মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন

  • অর্পণা মারমা

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, পাহাড়ের অনেক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির মানবতা দেখে আমি এবং আমার মতো যারা পাহাড়ের বাইরে আছেন, তারা সবাই সত্যিই মুগ্ধ। যারা পারছেন, তাদের অনেকই সুদূর ঢাকা বা আরো দূরে থেকে তাদের সংহতি ও  সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন, রাঙ্গামাটি হাসপাতালে ‘অবরুদ্ধ’ বা কারো কারো ভাষায় ‘চিকিৎসাধীন’  দুই বোনের জন্যে। অনেকে মানববন্ধন করেছেন, আবহাওয়ার বৈরিতাকে উপেক্ষা করে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন, বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন, অনলাইনের যেখানে পারছেন পোস্ট দিচ্ছেন; সবই মানবতার খাতিরে।পার্বত্য অঞ্চলের অতি উঁচু পর্যায়ের বেশ কয়েকজনতো প্রায় প্রতিদিনই রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালের সামনে সময় কাটাচ্ছেন – শুধুমাত্র মেয়ে দুইজনের কল্যাণ্যের জন্যে, ‘নিজেদের মেয়েদের’ জন্যে।

এইসবের যে কোন একটি কাজই  ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা অর্জন করার জন্যে যথেষ্ট, সেখানে অনেকেই আরো বেশি করছেন, অনেক বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন। আন্তরিক ধন্যবাদ সেইসব ভলান্টিয়ারদের জন্যে যারা হাসপাতালে মেয়ে দুইজনকে সঙ্গ দিচ্ছেন, তাদের সাথে রাতে ঘুমাচ্ছেন, তাদেরকে পছন্দের মুভি বা গান, ভিডিও দেখাচ্ছেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছেন। সত্যি বলতে কি, ধন্যবাদ দেয়াটা অনেক অনেক কমই হয়ে যায়। অবশ্য এর বেশি আর কীই বা বলতে পারি।

অর্থাৎ, নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এখনও সমাজে শ্রদ্ধেয় বরং মানবতা শুধু জীবিতই নয় বরং মানবতা প্রদর্শনকে  বীরোচিত ও সম্মানিত আচার-ব্যবহার হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। তবে কেন জানি, আমার ক্ষুদ্র মন তাদের এই মহান কাজগুলির মধ্যে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং মানবতার চেয়ে অন্য কিছু খুঁজে পায়, যা আরো বেশি মাত্রায় উপস্থিত, যা মানবতাকে প্রায়ই লজ্জায় ফেলে দেয়। অবশ্য আমার এই লজ্জাজনক উপলব্ধির জন্যে যদিও আমিই দায়ী, তবুও কেন জানি মনে হয় ঐসকল মহান লোকদের নিজস্ব কার্যকলাপের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, আমার এই উপলব্ধির পিছনে।

নিজের দোষ ধরা কঠিন বলেই, বিচারের ভারটা আমি পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি। আমি শুধু আমার এহেন ঘৃণ্য উপলব্ধির প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি।

নিশ্চয় আমরা কেউই রাঙ্গামাটির ভুমিধ্বসের কথা ভুলে যাইনি। বিশেষ করে যারা পার্বত্য অঞ্চলের ব্যাপারে কিছুটা হলেও খোঁজ রাখেন, তাদের তো ভোলার প্রশ্নই ওঠে না। অনেকেরই ভুমিধ্বসের কথা খেয়াল থাকলেও শুধুমাত্র রাঙ্গামাটিতেই প্রায় ১২০ জন মারা গিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৬১ জনই ছিলো পাহাড়ি- সেই তথ্য হয়ত খেয়াল নেই। রাতারাতি সহায়-সম্বল হারিয়ে, পাহাড়ি– বাঙ্গালী মিলিয়ে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এসে উঠছিলেন। অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছিল প্রায় মাসাধিককাল। তখন এই সহায়-সম্বলহীন মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল কারা, সেটি আর সবাই ভুলে গেলেও আশ্রয়কেন্দ্রের ঐ মানুষগুলো ভোলেনি।

আমি জানি অনেক পাহাড়ি ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর সাহায্য করেছেন এবং সাহায্য আনার জন্যেও অনেক কাজ করেছেন। তবে, আমাদেরকে যা ব্যথিত করে তা হলো, আমরা যাদেরকে নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করি, যাদেরকে আমাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পূজনীয় জানি – তাদের অনেকেই ঐ সময় যথাযথ ভূমিকা রাখেননি। আজ দুইজন মারমা বোনের জন্যে চাকমা রাণীমাতার  এবং অন্যান্যদের যে প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে, তখন যদি এর ছিটেফোঁটাও থাকতো, পাহাড়ের এই পূজনীয় ব্যক্তিদের জন্যে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকারেও অনেকে কুণ্ঠাবোধ করতো বলে মনে হয় না।

আরেকটা তথ্য এখানে না দিলেই নয়, ঐ সময় প্রায় শ’খানেক বা এর কিছু কম ভলান্টিয়ার রাত-দিন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে কাজ করছিলো– তাদের মধ্যে অতি নগন্য কয়েকজন ছিলো পাহাড়ি, বাকি সবাই ছিল বাঙ্গালী। যাদের অনেকই ছিলো শিক্ষার্থী, এমনকি রাঙ্গামাটির বাসিন্দাও নয়– রোজার ছুটিতে বাড়িতে এসে মানব সেবার সুযোগ পেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বিপন্ন মানুষের পাশে।“ঈদের দিনে অন্য বন্ধুদের সাথে উৎসব উদযাপনের পরিবর্তে এরা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ব্যস্ত সময়” কাটিয়েছে আন্তরিকতার খাতিরে। আর যাই হোক, প্রচারের জন্যে বা লোক দেখানোর জন্যে তারা কিছু করেনি- বরং সত্যিকারের মানবতার জন্যেই তারা নিবেদিত ছিল।

তাই তো, শুধুমাত্র পাহাড়িদের জন্যে বৌদ্ধ বিহারে যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিলো, সেখানেও ঐ বাঙ্গালী ভলান্টিয়ারদের আন্তরিকতা, আগ্রহ আর প্রচেষ্টায় কখনই কোন কমতি ছিলো না। কেন জানিনা, হাজার খানেক বিপন্ন মানুষের ঐ কঠিন সময়গুলোতে আজকের দিনের এইসব ভলান্টিয়ার ও মানবতাবাদীদের এমন সরব উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, তাদের মানবতাবোধ কি পক্ষপাতদুষ্ট? নাকি লোক দেখানো  বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

কারণ যাই হোক না কেন, তাদের এই মানবতাবোধ বা ‘নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা’ যে মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা অথবা মনুষ্যত্বের কারণে নয়, সেটা অবশ্য বুঝতে কারো দেরি হওয়ার কথা নয়। মানুষের প্রতি ভালবাসার কারণে হলে, আমরা তাদেরকে আরো অনেক ঘটনার পরপরই একই রকম সরব হতে দেখতাম। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এই যে, এমনটা হয়নি; বরং পার্বত্য অঞ্চলের অন্য অনেক নারী নির্যাতনের ঘটনায় তারা প্রতিবাদ করেন নি।

এমনকি, কোন কোন অতি ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরেও তাদের কোন ধরণের প্রতিবাদ বা বক্তৃতা-বিবৃতি চোখে পড়ার মতো ছিলো না। কেন জানি না, তারা মানবতাকে ভিন্ন রঙ্গে রাঙ্গিয়ে ফেলেছেন, মানবতা এখন আর তাদের কাছে দল-মত-নির্বিশেষে একই রূপে নেই। আমার মনে হয়, কয়েকটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরলেই বুঝতে পারবেন, এমন কথা আমি কেন বলছি।

এক কিশোরীকে প্রকাশ্যে মারধোর করে, পরে ধরে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে এবং তা যদি মোবাইলে ধারণ করা হয়, তাহলে কি এই প্রতিবাদীদের প্রতিবাদ করার কথা নয়? এখন যদি বলি, ঐ কিশোরী একজন চাকমা, তাহলে? আর যদি বলি, তাকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নামের একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা গহীন জঙ্গলে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে এবং মোবাইলে ধারণ করেছে, তাহলে কি প্রতিবাদ হবে? প্রতিবাদ অবশ্য হয়েছিল; তবে, কারা করেছিলো জানেন? আজ যে সব মানবদরদী দেখছেন, উনারা নন। প্রতিবাদ করেছিল, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ; ঐ ঘটনায় পুলিশ কর্তৃক আটককৃত ‘নেতার মুক্তির দাবিতে হরতাল-অবরোধ ও বিক্ষোভ করে’।

বিশ্বাস করতে চাইবেন না, জানি। তাই অনুরোধ করবো, ২০১৬ সালের মে মাসের আয়না চাকমার ঘটনার ব্যাপারে একটু খোঁজ নেয়ার জন্যে। ঐ কিশোরীর অপরাধ- এক বাঙালি ছেলের দোকানে গিয়েছিল সে, কলেজে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে। মানবতা বা যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা এখানে প্রযোজ্য নয়; কারণ, এখানে পাহাড়ী বীরপুরুষরা নিজেরাই জড়িত, যাদের সাত খুন সব সময়ই মাফ বিশেষ করে পাহাড়ে!

৬ষ্ঠ শ্রেনিতে পড়তো এক বাঙ্গালী দিন মজুরের মেয়ে। খাগড়াছড়ির গামারীঢালার মেয়েটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির এক শনিবার সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পাশে গরু আনতে গেলে এক পাহাড়ি যুবক তাকে ধর্ষণের চেষ্টার মধ্যেই মেয়েটির চিৎকারে আশে-পাশের লোকজন চলে আসে এবং আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আমি অবশ্য ঢাকায় কাউকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে শুনিনি; কোন নারীবাদী সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা তো দুরের কথা।

হাসপাতালে ঐ মেয়েকে দেখতে কয়জন গিয়েছিলেন বা আদৌ গিয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্ন নিশ্চয় এখানে অবান্তর। কোন ক্লাশ বর্জন, কালো ব্যাজ ধারণ, মানব-বন্ধন বা স্মারকলিপি পেশ করার মতো কিছু করারও প্রয়োজন কেউ সম্ভবত বোধ করেননি। হয়তবা, দিনমজুর কিংবা পাহাড়ের বাঙ্গালিদের বা যাদেরকে আমরা ‘সেটেলার’ বলে জানি তাদের জন্যে মানবতা, ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ বা মানবাধিকারের মতো কঠিন বিষয় প্রযোজ্য নয়!

গত বছরের জানুয়ারিতে রাংগামাটিতে রীতিমত সংবাদ সম্মেলন করে, এক নির্যাতিতা জানিয়েছিলো তার উপর চালানো অন্যাচারের লোমহর্ষক ঘটনাবলী। ‘গলায় শেকল দিয়ে বেঁধে টানা প্রায় দুই মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি মেয়ে জোসনা চাকমার ওপর’। কারা করেছিল জানেন? আমাদের ইউপিডিএফ এর স্থানীয় যুব সমিতির কর্মীরা। ঘটনাস্থল তো এই রাঙ্গামাটিই ছিলো। তখন না ছিল কোন ভলান্টিয়ার তার পাশে, না অন্য কেউ!

পাহাড়ের বড় নেতা দূরে থাক, কোন পাতি নেতা বা নেত্রীও জোসনা চাকমার জন্যে সহানুভূতি দেখাননি। এমনকি, কোন প্রতিবাদও করেননি। মনে হয়, উনাদের প্রতিবাদের চর্চাটা অনেকটা এরকম যে, স্বগোত্রের দূর্বৃত্তরা যাই করুক না কেন, প্রতিবাদ করা যাবে না; কারণ প্রতিবাদ অপরাধ অনুযায়ী হবে না, অপরাধী অথবা নির্যাতিতার পরিচয় অনুযায়ী হবে।

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার ক্ষেত্রলাল ত্রিপুরার মেয়ে দীপা ত্রিপুরা ভালবেসেছিলো এক বাঙ্গালিকে। পাহাড়ে এর ফলালফল কি হতে পারে সেটা জানতো বলেই, যখন সে তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে পালাচ্ছিলো, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কিছু কর্মী তাদেরকে অপহরণ করে। পরের ঘটনাবলি পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠিত এমন অন্যান্য ঘটনাগুলোর মতোই। ছেলেটিকে  পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করা হয়। আর মেয়েটিকে শিকার হতে হয় একাধিকবার গণধর্ষণের, এমন কি তা মোবাইলে রেকর্ডও করা হয়। ঘটনাটি বেশি দিন আগের নয়, ২০১৫ সালের জুন মাসের।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতেও কোন ধরণের প্রতিবাদ করার সাহস কেউ দেখান নি। কারণ হয়তবা, পাহাড়ে নারীদের অধিকারের সংজ্ঞা ভিন্ন। আর এখানে প্রতিবাদতো করা হয় অপরাধী দেখে, অপরাধ দেখে নয়।  আয়না চাকমার মতো, দিপা ত্রিপুরার পাশেও কোন ভলান্টিয়ার ছিলো না তাকে মানসিক স্বস্তি দেয়ার জন্যে; আজ যেমন আছে বিলাইছড়ির দুই নির্যাতিতা বোনের জন্যে।

সাংগঠনিকভাবে পরিচিত রেটিনা চাকমাকে বিয়ে করায় দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা ও প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্র হয়ে যান প্রতিপক্ষ ‘বাঙালী’। অথচ দুজনই ছিলেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার।কিন্তু “চাকমাদের দৃষ্টিতে যা ভয়াবহ অন্যায় সেই পাহাড়ী-বাঙালী বিয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। সংগঠনের নেতারাও ‘বিশেষ স্বার্থে’ সৈকত-রেটিনার প্রেম-বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতার সমাধানে এগিয়ে আসেনি।

এমনকি উপজাতীয় অধিকারের পক্ষে সোচ্চার জাতীয় সংবাদপত্র প্রথমআলোও তার স্টাফ ফটোগ্রাফারের কোনো অন্যায় নেই জেনেও তার পক্ষে না দাঁড়িয়ে বরং বিশেষ মহলের চাপে চাকুরিচ্যুত করেছে।”। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, স্বয়ং সৈকত ভদ্রের ভাষ্য অনুযায়ী, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামে তোলার মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন।” ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ তারিখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনের যদি প্রচার সীমিত হয়ে থাকে বা ২০১৫ সালের এই ঘটনা যদি আপনি না জানেন, আমি অবাক হবো না, কারণ এমন ঘটনাতো প্রচার নাও পেতে পারে !

নারীবাদী যারা আছেন, তারা তো আর কোন সংগঠনের বাইরের কেউ না, তাই কোন অজ্ঞাত কারণে কোন বিশেষ ঘটনা নিয়ে তেমন কিছু না বলাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।একইভাবে কোন বিশেষ ঘটনা নিয়ে সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করা বা খুবই সরব হওয়াও স্বাভাবিক মনে হতেই পারে, কারো কারো বিশেষ বিবেচনায়।

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির ১১ পাহাড়ী মারমা কিশোরীর মিয়ানমারে পাচারের ঘটনায় কয়জন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো, মনে পড়ে না। সোশ্যাল মিডিয়াতে এ নিয়ে আদৌ কোন প্রতিবাদ বা পোস্ট ছিলো কিনা, সেটি নিয়েই আমার সন্দেহ আছে। অথচ, একজন বা দু’জন নয়, ১১ জন ‘শিশু কন্যাকে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ ও স্বাস্থ্যপরীক্ষা’ করতে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ৫ সদস্যের মেডিকেল টিম কাজ করেছিলো। ভয়াবহ বিষয় হলো, “উদ্ধারকৃত পাচার হওয়া ১১ মারমা কিশোরী পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, প্রতিদিন বৌদ্ধ ভিক্ষু উসিরি তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো।” তাদের মধ্যে কমপক্ষে দুজনকে দুপাশে নিয়ে বিছানায় যেতো।

কিন্তু, ঢাকার রাজপথে কয়জন মানববন্ধন করেছিলো বা বিবৃতি দিয়েছিলো? কয়টি জাতীয় দৈনিক এই সংবাদটিকে গুরুত্ব সহকারে ছেপেছিলো? রাজশাহী বা চট্টগ্রামে কি কেউ কোন প্রতিবাদের আয়োজন করেছিলো? পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে কাজ করেন এমন কয়জন বুদ্ধিজীবী এই ঘটনায় শাহবাগে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করেছিলেন বা বিবৃতি দিয়েছিলেন? যেহেতু এই ঘটনায় আটক করা হয়েছিলো একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ২ পাচারকারীকে, তাই তথাকথিত অনেক প্রতিবাদী, নারীবাদী বা বুদ্ধিজীবীগণ প্রতিবাদের প্রয়োজন মনে করেননি বোধ হয়। যেভাবে দুই মারমা বোনের জন্যে প্রচার হয়েছে আর আমরা প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছি, ঐ ১১ জনের জন্যে তা হয়নি আর আমরাও কিন্তু প্রতিবাদে এগিয়ে আসিনি। কারণ কি হতে পারে, তা নির্ণয়ের ভার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেয়া ছাড়া আমার কোন উপায় আসলেই নেই।

তাই মনে হচ্ছে, বিলাইছড়ির ঘটনা নিয়ে যত প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন, সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট, মানববন্ধন আর প্ল্যাকার্ডের ছবি দেখছি তার সবই করা হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে, শুধুমাত্র বিশেষ কাউকে ছোট করার জন্যে; নির্যাতিতার প্রতি প্রকৃত দরদ বা নারীর প্রতি আন্তরিকতা থেকে নয়। আর এজন্যেই যখন সংবাদ পাই যে, ‘বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি’– তখন  নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা ও মানবতার কারনে পাহাড়ের যে পূজনীয় ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে মাথা নোয়াতাম তাদের প্রতি ঘৃণা জন্ম হয় মনের গভীরে।

ভাবতে কস্ট হয় যে, দুইজন অসহায় মেয়ের কষ্ট আর বিশ্বাস উনারা কত সহজে নিজেদের স্বার্থে অপব্যবহার করলেন। মাটিরাঙ্গার কুলসুম আকতার, আলীকদমের  সেলতিপাড়ার পাখি আক্তার, মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম কিংবা খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণধর্ষণের শিকার হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসদের মতো অনেক লোমহর্ষক আর ভয়াবহ ঘটনাগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেছে।

আমি জানি, যে ঘটনাগুলো আমি তুলে ধরেছি, এর বাইরেও এমন অনেক অনেক ঘটনা আছে। সেগুলোর বেশিরভাগই পাঠককুলের অজ্ঞাত। কারণ, স্বগোত্রের দূর্বৃত্ররা নারীর প্রতি কোন অন্যায় করলে, ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়; ধর্ষকের বিচার চেয়ে কোন আন্দোলন হয় না, কোনো মিছিল হয় না, পত্রিকার পাতায়ও কোনো খবর হয় না।

যেহেতু পাহাড়ের বেশিরভাগ সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধি পাহাড়ি, তাই তাদের বিবেচনায় হয়ত এ ধরনের ঘটনা সংবাদ হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না। কারণ, হয় এই ঘটনাগুলোর শিকার মেয়েরা বাঙ্গালির সাথে প্রেমের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, নয়তো পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিদের এই ঘটনাগুলোর সাথে কোন সংশ্লিষ্টতা নেই বরং পাহাড়ের উপজাতি সন্ত্রাসিরাই এগুলো ঘটিয়েছে। এমনকি এটা যদি পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় কোন বিশেষ বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত কোন অপরাধ হতো, তাহলেতো এটা নিয়ে কোন নিউজ করারও হয়ত অনেকে সাহস করতো না। যেমনটি হয়েছে, রেটিনা চাকমা, আয়না চাকমা, দিপা ত্রিপুরা বা জোছনা চাকমার ক্ষেত্রে।

লেখিকা রোকেয়া লিটার ডুমুরের ফুল নামক অভিজ্ঞতা লব্ধ গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, কোনো পাহাড়ী ছেলে যখন কোনো পাহাড়ী মেয়েকে ধর্ষণ করে তখন তথাকথিত প্রথাগত বিচারের নামে দোষী সাব্যস্ত হলে ওই পাহাড়ী ছেলেকে একটি শুকর জরিমানা করে স্থানীয় হেডম্যান/কার্বারীরা। জরিমানাকৃত শুকর জবাই করে তার রক্ত পাড়াময় ছিটিয়ে পাড়া পবিত্র করা হয় এবং জবাইকৃত শুকরের মাংস রান্না করে পাড়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খাওয়ানো হয়। এতে ধর্ষিতা মেয়েটি কি পায় বা তার নারীত্বের যে অসম্মান করা হয় সে বিষয়ে প্রথাগত বিচারের প্রণেতা ও সর্বময় কর্তা রাজা বা রাণীরা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? বরং ধর্ষিতা নারী বা তার পরিবার যদি এই বিচারে সন্তষ্ট না হয়ে রাষ্ট্রীয় আইনের আশ্রয় নিতে চান তাদেরও নিবৃত করা হয় এই প্রথাগত বিচারের কথা বলেই। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা পাহাড়ের শত শত এনজিওগুলোও কোনোদিন এদিকে নজর দেননি।

বিলাইছড়িতে সেদিন আসলে কী ঘটেছিলো সেটা সময় হলে সবাই জানতে পারবে- তবে এখন পর্যন্ত অন্তত একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে গেছে; তা হলো, পাহাড়ে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা একই ধরণের কিন্তু আরো অনেক জঘন্য ও ভয়াবহ ঘটনার পরেও অনেক নেতা-নেত্রী ও ভলন্টিয়ারদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন বা হাসপাতালে ছুটোছুটি করতে দেখা যায়নি। সেখানে বিলাইছাড়ির দুই মারমা বোনের জন্যে উনাদের দৌঁড়াদৌঁড়ি আর যাই হোক আন্তরিকতাপ্রসূত হতে পারে না, মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে হতে পারে না। এই মায়াকান্নার মুখোশের আড়ালে, কী লূকানো আছে, সেটি উন্মোচিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আন্তরিকতার পরিবর্তে পক্ষপাতদুষ্ট, লোকদেখানো  বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বিশেষ বিশেষ ঘটনায় অন্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টাতে আর যাই হোক, ফায়দা হবে না। এসব করে, সরল পাহাড়িদের বেশিদিন বোকা বানানো সম্ভব হবে না। বরং সকলের সামনে মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে– সবাই বুঝে যাবে যে, মানবতা নয় বরং অন্য কিছুই এখানে মুল নিয়ামক, যার কারণে আপনি শুধুমাত্র নির্বাচিত কয়েকটা ঘটনার প্রতিবাদে এতটা সরব, এতই উচ্চকণ্ঠী।

তাই আসুন, পাহাড়ি রঙ্গে না রাঙ্গিয়ে মানবতাকে তার প্রকৃত রঙ্গে বিকশিত হতে সাহায্য করি। রাজনীতির স্বার্থে মানবদরদী না হয়ে, একজন মানুষ হিসেবে দল-মত নির্বিশেষে প্রকৃত মানবদরদী হতে চেষ্টা করি। নারীর প্রতি সংবেদনশীলতার মত একটা স্বর্গীয় বিষয়কে ব্যক্তিস্বার্থে অপব্যবহার না করে সকল নির্যাতিতার প্রতি সমানভাবে সহানুভূতিশীল হই। প্রকৃত ঘটনা না জেনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ করার পরিবর্তে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেই আসল অপরাধীকে ধরতে এবং তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে।

অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে

নিজাম উদ্দিন লাভলু:

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে তিনটি আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠন। জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির কারণে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এ অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে সম্প্রতি রাঙামাটির লংগদুতে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে।

১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউপিডিএফ। পরবর্তীতে জেএসএস’র একটি অংশ মূল দল থেকে ছুটে গিয়ে জেএসএস (সংস্কার) নামে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠনগুলো সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে গড়ে তুলছে টাকার পাহাড়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেও তারা এখন সমৃদ্ধ।
বর্তমানে ৫১ ভাগ পাহাড়ি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠী আর ৪৯ ভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন এ তিন জেলায়। শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটছিল। একপর্যায়ে প্রতিবেশীসুলভ ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠে। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলোর লাগামহীন চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার কারণে এখানকার বাঙালি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস ক্রমশঃ বাড়ছে।
বাঙালিদের ধারণা, ঐ সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতায় পাহাড়িদের সবার সমর্থন আছে। অন্যদিকে, সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে বাঙালিদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে শত্রু-ভাবাপন্ন করে তুলছে। এতে দিন দিন সাম্প্রদায়িক দূরত্ব বেড়ে চলেছে।

এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তির পর এলাকার মানুষ আশা করেছিল তাদের বসবাস হবে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, অশান্তির দাবানল বেড়েই চলেছে। অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।

জানা যায়, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বিবেচনায় পাহাড়ি জনসাধারণকে করের আওতা থেকে মুক্তি দিয়েছে সরকার। কর দিতে না হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ। বাঙালি কিংবা উপজাতি- সবাই এসব সন্ত্রাসীকে চাঁদা দিতে বাধ্য। বিভিন্ন ফসল, ফল ফলাদি, গবাদিপশু বেচাকেনায়ও চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়েও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে তারা। প্রাণভয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের কাছে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ করছে না কেউ। অভিযোগ এলেও প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা।

নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ মাঝে-মধ্যে চাঁদাবাজদের আটক করলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। অভিযান কঠোর হলে নতুন উপায়ে চাঁদা আদায় করা হয়। এদিকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা না দিলে হত্যা, অপহরণের পাশাপাশি নানাভাবে ক্ষতি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে উঠা ফলদ ও বনজ বাগানের মালিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় মোটা অংকের চাঁদা। একরপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। তিনটি সংগঠনকেই পৃথক পৃথকভাবে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়।

খাগড়াছড়ির রামগড়ের শুধুমাত্র পাতাছড়া ইউনিয়নেই প্রায় চার হাজার একর ফলদ ও বনজ বাগান আছে। এসব বাগানের মালিকদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ একাই চাঁদা আদায় করে বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা। চাঁদা দেয়ার পরও নানা অজুহাতে হাজার হাজার ফলবান গাছ কেটে দেয়া হয়। বাগানের ফলফলাদি লুটে নেয়া হয়। এক বাগান মালিক বলেন, চাঁদা দিয়েও তারা পাহাড়ি সংগঠন দুটির কাছে জিম্মি।

রাঙামাটির নানিয়ারচর এলাকায়ও চাঁদার জন্য শত শত একর আনারস বাগান কেটে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ কারণে পার্বত্য এলাকার মানুষের মাঝে এখন বিরাজ করছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ‘চাঁদা আতঙ্ক’। পার্বত্য এলাকার সীমানা-লাগোয়া সমতল জেলায়ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো চাঁদাবাজিসহ সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়ির সীমানার পাশের ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র (সংস্কার) তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ঐ এলাকার সাতটি চা বাগানকে জিম্মি করে বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিনই পার্বত্য অঞ্চল থেকে উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপ এক থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। বছরশেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি।

চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস ও ইউপিডিএফের প্রায় পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। আদায় করা চাঁদার টাকা দিয়েই দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কাজ করে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পার্বত্য খাগড়াছড়ির এক ব্যবসায়ী বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজি অহরহ ঘটছে। চাঁদাবাজিতে তারা কেউ পিছিয়ে নেই। কোনো পরিবহন মাল নিয়ে খাগড়াছড়ি ঢোকার সময় অথবা বের হওয়ার সময় চাঁদা দিতে হয়। একেক সময় তারা একেক স্থান থেকে চাঁদা তোলে। চাঁদা না দিলে গাড়ি থামিয়ে স্টাফদের মারধর করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। চাঁদা না দেয়ায় সম্প্রতি বিআরটিসি’র একটি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয় ইউপিডিএফ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি ইউনিটে চাঁদাবাজির মাধ্যমে খুচরা খাত থেকে মাসিক আয় প্রায় ৪ কোটি টাকা। খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের অন্তর্গত প্রায় ৫টি সাবডিভিশন থেকে এ বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এছাড়াও ইউপিডিএফ’র আলাদা বার্ষিক চাঁদা শত কোটি টাকার উপরে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইউপিডিএফ’র সামরিক শাখার প্রধান প্রদীপন খীসার খাগড়াছড়ির বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৮০ লাখ টাকার সাথে প্রাপ্ত প্রায় দুই বস্তা নথিপত্র ঘেঁটে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া নথির তথ্য মতে, খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের আওতায় ইউপিডিএফ’র বেশ কয়েকটি ডিভিশন ও সাব-ডিভিশন রয়েছে।

ডিভিশনগুলো হচ্ছে, সুবর্ণপুর ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম) ও রতœপুর ডিভিশন। খাগড়াছড়ি জেলায় ইউপিডিএফ’র সাব ডিভিশনগুলো হচ্ছে : তৃণভূমি সাব ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম), বকুলতলা সাব ডিভিশন, বটতলা সাব ডিভিশন ও পূর্ণমিশন সাব ডিভিশন। প্রতিটি সাব ডিভিশনে মাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এ সব ডিভিশনের দায়িত্বে আছেন একজন প্রধান, একজন সেক্রেটারি ও একজন কো-অর্ডিনেটর। ঐ এলাকায় উত্তোলিত চাঁদা সাংগঠনিক কাজে খরচের পর মাসশেষে কো-অডিনেটর কেন্দ্রীয় অর্থ বিভাগের প্রধান (সিসি)-এর কাছে প্রেরণ করে থাকেন।

ইউপিডিএফ’র আদায়কৃত অর্থের হিসেব তদারকির জন্য রয়েছে আলাদা শৃঙ্খলা তদারকি বিভাগ সিসি। রয়েছে মিশন হাইয়ার পরিচালক পোস্ট। ইউপিডিএফ আয়-ব্যয়ের হিসাব খুবই নিখুঁতভাবে করে থাকে। চাঁদা আদায়সহ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় কাজ করার জন্য চাঁদা কালেক্টর ও কমান্ডারদের রয়েছে মোটরসাইকেল। এছাড়া একেকজনের কাছে রয়েছে একাধিক মোবাইল সিম। ফোন করে চাঁদা পরিশোধের তাগাদা দেয়া হয়।

জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলিও করা হয়। তারা সকলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করে। গত শুক্রবার রামগড়ের গৈয়াপাড়া এলাকায় আটক ইউপিডিএফের চাঁদা কালেক্টর জীবন চাকমা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, চাঁদাবাজির কাজে এলাকাভিত্তিক তাদের বাঙালি সোর্স রয়েছে। এদের মাধ্যমে তথ্য ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চাঁদা দাবি করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানায়, মাসিক খুচরা চাঁদার পাশাপাশি ইউপিডিএফ’র প্রতিটি সেক্টরে মোটা অংকের বাৎসরিক চাঁদা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাত, ফলদ ও বনজ বাগান, বিভিন্ন তামাক কোম্পানি, মোবাইল কোম্পানি, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কোম্পানি, স’ মিল ও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ বার্ষিক চাঁদা আদায় করে থাকে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দিবস ও উৎসব উপলক্ষে আলাদা চাঁদা আদায় করা হয়ে থাকে। এ টাকা নিয়মিত মাসিক আদায়কৃত ৪ কোটি টাকার বাইরে।

খাগড়াছড়ি সদরের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী বলেন, ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হওয়ার আগে পার্বত্য এলাকায় একমাত্র শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিতে হতো। চাঁদা নিয়ে ওরা ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সহায়তাও করতো। আর এখন চাঁদা দিতে হয় তিন গ্রুপকে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক এক সদস্য জানান, পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র চাষী থেকে শুরু করে সব পেশাজীবীকেই চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু পাহাড়িরা ভয়ে এসব কথা প্রকাশ করে না।

পাহাড়ি বাঙালি জনগোষ্ঠীর নানা পেশাজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প ও নিরাপত্তা পোস্ট প্রত্যাহার করার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিরাপদ ও মুক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে গ্রুপগুলো। এ অবস্থায় তুলে নেয়া নিরাপত্তা ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি তিন জেলায় র‌্যাবের ইউনিট স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠন পরিচালনা, অস্ত্র সংগ্রহ প্রভৃতির জন্য তিনটি সংগঠন ফান্ড গড়ে তোলার জন্য চাঁদা আদায় কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর এ কারণে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য গ্রহণকে কেন্দ্র করে সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব সংঘর্ষে তিন গ্রুপেরই অনেক সদস্য প্রাণ হারিয়েছে।

প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০ এর জানুয়ারি হতে ২০১১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র মধ্যে ৫৪ বার সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে জেএসএস’র ১৯ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। ইউপিডিএফের নিহত হয় ১০ জন ও আহত হয় ৫ জন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সমগ্র রাঙামাটি জেলায়, খাগড়াছড়ি জেলার অল্প কিছু এলাকায় এবং বান্দরবানে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য রয়েছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ-এর আধিপত্য রয়েছে সমগ্র খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙামাটির কোনো কোনো এলাকা ও বান্দরবানের অল্প পরিমাণ এলাকায়। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য থাকলেও রাঙামাটিতে অল্প পরিমাণে প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়।

সামরিক কাঠামোয় সংগঠনগুলোর সশস্ত্র উইং পরিচালিত হয়। কোম্পানি, প্লাটুন, পোস্ট, সাব-পোস্ট ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয় এলাকাকে। চাঁদা আদায়ের জন্য রয়েছে চাঁদা কালেক্টর। ক্যাপ্টেন বা মেজর পদবির সদস্যরা কোম্পানিগুলোর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে প্লাটুন কমান্ডার, পোস্ট বা সাব পোস্ট কমান্ডারও রয়েছে।

সশস্ত্র সদস্যরা বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পোষাক পরিধান করে। ইউপিডিএফ তিন পার্বত্য জেলাকে জাগুয়া, ঈগল ও ড্রাগন নামে তিনটি কোম্পানিতে ভাগ করে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদার টাকার একটি বড় অংশ ব্যয় করা হয় অস্ত্র সংগ্রহে। অত্যাধুনিক সব অস্ত্র সংগ্রহ করে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তারা। জানা যায়, এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ সাব মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুকের মতো অস্ত্র রয়েছে সংগঠনগুলোর হাতে। ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমার হতে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করে তারা।

মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) সহযোগিতায় এখানকার একটি পাহাড়ি সংগঠনের জন্য অস্ত্রের চালান আসার পথে ঐদেশের কারেন প্রদেশে সেগুলো ধরা পড়ে। গত ৯ ডিসেম্বরে আটক হওয়া ঐ চালানে ১৬টি একে-৪৭ রাইফেল ছিল বলে জানা যায়।

একইভাবে ভারতের মিজোরামেও একাধিকবার অস্ত্রের চালান ধরা পড়ে। ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় প্রচার শাখার প্রধান নিরন চাকমার মুঠোফোনের সুইচ কয়েকদিন ধরে অফ থাকায় চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

তবে নামপ্রকাশ না করার শর্তে ঐ সংগঠনের এক নেতা মুঠোফোনে বলেন, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার সাথে ইউপিডিএফকে জড়িয়ে যে ধরণের অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। জুম্মজাতির স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন করছেন তারা। এ কঠিন আন্দোলন সংগ্রাম চালাতে টাকার প্রয়োজন। তাই তারা জনগণের কাছ থেকে কিছু চাঁদা সংগ্রহ করে। সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে ওই নেতা বলেন, সন্তু লারমার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা অস্ত্র বহন করে।

এদিকে, সমঅধিকার আন্দোলন নামে একটি বাঙালি সংগঠনের খাগড়াছড়ির এক নেতা নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, আওয়ামীলীগ যখনই ক্ষমতায় আসে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ওই নেতা আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিশেষ নীতির কারণে এখন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধ্ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর জোরালো কোন অভিযান নেই। তাই সশস্ত্র গ্রুপগুলো এখন অনেকটা অবাধ ও নির্বিঘ্নে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে।

পাহাড়ে পর্যটনবিরোধী প্রচারণা

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9c-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%a8

ফজলুল হক, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে:

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। পাহাড় নদী আর ঝর্ণার আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটে যান পাবর্ত্য অঞ্চলের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে।

জানা গেছে, দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য তিন জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। পাহাড়, নদী-নালা ও গাছপালাবেষ্টিত অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ ভূমিতে রয়েছে বাঙালি ও ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। পর্যটন শিল্পের জন্য রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর জন্য তা আজ ভূলুণ্ঠিত হতে বসেছে।

তিন জেলার উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান:
বান্দরবানে নীলাচল, নীলগিরি, বগালেক, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির, শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড় ও ঝুলন্ত ব্রিজ, খাগড়াছড়িতে কলাংপাড়া, দীঘিনালা বনবিহার, রিছাং ঝর্না, আলুটিলা রহস্যাময় গুহা, সাংকসর নগর বৌদ্ধা মন্দির এবং রাঙ্গামাটিতে সাজেক ভ্যালি, কর্ণফুলী হ্রদ, পর্যটন মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু, সুবলং ঝর্ণা, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, ফুরমোন পাহাড়, রাজবণ বিহার, তিনটিলা বণবিহার ও উপজাতীয় যাদুঘর প্রভৃতি রয়েছে।

%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a7%81%e0%a6%9f%e0%a6%bf%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%a8

সম্ভাবনাময় পর্যটন:
রিছাং বর্ণার কাছে বসবাসকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চাকমা অধিবাসী জানান, বাপু আমার পাঁচটি মেয়ে, তিন মেয়ের বিয়া দিয়েছি। ১০জন নাতি নাতনি রয়েছে।এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষ আসে। মানুষের চা বিড়ি খাওয়ানোর জন্য প্রথমে একটি দোকান করেছি। এখন আমার চারটি দোকান। দোকানগুলো আমার স্ত্রী, মেয়ে এবং নাতি নাতনিরা চালায়।

পর্যটন শিল্পবিরোধী প্রচারণা:
পর্যটন আকৃষ্ট এসব অঞ্চলকে অশান্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা নানাভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।পাবর্ত্য এলাকায় বেশকিছু পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব পর্যটন কেন্দ্রে মানুষের আগমনে সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় পার্বত্য এলাকায় পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে পাহাড়ি সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলো নানাভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করছে।

তাদের এ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন।তারা কঠোর হস্তে সন্ত্রাসীদের দমন করতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, সাজেক, কাপ্তাই ও পাবর্ত্য এলাকায় যাতে পর্যটকরা না আসে এ জন্য পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নানা ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।পর্যটকদের ভয়ভীতি দেখানো হয়, বিভিন্ন হোস্টেল ও রিসোর্টের মালিকদের কাছ থেকে উচ্চহারে চাঁদা আদায় করা হয়। এমন কি বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়।

২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বান্দবানের অন্যতম দর্শনীয় স্থান স্বর্ণ মন্দিরে দর্শনার্থীদের প্রবেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।পরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হস্তক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়।

%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9c-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%9f%e0%a6%a8-%e0%a7%a8

রাঙামাটির অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক। এ পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করার জন্য নানামুখী চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা।২০১৪ সালের পর্যটন মওসুমে ৩১ ডিসেম্বর রাঙামাটির সাজেকে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার গাড়িতে আগুন দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনায় গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পর্যটকরা যাতে সাজেকে পরিদর্শন করতে না আসে এ কারণে এসব ঘটানো হয়।সাজেক এলাকার বাসিন্দারা জানান, আমরা এই পর্যটন কেন্দ্রের কারণে অনেকভাবে উপকৃত হচ্ছি।কিন্তু কিছু সন্ত্রাসী নানাভাবে এই পর্যটন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।

কয়েক মাস আগে ‘বৃহত্তর সাজেক ইউনিয়নবাসী’ব্যানারে পর্যটনের বিরুদ্ধে একটি লিফলেট প্রচার করেছে সন্ত্রাসীরা।তারা ওই লিফলেটে বেশকিছু মিথ্যা তথ্য তুলে ধরে ‘পর্যটন তুলে নাও- নিতে হবে’ এই শ্লোগান দেয়ার জন্য এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।কিন্তু সন্ত্রাসীদের লিফলেট প্রচারণার বিরুদ্ধে ‘রুইলুই ও কংলাকপাড়ার দরিদ্র এলাকাবাসী’ পাল্টা লিফলেট প্রচার করেছে।

‘সাজেক ইউনিয়নবাসীর কাছে রুইলুই ও কংলাকপাড়াবাসীর আকুল আবেদন, সাজেকের রুইলুইপাড়া পর্যটন কেন্দ্র বন্ধের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান’ শিরোনামের লিফলেটে বলা হয়েছে, সাজেক পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে এই দুই পাড়ার দরিদ্র জনগণের ব্যাপক আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে। এখন আমরা স্ত্রী পরিবার নিয়ে সুখে বসবাস করতে পারছি।

এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে ৩৫জন দরিদ্র ত্রিপুরা, মিজো ও পাংখু জনগোষ্ঠীর সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে স্থানীয় ব্যক্তি উদ্যোগে ছোট বড় ১২টি রিসোর্ট ও হোস্টেল গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে আরও অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে।

pahar-ctg

প্রচারে বলা হয়, ‘আমরা এলাকাবাসী আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর।কাজেই অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ ভিত্তিহীন। পর্যটনের জন্য আমাদের কোন পরিবার ও ব্যক্তিকে উচ্ছেদ হতে হয়নি বরং হেডম্যানের সহায়তায় নতুন স্থানে পরিকল্পিত ও আধুনিক বাসস্থান তৈরি করে দেয়া হয়েছে যার মাধ্যমে আমরা উপকৃত হয়েছি।

এই এলাকায় পর্যটনের উন্নয়ন হলে সকলেই উপকৃত হবে। কাজেই অন্যের কথায় এবং গুজবে কান দিয়ে আমাদের নিজেদের পেটে লাথি মারবেন না। চাঁদাবাজিতে ব্যর্থ হয়ে এবং নিজেদের হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সাজেক এলাকাবাসীর নামে যে উসকানিমূলক কথাবার্তা ও আন্দোলনের পায়তারা চলছে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

এই পর্যটনকে কেন্দ্র করে পরিবহন খাতে অনেক লোকের কর্মস্থান হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিদিন এই এলাকায় নতুন নতুন দোকানপাট গড়ে উঠেছে, যা এ অঞ্চলের জনগণের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে।

মনে রাখবেন, অতিথিরা দেবতা সমান, এদের নিরাপত্তা প্রদান সকলের দায়িত্ব। তবে বর্তমানে সন্ত্রাসীদের পক্ষ থেকে লিফলেট বিতরণ বন্ধ থাকলেও তাদের হুমকি এবং দেয়ালে সাঁটানো পোষ্টার দিয়ে পর্যটকবিরোধী প্রচারণা বন্ধ নেই’।

সাজেক এলাকার পর্যটন এসোসিয়েশনের প্রশাসক সিয়াতা লুসাই বলেন, এখানকার পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তারা চাঁদা দাবি করে, এলাকায় ভয়ভীতি দেখায়। ২০১৪ সালে একটি গাড়ি পুড়িয়ে এলাকায় ভীতি সৃষ্টি করেছিল।তারপর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রহরায় সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ করানো হয়।

সাজেক এলাকার এক হোটেলের মালিক ও ধর্ম প্রচারক মইতে লুসাই জানান, আমরা এ পর্যটন কেন্দ্রের মাধ্যমে অনেক আয় রোজগার করতে পারছি। কিন্তু সন্ত্রাসীরা আমাদের কাছে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। ফলে আমাদের এখানে ব্যবসা করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের বিরুদ্ধে লিফলেট ছেড়ে নানাভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান।

– সূত্র: জাগো নিউজ

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সকল পক্ষকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে

%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%a8

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসহাব উদদীন, এনডিসি, পিএসসি (অব.)

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সুপ্রাচীনকাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আজ থেকে প্রায় ১৫৬ বছর আগে, ১৮৬০ সালে, ব্রিটিশ-ভারতের সরকার তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশের পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা একটি প্রশাসনিক ইউনিট তথা একটি নতুন জেলার সৃষ্টি করে এবং নতুন জেলার নাম দেওয়া হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে যায়। অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাও বাংলাদেশের অংশ হিসেবে অব্যাহত থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেশ যখন দ্রুত পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জনগণের ঐক্যবদ্ধতা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর একটি ক্ষুদ্র অংশ এই যুক্তবদ্ধতার সঙ্গে শামিল না হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। উত্থান হয় ‘শান্তিবাহিনী’ নামক এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের। স্বাভাবিকভাবে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত পথ থেকে শান্তির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উত্তরণে বাংলাদেশের সব সরকারই সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।

অবশেষে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সফল অবসান ঘটিয়ে সূচিত হয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন। শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন : ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মায়’ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পক্ষে সন্তু লারমা।

as

এখানে উল্লেখ্য, কোনো প্রকার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এবং কোনো বিদেশি শক্তিকে যুক্ত না করেই এ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছিল যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম। পৃথিবীর যে কোনো দেশে সাধারণত এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায়। শুরু থেকেই এই চুক্তি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তৎকালীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ শান্তি বাহিনীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের।

ফলশ্রুতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়নের নবযাত্রার সূচনা হয়। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা হবে শান্তি ও উন্নয়নের রোল মডেল। শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারত থেকে প্রত্যাগত ১২,২২৩টি পরিবারের মোট ৬৪,৬১২ জন শরণার্থীকে পুনর্বাসন করেছে। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে এবং ১৫টি ধারা আংশিক রূপে বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়াও ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৩৩টি বিভাগ/বিষয়ের মধ্যে ৩০টি বিভাগ/বিষয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে এবং ২৮টি বিভাগ/বিষয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব বিভাগে লোকবল নিয়োগে চুক্তির শর্তানুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে তাদের বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত একটি ব্রিগেড এবং ২৩৯টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা

শান্তি চুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। এর জটিলতার প্রধান কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ না হওয়া। সরকার একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নিলেও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বিরোধিতা, অপহরণ ও সন্ত্রাসী তত্পরতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভূমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকি সব সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধি। বিষয়টির ব্যাপকতা এবং জটিলতার কারণেই বাস্তবায়নে একটু বেশি সময় লাগছে সমাধান করতে। শান্তি চুক্তি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। দুই পক্ষের জন্যই এই চুক্তিতে পালনীয় কিছু শর্ত রয়েছে।

asss

এটা ঠিক যে, শান্তি চুক্তি সম্পাদনের মূল লক্ষ্য— ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা’ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পাহাড়ি সংগঠন জেএসএসের সদস্যরা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাদের পক্ষ থেকে সব শর্ত পালন করেনি এবং শুরুতেই একটি অংশ ভাগ হয়ে অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়নি।

পরবর্তীকালে সেই সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আরও উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বাধার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি, নিরাপত্তা বাহিনীর অপারেশনে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দাবি করে থাকেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশই অবাস্তবায়িত। কিন্তু পরিসংখ্যান এই দাবি সমর্থন করে না। আমরা জানি, কিছু বাস্তবতার কারণে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছে। শান্তি চুক্তি বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতে একটি মামলা হাইকোর্টের রায়সহ বিচারাধীন রয়েছে। সরকারকে এসব বিষয় নিয়ে আরও দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত এবং সন্ত্রাসবাদ

পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে এবং সেসব সীমান্তে নিজ নিজ দেশের ইমারজেন্সি অপারেশন বিদ্যমান। দুর্গমতার কারণে বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত সেই সীমান্তের একটি বিরাট অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ২৬২ কিমি অরক্ষিত সীমানা রয়েছে।

ফলে, সে সব অরক্ষিত দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ওই সব দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এতে করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বন্ধু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি এবং ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। সম্প্রীতি, বান্দরবান ও রাঙামাটির কয়েকটি স্থানে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়াও, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে বান্দরবান জেলা থেকে পর্যটক অপহরণসহ বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো সম্প্রতি সমতলের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনাবেচা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততা সম্পর্কিত তথ্যাদি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম থেকে জানা গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শান্তি চুক্তির সাফল্য

শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যে সুবিধা ভোগ করছে তা ভুলে গেলে চলবে না। শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে উন্নয়ন প্রবলভাবে গতি পেয়েছে। সমতলের জেলাগুলোর মতো বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিমি রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিমি রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, কলকারখানাসহ সম্পন্ন হয়েছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম।

সরকারের প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এককালের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। যেখানে পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান উন্নয়নে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ হচ্ছে সেখানেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ বাধার সৃষ্টি করছেন। ইতিহাসে উন্নয়নকে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন নজির সম্ভবত আর নেই।

১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ছয়টি উচ্চবিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রায় প্রতিটি পাড়ায়। এ ছাড়াও ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আমরা এ অবস্থার আরও উন্নতি দেখতে চাই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা এবং পর্যটন সহায়ক শিল্প গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ বলে দাবি করা যায় না।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় ৩৫ কিমি দীর্ঘ থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ, নীলগিরি ও সাজেকের মতো উন্নত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আরও অনেক আকর্ষণীয় ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করা গেলে নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪৫টি নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে বিকাশ করতে পারলে প্রতিবছর ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা উপার্জন করা সম্ভব। এতে করে রাষ্ট্র যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে তেমনি পর্যটন বিকাশের ফলে স্থানীয় পাহাড়ি জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে চাঁদাবাজি/সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনেকাংশে কমে যাবে বলে সহজেই অনুমেয়।

assss

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অবস্থান

প্রথমেই একটি কথা বলা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠী কারও তাড়া খেয়ে, যাযাবর হয়ে বা কারও দয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়নি। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালি কিছু পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পাহাড়ের জলবায়ু, ভূমিরূপ ও ফুড চেইন তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে সেখানে বাঙালিদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহিন পাহাড়ি অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না।

ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক উন্নয়নের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও শান্তি বাহিনীর হুমকির মুখে তা পারত না। কারণ, সন্ত্রাসীরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নবিরোধী ছিল। শান্তি বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙালি হত্যা, নির্যাতন প্রক্রিয়া রোধ করতেই গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে বাঙাল ও পাহাড়িদের নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এতে বাঙালিরা নিরাপত্তা পেলেও সরকার প্রদত্ত বসতভিটা ও চাষের জমি হারাতে হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই ভিটা ও আবাদি জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল স্বত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত করা, আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ জমিতে চাষাবাদ করতে গেলেই পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি বাঙালিদের চাষকৃত জমির বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ এবং আনারস গাছ পর্যন্ত পাহাড়িরা কেটে ফেলে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অবস্থান

পাহাড়িদের মতে, পাহাড়ের সব জমিই তাদের। বাঙালিদের ভূমিহীন করার কৌশল হিসেবে তাদের জমির খাজনা অনেক পাহাড়ি হেডম্যান গ্রহণ করে না, ডিসি অফিসে দিতে হয়। বসতবাড়ি ও ভিটার জমিতে খাজনা দিয়েও তাদের এই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। পাহাড়িরা সমতলে এসে বসবাস করার সুযোগ পেলেও সমতলের বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করতে পারছে না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার সৎ উদ্দেশ্য থাকার পরেও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো প্রকার শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বাঙালিরা পাহাড়ে নানা বৈষম্যের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সরকারের দৃষ্টিগোচরে এনেছে। এরমধ্যে পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না।

উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের কমবেশি ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারি ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয় যাতে পাহাড়িরাও অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সব বদলি/নিয়োগ উপজাতীয় সংগঠন নিয়ন্ত্রিত। জাতীয়ভাবেও চাকরিতে ৫% কোটা তাদের জন্য নির্ধারিত। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতেও এই কোটা রয়েছে।

বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ-৫ পেয়েও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে জিপিএ-৫ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা কোটা সুবিধার কারণে বুয়েট/মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। নানা সুবিধায় তাদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ রাষ্ট্র কর্তৃক উন্মোচিত রাখা হয়েছে।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার যেমন অঙ্গীকারবদ্ধ তেমনি অন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এ জন্য কিছু সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন। অযথা উসকানিমূলক বক্তব্য এবং বাগাড়ম্বর হুমকি সবাইকে পরিহার করতে হবে। আশা করা যায় সব পক্ষই সেই ধৈর্য প্রদর্শন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের ধারাকে বেগবান করবে।

প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারসহ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিসত্তার সম্মিলিত ইচ্ছা ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশে সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নিজ নিজ দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। ওই সব দেশে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালীন সময়েও সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতে কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি করেনি। পর্যটন শিল্পই যে উন্নয়নের চাবিকাঠি তা তারা সবাই অনুধাবন করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও অনুরূপভাবে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

অতএব, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন”-এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পকে সরকার এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমাদের আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতিতে এই পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, “আমি” বা “তুমি” এবং “আমরা” বা “তারা”য় বিভক্ত না হয়ে, সবাই মিলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সেখানে বসবাসরত সব পাহাড়ি ও বাঙালি-ই এদেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের অবদান অপরিসীম ও প্রশংসার দাবী রাখে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনী নিজ দেশেরই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়োজিত। তারা সেখানে কোনো বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে বা যুদ্ধজয়ের জন্য নিয়োজিত নয়। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি নিশ্চিত করা। পরিশেষে, পার্বত্য এলাকায় শান্তির পরিবেশ আরও সুসংহত হবে এবং সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

♦ লেখক : সাবেক জিওসি, চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত

পাহাড়ী পুরুষদের ধর্ষণ নিয়ে উপন্যাস লেখায় লেখক রোকেয়া লিটাকে ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে পাহাড়ীরা

rokeya lita

স্টাফ রিপোর্টার:

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের জীবনধারা ও রাজনীতি নিয়ে উপন্যাস লেখায় লেখক রোকেয়া লিটাকে ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে পাহাড়ীরা। লেখিকা নিজেই তার ফেসবুকের টাইমলাইনে হুমকির স্ক্রীনশট দিয়ে লিখেছেন, “তথাকথিত সহজ সরল কতিপয় পাহাড়ির আসল চেহারা!! ইহারা এখন আমারেই ধর্ষণ করিতে চায়।”

ধর্ষণ করলে প্রথাগত বিচারে তার শাস্তি শূকর জরিমানা। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের প্রথাগত ও পরম্পরাগত নিয়ম এটি।সাংবাদিক রোকেয়া লিটার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ডুমুরের ফুল’-এ এমনই কিছু অসামঞ্জস্য বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, কখনও কখনও বিচারের নামে ধর্ষকের সাথেই ধর্ষিতাকে বিয়ে দেয়া এবং রক্ষক যে ভক্ষক হয়ে যায়, সেই ধরণের ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে বইটিতে। এ কারণেই লেখকের উপর চটেছেন পাহাড়ীরা।

দীর্ঘ আট মাস পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে, কখনও বা সীমান্তবর্তী দূর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে গিয়ে, পাহাড়িদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন লেখক। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পার্বত্যাঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাহাড়ীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতার অনেক ছবি রয়েছে সেখানে।

এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখা প্রসঙ্গে রোকেয়া লিটা বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকায় থাকি, প্রায়ই পাহাড়ে ধর্ষণের খবর পাই। এসব খবর পড়লে মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব ধর্ষণ হয়, তার সবই ঘটান বাঙালিরা। বিষয়টি আসলে তেমন নয়। কেবল বাঙালি কর্তৃক ধর্ষণের অভিযোগই আসে খবরে। পাহাড়ি পুরুষদের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে অনেক। কিন্তু সেসব বিষয় প্রকাশ্যে আনেন না সেখানকার পাহাড়ি নেতারা। তাই, ঢাকায় বসে বা ২/৩ দিনের জন্য পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে আসলে পাহাড়ের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়।’

শুধু ধর্ষণ বা প্রথাগত বিচার নয়, বইটিতে উঠে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনের অনেক অজানা তথ্য। আর এজন্যই বইটির নাম রাখা হয়েছে ‘ডুমুরের ফুল।’

লেখক জানান, উপন্যাসটির চরিত্রগুলো বাস্তব, তবে তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তমসবনচ

বইটির নামকরণ সম্পর্কে লেখক জানিয়েছেন, অনেকেই আমার দ্বিতীয় উপন্যাসের নামকরণের স্বার্থকতা জানতে চাইছেন। অনেকেই বলছেন, ডুমুরের ফুল বলতে তো কিছুই নেই, তাহলে আমার উপন্যাসের এই নাম রাখলাম! ডুমুরের ফুল আসলে ফলের ভেতরে থাকে, বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই উপন্যাসে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি ও জীবনাচরণকে ভেতর থেকে উন্মোচন করা হয়েছে যা সচরাচর ঢাকায় বসে বা দুই/তিন দিনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়ে বোঝা যায় না। এজন্যই উপন্যাসটির নাম রাখা হয়েছে ডুমুরের ফুল (The unseen object).

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি ও জীবনাচরণ নিয়ে রচিত এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন। একুশে বই মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে তিন নম্বর স্টলে আজ শুক্রবার থেকে পাওয়া যাচ্ছে উপন্যাসটি।

পাহাড়ীদের দাবী তাদের প্রতিবাদের মুখে বইটির উপর প্রকাশিত বুক রিভিউ দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকা তাদের অনলাইন ভার্সন থেকে তুলে নিয়েছে। কালের কণ্ঠের অনলাইন ভার্সন পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেখানে এ সংক্রান্ত কোনো বুক রিভিউ নেই। তবে প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো ঘোষণাও দেয়নি তারা।

বইটি সম্পর্কে লেখক বিভিন্ন সময় তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিযেছেন, প্রতিবছর শান্তি চুক্তি দিবস এলে ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা পাহাড়ে যায় রিপোর্ট করতে। বেশিভাগ প্রতিবেদনই বিগত বছরের পুনরাবৃত্তি। আর সারা বছর প্রতিবেদন পাঠায় স্থানীয় প্রতিনিধি। স্থাণীয় প্রতিনিধিদের বেশিভাগই পাহাড়ি, আর নিউজ করার জন্য এদের প্রিয় বিষয় হলো, “বাঙালী কর্তৃক পাহাড়ি নারী ধর্ষণ”। আমি বলবো পাহাড় রাজনীতির সবচে বড় হাতিয়ার হলো “পাহাড়ি নারী ধর্ষণ”। ধর্ষণ আর শান্তি চুক্তি ছাড়াও যে আরও হাজারটা বিতর্কিত ইস্যু আছে পাহাড়ে, তা হয়তো কখনও বুঝতেই পারতাম না “ডুমুরের ফুল” লেখা শুরু না করলে!! আমি বলবো, পাহাড়ের আজকের এই অবস্থার জন্য অনেক বেশি দায়ী আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো এবং কিছু এনজিও। ক্ষেত্র বিশেষে, এসব সংবাদপত্র ও এনজিও কাজ করেছে পাহাড় রাজনীতির ফুয়েল হিসেবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, আমার মনে হয় এতোকিছু করতে হবে না, থানায় গিয়ে খোঁজ নিলেও কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। তবে, সমস্যা হলো, পাহাড়ি মেয়েদের খুব একটা দেখা যায় না যে, তারা ধর্ষণ নিয়ে বাঙালীর ওপর দোষারোপ করছে। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পাহাড়ি পুরুষরা এই বিষয়টির রাজনীতিকরণ করছে এবং সেভাবেই প্রচার চালাচ্ছে..

পাহাড়ী নারী ধর্ষণ সম্পর্কে লেখিকা আরো বলেছেন, আজকে একজনের লেখা পড়লাম। তিনি লিখেছেন, “বাঙালী সেটেলারদের কাছে পাহাড়ি মেয়েরা ভোগ্যপণ্য”। এই কথাটি শুনলে প্রথমেই মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী সেটেলারদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে বোধ হয় শুধুই ধর্ষণ করার জন্য। তাদের আর কোনো কাজ নেই সারাদিন তারা শুধু মদ খায় আর পাহাড়ি মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণ করে। এমনকি এসব লেখা পড়লে মনে হয়, এই যে শীতকাল এলেই দলে দলে বাঙালীরা পাহাড়ে বেড়াতে যায়, তারাও বোধ হয় শুধু পাহাড়ি মেয়েদের ধর্ষণ করতেই যায়। বলি, পাহাড়ি মেয়েরা কি এতই রুপবতী আর এতই অাকর্ষনীয় হয়ে গেছে যে, বাঙালীরা সারাক্ষণ তাদের ধর্ষণ করার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে!!

তবে, পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনা যে ঘটছে না, তা কিন্তু নয়। হয়ত, এসব ঘটনার সাথে বাঙালীরাও জড়িত। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। প্রায় আট মাস পার্বত্যচট্টগ্রামে ছিলাম, দুজন পাহাড়ি মেয়ে ধর্ষণের ঘটনা আমার কানে এসেছে। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে, দুটি ঘটনাতেই অভিযোগ পাহাড়ি পুরুষের বিরুদ্ধে। আরও অবাক হয়েছিলাম যে বিষয়টি দেখে, দুটি ঘটনাই ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল, ধর্ষকের বিচার চেয়ে কোনো আন্দোলন নেই, নেই কোনো মিছিল, পত্রিকার পাতায়ও কোনো খবর নেই!! অথচ, ঢাকায় বসে আমরা শুধু খবর পাই, বাঙালীরা পাহাড়ি মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণের উৎসব পালন করছে। বুঝতে সমস্যা হয় না, এগুলোই হলো পাহাড়ের আসল রাজনীতি, এই রাজনীতির অনেকটা জুড়েই রয়েছে আমার উপন্যাস ” ডুমুরের ফুল (সময় প্রকাশন)”।

জেএসএসের কারণে পাহাড়ী ছাত্ররা ছাত্রলীগ করতে পারছে না- দীপংকর তালুকদার

12606762_978611458879143_1481615760_n

স্টাফ রিপোর্টার:

রাঙ্গামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব করতে পারে না। ছাত্রলীগ মেধাবী ছাত্রদের সংগঠন। আমার রাজনীতিও ছাত্রলীগ দিয়ে শুরু হয়েছিল। এরপর আমি এমপি হয়েছি মন্ত্রী হয়েছি। আজকের ছাত্রলীগের মেধাবী নেতা কর্মীরাই ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দেবে।

শনিবার লংগদু উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ছাত্রলীগের ৬৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপংকর তালুকদার এসব কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, আমরা যখন ছাত্রলীগ করতাম তখনও পার্বত্য অঞ্চলে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব পড়েনি। পাহাড়ী শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ করার কারণে অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বর্তমানেও জেএসএসের কারণে পাহাড়ী ছাত্ররা ছাত্রলীগ করতে পারছে না। পাহাড়ীরা জাতীয় রাজনীতি করতে চাইলে তাদের হত্যা ও গুম করার হুমকি দেয়।

তিনি বলেন, নিজেদের টাকায় পদ্মাসেতু হবে এটা কোনদিন এদেশের মানুষ কল্পনাই করতে পারেনি। জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বেশ এগিয়েছে বাংলাদেশ, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশ।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ লংগদু উপজেলা শাখার সভাপতি জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি মুছা মাতব্বর, সাংগঠনিক সম্পাদক ক্যারল চাকমা, প্রচার সম্পাদক মমতাজ উদ্দীন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল বারেক সরকার, সাধারণ সম্পাদক জানে আলম।

ছাত্রলীগ নেতা রাকিব হাসানের সঞ্চালনায় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম সম্পাদক মীর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঝান্টু, জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নজরুল ইসলাম, জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুবেল চৌধুরী, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম, ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. হানিফ রেজা, রাবেতা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মোহাম্মদ হৃদয়।

আলোচনা সভার পূর্বে সকাল দশটায় এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা উপজেলার প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। এপর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি দীপংকর তালুকদার কেক কাটার মধ্যদিয়ে ৬৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। বিকেল পরিবেশিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

পাহাড়ী ভাতা ৩০ শতাংশ করার দাবিতে বান্দরবানে মানববন্ধন

Bandarban pic-12.1

স্টাফ রিপোর্টার:

পাহাড়ী ভাতা ৩০ শতাংশ করার দাবিতে বান্দরবানে সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। মঙ্গলবার দুপুরে বান্দরবান প্রেসক্লাবের সামনে কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্বারকলিপি দিয়েছেন কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

জেলা কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি আবদুল মোতালেবের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক আমজাদ হোসেন, চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী পরিষদের সভাপতি আবু জাফর, সিনিয়র সাধারণ সম্পাদক এমরান হোসেনসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা।

সমন্বয় পরিষদের সভাপতি আবদুল মোতালেব বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাড়িয়েছে সরকার। কিন্তু পার্বত্যাঞ্চলে কর্মরত সরকারি-স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মচারীদের পাহাড়ী ভাতা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। ২০ শতাংশ হারে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীরা কখনো ৫ হাজার টাকাও পাবেন না। আগে পাহাড়ী ভাতা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সমান ভাবে পেত। বর্তমানে পাহাড়ী ভাতা জেলার কর্মচারীদের তুলনায় উপজেলা কর্মচারীদের বেশি দেয়া হচ্ছে। বৈষম্য দুরিকরণে পাহাড়ী ভাতা ৩০ শতাংশ হারে সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে মানববন্ধন কর্মসূচির পর কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের নেতৃবৃন্দরা মিছিল সহকারে গিয়ে জেলা প্রশাসক মিজানুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাহাড়ী ভাতার দাবির স্মারকলিপি দিয়েছেন।

দিনে দিনে পার্বত্য উপজাতীয়রা এলিট বাঙালীরা নিঃস্ব শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে

উপজাতি বাঙালী

মো: সাইফুল ইসলাম:

 পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপজাতীয়দের সকল প্রকার লেনদেন আয়কর মুক্ত। পার্বত্য এলাকায় যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লক্ষ টাকার মধ্যে সেগুলোর ঠিকাদারী সম্পূর্ণরূপে উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০% উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। বাকি ৯০% ঠিকাদারির সিংহভাগ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উপজাতীয়রাই দখল করে নেয়। কারণ তাদের আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র ৫ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় সারা দেশবাসীর মতই শতকরা ১৬ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। সরকারিভাবে গৃহীত এ ধরনের ভ্রান্তনীতির কারণে পার্বত্যাঞ্চলের বাঙালিরা উপজাতীয়দের তুলনায় প্রতিনিয়তই পিছিয়ে পড়ছে।

দিনে দিনে উপজাতীয়রা এলিট শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে আর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে হতে বাঙালিরা আজ অবহেলিত এবং উপজাতীয়দের অনুগত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। সরকারিভাবে এ ধরনের জাতিগত বৈষম্য তৈরি কখনোই কাম্য হতে পাওে না। আর এমন বৈষম্য নীতি কোন অঞ্চলের শান্তির জন্যও সহায়ক নয়। তাই এসব বৈষম্যের অবসান করে পার্বত্যাঞ্চলে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করার সময় এখনই।

চুক্তি পূর্ব বিশৃঙ্খল অবস্থায় যেসব উপজাতীয় নাগরিক ভারতে আশ্রয় গ্রহণকরেছিল তাদেরকে ফিরিয়ে এনে ২০দফা প্যাকেজ সুযোগ সুবিধা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এভাবে ৬০ হাজারেরও বেশি উপজাতীয় জনগণ বর্তমানে পুনর্বাসিত হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে।
অন্যদিকে ১৯৮৬ সাল থেকে ২৮ হাজারের বেশি বাঙালি পরিবারকে অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে গুচ্ছ গ্রামে এনে কার্যত বন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে। গুচ্ছ গ্রামগুলোতে পরিবার প্রতি একটি মাত্র ঘর তোলার জায়গা আর মাসিক ৮৬ কেজি চাল অথবা গম তাদের একমাত্র অবলম্বন। ২৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এসব গুচ্ছ গ্রামের এক একটি পরিবার ভেঙ্গে বর্তমানে ২টি, ৩টি বা তার চেয়েও বেশি পরিবারে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বাড়েনি তাদের ঘর তোলার জায়গা, মাসিক রেশনের পরিমাণও বাড়ানো হয়নি। তাছাড়া গুচ্ছ গ্রামগুলোতে সেনিটেশন ব্যবস্থাও নেই। নেই ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজ। চাষাবাদের জমিও তাদের নেই। ফলে তারা একমাত্র মাসিক ৮৬ কেজি রেশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে কোনো রকমে জীবন ধারণ করছে। মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ছেলের বউ, মেয়ের জামাই, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলসহ একই ঘরে গাদাগাঁদি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে গুচ্ছ গ্রামবাসী বাঙালি পরিবারগুলো। অথচ তাদের কবুলিয়ত ভুক্ত জমি-জমাগুলো দুস্কৃতিকারী উপজাতীয়রা দখল করছে নানা কৌশলে। কখনও বাঙালিদের জমিতে রাতারাতি কেয়াং নির্মাণ করে আবার কখনও চাষ করে দখল করছে বাঙালিদের জমি। সব কিছু দেখেও আমাদের সরকার এবং প্রশাসন নির্বিকার। তাদের যেন কিছুই করার নেই।
বাঙালিরা গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ হয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করতে থাকবে এটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু এ অমানবিক অবস্থা দীর্ঘ দিন চলতে পারে না। আর চললেও সরকার এবং উপজাতি কারো জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না। তা ছাড়া রেশন বাবদ প্রতিমাসে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব বিবেচনা করে গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙালিদেরকে তাদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে পুনর্বাসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
পার্বত্য চুক্তির ভূমিকার সাথে এর ধারা উপধারা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক অবস্থার মধ্যে সাংঘর্ষিক আরও অনেক বিষয় রয়েছে। আর এসব কিছুর ফলেই পার্বত্য চুক্তিকে শুরু থেকে সচেতন দেশবাসী মেনে নিতে পারেনি। ভবিষ্যতেও মেনে নেয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে গত ১৭ বছরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সরকার চুক্তির বিতর্কিত ধারা উপধারাগুলি নতুনভাবে বিবেচনা করতে পারে। এতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় সারা দেশই উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ :

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিদেশী দাতা সংস্থা ইউএনডিপি’র কার্যক্রম মনিটরিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা, সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তন, বিদেশী অতিথি ও কূটনীতিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ ও আনসারে যোগ দেয়া শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলীর মতো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্র দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রস্ফুটিত হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬ থেকে তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের নিকট ১১ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ফ্যাক্স পাঠানোর পর এ তথ্য জানা যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি লেখকের সংগ্রহে রয়েছে। বিজিবি’র একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি পরবর্তী পার্বত্য চট্রগ্রামের পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, আনসার ভিডিপি’র মহাপরিচালক, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবির কর্মকর্তাগণ।

সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একাধিক সংগঠন বিভিন্নভাবে শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমসহ চাঁদাবাজি, অপহরণ ও বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ি জনপদ ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামের উন্নয়নের নামে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার জবাবদিহিতা নেই বলললেই চলে। পার্বত্য জনপদে ইউএনডিপিসহ অন্যান্য এনজিও যেসব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে সেসব প্রকল্পের মনিটর করা দরকার। এছাড়া, তিন পার্বত্য জেলায় যেসব সংগঠন শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত এবং চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের সাথে যুক্ত তাদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামে গত দশ বছরে ইউএনডিপির মাধ্যমে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে মনিটর করা প্রয়োজন৤ তিনি বলেন, বিদেশী নাগরিকদের পার্বত্যাঞ্চল ভ্রমণে  Code of Conduct  প্রণয়ন করা দরকার। অনেক সময় বিদেশী নাগরিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে শুধু জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারকে জানিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে যায়, এটি সঠিক  নয়। জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের কাছে এধরণের কোন আবেদন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলে মন্ত্রণালয়ই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এদিকে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষায়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৪টি অধ্যায়ে ৭২টি ধারা রয়েছে। অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্ত লারমা) স্বীকার করেন না। উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার কারণে গত ২২ বছরেও তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তিচুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত ৩৩টি বিষয় /বিভাগসমূহের মধ্যে ৩০ টি সংস্থা/বিষয় ইতোমধ্যে হস্তান্তরিত হয়েছে। অবশিষ্ট তিনটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় হস্তান্তর কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, জেএসএস এবং ইউপিডিএফসহ আরও যে সব স্থানীয় সংগঠন আছে তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গ্রুপগুলো সব সময়ই সক্রিয় রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানীতেও কোন কোন সংগঠন জড়িত রয়েছে মর্মে অভিযোগ আছে। বিজিবি কর্তৃক বিওপি স্থাপনের জন্য বন বিভাগ থেকে জায়গা চাওয়া হলে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় হতে সহযোগিতা করা হবে মর্মে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক বলেন, উন্নয়নের নামে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কোথায় খরচ করা হলো তার হিসাব নেওয়া দরকার। ইউএনডিপির কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া যেতে পারে। তিনি  বলেন, বিদেশী পর্যটকগণ স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে গিয়ে থাকেন। ফলে বিষয়টি প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর অগোচরেই থেকে যায়। সভায় ডিজিএফআই প্রতিনিধি বলেন, বিদেশী নাগরিক মন্ত্রণালয় বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেলে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত কারোর মেহমান হিসাবে সাধারণ যানবাহনে গমন করে থাকে। সিএইচটি কমিশন সহ কিছু সংস্থা স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ব্যতিরেকে বৈঠক ও আলাপ আলোচনা বেশি পছন্দ করে। পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীয়দেরকে আদিবাসী হিসাবে ঘোষণা করা তাদের মূল উদ্দেশ্য। অন্যান্য বিষয়ে অনৈক্য থাকলেও এই পয়েন্টে সকল স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠন একমত পোষণ করে। বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়:

বিগত ১০ বছরে পার্বত্য চট্রগ্রামে ইউএনডিপি কর্তৃক ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের  উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ফলাফল প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়; শান্তিচুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সংগঠন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র চোরাচালান রোধকল্পে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার এর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; কোন আইনগত ভিত্তি না থাকায় সিএইচটি কমিশনের নাম সংশোধন করে ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ রেখে অন্য কোন নাম রাখার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়; কূটনৈতিকগণ ছাড়া সাধারণ বিদেশী নাগরিকগণ পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করতে চাইলে অন্তত একমাস পূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করবেন; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমতি প্রদান করবে; অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী নাগরিকগণ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারের নিকট তাদের উপস্থিতি/ভ্রমণসূচি দাখিল সাপেক্ষে ভ্রমণ করবেন; কূটনৈতিকগণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি গ্রহণ করে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করবেন; কোন দেশী-বিদেশী ব্যক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাত কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবি এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে; পার্বত্য চট্রগ্রামের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সাথে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ দায়িত্ব পালন করবে; ভারত ও বাংলাদেশের সাথে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্রগ্রামের ৪৭৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে ইতোমধ্যে গৃহীত/বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাসহ আবশ্যকীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব বিজিবি প্রেরণ করবে; পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান চেকপোস্টগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশ ও আনসার বাহিনীতে কর্মরত শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলীর সুপারিশ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। নিকট অতীতে এতো সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত, লক্ষ্যানুসারী সিদ্ধান্ত দৃষ্টিগোচর হয়নি। সন্দেহ নেই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত দেশবাসী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পাহাড়ী সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক, দেশী বিদেশী দাতা সংস্থা, এনজিও ও কূটনীতিকরা চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়েছে। তাই তারা সরকারী এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে তাদের অনুজীবী দেশীয় রাজনীতিবিদ, এনজিওকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মাঠে নামিয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহকে অগণতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক, নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতা, শান্তি চুক্তি বিরোধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরো বলেন, বিদেশী নাগরিকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে  যেতে অনুমতি লাগবে আবার যে কেউ সেখানকার ‘আদিবাসীদের’ সাথে দেখা করতে চাইলে সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে সাথে রাখতে হবে এইরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্বুদ্ধিতা ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দেয়’।

বিশিষ্ট কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সিএইসটি কমিশনের নাম পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের এ অধিকার স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কে দিয়েছে? এতদিন পর নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ কেন তোলা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অধিকার আছে দেশের বাইরে থেকে আসুক বা দেশের ভিতর থেকে কেউ আসুক সে বিষয়ে নজরদারী রাখা। তার মানে তো এই নয় যে, একজন বাঙালী পাহাড়ী কাউকে বিয়ে করতে হলে, বিয়ের বরযাত্রী নিয়ে পাহাড়ে যেতে হলে প্রশাসনের অনুমতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লাগবে। পাহাড়ীদের কি কোন বিদেশী মেহমান থাকতে পারে না’? এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা জানি জেলে কারোর সাথে দেখা করতে হলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে করতে হয়। তাহলে আমার প্রশ্ন, পার্বত্য চট্রগ্রাম কি তাহলে কারাগার যে এখানে বাইরের কেউ যেতে হলে অনুমতি নিতে হবে’। পংকজ ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাঙালি যে একটি উপনিবেশবাদী জাতি তা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা বর্ণবাদী, ইহুদী, জার্মানির মতো। এর মধ্য দিয়ে জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ্যে রূপ লাভ করেছে। পাহাড়ে সেনা শাসনের বিষয়টি এর মধ্য দিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো। এটাকে বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িকতা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তনের অনুরোধের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই কমিশনের সদস্য ব্যরিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংবিধান পরিপন্থী। তাছাড়া কোন একটি সংগঠনের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আছে কি? অধ্যাপক মেসবাহ কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে নির্লজ্জ সিদ্ধান্ত ও পার্বত্য চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক’ বলে অভিহিত করেন।

 উল্লেখ্য যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা বিরূপ মনোভাব ও মন্তব্য করেছেন তাদের সম্পর্কে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এরা কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন এনজিও সাথে জড়িত বা তা থেকে লাভবান। আর ঐ সকল এনজিও উল্লিখিত দাতা দেশ ও উন্নয়ন সংস্থা থেকে আর্থিকভাবে অনুদানপ্রাপ্ত বা লাভবান। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিকূলে যেকোনো সিদ্ধান্ত ও ঘটনাবলীতে তারা সবসময় সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার নয় বরং এর পেছনে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত।

 পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা সাম্প্রদায়িকতার বীজবপন তা ড. ইফতেখারুজ্জামানের স্বার্থের চোখে ধরা না পড়লেও তাকে প্রথম আলোর সাবেক ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্রের আর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশে, মহাদেশ নির্বিশেষে বিয়ে হচ্ছে সর্বত্র। কেবল বাংলাদেশের পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাছেই এটা মহা অপরাধ। যেকোনো কোনো পাহাড়ী মেয়ে কোনো বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করলে পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে থাকে। এমনকি পাহাড়ী মেয়েরা বাঙালী ছেলেদের সাথে প্রেম, বন্ধুত্ব, চলাফেরা করলে পাহাড়ী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে চাপ দেয় ফিরে আসতে। কিন্তু ফিরে না এলে জাতি রক্ষায় নামে উল্লিখিত শাস্তি দেয়া হয়। এটাই তাদের অঘোষিত শাস্তি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য  সাংবাদিক সৈকত ভদ্র। তিনি ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন খাগড়াছড়ির মেয়ে সহযোদ্ধা রেটিনা চাকমাকে। বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করায় রেটিনা চাকমার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। একই কারণে প্রথম আলো থেকে চাকুরী হারাতে হয় তাকে। পাহাড়ীদের চাপে তাকে চাকরী থেকে বহিস্কারের জন্য প্রথমআলোর সম্পাদক বরারব সুপারিশ করেছিলেন ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সৈকত ভদ্র সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামের মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন” । তিনি স্ত্রী রেটিনা চাকমাকে নিলামের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতীয় বিবেক ও মানবিকতার কাছে আর্তনাদ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ গণমাধ্যমের বিবেক ও মানবিকতায় সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ নিষ্ফল করাঘাত করেছে। এমনকি পাহাড়ীদের ব্যাপারে অতি স্পর্শকাতর গণমাধ্যমেও সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।

শুধু এক রেটিনা চাকমা নয়, গুইমারা উমাচিং মারমা, মাটিরাঙার সোনাবি চাকমা, রাঙামাটি কুতুকছড়ির রীনা ত্রিপুরা, রামগড়ের মণিকা ত্রিপুরা, এরকম আরো অসংখ্য পাহাড়ী মেয়েকে বাঙালী বিয়ে করায় অপহরণ, গণধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন নারকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে। অবশ্য সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনিও খাগড়াছড়ির জামাই। স্ত্রী চাকমা সম্প্রদায়ের। তাকে বা তার স্ত্রীকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন তথ্য লেখকের জানা নেই। বরং ঢাকায় তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের কাছে সর্বোচ্চ জামাই আদরই পেয়ে থাকেন। কিন্তু খাগড়াছড়িতে শশুরবাড়ী যেতে হয় রাতের অন্ধকারে। ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রায়ই বলে থাকেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসরাইলী শাসন চলছে। পঙ্কজ বাবুর ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না। তবে তিনি যদি পরিস্কার করে বলেন, ইসরাইলের স্যাটেলার ইহুদি শাসনে নিপীড়িত স্থানীয় মুসলিমদের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কীভাবে মেলালেন। এখানে কারা স্যাটলার, কারা স্থানীয়? কারা শোষক, কারা শাসক?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় দাতা সংস্থাগুলো অনেকটা স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এনজিও পরিচালনা সংক্রান্ত কোনো সরকারি নির্দেশনা তারা মানে না। তাদের কাজের ও খরচের কোনো বিবরণ/হিসাবও সরকারকে দেয় না। এ ব্যাপারে একাধিকবার বলা হলেও তারা তা পালন করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী দাতা সংস্থা, মিশনারী ও এনজিও’র কর্মকাণ্ড সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। এসব এনজিও ও দাতা সংস্থার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে সহায়তা, উস্কানী, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি, ধর্মান্তরকরণসহ নানা অভিযোগ বহুদিনের। সরকারি একাধিক তদন্তে একথা প্রমাণিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইস্ট তিমুর ও সাউথ সুদানের মতো আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর পশ্চিমা নীলনকশাও সকলের জানা। গত ১৩ মার্চ বান্দরবানের আলীকদমে  ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট’ নামে এক খ্রিস্টান মিশনারী লোভ দেখিয়ে অনেকটা গোপনেই স্থানীয় ৩৩ জন মুরুংকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে। পুলিশ এ অভিযোগে মিশনারীটির ৫ জন সদস্যকে গ্রেফতারও করেছে। গতবছর একই এলাকার চাক সম্প্রদায় মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। কাজেই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বৈদেশিক সাহায্যের নামে টাকা এনে এসব এনজিও ও দাতা সংস্থা কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করছে তা জানা জরুরি ও বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার।

এদিকে ১৯৮৯ সালে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন পর নতুন সিএইচটি কমিশন গঠিত হয়েছে। এর নামের আগে এখন আর ইন্টারন্যাশনাল লেখা হয় না। নতুন সংস্থাটি কবে, কোথায় গঠিত ও নিবন্ধিত হয়েছে, কোন আইনে নিবন্ধিত হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার আদৌও কোনো অনুমতি আছে কিনা সেসব খতিয়ে দেখে এই কমিশনকে নিষিদ্ধ করার দাবি পার্বত্যবাসী, বিশেষ করে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের। এই কমিশনের বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগ করে থাকে বাঙালিরা। সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অভিযোগে পার্বত্য বাঙালিরা ইতোমধ্যে এই কমিশনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের সফরকালে প্রায় সবসময় একই অভিযোগে বাঙালিদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান কি করে ‘কমিশন’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তা খতিয়ে দেখে মন্ত্রণালয় কেবল ‘কমিশন’ নামটি বাদ দিয়ে নতুন করে নিবন্ধিত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত সফট ডিসিশন বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে পাশ্চাত্যের স্বতন্ত্র খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র ও তৎপরতার কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশী নাগরিক ও কূটনীতিকদের চলাচলের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এমনিতেই কূটনীতিকদের সকল ভ্রমণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কর্মরত পশ্চিমা কূটনীতিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আইন অমান্য করে থাকেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় এ ঘটনা অহরহই ঘটে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে পরিচয় গোপন করে বা পর্যটকের ছদ্মাবরণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা পরিচালনার কথাও নতুন নয়।  এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের স্পেশ্যাল র‌্যাপোটিয়ার্স Mr. Lars Anders Bear এর কথা স্মরণ করা যেতে পারে।  সুইডেন নাগরিক Mr. Lars Anders Bear বিভিন্ন দেশের আদিবাসী ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। তিনি UNFPII-এ স্পেশাল রেপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োজিত। UNFPII এর দশম অধিবেশনে Mr. Lars Anders Bear কর্তৃক উপস্থাপিত ‘Status of the  implementation of CHT Peace Accord of 1997′ যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি জাতিসংঘের পরিচয় গোপন করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন এবং তার সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত UNFPII এর স্বার্থে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করতেও কসুর করেননি তিনি। এ ধরনের তৎপরতা রোধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নজরদারী করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেখানে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত অপহরণ ও জিম্মি করে হত্যা ও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে সেখানে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতেও নজরদারী প্রয়োজন।

 তবে একথা সত্য যে, এ ধরনের নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনাকে নিরুৎসাহিত করবে এবং একই সাথে সেখানে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের কাজে বাধার সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে সচেতন মহলের অভিমত এই যে, বিশেষ অঞ্চল হিসাবে বিবেচিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশীদের চাকরি ও অবস্থান নিরুৎসাহিত করে বাংলাদেশীদের মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন অঞ্চলে বিদেশীদের ভ্রমণে এ নিদের্শাবলীর শৈথিল্য প্রদর্শন এবং পর্যটন অঞ্চলের বাইরে বিদেশীদের ভ্রমণের এ নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়িভাবে আরোপ করা যেতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, চায়নাসহ বিশ্বের দেশে দেশের ইনসার্জেন্ট অঞ্চগুলোতে এভাবেই বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অন্যতম হচ্ছে, শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্য যারা পুলিশ ও আনসারে যোগদান করেছে এবং তাদের মাধ্যমে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত তাদের পার্ব্ত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলী করতে হবে। এটি অত্যন্ত সঠিক ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

 অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অনেক সদস্য ছাত্রজীবন শেষে নিরাপত্তাবাহিনীর চাকুরীতে যোগদান করে। কিন্তু সার্ভিসে যোগদানের পরেও  অনেকেই তাদের গোপন সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এ বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত পাহাড়ীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে একটি মহল ইউএনডিপি’র ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশ্র পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির নামে উপজাতীয় পুলিশ ও আনসারদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন শুরু করে। এই সুযোগে শান্তিবাহিনীর যেসকল সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে পুলিশ ও আনসারে চাকরী নিয়েছিল তারাও পদায়ন হয়। কিন্তু সার্ভিসে থাকলেও তারা সার্ভিসের গোপন খবর বিশেষ করে অপারেশনাল নানা তথ্যাদি উপজাতীয় সংগঠন ও সন্ত্রাসীদের কাছে পাচার করতো। এ বিষয়ে পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে রিপোর্ট করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাঙালীদের কাছে মদ একটি নিষিদ্ধ পানীয় হলেও পাহাড়ীদের জীবনে এটি খুবই সাধারণ পানীয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপজাতীয় পুলিশ দায়িত্ব পালনকালে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে, বা সন্ত্রাসীরা টার্গেট করে উপজাতীয় পুলিশদের পাহাড়ী মদ খাইয়ে মাতাল করে। মাতাল অবস্থায় সে অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পুলিশের অস্ত্র নিয়ে পলায়ন করে। এ কায়দায় গত দূর্গাপূজার সময় পানছড়িতে লক্ষ্ণীকুমার চাকমা নামের এক শান্তিবাহিনী ফেরত উপজাতীয় পুলিশের একে-৪৭ রাইফেল চুরি হয়। বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাজেই দেশী দাতা দেশ, সংস্থা ও তাদের অনুজীবী এনজিও, এনজিও’র মালিক, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে যত সমালোচনাই করুক, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে সরকারকে তার সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। জাতীয় প্রত্যাশাও এটাই।

Email:palash74@gmail.com

নোট: গত ২২ মার্চ ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে এই লেখাটি প্রকাশিত  হয়েছিল। তবে বর্তমান লেখাটি ঈষৎ পরিবর্ধিত। লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হয় তার পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৪ ফেব্রুয়ারীর আদেশ শিথিল করে।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা