image_pdfimage_print

বিচ্ছেদে ক্ষুদ্ধ হয়ে কলেজ ছাত্রী ইতি চাকমাকে প্রেমিক রণি চাকমা খুন করে: আদালতে স্বীকারোক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি::

প্রেমে বিচ্ছেদ হওয়ায় সাবেক ক্ষুব্ধ প্রেমিক রণি চাকমার হাতে খুন হয় খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমা।

 

সোমবার বিকেল ৪টায় ডিবি পুলিশের হাতে আটক তুষার চাকমা(১৮) নামের এক খুনি খাগড়াছড়ির জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালতে ১৬৪ ধারায় এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।

হত্যাকাণ্ডে তুষার চাকমাসহ ৫ জন অংশ নিয়েছিল এবং ইতি চাকমার প্রেমিক রনি চাকমা তাকে হত্যা করে। ইতি চাকমাকে প্রথমে শ্বাসরোধ ও পরে জবাই করে হত্যা করা হয়।

তুষার চাকমা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বালুঘাট এলাকার সুনীল চাকমার ছেলে। তুষারের মা নিরূপা চাকমা ইউপিডিএফ সমর্থিত সাজেক নারী সমাজ সংগঠনের নেত্রী।


এ সংক্রান্ত আরো খবর পড়ুন:

  1. ইতি চাকমা খুনের তদন্তে পুলিশ : আলোচনায় প্রেম পরকীয়া : আটক ১ : ফেসবুকে অপপ্রচার
  2. উপজাতীরাই ইতি চাকমাকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করেছে
  3. ইতি চাকমা’র খুনীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন
  4. ইতি চাকমার হত্যার প্রতিবাদে রাঙামাটিতে মানববন্ধন
  5. ইতি চাকমার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বাঙালী ছাত্র পরিষদের মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ 

তুষার চাকমা জানান, খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইতি চাকমার সাথে সহপাঠী রনি চাকমার প্রেমের সর্ম্পক ছিল। রনি চাকমা নিয়মিত ইতি চাকমার কাছ থেকে টাকা নিত। কিন্তু রনির অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ইতি চাকমা।

এতে রনি চাকমা প্রতিশোধ নিতে তুষার চাকমাসহ ৫ জনকে সাথে নিয়ে ইতি চাকমার ভগ্নিপতির বাড়িতে তাকে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডে রনি চাকমাসহ ৩ জন সরাসরি অংশ নেয়। অপর দু’জন বাসার বাইরে পাহারায় ছিল।

এদিকে হত্যার পর ইতি চাকমার হত্যাকাণ্ড পাহাড়ী-বাঙালী দ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িক খাতে প্রবাহিত করার জন্য ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে। এ সব কর্মসূচীতে হত্যাকারীরা বক্তব্য দেন বলে জানান, আটক তুষার চাকমা।

হত্যাকারীরা ইতি চাকমা হত্যার জন্য বাঙালীদের দায়ী করেন। ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী বিভিন্ন অংশ সংগঠন এ হত্যাকাণ্ডে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করে। যদিও বাঙালীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাহাড়ীদের দায়ী করে পাল্টা কর্মসূচী পালন করে।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ ফেব্রুয়ারী রাতে জেলা সদরের আরামবাগ এলাকায় ভগ্নিপতির ভাড়া বাসায় বোন ও ভগ্নিপতির অনুপস্থিতিতে গলা কেটে হত্যা করা হয় খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমাকে।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে চট্টগ্রাম বিভাগের সিআইডি’র সহযোগিতা নেয় খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ। অবশেষে রবিবার(১০ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টায় খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী স্কোয়ার এলাকা থেকে তুষার চাকমাকে আটক করা হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে এ অভিযানে অংশ নেন. খাগড়াছড়ি ডিবি পুলিশের পরিদর্শক(ওসি) আব্দুর রকিব। খাগড়াছড়ি সদর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) তারেক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান ও উপপরিদর্শক(এসআই) আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান জানান, দীর্ঘ সাড়ে ৬ মাস পর এক খুনিকে আটকের মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকার খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমার হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে। অন্য আসামীদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। শীঘ্রই বাকী আসামীদেরও গ্রেফতার করা হবে।

পাহাড়ী তরুণীদের বাঙালি ছেলের সঙ্গে সম্পর্কের শাস্তি গণধর্ষণ

রেটিনা চাকমা

মমিনুল ইসলাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম থেকে ফিরে:

অজ্ঞাত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি তরুণীরা প্রেমিক বা স্বামী হিসেবে পছন্দ করে বাঙালী যুবকদের। আমাদের সংবিধানও আন্ত:ধর্মীয় বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো বাধা প্রদান করে না। কিন্তু এ আইনের তোয়াক্কা করে না পাহাড়ের বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠনগুলো। কোন পাহাড়ী তরুণী কোনো বাঙালী যুবককে বিয়ে বা তার সঙ্গে মেলামেশা করলে ভোগ করতে হয় করুণ পরিণতি। শাস্তি স্বরুপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিকার হতে হয় অপহরণ, দল বেধে যৌন নির্যাতন, গণধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ ও হত্যার।

তবে এবার কোন প্রেম-ভালোবাসা নয়। কেবল কলেজ ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে এক বাঙালীর দোকানে যাওয়ায় এক চাকমা কিশোরীকে প্রকাশ্যে মারধর করেছে পাহাড়ের একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

শুধু এখানেই শেষ নয়। পরে এ কিশোরীকে নেয়া হয় পাহাড়ের গহীন জঙ্গলে। শরীরের কাপড় খুলে নগ্ন করে দল বেঁধে করা হয় যৌন নির্যাতন। এ বর্বর মুহূর্তের দৃশ্যও ধারণ করা হয় মোবাইলে। ঘটনাটি ঘটেছে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় গেল ২৯ মে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর করা মামলায় সুনীতিময় চাকমা (৩০) নামে এক পিসিপি নেতাকে ১৪ জুন আটক করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ। সে উপজেলা পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (সন্তু লারমা) অর্থ সম্পাদক।

১৭ বছর বয়সী ওই চাকমা কিশোরী রাঙামাটি কোতয়ালী থানার ধুল্লাছড়ি গ্রামের সুনীল কান্তি চাকমার মেয়ে। এ ঘটনায় মামলার পর ভুক্তভোগীকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৪ জুন আটকের পর পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন সুনীতিময়। আটকের পর তাকে সনাক্ত করেছে ভুক্তভোগী।

bilaichori_inner

ভুক্তভোগী ও মামলা সূত্রে জানা যায়, চাকমা কিশোরী এ বছর এসএসসি পাস করেছে। উচ্চ মাধ্যমিকে অনলাইনে আবেদনের জন্য গত ২৯ মে বিলাইছড়ি বাজারের শিহাবের কম্পিউটারের দোকানে যায় সে। এ সময় স্থানীয় সুনীতিময় চাকমা (৩০)সহ ১৫ থেকে ২০ জন পাহাড়ী দোকানের মধ্যেই আটকে ফেলে তাকে। বাঙালী ছেলের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক আছে দাবি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নিয়ে প্রকাশ্যে মারধর করা হয়।

পরে তাকে অপহরণ করে কেরণছড়ির অজ্ঞাত জঙ্গলে নিয়ে যায় পিসিপি কর্মীরা। সেখানে তাকে পুনরায় মারধর ও গালিগালাজ করে। অত:পর তার চোখ বেঁধে কাপড় চোপড় খুলে শরীরের স্পর্শকাতর অংশে যৌন হয়রানী করা হয়। এ ঘটনা কাউকে জানালে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়।

পরবর্তীতে মা সহকারে গাছকাটা ছড়া আর্মি ক্যাম্পে উপস্থিত হয়ে ঘটনার বর্ণনা দেয় চাকমা যুবকদের নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে পড়া মেয়েটি। এ সময় মেয়েটির শরীরের কিছু অংশ রক্তাক্ত দেখে সেনাবাহিনীর সদস্যরা পুলিশকে খবর দেয়। পরে মেয়েটি বাদি হয়ে বিলাইছড়ি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৭/১০/১৩ ধারায় একটি মামলা দায়ের করে। মামলা নং ১/৫/১৬।

এদিকে এ ঘটনায় আটক পিসিপি নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তার গ্রেফতারের প্রতিবাদে দুদিন হরতাল পালন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু গ্রুপ)। গেল ১৫ ও ১৬ জুন বিলাইছড়ি উপজেলায় এ হরতাল পালন করা হয়।

গত ২১ জুন বিলাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: মঞ্জুরুল আলম মোল্লা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। জানান, আটক পিসিপি নেতার বিরুদ্ধে শিগগিরই রিমান্ড আবেদন করা হবে। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে।

মা মোবাইল সেন্টারের মালিক শিহাব জানান, তার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। ওই চাকমা কিশোরীর সঙ্গে কোন ধরনের সম্পর্ক নেই। তার মতো অনেক পাহাড়ী মেয়েই তার দোকানে নিয়মিত আসত। এ ঘটনা ২৯ মে ঘটলেও ১৪ জুন পিসিপি নেতা আটক হওয়ার পর দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হন শিহাব। তার জমাদার সুশীল চাকমা জানান, অসামাজিক কার্যকলাপের বিষয়টি তিনি নিজে না দেখলেও তাকে আর দোকান ভাড়া দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে গত ২২ জুন বুধবার রাঙামাটি রিজার্ভ বাজার বাস স্টেশন মোড়ে ‘ধর্ষকদের’ দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পার্বত্য বাঙালী ছাত্র ঐক্য পরিষদ। এসময় বক্তারা অভিযোগ করেন, সন্তু লারমার মদদে জেএসএস ও পিসিপি পাহাড়ে চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ও জাতি বিদ্বেষী কর্মকা- পরিচালনা করছে।

গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এর আগে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে ভালোবেসে এক বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করার অপরাধে খাগড়াছড়ির গুইমারার উমাচিং মারমা(১৮) নামে এক মারমা তরুণী ও তার পরিবারকে নির্যাতন ভোগসহ মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। তাকে একটি কক্ষে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে ভালোবেসে চাকমা মেয়েকে বিয়ে করাই কাল হয় প্রথম আলোর সাবেক স্টাফ আলোকচিত্র সাংবাদিক সৈকত ভদ্র’র। তাকে হারাতে হয় প্রথম আলোর আকর্ষণীয় চাকরি। অপরদিকে ভালোবাসার মানুষকে ভুলে যেতে স্ত্রী রেটিনা চাকমার উপর চলে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। তোলা হয় নিলামে। যা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে গণমাধ্যমে।

সবচেয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা ঘটনা ঘটে গত বছরের এপ্রিলে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালায়। উপজেলার ক্ষেত্রলাল ত্রিপুরার মেয়ে দীপা ত্রিপুরা (১৮) ভালোবেসে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেছিল চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার আহমদ কবীরের ছেলে মো. আবদুল হান্নানের (২৪) সাথে। এসময় প্রেমিক হান্নানের হাত ধরে পালানোর সময় বাস থেকে থামিয়ে দীপা ত্রিপুরা ও হান্নানকে অপহরণ করে পিসিপি’র কর্মীরা।

অপহরণের পর একটি ঝুম ঘরে আটক করে দীপা ত্রিপুরাকে পালাক্রমে গণধর্ষণ করে পিসিপি’র স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী। একাধিকবার গণ-ধর্ষণের পর গভীর রাত পর্যন্ত দীপা ত্রিপুরাকে নিয়ে উল্লাস করে এসব সন্ত্রাসীরা। পুরো গণ-ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইলে ভিডিও করা হয়। এ ঘটনায় আটক ইউপিডিএফ সমর্থিত পিসিপি’র নেতা সজীব ত্রিপুরা(২২) প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানায়।

এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী মুসলিম ছেলেকে ভালোবেসে মাটিরাঙার সোনাবি চাকমা, রাঙামাটির কুতুকছড়িতে রিনা ত্রিপুরা, রামগড়ের মণিকা ত্রিপুরাসহ এরকম আরো অসংখ্য পাহাড়ী মেয়েকে অপহরণ, গণধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন নারকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে।

সম্প্রতি পাহাড়ী তরুণীদের নিজ জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের হাতে এরুপ নির্বিচারে গণধর্ষণের শিকার হওয়া নিয়ে গবেষণাধর্মী উপন্যাস বের করেন লেখিকা রোকেয়া লিটা। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘ডুমুরের ফুল’ নামে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ বইটি বের করলে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়া হয় তাকে।

রাঙামাটির বিলাইছড়ির কেরণছড়ি মৌজা কার্বারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি অংচাখই কার্বারী জানান, কোন পাহাড়ী মেয়ে বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করলে উপজাতিদের সামাজিক নিয়মে কোন শাস্তির বিধান নেই। তবে আমরা এ ক্ষেত্রে কার্বারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাধারণত ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে থাকি। এরপর তাদের একত্রে বসবাসে সমস্যা নেই।

গত বছরের এপ্রিলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার ঘটনায় নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে সজিব ত্রিপুরার চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তির একটি ভিডিও ক্লিপ স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। নিচে ভিডিওটি পুনরায় দেয়া হল।

পরকীয়া প্রেম এবং মহামারী সামজিক ব্যাধি প্রসঙ্গে

arif151_1265608578_1-porukria

আশরাফুজ্জামান মিনহাজ

ছোট বেলায় আমাদের পাঠ্য বইয়ের তালিকাতে ছিল দুইটা বই। একটা হচ্ছে পদ্মা নদীর মাঝি, আরেকটা হচ্ছে হাজার বছর ধরে। দুই বইতে অনেক সুন্দরভাবে পরকীয়া উপস্থাপন করা হয়েছে। বই দুটো খারাপ তা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু ওই বয়সে তা আমাদের সবার মনে তা দাগ কেটেছিল। হয়ত বলবেন বইগুলো বাস্তব ঘটনার আলোকে লেখা হয়েছে। কিন্তু নিজের অজান্তে আমাদের মনের মধ্যে যে কি পরিবর্তন আনছে তা বুঝতে অনেক সময় লাগবে। একটা সমাজের যখন পরিবর্তন হয় তা সহজেই লক্ষনীয়। সমাজের নৈরাজ্য কিন্তু পারিবারিক জীবনেও ছাপ ফেলে। লক্ষ করে দেখবেন আমাদের দেশে কিন্তু এখন পরিবার ভাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে পাশ্চাত্তের মত। বিদেশের মানুষ রা আমাদের সমালোচনা যতই করুক, আমাদের দেশের পরিবার প্রথাটা খুবই ভাল। তাদের দেশে এখন অনেক বাচ্চাই বড় হয় মা, বাবা ছাড়া। অথচ একটা বাচ্চার বড় হবার জন্য মা বাবার মধুর সম্পর্ক যে কতটা জরুরী তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

images (2)(2)(1)

মানুষকে অবশ্যই হতে হবে মনোগামী/ একগামী…! আবার এই প্রসঙ্গে বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা যাক……

জৈবিক দিক থেকে নারী পরকীয়ার কি ব্যাখ্যা :
 আসলে নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যেই যেমন একগামিতা দৃশ্যমান, তেমনি দৃশ্যমান বহুগামিতাও। নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যেই লংটার্ম বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক করার মনোবাসনা যেমন আছে, তেমনি সুযোগ এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় উঠে আসে শর্টটার্ম বা স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কের মনোবাঞ্ছাও। পুরুষের মধ্যে বহুগামিতা বেশি, কারণ অতীতের শিকারী-সংগ্রাহক

সমাজে শক্তিশালী এবং প্রতিপত্তিশালী পুরুষেরা যেভাবে নারীর দখল নিত, সেটার পর্যাক্রমিক ছাপ এখনো ক্ষমতাশালী পুরুষদের মধ্যে লক্ষ্য করলে পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে নারীরা পরকীয়া করে না, কিংবা তাদের মধ্যে বহুগামিতা নেই। প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাশালী পুরুষেরা যেমন পরকীয়া করতে উন্মুখ থাকে, তেমনি, ক্ষমতাশালী কিংবা প্রভাবশালী পুরুষের স্ট্যাটাস আবার নারীর কাছে পছন্দনীয়। কোন নারীর বর্তমান সঙ্গির চেয়ে যদি তার প্রেমিকের পদমর্যাদা বা স্ট্যাটাস ভাল হয়, কিংবা প্রেমিক দেখতে শুনতে অধিকতর সুদর্শন হয়, কিংবা যে সমস্যাগুলো নিয়ে একটি নারী তার পার্টনার কিংবা স্বামীর সাথে অসুন্তুষ্ট, সেগুলোর সমাধান যদি তার প্রেমিকের মধ্যে খুঁজে পায়, নারী পরকীয়া করে। তাই আমেরিকায় আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, নিউট গিংরিচ, বিল ক্লিন্টন কিংবা বাংলাদেশে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কিংবা হুমায়ূন আহমেদ যখন পরকীয়া করতে চেয়েছে, তারা সেটা করতে পেরেছে, কারণ নারীরাও তাদের মত যশস্বী কিংবা ‘হাই স্ট্যাটাসের’ কেউকেটাদের সাথে সম্পর্ক করতে প্রলুব্ধ হয়েছে। নারীর আগ্রহ, অনুগ্রহ কিংবা চাহিদা ছাড়া পুরুষের পক্ষে পরকীয়া করা সম্ভব নয়, এটা বলাই বাহুল্য। তাই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের চোখে নারীর একগামিতার ব্যাপারটি এক ধরণের ।
 
lutha_1323542064_1-376456_286825641354093_230043730365618_747571_828004774_n
 
আগেই বলেছি লং টার্ম এবং শর্ট টার্ম স্ট্র্যাটিজি নারী পুরুষ সবার মধ্যেই আছে। বহু কারণেই এটি নারী পরকীয়া করতে পারে, আগ্রহী হতে পারে বহুগামিতায়। নারীর পরকীয়ার এবং বহুগামিতার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুকল্প বা হাইপোথিসিস প্রস্তাব করেছেন বিজ্ঞানীরা, এর মধ্যে রয়েছে – রিসোর্স হাইপোথিসিস, জেনেটিক হাইপোথিসিস, মেট সুইচিং হাইপোথিসিস, মেট স্কিল একুজেশন হাইপোথিসিস, মেট ম্যানুপুলেশন হাইপথিসিস ইত্যাদি[1] দু একটি বিষয় এখানে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

জৈবিক কারণেই অসতর্ক কিংবা অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে (casual sex) নারীরা পুরুষদের মত প্রজননগত উপযোগিতা পায় না। তারপরেও নারীরা পরকীয়া করে, কিংবা হতে পারে বহুগামী, কারণ নারীদের ক্ষেত্রে বহুগামিতার একটি অন্যতম উপযোগিতা হতে পারে, সম্পদের তাৎক্ষনিক যোগান। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খাদ্যের বিনিময়ে তারা পুরুষ শিম্পাঞ্জিকে যৌনতা প্রদান করে থাকে। গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, নারী শিম্পাঞ্জিরা সেই সব পুরুষ শিম্পাঞ্জিদের প্রতিই যৌনতার ব্যাপারে থাকে সর্বাধিক উদার যারা খাদ্য যোগানের ব্যাপারে কোন কৃপণতা করে না। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে কোন কিছু সত্য হলে মানব সমাজেও সেটা সত্য হবে, এমন কোন কথা নেই অবশ্য। কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানীরা আমাজনের মেহিনাকু (Mehinaku) কিংবা ট্রোব্রিয়াণ্ড দ্বীপপুঞ্জের (Trobriand Island) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, সেখানেও পুরুষেরা নারীদের জন্য (অনেকটা শিম্পাঞ্জিদের সমাজের মতোই) রকমারী খাদ্য, তামাক, বাদাম, শঙ্খের মালা, বাহুবন্ধনী প্রভৃতি উপঢৌকন সংগ্রহ করে নিয়ে আসে, আর বিনিময়ে নারীরা যৌনতার অধিকার বিনিময় করে। যদি কারো কাছ থেকে উপঢৌকনের যোগান বন্ধ হয়ে যায়, তবে নারীরাও সে সমস্ত পুরুষের সাথে যৌনসম্পর্ক বন্ধ করে দেয় সম্পদের যোগানের সাথে যে নারীর যৌনতা প্রদানের একটা অলিখিত সম্পর্ক আছে, তা জানার জন্য অবশ্য আদিম সমাজে যাওয়ার দরকার নেই। আধুনিক সমাজেও সেটা লক্ষ্য করলে পাওয়া যাবে।

53334
সবচেয়ে চরম উদাহরণটির কথা আমরা সবাই জানি -পতিতাবৃত্তি। নারী যৌনকর্মীরা অর্থসম্পদের বিনিময়ে যৌনতার সুযোগ করে দেয় পুরুষদের – এটা সব সমাজেই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা থেকে পুরুষদের বহুগামী চরিত্রটি যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি হয় আর্থিক লাভের জন্য নারীর যৌনতা বিক্রির সম্পর্কটিও যৌনকর্মী শুধু নয়, আমেরিকায় সাধারণ মেয়েদের মধ্যে গবেষণা করেও দেখা গেছে, যে সমস্ত নারীরা শর্ট টার্ম বা স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কে জড়াতে ইচ্ছুক, তারা আশা করে যে, তার প্রেমিক অর্থ কড়ির দিক থেকে কোন কৃপণতা দেখাবে না, অনেক ধরণের দামী উপহার সামগ্রী উপঢৌকন হিসেবে নিয়ে আসবে, বিলাসবহুল জীবন যাত্রায় অভ্যস্থ হবে, নিয়মিতভাবে ভাল ভাল রেস্টুরেন্টে তাকে আপ্যায়ন করবে, এবং সর্বোপরি যে কোন ধরণের সম্পদের বিনিয়োগে থাকবে উদার কৃপণ স্বামীকে যাও বা মেয়েরা কিছুটা হলেও সহ্য করে, অ্যাফেয়ার বা পরকীয়ায় আগ্রহী কৃপণ যৌনসঙ্গিকে কখনোই নয়। অ্যাফেয়ার বা পরকীয়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের কৃপণতা মেয়েদের কাছে গ্রহণীয় কিংবা পছন্দনীয় নয়, কারণ তারা সঙ্কেত পেতে শুরু করে যে, তার সঙ্গিটি হয়তো ভবিষ্যতেও তার জন্য সম্পদ বিনিয়োগে সে রকমভাবে আগ্রহী নয়। এই মানসিক অভিরুচিগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সম্পদের তাৎক্ষণিক আহরণ নারীদের ক্ষেত্রে এক ধরণের অভিযোজন জনিত উপযোগিতা দিয়েছে, যা নারীরা অনেক সময় পরকীয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চায়।

নারীদের পরকীয়ার ব্যাপারে আরো একটি লক্ষ্যনীয় প্যাটার্ন পাওয়া গিয়েছে, যেটা পুরুষদের থেকে কিছুটা আলাদা। বহুক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নতুন সঙ্গির সাথে অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের (casual sex) মাধ্যমে নারীরা সঙ্গিটিকে ভবিষ্যৎ স্বামী হিসেবে মূল্যায়ন করে নিতে চায়। সে জন্যই এমনকি স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বহুগামী, বোহেমিয়ান ধরণের ছেলের সাথে সম্পর্ক করতে নারীরা প্রাথমিকভাবে অনিচ্ছুক থাকে; অতীতে যদি পুরুষটির বহু নারীর সাথে সম্পর্ক কিংবা আসক্তি থেকে থাকে, তা নারীটির কাছে তা এক ধরণের অনাকাংক্ষিত সংকেত নিয়ে উপস্থিত হয়। এর কারণ, স্বল্পমেয়াদী সম্পর্কে জড়ালেও তার অবচেতন মনে থাকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের আকাংক্ষা, যার নিরিখেই সে সাধারণতঃ উপরোক্ত বৈশিষ্টগুলো বিচার করে থাকে। তার সঙ্গির বহুগামিতা কিংবা অতীতে বহু নারীর প্রতি আসক্তির অর্থ তার চোখে হয়ে উঠে তার সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার নিয়ামক। অর্থাৎ, সে ধরে নেয় এ ধরণের পুরুষেরা ‘ভবিষ্যৎ স্বামী’ হিসেবে উপযুক্ত নয়। মোটা দাগে, ভবিষ্যৎ স্বামীর মধ্যে যে গুণাবলীগুলো প্রত্যাশা করে, ঠিক সেগুলোই একটি নারী তার যৌনসঙ্গির মধ্যে খুঁজতে চায়[5] দুটি ক্ষেত্রেই মেয়েরা চায় তার পুরুষ সঙ্গি হবে দয়ালু, রোমান্টিক, সমঝদার, দুর্দান্ত, স্বাস্থ্যবান, রসিক, বিশ্বস্ত এবং সম্পদের বিনয়গের ব্যাপারে থাকবে উদার। সেজন্যই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাস তার ‘বাসনার বিবর্তন’ (The Evolution Of Desire) বইয়ে বলেন…

উভয় ক্ষেত্রেই মেয়েদের অভিরুচির এই অপরিবর্তনীয়তা ইঙ্গিত করে যে, নারীরা অনিয়মিত যৌনসঙ্গিকে হবু স্বামী হিসবেই দেখে এবং সেজন্য দুইক্ষেত্রেই বেশি পদপর্যাদা আরোপ করে। বহু সমাজে আবার দেখা গেছে, যে সমস্ত সমাজে সহিংসতা খুব বেশি, নারীরা বিবাহ-বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক করে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারটা চিন্তা করে। স্বামীর বাইরে গোত্রের অন্য কোন পুরুষের সাথে যদি নারীর কোন ‘বিশেষ বন্ধুত্ব’ গড়ে উঠে তবে সে স্বামী বাইরে থাকলে বা অন্য কোন সময়ে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে। এ ব্যাপারটা সাধারণভাবে প্রানীজগতের মধ্যে প্রচলিত আছে। যেমন, সাভানা বেবুনদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বারবারা স্মুটস সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই ধরনের বেবুনদের সমাজে একটি নারী বেবুনের সাথে প্রাথমিক বা মূল সঙ্গির বাইরেও একজন বা দু’জন সঙ্গির সাথে ‘বিশেষ ধরনের’ সম্পর্ক গড়ে উঠে, এবং সেই সঙ্গি বা সঙ্গিরা অন্য বেবুনদের উত্যক্ত করার হাত থেকে নারী বেবুনটিকে রক্ষা করে[7]। ‘পর-পুরুষের’ সাথে যৌনতার বিনিময়ে মূলতঃ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নারী বেবুনটি। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী রবার্ট স্মিথ তার একটি গবেষণাপত্রে বলেন…

প্রাথমিক সঙ্গিটি সবসময় নারী বেবুন কিংবা তার সন্তানের পাশে থেকে থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে না। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোন পুরুষের সাথে নারীটির ‘বিশেষ কোন সম্পর্ক’ থাকলে তা তার বেঁচে থাকায় বাড়তি উপযোগিতা নিয়ে আসে। এভাবে নারীটি অন্য কোন পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের এবং নিজের সঙ্গির জিন রক্ষা করার ক্ষেত্রে এক ধরণের স্ট্র্যাটিজি তৈরি করে।এ ধরণের স্ট্র্যাটিজি মানব সমাজে বর্তমানে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আদিম শিকারী সংগ্রাহক কিছু সমাজে যেখানে নারীদের উপর পুরুষালী সহিংসতা, আগ্রাসন, ধর্ষণ খুবই বেশি, সেখানে নারীরা এ ধরণের ‘অতিরিক্ত যুগল বন্ধনের’ মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
gon

 
সঙ্গি রদবদল বা ‘মেট সুইচিং’ও হতে পারে আরেকটি বড় কারণ যার কারণে একটি নারী পরকীয়া করতে পারে। স্পটেড স্যাণ্ড পাইপার (বৈজ্ঞানিক নাম Actitis macularia) নামে আমেরিকার মিনেসোটার হ্রদে দৃশ্যমান এক ধরণের পাখিদের মধ্যে সঙ্গি রদবদলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যমাত্রায় পাওয়া গিয়েছে। জীববিজ্ঞানী মার্ক কলওয়েল এবং লিউস ওরিং প্রায় চার হাজার ঘন্টা ধরে এই পাখিদের জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এ ধরণের পাখিদের মধ্যে সঙ্গি রদবদল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা[10] সঙ্গি রদবদলের মাধ্যমে বর্তমান সঙ্গির চেয়ে আরো আকর্ষণীয় সঙ্গিকে খুঁজে নেয় একটি নারী স্পটেড স্যাণ্ড পাইপার। মানব সমাজেও কিন্তু এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করলে খুঁজে পাওয়া যাবে। বর্তমান সঙ্গির চেয়ে অন্য কাউকে অধিকতর আকর্ষণীয়, সুদর্শন কিংবা কাংক্ষিত মনে হলে, কিংবা বর্তমান সঙ্গির স্ট্যাটাসের চেয়ে উঁচু সামাজিক পদমর্যাদাসম্পন্ন কেউ তার সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলে নারী তার সাথেও পরকীয়ায় জড়াতে করতে পারে। পরকীয়া করতে পারে যদি নারীর বর্তমান সঙ্গি যদি অসুস্থ হয়, পঙ্গু হয়, শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়, যুদ্ধাহত হয় কিংবা মুমুর্ষু হয়। বাংলাদেশে বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের চাঞ্চল্যকর মুনীর-খুকুর পরকীয়া আর তাকে কেন্দ্র করে শহীদ সাংবাদিক কন্যা রীমা হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে আছে। মধ্যবয়সী খুকু পরকীয়া প্রেম শুরু করেছিলেন ডঃ মেহেরুন্নেসার পুত্র মুনীরের সাথে। খুকুর স্বামী ছিলেন পক্ষাঘাতগ্রস্থ এবং অসুস্থ। স্বামীর এ শারীরিক পরিস্থিতি খুকুকে চালিত করেছিলো মুনীরের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে, আর প্ররোচিত করেছিলো মুনীরকে রীমা হত্যায়। কাজেই নারী শুধু পরকীয়া করে না, প্রয়োজনে পরকীয়ার কারণে হত্যায় প্ররোচনা দেওয়া শুধু নয়, নিজ হাতে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। কিছুদিন আগে পরকীয়ার কারণে আয়শা হুমায়রা কীভাবে তার নিজের সন্তান সামিউলকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে লাশ ফ্রিজবন্দি করে পর বাইরে ফেলে দিয়েছিলো, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিনের পর দিন ধরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পরকীয়ার কারণে মায়ের নিজ সন্তান হত্যা হয়ত খুব চরম এবং ব্যতিক্রমী উদাহরণ, কিন্তু আকর্ষনীয় সঙ্গির জন্য বর্তমান সঙ্গিকে ত্যাগ, কিংবা স্বামীর তুলনায় আরো ‘উৎকৃষ্ট’ কারো সাথে লুকিয়ে ছাপিয়ে পরকীয়া তা নয়। এ ব্যাপারটা সব সময়ই এবং সব সমাজেই ছিল।

পয়সাওয়ালা কিংবা সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান, আকর্ষনীয়, মনোহর কিংবা উঁচু পদমর্যাদাসম্পন্ন সঙ্গির জন্য পুরাতন সঙ্গিকে ত্যাগ মেয়েদের মধ্যে এক সময় একধরনের অভিযোজনগত উপযোগিতা দিয়েছিলো, অন্ততঃ হেলেন ফিশারের মত নৃতত্ত্ববিদেরা তাই মনে করেন সেই আদিম শিকারী সংগ্রাহক সমাজের কথা চিন্তা করুন, যেখানে একটি নারীকে ‘বিয়ে করতে’ হয়েছিলো এক দুর্বল শিকারীকে যার চোখের দৃষ্টি ছিল ক্ষীণ, শিকারে অযোগ্য এবং স্বভাবে কাপুরুষ। এ ধরনের সম্পর্কে থাকা নারীরা মানসিক অতৃপ্তি মেটাতে হয়তো পরকীয়া শুরু করেছিলো সুস্থ সবল, স্বাস্থ্যবান তরুণ কোন সাহসী শিকারীর সাথে – ‘মিস্টার গুড জিন’ পাবার এবং ভবিষ্যত সন্তানের মধ্যে তা রেখে যাবার প্রত্যাশায়। ভাল জিনের জন্য সঙ্গিবদলের ব্যপারটি যদি আদিম শিকারী সংগ্রাহক পরিস্থিতিতে নারীদের একধরণের স্ট্র্যাটিজি হয়ে থাকে, তবে সেটি এখনকার সময়েরও বাস্তবতা হতে পারে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। র‍্যান্ডি থর্নহিলের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এই ‘গুড জিন’ অনুকল্পের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে. গবেষণায় দেখা গেছে নারীরা যখন পরকীয়া করে তখন প্রতিসম চেহারার প্রতি আকর্ষিত হয় বেশি. প্রতিসম চেহারা সবসময়ই একটি ভাল ‘ফিটনেস মার্কার’ হিসেবে বিবেচিত। প্রেমিকের চেহারা প্রতিসম হওয়া মানে – তার প্রেমিকের চেহারা আকর্ষনীয়, তার শারীরের গঠন উন্নত, সে পুরুষালী, বুদ্ধিদীপ্ত, চৌকষ, স্বাস্থ্যবান এবং রোগজীবাণু থেকে মুক্ত. তাই যে নারী স্বামীকে রেখে প্রতিসম বৈশিষ্ট্যের প্রেমিকের পেছনে ছুটছে, তার ‘প্রস্তর যুগের মস্তিস্ক’ আসলে প্রকারান্তরে ‘ভাল জিন’ নিজ সন্তানের জন্য নিশ্চিত করে রাখতে চাইছে।

ভাল জিনের জন্য প্রলুব্ধ হয়ে পরকীয়া করার এই জেনেটিক হাইপোথিসেরই আরেকটি প্রচলিত রূপ হচ্ছে ‘জোশিলা পোলা’ বা ‘সেক্সি সন’ অনুকল্প। এই অনুকল্পটি ১৯৭৯ সালে প্রস্তাব করেছিলেন কুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী প্যাট্রিক ওয়েদারহেড এবং রালি রবার্টসন। এই অনুকল্প অনুযায়ী মনে করা হয় যে, সুদর্শন পুরুষের সাথে নারী পরকীয়া করে কিংবা স্বল্পমেয়াদী যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে কারণ, অবচেতন মনেই তার মাথায় থাকে যে, তার সন্তানও হয়ে উঠবে ঠিক একই রকম মনোহারী গুণাবলীর অধিকারী। পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা তার সন্তানের এই প্রীতিকর বৈশিষ্টগুলো দিয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আকৃষ্ট হবে, ফলে যাদের মধ্যে এই গুণাবলীগুলোর অভাব রয়েছে তাদের তুলনায় তার সন্তান অনেক বেশি প্রজননগত সফলতা অর্জন করতে পারবে। বেশ কিছু সাম্প্রতিক জরিপে এই তত্ত্বের স্বপক্ষে কিছুটা হলেও সত্যতা মিলেছে। দেখা গেছে, নারীরা যখন পরকীয়ায় আসক্ত হয় তখন তাদের একটা বড় চাহিদা থাকে স্বামীর চেহারার চেয়ে প্রেমিকের চেহারা অনেক বেশি আকর্ষনীয় হতে হবে।

শুধু ভাল জিন, ভাল চেহারা বা ভাল সন্তানের জন্যই নয়, নারীরা আরো বহু কারণেই পরকীয়া করতে পারে। সামাজিক স্ট্যাটাস তার মধ্যে একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বিবাহিত নারী যখন অন্য কোন পুরুষের সাথে পরকীয়া করে, সেই পুরুষের স্ট্যাটাস, প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি তার বর্তমান স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি থাকে[16] প্রখ্যাত ব্যবসায়ী এবং ২০১২ সালের রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী (পরে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন থেকে সরে দাঁড়ানো ) ডোনাল্ড ট্রাম্প বছর খানেক আগে এক অপরিচিত মডেল মার্থা মেপেলের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে রাতারাতি মার্থা মেপল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। মিডিয়ার পাবলিসিটি তো ছিলোই, সাথে সাথে নানা ধরণের আর্থিক বিনিয়োগ, গনমান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রবেশের অধিকার সহ বিভিন্ন পদমর্যাদা ভোগ করতে থাকেন। বাংলাদেশেও এরশাদ সাহেব যখন রাস্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে জিনাত মোশারফ সহ বহু নারীর সাথে পকীয়ায় মত্ত ছিলেন, তখন সে সমস্ত নারীরাও রাতারাতি বহু রাজনৈতিক এবং সামাজিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে গিয়েছিলেন। এ সমস্ত নারীরা এমন সব মহলে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কিংবা সভায় প্রবেশ করে যেতেন অবলীয়ায়, যেগুলোতে সাধারণ মানুষদের জন্য প্রবেশ ছিলো অকল্পনীয়। প্রেমের অর্থনীতির বাজারে কোন কেউকেটা বা বিখ্যাত লোক যখন কোন পরিচিত নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়, তখন সে যত অখ্যাতই আগে থাকুক না কেন, মানুষ ভেবে নেয় নারীটি নিশ্চয় ‘স্পেশাল। সে রাতারাতি চলে আসে আলোচনা আর ক্ষমতার কেন্দ্রে। নারীটি পায় নতুন পরিচিতি, আর সামাজিক এবং বন্ধুমহলে ঘটে তার ‘স্ট্যাটাসের উত্তোরণ’।

বর্তমানে আমাদের সমাজে এর বাস্তবতাকে কি অস্বীকার করার সুযোগ আছে? সমাজের সিংহভাগ পুরুষ মনে করে তাদের স্ত্রীদের চেয়ে অন্য নারীরা সুন্দরী ও আকর্ষণীয়। শুধু তাই নয়, তারা অন্য নারীদের বাহ্যিকতাকে প্রাধান্য দেয়, প্রকৃত সৌন্দর্যের সংজ্ঞা ভুলে ভ্রান্ত পথে পা বাড়ায়। তারা তাদের বিবাহিত জীবন ছাড়াও অধিক নারীর সান্নিধ্য লাভে মরিয়া হয়ে ওঠে। একঘেঁয়ে মনে করে বাস্তবতাকে। তাদের ধারণা, একাধিক সঙ্গ জীবনে নতুনের যোগ-আনন্দ বয়ে আনে। এ নেশায় পরিতৃপ্তির ঢেকুর গিলে আত্মপ্রশান্তি লাভের অপপ্রয়াসে মত্ত হয়ে অধিক নারী লোভীরা। আসলে এটা যে মানুষকে নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছে দেয় তা ঘুর্ণাক্ষরেও চিন্তা করে না এ বিপথগামীরা। আর এ অবস্থার জন্য কেবল এককভাবে পুরুষদেরকেই দায়ী করা যায় না, পাশাপাশি নারীরাও সমভাবে দায়ী।এই বিষয়ে একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, সমাজের বেশির ভাগ বিবাহিত-অবিবাহিত তরুণ-তরুণী ও মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ তাদের অবসর বিনোদনে একান্ত করে কাছে পেতে চায় অন্যকে। নিবৃত্ত করতে চায় নিজ কুপ্রবৃত্তির লালসা। আর তাতে নিজ চরিত্রকে চরিতার্থ করে দ্রুত ধাবিত হয় অন্ধকারে। তারা কখনও চিন্তা করে না এ নৈতিকতাহীন-যৌন লালসায় একদিন পুড়ে ছাই হবে নিজে এবং পুরো সংসার। এই পরকীয়ার বিষ-ছোবলে কখনও কখনও এমনও হয়, নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আত্মহত্যার মতো জঘন্য ঘটনার পাশাপাশি গর্ভপাত ও অনেক রকম অপকর্ম এবং নৃশংসভাবে খুন হতে হয় অনেককে।আজ অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, দেশে বিয়ে বিচ্ছেদের বেশিরভাগ ঘটনাও ঘটে পরকীয়ার মতো অনৈতিক ব্যাধির ভয়াবহতার কারণে। আমরা লক্ষ্য করবো যে, এক যুগ আগেও গ্রামাঞ্চলে কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্তের মধ্যে এক্ষেত্রে পুরুষরাই ছিল এগিয়ে।

কিন্তু ইদানীং স্বামীরা প্রবাসে অবস্থানের কারণে গ্রাম-মফস্বল, থানা-উপজেলা পর্যায়েও এর ব্যাপকতা অনেকাংশে বেড়ে গেছে। গ্রাম-মফস্বলের তরুণী ও মধ্যবয়সী মহিলাদের স্বামীরা যখন দীর্ঘদিন প্রবাসে অবস্থান করছে তখন তাদের স্ত্রীরা বহুগামী কিছু পুরুষের সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলায় মত্ত হচ্ছে। তাদের অমূল্য শরীর-ইজ্জত তুলে দিচ্ছে পরপুরুষদের হাতে। আর এভাবেই সর্বনাশের যা হওয়ার তাই হচ্ছে। যদিও পুরুষের তুলনায় এক্ষেত্রে নারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। তারপরেও নারীর সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়ছে এই অকল্যাণ-অমানিশার দিকে। এমনও দেখা যায়, এসব ব্যভিচার চালাতে গিয়ে বড় অংকের টাকাপয়সার লেনদেন ও একাধিক ব্যক্তিকে দেহদান করে সমঝোতায় আসতে হয় নারীদের। যা পরে এক সময় প্রকাশ হয়ে তাদের সাংসারিক জীবনে বড় ধরনের অশান্তি ও সমস্যার সৃষ্টি করে।প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় যে, ভ্রমণের নেশায় আমি এশিয়ার কিছু দেশসহ ইউরোপেও ঘুরেছি। ওইখানে প্রায় সব দেশেই দেখেছি, ‘ফ্রি সেক্স’ সংস্কৃতি। সেখানে যৌনতার ক্ষেত্রে রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা। যে যেমন খুশী চলতে পারে। দুইয়ের সম্মতিক্রমে মেলামেশা তাদের সংস্কৃতিতে দোষের কিছু নয়। সে হোক বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত। এটা তাদের সাংস্কৃতিক-বিজাতীয় সংস্কৃতি। আমরা ওই সংস্কৃতি তথা যৌনতার বিষয়টিকে বেশি লক্ষ্য করে নিজেরা কলুষিত হচ্ছি এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক জীবনে এর নীল বিষ ছড়াচ্ছি। এবং এর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরাও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেছে। উদাসীন হয়ে পড়ছে স্বামী-স্ত্রী এবং অন্যান্যরাও অন্যান্যদের প্রতি। সংসারের প্রতি যে দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকার কথা, তা ক্রমেই ভুলতে বসেছে স্বামী-স্ত্রী তথা সন্তানের বাবা-মায়েরা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা থাকা প্রয়োজন তা হ্রাস পাচ্ছে না। যা একসময় বিবাহ বিচ্ছেদের মতো নির্মম-নির্দয় ব্যথিত কাজে পর্যন্ত গড়াচ্ছে।

স্বামী ও স্ত্রী একে অপরের বিরুদ্ধে পরকীয়া, শারীরিক চাহিদা পূরণে অক্ষমতা, এমনকি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার বাহানায় এক পর্যায়ে অনেক বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে অহরহ।এজন্য আমরা এক তরফাভাবে কোন পক্ষকে দায়ী করতে পারি না। দেশের তথাকথিত স্বনামধন্য লেখক, গায়ক, আমলাসহ উচ্চবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটান, যা সাধারণদের এ ঘৃণিত পথে উৎসাহ যোগায়। তাদের এ সকল পরকীয়া-বিষবা হয়ে ছড়ায় সমাজে। এমনও দেখা যায়, মেয়ের মত বা মেয়ের বান্ধবীর সঙ্গে পরকীয়ার পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন দেশের নামিদামী লোকেরা। নারী ও ছেলের বয়সী তরুণদের সঙ্গে একই রকম খেলায় মত্ত হচ্ছেন। আমরা স্বাতন্ত্র্য বলতে যাই বুঝিনা কেন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে কেউ কি অস্বীকার করতে পারি? আমাদের দেশ ইসলামের পূর্ণাঙ্গ সংবিধান না থাকলেও সিংহভাগই মুসলিম ও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরকীয়া, অবাধ যৌন মেলামেশা ও অসম বিয়েকে সমাজ কি করে মানবে? কোনভাবেই এই অনৈতিকতাকে মেনে নেয়া যায় না। আজ আমরা মনে করি, এ বিষয়টিকে নিয়ে সমাজসচেতনদের ভাবতে হবে। সর্বোপরি সরকারকেও খেয়াল দিতে হবে মাদক, যৌতুক, ইভটিজিং, বাল্যবিবাহ, ধর্ষণসন্ত্রাস ও এসিডসন্ত্রাসের মতো এই পরকীয়াসন্ত্রাসের প্রতিও। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে দেশের সর্বত্র। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এর কুফল তুলে ধরে বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করার বিকল্প আছে বলে মনে করি না। এর চেয়েও বড় কথা ধর্মীয় অনুশাসনকে জাগ্রত করতে হবে সকল মানুষের মাঝে।

লেখক: গবেষক, ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

 

পাহাড়ি তরুণীদের অর্ধশত নগ্ন ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে: অভিভাবকরা আতঙ্কে

পাহাড়ি তরুণীদের অর্ধশত নগ্ন ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে: অভিভাবকরা আতঙ্কে, (পাহাড়ি. তরুণী, নগ্ন,  ভিডিও, ইন্টারনেট, প্রেম, মোবাইল, পাহাড়ী)

পার্বত্য নিউজ ডেস্ক:

পাহাড়ি তরুণীদের অর্ধশত নগ্ন ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে: অভিভাবকরা আতঙ্কে

পাহাড়ের তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পর গোপন ক্যামেরায় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য সম্মতির ভিত্তিতে বা গোপনে ধারণ করে ফুটেজ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মোবাইলে-ইন্টারনেটে। এভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে পার্বত্য রাঙ্গামাটি এলাকার অর্ধশত তরুণী স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী হতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে এলাকা ছেড়ে দূরে কোথাও আত্মগোপনে চলে গেছেন। একের পর এক প্রতারণার ঘটনা ফাঁস হওয়ায় আতংক ছড়িয়ে পড়ছে গোটা পার্বত্য এলাকায়। মেয়ের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। অপকর্মের হোতারা ঘটনা ঘটিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা নিজেরাই মোবাইলের ব্লুট্রুথের মাধ্যমে সেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে বিপাকে পড়ছে সংশ্লিষ্ট তরুণী এবং তাদের পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক শ্রীলংকান কর্মকর্তা চাকরি শেষে রাঙামাটি ছেড়ে যাওয়ার পর শ্রীলংকা থেকে রাঙ্গামাটিতে তার পরিচিতদের ইমেইলে একটি ভিডিও ফুটেজ এবং কিছু স্টিল ছবি পাঠায়। সেখানে রাঙ্গামাটি শহরের একজন চাকমা গৃহবধূর সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কের বেশ খোলামেলা দৃশ্য রয়েছে। এই ছবি এবং ফুটেজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে। বেকায়দায় পড়া গৃহবধূটি আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়।

এরপর শহরের চম্পকনগর এলাকার একটি অভিজাত পরিবারের এক মেয়ের ওয়েব ক্যামেরায় নিজের পরিচিত কারো সামনে নগ্ন হওয়ার দৃশ্য সম্বলিত একটি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ঘটনাটি বেশ সাড়া ফেলে শহরে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে মেয়েটির পরিবার শিক্ষিত এবং সচেতন হওয়ায় তারা ইউটিউব/ফেসবুকসহ বিভিন্ন সাইটে যোগাযোগ করে ফুটেজটি প্রচার কিছুটা বন্ধ করতে সক্ষম হন। পরে মেয়েটিকে গোপনে অন্যত্র বিয়ে দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে পর পর রাঙ্গামাটি পার্বত্য এলাকার কয়েকজন পাহাড়ি তরুণীর ভিডিও ফুটেজ বের হয় । এর মধ্যে শহরের তিনটি অভিজাত পরিবারের তিন মেয়ের ফুটেজ নিয়েই আলোচনা ছিলো বেশি। এদের মধ্যে রাজপরিবারের মেয়ে যেমন আছে, তেমনি একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার মেয়েও আছে। আবার স্কুলপড়ুয়া দুই পাহাড়ি কিশোরীর ছবি এবং ফুটেজও আছে। এইসব ফুটেজের বেশিরভাগই পাহাড়ি তরুণ-তরুণীদের। তবে সম্প্রতি আবার তোলপাড় সৃষ্টি হয় গত সপ্তাহে পর পর পাওয়া দুইটি ফুটেজ নিয়ে। এই দুইটি ফুটেজের তরুণীরা পাহাড়ী হলেও অপরাধীরা বাঙালি। একটি ঘটনায় অভিযুক্ত তরুণ রাঙ্গামাটি শহরের হাসপাতাল এলাকার বাসিন্দা এবং ফুটেজ প্রকাশের পর ঘটনার শিকার মেয়েটি নিজেই বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা করে প্রতারক প্রেমিকের বিরুদ্ধে। মামলা হওয়ার পর প্রথমবারের মতো এই ধরনের ঘটনার তদন্তে নামে পুলিশ। পুলিশী তৎপরতায় প্রতারক প্রেমিক পালিয়ে গেলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা।

রাঙ্গামাটি শহরের রাজবাড়ী এলাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেয়েটির ঘটনার পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তার পুরো পরিবার।পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে এই ঘটনাটির পুরো ভিডিওটি ধারণা করা হয় কলেজগেট এলাকার মোটেল জর্জ নামের আবাসিক হোটেলের একটি কক্ষে। এ প্রসঙ্গে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা নাসিরউদ্দিন শরীফ বলেন, আমরা ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার জন্য তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছি এবং একই সাথে অপরাধীকে আটক করার জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।

একই সপ্তাহে রাঙ্গামাটি বনরুপা এলাকার এক মোবাইল বিক্রেতার সাথে শহরের এক সুন্দরী চাকমা তরুণীর কিছু স্থির ছবি প্রকাশ পায়। শিক্ষিতা এই সুন্দরী মেয়েটিকে বখাটে এই তরুণের পটিয়ে ফেলার ঘটনায় বিস্মিত হন সবাই।

ট্রাইবেল আদাম নামক এলাকার এক তরুণ-তরুণীর ‘মোটর সাইকেল সেক্স’ এর ফুটেজটিও সাড়া ফেলে সর্বত্র। এগুলো ছাড়াও জাতিসংঘের একটি সহযোগী সংস্থায় চাকরিরত দুই পাহাড়ি সহকর্মীর ভিডিও ফুটেজ, একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ছবি, ঢাকার একটি বাসায় পাঁচজন পাহাড়ি তরুণীর ব্যক্তিগত কিছু মুহূর্তের ছবি, ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত রাঙ্গামাটির এক মারমা তরুণী মডেল -এর ব্যক্তিগত জীবনের ছবি এখন ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল থেকে মোবাইলে।

এই মুহূর্তে অর্ধশত তরুণীর স্থির ছবি বা ফুটেজ শত শত যুবকের হাতে হাতে আছে। এসব ফুটেজ ও ছবির একটি বড় অংশই গোপনে ধারণ করা। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সম্মতির ভিত্তিতেই করা।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, পাহাড়ি সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিজ্ঞানেও সমৃদ্ধ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েরা। তবে কেবল শিক্ষিত হলেই হবে না, সেই সাথে মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তিনি বলেন- মোবাইল ফোন ব্যবহারের একটি নীতিমালা থাকা জরুরী আর এসব সামাজিক অপরাধ নির্মূলে প্রশাসনিক উদ্যোগের অনেক বেশি প্রয়োজন। আর সবচে বেশি প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মাসুদ উল হাসান বলেন, সারাদেশে মোবাইল এবং ভিডিও ক্যামেরায় যে পর্ণোগ্রাফির গোপন ব্যবসা চলে তার থেকে পার্বত্য এই শহরও ব্যতিক্রম নয়। আমাদের কাছে একাধিক অভিযোগ এসেছে, আমি রাঙামাটির সকল থানার ওসিকে নিয়ে এই বিষয়ে বৈঠক করেছি। ইতিমধ্যে আমরা ভিডিও ফুটেজ এবং স্থির ছবি দেখে অভিযুক্তদের সনাক্ত করেছি, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে এই বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি অনেক বেশি জরুরী বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সূত্র: সামহোয়ার ব্লগ/কৈ মাছের প্রাণ

Read the news in English

Pornography of tribal girls are spread in internet: parents perplexed

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও কিছু বিষয়

পর্ণো ছবিতে বনানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্রী ও তার বন্ধুরা!

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

রাঙামাটিতে উপজাতীয় গৃহবধুর নগ্নছবি তুলে ব্লাকমেইল করে ২ লাখ টাকা দাবি: ১ প্রতারক গ্রেফতার

পুরুষ ফাঁসানো এক সুন্দরী শিক্ষিকার দিনকাল

কাজের মেয়ের সঙ্গে শিল্পী আরেফিন রুমির অবৈধ সম্পর্কের ছবি ফেসবুকে

কাজের মেয়ের সাথে শিল্পী আরেফিন রুমির প্রকাশিত অশ্লীল ছবিটি সঠিক নয়