বিজিবি ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করছে

bgb camp 3

মেহেদী হাসান পলাশ:

ভারতের ভূমি ও সড়ক ব্যবহার করে নতুন বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট(বিওপি) নির্মাণ করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ(বিজিবি)। বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব সুসম্পর্কের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত এবং ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত ৬ টি বিওপি নির্মাণে ভারতের ভুমি ও সড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিজিবির পুণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় এ নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। একই রূপরেখার আওতায় বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিওনের আওতায় দুইটি নতুন সেক্টর ও ৫ ব্যাটালিয়ান স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন করে ১০৪টি বিওপির মধ্যে ৫২টি বিওপি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি. অরক্ষিত সীমান্তের ২১৫ কি.মি. সীমান্ত সুরক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। শুরু হয়েছে বিজিবির এয়ার উইং। এর ফলে দূর্গম ও অরক্ষিত সীমান্তের অপরাধ এখন আগের থেকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে বলে বিজিবি সূত্রের দাবী।

জানা গেছে, সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি বাংলাদেশের ৪,৪২৭ কিঃ মিঃ সীমানা দিবা-নিশি প্রহরার মাধ্যমে নিশ্চিত করছে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব। ২০০৯ পিলখানার ভয়াবহ বিপর্যয়ের দুঃসহ স্মৃতি পেরিয়ে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিজিবি। ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখে বিজিবির সদর দপ্তর পিলখানায় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিজিবি’র পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে শুরু হয় বিজিবি’র নব অভিযাত্রা। সে সাথে শুরু হয় এ বাহিনী ঢেলে সাজানোর মহাযজ্ঞ। এর অংশ হিসাবে ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে শুরু হয় বিজিবি’র ৪ টি রিজিয়ন এর আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড। এসময় খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, গুইমারা, বান্দরবান ও কক্সবাজার সেক্টর ও এর অধীনস্থ ইউনিটগুলো নিয়ে দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন সদর দপ্তর চট্টগ্রাম শহরের হালিশহর থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

bgb camp 1

দূর্গম পাহাড় ও অনিষ্পন্ন সীমান্তের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিওনের আওতাধীন ৮১০ কি.মি. সীমান্তের মধ্যে ৪৭৯ কি.মি সীমান্ত অরক্ষিত ছিলো। ফলে অরক্ষিত এই সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র, মানব ও মাদক পাচার, অপহরণ, আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতো। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর স্বর্গরাজ্য ছিলো অরক্ষিত সীমান্ত। এ সকল অপরাধ দমনে বাংলাদেশ ও সীমান্ত সংলগ্ন অন্যান্য দেশগুলোরও দাবী ছিলো বাংলাদেশের অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষিত করা।

সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিজিবি পূণর্গঠন রূপরেখা-২০০৯ এর আওতায় দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়ন, চট্টগ্রাম এর দায়িত্বপূর্ণ পাহাড় ও নদী বেষ্টিত ৮১০ কিঃ মিঃ সীমান্ত এলাকায় অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্ত এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু তদারকির লক্ষ্যে বর্তমান সীমান্ত চৌকির অতিরিক্ত সর্বমোট ১০৪টি নতুন বিওপি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

বিজিবি সূত্র জানায়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় সর্বমোট ৫২টি বিওপি’র নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ২৯ টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ২৮১ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ১৩০ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ – মিয়ানমার সীমান্তে ২৩টি নতুন বিওপি নির্মাণ করে ১৯৮   কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ৮৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষা করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে সর্বমোট ৪৭৯ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে আনুমানিক ২১৫ কিঃ মিঃ সীমান্ত সুরক্ষাসহ বিজিবি’র নজরদারী ও আধিপত্য বিস্তারের আওতায় আনা হয়েছে।

তবে বিজিবির এই নবযাত্রা কুসুমাস্তৃর্ণ ছিলো না। পদে পদে তাকে নানা প্রতিকুলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে এগুতে হয়েছে। সূত্র মতে, পাহাড়ি এলাকায় বিওপি নির্মাণের জন্য সরকার কর্তৃক ৫ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিমালা রয়েছে। দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের বেশির ভাগ এলাকাই পাহাড়ি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ৫ একর জমিতে বিওপি স্থাপন করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। কারণ পাহাড়ি ঢাল ও ভূমি বিন্যাসের ভিন্নতার কারণে জরুরী স্থাপনা সমূহও নির্মাণ করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও পার্বত্য এলাকার বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণে সাধারণ জনগণ তাদের জমি অধিগ্রহণের জন্য বিজিবিকে হস্তান্তর করতে ভীত সন্ত্রস্ত থাকে। বিশেষ করে বিজিবির এই অগ্রসর ভূমিকার কারণে যেসমস্ত সীমান্ত অপরাধীদের তৎপরতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে তারা বিজিবি সম্প্রসারণের পথে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। অস্ত্রের মুখে, হুমকি, ধামকি দিয়ে সাধারণ পাহাড়ীদের বাধ্য করেছে বিজিবিরি প্রতিপক্ষ হতে।

ফলে এখনো খাগড়াছড়ি ও রাংগামাটি জেলার অনেক অবস্থানে বিওপি নির্মাণের জন্য বিজিবি কর্তৃক জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়নি। ভূমি বিরোধের কারণে এখন পর্যন্ত বাঘাইছড়িতে অবস্থিত ৫৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ব্যাটালিয়ন সদর স্থাপন করা সম্ভবপর হয়নি। এছাড়াও আলীকদমে ৫৭ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন তাদের ব্যাটালিয়ন সদর নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। অথচ দেখা গেছে, দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিওপি স্থাপিত হলে নিকটস্থ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দারুণভাবে উপকৃত হয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, খাগড়াছড়িস্থ উত্তর লক্কাছড়া বিওপি সংলগ্ন উপজাতীয় পাড়ায় ডায়রিয়ার প্রকোপে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করলে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বিওপিতে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। হেলিকপ্টার যোগে ক্যাম্পে জরুরী ঔষধ ও চিকিৎসক প্রেরণ করা হয়। বিজিবি’র সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে রুগীদের শুশ্রষা করে এবং এলাকাবাসীকে এক ভয়াবহ মহামারী থেকে উদ্ধার সম্ভব হয়।

সূত্রে জানা গেছে, বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ এলাকার উত্তরাংশে খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত অধিকাংশ অবস্থানই দূর্গম পার্বত্য এলাকায় হওয়ায় অরক্ষিত সীমান্তে কিছু কিছু স্থানে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূমি ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণ করা অত্যন্ত দুষ্কর। হেলিকপ্টার সহায়তা ব্যতীত সেসকল অবস্থানে নির্মাণ সামগ্রী কিংবা প্রাত্যহিক রশদ সামগ্রী প্রেরণ কষ্টকর।

অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষাসহ সীমান্তে বিজিবি’র আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নির্মূলের অংশ হিসেবে বিজিবি কর্তৃক ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে দূর্গম পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় নতুন বিওপি স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়; যা যুগোপযোগী ও আধুনিক চিন্তা চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। বিজিবি’র অনুরোধে সরকার কর্তৃক প্রেরিত প্রস্তাবে ভারত সরকার উক্ত পরিকল্পনায় সম্মতি প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় দূর্গম পার্বত্য এলাকার অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার জন্য ভারতীয় রাস্তা ব্যবহার করে বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং ভারত দু‘দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গত ৬-৭ জুন ২০১৫ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময় “নতুন প্রজন্ম নয়া দিশা” নামে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

bgb camp 2

ইতিমধ্যে ৬টি নতুন বিওপি নির্মাণের লক্ষ্যে সকল পর্যায়ে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। অতিশীঘ্রই উক্ত বিওপি সমূহ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে। বিওপিগুলো হচ্ছে, খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় লাক্কাছড়া বিওপি, দিপুছড়ি বিওপি ও ডুপশিল বিওপি এবং রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাস্থ ৫৪ বিজিবি ব্যাটালিয়েনের আওতায় কাসালং-১ বিওপি, কাসালং-২ বিওপি এবং সাজচিলুই বিওপি।

জানা গেছে, ইতিমধ্যে বিজিবি’র দুটি রেকিদল নির্মাণ সামগ্রী ক্রয়, পরিবহন ও নির্মাণ কাজের প্রস্তুতির নিমিত্তে বাংলাদেশ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অংশে রেকি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে।

বিজিবির এই অগ্রসর অবস্থানের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তর সীমান্তে বিশেষ করে খাগড়াছড়ি সীমান্তের বিপরীতে যে সকল অংশে বিভিন্ন ভারতীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অরক্ষিত সীমান্তের সুযোগ নিতো, বর্তমানে ঐ সকল সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন বিওপি নির্মাণের ফলে সীমান্তে নজরদারী বৃদ্ধি পাওয়ায় সকল প্রকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসএফ কর্তৃকও কোন প্রকার প্রতিবাদ করা হয়নি।

একইভাবে দক্ষিণ-পূর্ব রিজিয়নের দায়িত্বপূর্ণ পার্বত্য এলাকার বান্দরবান জেলার সীমান্ত এলাকার দক্ষিণাংশে রয়েছে অত্যন্ত খাড়া পাহাড়  এবং দূর্গম এলাকা। উঁচু পাহাড়ের গা ঘেঁষেই রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। ভুপ্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে বিগত ৪ মাসেরও কম সময়ে উক্ত দূর্গম এলাকায় বিজিবি কর্তৃক নতুন ৬টি বিওপি নির্মাণ করা হয়েছে।

পূর্ববর্তী সময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রায়ই আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী দলের আস্তানা কিংবা তাদের অবাধ চলাচলের ব্যাপারে বিজিবি কর্তৃপক্ষের কাছে তারা প্রতিবাদ লিপি প্রেরণ করতো। কিন্তু বর্তমানে উক্ত এলাকার বেশির ভাগ অংশে বিজিবি’র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এখন এ ধরনের পত্রালাপ অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। সে সাথে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত ও সূচিহ্নিত হয়েছে দু’দেশের সীমানা।

এদিকে বর্তমানে নতুনভাবে নির্মিত সকল বিওপিগুলোই হেলি সাপোর্টেড। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী সমূহের মধ্যে বিজিবিরই রয়েছে সর্বাধিক ৭৮ টি হেলি সাপোর্টেড ক্যাম্প। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারগুলো স্বল্পতার মধ্যেও বিজিবির বিওপিগুলোতে হেলি সহায়তা প্রদানে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, হেলির প্রয়োজনীয়তা ও দ্রুত সাপোর্ট নিশ্চিতের বিষয়টি বিবেচনা করে সদর দপ্তর বিজিবি হেলি উইং এর সকল অবকাঠামো সাতকানিয়ায় বিজিবি’র একমাত্র প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান বিজিটিসিএন্ডএস সংলগ্ন স্থানে ইতিমধ্যে স্থাপন করেছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ৫ জুন ২০১৬ তারিখ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর হেলি উইং এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি। খুব শীঘ্রই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে নতুন হেলিকপ্টার সংযোজিত হবে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে বিজিবি হেলি উইং কাজ শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী।এতে নতুন বিওপি নির্মাণ কার্যক্রমসহ অপারেশনাল দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

বিজিবির দক্ষিণ পূর্ব রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ হাবিবুল করিম পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশে আর কোন সীমান্ত অরক্ষিত থাকবে না। বিজিবি’র বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ এর সার্বিক দিক নির্দেশনা ও সহায়তার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

ভূমি বিরোধের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিজিবির বিওপির স্থাপনে প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, আশা করা যায় খুব শীঘ্রই এ সকল সমস্যা দূর করে ব্যাটালিয়নগুলো তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন করতে পারবে।

ভবিষ্যতে মিয়ানমার এ ধরনের ঘটনা ঘটালে কঠোর প্রত্যুত্তর দেওয়া হবে- ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহমেদ

মিজানুর রহমানের লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে

naikoncori Bjb pic-1.6

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩১ ব্যাটালিয়নের রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহাম্মদ আলী মন্তব্য করেছেন, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটাল তাদের কাছে এর জবাব চাওয়া হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে মিয়ানমার এ ধরনের ঘটনার কঠোর প্রত্যুত্তর দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। রবিবার দুপুর বিজিবির ৩১ ব্যাটালিয়নের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মিয়ানমারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহাম্মদ আলী বলেন, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো ক্ষতি না হবে। নিজেদের ক্ষতি করে আমরা বন্ধুত্ব পছন্দ করি না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হলে কঠোর প্রত্যুত্তর দেয়া হবে মিয়ানমারকে।

তিনি বলেন, কেন তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটালো এ জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে। ৫ জুন দুই দেশের সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ের পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠকে তাদের কাছে এ বিষয়ে জবাব চাওয়া হবে। তিনি বলেন, এ ঘটনার পর তারা অনেক নাটক করেছে। অনেক প্রপাগান্ডা করেছে। কেন তারা এ রকম করলো তার জবাব চাইবো।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবির রিজিওন কমান্ডার বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি। ইতিমধ্যে সীমান্তের চেকপোস্টগুলোতে শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমাদের পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও প্রস্তুতি আছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, শুক্রবার ও শনিবার আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিল এর প্রত্যুত্তর (বিজিপি) তারা পেয়েছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আহাম্মদ বলেন, আপনারা ওদের (বিজিপি) সঙ্গে সে দেশের জনগণের সর্ম্পক বিবেচনা করুন, মানসিকতা পর্যালোচনা করুন, তাহলে জবাব পেয়ে যাবেন। আমি মনে করি এ ঘটনা তাদের মানসিকতার প্রতিফলন ও অভ্যন্তরীণ বিষয়। বিজিপি কাপুরুষোচিত কাজ করেছে বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, যে দুর্গম এলাকায় ওরা (বিজিপি) আমাদের নিহত বিজিবি সদস্যের লাশ হস্তান্তর করেছে সেখান থেকে লাশটি ৩১ ব্যাটালিয়ন কার্যালয়ে আনতে ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে।

এ সময় নিহত বিজিবির নায়েক মো. মিজানুর রহমানের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিজিবির ৩১ ব্যাটালিয়ন কার্যালয় মাঠে নিহত মিজানুরের লাশ নিয়ে আসা হয়। লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার সকাল ৯টার দিকে ফের নাইক্ষংছড়ি ৩১ ব্যাটালিয়ন মাঠে আনা হবে। সেখানে জানাজা শেষে হেলিকপ্টারে করে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হবে মিজানের লাশ।

এদিকে এখনো বান্দারবান সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ হলেও এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

এর আগে শনিবার সকালে সীমান্তে গুলিবর্ষণ ও বিজিবি সদস্যের লাশ ফেরত না দেয়ায় ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থানকে ফের তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। গত বৃহস্পতিবারও তাকে তলব করা হয়েছিল।

বিজিবির উপর মায়ানমারের সীমান্ত পুলিশ বাহিনীর গুলিবর্ষনের পর বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে উত্তেজনা ক্রমশই বাড়ছে। সীমান্তের তুমব্রু, ঘুনধুম, আশারতলি এলাকায় মায়ানমারের সেনাবাহিনী রণ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে অবস্থান নিয়েছে। এতে সীমান্তে বসবাসকারী লোকজনদের মধ্যে আতংক উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইনফেন্টি বিভাগের একটি দল বিজিবিকে সহায়তা দিতে নাইক্ষংছড়িতে অবস্থান নিয়েছে। সীমান্তের একটি সূত্র জানায়, মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু-ভেন্ডুলা (নাইক্ষ্যংছড়ির বিপরীতে),বলিবাজার থেকে মংডু শহর পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার সীমান্তে অস্ত্রশস্ত্র মজুদ করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেখানে রোহিঙ্গা নাগরিকদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের  ১৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চরম উত্তেজনা : মিয়ানমারের বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন, গুলিবর্ষণ

Bandarban

মেহেদী হাসান পলাশ:

নাইক্ষ্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৫০-৫২ নম্বর পিলার এলাকার বিপরীতে প্রায় যুদ্ধাবস্থায় সৈন্য সমাবেশ করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের(বিজিপি) পাশাপাশি দুই হাজারেরও অধিক সেনা সদস্য মোতায়েন করেছে সেদেশের সেনাবাহিনী। অন্যদিকে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলা ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশও অতিরিক্ত সংখ্যক বিজিবি সদস্য ও কিছু সেনাসদস্য মোতাযেন করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সীমান্তে টহলও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

এদিকে গতকাল মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আক্রমণের সময় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নবগঠিত পাইনছড়ি বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমানের এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে বিজিবি’র ধারণা বিজিপি’র আক্রমণে আহতা হওযার পর তাকে বিজিপি সদস্যরা তাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে টেনে নিয়ে গেছে। তাঁকে ফিরে পেতে এবং উদ্ভুত পরিস্থিতির সমাধানে ২৮ মে বিকাল ৪.০০ ঘটিকায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ’র নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে . কর্ণেল সফিকুর রহমান মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ( বিজিপি) মংডু ২নং সেক্টরের কমান্ডার থিংকোকো বরাবরে পতাকা বৈঠকের জন্য পত্র প্রেরণ করে। কিন্তু এ পত্রের কোনো উত্তর দেয় নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

এদিকে গতকাল ২৯ মে সকাল ১১.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহিরমাঠ এলাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করে। আয়োজন সম্পন্নের পরও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) পতাকা বৈঠকে আসেনি। মিয়ানমারের উত্তরের আশায় সকাল ৯.০০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করেছে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি)’র কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসান, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল সফিকুর রহমান, উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেনসহ বিজিবি ও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ।

বিজিবির নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সফিকুর রহমান এ তথ্য স্বীকার করে  জানান, সীমান্তের উদ্ধুত পরিস্থিতি নিয়ে পতাকা বৈঠকের আহবান করা হয়েছে। কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠকের জন্য পাইনছড়ি এলাকায় বিজিবি তাবু টাঙ্গানো হলেও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বিজিবি বৈঠকের সাড়া দেয়নি।

এদিকে সীমান্তের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমানকে টেনে মিয়ানমারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে তার শরীরে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে আরো কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এরপর তার দেহ মংডু হাসপাতালে হস্তান্তর করে। সীমান্ত ব্যবসায়ীরা জানায়, মিয়ামমানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে বিজিবির নায়েককে আরএসও বা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের সদস্য বলে প্রচার করা হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে বিজিপি কর্তৃপক্ষের একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা স্থগিত করে তারা। তবে স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্রগুলো এ খবর শুনেছেন বললেও নিশ্চিত করতে পারেননি বলে জানায়।

এদিকে গতকালও মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দুই দফায় বিজিবির অবস্থান লক্ষ্য করে গুলী বর্ষণ করেছে। গতকাল ২৯ মে বৃহস্পতিবারও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দৌছড়ি ইউনিয়নের সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহিরমাঠ এলাকার বিপরীতে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিজিপি’র ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যদের লক্ষ্য করে ৭০-৮০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। বর্তমানে মায়ানমারের ওই ক্যাম্পে ৫ শতাধিক মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) অবস্থান করছে । সেই সাথে বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গতকাল রাত আনুমানিক ৮ ঘটিকার দিকে মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী পুণরায় বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে গুলি বর্ষণ করে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে তারা গুলি বর্ষণ করে। গোলাগুলীর পর বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে দুইটি ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখা গেছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। স্থানীয়রা তাদের আরএসও সদস্য বলে জানিয়েছে। তবে ঘটনাস্থল অত্যন্ত দূর্গম পাহাড়ী অঞ্চল হওয়ায় রাতের অন্ধকারে সেখানে অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি বলে মৃতের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তা সূত্রগুলো গুলিবষর্ণের বিষয়টি স্বীকার করলেও অনুসন্ধান ছাড়া মৃতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। আজ দিনের আলোয় অনুসন্ধান শেষে তারা মৃত্যু বিষয়ে যে কোনো তথ্য দিতে পারবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।

কেন এই উত্তেজনা

প্রায় এক যুগ পর আবারো বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমার সরকার কর্তৃক নিজ দেশের মুসলমানদের উপর নজিরবিহীন নিপীড়ন চালানোর প্রতিবাদে আরাকানের মুসলমানদের কিছু সদস্য মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষায় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে। তাদের একটি সশস্ত্র গ্রুপের নাম রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে একাধিকবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরএসও সদস্যদের বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। গত ১৩ মে বাইশফাড়ী সীমান্তের ৩৮ ও ৩৭ নং পিলারের কাছে মুরুইঙ্গার ঝিড়ি এলাকায় সকালে কিছুক্ষণ পরপর গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এতে ওই এলাকার লোকজনদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় পাড়া প্রধান (কারবারী) ক্যহ্লাচিং জানান, সকাল ৭টার দিকে বেশ গোলাগুলি হয়েছে। তারা শুনেছেন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাথে সে দেশের দের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এছাড়াও আশারতলি ও বাশিফাঁড়ি এলাকায়ও সংঘর্ষ হয় বলে জানা যায়।

মিয়ানমারের সূত্রগুলো এ ঘটনায় ৪ সেনাসদস্য নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করলেও স্থানীয় সীমান্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, এ ঘটনায় কমপক্ষে ১০-১২ জন মিয়ানমার সেনা সদস্য নিহত হয়। ফলে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা এ ঘটনার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করে। তারা মনে করে আরএসও সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয়, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ কঠোরভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে সবসময়।

এদিকে সীমান্তে এ ধরণের তৎপরতা দমন নিয়ে গত ২২ মে  বুধবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির লেম্বুছড়ি সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবি ও মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বিজিপির (বর্ডার গার্ড পুলিশ) মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লেম্বুছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাহির মাঠ এলাকায় এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন কক্সবাজারের বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হোসেন। মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপির পক্ষে নেতৃত্ব দেন মংডু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল টিং কোকো। বৈঠকে নাইক্ষ্যংছড়ি কক্সবাজার ও টেকনাফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডারগণসহ বিজিবি ও বিজিপির স্থানীয় উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী বাহিনীর তৎপরতা ও মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মায়ানমারের বিজিপির পক্ষ হতে বৈঠকে জানানো হয়, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে তাদের উপর হামলা করছে। সন্ত্রাসীদের কোনভাবেই যাতে সীমান্ত এলাকা ব্যবহারের প্রশ্রয় দেয়া না হয় তার জন্য বিজিবির কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করে মায়ানমারের বিজিপির কর্মকর্তা। তারা জানায়, এর পর থেকে কোন ঘটনা ঘটলে তারা বিজিবি’র সাথে সম্পর্ক রাখবে না।

২২ মে অনুষ্ঠিত এই পতাকা বৈঠকের পর থেকেই মিয়ানমার সরকার তার দেশের সীমান্তে বিজিপি’র সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে থাকে। তাদের এ অবস্থানের বিপরীতে বাংলাদেশও সীমান্তে টহল জোরদার করে। দেশীয় একটি গোযেন্দা সংস্থাও বিজিবিকে তাদের উপর মিয়ানমার বাহিনীর অতর্কিত হামলা হতে পারে বলে আগাম তথ্য দিয়েছিল বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৮ মে  বুধবার সকাল ৯.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দূর্গম দৌছড়ি ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাইনছড়ি এলাকায় (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিবি বিওপি ক্যাম্পের কাছাকাছি স্থানে এসে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিপি শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে । বিজিপি বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আগে থেকে এমবুশ করে ছিল।

নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বিজিবির আওতাধীন দোছড়ি বর্ডার অবজারবেশন পোস্টের (বিওপি) সৈনিকরা ৫২নং সীমান্ত পিলার এলাকায় বুধবার সকাল ৯টার দিকে নায়েক সুবেদার জমির উদ্দিন এর নেতৃত্বে ২০ জন সৈনিক নিয়মিত টহল দেয়াকালে বিনা উষ্কানিতে মিয়ানমারের ওপার থেকে উপর্যপুরী গুলি ছোঁড়া শুরু করে বিজিপি। প্রায় ৪৫ মিনিট পর্যন্ত এই গুলি বর্ষণ চলে বলে জানা যায় । এছাড়া মায়ানমার সীমান্তের ৫২ পিলারেও এ ঘটনা ঘটে ।

তবে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, ৫২ পিলার এলাকায় বিজিপি নয় মিয়ানমার সেনা অবস্থান রয়েছে। তাই এ হামলা বিজিপি নয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তাদের সাথে ৯৬৯ নামের একটি বৌদ্ধ মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠী মিলিত হয়ে বিজিবির উপর আক্রমণ চালায়। আকষ্মিক হামলার মুখে টহলরত বিজিবি দল আত্মরক্ষার অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় দুই বিজিবি সদস্য নিখোঁজ হয়। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাসি চালিয়ে বিজিবি সদস্যরা নিখোঁজ একজন, অস্ত্র উদ্ধার করলেও পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান এলএমজি ও ১২০ রাউন্ড গুলিসহ ঘটনাস্থল থেকে নিখোঁজ হয়ে যান । নিখোঁজ মিজান কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ভেলা নগর এলাকার বাসিন্দা।

 এ বিষয়ে ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেন বলেন, বিজিবি’র পাইনছড়ি বিওপি’র দায়িত্বরত সীমান্তের টহল দলের উপর মায়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ অতর্কিত গুলি চালায় । ১০০-১৩০ রাউন্ড পর্যন্ত গুলি চালায় । এর পর পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান নিখোঁজ হয়ে যান। 

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক মো. মিজানুর রহমানকে আটক ও সীমান্তে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থানকে বৃহস্পতিবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মুস্তাফা কামাল মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠান। তিনি অবিলম্বে বিজিবির নায়েক মো. মিজানুর রহমানের মুক্তির দাবি জানান। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগামী দিনে এ ধরনের তৎপরতা রোধে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থান এ সময় সচিবকে আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি মিয়ানমারের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। মিয়ানমার থেকে জবাব পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে তা জানাবেন।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, চলমান অবস্থায় তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ জিরো লাইন বরাবর কারফিউ জারী করেছে। উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আলীকদম রিজিয়ন থেকে ৪০ জন সেনা ও ৩১ এবং ৫০ বিজিবি থেকে বাড়তি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সীমান্ত এলাকায়। সীমান্তে প্রচণ্ড উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 

নাইক্ষ্যংছড়ির নিখোঁজ বিজিবি সদস্য উদ্ধার হয়নি : পতাকা বৈঠকে সাড়া দেয়নি মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী

pic-1

নুরুল আলম সাঈদ, নাইক্ষ্যংছড়ি:

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দূর্গম দোছড়ি ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাইনছড়ি এলাকায় (বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন) বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিপি কর্তৃক গুলিবর্ষণ ও  ওই এলাকার নবগঠিত পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ।

 

এই ঘটনার উত্তরণের জন্য গত ২৮ মে বিকাল ৪.০০ঘটিকায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) ’র নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ(বিজিপি) মংডু ২নং সেক্টরের কমান্ডার থিং কো কো বরাবরে পতাকা বৈঠকের জন্য পত্র প্রেরণ করে । কিন্তু এ পত্রের কোনো উত্তর দেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

বিজিবি গতকাল ২৯ মে সকাল ১১.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহির মাঠ এলাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করে । আয়োজন সম্পন্নের পরও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) পতাকা বৈঠকে আসেনি । সকাল ৯.০০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল  বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি)’র কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসান, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান, উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেনসহ বিজিবি ও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ ।

বাংলাদেশ সীমান্তের প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্টে অতিরিক্ত বিজিবি ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে । নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান বলেন, মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী জেনেভা আইন লংঘন করেছে । সীমান্ত আইন অনুযায়ী সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় উভয় দেশের পতাকা নিয়ে সশস্ত্র টহলরত অবস্থায় কোন সেনা, সৈন্য ও সীমান্তরক্ষীকে গুলি বা অপহরণ করা যাবে না । এই আইন লংঘন করে গুলি চালায় এবং এক বিজিবি সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় । এই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতে মায়ানমার সরকার তাদের টিভি, রেডিওসহ সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করছে , বাংলাদেশর দূর্গম সীমান্তে এক সশস্ত্র মুজাহিদ আটক ।

এদিকে গতকাল নিখোঁজ বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমান এর খবরাখবর নেওয়ার জন্য তার ভাই, ভাই পো, চাচাসহ নিকট আত্মীয়রা নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জোন সদরে আসেন । উদ্ধার অভিযান, উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আলীকদম রিজিয়ন থেকে ৪০ জন সেনা ও ৩১ এবং ৫০  বিজিবি থেকে বাড়তি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সীমান্ত এলাকায় । রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছে ।

এদিকে গতকাল ২৯ মে বৃহস্পতিবারও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দৌছড়ি ইউনিয়নের সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহির মাঠ এলাকার বিপরীতে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিজিপি’র ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যদের লক্ষ্য করে ৭০-৮০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে । বর্তমানে মায়ানমারের ওই ক্যাম্পে ৫ শতাধিক মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) অবস্থান করছে । ওই এলাকায় যুদ্ধাভাব বিরাজ করছে । বিজিবি ও সেনা সদস্যগণ সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করছে । সীমান্তে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে । জিরো পয়েন্টে কারফিউ জারি করা হয়েছে ।