পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩ হাজার উপজাতীয় সন্ত্রাসীর হাতে ৩ হাজার ভয়ানক আগ্নেয়াস্ত্র

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র গ্রুপের রয়েছে আর্ম ক্যাডার ও সেমি আর্ম ক্যাডার বাহিনী। এর মধ্যে আর্ম ক্যাডারের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। অন্যদিকে সেমি আর্ম ক্যাডারের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। সেমি আর্ম ক্যাডাররা অস্ত্র প্রশিক্ষিত। তারা ভবিষ্যতে সংগঠনগুলোর জন্য কাজে লাগে।

এসব সন্ত্রাসীদের কাছে তিন হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সেখানে পুরনো অস্ত্রের পাশাপাশি নতুন এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। এসবের মধ্যে আছে এম ১৬ রাইফেল, মিয়ানমারে তৈরি এম ১ রাইফেল, একে ৪৭ রাইফেল, একে ২২ রাইফেল এবং এলএমজি (লাইট মেশিনগান), হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল ইত্যাদি ভয়ঙ্কর স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। প্রতিবেশী দুইটি দেশ থেকে তারা এই অস্ত্র, গুলি ও প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অস্ত্র আসছে। মাঝে মাঝে কিছু ধরা পড়লেও তা খুবই সামান্য। উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হাত ঘুরে এসব অস্ত্রের একটি অংশ সমতলের জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের হাতেও চালান হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি কিছু লোক ধর্মীয় নেতার পরিচয়ের আড়ালে অস্ত্র পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে। এরকম কিছু ধর্মীয় লেবাসধারী নেতা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে। গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, তারা বাংলাদেশি নয়। বাংলাদেশের পরিচয়পত্র তাদের হাতে নেই। গহীন অরণ্যে রয়েছে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।তারা স্বীকার করেছে, মিজোরাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাহাড়ি চারটি সশস্ত্র গ্রুপ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গ্রেনেড এনে মজুদ করছে।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা অস্ত্র জমা দিলেও পরে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, তারা তিনভাগের একভাগ অস্ত্র জমা দিয়েছে। যা জমা দিয়েছে তাও পুরোনো, ভাঙাচোরা, অচল ও সেকেল। নতুন ও অত্যাধুনিক অস্ত্র জমা দেয়নি। অন্যদিকে শান্তিবাহিনীর একটি অংশ এই চুক্তি না মেনে অস্ত্র জমাদান করেনি। মূলতঃ সরকারের উপর আস্থা স্থাপন না করা ও পরবর্তীকালে প্রেশার গ্রুপ হিসাবে কাজ করার জন্য কৌশলের অংশ হিসাবে শান্তি বাহিনী একটি অংশকে অস্ত্র সমর্পনের বাইরে রেখে দেয় চুক্তি বিরোধী হিসাবে। পরবর্তীতে নানা কারণে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনের বছরে রাজনৈতিক কারণে হানাহানিতে এসব অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পুলিশসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সাথে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বান্দরবান, বাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সশস্ত্র সংগঠনের হাতে ১৩০জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ৮৫জন বাঙালী নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন ২২৩জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ৫৫১জন বাঙালী। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৪০০ ও গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১৩০টি। প্রায় ৫০০টি অস্ত্র ও ৭ হাজার গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ১৮ এপ্রিল পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ২ টি ৭.৬২ মিঃমিঃ এসএমজি, ১ টি এ্যাসল্ট রাইফেল, ২ টি পিস্তল, ১৬ রাউন্ড এ্যামোনিশন, ২ টি এসএমজির ম্যাগাজিন, ১ টি এ্যাসল্ট রাইফেলের ম্যাগাজিন, ২ টি পিস্তলের ম্যাগাজিন ও ১ টি সিলিং। ১৮ এপ্রিল ভোর ৪ টায় রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বালুখালী ইউনিয়নের কাইন্দা এলাকায় সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত একটি বিশেষ অভিযান এ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

জানা গেছে, গত ৬ মাসে পাহাড়ে ৫২ সশস্ত্র হামলা ও অপহরণ হয়েছে। মিয়ানমারের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপের এক শীর্ষ নেতার ফোনালাপের ঘটনায় পার্বত্য অঞ্চলে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের ওই শীর্ষ ব্যক্তি পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপের ক্যাডারদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নেটওয়ার্কে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ওই সূত্রগুলো জানিয়েছে, সন্ত্রাস দমনে পার্বত্যাঞ্চলে নিয়োজিত সেনাবাহিনী যথেষ্ট তৎপর থাকলে শান্তিচুক্তির পর সেখানে তাদের অবস্থান ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ করে সরকার হাত পা বেঁধে দিয়েছে। পুলিশ ছাড়া সেনাবাহিনী সেখানে কোনো অপারেশনে যেতে পারে না। কিন্তু আগে থেকে পুলিশ জেনে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা আগাম তথ্য পেয়ে যাচ্ছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ৫৫২টি সেনা ক্যাম্পের মধ্যে ৩৩৪টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ২১৮টি ক্যাম্প রয়েছে। বেশিরভাগ ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দুর্গম খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি রোডের থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ায় বিশাল অংশ সশস্ত্র ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এরই একটি অংশে ৫ মে ঘটে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড।

সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে খুন, অপহরণ, দখল ও চাঁদাবাজি ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। শান্তিপ্রিয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালীরা চাঁদা দিয়েও এখন আর শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন না। প্রতিটি মুহুর্ত তাদের কাটছে নিরাপত্তাহীনতায় মধ্যে। বিস্তার ঘটেছে ভয়াবহ চাঁদাবাজীর নেটওয়ার্ক। বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে এই উপজাতীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। চাঁদা না দিয়ে সেখানে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা এমনকি বসবাসও সম্ভব নয়। এই চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হচ্ছে পাহাড়ী, বাঙালি নির্বিশেষে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি এক দিনের ব্যবধানে নানিয়ারচরে ঘটে যাওয়া ৬ হত্যাকাণ্ডের কারণও এই চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। জেএসএস সংস্কার নেতা সুদর্শন চাকমা আগামী নির্বাচনে প্রার্থি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নির্বাচনে দাঁড়ালে স্থানীয় একটি আঞ্চলিক সংগঠনের জন্য ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়িতে তারা নির্বিঘ্নে নির্বাচনী কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারতো না। অন্যদিকে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জেএসএস সংস্কার মিলে খাগড়াছড়িতে প্রার্থী দিলে মহালছড়ি, দিঘীনালায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) নির্বাচনে প্রবল বাঁধার সম্মুখীন হতো। বর্তমানে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূলের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতার সূত্রে সিজ ফায়ার রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচার রয়েছে।

হঠাৎ করে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে শিগগিরই যৌথ অভিযান চালানো প্রয়োজন বলে স্থানীয় শান্তিপ্রিয় সাধারণ বাঙালী ও ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর লোকজন মনে করেন।

খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির একাধিক স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিপুল পরিমান চাঁদার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। চাঁদা আদায় এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে পাহাড়ে।

১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে (জেএসএস) শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করে। এর এক বছরের মাথায় চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। মূলত তার পরেই পাহাড়ে আবারও আধিপত্য বিস্তারে রক্তের খেলা শুরু হয়।

এরপর ২০০৭ সালে জেএসএস থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। এতদিন ইউপিডিএফ ও জেএসএস (এম এন লারমা) দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। কিন্তু গতবছরে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আত্মপ্রকাশ করে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক দল। মূলত এই চার সংগঠনের ক্ষমতার বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়।

গত এক দশকের পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ইউপিডিএফের আধিপত্য খাগড়াছড়িতে বেশি। বালাঘাটা ও নাইক্ষ্যংছড়ির কিছু এলাকা বাদে বান্দরবানে আধিপত্য বেশি জেএসএসের। তবে রাঙামাটির বিশাল এলাকায় এক সময় ই্উপিডিএফ আধিপত্য বিস্তার করলেও বর্তমানে তাদের অবস্থান সঙ্কুচিত হয়ে বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালীর কিছু এলাকায় সীমিত রয়েছে। বাকি অংশ জেএসএস লারমা ও কিছু অংশ সংস্কারের দখলে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তিন পার্বত্য জেলার পরিস্থিতি হঠাৎ করেই জটিল হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক দলগুলোর নেতৃত্বে চার ভাগ হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এ বিভক্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতার কারণ বিশ্লেষণ করলে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চুক্তির (শান্তি চুক্তি) ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক না এমন অভিযোগ এনে ‘পাহাড়ে আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন। এরপরই ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ সমর্থিত অনাধি রঞ্জন চাকমা (৫৫) নামের নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক এক ইউপি সদস্যকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে হত্যাযজ্ঞের সূত্রপাত ঘটে। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ গণতান্ত্রিককে ইউপিডিএফতে দায়ী করে।

একই দিন রাঙামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (পিসিজেএসএস) দায়ী করে। একই দিন বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

৭ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরের বিহারপুর এলাকায় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রী ঝর্ণা খীসার বাসায় হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এসময় তাঁকে হত্যা করতে কুপিয়ে জখম করা হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

বিলাইছড়ি আ’লীগ নেতাকে কোপানোর অভিযোগে সেখার উপজেলার চেয়ারম্যান ও পিসিজেএসএস উপজেলা শাখার নেতা শুমঙ্গল চাকমাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির নেতা শুভমঙ্গল চাকমাসহ কয়েকজনকে আটকও করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পায়।এসময় প্রাণভয়ে জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলার আওয়ামী লীগ ও তার অংগসংগঠনগুলোর পাহাড়ী নেতাকর্মীরা দলে দলে পদত্যাগ করে উপজেলাগুলো প্রায় শাসকদল শুন্য হয়ে পড়ে। জেএসএসের হুমকির কারণেই এ ঘটনা ঘটে বলে আওয়ামী লীগের অভিযোগ।

১৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের ধামাইছড়া গ্রামে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ নেতা অনল বিকাশ চাকমা প্লাটো ওরফে লক্ষী নিহত হয়। ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক বার্মা গ্রুপকে দায়ী করেছে।

সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে ৫ ইউপি মেম্বারসহ ২০ জনকে অপহরণ করা হয়। একদিন পর তারা নিজ গ্রামে ফিরে আসে।

এদিকে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তঞ্চাঙ্গ্যাকে হত্যার উদ্দেশ্য গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ সন্তু গ্রুপ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল।

৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেওয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনার জন্য সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ।

১২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি শহরে ছাত্রলীগ নেতা সুপায়ন চাকমাকে মারধর করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীরা। প্রতিবাদে রাঙামাটিতে হরতাল পালন করে ছাত্রলীগ।

১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের কর্মী নতুন মনি চাকমাকে। ওই দিন রাতে নিজ বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নতুন মনি চাকমাকে হত্যা করা হয়। তাঁর মাথাসহ সারা শরীরে কোপানো হয়। তিনি ইউপিডিএফের প্রসিত বিকাশ খীসা পক্ষের কর্মী ছিলেন।

১৮ মার্চ রাঙামাটির কুতুছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে। ৩২ দিন পর ১৯ এপ্রিল মুক্তি দেওয়া হয় তাঁদের। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে।

১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান তিনজন। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) এক সদস্যকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিরও (এম এন লারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন ইউপিডিএফের কর্মী জনি তঞ্চঙ্গ্যা (৪০), জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কর্মী পঞ্চায়ন চাকমা ওরফে সাধন চাকমা (৩০) ও কালোময় চাকমা (২৯)।

গত ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের মারিশ্যা-দিঘিনালা সড়কের জোড়া ব্রিজ এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কর্মী তপন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা-দিঘিনালা সড়কের ৮-৯ কিলো নামক স্থানে ইউপিডিফের আরেক কর্মী বিজয় চাকমাকে (৩২) হত্যা করে প্রতিপক্ষ।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে ইউপিডিএফ তাদের আধিপত্য বিস্তারে রাঙামাটির দূর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংস্কার’র (জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপ) এলাকায় হানা দেওয়া শুরু করে। তাদের তান্ডবে ওইদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জনপ্রতিনিধিসহ ৫০পরিবার পালিয়ে এসে উপজেলা শহরে এসে আশ্রয় নেয়।

অপরদিকে চলতি মাসের ২ মে সকালে একই উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের নালকাটা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ এবং জেএসএস সংস্কার বন্দুক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি।

৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনের সময় গুলি করে হত্যা করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রূপম চাকমা গুলিবিদ্ধ হন।

এর একদিন পরই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিয়ে চলে যাওয়ার সময় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনয় চাকমা। এ সময় আহত হয় আরো নয়জন। একই সময় খাগড়াছড়িতে ৭ জনকে খুন করা হয়েছে এবং অনেককে অপহরণ করা হয়েছে।

শক্তিমান ও বর্মার উপর ভয়াবহ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে ব্রাশফায়ার করেছিল সন্ত্রাসীরা। দূর্গম সীমান্তের কারণে খুব সহজেই সন্ত্রাসীদের হাতে এ ধরণের মারণাস্ত্র চলে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমান্তের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সীমান্তচৌকি (বর্ডার আউটপোস্ট-বিওপি) নেই। ফলে সেখানে বাধাহীনভাবে অস্ত্র ঢুকতে পারে। তাছাড়া শান্তিচুক্তি সই করার পর চুক্তি বাস্তবায়নের শর্ত মোতাবেক বেশকিছু নিরাপত্তা ফাঁড়ি প্রত্যাহার করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি সীমান্তে পর্যাপ্ত রাস্তা না থাকায় উন্মুক্ত সীমান্তে বিওপি স্থাপন করা যাচ্ছে না। কেননা বিওপি স্থাপন করতে হলে তার নিরাপত্তার প্রয়োজনে যোগাযোগ জরুরি। বর্তমান অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন দুর্গম স্থানও রয়েছে, যেখানে কোনো সশস্ত্র হামলা হলে নিরাপত্তা বাহিনীর পৌঁছতে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

পার্বত্যাঞ্চলের যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে তাতে অভিজ্ঞ মহলের মতে, নির্বাচন যতো এগিয়ে আসবে এই সংঘাত ততোই বৃদ্ধি পাবে। সেকারণে সরকারকে এখনই তৎপর হতে হবে। তাদের মতে, দ্রুততার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস নির্মূলে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের নেতৃত্বে যৌথ অপারেশন পরিচালনা করে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় সন্ত্রাসীদের ভয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করতে সাহস পায় না। তাই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে সন্ত্রাসীদের আটক করতে হবে। পার্বত্যবাসীর দীর্ঘদিনের দাবী মেনে পাহাড়ে র্যাবের স্থায়ী ব্যাটালিয়ন করে র্যাব মোতায়েন করতে হবে এবং সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কারণে যেসব স্থানে নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে সেসব স্থানে সেনা ক্যাম্প পুণরায় মোতায়েন করতে হবে।

একের পর এক মটর সাইকেল চালক কেন টার্গেট হচ্ছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের

খাগড়াছড়ি সাড়ে ৬ বছরে ১৬ মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

খাগড়াছড়িতে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল চালক খুন, অপহরণ, গুম ও হামলা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই এখন নিত্যনৈতিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় সাড়ে ৬ বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত ৮জন মোটর সাইকেল চালক যাত্রীবেশীদের হাতে খুন হয়েছে। গুম হয়েছেন ৮জন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। অপহরণ হয়েছে অন্তত এক ডজন। এছাড়া অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরি হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যেমন বিচার পায়নি, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো ফিরে আসবে সে প্রতিক্ষায় আছে তাদের পরিবার- স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন পার করছে। সে সাথে একের পর এক মোটর সাইকেল চালক খন-গুমের ঘটনায় প্রায় অস্থির হয়ে আছে খাগড়াছড়ি।

এ সকল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে জেলায় দফায় দফায় হরতাল-অবরোধে উত্তাল হয়েছে। এছাড়াও মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের কাছ থেকে বিচারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে এ সকল হতভাগ্য মোটরসাইকেল চালকের জীবনে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি।

এদিকে একের পর এক মোটরসাইকেল চালকদের খুন, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।

খাগড়াছড়িতে যাত্রী পরিবহনের মোটরসাইকেল একটি জনপ্রিয় বাহন। ভূ প্রকৃতি এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। জেলায় অন্তত দুই হাজার বেকার যুবক ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু একের পর এক যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন চালকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত প্রায় ছয় বছরে ১৬ জন মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম হয়েছে। জেলার মহালছড়ি ছাদিকুল ইসলাম, মাটিরাঙার আজিজুল হাকিম শান্ত, আব্দুর রহিম, গুইমারা নিজাম উদ্দিন সোহাগ, দীঘিনালার শাহ আলম, আব্দুস সাত্তার, চান মিয়া ও সর্বশেষ পার্শ্ববর্তী লংগদু উপজেলার নুরুল ইসলাম নয়ন খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকায়।

লংগদুতে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়ি বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়ন হত্যাকান্ডটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসলেও অন্য হত্যাকান্ডগুলো তেমন কোন আলোচনায় আসেনি। একই সময় দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক আবুল কাশেম, মো: আলী, পানছড়ির হোসেন আলী, মানিকছড়ির মো: মোরশেদ, রাজিব কান্তি দে, গুইমারার রেজাউল করিম, আল আমীন ও শংকর দীর্ঘ দিন ধরে মোটরসাইকেলসহ নিখোঁজ রয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে খাগড়াছড়িতে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধার হয়েছে মাত্র কয়েকটি। প্রতিটি খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে।

সর্বশেষ গত ১ জুন খাগড়াছড়ির যৌথ খামার এলাকায় খুন হন লংগদু উপজেলার যুবলীগের নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তার এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরের দিন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ী ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

নিহত নয়নের ছোট ভাই লিটনের অভিযোগ ঐদিন সকালে তার বড় ভাই দুই পাহাড়ি যাত্রীকে নিয়ে খাগড়াছড়ি আসার পর নিখোঁজ হন। পরে সামাজিকে যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভাইয়ে লাশের সন্ধান পান।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো: আব্দুল হান্নান পার্বত্যনিউজকে জানান, নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যার ঘটনায় তার ভাই লিটন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে মামলা করেছেন। নয়ন হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিঘ্রই সু-সংবাদ পাবেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে (২৩) দুই উপজাতি মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিহত ছাদিকুলের নিহত ছাদিকুল ইসলামের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, দুই উপজাতি লোক ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে তার ভাইকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে তাকে ভাড়া করে নিয়ে যায়।

নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী দুপরে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রিছাং ঝর্না এলাকার দুর্গম পাহাড় থেকে মাটিরাযার মেটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত’র লাশ পুলিশ।

মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু পার্বত্যনিউজকে জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রী নিয়ে মাটিরাঙা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন মোটর সাইকেল চালক মো: আজিজুল হাকিম শান্ত। এ ঘটনায় ধন বিকাশ ত্রিপুরা নামে একজনকে আটকের পর তিনি ঘটনার সাথে জড়িত আরো দুই জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে জানিয়েছেন মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু। তবে শান্ত’র মোটরসাইকেলটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

নিখোঁজের একদিন পর ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক মো: আবদুর রহিমের (২৫) লাশ উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ। নিহত আবদুর রহিম বেলছড়ির ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর আলম এর ছেলে।

পুলিশ জানায়, এক সন্তানের জনক মো: আবদুর রহিম ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ১৭ সেপ্টেম্বর সে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়,কিন্তু রাতে সে বাড়ি ফিরেনি। পরের দিন বিকাল ৩টায় স্থানীয় নারী শ্রমিকরা লাকড়ি কুড়াতে গেলে বেলছড়ির হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গলে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বিজিবিকে খবর দেয়।

একই বছরের ৭ মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার ভৈরফা পাড়া এলাকায় শাহ আলম নামে এক মোটরসাইকেল চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহ আলমের লাশ উদ্ধার করে।

২০১৬ সালের ২৭ জন নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। স্থানীয় সমীর পালের ছেলে রাজিব দুপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মোটর সাইকেল চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা ময়িা‘র ছেলে মো: খলিলুর রহমান (২৭) কে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একই বছরের ৩০ জুলাই খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থেকে চন্দন ত্রিপুরা (২৪) নামে ভাড়ায় চালিত এক মোটরসাইকেলে চালককে অপহরণ করেছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। উপজেলার গামারীঢালা এলাকা থেকে  তাকে অপহরণ করা হয়। অপহৃত চালকের বাড়ি জেলা শহরের খাগড়াপুর হাদুক পাড়ায়।

২০১১ সালের ১০ জন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার জালিয়াপাড়ার মাহবুব নগর এলাকায় মোটরসাইকেল চালক নিজাম উদ্দিন সোহাগকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা। সে গুইমারা উপজেলার কালাপানি এলাকার বাসিন্দা সালেহ আহমেদের ছেলে।

পুলিশ জানায়, সোহাগ দুই যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পথে নির্মম এ ঘটনা ঘটে। সোহাগ মাহবুব নগর পৌছুলে যাত্রীবেশী হোন্ডা ছিনতাইকারী তাকে কুপিয়ে এবং জবাই করে লাশ রাস্তায় ফেলে হোন্ডা নিয়ে পালিয়ে যায়।

এছাড়া ২০১১ সালে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে জেলার দীঘিনালার কবাখালীর বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও চান মিয়া।

এদিকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী নিখোঁজ রয়েছেন। সে উপজেলার দক্ষিণ মিলনপুর গ্রামের হরমুজ আলীর পুত্র। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী মোছা ফাতেমা বেগম দীঘিনালা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম পার্বত্যনিউজকে জানান, তার স্বামী ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী বিকালে উপজেলার বাসটার্মিনাল থেকে একজন যাত্রী নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় যায়। এর পর থেকেই সে আর বাড়ি ফিরেনি। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম জানান, সংসারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি স্বামী নিখোঁজ থাকায় দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন তিনি। স্বামীকে উদ্ধারে প্রশাসনও কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে ফাতেমা বেগম।

২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন দীঘিনালার রশিকনগরে বাসিন্দা আবুল কাশেম পিসি।

আবুল কাশেম পিসির স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম পার্বত্যনিউজকে বলেন, নিখোঁজের পর স্বামীর লাশটাও পাননি তিনি। সংসারের এক মাত্র আয় সক্ষম স্বামী না থাকায় এক মেয়ে ও চার ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কোথাও থেকে কোন ধরনের সহযোগিতাও তিনি পাননি।

আবুল কাশেম পিসির ছেলে সাইদুর রহমান পিতার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানান প্রশাসনের কাছে।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন, জেলার পানছড়ি উপজেলার নিখোঁজ মোটর সাইকেল চালক হোসেন আলী। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির জিয়ানগর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে। তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি মাটিরাঙ্গা সদর ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের ব্রজেন্দ্র কার্বারী পাড়ার নির্জন এলাকা থেকে পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্বার করলেও হোসেন আলীর সন্ধান মেলেনি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে হোসেন আলী যাত্রী নিয়ে যায় । এর পর থেকে সে নিখোঁজ। এ ঘটনায় ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪জনকে। নিখোঁজ হোসেন আলীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ জুন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে।

২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী থেকে নিখোঁজ আছেন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক মো. মোরশেদ আলম। সে উপজেলার বড়ডলু মাস্টার পাড়ার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীনের পুত্র। মোরেশেদ আলম প্রতিদিনের ন্যায় গত ৬ ফেব্রুয়ারী সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রী পরিবহনে যান। কিন্তু ঐদিন রাতে বাড়ীতে ফিরে না আসায় থানায় সাধারন ডায়েরী করা হয়।

২০১২ সালে গুইমারা উপজেলার রেজাউল করিম, আল-আমীন ও শংকর যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। এখনো পর্যন্ত পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোটরসাইকেলগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন বিকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। ঘটনার প্রায় চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে আহত মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা মিয়ার ছেলে মো: খলিলুর রহমানকে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল চালক মো: খলিলুর রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, ঐদিন বিকাল ৪টার দিকে রিজেন ত্রিপুরা এক সহযোগিসহ মাটিরাঙ্গা বাজারে আসার কথা বলে চক্রপাড়া থেকে যাত্রী বেশে মোটর সাইকেলে উঠে চক্রপাড়া রহিমের টিলায় আসা মাত্র সেখানে থাকা আরো দুই পাহাড়ি যুবক গাড়ী থামাতে বলে। মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে মারধর তাকে গাছের সাথে বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অন্যকোন কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি সংসার চালান। কিন্তু সম্প্রতিককালে যাত্রীবেশি হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ফলে আতংকে দিন পার করছেন। নিহত ও গুম হওয়া পরিবারেও চলছে শোকের মাতম ও অভাব-অনটন।

বছরের পর বছর এভাবে একের পর এক মটর সাইকেল চালক খুন, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হচ্ছে কেন- জানতে চেয়েছিলাম অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম ফর চিটাগাং হিল ট্রাক্টসের সদস্য তাজুল ইসলাম নাজিমের কাছে। তিনি জানান, প্রধান কারণ উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজী। মটরসাইকেল চালকরা উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাদের খুন, গুম ও অপহরণের স্বীকার হতে হয়।

এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে। নাজিম বলেন, মটর সাইকেল চালকদের বেশিরভাগই বাঙালী। শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত বাঙালী যুবকেরা কোটা সুবিধার কারণে পাহাড়ী যুবকদের সাথে চাকরীর প্রতিযোগিতায় পেরে না উঠে বিকল্প কর্ম সংস্থান হিসাবে মটর সাইকেল চালায়। পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চায় না কোনো বাঙালী যুবক মটর সাইকেল চালাক।

সে কারণে তারা বিভিন্ন সময় বাঙালী মটর সাইকেল চালকদের যাত্রী না হবার জন্য পাহাড়ীদের প্রতি হুমকি, হুশিয়ারিও দিয়েছে। তাতে কাজ না হওয়ায় এই নির্যাতন।

মটর সাইকেল চালকদের যেহেতু যাত্রীদের ইচ্ছামত গভীর ও নির্জন পাহাড়ী অঞ্চলে যেতে হয়, তাই তাদের অপহরণ করা সহজ বলেও তিনি মনে করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ে পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। এরা সর্বত্র চাঁদাবাজি,খুন, গুম ও অপহরণ করে যাচ্ছে। অবৈধ উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে পাহাড়ে বার বার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। সমঅধিকার আন্দোলন সকল সকল জনগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে বলেও তিনি দাবী করেন।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান পুলিশের উপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, পুলিশের কাছে সবাই সমান। পুলিশ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল এ অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় বাহন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ কাজ করছে। তিনি মোটরসাইকেল চালকদের কোন যাত্রী পরিবহনের আগে যাত্রীর নাম ও কোথায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন ইত্যাদি রেজিষ্টারে লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার পরমর্শ দিয়ে বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজি বন্ধ ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর এসব ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। তিনি আইন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির এক পরিরহন ব্যবসায়ী পার্বত্যনিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মটর সাইকেল চালকদের একটা এসোসিয়েশন তৈরি করতে হবে। কোনো চালক যখন কোনো যাত্রী নেবে তখন সেই যাত্রীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও গন্তব্য এসোসিয়েশন অফিসে নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট জানিয়ে দেবে। এতে অপহরণ বা গুম কমে যাবে।

খাগড়াছড়িতে শুধু মোটরসাইকেল চালক নয়, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে এগিয়ে আসা জরুরী মনে করেন সচেতন মহল।

অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

শুধু তারিখ পিছিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ

পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন তৃতীয় ধাপের পরিবর্তে ৬ষ্ঠধাপে নেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে জারি করা এ সংক্রান্ত নির্দেশে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি সেহেতু নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাঙামাটি জেলার ১০টি উপজেলার সকল ৪৯ ইউনিয়নের নির্বাচন ৩য় পর্যায়ের পরিবর্তে ৬ষ্ঠ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত’ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যদিও অন্য একটি পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির ৩৭টি ইউনিয়নের মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৬টিতে, অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি ২৭টিতে নমিনেশন দিতে পেরেছে। কিন্তু খাগড়াছড়ি জেলার নির্বাচন পেছানো হয়নি।

এদিকে ইসির পত্রে রাঙামাটি জেলায় ‘প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন দিতে’ না পারার কোনো কারণ না বলা হলেও সরকারি দল আওয়ামী লীগের নেতারা পরিষ্কার করে একাধিকবার বলেছেন, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের হুমকির কারণে তারা অনেক ইউনিয়নে প্রার্থী দিতে পারছেন না। শুধু তাই নয় নির্বাচন পেছানোর পর সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে এও বলা হয়েছে, “পার্বত্য চট্রগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে শুধু ইউপি নির্বাচন কেন ভবিষ্যতে কোন নির্বাচনেই অংশ নেবে না আওয়ামী লীগ”।

cht book 4

এ প্রেক্ষাপটে রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে অবিলম্বে যৌথ অভিযান শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু কবে কখন থেকে এই অভিযান শুরু হবে বা আদৌ হবে কিনা এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ রাঙামাটি ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের অপর দুই জেলা খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে শুরু হয়েছে নির্বাচনী ডামাঢোল।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার প্রবল প্রতাপে দেশ পরিচালনা করছে।বাংলাদেশের ইতিহাসে এর চেয়ে দাপুটে সরকার আর কখনো দেশ শাসন করেনি।প্রশাসন, পুলিশসহ সকল ধরনের ব্যুরোক্রাসি, মিডিয়া, সরকার বিরোধী মত, এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহকে দলে পিষে অতীতে আর কোনো সরকার এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দাপটে যেখানে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত, শিবির যেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি দল চরম অসহায়! অসহায় প্রধান বিরোধী দলও।

সারা দেশের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে যেখানে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতকর্মীদের মধ্যে তদ্বির, কালো টাকা, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঘাত, সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড হচ্ছে; সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পূর্ণ আলাদা। কেননা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউপিতে প্রধান জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো মনোনয়ন দেয়ার জন্য প্রার্থীই খুঁজে পাচ্ছে না। সরকারি দল আওয়ামী লীগ, রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইউপিতে নমিনেশন দেয়ার মতো আগ্রহী প্রার্থী পাচ্ছে না। এমন নয় যে সেখানে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সংগঠন নেই। সংগঠন থাকলেও বিএনপি-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রার্থী হতে আগ্রহী নয়।

chtbook 9

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলায় সক্রিয় তিনটি আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র শাখার সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা নমিনেশন নিতে আগ্রহী নয়।হুমকির মুখে জীবন বাঁচতে তারা নির্বাচনী মাঠ ছেড়ে দিয়েছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের কাছে।

বিষয়টি স্বীকার করে  রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার জানিয়েছেন, স্থানীয় সশস্ত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের ভয়ে পাহাড়ে মানুষ জিম্মি। তাদের হুমকির কারণে অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে আমাদের দলের অনেকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এমনকি দলীয় বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানরা পর্যন্ত ভয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কারণ নির্বাচন এলে স্থানীয় আঞ্চলিক দলগুলোর অপতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে পাহাড় অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে তাদের জোর বেশি থাকে।

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির ৪৯টি আসনের মধ্যে ৩০ আসনে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। বাকি ১৯টি আসনে চেষ্টা করেও কোনো সরকারি দল কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি। সাবেক পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদার বলেন, নির্বাচনের আগেই স্থানীয় নামধারী সন্ত্রাসী গ্রুপের ভয়ে আওয়ামী লীগের কোন নেতাকর্মী প্রার্থী হতে চাইছেন না। যার কারণে রাঙামাটি ৪৯টি ইউনিয়নের মধ্যে ১৯টি ইউনিয়ন প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে একই জেলায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সাকুল্যে ২২টি ইউপিতে নমিনেশন দিতে পেরেছে। অর্ধেকের বেশি আসনে অর্থাৎ ২৭ টি ইউপিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দীপেন তালুকদার ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি, সাবেক মেয়র সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ভুট্টো পার্বত্য নিউজকে বলেন, সন্ত্রাসীদের হুমকি মুখে রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচন করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।

ooooooo

একই অবস্থা পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতেও। এ জেলার ৩৭ টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৩৬টিতে আওয়ামী লীগ নমিনেশন দিতে পারলেও বিএনপি ২৭ টিতে নমিনেশন দিতে পেরেছে। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়া পার্বত্যনিউজকে জানান, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপির নেতাকর্মীরা নির্বাচন করতে ভয় পাচ্ছেন। তাই তারা নমিনেশন নিতে আগ্রহী নয়। বান্দরবানে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ভিত অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় সেখানের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন। তবুৃ রুমা ও রোয়াংছড়ির মতো প্রত্যন্ত উপজেলাগুলো এলাকাবাসী ইচ্ছামতো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না।

পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা শুধু নির্বাচনে অংশ নিতে জাতীয় দলের নেতাকর্মীদের ভয় দেখাচ্ছে তা ই নয়। তারা সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপিদেরও নির্বাচনে অংশ নিতে ভয় দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যে সাবেক পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদারকে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। রাঙামাটি জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনসমূহ এই হুমকির বিরুদ্ধে জেলাব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশ করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মনোনীত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা তাকেও হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে

পার্বত্য চট্টগ্রামে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ থাকলের বাস্তবে তা যথেষ্ট কার্যকর নয়।শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ীদের একটি গ্রুপ অস্ত্র সমর্পন করলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনও বৃহৎ অবৈধ অস্ত্রাগার।

খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, হুমকি, অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামের নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। পাহাড়ে অপহরণ ঘটনায় এখনো মুক্তিপণ না দিয়ে মুক্তির ঘটনা বিরল। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁদা না দিয়ে পাহাড়ী-বাঙালি কারো পক্ষে বাস করা অসম্ভব। অথচ সেই পাহাড়ীরাই সন্ত্রাসীদের মনোনীত প্রার্থিকে ভোট নিয়ে নির্বাচিত করে। এটা ভালোবেসে নয়, স্বতঃস্ফুর্তভাবে অস্ত্রের মুখে জিম্মী হয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার এখনো নির্ভয়ে ভোটদানের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। তাছাড়া সন্ত্রাসীদের মনোনীত প্রার্থিকে ভোট না দিলে বিচ্ছিন্ন পাহাড়ী পাড়াগুলোতে বসবাসকারী নিরীহ জনগণের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে থাকে।

Rangamati pic2

শুধু তাই নয়, সরকার পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে তিন পার্বত্য জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে সরকারি দলের নেতারাই স্বীকার করেছেন।

পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের কার্যক্রমে অতিষ্ঠ হয়ে বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিল কয়েকশত শান্তিকামী পাহাড়ী। কিন্তু সরকারী দল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় পুণরায় তারা পাহাড়ী সংগঠনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নির্বাচনী প্রচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন পাহাড়ী পাড়াগুলোতে ঘুরে ঘুরে নিরীহ ভোটারদের ভয়, হুমকি প্রদর্শন করে নিজ দলের মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দেয়ার কথা বলছে। তারা এমনও বলছে যে, পুলিশ-সেনাবাহিনী-বিজিবি ভোটের কিছুদিন পাহারা দেবে। কিন্তু ভোটের পর আর তাদের পাওয়া যাবে না। সে সময় তারা থাকবে। তাদের প্রার্থীরা হেরে গেলে ভোটের পর তারা এর প্রতিশোধ নেবে।

গত ১৬ মার্চ রাঙামাটির নানিয়ারচরে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে চাওয়ায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান পঞ্চানন চাকমাকে অপহরণ করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। এরপরও এ উপজেলায় একই কারণে আরো কিছু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে দলীয় মনোনয়নের বাইরে প্রার্থি হতে চাওয়ায় বান্দরবানের রুমা উপজেলায় পাহাড়ী সংগঠনের এক নেতাকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে তার দলের সদস্যরাই।নির্বাচন যতো এগিয়ে আসবে এ ধরনের ঘটনা ততো বৃদ্ধি পাবে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় সর্বমোট ১১৯টি ইউপির মধ্যে ১১৩টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ৬টি ইউপি নির্বাচন স্থগিত হয়।  ১১৩টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৬টি, বিএনপি ২২টি, জেএসএস(মূল) ১৫টি, ইউপিডিএফ ৩১টি, জেএসএস(সংস্কার) ৫টি, স্বতন্ত্র ৩টি, বাঙালি সংগঠন ১টি আসনে জয়লাভ করে।

result 1

জেলাওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, রাঙামাটি জেলায় ৪৯টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ১১টি, বিএনপি ৬টি, ইউপিডিএফ ১৬টি, জেএসএস(মূল) ১২টি, জেএসএস(সংস্কার) ২টি, স্বতন্ত্র ২টি এবং বাঙালি সংগঠন ১টি ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করে। এ সময় ১টি আসনে নির্বাচন স্থগিত থাকে।

খাগড়াছড়ির ৩৯টি আসনের মধ্যে ৩৭টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২টির ফলাফল স্থগিত থাকে। নির্বাচন হওয়া ৩৭টি ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৩টি, বিএনপি ৩টি, ইউপিডিএফ ১৫টি, জেএসএস(সংস্কার) ৩টি আসনে জয়লাভ করলেও জেএসএস (মূল) ও বাঙালি সংগঠনগুলো এ জেলায় কোনো ইউপিতে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়নি।

অন্যদিকে বান্দরবানের ৩১টি ইউপির মধ্যে ২৮টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ১২টি, বিএনপি ১২টি, জেএসএস (মূল) ৩টি ও স্বতন্ত্র ১টি আসনে জয়লাভ করে। ইউপিডিএফ ও বাঙালি সংগঠন এ জেলায় কোনো আসন পায়নি।

কিন্তু ২০১১ সালের নির্বাচন ও ২০১৬ সালের নির্বাচনের মধ্যে বিস্তর তফাত রয়েছে। ২০১১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল অরাজনৈতিক আবরণে। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আবহে। একেবারে দলীয় মনোনয়নে, দলীয় প্রতীকে। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে বিবেচনা করলে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্তু লারমার ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলন চলছে। এ আন্দোলনের অংশ হিসাবে তিন স্থানীয় পাহাড়ী প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের মধ্যে চলছে অঘোষিত অস্ত্র বিরতি। শুধু তাই নয়, এ তিন পাহাড়ী সংগঠনের ঐক্য প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ী সংগঠনগুলো যদি সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামে তাহলে সরকারি দল আওয়ামী লীগসহ জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষ বেকায়দায় পড়তে হবে।

সাধারণত তিন পার্বত্য জেলার উপজাতি অধ্যুষিত ইউপিগুলোতে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জয়লাভ করে। তাছাড়া অনেক সময় একাধিক বাঙালি প্রার্থীর বিপরীতে একক পাহাড়ী প্রার্থী দিয়েও আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জয়লাভ করে। প্রত্যন্ত ইউপিগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করা পাহাড়ী পাড়া বা গ্রামগুলোর বাসিন্দা বা ভোটাররা সবসময় উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বন্দুকে মুখে বসবাস করে। এসব সন্ত্রাসীরা নিরীহ উপজাতি বাসিন্দাদের উপর যতোই জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস চালাক জীবনের ভয়ে, বন্দুকের মুখে তারা তাদের নির্দেশিত পথেই চলতে বাধ্য হয়, তাদের মনোনীত প্রার্থীকেই ভোট দিতে বাধ্য হয়।

cht book 6

পার্বত্য বিশেষজ্ঞদের মত, শুধুমাত্র নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও ভয়হীন নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না তিন পার্বত্য জেলায় প্রবলভাবে বিরাজমান পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী নিরীহ উপজাতীয় বাসিন্দাদের দিকে তাক করা পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নলগুলোকে নিষ্ক্রিয় বা ধংস করা না যাবে ততদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে সক্ষম হবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের অবাধ, নিরোপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পাহাড়কে অস্ত্রমুক্ত করা  সময়ের দাবী। এ দাবী সরকারী দল আওয়ামী লীগের, এ দাবী বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলের, এ দাবী বাঙালীর, এ দাবী নিরীহ ও সাধারণ পাহাড়ীর, এ দাবী পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বরত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের কথা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি জেএসএস সহসভাপতি ও সাংসদ উষাতন তালুকদারও স্থায়ী কমিটির বৈঠকে অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের কথা বলেছেন। কাজেই নির্বাচনের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানের দাবী কতিপয় সন্ত্রাসীবাদের দল, মত, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে ১৬ লাখ পার্বত্যবাসীর।

তিন পার্বত্য জেলায় জাতীয রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সরকারের আন্তরিকতা ও প্রশাসন, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছাড়া এ কঠিন কাজে জয়লাভ সম্ভব নয়।


 

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা