বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হতে চাওয়ার প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যত ভাবনা

তিমির মজুমদার:

বাংলাদেশে বসবাসরত  বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র  জাতিসত্ত্বা ও বিভিন্ন গোত্র পরিচয়ের জনসাধারণকে সাংবিধানিকভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে “The United Nations Declaration on The Rights of Indigenous People” বা “আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র” জারী হবার পর, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিরা হঠাৎ করেই নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিতি লাভের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মিডিয়ার একাংশ, সুশীল সমাজের কতিপয় ব্যক্তিবর্গ ও আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থার সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তাদের এই দাবী দিনের পর দিন আরও জোরালো হচ্ছে। তাদের এই দাবীর প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগলিক অখণ্ডতা, জাতীয় সংহতি ও স্বাধীন দেশের অস্তিত্বের উপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এই প্রবন্ধের বিবেচ্য।

আদিবাসী বলতে কি বুঝায়? এর সংজ্ঞা কি?  যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার এবরিজিন, নিউজিল্যান্ডের মাউরি, রাশিয়ার মেনেট, জাপানের আইনু, ফ্রান্স ও স্পেনে বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, আরবের বেদুইন প্রভৃতি জনগোষ্ঠী যারা সুপ্রাচীনকাল থেকে স্ব স্ব ভূখণ্ডে বসবাস করেছেন তারা আদিবাসী হিসেবে বিশ্বে সর্বজন স্বীকৃত ও সুপরিচিতি। এখানে উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ানগণ অষ্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করলে তাদের অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। আভিধানিক সংজ্ঞায় আদিবাসী শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘Indigenous’ অথবা ‘Aborigine’ যার অর্থ হচ্ছে ‘Native Born, Originating or Produced Naturally in a Country, not Imported’ অথবা  Belonging to a particular place rather than, coming to it from somewhere else.’ যার বাংলা প্রতিশব্দ/অর্থ হচ্ছে ‘দেশী’, স্বদেশজাত, দেশীয়; বৈদেশিক অথবা বহিরাগত নয়।

অন্যদিকে নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় ‘আদিবাসী’ হচ্ছে কোন স্থানে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, বসতি স্থাপন, ছড়িয়ে পড়া ইত্যাদি সম্পর্কে বিশেষ কোন ইতিহাস জানা যায়নি। (The Indigenous are the groups of human race who have been residing in a place form time immemorial. They are the true sons of the soil: Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972)।

এখন দেখা যাক জাতিসংঘ উপজাতি ও আদিবাসীর সংজ্ঞা কিভাবে নির্ধারণ করেছে। এই প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labor Organization-ILO) এর ৫ জুন ১৯৫৭ তারিখের ৪০তম অধিবেশনের কনভেশন- ১০৭ এবং ৭ জুন ১৯৮৯ তারিখের কনভেশন- ১৬৯ এ আদিবাসী ও উপজাতির সংজ্ঞা এবং এর সাথে তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সংযোজন করা হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ তারিখে ৬১তম অধিবেশনের ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ যার প্রেক্ষিতে আমাদের দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে, সেটিতে উপজাতিদের বিষয়ে কিছুই উল্লেখ নেই এবং আদিবাসীদের সংজ্ঞাও নির্ধারণ করা হয়নি।

Indigenous and Tribal Populations Convention,1957(No. 107)

Article 1: This Convention Applies to:

(a)     members of tribal or semi-tribal populations in independent countries whose social and economic condition are at a less advanced stage than the stage reached by the other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations.

(অর্থাৎ একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অন্যান্যদের চেয়ে অনগ্রসর এবং যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি, আইন অথবা  বিশেষ আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত তাদেরকে উপজাতি অথবা উপ–উপজাতি বলে গণ্য হবে)।

(b)     members of tribal or semi-tribal populations in independent countries which are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization and which, irrespective of their legal status, live more in conformity with the social, economic and cultural institutions of that time than with the institutions of the nation to which they belong.

(অর্থাৎ যে সকল জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া অথবা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতি, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে তারা আদিবাসী বলে গণ্য হবে)।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1989 (No. 169) Article 1 :

This Convention Applies to:

(a)     tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially be their own customs or traditions or by special laws or regulations.

(অর্থাৎ একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত তারা উপজাতি বলে গণ্য হবে)।

(b)     peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.

(অর্থাৎ যে সকল জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া অথবা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে তারা আদিবাসী বলে গণ্য হবে)।

উপরোল্লিখিত দুটি সংজ্ঞা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার বা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্বে থেকে বসবাস করা। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি একই রকম। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠী উপজাতি অথবা আদিবাসী হবেন উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে। আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি বাংলাদেশর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের ক্ষেত্রে বিচার করা হয় তাহলে পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, এরা আদিবাসী নয়;  উপজাতি।

এখন পর্যবেক্ষণ করা যাক বাংলাদেশর জন্য ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনের ‘United Nation Declaration on the Rights of Indigenous Peoples’ বা  ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’টি কতটা প্রযোজ্য। ঘোষণাপত্রটির উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এটি অনেক ক্ষেত্রে সংগতিপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। এই ঘোষণাপত্রের নিম্নোক্ত ধারাগুলি বিশেষভাবে অধ্যায়ন করা প্রয়োজনঃ

Article 3

Indigenous peoples have the right to self-determination. By virtue of that right’ they freely determine their political status and freely pursue their economic, social and cultural development. অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করতে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখতে পারবে।   

Article 4

Indigenous peoples, in exercising their right to self-determination, have the right to autonomy or self-government in matters relating to their internal and local affairs, as well as, ways and means for financing their autonomous functions.

অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী আত্মনিয়ন্ত্রাধিকার চর্চার বেলায় তাদের আভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্বশাসন বা স্ব শাসিত সরকারের অধিকার থাকবে এবং তাদের স্ব শাসনের কার্যাবলীর জন্য অর্থায়নের পন্থা ও উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার থাকবে।

Article 5

Indigenous peoples have the right to maintain and strengthen their distinct political, legal, economic, social and cultural institutions, while retaining their right to participate fully, if they so choose, in the political, economic, social and cultural life of the State.

অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে নিজস্ব জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার থাকবে।

Article 10

Indigenous peoples not be forcibly removed from their lands or territories. অর্থাৎ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি বা ভূখণ্ড থেকে জোর করে অন্য কোথাও সরানো যাবে না।

Article 30

Military activities shall not take place in the lands or territories of indigenous peoples, unless justified by relevant public interest or otherwise freely agreed with or requested by the indigenous peoples concerned.

 অর্থাৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা  যাবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজনে যুক্তিগ্রাহ্য হবে অথবা যদি সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতিজ্ঞাপন বা অনুরোধ করে।

জাতিসংঘ সনদগুলোর বর্তমান অবস্থা কি? Indigenous and Tribal Populations Convention-1957 (No. 107) ১৯৫৭ সালে পাশ হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭ টি দেশ এই কনভেনশনটি র‍্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশও কনভেনশন- ১০৭ র‍্যাটিফাই করেছিল। পরবর্তীতে কনভেনশন- ১৬৯ পাশ হবার পর কনভেনশন ১০৭ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তামাদী হয়ে গেছে এবং বাংলাদেশ অদ্যাবধি কনভেনশন- ১৬৯ র‍্যাটিফাই করেনি। তাই এটি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যপালনীয় নয়। এখানে লক্ষণীয় যে, ইতোমধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে।

অন্যদিকে Indigenous and Tribal Populations Convention-1989 (No.169), ১৯৮৯ সালে পাশ হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২২ টি দেশ এই কনভেনশনটি  র‍্যাটিফাই করেছে।  এই উপমহাদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশনটি র‍্যাটিফাই করেনি। অন্যদিকে, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক যে ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে ভোটদানের সময় ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকে। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এই দেশগুলোতে আদিবাসীরাই ছিল এক সময়ে মূল জনগোষ্ঠী এবং জাতিগতভাবে যাদের সংখ্যা বিপদজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

বিস্ময়কর অথবা পরিহাসের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের আদিবাসীদের রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন- ১০৭ বা ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের স্বাক্ষরকারী নয়, পক্ষে ভোট দেয়নি এবং র‍্যাটিফাইও করেনি। কাজেই তাদের কুমিরের অশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হবার প্রয়োজন নেই। এসব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি গুলোর উপজাতি, আদিবাসী কিংবা ক্ষ্রদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য এই মায়াকান্নার পেছনে মূলত ভূ–রাজনৈতিক, ভূ–অর্থনৈতিক এবং সর্বোপরি অধিপত্যবাদী স্বার্থই প্রকাশ্যে কিংবা অবচেতনে প্রবলভাবে কাজ করেছে একথা নির্দিধায় বলা যায়।

তাহলে বাংলাদেশে সত্যিকার আদিবাসী কারা? নিঃসন্দেহে বাঙালী ও বাংলা ভাষাভাষীরা এদেশের সত্যিকারের আদিবাসী। কারণ এরাই  প্রোটো–অষ্ট্রেলিয়েড (Proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ এবং তারাই একমাত্র আদিবাসী বা  Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রমাণও রয়েছে। বাংলাদেশের এই অঞ্চলে বাঙালিরা বসবাস করে আসছে চার হাজার বছরেরও পূর্বে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি–বটেশ্বর, সোনারগাঁও কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত নৃতাত্তিক প্রমাণাদি এসব বিষয় নিশ্চিত করে।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান ছিল আরাকানে, ত্রিপুরাদের আদি বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এবং মার্মা জনগোষ্ঠী এসেছে বার্মা থেকে। সেই অর্থে তারা কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয় বরং তারা এদেশে অভিবাসী। তারা বিভিন্ন স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানাস্থানে অভিবাসিত হয়ে আনুমানিক তিনশ থেকে পাঁচশ বৎসর পূর্ব থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাস করতে শুরু করেছে। তাই কোনোক্রমেই বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, অন্যান্য ক্ষ্রদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী হতে পারে না। যারা তাদের আদিবাসী বলে আখ্যায়িত করছেন তারা শুধু সংবিধান লংঘন করছেন তা নয় বরং তারা জেনে শুনে মিথ্যাচার করেছেন।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যে আদিবাসী নয় তার প্রমাণ কি?  বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপূত্র নয় তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ Robert Henry Sneyd Hutchinson তার বই  ‘An Account of Chittagong Hill Tracts’ (1906), Captain Thomas Herbart Lewin তার বই ‘The Chittagong Hill Tracts and Dwellers There in’ (1869) অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত বা অভিবাসিত হবার যুক্তি প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Captain Thomas Herbart Lewin  এর মতে, ‘A greater portion of the hill tribes, at present living in the Chittagong Hills, undoubtedly came about two generations ago from Arracan.  This is asserted both by their own traditions and by records in the Chittagong Collectorate (Lewin 1869, 28). অর্থাৎ মাত্র দুই পুরুষ আগে ব্রিটিশদের সাথে বার্মা যুদ্ধের সময় চাকমারা পার্বত্য অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করে যা চট্টগ্রাম কালেক্টরেট অফিসে রক্ষিত দলিল দস্তাবেজ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী সদস্যরা ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে বার্মা থেকে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস শুরু করে (Shelly, 1992 এবং Lewin, 1869)।

বিশিষ্ট ব্রিটিশ চাকমা পন্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগং’এ লিখেছেন, ‘তারা (চাকমারা)এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে’। পরবর্তীতে  আরাকান এবং মগ কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আড়াইশ থেকে তিনশ বছর পূর্বে তারা উত্তর দিকে রাঙ্গামাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন’। এ বিষয়ে বিশিষ্ট গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুর রব, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা ড. খুরশীদা বেগম, বিজয় কী বোর্ডের উদ্ভাবক জনাব মোস্তফা জব্বার, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কাজ করেছেন এমন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক জনাব মেহেদী হাসান পলাশ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নয়। এছাড়া মার্মা সার্কেল চীফ অংশু প্রু চৌধুরী প্রদত্ত বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য ও সাক্ষাৎকার এবং ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তিক্তে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উপজাতি হিসাবে পরিচিতি প্রদান করা হয়েছে ‘আদিবাসী’ হিসেবে নয় (বিস্তারিতঃ https://www.youtube.com/watch?v=_IlixQ1SS6s)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী আখ্যায়িত করেল অসুবিধা কি?   অনেককেই এটি বলতে শোনা যায় যে, আদিবাসী বললে যদি ওরা খুশী হয় বা খুশী থাকে তাহলে সমস্যা কি?  বিভিন্ন লেখা এবং দুই একটি সরকারী প্রজ্ঞাপনে এমনকি কোর্টের রায়ে পর্যন্ত অবচেতনভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এ থেকে কোন সমস্যা হবে না বলে মনে হতে পারে কিন্তু কিন্তু পরবর্তীতে ‘ইষ্ট তিমুর’ কিংবা ‘সাউথ সুদান’ এর মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তার দায়ভার নিতে কি আমাদের সেই সব বুদ্ধিজীবী এবং মিডিয়া ভালো প্রস্তুত আছেন?

সকলের জ্ঞাতার্থে এখানে উল্লেখ্য করা অপ্রাসাঙ্গিক হবে না যে  ‘ইষ্ট তিমুর’ এবং ‘সাউথ সুদান’ এর মত একই পরিস্থিতি কাশ্মীর, চেচনিয়া, ফিলিপাইনের মিন্দনাও এবং পৃথিবীর আরও কিছু স্থানে বিরাজ করলেও সেখানে গণভোট অনুষ্ঠিত করে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি এবং হবার কোন সম্ভাবনাও নেই। তাছাড়া স্বাধীনতার পরপরই পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একটি অংশ স্বাধীন ‘জম্মুল্যান্ড’ স্থাপন করার জন্য এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর একান্ত চেষ্টায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তারিখে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একাংশ এখনও জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (সংস্কার) এর নামে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম চালু রেখেছে। কাজেই ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি আদায় করতে পারলে জাতিসংঘ ঘোষণা অনুযায়ী তারা ‘জুম্মল্যান্ড’ দাবী করবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

কেননা ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র- ২০০৭’ অনুযায়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করলে সেই অনুযায়ী তাদের স্বায়ত্বশাসন, রাজনৈতিক, আইনী, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা প্রদান করার বাধ্যবাধকতা থাকবে। বিশেষ করে এই ঘোষণার ধারা ৩০ অনুযায়ী ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি কিংবা ভূখণ্ডে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না উপযুক্ত জনস্বার্থের প্রয়োজনে যুক্তিগ্রাহ্য হবে, অন্যথায় যদি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় সম্মতিজ্ঞাপন বা অনুরোধ না করে।

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ কোন জনগোষ্ঠীর ভূমি বা ভূখণ্ড ব্যবহারের আগে যথাযথ পদ্ধতি ও বিশেষ করে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে অনুমতি গ্রহণ করার বিষয়টি সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। আর যদি তারা ‘স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন’ না করে তাহলে কি হবে? যদি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বহির্বিশ্বের কারো সঙ্গে কোনো অশুভ আঁতাত করে? যদি বহির্বিশ্ব থেকে ওই অঞ্চল আক্রান্ত হয় তবে সরকার কি সামরিক কার্যক্রম গ্রহণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কারো সম্মতির অপেক্ষায় নিস্ক্রিয় থাকবে?  যদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতৃত্ব সম্মতি না দেয় তাহলে কি হবে? বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ অথবা এর কোন অঙ্গ সংগঠনের মত অনুযায়ী যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত না হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করতে পারে।

এছাড়াও বাংলাদেশে কম–বেশি ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ‘মালিকানাধীন’ ভূমি আছে এবং তারা যদি সেই ভূমি বা ভূখন্ড ব্যবহারে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর এত বিধি–নিষেধ আরোপ করে তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কী হবে?  এই সকল প্রশ্নের গুরুত্ব অনুধাবন করতঃ সকলকে এই বিষয়টিতে সতর্ক হতে হবে এবং ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’দের ‘আদিবাসী’ বলা বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও প্রচুর চাকমা, ত্রিপুরা ও অন্যান্য ট্রাইবাল জনেগোষ্ঠী রয়েছে। তারা সেখানে উপজাতি বা Schedule Cast হিসেবে পরিচিতি এবং সুবিধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। সেখানকার কোন মিডিয়া কিংবা বুদ্ধিজীবী তো তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবার আন্দোলন করছেনা।

উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা আমাদের মোট ভূখন্ডের দশভাগের একভাগ (১৩,২৯৫ বর্গ কিঃ মিঃ/৫,১৩৩ বর্গ মাইল) এবং এখানে মোট জনসংখ্যার মাত্র শতকরা এক ভাগ (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) মানুষ বাস করে। এ এলাকায় জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে যারা অবচেতনে উস্কে দিচ্ছেন তারা কি জানেন যে, এখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষূদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বাকী অর্ধেক বাঙালী। মাত্র দশ বছর আগে থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের দাবীকৃত আদিবাসী হবার প্রবল ইচ্ছা আসলে জাতিসংঘের ২০০৭ সালের ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্রে’র বিভিন্ন ধারা থেকে ভবিষ্যতে ফায়দা লোটার কৌশল। এই কৌশলের ফাঁদে পা দেয়া ভয়ংকর এবং বিপজ্জনক। কারণ তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তার এক দশমাংশ ভূমির মালিকানা হারাতে পারে যার সাথে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভূখণ্ডের একদশমাংশ ছেড়ে দিতে কি আমরা প্রস্তুত? যার উত্তর অবশ্যই ‘না’। কাজেই সকলকে সতর্ক হতে হবে এবং এদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ‘আদিবাসী’ বলা বন্ধ করতে হবে। আশা করা যাচ্ছে যে, এই রচনা পাঠ করার পর আর কেউ স্বজ্ঞানে বা অবচেতনে বাংলাদেশে বসবাসরত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’দের ‘আদিবাসী’ সম্বোধন করা থেকে বিরত থাকবেন।

(লেখক- শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মী)

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অস্থিরতার নেপথ্যে

images-ববব

সালিম অর্ণব

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সংঘাত ও সাম্প্রতিক উত্তেজনার মূল শিকড়টা খুঁজতে গেলে প্রথমে চোখ বুলাতে হয় ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উগ্রবাদী বৌদ্ধ আর স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে ধর্মান্তরিত হওয়া মুসলিম গোষ্ঠীর সংঘাত চলতে থাকে যুগের পর যুগ।

অন্যদিকে সামরিক শাসনের কষাঘাতে জর্জরিত মিয়ানমারের মানুষ শান্তি বলতে সত্যিকার অর্থে কী বোঝায়, সেটা প্রত্যক্ষ করতে পারেনি দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে। একের পর এক সামরিক জান্তার দুর্বিষহ শোষণ আর গণনিপীড়নে অস্থির জনজীবনে আরেক বিভীষিকার নাম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। বিশ্বজুড়ে গণমানুষের মনে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, বৌদ্ধমাত্রই শান্তিপ্রিয়, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ থেকে দূরে থাকা মুণ্ডিত মস্তকের বিদ্বান ব্যক্তি; যা মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধদের সঙ্গে একটুও মেলানো যাবে না। বেসামরিক জনতার ওপর সামরিক সরকারের দলনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষের প্রাণ যেখানে ওষ্ঠাগত, সেখানে যুক্ত হয়েছে মাদকের কালো ছোবল। পক্ষান্তরে আনুষঙ্গিক নানা দুরবস্থায় মিয়ানমারের উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সঙ্গে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্ত উত্তেজনার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।

বলতে গেলে বিগত এক দশকে মিয়ানমারের কোনো সংবাদপত্রের পাতায় এক দাঙ্গা-ফ্যাসাদ বাদে উল্লেখযোগ্য সংবাদ ছাপা হয়নি, যাতে মানুষ আশাবাদী হতে পারে। অং সাং সু চি নামমাত্র শান্তির বারতা নিয়ে মিডিয়া স্টান্ট হাজির করে নোবেল জিততে পেরেছেন ঠিকই। কিন্তু আমজনতার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দিতে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ— এটা এখন বলা যেতেই পারে।

সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবিরোধ, যার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বলতে গেলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের এ সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে অনেক নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদির আগমন, দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে রুশ-মার্কিন-চৈনিক ভাবনার বিপ্রতীপে ভারতীয় বিদেশনীতি— সবই অবস্থাবিশেষে গুরুত্বের দাবি রাখে।

দৈনিক সংবাদপত্রগুলো থেকে জানা যায়, কয়েক সপ্তাহ ধরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত ২৮ মে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান নিহত হন। এ সময় দখল-সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলায় দু’পক্ষের মধ্যে দীর্ঘসময় গুলি বিনিময় হয়। এ গুলি বিনিময়ে হতাহতের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। মিজানের মৃত্যুর পর সাময়িক বিরতি দিয়ে ৩ জুন ওই সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, আবার গোলাগুলির খবর শোনা যায় সংবাদ মাধ্যমগুলোয়। উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে ৫ জুন মিয়ানমারের মংডুতে বিজিবি ও বিজিপির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পতাকা বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ বৈঠকে তারা সুবেদার মিজানের হত্যার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে। কিন্তু ঠিক তার পরদিনও সীমান্তে গুলিবর্ষণ অব্যাহত ছিল বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে।

হঠাৎ করে অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত মিয়ানমারের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সীমান্তরক্ষীদের বিজিবির ওপর চড়াও হওয়াটা কোনো আশার কথা বলে না। এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে অনেক প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এ সীমান্তে হঠাৎ করে উত্তেজনা বাড়ল কেন? মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীইবা কোন দুঃসাহসে এবং কার ইন্ধনে কোনো হুঁশিয়ারি ছাড়া গুলি করে হত্যা করল বিজিবি সদস্যকে? অনেক বিশ্লেষক এটাকে নিছক দুর্ঘটনা কিংবা ভুল বোঝাবুঝির ফল হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইবেন, যেটা কোনো অংশেই ঠিক নয়; উপরন্তু এ-জাতীয় বিভ্রান্তিকর চিন্তা ওইসব বিশ্লেষকের রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রজ্ঞা ও শিষ্টাচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একটু খেয়াল করলে সাধারণ্যেই স্পষ্ট হয়, এ গোলাগুলি কোনো ভুল বোঝাবুঝির ফল নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং কারো উসকানির ফল। বিশেষ করে এই গুলি ছোড়া যদি ভুল বোঝাবুঝিই হবে, তাহলে দ্বিতীয়বার মিয়ানমারের বিজিপি বাংলাদেশী বিজিবির ওপর গুলি ছুড়ত না।

পররাষ্ট্রনীতির কিছু বিষয় ছাড়াও অর্থনৈতিক দিক থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করাটা বাংলাদেশের জন্য খুব জরুরি। অন্যদিকে সে বিষয়টি নিয়ে মিয়ানমারও বেশ ওয়াকিবহাল। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়েই বিমসটেকের সদস্য। পাশাপাশি বিসিআইএম নামক উপআঞ্চলিক জোটেও মিয়ানমার রয়েছে। এর থেকে ধরে নেয়াই যেতে পারে মিয়ানমারের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশ তার পূর্বমুখী নীতিতে সাফল্যের মুখ দেখবে না। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের চলমান সীমান্ত উত্তেজনা আর যা-ই হোক, দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিশেষ টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে; যা প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশেরই ক্ষতির কারণ। যেমন— কুনমিং-কক্সবাজার সড়কের ব্যাপারে বাংলাদেশের আগ্রহ থাকলেও সীমান্ত সংঘাতে সৃষ্ট শীতল সম্পর্ক মিয়ানমারের পক্ষে এ সড়কের অনুমতি প্রদানের অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার মৈত্রী সড়কের মাধ্যমে কুনমিংয়ের সংযুক্তির কথা থাকলেও তা এখন ঝুলে পড়েছে।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনীতির পুরোটাই সেনাশাসকদের অধীনে পর্যুদস্ত। নোবেলজয়ী নেত্রী সু চি শুধু মুখে মুখে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বললেও পর্দার আড়ালে কাজ করে সেখানে একটি মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছেন। আর এজন্য সুকৌশলে কিংবা সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করে আদিবাসী মুসলিমদের উত্খাত করাটা তাদের জন্য খুব জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। জেনারেল নে উইনের আমলে আরাকানে জাতিগত আন্দোলন দমনের নামে ১৯৭৮ সালে যে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালানো হয়েছিল, তার কালো থাবা আরো বেশি করে উসকে দেয় জাতিগত দাঙ্গাকে। তখনকার আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে হত্যা করা হয় হাজার হাজার মুসলিম নারী-পুরুষ, শিশুকে। তাদের আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নিপীড়ন ও ধর্ষণে বাধ্য হয়ে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আর মিয়ানমারের সামরিক শাসক থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী নেত্রী সু চি সবাই এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যত বেশি অত্যাচার করা হবে, তারা প্রাণভয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটতে থাকবে, প্রকারান্তরে অনেক পরিষ্কার হয়ে যাবে মৌলবাদী বৌদ্ধরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ।

রোহিঙ্গাদের ক্রমাগত আগমন জনসংখ্যার ভারে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য উটকো সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রথম প্রথম বাংলাদেশের কিছু মানুষ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের জন্য এক মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে উপস্থিত হয়। বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে এবং তার ফলও লাভ করে বেশ দ্রুত। ১৯৭৯ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি কিছু শরণার্থী রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরার পথ করে দেয়। এ সময় বাদ সাধে নাগরিকত্ব আইন। এর মাধ্যমে মিয়ানমার সরকার ১৯৮৩ সালের পর মিয়ানমারে আগত রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে। বলতে গেলে এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের পক্ষে সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ চলাচল একরকম নিষিদ্ধই হয়ে যায়। পাশাপাশি এ আইনও করা হয় যে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অন্য প্রদেশে গিয়ে বাস করতে পারবে না। উচ্চশিক্ষার সুযোগ না থাকার পাশাপাশি দুই সন্তানের বেশি হলে পিতামাতার ওপর নির্যাতন চালায় সামরিক বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে শিশুসন্তানকে হত্যাও করে তারা। রোহিঙ্গাদের বিয়েতে পর্যন্ত আরোপ করা হয় বিশেষ নিয়ন্ত্রণ। ফলে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকে বাংলাদেশ সীমান্তে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা চাইছে না রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যাক। উপরন্তু তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি মিয়ানমারেরই রাজনৈতিক সমস্যা, যার অংশ বাংলাদেশ নয়। কিন্তু তারা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট, আরাকান ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন— এসব সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ সীমান্তে জোরপূর্বক পুশইন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা তত্পর থাকায় মিয়ানমারের মৌলবাদী বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার কাজ অনেক কঠিন হয়ে গেছে। তাই বিশেষ গোষ্ঠীর নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থায়ী উত্তেজনা বজায় রাখার পথ সুগম করতেই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে মিয়ানমারের লুন্থিন বাহিনী।

গত মার্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার পর থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ ভালোই ছিল বলা যেতে পারে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোয় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠকও করেন। তখন বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক বৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, তখন বাংলাদেশের সহযোগী হতে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল মিয়ানমার। তাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রচিন্তাবিদ সবার মনে এখন একটিই প্রশ্ন মাত্র দুটি মাসের ব্যবধানে এমন কী ঘটে গেছে, যা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে রক্ত ঝরাচ্ছে? আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলতে চাইছেন নিছক ভুল বোঝাবুঝি থেকে ঘটছে হত্যাকাণ্ড। তবে তার বাইরে আরো কিছু কারণ আছে, যেটা কোনো আশার কথা বলছে না।

বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত শান্ত আছে, এমনটি নয়। বিশেষত আদিবাসী রোহিঙ্গাদের জোর করে বাংলাদেশ পাঠানো, নাফ নদী থেকে বাংলাদেশী জেলেদের পাকড়াও করা, নাইক্ষ্যংছড়ির অরণ্যে কাঠুরিয়াদের নির্যাতন দুটি দেশের শীতল সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে মাদকের ভয়াবহ ছোবলে বিধ্বস্ত মিয়ানমার গ্রাস করতে চাইছে বাংলাদেশকে। সম্প্রতি বাংলাদেশে আসা প্রাণঘাতী ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎস মিয়ানমার। মিয়ানমারের চোরাচালানিদের নিয়ে আসা ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের ড্রাগস আটকে দিতে সদাতত্পর আমাদের সাহসী সীমান্তরক্ষী বাহিনী। এগুলোর পাশাপাশি অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া পাঠানোর কাজে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারেও বাধা দেয় বিজিবি সদস্যরা। সম্প্রতি কোস্টগার্ডের সহায়তায় নৌকায় সাগর পাড়ি দেয়া বেশ কয়েকটি বহর আটকে দেয় তারা। বলতে গেলে নিছক দুর্ঘটনা তো নয়ই বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমান্তে ত্রাস সৃষ্টির জন্য বিজিবির মিজানুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করে লুন্থিন বাহিনী। একে তাই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ না করে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। মিয়ানমার বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রক্ষার প্রয়োজনে অনর্থক সংঘাত ও উত্তেজনা কাম্য নয়।

নাইক্ষ্যংছড়ির নিখোঁজ বিজিবি সদস্য উদ্ধার হয়নি : পতাকা বৈঠকে সাড়া দেয়নি মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী

pic-1

নুরুল আলম সাঈদ, নাইক্ষ্যংছড়ি:

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দূর্গম দোছড়ি ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাইনছড়ি এলাকায় (বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন) বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিপি কর্তৃক গুলিবর্ষণ ও  ওই এলাকার নবগঠিত পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ।

 

এই ঘটনার উত্তরণের জন্য গত ২৮ মে বিকাল ৪.০০ঘটিকায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) ’র নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ(বিজিপি) মংডু ২নং সেক্টরের কমান্ডার থিং কো কো বরাবরে পতাকা বৈঠকের জন্য পত্র প্রেরণ করে । কিন্তু এ পত্রের কোনো উত্তর দেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

বিজিবি গতকাল ২৯ মে সকাল ১১.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহির মাঠ এলাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করে । আয়োজন সম্পন্নের পরও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) পতাকা বৈঠকে আসেনি । সকাল ৯.০০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল  বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি)’র কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসান, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান, উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেনসহ বিজিবি ও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ ।

বাংলাদেশ সীমান্তের প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্টে অতিরিক্ত বিজিবি ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে । নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান বলেন, মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী জেনেভা আইন লংঘন করেছে । সীমান্ত আইন অনুযায়ী সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় উভয় দেশের পতাকা নিয়ে সশস্ত্র টহলরত অবস্থায় কোন সেনা, সৈন্য ও সীমান্তরক্ষীকে গুলি বা অপহরণ করা যাবে না । এই আইন লংঘন করে গুলি চালায় এবং এক বিজিবি সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় । এই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতে মায়ানমার সরকার তাদের টিভি, রেডিওসহ সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করছে , বাংলাদেশর দূর্গম সীমান্তে এক সশস্ত্র মুজাহিদ আটক ।

এদিকে গতকাল নিখোঁজ বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমান এর খবরাখবর নেওয়ার জন্য তার ভাই, ভাই পো, চাচাসহ নিকট আত্মীয়রা নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জোন সদরে আসেন । উদ্ধার অভিযান, উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আলীকদম রিজিয়ন থেকে ৪০ জন সেনা ও ৩১ এবং ৫০  বিজিবি থেকে বাড়তি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সীমান্ত এলাকায় । রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছে ।

এদিকে গতকাল ২৯ মে বৃহস্পতিবারও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দৌছড়ি ইউনিয়নের সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহির মাঠ এলাকার বিপরীতে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিজিপি’র ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যদের লক্ষ্য করে ৭০-৮০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে । বর্তমানে মায়ানমারের ওই ক্যাম্পে ৫ শতাধিক মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) অবস্থান করছে । ওই এলাকায় যুদ্ধাভাব বিরাজ করছে । বিজিবি ও সেনা সদস্যগণ সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করছে । সীমান্তে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে । জিরো পয়েন্টে কারফিউ জারি করা হয়েছে ।

বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা দশটি সম্ভাবনায় দেশের তালিকায়

Coface-Logo-2

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সম্ভাবনাময় সেরা ১০টি দেশের তালিকায় ওঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন ও সাউথ আফ্রিকাকে পেছনে ফেলে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সম্ভাবনাময় সেরা ১০টি দেশের তালিকায় ওঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। ফ্রান্সভিত্তিক বাণিজ্যিক ঋণ ও বিমা গ্রুপ কোফেইস এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।

তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা,অবকাঠামো, বিনিয়োগ সমস্যা ও  দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে এসব দেশের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে কোফেইসের গবেষণা প্রতিবেদনে সম্ভাবনাময় ১০টি দেশকে দুটি গ্রুপে ভাগ করেছে। এর মধ্যে প্রথম গ্রুপে রয়েছে পেরু, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও শ্রীলঙ্কা। ব্যবসায়িক পরিবেশ ভালো থাকায় এসব দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। দ্বিতীয় গ্রুপে রয়েছে বাংলাদেশ, কেনিয়া, তানজানিয়া, জাম্বিয়া এবং ইথিওপিয়া।

তবে গত মার্চে ফ্রান্সভিত্তিক বাণিজ্যিক ঋণ ও বিমা গ্রুপ কোফেইস এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বলেছে,১০ বছর ধরে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পর ব্রিকসের ৫টি দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরে ব্রিকসের জিডিপি গত এক দশকের চেয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে কমে যেতে পারে। একই সময়ে বাংলাদেশসহ সম্ভাবনাময় ১০টি দেশ তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে ফ্রান্সভিত্তিক সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভাবনার যে দিকগুলো উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- সস্তা শ্রমের কারণে পোশাক খাতে সক্ষমতা, শক্তিশালী রেমিট্যান্স আয়, আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবহারে সক্ষমতা, সীমিত অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ কিশোর (যাদের বয়স ১৫ বছরের নিচে)। অন্যদিকে দুর্বলতাগুলো হচ্ছে- বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বস্ত্র খাতের উন্নয়ন করতে না পারা, মাথাপিছু স্বল্প আয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, দুর্বল ব্যবসায় পরিবেশ, অবকাঠামো সমস্যা এবং সাইক্লোন ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বিজিবি’র সাথে সম্পর্ক ছিন্নের হুমকি দিল মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী

Bandarban-Bjb-Bjp boitok 21.5

স্টাফ রিপোর্টার, বান্দরবান:

বিজিবি’র সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিলেন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি। মিয়ানমারের সন্ত্রাসীরা যদি বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবহারের সুযোগ পায় তাহলে বিজিপি বিজিবি’র সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দেয়।

সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন নিয়ে গতকাল  বুধবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির লেম্বুছড়ি সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবি ও মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বিজিপির (বর্ডার গার্ড পুলিশ) মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে অনুষ্ঠিত এই পতাকা বৈঠকটি গতকাল দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে আড়াইটায় শেষ হয়।

লেম্বুছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাহির মাঠ এলাকায় এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন কক্সবাজারের বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হোসেন। মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপির পক্ষে নেতৃত্ব দেন মংডু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল টিং কোকো। বৈঠকে নাইক্ষ্যংছড়ি কক্সবাজার ও টেকনাফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডারগণসহ বিজিবি ও বিজিপির স্থানীয় উর্ধতন কর্মকর্তারা উপন্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী বাহিনীর তৎপরতা ও মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সীমান্তে সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনে মায়ানমারের বিজিপি ও বাংলাদেশের বিজিবি উভয়ই একে অপরের সহযোগিতা চেয়েছে। এছাড়া সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ মাদক পাচার নিয়েও আলোচনা হয় বৈঠকে।

তবে মায়ানমারের বিজিপির পক্ষ হতে বৈঠকে জানানো হয়, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে তাদের উপর হামলা করছে। সন্ত্রাসীদের কোনভাবেই যাতে সীমান্ত এলাকা ব্যবহারের প্রশ্রয় দেয়া না হয় তার জন্য বিজিবির কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করে মায়ানমারের বিজিপির কর্মকর্তা। তারা জানায়, এর পর থেকে কোন ঘটনা ঘটলে তারা বিজিবি’র সাথে সম্পর্ক রাখবে না।

উল্লেখ্য, এ সপ্তাহের শুরুতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের আশারতলি ও বাশিফাঁড়ি এলাকায় জিরো পয়েন্টের কাছে একদল সন্ত্রাসী বাহিনীর সাথে মায়ানমারর বিজিপির সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনার পর উভয় দেশই সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে।

মমতাকে বাংলাদেশিদের বন্ধু ভাবার কোনও কারণ নেই- তসলিমা নাসরিন

মমতাকে বাংলাদেশিদের বন্ধু ভাবার কোনও কারণ নেই- তসলিমা নাসরিন (মমতা, তসলিমা নাসরিন, বাংলাদেশ, ভারত)
 
ভারতের নির্বাচনী প্রচারে উঠে এলো বাংলাদেশি অবৈধ ‘অনুপ্রবেশকারী’ প্রসঙ্গ। বিজেপি নেতা মোদী বলেছেন, সব অনুপ্রবেশকারী যেন বাঙ্পেটরা গুছিয়ে ফেলে, কারণ ১৬ মে’র পর ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে। শুনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলাদেশিদের স্পর্শ করার স্পর্ধা যেন কেউ না করে। না, এ কারণে মমতা বন্দোপাধ্যায়কে বাংলাদেশিদের বন্ধু ভাবার কোনও কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন তসলিমা নাসরিন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের জন্য তাঁর যে দরদ, তা সত্যিকারের দরদ নয়, নেহাত রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির দরদ।
মোদী বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে অত্যাচারিত হয়ে যারা আসছে, যারা ভারতে দুর্গাষ্টমি করছে, তাদের তাড়ানো হবে না। এর মানে তাড়ানো হবে না শুধু হিন্দুদের। হিন্দুরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে আসছে, কারণ হিন্দু হওয়ার কারণে বাংলাদেশে তারা অত্যাচারিত। মুসলমানরাও কি অত্যাচারিত হতে পারে না? তারাও কি রাজনৈতিক শরণার্থী হতে পারে না? তাদের তো জাতিসংঘের যে কোনও দেশেই ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন অনুযায়ী রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া উচিত। যদি তারা অর্থনৈতিক শরণার্থীও হয়, তাদের তো ঘাড় ধাক্কা দেওয়া উচিত নয়, মানবতার কারণে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশই অর্থনৈতিক শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়। ভারত কেন দেবে না? আর কয়েক দশক পর যখন বাংলাদেশ জলে ডুবে যেতে থাকবে, পৃথিবীকে তো শিখতে হবে আবহাওয়া পরিবর্তনের শরণার্থীদের বরণ করে নিতে।
 
মমতার কোনও দরদ মুসলমানদের প্রতি নেই। তিনি এই যে মুসলমান মৌলবাদীদের মাথায় তুলে নাচছেন, তা সবই ভোটের জন্য। মুসলমানদের ভোট পাওয়ার জন্য তিনি হেন কাজ নেই করছেন না। তিনি হিন্দু হয়েও, কালীভক্ত হয়েও, মুসলমানদের এলাকায় গিয়ে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ, আল্লাহ এক, এবং মুহম্মদ তার প্রেরিত রসুল, বলেন। এই বাক্যটি বিধর্মীরা উচ্চারণ করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার উদ্দেশে। মমতা কিন্তু তাঁর ধর্ম বদল করার উদ্দেশে কলমা বলেন না। তিনি বলেন মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য। মাথায় হিজাব পরে নামাজ পড়েন, মোনাজাত করেন, রোজা রাখেন, ইফতার করেন। এতই যদি ইসলাম ধর্মের প্রতি ভালোবাসা, ইসলাম ধর্মকে গ্রহণ করলেই পারেন। তাঁর সবই মুসলমান মৌলবাদীদের খুশি করার জন্য।
 
মৌলবাদীরা মুসলমানদের নেতা। মৌলবাদীরা যাকে ভোট দিতে বলবে, মুসলমানরা তাকে ভোট দেবে। সে কারণে মৌলবাদীদের পটানোয় ব্যস্ত রাজনীতিকরা। সবচেয়ে ব্যস্ত শ্রীমতী মমতা বন্দোপাধ্যায়। কিন্তু মুসলমানদের খুশি করার নামে মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি অপমান করছেন তিনি। তিনি ভাবছেন মুসলমানরা এক একটা গাধা। তারা তাঁর ছলচাতুরী কিছুই ধরতে পারবে না। তিনি যে মুসলমান মৌলবাদীদের সব অন্যায় দাবি মেনে নিচ্ছেন, এবং মুসলমান সম্প্রদায়কে আরও অন্ধকারে রাখার ব্যবস্থা করছেন, ব্যবহার করছেন নিতান্তই ভোটব্যাংক হিসেবে, তা জগতের সব লোক বুঝতে পারলেও মুসলমানরা পারবে না। এরকমই তাঁর বিশ্বাস।
 
আমি জানিনা মুসলমানরা কেন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের এসব আদিখ্যেতার প্রতিবাদ করছে না। কেন বলছে না, ‘তুমি বাপু হিন্দু সে আমরা জানি। তোমার এত মুসলমানের সাজ পোশাক না পরলেও চলবে, অত কলমা না আওড়ালেও চলবে। দেশের নাগরিক হিসেবে মুসলমানদের যে সম্মান পাওনা, সেটুকুই আমরা চাই। আমাদের বোকা বানানোর চেষ্টা বন্ধ কর’।
 
মমতা বন্দোপাধ্যায়ের যদি বাংলাদেশের অহিন্দু শরণার্থীর প্রতি সামান্যও সহানুভূতি থাকতো তাহলে পশ্চিমবঙ্গে আমার উপস্থিতি তিনি নিষিদ্ধ করতেন না, আমার বই উদ্বোধনের অনুষ্ঠানও তিনি বাতিল করতেন না, আমার নতুন মেগাসিরিয়ালের প্রচারও তিনি বন্ধ করতেন না। আমাকে নিষিদ্ধ করার উদ্দেশ্য একটিই, মুসলমান মৌলবাদীদের তোষামোদ করা। মুসলমান মৌলবাদীরা আমার ওপর অত্যাচার হলে বেশ খুশি থাকে, আমার মাথার মূল্য তারা অনেক আগেই ধার্য করে ফেলেছে।
 
এখন প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি মোদী ক্ষমতায় এলে বাঙালি মুসলমানদের ভারতছাড়া করবেন? আমার বিশ্বাস হয় না। এই কাজ করলে সারা বিশ্ব মোদীর নিন্দায় মুখর হবে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোয় লক্ষ লক্ষ ভারতীয় হিন্দু বাণিজ্য করছে, চাকরি বাকরি করছে। মধ্যপ্রাচ্য মোদীবিরোধী হয়ে উঠলে ভারতের বিপদ। জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন না মানলে মোদীকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মোদী এখন ভারতে বাংলাদেশের অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বলছেন, রাম মন্দির গড়ার কথা বলছেন। ক্ষমতায় গেলে তিনি কি এসব বলবেন? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে অনেক কিছুই বলা যায়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর একটি বিশাল গণতান্ত্রিক দেশকে খুব ঠাণ্ডা মাথায় চারদিক সামলাতে হয়। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করলে ঠাণ্ডা মাথায় কিছুই সামলানো সম্ভব নয়। সুতরাং ক্ষমতায় দীর্ঘকাল থাকতে হলে ধর্মের রাজনীতি মোদীকে বর্জন করতেই হবে। তিনি এত বোকা নন যে তিনি তা করবেন না। ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের খুশি করার জন্য অল্প স্বল্প তিনি নিশ্চয়ই কিছু করবেন, সে করাটা নিশ্চয়ই কোনও মসজিদ ভেঙে বা মুসলমান খুন করে নয়।
 
শুনেছি খালেদা জিয়া মহাখুশি। এতকাল পর কংগ্রেস বিদেয় হচ্ছে। কংগ্রেস চিরকালই আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেছে। মোদী এলে হাসিনা সরকার আর ভারতের সহযোগিতা পাবে না। এই খুশিতে জামায়াতে ইসলামী আর বিএনপি এখন থেকেই বগল বাজাচ্ছে। কট্টর মুসলমান আর কট্টর হিন্দুর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। তারা যেহেতু সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যেতে চায়, অথবা এক জায়গায় থেমে থাকুক দেখতে চায়, তারা ভেতরে ভেতরে অনেকটাই ভাই ভাই। একে অপরের পরিপূরক। এ আছে বলেই ও আছে। বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ, বজরং দল, শিবসেনাদের কোনও আদর্শগত পার্থক্য নেই। এই ধর্মভিত্তিক দলগুলো যতদিন ভারতীয় উপমহাদেশে বিরাজ করবে, ততদিন সত্যিকার প্রগতির পথে এরা বাধা হয়ে দাঁড়াবে। শিক্ষিত সচেতন প্রগতিশীল মানুষের কাজ এই নারীবিরোধী ধর্মান্ধ দলগুলোকে নির্মূল করা। তলোয়ার দিয়ে নয়, মানুষের মধ্যে যুক্তি বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়ে।
 
আরও খবর

‘বাংলাদেশ ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত মুখোমুখি’

1383677_10152388687373636_911016660_n
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস অব ইণ্ডিয়া। ইন্দ্রানী বাগচীর লেখা প্রতিবেদনটি পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে ৩০ অক্টোবর। বাংলাদেশস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজেনার দিল্লী সফরের উপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদনটি রচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি নিম্নরূপ:

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মন মনকষাকষি – দরকষাকষি। “বাংলাদেশ ইন্ডিয়া এন অড ওভার বাংলাদেশ পলিসি” নামক এক প্রতিবেদনে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে প্রকাশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত দুই দেশকে সমানভাবেই উদ্বিগ্ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সংকটাপন্ন অব্স্থায় যুক্তরাষ্ট্রের যে অবস্থান তাতে ভারত ক্রমেই অস্বস্তিতে পড়ছে। ভারতের বিশ্বাস, বাংলাদেশ ও এ অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নেতিবাচক। আর এসব কারণে বাংলাদেশ বিষয়ে দিল্লির মনোভাব মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ক্রমেই বেখাপ্পা হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সাংঘর্ষিক মনোভাবের কথা তুলে ধরে প্রতিবেদনটিতে আরো জানানো হয়, গত সপ্তাহে দিল্লির সাউথ ব্লক ঘুরে গেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা। এ সময় তিনি যে লম্বা বৈঠক করেছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সাথে। তবে তাদের এই বৈঠকে মতনৈক্য হবার বদলে বেড়েছে দূরত্ব। আর এনিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত দুই দেশের মধ্যে দেখা দি্যেছে মন কষাকষি আর এ নিয়ে চলছে দর কষাকষি।

তারা যখন সাউথ ব্লকে বসে ঢাকায় কার কী নীতি বাস্তাবায়ন হবে তা নিয়ে দুই পক্ষ বোঝাপড়া করছিলেন তখন রাজধানী ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের হরতাল চলছিল। সূত্রের বরাত দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া বলেছে, ‘ভারত মনে করছে বিএনপি সহিংসতা বন্ধ করার ব্যাপারে আগ্রহী নয়, তারা তত্ত্বাবধায়কের দাবিতেই অনড় থাকতে চায়।

 আর ভারতে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ বিএনপি যে ধরনের রাজনীতি করছে তার ধরন নিয়ে। ঠিক এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের সথে ভারতের ‘বিরোধ’। ভারত মনে করে, প্রকাশ্যেই কট্টর হয়ে ওঠা রাজনৈতিক দল বিএনপি-জামায়াতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। দিল্লির বিশ্বাস, তারা সফল হলে বাংলাদেশ জাতি হিসেবেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হয়ে যাবে। কারণ গত দুই বছরে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি অনেক বেশি কট্টর ও চরমপন্থী হয়ে উঠেছে। জামায়াত ও বিএনপি রীতিমত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ক্রমাগত প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। আর এবিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব সম্পূর্ণ বিপরীত মুখী।

 শুধু তাই নয়, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জামায়াত-বিএনপির ওপর আল-কায়েদা ও পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তৈয়বার গুরুতর প্রভাব ও সম্পর্ক সম্পর্কে যে সন্দেহ প্রকাশ করেছে তা নিয়েও রয়েছে মতপার্থক্য। পাকিস্তান ও পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশের কাছ থেকে ব্যাপক আর্থিক তহবিলের যোগান পায় এই গ্রুপগুলো এমনটাই এখন ভারতের দাবি। এছাড়া বিএনপির সাথে ভারতের ভিন্ন অবস্থানের আরো বড় কারণের কথাও বলেছে পত্রিকাটি। পত্রিকাটি মনে করে, ২০০১ সালে পদুয়া-রৌমারি সীমান্তে বিডিআর গণহত্যা চালিয়ে বিএসএফের যে ১৫ জওয়ান নিহত হওয়ায় ঘটনা ঘটিয়েছে তার জন্য বিএনপিকে বিশ্বাস করতে পারে না ভারত। এই ঘটনা ভারত কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি। বিএনপিতে ভারতের স্বাচ্ছন্দ্য না পাওয়ার আরো কারণ হল, জামায়াতকে নিয়ে তাদের আন্দোলন ও সরকার গঠন। জামায়াতের সাথে বিএনপির সম্পর্ক ভারত মেনে নিতে পারছে না।

পত্রিকাটি বলছে, এছাড়া বিএনপির প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঝোঁকটা আরো নানা কারণেও হতে পারে। প্রথমত ইতোমধ্যে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী এবং আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব ড. মুহম্মদ ইউনূসের সাথে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে হাসিনার মারাত্মক বিরোধ ঘটে গেছে। হাসিনা-ইউনূসের এই বিরোধ পদ্মা সেতু পর্যন্তও গড়িয়েছিল। একই সাথে পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে ক্যালেঙ্কারি এবং যুদ্ধাপররাধ ট্রাইবুনালসহ নানা কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি-জামায়াত জোটেই সম্পর্ক খুঁজে নিতে চায়।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত!

kk

ডেস্ক নিউজ:

মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠী ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ভারতের উত্তরপূর্বাংশ বা দক্ষিণপূর্ব এশীয় তিব্বতি-বার্মা ভাষীদের চেয়ে তিব্বতি-বার্মা ভাষাভাষী এসব বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতের মূল ভূখণ্ডের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট উপাদান বিদ্যমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) ও সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি) এর একটি যৌথ গবেষণায় এ তথ্য  বেরিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নুরুন নাহার গাজী সুলতানা ও   সিএসআইআরের কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজের নেতৃত্বাধীন এ গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘পিএলওএস ওয়ান’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

সিএসআইআর-সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলেকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি)-এর কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজ বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নৃ-গোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা) বংশগতি নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ চালিয়েছি যারা তিব্বতি-বার্মা ভাষা বর্গের একটি  শাখা ভাষা কথা বলেন। ভারত ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী তিব্বতি-বার্মাভাষীদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে তাদের তথ্যের তুলনা করেছি। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, ভারতের উত্তরপূর্বাংশ বা দক্ষিণপূর্ব এশীয় তিব্বতি-বার্মা ভাষীদের চেয়ে তিব্বতি-বার্মা ভাষাভাষী এসব বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতের মূল ভূখণ্ডের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট উপাদান তাদের মধ্যে বিদ্যমান।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, সিনো-তিব্বতীয় ভাষা পরিবারের একটি ভাষা হচ্ছে তিব্বতো-বার্মা ভাষা। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উচুভূমিতে ও মায়ানমারের (পূর্বে বার্মা নামে পরিচিত ছিল) নিম্নভূমিতে তিব্বতো-বার্মা বর্গের ৪০০টি ভাষা প্রচলিত। প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ বার্মিজ ভাষায় ও ৮০ লাখ মানুষ তিব্বতি ভাষা কথা বলে।

নুরুন নাহার ‍গাজী সুলতানা ও থাঙ্গারাজের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বংশগতির সকল উপাদান (মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ, ওয়াই ক্রোমোজোম ও অটোজম) ব্যবহার করে বাংলাদেশের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও সাদৃশ্যে নিয়ে গবেষণা চালালেন।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল পূর্ব ভারত, উত্তর ও পূর্বাঞ্চল উত্তরপূর্ব ভারত দিয়ে ঘেরা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কিছুটা মায়ানমারের সীমান্তের সঙ্গে লাগোয়া। কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজ বলেন, বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থানই তুলে ধরে যে, এটি (বাংলাদেশ) ভাষা সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল।

তিনি জানান, বাংলাদেশের চতুর্দিকে বাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ওপর পুরোপুরিভাবে গবেষণা চালানো হলেও উপকূল ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চালানো হয়নি। ভারত ও মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসব নৃ-গোষ্ঠীর স্থানান্তর সম্পর্কেও বলা হয়েছে তাদের গবেষণায়।

দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশীয় জনগণের ওপর চালানো বংশগতি গবেষণাটিতে দেখা গেছে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে ভারতে খুব সম্প্রতি তিব্বতো-বার্মাভাষীদের বিস্তরণ হয়েছে।

সূত্র: বাংলানিউজ