পার্বত্য চট্টগ্রাম কি পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদান এর মত স্বাধীন জুম্মল্যান্ড হবে?

 

তিমির মজুমদার

 পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় ভারতের অংশ হতে চেয়েছিল। তদানীন্তন চাকমা নেতা কামিনীমোহন দেওয়ান এবং স্নেহকুমার চাকমা রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা এবং বোমাং রাজা বান্দরবানে বার্মার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। একই ভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা সার্কেল চিফ ত্রিদিব রায় (বর্তমান চাকমা সার্কেল চিফ দেবাশীষ রায়ের বাবা) এবং বোমাং  সার্কেল চিফ মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের অনতিবিলম্ব পর হতেই তারা অস্ত্র সমর্পণ না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হবার জন্য সাংগঠনিক ও সামরিক শক্তি অর্জন করতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা সংক্ষেপে ‘পিসিজেএসএস’ অথবা ‘জেএসএস’ নামে আঞ্চলিক দল গঠন করে এবং এই দলের সামরিক শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ নাম দিয়ে অদ্যাবধি পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত আছে।

গত ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় জেএসএস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার সিংহভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন আংশিকভাবে সম্পন্ন হলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছেনা; এই অজুহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করে চলছে স্থানীয় একটি গোষ্ঠী। ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে একটি নতুন দেশ গঠন করার ষড়যন্ত্রে  লিপ্ত রয়েছে তারা।

একই প্রেক্ষাপটে যদি ‘পূর্ব তিমুর’ কিংবা ‘দক্ষিণ সুদান’ এর দিকে দৃষ্টিপাত করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে মাত্র ২০ বছরের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে ইস্ট তিমুরকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরী করা হয়েছে। মাত্র ৬০–৭০ বছরের প্রচেষ্টায় দক্ষিণ সুদানকে জাতিসংঘের নেতৃত্বে সুদান থেকে আলাদা করে স্বাধীন দেশ হিসেবে নতুন দেশ তৈরী করা হয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একই ধরণের ষড়যন্ত্র চলছে না তো ?

কাকতালীয়ভাবে দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ১৩,২৯৫ বর্গ কিলোমিটার এবং পূর্ব তিমুরের আয়তন ১৪,৫০০ বর্গ কিলোমিটার যা প্রায় কাছাকাছি। ১৯৭৫ সালে পূর্ব তিমুরে ক্যাথলিক খ্রিস্টান এর জনসংখ্যার হার ছিল ৩০–৪০% যা ৯০ দশকে ৯০% পৌঁছায়। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, যে তিন পার্বত্য জেলায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৫২,৬৯৯ জন ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু শুধুমাত্র ২০১৪–১৫ সালে সর্বমোট ৫০৬টি পরিবারের ২,২২২ জন ধর্মান্তরিত হয় এবং ২০১৫–১৬ সালে এ সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বমোট ১,৬৮৯টি পরিবারের ৫,৬৮৯ জন ধর্মান্তরিত হয়েছেন বলে জানা যায়। একই সাথে ২০১০ সালে তিন পার্বত্য জেলায় চার্চ এর সংখ্যা ছিল সর্বমোট ২০৯টি যা ২০১৫ সালে বেড়ে ২৫৭টিতে গিয়ে পৌঁছেছে। কিছু এনজিও এবং মিশনারী অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষা সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ধর্মান্তকারীদের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সাহায্য করছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বলা হচ্ছে যে, খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে অজীবন তারা যাবতীয় সুবিধা পেতে থাকবে এবং কেউ তাদের জায়গা জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। দরিদ্রতার সুযোগ এবং জমির স্থায়ী মালিকানার লোভ  দেখিয়ে সহজ সরল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ব্যাপকহারে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরকরণ করা হচ্ছে। কাজেই প্রতি বছরে এই সংখ্যা তিনগুণ হিসেবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে সেদিন আর বেশী দূরে নয় যখন পার্বত্য এলাকার একটি বৃহৎ জনসংখ্যা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভূক্ত হয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এমন ভাবনার কারণ কি? প্রথমতঃ মুক্তিযুদ্ধের পর হতে অদ্যাবধি চলমান  সশস্ত্র সংগ্রাম; দ্বিতীয়তঃ অনলাইন ও বিভিন্ন মিডিয়ার প্রচার প্রচারণা; তৃতীয়তঃ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের  দাবীর পক্ষে ক্রমশঃ কতিপয় দেশী ও বিদেশী বুদ্ধিজীবীদের জোরালো সমর্থন এবং চতুর্থতঃ কিছু সংখ্যক বিদেশী এনজিও এবং দাতাগোষ্ঠীর একপেশে ও একনিষ্ঠ সমর্থন।

একইভাবে এর বিপক্ষে কোনরকম প্রচার প্রচারণা না করা এবং মিডিয়া ও সুশীল সমাজের চুপচাপ থাকা প্রকারান্তরে এসকল আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী দলসমূহের দাবীর পক্ষে সমর্থন দেবারই নামান্তর। এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা তাদের দেশের নাম, পতাকা, মুদ্রা ইত্যাদি কি এবং কেমন হবে তা তৈরী করে ফেলেছে এবং অনলাইন ও মিডিয়ার কল্যাণে সেগুলো ব্যাপক পরিচিতি করাতে সক্ষম হয়েছে।

অনলাইন প্রচার প্রচারণা এবং বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও চাকুরীর জন্য বিদেশে গমন করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সামনে ব্যানার ফ্যাস্টুনসহ র‍্যালি, মানববন্ধন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি নানারকম কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং তাদের দাবীর স্বপক্ষে নিরন্তর জনমত সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কাছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সমর্থন চেয়ে ইমেইল করা হয়েছে বলে জানা যায়। যিনি ইমেইলটি করেছেন তিনি নিজেকে ‘মাইনরিটি কংগ্রেস পার্টি’র আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, ক্যাপ্টেন ‘শচীন কর্মকার’ বলে দাবী করেছেন। ভারতের পূর্ব সীমানা  সংলগ্ন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সহায়তা চেয়েছে।

একইভাবে বাংলাদেশে কর্মরত কিছু এনজিও, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং ‘Peace Campaign Group’ ইত্যাদি বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতায় লিপ্ত বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নবাদী তথা জেএসএস, ইউপিডিএফ, জেএসএস (সংস্কার) ইত্যাদি দলসমূহ চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে যার পরিমাণ বাৎসরিক প্রায় সাড়ে চারশত কোটি টাকার মত।  সেই অর্থের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই তারা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। আদায়কৃত অর্থের আর একটি বড় অংশ তাদের দাবী দাওয়ার পক্ষে প্রচার প্রচারণা  এবং জনমত সৃষ্টির জন্য ব্যয় করছে বলে জানা যায়। ‘Peace Campaign Group’ নামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাংগঠনটি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা গোষ্ঠীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে দাবী করেছে যে, বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী মিলে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে ‘ইসলামিকরণ’ চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশ একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে।

এদিকে ইউএনডিপি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালীদের মাথা পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা করে প্রদান করে বাংলাদেশের অন্য কোন স্থানে স্থানান্তরের জন্য একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেবার খবর পাওয়া গেছে। এই কৌশলে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাঙ্গালীদের বিতাড়িত  করতে পারলে সেখানে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন অনেক সহজতর হবে বলে অনুমেয়।

অতএব সাধু সাবধান । এখনই তৎপর না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখন্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি হুমকি হতে পারে। প্রাণপ্রিয় এই মাতৃভূমির প্রতিটি ইঞ্চির সাথে মিশে রয়েছে অনেক রক্ত ও ত্যাগ। আমরা সবাই বড়  ভালোবাসি আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে। কাজেই এদেশের ভূখণ্ডে যারা স্বাধীন জুম্ম ল্যান্ডের পতাকা উড়াবার স্বপ্ন দেখছেন, এদেশের স্বাধীনচেতা দামাল ছেলেরা তা বাস্তবায়ন হতে দেবে বলে মনে হয় না।

 (লেখক: শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারী সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা কাম্য

মেহেদী হাসান পলাশ

মেহেদী হাসান পলাশ :

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় বিদেশী দাতা সংস্থা ইউএনডিপি’র কার্যক্রম মনিটরিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা, সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তন, বিদেশী অতিথি ও কূটনীতিদের পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণ ও স্থানীয় পর্যায়ে বৈঠক নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশ ও আনসারে যোগ দেয়া শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলীর মতো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও ষড়যন্ত্র দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রস্ফুটিত হয়েছে। গত ৭ জানুয়ারী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬ থেকে তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসকদের নিকট ১১ দফা নির্দেশনা সম্বলিত ফ্যাক্স পাঠানোর পর এ তথ্য জানা যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি লেখকের সংগ্রহে রয়েছে। বিজিবি’র একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি পরবর্তী পার্বত্য চট্রগ্রামের পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিক বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, আনসার ভিডিপি’র মহাপরিচালক, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিজিবির কর্মকর্তাগণ।

সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে স্থানীয় একাধিক সংগঠন বিভিন্নভাবে শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমসহ চাঁদাবাজি, অপহরণ ও বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ি জনপদ ক্রমেই অশান্ত হয়ে উঠছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামের উন্নয়নের নামে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার জবাবদিহিতা নেই বলললেই চলে। পার্বত্য জনপদে ইউএনডিপিসহ অন্যান্য এনজিও যেসব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে সেসব প্রকল্পের মনিটর করা দরকার। এছাড়া, তিন পার্বত্য জেলায় যেসব সংগঠন শান্তিচুক্তি বিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত এবং চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণের সাথে যুক্ত তাদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য চট্রগ্রামে গত দশ বছরে ইউএনডিপির মাধ্যমে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে মনিটর করা প্রয়োজন৤ তিনি বলেন, বিদেশী নাগরিকদের পার্বত্যাঞ্চল ভ্রমণে  Code of Conduct  প্রণয়ন করা দরকার। অনেক সময় বিদেশী নাগরিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে শুধু জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারকে জানিয়ে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে যায়, এটি সঠিক  নয়। জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের কাছে এধরণের কোন আবেদন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হলে মন্ত্রণালয়ই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এদিকে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষায়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ৪টি অধ্যায়ে ৭২টি ধারা রয়েছে। অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হলেও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্ত লারমা) স্বীকার করেন না। উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার কারণে গত ২২ বছরেও তিন পার্বত্য জেলায় স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। পার্বত্য চট্রগ্রাম শান্তিচুক্তি অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত ৩৩টি বিষয় /বিভাগসমূহের মধ্যে ৩০ টি সংস্থা/বিষয় ইতোমধ্যে হস্তান্তরিত হয়েছে। অবশিষ্ট তিনটি বিষয় কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিধায় হস্তান্তর কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তিনি বলেন, জেএসএস এবং ইউপিডিএফসহ আরও যে সব স্থানীয় সংগঠন আছে তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার করা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে সশস্ত্র গ্রুপগুলো সব সময়ই সক্রিয় রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানীতেও কোন কোন সংগঠন জড়িত রয়েছে মর্মে অভিযোগ আছে। বিজিবি কর্তৃক বিওপি স্থাপনের জন্য বন বিভাগ থেকে জায়গা চাওয়া হলে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় হতে সহযোগিতা করা হবে মর্মে তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক বলেন, উন্নয়নের নামে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কোথায় খরচ করা হলো তার হিসাব নেওয়া দরকার। ইউএনডিপির কাছে এ বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া যেতে পারে। তিনি  বলেন, বিদেশী পর্যটকগণ স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করে পার্বত্যাঞ্চলে ভ্রমণে গিয়ে থাকেন। ফলে বিষয়টি প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর অগোচরেই থেকে যায়। সভায় ডিজিএফআই প্রতিনিধি বলেন, বিদেশী নাগরিক মন্ত্রণালয় বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেলে পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত কারোর মেহমান হিসাবে সাধারণ যানবাহনে গমন করে থাকে। সিএইচটি কমিশন সহ কিছু সংস্থা স্থানীয় উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে প্রশাসন কিংবা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ব্যতিরেকে বৈঠক ও আলাপ আলোচনা বেশি পছন্দ করে। পার্বত্য চট্রগ্রামের উপজাতীয়দেরকে আদিবাসী হিসাবে ঘোষণা করা তাদের মূল উদ্দেশ্য। অন্যান্য বিষয়ে অনৈক্য থাকলেও এই পয়েন্টে সকল স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠন একমত পোষণ করে। বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়:

বিগত ১০ বছরে পার্বত্য চট্রগ্রামে ইউএনডিপি কর্তৃক ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের  উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ফলাফল প্রেরণের জন্য অনুরোধ করা হয়; শান্তিচুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সংগঠন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ কর্তৃক চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ, মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র চোরাচালান রোধকল্পে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার এর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়; কোন আইনগত ভিত্তি না থাকায় সিএইচটি কমিশনের নাম সংশোধন করে ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ রেখে অন্য কোন নাম রাখার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়; কূটনৈতিকগণ ছাড়া সাধারণ বিদেশী নাগরিকগণ পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করতে চাইলে অন্তত একমাস পূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমতির জন্য আবেদন করবেন; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুমতি প্রদান করবে; অনুমতিপ্রাপ্ত বিদেশী নাগরিকগণ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক/ পুলিশ সুপারের নিকট তাদের উপস্থিতি/ভ্রমণসূচি দাখিল সাপেক্ষে ভ্রমণ করবেন; কূটনৈতিকগণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমতি গ্রহণ করে পার্বত্য চট্রগ্রাম ভ্রমণ করবেন; কোন দেশী-বিদেশী ব্যক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্যাঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাত কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবি এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে; পার্বত্য চট্রগ্রামের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সাথে পারস্পরিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ দায়িত্ব পালন করবে; ভারত ও বাংলাদেশের সাথে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্রগ্রামের ৪৭৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার নিমিত্তে ইতোমধ্যে গৃহীত/বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনাসহ আবশ্যকীয় স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব বিজিবি প্রেরণ করবে; পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান চেকপোস্টগুলোকে শক্তিশালী করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুলিশ ও আনসার বাহিনীতে কর্মরত শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্যদের তিন পার্বত্য জেলা থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলীর সুপারিশ করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত যুগান্তকারী। নিকট অতীতে এতো সুনির্দিষ্ট, সুচিন্তিত, লক্ষ্যানুসারী সিদ্ধান্ত দৃষ্টিগোচর হয়নি। সন্দেহ নেই পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত দেশবাসী কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পাহাড়ী সন্ত্রাসী ও তাদের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক, দেশী বিদেশী দাতা সংস্থা, এনজিও ও কূটনীতিকরা চরমভাবে ক্ষুদ্ধ হয়েছে। তাই তারা সরকারী এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে তাদের অনুজীবী দেশীয় রাজনীতিবিদ, এনজিওকর্মী, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীদের মাঠে নামিয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহকে অগণতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক, নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িকতা, শান্তি চুক্তি বিরোধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি আরো বলেন, বিদেশী নাগরিকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণে  যেতে অনুমতি লাগবে আবার যে কেউ সেখানকার ‘আদিবাসীদের’ সাথে দেখা করতে চাইলে সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে সাথে রাখতে হবে এইরকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ নির্বুদ্ধিতা ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দেয়’।

বিশিষ্ট কলামিষ্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ সিএইসটি কমিশনের নাম পরিবর্তন সম্পর্কে বলেন, ‘নাম পরিবর্তনের এ অধিকার স্বারাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কে দিয়েছে? এতদিন পর নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গ কেন তোলা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অধিকার আছে দেশের বাইরে থেকে আসুক বা দেশের ভিতর থেকে কেউ আসুক সে বিষয়ে নজরদারী রাখা। তার মানে তো এই নয় যে, একজন বাঙালী পাহাড়ী কাউকে বিয়ে করতে হলে, বিয়ের বরযাত্রী নিয়ে পাহাড়ে যেতে হলে প্রশাসনের অনুমতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লাগবে। পাহাড়ীদের কি কোন বিদেশী মেহমান থাকতে পারে না’? এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। প্রবীণ রাজনীতিবিদ ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পংকজ ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা জানি জেলে কারোর সাথে দেখা করতে হলে প্রশাসনের উপস্থিতিতে করতে হয়। তাহলে আমার প্রশ্ন, পার্বত্য চট্রগ্রাম কি তাহলে কারাগার যে এখানে বাইরের কেউ যেতে হলে অনুমতি নিতে হবে’। পংকজ ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাঙালি যে একটি উপনিবেশবাদী জাতি তা প্রমাণিত হয়েছে। বাঙালিরা বর্ণবাদী, ইহুদী, জার্মানির মতো। এর মধ্য দিয়ে জাতিগত সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ্যে রূপ লাভ করেছে। পাহাড়ে সেনা শাসনের বিষয়টি এর মধ্য দিয়ে জানিয়ে দেয়া হলো। এটাকে বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িকতা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সিএইচটি কমিশনের নাম পরিবর্তনের অনুরোধের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই কমিশনের সদস্য ব্যরিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত অবশ্যই সংবিধান পরিপন্থী। তাছাড়া কোন একটি সংগঠনের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আছে কি? অধ্যাপক মেসবাহ কামাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে নির্লজ্জ সিদ্ধান্ত ও পার্বত্য চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক’ বলে অভিহিত করেন।

 উল্লেখ্য যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা বিরূপ মনোভাব ও মন্তব্য করেছেন তাদের সম্পর্কে খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে এরা কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন এনজিও সাথে জড়িত বা তা থেকে লাভবান। আর ঐ সকল এনজিও উল্লিখিত দাতা দেশ ও উন্নয়ন সংস্থা থেকে আর্থিকভাবে অনুদানপ্রাপ্ত বা লাভবান। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের প্রতিকূলে যেকোনো সিদ্ধান্ত ও ঘটনাবলীতে তারা সবসময় সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়ে থাকে। অর্থাৎ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অধিকার নয় বরং এর পেছনে তাদের আর্থিক স্বার্থ জড়িত।

 পার্বত্য চট্টগ্রামে কারা সাম্প্রদায়িকতার বীজবপন তা ড. ইফতেখারুজ্জামানের স্বার্থের চোখে ধরা না পড়লেও তাকে প্রথম আলোর সাবেক ফটো সাংবাদিক সৈকত ভদ্রের আর্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দেশে, মহাদেশ নির্বিশেষে বিয়ে হচ্ছে সর্বত্র। কেবল বাংলাদেশের পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কাছেই এটা মহা অপরাধ। যেকোনো কোনো পাহাড়ী মেয়ে কোনো বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করলে পাহাড়ী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে থাকে। এমনকি পাহাড়ী মেয়েরা বাঙালী ছেলেদের সাথে প্রেম, বন্ধুত্ব, চলাফেরা করলে পাহাড়ী সংগঠনগুলো ওই মেয়েকে চাপ দেয় ফিরে আসতে। কিন্তু ফিরে না এলে জাতি রক্ষায় নামে উল্লিখিত শাস্তি দেয়া হয়। এটাই তাদের অঘোষিত শাস্তি। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সদস্য  সাংবাদিক সৈকত ভদ্র। তিনি ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন খাগড়াছড়ির মেয়ে সহযোদ্ধা রেটিনা চাকমাকে। বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করায় রেটিনা চাকমার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। একই কারণে প্রথম আলো থেকে চাকুরী হারাতে হয় তাকে। পাহাড়ীদের চাপে তাকে চাকরী থেকে বহিস্কারের জন্য প্রথমআলোর সম্পাদক বরারব সুপারিশ করেছিলেন ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। সৈকত ভদ্র সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশেও মেয়েদের উপর নিলামের মত মধ্যযুগীয় বর্বরতা সংঘটিত হতে পারে সেটা জেনে আপনারা অবাক হতে পারেন” । তিনি স্ত্রী রেটিনা চাকমাকে নিলামের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতীয় বিবেক ও মানবিকতার কাছে আর্তনাদ করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ গণমাধ্যমের বিবেক ও মানবিকতায় সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ নিষ্ফল করাঘাত করেছে। এমনকি পাহাড়ীদের ব্যাপারে অতি স্পর্শকাতর গণমাধ্যমেও সৈকত ভদ্রের এ আর্তনাদ প্রকাশযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি।

শুধু এক রেটিনা চাকমা নয়, গুইমারা উমাচিং মারমা, মাটিরাঙার সোনাবি চাকমা, রাঙামাটি কুতুকছড়ির রীনা ত্রিপুরা, রামগড়ের মণিকা ত্রিপুরা, এরকম আরো অসংখ্য পাহাড়ী মেয়েকে বাঙালী বিয়ে করায় অপহরণ, গণধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন নারকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হতে হয়েছে। অবশ্য সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনিও খাগড়াছড়ির জামাই। স্ত্রী চাকমা সম্প্রদায়ের। তাকে বা তার স্ত্রীকে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে এমন তথ্য লেখকের জানা নেই। বরং ঢাকায় তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের কাছে সর্বোচ্চ জামাই আদরই পেয়ে থাকেন। কিন্তু খাগড়াছড়িতে শশুরবাড়ী যেতে হয় রাতের অন্ধকারে। ঐক্যন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য প্রায়ই বলে থাকেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসরাইলী শাসন চলছে। পঙ্কজ বাবুর ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলার ধৃষ্টতা দেখাতে চাই না। তবে তিনি যদি পরিস্কার করে বলেন, ইসরাইলের স্যাটেলার ইহুদি শাসনে নিপীড়িত স্থানীয় মুসলিমদের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি কীভাবে মেলালেন। এখানে কারা স্যাটলার, কারা স্থানীয়? কারা শোষক, কারা শাসক?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় দাতা সংস্থাগুলো অনেকটা স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এনজিও পরিচালনা সংক্রান্ত কোনো সরকারি নির্দেশনা তারা মানে না। তাদের কাজের ও খরচের কোনো বিবরণ/হিসাবও সরকারকে দেয় না। এ ব্যাপারে একাধিকবার বলা হলেও তারা তা পালন করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী দাতা সংস্থা, মিশনারী ও এনজিও’র কর্মকাণ্ড সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। এসব এনজিও ও দাতা সংস্থার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে সহায়তা, উস্কানী, সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি, ধর্মান্তরকরণসহ নানা অভিযোগ বহুদিনের। সরকারি একাধিক তদন্তে একথা প্রমাণিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইস্ট তিমুর ও সাউথ সুদানের মতো আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র বানানোর পশ্চিমা নীলনকশাও সকলের জানা। গত ১৩ মার্চ বান্দরবানের আলীকদমে  ‘সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্ট’ নামে এক খ্রিস্টান মিশনারী লোভ দেখিয়ে অনেকটা গোপনেই স্থানীয় ৩৩ জন মুরুংকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করে। পুলিশ এ অভিযোগে মিশনারীটির ৫ জন সদস্যকে গ্রেফতারও করেছে। গতবছর একই এলাকার চাক সম্প্রদায় মিশনারীদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরিত করার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে। কাজেই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বৈদেশিক সাহায্যের নামে টাকা এনে এসব এনজিও ও দাতা সংস্থা কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করছে তা জানা জরুরি ও বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার।

এদিকে ১৯৮৯ সালে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল সিএইচটি কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন পর নতুন সিএইচটি কমিশন গঠিত হয়েছে। এর নামের আগে এখন আর ইন্টারন্যাশনাল লেখা হয় না। নতুন সংস্থাটি কবে, কোথায় গঠিত ও নিবন্ধিত হয়েছে, কোন আইনে নিবন্ধিত হয়েছে, বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার আদৌও কোনো অনুমতি আছে কিনা সেসব খতিয়ে দেখে এই কমিশনকে নিষিদ্ধ করার দাবি পার্বত্যবাসী, বিশেষ করে বাঙালিদের দীর্ঘদিনের। এই কমিশনের বিরুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িকতা, দাঙ্গা সৃষ্টির অভিযোগ করে থাকে বাঙালিরা। সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির অভিযোগে পার্বত্য বাঙালিরা ইতোমধ্যে এই কমিশনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তাদের সফরকালে প্রায় সবসময় একই অভিযোগে বাঙালিদের হামলার শিকার হতে হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান কি করে ‘কমিশন’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে তা খতিয়ে দেখে মন্ত্রণালয় কেবল ‘কমিশন’ নামটি বাদ দিয়ে নতুন করে নিবন্ধিত হয়ে কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে। এটি অত্যন্ত সফট ডিসিশন বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে পাশ্চাত্যের স্বতন্ত্র খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র ও তৎপরতার কারণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশী নাগরিক ও কূটনীতিকদের চলাচলের ক্ষেত্রে উল্লিখিত বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এমনিতেই কূটনীতিকদের সকল ভ্রমণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কর্মরত পশ্চিমা কূটনীতিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আইন অমান্য করে থাকেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় এ ঘটনা অহরহই ঘটে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে পরিচয় গোপন করে বা পর্যটকের ছদ্মাবরণে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা পরিচালনার কথাও নতুন নয়।  এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের স্পেশ্যাল র‌্যাপোটিয়ার্স Mr. Lars Anders Bear এর কথা স্মরণ করা যেতে পারে।  সুইডেন নাগরিক Mr. Lars Anders Bear বিভিন্ন দেশের আদিবাসী ইস্যু নিয়ে কাজ করেন। তিনি UNFPII-এ স্পেশাল রেপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োজিত। UNFPII এর দশম অধিবেশনে Mr. Lars Anders Bear কর্তৃক উপস্থাপিত ‘Status of the  implementation of CHT Peace Accord of 1997′ যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তিনি জাতিসংঘের পরিচয় গোপন করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক কমিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেন এবং তার সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত UNFPII এর স্বার্থে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এমনকি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করতেও কসুর করেননি তিনি। এ ধরনের তৎপরতা রোধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নজরদারী করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেখানে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা প্রতিনিয়ত অপহরণ ও জিম্মি করে হত্যা ও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে সেখানে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণ নিরাপদ করতেও নজরদারী প্রয়োজন।

 তবে একথা সত্য যে, এ ধরনের নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনাকে নিরুৎসাহিত করবে এবং একই সাথে সেখানে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের কাজে বাধার সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে সচেতন মহলের অভিমত এই যে, বিশেষ অঞ্চল হিসাবে বিবেচিত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশীদের চাকরি ও অবস্থান নিরুৎসাহিত করে বাংলাদেশীদের মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন অঞ্চলে বিদেশীদের ভ্রমণে এ নিদের্শাবলীর শৈথিল্য প্রদর্শন এবং পর্যটন অঞ্চলের বাইরে বিদেশীদের ভ্রমণের এ নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়িভাবে আরোপ করা যেতে পারে। ভারত, পাকিস্তান, চায়নাসহ বিশ্বের দেশে দেশের ইনসার্জেন্ট অঞ্চগুলোতে এভাবেই বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অন্যতম হচ্ছে, শান্তিবাহিনীর সাবেক সদস্য যারা পুলিশ ও আনসারে যোগদান করেছে এবং তাদের মাধ্যমে যারা পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত তাদের পার্ব্ত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলী করতে হবে। এটি অত্যন্ত সঠিক ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

 অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অনেক সদস্য ছাত্রজীবন শেষে নিরাপত্তাবাহিনীর চাকুরীতে যোগদান করে। কিন্তু সার্ভিসে যোগদানের পরেও  অনেকেই তাদের গোপন সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এ বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনীতে কর্মরত পাহাড়ীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে একটি মহল ইউএনডিপি’র ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রামে মিশ্র পুলিশ বাহিনী সৃষ্টির নামে উপজাতীয় পুলিশ ও আনসারদের পার্বত্য চট্টগ্রামে পদায়ন শুরু করে। এই সুযোগে শান্তিবাহিনীর যেসকল সদস্য অস্ত্র জমা দিয়ে পুলিশ ও আনসারে চাকরী নিয়েছিল তারাও পদায়ন হয়। কিন্তু সার্ভিসে থাকলেও তারা সার্ভিসের গোপন খবর বিশেষ করে অপারেশনাল নানা তথ্যাদি উপজাতীয় সংগঠন ও সন্ত্রাসীদের কাছে পাচার করতো। এ বিষয়ে পুলিশসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে রিপোর্ট করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাঙালীদের কাছে মদ একটি নিষিদ্ধ পানীয় হলেও পাহাড়ীদের জীবনে এটি খুবই সাধারণ পানীয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে, উপজাতীয় পুলিশ দায়িত্ব পালনকালে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে, বা সন্ত্রাসীরা টার্গেট করে উপজাতীয় পুলিশদের পাহাড়ী মদ খাইয়ে মাতাল করে। মাতাল অবস্থায় সে অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা পুলিশের অস্ত্র নিয়ে পলায়ন করে। এ কায়দায় গত দূর্গাপূজার সময় পানছড়িতে লক্ষ্ণীকুমার চাকমা নামের এক শান্তিবাহিনী ফেরত উপজাতীয় পুলিশের একে-৪৭ রাইফেল চুরি হয়। বিষয়টি বিবেচনা করেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কাজেই দেশী দাতা দেশ, সংস্থা ও তাদের অনুজীবী এনজিও, এনজিও’র মালিক, সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে যত সমালোচনাই করুক, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে সরকারকে তার সিদ্ধান্তে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে হবে। জাতীয় প্রত্যাশাও এটাই।

Email:palash74@gmail.com

নোট: গত ২২ মার্চ ২০১৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে এই লেখাটি প্রকাশিত  হয়েছিল। তবে বর্তমান লেখাটি ঈষৎ পরিবর্ধিত। লেখাটি যেদিন প্রকাশিত হয় তার পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৪ ফেব্রুয়ারীর আদেশ শিথিল করে।

লেখকের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আরো কিছু লেখা

 

আলীকদমে আর্থিক লোভ দেখিয়ে বৌদ্ধ থেকে ৩৩ জনকে খৃস্টান বানানোর অভিযোগে সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট মিশনারীর ৫ জন আটক

Ak khristan news pc 13-03-2015

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান):

বান্দরবানের আলীকদমে সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট নামের একটি খৃস্টান মিশনারী কর্তৃক প্রলুব্ধ করে স্থানীয় মুরুং উপজাতিদের ধর্মান্তরের অভিযোগে শুক্রবার সকালে পুলিশ মিশনারিটির ৫ কর্মীকে উপজেলার চিওনী মুরুং পাড়া থেকে আটক করে। একইসাথে খৃস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত পাড়া কার্বারীসহ ৫ জনকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে এগার বছর পর এ মিশানারীটির বিরুদ্ধে আবারো আলীকদমে প্রকাশ্যে ধর্মান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার অভিযোগ উঠেছে।

 

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বাধীন খৃস্টান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বেশ কয়েকটি মিশনারী কাজ করে যাচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ‘সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিষ্ট’ নামে একটি খৃস্টান মিশনারী অনেকটা গোপনেই স্থানীয় মুরুংদের টার্গেট করে ধর্মান্তর করে যাচ্ছে। ১৩ মার্চ ভোরে পূর্বপরিকল্পনা মতে, সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিষ্ট, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেক্রেটারী ডেনিশটি দাস ও প্রজেক্ট ডাইরেক্টর ডিটি রায় অন্যান্যদের নিয়ে চিওনী মুরুং পাড়ায় ৩৩ জন মুরুং নারী-পুরুষ ও শিশুকে খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত করান। কিন্তু গোপন খবরের প্রেক্ষিতে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মালম্বী লোকজনসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা চিওনী পাড়ায় উপস্থিত হওয়ার আগেই সটকে পড়েন ডেনিশটি দাশ ও প্রজেক্ট ডাইরেক্টর ডিটি রায়। এ সময় চিওনী পাড়ার কার্বারী সাকনাই মুরুং এর বাসায় সংস্থাটির ৩ নারী কর্মীসহ ৫ জনকে পাওয়া যায়।

সাংবাদিক ও গোয়েন্দা সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদে সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট কর্মী ট্যাটম্যান ত্রিপুরা ও তার স্ত্রী হাঁসচি ত্রিপুরা স্বীকার করেন, মিশনারিটির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেক্রেটারী ডেনিশটি দাসের নির্দেশে তারা মুরুংদের ধর্মান্তর করার কাজে চিওনী পাড়ায় আসেন। ট্যাটম্যান আরো বলেন, আমি মিশনারিটির লামা গজালিয়া ইউনিয়নের গতিরাম পাড়ায় পরিচালিত মিশনারি স্কুলের একজন শিক্ষক। এ মিশনারীটির একাধিক স্কুল লামা ও আলীকদমের পাহাড়ি পল্লীতে রয়েছে।

IMG_20150313_102239

‘কেন বৌদ্ধ ধর্ম থেকে খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত হলেন’- এ প্রশ্নের জবাবে চিওনী মুরুং পাড়ার কার্বারী চাকনাই মুরুং ও সাকডিং মুরুং জানান, আমরা বঞ্চিত জাতি। উপজেলা সদরের দুই কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করার পরও প্রশাসনের লোকজন কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমাদের খোঁজ-খবর নেয় না। আমরা খাবার পানি ও স্যানিটেশন সমস্যায় আছি। সরকারের লোকেরা এসব দেখে না। খৃস্টান ধর্মে গেলে আমাদের অভাব তারা পূরণ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তাই আমরা কিছু পাওয়ার আশায় আজ (শুক্রবার) সকালে খৃস্টান হয়েছি। আমরা এখন নতুন ধর্ম পেয়েছি! এখানে এক মণ মুরগী জবাই করে পাড়ার লোকজনকে খাওয়ানো হয়েছে’- যোগ করেন কার্বারী।

সাকাইন মুরুং কার্বারী আরো জানান, তার পরিবারের ৫ জনসহ পাড়ার মেন্নাম মুরুং, চাকদিন মুরুং, ফারিং মুরুং, বথুই মুরুং, মেনপং মুরুং, ইয়ংওয়াই মুরুং, লাইরুং মুরুং, ফন্নাং মুরুং, তংহ্লা মুরুংসহ তাদের পরিবারের ৩৩ জন বৌদ্ধ ধর্ম ত্যাগ করে খৃস্টান হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট নামের এই মিশনারী কর্তৃক উপজেলার তালুক চন্দ্র পাড়ায় ১১০ জন তঞ্চঙ্গ্যা ও চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের শিশু পাড়ার ৪৩ জন মার্মাকে খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত করান। এরা সকলের বৌদ্ধ ধর্মালম্বী ছিলেন। এ খবরে স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের মাঝে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ নিয়ে সাংবাদিকরা লেখালেখি করলে মিশনারীটি আলীকদম থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। প্রশাসনের নীরবতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন পর আবারো মিশনারীটি ধর্মান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বরে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিষ্ট এর চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেক্রেটারী ডেনিশটি দাশ শুক্রবার বিকেলে মুঠোফোনে বলেন, আমরা সমাজসেবার কাজ করে থাকি। জোর করে কাউকে ধর্মান্তর করি না। তবে চিওনী মুরুং পাড়ায় শুক্রবার সকালে তারা উপস্থিত হয়েছিলেন স্বীকার করে বলেন, কাউকে লোভ দেখিয়ে খৃস্টান বানানো হয়নি। স্বেচ্ছায় মুরুংরা খৃস্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আলীকদম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আসলাম হোসেন বলেন, যারা খৃস্টান হয়েছেন এবং যারা করিয়েছেন উভয়পক্ষকেই থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ধর্মান্তর হওয়ার বিষয়টি সত্য হলেও জোর করে ধর্মান্তরের অভিযোগ মিলেনি। মিশনারীটির লোকজন থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এই অঞ্চলের চাক সম্প্রদায় লোভ দেখিয়ে খৃস্টান বানানোর অভিযোগে বিভিন্ন মিশনারীর বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছে।

Continue reading

আপত্তিকর অভিযোগে বান্দরবান খ্রীস্টান মিশনারীর ৬৫ ছাত্রীর হোস্টেল ত্যাগ

fatema rani church

জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান:

বান্দরবান পার্বত্য জেলার ফাতিমা রাণী ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক পরিচালিত খ্রীষ্টান মিশনারীর ৬৫ ছাত্রীর আকস্মিক হোস্টেল ত্যাগের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে স্থানীয় অনেকের মতে এই সংখ্যা ৭১ জন। তবে চার্চ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনকে চার্চ হোস্টেলের রেজিস্টার দেখতে না দেয়ায় এ সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সূত্র মতে, চলে যাওয়া কযেকজন ছাত্রীকে চার্চ কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে ফেরত নিয়ে এসেছে। তবে এখনও ৬৫ ছাত্রী নিখোঁজ। ছাত্রীরা সবাই উপজাতি জনগোষ্ঠীর ও দরিদ্র। বিনা খরচে শিক্ষা ও থাকা খাওয়ার কথা বলে তাদের এখানে আনা হয়েছে।

গত ১৬ মার্চ সকাল সাড়ে চারটায় হাতমুখ ধোয়ার অযুহাতে ৬৫ ছাত্রী সাঙ্গু নদীতে গেলে তারা আর হোস্টেলে ফেরত আসেনি। এ ঘটনা বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনার রহস্য উন্মোচনের জন্য তদন্ত শুরু করে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কি কারণে তারা হোস্টেল ত্যাগ করেছে তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো সূত্র।  ঘটনাটি বেশ কয়েকদিন আগে ঘটলেও চার্চ কর্তৃপক্ষ নানা কৌশলে তা ধামাচাপাদিতে সক্ষম হয়।

চার্চ এলাকার বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ এ হোস্টেলটির ছাত্রীদের উপর বিভিন্ন রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। ফাতিমা রাণী চার্চের ফাদার এডমন পল পুরোহিত কর্তৃক হোস্টেলটিতে শিক্ষকতা করেন ব্রাদার প্রত্যয় পল ত্রিপুরা, সিলভেসটারসহ অনেকে। তাছাড়া চার্চটি এমন জায়গায় অবস্থিত যেখানে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। যার ফলে সেখানে কোন অনৈতিক বা অসামাজিক কর্মকান্ড ঘটলেও তা লোক চক্ষুর আড়ালে থেকে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় হোষ্টেল ছাত্রী এ প্রতিবেদককে জানান, ফাতিমা রাণী ক্যাথলিক চার্চের ফাদার এবং শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে হোস্টেলের ছাত্রীদের অসামাজিক কাজে বাধ্য করেন। অন্যথায় তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। তাছাড়া হোস্টেলে খাবার, সেবাসহ অন্যান্য বিষয়েও তারা অভিযোগ করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা হোস্টেল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করতে গেলে চার্চ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনকে নূনতম সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ করেছেন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাসংস্থার একাধিক সূত্র। তারা জানান, এই চার্চের হোস্টেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা আপত্তিকর অভিযোগের কথা শোনা গেছে। তবে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখায় বিষয়গুলো কখনোই তদন্ত করে বের করা সম্ভব হয়নি।

ফাতিমা রাণী ক্যাথলিক চার্চের ফাদার এডমন পল এর সাথে যোগাযোগ করতে গেলে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, আমরা এ ঘটনার ব্যাপারে শুনলেও এখনো পর্যন্ত লিখিত কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার বিষয়ে তদন্ত স্বাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বান্দরবান সেনাবাহিনীর জিএসটু মেজর মাহবুব মোর্শেদ পিএসসি, ইবি এ ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দূঃখজনক। তবে এ ঘটনার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কে. এম তারিকুল ইসলাম জানান, ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। এ বিষয় নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে হোষ্টেল কর্তৃপক্ষ জানায়, হোষ্টেল ত্যাগ করা ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের নিয়ে চার্চ প্রাঙ্গনে আগামী ২৬ মার্চ চার্চের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে শুধুমাত্র চার্চ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন বলেও জানা যায়।