সবুজ পাহাড় নিয়ে কেন এত হলুদ সাংবাদিকতা?

সন্তোষ বড়ুয়া

হলুদ সাংবাদিকতা শব্দটার সাথে কম বেশী সবাই আমরা পরিচিত। তবুও সবার জানার জন্য বলছি- হলুদ সাংবাদিকতা বলতে আসলে কি বোঝায়? উইকিপিডিয়ার মতে হলুদ সাংবাদিকতা বলতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশন বা উপস্থাপনকে বোঝায়। এ ধরনের সাংবাদিকতায় ভালমত গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হল সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে যেভাবেই হোক পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। অর্থাৎ হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকৰ্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্ৰতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্ৰচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি।

হলুদ সাংবাদিকতার পাঁচটি বৈশিষ্ট্য:
• সাধারণ ঘটনাকে কয়েকটি কলাম জুড়ে বড় আকারের ভয়ানক একটি শিরোনাম করা।
• ছবি আর কাল্পনিক নক্সার অপরিমিত ব্যবহার।
• ভুয়া সাক্ষাৎকার, ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে এমন শিরোনাম, ভুয়া বিজ্ঞানমূলক রচনা আর তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কর্তৃক ভুল শিক্ষামূলক রচনার ব্যবহার।
• সম্পূৰ্ণ রঙিন রবিবাসরীয় সাময়িকী প্রকাশ, যার সাথে সাধারণত কমিক্স সংযুক্ত করা হয়।
• স্রোতের বিপরীতে সাঁতরানো পরাজিত নায়কদের প্ৰতি নাটকীয় সহানুভূতি।

তবে হলুদ সাংবাদিকতার সংজ্ঞায় নতুন একটি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা যায় তা হল একটি নির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে সুবিধা দেয়ার জন্য অন্য কোন জাতি-গোষ্ঠী বা ব্যক্তির সংবাদ প্রকাশ না করে উহ্য রাখা অথবা আংশিক প্রকাশ করা। আর এভাবে হলুদ সাংবাদিকতা করে নিজেদের পকেট ভারী করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশে বর্তমানে দেশের প্রথম সারির কতিপয় সংবাদমাধ্যমগুলো এই নীতি অনুসরণ করছে। কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আপনাদের কাছে আরো পরিস্কার হবে।

ঘটনা-১
২১ জুন ২০১৮, পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে দশম শ্রেণীর এক ত্রিপুরা কিশোরীকে গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায়। জানা যায় যে, ত্রিপুরা কিশোরীটি তার বন্ধু নয়নময় ত্রিপুরার সঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্কে ঘুরতে গেলে কয়েকজন স্থানীয় বাঙালি যুবক এসে নয়নময় ত্রিপুরাকে আটকে রেখে উক্ত কিশোরীর চোখ-মুখ বেঁধে গণধর্ষণ করে। উক্ত ঘটনাটি ২২ জুন ২০১৮, “Indigenous girl ‘gang-raped’ in Khagrachhari” শিরোনামে দেশের প্রথম সারির একটি স্বনামধন্য ইংরেজী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। শুধু ওই একটি পত্রিকা নয় দেশের আরো অনেক বিখ্যাত গণমাধ্যম নিউজটি ফলাও করে প্রচার করে।

ঘটনা- ২
ঠিক এমনই আরেকটা ঘটনা ঘটে তার মাত্র কিছু দিন আগে ২৯ মে ২০১৮। খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে একই সঙ্গে দশম শ্রেণীর তিনজন মারমা ছাত্রী ৪জন উপজাতি যুবক কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। জানা যায় যে, মহালছড়ি উপজেলার মানিকছড়িমুখ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে উক্ত তিন মারমা ছাত্রী বসে আড্ডা দিচ্ছিল। এ সময় চারজন উপজাতি যুবক তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে পার্শ্ববর্তী সেগুন বাগানে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। বর্ণিত দুটি ঘটনা একই রকম হলেও পরের ঘটনাটি কোন এক দৈব কারণে সেই স্বনামধন্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। একইভাবে পূর্বোল্লিখিত ঘটনাটি যেসব গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করেছিল পরোল্লিখিত ঘটনাটি সেসব গণমাধ্যমের অধিকাংশতে স্থান পায়নি।

ঘটনা-৩ 
২২ মে ২০১৮। স্থান: খাগড়াছড়ি জেলা শহরের স্বনির্ভর বাজার। সেদিন দিনে দুপুরে জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে দুই দল উপজাতি সন্ত্রাসীর মধ্যে শতাধিক রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। দিনে দুপুরে একটা জেলা শহরের মাঝে গোলাগুলির মত এত বড় একটা ঘটনা ঘটলো অথচ সে বিষয়ে গুটিকয়েক পত্রিকা ছাড়া দেশের প্রথম সারির অধিকাংশ জাতীয় পত্রিকাতেই সংবাদটি প্রকাশ পায়নি। বলাবাহুল্য প্রথম ঘটনায় বর্ণিত সেই স্বনামধন্য পত্রিকাটিও এই সংবাদ এড়িয়ে গিয়েছিলো।

ঘটনা-৩
২০১৭ সালের জুন মাসের ২ তারিখে রাঙামাটি জেলার লংগদুতে সংঘটিত অগ্নিকান্ডের ঘটনায় শতাধিক বাড়ি পোড়ানোর মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটলেও সেখানে প্রাণহানির কোন ঘটনা ঘটেনি। অথচ দেশের প্রথম সারির একটি স্বনামধন্য বাংলা পত্রিকা গুণমালা চাকমা নামে ৭০ বছরের এক উপজাতি বৃদ্ধা আগুনে পুড়ে মারা যায় বলে দাবী করে সংবাদ প্রকাশ করে। অথচ, অগ্নিকান্ডের পরে লংগদু উপজেলা কার্যালয় কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতির যে চুড়ান্ত তালিকা/বিবরণ তৈরী করা হয় সেখানে আগুনে পুড়ে গুণমালা চাকমার মৃত্যু সংক্রান্ত কোন তথ্য নেই।
উল্লেখ্য যে, স্বনামধন্য ঐ বাংলা পত্রিকার সাংবাদিক ছিলো একজন উপজাতি জনগোষ্ঠীর।

ঘটনা-৪
২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটি জেলাতে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। উক্ত ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানিসহ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার জন্য ১৪ জুন তারিখ থেকে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামত/সংস্কার কাজ শুরু করে। পাশাপাশি ১৩ জুন তারিখ থেকেই সেনাবাহিনীর জওয়ানরা স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য উদ্ধার তৎপরতা ও বিভিন্ন প্রকার জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম চালাতে থাকে। সেনাবাহিনীর এরূপ মানবিক কাজের প্রশংসা করে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

কিন্তু ১৭ জুন তারিখে দেশের সেই প্রথম সারির স্বনামধন্য বাংলা পত্রিকাটি “যেন যুদ্ধ বিধ্বস্ত জনপদ” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে যেখানে পাহাড় ধসের ঘটনায় রাঙামাটির দূর্যোগ পরবর্তী দূরাবস্থা, উদ্ধার তৎপরতা এবং বিধ্বস্ত সড়ক যোগাযোগ নিয়ে বলা হয়। অথচ, ঐ রিপোর্টে সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত রাস্তাঘাট সংস্কার/মেরামতসহ নানাবিধ জনকল্যাণমূলক কাজের তথ্যসমূহ উহ্য রাখা হয়।

এখানে বলে রাখতে চাই যে, যেদিন সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছিলো সেদিনও সেনাবাহিনীর সড়ক মেরামত/সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত ছিলো। তথ্য উহ্য রেখে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন কি সাংবাদিকতা পেশার নৈতিকতা বিবর্জিত নয়?

পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশে “হলুদ সাংবাদিকতার” এরকম হাজারো উদাহরণ আছে।

পরিশেষে বলতে চাই যে, নৈতিকতা বলে সাংবাদিকতায় একটি বিষয় আছে যা না থাকলে সাংবাদিকতা আর সাংবাদিকতা থাকে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতে সেই নৈতিকতা এখন সাংবাদিতকতা পেশায় বিরল। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে একটু নজর দিবেন কি?

লেখক: রাঙামাটি থেকে

পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক

মাহের ইসলাম:

মশাল মিছিল ঠিক কবে, কোথায় এবং কি পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়েছিল, আমার জানা নেই। জানার জন্যে অল্প-স্বল্প চেষ্টা যে করিনি তা নয়, কিন্তু জানতে পারিনি। তবে উৎপত্তি যেভাবেই হোক না কেন, মশাল মিছিলকে আমার অন্য মিছিলের তুলনায় বেশি জীবন্ত মনে হয়। তাই আল জাজিরার মত একটা বিখ্যাত মিডিয়াতে যখন বাংলাদেশের একটা সংবাদের সাথে মশাল মিছিলের ছবি থাকে তখন আমার মনোযোগ আকর্ষণ না করে পারে না। আর যখন দেখলাম যে, সংবাদটি পার্বত্য চট্রগ্রামের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তখন একটু বাড়তি কৌতূহল নিয়েই সংবাদটি পড়তে শুরু করি।

২৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আল জাজিরার যে সংবাদটি আমার এক বন্ধু আমার সাথে শেয়ার করেছেন, সেটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়াতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুই মারমা বোনের কথিত ধর্ষণের ব্যাপারে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে, সংবাদটিতে বলা হয়েছে কিভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্রগ্রামে ধর্ষণ করে ঘটনাটি আড়ালের চেষ্টা করছে। মশাল মিছিলের ছবি দেখিয়ে দাবী করা হয়েছে যে সাধারন মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচারের দাবিতে।

সংবাদটি পড়ে আমি উপলব্ধি করলাম, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অপপ্রচার চালানোতে অভাবনীয় দক্ষতা অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশে এবং বিদেশে  মানুষের হৃদয় জয়ের পথে আমাদের দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে তারা সাথী হিসেবে পেয়েছে, যারা নিজেদেরকে সংবেদনশীল, ধর্মনিরপেক্ষ এবং নারীর অধিকার আদায়ের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে পরিচিত হতে পছন্দ করেন।


  1. এ সংক্রান্ত আরো খবর ও লেখা পড়ুন
  2. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  3. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন
  6. বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি
  7. আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি: দু’মারমা কিশোরী
  8. বিলাইছড়িতে কথিত নির্যাতিত দুই কিশোরীর নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত বিশেষ মহল

এই সংবাদটিতে  চাকমা জনগোষ্ঠীকে “দেশের অত্যাচারিত জনসংখ্যা” হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্রগ্রামকে পরিচিত করা হয়েছে এই বলে যে, কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের ১৩ টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর হালকা সংঘাত (Low Intensity Conflict) চলছে।  পুলিশ কর্তৃক আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দুই মারমা কিশোরীকে তাদের পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ এর তকমা লাগানো হয়েছে; এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের  উদ্ধৃতি দিয়েই অবশ্য এটি করা হয়েছে।এই খবরে মিসেস ইয়ান ইয়ানকে উপস্থাপন করা হয়েছে চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্যা হিসেবে যিনি “ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য লড়াই করছেন”।

আমি অবাক হবো না যদি ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করে থাকেন যে, কারা চাকমাদেরকে অত্যাচারিত জনগোষ্ঠী মনে করে, কারা বলতে পারে যে পার্বত্য চট্রগ্রামে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সাথে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর সংঘাত (Low Intensity Conflict) চলছে, এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ এর তকমা কারা দিতে পারে! সঙ্গত কারণেই আমি মনে করি যে, আল জাজিরার সংবাদটিতে যে শুধুমাত্র মুদ্রার একপাশকে বিকৃত করে দেখানো হয়েছে– তা বোঝার জন্যে একজন পাঠকের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট।

তেমনি একজন স্বাভাবিক পাঠকের দৃস্টিতেই এই নির্দিষ্ট সংবাদের কিছু কিছু অসংগতি তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি। এক্ষেত্রে, আমি যেসব সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমের তথ্য ব্যবহার করছি তার বেশিরভাগই পাহাড়ী ঘরানার বা ইতোমধ্যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে পরিচিত। ইচ্ছে করেই আমি এটি করছি, অন্যথায় বাঙ্গালীর প্রতি সহানুভূতি দেখায় এমন মিডিয়া উল্লেখ করলে আমার দাবিকে অনেকে দুর্বল ভাবতে পারেন। শুরুতেই বলে নেয়া ভাল যে, ২২ জানুয়ারি প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিলো তা প্রমাণ করার ইচ্ছা আমার নেই। সেই ভার যেহেতু মামলা হয়েছে তাই তা আদালতের বিচার্য অথবা সচেতন পাঠকের হাতেই রইল।

যৌন হয়রানির কোন ঘটনা ঘটলে, যে কোন বাবা-মা তাদের সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ করবে, এই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড, কিন্তু মারমা দুই বোনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কেন হয়নি, সেটির কোন উত্তর এই সংবাদে নেই। পাঠকদের কি জানানো উচিত নয় যে, কেন বাবা-মা তাদের হাসপাতালে ভর্তি করেনি বা কেন তারা পুলিশে যায়নি? মেয়ে দুইজনকে ২২ জানুয়ারি সকালে গ্রাম থেকে ‘কে বা কারা’ নিয়ে যাওয়ার পর ২৩ জানুয়ারী দুপুরের পরে রাঙ্গামাটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বাবা-মাকে ছাড়াই দুইজন নাবালিকাকে গ্রাম থেকে তুলে নেয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি করার মধ্যবর্তী ৩০ ঘণ্টায় কী ঘটেছে,  তা প্রকাশ করা হয়নি। কারা তাদেরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছিল, কোথায় তারা ছিল, এসময় তাদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছে- অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। চিকিৎসা করাই যদি উদ্দেশ্য হবে, তাহলে ভর্তির পরদিনই মেয়ে দুইজনকে নিজেদের জিম্মায় নেয়ার জন্যে কিছু স্থানীয় নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী এতটা উঠে পড়ে লেগেছিলো কেন– সেটি আজো অজানা রয়ে গেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়, এই মেয়েদের হাসপাতালে ভর্তি করার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, অনিচ্ছাকৃত হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই  সম্পূর্ণ সত্যের পরিবর্তে এখানে আংশিক সত্য প্রকাশ করা হয়েছে।

খেয়াল করে দেখুন, ২২ তারিখেই এটা পোস্ট করা হয়েছে। এই পোষ্টের অন্যান্য দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করার ভার পাঠকের উপরই রইল; বিশেষ করে, ঘরে কয়জন ঢুকেছিল এবং বাবা-মায়ের উপস্থিতির বিষয়টি।  এমন অনেক মনগড়া পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু জাতীয় দৈনিকে দেখা গেছে।

এখানে আরো লুকানো হয়েছে যে, মেয়ে দুটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ইচ্ছেমতো কাহিনী প্রচার শুরু হয়ে যায়; একই সাথে হাসপাতালের সামনেও অনেকে জড়ো হয়।

বাবা-মায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে, উচ্চ আদালত মেয়ে দু’জনকে তাদের  পিতামাতার কাছে হস্তান্তর ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দেয়। পুলিশ কর্তৃক আদালতের এই আদেশ বাস্তবায়নকে এই সংবাদে বলা হয়েছে, ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ (forced abduction) যা কিনা সশস্ত্র বাহিনী করেছে। অবশ্য এমন উদ্ভট দাবিকে জায়েজ করার জন্যে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর সুত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি আদালতের এই আদেশের বৈধতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে; কারণ অন্য আদালতে মেয়ে দু’জনকে চাকমা সার্কেল চিফের এখতিয়ারে নেয়ার জন্যে আগেই রীট করা হয়েছিল।

তবে দুইজন নাবালিকাকে পিতা-মাতার পরিবর্তে তার নিজের জিম্মায় নিতে চাইলেও  মিসেস ইয়ান ইয়ান ও তার দোসরদের পদক্ষেপগুলির কোন সমালোচনা করা হয় নি। এমনকি, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে বাঁধা দেয়া, এমনকি রীতিমত শারীরিক প্রতিরোধের পরেও প্রশ্ন উঠে নি যে, এখানে আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করা হয়েছে কিনা? এমনটি এই কারণেই সম্ভব যে, আল জাজিরার ঐ প্রতিনিধি শুধুমাত্র ইয়ান ইয়ান এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল সমর্থকদের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনেছেন। তাই অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় উপেক্ষা করে এমন একতরফা ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এটা করতে গিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন; যেমন, ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, যেখানে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, মেডিক্যাল বোর্ডের ৩ সদস্যার মধ্যে একজন বড়ুয়া ও একজন পাহাড়ি ডাক্তারও ছিলেন।

পুরো সংবাদটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল যে, এই সাংবাদিক অন্ধের মতো মিসেস ইয়ান ইয়ান এবং তার সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের বিশ্বাস করেছেন।এমনও মনে হয়েছে যে, তিনি প্রকৃত সত্য উপস্থাপন না করে, মিথ্যার সাথে  কিছু সত্য ও পর্যবেক্ষণ মিশ্রিত করার এবং মিথ্যা উপসংহার উপস্থাপনের জন্যে কোন ধরনের বাধ্যবাধকতার শিকার হয়ে  থাকতে পারেন। এই কারণেই হয়তবা বাবা-মায়ের দাবী এবং তাদের কথা কিছুটা কমই উল্লেখ করা হয়েছে। আমার অদ্ভুত লেগেছে যে, একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে খোলাখুলিভাবে বাবা-মা দাবি করেন যে, মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়নি– সেটি পর্যন্ত এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে, পুরো সংবাদ জুড়ে পিতামাতার দাবি কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ এমনকি মেয়ে দুইজনের পিতা-মাতার পরিবর্তে,  স্থানীয় কিছু নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার  কর্মীদেরকে কথা অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়ছে। তাই আমি অনুভব করছিলাম যে, এই প্রতিনিধি ও ঐসব স্থানীয় নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার  কর্মীদের মাঝে এক ধরনের বোঝাপড়া থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। পাশাপাশি, প্রকৃত গল্পটি খোঁজার পরিবর্তে হয়তো তিনি কোন বিশেষ ব্যক্তির বীরত্বপূর্ণ ইমেজ সৃষ্টির লক্ষ্যেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

আমি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছি যখন মেয়ে দুইজনের ছোট ভাইয়ের কথা বলা হয়েছে। সংবাদদাতা দাবি করেছেন যে, “প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত ছোট ভাই মার্মা ভাষায় বলেন যে, ‘এক নয়, তবে দুইজন লোক রুমটিতে প্রবেশ করেছে’।” অথচ, পাহাড়িদের ভিডিও ক্লিপে কিন্তু ‘একজন’ এর কথাই বলা হয়েছে। যেহেতু সাবটাইটেল সহ এই ভিডিওটি এমন একটি Facebook পেইজে  আপলোড করা হয়েছিল যা তার সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্যের জন্য সুপরিচিত, সেহেতু এই ক্লিপের সাবটাইটেল অবিশ্বাস করার কোন কারণ থাকতে পারে না। তাহলে, এই প্রতিবেদক ছোট ভাইয়ের কথার এমন মিথ্যে অনুবাদ কেন প্রচার করবেন? নাকি তিনি নিজেই পাহাড়িদের অপপ্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং মিথ্যে প্রচারে সর্বতোভাবে চেষ্টা করছেন?

যেকোনো নির্যাতিতার জন্যেই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া আতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুরু থেকেই কিছু নেতা-নেত্রী মেয়েদেরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেষ্টা ছিল। অজ্ঞাত কারণে, এই সত্যটি, প্রতিবেদকের মনে কোন ধরনের সন্দেহ উত্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে, প্রতিবেদক এটিকে সত্য বলে প্রমাণ করেছেন যে, “সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুরো হাসপাতালটিকে নজরদারির আওতায় রাখে এবং বহিরাগতদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না।” বাস্তবতা হলো, এই সংবাদেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বড় মেয়েটির স্বাক্ষর করা একটি চিঠি এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হস্তগত হয়েছে। আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিছু ভলান্টিয়ারসহ ইয়ান ইয়ান হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

এমন কি, মিসেস ইয়ান ইয়ানের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক শুরু থেকে হাসপাতালের মধ্যে মেয়েদের সাথে ছিল। সংবাদদাতা আরো লিখেছেন, “আল জাজিরার সাথে কথা বলার সময় ইয়্যান ইয়ান বলেন, ২২ জানুয়ারি ভোর বেলা নিরাপত্তা বাহিনীর চারজন সদস্য মারমা পরিবারের ঘরে প্রবেশ করেন”। সংবাদদাতা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছেন যে ‘দুইজন পুরুষ’ বাড়িতে প্রবেশ করেছিল।

শুরুতেই বলে নিয়েছি যে, উরাছড়িতে ২২ তারিখে কি ঘটেছিল, আমি তা প্রমাণ করতে চেষ্টা করছি না। তাই, এই ঘটনাটি নিয়ে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে কি প্রকাশিত হয়েছে- তা এখানে উল্লেখ করতে চাই না। উৎসুক যে কোন ব্যক্তিই সেগুলো দেখে নিতে পারবেন। যা নিশ্চিত, তা হলো এই যে, আল জাজিরার এই সংবাদে বেছে বেছে কিছু নির্বাচিত ঘটনা বিকৃত বা আংশিক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে। এটা দিবালোকের মতো পরিস্কার যে, এই সংবাদে প্রদত্ত বেশিরভাগ তথ্যই পক্ষপাতদুষ্ট, কারণ একটি বিশেষ ঘরনার কাছে থেকেই সকল তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে; প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয়নি বলে দৃশ্যমান। মূলত কিছু বিশেষ লক্ষ্যের দিকে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায় বা জনগণের মনোভাবকে প্রভাবিত করাই এই সংবাদের লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে।

– লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক নীতি-কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ

গত ডিসেম্বর ও চলতি জানুয়ারি মাসে দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এ সকল পত্রিকার রিপোর্টার ও সিনিয়র সাংবাদিকগণের সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা এসব সরেজমিন প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত খবরের নিয়মিত পাঠক হিসাবে বলতে পারি, বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় দৈনিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখালেখির একটি কমন ট্রেন্ড রয়েছে। এই ট্রেন্ডের টার্গেট থাকে পুনর্বাসিত বাঙালি ও সেনাবাহিনী। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অশান্তি ও অস্থিরতার জন্য এদেরকে দায়ী করা হয় এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র শাখার সন্ত্রাসী তৎপরতাকে সযত্মে আড়াল করা হয়। কিন্তু এবারের প্রতিবেদনগুলোতে সেই ট্রেন্ড ছিল না। রিপোর্টারগণ সরেজমিন পরিদর্শন করে খোলা চোখে যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত এবং লুকানো বাস্তবতা উঠে এসেছে এই রিপোর্টগুলোতে। এতে সারাদেশের মানুষের মনে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত চিত্রের উপর কিছুটা হলেও ধারণা তৈরি হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

গত ৯ জানুয়ারি সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা বাড়াতে সুপারিশ করা। একই সাথে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কমিটির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ইতিবাচক রিপোর্টের সুফল।

স্বাধীন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের কালপঞ্জীকে আমরা মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। সত্তরের দশকে জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠা, আশির দশকে বাঙালি পুনর্বাসন এবং ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি।  ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। শুধু রাজনীতি নয়; নিরাপত্তা, উন্নয়নসহ জনজীবনের সকল ক্ষেত্রেই এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও দিকবদল। শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সন্ত্রাসী ও নিরাপত্তা বাহিনী পরস্পর মুখোমুখি ও শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে ছিল। শান্তিবাহিনী যেখানে পেরেছে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের উপর অতর্কিত বা পরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোও হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত শান্তিবাহিনীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তাদের আটক করেছে।

শান্তিচুক্তির পর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের একটি অংশ অস্ত্র জমা দিয়ে সাধারণ ক্ষমার আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসাই নয়, শান্তিচুক্তির পুনর্বাসনের আওতায় জেএসএস ও শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা অতিদ্রুতই মন্ত্রী-এমপিসহ বিভিন্ন পদমর্যাদায় সরকারি পদে আসীন হয়। ফলে কিছুদিন আগেও যে সন্ত্রাসী হিসাবে রাষ্ট্রের ও সেই সুবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর শত্রু ছিল, চুক্তির বছরখানেকের মধ্যেই তারা একই অফিসের বস বা সহকর্মীদের পরিণত হয়। অনেকেই আবার রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন সুবিধার আওতায় ব্যবসা বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ভাবে বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে একথা সকলেই জানেন যে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের একটি বড় অংশ শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে অস্ত্র সমর্পণ না করে রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত থাকে। শান্তিচুক্তির দুই দশক পরেও এই তৎপরতা স্তিমিত না হয়ে ক্রমাগত বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিগত ২ বছরে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসনীয় অর্জন রয়েছে। বিশেষ করে সাজেক, বাঘাইছড়ি, দিঘীনালা, মহালছড়ি, রাঙামাটি ও রুমাতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক সাফল্য লাভ করেছে। অন্যদিকে আলীকদমে আলোচনার মাধ্যমে অর্ধশতাধিক সন্ত্রাসী শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাস মোকাবেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে অতীতে বিস্তারিত লিখেছি বহুবার।

কিন্তু শান্তিচুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে শান্তিবাহিনী ও জেএসএসের যেসকল নেতাকর্মী পূর্বের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেই কাজ করে যাচ্ছে তাদের মোকাবেলার বিষয়টি আজ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, বর্তমান প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিবেচনা করে দেখলে এটা সহজেই প্রতিভাত হয়ে যে, শান্তিবাহিনী সশস্ত্র লড়াই করে যা অর্জন করতে পারেনি, শান্তিবাহিনীর সাবেক ও গুপ্ত সদস্যরা নিরস্ত্র লড়াই চালিয়ে তার চেয়ে ঢের বেশী অর্জন করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সশস্ত্র লড়াইয়ের ঝুঁকি ও কষ্টকর জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজাত, শিক্ষিত ও নিরীহ উপজাতীয় সমাজে যতটা থাবা বিস্তার করতে পেরেছিল, নিরস্ত্র লড়াই তার থাবা সহজেই অনেক গভীরে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে অফিস-আদালত, হাটে-মাঠে, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প বাণিজ্য, মিডিয়া প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে শান্তিবাহিনীর নিরস্ত্র অনুসারীরা জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রত্যেকটি অবস্থানে থেকে এই নিরস্ত্র অনুসারীরা প্রকাশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন এবং গোপনে স্বাধীনতার জন্য বা স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য অভিন্ন লক্ষ্যে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। তাই আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর সামনে, বাংলাদেশের ইন্টিলিজেন্স এজেন্সিগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নিরস্ত্র ও গুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলার উপায় বের করা।

আমরা জানি, রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক উপাদান হচ্ছে জাতীয়তা বা জাতীয়তাবোধের চেতনা। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা থেকেই দেশপ্রেমের জন্ম হয়। এই জাতীয়তাবোধের চেতনা বা দেশপ্রেমের কারণেই ১৯৪৭ সালে এই ভূখ-ের নাগরিকেরা ভারতে যোগ না দিয়ে পাকিস্তান নামে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন হয়েছে। ইতিহাস খুললে দেখতে পাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সামন্ত সমাজের বড় অংশটিই ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে এ ভূখ-ে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিল বা সমর্থন দিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের একটি অংশ এখনো এই জাতীয় চেতনার বিরোধিতা করে চলেছে। তার প্রমাণ ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি থেকে ভারতীয় পতাকা নামানোর দিনকে উপজাতীয় এ সকল জনগোষ্ঠীর একাংশ কর্তৃক ‘পাকিস্তান আগ্রাসন দিবস’ পালন করা, পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন না করা প্রভৃতি।

শুধু জাতীয় চেতনার সাথে অঙ্গীভূত না হওয়াই নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে এই জাতীয় চেতনার বিরুদ্ধে চরম বিদ্বেষমূলক, প্রতিহিংসামূলক ও ঘৃণাত্মক প্রচারণা চলানো হচ্ছে প্রবলভাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের নেতারা ও তাদের অনুসারীগণ ক্রমাগত বিভিন্নভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ঘৃণাত্মক, বিদ্বেষমূলক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এ অপপ্রচারণায় সরলপ্রাণ, সাধারণ ও নিরীহ পাহাড়ি তরুণরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। এতে তাদের মনেও জন্ম নিচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি  ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা। বাংলাদেশ রাষ্ট্র উপজাতীয়দের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দিয়েছে বিশেষ কোটা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্যও দিয়েছে নানা প্রকার আর্থিক বিশেষ সুবিধা। এই কোটা ও আর্থিক সুবিধার আওতায় বড় হয়ে একটি পাহাড়ি তরুণের যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অপার দেশপ্রেম প্রদর্শন করার কথা, বাস্তবে হচ্ছে তার উল্টো।

পাহাড়ি সংগঠনগুলোর হেট্রেইট ক্যাম্পেইনের শিকার হয়ে আজ পাহাড়ের ঘরে ঘরে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি বিদ্বেষী তরুণ প্রজন্ম যাদের আনুগত্য বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতি নয়, বরং জুম্মল্যান্ড নামক কল্পিত রাষ্ট্রের প্রতি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পলাতক (পরে ভারতে আটক) ক্যাপ্টেন উদ্ভাস চাকমা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উদ্ভাস চাকমা ইনফেন্ট্রি অফিসার হিসাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পেয়েছিল। পরে আর্টিলারি ও কমান্ডো অফিসারের কোর্সও করার সুযোগ পায় সে। এমন উন্নত ভবিষ্যতের হাতছানিও তাকে আটকে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে কল্পিত জুম্মরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী জুম্ম লিবারেশনর আর্মির প্রশিক্ষক হিসাবে যোগ দেয়ার জন্য ভারতে গমন করে। উদ্ভাস চাকমা শুধু একজন নয়, রাষ্টের বিভিন্ন সেক্টরে এমন অনেক উদ্ভাস চাকমা আছে যারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অপপ্রচারের প্রধান টার্গেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুনর্বাসিত বাঙালি। কারণও স্পষ্ট। কল্পিত জুম্ম রাষ্ট্রের পক্ষে এ দুটিই প্রধান বাধা। পাহাড়ি সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থকরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে এ দুটির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।

এদের জন্য মঞ্চ, মিডিয়া, বই, জার্নাল, গবেষণা, বুদ্ধিবৃত্তিক সমর্থন, আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতা সবই রয়েছে। জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ সজ্ঞানে অথবা বিভ্রান্তির শিকার হয়ে এই রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় সমর্থন জুগিয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা অনেকেই জানেন। কাজেই জুম্মরাষ্ট্রের সমর্থকদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণও স্পষ্ট। বাংলাদেশের তথাকথিত নাগরিক সমাজের সমর্থনের কারণও একই। দেখা যায়, নাগরিক সমাজের নেতাকর্মী কোনো না কোনোভাবে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন দেশ ও সেসব দেশের এনজিও এবং দাতা সংস্থার সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত বা উপকারভোগী। পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনীতিবিদদের জন্যও এ কথা সত্য। তবে এদের বেশিরভাগই আবার বামধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সাথে বাম ধারার রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নানা কারণে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সামগ্রিক এই সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা, অপপ্রচারের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা গড়ে উঠতে পারেনি। সে কারণে রামপাল নিয়ে জাতীয়ভাবে যে আন্দোলন দেখেছি, পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধনী-২০১৬ এর বিরুদ্ধে তার ছিটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ গুরুত্ব বিচার করলে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বাংলাদেশের এক-দশমাংশ  ভূখণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এর জন্য কে দায়ী? দায়ী রাষ্ট্র, দায়ী সরকারসমূহ, দায়ী দেশপ্রেমিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলো। কেননা তারা কখনই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় দৃষ্টিতে দেখেনি, জাতীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে তুলে ধরেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং এ অঞ্চলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয়ে দেশবাসীকে সচেতন করেনি। সে কারণে সরকারের সাথে সাথে পার্বত্য নীতি পরিবর্তিত হয়েছে, এমনকি অফিসার পরিবর্তনের সাথে সাথেও এ নীতি পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। অথচ প্রতিপক্ষ কিন্তু অর্ধ শতাব্দী ধরে একই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং আজ তার সুফল পেতে শুরু করেছে।

একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সকল ইতিহাস ও যুক্তি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ও নাগরিক সমাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ বলা হয়। এ নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়, ‘উপজাতি’ বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে এবং ‘আদিবাসী’ বললে তারা যদি সম্মানিত বোধ করে তাহলে সমস্যা কোথায়? কেউ কেউ এ নসিহতও করেন যে, বড় জাতি বাঙালিদের এতটুকু উদারতা দেখানো উচিত। অদ্ভুত এক সরল চিন্তা। কিন্তু ‘আদিবাসী’ উপমার আড়ালে যে ভয়াবহ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের আন্তর্জাতিক ব্লু প্রিন্ট লুকায়িত রয়েছে, দেশের বেশিরভাগ মানুষই সে বিষয়ে অজ্ঞাত। কারণ রাষ্ট্র তাদের সচেতন করেনি।

রাষ্ট্র মিডিয়াকে দূষেছে, অথচ মিডিয়াকেও ডেকে, বুঝিয়ে বলা হয়নি, কেন ‘আদিবাসী’ থিওরিটি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর এবং কতটা ক্ষতিকর। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে শুধু পড়ানো হয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বছরের পর বছর একই সিলেবাস পড়তে পড়তে শিক্ষার্থীদের ধারণা জন্মে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন শুধু পাহাড়িদের আবাসস্থল। ফলে বড় হয়ে তাদের ধারণা জন্মে বাঙালিদের ও সেনাবাহিনীকে সেখানে পাঠানো ভুল সিদ্ধান্ত। আমাদের সিলেবাসে ’৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী ও সংগ্রামের কাহিনী পড়ানো হয় অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত সেনাসদস্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছে তাদের জীবনী পড়ানো হয় না। ফলে শহীদ লে. মুশফিক, ক্যাপ্টেন জসিমউদ্দীন, মেজর মহসিন রেজাদের আত্মত্যাগ আড়ালেই রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ’৭১ শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে জেলায় জেলায়। অথচ স্বাধীনতার পর দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা শহীদ হয়েছেন তাদের নাম কোথাও প্রদর্শিত হয়নি। ফলে পর্যটকরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হয়ে ফিরে আসেন, কিন্তু এই পার্বত্য চট্টগ্রামকে পর্যটনবান্ধব করে আজকের অবস্থায় আনতে যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন তাদের কথা কেউ জানে না।

হলিউড বলিউডে রাষ্ট্রবিরোধীদের সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন লড়াইয়ের বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে সিনেমা, নাটক তৈরি হয় কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সংগ্রাম নিয়ে কোনো ডকুমেন্টারি ফিল্ম তৈরি হয়নি। বলিউডে কারগিল নিয়ে অনেক সিনেমা হয়েছে, সীমান্তে ফেলানীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে সিনেমা বানিয়েছে বজরঙ্গি ভাইজান। ওরা নিরাপত্তা বাহিনীর ত্যাগকে জাতীয়ভাবে গৌরবের উপাদান হিসাবে তুলে ধরছে কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনা, ভৌগোলিক গুরুত্বের বিষয়টি পড়ানো হয় না। পড়ানো হয় না পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থানের গুরুত্ব। ফলে আমরা চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বৈসাবি, কোমর তাঁত, দোচুয়ানী, বাঁশ নৃত্য, বোতল নৃত্য প্রভৃতি উপজাতীয় সম্প্রদায়ের নাম, খাদ্য, পোশাক ও সংস্কৃতির বাইরে আর কিছুই জানতে পারছি না।

দেখা যায়, আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিদর্শন করতে এলে তাকে যে সকল প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য দেয়া হয় তা একটি পক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টু। এমনকি তিনি/তারা যাদের সাথে কথা বলেন, সেই নাগরিক সমাজের ব্যক্তিবর্গও বিশেষ পক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল। ফলে ঐ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ফিরে গিয়ে যখন রিপোর্ট করেন তাও একদেশদর্শী হয়। এতে করে রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। রাষ্ট্র তখন ওই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে। কিন্তু বাস্তবতা কী? রাষ্ট্র কি তার কাছে নিরপেক্ষ তথ্য গবেষণা পৌঁছে দিয়েছে? নাকি রাষ্ট্রের এ ধরনের কোন ইন্সট্রুমেন্ট বা থিংক ট্যাংক আছে? বিষয়গুলো ভেবে দেখার দাবি রাখে।

তাই আজ সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে জাতীয় সচেতনতা সৃষ্টির উপায় বের করা। একই সাথে এ অঞ্চল নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে বিভ্রান্তিকর, হিংসাত্মক, বিদ্বেষপ্রসূত ও ঘৃণাব্যঞ্জক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা মোকাবেলা করা। এই কাজটি খুব সহজ নয়। কেননা শান্তিচুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা যখন অস্ত্র নিয়ে জঙ্গলে অবস্থান করছিলো তখন হয়তো তাদের অস্ত্র নিয়ে মোকাবেলা করা যেত। কিন্তু শান্তিবাহিনীর যে সাবেক সদস্য বা তাদের অনুসারী অফিসে, আদালতে, মিডিয়াতে, মঞ্চে, ময়দানে, এনজিওতে, আন্তর্জাতিক ফোরামে বসে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাকে তো অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাকে মোকাবেলার জন্য তার ক্ষেত্রেই উপায় ও ইন্সট্রুমেন্ট তৈরি করতে হবে।

ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যে ব্যক্তিটি সরকার ও দেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে তাকে আইসিটি অ্যাক্ট দিয়ে মোকাবেলা করে চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়, মিথুন চাকমা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সামাজিক গণমাধ্যমের অপপ্রচার যেমন সামাজিক গণমাধ্যমেই কাউন্টার করে জবাব দিতে হবে। তেমনি মিডিয়া, বই, পুস্তক, গবেষণা, সেমিনারের জবাব আইন ও শাসন দিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। এগুলোর জবাবও মিডিয়া, বই, পুস্তক, জার্নাল, গবেষণা, তথ্য, উপাত্ত ও সেমিনার করেই দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় আজ নিরাপত্তা টহলের চেয়েও অপপ্রচারের মোকাবেলা (কাউন্টার ক্যাম্পেইনিং) অধিক গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ফেসবুকের বিরুদ্ধে ফেসবুক, কলমের বিরুদ্ধে কলম, তথ্যের বিরুদ্ধে তথ্য, মিডিয়ার বিরুদ্ধে মিডিয়া, মঞ্চের বিরুদ্ধে মঞ্চ সৃষ্টি করতে হবে।

আগামী দিনের তরুণ ও যুবকেরা যেনো সন্ত্রাসবাদী, রাষ্ট্রবিরোধী ও তাদের অনুসারীদের খপ্পরে পড়ে রাষ্ট্রবিদ্বেষী না হয়ে পড়ে তা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তাদের প্রবলভাবে জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করতে, দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর প্রতি পার্বত্যবাসীকে সচেতন ও আন্তরিক করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে ১৬ কোটি মানুষকে দেশের এই এক দশমাংশ ভূখ-ের প্রতি ভালোবাসা, আগ্রহ, অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। এ কাজে কোনো গাফলতি, ধীরগতি কেবল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অখ-তাকেই হুমকির মুখেই ফেলবে।
email: palash74@gmail.com


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

  1. ♦ বিশ্ব আদিবাসী দিবস ও বাংলাদেশের আদিবাসিন্দা

  2.  পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

  3.  বিতর্কিত সিএইচটি কমিশনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে

  4.  আদিবাসী স্বীকৃতি দিতে সমস্যা কোথায়?

  5.  পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

  6.  একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

  7.  বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

  8.  আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

  9.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

  10.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

  11.  পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

  12.  শান্তিচুক্তির এক যুগ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

  13.  পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশেষ গোষ্ঠির অতিআগ্রহ বন্ধ করতে হবে

  14.  হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

  15.  অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান সময়ের দাবী

  16.  পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর কি কাজ

  17.  রোহিঙ্গা ইস্যু : শেখ হাসিনা কি ইন্দিরা গান্ধী হতে পারেন না?

২০১৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য প্রকাশ করলো ইউপিডিএফ

‘১৪৩ জন নেতা-কর্মী-সমর্থক গ্রেফতার, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩৩ জন পাহাড়ি নারী’

বিবৃতি

স্টাফ রিপোর্টার:

‘২০১৫ সালে ইউপিডিএফ’র ১৪৩ জন নেতা-কর্মী-সমর্থক গ্রেফতার, ৩৫ জনকে শারীরিক নির্যাতন, একটি বৌদ্ধ বিহারসহ ১০৩টি বাড়িতে তল্লাশির ঘটনা ঘটেছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৩ জন পাহাড়ি নারী। এছাড়া গণতান্ত্রিক সভা-সমাবেশে বাধাদান এবং সেটলার বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের উপর ১৩টি হামলা ও বেশ কয়েকটি ভূমি বেদখল চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে’।

ইউপিডিএফ-এর মানবাধিকার পরিবীক্ষণ সেলের প্রধান এডভোকেট রিপন চাকমা ৪ জানুয়ারি ২০১৬ সোমবার সংবাদ মাধ্যমে এক বিবৃতির মাধ্যমে ২০১৫ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত  এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য প্রকাশকালে রিপন চাকমা ইউপিডিএফের উপর নিষ্ঠুর রাজনৈতিক দমনপীড়ন চলছে উল্লেখ করে বলেছেন, ২০১৫ সালে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক ইউপিডিএফ ও সহযোগী সংগঠনের ১৪৩ জন নেতা-কর্মী সমর্থককে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে স্কুল-কলেজের ছাত্র/ছাত্রীও রয়েছেন।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অনেকে ছাড়া পেলেও বর্তমানে ইউপিডিএফ নেতা দেবদন্ত ত্রিপুরা, প্রতীম চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম নেতা জিকো ত্রিপুরা, পিসিপি নেতা নিকাশ চাকমাসহ আরো বেশ ক’জন জেলে অন্তরীণ রয়েছেন। মূলত: ‘অবৈধ অস্ত্র রাখা’, ‘চাঁদাবাজি”, ‘ভাঙচুর’ ও ‘সরকারী কাজে বাধা দেয়ার’ মতো মিথ্যা অভিযোগে ও হয়রানি করতে তাদের আটক করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

রিপন চাকমা বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থতির উন্নতির জন্য ইউপিডিএফের উপর দমনপীড়ন বন্ধ ও সমাবেশের অধিকার প্রদানসহ ৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন।

অমিত সম্ভাবনার পার্বত্য চট্টগ্রাম : শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

bri. gen. tofayel ahmed

ব্রি. জে. মো. তোফায়েল আহমেদ, পিএসসি

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সুপ্রাচীন কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার জীবনযাত্রা সমতল এলাকার তুলনায় কঠিন ছিল বিধায় অতীতে খুব বেশিসংখ্যক লোকজন এই এলাকায় বাস করতে উৎসাহী হয়নি। বর্তমানে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আছেন তারা ইদানীং নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করেন এবং এদেশের কিছু মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবিগণ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন না করে, জেনে অথবা না জেনে বিভিন্ন সময়ে এ শব্দের প্রতিধ্বনি করে যাচ্ছে। আদিবাসী হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ার এ্যাবোরেজিনিয়াস, নেটিভ আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ান, ফ্রান্স ও স্পেন এর বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, আরব বেদুইন সম্প্রদায় ইত্যাদি যারা সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে আদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের একদশমাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় (১৩,২৯৫ বর্গ কিঃমিঃ/৫,১৩৩ বর্গ মাইল) যে মাত্র এক শতাংশ জনসংখ্যা (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) বাস করছে তার ৪৭% বাঙালী, ২৬% চাকমা, ১২% মারমা এবং ১৫% অন্যান্য পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা সিনলুন, চিন, আরাকান, ত্রিপুরা, বার্মা এবং অন্যান্য এলাকা থেকে আনুমানিক মাত্র তিনশ থেকে পাঁচশ বছর পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আবাস স্থাপন করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রথম আসে কুকীরা। পরবর্তীতে ত্রিপুরাগণ এবং ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আসে আরাকানী গোত্রভুক্ত চাকমা ও মার্মা সম্প্রদায়। অথচ এদেশে বাঙালী বা তাদের পূর্বপুরুষগণ বসবাস করতে শুরু করেছে প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে। কাজেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হবার দাবীর প্রশ্নটি এখানে অবান্তর এবং আবাসপত্তনের সময় হিসেব করলে বাঙালীরাই বাংলাদেশের আদিবাসী । আর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অবাঙালীরা এদেশের সংবিধানের স্বীকৃতি অনুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

দেশ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিকা
কালের পরিক্রমায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা দুইবার বড় ধরনের ভুল করে। প্রথমবার ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় তারা ভারতের অংশ হবার চেষ্টা করে এবং চাকমা নেতা কামিনী মোহন দেওয়ান ও স্নেহকুমার চাকমা রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় এবং বোমাং রাজা বান্দরবনে বার্মার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে রাজাকার এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এর মধ্যে রাজা ত্রিদিব রায় যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে পাকিস্তানে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে কখনোই আর তিনি বাংলাদেশে ফেরৎ আসেননি। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন মং সার্কেলের রাজা মং প্রু সাইন। তিনিই একমাত্র রাজা যিনি মুক্তিযুদ্ধে আখাউড়া ও ভৈরব এলাকায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর কর্ণেল পদমর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। রাজা মং প্রু সাইন নিজস্ব ৩৩টি অস্ত্র, ৪টি গাড়ী এবং অনেক অর্থ মুক্তিযুদ্ধের জন্য ব্যয় করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা মং রাজার ৮টি হাতি, ৭টি ঘোড়া, ১৭০টি মহিষ, ১৬৬৩টি গরু, গুদাম ঘরে রক্ষিত ৯০,০০০ আড়ি ধান, ২৭০০টি চেয়ারসহ অনেক মূল্যবান ফার্নিচার, দশহাজার অতিথিকে আপ্যায়ন করার মত সরঞ্জামাদি, ১৮টি পাওয়ারটিলার, ১০টি জেনারেটর, রাজ পরিবারের শত বছরের স্মৃতি বিজড়িত অজস্ত্র স্বর্ণালংকার ও কয়েক কোটি টাকার ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে এতবড় ত্যাগ এবং অবদান রাখার পরও তাঁকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এখনও পর্যন্ত করা হয়নি। আশা করা যায়, মুক্তিযুদ্ধে তার এবং এই রাজপরিবারের অবদান যথাসময়ে মূল্যায়ন করা হবে।

কাপ্তাই ড্যাম ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল
১৯৬২ সালের কাপ্তাই ড্যাম অধ্যায় যে ন্যাক্কারজনকভাবে সমাধান করা হয়েছে তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সত্যিই বিরল। হাজার হাজার মানুষ (তার মধ্যে অনেক বাঙালীও ছিল) যারা তাদের বসতবাড়ি হারালো অথচ তাদের যথাযথভাবে ক্ষতিপুরণ প্রদান এবং পূর্নবাসন করলো না তদানিন্তন পাকিস্তানি সরকার। ১৯৭০ সালে থেগামুখ, শুভলং এবং রাইনখিয়াং থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য অনেক পরিবারকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক একইভাবে যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হয়েছিল। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই পাকিস্তান সরকারের পক্ষেই অস্ত্র ধরলো ঐ পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বেশীর ভাগ  এবং হত্যা করলো ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের এই ভূমিকার কথা এদেশের আপামর জনসাধারণের ক’জনই বা জানে? এখন দেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য রাজাকারদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই অপরাধে তারা অপরাধী কিনা সময়ই তা বলে দিবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কার্যক্রম
মুক্তিযুদ্ধের ধকল কাটতে না কাটতেই এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই বিলাইছড়ি থানার তক্তানালার কাছে মালু মিয়া পাহাড়ের নিকটে সকাল ১১টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ পেট্রোলের উপর আক্রমণ পরিচালনার মধ্য দিয়ে আরেকটি অসম যুদ্ধের সূচনা হয়। এর পরবর্তী ইতিহাস রক্তের হোলি খেলার ইতিহাস। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল অসংখ্য নিরীহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। বর্তমানে একই ধরনের কার্যক্রম ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং সংস্কারবাদী দলের সন্ত্রাসীরা সবাই মিলে করছে। তথ্য মতে, ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০৯৬ জনকে হত্যা, ১৮৮৭ জনকে আহত এবং ২১৮৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। নিরাপত্তা বাহিনীকেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৫৩ জন প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৫২ জন এবং ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৫ জন।

শান্তিচুক্তি ও পরবর্তী অধ্যায়
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তির মাধ্যমে হত্যা, লুণ্ঠন, জ্বালাও, পোড়াও, নারী নির্যাতনসহ অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্য়ক্রমের অবসান হবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনসাধারণ ধারণা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে কি দেখা যাচ্ছে? শুধু বাঙ্গালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও অত্যাচারিত, নিপীড়িত এবং ভয়ংকর জিঘাংসার শিকার। জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী নামে গড়ে উঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মানুষদের কাছ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে জোর জবরদস্তি করে চাঁদা আদায় করে, আদায়কৃত চাঁদার টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে এবং সেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আরো বেশি চাঁদা আদায় করে। এ যেন এক সীমাহীন চলমান গোলক ধাঁধার বৃত্ত। এখানকার বিত্তহীন নিরীহ মানুষদের হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ফসল ধ্বংস, বাগান ধ্বংস, জ্বালাও-পোড়াও, ভয়ভীতি এবং নির্যাতন এখনও চলছে। ইদানীং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সংগঠিত সকল বিষয়ে তারা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, আদেশ নির্দেশ ও মিমাংসা না মানার জন্য ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে যা সংবিধান বিরোধী এবং দেশদ্রোহীতার নামান্তর। তারা পার্বত্য জনপদে সরকার ও প্রশাসনের একটি বিকল্প সরকার ও ছায়া প্রশাসন জোর করে এখানকার মানুষদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর প্রশাসন কখনো কখনো নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্যাতন ও অত্যাচারের ভয়ে এই সব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এত অমিত সম্ভবনাময় এই অঞ্চল অথচ এখানে সকলে আসতে ভয় পায় কেন? কেন সকল উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের চাঁদা দিতে হয়? কেন কলা, কচু, মুরগি, ছাগল, শুকর, গরু বিক্রি থেকে শুরু করে ধানিজমি, বাগান সব কিছুর জন্য চাঁদা দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?

শান্তিচুক্তি বাস্ততবায়নের অগ্রগতি
একটি অর্ধেক পানি ভর্তি গ্লাসকে অর্ধেক পুর্ণ বা অর্ধেক খালি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। শান্তি চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার বেশীর ভাগ অংশ এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি করেছিলেন এবং অবশ্যই তিনি তা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। চুক্তি অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক ক্যাম্প ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে অথচ সন্ত্রাসীরা তাদের সকল অস্ত্র এখনও পর্যন্ত সমর্পন করেনি। কিন্তু পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সাধারণ জনগন দাবী করেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী এখান থেকে চলে গেলে তারা আরও বেশী নিরপত্তা ঝুকিতে আবর্তিত হবে। শান্তিচুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভুমি ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে ভুমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভুমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকী সকল সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। বিষয়টির ব্যপকতা এবং জটিলতার কারণেই একটু বেশী সময় লাগছে সমাধান করতে। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙ্গালী উভয় পক্ষ খাগড়াছড়িতে ৩১০৫টি, রাঙ্গামাটিতে ৯৬৯টি এবং বান্দরবনে ৩৮৪টিসহ সর্বমোট ৪৪০৮টি ভুমি সংক্রান্ত মামলা করেছে। অগ্রগতি হিসেবে ইতোমধ্যে কমবেশী ৪০০০টি মামলার ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে, ৩৩টি মামলার শুনানী শেষ হয়েছে এবং বাকী মামলাগুলোর ব্যাপারে কার্যক্রম চলছে। দেখা গেছে, এখানকার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ভুমি সমস্যা সমাধান কার্যক্রমে সর্বদা বাধা প্রদান করে থাকে, কারণ ভূমি সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তাদের হাতে কোন ইস্যু থাকবেনা যা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ট্রাম কার্ড। একইভাবে যে সকল বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ অবৈধভাবে প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশী জমি দখল করে আছেন তারাও চান না ভূমি সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক। এছাড়া আর একটি জটিলতা হলো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিবর্গের ভূমির মালিকানার যথাযথ কাগজপত্র না থাকা। কারণ অতীতে তারা কোন প্রকার কাগজপত্র ব্যতিরেকেই জমি ভোগদখল করতো। এছাড়া শান্তিচুক্তির কিছু ধারা আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সেগুলোর সমাধানের বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে পৃথিবীর অনেক দেশে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হবার পরও তা নানান কারণে কার্যকর করা যায়নি বা সম্ভব হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ সুদান (১৯৭২), সোমালিয়া (১৯৯০), এঙ্গোলা (১৯৯১ ও ১৯৯৪), রুয়ান্ডা (১৯৯৩), নর্দান আয়ারল্যান্ড ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কাজেই শান্তি চুক্তির অনিষ্পন্ন বিষয়াবলির সামধানের জন্য ধৈর্য্যচ্যুতি কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও মানবতার কল্যাণে নিরাপত্তাবাহিনীর ভূমিকা  অনেকেই অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম সম্বন্ধে তেমনটা ওয়াকিবহাল নন। সন্ত্রাস দমন ও দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা নিশ্চিত করার সাথে সাথে নিরাপত্তা বাহিনী এই অশান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জনগনের জন্য আবাসন স্থাপনে সহযোগীতা, স্থানীয় জনগনকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান এবং প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরাসরি ভুমিকা রাখা; শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কুটির শিল্প স্থাপন; নিরাপদ হাইজিন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা; কৃষি, পশুপালন, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগী পালন, বৃক্ষ রোপন; ধর্মীয় ও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন, চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে নিরাপত্তাবাহিনীর সাফল্যের কথা কোন এক অজানা কারণে এদেশের মানুষ জানতে পারে না বা জানানো হয় না। আমাদের মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে তেমন কার্যকরী ভূমিকা নেয় না বলেই অভিযোগ রয়েছে। একটি বিষয় এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, পক্ষপাতহীন কার্যক্রমের জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসী ব্যক্তিবর্গ ছাড়া বাকী সকলের কাছে এখনও নিরাপত্তাবাহিনীই সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য।

সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের স্বপ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের অঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাওয়া এবং স্বপ্নগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরী। অবস্থাদৃষ্টে তাদের চাহিদাগুলো নিম্নরূপ বলে প্রতীয়মান হয়:

শিক্ষার উন্নয়নে বাধা প্রদান

তাদের প্রথম স্বপ্ন সম্ভবতঃ এই এলাকার পশ্চাৎপদ মানুষদের মূর্খ করে রাখা। রাঙ্গামটিতে মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বাধা প্রদান তার প্রমাণ। না হলে এখানকার নিরীহ জনগণ, যারা তাদের ভয়ে নিয়মিত চাঁদা দেয়, তাদের ছেলেমেয়রা স্কুল/কলেজে যেতে পারে না; অথচ তাদের দেয়া চাঁদার টাকায় সেই সব নেতানেত্রীদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করে শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজে এবং বিদেশে। সেসব নেতানেত্রীদের সন্তানেরা ইংরেজী মাধ্যমে লেখাপড়া করলেও তারা চান সাধারণ জনগণের সন্ত্রানেরা শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষা শিখে এবং বাংলা ও ইংরেজী না শিখে জংগলের আরও গভীরে চলে যাক। এখানে মায়ের ভাষা ভুলে যাবার কথা বলা হচ্ছে না, প্রগতি ও অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছে। ভারতে সবাইকে কমপক্ষে ৩টি ভাষা শিখতে হয়। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ইচ্ছা, এখানকার জনগণ মূর্খ থাকলে তাদের পক্ষে শোষণ করা সহজ; যেমনটি তারা এতকাল ধরে করে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার এই এলাকার শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছে। ১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ৬টি উচ্চ বিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রতি পাড়ায় পাড়ায়। এছাড়া ইতোমধ্যে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় (ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়েছে), একটি মেডিক্যাল কলেজ, ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাষ্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। অবশ্য এই তথ্যে সন্তুষ্ট হবার কিছু নেই। এখানে বসবাসরত মানুষদের জন্য আরও অনেক কিছু করার দরকার ছিল এবং আরও অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। অনেক কিছুই করা সম্ভব হয়নি এখানকার তথাকথিত সেইসব কল্যাণকামী (?) নেতানেত্রী এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বাঁধার কারণে।

জনগণের থেকে জোর করে আদায় করা চাঁদার টাকায় আরাম আয়েশে দিনযাপন করা

এটি তাদের দ্বিতীয় স্বপ্ন এবং বর্তমানে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জানা গেছে, যে শুধুমাত্র মাটিরাঙ্গা থেকে বছরে ৩২ কোটি টাকার মত এবং সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বছরে কমবেশী ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। কোথায় ব্যয় হয় সেই টাকা? কয়টা স্কুল, কয়টা কলেজ, কয়টা হাসপাতাল তৈরি করে দিয়েছে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংষ্কারবাদীরা? কত ফিট রাস্তা তারা এ পর্যন্ত নির্মাণ করে দিয়েছে? কি করেছে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা জবরদস্তী করে লুট করে নিয়ে? এখন সময় এসেছে এখানকার সন্ত্রাসী নেতাদের সম্পত্তির হিসাব নেয়ার কারণ জানা গেছে যে, নেতাদের অনেকেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, করেছেন বাড়ী/গাড়ী, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি। পাহাড়ে বসবারত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা সরকারকে কর প্রদান করে না। পক্ষান্তরে করের থেকে কয়েকগুণ বেশী চাঁদা দিতে বাধ্য হয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের। এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ সরকার সমতল ভূমির জনগণের কর থেকে অর্জিত অর্থ পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যয় করছে । পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিঃমিঃ রাস্তা ছিল। বাংলাদেশ সরকার নির্মাণ করেছে প্রায় ১,৫০০ কিঃমিঃ রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্টসহ সম্পন্ন করেছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম। কিন্তু রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণে এবং সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা সবসময়ে বাঁধা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজী এবং শ্রমিক অপহরণ ও বাঁধার সৃষ্টি না করলে উন্নয়ন কাজ আরও সহজে সম্পন্ন করা যেত। জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল নির্মাণ কাজে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী সন্ত্রাসীদের যথাক্রমে ১০%, ৫% ও ৩% অথবা আরোও বেশী হারে চাঁদা দিতে হয়। এখানে কোন বিত্তশালী কিংবা দেশী বিদেশী কোম্পানী পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান না কেন ? লক্ষীছড়ি থেকে বার্মাছড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ বন্ধ করে ঠিকাদার কেন পালিয়ে গেলেন? এই অত্যাচার থেকে এখানে বসবাসরত নিরীহ মানুষদের কবে মুক্তি মিলবে ?

স্বায়ত্বশাসন তথা পৃথক জম্মুল্যান্ড গঠন  

পার্বত্য সন্ত্রাসীদের তৃতীয় দিবা কিংবা অলীক স্বপ্ন হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্বশাসিত প্রকারান্তরে স্বাধীন একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা যার নাম হবে ‘জম্মুল্যান্ড’। বর্তমান বিশ্বে দুই জার্মানী এক হলো, দুই কোরিয়া এক হতে চেষ্টা করেছে, ইন্ডিয়া সিকিমকে যুক্ত করে আরও বড় হয়েছে, সমগ্র ইউরোপ অভিন্ন মুদ্রা ব্যবহার করছে এবং পাসপোর্টবিহীনভাবে ইউরোপের সব দেশে চলাচল করছে, হংকং চীনের সাথে অঙ্গীভুত হয়েছে, স্কটল্যান্ডের জনগন পৃথক দেশ গঠনের বিরুদ্ধে গণভোট প্রয়োগ করেছে; অর্থাৎ সবাই যখন যুক্তভাবে শক্তিশালী হতে চেষ্টা করেছে তখন পার্বত্য সন্ত্রাসীরা চেষ্টা করছে এদেশ ভেঙ্গে ছোট করতে; প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে টুকরো টুকরো করতে। তাদের স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধীন ভূ-খন্ডের এই অলীক ও অবাস্তব স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না, হতে পারে না। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে প্রায় সব দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। কিন্তু লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভূখণ্ডে নতুন করে আরেকটি দেশ তৈরী করা কখনোই সম্ভব হবে না। এখানে আরোও দুটি বিষয়ে আলোকপাত করা দরকারঃ

বর্তমান চাহিদামত নতুন ভূখণ্ড তথা ‘জম্মুল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের আরও এক বা একাধিকবার যুদ্ধ করতে হবে স্বতন্ত্র চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা ল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কারণ সবাই জানে যে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাদের মধ্যে শিক্ষা, সুযোগ সুবিধা, জীবনযাত্রার মানের বিভিন্ন সূচকে রয়েছে বিশাল বৈষম্য। অপর বিষয়টি হলো: ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, এক সাগর রক্তের দামে কেনা এদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথা রাজাকারদের কোন প্রচেষ্টা, এদেশের ১৬ কোটি মানুষ এবং এদেশের চৌকষ নিরাপত্তা বাহিনী সফল হতে দেবে কিনা তা বিবেচনার ভার পাঠকদের উপর থাকলো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে বিতাড়িত করা

এখানকার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আরেকটি স্বপ্ন এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অর্থাৎ বাঙালী সম্প্রদায়কে এখান থেকে বিতাড়িত করা। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকাকে বলা হয় ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীদের দেশ। আমেরিকাতে নেটিভদের বাদ দিলে শতকরা ৯৯% জনেরও বেশী মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে গিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা ও ইউরোপে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠি একত্রে বসবাস করছে। এখানকার অনেক নেতা নেত্রীদের সন্তান ও আত্বীয়/স্বজনেরা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেন এর স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন কিংবা নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা বাংলাদেশের যে কোন স্থানে বসতি স্থাপন করতে পারে এবং করছে। কিন্তু সমতলের বাংলাদেশীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করাতেই তাদের যত আপত্তি। তাদের এক অদ্ভুত দাবী। এখানে যার জন্ম হয়েছে, এই মাটির ধূলা মাখিয়ে যে বড় হয়েছে, এখানের বাতাসে যে নিশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করে বেঁচে আছে, তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। কি অদ্ভুত এবং অবাস্তব আবদার। শান্তিচুক্তিতেও কিন্তু একথা লেখা নেই যে এখানে বসবাসরত বাঙালীদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দাবী মোটেই বাস্তব সম্মত নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাসবাসরত জনসাধারনের করণীয় কি

একটু আগেই বলা হয়েছে যে এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর জীঘাংসার শিকার। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সাধারণ মানুষদের ইচ্ছা অনিচ্ছায় কিছু যায় আসে না। তাদের পালন করতে হয় এখানকার নেতৃত্ব ও সন্ত্রাসীদের নির্দেশ। এই প্রসঙ্গে নিম্নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে যেমন:

নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে

পৃথিবীর এমন কোন শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী নেই যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই এখানকার জনসাধারণের নিরাপত্তা নিজেদেরকে সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নিজ নিজ এলাকায়, প্রতিটি বাজারে এবং পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যথার্থ তথ্য দিলে যে সব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও দুস্কৃতিকারীরা এলাকায় শান্তি বিনষ্ট করছে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে।

চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে

যেকোন ভাবে সকলকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে এখানকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, আন্তঃজেলা বাসমালিক ও ব্যবসায়ীদেরকে সন্ত্রাসীদের চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। তাহলেই তারা অস্ত্র কেনা এবং অন্যান্য দলীয় কার্যক্রম সম্পাদনে অর্থ যোগানের জটিলতায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পরবে। তাই নিজ নিজ পাড়া ও বাজার এলাকাকে চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাস মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজদের পাকড়াও করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিত ভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের প্রতিরোধ করা সম্ভব।

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সচেষ্ট হতে হবে

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় এবং আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা শুধু “পাশের হার” এবং “জিপিএ”র হলে চলবে না। সত্যিকার অর্থে আত্মকর্মসংস্থান সম্ভব হবে এমন শিক্ষাগ্রহণ করতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ও উৎসাহিত করতে হবে। আর এজন্য যা দরকার তা হচ্ছে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। কৃষি, বৃক্ষরোপণ, পশুপালন, মাছ চাষ, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে সকলকে স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করতে হবে এবং জীবনযাত্রার মান এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম যে অবস্থায় আছে তার চেয়ে পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকতে পারে এই চেষ্টা বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকর্তা তাকেই সহযোগিতা করেন যিনি নিজেকে সাহায্য করতে সচেষ্ট থাকেন।

শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে                                                                 

সকলকে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বাঙালী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সকল ধর্মালম্বী ও সকল জাতি গোষ্ঠীদের পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতে হবে। কেউ যেন কখনই অন্য কারো কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদিতে আঘাত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার
স্বাধীনতার পর ৪২ বছরে বাংলাদেশের অর্জন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে সময় নষ্ট করা কারও কাম্য হতে পারে না। অতীতের হানাহানী ও বিবাদভূলে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হতে হবে। এখানকার ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর অধিকার, তাদের উত্তরাধিকারীদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নতির অধিকার সুষমভাবে নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। একই সাথে এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীরাও নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার। এই সমস্যার সমাধান তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মধ্যে নয় বরং উভয় পক্ষের স্বার্থ ও সম্প্রীতি রক্ষা করার মাধ্যমেই সম্ভব। এদেশের জনগণ কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ নিজের পরিবারের জন্য ব্যয় করতে চায়। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পরে শান্তিতে জীবন যাপন করতে চায়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুশিক্ষা এবং উন্নত জীবন চায়। অসুস্থ্য হলে সুচিকিৎসা চায়। এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কিছু সন্ত্রাসী কর্তৃক সৃষ্ট অশান্তি ও অস্ত্রের ঝনঝনানী সমূলে উৎপাটন করে সকলে মিলে একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত জীবন যাপন করা এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্য বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়াই সকলের স্বপ্ন। এদেশের অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য এলাকায় সকলে মিলে শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারলে উন্নয়ন এবং উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত হতে বাধ্য।

 লেখক: কমান্ডার, ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়ন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

Ferdous Ahmed Quarishi f

ড. ফে র দৌ স  আ হ ম দ  কো রে শী
আমাদের আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারিরা ইতিমধ্যে ১৫ হাজার পাহাড়িকে খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলেছে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী সেখানে এখন ১৪৯টি এনজিও কাজ করছে।
আমাদের স্বাধীনতার সময় এই সমগ্র পার্বত্য এলাকায় ১৫ হাজার দূরে থাক, এক ডজন খ্রিস্টান ছিল কিনা সন্দেহ। বিষয়টা নিছক ধর্মপ্রচার হলে কিছু বলার ছিল না। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের ধর্মকথা শুনিয়ে যদি কিছু মানুষ মহামতি যিশুর শিক্ষায় দীক্ষিত হন, তাতে মানবজাতির অকল্যাণ হওয়ার কোন কারণ দেখি না। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যাটা অন্যত্র।
প্রথমত, খ্রিস্টীয়করণের এ প্রক্রিয়াটা নিছক ধর্মপ্রচার নয়। এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী ‘রাজনৈতিক’ এজেন্ডা। তদুপরি যে প্রক্রিয়ায় খ্রিস্টীয়করণ করা হয়, তাতে ন্যায়-অন্যায়ের কোন বাছবিচার থাকে না। দরিদ্র, অজ্ঞ ও পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোকে সেবার নামে কাছে টেনে, কিছু বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা বা নগদ সাহায্যের টোপ দিয়ে ধর্মান্তরিত করার চেয়ে বড় অধর্ম আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু যে বিপুলসংখ্যক এনজিও পার্বত্য জেলাগুলোতে কাজ করছে বলে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, তারা সবাই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে সেই ‘কাজ’ই করছে।
দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়ায় দেশের মূল জনসমষ্টি থেকে ‘টার্গেট গ্রপ’ গুলোকে আলাদা করে ফেলার প্রয়াস চলতে থাকে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য নাগরিকের সঙ্গে তাদের একটা বৈরী অবস্থান সৃষ্টির কাজও চালানো হয় সুকৌশলে। দেশের কথিত ‘সুশীল সমাজ’-এর একাংশ ও কিছু সংগঠন এ কাজে লোকাল এজেন্ট বা কোলাবরেটর হিসেবে কাজ করে।

‘আদিবাসী’ আন্দোলনের পেছনে
এই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ ‘আদিবাসী’ আন্দোলন। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ অভিধার প্রথম দাবিদার বাংলার কৃষক। যাদের পূর্বপুরুষরা কমপক্ষে ৫ হাজার বছর আগে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার এই অববাহিকায় কৃষি-সভ্যতারেউন্মেষ ঘটিয়েছে এবং এই মাটি কামড়ে পড়ে থেকে প্রজেক্টের পর প্রজেক্ট এই মাটিতেই মিশে গেছে। যুগে যুগে তাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্য অনেক জাতি-উপজাতি-খণ্ডজাতি। সে কারণেই আজকের বাঙালি পৃথিবীর ‘অতি-শংকর’ মানবগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। সন্তু লারমার পূর্বপুরুষরা যদি আরও আগে এদেশে আসতেন, তাহলে তারাও এতদিনে এই ‘এক দেহে লীন’ হয়ে যেতেন।
আদিবাসীকে অবশ্যই আদিবাসী বলতে হবে। কিন্তু সন্তু লারমা চাকমা সম্প্রদায়কে ‘আদিবাসী’ বা ধনড়ৎরমরহধষ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন কেন? চাকমা সম্প্র্রদায় বাংলাদেশ অঞ্চলে আগত জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে নবাগত। অপরদিকে এই জনগোষ্ঠী সমাজ-সংস্কৃতির অগ্রযাত্রার পরিমাপে একটি সুসভ্য মানবগোষ্ঠী। যারা মাত্র কয়েকশ’ বছর আগে আজকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমতলভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করে। একপর্যায়ে তারা সমতল চট্টগ্রামে রাজত্বও করেছে।
বস্তুত ‘আদিবাসী’ কেবল একটি শব্দমাত্র নয়। গোত্রীয় পদবিও নয়। কাদের আদিবাসী বলা হবে সে বিষয়টি জাতিসংঘ সনদে বিশদভাবে সংজ্ঞায়িত আছে। মূলত আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্যবিড়ম্বিত আদি অধিবাসীদের বিষয়টি মাথায় রেখেই এ ধরনের জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার কথা ভাবা হয়েছে। যারা সুপ্রাচীনকাল থেকে ওই সব এলাকার বাসিন্দা ছিল এবং বিশ্বজনীন ধর্মবিশ্বাস ও জ্ঞানচর্চার বাইরে থেকে নিজ নিজ গণ্ডিতে বৃত্তবন্দি থেকেছে হাজার হাজার বছর। বাইরের শক্তিমান, প্রাগ্রসর ও অস্ত্রবলে বলীয়ান জনগোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচারে যাদের জাতিগত অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। সেজন্যই জাতিসংঘ সনদে (১৬৯) তাদের জন্য এবং অনুরূপ জাতিসত্তাগুলোর কিছু রক্ষাকবচ রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে, সেখানকার প্রধান তিন জনগোষ্ঠী- চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়কে সেভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই।
তারপরও তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করার জন্য এত প্রচেষ্টা কেন? বিশেষ করে ড্যানিডার মতো কিছু বড় এনজিও এ নিয়ে এত চাপ সৃষ্টি করছে কেন?
এর কারণ এই যে, তাদের একবার ‘আদিবাসী’ নামে অভিহিত করা গেলে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ‘এবরিজিন’দের জাতিগত বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্য যেসব বিশেষ সুরক্ষা ও সুবিধা জাতিসংঘ নির্ধারণ করেছে সেগুলো দাবি করা যাবে। যেমনটি করা হয়েছে পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রে। যার পরিণতি আমাদের চোখের সামনে। বাংলাদেশের জন্য তা নিশ্চিতরূপেই নানাবিধ জটিল সমস্যার উদ্ভব ঘটাবে। এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে অনেকবার লেখালেখি করেছি। কিন্তু অতীতের সরকার এবং সংশি¬ষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের নিদ্রাভঙ্গ হয়নি। সামান্য কিছু বিদেশী দান-খয়রাত পাওয়ার জন্য তারা এসব বিদেশী সংস্থাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ বিচরণের সুযোগ দিয়েছেন। যে সুযোগ কোন দেশীয় সেবা সংস্থাকে দেয়া হয়নি। দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে একটা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে, সেজন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্র্রতি এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে তাদের স্বকীয়তার স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই কাজটি শুরুতেই করা হলে বিষয়টি নিয়ে এতটা পানি ঘোলা করার সুযোগ থাকত না।
প্রকৃত অর্থে আদিবাসী না হলে কেবল কারও বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি বা চাপের মুখে কোন জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোন সুযোগ এখন নেই। এই বাস্তবতা সংশি¬ষ্ট সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।

ফিরে আসছে কুখ্যাত ‘কুপল্যান্ড প্লান’?
এই উপমহাদেশ থেকে বৃটিশের বিদায় ঘণ্টা বাজার পর শেষ মরণ-কামড় হিসেবে চেষ্টা হয়েছিল বর্তমান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আমাদের তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দক্ষিণাংশ এবং মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে একটি ‘ক্রাউন কলোনি’ গঠন করার। প্রস্তাব করা হয়েছিল : এই অঞ্চলটি উপমহাদেশের স্বাধীনতার আলোচনার বাইরে থাকবে এবং সরাসরি ব্রিটিশ শাসনে থেকে যাবে। চল্লিশের দশকে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে, ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায়, ভাইসরয়ের দফতরে এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। ব্রিটিশ আমলা রিজিনাল্ড কুপল্যান্ড এই পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। এজন্য একে ‘কুপল্যান্ড প্লান’ নামে অভিহিত করা হয়। তবে এর পেছনে আসল কুশীলব ছিল খ্রিস্টান চার্চ সম্প্র্রদায়। তাদের সূদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলটিকে আরও কিছুকাল সরাসরি ব্রিটিশ শাসনে রেখে সেখানে খ্রিস্টীয়করণের কাজটি সম্পন্ন করা। অতঃপর সেখানে একটি ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা। বলা বাহুল্য তাদের হিসাব-নিকাশ ঠিকই ছিল। এলাকাটিকে আরও পঞ্চাশ বছর ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ শাসনে রাখা গেলে এতদিনে তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতেই পারত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আজকের পরিস্থিতির দিকে তাকালে তা অনুধাবন করা যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে আজ যেসব ‘তৎপরতা’ চলছে তা দৃষ্টে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি ‘কুপল্যান্ড প্লান’ এখনও বেঁচে আছে?

পূর্ব তিমুরের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের তুলনা
পশ্চিমের প্রচার মাধ্যম ও কিছু ‘বিশেষজ্ঞ’ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখালেখিতে প্রায়ই এখানকার পরিস্থিতিকে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপের পূর্বাংশে ছিল কিছু পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী যারা ছিল অবহেলিত, ধর্মবিশ্বাসে এনিমিস্ট বা প্রকৃতি পূজারি। ইন্দোনেশিয়া মুসলমানপ্রধান দেশ হলেও এই পাহাড়ঘেরা অঞ্চলটিতে ইসলাম প্রচারে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সেই সুযোগ নিয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খ্রিস্টান চার্চ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো তারা সফলভাবে এখানকার প্রকৃতিপূজারি মানুষগুলোকে ব্যাপকভাবে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে সক্ষম হয়। তারপর শুরু হয়ে যায় আসল কাজ। এলাকাটিকে মূল ইন্দোনেশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলন। এর পেছনে অবশ্য একটি বিরাট বৈষয়িক স্বার্থও যুক্ত হয়Ñ দ্বীপটির দক্ষিণের সমুদ্রগর্ভের তেলসম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা। অস্ট্রেলিয়া এবং পশ্চিমের কিছু দেশ সেই লক্ষ্য সামনে রেখে সহায়তা দিয়েছে বিদ্রোহীদের। একপর্যায়ে বিদ্রোহীদের নেতাকে দেয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার। তারপর সেখানে জাতিসংঘ বাহিনী মোতায়েন। গণভোট এবং সবশেষে একটি নতুন খ্রিস্টান রাষ্ট্রের অবধারিত অভ্যুদয়। স্বাধীন ‘পূর্ব তিমুর’।
এ থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘পূর্ব তিমুর’-এর সঙ্গে একপর্যায়ে রেখে লেখালেখি ও প্রচারণার অর্থ বোধগম্য।
এই প্রচারণা চলছে দীর্ঘকাল ধরেই। একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। আশির দশকের মাঝামাঝি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একটি বিভাগে পিএইচডি গবেষণাপত্রের একটি প্রস্তাবনা জমা পড়ে ‘genocide in Chitagong Hill Tracts and East Timor’ শিরোনামে। সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক (যিনি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত) প্রস্তাবনাটি মানসম্মত নয় বলে নাকচ করে দেন এবং আমাকে সামনে পেয়ে বললেন, ‘আপনার দেশের ব্যাপার। ট্র্যাশ। পড়ে দেখতে পারেন।’ দেখলাম ড্রাফটের পাতায় পাতায় অসঙ্গতি এবং ভুল তথ্য। অধ্যাপকের বিরক্তির কারণ বুঝলাম।
স্পষ্টতই এটি ছিল কোন বিশেষ মহলের মদদে একটি উদ্দেশ্যমূলক উদ্যোগ। কিন্তু লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ওই গবেষণা প্রস্তাব নাকচ করে দিলে কী হবে, ওই গবেষক আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা জমা দিয়ে কয়েক বছর পর সেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার সেই ‘জেনোসাইড’ তত্ত্ব পুস্তকাকারে প্রকাশিতও হয়েছে। সামান্য রদবদল করে। এ থেকেই বোঝা যাবে এই বিষয়টির মূল কত গভীরে।
কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আর পূর্ব তিমুর এক কথা নয়।

প্রচারণা ও বাস্তবতা
দুনিয়াজুড়ে আজ বাংলাদেশের এই পার্বত্য অঞ্চলটিকে নিয়ে ভীষণ মাতামাতি চলছে। অসংখ্য ওয়েবসাইটে চলছে নানাবিধ প্রচারণা। যার কোন কোনটিতে কিছু সত্যতা থাকলেও অধিকাংশই ভয়ানক রকমে অতিরঞ্জিত, কোন কোনটি ডাহা মিথ্যা। ‘একটা মিথ্যাকে হাজারবার বলা হলে তা সত্যে পরিণত হয়’- সেই লক্ষ্য নিয়ে এসব কাজ চলছে বলে মনে হয়।
প্রচারণা চলছে একতরফা। জবাব দেয়ার কেউ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে প্রচারণা বিশ্বজুড়ে চলছে তার মূল প্রতিপাদ্য চারটি :
(১) বহিরাগত বাঙালি এবং সেনাবাহিনীর লোকেরা সেখানে নির্বিচার ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে। সেখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে এটা করা হচ্ছে।
(২) সেখানে বাঙালি এবং সেনাবাহিনীর লোকেরা নিত্যদিন পাহাড়ি নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে।
(৩) সেখানে পাহাড়িদের জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।
(৪) সেখানে এখন সেনা শাসন চলছে।

‘গণহত্যা’ প্রসঙ্গ
‘আড়াই লাখ চাকমাকে হত্যা’ করার গল্প : ৮০’র দশকের শেষদিকে একদিন বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করছি। ইংরেজিতে পাঠানো সংবাদ কিছু কাটছাঁট করে বাংলায় অনুবাদের কাজ। একটু পরেই ট্রান্সমিশন। সামনে একটা আইটেম দেখে চমকে উঠলাম- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে এযাবৎ আড়াই লাখ চাকমাকে বাঙালিরা হত্যা করেছে!’
তখন সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের মোট সংখ্যাই ছিল আড়াই লাখ। আমাকেই ওটা সম্প্র্রচার করতে হবে! আর মাত্র ১০ মিনিট পর। ছুটে গেলাম পাশের রুমে, বিভাগীয় প্রধানের কাছে। পিটার ম্যানগোল্ড তখন বাংলা বিভাগের প্রধান। বললাম, ‘পিটার, এটা কোথা থেকে এসেছে? আড়াই লাখ চাকমা মেরে ফেললে তো সেখানে আর কোন চাকমা থাকে না। সমস্যাই খতম। তোমরা অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকায় যেমন করেছ।’
পিটার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সব্বোনাশ! হাতে একদম সময় নেই। হারি আপ্! ওটা বাদ দিয়ে তুমি অন্য কোন আইটেম দিয়ে ট্রান্সমিশন শেষ করো।’
ট্রান্সমিশন শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সবাই বসলাম। পিটার আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘কিন্তু ওটা তো এসেছে খুব বড় জায়গা থেকে!’
জানলাম ওই দিনই সকালে বিবিসি বুশ হাউসের পাশের দালানে অবস্থিত একটি দূতাবাসে নেদারল্যান্ডস থেকে কয়েকজন এসেছিলেন একজন চাকমা ‘নেতা’কে সঙ্গে নিয়ে। তাদের প্রেস ব্রিফিং থেকেই এই ‘রিপোর্টে’র উৎপত্তি।
এভাবেই চলছে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যার নিরন্তর প্রচারণা।
(আগামীবারে : পার্বত্য চট্টগ্রামে কতজন পাহাড়ি মুসলমান হয়েছেন? বৌদ্ধধর্ম কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে?)

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com

 পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

উপজাতীয় নওমুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান মিশনারিদের দৌরাত্ম্য

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালি উচ্ছেদের আয়োজন চূড়ান্ত

বিদেশী সংস্থার চাপে ভূমি আইনের সংশোধনী আসছে

তারেক মোরতাজা

সরকার বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চাপে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইনে বেশ কিছিু সংশোধনী চূড়ান্ত করেছে। এসব সংশোধনী কার্যকর হলে সেখান থেকে বাঙালিরা উচ্ছেদ হয়ে যাবে আর পার্বত্য ভূমির ওপর সরকারের কর্তৃত্ব বলতে কিছুই থাকবে না।
এ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি ঠিক কবে হবে সেটি নিশ্চিত করে সরকারের তরফে কেউ বলতে পারছেন না। তবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একটি সূত্র মতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকার এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে যাবে।
গত বছরের ১৯ জুলাই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খাদেমুল ইসলামের মেয়াদ শেষের পর সরকার এ পদে নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেয়নি। একই সাথে কমিশনের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ৯ মাস ধরে কমিশনে কোনো কাজই হচ্ছে না।
গত বছরের জুলাই মাসের শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি আইনের সংশোধনী চূড়ান্ত করা নিয়ে সরকারের ভেতরে বিরোধ দেখা দেয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভূমি আইনের ১৩টি সংশোধনী আনা হয়েছে উল্লেখ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, এ আইন কার্যকর করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের বেরিয়ে আসতে হবে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুসারে সেখানে বৈধ নাগরিকদের থাকার কথা। তার মতে, কেবল বাঙালি নয় সেখানে সরকারও অনেকটা কার্যকরহীন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে সরকারের ভূমির সার্বভৌমত্ব বা কর্তৃত্ব থাকবে না। তার ওপর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জলে ভাসা ভূমি, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতে স্থাপিত রাষ্ট্রের প্রথম ভূ-উপগ্রহের জমির ওপরও সরকারের কর্তৃত্ব থাকবে না। এ দিকে বোমাং সার্কেলের ১৭তম রাজা হিসেবে নির্বাচিত উ চ প্রু বলেছেন, পাহাড়ে বাঙালি-পাহাড়ি বিভেদ তৈরি করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। ভূমি সমস্যার সমাধানে সব পক্ষকে আন্তরিক হতে হবে।
ভূমি আইনের সংশোধনী সম্পর্কে ভূমি সচিব মোখলেসুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, এখনো পার্বত্য ভূমি আইন চূড়ান্ত হয়নি। এটি এখন আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি নিয়ে সরকারের ভেতরে বিরোধ চলছে। এ বিরোধ মেটানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী তার তরফে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভীকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, আলোচিত সংশোধনী যদি চূড়ান্ত করা হয় তাহলে পাহাড়ে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। রাষ্ট্রের মোট ভূমির ১০ শতাংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম গঠিত।
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, সরকারের ওপর বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার চাপে রাজনৈতিকভাবে আইনটি সংশোধনের চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে এখানে সে রকম কোনো কিছুর দরকার নেই। জনসংহতি সমিতি সরকারকে এ আইন সংশোধনে বাধ্য করতে বিদেশীদের দ্বারস্থ হচ্ছে।
সূত্র মতে, রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্রের আদল গড়ে তুলবে এ আইন। তাই তারা এ আইনটি সংশোধনের বিপক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য খুব একটা আমলে নিচ্ছে না সরকারের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ। তারা মনে করছেন, সমস্যা চুকিয়ে ফেলার জন্য আইনটির প্রস্তাবিত ১৩টি সংশোধনীই চূড়ান্ত করতে হবে।
২০০১ সালে এ আইনটি আওয়ামী লীগ সরকারই করেছিল। যেটাকে কালো আইন উল্লেøখ করে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান সন্তু লারমা। তাকে সহযোগিতা করছেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি দেশে ও দেশের বাইরের পাহাড়িদের বিষয়টি সবার নজরে আনার কাজটি করে থাকেন। আইন সংশোধনে সর্বশেষ যে যৌথ সভা সরকার করেছিল তিনি সেখানেও হাজির ছিলেন।
সরকারের দাবি ও নৃবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ মতে, দেশে কোনো আদিবাসী না থাকলেও ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বাংলাদেশের হয়েও জাতিসঙ্ঘের আদিবাসীবিষয়ক ফোরামে আদিবাসী সদস্য। রাজা দেবাশীষ পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদের পক্ষে জনমত তৈরি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের নেতা মনিরুজ্জামান।
তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, পাহাড় থেকে বাঙালিদের উচ্ছেদে সবাই এখন শোর তুলেছে ভূমি আইন সংশোধনের। এ আইন সংশোধন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকতে পারবে না। অথচ যুগের পর যুগ ধরে সেখানে বাঙালিরা বসবাস করে আসছেন।
অন্য দিকে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা নয়া দিগন্তকে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য বাঙালি বিতাড়ন নয়। তারা পাহাড়িদের ভূমি মালিকানা বুঝে পেতে কাজ করছেন।
এতে অবশ্য আশ্বস্ত হতে পারছে না বাঙালিরা। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, সরকার এখানে যে ভূমি কমিশন করেছিল তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ। দু’আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে বিবাদ করলেও বাঙালিদের বিষয়ে তাদের অবস্থান অভিন্ন উল্লেখ করে মনিরুজ্জামান বলেন, এখানে বাঙালি খেদাও আন্দোলন চলছে। এটা চলতে দেয়া উচিত হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন পুনর্গঠন করে নতুন করে বিচারপতি খাদেমুল ইাসলামকে নিয়োগ দেয়। তবে জনসংহতি সমিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলের প্রধানরা তাকে বয়কট করেন। এ রকম পরিস্থিতিতেও তিনি কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার কাজের প্রতি স্থানীয় পাহাড়িদের আস্থা ছিল উল্লেøখ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হচ্ছে, আস্থার প্রমাণ হলো ৫ হাজার পাহাড়ি কমিশনে তাদের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আবেদন করেছিল। সে আবেদন কেবল আঞ্চলিক পরিষদ ও পাহাড়ি সার্কেল চিফদের অসহযোগিতার কারণে নিষ্পত্তি করা যায়নি।

courtesy by- the daily naya digonta, 24-4-2013.

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে আরো কিছু প্রবন্ধ

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস