শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তার যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত জরুরি

মেহেদী হাসান পলাশ |

আজ পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২১ বছরপূর্তি। প্রতিবছর তিন পার্বত্য জেলায় নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে ঢাকায় সভা সেমিনার হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়, টেলিভিশনে টকশোতে আলোচনা হয়। বস্তুত এ সকল আলোচনার মূল লক্ষ্য থাকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা ও নিরূপণ করা।

শান্তিচুক্তি একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক সরকারের কৃতীত্ব নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। তিনি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করে তার দলের সাথে এই আলোচনার জন্য তাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ তার স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারার কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারের, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তথা জেএসএস ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা গত ২৯ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক সাংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে এক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান হাজির করে সরকারের দাবি, বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করে ফেলেছে। বাকি অল্প কিছু ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। শান্তিচুক্তিতে ৪ খণ্ডে সর্বমোট ৭২টি ধারা রয়েছে। সরকারের দাবি মতে, এর মধ্যে মোট ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জেএসএস সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, সরকার শান্তিচুক্তির মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়াও ১৩টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করেছে এবং ৩৪টি ধারা অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তিনি আরো দাবি করেছে, শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহের দুই তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত রয়েছে। একই সাথে সন্তু লারমা আরো দাবি করে থাকেন, লিখিত শান্তিচুক্তির পাশাপাশি এর একটি অলিখিত রূপ বা প্রতিশ্রুতি ছিল। সন্তু লারমা লিখিত শান্তিচুক্তির চেয়েও শান্তিচুক্তির সমঝোতা বা প্রতিশ্রুতি বা অলিখিত রূপ বাস্তবায়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

শান্তিচুক্তির সাফল্য বা সুফল শান্তিচুক্তির ধারা বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধারা বাস্তবায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শান্তিচুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামো, জীবনযাপন, পরিবেশ, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুতায়ন, শান্তি ও স¤প্রীতি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পরিবর্তন। এসব ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উন্নয়ন হয়েছে তা এককথায় অভূতপূর্ব। এককালের পানিশমেন্ট জোন পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ট্যুরিস্ট জোন, এন্টারটেইনমেন্ট জোন- এটাই পার্বত্য চুক্তির অনত্যম বড় সাফল্য। শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এটাই ছিলো। চুক্তির শুরুতে লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে ‌’পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে’ এ চুক্তি। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে সন্দেহ নেই। (এ বিষয়ে আমার পূর্বের লেখা ‘ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক: পুনর্মূল্যায়ন জরুরি’ তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ নীল রঙিন শিরোনামে ক্লিক করে পরে নিতে পারেন।)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচ্য, সেটা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ২১ বছরের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনকারী সরকার প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও শান্তিচুক্তির কিছু ধারা অবাস্তবায়িত, বাস্তবায়নাধীন বা আংশিক বাস্তবায়িত কেন থাকল? প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কি শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়? আওয়ামী লীগ শাসন আমলের বিগত ১৫ বছরের বিশেষ করে শেষ ৫ বছরের সরকারের কার্যক্রম বক্তৃতা-বিবৃতি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিবৃতি, উদ্যোগ, আন্তরিকতা বিশ্লেষণ করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে মোটেই অনাগ্রহী নয় বরং অত্যন্ত আন্তরিক। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই দীর্ঘ সময়ে শান্তিচুক্তি কেন পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হলো না? এর উত্তর দীর্ঘ ও বহুমুখী, এই লেখায় বিস্তারিতভাবে তা আলোচনা করা সম্ভব নয়। খুব সংক্ষেপে যদি আলোচনা করতে হয় তাহলে বলতে হয়, এই চুক্তিতে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে, সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে, জাতীয় চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ। শান্তিচুক্তিকালে তাড়াহুড়ো, অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণে এই ত্রুটিগুলো রয়ে যায়। মানুষের সৃষ্টি কোনো বিধানই একবারে বা শুরুতেই ত্রুটিমুক্ত করা সম্ভব নয়। এটা সেরূপ একটা ভ্রম। এই অসচেতন ভুলগুলোই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। নিম্নে এ লেখায় সেগুলো ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রথমেই শান্তিচুক্তির মুখোবন্ধের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। আলোচনার সুবিধার্থে অথবা বলার সুবিধার্থে কিংবা রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এ চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালোচুক্তি’, ‘দেশ বিরোধী চুক্তি’- নানা নামে আখ্যা দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে- এই চুক্তির নাম ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালো চুক্তি’- কোনোটিই নয়। সরকারি গেজেট অনুসারে এই চুক্তির নাম বলা হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সহিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি’। সম্পাদনকালীন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নন। তিনি সংসদ সদস্য মাত্র। তাহলে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সাথে জনসংহতি সমিতির চুক্তিকে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি বলে আখ্যা দেয়া কতটা সঠিক হবে? এ ছাড়া শান্তিচুক্তি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস করা হয়নি। যদিও শান্তিচুক্তির আলোকে গঠিত বিভিন্ন আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে, সংশোধিত হয়েছে। শান্তিচুক্তির এটি একটি অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতা।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অপরপক্ষ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ বা এর সভাপতি সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, এমনকি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিও নন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালি, সন্তু লারমা কোনভাবেই তাদের প্রতিনিধি নন। বরং তিনি প্রচণ্ড বাঙালি বিদ্বেষী। বাঙালিদের দাবি, তিনি ত্রিশ হাজার বাঙালি হত্যার নেতৃত্বদানকারী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে চুক্তি করে, সেই চুক্তি বাঙালিদের মেনে নিতে বলা অর্থহীন। কারণ, বাঙালিরা তো তাকে মানেই না। কেবল সন্তু লারমাই নন, পার্বত্য চুক্তিও প্রবলভাবে বাঙালি বিদ্বেষী ও বাঙালি স্বার্থ বিরোধী। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা বলে আখ্যা দিয়ে এখানকার অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালির অবস্থানকে অস্বীকার করা হয়েছে।

যে জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতির জন্য বাঙালি জাতি বহু শতাব্দি সংগ্রাম করেছে, চুক্তিতে সেই বাঙালিদেরকে ‘অউপজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। চুক্তিতে বাঙালির নাগরিকত্ব ও নির্বাচনের অধিকার উপজাতীয় সার্কেল চিফের করুণাধীন করা হয়েছে। এ চুক্তির ফলে সৃষ্ট সরকারি ও স্থানীয় সরকারের শীর্ষ পদে বাঙালিদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য পদেও বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যানুপাতে না করে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা এজন্য করা হয়নি যে, পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আওতায় করা হয়েছে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া উপজাতীয় নাগরিকদেরও এই চুক্তিতে অবহেলা করে সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি চাকমা আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সকল পদ উপজাতীয়দের এবং অন্যান্য পদেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সকল ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও সুবিধায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের দায়িত্ব শুধু উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ একই কারণে বিপুল সংখ্যক বাঙালি উদ্বাস্তু হলেও তাদের এই চুক্তির আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি।

শান্তিবাহিনীর খুনী ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসীদের ক্ষমা করে তাদের ২০ দফা প্যাকেজের আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও তাদের কারণে হতাহত হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাঙালিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি। তাদের স্বজনের হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভূমি কমিশন আইনে শুধু শরণার্থীদের বা বাস্তচ্যুত উপজাতীয়দের জমি প্রত্যার্পনের পরিবর্তে সকল ভূমির বিরোধ নিষ্পত্তি এবং তা মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেয়ায় সেখানকার বাঙালিরা ভূমিহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে উপনীত হয়েছে। এভাবে ছত্রে ছত্রে এই চুক্তিতে বাঙালিদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এমন একটা চুক্তি বাঙালিরা কেন মানবে বা তাদের মানতে বলা হবে? এ চুক্তিতো বাঙালীর আত্মহত্যার দলিল। কোনো মানুষ কি নিজে তার আত্মহত্যার সনদে স্বাক্ষর করতে পারে?

শুধু বাঙালি নয়, সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠিরও প্রতিনিধি নন। তার দল জনসংহতি সমিতি চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করে না বা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠি জনসংহতি সমিতি করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চারটি আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তার একটি। বাকীরা জনসংহতি সমিতির(সন্তু) গ্রুপের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে বা জেএসএসের সাথে চুক্তি করে সন্তু বিরোধী এ সমস্ত উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনকে সেই চুক্তি মেনে নিতে বলা কতটা যুক্তি সঙ্গত তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সাধারণ পাহাড়ি, যারা কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়, কিন্তু হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ইত্যাদির কারণে সন্তু লারমা ও জনসংহতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও সমিতিকে ঘৃণা করে। তাদেরও জনসংহতি সমিতিকে প্রতিষ্ঠাদানকারী সন্তু লারমার সাথে কৃত চুক্তি মেনে নিতে বলা যুক্তিযুক্ত নয়।

হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন, তখন তো চারটি সংগঠন ছিল না। একটি সংগঠন ছিল- জনসংহতি সমিতি। এ কথা ঠিক যে, তখন চারটি আঞ্চলিক সংগঠন ছিল না। কিন্তু জনসংহতি সমিতি সম্পূর্ণভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। কাজেই সরকার যখন জেএসএসের একটি অংশের সাথে সংলাপ করে তার সাথে চুক্তি করেছে, তখন অপর অংশ এর বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ নামে নতুন সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। যারা শান্তিচুক্তির আলাপ ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ছিলেন তারা আরেকটু সতর্ক হলে বিষয়টি এড়ানো যেতো। সন্তু লারমাও এ চুক্তির ব্যাপারে তার দলের প্রতিবাদী অংশের সাথে কোনোরূপ আলোপ-আলোচনা করা, তাদের মতামত নেয়া, তাদের পুনর্বাসনের আওতাভুক্ত করার কাজটি করেনি। কাজেই সন্তু লারমা অস্ত্র সমর্পণ করে পুনর্বাসিত হলেও তার বিরোধী অংশ অস্ত্র সমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে সন্তু লারমা অংশের লোকেরাও সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর পূর্ণ আস্থাশীল হতে না পারায় শান্তিবাহিনীর একাংশকে ভারী ও উন্নত অস্ত্রসহ জঙ্গলে রেখে ভাঙাচোরা অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিবাহিনী অফিসিয়ালি অবলুপ্ত করার ঘোষণা দিলেও কার্যত শান্তিবাহিনী বহাল থাকে। এই দুই অংশের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা শান্তিচুক্তির পর দুই দশকে নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বণ্দ্বে এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, নির্যাতন চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত করেছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পূর্বে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩, বিজিবি ৯৬, পুলিশ ৬৪, আনসার ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে অফিসার ৫ জন, জেসিও ৩ জন, বাকিরা সৈনিক। এছাড়াও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ, ভূমিধস প্রভৃতি কারণে মারা গেছে আরো অনেকে। এর মধ্যে শান্তিচুক্তির পূর্বে শুধু ম্যালেরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬০ জন এবং পরে ৮১ জন মারা গেছে। উভয় কারণে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে শান্তিচুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ৯৬ জন সদস্য মারা গেছে। এর মধ্যে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে মারা গেছে ১১ জন, ৫ জন রাঙামাটির ভূমিধসে।

শান্তিচুক্তির পূর্বে নিরাপত্তা বাহিনী ১৬ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে গ্রেনেড ৩৫৯টি, মর্টার ৭০টি, মাইন ১৩টি এবং অন্যান্য গোলাবারুদ সাড়ে ৪ লক্ষ। এক পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পরে ২০০৫ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৭৩০টি অস্ত্র ও ১ লক্ষ ৮৬ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। শান্তিচুক্তির পূর্বে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ২৩৮ জন উপজাতি, ১০৫৭ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৮১ জন উপজাতি ও ৬৮৭ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ২৭৪ জন উপজাতি ও ৪৬৮ জন বাঙালি।

একই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শান্তিচুক্তির পরে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ৪৭৪ জন উপজাতি, ১৮৬ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৬৪৬ জন উপজাতি ও ৬৪২ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ৯১০ জন উপজাতি ও ৩৮৪ জন বাঙালি। এমতাবস্থায় শান্তিচুক্তিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষে সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার সম্ভব হয়নি (আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস ও কৌশলগত ঝুঁকির কথা এখানে বিবেচিত হয়নি)। তবু শান্তিচুক্তির ২১ বছরে সরকার একটি ব্রিগ্রেডসহ ২৪০টি নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর যেসকল ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, ওই সকল এলাকা উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলোর অনেকগুলো বিভিন্ন নামে সন্ত্রাসীরা দখল করেছে। ফলে স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পুনরায় নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানানো হয়েছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একপাক্ষিক বিষয় নয়, দ্বিপাক্ষিক। সন্তু লারমা অফিসিয়ালি শান্তিবাহিনী অবলুপ্ত ঘোষণা করলেও একথা সূর্যের মতো সত্য যে, শান্তিবাহিনী বিদ্যমান এবং এই বাহিনীর হাতে ভয়ানক মারণাস্ত্র রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ করেননি তিনিই আবার সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে শান্তিচুক্তি করেও সন্তু লারমা নিজে এখনো বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় থেকেও তিনি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন করেননি। সরকারকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করার দাবি জানানোর পূর্বে তাকে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ছাড়তে হবে। কেননা, বাংলাদেশের সংবিধানে প্রাদেশিক কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। আঞ্চলিক সংগঠন যদি শান্তিচুক্তি মানতোই তাহলে তাদের মনে জুম্মল্যান্ডের স্বপ্ন কেন? জুম্মল্যান্ডের পতাকা, মানচিত্র, জাতীয় সঙ্গীত, প্রতীক, সেনাবাহিনী কেন?

অনেকেই জানেন, শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। এই রিটে উচ্চ আদালত শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারাকে সংবিধান বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বর্তমানে এই রিটটির আপিল বিভাগে শুনানি চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আদালতের এই অবর্জাভেশনগুলোরও সমাধান হওয়া জরুরি। এ চুক্তিতে যে আঞ্চলিক পরিষদের কথা বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত তাকে সংবিধান ও বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠনের সুযোগ রাখা হয়নি। সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠির জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বিশেষ উপজাতীয় গোষ্ঠিকে নয়। আদালতের রায়ে এ বিষয়েও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কোনো পদ কোনো জাতির জন্য বারিত রাখার সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদগুলো বাঙালিদের জন্য বারিত করা হয়েছে। চুক্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সাব ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদগুলোতে নিয়োগ ও বদলীর দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের হাতে দেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এসব পদে উপজাতীয়দের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ ধারা বাস্তবায়ন তো দূরেরর কথা, এ ধারার আওতায় ইতোমধ্যে মিশ্র পুলিশ সৃষ্টি করে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় পুলিশের আনুগত্য প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসকল কারণেও সরকারের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে।

আজ সময় এসেছে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। শান্তিচুক্তিতে বিদ্যমান অসংঙ্গতি, বৈষম্যমূলক বিধান ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ধারা বজায় রেখে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশে সংবিধান যদি ১৭ বার সংশোধিত হতে পারে তবে শান্তিচুক্তি কেন যুগোপযোগী হতে পারবে না? এমনকি শান্তিচুক্তি দ্বারা গঠিত বিভিন্ন আইন ইতোমধ্যে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। তাহলে শান্তিচুক্তি কেন আপডেইট করা যাবে না? এখানে সংশোধন শব্দটি পরিহার করে আপডেইট শব্দটি ব্যবহার করা হলো যার সুপ্রযুক্ত বাংলা হতে পারে যুগোপযোগীকরণ। সময়ের ব্যবধানে সন্তু লারমা নিজেও কিছু নতুন নতুন দাবি তুলেছেন, অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠিরও কিছু দাবি রয়েছে, বাঙালিদের দাবি রয়েছে। কাজেই সকলের দাবি আলোচনা করে সংবিধানের ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন দাবিগুলো বিবেচনা করে শান্তিচুক্তি যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থেই এই যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, শান্তিচুক্তি ও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? সংক্ষেপে উত্তর, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলেই কি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? উত্তর, কোনোভাবেই নয়। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিই এই শান্তিচুক্তির আওতার বাইরে রয়েছে। বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিকে বাইরে রেখে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? সন্তু লারমার চুক্তি প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু কিম্বা তরু চাকমাকে মেনে চলতে বললে তারা তা কখনোই মানবে না। কারণ তারা কেউ সন্তু লারমাকে মানেন না? অন্যদিকে শান্তিচুক্তি করে সন্তু লারমা পতাকা উড়িয়ে চলবেন, জেএসএস নেতারা সরকারি বিভিন্ন পদ-পদবী অলঙ্কৃত করে সুবিধা ভোগ করবেন আর প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু, জলেয়াদের লোকেরা জঙ্গলে অনিশ্চিত জীবন কাটাবে যে চুক্তিতে সে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সে কারণে শান্তিচুক্তির যুগোপযোগীকরণে এদেরও অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

আমরা আন্তরিকভাবে মনে করি, সরকার যদি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করতে পারে তবে প্রসীত, সুধাসিন্ধু, তরুর সাথে আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়? তারা কী এমন করেছেন যা সন্তু লারমা করেননি? পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসন দাবি? সে তো সংবিধান মেনে চুক্তি করেও সন্তু লারমা দাবি করছে? হয়তো পূর্ণাঙ্গ শব্দটি ব্যবহার করেননি। কাজেই তারা পাপী হলে সন্তু লারমাকে পূণ্যবান ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

দীর্ঘদিন পুলিশ, র‌্যাব দিয়েও যা পারা যায়নি, বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরবনের বনদস্যু, মহেশখালীর জলদস্যুদের সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসনের আওতায় অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সেসব এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। শুধু সুন্দরবন বা মহেশখালী নয়, বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়ন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এমএনপির বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র সন্ত্রাসীর অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উপর জোর দিয়ে বলেছেন, এ সমস্যার সামরিক সমাধান নেই। তাহলে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেএসএসের(সন্তু) বাইরে বিদ্যমান সকল উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন ও তাদের সামরিক শাখার সাথে আলোচনা করে তাদের নায্য দাবিগুলো সংবিধানের আলোকে বিবেচনা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের এ সকল আঞ্চলিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আমার পেশাগত যেসব আলোচনার সুযোগ হয়েছিল তাতে আমি দেখেছি, তারা নিজেরাও সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী এবং আলোচনায় বসলে তাদের নায্য দাবিগুলো বিবেচনা করলে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী দাবিগুলোতে তারাও ছাড় দিতে প্রস্তুত বলেই আমার মনে হয়েছে। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালিদেরকে, তাদের স্বীকৃতি ও দাবিগুলোকেও শান্তিচুক্তির আওতাভুক্ত করে বিদ্যমান শান্তিচুক্তিকে যুগোপযোগী করা সময়ের দাবি। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের স্বার্থে এর কোনো বিকল্পও নেই।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

Yunus

বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত অজস্র হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোন হত্যাকান্ডের নৃসংশতা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোকেও হারমানায়। পাকুয়াখালী ট্রাজেডি এই নৃসংশ গণহত্যাগুলোরই একটি। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ঘটিয়েছিল পার্বত্য ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় পালিয়ে আসতে পেরেছিল মুহাম্মদ ইউনুছ মিয়া নামের এক ভাগ্যবান। সেদিনের সেই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা ইউনুছ মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সৈয়দ ইবনে রহমত।

প্রঃ কি করছিলেন?
উঃ গায়ে জ্বর, শুইয়া আছিলাম।

প্রঃ কতদিন যাবৎ জ্বর? ওষুধপত্র খাচ্ছেন না?
উঃ দুইদিন ধইরা জ্বর। ভাই, ওষুধপাতি খাইয়া কি অইব। জ্বরের লাগি ওষুধ খাইলেই কি আর না খাইলেই কি। এই বাড়ে-এই কমে, ওষুধ খাওন লাগব না, দুই দিন পরে এমনেই সাইরা যাইব।

প্রঃ আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো পাকুয়াখালী হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানা।
উঃ এইসব কইয়া লাভ কি? কতই তো কইলাম। আর্মি, পুলিশ, সিআইডির অফিসার, সাংবাদিক, আরো কতজনের লগে কইছি। কই, কিছুইতো অইল না। এইসব কইয়া আর মনের জ্বালাটা বাড়াইয়া লাভ কি?

প্রঃ আপনারা তো জানতেন যে, পাহাড়ে শান্তিবাহিনী আছে, তারা বাঙালির দেখা মাত্রই গুলি করে। তারপরও পাহাড়ে যাওয়ার সাহস পেলেন কিভাবে?
উঃ ভাই, শখ কইরা কেউ কী আর মরণের সামনে যায়? পেটের দায়ে যাওন লাগে। পাহাড়ে যাওন ছাড়া আর তো বাঁচনের পথ নাই। সামান্য জমি-জমা যা আছে এইডাও তো কোন বছর চাষ কইরা ঘরে তোলা যায় না। কাপ্তাই বান্ধের পানি আইসা ডুবাইয়া দেয়। তাই বাধ্য অইয়াই পাহাড়ে যাওন লাগে। আর পাকুয়াখালীর ঘটনার সময়তো কোন ভয় আছিল না। তখন শান্তিবাহিনীর লগে আমাদের চুক্তি আছিল। আমরা তাদেরকে ১ ফুট (এক ঘনফুট) গাছের বিনিময়ে ৪০/৫০ টাকা কইরা চান্দা দিতাম।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে কখন থেকে টাকার বিনিময়ে গাছ কাটার চুক্তি হয়েছিল?
উঃ পাকুয়াখালীর ঘটনার ৫/৬ বছর আগে একদিন বড় মাহিল্যার তক্তা নজরুল (লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের কারণে তাকে লোকজন তক্তা নজরুল নামে চিনত) আমাদের কইল, পাহাড়ে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহিনীরা আর বাঙালিরে গুলি করব না। কিন্তু তাদেরকে চান্দা দিতে অইব। তারপর থাইক্যা শুরু অইল গাছ কাটা। আগের থাইক্যাই চাকমাদের লগে নজরুল ভাইয়ের বালা সম্পর্ক আছিল। চাকমাদের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে হে যাইত, আবার চাকমারাও হের বাড়ীতে আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তারাই তক্তা নজরুলরে দিয়া চান্দার মাধ্যমে গাছ কাটার খবর দিছিল।

প্রঃ চাঁদা দিয়া যখন গাছ কাটতেন, তখন আপনাদের সাথে শান্তিবাহিনী কেমন আচরণ করত?
উঃ এমনিতে তারা কোন খারাপ আচরণ করত না। তবে তাদের আইন কানুন আছিল খুব কড়া। যেই দিন যা কইতো, তাই করতে অইতো। কেউ কথা না হুনলে মাইর-ধোর করতো, পাহাড়ে যাওন বন্ধ কইরা দিত।

প্রঃ আপনারা যেখানে গাছ কাটতে যেতেন, সেখানকার চাকমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ আমরা যেখানে গাছ কাটতে যাইতাম সেখানে অনেক চাকমা বসবাস করত। এদের কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তবে বেশির ভাগই ছিল আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তারাও আমাদের সাথে গাছ কাটত। স্থানীয় এইসব চাকমাদের লগে আমাদের বালা সম্পর্ক আছিল। তারা আমাদের ঈদ-পরবের সময় বেড়াইতে আইত। আমরাও বিজুর (চাকমাদের বাৎসরিক উৎসব) সময় তাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতাম। অনেক সময় পাহাড়ে কোন গন্ডগোলের ভাব থাকলে তারা আমাদেরকে আগেই জানাইয়া দিত।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে স্থানীয় চাকমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ শান্তিবাহিনীরা স্থানীয় চাকমাদের উপরেও অত্যাচার করতো, ওদের কাছ থাইকয়াও চান্দা নিত। সামান্য ভুল-ত্রুটি অইলে বা তাদের কথামতো না চললে মাইর-ধোর করতো। কতজনরে তো গুলি কইরা মাইরাও ফালাইছে। শান্তিবাহিনীর খাওন-খোরাক অনেক সময় বাজার থাইক্যা কিইন্যা পাহাড়ে গিয়া দিয় আইতে অইতো। তাই স্থানীয় চাকমারা কৌশলে শান্তিবাহিনীর কালেক্টরদেরকে বিপদে ফালাইয়া তাড়ানোর চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মদ-টদ খাওয়াইয়া মাইয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ফালাইতো, আবার কোন কোন সময় টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল লাগাইয়া শান্তিবাহিনীর বড় অফিসারের কাছে নালিশ করতো। এমনও সময় গেছে যখন এক মাসের মধ্যে তিন-চারজন কালেক্টর বদল হইছে।

প্রঃ দুই মাসের চাঁদা বাকি পড়ায় শান্তিবাহিনী ব্যবসায়ীদেরকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না যাওয়ায় তারা ক্ষেপে গিয়ে এই হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল বলে অনেকে মনে করে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
উঃ এইডা একটা ফালতু কথা। ব্যবসায়ীরা পাহাড়েও যায় না। পাহাড়ে গিয়া কখনো চান্দা দেয় না। পাহাড়ে যাই আমরা। কাঠ বলেন, বাঁশ বলেন, তার চান্দা প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় দিয়াই আনতে হইত। কোন দিনের চান্দাই বাকি থাকত না।

প্রঃ ব্যবসায়ীদের কথা বলছি-
উঃ ব্যবসায়ীরা তাদের মাল (কাঠ, বাঁশ) নেওনের সময় রাস্তায় রাস্তায় চান্দা দেয়। চান্দা ছাড়া ১ ফুট গাছ নেওনের ক্ষেমতাও ব্যবসায়ীদে নাই। চান্দা বাকী রাইখ্যা শান্তিবাহিনী গাছ নিতে দিছে এই কথা জীবনেও শুনি নাই। ব্যবসা করতে চাইলে তাদেরকে চান্দা দেওনই লাগবো। আর হেগোর লাইগ্যা আমাদের মতন গরীব মানুষেরে মারব ক্যান্?

প্রঃ এতগুলো মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
উঃ জানি না ভাই। কি জন্য যে মারল, হেইডাই তো কইতে পারি না। ওরা ভাই বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর, তক্তা নজরুলরে পর্যন্ত মাইরা ফালাইল। যে নিজে না খাইয়াও হেগোরে খাওয়াইছে, কত বিপদ থাইক্যা উদ্ধার করছে।

প্রঃ ঘটনার দিন পাহাড়ে গিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?
উঃ ঐদিন আমার পোলাগো মোসলমানির (খৎনা করার) কথা আছিল। তাছাড়া শরীরটাও বেশি বালা আছিলনা। কিন্তু আলাল ভাই (স্ত্রীর বড় ভাই) কইল, পাহাড়ে যাওনের লাগি। একরকম জোরের মধ্যেই আমি আলাল ভাইয়ের লগে রওনা হইলাম। অফিস ছড়া দিয়া পাহাড়ে ঢুকলাম। কেচিং (একটা জায়গার নাম) থাইক্যা সামান্য উপরে একটা দোকান। দোকানে দেখলাম তিনজন শান্তিবাহিনী অস্ত্র নিয়া বইসা আছে। এইডাতে অবশ্য সন্দেহ করি নাই। এই রকমতো মাঝে মধ্যেই দেখতাম। আলাল ভাইয়ের সাথে গ্যানো চাকমার ছোটখাট ব্যবসা আছিল। আলাল ভাই তার জন্য কিছু টাকা নিয়া গেছিল। টাকা দেওনের লাগি আলাল ভাই যখন গ্যানো চাকমার সাথে কথা কইতেছিল তখন কালু চাকমা এবং তার সাথের কয়েকজন আইসা কইল, মিটিং আছে, ভিতরে যাইতে অইব। তখন আলাল ভাই কইল, গ্যানো বদ্দা, তোমার টাকা মিটিং থাইক্যা আসার সময় দিব। কিন্তু গ্যানো চাকমা, টাকাটা তখনই লইতে চাইছিল। কালু চাকমা আলাল ভাইরে কইল, যাওনের সময় দিয়া যাওনের লাইগ্যা।

প্রঃ প্রথম কখন বুঝতে পারলেন যে, কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে?
উঃ কালু চাকমার সাথে কিছুদূর যাইতেই দেখি রাস্তার দুই পাশে চার জন করে মোট আট জন এসএম জি নিয়া বইসা আছে। আমরা কাছে যাওন মাত্রই আমাদেরকে ঘিরে ফালাইল। এই অবস্থা দেইখ্যাই আমার প্রথম মনে অইল যে, আজকে আমাদেরকে মাইরা ফালাইব। পকেট থাইক্যা টাকা পয়সা সব রাইখ্যা কালু চাকমা আর তার লগের একজন আমাদের হাত পিছ-মোড়া কইরা গাছের লতা দিয়া বানল। বান্ধার সময় কইল মিটিংয়ের জায়গা নিয়া বান ছাইড়া দিব। তখন আমি কইলাম ছাইড়াই যখন দিবা, তখন অত শক্ত কইরা বান্ধনের দরকার কী, আমরাতো পালাইতেছি না। আমিও হাত এমন ভাবে রাখলাম যাতে বান বেশি শক্ত না হয়।

প্রঃ আপনাদের বেঁধে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে কি দেখলেন?
উঃ ১৫/২০ মিনিট হাইট্টা ভিতরে যাওনের পর দেখলাম একাটা মেড়া গাছের লগে তক্তা নজরুলসহ ৪ জন বান্ধা। সামনেই অন্যান্য গাছের লগে আরো মানুষ বান্ধা। গুনে দেখলাম আমিসহ ২৯ জন। এলএমজি ও এসএমজি হাতে পাহাড়া দিতেছে ১৯ জন শান্তিবাহিনী। আর লাঠি, দা, কুইচ্যা মারা শিক হাতে আরো ১২ জন চাকমা আছে, এদের মধ্যে কয়েকজনরে আমি চিনি। তারা হল- লাম্পায়া চাকমা, ছিক্কা কারবারী, বলি চাকমা, শান্তিময় চাকমা, বাবুল চাকমা, গুলুক্যা চাকমা, তরুন চাকমা(কালেক্টর), কবির চাকমা, বাশি চাকমা, বিমল চাকমা এবং সমিতি রঞ্জন চাকমা। এক সময় শান্তিবাহিনীর একজন একটা খাতা ও কলম নিয়া আমাদের সবার নাম লিখল এবং কার কাছ থাইক্যা রাস্তায় কত টাকা এবং কি কি জিনিস পত্র রাখা হইছে তা লিখল।

প্রঃ বাঁধা অবস্থা থেকে আপনি পালালেন কিভাবে?
উঃ কিছুক্ষণ পর কালাপাকুইজ্যার ৫ জনরে গাছের থাইক্যা দড়ি খুইল্লা আরো সামনের দিকে লইয়া গেল। তাদের সাথে গেল ২ জন অস্ত্রধারী আর ৩ জন গেল দা, লাঠি, কুইচ্যা মারার শিক নিয়া। ১০/১২ মিনিট পর নজরুল ভাইসহ আরো ৫ জনরে নিয়া গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নজরুল ভাই আর যাইতে চাইতেছে না। তখন একজন তারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া নিয়া গেল। তখনই বুঝলাম যে, লোকজনেরে সামনে নিয়া মাইরা ফালাইতেছে। কারণ নজরুল ভাইরে ঘাড়ে ধরা দূরের কথা. তার লগে গরম অইয়াও চাকমাদেরকে কথা কইতে কোন দিন দেহি নাই। তখন আমি একজনরে কইলাম, দাদা আমি একটু পেশাব করব। উনি এবং আরেক জন আমাকে একটু দূরে নিয়া গেল। পেশাবের ছল কইরা কিছুক্ষণ বইসা থাইক্যা মনে মনে ঠিক করছিলাম খাড়াইয়াই দৌড় দিমু। কিন্তু যখন খাড়াইলাম, তখন ঠাস কইরা বাঁকা একটা বাঁশের লগে মাথাটা বাড়ি লাগল। তখন আমার সাথের শান্তিবাহিনী দুইজন সর্তক হইয়া গেল। আমি মাথা হাতাইতে হাতাইতে আবার আগের জায়গায় আইলাম। আমারে আবার অন্যদের লগে বানল। তখন খুব লুকাইয়া লুকাইয়া আমি আমার হাতের বান খুইলা ফালাইলাম এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেই জন্য হাতের নিচে চাইপ্যা রাখলাম। তারপর আল্লাহর নাম লইয়া দিলাম এক দৌড়।

কিন্তু সামনেই দেখি এলএমজি নিয়া একজন খাড়াইয়া রইছে। আমারে কইল, দৌড় দিবিনা, ব্রাশ কইরা দিমু, তখন আমি ডান পাশের ছড়ার দিকে লাফ দিলাম। লাফ দেয়ার সাথে সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম, আর শব্দ শুনতে শুনতেই গড়ায়ে পড়লাম নিচের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের গুড়ির দিকে গর্তমতো জাগা পাইলাম। সেইখানে বইসা মাথার উপরে জঙ্গল টাইন্যা ধইরা রাখলাম। ভয়ে তখন আমার বুকের মধ্যে এমন জোরে আওয়াজ অইতেছিল যে, মনে হইছিল এই শব্দ না জানি শান্তিবাহিনী শুইনা ফালায়। রাত হওয়ার পর ছড়া দিয়াই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ছড়ার মধ্যে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি, আবার কোথাও সাঁতার। ঘন জঙ্গলে ভরা ছড়া দিয়ে চলবার মত কোন পথ নাই। তার উপর আবার নিশি অন্ধকার। ছড়ার মধ্যে ঠান্ডা পানি, বেতের কাঁটা, বিষাক্ত সাপ, হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল। কিন্তু তখন এক শান্তিবাহিনী ছাড়া আর কিছুকেই ভয় হচ্ছিল না। সারা রাত হেঁটে হেঁটে অবশেষে ভোরের দিকে পাহাড় থেকে বের হই।

প্রঃ ১১ তারিখ সেনাবাহিনীর লাশ উদ্ধারের কথা কিছু বলুন।
উঃ বাড়িতে আসার পর আর্মিরা যহন জানল যে আমাকেও শান্তিবাহিনী ধরে নিয়া গেছিল। তহন তারা আমাকে সাথে নিয়া গেল পথ দেখানোর জন্য। আমি তাদের পাহাড়ে নিয়া গেলাম। তক্তা নজরুলরে যেইখানে ঘাড়ে ধাক্কা দিছিল, সেইখান থাইকা আরেকটু সামনে গিয়া দেখলাম, বাম দিকে প্রায় এক-দেড়’শ গজ পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া। নিচে নাইমা সেই বেড়া পার হইলাম। কিন্তু তারপর আর রাস্তার কোন চিহ্ন নাই। একটু দূরে দেখলাম, একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি আধা ভাঙ্গা অবস্থায় ঝুইলা রইছে। কঞ্চিটা সরানোর পর একটা ছোট পথ পাইলাম। এই পথ দিয়া সামনে গিয়া দেখি সরাফদ্দি ভাইয়ের টুপিটা একটা কঞ্চির লগে বাইজ্যা রইছে। এরপর সেন্ডেল, মদের টেংকি, বেশ কয়ডা লাঠিও দেখলাম। তারপর দেখলাম আলাল ভাইয়ের লাশ। আরেকটু সামনে গিয়া দেখি বিশাল জায়গা জুইড়া লাশ আর লাশ। কেউরে চিনা যায় না। বন্দুকের সামনে যে চাকুটা (বেয়নেট) থাকে এইডা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া মারছে। লাঠি দিয়া পিটাইয়া, দা দিয়া কুবাইয়া, কুইচ্যা মারার শিক দিয়া পারাইয়া, চোখ তুইলা, আরো কতভাবে যে কষ্ট দিয়া মারছে তা কইয়া শেষ করুন যাইব না। ঐকথা মনে অইলে আইজো শরীরের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐখানে লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের।

Pakuakhali-4

Pakuakhali-2

Pakuakhali-

pakuakhali-00

ছবি: পাকুয়াখালিতে নিহত কয়েকজন কাঠুরিয়ার লাশ

প্রঃ মানুষ মারা গিয়েছিল ৩৫ জন,  আপনি বলছেন লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের। বাকিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উঃ ঘটনার দিন আমি যাদেরকে বান্ধা অবস্থায় দেখছিলাম তাদের মধ্যে আমার পরিচিত আলী, দুলু দুই ভাইসহ ৪ জনের লাশ ঐখানে ছিল না। আর এমন তিনজনের লাশ পাইছি যারা ঐ দিন ঐখানে বান্ধা ছিল না। আমার মনে হয়, আমি পালানোর পরে আরো সাত জনরে শান্তিবাহিনীরা ধইরা নিয়া গেছিল। সাত জনরে মনে হয় অন্য কোন খানে নিয়া মারছে, আমরা তাদের লাশ খুইজ্জা বাইর করতে পারি নাই। আর বালা কইরা খুজবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।

প্রঃ শান্তিবাহিনী এতগুলো মানুষকে একসাথে হত্যা করল, অথচ তাদের কোন বিচার হল না। আপনারা কি সরকারের কাছে এর বিচার চান নাই?
উঃ আমরাতো বিচারের দাবী করছিই, আমি নিজে বাদী অইয়া মামলাও করছিলাম। তখন সরকারের মন্ত্রীরাও কইছিল বিচার করব। তদন্তও করছিল। হুনছি তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে আজ ১৪ বছর পার অইয়া গেল। কই, কিছুই তো অইল না। শুধু এইডাই না, শান্তিবাহিনী তো আরো অনেক বাঙালিরে মারছে। কোনডারই তো বিচা অয় নাই। চাকমারা মানুষ মারলে তো এই দেশে বিচার অয় না। বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে, তার। আর অহন তো চুক্তি কইরা শান্তিবাহিনীরাই সরকার (সাবেক শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা চুক্তির পর থেকে পার্বত্যচট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন) অইছে। তাইলে আর বিচার করব কেডা?

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবী, আপনার বাবাকেও মাইরা ফালাইছিল। বাবা হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। আর আপনি সেই হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। এই জন্য আপনাকেই বলি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকুয়াখালীতে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে তারাও তাদের বাবা হত্যার বিচার চায়, যারা সেখানে ভাই হারিয়েছে তারা তাদের ভাই হত্যার বিচার চায়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছে তারা সন্তান হত্যাকারীর বিচার চায়, যেসব মহিলা স্বামী হারিয়েছে তারা স্বামী হত্যার বিচার চায়। কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হইয়া আত্বীয়-স্বজনদের হত্যাকারীর বিচার করতে পারব না। তাই এই হত্যাকান্ডের বিচার আপনাকেই করতে হইব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

রাষ্ট্র, নাগরিক ও ‘সেটলার’

কাকন রেজা :

অনেকের অনেক লেখাতেই দেখি ‘সেটেলার’ শব্দটি। বিশেষ করে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। অনেকে ‘সেটেলার’ এর পরিভাষা হিসাবে বোঝান ‘শরণার্থী’ শব্দটিকে, অর্থাৎ অন্য দেশ বা স্থান হতে আসা ‘আশ্রয়প্রার্থী’। ‘শরণার্থী’ বা ‘আশ্রয়প্রার্থী’ দুটিরই ইংরেজি `Refugee’, যার আরেকটি বাংলা প্রতিশব্দ ‘উদ্বাস্তু’। কিন্তু মজার বিষয় অভিধান খুঁজলে কিন্তু আলোচিত ‘সেটেলার’ শব্দটির দেখা মেলে না। যে শব্দটির দেখা মেলে সেটি হলো ‘সেটলার’। শব্দটি ভাঙলে দেখায় অনেকটা “সেট্ল(র)” এরূপ আর কী। যার অর্থ হলো, ‘ঔপনিবেশিক’। ব্যাখ্যা হলো, ‘নতুন উন্নয়নশীল দেশে বাস করতে আসা বিদেশী বসতকার’। ইংরেজিতে ‘সেটলার’ বিষয়টি বোঝানোর জন্য `The settlers had come to America to look for land’ এই বাক্যটিই সাধারণত ব্যবহার করা হয়। ক্যামব্রিজ অভিধান ‘সেটলার’ শব্দটিকে সুনির্দিষ্টি করতে বলেছে, ‘a person who arrivesespecially from another country’। আমাদের দেশে  ‘সেটলার’ কে ‘সেটেলার’ বানাতে গিয়ে শব্দটির মতো পুরো বিষয়টিতেই বিভ্রান্তি ঘটানো হয়েছে।

বিষদ বলার আগে রাষ্ট্র বিষয়ে বলি। সোজা ভাষায়, ‘একটি সুনির্দিষ্ট ভূখন্ডকে ঘিরে, রাষ্ট্রিক পরিচয়ে পরিচিত মানবগোষ্ঠীর স্বাধীন সত্ত্বাই হলো রাষ্ট্র’। যা আমরা ১৯৭১-এ একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম। এই মানবগোষ্ঠীর বিপরীতে ‘সেটলার’ শব্দটি কী যায়? যদি যায় তাহলে রাষ্ট্র মানে কী? এ পর্যায়ে নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সাথে নাগরিক অধিকারের কথায় আসি এবং যথারীতি সহজ ভাষায়। যে অধিকার প্রশ্নে মাঝেমধ্যেই অনেকের ঘুম হারাম হয়ে যায় তারমধ্যে প্রধানতম হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান। একজন নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের সংস্থান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। আমাদের স্বাধীন সীমানার যে কোন স্থানে যে কোন নাগরিককে পুনর্বাসন করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের। একজন ভূমিহীন নাগরিকের বাসস্থান এবং খাদ্যের যোগানদানের অধিকার রাষ্ট্র সংরক্ষণ করে, যেহেতু এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এর বিরোধিতা করা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের কমিটমেন্টের বিরোধিতা করা। মানবাধিকারের প্রশ্নে যা সবচেয়ে বড় মানবাধিকার বিরোধী কাজ।

সবাই মিলে যদি আমরা দেশটা স্বাধীন করে থাকি, তাহলে পুরো দেশটাই আমাদের। এখানে সম্প্রদায়, গোত্র বা ধর্মের প্রশ্নে আলাদা করে কিছু থাকার কথা নয়। থাকার কথা নয় সংখ্যাধিক্যেও। সুতরাং কোন যুক্তিতেই দেশের কোন অঞ্চল বা জায়গা সম্প্রদায়, ধর্ম বা অন্যকোন ভিত্তিতেই আলাদা করে বন্টনের প্রশ্ন উঠতে পারে না। দেশের একটি অঞ্চলকে কারো জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়ার প্রচেষ্টা মানেই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দ্বৈততার সৃষ্টি করা, বিরোধ সৃষ্টি করা। এমন হলে আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে, সম্প্রদায়গত কারণে সারাদেশ বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে পড়বে। উদাহরণ হিসাবে সিলেটের কথাই বলি। সিলেটের ভাষাকে অনেকেই বাংলার চেয়ে আলাদা বলেন। সিলেটের আলাদা বর্ণমালার কথাও ওঠে। তাহলে কী সিলেটকে শুধু সিলেটের মানুষের জন্য আলাদা করা দেয়ার কথা তুলতে হবে? বলতে হবে এখানে অন্যরা ‘সেটলার’, ‘ঔপনিবেশিক’? এমন কথা তোলা কী অন্যায়, রাষ্ট্র পরিপন্থী সর্বোপরি ৭১’এর অর্জন বিরোধী নয়?

অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে মেতেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের ‘সেটেলার’ তথা ‘সেটলার’ বলে আখ্যায়িত করছেন তারা। খুব ‘সহজিয়া’ প্রশ্ন করা যায়, তবে কী বাংলাভাষীরা ‘ঔপনিবেশিক’? তারা কী?

‘a person who arrivesespecially from another country’? তাদের ক্ষেত্রে কী `The Bangladeshi settlers had come to Hill to look for land’ এই উদাহরণ ব্যবহার করা হবে? এর কী জবাব আমি জানি না। তবে একটা বিষয় জানি, আবেগ দিয়ে কোন কিছু ব্যাখ্যার আগে বাস্তবতাটা চিন্তা করে নেয়া দরকার। চিন্তা করা দরকার যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা এই স্বাধীন ভূখন্ড অর্জন করেছিলাম, তা সম্প্রদায়, গোত্র, ভাষা, ধর্ম বা অন্যকোনে পরিচয়ে বিভক্ত করা জন্য নয়। এই দেশ অর্জিত হয়েছিল পুরো ভূখন্ডটিই নিজের ‘মাটি’ ভাবার জন্য, ‘মা’ ভাবার জন্য; খালা বা মাসি ভাবার জন্য নয়।

অন্যের জমি যদি কেড়ে নেয়া হয় তাহলে অন্যায়, কিন্তু একজন ভূমিহীনকে রাষ্ট্র যদি তার জায়গা বসবাসের জন্য দেয় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও কী উচিত? সেক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়গত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ‍তোলা তো আরো বেশী অনুচিতের মধ্যে পড়ে। অসাম্প্রদায়িকতার কথা যারা বলেন, তারা বলুন তো এরচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িকতা আর কী আছে? এটা রাষ্ট্রের কোন দয়ার দান নয়, একজন নাগরিকের প্রতি দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি। একজন নাগরিক যিনি ভূমিহীন, তিনি সেই রাষ্ট্রেরই অংশ। জানি এর বিপরীতে অনেক কথা আসবে। আসবে রাষ্ট্র ও ‘সেটলার’ কর্তৃক নিপীড়নের কথা। আসবে ‘বাহিনী’ বিষয়ক কথকতা। এর বিপরীতেও যুক্তি আছে যা খন্ডন করা খুব আয়াসসাধ্য নয়। তবে যুক্তি যখন মার খায় তখন কৌশলীরা আবেগের আশ্রয় নেন, মানুষের সহানুভূতির জায়গায় খোঁচা দেন। যুক্তি ও বাস্তবতার বিপরীতে আবেগ একটি অপকৌশল, এটা যারা নেন তারাও বোঝেন।

সম্প্রতি রোমেল বা রমেল চাকমা নামে একজন পাহাড়ের অধিবাসী যুবকের প্রশ্নবোধক মৃত্যু নিয়ে কথা হচ্ছে। বিনা বিচারে একজন মানুষের মৃত্যু বিনা প্রশ্নে মেনে নেয় যারা তাদের মধ্যে ন্যায়বোধ সঠিক ভাবে বিকশিত হয়নি। কিন্তু এখানেও কথা আছে, এক যাত্রায় দুই ফল বিষয়ে। আমি যখন একটি বিচারবিহীন মৃত্যু নিয়ে সোচ্চার হবো, আরেকটির বিষয়ে চোখ বুঝে থাকবো তখন বুঝতে হবে আমার এই চাওয়ার মধ্যে ‘ইনটেনশন’ আছে। যে কোন বিচার বহির্ভূত মৃত্যুই সমর্থনযোগ্য নয়।

সুতরাং ‘ন্যায়বোধে’র বিষয়টি প্রমাণ করতে হলে সব বিচার বহির্ভূত মৃত্যুর ব্যাপারেই বলতে হবে, সেটি যদি শত্রুপক্ষেরও হয়। এটাই ‘ন্যায়বোধ’। আর মানুষের সাধারণ ‘ন্যায়বোধ’ থেকেই কিন্তু সৃষ্টি আইনের। জানি, এরপরেও এ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, ব্যাখ্যা আসবে, আসবে ‘কী’ ও ‘কেনো’ সহযোগে প্রশ্নমালা। তবে এসব ‘কী’ ও ‘কেনো’র উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে ইতিহাসের পথে অনেকদূর। ইতিহাস আর যুক্তির পথে অত দূরভ্রমন সবার জন্য আনন্দময় নাও হতে পারে।

ফুটনোট : আমি সাধারণত খুব সহজভাবে সব কিছু বলতে পছন্দ করি। কারণ অহেতুক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যারা যান তাদের সেই পথেও হেটে দেখেছি, মঞ্জিল কিন্তু একটাই। তাই সহজ করে বলাটাই সবচেয়ে ভালো। পান করাই যখন লক্ষ্য কী দরকার পানি ঘোলা করে। তাতে শুধু পানির বিশুদ্ধতাই নষ্ট হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বৈষম্যের শিকার পাহাড়ের বাঙালিরা

পাহাড়ে অশান্তির আগুন-৪

ফারুক হোসাইন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে :

  খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের আব্দুল লতিফ (৭০) ছোট একটি ছাউনি ঘরে পরিবারের পাশপাশি গরু-ছাগল নিয়ে একইসাথে রাত্রি যাপন করেন। ৩০ বছর আগে সরকার তাকে পার্বত্য অঞ্চলে এনে বসতের জন্য ২৫ শতাংশ এবং চাষের জন্য চার একর জমি দিলেও তা কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। সব হারিয়ে সরকারি রেশন পেয়ে ছোট একটি ঘরে দিনাতিপাত করছেন তিনি। একদিন রেশন না দিলে বন্ধ থাকে খাওয়া-দাওয়া। আশপাশের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের ৪শ’ পরিবার সেই গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় নিয়ে একইভাবে জীবনযাপন করছেন।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান (টিন, কম্বল) বিতরণে গিয়ে একজন বাঙালিরও নাম খুঁজে পাননি সরকারি কর্মকর্তারা। পার্বত্য অঞ্চলকে অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, চাকরি, উচ্চশিক্ষা বৃত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা রকম কোটা ও সুযোগ-সুবিধা চালু করেছে সরকার। তবে একই এলাকায় বসবাস করে এবং জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হয়েও তা পাচ্ছেন না বাঙালিরা।

শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগিরা। অবিলম্বে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে জনসংখ্যানুপাতে সকল সুযোগ-সুবিধা বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে একজন বাঙালি প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়ার  দাবি জানান তারা।

তিন পার্বত্য জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই এলাকার বাঙালিরা সরকারি বরাদ্দের কোনো কিছুই পান না। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে যেসব সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ অঞ্চল এবং অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে যেসব বরাদ্দ দেয়া হয় তার পুরোটাই ভোগ করছে উপজাতিরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে উপজাতিরা নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং তারাই তালিকা করেন কাদেরকে বরাদ্দ দেয়া হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় প্রতিনিধিদের তালিকায় কোনো বাঙালির নাম থাকে না। ফলে জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়ায় চলতে হচ্ছে। অন্য দিকে উপজাতি জনগোষ্ঠী এককভাবে এর পুরোটা লাভ করছে।

%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80

জানা যায়, মেডিক্যাল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সকল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর কোটার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২৫ জন উপজাতি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে কোটাতেই। নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর সংখ্যা আরো বাড়ানো হয়েছে।

অন্য দিকে একই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বাঙালিদের জন্য তেমন কোনো সুযোগ এখনো তৈরি করা হয়নি। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী দু’টি জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রকম নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তাও সেটি পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের ফলে।

শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পাহাড়ের বাঙালিরা। উপজাতি জনগোষ্ঠী করের আওতামুক্ত হলেও বাঙালিদের কর দিতে হচ্ছে। পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আদায় করা চাঁদার ক্ষেত্রে বাঙালিদের কাছ থেকে অধিক হারে আদায় করা হয়। পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লাখ টাকার মধ্যে হলে ঠিকাদারী সম্পূণরূপে উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০ শতাংশ উপজাতিদের আর বাকি ৯০ শতাংশ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হলেও তার বেশির ভাগ পায় উপজাতিরাই।

আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র পাঁচ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় ১৬ শতাংশ।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তিতে বাঙালিরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জনসংখ্যার দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ৪৮ হলেও তাদের জন্য মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্য দিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫২ শতাংশ অধিবাসীদের জন্য ৭৭ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ করা হয়েছে। আর ২৩ শতাংশ বাঙালি শিক্ষার্থীদের তালিকায় মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু ও বড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও রাখা হয়েছে। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়েছে তারাও।

গতবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তি তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় সর্বমোট ৪৭৫ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উপজাতির সংখ্যা ৩৬৪ জন আর মাত্র ১১১ জন বাঙালি (মুসলিম, হিন্দু ও বডুয়া) শিক্ষার্থী। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় দেয়া ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১২১ জন, ৩৭ জন বাঙালি। রাঙামাটি জেলায় ১৫৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১১৩ জন আর মাত্র ৪৬ জন বাঙালি। বান্দরবান জেলায় ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষা বৃত্তি দেয়া হয়। এর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থীর  সংখ্যা ১৩০ জন, আর মাত্র ২৮ জন বাঙালি শিক্ষার্থীকে এই বৃত্তি দেয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেড় শতাধিক এনজিওর মাধ্যমে কয়েক হাজার খানেক প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই বাঙালি অধিবাসীরা সুযোগ পাচ্ছে না। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে তা দেয়া হচ্ছে। রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলায় এনজিওগুলোর ২২৫টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯টি ক্ষুদ্র প্রকল্প বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়।

পার্বত্য অঞ্চলের শহরের বাঙালিরা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলেও গ্রামের মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে বসতি ও চাষের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। তিন জেলাতে এরকম মোট  ৮৬টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এগুলো ২৬ হাজার পরিবার পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বাড়লেও রেশন কার্ড বাড়েনি একটিও।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাহাড়ি বাঙালিরা। থাকার জায়গার অভাবে একই ঘরে গরু, ছাগল এবং মানুষ বসবাস করছে। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে ৫৬টি পরিবারকে ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাসের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।

কিন্তু পাহাড়ি উপজাতিদের অব্যাহত বিরোধীতা ও আক্রমণের কারণে ১৯৮৮ সালে তাদেরকে একটি গ্রামে একত্রিত করে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ৫৬টি পরিবারকে ২৫ শতাংশ বসতি জমি এবং পৌনে চার একর চাষযোগ্য জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ৩০ বছর পর সেই ৫৬ পরিবার এখন ৪০০ পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশও বাড়েনি।

অন্য দিকে চাষযোগ্য যে পৌনে চার একর জমি তাদের দেয়া হয়েছিল তা পাহাড়ে হওয়ার কারণে উপজাতিদের বাধা ও অপহরণের ভয়ে সেগুলোতে চাষ তো দূরের কথা, পা পর্যন্ত ফেলতে পারে না বাঙালিরা। কেউ বাধা ডিঙিয়ে চাষ করার কথা চিন্তা করলেই রাতের অন্ধকারে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মুকুল হোসেন বলেন, ৩০ বছর আগে যে বসতি জমি দিয়েছিল, এখন সেই জমিতের আমাদের পরিবারদের আর জায়গা হয় না। মানুষ বেড়েছে পরিবার বেড়েছে কিন্তু জমিতো বাড়েনি। অন্য দিকে চাষের জন্য পাহাড়ে যে জমি দিয়েছে, সেই জমিতে তো আমরা যেতেই পারি না।

পুলিশের কাছে অভিযোগ এবং কোর্টের কাছে সুরাহা চাইলে বলা হচ্ছে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান কর। ৭০ বছর বয়সী মো: আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের যে চাষের জমি দিয়েছিল, সেখানে তো ভয়ে যেতে পারছি না। আর যে জমিতে প্রথমে বাড়ি করেছিলাম, সেখানে শান্তিবাহিনীর অত্যাচারে ছেড়ে আসতে হয়। আবুল হাসেন বলেন, কুলারাম পাড়া, লেম্বু ছড়িতে প্রথমে তাদের বসবাস ছিল। যখন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসের কারণে নিরাপত্তা দেয়া যাচ্ছিল না তখন ৮৮ সালে এই গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ৮২’ সালে বসবাস শুরু করার পর শান্তিবাহিনী অত্যাচার শুরু করে। রাতের বেলা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়। ফায়ার করে ভীতি তৈরি করা হয়। এই নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আশপাশের বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে নিয়ে এসে এই গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের প্রধান ও ১১ নম্বর সেক্টরের ২ এম এফ কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বলেন, এখানে বাঙালিরা ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গণতন্ত্র নাই, পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। নিকৃষ্ট, খুনি, রাজাকারের জাতি স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। আবার সরকারও নতজানু হয়ে তাদের সহযোগিতা করছে। আমাদের নিজেদের দেশে আমরা নাগরিক না, নতুন করে নাগরিক হতে হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, এনজিওগুলো বলছে- পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কনফিডেন্স তৈরিতে তারা কাজ করছে। এর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ের বাঙালিরা এর কোনো অর্থই পায় না, সহযোগিতা পায় না। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে বাঙালিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে স্বীকার করে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সকল পক্ষকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে

%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%a8

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসহাব উদদীন, এনডিসি, পিএসসি (অব.)

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সুপ্রাচীনকাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আজ থেকে প্রায় ১৫৬ বছর আগে, ১৮৬০ সালে, ব্রিটিশ-ভারতের সরকার তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশের পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা একটি প্রশাসনিক ইউনিট তথা একটি নতুন জেলার সৃষ্টি করে এবং নতুন জেলার নাম দেওয়া হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে যায়। অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাও বাংলাদেশের অংশ হিসেবে অব্যাহত থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেশ যখন দ্রুত পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জনগণের ঐক্যবদ্ধতা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর একটি ক্ষুদ্র অংশ এই যুক্তবদ্ধতার সঙ্গে শামিল না হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। উত্থান হয় ‘শান্তিবাহিনী’ নামক এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের। স্বাভাবিকভাবে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত পথ থেকে শান্তির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উত্তরণে বাংলাদেশের সব সরকারই সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।

অবশেষে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সফল অবসান ঘটিয়ে সূচিত হয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন। শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন : ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মায়’ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পক্ষে সন্তু লারমা।

as

এখানে উল্লেখ্য, কোনো প্রকার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এবং কোনো বিদেশি শক্তিকে যুক্ত না করেই এ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছিল যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম। পৃথিবীর যে কোনো দেশে সাধারণত এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায়। শুরু থেকেই এই চুক্তি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তৎকালীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ শান্তি বাহিনীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের।

ফলশ্রুতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়নের নবযাত্রার সূচনা হয়। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা হবে শান্তি ও উন্নয়নের রোল মডেল। শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারত থেকে প্রত্যাগত ১২,২২৩টি পরিবারের মোট ৬৪,৬১২ জন শরণার্থীকে পুনর্বাসন করেছে। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে এবং ১৫টি ধারা আংশিক রূপে বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়াও ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৩৩টি বিভাগ/বিষয়ের মধ্যে ৩০টি বিভাগ/বিষয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে এবং ২৮টি বিভাগ/বিষয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব বিভাগে লোকবল নিয়োগে চুক্তির শর্তানুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে তাদের বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত একটি ব্রিগেড এবং ২৩৯টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা

শান্তি চুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। এর জটিলতার প্রধান কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ না হওয়া। সরকার একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নিলেও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বিরোধিতা, অপহরণ ও সন্ত্রাসী তত্পরতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভূমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকি সব সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধি। বিষয়টির ব্যাপকতা এবং জটিলতার কারণেই বাস্তবায়নে একটু বেশি সময় লাগছে সমাধান করতে। শান্তি চুক্তি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। দুই পক্ষের জন্যই এই চুক্তিতে পালনীয় কিছু শর্ত রয়েছে।

asss

এটা ঠিক যে, শান্তি চুক্তি সম্পাদনের মূল লক্ষ্য— ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা’ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পাহাড়ি সংগঠন জেএসএসের সদস্যরা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাদের পক্ষ থেকে সব শর্ত পালন করেনি এবং শুরুতেই একটি অংশ ভাগ হয়ে অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়নি।

পরবর্তীকালে সেই সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আরও উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বাধার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি, নিরাপত্তা বাহিনীর অপারেশনে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দাবি করে থাকেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশই অবাস্তবায়িত। কিন্তু পরিসংখ্যান এই দাবি সমর্থন করে না। আমরা জানি, কিছু বাস্তবতার কারণে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছে। শান্তি চুক্তি বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতে একটি মামলা হাইকোর্টের রায়সহ বিচারাধীন রয়েছে। সরকারকে এসব বিষয় নিয়ে আরও দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত এবং সন্ত্রাসবাদ

পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে এবং সেসব সীমান্তে নিজ নিজ দেশের ইমারজেন্সি অপারেশন বিদ্যমান। দুর্গমতার কারণে বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত সেই সীমান্তের একটি বিরাট অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ২৬২ কিমি অরক্ষিত সীমানা রয়েছে।

ফলে, সে সব অরক্ষিত দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ওই সব দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এতে করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বন্ধু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি এবং ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। সম্প্রীতি, বান্দরবান ও রাঙামাটির কয়েকটি স্থানে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়াও, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে বান্দরবান জেলা থেকে পর্যটক অপহরণসহ বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো সম্প্রতি সমতলের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনাবেচা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততা সম্পর্কিত তথ্যাদি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম থেকে জানা গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শান্তি চুক্তির সাফল্য

শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যে সুবিধা ভোগ করছে তা ভুলে গেলে চলবে না। শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে উন্নয়ন প্রবলভাবে গতি পেয়েছে। সমতলের জেলাগুলোর মতো বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিমি রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিমি রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, কলকারখানাসহ সম্পন্ন হয়েছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম।

সরকারের প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এককালের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। যেখানে পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান উন্নয়নে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ হচ্ছে সেখানেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ বাধার সৃষ্টি করছেন। ইতিহাসে উন্নয়নকে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন নজির সম্ভবত আর নেই।

১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ছয়টি উচ্চবিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রায় প্রতিটি পাড়ায়। এ ছাড়াও ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আমরা এ অবস্থার আরও উন্নতি দেখতে চাই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা এবং পর্যটন সহায়ক শিল্প গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ বলে দাবি করা যায় না।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় ৩৫ কিমি দীর্ঘ থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ, নীলগিরি ও সাজেকের মতো উন্নত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আরও অনেক আকর্ষণীয় ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করা গেলে নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪৫টি নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে বিকাশ করতে পারলে প্রতিবছর ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা উপার্জন করা সম্ভব। এতে করে রাষ্ট্র যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে তেমনি পর্যটন বিকাশের ফলে স্থানীয় পাহাড়ি জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে চাঁদাবাজি/সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনেকাংশে কমে যাবে বলে সহজেই অনুমেয়।

assss

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অবস্থান

প্রথমেই একটি কথা বলা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠী কারও তাড়া খেয়ে, যাযাবর হয়ে বা কারও দয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়নি। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালি কিছু পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পাহাড়ের জলবায়ু, ভূমিরূপ ও ফুড চেইন তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে সেখানে বাঙালিদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহিন পাহাড়ি অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না।

ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক উন্নয়নের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও শান্তি বাহিনীর হুমকির মুখে তা পারত না। কারণ, সন্ত্রাসীরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নবিরোধী ছিল। শান্তি বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙালি হত্যা, নির্যাতন প্রক্রিয়া রোধ করতেই গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে বাঙাল ও পাহাড়িদের নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এতে বাঙালিরা নিরাপত্তা পেলেও সরকার প্রদত্ত বসতভিটা ও চাষের জমি হারাতে হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই ভিটা ও আবাদি জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল স্বত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত করা, আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ জমিতে চাষাবাদ করতে গেলেই পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি বাঙালিদের চাষকৃত জমির বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ এবং আনারস গাছ পর্যন্ত পাহাড়িরা কেটে ফেলে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অবস্থান

পাহাড়িদের মতে, পাহাড়ের সব জমিই তাদের। বাঙালিদের ভূমিহীন করার কৌশল হিসেবে তাদের জমির খাজনা অনেক পাহাড়ি হেডম্যান গ্রহণ করে না, ডিসি অফিসে দিতে হয়। বসতবাড়ি ও ভিটার জমিতে খাজনা দিয়েও তাদের এই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। পাহাড়িরা সমতলে এসে বসবাস করার সুযোগ পেলেও সমতলের বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করতে পারছে না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার সৎ উদ্দেশ্য থাকার পরেও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো প্রকার শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বাঙালিরা পাহাড়ে নানা বৈষম্যের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সরকারের দৃষ্টিগোচরে এনেছে। এরমধ্যে পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না।

উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের কমবেশি ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারি ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয় যাতে পাহাড়িরাও অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সব বদলি/নিয়োগ উপজাতীয় সংগঠন নিয়ন্ত্রিত। জাতীয়ভাবেও চাকরিতে ৫% কোটা তাদের জন্য নির্ধারিত। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতেও এই কোটা রয়েছে।

বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ-৫ পেয়েও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে জিপিএ-৫ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা কোটা সুবিধার কারণে বুয়েট/মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। নানা সুবিধায় তাদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ রাষ্ট্র কর্তৃক উন্মোচিত রাখা হয়েছে।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার যেমন অঙ্গীকারবদ্ধ তেমনি অন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এ জন্য কিছু সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন। অযথা উসকানিমূলক বক্তব্য এবং বাগাড়ম্বর হুমকি সবাইকে পরিহার করতে হবে। আশা করা যায় সব পক্ষই সেই ধৈর্য প্রদর্শন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের ধারাকে বেগবান করবে।

প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারসহ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিসত্তার সম্মিলিত ইচ্ছা ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশে সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নিজ নিজ দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। ওই সব দেশে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালীন সময়েও সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতে কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি করেনি। পর্যটন শিল্পই যে উন্নয়নের চাবিকাঠি তা তারা সবাই অনুধাবন করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও অনুরূপভাবে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

অতএব, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন”-এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পকে সরকার এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমাদের আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতিতে এই পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, “আমি” বা “তুমি” এবং “আমরা” বা “তারা”য় বিভক্ত না হয়ে, সবাই মিলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সেখানে বসবাসরত সব পাহাড়ি ও বাঙালি-ই এদেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের অবদান অপরিসীম ও প্রশংসার দাবী রাখে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনী নিজ দেশেরই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়োজিত। তারা সেখানে কোনো বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে বা যুদ্ধজয়ের জন্য নিয়োজিত নয়। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি নিশ্চিত করা। পরিশেষে, পার্বত্য এলাকায় শান্তির পরিবেশ আরও সুসংহত হবে এবং সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

♦ লেখক : সাবেক জিওসি, চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বৈষম্যমূলক ও বাঙালি বিদ্বেষী

%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%a4

(২)

মেহেদী হাসান পলাশ :

জাতীয় সংসদের বিগত অধিবেশনে পাস হওয়া পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধনীকে বৈষম্যমূলক ও বাঙালি বিদ্বেষী বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞ ও পার্বত্য বাঙালি নেতৃবৃন্দ। পার্বত্য বাঙালিরা একে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি বিতাড়নের হাতিয়ার বলে আখ্যা দিয়ে এ আইনের বিরুদ্ধে হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে গত ৩ মাস ধরে।

বাঙালিদের অভিযোগ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে বাঙালি, পাহাড়ি, সরকারিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সব জমি আওতাভুক্ত করা হয়েছে। অথচ বিচারক হিসেবে ৫ জনের ৩ জনই উপজাতি এবং ২ জন সরকারি প্রতিনিধি রাখলেও পার্বত্য বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।

অন্যদিকে ২০০১ সালের আইনে মতবিরোধের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলা হলেও ২০১৬ সালের সংশোধনীতে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতীয় বিচারক প্যানেলে চেয়ারম্যান ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছেন। তাছাড়া এই আইনের বিভিন্ন ছত্রে এমন কিছু শব্দ বা শর্ত যুক্ত করা হয়েছে যা চরমভাবে বাঙালিদের স্বার্থ পরিপন্থী- তাই তারা এই আইন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন।


এই সিরিজের আগের লেখা পড়ুন

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: সরকারের মর্যাদা কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার ক্ষুণ্ন হতে পারে


নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন সামরিক দায়িত্বের অভিজ্ঞতালব্ধ অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম বীরপ্রতীক এ প্রসঙ্গে দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন যাবৎ বিরাজমান যে সমস্যা, তার অনেকগুলো আঙ্গিক আছে। একটি আঙ্গিক হলো ভূমি। অর্থাৎ ভূমির মালিকানা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভূমিব্যবস্থাপনা, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভূমির ব্যবহার ইত্যাদি। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন যাবৎ একটি অপ্রকাশিত দ্বন্দ্ব বিরাজমান।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি এবং তাদের শুভাকাক্সক্ষীরা বলতে চেষ্টা করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল প্রকার ভূমির একচ্ছত্র মালিক হচ্ছে পাহাড়ি জনগণ। অপরপক্ষে বাংলাদেশ সরকার এবং সচেতন বাংলাদেশীরা মনে করেন যে, ভূমির মালিক পাহাড়ি জনগণ, বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের আইন মোতাবেক মালিকানাপ্রাপ্ত অন্য সব নাগরিক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন পক্ষের ব্যক্তিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ বিরাজমান। এরূপ দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারি ব্যবস্থা কাম্য। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনটি যেই অক্ষরে এবং যেই স্পিরিটে বা চেতনায় আছে, আমি মনে করি তার অন্তর্নিহিত বা গোপন লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বাঙালিদের ভূমিহীন করা; বিশেষত ঐ সব বাঙালি, যারা ১৯৭৮ থেকে ১৯৮২ সালে সেখানে বসতি করেছিলেন। যদি ঐ বাঙালিরা ভূমিহীন হয়, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপে তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করার কাজটি বিতাড়নকারীদের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে।

বাঙালিদের বিতাড়ন করা হলে, সেটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর হবে। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন বা সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে এমন জায়গা-জমির মালিকানাও হুমকির মুখে পড়ার বৃহৎ সম্ভাবনা আছে বলে আমি মনে করি। যদি এ মুহূর্তে বিদ্যমান অক্ষরের ও চেতনার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাস্তবায়ন হতেই থাকে।

জেনারেল ইব্রাহীম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে স্বায়ত্তশাসিত জুম্মল্যান্ড প্রদেশের জন্য সশস্ত্র ও নিরস্ত্র আন্দোলন করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিরা চলে এলে সেখানকার জনভারসাম্য বিনষ্ট হবে। ফলে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী বিভিন্ন তৎপরতা আরো জোরদার হয়ে পড়বে। তাই ভূমিসংক্রান্ত আইন বিশারদরা এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আমার আবেদন, তারা যেন সংবিধানসম্মত বা আইনানুগ পদ্ধতিতে সরকারের ওপর নেতিক চাপ প্রয়োগ করেন; আইনটিকে বাস্তবসম্মতভাবে সংশোধন করার জন্য।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২ জুন স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির ঘ খ-ের ৪, ৫ ও ৬ ধারা মোতাবেক ২০০১ সালের ১৭ জুলাই জাতীয় সংসদে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১ জুলাই মন্ত্রিসভায় এই আইনের সংশোধনী গেজেট আকারে পাস হয়ে গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হয়। নতুন আইন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এই কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন।

এছাড়াও সংশ্লিষ্ট সার্কেল চিফ বা তার মনোনীত প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান বা তার প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, বিভাগীয় কমিশনার/অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নিয়ে এই কমিশন গঠন করা হয়েছে। এতে সার্কেল চিফ বা তার প্রতিনিধি, আঞ্চলিক পরিষদ বা তার প্রতিনিধি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানরা উপজাতীয় সদস্য হবে। চেয়ারম্যান ও সদস্যসচিব সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে বাঙালি বা পাহাড়ি যে কেউ হতে পারে। কিন্তু পার্বত্য বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধি সেখানে রাখা হয়নি।

এছাড়াও কমিশনের বিচারিক আইনে উপজাতীয়দের সামাজিক আইন প্রথা, রীতি ও পদ্ধতিকে নির্ধারণ করায় তা বাঙালিদের বিরুদ্ধে যাবে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের বিশেষ করে পুনর্বাসিত বাঙালিদের সরকার খাস জমিতে পুনর্বাসন করায় সেখানে উপজাতীয় সামাজিক আইন গণ্য করা হয়নি। এখানে উল্লেখ্য, উপজাতীয়দের সামাজিক আইনের কোনো লিখিত রূপ নেই।

ফলে সমাজ ও গোত্রভেদে তাতে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এতে করে বাঙালিদের পক্ষে এই কমিশনে সঠিক বিচার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তাদের দাবি। অন্যদিকে কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ না থাকায় বাঙালিরা কমিশনের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা করছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক এমপি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভুঁইয়া ইনকিলাবকে বলেন, আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে এই আইনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি বিতাড়ন করার চেষ্টা চলছে। সরকারের ভূমি বরাদ্দের একটি সাংবিধানিক নিয়ম আছে, কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রথাগত নিয়মকে এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাহাড়িদের প্রথাগত এই ধারণাটি অত্যন্ত অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট এবং আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে ভিত্তিহীন। তাই এ ধারণা কখনো কোনো রাষ্ট্রীয় বিচারিক আইন হিসেবে বিচার্য হতে পারে না।

কেননা, কি রূপে পাহাড়িরা তা বাস্তবায়ন করবে তা নির্দিষ্ট নয়। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে উপজাতীয় প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক আক্রোশে দুর্বলদের ভূমি কেড়ে নেবে। শুধু বাঙালি নয়, সংখ্যালঘিষ্ঠ উপজাতীয়রাও এই আক্রোশের শিকার হয়ে ভূমিহীন হয়ে পড়বে।

পার্বত্য বাঙালি অধিকার আন্দোলনকারী সংগঠন পার্বত্য নাগরিক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুঁইয়া ইনকিলাবকে বলেন, সংশোধিত ভূমি কমিশন আইন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি বিতাড়নের হাতিয়ার। এটি বৈষম্যমূলক ও বাঙালি বিদ্বেষপ্রসূত একটি আইন। এখানে বিচারক হিসেবে যারা অংশ নিচ্ছেন তারা কেউ নির্বাচিত বা সংবিধান রক্ষার শপথ গ্রহণকারী নয়। ফলে তাদের কোথাও কোনো জবাবদিহিতা নেই। ফলে এ কমিশন একটি স্বেচ্ছাচারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি ইনকিলাবকে বলেন, এই আইনে বাঙালি-পাহাড়ি বিচার করা হয়নি। যাকে বিচারপতি করা হয়েছে, তিনি একজন আইনের মানুষ। সকলেই এখানে অভিযোগ করতে পারবে। তথ্য-উপাত্ত বাছাই, বিচার-বিশ্লেষণ করে যার পক্ষে যাবে তিনি জমি পাবেন। শান্তিচুক্তি হওয়ার আগেও এভাবে অনেক কথা বলা হয়েছে যে, দেশ ভারতের অংশ হয়ে যাবে। কিন্তু তা কি হয়েছে। কাজ শুরু হোক, দেখুক কোনো ভুল হলে তখন বলবে। কাজ শুরু করার আগেই বিচার-বিবেচনা ছাড়া এমন মন্তব্য করা ঠিক নয়।

একই কথা বললেন, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক। ইনকিলাবের সাথে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, আমাদের ওপর আস্থা রাখুন, আমাদের কাজ করতে দিন, আমাদের কাজ দেখুন। তারপর বিচার করবেন। কাজ শুরু করার আগে ধারণা থেকে কোনো কিছুকে বিতর্কিত করা ঠিক নয়। ওরা পাহাড়ি-বাঙালি যা-ই হোক তারা যখন ভূমি কমিশনে আসবে তারা সকল মানুষের মেম্বার। তারপরও আমরা দেখি কতটুকু কি করতে পারি। এটা মিনিমাইজ করতে পারি।

চেয়ারম্যানের ক্ষমতা হ্রাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি আগেও ক্ষমতাবান ছিলাম না, এখনো ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রশ্নটা ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীনের নয়। আমরা অভিযোগ পেলে উভয় পক্ষকে ডাকব এবং উভয় পক্ষকে কিছু কিছু অপশন দেবো। তারা নিজেরা নিজেদের বিরোধ মিটিয়ে নেবেন। এটাই হলো আমাদের মটো।

আপনি যাদের কথা বলছেন তারা যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় যেটা বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের ওপর কোনো জুলুম হবে তখন আমার মনে হয় আমার কিছু করার এখতিয়ার আছে। আইনের কোথায় আছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওখানেই আছে। কারণ বলা হয়েছে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কাজেই আমাকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে না।

আইনে প্রচলিত রীতি, পদ্ধতি যা ই থাক কমিশন বিচার করবে সংবিধানকে অক্ষুণ্ন রেখে- বিচারপতি আনোয়ার উল হক

land-comisiion

নিজস্ব প্রতিনিধি:

সংশোধিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে রীতি-নীতি, পদ্ধতি যা ই থাকুক না কেন, দেশের প্রচলিত সংবিধানকে অক্ষুন্ন রেখে কাজ করবে কমিশন। সংবিধান সর্বাগ্রে। শুক্রবার সকালে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজের ভিআইপি লাউঞ্জে বাঙালী নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় সভায় কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ার উল হক এসব কথা বলেন।

তিনি কমিশনের কার্যক্রমের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখার অনুরোধ রেখে বলেন, কমিশন দেশের প্রচলিত সংবিধানকে অক্ষুন্ন রেখে কাজ করবে। তাই কমিশনের কার্যক্রমের উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখুন। রাতারাতি কমিশন বিরোধের নিষ্পত্তি করতে পারবে না। সময় ও অনুকুল পরিবেশ লাগবে কাজ করতে। তাই কমিশনকে কাজ করার সুযোগ দিন। তারপর মূল্যয়ন করবেন কমিশন কী কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, কমিশন চেয়ারম্যান সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন না, আইনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আপনাদের যদি কোন অভিযোগ থাকে তা লিখিত আকারে আমার মাধ্যমে সরকারকে জানাতে পারেন।

সংশোধিত কমিশন আইনে চেয়ারম্যানের ক্ষমতা খর্ব করা হয়নি উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, চেয়াম্যানসহ সংখ্যগরিষ্ঠ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে। তাই চেয়ারম্যানের ক্ষমতা এখানে গৌণ।

বাঙালী নেতৃবৃন্দর কমিশনে বাঙালী প্রতিনিধিত্ব না থাকায় শঙ্কা প্রকাশ করে, সংশোধিত আইনটি বাতিল করে বাঙালীদের স্বার্থ রক্ষা করে আইন সংশোধনের অনুরোধ জানান।

মতবিনিময় সভায় খাগড়াছড়ি পৌর মেয়র রফিকুল আলম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রইছ উদ্দিন, এডভোকেট মঞ্জুর মোর্শেদ, এ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার, বাঙালী ব্যবসায়ী হাজী রফিক উদ্দীন, বাঙালী ছাত্র পরিষদ নেতা মাঈন উদ্দিন ও এস এম মাসুম রানা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ ভূমি কমিশনের সচিব ও যুগ্ম জেলা ও জেলা দায়রা জজ মো: রেজাউল করিম ও রেজিস্টার মো: সোয়েক খান উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত,পাহাড়ে ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে চলতি বছরের ০৮ সেপ্টেম্বর ক্ষতিগ্রস্থদের ৪৫দিনের মধ্যে আবেদন চেয়ে জারি করা গণবিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে প্রায় ১৪ হাজার ৮শ ব্যক্তি আবেদনপত্র পড়ে। পাশাপাশি আগামী ৩০ অক্টোবর পার্বত্য ভূমি কমিশনের দ্বিতীয় বৈঠক আহবান করা হয়েছে।

গত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদেও আরো এক দফা গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। সে সময় ৪৪০৮টি দআবেদন কমিশনে জমা পড়ে।

১৯৯৭ সালে সম্পাদিক পার্বত্য চুক্তির আলোকে গঠিত পার্বত্য ভ‚মি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন-২০০১। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা শুরু থেকে এ আইনের বিরোধিতা করে আসছিলেন।

অবশেষে চলতি বছরের ১ লা আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ভেটিং সাপেক্ষে ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন- ২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগতভাবে অনুমোদন ও ৯ আগষ্ট তা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গেজেট আকারে প্রকাশের পর গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদের পাশ হয়। বাঙালি সংগঠনগুলো আইন সংশোধনের পর থেকে আইনটি বাতিলের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে।

এদিকে সংশোধিত পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাতিল ও কমিশনের দ্বিতীয় বৈঠকের আহবানে আগামী ৩০ অক্টোবর(রবিবার) খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে সকাল-সন্ধ্যা সড়ক অবরোধ ডেকেছে বাঙালি দেরে ৫টি সংগঠন।

সংশোধিত ভূমি কমিশন আইনে বাংলাদেশের সংবিধান ও শান্তিচুক্তি লংঘিত হয়েছে

ভূমি কমিশন

♦ নির্মল বড়ুয়া মিলন ♦

জাতিগত বঞ্চনার সমাধান হিসাবেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি – বাঙ্গালী বহুমূখী বঞ্চনা বিদ্যামান। কিছু ক্ষেত্রে তা প্রশাসনিকভাবেও। এর উৎস কাপ্তাই বাঁধ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়নকালে এর প্রস্তাবনায়ও বলা হয়েছিল, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে। কিন্তু সাম্য-মৈত্রী- স্বাধীনতার কথিত ওই ধারণাটিকে এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিকতা দিতে পারেনি।
এর প্রমাণ হলো ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তরফ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নিম্নে বর্ণিত চারি খণ্ড (ক, খ, গ, ঘ) সম্বলিত চুক্তিতে উপনীত হইলেন। তবু এই চুক্তিতে কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক দলকে বা একটি সম্প্রদায়কে প্রধান্য দেয়া হয়েছে।

মুক্তমত

কিন্তু চুক্তির পর র্দীঘ ১৯ বছর যাবৎ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের ভিতর পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে কোন ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি বা পার্বত্য জনপদের সকল জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে সম-ভুমিকা রাখতে পারেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, কথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ ১৯ বছরের মধ্যে একবারও পার্বত্য তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এর কোন সাধারন পাহাড়ি – বাঙ্গালীদের এক সাথে নিয়ে বৈঠক করেনি (অদ্যবধি যাদের নিয়ে পিসিজেএসএস নেতৃবৃন্দ বৈঠক করেছেন এসব পাহাড়ি – বাঙ্গালীরা তাদের পকেটের লোকজন)।

পার্বত্য চুক্তির পর ১৯ বছরে ডাকঢোল পিটিয়ে, কিছু সংখ্যক সভা – সেমিনার করে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ধোঁয়া তোলা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা হয়নি।

এমন কি চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি তার নিজস্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত করার মতো উল্লেখযোগ্য নজিরও নাই, বরং তাদের বিরুদ্ধে নিজ জনগোষ্ঠীর লোকজনদের উপর প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন,অপহরণ, হত্যা, কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে।

পিসিজেএসএসের কেন্দ্রীয় নেতা এখন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার একজন তথাকথিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি স্থানীয় সংসদ সদস্য, অদ্যাবধি তার মুখ থেকে জেলার উন্নয়নমূলক কোন কর্মকাণ্ডের বুলি বের হয়নি। এ সংসদ সদস্য যখন জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় প্রশাসনে অথবা কোন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, তখন তার কথা শুনে মনে হয় তারা ও তার পরামর্শকরা আমাদের দেশের বাইরের, অন্য কোন দেশের মানুষ!

আমি বা আমার লেখা সরকার, কোন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল বা পার্বত্য চুক্তির বিরুদ্ধে নয়, সাম্য- মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধারণা পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে কতটা প্রাসঙ্গিক তা তুলে ধরার চেষ্টা করছি মাত্র।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় যে কোন সময়ের চেয়ে বেশী এসময় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ জাতীয় সংসদে পাশ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পাওয়ার পর সরকার গেজেটের মাধ্যমে আইন আকারে প্রকাশ করেছে।

এ আইন অনুসারে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যেমন; আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সদস্য সংখ্যা ছিলো কমিশনের চেয়ারম্যানসহ (অবসরপ্রাপ্ত ১ জন বিচারপতি) ৭ জন, সংশোধন করে এ কমিশনের সদস্য সংখ্যা করা হয়েছে ৯ জন।

কমিশনের চেয়ারম্যান ১ জন (অবসরপ্রাপ্ত ১ জন বিচারপতি), পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি কমিশনের সদস্য ১ জন, রাঙামাটি (চাকমা), খাগড়াছড়ি (ত্রিপুরা) ও বান্দরবান (মারমা) পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান/প্রতিনিধি সদস্য ৩ জন, রাঙামাটি (চাকমা সার্কেল চীফ), খাগড়াছড়ি (মং সার্কেল চীফ) ও বান্দরবান (বোমাং সার্কেল চীফ) সার্কেল চীফ/প্রতিনিধি সদস্য ৩ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার সদস্য ১ জন।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে রাখা হয়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর কোন প্রতিনিধি।

বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে বলা হয়েছে, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।

এছাড়া ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরাণ্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। ২০১৬ সালের সংশোধীত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে ৩টি জনগোষ্ঠীকে প্রধান্য দেয়া হচ্ছে, লঙ্ঘিত করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবিধান এবং ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি।

আগের আইনে ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে চেয়ারম্যান যে কোন সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারবেন, এখন সংশোধীত আইনে কমিশনের সে ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রস্তাবে নতুন আইনে বলা হয়েছে, কমিশনের সকল সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধনী) ২০১৬ এবং ২০০১ সানের ৫৩ নং আইন এর ধারা ৩ এর ৬ নং উপ ধারায় বলা হয়েছে, “ কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :

(ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা;

(খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল;

(গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ(রিজার্ভ ফরেস্ট) কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

তবে শর্ত থাকে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়ীসহ জলেভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।

এ আইনের উপধারার ব্যাখা অস্পষ্ট এতে করে যুগ যুগ ধারে পার্বত্য অঞ্চলে যে সব সরকারী ও স্বায়ত্বসাশিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, বিশেষ করে রক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেষ্ট) তারা তাদের ভুমির মালিকানা হারাবে এতে কোন ধরনের সন্দেহ নাই। এতে সমস্যার সমুখিন হবে, সরকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও ভুমি জরিপ বিভাগ ইত্যাদি।

সরকার চাইলেই আগের মতো করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে যে কারো ভুমি/ জায়গা অধিগ্রহণ করতে পারবে না। খোদ সরকারকে অনুমতি নিতে হবে বা পূর্বেই অনুমোদন নিতে হবে অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কাছ থেকে।

পার্বত্য অঞ্চলের জনসাধারনকে এ আইনের সারমর্ম কি এবং কাদের স্বার্থে এই আইন বা প্রবিধানের সংযোজন করা হয়েছে এটা পরিস্কার করে জানিয়ে দেয়া এখন সময়ের দাবি। আমাদের দেশের সরকার প্রধান, পিসিজেএসএস প্রধান এবং পার্বত্য অঞ্চলের নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজন পার্শ্বের বাড়িতে আগুন লাগলে নিজের বাড়িও তছনছ হয়।

৩ নং ধারার নং উপধারা দেশের প্রচলিত আইনের পরিপস্থি বলা হয়েছে,“২০। সরল বিশ্বাসে কৃত কাজ-কর্ম সংরক্ষণ : এই আইন বা প্রবিধানের অধীন সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কাজের ফলে কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানী বা ফৌজদারী মামলা বা অন্য কোন আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না”।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধন) ২০১৬ করা হয়েছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা জন্য।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন -২০০১ (সংশোধন) ২০১৬ বাস্তবায়ন করে কৌশলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের রেগুলেসন আইন পুর্ণ বলবৎ করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী (উপজাতীয়) রীতি ও প্রথায় ভুমি বন্দোবস্তী দেয়া হবে, আসলে সেই রীতি ও প্রথা কি ?

সহজ ও সরল ভাবে বলতে গেলে; প্রথমত কোনো ভুমির মালিক তার খাস জায়গা বা ভুমি নিজের নামে বন্দোবস্তী করতে চাইলে বা আবেদন করলে প্রথম যেতে হবে তার এলাকার/গ্রামের কার্বারীর কাছে, সে কার্বারীর সুপারিশ নিয়ে ভুমির মালিক যাবে ২য় পর্য়ায়ে মৌজা হেডম্যানের কাছে, কিন্তু (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি)’র পক্ষ থেকে গ্রাম প্রধান কার্বারীকে আগে থেকে বলা আছে, কোন বাঙ্গালী (মুসলিম, হিন্দু ও বড়ুয়া পার্বত্য অঞ্চলে এরা হচ্ছে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী) যদি ভুমি/ জায়গার সুপারিশ নিতে আসে তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

ভুমির মালিক যদি কয়েক মাস দৌঁড়-ঝাঁপ করে তাহলে হয়তো মিলেও যেতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছ থেকে অনুমতি।

ভুমির মালিক ২য় পর্য়ায়ে মৌজা হেডম্যানের কাছে গেলে সবার আগে হেডম্যান চাইবে সার্কেল চীফের স্থানীয় নাগরিকের সনদপত্র, (পার্বত্য চুক্তিতে এ ক্ষমতা জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চীফদের প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু সার্কেল চীফ, হেডম্যান ও কারর্বারীদের কাছে জেলা প্রশাসক প্রদত্ত স্থানীয় নাগরিকত্ব সনদপত্র গ্রহণযোগ্য নয়) যদি থাকে তো ভালো, না হলে দিনের পর দিন ঘুরতে হবে সেই সার্কেল চীফের সনদপত্রের জন্য।

সার্কেল চীফদের কার্যালয়ে গিয়ে দেখবেন তাদের কার্যালয়ে পাহাড়িরদের জন্য ১টি ফাইল আর বাঙ্গালীদের জন্য ১টি ফাইল। পাহাড়িদের ফাইলে দেখবেন ৩০টি সনদপত্রের জন্য আবেদন আর বাঙ্গালীদের ফাইলে দেখবেন ১-২টি সনদপত্রের জন্য আবেদন। এ সনদের জন্য পাহাড়িদের কাছ থেকে নেয় ১শত টাকা ফি আর বাঙ্গালীদের কাছ থেকে নেয়া হয়(যদি সনদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়) হাজার টাকা ফি, যা চরম বৈষম্য ও সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।

যাক ধরে নিন, ভুমির মালিক সার্কেল চীফের কাছ থেকে স্থানীয় নাগরিকের সনদপত্র নিতে পেরেছেন, এবার মৌজা হেডম্যানের কাছে সুপারিশ নিয়ে ৩য় পর্যায়ে ভুমির মালিক যাবে সার্কেল চীফের সুপারিশ নিতে, ভাগ্য ভাল হলে সার্কেল চীফের সুপারিশ পেয়ে যাবে, না হলে দিনের পর দিন ঘুরেও ভুমি/ জায়গার মালিক সার্কেল চীফের কাছ থেকে সুপারিশ পাবে না।

ভুমি/ জায়গার মালিককে কেন সার্কেল চীফ সুপারিশ করছে না অথবা সমস্যা কি জানতে ভুমি/জায়গার মালিক সেই সার্কেল চীফের সাথে দেখা করতে চাইলে সার্কেল চীফ দেখা করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন বর্তমানে। সার্কেল চীফের কার্যালয় থেকে সে ভুমির মালিককে বলা হয় আপনার সমস্যা জানিয়ে সার্কেল চীফের কাছে আবেদন করতে। একবার, দুইবার ও তিনবার আবেদন করেও কোন ফল পাওয়া যায় না।

একদিকে ভুমির মালিকের দখলে থাকা ভুমি/জায়গা বন্দোবস্তীর জন্য সুপারিশ করবে না অন্যদিকে সার্কেল চীফ সেই ভুমি/জায়গার মালিকের সাথে দেখাও করেন না।(এই কাজটি বেশী করেন এক আইনজীবী সার্কেল চীফ)।

ধরা যাক, ভুমির মালিক সার্কেল চীফের সুপারিশ পেয়ে গেছেন, ৪র্থ পর্যায়ে যেতে হবে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড)’র কাছে। উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) অফিসে সেই কয়েক মাস পড়ে থাকার পর যাচাই – বাচাই করে, ৫ম পর্যায়ে উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা সুপারিশ করে সেই ভুমি বন্দোবস্তীর ফাইল পাঠাবেন জেলা প্রশাসকের কাছে, সেই ফাইল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) যাচাই – বাছাই করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৬ষ্ঠ পর্যায়ে সেই ভুমি বন্দেবস্তীর ফাইল পাঠাবেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে অনুমোদনের জন্য।

জেলা পরিষদে সেই ভুমি বন্দোবস্তীর ফাইল কয়েক মাস পড়ে থাকার পর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমোদন পেলে সেই ভুমি/ জায়গা বন্দোবস্তীর ফাইল চলে যাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে, সেখানে কয়েক মাস শুনানী করার পর খাস ভুমি/জায়গার মালিককে অফিসিয়াল পত্র দিয়ে জানিয়ে দেয়া হবে ভুমি বন্দোবস্তীর সেলামীর টাকা (রাজস্ব) জমা দেয়ার জন্য। এখানে কেবলমাত্র মৌজার জায়গা/ভুমি বন্দোবস্তীর বিষয়ে বলা হয়েছে।

পার্বত্য তিন জেলায় রয়েছে বাজার ফান্ড নামক আরো একটি গোদের উপর বিষফোঁড়া।

এছাড়া বিএনপি সরকারের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের পরামর্শে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান তিন পার্বত্য জেলায় এক পরিপত্র জারি করিয়েছেন, এতে বলা হয়েছে, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য তিন জেলার জেলা শহরের মৌজা বা পৌরসভা এলাকার মধ্যে একজন ব্যাক্তিকে ৩০ শতকের বেশী ভুমি/ জায়গা বন্দোবস্তী জন্য জেলা প্রশাসক ও সার্কেল চীফের কার্যালয় থেকে সুপারিশ দেয়া বা গ্রহণ করা যাবে না।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহ, জেলা প্রশাসক কার্যালয়, উপজেলা ভুমি কর্মকর্তার কার্যালয়,সার্কেল চীফ কার্যালয়, হেডম্যান কার্যালয় ও কার্বারীদের ভিতর বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর অবস্থান ক্ষীণ।

বিশেষ ভাবে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে, পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ১০০% কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা গড়ে ২-৩ %।

এছাড়া পার্বত্য এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, প্রতিটি সরকারী ও বেসরকারী (এনজিও) প্রতিষ্ঠানে ১০০% কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে বাঙ্গালীর সংখ্যা গড়ে ১% ও নয়।স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর ভবিষৎ কি?

লেখক: প্রধান সম্পাদক, সিএইচটি মিডিয়া টুয়েন্টিফোর ডটকম

এগুলো দেখার জন্য কি পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম?

পিবিসিপি

প্রকৌশলী আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া

আমি প্রতিনিয়ত উদ্বেগ উৎকন্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি, যে সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের মানবাত্মায় স্নিগ্ধ হাসি ও প্রশান্তির উদ্ভাবক ছিল, সেই সংগঠন এখন কি করে এত হিংসাশ্রয়ী, হটকারী ও বেত্তমিজি আচরণ করছে এবং বীভৎস চেহারা নিয়ে জাতির সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে! একজন আরেক জনকে অবাঞ্ছিত করছে।

ব্যক্তি আক্রোশের কারণে নেতৃবৃন্দকে আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। দায়িত্বের মেয়াদকাল শেষ হলেও; দায়িত্ব ছাড়তে বা অন্যকে সুযোগ দিতে নারাজ। আমাদের কী দুর্ভাগ্য! এগুলো দেখার জন্য কি ১৯৯১ সালের ১ নভেম্বর এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম এবং এখনও নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি এরকম পরিণতি অবলোকন করার জন্য?

ছাত্র পরিষদের নেতা/কর্মী ভাইদের একটু চিন্তা করার জন্য এবং একটু ভাবনার জন্য আমার এ নিবেদন। সকলকে বুঝতে হবে, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে চায় যারা, তাদের গোড়া নিঃসন্দেহে সুদৃঢ়, তারা সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের ন্যায় পৃথক রাষ্ট্র এর স্বরূপ দানে ব্যাতি ব্যাস্ত।

মুক্তমত

সেই লক্ষ্যে পাহাড়কে যারা অনিদ্র সৈনিকের ন্যায় পাহারারত সেই পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদকে বিভিন্ন মোহে আক্রান্ত করে, তাদের পারষ্পারিক অর্ন্তঃদ্বন্দ্বের প্রতি সুদৃষ্টি নিবন্ধন সাপেক্ষে, ছাত্র পরিষদকে নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে অস্বাভাবিক ও ক্রমাগত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

আসলে আমরা জানি হিংসার রাজনৈতিক ফল সুখকর নয়।যারা এগুলোতে সহায়তা করছে তাদের পিছনের শক্তির উৎসগুলোর মূল শিকড় কোথায়? কারা এবং কেন এ উস্কানি দিচ্ছে? নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী কারা?

কারা ঠান্ডা মাথায় আমাদের তরুণদেরকে অস্বাভাবিক ভ্রান্ত বানিয়ে সহোদরদের মুখোমুখী দাঁড় করাচ্ছে?
আমরা দেখছি তারা প্রতিনিয়ত হিংস্র ও জিঘাংসা পূর্ণ হয়ে উঠছে। আসলে প্রত্যেকের বোঝা উচিত ছিল- হিংসা এবং অহংকারের রাজনীতির ফল সুখকর হয় না ।

আমাদের কী দুর্ভাগ্য! পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ এর বতর্মান নেতৃবৃন্দকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে ক্রমাগত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। লোভী, ছাত্র নামধারী ব্যবসায়ী এবং মোহআক্রান্ত ষড়যন্ত্রকারী, ভাতৃঘাতি দ্বন্দ্বে লিপ্ত যারা এগুলো করছে, তাদের খুজেঁ বের করার এবং ষড়যন্ত্র নির্মূল করার জন্য চিন্তাশীল, দেশপ্রেমিক, নির্লোভ নেতৃত্ব ও বাঙালি ভাইদের প্রতি আহব্বান জানাচ্ছি।

ষড়যন্ত্রকারী অবশ্যই নোংরা রাজনৈতিক প্রভাব পুষ্ট, তারপরও আমি আশা করি ইতোপূর্বে পার্বত্যবাসীর দূর্যোগ-দুর্বিপাকে পার্বত্য বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐ সব অপশক্তিকে রুখে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণ করেছে,পার্বত্য বাঙালিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস-বাঙালি জাতি পারষ্পারিক অর্ন্তদ্বন্দ্বের কথা ভুলে গিয়ে,প্রতিহিংসামূলক আচরণ ছেড়ে দিয়ে জাতির এ ক্রান্তিকালের কথা চিন্তা করে দেশপ্রেমে অবিচল থেকে পার্বত্যবাসির জন্য ভাবুক। কবিমন নিয়ে বাংলাদেশের এক দশমাংশ রক্ষায় দীপ্ত শপথে এগিয়ে আসবে। ভুলে যাবে সব ভাই/বন্ধুদের দেওয়া যতকষ্ট, ভুলে যাবে সব না পাওয়ার বেদনা, মুছে ফেলবে হৃদয়ের প্রাপ্ত সব গ্লানি। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এ আমার বিনীত মিনতি।

♦ প্রকৌশলী আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া: প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি, চেয়ারম্যান,পার্বত্য নাগরিক পরিষদ।

বিতর্কিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাতিলের দাবীতে ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে বাঙালী সংগঠনগুলো

হরতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বিতর্কিত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ সংশোধনী- ২০১৬ অবিলম্বে বাতিল এবং বান্দরবানের বাঙালী নেতা আতিকুর রহমানের মুক্তির দাবীতে ৪৮ ঘণ্টা হরতাল ডেকেছে ৫ বাঙালী সংগঠন। ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা এবং ১৬ অক্টোবর রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মোট ৪৮ ঘন্টা হরতাল হরতাল ডেকেছে সংগঠন ৫ টি।

রবিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে-

‘পার্বত্য জনগণের আন্দোলনকে উপেক্ষা করে সরকার পার্বত্য চট্রগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন- ২০০১ ও তার সংশোধনী আইন-২০১৬ তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে পাস করার প্রতিবাদে এবং বান্দরবানের বাঙ্গালী নেতা আতিকুর রহমানের মুক্তির দাবিতে আগামী ১৩ অক্টোবর ও ১৬ অক্টোবর হরতাল ডেকেছে পাঁচ বাঙ্গালী সংগঠন ।

৯ অক্টোবর সকাল ১০টায় সংগঠনগুলোর ঢাকার অস্থায়ী কার্যালয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয় । এতে সভাপতিত্ব করেন পাঁচ বাঙ্গালী সংগঠনের আহবায়ক, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ্ব আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া ।

এতে আরো উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য সমধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কামাল, পার্বত্য গণ পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার, পার্বত্য গণ পরিষদের মহাসচিব এডভোকেট মোহাম্মদ আলম খান, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আহম্মেদ রাজু, পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাব্বির আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার জাহান খান,পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আফছার হোসেন রনি, সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মুন্না তালুকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ সাইফুল ইসলাম খান।

সরকার গত ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০১৬ পাস করায় পাঁচ বাঙ্গালী সংগঠন নেতৃবৃন্দ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, এই বিতর্কিত আইন পার্বত্য চট্রগ্রামে বাঙ্গালী এবং উপজাতীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ইতোমধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সমুহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে । তাই এই বিতর্কিত আইন শীঘ্রই বাতিল এবং বান্দরবানের পাঁচ সংগঠনের শীর্ষ নেতা, পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি আতিকুর রহমান মুক্তির দাবিতে তারা নিন্মোক্ত কর্মসূচি গ্রহণ করে:

ক) ৯ অক্টোবর থেকে তিন পার্বত্য জেলায় বিক্ষোভ মিছিল, গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ এবং সর্বত্র কালো পতাকা উত্তোলন।
খ) ১৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টা এবং ১৬ অক্টোবর রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত মোট ৪৮ ঘন্টা হরতাল’ ।