image_pdfimage_print

পাহাড় ধসে দুর্গতদের দেখতে যাওয়ার পথে মির্জা ফখরুলের উপর হামলা

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

পাহাড় ধসে দুর্গতদের দেখতে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পাহাড়ধসে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণের জন্য রাঙামাটি যাওয়ার পথে হামলায় শিকার হয়েছেন বিএনপি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

হামলায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল আলম চৌধুরীসহ ৫ জন আহত হয়েছেন। হামলার কারণে রাঙামাটি যেতে না পেরে নগরীতে ফিরে আসছে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বের প্রতিনিধি দল। রোববার সকাল ১০টার দিকে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার গোছরা এলাকায় হামলা হয় বলে জানা গেছে।

বিএনপি নেতাদের অভিযোগ সরকার দলের ক্যাডাররা এ হামলা চালিয়েছে।  আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, রাঙামাটি যাওয়ার পথে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার গোছরা এলাকা পার হওয়ার পর আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। পরে ৩০ থেকে ৪০ জন যুবক লোহার রড ও লাঠি নিয়ে আমাদের গাড়ি ভাংচুর করে। হামলায় দলের মহাসচিব, আমিসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছি।

হামলা এবং বাধার কারণে রাঙামাটি না গিয়ে নগরীতে ফিরে আসছেন জানিয়ে আমীর খসরু বলেন, জীবনের নিরাপত্তা না থাকায় আমরা রাঙামাটি যাইনি।

রাজনৈতিক জীবনে এমন ন্যাক্কারজনক হামলা প্রত্যক্ষ করেননি মন্তব্য করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা কল্পনাও করতে পারিনি এমন হামলা হবে। দেশের রাজনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে বিশ্বাস করতে পারছি না।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের নের্তৃত্বে প্রতিনিধি দলে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান রুহুল আলম চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিষয়ক সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম, বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. ফাওয়াজ হোসেন শুভ, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে করে ঢাকা থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বের প্রতিনিধি দল।সকাল সাড়ে ৮টায় বিমানবন্দর থেকে সড়ক পথে রাঙা্মাটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন তারা।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পাজেরো গাড়িতে উঠেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, রুহুল আলম চৌধুরী ও মাহবুবু রহমান শামীম। এছাড়া আরও অন্তত ১০টি পাজেরো জিপ গাড়িতে করে রওয়ানা দেন প্রতিনিধি দলের সদস্য, নগর ও উত্তর জেলা বিএনপির নেতারা। প্রতিনিধি দলের গাড়ি বহরের সামনে একটি গাড়িতে ছিলেন বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি এম এ আজিজ।

তিনি বলেন, আমরা একটি জিপ গাড়িতে বহররের সামনে ছিলাম। গোছরা বাজার অতিক্রমের পর দেখি ৩০ থেকে ৪০ জন যুবক লোহার রড ও লাঠি নিয়ে হামলা করতে আসছে। এসময় আমরা গাড়ি দ্রুত ঘুরিয়ে দলের মহাসচিবকে বহনকারী গাড়ির চালককে গাড়ি ঘুরানোর কথা বলি। কিন্তু ততক্ষণে হামলা শুরু হয়ে যায়।

দলের মহাসচিব গাড়ির সামনের সিটে ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, তারা দলের শীর্ষ নেতাদের দেখে গাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য, রুহুল আলম ও মাহবুবুর রহমান শামীম আহত হন। হামলাকারীরা বহরের অধিকাংশ গাড়িতে ভাংচুর চালিয়েছে বলেও জানান তিনি।

ঘটনার বর্ণনায় বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘পাহাড় ধসে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের নির্দেশে আমরা ঢাকা থেকে চার জনের একটি দল চট্টগ্রামে এসেছি। চট্টগ্রাম বিমান বন্দর থেকে আমরা রাঙামাটির উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। রাস্তায় জানতে পারলাম রাঙামাটির যে রাস্তায় ভাঙন  শুরু হয়েছিল সেটি  ভেঙে গেছে। ওই রাস্তা হয়ে রাঙামাটি যাওয়া সম্ভব নয়।

তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কাপ্তাই লেক হয়ে নদী পথে রাঙামাটি পৌঁছাবো। যে কারণে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কাপ্তাই যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। ইছাখালী বাজারে যেতে না যেতেই মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টি ঠেলে কিছুদূর যেতেই হঠাৎ ৩০-৪০ যুবক লাঠিসোটা, হকস্টিক, রামদা ও বড় বড় পাথর নিয়ে আমাদের গাড়িতে আক্রমণ করলো।

প্রথমেই তারা গাড়ি সামনের গ্লাসে পাথর ছুঁড়ে মারে। এরপর অনবরত তারা হকস্টিক, লাঠিসোটা দিয়ে ভাঙচুর চালায়। এতে আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রক্তাক্ত হয়েছেন, মেজর জেনারেল (অব) রহুল আলম চৌধুরী আহত হয়েছেন, আমি নিজেও আহত হয়েছি।’

এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম আহত হন। গাড়ি বহরে থাকা একজনের মাথা ফেটে গেছে।

রবিবার সকাল সোয়া এগারোটার দিকে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের জীবন হুমকির মুখে। আমার হাতের আঙুল ফেটে গেছে, মহাসচিব হাতে ব্যাথা পেয়েছেন। আমাদের গাড়ি পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি এই হামলার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের দায়ী করেছেন।

হামলার পর মির্জা ফখরুলের প্রতিক্রিয়া

পাহাড় ধসের দুর্গতদের দেখতে রাঙামাটি যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় হামলার শিকার হওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে রবিবার বেলা ১টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রক্তাক্ত হয়েছেন।  আমি আঘাত পেয়েছি, আরও কয়েকজন আঘাত পেয়েছেন। কে কতটুকু আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন তা বড় কথা নয়।

আসল কথা হচ্ছে এই আঘাত গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত। জাতীয়বাদী রাজনীতির প্রতি আঘাত, মুক্তবুদ্ধি ও সুস্থ চিন্তার প্রতি আঘাত। এ আঘাত যারা সরকারের খারাপ কাজের প্রতিবাদ করেন তাদের প্রতিও আঘাত। এই আক্রমণের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের চরিত্র আরও বেশি করে উম্মোচিত হয়েছে।’

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সবসময় দাবি করে তারা গণতন্ত্র বিশ্বাস করে। আসলে তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, ভিন্নমতেও তাদের বিশ্বাস নেই। সহনশীলতা বলতে তাদের কিছুই নেই। এভাবে আক্রমণ আমাদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো এবং অবিশ্বাস্য। আমাদের পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের ওপর যদি এ ধরনের হামলা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তো সেখানে জনসভা অথবা পার্টির মিটিং করতে যাচ্ছিলাম না। আমরা দুর্গত ও পাহাড় ধসে নিহতদের পরিবারকে পার্টির পক্ষ থেকে সমবেদনা জানাতে যাচ্ছিলাম। এই আক্রমণের একমাত্র প্রতিবাদ তখনই হবে যখন আমরা জনগনকে ঐক্যবদ্ধ করে এই ফ্যাসিস্ট, অপশক্তিকে পরাজিত করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবো।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকের এ সুনির্দিষ্ট আক্রমণ কোথা থেকে আসতে পারে আপনারা তদন্ত করে দেখবেন। আওয়ামী লীগের লোকেরা এটা করেছে। এটা কোথা থেকে আসতে পারে আপনারা সেটা ভালো করে বলতে পারবেন।’

সংবাদ সম্মেলনে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এটি একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। কোনও সভ্য দেশে এ ধরনের আক্রমণ হতে পারে না। আমাদের রাজনীতি করতে দেবেন, এখন ত্রাণও দিতে পারবো না।’

তিনি বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের ওপর যদি আক্রমণ হয় তাহলে আর বাকি থাকে কী? এর পরে কি আর রাজনীতি থাকে? রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতায় টিকে রয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন  দলের ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) রহুল আলম চৌধুরী, কেন্দ্রীয়  সাংগঠনিক সম্পাদক মাহববুর রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ নেতাকর্মীরা।

ওবায়দুল কাদেরের প্রতিক্রিয়া

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর হামলা অন্যায় বলে মন্তব করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

রবিবার রাজধানীতে বিমানবন্দর সড়কে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যে বা যারাই মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলা করুক না কেন, সেটা অন্যায়। আওয়ামী লীগ এটা খতিয়ে দেখছে, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। চট্টগ্রামের ডিসি-এডিশনাল এসপির সঙ্গে কথা বলেছি। কে বা কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

সেতুমন্ত্রীর অভিযোগ, বিএনপি তার কর্মসূচি সম্পর্কে পুলিশকে আগে থেকে জানায়নি। তিনি বলেন, ‘বিএনপি পুলিশকে সঠিক তথ্য দেয় না। তাদের রাউজান হয়ে যাওয়ার তথ্য ছিল পুলিশের কাছে। পরে তারা বামুনিয়া হয়ে গেছে। পুলিশের কাছে এ তথ্য ছিল না। তথ্য থাকলে পুলিশ ওখানেই পাহারার ব্যবস্থা করত।’

বিএনপির গাড়ি বহরে হামলার পর বিএনপির প্রতিনিধি দল রাঙামাটিতে না গিয়ে চট্টগ্রাম ফিরে যায়।রবিবার (১৮ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার শান্তিরহাট এলাকায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

তিনি রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে দুর্গতদের দেখতে যাচ্ছিলেন। এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম আহত হন। গাড়ি বহরে থাকা একজনের মাথা ফেটে গেছে।

ওবায়দুল কাদের জানান, ঘটনার পর পুলিশ এসে তাদেরকে ত্রাণ বিতরণে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু তারা সেটা করেনি।

ফখরুলের উপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরে হামলার প্রতিবাদে নয়া পল্টনে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল। রবিবার দুপুরে রাজধানীর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তাৎক্ষণিক এই বিক্ষোভ হয়।

বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভুইয়া জুয়েল, যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মোরতাজুল করিম বাদরুসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী।

নিন্দা ও প্রতিবাদ: এদিকে মির্জা ফখরুলের গাড়ি বহরে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, ছাত্রদল সভাপতি রাজীব আহসান, সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, বাংলাদেশ ন্যাপ ভাসানীর সভাপতি জেবেল রহমান গানি, মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভুইয়াসহ বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিকদল।

এদিকে মির্জা ফখরুলের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার দেশের সব জেলা সদরে এবং ঢাকা মহানগরীতে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

রোববার দুপুরে কুমিল্লা আদালতে একটি মামলার হাজিরা শেষে জেলা বিএনপির কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

পার্বত্য এলাকায় পর্যটন শিল্প বিকাশে বাধা সশস্ত্র গ্রুপ

অস্থির পাহাড় দিশেহারা মানুষ- (শেষ)

সাজেক১

আবু সালেহ আকন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে:

সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এখন পাহাড়ের বিষফোঁড়া। শুধু খুন, জখম, অপহরণ, গুম ও চাঁদাবাজির মধ্যেই তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ নেই। দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্যও তারা এখন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পর্যটকদের প্রশ্ন, এভাবে ঘুরে বেড়াতে কার ভালো লাগে? অপর দিকে এই এলাকায় যাতে পর্যটকরা না আসেন সে জন্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বছরজুড়ে চালানো হয় অপপ্রচার।

সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত মৈতে লুসাই বলেন,

পর্যটন ব্যবসায় এখন ভয়াবহ ধস নেমেছে। তিনি বলেন, এই সময়ে অতীতের বছরগুলোতে মাসে ৭০-৮০ হাজার টাকার ওপরে ব্যবসায় করতেন। এখন তা নেমে এসেছে ১০ হাজারে। পর্যটকরা কেউ আর এই এলাকায় রাত কাটান না। দিনে এসে দিনেই তারা চলে যান।


আরো দেখুন:
  1. আবারও বাঘাইছড়িতে মালভর্তি ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন

  2. রাঙামাটির সাজেকে মালভর্তি ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন

  3. সাজেকে পর্যটকবাহী মাইক্রোবাস আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা

  4. পণ্যবোঝাই ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন দেয়ার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন

  5. রাঙামাটির সাজেকে গাড়ি চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা

  6. পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাত অচল করতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে


সাজেকে গিয়ে দেখা যায়, এই এলাকায় সরকারি ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে বেসরকারি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প বিকাশে বেশ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বেশ কিছু কাঠের দোতলা বাড়ি উঠছে পর্যটকদের থাকার জন্য। স্থানীয় বাসিন্দারাই এই ঘরগুলো তৈরি করছেন।

দানিয়েল লুসাই বলেন,

এক সময় সারা বছর পর্যটকের এতটাই ভিড় লেগে থাকত যে মাঝেমধ্যে থাকার স্থান না পেয়ে তারা রাস্তার ওপর রাত কাটাতেন। স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতেও রুম ভাড়া করে পর্যটকরা অবস্থান করতেন। এখন আর সেই অবস্থা নেই। আস্তে আস্তে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ছে এই এলাকা।

bght

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে পর্যটকবাহী একটি গাড়ি পোড়ানো হয় সাজেকের রাস্তায়। এরপরই এ এলাকার পর্যটক শিল্পে অনেকটা স্থবিরতা নেমে আসে। ওই ঘটনার পর থেকে এখনো সাজেকে যারা যান তাদের পাহারা দিয়ে নেয়া হয়। যেসব পর্যটক সাজেকের উদ্দেশে যান তারা বাঘাইহাট সেনা চৌকি এলাকায় গিয়ে জড়ো হন। পরে তাদের সেখান থেকে সেনাবাহিনীর স্কর্ট দিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাজেকের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার বিকেলে সেনা পাহারায় তাদের শহরে ফিরতে হয়। যে কেউ ইচ্ছে করলেই এখন আর সাজেকে যেতে পারেন না, আবার সেখান থেকে ফিরেও আসতে পারেন না। নিরাপত্তা নিয়ে তাদের চলতে হয়। ৩৪ কিলোমিটারের এই দুর্গম পথটুকু পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সাজেকের পর্যটন অ্যাসোসিয়েশনের প্রশাসক সিয়াতা লুসাই বলেন,

পাহাড়ে পর্যটন শিল্প বিকাশ রোধ করতে চাচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। তারা চায় না এই এলাকায় কোনো পর্যটক আসুক। তাতে তাদের অসুবিধা হয়। যত বেশি লোকসমাগম হবে ততই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। এ আশঙ্কায় তারা চাচ্ছে না পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটুক।

সিয়াতা লুসাই বলেন,

এলাকার পর্যটন শিল্প বিকাশে সেনাবাহিনী অনেক কাজ করেছে। সুন্দর রাস্তাঘাট করে দিয়েছে। পানির ব্যবস্থা করেছে। চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করেছে। মসজিদ-উপাসনালয় গড়ে তুলেছে। এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছে। আর এই শিল্পের কারণে এখন এই এলাকার মানুষ দুই বেলা খেয়ে-পড়ে ভালো আছেন। আগে তারা পাহাড়ে জুম চাষ করতেন, গাছ কাটতেন, শিকার করতেন। তাতে দিন চলত না। না খেয়ে থাকতে হতো। পর্যটন শিল্পের বিকাশের পরই তারা কিছু উপার্জন করছেন। পর্যটকদের সেবা দিয়ে তাদের ভালোই উপার্জন হয়। এতে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের সমস্যা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন বলেন, দুর্বৃত্তরা এখনো চাঁদা দাবি করে। প্রতিটি কটেজের মালিকের কাছে সন্ত্রাসীরা এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে।

সিয়েতা লুসাই বলেন,

এক সময় সাজেকে দিনে গড়ে ৩০০ পর্যটকবাহী গাড়ি আসত। এখন আসে ২০-২৫টা। রুইলুই জুনিয়র হাইস্কুলের শিক্ষক বোবিন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি জনপদে পর্যটন শিল্পের যত বিকাশ ঘটবে ততই এলাকা উন্নত হবে। তিনি বলেন, রুইলুই এলাকায় পর্যটন শিল্পকেন্দ্রিক অনেক কিছ্ইু গড়ে উঠছে। তিনি যে স্কুলে চাকরি করেন সেখানে এখন ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ৮৫। অথচ এখানে এক সময় কোনো স্কুল ছিল না। পর্যটন শিল্প বিকাশের সাথে সাথে এখানে আরো অনেক কিছুই গড়ে উঠেছে।

নীলাচলে গিয়ে দেখা যায় সেখানেও পর্যটকদের তেমন ভিড় নেই। দু-একজন যারা এসেছেন তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পর্যটকরা এসে সব এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে না। এখানে রয়েছে অপহরণ আতঙ্ক। অনেকেই অপহরণের শিকার হয়েছেন ইতঃপূর্বে। কেউ কেউ মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। ফলে যারা এখানে ঘুরতে আসেন তারাও কেবল শহর ও লোকালয়কেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি করেন।

এ দিকে পাহাড়ে যাতে পর্যটকরা না যান সে কারণে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নানা অপপ্রচারও চালানো হয়। এমনকি কোনো কোনো দর্শনীয় স্থান বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যেমন স্বর্ণমন্দির গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে শিগগিরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। পর্যটকরা যাতে এই এলাকায় এসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন-পাহাড়ে বাঘের অস্তিত্ব

হোসাইন সোহেল

হাসান সোহেল

বান্দরবানের থানচি উপজেলা থেকে শঙ্খ নদীর কূল ধরে হেঁটে চলেছি আরো উঁচু পাহাড়ে। তিন দিন পর দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে দেখা মিলল ছোটমদক নামক জায়গাটির। এর আগে পুনর্বাসনপাড়াসহ রেমাক্রির আরো দুটি পাড়ায় কেটেছে দুই রাত। সারা দিন হেঁটে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, তখন তৃতীয় রাত। ছোটমদক থেকে আরো প্রায় দেড় হাজার ফুট ওপরে রেমাক্রি ইউনিয়নের সবচেয়ে উঁচু রুংশোলাপাড়াতে তৃতীয় রাতের আশ্রয় মিলল। সে রাতেই জানতে পারি, মাত্র তিন বছর আগে পাহাড়ের জঙ্গলে বাঘ শিকারের গল্পটি।

পঁয়ত্রিশ বছরের শক্ত-সমর্থ যুবক আলেকজেন্ডার ত্রিপুরার সঙ্গে কথা হলো রুংশোলাপাড়ার একটি টংঘরে। মিষ্টি হাসির মানুষটি দেখে বোঝার উপায় নেই, সে একজন বাঘশিকারি। সচরাচর শিকারিদের চেহারায় একটু ভাবগাম্ভীর্য থাকলেও সে ব্যতিক্রম।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ডকৃত সর্বশেষ পাহাড়ি বাঘটি ধরাশায়ী হয়েছে আলেকজেন্ডারের হাতে। তবে পাহাড়ে শুধু বাঘ নয়, অনেক প্রাণীই তিনি শিকার করেছেন পাড়াবাসীর খাদ্যের জন্য। রুংশোলাপাড়া থেকে পূর্ণিয়মপাড়া বেশি দূরে নয়। পাহাড়ের ঢালে জুম কাটতে (ধান চাষের আগে পাহাড়ের জঙ্গল কাটা বলে) আলেকজেন্ডার সঙ্গে নিয়েছিল তার শিকারি দুটি কুকুর (ত্রিপুরা ভাষায় কুকুরকে বলে সই)।

অন্যমিডিয়া

এক বিকেলে আলেকজেন্ডার বসেছিল জুমঘরে (বিশ্রামের অস্থায়ী ঘর)। হঠাৎই সে তার কুকুরের মৃত্যুচিৎকার শুনতে পায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় কুকুরটিরও একই অবস্থা। এমন অবস্থায় তার শিকারি মন বুঝতে পারে, একটি বড় বাঘের মাথা জঙ্গলের আড়ালে রয়েছে।

আলেকজেন্ডার সময় নষ্ট করেনি। নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত রাইফেলের একটি গুলি যথেষ্ট ছিল বাঘটিকে ধরাশায়ী করতে। উভয়ের দূরত্ব কম থাকায় বাঘটি পালানোর সুযোগ পায়নি। অবশেষে কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করে সে নিশ্চিত হয়, বাঘটি নড়াচড়া করছে না। আলেকজেন্ডার তার দুটি কুকুর হত্যার প্রতিশোধসহ রুংশোলাপাড়ার ৩৮টি পরিবারের সদস্যদের মুখে মাংস তুলে দিতে পারবে বলে আরো উচ্ছ্বসিত হলো। কিন্তু বিপদ হলো, সে তো একা বাঘটি বহন করে নিয়ে যেতে পারবে না। তাই পাড়াতে ফিরে কয়েকজন যুবকের সহযোগিতায় মৃত বাঘটি চলে এলো রুংশোলাপাড়ায়।

এমন গোছানো গল্প আমাকে ভাবিয়ে তোলে। তারপরও শুনতে চাই পরের ঘটনা। ছোটমোদকের রুংশোলাপাড়া শুধু নয়, বড় জীবজন্তুর শিকারের ঘটনা আশপাশের পাড়াতেও নাড়া দেয়। পাড়াতে যখন মৃত বাঘ এলো, তখন পাড়াবাসী সবাই এসে হাজির সন্ধ্যার আঁধারে কুপিবাতি হাতে।

আলেকজেন্ডার ত্রিপুরা আগেও একটি বাঘ শিকার করেছিল। ২০০৮ সালে, অর্থাৎ সাত বছর আগে হাড় ছাড়া ৫৭ কেজি ওজনের বাঘটির চামড়াও পুড়ে খেয়েছিল পাড়াবাসী। তবে এবার চামড়া পুড়িয়ে খেতে রাজি নয় কেউ। সাত ফুট লম্বা চামড়াটি পাড়াবাসী সংরক্ষণ করতে চায় শিকারের স্মৃতি হিসেবে। পূর্ণিয়মপাড়ায় মাঝারি আকারের বাঘটির চামড়া ও হাড় বাদে মাংস পেয়েছে কমপক্ষে ৩৫ কেজি।  মাংস বা হাড় খাওয়া শেষে কাটাছাঁটাহীন চামড়া রোদে শুকিয়ে নতুন একটি বাঘ (স্টাফড) তৈরি করে আলেকজেন্ডার। চামড়ার ভেতর জুম ধানের খড়কুটো ঢুকিয়ে দাঁড় করানো বাঘটি সাজিয়ে রাখে নিজ ঘরে। মাসখানেক না যেতে একদিন মিয়ানমারের চার সদস্যের একটি দল এসে হাজির তার বাড়িতে। তারা বাঘটির চামড়া, দাঁত, নখ সব কিনে নিতে চায়।

দুর্গম পাহাড়ের মানুষগুলো একেবারে দরিদ্র। তাদের কাছে একশ টাকা মহামূল্যবান। সে সুযোগে আলেকজেন্ডারের হাতে দেওয়া হলো তিন হাজার ৫০০ টাকা। বিনিময়ে বাঘের সাত ফুট লম্বা সেই চামড়া, দাঁত ও নখ চলে যায় মিয়ানমারের দলটির দখলে।

এমন গল্পের যখন শেষ, তখনো কোনো বস্তুগত প্রমাণ আমার হাতে আসেনি। এর পরও রাতের আঁধারে পাড়াপ্রধান রুংশোলা কারবারি বীরেন্দ্র ত্রিপুরাসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে তার এই বক্তব্য অবশ্য বাস্তবতার একেবারে কাছাকাছি।

পরদিন সকাল ৭টা। ঘুম থেকে উঠে নজরে আসে টংঘরের বাঁশের দেয়াল। গত রাতে কুপিবাতির আলোয় যে ঘরে শুনেছি বাঘ শিকারের গল্প, সে ঘরের দেয়ালে সাটানো রয়েছে শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমের জীবজন্তুর ছবি আঁকা একটি পোস্টার। তার মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের বেঙ্গল টাইগারের আঁকা ছবিসহ অন্যান্য বিড়াল প্রজাতির ছবিও।

আলেকজেন্ডারকে সর্বশেষ জিজ্ঞাসা, এই ছবির বাঘটি তার শিকারের বাঘ কি না। যার গায়ে রয়েছে ডোরাকাটা কালো দাগ, রয়েছে সারা শরীরে সাদা-কমলা রং মেশানো। তার সব উত্তর হ্যাঁ হলো। মনের মধ্যে খচখচানো থাকলেও এবার বিশ্বাসের নিশ্বাস এসে থেমে দাঁড়ায়। সত্যিকারের বাঘটি ছিল বেঙ্গল টাইগার ইংরেজদের ভাষায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার!

গত রাত থেকে অনর্গল বলে যাওয়া গল্প যেন বিশ্বাস করতে চাইছি না। এর পর আবারো পোস্টারে বাঘটির চিত্র দেখিয়ে সত্যতা জানতে চাওয়াতে আলেকজেন্ডার বোধ করি একটু মন খারাপ করল। শত হলেও সে শিকারি।

শিকারিদের জেদ বোধ করি একটু বেশি। এবার সে দেরি না করে তার ছোট ছেলের গলা থেকে খুলে নিয়ে আসা দাঁতটিও আমার চোখের সামনে তুলে ধরল। শুধু দাঁত নয়, পেশাগত জায়গা থেকে আলেকজেন্ডারের বাঘ শিকারের গল্পটি ভিডিও ক্যামেরাতে ধারণ করলাম।

এভাবে আরো সাত দিন চলে পাহাড় পরিক্রমা। এর পর বান্দরবান থেকে ঢাকা এসে পাহাড়ের বাঘ নিয়ে গবেষণারত সুপ্রিয় চাকমাকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোস্তফা ফিরোজ, প্রাণীবিদ ড. আনিসুজ্জামান খানসহ আরো কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে পুরো বিষয়টি জানালাম। কারণ, আমার সংশয় বা জানার সংকট কিংবা পরিবেশ সাংবাদিকতার কোনো ভুল বিষয়বস্তু কাউকে জানাতে চাই না।

ফিরে আসার পর আমার সন্দেহ দূর করতে উপরে উল্লিখিত বাঘের মাংস পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলাম। উত্তরও পেলাম বাংলার বাঘ বা চিতা ছাড়া বিড়াল প্রজাতির অন্য কারো দেহে হাড় ছাড়া এত মাংস হওয়ার কথা নয়। সে অনুযায়ী বাঘের আকারটি হতে পারে মাঝারি আকারের।

যাই হোক, প্রাণীবিদদের বক্তব্য স্পষ্ট, বাংলার বাঘ শুধু সুন্দরবন নয়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় এখনো রয়েছে। পাহাড় বা সুন্দরবন বলে কথা নয়, দুটো একই বাঘ। তবে তাদের আবাসস্থল ভিন্ন। পাহাড়ে অনেক আগে থেকে বাঘ তো ছিলই, সে সঙ্গে ছিল ঘন অরণ্য। মিয়ানমার বা বাংলাদেশে যেটাই হোক, এই বাঘগুলোর যাতায়াত উন্মুক্ত ছিল। তবে বাঘ শিকার, ঘন জঙ্গল কেটে ফেলা, খাদ্যসংকটসহ বসবাসের উপযোগিতা কম, তাই পাহাড়ে বাঘের পরিমাণও কম।

বাঘ বিলুপ্তির প্রথম কারণ, শিকার আর দ্বিতীয় বড় কারণ হলো খাদ্যসংকট। একটি পূর্ণাঙ্গ বাঘের বছরে ৫০টি বড় হরিণের (সাম্বার) সমান খাবার দরকার হয়। যার মাংসের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার কেজি। কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়ে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে প্রতিটি বাঘের জন্য তাই ৫০০টি বড় জন্তু বা বড় হরিণের দরকার হয়।

আলেকজেন্ডারের বাঘ শিকার নতুন বিষয় নয়, এর আগেও বাংলাদেশের পাহাড়ে শিকার হয়েছে অনেক বেঙ্গল টাইগার। তবে ২০০৮ সালসহ আলেকজেন্ডারের তিন বছর আগে, অর্থাৎ ২০১২ সালের বাঘ শিকারটি ছিল এ সময়ের সর্বশেষ বাঘ শিকার। এর পর তিন বছরের মধ্যে পাহাড়ে এখন পর্যন্ত আর কোনো বাঘ শিকারের ঘটনা শোনা যায়নি। এর আগে ২০০৩ সালে কাসালং সংরক্ষতি বনে দুটি ও ২০০৬ সালে রেমাক্রি খালে একটি বাঘ হত্যার রেকর্ড নথিভুক্ত ছিল। অন্যদিকে ২০০৯ সালে রাইংখং সংরক্ষিত বনে একটি জীবন্ত বাঘের দেখা মিলেছিল। আর তাই বলা যায়, পাহাড়ে বাঘ একেবারে হারিয়ে যায়নি।

পাহাড়ের শুধু বাঘ শিকার নয়, অসংখ্য জীবজন্তুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যুগ যুগ ধরে বেচাকেনা হয়েছে সীমান্তের এপার-ওপার। মিয়ানমারের চার সদস্যের যে দলটি আলেকজেন্ডারের বাঘের চামড়াটি নিয়ে গেছে, তার বাজারমূল্য অনেক চড়া। অথচ আলেকজেন্ডারের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকায়। আর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বাঘের পায়ের নখ ও দাঁত। যার বাজারমূল্য অনেক।

বাংলাদেশ বন বিভাগের পাহাড়ের বনজ বা প্রাণিজ সম্পদের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, তাদের পরিকল্পনা নেই। পাহাড়ে গভীরে নেই কোনো সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি। বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের সব তহবিল তাই ঢেলে দিতে চায় সমতলভূমিতে। অথচ পাহাড়ের মানুষকে সচেতন করতে পারলে দিন শেষে তারাই অনেক বেশি সহনশীল সংরক্ষণবাদীতে পরিণত হতে পারতেন।

লেখক : পরিবেশ ও বন্য প্রাণীবিষয়ক সাংবাদিক।

সূত্র: এনটিভিবিডি

নাইক্ষ্যংছড়িতে অবৈধ ইটভাটা সাবাড় করে চলছে পাহাড় ও বন

01

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসনের অনুমোদন, জনবসতি এলাকার বাইরে সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কয়লা পুড়িয়ে ইটভাটায় ইট তৈরির নিয়ম থাকলেও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুমে প্রায় পাচঁ একর জায়গা জুড়ে ‘এ-বি’ নামে একটি ইটভাটায় ইট তৈরি হচ্ছে ভিন্নভাবে। ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি থেকে প্রায় দুই কি. মি. দূরে বৃহত্তর রেজু ফাত্রাঝিরি ৮নং ওয়ার্ডে সংরক্ষিত বনায়ন এলাকার কাছাকাছি মাটি কেটে সেখানে তৈরি করা হয় কাঁচা ইট এবং তা পাকা করা হয় ওই বনেরই গাছ পুড়িয়ে। এ রকম অনিয়ম সত্ত্বেও ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই ইটভাটায় এখনো যাননি। ইটভাটাটির মালিক কক্সবাজারের উখিয়ার নুরুল হক কোম্পানি বলে জানা গেছে।

উখিয়া শরণার্থী ক্যাম্পের সামনের সড়ক দিয়ে ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ি থেকে দুই কি. মি. এগোলেই রাস্তার পূর্ব পার্শে বনের ভিতর নজরে আসে ‘এ-বি’ ইট ভাটার কাচা চারটি ড্রাম চুল্লি। পাশের ওই সবুজ বনের বুকে আছড়ে পড়েছে ইটভাটার কালো ধোঁয়া। বনাঞ্চল লাগোয়া ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু মগপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিকটে গত দুই বছর স্থাপন করা হয়েছে ভাটাটি।

স্থানীয় লোকজন জানায়, ভাটার চতুর পাশে বনায়ন, জনবসতী গ্রাম ও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই দিব্যি ইটভাটা চলছে। গত বছরও এই ইটভাটার সব কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয় বন থেকে। চলতি মৌসুমে ৩০ লাখ ইট তৈরির টার্গেটে নেমেছে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ। কাঁচা ইট তৈরির মাটি নেওয়া হচ্ছে ইটভাটা লাগোয়া বিশাল আকৃতির পাহাড় থেকেই। স্থানীয় রেজু বনবিট কর্মকর্তার যোগসাজোসে ইট পোড়ানোর জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা চলছে আশপাশের বনে। তবে ইটভাটা দেখার দায়িত্ব বন বিভাগের নয় বলে বিষয়টি উড়িয়ে দেন রেজু বিট কর্মকর্তা মো. ছৈয়দ আলম। সে কারনে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধে নবাগত জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ।

স্থানীয় ইউপি সদস্য বাবু কান্তি চাকমা জানান, বিভিন্ন ভাবে পরিবেশ ধ্বংসের কারনে এলাকার জনসাধারণ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু এখনো এলাকায় বহাল তবিয়তে পাহাড়ী পাথর উত্তোলন ও ইটভাটার কার্যক্রম চলছে।

সরেজমিনে ইটভাটায় নিয়োজিত মাটি কাটা একাধিক শ্রমিক জানান, মালিকের নির্দেশে প্রতিদিন বনের পাশের পাহাড় থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার করছেন তারা। বনের গাছ কেটে ইটভাটায় পোড়ানোর জন্য রয়েছে আরেকটি দল। জানতে চাইলে ভাটার ম্যানেজার আমান উল্লাহ মুঠোফোনে এ প্রতিবেদক কে বলেন, সবার সাথে সু-সম্পর্ক রেখে ভাটার কার্যক্রম চলছে। সাংবাদিক ছাড়াও ভাটায় অনেকে আসেন, তাই এ প্রতিবেদককে তাঁর মালিকের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানান তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে ইট ভাটার মালিক নুরুল হক কোম্পানীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়া মাত্রই তিনি ‘কি করতে হবে’ প্রশ্ন করেন। এ প্রতিবেদকের পাল্টা প্রশ্নে তিনি জ্বালনী হিসেবে বনের কাঠ, মাটি ব্যবহারের কথা স্বীকার করেন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে কাটা ড্রাম চুল্লি দিয়ে ইট ভাটার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন।

ইটভাটার মালিক পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করলেও কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, শুধু এবি ইটভাটা নয়, ঘুমধুমের কোন ইটভাটার জন্যই ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। ওই ইটভাটায় গত বছরও অভিযান চালানো হয়। এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনাক্রমে এবারও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু শাফায়েত মো. শাহেদুল ইসলাম বলেন, এসব অবৈধ ইট ভাটার বিষয়ে তিনি অবগত রয়েছেন এবং অভিযান চালাতেও প্রস্তুত। তবে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের তদবিরে ও হুমকিতে কিছুই করতে পারছেন না বলে জানান।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ঘুমধুমে কোন ইট ভাটার বৈধ কাগজপত্র নেই। তাদের কার্যক্রমের বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে কখনো তাঁকেও অবহিত করা হয়নি।

নাইক্ষ্যংছড়ি বন কর্মকর্তা আবদুস সবুর ভুইয়া বলেন, ইট ভাটায় জ¦ালানী মজুদ বা পোড়ানোর বিষয়ে ‘আমি এ সম্পর্কে অবগত না, আমাকে কেউ জানায়নি। এখন জানলাম, খোঁজ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবহিত করা হবে বলে জানান।

উল্লেখ্য, অবৈধ ইটভাটার মালিকরা মৌসুমের শুরুতেই মুনাফা লাভের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোক দেখানো অভিযান চালানো হলেও পাহাড় কর্তন ও জ্বালানী ব্যবহারের জন্য দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় প্রতি বছর ইটভাটায় অবৈধ কার্যক্রম বাড়ছে বলে মনে করেন পরিবেশবাদী মহল। এজন্য মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি পর্যালোচনা করে এসব অবৈধ ইট ভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন তারা।

দূর্গম সাজেক ভ্যালিতে ‘রুম্ময়’ ও থ্রি স্টার হোটেল হাতছানি দিয়ে ডাকছে রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের

সাজেক রিসোর্টে

মো: সানাউল্যাহ , সাজেক থেকে ফিরে:

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে উঠতে উঠতে হঠাৎই ঢালের শুরু। জিপ কিংবা মোটরবাইকে চড়ে সাজেকে পৌঁছাতে পথে পড়বে বুকে হিম ধরানো উঁচু-নিচু সড়ক। ক্ষণে ক্ষণে মনে হতেই পারে রোলার কোস্টারে চড়ছেন। তবু চার পাশের সবুজ পাহাড় ডিঙিয়ে রুইলুই উপত্যকায় (ভ্যালি) পৌঁছে মনে হবে স্বর্গে আসার জন্য এটুকু ঝক্কিতো পোহানো যেতেই পারে।

সাজেক ভ্যালিতে উঠেই আকাশপানে তাকালে মনে হয় কালো মেঘগুলোকে যেন সরিয়ে দিয়ে সাদা মেঘের আনা গোনা শুরু হয়। এমন সাদা মেঘ আকাশে এসে জমে, মনে হয় শিমুল তুলার খন্ড আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে। পায়ের নিচে মেঘের দল। মাথার উপরেও মেঘ। মেঘের এ দৃশ্য সবার মনকে উতাল উদাস করে তোলে, মনের গভীরে সুখময় আনন্দের কোমল পরশ ছুঁয়ে যায়। সমতল থেকে তিন হাজার ফুট ওপরে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের রুইলুই ভ্যালি।

এখানে দাঁড়ালে নিচে ভাসমান মেঘ দেখা যাবে। কখনো মেঘ এসে ভিজিয়ে দেবে শরীর। প্রাকৃতিক
সৌন্দর্যের টানে বহু পর্যটক এখন সাজেক আসছেন। প্রকৃতির সাথে মিতালি করতে এসে পর্যটকরা যাতে আরো স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাতে পারে তার জন্য সেনাবাহিনী গত কয়েক বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে গত বছরের নভেম্বর মাসে সেনাবাহিনী পর্যটনের নানা অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করে। সুদৃশ্য সড়ক, কটেজ, বিশ্রামাগার, সড়কবাতি, ক্লাবঘর, শিব মন্দির, পাবলিক টয়লেট, বিদেশি ঘরের স্টাইলে তৈরি রিসোর্ট “রুম্ময়”ও থ্রি স্টার মানের হোটেলও এ পাহাড়ে তৈরি করা হয়েছে।

আগে পর্যটকরা দিনে এসে রাতযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় আবার দিনেই ফিরে যেতে হতো। এখন পরিবার নিয়েও রাতযাপন করা যাবে। নতুন বিবাহিত দম্পতিরা তাদের হানিমুনের জন্য পাহাড়ের ওপর এই স্থানটিও পছন্দ করতে পারেন। লুসাই ও পাংখোয়া উপজাতিদের বাস এখানে। রুইলুই এলাকার বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেনাবাহিনীর উদ্যোগে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর পাল্টে গেছে রুইলুই ভ্যালির চেহারা।
এলাকাবাসীদের শিক্ষার উন্নয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য উন্নতমানের ট্যাংক তৈরি করা হয়েছে। ফুটপাথে টাইলস বিছানো হয়েছে। ফুটপাথে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে সড়ক বাতি নির্মাণ করা হয়েছে। এলাকার অধিবাসীরা তাদের ধর্মীয় চর্চা করার জন্য সেনাবাহিনী বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দিয়েছেন। সংস্কৃতি চর্চার জন্য ক্লাবঘরও তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতির সাথে মিল
রেখে এলাকাবাসীদের ঘর তৈরি করা হয়েছে। যারা আগে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো। এখন তারা ঐ এলাকায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পাচ্ছে। এজন্য সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন।

খাগড়াছড়ি থেকে দিঘিনালা, কাচালং হয়ে সড়ক পথে তিন থেকে চার ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় সাজেকের রুইলুই ভ্যালিতে। অপর দিকে রাঙামাটি থেকে প্রথমে নৌযানে কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দিয়ে ছয়-সাত ঘন্টায় বাঘাইছড়ি, সেখান থেকে দেড় থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে পৌঁছানো যায় রুইলুইয়ে। উপত্যকার প্রথম পাড়া রুইলুইয়ে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড় সারি ও সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্য উপভোগ করা যাবে। পথে যেতে রিজার্ভ ফরেস্টের গভীর ঘনবন, সুউচ্চ পাহাড়ী বৃক্ষ আপনার মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেবে। এরপর লুসাই জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত কংলাকপাড়া পর্যন্ত যাওয়া যাবে। হেঁটে যেতে সময় লাগবে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। পথে পড়বে বিজিবি ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্প, হ্যালিপ্যাড, ঘন বনে আচ্ছাদিত নির্জন পাহাড়, কমলালেবু বাগান। উপত্যকা জুড়ে কংলাকের পর আরও বহু পাহাড়ি পাড়া পর্যন্ত হেঁটে যেতে সময় লাগবে দেড় থেকে দুইদিন। তবে দুর্গম হওয়ায় এখনো পর্যটকেরা সে পথে খুব একটা পা মাড়ান না। পাঙ্খো ও লুসাই উপজাতির প্রাকৃতিক জীবনপ্রণালী ও সৌন্দর্যবোধ, সংস্কৃতি মুহুর্তেই মুগ্ধ  করবে যেকোনো পর্যটককে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, রুইলুই ভ্যালিতে পর্যটকদের ভিড়। রুইলুই পাড়া থেকে কংলাক পাড়া পর্যন্ত দল বেঁধে ঘুরছিলেন অনেকে।

কথা হয় ঢাকা থেকে আসা মোঃ আমজাদের সাথে। তিনি বলেন, আমরা ৩০ বন্ধু মিলে সাজেকের উইন্ড মিলসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসেছি। এতো সুন্দর জায়গা বাংলাদেশের আর কোথাও দেখিনি। ভবিষ্যতে সময়-সুযোগ মিললেই আবার ছুটে আসব এখানে।

খাগড়াছড়ি সদর থেকে প্রতিদিন ছেড়ে যাওয়া শান্তি পরিবহনে সাজেকের মাচালং পর্যন্ত যাওয়া যাবে। সেখান থেকে জিপ, মোটর সাইকেল, সিএনজি ভাড়া করে সাজেক ভ্যালিতে যাওয়া যাবে। রুইলুই মৌজার হেডম্যান লাল থাঙ্গা লুসাই বলেন, সাজেকের সৌন্দর্যের টানে দেশের নানা স্থান থেকে প্রতিদিনই পর্যটকেরা আসছেন। রুইলুই ভ্যালিতে প্রতি দিন শত শত পর্যটক আসছেন। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের পর আসার হার বাড়ছে।
তবে সকল অবকাঠামো নির্মাণ সমাপ্ত হলে পর্যটকদের পদচারণা আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।

মারিশ্যা জোন কমান্ডার লে.কর্নেল মো: রবিউল ইসলাম বলেন, সাজেকের রুইলুই ভ্যালিতে এখন বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসা শুরু করেছেন। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে এখানে ‘রুম্ময়’ নামে একটি মনোমুগ্ধকর রিসোর্ট ও থ্রি স্টার মানের একটি হোটেল নির্মাণ করা হয়েছে।

নির্মিত রিসোর্ট ও হোটেল দু’টি আগামী ৪ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান সাজেক সফরকালে উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। তবে তারিখটি এখন চুড়ান্ত হয়নি। সেই সাথে হোটেলের রুম ভাড়া, বুকিং সিস্টেম এখনো চুড়ান্ত করা হয়নি।

বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

mehadi Hassan palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ
 

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া উত্তাপ ও উত্তেজনার কালো মেঘ এখনো কাটেনি। বরং তা আরো বিস্তৃত হয়ে রাজধানী তথা সারাদেশ এমনকি আন্তর্জাতিক আকাশেও ছায়া ফেলেছে।

 
গত ২-৫ জুলাই সিএইচটি কমিশনের এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। কমিশনকে বিতর্কিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠন আখ্যা দিয়ে এই সফরকালে ঘিরে ৬ বাঙালি সংগঠন তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ডাকে। অবরোধের মধ্যেই সফর অব্যাহত রেখে ২ জুলাই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের টিম খাগড়াছড়ি গমন করে। খাগড়াছড়িতে রাত্রি যাপনের পর ৩ জুলাই প্রবল উত্তেজনা ও প্রশাসনের ডাকা ১৪৪ ধারা জারির মধ্যেই দিঘীনালায় বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা স্থানীয় স্কুলে আশ্রয় নেয়া ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিদার ২১ পরিবারের সাথে কথা বলেন। এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়িদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।
 
এরপর স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেন। এসময় বাবুছড়া বিজিবি জোন কর্মকর্তারা তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩-৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে বিজিবিকে অধিগ্রহণকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য বিজিবি স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করে। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকেলে একদল মহিলা বিজিবির হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদের বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেঁধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাঙচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালোই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না। এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ি মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। 
 
এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারি রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়িদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারির কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে, বনবিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। কমিশনের সদস্যরা খাগড়াছড়ি অবস্থানকালে দফায় দফায় পাহাড়ি নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্নস্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করতে থাকেন। কমিশনের এরূপ একতরফা আচরণ ও পক্ষপাতদুষ্ট বক্তব্যের কারণে স্থানীয় বাঙালি নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত ও উত্তেজিত হয়ে আধঘণ্টার মধ্যে কমিশনকে খাগড়াছড়ি ছাড়ার আল্টিমেটাম দেন। অবশেষে আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই কমিশন তার পূর্বনির্ধারিত রাঙামাটি সফর বাতিল করে পুলিশ প্রহরায় খাগড়াছড়ি ত্যাগ করে। অবশ্য শহর ত্যাগের পথে বাঙালিরা কমিশনের গাড়িতে বৃষ্টির মতো জুতা নিক্ষেপ করে ঘৃণার প্রকাশ ঘটায়।
 
এদিকে কমিশনের রাঙামাটি কর্মসূচি পরিত্যাগের ঘোষণা জানতে পেরে রাঙামাটির বাঙালি সংগঠনগুলো তাদের অবরোধ তুলে নেয়। এখবর জানতে পেরে কমিশন গোপনে রাঙামাটি প্রবেশ করে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। এতে করে রাঙামাটির বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারাও কমিশনকে বাঙালি বিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে রাঙামাটি ত্যাগের জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করে শহরে নতুন করে অবরোধ আরোপ করে। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওযার আশঙ্কা করে স্থানীয় প্রশাসন কমিশন সদস্যদের রাঙামাটি ত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করলে তারা রাজি হন। দুপুরে পুলিশ প্রহরায় তারা রাঙামাটি ত্যাগ করার পথে বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা পাহাড়ের উপর থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অতর্কিত এ হামলায় পুলিশ ও কমিশন সদস্যরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। স্থানীয় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৪ কমিশন সদস্য এ ঘটনায় আহত হয়। তাদের বহনকারী গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কমিশনের সদস্যরা প্রশাসনের দেয়া গাড়িতে করে নিরাপত্তা প্রহরায় রাঙামাটি ত্যাগ করেন। এরপর কমিশনের তরফে চট্টগ্রাম শহরে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করা হয় শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য রাঙামাটির অভিজ্ঞতা থেকে তারা তাদের বান্দরবান সফরসূচি ত্যাগ করে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর কমিশন সমর্থিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ এবং গণমাধ্যমে শুরু হয় একতরফা প্রচারণা।
 
বিবাদের কারণ 
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১২৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা অংশে রয়েছে ৪৭ কিলোমিটার। এই সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে বিজিবির কোনো নজরদারি না থাকায় দুই দেশের সন্ত্রাসী, পাচারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীরা অপরাধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। গহীন পাহাড় ও বন সমৃদ্ধ অত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় দূর থেকে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক রক্ষা, সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ অঞ্চলে নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকেই। বিজিবির ভারতীয় কাউন্টারপার্ট বিএসএফের তরফ থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। সে কারণে নয়টি নতুন সীমান্ত পর্যবেক্ষণ চৌকি (বিওপি) করতে যাচ্ছে বিজিবি- যারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতায় কাজ করবেন। বিজিবি সূত্র মতে, সীমান্তবর্তী নাড়াইছড়ি, টেক্কাছড়া, শিলছড়ি, উত্তর শিলছড়ি, লালতারান, দিপুছড়ি, লক্কাছড়া, উত্তর লক্কাছড়া, ধূপশীল ও আড়ানীছড়া এলাকায় সীমান্ত নিরাপত্তা চৌকিগুলো বসানো হবে। দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষায় ১৯৯৫ সালে ব্যাটালিয়ন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ১৮ মে ৫১, বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন- বিজিবি গঠন করা হয়।
 
মূলত ৫টি কারণে এই নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথমত : দীঘিনালা অংশের এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত। একটি রাষ্ট্রের সীমানা কখনো অরক্ষিত থাকতে পারে না। তাই এই সীমান্তের সুরক্ষা প্রদানে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি, দ্বিতীয়ত : এই ৪৭ কিমি. সীমান্ত অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত অপরাধীরা এই সীমান্ত দিয়ে তাদের নির্ভয়ে তাদের অপরাধ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। অস্ত্র, মানব, মাদক পাচারসহ সব ধরনের পাচারকাজ এবং অবৈধ যেকোনো ধরনের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ এ ব্যাটালিয়নের কাজ। তৃতীয়ত : উত্তরপূর্ব ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই তাদের নানাবিধ অপরাধ কাজে এই মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে থাকে। ফলে বিএসএফের তরফ থেকে তা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েনের অনুরোধ আসতে থাকে। বাংলাদেশ অন্যদেশের অপরাধীদের নিজ সীমান্তে প্রশ্রয় না দিতে বদ্ধ পরিকর। চতুর্থত : বাংলাদেশের বিভিন্ন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এই দুর্গম সীমান্তে তাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, আশ্রয়স্থল ও ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। তারা অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে এই অঞ্চলে আশ্রয়গ্রহণ করে থাকে। পঞ্চমত : দুর্গম এই সীমান্ত মূল্যবান বনজ ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই সম্পদের সুরক্ষা প্রদান এবং ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে এখানে কোনো বাঙালি বসতি নেই। কিন্তু নিরীহ পাহাড়ি জনগণের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া চাঁদাবাজিসহ নানাপ্রকার নির্যাতন চালায় তা বন্ধ করতে এই ব্যাটালিয়ন স্থাপন জরুরি।
 
এদিকে সরকার যখন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের মাধ্যমে ৪৭ কিমি. অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ চোরাচালান প্রতিরোধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের মদদে বাবুছড়ায় বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন-বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের বিরোধিতাসহ বিজিবির নির্মাণাধীন সদর দপ্তরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা দেশের অখ-তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন পাহাড়ের রাজনীতি সচেতন মহল। নতুন বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন হলে জনগণের সুবিধা হলেও অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের অসুবিধা হবে। তাই স্থানীয়ভাবে যারা এই ক্যাম্প স্থাপনের বিরোধিতা করছে তারা ঐ সকল অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক এবং প্রশ্রয়দাতা। সিএইচটি কমিশন তাদেরই অন্যতম।
 
ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা
সাজেকের সাম্প্রতিক বিদ্রোহের পেছনে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের ভূমিকা রয়েছে বলে বাঙালিদের অভিযোগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন এবং অন্যান্য বাঙালি সংগঠনগুলোর দাবি ঘটনার একদিন আগে ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের একটি প্রতিনিধি দল বাঘাইছড়ি এলাকার চাকমা নেতাদের সাথে গোপন বৈঠক করে এবং তারপর তারা চলে আসার পরই বাঙালিদের ঘর-বাড়িতে আগুন ধরে যায়।
এরশাদ সরকারের সামরিক সাশনের দুর্বলতার সুযোগে ১৯৮৩ সাল থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পায়। একের পর এক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেয়া শুরু করে। ১৯৮৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে একটি নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী কোপেনহেগেনের ড্যানিস পার্লামেন্টের সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক কমিশনকে স্বাগত জানানোর ঘোষণা দেয়। দশমাস পর আমস্টার্ডামে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিস্থিতি তদন্তে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ নাগাদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠিত হয়। শুরুতে এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান ছিলেন কানাডার আইনের অধ্যাপক স্যার ডগলাস স্যান্ডারস ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহসভাপতি জার্মানির উইলফ্রিড টেলকেম্পার। এছাড়াও কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার রোজ মুরে, নরওয়ের লীফ ডানফিল্ড, গ্রীনল্যান্ডের হ্যান্স পাভিয়া রোজিং। কমিটি গঠনের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য এলাকার মানবাধিকার ও ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করা।
 
কিন্তু এ কমিটির গঠন, স্থান ও সদস্যদের তালিকা থেকে শুরুতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা। বিষয়টি ভারত সরকারও অনুধাবন করতে পারায় কমিটি ১০ দিনের জন্য ত্রিপুরা সফরের অনুমতি চাইলে তাদেরকে ৫ দিনের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কমিটি ১৯৯০ সালের ২১-২৫ নভেম্বর ত্রিপুরাস্থ বাংলাদেশী উপজাতীয় শরণার্থী শিবির এবং একই বছরের ৮-২৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা সফর করে সেখানকার উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাথে কথা বলে এবং এ সময় তারা দোভাষী হিসেবে চাকমাদের সহায়তা নেয়। ত্রিপুরা সফরকালে ভারত সরকার কমিটির সাথে সার্বক্ষণিক তাদের লোক মারফত পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদেকে কোনো টেপ রেকর্ডার ব্যবহার করতে দেয়নি। সফরে প্রাপ্ত তথ্য বলে দাবি করে এ কমিটি ১৯৯১ সালের ২৩ মে লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ‘Life is not ours : land human rights in the Chittagong hill tracts’  শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে এ কমিটি ১৯৯২, ১৯৯৪, ১৯৯৭ এবং ২০০০ সালে পরপর চারটি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রিপোর্টে কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাঙালি, ইসলাম, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে নানা মিথ্যা ও রাষ্ট্রবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করে। রিপোর্টে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিশেষ করে সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, গণধর্ষণ প্রভৃতির জন্য বাঙালি বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই মিশনারিদের তৎপরতায় নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি ছেড়ে খ্রিস্টান হয়ে গেলেও কমিটি তাদের রিপোর্টে উপজাতীয়দের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে এবং নাম না জানা ৭ জন মারমার মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করে। তাদের মতে, গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মসজিদ নির্মাণ অব্যহত থাকার দাবি করে বলে, মাইক্রোফোনে ভেসে আসা মসজিদের আজানের শব্দে কমিশনের কাজকর্ম অনেক সময় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। 
 
২০০০ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকার পর ২০০৮ সালের ৩১ মে-১ জুন ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে দুইদিন ব্যাপী এক সম্মেলনে নতুন করে সিএইচটি কমিশন গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ১২ সদস্যের এই কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হন ব্রিটিশ নাগরিক লর্ড এরিক এভাব্যুরি, বাংলাদেশের সুলতানা কামাল ও ডেনমার্কের ড. আইডা নেকোলাইসেন। লর্ড এরিক এবাব্যুরি ১৯৬২-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি এবং ১৯৭১ সাল থেকে ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এই সভার সভাপতি। তিনি পূর্ব তিমুরকে (স্বাধীন বা আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন) বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনে কাজ করেছেন। পাশাপাশি বর্তমানে লর্ড এরিক এভাব্যুরি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামের আন্তর্জাতিক প্রচার সেলের প্রধান হিসাবে কাজ করছেন। 
 
পুনর্গঠিত কমিশন ২০০৮ সালের ৬-১৪ আগস্ট এবং ২০০৯ সালের ১৬-২২ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করেন। সাজেক এলাকাটি এই কমিশনের কাছে সবসময়ই বিশেষ আগ্রহের ছিল। ২০০৮ সালের সফরকালে এ কমিশনের বিতর্কিত কর্মকা- ও বাঙালিদের কথা না শোনার কারণে তারা সুলতানা কামালকে অবরোধ করে। তার সামনে ঝাড়ু ও জুতা মিছিল করে। কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কমিশনের বিরুদ্ধে বাঙালিদের অন্যতম অভিযোগ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করার পরপরই পাহাড়ে বড় ধরনের হিংসাত্মক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে।
 
২০১০ সালের ১৭-১৮ ফেব্রুয়ারি এ কমিশন বাঘাইছড়ি সফর করে ও সেখানে রাত্রিযাপন করে। এর পরদিনই বিপুল সংখ্যক পাহাড়িদের ঘরে আগুন লাগে। এর দায় বাঙালিদের উপর চাপিয়ে পাহাড়িরাও বাঙালিদের ঘরে আগুন লাগায়, তাদের জায়গা-জমি দখল করে। শুরু হয় ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা- যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। সেসময় সাজেকের চেয়ারম্যান লাল থাঙ্গা পাঙ্খো দৈনিক ইনকিলাবের জন্য আমাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, চাকমারা নিজেরাই নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে বাঙালিদের দোষ দিচ্ছে। বাঙালিরা অভিযোগ করেছিল সিএইচটি কমিশনের গোপন উসকানিতে পাহাড়িরা এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে।
২০০৮ সালে কমিশন তাদের পার্বত্য সফরকালে বাঙালিদের পাহাড় ছেড়ে সমতলে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং এজন্য তাদের প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা পূরণের প্রলোভন দেখায়। বাঙালিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে ২০০৯ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রিপোর্ট দেয় যে, বাঙালিদের পাহাড় থেকে সমতলের সরকারি খাস জমিতে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এর জন্য যত অর্থের প্রয়োজন ইইউ, ইউএনডিপিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তা সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
 
২০১০ সালে কমিশন বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানায়, বাঙালিদের জোর করে পাহাড় থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। তাদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে, গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দিতে হবে। এছাড়াও কমিশন তাদের প্রত্যেক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অনুদান বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য এলাকার উপজাতিদের অধিকার হরণের কাজে ব্যবহার করছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। কাজেই যতদিন বাংলাদেশ সরকার তাদের নির্দেশিত সুপারিশ পার্বত্য চট্টগ্রামে বাস্তবায়ন না করবে ততদিন যেন তারা বাংলাদেশ সরকারকে সবধরনের সহায়তা প্রদান বন্ধ রাখে- এ মর্মেও কমিশন বিদেশি দাতা দেশ ও সংস্থার কাছে আবেদন জানিয়েছে। এভাবে সিএইচটি কমিশন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
 
সিএইচটি কমিশনের সকল রিপোর্টই একতরফা ও পক্ষপাতদুষ্ট। তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরকালে একতরফা উপজাতিদের সাথে কথা বলে। কখনো কখনো বাঙালিদের সাথে কথা বললেও তা তাদের নির্বাচিত বাঙালি। যারা সন্তু লারমার উপকারভোগী। সে কারণে তাদের সেখানো বুলি মতে, তারা কমিশনের সামনে মত প্রকাশ করে, সরকার তাদের সমতলে পুনর্বাসন করতে চাইলে তাদের আপত্তি নেই। সিএইচটি কমিশন পাহাড়ে উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার নিয়ে শতশত পৃষ্ঠা রিপোর্ট করলেও তাতে বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনা, নির্যাতনের কোনো কথা উঠে আসেনি। 
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত যে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ বেপরোয়াভাবে চালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। তারা শুধু বাংলাদেশ সরকার কতটুকু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করলো না তা নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু সন্তুবাহিনীর সহস্রাধিক সদস্য এখনো অস্ত্র সারেন্ডার না করে হিংসা, হানাহানি ও অপরাধ বিস্তার কার্যক্রমে জড়িত রয়েছে তাদের বেলায় কমিশনের কোনো বক্তব্য নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনা তাদের অগ্রাধিকার তালিকার অন্যতম দাবি। ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাচীন বাঙলার সমৃদ্ধ হরিকল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে কারণে বাঙালিরাই এ অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠী। অথচ কমিশন উপজাতিদের তারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি রেখে বাকি সকল ক্ষমতা প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ব্যাপক স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ বানাতে সুপারিশ করেছে। এসব কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সম্প্রদায় সিএইচটি কমিশনের প্রতি বিক্ষুদ্ধ।
 
একটি রাষ্ট্রের সীমান্তে কোথায় নিরাপত্তা ক্যাম্প বসবে এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার ভাবনা। এ নিয়ে নাগরিকের চাহিদা বাধা থাকতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক বিষয়। সেখানে কারো ব্যক্তিগত জমি বা সম্পদ অধিগৃহীত হলে সে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করতেই পারে, কিন্তু বাধা দিতে পারে না। যে কোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কাজেই আমরা এ ধরনের অধিগ্রহণ সারা দেশেই দেখছি। পদ্মা সেতুর কথা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়। কিন্তু পাহাড়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একটি চিহ্নিত পাহাড়ি গ্রুপ সকল প্রকার উন্নয়নেই বাধা সৃষ্টি করে থাকে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই হোক আর নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হোক। কখনো আর্মি চাই না, কখনো বিজিবি চাই না, কখনো র‌্যাব চাই না বলে, এমনকি অবকাঠামো, পর্যটন, মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিয়ারিং ইউনিভার্সিটিসহ সকল ধরনের উন্নয়নের তারা বিরোধিতা করে আসছে। আসলে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মুখে স্বায়ত্বশাসনের কথা বললেও বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক রাষ্ট্র বানাতে চায়। সে কারণেই তারা গঠন করেছে জুম্ম লিবারেশন আর্মি (জেএলএ), স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের পতাকা। আর এই কাজে তাদের গোপনে, প্রকাশ্যে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে সিএইচটি কমিশনের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় শতাধিক দেশি-বিদেশি এনজিও, দাতা দেশ ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। কাজেই বাংলাদেশ সরকারকে অচিরেই নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সিএইচটি কমিশনের মতো রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত সকল দেশি-বিদেশি এনজিও এবং দাতাসংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ কাজে সময় ক্ষেপণের বা শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো অবকাশ নেই।
Email: palash74@gmail.com. (দৈনিক ইনকিলাবের সৌজন্যে)
 
লেখকের পার্বত্যচট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা
 
 
 
 

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত শেষ হবে কবে?

অধ্যাপক আবদুল গফুর

মোহাম্মদ আবদুল গফুর

বাংলাদেশের এক-দশমাংশ এলাকা নিয়ে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত যেন কিছুতেই শেষ হচ্ছে না। এই চক্রান্ত শেষ না হওয়ার অন্যতম কারণ এর সাথে এদেশের কিছু মানবাধিকার কর্মী নামধারী ব্যক্তির সাম্রাজ্যবাদের শিখন্ডি হিসেবে ব্যবহৃত হবার উদগ্র বাসনা।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই পলাশী যুগে জগৎ শেঠ, মীরজাফর, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, ঘষেটি বেগমদের যে ভূমিকা পালনের পরিণতিতে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা হরণ করে নিতে সক্ষম হয়, মনে হয়, আজও তাদের এ যুগের উত্তরসূরিরা নতুন করে পলাশী বিপর্যয় ডেকে আনতে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।

সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন তথা সিএইচটির গাড়ি বহরে কথিত হামলা নিয়ে দেশে বেশ উত্তপ্ত আলোচনা শুরু হয়েছে। এই গাড়ি বহরে ছিলেন উল্লেখিত কমিশনের কো-চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালসহ অন্যরা। দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাঙ্গামাটি পর্যটন মোটেলে সকাল থেকে বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের তোপের মুখে ছিলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। দুপুরে কড়া পুলিশ প্রহরায় পর্যটন মোটেল থেকে বের হয়ে একটি মাইক্রোবাসযোগ রাঙ্গামাটি ছেড়ে যাওয়ার পথে ওমদ্যামিয়ণ হিল এলাকায় বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জসহ দুই রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।

বিক্ষুব্ধ বাঙালিদের এ বিক্ষোভের সূত্র সম্পর্কে যতদূর জানা গেছে, তা হচ্ছে পরিস্থিতি অনুকূল না থাকায় কমিশন প্রতিনিধিদের রাঙ্গামাটিতে না আসতে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু গরজ বড় বালাই। এ অনুরোধকে কোনো পাত্তা না দিয়ে এমনকি প্রশাসনের কাউকে না জানিয়ে তারা রাঙ্গামাটি আসেন। এর আগে এই কমিশনের প্রতিনিধি দলের গোপনে রাঙ্গামাটি সফরের প্রতিবাদে শনিবার সকালে শহরের প্রধান সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করে বাঙালিদের ছয়টি সংগঠন। অবরোধের কারণে রাঙ্গামাটি শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কমিশনের প্রতিনিধি দল যতক্ষণ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি ত্যাগ না করে ততক্ষণ পর্যন্ত অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সংগঠনের নেতারা। কমিশনের রাঙ্গামাটি সফরের প্রতিবাদে শুক্রবার সকাল থেকে ৩৬ ঘণ্টার অবরোধ শুরু হলেও কমিশন রাঙ্গামাটি থাকবে না বলে জানানো হলে ৭ ঘণ্টা পর অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল বাঙালি সংগঠনগুলো।

কিন্তু শুক্রবার রাতে কমিশনের প্রতিনিধি দল গোপনে রাঙ্গামাটি অবস্থান করলে প্রতিবাদকারী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর ধারাবাহিকতায় শনিবার সকালে বাঙালি সংগঠনগুলো কাঁঠালতলী ফিসারি বাঁধ সড়কের ওপর ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে সুস্পষ্ট যে, কমিশন যদি পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের অবস্থান সম্পর্কে লুকোচুরি না খেলতেন, তাহলে অন্তত সর্বশেষ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি ঘটত না।

এখানে উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘মানবাধিকার’ লঙ্ঘনজনিত ঘটনা খতিয়ে দেখার নামে মাঝে-মধ্যেই এই কমিশনের প্রতিনিধি দল তিন পার্বত্য জেলা সফরে যায়। গত ২ জুন প্রতিনিধি দলটি খাগড়াছড়ি পৌঁছে। ঐদিন দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিপি ব্যাটালিয়ন ও উচ্ছেদ হওয়া পাহাড়ি ২১টি পরিবার দেখতে যাওয়ার কথা থাকলেও অনিবার্যকারণবশত তা বাতিল করা হয়। তবে ঐদিন খাগড়াছড়িতে একটি প্লাজায় স্থানীয় চার উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে তাদের বৈঠক হয়। বাবুছড়ায় প্রস্তাবিত ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এলাকাও তারা পরিদর্শন করে। বিজিবির ব্যাটেলিয়ন উপঅধিনায়ক ও স্থানীয় সেনাবাহিনী সাবজোন কমান্ডার জানান, হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগানোর সময় বাধা দিল পাহাড়িরা বিজিবির ওপর হামলা চালায়, স্থাপনা ভাংচুর করে এবং বিজিবি সদস্যদের আহত করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। তিনি প্রতিনিধি দলকে আরো জানান, ১২৩ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েই বিজিবি কাজ করছে। এতে পাহাড়িদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

আসলে বিজিবির ঐ প্রকল্প সফল হলে বিরোধী একটি সশস্ত্র গ্রুপের অবাধ বিচরণ এলাকার নিরাপত্তা নজরে আসার আশঙ্কায়ই গ্রুপটি পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে চাইছে। এখানে উল্লেখ্য, গত মে মাসে বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়নের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়। এরপর থেকেই একশ্রেণীর পাহাড়ির মধ্যে উত্তেজনা দানা বাঁধতে থাকে। এই ধারাবাহিকতায় গত ১০ জুন সন্ধ্যায় কয়েকশ’ পাহাড়ি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্মাণাধীন বাবুছড়া বিজিবি সদর দফতরে হামলা চালালে ছয় বিজিবি ও পুলিশ কনস্টেবলসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়।

মজার ব্যাপার এই যে, এতসবের পরও তথাকথিত সিএইচটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাহাড়িরা অজানা আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, কমিশনের এক পেশে বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় কাজ করছে। কমিশন সদস্যরা মুখে মানবাধিকারের কথা উচ্চারণ করতে কখনও ক্লান্তি বোধ করেন না। অথচ পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিদের মানবাধিকার নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিরা এমনিতেই তাদের মানবাধিকার নিয়ে সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে। কারণ শান্তি চুক্তিতে পাহাড়ি আর বাঙালিদের অধিকারের মধ্যে যথেষ্ট বৈষম্য ছিল। যেমন পাহাড়িরা বাংলাদেশের যে কোনো স্থানে পূর্ণ নাগরিক অধিকারসহ বসবাস করতে পারলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসে বাঙালিদের ওপর অসংখ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

সিএইচটি প্রতিনিধি দল পাহাড়িদের অধিকার নিয়ে যতটা উৎসাহ প্রদর্শন করেন ওই অঞ্চলে বসাবসরত বাঙালিদের মানবাধিকারের জন্যও যদি ততটা দায়িত্ব অনুভব করতেন তবে সমস্যা মোটেই এভাবে গড়াত না। সাম্রাজ্যবাদের মনোরঞ্জনের লক্ষ্যে তারা উপাজাতিদের মধ্যে প্ররোচনা না দিয়ে চলতে এবং বাঙালিদের জন্যও সমান মানবাধিকারের চিন্তা করলে বাঙালিদের মধ্যে নিশ্চয়ই ক্ষোভ সৃষ্টি হতো না ও কমিশনের প্রতিনিধি দলকে বাঙালিদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হতো না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য তাদের সংগঠনের নামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। তাদের সংগঠনের নামই সমঅধিকার আন্দোলন। অর্থাৎ তারা বাংলাদেশের এক-দশমাংশজুড়ে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান, সেখানে অন্যদের সাথেও সমান অধিকার চান। উপজাতিদের যেমন রয়েছে বাংলাদেশের যে কোনো অঞ্চলে বসবাস করার অধিকার, বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সেরূপ অধিকারই দাবি করে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের কো-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বাঙালিদের জন্য এতটুকু অধিকারও বরদাশত করতে রাজি নয়। এর মধ্যে তিনি সাম্প্রদায়িকতার ভূত পর্যন্ত আবিষ্কার করেছেন।

সুলতানা কামালদের পক্ষে এটাই সম্ভবত স্বাভাবিক। কারণ তিনি ঐ কমিশনের কো-চেয়ারম্যান হলেও ভেতর থেকে ওই কমিশনের আসল কলকাঠি যিনি নাড়েন তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বস্ততম প্রতিনিধি লর্ড এরিক অ্যাভেবরি। সাম্রাজ্যবাদের সেবায় বিশ্বজোড়া রেকর্ড তার। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে বিচ্ছিন্ন করা ও সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে বিচ্ছিন্ন করাসহ সাম্রাজ্যবাদী বহু ষড়যন্ত্রেরই হোতা তিনি। দেশে দেশে সুলতানা কামালরা শুধু শিখন্ডি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছেন। নইলে যে সুলতানা কামাল বাংলাদেশের অন্যত্র বাংলাদেশীর বিপরীতে নিজেকে কম্পানী প্রমান করতে কখনও এতটুকু কার্পণ্য করেন না, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এতবড় সর্বনাশা ষড়যন্ত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে যাবেন কেন?

আসলে ‘মানবাধিকার’ শব্দটি বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের দ্বারা, যারা সারা বিশ্বে মানবাধিকারের বিরুদ্ধে ভয়াবহতম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, সেই সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি। কুখ্যাত হান্টিংটক তত্ত্ব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কমিউনিস্টদের পতন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন-পরবর্তী বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে উদীয়মান মুসলিম বিশ্বসহ তৃতীয় বিশ্ব। তাই তো দেখি, আফগানিস্তানে ও ইরাকে এখন প্রতিষ্ঠিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন সরকার। বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুর এবং সুদান থেকে দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি এখন বাংলাদেশ থেকে তার এক-দশমাংশ এলাকায় অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে সে অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদ পৃষ্ঠপোষিত একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা সাম্রাজ্যবাদের বহু দিনের। ওই পরিকল্পনা নিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করছে তথাকথিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিশন, যার শিখন্ডি কো-চেয়ারম্যান ও মূল কলকাঠি নড়ার কে কে তা ইতোপূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে।

মানবাধিকার রক্ষার নামে তথাকথিত মানবাধিকারবাদীরা মুখে উচ্চকণ্ঠ হলেও প্রকৃত মানবাধিকারে যে তাদের উৎসাহ নেই, তা তাদের কার্যকলাপেই সুস্পষ্ট। তা যদি না হবে তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে বাঙালিদের সমান অধিকার যে চরম ভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে তা বলতে তারা ভুলে যাবেন কি করে? তাদের উচিত ছিল পাহাড়িরা যেভাবে বাংলাদেশের সর্বত্র বসতি স্থাপনের অধিকারী, তেমনি বাঙালিরাও যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপনের সমান অধিকার পায় তার দাবি তোলা। তা তারা তোলেননি, তোলেন না।
কমিশনের কো-চেয়ারম্যান মহোদয়া রাঙ্গামাটি সফরে গিয়ে বাঙলিদের বিক্ষোভের মুখে পড়বার পর তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, হামলা করে আমাদের প্রতিহত করা যাবে না।

কথায় বলে, ভেড়া কোঁদে খুঁটির জোরে। তাদের খুঁটির জোর যে সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষকতা এটা কাউকে নতুন করে বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তারা ভুলে যান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের এসব চক্রান্ত এদেশের জনগণ কিছুতেই মুখ বুজে সহ্য করবে না। তারা ভুলে যান, পলাশীর চক্রান্তের পর প্রথম একশ’ বছর সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ, পরে দীর্ঘ দিন নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম, সব শেষে পুনরায় নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম হয়েছে আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। এদেশের মানুষ মীরজাফর, ক্লাইভ, ঘষেটি বেগমদের কোনো চক্রান্তই আর সফল হতে দেবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের কোনো অংশের বিরুদ্ধেই কোনো ষড়যন্ত্র বরদাস্ত করা হবে না। যে দেশের জন্ম হয়েছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে, প্রয়োজন হলে পুনরায় এদেশের জনগণ তাদের বুকের শেষ রক্তবিন্দুর বিনিময়ে এদেশের সার্বভৌম অখন্ডতা রক্ষা করবে।

অধ্যাপক আবদুল গফুর: অগ্রজ ভাষা সৈনিক, সাংবাদিক ও কলামনিস্ট।

সিএইচটি কমিশনের পার্বত্য অঞ্চল সফরকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পাহাড়

10366285_604974949616298_8391994001178499597_n

দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি :

বহুল বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের তিন পার্বত্য জেলা সফরকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে পড়েছে পাহাড়। তাদের অবরোধ প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি জেলা বাঙালী ছাত্র পরিষদ গতকাল মানববন্ধন করেছে জেলা শহরে। এদিকে সিএইচটি কমিশনের রাঙামাটি সফর প্রত্যাখ্যান করে ৬ বাঙালী সংগঠনের ডাকা দুই দিনের সড়ক ও নৌ অবরোধ শুরু হয়েছে আজ সকাল থেকে। এরপর বান্দরবানের ৬ বাঙালী সংগঠনও ৪ দিনের জন্য সড়ক ও নৌ অবরোধ কর্মসূচী ডেকেছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন সময়ে পার্বত্য এলাকায় মানবাধিকার লংঙ্ঘনের অযুহাত দেখিয়ে পার্বত্য তিন জেলা সফরে এসেছে সিএইচটি কমিশনের ৬ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন কমিশনের কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পাহাড়ীদের একক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য এলাকা পর্যবেক্ষণে এসেছে প্রতিনিধ দলটি।

গত দুই জুলাই বিকেলে সিএইচটি কমিশনের প্রতিনিধি দলটি খাগড়াছড়ি এসে পৌছে। ঐদিন জেলার দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও উচ্ছেদ হওয়া পাহাড়ি ২১ পরিবারকে দেখতে পরিদর্শনে যাওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়। ঠিক কি কারনে ঐদিন বাবুছড়া পরিদর্শনে যাওয়া বাতিল করেছে সে ব্যপারে স্পষ্ঠ নয় কেওই। এদিকে দুই জুন বিকেলে খাগড়াছড়ি মহাজন পাড়াস্থ একটি রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করার নামে এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগ দেয় দীঘিনালা, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি ও সদর উপজেলার চার চেয়ারম্যান। তবে বৈঠকে ঠিক কি শলাপরামর্শ হয়েছে তা জানা যায়নি।

এদিকে দীঘিনালা উপজেলায় ৩ জুন পাহাড়ি ও বাঙালি সংগঠন একই স্থানে একই সময় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনা করে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনা করায় সম্ভাব্য অপ্রিতিকর ঘটনা এড়াতে ঐদিনই উপজেলা প্রশাসন বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করে। ১৪৪ ধারা বহাল থাকা অবস্থায় সিএইচটি কমিশন দীঘিনালার বাবুছড়া ও দ্বি-টিলা পরিদর্শন করে।

এদিকে খাগড়াছড়ি জেলায় বাবুছড়া বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে ইউপিডিএফ সমর্থিত গনতান্ত্রীক যুব ফোরাম। বৃহস্পতিবার সকালে অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন(সিএইচটি কমিশন)’র সকল কার্যক্রম বয়কটের ঘোষনা দিয়েছে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ(পিবিসিপি)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তর হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুশিঁয়ারী দেয়া হয়। সিএইচটি কমিশনের রাঙামাটি সফর বাতিলের দাবীতে রাঙামাটিতে শুক্রবার-শনিবার সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে বাঙালি সংগঠনগুলো।

একই দাবীতে বান্দরবানে সিএইচটি কমিশনের সফর বাতিলের দাবীতে আগামী ৫ জুলাই থেকে টানা চারদিন সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করেছে পার্বত্য নাগরিক পরিষদ’সহ বাঙ্গালী সংগঠনগুলো।

এদিকে বাবুছড়ায় প্রস্তাবিত ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন এলাকা পরিদর্শন শেষে বৃহস্পতিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের (সিএইচটি) কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সময়োচিতভাবে শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এত জটিল হতো না। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নই পাহাড়ে শান্তির একমাত্র পথ।’ কমিশনের কো-চেয়ারম্যান এডভোকেট সুলতানা কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন কমিশনের সদস্য ডঃ স্বপন আদনান, ডঃ ইফতেখারুজ্জামান, খুশি কবির ও হানা শামস।

অপরদিকে প্রতিনিধিদলের নিকট ঘটনার বিবরণ তোলে ধরেন বিজিবি ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ কামাল উদ্দিন এবং সেনাবাহিনীর সাবজোন কমান্ডার মেজর মঈন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগানোর সময় বাধা দিলে স্থানীয়রা বিজিবি’র ওপর হামলা করে স্থাপনা ভাংচুর করে বিজিবি সদস্যদের আহত করে। তখন পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে। কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদলের নিকট আরো জানান, ১২৩ কিঃ মিঃ অরক্ষিত সীমান্ত সুরক্ষায় সরকারী সিদ্ধান্তে বিজিবি’র দপ্তর স্থাপনের কাজ চলছে। এতে স্থানীয়দের সমস্যা হওয়ার কথা নয়; কিন্তু শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সশস্ত্র গ্রুপের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রের এলাকটি নিরাপত্তা নজরে চলে আসার আশংকায় সংগঠনটি নেপথ্যে থেকে সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করছে। বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনে কোনো পরিবার উচ্ছেদ হয়নি দাবি করে উপ-অধিনায়ক বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩/৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ উল্লেখ্য, দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় বিজিবি’র একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপনের জন্য ১৯৯১ সালে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়।

চলতি বছরের ২২ মে বাবুছড়া বিজিবি ব্যাটালিয়নের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আনুষ্ঠানিকভাবে বাবুছড়াতেই পালন করা হয়। এরপর থেকে জায়গা-জমি নিয়ে বিজিবির সঙ্গে স্থানীয় পাহাড়িদের বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১০ জুন সন্ধ্যায় কয়েকশ সংঘবদ্ধ পাহাড়ি নারী-পুরুষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্মাণাধীন বাবুছড়া ৫১বিজিবি সদর দফতরে হামলা চালালে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ৬ বিজিবি ও এক পুলিশের কনস্টেবলসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। হামলায় বিজিবির দুটি রাইফেলসহ বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুলিশ ৫ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ও ৫ রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ঘটনায় বিজিবির দায়ের করা মামলায় ৭ জন কারাগারে আটক রয়েছেন।

দ্বিতীয় দিনে সিএইচটি কমিশনের বাবুছড়া ও দুইটিলা পরিদর্শন: উপজেলা চেয়ারম্যানদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও এসপি বাসায় ডিনার

Untitled-2

পার্বত্য নিউজ রিপোর্ট:

পাহাড়ে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে পার্বত্য চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় । পরিপূর্ণভাবে চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এসব ঘটনা ঘটতো না। তাই পাহাড়ের মানুষের শান্তি সম্প্রীতি উন্নয়নে পার্বত্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিজিবি-গ্রামবাসীর মধ্যে চলমান ভূমি বিরোধ সরেজমিন পরিদর্শনকালে এসব কথা বলেন, সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল।

বৃহস্পতিবার সুলতানা কামালের নেতৃত্বে ছয় সদস্যসের একটি প্রতিনিধি দল দীঘিনালার বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠি পাহাড়ীদের সাথে কথা বলেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের উপরোক্ত কথাগুলো বলেন সুলতানা কামাল।

উল্লেখ্য ১৪৪ ধারা জারী করলেও পুলিশ নিজেই পাহারা দিয়ে কমিটির সদস্যদের দিঘীনালা নিয়ে যায়। দিঘীনালায় কমিশন প্রথমেই স্থানীয় স্কুলে যান। সেখানে অবস্থানরত পাহাড়ী পরিবারের সাথে কথা বলেন।বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া পরিবারের পক্ষে গোপা চাকমা, মৃনাল কান্তি চাকমা ও রিপন চাকমা সিএইচটি কমিশনকে অভিযোগ করে জানান, আমাদের বসতভিটায় বিজিবি’র সদর দপ্তর স্থাপন করায় আমরা আশ্রয়হীন হয়ে বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছি। আমরা বিজিবি সদর দপ্তর চাই না। আমরা বসতভিটায় ফিরে যেতে চাই। প্রথাগত অধিকার মূলে বসতভিটা ফেরৎ দেয়ার দাবী জানান তারা, এসময় সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বক্তব্য শুনেন এবং বসতভিটা ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে সুদৃঢ় অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দেন।  এ সময় কমিশনের এক সদস্য পাহাড়ীদের বলেন, ভয় পাবেন না। আমরা আপনাদের পাশে আছি। শক্ত হয়ে থাকতে হবে। স্থান ত্যাগ করবেন না।

এরপর কমিশন বাবুছড়া জোন সদর দফতর পরিদর্শন করেন। এসময় জোন উপ অধিনায়ক মেজর কামাল তাদের সকল পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেন, সকল ঘটনার আদ্যপান্ত জানান। বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনে কোনো পরিবার উচ্ছেদ হয়নি দাবি করে উপ-অধিনায়ক বলেন, ‘যারা উচ্ছেদ হয়েছে বলে দাবি করছেন, বাস্তবিক অর্থে তারা বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপন প্রকল্প শুরু হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় ৩/৪ মাস আগে বসতি স্থাপন করেছিলেন।’ মতবিনিময়কালে বিজিবি’র ৫১ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ কামাল উদ্দীন ও বাবুছড়া সাবজোন কমান্ডর মেজর মঈন সিএইচটি কমিশনকে জানান, বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য ২৯.৮১ একর ভূমি অধিগ্রহন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সকল প্রকার সরকারী নিয়মনীতি অনুসরন করে বিজিবিকে অধিগ্রহনকৃত ভূমি হস্তান্তর করেন। হস্তান্তরিত ভূমিতে বিজিবি’র স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা অবস্থায় গত ১০ জুন সকাল ১০ টায় ভূমি নিয়ে গ্রামবাসীদের সাথে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে তা নিষ্পত্তি করার জন্য আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিদের সাথে মতবিনিময় সভা করি। মতবিনিময়ে আলোচনার মাধ্যমে এসমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে বানচাল করার জন্য একটি বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বিকালে একদল মহিলা আমাদের হেলিপ্যাডে কলাগাছ লাগাতে থাকে। তাদেরকে বাধা দিলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের মহিলা ও যুবকরা দল বেধে এসে বিজিবি সদর দপ্তরে হামলা চালায় এবং বেশ কিছু স্থাপনা ভাংচুর করে। হামলায় এক পুলিশ সদস্যসহ ৬ বিজিবি সদস্য আহত হয়। মেজর মঈন আরো জানান, এই বিজিবি সদর দপ্তরের আওতাধীন ৪৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা অরক্ষিত রয়েছে। অরক্ষিত এলাকায় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র সদস্যরা অভয়ারণ্য গড়ে তোলেছে। ওই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রানহানির ঘটনাও ঘটেছে। তাই অরক্ষিত ওইসব এলাকা নিয়ন্ত্রনে আনার লক্ষ্যে সরকার বাবুছড়ায় বিজিবি’র ৫১ ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাউকে উচ্ছেদ কিংবা কারো ভূমি বেদখল করে নয় সরকারী নিয়মনীতি অনুসর করেই বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের কার্যক্রম চলছে বলে জানান তিনি। 

এ সময় কমিশন সদস্য ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্লটটি তো ভালই সাজিয়েছেন কিন্তু বাস্তবে তা টিকবে না।  এছাড়াও কমিশনের আরো কেউ কেউ বিজিবিকে অবজ্ঞাসূচক কথা বলেন। সিএইচটি কমিশনের কো-চেয়ারপার্সন এডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে পাহাড়ী মহিলারা হামলা করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারপরও বিজিবি’র সদর দপ্তর স্থাপনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গ্রামবাসীদের সাথে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার জন্য তিনি বিজিবি কর্মকর্তাদের পরামর্শ দেন।

এদিকে দিঘীনালা পরিদর্শন শেষে কমিশন সদস্যরা বাঘাইছড়ি উপজেলার দুইটিলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় সেখানে দায়িত্বপালনরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে ১৪৪ ধারা জারী রয়েছে জানিয়ে কমিটির সাথে যাওয়া পাহাড়ীদের সেখানে প্রবেশ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানান। এসময় কমিশন সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারীর কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা জানান, ফরেস্টের জমিতে অবৈধভাবে মন্দির নির্মাণ করতে গেলে তাদের বারণ করা হয়। তারা তা না শুনলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারী করে। জবাবে কমিশন মন্তব্য করে বন বিভাগের জায়গায় মসজিদ থাকতে পারলে মন্দির কেন থাকতে পারবে না। দুই টিলা পরিদর্শন শেষে  কমিশন স্থানীয় অগালচুক মন্দিরে গিয়ে লাঞ্চ সারেন। 

পরিদশর্দন করে স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের কাছে সুলতানা কামাল বলেন, সময়মতো পুরোপুরি শান্তি-চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলে পরিস্থিতি এতো জটিল হতো না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বশেষ অবস্থা, শান্তিচুক্তির অগ্রগতি এবং বাবুছড়ার ঘটনা সম্পর্কে জানতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলটি গত বুধবার বিকেলে খাগড়াছড়িতে আসেন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে দীঘিনালা ও বাবুছড়া এলাকা পরিদর্শন করেন।

কমিশনের কো-চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে অন্যরা হলেন কমিটির সদস্য ও টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখায়রজ্জামান, খুশী কবীর, কমিশনের সদস্য ড. স্বপন আদনান, ও কমিশনের বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েটের সমন্বয়কারী হানা শামস আহমেদ প্রমুখ।

এদিকে বাবুছড়ায় ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন স্থাপনকে কেন্দ্র করে একই সময়ে ও একই স্থান বিবদমান দুটি পক্ষের মানববন্ধনসহ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষনার করায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় জারি করা ১৪৪ ধারা বলবৎ আছে। ১৪৪ ধারার কারণে উভয় পক্ষের সকল কর্মসুচী পন্ড হয়ে যায়। রাস্তায় পুলিশের টহলের পাশাপাশি বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে ১৪৪ ধারা জারী করলেও প্রশাসন নিজেই তা ভঙ্গ করে বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনকে প্রটোকল দিয়ে দিঘীনালা ও বাঘাইছড়িতে নিয়ে যায় ও ফিরিয়ে নিয়ে আসে। খাগড়াছড়িতে ফিরে টিম তাদের বুকিং দেয়া পর্যটনের মোটেলে না ফিরে শহরের মহাজন পাড়াস্থ টং রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে। বিকাল থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত কমিশন সদস্যরা এ্রই রেস্টুরেন্টে অবস্থান করেন। এসময় তারা জেলার ৪ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে দীর্ঘ সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে। উপজেলা চেয়ারম্যান হলেন খাগড়াছড়ি সদর, পানছড়ি, দিঘীনালা ও লক্ষ্ণীছড়ি।

গতকালও এই ৪ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথে কমিশন একই স্থানে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। তবে তাদের বৈঠকের বিষয়বস্তু জানা যায়নি। এদিকে টং রেস্টুরেন্টেই কমিশন সদস্যদের রাতে ডিনারের কর্মসূচী থাকলেও খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার শেখ মিজানুর রহমান রাতে কমিশন সদস্যদের নিজ বাড়িতে ডিনারের আমন্ত্রণ জানালে কমিশন সদস্যরা এসপি’র বাড়িতে যান এবং সেখানে ডিনার করেন। 

এদিকে সিএইচটি কমিশনের মতো একটি বিতর্কিত ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত সংগঠনকে জেলা পুলিশ সুপার কী করে তার বাড়িতে ডিনারে আহ্বান করলেন তা নিয়ে শহরে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। 

 বাবুছড়ায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন প্রত্যাহার ও পাহাড়ীদের বসতভিটা ফিরিয়ে দেয়ার দাবীতে দীঘিনালা ভুমি রক্ষা কমিটি এবং বিজিবি সদর দপ্তরে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ একই সময়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসুচির ঘোষনা দিয়েছে। 

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের নির্দেশে দীঘিনালা উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা হতে রাত ১২টা পর্যন্ত দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ হতে বাবুছড়া বাজার পর্যন্ত ৮ কিলোমিটার এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

 

সিএইচটি কমিশনের সকল কার্যক্রম প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়িতে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের মানববন্ধন

pbcp pic 01

নিজস্ব প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি ॥

আবারও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে অবৈধ সিএইচটি কমিশন। এ কমিশন সাম্প্রতিক সময়ে দিঘীনালা উপজেলার বাবুছড়ায় বিজিবি সদর দপ্তরে হামলাকারীদের রক্ষা করতে ও সত্য ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রভাবিত এবং বিজিবি বাহিনীর ভাবমূর্তি বিনষ্টে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের সাথে আতাঁত করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সফরে এসেছে।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় খাগড়াছড়ি জেলা শহরের শাপলা চত্ত্বরে পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ (পিবিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মানববন্ধন কর্মসূচী পরবর্তী প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব অভিযোগ করেন।

এসময় তারা আরও বলেন, পাহাড়ের সশস্ত্র দলগুলো বাবুছড়া-নাড়াইছড়ি সীমান্ত দিয়ে অবাধে পাহাড়ে অস্ত্র প্রবেশ করার যে রুট ছিল তাতে বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপিত হলে সশস্ত্র উপজাতীয় দলগুলোর স্বার্থে আঘাত হানবে। তাই বিজিবি সদর দপ্তর স্থাপনের শুরু থেকে ইউপিডিএফ বিরোধিতা করছে।

গত ১০জুন ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা বিজিবি ও পুলিশ বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে অস্ত্র ভাংচুরসহ ৬ বিজিবি সদস্যকে গুরুতর আঘাত করলেও সিএইচটি কমিশন এ বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে বরং তাদের ডাকে বাবুছড়া সফরে এসে গত (বুধবার) খাগড়াছড়ি সদরে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের সাথে বৈঠক করে আজ বাবুছড়া গিয়েছে। সেখানে গিয়ে ইউপিডিএফ’র তৈরী করা নাটকের মঞ্চে আশ্রয় নেয়া লোকদের সাথে কথা বলে মিডিয়া কাভারেজ দিয়ে একতরফা রিপোর্ট প্রদান করবে।

এভাবে সিএইচটি কমিশনের নাম দিয়ে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের সাথে আতাঁত করে একতরফা প্রতিবেদন তৈরী ইতোপূর্বেও এ কমিশন করেছে। পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ সিএইচটি কমিশনের একতরফা কার্যক্রমকে অবাঞ্চিত ঘোষণা সহ সকল কার্যক্রমকে প্রত্যাখান করছে।

পার্বত্য বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদের খাগড়াছড়ি জেলা সভাপতি সাহাজল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানবন্ধনে মাটিরাঙ্গা উপজেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক মো: আনিসুজ্জামান ডালিম স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, পানছড়ি উপজেলা কমিটির সভাপতি এরশাদ আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক ইকবাল হোসেন, মাটিরাঙ্গা সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

বক্তারা অভিযোগ করেন, সিএইচটি কমিশন তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের সাথে সমন্বয় করে পার্বত্যাঞ্চলকে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরে হামলার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করা হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুশিয়ারী দেন সংগঠনটি। এসময় বিজিবি সদর দপ্তরে হামলাকারীদের গ্রেফতার পূর্বক শাস্তির দাবী জানান বক্তারা।