মন্ত্রিসভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি অধিগ্রহণ আইন-২০১৯’র খসড়া অনুমোদন

ডেস্ক রিপোর্ট:

নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম (ভূমি অধিগ্রহণ) রেগুলেশন (সংশোধন) আইন-২০১৯’র খসড়া অনুমোদন দিয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের ভূমির অধিগ্রহণে সমতলের জনগণের সঙ্গে সমতা বিধানের জন্য যে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল সেটাকেই আইন আকারে আনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে এই অনুমোদন দেয়া হয়। পরে বিকেলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম একথা জানান।

শফিউল আলম বলেন, ভুমি অধিগ্রহণের ক্ষতি পূরণের ব্যাপারে আগে সমতল এবং পাহাড় এদুটির মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। সেখানে পাহাড়ের ভূমি অধিগ্রহণে ১৫ শতাংশ এবং সমতলের ভূমি অধিগ্রহণে ৩শ’ শতাংশ প্রদান করা হত। এই বৈষম্য হ্রাস করার লক্ষ্যেই সরকার গত মেয়াদের শেষ পর্যায়ে উভয়ের জন্যই ৩শ’ শতাংশ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে এই সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি জারি করেছিল। সেটিকেও এখন আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া এদিনের সংসদে আরও ৫টি এজেন্ডা আলোচনায় স্থান পায়।

শফিউল আলম জানান, বৈঠকে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০১৮ কে আইনে পরিণত করার জন্য এর খসড়া অনুমোদন এবং জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ আইন ২০১৮’ এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘বৈঠকে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০১৮কে আগেই মন্ত্রিসভায় পাশ করা হয়েছিল কিন্তু সংসদে উপস্থাপনের আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় এটিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ আইন ২০১৮’র খসড়া অনুমোদন সম্পর্কে তিনি বলেন, সমাজকল্যাণ পরিষদ ১৯৫৬ সাল থেকেই চলছে একটি রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে। পরে ১৯৭২ সাল থেকে এটা আবার পুনর্গঠিত হওয়ার পর থেকেই সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চলছিল, এখানে কোন আইন ছিল না। সেখানে এটি যে গতানুগতিক ধারায় অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় এটি চলছিল তাকেই আইনে রূপ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এর ৭ ধারায় একটি পরিচালনা বোর্ডের কথা বলা হয়েছে। এখানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি বা বোর্ড থাকবে। তিনি সভাপতি হবেন আর মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী থাকলে সহ-সভাপতি এবং সমাজকল্যাণ সচিব সদস্য সচিব হবেন। ৮৪ জন বিশেষায়িত সদস্য থাকবেন, যারমধ্যে ২০ জন হবেন মহিলা। সভাপতি নির্দিষ্ট স্থান এবং তারিখ অনুযায়ী সভা আহ্বান করতে পারবেন এবং বছরে অন্তত দুটি সভা অনুষ্ঠিত হতে হবে এবং সভায় এক তৃতীয়াংশ সদস্য উপস্থিত থাকলে কোরাম হবে।

শফিউল আলম বলেন, মন্ত্রিসভায় বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক) আইনের খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিটাক ও ১৯৬২ সাল থেকে রেজ্যুলেশন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এ জন্যে আইনের প্রস্তাবটি করা হয়েছে। এই বিটাক আমাদের ক্ষুদ্র এবং মাঝারি যে শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে বা বিটাকের যে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে তাদের কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। এই প্রতিষ্ঠানটিও এর ৭ ধারা অনুযায়ী একটি পরিচালনা পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হবে এবং সচিব শিল্প মন্ত্রণালয় হবেন এর চেয়ারম্যান এবং বিটাক মহাপরিচালক হবেন সদস্য সচিব। ১১ সদস্য বিশিষ্ট এর পরিচালনা পর্ষদ হবে। প্রতি বছর অন্তত দুইটি সভা অনুষ্ঠিত হবে হবে এবং এক তৃতীয়াংশ সদস্য বৈঠকে উপস্থিত থাকলে কোরাম হবে।

পরবর্তী বিষয়টি হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সুরক্ষা বিধিমালা-২০১৫ এর আলোকে প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আইন বা বিধিমালার আলোকে সেই ব্যাপারে গাইডলাইন দেয়া হয়েছে। প্রবেশগম্যতা বা অ্যাক্সেসিবিলিটি অর্থাৎ প্রতিবন্ধীরা চলাফেলার ক্ষেত্রে কোন জায়গায় কীভাবে যাবেন সেটা নিয়ে অনেকগুলো বিষয় রাখা আছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রবেশগম্যতা যেমন- ভৌত অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগসহ জনসাধারণের প্রাপ্য সব সুবিধা ও সেবাসমূহে অন্যদের মতো সমসুযোগ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী নিশ্চিত করা। যেমন- বাসে আজকাল প্রতিবন্ধীরা উঠতে গেলে একজন টেনে তুলতে হবে বা ল্যাডার লাগাতে হবে। অন্য দেশে দেখবেন যে বাস বে’র সাথে সেইম লেবেল, হুইল চেয়ার দিয়ে উঠে যেতে পারে। আমাদের আস্তে আস্তে ওই বিষয়গুলোর মধ্যে যেতে হবে, এ বিষয়গুলো এখানে আছে।’

‘অর্থাৎ গণপরিবহন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ব্যবহার উপযোগী করার নির্দেশনা আছে, এটা করতে হবে,’ বলেন তিনি।

আলম বলেন, ‘ভবনগুলোতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড-২০০৬ এর বিধানগুলো কার্যকর করা। যেমন- সব গণস্থাপনা ভবন, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আদালত, পুলিশ স্টেশন, আইনি সহায়তা কেন্দ্র, রেল স্টেশন, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, বিমান বন্দর, নৌ ও স্থল বন্দর, দুর্যোগকালীন আশ্রয় কেন্দ্র, সাইক্লোন শেল্টার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান স্থল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, উড়াল সেতু, পরিসেবার স্থান, বিনোদন ও খেলাধুলার স্থানসহ সব জায়গায় এটা (বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন) করা।’

তিনি বলেন, ‘বিমানে আই-চেয়ার, কেবিন চেয়ারের ব্যবস্থা রাখা, দুর্যোগকালীন আশ্রয় কেন্দ্র ও সাইক্লোন শেল্টার শিশু ও দুগ্ধ কন্যার প্রবেশগম্য টয়লেট রাখার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে।’

প্রতিবন্ধী বিষয়ক কোটা রাখা বা না রাখা সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এটা নিয়ে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়নি। তবে আপনাদের জানার জন্য বলি, আইনে যে প্রভিশন আছে ওটা কিন্তু কার্টেল (বাদ দেয়া) হয়নি। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অর্ডার (প্রশাসনিক আদেশ) দিয়ে আইন কখনও সুপারসিড হয় না। (প্রতিবন্ধীদের কোটা আইনানুযায়ী) যা ছিল, তাই আছে।’

এছাড়া মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংবাদ পত্র এবং সংবাদ সংস্থায় কর্মরত সাংবাদিক এবং সংবাদকর্মীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত ‘নবম মজুরি বোর্র্ড রোয়েদাদ ২০১৮’ এর পর্যালোচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নতুন কমিটি পুনর্গঠনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের অনুমোদন করা হয়।

এদিন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকের শুরুতেই আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। শোক প্রস্তাবে বলা হয়, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন বীর মুত্তিযোদ্ধা এবং আদর্শবান রাজনীবিদকে হারালো।

 

সূত্র: বাসস

বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর সাথে পাহাড়ী প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়েছিল কি?

মাহের ইসলাম

এমএন লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রতিনিধিদল বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত করতে গেলে, তিনি তাদেরকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান জানান এবং পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের হুমকি দিয়েছিলেন – প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য  এমন এক ধারণার নির্ভরযোগ্য সুত্রের অনুপস্থিতি আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করেছে।  তবে এই ঘটনা সংক্রান্ত কিছু পরস্পর বিরোধী তথ্যের উপস্থিতি আমাকে যতটা না বিস্মিত করেছে তার চেয়ে বেশি দ্বিধান্বিত করেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলনের পিছনে এই ধারণার সম্পৃক্ততার মাত্রা বিবেচনায়, এমন একটা অনির্ভরযোগ্য তথ্যের গড়মিলগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরা অপরিহার্য বলে মনে করেই এই লেখার অবতারণা।  যা করতে গিয়ে প্রকাশনার গ্রহণযোগ্যতা, অহেতুক বিতর্ক এড়ানো এবং দীর্ঘ লেখায় ধৈর্যচ্যুতির সম্ভাবনা বিবেচনায় শুধুমাত্র নির্বাচিত কয়েকটি প্রকাশনার উপরেই দৃষ্টি সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে।

  • ১৯৮৪ সালে Anti-Slavery Society ‘The Chittagong Hill Tracts: Militarization, oppression and the hill tribes’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি প্রতিনিধিদল ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের নিকট নিম্নোক্ত চার দফা দাবী উপস্থাপন করেঃ
    ক।  নিজস্ব আইন পরিষদসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হবে।
  • খ। সংবিধানে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন- ১৯০০ বহাল রাখতে হবে।
  • গ। পূর্ণ প্রশাসনিক ক্ষমতাসহ উপজাতীয় রাজাদের অফিস বহাল থাকবে।
  • ঘ। সংবিধানে এমন এক রক্ষা কবচ থাকবে যে, ১৯০০ সালের রেগুলেশন সংশোধন করা হবে না এবং এই এলাকায় বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে না।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, শেখ মুজিব স্বায়ত্বশাসনের দাবীকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিবেচনা করে তাদেরকে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের আত্মীকরণ এবং বাঙালি হওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন।  (পৃ-৪৬)।


এ বিষয়ে আরো পড়ুন:


‘জীবন আমাদের নয়’ – সিএইচটি কমিশন রচিত এই রিপোর্টের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯১ সালের মে মাসে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতি বঞ্চনা আর নিপীড়নের একপেশে এক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এই রিপোর্টটি ইতোমধ্যেই আলোচিত হয়েছে।  পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আলোচনায় ও গবেষণায় দেশের, এমনকি দেশের বাইরের একাধিক ব্যক্তি, গবেষক এবং সংস্থা এই রিপোর্টটিকে সুত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।  এই রিপোর্টের গুরুত্ব সম্পর্কে চিন্ময় মুৎসুদ্দী’র একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য,

“এটি আন্তর্জাতিক একটি কমিশনের রিপোর্ট।  বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়ে তারা ১৯৯০/৯১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে। …………….. এই রিপোর্টে অঙ্কে স্পর্শকাতর বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে।  আন্তর্জাতিক কমিশনের এই রিপোর্টটি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ বা সেটি অসত্য এমন কোনো বক্তব্য বাংলাদেশ সরকার বলেনি।” (মুৎসুদ্দী, ১৯৯২, পৃ-মুখবন্ধ)।

সিএইচটি কমিশনের উক্ত প্রতিবেদনের সুত্রে পাহাড়ি জনগণের এক প্রতিনিধি দলের সাথে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতের নাতিদীর্ঘ বিবরণ তুলে ধরেছেন বিপ্লব রহমান (২০১৫):

“১৯৭২ সালের পাহাড়ি জনগণের নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধি দল প্রথম রাষ্ট্রপতি মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন।  প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন সংসদের চাকমা সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, সঙ্গে ছিলেন উপেন্দ্রলাল চাকমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ১২ জন পাহাড়ি। মানবেন্দ্র লারমার সঙ্গে ছিল শেখ মুজিবের বরাবরে লিখিত একটি স্মারকলিপি।

শেখ মুজিব জিজ্ঞাসা করলেন, ওতে কী লেখা আছে? স্মারকলিপিতে দাবী করা হয়েছিল, নিজস্ব আইন পরিষদ সম্বলিত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসন, ১৯০০ সালের বিধিসমূহের সংরক্ষণ, তিন প্রধানের দপ্তরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, বিধিসমূহের সংশোধনের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ এবং অ-পাহাড়িদের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করা।  মুজিব দাবিগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

উপেন্দ্রলাল চাকমার স্মরণে আছে শেখ মুজিব বলেছিলেন, ‘না, আমরা সবাই বাঙালি, আমাদের দুই ধরণের সরকার ব্যবস্থা থাকতে পারে না।  তোমরা তোমাদের জাতীয় পরিচয় ভুলে যাও এবং বাঙালি হয়ে যাও।’ তিনি নাকি হুমকি দিয়ে এও বলেন যে, বাঙালি মুসলমানরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেয়ে ফেলবে।

শেখ মুজিবের অফিসে মিটিং স্থায়ী হয় মাত্র ৩-৪ মিনিট। প্রতিনিধিদেরকে বসতে বলা হয়নি। শেখ মুজিব স্মারকলিপি গ্রহণ করেননি।  উপেন্দ্রলাল চাকমার ভাষ্যমতে, তিনি সেটা মানবেন্দ্র লারমার দিকে ছুড়ে মেরেছিলেন।” (রহমান, ২০১৫, পৃ-১৪০-৪১)।

প্রায় একই বক্তব্য তুলে ধরেছেন সৈয়দ মুর্তজা আলী (১৯৯৬) এবং মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন (২০০৩)।  তবে দু’জনেই প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা সাতজন ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।  তন্মধ্যে আলী (১৯৯৬) উপেন্দ্রলাল চাকমাকে প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য হিসেবে বর্ণনা করে, তার উদ্ধৃতি দিয়েছেন।  (আলী, ১৯৯৬, পৃ-৩৭-৩৮; আবেদিন, ২০০৩,পৃ-৪৫)।

এই ঘটনার প্রায় একই বিবরণ পাওয়া যায় আমেনা মহসিন (১৯৯৭) রচিত ‘দি পলিটিক্স অফ ন্যাশনালিজম’ বইয়ে।  তবে তিনি প্রতিনিধিদলকে বসতে না দেয়া, মিটিংয়ের স্বল্প স্থায়ীত্ব এবং স্মারকলিপি গ্রহণ না করে ছুঁড়ে মারার ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেননি।  একই সাথে লেখিকা আরো জানিয়েছেন যে, উক্ত প্রতিনিধিদলের সদস্য অনন্ত বিহারী খিসা ১৯ অক্টোবর ১৯৭৩ তারিখে লেখিকার সাথে এক সাক্ষাতকারে এই ঘটনা নিশ্চিত করেছেন।  (মহসিন, ১৯৯৭, পৃ-৫৭-৫৮)।

এস মাহমুদ আলী (১৯৯৩) জানান, ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে এমএন লারমার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল শেখ মুজিবের কাছে চার দফা দাবী পেশ করলে তিনি প্রতিনিধিদলকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার উপদেশ দেন।  তবে তিনিও প্রতিনিধিদলকে বসতে না দেয়া, মিটিংয়ের স্থায়ীত্ব এবং স্মারকলিপি গ্রহণ না করে ছুঁড়ে মারার ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেননি।  অনুরূপ বক্তব্য ফুটে উঠেছে মিজানুর রহমান শেলী (১৯৯২) এবং এস পি তালুকদারের (১৯৯৪) কণ্ঠেও।

প্রদীপ্ত খীসা (১৯৯৬) জানিয়েছেন,

“ বাংলাদেশের ভাবি সংবিধানে উপজাতীয়দের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণের জন্যে এমএন লারমাসহ একটি উপজাতীয় প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সন্ধ্যে সাড়ে ছয়টার সময় একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ”

তিনি আরো জানিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধু

“উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের দাবিদাওয়ার প্রতি সমর্থনে কুণ্ঠিত হন। উল্টো তিনি এমএন লারমাকে এ ব্যাপারে আর অগ্রসর না হবার পরামর্শ দেন ”।

এখানে লেখক চার দফা দাবীর প্রতিটি উল্লেখ করেছেন।  তবে, প্রতিনিধিদলে সদস্য সংখ্যা, প্রতিনিধিদলকে বসতে না দেয়া, মিটিংয়ের স্থায়ীত্ব এবং স্মারকলিপি গ্রহণ না করে ছুঁড়ে মারার ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেননি। (খীসা, ১৯৯৬, পৃ-৪১)।

সুবীর ভৌমিক (১৯৯৬) জানিয়েছেন যে, ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে সতের সদস্যের এক প্রতিনিধিদল ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর সরকারী বাসভবনে তার সাথে সাক্ষাৎ করে চার দফা দাবী সম্বলিত এক স্মারকলিপি পেশ করে।  সতের জনের একজন উপেন্দ্রলাল চাকমা’কে উদ্ধৃত করে তিনি জানান যে, বঙ্গবন্ধু তাদেরকে স্বশাসনের কথা ভুলে গিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে এবং বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।  প্রতিনিধি দলে মং রাজা এবং এমএন লারমার উপস্থিতির কথা জানালেও লেখক অন্য কোন সদস্যের নাম উল্লেখ করেননি।  এছাড়াও, প্রতিনিধিদলকে বসতে না দেয়া, মিটিংয়ের স্থায়ীত্ব এবং স্মারকলিপি গ্রহণ না করে ছুঁড়ে মারার ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেননি।

তারিখ উল্লেখ না করলেও ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রতিনিধিদলের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে চার দফা দাবী প্রণয়ন এবং বঙ্গবন্ধু কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপার উল্লেখ করেছেন আরো কিছু লেখক/ গবেষক। তন্মধ্যে ইফতেখারুজ্জামান (১৯৯৮) এবং শরদিন্দু শেখর চাকমা (২০১৪) উল্লেখযোগ্য।  উল্লেখ্য যে, আমেনা মহসিন (২০০৩) তার ভিন্ন আরেকটি বইয়ে সন-তারিখ উল্লেখ না করে বলেন যে, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়কালে এমএন লারমার নেতৃত্বে পাহাড়িদের এক প্রতিনিধিদল শেখ মুজিবের রহমানের সাথে দেখা করে চার দফা দাবী পেশ করেন। মুজিব তাদের দাবী প্রত্যাখ্যান করে বাঙালি জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করার উপদেশ দেন এবং বাঙালি পুনর্বাসনের হুমকি দেন।  (মহসিন, ২০০৩, পৃ-২২)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কতটি প্রতিনিধিদল বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিল, তার কোন তালিকা হয়ত থাকতে পারে, কিন্তু আমি খুঁজে বের করতে পারিনি।  তবে বিভিন্ন প্রকাশনা পর্যালোচনা করে এবং বিভিন্ন লেখকের বইয়ে প্রদত্ত ঘটনাপঞ্জী হতে দুইটি প্রতিনিধিদলের ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ অন্তত আমার নেই। এই প্রতিনিধিদল দু’টির একটির নেতৃত্বে ছিলেন চারু বিকাশ চাকমা; অন্যটির নেতৃত্বে ছিলেন মং রাজা মং প্রু সাইন।  এমএন লারমা’র নেতৃত্বে কোন প্রতিনিধি দলের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে আমি প্রমাণ পাইনি।

১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারিতে চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে সাত সদস্য বিশিষ্ট এক প্রতিনিধিদলের উল্লেখ পাওয়া যায় জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা রচিত ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ’ বইয়ে (প্রকাশকাল ১৯৯১ সন)।  পরবর্তীতে আরো কিছু লেখক এই প্রতিনিধিদলের উল্লেখ করেছেন যেমন, মিজানুর রহমান শেলী (১৯৯২),  আফতাব আহমাদ ( ১৯৯৩),  প্রদীপ্ত খীসা (১৯৯৬), আমেনা মহসিন (১৯৯৭), গোলাম মোর্তোজা (২০০০), হাবিবুর রহমান (২০০৪), প্রমুখ।  তন্মধ্যে মেজর জেনারেল  (অব.) ইবরাহিম (২০০১) এই প্রতিনিধিদলের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন।  এরা হলেন, মং শানু চৌধুরী, দেবদত্ত খীসা, যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, অশোক মিত্র, রুপায়ন দেওয়ানসহ আরো দুইজন।

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মং রাজা মং প্রু সাইনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের আরেকটি প্রতিনিধিদল বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিল।  অন্যান্য যারা এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন, তারা হলেনঃ

  • ১। মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা।
  • ২। কে কে রায়।
  • ৩। বিনীতা রায়।
  • ৪। বোমাং রাজা মং শৈ প্রু।
  • ৫। সুবিমল দেওয়ান।
  • ৬। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা।

উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্য জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা (১৯৯১) হতে জানা যায় যে, বঙ্গবন্ধু জরুরী কাজে বাইরে থাকায় প্রতিনিধিদল তার (বঙ্গবন্ধু) সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেনি।  তাই, তার জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে নিন্মোল্লিখিত ৪ দফা দাবী সম্বলিত একটি দাবীনামা রেখে আসেঃ

  • ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর একটি নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
  • খ। উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ১৯০০ সালের ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির’ অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে।
  • গ। উপজাতীয় রাজাদের দফতর সংরক্ষণ করা হবে।
  • ঘ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কোন শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না করা হয়, এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। (চাকমা, ১৯৯১, পৃ-৫০-৫১)।

১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন মং রাজার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদলের আগমন, বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাত না হওয়ার প্রেক্ষিতে চার দফা দাবীনামা রেখে যাওয়ার ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন আরো কিছু লেখক/গবেষক।  তন্মধ্যে আফতাব আহমাদ (১৯৯৩), মাহফুজ পারভেজ (১৯৯৯), গোলাম মোর্তোজা (২০০০), মেজর জেনারেল  (অব.) ইবরাহিম (২০০১) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

উপরোক্ত দু’টি প্রতিনিধি দল ছাড়া আর কোন উপজাতীয় প্রতিনিধি দলের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের বিবরণ পাওয়া যায় না।  তবে আফতাব আহমাদ ( ১৯৯৩) জানিয়েছেন যে, জাতীয় সংসদ কর্তৃক বাংলাদেশের সংবিধান অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত, ১৯৭২ সালে একাধিকবার এম এন লারমা বঙ্গবন্ধুর সাথে পাহাড়িদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং  দাবীদাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন।

এমতাবস্থায়, যখন চোখে পড়ে, কেউ কেউ দাবী করছেন যে, এমএন লারমার নেতৃত্বে এক উপজাতীয় প্রতিনিধিদল ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে চার দফা দাবী পেশ করেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু সেই দাবী মেনে নেননি – তখন বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না।  বিস্ময়ের মাত্রা আরো উঁচুতে ওঠে যখন চোখে পড়ে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ তারিখের প্রতিনিধিদলের সাতজনের মধ্যে যার নামই নেই, সেই  উপেন্দ্রলাল চাকমাকে উদ্ধৃত করে সিএইচটি কমিশন তাদের প্রতিবেদনে স্মারকলিপি ছুঁড়ে মারার মত ঘটনা উল্লেখ করছে – সেই প্রতিবেদন আবার অনেক গবেষণাকর্মের সুত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ তারিখের প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন, এমন একজন হলেন জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা।  তিনি যেখানে নিজে বলেছেন (১৯৯১) যে, মং রাজা মং প্রু সাইনের নেতৃত্বে সাত সদস্যের এক প্রতিনিধি দলে গিয়েছিল এবং ঐ সময়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রতিনিধিদলের দেখা হয়নি; সেখানে সিএইচটি কমিশন (১৯৯১), মিজানুর রহমান শেলী (১৯৯২), এস মাহমুদ আলী (১৯৯৩), এস পি তালুকদার (১৯৯৪),  প্রদীপ্ত খীসা (১৯৯৬), সুবীর ভৌমিক (১৯৯৬), সৈয়দ মুর্তজা আলী (১৯৯৬), আমেনা মহসিন (১৯৯৭), বিপ্লব রহমান (২০১৫) এবং আরো অনেক লেখক গবেষকের প্রকাশনায় এমএন লারমার নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল গমন, বারো বা সতের সদস্যের প্রতিনিধিদল, অনন্ত বিহারী খীসা কিংবা উপেন্দ্রলাল চাকমাকে প্রতিনিধি দলের সদস্য বিবেচনা করা, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রতিনিধিদলের দাবী অগ্রাহ্য করা বা স্বল্প সময়ের মিটিং, কিংবা তাদেরকে বসতে না দেয়া, এমনকি এমএন লারমার দিকে  স্মারকলিপি ছুঁড়ে মারার ব্যাপারগুলো কোন দৃষ্টিকোণ হতে বিবেচনা করা উচিৎ- সেটা বিবেচনার ভার পাঠকের উপর ন্যস্ত করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

প্রথিতযশা আর স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের প্রকাশনায় তথ্য বিভ্রাটের এহেন উপস্থিতিতে সাধারণ পাঠকের দ্বিধান্বিত না হয়ে উপায় নেই।  বিগত বছরগুলোতে এই তথ্য বিভ্রাটের বলি হয়েছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ, বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামে।  পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরেই তথ্য বিভ্রাটের মাত্রা এমনি ব্যাপক যে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেও এমনটা ঘটেছে; যার প্রমাণ হল ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলী।  যাদের সাথে বঙ্গবন্ধুর দেখাই হয়নি, তাদের দাবী না মেনে বসতে না দেয়ার মত অভদ্র আচরণ এমনি স্মারকলিপি ছুঁড়ে মারার মত শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজের দায়ভারে আক্রান্ত করা হয়েছে তাঁকে –  দেশে, এমনকি বিদেশে।

তথ্যসুত্রঃ

  • ১। ইব্রাহিম, মেজর জেনারেল (অব.) (২০০১). পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স।
  • ২। খীসা, প্রদীপ্ত (১৯৯৬). পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা. ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ।
  • ৩। চাকমা, জ্ঞানেন্দু বিকাশ (১৯৯১). ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ. রাঙামাটি: স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।
  • ৪। পারভেজ, মাহফুজ ( ১৯৯৯). বিদ্রোহী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও শান্তি চুক্তি. ঢাকা: সন্দেশ।
  • ৫। মুৎসুদ্দি, চিন্ময় (১৯৯২). অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ . ঢাকা: আগামী প্রকাশনী।
  • ৬। মোর্তোজা, গোলাম (২০০০ ). শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন. ঢাকা: সময় প্রকাশন।
  • ৭। রহমান, বিপ্লব (২০১৫). পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ. ঢাকা: সংহতি প্রকাশন।
  • ৮। Abedin, Mohammad Zainal (2003). The Chittagong Hill Tracts: A Victim of Indian Intervention. London: Eastern Publications.
  • ৯। Ahmed, Aftab (1993, November). Ethnicity and Insurgency in the Chittagong Hill Tracts Region: A Study of the Crisis of Political Integration in Bangladesh. Journal of Commonwealth & Comparative Politics, 31(3), 32-36.
  • ১০। Ali, S Mahmud (1993). The Fearful State: Power, People and Internal War in South Asia . London: Zed Books.
  • ১১। Ali, yed Murtaza (1996). The Hitch in the Hills: CHT Diary. Chittagong: Dil Monowara Begum.
  • ১২। Bhaumik, Subir. (1996). Insurgent Crossfire North-East India. New Delhi: Lancer Publishers.
  • ১৩। Mohsin, Amena. (1997). The Politics of Nationalism: The Case of the Chittagong Hill Tracts Bangladesh. Dhaka: The University Press Limited.
  • ১৪। Mohsin, Amena. (2003). The Chittagong Hill Tracts, Bangladesh: On the Difficult Road to Peace. Dhaka: The University Press Limited.
  • ১৫। Royhan, Syed Abu (2016). The Chittagong Hill Tracts. Dhaka: Kalikolom Prokashona.
  • ১৬। Shelley, Mizanur Rahman (Ed.). (1992). The Chittagong Hill Tracts of Bangladesh: The Untold Story. Dhaka: Centre for Development Research, Bangladesh.
  • ১৭। Society, Anti-Slavery (1984). The Chittagong Hill Tracts: Militarization, oppression and the hill tribes. London: Anti-Slavery Society.

মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও অবদান

মাহের ইসলাম

পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বিচার করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ‌‌’বাঙালি হইয়া যা’ বক্তব্যকে রীতিমত অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করেন – এমন লোকের সংখ্যা মোটেও কম নয়, বিশেষত উপজাতিদের মতে । পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী সময়কাল, এমনকি বর্তমানে চলমান সহিংস এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পিছনে দায় খুঁজতে গিয়েও অনেকেই উপরোক্ত বক্তব্যকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিতবোধ করেন না, যার মধ্যে মূল জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত এবং জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গও রয়েছেন। । এতসব বিবেচনায় ইবরাহিম (২০১৮) যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “বঙ্গবন্ধু তাঁর কথাতে কী বোঝাতে চেয়েছিলেন এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠী কী বুঝেছিলেন সেটি ইতিহাসের অন্যতম একটি বিতর্কিত উল্লেখযোগ্য বিষয়।” (ইবরাহিম, ২০১৮, পৃ-২৫৫)।

ঘটনার দুই যুগের বেশী সময় পার হয়ে যাওয়ার পরে, এই বিতর্ক অবসানে গ্রহনযোগ্য সমাধান পাওয়া যতটা দুষ্কর, ‘বঙ্গবন্ধু কী বুঝাতে চেয়েছিলেন’ আর ‘পার্বত্য জনগোষ্ঠী কী বুঝেছিলেন’ – সেটা নির্ণয় করা অতটা দুষ্কর নয়। বরং নিঃসন্দেহে দাবী করা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে জ্ঞান রাখেন এমন কিছু শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির প্রকাশিত মতামতের সুত্রেই এই বিতর্কের উপসংহার টানা সম্ভব।  তবে উপসংহার টানার পূর্বশর্ত হিসেবে বঙ্গবন্ধুর এহেন উচ্চারণের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।


এ বিষয়ে আরো পড়ুন


বঙ্গবন্ধু মোট তিনবার পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তন্মধ্যে তাঁর প্রথম ভ্রমণই সর্বাধিক আলোচিত।  অবাক হওয়ার ব্যাপার হল এই যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও এমন ব্যক্তি আছেন, যারা পরের দুই ভ্রমণের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নয়। প্রথমবার এসেছিলেন ১৯৭৩ সালে এবং এর পরে ১৯৭৫ সালে দুই বার রাঙামাটি এসেছিলেন।

১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের আলোকে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৭৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবার পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবের কথা শুনতে পাহাড়ের অগনিত মানুষ সেদিন ভীড় জমিয়েছিল রাঙামাটি স্টেডিয়ামে। সেই ভাষণের পুরো বিষয়বস্তু সম্পর্কে তেমন তথ্য না পাওয়া গেলেও, দু’টো বিষয়ের উপর যে তিনি আলোকপাত করেছিলেন, সেটা নিশ্চিত হওয়া যায় একাধিক নির্ভরযোগ্য সুত্রের মাধ্যমে। একটি ছিল ত্রিদিব রায় সংক্রান্ত আর অপরটি ছিল বাঙালী জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটা খণ্ড চিত্র পাওয়া যায় প্রদীপ্ত খীসা (১৯৯৬)  রচিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা’ বইয়ে।  জাতীয়তাবাদের সঙ্কট ও জুম্ম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি ১৯৭৩ সালের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অবতারণা করেন।  ত্রিদিব রায়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি উল্লেখ করেছেন,

“তিনি (বঙ্গবন্ধু) চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা পালনের অভিযোগ আনেন।  মহান নেতার এই উক্তিতে তাঁর পাশে উপবিষ্টা রাজমাতা বিনীতা রায়ের দু’চোখ সজল হয়ে উঠে।  যারা ওই জনসভায় উপস্থিত ছিলেন, তারা মহান নেতার সেদিনকার উক্তি এবং সেই করুণ দৃশ্য সহজে ভুলতে পারেন নি।” (খীসা, ১৯৯৬, পৃ-৪৮)।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের উপরে আলোকপাত করতে গিয়ে শরদিন্দু শেখর চাকমা (২০১১) রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইয়ে, ত্রিদিব রায়ের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর এহেন অভিযোগের কারণ তুলে ধরে জানিয়েছেন,

“ঐ ভাষণে তিনি রাজা ত্রিদিব রায়ের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে তাকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করেন।  উল্লেখ্য, পাকিস্তান হতে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু রাজা ত্রিদিব রায়কে বাংলাদেশে ফেরত আনার জন্য তার মা বিনীতা রায়কে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন। তখন ত্রিদিব রায় জাতিসংঘে পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে নিউইয়র্কে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু রাজা ত্রিদিব রায় দেশে ফেরত আসেন নি। তিনি এখনও পাকিস্তানে আছেন। আরো উল্লেখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় রাজা ত্রিদিব রায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে পাকিস্তানিদের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং যুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য শ্রীলঙ্কা, বার্মা (বর্তমান মায়ানমার), থাইল্যান্ড ইত্যাদি বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশগুলো সফর করতে গেছিলেন। এসব কারণে বঙ্গবন্ধু ত্রিদিব রায়-এর উপর খুবই নাখোশ হয়েছিলেন ” (চাকমা, ২০১১, পৃ-৯)।

সঙ্গত কারণেই উল্লেখ্য যে, ত্রিদিব রায়ের প্রসঙ্গে নয় বরং  বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৩ সালের ভাষণ পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপটে সর্বাধিক আলোচিত/সমালোচিত হয়েছে ‘ বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ প্রসঙ্গের অবতারণায়।  বস্তুত বঙ্গবন্ধুর ঐ ভাষণের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল, উপজাতিদেরকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান সংক্রান্ত। এক জনাকীর্ণ জনসভায়, ‘আবেগ আপ্লুতভাবে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে’ তিনি বলেছিলেন,

“আমরা এখন সবাই বাঙালী। এখানে কোন উপজাতি নেই। আমি আজ থেকে আপনাদেরকে উপজাতি থেকে জাতিতে প্রমোশন দিলাম” (চাকমা, ১৯৯১, পৃ-৫২)।

ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির কয়েক মাস পরে ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই হতে ২১ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত ‘জাতীয় সংহতির প্রেক্ষিতেঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপ’ শিরোনামের এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় ডাঃ হারুন-অর-রশিদ বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত বক্তব্যের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি তৎকালীন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মূলত  স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি উপজাতীয়দের আনুগত্য প্রকাশের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন।  তাঁর মতে,

“বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে বাঙালী হয়ে দেশের সমগ্র জনগণের সঙ্গে বসবাসের বহুল আলচিত পরামর্শদানের ঘটনা থেকে ভিন্ন অবস্থায় নতুন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সূচনা বলে অনেকে মনে করলেও প্রকৃত অবস্থা ছিল ভিন্নতর।

এ কথা সত্যি যে, বঙ্গবন্ধু সরকার প্রবর্তিত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৬নং অনুচ্ছেদে ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালী নামে পরিচিত হইবেন’ – এ কথা বলা হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবান ছিল সংবিধানের উক্ত অনুচ্ছেদের বলিষ্ঠ উচ্চারণ এবং জাতীয় সংহতির প্রতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধকরণের প্রয়াস।

একথা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না যে, বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের চুড়ান্ত পরিণতিতে ’৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছে।  এ যুদ্ধে রাজা ত্রিদিবরায়সহ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের পক্ষ সমর্থন করে।  স্বাধীনতা – পরবর্তী পার্বত্য বিদ্রোহের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাসহ অপর একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্নসমর্পণ সত্ত্বেও কিছু সংখ্যক পাকিস্তানী সৈন্য এবং হানাদার বাহিনী কর্তৃক বেসামরিক লোকজন নিয়ে সৃষ্ট ওদের সহযোগী সশস্ত্র রাজাকার বাহিনীর সদস্য পাহাড়িদের একটি অংশের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে নতুন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাতে থাকে।  তাদের এ তৎপরতা দমন করতে ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসের শেষ পর্যন্ত সময় লাগে।

এমনি এক অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর পাহাড়ি জনগণকে ‘বাঙালী হয়ে’ বসবাসের পরামর্শ ছিল বস্তুত তাদের প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব মেনে নেয়ার তাগিদ এবং নতুন রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের (জাতিসত্ত্বার নয়) পরিচয়বাহী।  জাতির জনক হিসেবে তা ছিল সময়োপযোগী ও যথার্থ। ” (হারুন-অর-রশিদ, ১৯৯৮)।

সুনীতি বিকাশ চাকমা রচিত, ‘উপজাতীয় নেতৃত্বঃ সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিকথা’, শীর্ষক প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত আহবানের ভিন্ন আঙ্গিকের এক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তাঁর মতে,
“শেখ মুজিব বুঝাতে চেয়েছিলেন, ‘উপ’ শব্দটি বরাবরই খাটো বা নিম্ন শ্রেণীভুক্ত করার জন্যই ব্যবহৃত হয়।  যেমন উপ-সচিব, উপমন্ত্রী, উপ-প্রধান, উপ-রাষ্ট্রপতি যথাক্রমে সচিব, মন্ত্রী, প্রধান এবং রাষ্ট্রপতির চেয়ে নিম্ন পদবীর।  সুতরাং সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে উপজাতিরা কি বাঙালী জাতি থেকে নিম্ন শ্রেণীর? তাই তিনি সেদিন বুঝাতে চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে কোন জাতিভেদ থাকবে না।  একজন সাধারণ বাঙালী সংবিধানের আওতায় যে সুযোগ, সুবিধা, গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে তেমনি পার্বত্যাঞ্চলে যে কোন পাহাড়ীও একই সুযোগ সুবিধা ভোগ করার অধিকার থাকবে। সুতরাং কোনক্রমেই শেখ মুজিব উপজাতীয়দের মুসলমান বানাতে চাননি। বরং তাদের সমান অধিকার দেওয়ারই অঙ্গীকার করেছিলেন”।

বঙ্গবন্ধু কী মনে করে পাহাড়িদেরকে বাঙালী হওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন তার একটা পরিস্কার ধারণা উঠে এসেছে সুবীর ভৌমিক (১৯৯৬) এর ‘Insurgent Crossfire: North-East India’ বইয়ে।  উপেন্দ্রলাল চাকমা’র সাথে সাক্ষাৎকারের সুত্রোল্লেখ করে সুবীর ভৌমিক সামনে এনেছেন,

“ব্রিটিশরা আপনাদেরকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে রেখেছিল। পাকিস্তানিরাও একই কাজ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন জাতি এবং আপনারাও মুক্ত মানুষ।  সুতরাং পৃথক পরিচয়ের ব্যাপারে কুচক্রীরা আপনাদের কী বলেছে – তা ভুলে যান এবং এই স্বাধীন জাতির অন্য সকলের মত একই অধিকার উপভোগ করার জন্যে  বাঙালী হয়ে উঠুন।” (The British kept you as second- and third-class citizens, the Pakistanis did the same, but now Bangladesh is a free nation and you are free people. So, forget what mischief-makers tell you about your separate identity and become Bengalis to avail yourselves of the same rights others will have in this free nation.)  (Bhaumik, 1996, p. 260)।

উপজাতিদের অধিকার নিশ্চিত করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুতির কথা উঠে এসেছে শরদিন্দু শেখর চাকমা’র কণ্ঠেও।  তিনি তার পূর্বোক্ত বইয়ে তিনি জানিয়েছেন,

“উল্লেখিত জনসভায় (১৯৭৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি) বঙ্গবন্ধু আরো ঘোষণা করেন যে, জাতি উপজাতি নির্বিশেষে আমরা সবাই বাঙালী। তবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সামাজিক জীবনে কেহ হস্তক্ষেপ করবে না বলে উপজাতিদের আশ্বস্ত করেন।এবং বাঙালীদের উপজাতি জনগণের জায়গা জমি জোর করে দখল করার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি করে দেন। এরপর সরকার ভুমি অধিকার বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করে।” (চাকমা, ২০১১, পৃ-৯-১০)।

বঙ্গবন্ধুর মনে ঠিক কী ছিল কিংবা তিনি কী বুঝাতে চেয়েছিলেন সেটা নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই যে,  তাঁর এই কথাকে পাহাড়ের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ নিজেদের মত অপব্যাখ্যা দিয়ে ব্যবহার করেছিলেন নিজেদের স্বার্থোদ্ধারে। পাহাড়ের কিছু কুচক্রী কর্তৃক এহেন জঘন্য মানসিকতার বলি হয়েছিল পাহাড়ের সহজ-সরল, নিরীহ আপামর জনসাধারণ।

জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা তার ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ’ পুস্তকে বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত উক্তির অপব্যাখ্যার এক সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেছেন।  তিনি বলেছেন,

“উপজাতীয়রা বাঙালী বলতে বাঙালী মুসলমানদের বুঝে। জনসংহতি সমিতি শেখ মুজিবের উপরোক্ত বক্তব্যকে অপব্যাখ্যা করে বলেছে যে, তিনি উপজাতীয় জনগনকে বাঙালী আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে উপজাতীয়দের সবাই বাঙালী বা মুসলমান হতে হবে। তাই মুসলমান তথা বাঙালী হওয়া থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যে জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ তাদের মনোনীত প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য উপজাতীয় জনগণের প্রতি আহবান জানান। সহজ-সরল উপজাতীয় জনগণ তাদের কথায় বিশ্বাস করে জনসংহতি সমিতির প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে।”(চাকমা, ১৯৯১,পৃ-৫২)।

অথচ এই ঘটনার এক বছর আগেই ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের এক প্রতিনিধিদলকে বঙ্গবন্ধু আশ্বস্ত করেছিলেন যে, “উপজাতীয়দের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি পুরাপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হবে।” (পূর্বোক্ত, পৃ-৫১)।

৭ জুন ১৯৭৩ সালের দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদ হতে জানা যায় যে,  সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর চেম্বারে সাক্ষাৎ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যা সুদিপ্তা দেওয়ান বঙ্গবন্ধুকে তার নির্বাচনী এলাকা এবং উপজাতীয় জনসাধারণের সমস্যা সম্পর্কে  অবহিত করেছিলেন। যার প্রেক্ষিতে, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, “উপজাতীয় এলাকার জনগণের জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করা হবে।”  আরো জানা যায় যে,

 “প্রধানমন্ত্রী দুঃখের সঙ্গে বলেন যে, অতীতের ঔপনিবেশিক সরকারের শোষণ ও অবহেলার ফলেই উপজাতীয় এলাকায় কোনরূপ উন্নয়ন হয়নি। বঙ্গবন্ধু বলেন যে, উপজাতীয় এলাকার জনগণের দুঃখের দিনের অবসান হয়েছে। উপজাতীয় জনগণও স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক এবং অন্যান্য নাগরিকদের মতই সমান সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করবে। ” (Tripura, 2017, p. 8)।

এই সাক্ষাৎকালেই সুদিপ্তা দেওয়ান মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে উপজাতিদের জন্যে পাঁচটি করে কোটা দাবী করেছিলেন- যা বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ই নিশ্চিত করা হয়েছিল।

স্মরণযোগ্য যে, ১৯৭৩ সালের ১১ ডিসেম্বর চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে এক উপজাতীয় প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করে, “পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগণের জাতীয় বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ইত্যাদি সংরক্ষণের জন্য এই জেলার বিশেষ প্রশাসনিক মর্যাদা প্রদানের দাবী জানান।” এই প্রতিনিধি দলে সংসদ সদস্যা মিসেস সুদীপ্তা দেওয়ানও ছিলেন।  এই দাবীর প্রেক্ষিতে, “প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধিদলকে আশ্বাস দেন যে, নির্বাহী আদেশ বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি পার্বত্য চট্টগ্রামে বলবৎ করা হবে এবং বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে।”  (চাকমা, ১৯৯১, পৃ-৫২-৫৩)।

১৯৭৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে বঙ্গবন্ধু ২য় বার রাঙামাটি গিয়েছিলেন। সেখানে স্থানীয় এমপি, সার্কেল চীফ, হেডম্যান, কারবারী, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং অগনিত জনসাধারণের সামনে ঘোষণা করেছিলেন, “জাতীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার অবশ্যই রক্ষা করা হবে।” তিনি আরো বলেছিলেন যে, “অনগ্রসর সম্প্রদায় এবং এলাকার উন্নয়নের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ” (Tripura, 2017, p. 5)।

বক্তব্যে তিনি আরো জানিয়েছিলেন,

“পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনি একটি সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, সেজন্য তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামকে ৩ (তিন) জেলায় ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি পুলিশ বাহিনীতে ৩ শত এবং রক্ষী বাহিনীতে ২শত জন উপজাতিকে নিয়োগ দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। এখন হতে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও অধিকতর সুবিধা দানের সংশ্লিস্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। (চাকমা, ২০১১, পৃ-১২)।

বিষ্মিত হতে হয় এই ভেবে যে, বঙ্গবন্ধু উপজাতিদের অধিকার  ও স্বার্থ রক্ষা এবং উন্নয়নের জন্যে বাংলাদেশে ফেরার পর হতেই একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।  কোন এক অজ্ঞাত কারণে, তার ছিটেফোঁটাও উল্লেখ করা হতে বিরত থাকলেও বঙ্গবন্ধুর একটা কথার প্রায় খণ্ডিতাংশকে যুগের পর যুগ ধরে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।  এই অপপ্রচার এবং তার কথার অপব্যাখ্যার মূল উৎস খুঁজতে গেলে সামনে চলে আসে কিছু অদূরদর্শী এবং স্বার্থান্বেষী চাকমা নেতার নাম। যাদের সাথে পরবর্তীতে যোগ দিয়েছে বাঙালী সমাজের কিছু বিজ্ঞজন।

আবেগতাড়িত ভ্রান্তি (Emotional Mistake) অথবা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা (Political Wisdom) – যাই বলা হোক না কেন, বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় পাহাড়ের মানুষদের পরিচয় মুছে ফেলা কিংবা ধর্মান্তরিত করা, এমনকি জোর জবরদস্তি করে হলেও তাদেরকে ‘বাঙালী’  বানানোর ছিটেফোঁটা উদ্যোগও কখনো গ্রহণ করা হয়নি।

বরং বাস্তবে ঘটেছিল – এর উল্টোটা। পাহাড়ের অনগ্রসর এবং পিছিয়ে পরা মানুষদের স্বার্থ রক্ষা এবং অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্যে একাধিক বাস্তবমুখী পদক্ষপে গ্রহণ করা হয়েছিল। যে পাহাড়িদের দুরবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ১৯৭৩ সালের ২৩ জুন তারিখে এম এন লারমা জাতীয় সংসদে বলেছিল,

“আপনারা বিশ্বাস করতে পারবেন না যে, আমাদের ওখানে এখনও আদিম যুগের মানুষ রয়েছে। ……….. এরা অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় এখনও বাস করে। ………. ব্রিটিশের সময়ে এবং পাকিস্তানের আমলে আমাদেরকে চিড়িয়াখানার জীবের মতো করে রাখা হয়েছিল।” (রহমান, ২০১৮, পৃ-১৪২-১৪৩)।

সেই মানুষদের এক প্রতিনিধিদলকে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারিতে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, “উপজাতীয়দের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি পুরাপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হবে।” স্মরণযোগ্য, এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পাকিস্তানে বন্দীদশা কাটিয়ে দেশে ফেরার মাত্র ১৮ দিনের মাথায়।

১৯৭৩ সালের ৭ জুনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “উপজাতীয় এলাকার জনগণের জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করা হবে। … … উপজাতীয় জনগণ ও স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক এবং অন্যান্য নাগরিকদের মতই সমান সুযোগ ও সুবিধা ভোগ করবে।” ১৯৭৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে ঘোষণা করেছিলেন, “জাতীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার অবশ্যই রক্ষা করা হবে। …….. অনগ্রসর সম্প্রদায় এবং এলাকার উন্নয়নের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

প্রাসঙ্গিক কারণেই বলতে হয়, বঙ্গবন্ধুর উপজাতীয়দের জন্য  আরো যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ

  • ১। চাকমা রাজপরিবারের আর্থিক সংকট চলছিল বলে, বঙ্গবন্ধু নিজেই ত্রিদিব রায়ের ছোট ভাই সমিত রায়কে রাঙামাটি সরকারী কলেজে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের আদেশ দিয়েছিলেন।
  • ২। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্রছাত্রীদের জন্যে বিশেষ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
  • ৩। বিদেশে উপজাতি শিক্ষার্থী পাঠানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যার ফলে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশে ডাক্তারি এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে কিছু চাকমা শিক্ষার্থী প্রেরণ করা হয়।
  • ৪।  রাঙ্গামাটির ঐ জনসমাবেশেই উপজাতি শিক্ষার্থীদের জন্যে বঙ্গবন্ধু বৃত্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।  এছাড়াও  স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আনারস বাজারজাতকরণের জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।
  • ৫। বাকশাল গঠনের পরে উপজাতিদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করানো হয়। যেমন, জেলা গভর্নর পদে  খাগড়াছড়িতে মং চীফ এবং বান্দরবানে বোমাং চিফকে নিয়োগ করা হয়। এর পাশাপাশি বাকশালের জেলা সেক্রেটারি হিসেবে খাগড়াছড়িতে অনন্ত বিহারী খীসা, বান্দরবান জেলায় কে এস প্রু এবং রাঙামাটি জেলায় চারু বিকাশ চাকমাকে নিয়োগ দেয়া হয়। (চাকমা, ২০১১)।
  • ৬। ১৯৭৩-৭৪ সালে বিভিন্ন সময়ে কিছু অর্থনৈতিক – প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।  যেমন, “সরকারী জুম কর মওকুফ ( ৬ টাকার মধ্যে ১.২৫ টাকা), শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংরক্ষণ, বেতারে ‘উপজাতি’ অনুষ্ঠান প্রচার, বাংলা একাডেমি কর্তৃক উপজাতীয় গল্প, কবিতা, ছড়া, লোকগাথা ও রুপকাহিনী প্রকাশ ইত্যাদি।” (রহমান, ২০১৮, পৃ-১৭৩)।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বঙ্গবন্ধুর আমলেই ১৯৭২ সালে আই এল ও কনভেশন-১০৭ বাংলাদেশ কর্তৃক গ্রহীত হয়।  যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, সামাজিক ইত্যাদি সকল অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকার করার পাশাপাশি নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর মনোভাব কেমন ছিল, সেটার উল্লেখ পাওয়া যায় শরদিন্দু শেখর চাকমা রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও পার্বত্য চট্টগ্রাম’ এবং ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম সেকাল একাল’ বইয়ে।  লেখক জানিয়েছেন যে, রাঙ্গামাটির তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ, এম, আব্দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের উপ-সচিব থাকাকালে বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, উপজাতিরা সহজ সরল মানুষ এবং পাকিস্তান আমলে তারা নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়েছিল।   এছাড়া, “ কেবল রাজা ত্রিদিব রায় এবং অং শুয়ে প্রু চৌধুরীর কারণে সকল চাকমা এবং অন্যান্য উপজাতিদের বাংলাদেশ বিরোধী বলে বিশ্বাস করা বা মনে করা তো ঠিক নহে।”(চাকমা, ২০১১)।

শুধু তাই নয়, জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের এবং কর্ণফুলী বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কর্মকর্তা এ, কে, এম, ফজলুল হক মিয়া দু’জনে মিলে বঙ্গবন্ধুকে আরো বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্য জেলা থেকে বাঙালী পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত জমি নেই। যার ফলে, বঙ্গবন্ধু রাঙ্গামাটির পূর্বতন জেলা প্রশাসক “ জিন্নাত আলীর পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী পুনর্বাসনের প্রস্তাব নাকচ করে দেন।” (চাকমা, ২০১১, পৃ-১১)।

২৭ জুন ২০০৮ তারিখের সাপ্তাহিক ২০০০ এর সুত্রোল্লেখ করে, শরদিন্দু শেখর চাকমা জানান যে , ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বাকশালে যোগদানের সময় বঙ্গবন্ধু নিজেই জন সংহতি সমিতির নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাকে বলেছিলেন,

“তাঁর কিছু লোক চাকমাদের সম্পর্কে তাকে ভুল তথ্য দিয়েছিল, সেটা তিনি পরে বুঝতে পেরেছেন, তিনি এখন চাকমাদের জন্য কিছু করতে চান।” (চাকমা, ২০১১, পৃ-১১)।

বস্তুত, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সত্য চোখে পরে যে, বঙ্গবন্ধু কখনই উপজাতিদের প্রতি বিদ্বেষমূলক কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি ।  এমনকি পুরো দেশ যখন স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রতি নির্দয় ছিল, স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরের সেই দিনগুলোতেও তিনি অন্যদের মত প্রতিশোধপরায়ণ হন নি।

বরং উপজাতিদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রতি দিয়েছিলেন।  পরবর্তীকালে তিনি তাদের সকল স্বার্থ ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্যে বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।  যা থেকেই সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, বঙ্গবন্ধু পাহাড়ের উপজাতিদের প্রতি মুলত সহানুভূতিশীল ছিলেন, বিদ্বেষী ছিলেন না।

তাই, নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের স্বার্থহানিকর কোন কিছু বোঝাতে চাননি, বরং তাদেরকে দেশের মূল জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।  তাঁর লক্ষ্য ছিল জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে  বাংলাদেশের  আপামর জনসাধারণের জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি।  যেখানে বৃহত্তর বাঙালী জাতীয়বাদের মধ্যেই দেশের সকল  সংখ্যালঘুর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্ম, কৃষ্টি ইত্যাদির রক্ষাকবচের মাধ্যমে নিজস্ব অস্তিত্ব বিকাশের সুযোগ থাকবে।

অপরদিকে কিছু স্বার্থান্বেষী চাকমা নেতা মহান নেতার এই আহবানের ভুল ব্যাখ্যায় নিরীহ-সাধারন পাহাড়িদের প্রতারিত করেছিলেন। যেখানে কিছু স্বার্থান্বেষী নেতার চোখের সামনে হাজির ভোটের রাজনীতিতে জয়ী হওয়ার অভিপ্রায়ের কাছে দৃষ্টির আড়ালে রয়ে যাওয়া পার্বত্য অঞ্চলের আপামর জনসাধারণের স্বার্থ এবং ভাগ্যোন্নয়নের চাবিকাঠি চাপা পরে গিয়েছিল। সহজ সরল পাহাড়িদেরকে যার জের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বংশানুক্রমিকভাবে – কোন কারণ না জেনেই, না বুঝেই। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে সত্য জানার ন্যুনতম সুযোগ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে –  ঘৃণা, বিদ্বেষ আর অপপ্রচারের ডামাডোলে।

  • তথ্যসুত্রঃ
    ১। মেজর জেনারেল ইব্রাহিম, বীর প্রতীক (অব.) (২০১৮). পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন (৪র্থ মুদ্রণ), ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স।
  • ২। প্রদীপ্ত খীসা, (১৯৯৬). পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যা. ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ।
  • ৩। শরদিন্দু শেখর চাকমা, (২০১১). বংগবন্ধু ও পার্বত্য চট্টগ্রাম. ঢাকা: বিভাস।
  • ৪। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, (১৯৯১). ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ. রাঙামাটি: স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।
  • ৫। জিবলু রহমান, (২০১৮). পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও সমাধান (১৯৭২-১৯৯৮). সিলেট: শ্রীহট্ট প্রকাশ।
  • ৬। সুনীতি বিকাশ চাকমা, ‘উপজাতীয় নেতৃত্বঃ সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিকথা’, প্রকাশের সময় অজ্ঞাত।
  • ৭। ডাঃ হারুন-অর-রশিদ, ‘জাতীয় সংহতির প্রেক্ষিতেঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপ’ (১ম পর্ব), দৈনিক জনকণ্ঠ, জুলাই ১৭, ১৯৯৮, ঢাকা।
  • ৮। স্টাফ রিপোর্টার, পত্রিকায় ‘উপজাতীয় এলাকার জনগণের জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করা হবেঃ বঙ্গবন্ধু, দৈনিক পূর্বদেশ, ৭ জুন ১৯৭৩,  ঢাকা।
  • ৯। Bhaumik, Subir. (1996). Insurgent Crossfire North-East India. New Delhi: Lancer Publishers.
  • ১০। Tripura, Naba Bikram Kishore (Ed.). (2017). Chittagong Hill Tracts: Journey towards Peace and Prosperity. Dhaka: Ministry of Chittagong Hill Tracts Affairs.

মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

তোরা বাঙালি হইয়া যা- সত্য মিথ্যা মিথ: ইতিহাস বিচার

(গতকাল প্রকাশিতের পর)

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আফতাব আহমাদের (১৯৯৩) গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এমএন লারমা সংবিধান প্রণয়নের কাজে নিয়োজিত সকলকে  কনভিন্স করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্যে স্বায়ত্ত্বশাসন এবং পৃথক আইন পরিষদ অপরিহার্য। এমনকি, পাহাড়িদের জন্যে আলাদা পরিচিতি, তাদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্যে স্বায়ত্ত্বশাসন এবং আলাদা আইন পরিষদের দাবী নিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এমএন লারমা একাধিকবার খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে দাবী আদায়ের প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। এমনি এক সাক্ষাৎকালে, তাদের দু’জনের মধ্যে সৃষ্ট বাদানুবাদের এক পর্যায়ে শেখ মুজিব হুমকি দিয়েছিলেন যে, দশ লাখ বাঙালি পাঠিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভাসিয়ে ফেলবেন। (In one of these discussions, he had an altercation with Mujib who threatened to swamp the CHT with the influx of one million Bangalees). (আহমাদ, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা-৪২)। তবে, বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান সম্পর্কে লেখক কিছু উল্লেখ করেন নি।

প্রদীপ্ত খিসা (১৯৯৬), ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা’ বইয়ে ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি এবং ১৫ ফেব্রুয়ারির প্রতিনিধি দলের দাবীর বিষয়াদি বিবৃত করেছেন। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক ‘লাল পতাকা’র কাছে দেয়া এমএন লারমা’র সাক্ষাৎকার এবং ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে রাঙামাটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের বিষয়াদি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, খসড়া সংবিধানের উপর আলোচনাকালে এমএন লারমা ১৯৭২ সালে বলেন,

“এ সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের কথা নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিগণ বৃটিশ ও পাকিস্তানী আমল হতে নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে। আমি দুঃখের সাথে বলছি যে, আমাদের জাতিসত্তার কথা ভুলে যাওয়া হচ্ছে, অথচ আমরা বাংলাদেশের মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে বসবাস করতে চাই। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নে জাতিসত্তার স্বীকৃতি রয়েছে। আমি সংবিধানে উপজাতীয় জনগণের অধিকার স্বীকার করে নেয়ার আহবান জানাচ্ছি”। (খীসা, ১৯৯৬, পৃ-৪৯)। তিনিও  বঙ্গবন্ধুর বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান কিংবা পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেন নি।

সালাম আজাদ (২০১৩) তাঁর ‘শান্তিবাহিনী ও শান্তিচুক্তি’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন,

“দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন এবং পাহাড়িদের অসন্তোষ উত্থাপন করে তা সমাধানের দাবী জানান। বঙ্গবন্ধু মানবেন্দ্র  লারমাকে বাঙালি হয়ে যাবার কথা বলেন।” (আজাদ, ২০১৩, পৃ-১২)।

প্রায় অনুরূপ মতামত ফুটে উঠেছে, এস মাহমুদ আলী (১৯৯৩) এবং সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিমের (২০১৮) কন্ঠেও। উভয়েই মোটামুটি কাছাকাছি ধরণের মতামত ব্যক্ত করে জানান যে, এম এন লারমার নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্লুয়ারি এক প্রতিনিধিদল স্বায়ত্তশাসন, ১৯০০ সালের ম্যানুয়াল পুনর্বহালসহ ৪ দফা দাবী পেশ করে। বঙ্গবন্ধু এই দাবিগুলোকে বিচ্ছিন্নতাবাদী দাবী বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং প্রতিনিধিদলকে বাঙালি হওয়ার উপদেশ প্রদান করেন। তবে এই তিনজনের কেউই  পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসন সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধুর হুমকির ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেন নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট সংক্ষিপ্তভাবে তুলে এনে কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ (২০১৪) তাঁর ‘পার্বত্য চট্টগ্রামঃ সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা’ বইয়ে ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি, ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২৪ এপ্রিলের প্রতিনিধিদলের দাবি পেশ করার ঘটনাবলী  উল্লেখ করেছেন। মানবেন্দ্র লারমা’র দাবীর প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন,

“মুজিব এর একটিও মানেননি; শোনা যায় তিনি মানবেন্দ্র লারমাকে বলেন যে, ‘যা বাঙালি হইয়া যা’।“ (আজাদ, ২০১৪, পৃ-১৮)। তবে পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি।

সুবীর ভৌমিক (১৯৮৬) রচিত ‘ Insurgent Crossfire: North-East India’ বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে । তার দাবি মতে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সতের সদস্যের এক প্রতিনিধিদল মং রাজা মং প্রু সাইন এবং এম এন লারমা’র নেতৃত্বে শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে চার দফা  দাবী সম্বলিত এক স্মারকলিপি পেশ করেন। ঐ স্মারকলিপির একজন স্বাক্ষরদাতা হিসেবে উপেন্দ্রলাল চাকমার নামোল্লেখ করে, তাঁর সাথে এক সাক্ষাৎকারের সূত্রে লেখক জানিয়েছেন যে, উপজাতিদের দাবি-দাওয়ার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর স্বীকার করে নেন যে, পার্বত্যাঞ্চল পিছিয়ে রয়েছে, তাই বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার পর্যায়ে আনতে উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তবে তিনি স্বায়ত্বশাসনের এবং পৃথক জাতিসত্ত্বার দাবী মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন,

“ তোমাদের এটা অস্বীকার করার কোন কারণ নেই যে,বাংলাদেশের সকল মানুষ বাঙালি। সুতরাং স্বশাসনের কথা ভুলে বাড়ি ফিরে যাও, আর বাঙালি হয়ে যাও।“ (All people of Bangaldesh are Bengalis, you have no reason to deny this reality. So forget about self-governance, go home and become Bengalis. ) (ভৌমিক, ১৯৯৬, পৃষ্ঠা- ২৫৬)।

তবে, তাঁর বইয়েও পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের কোন উল্লেখ নেই। স্মরণযোগ্য, অন্যান্য লেখকদের মতে, প্রতিনিধি দলে ৭ জন ছিলেন, তন্মধ্যে উপেন্দ্রলাল চাকমার নাম ছিল না।

জামাল উদ্দিন (২০১৬) এর ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইয়ে এম এন লারমা  কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ মর্যাদা, নিজস্ব আইন পরিষদ এবং পার্বত্য অঞ্চলের জন্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবীর প্রেক্ষিতে আইন প্রণেতাদের পক্ষে এমন দাবী মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না বলে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে। সেই সাথে উপজাতিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর সহানুভুতির প্রসঙ্গ ও উঠে এসেছে। তবে, বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান কিংবা পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোন কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

উপরোল্লিখিত বইসমূহ বা গবেষক/লেখকগণই এ সংক্রান্ত সমস্ত সূত্রের একমাত্র এবং চুড়ান্ত উৎস হতে পারে না। এর বাইরেও আরো অনেক বই বা গবেষক/লেখক অবশ্যই আছেন। তবে, যে কয়েকজনের প্রকাশনা পর্যালোচনা করা হয়েছে, তাতে কয়েকটি  তথ্যের পার্থক্য লক্ষ্যণীয়।

যেমনঃ

প্রথমত, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ তারিখে বঙ্গবন্ধু অফিসে ছিলেন না।  উক্ত তারিখের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা নিজেই তা উল্লেখ করেছেন। তিনি দাবী করেছেন যে,

“ নির্ধারিত সময়ে তিনি (বঙ্গবন্ধু) জরুরী কাজে বাইরে থাকায়, প্রতিনিধি দল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেনি।“ (চাকমা, ১৯৯১, পৃ-৫০)।

সুতরাং, যেসব লেখক/গবেষক দাবী করেছেন যে, উক্ত তারিখে পেশকৃত দাবীর প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু এমএন লারমাকে পাহাড়িদেরকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন অথবা পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের হুমকি দিয়েছিলেন– তাদের দাবী কতটা নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, সেটা পাঠকগণের বিবেচ্য। স্মরণীয় যে, আমেনা মহসিন (১৯৯৭), সালাম আজাদ (২০১৩), মাহমুদ আলী (১৯৯৩), সুবীর ভৌমিক (১৯৮৬) এবং এস পি তালিকদার (১৯৯৪) প্রমুখের ভাষ্যে বঙ্গবন্ধুর এমন প্রতিক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তথ্যসূত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে।

গোলাম মোর্তোজা (২০০০) সন্তু লারমা’র সাথে এক সাক্ষাৎকারের সূত্রোল্লেখ করে  পাহাড়িদেরকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবানের পাশাপাশি বাঙালি পুনর্বাসনের হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন।

আমেনা মহসিন (১৯৯৭) সিএইচটি কমিশনের সূত্রে বাঙালি হয়ে যাওয়া এবং বাঙালি পুনর্বাসনের হুমকির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রতিনিধিদলের সাক্ষাতের তারিখ বিবেচনা করলে, তার সূত্রের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটা স্বাভাবিক। কারণ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ তারিখে পাহাড়ি প্রতিনিধিদলের সাথে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ ঘটেনি। একই কারণে সিএইচটি কমিশনের দাবীর যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে।

আফতাব আহমাদ (১৯৯৩) বাঙালি পুনর্বাসনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর এহেন দাবীর সূত্র হিসেবে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মালেকের সাথে ১১-১৩ মার্চ ১৯৮৯-এর সাক্ষাৎকার এবং ১২ এপ্রিল ১৯৮৭ সালের The Sunday Statesman পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখার নামোল্লেখ করেছেন। অপরদিকে সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম (২০১৮)  সিদ্ধার্থ শেখর চাকমার সূত্রে বাঙালি পুনর্বাসনের কথা জানিয়েছেন।

সুবীর ভৌমিক (১৯৮৬) উপেন্দ্রলাল চাকমার সাথে সাক্ষাৎকারের সূত্র উল্লেখ করে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে সতের সদস্যের এক প্রতিনিধিদলের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের কথা জানিয়েছেন। এখানে একাধিক বিভ্রান্তি রয়েছে। যেমন, প্রতিনিধি দলে সাতজন সদস্যের কথা স্বয়ং জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা বলেছেন। আর, ১৫ ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। তাই, উপেন্দ্রলাল চাকমার সূত্র কতটা নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, সেটা বিবেচনার ভার পাঠকগণের হাতে ছেড়ে দেয়া হল।

তৃতীয়ত, ঐতিহাসিক তথ্য উদঘাটনে প্রাথমিক সূত্রের মুল্য অপরিসীম। ইতোমধ্যেই  প্রখ্যাত ও স্বনামধন্য  কিছু লেখক/গবেষকের লেখায় তথ্য বিভ্রাটের উদাহরণ উপরের অনুচ্ছেদে বিবেচনা করা হয়েছে। সুতরাং যাদের মতামত বা দাবীর সপক্ষে কোন সূত্রোল্লেখ করা হয়নি, তাদের বক্তব্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ণয়ের ভার পুরোপুরি পাঠকের। উল্লেখ্য যে, সালাম আজাদ (২০১৩), হুমায়ুন আজাদ (২০১৪), এবং জিবলু রহমান (২০১৮) বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবানের কথা জানালেও কোন সূত্র উল্লেখ করেননি।

শরদিন্দু শেখর চাকমা (২০১১), জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা (১৯৯১) এবং প্রদীপ্ত খিসা (১৯৯৬)  বঙ্গবন্ধুর বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান কিংবা পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসন সংক্রান্ত কোন মতামত বা তথ্য উল্লেখ করেননি।

না বললেই নয় যে, ঘটনার সময় এবং সূত্রের গ্রহণযোগ্যতা বিচারে গোলাম মোর্তোজা’র বক্তব্য অন্য সকলের তুলনায় বেশী গ্রহণযোগ্যতার দাবীদার (মোর্তোজা, ২০০০, পৃ-২০ )। সেটা বিবেচনায়, ব্যাপারটা কি এমন দাঁড়াচ্ছে যে, শুধুমাত্র সন্তু লারমার সাথে গোলাম মোর্তোজা’র এক সাক্ষাৎকারের সূত্রেই দাবী করা হচ্ছে যে, বঙ্গবন্ধু মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাকে বলেছিলেন,

“তোরা বাঙালি হইয়া যা” ? যদিও সন্তু লারমা ঐ প্রতিনিধি দলে ছিলেন না। যেমনটা ছিলেন জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা। অর্থাৎ সন্তু লারমাকেও শোনা কথার উপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কোথায় বা কার কাছ থেকে এ কথা শুনেছেন তার উল্লেখ এ বইয়ে নেই বা তিনি বলেননি।

বেশীরভাগ লেখকই বঙ্গবন্ধুর এমন আহবানের ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, পরিস্থিতি এবং ঘটনার কোন বিবরণ দেননি। শুধুমাত্র, দুই জনের লেখায় ঘটনার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়- তখন পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন ছিল। এই দু’জন হলেন গোলাম মোর্তোজা এবং আফতাব আহমাদ।

গোলাম মোর্তোজা জানিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধু “তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ধমক দিয়ে” বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিলেন। কাহিনী এখানেই শেষ হয়ে যায় না, যখন লেখক আরো জানিয়েছেন,  “এই কথা বলতে বলতে বঙ্গবন্ধু উত্তেজিত হয়ে ওঠেন।” (মোর্তোজা, ২০০০, পৃ. ২০)। আর, এই উত্তেজিত অবস্থায়ই তিনি পাহাড়ে দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

আফতাব আহমাদ জানিয়েছেন যে, ১৯৭২ সালে এম এন লারমা শেখ মুজিবের সাথে একাধিক দফা আলোচনায় বসেছিলেন তাঁর দাবীসমূহ নিয়ে। তন্মধ্যে এক আলোচনায় তাদের মধ্যে বাদানুবাদ হয়েছিল, যেখানে শেখ মুজিব পাহাড়ে দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। (আহমাদ, ১৯৯৩, পৃ-৪২)।

পরবর্তীতে, বঙ্গবন্ধুর গৃহীত একাধিক পদক্ষেপে  এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি কখনো উপজাতিদের জাতিসত্ত্বা  পরিবর্তনের চেষ্টা করেননি। উল্টো, তিনি উপজাতিদের জাতিসত্ত্বা, স্বার্থ এবং অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। এছাড়াও, তাঁর জীবদ্দশায় কোন বাঙালিকে পাহাড়ে পুনর্বাসনের জন্যে প্রেরণ করা হয়নি। বরং উপজাতিদের ভূমির অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিসহ  ভাগ্যোন্নয়নের জন্যে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি,

‍‍‍”বঙ্গবন্ধু লারমাকে বলেছিলেন তাঁর কিছু লোক চাকমাদের সম্পর্কে তাকে ভুল তথ্য দিয়েছিল, সেটা তিনি পরে বুঝতে পেরেছেন, এখন তিনি চাকমাদের জন্যে কিছু করতে চান।”। (চাকমা, ২০১১, পৃ-১১)।

উপরোক্ত আলোচনায় দেখা যায় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‌’তোরা সব বাঙালী হয়ে যা’ এমন কোনো কথা বলেছেন তার নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী অনুপ্রবেশের হুমকি দিয়েছিলেন এমন কোনো কথারও তথ্য প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য ভিত্তি পাওয়া যায় না। কাজেই বঙ্গবন্ধু নামে উপরোক্ত দোষারোপ সত্য, মিথ্য নাকি মিথ তা- পাঠকগণ ও ভবিষ্যত গবেষকদের বিবেচনার উপর ছেড়ে দেয়া হলো।

(সমাপ্ত)

তথ্যসুত্রঃ

  • ১। জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, (১৯৯৩).ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ. রাঙামাটি: স্থানীয় সরকার পরিষদ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।
  • ২। শরদিন্দু শেখর চাকমা, (২০০৬). মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্রগ্রাম. ঢাকা: অঙ্কুর প্রকাশনী।
  • ৩। শরদিন্দু শেখর চাকমা, (২০১১). বঙ্গবন্ধু ও পার্বত্য চট্রগ্রাম. ঢাকা: বিভাস।
  • ৪। উৎপল খীসা, (১৯৯৬).ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ স্বপ্নের অপমৃত্যু. ঢাকা: শ্রাবণ প্রকাশনী।
  • ৫। সালাম আজাদ, (২০১৩), শান্তিবাহিনী ও শান্তিচুক্তি. ঢাকা: আফসার ব্রাদার্স।
  • ৬। হুমায়ূন আজাদ, (২০১৪).পার্বত্য চট্টগ্রামঃ সবুজ পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হিংসার ঝরনাধারা (৪র্থ সংস্করণ.). ঢাকা: আগামী প্রকাশনী।
  • ৭। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, বীর প্রতীক, (২০১৮).পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ- পরিস্থিতির মূল্যায়ন (৪র্থ সংস্করণ.). ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স।
  • ৮। মেজর জেনারেল (অব.) এস এস উবান, (২০০৫). ফ্যান্টমস অব চিটাগাং- দি ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ. (হোসাইন রিদওয়ান আলী খান অনুদিত), ঢাকা: ঘাস ফুল নদী প্রকাশনী।
  • ৯। জামাল উদ্দিন, (২০১৬). পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস. ঢাকা: বলাকা প্রকাশন।
  • ১০। গোলাম মোর্তোজা, (২০০০).শান্তি বাহিনী গেরিলা জীবন. ঢাকা: সময় প্রকাশন।
  • ১১। জিবলু রহমান, (২০১৮).পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও সমাধান (১৯৭২-১৯৯৮). সিলেট: শ্রীহট্ট প্রকাশ।
  • ১২। Aftab Ahmed, (1993, November). Ethnicity and Insurgency in the Chittagong Hill Tracts Region: A Study of the Crisis of Political Integration in Bangladesh. Journal of Commonwealth & Comparative Politics, 31(3), 32-66.
  • ১৩। Amena Mohsin, (2002). The Politics of Nationalism: The Case of the Chittagong Hill Tracts Bangladesh (2nd ed.). Dhaka: The University Press Limited.
  • ১৪। Subir Bhaumik, (1996).Insurgent Crossfire North-East India. New Delhi: Lancer Publishers.
  • ১৫। S Mahmud Ali, (1993), The Fearful State: Power, People and Internal War in South Asia, New Jersey, Zed Books.
  • ১৬। Willem Van Schendel, (October 2015), A War Within a War: Mizo rebels and the Bangladesh liberation struggle. Modern Asian Studies, pp.1-43.

মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

‘তোরা বাঙালি হইয়া যা’- সত্য মিথ্যা মিথ: ইতিহাস বিচার

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ও সঙ্কটের কারণ ও সূত্রপাত সম্পর্কে অনেক ইতিহাস গবেষক ও বিজ্ঞ  লেখককে তোরা সব বাঙালি হইয়া যা- এই বাক্য বা বাকাংশের প্রতি ইঙ্গিত করেন। “তোরা সব বাঙালি হইয়া যা” – এই আহ্বানের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জ্ঞাত বাংলাদেশীর আনুমানিক সংখ্যা কী পরিমাণ কিংবা বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর কী পরিমাণ মানুষ এই শব্দগুচ্ছের সাথে পরিচিত– সেটা জানার উপায় নেই।  তবে অনেকেই ধারণা করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ  অংশের  আবেগের সাথে এই আহবান ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলীর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন অন্যতম। দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে পাহাড়ি আর বাঙালি মিলিয়ে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা অদ্যবধি নিরূপণ করা যায়নি। ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি পরবর্তী সময়ে সরকারের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গৃহীত বহুবিধ রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের পরেও  অদ্যবধি পার্বত্যাঞ্চলে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।

এমনকি যে জাতিগত অধিকার আর স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দোহাই দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল এই অঞ্চলের কিছু মানুষ,  সংবিধান সংশোধন করে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদের প্রবর্তনের মাধ্যমে তাদের জাতিসত্ত্বা রক্ষার সাংবিধানিক রক্ষাকবচ দেয়া সত্ত্বেও তারা সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে সরে আসেনি। এতে বোঝা যায়, শুধু জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি নয়, তাদের দাবী ছিলো আরো বেশী কিছু।  তাই আজ সেখানে তথাকথিত ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’ আর ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’ এর আওয়াজ শোনা যায়।  সঙ্গত কারণেই কৌতুহল জাগে যে,  বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর এহেন আহবানের ভূমিকা আদতে কতটুকু ছিল?

যে মানুষটি সারা জীবন বাঙালি জাতির কল্যাণ ও অধিকার নিয়ে ভেবেছেন, দেশের সকল মানুষের মৌলিক অধিকার পুরণের মাধ্যমে উন্নত জীবন নিশ্চিত করার চিন্তা যার মনে প্রতিনিয়ত ছিল, মানুষের দুঃখে যার মন কাঁদত, বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি ১৩ বছর জেল খেঁটেছেন, যার বিশাল হৃদয়ের ঔদার্য নিয়ে তার নিন্দুকেরা পর্যন্ত কখনো কিছু বলতে পারেনি– জাতির সেই মহান জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখে উচ্চারিত এহেন শব্দগুচ্ছের ইপ্সিত বার্তা ও প্রেক্ষাপট এবং বাস্তবতা অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।  প্রাসঙ্গিকভাবেই বঙ্গবন্ধুর এহেন উচ্চারণে প্রকাশিত অসহিষ্ণুতার  বিপরীতে উপজাতিদের অধিকার নিশ্চিত করা ও স্বার্থ রক্ষায় তিনি কতটা আন্তরিক ছিলেন তা খুঁজে বের করা তাই অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন উপজাতিদের একটা বড় অংশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলেও পক্ষাবলম্বনকারীদের সিংহভাগই পাকিস্তানীদের সমর্থনে উপজাতীয় রাজাকার, মুজাহিদ বাহিনী ও সিভিল আর্মড ফোর্সে যোগদান করেছিল।  বিশেষ করে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং চাকমা সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা  ছিল উল্লেখযোগ্য।  ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সাধারণভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী  মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়।  যার পরিণতিতে, যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে উপজাতিরা কোন কোন ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের বিদ্বেষ এমনকি সহিংসতার শিকার হতে বাধ্য হয়।

বাঙালীদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির খবরাখবর জানা থাকলেও ২৫শে মার্চের বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করার উপায় বঙ্গবন্ধুর ছিল না।  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয়মাস পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী  থাকাকালীন স্বাভাবিকভাবেই বাংলদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী তাঁর জানার সুযোগ ছিল না।  স্বাধীনতার পরে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।

দেশে ফিরে প্রত্যক্ষ করেছিলেন বাংলাদেশের চারদিকে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা, শুনেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ আত্নত্যাগ, ৩০ লাখ শহীদের হত্যাযজ্ঞ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীর করুণ কাহিনী। ধ্বংস, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণের করুণ কাহিনীর পাশাপাশি জেনেছিলেন স্বাধীনতা বিরোধিদের কথা।  সঙ্গত কারণেই রাজাকার, আল বদর, আল শামস, জামায়াতে ইসলামী আর শান্তি বাহিনীর স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি উঠে এসেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা রাজা, বোমাং রাজা আর চাকমা সম্প্রদায়ের স্বাধীনতা বিরোধী নৃশংসতার বিবরণ আর বিশ্বাসঘাতকতার সমস্ত কাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তার বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা অব্যাহত রাখে। উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ত্রিদিব রায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী চারু বিকাশ চাকমাকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। (চাকমা শ. শ., ২০০৬) (।  মুলত ত্রিদিব রায়ের বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্বাচরণ তখন থেকেই শুরু। এরপরে, তার প্ররোচণায় চাকমা সমাজের একাংশের বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকার কারণে সমগ্র চাকমা জাতি বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কাছে জাতীয় আনুগত্যের প্রশ্নে সংশয়াবদ্ধ হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনী আত্নসমর্পণ করলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে তখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং কিছু পাকিস্তানী সেনা, পূর্ব পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স (EPCAF) এবং রাজাকার বাহিনী পালিয়ে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিল।  এমনকি ভারতের মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীরাও স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে থাকে। ( (ভৌমিক, ১৯৯৬), (আহমাদ, ১৯৯৩)। যার প্রতিফলন পাওয়া যায় মেজর জেনারেল উবান (২০০৫) এর কথায়,

“আমার সৈন্যরা তখনও গোলাগুলির সম্মুখীন হচ্ছিল।  মিযো, রাযাকার এবং চাকমাসহ অনেক প্যারা মিলিটারি বাহিনীর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কিন্তু সশস্ত্র লোক পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো গেরিলা যুদ্ধের আদর্শ ভুমিতে বিচরণ করছিল।” (উবান, ২০০৫, পৃ. ১১৭)।

লেখক জামাল উদ্দিনের গবেষণা গ্রন্থ ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইয়ে তিনি জানান,

“ঢাকা স্বাধীন হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর। অথচ ২২ ডিসেম্বরেও পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধ হয়েছে।” (উদ্দিন, ২০১৬, পৃ. ৩৮১)

এহেন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত  বাংলাদেশ বিরোধী সকল উপাদানকে শক্ত হাতে দমন করার জন্যে নির্দেশ দেয়া হয়- যা বাস্তবায়নে বিমান বাহিনীর সহায়তায় বোম্বিং পর্যন্ত করা হয়েছিল।  জানুয়ারি ১৯৭২ এর প্রায় শেষের দিকে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় (আহমাদ, ১৯৯৩)।  যদিও ১৯৭২ সালের মার্চে বান্দরবানের রুমা’তে মিজো বিদ্রোহীরা এক পুলিশ স্টেশন আক্রমণ করে ১১ জনকে হত্যা করে এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়। (Schendel, ২০১৫)।   ইত্যবৎসরে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের নির্মূলের অভিযান  চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পার্বত্য চট্রগ্রামের বেশ কিছু স্থানে নিরীহ উপজাতির লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঠিক এই সময়কালে, ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা চারু বিকাশ চাকমার নেতৃত্বে ৭ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল রাস্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এবং অন্যান্য উর্ধ্বতন আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।  বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎকালে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি জানাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ আর পাহাড়িদের ক্ষোভের কথা জানিয়ে তাদের রক্ষার জন্যে সাংবিধানিক রক্ষাকবচের অনুরোধ করেন। নিজ ঔদার্য আর মহানুভবতার গুণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই প্রতিনিধিদলকে তৎক্ষণাৎ আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে,

  • – পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের ঐতিহ্য ও কৃষ্টি পুরোপুরিভাবে সংরক্ষণ করা হবে।
  • – সরকারী চাকুরীতে উপজাতিয়দের ন্যায্য অংশ প্রদান করা হবে।
  • – তাদের ভূমির অধিকার আগের মতই ভোগ করতে থাকবে।  (চাকমা, ১৯৯৩)।

মৃত্যুকে তুচ্ছ করে, জীবন বাজী রেখে, ১৩ বছর জেল খেঁটে ত্রিশ লাখ বাঙালির প্রাণের বিনিময়ে, ২ লাখ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত স্বপ্নের, সাধের দেশে ফেরার মাত্র ১৮ দিনের মাথায়, এমন এক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিবৃন্দ এমন এক দাবী নিয়ে এসেছিলেন(যা মূলত সেই দেশের অখণ্ডতাকে, সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়) যাদের রাজা এবং অন্যান্য নেতাদের ভুমিকার কারণে পুরো জনগোষ্ঠীকে ইতোমধ্যেই সাধারণভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এমন এক সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ  উত্থাপন করা হয়েছে, যখন নব্য স্বাধীনতালব্ধ দেশের আভ্যন্তরীণ গোলযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রামে। সমগ্র বাংলাদেশ যখন নয় মাসের এক যুদ্ধের ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, দেশ যখন গোলযোগ আর স্থিতিশীলতার মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই প্রতিনিধিদল এসেছিল তাদের পৃথক জাতিসত্ত্বার রক্ষাকবচের দাবীতে, স্বায়ত্ত্বশাসনের নামে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকে কুঠারাঘাত করতে।

এর মাত্র দুই সপ্তাহ পরে, ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুআরিতে মং রাজা মং প্রু সাইনের নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিদল এক স্মারকলিপি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে যান।  এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন, এম এন লারমা, বিনীতা রায়, জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, কে কে রায়, মং প্রু চাই, মং শৈ প্রু এবং সুবিমল দেওয়ান। প্রতিনিধি দলের সদস্য জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা নিশ্চিত করেছেন যে, “নির্ধারিত সময়ে তিনি জরুরী কাজে  বাইরে থাকায়, প্রতিনিধিদল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেনি। ” (চাকমা জ. ব., ১৯৯১ পৃষ্ঠা ৫০)।  তাই, ‘বাংলাদেশের ভাবি সংবিধানে উপজাতীয়দের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণের জন্যে’ এই প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি পেশ করে, যে স্মারকলিপিতে উল্লিখিত চার দফা দাবী ছিল নিম্নরূপঃ

  • ১।  পার্বত্য অঞ্চল একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হবে এবং এর নিজস্ব আইন পরিষদ থাকবে।
  • ২।  উপজাতীয় জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য ‘১৯০০ সালের পার্বত্য চট্রগ্রাম শাসনবিধি’র ন্যায় অনুরূপ সংবিধি ব্যবস্থা (Sanctuary Provision) শাসনতন্ত্রে থাকবে।
  • ৩।  উপজাতীয় রাজাদের দফতর সংরক্ষণ করা হবে।
  • ৪।  পার্বত্য চট্রগ্রামের জনগণের মতামত যাচাই ব্যতিরেকে পার্বত্য চট্রগ্রামের বিষয় নিয়ে কোনো শাসনতান্ত্রিক সংশোধন বা পরিবর্তন যেন না হয়, এরূপ সংবিধি ব্যবস্থা শাসনতন্ত্রে থাকবে। (খীসা, ১৯৯৬)।

নব্য স্বাধীনতালব্ধ যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে কত ধরনের যে সমস্যা থাকতে পারে, তা জানতে আমাদের বেশী দূর যেতে হবে না। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের তৎকালীন সময়ের দিকে খেয়াল করলেই বরং বুঝতে সহজ হবে। এই রকম একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সমস্যা-সংকুল দেশের প্রেক্ষাপটে, বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রায় এক মাসের মধ্যেই কারা এমন দাবী করেছিল? যাদের রাষ্ট্রীয় আনুগত্য পাকিস্তান আমল থেকেই সন্দেহাতীত ছিলো না(ভারত ভাগে যারা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে তথা বাংলাদেশের সাথে অন্তর্ভূক্তি অস্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতে পতাকা উড়িয়েছিলেন) এবং যাদের একটা বড় অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করেছিল।

তাই স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই দেশের এক- দশমাংশ অংশের জন্যে  স্বায়ত্বশাসনের দাবী, স্বাভাবিকভাবেই অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।  বাংলাদেশের প্রতি এই জনগোষ্ঠীর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া তাই একেবারে অস্বাভাবিক নয়।  অথচ, বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে এই প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন তাদের ভুলের জন্যে ক্ষমা চাওয়া এবং  সবাই মিলে নতুন দেশ গড়ার কাজে তাঁর হাত শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিতে পারতেন।

সঙ্গত কারণেই তৎকালীন সময়ের ঘটনাবলী, এবং নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও ভুলের কারণে সৃষ্ট অবিশ্বস্ততার ধারণা এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীর প্রতি বাংলাদেশের মূল জনগোষ্ঠীর সন্দেহের প্রেক্ষাপটে একজন মন্তব্য করেছিলেন,

“ দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে শেখ মুজিব যদি আমাদের উপজাতীয় নেতাদের সেই সদস্যদের ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন তা অমান্য করার স্পর্ধা কারো ছিল না। ” ( উপজাতীয় নেতৃত্ব: সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিকথা, সুনীতি বিকাশ চাকমা)।

অথচ, বঙ্গবন্ধু নিজস্ব প্রজ্ঞা আর মহানুভবতা দিয়ে কালক্ষেপণ ব্যতিরেকেই তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।  শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে তিনি যথেষ্ট আন্তরিকও ছিলেন।

১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পক্ষে  “বাংলাদেশ খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির নিকট পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের শাসনতান্ত্রিক অধিকার  দাবীর আবেদনপত্র” শীর্ষক এক দাবিনামা পেশ করেন। এই আবেদন পত্রটি মুলত ইতিপূর্বে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে পেশকৃত দাবি-দাওয়ার আরো বিস্তারিত ভার্সন যেখানে উক্ত চার দফা দাবীর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা হয়।  লেখক জিবলু রহমানের (২০১৮) ভাষ্যমতে,

“বঙ্গবন্ধু এ দফাগুলো মানতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মানবেন্দ্র লারমাকে বলেন, ‘যা বাঙালি হইয়া যা’।  (রহমান, ২০১৮, পৃ. ১৯)। তবে লেখক বঙ্গবন্ধুর এই উক্তির সমর্থনে নির্দিষ্ট  কোন সুত্র উল্লেখ করেননি। এছাড়া বাঙালি পুনর্বাসনের ব্যাপারেও কিছু উল্লেখ করেননি।

গোলাম মোর্তোজা ‘ শান্তিবাহিনী গেরিলা জীবন’ (২০০০) বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ১৫ ফেব্রুয়ারির ১৯৭২ সালে মং রাজা মং প্রু সাইনের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, সেখানে এম এন লারমা, কে কে রায়, বিনীতা রায়, সুবিমল দেওয়ান ও জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা ছিলেন।

তিনি আরো দাবী করেছেন যে, “বঙ্গবন্ধু তাদের সাথে দেখা করেননি”। (মোর্তোজা, ২০০০, পৃ-১৯)।

২৪ এপ্রিল ১৯৭২ তারিখের মানবেন্দ্র লারমার দাবী প্রসঙ্গে, সন্তু লারমার সাথে সাক্ষাৎকারের সুত্রোল্লেখ করে তিনি জানিয়েছেন,

“কিন্তু এই দাবিগুলোকে বঙ্গবন্ধুও কোন পাত্তাই দিলেন না। তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘যা তোরা বাঙালি হইয়া যা’।

এই কথা বলতে বলতে বঙ্গবন্ধু উত্তেজিত হয়ে উঠেন। তুড়ি মারতে মারতে বঙ্গবন্ধু, এক লাখ, দু লাখ, ……. দশ লাখ পর্যন্ত গুণে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে বলেন,

“প্রয়োজনে দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব। তোরা সংখ্যায় পাঁচ লাখ। প্রয়োজনে এর দ্বিগুণ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব পার্বত্য চট্টগ্রামে। তখন কী করবি?”। (মোর্তোজা, ২০০০, পৃ. ২০)।

শরদিন্দু শেখর চাকমা (২০১১) রচিত, ‘বঙ্গবন্ধু ও পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত অনেক ঘটনা উল্লেখ থাকলেও বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান কিংবা পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা (১৯৯১) রচিত ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ’ বইটিকে তৎকালীন ঘটনাবলীর একটি নির্ভরযোগ্য সুত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়।  তিনি ২৯ জানুয়ারি ১৯৭২, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ এবং ২৪ এপ্রিল ১৯৭২ তারিখের প্রতিনিধিদলের  এবং তাদের পেশকৃত দাবি-দাওয়ার উল্লেখ করেছেন। শরদিন্দু শেখর চাকমার মত তিনিও  বঙ্গবন্ধুর বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবান কিংবা পাহাড়ে বাঙালি পুনর্বাসনের ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমেনা মহসিন (২০০২), রচিত ‘দি পলিটিক্স অব ন্যাশনালিজমঃ দি কেস অব দি চিটাগং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ’ বইয়ে বলা হয়েছে যে, ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে এম এন লারমার  নেতৃত্বে পার্বত্য চট্রগ্রামের এক প্রতিনিধি দল শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং নিম্নোক্ত চার দফা দাবিনামা পেশ করেনঃ

  • ১। নিজস্ব আইন পরিষদসহ পার্বত্য অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসন।
  • ২। বাংলাদেশের সংবিধানে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্রগ্রাম ম্যানুয়াল বহাল।
  • ৩। উপজাতীয় রাজাদের দফতর সংরক্ষণ করা।
  • ৪।  বাঙালি অনুপ্রবেশ এবং ১৯০০ সালের ম্যানুয়াল সংশোধনের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক বিধি ব্যবস্থা।

এই দাবিনামার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে The CHT Commission প্রকাশিত বই লাইফ ইজ নট আওয়ার্স: ল্যান্ড এন্ড হিউম্যান রাইটস ইন দি চিটাগাং হিল ট্রাক্টস বাংলাদেশ (১৯৯১ ) এর সুত্রোল্লেখ করে লেখিকা জানান যে,

“উপরের দাবিগুলো শেখ মুজিবের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে শুধুমাত্র একটি ‘জাতি’ থাকতে পারে। তাই, তিনি পাহাড়িদেরকে পৃথক পরিচিতি ভুলে যেতে এবং বাঙালি হয়ে উঠতে বলেছিলেন। তিনি বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি পাঠিয়ে পাহাড়িদেরকে সংখ্যালঘু বানানোর হুমকি দেন।” (The above demands were unacceptable to Sheikh Mujib. He insisted that there could be only one ‘nation’ in Bangladesh. He therefore asked the Hill people to forget about their separate identity and to become Begnalis. He further threatened to turn them into minorities by sending Benglaies in the CHT.) (মহসিন, ২০০২, পৃষ্ঠা- ৫৮)।

প্রায় একই বক্তব্যের অনুরণন ঘটেছে মিজোরাম সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিচালক এস পি তালুকদার  (১৯৯৪) রচিত, ‘CHAKMAS: An Embattled Tribe’ গ্রন্থে।  লেখকের ভাষ্যমতে,  ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে এম এন লারমার প্রতিনিধি দলে আরো ১৮ জন ছিলেন। উল্লেখ্য যে, তিনিও তার দাবীর সমর্থনে কোন সুত্র উল্লেখ করেননি।

ইফতেখারুজ্জামান (১৯৯৮) এর ‘Ethnicity and Constitutional Reform in South Asia’  গ্রন্থে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এম এন লারমার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদলের শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ এবং চার দফা দাবী পেশ করার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হয়েছে। আরো জানানো হয়েছে যে, নতুন প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব কর্তৃক দাবীগুলো মেনে নেয়া হয়নি। চার দফার তালিকা থাকলেও বঙ্গবন্ধুর প্রত্যুত্তর বা প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না।

(বাকি অংশ আগামীকাল)


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

খাগড়াছড়িতে স্কুল উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্প ও বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখল

নিজাম উদ্দীন লাভলু:

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ও ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠাসহ নানা কৌশলে বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় জায়গা, নিরাপত্তাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্প ও সরকারি খাস খতিয়ানের ভূমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) এসব ভূমি দখল প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থাকার অভিযোগ উঠেছে। দখল করা জায়গায় অন্যত্র থেকে উপজাতীয় পরিবারদের এনে পুর্নবাসন এবং বৌদ্ধ বিহার, কিয়াং ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা হচ্ছে।

আশির দশকে তৎকালীন শান্তিবাহিনীর জ্বালাও পোড়াও এবং হত্যাযজ্ঞের মুখে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বসতবাগিচা ফেলে আসা বাঙ্গালি পরিবারদের ঐসব জায়গাগুলোর অধিকাংশই ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের হাতে দখল হওয়া ভূমি উদ্ধারে প্রশাসনের কোন সহানুভূতি- সহযোগিতাও তারা পাচ্ছেন না তারা। ফলে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে পার্বত্য এলাকা ছেড়ে সমতল জেলায় চলে গেছেন।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রামগড়ের দুর্গম এলাকা ছোট বেলছড়ি, গরু কাটা, লালছড়ি, সাতক্ষীরা পাড়া, তৈছাগাড়া, থানাচন্দ্র পাড়া, গৈয়াপাড়া প্রভৃতি এলাকায় বাঙ্গালীদের প্রায় দেড়শ একর রেকর্ডীয় জায়গা জোর করে দখল করে নেওয়া হয়েছে।



ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালিদের এসব ভূমি দখলে প্রত্যক্ষভাবে মদদ ও সহযোগিতা দিচ্ছে। দখল করা এসব জায়গার মধ্যে দক্ষিণ লালছড়িতে জগদীশ চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তির রেকর্ডীয় তিন একর ভূমি কথিত স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে।

জগদীশ পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০০৮ সালে ইলিয়াছ মিয়া নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে রামগড় মৌজার ১০২ নং হোল্ডিংয়ের তিন একর টিলা ভূমি কিনে নিজ নামে রেজিষ্ট্রি করার পর সেখানে বনজ গাছের বাগান সৃজন করেন। সম্প্রতি একটি উপজাতি সন্ত্রাসী গ্রুপের লোকজন বাগানের সমস্ত গাছগাছালি কেটে জায়গাটি জোরপূর্বক দখল করে। তারা স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে ঐ জায়গার উপর একটি ঘরও নির্মাণ করেছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা জগদীশেকে প্রাণ নাশের হুমকীও দিয়েছে’ বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হতে দুর্গম লালছড়ি এলাকায় সরেজমিন পরির্দশন করে দেখা যায়, জনবসতিহীন গভীর বনের মধ্যে পাহাড়ের চূড়ায় টিনের ছাউনীর একটি লম্বা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী এলাকার জনৈক ব্যক্তি জানায়, ‘ভিতরের পার্টি’র লোকেরা (পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপকে স্থানীয়রা ভিতরের পার্টি নামে আখ্যায়িত করে) রাতের আধাঁরে ঘরটি নির্মাণ করেছে।

তিনি আরও জানান, জায়গাটি দখল করার জন্যই স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে ঘরটি তৈরী করা হয়।

রামগড় উপজেলা নির্বাহি অফিসার(ভারপ্রাপ্ত) একেএম মোর্শেদ স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের জায়গা দখলের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কতিপয় উপজাতি যুবক স্কুল চালু করার অনুমতির জন্য তার কাছে এসেছিল। জায়গার বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তিনি অনুমতি দেননি।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে জানা যায়, লালছড়ি এলাকার পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরা পাড়া ও ছোট বেলছড়ি পাড়ার প্রায় ৩০টি বাঙ্গালী পরিবার সন্ত্রাসী গ্রুপের নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি, বাগানবাগিচা ফেলে অন্যত্র চলে গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের দুর্গম ছোট বেলছড়িতে ২০-২৫টি বাঙ্গালি পরিবার ছিল। ২০১৫’র মে মাসে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা দুটি বাঙ্গালি পরিবারের ওপর প্রথম হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা ঐদিন পরিবার দুটির তিনজন নারীকে গণধর্ষণসহ বেদম মারপিট করে ১০-১২জনকে আহত করে। তারা ঘরবাড়ি ভাংচুর ও মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

এ ঘটনায় রামগড় থানায় মামলা করার কারণে সন্ত্রাসীরা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরবর্তীতে বাঙ্গালী পরিবারগুলোর বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ, হামলাসহ লাগাতার নির্যাতন নিপীড়নের কারণে সবাই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। একই কায়দায় সাতক্ষীরা পাড়ার ৭টি পরিবারের ওপর নানা নির্যাতন চালিয়ে তাদের মধ্যে ছয়টি পরিবারকে এলাকা ছাড়া করা হয়।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সাতক্ষীরা পাড়ার ইমান আলীর ফেলে যাওয়া মাটির তৈরী দুটি বসতঘর পরিত্যক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়। জানা যায়, বাঙ্গালী পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে তাদের ফেলে যাওয়া জায়গাতে উপজাতীয় পরিবারদের এনে বসতি গড়ে দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, রামগড় ইউনিয়নের ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজার তৈচাগাড়া, থানা চন্দ্র পাড়া ও গৈয়াপাড়া এলাকায় ১৪টি বাঙ্গালী পরিবারের প্রায় ৭০ একর রেকডীয় টিলা ভূমির গাছপালা কেটে কাঁচাঘর নির্মাণ করে কতিপয় উপজাতি বসতি গড়ে তুলছে। ইতিমধ্যে ৫০-৬০টি উপজাতীয় পরিবার ঘর তৈরী করে সেখানে বসবাস শুরু করেছে।

ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে এসব উপজাতীয় পরিবারগুলোকে এনে বাঙ্গালীদের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছে।

উত্তর লামকু পাড়ার বাসিন্দা সৈয়দের রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, তৈচাগাড়া পাড়ায় তার নামে রেকর্ডীয় ৮৭৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে সাড়ে ৩ একর এবং ২২৮ খতিয়ানে দুই একর জায়গা রয়েছে। সম্প্রতি কতিপয় উপজাতি জায়গার গাছপালা কেটে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করে। বাধা দিলে ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা তাকে হুমকী দেয়।

তিনি বলেন, তৈচাগাড়া এলাকায় একইভাবে নজিরটিলার ফরিদ মিয়ার ২৩৭ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, সোনাইআগা গ্রামের নুরুল হকের ৭৪৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আবু সায়েদের ৫ একর, হানিফ মজুমদারের ৯২৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আবুল হোসেনের থানা চন্দ্র পাড়া এলাকায় ২০৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আব্দুল মালেকের ৫ একর, কালাডেবার নুরুল ইসলামের ৫ একর, বলিপাড়ার আবু আহম্মদের ৯৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আহম্মদ উল্লাহর ৭৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, হেদায়েত হোসেনের ৮৬১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, সোনাইপুলের মো: শাহ আলমের ৫ একর ও দক্ষিণ বালুখালীর সুলতান আহমেদের গৈয়াপাড়ার ১০ একর টিলা ভূমি উপজাতীয়রা দখল করে নিয়েছে।

সোনাই আগার আব্দুল মান্নান পার্বত্যনিউজকে বলেন, ৫০-৬০টি উপজাতীয় পরিবার তাদের এ রেকর্ডীয় জায়গার উপর বসতি স্থাপন করে দখল করে নিয়েছে। ইউপিডিএফের সদস্যরা লক্ষ্মীছড়ি ও মানিকছড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে এসব উপজাতি পরিবারগুলোকে এনে ঘর বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। জায়গা উদ্ধারের জন্য তারা জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন অভিযোগ করেও কোন ফল পাননি।

রামগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলগের আহবায়ক শাহ আলম মজুমদার পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালিদের উচ্ছেদ করে তাদের বসতবাগিচা দখল করে নিচ্ছে। তার ইউনিয়নের বহু বাঙ্গালি পরিবারবাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় জমি দখলের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে রামগড় উপজেলার সহকারি কমিশনার(ভূমি) পার্বত্যনিউজকে জানান, অভিযোগকারীদের জায়গার বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছ্বদের জন্য তাদেরকে আদালতে মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এদিকে, ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামেও বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন, নিরাপত্তাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্পসহ সরকারি খাস ভূমি কৌশলে দখল করার তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, রামগড় ভূমি অফিসের আওতাধীন কুকিছড়া এলাকায় গত জুনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় একটি ঘর নির্মাণ করে সেখানে বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

একইভাবে, গত জুলাইয়ে মহালছড়ি ভূমি অফিসের আওতাধীন সিন্ধুকছড়ির তিন্ধুকছড়ি নামক এলাকায় নিরাাপত্তা বাহিনীর আরেকটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায় কেয়াং ঘর নির্মাণ করে জায়গাটি দখল করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ৭টি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে জায়গাগুলো দখল করা হয়েছে।

তথ্যাভিজ্ঞমহল জানান, অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর প্রধান টার্গেট আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর এসব পরিত্যক্ত ক্যাম্প। আর ক্যাম্পের জায়গাগুলো দখলের হাতিয়ার হিসেবে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ধর্মীয় উপাসনালয়।

তন্মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীছড়ির কুতুবছড়ি বৌদ্ধ বিহার, নানিয়ারচরের জনবল বৌদ্ধ বিহার, জুরাছড়ি পাড়া, নাভাঙ্গাপাড়া বৌদ্ধ বিহার ও শিবের আগা। এছাড়া দীঘিনানলার সোনামিয়া টিলাসহ বাঙ্গালীদের অনেক জায়গাও উপাসনালয় প্রতিষ্টার নামে দখল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নানা কৌশলে বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখলের ব্যাপারে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো: শহিদুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে বলেন, তিনি এ জেলায় সদ্য যোগদান করেছেন। বিষয়টি এখনও পর্যন্ত কেউ তাকে জানায়নি। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি ও পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় স্কুল ও উপাসনালয় নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে ইউপিডিএফের(প্রসীত গ্রুপ) প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের সম্পাদক নিরন চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়িরা তাদের জায়গায় স্কুল ও উপাসনালয় নির্মাণ করছে। বাঙ্গালিরা ভূমির মালিকানার যেসব দলিলপত্র দেখাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন অনুযায়ী ঐসব কাগজপত্রের কোন বৈধতা নেই।

তিনি বলেন, পাহাড়ি ছেলে মেয়েরা যেন লেখাপড়া শিখতে না পারে সেজন্যই সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে প্রশাসন স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজেও বাঁধা দিচ্ছে। পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ক্যাম্পের জায়গার কোন দাবি করার সুযোগ নেই।

খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের ভূমি দখল মিশন: বাদ যাচ্ছে না সংখ্যালঘুর জমিও

দিদারুল আলম:
এখানে মাটির নিচে শুয়ে অাছে কোন না কোন বাঙ্গালী সন্তানের পিতা। যেখানে তাদের বংশ পরম্পরা বসবাস ছিলো। যে মাটিতে লেগে আছে বাঙ্গালী বাবা ভাইয়ের রক্ত সে মাটি কি সন্ত্রাসীদের আখড়ার জন্য ছেড়ে দিতে হবে- দু’চোখে বেদনার অশ্রুর প্লাবন ঝরিয়ে প্রতিনিধির কাছে ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বললেন পার্বত্য অধিকার ফোরাম নেতা মো. মাইনুদ্দীন।

সম্প্রতি গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও রামগড়ে বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত ও সরকারী খাস জমি ইউপিডিএফ কর্তৃক একের পর এক দখল কাণ্ডে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রশাসন এখানে অসহায়। ইউপিডিএফ একেরপর এক ভূমি দখল করেই যাচ্ছে আর প্রশাসন মাপজোখ, দলিল খতিয়ান চেক করার নামে সময়ক্ষেপণ করছে।

পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বাঙ্গালী বা সরকারী খাস জমি দখল করার চিরাচরিত পন্থা হচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নামে জোর করে জায়গা দখল ও পরে ভাগ করে নেয়া অথবা নিজেদের দলীয় কাজে ব্যবহার করা। কখনো এসব জমি নিজ দলীয় ক্যাডারদের মাঝে ভাগ করেও দেয়া হয়।

শুধু খাস জমি বা বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমিই নয়, এই ষড়যন্ত্রের কবল থেকে সেনা বাহিনীর পরিত্যাক্ত স্থাপনা বা ক্যাম্পগুলোও রক্ষা হচ্ছে না। অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের প্রধান আকর্ষণ পরিত্যাক্ত ক্যাম্পগুলো। আর ক্যাম্পের জায়গা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম। পাহাড়ের নিরস্ত্র, অসহায়, নিরীহ জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল নিরাপত্তা বাহিনী।



কিন্তু আজ তাদের ক্যাম্পের জায়গাই দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভেঙে পড়ছে সাধারণ মানুষের ভরসা ও নিরাপত্তার চিন্তা। সকলের মনে এখন একটিই প্রশ্ন, উপজাতীয় সন্ত্রসীদের এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি কীভাবে হবে? কবে পাওয়া যাবে মুক্তি?

খাগড়াছড়ির রামগড়ে সংখ্যালঘু পরিবারের একমাত্র জমি জোরপূর্বক দখল করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপ স্কুলের নামে নিজেদের ট্রেনিং সেন্টার বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মে (বুধবার) রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটা এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসিন্দা জগদীশ চন্দ্র নাথ (৫৫) এর জায়গা জোরপূর্বক দখল করে একটি স্কুল ঘর তুলেছে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র দলের কিছু সদস্য। এভাবে তারা পার্বত্য অঞ্চলে বহু বাঙ্গালীর বসতভিটা, বন্দবস্তকৃত বৈধ ভূমি জবর দখল করে নিয়েছে অস্ত্রের মুখে।

সম্প্রতি, রামগড় বিজিবি জোনের খাগড়াবিল সিআইও ক্যাম্প থেকে টহল দল ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়রা জানান, উক্ত জায়গায় স্কুল ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে রাতের আঁধারে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ স্কুল ঘরের ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে ফেলে।

এদিকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর (রবিবার) স্কুলের নামে তথাকথিত ট্রেনিং সেন্টারটি প্রশাসনের নজর এড়াতে স্কুলের নাম দিয়ে ৪ জন উপজাতি রামগড় উপজেলা শিক্ষা অফিসে একটি আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে অফিস সহকারী আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে আবেদনটি জমা দিতে বলেন। এরপর ঐ ৪ উপজাতি ব্যক্তি জগদীশ চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে ‘জমিটি স্কুলের নামে লিখে দিতে হবে- না হয় জীবন শেষ করে ফেলার’ হুমকি দেন। এই ভয়ে জগদীশ চন্দ্র কোন অভিযোগ দিতে বা হুমকিদাতাদের নাম বলতে রাজি হননি।

পরে ঐ ৪ উপজাতি ব্যক্তি কর্তৃক আবেদনটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট জমা দেওয়া হলে সেখান থেকে হুমকিদাতাদের সণাক্ত করতে সক্ষম হয় প্রশাসনসহ অন্যন্যরা। আবেদনে বিষু ত্রিপুরার নাম থাকায় রামগড় বিজিবি তাকে খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু বিষু পলাতক থাকায় তাকে খুঁজে পায়নি বলে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রামগড় বিজিবি জোন উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে। সংখ্যালঘুর জমি জোরকরে দখল করার কারণে উপজেলা প্রশাসন আবেদন গ্রহণ করেনি।

জগদীসের স্ত্রী মিনু বালা বলেন, জমি হারিয়ে শোকে তার স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রামগড় হাসপাতাল চট্রগ্রাম নিয়ে যেতে বলছেন। দুই সন্তান আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন। এই জমিটা ছাড়া তাদের অন্য কোন জমি নেই।

বিগত দশ বছর আগে অনেক কষ্টে নিজের হাতের বালাসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে জমিটি ক্রয় করেছিলেন তারা। আর সে জমি জোর করে নিয়ে যাচ্ছে সেটা জগদীস সইতে না পেরে রীতিমত অসুস্থ। এখন স্বমীকে চিকিৎসা করবে নাকি জমি রক্ষা করবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না মিনু বালা।

এ বিষয়ে স্কুল নির্মাণের মূল হোতা বিষু ত্রিপুরার নিকট মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি পার্বত্যনিউজকে ইউপিডিএফের ট্রেনিং সেন্টার তৈরির কথা অস্বীকার করে বলেন, আমাদের এলাকায় কোন স্কুল না থাকায় আমরা এলাকাবাসীরা এক হয়ে স্কুলটি করেছি। তবে জমির মালিকের নিকট থেকে লিখিত কাগজ না নেওয়ায় তাদের ভুল হয়েছে মর্মে জানান তিনি।

জমির মালিক মৌখিকভাবে জমি দিবে বলায় আমরা স্কুলের কাজ করেছি। ইউএনও অফিসে আবেদনও করা হয়েছে। কিন্তু বিজিবির সদস্যরা কেন আমাদের সাইনবোর্ড নিয়ে গেছে তারা জানে না। পার্বত্যনিউজের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, জমির মালিককে কোন ক্ষতিপূরণ দেননি। বর্তমানে স্কুলের কাজ বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে পতাছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, কারো যদি স্কুলের প্রয়োজন হয় তাহলে প্রশাসনসহ সকলের সহযোগিতা নিয়ে স্কুল তৈরি করবে। সরকারী খাস জায়গার কোন অভাব নেই পাতাছড়ায়। স্কুলের নামে জোর করে বাঙ্গালীদের জমি দখল করা কারো প্রত্যাশিত হতে পারে না। তিনি এসব জোরপূর্বক দখলের বিষয়ে নিন্দা জানান।

রামগড় থানার অফিসার ইনচার্জ এভাবে জোর করে জমি দখল করার বিষয়ে নিন্দা জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, ভুক্তভোগী কেউ থানায় আসেনি আসলে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, ৪জন উপজাতি ব্যক্তি স্কুলের নামে একটি আবেদন নিয়ে এসেছিলেন। রামগড় জোন সদর থেকে জানতে পেরেছি জগদীস চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তির জায়গায় জোর করে স্কুল তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি অবগত থাকায় স্কুলের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন থেকে কোন অনুমতি দেয়া হয়নি।

সাম্প্রতিক ভুমি দখলের আরো কিছু ঘটনা

১. জেলার মানিকছড়িতে গত ২৩ মে ২০১৮ তারিখে দুইজন বাঙ্গালী মো. জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারুল ইসলাম এর মালিকানাধীন জায়গায় উপজাতী রিপ্রুচাই মারমা (৪০) জোর করে জঙ্গল পরিস্কার করে ঘর নির্মাণ করলে উভয়পক্ষে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।

পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ফলে বৈধ কাগজপত্র না দেখানো পর্যন্ত উক্ত জমিতে উভয় পক্ষের কেও প্রবেশ করিবে না মর্মে সম্মত হয়।

২. সিন্দুকছড়ির তিন্দুকছড়িতে পরিত্যাক্ত আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন পাশ্ববর্তী টিলায় গত ৪ জুলাই ২০১৮ টিন দিয়ে একটি নতুন ঘর তৈরি করে এই সন্ত্রাসী দল।

ইউপিডিএফ সমর্থিত সিন্দুকছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রেদাক মারমা বলেন, প্রথমে তিনি নিজে এ ব্যাপারে অবগত নন। পরে বলেন, ভূলবশতঃ জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে, ঘরটি পরদিন সরিয়ে নেয়া হবে বলে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল সদস্যদের জানান। কিন্তু ৫ জুলাই ২০১৮ তারিখে, রাতের আধাঁরে উক্ত ঘরে ১০ ইঞ্চি উচ্চতার একটি বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করে জায়গাটি দখলে নেয় তারা।

পরবর্তীতে, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানিকছড়ি উপজেলার ভূমি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে উক্ত জায়গার মালিকানা যাচাইপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস কর্তৃক জায়গার মালিকানা যাচাই এর কার্যক্রম চলমান। সিন্দুকছড়ি জোন থেকে মহালছড়ি ভূমি অফিসকে সার্ভে করার জন্য পত্র লেখা হয়। মহালছড়ি ভূমি অফিস হতে ১টি সার্ভেয়ার টীম গত ২৮ আগষ্ট ২০১৮ তারিখে সিন্দুকছড়ি জোনের টহল দলের সাথে উক্ত স্থানে গমন করে এবং উক্ত এলাকা সার্ভে করে। সার্ভে টীম কর্তৃক সরেজমিনে সার্ভে করার পর জানানো হয় যে উক্ত জায়গাটি ৫৫ নং দাগের অর্ন্তভূক্ত এবং এটি সরকারী খাস জমি যা পাহাড়ীরা জোরপূর্বক দখল করেছে।

৩. মাটিরাঙ্গার কুকিছড়া এলাকায় গত ২৪ জুন ২০১৮ তারিখে সেনাবাহিনীর পরিত্যাক্ত ক্যাম্পের জায়গায় একটি কিয়াং ঘর নির্মাণ করছে শুনে নাইক্যাপাড়া আর্মি ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনা স্থলে গিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, পাড়ার কারবারীদের নিকট জানতে চান, কেন কোন প্রকার অনুমতি বা তথ্য ছাড়া এই কিয়াং ঘর নির্মাণ করা হয়েছে? তখন স্থানীয় উপজাতীয়রা অনুমতিপত্র ছাড়া কাজ করবে না মর্মে জানালেও পরবর্তীতে ২০-২১ মে ২০১৮ উক্ত পরিত্যক্ত ক্যাম্পে কিয়াং ঘর স্থাপনের কাজ পুণরায় শুরু করে।

ইতোমধ্যে কিয়াং ঘরের নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্ত হয়েছে এবং উক্ত কিয়াং ঘরে ৮ (আট) ফুট উচ্চতার একটি বৌদ্ধমূর্তিও স্থাপন করেছে তারা। কিন্তু কিয়াং ঘরটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহার এখনও শুরু হয়নি।নির্মাণাধীন উপাসনালয়টির প্রায় ৩০০ গজ রেডিয়াসের ভেতর আরো ২ টি উপাসনালয় রয়েছে। তাছাড়া দূর্গম পাহাড়ী এলাকাটি এত ঘনবসতি নয় যে সেখানে আরো উপাসনালয় নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত পরিত্যক্ত এই সেনাক্যাম্পের জায়গাটি দখল করে তাদের আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহারের জন্যই এই কিয়াংটি নির্মাণ করা হয়েছে।

৪. রামগড় তৈছাগাড়া, থানা চন্দ্রপাড়ায় গত ৩ জুন ২০১৮ তারিখ ১০ জন বাঙ্গালীর সর্বমোট ৭০.৫০ একর জায়গা উপজাতীয় ব্যক্তিবর্গ ছোট ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে দখলে নেয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালীরা উক্ত জায়গার মালিকানা দাবী করে তাদেরকে বাধা প্রদান করলে উপজাতীয়রা বলেন, এ এলাকার জায়গাসমূহ বেনামী (কারো নামে রেকর্ডভূক্ত নয়) এবং ইউপিডিএফ (মূলদল) এর সদস্যরা তাদের এখানে এনে বসিয়েছে। এ সময় ইউপিডিএফ (মূল দল) এর সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলেও জানা যায়।

অভিযোগ প্রাপ্তির পর রামগড় বিজিবি জোন থেকে টহল দল উক্ত স্থানসমূহে যায় এবং বাঙ্গালীদের নামে রেকর্ডকৃত জায়গা হওয়ায় উপজাতীয়দেরকে জবরদখলকৃত স্থান থেকে নিজের ভূমিতে ফেরত যাওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। তথাপি, ও উপজাতীয়রা ঘটনাস্থল ত্যাগ না করে উক্ত স্থানে এখনো বসবাস করছে।

৫. গত ১৮ জুলাই ২০১৮ রামগড় জোনের আওতাধীন
পাতাছড়া ইউনিয়নের গৈয়াপাড়া এলাকায় জনৈক বাঙ্গালী মো. সুলতান আহমেদ (৭০) এর মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর ইন্ধনে উপজাতীয়রা ৩/৪টি বাড়ী নির্মাণ করেছে মর্মে রামগড় জোন সদর জানতে পারে। উল্লেখ্য, উক্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাহিরে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় অবস্থিত।

পরবর্তীতে, আরো জানা যায় যে, উক্ত পাড়ার জনৈক চিকন কারবারী কর্তৃক লক্ষীছড়ি এলাকা হতে ৩টি উপজাতীয় পরিবারকে ঘর নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। রামগড় জোন সদর কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করা হয়।

মো. সুলতান আহমেদ রামগড় জোন সদরে উপস্থিত হয়ে বেআইনীভাবে বসবাসকারী উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর সহায়তায় তারা বাড়ী নির্মাণ করেছে মর্মে জানায়।

এই সময় রামগড় জোন সদরের পরামর্শ অনুয়ায়ী বাদী সুলতান আহমেদ রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দখলকারী তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার উক্ত স্থান হতে চলে গেলেও দুইটি পরিবার এখনও আছে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয় নাই। মো. সুলতান আহমদের ৫ একর জমির টিলা গাছ কেটে পরিস্কার করে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) সন্ত্রাসীরা ৩টি ঘর নির্মাণ করে পাহাড়ী পরিবারকে দিয়েছে।

উক্ত ঘটনাটি রামগড় জোনের অধীনস্থ খাগড়াবিল বিজিবি ক্যাম্প থেকে ৫ কি. মি. দক্ষিণে গৈয়াপাড়া মনকুমার চাকমাপাড়া। উক্ত ঘরগুলোতে এখনও পাহাড়ী পরিবার বসবাস করছে। সেখানে জমির মালিক সুলতান আহমেদ বসবাস করেন না। তিনি স্বপরিবারে পার্শ্ববর্তী দাতারামপাড়া এলাকায় বসবাস করেন।

৬. গত ২০ আগস্ট ২০১৮ রামগড় উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের আওতাধীন সোনাইআগা নোয়াপাড়া নামক স্থানে বসবাসকারী মো. আব্দুল মান্নান (৪২) কে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর ১০-১২ জন সন্ত্রাসী মারধর করে আহত করে। পরবর্তীতে, স্থানীয়রা আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

আব্দুল মান্নানের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর সন্ত্রাসীরা সোনাইআগা নোয়াপাড়া থেকে বাঙ্গালীদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে উক্ত এলাকা পাহাড়ীদের বলে দাবী করে। আব্দুল মান্নান কর্তৃক রামগড় থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করা হয়েছে এবং উক্ত বাড়ীতে আব্দুল মান্নান এখনও বসবাস করছেন। সন্ত্রাসীদের ভয়ে সে স্থান থেকে বের হতে সাহস করছে না।

এভাবেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি আগ্রাসন চালাচ্ছে। এ কাজে জনগণ ও মিডিয়ার সমর্থন পেতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও প্রাণের হুমকির ভয়ে ক্ষতিগ্রস্তরাও অসহায় ।

এ ব্যাপারে কথা বলতে ইউপিডিএফ প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের মুখপাত্র নিরন চাকমার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

তবে ইউপিএফ কেন্দ্রীয় নেতা ও সংগঠক মাইকেল চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, যে স্থানে স্কুলটি নির্মিত হয়েছে সেখানে মূলত কখনো কোন বাঙ্গালীর বসবাস ছিল না। যদি কেউ জমির মালিক হয়ে থাকে তাহলে সে আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। স্কুলটি এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত হলেও ইউপিডিএফের সহযোগিতা ছিলো বলে তিনি স্বীকার করেন।

তিনি আরো বলেন, সারা দেশে আওয়ামীলীগ, বিএনপি স্কুল তৈরি করে, আমরা কি সহযোগিতাও করতে পারবো না।

রামগড়ে ভূমি দখলের আড়ালে ইউপিডিএফের নেতৃত্বে চলছে বাঙালী উচ্ছেদ মিশন

সন্তোষ বড়ুয়া

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উপজাতি স্বার্থান্বেষী মহল নিয়মিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকা, মিছিল, মিটিং, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান, হরতাল, স্কুল-কলেজে ক্লাস বর্জনসহ নানা ধরণের পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করে থাকে। তাদের এই মিথ্যা অপপ্রচারের গণ্ডি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা এমনকি বিদেশেও তারা এই অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় এই যে, তাদের এই অপপ্রচারে সরাসরি সহযোগিতা করছে দেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

আমার আজকের লেখার বিষয় হল পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলাকে নিয়ে এমনই কিছু মিথ্যাচার আর সেখানে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ে।

রামগড়ে গত বেশ কিছুদিন যাবত ভূমি নিয়ে সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপজাতিদের অভিযোগ সেখানকার স্থানীয় বাঙালি এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে, তাদের বসত-ঘর ভেঙ্গে দিচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের এই অভিযোগসমূহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বেশ ঘটা করে তারা প্রচারও করছে। অভিযোগ যেহেতু গুরুতর তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি রামগড়ে সরেজমিনে তদন্তের জন্য রাঙামাটি থেকে ছুটে গেলাম।

সেখানকার স্থানীয় জনসাধারনের সাথে কথা বলে যে তথ্য সংগ্রহ করেছি তাতে একটা বিষয় পরিস্কার যে ভূমি নিয়ে উপজাতিদের উত্থাপিত সকল অভিযোগ মিথ্যা।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায় যে, রামগড় এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাটি মূলতঃ আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের আধিপত্যপূর্ণ এলাকা। সশস্ত্র ঐ সংগঠনটি রামগড় এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণসহ নানান ধরণের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত। তাদের এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রমে প্রধান বাধা নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। আর সে কারণেই তারা নিরাপত্তাবাহিনীকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বানোয়াট আর বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার করে গুজব সৃষ্টি করে আসছে। শুধু অপপ্রচারেই তারা ক্ষ্যান্ত নয়। সুযোগ পেলে তারা নিরাপত্তাবাহিনীর উপর হামলা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ৫ জুন ২০১৭ তারিখে পুলিশের ওপর ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের পেট্রোল বোমা ও ককটেল নিক্ষেপ, ৭ জুন ২০১৭ তারিখে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কর্মীদের কর্তৃক বিজিবি ও পুলিশের উপর হামলা, ৮ মার্চ ২০১৮ তারিখে ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল ইউমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক পুলিশের উপর হামলার চেষ্টা ইত্যাদি।


এ সংক্রান্ত আরো লেখা:
নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা


ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সশস্ত্র দলের অস্ত্রের মুখে স্থানীয় জনসাধারণও অতিষ্ঠ। কিন্তু প্রাণ ভয়ে তারা কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। নামপ্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় উপজাতি এবং বাঙালিরা ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সশস্ত্র দলের বেশ কিছু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঘটনার বর্ণনা করেছেন পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকেও এর সত্যতা পেয়েছি। এর কিছু উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১। ১৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, রামগড়ের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম অন্তুপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আকস্মিকভাবে এসে চাইন্দে মারমা নামক এক ব্যক্তির বসতঘর ও রান্নাঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়।

২। ২৭ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে, তৈচাগাড়া বাটনাশিবির নামক স্থানে মো. হানিফ মজুমদার (৬৫), মো. আবু সাইদ (৫৫) এবং মো. ওবাইদুল হক (৫০) নামক তিনজন বাঙালির মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের লোকজন জোরপূর্বক বসত-ঘর তৈরী করে। কিন্তু ইউপিডিএফ কর্তৃক তৈরীকৃত ঘরগুলো উক্ত জমির মালিকরা ভেঙ্গে দেয়। পরবর্তীতে, বাঙালিরা তাদের বসত-ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে মর্মে অপপ্রচার চালায় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা।

৩। ৪ মার্চ ২০১৮ তারিখে, পাকলাপাড়া নামক স্থানে নিজ বাসা থেকে অজ্ঞাতনামা উপজাতি অস্ত্রধারীরা (স্থানীয়দের দাবী ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ) চাইথুই মারমা (৫৫)নামক একজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

৪। ২১ মার্চ ২০১৮ তারিখে, পাতাছড়া ইউনিয়নের কলাবাড়ি নামক স্থানে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীদের গুলিতে সিএনজি চালিত অটো রিক্সার চালক শরীফুল ইসলাম(২৬) আহত হয়। একই স্থানে অপর একটি অটো রিক্সায় ছোঁড়া ইটের আঘাতে দেড় বছরের একটি শিশুও আহত হয়।

৫। ৪ জুন ২০১৮ তারিখে পার্বত্যনিউজ ডট কম পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায় যে, রামগড় ইউনিয়নের ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজার তৈচাগাড়া ও থানা চন্দ্র পাড়া এলাকায় সরকারিভাবে বন্দোবস্তী দেয়া ১৩টি বাঙালি পরিবারের প্রায় ৬০ একর টিলা ভূমি দখল করে বসতি স্থাপন করছে কতিপয় উপজাতিরা। ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদেরকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে অন্যত্র থেকে পাহাড়ি পরিবারগুলোকে এনে বাঙালিদের ওইসব জায়গায় বসতি তৈরী করে দিচ্ছে।

৬। ৩ জুন ২০১৮ তারিখে থানাচন্দ্রপাড়া নামক স্থানে ১০ জন বাঙালির সর্বমোট ৭০.৫০ একর জায়গা ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে দখলে নেয়। পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট বাঙালিরা উক্ত জায়গার মালিকানা দাবী করে তাদেরকে বাধা প্রদান করলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বাঙালিদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এ প্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি কর্তৃক উক্ত ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হয়।

৭। ১৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে গৈয়াপাড়া এলাকায় জনৈক বাঙালি মোঃ সুলতান আহমেদ (৭০) এর মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের এর ইন্ধনে উপজাতীয়রা ৩/৪টি বাড়ী নির্মাণ করে। পরবর্তীতে বাদী সুলতান আহমেদ রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

৮। ২৫ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, দাতারামপাড়া, রসলপুর নামক স্থানে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী নির্মাণাধীন রাস্তার কাজে নিয়োজিত চারজন শ্রমিকের কাছে চাঁদা দাবী করে। শ্রমিকরা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা তাদেরকে মারধর করে।

৯। ২০ আগষ্ট ২০১৮ তারিখে, চাঁদা না দেয়ায় সোনাইআগা নোয়াপাড়া নামক স্থানে বসবাসকারী মো. আব্দুল মান্নান (৪২) নামক এক বাঙালিকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের ১০/১২ জন সন্ত্রাসী মারধর করে আহত করে। আব্দুল মান্নান জানায় যে, ইউপিডিএফ (মূলদল) এর সন্ত্রাসীরা সোনাইআগা নোয়াপাড়া হতে বাঙালিদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে উক্ত এলাকা পাহাড়ীদের বলে দাবী করে।

১০. গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের গরুকাটা নামক দুর্গম এলাকায় চাঁদার টোকেন দেখাতে না পারায় এক বাঙালী অটো রিক্সা ড্রাইভারের গাড়ী ভাঙচুর করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। জানা যায়, সকালে খাগড়াবিল বাজার থেকে যাত্রী নিয়ে গরুকাটায় পৌঁছলে ৩-৪ জন সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসী অটোরিক্সাটি আটক করে। তারা চালকের কাছে চাঁদার টোকেন দেখতে চায়।

তাৎক্ষণিকভাবে টোকেন দেখাতে না পারায় সন্ত্রাসীরা অটোরিক্সার চাবি কেড়ে নিযে চালক ফজলুর রহমান(২৩)কে ধারালো দা দিয়ে কোপাতে চায়। এ সময় সে দৌঁড়ে পালিযে প্রাণ বাঁচায়। সন্ত্রাসীরা অটোরিক্সাটি রাস্তার পাশের জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে ব্যাপকভাবে ভাংচুর করে। পরে অটোরিক্সা চালক সমবায় সমিতির নেতারা ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ করে অটোরিক্সাটি উদ্ধার করেন।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটেছিল ৩০ জুন ২০১৭ তারিখে। সেদিন রামগড় উপজেলার বাঙালি অধ্যুষিত কালাডেবা নামক স্থানে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কতিপয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সদলবলে উপস্থিত হয়ে বাঙালিদের নিকট চাঁদা দাবী করে। এ ঘটনা জানার সাথে সাথে স্থানীয় এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাঙালিরা সমবেত হয়ে সে সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী মারমা উপজাতি অধ্যুষিত সোনাইআগা এলাকা দিয়ে চন্দ্র কারবারীপাড়া (ত্রিপুরা উপজাতি অধ্যুষিত) এলাকায় পালিয়ে যায় এবং পলায়নকালে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে।

এ সময় স্থানীয় সাধারণ উপজাতিরাও সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে বাঙালিদের সাথে যোগ দেয়। সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করার সময় স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার কিছুদিন পূর্বেও ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীরা উক্ত এলাকার বাঙালিদের নিকট চাঁদা দাবী করে এবং চাঁদা না দিলে এলাকা ছাড়া করবে এবং বাঙালি মেয়েদেরকে অপহরণ করে ধর্ষণ করবে বলেও হুমকি প্রদান করে বলে স্থানীয়দের নিকট হতে জানা যায়।

ঘটনার মীমাংসা করার জন্য গত ১ জুলাই ২০১৭ তারিখ ১১ ঘটিকায় সোনাইআগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালি গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে স্থানীয় এলাকাবাসী সবাই জানান যে, ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের একদল সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ব্যবসায়ী, কৃষক সবার কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে। তাদের অত্যাচারে গ্রামবাসিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বৈঠকে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে সকলে মতামত ব্যক্ত করেন। বৈঠকে উপস্থিত সকল জনপ্রতিনিধি ও পাহাড়ি-বাঙালি নেতৃবৃন্দ বলেন, গুজবের মাধ্যমে এলাকার শান্তি-সম্প্রীতি নষ্ট হয়, হিংসা ও হানাহানির মত বড় ধরনের ঘটনার সৃষ্টি হয়।

এ প্রসংগে রামগড় ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড মেম্বার ক্যাওরি মারমা বলেন, পাহাড়ি- বাঙালি সবাই মিলেই সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করা হয়েছে। এখানে কেউ কোন পাহাড়ির বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেনি। সোনাইআগার স্থানীয় বয়োঃবৃদ্ধ বাসিন্দা ক্যয়প্রু মারমা বলেন, সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে আমার ছেলে এবং ভাতিজিও যায়। এই সময় তিনি সোনাইআগা এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের দাবীও জানান।

কিন্তু, উপরোক্ত ঘটনাকে ইস্যু করে পাহাড়িদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক তথ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বনপূর্বক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তি কর্তৃক অপপ্রচার চালানো হয়।

উদাহরস্বরূপঃ পাহাড়ীদের প্রতি সহানুভুতিশীল সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন যে,  “একটু আগে মাত্র খবর পেয়েছি খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার ১ নং সদর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত সৌনায়া গা ও ব্রত চন্দ্র কারবারী পাড়াতে পার্শ্ববর্তী কালাডেবা নামক এলাকা থেকে শতাধিক সেটেলার সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালাচ্ছে। এই গ্রামগুলিতে ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাস। রাত এগারটার দিকে সৌনায়া গা গ্রামটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এগারটার দিকে ব্রত চন্দ্র কারবারী গ্রামটিতে চলছিল নির্বিচার হামলা, মারধর আর লুটপাট। সেটেলারদের সাথে এইসব হামলায় স্থানীয় চৌচালা বিজিবি ক্যাম্প থেকে বিজিবি সদস্যরাও অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। গ্রামের ত্রিপুরা আদিবাসী মানুষজন প্রাণভয়ে পালাচ্ছে বাড়িঘর ছেড়ে”।

এছাড়াও চাকমা সার্কেল চিফের স্ত্রী রাণী য়েন য়েন, Ajal Dewan, Mikel Changma Jummo, Thuikyaw Ching, CHT-jummaland, Chittagong Hill Tracts International Network for Human Rights নামক ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকেও এ সংক্রান্ত বিষয়ে অপপ্রচার চালানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারপূর্বক এ ধরণের উস্কানীমূলক অপপ্রচার পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রতিকে বিনষ্ট করে যে কোন সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে এবং নিয়ে থাকে। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল করার লক্ষ্যে এ ধরণের অপপ্রচার চালানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও ইমতিয়াজ মাহমুদ কর্তৃক মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখনী হতে প্রমাণ হয় যে, তিনি নির্দিষ্ট কোন স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ রক্ষা করছেন। ইতোপূর্বেও তিনি পার্বত্য চট্রগ্রামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ও মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখা প্রকাশ করেছিলেন। তার এই মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখনীর জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

তবে আশার কথা হল রামগড়ের উপজাতি-বাঙালি সকল জনসাধরণই এখন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাইতো, ২৯ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, রামগড়ে চাঁদাবাজির সময় প্রবীর ত্রিপুরা(২২) নামক ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের এক চাঁদাবাজকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দিয়ে বিজিবি’র কাছে সোপর্দ করে স্থানীয় জনসাধারণ। পাশাপাশি পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে এই সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করছে।

উদাহরণস্বরূপঃ ১৪ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে, সুজন চাকমা(২৮) ও আব্বাই মারমা(৩৩) নামক ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের দুই চাঁদাবাজকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক করে বিজিবি সদস্যরা।
২৫ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে চাঁদাবাজি করার সময় পাত্র চাকমা নামক ইউপিডিএফ’র এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করে বিজিবি সদস্যরা।

পুলিশ, বিজিবি আর স্থানীয় প্রশাসনের এমন তৎপরতার কারণে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র কার্যক্রম বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে। সে জন্য তারা নিয়মিতভাবে এইসব বাহিনী এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হল গত ১২ সেপ্টেম্বর রামগড় উপজেলায় সদর ইউনিয়নে ৬নং ওয়ার্ড নাঙ্গল আদামে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ কর্তৃক অবৈধভাবে ভূমি দখল করতে না পেরে নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার।

♦ লেখক- রাঙামাটি থেকে

আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃশংসতম গণহত্যা পাকুয়াখালী ট্রাজেডি দিবস

Pakuakhali-

সৈয়দ ইবনে রহমত

৯ সেপ্টেম্বর, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি দিবস। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী রাঙ্গামাটি জেলার পাকুয়াখালীতে নিরীহ এবং নিরস্ত্র বাঙালি কাঠুরিয়াদের উপর নির্মম হত্যাকান্ড চালিয়ে তাদের বিভৎস মানসিকতার এক জঘন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

স্বাধীনতার পর পরই জেএসএস তথা শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পার্বত্যাঞ্চলের সহজ-সরল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে শুরু করে সশস্ত্র তৎপরতা। প্রথম থেকেই তারা নিরাপত্তা বাহিনী এবং নিরীহ বাঙালিদের বিরুদ্ধে চালাতে থাকে একের পর এক আক্রমণ। যে কোন নিরীহ এবং নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করাই যেখানে মানবতা বিরোধী চরম অপরাধ সেখানে শান্তিাবাহিনীর সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙালিদের উপর হাজার হাজার সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনা করেছে। কথিত আছে শান্তিবাহিনী এ পর্যন্ত হত্যা করেছে ৩০ হাজারেরও বেশি বাঙালি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে। এর মধ্যে কিছু কিছু গণহত্যার ঘটনা আছে যেগুলোকে কোনভাবেই কোনো মানুষের কর্ম বলে বিশ্বাস করা যায় না। বিশেষ করে ২৯ এপ্রিল ১৯৮৪ খাগড়াছড়ি মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ৩০ মে ১৯৮৪ দিবাগত রাতে সংঘটিত রাঙ্গামাটি জেলার ভূষণছড়া গণহত্যা এবং ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ রাঙ্গামাটির পাকুয়াখালী গণহত্যা অন্যতম। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল আছেন তারা পাকুয়াখালী গণহত্যাকে শান্তিবাহিনীর নৃশংসতম গণহত্যা বলে স্বীকার করেন। কেননা সেদিন শান্তিবাহিনী মিটিং করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ডেকে নিয়ে ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। অবাক করার বিষয় হচ্ছে যে, শান্তিবাহিনী সেদিন এতগুলো মানুষকে হত্যা করতে একটি বুলেটও ব্যবহার করেনি। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে কুপিয়ে এবং বন্দুকের বেয়নেট ও অন্যান্য দেশি অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

pakuakhali-00

pakuakhali-5

ছবি : পাকুয়াখালীতে গণহত্যার শিকার নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াদের লাশের স্তূপ

১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মতায় আসে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার। সে সময় সবাই আশা করছিল যে, এবার হয়ত পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যাটি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব হবে। কেননা এরশাদ সরকারের আমলেই শান্তিবাহিনীর সাথে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। এরপর বিএনপির সরকার (১৯৯১-৯৬) আমলে এই আলোচনা আরো বিস্তৃতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। একে একে অনুষ্ঠিত হয় ১৩টি বৈঠক। কিন্তু শান্তিবাহিনীর নানা অযৌক্তিক দাবির কারণেই শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়ে ওঠেনি। এমতাবস্থায় আওয়ামীলীগ সরকার মতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে ধারণা জম্মেছিল যে, এবার হয়ত বিষয়টি নিষ্পত্তির দিকে যাবে। কেননা শান্তিবাহিনীর আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে আওয়ামীলীগের সম্পর্ক ভালো।

অতএব ভারতও চাইবে না শান্তিবাহিনী তাদের চিরাচরিত অপকর্ম দ্বারা আওয়ামীলীগ সরকারকে বিব্রত করুক। এমন আশা কিংবা আশঙ্কার মধ্যেই শান্তিবাহিনী ৯ সেপ্টম্বর ১৯৯৬ পাকুয়াখালী ট্রাজেডির জন্ম দেয়। এসময় পুরো পার্বত্যাঞ্চলই ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত। শান্তিবাহিনী এসময় স্ব-ঘোষিত অস্ত্র বিরতি দিয়ে, চাঁদা আদায় এবং অস্ত্র সংগ্রহের প্রতিই বেশি মনোযোগী ছিল। সেই সাথে সরকারের সাথে নিজেদের দাবী-দাওয়া নিয়ে দেন-দরবার করার জন্যও সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। অন্যদিকে নিজেদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিল সর্বাত্মকভাবে। তাই, তখন পার্বত্যাঞ্চলের নিরীহ অসহায় পাহাড়ি-বাঙালিরা শান্তিবাহিনীকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে পাহাড় থেকে বাঁশ-কাঠসহ অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছিল। রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ির পাকুয়াখালীতেও একই অবস্থা চলছিল। এখানে প্রতিদিন শত শত পাহাড়ি এবং বাঙালি কাঠুরিয়া শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিয়ে বাঁশ এবং গাছ কাটতে যেত। লোকজন পাহাড়ে গিয়ে গাছ, বাঁশ কেটে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ফিরে আসত।

চাঁদা আদায় সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনার জন্য মাঝে-মধ্যে পাহাড়ে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঠুরিয়াদের বৈঠক হতো। এক পর্যায়ে ৯ সেপ্টেম্বর ’৯৬ একটি বৈঠক ডাকা হয়। এই বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য কাঠ ব্যবসায়ীদেরও নেয়ার জন্য শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। শান্তিবাহিনীর কালেক্টর লংগদু থানার মাইনিমুখ বাজারে এসে ব্যবসায়ীদের চিঠির মাধ্যমে বৈঠকে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু ইতিপূর্বে কোনো বৈঠকে ব্যবসায়ীদের এভাবে গুরুত্ব দিয়ে ডাকা হয়নি। ফলে ৯ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ব্যবসায়ীদের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ায় ব্যবসায়ীরা বিষয়টি এড়িয়ে যায়। কিন্তু কাঠুরিয়ারা প্রতিদিনের মতো সেই দিন সকাল বেলা স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ে প্রবেশ করতে শুরু করে। তখন শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদেরকে জানানো হয়, বড়বাবু আজ সবার সঙ্গে মিটিং করবেন। তাই আগে মিটিং-এ যেতে হবে। এর পর যে যার কাজে যাবে। একথা বলেই এক সাথে চার-পাঁচজন বাঙালি কাঠুরিয়াকে কিছুদূর নিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিনকার বাঁধা অবস্থা থেকে পালিয়ে আসা এক মাত্র ব্যক্তি মোহাম্মদ ইউনুছ মিয়া। এই ইউনুছ মিয়ার দেখানো পথ ধরেই ১১ সেপ্টম্বর খুঁজে বের করা হয় ২৮ জনের ক্ষত-বিক্ষত, বিকৃত লাশ। কারো হাত নেই, কারো চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, কারো কেটে নেয়া হয়েছে কান কিংবা পুরুষাঙ্গ। কাউকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে থেতলে দেয়া হয়েছে মাথা। আবার কাউকে জবাই করা হয়েছে অমানবিকভাবে। অপর ৭ হতভাগ্যেরতো লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমন নির্মম দৃশ্য দেখে সেদিন পার্বত্যাঞ্চলের আকাশ-বাতাস স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। শোকে ভারি হয়ে ওঠেছিল সমস্ত পরিবেশ। পরে উদ্ধার করা লাশগুলি এনে লংগদু উপজেলা মাঠ সংলগ্ন খোলা যায়গায় দাফন করা হয়।

সেদিন নিহত ৩৫ কাঠুরিয়ার স্বজনদের আহাজারী আর উত্তাল পার্বত্য পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখার জন্য তৎকালীন সরকারের ৪ জন প্রভাবশালী মন্ত্রী লংগদু সফর করেছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম, শিল্প মন্ত্রী তোফায়েল আহম্মদ, পানি সম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এবং শ্রম ও কর্ম সংস্থান মন্ত্রী এম. এ. মান্নান। তাঁরা লংগদু গিয়ে মানুষের বুক ফাটা কান্না আর আহাজারী দেখে হত্যকারীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করার। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তাদের লেখা-পড়ার দায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতিও তারা দিয়েছিলন। তারা লংগদু থেকে ফিরে আসার পর তৎকালীন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার সুলতান মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি ৩১ অক্টোবর ’৯৬ ইং বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।

তবে ১ নভেম্বর ১৯৯৬ দৈনিক জনকণ্ঠের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, উক্ত প্রতিবেদনে শান্তিবাহিনীকেই পাকুয়াখালী ট্রাজেডির জন্য দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার দুই দশক পরেও শান্তিবাহিনীর সন্ত্রসাীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি। পুনর্বাসন করা হয়নি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে। ক্ষতিগ্রস্থদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারেও কোন দায়িত্ব নেয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তাই আজ তারা শিাক্ষা-দীক্ষাহীনভাবে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে।

১৯৯৭ সালে শান্তিবাহিনী সরকারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে অস্ত্র জমা দিলেও তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে বিশ্বাস করা যায় না, কেননা পাহাড়ে অস্ত্রবাজী এবং চাঁদাবাজী রয়ে গেছে আগের মতোই। পাহাড়ে সংগঠিত বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখে বুঝা যায় ধীরে ধীরে তারা অস্ত্রের মজুদ রাড়িয়ে আরো শক্তিশালী হচ্ছে। মাঝে-মধেই জেএসএস নেতাদের আবারো জঙ্গলে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠার হুমকি থেকেও এটা প্রমাণিত। তাছাড়া কোন অপকর্ম করে বিচারের সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা যদি না থাকে তাহলে অপরাধীরা তো তাদের অপকর্মে উৎসাহ পাবেই। তাই মানবাধিকার এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই পাকুয়াখালী গণহত্যা সহ সকল হত্যাকান্ডের তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। অন্যথায় পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা কোনদিনই সফল হবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক অবকাঠামো স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও প্রভাব

পারভেজ হায়দার:
বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত পার্বত্য জেলাসমূহে প্রায় ১২টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী এবং বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ অঞ্চলের মানুষগুলোকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে মনে করা হয়। অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীকে দেশের অন্যান্য এলাকার জনগণের সমপর্যায়ে আনার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচীর পাশাপাশি দেশী/বিদেশী এনজিও সমূহের অংশগ্রহণ এই অঞ্চলের অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে সহায়তা করছে।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতি শরণার্থীদের জন্য সরকার নিয়মিত রেশন প্রদান ও অন্যান্য সহায়তা করে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকার ভূমি দেশের অন্যান্য এলাকার মত নয়। পার্বত্য এই ভূখন্ডের শুধুমাত্র শতকরা একভাগ জমি পাহাড়সমূহের মাঝে অবস্থিত সমতল, ২% জমি সামান্য উঁচু, ৫% জমি স্বল্প উঁচু পাহাড়ের ভ্যালী এবং ৯২ ভাগ জমি উঁচু এবং মাঝারি আকারের পাহাড়ে পরিবেষ্টিত। তবে সময়ের প্রয়োজনে ব্যাপকহারে পাহাড় কেটে ফেলায় বর্তমানে উক্ত শতকরা হিসাবের সামান্য হেরফের হতে পারে। অর্থাৎ এই অঞ্চলে কৃষির মাধ্যমে উৎপাদনযোগ্য শস্য ভূমির পরিমাণ কম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী ও পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর জন্য ঐ এলাকার শস্যভূমি যথেষ্ট নয়, আর চাষযোগ্য জমির একটি বড় অংশে ব্যাপক হারে তামাক চাষ করা হয়েছে।

পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী জনগোষ্ঠী জুম চাষে অভ্যস্ত। ইতিপূর্বে তারা প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর অন্তর এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে গিয়ে জুম চাষ করত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পার্বত্য এলাকাগুলোতেও এসেছে। পার্বত্য এলাকার মানুষের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সঠিকভাবে না পাওয়ার যে উদাহরণ বিগত বছরগুলোতে ছিল বর্তমানে সেই অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন এনজিও কর্মীগণ এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যক্তিবর্গের পরামর্শে পার্বত্য এলাকার মানুষ তাদের পাহাড় বেষ্টিত ভূমির কার্যকরী ব্যবহার শিখেছে।

এমনকি একই জমিতে MTO (Multi Tier Orchard) পদ্ধতি ব্যবহার করে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, উদাহরণস্বরূপ, জলপাই এর বাগানে কলা, আনারস আমের বাগানে কলা ইত্যাদি। যে সমস্ত ভূমিতে ইতিপূর্বে জুম চাষ হতো ঐ সকল জমির একটি বড় অংশে বর্তমানে আম, লিচু, কলা ও জলপাই এর ব্যাপকহারে চাষাবাদ হচ্ছে।

ইতিপূর্বে পাহাড়ী সমাজে মহিলারা শুধুমাত্র কাজ করত আর পুরুষরা অলস সময় কাটাত। কিন্তু বর্তমানে তাদের অভ্যাসেরও পরিবর্তন হয়েছে। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর পুরুষ ও মহিলাগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ফ্যাক্টরী এবং দপ্তরসমূহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙ্গালী অধিবাসীগণ অর্থনৈতিকভাবে ও শিক্ষায় অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও সরকারী বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন ছোট ছোট ক্ষুদ্র কৃষি ও মৎসভিত্তিক প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে বসবাসরত বাঙ্গালী ও পাহাড়ীদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণ বিভিন্ন ফলজ, মৎস ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রজেক্টের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং ঐ পণ্যসমূহ বিভিন্ন ফ্যাক্টরীর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় অর্থনৈতিকভাবে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

একটি এলাকায় অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে তোলার জন্য যে পূর্বশর্ত রয়েছে তা হলো জ্বালানি, গ্যাস, প্রয়োজনীয় জমি এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো সমাধানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সহজেই উৎসাহিত হয়। অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরীর পূর্ব শর্তসমূহ সূচারু রূপে পূরণ করা পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোর মত বাংলাদেশের অনেক স্থানেও হয়তো সম্ভব হয় না। কিন্তু একটি এলাকায় শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে উপরে উল্লেখিত পূর্ব শর্তসমূহের একটি প্যাকেজ সমাধান সম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার উপজাতি নারী ও পুরুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান বিশেষ করে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় বিভিন্ন তৈরী পোশাক শিল্প ও ইপিজেড সমূহে কর্মরত আছে। তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের মধ্যে অনেক বেকার নারী ও পুরুষ রয়েছে, সুযোগ পেলে তারা তাদের বেকারত্ব দূরীকরণসহ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

বাংলাদেশ সরকারের রূপকল্প ২০৪১ এর অংশ হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এরই অংশ হিসাবে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ হাজার একর জমির উপর দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক জোন নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের পূর্ব শর্তসমূহ যেমন জ্বালানী, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জনশক্তি ইত্যাদি নিশ্চিত করার জোর সম্ভাবনা থাকায় মিরসরাই এর ইপিজেড এ দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়াও চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে ৭০০ একর এবং গোহিরাতে ৫০০ একর জমির উপর অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।

শুধুমাত্র মিরসরাই এর অর্থনৈতিক জোনে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরী হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মাষ্টারপ্লান অনুযায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধাদির কাজ এগিয়ে চলছে। এ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কয়েকটি বিদেশী কোম্পানীর নিকট থেকে প্রস্তাব পেয়েছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক জোনের জন্য প্রয়োজনীয় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর অবশিষ্ট সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। মিরসরাই এলাকাতে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর অন্যতম কারণ হলো চট্টগ্রাম বন্দর হতে মাত্র ৬৭ কিঃ মিঃ দূরে এর অবস্থান। এই অর্থনৈতিক অঞ্চল হতে উৎপাদিত রপ্তানীযোগ্য পণ্য অতিদ্রুত জাহাজীকরণ এবং আমদানীকৃত পণ্য দ্রুত খালাস করে ফ্যাক্টরিতে নেওয়া সম্ভব হবে।

ভৌগলিক অবস্থানসহ অন্যান্য যে সমস্ত সুবিধার কারণে মিরসরাই, আনোয়ারা বা গোহিরাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার সকল সুবিধাদি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে সৃষ্টি করা সম্ভব। উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরীর পূর্ব শর্ত যেমনঃ জ্বালানী ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি উন্নয়নে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে উৎপাদিত বিভিন্ন ফলজ সম্পদকে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প যেমনঃ পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল প্লান্ট, তথ্য প্রযুক্তি ইত্যাদি শিল্প স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে কর্মঠ উপজাতি ও বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী।

উদাহরণস্বরূপ তিন পার্বত্য জেলার একমাত্র পোশাক শিল্প কারখানা বান্দরবান জেলায় অবস্থিত ‘লুম্বিনী গার্মেন্টস’ এর সাফল্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সিদ্ধান্ত রয়েছে তার মধ্যে অন্তত কয়েকটি পার্বত্য জেলাগুলোতে স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ব্যক্তিগতভাবে এই অঞ্চলের বেকার নারী ও পুরুষগণ উপকৃত হবে।

পার্বত্য অঞ্চলের জেলাসমূহে সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে যদি কখনও পরিকল্পনামাফিক অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী হয় তাহলে এখানে অনেক বিদেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। অর্থনৈতিক অবকাঠামোসমূহে বিদেশী বিনিয়োগ শুরু হলে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক পর্যটন শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনে ও সহায়তায় এই অঞ্চলে ব্যাপকহারে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যটন শিল্পের প্রভৃত উন্নয়ন সাধিত হবে যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনেকেই হয়তো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর তৈরীর বিরুদ্ধে কথা বলবেন, তারা হয়তো এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতও সামনে দাঁড় করাবার চেষ্টা করবেন। এটা ঠিক, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক রাজনীতির বিভিন্ন পরিক্রমায় এই অঞ্চলে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪টি সশস্ত্র দল তৈরী হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, বাঙ্গালীদের অনেকেই তাদের বেকারত্বের কারণে বিভিন্ন পাহাড়ী সন্ত্রাসী দলের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের একথাও স্মরণ রাখতে হবে যারা এ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের একটি বড় অংশের নীতিগত অবস্থান আদর্শগত নয়। এদের অধিকাংশই স্বল্পশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত আবার যারা শিক্ষিত তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট সন্ত্রাসী দলের নেতৃবৃন্দ জোর করে আটকিয়ে রেখেছে। ধারণা করা যায়, উপজাতি সন্ত্রাসী দলসমূহের একটা বড় অংশই নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিয়েছে বা নিতে বাধ্য হয়েছে।

যতটুকু জানা যায়, সন্ত্রাসী দলের কর্মীগণ অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ঠ লাভবান হন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভাতা হিসাবে যে টাকা দেয়া হয় তা দিয়ে সম্মানজনকভাবে জীবন নির্বাহ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী করা হলে বিপথগামী এই পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ও কর্মহীন বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে ঐ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যোগদান করতে উৎসাহিত হবে বলে আশা করা যায়। একই সাথে ঐ সময় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে একটি সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবন বেছে নেওয়ার জন্য চাপ থাকবে। আর এসব কিছু নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা সময়ের প্রয়োজনে এমনিতেই চলে আসবে।