image_pdfimage_print

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।)

বৈষম্যের শিকার পাহাড়ের বাঙালিরা

পাহাড়ে অশান্তির আগুন-৪

ফারুক হোসাইন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে :

  খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামের আব্দুল লতিফ (৭০) ছোট একটি ছাউনি ঘরে পরিবারের পাশপাশি গরু-ছাগল নিয়ে একইসাথে রাত্রি যাপন করেন। ৩০ বছর আগে সরকার তাকে পার্বত্য অঞ্চলে এনে বসতের জন্য ২৫ শতাংশ এবং চাষের জন্য চার একর জমি দিলেও তা কেড়ে নিয়েছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। সব হারিয়ে সরকারি রেশন পেয়ে ছোট একটি ঘরে দিনাতিপাত করছেন তিনি। একদিন রেশন না দিলে বন্ধ থাকে খাওয়া-দাওয়া। আশপাশের পাঁচ-ছয়টি গ্রামের ৪শ’ পরিবার সেই গুচ্ছগ্রামে আশ্রয় নিয়ে একইভাবে জীবনযাপন করছেন।

লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সরকারের পক্ষ থেকে অনুদান (টিন, কম্বল) বিতরণে গিয়ে একজন বাঙালিরও নাম খুঁজে পাননি সরকারি কর্মকর্তারা। পার্বত্য অঞ্চলকে অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, চাকরি, উচ্চশিক্ষা বৃত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা রকম কোটা ও সুযোগ-সুবিধা চালু করেছে সরকার। তবে একই এলাকায় বসবাস করে এবং জনগোষ্ঠীর অর্ধেক হয়েও তা পাচ্ছেন না বাঙালিরা।

শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা হচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগিরা। অবিলম্বে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করে জনসংখ্যানুপাতে সকল সুযোগ-সুবিধা বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডে একজন বাঙালি প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়ার  দাবি জানান তারা।

তিন পার্বত্য জেলার সরকারি কর্মকর্তাদের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই এলাকার বাঙালিরা সরকারি বরাদ্দের কোনো কিছুই পান না। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার প্রশাসনের মাধ্যমে যেসব সুযোগ-সুবিধা, বিশেষ অঞ্চল এবং অনগ্রসর অঞ্চল হিসেবে যেসব বরাদ্দ দেয়া হয় তার পুরোটাই ভোগ করছে উপজাতিরা। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে উপজাতিরা নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং তারাই তালিকা করেন কাদেরকে বরাদ্দ দেয়া হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, স্থানীয় প্রতিনিধিদের তালিকায় কোনো বাঙালির নাম থাকে না। ফলে জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ছাড়ায় চলতে হচ্ছে। অন্য দিকে উপজাতি জনগোষ্ঠী এককভাবে এর পুরোটা লাভ করছে।

%e0%a6%97%e0%a7%81%e0%a6%9a%e0%a7%8d%e0%a6%9b%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%99%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80

জানা যায়, মেডিক্যাল, বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সকল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে উপজাতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে ১৯৮৪ সাল থেকে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর কোটার সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতি বছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩২৫ জন উপজাতি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে কোটাতেই। নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর সংখ্যা আরো বাড়ানো হয়েছে।

অন্য দিকে একই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বাঙালিদের জন্য তেমন কোনো সুযোগ এখনো তৈরি করা হয়নি। পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী দু’টি জনগোষ্ঠীর জন্য দুই রকম নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩টি আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তাও সেটি পার্বত্য বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের ফলে।

শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন পাহাড়ের বাঙালিরা। উপজাতি জনগোষ্ঠী করের আওতামুক্ত হলেও বাঙালিদের কর দিতে হচ্ছে। পাহাড়ি সংগঠনগুলোর আদায় করা চাঁদার ক্ষেত্রে বাঙালিদের কাছ থেকে অধিক হারে আদায় করা হয়। পার্বত্য এলাকায় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লাখ টাকার মধ্যে হলে ঠিকাদারী সম্পূণরূপে উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০ শতাংশ উপজাতিদের আর বাকি ৯০ শতাংশ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হলেও তার বেশির ভাগ পায় উপজাতিরাই।

আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র পাঁচ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় ১৬ শতাংশ।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তিতে বাঙালিরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। জনসংখ্যার দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা ৪৮ হলেও তাদের জন্য মাত্র ২৩ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্য দিকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন উপজাতি তথা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৫২ শতাংশ অধিবাসীদের জন্য ৭৭ শতাংশ শিক্ষাবৃত্তি বরাদ্দ করা হয়েছে। আর ২৩ শতাংশ বাঙালি শিক্ষার্থীদের তালিকায় মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু ও বড়ুয়া শিক্ষার্থীদেরও রাখা হয়েছে। ফলে বৈষম্যের শিকার হয়েছে তারাও।

গতবছর পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উচ্চ শিক্ষাবৃত্তি তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় সর্বমোট ৪৭৫ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। এর মধ্যে উপজাতির সংখ্যা ৩৬৪ জন আর মাত্র ১১১ জন বাঙালি (মুসলিম, হিন্দু ও বডুয়া) শিক্ষার্থী। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় দেয়া ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১২১ জন, ৩৭ জন বাঙালি। রাঙামাটি জেলায় ১৫৯ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থী ১১৩ জন আর মাত্র ৪৬ জন বাঙালি। বান্দরবান জেলায় ১৫৮ জন ছাত্র-ছাত্রীকে উচ্চশিক্ষা বৃত্তি দেয়া হয়। এর মধ্যে উপজাতি শিক্ষার্থীর  সংখ্যা ১৩০ জন, আর মাত্র ২৮ জন বাঙালি শিক্ষার্থীকে এই বৃত্তি দেয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেড় শতাধিক এনজিওর মাধ্যমে কয়েক হাজার খানেক প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কোনোটিতেই বাঙালি অধিবাসীরা সুযোগ পাচ্ছে না। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে তা দেয়া হচ্ছে। রাঙ্গামাটির বিভিন্ন উপজেলায় এনজিওগুলোর ২২৫টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯টি ক্ষুদ্র প্রকল্প বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায়।

পার্বত্য অঞ্চলের শহরের বাঙালিরা অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সচ্ছল হলেও গ্রামের মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিশেষ করে বসতি ও চাষের জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা। তিন জেলাতে এরকম মোট  ৮৬টি গুচ্ছগ্রাম রয়েছে। এগুলো ২৬ হাজার পরিবার পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা পাঁচ গুণ বাড়লেও রেশন কার্ড বাড়েনি একটিও।

খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার চেংড়াছড়ি গুচ্ছগ্রামে গিয়ে দেখা যায়, মানবেতর জীবনযাপন করছেন পাহাড়ি বাঙালিরা। থাকার জায়গার অভাবে একই ঘরে গরু, ছাগল এবং মানুষ বসবাস করছে। স্থানীয়দের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে ৫৬টি পরিবারকে ওই এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসবাসের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেয়া হয়।

কিন্তু পাহাড়ি উপজাতিদের অব্যাহত বিরোধীতা ও আক্রমণের কারণে ১৯৮৮ সালে তাদেরকে একটি গ্রামে একত্রিত করে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। সে সময় ৫৬টি পরিবারকে ২৫ শতাংশ বসতি জমি এবং পৌনে চার একর চাষযোগ্য জমি দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়। ৩০ বছর পর সেই ৫৬ পরিবার এখন ৪০০ পরিবারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ২৫ শতাংশ জমির মধ্যে এক শতাংশও বাড়েনি।

অন্য দিকে চাষযোগ্য যে পৌনে চার একর জমি তাদের দেয়া হয়েছিল তা পাহাড়ে হওয়ার কারণে উপজাতিদের বাধা ও অপহরণের ভয়ে সেগুলোতে চাষ তো দূরের কথা, পা পর্যন্ত ফেলতে পারে না বাঙালিরা। কেউ বাধা ডিঙিয়ে চাষ করার কথা চিন্তা করলেই রাতের অন্ধকারে তাকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা মুকুল হোসেন বলেন, ৩০ বছর আগে যে বসতি জমি দিয়েছিল, এখন সেই জমিতের আমাদের পরিবারদের আর জায়গা হয় না। মানুষ বেড়েছে পরিবার বেড়েছে কিন্তু জমিতো বাড়েনি। অন্য দিকে চাষের জন্য পাহাড়ে যে জমি দিয়েছে, সেই জমিতে তো আমরা যেতেই পারি না।

পুলিশের কাছে অভিযোগ এবং কোর্টের কাছে সুরাহা চাইলে বলা হচ্ছে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান কর। ৭০ বছর বয়সী মো: আব্দুল লতিফ বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের যে চাষের জমি দিয়েছিল, সেখানে তো ভয়ে যেতে পারছি না। আর যে জমিতে প্রথমে বাড়ি করেছিলাম, সেখানে শান্তিবাহিনীর অত্যাচারে ছেড়ে আসতে হয়। আবুল হাসেন বলেন, কুলারাম পাড়া, লেম্বু ছড়িতে প্রথমে তাদের বসবাস ছিল। যখন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসের কারণে নিরাপত্তা দেয়া যাচ্ছিল না তখন ৮৮ সালে এই গুচ্ছগ্রামে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ৮২’ সালে বসবাস শুরু করার পর শান্তিবাহিনী অত্যাচার শুরু করে। রাতের বেলা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়, কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়। ফায়ার করে ভীতি তৈরি করা হয়। এই নিরাপত্তাহীন অবস্থায় আশপাশের বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোকে নিয়ে এসে এই গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা হয়।

গুচ্ছগ্রামের প্রধান ও ১১ নম্বর সেক্টরের ২ এম এফ কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বলেন, এখানে বাঙালিরা ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। গণতন্ত্র নাই, পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। নিকৃষ্ট, খুনি, রাজাকারের জাতি স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। আবার সরকারও নতজানু হয়ে তাদের সহযোগিতা করছে। আমাদের নিজেদের দেশে আমরা নাগরিক না, নতুন করে নাগরিক হতে হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, এনজিওগুলো বলছে- পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যে কনফিডেন্স তৈরিতে তারা কাজ করছে। এর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ের বাঙালিরা এর কোনো অর্থই পায় না, সহযোগিতা পায় না। শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে বাঙালিরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে স্বীকার করে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সকল পক্ষকে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে

%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%ac-%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%a8

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসহাব উদদীন, এনডিসি, পিএসসি (অব.)

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সুপ্রাচীনকাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আজ থেকে প্রায় ১৫৬ বছর আগে, ১৮৬০ সালে, ব্রিটিশ-ভারতের সরকার তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলার পূর্ব অংশের পার্বত্য অঞ্চলকে আলাদা একটি প্রশাসনিক ইউনিট তথা একটি নতুন জেলার সৃষ্টি করে এবং নতুন জেলার নাম দেওয়া হয় ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাটি পাকিস্তান তথা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে যায়। অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাও বাংলাদেশের অংশ হিসেবে অব্যাহত থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে দেশ যখন দ্রুত পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল জনগণের ঐক্যবদ্ধতা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর একটি ক্ষুদ্র অংশ এই যুক্তবদ্ধতার সঙ্গে শামিল না হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। উত্থান হয় ‘শান্তিবাহিনী’ নামক এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলের। স্বাভাবিকভাবে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার শক্তি প্রয়োগে বাধ্য হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত পথ থেকে শান্তির পথে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উত্তরণে বাংলাদেশের সব সরকারই সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।

অবশেষে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সফল অবসান ঘটিয়ে সূচিত হয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন। শান্তি চুক্তি ও বাস্তবায়ন : ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মায়’ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর সঙ্গে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দের পক্ষে সন্তু লারমা।

as

এখানে উল্লেখ্য, কোনো প্রকার তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই এবং কোনো বিদেশি শক্তিকে যুক্ত না করেই এ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছিল যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম। পৃথিবীর যে কোনো দেশে সাধারণত এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায়। শুরু থেকেই এই চুক্তি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চুক্তিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে তৎকালীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ শান্তি বাহিনীর দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের।

ফলশ্রুতিতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও উন্নয়নের নবযাত্রার সূচনা হয়। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা হবে শান্তি ও উন্নয়নের রোল মডেল। শান্তি চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ভারত থেকে প্রত্যাগত ১২,২২৩টি পরিবারের মোট ৬৪,৬১২ জন শরণার্থীকে পুনর্বাসন করেছে। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণরূপে এবং ১৫টি ধারা আংশিক রূপে বাস্তবায়ন করেছে। এ ছাড়াও ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ৩৩টি বিভাগ/বিষয়ের মধ্যে ৩০টি বিভাগ/বিষয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে এবং ২৮টি বিভাগ/বিষয় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব বিভাগে লোকবল নিয়োগে চুক্তির শর্তানুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়ায় স্থানীয়ভাবে তাদের বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত একটি ব্রিগেড এবং ২৩৯টি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলা হয়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা

শান্তি চুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। এর জটিলতার প্রধান কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপ না হওয়া। সরকার একাধিকবার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি জরিপের উদ্যোগ নিলেও পাহাড়ি সংগঠনগুলোর বিরোধিতা, অপহরণ ও সন্ত্রাসী তত্পরতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভূমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকি সব সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধি। বিষয়টির ব্যাপকতা এবং জটিলতার কারণেই বাস্তবায়নে একটু বেশি সময় লাগছে সমাধান করতে। শান্তি চুক্তি একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। দুই পক্ষের জন্যই এই চুক্তিতে পালনীয় কিছু শর্ত রয়েছে।

asss

এটা ঠিক যে, শান্তি চুক্তি সম্পাদনের মূল লক্ষ্য— ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠা’ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী পাহাড়ি সংগঠন জেএসএসের সদস্যরা শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাদের পক্ষ থেকে সব শর্ত পালন করেনি এবং শুরুতেই একটি অংশ ভাগ হয়ে অস্ত্র সমর্পণে সম্মত হয়নি।

পরবর্তীকালে সেই সংখ্যা আরও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা আরও উন্নত অস্ত্র সংগ্রহ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অসহযোগিতা অব্যাহত রাখে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বাধার সৃষ্টি করে। সম্প্রতি, নিরাপত্তা বাহিনীর অপারেশনে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ দাবি করে থাকেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশই অবাস্তবায়িত। কিন্তু পরিসংখ্যান এই দাবি সমর্থন করে না। আমরা জানি, কিছু বাস্তবতার কারণে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়েছে। শান্তি চুক্তি বিষয়ে দেশের উচ্চ আদালতে একটি মামলা হাইকোর্টের রায়সহ বিচারাধীন রয়েছে। সরকারকে এসব বিষয় নিয়ে আরও দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সীমান্ত এবং সন্ত্রাসবাদ

পার্বত্য চট্টগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের অভিন্ন সীমান্ত রয়েছে এবং সেসব সীমান্তে নিজ নিজ দেশের ইমারজেন্সি অপারেশন বিদ্যমান। দুর্গমতার কারণে বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত সেই সীমান্তের একটি বিরাট অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে ২৬২ কিমি অরক্ষিত সীমানা রয়েছে।

ফলে, সে সব অরক্ষিত দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ওই সব দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রায়শই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এতে করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও বন্ধু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি এবং ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। সম্প্রীতি, বান্দরবান ও রাঙামাটির কয়েকটি স্থানে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে।

এ ছাড়াও, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের যোগসাজশে বান্দরবান জেলা থেকে পর্যটক অপহরণসহ বিভিন্ন প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো সম্প্রতি সমতলের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অস্ত্র কেনাবেচা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততা সম্পর্কিত তথ্যাদি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম থেকে জানা গেছে। এসব প্রেক্ষাপটে জাতীয় স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

শান্তি চুক্তির সাফল্য

শান্তি চুক্তির ফলে পাহাড়ি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ যে সুবিধা ভোগ করছে তা ভুলে গেলে চলবে না। শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে উন্নয়ন প্রবলভাবে গতি পেয়েছে। সমতলের জেলাগুলোর মতো বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিমি রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিমি রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। এ ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, কলকারখানাসহ সম্পন্ন হয়েছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম।

সরকারের প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আজ মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে এককালের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। যেখানে পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান উন্নয়নে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ হচ্ছে সেখানেও কতিপয় স্বার্থান্বেষী নেতৃবৃন্দ বাধার সৃষ্টি করছেন। ইতিহাসে উন্নয়নকে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন নজির সম্ভবত আর নেই।

১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ছয়টি উচ্চবিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রায় প্রতিটি পাড়ায়। এ ছাড়াও ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। আমরা এ অবস্থার আরও উন্নতি দেখতে চাই।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব শিল্পকারখানা এবং পর্যটন সহায়ক শিল্প গড়ে তোলার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন নতুন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ বলে দাবি করা যায় না।

অন্যদিকে, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতায় ৩৫ কিমি দীর্ঘ থানচি-আলীকদম সড়ক নির্মাণ, নীলগিরি ও সাজেকের মতো উন্নত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আরও অনেক আকর্ষণীয় ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ সুবিধা আরও সম্প্রসারিত করা গেলে নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪৫টি নয়নাভিরাম পর্যটন স্পট রয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে বিকাশ করতে পারলে প্রতিবছর ১৫-২০ হাজার কোটি টাকা উপার্জন করা সম্ভব। এতে করে রাষ্ট্র যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে তেমনি পর্যটন বিকাশের ফলে স্থানীয় পাহাড়ি জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে চাঁদাবাজি/সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অনেকাংশে কমে যাবে বলে সহজেই অনুমেয়।

assss

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের অবস্থান

প্রথমেই একটি কথা বলা প্রয়োজন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি জনগোষ্ঠী কারও তাড়া খেয়ে, যাযাবর হয়ে বা কারও দয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যায়নি। রাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটাতেই বাঙালি কিছু পরিবারকে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়েছে। পাহাড়ের জলবায়ু, ভূমিরূপ ও ফুড চেইন তাদের বসবাসের জন্য উপযোগী ছিল না। তা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে সেখানে বাঙালিদের যাতায়াত ও বসবাস ছিল।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। কিন্তু পাহাড়িরা এই কাজে অভ্যস্ত বা অভিজ্ঞ ছিল না। ফলে উন্নয়ন কাজ সমাধা করার জন্য বাঙালি প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। শ্রমিকদের পক্ষে গহিন পাহাড়ি অরণ্যে কাজ করে দিনে দিনে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না।

ফলে নিকটবর্তী স্থানে তাদের বসতি গড়তে হয়। কোনো পাহাড়ি শ্রমিক উন্নয়নের কাজে সহায়তা করতে চাইলেও শান্তি বাহিনীর হুমকির মুখে তা পারত না। কারণ, সন্ত্রাসীরা সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নবিরোধী ছিল। শান্তি বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙালি হত্যা, নির্যাতন প্রক্রিয়া রোধ করতেই গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টি করে বাঙাল ও পাহাড়িদের নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের জন্য ১০৯টি গুচ্ছগ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ ব্যক্তিকে জায়গা-জমি দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়। এতে বাঙালিরা নিরাপত্তা পেলেও সরকার প্রদত্ত বসতভিটা ও চাষের জমি হারাতে হয়। সেই আশির দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বাঙালিরা আর তাদের সেই ভিটা ও আবাদি জমি ফেরত পায়নি। প্রতিবছর খাজনা দিয়ে ডিসি অফিসের খাতায় জমির দখল স্বত্ব বহাল রাখলেও তাতে বসত করা, আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ জমিতে চাষাবাদ করতে গেলেই পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি বাঙালিদের চাষকৃত জমির বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ এবং আনারস গাছ পর্যন্ত পাহাড়িরা কেটে ফেলে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের অবস্থান

পাহাড়িদের মতে, পাহাড়ের সব জমিই তাদের। বাঙালিদের ভূমিহীন করার কৌশল হিসেবে তাদের জমির খাজনা অনেক পাহাড়ি হেডম্যান গ্রহণ করে না, ডিসি অফিসে দিতে হয়। বসতবাড়ি ও ভিটার জমিতে খাজনা দিয়েও তাদের এই মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। পাহাড়িরা সমতলে এসে বসবাস করার সুযোগ পেলেও সমতলের বাঙালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে জমি ক্রয় করতে পারছে না।

এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন শিল্প উদ্যোক্তার সৎ উদ্দেশ্য থাকার পরেও তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো প্রকার শিল্পায়নের প্রসার ঘটাতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা সারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। বাঙালিরা পাহাড়ে নানা বৈষম্যের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সরকারের দৃষ্টিগোচরে এনেছে। এরমধ্যে পাহাড়ে ব্যবসা করতে গেলে বাঙালিদের কর দিতে হয়, উপজাতিদের দিতে হয় না।

উপজাতিদের ব্যাংকের সুদ ৫%, বাঙালিদের কমবেশি ১৬%। দুই লাখ টাকার নিচের ঠিকাদারি ব্যবসা একচেটিয়া পাহাড়িদের, তার উপরের কাজগুলোরও ১০% পাহাড়িদের জন্য নির্ধারিত। বাকি ৯০ ভাগ ওপেন টেন্ডারে করা হয় যাতে পাহাড়িরাও অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এসআই পর্যন্ত পুলিশের সব বদলি/নিয়োগ উপজাতীয় সংগঠন নিয়ন্ত্রিত। জাতীয়ভাবেও চাকরিতে ৫% কোটা তাদের জন্য নির্ধারিত। বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতেও এই কোটা রয়েছে।

বাংলাদেশের খ্যাতনামা এনজিও এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোতে চাকরির ক্ষেত্রে তাদের রয়েছে অগ্রাধিকার। একজন পার্বত্য বাঙালি ছাত্র ডাবল জিপিএ-৫ পেয়েও উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না। অন্যদিকে জিপিএ-৫ বা তার নিচের গ্রেড পেয়ে পাহাড়ি ছেলে-মেয়েরা কোটা সুবিধার কারণে বুয়েট/মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। নানা সুবিধায় তাদের জন্য বিদেশে শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ রাষ্ট্র কর্তৃক উন্মোচিত রাখা হয়েছে।

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার যেমন অঙ্গীকারবদ্ধ তেমনি অন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেও অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। এ জন্য কিছু সময় ও ধৈর্য প্রয়োজন। অযথা উসকানিমূলক বক্তব্য এবং বাগাড়ম্বর হুমকি সবাইকে পরিহার করতে হবে। আশা করা যায় সব পক্ষই সেই ধৈর্য প্রদর্শন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নের ধারাকে বেগবান করবে।

প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারসহ ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতিসত্তার সম্মিলিত ইচ্ছা ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। নেপাল এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশে সরকার এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নিজ নিজ দেশে পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশে পদক্ষেপ গ্রহণ করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। ওই সব দেশে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালীন সময়েও সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতে কোনোরূপ বাধার সৃষ্টি করেনি। পর্যটন শিল্পই যে উন্নয়নের চাবিকাঠি তা তারা সবাই অনুধাবন করতে পেরেছে। আমাদের দেশেও অনুরূপভাবে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

অতএব, “শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন”-এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পর্যটন শিল্পকে সরকার এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং আমাদের আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতিতে এই পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে।

আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, “আমি” বা “তুমি” এবং “আমরা” বা “তারা”য় বিভক্ত না হয়ে, সবাই মিলেই পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, সেখানে বসবাসরত সব পাহাড়ি ও বাঙালি-ই এদেশের গর্বিত নাগরিক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদের অবদান অপরিসীম ও প্রশংসার দাবী রাখে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা নিরাপত্তা বাহিনী নিজ দেশেরই একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষায় নিয়োজিত। তারা সেখানে কোনো বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে বা যুদ্ধজয়ের জন্য নিয়োজিত নয়। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে শান্তি নিশ্চিত করা। পরিশেষে, পার্বত্য এলাকায় শান্তির পরিবেশ আরও সুসংহত হবে এবং সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় সার্বিক উন্নয়ন সাধিত হবে।

♦ লেখক : সাবেক জিওসি, চট্টগ্রাম সেনানিবাস ও প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি স্বাধীন হবে?

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ চিরদিনের জন্য তামাদি হয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আ ল ম ফজলুর রহমান

(২৫)
পার্বত্য চট্টগ্রাম কি স্বাধীন হবে? হবে না। কেন হবে না? আলোচনায় আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতা কি সমর্থনযোগ্য? না সমর্থনযোগ্য নয়। কেন নয়? আলোচনা করবো। এই সব গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণের পূর্বে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনেকরি ।

সপ্তম শতাব্দীতে আরবরা ধর্ম প্রচার এবং ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ভারত এবং বাংলায় আসেন। আরবের তেঁতুল মিষ্টি হয় । ভারতে এবং বাংলায় এসে আরব বণিক ও ধর্ম প্রচারকরা টক তেঁতুলের সাথে পরিচিত হন । আরবরা এই টক তেঁতুলের নাম দেন “তামার আল হিন্দ” যার অর্থ হিন্দের তেঁতুল । পরে এই তামার হিন্দ থকে ইংরেজি শব্দ ট্যামারিন্ড শব্দের উৎপত্তি হয় ।

রাসুলে পাক হযরত মুহাম্মদ ( সা: ) এর আপন মামা চট্টগ্রাম হয়ে চীনের সাংহাইতে গমন করেন ইসলাম প্রচারের জন্য সাথে অনেক সঙ্গী সাহাবীদের নিয়ে। আমার ধারণা বাংলাদেশে এবং চট্টগ্রামে নিশ্চয় কোনো সাহাবী (রা:) কবর থেকে থাকবে।

আরব বণিক এবং ধর্ম প্রচারকরা কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে প্রথমে দক্ষিণ ভারতে নোঙর করেন। আরবরা দক্ষিণ ভারতের রাজাদের এতোই বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন যে, আরবদের অনেকে দক্ষিণ ভারতের রাজাদের সেনাবাহিনীতে জেনারেলের পদে অধিষ্ঠিত হন। এই আরব বণিকরা দক্ষিণ ভারতে “মাই পোলা” নামে অভিহিত হতেন। মাই অর্থ স্তন এবং পোলা অর্থ ছেলে সন্তান। অর্থাৎ এই আরবদের দক্ষিণ ভারতীয়রা দুধ সন্তান হিসাবে অভিহিত করতেন। এই মাইপোলা থেকে মোপোলা এবং মোপোলা থেকে বর্তমানের পোলা শব্দের উৎপত্তি হয় বাংলায়।

যৌক্তিক ইতিহাস চিন্তায় এও উপলব্ধি কর যায় যে, আরবরা দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলায় আসেন বলেই বাংলায় পোলা শব্দের উণ্মেষ ঘটে। দক্ষিণ ভারতের মতো বাংলাতেও আরবরা আপন সন্তানের মতো সমাদৃত হতেন। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, ধর্ম প্রচারক আরবরা এবং বণিক আরবরা জেদ্দা থেকে সোজা বাংলায় আসেন।

যৌক্তিক ইতিহাস চিন্তায় আমাদের নবী পাকের আপন মামার ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক মতামত যুক্তিযুক্ত মনে হয়। কারণ তাঁকে চীনে গিয়ে ধর্ম প্রচারের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। সেই ক্ষেত্রে পাক ভারত উপমহাদেশে আরবদের প্রথম আগমন ঘটে বাংলায়। এবং বাংলার মাটি ধন্য হয় নবী পাকের আপন মামা ( রা: )এবং তাঁর সাথী সাহাবীদের ( রা : ) পদস্পর্শে।

আরবরা যখন বাংলায় আসেন তখন সম্ভবতঃ গঙ্গা নদীর গতিপথের প্রবাহ ফরিদপুরের কোটালিপাড়া হয়ে চট্টগ্রামে সমুদ্রে গিয়ে মিশতো। আরব বণিকরা গঙ্গা নদী দিয়ে চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রামে আসার পরে চট্টগ্রামকে গঙ্গা নদীর উপদ্বীপ বলে মনে হয় আরব বণিকদের। আরবীতে উপদ্বীপকে বলা হয় সাত । আরব বণিকরা চট্টগ্রামের নাম দেন ” সাত আল গঙ্গা”। অর্থ গঙ্গার উপদ্বীপ। এই সাত আল গঙ্গা থেকে সাত গাঁ এবং সাত গাঁ থেকে চাট গাঁ। শেষে বর্তমানের চট্টগ্রাম।

চট্টগ্রামের নামকরণ নিয়ে অনেক ঐতিহাসিক মতভেদ আছে। তবে উপরের ঐতিহাসিক বর্ণনা অধিক যুক্তিসংগত মনে হয়েছে যৌক্তিক ইতিহাস চিন্তায়।

সার্বিকভাবে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা। মোটাদাগে চট্টগ্রামের পার্বত্য বর্ধিতাংশটিই হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম যা সর্বকালে চট্রগ্রামের এবং বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ থেকেছে।

নয় শত পঞ্চাশ খৃ: চট্টগ্রাম আরাকান রাজার অধীনস্ত হয়। বারোশত চল্লিশ খৃ: চট্টগ্রাম সুলতানী শাসনের অধীনে আসে। পনেরো শত সাতান্ন খৃ : চট্টগ্রাম পুনরায় আরাকান রাজার শাসনে শাসিত হতে থাকে। ষোলশত ছেষট্টি খৃ: চট্টগ্রাম মোগল শাসনে আসে। সতের শত সাতান্ন খৃ: বাংলার নবাব সিরাজোদ্দৌলার ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হবার পরে বাংলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং পরে বাংলা ব্রিটিশ শাসনে এলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ইংরেজ শাসনের অধীন হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিরা ষোলশত খৃষ্টাব্দের দিকে নিজ নিজ স্হান হতে বিতাড়িত হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী উপজাতিরা মূলতঃ মিয়ানমারের আরাকান এবং চীনহিল অঞ্চল থেকে প্রথমে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপন করে। পরে তারা ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে । এই উপজাতিদের মধ্যে আছে যেমন- চাকমা, মারমা (মারাম্মা), ব্যোম, পাঙ্খু, তনচ্যঙ্গা, ত্রিপুরা, চাক, খুমি, খিয়াং, গোর্খা, কুকি, মুরং প্রভৃতি । উপজাতিদের মধ্যে চাকমারা তেত্রিশ শতাংশ। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতির সংখ্যা একান্ন শতাংশ এবং বাঙালীর সংখ্যা উনপঞ্চাশ শতাংশ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ইংরেজ শাসনে আসার পরে উনিশ শত খৃ: হিলট্রাক্ট ম্যানুয়াল এক্ট-১৯০০ পাশ করে ইংরেজ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে নন রেগুলেটেড এরিয়া ঘোষণা করে। এই রেগুলেশনের অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে চাকমা, মারমা এবং ব্যোমাং সার্কেলে ভাগ করে তিনজন সার্কেল চীফ নিয়োগ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনের সুবিধার জন্য সার্কেল চীফ বা তিনজন রাজার অধীনে মৌজা প্রধান হিসাবে হেডম্যানদের এবং গ্রাম প্রধান হিসাবে কারবারীরা নিয়োগ পান। এই সব হেডম্যন এবং কারবারীদের মাধ্যমে খাজনা আদায় করে সার্কেল চীফরা ইংরেজ সরকারের কাছে দেওয়ানদের দ্বারা খাজনা জমা করতো।

পাকিস্তান আমলেও একই পদ্ধতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসিত হয় । বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হয়। পরে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল কাউন্সিল গঠন করেন সরকার। পরে উনিশ শত সাতানব্বই সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন শান্তিবাহিনী যুদ্ধ শুরু করলো ? শান্তিবাহিনী কেন এবং কিভাবে গঠিত হলো? এবিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন মনে করি ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। উনিশ শত বাহাত্তর সালের ঘটনা। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় গণপরিষদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তির দাবি করেন। সরকার মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার এই দাবি অগ্রাহ্য করে। পরে বঙ্গবন্ধু রাঙ্গামাটিতে সফরে এসে তাঁর বক্তৃতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের বাঙালী হবার আহ্বান করেন। ফলে উপজাতিদের মনে তাদের পরিচিতির বিলুপ্তির আশংকার সৃষ্টি হয়।

এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও সন্তু লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা ষ্টাফ ব্যাটলার্স সংক্ষেপে এসবি যা পরে শান্তিবাহিনী নামে পরিচিতি পায় ( এস- শান্তি বি- বাহিনী= শান্তিবাহিনী ) সৃষ্টি হয়।

বঙ্গবন্ধুর উপজাতিদের বাঙালী হবার এক আহ্বানে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি হলো এবং গেরিলা যুদ্ধের শুরু হয়ে গেলো এমন ধারণা অতি সরলীকরণ বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। গভীর ভাবে লক্ষ্য করলে প্রতিভাত হবে যে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ও অখণ্ডতার আওতায় বাঙালী জাতীয়তাবাদকে মেনে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনের দাবীকে পরিহার করার পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতি আহ্বানই ছিলো বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের মর্মমূলে।

বঙ্গবন্ধুর বাঙালী হবার আহ্বানে চাকমা উপজাতি বাঙালীতে রূপান্তরিত হয়ে যাবে এমন ধারণা কোনো সুস্হ মস্তিষ্কজাত হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের বাঙালী জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনের দাবীকে পরিহার করতে বলেছিলেন। দেশের অখণ্ডতার জন্য সকল উপজাতিদের বাঙালী জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা অপরিহার্য ছিলো। বঙ্গবন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের বাঙালী জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করতে বলে তাদের বাঙালী হবার আহ্বান জানাননি। আর এটা যুক্তিসংগতও নয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের স্লোগান ছিলো বীর বাঙালী অস্ত্র ধরো- বাংলাদেশ স্বাধীন করো। এই আহ্বানে কেবল বাঙালীর উল্লেখ থাকলেও এই আহ্বান বাঙালী, উপজাতি সবার জন্যই ছিলো। উপজাতিদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানও তেমনই ছিলো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি কেন হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পিছনে ফিরে যেতে হবে। পাকিস্তানের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তান আর্মি নাগা এবং মিজো গেরিলাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতো। এর ফলশ্রুতিতে উওর পুর্ব ভারতের সাত রাজ্য অশান্ত হতে থাকে। ভারতের পক্ষে এই গেরিলা যুদ্ধের অবসান করা সম্ভব হয় নাই।

বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে ভারতের স্বাধীনতাকামী গেরিলারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্যাম্প করে থেকে ভারতের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ভারতের জন্য ভারতের সাত রাজ্যের গেরিলা যুদ্ধের অবসানের পরিকল্পনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম খুবই গুরুত্বপুর্ণ হয়ে আবির্ভুত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতীয় গেরিলাদের অভয়ারণ্যকে ধ্বংস করতে এবং একই সাথে সদ্য স্বাধীন দুর্বল বাংলাদেশকে চাপে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের এক্সটেন্ডেড সিকিউরিটি হ্যান্ড হিসাবে ভারতীয় গেরিলাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে একটি উপজাতি গেরিলা ফোর্সের সৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা উপজাতিদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় উনিশ শত তিহাত্তর সালে ভারতের এক্সটেন্ডেড সিকিউরিটি হ্যান্ড হিসাবে মুখ্যত চাকমা উপজাতিদের দ্বারা শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি হয়।

উনিশ শত তিহাত্তর সালে শান্তিবাহিনীর সৃষ্টি হলেও উনিশ শত সাতাত্তর সালের আগে শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশনে যেতে পারেনি কারণ বঙ্গবন্ধুর সাথে ভারতের গভীর বন্ধুত্যপূর্ণ সম্পর্কের কারণে শান্তিবাহিনী ভারতের সহযোগীতা পায় নাই বলে।

উনিশ শত পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পরে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় শান্তিবাহিনীর জন্য ভারতের সাহায্য উন্মুক্ত হয় এবং উনিশ শত সাতাত্তর সালে শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে প্রথম সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন পার্বত্য চট্টগ্রাম কি স্বাধীন হবে? আমি দৃঢ় ভাবে মনে করি পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন হবে না। কারণ:

এক। পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন হলে ভারতের সাত রাজ্য যা পার্বত্য চট্টগ্রাম সংলগ্ন স্বাধীন হয়ে যাবার উজ্জল সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে যা ভারত কোনোদিনও চাইবে না ।

দুই । পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা নৃতাত্বিকভাবে মঙ্গলয়েড অতএব পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন রাষ্ট্র হলে তা চীনের প্রভাব বলয় ভুক্ত হবে। এটা ভারতের চাওয়ার মানে হবে নিজ বাড়ীতে খাল কেটে কুমির আনার মতো আত্মঘাতী ঘটনা। যা ভারত কখনই সমর্থন করবে না।

একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতার প্রশ্ন সমর্থনযোগ্য নয় কারণ অন্যের স্বাধীন ভূখণ্ডে মাত্র তিন / চার শত বছর পূর্বে আশ্রয় গ্রহণকারী একটি অতি ক্ষুদ্র উপজাতির জনগণ যা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির দুই শতাংশের কম তাদের স্বাধীনতার দাবীকে যদি সমর্থন করতে হয় তবে তিনশত বৎসর পূর্বে ইংল্যান্ডে গমনকারী বাঙালীদের ঐদেশে স্বাধীনভাবে বসবাসের জন্য যদি স্বাধীনতা দাবী উত্থাপন করে তবে সেই দাবীকে ও সমর্থন করতে হবে- এটা কি যুক্তিসংগত? না এই দাবী যুক্তিগ্রাহ্য নয়।

অতএব পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের স্বাধীনতার দাবী কষ্মিনকালেও সমর্থনযোগ্য হবেনা। উনিশ শত সাতানব্বই সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পরে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ চিরদিনের জন্য তামাদি হয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চুক্তির মাধ্যমে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

♦ জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান: প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: সরকারের মর্যাদা কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার ক্ষুণ্ন হতে পারে

অস্তিত্ব সংকটে পার্বত্য চট্টগ্রাম-১

land-comeetion-pic-30-10-16-03

মেহেদী হাসান পলাশ :

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এক দশমাংশ ভূখন্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। এর অন্যতম প্রধান কারণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ সংশোধনী ২০১৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়ে কার্যকারিতা শুরু করা। স্থানীয় পার্বত্য বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই আইনের ফলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা, সরকারের মর্যাদা, কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার চরমভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কার তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে পাহাড়ী শীর্ষ নেতৃবৃন্দের নানা বক্তব্য ও তৎপরতায় এসবের আলামত ফুটে উঠেছে। স্থানীয় পার্বত্য বাসিন্দাদের সাথে সরকারী নানা সংস্থাও এ নিয়ে ইতোমধ্যে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে ঊর্ধ্বতন মহলকে অবগত করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, নিরাপত্তা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম বীর প্রতীক ইনকিলাবকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত বিভিন্ন পক্ষের ব্যক্তিগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ বিরাজমান। এইরূপ দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য সরকারি ব্যবস্থা কাম্য। কিন্তু দুঃখজনক ও আতংকজনক বিষয় হলো যে, বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার নিমিত্তে যেই আইন করেছেন যথা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন, সেই আইনের অনেকগুলো বিধান এবং সেই বিধানের বাস্তবায়নকে আমি বাংলাদেশের জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করি। ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, বাংলাদেশের আগামীদিনের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব তথা ভৌগলিক অখ-তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।

গত ১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় ভেটিং সাপেক্ষে এই সংশোধনী পাস হওয়ার পর থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী অধিকার নিয়ে সক্রিয় ৫ বাঙালী সংগঠন হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে আসছে। এ পর্যন্ত মোট ৬ দিন হরতাল ও ১ দিন অবরোধ পালন করেছে। ইতোমধ্যে বাঙালী সংগঠনগুলো খাগড়াছড়িতে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।

গত রোববার একই দাবীতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে অবরোধ পালিত হয়েছে। এর কারণ গত রোববার রাঙামাটি সার্কিট হাউজে ভূমি কমিশনের দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া দুই পার্বত্য জেলায় শান্তিপূর্ণভাবেই অবরোধ পালিত হয়েছে।

এদিকে রোববার সকাল ১০টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হক-এর সভাপতিত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান ও জনসংহতি সমিতি সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা, রাঙামাটির চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, খাগড়াছড়ির মং সার্কেল চিফ সাচিং প্রু চৌধুরী ও বান্দরবানের বোমাং সার্কেল উ ছ প্রু চৌধুরী, রাঙামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা, বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্যা শৈ হ্লা, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের প্রতিনিধি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মমিনুর রশিদ আমিন ও কমিশনের সচিব রেজাউল করিম উপস্থিত ছিলেন। তবে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরি চৌধুরী বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন।

land-comeetion-pic-30-10-16-02

বৈঠক সূত্র ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, বৈঠকে কমিশনের জনবল, লজিস্টিক ও আর্থিক বরাদ্দের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত সহায়তা চেয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে ভূমি কমিশনে অভিযোগ জমা দেয়ার সময় চলমান রাখারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে ১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় ভেটিং সাপেক্ষে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন পাস হওয়ার পর ভেটিং শেষে ৮ আগস্ট প্রেসিডেন্ট সংশোধনীতে স্বাক্ষর করেন এবং ৯ আগস্ট তা অধ্যাদেশ আকারে গেজেটে প্রকাশিত হয়। ৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদে পাস হলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কাজ শুরু করে। এর আগেও আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী মন্ত্রিসভায় পাস হলেও পার্লামেন্টে পাস করতে না পারায় তা বাতিল হয়ে যায়।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন

শান্তিচুক্তির ঘ খণ্ডের ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, “জায়গা-জমি বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন (ল্যান্ড কমিশন) গঠিত হইবে। পুনর্বাসিত শরণার্থীদের জমি-জমা বিষয়ক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা ছাড়াও এ যাবৎ যেইসব জায়গা-জমি ও পাহাড় অবৈধভাবে বন্দোবস্ত ও বেদখল হইয়াছে সেই সমস্ত জমি ও পাহাড়ের মালিকানা স্বত্ব বাতিলকরণের পূর্ণ ক্ষমতা এই কমিশনের থাকিবে। এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে কোন আপিল চলিবে না এবং এই কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া বিবেচিত হইবে। ফ্রীঞ্জল্যান্ড (জলে ভাসা জমি)-এর ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য হইবে।”

একই সাথে ৬ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি করিবেন”। মূলত এই ধারাগুলোই ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের মূল উৎস।

তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম বার ক্ষমতার একেবারে শেষ দিকে ২০০১ সালের ১৭ জুলাই জাতীয় সংসদে ভূমি কমিশন আইন পাস হয়। সেই আইনে পদ্ধতিগতভাবে অধিগ্রহণকৃত জমির পরিবর্তে প্রযোজ্য আইনের কথা বলা হয়।

এই চুক্তির ৬ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশনের কার্যাবলী ও ক্ষমতা : (১) কমিশনের কার্যাবলী নিম্নরূপ হইবে, যথা :- (ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা; (খ) আবেদনে উল্লিখিত ভূমিতে আবেদনকারী বা ক্ষেত্রমত সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষের স্বত্ব বা অন্যবিধ অধিকার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী নির্ধারণ এবং প্রয়োজনবোধে দখল পুনর্বহাল; (গ) পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন বহির্ভূতভাবে কোন ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিলকরণ এবং উক্ত বন্দোবস্তজনিত কারণে কোন বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপ-ধারা প্রযোজ্য হইবে না।

তবে সন্তু লারমা এই আইন মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তিনি সব সময় বলে থাকেন, শান্তিচুক্তির দুইটি রূপ রয়েছে। একটি লিখিত এবং অন্যটি অলিখিত বা মৌখিক সমঝোতা। সেই অলিখিত শান্তিচুক্তির বলে সন্তু লারমা ভূমি কমিশন আইনে ২৩ দফা সংশোধনী প্রস্তাব দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান।

এরই অংশ হিসাবে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপির মধ্যে এক যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সে বৈঠকে সন্তু লারমা প্রস্তাবিত ২৩ দফার মধ্যে ১৩ দফা মেনে নেয়া হয়। ১ আগস্ট, ২০১৬ সালে মন্ত্রিসভায় যে সংশোধনী পাস করা হয়েছে তা মূলত ওই বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের অনুসরণ।

এই সংশোধনীর উল্লেখযোগ্য হলো: প্রচলিত আইন ও রীতির সাথে পদ্ধতি সংযুক্ত করা। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিগতভাবে জলেভাসা ভূমিসহ যেকোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান করিলে বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিল করণ এবং বন্দোবস্ত জনিত বা বেদখল জনিত কারণে কোনো বৈধ ভূমির মালিক বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল:

  তবে শর্ত থাকে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং বসতবাড়িসহ জলে ভাসা ভূমি, টিলা পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ এলাকা ও বেতবুনিয়া ভূ উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না। এখানে লক্ষ্যণীয় হলো ২০০১ সালের আইন থেকে প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমিকে কমিশনের আওতা বহির্ভূত রেখে যে সুরক্ষা দেয়া ছিলো ২০১৬ সালের সংশোধনীতে তা তুলে দেয়া হয়েছে। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল প্রকার সরকারী স্থাপনা ভূমি কমিশন আইনের আওতায় চলে এসেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সচেতন মহলের অভিমত, সরকার এসকল ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের প্রযোজ্য আইন ব্যবহার করেছে। তারা হেডম্যানের সার্টিফিকেট নেয়নি। কিন্তু পদ্ধতিগত শব্দটি যুক্ত করায় প্রায় সকল প্রকার সরকারী স্থাপনা অবৈধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

এদিকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার পর থেকেই বাঙালী সংগঠনগুলো বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা একের পর এক আন্দোলন করতে থাকে।

পার্বত্য সমঅধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক এমপি ও উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ওয়াদুদ ভুঁইয়া ভূমি কমিশন আইনকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বিরোধী আখ্যা দিয়ে বলেন, এই আইনের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, সরকারের মর্যাদা, কর্তৃত্ব ও অধিকার খর্ব হবে।

কিভাবে এই প্রশ্নের জবাবে ওয়াদুদ ভুঁইয়া বলেন, বর্তমান আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের সামাজিক আইন যাকে আইনে প্রচলিত রীতি ও পদ্ধতি বলা হয়েছে সে আইনে অধিগ্রহণ ব্যতিরেকে সকল ভূমি বন্দোবস্তী অবৈধ হয়ে যাবে। অর্থাৎ এখন যেখানে ডিসি অফিস, এসপি অফিস বা অন্যান্য সরকারী অফিস রয়েছে তাতে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো অধিবাসী যদি বলে এই জমিতে তার দাদার বাবা গরু চরাতেন বা নানা জুম চাষ করতেন। হেডম্যান যদি সে মর্মে তাকে সত্যায়ন করে তাহলে তা বাতিল হয়ে যাবে।

এভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পুলিশ ব্যারাক, ক্যান্টনমেন্ট, ভূমি অফিস, আদালত, এমনকি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন অফিস সব বাতিল হয়ে যাবে।

পার্বত্য বাঙালী অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত বাঙালী পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইন্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুইয়া ইনকিলাবকে বলেন, আমরা শুধু বাঙালীদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়ছি না, একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের অখ-তা ও সরকারের কর্তৃত্ব, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য লড়াই করছি।

এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর ইনকিলাবকে বলেন, আইন হলো ভূমি সমস্যার সমাধান। ভূমি সমস্যা থাকলে অভিযোগ করবে, যাচাই বাছাই করবে, তথ্য প্রমাণ থাকলে বিচার করবে। এর মধ্যে যদি তারা কোনো অন্যায় পায় বিচার করবে নয়তো ডিসমিস হয়ে যাবে। কোনো ক্ষতির কিছু নেই। পদ্ধতিগতভাবে বলতে আসলে কি বোঝায় সেটা আগে জানতে হবে। না জেনে একটা উল্টাপাল্টা বললে তো হবে না। এগুলো নেয়া হয়েছে। হেডম্যান নিয়োগ দেন ডিসি সাহেব। ডিসি সাহেবরা কি এগুলো না দেখেই দিয়েছে বলে আপনি মনে করেন। তারা হেডম্যানের রিপোর্ট নিয়েই করেছে বলে।

আগে ডিসি সাহেবরা সরাসরি দিতেন জানালে তিনি বলেন, ডিসি সাহেবরা হেডম্যানদের অনুমোদন নিয়েই দিয়েছেন। যদি এগুলো না দেয়া হয়ে থাকে তাহলে কে আগে দিলো কে পরে দিলো সেসব বিবেচনা করে বিচার করা হবে।

এ বিষয়ে কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলার মতো হয়নি। তিনি বলেন, আগে আমাদের সময় দিন, কাজ দেখুন, তারপর কাজ দেখে মন্তব্য করুন। এটা কার্যকরী করা হিউজ টাফ।

কিন্তু সংবিধান রক্ষার শপথহীন এইসব লোকদের বিচারের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করা যাবে না বলে যে ধারা আছে তাতে কি উচ্চ আদালতের এখতিয়ার খর্ব করা হলো কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেয়ার ক্যান বি নো রঙ উইদাউট রেমিডি। এটাই বেসিক প্রিন্সিপ্যাল অভ ন্যাচারাল জাস্টিসের কথা।যদি কোনো রং থাকে দেয়ার মাস্ট বি এ রেমিডি। ন্যাচারাল জাস্টিসের একটা বিধান আছে এটা সর্বত্র ইমপ্লাইড।

কমিশন আইনের ৬-এর বিভিন্ন উপধারা উল্লেখ করে এর ফলে সকল সরকারী স্থাপনা অবৈধ হয়ে যায়নি এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি জানি, আমিও এই আইনগুলো আমি দেখেছি। এগুলো কতোটা আমাদের এখতিয়ারভুক্ত তা বিবেচনা করে দেখতে হবে। আমরা কি ডিসি অফিস ভেঙে ফেলবো? আইন দ্বারা কিভাবে রাখবেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এই বিষয়টি সামনাসামনি বলবো, টেলিফোনে বলা যাবে না।

এগুলো দেখার জন্য কি পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম?

পিবিসিপি

প্রকৌশলী আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া

আমি প্রতিনিয়ত উদ্বেগ উৎকন্ঠার সাথে লক্ষ্য করছি, যে সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের মানবাত্মায় স্নিগ্ধ হাসি ও প্রশান্তির উদ্ভাবক ছিল, সেই সংগঠন এখন কি করে এত হিংসাশ্রয়ী, হটকারী ও বেত্তমিজি আচরণ করছে এবং বীভৎস চেহারা নিয়ে জাতির সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে! একজন আরেক জনকে অবাঞ্ছিত করছে।

ব্যক্তি আক্রোশের কারণে নেতৃবৃন্দকে আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। দায়িত্বের মেয়াদকাল শেষ হলেও; দায়িত্ব ছাড়তে বা অন্যকে সুযোগ দিতে নারাজ। আমাদের কী দুর্ভাগ্য! এগুলো দেখার জন্য কি ১৯৯১ সালের ১ নভেম্বর এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম এবং এখনও নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি এরকম পরিণতি অবলোকন করার জন্য?

ছাত্র পরিষদের নেতা/কর্মী ভাইদের একটু চিন্তা করার জন্য এবং একটু ভাবনার জন্য আমার এ নিবেদন। সকলকে বুঝতে হবে, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদের অগ্রযাত্রাকে রুখতে চায় যারা, তাদের গোড়া নিঃসন্দেহে সুদৃঢ়, তারা সাম্রাজ্যবাদীদের ক্রীড়নক, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের ন্যায় পৃথক রাষ্ট্র এর স্বরূপ দানে ব্যাতি ব্যাস্ত।

মুক্তমত

সেই লক্ষ্যে পাহাড়কে যারা অনিদ্র সৈনিকের ন্যায় পাহারারত সেই পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদকে বিভিন্ন মোহে আক্রান্ত করে, তাদের পারষ্পারিক অর্ন্তঃদ্বন্দ্বের প্রতি সুদৃষ্টি নিবন্ধন সাপেক্ষে, ছাত্র পরিষদকে নিজেদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে অস্বাভাবিক ও ক্রমাগত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে।

আসলে আমরা জানি হিংসার রাজনৈতিক ফল সুখকর নয়।যারা এগুলোতে সহায়তা করছে তাদের পিছনের শক্তির উৎসগুলোর মূল শিকড় কোথায়? কারা এবং কেন এ উস্কানি দিচ্ছে? নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী কারা?

কারা ঠান্ডা মাথায় আমাদের তরুণদেরকে অস্বাভাবিক ভ্রান্ত বানিয়ে সহোদরদের মুখোমুখী দাঁড় করাচ্ছে?
আমরা দেখছি তারা প্রতিনিয়ত হিংস্র ও জিঘাংসা পূর্ণ হয়ে উঠছে। আসলে প্রত্যেকের বোঝা উচিত ছিল- হিংসা এবং অহংকারের রাজনীতির ফল সুখকর হয় না ।

আমাদের কী দুর্ভাগ্য! পার্বত্য বাঙালী ছাত্র পরিষদ এর বতর্মান নেতৃবৃন্দকে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে ক্রমাগত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। লোভী, ছাত্র নামধারী ব্যবসায়ী এবং মোহআক্রান্ত ষড়যন্ত্রকারী, ভাতৃঘাতি দ্বন্দ্বে লিপ্ত যারা এগুলো করছে, তাদের খুজেঁ বের করার এবং ষড়যন্ত্র নির্মূল করার জন্য চিন্তাশীল, দেশপ্রেমিক, নির্লোভ নেতৃত্ব ও বাঙালি ভাইদের প্রতি আহব্বান জানাচ্ছি।

ষড়যন্ত্রকারী অবশ্যই নোংরা রাজনৈতিক প্রভাব পুষ্ট, তারপরও আমি আশা করি ইতোপূর্বে পার্বত্যবাসীর দূর্যোগ-দুর্বিপাকে পার্বত্য বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐ সব অপশক্তিকে রুখে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণ করেছে,পার্বত্য বাঙালিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস-বাঙালি জাতি পারষ্পারিক অর্ন্তদ্বন্দ্বের কথা ভুলে গিয়ে,প্রতিহিংসামূলক আচরণ ছেড়ে দিয়ে জাতির এ ক্রান্তিকালের কথা চিন্তা করে দেশপ্রেমে অবিচল থেকে পার্বত্যবাসির জন্য ভাবুক। কবিমন নিয়ে বাংলাদেশের এক দশমাংশ রক্ষায় দীপ্ত শপথে এগিয়ে আসবে। ভুলে যাবে সব ভাই/বন্ধুদের দেওয়া যতকষ্ট, ভুলে যাবে সব না পাওয়ার বেদনা, মুছে ফেলবে হৃদয়ের প্রাপ্ত সব গ্লানি। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এ আমার বিনীত মিনতি।

♦ প্রকৌশলী আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া: প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি, চেয়ারম্যান,পার্বত্য নাগরিক পরিষদ।

আদিবাসী প্রসঙ্গ এবং ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন

পার্বত্য-চট্টগ্রাম11

♦ মুন্শী আবদুল মাননান ♦

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। এতে বক্তব্যে রাখেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবীর, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম প্রমুখ।

ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নেই, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে আধিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে জোর চেষ্টা চলছে। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করছে, তেমনি কিছু মহলও একই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত আদিবাসী ফোরাম গঠনের লক্ষ্যই হলো, ওইসব জনগোষ্ঠীর আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করা। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানাদির আয়োজনের লক্ষ্যও মূলত একই। এখানে স্মরণ করা দরকার, অতীতে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দেয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা একযোগে নিজেদের আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দাবি করছে কেন, তা একটি বড় প্রশ্ন। সাধারণ অর্থে কোনো দেশ বা অঞ্চলের বা ভূখ-ের সর্বপ্রাচীন অধিবাসীদের আদিবাসী বলে অভিহিত করা হয়।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো নিজেদের আদিবাসী দাবি করে এটা প্রমাণ করতে চাইছে, বাংলাদেশের বা তার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের তারাই সর্বপ্রাচীন আদিবাসী। এই দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশের বা ওইসব অঞ্চলের ভূমি বা সম্পদের ওপর তাদের একটি বিশেষ অধিকার জন্মে এবং সেই অধিকার কায়েমের পথ প্রশস্ত হয়। অথচ ইতিহাসের সাক্ষ্য এই যে, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, হাজংসহ কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন আধিবাসী নয়। তারা মাত্র কয়েকশ বছরের ব্যবধানে অন্যান্য দেশ থেকে এসে বাংলাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে বাঙালিরাই সর্বপ্রাচীন অধিবাসী বা আদিবাসী।

ইতিহাসের এই সাক্ষ্য এখন স্বীকার বা মান্য করতে চাইছে না উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো এবং কিছু মহল। তারা যে কোনো মূল্যে নিজেদের বা উপজাতীয়দের আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন সময় ইতিহাসের অকাঠ্য তত্ত্ব-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি (আরো অনেকে দেখিয়েছেন) বাংলাদেশে যেসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করে তাদের কেউই বাংলাদেশের আদিবাসী নয়। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো যেমন তেমন দেশের চিহ্নিত কিছু মহল সেটা মানতে নারাজ। তারা লাগাতার তাদের লক্ষ্য হাসিলে কাজ করে যাচ্ছে। ঘটা করে আদিবাসী দিবস পালন ওই তৎপরতারই অংশ।

লক্ষ্যণীয়, ওই দিনের অনুষ্ঠানে পূর্বে উল্লিখিত বক্তারা সবাই উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী অভিধায় চিহ্নিত করে তাদের অধিকার সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছেন। সন্তু লারমার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। সন্তু লারমা সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, সরকার ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের প্রশ্নে আন্তরিক নয়। এটা নানাভাবে নানা যৌক্তিকতার মাধ্যমে প্রমাণ করা যায়। তিনি অভিযোগ করেছেন, বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ ‘আদিবাসীদের’ অধিকারের পক্ষে কাজ না করে জনসংহতি সমিতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ‘আদিবাসীদের’ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এর প্রতিকার চেয়েছেন এবং সবাইকে সংগ্রামী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, আমাদের সবাইকে নিজেদের প্রয়োজনেই সংগ্রামী হতে হবে। সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকতে হবে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে দেশ স্বাধীন হলেও ‘আদিবাসীরা’ শোষণমুক্ত হওয়া তো দূরের কথা ‘আদিবাসী’ পরিচয়ই পাননি। আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে তথা রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই ‘আদিবাসীদের’ মূল্যায়ন করতে হবে। তাদের অধিকার দিতে হবে। আদিবাসী স্বীকৃতি সরকারি তরফ থেকে না আসায় অত্যন্ত মনোবেদনা প্রকাশ করে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, আমাদের দেশে এখনো ‘আদিবাসীরা’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো তাদের শিক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারিনি। এটা অত্যন্ত বেদনার ও হতাশার কথা।

ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। সে রাষ্ট্রটি মাথা উঁচু করেও বিশ্বের দরবারে দাঁড়াতে পারে না। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দার্শনিক ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্ত অধিকার দেয়া। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও ‘আদিবাসীরা’ সে সুযোগ পায়নি। পার্বত্য শান্তি চুক্তি প্রণয়নের পর ‘আদিবাসীরা’ তাদের ভূমির অধিকার সংরক্ষণের জন্য যে দাবি জানিয়ে আসছিল সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে বা সংরক্ষিত হয়নি। মামুনুর রশীদ বলেছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে যে নিয়ম-কানুন হয়েছে, তার কোনোটিই তেমনভাবে কার্যকর হয়নি। অথচ তা হলে ‘আদিবাসীদের’ বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন মান আরো উন্নত হতো। অন্যদের বক্তব্য প্রায় একই রকম। কাজেই তাদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি না। যাদের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের বক্তব্যের সারকথা হলো : কথিত আদিবাসীদের অধিকার অনর্জিত রয়েছে। ভাবটা এরকম যেন উপজাতীয় বাদে দেশের সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, উপজাতীয়দের চেয়েও দেশের বহু মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি-বাকরি, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। তারা উপজাতীয়দের অধিকার অনর্জিত থাকার জন্য সরকারকেই দায়ী করেছেন। সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন সরকার কেন উপজাতিদের আদিবাসী বলে না, এ জন্য। তাদের এই ক্ষোভ একটি অযৌক্তিক ও অনৈতিক দাবির প্রতি সমর্থনেরই নামান্তর। সরকার বরাবরই বলে আসছে, বাংলাদেশে তথাকথিত কোনো আদিবাসী নেই। এটাই রাষ্ট্রের অবস্থান। বস্তুত, তারা রাষ্ট্রের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নির্দিষ্ট করেছেন। উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হলে কী ধরনের বিপদ হতে পারে সে বিষয়ে অনেকেই আলোকপাত করেছেন।

যে সন্তু লারমা উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোকে আদিবাসী বানানোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যিনি একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতিও বটেন, তিনি এক সময় তথাকথিত শান্তি বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই ‘শান্তি বাহিনী’ বছরের পর বছর ধরে দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, মানুষ হত্যা করেছে, অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। ‘শান্তি বাহিনীর’ লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা। গত শতকের ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘শান্তি বাহিনী’র দৌরাত্ম্য ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। তখন সরকার দু’টি পন্থা অবলম্বন করে।

প্রথমত, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যথাসম্ভব এই বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দমন করা। দ্বিতীয়ত, শান্তি স্থাপনের জন্য ‘শান্তিবাহিনী’র সঙ্গে আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত রাখা। ‘শান্তি বাহিনী’ সে সময় আলোচনায় পাঁচ দফা দাবিনামা পেশ করে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক তার একটি লেখায় ওই পাঁচ দফা দাবির প্রথম দফাটি উল্লেখ করেছেন। দফাটি এই : ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙামাটি। ২টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে, ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ, রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’ সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম অতঃপর লিখেছেন: ‘শান্তি বাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের কাছে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতিকিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অংকন করা।’ বলা বাহুল্য, এ দাবিনামা মানা সম্ভব ছিল না এবং মানাও হয়নি।

‘শান্তি বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে তার দাবিনামা পেশ করে ১৯৮৭ সালে। এর দশ বছর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য জনসংহতি সমিতির মধ্যে একটি চুক্তি হয় যা ‘পার্বত্য শান্তিচুক্তি’ নামে অভিহিত হয়ে থাকে। এই চুক্তির পর এত বছর অতিবাহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বলা যাবে না। জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠাকামীরা তাদের লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে, এমন দাবিও জোর দিয়ে কেউ করতে পারে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, তারা এখনো তৎপর ও সক্রিয়। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বহু সশস্ত্র গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা হত্যা, চাঁদাবাজি ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ সংশোধিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ গত ৮ আগস্ট প্রণয়ন ও জারি করেছেন মাননীয় প্রেসিডেন্ট।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে ৩ জুন বিচারপতি আনোয়ারুল হক চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে সরকার ল্যান্ড কমিশন গঠিত করে। ২০০১ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১’ প্রণীত হয়। ওই সময়ই এই আইন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বাঙালীদের ভূমি অধিকার এই আইনে খর্ব হয়েছে। জনসংহতি সমিতিও এ আইনের ব্যাপারে আপত্তি তোলে। তার মতে, এতে উপজাতীয়দের ভূমি অধিকার নিরংকুশ হয়নি। কমিশনের নিয়ন্ত্রণও রয়ে গেছে সরকারের হাতে। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। শুধু এটুকু বলবো যে, জনসংহতি সমিতি আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আইনের ১৯ দফা সুপারিশ পেশ করে। এই সংশোধনীগুলো পেশ করা হয় বাঙালীদের ভূমি অধিকার আরো খর্ব ও অনিশ্চিত করে উপজাতীয়দের অধিকার নিশ্চিত ও সংহত করার জন্য এবং কমিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার জন্য।

যতদূর জানা গেছে, আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে আসা জনসংহতি সমিতির সংশোধনী প্রস্তাবগুলো সংশোধিত আইনে গুরুত্ব ও প্রাধান্য পেয়েছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ এখানে কম; সংক্ষেপে দুয়েকটি বিষয় ও প্রসঙ্গ এখানে উল্লেখ করছি। এক : মূল আইন বা ২০০১ সালে প্রণীত ৫৩ নং আইনের ৪ ধারার ২ উপধারায় উল্লিখিত ‘যে কোনো পার্বত্য জেলায়’ শব্দগুলোর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে ‘যে কোনো পার্বত্য জেলাসহ অন্য কোনো স্থানে’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। ৪ নং ধারাটি কমিশনের কার্যালয় সংক্রান্ত। দেখা যাচ্ছে, মূল আইনে এর শাখা কার্যালয় যে কোনো পার্বত্য জেলায় স্থাপন করার কথা থাকলেও সংশোধিত আইন অনুযায়ী অন্য কোনো স্থানেও স্থাপন করা যাবে। অর্থাৎ কমিশন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও দেশের যে কোনো স্থানে শাখা কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে। দুই : ২০০১ সালের আইনের ৬ ধারার উপধারা (১) এর (ক) দফা (ক) এর পরিবর্তে সংশোধিত আইনে দফা (ক) প্রতিস্থাপিত হয়েছে এভাবে : (ক) পুনর্বাসিত শরণার্থীদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং অবৈধ বন্দোবস্ত ও বেদখল হওয়া ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, নীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী নিষ্পন্ন করা; (খ) দফা (খ) তে উল্লিখিত ‘আইন ও রীতি’ শব্দগুলির পরিবর্তে ‘আইন, রীতি ও পদ্ধতি’ শব্দগুলি ও কমা প্রতিস্থাপিত হইবে; (গ) দফা (গ) এর পরিবর্তে যা প্রতিস্থাপিত হয়েছে তা এরকম : (গ) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন। নীতি ও পদ্ধতি বহির্ভূতভাবে চলে আসা ভূমিসহ (ঋৎরহমব খধহফ) কোনো ভূমি বন্দোবস্ত প্রদান বা বেদখল করা হইয়া থাকিলে উহা বাতিল করণ এবং বন্দোবস্তজনিত বা বেদখলজনিত কারণে কোনো বৈধ মালিক ভূমি হইতে বেদখল হইয়া থাকিলে তাহার দখল পুনর্বহাল; তবে শর্ত থাকে যে, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত এবং বসতবাড়িসহ জলে ভাসা ভূমি, টিলা ও পাহাড় ব্যতীত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা এবং বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকার ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’

উল্লেখ করা দরকার, মূল আইনে এই ‘শর্তের’ অংশটি ছিল এরকম। ‘তবে শর্ত থাকে যে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণকৃত ভূমি এবং রক্ষিত (জবংবৎাবফ) বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া। ভূ-উপগ্রহ এলাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির ক্ষেত্রে এই উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।’ এখানে বিবেচ্য বিষয় এই যে, ‘আইন ও রীতি’র জায়গায় ‘আইনে, রীতি ও পদ্ধতি’ প্রতিস্থাপিত হলো যেন তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অন্যদিকে ‘শর্তের’ জায়গায় বনাঞ্চল, এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প-কারখানা ও সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি বাদ গেল কেন, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেকের অভিমত, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই-তৃতীয়াংশ ভূমিই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখন এই বনাঞ্চলের ভূমির দাবীও যে উপজাতীয়রা করতে পারবে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের কথা নিয়ে আমরা ইতি টানবো এই নিবন্ধের। তিনি আগে উল্লেখিত নিবন্ধের শেষাংশে বলেছেন; ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে।

যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন ও তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না ? যদি থাকে, তাহলে কত সংখ্যক ও কোন কোন শর্তে ?’

এক মানববন্ধনে তিনি বলেছেন : ‘১৯৮৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের এসব দেশদ্রোহীরা সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দু’টি ভাগে ভাগ করার। এক ভাগের নাম বাংলাদেশ, যার রাজধানী ঢাকা। আর এক ভাগের নাম হবে জুম্মল্যান্ড, যার রাজধানী রাঙামাটি। এই দুটি অংশ মিলে একটি ফেডারেল সরকার হবে। তখন আমরা রাজি হয়নি। কিন্তু বর্তমান ভূমি আইন বাস্তবায়নের ফলে বিদ্রোহীদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।’

জুম্মল্যান্ডের অজানা গল্প এবং সামারি

জেনারেল ইব্রাহীম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

নোটশিট ও সামারি
দু’টি শব্দ এখানে লিখলাম। একটি শব্দ ‘সারসংক্ষেপ’, ইংরেজিতে সামারি। আরেকটি শব্দ ‘নোটশিট’। এই দু’টি শব্দের সাথে সরকারি চাকরিজীবীরা নিবিড়ভাবে পরিচিত। নোটশিট মানে ছাপানো কাগজ, যেখানে অফিসের কর্মকর্তারা কোনো বিষয়ে বা প্রস্তাবে তাদের মন্তব্য লিখে ওপরের দিকে পাঠান এবং আবার ওপরের দিক থেকে নিচের দিকে পাঠান। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি অফিসে এ ধরনের কাগজ এবং এ ধরনের নোট লেখা সুপ্রচলিত। সামরিক বাহিনীতে নোটশিট না বলে অনেক সময় বলা হয় মাইনিউটস (বা মিনিটস) লেখা তথা মিনিট-শিটে লেখা। নোট মানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। কারণ জ্যেষ্ঠ স্টাফ অফিসার বা অতি জ্যেষ্ঠ দায়িত্বশীলদের হাতে এত সময় থাকে না যে, তারা সব বিষয়ে বিস্তারিত শুনবেন বা পড়বেন। কোন কোন বিষয়ে বিস্তারিত জানা উচিত এবং কোন কোন বিষয়ে সারমর্ম বা সামারি জানলেই চলবে, এই সিদ্ধান্তটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকেই নিতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ এবং চলমান সন্ত্রাস ও সন্ত্রাস দমনের চেষ্টা প্রসঙ্গে আমার একটি প্রস্তাব এই কলামের শেষ অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করছি; কিন্তু কেন করছি সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য ইতিহাস থেকে একটি গল্প তুলে ধরলাম।

খাগড়াছড়িতে ব্রিগেড কমান্ডার হলাম
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎই জানানো হলো, আমাকে রাঙ্গামাটি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে খাগড়াছড়ি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে। ডিসেম্বরের ২০ তারিখ আমি খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং সাত দিন পর ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ রাঙ্গামাটি ব্রিগেডের দায়িত্ব অন্যের বরাবরে হস্তান্তর করেছিলাম। ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনী নামক জঙ্গি দল বা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত কর্মকাণ্ডের উত্তাপ চরমে ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে দু-মুখী চেষ্টা চলছিল। একমুখী চেষ্টা হলো নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যথাসম্ভব দমন করা। আরেকমুখী চেষ্টা ছিল, শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তি স্থাপনের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। আমার আগে যিনি খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন তিনি প্রক্রিয়াটি শুরু করে গিয়েছিলেন; কিন্তু আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সময়েই তিনি বদলি হয়ে যান। অতএব ওই অভিনব গুরুদায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ে। দায়িত্বটি কী? দায়িত্বটি হলো, শান্তি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা, পরিবেশ অব্যাহত রাখা এবং আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া।

বিস্তারিত বর্ণনা আমার লেখা দ্বিতীয় বইয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে বা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপগুলোর বিবরণ ও মূল্যায়ন এই বইয়ে আমি লিপিবদ্ধ করেছি। বইয়ের নাম : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন’। বইটির প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক; প্রকাশনী সংস্থার নাম মওলা ব্রাদার্স (০২-৭১৭৫২২৭)।

শান্তিবাহিনীর দাবিনামা : জুম্মল্যান্ড
সংক্ষেপে স্মৃতিচারণ করি। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিবাহিনীর সাথে চতুর্থ আনুষ্ঠানিক আলোচনা বৈঠক হয়। হাবভাব দেখে বুঝলাম, শান্তিবাহিনী আরেক দফা রক্তারক্তি করবে। উদ্দেশ্য, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেন, সরকার তাদের দাবিনামা মেনে নেয়। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির কথা বলছি। দাবিনামাটি ছিল পাঁচ দফা। পাঁচ দফার পুরোটাই এখানে লিখব না, স্থানাভাবে। শুধু প্রথম দফা লিখলাম। ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙ্গামাটি। দু’টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে; ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’

শান্তিবাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের বরাবরে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতি-কিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অঙ্কন করা। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ বছর যাবৎ শান্তিবাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই প্রথমবার, ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এসে তারা লিখিতভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করেছিল। দাবিগুলো সংবিধানবহির্ভূত হওয়ার কারণে, বাংলাদেশ সরকার তথা সরকারের প্রতিনিধিদল ওই দাবিনামার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছিল, সেহেতু শান্তিবাহিনী উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আরেকবার একটি বড় আকারের রক্তাক্ত নাটক তারা মঞ্চস্থ করবে। আমার সামরিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং গোয়েন্দাদের মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে আমিও উপসংহারে এলাম যে, শান্তি বাহিনী আসলেই আরো একবার বড় রকমের রক্তপাত ঘটাবে।

রক্তারক্তি এবং প্রেসিডেন্টের সফর
এটি ১৯৮৮-এর মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরুর কথা। আমি আমার মূল্যায়ন বা ফোরকাস্ট ওপরোস্থ কর্তৃপক্ষ এবং সরকারকে জানালাম। পরিষ্কার বললাম, সেটি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের মজুদ নেই। ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ, রমজান মাসের আট বা নয় এরকম একটি তারিখ; এশার নামাজের পর শুরু হলো শান্তিবাহিনীর আক্রমণ। ঘটনাক্রমে কিন্তু একান্তই অপরিকল্পিতভাবে, তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ম. হামিদ ক্যামেরাসহ খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছিলেন, পর্যটনমুখী একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর জন্য। ২৪ এপ্রিল রাত এবং পরবর্তী দু-তিন দিনের সব সন্ত্রাসী তৎপরতা বিটিভি ক্যামেরাবন্দী করে এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করে। শান্তিবাহিনীর আক্রমণে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বাঙালিদের হতাহত হওয়ার খবর জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গার কারণে পাহাড়ি মানুষের হতাহতের খবরও জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি মানুষ সীমান্তের অপর পারে শরণার্থী হওয়ার খবরও জনগণ পেতেন না। এই প্রথমবার, বিটিভির বদৌলতে বাংলাদেশের আপামর জনগণ শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে কম হোক বেশি হোক, ভালো হোক মন্দ হোক, একটি ধারণা পেলো। শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে ওইরূপ আগ্রাসী কর্মকাণ্ড পরবর্তী দিনগুলোতেও অব্যাহত ছিল।

ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ সরকার মানসিকভাবে চাপের মধ্যে পড়ে। চাপটি কী? পার্বত্য চট্টগ্রামে এত রক্তারক্তি কেন হচ্ছে? শান্তিবাহিনীর হাতে এত বাঙালি কেন মরছে? সরকার কী করছে? সেনাবাহিনী কী করছে? ইত্যাদি। এই প্রেক্ষাপটে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার জন্য এবং মূল্যায়নের জন্য খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। ওই দিন পর্যন্ত প্রায় চল্লিশটি বাঙালি গ্রাম শান্তিবাহিনীর গুলি ও আগুন-আক্রমণের শিকার হয়েছিল, শতাধিক বাঙালি নিহত হয়েছিল, শত শত বাঙালি আহত হয়েছিল, শত শত উপজাতীয় মানুষ ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্টের সফরের তারিখটি ছিল ৫ মে ১৯৮৮। প্রেসিডেন্টের সাথে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান এবং চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আব্দুস সালামও ছিলেন। এলাকা ঘুরে, রাষ্ট্রপতি তার দলবলসহ খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে আসেন। আমাদের অপারেশনস রুমে বসেন। আংশিকভাবে উত্তেজিত (ইংরেজিতে : এনয়ড), আংশিকভাবে বিমর্ষ রাষ্ট্রপতি জানতে চান শুনতে চান, কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? এই কলামের সম্মানিত পাঠক, এবার আলাপন বা ডায়ালগ অনুসরণ করুন। কথাবার্তা সব না, কিন্তু বেশির ভাগ ইংরেজিতে হয়েছিল। পাঠকের জন্য বাংলায় লিখলাম।

প্রেসিডেন্টকে ব্রিফিং দিতে দুই ঘণ্টা
প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘ইবরাহিম, বলো এসব কী হচ্ছে? হোয়াট দ্য হেল ইজ হ্যাপেনিং? হোয়াই সো মেনি পিপল আর বিইং কিলড? হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং?’ মানে : এত লোক মারা যাচ্ছে কেন? তোমরা কী করছ? কী ঘটছে? কর্নেল ইবরাহিম বলল, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনি এবং আমরা সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি যে, অনেক কম মারা গিয়েছে। আরো অনেক বেশি মারা যেতে পারত; কিন্তু আমরা বাঁচাতে পারিনি এটাই বাস্তবতা, আমি দুঃখিত।’ প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘পুরো জাতি উদ্বিগ্ন, আমাকে জবাব দিতে হচ্ছে। ইউ হ্যাভ টু এক্সপ্লেইন হোয়াই ইউ ফেইলড?’ আমি বললাম, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমি অবশ্যই ব্যাখ্যা করব; আমাকে সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট : ‘ঠিক আছে তুমি বলো, তোমাকে বিশ মিনিট সময় দিলাম।’ ইবরাহিম : ‘স্যার, আমি বিশ মিনিট সময়ে বলব না। কারণ, আমি বিশ মিনিটে বলে সারতে পারব না। আপনি আমাকে অন্তত দুই ঘণ্টা সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট যুগপৎ আশ্চর্য এবং রাগান্বিত হয়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি স্টাফ কলেজের ডিএস (ইন্সট্রাক্টর) ছিলে; তুমি সামারি করা শিখিয়েছ ছেলেদের; আর এখন তুমি বলছ, তুমি বিশ মিনিটে বলতে পারবে না। কেন পারবে না? তুমি আমাকে সামারি বলো।’

আমি আবারো বিনীতভাবে উত্তর দিলাম যে, ‘আমি অবশ্যই সামারি করতে পারি কিন্তু আমি এখন করব না, কারণ সামারিতে সমাধান হবে না।’ প্রেসিডেন্টের সাথে তার সামরিক সচিব উপস্থিত ছিলেন; র‌্যাংক ব্রিগেডিয়ার; আমার থেকে এমনিতেও সিনিয়র এবং আমার সুপরিচিত। প্রেসিডেন্টের হয়ে, প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী তৎকালীন সামরিক সচিব আমাকে বললেন, টঙ্গী খালের ওপরে দ্বিতীয় ব্রিজ উদ্বোধনের অনুষ্ঠান আছে; প্রেসিডেন্টকে ওখানে যেতে হবে। অতএব তোমাকে দুই ঘণ্টা সময় দেয়া যাবে না (পাঠকের জন্য একটু ডাইভারশন। ঢাকা মহানগর থেকে উত্তর দিকে উত্তরা মডেল টাউন এবং টঙ্গী শিল্প শহরের মধ্যে সীমানা হলো টঙ্গী খাল। ওই খালের উপরে পুরনো একটি ব্রিজ ছিল। পুরনো ব্রিজ ট্রাফিক সামলাতে পারে না বিধায় সরকার একটি নতুন ব্রিজ বানিয়েছিল; ওই নতুন ব্রিজটির উদ্বোধনের কথাটিই বলা হচ্ছে)।

আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বললাম : ‘স্যার, আপনিই ঠিক করুন, টঙ্গী খালের ওপর ব্রিজ উদ্বোধন করবেন, নাকি আমার কাছ থেকে ব্রিফিং শুনবেন? ব্রিজ উদ্বোধন অন্য কোনো মাননীয় মন্ত্রী করলেও ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে অসুবিধা হবে না; কিন্তু আজ যদি পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা আপনার বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী শোনেন, তাতে কিন্তু আপনার চাহিদা মিটবে না।’ প্রেসিডেন্ট এরশাদ গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘দুই ঘণ্টা সময়ই তোমাকে দিলাম। আমাকে যেহেতু ঢাকা ফেরত যেতে হবে, সময় হিসাব করেই ব্রিফিং শেষ করবে।’

সামারি কেন করিনি?
এরপর আমি ঘড়ির কাঁটা ধরে, ম্যাপের সামনে দাঁড়িয়ে মহামান্য প্রেসিডেন্টকে দুই ঘণ্টাব্যাপী একটি ব্রিফিং দিলাম। স্থান খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে অবস্থিত ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের অপারেশন্স রুম; তারিখ ৫ মে ১৯৮৮; সময় অপরাহ্ণ সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা। ব্রিফিংয়ের মধ্যে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার ব্যাপ্তি, সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগগুলো, সমস্যা বাড়ানোর জন্য শান্তিবাহিনীর প্রচেষ্টা, শান্তিবাহিনীর প্রতি প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনের ব্যাপ্তি, শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও দুর্বলতা, বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলো এবং আমার পক্ষ থেকে সুপারিশমালা। দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্রিফিং শোনার পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত মন্তব্য শুনে, আমি দুষ্টুমি করতে বাধ্যই হয়েছিলাম। সিরিয়াস কণ্ঠে বললাম, ‘স্যার, আপনি এত কিছু জানতেন না; কারণ আপনি সব সময় সামারি শুনেছেন। সামারি শুনলে ওইটিই আপনি জানবেন যেটি সামারি-করনেওয়ালা আপনাকে জানায়। এর বাইরে যা কিছু সব আপনার অগোচরে থেকে যাবে।’ প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ‘আমি সব কিছু একলা সামলাতে পারব না, সরকারকে পূর্ণাঙ্গভাবে জড়িত হতে হবে।’ অতএব, প্রেসিডেন্টের আদেশে ১৯৮৮ সালের মে মাসের ৮ তারিখ বিকেলবেলা বঙ্গভবনে, সেনাসদরের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির ওপর একটি ব্রিফিং দেয়া হয়। কেবিনেটের সব সদস্য, সরকারের সব সচিব, ঢাকা অঞ্চলের সব জেনারেল এবং ডিআইজি ও ওপরস্থ সব পুলিশ অফিসার সেই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পূর্ণ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকে পাঁচ মিনিট করে সূচনা বক্তব্য রেখেছিলেন : মহামান্য প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী প্রধান মহোদয় এবং চট্টগ্রামের মাননীয় জিওসি। বাকি এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম আমি। আরো একটি ক্ষুদ্র স্মৃতির উল্লেখ করছি।

বেগম জিয়াকে ব্রিফিং
১৯৯১ সালের শুরুর দিকে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তিনিও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি বোঝার জন্য সেনাসদরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্টাফ অফিসাররা আমাকে বারবার বলেছিলেন, ইবরাহিম, সংক্ষেপে বলবে। দেড় ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল। আমাদের বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বাস্তবে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদ সাহেব প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও বলেছিলেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ বেগম জিয়ার তো আগের থেকে কোনো কিছু জানার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সে জন্যই তার স্টাফ অফিসারদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বেগম জিয়া দীর্ঘ সময় ব্রিফিং শুনেছেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব সম্পাদন করেছিলেন। বঙ্গভবনের ব্রিফিং বা বেগম জিয়ার প্রতি (১৯৯১) ব্রিফিংয়ের বিবরণ দেয়া আজকের কলামের উদ্দেশ্য নয়।

দৃষ্টি আকর্ষণ : বর্তমান সরকারপ্রধান
আজকের কলামের উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই মর্মে যে, দু’টি বিষয়ে তিনি যেন সামারি-নির্ভর হয়ে না চলেন। এখন প্রথম বিষয়টির উল্লেখ করছি। গতকাল ৯ আগস্ট ছিল তথাকথিত ‘আদিবাসী’ দিবস। স্থানের অভাবে, সময়ের অভাবে, শক্তির অভাবে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের অন্তর্নিহিত বিপদগুলো নিয়ে লিখতে পারছি না বা বলারও সুযোগ পাচ্ছি না। অনুমান করছি, কেউ না কেউ আপনাকে নিশ্চয়ই বলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট-দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে। যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না? যদি থাকে, তাহলে কতসংখ্যক ও কোন কোন শর্তে?’ এই অপ্রিয় প্রশ্নটি আড়াল করেই সব ডামাডোল।

দ্বিতীয় বিষয় : চলমান উগ্রবাদ বা চরমবাদ বা এক্সট্রিমিজম বা মিলিটেন্সি বা টেরোরিজম বা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস প্রসঙ্গ (যেই নামেই ডাকি না কেন)। সরকার অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে; সরকার তথা সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সরকারের দফতর-অধিদফতর, পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাব ইত্যাদি অনেকেই বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ঘোষিতভাবে, ওই পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্ত্রাস দমন বা দমনের সহায়তা। আমি আশা করব, এ প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান সামারি-নির্ভর হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করবেন না। সরকারপ্রধান যেন বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হন, এই অনুরোধ করছি। কারণ, যা কিছু হবে, সব কিছুর দায়দায়িত্ব সরকারপ্রধানের ওপরেই পড়বে। সরকারপ্রধান যেহেতু সরকার চালাচ্ছেন, সেহেতু তিনি অজস্র বিষয়ে অবশ্যই সামারি শুনবেন এবং সিদ্ধান্ত দেবেন; এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সন্ত্রাস দমন বা জঙ্গি দমনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো দেয়ার আগে এক বা একাধিকবার মেহেরবানি করে পূর্ণ বিষয়টি যেন তিনি জানতে চেষ্টা করেন এবং আবারো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সামারি-নির্ভর যেন তিনি না হন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ইমেইল : mgsmibrahim@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার অভিজ্ঞতা

আ ল ম ফজলুর রহমান

এক.

আমার অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ড আমাকে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার বিশেষ অভিজ্ঞতা তাদের সাথে শেয়ার করার জন্য। বিশেষ অভিজ্ঞতা বলতে আমি এমন কিছু ব্যাতিক্রমী অভিজ্ঞতা বুঝি যা মানুষের জীবনে কালেভদ্রে ঘটে। অতএব অভিজ্ঞতার ঝুড়িতে ব্যাতিক্রমী অভিজ্ঞতার সংখ্যা যে কম হবে তাতো বলাই যায়।

আমি উনিশ শত বিরাশি সালে লে. কর্ণেল পদে পদোন্নতি পেয়ে একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের আধিনায়ক ( কমান্ডিং অফিসার বা সংক্ষেপে সিও ) হিসাবে প্রথম পার্বত্য চট্টগ্রামের ফারুয়াতে যাই। আমি এর পুর্বে সামরিক কর্তব্যের অংশ হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসি নাই। ফারুয়া কাপ্তাই লেক থেকে উৎসারিত রেংখিয়াং খাল/ ছড়া/ নদীর পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত ফরেস্ট ডাকবাংলা সম্বলিত একটি নীচু খোলামেলা এলাকা যেখানে পাহাড়ের উচ্চতার কারণে বাতাসশুণ্য বললে বেশী বলা হবেনা। অর্থাৎ ফারুয়াতে থাকলে গায়ে বাতাস লাগেনা। এলাকাটা ডিপ্রেস্ট হবার ফলে এখানে টিভি দেখা যায় না। রেংখিয়াং কে খাল, ছড়া এবং নদী এই তিন নামে অভিহিত করা যায়। রেংখিয়াং খালে স্রোত নাই। তবে উপরে বা আপস্ট্রিমে বৃষ্টি হলে রেংখিয়াং খাল নদীতে পরিণত হয়ে এর স্রোত কি পরিমাণ ভয়াবহ ও ধ্বংসাওক হতে পারে সে অভিজ্ঞতায় পরে আসছি। এবারে বলবো ছড়া সম্বন্ধে।

ছড়া এক কথায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা বলা যায় যা পরে একটু ছড়িয়ে নীচের দিকে প্রবাহিত হয়। কোনো কোনো ছড়া শুকিয়ে যায় আবার বর্ষার সময় জীবন্ত হয়ে স্রোতের সৃষ্টি করে। তবে যেহেতু রেংখিয়াং কাপ্তাই লেক থেকে উৎসারিত কোনো পাহাড় থেকে নয় তাই একে খাল বলাই অধিক সমীচীন ছড়া নয় । এবং রেংখিয়াংকে পহাড়ী স্হানীয়রা খাল বলে অভিহিত করে। আমিও রেংখিয়াংকে খাল বলে আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।

তো ফারুয়াতে আমার ব্যটালিয়ান সদর দপ্তর তবে রিয়ার সদর কাপ্তাইতে। এলাম কাপ্তাই। ফর্মালিটিস সম্পন্ন করে ফারুয়া যাবার দিন ঠিক হলো। তিনটা স্পিডবোট । সামনে এবং পিছনে সশস্ত্র স্কট এবং মাঝে আমার স্পিডবোট। সবাই সশস্ত্র এবং ব্যাটেল ড্রেসে আমরা। রেংখিয়াং খাল ধরে যেতে হবে দক্ষিণ পুর্বে প্রায় তিন ঘন্টা বিরতিহীন ।

যাত্রা শুরু হল। সবাই সজাগ এবং ঈগলের দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ অবলোকন করতে করতে অগ্রসর হচ্ছি। এলাম বিলাই ছড়ি। আকাশচুম্বী পাহাড়ের পাদদেশে কাপ্তাই লেকের কাকচক্ষু পানির সাথে এযেন পাহাড় আর লেকের বিশাল জলরাশির জলের সাথে পাহাড়ের জলকেলি। বিলাইছড়ি যাবার পথে দেখলাম ছোট ছোট টিলার যেঅংশ আগবাড়িয়ে লেকের পানিতে মিশেছে তারি সবুজ সোনালী আভায় ঢাকা ঘাসে বনমরোগ এবং মথুরা চরে বেড়াচ্ছে। হাঁটু পানিতে দলবেঁধে মাছ শিকার করছে কালেম পাখির ঝাঁক । তারই মাঝে ঘন বনে ঢাকা টিলার উপরে পাহাড়ীদের বাড়ী এবং নীচে কাপ্তাই লেকের স্তব্ধ কালো জল। আমি এই মহোময় দৃশ্য দেখে ভাবছিলাম এমন শান্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে যাদের নিত্য দিনাতিপাত তারা রক্তপিপাশু শান্তিবাহিনী কি করে হয় ?

বিলাইছড়ি পেরিয়ে বামে পড়লো এংলিয়ানার পাংখু পাড়া। পাংখুরা এখন সবাই খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে। এংলিয়ানা এই পাড়ার হেডম্যান। এলাম তক্তানালা গ্রামে। এখানে ফারুয়া ইউনিয়নের ইউনিয়ন কাউন্সিল। যখন তক্তানালা গ্রাম অতিক্রম করছিলাম তখন মনে হলো আমি কোন আফ্রিকার জঙ্গলে প্রবেশ করেছি টারজানের মতো। রেংখিয়াং খালের উভয় পাশে খাড়া উচু পাহাড়। শত বছরের পুরোন পাহাড়ী গাছের কান্ড বেয়ে নেমে এসেছে বটগাছের মতো লতানো ঝুরি। পাহাড়ের চূড়ায় তাকালে মাথার টুপি পড়ে যায়। গভীর জঙ্গলে ভরা পাহাড়। বিশাল বিশাল চাপালিশ গাছ । গাছে গাছে নানা জাতের পাখি এবং বানরসহ অনেক জাতের ছোট ছোট প্রাণীতে ভরা দেখলাম প্রাণভরে। চাপালিশ গাছের মগডালে বসে হুম হুম করে ডাকছে রয়েল পিজিয়ন। আমি ইতিপূর্বে রয়েল পিজিয়ন দেখি নাই। রয়েল পিজিয়ন ধুসর বর্ণের প্রায় কেজি ওজনের হরিয়াল পাখি। রয়েল পিজিয়নের হুম ডাক প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকে ভেসে আসে।

আপনাদের শুনতে খারাপ লাগলেও বলছি। আমি তক্তানালার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেমন উপভোগ করেছি সাথে চিন্তা করছিলাম কোনো সময় এখানে এসে এই সব পশুপাখি শিকার করবো। তখন ইউনিফর্মে ছিলাম, বয়স কম, মনোভঙ্গি অন্যরকম ছিলো তাই এইসব চিন্তা করতে পেরেছিলাম। এখন পাখি শিকার আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তো ফারুয়াতে যখন এলাম তখন বেলা দুটা হবে। দেখলাম রেংখিয়াং খালের পুর্ব পাড়ে তজেন্দ্রলাল তনচ্যঙ্গা হেডম্যান পাড়া এবং পাড়ার দক্ষিণে খালের পাড় ঘেষে ফারুয়া বাজার।

-চলবে

পাহাড়ে ধর্মান্তরিত করে ১২ হাজার পরিবারকে খৃস্টান বানানো হয়েছে

সেবার নামে এনজিওর আড়ালে চলছে ধর্মান্তকরণ

গির্জা

মিয়া হোসেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে :

দরিদ্র ও অসহায় পাহাড়ী পরিবারদের নিয়ে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে কাজ করছে অসংখ্য দেশী-বিদেশী এনজিও। এদের মধ্যে বেশকিছু এনজিও সেবার আড়ালে দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তকরণ করছে।

স্থানীয় আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের তথ্য থেকে জানা যায়, গত দেড় বছর তথা ২০১৫-১৬ বছরে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে ১৫৪টি উপজাতি পরিবারকে খৃস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। এসব পরিবারের ৪৭৫ জন সদস্যকে খৃস্টান করা হয়েছে। আর গত ২০ বছরে ১২ হাজার উপজাতি পরিবারকে খৃস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।

সম্প্রতি পাবর্ত্য চট্টগ্রামে সরেজমিনে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে এনজিওর আড়ালে চলছে ধর্মান্তরকরণ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ জনপদের পিছিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের টার্গেট করে মাঠে নেমেছে আন্তর্জাতিক খৃস্টান মিশনারিগুলো। অভিযোগ, স্বাস্থ্য ও সমাজসেবার নামে দারিদ্র্য পীড়িত উপজাতি জনগোষ্ঠীকে ধর্মান্তরকরণের অপতৎপরতায় লিপ্ত বিদেশি অর্থে পরিপুষ্ট এ এনজিওগুলো। এ অবস্থা চলতে থাকলে এ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম জোরদার হওয়ার শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বসবাস করে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী। রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা, মহামারি, অপুষ্টি ও স্যানিটেশন সমস্যা নিত্যসঙ্গী তাদের। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করছে এনজিওগুলো। পশ্চিমাদের পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে একটি খৃস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চক্রান্তের অংশ এটি।

স্থানীয় আইন শৃংখলা বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, গত দেড় বছর তথা ২০১৫ থেকে চলতি ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত পাবর্ত্য এলাকায় ১৫৪টি পরিবারের ৪৭৫জন সদস্যকে খৃস্টান ধর্মে ধমান্তরিত করা হয়েছে। এসব পরিবারকে বিভিন্ন এনজিও ও ব্যক্তিরা নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। তাদের মধ্যে খাগড়াছড়িতে ১৪৪টি পরিবারের ৩৪২জন সদস্য ও বান্দরবানে ১০টি পরিবারের ৩৩জন। তবে রাঙামাটিতে ধর্মান্তরিত করার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। ধর্মান্তরিত করা এসব উপজাতিদের মধ্যে অধিকাংশই চাকমা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২০ বছরে সেখানে ১২ হাজার উপজাতি পরিবার খৃস্টান হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিন পার্বত্য জেলার ১৯৪টি গির্জা মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলায় ৭৩টি গির্জা রয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ জেলায় চার হাজার ৩১টি পরিবার খৃস্টান হয়েছে। বান্দরবান জেলায় গির্জা রয়েছে ১১৭টি। এখানে একই সময়ে খৃস্টান হয়েছে ছয় হাজার ৪৮০টি উপজাতি পরিবার।

রাঙ্গামাটিতে চারটি গির্জা খৃস্টান বানিয়েছে এক হাজার ৬৯০টি পরিবারকে। পাহাড়ি যেসব জনগোষ্ঠীর লোকসংখ্যা কম, তাদের প্রায় শতভাগ খৃস্টান হয়ে গেছে অনেক আগেই। এমন একটি উপজাতি পাংখু। যাদের পুরো জনগোষ্ঠীই খৃস্টান হয়ে গেছে; বদলে গেছে তাদের ভাষা। এমনকি তাদের অক্ষরও ইংরেজি।

জানা যায়, এনজিওর নাম ধারণ করে খৃস্টানরা এই দুর্গম এলাকায় হাসপাতাল, বিনোদন কেন্দ্র, গির্জা ইত্যাদি গড়ে তুলেছে। বহুজাতিক কোম্পানির আর্থ-রাজনৈতিক স্বার্থে এবং অসহায়, নিঃস্ব, নিরক্ষর মানুষকে সেবা করার নামে ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এ এনজিওগুলো। এদের বাজেটের ৯০ শতাংশ অর্থ খৃস্টানদের বা খৃস্টান হওয়ার সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের স্বার্থে ব্যয় হয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তর ইউনিয়ন খাগড়াছড়ি জেলার সাজেক। সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এই উপত্যকায় খাগড়াছড়ি বা রাঙ্গামাটি শহর থেকে পৌঁছতে সময় লাগে দু’দিন। এই ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে খেয়াং, বম, পাংখু, লুসাই উপজাতির ১০ হাজার মানুষের বাস। ২০ বছর আগেও এখানে খ্রিস্ট ধর্মের নামগন্ধ ছিল না। উপজাতিদের ভাষা, সংস্কৃতি সবই ছিল। আজ তার কিছুই নেই।

সাজেক ইউনিয়নের আকর্ষণীয় রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রে অবস্থিত গির্জার ধর্ম প্রচারক ময়তে লুসাইয়ের সঙ্গে কথা হয় এ বিষয়ে। তিনি ধর্মান্তর করণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। বলেন, ‘আমরা কেবল নিজ ধর্মের অনুসারীদের বাইবেলের শিক্ষা দিয়ে থাকি।’

‘সেভেন সিস্টা’র নামে খ্যাত মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, হিমাচল, অরুণাচল প্রভৃতি ভারতীয় রাজ্যের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এখন ধর্মান্তরিত খৃস্টান। ওই সব পাহাড়ি অঞ্চল সংলগ্ন বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকায়ও উল্লেখযোগ্য হারে খৃস্টানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রদায়িক উন্নয়ন পরিকল্পনার অধীনে এখানকার খৃস্টান যুবকদের উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা প্রভৃতি দেশে প্রেরণ করে থাকে।

এদিকে, এনজিওদের দেশীয় সংস্কৃতি ও আদর্শবহির্ভূত সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। পাশাপাশি এ এনজিওদের কর্মকা- ঘনিষ্টভাবে মনিটরিং এর দাবি তুলেছেন তারা। এর আগে ২০১৫ সালের জুন মাসে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদের হলরুমে ধর্মান্তরিত করার ঘটনায় গণশুনানিও অনুষ্ঠিত হয়। তারও আগে ২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামে খৃস্টান মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ এনেছে বান্দরবানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাক সম্প্রদায়ের নেতারা। এ বিষয়ে ২০১৪ সালের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি স্মারকলিপিও প্রদান করেন তারা।

৩২ জন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নেতার স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিটি রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়াও ৬টি মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা, বিজিবি-পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা চেয়ারম্যান, ওসিসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ সমিতি এবং ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। স্মারকলিপির সাথে নব্য খৃস্টান প্রচারক চাক ছেলে- মেয়েদের একটি নামের তালিকাও সংযুক্ত করা হয়।

এ ব্যাপারে চাক সম্প্রদায়ের নেতা ছানু অং চাক, বাচাচিং চাক, নাইন্দা অং চাক, ফোছা অং চাক, অংথোয়াইচিং চাক জানান, খ্রিশ্চিয়ান মিশন চাক ছেলে মেয়েদেরকে ধর্মান্তরিত করার কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ধর্মীয় দাঙ্গা হাঙ্গামার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রশাসনিক সহায়তা পেতে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানান।