মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন

  • অর্পণা মারমা

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে, পাহাড়ের অনেক নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির মানবতা দেখে আমি এবং আমার মতো যারা পাহাড়ের বাইরে আছেন, তারা সবাই সত্যিই মুগ্ধ। যারা পারছেন, তাদের অনেকই সুদূর ঢাকা বা আরো দূরে থেকে তাদের সংহতি ও  সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন, রাঙ্গামাটি হাসপাতালে ‘অবরুদ্ধ’ বা কারো কারো ভাষায় ‘চিকিৎসাধীন’  দুই বোনের জন্যে। অনেকে মানববন্ধন করেছেন, আবহাওয়ার বৈরিতাকে উপেক্ষা করে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন, বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন, অনলাইনের যেখানে পারছেন পোস্ট দিচ্ছেন; সবই মানবতার খাতিরে।পার্বত্য অঞ্চলের অতি উঁচু পর্যায়ের বেশ কয়েকজনতো প্রায় প্রতিদিনই রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালের সামনে সময় কাটাচ্ছেন – শুধুমাত্র মেয়ে দুইজনের কল্যাণ্যের জন্যে, ‘নিজেদের মেয়েদের’ জন্যে।

এইসবের যে কোন একটি কাজই  ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা অর্জন করার জন্যে যথেষ্ট, সেখানে অনেকেই আরো বেশি করছেন, অনেক বেশি দায়িত্ব নিচ্ছেন। আন্তরিক ধন্যবাদ সেইসব ভলান্টিয়ারদের জন্যে যারা হাসপাতালে মেয়ে দুইজনকে সঙ্গ দিচ্ছেন, তাদের সাথে রাতে ঘুমাচ্ছেন, তাদেরকে পছন্দের মুভি বা গান, ভিডিও দেখাচ্ছেন, ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছেন। সত্যি বলতে কি, ধন্যবাদ দেয়াটা অনেক অনেক কমই হয়ে যায়। অবশ্য এর বেশি আর কীই বা বলতে পারি।

অর্থাৎ, নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এখনও সমাজে শ্রদ্ধেয় বরং মানবতা শুধু জীবিতই নয় বরং মানবতা প্রদর্শনকে  বীরোচিত ও সম্মানিত আচার-ব্যবহার হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছে। তবে কেন জানি, আমার ক্ষুদ্র মন তাদের এই মহান কাজগুলির মধ্যে নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা এবং মানবতার চেয়ে অন্য কিছু খুঁজে পায়, যা আরো বেশি মাত্রায় উপস্থিত, যা মানবতাকে প্রায়ই লজ্জায় ফেলে দেয়। অবশ্য আমার এই লজ্জাজনক উপলব্ধির জন্যে যদিও আমিই দায়ী, তবুও কেন জানি মনে হয় ঐসকল মহান লোকদের নিজস্ব কার্যকলাপের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, আমার এই উপলব্ধির পিছনে।

নিজের দোষ ধরা কঠিন বলেই, বিচারের ভারটা আমি পাঠকদের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি। আমি শুধু আমার এহেন ঘৃণ্য উপলব্ধির প্রেক্ষাপট তুলে ধরছি।

নিশ্চয় আমরা কেউই রাঙ্গামাটির ভুমিধ্বসের কথা ভুলে যাইনি। বিশেষ করে যারা পার্বত্য অঞ্চলের ব্যাপারে কিছুটা হলেও খোঁজ রাখেন, তাদের তো ভোলার প্রশ্নই ওঠে না। অনেকেরই ভুমিধ্বসের কথা খেয়াল থাকলেও শুধুমাত্র রাঙ্গামাটিতেই প্রায় ১২০ জন মারা গিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৬১ জনই ছিলো পাহাড়ি- সেই তথ্য হয়ত খেয়াল নেই। রাতারাতি সহায়-সম্বল হারিয়ে, পাহাড়ি– বাঙ্গালী মিলিয়ে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে এসে উঠছিলেন। অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছিল প্রায় মাসাধিককাল। তখন এই সহায়-সম্বলহীন মানুষদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল কারা, সেটি আর সবাই ভুলে গেলেও আশ্রয়কেন্দ্রের ঐ মানুষগুলো ভোলেনি।

আমি জানি অনেক পাহাড়ি ব্যক্তিগতভাবে প্রচুর সাহায্য করেছেন এবং সাহায্য আনার জন্যেও অনেক কাজ করেছেন। তবে, আমাদেরকে যা ব্যথিত করে তা হলো, আমরা যাদেরকে নেতা হিসেবে শ্রদ্ধা করি, যাদেরকে আমাদের রীতিনীতি অনুযায়ী পূজনীয় জানি – তাদের অনেকেই ঐ সময় যথাযথ ভূমিকা রাখেননি। আজ দুইজন মারমা বোনের জন্যে চাকমা রাণীমাতার  এবং অন্যান্যদের যে প্রচেষ্টা চোখে পড়ছে, তখন যদি এর ছিটেফোঁটাও থাকতো, পাহাড়ের এই পূজনীয় ব্যক্তিদের জন্যে অনেক বড় ত্যাগ স্বীকারেও অনেকে কুণ্ঠাবোধ করতো বলে মনে হয় না।

আরেকটা তথ্য এখানে না দিলেই নয়, ঐ সময় প্রায় শ’খানেক বা এর কিছু কম ভলান্টিয়ার রাত-দিন আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে কাজ করছিলো– তাদের মধ্যে অতি নগন্য কয়েকজন ছিলো পাহাড়ি, বাকি সবাই ছিল বাঙ্গালী। যাদের অনেকই ছিলো শিক্ষার্থী, এমনকি রাঙ্গামাটির বাসিন্দাও নয়– রোজার ছুটিতে বাড়িতে এসে মানব সেবার সুযোগ পেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বিপন্ন মানুষের পাশে।“ঈদের দিনে অন্য বন্ধুদের সাথে উৎসব উদযাপনের পরিবর্তে এরা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ব্যস্ত সময়” কাটিয়েছে আন্তরিকতার খাতিরে। আর যাই হোক, প্রচারের জন্যে বা লোক দেখানোর জন্যে তারা কিছু করেনি- বরং সত্যিকারের মানবতার জন্যেই তারা নিবেদিত ছিল।

তাই তো, শুধুমাত্র পাহাড়িদের জন্যে বৌদ্ধ বিহারে যে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছিলো, সেখানেও ঐ বাঙ্গালী ভলান্টিয়ারদের আন্তরিকতা, আগ্রহ আর প্রচেষ্টায় কখনই কোন কমতি ছিলো না। কেন জানিনা, হাজার খানেক বিপন্ন মানুষের ঐ কঠিন সময়গুলোতে আজকের দিনের এইসব ভলান্টিয়ার ও মানবতাবাদীদের এমন সরব উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, তাদের মানবতাবোধ কি পক্ষপাতদুষ্ট? নাকি লোক দেখানো  বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

কারণ যাই হোক না কেন, তাদের এই মানবতাবোধ বা ‘নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা’ যে মানুষের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা অথবা মনুষ্যত্বের কারণে নয়, সেটা অবশ্য বুঝতে কারো দেরি হওয়ার কথা নয়। মানুষের প্রতি ভালবাসার কারণে হলে, আমরা তাদেরকে আরো অনেক ঘটনার পরপরই একই রকম সরব হতে দেখতাম। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এই যে, এমনটা হয়নি; বরং পার্বত্য অঞ্চলের অন্য অনেক নারী নির্যাতনের ঘটনায় তারা প্রতিবাদ করেন নি।

এমনকি, কোন কোন অতি ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পরেও তাদের কোন ধরণের প্রতিবাদ বা বক্তৃতা-বিবৃতি চোখে পড়ার মতো ছিলো না। কেন জানি না, তারা মানবতাকে ভিন্ন রঙ্গে রাঙ্গিয়ে ফেলেছেন, মানবতা এখন আর তাদের কাছে দল-মত-নির্বিশেষে একই রূপে নেই। আমার মনে হয়, কয়েকটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরলেই বুঝতে পারবেন, এমন কথা আমি কেন বলছি।

এক কিশোরীকে প্রকাশ্যে মারধোর করে, পরে ধরে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে এবং তা যদি মোবাইলে ধারণ করা হয়, তাহলে কি এই প্রতিবাদীদের প্রতিবাদ করার কথা নয়? এখন যদি বলি, ঐ কিশোরী একজন চাকমা, তাহলে? আর যদি বলি, তাকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নামের একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা গহীন জঙ্গলে নিয়ে যৌন নির্যাতন করে এবং মোবাইলে ধারণ করেছে, তাহলে কি প্রতিবাদ হবে? প্রতিবাদ অবশ্য হয়েছিল; তবে, কারা করেছিলো জানেন? আজ যে সব মানবদরদী দেখছেন, উনারা নন। প্রতিবাদ করেছিল, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ; ঐ ঘটনায় পুলিশ কর্তৃক আটককৃত ‘নেতার মুক্তির দাবিতে হরতাল-অবরোধ ও বিক্ষোভ করে’।

বিশ্বাস করতে চাইবেন না, জানি। তাই অনুরোধ করবো, ২০১৬ সালের মে মাসের আয়না চাকমার ঘটনার ব্যাপারে একটু খোঁজ নেয়ার জন্যে। ঐ কিশোরীর অপরাধ- এক বাঙালি ছেলের দোকানে গিয়েছিল সে, কলেজে ভর্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে। মানবতা বা যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা এখানে প্রযোজ্য নয়; কারণ, এখানে পাহাড়ী বীরপুরুষরা নিজেরাই জড়িত, যাদের সাত খুন সব সময়ই মাফ বিশেষ করে পাহাড়ে!

৬ষ্ঠ শ্রেনিতে পড়তো এক বাঙ্গালী দিন মজুরের মেয়ে। খাগড়াছড়ির গামারীঢালার মেয়েটি ২০১৫ সালের জানুয়ারির এক শনিবার সন্ধ্যার দিকে বাড়ির পাশে গরু আনতে গেলে এক পাহাড়ি যুবক তাকে ধর্ষণের চেষ্টার মধ্যেই মেয়েটির চিৎকারে আশে-পাশের লোকজন চলে আসে এবং আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে আমি অবশ্য ঢাকায় কাউকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে শুনিনি; কোন নারীবাদী সংগঠনের সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা তো দুরের কথা।

হাসপাতালে ঐ মেয়েকে দেখতে কয়জন গিয়েছিলেন বা আদৌ গিয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্ন নিশ্চয় এখানে অবান্তর। কোন ক্লাশ বর্জন, কালো ব্যাজ ধারণ, মানব-বন্ধন বা স্মারকলিপি পেশ করার মতো কিছু করারও প্রয়োজন কেউ সম্ভবত বোধ করেননি। হয়তবা, দিনমজুর কিংবা পাহাড়ের বাঙ্গালিদের বা যাদেরকে আমরা ‘সেটেলার’ বলে জানি তাদের জন্যে মানবতা, ‘সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ বা মানবাধিকারের মতো কঠিন বিষয় প্রযোজ্য নয়!

গত বছরের জানুয়ারিতে রাংগামাটিতে রীতিমত সংবাদ সম্মেলন করে, এক নির্যাতিতা জানিয়েছিলো তার উপর চালানো অন্যাচারের লোমহর্ষক ঘটনাবলী। ‘গলায় শেকল দিয়ে বেঁধে টানা প্রায় দুই মাস ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে রাঙ্গামাটির পাহাড়ি মেয়ে জোসনা চাকমার ওপর’। কারা করেছিল জানেন? আমাদের ইউপিডিএফ এর স্থানীয় যুব সমিতির কর্মীরা। ঘটনাস্থল তো এই রাঙ্গামাটিই ছিলো। তখন না ছিল কোন ভলান্টিয়ার তার পাশে, না অন্য কেউ!

পাহাড়ের বড় নেতা দূরে থাক, কোন পাতি নেতা বা নেত্রীও জোসনা চাকমার জন্যে সহানুভূতি দেখাননি। এমনকি, কোন প্রতিবাদও করেননি। মনে হয়, উনাদের প্রতিবাদের চর্চাটা অনেকটা এরকম যে, স্বগোত্রের দূর্বৃত্তরা যাই করুক না কেন, প্রতিবাদ করা যাবে না; কারণ প্রতিবাদ অপরাধ অনুযায়ী হবে না, অপরাধী অথবা নির্যাতিতার পরিচয় অনুযায়ী হবে।

খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার ক্ষেত্রলাল ত্রিপুরার মেয়ে দীপা ত্রিপুরা ভালবেসেছিলো এক বাঙ্গালিকে। পাহাড়ে এর ফলালফল কি হতে পারে সেটা জানতো বলেই, যখন সে তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে পালাচ্ছিলো, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কিছু কর্মী তাদেরকে অপহরণ করে। পরের ঘটনাবলি পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠিত এমন অন্যান্য ঘটনাগুলোর মতোই। ছেলেটিকে  পাশের জঙ্গলে নিয়ে মারধর করা হয়। আর মেয়েটিকে শিকার হতে হয় একাধিকবার গণধর্ষণের, এমন কি তা মোবাইলে রেকর্ডও করা হয়। ঘটনাটি বেশি দিন আগের নয়, ২০১৫ সালের জুন মাসের।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতেও কোন ধরণের প্রতিবাদ করার সাহস কেউ দেখান নি। কারণ হয়তবা, পাহাড়ে নারীদের অধিকারের সংজ্ঞা ভিন্ন। আর এখানে প্রতিবাদতো করা হয় অপরাধী দেখে, অপরাধ দেখে নয়।  আয়না চাকমার মতো, দিপা ত্রিপুরার পাশেও কোন ভলান্টিয়ার ছিলো না তাকে মানসিক স্বস্তি দেয়ার জন্যে; আজ যেমন আছে বিলাইছড়ির দুই নির্যাতিতা বোনের জন্যে।

সাংগঠনিকভাবে পরিচিত রেটিনা চাকমাকে বিয়ে করায় দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা ও প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্র হয়ে যান প্রতিপক্ষ ‘বাঙালী’। অথচ দুজনই ছিলেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার।কিন্তু “চাকমাদের দৃষ্টিতে যা ভয়াবহ অন্যায় সেই পাহাড়ী-বাঙালী বিয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। সংগঠনের নেতারাও ‘বিশেষ স্বার্থে’ সৈকত-রেটিনার প্রেম-বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতার সমাধানে এগিয়ে আসেনি।

এমনকি উপজাতীয় অধিকারের পক্ষে সোচ্চার জাতীয় সংবাদপত্র প্রথমআলোও তার স্টাফ ফটোগ্রাফারের কোনো অন্যায় নেই জেনেও তার পক্ষে না দাঁড়িয়ে বরং বিশেষ মহলের চাপে চাকুরিচ্যুত করেছে।”। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, স্বয়ং সৈকত ভদ্রের ভাষ্য অনুযায়ী, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামে তোলার মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন।” ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ তারিখে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনের যদি প্রচার সীমিত হয়ে থাকে বা ২০১৫ সালের এই ঘটনা যদি আপনি না জানেন, আমি অবাক হবো না, কারণ এমন ঘটনাতো প্রচার নাও পেতে পারে !

নারীবাদী যারা আছেন, তারা তো আর কোন সংগঠনের বাইরের কেউ না, তাই কোন অজ্ঞাত কারণে কোন বিশেষ ঘটনা নিয়ে তেমন কিছু না বলাটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।একইভাবে কোন বিশেষ ঘটনা নিয়ে সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করা বা খুবই সরব হওয়াও স্বাভাবিক মনে হতেই পারে, কারো কারো বিশেষ বিবেচনায়।

বান্দরবানের রোয়াংছড়ির ১১ পাহাড়ী মারমা কিশোরীর মিয়ানমারে পাচারের ঘটনায় কয়জন ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো, মনে পড়ে না। সোশ্যাল মিডিয়াতে এ নিয়ে আদৌ কোন প্রতিবাদ বা পোস্ট ছিলো কিনা, সেটি নিয়েই আমার সন্দেহ আছে। অথচ, একজন বা দু’জন নয়, ১১ জন ‘শিশু কন্যাকে ধর্ষণের আলামত সংগ্রহ ও স্বাস্থ্যপরীক্ষা’ করতে বান্দরবান সদর হাসপাতালে ৫ সদস্যের মেডিকেল টিম কাজ করেছিলো। ভয়াবহ বিষয় হলো, “উদ্ধারকৃত পাচার হওয়া ১১ মারমা কিশোরী পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, প্রতিদিন বৌদ্ধ ভিক্ষু উসিরি তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো।” তাদের মধ্যে কমপক্ষে দুজনকে দুপাশে নিয়ে বিছানায় যেতো।

কিন্তু, ঢাকার রাজপথে কয়জন মানববন্ধন করেছিলো বা বিবৃতি দিয়েছিলো? কয়টি জাতীয় দৈনিক এই সংবাদটিকে গুরুত্ব সহকারে ছেপেছিলো? রাজশাহী বা চট্টগ্রামে কি কেউ কোন প্রতিবাদের আয়োজন করেছিলো? পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে কাজ করেন এমন কয়জন বুদ্ধিজীবী এই ঘটনায় শাহবাগে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট করেছিলেন বা বিবৃতি দিয়েছিলেন? যেহেতু এই ঘটনায় আটক করা হয়েছিলো একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ২ পাচারকারীকে, তাই তথাকথিত অনেক প্রতিবাদী, নারীবাদী বা বুদ্ধিজীবীগণ প্রতিবাদের প্রয়োজন মনে করেননি বোধ হয়। যেভাবে দুই মারমা বোনের জন্যে প্রচার হয়েছে আর আমরা প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছি, ঐ ১১ জনের জন্যে তা হয়নি আর আমরাও কিন্তু প্রতিবাদে এগিয়ে আসিনি। কারণ কি হতে পারে, তা নির্ণয়ের ভার পাঠকের হাতেই ছেড়ে দেয়া ছাড়া আমার কোন উপায় আসলেই নেই।

তাই মনে হচ্ছে, বিলাইছড়ির ঘটনা নিয়ে যত প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন, সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট, মানববন্ধন আর প্ল্যাকার্ডের ছবি দেখছি তার সবই করা হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে, শুধুমাত্র বিশেষ কাউকে ছোট করার জন্যে; নির্যাতিতার প্রতি প্রকৃত দরদ বা নারীর প্রতি আন্তরিকতা থেকে নয়। আর এজন্যেই যখন সংবাদ পাই যে, ‘বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি’– তখন  নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা ও মানবতার কারনে পাহাড়ের যে পূজনীয় ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে মাথা নোয়াতাম তাদের প্রতি ঘৃণা জন্ম হয় মনের গভীরে।

ভাবতে কস্ট হয় যে, দুইজন অসহায় মেয়ের কষ্ট আর বিশ্বাস উনারা কত সহজে নিজেদের স্বার্থে অপব্যবহার করলেন। মাটিরাঙ্গার কুলসুম আকতার, আলীকদমের  সেলতিপাড়ার পাখি আক্তার, মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম কিংবা খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণধর্ষণের শিকার হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌসদের মতো অনেক লোমহর্ষক আর ভয়াবহ ঘটনাগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেছে।

আমি জানি, যে ঘটনাগুলো আমি তুলে ধরেছি, এর বাইরেও এমন অনেক অনেক ঘটনা আছে। সেগুলোর বেশিরভাগই পাঠককুলের অজ্ঞাত। কারণ, স্বগোত্রের দূর্বৃত্ররা নারীর প্রতি কোন অন্যায় করলে, ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়; ধর্ষকের বিচার চেয়ে কোন আন্দোলন হয় না, কোনো মিছিল হয় না, পত্রিকার পাতায়ও কোনো খবর হয় না।

যেহেতু পাহাড়ের বেশিরভাগ সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধি পাহাড়ি, তাই তাদের বিবেচনায় হয়ত এ ধরনের ঘটনা সংবাদ হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না। কারণ, হয় এই ঘটনাগুলোর শিকার মেয়েরা বাঙ্গালির সাথে প্রেমের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, নয়তো পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিদের এই ঘটনাগুলোর সাথে কোন সংশ্লিষ্টতা নেই বরং পাহাড়ের উপজাতি সন্ত্রাসিরাই এগুলো ঘটিয়েছে। এমনকি এটা যদি পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় কোন বিশেষ বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত কোন অপরাধ হতো, তাহলেতো এটা নিয়ে কোন নিউজ করারও হয়ত অনেকে সাহস করতো না। যেমনটি হয়েছে, রেটিনা চাকমা, আয়না চাকমা, দিপা ত্রিপুরা বা জোছনা চাকমার ক্ষেত্রে।

লেখিকা রোকেয়া লিটার ডুমুরের ফুল নামক অভিজ্ঞতা লব্ধ গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, কোনো পাহাড়ী ছেলে যখন কোনো পাহাড়ী মেয়েকে ধর্ষণ করে তখন তথাকথিত প্রথাগত বিচারের নামে দোষী সাব্যস্ত হলে ওই পাহাড়ী ছেলেকে একটি শুকর জরিমানা করে স্থানীয় হেডম্যান/কার্বারীরা। জরিমানাকৃত শুকর জবাই করে তার রক্ত পাড়াময় ছিটিয়ে পাড়া পবিত্র করা হয় এবং জবাইকৃত শুকরের মাংস রান্না করে পাড়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খাওয়ানো হয়। এতে ধর্ষিতা মেয়েটি কি পায় বা তার নারীত্বের যে অসম্মান করা হয় সে বিষয়ে প্রথাগত বিচারের প্রণেতা ও সর্বময় কর্তা রাজা বা রাণীরা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? বরং ধর্ষিতা নারী বা তার পরিবার যদি এই বিচারে সন্তষ্ট না হয়ে রাষ্ট্রীয় আইনের আশ্রয় নিতে চান তাদেরও নিবৃত করা হয় এই প্রথাগত বিচারের কথা বলেই। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা পাহাড়ের শত শত এনজিওগুলোও কোনোদিন এদিকে নজর দেননি।

বিলাইছড়িতে সেদিন আসলে কী ঘটেছিলো সেটা সময় হলে সবাই জানতে পারবে- তবে এখন পর্যন্ত অন্তত একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে গেছে; তা হলো, পাহাড়ে যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা একই ধরণের কিন্তু আরো অনেক জঘন্য ও ভয়াবহ ঘটনার পরেও অনেক নেতা-নেত্রী ও ভলন্টিয়ারদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোন প্রতিবাদ, সংবাদ সম্মেলন বা হাসপাতালে ছুটোছুটি করতে দেখা যায়নি। সেখানে বিলাইছাড়ির দুই মারমা বোনের জন্যে উনাদের দৌঁড়াদৌঁড়ি আর যাই হোক আন্তরিকতাপ্রসূত হতে পারে না, মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণে হতে পারে না। এই মায়াকান্নার মুখোশের আড়ালে, কী লূকানো আছে, সেটি উন্মোচিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

আন্তরিকতার পরিবর্তে পক্ষপাতদুষ্ট, লোকদেখানো  বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে বিশেষ বিশেষ ঘটনায় অন্যদের উত্তেজিত করার চেষ্টাতে আর যাই হোক, ফায়দা হবে না। এসব করে, সরল পাহাড়িদের বেশিদিন বোকা বানানো সম্ভব হবে না। বরং সকলের সামনে মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যাবে– সবাই বুঝে যাবে যে, মানবতা নয় বরং অন্য কিছুই এখানে মুল নিয়ামক, যার কারণে আপনি শুধুমাত্র নির্বাচিত কয়েকটা ঘটনার প্রতিবাদে এতটা সরব, এতই উচ্চকণ্ঠী।

তাই আসুন, পাহাড়ি রঙ্গে না রাঙ্গিয়ে মানবতাকে তার প্রকৃত রঙ্গে বিকশিত হতে সাহায্য করি। রাজনীতির স্বার্থে মানবদরদী না হয়ে, একজন মানুষ হিসেবে দল-মত নির্বিশেষে প্রকৃত মানবদরদী হতে চেষ্টা করি। নারীর প্রতি সংবেদনশীলতার মত একটা স্বর্গীয় বিষয়কে ব্যক্তিস্বার্থে অপব্যবহার না করে সকল নির্যাতিতার প্রতি সমানভাবে সহানুভূতিশীল হই। প্রকৃত ঘটনা না জেনে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ঢালাওভাবে কাউকে দোষারোপ করার পরিবর্তে, সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেই আসল অপরাধীকে ধরতে এবং তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে।

বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

রাঙামাটির বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে ডাক্তারী পরীক্ষায় পুরুষ শুক্রানুর কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এমনকি তাদের শরীরে নির্যাতনেরও কোনো আলামত খুঁজে পায়নি তাদের পরীক্ষাকারী ডাক্তারগণ। তবে অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট, সনোলজিস্ট ও ফরেনসিক মেডিক্যাল এক্সপার্টের অভাবে ডাক্তারগণ চুড়ান্ত মন্তব্য করেননি। আল্ট্রা সনোগ্রাম রিপোর্টের জন্য বড় বোনের  জরায়ু ও তলপেটের রিপোর্ট পেন্ডিং রাখা হয়েছে।

এদিকে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর বয়সও ডাক্তারগণ নিশ্চিত হতে পারেননি। তাই উন্নত পরীক্ষার জন্য অভিযুক্ত কিশোরীদ্বয়কে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করার সুপারিশ করা হয়েছে। পার্বত্যনিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এই মেডিকেল রিপোর্টের ব্যাপারে মুখ খুলতে চায়নি কোনো পক্ষই।

রাঙামাটির ডেপুটি সিভিল সার্জন  নীহার রঞ্জন নন্দী জানান, দুই কিশোরীর পরিক্ষার রিপোর্ট  আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া এ রিপোর্টের ফলাফল প্রকাশ করা যাবে না বলে তিনি জানান। সিভিল সার্জন জানান, ওই কিশোরী পুলিশী হেফাজতে রাঙামাটি সদর হাসপতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, কিশোরীদের বয়স নির্ধারণের জন্য রাঙামাটিতে এক্সরে মেশিন বা উন্নতমানের ফরেনসিক মেশিন না থাকায় বয়স নির্ধারণের জন্য পুলিশি হেফাজতে কিশোরীদের চট্টগ্রামে রোববার প্রেরণের সম্ভবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোহাম্মদ সাফিউল সারোয়ার জানান, বিজ্ঞ আদালত ওই দু’কিশোরীর বয়স নির্ধারণের জন্য রাঙামাটি সিভিল সার্জনকে নির্দেশ দিয়েছে। আমরা শুধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পারি বলে তিনি জানান।

এদিকে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় নির্যাতিত দুই কিশোরীর শুনানীর দিন ৭ফেব্রুয়ারী ধার্য করেছে আদালত।

বুধবার সকালে তাদের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট  সাইফুদ্দীন খালেদের আদালতে তোলা হলে শুনানি শেষে আদালত এ তারিখ ঘোষণা করেন।

রাঙামাটি ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা: নীহার  রঞ্জন নন্দী জানান, ওই দুই কিশোরী পরিক্ষার রিপোর্ট আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) রুহুল আমীন সিদ্দিকী জানান, ওই দুই কিশোরীর বয়স নির্ধারণের জন্য আদালতে আবেদন করা হলেও এ ব্যাপারে আদালত কোন শুনানী না করে পরবর্তী ৭ফেব্রুয়ারী শুনানীর দিন ধার্য করে।

উল্লেখ্য চলতি বছরের ২২জানুয়ারী গভীর রাতে বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে সন্ত্রাসীদের ধরতে একটি অভিযান পরিচালনা করে নিরাপত্তা বাহিনী।

এরপর ওইদিন  গভীর রাতে মারমা দুই কিশোরী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযাগ তুলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায়  পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি  (জেএসএস)।

এদিকে ঘটনার পরের দিন ২৩ জানুয়ারী কে বা কারা ওই মারমা কিশোরীকে দূর্গম বিলাইছড়ি থেকে এনে রাঙামাটি জেনারেল হাসপতালে ভর্তি করায়।

ছবি- প্রতিকী

পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষণ নির্যাতন আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে

ধর্ষণ

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

বাঙালী কর্তৃক উপজাতীয় নারী নির্যাতনের বিষয়ে উপজাতীয়দের প্রচার- প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশের আড়ালে পাহাড়ের দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনা। উপজাতি কর্তৃক বাঙ্গালী নারী ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনাগুলো বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। কিন্তু কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। কোন এক অদৃশ্য ক্ষমতাবলে এসব অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এনিয়ে নিরীহ বাঙ্গালীদের মাঝে দিনের পর বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। ক্ষীণ হয়ে আসছে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশাও। অন্যদিকে একের পর এক ঘটনা করে পার পেয়ে যাওয়া উপজাতীয় যুবকদের দৌরাত্ম বেড়েই চলছে। পরিস্থিতি বর্তমানে এতোটাই খারাপ হয়েছে যে, বিভিন্ন ফেসবুক পেইজে পাহাড়ী যুবকেরা বাঙালী নারীদের সুপার ইম্পোজ ছবি পোস্ট করছে, তাদেরকে ধর্ষণের জন্য পাহাড়ী যুবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

পার্বত্যনিউজের তথ্যানুসন্ধান ও ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৩জুন মাটিরাঙ্গা উপজেলার পলাশপুর জোন সদরের কাছাকাছি দক্ষিণ কুমিল্লা টিলা এলাকায় মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা মো: আব্দুল মান্নানের মেয়ে কুলসুম আকতার (১২) নামে এক কিশোরী ধর্ষনের শিকার হয়। ঘটনার সূত্রে জানা যায়, নিজেদের বাড়ি হতে মাটিরাঙ্গা বাজারে কেনাকাটার জন্য যাবার পথে এক পাহাড়ি যুবকসহ চার যুবক তাকে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে মোহন ত্রিপুরা নামক এক ব্যক্তিকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে। এসময় অন্য তিনজন পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন তার পরিবারের পক্ষ থেকে মাটিরাঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ কর্তৃক অভিযান চালিয়ে অপর ব্যক্তিদের আটক করে।

এক্সক্লুসিভ লোগো

এ ঘটনার এক মাসের মাথায় ২৩ জুলাই মহালছড়ির মাইসছড়ি এলাকায় শাহদা বেগম (৫৫) নামে এক বাঙ্গালী গৃহবধুকে পাহাড়ী যুবক কর্তৃক ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে। সে মাইসছড়ির মো: সয়ন উদ্দীনের স্ত্রী। জানা গেছে, ঐ মহিলা তার গরু খোজার জন্য নিকটবর্তী নীলাৎপল খীসার সবজি ক্ষেতে গেলে চার পাহাড়ী যুবক তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে। পরে মহালছড়ি জোন কমান্ডার লে: কর্ণেল মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এর নেতৃত্বে সেনা সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে মহালছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেরণ ও জোনের পক্ষ থেকে চিকিৎসা বাবদ পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এ ব্যাপারে ধর্ষিতার ছেলে মো: গুলজার হোসেন মহালছড়ি থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ অভিযুক্ত লাব্রেচাই মারমা ও মাউশিং মারমা নামে দুই যুবককে আটক করে।

এ ঘটনার কয়েক মাসের মাথায় ৯ অক্টোবর মহালছড়ির শ্মশানখোলা এলাকার বাসিন্দা শামছুন্নাহার (৩০) নামে একজনকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠে। এসময় উপজাতি যুবকের দা‘র আঘাতে শামছুন্নাহারের মাথায় মারাত্বক জখম হয়। পরবর্তীতে তাকে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে ভর্তি করা হয়। এঘটনায় পুলিশী কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী খাগড়াছড়ির আলুটিলাস্থ ইমাং রেস্টুরেন্টে গণ-ধর্ষণের শিকার হয় জান্নাতুল ফেরদৌস (১৫) নামে এক বাঙ্গালী কিশোরী। সে জেলার রামগড় উপজেলার বাসিন্দা। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ঘটনার দিন জান্নাতুল ফেরদৌস বান্ধবীর বাড়ীতে যাওয়ার পথে অজ্ঞাত পরিচয়ধারী উপজাতীয় দুষ্কৃতিকারীরা তাকে অপহরণপূর্বক এই ঘটনা ঘটায়। ধর্ষণের শিকার এই কিশোরী ঘটনার পরদিন ০৫ ফেব্রুয়ারি হোটেলর ২য় তলা থেকে জানালা দিয়ে নীচে লাফ দিয়ে ধর্ষণকারীদের কবল হতে পালানোর চেষ্টা করলে গুরুতর আহত হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে। উদ্ধারের পর প্রথমে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতাল ও পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। এসময় সন্দেহভাজন হোটেল কর্মচারি রাহুল ত্রিপুরাকে (২৮) আটক করে পুলিশ।

এ ঘটনার কয়েকদিনের মাথায় ১৩ ফেব্রুয়ারী মহালছড়ি জোনের আওতাধীন থলিপাড়া এলাকায় মহালছড়ি ডিগ্রী কলেজের ছাত্রী মিতা সরকারের সাথে অসদাচরনসহ তাকে উত্যক্ত করে রামপ্রু মারমা নামে উপজাতি স্কুল ছাত্র। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ও বাঙ্গালি যুবকদের মাঝে হাতাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা জানাজানি হলে মহালছড়ি জোন ও এপি ব্যাটালিয়নের পৃথক দুটি টহলদল ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে জোন কমান্ডার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়ারম্যান, কলেজের অধ্যক্ষ, অভিযুক্ত ছাত্র রামপ্রু মারমা‘র পিতা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরণের কার্যকলাপে লিপ্ত হবে না মর্মে মুচলেকা দিয়ে সেবারের মতো রেহাই পায় বখাটে উপজাতি যুবক রামপ্রু মারমা।

এর পরপরই স্বাধীনতার মাসে (১৮ মার্চ) গুইমারার রামসু বাজারে মিসেস ফেরদৌসি বেগম (৩৫) এর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতিয় মোটরসাইকেল চালক অংচল মারমা (৩২)। প্রাপ্ত সূত্রমতে, ফেরদৌসি বেগম ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলযোগে মানিকছড়ি হতে গুইমারা বাজারে যাওয়ার পথে তার শ্ললতাহানির চেষ্টা চালালো হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে এ ঘটনা জানার সাথে সাথে গুইমারা সেনা ক্যাম্পের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সিএমএইচ-এ ভর্তি করে। পরবর্তীতে, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়রা অভিযুক্ত মোরসাইকের চালককে আটকপূর্বক গুইমারা থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করে। এ ব্যাপারে গুইমারা থানায় মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে একটি মামল করা হয়।

এরপর ৩০ এপ্রিল আলীকদম জোনের আওতাধীন গুড়রঝিরি এলাকার একটি তামাক ক্ষেতে মোছাম্মদ হুরাইরা (২৬) নামের এক বাঙ্গালি নারী উপজাতিয় যুবক মংচিং আই মারমা (৩০) কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়। জানা গেছে হুরাইরা ও তার স্বামী উক্ত তামাক ক্ষেতের শ্রমিক। তার স্বামীর অনুপুস্থিতিতে একই তামাক ক্ষেতের অপর শ্রমিক মং চিং আই মারমা উক্ত ঘটনা ঘটায়। সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এ ঘটনার ব্যাপারে লামা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পর থেকে ধর্ষক মং চিং আই মারমা পলাতক রয়েছে।

২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল পুর্বপ্রণয়ের জের ধরে মাটিরাঙ্গার গাজীনগর বটতলী এলাকার বাঙ্গালি কিশোরী সবিলা আক্তর (২৪)-কে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করে উপজাতিয় যুবক কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা (২৭)। স্থানীয়রা বিষয়টি জানলে পলায়নকৃত কৃঞ্চমাহন ত্রিপুরা ও সবিলা আক্তরকে আটক করে মাটিরাঙ্গা থানায় হস্তান্তর করে।

এর কয়েকদিনের মাথায় ৮ এপ্রিল আলকদম জোনের আওতাধীন সেলতিপাড়া এলাকায় পাখী আক্তার (৩৫) নামে বাঙ্গালী গৃহবধুর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে উপজাতি যুবক সামারি মারমা (৩৬)। উক্ত ঘটনায় স্থানীয় বাঙ্গালীরা উত্তেজিত হয়ে সামারি মারমাকে মারধর করে। পরবর্তীতে, এই ঘটনা উক্ত এলাকায় পাহাড়ি-বাঙ্গালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ঘটনা জানার পর সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নিয়োজিত রাখে।

একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী রুনা আক্তার (৭)-কে ধর্ষনের অভিযোগ উঠেছে একই বিদ্যালয়ের উপজাতি ছাত্রের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার মেয়ে শিশুটির ভাষ্যমতে জানা যায়, বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজাতীয় ছাত্র তাকে বিদ্যালয় ভবনের পিছনে নিয়ে উক্ত ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে, শিশুটির মা ও নেপচুন টি স্টেট‘র শ্রমিক কাঞ্চন মালা তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতলে প্ররণ করে। এ ব্যাপারে কাঞ্চন মালা বাদী হয়ে মানিকছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

পরবর্তীতে, মানিকছড়ি উপজেলার ইউএনও, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় বাটনাতলী ইউপি চেয়াম্যান এবং বিদ্যালয়ের পরিচালক কমিটির সদস্যবৃন্দ ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে ০১ অক্টোবর সদরখিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্ষণের শিকার শিশুটি কর্তৃক অভিযুক্ত প্রথম শ্রেণির ছাত্র রাজ কুমার চাকমাকে (১২) সনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ কর্তৃক রাজ কুমার চাকমাকে আটক পূর্বক খাগড়াছড়ি জেলে প্রেরণ করা হয়।

সমঅধিকার আন্দোলন একাংশের মহাসচিব মনিরুজ্জামান মনির পার্বত্যনিউজকে বলেন, বাঙালী কর্তৃক কোনো উপজাতি নারী নির্যাতিত হলে উপজাতি সমর্থিত বিপুল মিডিয়ার প্রচার প্রপাগাণ্ডা, প্রতিবাদ, বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু উপজাতি কর্তৃক বাঙালী নারী ধর্ষিত বা নির্যাতিত হলে সরকারের তরফ থেকে সেই তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুই একজন নামেমাত্র গ্রেফতার হলেও অল্পদিন পরই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। আর এই বিচার বছরের পর বছর ধরে ফাইলবন্দী থেকে একসময় তামাদি হয়ে যায়। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে জাতীয় গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী আন্তর্জাতিক মহল কারোরই আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। বাঙালী নারীদের ক্ষেত্রে বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে বিচার না হওয়ায়,, সম্মান কিম্বা নিরাপত্তার কারণে বাঙালীরা বিচার প্রার্থিও হয় না। ঘটনার আসল সংখ্যা কখনোই জানা যায় না।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা করে পাহাড়ের সচেতন মহল বলেন, এভাবে চলতে দেয়া যায় না। বাঙ্গালী যুবকের দ্বারা কোন পাহাড়ী নারী ধর্ষিত হলে কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবীমহল মাঠ গরমের চেষ্টা করলেও এতোগুলো ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় তাদের কোন বক্তব্য-বিবৃতি জাতি দেখেনি। পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও বাঙালীর অবস্থান নিশ্চিত করতে এ ধরণের ঘটনা রোধ করা ও সুবিচার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

আলীকদমে স্কুলছাত্রী ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা : বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে

16

আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি:
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় ৫ম শ্রেণীর এক ছাত্রী প্রায় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। পিতৃহীনা এ স্কুল ছাত্রী ও তার মা এ ঘটনাটি সমাজের সর্দারসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজের গণ্যমান্যদের জানিয়েছেন। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ সহযোগিতার হাত বাড়াননি। শেষ মেষ গতকাল সোমবার ওই ছাত্রীর মা বান্দরবান জেলা জাতীয় মানবাধিকার ইউনিটির সহায়তায় আলীকদম থানায় এজাহার দায়ের করেছেন। থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি মোঃ হোসাইন জানিয়েছেন তদন্ত করে তিনি মামলাটি রেকর্ডভূক্ত করবেন।

থানায় প্রদত্ত এজাহারে উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের নয়াপাড়া বশির সর্দার পাড়ার মৃত আহামদ হোসেনের স্ত্রী ছিরলোক বেগম (৪০) বলেন, স্বামীর মুত্যৃর পর তিনি মেয়েকে নিয়ে স্থানীয় মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে শামশুল আলম (৩৫) এর বাড়িতে সাত বছর ধরে আশ্রিতা ছিলেন। তার মেয়েটি নয়াপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী।

অভিযোগে বলা হয়, বাড়ির কর্তা লম্পট শামশুল আলম তের বছর বয়সী ওই ছাত্রীকে নানা প্রলোভন দিয়ে কৌশলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের ৮ তারিখ থেকে পরপর চারবার ধর্ষণ করে। মেয়েটি বর্তমানে সাড়ে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

এ ঘটনার বিষয়ে ওই ছাত্রীর মা উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, মহিলা মেম্বার, ইউপি মেম্বার ও সমাজের সর্দারসহ স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হন। কিন্তু এ পর্যন্ত কেউই কোন সুরাহা দেননি বলে অভিযোগ করেন স্কুল ছাত্রীর মা। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ার পর লম্পট শামশুল আলম তাকেসহ তার মেয়েকে ঘর থেকে দুইমাস পূর্বে বের করে দিয়েছেন।

এ ঘটনাটি সমাজের সর্দারসহ গণ্যমান্যদের জানিয়েছেন মা ও মেয়ে। অভিহিত হয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে উপজেলার শীর্ষ জনপ্রতিনিধিরাও। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পিতৃহীনা এ স্কুলছাত্রী ও তার বিধবা মায়ের আর্তিতে কেউ সাড়া দেয়নি।
স্কুল ছাত্রীর মা ছিরলোক বেগম বলেন, “ইউপি চেয়ারম্যান জয়নালের কাছে আমি সহযোগিতা চাই। চেয়ারম্যান বলেন, আমার উপরে একজন আছেন। তিনি হলেন উপজেলা চেয়ারম্যান। তুমি তার কাছে যাও। পরে আমি উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালামের অফিসে গেলে তিনি আমাকে দেখমাত্র বলেন, এখানে কেন, তোমরা চলে যাও”। তার এ বক্তব্যের বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

বান্দরবান জেলা জাতীয় মানবাধিকার ইউনিটির সিঃ সহ-সভাপতি কামরুল হাসান টিপু জানান, ঘটনাটি তারা জানতে পেরে স্কুল ছাত্রীটিকে আইনী সহায়তা দিতে তৎপর হয়েছেন। মানবাধিকার ইউনিটির সহযোগিতায় সোমবার ভিকটিমের মা অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৈক্ষ্যং ইউপি সদস্যা ইয়াছমিন আক্তার বলেন, সপ্তাহ দুয়েক পূর্বে বিষয়টি তিনি শুনেছেন। ভিকটিমের মা তার কাছে মৌখিক বললেও লিখিত অভিযোগ করেননি!

চৈক্ষ্যং ইউপি চেয়ারম্যান মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘ওই ছাত্রীকে আইনগত সহযোগিতা দেওয়ার জন্য ৪/৫দিন পূর্বে আমাকে ইউএনও কর্তৃক নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে ছাত্রীটি অন্তঃসত্ত্বা কিনা আমি নিশ্চিত নই। স্কুলছাত্রীর মা আমার কাছে লিখিত অভিযোগ না করায় এ পর্যন্ত সহযোগিতা করতে পারিনি’।

ছাত্রলীগ নেতা কর্তৃক রাঙামাটির বেতবুনিয়ার মারমা তরুণীকে চেতনানাশক লাগিয়ে অপহরণের চেষ্টা

9454_1

আলমগীর মানিক/জয়নাল আবেদিন,  রাঙামাটি:

রাঙামাটির কাউখালীতে কলমপতি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি কর্তৃক মারামা তরুণী স্কুল ছাত্রী মিখ্যাইচিং মারমা (১৫) কে উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে এলাকাবাসী। ২২ মার্চ সকাল ৭টায় উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের সুগারমিল পূর্ব আদর্শগ্রাম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এসময় ছাত্রলীগ- যুবলীগ কর্মীদের হামলায় মিখ্যাইচিং এর বাবা মিন্টু মারমা আহত হন। কাউখালী থানার অফিসার ইনচার্জ শ্যামল কান্তি বড়ুয়া ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। এব্যাপারে মেয়ের মা বাদী হয়ে কাউখালী থানায় মামলা দায়ের করছেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কলমপতি ইউনিয়নের আদর্শগ্রাম কোলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মিন্টু মারমার মেয়ে বেতবুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী মিচিচিং মারমা (১৫) প্রতিদিনের ন্যায় স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়। ঘর থেকে কিছুদুর আসার পর পূর্বে থেকে ওঁৎপেতে থাকা আদর্শগ্রাম এলাকার খোরশেদ মিস্ত্রি ছেলে কলমপতি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি শিহাব উদ্দিনের নেতৃত্বে লায়েক, মাসুদ, মনির, ইব্রাহীম, নুরুদ্দিনসহ ৬/৭জনের ছাত্রলীগ যুবলীগের বখাটে তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। এসময় ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি শিহাব মিখ্যাইচিং এর মূখে চেতনা নাশক লাগিয়ে দিয়ে তাকে উঠিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। মিখ্যাইচিং এর চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা তাদের উপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা চালায়।

খবর পেয়ে মিখ্যাইচিং এর বাবা থোয়াইচিং অং মারমা (মিন্টু ড্রাইভার) বিষয়টি শিহাব উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করতে গেলে সন্ত্রাসীরা তার উপরও হামলা চালায়। ঘটনার পর এলাকাবাসী তাদেরকে হাসপাতালে নিতে চাইলে সেখানেও তারা বাঁধা প্রদান করে। খবর পেয়ে বেতবুনিয়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবুল কাশেম পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে আসলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

 এখবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লে ঐ এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সদস্য অংসুপ্রু চৌধুরী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশংকায় আজ বিকেলে বেতবুনিয়ায় জরুরী বৈঠক ডেকেছেন।

এদিকে স্কুল ছাত্রী মিখ্যাইচিং মারমার মা উসাটিং মারমা জানান, শিহাব গত দুই বছর যাবৎ আমার মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার পথে উত্যক্ত করে আসছিল। এমনকি গত বছর আমার মেয়ে উঠিয়ে নিয়ে জোরপূর্বক বিতর্কিত ছবি তুলে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এসব বিষয়ে আমরা উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের কাছে বিচার প্রার্থনা করলেও গত এক বৎসর যাবৎ তার কোন সুরাহা হয়নি।

পরে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে কাউখালী থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলে স্থানীয় ভাবে মিমাংসার জন্য রাজনৈতিক চাপ থাকায় পুলিশও কোন ব্যবস্থা নেয়নি। মেয়ের মা আরো অভিযোগ করেন, শিহাবের নেতৃত্বে বখাটেরা যে কোন মূহুর্তে আমার মেয়ের বড়ধরণের ক্ষতি সাধন করতে পারে। সন্ত্রাসীরা তার পরিবারকে নিয়মিত হুমকী প্রদান করে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় আমি ও আমার পরিবার মারাত্মক নিরাপত্তহীনতায় ভূগছি।

ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে রাঙামাটি কাউখালী থানায় মামলা দায়ের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। কাউখালী থানার অফিচার ইনচার্জ, শ্যামল কান্তি বড়ুয়া জানান, তিনি শুনেছেন তবে এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোন অভিযোগ নিয়ে আসেনি বলে জানান তিনি।

এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল ও রাখাইন জনকল্যান সমিতি নামে দু’টি সংগঠন।
মেয়েটির পরিবার আরো জানায়, এই ঘটনা নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ও জেলা পরিষদের সদস্য অংসুই প্রু মারমা এই ঘটনার বিচার করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেছিলেন। পরে বেশ কয়েকবার বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়ে করেননি।

সর্বশেষ নির্বাচনের পরে এই ঘটনা নিয়ে একটি বৈঠকের কথা ছিলো কিন্তু তার আগেই আবারো মেয়েটিকে উত্যক্ত করলো বেতবুনিয়ার কলমপতি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি পদে বহাল থাকা ছাত্রলীগ নেতা শিহাব উদ্দিন।