পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ও বাঙালী কেন এলো?

মাহের ইসলাম:
পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে, কিছু কিছু শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি শুধুমাত্র পাহাড়িদের বঞ্চনা এবং অত্যাচারিত হওয়ার নির্বাচিত অংশ বিশেষের উপর আলোকপাত করেন এবং কোন এক অজানা কারণে পুর্ণাঙ্গ সত্য এড়িয়ে যান। এতে হয়তো, পাহাড়িদের প্রতি সহানুভূতি আদায় করা সহজ হয়; কিন্তু প্রকৃত সত্য আড়ালের দায় এড়ানো যায় না। পাহাড়িদের প্রতি ভালোবাসা থেকে বা অন্য বিশেষ কোন কারণে কেউ কেউ এমন করতে গিয়ে হয়ত ভুলে যান যে, কিছু লোকের জন্যে সহানুভূতি আদায়ের এই পদ্ধতি অন্য অনেক লোকের প্রতিও এক ধরনের বঞ্চনার সৃষ্টি করছে। সর্বোপরি, সত্য গোপনের দায়ভারও কিন্তু তার উপর বর্তায়।

কোন সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশের অন্য যে কোন অঞ্চলের তুলনায় পার্বত্য চট্রগ্রামে অস্বাভাবিক বেশী সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তেমনি এটাও সত্যি যে, আশির দশকে দেশের অন্যান্য স্থান থেকে বাঙ্গালীদেরকে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসন করা হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের পাহাড়ীরদের কাছে বা পাহাড়ের ব্যাপারে যারা তেমন বেশী খোঁজ খবর রাখার সুযোগ পান না, তাদের কাছে এই দুই বাস্তবতার আলোকে মনে হতেই পারে যে, পাহাড়িদের দুর্দশার জন্যে বাংলাদেশ সরকারই দায়ী। কারণ, সেনা মোতায়েন আর বাঙ্গালী পুনর্বাসন সরকারের গৃহীত নীতিমালার বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের ব্যাপারে যথাযথ ধারনা লাভের জন্যে এই দু’টি বাস্তবতার আংশিক নয় বরং সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং এর সাথে জড়িত তৎকালীন পাহাড়ি নেতাদের ভূমিকা খাটো করে দেখার অবকাশ রয়েছে বলে মনে হয় না।

প্রকৃতপক্ষে, পাহাড়ি নেতাদের ভুমিকাই অনেকাংশে এই বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে । দেশের বৃহৎ স্বার্থের পরিবর্তে কিছু লোকের ক্ষুদ্র স্বার্থ বড় করে দেখতে গিয়ে, এই নেতারা তাদের স্বগোত্রের সাধারণ মানুষের জন্যে বয়ে এনেছেন দুর্ভোগ। যদিও, অনেকের কাছে মনে হতে পারে যে, তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে খারাপ কিছু ছিল না, কিন্তু তাদের অদূরদর্শীতা সমগ্র জাতির জন্যে বঞ্চনা আর দুর্দশা নিশ্চিত করেছে।

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় পাহাড়ের কোন নেতাই পার্বত্য চট্রগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ছিলেন না। বরং বেশিরভাগ নেতাই যারপরনাই চেষ্টা করেছিলেন ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তির জন্যে। এমনকি পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের পরেও, তৎকালীন জনসমিতির সাধারণ সম্পাদক স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের অফিসের সামনে প্রকাশ্যে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এক্ষেত্রে তিনি স্থানীয় পাহাড়ী পুলিশদেরকে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্যে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি “গ্রামস্থ বহু পাহাড়ীকেও বন্দুক প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র লইয়া উপস্থিত হইতে নির্দেশ প্রদান” করেন। অবশ্য সশস্ত্র প্রতিরোধের পরিকল্পনা জানতে পেরে গভর্নর জেনারেল বলেছিলেন, “হিন্দুস্তান ভুক্তির চেষ্টা পরিহার করুন, অন্যথা শুধু শক্তির অপব্যয় করা হইবে এমন নহে, ইহাতে তোমরা বিশেষ কষ্টে পতিত হইবে”। শ্রী কামিনী মোহন, পার্বত্য চট্টলের এক দীন সেবকের জীবন কাহিনী, রাঙামাটি, দেওয়ান ব্রাদার্স এন্ড কোং, প্রকাশ- ১৯৭০ দ্রষ্টব্য।

পরবর্তীতে, পাহাড়ী নেতৃবৃন্দের সশস্ত্র প্রতিরোধ ব্যর্থ করে পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্ট ২১ আগস্ট ভারতের পতাকা নামিয়ে ফেলে। “এরপর পাকিস্তান সরকার ঢালাওভাবে উপজাতীয়দের প্রো-ইন্ডিয়ান বা ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। এবং সেই থেকে শুরু হয় তাদের ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ প্রদর্শনের পালা।” প্রদীপ্ত খীসা, পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য। পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে এটা স্পষ্ট ছিল যে, “পাকিস্তানের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়ে সব সময় সন্দেহ করা হত”। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটি, প্রকাশ-১৯৯৩, দ্রষ্টব্য।

এদিকে পতাকা নামালেও পাহাড়ি নেতারা দমে যাননি, অপরপক্ষে ভারতীয় নেতারাও তাদের ভারত বিভাগপূর্ব সেন্টিমেন্ট বজায় রাখেন। যার প্রকাশ ঘটে ভারত বিভাগের প্রায় দুই বছর পরে ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সরদার প্যাটেল পূর্ব পাকিস্তানী সংখ্যালঘুদের খুশী করার জন্যে যখন বলেন যে, “শুধুমাত্র একটা দাগের অন্যপাশে আছে বলেই যারা আমাদের রক্ত এবং মাংস, যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের পাশে থেকে লড়াই করেছে, হঠাৎ করে তারা আমাদের কাছে বিদেশী হতে পারে না।” মো. নাজমুল হাসান চৌধুরী, The Resistance Movement in the Chittagong Hill Tracts: Global and Regional Connections, এশিয়ান এফেয়ারস, প্রকাশ-২০০৬, দ্রষ্টব্য। তাই পাহাড়ি নেতাদের সাথে ভারতীয় নেতাদের যোগাযোগের বিষয়টি বুঝতে পেরে, পাকিস্তান সরকার স্বাভাবিকভাবেই তা বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

পাকিস্তান সরকারের প্রচেষ্টার মধ্যে পার্বত্য চট্রগ্রামকে বাঙ্গালীদের প্রবেশের জন্যে খুলে দেয়া অন্যতম ছিল। যার ধারাবাহিকতায়, ১৯৬২ সালের সংবিধানে পার্বত্য চট্রগ্রামকে ‘এক্সক্লুডেড এলাকা’ থেকে ‘ট্রাইবাল এলাকা’র মর্যাদা দেয়া হয়। এমনকি ১৯৬৪ সালে, ‘ট্রাইবাল এলাকা’র বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে এই অঞ্চলে বাইরের অধিবাসীদের প্রবেশ, বসবাস এবং জমি অধিগ্রহণ এর উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।

অপরপক্ষে, ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ সালে, এই অঞ্চল থেকে বেশীরভাগ পাহাড়ী সরকারী কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি করে দিয়ে শুধুমাত্র প্রধানত বাঙ্গালিদেরকেই এখানে সরকারী প্রশাসনের দায়িত্বে রাখা হয়। একই সময়, সোভিয়েত ব্লক ও ভারতের বিপক্ষে আমেরিকাকে সমর্থনের অংশ হিসেবে পাকিস্তান পার্বত্য অঞ্চলে ভারতের নাগা ন্যাশনাল আর্মি এবং মিজো গেরিলাদের সাহায্য করে।

এরই পাশাপাশি, এই এলাকার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্রগ্রামকে ‘ট্যাক্স ফ্রি জোন’ হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। একই লক্ষ্যে, ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা ও এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯৫৭ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।

এই সমস্ত কিছু করা হয় প্রধানত পার্বত্য অঞ্চলকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।
স্মরণযোগ্য যে, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পরে জম্মু ও কাশ্মীর, হায়দ্রাবাদ, গোয়া, সিকিম, জুনাগর ইত্যাদির ভাগ্যের দিকে তাকালে পাকিস্তানের এহেন ভারত ভীতি থাকা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয় না।
মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটা ক্ষুদ্র অংশ যখন বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করেছিল, তখন তাদের একটা বড় অংশ পাকিস্তানী বাহিনীকে সক্রিয় সহায়তা করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। “উপজাতীয় যুবকদের কিছু সংখ্যক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও অধিকাংশই পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত ‘সিভিল আর্মড ফোর্স’ বা ‘সিএএফ’ (রাজাকার বাহিনী হিসেবে পরিচিত) এ যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় অংশ নেয়।” মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পার্বত্য অঞ্চলে তিনজন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন; এরা হলেন, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা, অং শৈ প্রু চৌধুরী এবং ত্রিদিব রায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এম এন লারমা কোন পক্ষাবলম্বন করেননি। কিন্তু অং শৈ প্রু চৌধুরী এবং ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে হানাদার বাহিনীকে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। অপরদিকে, তৎকালীন তিন সার্কেল চীফ বা প্রথাগত রাজাদের মধ্যে একমাত্র মং সার্কেলের রাজা মংপ্রু সাইন তাঁর সবকিছু বিলিয়ে দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখেন। বোমাং রাজা এবং চাকমা রাজা দুজনই পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেন।

বস্তুত, তৎকালীন রাজাকার বাহিনীতে তুলনামুলকভাবে চাকমাদের সংখ্যাই ছিল বেশী। এর মূল কারণ, চাকমা রাজার পাকিস্তানপন্থী সক্রিয় ভুমিকা পালন। তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার সার্কেলের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তা করার জন্যে প্রচারণার পাশাপাশি গ্রামের হেডম্যান ও কারবারীদের নির্দেশ প্রদান করেন লোকদেরকে রাজাকার বাহিনীতে ভর্তি করানোর জন্যে। অবশ্য বেতন ও অস্ত্রের লোভেও অনেকে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেয়। পাহাড়ি যুবকেরা বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত পাকিস্তানী ট্রেনিং ক্যাম্পে অস্ত্র চালনা, ওয়্যারলেস সেট চালনা ইত্যাদির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। পাহাড়ি রাজাকারদের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল পার্বত্য চট্রগ্রামে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর, ২৯ জানুয়ারিতে রাঙামাটির আওয়ামী লীগ নেতা চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল যখন উপজাতিদের জন্যে পৃথক সাংবিধানিক রক্ষাকবচের দাবী জানান, তখন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ মর্মে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে,

– সরকারী চাকরীতে উপজাতীয়দের ন্যায্য অংশ প্রদান করা হবে।
– উপজাতীয়দের ঐতিহ্য ও কৃস্টি পুরোপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
– উপজাতীয়রা তাদের ভূমির অধিকার পূর্বের মতই ভোগ করতে থাকবেন।

এর কিছুদিন পরেই, ১৫ ফেব্রুয়ারিতে মং প্রু সাইন এর নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধিদল চার দফা দাবী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যান। অন্যান্যদের মধ্যে এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন, এম এন লারমা এবং ত্রিদিব রায়ের মাতা বিনীতা রায়। ‘বাংলাদেশের ভাবি সংবিধানে উপজাতীয়দের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণের জন্যে’ এই প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করে, যে স্মারকলিপির শেষান্তে উল্লেখ করা হয়:
১। পার্বত্য অঞ্চল একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
২। উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ‘১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি’র ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা (Sanctuary Provision) শাসনতন্ত্রে থাকবে।
৩। উপজাতীয় রাজাদের দফতর সংরক্ষণ করা হবে।
৪। পার্বত্য চট্রগ্রামের জনগণের মতামত যাচাই ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোনো শাসনতান্ত্রিক

সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয়, এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। প্রদীপ্ত খীসা, পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য।

নব্য স্বাধীনতালব্ধ একটি দেশে যে কত ধরণের সমস্যা থাকতে পারে, তা জানতে আমাদের বেশী দূর যেতে হবে না। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের তৎকালীন সময়ের দিকে খেয়াল করলেই বরং বুঝতে সহজ হবে। এই রকম একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সমস্যা-সঙ্কুল দেশের প্রেক্ষাপটে, বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের তিন সপ্তাহের মধ্যেই কারা এমন দাবী করেছিল? যাদেরকে পাকিস্তান আমল থেকেই সন্দেহের চোখে দেখা হত এবং যাদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করেছিল। অথচ, বঙ্গবন্ধু নিজস্ব প্রজ্ঞা আর মহানুভবতা দিয়ে কালক্ষেপণ ব্যতিরেকেই তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

প্রাসঙ্গিক কারণে প্রায় সমসাময়িক আরো কিছু ঘটনা প্রবাহের দিকে দৃষ্টি দেয়া অপরিহার্য। সহায়তার জন্যে বিশিষ্ট পার্বত্য গবেষক আতিকুর রহমান রচিত পার্বত্য তথ্য কোষের (১ম খণ্ডের) কিছু তথ্য প্রণিধানযোগ্য। উক্ত গবেষকের মতে, পাকিস্তান আমলে পার্বত্য চট্রগ্রামে ভারতের মিজো স্বাধীনতাকামীরা আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয়ের পরে এম এন লারমা ও তার সহযোগীরা পাহাড়ী রাজাকার ( সিএএফ) এবং মিজো বাহিনীকে ( বাংলাদেশ, মায়ানমার ও ভারতের সীমান্তের সংযোগস্থলের কাছাকাছি) রাইংক্ষ্যং সীমান্তবর্তী এলাকায় আত্নগোপনে পাঠিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে, ভারতীয় বাহিনীর ভয়ে মিজোরা সেখান থেকে সরে গেলেও পাহাড়ি রাজাকাররা রয়ে যায়। যারা লারমা বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। এরপর, পাকিস্তানী বাহিনীর পরিত্যক্ত ও লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে ট্রেনিং শুরু হয়, শক্তিবৃদ্ধির জন্যে নতুন নিয়োগও চলতে থাকে। “এই সশস্ত্র লারমা বাহিনী পরিশেষে শান্তিবাহিনী নাম ধারণ করে এবং তার পরিচালক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জন সংহতি সমিতি গঠিত হয়। উভয়ের জন্ম হয় আগে পরে ১৯৭২ সালেই।”

একই গবেষকের তথ্য মতে, স্থানীয় রাজাকার ও সিভিল ফোর্সের সংখ্যা ছিল ১৮৩০ জন, তন্মধ্যে ৩০০ জনের মত আত্নসমর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধ শেষে। অবশিষ্ট ১৫০০ জনকে নিয়ে শান্তিবাহিনী গঠন করা হয়। আতিকুর রহমান, পার্বত্য তথ্য কোষ (Vol. তৃতীয় খণ্ড). পর্বত প্রকাশনী, সিলেট, প্রকাশ- ২০০৭।

এর পরের ইতিহাস হয়ত কেউ কেউ কিছুটা জানেন। শান্তি বাহিনীর ফিল্ড কমান্ডার উষাতন তালুকদার ওরফে মলয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে গোলাম মোর্তোজা জানিয়েছেন, “শান্তিবাহিনীর জোয়ারের সময় ছিল ১৯৭২-৭৬ পর্যন্ত। এই সময় চোখে স্বপ্ন আর রোমাঞ্চ নিয়ে অসীম সাহসী পাহাড়ী যুবকেরা যোগ দিয়েছে শান্তিবাহিনীতে। সাধারণ পাহাড়িদের ব্যাপক সমর্থন তো ছিলই। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলের রমরমা অবস্থা। কঠিন জীবন। ঘুম নেই। ঠিকমতো খাওয়া নেই। কঠোর পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ। …… গভীর জঙ্গলের পাহাড়ে পাহাড়ে তখন চলছে শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ। গোলাম মোর্তোজা, শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন, সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ-২০০০।

অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ, পাহাড়ে সশস্ত্র পাহাড়িদের আনাগোনা বাড়তে থাকে, শুরু হয় চাঁদাবাজি ও হুমকি। স্বাভাবিকভাবেই, সরকারেরও জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা চলে আসে।

“১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে শান্তিবাহিনী বিলাইছড়ি আর্মড পুলিশ ক্যাম্প ও খাগড়াছড়ির বেতছড়ি গ্রামে পুলিশের নৌকায় সফল হামলার মধ্য দিয়ে সশস্ত্র কার্যকলাপের সুচনা করে। প্রদীপ্ত খীসা, পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৯৬ দ্রষ্টব্য। যার পরিণতিতে, বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্রগ্রামে দেশের অন্য স্থান হতে সেনাবাহিনী আনতে শুরু করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৬৫, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে তাতিন্দ্রলাল চাকমা ওরফে মেজর পেলের উদ্ধৃতি দিয়ে, গোলাম মোর্তোজা তার ‘শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন, “অপরিচিত জঙ্গল আর পাহাড়ি পরিবেশে শান্তিবাহিনীর এম্বুসে পড়ে অসহায়ভাবে নিহত হতে থাকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। ফলে এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয় হাজার হাজার সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আক্রমণ বাড়াতে থাকে শান্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ”। গোলাম মোর্তোজা, শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন, পৃষ্ঠা-৬২, সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ-২০০০।

সামরিক পন্থার পাশাপাশি তৎকালীন সরকার পার্বত্য সমস্যার সমাধানের বিকল্প অনুসন্ধান করছিল দীর্ঘদিন ধরেই। এরই ধারাবাহিকতায়, বাঙালী পুনর্বাসন করার চিন্তাভাবনা শুরু হয়। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইব্রাহিম বাঙালী পুনর্বাসনের প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্তাকারে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। এইভাবে, “অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক সমাধান প্রচেষ্টা এবং পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সামরিক, আধাসামরিক, পুলিশ ও আনসার বাহিনী মোতায়েনের পরও শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বন্ধ না হওয়ায় সরকার পার্বত্য চট্রগ্রামে পাহাড়ী এবং বাঙ্গালী জনসংখ্যার অনুপাতে ভারসাম্য আনয়নের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মূল শক্তিকে দুর্বল করার চিন্তাভাবনা করেন।” মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৪৮, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

মূলত, এই লক্ষ্যেই ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন দফায় সর্বমোট ৫৫,৫৭১টি বাঙ্গালী পরিবারকে পার্বত্য চট্রগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল, যদিও তন্মধ্যে ২৩,৫১১টি পরিবার ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্রগ্রাম থেকে চলে যায়। করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৪৮-১৪৯, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

আজ যাদের চোখে পাহাড়ে সেনাবাহিনী চক্ষুশূল, তাদের জন্যে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য, ১৯৭৩ সালের ৭ জানুয়ারি শান্তি বাহিনী গঠিত হলেও, সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয় ১৯৭২ সাল থেকেই । ১৯৭৩ – ১৯৭৪ সালে শান্তিবাহিনীর রিক্রুটিং এর সময় হাজার হাজার উপজাতীয় যুবক শান্তি বাহিনীতে যোগ দেয়। ১৯৭৬ সালে শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। গোলাম মোর্তোজা, শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন, সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশ-২০০০।

অনন্যোপায় হয়ে, বাংলাদেশের সরকার ১৯৭৭ সাল থেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে পার্বত্য চট্রগ্রামে দেশের অন্য স্থান হতে সেনাবিহিনী আনতে শুরু করে। করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৬৫, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে সরকারের কোন বিকল্প ছিল কিনা সেটা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। দুনিয়ার কোন দেশে, কোন কালেও ছিল না।

যারা বাঙ্গালীদের কে পাহাড়ের সমস্যার মূল কারণ বলে মনে করেন, তাদের হয়তো জানা নেই যে, সরকারী ভাবে বাঙ্গালীদের পুনর্বাসন শুরু হয় ১৯৭৯ সাল থেকে করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মাদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক, পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, পৃষ্ঠা-১৪৮, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, প্রকাশ- ২০১১।

স্মরণযোগ্য, শান্তি বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার তিন বছর পরে। অর্থাৎ, শান্তি বাহিনী যদি সৃস্টি না হত, তাহলে নিশ্চয় পাহাড়ে এতো সেনা মোতায়েনের প্রশ্নই উঠত না। আর, সেনা মোতায়েনের পরেও যখন শান্তি বাহিনী সাফল্য লাভ করছিল শুধুমাত্র স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে শান্তি বাহিনীর আশ্রয় লাভের সুযোগ প্রাপ্তি এবং অন্যান্য সহযোগিতার জন্যে ( যার বহুবিধ কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে ভীতি প্রদর্শন একটি মাত্র) – তখন জনসংখ্যায় ভারসাম্য আনতে সরকারকে বাধ্য হয়েই বাঙ্গালী পুনর্বাসনের পথ বেছে নিতে হয়েছে।

সহজ ভাষায়, পাহাড়ে সেনা মোতায়েন এবং পরবর্তীতে বাঙ্গালী পুনর্বাসন করতে তৎকালীন সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল। দেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে যেটা ছিল সময়ের দাবী। অখণ্ডতা রক্ষার জন্যে পৃথিবীর বহু দেশে অনেক ধরণের নৃশংসতা চালানো হয়েছে, যার ভুরি ভূরি উদাহরণ চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও সরকার দেশের বিচ্ছিন্নতাকামী মানুষদের প্রতিও অমানবিক কিছু ঘটতে দিতে চায়নি। যার প্রতিফলন ঘটেছে, পরবর্তী সরকার সমুহের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী পুনর্বাসনের আরেকটি দিকের কথা বলেছেন, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, পার্বত্যনিউজের সম্পাদক ও পার্বত্য গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ। তিনি বলেছেন, আদিকাল থেকে সেখানে বাঙালীদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল। অত:পর বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে নেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালিরা সেখানে বসবাস করতে গিয়েছে। গিয়ে মশা, ম্যালেরিয়া ও সাপের কামড়ে, শান্তিবাহিনীর আক্রমণে অনেকেই জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। পাহাড়কে আবাদ করেছে, মানুষের বাসযোগ্য করেছে, পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় করেছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করেছে।……..

জিয়াউর রহমান এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করেন। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিক প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহীন পাহাড় অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক সরকারের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও পারতো না শান্তিবাহিনীর হুমকির মুখে। কারণ পাহাড়িরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন বিরোধী ছিল।………

বাঙালি শ্রমিক ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। কাজেই আজকে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে দেশি বিদেশি পর্যটকরা মুগ্ধ হন তার পেছনে রয়েছে বাঙালির শ্রম, ঘাম, রক্ত ও আত্মদান। এখানেই শেষ নয়; শিক্ষা, বৃক্ষরোপণ, উন্নত চাষাবাদ ও নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতাও পাহাড়িরা পেয়েছে বাঙালির কাছ থেকেই। দেখুন: পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

নিরপেক্ষভাবে যদি দেখার সুযোগ থাকে, তাহলে ভেবে দেখা যেতে পারে, অন্তত একবার হলেও। সেটা এই যে, কোন দেশের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই যদি ঐ দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতা বিরোধীদের সহায়তা করে এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরেই যদি আবার তারাই তাদের নির্দিষ্ট ভুখণ্ডের জন্যে নিজস্ব আইন পরিষদসহ স্বায়ত্তশাসন দাবী করে বসে– তাহলে ঐ জনগোষ্ঠীর প্রতি নব্য স্বাধীন রাষ্ট্রের আচরণ কেমন হওয়া উচিত ছিল?

একই সাথে, সেটাও ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো, এই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী পরবর্তীতে কীভাবে এই দেশের প্রতি তার প্রতিদান দিয়েছিল? এমনকি, এখনো বাংলাদেশের প্রতি এই অঞ্চলের কিছু লোকের মনোভাব কী? এটা বুঝতে হলে নিচের স্ক্রিন শটটি দেখে নিতে পারেন।

সাধারণ পাহাড়ীদের এমন বাংলাদেশ বিদ্বেষী মনোভাবের পিছনে সেনাবাহিনী আর বাঙ্গালীকে দোষারোপ করা যেতেই পারে। কিন্তু, মূল কারণ চিহ্নিত না করলে, অতীতের মত আবারো কোন ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হলে– তার দায়ভার গ্রহণের জন্য সেনাবাহিনী আর বাঙালীকে বলির পাঠা বানানোর সুযোগ থাকবে না।
সেনাবাহিনীর উপস্থিতি আর বাঙালী পুনর্বাসনকে পাহাড়ের মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে যারা পাহাড়িদের বঞ্চনা এবং অত্যাচারিত হওয়ার গল্পে কান্না করতে ভালোবাসেন, বাস্তবে তারা পার্বত্য চট্রগ্রামের নেতৃত্বের অদূরদর্শিতার কারণে সাধারণ জনগণের উপর আরোপিত দুর্দশার পুরো ব্যাপারটিকে আড়ালে রাখতে সচেষ্ট। বর্তমানে চলমান সশস্ত্র দলের কোন্দল, চাঁদাবাজি, হত্যা আর অপহরণের ঘটনা তেমনি ইঙ্গিত বহন করে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায় যে, দেশের পরিবর্তে নিজেদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে এই নেতারা তাদের সমাজ ও গোত্রের সাধারণ মানুষের জন্যে বয়ে এনেছেন দুর্ভোগ। যদিও তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে হয়ত খারাপ কিছু ছিল না বলে প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু তাদের অদূরদর্শীতা সমগ্র জাতির জন্যে বঞ্চনা আর দুর্দশা নিশ্চিত করেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি এই যে, এখনকার নেতৃবৃন্দগণও কেন জানি তাদের পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বদ্ধ পরিকর – যেখানে আবার আমাদের দেশেরই কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী যোগ দিয়েছেন। তাই এক অজানা আশংকায় বুক কেঁপে উঠে। কারণ, এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি পছন্দ করে।

মাহের ইসলাম: গবেষক ও কলামিস্ট।


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)
  8. অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?
  9. রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার এবং পার্বত্যাঞ্চলে বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার
  10. পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে জিম্মি সমাজ ও রাষ্ট্র
  11. ব্যাক্তিগত বিশ্বাস, সংবাদ মাধ্যম ও নৈতিকতার মানদণ্ড
  12. কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পের ক্ষতিপূরণঃ ব্যক্তি স্বার্থের রাজনীতির শিকার নিরীহ পাহাড়ি
  13. ভূষণছড়াঃ যেখানে শুধু কুকুরই বেঁচে ছিল!
  14. প্রেক্ষাপট বিচারে কল্পনা চাকমার ‌‌’অপহরণ’ যাচাই
  15. কল্পনা চাকমা অপহরণ না অন্তর্ধান
  16. দোষী না নির্দোষ?

পার্বত্য বাঙালী সংগঠনসমূহের অনৈক্য, সমস্যা, সঙ্কট ও করণীয় বিষয়ক পর্যালোচনা

পারভেজ হায়দার:
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। তুলনামূলকভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি সার্বিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ গুচ্ছগ্রামসমূহে কষ্টকর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে সরকারী সিদ্ধান্তে। এই সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল ছিলো তা নিয়ে নানা মত রয়েছে। গুচ্ছগ্রামে রয়েছে শিক্ষার অভাব, কর্মসংস্থানের অভাব আর রয়েছে সীমাহীন দারিদ্রতা। যারা গুচ্ছগ্রামের বাইরে অবস্থান করছে তারাও সরকারী নানা বৈষম্যমূলক আইনের ও সুবিধার কারণে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়েছে বলে তাদের দাবী।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের চারটি আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের মধ্যে আন্তঃকলহ থাকলেও ভূমি অধিকারসহ অন্যান্য জাতিগত দাবী ও প্রাপ্তির প্রশ্নে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ঐক্যমত রয়েছে। উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দের অনেকেই জাতীয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও পাহাড়ীদের জাতিগত স্বার্থের প্রয়োজনে তারা গুরুত্ব সহকারে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। পক্ষান্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক বাঙালি সংগঠনসমুহ যেমন: পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, সমধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ, বৃহত্তর পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদ ইত্যাদির নেতৃত্বে সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। জাতীয় রাজনীতির সাথে জড়িত পার্বত্য বাঙালি নেতৃবৃন্দ বাঙালী অধিকার ও দাবীর বিষয়ে উদাসীন ও উপেক্ষা করে চলেন।

এ সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তঃদলীয় ও অর্ন্তদলীয় কোন্দল। এই দলগুলোর নেতৃবৃন্দ ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেবার কারণে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী উপজাতি ও বাঙালি ব্যক্তিবর্গের লেজুরবৃত্তির কারণে তারা তাদের মূল উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি থেকে দূরে সরে গেছেন। ক্ষমতা ও সুবিধাসমুহ কুক্ষিগত করার প্রবণতা দৃশ্যমান। বাঙালি এই দলসমূহের কর্মকাণ্ড অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অগোছালো। রয়েছে ধারাবাহিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অভাব। সম্ভবত তাদের নেতৃত্বে সুশিক্ষিত ও মেধাবী ব্যক্তিবর্গের অনুপস্থিতি থাকায় স্বার্থন্বেষী মহল সহজেই তাদেরকে অপব্যবহার করতে পারে। কোন একটি কর্মকাণ্ডে/সিদ্ধান্তে সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে পূর্ব অনুধাবন করতে সক্ষম না হওয়ায় বাঙ্গালী নেতৃবৃন্দের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

কোন কোন ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের কাছে মনে হয় তারা কোন বড় রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রভাবশালী পরিবারসমূহের ইচ্ছা পূরণ করছে। ফলশ্রুতিতে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠনগুলো একদিকে সাধারণ জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। অন্যদিকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি ভবিষ্যতে তাদের ভূমির অধিকারসহ মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলো সুরক্ষার বিষয়ে ন্যায্য দাবীসমূহ কার্যকরীভাবে উপস্থাপন করার আন্দোলনের নেতৃত্ব খুঁজে পাবে না।

যেকোন দলই নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সুচিন্তিত গবেষণার মাধ্যমে কর্মপন্থা ও কর্মপরিধি সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করে থাকে। এই কর্মপন্থার মধ্যে নেতৃত্ব নির্বাচন পদ্ধতি, বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের প্রক্রিয়া, নতুন সদস্য নিয়োগের পদ্ধতি, সদস্যদের কর্মকাণ্ডের সীমারেখা, জবাবদিহিতা, আয়ের উৎস, ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট খাতসমূহ, ব্যয়ের সঠিকতা নির্ধারণের জন্য আলাদা কমিটি ইত্যাদি বিষয়গুলো নূন্যতমভাবে থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাঙালি ভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠনসমূহের অপরিকল্পিত ও অগোছালো কর্মকাণ্ডসমূহ পর্যালোচনা করলে পার্টির শৃঙ্খলাজনিত বিষয়গুলোর অনুপস্থিতি অনুধাবন করা যায়।

বাঙালিভিত্তিক দলসমূহের মেধাবী নেতৃত্বের স্বল্পতা ও শৃঙ্খলার অভাব এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক দূরবস্থা ও স্বচ্ছতার কারণে তাদের প্রভাবশালী কোন দল বা ব্যক্তিদের উপর নির্ভর করতে হয়। তাদের এই দূর্বলতা সাধারণ জনগনের কাছেও দৃশ্যমান হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তারা বাঙালি স্বার্থের প্রশ্নে অনেক ন্যায্য দাবীও কার্যকরীভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়।

বর্তমান সময়ে একটি সংগঠনের কয়েকটি বিষয়ে একান্তভাবে পরিপূর্ণতা থাকা আবশ্যক। যেমনঃ দলীয় মূলনীতি ও কার্যপরিধি, শৃঙ্খলা, দলীয় অর্থনীতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়ায় প্রচারণার জন্য মেধাবী কর্মী এবং ন্যায্য দাবী সমূহের আইনগত ও কার্যকরীভাবে উপস্থাপনের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সক্রিয় কর্মী, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বুদ্ধিজীবীদের সাথে সমন্বয় ইত্যাদি। এ বিষয়গুলোর ঘাটতি থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক বাঙালি সংগঠনসমূহ তাদের দাবী প্রতিষ্ঠায় ও প্রতিপক্ষের মোকাবেলায় তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলশ্রুতিতে সাধারণ অসহায় বাঙালি জনগোষ্ঠী ব্যপকভাবে অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি জেলার বাবুছড়ার নিকটস্থ সোনামিয়া টিলায় ৮১২ বাঙালি পরিবারের নিকট সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তারা নিজ জমিতে যেতে পারছে না। তারা কয়েক পুরুষ ধরে গুচ্ছগ্রামসমূহে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। শিক্ষার অভাব ও বেকারত্বের কারণে গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালীরা বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। সমাজে অবৈধ মাদক চোরাচালানের স্থানান্তর, আঞ্চলিক উপজাতি দল সমূহের অস্ত্র ও গোলাবারুদ এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তর, পাহাড়ী দলগুলোর জন্য অবৈধ চাঁদা উত্তোলনে সহায়তা এবং তা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর চলাচল সম্পর্কিত তথ্য উপজাতি আঞ্চলিক দলসমূহের সশস্ত্র দলের নিকট পৌঁছে দেওয়ার কাজেও বাঙালিরা ব্যবহৃত হচ্ছে।

কিন্তু ৮১২ বাঙালি পরিবারের এই জমি আইনগতভাবে পূনরুদ্ধারে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠনসমূহ উল্লেখযোগ্য কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সমর্থ হয়নি। তারা তাদের কর্মসূচী কয়েকটি মানববন্ধন ও মিছিলের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রেখেছে। অথচ এই বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিভিন্ন ধারাবাহিক কর্মসূচীর পাশাপাশি আইনগত পদক্ষেপও গ্রহণ করা যেতে পারত। প্রশাসন সাম্প্রদায়িক সংঘাত এড়াতে বাঙালি পরিবারসমূহকে সোনামিয়া টিলায় যেতে বাঁধা দিচ্ছে বলে জনশ্রুতি আছে।

অথচ বাঙালিদের নিকট যদি সরকার প্রদত্ত সঠিক কাগজপত্র থাকে তাহলে বাঙালি নেতৃবৃন্দ প্রশাসন এবং আদালতের কাছে তাদের জমির দখল বুঝিয়ে দেবার ব্যবস্থা করার জন্য আবেদন করতে পারে এবং একই সাথে যেহেতু সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে সেহেতু আদালতের কাছে বাঙালি নেতৃবৃন্দ নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করতে পারে। আদালতের নির্দেশক্রমে জেলা প্রশাসন তখন পাহাড়ী-বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনাক্রমে জমির কাগজপত্রের সঠিকতা বিশ্লেষণ করে ন্যায্যভাবে প্রাপ্য ব্যক্তিদের কাছে জমির দখল বুঝিয়ে দিতে পারে। আইগত পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করার পরেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা না নিলে বাঙালিরা তাদের অধিকার আদায়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে সাংবাদিক সম্মেলন, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারে। এছাড়াও বাঙালি অধিকার আদায়ে মেধা সম্পন্ন কর্মী/ব্লগারগণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার করে আশানুরূপ ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।

বাবুছড়ার সোনামিয়া টিলা ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিদের রয়েছে অবহেলা, বঞ্চনা ও অধিকার হারানোর ঘটনা। রামগড়ে গত দুই বছরে অন্তত আট-নয়টি স্থানে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে বাঙালিরা অধিকার বঞ্চিত হয়েছে। ইউপিডিএফ (প্রসীত পন্থী) দলের সন্ত্রাসীগণ জোরপূর্বক বাঙালিদের জমি দখল করে বিভিন্ন স্থান থেকে পাহাড়ীদের এনে পুনর্বাসিত করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বাঙালিদের জমি অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরী করেছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পাহাড়ী বাঙালিদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত হয়েছে এমন অপপ্রচার করে এবং উল্লিখিত বিষয়ে বাঙালিদের এককভাবে দায়ী করে আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনসমূহের অনুগত ব্লগারগণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার করেছে। এ বিষয়ে বাঙালি সংগঠনসমূহ কার্যকর ভুমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো বাঙালি যখন উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের দ্বারা খুন, অপহরণসহ নিপীড়নের শিকার হয়, তখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাঙালি সংগঠনসমূহ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়ার কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না। উদাহরণ স্বরূপ মাটিরাঙার তিন বাঙালি অপহরণের কথা বলা যায়। এ নিয়ে বাঙালি সংগঠনসমূহ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখালেও পরবর্তীতে তার কোনো ফলোআপ দেখা যায়নি। এমনকি অপহৃত বাঙালি পরিবারগুলোর দুর্দশার পাশেও দাঁড়ায়নি তারা। একইভাবে নয়ন, সাদিকুলসহ অসংখ্য নিহত, নির্যাতিত বাঙালির ঘটনাগুলো ধারাবাহিকতার অভাবে হারিয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় না উল্লেখ না করলেই নয়, উপজাতি আঞ্চলিক সংগঠনসমূহ ‌’কল্পনা চাকমা’ ইস্যুটি দেশে-বিদেশে তথা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপকভাবে প্রচার করে এটিকে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার বিষয় হিসাবে দাঁড় করতে সমর্থ হয়েছে। এছাড়াও নারী এবং ভূমি সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে উপজাতি সংগঠনগুলো এমন হৃদয়স্পর্শী এবং আকর্ষণমূলকভাবে উপস্থাপন করে প্রচারণা করে যে, তা সহজেই দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। পক্ষান্তরে বাঙালি ভিত্তিক আঞ্চলিক সংগঠনগুলো মেধাবী নেতৃত্ব, কর্মী ও মিডিয়া এবং ব্লগারদের অপ্রতুলতা থাকায় এ বিষয়ে নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করার মত ক্ষেত্র এখনও গড়ে তুলতে পারেনি।

রাঙামাটির ভুষণছড়ায় ব্যাপকহারে বাঙালি গণহত্যা, আঠারো বাঙ্গালী কাঠুরিয়া হত্যা এবং অগণিত নিরীহ বাঙ্গালী হত্যার ঘটনাগুলো আজও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রচার পায় নি।
সামগ্রিকভাবে বিষয়টি পরিষ্কার যে, ন্যায্য ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বাঙালিভিত্তিক সংগঠনগুলো উপজাতি সংগঠনগুলোর মত কোন ক্ষেত্রেই কার্যকরীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তবে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা সদরের কিছু কিছু বিষয়ে বাঙালি নেতৃবৃন্দের পদচারণা দেখা গেলেও উপজেলা ভিত্তিক সংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমনঃ রামগড়ের ঘটনাবলীর বিষয়ে আঞ্চলিক বাঙালি সংগঠনসমূহকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কোন ভুমিকা নিতে দেখা যায়নি।

ফলশ্রুতিতে রামগড়ের সাধারণ বাঙালিরা বাধ্য হয়ে তাদের ভুমি অধিকার রক্ষার দাবীসমূহ হাতে লেখা পোষ্টারে প্রচার করতে বাধ্য হয়েছে। অথচ বাঙালিদের এ ন্যায্য দাবীর বিষয়ে বাঙালিভিত্তিক আঞ্চলিক দলসমূহ কার্যকরীভাবে সোচ্চার হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা জাতীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে ব্যপকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হত। এদিকে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পার্বত্য বাঙালি সংগঠনের কিছু তৎপরতা চোখে পড়লেও বান্দরবানে তা দৃশ্যমান নেই বললেই চলে।

একটি দলের সুশৃঙ্খল এবং পেশাদার আচরণ, যৌক্তিক ও তথ্য সমৃদ্ধ দাবী সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে। সংগঠনের নেতাদের ব্যক্তিগত আচরণ সাধারণ জনগণ ও কর্মীদের কাছে উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে। নেতা যখন কোন নির্দিষ্ট দলের কিংবা কোন প্রভাবশালী পরিবারের লেজুরবৃত্তি করতে গিয়ে স্বার্থন্বেষী আচরণ করে তখন সাধারণ জনগণের কাছে তারা তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সংগঠনসমূহে সার্বজনীন হতে না পারার প্রধান কারণ পরিবার, অাঞ্চলিকতা ও দলীয় স্বার্থের উর্দ্ধে উঠতে না পারা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ অসহায় বাঙালিদের ন্যায্য দাবীর বাস্তাবায়ন রাষ্ট্রের স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরী। দারিদ্রতা ও বেকারত্বের মাঝে বেড়ে ওঠা এই বিশাল বাঙালি জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে পরিচালিত করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে তা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালী সম্প্রদায়ের জাতিগত অস্তিত্বের প্রশ্নে এবং দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার মত কার্যকরী ও মেধাবী জনগোষ্ঠী সৃষ্টিতে প্রশাসনের পাশাপাশি বাঙালি আঞ্চলিক সংগঠনসমূহকে জোরালোভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর এই দায়িত্ব পালনে আঞ্চলিক বাঙালি সংগঠনসমূহের মধ্যে সংস্কার, পূনর্গঠন ও আত্নসমালোচনার ভিত্তিতে সমাধানকরণ এখন সময়ের দাবী।

♦ পারভেজ হায়দার: কলামিস্ট ও গবেষক


পারভেজ হায়দারের আরো লেখা:

বৈষম্যের শিকার পাহাড়ের বাঙালিরা

পাহাড়ে অশান্তির আগুন-৪

ফারুক হোসাইন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে :

  খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের আব্দুল লতিফ (৭০) ছোট একটি ছাউনি ঘরে পরিবারের পাশপাশি গরু-ছাগল নিয়ে একইসাথে রাত্রি যাপন করেন। ৩০ বছর আগে সরকার তাকে পার্বত্য অঞ্চলে এনে বসতের জন্য ২৫ শতাংশ এবং চাষের জন্য চার একর জমি দিলেও তা কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। সব হারিয়ে সরকারি রেশন পেয়ে ছোট একটি ঘরে দিনাতিপাত করছেন তিনি। একদিন রেশন না দিলে বন্ধ থাকে খাওয়া-দাওয়া। আশপাশের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের ৪শ’ পরিবার সেই গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় নিয়ে একইভাবে জীবনযাপন করছেন।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান (টিন, কম্বল) বিতরণে গিয়ে একজন বাঙালিরও নাম খুঁজে পাননি সরকারি কর্মকর্তারা। পার্বত্য অঞ্চলকে অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, চাকরি, উচ্চশিক্ষা বৃত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা রকম কোটা ও সুযোগ-সুবিধা চালু করেছে সরকার। তবে একই এলাকায় বসবাস করে এবং জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হয়েও তা পাচ্ছেন না বাঙালিরা।

শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগিরা। অবিলম্বে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে জনসংখ্যানুপাতে সকল সুযোগ-সুবিধা বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে একজন বাঙালি প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়ার  দাবি জানান তারা।

তিন পার্বত্য জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই এলাকার বাঙালিরা সরকারি বরাদ্দের কোনো কিছুই পান না। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে যেসব সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ অঞ্চল এবং অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে যেসব বরাদ্দ দেয়া হয় তার পুরোটাই ভোগ করছে উপজাতিরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে উপজাতিরা নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং তারাই তালিকা করেন কাদেরকে বরাদ্দ দেয়া হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় প্রতিনিধিদের তালিকায় কোনো বাঙালির নাম থাকে না। ফলে জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়ায় চলতে হচ্ছে। অন্য দিকে উপজাতি জনগোষ্ঠী এককভাবে এর পুরোটা লাভ করছে।

%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80

জানা যায়, মেডিক্যাল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সকল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর কোটার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২৫ জন উপজাতি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে কোটাতেই। নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর সংখ্যা আরো বাড়ানো হয়েছে।

অন্য দিকে একই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বাঙালিদের জন্য তেমন কোনো সুযোগ এখনো তৈরি করা হয়নি। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী দু’টি জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রকম নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তাও সেটি পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের ফলে।

শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পাহাড়ের বাঙালিরা। উপজাতি জনগোষ্ঠী করের আওতামুক্ত হলেও বাঙালিদের কর দিতে হচ্ছে। পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আদায় করা চাঁদার ক্ষেত্রে বাঙালিদের কাছ থেকে অধিক হারে আদায় করা হয়। পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লাখ টাকার মধ্যে হলে ঠিকাদারী সম্পূণরূপে উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০ শতাংশ উপজাতিদের আর বাকি ৯০ শতাংশ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হলেও তার বেশির ভাগ পায় উপজাতিরাই।

আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র পাঁচ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় ১৬ শতাংশ।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তিতে বাঙালিরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জনসংখ্যার দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ৪৮ হলেও তাদের জন্য মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্য দিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫২ শতাংশ অধিবাসীদের জন্য ৭৭ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ করা হয়েছে। আর ২৩ শতাংশ বাঙালি শিক্ষার্থীদের তালিকায় মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু ও বড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও রাখা হয়েছে। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়েছে তারাও।

গতবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তি তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় সর্বমোট ৪৭৫ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উপজাতির সংখ্যা ৩৬৪ জন আর মাত্র ১১১ জন বাঙালি (মুসলিম, হিন্দু ও বডুয়া) শিক্ষার্থী। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় দেয়া ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১২১ জন, ৩৭ জন বাঙালি। রাঙামাটি জেলায় ১৫৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১১৩ জন আর মাত্র ৪৬ জন বাঙালি। বান্দরবান জেলায় ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষা বৃত্তি দেয়া হয়। এর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থীর  সংখ্যা ১৩০ জন, আর মাত্র ২৮ জন বাঙালি শিক্ষার্থীকে এই বৃত্তি দেয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেড় শতাধিক এনজিওর মাধ্যমে কয়েক হাজার খানেক প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই বাঙালি অধিবাসীরা সুযোগ পাচ্ছে না। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে তা দেয়া হচ্ছে। রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলায় এনজিওগুলোর ২২৫টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯টি ক্ষুদ্র প্রকল্প বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়।

পার্বত্য অঞ্চলের শহরের বাঙালিরা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলেও গ্রামের মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে বসতি ও চাষের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। তিন জেলাতে এরকম মোট  ৮৬টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এগুলো ২৬ হাজার পরিবার পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বাড়লেও রেশন কার্ড বাড়েনি একটিও।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাহাড়ি বাঙালিরা। থাকার জায়গার অভাবে একই ঘরে গরু, ছাগল এবং মানুষ বসবাস করছে। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে ৫৬টি পরিবারকে ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাসের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।

কিন্তু পাহাড়ি উপজাতিদের অব্যাহত বিরোধীতা ও আক্রমণের কারণে ১৯৮৮ সালে তাদেরকে একটি গ্রামে একত্রিত করে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ৫৬টি পরিবারকে ২৫ শতাংশ বসতি জমি এবং পৌনে চার একর চাষযোগ্য জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ৩০ বছর পর সেই ৫৬ পরিবার এখন ৪০০ পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশও বাড়েনি।

অন্য দিকে চাষযোগ্য যে পৌনে চার একর জমি তাদের দেয়া হয়েছিল তা পাহাড়ে হওয়ার কারণে উপজাতিদের বাধা ও অপহরণের ভয়ে সেগুলোতে চাষ তো দূরের কথা, পা পর্যন্ত ফেলতে পারে না বাঙালিরা। কেউ বাধা ডিঙিয়ে চাষ করার কথা চিন্তা করলেই রাতের অন্ধকারে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মুকুল হোসেন বলেন, ৩০ বছর আগে যে বসতি জমি দিয়েছিল, এখন সেই জমিতের আমাদের পরিবারদের আর জায়গা হয় না। মানুষ বেড়েছে পরিবার বেড়েছে কিন্তু জমিতো বাড়েনি। অন্য দিকে চাষের জন্য পাহাড়ে যে জমি দিয়েছে, সেই জমিতে তো আমরা যেতেই পারি না।

পুলিশের কাছে অভিযোগ এবং কোর্টের কাছে সুরাহা চাইলে বলা হচ্ছে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান কর। ৭০ বছর বয়সী মো: আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের যে চাষের জমি দিয়েছিল, সেখানে তো ভয়ে যেতে পারছি না। আর যে জমিতে প্রথমে বাড়ি করেছিলাম, সেখানে শান্তিবাহিনীর অত্যাচারে ছেড়ে আসতে হয়। আবুল হাসেন বলেন, কুলারাম পাড়া, লেম্বু ছড়িতে প্রথমে তাদের বসবাস ছিল। যখন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসের কারণে নিরাপত্তা দেয়া যাচ্ছিল না তখন ৮৮ সালে এই গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ৮২’ সালে বসবাস শুরু করার পর শান্তিবাহিনী অত্যাচার শুরু করে। রাতের বেলা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়। ফায়ার করে ভীতি তৈরি করা হয়। এই নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আশপাশের বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে নিয়ে এসে এই গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের প্রধান ও ১১ নম্বর সেক্টরের ২ এম এফ কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বলেন, এখানে বাঙালিরা ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গণতন্ত্র নাই, পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। নিকৃষ্ট, খুনি, রাজাকারের জাতি স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। আবার সরকারও নতজানু হয়ে তাদের সহযোগিতা করছে। আমাদের নিজেদের দেশে আমরা নাগরিক না, নতুন করে নাগরিক হতে হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, এনজিওগুলো বলছে- পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কনফিডেন্স তৈরিতে তারা কাজ করছে। এর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ের বাঙালিরা এর কোনো অর্থই পায় না, সহযোগিতা পায় না। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে বাঙালিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে স্বীকার করে।