নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে নিহত বিজিবি কর্মকর্তার ময়না তদন্ত সম্পন্ন

naikoncori Bjb pic-1

স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার:
নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে নিহত বিজিবি কর্মকর্তার ময়না তদন্ত শেষ হয়েছে। দেশের তরে প্রাণ দেয়া নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মিয়ানমার বাহিনীর গুলিতে নিহত বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমানের লাশ কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে রোববার বিকেল তিনটার দিকে আনা হয়। বিজিবি’র কর্মকর্তারা একটি বিশেষ লাশবাহী গাড়ীতে করে ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজারে আনেন।

জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সিরাজীর নেতৃত্বে তিন সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল টীম লাশের ময়না তদন্ত করে। আগামীকাল সকাল ৯ টায় নাইক্ষ্যংছড়ি বিজিবি ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টারে নায়েক মিজানের জানাযা অনুষ্ঠিত হবে।

বিজিবি’র মর্টার গোলার আঘাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ২ কর্মকর্তাসহ ৪ সেনাসদস্য নিহত: আহত ৩

08

মেহেদী হাসান পলাশ:

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়িতে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবি ও মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিপি’র মধ্যে সংঘটিত গোলাগুলিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ২ কমকর্তাসহ ৪ জন নিহত এবং অপর ৩ জন আহত হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। গত ৩০ মে সংঘটিত গোলাগুলিতে বিজিবি’র ছোড়া মর্টার গোলার আঘাতে এ ঘটনা ঘটেছে।

 

সূত্র মতে, গত বুধবার মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপি’র গুলিতে নিহত বিজিবি নায়েক সুবেদার মিজানুরের লাশ আনতে  ৩০ মে বিজিবি’র চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আহমদ হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম মিয়ানমার সীমান্তে যায়। এই টিমে আরো ছিলেন বিজিবি’র কক্সবাজার সেক্টর কমাণ্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান , নাইক্ষ্যংছড়ির ৩১ বিজিবি’র সিও লে. কর্নেল শফিকুর রহমানসহ উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ। বিজিপি কর্তৃপক্ষ এসময় বাংলাদেশ টিমকে ৫২ পিলারের সন্নিকটে যাবার আহ্বান জানালে তারা লাশ গ্রহণের নিমিত্তে ৫২ পিলার এলাকায় গমন করে। এসময় মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী সকল আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে বিজিবি’র উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে শুরু করলে আত্মরক্ষার্থে বিজিবিও গুলি করতে বাধ্য হয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধের মতো ব্যাপক গোলাগুলি চলতে থাকে। দুইপক্ষই মর্টার, রকেট লঞ্চার, মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করতে শুরু করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি স্থানীয় সূত্র পার্বত্যনিউজকে নিশ্চিত করেছে, উভয়পক্ষের এই গোলাগুলির সময় বিজিবি’র ছোড়া একটি মর্টারের গোলা মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর অবস্থানের উপর গিয়ে পড়লে ঘটনাস্থলেই দুই কর্মকর্তাসহ ৪ জন নিহত হয়। সূত্রটি আরো জানিয়েছে, পোস্টটি মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর হলে সেখানে অবস্থান নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাংলাদেশের দিকে গোলাবর্ষণ করছিল। ফলে নিহত ২ কর্মকর্তা ও ২ সদস্যের সকলেই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বলে জানা গেছে। এছাড়াও আহত অপর ৩জনও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে। তবে নিহত কর্মকর্তাদের পদবী সম্পর্কে সূত্রটি নিশ্চিত করতে পারেনি। 

সূত্র আরো জানিয়েছে, আহত তিন সেনাসদস্যকে মংডু হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। এসময় ঘটনাটি গোপন রাখতে মংডু হাসপাতালের নিরাপত্তা  ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়। তবে আহতদের শারিরীক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়া গত রাতে তাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

তবে মিয়ানমারের কোন কর্তৃপক্ষ এ খবরের সত্যতা স্বীকার করেনি। কিন্তু বাংলাদেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় গোযেন্দা সূত্র পার্বত্যনিউজকে এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

 

আরও খবর

নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এবং কক্সবাজার নিয়ে

 কি ঘটবে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন সংশোধন প্রস্তাব কার্যকর হলে?

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলিতে আরো ৪ বিজিবি সদস্য নিখোঁজ (ভিডিওসহ)

মর্টার, রকেট লঞ্চারের মতো ভারী অস্ত্র ব্যবহার করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী: নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে সীমান্তবাসী

মমম

মেহেদী হাসান পলাশ/ নুরুল আলম সাঈদ:

অপহৃত নায়েব সুবেদার মিজানের লাশ ফেরত নিতে আহ্বান জানিয়ে অপেক্ষমান বিজিবির কর্মকর্তা ও জওয়ানদের লক্ষ্য করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী,  কমান্ডো ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিবর্ষণ করে। এসময় বিজিবিও আত্মরক্ষার্থে গুলিবর্ষণ করে। ফলে উভয় পক্ষের পাল্টা গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ঘটনায় আরো চারজন বিজিবি সদস্য নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে নিখোঁজের ব্যাপারে বিজিবির কোন কর্মকর্তারা স্বীকার করেননি।

 

গতকাল ৩০ মে দুপুর ২.৩০ ঘটিকায় ৫২ পিলার এলাকায় কোন আলোচনা ছাড়াই এ ঘটনা ঘটে। এই খবর নিশ্চিত করেছে নাইক্ষ্যংছড়ি বিজিবি। এদিকে গত বুধবার বিজিপির গুলিতে নিহত বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমানের মরদেহ মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ফেরত দেয়নি। উল্টো বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকে লক্ষ্য করে ব্যাপক গুলি ছুড়েছে মিয়ানমারের পুলিশ বাহিনী বিজিপি  ও তাদের সেনাবাহিনী  এবং স্পেশাল কমান্ডো বাহিনী। তবে এ ঘটনার পর থেকে সীমান্ত টহল জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাইক্ষ্যংছড়ি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক লে: কর্নেল শফিকুর রহমান।

সীমান্তে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘঠনার কারনে পুরো সীমান্ত এলাকায় আতংক বিরাজ করছে। মিয়ানমার পক্ষ থেকে মর্টারসেল, রকেট লঞ্চার প্রভৃতি ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে গোলা নিক্ষেপ করার পর ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ৪জন বিজিবি সদস্য নিখোঁজ রয়েছে । এরা হলেন, হাবিলদার মোতালেব, ল্যান্স নায়েক বাতেন, সিপাহী আমিনূল এবং জাহাঙ্গীর। বিজিবি’র ৬০ জনের টহলদলের সাথে ৫৬ জন ফেরত আসলেও বাকী ৪জন ফেরত আসেনি ।

সীমান্তে রণসজ্জা

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের পার্বত্য নাইক্ষ্যংছড়ির দূর্গম পাহাড়ী জনপদ পাইনছড়ি ৫২নং পিলার এলাকায় বিজিবি নিয়মিত টহলদানকালে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ বিনা উস্কানিতে বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে ৩ শতাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করার ঘটনায় মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে রণসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে বলে নিভর্রযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। মিয়ানমার মংডু শহরের বলি বাজার, ফকিরা বাজার, ওয়ালিদং, তুমরু ও ঢেকিবনিয়া সীমান্ত এলাকায় ১নং ও ২ নং সেনাবাহিনীর সেক্টরে তারা অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় অঘোষিত কারফিউ চলছে। এমনকি বিজিবি সদস্যরা এ মুহুর্তে ক্যাম্প ছেড়ে কোথাও যাচ্ছে না।

জানা গেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বিজিপি’র বাউন্ডুলা ক্যাম্প এলাকায় তাদের দেশের দুই শতিাধিক কমান্ডো বাহিনী মোতায়েন করেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, মিয়ানমান সেনাবাহিনীর অবস্থান পাহাড়ের উপর এবং বিজিবি’র অবস্থান পাহাড়ের নীচে হওয়ায় কৌশলগতভাবে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সূত্রটি আরো জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের আশেপাশে বসবাসরত মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠীভূক্ত উপজাতি জনগোষ্ঠীর কারণে বিজিবি’র অবস্থান মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা জেনে যাচ্ছে।

এর আগে শুক্রবার সকালে মিয়ানমার নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু সীমান্তের ওপারে তিন শতাধিক সেনা সদস্য মোতায়েন করলে বাংলাদেশও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করায় ঘন্টা দুয়েক পর তারা সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় একটি ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগ্রেড মোতায়েন করেছে।

বুধবারে পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিপির গুলি বর্ষণে ওই ক্যাম্পের নায়েক মিজানুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে বলে সরকারী দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী তার লাশ মংডু হাসপাতালে হস্তান্তর করেছে বলে জানা গেছে। তবে তারা স্থানীয় গণমাধ্যমে এ লাশের পরিচয় আরএসও সদস্য বলে প্রচার করছে।

বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) তার লাশ শুক্রবার সকালে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিজিবির হাতে হস্তান্তর করার কথা জানিয়ে পত্র পাঠালেও এ রিপোর্ট লেখাকালীন সময় সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিজিবির কর্মকর্তার লাশ ফেরত দেয়নি মিয়ানমার। এ উদ্ভুট পরিস্থিতিতে উখিয়া-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের মধ্যে বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। যার ফলে উভয় সীমান্ত এলাকা জনমানব শূন্য হয়ে পড়েছে।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সদ্য স্থাপিত পাইনছড়ি বিওপি ক্যাম্প থেকে গত বুধবার একদল বিজিবি নিয়মিত টহলের উদ্দেশ্যে বের হয়ে দোছড়ি ও তেছড়ি খালের সংযোগস্থলে পৌছঁলে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিয়ানমারের ওপার থেকে বিজিপি তাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় বিজিবি সদস্যরা দিক-বেদিক ছুটাছুটি করে পালিয়ে গেলেও দায়িত্বরত নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়।

ঘটনাস্থল থেকে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ জাতিসংঘের কনভেনশন আইন অমান্য করে বাংলাদেশ সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় অনুপ্রবেশ করে অস্ত্র ও গোলা বারুদসহ তাকে নিয়ে যায়। যে কারণে এখনো পর্যন্ত ওই বিজিবি কর্মকর্তা নিখোঁজ রয়েছে।  স্থানীয়রা জানান, যেহেতু ঘটনাস্থলে রক্তের আলামত দেখা গেছে তাই মনে করা হচ্ছে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন।

উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালের শেষের দিকে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী তৎকালীন নাসাকা বাহিনী অর্তকিতভাবে ঘুমধুমের রেজু ফাত্রাঝিরি বিজিবি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে এক বিজিবি সদস্যকে নিহত করে অস্ত্র ও গোলা বারুদ লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনাকে পুঁজি করে মিয়ানমার থেকে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ ঘটে।

ধারণা করা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের আবারো বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে মিয়ানমারের বিজিপি সদস্য সীমান্তে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে বার বার গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। বর্তমানে ওই সময় চলে আসা বৈধ ও অবৈধ প্রায় ৩ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অবস্থান করছে। এছাড়াও বিজিবির চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিনিয়ত সীমান্ত পেরিয়ে অহরহ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আশ্রয় নিচ্ছে।

গতকাল শুক্রবার সকালে সীমান্ত এলাকা সরজমিন ঘুরে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বাইশপারি ৪১ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকায় মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের গুলি বর্ষনের ঘটনায় স্থানীয় জনমনে আতংক বিরাজ করছে। ঘুমধুম বিজিবির সুবেদার সাহাব উদ্দিন জানান, সীমান্তের উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে লোকজন আতংকগ্রস্ত হয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। যে কারণে সীমান্তের উভয়পাড়ে মানব শুন্য হয়ে পড়েছে। রেজু আমতলী ক্যাম্পের সুবেদার মোঃ সোহরাব হোসেন জানান, বিজিপির গুলি বর্ষনের ঘটনার পর থেকে সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিজিবি সদস্যদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কঠোর সর্তক রাখা হয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম জানান, গতকাল শুক্রবার পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে নিহত বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের লাশ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বিকাল পর্যন্ত ফেরত দেয়নি। কক্সবাজার ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল খন্দকার সাইফুল আলম বলেন, বুধবারে পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় গুলি বর্ষনের ঘটনার পর থেকে আমার নিয়ন্ত্রনাধীন ১৮ হতে ৪০ নং সীমান্ত পিলার পর্যন্ত সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং তাদেরকে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, মিয়ানমার আগে থেকে সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত দু’দেশের মধ্যে সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে একটি বৈঠক আগামী ৩ জুন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডুতে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাফায়াৎ মুহাম্মদ সাঈদুল ইসলামের নিকট বিজিবির উপর গুলি বর্ষনের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুক্রবারও পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার বিজিপি সদস্যরা আবারো দফায় দফায় গুলি বর্ষন অব্যাহত রেখেছে। যে কারণে বিজিবির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকায় যোগাযোগ করতে না পারায় বিস্তারতি জানানো সম্ভব হচ্ছে না। বিজিবি’র চট্টগ্রাম রিজিয়নের কমান্ডার ব্রি. জে. আহমদ হোসেন পার্বত্যনিউজকে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে টেলিফোনে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। কক্সবাজার বিজিবির সেক্টর কমান্ডর খোন্দকার ফরিদ হাসানের মুঠোফোনে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

দৌছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রশিদ আহমদ বলেন, পাইনছড়ি এলাকায় বিজিপি আবারো শুক্রবারে গুলিবর্ষণ করার ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় পূর্ব নির্ধারিত পতাকা বৈঠক হয়নি। ফলে লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়াও স্থগিত হয়ে যায়। উপরোন্ত সীমান্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নিহত নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের মরদেহ ফিরিয়ে আনতে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের সঙ্কটকে দায়ী করেছেন বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। লোক মারফত যোগাযোগের ফলে দু’দেশের ভুল বুঝাবুঝিতে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে বলে শুক্রবার রাতে গণমাধ্যমকে বলেছেন। 

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এ ঘটনায় মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ মায়ো মিন্টথানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে কৈফিয়ত তলব করা হয়।

 

নাইক্ষ্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে চরম উত্তেজনা : মিয়ানমারের বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন, গুলিবর্ষণ

Bandarban

মেহেদী হাসান পলাশ:

নাইক্ষ্যংছড়ির বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৫০-৫২ নম্বর পিলার এলাকার বিপরীতে প্রায় যুদ্ধাবস্থায় সৈন্য সমাবেশ করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের(বিজিপি) পাশাপাশি দুই হাজারেরও অধিক সেনা সদস্য মোতায়েন করেছে সেদেশের সেনাবাহিনী। অন্যদিকে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলা ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশও অতিরিক্ত সংখ্যক বিজিবি সদস্য ও কিছু সেনাসদস্য মোতাযেন করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। সীমান্তে টহলও বৃদ্ধি করা হয়েছে।

 

এদিকে গতকাল মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আক্রমণের সময় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নবগঠিত পাইনছড়ি বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমানের এখনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে বিজিবি’র ধারণা বিজিপি’র আক্রমণে আহতা হওযার পর তাকে বিজিপি সদস্যরা তাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে টেনে নিয়ে গেছে। তাঁকে ফিরে পেতে এবং উদ্ভুত পরিস্থিতির সমাধানে ২৮ মে বিকাল ৪.০০ ঘটিকায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ’র নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে . কর্ণেল সফিকুর রহমান মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ( বিজিপি) মংডু ২নং সেক্টরের কমান্ডার থিংকোকো বরাবরে পতাকা বৈঠকের জন্য পত্র প্রেরণ করে। কিন্তু এ পত্রের কোনো উত্তর দেয় নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

এদিকে গতকাল ২৯ মে সকাল ১১.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহিরমাঠ এলাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করে। আয়োজন সম্পন্নের পরও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) পতাকা বৈঠকে আসেনি। মিয়ানমারের উত্তরের আশায় সকাল ৯.০০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করেছে বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি)’র কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসান, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্ণেল সফিকুর রহমান, উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেনসহ বিজিবি ও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ।

বিজিবির নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সফিকুর রহমান এ তথ্য স্বীকার করে  জানান, সীমান্তের উদ্ধুত পরিস্থিতি নিয়ে পতাকা বৈঠকের আহবান করা হয়েছে। কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠকের জন্য পাইনছড়ি এলাকায় বিজিবি তাবু টাঙ্গানো হলেও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বিজিবি বৈঠকের সাড়া দেয়নি।

এদিকে সীমান্তের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবি’র নায়েক মিজানুর রহমানকে টেনে মিয়ানমারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে তার শরীরে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে আরো কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এরপর তার দেহ মংডু হাসপাতালে হস্তান্তর করে। সীমান্ত ব্যবসায়ীরা জানায়, মিয়ামমানের স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে বিজিবির নায়েককে আরএসও বা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের সদস্য বলে প্রচার করা হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে বিজিপি কর্তৃপক্ষের একটি সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে তা স্থগিত করে তারা। তবে স্থানীয় নিরাপত্তা সূত্রগুলো এ খবর শুনেছেন বললেও নিশ্চিত করতে পারেননি বলে জানায়।

এদিকে গতকালও মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দুই দফায় বিজিবির অবস্থান লক্ষ্য করে গুলী বর্ষণ করেছে। গতকাল ২৯ মে বৃহস্পতিবারও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দৌছড়ি ইউনিয়নের সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহিরমাঠ এলাকার বিপরীতে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিজিপি’র ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যদের লক্ষ্য করে ৭০-৮০ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। বর্তমানে মায়ানমারের ওই ক্যাম্পে ৫ শতাধিক মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) অবস্থান করছে । সেই সাথে বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে গতকাল রাত আনুমানিক ৮ ঘটিকার দিকে মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীবাহিনী পুণরায় বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে গুলি বর্ষণ করে। প্রায় ২০ মিনিট ধরে তারা গুলি বর্ষণ করে। গোলাগুলীর পর বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে দুইটি ডেডবডি পড়ে থাকতে দেখা গেছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। স্থানীয়রা তাদের আরএসও সদস্য বলে জানিয়েছে। তবে ঘটনাস্থল অত্যন্ত দূর্গম পাহাড়ী অঞ্চল হওয়ায় রাতের অন্ধকারে সেখানে অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি বলে মৃতের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তা সূত্রগুলো গুলিবষর্ণের বিষয়টি স্বীকার করলেও অনুসন্ধান ছাড়া মৃতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। আজ দিনের আলোয় অনুসন্ধান শেষে তারা মৃত্যু বিষয়ে যে কোনো তথ্য দিতে পারবেন বলে নিশ্চিত করেছেন।

কেন এই উত্তেজনা

প্রায় এক যুগ পর আবারো বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমার সরকার কর্তৃক নিজ দেশের মুসলমানদের উপর নজিরবিহীন নিপীড়ন চালানোর প্রতিবাদে আরাকানের মুসলমানদের কিছু সদস্য মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষায় স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে। তাদের একটি সশস্ত্র গ্রুপের নাম রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে একাধিকবার মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে আরএসও সদস্যদের বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। গত ১৩ মে বাইশফাড়ী সীমান্তের ৩৮ ও ৩৭ নং পিলারের কাছে মুরুইঙ্গার ঝিড়ি এলাকায় সকালে কিছুক্ষণ পরপর গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এতে ওই এলাকার লোকজনদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় পাড়া প্রধান (কারবারী) ক্যহ্লাচিং জানান, সকাল ৭টার দিকে বেশ গোলাগুলি হয়েছে। তারা শুনেছেন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাথে সে দেশের দের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়। এছাড়াও আশারতলি ও বাশিফাঁড়ি এলাকায়ও সংঘর্ষ হয় বলে জানা যায়।

মিয়ানমারের সূত্রগুলো এ ঘটনায় ৪ সেনাসদস্য নিহত হওয়ার তথ্য স্বীকার করলেও স্থানীয় সীমান্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছে, এ ঘটনায় কমপক্ষে ১০-১২ জন মিয়ানমার সেনা সদস্য নিহত হয়। ফলে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা এ ঘটনার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করে। তারা মনে করে আরএসও সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আশ্রয়, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ কঠোরভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে সবসময়।

এদিকে সীমান্তে এ ধরণের তৎপরতা দমন নিয়ে গত ২২ মে  বুধবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির লেম্বুছড়ি সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিজিবি ও মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর বিজিপির (বর্ডার গার্ড পুলিশ) মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। লেম্বুছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের কাছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাহির মাঠ এলাকায় এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের বিজিবির পক্ষে নেতৃত্ব দেন কক্সবাজারের বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হোসেন। মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপির পক্ষে নেতৃত্ব দেন মংডু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল টিং কোকো। বৈঠকে নাইক্ষ্যংছড়ি কক্সবাজার ও টেকনাফের ব্যাটালিয়ন কমান্ডারগণসহ বিজিবি ও বিজিপির স্থানীয় উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী বাহিনীর তৎপরতা ও মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সাথে সংঘর্ষের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মায়ানমারের বিজিপির পক্ষ হতে বৈঠকে জানানো হয়, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশের ভূখন্ড ব্যবহার করে তাদের উপর হামলা করছে। সন্ত্রাসীদের কোনভাবেই যাতে সীমান্ত এলাকা ব্যবহারের প্রশ্রয় দেয়া না হয় তার জন্য বিজিবির কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ করে মায়ানমারের বিজিপির কর্মকর্তা। তারা জানায়, এর পর থেকে কোন ঘটনা ঘটলে তারা বিজিবি’র সাথে সম্পর্ক রাখবে না।

২২ মে অনুষ্ঠিত এই পতাকা বৈঠকের পর থেকেই মিয়ানমার সরকার তার দেশের সীমান্তে বিজিপি’র সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিতে থাকে। তাদের এ অবস্থানের বিপরীতে বাংলাদেশও সীমান্তে টহল জোরদার করে। দেশীয় একটি গোযেন্দা সংস্থাও বিজিবিকে তাদের উপর মিয়ানমার বাহিনীর অতর্কিত হামলা হতে পারে বলে আগাম তথ্য দিয়েছিল বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৮ মে  বুধবার সকাল ৯.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দূর্গম দৌছড়ি ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাইনছড়ি এলাকায় (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিবি বিওপি ক্যাম্পের কাছাকাছি স্থানে এসে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিপি শতাধিক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে । বিজিপি বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে আগে থেকে এমবুশ করে ছিল।

নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বিজিবির আওতাধীন দোছড়ি বর্ডার অবজারবেশন পোস্টের (বিওপি) সৈনিকরা ৫২নং সীমান্ত পিলার এলাকায় বুধবার সকাল ৯টার দিকে নায়েক সুবেদার জমির উদ্দিন এর নেতৃত্বে ২০ জন সৈনিক নিয়মিত টহল দেয়াকালে বিনা উষ্কানিতে মিয়ানমারের ওপার থেকে উপর্যপুরী গুলি ছোঁড়া শুরু করে বিজিপি। প্রায় ৪৫ মিনিট পর্যন্ত এই গুলি বর্ষণ চলে বলে জানা যায় । এছাড়া মায়ানমার সীমান্তের ৫২ পিলারেও এ ঘটনা ঘটে ।

তবে স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, ৫২ পিলার এলাকায় বিজিপি নয় মিয়ানমার সেনা অবস্থান রয়েছে। তাই এ হামলা বিজিপি নয় মিয়ানমার সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। তাদের সাথে ৯৬৯ নামের একটি বৌদ্ধ মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠী মিলিত হয়ে বিজিবির উপর আক্রমণ চালায়। আকষ্মিক হামলার মুখে টহলরত বিজিবি দল আত্মরক্ষার অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় দুই বিজিবি সদস্য নিখোঁজ হয়। পরে ঘটনাস্থলে তল্লাসি চালিয়ে বিজিবি সদস্যরা নিখোঁজ একজন, অস্ত্র উদ্ধার করলেও পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান এলএমজি ও ১২০ রাউন্ড গুলিসহ ঘটনাস্থল থেকে নিখোঁজ হয়ে যান । নিখোঁজ মিজান কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ভেলা নগর এলাকার বাসিন্দা।

 এ বিষয়ে ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেন বলেন, বিজিবি’র পাইনছড়ি বিওপি’র দায়িত্বরত সীমান্তের টহল দলের উপর মায়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ অতর্কিত গুলি চালায় । ১০০-১৩০ রাউন্ড পর্যন্ত গুলি চালায় । এর পর পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান নিখোঁজ হয়ে যান। 

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক মো. মিজানুর রহমানকে আটক ও সীমান্তে নির্বিচারে গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থানকে বৃহস্পতিবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) মুস্তাফা কামাল মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠান। তিনি অবিলম্বে বিজিবির নায়েক মো. মিজানুর রহমানের মুক্তির দাবি জানান। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি চিঠি হস্তান্তর করেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগামী দিনে এ ধরনের তৎপরতা রোধে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিউ মিন্ট থান এ সময় সচিবকে আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়টি মিয়ানমারের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। মিয়ানমার থেকে জবাব পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে তা জানাবেন।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, চলমান অবস্থায় তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বাংলাদেশ জিরো লাইন বরাবর কারফিউ জারী করেছে। উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আলীকদম রিজিয়ন থেকে ৪০ জন সেনা ও ৩১ এবং ৫০ বিজিবি থেকে বাড়তি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সীমান্ত এলাকায়। সীমান্তে প্রচণ্ড উত্তেজনা বিরাজ করছে।

 

নাইক্ষ্যংছড়ির নিখোঁজ বিজিবি সদস্য উদ্ধার হয়নি : পতাকা বৈঠকে সাড়া দেয়নি মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী

pic-1

নুরুল আলম সাঈদ, নাইক্ষ্যংছড়ি:

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দূর্গম দোছড়ি ইউনিয়নের মায়ানমার সীমান্তবর্তী পাইনছড়ি এলাকায় (বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন) বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বর্ডার গার্ড পুলিশ) বিজিপি কর্তৃক গুলিবর্ষণ ও  ওই এলাকার নবগঠিত পাইনছড়ি বিওপি’র নায়েক মিজানুর রহমান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ।

 

এই ঘটনার উত্তরণের জন্য গত ২৮ মে বিকাল ৪.০০ঘটিকায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি) ’র নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ(বিজিপি) মংডু ২নং সেক্টরের কমান্ডার থিং কো কো বরাবরে পতাকা বৈঠকের জন্য পত্র প্রেরণ করে । কিন্তু এ পত্রের কোনো উত্তর দেয়নি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।

বিজিবি গতকাল ২৯ মে সকাল ১১.০০ ঘটিকায় নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহির মাঠ এলাকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের জন্য সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করে । আয়োজন সম্পন্নের পরও মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) পতাকা বৈঠকে আসেনি । সকাল ৯.০০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল  বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন (বিজিবি)’র কক্সবাজারের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল খন্দকার ফরিদ হাসান, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান, উপ-পরিচালক (এডি) মোশারফ হোসেনসহ বিজিবি ও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ ।

বাংলাদেশ সীমান্তের প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্টে অতিরিক্ত বিজিবি ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে । নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে .কর্ণেল সফিকুর রহমান বলেন, মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী জেনেভা আইন লংঘন করেছে । সীমান্ত আইন অনুযায়ী সীমান্তের জিরো পয়েন্ট এলাকায় উভয় দেশের পতাকা নিয়ে সশস্ত্র টহলরত অবস্থায় কোন সেনা, সৈন্য ও সীমান্তরক্ষীকে গুলি বা অপহরণ করা যাবে না । এই আইন লংঘন করে গুলি চালায় এবং এক বিজিবি সদস্যকে অপহরণ করে নিয়ে যায় । এই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রভাবিত করতে মায়ানমার সরকার তাদের টিভি, রেডিওসহ সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করছে , বাংলাদেশর দূর্গম সীমান্তে এক সশস্ত্র মুজাহিদ আটক ।

এদিকে গতকাল নিখোঁজ বিজিবি সদস্য নায়েক মিজানুর রহমান এর খবরাখবর নেওয়ার জন্য তার ভাই, ভাই পো, চাচাসহ নিকট আত্মীয়রা নাইক্ষ্যংছড়িস্থ ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের জোন সদরে আসেন । উদ্ধার অভিযান, উদ্ভুত পরিস্থিতি সমাধানের জন্য আলীকদম রিজিয়ন থেকে ৪০ জন সেনা ও ৩১ এবং ৫০  বিজিবি থেকে বাড়তি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে সীমান্ত এলাকায় । রাত ৮.০০ ঘটিকা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলছে ।

এদিকে গতকাল ২৯ মে বৃহস্পতিবারও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দৌছড়ি ইউনিয়নের সীমান্তের ৫০নং পিলারের নিকটবর্তী বাহির মাঠ এলাকার বিপরীতে মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিজিপি’র ক্যাম্প থেকে বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যদের লক্ষ্য করে ৭০-৮০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে । বর্তমানে মায়ানমারের ওই ক্যাম্পে ৫ শতাধিক মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) অবস্থান করছে । ওই এলাকায় যুদ্ধাভাব বিরাজ করছে । বিজিবি ও সেনা সদস্যগণ সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করছে । সীমান্তে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে । জিরো পয়েন্টে কারফিউ জারি করা হয়েছে ।

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বিজিবিকে লক্ষ্য করে বিজিপির গুলি: সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার

Bandarban pic-28.5.2014

স্টাফ রিপোর্টার:

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি ইউনিয়নের বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তের ৫২ নম্বর পিলার এলাকায় বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়েছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী পুলিশ বাহিনী বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ)।

 

বুধবার সকাল ৯ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এতে সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং বিজিবি করণীয় নির্ধারণে জরুরী বৈঠক শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বিজিবির কক্সবাজার কমান্ডার কর্নেল ফরিদ।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সকাল ৯টার দিকে দোছড়ি ইউনিয়নের ৫২ নম্বর পিলারের কাছে বিজিবি সদস্যদের ওপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে বিজিপি। এর আগে, গত বৃহস্পতিবার সকালে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম ইউনিয়নের রেজুপাড়ায় ৪১ নং পিলারের কাছে বিজিবির টহল দল লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। মিয়ানমারের কাছে প্রতিবাদপত্র পাঠিয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি

উল্লেখ্য, গত ২১ মে নাইক্ষ্যংছড়ির লেম্বুছড়ি সীমান্তে বিজিবি ও বিজিপির  মধ্যে পতাকা বৈঠকে সীমান্ত এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে আলোচনা হয়।

নাইক্ষ্যংছড়ির ৯টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে আসছে ইয়াবা : প্রকৃত ইয়াবা ব্যবসায়ীরা ধরাছোয়ার বাইরে

pic-19,05.14

নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি:
বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৯টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে মায়ানমার থেকে আসছে ইয়াবা । বর্তমানে ওই পয়েন্ট গুলিতে ১২টি চোরাচালানী সিন্ডিকেট সক্রিয় । জানা যায়,সীমান্তরক্ষী ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে আড়াল করে ইয়াবা পাচারকারীরা নাইক্ষ্যংছড়ির সীমান্ত পয়েন্ট গুলোকে নতুন পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে । বর্তমানে  নাইক্ষ্যংছড়ির  ৯টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বানের স্রোতের মত আসছে ইয়াবা, অস্ত্র ও হরেক রকম বিদেশী মাদক । ফলে বাংলাদেশ- মিয়ানমার- থাইল্যান্ড- লাউস ভিত্তিক আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত মাদক ও অস্ত্র পাচারের অন্যতম রুট ফের চাঙ্গা হয়ে উঠেছে ।

অনেক দিন ঝিমিয়ে থাকার পর এই রুট দিয়ে ব্যাপক হারে অস্ত্র,ইয়াবা ও মাদক পাচার শুরু হয়েছে । অন্যদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি, টেকনাফ,উখিয়ার মধ্য বয়সী ও টিনেজ ছেলেরা কাচাঁ টাকার লোভে এসব মাদক পাচারের কাজে ব্যবহ্নত হচ্ছে বলে জানা গেছে ।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মায়ানমার সীমান্ত ৯টি সীমান্ত পয়েন্টে বর্তমানে ১২টি চোরাচালানী চক্র সক্রিয়ভাবে ইয়াবাসহ মাদক পাচারে জড়িত রয়েছে । সিন্ডিকেটগুলো হচ্ছে, দেলোয়ার -কামাল সিন্ডিকেট , সাইফুল-লাইতুচিং সিন্ডিকেট , উজ্জ্বল -আলী হোসেন সিন্ডিকেট, বিষ্ণ কুমার দাশ – জয়নাল সিন্ডিকেট, মৌলভী সালেহ- ফয়েজ উল্লাহ সিন্ডিকেট, ইউনুছ-নুর হোসেন মেম্বার সিন্ডিকেট ,ক্যারালা অং- সেলিম সিন্ডিকেট, মেকানিক নুরুল আলম-সালেহ আহমদ সিন্ডিকেট, ফরিদ উল্লাহ-মৌলভী শাহজাহান সিন্ডিকেট , সুমন-মো. নুর সিন্ডিকেট, শামসুল আলম- ইকবাল সিন্ডিকেট, রফিক-লিটন সিন্ডিকেট। প্রত্যেক সিন্ডিকেটের সদস্য সংখ্যা ১০-১২ জন ।

জানা যায়, এসব পাচারকারীরা আশারতলীর (৪৭ নং পিলার) পর্দান ঝিরি থেকে এই ইয়াবা সংগ্রহ করে । পরে বাইক যোগে উপজেলা সদরের মসজিদ ঘোনা মজুদপূর্বক সুযোাগ বুঝে সিন্ডিকেটের অপর সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় পাচার করে দেয় । উল্লেখিত ব্যক্তিরা প্রতিরাতে বাইকের সিট কভারের ভিতর ,পাজারো, মাইক্রো, জিপ বাস যোগে ইয়াবা পাচার করে আসছে ।

পয়েন্টগুলো হচ্ছে, চাকঢালার ৪৩ নং সীমান্ত পিলার, দ : চাকঢালার কাসিম এর বাড়ী এলাকা, আশারতলীর ৪৪ নং, চেরারকূলের ৪৫ নং , কম্বনিয়ার ৪৬ নং, ৪৭ নং পর্দান ঝিরি , ৪৮ নং ফুলতলী , ৪৯ নং ভাল্লুখ খাইয়া , দৌছড়ির পাইন ছড়ি ৫২ নং, ৫১ নং কোলাচি , ঘুমধুমের বাইশ ফাড়ি,তুমরু । জানা যায়, সোনাইছড়ির লাইতুছিং মার্মা ও ওই এলাকার ফখরুল আলমের পুত্র সাইফুল ইসলাম চাকঢালার ৪৩ নং পিলার দিয়ে ফরিদের মাধ্যমে সিএনজি যোগে প্রথমে জারুলিয়াছড়ি পরে সোনাইছড়ির মারিগ্যা পাড়া দিয়ে থোয়াইঙ্গা কাটাঁ দিয়ে কক্সবাজার পাচার করে দেয় ।

সোনাইছড়ির বাসিন্দা ও বান্দরবান জেলা আওয়ামীলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যানিং মার্মা বলেন, সোনাইছড়ির মারিগ্যা পাড়া দিয়ে থোয়াইগ্যা কাটাঁ ইয়াবা পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে । গুটিকয়েক ব্যক্তি এই ব্যবসা করে সুন্দর এই উপজাতীয় এলাকাটির পরিবেশ নষ্ট করছে ।  প্রধান সড়কে তল্লশি জোরদার করা হলে ,ইয়াবা ব্যবসীরা দৌছড়ির পাইন ছড়ি,কোলাচির সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা সংগ্রহ করে কৌশলে কক্সবাজার, চট্রগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের প্রভৃতি জায়গায় পাচার করে দেয় ।

সম্প্রতি ওই এলাকা থেকে ইয়াবা পাচার কালে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদরের ফজল কবিরের পুত্র ইকবালকে চট্রগ্রাম ডিবি পুলিশ আটক করে । ইয়াবা পাচারে মায়ানমার সীমান্তবর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার শতাধিক অল্প বয়সী যুবক, ছাত্র, বিবাহিত-অবিবাহিত নারী, সরকার দলীয় শতাধিক নেতা-কর্মী, টেকনাফ-উখিয়ার ৫জন সাংবাদিক, কিছু সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে সরকারী ৪/৫টি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় ।

গত ৬ মে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার ইয়াবা পাচার ও ইয়াবা পাচারে সহযোগিতাকারীদের একটি প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদন নিয়ে খোদ পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দ্বিমত পোষণ করেন । ওই প্রতিবেদনে প্রকৃত ইয়াবা ব্যবসায়ী ও পাচারে সহযোগিতাকারীগণ ধরাছোয়ার বাইরে থেকে গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায় । এই প্রতিবেদন নিয়ে পুলিশ বাহিনীতেও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে ।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার দেবদাশ ভট্রাচার্য বলেন, কক্সবাজার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ইয়াবা পাচারে সহযোগিতাকারীদের তালিকা থেকে রেহায় দিতে এই বিভান্তিকর প্রতিবেদন প্রকাশ করে । প্রতিবেদনে নাইক্ষ্যংছড়ির ওসিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে । মূলত: নাইক্ষ্যংছড়ির ওসি রফিকুল ইসলাম গত ২০১২ সালের বৌদ্ধ মন্দির হামলার পরবর্তী ওই উপজেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ওই মামলা গুলির আসামীদের ধরতে চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে তাকে নাইক্ষ্যংছড়ি থানায় পাঠানো হয় । পুলিশ বাহিনীতে ওসি রফিকুল ইসলামের দীর্ঘ সুনাম রয়েছে ।

এছাড়া ২০১০ সালে কক্সবাজার জেলার উখিয়ার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ’র দায়িত্বপালনকালে উখিয়া এলাকায় ৩টি অস্ত্রসহ ৯জন দুর্ধষ ডাকাতকে হাতে নাতে আটক করার পুরস্কার হিসেবে প্রধানমন্ত্রী পুলিশের সর্বোচ্চ  পিপিএম পদক প্রদান করেন । পুলিশ বাহিনীতে দক্ষ ,সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে । অপরাধী ও মাদক পাচারকারীকে তিনি কখনও প্রশ্রয় দিতেন না । প্রতিবেদনে বান্দরবান জেলার প্রধান ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে নাইক্ষ্যংছড়ির সোলাইমান সওদাগরের পুত্র কামাল উদ্দিন ও বহিরাগত মোশারফ হোসেনের ছত্রছায়ায় আশারতলি, লেমুছড়ি ও ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা চালান আসে এবং বিভিন্ন স্থানে মাইক্রোবাস ও মোটর সাইকেলযোগে সরবরাহ করা হয়।

বান্দরবান জেলা শহরে পাচারকারী দলের সদস্য হিসেবে আবু তাহের, রুস্তম, নাইক্ষ্যংছড়ির ব্যবসায়ী পাড়ার কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি ফরিদ উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক নজিব উল্লাহ,মসজিদ ঘোনার পরিমল দাশের পুত্র উজ্বজল দাশসহ ৩০ জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে । ওই প্রতিবেদনে নাম এসেছে কক্সবাজারের ৫ জন সাংবাদিকের।

বান্দরবান সদর সার্কেলের এএসপি শিবলি কায়সার বলেছেন, আইন প্রয়োগে শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে মাদক পাচারকারী ও তাঁদের সহযোগিরা ষড়যন্ত্র করছেন। তাকে অন্যত্র বদলি করানোর জন্য একটি মহল সুকৌশলে ঐ প্রতিবেদনে নাম উঠেয়েছেন বলে তিনি দাবী করেন । মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হুমায়ুন কবীর খন্দকার বলেছেন, তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, মূলত পদস্থ কর্তাদের ক্ষোভ ও সরকারী দলের নেতাদের বিরাজভাজন হওয়ায় এসব পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকাভূক্ত করা হয়েছে ।

অন্যদিকে আলীকদম থানার ওসি মো.হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের হ-য-ব-র-ল প্রতিবেদন কখনই দেখিনি । সঠিক তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়নি । প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে তিনি উল্লেখ করেন । প্রতিবেদনে তাঁকে লামা থানার ওসি বলা হয়েছে। নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১  বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্ণেল সফিকুর রহমান বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায়  মিয়ানমারের বিভিন্ন সীমান্তে  রোহিঙ্গা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে । এদের মাধ্যমে স্থানীয় রোহিঙ্গা নেতারা ইয়াবা পাচার ও পাচারে সহযোগিতা করে আসছে । ইয়াবা পাচারকারীকে আটকের পর তাদের ছাড়িয়ে নিতে কিছু নেতা তদবির করে । বিজিবি থেকে ছাড়তে না পেরে পুলিশের কাছে গিয়েও তদবির করতে যায় বলে জানা যায় । ইয়াবা পাচার ও চোরাকারবারী যে কেউ হোক না কেন,  সে যত বড় নেতা বা ক্ষমতাধর হোক না কেন, কোন ভাবে ছাড় দেয়া হবে না ।

নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইয়াবা  ও মাদক পাচারকারীগণ প্রতিনিয়ত পুলিশ-বিজিবি থেকে শক্ত বাধা পায় । এই বাধাঁ অতিক্রম করতে না পেরে বর্তমান থানার অফিসার ইনচার্জসহ কয়েকজন এসআই কে যে কোন ভাবে অনত্র বদলীর জন্য তদবির ও ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে । প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত । ইয়াবা পাচারকারী বা চালান আটকের পর থানায় কিছু স্থানীয় নেতা তদবির চালায় । তাদের সিন্ডিকেট অনেক শক্তিশালী । এরা ইয়াবা সহজ উপায়ে ও নির্বিঘ্নে পাচার করতে দায়িত্ব প্রাপ্ত বিজিবি ও পুলিশ কর্মকর্তা এবং সদস্যদের বদলীর জন্য নানা প্রচেষ্টা চালাচ্ছে । তালিকায় পাচারে সহযোগিতাকারী হিসাবে আমার নাম আসার পরে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা হাসছে। আমি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের শত্রু। আর নাম এসেছে ইয়াবা পাচারে সহযোগিতাকারী হিসাবে । এটা দু:খজনক’। এছাড়া তিনি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের পুণরায় তদন্ত করার জন্য দাবী জানান ।

 গত (১২ এপ্রিল ২০১৩ ইং) কিশোরগঞ্জ সদর এলাকা থেকে কিশোরগঞ্জ থানা পুলিশ নাইক্ষ্যংছড়ির ব্যবসায়ী পাড়ার মৃত মোস্তাফিজুর রহমানের পুত্র জিয়া উদ্দিনকে ৪০,৩৫০ টি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করে । গত (২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ইং ) চট্রগ্রাম ডিবি পুলিশ আগ্রাবাদ এলাক থেকে কচ্ছপিয়ার হাজীর পাড়ার জামসেদ নামের আরেক যুবক ইয়াবা পাচার কালে পুলিশের হাতে আটক হন । গত (৭ মে) নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের হাবিলদার মোঃ শওকত আলীর নেতৃত্বে চেরারমাঠ এলাকা থেকে মায়ানমার আকিয়াব জেলার ওয়ালিডং এলাকার মো. সৈয়দ হোসনের পুত্র মোঃ আব্দুল আজিজ(৩২) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে । এসময় পাচারকারী থেকে ১৮৮২ টি ইয়াবা উদ্ধার করে। গত (৭ এপ্রিল) নাইক্ষ্যংছড়ির ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের নায়েক সুবেদার মোঃ শাহ আলম এর নেত্বত্বে আশারতলী বিওপি থেকে ৩০,০৩৫ টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। গত (১৭ এপ্রিল ) নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের সুবেদার আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে চাকঢালা মডেল স্কুলের সামনে থেকে ১৩,৯৫৪ পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে ।

এ সময় কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার হাজি নুরুল আমিনের পুত্র মো. ইসমাইল হোসেন (৩৬),নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালার কালু কাটাঁর আলী আহমদের পুত্র মো. আনোয়ার হোসেন (১৮) নামের দুই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে ইয়াবাসহ হাতে নাতে আটক করে । গত (১৬ মে) চট্রগ্রাম ডিবি পুলিশ কোতয়ালীর মোড় থেকে ৩৬,৫৫০টি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ নাইক্ষ্যংছড়ির সিনামহল এলাকার ফজল কবিরের পুত্র মো. ইকবাল (৩৬)কে আটক করে । জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল ওই ইয়াবার চালান নাইক্ষ্যংছড়ির দৌছড়ী থেকে নিয়ে যাচ্ছিল বলে জানান ।

বাইশারীতে অপহরণ : ২২ ঘন্টা পর শাহাজালালকে উদ্ধার করেছে পুলিশ

41

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বা্ন্দারবান নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীতে অপহরণ হওয়ার ২২ ঘন্টার মধ্য শাহজালালকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার পুলিশ অভিযান চালিয়ে গহীন অরণ্য থেকে উদ্ধার করে তার পিতার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ফেরিওয়ালা শাহাজালাল (২২) বাইশারীর লম্বাবিল হয়ে চাইল্যাতলী এলাকা পৌঁছলে উঁৎপেতে থাকা ৪/৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রসী তাকে অপহরণ করে গহীন অরণ্যে নিয়ে যায়। অপহরণের পর সন্ত্রাসীরা সোমবার সন্ধ্যা ঈদগাঁওতে অবস্থানরত তার পিতার কাছে মোবাইল ফোনে তিন লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। অন্যথায় তার ছেলেকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয়।

খবর পেয়ে বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আনিছুর রহমান দ্রুত পুলিশ ও স্থানীয় জনতার সহায়তায় রাতভর অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানের খবর টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা গহীন পাহাড়ে অপহৃত শাহাজালালকে রেখে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ তাকে চিতা মুরা এলাকায় হাত-পাঁ বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করে।

বাইশারীতে অপহরণ হওয়া শাহাজালাল উদ্ধারের পর সাংবাদিকদের জানান, তাকে কয়েকটি পাহাড়ের ঢালুতে লুকিয়ে রেখেছিল এবং মুক্তিপণের টাকার জন্য বেদম প্রহার করে। কিন্তু পুলিশি অভিযানের খবর টের পেয়ে তারা তাকে একা রেখে পালিয়ে যায়। অপহৃত যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মঙ্গলবার বেলা ১২টার তার পিতার নিকট হস্থান্তর করেছে পুলিশ।