একের পর এক মটর সাইকেল চালক কেন টার্গেট হচ্ছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের

খাগড়াছড়ি সাড়ে ৬ বছরে ১৬ মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

খাগড়াছড়িতে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল চালক খুন, অপহরণ, গুম ও হামলা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই এখন নিত্যনৈতিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় সাড়ে ৬ বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত ৮জন মোটর সাইকেল চালক যাত্রীবেশীদের হাতে খুন হয়েছে। গুম হয়েছেন ৮জন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। অপহরণ হয়েছে অন্তত এক ডজন। এছাড়া অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরি হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যেমন বিচার পায়নি, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো ফিরে আসবে সে প্রতিক্ষায় আছে তাদের পরিবার- স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন পার করছে। সে সাথে একের পর এক মোটর সাইকেল চালক খন-গুমের ঘটনায় প্রায় অস্থির হয়ে আছে খাগড়াছড়ি।

এ সকল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে জেলায় দফায় দফায় হরতাল-অবরোধে উত্তাল হয়েছে। এছাড়াও মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের কাছ থেকে বিচারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে এ সকল হতভাগ্য মোটরসাইকেল চালকের জীবনে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি।

এদিকে একের পর এক মোটরসাইকেল চালকদের খুন, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।

খাগড়াছড়িতে যাত্রী পরিবহনের মোটরসাইকেল একটি জনপ্রিয় বাহন। ভূ প্রকৃতি এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। জেলায় অন্তত দুই হাজার বেকার যুবক ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু একের পর এক যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন চালকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত প্রায় ছয় বছরে ১৬ জন মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম হয়েছে। জেলার মহালছড়ি ছাদিকুল ইসলাম, মাটিরাঙার আজিজুল হাকিম শান্ত, আব্দুর রহিম, গুইমারা নিজাম উদ্দিন সোহাগ, দীঘিনালার শাহ আলম, আব্দুস সাত্তার, চান মিয়া ও সর্বশেষ পার্শ্ববর্তী লংগদু উপজেলার নুরুল ইসলাম নয়ন খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকায়।

লংগদুতে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়ি বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়ন হত্যাকান্ডটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসলেও অন্য হত্যাকান্ডগুলো তেমন কোন আলোচনায় আসেনি। একই সময় দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক আবুল কাশেম, মো: আলী, পানছড়ির হোসেন আলী, মানিকছড়ির মো: মোরশেদ, রাজিব কান্তি দে, গুইমারার রেজাউল করিম, আল আমীন ও শংকর দীর্ঘ দিন ধরে মোটরসাইকেলসহ নিখোঁজ রয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে খাগড়াছড়িতে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধার হয়েছে মাত্র কয়েকটি। প্রতিটি খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে।

সর্বশেষ গত ১ জুন খাগড়াছড়ির যৌথ খামার এলাকায় খুন হন লংগদু উপজেলার যুবলীগের নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তার এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরের দিন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ী ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

নিহত নয়নের ছোট ভাই লিটনের অভিযোগ ঐদিন সকালে তার বড় ভাই দুই পাহাড়ি যাত্রীকে নিয়ে খাগড়াছড়ি আসার পর নিখোঁজ হন। পরে সামাজিকে যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভাইয়ে লাশের সন্ধান পান।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো: আব্দুল হান্নান পার্বত্যনিউজকে জানান, নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যার ঘটনায় তার ভাই লিটন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে মামলা করেছেন। নয়ন হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিঘ্রই সু-সংবাদ পাবেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে (২৩) দুই উপজাতি মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিহত ছাদিকুলের নিহত ছাদিকুল ইসলামের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, দুই উপজাতি লোক ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে তার ভাইকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে তাকে ভাড়া করে নিয়ে যায়।

নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী দুপরে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রিছাং ঝর্না এলাকার দুর্গম পাহাড় থেকে মাটিরাযার মেটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত’র লাশ পুলিশ।

মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু পার্বত্যনিউজকে জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রী নিয়ে মাটিরাঙা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন মোটর সাইকেল চালক মো: আজিজুল হাকিম শান্ত। এ ঘটনায় ধন বিকাশ ত্রিপুরা নামে একজনকে আটকের পর তিনি ঘটনার সাথে জড়িত আরো দুই জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে জানিয়েছেন মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু। তবে শান্ত’র মোটরসাইকেলটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

নিখোঁজের একদিন পর ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক মো: আবদুর রহিমের (২৫) লাশ উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ। নিহত আবদুর রহিম বেলছড়ির ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর আলম এর ছেলে।

পুলিশ জানায়, এক সন্তানের জনক মো: আবদুর রহিম ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ১৭ সেপ্টেম্বর সে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়,কিন্তু রাতে সে বাড়ি ফিরেনি। পরের দিন বিকাল ৩টায় স্থানীয় নারী শ্রমিকরা লাকড়ি কুড়াতে গেলে বেলছড়ির হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গলে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বিজিবিকে খবর দেয়।

একই বছরের ৭ মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার ভৈরফা পাড়া এলাকায় শাহ আলম নামে এক মোটরসাইকেল চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহ আলমের লাশ উদ্ধার করে।

২০১৬ সালের ২৭ জন নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। স্থানীয় সমীর পালের ছেলে রাজিব দুপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মোটর সাইকেল চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা ময়িা‘র ছেলে মো: খলিলুর রহমান (২৭) কে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একই বছরের ৩০ জুলাই খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থেকে চন্দন ত্রিপুরা (২৪) নামে ভাড়ায় চালিত এক মোটরসাইকেলে চালককে অপহরণ করেছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। উপজেলার গামারীঢালা এলাকা থেকে  তাকে অপহরণ করা হয়। অপহৃত চালকের বাড়ি জেলা শহরের খাগড়াপুর হাদুক পাড়ায়।

২০১১ সালের ১০ জন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার জালিয়াপাড়ার মাহবুব নগর এলাকায় মোটরসাইকেল চালক নিজাম উদ্দিন সোহাগকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা। সে গুইমারা উপজেলার কালাপানি এলাকার বাসিন্দা সালেহ আহমেদের ছেলে।

পুলিশ জানায়, সোহাগ দুই যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পথে নির্মম এ ঘটনা ঘটে। সোহাগ মাহবুব নগর পৌছুলে যাত্রীবেশী হোন্ডা ছিনতাইকারী তাকে কুপিয়ে এবং জবাই করে লাশ রাস্তায় ফেলে হোন্ডা নিয়ে পালিয়ে যায়।

এছাড়া ২০১১ সালে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে জেলার দীঘিনালার কবাখালীর বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও চান মিয়া।

এদিকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী নিখোঁজ রয়েছেন। সে উপজেলার দক্ষিণ মিলনপুর গ্রামের হরমুজ আলীর পুত্র। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী মোছা ফাতেমা বেগম দীঘিনালা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম পার্বত্যনিউজকে জানান, তার স্বামী ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী বিকালে উপজেলার বাসটার্মিনাল থেকে একজন যাত্রী নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় যায়। এর পর থেকেই সে আর বাড়ি ফিরেনি। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম জানান, সংসারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি স্বামী নিখোঁজ থাকায় দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন তিনি। স্বামীকে উদ্ধারে প্রশাসনও কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে ফাতেমা বেগম।

২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন দীঘিনালার রশিকনগরে বাসিন্দা আবুল কাশেম পিসি।

আবুল কাশেম পিসির স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম পার্বত্যনিউজকে বলেন, নিখোঁজের পর স্বামীর লাশটাও পাননি তিনি। সংসারের এক মাত্র আয় সক্ষম স্বামী না থাকায় এক মেয়ে ও চার ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কোথাও থেকে কোন ধরনের সহযোগিতাও তিনি পাননি।

আবুল কাশেম পিসির ছেলে সাইদুর রহমান পিতার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানান প্রশাসনের কাছে।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন, জেলার পানছড়ি উপজেলার নিখোঁজ মোটর সাইকেল চালক হোসেন আলী। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির জিয়ানগর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে। তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি মাটিরাঙ্গা সদর ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের ব্রজেন্দ্র কার্বারী পাড়ার নির্জন এলাকা থেকে পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্বার করলেও হোসেন আলীর সন্ধান মেলেনি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে হোসেন আলী যাত্রী নিয়ে যায় । এর পর থেকে সে নিখোঁজ। এ ঘটনায় ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪জনকে। নিখোঁজ হোসেন আলীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ জুন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে।

২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী থেকে নিখোঁজ আছেন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক মো. মোরশেদ আলম। সে উপজেলার বড়ডলু মাস্টার পাড়ার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীনের পুত্র। মোরেশেদ আলম প্রতিদিনের ন্যায় গত ৬ ফেব্রুয়ারী সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রী পরিবহনে যান। কিন্তু ঐদিন রাতে বাড়ীতে ফিরে না আসায় থানায় সাধারন ডায়েরী করা হয়।

২০১২ সালে গুইমারা উপজেলার রেজাউল করিম, আল-আমীন ও শংকর যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। এখনো পর্যন্ত পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোটরসাইকেলগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন বিকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। ঘটনার প্রায় চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে আহত মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা মিয়ার ছেলে মো: খলিলুর রহমানকে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল চালক মো: খলিলুর রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, ঐদিন বিকাল ৪টার দিকে রিজেন ত্রিপুরা এক সহযোগিসহ মাটিরাঙ্গা বাজারে আসার কথা বলে চক্রপাড়া থেকে যাত্রী বেশে মোটর সাইকেলে উঠে চক্রপাড়া রহিমের টিলায় আসা মাত্র সেখানে থাকা আরো দুই পাহাড়ি যুবক গাড়ী থামাতে বলে। মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে মারধর তাকে গাছের সাথে বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অন্যকোন কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি সংসার চালান। কিন্তু সম্প্রতিককালে যাত্রীবেশি হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ফলে আতংকে দিন পার করছেন। নিহত ও গুম হওয়া পরিবারেও চলছে শোকের মাতম ও অভাব-অনটন।

বছরের পর বছর এভাবে একের পর এক মটর সাইকেল চালক খুন, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হচ্ছে কেন- জানতে চেয়েছিলাম অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম ফর চিটাগাং হিল ট্রাক্টসের সদস্য তাজুল ইসলাম নাজিমের কাছে। তিনি জানান, প্রধান কারণ উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজী। মটরসাইকেল চালকরা উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাদের খুন, গুম ও অপহরণের স্বীকার হতে হয়।

এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে। নাজিম বলেন, মটর সাইকেল চালকদের বেশিরভাগই বাঙালী। শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত বাঙালী যুবকেরা কোটা সুবিধার কারণে পাহাড়ী যুবকদের সাথে চাকরীর প্রতিযোগিতায় পেরে না উঠে বিকল্প কর্ম সংস্থান হিসাবে মটর সাইকেল চালায়। পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চায় না কোনো বাঙালী যুবক মটর সাইকেল চালাক।

সে কারণে তারা বিভিন্ন সময় বাঙালী মটর সাইকেল চালকদের যাত্রী না হবার জন্য পাহাড়ীদের প্রতি হুমকি, হুশিয়ারিও দিয়েছে। তাতে কাজ না হওয়ায় এই নির্যাতন।

মটর সাইকেল চালকদের যেহেতু যাত্রীদের ইচ্ছামত গভীর ও নির্জন পাহাড়ী অঞ্চলে যেতে হয়, তাই তাদের অপহরণ করা সহজ বলেও তিনি মনে করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ে পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। এরা সর্বত্র চাঁদাবাজি,খুন, গুম ও অপহরণ করে যাচ্ছে। অবৈধ উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে পাহাড়ে বার বার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। সমঅধিকার আন্দোলন সকল সকল জনগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে বলেও তিনি দাবী করেন।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান পুলিশের উপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, পুলিশের কাছে সবাই সমান। পুলিশ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল এ অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় বাহন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ কাজ করছে। তিনি মোটরসাইকেল চালকদের কোন যাত্রী পরিবহনের আগে যাত্রীর নাম ও কোথায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন ইত্যাদি রেজিষ্টারে লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার পরমর্শ দিয়ে বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজি বন্ধ ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর এসব ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। তিনি আইন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির এক পরিরহন ব্যবসায়ী পার্বত্যনিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মটর সাইকেল চালকদের একটা এসোসিয়েশন তৈরি করতে হবে। কোনো চালক যখন কোনো যাত্রী নেবে তখন সেই যাত্রীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও গন্তব্য এসোসিয়েশন অফিসে নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট জানিয়ে দেবে। এতে অপহরণ বা গুম কমে যাবে।

খাগড়াছড়িতে শুধু মোটরসাইকেল চালক নয়, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে এগিয়ে আসা জরুরী মনে করেন সচেতন মহল।

দিনে দিনে পার্বত্য উপজাতীয়রা এলিট বাঙালীরা নিঃস্ব শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে

উপজাতি বাঙালী

মো: সাইফুল ইসলাম:

 পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপজাতীয়দের সকল প্রকার লেনদেন আয়কর মুক্ত। পার্বত্য এলাকায় যেসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ব্যয় বরাদ্দ দু’লক্ষ টাকার মধ্যে সেগুলোর ঠিকাদারী সম্পূর্ণরূপে উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। দু’লাখ টাকার ঊর্ধ্বে বরাদ্দকৃত প্রকল্পের ১০% উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত। বাকি ৯০% ঠিকাদারির সিংহভাগ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে উপজাতীয়রাই দখল করে নেয়। কারণ তাদের আয়কর দিতে হয় না বলে তারা বাঙালিদের চাইতে কম দরে কাজ করার সুযোগ পায়। উপজাতীয়রা ব্যাংক ঋণ নিলে তাদের সুদ দিতে হয় শতকরা মাত্র ৫ টাকা। আর বাঙালিদের সুদ দিতে হয় সারা দেশবাসীর মতই শতকরা ১৬ টাকা বা তার চেয়েও বেশি। সরকারিভাবে গৃহীত এ ধরনের ভ্রান্তনীতির কারণে পার্বত্যাঞ্চলের বাঙালিরা উপজাতীয়দের তুলনায় প্রতিনিয়তই পিছিয়ে পড়ছে।

দিনে দিনে উপজাতীয়রা এলিট শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছে আর অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হতে হতে বাঙালিরা আজ অবহেলিত এবং উপজাতীয়দের অনুগত শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। সরকারিভাবে এ ধরনের জাতিগত বৈষম্য তৈরি কখনোই কাম্য হতে পাওে না। আর এমন বৈষম্য নীতি কোন অঞ্চলের শান্তির জন্যও সহায়ক নয়। তাই এসব বৈষম্যের অবসান করে পার্বত্যাঞ্চলে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করার সময় এখনই।

চুক্তি পূর্ব বিশৃঙ্খল অবস্থায় যেসব উপজাতীয় নাগরিক ভারতে আশ্রয় গ্রহণকরেছিল তাদেরকে ফিরিয়ে এনে ২০দফা প্যাকেজ সুযোগ সুবিধা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এভাবে ৬০ হাজারেরও বেশি উপজাতীয় জনগণ বর্তমানে পুনর্বাসিত হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করছে।
অন্যদিকে ১৯৮৬ সাল থেকে ২৮ হাজারের বেশি বাঙালি পরিবারকে অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে গুচ্ছ গ্রামে এনে কার্যত বন্দী অবস্থায় রাখা হয়েছে। গুচ্ছ গ্রামগুলোতে পরিবার প্রতি একটি মাত্র ঘর তোলার জায়গা আর মাসিক ৮৬ কেজি চাল অথবা গম তাদের একমাত্র অবলম্বন। ২৯ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এসব গুচ্ছ গ্রামের এক একটি পরিবার ভেঙ্গে বর্তমানে ২টি, ৩টি বা তার চেয়েও বেশি পরিবারে বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু বাড়েনি তাদের ঘর তোলার জায়গা, মাসিক রেশনের পরিমাণও বাড়ানো হয়নি। তাছাড়া গুচ্ছ গ্রামগুলোতে সেনিটেশন ব্যবস্থাও নেই। নেই ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজ। চাষাবাদের জমিও তাদের নেই। ফলে তারা একমাত্র মাসিক ৮৬ কেজি রেশনের উপর নির্ভরশীল হয়ে কোনো রকমে জীবন ধারণ করছে। মা-বাবা, ছেলে-মেয়ে, ছেলের বউ, মেয়ের জামাই, হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগলসহ একই ঘরে গাদাগাঁদি করে মানবেতর জীবনযাপন করছে গুচ্ছ গ্রামবাসী বাঙালি পরিবারগুলো। অথচ তাদের কবুলিয়ত ভুক্ত জমি-জমাগুলো দুস্কৃতিকারী উপজাতীয়রা দখল করছে নানা কৌশলে। কখনও বাঙালিদের জমিতে রাতারাতি কেয়াং নির্মাণ করে আবার কখনও চাষ করে দখল করছে বাঙালিদের জমি। সব কিছু দেখেও আমাদের সরকার এবং প্রশাসন নির্বিকার। তাদের যেন কিছুই করার নেই।
বাঙালিরা গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ হয়ে যুগ যুগ ধরে বসবাস করতে থাকবে এটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু এ অমানবিক অবস্থা দীর্ঘ দিন চলতে পারে না। আর চললেও সরকার এবং উপজাতি কারো জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না। তা ছাড়া রেশন বাবদ প্রতিমাসে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এসব বিবেচনা করে গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙালিদেরকে তাদের কবুলিয়তভুক্ত জমিতে পুনর্বাসন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
পার্বত্য চুক্তির ভূমিকার সাথে এর ধারা উপধারা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক অবস্থার মধ্যে সাংঘর্ষিক আরও অনেক বিষয় রয়েছে। আর এসব কিছুর ফলেই পার্বত্য চুক্তিকে শুরু থেকে সচেতন দেশবাসী মেনে নিতে পারেনি। ভবিষ্যতেও মেনে নেয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে গত ১৭ বছরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সরকার চুক্তির বিতর্কিত ধারা উপধারাগুলি নতুনভাবে বিবেচনা করতে পারে। এতে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয় সারা দেশই উপকৃত হবে বলে আশা করা যায়।

হঠাৎ উত্তপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম: খতিয়ে দেখতে হবে এখনই

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ 

হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। গত ১০-১২ দিনে একের পর এক সহিংস ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালিদের মাঝে চরম উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সেনা, বিজিবি ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতির উপর আপাতত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও সেখানে বিরাজ করছে চাপা উত্তেজনা ও বিষ্ফোরনোন্মুখ পরিস্থিতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে গত ৬ ডিসেম্বর প্রায় একই সময়ে পৃথক তিন উপজেলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে দু’জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে চিংসামং চৌধুরী (৪২) নামের এক স্কুল শিক্ষক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান নামের মানিকছড়ি উপজেলা জেএসএস সভাপতি। তাকে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। বেশ কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মংসাজাই মারমা ওরফে জাপান মারা যান। পৃথক এক ঘটনায়, জেলার পানছড়ি উপজেলার মগপাড়া (হলধর পাড়া) এলাকায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের গুলিতে রমজান আলী (৫৫) ও তার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৪০) গুরুতর আহত হয়েছেন। অপর এক ঘটনায় মাটিরাঙ্গা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছেন চুক্তি স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা আশুতোষ ত্রিপুরা (২৬)। চিংসামং চৌধুরীর খুনের ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলার মারমা সম্প্রদায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ ও মারমা সম্প্রদায়ের উপর পরিচালিত আরেকটি উপজাতীয় সংগঠনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে খাগড়াছড়িতে মিছিল মিটিং ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখান থেকে চাকমাদের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও ঘটে। মারমাদের এই শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে আঙুল তোলা কার্যত তিন পার্বত্য জেলার প্রভাবশালী চাকমা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ছিল। এরই মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে সুউচ্চ পাহাড়ের উপর ছবি মারমা (১৫) নামে এক উপজাতীয় তরুণীকে ধর্ষণের পর জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। কাপ্তাই থানা ওইদিন বিকেলে জবাই করা লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত তরুণী চিৎমরম স্কুলের জেএসসি ফলপ্রার্থী। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ১২টার দিকে বাসার জন্য গসিয়া নামক এক প্রকার খাদ্য আনার জন্য সুউচ্চ পাহাড়ের উপর জুম এলাকায় যায় সে। দুপুরে পরিবারের লোকজন খবর পায়, তাকে কে বা কারা জবাই করে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে গেছে। এদিকে ৯ ডিসেম্বর বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ডলু ঝিরি এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টির (এমএনপি) সন্ত্রাসীরা দুই বাঙালি নারীকে গণধর্ষণ ও দুইজনকে অপহরণ করে। একই সাথে ৭-৮টি বাঙালি পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে স্বর্বস্ব লুট করে।
এদিকে রাঙামাটিতে ছবি মারমা নিহত হওয়ার একদিন পরই অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর জেলার নানিয়ারচর উপজেলার তরুণীপাড়া এলাকায় মধ্যরাতে বাঙালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের ২২ হাজার সেগুন গাছের চারা কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। ভোরে আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পান। তাদের অভিযোগ, পাশের গ্রামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ধ্বংস করে দিয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতিপক্ষ পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্টের সদস্যরা এই বর্বরতা চালিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর এক পর্যায়ে মঙ্গলবার সকাল পৌনে আটটার দিকে দলবদ্ধভাবে ক্ষুব্ধ বাঙালিরা বিক্ষোভ শুরু করে। অন্যদিকে দুর্বৃত্তরা পাশের তিনটি পাহাড়ি গ্রাম বগাছড়ি, ছড়িদাশ পাড়া ও নবীন তালুকদার পাড়ায় দোকানপাট ও বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। অগ্নিসংযোগে পাহাড়িদের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসময় বাঙালিদেরও কয়েকটি ঘর পুড়তে দেখা গেছে। পাহাড়িদের অভিযোগ, এ সময় বুড়িঘাট ইউনিয়নের সুরিদাসপাড়া এলাকার ‘করুণা বিহার’ নামের একটি বৌদ্ধ বিহারে হামলা চালায় হামলাকারীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার থেকেই রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠন ভূমি রক্ষা কমিটি। নানিয়ারচরের ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে অপহরণ করে অজ্ঞাতনামারা। অপহৃত ব্যক্তির নাম অমল কুমার ত্রিপুরা (২৩)। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির মরাটিলা এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য শান্তি কুমার ত্রিপুরার ছেলে। একই দিন খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকায় মন্টু বিকাশ চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সদস্যের বাসায় গুলি ও গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। গ্রেনেডটি অবিস্ফোরিত অবস্থায় উদ্ধার করেছে দীঘিনালা থানা পুলিশ।
উপরের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো উপায় নেই। কারণ, শান্তিচুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র ব্যোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে শান্তিচুক্তির দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপ্রিয় ও অশান্তিপ্রিয় পন্থায় অসহযোগ আন্দোলন করার হুমকি দেন। ২৯ নভেম্বর রাজধানীর হোটেল সুন্দরবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সন্তু লারমা এ হুমকি দিয়ে বলেন, ১ মে ২০১৫ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। সন্তু লারমা অকষ্মাৎ এমন উক্তি করেছেন, বিষয়টি এমন নয়। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলে পুরাতন সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়ে আসছেন। শান্তিচুক্তির দেড় দশকপূর্তির অনুষ্ঠানে প্রথম তিনি এই সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দেন। তবে এবারে তার হুমকি দেয়ার পর থেকেই পাহাড়ে যে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে তা সচেতন দেশবাসীকে চিন্তিত করে তুলেছে।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে শান্তিবাহিনীর ৭৩৯ সদস্যের প্রথম দলটি সন্তু লারমার নেতৃত্বে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৬ ও ২২ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে ৪ দফায় শান্তিবাহিনীর মোট ১৯৪৭ জন অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানেই শান্তিবাহিনীর একাংশ শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়াম কালো পতাকায় ঢেকে ফেলে। সৃষ্টি হয় প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে চুক্তিবিরোধী নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ। সে সময় থেকেই তারা প্রতিবছর ২ ডিসেম্বরকে ‘বেঈমান দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছে। বলা হয়ে থাকে, শান্তিবাহিনীর সকল সদস্য আত্মসমর্পণ করেনি ও তাদের সব অস্ত্র জমা পড়েনি বরং পুরাতন ও ভাঙাচোরা কিছু অস্ত্র জমা দিয়ে তারা সরকারকে ধোঁকা দিয়েছিল।
২০১৪ সালের পরিসংখ্যান পুরোপুরি পাওয়া না গেলেও নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র মতে, শান্তিচুক্তির পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় সন্ত্রাসী কর্তৃক নিহতের সংখ্যা ৭৫৩ জন। আহত হয়েছে ৯৩২ জন। অপহৃত হয়েছে ১৩৬৫ জন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেফতার হয়েছে ৩৮৬৫ জন, গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটেছে ১২৫১টি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে ২০টি। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ৬৭ বার। জেএসএস-ইউপিডিএফ’র মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে ১৭৫ বার। পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য নয়। প্রকৃত পরিসংখ্যান আরো বেশি। পার্বত্যাঞ্চলের আঞ্চলিক দলগুলো পারস্পরিক দ্বন্দ্বে শান্তিচুক্তির ১৬ বছরে ৩৪৪ নেতাকর্মী নিহত ও সহ¯্রাধিক আহত হয়েছে। ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত তাদের ২৫৪ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য মোতাবেক, শান্তিচুক্তির পর থেকে একই সময় পর্যন্ত তাদের ৯০ জন নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়েছে। এদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৮ জন নিহত হয়েছে। ১২৬ জন আহত হয়েছে। ৮৭ জন অপহৃত হয়েছে। ৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যে শান্তির অন্বেষণে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আনতে সফল হয়নি। উল্টো সেখানকার প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি সম্প্রদায়কে এই চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে নিজ দেশে পরবাসী করে ফেলা হয়েছে।
সন্তু লারমা কথায় কথায় সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে থাকেন। বস্তুত ১৯৯৮ সালের ৬ ডিসেম্বর আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের পর থেকেই তিনি এ অভিযোগ তুলে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণে গড়িমসি করছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকার সন্তু লারমাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জেএসএস নেতা এ পদে বসানোর হুমকি দিলে তিনি তড়িঘড়ি করে ১৯৯৯ সালের ১২ মে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদে যোগ দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় এই পদে অবস্থান করে সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন এবং মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। এ পদে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উপজাতি নেতারাই করেছেন বিভিন্ন সময়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী এই পদের মেয়াদ ৫ বছর। অথচ ১৬ বছর ধরে তিনি এই পদটি দখল করে ক্রমাগত শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করে চলেছেন। যদিও হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র বলে তাকে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দিয়েছেন। তবে রায়টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্টে অবস্থায় রয়েছে।
শান্তিচুক্তির কোথাও সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তি হিসাবে দেয়া হয়নি। তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষা, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতায় তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য উপজাতীয় নেতা রয়েছেন। এই পদে বসলে আরো যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেই পাহাড়িরা বিশ্বাস করে। এমনকি তার নিজের দল জেএসএসের মধ্যেও অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। ত্যাগ, তিতীক্ষা, জনপ্রিয়তা ও দক্ষতায় যারা এ পদের যোগ্য দাবিদার। সন্তু লারমা তাদের কোনো সুযোগ দেননি। সন্তু লারমার ক্ষমতালিপ্সার প্রতিবাদেই আরেক দফা জেএসএসে ভাঙন সৃষ্টি হয়। জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার) পার্টির। কাজেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থে সংশোধিত আইনে জেলা পরিষদসমূহের পুনর্গঠন শেষ হলে শান্তিচুক্তির গ খণ্ডের ১২ ধারা অনুযায়ী সরকারকে নতুন করে অন্তবর্তীকালীন আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের বিষয়টি সক্রিয় ভাবে বিবেচনা করে দেখতে হবে। অন্য যোগ্য উপজাতীয় নেতাকে সুযোগ দিতে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সেসব স্থান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে সেসব স্থান পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। শান্তিচুক্তির সুযোগ নিয়ে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। বাৎসরিক প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা সেখানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ি সংগঠনগুলো আয় করে থাকে বলে ধারণা করা হয়। এর সাথে রয়েছে আর্মস, ড্রাগস ও মানব পাচার। অপহৃতদের লুকিয়ে রাখার জন্যও এসব স্থান নিরাপদ জোন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ কারণে বিগত কয়েক বছরে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা যেসব অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে মুক্তিপণ ছাড়া তাদের উদ্ধার সম্ভব হয়নি। এখন যখন সরকার ঐসব স্থানে জনগণের নিরাপত্তা বিধানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা উচ্ছেদ ও ভূমি দখলের অভিযোগ তুলে তা থামাতে চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা জাতীয় পর্যায়ের বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ সহায়তা পাচ্ছে। পাহাড়িদের প্রতি বামপন্থীদের এই আত্মঘাতী সমর্থন নতুন নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত মহিউদ্দীন আহমদ লিখিত ‘জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, জনসংহতি সমিতির স্বায়ত্তশাসন দাবি জোরালো করবার আগেই ১৯৭৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জাসদের নির্বাচনী ইশতেহারে উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন দেবার দাবি উত্থাপন করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে, একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর জাসদের ২৯ দফায় উপজাতীয়দের স্বায়ত্তশাসন এমনকি স্বাধীনতা দেবার দাবিও করা হয়। (প্রাগুক্ত, ৯৬ ও ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বর্তমানেও একই গোষ্ঠী পাহাড় থেকে নিরাপত্তাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের দাবিতে উপজাতীয়দের সাথে কোরাস করছে। মূলত একটি রাষ্ট্রের কোথায় সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প থাকবে এটি নির্ধারণ করবেন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা আর কোনো কিছুর সঙ্গে তুল্য হতে পারে না।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শান্তিচুক্তির বেশিরভাগ বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়েছে। চুক্তিতে ৭২টি শর্ত আছে, তার মধ্যে ৪৮টি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়েছে। আর ১৫টি আংশিকভাবে হয়েছে এবং ৯টি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, বাকি ধারাগুলোও শীঘ্রই বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু সন্তু লারমা একে অসত্য, বিভ্রান্তিমূলক ও মনগড়া বক্তব্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ সাবেক সিএইচটি প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদারের মতে, ২০১৩ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ৪৮টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মতৈক্যপত্রে সন্তু লারমা স্বয়ং স্বাক্ষর করেছেন। অর্থাৎ সন্তু লারমা তার নিজের জনগণের সাথেও ধোঁকাবাজির খেলা খেলছেন। এদিকে জেএসএসের সাথে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নকারী দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কৃতিত্ব দাবি করলেও সন্তু লারমা তা মানতে রাজি নন। শান্তিচুক্তির ১৬ বছর পূর্তিতে রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলে দেন, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি নিয়ে মিথ্যাচার ও প্রতারণা করে চলেছে। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা একক সরকারের কৃতিত্ব নয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এমনকি সেই অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রক্ষাকবচ বলেও উল্লেখ করেন সন্তু লারমা। অথচ এ বছর তিনি শান্তিচুক্তিকে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বস্তুত তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএসের সাথে শাসকদল আওয়ামী লীগের ব্যাপক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জাতীয় সংসদ, উপজেলা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনে জেএসএসকে দেখা গেছে বিরোধী দল বিএনপির সাথে অঘোষিত সমঝোতা করতে। জাতীয়ভাবে সংসদ নির্বাচন বয়কট করলেও রাঙামাটিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা জেএসএস প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছে। খাগড়াছড়িতে জেএসএস না থাকলেও অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফের সাথে বিএনপির সম্পর্কের প্রচার রয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে এসে এই সমঝোতা আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। অর্থাৎ কখনো নৌকায় পা দিয়ে, কখনো ধানের শীষ মাথায় নিয়ে সন্তু লারমা তার নিজস্ব লক্ষ্য জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার এই লক্ষ্য বাংলাদেশের অখন্ডতার প্রতি চরম হুমকি স্বরূপ। দেশি-বিদেশি দাতাসংস্থা, এনজিও ও মিশনারিদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ফলে সন্তু লারমা এখন বাংলাদেশের সরকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়তেও দ্বিধা করছেন না।
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সক্রিয় যেকোনো দেশি-বিদেশি এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে চলতে বাধ্য। বিগত কয়েক বছর যাবত বেশকিছু এনজিও ও দাতাসংস্থা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী ও রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থী ‘আদিবাসী’ ধারণাকে প্রচার, প্রসার, জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠা করতে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এটি সম্পূর্ণ আইনবিরোধী এবং তাদের এখতিয়ার ও অধিকারের লঙ্ঘন। রাষ্ট্রীয় অখ-তার স্বার্থে সরকারকে অতিদ্রুত এই সকল দাতাসংস্থা ও এনজিওর আদিবাসী বিষয়ক প্রোগ্রামসমূহ বন্ধ করতে বাধ্য করতে হবে এবং যারা বাংলাদেশে আইন ও সংবিধান মানতে অস্বীকার করবে তাদের কার্যক্রম বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার অনুযায়ী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের জাতীয়তা, রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিক স্ট্যাটাস ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষণ করে। তাই সন্তু লারমা তার জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হিসাবে নিজেদের আদিবাসী স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
Email : palash74@gmail.com

প্রবন্ধটি গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ তারি্খে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়েছিল

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

বিজয় দিবস পালন করেনি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো: কটুক্তি ফেসবুকে

বিজয় দিবস

মুজিবুর রহমান ভুইয়া :

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, ২ লাখ নারীর সম্ভ্রমহানীর বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই বিশ্বের বুকে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। সেকারণে ৪৩ বছর ধরে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ বিপুল গাম্ভীর্য,  আনন্দ ও উৎসবের মাধ্যমে এই দিন পালন করে আসছে। সরকারী, আধাসরকারী, স্বায়ত্বশাসিত, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন যথাসাধ্য ভাবমর্যাদার সাথে এ দিন পালন করে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রম হচ্ছে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের নেতৃবৃন্দ। বিজয় দিবস পালিত হয় না সেখানে।

গত ১৬ ডিসেম্বরের প্রথম প্রহরে রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচরে পাহাড়ী কর্তৃক বাঙালীদের ফলন্ত ও কাঠের বাগান ধ্বংস এবং প্রতিবাদে পাহাড়ীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাহাড়ী সংগঠনগুলো বাঙালীদের বিরুদ্ধে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে এহেন সাম্প্রদায়িক হামলার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই পাহাড়ী সংগঠনগুলো নিজেরা কখনোই বাংলাদেশের বিজয় দিবস পালন করে না। এ বছরও তার অন্যথা হয়নি।

যদিও সারাদেশের ন্যায় পাহাড়ে ব্যাপক আয়োজন ও যথাযোগ্য মর্যাদার মধ্য দিয়ে মহান বিজয় দিবস পালিত হয়েছে। এজন্য দিনব্যাপী নানাকর্মসুচী পালন করা হয় সরকারীভাবে। পাহাড়ে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনগুলোও ব্যাপক উদ্দীপনার সাথে জাতীয় বিজয় দিবস পালন করেছে। এসব উৎসবে বাঙালীদের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতির সাথে জড়িত বিপুল সংখ্যক উপজাতীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ উপজাতীয় জনতা অংশগ্রহণ করেছে। তবে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় বিজয় দিবস উপলক্ষে কোনো কর্মসূচী ছিল না।

অব্যাহত চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ও গুমসহনানা সহিংস রাজনৈতিক কর্মসুচী নিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন জনপদে নানা কর্মসূচী দেখা গেলেও মহান বিজয় দিবসের কোন কর্মসুচীতে দেখা যায়নি পাহাড়ের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠন চুক্তিবিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ, চুক্তির পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস (সন্তু লারমা) এবং পুর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলনরত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি জেএসএস (এমএন লারমা) সহ বিভিন্ন উপ-গ্রুপগুলোকে। এমনকি বিজয় দিবসের কোনো অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি ১৬ বছর ধরে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগকারী জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের বিজয় দিবসে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের স্বতন্ত্র কর্মসূচী ছিল না। এমনকি এসব কোনো সংগঠনই তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো নেতা বিজয় দিবসে শহীদ মিনারে পুস্পমাল্য অর্পন করেনি।

yyyy

শুধু বিজয় দিবস পালন না করাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকদের ফেসবুক আইডি ও তাদের পরিচালিত বিভিন্ন পেইজে বাংলাদেশের জাতীয় বিজয় দিবস নিয়ে কটুক্তি ও অশ্লীল গালিগালাজ করা হয় যা বর্ণণার অযোগ্য। এমনকি বিজয় দিবস বয়কট করার আহ্বান জানানো হয় এসব পেইজ ও আইডিগুলোতে।

মহান বিজয় দিবসের মতো একটি জাতীয় দিবসের কোন কর্মসুচী নিয়ে মাঠে না থাকায় এসব সংগঠনের দেশপ্রেম, দেশাত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাহাড়ের সচেতনমহল। তাদের মতে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য, দেশপ্রেম, দেশাত্ববোধ নেই তাদের বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার নেই। তাদেরকে দেশের স্বাধীনতা বিরোধী দাবী করে সচেতন মহলটি জানতে চায় আসলে এ সংগঠনগুলো কাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পাহাড়ে রাজনীতির নামে একের পর এক সহিংসতা করছে।

এ বিষয়ে নিজের নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক উপজাতীয় জনপ্রনিধি বলেন, আঞ্চলিক দলগুলো দেশের বা জনগণের স্বার্থে নয়, তারা তাদের নিজেদের স্বার্থেই বিভিন্ন সহিংস কর্মসুচী পালন করে থাকে। দেশ বা জনগনের প্রতি তাদের কোন ‘কমিটমেন্ট’ নেই। তাই বিজয় দিবসের মতো কোন কর্মসুচীতেও তারা শহীদ মিনার বা মাঠে নেই। তিনি আইন করে তাদের সহিংস রাজনীতি নিষিদ্ধ করারও দাবী জানান।

পানছড়ি

বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে কোন কর্মসুচীতে নেই কেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্গ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস’র (সন্তু লারমা) সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা যেকোন জাতীয় দিবসে জনসংহতি সমিতিরি অংশগ্রহণ থাকে দাবী করে পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা অনেক ভোরে শহীদ মিনারে যাই বলে আমাদেরকে কেউ দেখেনা। তবে বিজয় দিবসসহ সকল জাতীয় দিবসের প্রতি আমাদের সমান শ্রদ্ধা আছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবস সরকারীভাবেই পালন করা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে আমাদের সেরকম ভুমিকা রাখার সুযোগ সীমিত বলে দাবী করেন জেএসএস’র এ নেতা। তবে তিনি বারবারই দাবী করে বলেন, লিডিং ভুমিকা না থাকলেও বিভিন্ন জাতীয় দিবসে জনসংহতি সমিতির অংশগ্রহণ থাকে।

এদিকে এ বিষয়ে জানার জন্য পাহাড়ের অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠন চুক্তিবিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-ইউপিডিএফ‘র কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের প্রধান নিরণ চাকমা’র মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও সংযোগ না পাওয়ায় তার কোন বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

বিজয় দিবস কোন দলীয় দিবস নয় এটা একটা জাতীয় দিবস, তাই বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসকে দলীয় কর্মসুচীতে নিয়ে আসা ঠিক হবেনা দাবী করে পুর্ণ স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলনরত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি-জেএসএস‘র (এমএন লারমা) খাগড়াছড়ি জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কিরণ চাকমা বলেন, বিজয় দিবস সকলের আনন্দের দিন। আমরা সকলেই দিবসটিকে যথাযোগ্যভাবে পালন করে থাকি।

বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সরকারী কর্মসুচীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দিবসটি নানা কর্মসুচীর মধ্য দিয়ে পালন করলেও জেএসএস (এমএন লারমা)সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনকে এরকম কোন কর্মসুচী পালন করেনি কেন এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা সরকারী সকল কর্মসুচীতে ছিলাম। জনসংহতি সমিতিকে আলাদা করে বিজয় দিবস পালন করতে হবে এমনটা ঠিক নয় বলেও দাবী করেন তিনি।

এসব দল বিজয় দিবসের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসের প্রাক্কালে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বগাছড়ির তরুনীপাড়া এলাকায় বাঙ্গালিদের প্রায় পনের একর আনারস বাগানের সাড়ে ৪ লাখ ফলন্ত আনারসের গাছ এবং একটি নতুন সেগুন বাগানের কয়েক হাজার সেগুন চারা কেটে ফেলে দেয় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। আনারস বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম, মো. আসাদ, কামাল হোসেন, জামাল হোসেন এবং সেগুন বাগানের মালিক আবছার মাস্টার বাগানে গিয়ে দেখতে পান নিজেদের বাগানের ধ্বংসাবশেষ। তাদের অভিযোগ পাশের গ্রাামের পাহাড়িরাই রাতের আঁধারে তাদের বাগানের গাছগুলো কেটে ফেলে ধ্বংস করে দিয়েছে। ওই আনারস ও সেগুন বাগান কেটে ফেলার ঘটনাকে ঘিরে কুতুকছড়ি ইউনিয়নের বগাছড়ি এলাকার বাঙালিদের মাঝে ব্যাপক আকারে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে পাহাড়ী সংগঠনগুলোর জাতীয় দিবস পালন না করা নিয়ে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুইয়া টেলিফোনে পার্বত্যনিউজকে জানান, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ১৯৭১ সালের মতো এখনো বাঙালীদের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস মেনে নিতে পারেনি। তাই বিজয় দিবসের প্রাক্কালে জাতির দৃষ্টি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে, বিজয় দিবসকে কলঙ্কিত করতে পরিকল্পিতভাবেই এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সমতলে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পতাকা না তুললে, জাতীয় সঙ্গীত না গাইলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু পাহাড়ী সংগঠনগুলো এবং তাদের নেতারা বছরের পর বছর জাতীয় বিজয় দবিসকে অবজ্ঞা করে যাচ্ছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

সমঅধিকার আন্দোলনের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির পার্বত্যনিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা নানিয়ারচর থেকে বাঙালী উচ্ছেদে পরিকল্পিতভাবে নানা অত্যাচার ও নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। অতীতের একাধিকবার এখানে বাঙালী ফসল, সম্পদের উপর আঘাত হেনেছে পাহাড়ীরা। এ ঘটনা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র। এবারে তারা এরসাথে বিজয় দিবসের গৌরব মলিন করতে চেয়েছে। তারা নিজেরা কোথাও বিজয় দিবস পালন করে না। তাই বাঙালীর বিজয় দিবসকে বিতর্কিত করতে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

তিনি বলেন, তারা বাঙালীর স্বাধীনতা মেনে না নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তানী, ভারতীয় ও মিয়ানমারের পতাকা উড়িয়েছিল। এখনো তারা জুম্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী বলেই বাঙালীর জাতীয় বিজয় দিবস পালন করে না। নেতৃবৃন্দ এ ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালীদের চিকিৎসাসহ পুনর্বাসন সহায়তা দেয়ার দাবী জানিয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসিত বাঙালীদের সরিয়ে নিন- ড. মিজানুর রহমান

IMG_5359

স্টাফ রিপোর্টার:

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, `পার্বত্য চট্টগ্রামে জোর করে বাঙালি জনসংখ্যা বাড়িয়ে সেখানকার আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করার রাজনীতি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার যেসব বাঙ্গালিদের পুনর্বাসন করেছে তাদের আবারো সেখান থেকে সরিয়ে নিন।  প্রয়োজনে তাদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন করতে হবে’।

তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতিসংঘ ইউনিভার্সাল পিরিউডিক রিভিউর (ইউপিআর) সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে অগ্রগতির বর্তমান অবস্থা: আদিবাসী প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন।

অ্যাকশন এইড এবং কাপেং ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজক। সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম এর সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত; নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবীর; পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব সালমা আক্তার জাহান; বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং; জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন প্রমূখ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একশন এইড এর প্রেপাগ্রাম, পলিসি এন্ড ক্যাম্পেইন এর পরিচালক আসগর আলী সাবরী। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের বিনোতাময় ধামাই।

পার্বত্য এলাকায় সেনা বাহিনীর অবস্থানের সমালোচনা করে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণই আপনার শক্তি। তারাই আপনাকে নিরাপত্তা দিবে। কোনো বাহিনী আপনার নিরাপত্তা দিতে পারবে না। তাই জনগণকে আপনি দূরে সরিয়ে দিবেন না।’

অধ্যাপক মিজান বলেন, ‘বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রের আচরণ কখনো তার আদিবাসীদের প্রতি এমন হতে পারে না। এখন সময় এসেছে জাতীয় সংসদে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা। আদিবাসীদের ভোটেই তারা নির্বাচিত হবেন। আদিবাসীদের নিজ ভুমিতে পরবাসের অবস্থা দুর করতে হবে। জেরুজালেমকে আরবহীন করার যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছে তেমনি পার্বত্য চট্রগামের ক্ষেত্রে একই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে’।

তিনি বলেছেন, ‘জাতিসংঘ ইউনিভার্সেল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) সুপারিশসমূহে বাংলাদেশ সরকার বলেছিল আদিবাসী শব্দটা ব্যবহার করা যাবে না। কিন্ত আমরা তখন বলে ছিলাম বাংলাদেশে আদিবাসী আছে, এখনো বলছি আছে, ভবিষ্যতেও বলবো আছে। কারণ আদিবাসী ছাড়া বাংলাদেশ পূণাঙ্গ রাষ্ট্র নয়। সরকার জাতির কাছে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার যে প্রতিশ্রতি দিয়েছিল তা পুরণ করতে বাধ্য’।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ভুল পথে চলতে পারে। তবে আমাদের কাজ হবে সঠিক পথে ফেরাতে চিৎকার করা। রাষ্ট্র আমাদের চিৎকার না শুনলে আরো জোরে চিৎকার করতে হবে। তাহলেই সরকার আমাদের চিৎকার শুনতে পারবে।’

অধ্যাপক মিজান বলেন, ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন চাই। অন্য কোনো কিছুই দরকার নেই, ভূমি অধিকার বাস্তবায়ন চাই। তাইলেই পরিস্থিতির আমূল ও মৌলিক পরিবর্তন আসবে। এই শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না করলে এক সময় এদেশ থেকে পাহাড়িরা বিলুপ্তি হয়ে যাবে।’

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মিজানুর রহমান বলেন,  `জাতির পিতাকে কোন আদিবাসী আজ পর্যন্ত অসম্মান করেনি। কেউ কোনদিন রাজাকার বলেনি। এ থেকে বোঝা যায় আদিবাসীদের আস্থা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপর আছে। কিন্তু এ আস্থা আর কতদিন থাকবে? সরকারপক্ষ বা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাবো আদিবাসীদের এই আস্থাকে সম্মান দেখাতে। এতে করে পারস্পরিক সম্প্রীতি যেমন বাড়বে তেমনি সরকারই লাভবান হবে’।

তিনি বলেন, `পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিষয়ে সরকার শুধু বিভিন্ন বিভাগ হস্তান্তরের বিষয়গুলো বলে মূল সমস্যাকে এড়িয়ে যায়। কিন্তু আমি মনে করি সেখানকার ভূমি কমিশনকে কার্যকর করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। এছাড়াও তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন শৃ্খংলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভারও আঞ্চলিক পরিষদের কাছে হস্তান্তরের সুপারিশ করেন’।

আদিবাসীদের যেকোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তিনি সকলকে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ পাঠানোর অনুরোধ জানান। সাম্প্রতিক সময়ে নানিয়াচরে আদিবাসী গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শানাক্ত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তিরও দাবি জানান তিনি।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, `২০১৩ সালের ইউপিআর রিভিউ এর সময় তখনকার পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনির নেতৃতে যে দল অধিবেশনে গিয়েছিল সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন দেওয়ার আগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দটির পরিবর্তে আদিবাসী শব্দটি প্রতিবেদনে লেখার জন্য জোর দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।

এই সরকারের আমলে পার্বত্য চুক্তির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও এখন পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ আমরা দেখছিনা। বাধ্য হয়ে সেই চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী সন্তু লারমাকে অসহযোগ আন্দোলেনের ডাক দিতে হচ্ছে। জানিনা সেই আন্দোলন শান্তিপূর্ন হবে নাকি সহিংসতাপূর্ন হবে। অনতিবিলম্বে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমি সরকারের প্রতি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রোডম্যাপ ঘোষনা করার। যাতে করে পাহাড়ী আদিবাসীরা সুস্পষ্ট ধারনা পায় কবে কখন এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হব ‘।

 সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম বলেন, ‘ইউপিআরে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে সরকার কিছু ইতিবাচত পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু জায়গায় কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমাদেরকে তাই আরো বেশী এই বিষয়ে এডভোকেসি করতে হবে। এক্ষেত্রে আদিবাসী বান্ধব সাংসদ বৃদ্ধি করতে হবে’।

তিনি আরো বলেন, ‘বিজয়ের মাসে যে চুক্তি হয়েছিল এবং চুক্তির ফলে যারা অস্ত্র জমা দিয়েছিল তাদের প্রতি বর্তমান সরকার অন্যায় করতে পারেনা’। তিনি অবিলম্বে বর্তমান সরকারকে আদিবাসীদের অধিকারগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানান।

 নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘সরকার ভোটের আগে পাহাড়িদের আদিবাসীর স্বীকৃতি দিবে বলে অঙ্গীকার করেছিল। নির্বাচনে জিতে তা ভুলে গেছে’।

আদিবাসী নারীদের উপর চলমান সহিংসতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এদেশের নারীদের প্রতি যে মানসিকতা লালন করে তাদের উপর অন্যায়-অত্যাচার চালিয়েছে ঠিক যেন আমরা এখন আদিবাসী নারীদের প্রতি সেই মানসিকতায় পোষন করছি। এ জন্য আমরা দেখি আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতার কোন ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন দোষী ব্যক্তিকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি’।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘ইউপিআর ২য় পর্বে সরকার আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় বেশ কিছু সুপারিশ গ্রহণ করেছিল। সরকার যদি সেগুলো এখনো বাস্তবায়ন না করে তাহলে ২০১৭ সালের অধিবেশনে আবারো তাকে প্রশ্নে সম্মুখীন হতে  হবে। বাংলাদেশে জাতিগত সংখ্যালঘূদের অবস্থা কি। পার্বত্য চুক্তির অবস্থা কি? সরকারকে আবারো ২০১৭ সালে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে নানিয়াচরে যে হামলা হয়েছে তাতে বাংলাদেশ থমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার বা প্রশাসনের এ বিষয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই। যা আদিবাসীদের শুধূ হতবাক করে। আদিবাসীদের অধিকার অর্জনের জন্য তিনি বাঙালি-আদিবাসী সকলকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান’।

রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, ‘ইউপিআরে সরকার যে অঙ্গীকার করে সেটি কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটা খুবই বেশী গুরুত্বপূর্ন অর্থ বহন করে। এজন্য দেশের সুশীল সমাজ, সরকারের প্রতনিধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও জবাবদিহিতার জায়গায় আনতে হবে’।

তিনি আরো বলেন, ‘১৯৫০ সনের প্রজাস্বত্ত আইনে যেসব আদিবাসীদের নাম আছে তাদের অনেকের নাম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে আসেনি। এর ফলে বাদপড়া আদিবাসীদের শিক্ষা গ্রহণে, চাকুরী ক্ষেত্রে অনকে সমস্যা তৈরি হচ্ছে’।

নিয়মিত ভাতা তুলছেন রাজস্থলীর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা

প্রতারণা

রাজস্থলী প্রতিনিধি :

জেলার রাজস্থলী উপজেলার সেনাবাহিনীর সদস্য মোঃ চাঁদ আলী সম্প্রতি চাকুরীচ্যুত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ বেতন ভাতা উত্তোলনের নথি নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র সব খানেই তার নাম চাঁদ আলী, পিতা: শুক্কুর আলী উল্ল্যেখ রয়েছে। তিনি নাম বদল করে মুক্তিযোদ্ধা সনদে উল্লেখ করেন, চান্দু মিয়া, পিতা: শুক্কুর আলী গুড়া মিয়া। আসলে তার প্রকৃত নাম হল, চাঁদ আলী, পিতা: মরহুম শুক্কুর আলী। তিনি রাজস্থলীতে ২৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেনাবাহিনীর সৈনিক পদে চাকুরী করার সময় মুক্তিযোদ্ধার কোন পরিচয় প্রদান করেননি। বরং সেনাবাহিনীর সদস্য বলে পরিচয়পত্র প্রদান করেন।

তবে কিভাবে সে মুক্তিযোদ্ধা হলো তা রাজস্থলী উপজেলার জনসাধারণের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ’৭১ কোন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এমনটাও জানা নেই রাজস্থলী এলাকাবাসীর। ১৯৭২ সনের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২৩ ইস্ট বেঙ্গলে সৈনিক পদে ভর্তি হন তিনি। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর। বর্তমান জন্ম তারিখ হিসেবে তার চাকুরী ও মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে গড়মিল রয়েছে যা প্রমাণ করার মত নয়। নামবদল করে দুই মন্ত্রণালয়ের আলাদা নামে সরকারী সুবিধা এমনকি মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেট বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন করছে বলে জানা গেছে।

রাজস্থলীতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনকালে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের নজরে পড়লে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক স্মারক নং. ০৫.৪২.৮৪০০.২০৪.০৬.০০১.১৪-৫৮৮ মুলে একটি পরিপত্র বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা ইউনিট কমান্ড এর কার্যালয়ে প্রেরণ করেন। উক্ত পরিপত্র অনুযায়ী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজস্থলীতে চাঁদ আলী, সুলতান আহম্মদ, ইউছুপ, রুহুল আমীন ও আবুল কাশেম তাদের সঠিক মুক্তিযোদ্ধার যাবতীয় কাগজপত্র অসম্পুর্ণ থাকায় তাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন বলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড রবার্ট রোনাল পিন্টুর স্বাক্ষরিত পরিপত্রে জানা যায়।

এদিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চাঁদ আলীর তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে চাঁদ আলী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। একাত্তরে কোন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এমন কোন প্রমাণ নাই । মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ে চাঁদ আলীর নিকট সঠিক কাগজপত্র বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত একটি পরিচয় পত্র যার ক্রমিক নং-০৪১৫৮৭ এবং ৩৯৫৩৪৭৪ দেখাতে পেরেছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কোন সনদ দেখাতে পারেন নাই। ২০১৩ সালের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ও বিশেষ গেজেট মুলে কপিতে দেখা গেছে সেখানে যুদ্ধকালীন বিভাগ, রাজশাহী জেলা, সিরাগঞ্জ উপজেলা, শাহজাত পুরে ১৩ জন সেনা সদস্য নাবিক ও সেনা শহীদদের নাম ছাপা হলেও চাঁদ আলী নামক কারোর নাম নেই।

এ বিষয়ে চাঁদ আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার নাম চাঁদ আলী, আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চান্দু মিয়া পরিচিত। তবে তিনি দাবী করেন, সেনাবাহিনী থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তখন ভুলক্রমে তার নাম চান্দু মিয়া লেখা হয়েছে এবং ঐ নামে তিনি সনদ পেয়েছেন।

এভাবে রাজস্থলীতে আরো ৪ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে। কিন্তু তারা এখনো কোন মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সনদ দেখাতে পারেন নাই। স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে নানা কৌশলে তারা মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেট প্রাপ্ত হোন। গেজেট প্রাপ্ত হয়ে তারা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করে সরকারী ভাতা গ্রহণ করে আসছেন। বর্তমানে শেখ হাসিনা সরকার এসব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা মুক্তিযোদ্ধার সঠিক ইতিহাস বিকৃত করে নিজেরা যুদ্ধ না করে মুক্তিযোদ্ধা সেজে সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের আবেগে আঘাত করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস এর সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্র দেখে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট যাচাই বাছাই করে আগামী ১৬ ডিসেম্বর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে এবং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষণ নির্যাতন আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে

ধর্ষণ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বাঙালী কর্তৃক উপজাতীয় নারী নির্যাতনের বিষয়ে উপজাতীয়দের প্রচার- প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশের আড়ালে পাহাড়ের দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা। উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনাগুলো বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এসব অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এনিয়ে নিরীহ বাঙ্গালীদের মাঝে দিনের পর বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ক্ষীণ হয়ে আসছে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাও। অন্যদিকে একের পর এক ঘটনা করে পার পেয়ে যাওয়া উপজাতীয় যুবকদের দৌরাত্ম বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি বর্তমানে এতোটাই খারাপ হয়েছে যে, বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে পাহাড়ী যুবকেরা বাঙালী নারীদের সুপার ইম্পোজ ছবি পোস্ট করছে, তাদেরকে ধর্ষণের জন্য পাহাড়ী যুবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

পার্বত্যনিউজের তথ্যানুসন্ধান ও ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৩জুন মাটিরাঙ্গা উপজেলার পলাশপুর জোন সদরের কাছাকাছি দক্ষিণ কুমিল্লা টিলা এলাকায় মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা মো: আব্দুল মান্নানের মেয়ে কুলসুম আকতার (১২) নামে এক কিশোরী ধর্ষনের শিকার হয়। ঘটনার সূত্রে জানা যায়, নিজেদের বাড়ি হতে মাটিরাঙ্গা বাজারে কেনাকাটার জন্য যাবার পথে এক পাহাড়ি যুবকসহ চার যুবক তাকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে মোহন ত্রিপুরা নামক এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে। এসময় অন্য তিনজন পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন তার পরিবারের পক্ষ থেকে মাটিরাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ কর্তৃক অভিযান চালিয়ে অপর ব্যক্তিদের আটক করে।

এক্সক্লুসিভ লোগো

এ ঘটনার এক মাসের মাথায় ২৩ জুলাই মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম (৫৫) নামে এক বাঙ্গালী গৃহবধুকে পাহাড়ী যুবক কর্তৃক ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে। সে মাইসছড়ির মো: সয়ন উদ্দীনের স্ত্রী। জানা গেছে, ঐ মহিলা তার গরু খোজার জন্য নিকটবর্তী নীলাৎপল খীসার সবজি ক্ষেতে গেলে চার পাহাড়ী যুবক তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। পরে মহালছড়ি জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এর নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ ও জোনের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এ ব্যাপারে ধর্ষিতার ছেলে মো: গুলজার হোসেন মহালছড়ি থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযুক্ত লাব্রেচাই মারমা ও মাউশিং মারমা নামে দুই যুবককে আটক করে।

এ ঘটনার কয়েক মাসের মাথায় ৯ অক্টোবর মহালছড়ির শ্মশানখোলা এলাকার বাসিন্দা শামছুন্নাহার (৩০) নামে একজনকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠে। এসময় উপজাতি যুবকের দা‘র আঘাতে শামছুন্নাহারের মাথায় মারাত্বক জখম হয়। পরবর্তীতে তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় পুলিশী কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণ-ধর্ষণের শিকার হয় জান্নাতুল ফেরদৌস (১৫) নামে এক বাঙ্গালী কিশোরী। সে জেলার রামগড় উপজেলার বাসিন্দা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘটনার দিন জান্নাতুল ফেরদৌস বান্ধবীর বাড়ীতে যাওয়ার পথে অজ্ঞাত পরিচয়ধারী উপজাতীয় দুষ্কৃতিকারীরা তাকে অপহরণপূর্বক এই ঘটনা ঘটায়। ধর্ষণের শিকার এই কিশোরী ঘটনার পরদিন ০৫ ফেব্রুয়ারি হোটেলর ২য় তলা থেকে জানালা দিয়ে নীচে লাফ দিয়ে ধর্ষণকারীদের কবল হতে পালানোর চেষ্টা করলে গুরুতর আহত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর প্রথমে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এসময় সন্দেহভাজন হোটেল কর্মচারি রাহুল ত্রিপুরাকে (২৮) আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় ১৩ ফেব্রুয়ারী মহালছড়ি জোনের আওতাধীন থলিপাড়া এলাকায় মহালছড়ি ডিগ্রী কলেজের ছাত্রী মিতা সরকারের সাথে অসদাচরনসহ তাকে উত্যক্ত করে রামপ্রু মারমা নামে উপজাতি স্কুল ছাত্র। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙ্গালি যুবকদের মাঝে হাতাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা জানাজানি হলে মহালছড়ি জোন ও এপি ব্যাটালিয়নের পৃথক দুটি টহলদল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে জোন কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, কলেজের অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত ছাত্র রামপ্রু মারমা‘র পিতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরণের কার্যকলাপে লিপ্ত হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে সেবারের মতো রেহাই পায় বখাটে উপজাতি যুবক রামপ্রু মারমা।

এর পরপরই স্বাধীনতার মাসে (১৮ মার্চ) গুইমারার রামসু বাজারে মিসেস ফেরদৌসি বেগম (৩৫) এর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতিয় মোটরসাইকেল চালক অংচল মারমা (৩২)। প্রাপ্ত সূত্রমতে, ফেরদৌসি বেগম ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলযোগে মানিকছড়ি হতে গুইমারা বাজারে যাওয়ার পথে তার শ্ললতাহানির চেষ্টা চালালো হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এ ঘটনা জানার সাথে সাথে গুইমারা সেনা ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সিএমএইচ-এ ভর্তি করে। পরবর্তীতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা অভিযুক্ত মোরসাইকের চালককে আটকপূর্বক গুইমারা থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। এ ব্যাপারে গুইমারা থানায় মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে একটি মামল করা হয়।

এরপর ৩০ এপ্রিল আলীকদম জোনের আওতাধীন গুড়রঝিরি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে মোছাম্মদ হুরাইরা (২৬) নামের এক বাঙ্গালি নারী উপজাতিয় যুবক মংচিং আই মারমা (৩০) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। জানা গেছে হুরাইরা ও তার স্বামী উক্ত তামাক ক্ষেতের শ্রমিক। তার স্বামীর অনুপুস্থিতিতে একই তামাক ক্ষেতের অপর শ্রমিক মং চিং আই মারমা উক্ত ঘটনা ঘটায়। সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ঘটনার ব্যাপারে লামা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পর থেকে ধর্ষক মং চিং আই মারমা পলাতক রয়েছে।

২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল পুর্বপ্রণয়ের জের ধরে মাটিরাঙ্গার গাজীনগর বটতলী এলাকার বাঙ্গালি কিশোরী সবিলা আক্তর (২৪)-কে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে উপজাতিয় যুবক কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা (২৭)। স্থানীয়রা বিষয়টি জানলে পলায়নকৃত কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা ও সবিলা আক্তরকে আটক করে মাটিরাঙ্গা থানায় হস্তান্তর করে।

এর কয়েকদিনের মাথায় ৮ এপ্রিল আলকদম জোনের আওতাধীন সেলতিপাড়া এলাকায় পাখী আক্তার (৩৫) নামে বাঙ্গালী গৃহবধুর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতি যুবক সামারি মারমা (৩৬)। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় বাঙ্গালীরা উত্তেজিত হয়ে সামারি মারমাকে মারধর করে। পরবর্তীতে, এই ঘটনা উক্ত এলাকায় পাহাড়ি-বাঙ্গালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ঘটনা জানার পর সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়োজিত রাখে।

একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুনা আক্তার (৭)-কে ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের উপজাতি ছাত্রের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার মেয়ে শিশুটির ভাষ্যমতে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজাতীয় ছাত্র তাকে বিদ্যালয় ভবনের পিছনে নিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে, শিশুটির মা ও নেপচুন টি স্টেট‘র শ্রমিক কাঞ্চন মালা তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে প্ররণ করে। এ ব্যাপারে কাঞ্চন মালা বাদী হয়ে মানিকছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

পরবর্তীতে, মানিকছড়ি উপজেলার ইউএনও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় বাটনাতলী ইউপি চেয়াম্যান এবং বিদ্যালয়ের পরিচালক কমিটির সদস্যবৃন্দ ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে ০১ অক্টোবর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ষণের শিকার শিশুটি কর্তৃক অভিযুক্ত প্রথম শ্রেণির ছাত্র রাজ কুমার চাকমাকে (১২) সনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ কর্তৃক রাজ কুমার চাকমাকে আটক পূর্বক খাগড়াছড়ি জেলে প্রেরণ করা হয়।

সমঅধিকার আন্দোলন একাংশের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির পার্বত্যনিউজকে বলেন, বাঙালী কর্তৃক কোনো উপজাতি নারী নির্যাতিত হলে উপজাতি সমর্থিত বিপুল মিডিয়ার প্রচার প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ, বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু উপজাতি কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষিত বা নির্যাতিত হলে সরকারের তরফ থেকে সেই তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই একজন নামেমাত্র গ্রেফতার হলেও অল্পদিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। আর এই বিচার বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দী থেকে একসময় তামাদি হয়ে যায়। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী আন্তর্জাতিক মহল কারোরই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে বিচার না হওয়ায়,, সম্মান কিম্বা নিরাপত্তার কারণে বাঙালীরা বিচার প্রার্থিও হয় না। ঘটনার আসল সংখ্যা কখনোই জানা যায় না।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করে পাহাড়ের সচেতন মহল বলেন, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। বাঙ্গালী যুবকের দ্বারা কোন পাহাড়ী নারী ধর্ষিত হলে কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও এতোগুলো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাদের কোন বক্তব্য-বিবৃতি জাতি দেখেনি। পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও বাঙালীর অবস্থান নিশ্চিত করতে এ ধরণের ঘটনা রোধ করা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

এবার মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ আনলেন বান্দরবানের চাক সম্প্রদায়ের বৌদ্ধরা

CHAK woman

পার্বত্যনিউজ ডেস্ক:

পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ অনেক পুরাতন হলেও যারা মূলত এর শিকার তিন পার্বত্য জেলার সেই উপজাতীয় ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় অনেকটাই নীরব ছিলেন এতোদিন। তবে সেই নীরবতা ভেঙে মুখ খুললেন বান্দরবানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাক সম্প্রদায়ের নেতারা। গত ২৯ অক্টোবর ২০১৪ নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন চাক সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ। 

 

৩২ জন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নেতার স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিটি রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়াও ৬টি মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থা, বিজিবি-পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা চেয়ারম্যান, ওসিসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ সমিতি এবং ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছে অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। স্মারকলিপির সাথে নব্য খ্রিষ্টান প্রচারক চাক ছেলে-মেয়েদের একটি নামের তালিকাও সংযুক্ত করা হয়। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের আদর্শ তথ্য কেন্দ্র ধম্মইনফো সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্রে জানা গেছে, নামেমাত্র সাহায্য-সহযোগিতার প্রলোভনে ধর্মান্তর করা হচ্ছে বাংলাদেশের পাহাড়ী বৌদ্ধদের – এমন অভিযোগ সর্বদাই থাকলেও বেশ দীর্ঘদিন পর আনুষ্ঠানিকভাবেই এমন এক অভিযোগ তথ্য-উপাত্তসহ তুলে ধরেছে “চাক” সম্প্রদায়। বাংলাদেশের পাহাড়ীদের মধ্যে অন্যতম বৌদ্ধ সম্প্রদায় “চাক” সম্প্রদায়ের নেতারা ধর্মান্তরের অভিযোগ এনেছেন স্থানীয় খ্রীস্টান মিশনারীগুলোর বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধর্মান্তরের কর্মকাণ্ড নিভৃতে চললেও অবশেষে রাষ্ট্র প্রধানের কাছে প্রতিকার চেয়ে স্মারকলিপি দিতে বাধ্য হয়েছে চাক সম্প্রদায়।

এমনিতেই পার্বত্য এলাকার এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের একটি অভিযোগ, এরা স্বাস্থ্যসেবা, মানবসেবা ও দারিদ্রবিমোচন সম্পর্কিত সেবার নামে কার্যত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে ধর্মান্তরিত করার কাজে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মুল চেতনা ছিল স্বাধীন, সার্বভৌমত্ব ও সেক্যুলারিজম রাষ্ট্র গঠন করা। পরবর্তী বাংলাদেশ সংবিধানে ৪১ অনুচ্ছেদ (ক) এবং (খ) ধারায় সুষ্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

চাক সম্প্রদায়ের পক্ষে দেওয়া স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষা-ভাষী ও ১১টি ক্ষুদ্র অধিবাসীর মধ্যে চাক জনগোষ্ঠী অন্যতম। ঐতিহ্যগতভাবে তারা বৌদ্ধ ধর্মালম্বী অনুসারী। কিন্তু বিদেশী দাতাদের মদদ ও আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যান্তরে বসবাসকারী কতিপয় ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত খ্রিষ্টায়ান ধর্মীয় (বাংলাদেশ প্রধান কার্যালয় এপিএবি কমপ্লেক্স ছাত্র হোষ্টেল ও সানরাইজ হাই স্কুল দাতারাম চৌধুরী সড়ক, চৌধুরী হাট, ফতোয়াবাদ, হাটাজারী, চট্টগ্রাম) এবং ২য় শাখা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদরের রেস্ট হাউজ সংলগ্ন কবির মৌলভীর ভাড়া বাসায় বসে ধর্মান্তরিত করার এ কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্মারকলিপিতে তারা আরো অভিযোগে করেন, মিশনের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে ঐতিহ্যগতভাবে বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ক্ষুদ্র চাক জনগোষ্টীর ছেলে-মেয়েদেরকে নামে মাত্র পড়ালেখার খরচ যোগানে অজুহাতে আর্থিক প্রলোভন দিয়ে সম্পূর্ণ খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কৌশল অবলম্ব করা হচ্ছে। যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে তারা বৌদ্ধ ধর্মে গিয়ে ধর্মীয় অনুভূতির উপর আঘাত হেনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করছে। এমনকি তারা বৌদ্ধ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য ও কটুক্তি করছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।

এ ব্যাপারে চাক সম্প্রদায়ের নেতা ছানু অং চাক, বাচাচিং চাক, নাইন্দা অং চাক, ফোছা অং চাক, অংথোয়াইচিং চাক জানান, খ্রীশ্চিয়ান মিশন কর্তৃক চাক ছেলে মেয়েদেরকে ধর্মান্তরিত করার কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরণের ধর্মীয় দাঙ্গা হাঙ্গামার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় আইন ও আর্ন্তজাতিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল। তাই তথাকথিত খ্রীশ্চিয়ান ধর্মীয় মিশন কর্তৃক ধর্মান্তরিতকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রশাসনিক সহায়তা পেতে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় ধর্মান্তরিত হওয়া চাক উপজাতিদের একটি বড় অংশ দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। নিয়মিত আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ধর্মান্তরিত করার কিছুদিন পর অর্থ প্রদান বন্ধ করে দেওয়া এবং খ্রিষ্টান ধর্ম শুদ্ধভাবে পালনে চাপ দেওয়ার কারণেই তাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। নতুন করে ধর্মান্তরিত ঠেকাতে সীমান্ত অঞ্চল নাইক্ষ্যংছড়িতে ‘আদিবাসী ধর্ম রক্ষা পরিষদ’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

সূত্র মতে, ধর্মান্তরিত করার এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকার ব্যাপারে বেশ কয়েকটি এনজিওর নাম প্রায় সময় উঠে আসে। গত ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় একটি দৈনিকে প্রকাশিত একটি সংবাদে এসব এনজিওগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়। এগুলো হচ্ছে- ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ (সিসিডিবি), অ্যাডভানটেজ ক্রুশ অব বাংলাদেশ, হিউম্যানেটারিয়ান বাংলাদেশ, গ্রিন হিল, গ্রামীণ উন্নয়ন সংস্থা (গ্রাউস), কারিতাস, ইভানজেলিক্যাল ক্রিশ্চিয়ান ক্রুশ, শান্তি রানী ক্যাথলিক চার্চ, জাইনপাড়া আশ্রম উদ্যান, আশার আলো, মহামনি শিশুসদন, বৈশানীয়, তৈমু প্রভৃতি। অভিযোগ উঠেছে, এসব সংগঠন মাসিক নগদ অর্থসহায়তা ও প্রতি সপ্তাহে চাল, ঢাল, তেল, কৃষি সামগ্রী সরবরাহের শর্তে এলাকার গরিব মানুষকে খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত করছে। অর্থঋণসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গরিব মানুষকে প্রলুব্ধ করছে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হতে।

মাটিরাঙ্গায় ইতালিয়ান পিস্তলসহ জেএসএস সন্ত্রাসী আটক : ৪ পুলিশ আহত(ভিডিওসহ)

Arms Recover 19.10 (1)

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় ইতালির তৈরী ৭.৬৫ বোরের পিস্তলসহ এক উপজাতি সন্ত্রাসীকে মাটিরাঙ্গা ও গুইমারা থানা পুলিশ এক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আটক করেছে।

আজ রোববার সকাল সাড়ে ন‘টার দিকে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার শেখ মো: মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল বাইল্যাছড়ির কামাল কোম্পানীর ব্রিক ফিল্ড থেকে এ সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে।

আটককৃত সন্ত্রাসীর নাম কিশোর কুমার ত্রিপুরা (৩০) প্রকাশ বীতেন ত্রিপুরা। সে বাই্ল্যাছড়ির ৩ নং রাবার বাগান এলাকার ধীরেন্দ্র কুমার ত্রিপুরার ছেলে। সে জনসংহতি সমিতি‘র (এমএন লারমা) স্থানীয় নেতা ও চাঁদা আদায়কারী বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

অভিযানকালে সন্ত্রাসী কিশোর ত্রিপুরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করলে অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান মাটিরাঙ্গা থানার এস আই মো: কবির হোসেন। এসময় পুলিশের সাথে সন্ত্রাসী কিশোর ত্রিপুরা‘র ধস্তাস্তির ঘটনাও ঘটে। এ সময় পুলিশ তাকে জাপটে ধরে। তবে ধস্তাধস্তিতে পুলিশের এস.আই কবির, এ.এস.আই মহসিন, কনষ্টবল আল মামুন ও ডিএসবি লাইজু আহত হয়। আটককালে পুলিশ তার কাছ থেকে ৫ রাউন্ড গুলিসহ একটি ইতালিয়ান ব্যারেটা পিস্তল, নগদ টাকা ও একটি মোবাইল ফোন জব্দ করেছে।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার শেখ মো: মিজানুর রহমান বলেন, কিছুদিন যাবত এই সন্ত্রাসী আমাদের অব্যাহত নজরদারীতে ছিল। অবশেষে আজ তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেফতার করা হলো। এটা পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রমের একটা বড় সাফল্য বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন আপনারা জানেন, এসকল সন্ত্রাসীরা চাঁদাবজি ও হত্যা থেকে সব অপরাধমুলক কর্মকান্ড করে থাকে। তারা বিভিন্ন ভাবে এখানকার মানুষকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। তিনি সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করে সকলের সহযোগিতা নিয়ে সুন্দর আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ উপহার দিতে পারবো। তিনি বলেন স্থানীয় আঞ্চলিক সংগঠনের ব্যানারে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিসহ সার্বিক উন্নয়ন ব্যহত করার চেষ্টা করছে।

পানছড়িতে পুলিশের অস্ত্র হারানোর ঘটনার সাথে এসব সন্ত্রাসীদের কোন ধরনের যোগসুত্র আছে কিনা স্থানীয় সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবিষয়ে একটি মামলা চলমান রয়েছে তাই তদন্তের স্বার্থে এবিষয়ে বেশী কিছু বলা যাবেনা। তবে অস্ত্রটি উদ্ধারে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং অস্ত্রটি উদ্ধারে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সন্ত্রাসীরা আটকের পর খুব অল্প সময়ে জামিনে বেরিয়ে আসে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উপযুক্ত স্বাক্ষীর অভাবেই সন্ত্রাসীরা বেরিয় আসে।

পুলিশের হাতে আটক সন্ত্রাসী কিশোর কুমার ত্রিপুরা (৩০) প্রকাশ বীতেন ত্রিপুরা‘র বিরুদ্ধে গুইমারা থানায় অস্ত্র আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার শেখ মো: মিজানুর রহমান।

এদিকে ইতালির তৈরী ৭.৬৫ বোরের পিস্তলসহ জনসংহতি সমিতি‘র (এমএন লারমা) সন্ত্রাসী কিশোর কুমার ত্রিপুরা (৩০) প্রকাশ বীতেন ত্রিপুরা আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে মাটিরাঙ্গার সাধারণ মানুষ স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে দেশীয় আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে তার শাস্তি দাবী করেন।

জুমের পাকা ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত বান্দরবানের জুমিয়ারা

জুম চাষ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জুমের পাকা ধানের গন্ধ মৌ মৌ করছে সবখানে। বান্দরবানের পাহাড়ে চলছে জুমের ধান কাঁটার উৎসব। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পাহাড়ে জুম ক্ষেতে এখন পাকা ধান তোলার ভর মৌসুম। জুমিয়ারা ঘরে তুলছে সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালী ধান। জুমে বাম্পার ফলনে পাহাড়ে ধান কাটার আনন্দে মেতেছে ম্রো, বম, মারামা, চাকমা সম্প্রদায়সহ উপজাতি নারী-পুরুষেরা। ঘরে বসে নেই শিশু কিশোর, বাবা-মা কেউই।

 

পরিবার-পরিজন নিয়ে জুমিয়া পরিবারেরা ধান কাটতে নেমেছে পাহাড়ে পাহাড়ে। জুমের সোনালী ফসল ঘরে তোলার পাশাপাশি আদিবাসী পল্লীগুলোতে চলছে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি।

গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় প্রায় ৬০৩ হেক্টর পাহাড়ী জমিতে জুম চাষ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি বিভাগ। গতবছর বান্দরবান জেলায় ৮ হাজার ৪৩৯ হেক্টর জমিতে পাহাড়ী জমিতে জুম চাষ হয়। চলতি ৯০৫০বছর জুম চাষ হয়েছে।

কৃষি বিভাগ ও জুম চাষীদের সূত্রে জানাগেছে, পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীরা প্রতিবছর জেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত পাহাড়ে জুম চাষ করে। একই পাহাড়ে একাধিকবার জুম চাষ করা যায় না বলে জুমিয়ারা প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন পাহাড়ে জুমের চাষ করে থকে। জেলায় বসবাসরত মারমা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমী, লুসাই, পাংখো, বম, চাকসহ ১১টি পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর অধিকাংশরাই জুম চাষের উপর জীবণ জিবিকা নির্বাহ করে থাকে।

জুম চাষ

জেলা শহরে বসবারত কিছু সংখ্যক শিক্ষিত পরিবার ছাড়া দূর্গমাঞ্চলে পাহাড়ে বসবাসরত উপজাতিরাও আজও জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। তবে ১১টি উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ম্রো সম্প্রদায় আদিকাল থেকেই জুম চাষের মাধ্যমেই সারাবছরের খাদ্য শস্য সংগ্রহ করে রাখে।

জুমিয়া পরিবারগুলো প্রতিবছর বছরের মার্চ-এপ্রিল মাসের দিকে জুম চাষের জন্য পাহাড়ে আগুন দেয়। মে-জুন মাসের দিকে আগুনে পোড়ানো পাহাড় পরিষ্কার করে জুম চাষ শুরু করে। প্রায় ৩/৪ মাস পরিচর্যার পর বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষেরে দিকে জুমের ধান কাটা শুরু করে।

চলতি মৌসুমেও বান্দরবান জেলায় প্রায় ৬ হাজার ৫০ হেক্টর পাহাড়ী জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। তারমধ্যে সদর উপজেলায় ৫৮০ হেক্টর, রোয়াংছড়ি উপজেলায় ৩২৬ হেক্টর, রুমা উপজেলায় ১ হাজার ৮৭৫ হেক্টর, থানছি উপজেলায় ২ হাজার ৮৪৭ হেক্টর, লামা উপজেলায় ১ হাজার ৩১৭ হেক্টর, আলীকদম উপজেলায় ৯১৫ হেক্টর এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় ৭১৫ হেক্টর পাহাড়ে জুম চাষ করা হয়েছে।

মংহ্লা মং, উথাইচায়, রেংনিং ম্রোসহ একাদিক জুম চাষী জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং আবাহাওয়া জুম চাষের অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে জুমের ফলন ভাল হয়েছে। জেলার রুমা, থানছি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রোয়াংছড়ি এবং বান্দরবান সদর উপজেলার ডলুপাড়া, মেঘলা, শৈলপ্রপাত, ফারুক পাড়া, কানাপাড়া, শ্যারণ পাড়া, ওয়াইজংশন, পোড়া পাড়া, হাতিভাঙ্গা পাড়া, গেৎমনি পাড়া, কানাপাড়া, ডলুপাড়া, সাতকমল ইত্যাদি এলাকায় জুমের বাম্পার ফলন হয়েছে।

বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের দুপাশের পাহাড়ের পাকা ধানের গন্ধে মৌ মৌ করছে। স্ত্রী পরিবার-পরিজন নিয়ে জুমিয়া পরিবার গুলো নেমে পড়েছে জুমের ধান কাটতে। বাবা-মায়ের সাথে ধান কাটছে পাহাড়ী শিশুরাও। জুম চাষ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ক্ষতি করলেও উপজাতি জনগোষ্ঠীর কাছে এটি ঐতিহ্য। জুমিয়ারা পাহাড়ে ধানের পাশাপাশি ভূট্টা, মরিচ, যব, সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, টকপাতাসহ বিভিন্ন রকম অর্থকারী ফসল ও সবজির চাষ করে।

বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক জানান, এবারে হেক্টর প্রতি ৩৫-৪০ মন ধান উৎপন্ন হয়েছে। তবে গুন্ডা জাতের ধান হেক্টর প্রতি প্রায় ৮০ মন পর্যন্ত উৎপন্ন হয়েছে। জুমিয়ারা লাল চিকন, পিড়ি, কক্স, বিন্নী, গেলন, ময়মনসিং, সূর্য্যমূখি ও গুন্ডা জাতের ধান চাষ করে থকে।
তিনি আরো জানান, আদিপদ্ধতিতে জুম চাষের কারণে পাহাড়ের ক্ষয়সৃষ্টি হচ্ছে এবং জমির উর্ব্বরা হ্রাস পাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুম চাষ করা গেলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে জুমিয়ারাও লাভবান হবে।

এদিকে জুমের ধান কাটার সময়টা পাহাড়ীরা নবান্ন উৎসব হিসেবেও পালন করে। পাহাড়ে জুমের ফসল ঘরে তোলার পাশাপাশি আদিবাসী পল্লীগুলোতে চলছে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতি।