পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষণ নির্যাতন আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে

ধর্ষণ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বাঙালী কর্তৃক উপজাতীয় নারী নির্যাতনের বিষয়ে উপজাতীয়দের প্রচার- প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশের আড়ালে পাহাড়ের দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা। উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনাগুলো বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এসব অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এনিয়ে নিরীহ বাঙ্গালীদের মাঝে দিনের পর বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ক্ষীণ হয়ে আসছে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাও। অন্যদিকে একের পর এক ঘটনা করে পার পেয়ে যাওয়া উপজাতীয় যুবকদের দৌরাত্ম বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি বর্তমানে এতোটাই খারাপ হয়েছে যে, বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে পাহাড়ী যুবকেরা বাঙালী নারীদের সুপার ইম্পোজ ছবি পোস্ট করছে, তাদেরকে ধর্ষণের জন্য পাহাড়ী যুবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

পার্বত্যনিউজের তথ্যানুসন্ধান ও ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৩জুন মাটিরাঙ্গা উপজেলার পলাশপুর জোন সদরের কাছাকাছি দক্ষিণ কুমিল্লা টিলা এলাকায় মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা মো: আব্দুল মান্নানের মেয়ে কুলসুম আকতার (১২) নামে এক কিশোরী ধর্ষনের শিকার হয়। ঘটনার সূত্রে জানা যায়, নিজেদের বাড়ি হতে মাটিরাঙ্গা বাজারে কেনাকাটার জন্য যাবার পথে এক পাহাড়ি যুবকসহ চার যুবক তাকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে মোহন ত্রিপুরা নামক এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে। এসময় অন্য তিনজন পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন তার পরিবারের পক্ষ থেকে মাটিরাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ কর্তৃক অভিযান চালিয়ে অপর ব্যক্তিদের আটক করে।

এক্সক্লুসিভ লোগো

এ ঘটনার এক মাসের মাথায় ২৩ জুলাই মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম (৫৫) নামে এক বাঙ্গালী গৃহবধুকে পাহাড়ী যুবক কর্তৃক ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে। সে মাইসছড়ির মো: সয়ন উদ্দীনের স্ত্রী। জানা গেছে, ঐ মহিলা তার গরু খোজার জন্য নিকটবর্তী নীলাৎপল খীসার সবজি ক্ষেতে গেলে চার পাহাড়ী যুবক তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। পরে মহালছড়ি জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এর নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ ও জোনের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এ ব্যাপারে ধর্ষিতার ছেলে মো: গুলজার হোসেন মহালছড়ি থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযুক্ত লাব্রেচাই মারমা ও মাউশিং মারমা নামে দুই যুবককে আটক করে।

এ ঘটনার কয়েক মাসের মাথায় ৯ অক্টোবর মহালছড়ির শ্মশানখোলা এলাকার বাসিন্দা শামছুন্নাহার (৩০) নামে একজনকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠে। এসময় উপজাতি যুবকের দা‘র আঘাতে শামছুন্নাহারের মাথায় মারাত্বক জখম হয়। পরবর্তীতে তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় পুলিশী কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণ-ধর্ষণের শিকার হয় জান্নাতুল ফেরদৌস (১৫) নামে এক বাঙ্গালী কিশোরী। সে জেলার রামগড় উপজেলার বাসিন্দা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘটনার দিন জান্নাতুল ফেরদৌস বান্ধবীর বাড়ীতে যাওয়ার পথে অজ্ঞাত পরিচয়ধারী উপজাতীয় দুষ্কৃতিকারীরা তাকে অপহরণপূর্বক এই ঘটনা ঘটায়। ধর্ষণের শিকার এই কিশোরী ঘটনার পরদিন ০৫ ফেব্রুয়ারি হোটেলর ২য় তলা থেকে জানালা দিয়ে নীচে লাফ দিয়ে ধর্ষণকারীদের কবল হতে পালানোর চেষ্টা করলে গুরুতর আহত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর প্রথমে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এসময় সন্দেহভাজন হোটেল কর্মচারি রাহুল ত্রিপুরাকে (২৮) আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় ১৩ ফেব্রুয়ারী মহালছড়ি জোনের আওতাধীন থলিপাড়া এলাকায় মহালছড়ি ডিগ্রী কলেজের ছাত্রী মিতা সরকারের সাথে অসদাচরনসহ তাকে উত্যক্ত করে রামপ্রু মারমা নামে উপজাতি স্কুল ছাত্র। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙ্গালি যুবকদের মাঝে হাতাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা জানাজানি হলে মহালছড়ি জোন ও এপি ব্যাটালিয়নের পৃথক দুটি টহলদল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে জোন কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, কলেজের অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত ছাত্র রামপ্রু মারমা‘র পিতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরণের কার্যকলাপে লিপ্ত হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে সেবারের মতো রেহাই পায় বখাটে উপজাতি যুবক রামপ্রু মারমা।

এর পরপরই স্বাধীনতার মাসে (১৮ মার্চ) গুইমারার রামসু বাজারে মিসেস ফেরদৌসি বেগম (৩৫) এর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতিয় মোটরসাইকেল চালক অংচল মারমা (৩২)। প্রাপ্ত সূত্রমতে, ফেরদৌসি বেগম ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলযোগে মানিকছড়ি হতে গুইমারা বাজারে যাওয়ার পথে তার শ্ললতাহানির চেষ্টা চালালো হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এ ঘটনা জানার সাথে সাথে গুইমারা সেনা ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সিএমএইচ-এ ভর্তি করে। পরবর্তীতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা অভিযুক্ত মোরসাইকের চালককে আটকপূর্বক গুইমারা থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। এ ব্যাপারে গুইমারা থানায় মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে একটি মামল করা হয়।

এরপর ৩০ এপ্রিল আলীকদম জোনের আওতাধীন গুড়রঝিরি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে মোছাম্মদ হুরাইরা (২৬) নামের এক বাঙ্গালি নারী উপজাতিয় যুবক মংচিং আই মারমা (৩০) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। জানা গেছে হুরাইরা ও তার স্বামী উক্ত তামাক ক্ষেতের শ্রমিক। তার স্বামীর অনুপুস্থিতিতে একই তামাক ক্ষেতের অপর শ্রমিক মং চিং আই মারমা উক্ত ঘটনা ঘটায়। সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ঘটনার ব্যাপারে লামা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পর থেকে ধর্ষক মং চিং আই মারমা পলাতক রয়েছে।

২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল পুর্বপ্রণয়ের জের ধরে মাটিরাঙ্গার গাজীনগর বটতলী এলাকার বাঙ্গালি কিশোরী সবিলা আক্তর (২৪)-কে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে উপজাতিয় যুবক কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা (২৭)। স্থানীয়রা বিষয়টি জানলে পলায়নকৃত কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা ও সবিলা আক্তরকে আটক করে মাটিরাঙ্গা থানায় হস্তান্তর করে।

এর কয়েকদিনের মাথায় ৮ এপ্রিল আলকদম জোনের আওতাধীন সেলতিপাড়া এলাকায় পাখী আক্তার (৩৫) নামে বাঙ্গালী গৃহবধুর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতি যুবক সামারি মারমা (৩৬)। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় বাঙ্গালীরা উত্তেজিত হয়ে সামারি মারমাকে মারধর করে। পরবর্তীতে, এই ঘটনা উক্ত এলাকায় পাহাড়ি-বাঙ্গালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ঘটনা জানার পর সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়োজিত রাখে।

একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুনা আক্তার (৭)-কে ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের উপজাতি ছাত্রের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার মেয়ে শিশুটির ভাষ্যমতে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজাতীয় ছাত্র তাকে বিদ্যালয় ভবনের পিছনে নিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে, শিশুটির মা ও নেপচুন টি স্টেট‘র শ্রমিক কাঞ্চন মালা তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে প্ররণ করে। এ ব্যাপারে কাঞ্চন মালা বাদী হয়ে মানিকছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

পরবর্তীতে, মানিকছড়ি উপজেলার ইউএনও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় বাটনাতলী ইউপি চেয়াম্যান এবং বিদ্যালয়ের পরিচালক কমিটির সদস্যবৃন্দ ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে ০১ অক্টোবর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ষণের শিকার শিশুটি কর্তৃক অভিযুক্ত প্রথম শ্রেণির ছাত্র রাজ কুমার চাকমাকে (১২) সনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ কর্তৃক রাজ কুমার চাকমাকে আটক পূর্বক খাগড়াছড়ি জেলে প্রেরণ করা হয়।

সমঅধিকার আন্দোলন একাংশের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির পার্বত্যনিউজকে বলেন, বাঙালী কর্তৃক কোনো উপজাতি নারী নির্যাতিত হলে উপজাতি সমর্থিত বিপুল মিডিয়ার প্রচার প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ, বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু উপজাতি কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষিত বা নির্যাতিত হলে সরকারের তরফ থেকে সেই তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই একজন নামেমাত্র গ্রেফতার হলেও অল্পদিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। আর এই বিচার বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দী থেকে একসময় তামাদি হয়ে যায়। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী আন্তর্জাতিক মহল কারোরই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে বিচার না হওয়ায়,, সম্মান কিম্বা নিরাপত্তার কারণে বাঙালীরা বিচার প্রার্থিও হয় না। ঘটনার আসল সংখ্যা কখনোই জানা যায় না।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করে পাহাড়ের সচেতন মহল বলেন, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। বাঙ্গালী যুবকের দ্বারা কোন পাহাড়ী নারী ধর্ষিত হলে কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও এতোগুলো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাদের কোন বক্তব্য-বিবৃতি জাতি দেখেনি। পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও বাঙালীর অবস্থান নিশ্চিত করতে এ ধরণের ঘটনা রোধ করা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

পার্বত্য ভূমি কমিশনের কার্যক্রম অচল!

copy-chittagong-hill-tracts_0_1
নিজস্ব প্রতিনিধি, রাঙামাটি:

পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইনের প্রস্তাবিত ধারাগুলো দীর্ঘ ৬ বছরেও সংশোধিত হয়নি। বর্তমানে কমিশন সম্পূর্ণ অচল। এর মধ্যে শেষ হয়ে গেছে গত সরকারে পুনর্গঠিত পার্বত্য ভূমি কমিশনটি। এখন কমিশনে অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ পর্যন্ত কমিশন পুনর্গঠনের কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও কার্যত: কোন সফলতা আসেনি। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সাধারণ জনগণ । কিন্তু থামছে না সরকারী খাস ভুমি বেদখল চক্রের দৌরাত্ব্য। পার্বত্য এলাকায় রাঙামাটি সার্কেলর প্রায় ৬ লক্ষাধিক সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কোন মাথা ব্যথা নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ঝুম নিয়ন্ত্রন বনবিভাগের ১৯৮২ সালে যেইসব বাগান করা হয়েছে তার অধিকাংশ ভুমি বনকর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বেদখল হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে প্রধান বনসংরক্ষক ,জেলা বনসংরক্ষক ও বিভাগীয় বনকর্মকর্তারা প্রতিযোগিতা নিয়ে পোষ্টিং বাণিজ্যর মাধ্যমে ফ্রি পারমিটের নামে সরকারী বাগান(রিজার্ভ ফরেষ্ট ) কাঠ পাচার করতে এসেছে। কেউ রিজার্ভ ও বনভুমি রক্ষায় কার্যত: কোন ভুমিকা রাখতে দেখা যায়নি।

এসব ইস্যুকে পুঁজি করে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখায় কিছু কর্মচারী সরকারী খাস জায়গা দখলে নিয়ে বিভিন্ন মহলে উৎসাহ করতে দেখা গেছে। পরবর্তীতে প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়ে উভয় পক্ষ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ভুমি সমস্যা জটিলতা সৃষ্টি করে আসছে।

জানা গেছে, পার্বত্য এলাকায় ১৯০০ সালের শাসন বিধি অনুসারে এবং ভুমি মন্ত্রনালয়ের নির্দেশমতে সরকারী খাস জায়গা দখলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করা,শুনানীসহ পরিমাপ ওপর নিষেধজ্ঞা রয়েছে। তবে আদালতের মামলার জনিত কারণে রেকর্ডীয় ভুমির পরিমাপ করার বিধান রয়েছে।

এদিকে পার্বত্য ভূমিবিরোধ নিস্পত্তি কমিশনকে কার্যকর করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বিরোধ নিস্পত্তির লক্ষ্যের নামে কিছু কিছু এনজিও রাঙামাটিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বর্তমান প্রেক্ষিত’ ইস্যুতে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করে আসছে। এসব সেমিনারে সরকারের উচ্ পদস্থ কর্মকর্তা,চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, জেলা প্রশাসক মোঃ মোস্তফা কামাল ও পুলিশ সুপার আমেনা বেগমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

এদিকে কমিশন আইনের সংশোধনী তথা সরকারী ভুমির পরিমাপ করার নিয়ে এ সরকারেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ নিস্পত্তির জন্য কমিশন গঠিত হলেও তা আজও কার্যকর হতে পারেনি। ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই বচারপতি (অব:) খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে তিন বছরের জন্য গঠিত হয় আগের সরকারে বিদায়ী কমিশন। চতুর্থতম কমিশন সেটি। ওই বছর ২০জুলাই বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী ওই কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। মেয়াদ শেষে সরকার এখনও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়নি। ফলে কমিশন এখন কার্যত: অচল। বর্তমানে কমিশনের খাগড়াছড়ির প্রধান কার্যালয়ে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

অন্যদিকে সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা পার্বত্য ভূমি কমিশন সম্পর্কিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আগের সরকারে ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধনে আনা বিলে মতামতও দেয়নি। রহস্যজনকভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয় বিলটি। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৩ বিল জাতীয় সংসদে পাস করানো হয়নি।

জানা গেছে, গত বছর ২৭মে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৩’ বিল মন্ত্রিসভায় উত্থাপিত হয়। পরে ৩জুন অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিলটি অনুমোদিত হয়। ১৬ জুন সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। বিধি অনুযায়ী মতামত চেয়ে বিলটি ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল।

জনসংহতি সমিতির এক বিবৃতিতে বলা হয়, বিলে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি অনুমোদিত ও ২০১২ সালের ৩০জুলাই আইনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্ত:মন্ত্রণালয় সভায় গৃহীত ১৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে ১০টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাকি ৩ দফা গুরুত্বপূর্ণ সংধোশনী প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে বাদ দেয়া হয়। অপরদিকে উত্থাপিত ১০টি সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে ২টি সংশোধনী প্রস্তাব বিলে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন যথাযথভাবে সংশোধনে বিলের ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে গত বছর ১৮জুন সরকারের নিকট পাঁচ দফা সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করা হয়।

চেয়ারম্যানকে নিয়ে ৯ সদস্যের পার্বত্য ভূমি কমিশন। কিন্তু চেয়ারম্যান না থাকলে কমিশন কার্যকর থাকে না। বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন গত কমিশনও ছিল অনেকটা অচল। ২০০৭ সালের ৩১ অক্টোবর তার আগের কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়। চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিস্পত্তিকল্পে সর্বশেষ ২০০৪ সালের ১ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএম মাহমুদুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে তিন বছরের জন্য পার্বত্য ভূমি কমিশন গঠিত হয়। কিন্তু সেই সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে ওই কমিশন কোনো কাজই করতে পারেনি।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির (ঘ) খন্ডের ৪নং ধারা বলে ১৯৯৯ সালের ৩ জুন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়। ২০০১ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি (ল্যান্ড কমিশন) কমিশন আইন-২০০১ পাস হয়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে ল্যান্ড কমিশন আইনে অসংগতি থাকায় কোনো কমিশনই সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি।

১৯৯৯ সালের ৩জুন বিচারপতি আনোরুল হক চৌধুরীকে পার্বত্য ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হলেও তিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগে ১৯৯৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ২০০০ সালের ৫এপ্রিল অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল করিমকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হলে তিনি শারিরীক অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেন।

অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, আইনি জটিলতাসহ নানা সমস্যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিস্পত্তি কমিশন গঠনের পর এ পর্যন্ত কোনো কাজই করতে পারেনি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমিবিরোধ নিস্পত্তি নিয়ে এখনও অনিশ্চিত।

এদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ভূমি বিরোধ নিস্পত্তি কমিশন আইন শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করতে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পাঠানো ১৩ প্রস্তাবের মধ্যে ১০টি ধারা সংশোধন এবং ৩টি নতুন ধারা সংযোজনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তও দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি।

বিদ্যমান আইনে ৬(১)(ক) ধারায় বলা আছে, পুনর্বাসিত শরনার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিস্পত্তি করতে হবে। সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পুনর্বাসিত শরনার্থীদের জমিজমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিস্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্তু ও বেদখল হওয়া জায়গা-জমি ও পাহাড়ের মালিকানাস্বত্ব বাতিল করাসহ সব ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিস্পত্তি করতে হবে।

আইনের ৬(১)(গ) ধারায় বলা আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভূতভাবে কোন বন্দোবস্তু প্রদান করা হয়ে থাকলে তা বাতিল করে বৈধ মালিককে ফেরত দিতে হবে। এর সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ কোন ভূমি বন্দোবস্তু প্রদান বা বেদখল করা হয়ে থাকলে তা বাতিল করে আগের বৈধ মালিককে ফেরত দিতে হবে।

আইনের ৭(৫) ধারায় সংশোধন প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কমিশন তার এখতিয়ারভূক্ত কোন বিষয়ে সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্তে উপণীত হতে না পারলে সংখ্যগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে।

বিজ্ঞ মহলের ধারণা আগে পার্বত্য এলাকায় ভুমি জরিপ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে কমিশনকে। এর পর কোন কোন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কত ভুমি রয়েছে জরিপের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কিছু কিছু পাহাড়ী যেমন প্রতারণার মাধ্যমে বাঙ্গালীদের ভুমি দখল করেছে তেমনি সবচেয়ে বেশী ভুমি সমস্যা বাঙ্গালী এলাকায়। খোদ রাঙামাটি জেলায় ভুমির পরিমাপ ও সীমানা সংক্রান্ত সার্কেল চীফ,পৌরসভা,জেলাপ্রশাসক ও আদালতে প্রায় ৫ হাজারের অধিক মামলা রয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরো দেখুন:

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

পাহাড়ে অপহরণ-মুক্তিপণ খেলা!

wadud bhuyan

ওয়াদুদ ভূইয়া

অবশেষে গতকাল ১৭ জুলাই ২০১৪ খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা থেকে অপহৃত চার শ্রমিক উদ্ধার। অপহরণের ১১ দিন পরে অপহরণকারীদের থেকে জেলার ব্যাঙমারা এলাকায় সেতু উন্নয়ন প্রকল্পের অপহৃত চার বাঙ্গালী শ্রমিককে উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী।

সিন্ধুকছড়ি জোনের আওতাধীন কংসীমুড়া প্রাক্তন সেনা ক্যাম্প এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার রাত পৌন ৯টার দিকে তাদেরকে উদ্ধার করা হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। উদ্ধারকৃতরা হলেন- বুলডোজার চালক রাজু মিয়া, বুলডোজারের হেলপার হাসান মিয়া, মো. ফারুক মিয়া ও লিয়াকত আলী।

এখানে পার্বত্য অঞ্চলের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বযুক্ত মহলের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন:

. পাহাড়ের এই গরিব মানুষগুলো অপহরণ করলো কারা, করে আসছে কারা? তাদের সাংগঠনিক বা সামাজিক পরিচয় কি বের করা হয়েছে? সরকার/প্রশাসন তা প্রকাশ করেছে? তাদের নামে কি কোন মামলা নেয়া হয়েছে? যদি এসব না করা হয়ে থাকে, তাহলে কেন করা হয়নি? ভাসুরর নাম নিতে বাধা কোথায়? নাকি ভাসুরপোকে মাঝে মাঝে নিজের পো মনে হয়? নাকি নিজের পো’র মত করে লালন পালন করা হয়?

আজ সময় এসেছে পার্বত্যবাসী তা জানতে চায় এবং পার্বত্যবাসী তা সন্দেহের দৃষ্টিপথে ভাবছে! যা বিগত ৪০ বছরও ভাবার বা অনুভবযোগ্য মনে করেনি! কিন্তু আজ কেন করবে তাও দায়িত্ববানদের বিবেচনায় নেয়া দরকার। কারণ সংবাদে বলা হয়েছে অপহৃতদের উদ্ধার করা হয়েছে ঘেরাও দিয়ে, আবার কেউ কেউ বলছে এদের উদ্ধারের পেছনে স্থানীয় সরকারী দলের লালিত এক মেয়রের মাধ্যমে অপহৃতদের প্রকল্প কোম্পানি থেকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অপহৃতদের মুক্তি দিয়েছে অপহরণকারীরা।

এখন প্রশ্ন হলো কোনটি সত্য? অন্যদিকে কেউ বলছে অপহরণকারীরা ইউপিডিএফ, আবার কেউ বলছে জেএসএস। আমি জানতে পেরেছি অপহরণকারীরা হচ্ছে ‘জেএসএস (সংস্কার)। পাহাড়ে আগে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদা আদায়, হত্যাকারী ছিল শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক দল। আর এখন তা দাঁড়িয়েছে তিনগ্রুপে। এখন তিনগ্রুপই অপহরণ, চাঁদা আদায় ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এই সন্ত্রাসের শিকার পাহাড়ের নিরীহ, নিরস্ত্র পাহাড়ি – বাঙ্গালী সবাই। জেএসএস-এর এক সময়ের ছাত্র সংগঠনের নেতার হাত ধরে, বর্তমানে ইউপিডিএফ শক্ত অবস্থান নিয়েছে। জেএসএস-এর শীর্ষ নেতাদের একসময়কার সহকর্মীরা ওয়ান-ইলেভেনে জাতীয় রাজনৈতিকদলগুলোর সংস্কারপন্থী গ্রুপের অনুকরণে এবং পার্বত্য অঞ্চলের ওই সময়কালের ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহবর্ষণে বা নির্দেশনায় জেএসএস (সংস্কার) নামে পাহাড়ে তৃতীয় আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

বর্তমানে এই তিনটি আঞ্চলিক অস্ত্রধারী দল পাহাড়ে, আবার দেশের বাহিরে নিজেদেরকে গ্রুপভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে পরিচয় দিয়েও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে। এই তিনগ্রুপের নির্যাতনের লক্ষ্যই হলো নিরস্ত্র বাঙ্গালী -পাহাড়ি বিশাল জনগোষ্ঠী। মনে হয় যেন, রাষ্ট্র এই জনগোষ্ঠীর সাথে নাই, বরং অনেকটা সহানুভূতিশীল অস্ত্রধারী ক্ষুদ্র গ্রুপগুলোর পক্ষে।

17.07.2014_Matiranga Labour Recover Pic-03

. অপহৃত চারজনকে উদ্ধার করা হলো, খুবই খুশির খবর। কিন্তু অপহরণকারীদের মধ্যে থেকে একজনও ধরা পড়লো না! অতীতে কি উল্লেখযোগ্য কোন অপহরকারী আটক হয়েছিল? হয়ে থাকলে তাদেরকে কি বিচারের আওতাভুক্ত রাখা হয়েছে? আমার জানামতে তেমন উল্লেখযোগ্য কেউ নেই। তাহলে কি কারনে অপরাধীদেরকে তাদের অপকর্ম সহজতর করে দেয়া হচ্ছে? এতে কি এই অপহরণ, গুম, হত্যা ইত্যাদি দীর্ঘপথে নিয়ে যেতে রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা রাখছে না? কেউ কেউ মনে করে, রাখছে। নিকট আগামীতে রাষ্ট্রকেই এ আঘাতজনিত ব্যথাহত হতে হবে। এটা আমাদের সবাইকে ভেবে দেখা জরুরি।

. আমাদের জানতে ইচ্ছে করে প্রায় ৫-৬ মাস আগে খাগড়াছড়ি সদরের ভূয়াছড়ি থেকে অপহৃত শিশু শহিদুলকে কেন আজও উদ্ধার করা হলো না? বা উদ্ধারকাজ চলছে কিনা? কিন্তু ওই শিশু অপহরণের পর মহালছড়ি-রাংগামাটি সড়কে অপহৃত রাংগামাটির বিশিষ্ট শিল্পী ও দেশের বড় আমলার মেয়ের পাহাড়ি জামাই হওয়াতে তাকে দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হল। কিন্তু বাঙ্গালী শিশুটি কি গরিব ঘরের সন্তান বা সরকার দলের কোন মদদপুষ্ট মেয়রের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকার বিনিময় করতে পারেনি বলে শিশুটির ভাগ্যে কি ঘটেছে আজও তার মা-বাবা ও পার্বত্যবাসী জানতে পারছে না? তাহলে এখানে দায়িত্বশীলদের ভূমিকা কই? তাহলে কি শুধু অর্থ ও মুক্তিপনের বিনিময়েই আমাদের মুক্তি হবে,বছরের পর বছর?

. আজ পাহাড়ের সাধারণ নাগরিক তথা নিরস্ত্র পাহাড়ি -বাঙ্গালীরা জানতে চায়, কবে আর কতকাল পরে পাহাড়ে শান্তি স্থাপন হবে। হবে নাগরিকদের বসবাসযোগ্য একটু স্বাধীন ভূমি? আমার দীর্ঘদিন পাহাড়ে কাজ করে একটা বিষয়ে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, পাহাড়ের সাধারন নাগরিকরা সত্যিই শান্তিতে বসবাস করতে চায়, সমঝোতা ও সহাবস্থান চায়। চায় শান্তি ও উন্নয়ন এবং এই অস্ত্রহীন পাহাড়ি – বাঙ্গালীরা সত্যিকারভাবেই এই সন্ত্রাসী অস্ত্রধারী চাঁদাবাজদের পতন চায়। এখন দরকার সকল মহলের আন্তরিক ইচ্ছা, যা কিনা সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাবে, যা হলে এই চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে রুখে দেয়া খুব কঠিন নয়। এ অবস্থায় পাহাড়বাসীর পক্ষে এ বিষয়ে আমি সকলের শুভ ইচ্ছাময় ভূমিকা কামনা করছি।

লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, ও সাবেক চেয়ারম্যান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড

সিএইচটি কমিশনের উপর হামলা কেন?

Rangamati pic-05-07-14-1

গাজী সালাউদ্দীন

গত ৪ ও ৫ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সিএইচটি কমিশনকে সাধারণ জনতা কর্তৃক প্রতিরোধের ঘটনা বিভিন্ন মহল যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুক না কেন, প্রকৃতপক্ষে এটি নিছক একটি হামলা কিংবা আকস্মিক কোন ঘটনা নয়। এটি ছিল শাসন ও শোষণের  বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষের দীর্ঘ দিনের পূঞ্জিভুত  ক্ষোভ ও অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ। উপজাতীয় অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা এবং উক্ত কমিশনের একপেশে আচরণের বিরুদ্ধে বাঙ্গালীদের এক বজ্রদীপ্ত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।

 

সিএইচটি কমিশন কি, কিংবা এর কার্যক্রম ও উদ্দেশ্যই বা কি- এ সর্ম্পকে দেশবাসী এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামেরও অধিকাংশ মানুষের অজানা। যতদূর জানা যায়, সিএইচটি কমিশন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কমিশন হলো  আন্তর্জাতিক মহলের একটি বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে  গঠিত একটি কমিশন, যার কো চেয়ারম্যান হলেন বৃটিশ আইন সভার একজন লর্ড। যার কিনা সাম্প্রতিক সময়ে গঠিত পূর্ব  তিমুর এবং দক্ষিণ সুদান রাষ্ট্র গঠনে বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে। এমনকি এই কমিশনের বাংলাদেশ থেকে নিযুক্ত  অন্যান্য সদস্যরাও বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে বিতর্কিত।

এই কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য যাই থাকুক না কেন, অতীত ইতিহাস ও বিগত বছরগুলোতে এর কার্যক্রম ও আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম সর্ম্পকে তাদের ভুমিকা যে একপেশে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, রাষ্ট্রবিরোধী তা বুঝতে বড়মাপের কোন গবেষক অথবা বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। সচেতন লোক মাত্রেই এটিই উপলদ্ধি করতে পারবেন।

ইতিহাসের পাতা থেকে যতদূর জানা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলার অবিচ্ছদ্য অংশ ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই একটি গোষ্ঠির রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসী মনোভাব এবং আমাদের সরকারগুলোর অদূরদর্শী পার্বত্যনীতির কারণে সেখানে অসংখ্য মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে। বলাবাহুল্য, এর সবগুলোই পরিচালিত  হয়েছিল একটি  বিশেষ গোষ্ঠী কর্তৃক, যা সম্ভব হয়েছিল আমাদের  পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের প্রত্যাক্ষ সহযোগিতায়।

পার্বত্য এলাকার এই উত্তপ্ত  পরিস্থিতিতে কতগুলো গণহত্যা হয়েছিল অথবা কী পরিমাণ লোকজন নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার সঠিক পরিসংখ্যন না থাকলেও ধারণা করা হয় প্রায় ৪০ হাজারের অধিক বাঙ্গালী (যাদের অধিকাংশই সরকার কর্তৃত পূনর্বাসিত) এবং অসংখ্য সেনা, বিডিআর, আনসার, পুলিশ শহিদ হয়েছিল। উপজাতীরা যে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এমনটি নয়। বিভিন্ন সময়ে সংগঠিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসংখ্য পাহাড়িরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যাহোক, সবকিছু মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যু। পার্বত্য চট্টগ্রামের এরূপ নাজুুক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কুচক্রি  মহল। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সিএইচটি কমিশন তাদেরই একটি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪০ বছরের ইতিহাসে সেখানে বাঙ্গালীরাই বেশি আক্রান্ত জাতি। অথচ এ  ব্যাপারে কমিশনকে কখনো দুঃখ প্রকাশ করতে কেউ শোনেনি।

কিন্তু একজন উপজাতী কোনভাবে দুর্ঘটনার স্বীকার হলেই এরা বৈঠক, সেমিনার, প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বর্হিঃবিশ্বে বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। যার ফলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও শান্তির মূর্ত প্রতীক সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয়। ‘Life is not ours’ এর ধারাবাহিক প্রকাশ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সতরাং সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম যে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এতে কোন সন্দেহ নাই।

এই সংগঠনের আরেকটি বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য- সেটি হলো ‘আদিবাসী’ শব্দের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার। এরা কথায় কথায় এবং এদের অফিসিয়াল বিভিন্ন ডুকুমেন্টস-এ  পার্বত্য চট্টগ্রামে  বসবাসকারী  উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে আদিবাসী বলে উল্লেখ করে। যেখানে বাংলাদেশ সরকার আদিবাসী শব্দের ক্ষতিকর প্রভাব বুঝতে পেরে বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শব্দটি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে- সেখানে এই কমিশনের গায়ের জোরে আদিবাসীর শব্দের ব্যবহার রাষ্ট্রদ্রোহীতার শামিল। আদিবাসী ইস্যু একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের  জন্য কতটা হুমকি স্বরূপ তা সকলেরই জানা আছে।

যাহোক, সম্প্রতি যে বিষয়টি নিয়ে এই কমিশন গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে তা হলো  গত ৪ জুলাই খাগড়াছড়িতে ও রাঙ্গামাটিতে উদ্দেশ্ মূলক সফর এবং জনগণ কর্তৃক প্রতিরোধের চেষ্টা। এই কমিশনের পার্বত্য এলাকা সফরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বাঙ্গালী ভিত্তিক সংগঠনগুলো অবরোধের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু অবরোধ উপেক্ষা করে কমিশন খাগড়াছড়ি সফরকালে বিতর্কিত কর্মকান্ডের জন্য  হাজার হাজার  বাঙ্গালীর জুতা নিক্ষেপের শিকার হয়। পরদিন  গোপনে রাঙ্গামটি সফরকালে সেখানেও সাধারণ বাঙ্গালীদের প্রতিরোধের মুখে পরতে হয় তাদের। সেখান থেকে ফিরে গিয়ে কমিশনের কো-চেয়ারম্যান একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন, পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালীরাতো অনেক পিছিয়ে আছে। তাহলে তারা এত শক্তি পেল কোথায় ?

এর উত্তর হতে পারে মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সে বাঁচার জন্য সর্বশেষ চেষ্টাটাই করে। এক্ষেত্রেও  কাজটি  তেমনি  হয়েছে। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে মানুষ যুগযুগ ধরে দেখে এসেছে- এদের মুখ থেকে ঠিক এর উল্টোটা শোনা যায়।

পাহাড়ে  বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা অর্ধেক বাঙ্গালী। অথচ বিভিন্ন  রাষ্ট্রিয়  সুবিধা দেওয়া ফলে শিক্ষা, চাকুরী সামাজিক, রাজনৈতিক  ইত্যাদি ক্ষেত্রে উপজাতীরা অনেক  অগ্রসর, পক্ষান্তরে চরম বৈষম্যর শিকার বাঙ্গালীরা রয়েছে প্রায়  শূন্যর কোঠায়।  বাঙ্গালীরা সেখানে দুমুঠো ভাত খাওয়া জন্য দিবা-রাত্রি সংগ্রাম করতে হচ্ছে। মোট কথা উপজাতি- বাঙ্গালীদের মধ্যে সেখানে রাজা-প্রজা  সর্ম্পক বিদ্যমান। সেখানে যদি উল্টো বাঙ্গালীদেরকেই  নির্যাতনকারী, জবর দখলকারী হিসেবে কেউ উল্লেখ করে সেক্ষেত্রে  বাঙ্গালীদের আবেগে  খোঁচা লাগতেই পারে। কাজেই এই ধরনের প্রতিরোধ অস্বাভাবিক  নয়।

এখানে বাঙ্গালীদের জেএসএস- ইউপিডিএফের মত  কোন সশস্ত্র সংগঠন নাই। তাদের অস্ত্রের  জোর নাই। চাঁদাবাজির অর্থ নাই যা দিয়ে কমিশনের লোকদের ম্যানেজ করতে  পারবে।  তাই বিক্ষোভ প্রদর্শন করে  জুতা  নিক্ষেপ করে  প্রতিবাদই  তাদের সবচেয়ে  বড় ও  চুড়ান্ত প্রতিবাদ। রাঙ্গামাটিতে গাড়ি বহরে হামলার কারণ অনুসন্ধান করতে  গিয়ে গণমাধ্যম কর্মিদের চোখে  সিএইচটি  কমিশনের পক্ষপাতমুলক আচরণ ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি  উঠে আসে। এই সম্পর্কে বিভিন্ন  প্রশ্নোত্তরে তারা সঠিক  জবাব দিতে পারেনি  এবং অনেক কিছুই কৌশলে  এড়িয়ে গেছে। এ সময় তারা  কিছুটা নরম স্বরে  বাঙ্গালীদের  সাথেও আলোচনা প্রস্তাব দিয়েছেন বলে দাবী করেন। কিন্তু  বাস্তবে এটিও ছিল একটি চরম মিথ্যাচার।

আদৌ এই কমিশনের জন্মলগ্ন থেকে অদ্যবদি পার্বত্য বিষয়ে কোন বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দের  সাথে আলোচনার ইতিহাস  নাই। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি লোক বাঙ্গালী  (যাদেরকে কমিশন সেটেলার  সন্ত্রাসী বলে  আখ্যায়িত করেছেন)। এখানে  বসবাসরত দুইটি পক্ষের  মধ্যে একটি পক্ষ নিয়ে কাজ করতে  আসবেন  এবং  অপর  পক্ষটিকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে  চাইবেন তখন  এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।

সুলতানা কামালের দল খাগড়াছড়ি ত্যাগ করার দুই দিন পর ৪ জন বাঙ্গালীকে  উপজাতী  সন্ত্রাসীরা অপহরণ করেছে। আজ এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল,  কই এই ঘটনা নিয়ে তো  তাদের কেউ বিবৃতি  দিলো না। কোন কমিশন নিন্দা জানালো না। অথচ আবুুল  মকসুদের মত ব্যাক্তিরাও ঢাকায় বসে বাণী ছাড়ে-পার্বত্য অঞ্চলে কথা বলার  স্বাধীনতা নেই!  হ্যা, মকসুদ সাহেব ঠিকই বলেছেন, সেখানে কথাবলার  স্বাধীনতা নেই। তবে এই কথাটিই পাহাড়িদের  নয় বাঙ্গালীদের জন্য প্রজোয্য।

পরিশেষে  সিএইচটি কমিশনের উদ্দেশ্যে পার্বত্য  বাঙ্গালীদের পক্ষ থেকে একটি কথাই বলতে চাই, সত্যিকারার্থে  যদি পার্বত্য  এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে একটি  পক্ষের স্বার্থকে বাদ দিয়ে নয় বরং বসবাসকারী সকল মানুষের মানবিক অধিকারের দিকে  দৃষ্টি  দিয়ে কাজ করুন। তবেই স্থায়ী  শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। 

হঠাৎ আলোচনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম

gen ibrahim

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

পাঁচ-ছয় দিন আগে, চিটাগং হিলট্রাক্টস কমিশন নামক একটি সংস্থার পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধি দল রাঙ্গামাটি শহরে গিয়েছিল। উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে রাঙ্গামাটি শহরের একাধিক বাঙালি সংগঠন সেই কমিশনের গাড়িবহরকে বাধা দেয় এবং মিডিয়ার রিপোর্ট মোতাবেক, গাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন সুলতানা কামাল। আরেকজন ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিক ও আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের কন্যা স্বনামখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন।

এ ঘটনার পর পত্র-পত্রিকায় কিছু কিছু লেখালেখি হয়েছে, কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলে টকশো অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক কলাম লেখক বা সংবাদদাতা বা টকশো আলোচক এ বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। রমজানুল মোবারকের সীমাবদ্ধতার কারণে আমি টকশোতে যেতে পারিনি। কিন্তু মন্তব্যগুলো শুনে কিছু না বলতে পারলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। ৭ জুলাই রাত ১১টা থেকে ১১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত যমুনা টিভিতে টকশো ছিল। আলোচক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (সাবেক নির্বাচন কমিশনার) এম সাখাওয়াত হোসেন, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল এবং ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন। সেখানে মোবাইল ফোনে চার মিনিট কথা বলেছি। স্বাভাবিকভাবেই সেটা ছিল অসম্পূর্ণ কথা। ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন এবং অধ্যাপক মেসবাহ কামালের অনেক মন্তব্য লাখ লাখ মানুষ শুনেছে, কিন্তু আমি উত্তর দেয়ার সুযোগ পাইনি। এ নিয়ে কোনো নালিশ নেই। কিন্তু কিছু কথা বলে রাখা বাঞ্ছনীয়, তাই এ কলাম লেখা।

আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বড় বই লিখেছি, বইটি অথেনটিক এবং প্রামাণিকভাবেই নির্ভুল। কারণ সেটা সরেজমিন অভিজ্ঞতালব্ধ। বইয়ের নাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন। প্রকাশক মওলা ব্রাদার্স। কিন্তু বই সবার পক্ষে পড়া সম্ভব হয় না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটি কলাম লিখব বহুল প্রচারিত যুগান্তর পত্রিকাতেই। কিন্তু কলামের আকার সংক্ষিপ্ত হতেই হবে। তাই এ কলামের চারগুণ বর্ধিত অংশ পাওয়া যাবে আমার ওয়েবসাইটে। যে কোনো আগ্রহী ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই সেটা পড়তে পারবেন। ওয়েবসাইট ঠিকানা ইংরেজিতে এইরূপ: www.generalibrahim.com. আজকের কলামটি সূচনামূলক।

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পাঁচটি জেলার নাম হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান। শেষের তিনটি জেলা ভূ-প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়ি বা পার্বত্য অঞ্চল। এ পাঁচটি জেলা সম্মিলিতভাবে একটি জেলা ছিল ১৮৬০ সাল পর্যন্ত। ১৮৬০ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশকে তথা পাহাড়ি বা পার্বত্য অংশকে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার একটি আলাদা জেলা হিসেবে চিহ্নিত করে। ওই জেলার নাম দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম। ১৯৮৪ সালে ওই একটি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা ভেঙে তিনটি করা হয়- রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্ব উত্তর-পশ্চিম অংশে, মোটামুটি খাগড়াছড়ি জেলা নিয়ে হচ্ছে মং সার্কেল এবং সেই সার্কেলের চিফ বা প্রধানের পারিবারিক ও প্রশাসনিক সদর দফতর হচ্ছে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি নামক একটি জায়গায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাংশে মোটামুটি রাঙ্গামাটি জেলা নিয়ে চাকমা সার্কেল এবং সেই সার্কেলের চিফ বা প্রধানের পারিবারিক ও প্রশাসনিক সদর দফতর হচ্ছে রাঙ্গামাটি শহরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাংশে মোটামুটি বান্দরবান জেলা নিয়ে হচ্ছে বোমাং সার্কেল এবং সেই সার্কেলের চিফ বা প্রধানের পারিবারিক ও প্রশাসনিক সদর দফতর বান্দরবান শহরে। সার্কেল চিফ বা প্রধানদের ঐতিহ্যগতভাবে রাজা বলা হয়। যেমন- চাকমা রাজা, বোমাং রাজা ও মং রাজা। কিন্তু তারা ইংরেজি পরিভাষায় কিং নয়। উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান এ তিনটি আলাদা আলাদা জেলা হলেও, সমগ্র ভূখণ্ডটিকে এককথায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বলে অভিহিত করা হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৭১ সালে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ যেখানে জোয়ারের পানির মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল, সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী ক্ষীণভাবে যুক্ত ছিল এই যুদ্ধে। উপজাতীয় জনগণের পক্ষ থেকে যারাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন অথবা রণাঙ্গনে অংশ নিয়েছেন তারাই সুনামের সঙ্গে কাজটি করেছেন। তারা অবশ্যই স্মরণীয়। তবে বৃহদাংশ কেন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল তার অনেক কারণ আছে, যা এখানে আলোচনা করছি না। অতি চমকপ্রদ তথ্য হল, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের পক্ষের শক্তির স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় (অর্থাৎ বর্তমানে বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাগরিক, ১/১১ সরকারের অন্যতম বিশেষ উপদেষ্টা ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়ের সুযোগ্য পিতা)। রাজা ত্রিবিদ রায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর দুএকদিন আগে-পরে, গোপনে পার্বত্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করে পাকিস্তান পৌঁছে যান। দুই বছর আগে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূত অথবা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অথবা মন্ত্রী মর্যাদার নাগরিক ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি অবিচার করা হয়েছিল, আমি দৃঢ়ভাবে তা বিশ্বাস করি। নতুন স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণ কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি-দাওয়া নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেন-দরবার করেন। এতে বিশেষ সাফল্য আসেনি। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৭২ সালে গোপনে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল যার নাম পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ১৯৭৩ সালে এ দলের একটি সশস্ত্র অঙ্গ সংগঠন সৃষ্টি করা হয় যার নাম শান্তিবাহিনী। শান্তিবাহিনীকে সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রদান করেছিল প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এই শান্তি বাহিনী ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের ভূখণ্ডকে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক-সামরিক যুদ্ধ (ইংরেজি ভাষায় ইনসার্জেন্সি) শুরু করে। তাদের কিছু দাবি-দাওয়া ছিল যেগুলো বিবেচনাযোগ্য বলে আমি মনে করি।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর নতুন সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার উদ্যোগ না নিয়ে তারা যুদ্ধ শুরু করে। তারা মনে করেছিল, রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এখন (১৯৭৫-৭৬ সময়ে) অস্থিতিশীল, অতএব জোরে ধাক্কা দিলে দাবি আদায় সম্ভব। ওই আমলের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম পার্বত্য চট্টগ্রামে বারবার গমন করেন, উপজাতীয় নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেন, গঠনমূলক বহুবিধ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং বারবার আহ্বান জানান এই মর্মে যে, আসুন, আলাপ-আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করি। দুঃখের বিষয় হল, আলাপ-আলোচনা হয়নি। তখন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার জন্য এবং সামরিকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য, সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল দরিদ্র বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সেখানে বসতির অনুমতি দেয়া হবে।

পৃথিবীর অন্যান্য অনুরূপ যুদ্ধবহুল জায়গার মতো (অর্থাৎ ইংরেজি পরিভাষায় ইনসার্জেন্সি এবং কাউন্টার ইনসার্জেন্সি যেখানে বিরাজমান সেইরূপ জায়গায়) পার্বত্য চট্টগ্রামে দরিদ্র বাঙালি জনগণকে বসতি স্থাপন করতে দেয়ার কাজটি বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের কাছে, প্রশাসনের কাছে এ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভূমিকা এবং মূল্য অপরিসীম। স্থানের অভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলেও, আমি মন্তব্যটি করে রাখতে চাই যে, বাঙালি জনগণ না থাকলে ইনসার্জেন্সি তথা শান্তিবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধ অন্য নেতিবাচক দিকে মোড় নেয়ার আশংকা ছিল শতভাগ। অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার বাঙালি শান্তিবাহিনীর আক্রমণে মারা গিয়েছে ১৯৯০ সালের পূর্ব পর্যন্ত। ওই পরিমাণ না হলেও বেশ কিছু উপজাতীয় জনগোষ্ঠীও মারা গিয়েছে। উপজাতীয় জনগণ মারা যাওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ দ্বিবিধ। এক কারণ হল, বাঙালির সঙ্গে সংঘর্ষ। আরেকটি কারণ হল শান্তিবাহিনী কর্তৃক আক্রমণ। যেসব উপজাতীয় জনগণ সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করতেন বা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন, তাদের শান্তিবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করত, এমনকি গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দিত।

১৯৮৮ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে, বিশেষত খাগড়াছড়িতে, অতি অল্পভাবে রাঙ্গামাটিতে, প্রায় ২৬ হাজার বাঙালি পরিবার গুচ্ছগ্রামে থাকছে এবং তাদের দৈনন্দিন রেশনের চার ভাগের এক ভাগ সহযোগিতা সরকার থেকে পাচ্ছে। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি বহুলাংশে বাস্তবায়িত হওয়ার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি জনগণ শান্তিচুক্তিকে গ্রহণ করেনি। শান্তিচুক্তিতে এমন কিছু বিধান আছে, যেগুলো তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও শান্তিবাহিনীর নেতারা কৌশলগত উদ্দেশ্যে ছদ্মবেশে সন্নিবেশ করেছে।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার চৌদ্দ বছর পরও সেখানে সংঘাত, চাঁদাবাজি, গুম-হত্যা, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বন্ধ হয়নি এবং বাঙালিদের ওপর নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে সুবিধাবঞ্চিত দরিদ্র অনগ্রসর উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর উপকার করার জন্য বেশকিছু বন্দোবস্ত নেয়া হয়েছিল। সেসব বন্দোবস্তের সুবাদে আজ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী দারুণভাবে অগ্রসর এবং তার বিপরীতে বাঙালি জনগোষ্ঠী দারুণভাবে অনগ্রসর। বাংলাদেশ সরকারের উপকারী মনোভাবের বদৌলতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী অনেকগুলো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করে, যেগুলো বাঙালিরা ভোগ করে না। ফলে বাঙালিরা অনগ্রসর। বাঙালিরা সেই অনগ্রসরতা কাটিয়ে ওঠার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক কিছু গোষ্ঠী এবং বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষপন্থী ও ভারতপন্থী গোষ্ঠী বাঙালিদের অগ্রসরতা চায় না। ষোলো কোটি বাঙালির দেশ বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই লাখ বাঙালি যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো জীবনযাপন করছে এটা সমতল ভূমির মানুষ জানে না, উপলব্ধিও করে না। মাঝেমধ্যে গণ্ডগোল হলে মিডিয়ার কারণে নজরে আসে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন।

এ কলামে স্থানের অভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আগ্রহী সচেতন পাঠকের মনে সৃষ্টি হওয়া অনেক প্রশ্নের আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। তাই আগ্রহী পাঠক, সম্ভব হলে আমার ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখবেন। আমি শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন তথা রিভিশন প্রস্তাব করেছি।

মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

রাঙামাটিতে কল্পনা চাকমা অপহরণের সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবী

পাহাড়ি নারী সংগঠনে বিভিন্ন কর্মসূচী পালিত

Kalpanaprogram,12June2014, kudukchari1

স্টাফ রিপোর্টার, রাঙামাটি: 

হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমা অপহরণের সুষ্ঠু বিচার ও দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি জানিয়ে রাঙামাটিতে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে, জেএসএস ও ইউপিডিএফ সমর্থীত কয়েকটি পাহাড়ি নারী সংগঠন।

বৃহষ্পতিবার সকালে কল্পনা চাকমা অপহরণের ১৮তম প্রতিবাদ দিবসে উপলক্ষে রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের যৌথ উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এসময় মহিলা সমিতির সভাপতি জরিতা চাকমার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা, বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট জুয়েল দেওয়ান, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমাসহ অন্যরা।

সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, অপহরণের ১৮ বছরেও কল্পনা চাকমার চিহ্নিত অপহরণকারী ও তার দোসরদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। অপহরণ ঘটনার প্রায় ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে ঘটনার বিষয়ে পুলিশের চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট পেশ করা হয়, যাতে অভিযুক্ত ও প্রকৃত দোষীদের সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ফলে বাদী কালিন্দী কুমার চাকমা ওই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদন দাখিল করেন। বক্তারা অবিলম্বে অপহৃত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালিন সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমার অপহরনের সুষ্ঠু তদন্ত ও এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবী জানান।

অন্যদিকে একই দাবীতে রাঙামাটি সদরের কুতুকছড়িতে প্রতিবাদ সমাবেশে ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থনপুষ্ট হিল উইমেন্স ফেডারেশন। সকাল সাড়ে ১০টায় বড়মহাপুরম উচ্চবিদ্যালয় গেট এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে কুতুকছড়ি বাজার ঘুরে যাত্রী ছাউনীর সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সদস্য কজলী ত্রিপুরা ও পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক বাবলু চাকমা। সমাবেশ পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রিনা চাকমা।

এছাড়া জেলার বাঘাইছড়ি সাজেকের গঙ্গারাম উজোবাজারে সাজেক ভুমিরক্ষা কমিটি ও সাজেক নারী সমাজের অফিসে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন পিসিপি সাজেক বিশেষ থানা শাখার সভাপতি রিপনজ্যোতি চাকমা। বক্তব্য রাখেন, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের সংগঠক ও সাজেক এলাকার সমন্বয়ক মিঠুন চাকমা, সাজেক ভুমিরক্ষা কমিটির সভাপতি জ্ঞানেন্দ বিকাশ চাকমা, উজোবাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি জ্যোতিলাল চাকমা, গণতান্ত্রিক যুবফোরাম সাজেক শাখার অর্থ সম্পাদক মিলন চাকমা প্রমুখ।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬সালের ১২জুন বাঘাইছড়ি উপজেলার পশ্চিম লাইল্যাঘোনা নিজ বাসা থেকে অপহরণ করা হয় কল্পনা চাকমাকে। 

দীঘিনালায় জোন সদরদপ্তর স্থাপন নিয়ে বিরোধ মেটাতে পাহাড়ী প্রতিনিধিদের সাথে বিজিবি’র বৈঠক

?????????????????????????????

স্টাফ রিপোর্টার:

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৫১ ব্যাটালিয়নের জোন সদর দপ্তর স্থাপন কার্যক্রমকে ঘিরে পাহাড়ীদের সাথে ভূল বুঝাবুঝি অবসানের লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেছে বিজিবি।

 

মঙ্গলবার সকালে বাবুছড়া বিজিবি’র জোন সদরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, হেডম্যান, কার্বারী এবং দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির নেতৃবৃন্দ। বৈঠকে প্রতিনিধিরা জানান, বিজিবির অধিগ্রহণকৃত ভূমি খাস। কিন্তু পাহাড়িরা তাদের প্রথাগত অধিকার মতে পাহাড়ের সব জমি তাদের- দাবীতে দখল ছাড়তে রাজি হয়নি। তবে স্থানীয়দের বুঝিয়ে বিষয়টি সুরাহা করার দায়িত্ব নিয়েছেন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা। তবু কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক বিবেচনায় তাদের ক্ষতিপুরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বিজিবি’র পক্ষ থেকে।

গত ১৫ মে বাবুছড়া বিজিবি জোন সদর দপ্তর স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এরপর থেকেই বিজিবি’র কার্যক্রম স্থগিতের দাবীতে দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির ব্যানারে মানববন্ধন, স্বারকলিপি প্রদানসহ কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে পাহাড়ীদের একটি অংশ।

সভায় স্থানীয়দের মতামত তুলে ধরে দেয়া বক্তব্যে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা, দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক পরিতোষ চাকমা, সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান প্রান্তর চাকমা। তারা বিজিবি’র সদর দপ্তর স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে জানান, অধিগ্রহনকৃত ভূমি খাস হলেও পাহাড়িরা প্রথাগত অধিকারের দাবীতে ভূমি না ছাড়ার দাবীতে আন্দোলন করছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেন তারা।

বৈঠকে বিজিবি’র জোন অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আবুল কালাম আজাদ জানান, দীঘিনালার নাড়াইছড়ি এলাকায় ভারতের সাথে বাংলাদেশের ১২৯ কিঃমিঃ সীমান্ত অরক্ষিত রয়েছে। তা বিজিবি’র নিয়ন্ত্রণে পাহারায় আনতে নতুন ব্যাটালিয়ন সৃষ্টি করেছে সরকার। ৩টি বাটালিয়ন ১২৯ কিঃ মিঃ সীমান্ত চৌকি পাহারা দেবে। এর মধ্যে বাবুছড়া ৫১ ব্যাটালিয়ন সীমান্ত এলাকায় বিওপি করে চৌকি দেবে ৪৭ কিঃ মিঃ সীমান্ত। সে লক্ষেই আইন-কানুন এবং নিয়ম নীতির মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে বিজিবি। কারো ক্ষতি সাধন করা বিজিবি’র কাজ নয়।

তিনি আরো জানান, অধিগ্রহনের জন্য প্রস্তাবিত জায়গার যে অংশ নিয়ে আদালতে রীট আবেদন করেছে সে জায়গা বাদ দিয়ে জেলা প্রশাসন বিজিবিকে জায়গা হস্তান্তর করেছে।

পাহাড়ে উপত্যকায় অসহায় বাঙালির কান্না

10155403_706022802772172_9049515200200666589_n

মনযূরুল হক ::

অসহায় বাঙালির কান্না পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। প্রতিবছর হাজারো মানুষ নিজেদের সুন্দর সময়গুলো কাটাতে পাহাড়কেই বেছে নেয় পর্যটনের জন্য তাদের প্রথম পছন্দ হিসেবে। কিন্তু মানুষ যেখানে যায় বিনোদনের জন্য, সেখানকার সেই পর্যটন অঞ্চলখ্যাত এলাকার মানুষেরা আসলে কতটা ‘আনন্দে’ আছে, তা সব সময়ই রয়ে যায় পর্যটকদের দৃষ্টির আড়ালে। পাহাড়ের বাইরে সাধারণ সমতল অঞ্চলে যেমন সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে, পার্বত্য অঞ্চলে সেটা সাদা চোখেই কেবল অনুমান করা যায়। নইলে ধর্মবর্ণ যাই হোক, শতবছরের ইতিহাসে নৈসর্গিক পাহাড় এমন এক বিভাজনের জন্ম দিয়েছে, যা কেবল ধর্মের দৃষ্টিতে নয়, মানবতার দৃষ্টিতেও অমার্জনীয় অপরাধ বলেই বিবেচিত হওয়ার কথা।

একই পাহাড়ের অলিন্দে বাস করলেও এবং কখনো কখনো একই বর্ণের দেখতে হলেও সেখানে রয়েছে অলঙ্ঘনীয় এক অন্তরায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ বলেই চিহ্নিত করা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। অথচ তা সংবিধানের ১৯ নং (সুযোগের সমতা), ২৭ নং (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ২৮ নং (ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য) অনুচ্ছেদের পরিষ্কার পরিপন্থি। এই বিভাজনই একই দেশের মানুষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর একটার পর একটা সংঘর্ষের জন্ম দিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ে। একসময় সেটা ‘ভূমিবিরোধ’ বলে চালিয়ে দেয়া হলেও ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে, আসলে এই ভূমিবিরোধের পর্দায় ঢেকে রাখা হচ্ছে অন্য এক রহস্য।

পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মুসলিম অধ্যুষিত দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে মুসলিম ওপর নির্যাতন চললেও পাহাড়ে চলছে সম্পূর্ণ অন্যরকম পরিস্থিতি। সেখানে শুধু যে মুসলিমরা অসহায় তাই নয়, বরং তাদের মানবেতর জীবনযাপন যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোকেও হার মানাচ্ছে।

ভূমিবিরোধের কথা
পাহাড়ি নেতাদের বক্তব্যে ‘শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভূমিহীনরা ভূমি ফিরে পাবে’ বলা হলেও ভূমিবিরোধ নিষ্পপত্তি আইনটি বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ে বাঙালিদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা বাঙালি সংগঠনগুলোর নেতাদের। যদিও সরকার বলছে, ভূমি নিয়ে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সংঘাত এড়াতেই ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ করা হয়েছে।

বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ে সৃষ্ট সংঘাতে প্রতিবেশীদেশ ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী, দুর্গম পাহাড়ে চলে যাওয়া পাহাড়ি এবং নিজ ভূমিতে পুনর্বাসনের সুযোগবঞ্চিত বাঙালিদের ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করতে পরপর চারটি কমিশন গঠন করা হয়, কিন্তু কোনো কমিশনই পাহাড়িদের বিরোধিতার কারণে কাজ শুরু করতে পারেনি। সর্বশেষ জুলাই ২০০৯ ভূমি কমিশন পুনর্গঠনের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ মীমাংসার জন্য সরকার জরিপ চালানোর উদ্যোগ নেয়। তবে জনসংহতি সমিতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠন, সুশীল সমাজ, তিনটি সার্কেলের প্রধানরা (তিন রাজাসহ) এটার বিরোধিতা করেন। কিন্তু এবার পাহাড়িরা বিরোধিতা না করলেও প্রতিবাদ করছে বাঙালিরা, বিশেষ করে পাহাড়ে বসবাসকারী বাঙালি মুসলিমরা।
পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিসমস্যা নিরসনে ২০০১ সালে প্রণীত আইনটি সংশোধনের জন্য ২৭ মে মন্ত্রিসভা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলে তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে বাঙালি সংগঠনগুলো। তবে ৩ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন (সংশোধন) ২০১৩ এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। ১৬ জুন কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধন) বিল ২০১৩ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়। উত্থাপনের পর বিলটি সাত দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ভূমিমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।

কী আছে কমিশনে?
সংশোধিত ভূমিনিষ্পত্তি আইনের ধারা ৬ (১) এর ক-তে আছে, পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমিজমা বিষয়ে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও অবৈধভাবে বন্দোবস্তি ও বেদখল হওয়া সমস্ত ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। বাঙালি নেতারা আশঙ্কা করছেন, সংশোধনী প্রস্তাবে ‘সমস্ত ভূমি’ শব্দসমূহ যুক্ত হওয়ার ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সরকারি ব্যবস্থাপনা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া সংশোধনীতে প্রচলিত আইন ও রীতির সঙ্গে ‘পদ্ধতি’ শব্দটি যুক্ত হওয়ায় ভূমির ওপর বাঙালিদের অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে। ধারা ৬ (১) এর গ-তে আছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল হয়ে থাকলে এবং বন্দোবস্তজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হতে বেদখল হয়ে থাকলে তার দখল পুনর্বহাল।

এখানে আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি বাস্তবায়িত হলে বাঙালিদের ফ্রিঞ্জল্যান্ডসহ (জলেভাসা জমি) অন্যান্য বন্দোবস্তে যেসব ভূমি দেয়া হয়েছে, তার মালিকানা হারাবে। এছাড়া পাঁচসদস্যবিশিষ্ট কমিশনের মধ্যে তিনটি সদস্যপদ পাহাড়িদের জন্য সংরক্ষিত এবং বাকি দুই সদস্যের মধ্যে একজন হলেন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও অন্যজন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার বা তার মনোনীত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। এক্ষেত্রে বাঙালিদের যৌক্তিক আশঙ্কা হচ্ছে, কমিশনে পাহাড়িদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিচারিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং সেইসঙ্গে প্রতিটি রায় বাঙালিদের বিপক্ষে যাবে। এছাড়া আইনে কমিশনের সচিব এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগের বিধান থাকায় বাঙালিরা সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ধারা ১০ এ আছে, কমিশন কর্তৃক আবেদন নিষ্পত্তির পূর্বে যেকোনো ন্যায্য বিচারের স্বার্থে আবেদনকারী তার আবেদন সংশোধন করতে পারবে। এর ফলে বিচারকাজ প্রভাবিত হওয়া ছাড়াও বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে।

গোড়ায় গলদ না আগায়?
১৯৭৫ সালের পরে পাহাড়ে গেরিলা গ্রুপ শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। ওই সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার বিদ্রোহ দমনে ব্যবস্থা নেয়। পাশাপাশি পাহাড়ে পাহাড়ী ও বাঙালি জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। সে লক্ষে সমতলের অনেক ‘সেটেলার’ পরিবারকে দুই একর আবাদি জমি ও পাঁচ একর পাহাড়ি জমি দেয়ার কথা বলে সরকারি উদ্যোগে তিন পার্বত্য জেলায় পুনর্বাসন করা হয়। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তিনি একটি পাহাড়ি একটি বাঙালি- এভাবে পুরো পার্বত্যাঞ্চলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার সুদূরপ্রসারী ইচ্ছা ছিলো- এভাবে দীর্ঘসময় ধরে পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করার ফলে তাদের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচে যাবে, সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পাবে এবং একসময় চিরকালের মতো বিরোধ-মীমাংসা তারা নিজেরাই করে নিতে পারবে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালিদের উপস্থিতি একান্তই জরুরি ছিলো। কেননা কেবল সেনাবাহিনী দিয়ে পার্বত্য এলাকার সীমান্ত রক্ষা সম্ভব নয়।

অভিযোগ রয়েছে, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বন্দোবস্তীর নিয়ম ভেঙে সেটেলারদের জমির কবুলিয়ত দেয়। এ কারণেই নাকি ভূমিবিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর এরশাদ সরকার এসে বাঙালিদের জন্য পূর্বের সরকারের বরাদ্দকৃত জমির কবুলিয়ত প্রত্যাখ্যান করে বিরোধ-মীমাংসার উসিলায় বাঙালিদের পাহাড় থেকে সরিয়ে এনে ছোট ছোট গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ করে ফেলে। সেখানে বাঙালিদের জন্য বন্দোবস্ত দেয়া হয় মাত্র এক একর করে অনাবাদি জমি। মূলত ভূমির বিরোধটা শুরু হয় সে কারণেই। এরপর থেকে বাঙালিরা পাহাড়ে পড়ে থাকা তাদের ৫ একর জমি ফিরে পেতে চাইলেও কোনো সরকারই সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। খালেদা জিয়ার সরকার হয়ে শান্তিচুক্তির পর শেখ হাসিনা, তারপর খালেদা জিয়া হয়ে আবারো শেখ হাসিনার সরকার এলো। কিন্তু এখনো আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে সেই গুচ্ছগ্রামবন্দি ৮ লাখ বাঙালি মুসলিমদের।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সইয়ের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা বিলুপ্ত শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই হাজার সদস্য। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু এরমধ্যে পাহাড়ে ভূমির সমস্যা সমাধান এখনো হয়নি।

সেনাদের প্রতি বিষোদগার
‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অশনি সংকেত! নামে ‘পাহাড়ি ব্যাটেলিয়ন’, আসল লক্ষ্য পাহাড়ি নিধন, সজাগ হোন সংগ্রামি জনতা’। সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি সেনাবাহিনীর নতুন ব্যাটেলিয়ন মোতায়েনকে কেন্দ্র করে পার্বত্য অঞ্চলের সবচে’ সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল খাগড়াছড়ির মহালছড়ি দীঘিনালাসহ পুরো পাহাড়ি অঞ্চলে সাঁটা এ ধরণের অসংখ্য পোস্টার। পোস্টারের নিচে লেখা আছে ‘গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম’ ও ‘ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি’সহ আটটি সংগঠনের নাম। এর মধ্যে উল্লিখিত দুটি সংগঠনের নেপথ্যে নামে বেনামে রয়েছে বিভিন্ন বাম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। বোঝা যায়, সেনা ক্যাম্প স্থাপনাকে নিয়ে কোন্দলে প্রকাশ্যই ঘৃতাহুতি দিচ্ছে বাম দলগুলো। পাহাড়ি অঞ্চলের সেনারা নিজেদের স্বার্থেই সবসময় পাহাড়িদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করলেও পাহাড়িরা সেনাদেরকে নিজেদের প্রতিপক্ষভাবে বরাবরই। পাহাড়ের পার্বত্য জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বান্দরবান জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বা ক্যবা মার্মা বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে কেন? অন্য কোনো জেলায় তো দরকার হয় না। সেনাবাহিনী কেন সমাধান হবে’? একই মনোভাব ব্যক্ত করেন রাঙামাটির শুভলং উপজেলার বাসিন্দা কলেজ ছাত্র সুপণ চাকমা। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে তারাই ( সেনাবাহিনী) অশান্তির কারণ হয়ে ওঠেছে পাহাড়ে বারবার। যে বিরোধের শুরু হয় সামান্য বাকবিতণ্ডা দিয়ে, তার শেষে রক্ত গড়ায় কেন? অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে যারা ব্যর্থ, তারা কীভাবে সীমান্ত রক্ষা করবে’?

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফেসবুক ও ব্লগেও বামঘেঁষা বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের পক্ষ থেকে পার্বত্য এলাকায় মোতায়েনকৃত সেনাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হচ্ছে। ‘বামপন্থা’ নামের একটি ওয়েবে দেখা গেছে, সেখানে ‘আদিবাসী’ নাম নিয়ে জনৈক ব্লগার লিখেছেন, এটি হচ্ছে সেনা কর্মকর্তাদের খুশি রেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বা ক্ষমতায় যাওয়ার ভোটবাজির এক বিচিত্র রাজনীতি। গণতন্ত্রের খোলসে পাহাড়ে বন্দুকের শাসন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা।

ভূমিবিরোধ নাকি মুসলিম বিরোধ?
বিরোধের ব্যাপারে সবসময় মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হয়ে থাকে যে, বিরোধ হয়েছে ভূমি নিয়ে। কিন্তু এই বিরোধ চলাকলীন সময়ে পাহাড়িদের হাতে যে অস্ত্র দেখা যায়, সেই অস্ত্র এলো কোত্থেকে- এমন প্রশ্ন সাধারণের মনে উঁকি দেয় হরহামেশাই। কেন বিরোধের পরে ধর্মীয় স্থাপনায় আঘাত করা হয়? আসলেই কি কেবল ভূমিবিরোধের ফলে সংঘর্ষের সৃষ্টি হচ্ছে, নাকি আরো কিছু জড়িয়ে আছে? সাপ্তাহিক লিখনীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ কিছু তথ্য।

পার্বত্য এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ ছাড়াও বিভিন্ন অবৈধ সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, অত্যাচার-নিপীড়নে প্রতিনিয়তই সেখানকার বাঙালিদের জীবনযাত্রা কাটছে অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থায়। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠীর অনেকেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ ১১টি উপজাতীয় গোষ্ঠীর যে কেউ চাইলেই রাজধানী ঢাকার লাক্সারিয়াস জোন গুলশান, বারিধারা কিংবা বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামের খুলশি, নাসিরাবাদে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, এপার্টমেন্ট ইত্যাদির মালিক হতে পারছে অনায়াসেই। অথচ কোনো বাঙালি মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও জমি কিনতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারে না।

এর সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোনো উপজাতীয় নাগরিকের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে বিশেষ উপজাতীয় কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সুবাদে বর্তমানে চাকমা উপজাতির মধ্যে শিক্ষার হার শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ। অন্যান্য উপজাতির শিক্ষার হার সমতল অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীর থেকেও অনেক বেশি। অথচ পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি মুসলমানদের জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কোটা কিংবা অন্য কোনো ধরনের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালি মুসলিমদের শিক্ষার হার কমতে কমতে বর্তমানে ২০ শতাংশেরও নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও উপজাতি বিশেষ কোটায় চাকরি লাভের সুযোগ রয়েছে অবারিত। এতে করে চাকরিতে যথেষ্ট হারে উপজাতি গোষ্ঠীর লোক সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমান নাগরিকরা এক্ষেত্রে সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত। শিক্ষিত এমনকি উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বেড়েই চলেছে সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে। কেবল চাকরিক্ষেত্রে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি, কৃষি-খামার, পোলট্রি থেকে শুরু করে হ্রদে মাছ শিকারের মতো যে কোনো পেশা নিয়েও পদে পদে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা এ ধরনের যে কোনো কাজে নিয়োজিত থাকতে গিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদেরকে মোটা অঙ্কের চাঁদা বা ট্যাক্স দিতে হচ্ছে।

নির্যাতনের শিকার নওমুসলিমরা
পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে উপজাতি জাতিগোষ্ঠীর নওমুসলিমরা। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পরে নিজেদের সমাজ গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেও রেহাই পাচ্ছে না তারা। জানা গেছে মুসলিম হওয়ার ফলে সামজের চাপের মুখে পড়ে অনেকেই পার্বত্য অঞ্চল ছেড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন সমতল জেলাস্থ মসজিদ ও মাদরাসায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ ও র‌্যাবে নিয়োজিত খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী উপজাতীয় সদস্যরা তাদের ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের পাশাপাশি থানায় সোপর্দ করে। পার্বত্যাঞ্চলের খ্রিস্টান মিশনারিদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সে হানা দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে থাকা উপজাতীয় সদস্যরা। সর্বশেষ গত ২ জানুয়ারি রাজধানীর বাসাবো এলাকার একটি মাদরাসায় হানা দিয়ে পুলিশ উপজাতি ৫ মুসলিম এবং তাদের ১১ সন্তানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা সেসময় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে কর্মরত কনস্টেবল লালমিয়া এ প্রতিবেদকের কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

এসব মুসলিম জানান, পাহাড়ে থাকলে চলে শান্তি বাহিনীর অত্যাচার আর নির্যাতন। অন্যকোথাও গেলেও আশ্রয় জোটে না আমাদের। কোনো মসজিদ কিংবা মাদরাসায় ঠাঁই নিলেও ভাগ্যে জোটে পুলিশ ও র‌্যাবের নির্যাতন। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে আমাদের কি বাঁচার অধিকারও নেই? ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর মিরপুরের একটি মসজিদ কমপ্লেক্সের পরিচালক আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। পার্বত্য এলাকায় বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার সদস্য খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে। অথচ উপজাতীয়দের মধ্যে কেউ স্বেচ্ছায় মুসলমান হলেই তার আর রক্ষা নেই। এদের রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১ জানুয়ারি রাঙামাটির সাংড়াছড়ি এলাকার মো. করিম হোসেন (পূর্বনাম হামাজং ত্রিপুরা), মো. নূর ইসলাম (পূর্বনাম সুবামং ত্রিপুরা) সহ উপজাতীয় ৫ মুসলমান তাদের ১১ সন্তানকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি মাদরাসায় ভর্তি করাতে ঢাকায় পাড়ি জমান। পরদিন বাসাবো আবুজর গিফারী কমপ্লেক্সে পৌঁছার কিছুক্ষণ পরই সবুজবাগ থানা পুলিশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে অভিভাবকসহ সব ছাত্রকে আটক করে নিয়ে আসে। পুলিশ জানায়, মুসলমান হওয়ার এফিডেভিটসহ যাবতীয় কাগজপত্র সঙ্গে না থাকায় তাদের বিষয়ে আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ফাউন্ডেশনের এককর্মকর্তা জানান, এফিডেভিটসহ মুসলমান হওয়ার সব কাগজপত্র পুলিশকে দেখানোর পরও পুলিশ তাদের সন্তানদের মুক্তি দেয়নি। বরং ঢাকায় ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি উদয় ত্রিপুরাসহ ১০-১২ জন উপজাতীয় তরুণ থানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথকভাবে দেনদরবার করে।

তিনি আরো জানান, ভিকটিম সেন্টারে আটক এসব ছাত্রছাত্রীকে খ্রিস্টানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য একটি ক্যাথলিক চার্চ থেকে চিঠিও দেয়া হয়েছে। ঢাকায় আশ্রয় নেয়া উপজাতীয় তরুণ একজন মুসলমান আল-আমীনের সঙ্গে লিখনীর এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় কোনো স্কুল কিংবা অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। কেবল খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি মিশনারি প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। বাধ্য হয়েই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এসব মুসলমান শিক্ষার্থীকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ অন্যান্য সংস্থা পরিচালিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের গ্রামের কাছাকাছি পাহাড়ের উপরে বিজিবির একটি ক্যাম্প রয়েছে। ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যদের আজানের আওয়াজ ও নামাজ দেখে আমাদের খুবই ভালো লেগে যায়। পরে শহরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাত করার পর তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি ঢাকায় আবুজর গিফারী ট্রাস্টসহ আরও কিছু সরকার অনুমোদিত সংস্থার ঠিকানা দেন, যারা ভিন্নধর্মাবলম্বীদের ইসলামিক রীতিনীতি শেখাতে সহযোগিতা করে। আমাদের অনুসরণ করে গ্রামের হেডম্যানসহ অনেকেই ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন।

এছাড়া অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্পূর্ণ ভিন্নরকম এক তথ্য। পাহাড়ে অনেকসময়ই বাঙালি ও পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রেমের ঘটনা ঘটে। যা কখনো কখনো বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু দেখা যায়, যেখানেই বাঙালি মেয়ে ও উপজাতি ছেলের বিয়ে হয়েছে, দু’একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া প্রতিক্ষেত্রেই বিয়ের সময় উপজাতীয়রা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হচ্ছে। তাদেরকে তাদের পরিবার আর মেনে না নিলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মুসলিমদের ধর্ম থেকে দূরে সরে যায় নি। এই আক্ষেপের ফলেও হয়তো সময়-অসময় বাঙালি মুসলিমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে- বলেছেন খাগড়া শহরের এক মাদরসা শিক্ষক। খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত উপজাতিদের বা চার্চের বিরুদ্ধে মুসলিমরা তেমন কোন অভিযোগ না করলেও মুসলিমরা হরহামেশাই নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে।

অভিযোগ আছে, মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত তিনটি পরিবারকে গত ২০১২ সালে ঢাকায় উপজাতি পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করিয়েছে পুলিশের তৎকালীন এডিশনাল আইজি (বর্তমান সচিব ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়নবোর্ডের এর চেয়ারম্যান) নব বিক্রম ত্রিপুরা। একই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক উপজাতি ছাত্রীকে অপহরণ করা হয়, সমতলের বাঙালি ছেলের সাথে প্রেম করার অপরাধে।

‘আদিবাসী’ তাই কদরের শেষ নেই
পার্বত্য এলাকায় বেড়াতে গিয়ে গভীরভাবে নজর করলেই একটি বিষয় প্রায় স্পষ্টভাবেই চোখে ধরা পড়ে। পাহাড়িরা একে তো অমুসলিম এবং দ্বিতীয়ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি হওয়ার সুবাদে সংখ্যালঘুতার দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করুণা পেয়ে আসছে সবসময়ই। সেক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিমরা অনেকটাই অসহায়। মুসলিমদের জন্য একটা এনজিও তো দূরে থাক, মসজিদ করে দেয়ার মতো লোকবল পাওয়া যায় না বললেই চলে। এরই সাথে পাহাড়িরা সর্বত্রই প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, তারা বাংলাদেশের সবচে’ পুরাতন জাতি তথা ‘আদিবাসী’। চাকমাদের মতে, বাঙালিরা সেখানে ‘সেটেলার’। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্তিক বিভাগের এক গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, বিরান পাহাড়ি ভূমিতে প্রথমে চাকমা তথা অন্য পাহাড়িরা বসবাস করতে শুরু করলেও প্রায় একই সময় বাঙালিরাও সেখানে বসবাস করতে শুরু করে। তবে তারা সংখ্যায় কম ছিল।

গবেষণায় জানা যায়, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা লুসাই জনগোষ্ঠির কেউই আদিবাসী নয়।
সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি উপজাতির মাত্র ৬ লাখ মানুষ ‘আদিবাসী’ দাবি করে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিতে চাওয়াটা কিছুতেই যৌক্তিক হতে পারে না। অথচ সরকার যেনো এখানে নিজেই তাদেরকে পরোক্ষ শেল্টার দিয়ে যাচ্ছে। গত টার্মে আওয়ামী সরকারের আমলেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপুমনি এ প্রেস কনফারেন্সে ‘বাঙালিদেরকেই আদিবাসী’ বলে উপজাতীয়দের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি বললেই খোদ সরকারের ভেতর থেকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেসময় নানা মহলের চাপে বিষয়টি আমূল চেপে যায় সরকার।

পাহাড়ী নেতা হিসেবে কোনো ধরনের নির্বাচন কিংবা দায়বদ্ধতা ছাড়াই সন্তু লারমা ১৯৯৯ সালের ১২ মে থেকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অথচ একটানা দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর এ দেশের রাষ্ট্রপতিও ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। সন্তু বাবু থাকছেন কোন আইন বলে? শান্তি চুক্তির পর থেকে ঢাকায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে বাসা ভাড়া থাকছেন, যার ব্যয় বহন করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্ট এইচ টি ইমাম বান্দরবানের এক মতবিনিময় সভায় যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি সেখানে বলেন, পাহাড়ে যেসকল পাহাড়িরা বসবাস করছেন, এখানে উন্নয়ন করেছেন, এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স¤পদকে ব্যবহার করে এই জেলাকে উঁচিয়ে রেখেছেন তাদের কোনো ক্ষতি হোক এটি আমরা কখনও গ্রহণ করতে পারি না। জননেত্রী শেখ হাসিনাও এটি কামনা করেন না, তিনি আপনাদের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত আছেন। এই ‘ক্ষতি’র মানে কি- সেটা এখন প্রায় স্পষ্ট।

পাহাড়ের বাঙালিদের ছাত্র সংগঠন পিবিসিপির খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা লিখনীকে বলেন, আমাদের এখানে সবসময়ই সরকার ও প্রশাসন পাহাড়িদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে। আমাদের ওপর পাহাড়িরা আক্রমণ চালানোর পরে আমরা থানায় মামলা নিয়ে গেলেও দেখা যায় উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের নেতৃত্বে আমাদের অঞ্চলে ভূমি বিরোধ নিরসনের জন্য এলেও কেবল পাহাড়িদের বাধার কারণেই সেটা সম্পন্ন করতে পারেন নি। অথচ মিডিয়া বলছে কেবল আমাদের প্রতিবাদের কথা।

পাহাড়ে মুসলিম বাঙালিদের দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সেখানকার মুসলিমরা সবসময়ই যেনো একটা ভয়ের মধ্যে বাস করছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও অনেকেই তা প্রকাশও করেছেন। অনেকেই বলেছেন, কোনোক্রমইে যেনো পত্রিকায় তাদের নাম প্রকাশ করা না হয়, তাহলে যেকোনো সময় তারা নির্যাতনের শিকার হতে পারেন। একই দেশের মধ্যে, যে দেশকে আমরা মুসলিম দেশ বলে প্রচার করে থাকি, আসলেই কি মুসলিম হিসেবে পাহাড়ের বাঙালি মুসলিমরা বসবাস করতে পারছেন? যারা এখনো সকল নির্যাতনের পরেও টিকে আছেন, তারাই বা কতদিন টিকতে পারবেন, জানেন না সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠি। মুসলিম হিসেবে না হোক অন্তত মানুষ হিসেবেও তারা যে মানবিক পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছেন, এর দায় কার- সে প্রশ্ন এদেশের নাগরিকদের অভিভাবক সরকার ও সমাজপতিদের কাছে রইলো।

সূত্র: সাপ্তাহিক লিখনী

 

আরও প্রবন্ধ পড়ুন

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ : প্রেক্ষাপট ও শান্তির সম্ভাবনা

আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বিতর্ক

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

পর্যটক ছদ্মবেশে মিশনারি কাজের অভিযোগে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করতে বাধ্য হলো ১২ দেশি- বিদেশি নাগরিক

পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash

 মেহেদী হাসান পলাশ

২০১৪ সালের প্রথম চতুর্ভাগে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় দুটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের ফলাফলের জাতীয় প্রবণতার সাথে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের ফলাফল ভিন্নতর। সেটা শুধু স্রেফ ভিন্নতা নয়, এর সাথে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, জাতীয়তা, সংবিধানসহ নানা বিষয় জড়িত হয়ে পড়েছে।সে কারণে এ ভিন্নতাটি বিশেষভাবে আলোচনার দাবী রাখে।

৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট বয়কট করেছিল।নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল শাসকদল আওয়ামী লীগ, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(সংস্কারপন্থী) ও ইউপিডিএফ। সে নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি আসনের মধ্যে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে আওয়ামী লীগ এবং রাঙামাটিতে জেএসএস(সন্তু) প্রার্থি জয়লাভ করেছে।অভিযোগ রয়েছে রাঙামাটিতে বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামীলীগ প্রার্থিকে পরাজিত করাতে জেএসএস প্রার্থির পক্ষে গোপনে কাজ করেছে ও ভোট দিয়েছে। জেলা বিএনপি’র শীর্ষনেতা এ ব্যাপারে জোরালো ভুমিকা রেখেছেন বলে আওয়ামী লীগের তরফেও অভিযোগ করা হয়েছে। একইভাবে খাগড়াছড়ি আসনেও বিএনপির বিপুল পরিমাণ সাধারণ ভোটার ইউপিডিএফ প্রার্থি প্রসীত বিকাশ খীসাকে ভোট দিয়েছে বলে দাবী করা হয়েছে। যদিও প্রসীত বিকাশ খীসা পরাজিত হয়েছেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী শাসক দলের প্রার্থি কুজেন্দ্রলালের বিজয় নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে জেলাবাসীর মনে। তারা মনে করে নির্বাচনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা না থাকলে এখানেও ভোটের ফলাফল ভিন্নতর হতে পারতো।  

অন্যদিকে ৪র্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩টি, বিএনপি ৭, জামায়াত ১, ইউপিডিএফ ৪, জেএসএস(সন্তু) ৮ ও জেএসএস(সংস্কার) ২টি পদে বিজয়ী হয়েছে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, তিন পার্বত্য জেলার ২৫টি উপজেলা আসনের মধ্যে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো ১১টি আসনে এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো ১৪টি আসনে জয়লাভ করেছে। অর্থাৎ ৬০ ভাগেরও বেশী উপজেলা আসন এখন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর দখলে।বাংলাদেশের সংবিধানে এককেন্দ্রীক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টতা ও গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের বৈধতা দানের সুযোগ না থাকায় স্বতন্ত্রপ্রার্থি হিসাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো এ সংখ্যক আসনলাভ করেছে।এখানে উল্লেখ্য যে, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে একটি আসনে বাঙালী অধিকার আন্দালনের সংগঠন সমর্থিত প্রার্থি নির্বাচনে অংশ নিলেও তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

এতে আশঙ্কার কারণ হচ্ছে, এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে বাংলাদেশের এককেন্দ্রীক রাষ্ট্র কাঠামোর বৈশিষ্ট্য ভেঙে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলন করছে। কিন্তু অপ্রকাশ্যে বা গোপনে এই সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে জুম্মল্যান্ড নামে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছে। এ লক্ষ্যে তাদের রয়েছে গোপন সামরিক বাহিনী ও পতাকা ইত্যাদি।পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দুর ও নিকটবর্তী বিদেশী ষড়যন্দ্রকারী শক্তিসমূহের সাথে এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রযেছে গভীর আঁতাত। তারা অর্থ সমর্থনসহ নানাভাবে এই বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোকে সমর্থন যুগিয়ে আসছে।কাজেই এ ধরণের রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যখন সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকে তখন দেশপ্রেমিক জনতা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। জাতীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এহেন রাষ্ট্র বিরোধী শক্তিগুলোকে দ্রুততার সাথে নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংস করার কোনো বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যে জাতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সুনির্দিষ্ট, সুপরিকল্পিত, সুচিন্তিত ও সুগভীর নীতিমালা প্রণয়ন জরুরী। তবে সেই পরিকল্পনা বিশ্লেষণের আগে তিন পার্বত্য জেলার উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ জরুরী।কিন্তু তার আগে এ কথা মনে রাখা জরুরী যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আর ৫০টি সমতল জেলার মতো নয়। ভৌগলিক অবস্থান, ভূরাজনীতি, ভূপ্রকৃতি, জীব ও জনবৈচিত্র প্রভৃতি বিচারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অনন্য বৈশিষ্ট সম্পন্ন অঞ্চল। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে যে কোনো বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, নীতিগ্রহণ ও বিবেচনার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গী প্রয়োজন। 

উপজেলা নির্বাচনে তিন পার্বত্য জেলায় জাতীয় দলগুলোর আশানুরূপ সাফল্য অর্জিত না হওয়ার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে, নিরাপত্তাহীনতা, জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক দূর্বলতা, সাংগঠনিকভাবে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পার্বত্য চট্ট্রগ্রাম বিষয়ে বাংলাদেশের অখণ্ডতার নিরিখে বিশেষ দর্শন বা অবস্থান না থাকা, রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা, দ্বন্দ্ব, বাঙালী-পাহাড়ী নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা, শক্তিশালী বাঙালী নেতৃত্ব তৈরী না হওয়া, বাঙালী সংগঠনগুলোর বিভাজন, নেতৃত্বের দূর্বলতা ও জনসম্পৃক্ত হতে না পারার ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত প্রভৃতি।

উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মনোনয়নের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব এই দুটি দল তিন পার্বত্য জেলার বেশ কিছু আসনে মনোনয়নই দিতে পারেনি।রাঙমাটির ১০টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬টিতে, বিএনপি ৭টিতে, খাগড়াছড়ির ৮টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ সবগুলো উপজেলায় এবং বিএনপি ৬টিতে বান্দরবানের ৭টি উপজেলার মধ্যে আওয়ামী লীগ সবগুলোতে এবং বিএনপি ৪টিতে ও জামায়াত একটিতে মনোনয়ন জমা দিয়েছিল। অর্থাৎ ২৫টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪টিতে ও বিএনপি ৮টি আসনে মনোনয়ন দিতে পারেনি বা মনোনয়ন দেয়ার মতো সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠেনি প্রভাবশালী জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সরকারের শাসনামলে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৬ জন করে জনপ্রতিনিধি প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার স্ট্যাটাস ও সুবিধা ভোগ করে থাকেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সবগুলো উপজেলায় মনোনয়ন দেয়ার মতো সাংগঠনিক অবস্থা তৈরী করতে পারেনি।মূলত পাহাড়ী অধ্যুষিত উপজেলাগুলোতে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো নমিনেশন দিতে ব্যর্থ হয়েছে।অথচ এই দুই দলেরই শীর্ষ নেতৃত্বের পদগুলো পাহাড়ীদের দখলে ।অভিযোগ রয়েছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ দিনে বা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ/বিএনপি করলেও গোপনে জেএসএস বা ইউপিডিএফ’র সাপোর্টার। সবক্ষেত্রে না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।আবার জেএসএস ও ইউপিডিএফও বিভিন্ন কৌশল ও লবিঙের মাধ্যমে তাদের সাবেক সহযোদ্ধাদের এ দুই দলের শীর্ষপদে অধিষ্ঠিত করিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে থাকে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর অবস্থানের বিরোধীতা করে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর জন্ম হলেও জিয়াউর রহমানের নীতির কারণে তারা গা বাঁচাতে আওয়ামী লীগের সাথে মিত্রতা গড়ে তুলেছিল।এদিকে শান্তিচুক্তি করার কারণে জেএসএস ও তার প্রভাবে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বড় অংশটি আওয়ামী লীগের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে আর বিএনপি বাঙালী ঘেষাঁ রাজনৈতিক দল হিসাবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় বাঙালী হত্যাকান্ডের নায়ক শান্তিবাহিনীর মেজর রাজেশকে নমিনেশন ও ক্ষমতায় এসে প্রতিমন্ত্রী হিসাবে অধিষ্ঠিত করে। মেজর রাজেশ ওরফে মনি স্বপন দেওয়ান প্রতিমন্ত্রী হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিএনপিকে সংগঠিত করার চেয়ে জেএসএস’র স্বার্থ উদ্ধারে নিবেদিত ছিল। পরবর্তীকালে সংস্কারপন্থী হয়ে বিএনপি ত্যাগ করলেও তার জায়গায় রাঙামাটি জেলা বিএনপি’র নেতৃত্বে যিনি এসেছেন তিনি আরো বেশী জেএসএস ঘেঁষা বলে অভিযোগ রয়েছে।এই ব্যক্তির কারণে রাঙামাটিতে বিএনপি’র সাথে বাঙালী সংগঠনগুলোর ব্যাপক দুরত্ব তৈরী হয়েছে। বাঙালী অধিকার আদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কোনো অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতারা অংশ নিলে বা পৃষ্ঠপোষকতা দিলে তার তিরস্কার সইতে হয়। তিনি সুকৌশলে বিএনপি’র জেলা, উপজেলা কমিটি ও অংগ সংগঠনগুলোর কমিটিতে জেএসএস’র সাবেক ও গোপন সদস্যদের পুনর্বাসন করেছেন। ফলে বিগত সংসদ ও উপজেলা নির্বাচনে নমিনেশন, প্রচার প্রচারণা ও ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে জেএসএসের জন্য সুবিধাজনক রাস্তা তৈরী করতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি।সেকারণে বিগত সংসদ নির্বাচনে জেএসএস’র সাবেক সামরিক কমান্ডার মেজর মলয়কে(উষাতন) সমর্থন দিতে তার একটুও কষ্ট পেতে হয়নি।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিন পার্বত্য জেলা থেকে ৫জন পাহাড়ী নেতা থাকলেও বাঙালী নেই একজনও। এই পাহাড়ী নেতাদের বেশিরভাগই বিগত দুটি নির্বাচনে জেএসএস ও ইউপিডিএফ’র সমর্থনে প্রকাশ্যে ও গোপনে কাজ করেছে। খাগড়াছড়ি বিএনপির একটি অংশ বিভিন্ন উপজেলায় প্রকাশ্যে ইউপিডিএফকে সমর্থন দিয়েছে।অন্যদিকে বান্দরবান জেলায় বিএনপি-জেএসএস আঁতাত ছিল প্রকাশ্য। দুইটি উপজেলার চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রকাশ্যে তারা জেএসএসকে সাপোর্ট করেছে। এমনকি নাইক্ষংছড়ি উপজেলায় জেএসএস-জামায়াত সমঝোতায় জামায়াত প্রার্থি জয়লাভ করেছে। তবে এর বাইরেও বিভিন্নস্থানে বিএনপি আওয়ামী লীগ একে অন্যকে ঠেকাতে জেএসএস ও ইউপিডিএফকে সাপোর্ট করেছে।

এদিকে রাজনৈতিক মাঠে জেএসএস-ইউপিডিএফ প্রবল প্রতিপক্ষ হলেও যেসকল উপজেলায় বাঙালী প্রার্থি বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে সমন্বিতভাবে পাহাড়ী প্রার্থিকে সাপোর্ট করেছে। খাগড়াছড়ির দিঘীনালা ও রাঙামাটি সদর এভাবেই পারস্পারিক বিনিময়ের মাধ্যমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাঙালী প্রার্থিকে জয়লাভ করতে দেয়নি তারা। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে পাহাড়ীদের সকল আন্দোলন ও দাবীকে সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা করে গেছে। সেকারণে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাহাড়ীদের উচ্চপদে দেখা গেলেও পার্বত্য বাঙালীদের বেলায় তা দেখা যায় না। অন্যদিকে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলো সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে জাতীয় পর্যায়ের বাম রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলো তাদের দাবীগুলোকে সবসময় সক্রিয় সমর্থন যুগিয়ে আসছে। এমনকি রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা ও সংহতির জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী দাবীগুলোতেও এই বামপন্থীরা পাহাড়ীদের সমর্থন করে থাকে। ফলে পাহাড়ী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাষ্ট্রঘাতী দাবীগুলোও সমগ্র দেশবাসীর মাঝে অনেক ক্ষেত্রেই অসচেতনভাবে সমর্থিত হয়ে থাকে। অথচ জাতি হিসাবে আমরা বাংলাদেশের ৯৯% সমতলবাসীকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অনন্য বৈশিষ্টের কথা তুলে ধরতে পারিনি।এর ভৌগলিক অবস্থান ও ভুরাজনৈতিক গুরুত্ব, একে নিয়ে চলমান দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সচেতন করতে পারিনি। মূলত একটি স্থায়ী জাতীয় পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই এই বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের একক বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাঙালী- মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ভাগ।কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান সরকারী বৈষম্যমূলক নীতি, বিদেশী দাতা গোষ্ঠী ও এনজিও’র পক্ষপাতিত্বের কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হচ্ছে পার্বত্য বাঙালী সম্প্রদায়।এই বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি বাঙালী অধিকার আন্দোলনের সংগঠন রয়েছে। এদের মধ্যে সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ, পার্বত্য গণপরিষদ ইত্যাদি। কিন্তু নেতৃবৃন্দের নীতিহীনতা, সুবিধাবাদ, অনৈক্য, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, দ্বন্দ্ব প্রভৃতি কারণে পার্বত্য বাঙালীদের সংগঠনগুলো শক্তিশালী, জনপ্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠেনি। দু’একজন নেতা এই আন্দোলনের মাধ্যমে বেরিয়ে আসলেও ক্ষমতার লোভে অতি দ্রুতই জাতীয় রাজনৈতিক দলে ঢুকে সেখানকার পরিস্থিতি বিবেচনায় বাঙালীদের সাথে দুরত্ব তৈরী করতে বাধ্য হয়েছে।এর মধ্যে আবার সবচেয়ে সক্রিয় দুটি সংগঠনের একটি জামায়াতের অপরটি বিএনপি’র পকেট সংগঠনে পরিণত হওয়ায় পার্বত্য বাঙালীদের মাঝে সার্বজনীনতা পায়নি।এছাড়াও বাঙালী সংগঠনগুলো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ার কারণে সংগঠন ও নেতৃত্বের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ লাভ করেনি।

বিগত দুটি নির্বাচনে পাহাড়ী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর আশাতীত সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ শক্তি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। একথা সত্য যে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আয়োজন সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। একারণে প্রতিদিন সেখানে হত্যা, ধর্ষণ, অপরহণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে।চাঁদাবাজি সেখানে এতাটাই বাস্তব যে, সরকারী ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে হয়তো সেখানে পার পাওয়া যায় কিন্তু চাঁদাবাজদের চাঁদা না দিয়ে পার পাওয়ার কোনো ‍উপায় নেই। থানার পাশে, ক্যান্টনমেন্টের পাশে বসবাসকারীরাও চাঁদাবাজির কবল থেকে রেহাই পাননা। এমনকি সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীরাও চাঁদাবাজির আওতামুক্ত নয়। এসব অপরাধীদের দু’একজনকে মাঝে মধ্যে নামমাত্র গ্রেফতার করা হলেও বিচার করে তাদের কারোরই শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি।বিচারহীন অপরাধ সেখানে ফ্রি স্টাইলে চলে।এই অপরাধের শিকার শুধু বাঙালীরা নয়, নিরীহ পাহাড়ীরাও সমভাবে হচ্ছে।ফলে সন্ত্রাসীদের প্রতি পাহাড়ীরা ক্ষুদ্ধ হলেও জীবনের নিরাপত্তার হুমকির মুখে তারা এ সকল সন্ত্রাসীদের ভোট দিতে বাধ্য হয়।

এই নিরাপত্তাহীনতার একটি কারণ দূর্গমতা হলেও শুধু দূর্গমতার উপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার কোনো উপায় নেই। নিরাপত্তা বিষয়ক নীতি, পদ্ধতির ভ্রান্তি ও জটিলতা এর জন্য অন্যতম দায়ী। কেননা রাষ্ট্রের নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। দুর্গম বলে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দীর্ঘদিন ফেলে রাখতে পারেনা।

পার্বত্য বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাবিষয়ক নীতি, পদ্ধতিকে নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, অপরাধীরা যুগ যুগ ধরে বিচার বহিঃভূত থাকার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। সেখানে নিরাপত্তার জন্য বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনী থাকলেও তারা ‘In aid to civil power’ হওয়ার কারণে পুলিশ বিজিবি’র সহায়তা ছাড়া রাষ্ট্রই তাদের ঠুঁটো জগন্নাথ করে রেখেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার প্রদান করা ও এককভাবে অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা প্রদান জরুরী। একইসাথে র‌্যাব দিয়ে যেভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্বহারা সন্ত্রাসী দমন করা হয়েছে সেভবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের দমন করা জরুরী। অপরাধ নির্মূল করতে অপরাধী নির্মূল করতে হবে- নীতি গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে। তবে এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য ও সচেতনতা গড়ে তুলতে না পারলে এ ধরণের অভিযান সমালোচনার মুখে থুবড়ে পড়তে পারে। সেকারণে একটি স্থায়ী জাতীয় পার্বত্যনীতি প্রণয়ন অতি জরুরী এবং এ নীতির আওতায় জাতীয় জনমত গঠন থেকে শুরু করে সরকারী বেসরকারী, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক সকল পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর গুপ্তচরদের ছেঁটে ফেলে দেশপ্রেমিক পাহাড়ী-বাঙালী নেতৃত্ব বিকাশে সর্বপ্রকার সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। পাহাড়ী- বাঙালী দেশপ্রেমিক সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।পাহাড়ী নেতৃত্বের সমপর্যায়ে বাঙালী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হতে হবে। জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন থেকে শুরু করে সরকারী-বেসরকারী চাকুরী, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী-বিচি্‌ছন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য ও গোপন কর্মীরা যেন অনুপ্রবেশ না করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ কাজে কোনো শৈথিল্য ও সময়ক্ষেপন করা চলবে না্। কারণ সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে এই সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো জাতীয় দৃষ্টির বাইরে থেকে, জাতীয় দৃষ্টির অগোচরে, উদাসীনতায় যেভাবে শক্তি বৃদ্ধি করে চলছে তাতে জাতীয় নিরাপত্তা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও সংহতি বিপন্ন হওয়ার মুখে উপনীত হয়েছে।

Email: palash74@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

আরও প্রবন্ধ

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

মাটিরাঙ্গায় চাঁদার দাবীতে ব্যবসায়ীসহ দুই জনকে অপহরণ

Opohoron-1-8 
 
স্টাফ রিপোর্টার, পার্বত্যনিউজ :
খাগড়াছড়ি’র মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন গুইমার থেকে চাঁদার দাবীতে এক কাঠ ব্যবসায়ীসহ দুই জনকে অপহরণ করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় মাটিরাঙ্গা উপজেলাধীন গুইমারা থানা এলাকার বুদুংপাড়া এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার পর পরই অপহৃতদের উদ্ধারে নামে পুলিশ ও সেনাবাহিনী পুলিশ।
 
স্থানীয়রা জানায়, মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রামের নাজিরহাট এলাকা থেকে লোকমান হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী একটি চাঁদের গাড়ী (চট্ট মেট্রো ন-১৯৭০) নিয়ে বুদুংপাড়া এলাকায় লাকরী কিনতে আসে। সন্ধ্যায় গাড়ীতে লাকড়ি ভর্তি করে যাওয়ার পথে ৫/৭জন পাহাড়ী সন্ত্রাসী মোটর সাইকেল যোগে এসে গাড়ির চালক মো: আব্বাস আলী (৩০) ও লাকড়ীর ব্যাবসায়ীকে কাজ আছে বলে পাশ্ববর্তী বাইল্যাছড়ি এলাকায় নিয়ে যায়। এরপর থেকেই দুই ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন।
 
ঘটনার পর পরই আশ-পাশের এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান অব্যহত রয়েছে। গাড়ির হেলপার মো: ফারুক হোসেন (২২) জানায়, উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা এর আগে তাদের কাছে চাঁদা দাবী করেছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদার টাকা না পেয়ে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা ব্যবসায়ী ও চালককে অপহরণ করেছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। তবে কারা তাদের অপহরণ করছে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি।
 
গুইমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: আবু ইউসুফ মিয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অপহৃতদের উদ্ধারে সব ধরণেন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী।