বান্দরবানে চাঞ্চল্যকর পর্যটক ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি আটক

নিজস্ব প্রতিনিধি, বান্দরবান:

বান্দরবান পর্যটন মোটেলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর পর্যটক ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি মো. রাসেলকে আটক করেছে পুলিশ।

সোমবার (১১মার্চ) দুপুরে চকরিয়া থেকে তাকে আটক করা হয়। আটকৃত রাসের (২৬) সাতকানিয়া থানার পশ্চিম নলুয়ার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে।

বান্দরবান সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বান্দরবান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকির হোসেন মজুমদার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) ইয়াছির আরাফাত এর সার্বিক দিক নির্দেশনায় চকরিয়া এলাকায় বিশেষ অভিযান চালানো হয়।

অভিযানে চাঞ্চল্যকর পর্যটক ধর্ষণ মামলার মূল অভিযুক্ত আসামি মো. রাসেল ড্রাইভার(২৬) কে গ্রেফতার করা হয়। সে ঘটনার আগে বান্দরবান সদরে বসবাস করতো।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি  রাত ১টার দিকে বান্দরবান শহরের মেঘলা পর্যটন মোটেলে ঘুরতে আসা এক মহিলা পর্যটকের সাথে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার মূল অভিযুক্ত আসামি করা হয় মো. রাসেলকে। ঘটনার পর থেকে সে পলাতক ছিল।

বান্দরবান সদর থানার মামলা নং- ০৯,  তাং- ২৬/০২/২০১৯ খ্রিঃ, ধারা- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) এর ৯(১)/৩০ এর এজাহার নামীয় প্রধান আসামি।

মানিকছড়িতে পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষণকারী আটক

মানিকছড়ি প্রতিনিধি:

মানিকছড়ির মুসলিমপাড়া এলাকায় গতকাল ২০ জানুয়ারি  রাত ৯টায় ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করেন দুই সন্তানের জনক মো. মোস্তাফিজ (২৪) তাকে স্থানীয়রা ও পুলিশ আটক করেছে।

ঘটনার সূত্রে জানাযায়, পাশের ঘরে শিশুটি প্রাইভেট পড়ে বাড়িতে আসার পথে ধর্ষক শিশুটিকে লোভ দিখিয়ে পাশের শসানের নিরবস্থানে নিয়ে যায়। পরে জোর করে ধর্ষণ করে শিশুটির চিৎকার শুনে পাশের লোকজন তাকে আটক করে। পুলিশ ঘটনার স্থলে আসার আগে ধর্ষক কৌশলে পালিয়ে যায়। পরে ধর্ষকের নিজ বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালিয় খাটের নিচ থেকে তাকে আটক করে।

মানিকছড়ি থানা অফিসার ইনর্চাজ(ওসি) আব্দুর রশিদ বলেন ধর্ষক অপরাধ  স্বীকার করেছে।

ওই শিশুটির মা বাদী হয়ে ধর্ষকের বিরুদ্ধে মানিকছড়ি থানায় নারী শিশু নির্যাতন আইনে ধর্ষণ মামলা রুজু করেন। মানিকছড়ি মামলা নং-০২,তারিখ-২১/০১/১৯ইং

রামগড়ে আ’লীগ নেত্রী ফাতেমাকে গণধর্ষণের পর হত্যার লোমহর্ষক ঘটনার স্বীকারোক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রামগড়:

খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলার হাফছড়ি ইউনিয়ন মহিলা আ’লীগের সভানেত্রী ও  গ্রাম প্রতিরক্ষাবাহিনীর সদস্যা  ফাতেমা বেগমকে(৫০) গণধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যা করার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে জাহাঙ্গীর আলম(৪৫) নামে এক ব্যক্তি।

বৃহস্পতিবার(১০ জানুয়ারি) রাতে রামগড় থানা পুলিশ তাকে মাটিরাঙ্গা থেকে গ্রেফতার করে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করার পর পরদিন শুক্রবার বিকালে খাগড়াছড়ির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো: মোরশেদুল আলমের আদালতে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ শুক্রবার(১১ জানুয়ারি) নজরুল ইসলাম প্রকাশ নাজিম(২৮) নামে আরেক আসামিকে গ্রেফতার করেছে। গত ২৪ ডিসেম্বর রামগড়ের মাহবুবনগর এলাকা থেকে ফাতেমা বেগমের (৫০) অর্ধ গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি স্বামী পরিত্যক্তা ও দুই সন্তানের জননী। এ ব্যাপারে ২৫ ডিসেম্বর রামগড় থানায় ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় একটি মামলা(নম্বর-৫) রুজু করা হয়।

পু্লিশ জানায়, গোপনসূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধমে বৃহস্পতিবার রাতে মাটিরাঙ্গার কাজীপাড়া থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে আটক করে পুলিশ। তিনি মাটিরাঙ্গার তবলছড়ি ইউনিয়নের বড়বিল মুসলিমপাড়া গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে। তিনি দুই সন্তানের জনক এবং পেশায় বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন কাজের শ্রমিক। খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(সদ্য পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) এস্এম সালাহ উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল তাকে গ্রেফতার করে।

পুলিশের ঐ অভিযানে অংশ নেয়া রামগড় থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল হান্নান মো: তারেক জানান, আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, নজরুল ইসলাম  প্রকাশ নাজিম নামে এক পিকআপ ড্রাইভারের মাধ্যমে গত ১৮ ডিসেম্বর রাত ৮ টার দিকে জালিয়াপাড়া রামগড় সড়কের মাহবুবনগর নামক স্থানে  ফাতেমা বেগমকে ডেকে আনা হয়। তারা ফাতেমাকে রাস্তার অদূরে একটি সেগুন বাগানে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। ঘটনা প্রকাশ করে দেয়ার ভয়ে জাহাঙ্গীর ও নজরুল দুজন মিলে তাকে হত্যা করে। জবানবন্দিতে জাহাঙ্গীর আরও উল্লেখ করেন, তিনি ফাতেমার দুই পা ও হাত চেপে ধরেন এবং নজরুল তার গলা টিপে হত্যা করে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সেগুন গাছের ঝরেপড়া শুকনো পাতা দিয়ে  ফাতেমার মরদেহ ঢেকে রেখে তারা পালিয়ে যান।

ওসি আব্দুল হান্নান মো: তারেক আরও জানান, জাহাঙ্গীরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী শুক্রবার গুইমারার জালিয়াপাড়া এলাকা থেকে নজরুল ইসলাম নাজিমকে পুলিশ গ্রেফতার করে। নজরুল জালিয়াপাড়ার রেজাউলের ছেলে। তিনি দুই শিশু পুত্রের পিতা।

ওসি আরও জানান, জাহাঙ্গীর রামগড় জালিয়াপাড়া ৩৩ কেভিএ বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপন কাজের শ্রমিক আর নজরুল পিকআপের মালিক ও  ড্রাইভার। তাঁর পিকআপ করেই বৈদ্যুতিক লাইন স্থাপনের মালামাল পরিবহন করা হত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান ওসি।

প্রসঙ্গত: উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের মাহবুব নগর এলাকায় স্থানীয় শিশুরা বিকালে ক্রিকেট খেলার সময় বলটি বাগান থেকে কুড়িয়ে আনতে গেলে দুর্গন্ধ পায়। পরে তারা বল খোঁজার এক পর্যায়ে সেগুন গাছের ঝরে পড়া শুকনো পাতায় ঢাকা গলিত লাশ দেখতে পেয়ে অভিভাবকদের জানায়। পরে খবর পেয়ে  রামগড় থানার পুলিশ এসে লাশটি  উদ্ধার করে। নিহত ফাতেমার ছেলে শাহজাহান এটি তাঁর নিখোঁজ মায়ের লাশ বলে শনাক্ত করে ।

মিতালী চাকমা ধর্ষণ ও সুশীল সমাজ এবং নারী নেত্রীদের দ্বিচারিতা

মাহের ইসলাম
স্থানীয় এক ডিগ্রী কলেজের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রীকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রস্তাব দেয়া হচ্ছিল একটি রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ার। কিন্তু মেয়েটি সেই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে চলছিল। কে জানে, কি ছিল তার মনে? হতে পারে লেখাপড়া করে মেয়েটি একটি উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখতো। তাই সে অন্ধকার জগতের, অনিশ্চিত জীবনের, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের, দেশ, রাষ্ট্র ও সমাজ বিরোধী, পাপময় কোনো জীবনের সাথে নিজেকে জড়াতে চায়নি।
এমন হতে পারে, পড়ার খরচ যোগাতে বাবা-মা আর বড় বোনের কষ্টের ছবি তার মানসপটে এমনভাবে গ্রোথিত ছিল যে, পড়ালেখার বাইরে অন্য কোনো কিছুতে জড়ানো মানেই নিজের দরিদ্র ও সমস্যা জর্জরিত পরিবারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার সামিল বলে বিবেচিত হয়েছিল। অথবা বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত উপার্জনে পড়তে এসে লেখাপড়ার বাইরে অন্য কোন কিছুতে জড়াতে মন সায় দেয়নি।

লেখাপড়াকে ধ্যান-জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করে সে হয়ত ভেবেছিল, লেখাপড়ার পিছনেই সমস্ত প্রচেষ্টা নিয়োগ করবে যেন সকলের মুখ উজ্জল করতে পারে। আশা ছিল, একদিন দেশবাসী তার নাম জানবে। তার অর্জনে পিতা-মাতার দুঃখক্লিষ্ট মুখে ফুটবে গর্বের হাসি, গর্বিত হবে ভাই-বোন, সহপাঠিরা, এমনকি এলাকার সকলে।

দেশবাসীর কাছে তার নাম কতটা পৌঁছেছে, সেটা জানা না থাকলেও এলাকাবাসীর কাছে তার নাম এখন পৌঁছে গেছে সেটা নিশ্চিত। তেমনি এটাও নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে কন্যার কল্যাণে তার পিতা-মাতা এখন প্রাণ হারানোর শংকায় ভুগছে। বাস্তবে তারা কোথায় আছে, কেমন আছে – কেউ জানে না।

রাঙ্গামাটির এক প্রত্যন্ত গ্রামে দুই বোন আর এক ভাইয়ের সংসারে মিতালী চাকমা মাঝের জন। দুনিয়াবী প্রাচুর্যে লাগাতার ঘাটতির ঢেউ সংসারের সকলকে প্রতিনিয়ত ভিজে চুপসে দিলেও পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার কমতি কখনো শিশিরের ফোঁটা হয়েও কারো গায়ে লাগেনি। দিন এনে দিন খেতে না হলেও সাধ আর সামর্থ্যের যোজন যোজন দূরত্ব কখনই সন্তানদের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সংকল্প থেকে এই পরিবারের কর্তাকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
বৃষ্টিতে ভেজা চোখের জলের মতই এই বাস্তবতা পরিবারের বড় মেয়েটি বুঝে ফেলে একটু বড় হওয়ার পরেই।

তাই বাবা-মায়ের কাঁধ থেকে সংসারের জোয়ালের ভার কিছুটা হলেও লাঘবের অভিপ্রায়ে, সে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রিয় বাবা-মা আর আদরের ছোট ভাই-বোনদের ছেড়ে শহরে ছোট-খাটো এক চাকুরিতে যোগ দিতে অনেকটাই বাধ্য হয়েছে আগেই। আর তাদের সকলের অতি আদরের ছোট ভাই এখনো স্কুলের গন্ডী পেরুতে পারেনি।

পারিবারিক বন্ধনে ভালবাসায় বেড়ে উঠা সন্তানদের পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা আর দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি বাস্তবতার আলোকে কষ্ট আর পরিশ্রমকে পাথেয় বানিয়ে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার এমন অনেক গল্প হয়ত পাঠকের জানা আছে। সেদিক থেকে মিতালী চাকমাকে নিয়ে কিছু লেখার কোন প্রয়োজন ছিল না। তবে, তার জীবনের ক্যনাভাসে কিছু দুর্জনের আঁচড়ের বিভীষিকা এবং তৎপ্রেক্ষিতে আমাদের সমাজের প্রতিক্রিয়ার অসঙ্গতির উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া নিতান্তই অমানবিক বিবেচিত হওয়ার কারণেই এই লেখার অবতারণা করা হয়েছে।

গত ২৩ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক প্রেস ব্রিফিং এর পরেই মিতালী চাকমার ঘটনাবলী আলোচিত হতে থাকে। বিভিন্ন সুত্র হতে প্রাপ্ত তথ্যাবলী থেকে তার অপহরণের ঘটনার পরিস্কার একটা চিত্র পাওয়া যায়।(https://goo.gl/mT4JP4)

আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ার আহবান উপেক্ষা করায় ১৭ আগস্ট ২০১৮ তারিখে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। এর পরে তাকে আটকে রেখেই বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। সে রাজী না হলে, তাকে স্থানীয় দুই নেতার হাতে তুলে দেয়া হলে, তার প্রতি চালানো শুরু হয় অবর্ণনীয় শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের ষ্টীম রোলার।
তার বিভীষিকাময় জীবনের একাংশ কিছুটা হলেও উঠে এসেছে, তার কান্নামিশ্রিত কন্ঠে,

“তাদেরকে বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমাকে গর্ভবতী না করলে আমি হয়তো ইউপিডিএফ এ যোগ দিতে রাজী হবো না। এমতাবস্থায় গত ৩০/৮/২০১৮ তারিখ হইতে ১৯/১১/২০১৮ তারিখ পর্যন্ত ইউপিডিএফ কর্মীরা আমাকে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার রেপ করে। ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর কর্মীদের পাশবিক নির্যাতনে আমি শারীরিক ও মানষিকভাবে ভেঙ্গে পড়ি। বেশ কয়েকবার আত্নহত্যার চেষ্টা করেও করতে পারি নাই।“

তার কাছ থেকে আরো জানা যায় যে, তাকে সব সময় দুইজন অস্ত্রসহ পাহারা দিয়ে রাখত, যেন সে পালাতে না পারে। তবে, যেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে সেনাবাহিনীর এক টহল দলের আনাগোনা টের পেয়ে অস্ত্রধারীরা সরে পড়ে। এই সুযোগে, সে টহল দলের কাছে এসে তার দুর্দশার কথা জানালে, তারা তাকে উদ্ধার করে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

প্রয়োজনীয় ডাক্তারী পরীক্ষা ও মামলার প্রক্রিয়া শেষ হলেও প্রাণ ভয়ে সে এখন বাড়ীতে ফিরতে পারেনি। সে এখন চিন্তিত আছে এই ভয়ে যে, তার বাবা-মাকে এই সন্ত্রাসীরা মেরে ফেলবে। তার সাথে আরো দুই জন নারী বন্দি ছিল, তাদেরকে উদ্ধারের আবেদনও সে জানিয়েছে।

ইউপিডিএফ (প্রসীত) এর পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবী করা হয়েছে যে, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যেই এমন পরিকল্পিত নাটক সাজানো হয়েছে। ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়াতে এমন দাবীর সপক্ষে বেশ কিছু প্রচারণাও লক্ষ্য করা গেছে।

ইতোপূর্বে এক চাকমা নারীকে কোনো বাঙ্গালী কর্তৃক ধর্ষণের শুধুমাত্র অভিযোগ পাওয়ার পর প্রমাণিত হওয়ার আগেই কি পরিমাণ প্রতিবাদ হয়েছিল– সেটা বলার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। ইতি চাকমা নিহতের ঘটনায় দেশবাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে।(https://goo.gl/Ch4cKz) কারণ, এমন প্রতিবাদ মিছিল ঢাকার শাহবাগ ছাড়াও চট্রগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। আর যদি কোনোভাবে একটা ধর্ষণের ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে আঙ্গুল তোলা যায়, তাহলে কি লঙ্কাকাণ্ড হতে পারে সেটাও দেশবাসী দেখেছে বিলাইছড়ির দুই মারমা বোনের ঘটনায়। এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষিতে অপরাধীর শাস্তি দাবী করে আন্দোলন বা নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে যাবতীয় পদ্ধতি প্রয়োগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মীদেরকেও অহরহই দেখা যায়।(https://goo.gl/eHFoQR)

অথচ, নারীর প্রতি সংবেদনশীল এই মানুষগুলোই আবার একদম চুপ মেরে যান, যদি ধর্ষক, খুনী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট কেউ হয় বা অবাঙ্গালী কেউ হয়। তেমনটি ঘটে থাকলে, অনেক সময় আবার অপপ্রচার চালানো হয় ঘটনার দায় বাঙ্গালী বা নিরাপত্তা বাহিনীর উপর চাপিয়ে দেয়ার অপচেস্টায়। এক বছরের মধ্যেই সংঘঠিত মাত্র দু’টি ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে উপস্থাপন করে আমাদের সমাজের কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্যের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়ার অসঙ্গতির এই চিত্র পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।(https://goo.gl/1ps1YB)

এই বছরের জানুয়ারীতে রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ির দুই মারমা বোনের ঘটনা নিয়ে কী না করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ঢাকার সুশীল সমাজের, মানবাধিকারের নেতা কর্মীরা। (https://goo.gl/xKdvZS) দেশের বড় বড় শহরে প্রতিবাদ মিছিল ও মানববন্ধন, শাহবাগে সেনাবাহিনীকে বিদ্রুপ করে আয়োজিত পথনাটক, ব্লগ ও সংবাদপত্রে নারীবাদীদের লেখালেখি, মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি, উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজের বিবৃতি, সুপ্রিম কোর্টে কিছু দেশবরেণ্য ব্যক্তির দৌঁড়াদৌঁড়ি, ঢাকার বুকে মশাল মিছিল, চাকমা সার্কেল চীফের পত্নীর আবেগঘন মিথ্যাচার, হাসপাতালে পাহারা বসানো ইত্যাদির বাইরে আরও অনেক কিছুই ছিল। অথচ, ঐ সময়ে আবেগে আপ্লূত হওয়া ব্যক্তিবর্গের অনেকেই আজো জানেন না যে, এক মিথ্যে অভিযোগকে কেন্দ্র করে কিভাবে তাদের অনুভূতিকে ব্লাকমেইল করা হয়েছে।(https://goo.gl/TZiEEi

বেশিদিন আগের কথাও নয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাঙামাটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এক নারী নিজের মুখে যা শুনিয়েছে, তা অনেকটাই ভৌতিক সিনেমার কাহিনী বলে মনে হচ্ছিল। ভিন্ন সম্প্রদায়ের একজনকে ভালোবেসে বিয়ে করায় জোসনা চাকমাকে দুই মাস হাতে-পায়ে শিকল বেঁধে অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে দিনের পর দিন অমানবিক নির্যাতন করেছিল ইউপিডিএফ। ১৬ জানুয়ারী ২০১৭ এর মধ্যরাতে কোনমতে পালিয়ে এসে আশ্রয় প্রার্থনা করে নিকটস্থ সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে। এরপর সেনাবাহিনী তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। তিন দিন পরে সংবাদ সম্মেলনের সময় বার বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিল হতভাগা এই নারী। সংবাদ সম্মেলনে সে নিজেই জানায় যে, তার স্বামী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও শুধুমাত্র বাঙালী বড়ুয়া সম্প্রদায়ের একজনকে বিয়ে করার অপরাধেই এই নির্মম ও লোমহর্ষক পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল তাকে।(https://goo.gl/4z3pzq)

একজন নির্যাতিতা নারী প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে তার জীবনের উপর বয়ে যাওয়া দুর্বিষহ যন্ত্রণা জানান দিলেও এর প্রতিবাদের আওয়াজ দেশের কোনো দিক থেকেই শোনা যায়নি। এমনকি, কোনো নারীবাদী সংগঠন বা মানবাধিকার কমিশন যাদের জেলা অফিস এই রাঙ্গামাটিতেই অবস্থিত – প্রতিবাদতো দুরের কথা এমন ভয়াবহ এবং গাঁ শিউরে উঠা ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে হলেও নির্যাতিতার সাথে কথা বলার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। আমাদের সমাজের যে মহিয়সী নারীগণ আর কিছু না হলেও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে অন্তত কলম দিয়ে যুদ্ধ করেন, তাদের মধ্য হতেও কেউ এই হতভাগ্যার কান্নায় নিদেনপক্ষে সহমর্মিতা পর্যন্ত ব্যক্ত করেননি। রাস্তায় প্ল্যাকার্ড নিয়ে রোদের মধ্যে দাড়িয়ে মানববন্ধনেও দেখা যায়নি কাউকে।

কেউ কি একবার ভেবে দেখেছেন যে, নির্যাতনের ভয়াবহতার পারদ কোন উচ্চতায় উঠলে একজন নারী ধর্ষণের মতো অসম্মানের বিষয় প্রকাশ্যে উচ্চারণ করে! তাও আবার পার্বত্য চট্রগ্রামে ! যেখানে হত্যার বিচার পর্যন্ত চাইতে ভয় পায় সাধারণ মানুষ। অথচ, অতি সাম্প্রতিক এই মিতালী চাকমার ঘটনার প্রতিবাদের কোন ধরণের লক্ষণ চোখে পড়ছে না কোথাও। না পার্বত্য চট্রগ্রামে, না দেশের অন্য কোন স্থানে। নারীর প্রতি সহানুভূতি দেখাতে গিয়ে তৃতীয় পক্ষের শুধুমাত্র অভিযোগেই যারা এর আগে বহুবার নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যেভাবে সম্ভব প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন, তারা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই ঘটনায় কঠোর নীরবতা পালন করছেন। যদিও এখানে নির্যাতিতা নিজেই ভয়াবহ নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন । জোসনা চাকমার ঘটনাতেও এর ব্যতিক্রম কিছু ছিল না।

নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা আর পাহাড়ের নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সকল সময়ে যারা উচ্চকিত, সেই সুলতানা কামাল, বাঞ্চিতা চাকমা, ইয়ান ইয়ান, মিজানুর রহমান, রোবায়েত ফেরদৌস, য়েন য়েন, খুশী কবির প্রমুখদের মিতালী চাকমা’র জন্যে কোন ধরনের পদক্ষেপ যেমন চোখে পড়ছে না, তেমনি তাদের এই হতভাগার জন্যে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা আছে বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে না।

একজন নারী হিসেবে এবং বিশেষতঃ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর সামনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ইমেজের কথা মাথায় রেখে নিতান্ত দায়সারা গোছের হলেও অন্তত ক্ষীণ কন্ঠে কিছু একটা বলা যেত– অথচ তেমন কিছুও করা হচ্ছে না। একই ধরনের নির্লিপ্ততা প্রকাশ পেয়েছে সিএইচটি কমিশনের আচরণে – যারা কিনা পার্বত্য চট্রগ্রামের ইস্যুতে নিজেদের সম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্যে এর আগে অসংখ্যবার নিদেনপক্ষে বিবৃতি প্রকাশ করেছেন।

পার্বত্য চট্রগ্রামের সংঘটিত ঘটনাবলীর প্রতি আমাদের দেশের কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্য কতটা চরম হতে পারে, তার সর্বশেষ উদাহরণ মিতালী চাকমা’র ঘটনাবলী। যারা এই ধরণের ঘটনায় প্রতিবাদ করেন বা ইতিপূর্বে করেছিলেন– তাদের কাউকেই এখন আর দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য আমাদের সমাজের কিছু লোকের এমন আপাতদৃষ্টিতে রহস্যজনক কিন্তু বাস্তবে দ্বিমুখী আচরণ একেবারে আনকোরা কিছু নয়।

গুইমারার উমাচিং মারমা (মার্চ, ২০১৫), দীঘিনালার দীপা ত্রিপুরা (জুন, ২০১৫), বিলাইছড়ির আয়না চাকমা ( মে, ২০১৬), নানিয়ারচরের শুবলপুরি চাকমা (জুলাই, ২০১৭), পানছড়ির নয়না ত্রিপুরা ওরফে ফাতেমা বেগম ( সেপ্টেম্বর, ২০১৭), দীঘিনালার আয়না চাকমা ওরফে রিমা আক্তার (অক্টোবর, ২০১৭) এবং আরো অনেকের ঘটনার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা এমন ঘৃন্য এবং লজ্জাজনকই ছিল। (https://goo.gl/Mvcznx) (https://goo.gl/S1fQPB)  

অতীতের ঘটনাবলীর আলোকে মিতালী চাকমার উপর যে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে তার প্রতিবাদ বা বিচারের দাবী করে হয়ত তেমন কেউ সরব হবেন না। কারণ, সচরাচর এই ধরণের ঘটনায় দেশের মূল জনগোষ্ঠীর যারা প্রতিবাদ করেন- অদ্যবধি তারা অপরাধী দেখে প্রতিবাদ করেছেন, অপরাধ বিবেচনা করে প্রতিবাদ করেননি। অপরপক্ষে, পাহাড়ের নেতৃবৃন্দের “প্রতিবাদের চর্চাটা অনেকটা এরকম যে, স্বগোত্রের দুর্বৃত্তরা যাই করুক না কেন, প্রতিবাদ করা যাবে না; কারণ প্রতিবাদ অপরাধ অনুযায়ী হবে না, অপরাধী অথবা নির্যাতিতার পরিচয় অনুযায়ী হবে।” (https://goo.gl/gDHoND

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন রয়ে যায়, সাধারণ জুম্ম, যাদের কোন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই, তারা কি মিতালী চাকমার কথা বিশ্বাস করছে? কারণ, তারা তো এখন আর বোকা নেই, অনেক বুদ্ধিমান। পার্বত্য চট্রগ্রামের যে কোন আন্দোলনে নারীরা এখনের পুরুষের ঢাল হিসেবে সামনে থাকে। তাদের হাতে থাকে লম্বা লাঠি, আর নারীর ঢালে আশ্রয় নেয়া পালোয়ানের হাতে থাকে ছোট্ট গুলতি। বছরের যে কোন সময়ে, যে কোন উপলক্ষ্যে আয়োজিত মিছিল বা প্রতিবাদে এখন নারীদের সরব উপস্থিতি নজর এড়ানোর উপায় নেই।

তবে বলাই বাহুল্য, ৩০ মে ২০১৮ তারিখে স্বজাতির হাতে মহালছড়ির তিনজন মারমা ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরেও যখন কেউ কোন প্রতিবাদের আওয়াজ তুলেনি– তখন বুঝতে বাকী থাকে না যে, পাহাড়ে নারীরা এখনো যতটা না মানুষ হিসেবে স্বীকৃত, তার চেয়ে অনেক বেশী কার্যোদ্ধারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র আর ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে পছন্দের হাতিয়ার হিসেবেই তাদেরকে শ্রেয় বিবেচনা করা হয়। (https://goo.gl/93Xu5v

তাই, অবধারিতভাবেই প্রশ্নের উদ্রেক হয়, মিতালী চাকমা কি নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমাদের ‘সমাজের কিছু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির বৈপরীত্যের পাশাপাশি প্রতিক্রিয়ার অসঙ্গতির’ শুধুমাত্র আরেকটি উদাহরণ হিসেবেই থেকে যাবে? নাকি, প্রতিটি জুম্ম নারীরও যে একজন মানুষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অধিকার থাকতে পারে – তা অন্যরা বিশেষতঃ নারীরা অনুধাবন করবেন? এই ঘটনায় এমন সৎসাহস কি দেখানোর সুযোগ আছে যে, জুম্ম নারীরা ভবিষ্যতে আর কখনো কারো ‘কার্যোদ্ধারের মাধ্যম’ কিংবা ‘স্বার্থ হাসিলের সবচেয়ে পছন্দের হাতিয়ার’ অথবা ‘প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে চাইবে না?

নোট: সর্ট লিংকগুলো সংশ্লিষ্ট, খবর, তথ্য ও বিশ্লেষণ

লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন:

দলে যোগ না দেয়ায় মিতালী চাকমাকে অপহরণ করে টানা তিন মাস ধর্ষণ করে ইউপিডিএফ কর্মীরা(ভিডিওসহ)

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি:

প্রসীতপন্থী ইউপিডিএফ-এ যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় টানা তিন মাস আস্তানায় আটকে রেখে শাররীক অত্যাচার ও ধর্ষণের অভিযোগ করেছে মিতালী চাকমা নামের এক কলেজ ছাত্রী ।

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় উদ্ধার হওয়া ঐ কলেজ ছাত্রী শুক্রবার সকালে খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে অপহরণকরীদের বিচার ও সরকারের কাছে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন। পাশাপাশি ইউপিডিএফ(প্রসীত)গ্রুপের হাতে বন্দি আরো দুই নারীকে উদ্ধারের দাবী জানিয়েছেন।

সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রাঙামাটি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মিতালী চাকমা বলেন, তাকে দীর্ঘদিন করে প্রসীতপন্থী ইউপিডিএফ-এ যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল দলটির নেতাকর্মীরা। এতে রাজি না হওয়ায় গত ১৭ আগষ্ট তাকে সকাল সোয়া ১০টার দিকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে একটি অটোরিক্সায় তুলে নিয়ে যায় এবং আটকে রেখে বিয়ে প্রস্তাব দেয়।

এতে সে রাজি না হওয়ায় ৩০ আগষ্ট তাকে ইউপিডিএফ নেতা অংগ্য মারমা ও শান্তি দেব চাকমার হাতে তুলে দেওয়া হলে ইউপিডিএফ কর্মীরা তাকে দফায় দফায় শাররীক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে।

নির্যাতনের এক পর্যায়ে মিতালী চাকমা আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। এক পর্যায়ে গত ১৯ নভেম্বর সেনাবাহিনীর টহল দেখে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলে মিতালী চাকমা সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় উদ্ধার হয়।

মিতালী চাকমা জানায়, ডাক্তারী পরীক্ষার পর প্রাণ ভয়ে সে এক আত্মীয়রে সাথে খাগড়াছড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কারণ বাড়ীতে গেলে তাকে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপ মৃত্যুদণ্ড দেবে। তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে।

মিতালী চাকমা আরো বলেন, যারা অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার জীবনকে দূর্বিসহ করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও একই সাথে তার পিতা-মাতাকে ইউপিডিএফ(প্রসীত) গ্রুপের কবল থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানান।

তবে ইউপিডিএফ(প্রসীত)-এর গণমাধ্যম শাখার নিরণ চাকমা এমন অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার উদ্দেশে পরিকল্পিত সাজানো নাটক বলে দাবী করেছেন।

বান্দরবানে দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা

বান্দরবান ও লামা প্রতিনিধি:
লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বনফুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর দুই ত্রিপুরা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে তিন বিজিবি সদস্যসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে লামা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঈদ-উল-আযহার দিন দিবাগত রাতে বনফুর রামগতি ত্রিপুরা পাড়ার পাশের একটি জঙ্গলে এই ২ শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সকালে ধর্ষণের শিকার দুই ছাত্রীকে ডাক্তার পরীক্ষার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আপ্পেলা রাজু নাহা জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় কাউকে এখন পর্যন্ত আটক করা হয়নি।

স্থানীয় লোকজন বলছেন, উপজেলার ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের একটি বিজিবি ক্যাম্পের তিন সদস্য বুধবার রাত ১০টার দিকে অস্ত্রসহ ত্রিপুরা পাড়ায় যান। তারা পাড়ার এক গৃহিণীর মাধ্যমে দুই কিশোরীকে পাড়া থেকে কিছু দুরে জঙ্গলে ডেকে নেন। সেখানে তিন বিজিবি সদস্যের একজন পাহারায় থাকেন। আর দুজন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দুই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন।

ধর্ষণের শিকার কিশোরীরা অভিযোগ করেছে, বিজিবি সদস্যরা দিদি সম্পর্কীয় এক প্রতিবেশীর মুঠোফোনে ফোন দিয়ে তাদের দু’জনকে পাড়ার বাইরে ডেকে নেন। তারা যেতে চাইছিল না। তখন দিদি তাদের বলেন যে, না গেলে অসুবিধা হবে। এ কথায় ভয় পেয়ে তারা সেখানে গেছে।

কিশোরীরা জানায়, সেখানে গেলে বিজিবির সদস্যরা প্রথমে তাদের টাকা দিতে চান। রাজি না হলে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে দুজন বিজিবি সদস্য দুজনকে ধর্ষণ করেন। একজন তখন পাহারায় ছিলেন। পাড়ার লোকজন এগিয়ে এলে বিজিবি সদস্যরা পালিয়ে যান। বিজিবি সদস্যরা আবার চলে আসতে পারেন, এই ভয়ে সারা রাত তারা দুজনও জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে ভোরে পাড়ায় আসে।

২ শিশুর পিতা-মাতা ও তাদের আত্মীয় স্বজন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে লামা থানায় হাজির হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করে। লামা থানার মামলা নং ০৫ ধারা- নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১)/৩০। এজাহারে বর্ণিত অভিযুক্তরা হল: ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্পের নায়েক রবিউল ইসলাম, বিজিবি সৈনিক সুমন, মারুফ এবং স্থানীয় জনেরুং ত্রিপুরা (২৭)। বিজিবি নায়েক রবিউল ইসলাম ও জনেরুং ত্রিপুরার সহায়তায় সৈনিক সুমন ও মারুফ কথিত দুই শিশুকে ধর্ষণ করেছে মর্মে এজাহারে দাবী করা হয়েছে।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার (এসপি) জাকির হোসেন মজুমদার পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, বিজিবি কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুই কিশোরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে তিন বিজিবি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। তারা বলেছে, একজন পাহারায় ছিলেন। অন্য দুজন ধর্ষণের করেছেন। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর বিস্তারিত জানা যাবে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিমল ত্রিপুরা সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর মেয়েদের খোঁজ করতে এগিয়ে যাই। এ সময় একজন বিজিবি সদস্যদের একজন আমাদের বাধা দেন। তবে লোকজন আসায় সদস্যরা সরে যান।’

বিমল বলেন, তিন বিজিবি সদস্যকে স্থানীয় লোকজন চেনেন। বনফুর বাজারের ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান ও ডা. রিংকু দাশ বলেছেন, বিজিবির এই সদস্যরা স্থানীয় লোকজনের কাছে পরিচিত। তাঁরা বাজারে ডিউটি করেন এবং পাড়ায় গিয়ে মোরগমুরগি, কাঁচা শাকসবজি ও বাজার থেকে ক্যাম্পের জন্য মালামাল কেনেন।

বিজিবি বান্দরবান সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল ইকবাল হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অভিযোগটি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করে তাদের মতো করে ব্যবস্থা নেবে। তবে আমরাও বিষয়টি অভ্যন্তরীণভাবে গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। এ পর্যন্ত আমরা বিষয়টি তদন্তে অনেক অসংলগ্ন ও পরস্পর বিরোধী তথ্য পেয়েছি। আমরা এখনো বলতে পারছি না ঘটনাটি ঘটেছে, অথবা আমরা অভিযোগটি এখনই উড়িয়ে দিচ্ছি না। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়, ঘটনা সত্য, তবে অভিযুক্তেদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু যদি প্রমাণিত হয়, অভিযোগ সত্য নয়, তাহলে সে বিষয়টিও দেখা হবে।

বিজিবি নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আসাদুজ্জামান পার্বত্যনিউজকে বলেছেন, রাতে বিজিবির একটি টহল দল স্থানীয় বনফুর বাজার এলাকায় ছিল। ত্রিপুরাপাড়ার দিকে তাঁদের যাওয়ার কথা ছিল না। যে তিনজনের নাম বলা হচ্ছে, সেই নামে বনফুর ক্যাম্পে কোনো বিজিবি সদস্যও নেই। তারপরও ছদ্মনামে কোনো বিজিবি সদস্য সেখানে গেছেন কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ত্রিশডেবা ক্যাম্প সরানোর জন্য অনেক ষড়যন্ত্র চলে আসছে। ক্যাম্প না থাকলে পাহাড়ী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনায় কোন বাধা থাকবে না। সে কারণে সন্ত্রাসী একটি গোষ্ঠী ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্পের বিরুদ্ধে চক্রান্ত চালিয়ে আসছে। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। যদি তদন্তে সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সাজানো ঘটনা হলে এটি নিন্দনীয় ঘটনা।

স্থানীয় ইউপি মেম্বার আপ্রুচিং মার্মা পার্বত্যনিউজকে জানিয়েছেন, কথিত ঘটনাস্থল থেকে ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্পের অবস্থান দেড় কিলোমিটার দূরে এবং রামগতি পাড়ার ৫ শত গজের মধ্যে। পোশাক পরিহিত লোকজন এত দুরে গিয়ে এ জাতীয় একটি ঘটনা ঘটাবে তা বিশ্বাস হচ্ছে না। ঘটনাটি আমার কাছে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র মনে হচ্ছে।

স্থানীয় অধিবাসী লুৎফুর রহমান, মনির উদ্দিন ও আবুল কালাম পার্বত্যনিউজকে জানান, একটি গোষ্ঠী দীর্ঘদিন থেকে বনফুর বিজিবি ক্যাম্প প্রত্যাহার করার জন্য ষড়যন্ত্র করে আসছে। পাহাড়ী উক্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বনফুর ক্যাম্প প্রত্যাহার হলে হত্যা, খুন, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজি নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবে। তাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রেই এই ঘটনার জন্ম দিয়েছে। হতে পারে তারাই বিজিবির পোশাক পরে তার নাম ধরে বিজিবিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে।

ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকের হোসেন মজুমদার জানান, বনফুর ত্রিশডেবা বিজিবি ক্যাম্প হইতে এক থেকে দেড় কিলোমিটার দুরে জন সম্মুখ দিয়ে গিয়ে পোশাক পরিহিত লোকজন ধর্ষণ করার বিষয়টি আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বনফুর বাজারে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের ওদিকে যাওয়ার কথা নয়। এখানে যে কোন ধরণের ষড়যন্ত্র রয়েছে।

বান্দরবান পুলিশ সুপার জাকের হোসেন মজুমদার জানিয়েছেন, পুলিশ মামলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আপ্পেলা রাজু নাহা বলেন, দুই কিশোরীর জবানবন্দির ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে করে যা যা করার প্রয়োজন, তা করা হবে। দুই কিশোরীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিরূপা চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক মন্টি চাকমা শুক্রবার সংবাদ মাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে গত বুধবার রাতে বান্দরবানের লামায় বিজিবি’র ত্রিশডেবা ক্যাম্পের তিন সদস্য কর্তৃক দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

কাউখালীতে উপজাতীয় নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ: থানায় মামলা

আসামী পক্ষের দাবী জমি সংক্রান্ত বিরোধ: মামলার এজহারের উল্লেখিত বাদীর নাম ঠিকানা ভূয়া


কাউখালী প্রতিনিধি:
রাঙামাটির কাউখালীতে এক উপজাতীয় নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৯ জুলাই উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের মাগরামাছড়া নামক স্থানে এঘটনা ঘটে বলে মামলার এজহার সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে ঐ মহিলা বাদী হয়ে কাউখালী থানায় মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ আসামীকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখে বলে জানিয়েছেন কাউখালী থানার ওসি (তদন্ত) মোঃ সাখাওয়াত হোসেন।

মামলার এজহার সূত্রে জানা যায়, ৯ জুলাই সকাল সাড়ে ন’টায় উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নের বড়ইছড়ি গ্রামের সাচিংউ মারমার স্ত্রী ২ সন্তানের জননী (২৫) কাউখালী বাজার থেকে বাড়ী যাওয়ার সময় মাগরামা ছড়া নামক স্থানে পৌঁছলে উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের কাশখালী এলাকার মোঃ আব্দুল বারেকের ছেলে মোঃ সাকিব (১৯) তাকে জড়িয়ে ধরে শরীরের কাপড় খুলে ফেলে এবং পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ফেলে দেয়। পরে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।

এসময় ঐ মহিলা চিৎকার শুরু করলে পাশ্ববর্তী মংচিং মারমা শামীম (৪৪) ও চাইহ্লা প্রু মারমা (৩২) ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করে কাউখালী থানায় নিয়ে যায়।

এদিকে মামলার এজহারে উল্লেখিত বাদীর যে নাম, ও স্বামীর নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে তাতে যথেষ্ট গড়মিল দেখা গেছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা বাদীর বয়স নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় ভোটার তালিকা খুঁজে দেখা গেছে এ নামের কেউ কলমপতি ৩নং ওয়ার্ডে বসবাস করে না এবং এলাকার ভোটারও না।

এবিষয়ে কলমপতি ৩নং ওয়ার্ডের মেম্বার পাইচামং মারমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা দীর্ঘ ১০-১৫ বৎসর যাবৎ ঐ এলাকায় বসবাস করে। ৩নং ওয়ার্ডের স্থায়ী বাসিন্দা এবং এ এলাকার ভোটার। প্রতিটি নির্বাচনেই তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও কিভাবে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে এমন প্রশ্নের জবাবে মেম্বার জানান, হয়তো তারা অন্য জায়গার ভোটার এতদিন প্রক্সি ভোট দিয়েছে।

এদিকে এজহারে বাদী বিবাদীর বয়স ১৯ বৎসর উল্লেখ করলেও জন্ম নিবন্ধন খুঁজে দেখা যায় তার ১৬ বছর ৮ মাস। তাছাড়া বাদী মামলায় তার বয়স ২৫ বৎসর উল্লেখ করলেও তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ করছে আসামী পক্ষ। প্রকৃত কাগজপত্র হাতে আসলে তাও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে অভিযুক্ত আসামী সাকিবের বাবা মোঃ আব্দুল বারেক জানান, এটি সম্পূর্ণ ষড়ন্ত্রমূলক মামলা। তিনি জানান, এজহারে বাদীর পক্ষে মংচিং মারমা (শামীম) নামে যে নাম ব্যাবহার করা হয়েছে তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে।

তিনি জানান, উল্লেখিত মংচিং এর কাছ থেকে ৫ বৎসর পূর্বে আমি এক একর জমি ক্রয় করেছি। কিন্তু পাঁচ বৎসর পার হলেও উক্ত জমি আমাকে রেজেষ্ট্রি করে দেয়নি। তাছাড়া আমার মেঝো ছেলের সাথে দোকানের বকেয়া টাকা নিয়ে বাদীর সাথে কয়েক দফা বাকবিতন্ডাও হয়।

বারেক জানান, বাদী ও মংচিং মারমা মিলে আমাকে জমি এবং দোকানের বকেয়া টাকা না দিতেই মূলত এ মামলা সাজানো হয়েছে। নাহলে ১৬ বছরের কিশোর তার মায়ের সমতুল্য ৩৫ উর্ধ এবং শারিরীক গঠনে তার চেয়ে শতগুণ শক্তিশালী একজন মহিলাকে কিভাবে ধর্ষণ করে। মেডিকেল পরীক্ষার রিপোর্ট আসলেই আপনারা প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক

মাহের ইসলাম:

মশাল মিছিল ঠিক কবে, কোথায় এবং কি পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়েছিল, আমার জানা নেই। জানার জন্যে অল্প-স্বল্প চেষ্টা যে করিনি তা নয়, কিন্তু জানতে পারিনি। তবে উৎপত্তি যেভাবেই হোক না কেন, মশাল মিছিলকে আমার অন্য মিছিলের তুলনায় বেশি জীবন্ত মনে হয়। তাই আল জাজিরার মত একটা বিখ্যাত মিডিয়াতে যখন বাংলাদেশের একটা সংবাদের সাথে মশাল মিছিলের ছবি থাকে তখন আমার মনোযোগ আকর্ষণ না করে পারে না। আর যখন দেখলাম যে, সংবাদটি পার্বত্য চট্রগ্রামের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে, তখন একটু বাড়তি কৌতূহল নিয়েই সংবাদটি পড়তে শুরু করি।

২৮ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আল জাজিরার যে সংবাদটি আমার এক বন্ধু আমার সাথে শেয়ার করেছেন, সেটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়াতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী দুই মারমা বোনের কথিত ধর্ষণের ব্যাপারে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে, সংবাদটিতে বলা হয়েছে কিভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্রগ্রামে ধর্ষণ করে ঘটনাটি আড়ালের চেষ্টা করছে। মশাল মিছিলের ছবি দেখিয়ে দাবী করা হয়েছে যে সাধারন মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং বিচারের দাবিতে।

সংবাদটি পড়ে আমি উপলব্ধি করলাম, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলো অপপ্রচার চালানোতে অভাবনীয় দক্ষতা অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশে এবং বিদেশে  মানুষের হৃদয় জয়ের পথে আমাদের দেশের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে তারা সাথী হিসেবে পেয়েছে, যারা নিজেদেরকে সংবেদনশীল, ধর্মনিরপেক্ষ এবং নারীর অধিকার আদায়ের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে পরিচিত হতে পছন্দ করেন।


  1. এ সংক্রান্ত আরো খবর ও লেখা পড়ুন
  2. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  3. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মানবতার পাহাড়ি রঙ: প্রেক্ষিত নারী নির্যাতন
  6. বিলাইছড়িতে নির্যাতিতা দুই কিশোরীর শরীরে শুক্রানুর আলামত পাওয়া যায়নি
  7. আমরা ভাল আছি, শান্তিতে আছি: দু’মারমা কিশোরী
  8. বিলাইছড়িতে কথিত নির্যাতিত দুই কিশোরীর নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটতে ব্যস্ত বিশেষ মহল

এই সংবাদটিতে  চাকমা জনগোষ্ঠীকে “দেশের অত্যাচারিত জনসংখ্যা” হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্রগ্রামকে পরিচিত করা হয়েছে এই বলে যে, কয়েক দশক ধরে এ অঞ্চলের ১৩ টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সাথে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর হালকা সংঘাত (Low Intensity Conflict) চলছে।  পুলিশ কর্তৃক আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দুই মারমা কিশোরীকে তাদের পিতা-মাতার কাছে হস্তান্তর করাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ এর তকমা লাগানো হয়েছে; এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের  উদ্ধৃতি দিয়েই অবশ্য এটি করা হয়েছে।এই খবরে মিসেস ইয়ান ইয়ানকে উপস্থাপন করা হয়েছে চাকমা জনগোষ্ঠীর একজন সদস্যা হিসেবে যিনি “ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের জন্য লড়াই করছেন”।

আমি অবাক হবো না যদি ইতোমধ্যেই ভাবতে শুরু করে থাকেন যে, কারা চাকমাদেরকে অত্যাচারিত জনগোষ্ঠী মনে করে, কারা বলতে পারে যে পার্বত্য চট্রগ্রামে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সাথে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর সংঘাত (Low Intensity Conflict) চলছে, এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করাকে ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ এর তকমা কারা দিতে পারে! সঙ্গত কারণেই আমি মনে করি যে, আল জাজিরার সংবাদটিতে যে শুধুমাত্র মুদ্রার একপাশকে বিকৃত করে দেখানো হয়েছে– তা বোঝার জন্যে একজন পাঠকের স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট।

তেমনি একজন স্বাভাবিক পাঠকের দৃস্টিতেই এই নির্দিষ্ট সংবাদের কিছু কিছু অসংগতি তুলে ধরার প্রয়োজন বোধ করছি। এক্ষেত্রে, আমি যেসব সোশ্যাল মিডিয়া এবং সংবাদ মাধ্যমের তথ্য ব্যবহার করছি তার বেশিরভাগই পাহাড়ী ঘরানার বা ইতোমধ্যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে পরিচিত। ইচ্ছে করেই আমি এটি করছি, অন্যথায় বাঙ্গালীর প্রতি সহানুভূতি দেখায় এমন মিডিয়া উল্লেখ করলে আমার দাবিকে অনেকে দুর্বল ভাবতে পারেন। শুরুতেই বলে নেয়া ভাল যে, ২২ জানুয়ারি প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিলো তা প্রমাণ করার ইচ্ছা আমার নেই। সেই ভার যেহেতু মামলা হয়েছে তাই তা আদালতের বিচার্য অথবা সচেতন পাঠকের হাতেই রইল।

যৌন হয়রানির কোন ঘটনা ঘটলে, যে কোন বাবা-মা তাদের সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ করবে, এই স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড, কিন্তু মারমা দুই বোনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কেন হয়নি, সেটির কোন উত্তর এই সংবাদে নেই। পাঠকদের কি জানানো উচিত নয় যে, কেন বাবা-মা তাদের হাসপাতালে ভর্তি করেনি বা কেন তারা পুলিশে যায়নি? মেয়ে দুইজনকে ২২ জানুয়ারি সকালে গ্রাম থেকে ‘কে বা কারা’ নিয়ে যাওয়ার পর ২৩ জানুয়ারী দুপুরের পরে রাঙ্গামাটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বাবা-মাকে ছাড়াই দুইজন নাবালিকাকে গ্রাম থেকে তুলে নেয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি করার মধ্যবর্তী ৩০ ঘণ্টায় কী ঘটেছে,  তা প্রকাশ করা হয়নি। কারা তাদেরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়েছিল, কোথায় তারা ছিল, এসময় তাদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছে- অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অজানা। চিকিৎসা করাই যদি উদ্দেশ্য হবে, তাহলে ভর্তির পরদিনই মেয়ে দুইজনকে নিজেদের জিম্মায় নেয়ার জন্যে কিছু স্থানীয় নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার কর্মী এতটা উঠে পড়ে লেগেছিলো কেন– সেটি আজো অজানা রয়ে গেছে। প্রশ্ন থেকেই যায়, এই মেয়েদের হাসপাতালে ভর্তি করার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

অতএব, এটা সুস্পষ্ট যে, অনিচ্ছাকৃত হোক বা ইচ্ছাকৃতভাবেই  সম্পূর্ণ সত্যের পরিবর্তে এখানে আংশিক সত্য প্রকাশ করা হয়েছে।

খেয়াল করে দেখুন, ২২ তারিখেই এটা পোস্ট করা হয়েছে। এই পোষ্টের অন্যান্য দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করার ভার পাঠকের উপরই রইল; বিশেষ করে, ঘরে কয়জন ঢুকেছিল এবং বাবা-মায়ের উপস্থিতির বিষয়টি।  এমন অনেক মনগড়া পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়া এবং কিছু জাতীয় দৈনিকে দেখা গেছে।

এখানে আরো লুকানো হয়েছে যে, মেয়ে দুটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ইচ্ছেমতো কাহিনী প্রচার শুরু হয়ে যায়; একই সাথে হাসপাতালের সামনেও অনেকে জড়ো হয়।

বাবা-মায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে, উচ্চ আদালত মেয়ে দু’জনকে তাদের  পিতামাতার কাছে হস্তান্তর ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দেয়। পুলিশ কর্তৃক আদালতের এই আদেশ বাস্তবায়নকে এই সংবাদে বলা হয়েছে, ‘জোরপূর্বক অপহরণ’ (forced abduction) যা কিনা সশস্ত্র বাহিনী করেছে। অবশ্য এমন উদ্ভট দাবিকে জায়েজ করার জন্যে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর সুত্র উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি আদালতের এই আদেশের বৈধতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে; কারণ অন্য আদালতে মেয়ে দু’জনকে চাকমা সার্কেল চিফের এখতিয়ারে নেয়ার জন্যে আগেই রীট করা হয়েছিল।

তবে দুইজন নাবালিকাকে পিতা-মাতার পরিবর্তে তার নিজের জিম্মায় নিতে চাইলেও  মিসেস ইয়ান ইয়ান ও তার দোসরদের পদক্ষেপগুলির কোন সমালোচনা করা হয় নি। এমনকি, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে বাঁধা দেয়া, এমনকি রীতিমত শারীরিক প্রতিরোধের পরেও প্রশ্ন উঠে নি যে, এখানে আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করা হয়েছে কিনা? এমনটি এই কারণেই সম্ভব যে, আল জাজিরার ঐ প্রতিনিধি শুধুমাত্র ইয়ান ইয়ান এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল সমর্থকদের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শুনেছেন। তাই অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় উপেক্ষা করে এমন একতরফা ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আর এটা করতে গিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছেন; যেমন, ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, যেখানে ধর্ষণের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, মেডিক্যাল বোর্ডের ৩ সদস্যার মধ্যে একজন বড়ুয়া ও একজন পাহাড়ি ডাক্তারও ছিলেন।

পুরো সংবাদটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল যে, এই সাংবাদিক অন্ধের মতো মিসেস ইয়ান ইয়ান এবং তার সমর্থক ও সহানুভূতিশীলদের বিশ্বাস করেছেন।এমনও মনে হয়েছে যে, তিনি প্রকৃত সত্য উপস্থাপন না করে, মিথ্যার সাথে  কিছু সত্য ও পর্যবেক্ষণ মিশ্রিত করার এবং মিথ্যা উপসংহার উপস্থাপনের জন্যে কোন ধরনের বাধ্যবাধকতার শিকার হয়ে  থাকতে পারেন। এই কারণেই হয়তবা বাবা-মায়ের দাবী এবং তাদের কথা কিছুটা কমই উল্লেখ করা হয়েছে। আমার অদ্ভুত লেগেছে যে, একটি প্রেস ব্রিফিংয়ে খোলাখুলিভাবে বাবা-মা দাবি করেন যে, মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়নি– সেটি পর্যন্ত এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে, পুরো সংবাদ জুড়ে পিতামাতার দাবি কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ এমনকি মেয়ে দুইজনের পিতা-মাতার পরিবর্তে,  স্থানীয় কিছু নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার  কর্মীদেরকে কথা অনেক বেশি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়ছে। তাই আমি অনুভব করছিলাম যে, এই প্রতিনিধি ও ঐসব স্থানীয় নেতা-নেত্রী ও মানবাধিকার  কর্মীদের মাঝে এক ধরনের বোঝাপড়া থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। পাশাপাশি, প্রকৃত গল্পটি খোঁজার পরিবর্তে হয়তো তিনি কোন বিশেষ ব্যক্তির বীরত্বপূর্ণ ইমেজ সৃষ্টির লক্ষ্যেই নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।

আমি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছি যখন মেয়ে দুইজনের ছোট ভাইয়ের কথা বলা হয়েছে। সংবাদদাতা দাবি করেছেন যে, “প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত ছোট ভাই মার্মা ভাষায় বলেন যে, ‘এক নয়, তবে দুইজন লোক রুমটিতে প্রবেশ করেছে’।” অথচ, পাহাড়িদের ভিডিও ক্লিপে কিন্তু ‘একজন’ এর কথাই বলা হয়েছে। যেহেতু সাবটাইটেল সহ এই ভিডিওটি এমন একটি Facebook পেইজে  আপলোড করা হয়েছিল যা তার সেনাবাহিনী বিরোধী বক্তব্যের জন্য সুপরিচিত, সেহেতু এই ক্লিপের সাবটাইটেল অবিশ্বাস করার কোন কারণ থাকতে পারে না। তাহলে, এই প্রতিবেদক ছোট ভাইয়ের কথার এমন মিথ্যে অনুবাদ কেন প্রচার করবেন? নাকি তিনি নিজেই পাহাড়িদের অপপ্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন এবং মিথ্যে প্রচারে সর্বতোভাবে চেষ্টা করছেন?

যেকোনো নির্যাতিতার জন্যেই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া আতি প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুরু থেকেই কিছু নেতা-নেত্রী মেয়েদেরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিজেদের হেফাজতে নিতে চেষ্টা ছিল। অজ্ঞাত কারণে, এই সত্যটি, প্রতিবেদকের মনে কোন ধরনের সন্দেহ উত্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে, প্রতিবেদক এটিকে সত্য বলে প্রমাণ করেছেন যে, “সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা পুরো হাসপাতালটিকে নজরদারির আওতায় রাখে এবং বহিরাগতদের প্রবেশের অনুমতি দেয় না।” বাস্তবতা হলো, এই সংবাদেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বড় মেয়েটির স্বাক্ষর করা একটি চিঠি এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হস্তগত হয়েছে। আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, কিছু ভলান্টিয়ারসহ ইয়ান ইয়ান হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

এমন কি, মিসেস ইয়ান ইয়ানের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক শুরু থেকে হাসপাতালের মধ্যে মেয়েদের সাথে ছিল। সংবাদদাতা আরো লিখেছেন, “আল জাজিরার সাথে কথা বলার সময় ইয়্যান ইয়ান বলেন, ২২ জানুয়ারি ভোর বেলা নিরাপত্তা বাহিনীর চারজন সদস্য মারমা পরিবারের ঘরে প্রবেশ করেন”। সংবাদদাতা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছেন যে ‘দুইজন পুরুষ’ বাড়িতে প্রবেশ করেছিল।

শুরুতেই বলে নিয়েছি যে, উরাছড়িতে ২২ তারিখে কি ঘটেছিল, আমি তা প্রমাণ করতে চেষ্টা করছি না। তাই, এই ঘটনাটি নিয়ে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে কি প্রকাশিত হয়েছে- তা এখানে উল্লেখ করতে চাই না। উৎসুক যে কোন ব্যক্তিই সেগুলো দেখে নিতে পারবেন। যা নিশ্চিত, তা হলো এই যে, আল জাজিরার এই সংবাদে বেছে বেছে কিছু নির্বাচিত ঘটনা বিকৃত বা আংশিক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে। এটা দিবালোকের মতো পরিস্কার যে, এই সংবাদে প্রদত্ত বেশিরভাগ তথ্যই পক্ষপাতদুষ্ট, কারণ একটি বিশেষ ঘরনার কাছে থেকেই সকল তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে; প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয়নি বলে দৃশ্যমান। মূলত কিছু বিশেষ লক্ষ্যের দিকে নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায় বা জনগণের মনোভাবকে প্রভাবিত করাই এই সংবাদের লক্ষ্য হয়ে থাকতে পারে।

– লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

খুন-গুম, ধর্ষণ, অপহরণ পাহাড়ের নিত্যদিনের ঘটনা

paharer pothe pothe

মানিক মুনতাসির, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরে:

ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে পাহাড়ের জনপদ। শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফেরেনি। খুন-গুম, ধর্ষণ, অপহরণ যেন এ অঞ্চলের নিত্যদিনের ঘটনা। পুলিশ বলছে, থানায় মামলা করতে আসে না সাধারণ মানুষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যেকের তো প্রাণের ভয় রয়েছে। কেউ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। কিন্তু মানুষকে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল পুলিশের নেই।

রাঙামাটি জেলার সবচেয়ে দুর্গম এলাকা বিলাইছড়ি। সেখানকার থানায় গত ৬ মাসে মাত্র তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে দুটি মারামারি আর একটি চাকমা মেয়েকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলা। অথচ ওই অঞ্চলে মাস তিনেক আগে বিলাইছড়ি থানার কাছাকাছি এক জঙ্গলে নাম পরিচয়হীন এক হতভাগ্যের লাশ পাওয়া যায়।

কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে না হয়েছে মামলা, না পাওয়া গেছে ওই লাশের পরিচয়। ওই থানার রেকর্ড অনুযায়ী ২০১৩ সালে মামলা হয়েছে ৫টি। ২০১৪ সালে মামলা হয়েছে ৮টি, ২০১৫ সালে ৬টি। আর চলতি বছর ২৩ জুন পর্যন্ত ৩টি মামলা হয়েছে।

অন্যমিডিয়া

অথচ স্থানীয় বাসিন্দারা (পাহাড়ি কিংবা বাঙালি) বলেছেন, এ অঞ্চলে কৃষিকাজ, ব্যবসা, দোকান বা যে কোনো ধরনের লাভজনক কাজের কমিশন দিতে হয় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সন্ত্রাসীদের। অন্যথায় ফোন করে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, বাজারে কোনো কৃষিপণ্য বিক্রি করতে নিলে সেখান থেকেও কমিশন দিতে হয় জেএসএসকে। সরেজমিনে জানা গেছে, এ অঞ্চলে চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হচ্ছে চাকমা মেয়েটিকে ধর্ষণ ও নির্যাতন। তার অপরাধ ছিল একজন পাহাড়ি (উপজাতি) হয়ে একজন বাঙালি ছেলের দোকান থেকে জিনিসপত্র কেনা।

গত ২৯ মে মেয়েটি শিহাব নামের এক বাঙালি দোকানদারের (মা টেলিকম) দোকান থেকে নিজের এসএসসি পাসের ট্রান্সক্রিপ্ট ওঠাতে যায় অনলাইনের মাধ্যমে। ওই সময় ৮ থেকে ১০ জন উপজাতি যুবক তাকে অস্ত্রের মুখে মা টেলিকম থেকে তুলে নিয়ে যায় পাশের এক জঙ্গলে। সেখানে প্রথমে শ্লীলতাহানি ও মারধর করা হয়। পরে তরুণীর চোখ বেঁধে উলঙ্গ অবস্থায় তার ছবি তোলা হয় এবং ধর্ষণ করা হয়। ওই ঘটনার কথা কাউকে বললে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

পরে ভুক্তভোগীর মা গাছকাটাছড়া আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে ঘটনার জন্য নালিশ করে ধর্ষকদের বিচার দাবি করেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী তাকে বিলাইছড়ি থানায় পাঠিয়ে দেয়। এ ঘটনায় স্থানীয় উপজাতি যুবক পুলক চাকমা, নেলসন চাকমা, মানিক চাকমা, সুনিতিময় চাকমা, সৃজয় চাকমাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার ওই তরুণী। এ ঘটনায় চারজনকে পুলিশ গ্রেফতারও করে। এরপর মামলার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। আসামিরা একদিকে জামিনের জন্য চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে বলে ওই তরুণীর বাবা অভিযোগ করেছেন।

সূত্র জানায়, রাঙামাটি, বান্দরবান আর খাগড়াছড়ির সাধারণ মানুষ এখন ইউপিডিএফ আর জেএসএসের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের ভয়ে ওই সব এলাকায় প্রতিনিয়ত পর্যটকের সংখ্যা কমছে। দিনের বেলায় তারা অস্ত্রের মহড়া প্রদর্শন করছে। প্রাণের ভয়ে থানায় অভিযোগও দেন না পাহাড়িরা। খুন, গুম, অপহরণ আর চাঁদাবাজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ এসব অঞ্চলের মানুষ। পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা।

সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ এপ্রিল বান্দরবানের লামায় উপজাতি সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হন তিন বাঙালি গরু ব্যবসায়ী। এ ঘটনায় তিন ত্রিপুরা এক সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করা হয়। ১৩ জুন বোয়াংছড়ি উপজেলায় আক্তার (২০) নামে এক বাঙালি গৃহবধূকে প্রকাশ্যে দিবালোকে অস্ত্র ঠেকিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে এক উপজাতি সন্ত্রাসী। একই দিন অস্ত্রের মুখে অপহরণ হন বান্দরবানের আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক ইউপি সদস্য মংপ্রু মারমা। তিনি এখনো নিখোঁজ। তার পরিবারকেও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এ ঘটনায় জেএসএসের ৩৬ জনকে আসামি করে মামলা করেছে পরিবার। ৩০ মে রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে জেএসএস কর্মীরা মুকুল কান্তি চাকমা নামে অবসরপ্রাপ্ত এক সেনা সার্জেন্টকে ডেকে নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। তার পরিবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী গ্রুপের কাছে নানাভাবে ধরনা দিলেও মুকুল কান্তি চাকমার খোঁজ মেলেনি আজও।

জানা গেছে, এর আগে গত বছর ৩১ ডিসেম্বর রাঙামাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা সাজেকে এক সেনা কর্মকর্তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে তার গাড়িতে আগুন দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। ওই সময় গাড়িতে তার পরিবারসহ ভ্রমণে ছিলেন সেই সেনা কর্মকর্তা। ২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৫ জেএসএস (সংস্কার) সন্ত্রাসী। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র। একই বছরের ২৬ জুলাই রাঙামাটিতে জেএসএস-ইউপিডিএফ বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৩ জন এবং ২৬ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে জেএসএস-ইউপিডিএফের আরেকটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র।

রাঙামাটির বিলাইছড়ি এলাকার কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা অংচাখই কারবারি বলেন, তাদের সব সময় প্রাণের ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হয়। ইউপিডিএফ আর জেএসএসের সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে দিবালোকে মানুষ খুন করছে। আর প্রতিটি বাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করছে। সাধারণ মানুষ এসব সন্ত্রাসীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ।

বিলাইছড়ি থানার ওসি মো. মঞ্জুরুল আল মোল্লা বলেন, পুলিশ সাধ্যমতো চেষ্টা করছে সন্ত্রাসীদের দমনে।

এদিকে গত ২২ জুন রাঙামাটি শহরের নিজ বাসভবনে পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, উপজাতীয় নেতারা সব সময়ই সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের সময় ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা মূল স্রোতের বিরোধিতা করেছে। এখন তারা বাংলাদেশ সরকারের বিরোধিতা করছে। অর্থাৎ মূল স্রোতের বিপরীতে থাকাই তাদের স্বভাবগত অভ্যাস। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই এমপি বলেন, সন্ত্রাসীরা এতটাই শক্তিশালী যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সঙ্গে পেরে উঠে না। এ জন্য দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেএসএসের সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার রাঙামাটি শহর কল্যাণপুরস্থ বাসায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তিনি তখন ঢাকায় ছিলেন। পরবর্তীতে তার ব্যবহূত টেলিফোন নম্বরে ফোন করা হলে তার অফিস স্টাফ চিংকি চাকমা নামের এক তরুণী বলেন, স্যার এখন বাসায় নেই। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

– সূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন

পাহাড়ী পুরুষদের ধর্ষণ নিয়ে উপন্যাস লেখায় লেখক রোকেয়া লিটাকে ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে পাহাড়ীরা

rokeya lita

স্টাফ রিপোর্টার:

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের জীবনধারা ও রাজনীতি নিয়ে উপন্যাস লেখায় লেখক রোকেয়া লিটাকে ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে পাহাড়ীরা। লেখিকা নিজেই তার ফেসবুকের টাইমলাইনে হুমকির স্ক্রীনশট দিয়ে লিখেছেন, “তথাকথিত সহজ সরল কতিপয় পাহাড়ির আসল চেহারা!! ইহারা এখন আমারেই ধর্ষণ করিতে চায়।”

ধর্ষণ করলে প্রথাগত বিচারে তার শাস্তি শূকর জরিমানা। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের প্রথাগত ও পরম্পরাগত নিয়ম এটি।সাংবাদিক রোকেয়া লিটার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ডুমুরের ফুল’-এ এমনই কিছু অসামঞ্জস্য বিচার ব্যবস্থার বর্ণনা পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, কখনও কখনও বিচারের নামে ধর্ষকের সাথেই ধর্ষিতাকে বিয়ে দেয়া এবং রক্ষক যে ভক্ষক হয়ে যায়, সেই ধরণের ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে বইটিতে। এ কারণেই লেখকের উপর চটেছেন পাহাড়ীরা।

দীর্ঘ আট মাস পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে, কখনও বা সীমান্তবর্তী দূর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে গিয়ে, পাহাড়িদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন লেখক। লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পার্বত্যাঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাহাড়ীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতার অনেক ছবি রয়েছে সেখানে।

এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখা প্রসঙ্গে রোকেয়া লিটা বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকায় থাকি, প্রায়ই পাহাড়ে ধর্ষণের খবর পাই। এসব খবর পড়লে মনে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব ধর্ষণ হয়, তার সবই ঘটান বাঙালিরা। বিষয়টি আসলে তেমন নয়। কেবল বাঙালি কর্তৃক ধর্ষণের অভিযোগই আসে খবরে। পাহাড়ি পুরুষদের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে অনেক। কিন্তু সেসব বিষয় প্রকাশ্যে আনেন না সেখানকার পাহাড়ি নেতারা। তাই, ঢাকায় বসে বা ২/৩ দিনের জন্য পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে আসলে পাহাড়ের প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব নয়।’

শুধু ধর্ষণ বা প্রথাগত বিচার নয়, বইটিতে উঠে এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাজনৈতিক অস্থিরতার পেছনের অনেক অজানা তথ্য। আর এজন্যই বইটির নাম রাখা হয়েছে ‘ডুমুরের ফুল।’

লেখক জানান, উপন্যাসটির চরিত্রগুলো বাস্তব, তবে তাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

তমসবনচ

বইটির নামকরণ সম্পর্কে লেখক জানিয়েছেন, অনেকেই আমার দ্বিতীয় উপন্যাসের নামকরণের স্বার্থকতা জানতে চাইছেন। অনেকেই বলছেন, ডুমুরের ফুল বলতে তো কিছুই নেই, তাহলে আমার উপন্যাসের এই নাম রাখলাম! ডুমুরের ফুল আসলে ফলের ভেতরে থাকে, বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই উপন্যাসে মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি ও জীবনাচরণকে ভেতর থেকে উন্মোচন করা হয়েছে যা সচরাচর ঢাকায় বসে বা দুই/তিন দিনের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামে বেড়াতে গিয়ে বোঝা যায় না। এজন্যই উপন্যাসটির নাম রাখা হয়েছে ডুমুরের ফুল (The unseen object).

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি ও জীবনাচরণ নিয়ে রচিত এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে সময় প্রকাশন। একুশে বই মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে তিন নম্বর স্টলে আজ শুক্রবার থেকে পাওয়া যাচ্ছে উপন্যাসটি।

পাহাড়ীদের দাবী তাদের প্রতিবাদের মুখে বইটির উপর প্রকাশিত বুক রিভিউ দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকা তাদের অনলাইন ভার্সন থেকে তুলে নিয়েছে। কালের কণ্ঠের অনলাইন ভার্সন পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেখানে এ সংক্রান্ত কোনো বুক রিভিউ নেই। তবে প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো ঘোষণাও দেয়নি তারা।

বইটি সম্পর্কে লেখক বিভিন্ন সময় তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিযেছেন, প্রতিবছর শান্তি চুক্তি দিবস এলে ঢাকা থেকে সাংবাদিকরা পাহাড়ে যায় রিপোর্ট করতে। বেশিভাগ প্রতিবেদনই বিগত বছরের পুনরাবৃত্তি। আর সারা বছর প্রতিবেদন পাঠায় স্থানীয় প্রতিনিধি। স্থাণীয় প্রতিনিধিদের বেশিভাগই পাহাড়ি, আর নিউজ করার জন্য এদের প্রিয় বিষয় হলো, “বাঙালী কর্তৃক পাহাড়ি নারী ধর্ষণ”। আমি বলবো পাহাড় রাজনীতির সবচে বড় হাতিয়ার হলো “পাহাড়ি নারী ধর্ষণ”। ধর্ষণ আর শান্তি চুক্তি ছাড়াও যে আরও হাজারটা বিতর্কিত ইস্যু আছে পাহাড়ে, তা হয়তো কখনও বুঝতেই পারতাম না “ডুমুরের ফুল” লেখা শুরু না করলে!! আমি বলবো, পাহাড়ের আজকের এই অবস্থার জন্য অনেক বেশি দায়ী আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো এবং কিছু এনজিও। ক্ষেত্র বিশেষে, এসব সংবাদপত্র ও এনজিও কাজ করেছে পাহাড় রাজনীতির ফুয়েল হিসেবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, আমার মনে হয় এতোকিছু করতে হবে না, থানায় গিয়ে খোঁজ নিলেও কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। তবে, সমস্যা হলো, পাহাড়ি মেয়েদের খুব একটা দেখা যায় না যে, তারা ধর্ষণ নিয়ে বাঙালীর ওপর দোষারোপ করছে। বেশিভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পাহাড়ি পুরুষরা এই বিষয়টির রাজনীতিকরণ করছে এবং সেভাবেই প্রচার চালাচ্ছে..

পাহাড়ী নারী ধর্ষণ সম্পর্কে লেখিকা আরো বলেছেন, আজকে একজনের লেখা পড়লাম। তিনি লিখেছেন, “বাঙালী সেটেলারদের কাছে পাহাড়ি মেয়েরা ভোগ্যপণ্য”। এই কথাটি শুনলে প্রথমেই মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী সেটেলারদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে বোধ হয় শুধুই ধর্ষণ করার জন্য। তাদের আর কোনো কাজ নেই সারাদিন তারা শুধু মদ খায় আর পাহাড়ি মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণ করে। এমনকি এসব লেখা পড়লে মনে হয়, এই যে শীতকাল এলেই দলে দলে বাঙালীরা পাহাড়ে বেড়াতে যায়, তারাও বোধ হয় শুধু পাহাড়ি মেয়েদের ধর্ষণ করতেই যায়। বলি, পাহাড়ি মেয়েরা কি এতই রুপবতী আর এতই অাকর্ষনীয় হয়ে গেছে যে, বাঙালীরা সারাক্ষণ তাদের ধর্ষণ করার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে!!

তবে, পাহাড়ে ধর্ষণের ঘটনা যে ঘটছে না, তা কিন্তু নয়। হয়ত, এসব ঘটনার সাথে বাঙালীরাও জড়িত। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। প্রায় আট মাস পার্বত্যচট্টগ্রামে ছিলাম, দুজন পাহাড়ি মেয়ে ধর্ষণের ঘটনা আমার কানে এসেছে। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে, দুটি ঘটনাতেই অভিযোগ পাহাড়ি পুরুষের বিরুদ্ধে। আরও অবাক হয়েছিলাম যে বিষয়টি দেখে, দুটি ঘটনাই ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল, ধর্ষকের বিচার চেয়ে কোনো আন্দোলন নেই, নেই কোনো মিছিল, পত্রিকার পাতায়ও কোনো খবর নেই!! অথচ, ঢাকায় বসে আমরা শুধু খবর পাই, বাঙালীরা পাহাড়ি মেয়েদের ধরে এনে ধর্ষণের উৎসব পালন করছে। বুঝতে সমস্যা হয় না, এগুলোই হলো পাহাড়ের আসল রাজনীতি, এই রাজনীতির অনেকটা জুড়েই রয়েছে আমার উপন্যাস ” ডুমুরের ফুল (সময় প্রকাশন)”।