা এনে এসব এনজিও ও দাতা সংস্থা কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করছে তা জানা জরুরি ও বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার।

এদিকে ১৯৮৯ সালে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন পর নতুন সিএইচটি কমিশন গঠিত হয়েছে। এর নামের আগে এখন আর ইন্টারন্যাশনাল লেখা হয় না। নতুন সংস্থাটি কবে, কোথায় গঠিত ও নিবন্ধিত হয়েছে, কোন আইনে নিবন্ধিত হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার আদৌও কোনো অনুমতি আছে কিনা সেসব খতিয়ে দেখে এই কমিশনকে নিষিদ্ধ করার দাবি পার্বত্যবাসী, বিশেষ করে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের। এই কমিশনের বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগ করে থাকে বাঙালিরা। সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অভিযোগে পার্বত্য বাঙালিরা ইতোমধ্যে এই কমিশনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের সফরকালে প্রায় সবসময় একই অভিযোগে বাঙালিদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান কি করে ‘কমিশন’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তা খতিয়ে দেখে মন্ত্রণালয় কেবল ‘কমিশন’ নামটি বাদ দিয়ে নতুন করে নিবন্ধিত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত সফট ডিসিশন বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে পাশ্চাত্যের স্বতন্ত্র খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র ও তৎপরতার কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশী নাগরিক ও কূটনীতিকদের চলাচলের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এমনিতেই কূটনীতিকদের সকল ভ্রমণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কর্মরত পশ্চিমা কূটনীতিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আইন অমান্য করে থাকেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় এ ঘটনা অহরহই ঘটে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে পরিচয় গোপন করে বা পর্যটকের ছদ্মাবরণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা পরিচালনার কথাও নতুন নয়।  এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের স্পেশ্যাল র‌্যাপোটিয়ার্স Mr. Lars Anders Bear এর কথা স্মরণ করা যেতে পারে।  সুইডেন নাগরিক Mr. Lars Anders Bear বিভিন্ন দেশের আদিবাসী ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। তিনি UNFPII-এ স্পেশাল রেপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োজিত। UNFPII এর দশম অধিবেশনে Mr. Lars Anders Bear কর্তৃক উপস্থাপিত ‘Status of the  implementation of CHT Peace Accord of 1997′ যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি জাতিসংঘের পরিচয় গোপন করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন এবং তার সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত UNFPII এর স্বার্থে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করতেও কসুর করেননি তিনি। এ ধরনের তৎপরতা রোধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নজরদারী করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেখানে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত অপহরণ ও জিম্মি করে হত্যা ও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে সেখানে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতেও নজরদারী প্রয়োজন।

 তবে একথা সত্য যে, এ ধরনের নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনাকে নিরুৎসাহিত করবে এবং একই সাথে সেখানে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের কাজে বাধার সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে সচেতন মহলের অভিমত এই যে, বিশেষ অঞ্চল হিসাবে বিবেচিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশীদের চাকরি ও অবস্থান নিরুৎসাহিত করে বাংলাদেশীদের মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন অঞ্চলে বিদেশীদের ভ্রমণে এ নিদের্শাবলীর শৈথিল্য প্রদর্শন এবং পর্যটন অঞ্চলের বাইরে বিদেশীদের ভ্রমণের এ নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়িভাবে আরোপ করা যেতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, চায়নাসহ বিশ্বের দেশে দেশের ইনসার্জেন্ট অঞ্চগুলোতে এভাবেই বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অন্যতম হচ্ছে, শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্য যারা পুলিশ ও আনসারে যোগদান করেছে এবং তাদের মাধ্যমে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত তাদের পার্ব্ত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলী করতে হবে। এটি অত্যন্ত সঠিক ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

 অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অনেক সদস্য ছাত্রজীবন শেষে নিরাপত্তাবাহিনীর চাকুরীতে যোগদান করে। কিন্তু সার্ভিসে যোগদানের পরেও  অনেকেই তাদের গোপন সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এ বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত পাহাড়ীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে একটি মহল ইউএনডিপি’র ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশ্র পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির নামে উপজাতীয় পুলিশ ও আনসারদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন শুরু করে। এই সুযোগে শান্তিবাহিনীর যেসকল সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে পুলিশ ও আনসারে চাকরী নিয়েছিল তারাও পদায়ন হয়। কিন্তু সার্ভিসে থাকলেও তারা সার্ভিসের গোপন খবর বিশেষ করে অপারেশনাল নানা তথ্যাদি উপজাতীয় সংগঠন ও সন্ত্রাসীদের কাছে পাচার করতো। এ বিষয়ে পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে রিপোর্ট করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাঙালীদের কাছে মদ একটি নিষিদ্ধ পানীয় হলেও পাহাড়ীদের জীবনে এটি খুবই সাধারণ পানীয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপজাতীয় পুলিশ দায়িত্ব পালনকালে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে, বা সন্ত্রাসীরা টার্গেট করে উপজাতীয় পুলিশদের পাহাড়ী মদ খাইয়ে মাতাল করে। মাতাল অবস্থায় সে অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পুলিশের অস্ত্র নিয়ে পলায়ন করে। এ কায়দায় গত দূর্গাপূজার সময় পানছড়িতে লক্ষ্ণীকুমার চাকমা নামের এক শান্তিবাহিনী ফেরত উপজাতীয় পুলিশের একে-৪৭ রাইফেল চুরি হয়। বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাজেই দেশী দাতা দেশ, সংস্থা ও তাদের অনুজীবী এনজিও, এনজিও’র মালিক, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে যত সমালোচনাই করুক, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে সরকারকে তার সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। জাতীয় প্রত্যাশাও এটাই।

Email:palash74@gmail.com

নোট: গত ২২ মার্চ ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে এই লেখাটি প্রকাশিত  হয়েছিল। তবে বর্তমান লেখাটি ঈষৎ পরিবর্ধিত। লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হয় তার পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৪ ফেব্রুয়ারীর আদেশ শিথিল করে।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত বাঙালীদের সরিয়ে নিন- ড. মিজানুর রহমান

IMG_5359

স্টাফ রিপোর্টার:

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, `পার্বত্য চট্টগ্রামে জোর করে বাঙালি জনসংখ্যা বাড়িয়ে সেখানকার আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করার রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার যেসব বাঙ্গালিদের পুনর্বাসন করেছে তাদের আবারো সেখান থেকে সরিয়ে নিন।  প্রয়োজনে তাদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে’।

তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতিসংঘ ইউনিভার্সাল পিরিউডিক রিভিউর (ইউপিআর) সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে অগ্রগতির বর্তমান অবস্থা: আদিবাসী প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন।

অ্যাকশন এইড এবং কাপেং ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজক। সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম এর সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত; নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবীর; পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব সালমা আক্তার জাহান; বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং; জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন প্রমূখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একশন এইড এর প্রেপাগ্রাম, পলিসি এন্ড ক্যাম্পেইন এর পরিচালক আসগর আলী সাবরী। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের বিনোতাময় ধামাই।

পার্বত্য এলাকায় সেনা বাহিনীর অবস্থানের সমালোচনা করে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণই আপনার শক্তি। তারাই আপনাকে নিরাপত্তা দিবে। কোনো বাহিনী আপনার নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তাই জনগণকে আপনি দূরে সরিয়ে দিবেন না।’

অধ্যাপক মিজান বলেন, ‘বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রের আচরণ কখনো তার আদিবাসীদের প্রতি এমন হতে পারে না। এখন সময় এসেছে জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা। আদিবাসীদের ভোটেই তারা নির্বাচিত হবেন। আদিবাসীদের নিজ ভুমিতে পরবাসের অবস্থা দুর করতে হবে। জেরুজালেমকে আরবহীন করার যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে তেমনি পার্বত্য চট্রগামের ক্ষেত্রে একই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে’।

তিনি বলেছেন, ‘জাতিসংঘ ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) সুপারিশসমূহে বাংলাদেশ সরকার বলেছিল আদিবাসী শব্দটা ব্যবহার করা যাবে না। কিন্ত আমরা তখন বলে ছিলাম বাংলাদেশে আদিবাসী আছে, এখনো বলছি আছে, ভবিষ্যতেও বলবো আছে। কারণ আদিবাসী ছাড়া বাংলাদেশ পূণাঙ্গ রাষ্ট্র নয়। সরকার জাতির কাছে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার যে প্রতিশ্রতি দিয়েছিল তা পুরণ করতে বাধ্য’।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ভুল পথে চলতে পারে। তবে আমাদের কাজ হবে সঠিক পথে ফেরাতে চিৎকার করা। রাষ্ট্র আমাদের চিৎকার না শুনলে আরো জোরে চিৎকার করতে হবে। তাহলেই সরকার আমাদের চিৎকার শুনতে পারবে।’

অধ্যাপক মিজান বলেন, ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন চাই। অন্য কোনো কিছুই দরকার নেই, ভূমি অধিকার বাস্তবায়ন চাই। তাইলেই পরিস্থিতির আমূল ও মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এই শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না করলে এক সময় এদেশ থেকে পাহাড়িরা বিলুপ্তি হয়ে যাবে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিজানুর রহমান বলেন,  `জাতির পিতাকে কোন আদিবাসী আজ পর্যন্ত অসম্মান করেনি। কেউ কোনদিন রাজাকার বলেনি। এ থেকে বোঝা যায় আদিবাসীদের আস্থা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপর আছে। কিন্তু এ আস্থা আর কতদিন থাকবে? সরকারপক্ষ বা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাবো আদিবাসীদের এই আস্থাকে সম্মান দেখাতে। এতে করে পারস্পরিক সম্প্রীতি যেমন বাড়বে তেমনি সরকারই লাভবান হবে’।

তিনি বলেন, `পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিষয়ে সরকার শুধু বিভিন্ন বিভাগ হস্তান্তরের বিষয়গুলো বলে মূল সমস্যাকে এড়িয়ে যায়। কিন্তু আমি মনে করি সেখানকার ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। এছাড়াও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন শৃ্খংলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভারও আঞ্চলিক পরিষদের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করেন’।

আদিবাসীদের যেকোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তিনি সকলকে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ পাঠানোর অনুরোধ জানান। সাম্প্রতিক সময়ে নানিয়াচরে আদিবাসী গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শানাক্ত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তিরও দাবি জানান তিনি।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, `২০১৩ সালের ইউপিআর রিভিউ এর সময় তখনকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনির নেতৃতে যে দল অধিবেশনে গিয়েছিল সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন দেওয়ার আগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দটির পরিবর্তে আদিবাসী শব্দটি প্রতিবেদনে লেখার জন্য জোর দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।

এই সরকারের আমলে পার্বত্য চুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও এখন পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ আমরা দেখছিনা। বাধ্য হয়ে সেই চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাকে অসহযোগ আন্দোলেনের ডাক দিতে হচ্ছে। জানিনা সেই আন্দোলন শান্তিপূর্ন হবে নাকি সহিংসতাপূর্ন হবে। অনতিবিলম্বে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমি সরকারের প্রতি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রোডম্যাপ ঘোষনা করার। যাতে করে পাহাড়ী আদিবাসীরা সুস্পষ্ট ধারনা পায় কবে কখন এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হব ‘।

 সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম বলেন, ‘ইউপিআরে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার কিছু ইতিবাচত পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু জায়গায় কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদেরকে তাই আরো বেশী এই বিষয়ে এডভোকেসি করতে হবে। এক্ষেত্রে আদিবাসী বান্ধব সাংসদ বৃদ্ধি করতে হবে’।

তিনি আরো বলেন, ‘বিজয়ের মাসে যে চুক্তি হয়েছিল এবং চুক্তির ফলে যারা অস্ত্র জমা দিয়েছিল তাদের প্রতি বর্তমান সরকার অন্যায় করতে পারেনা’। তিনি অবিলম্বে বর্তমান সরকারকে আদিবাসীদের অধিকারগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান।

 নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘সরকার ভোটের আগে পাহাড়িদের আদিবাসীর স্বীকৃতি দিবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। নির্বাচনে জিতে তা ভুলে গেছে’।

আদিবাসী নারীদের উপর চলমান সহিংসতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এদেশের নারীদের প্রতি যে মানসিকতা লালন করে তাদের উপর অন্যায়-অত্যাচার চালিয়েছে ঠিক যেন আমরা এখন আদিবাসী নারীদের প্রতি সেই মানসিকতায় পোষন করছি। এ জন্য আমরা দেখি আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতার কোন ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন দোষী ব্যক্তিকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি’।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘ইউপিআর ২য় পর্বে সরকার আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় বেশ কিছু সুপারিশ গ্রহণ করেছিল। সরকার যদি সেগুলো এখনো বাস্তবায়ন না করে তাহলে ২০১৭ সালের অধিবেশনে আবারো তাকে প্রশ্নে সম্মুখীন হতে  হবে। বাংলাদেশে জাতিগত সংখ্যালঘূদের অবস্থা কি। পার্বত্য চুক্তির অবস্থা কি? সরকারকে আবারো ২০১৭ সালে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে নানিয়াচরে যে হামলা হয়েছে তাতে বাংলাদেশ থমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার বা প্রশাসনের এ বিষয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই। যা আদিবাসীদের শুধূ হতবাক করে। আদিবাসীদের অধিকার অর্জনের জন্য তিনি বাঙালি-আদিবাসী সকলকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান’।

রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, ‘ইউপিআরে সরকার যে অঙ্গীকার করে সেটি কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটা খুবই বেশী গুরুত্বপূর্ন অর্থ বহন করে। এজন্য দেশের সুশীল সমাজ, সরকারের প্রতনিধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও জবাবদিহিতার জায়গায় আনতে হবে’।

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৫০ সনের প্রজাস্বত্ত আইনে যেসব আদিবাসীদের নাম আছে তাদের অনেকের নাম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে আসেনি। এর ফলে বাদপড়া আদিবাসীদের শিক্ষা গ্রহণে, চাকুরী ক্ষেত্রে অনকে সমস্যা তৈরি হচ্ছে’।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষণ নির্যাতন আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে

ধর্ষণ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বাঙালী কর্তৃক উপজাতীয় নারী নির্যাতনের বিষয়ে উপজাতীয়দের প্রচার- প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশের আড়ালে পাহাড়ের দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা। উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনাগুলো বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এসব অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এনিয়ে নিরীহ বাঙ্গালীদের মাঝে দিনের পর বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ক্ষীণ হয়ে আসছে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাও। অন্যদিকে একের পর এক ঘটনা করে পার পেয়ে যাওয়া উপজাতীয় যুবকদের দৌরাত্ম বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি বর্তমানে এতোটাই খারাপ হয়েছে যে, বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে পাহাড়ী যুবকেরা বাঙালী নারীদের সুপার ইম্পোজ ছবি পোস্ট করছে, তাদেরকে ধর্ষণের জন্য পাহাড়ী যুবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

পার্বত্যনিউজের তথ্যানুসন্ধান ও ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৩জুন মাটিরাঙ্গা উপজেলার পলাশপুর জোন সদরের কাছাকাছি দক্ষিণ কুমিল্লা টিলা এলাকায় মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা মো: আব্দুল মান্নানের মেয়ে কুলসুম আকতার (১২) নামে এক কিশোরী ধর্ষনের শিকার হয়। ঘটনার সূত্রে জানা যায়, নিজেদের বাড়ি হতে মাটিরাঙ্গা বাজারে কেনাকাটার জন্য যাবার পথে এক পাহাড়ি যুবকসহ চার যুবক তাকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে মোহন ত্রিপুরা নামক এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে। এসময় অন্য তিনজন পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন তার পরিবারের পক্ষ থেকে মাটিরাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ কর্তৃক অভিযান চালিয়ে অপর ব্যক্তিদের আটক করে।

এক্সক্লুসিভ লোগো

এ ঘটনার এক মাসের মাথায় ২৩ জুলাই মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম (৫৫) নামে এক বাঙ্গালী গৃহবধুকে পাহাড়ী যুবক কর্তৃক ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে। সে মাইসছড়ির মো: সয়ন উদ্দীনের স্ত্রী। জানা গেছে, ঐ মহিলা তার গরু খোজার জন্য নিকটবর্তী নীলাৎপল খীসার সবজি ক্ষেতে গেলে চার পাহাড়ী যুবক তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। পরে মহালছড়ি জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এর নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ ও জোনের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এ ব্যাপারে ধর্ষিতার ছেলে মো: গুলজার হোসেন মহালছড়ি থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযুক্ত লাব্রেচাই মারমা ও মাউশিং মারমা নামে দুই যুবককে আটক করে।

এ ঘটনার কয়েক মাসের মাথায় ৯ অক্টোবর মহালছড়ির শ্মশানখোলা এলাকার বাসিন্দা শামছুন্নাহার (৩০) নামে একজনকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠে। এসময় উপজাতি যুবকের দা‘র আঘাতে শামছুন্নাহারের মাথায় মারাত্বক জখম হয়। পরবর্তীতে তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় পুলিশী কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণ-ধর্ষণের শিকার হয় জান্নাতুল ফেরদৌস (১৫) নামে এক বাঙ্গালী কিশোরী। সে জেলার রামগড় উপজেলার বাসিন্দা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘটনার দিন জান্নাতুল ফেরদৌস বান্ধবীর বাড়ীতে যাওয়ার পথে অজ্ঞাত পরিচয়ধারী উপজাতীয় দুষ্কৃতিকারীরা তাকে অপহরণপূর্বক এই ঘটনা ঘটায়। ধর্ষণের শিকার এই কিশোরী ঘটনার পরদিন ০৫ ফেব্রুয়ারি হোটেলর ২য় তলা থেকে জানালা দিয়ে নীচে লাফ দিয়ে ধর্ষণকারীদের কবল হতে পালানোর চেষ্টা করলে গুরুতর আহত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর প্রথমে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এসময় সন্দেহভাজন হোটেল কর্মচারি রাহুল ত্রিপুরাকে (২৮) আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় ১৩ ফেব্রুয়ারী মহালছড়ি জোনের আওতাধীন থলিপাড়া এলাকায় মহালছড়ি ডিগ্রী কলেজের ছাত্রী মিতা সরকারের সাথে অসদাচরনসহ তাকে উত্যক্ত করে রামপ্রু মারমা নামে উপজাতি স্কুল ছাত্র। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙ্গালি যুবকদের মাঝে হাতাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা জানাজানি হলে মহালছড়ি জোন ও এপি ব্যাটালিয়নের পৃথক দুটি টহলদল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে জোন কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, কলেজের অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত ছাত্র রামপ্রু মারমা‘র পিতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরণের কার্যকলাপে লিপ্ত হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে সেবারের মতো রেহাই পায় বখাটে উপজাতি যুবক রামপ্রু মারমা।

এর পরপরই স্বাধীনতার মাসে (১৮ মার্চ) গুইমারার রামসু বাজারে মিসেস ফেরদৌসি বেগম (৩৫) এর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতিয় মোটরসাইকেল চালক অংচল মারমা (৩২)। প্রাপ্ত সূত্রমতে, ফেরদৌসি বেগম ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলযোগে মানিকছড়ি হতে গুইমারা বাজারে যাওয়ার পথে তার শ্ললতাহানির চেষ্টা চালালো হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এ ঘটনা জানার সাথে সাথে গুইমারা সেনা ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সিএমএইচ-এ ভর্তি করে। পরবর্তীতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা অভিযুক্ত মোরসাইকের চালককে আটকপূর্বক গুইমারা থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। এ ব্যাপারে গুইমারা থানায় মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে একটি মামল করা হয়।

এরপর ৩০ এপ্রিল আলীকদম জোনের আওতাধীন গুড়রঝিরি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে মোছাম্মদ হুরাইরা (২৬) নামের এক বাঙ্গালি নারী উপজাতিয় যুবক মংচিং আই মারমা (৩০) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। জানা গেছে হুরাইরা ও তার স্বামী উক্ত তামাক ক্ষেতের শ্রমিক। তার স্বামীর অনুপুস্থিতিতে একই তামাক ক্ষেতের অপর শ্রমিক মং চিং আই মারমা উক্ত ঘটনা ঘটায়। সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ঘটনার ব্যাপারে লামা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পর থেকে ধর্ষক মং চিং আই মারমা পলাতক রয়েছে।

২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল পুর্বপ্রণয়ের জের ধরে মাটিরাঙ্গার গাজীনগর বটতলী এলাকার বাঙ্গালি কিশোরী সবিলা আক্তর (২৪)-কে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে উপজাতিয় যুবক কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা (২৭)। স্থানীয়রা বিষয়টি জানলে পলায়নকৃত কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা ও সবিলা আক্তরকে আটক করে মাটিরাঙ্গা থানায় হস্তান্তর করে।

এর কয়েকদিনের মাথায় ৮ এপ্রিল আলকদম জোনের আওতাধীন সেলতিপাড়া এলাকায় পাখী আক্তার (৩৫) নামে বাঙ্গালী গৃহবধুর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতি যুবক সামারি মারমা (৩৬)। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় বাঙ্গালীরা উত্তেজিত হয়ে সামারি মারমাকে মারধর করে। পরবর্তীতে, এই ঘটনা উক্ত এলাকায় পাহাড়ি-বাঙ্গালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ঘটনা জানার পর সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়োজিত রাখে।

একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুনা আক্তার (৭)-কে ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের উপজাতি ছাত্রের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার মেয়ে শিশুটির ভাষ্যমতে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজাতীয় ছাত্র তাকে বিদ্যালয় ভবনের পিছনে নিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে, শিশুটির মা ও নেপচুন টি স্টেট‘র শ্রমিক কাঞ্চন মালা তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে প্ররণ করে। এ ব্যাপারে কাঞ্চন মালা বাদী হয়ে মানিকছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

পরবর্তীতে, মানিকছড়ি উপজেলার ইউএনও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় বাটনাতলী ইউপি চেয়াম্যান এবং বিদ্যালয়ের পরিচালক কমিটির সদস্যবৃন্দ ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে ০১ অক্টোবর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ষণের শিকার শিশুটি কর্তৃক অভিযুক্ত প্রথম শ্রেণির ছাত্র রাজ কুমার চাকমাকে (১২) সনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ কর্তৃক রাজ কুমার চাকমাকে আটক পূর্বক খাগড়াছড়ি জেলে প্রেরণ করা হয়।

সমঅধিকার আন্দোলন একাংশের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির পার্বত্যনিউজকে বলেন, বাঙালী কর্তৃক কোনো উপজাতি নারী নির্যাতিত হলে উপজাতি সমর্থিত বিপুল মিডিয়ার প্রচার প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ, বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু উপজাতি কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষিত বা নির্যাতিত হলে সরকারের তরফ থেকে সেই তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই একজন নামেমাত্র গ্রেফতার হলেও অল্পদিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। আর এই বিচার বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দী থেকে একসময় তামাদি হয়ে যায়। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী আন্তর্জাতিক মহল কারোরই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে বিচার না হওয়ায়,, সম্মান কিম্বা নিরাপত্তার কারণে বাঙালীরা বিচার প্রার্থিও হয় না। ঘটনার আসল সংখ্যা কখনোই জানা যায় না।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করে পাহাড়ের সচেতন মহল বলেন, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। বাঙ্গালী যুবকের দ্বারা কোন পাহাড়ী নারী ধর্ষিত হলে কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও এতোগুলো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাদের কোন বক্তব্য-বিবৃতি জাতি দেখেনি। পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও বাঙালীর অবস্থান নিশ্চিত করতে এ ধরণের ঘটনা রোধ করা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও প্রতিরক্ষা

gussagram 1
আ তি কু র  র হ মা ন:

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

ভারত বিভাগকালে সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহের ভাগ্যে অনেক ওলট-পালট হয়েছে। পূর্ব পাঞ্জাবের অধীন গুরুদাসপুর জেলা সীমান্তবর্তী মুসলিম প্রধান অঞ্চলরূপে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিলো। কিন্তু কাশ্মীরের পক্ষে ভারতের সাথে যোগদানের সুযোগ বজায় রাখার প্রয়োজনে ভূমি সংযোগরূপে গুরুদাসপুরকে ভারতভুক্ত করে দেয়া হয়। ঠিক একই কারণে আসাম ও ত্রিপুরার সাথে ভারতের ভূমি সংযোগ রক্ষার প্রয়োজনে, পশ্চিম দিনাজপুর ও করিমগঞ্জ অঞ্চলকে ভারতের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। এই দুই সংযোগ ঘটান না হলে কাশ্মীর হতো পাকিস্তানের বাধ্য অঞ্চল, এবং আসাম ও ত্রিপুরা হতো বাংলাদেশের দ্বারা বিচ্ছিন্ন বাধ্য এলাকা। পার্বত্য চট্টগ্রামের পক্ষে অনুরূপ ভূমি সংযোগ হওয়ার কোনরূপ ভৌগোলিক ও জাতিগত আনুকুল্য ছিলো না। এর উত্তরে অবস্থিত ত্রিপুরা ও পূর্বে অবস্থিত মিজোরাম দুর্গম পর্বতসংকুল সীমান্ত। এ পথে আসামের সাথে সংযোগ সাধন দুরুহ। জাতিগতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী উপজাতীয়রা হলো বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত ও স্বতন্ত্র। স্থল যোগাযোগের দুরুহতা ও জাতিগত ভিন্নতা হেতু, এতদাঞ্চলের ভারতভুক্তি বিচ্ছিন্নতারই সহায়ক হবে বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অখন্ডতা, অর্থনৈতিক অভিন্নতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে রক্ষার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সঠিকভাবেই বাংলাদেশভুক্ত রাখা হয়, যার কোন বিকল্প ছিলো না।

ভৌগোলিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম, মুল চট্টগ্রামেরই অংশ এবং লোক হিসেবে স্থানীয় উপজাতীয়রা জেলা ভাগের সুযোগে আকস্মিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মাত্র। তারা আদি চট্টগ্রামী মূলের লোক নয়। অভিবাসনের মাধ্যমে তারা হালে স্থানীয় অধিবাসী রূপে স্বীকৃত। মাত্র শত বছর আগে পার্বত্য অঞ্চল শাসন আইন ধারা নং ৫২ তথা পর্বতে অভিবাসন নামক আইন বলে তারা স্থানীয় অধিবাসী। তারা চট্টগ্রামী মৌলিকত্ব সম্পন্ন স্থানীয় আদি ও স্থায়ী অধিবাসীর মর্যাদা সম্পন্ন লোক নয়। এই বিচারে তাদের অগ্রাধিকার, বিশেষাধিকার, স্বায়ত্তশাসন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবী অযৌক্তিক। তদুপরি এই প্রশ্নে তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটন, একটি অমার্জনীয় রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি।

সুতরাং তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী বিবেচিত হয়। এই ব্যবস্থারই অংশ হলো এতদাঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারকরণ ও রাষ্ট্রের স্বপক্ষ জনশক্তি বাঙ্গালীদের সংখ্যাগত প্রাধান্য রচনা। বাঙ্গালী বসতি স্থাপনকে তাই অবাঙ্গালী বিদ্রোহের বিকল্প ভাবাই সঙ্গত। এতে কারো বিরোধিতা ও আপত্তি উত্থাপন যৌক্তিক নয়। স্থানীয়ভাবে সেনাবাহিনীর অবস্থান প্রতিরক্ষামূলক। স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন তাদের হস্তক্ষেপের বিষয়বস্তু নয়। তাদের হস্তক্ষেপকে ঠেকাতে, সশস্ত্র উপজাতি বিদ্রোহের বিপক্ষে শান্তিস্থাপক সপক্ষীয় জনশক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন। বাঙ্গালী বসতি সেই প্রয়োজনেরই সম্পূরক। এটা উপজাতীয় বৈরীতা নয়।

সেনাবাহিনীর দায়িত্বপালন সংক্রান্ত কঠোরতা তাতে হালকা হয়েছে। উপজাতীয় বিদ্রোহ দমাতে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক বাঙ্গালী জনশক্তি মোতায়েন নমনীয় ব্যবস্থা। যখন বাঙ্গালী বসতি স্থাপনের সূচনা হয়নি, বাংলাদেশের সেই শিশুকালে, উপজাতীয় বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়েছে। তখন দেশের অখন্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে এতদাঞ্চলে সেনা মোতায়েন ছাড়া উপায় ছিলো না। তৎপর বিদ্রোহী পক্ষের সাথে আপোষ-রফামূলক আলোচনা ও বৈঠক হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাই সরকারী পর্যায়েই সিদ্ধান্ত হয় যে, সেনাবাহিনী কেবল সশস্ত্র দুষ্কর্মই ঠেকাবে। বিদ্রোহী জনশক্তির মোকাবেলায় স্বপক্ষ বাঙ্গালী জনশক্তিকে সংখ্যা ও সামর্থে জোরদার করে তুলতে হবে। সুতরাং উপজাতীয় বিদ্রোহেরই ফল সেনা মোতায়েন ও বাঙ্গারী বসতি স্থাপন। এই দুই শক্তির বিরুদ্ধে উপজাতীয় পক্ষের আপত্তি ও আন্দোলন এই প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক নয়।

এখনো উপজাতীয় পক্ষ উগ্রতা, হিংসা, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি আর অরাজকতা ত্যাগ করে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের ধারায় ফিরে এলে সেনাবাহিনীর পক্ষে তার ক্যাম্পে ফিরে যাবার পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং বাঙ্গালী জনস্রোতও থেমে যাবে। বাঙ্গালী পাহাড়ী শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সমঅধিকার নীতি প্রতিষ্ঠিত হলে, এতদাঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নের ধারা অবশ্যই জোরদার হবে। কেবল স্বপক্ষীয় সুযোগ-সুবিধা আর বিপক্ষ বৈরীতা, পার্বত্য অঞ্চলকে সংঘাতমুখর ও বিক্ষুব্ধ করে রেখেছে। বাঙ্গালীরা মুহুর্তে সব উপজাতীয় বৈরীতা ভুলে যেতে প্রস্তুত, যদি উপজাতীয় পক্ষ সকলের সমঅধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্য রূপে গ্রহণ করে। সুতরাং পার্বত্য রাজনীতি খেলার ট্রাম কার্ড তাদের হাতেই নিহিত। অযথা সেনাবাহিনী আর বাঙ্গালী পক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

অরাজক ও বিক্ষুব্ধ পার্বত্য অঞ্চল থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হলে, এতদাঞ্চলের শান্তি-শৃঙ্খলা আর অখন্ডতা রক্ষার দায়িত্ব কে পালন করবে? উপজাতীয় কোন জনসংগঠন সে দায়িত্ব পালনের উপযোগী আস্থা এখনো অর্জন করতে পারেনি। তারা নিজেরাও ঐক্যবদ্ধ নয়। বরং পরস্পর সংঘাত ও বৈরীতায় লিপ্ত। এটা ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের ধারক নয়। উপজাতীয়রা পরস্পর রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও সংঘাতে লিপ্ত। তারা গঠনমূলক রাজনীতির কোন উদাহরণ স্থাপন করতে পারেনি। দেশ ও জাতি তাদের প্রতি আস্থাশীল নয়। জাতীয় সন্দেহপ্রবণতাকে কাটাতে তাদের কোন রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মসূচী নেই।

উপজাতীয় দাবিও সংখ্যালঘু স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গৃহীত হয়েছে। এখন তারা তাতে স্থির নেই, বিকল্প জুম্ম জাতীয়তাবাদেই অনড়। তাদের আগ্রহেই উপজাতীয় সুবিধাবাদ গৃহীত হয়েছিলো। কিন্তু এখন তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী পরিচয় গ্রহণ। দেশ ও জাতি থেকে তারা কেবল গ্রহণেই অভ্যস্ত, কিছু দিতে নয়। তারা দেশ ও জাতির বিপক্ষে বৈরী শক্তিরূপে প্রতিভাত। এই বৈরী ভাবমূর্তি কাটাবার দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। এমনটা ঘটলেই তাদের পক্ষে জাতীয় আস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব। কেবল উত্যক্ত করা, দাবী-দাওয়ার বহর বৃদ্ধি, আর নিজেদের স্বার্থকেই বড় করে দেখা, এই প্রবণতা, জাতীয় আস্থা ও সহানুভুতি গড়ে ওঠার অনুকূল নয়।

পার্বত্য বাঙ্গালীরা ঐ বাঙ্গালীদেরই অংশ, যারা গোটা দেশের শাসক শক্তি এবং তারা সংখ্যায় বাংলাদেশী জাতি সত্তার ৯৯%। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের সাথে সদ্ভাব সৃষ্টি, গোটা জাতিকে প্রভাবিত করারই সূত্র। এই বোধোদয় না ঘটা, উপজাতীয়দের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। বাঙ্গালীপ্রেমী সাধারণ উপজাতীয় লোক অবশ্যই আছেন, এবং এমন উদার মনোভাব সম্পন্ন সাধারণ উপজাতীয় লোকেরও অভাব নেই, যারা পাহাড়ী বাঙ্গালীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেন। কিন্তু এরা সংখ্যালঘু ও দুর্বল। এরা উপজাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন না। সমাজে এদের অবস্থান নিরীহ।

দেশ ও জাতি অনির্দিষ্ট দীর্ঘকাল অনুকূল উপজাতীয় বোধোদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। ধ্বংসাত্মক উপজাতীয় শক্তিকে নিস্ক্রিয় ও নির্মূল করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তজ্জন্য গৃহীত রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে শিথিল বা পরিত্যাগ করা যথার্থ নয়। সেনাশক্তি ও জনশক্তি মোতায়েনের অতীত নীতিকে পরিহারের কোন অবকাশ নেই। ইতিমধ্যে গৃহীত কোন শৈথিল্য ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়নি। নতুবা এতোদিনে উপজাতীয় বিদ্রোহী শক্তি এক ক্ষুদ্র অপশক্তিতে পরিণত হতো, এবং পর্বতাঞ্চলে বাঙ্গালীরাই হয়ে উঠতো সংখ্যাগরিষ্ঠ। এমনটি ঘটানো ছাড়া এতদাঞ্চলে বাংলাদেশ নিরাপদ হবে সে আশা করা যায় না, আর একমাত্র তখনই উপজাতীয়রা হবে দেশ ও জাতির পক্ষে বাধ্য অনুগত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এমনটি ঘটান অন্যায় নয়। এমন শক্ত মনোভাব জাতীয় রাজনীতিতে থাকা আবশ্যক। তাই পার্বত্য নীতিতে বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পূনর্বাসন পুনঃবিবেচিত হওয়া দরকার।

বাঙ্গালী বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন কাজ অসম্পন্ন আছে। তা বাস্তবায়ন না করা ক্ষতিকর। সরকারের এই দায় অপরিত্যজ্য। লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী সরকারী দায়িত্বহীনতার ফলে পর্বতের আনাচে-কানাচে ভূমিহীন, আশ্রয়হীন, বেকার। ভূমি দান ও পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে তারা সরকারীভাবে এতদাঞ্চলে আনিত। এই অঙ্গীকার পালন করা সরকারের একটি দায়। নিরূপায় হয়ে ভূমি বঞ্চিত বাঙ্গালীদের অনেকেই সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেছে। কিন্তু ঐ মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই। এমনি একটি মামলা হলো রীট নং-৬৩২৯/২০০১, যার শুনানীর দিন ধার্য্য ছিলো ২৫ আগস্ট ২০০৪ সে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়নি। এছাড়াও আরো কয়েকটি রীট দায়ের করা আছে যেগুলোর মীমাংসা হচ্ছে না। তবে এই পথ ধরে একদিন বিষয়টির সুরাহা অবশ্যই হবে, সে আশায় নিঃস্ব পার্বত্য বাঙ্গালীরা আশান্বিত দিন যাপন করছে।

রাষ্ট্র কর্তৃক বাঙ্গালী পুনর্বাসন মানে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশী চরিত্র দান, উন্নয়নের অর্থ পশ্চাদপদতার অবসান ঘটান, সেনা নিয়ন্ত্রণের অর্থ অরাজকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ, আর পার্বত্য চুক্তি হলো বিদ্রোহীদের গৃহবন্দি করার কৌশল। এগুলো রাষ্ট্র প্রবর্তিত কর্মসূচী। উপজাতীয়দের আনুগত্য প্রদর্শন ছাড়া এই কার্যক্রমের কোন ব্যতিক্রম হতে পারে না।

গত ১৬ জুন ২০০৪ তারিখে গৃহীত সরকারী সিদ্ধান্তটি পার্বত্য বাঙ্গালীদের অবশ্যই বিক্ষুব্ধ করবে। তারা সরকার কর্তৃক পুনর্বাসনের অঙ্গীকারে পার্বত্য চট্টগ্রামে আনিত, এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনে আবাসত্যাগী ও গুচ্ছগ্রাম সমূহে পুনর্বাসিত। এই আনয়ন ও বসতি বন্ধকরণ ভুল হয়ে থাকলে, তার খেসারত ঐ বাঙ্গালীদের প্রাপ্য নয়। সরকারই নিজ ভুলের দায়িত্ব নিতে ও খেসারত দিতে বাধ্য। গুচ্ছগ্রামবাসী ও ভাসমান অন্যান্য পার্বত্য বাঙ্গালীরা স্বউদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি গড়েনি। তাদের কিছু সরকারীভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে, কিছু প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে এবং বাদ বাকিরা বেসরকারীভাবে পাকিস্তান আমলে ও শেখ মুজিবের উৎসাহে বাংলাদেশ আমলের শুরুতে, এতদাঞ্চলে আনিত ও স্বউদ্যোগে বসতি স্থাপন করেছে। এরা রাষ্ট্রের স্বপক্ষীয় জনশক্তি। বিদ্রোহী উপজাতীয়দের বিপক্ষে এই সপক্ষীয় জনশক্তির প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রীয়ভাবে কাম্য।

১৯৮৬ সাল আমলে বিদ্রোহী শান্তিবাহিনীর মদদে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক আকার ধারণ করে। তাতে উপদ্রুত বাঙ্গালীরা মারমুখী হয়ে ওঠে এবং দাঙ্গা উপদ্রুত উপজাতীয়রাও বিপুল সংখ্যায় শরণার্থীরূপে ভারতমুখী হতে শুরু করে। এই বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বাঙ্গালীদের তাদের বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি থেকে উঠিয়ে এনে সেনাক্যাম্প সমূহের আশপাশে গুচ্ছগ্রাম গড়ে বসবাস করতে দেন। বাড়ি-ঘর, জায়গা-জমি, ফল-ফসল ও রুজি-রোজগারচ্যুত এই গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা হয়ে পড়ে সরকারী ত্রাণ নির্ভর। ঐ ২৬ হাজার গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালী পরিবারের দাবী হলো, তাদের পুরাতন বাড়ি-ঘর ও জায়গা-জমি ফেরত লাভ, নতুনভাবে পুনর্বাসন নয়। সরকারের দ্বারা প্রকৃত অবস্থার মূল্যায়ন হয়নি। তারা বাস্তবে আবাসিত ও পুনর্বাসিত পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী লোক। তাদের স্থানীয় নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত। এদের প্রবীনরা এখানকার অর্ধ শতাব্দী ও তার আরো বেশি সময়ের বাসিন্দা এবং সন্তান-সন্ততিরা জন্মসূত্রে স্থানীয় অধিবাসী।

পর্বতবাসী এই বাঙ্গালীরা সরকার কর্তৃক বার বার বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি সত্ত্বেও তারা স্বপক্ষীয় ভোট ব্যাংক বলে অনুমিত। তবে হালে তাদের ভুল ভাঙছে। একা বিএনপি নয় আওয়ামী লীগকেও তারা উপযুক্ত মূল্য দিতে এখন প্রস্তুত। তারা ভাবছে আওয়ামী লীগ তাদের চির শত্রু নয়। বহু সংখ্যক বাঙ্গালী মরহুম শেখ মুজিবের উৎসাহে এতদাঞ্চলে এসেছে ও বসতি গড়েছে। বিদ্রোহের বিরুদ্ধে প্রথম সেনা ছাউনীর প্রতিষ্ঠাতা হলেন শেখ মুজিব নিজে। আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের হরতাল পালনের দিন ঘোষণা করেছিলেন; একজন বাঙ্গালীকেও পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিতাড়ন করা হবে না। তার সরকার সন্ত্রাস উপদ্রুত উদ্বাস্তু পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের সবাইকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছেন।

পুনর্বাসন তালিকায় গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীরা অন্তর্ভুক্ত আছে। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তিতে সাংবিধানিক ব্যবস্থার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায়, বাঙ্গালীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়েছে। সুতরাং পার্বত্য বাঙ্গালীদের একমাত্র মিত্র সংগঠন বিএনপি নয়, আওয়ামী লীগও তাদের মিত্রের মর্যাদা প্রাপ্ত দল।
এটা কৃতজ্ঞতার বিষয় যে, প্রেসিডেন্ট জিয়া, শেখ মুজিব ও এরশাদ বাঙ্গালীদের সরকারীভাবে পার্বত্য অঞ্চলে আবাস দান করেছেন। তবে এটাও প্রশংসনীয় কাজ নয় যে, ঐ সরকারগুলো জায়গা-জমি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা পার্বত্য চুক্তির আপত্তিজনক দফাগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহী, গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙ্গালীদের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার দানে নিষ্ক্রিয়, এবং বিদ্রোহী উপজাতীয় পক্ষের তোষামোদে লিপ্ত। এই পরিস্থিতিতে পার্বত্য বাঙ্গালীরা নতুন মিত্র খুঁজতে বাধ্য।

আবার বলি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙ্গালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রাম তারই ভৌগোলিক অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অমুসলিম প্রধান অঞ্চল হওয়া মৌলিক নয়, কৃত্রিম। এ কারণেই ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালে এটি ভারতের প্রাপ্য বা স্বতন্ত্র অঞ্চলরূপে স্বীকৃতি লাভ করেনি।

♦ আতিকুর রহমান পার্বত্য বিষয়ক গবেষক ও গ্রন্থপ্রণেতা এবং উপদেষ্টা, পার্বত্যনিউজ ডটকম।

বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

গত ৯ আগস্ট রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ সাড়ম্বরেই পালিত হলো বিশ্ব আদিবাসী দিবস। যদিও বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের দুই দিন আগে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য নির্দেশনা জারি করে সরকার।

 

৭ আগস্ট সরকারি এক তথ্য বিবরণীতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী বর্তমানে দেশে আদিবাসীদের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বিভিন্ন সময় বিশেষ করে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দটি বারবার ব্যবহার হয়ে থাকে। পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে উল্লেখ করে তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, “আগামী ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও টকশোতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে এবং সকল আলোচনা ও টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ সুশীল সমাজের অন্যান্য ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আদিবাসী শব্দটির ব্যবহার পরিহারের জন্য পূর্বেই সচেতন থাকতে অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।”

আদিবাসী দিবস উদযাপনে এই তথ্য বিবরণীর তেমন কোনো প্রভাব দেশের মধ্যে দৃশ্যমান হয়নি। বেশিরভাগ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিগণকে পূর্ববৎ তাদের সংবাদ, ভাষ্য, মন্তব্য, টকশোতে আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশেষ করে যে সরকার এই পরিপত্র জারি করে সেই সরকারেরই অনেক মন্ত্রী, এমপিসহ ঊর্ধ্বতন পদাধিকারিকগণ এই পরিপত্র অবজ্ঞা করে আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিদানের জন্য জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা সরকারি পরিপত্রের তীব্র সমালোচনা করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্কের পক্ষে-বিপক্ষে জোরালো অবস্থান রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জাতীয় গণমাধ্যম বিশেষ করে পত্রিকার সম্পাদকীয়/প্রবন্ধ/মন্তব্য ও টিভি চ্যানেলের টকশোতে একপাক্ষিকভাবে অর্থাৎ আদিবাসীদের পক্ষেই প্রচারণা চালানো হয়। তাদের বেশিরভাগই বর্তমান সরকারের অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, বক্তব্য, অবস্থান ও বাণীর রেফারেন্স দিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২৮ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত ‘উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী হিসেবে অভিহিত করার অপতৎপরতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের গোপনীয় প্রতিবেদনে (স্মারক : পাচবিম (সম-২)২৯/২০১০/২৫, তারিখ : ২৮/১/২০১০) বলা হয় : “বাংলাদেশে ৪৫টি উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে। বাংলাদেশের সংবিধান, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের কোথাও ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়নি। তথাপি কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরাও ইদানিং উপজাতীয় সম্প্রদায়গুলোকে ‘উপজাতি’ না বলে ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করতে দেখা যাচ্ছে। এতদ বিষয়ে বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশী সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এ সকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে তাদের একটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সহায়তায় অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ উপজাতীয় সম্প্রদায় এখন নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতিতে অবস্থান না করে তাদের অনেকেই খ্রিস্টান হয়ে গেছে। বাংলাদেশীয় উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ উল্লেখ না করার বিষয়ে ইতিপূর্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। তবে বর্তমানে সে নির্দেশনার কোনো কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি উপজাতীয়দেরকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চি‎হ্নিতকরণ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে আদিবাসী মন্ত্রণালয় করার ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উত্থাপিত হচ্ছে বলে জানা যায়। ইউএনডিপি, ডানিডা, এডিবিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ এবং উপজাতীয়দের ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই সাথে উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপে এবং সাংবাদিকরা বিভিন্ন লেখায় উপজাতীয়দের ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্ণিত করছে। এরূপ কাজ অব্যাহত রাখলে উপজাতীয়দের ভবিষ্যতে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে। বর্ণিত অবস্থায় বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই যেন ‘উপজাতি’ এর পরিবর্তে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ না করা হয় এবং পার্বত্য অঞ্চলে যে সমস্ত এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বৃদ্ধিকরণসহ সতর্কতামূলক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”

২০১১ সালের মে মাসে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের (ইউএনপিএফআইআই) অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে অধিবেশনে উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক লার্স আন্দ্রেস বায়ের বলেন, সরকারের সদিচ্ছার অভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তি মিশনের কোনো দেশের সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করার আগে তাদের মানবাধিকার রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখারও সুপারিশ করেন বায়ের। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য স্থানে বসবাসকারী আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দাবি করে আসছে। তাদের এই দাবি পূরণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ইউএনপিএফআইআইর অধিবেশনে যোগদানকারী বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। নিউইয়র্কে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে (ইউএনপিএফআইআই) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক দশম অধিবেশনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ বৈঠকে ফোরামের সাবেক সদস্য লার্স-অ্যান্ডার্সবায়ের এ সুপারিশ করেন বলে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জানানো হয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তিনি। ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে ১১৯ বার আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা ছাড়াও তাদের আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, লারস এন্ডারস পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে প্রতিবেদন তৈরি করেন স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে। বিষয়টি প্রতারণা ও উদ্দেশ্যমূলক।
অবশ্য জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট সেক্রেটারি ইকবাল আহমেদ অভিযোগ অস্বীকার করার পাশাপাশি বায়েরের দেয়া প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই দাবি করে তিনি বলেন, এ কারণে শান্তি চুক্তি নিয়ে এই ফোরামে আলোচনার কোনো অবকাশও নেই।

ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে ঢাকায় বিদেশি মিশন প্রধানদের মাধ্যমে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সারাবিশ্বকে জানান, এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো আদিবাসী নয়। বাঙালি নৃগোষ্ঠীই এ ভূখ-ে ৪ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বসবাস করছে। আদিবাসী হিসেবে দাবি করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ১৬ শতকের আগে এ ভূখণ্ডে ছিল এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিদেশি মিশনগুলোর প্রধানদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীপু মনি বলেন, “১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তিতে ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর স্বার্থান্বেষী কিছু মহল উপজাতি শব্দকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ করে জাতিসংঘ ফোরাম ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুবিধা আদায় করতে চাইছে।” পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শক্ত অবস্থান আঁচ করতে পেরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশী রাষ্ট্রদূত ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিগণ বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে আরো আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপুমণি তাদের দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ় ও সুস্পষ্ট। কাজেই ভবিষ্যতে এ নিয়ে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সরকার কখনোই বাংলাদেশের উপজাতীয় বাসিন্দাদের ‘আদিবাসী’ বলে সরকারিভাবে স্বীকার করেনি। তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সরকারি মন্ত্রী-এমপিসহ সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে উপজাতিদের আদিবাসী বলে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও শুরু থেকেই পার্বত্য উপজাতিদের দাফতরিকভাবে ‘আদিবাসী’ বলে স্বীকার করেনি। সে কারণেই ব্যাপক দাবি সত্ত্বেও মানবাধিকার কমিশনেও ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে’ ‘উপজাতি’ শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার না করে ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ ব্যবহার করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে উপজাতিদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সরকারিভাবে জানানো হয় যে, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই এবং একই সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ না বলতে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কতিপয় নেতা জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে আর্থিক সহায়তাসহ তাদের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন ভারত এবং মিয়ানমারের বিশাল এলাকার বাসিন্দাদের জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের সহায়তায় ব্যাপকহারে খ্রিস্টানকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ইসরাইল বা পূর্ব তিমুরের মতো স্বতন্ত্র খ্রিস্টান ‘বাফার স্টেট’ তৈরির পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহল সতর্ক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারে আদিবাসীদের স্বার্থ রক্ষায় জাতিসংঘ তার সদস্যভুক্ত কোনো দেশে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে এ মর্মে ক্লজ থাকায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সেই চার্টারে স্বাক্ষর দিতে আপত্তি জানায়। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের permanent forum for indigenous people-এর ৭ম অধিবেশনে বাংলাদেশ পরিষ্কারভাবে জানায় :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’ এরপর ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে আদিবাসী প্রসঙ্গ থাকায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে জানতে চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়ে চিঠি লেখে। এর উত্তরে ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একই কথা জানায়। [(স্মারক নং : পাচবিম(সম-১)৩৭/৯৭-১১৭ তারিখ : ৯/৯/২০০৮) :The country has some tribal population and there are no indigenous people.’

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নীতিরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, আদিবাসী বিষয়ে বাংলাদেশের পরপর তিনটি সরকারের নীতি অভিন্ন রয়েছে। নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ এক উজ্জ্বল ও ইতিবাচক ব্যতিক্রম। কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘কতিপয় নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী, পাহাড়ে বসবাসরত শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, এমনকি সাংবাদিকরা বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সংবাদ মাধ্যম, জাতিসংঘের আড়ালে থাকা খ্রিস্টান রাষ্ট্রসমূহ এসকল ব্যক্তিবর্গের সাহায্যে’ বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। অবশ্য অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও সরল মনে কখনো বলে থাকেন, “উপজাতি বললে যদি তারা আহত হয় তবে আদিবাসী বলেন, কী এমন সমস্যা তাতে?” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল হলে উপজাতিদের আদিবাসী বলে মেনে নিতে এতটা আপত্তি হয়তো থাকত না ১৬ কোটি বাংলাদেশীর।

ঐতিহাসিক ভুল
আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. অনেকে আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবে Aborigine ব্যবহার করেন। কিন্তু Aborigine বলতে সার্বজনীনভাবে আদিবাসী বোঝায় না। Aborigine বলতে সুনির্দিষ্টভাবে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের বোঝায়। অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে Aborigine শব্দের অর্থ বলা হয়েছে ‘a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia’. একইভাবে Red Indian বলতে মার্কিন আদিবাসীদের বোঝায়, অস্ট্রেলীয় Aborigine বা আদিবাসীদের বোঝায় না। এ ছাড়াও বিভিন্ন ডিকশনারীতে আদিবাসী বিষয়ে যে সংজ্ঞা ও প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
Aborigine : noun. a member of a race of people who were the original living in a country, especially Australia. Indigenous : belonging to a particular place rather than coming to it from some where else. Native. The indigenous people/indigenous area. Aborigine : earliest. Primitive. Indigenous. Indigenous : adj. Native born or produced naturally in a country, not imported (opposite to exotic).
অন্যদিকে বাংলা একাডেমির অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ বলা হয়েছে : দেশি, দৈশিক, স্বদেশীয়, স্বদেশজাত। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সংসদ অভিধানে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, স্বদেশজাত, দেশীয়। আবার চেম্বার্স ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে, native born, originating or produced naturaly in a country, not imported. একই ডিকশনারীতে Indigenous শব্দের বিপরীত শব্দ হিসেবে exotic শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে- যার অর্থ বহিরাগত। নৃতত্ত্ববিদ লুই মর্গান (Louis Morgan) মনে করেন, “The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil.\\\( Louis Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972.) অর্থাৎ অভিধানিকভাবে আদিবাসী শব্দের অর্থ দেশি, স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র। তাহলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের যে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে তারা কী বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত?
এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখা গত ১ আগস্ট ২০১৩ তারিখে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত হয়েছে যারা ওয়েবলিংক (বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক)| । প্রয়োজনে পাঠকগণ তা দেখে নিতে পারেন।

সংক্ষেপে এখানে শুধু একটি কথা বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো উপজাতি ও তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গবেষকও এখন বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোকে ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলে দাবি করেন না। বরং তাদের রচিত ইতিহাসেই প্রমাণিত হয়েছে এরা বহিরাগত। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র হচ্ছে এদেশের মূল জনগোষ্ঠী বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। প্রাচীন বিভিন্ন ইতিহাসে সে কথা নানাভাবে এসেছে। বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারগুলো সে ইতিহাসকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণ করছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল, অনেক বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক আইন তথা আইএলও সংজ্ঞা অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেটাও যে সবৈর্ব ভুল ব্যাখা তা জানতে পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত আমার আরো একটি লেখা দেখতে পারেন এই লিংক থেকে: (আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ).

অন্যদিকে বাংলাদেশের সকল উপজাতি সম্প্রদায় নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে না। বরং বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশের যারা মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা, সন্ত্রাসী কর্মকা- কিংবা এনজিও কার্যক্রমের সাথে জড়িত বা তাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত তারাই কেবল নিজেদের আদিবাসী বলে দাবি করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী উল্লিখিত শ্রেণীর জনগোষ্ঠীই এ দাবির মূল পরিচালক। তবে তাদের এ দাবিটি অতি অধুনা। অতীতে তারা নিজেদের উপজাতি পরিচয়ে পরিচিত করিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। এমনকি স্বাধীনতার পর যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার প্রথম শুরু হয় তখন তাদের সর্বজনগ্রাহ্য নেতা মানবেন্দ্র লারমা সংসদে জাতিগত পরিচয়ের স্বীকৃতি দাবি করেছিলেন, আদিবাসী পরিচয়ের নয়। ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময়ও বর্তমান নেতা নিজেকে উপজাতি পরিচয়েই পরিচিত করিয়েছিলেন। চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ক প্রচারণার কী পার্সন। জনসংহতি সমিতি ও সন্ত্রাসী সংগঠন শান্তি বাহিনীর নেতা সন্তু লারমাও শুরুতে আদিবাসী দাবির পক্ষে ছিলেন না। দেবাশীষ রায়ের দাবি বলে তিনি এর সাথে একমত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বিদেশী রাষ্ট্র ও দাতা সংস্থার সমর্থন এবং আর্থিক প্রলোভনে তিনি এই দাবিতে শরিক হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি।

এ বিষয়ে রাঙ্গামাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার গত শনিবার জাতীয় শোক দিবসের আলোচনায় বলেছেন, আমি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন করেছিলাম, তখন সন্তু লারমা বলেছিলেন, এই দেশে কোনো আদিবাসী নেই। এখানে আমরা সবাই উপজাতি। জুম্ম জনগণের আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আদিবাসী দিবস পালন করা হচ্ছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের সময়ে আমি সন্তু লারমাকে বলেছিলাম এ সময়ে উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে ফেলি, তখনও সন্তু লারমা রাজি হননি। তখনও সন্তু লারমা বলেছিলেন আমরা আদিবাসী নই, আমরা উপজাতি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে প্রচলিত উপজাতি শব্দটি বহাল রাখা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার আরো বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশিষ রায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অফিসিয়ালি লিখেছেন, বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। কিছু জনগোষ্ঠী আছে উপজাতি। তাহলে এখন কেন আদিবাসী দাবিতে সংগ্রাম-সংঘর্ষের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে? এটি কোন দেশের ষড়যন্ত্রের আলামত? সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেছেন, এখানে আদিবাসী আছে কি নেই গবেষণার দরকার, গবেষণায় প্রমাণ হলে আদিবাসী হবে, না হলে নেই। কিন্তু এ নিয়ে সংঘর্ষ, মারামারি হবে কেন ?

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিজেদের আদিবাসী বলে মনে করে না। প্রকাশ্যতঃ পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ইউপিডিএফ নামক অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সমর্থকরা আদিবাসী দিবস পালনের ঘোর বিরোধী। তারা জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়- যা এম এন লারমার দাবির কাছাকাছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, ৯ আগষ্ট “বিশ্ব আদিবাসী দিবস” উদযাপন নিয়ে পাহাড়ে ধুম্রজাল তৈরি হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে এ দিবসটি পালনে পাহাড়ের এনজিওগুলো অনেক আগ থেকেই তোড়জোড় শুরু করলেও এবার তেমনটি দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ সমর্থিত “গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম” আদিবাসী দিবস পালনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। শুধু তাই নয়, সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসী দিবস বিরোধী জনমত সংঘটিত করা হচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, জনসংহতি সমিতির প্রধান সন্তু লারমার নেপথ্য সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জাতি-গোষ্ঠী আদিবাসী দিবস পালনের নাম করে সরকার ও বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর কাছ থেকে ব্যাপক অর্থ পেয়ে থাকে এবং এ অর্থের সামান্য একটি অংশ দিয়ে র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হয়, বাকি অর্থ তারা নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা এবং সন্তু গ্রুপের জন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করে।
বান্দরবানের প্রয়াত বোমাং রাজা ২০১০ সালে চ্যানেল আইয়ের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তারা আদিবাসীও নয়, স্থানীয়ও নয়। তারা মিয়ানমার থেকে এখানে এসেছিলেন।

ঐতিহাসিক বিচারে বাংলাদেশে আদিবাসিন্দা বা ভূমিপুত্র বা স্বদেশজাত বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মূল স্রোতধারা বাঙালী ও তাদের পূর্বপুরুষগণ। নৃবিজ্ঞানের আধুনিক আবিষ্কারও সে কথা প্রমাণ করছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ.) জান্নাত থেকে দুনিয়াতে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন শ্রীলঙ্কায়। ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) থেকে আমাদের এই মানব জাতির শুরু। কিন্তু হযরত নূহ (আ.)-এর সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে এক মহাপ্লাবন ঘটেছিল। এই মহাপ্লাবনে দুনিয়ার সকল কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ জীবিত ছিল না, শুধু নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণ করেছিলেন ৮০ জন নূহের ভক্ত; এই ৮০ জন থেকেই মানব জাতির আবার নতুন যাত্রা।”এই নতুন যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের মধ্যে ছিলেন হযরত নূহের এক পুত্র; নাম তার ‘হাম’। নূহ তার পুত্র হামকে বললেন, ‘তুমি মানব বসতি স্থাপনের জন্যে চলে যাও পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে’। পিতার নির্দেশ পেয়ে হাম চলে এলেন আমাদের এশিয়া মহাদেশের কাছাকাছি। সেখানে এসে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দকে পাঠালেন ভারতের দিকে। অনেকে মনে করেন, হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করে। সে হিসাবে বাঙালির আদি পুরুষ হচ্ছেন ‘বঙ্গ’।” প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড) থেকে ছোট্ট আর একটি উদ্ধৃতি : ‘ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ শব্দের সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া গিয়াছে। … যে সময়ে ঐতরের ব্রাহ্মণে বা আরণ্যকে আমরা বঙ্গ অথবা পুণ্ড্রজাতির উল্লেখ দেখিতে পাই সে সময়ে অঙ্গে, বঙ্গে অথবা মগধে আর্য্য জাতির বাস ছিল না।’ পবিত্র ঋগ্বেদে একইভাবে এই অঞ্চলে বঙ্গ নামে জাতির উল্লেখ আছে এবং এইসব কম-বেশি তিন হাজার বছর আগের কথা।’ মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচিত “Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature ” নামক অপ্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেয়া যায় : ‘বাংলার ইতিহাস এখনও এত পরিষ্কার হয় নাই যে কেহ নিশ্চয় বলিতে পারেন বাংলা Egypt হইতে প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা Ninevah ও Babylon হইতেও প্রাচীন অথবা নূতন। বাঙ্গালা চীন হইতেও প্রাচীন অথবা নতুন। যখন আর্য্যগণ মধ্য এশিয়া হইতে পাঞ্জাবে আসিয়া উপনীত হন, তখনও বাংলা সভ্য ছিল। আর্য্যগণ আপনাদের বসতি বিস্তার করিয়া যখন এলাহাবাদ পর্যন্ত উপস্থিত হন, বাংলার সভ্যতায় ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহারা বাঙালিকে ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন।’ মেগাস্থিনিস ও টলেমি প্রমুখ ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদদের বর্ণনায় ভারতবর্ষে শক্তিশালী গঙ্গরিড়হী রাজ্যের কথা বলা হয়েছে তার অবস্থান আজকের বাংলাদেশে। যার বিশাল হস্তিবাহিনীর কথা শুনে ভয় পেয়েছিলেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার। রামায়নে উল্লিখিত মহাবালী রাজাকে ঐতিহাসিকগণ প্রাচীন বাংলার কোনো পরাক্রমশালী রাজা বলে শনাক্ত করেছেন।

নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত নৌকা দুটির আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর বলে তারা মনে করেন। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। তার চেয়েও প্রাচীন উয়ারী বটেশ্বরের সভ্যতাকে নৃবিজ্ঞানীগণ মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সমসাময়িক বলে দাবি করেন। প্রাচীন বাংলার স্বীকৃত সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু সে বৌদ্ধরা চাকমা ছিলেন না। ছিলেন বাঙালি। শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল বাঙালি ছিলেন। বাঙালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তাদের পাণ্ডিত্বে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সুদুর চীন পর্যন্ত আলো ছড়িয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন পুস্তিকা চর্যাপদও আবিস্কৃত হযেছে নেপালের রাজসভায়। উল্লেখ্য, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধগান।

অন্যদিকে লালমনিরহাটের মজদের আড়ায় ৬৯ হিজরীতে নির্মিত মসজিদের শিলালিপি পাওয়া গেছে। এমনকি খোদ পার্বত্য চট্টগ্রামও প্রাচীন বাংলার হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় বাঙালিরা এ অঞ্চলে বসবাস করত। কিন্তু বৈরী ভূপ্রকৃতি, খাদ্যাভাস, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন প্রভৃতি কারণে বেশিরভাগ বাঙালি সেখানে বসবাস করতে না পেরে সমতলের দিকে সরে আসে। এ সকল ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা প্রমাণ করে বাংলাদেশের ভূমিপুত্র বা আদিবাসিন্দা বা আদিবাসী কোনো চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো, হাজং, ত্রিপুরা উপজাতি নয়,বরং বাঙালি।
Email: palash74@gmsil.com

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

পূর্ণাঙ্গ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি

পার্বত্য শান্তিচুক্তি

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খন্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন:

(ক) সাধারণ
১) উভয়পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করিয়া এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এ অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন;
২) উভয়পক্ষ এ চুক্তির আওতায় যথাশিগগির ইহার বিভিন্ন ধারায় বিবৃত ঐক্যমত্য ও পালনীয় দায়িত্ব অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন, বিধানাবলী, রীতিসমূহ প্রণয়ন, পরিবর্তন, সংশোধন ও সংযোজন আইন মোতাবেক করা হইবে বলিয়া স্থিরীকৃত করিয়াছেন;
৩) এই চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিবীক্ষণ করিবার লক্ষ্যে নিম্নে বর্ণীত সদস্য সমন্বয়ে একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হইবে;
ক) প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য : আহ্বায়ক
খ) এই চুক্তির আওতায় গঠিত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান : সদস্য
গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি : সদস্য
৪) এই চুক্তি উভয়পক্ষের তরফ হইতে সম্পাদিত ও সহি করার তারিখ হইতে বলবৎ হইবে। বলবৎ হইবার তারিখ হইতে এই চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ হইতে সম্পাদনীয় সকল পদক্ষেপ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই চুক্তি বলবৎ থাকিবে।

(খ) পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ/পার্বত্য জেলা পরিষদ
উভয়পক্ষ এই চুক্তি বলবৎ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ (রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, বান্দরবন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯) এবং-এর বিভিন্ন ধারাসমূহের নিম্নে বর্ণীত পরিবর্তন, সংশোধন, সংযোজন ও অবলোপন করার বিষয়ে ও লক্ষ্যে একমত হইয়াছেন:
১) পরিষদের আইনে বিভিন্ন ধারায় ব্যবহৃত ‘উপজাতি’ শব্দটি বলবৎ থাকিবে।
২) ‘পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ’ এর নাম সংশোধন করিয়া তদপরিবর্তে এই পরিষদ ‘পার্বত্য জেলা পরিষদ’ নামে অভিহিত হইবে।
৩) ‘অ-উপজাতীয় স্থায়ী বাসিন্দা’ বলিতে যিনি উপজাতীয় নহেন এবং যাহার পার্বত্য জেলায় বৈধ জায়গা-জমি আছে এবং যিনি পার্বত্য জেলায় সুনির্দিষ্ট ঠিকানায় সাধারণতঃ বসবাস করেন তাহাকে বুঝাইবে।
৪) (ক) প্রতিটি পার্বত্য জেলা পরিষদে মহিলাদের জন্যে ৩ (তিন) টি আসন থাকিবে। এসব আসনের এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয়দের জন্যে হইবে।
(খ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা ১, ২, ৩ ও ৪ মূল আইন মোতাবেক বলবৎ থাকিবে।
(গ) ৪ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৫)-এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘ডেপুটি কমিশনার’ এবং ‘ডেপুটি কমিশনারের’ শব্দগুলি পরিবর্তে যথাক্রমে ‘সার্কেল চীফ’ এবং ‘সার্কেল চীফের’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপিত হইবে।
(ঘ) ৪ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে ‘কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় কিনা এবং হইলে তিনি কোন সম্প্রদায়ের সদস্য তাহা সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান/পৌর সভার চেয়ারম্যান কর্তৃক প্রদত্ত সার্টিফিকেট দাখিল সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের চীফ স্থির করিবেন এবং এতদসম্পর্কে সার্কেল চীফের নিকট হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকট ব্যতীত কোন ব্যক্তি অ-উপজাতীয় হিসাবে কোন অ-উপজাতীয় সদস্য পদের জন্যে প্রার্থী হইতে পারিবেন না।
৫) ৭ নম্বর ধারায় বর্ণীত আছে যে, চেয়ারম্যান বা কোন সদস্য পদে নির্বাচিত ব্যক্তি তাহার কার্যক্রম গ্রহণের পূর্বে চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন। ইহা সংশোধন করিয়া ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার’-এর পরিবর্তে ‘হাই কোর্ট ডিভিশনের কোন বিচারপতি’ কর্তৃক সদস্যরা শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা করিবেন-অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে।
৬) ৮ নম্বর ধারার চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনারের নিকট’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘নির্বাচন বিধি অনুসারে’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৭) ১০ নম্বর ধারার দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘তিন বৎসর’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘পাঁচ বৎসর’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
৮) ১৪ নম্বর ধারায় চেয়ারম্যানের পদ কোন কারণে শূন্য হইলে বা তাহার অনুপস্থিতিতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
৯) বিদ্যমান ১৭নং ধারা নিম্নে উল্লেখিত বাক্যগুলি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইবে: আইনের আওতায় কোন ব্যক্তি ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারিবেন, যদি তিনি- (১) বাংলাদেশের নাগরিক হন; (২) তাহার বয়স ১৮ বৎসরের কম না হয়; (৩) কোন উপযুক্ত আদালত তাহাকে মানসিকভাবে অসুস্থ ঘোষণা না করিয়া থাকেন; (৪) তিনি পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হন।
১০) ২০ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারায় ‘নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ’ শব্দগুলি স্বতন্ত্রভাবে সংযোজন করা হইবে।
১১) ২৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এ পরিষদের সকল সভায় চেয়ারম্যান এবং তাহার অনুপস্থিতিতে অন্যান্য সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত একজন উপজাতীয় সদস্য সভাপতিত্ব করিবেন বলিয়া বিধান থাকিবে।
১২) যেহেতু খাগড়াছড়ি জেলার সমস্ত অঞ্চল মং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত নহে, সেহেতু খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার আইনে ২৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত ‘খাগড়াছড়ি মং চীফ’-এর পরিবর্তে ‘মং সার্কেলের চীফ এবং চাকমা সার্কেলের চীফ’ শব্দগুলি প্রতিস্থাপন করা হইবে। অনুরূপভাবে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফেরও উপস্থিত থাকার সুযোগ রাখা হইবে। একইভাবে বান্দরবন জেলা পরিষদের সভায় বোমাং সার্কেলের চীফ ইচ্ছা করিলে বা আমন্ত্রিত হইলে পরিষদের সভায় যোগদান করিতে পারিবেন বলিয়া বিধান রাখা হইবে।
১৩) ৩১ নম্বর উপ-ধারা (১) ও উপ-ধারা (২) এ পরিষদে সরকারের উপ-সচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সচিব হিসাবে থাকিবেন এবং এই পদে উপজাতীয় কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৪) (ক) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এ পরিষদের কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত পরিষদ সরকারের অনুমোদনক্রমে, বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারির পদ সৃষ্টি করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
(খ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে প্রণয়ন করা হইবে ঃ ‘পরিষদ প্রবিধান অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদে কর্মচারী নিয়োগ করিতে পারিবেন এবং তাহাদেরকে বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ বা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে’।
(গ) ৩২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ পরিষদের অন্যান্য পদে সরকার পরিষদের পরামর্শক্রমে বিধি অনুযায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ করিতে পারিবে এবং এই সকল কর্মকর্তাকে সরকার অন্যত্র বদলি, সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত, অপসারণ অথবা অন্য কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া বিধান থাকিবে।
১৫) ৩৩ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এ বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখ থাকিবে।
১৬) ৩৬ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) এর তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অন্য কোন প্রকার’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
১৭) (ক) ৩৭ নম্বর ধারার (১) উপ-ধারার চতুর্থতঃ এর মূল আইন বলবৎ থাকিবে।
(খ) ৩৭ নম্বর ধারার (২) উপ-ধারা (ঘ)-তে বিধি অনুযায়ী হইবে বলিয়া উল্লেখিত হইবে।
১৮) ৩৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) বাতিল করা হইবে এবং উপ-ধারা (৪) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে ঃ কোন অর্থ-বৎসর শেষ হইবার পূর্বে যে কোন সময় সেই অর্থ-বৎসরের জন্যে, প্রয়োজন হইলে, একটি বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন করা যাইবে।
১৯) ৪২ নম্বর ধারার নিম্নোক্ত উপ-ধারা সংযোজন করা হইবে: পরিষদ সরকার হইতে প্রাপ্য অর্থে হস্তান্তরিত বিষয়সমূহের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করিতে পারিবে, এবং জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত সকল উন্নয়ন কার্যক্রম পরিষদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করিবে।
২০) ৪৫ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকার’ শব্দটির পরিবর্তে ‘পরিষদ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২১) ৫০, ৫১ ও ৫২ নম্বর ধারাগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে নিম্নোক্ত ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্যের সহিত পরিষদের কার্যকলাপের সামঞ্জস্য সাধনের নিশ্চয়তা বিধানকল্পে সরকার প্রয়োজনে পরিষদকে পরামর্শ প্রদান বা অনুশাসন করিতে পারিবে। সরকার যদি নিশ্চিতভাবে এইরূপ প্রমাণ লাভ করিয়া থাকে যে, পরিষদ বা পরিষদের পক্ষে কৃত বা প্রস্তাবিত কোন কাজ-কর্ম আইনের সহিত সংগতিপূর্ণ নহে অথবা জনস্বার্থের পরিপন্থী তাহা হইলে সরকার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরিষদের নিকট হইতে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাহিতে পারিবে এবং পরামর্শ বা নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।
২২) ৫৩ ধারার (৩) উপ-ধারার ‘বাতিল থাকার মেয়াদ শেষ হইলে’ শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘এই আইন’ শব্দটির পূর্বে ‘পরিষদ বাতিল হইলে নব্বই দিনের মধ্যে’ শব্দগুলি সন্নিবেশ করা হইবে।
২৩) ৬১ নম্বর ধারার তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের’ শব্দটির পরিবর্তে ‘মন্ত্রণালয়ের’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৪) (ক) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে : আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদনিম্ন স্তরের সকল সদস্য প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং পরিষদ তাহাদের বদলি ও প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে তাহাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলার উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার বজায় রাখিতে হইবে।
(খ) ৬২ নম্বর ধারার উপ-ধারা (৩) এর দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত আপাততঃ বলবৎ অন্য সকল আইনের বিধান সাপেক্ষে শব্দগুলি বাতিল করিয়া তদপরিবর্তে ‘যথা আইন ও বিধি অনুযায়ী’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হইবে।
২৫) ৬৩ নম্বর ধারার তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সহায়তা দান করা’ শব্দগুলি বলবৎ থাকিবে।
২৬) ৬৪ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারাটি প্রণয়ন করা হইবে :
(ক) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলার এলাকাধীন বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোন জায়গা-জমি পরিষদের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে ইজারা প্রদানসহ বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, রক্ষিত (Reserved বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্প কারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হইবে না।
(খ) আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সাথে আলোচনা ও ইহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না।
(গ) পরিষদ হেডম্যান, চেইনম্যান, আমিন, সার্ভেয়ার, কানুনগো ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)দের কার্যাদি তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবে।
(ঘ) কাপ্তাই হ্রদের জলে ভাষা (Fringe Land) জমি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জমির মূল মালিকদেরকে বন্দোবস্ত দেয়া হইবে।
২৭) ৬৫ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে। আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, জেলার ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের দায়িত্ব পরিষদের হস্তে ন্যস্ত থাকিবে এবং জেলায় আদায়কৃত উক্ত কর পরিষদের তহবিলে থাকিবে।
২৮) ৬৭ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পরিষদে এবং সরকারী কর্তৃপক্ষের কার্যাবলীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার বা পরিষদ নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করিবে এবং পরিষদ ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে কাজের সমন্বয় বিধান করা যাইবে।
২৯) ৬৮ নম্বর ধারার উপ-ধারা (১) সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই উপ-ধারা প্রণয়ন করা হইবে : এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে বিধি প্রণয়ন করিতে পারিবে এবং কোন বিধি প্রণীত হওয়ার পরেও উক্ত বিধি পুনর্বিবেচনার্থে পরিষদ কর্তৃক সরকারের নিকট আবেদন করিবার বিশেষ অধিকার থাকিবে।
৩০) (ক) ৬৯ ধারার উপ-ধারা (১) এর প্রথম ও দ্বিতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে’ শব্দগুলি বিলুপ্ত এবং তৃতীয় পংক্তিতে অবস্থিত ‘করিতে পারিবে’ এই শব্দগুলির পরে নিম্নোক্ত অংশটুকু সন্নিবেশ করা হইবে ঃ তবে শর্ত থাকে যে, প্রণীত প্রবিধানের কোন অংশ সম্পর্কে সরকার যদি মতভিন্নতা পোষণ করে তাহা হইলে সরকার উক্ত প্রবিধান সংশোধনের জন্য পরামর্শ দিতে বা অনুশাসন করিতে পারিবে।
(খ) ৬৯ নম্বর ধারার উপ-ধারা (২) এর (হ) এ উল্লেখিত ‘পরিষদের কোন কর্মকর্তাকে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা অর্পণ’ এই শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩১) ৭০ নম্বর ধারা বিলুপ্ত করা হইবে।
৩২) ৭৯ নম্বর ধারা সংশোধন করিয়া নিম্নোক্তভাবে এই ধারা প্রণয়ন করা হইবে : পার্বত্য জেলায় প্রযোজ্য জাতীয় সংসদ বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ গৃহীত কোন আইন পরিষদের বিবেচনায় উক্ত জেলার জন্য কষ্টকর হইলে বা উপজাতীয়দের জন্যে আপত্তিকর হইলে পরিষদ উহা কষ্টকর বা আপত্তিকর হওয়ার কারণ ব্যক্ত করিয়া আইনটির সংশোধন বা প্রয়োগ শিথিল করিবার জন্যে সরকারের নিকট লিখিত আবেদন পেশ করিতে পারিবে এবং সরকার এই আবেদন অনুযায়ী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারিবে।
৩৩) (ক) প্রথম তফসিল বর্ণীত পরিষদের কার্যাবলীর ১ নম্বরে ‘শৃঙ্খলা’ শব্দটির পরে ‘তত্ত্বাবধান’ শব্দটি সন্নিবেশ করা হইবে।
(খ) পরিষদের কার্যাবলীর ৩ নম্বরে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ সংযোজন করা হইবে: (১) বৃত্তিমূলক শিক্ষা, (২) মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা, (৩) মাধ্যমিক শিক্ষা।
(গ) প্রথম তফসিলে পরিষদের কার্যাবলীর ৬(খ) উপ-ধারায় ‘সংরক্ষিত বা’ শব্দগুলি বিলুপ্ত করা হইবে।
৩৪) পার্বত্য জেলা পরিষদের কার্য ও দায়িত্বাদির মধ্যে নিম্নে উল্লেখিত বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত হইবে ঃ
ক) ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা;
খ) পুলিশ (স্থানীয়);
গ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার;
ঘ) যুব কল্যাণ;
ঙ) পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন;
চ) স্থানীয় পর্যটন;
ছ) পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাষ্ট ও অন্যান্য স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান;
জ) স্থানীয় শিল্প-বাণিজ্যের লাইসেন্স প্রদান;
ঝ) কাপ্তাই হ্রদের জলসম্পদ ব্যতীত অন্যান্য নদী-নালা, খাল-বিলের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সেচ ব্যবস্থা;
ঞ) জন্ম-মৃত্যু ও অন্যান্য পরিসংখ্যান সংরক্ষণ;
ট) মহাজনী কারবার;
ঠ) জুম চাষ।
৩৫) দ্বিতীয় তফসীলে বিবৃত পরিষদ আরোপনীয় কর, রেইট, টোল এবং ফিস-এর মধ্যে নিম্নে বর্ণীত ক্ষেত্র ও উৎসাদি অন্তর্ভুক্ত হইবে:
ক) অযান্ত্রিক যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন ফি;
খ) পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের উপর কর;
গ) ভূমি ও দালান-কোঠার উপর হোল্ডিং কর;
ঘ) গৃহপালিত পশু বিক্রয়ের উপর কর;
ঙ) সামাজিক বিচারের ফিস;
চ) সরকারী ও বেসরকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের উপর হোল্ডিং কর;
ছ) বনজ সম্পদের উপর রয়্যালিটির অংশ বিশেষ;
জ) সিনো, যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদির উপর সম্পূরক কর;
ঝ) খনিজ সম্পদ অন্বেষণ বা নিষ্কর্ষণের উদ্দেশ্যে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত অনুজ্ঞা পত্র বা পাট্টাসমূহ সূত্রে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশ বিশেষ;
ঞ) ব্যবসার উপর কর;
ট) লটারীর উপর কর;
ঠ) মৎস্য ধরার উপর কর।

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ
১) পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করিবার লক্ষ্যে পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, ১৯৮৯ ইং (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন)-এর বিভিন্ন ধারা সংশোধন ও সংযোজন সাপেক্ষে তিন পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদের সমন্বয়ে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হইবে।
২) পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে এই পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন যাহার পদমর্যাদা হইবে একজন প্রতিমন্ত্রীর সমকক্ষ এবং তিনি অবশ্যই উপজাতীয় হইবেন।
৩) চেয়ারম্যানসহ পরিষদ ২২ (বাইশ) জন সদস্য লইয়া গঠন করা হইবে। পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপজাতীয়দের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইবে। পরিষদ ইহার কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করিবেন। পরিষদের গঠন নিম্নরূপ হইবে :
চেয়ারম্যান – ১ জন
সদস্য উপজাতীয় (পুরুষ)- ১২ জন
সদস্য উপজাতীয় মহিলা)- ­ ২ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (পুরুষ)- ৬ জন
সদস্য অ-উপজাতীয় (মহিলা)- ১ জন
উপজাতীয় পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ৫ জন নির্বাচিত হইবেন চাকমা উপজাতি হইতে, ৩ জন মার্মা উপজাতি হইতে, ২ জন ত্রিপুরা উপজাতি হইতে, ১ জন মুরং ও তনচৈঙ্গ্যা উপজাতি হইতে এবং ১ জন লুসাই, বোম, পাংখো, খুমী, চাক ও খিয়াং উপজাতি হইতে।
অ-উপজাতি পুরুষ সদস্যদের মধ্যে হইতে প্রত্যেক জেলা হইতে ২ জন করিয়া নির্বাচিত হইবেন।
উপজাতীয় মহিলা সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকমা উপজাতি হইতে ১ জন এবং অন্যান্য উপজাতি থেকে ১জন নির্বাচিত হইবেন।
৪) পরিষদের মহিলাদের জন্য ৩ (তিন) টি আসন সংরক্ষিত রাখা হইবে। এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) অ-উপজাতীয় হইবে।
৫) পরিষদের সদস্যগণ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হইবেন। তিন পার্বত্য জেলার চেয়ারম্যানগণ পদাধিকারবলে পরিষদের সদস্য হইবেন এবং তাহাদের ভোটাধিকার থাকিবে। পরিষদের সদস্য প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার অনুরূপ হইবে।
৬) পরিষদের মেয়াদ ৫ (পাঁচ) বৎসর হইবে। পরিষদের বাজেট প্রণয়ন ও অনুমোদন, পরিষদ বাতিলকরণ, পরিষদের বিধি প্রণয়ন, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয় ও পদ্ধতি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে প্রদত্ত ও প্রযোজ্য বিষয় ও পদ্ধতির অনুরূপ হইবে।
৭) পরিষদে সরকারের যুগ্মসচিব সমতুল্য একজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা থাকিবেন এবং এই পদে নিযুক্তির জন্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হইবে।
৮) (ক) যদি পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয় তাহা হইলে অন্তরবর্তীকালীন সময়ের জন্য পরিষদের অন্যান্য উপজাতীয় সদস্যগণের মধ্য হইতে একজন তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্যগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হইবেন।
(খ) পরিষদের কোন সদস্যপদ যদি কোন কারণে শূন্য হয় তবে উপ-নির্বাচনের মাধ্যমে তাহা পূরণ করা হইবে।
৯) (ক) পরিষদ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমন্বয় সাধন করাসহ তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন ও উহাদের উপর অর্পিত বিষয়াদি সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে। ইহা ছাড়া অর্পিত বিষয়াদির দায়িত্ব পালনে তিন জেলা পরিষদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কিংবা কোনরূপ অসংগতি পরিলক্ষিত হইলে আঞ্চলিক পরিষদের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলিয়া পরিগণিত হইবে।
(খ) এই পরিষদ পৌরসভাসহ স্থানীয় পরিষদসমূহ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে।
(গ) তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিবে।
(ঘ) পরিষদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ এনজিও’দের কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে।
(ঙ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে।
(চ) পরিষদ ভারী শিল্পের লাইসেন্স প্রদান করিতে পারিবে।
১০) পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, পরিষদের সাধারণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবে। উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার যোগ্য উপজাতীয় প্রার্থীকে অগ্রাধিকার প্রদান করিবেন।
১১) ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন, বিধি ও অধ্যাদেশের সাথে ১৯৮৯ সনের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনের যদি কোন অসংগতি পরিলক্ষিত হয় তবে আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে সেই অসংগতি আইনের মাধ্যমে দূর করা হইবে।
১২) পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতে আঞ্চলিক পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার অন্তরবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করিয়া তাহার উপর পরিষদের প্রদেয় দায়িত্ব দিতে পারিবেন।
১৩) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আইন প্রণয়ন করিতে গেলে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে ও ইহার পরামর্শক্রমে আইন প্রণয়ন করিবেন। তিনটি পার্বত্য জেলার উন্নয়ন ও উপজাতীয় জনগণের কল্যাণের পথে বিরূপ ফল হইতে পারে এইরূপ আইনের পরিবর্তন বা নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে পরিষদ সরকারের নিকট আবেদন অথবা সুপারিশমালা পেশ করিতে পারিবেন।
১৪) নিম্নোক্ত উৎস হইতে পরিষদের তহবিল গঠন হইবে:
(ক) জেলা পরিষদের তহবিল হইতে প্রাপ্ত অর্থ;
(খ) পরিষদের উপর ন্যস্ত এবং তৎকর্তৃক পরিচালিত সকল সম্পত্তি হইতে প্রাপ্ত অর্থ বা মুনাফা;
(গ) সরকার বা অন্যান্য কর্তৃৃপক্ষের ঋণ ও অনুদান;
(ঘ) কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান;
(ঙ) পরিষদের অর্থ বিনিয়োগ হইতে মুনাফা;
(চ) পরিষদ কর্তৃক প্রাপ্ত যে কোন অর্থ;
(ছ) সরকারের নির্দেশে পরিষদের উপর ন্যস্ত অন্যান্য আয়ের উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ।

(ঘ) পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও অন্যান্য বিষয়াবলী
পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা পুনঃস্থাপন এবং এই লক্ষ্যে পুনর্বাসন, সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কার্য এবং বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ নিম্নে বর্ণীত অবস্থানে পৌঁছিয়াছেন এবং কার্যক্রম গ্রহণে একমত হইয়াছেন:
১) ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থানরত উপজাতীয় শরণার্থীদের দেশে ফিরাইয়া আনার লক্ষ্যে সরকার ও উপজাতীয় শরণার্থী নেতৃবৃন্দের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় ৯ মার্চ ’৯৭ ইং তারিখে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ২৮ মার্চ ’৯৭ ইং হইতে উপজাতীয় শরণার্থীগণ দেশে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকিবে এবং এই লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির পক্ষ হইতে সম্ভাব্য সব রকম সহযোগিতা প্রদান করা হইবে। তিন পার্বত্য জেলার আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ করিয়া একটি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।
২) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন এবং উপজাতীয় শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের পর সরকার এই চুক্তি অনুযায়ী গঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনাক্রমে যথাশীঘ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ কাজ শুরু এবং যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতঃ উপজাতীয় জনগণের ভূমি মালিকানা চুড়ান্ত করিয়া তাহাদের ভূমি রেকর্ডভূক্ত ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত করিবেন।
৩) সরকার ভূমিহীন বা দুই একরের কম জমির মালিক উপজাতীয় পরিবারের ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করিতে পরিবার প্রতি দুই একর জমি স্থানীয় এলাকায় জমির লভ্যতা সাপেক্ষে বন্দোবস্ত দেওয়া নিশ্চিত করিবেন। যদি প্রয়োজন মত জমি পাওয়া না যায় তাহা হইলে সেই ক্ষেত্রে টিলা জমির (গ্রোভল্যান্ড) ব্যবস্থা করা হইবে।
৪) জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলে ভাসা জমি)-এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।
৫) এই কমিশন নিম্নোক্ত সদস্যদের লইয়া গঠন করা হইবে :
(ক) অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি;
খ) সার্কেল চীফ (সংশ্লিষ্ট);
গ) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি;
ঘ) বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত কমিশনার;
ঙ) জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সংশ্লিষ্ট)।
৬) (ক) কমিশনের মেয়াদ তিন বছর হইবে। তবে আঞ্চলিক পরিষদের সাথে পরামর্শক্রমে উহার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাইবে।
(খ) কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন।
৭) যে উপজাতীয় শরণার্থীরা সরকারের সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন অথচ বিবদমান পরিস্থিতির কারণে ঋণকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই সেই ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
৮) রাবার চাষের ও অন্যান্য জমি বরাদ্ধ ঃ যে সকল অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিদের রাবার বা অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য জমি বরাদ্দ করা হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে যাহারা গত দশ বছরের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ করেন নাই বা জমি সঠিক ব্যবহার করেন নাই সে সকল জমি বন্দোবস্ত বাতিল করা হইবে।
৯) সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করিবেন। এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করিবেন। এবং সরকার এই উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করিবেন। সরকার এই অঞ্চলের পরিবেশ বিবেচনায় রাখিয়া দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে উৎসাহ যোগাইবেন।
১০) কোটা সংরক্ষণ ও বৃত্তি প্রদান: চাকরি ও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সমপর্যায়ে না পৌঁছা পর্যন্ত সরকার উপজাতীয়দের জন্যে সরকারী চাকরি ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা বহাল রাখিবেন। উপরোক্ত লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য সরকার অধিক সংখ্যক বৃত্তি প্রদান করিবেন। বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় বৃত্তি প্রদান করিবেন।
১১) উপজাতীয় কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা বজায় রাখার জন্য সরকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ সচেষ্ট থাকিবেন। সরকার উপজাতীয় সংস্কৃতির কর্মকান্ডকে জাতীয় পর্যায়ে বিকশিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা করিবেন।
১২) জনসংহতি সমিতি ইহার সশস্ত্র সদস্যসহ সকল সদস্যের তালিকা এবং ইহার আওতাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিবরণী এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করিবেন।
১৩) সরকার ও জনসংহতি সমিতি যৌথভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমাদানের জন্য দিন, তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করিবেন। জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত সদস্যদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমাদানের জন্য দিন তারিখ ও স্থান নির্ধারণ করার জন্য তালিকা অনুযায়ী জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারবর্গের স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের জন্যে সব রকমের নিরাপত্তা প্রদান করা হইবে।
১৪) নির্ধারিত তারিখে যে সকল সদস্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিবেন সরকার তাহাদের প্রতি ক্ষমা ঘোষণা করিবেন। যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা আছে সরকার ঐ সকল মামলা প্রত্যাহার করিয়া নিবেন।
১৫) নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে কেহ অস্ত্র জমা দিতে ব্যর্থ হইলে সরকার তাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিবেন।
১৬) জনসংহতি সমিতির সকল সদস্য স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর তাহাদেরকে এবং জনসংহতি সমিতির কার্যকলাপের সাথে জড়িত স্থায়ী বাসিন্দাদেরকেও সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হইবে।
(ক) জনসংহতি সমিতির প্রত্যাবর্তনকারী সকল সদস্যকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পরিবার প্রতি এককালীন ৫০,০০০/- টাকা প্রদান করা হইবে।
(খ) জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সদস্যসহ অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে যাহাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া জারি অথবা অনুপস্থিতিকালীন সময়ে বিচারে শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে, অস্ত্রসমর্পন ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর যথাশীঘ্র সম্ভব তাহাদের বিরুদ্ধে সকল মামলা, গ্রেফতারী পরোয়ানা, হুলিয়া প্রত্যাহার করা হইবে এবং অনুপস্থিতকালীন সময়ে প্রদত্ত সাজা মওকুফ করা হইবে। জনসংহতি সমিতির কোন সদস্য জেলে আটক থাকিলে তাহাকেও মুক্তি দেওয়া হইবে।
(গ) অনুরূপভাবে অস্ত্র সমর্পণ ও স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তনের পর কেবলমাত্র জনসংহতি সমিতির সদস্য ছিলেন কারণে কাহারো বিরুদ্ধে মামলা দায়ের বা শাস্তি প্রদান বা গ্রেফতার করা যাইবে না।
(ঘ) জনসংহতি সমিতির যে সকল সদস্য সরকারের বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা হইতে ঋণ গ্রহণ করিয়াছেন কিন্তু বিবদমান পরিস্থিতির জন্য গৃহীত ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারেন নাই তাহাদের উক্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হইবে।
(ঙ) প্রত্যাগত জনসংহতি সমিতির সদস্যদের মধ্যে যাহারা পূর্বে সরকার বা সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত ছিলেন তাহাদেরকে স্ব-স্ব পদে পুনর্বহাল করা হইবে এবং জনসংহতি সমিতির সদস্য ও তাহাদের পরিবারের সদস্যদের যোগ্যতা অনুসারে চাকরিতে নিয়োগ করা হইবে। এইক্ষেত্রে তাহাদের বয়স শিথিল সংক্রান্ত সরকারী নীতিমালা অনুসরণ করা হইবে।
(চ) জনসংহতি সমিতির সদস্যদের কুটির শিল্প ও ফলের বাগান প্রভৃতি আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের সহায়তার জন্যে সহজশর্তে ব্যাংক ঋণ গ্রহণের অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে।
(ছ) জনসংহতি সমিতির সদস্যগণের ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হইবে এবং তাহাদের বৈদেশিক বোর্ড ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হইতে প্রাপ্ত সার্টিফিকেট বৈধ বলিয়া গণ্য করা হইবে।
১৭) (ক) সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে চুক্তি সই ও সম্পাদনের পর এবং জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরত আসার সাথে সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলী কদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া হইবে এবং এই লক্ষ্যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হইবে। আইন-শৃঙ্খলা অবনতির ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে এবং এই জাতীয় অন্যান্য কাজে দেশের সকল এলাকার ন্যায় প্রয়োজনীয় যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণে বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীনে সেনাবাহিনীকে নিয়োগ করা যাইবে। এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন বা সময় অনুযায়ী সহায়তা লাভের উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক পরিষদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ করিতে পারিবেন।
(খ) সামরিক ও আধা-সামারিক বাহিনীর ক্যাম্প ও সেনানিবাস কর্তৃক পরিত্যক্ত জায়গা-জমি প্রকৃত মালিকের নিকট অথবা পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করা হইবে।
১৮) পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সরকারী, আধা-সরকারী, পরিষদীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণীর কর্মচারী পদে উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের নিয়োগ করা হইবে। তবে কোন পদে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীদের মধ্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি না থাকিলে সরকার হইতে প্রেষণে অথবা নির্দিষ্ট সময় মেয়াদে উক্ত পদে নিয়োগ করা যাইবে।
১৯) উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে। এই মন্ত্রণালয়কে সহায়তা করিবার জন্য নিম্নে বর্ণিত উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হইবে।
(ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
(খ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ
(গ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঘ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ
(ঙ) চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি, বান্দরবন পার্বত্য জেলা পরিষদ
(চ) সাংসদ, রাঙ্গামাটি
(ছ) সাংসদ, খাগড়াছড়ি
(জ) সাংসদ, বান্দরবন
(ঝ) চাকমা রাজা
(ঞ) বোমাং রাজা
(ট) মং রাজা
(ঠ) তিন পার্বত্য জেলা হইতে সরকার কর্তৃক মনোনীত পার্বত্য এলাকার স্থায়ী অধিবাসী তিনজন অ-উপজাতীয় সদস্য।
এই চুক্তি উপরোক্তভাবে বাংলা ভাষায় প্রণীত এবং ঢাকায় ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪০৪ সাল মোতাবেক ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ইং তারিখে সম্পাদিত ও সইকৃত।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে               পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসিদের পক্ষে
(আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্)                               (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা)
আহ্বায়ক                                                            সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি                 পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।
বাংলাদেশ সরকার।