খাগড়াছড়িতে স্কুল উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্প ও বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখল

নিজাম উদ্দীন লাভলু:

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ও ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠাসহ নানা কৌশলে বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় জায়গা, নিরাপত্তাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্প ও সরকারি খাস খতিয়ানের ভূমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) এসব ভূমি দখল প্রক্রিয়ার নেপথ্যে থাকার অভিযোগ উঠেছে। দখল করা জায়গায় অন্যত্র থেকে উপজাতীয় পরিবারদের এনে পুর্নবাসন এবং বৌদ্ধ বিহার, কিয়াং ইত্যাদি ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা হচ্ছে।

আশির দশকে তৎকালীন শান্তিবাহিনীর জ্বালাও পোড়াও এবং হত্যাযজ্ঞের মুখে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বসতবাগিচা ফেলে আসা বাঙ্গালি পরিবারদের ঐসব জায়গাগুলোর অধিকাংশই ইতোমধ্যে দখল হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের হাতে দখল হওয়া ভূমি উদ্ধারে প্রশাসনের কোন সহানুভূতি- সহযোগিতাও তারা পাচ্ছেন না তারা। ফলে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে পার্বত্য এলাকা ছেড়ে সমতল জেলায় চলে গেছেন।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রামগড়ের দুর্গম এলাকা ছোট বেলছড়ি, গরু কাটা, লালছড়ি, সাতক্ষীরা পাড়া, তৈছাগাড়া, থানাচন্দ্র পাড়া, গৈয়াপাড়া প্রভৃতি এলাকায় বাঙ্গালীদের প্রায় দেড়শ একর রেকর্ডীয় জায়গা জোর করে দখল করে নেওয়া হয়েছে।



ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালিদের এসব ভূমি দখলে প্রত্যক্ষভাবে মদদ ও সহযোগিতা দিচ্ছে। দখল করা এসব জায়গার মধ্যে দক্ষিণ লালছড়িতে জগদীশ চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তির রেকর্ডীয় তিন একর ভূমি কথিত স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে।

জগদীশ পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০০৮ সালে ইলিয়াছ মিয়া নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে রামগড় মৌজার ১০২ নং হোল্ডিংয়ের তিন একর টিলা ভূমি কিনে নিজ নামে রেজিষ্ট্রি করার পর সেখানে বনজ গাছের বাগান সৃজন করেন। সম্প্রতি একটি উপজাতি সন্ত্রাসী গ্রুপের লোকজন বাগানের সমস্ত গাছগাছালি কেটে জায়গাটি জোরপূর্বক দখল করে। তারা স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে ঐ জায়গার উপর একটি ঘরও নির্মাণ করেছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা জগদীশেকে প্রাণ নাশের হুমকীও দিয়েছে’ বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হতে দুর্গম লালছড়ি এলাকায় সরেজমিন পরির্দশন করে দেখা যায়, জনবসতিহীন গভীর বনের মধ্যে পাহাড়ের চূড়ায় টিনের ছাউনীর একটি লম্বা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী এলাকার জনৈক ব্যক্তি জানায়, ‘ভিতরের পার্টি’র লোকেরা (পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপকে স্থানীয়রা ভিতরের পার্টি নামে আখ্যায়িত করে) রাতের আধাঁরে ঘরটি নির্মাণ করেছে।

তিনি আরও জানান, জায়গাটি দখল করার জন্যই স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে ঘরটি তৈরী করা হয়।

রামগড় উপজেলা নির্বাহি অফিসার(ভারপ্রাপ্ত) একেএম মোর্শেদ স্কুল প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের জায়গা দখলের অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কতিপয় উপজাতি যুবক স্কুল চালু করার অনুমতির জন্য তার কাছে এসেছিল। জায়গার বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তিনি অনুমতি দেননি।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে জানা যায়, লালছড়ি এলাকার পার্শ্ববর্তী সাতক্ষীরা পাড়া ও ছোট বেলছড়ি পাড়ার প্রায় ৩০টি বাঙ্গালী পরিবার সন্ত্রাসী গ্রুপের নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি, বাগানবাগিচা ফেলে অন্যত্র চলে গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের দুর্গম ছোট বেলছড়িতে ২০-২৫টি বাঙ্গালি পরিবার ছিল। ২০১৫’র মে মাসে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা দুটি বাঙ্গালি পরিবারের ওপর প্রথম হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা ঐদিন পরিবার দুটির তিনজন নারীকে গণধর্ষণসহ বেদম মারপিট করে ১০-১২জনকে আহত করে। তারা ঘরবাড়ি ভাংচুর ও মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

এ ঘটনায় রামগড় থানায় মামলা করার কারণে সন্ত্রাসীরা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরবর্তীতে বাঙ্গালী পরিবারগুলোর বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ, হামলাসহ লাগাতার নির্যাতন নিপীড়নের কারণে সবাই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। একই কায়দায় সাতক্ষীরা পাড়ার ৭টি পরিবারের ওপর নানা নির্যাতন চালিয়ে তাদের মধ্যে ছয়টি পরিবারকে এলাকা ছাড়া করা হয়।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সাতক্ষীরা পাড়ার ইমান আলীর ফেলে যাওয়া মাটির তৈরী দুটি বসতঘর পরিত্যক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়। জানা যায়, বাঙ্গালী পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে তাদের ফেলে যাওয়া জায়গাতে উপজাতীয় পরিবারদের এনে বসতি গড়ে দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, রামগড় ইউনিয়নের ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজার তৈচাগাড়া, থানা চন্দ্র পাড়া ও গৈয়াপাড়া এলাকায় ১৪টি বাঙ্গালী পরিবারের প্রায় ৭০ একর রেকডীয় টিলা ভূমির গাছপালা কেটে কাঁচাঘর নির্মাণ করে কতিপয় উপজাতি বসতি গড়ে তুলছে। ইতিমধ্যে ৫০-৬০টি উপজাতীয় পরিবার ঘর তৈরী করে সেখানে বসবাস শুরু করেছে।

ইউপিডিএফের প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে এসব উপজাতীয় পরিবারগুলোকে এনে বাঙ্গালীদের জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছে।

উত্তর লামকু পাড়ার বাসিন্দা সৈয়দের রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, তৈচাগাড়া পাড়ায় তার নামে রেকর্ডীয় ৮৭৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে সাড়ে ৩ একর এবং ২২৮ খতিয়ানে দুই একর জায়গা রয়েছে। সম্প্রতি কতিপয় উপজাতি জায়গার গাছপালা কেটে ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করে। বাধা দিলে ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা তাকে হুমকী দেয়।

তিনি বলেন, তৈচাগাড়া এলাকায় একইভাবে নজিরটিলার ফরিদ মিয়ার ২৩৭ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, সোনাইআগা গ্রামের নুরুল হকের ৭৪৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আবু সায়েদের ৫ একর, হানিফ মজুমদারের ৯২৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আবুল হোসেনের থানা চন্দ্র পাড়া এলাকায় ২০৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আব্দুল মালেকের ৫ একর, কালাডেবার নুরুল ইসলামের ৫ একর, বলিপাড়ার আবু আহম্মদের ৯৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, আহম্মদ উল্লাহর ৭৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, হেদায়েত হোসেনের ৮৬১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ৫ একর, সোনাইপুলের মো: শাহ আলমের ৫ একর ও দক্ষিণ বালুখালীর সুলতান আহমেদের গৈয়াপাড়ার ১০ একর টিলা ভূমি উপজাতীয়রা দখল করে নিয়েছে।

সোনাই আগার আব্দুল মান্নান পার্বত্যনিউজকে বলেন, ৫০-৬০টি উপজাতীয় পরিবার তাদের এ রেকর্ডীয় জায়গার উপর বসতি স্থাপন করে দখল করে নিয়েছে। ইউপিডিএফের সদস্যরা লক্ষ্মীছড়ি ও মানিকছড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে এসব উপজাতি পরিবারগুলোকে এনে ঘর বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। জায়গা উদ্ধারের জন্য তারা জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন অভিযোগ করেও কোন ফল পাননি।

রামগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলগের আহবায়ক শাহ আলম মজুমদার পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা বাঙ্গালিদের উচ্ছেদ করে তাদের বসতবাগিচা দখল করে নিচ্ছে। তার ইউনিয়নের বহু বাঙ্গালি পরিবারবাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।

বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় জমি দখলের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে রামগড় উপজেলার সহকারি কমিশনার(ভূমি) পার্বত্যনিউজকে জানান, অভিযোগকারীদের জায়গার বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছ্বদের জন্য তাদেরকে আদালতে মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এদিকে, ধর্মীয় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামেও বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি মালিকানাধীন, নিরাপত্তাবাহিনীর পরিত্যক্ত ক্যাম্পসহ সরকারি খাস ভূমি কৌশলে দখল করার তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, রামগড় ভূমি অফিসের আওতাধীন কুকিছড়া এলাকায় গত জুনে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একটি পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় একটি ঘর নির্মাণ করে সেখানে বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

একইভাবে, গত জুলাইয়ে মহালছড়ি ভূমি অফিসের আওতাধীন সিন্ধুকছড়ির তিন্ধুকছড়ি নামক এলাকায় নিরাাপত্তা বাহিনীর আরেকটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায় কেয়াং ঘর নির্মাণ করে জায়গাটি দখল করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এভাবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ৭টি পরিত্যক্ত ক্যাম্পের জায়গায় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার নামে জায়গাগুলো দখল করা হয়েছে।

তথ্যাভিজ্ঞমহল জানান, অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর প্রধান টার্গেট আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর এসব পরিত্যক্ত ক্যাম্প। আর ক্যাম্পের জায়গাগুলো দখলের হাতিয়ার হিসেবে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ধর্মীয় উপাসনালয়।

তন্মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীছড়ির কুতুবছড়ি বৌদ্ধ বিহার, নানিয়ারচরের জনবল বৌদ্ধ বিহার, জুরাছড়ি পাড়া, নাভাঙ্গাপাড়া বৌদ্ধ বিহার ও শিবের আগা। এছাড়া দীঘিনানলার সোনামিয়া টিলাসহ বাঙ্গালীদের অনেক জায়গাও উপাসনালয় প্রতিষ্টার নামে দখল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নানা কৌশলে বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি দখলের ব্যাপারে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো: শহিদুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে বলেন, তিনি এ জেলায় সদ্য যোগদান করেছেন। বিষয়টি এখনও পর্যন্ত কেউ তাকে জানায়নি। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে, বাঙ্গালিদের রেকর্ডীয় ভূমি ও পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় স্কুল ও উপাসনালয় নির্মাণের অভিযোগ সম্পর্কে ইউপিডিএফের(প্রসীত গ্রুপ) প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের সম্পাদক নিরন চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়িরা তাদের জায়গায় স্কুল ও উপাসনালয় নির্মাণ করছে। বাঙ্গালিরা ভূমির মালিকানার যেসব দলিলপত্র দেখাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন অনুযায়ী ঐসব কাগজপত্রের কোন বৈধতা নেই।

তিনি বলেন, পাহাড়ি ছেলে মেয়েরা যেন লেখাপড়া শিখতে না পারে সেজন্যই সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে প্রশাসন স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজেও বাঁধা দিচ্ছে। পরিত্যক্ত নিরাপত্তা ক্যাম্পের জায়গায় উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ক্যাম্পের জায়গার কোন দাবি করার সুযোগ নেই।

খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের ভূমি দখল মিশন: বাদ যাচ্ছে না সংখ্যালঘুর জমিও

দিদারুল আলম:
এখানে মাটির নিচে শুয়ে অাছে কোন না কোন বাঙ্গালী সন্তানের পিতা। যেখানে তাদের বংশ পরম্পরা বসবাস ছিলো। যে মাটিতে লেগে আছে বাঙ্গালী বাবা ভাইয়ের রক্ত সে মাটি কি সন্ত্রাসীদের আখড়ার জন্য ছেড়ে দিতে হবে- দু’চোখে বেদনার অশ্রুর প্লাবন ঝরিয়ে প্রতিনিধির কাছে ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বললেন পার্বত্য অধিকার ফোরাম নেতা মো. মাইনুদ্দীন।

সম্প্রতি গুইমারা, মাটিরাঙ্গা ও রামগড়ে বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত ও সরকারী খাস জমি ইউপিডিএফ কর্তৃক একের পর এক দখল কাণ্ডে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, প্রশাসন এখানে অসহায়। ইউপিডিএফ একেরপর এক ভূমি দখল করেই যাচ্ছে আর প্রশাসন মাপজোখ, দলিল খতিয়ান চেক করার নামে সময়ক্ষেপণ করছে।

পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বাঙ্গালী বা সরকারী খাস জমি দখল করার চিরাচরিত পন্থা হচ্ছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নামে জোর করে জায়গা দখল ও পরে ভাগ করে নেয়া অথবা নিজেদের দলীয় কাজে ব্যবহার করা। কখনো এসব জমি নিজ দলীয় ক্যাডারদের মাঝে ভাগ করেও দেয়া হয়।

শুধু খাস জমি বা বাঙালীদের কবুলিয়ত প্রাপ্ত জমিই নয়, এই ষড়যন্ত্রের কবল থেকে সেনা বাহিনীর পরিত্যাক্ত স্থাপনা বা ক্যাম্পগুলোও রক্ষা হচ্ছে না। অবস্থান ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের প্রধান আকর্ষণ পরিত্যাক্ত ক্যাম্পগুলো। আর ক্যাম্পের জায়গা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম। পাহাড়ের নিরস্ত্র, অসহায়, নিরীহ জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল নিরাপত্তা বাহিনী।



কিন্তু আজ তাদের ক্যাম্পের জায়গাই দখল হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভেঙে পড়ছে সাধারণ মানুষের ভরসা ও নিরাপত্তার চিন্তা। সকলের মনে এখন একটিই প্রশ্ন, উপজাতীয় সন্ত্রসীদের এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে মুক্তি কীভাবে হবে? কবে পাওয়া যাবে মুক্তি?

খাগড়াছড়ির রামগড়ে সংখ্যালঘু পরিবারের একমাত্র জমি জোরপূর্বক দখল করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপ স্কুলের নামে নিজেদের ট্রেনিং সেন্টার বানানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মে (বুধবার) রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের গরুকাটা এলাকার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসিন্দা জগদীশ চন্দ্র নাথ (৫৫) এর জায়গা জোরপূর্বক দখল করে একটি স্কুল ঘর তুলেছে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র দলের কিছু সদস্য। এভাবে তারা পার্বত্য অঞ্চলে বহু বাঙ্গালীর বসতভিটা, বন্দবস্তকৃত বৈধ ভূমি জবর দখল করে নিয়েছে অস্ত্রের মুখে।

সম্প্রতি, রামগড় বিজিবি জোনের খাগড়াবিল সিআইও ক্যাম্প থেকে টহল দল ঘটনাস্থলে গেলে স্থানীয়রা জানান, উক্ত জায়গায় স্কুল ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে রাতের আঁধারে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ স্কুল ঘরের ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে ফেলে।

এদিকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর (রবিবার) স্কুলের নামে তথাকথিত ট্রেনিং সেন্টারটি প্রশাসনের নজর এড়াতে স্কুলের নাম দিয়ে ৪ জন উপজাতি রামগড় উপজেলা শিক্ষা অফিসে একটি আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে অফিস সহকারী আবেদনটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে কথা বলে আবেদনটি জমা দিতে বলেন। এরপর ঐ ৪ উপজাতি ব্যক্তি জগদীশ চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে ‘জমিটি স্কুলের নামে লিখে দিতে হবে- না হয় জীবন শেষ করে ফেলার’ হুমকি দেন। এই ভয়ে জগদীশ চন্দ্র কোন অভিযোগ দিতে বা হুমকিদাতাদের নাম বলতে রাজি হননি।

পরে ঐ ৪ উপজাতি ব্যক্তি কর্তৃক আবেদনটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট জমা দেওয়া হলে সেখান থেকে হুমকিদাতাদের সণাক্ত করতে সক্ষম হয় প্রশাসনসহ অন্যন্যরা। আবেদনে বিষু ত্রিপুরার নাম থাকায় রামগড় বিজিবি তাকে খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু বিষু পলাতক থাকায় তাকে খুঁজে পায়নি বলে জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রামগড় বিজিবি জোন উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করে। সংখ্যালঘুর জমি জোরকরে দখল করার কারণে উপজেলা প্রশাসন আবেদন গ্রহণ করেনি।

জগদীসের স্ত্রী মিনু বালা বলেন, জমি হারিয়ে শোকে তার স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রামগড় হাসপাতাল চট্রগ্রাম নিয়ে যেতে বলছেন। দুই সন্তান আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন। এই জমিটা ছাড়া তাদের অন্য কোন জমি নেই।

বিগত দশ বছর আগে অনেক কষ্টে নিজের হাতের বালাসহ অন্যান্য জিনিস বিক্রি করে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে জমিটি ক্রয় করেছিলেন তারা। আর সে জমি জোর করে নিয়ে যাচ্ছে সেটা জগদীস সইতে না পেরে রীতিমত অসুস্থ। এখন স্বমীকে চিকিৎসা করবে নাকি জমি রক্ষা করবে সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না মিনু বালা।

এ বিষয়ে স্কুল নির্মাণের মূল হোতা বিষু ত্রিপুরার নিকট মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি পার্বত্যনিউজকে ইউপিডিএফের ট্রেনিং সেন্টার তৈরির কথা অস্বীকার করে বলেন, আমাদের এলাকায় কোন স্কুল না থাকায় আমরা এলাকাবাসীরা এক হয়ে স্কুলটি করেছি। তবে জমির মালিকের নিকট থেকে লিখিত কাগজ না নেওয়ায় তাদের ভুল হয়েছে মর্মে জানান তিনি।

জমির মালিক মৌখিকভাবে জমি দিবে বলায় আমরা স্কুলের কাজ করেছি। ইউএনও অফিসে আবেদনও করা হয়েছে। কিন্তু বিজিবির সদস্যরা কেন আমাদের সাইনবোর্ড নিয়ে গেছে তারা জানে না। পার্বত্যনিউজের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, জমির মালিককে কোন ক্ষতিপূরণ দেননি। বর্তমানে স্কুলের কাজ বন্ধ রয়েছে।

এ বিষয়ে পতাছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, কারো যদি স্কুলের প্রয়োজন হয় তাহলে প্রশাসনসহ সকলের সহযোগিতা নিয়ে স্কুল তৈরি করবে। সরকারী খাস জায়গার কোন অভাব নেই পাতাছড়ায়। স্কুলের নামে জোর করে বাঙ্গালীদের জমি দখল করা কারো প্রত্যাশিত হতে পারে না। তিনি এসব জোরপূর্বক দখলের বিষয়ে নিন্দা জানান।

রামগড় থানার অফিসার ইনচার্জ এভাবে জোর করে জমি দখল করার বিষয়ে নিন্দা জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, ভুক্তভোগী কেউ থানায় আসেনি আসলে আইনগত ব্যবস্থা নিবো।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, ৪জন উপজাতি ব্যক্তি স্কুলের নামে একটি আবেদন নিয়ে এসেছিলেন। রামগড় জোন সদর থেকে জানতে পেরেছি জগদীস চন্দ্র নাথ নামে এক ব্যক্তির জায়গায় জোর করে স্কুল তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি অবগত থাকায় স্কুলের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন থেকে কোন অনুমতি দেয়া হয়নি।

সাম্প্রতিক ভুমি দখলের আরো কিছু ঘটনা

১. জেলার মানিকছড়িতে গত ২৩ মে ২০১৮ তারিখে দুইজন বাঙ্গালী মো. জামাল উদ্দিন ও আনোয়ারুল ইসলাম এর মালিকানাধীন জায়গায় উপজাতী রিপ্রুচাই মারমা (৪০) জোর করে জঙ্গল পরিস্কার করে ঘর নির্মাণ করলে উভয়পক্ষে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে।

পরবর্তীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের ফলে বৈধ কাগজপত্র না দেখানো পর্যন্ত উক্ত জমিতে উভয় পক্ষের কেও প্রবেশ করিবে না মর্মে সম্মত হয়।

২. সিন্দুকছড়ির তিন্দুকছড়িতে পরিত্যাক্ত আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন পাশ্ববর্তী টিলায় গত ৪ জুলাই ২০১৮ টিন দিয়ে একটি নতুন ঘর তৈরি করে এই সন্ত্রাসী দল।

ইউপিডিএফ সমর্থিত সিন্দুকছড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রেদাক মারমা বলেন, প্রথমে তিনি নিজে এ ব্যাপারে অবগত নন। পরে বলেন, ভূলবশতঃ জনৈক ব্যক্তি কর্তৃক ঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে, ঘরটি পরদিন সরিয়ে নেয়া হবে বলে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল সদস্যদের জানান। কিন্তু ৫ জুলাই ২০১৮ তারিখে, রাতের আধাঁরে উক্ত ঘরে ১০ ইঞ্চি উচ্চতার একটি বৌদ্ধ মূর্তি স্থাপন করে জায়গাটি দখলে নেয় তারা।

পরবর্তীতে, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানিকছড়ি উপজেলার ভূমি কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে উক্ত জায়গার মালিকানা যাচাইপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়। বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস কর্তৃক জায়গার মালিকানা যাচাই এর কার্যক্রম চলমান। সিন্দুকছড়ি জোন থেকে মহালছড়ি ভূমি অফিসকে সার্ভে করার জন্য পত্র লেখা হয়। মহালছড়ি ভূমি অফিস হতে ১টি সার্ভেয়ার টীম গত ২৮ আগষ্ট ২০১৮ তারিখে সিন্দুকছড়ি জোনের টহল দলের সাথে উক্ত স্থানে গমন করে এবং উক্ত এলাকা সার্ভে করে। সার্ভে টীম কর্তৃক সরেজমিনে সার্ভে করার পর জানানো হয় যে উক্ত জায়গাটি ৫৫ নং দাগের অর্ন্তভূক্ত এবং এটি সরকারী খাস জমি যা পাহাড়ীরা জোরপূর্বক দখল করেছে।

৩. মাটিরাঙ্গার কুকিছড়া এলাকায় গত ২৪ জুন ২০১৮ তারিখে সেনাবাহিনীর পরিত্যাক্ত ক্যাম্পের জায়গায় একটি কিয়াং ঘর নির্মাণ করছে শুনে নাইক্যাপাড়া আর্মি ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনা স্থলে গিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য, পাড়ার কারবারীদের নিকট জানতে চান, কেন কোন প্রকার অনুমতি বা তথ্য ছাড়া এই কিয়াং ঘর নির্মাণ করা হয়েছে? তখন স্থানীয় উপজাতীয়রা অনুমতিপত্র ছাড়া কাজ করবে না মর্মে জানালেও পরবর্তীতে ২০-২১ মে ২০১৮ উক্ত পরিত্যক্ত ক্যাম্পে কিয়াং ঘর স্থাপনের কাজ পুণরায় শুরু করে।

ইতোমধ্যে কিয়াং ঘরের নির্মাণ কাজ প্রায় সমাপ্ত হয়েছে এবং উক্ত কিয়াং ঘরে ৮ (আট) ফুট উচ্চতার একটি বৌদ্ধমূর্তিও স্থাপন করেছে তারা। কিন্তু কিয়াং ঘরটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহার এখনও শুরু হয়নি।নির্মাণাধীন উপাসনালয়টির প্রায় ৩০০ গজ রেডিয়াসের ভেতর আরো ২ টি উপাসনালয় রয়েছে। তাছাড়া দূর্গম পাহাড়ী এলাকাটি এত ঘনবসতি নয় যে সেখানে আরো উপাসনালয় নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত পরিত্যক্ত এই সেনাক্যাম্পের জায়গাটি দখল করে তাদের আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহারের জন্যই এই কিয়াংটি নির্মাণ করা হয়েছে।

৪. রামগড় তৈছাগাড়া, থানা চন্দ্রপাড়ায় গত ৩ জুন ২০১৮ তারিখ ১০ জন বাঙ্গালীর সর্বমোট ৭০.৫০ একর জায়গা উপজাতীয় ব্যক্তিবর্গ ছোট ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে দখলে নেয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালীরা উক্ত জায়গার মালিকানা দাবী করে তাদেরকে বাধা প্রদান করলে উপজাতীয়রা বলেন, এ এলাকার জায়গাসমূহ বেনামী (কারো নামে রেকর্ডভূক্ত নয়) এবং ইউপিডিএফ (মূলদল) এর সদস্যরা তাদের এখানে এনে বসিয়েছে। এ সময় ইউপিডিএফ (মূল দল) এর সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বাঙ্গালীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বলেও জানা যায়।

অভিযোগ প্রাপ্তির পর রামগড় বিজিবি জোন থেকে টহল দল উক্ত স্থানসমূহে যায় এবং বাঙ্গালীদের নামে রেকর্ডকৃত জায়গা হওয়ায় উপজাতীয়দেরকে জবরদখলকৃত স্থান থেকে নিজের ভূমিতে ফেরত যাওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়। তথাপি, ও উপজাতীয়রা ঘটনাস্থল ত্যাগ না করে উক্ত স্থানে এখনো বসবাস করছে।

৫. গত ১৮ জুলাই ২০১৮ রামগড় জোনের আওতাধীন
পাতাছড়া ইউনিয়নের গৈয়াপাড়া এলাকায় জনৈক বাঙ্গালী মো. সুলতান আহমেদ (৭০) এর মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর ইন্ধনে উপজাতীয়রা ৩/৪টি বাড়ী নির্মাণ করেছে মর্মে রামগড় জোন সদর জানতে পারে। উল্লেখ্য, উক্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাহিরে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলায় অবস্থিত।

পরবর্তীতে, আরো জানা যায় যে, উক্ত পাড়ার জনৈক চিকন কারবারী কর্তৃক লক্ষীছড়ি এলাকা হতে ৩টি উপজাতীয় পরিবারকে ঘর নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। রামগড় জোন সদর কর্তৃক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করা হয়।

মো. সুলতান আহমেদ রামগড় জোন সদরে উপস্থিত হয়ে বেআইনীভাবে বসবাসকারী উপজাতীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর সহায়তায় তারা বাড়ী নির্মাণ করেছে মর্মে জানায়।

এই সময় রামগড় জোন সদরের পরামর্শ অনুয়ায়ী বাদী সুলতান আহমেদ রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। দখলকারী তিনটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার উক্ত স্থান হতে চলে গেলেও দুইটি পরিবার এখনও আছে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয় নাই। মো. সুলতান আহমদের ৫ একর জমির টিলা গাছ কেটে পরিস্কার করে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) সন্ত্রাসীরা ৩টি ঘর নির্মাণ করে পাহাড়ী পরিবারকে দিয়েছে।

উক্ত ঘটনাটি রামগড় জোনের অধীনস্থ খাগড়াবিল বিজিবি ক্যাম্প থেকে ৫ কি. মি. দক্ষিণে গৈয়াপাড়া মনকুমার চাকমাপাড়া। উক্ত ঘরগুলোতে এখনও পাহাড়ী পরিবার বসবাস করছে। সেখানে জমির মালিক সুলতান আহমেদ বসবাস করেন না। তিনি স্বপরিবারে পার্শ্ববর্তী দাতারামপাড়া এলাকায় বসবাস করেন।

৬. গত ২০ আগস্ট ২০১৮ রামগড় উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের আওতাধীন সোনাইআগা নোয়াপাড়া নামক স্থানে বসবাসকারী মো. আব্দুল মান্নান (৪২) কে ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর ১০-১২ জন সন্ত্রাসী মারধর করে আহত করে। পরবর্তীতে, স্থানীয়রা আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

আব্দুল মান্নানের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, ইউপিডিএফ (প্রসীত গ্রুপ) এর সন্ত্রাসীরা সোনাইআগা নোয়াপাড়া থেকে বাঙ্গালীদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে উক্ত এলাকা পাহাড়ীদের বলে দাবী করে। আব্দুল মান্নান কর্তৃক রামগড় থানায় একটি জিডি এন্ট্রি করা হয়েছে এবং উক্ত বাড়ীতে আব্দুল মান্নান এখনও বসবাস করছেন। সন্ত্রাসীদের ভয়ে সে স্থান থেকে বের হতে সাহস করছে না।

এভাবেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি আগ্রাসন চালাচ্ছে। এ কাজে জনগণ ও মিডিয়ার সমর্থন পেতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে। ফলে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে অসহায় হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও প্রাণের হুমকির ভয়ে ক্ষতিগ্রস্তরাও অসহায় ।

এ ব্যাপারে কথা বলতে ইউপিডিএফ প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের মুখপাত্র নিরন চাকমার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইলে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

তবে ইউপিএফ কেন্দ্রীয় নেতা ও সংগঠক মাইকেল চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, যে স্থানে স্কুলটি নির্মিত হয়েছে সেখানে মূলত কখনো কোন বাঙ্গালীর বসবাস ছিল না। যদি কেউ জমির মালিক হয়ে থাকে তাহলে সে আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। স্কুলটি এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত হলেও ইউপিডিএফের সহযোগিতা ছিলো বলে তিনি স্বীকার করেন।

তিনি আরো বলেন, সারা দেশে আওয়ামীলীগ, বিএনপি স্কুল তৈরি করে, আমরা কি সহযোগিতাও করতে পারবো না।

রামগড়ে ভূমি দখলের আড়ালে ইউপিডিএফের নেতৃত্বে চলছে বাঙালী উচ্ছেদ মিশন

সন্তোষ বড়ুয়া

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উপজাতি স্বার্থান্বেষী মহল নিয়মিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন পত্রিকা, মিছিল, মিটিং, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান, হরতাল, স্কুল-কলেজে ক্লাস বর্জনসহ নানা ধরণের পদক্ষেপ তারা গ্রহণ করে থাকে। তাদের এই মিথ্যা অপপ্রচারের গণ্ডি শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা এমনকি বিদেশেও তারা এই অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় এই যে, তাদের এই অপপ্রচারে সরাসরি সহযোগিতা করছে দেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।

আমার আজকের লেখার বিষয় হল পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলাকে নিয়ে এমনই কিছু মিথ্যাচার আর সেখানে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ে।

রামগড়ে গত বেশ কিছুদিন যাবত ভূমি নিয়ে সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপজাতিদের অভিযোগ সেখানকার স্থানীয় বাঙালি এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করছে, তাদের বসত-ঘর ভেঙ্গে দিচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের এই অভিযোগসমূহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বেশ ঘটা করে তারা প্রচারও করছে। অভিযোগ যেহেতু গুরুতর তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি রামগড়ে সরেজমিনে তদন্তের জন্য রাঙামাটি থেকে ছুটে গেলাম।

সেখানকার স্থানীয় জনসাধারনের সাথে কথা বলে যে তথ্য সংগ্রহ করেছি তাতে একটা বিষয় পরিস্কার যে ভূমি নিয়ে উপজাতিদের উত্থাপিত সকল অভিযোগ মিথ্যা।

স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায় যে, রামগড় এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকাটি মূলতঃ আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের আধিপত্যপূর্ণ এলাকা। সশস্ত্র ঐ সংগঠনটি রামগড় এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণসহ নানান ধরণের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত। তাদের এই সশস্ত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রমে প্রধান বাধা নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। আর সে কারণেই তারা নিরাপত্তাবাহিনীকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বানোয়াট আর বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার করে গুজব সৃষ্টি করে আসছে। শুধু অপপ্রচারেই তারা ক্ষ্যান্ত নয়। সুযোগ পেলে তারা নিরাপত্তাবাহিনীর উপর হামলা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ৫ জুন ২০১৭ তারিখে পুলিশের ওপর ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের পেট্রোল বোমা ও ককটেল নিক্ষেপ, ৭ জুন ২০১৭ তারিখে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কর্মীদের কর্তৃক বিজিবি ও পুলিশের উপর হামলা, ৮ মার্চ ২০১৮ তারিখে ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল ইউমেন্স ফেডারেশন কর্তৃক পুলিশের উপর হামলার চেষ্টা ইত্যাদি।


এ সংক্রান্ত আরো লেখা:
নতুন কৌশলে পাহাড়ীদের ভূমি দখল: পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালী বিতাড়নের নীল নকশা


ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সশস্ত্র দলের অস্ত্রের মুখে স্থানীয় জনসাধারণও অতিষ্ঠ। কিন্তু প্রাণ ভয়ে তারা কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। নামপ্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় উপজাতি এবং বাঙালিরা ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সশস্ত্র দলের বেশ কিছু সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ঘটনার বর্ণনা করেছেন পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকেও এর সত্যতা পেয়েছি। এর কিছু উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১। ১৬ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, রামগড়ের দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম অন্তুপাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের কয়েকজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী আকস্মিকভাবে এসে চাইন্দে মারমা নামক এক ব্যক্তির বসতঘর ও রান্নাঘর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়।

২। ২৭ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখে, তৈচাগাড়া বাটনাশিবির নামক স্থানে মো. হানিফ মজুমদার (৬৫), মো. আবু সাইদ (৫৫) এবং মো. ওবাইদুল হক (৫০) নামক তিনজন বাঙালির মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের লোকজন জোরপূর্বক বসত-ঘর তৈরী করে। কিন্তু ইউপিডিএফ কর্তৃক তৈরীকৃত ঘরগুলো উক্ত জমির মালিকরা ভেঙ্গে দেয়। পরবর্তীতে, বাঙালিরা তাদের বসত-ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে মর্মে অপপ্রচার চালায় ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা।

৩। ৪ মার্চ ২০১৮ তারিখে, পাকলাপাড়া নামক স্থানে নিজ বাসা থেকে অজ্ঞাতনামা উপজাতি অস্ত্রধারীরা (স্থানীয়দের দাবী ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ) চাইথুই মারমা (৫৫)নামক একজনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

৪। ২১ মার্চ ২০১৮ তারিখে, পাতাছড়া ইউনিয়নের কলাবাড়ি নামক স্থানে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের সন্ত্রাসীদের গুলিতে সিএনজি চালিত অটো রিক্সার চালক শরীফুল ইসলাম(২৬) আহত হয়। একই স্থানে অপর একটি অটো রিক্সায় ছোঁড়া ইটের আঘাতে দেড় বছরের একটি শিশুও আহত হয়।

৫। ৪ জুন ২০১৮ তারিখে পার্বত্যনিউজ ডট কম পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা যায় যে, রামগড় ইউনিয়নের ২২৯ নম্বর রামগড় মৌজার তৈচাগাড়া ও থানা চন্দ্র পাড়া এলাকায় সরকারিভাবে বন্দোবস্তী দেয়া ১৩টি বাঙালি পরিবারের প্রায় ৬০ একর টিলা ভূমি দখল করে বসতি স্থাপন করছে কতিপয় উপজাতিরা। ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদেরকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে অন্যত্র থেকে পাহাড়ি পরিবারগুলোকে এনে বাঙালিদের ওইসব জায়গায় বসতি তৈরী করে দিচ্ছে।

৬। ৩ জুন ২০১৮ তারিখে থানাচন্দ্রপাড়া নামক স্থানে ১০ জন বাঙালির সর্বমোট ৭০.৫০ একর জায়গা ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সদস্যরা ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে দখলে নেয়। পরবর্তীতে, সংশ্লিষ্ট বাঙালিরা উক্ত জায়গার মালিকানা দাবী করে তাদেরকে বাধা প্রদান করলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট বাঙালিদের অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। এ প্রেক্ষিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি কর্তৃক উক্ত ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হয়।

৭। ১৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে গৈয়াপাড়া এলাকায় জনৈক বাঙালি মোঃ সুলতান আহমেদ (৭০) এর মালিকানাধীন জায়গায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের এর ইন্ধনে উপজাতীয়রা ৩/৪টি বাড়ী নির্মাণ করে। পরবর্তীতে বাদী সুলতান আহমেদ রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

৮। ২৫ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, দাতারামপাড়া, রসলপুর নামক স্থানে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসী নির্মাণাধীন রাস্তার কাজে নিয়োজিত চারজন শ্রমিকের কাছে চাঁদা দাবী করে। শ্রমিকরা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সন্ত্রাসীরা তাদেরকে মারধর করে।

৯। ২০ আগষ্ট ২০১৮ তারিখে, চাঁদা না দেয়ায় সোনাইআগা নোয়াপাড়া নামক স্থানে বসবাসকারী মো. আব্দুল মান্নান (৪২) নামক এক বাঙালিকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) গ্রুপের ১০/১২ জন সন্ত্রাসী মারধর করে আহত করে। আব্দুল মান্নান জানায় যে, ইউপিডিএফ (মূলদল) এর সন্ত্রাসীরা সোনাইআগা নোয়াপাড়া হতে বাঙালিদেরকে বাড়ি ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে উক্ত এলাকা পাহাড়ীদের বলে দাবী করে।

১০. গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে উপজেলার রামগড় ইউনিয়নের গরুকাটা নামক দুর্গম এলাকায় চাঁদার টোকেন দেখাতে না পারায় এক বাঙালী অটো রিক্সা ড্রাইভারের গাড়ী ভাঙচুর করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। জানা যায়, সকালে খাগড়াবিল বাজার থেকে যাত্রী নিয়ে গরুকাটায় পৌঁছলে ৩-৪ জন সশস্ত্র উপজাতি সন্ত্রাসী অটোরিক্সাটি আটক করে। তারা চালকের কাছে চাঁদার টোকেন দেখতে চায়।

তাৎক্ষণিকভাবে টোকেন দেখাতে না পারায় সন্ত্রাসীরা অটোরিক্সার চাবি কেড়ে নিযে চালক ফজলুর রহমান(২৩)কে ধারালো দা দিয়ে কোপাতে চায়। এ সময় সে দৌঁড়ে পালিযে প্রাণ বাঁচায়। সন্ত্রাসীরা অটোরিক্সাটি রাস্তার পাশের জঙ্গলের ভিতরে নিয়ে ব্যাপকভাবে ভাংচুর করে। পরে অটোরিক্সা চালক সমবায় সমিতির নেতারা ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ করে অটোরিক্সাটি উদ্ধার করেন।

এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটেছিল ৩০ জুন ২০১৭ তারিখে। সেদিন রামগড় উপজেলার বাঙালি অধ্যুষিত কালাডেবা নামক স্থানে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের কতিপয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সদলবলে উপস্থিত হয়ে বাঙালিদের নিকট চাঁদা দাবী করে। এ ঘটনা জানার সাথে সাথে স্থানীয় এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাঙালিরা সমবেত হয়ে সে সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী মারমা উপজাতি অধ্যুষিত সোনাইআগা এলাকা দিয়ে চন্দ্র কারবারীপাড়া (ত্রিপুরা উপজাতি অধ্যুষিত) এলাকায় পালিয়ে যায় এবং পলায়নকালে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে।

এ সময় স্থানীয় সাধারণ উপজাতিরাও সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে বাঙালিদের সাথে যোগ দেয়। সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করার সময় স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার কিছুদিন পূর্বেও ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সন্ত্রাসীরা উক্ত এলাকার বাঙালিদের নিকট চাঁদা দাবী করে এবং চাঁদা না দিলে এলাকা ছাড়া করবে এবং বাঙালি মেয়েদেরকে অপহরণ করে ধর্ষণ করবে বলেও হুমকি প্রদান করে বলে স্থানীয়দের নিকট হতে জানা যায়।

ঘটনার মীমাংসা করার জন্য গত ১ জুলাই ২০১৭ তারিখ ১১ ঘটিকায় সোনাইআগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালি গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে স্থানীয় এলাকাবাসী সবাই জানান যে, ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের একদল সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ব্যবসায়ী, কৃষক সবার কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে। তাদের অত্যাচারে গ্রামবাসিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বৈঠকে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে সকলে মতামত ব্যক্ত করেন। বৈঠকে উপস্থিত সকল জনপ্রতিনিধি ও পাহাড়ি-বাঙালি নেতৃবৃন্দ বলেন, গুজবের মাধ্যমে এলাকার শান্তি-সম্প্রীতি নষ্ট হয়, হিংসা ও হানাহানির মত বড় ধরনের ঘটনার সৃষ্টি হয়।

এ প্রসংগে রামগড় ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড মেম্বার ক্যাওরি মারমা বলেন, পাহাড়ি- বাঙালি সবাই মিলেই সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করা হয়েছে। এখানে কেউ কোন পাহাড়ির বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেনি। সোনাইআগার স্থানীয় বয়োঃবৃদ্ধ বাসিন্দা ক্যয়প্রু মারমা বলেন, সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করতে আমার ছেলে এবং ভাতিজিও যায়। এই সময় তিনি সোনাইআগা এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের দাবীও জানান।

কিন্তু, উপরোক্ত ঘটনাকে ইস্যু করে পাহাড়িদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক তথ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বনপূর্বক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন ব্যক্তি কর্তৃক অপপ্রচার চালানো হয়।

উদাহরস্বরূপঃ পাহাড়ীদের প্রতি সহানুভুতিশীল সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ তার ফেসবুক আইডিতে লিখেন যে,  “একটু আগে মাত্র খবর পেয়েছি খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার ১ নং সদর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত সৌনায়া গা ও ব্রত চন্দ্র কারবারী পাড়াতে পার্শ্ববর্তী কালাডেবা নামক এলাকা থেকে শতাধিক সেটেলার সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালাচ্ছে। এই গ্রামগুলিতে ত্রিপুরা আদিবাসীদের বাস। রাত এগারটার দিকে সৌনায়া গা গ্রামটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে লুটপাট চালানো হয়েছে এবং এগারটার দিকে ব্রত চন্দ্র কারবারী গ্রামটিতে চলছিল নির্বিচার হামলা, মারধর আর লুটপাট। সেটেলারদের সাথে এইসব হামলায় স্থানীয় চৌচালা বিজিবি ক্যাম্প থেকে বিজিবি সদস্যরাও অংশ নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। গ্রামের ত্রিপুরা আদিবাসী মানুষজন প্রাণভয়ে পালাচ্ছে বাড়িঘর ছেড়ে”।

এছাড়াও চাকমা সার্কেল চিফের স্ত্রী রাণী য়েন য়েন, Ajal Dewan, Mikel Changma Jummo, Thuikyaw Ching, CHT-jummaland, Chittagong Hill Tracts International Network for Human Rights নামক ফেসবুক আইডি ও পেজ থেকেও এ সংক্রান্ত বিষয়ে অপপ্রচার চালানো হয়।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারপূর্বক এ ধরণের উস্কানীমূলক অপপ্রচার পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রতিকে বিনষ্ট করে যে কোন সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে এবং নিয়ে থাকে। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যকলাপকে সম্পূর্ণরূপে আড়াল করার লক্ষ্যে এ ধরণের অপপ্রচার চালানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী হওয়া সত্ত্বেও ইমতিয়াজ মাহমুদ কর্তৃক মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখনী হতে প্রমাণ হয় যে, তিনি নির্দিষ্ট কোন স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ রক্ষা করছেন। ইতোপূর্বেও তিনি পার্বত্য চট্রগ্রামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ও মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখা প্রকাশ করেছিলেন। তার এই মিথ্যা ও উস্কানীমূলক লেখনীর জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।

তবে আশার কথা হল রামগড়ের উপজাতি-বাঙালি সকল জনসাধরণই এখন সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাইতো, ২৯ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে, রামগড়ে চাঁদাবাজির সময় প্রবীর ত্রিপুরা(২২) নামক ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের এক চাঁদাবাজকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দিয়ে বিজিবি’র কাছে সোপর্দ করে স্থানীয় জনসাধারণ। পাশাপাশি পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা নিয়মিতভাবে অভিযান চালিয়ে এই সব সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করছে।

উদাহরণস্বরূপঃ ১৪ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে, সুজন চাকমা(২৮) ও আব্বাই মারমা(৩৩) নামক ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের দুই চাঁদাবাজকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক করে বিজিবি সদস্যরা।
২৫ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে চাঁদাবাজি করার সময় পাত্র চাকমা নামক ইউপিডিএফ’র এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করে বিজিবি সদস্যরা।

পুলিশ, বিজিবি আর স্থানীয় প্রশাসনের এমন তৎপরতার কারণে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপের সশস্ত্র কার্যক্রম বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে। সে জন্য তারা নিয়মিতভাবে এইসব বাহিনী এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হল গত ১২ সেপ্টেম্বর রামগড় উপজেলায় সদর ইউনিয়নে ৬নং ওয়ার্ড নাঙ্গল আদামে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ কর্তৃক অবৈধভাবে ভূমি দখল করতে না পেরে নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার।

♦ লেখক- রাঙামাটি থেকে

আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃশংসতম গণহত্যা পাকুয়াখালী ট্রাজেডি দিবস

Pakuakhali-

সৈয়দ ইবনে রহমত

৯ সেপ্টেম্বর, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি দিবস। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন শান্তিবাহিনী রাঙ্গামাটি জেলার পাকুয়াখালীতে নিরীহ এবং নিরস্ত্র বাঙালি কাঠুরিয়াদের উপর নির্মম হত্যাকান্ড চালিয়ে তাদের বিভৎস মানসিকতার এক জঘন্যতম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

স্বাধীনতার পর পরই জেএসএস তথা শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পার্বত্যাঞ্চলের সহজ-সরল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে শুরু করে সশস্ত্র তৎপরতা। প্রথম থেকেই তারা নিরাপত্তা বাহিনী এবং নিরীহ বাঙালিদের বিরুদ্ধে চালাতে থাকে একের পর এক আক্রমণ। যে কোন নিরীহ এবং নিরস্ত্র মানুষের উপর সশস্ত্র আক্রমণ করাই যেখানে মানবতা বিরোধী চরম অপরাধ সেখানে শান্তিাবাহিনীর সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙালিদের উপর হাজার হাজার সশস্ত্র আক্রমণ পরিচালনা করেছে। কথিত আছে শান্তিবাহিনী এ পর্যন্ত হত্যা করেছে ৩০ হাজারেরও বেশি বাঙালি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাকে। এর মধ্যে কিছু কিছু গণহত্যার ঘটনা আছে যেগুলোকে কোনভাবেই কোনো মানুষের কর্ম বলে বিশ্বাস করা যায় না। বিশেষ করে ২৯ এপ্রিল ১৯৮৪ খাগড়াছড়ি মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ৩০ মে ১৯৮৪ দিবাগত রাতে সংঘটিত রাঙ্গামাটি জেলার ভূষণছড়া গণহত্যা এবং ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ রাঙ্গামাটির পাকুয়াখালী গণহত্যা অন্যতম। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল আছেন তারা পাকুয়াখালী গণহত্যাকে শান্তিবাহিনীর নৃশংসতম গণহত্যা বলে স্বীকার করেন। কেননা সেদিন শান্তিবাহিনী মিটিং করার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ডেকে নিয়ে ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। অবাক করার বিষয় হচ্ছে যে, শান্তিবাহিনী সেদিন এতগুলো মানুষকে হত্যা করতে একটি বুলেটও ব্যবহার করেনি। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে কুপিয়ে এবং বন্দুকের বেয়নেট ও অন্যান্য দেশি অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানাভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

pakuakhali-00

pakuakhali-5

ছবি : পাকুয়াখালীতে গণহত্যার শিকার নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াদের লাশের স্তূপ

১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মতায় আসে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার। সে সময় সবাই আশা করছিল যে, এবার হয়ত পার্বত্যাঞ্চলের সমস্যাটি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব হবে। কেননা এরশাদ সরকারের আমলেই শান্তিবাহিনীর সাথে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল। এরপর বিএনপির সরকার (১৯৯১-৯৬) আমলে এই আলোচনা আরো বিস্তৃতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। একে একে অনুষ্ঠিত হয় ১৩টি বৈঠক। কিন্তু শান্তিবাহিনীর নানা অযৌক্তিক দাবির কারণেই শেষ পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়ে ওঠেনি। এমতাবস্থায় আওয়ামীলীগ সরকার মতায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে ধারণা জম্মেছিল যে, এবার হয়ত বিষয়টি নিষ্পত্তির দিকে যাবে। কেননা শান্তিবাহিনীর আশ্রয়দাতা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে আওয়ামীলীগের সম্পর্ক ভালো।

অতএব ভারতও চাইবে না শান্তিবাহিনী তাদের চিরাচরিত অপকর্ম দ্বারা আওয়ামীলীগ সরকারকে বিব্রত করুক। এমন আশা কিংবা আশঙ্কার মধ্যেই শান্তিবাহিনী ৯ সেপ্টম্বর ১৯৯৬ পাকুয়াখালী ট্রাজেডির জন্ম দেয়। এসময় পুরো পার্বত্যাঞ্চলই ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত। শান্তিবাহিনী এসময় স্ব-ঘোষিত অস্ত্র বিরতি দিয়ে, চাঁদা আদায় এবং অস্ত্র সংগ্রহের প্রতিই বেশি মনোযোগী ছিল। সেই সাথে সরকারের সাথে নিজেদের দাবী-দাওয়া নিয়ে দেন-দরবার করার জন্যও সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল। অন্যদিকে নিজেদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিল সর্বাত্মকভাবে। তাই, তখন পার্বত্যাঞ্চলের নিরীহ অসহায় পাহাড়ি-বাঙালিরা শান্তিবাহিনীকে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে পাহাড় থেকে বাঁশ-কাঠসহ অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছিল। রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলার সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ির পাকুয়াখালীতেও একই অবস্থা চলছিল। এখানে প্রতিদিন শত শত পাহাড়ি এবং বাঙালি কাঠুরিয়া শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিয়ে বাঁশ এবং গাছ কাটতে যেত। লোকজন পাহাড়ে গিয়ে গাছ, বাঁশ কেটে নিয়মিত চাঁদা দিয়ে ফিরে আসত।

চাঁদা আদায় সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনার জন্য মাঝে-মধ্যে পাহাড়ে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে কাঠুরিয়াদের বৈঠক হতো। এক পর্যায়ে ৯ সেপ্টেম্বর ’৯৬ একটি বৈঠক ডাকা হয়। এই বৈঠকে অংশগ্রহণের জন্য কাঠ ব্যবসায়ীদেরও নেয়ার জন্য শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। শান্তিবাহিনীর কালেক্টর লংগদু থানার মাইনিমুখ বাজারে এসে ব্যবসায়ীদের চিঠির মাধ্যমে বৈঠকে অংশগ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানায়। কিন্তু ইতিপূর্বে কোনো বৈঠকে ব্যবসায়ীদের এভাবে গুরুত্ব দিয়ে ডাকা হয়নি। ফলে ৯ সেপ্টেম্বরের বৈঠকে ব্যবসায়ীদের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ায় ব্যবসায়ীরা বিষয়টি এড়িয়ে যায়। কিন্তু কাঠুরিয়ারা প্রতিদিনের মতো সেই দিন সকাল বেলা স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ে প্রবেশ করতে শুরু করে। তখন শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদেরকে জানানো হয়, বড়বাবু আজ সবার সঙ্গে মিটিং করবেন। তাই আগে মিটিং-এ যেতে হবে। এর পর যে যার কাজে যাবে। একথা বলেই এক সাথে চার-পাঁচজন বাঙালি কাঠুরিয়াকে কিছুদূর নিয়ে হাত-পা বেঁধে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেদিনকার বাঁধা অবস্থা থেকে পালিয়ে আসা এক মাত্র ব্যক্তি মোহাম্মদ ইউনুছ মিয়া। এই ইউনুছ মিয়ার দেখানো পথ ধরেই ১১ সেপ্টম্বর খুঁজে বের করা হয় ২৮ জনের ক্ষত-বিক্ষত, বিকৃত লাশ। কারো হাত নেই, কারো চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে, কারো কেটে নেয়া হয়েছে কান কিংবা পুরুষাঙ্গ। কাউকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে থেতলে দেয়া হয়েছে মাথা। আবার কাউকে জবাই করা হয়েছে অমানবিকভাবে। অপর ৭ হতভাগ্যেরতো লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমন নির্মম দৃশ্য দেখে সেদিন পার্বত্যাঞ্চলের আকাশ-বাতাস স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। শোকে ভারি হয়ে ওঠেছিল সমস্ত পরিবেশ। পরে উদ্ধার করা লাশগুলি এনে লংগদু উপজেলা মাঠ সংলগ্ন খোলা যায়গায় দাফন করা হয়।

সেদিন নিহত ৩৫ কাঠুরিয়ার স্বজনদের আহাজারী আর উত্তাল পার্বত্য পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখার জন্য তৎকালীন সরকারের ৪ জন প্রভাবশালী মন্ত্রী লংগদু সফর করেছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম, শিল্প মন্ত্রী তোফায়েল আহম্মদ, পানি সম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এবং শ্রম ও কর্ম সংস্থান মন্ত্রী এম. এ. মান্নান। তাঁরা লংগদু গিয়ে মানুষের বুক ফাটা কান্না আর আহাজারী দেখে হত্যকারীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করার। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তাদের লেখা-পড়ার দায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতিও তারা দিয়েছিলন। তারা লংগদু থেকে ফিরে আসার পর তৎকালীন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার সুলতান মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি ৩১ অক্টোবর ’৯৬ ইং বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।

তবে ১ নভেম্বর ১৯৯৬ দৈনিক জনকণ্ঠের এক রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, উক্ত প্রতিবেদনে শান্তিবাহিনীকেই পাকুয়াখালী ট্রাজেডির জন্য দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার দুই দশক পরেও শান্তিবাহিনীর সন্ত্রসাীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি। পুনর্বাসন করা হয়নি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে। ক্ষতিগ্রস্থদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারেও কোন দায়িত্ব নেয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তাই আজ তারা শিাক্ষা-দীক্ষাহীনভাবে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে।

১৯৯৭ সালে শান্তিবাহিনী সরকারের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করে অস্ত্র জমা দিলেও তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে বিশ্বাস করা যায় না, কেননা পাহাড়ে অস্ত্রবাজী এবং চাঁদাবাজী রয়ে গেছে আগের মতোই। পাহাড়ে সংগঠিত বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখে বুঝা যায় ধীরে ধীরে তারা অস্ত্রের মজুদ রাড়িয়ে আরো শক্তিশালী হচ্ছে। মাঝে-মধেই জেএসএস নেতাদের আবারো জঙ্গলে গিয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠার হুমকি থেকেও এটা প্রমাণিত। তাছাড়া কোন অপকর্ম করে বিচারের সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা যদি না থাকে তাহলে অপরাধীরা তো তাদের অপকর্মে উৎসাহ পাবেই। তাই মানবাধিকার এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই পাকুয়াখালী গণহত্যা সহ সকল হত্যাকান্ডের তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। অন্যথায় পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার আশা কোনদিনই সফল হবে না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক অবকাঠামো স্থাপনের সম্ভাব্যতা ও প্রভাব

পারভেজ হায়দার:
বাংলাদেশের প্রায় এক দশমাংশ এলাকা জুড়ে অবস্থিত পার্বত্য জেলাসমূহে প্রায় ১২টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী এবং বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ অঞ্চলের মানুষগুলোকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসাবে মনে করা হয়। অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীকে দেশের অন্যান্য এলাকার জনগণের সমপর্যায়ে আনার জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচীর পাশাপাশি দেশী/বিদেশী এনজিও সমূহের অংশগ্রহণ এই অঞ্চলের অধিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সচল রাখতে সহায়তা করছে।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতি শরণার্থীদের জন্য সরকার নিয়মিত রেশন প্রদান ও অন্যান্য সহায়তা করে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকার ভূমি দেশের অন্যান্য এলাকার মত নয়। পার্বত্য এই ভূখন্ডের শুধুমাত্র শতকরা একভাগ জমি পাহাড়সমূহের মাঝে অবস্থিত সমতল, ২% জমি সামান্য উঁচু, ৫% জমি স্বল্প উঁচু পাহাড়ের ভ্যালী এবং ৯২ ভাগ জমি উঁচু এবং মাঝারি আকারের পাহাড়ে পরিবেষ্টিত। তবে সময়ের প্রয়োজনে ব্যাপকহারে পাহাড় কেটে ফেলায় বর্তমানে উক্ত শতকরা হিসাবের সামান্য হেরফের হতে পারে। অর্থাৎ এই অঞ্চলে কৃষির মাধ্যমে উৎপাদনযোগ্য শস্য ভূমির পরিমাণ কম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালী ও পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর জন্য ঐ এলাকার শস্যভূমি যথেষ্ট নয়, আর চাষযোগ্য জমির একটি বড় অংশে ব্যাপক হারে তামাক চাষ করা হয়েছে।

পার্বত্য এলাকার পাহাড়ী জনগোষ্ঠী জুম চাষে অভ্যস্ত। ইতিপূর্বে তারা প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর অন্তর এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে গিয়ে জুম চাষ করত। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের এই অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পার্বত্য এলাকাগুলোতেও এসেছে। পার্বত্য এলাকার মানুষের উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ মূল্য যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সঠিকভাবে না পাওয়ার যে উদাহরণ বিগত বছরগুলোতে ছিল বর্তমানে সেই অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন এনজিও কর্মীগণ এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যক্তিবর্গের পরামর্শে পার্বত্য এলাকার মানুষ তাদের পাহাড় বেষ্টিত ভূমির কার্যকরী ব্যবহার শিখেছে।

এমনকি একই জমিতে MTO (Multi Tier Orchard) পদ্ধতি ব্যবহার করে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যায়, উদাহরণস্বরূপ, জলপাই এর বাগানে কলা, আনারস আমের বাগানে কলা ইত্যাদি। যে সমস্ত ভূমিতে ইতিপূর্বে জুম চাষ হতো ঐ সকল জমির একটি বড় অংশে বর্তমানে আম, লিচু, কলা ও জলপাই এর ব্যাপকহারে চাষাবাদ হচ্ছে।

ইতিপূর্বে পাহাড়ী সমাজে মহিলারা শুধুমাত্র কাজ করত আর পুরুষরা অলস সময় কাটাত। কিন্তু বর্তমানে তাদের অভ্যাসেরও পরিবর্তন হয়েছে। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর পুরুষ ও মহিলাগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ফ্যাক্টরী এবং দপ্তরসমূহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙ্গালী অধিবাসীগণ অর্থনৈতিকভাবে ও শিক্ষায় অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও সরকারী বিভিন্ন পৃষ্ঠপোষকতায় এবং জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন ছোট ছোট ক্ষুদ্র কৃষি ও মৎসভিত্তিক প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে বসবাসরত বাঙ্গালী ও পাহাড়ীদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণ বিভিন্ন ফলজ, মৎস ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রজেক্টের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা এবং ঐ পণ্যসমূহ বিভিন্ন ফ্যাক্টরীর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ না থাকায় অর্থনৈতিকভাবে আশানুরূপ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

একটি এলাকায় অর্থনৈতিক অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে তোলার জন্য যে পূর্বশর্ত রয়েছে তা হলো জ্বালানি, গ্যাস, প্রয়োজনীয় জমি এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই বিষয়গুলো সমাধানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা সহজেই উৎসাহিত হয়। অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরীর পূর্ব শর্তসমূহ সূচারু রূপে পূরণ করা পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোর মত বাংলাদেশের অনেক স্থানেও হয়তো সম্ভব হয় না। কিন্তু একটি এলাকায় শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে উপরে উল্লেখিত পূর্ব শর্তসমূহের একটি প্যাকেজ সমাধান সম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার উপজাতি নারী ও পুরুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান বিশেষ করে চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় বিভিন্ন তৈরী পোশাক শিল্প ও ইপিজেড সমূহে কর্মরত আছে। তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ী ও বাঙ্গালীদের মধ্যে অনেক বেকার নারী ও পুরুষ রয়েছে, সুযোগ পেলে তারা তাদের বেকারত্ব দূরীকরণসহ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

বাংলাদেশ সরকারের রূপকল্প ২০৪১ এর অংশ হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এরই অংশ হিসাবে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজীতে ৩০ হাজার একর জমির উপর দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক জোন নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। অর্থনৈতিক অবকাঠামো নির্মাণের পূর্ব শর্তসমূহ যেমন জ্বালানী, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জনশক্তি ইত্যাদি নিশ্চিত করার জোর সম্ভাবনা থাকায় মিরসরাই এর ইপিজেড এ দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে। এছাড়াও চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে ৭০০ একর এবং গোহিরাতে ৫০০ একর জমির উপর অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।

শুধুমাত্র মিরসরাই এর অর্থনৈতিক জোনে প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরী হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মাষ্টারপ্লান অনুযায়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধাদির কাজ এগিয়ে চলছে। এ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার কয়েকটি বিদেশী কোম্পানীর নিকট থেকে প্রস্তাব পেয়েছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক জোনের জন্য প্রয়োজনীয় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর অবশিষ্ট সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। মিরসরাই এলাকাতে দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর অন্যতম কারণ হলো চট্টগ্রাম বন্দর হতে মাত্র ৬৭ কিঃ মিঃ দূরে এর অবস্থান। এই অর্থনৈতিক অঞ্চল হতে উৎপাদিত রপ্তানীযোগ্য পণ্য অতিদ্রুত জাহাজীকরণ এবং আমদানীকৃত পণ্য দ্রুত খালাস করে ফ্যাক্টরিতে নেওয়া সম্ভব হবে।

ভৌগলিক অবস্থানসহ অন্যান্য যে সমস্ত সুবিধার কারণে মিরসরাই, আনোয়ারা বা গোহিরাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার সকল সুবিধাদি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে সৃষ্টি করা সম্ভব। উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা গেলে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরীর পূর্ব শর্ত যেমনঃ জ্বালানী ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি উন্নয়নে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে উৎপাদিত বিভিন্ন ফলজ সম্পদকে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প যেমনঃ পোশাক শিল্প, টেক্সটাইল, অটোমোবাইল প্লান্ট, তথ্য প্রযুক্তি ইত্যাদি শিল্প স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যে কর্মঠ উপজাতি ও বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী।

উদাহরণস্বরূপ তিন পার্বত্য জেলার একমাত্র পোশাক শিল্প কারখানা বান্দরবান জেলায় অবস্থিত ‘লুম্বিনী গার্মেন্টস’ এর সাফল্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ সরকারের ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের সিদ্ধান্ত রয়েছে তার মধ্যে অন্তত কয়েকটি পার্বত্য জেলাগুলোতে স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা ও ব্যক্তিগতভাবে এই অঞ্চলের বেকার নারী ও পুরুষগণ উপকৃত হবে।

পার্বত্য অঞ্চলের জেলাসমূহে সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে যদি কখনও পরিকল্পনামাফিক অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী হয় তাহলে এখানে অনেক বিদেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। অর্থনৈতিক অবকাঠামোসমূহে বিদেশী বিনিয়োগ শুরু হলে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক পর্যটন শিল্প বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তখন বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনে ও সহায়তায় এই অঞ্চলে ব্যাপকহারে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পর্যটন শিল্পের প্রভৃত উন্নয়ন সাধিত হবে যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনেকেই হয়তো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর তৈরীর বিরুদ্ধে কথা বলবেন, তারা হয়তো এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতও সামনে দাঁড় করাবার চেষ্টা করবেন। এটা ঠিক, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক রাজনীতির বিভিন্ন পরিক্রমায় এই অঞ্চলে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪টি সশস্ত্র দল তৈরী হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, বাঙ্গালীদের অনেকেই তাদের বেকারত্বের কারণে বিভিন্ন পাহাড়ী সন্ত্রাসী দলের সাথে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের একথাও স্মরণ রাখতে হবে যারা এ সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের একটি বড় অংশের নীতিগত অবস্থান আদর্শগত নয়। এদের অধিকাংশই স্বল্পশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত আবার যারা শিক্ষিত তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট সন্ত্রাসী দলের নেতৃবৃন্দ জোর করে আটকিয়ে রেখেছে। ধারণা করা যায়, উপজাতি সন্ত্রাসী দলসমূহের একটা বড় অংশই নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঐ অনিশ্চয়তার জীবন বেছে নিয়েছে বা নিতে বাধ্য হয়েছে।

যতটুকু জানা যায়, সন্ত্রাসী দলের কর্মীগণ অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ঠ লাভবান হন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভাতা হিসাবে যে টাকা দেয়া হয় তা দিয়ে সম্মানজনকভাবে জীবন নির্বাহ করা এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাসমূহে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরী করা হলে বিপথগামী এই পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ও কর্মহীন বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী ক্রমান্বয়ে ঐ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যোগদান করতে উৎসাহিত হবে বলে আশা করা যায়। একই সাথে ঐ সময় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকেও অনিশ্চিত জীবন ছেড়ে একটি সুস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবন বেছে নেওয়ার জন্য চাপ থাকবে। আর এসব কিছু নিশ্চিত করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা সময়ের প্রয়োজনে এমনিতেই চলে আসবে।

বাংলাদেশের উপজাতীয়রা আদিবাসী নয় কেন?

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। ১৯৮২ সালের এই দিনে ফ্রান্সের জেনেভা শহরে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংয়ে ৯ আগস্টকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসাবে নির্ধারণ করা হয় এবং ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সম্মেলনে এ দিবসকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস রূপে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সারা বিশ্ব প্রতিবছর বিশ্বে ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বর্তমান বিশ্বে ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস- যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ। বিশ্বের ৯০ টি দেশে এই ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তারা বিশ্বের ৭ হাজার ভাষা ও ৫ হাজার স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। প্রত্যেক বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের একটি থিম থাকে। এ বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- “Indigenous peoples’ migration and movement.” বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর বাংলা করেছে, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দেশান্তর ও প্রতিরোধের সংগ্রাম’।বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অগ্রীম শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা জানাই।

২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা বাংলাদেশে নিজেদের আদিবাসী দাবী করে বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন শুরু করে।  পরবর্তীকালে তারা দেশের সমতলের বিভিন্ন উপজাতীয় ও তফসিলী জনগোষ্ঠীকেও এতে সামিল করে মোট ৪৫ টি মতান্তরে ৭৫ টি জনগোষ্ঠীকে একত্রে আদিবাসী আখ্যা দিয়ে করে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের স্বীকৃতি দাবী করে। কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এই আদিবাসী দাবী শুরুতেই দেশের মধ্যে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। কারণ আভিধানিক ও নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী মানে আদিবাসিন্দা। আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, “কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।” মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…”. (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

সকল ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কেউই বাংলাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করছে না। তাদের সকলেই বর্হিবিশ্ব বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সময়। এই অনুপ্রবেশও স্মরণাতীত কাল পূর্বে ঘটে নাই। মাত্র ৫-৭ শত বছর পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার থেকে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উপরন্তু বাংলাদেশের এই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের আদিনিবাস ভারত ও মিয়ানমারেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃত নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় মানব বসতির যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন।

এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-  Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107),  আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত- Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169),  এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে  The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.

এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention. অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)-  এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’. অর্থাৎ  একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিস্কার বোঝা যায় তারা উপজাতি। কেননা, ট্রাইব শব্দের বাংলা অর্থ উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাস পিপলের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে থাকেন।

এখন আমরা ইনডিজিন্যাস পিপলের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করবো।  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- এর আর্টিকল ১-এর (b)তে ইনডিডজিন্যাস পিপল বা আদিবাসীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions’.

অর্থাৎ আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া বা বর্তমান সীমানা নির্ধারণের পূর্বে বা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে। এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে।

আইএলও কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার, বর্তমান সীমানা নির্ধারণের পূর্বে বা উপনিবেশ সৃষ্টি পূর্ব থেকে বসবাস। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি উপজাতিদের মতোই। অর্থাৎ একজন উপজাতি আদিবাসী হবেন বা হবেন না উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে।

এছাড়াও রয়েছে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples চার্টার। এটি এক্সক্লুসিভলি আদিবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, উপজাতিদের নয়।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)-  ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করলেও তা ছিল বৈশ্বিক দৃষ্টিতে। কেননা, বাংলাদেশ কখনই এ দেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে তা স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের  মাত্র ২৩টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানও Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)- র‌্যাটিফাই করলেও কনভেনশন-১৬৯ র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা, কনভেনশন-১৬৯ পাস হওয়ার পর কনভেনশন-১০৭ এর গুরুত্ব হারিয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ যে দেশগুলো র‌্যাটিফাই করেছে তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশ যাদের প্রধান বা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত।

অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭, ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারের সিগনেটরি বা ভোটদানকারী নয়। এ থেকেই নিজ দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের নিজেদের অবস্থান এবং অন্যদেশের ‘আদিবাসীদের’ জন্য কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। উল্লিখিত চারটি দেশ শুধু ইউএন চার্টারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাই নয় বরং অধিবেশনে তাদের প্রতিনিধিরা এই চার্টারের প্রবল সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছে।

এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। বর্তমান সরকার নতুন সৃষ্ট ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে, সেটা যদি সফল হয় তাহলে রোহিঙ্গাদেরও কি বাংলাদেশের আদিবাসী বলা হবে? সাংস্কৃতিকভাবে রোহিঙ্গারাও তো বৈশিষ্টমণ্ডিত। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যেসকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার? কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR  শব্দদ্বারা বা অথবা শব্দ দ্বারা বিভক্ত।

আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তর বঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারমা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রি কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এখানকার মূল জনস্রোত, বাঙালি জনগোষ্ঠী।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য ভাইস চ্যান্সেলরও একবার একান্ত আলোচনায় আমার কাছে এই মত প্রকাশ করেছিলেন। প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। আগেই বলা হয়েছে, এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)।

শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, আগস্ট, ২০১৮ সংখ্যা।

♦ মেহেদী হাসান পলাশ: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইনকিলাব।

email: palash74@gmail.com  


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের কবরগুলোর একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।- সম্পাদক।)

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩ হাজার উপজাতীয় সন্ত্রাসীর হাতে ৩ হাজার ভয়ানক আগ্নেয়াস্ত্র

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

পার্বত্য চট্টগ্রামে চারটি উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র গ্রুপের রয়েছে আর্ম ক্যাডার ও সেমি আর্ম ক্যাডার বাহিনী। এর মধ্যে আর্ম ক্যাডারের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। অন্যদিকে সেমি আর্ম ক্যাডারের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। সেমি আর্ম ক্যাডাররা অস্ত্র প্রশিক্ষিত। তারা ভবিষ্যতে সংগঠনগুলোর জন্য কাজে লাগে।

এসব সন্ত্রাসীদের কাছে তিন হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। সেখানে পুরনো অস্ত্রের পাশাপাশি নতুন এবং অত্যাধুনিক অস্ত্রও রয়েছে। এসবের মধ্যে আছে এম ১৬ রাইফেল, মিয়ানমারে তৈরি এম ১ রাইফেল, একে ৪৭ রাইফেল, একে ২২ রাইফেল এবং এলএমজি (লাইট মেশিনগান), হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল ইত্যাদি ভয়ঙ্কর স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। প্রতিবেশী দুইটি দেশ থেকে তারা এই অস্ত্র, গুলি ও প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অস্ত্র আসছে। মাঝে মাঝে কিছু ধরা পড়লেও তা খুবই সামান্য। উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হাত ঘুরে এসব অস্ত্রের একটি অংশ সমতলের জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের হাতেও চালান হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি কিছু লোক ধর্মীয় নেতার পরিচয়ের আড়ালে অস্ত্র পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে। এরকম কিছু ধর্মীয় লেবাসধারী নেতা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরাও পড়েছে। গোয়েন্দারা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, তারা বাংলাদেশি নয়। বাংলাদেশের পরিচয়পত্র তাদের হাতে নেই। গহীন অরণ্যে রয়েছে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।তারা স্বীকার করেছে, মিজোরাম সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাহাড়ি চারটি সশস্ত্র গ্রুপ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গ্রেনেড এনে মজুদ করছে।

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা অস্ত্র জমা দিলেও পরে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, তারা তিনভাগের একভাগ অস্ত্র জমা দিয়েছে। যা জমা দিয়েছে তাও পুরোনো, ভাঙাচোরা, অচল ও সেকেল। নতুন ও অত্যাধুনিক অস্ত্র জমা দেয়নি। অন্যদিকে শান্তিবাহিনীর একটি অংশ এই চুক্তি না মেনে অস্ত্র জমাদান করেনি। মূলতঃ সরকারের উপর আস্থা স্থাপন না করা ও পরবর্তীকালে প্রেশার গ্রুপ হিসাবে কাজ করার জন্য কৌশলের অংশ হিসাবে শান্তি বাহিনী একটি অংশকে অস্ত্র সমর্পনের বাইরে রেখে দেয় চুক্তি বিরোধী হিসাবে। পরবর্তীতে নানা কারণে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। সশস্ত্র গ্রুপগুলোর চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনের বছরে রাজনৈতিক কারণে হানাহানিতে এসব অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পুলিশসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সাথে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত বান্দরবান, বাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সশস্ত্র সংগঠনের হাতে ১৩০জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ৮৫জন বাঙালী নিহত হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন ২২৩জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ৫৫১জন বাঙালী। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৪০০ ও গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১৩০টি। প্রায় ৫০০টি অস্ত্র ও ৭ হাজার গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ১৮ এপ্রিল পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ২ টি ৭.৬২ মিঃমিঃ এসএমজি, ১ টি এ্যাসল্ট রাইফেল, ২ টি পিস্তল, ১৬ রাউন্ড এ্যামোনিশন, ২ টি এসএমজির ম্যাগাজিন, ১ টি এ্যাসল্ট রাইফেলের ম্যাগাজিন, ২ টি পিস্তলের ম্যাগাজিন ও ১ টি সিলিং। ১৮ এপ্রিল ভোর ৪ টায় রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বালুখালী ইউনিয়নের কাইন্দা এলাকায় সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত একটি বিশেষ অভিযান এ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

জানা গেছে, গত ৬ মাসে পাহাড়ে ৫২ সশস্ত্র হামলা ও অপহরণ হয়েছে। মিয়ানমারের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপের এক শীর্ষ নেতার ফোনালাপের ঘটনায় পার্বত্য অঞ্চলে তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। মিয়ানমারের ওই শীর্ষ ব্যক্তি পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপের ক্যাডারদের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নেটওয়ার্কে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

ওই সূত্রগুলো জানিয়েছে, সন্ত্রাস দমনে পার্বত্যাঞ্চলে নিয়োজিত সেনাবাহিনী যথেষ্ট তৎপর থাকলে শান্তিচুক্তির পর সেখানে তাদের অবস্থান ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ করে সরকার হাত পা বেঁধে দিয়েছে। পুলিশ ছাড়া সেনাবাহিনী সেখানে কোনো অপারেশনে যেতে পারে না। কিন্তু আগে থেকে পুলিশ জেনে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা আগাম তথ্য পেয়ে যাচ্ছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে ৫৫২টি সেনা ক্যাম্পের মধ্যে ৩৩৪টি ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। বর্তমানে ২১৮টি ক্যাম্প রয়েছে। বেশিরভাগ ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দুর্গম খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি রোডের থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ায় বিশাল অংশ সশস্ত্র ইউপিডিএফের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এরই একটি অংশে ৫ মে ঘটে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড।

সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়ার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে খুন, অপহরণ, দখল ও চাঁদাবাজি ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। শান্তিপ্রিয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙালীরা চাঁদা দিয়েও এখন আর শান্তিতে বসবাস করতে পারছেন না। প্রতিটি মুহুর্ত তাদের কাটছে নিরাপত্তাহীনতায় মধ্যে। বিস্তার ঘটেছে ভয়াবহ চাঁদাবাজীর নেটওয়ার্ক। বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে এই উপজাতীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। চাঁদা না দিয়ে সেখানে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা এমনকি বসবাসও সম্ভব নয়। এই চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বলি হচ্ছে পাহাড়ী, বাঙালি নির্বিশেষে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি এক দিনের ব্যবধানে নানিয়ারচরে ঘটে যাওয়া ৬ হত্যাকাণ্ডের কারণও এই চাঁদাবাজী, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। জেএসএস সংস্কার নেতা সুদর্শন চাকমা আগামী নির্বাচনে প্রার্থি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নির্বাচনে দাঁড়ালে স্থানীয় একটি আঞ্চলিক সংগঠনের জন্য ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি হতো। বিশেষ করে নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়িতে তারা নির্বিঘ্নে নির্বাচনী কার্যকলাপ পরিচালনা করতে পারতো না। অন্যদিকে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ও জেএসএস সংস্কার মিলে খাগড়াছড়িতে প্রার্থী দিলে মহালছড়ি, দিঘীনালায় ইউপিডিএফ (প্রসীত) নির্বাচনে প্রবল বাঁধার সম্মুখীন হতো। বর্তমানে জেএসএস মূল ও ইউপিডিএফ মূলের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতার সূত্রে সিজ ফায়ার রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচার রয়েছে।

হঠাৎ করে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে শিগগিরই যৌথ অভিযান চালানো প্রয়োজন বলে স্থানীয় শান্তিপ্রিয় সাধারণ বাঙালী ও ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠীর লোকজন মনে করেন।

খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির একাধিক স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিপুল পরিমান চাঁদার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। চাঁদা আদায় এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে পাহাড়ে।

১৯৯৭ সালে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে (জেএসএস) শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করে। এর এক বছরের মাথায় চুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। মূলত তার পরেই পাহাড়ে আবারও আধিপত্য বিস্তারে রক্তের খেলা শুরু হয়।

এরপর ২০০৭ সালে জেএসএস থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান-সুধাসিন্ধু খীসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। এতদিন ইউপিডিএফ ও জেএসএস (এম এন লারমা) দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। কিন্তু গতবছরে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আত্মপ্রকাশ করে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক দল। মূলত এই চার সংগঠনের ক্ষমতার বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের দ্বন্দ্বে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়।

গত এক দশকের পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ইউপিডিএফের আধিপত্য খাগড়াছড়িতে বেশি। বালাঘাটা ও নাইক্ষ্যংছড়ির কিছু এলাকা বাদে বান্দরবানে আধিপত্য বেশি জেএসএসের। তবে রাঙামাটির বিশাল এলাকায় এক সময় ই্উপিডিএফ আধিপত্য বিস্তার করলেও বর্তমানে তাদের অবস্থান সঙ্কুচিত হয়ে বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালীর কিছু এলাকায় সীমিত রয়েছে। বাকি অংশ জেএসএস লারমা ও কিছু অংশ সংস্কারের দখলে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তিন পার্বত্য জেলার পরিস্থিতি হঠাৎ করেই জটিল হয়ে উঠছে। আঞ্চলিক দলগুলোর নেতৃত্বে চার ভাগ হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এ বিভক্তি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংসতার কারণ বিশ্লেষণ করলে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্টে থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পার্বত্য চুক্তির (শান্তি চুক্তি) ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে এক আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক না এমন অভিযোগ এনে ‘পাহাড়ে আগুন জ্বলবে’ বলে হুঁশিয়ারি দেন। এরপরই ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ সমর্থিত অনাধি রঞ্জন চাকমা (৫৫) নামের নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক এক ইউপি সদস্যকে হত্যা করার মধ্যে দিয়ে পাহাড়ে হত্যাযজ্ঞের সূত্রপাত ঘটে। এ হত্যার জন্য ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপ গণতান্ত্রিককে ইউপিডিএফতে দায়ী করে।

একই দিন রাঙামাটির জুরাছড়িতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অরবিন্দ চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (পিসিজেএসএস) দায়ী করে। একই দিন বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাসেল মার্মাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

৭ ডিসেম্বর রাঙামাটি শহরের বিহারপুর এলাকায় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভানেত্রী ঝর্ণা খীসার বাসায় হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এসময় তাঁকে হত্যা করতে কুপিয়ে জখম করা হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

বিলাইছড়ি আ’লীগ নেতাকে কোপানোর অভিযোগে সেখার উপজেলার চেয়ারম্যান ও পিসিজেএসএস উপজেলা শাখার নেতা শুমঙ্গল চাকমাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতির নেতা শুভমঙ্গল চাকমাসহ কয়েকজনকে আটকও করা হয়। পরে তারা জামিনে মুক্তি পায়।এসময় প্রাণভয়ে জুড়াছড়ি, বিলাইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলার আওয়ামী লীগ ও তার অংগসংগঠনগুলোর পাহাড়ী নেতাকর্মীরা দলে দলে পদত্যাগ করে উপজেলাগুলো প্রায় শাসকদল শুন্য হয়ে পড়ে। জেএসএসের হুমকির কারণেই এ ঘটনা ঘটে বলে আওয়ামী লীগের অভিযোগ।

১৫ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়নের ধামাইছড়া গ্রামে প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ নেতা অনল বিকাশ চাকমা প্লাটো ওরফে লক্ষী নিহত হয়। ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক বার্মা গ্রুপকে দায়ী করেছে।

সর্বশেষ ২১ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির বন্দুকভাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে ৫ ইউপি মেম্বারসহ ২০ জনকে অপহরণ করা হয়। একদিন পর তারা নিজ গ্রামে ফিরে আসে।

এদিকে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি বিলাইছড়ি উপজেলায় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিশ্বরায় তঞ্চাঙ্গ্যাকে হত্যার উদ্দেশ্য গুলি করা হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনার জন্য যুবলীগ সন্তু গ্রুপ জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল।

৩০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী মহাসমাবেশে অংশ নেওয়ায় বিলাইছড়িতে আওয়ামী লীগের তিন কর্মীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। এ ঘটনার জন্য সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করেছিল আওয়ামী লীগ।

১২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটি শহরে ছাত্রলীগ নেতা সুপায়ন চাকমাকে মারধর করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীরা। প্রতিবাদে রাঙামাটিতে হরতাল পালন করে ছাত্রলীগ।

১১ মার্চ বাঘাইছড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইউপিডিএফের কর্মী নতুন মনি চাকমাকে। ওই দিন রাতে নিজ বাড়িতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নতুন মনি চাকমাকে হত্যা করা হয়। তাঁর মাথাসহ সারা শরীরে কোপানো হয়। তিনি ইউপিডিএফের প্রসিত বিকাশ খীসা পক্ষের কর্মী ছিলেন।

১৮ মার্চ রাঙামাটির কুতুছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশন নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে। ৩২ দিন পর ১৯ এপ্রিল মুক্তি দেওয়া হয় তাঁদের। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে।

১২ এপ্রিল পাল্টাপাল্টি হামলায় মারা যান তিনজন। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) এক সদস্যকে গুলি করে হত্যার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিরও (এম এন লারমা) দুই কর্মীকে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন ইউপিডিএফের কর্মী জনি তঞ্চঙ্গ্যা (৪০), জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কর্মী পঞ্চায়ন চাকমা ওরফে সাধন চাকমা (৩০) ও কালোময় চাকমা (২৯)।

গত ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের মারিশ্যা-দিঘিনালা সড়কের জোড়া ব্রিজ এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কর্মী তপন চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা-দিঘিনালা সড়কের ৮-৯ কিলো নামক স্থানে ইউপিডিফের আরেক কর্মী বিজয় চাকমাকে (৩২) হত্যা করে প্রতিপক্ষ।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলের ২০ তারিখ থেকে ইউপিডিএফ তাদের আধিপত্য বিস্তারে রাঙামাটির দূর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংস্কার’র (জেএসএস এমএন লারমা গ্রুপ) এলাকায় হানা দেওয়া শুরু করে। তাদের তান্ডবে ওইদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জনপ্রতিনিধিসহ ৫০পরিবার পালিয়ে এসে উপজেলা শহরে এসে আশ্রয় নেয়।

অপরদিকে চলতি মাসের ২ মে সকালে একই উপজেলার রূপকারী ইউনিয়নের নালকাটা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে ইউপিডিএফ প্রসীত গ্রুপ এবং জেএসএস সংস্কার বন্দুক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে উভয়পক্ষের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি।

৩ মে নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনের সময় গুলি করে হত্যা করা হয় নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে। এই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সংগঠনটির আরেক নেতা রূপম চাকমা গুলিবিদ্ধ হন।

এর একদিন পরই ৪ মে শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়ায় অংশ নিয়ে চলে যাওয়ার সময় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিকের শীর্ষ নেতা তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) নেতা সুজন চাকমা, সেতুলাল চাকমা, তনয় চাকমা। এ সময় আহত হয় আরো নয়জন। একই সময় খাগড়াছড়িতে ৭ জনকে খুন করা হয়েছে এবং অনেককে অপহরণ করা হয়েছে।

শক্তিমান ও বর্মার উপর ভয়াবহ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে ব্রাশফায়ার করেছিল সন্ত্রাসীরা। দূর্গম সীমান্তের কারণে খুব সহজেই সন্ত্রাসীদের হাতে এ ধরণের মারণাস্ত্র চলে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমান্তের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সীমান্তচৌকি (বর্ডার আউটপোস্ট-বিওপি) নেই। ফলে সেখানে বাধাহীনভাবে অস্ত্র ঢুকতে পারে। তাছাড়া শান্তিচুক্তি সই করার পর চুক্তি বাস্তবায়নের শর্ত মোতাবেক বেশকিছু নিরাপত্তা ফাঁড়ি প্রত্যাহার করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি সীমান্তে পর্যাপ্ত রাস্তা না থাকায় উন্মুক্ত সীমান্তে বিওপি স্থাপন করা যাচ্ছে না। কেননা বিওপি স্থাপন করতে হলে তার নিরাপত্তার প্রয়োজনে যোগাযোগ জরুরি। বর্তমান অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন দুর্গম স্থানও রয়েছে, যেখানে কোনো সশস্ত্র হামলা হলে নিরাপত্তা বাহিনীর পৌঁছতে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

পার্বত্যাঞ্চলের যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে তাতে অভিজ্ঞ মহলের মতে, নির্বাচন যতো এগিয়ে আসবে এই সংঘাত ততোই বৃদ্ধি পাবে। সেকারণে সরকারকে এখনই তৎপর হতে হবে। তাদের মতে, দ্রুততার সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস নির্মূলে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের নেতৃত্বে যৌথ অপারেশন পরিচালনা করে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় সন্ত্রাসীদের ভয়ে ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করতে সাহস পায় না। তাই পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে সন্ত্রাসীদের আটক করতে হবে। পার্বত্যবাসীর দীর্ঘদিনের দাবী মেনে পাহাড়ে র্যাবের স্থায়ী ব্যাটালিয়ন করে র্যাব মোতায়েন করতে হবে এবং সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের কারণে যেসব স্থানে নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে সেসব স্থানে সেনা ক্যাম্প পুণরায় মোতায়েন করতে হবে।

আগামীকাল ভয়াল ২৯ এপ্রিল : উপজাতি সন্ত্রাসী কর্তৃক ভয়াবহ বাঙালি গণহত্যার এক কালো দিবস

সন্তোষ বড়ুয়া:

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন “শান্তিবাহিনী” কর্তৃক অসংখ্য বর্বরোচিত, নারকীয় ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিরা। কিন্তু কোন এক অলৌকিক কারণে বাঙালিদের উপর সন্ত্রাসীদের চালানো এসব নির্যাতনের চিত্র প্রচার মাধ্যমে তেমন স্থান পায়নি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্যাতনকারী উপজাতিরা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল বানিয়ে দেশে-বিদেশে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে যাচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা অত্যাচারিত।

কতিপয় উপজাতি সাইবার এক্টিভিস্ট এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ কর্তৃক অর্থের বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের উপর সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত এসব গণহত্যার সম্পর্কে বিদেশী ও দেশের মানুষকে ভুল বোঝানো হয়। এতে করে সর্বমহলে ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের আসলে উপজাতিরাই নির্যাতনের শিকার।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশিরভাগ গণহত্যা শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এই তথ্য এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী শান্তিবাহিনীর দালালদের কর্তৃক লুকানো হচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দেশে-বিদেশে সর্বত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে। স্বাভাবিকভাবে মানুষ সংখ্যালঘুদের কথা বিশ্বাস করে এবং ভাবে যে সংখ্যাগুরুরা তাদের নির্যাতন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষেত্রে এখানকার বাঙালিরাই উপজাতি সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত এবং অত্যাচারিত।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিুচুক্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি, বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ড।

কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির অন্বেষায় সরকার শান্তিচুক্তি করলেও সন্তু লারমার শান্তিবাহিনীর বিকল্প জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(সংস্কার), ইউপিডিএফ(প্রসীত) এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামক চারটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠিত হয়েছে। এই চার সংগঠন এখন পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তারা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কখন কার উপর তারা যমদূতের মতো আবির্ভূত হয় তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে পাহাড়ের মানুষ।

শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক অসংখ্য গণহত্যা চালানো হয়। তাদের এইসব গণহত্যার শিকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো। এমনকি শান্তিবাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ড থেকে রেহায় পায়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরাও।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম হল ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিলে সংঘটিত তিন তিনটি গণহত্যা। এগুলো হলো- পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

সেদিন দিবাগত রাত আনুমানিক ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত একযোগে চালানো হয় পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

এদিনে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং, চেঙ্গী, পানছড়ি, লতিবান, উল্টাছড়ি এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে; দীঘিনালা উপজেলার মেরুং, বোয়ালখালী, কবাখালী, দিঘীনালা, বাবুছড়া এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে এবং মাটিরাংগা উপজেলার তাইন্দং, তবলছড়ি, বর্ণাল, বেলছড়ি, আমতলি, গোমতি, মাটিরাংগা, গুইমারা এই ৮টি ইউনিয়নের ৩২৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে অগ্নিসংযোগসহ লুটতরাজ, হত্যা, বাঙালি নারীদের গণধর্ষণ ও পরে হত্যা করে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিলো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা।

মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যে তারা পানছড়ি এলাকায় ৮৫৩ জন, দিঘীনালা এলাকায় ৮৯৮ জন এবং মাটিরাঙ্গা এলাকায় ৬৮৯ জন নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালি নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতাকে হত্যা করে। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে, জবাই করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় বাঙালি মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

ওই ঘটনায় পানছড়ি এলাকায় আহত হয় ৫০০ জনের অধিক বাঙালি। ৬২৪০টি বাঙালিদের বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। দিঘীনালা এলাকায় আহত হয় ১২০০ জনের অধিক বাঙালি। ৭৩০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। মাটিরাঙ্গা এলাকায় আহত হয় ৮০০ জনের অধিক বাঙালি। ৯০৪৮টি বাড়ি উপজাতি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

তিনটি ঘটনাতে অপহরণ ও গুমের শিকার হয় কয়েক হাজার বাঙালি। সেদিন কতিপয় বাঙালি প্রাণে বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার বাঙালি পরিবার। ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখা এবং বেঁচে যাওয়া কিছু কিছু সাক্ষী আজো আছে। কিন্তু ঘটনার বীভৎসতার কথা মনে পড়লে আজও তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ গণহত্যা ও বাঙালী নিধনের কথা আজ ইতিহাসের অতলান্তে, স্মৃতির ধুলার পুরো আস্তরে ঢাকা পড়ে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবে তাদের প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে আজো পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অখণ্ড ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে টিকে আছে বাংলাদেশের মানচিত্রে।

লেখক: রাঙামাটি থেকে

রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার এবং পার্বত্যাঞ্চলে বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার

মাহের ইসলাম:

সম্প্রতি ফেসবুকের উদ্যোক্তা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ স্বীকার করেছেন যে, মায়ানমারের চলমান রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের ভূমিকা রয়েছে। এই স্বীকারোক্তি এসেছে তখনই, যখন রাখাইনে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার প্রেক্ষাপট তৈরিতে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী কাজে ফেসবুকই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন সংস্থা অভিযোগ করছে।

উল্লেখ্য, গত ২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ তারিখে লন্ডনে ১৫৯টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর প্রকাশিত ‘দ্য স্টেস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স হিউম্যান রাইটস’- শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে যে, বিশ্বনেতাদের ছড়িয়ে দেয়া ঘৃণা ও রাজনৈতিক মতাদর্শ সিরিয়া ও মিয়ানমারে সংখ্যালঘু নির্যাতন উস্কে দিয়েছে। মিয়ানমারের পাশাপাশি ইরাক, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেনেও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হয়েছে। (দি গার্ডিয়ান, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)

মায়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের “ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন” এর চেয়ারম্যান মারজুকি দারুসমান একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিরূপ মনোভাবের জন্য বহুলাংশে অবদান রাখছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “মায়ানমারে সামাজিক মাধ্যম মানেই ফেসবুক, এবং বিভিন্ন বিরূপ মন্তব্য সেখানে বর্তমান”।

অন্যদিকে, মিয়ানমার মানবাধিকার পরিস্থিতির একজন দূত বলেন, “আমরা জানি জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের নিজস্ব ফেসবুক একাউন্ট রয়েছে এবং তারা রোহিঙ্গা বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অনেক সহিংসতা এবং ঘৃণা ছড়াচ্ছে”।(আল জাজিরা, ১৪ মার্চ, ২০১৮)

ইতোমধ্যেই এটা সবারই জানা হয়ে গেছে যে, খবরের নামে গুজব ছড়ানোর মধ্য দিয়ে মায়ানমারে মুসলিম ও রোহিঙ্গাবিদ্বেষী মনোভাবে উসকানি ও প্রণোদনা জোগানোর কাজে ফেসবুককে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই, মিয়ানমার সেনা ও উগ্রবৌদ্ধদের বর্বরতার খবর মুছে দিয়ে এবং রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ নির্যাতনের সত্য খবরও আড়াল করেছে ফেসবুক। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাবিদ্বেষী প্রচারণায় প্রচণ্ড বর্ণবাদী রাজনৈতিক কার্টুন, মিথ্যা ছবি এবং বানোয়াট সংবাদ সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। পরবর্তীতে, এগুলো প্রায়ই ভাইরাল করে ছড়িয়ে দেয়া হয় সাধারন মানুষের মাঝে।

ফলে, মায়ানমারের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গা বিদ্বেষ এবং অনেকেই আরাকান রাজ্যের এই সংখ্যালঘু মুসলিম মানুষদের দেখতে শুরু করেছে ঘৃণার চোখে। অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসেবে, মায়ানমারের অনলাইন জগতে রোহিঙ্গাবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ, উসকানি, সহিংসতা এবং ঘৃণা প্রচারণা অনেকটা উৎসবে পরিণত হয়।

চূড়ান্ত পরিণতিতে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত জাতিগত নিধনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে, ১২ এপ্রিল ২০১৮ পর্যন্ত শুধুমাত্র বাংলাদেশেই আশ্রয়প্রার্থী নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১,০২,৬৩২ জন; জাতিগত নিধন, হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা শিকার হওয়া দুর্ভাগাদের প্রকৃত সংখ্যা হয়ত কোনদিনও জানা যাবে না।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলেও প্রায় অনুরূপ ক্ষেত্র সৃস্টির অপচেষ্টার আশংকা দেখা দিয়েছে, কিছু কিছু পাহাড়ির ফেসবুক পোস্ট দেখে। যেখানে, প্রতিনিয়তই বাঙ্গালী বিদ্বেষী অপপ্রচার চালিয়ে ঘৃণা, অবিশ্বাস আর সন্দেহের বীজ বপনের কাজে ফেসবুক ক্রমেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে, বেছে বেছে শুধুমাত্র বাঙ্গালীদেরকে টার্গেট করা হচ্ছে, তাই নয়। বরং, অনেক ক্ষেত্রেই সাম্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি এসব পোস্টে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন এমনকি সরকার এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী উপাদানও থাকে।

পাহাড়ে সংঘটিত হলেতো কথাই নেই, এমনকি সমতলে সংঘটিত ঘটনাকে পুঁজি করেও এমন অপপ্রচেষ্টা অহরহ দেখা যায়। এক্ষেত্রে, বেশীরভাগ সময়ই যে কোন বাস্তব ঘটনাকে ব্যবহার করা হয়; তবে প্রকৃত ঘটনা গোপন করে, কিছুটা মিথ্যে মিশ্রণ করে বা আংশিক সত্য প্রকাশ করে এবং ছবি এডিট করে প্রকাশ করা হয়। এছাড়াও অতীতে ঘটে যাওয়া ভিন্ন কোন ঘটনার ছবি ব্যবহার করে, সাম্প্রতিক বা আলোচ্য ঘটনার ছবি হিসেবে চালিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায়। এ ধরণের প্রচেষ্টার নিয়মিত শিকার হলো পাহাড়ে বসবাসরত বাঙ্গালীরা। ইচ্ছে করেই পজিটিভ সংবাদগুলো আড়াল করে শুধুমাত্র নেগেটিভ সংবাদগুলোই সামনে এনে এবং অবশ্যই কিছুটা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়; বাঙ্গালীর প্রতি ঘৃণা আর পাহাড়ীর প্রতি সহানুভূতি অর্জনের উদ্দেশ্যে।

উপরের ছবিটি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে কিশোরী বিউটি আক্তারের, যাকে হত্যা করা হয় গত মার্চের ১৬ তারিখে। ঘটনার পরপরই, বাঙ্গালী বিদ্বেষী পোস্ট চলে আসে ফেসবুকে। ২০১২ সালের সবিতা চাকমার ঘটনা উল্লেখ করে এক উস্কানিমূলক পোস্ট আপলোড করা হয়, যেখানে ব্যবহার করা হয় ২০১৮ সালের বিউটি আক্তারের মৃতদেহের ছবি। প্রকৃতপক্ষে, ২০১৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী সবিতা চাকমার লাশ নিজ বাড়ির পাশে পাওয়ার পর বিভিন্ন পাহাড়ী সংগঠনগুলো থেকে সবিতা চাকমা বাঙালী ট্রাক ড্রাইভার ও হেলপার কর্তৃক গণধর্ষিতা হয়ে মারা গেছে বালে দাবী করে ব্যাপক প্রচারণা, প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। এমনকি শাহবাগেও সবিতা চাকমা ‘ধর্ষণ’ ও খুনের ঘটনায় মানবন্ধন হয়েছে। কিন্তু পরে ময়না তদন্তে প্রমাণ হয় যে, তাকে ধর্ষণ করা হয়নি।

‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ : বিচার কামনার চেয়েও বাঙালিকে ধর্ষক প্রমাণ করাটা যখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ শিরোনামের নাজমুল আহসান এর ব্লগ থেকে জানতে পারি যে, “বাংলাদেশে মিডিয়া ক্যু’র সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে পার্বত্য বাঙালিরা।” তিনি আরো জানিয়েছেন, “অনেক অপরাধের বোঝা বইতে হয়েছে পার্বত্য বাঙালিদের, যেটার জন্য আদৌ তারা কোনোকালেই দায়ী ছিল না।” পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণ ও তার প্রতিবাদের শুধুমাত্র ২০১৪ সালের ৫টি ঘটনাকে কেস স্টাডি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, “কেউ কেউ আসলে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের বিচার চায় না, কিন্তু বাঙালিই ধর্ষক সেটাই প্রমাণ করতে চায়। বিচার এখানে মূখ্য নয়, ধর্ষণকে কেন্দ্র করে আমি কতোটুকু রাজনীতি করতে পারলাম, সেটাই মূখ্য বিষয়।” (https://www.istishon.com/?q=node/19537)

দেবী ত্রিপুরা, বিশাখা চাকমা, উ প্রু মারমা, আয়না চাকমা, দিপা ত্রিপুরা, ফাতেমা বেগম, এবং সবিতা চাকমা এর মতো অনেক ঘটনা আছে যেখানে ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বাঙ্গালী বিদ্বেষী প্রচারণা ও ঘৃণা সৃষ্টিতে।

অনেক পাহাড়ী মেয়ের জন্যে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক। বাঙ্গালী ছেলের সাথে মেলামেশা করলে বা এক সাথে ছবি তুললেই পাহাড়ী মেয়েরা পাহাড়ী আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত যুবকদের দ্বারা হেনস্তার শিকার হচ্ছে ফেসবুকের মাধ্যমে এবং সরাসরি।

অনেক ক্ষেত্রেই, মেয়ের বিস্তারিত পরিচয় উল্লেখ করে এসব ছবি ফেসবুকে চলে আসছে; বিভিন্ন ধরনের হুমকি, এমন কি নিলামে তোলা বা প্রাণনাশের হুমকিসহ। পাহাড়ী মেয়েদের ছবি, নাম, পিতার নামে এমনকি ঠিকানা পর্যন্ত ফেসবুকে পোস্ট করে, তাদেরকে সর্বত্র হেয় করার পাশাপাশি তাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। বাঙ্গালী বিদ্বেষী মনোভাব এমনই প্রকট যে, এখানে ‘পতিতাবৃত্তি’ কেও গ্রহণযোগ্য বলা হচ্ছে, কিন্তু বাংগালী ছেলের সাথে পাহাড়ি মেয়ের ‘প্রেম, ভালোবাসা এবং বিয়ে’ গ্রহণযোগ্য নয়।

পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালিদের প্রতি ঘৃণার প্রকটতা এমনই পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মৃতকে পর্যন্ত রেহাই দেয়া হয়নি। রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসের অব্যবহিত পরেই সেনাসদস্যরা জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পরে। অথচ, এই উদ্ধার কাজে নিয়োজিত সেনাসদস্যদের মৃত্যতে ও কিছু পাহাড়িকে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তারচেয়েও বেদনাদায়ক হলো এই যে, তারা তাদের এই ঘৃণা ও উল্লাস প্রকাশে কোন রাখ ঢাকের ধার ধারেনি, বরং প্রকাশ্যেই জানান দিয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে। 

২০১৭ সালের জুন মাসে রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত হয় স্মরণ কালের অন্যতম ভয়াবহ পাহাড় ধস। তাৎক্ষণিক উদ্ধারকাজে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় একজন মেজর ও একজন ক্যাপ্টেনসহ ৫ জন সেনাসদস্য শাহাদাত বরণ করার পরেও ঘৃণা প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাদের মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত মিথ্যামিশ্রিতভাবে উপস্থাপন করতে দেখা যায়।মৃত সেনাসদস্যদের ‘অত্যাচারি এবং নরপিশাচ’ বলে উপস্থাপন করা হয়। অথচ, উক্ত পাহাড় ধসের ঘটনা পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবেলায় রাঙ্গামাটিতে সেনা সদস্যরা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ৮ টি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, যেখানে দুই মাসের বেশি সময় ধরে সর্বমোট ৯৩,৩৮১ জনের খাবারের ব্যবস্থা করে এবং ২২৫৭ জনকে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা প্রেদান করে। আর, বাঙ্গালিদের প্রতি ঘৃণা এমনই তীব্র যে, শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত সহানুভূতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে !

২ জুন ২০১৭, সকালে রাঙ্গামাটির লংগদুতে পাহাড়িদের প্রায় শতাধিক বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। অনুমান করা হচ্ছে, পাহড়ি দুই যুবকের হাতে নিহত বাঙ্গালী মটর সাইকেল চালক নয়নের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ মিছিল হতে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল তরুণ এই অগ্নিকান্ডের জন্য দায়ী। ফলে, কয়েকশত নিরীহ পাহাড়ি পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে রাতারাতি সহায় সম্বলহীন হয়ে মানবেতর দিনযাপনে বাধ্য হয়েছে। পরবর্তীতে, স্থানীয় রাজনীতির জটিলতায়, নারী ও শিশুসহ এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই সরকারী ত্রাণ এমনকি চিকিৎসা সহায়তা পর্যন্ত নিতে বাধার সম্মুখীন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ফেসবুকের কল্যাণে ঘটনাটি অতি দ্রুত লংগদুর বাইরে ছড়িয়ে দেয়া হয়, দেশে এবং বিদেশে; তবে একটু ভিন্ন ভাবে। জ্ঞাতসারেই হোক আর অজ্ঞাতসারেই হোক, এই ভয়াবহ সংবাদটি কয়েকটি দেশি এবং বিদেশী পত্রিকাতেও খানিকটা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

যে তিনটি ছবিকে লংগদুর অগিকান্ডের ছবি বলে চালানো হলো, দেশবাসি এবং বিশ্ববাসীর সমবেদনা প্রাপ্তি এবং বাঙ্গালীদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টির লক্ষ্যে, সেগুলো আসলে এদেশেই ঘটে যাওয়া টঙ্গীতে বয়লার বিস্ফোরণ (১০/৯/১৬), গাইবান্ধায় সাঁওতাল পল্লি (৭/২/১৭) এবং বরিশালে বিস্কুটের গোডাউন (৪/২/১৭) এর আগুনের ছবি। অনলাইনে গিয়ে ‘লংগদুতে আদিবাসীদের উপর হামলা: কিছু ভুল ছবি’ (https://www.jaachai.com/posts/post-807) শিরোনামের এক পেজ থেকে জানা যায় যে, লংগদুতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা সত্য হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে সকল ছবি এসেছে তার সব ছবিই এই ঘটনা সংশ্লিষ্ট নয়।ভিন্ন ঘটনার ছবি ব্যবহার করে বাঙ্গালীদের দোষারোপ করা হয়েছে অত্যন্ত সুচারুভাবে।

একদিকে বাঙ্গালিদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি আর অন্যদিকে পাহাড়িদের প্রতি সমবেদনা আদায় করার এই পন্থা শুধুই পুরাতনই নয় বরং কিছু পাহাড়ির কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বাংলাদেশ সংক্রান্ত যে কোন সংবাদের মধ্যে দেশ বিরোধী বা দেশের জন্যে অবমাননাকর উপাদান যোগ করে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়। যে কোন কিছুর সাথে কিছুটা মিথ্যে যোগ করে বা কোন নেতিবাচক সংবাদ এর সাথে বাঙ্গালী বিদ্বেষী মতামত যোগ করে পোস্ট আপলোড করা নৈমিত্তিক ব্যাপার।

একটু খেয়াল করলেই এ ধরনের হাজার হাজার পোস্ট চোখে পড়বে যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পাহাড়ের সরল মনের মানুষদের বাঙ্গালী বিদ্বেষী মনোভাব গড়ে তোলার চেস্টা চলছে। সরকার যখন পাহাড়ে পাহাড়ি- বাঙ্গালীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং শান্তি আর উন্নতির চেস্টায় আন্তরিকভাবে নিবেদিত, তখন এ ধরনের ফেসবুক পোস্ট সরকারের সমস্ত প্রচেস্টার বিরুদ্ধে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের চোখের আড়ালে ঘটছে বলে, অনেকেই এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে হয়ত কিছুটা সময় নিতে পারে।

কিন্তু, চরম বাস্তবতা হলো, ফেসবুকের এই ঘৃণা ছড়ানো এবং বাঙ্গালী বিদ্বেষী প্রচারণা পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের পাশাপাশি অশান্তি এবং অসাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প পাহাড়ের বাতাসে বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে। নিরীহ এবং সরল মানুষগুলো প্রকৃত সত্যের পরিবর্তে মিথ্যের জালে ক্রমাগত আষ্টপৃষ্টে বাঁধা পড়ছে; না বুঝেই পরস্পরের শত্রু হয়ে মুখোমুখি হয়ে পড়ছে একই সমাজের মানুষগুলো। ষড়যন্ত্রকারীদের কুটচালে ব্যহত হচ্ছে উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি; অকার্যকর হয়ে পড়ছে রাষ্ট্রীয় আন্তরিকতা, দেশবাসীর উদারতা আর জাতির ধর্মীয় সহিষ্ণুতা। দেশের বাইরে ভুলন্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সম্মান ও মর্যাদা।

রামনবমী পালনকে কেন্দ্র করে, মার্চের শেষ সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ আর বিহার রাজ্যে মোট দশটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটেছিল। বিবিসির হিন্দি বিভাগ তাদের সংবাদ দাতাদের প্রেরিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই মতামত ব্যক্ত করছে যে, “এ অশান্তি, হিংসা বা অগ্নিসংযোগ কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই, অনিয়ন্ত্রিতভাবে, হঠাৎ ঘটে গেছে – ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে এরকমটা মনে করা কঠিন।”

এ নিয়ে ১২ এপ্রিল ২০১৮ তারিখে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত, ‘ভারতে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গা ‘পরিকল্পিত’ মনে করার ৯টি কারণ’ সংবাদে বিস্তারিত আলোচনা করার সময়, ‘সামাজিক মাধ্যমে গুজব’ ছড়ানোকে একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই, মায়ানমারের রোহিঙ্গা নিধনে ফেসবুকের অপব্যবহার আর ভারতে মুসলিম বিরোধি দাঙ্গায় সামাজিক মাধ্যমের গুজব ছড়ানোকে মাথায় রেখে পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে ফেসবুকে ধর্মীয় উস্কানিমূলক ও বাঙ্গালী বিরোধী প্রচারণা ও ঘৃণা ছড়ানো বন্ধের পদক্ষেপ এক্ষুণি নিতে হবে। এ নিয়ে কালক্ষেপণের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বরং এ বিষয়ে লাগাম টানতে যত দেরি হবে, তত বেশি জ্যামিতিক হারে এর ক্ষতির শিকার হতে পারে আমাদের সকলকে।

• লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক ও লেখক।

maherislm@gmail.com


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)
  8. অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?