রক্তের ঝর্ণা বইছে পার্বত্য জনপদে ॥ উপদলীয় সংঘাতে ১৪ মাসে নিহত ৪৯ জন

তোফাজ্জল হোসেন কামাল :
সবুজ পাহাড় আবার রক্তে লাল হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত শুরু হয়েছিল, তার সর্বশেষটা ঘটেছে ৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে। সেদিন দূর্বৃত্তদের গুলীতে উপজেলার রাইখালীর কারিগর পাড়ায় দু’জন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে একই জেলার লংগদুতে। এ নিয়ে গত ১৪ মাসে পাহাড়ের সন্ত্রাসপ্রবণ জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ৪৯ জনের অকাল মৃত্যু ঘটেছে।

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর পরই বিবদমান গ্রুফগুলো ঘটনার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করে আসছে। সর্বশেষ কাপ্তাইয়ের ঘটনার জন্যও পাহাড়ের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। তবে জেএসএস অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

জানা গেছে, রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নে কারিগড় পাড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলীতে সোমবার বিকেলে নিহত দুজনের মধ্যে একজন জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কর্মী। অন্যজন স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা। তবে কাপ্তাইর রাইখালী ইউনিয়েনর কারিগর পাড়ায় নিহত দুইজনকে আওয়ামী লীগের কর্মী বল দাবি করা হয়েছে। সোমবার রাতে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক রফিক আহম্মদ তালুকদার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি করা হয়। এ সময় জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গুলী করে তাদেরকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এর আগে ২৯ জানুয়ারির ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)কে দায়ী করেছিল। তবে এমএন লারমা তা অস্বীকার করে। এর আগে ১৯ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির জেলা সদরে পেরাছড়া গ্রামে রনীক ত্রিপুরা নামে ইউপিডিএফের কর্মী নিহত হন।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি শুক্রবার রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) এক কর্মী নিহত হন।

আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে এই সংঘাত চলে আসছে। এক একটি হত্যাকাণ্ডের পর দলগুলো পরস্পরের ওপর দায় চাপায়।

জানতে চাইলে পার্বত্য নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, ‘পার্বত্য নাগরিক কমিটির উদ্যোগে পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছি। সংঘাত চলমান থাকায় আমরা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছি।’

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তির পর জেএসএস ভেঙে পর্যায়ক্রমে কয়েকটি দল গঠিত হয়। এরপর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে অশান্ত হয়ে পড়ে পাহাড়। ২০১৫ সালে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এরপর সংঘাত প্রায় আড়াই বছর বন্ধ ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে অপর একটি দল গঠিত হওয়ার ২০ দিনের মাথায় পুনরায় সংঘাত শুরু হয়।

তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত কিছুটা কমে আসে। নির্বাচনে ইউপিডিএফ খাগড়াছড়িতে ও জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) রাঙামাটিতে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দুই দলের মধ্যে একটা অলিখিত ঐক্যও হয় বলে সে সময় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়।

আর এই দুই দল ভেঙে গঠিত জেএসএস এমএন লারমা এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়। দুই জেলায় তারা ইউপিডিএফ এবং জেএসএস প্রার্থীর সরাসরি বিপক্ষে কাজ করে। এই দ্বন্ধ থেকে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে পানছড়িতে হামলায় দুজন নিহত হন। তাঁদের একজন ইউপিডিএফ সমর্থক।

এ নিয়ে দল দুটির ওপর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আঞ্চলিক দল দুটি ক্ষুব্ধ হয়। নির্বাচনের পর রাঙামাটিতে কারচুপির অভিযোগ এনে জেএসএস প্রার্থী এবং দশম সংসদের সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন।

১ জানুয়ারির ওই সংবাদ সম্মেলনে জেএসএস (এমএন লারমা) ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখল এবং জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ করা হয়। এ সব কারণে নির্বাচন শেষ হতে না হতেই আবারও সহিংসতা শুরু হয় বলে বিভিন্ন মহল ধারণা করছে। ৪ জানুয়ারি বাঘাইছড়িতে এমএন লারমার কর্মী বসু চাকমা হত্যার ঘটনায় জেএসএসকে দায়ী করে দলটি।

অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গুনেন্দু বিকাশ চাকমা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোট কেড়ে নিয়েছে এমএন লারমা। বাঘাইছড়ি উপজেলার তুলাবান ও পাবলাখালী গ্রামে ভোটারদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষ ক্ষেপে গিয়ে হয়তো বসু চাকমাকে হত্যা করেছে। এঘটনায় জেএসএস দায়ী নয়।

তবে সংঘাতের জন্য আঞ্চলিক দলগুলো প্রশাসন এবং সরকারকে দায়ী করছে। ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীরা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জিইয়ে রেখেছে। সরকার চাইলে যেকোনো সময় সংঘাত বন্ধ করতে পারে।

জানতে চাইলে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে হচ্ছে। হত্যাকা-গুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। সংঘাত কমিয়ে আনতে পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

কাপ্তাই’র রাইখালিতে যে দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন, তারা পাহাড়ে স্থানীয় বিববদমান রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাতের বলি। নিহত দু’জনের মধ্যে একজন জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কর্মী। অন্যজন স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা।

গত সোমবার বিকেলের এ ঘটনার জন্য পাহাড়ের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। তবে জেএসএস অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ নিয়ে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বিবদমান এসব গোষ্ঠীর সংঘাতে গত ১৪ মাসে ৪৯ জন নিহত হলেন।

সর্বশেষ গত ২৯ জানুয়ারি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার লংগদু সদর ইউনিয়নের ভুইয়োছড়া গ্রামে ইউপিডিএফের কর্মী পবিত্র চাকমা নিহত হন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বেলা তিনটার দিকে রাইখালীর কারিগড় পাড়ার ফরেস্ট অফিস এলাকায় একটি চা-দোকানে বসে জেএসএসের (এমএন লারমা) কর্মী মংসানু মারমা কয়েক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে ৮ থেকে ১০ জন দুর্বৃত্তের দল তাঁদের ঘেরাও করে। পরে পালানোর চেষ্টা করলে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করা হয়।

মংসানু মারমা (৪০) ও ট্রাকচালকের সহকারী মো. জাহিদুল ইসলাম (৩২) গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত জাহিদুলের বাড়ি নোয়াখালীতে। তিনি রাইখালি ইউনিয়নের নারানগিরি গ্রামে থাকতেন। ঘটনার পর কারিগড় পাড়ার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

রাইখালী এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘ সময় ধরে কাপ্তাই উপজেলায় জনসংহতি সমিতির ( জেএসএস) আধিপত্য ছিল। গত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কিছু নেতা-কর্মী রাইখালী এলাকায় এসে দলীয় কর্মকান্ড শুরু করেন। তাঁরা সেখান থেকে রাজস্থলীর বাঙালহালিয়া বাজারেও দলীয় কাজ করতেন।

ঘটনার দিন সকালে সাংগঠনিক কাজে জনসংহতি সতিমির (এমএন লারমা) কর্মী মংসানু মারমা কারিগড়পাড়ায় যান। মংসানু মারমার বাড়ি একই ইউনিয়নের নারানগিরিমুখ গ্রামে। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর বাড়ি চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার।

জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে কাপ্তাইয়ে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যরা এ হামলা চালিয়েছে। ঘটনায় আমাদের একজন সক্রিয় কর্মী ও একজন সাধারণ বাঙালি নিহত হয়েছেন।’

এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে ও প্রকৃত অপরাধীকে আইনে আওতায় এনে শাস্তিও দাবি করেন তিনি।
এ অভিযোগের বিষয়ে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) তথ্য ও প্রচার বিভাগের সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, এ ঘটনায় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সম্পৃক্ততার প্রশ্নই আসে না এটা তাদের বিরোধের ফসল।

সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম

বাঘাইছড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএস গোলাগুলি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি:

রাঙামাটির দুর্গম বাঘাইছড়ি উপজেলায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সংস্কার (পিসিজেএসএস) এমএর লারমা গ্রপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

রবিবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে,  উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের সাধনা চোখ বন বিহারের পাশে ইউপিডিএফ এবং জেএসএস সংস্কার তাদের আধিপত্য বিস্তার এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিতে উভয় পক্ষ গুলিবিনিময় করে। তবে গোলাগুলির ঘটনায় কোনো পক্ষের  মধ্যে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। দুপুর পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা স্থায়ী ছিলো।

এ ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে  ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বাঘাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম এ মনজুরুল আলম জানান- লোক মুখে শুনেছি সাধনা চোখ বন বিহারের পাশে পাহাড়ের দু’টি সশস্ত্র আঞ্চলিক দল এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিতে গুলাগুলি করেছে।

রাঙামাটিতে অস্ত্রসহ জেএসএস’র বাঙালি চাঁদা কালেক্টর আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি:

রাঙামাটি শহরে যৌথবাহিনী  অভিযান চালিয়ে জেএসএস’র সক্রিয় চাঁদা কালেক্টর আফজাল হোসেন (৫২) নামের এক চাঁদাবাজকে আটক করেছে।

মঙ্গলবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে শহরের ক্ষেপ্পাপাড়া থেকে তাকে আটক করা হয়।

এসময় তাঁর কাছ থেকে একটি পিস্তল, ৩টি মোবাইল ফোন  এবং  নগদ ২হাজার ১২০টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

যৌথবাহিনী সূত্রে জানানো হয়, সোমবার দুপুরে যৌথবাহিনী শহরের আসামবস্তিস্থ ক্ষেপ্পাপাড়া নামক স্থানে আফজালকে ধরতে অভিযান পরিচালনা করে। আফজাল যৌথবাহিনীর অভিযান টের পেয়ে তার বাড়ির পাশে ঝোঁপে লাফ দেয়। যৌথবাহিনী ওই ঝোঁপ  থেকে তাকে হাতেনাতে আটক করতে সক্ষম হয়। এসময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল, ৩টি মোবাইল ফোন এবং  নগদ ২হাজার ১২০টাকা উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানানো হয়, আফজাল শহরের রিজার্ভবাজার, তবলছড়ি  এবং আসামবস্তি বাজার এলাকার স্থানীয় কাঠ, মাছ, বাঁশ ব্যবসায়ী, দোকানদার, সিএনজি এবং বিভিন্ন পণ্যবাহী গাড়ি থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র (পিসিজেএসএস)  হয়ে  চাঁদা আদায় করে আসছে বহুবছর ধরে।

আফজাল  ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এসব চাঁদার টাকা সংগ্রহ করে জেএসএস’র চীফ কালেক্টর জ্ঞান শংকর চাকমার কাছে হস্তান্তর করে। আর আফজালের অবর্তমানে তার স্ত্রী খোদেজা বেগম এবং তার সহযোগী ওই এলাকার বাসিন্দা ডেস্কী মিয়া ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে থাকে।  আদায়ের সেসব চাঁদা থেকে আফজাল ৩০% করে কমিশন পেয়ে থাকে বলে যৌথবাহিনীর কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন তিনি।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে রাঙামাটি কোতয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রহিম জানান, আটক আফজালের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে দু’টি মামলা দায়ের করা হবে।

যৌথ কম্বিং অপারেশনে পরিচালনা করছে জেএসএস-ইউপিডিএফ?

নির্বাচন পরবর্তী অভিযান, ভয়াবহ নাশকতার আশঙ্কা

আরিফুল হক মাহবুব, কাউখালী:

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেরে যাওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠন প্রসীত বিকাশ খীসার ইউপিডিএফ ও সন্তু লারমার জেএসএস অত্যন্ত মারমুখী হয়ে উঠেছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যারা ভিন্ন প্রতীকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে তাদেরকে চিহ্নিত করে যৌথ কম্বিং অপারেশনের ঘোষণা দিয়েছে ইউপিডিএফ ও জেএসএস। দীর্ঘদিন সাপে নেওলে সম্পর্কে থাকা দল দুটি অঘোষিতভাবে ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েও আশানুরূপ ফল লাভে ব্যর্থ হয়। এতে দলদুটি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠেছে। বিশেষ করে যেসব উপজাতীয় জনগণ দল দুইটির প্রার্থিদের ভোট দেয়নি এবং যেসকল ব্যক্তি ও সংগঠনের কারণে তাদের নির্বাচনী আধিপত্য বিস্তারে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল তাদের প্রতি বেশী ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গেল নির্বাচনে তাদের প্রার্থীর ভরাডুবির পর মারমূখী হয়ে উঠেছে উপজাতীয় সংগঠন দুটি । নির্বাচনে হারের কারণ অনুসন্ধান করতে এবং দল দু’টির নির্দেশনা অমান্য করে যেসব ব্যক্তি ভিন্ন প্রতীকে ভোট প্রদান করতে উদ্বুদ্ধ করেছে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচনের পর পরই ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বেশ কয়েদফা বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেছে একাধিক সূত্র।

গত ০১ জানুয়ারি রাঙ্গামাটি শহরের রাজবাড়িস্থ সাবারাং হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেএসএস মনোনীত পরাজিত প্রার্থি উষাতন তালুকদার হুমকি দিয়ে বলেন, ফলাফল বাতিল করা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবে।

তার এ ঘোষণার পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন হতাহত হয়েছে। এতে করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলার উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাউখালী, নানিয়ারচর, মহালছড়ি, পানছড়ি, দিঘীনালা ও বাঘাইছড়িতে যেকোনো মূহুর্তে বড় ধরণের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা সর্বত্র বিরাজ করছে। এতে জনপ্রতিনিধি, সরকারী স্থাপনা বা পর্যটকগণ টার্গেটেড হতে পারেন।

উল্লিখিত এলাকায় কম্বিং অপারেশন জোরদার করতে গত ১০ জানুয়ারী বিকাল ৩টায় রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার দূর্গম শুকনাছড়ি পাড়ায় বৈঠক করে প্রসীত বিকাশ খীসার ইউনাইটেড পিপলস ডেমক্রটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও সন্তুলারমার জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। বৈঠকে জেএসএস’র রাঙামাটি জেলার সামরিক কমান্ডার আশাপূর্ণ চাকমা, কেন্দ্রীয় সদস্য উথোয়াইচিং মারমা, কাউখালী উপজেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুদিপ্ত চাকমা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ইউপিডিএফ’র পক্ষে উপস্থিত ছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব সজীব চাকমা, কেন্দ্রীয় অর্থসম্পাদক রবি চন্দ্র চাকমা, কাউখালী ইউনিটের পরিচালক কার্তিক চাকমাসহ আরো অনেকে।

সমন্বিত বৈঠকে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ বিগত নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে সমর্থনকারী সংস্কারপন্থী জেএসএস (এমএন লারমা) ও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আওয়ামীলীগকে সমর্থনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সমূহের বিরুদ্ধে যৌথ কম্বিং অপারেশনের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় পার্বত্য অঞ্চলে চলছে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা।

নির্বাচন পরবর্তী সংঘর্ষের ঘটনায় জেএসএস (সন্তু) কর্তৃ হত্যা করা হয় বাঘাইছড়ির জেএসএস সংস্কারপন্থী নেতা বসু চাকমাকে। ইউপিডিএফ কর্তৃক ব্রাশফায়ারের শিক্ষার হয়েও প্রাণে বেঁচে যান খাগড়াছড়ির দীঘিনালা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক নাজির উদ্দিন। সবশেষ ১৩ জানুয়ারী দিঘীনালার মেরুং ইউনিয়নের চৌধুরী পাড়ায় সন্ত্রাসীদের হামলায় মারাত্মক আহত হন অন্তত তিন বাঙ্গালী। এছাড়াও কাউখালী উপজেলার দূর্গম হারাঙ্গী এলাকায় ফেরীতে মাল বিক্রি করতে যাওয়া এক বাঙ্গালীর কাছে ১০ হাজার চাঁদা দাবী করে সন্ত্রাসীরা। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তাকে মারধর করে পাহাড়ে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দেয়।

এমন পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। আতংকিত লোকজন লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য ভিতরে(দূর্গম এলাকায়) প্রবেশ করতে পারছে না। একইভাবে ভেতর থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লোক ব্যবসায়িক কাজে বের হতে পারছে না। শত নির্যাতনের পরও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। প্রাণের ভয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তাও নিতে পারছে না। এসব বিষয়ে ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র বেশ কয়েকজন নেতার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সংযোগ পাওয়া যায়নি।

সূত্র মতে, আন্তঃদলীয় সংঘাত নিরসনে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অঘোষিত অস্ত্র বিরতি শুরু করে ইউপিডিএফ ও জেএসএস। যার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাহাড়ের আসনগুলোতে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দেয় দল দুটি। কিন্তু ভয়ভীতি ও শত বাঁধা বিপত্তির মুখেও নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আদায় করতে ব্যর্থ হয় আঞ্চলিক দুটি সংগঠন। ফলে নির্বাচনের পর থেকে যৌথ কম্বিং অপারেশনের ঘোষণা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে পাহাড় জুড়ে সাধারণ পাহাড়ী- বাঙ্গালীর মাঝে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। সৃষ্ঠ পরিস্থিতি কঠোর হাতে দমন করা না গেলে পাহাড়ের আইনশৃংখলার মারাত্মক অবনতির আশঙ্কা করছে অধিবাসীগণ।

শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে তার যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত জরুরি

মেহেদী হাসান পলাশ |

আজ পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২১ বছরপূর্তি। প্রতিবছর তিন পার্বত্য জেলায় নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে ঢাকায় সভা সেমিনার হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়, টেলিভিশনে টকশোতে আলোচনা হয়। বস্তুত এ সকল আলোচনার মূল লক্ষ্য থাকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ব্যর্থতা পর্যালোচনা ও নিরূপণ করা।

শান্তিচুক্তি একটি জাতীয় আকাঙ্ক্ষা। শান্তিচুক্তি কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একক সরকারের কৃতীত্ব নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সর্বপ্রথম পার্বত্য অঞ্চলের বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিরসনে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপের সূচনা করেছিলেন। তার সময়ের সিনিয়র মন্ত্রী মশিউর রহমানসহ আরো কয়েকজনের সাথে সফল আলোচনা হয়েছিল। তিনি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করে তার দলের সাথে এই আলোচনার জন্য তাকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ তার স্ত্রীকে সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে এরশাদ আমলে ৬টি, বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম আমলে ১৩টি ও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ৭টি মিলে মোট ২৬টি সংলাপের মাধ্যমে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে এ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারার কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারের, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তথা জেএসএস ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা গত ২৯ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক সাংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে এক দশক ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যান হাজির করে সরকারের দাবি, বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করে ফেলেছে। বাকি অল্প কিছু ধারা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। শান্তিচুক্তিতে ৪ খণ্ডে সর্বমোট ৭২টি ধারা রয়েছে। সরকারের দাবি মতে, এর মধ্যে মোট ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জেএসএস সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা সরকারের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার মতে, সরকার শান্তিচুক্তির মাত্র ২৫টি ধারা বাস্তবায়ন করেছে। এছাড়াও ১৩টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করেছে এবং ৩৪টি ধারা অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। তিনি আরো দাবি করেছে, শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহের দুই তৃতীয়াংশ অবাস্তবায়িত রয়েছে। একই সাথে সন্তু লারমা আরো দাবি করে থাকেন, লিখিত শান্তিচুক্তির পাশাপাশি এর একটি অলিখিত রূপ বা প্রতিশ্রুতি ছিল। সন্তু লারমা লিখিত শান্তিচুক্তির চেয়েও শান্তিচুক্তির সমঝোতা বা প্রতিশ্রুতি বা অলিখিত রূপ বাস্তবায়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

শান্তিচুক্তির সাফল্য বা সুফল শান্তিচুক্তির ধারা বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধারা বাস্তবায়নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শান্তিচুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবকাঠামো, জীবনযাপন, পরিবেশ, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুতায়ন, শান্তি ও স¤প্রীতি প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পরিবর্তন। এসব ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে যে উন্নয়ন হয়েছে তা এককথায় অভূতপূর্ব। এককালের পানিশমেন্ট জোন পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ট্যুরিস্ট জোন, এন্টারটেইনমেন্ট জোন- এটাই পার্বত্য চুক্তির অনত্যম বড় সাফল্য। শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এটাই ছিলো। চুক্তির শুরুতে লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে ‌’পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে সকল নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অধিকার সমুন্নত এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং বাংলাদেশের সকল নাগরিকের স্ব-স্ব অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে’ এ চুক্তি। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায় শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে সন্দেহ নেই। (এ বিষয়ে আমার পূর্বের লেখা ‘ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দুই দশক: পুনর্মূল্যায়ন জরুরি’ তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ নীল রঙিন শিরোনামে ক্লিক করে পরে নিতে পারেন।)

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচ্য, সেটা হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনের ২১ বছরের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনকারী সরকার প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শান্তিচুক্তি সম্পাদনকারী সরকার ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও শান্তিচুক্তির কিছু ধারা অবাস্তবায়িত, বাস্তবায়নাধীন বা আংশিক বাস্তবায়িত কেন থাকল? প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কি শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়? আওয়ামী লীগ শাসন আমলের বিগত ১৫ বছরের বিশেষ করে শেষ ৫ বছরের সরকারের কার্যক্রম বক্তৃতা-বিবৃতি, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা বিবৃতি, উদ্যোগ, আন্তরিকতা বিশ্লেষণ করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে মোটেই অনাগ্রহী নয় বরং অত্যন্ত আন্তরিক। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এই দীর্ঘ সময়ে শান্তিচুক্তি কেন পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হলো না? এর উত্তর দীর্ঘ ও বহুমুখী, এই লেখায় বিস্তারিতভাবে তা আলোচনা করা সম্ভব নয়। খুব সংক্ষেপে যদি আলোচনা করতে হয় তাহলে বলতে হয়, এই চুক্তিতে বেশ কিছু অসঙ্গতি রয়েছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে, সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাথে, জাতীয় চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ। শান্তিচুক্তিকালে তাড়াহুড়ো, অসতর্কতা ও অসচেতনতার কারণে এই ত্রুটিগুলো রয়ে যায়। মানুষের সৃষ্টি কোনো বিধানই একবারে বা শুরুতেই ত্রুটিমুক্ত করা সম্ভব নয়। এটা সেরূপ একটা ভ্রম। এই অসচেতন ভুলগুলোই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়। নিম্নে এ লেখায় সেগুলো ক্রমান্বয়ে আলোচনা করা হবে।

প্রথমেই শান্তিচুক্তির মুখোবন্ধের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। আলোচনার সুবিধার্থে অথবা বলার সুবিধার্থে কিংবা রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এ চুক্তিকে ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালোচুক্তি’, ‘দেশ বিরোধী চুক্তি’- নানা নামে আখ্যা দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে- এই চুক্তির নাম ‘শান্তিচুক্তি’, ‘পার্বত্যচুক্তি’, ‘কালো চুক্তি’- কোনোটিই নয়। সরকারি গেজেট অনুসারে এই চুক্তির নাম বলা হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সহিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চুক্তি’। সম্পাদনকালীন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি নন। তিনি সংসদ সদস্য মাত্র। তাহলে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির সাথে জনসংহতি সমিতির চুক্তিকে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি বলে আখ্যা দেয়া কতটা সঠিক হবে? এ ছাড়া শান্তিচুক্তি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে পাস করা হয়নি। যদিও শান্তিচুক্তির আলোকে গঠিত বিভিন্ন আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে, সংশোধিত হয়েছে। শান্তিচুক্তির এটি একটি অসম্পূর্ণতা ও দুর্বলতা।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অপরপক্ষ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার অধিবাসীদের পক্ষ হইতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ বা এর সভাপতি সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, এমনকি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিও নন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালি, সন্তু লারমা কোনভাবেই তাদের প্রতিনিধি নন। বরং তিনি প্রচণ্ড বাঙালি বিদ্বেষী। বাঙালিদের দাবি, তিনি ত্রিশ হাজার বাঙালি হত্যার নেতৃত্বদানকারী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে চুক্তি করে, সেই চুক্তি বাঙালিদের মেনে নিতে বলা অর্থহীন। কারণ, বাঙালিরা তো তাকে মানেই না। কেবল সন্তু লারমাই নন, পার্বত্য চুক্তিও প্রবলভাবে বাঙালি বিদ্বেষী ও বাঙালি স্বার্থ বিরোধী। এই চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকা বলে আখ্যা দিয়ে এখানকার অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালির অবস্থানকে অস্বীকার করা হয়েছে।

যে জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতির জন্য বাঙালি জাতি বহু শতাব্দি সংগ্রাম করেছে, চুক্তিতে সেই বাঙালিদেরকে ‘অউপজাতীয়’ আখ্যা দিয়ে বাঙালি জাতিসত্ত্বার পরিচয় কেড়ে নেয়া হয়েছে। চুক্তিতে বাঙালির নাগরিকত্ব ও নির্বাচনের অধিকার উপজাতীয় সার্কেল চিফের করুণাধীন করা হয়েছে। এ চুক্তির ফলে সৃষ্ট সরকারি ও স্থানীয় সরকারের শীর্ষ পদে বাঙালিদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যান্য পদেও বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যানুপাতে না করে চরমভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। এটা এজন্য করা হয়নি যে, পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আওতায় করা হয়েছে। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া উপজাতীয় নাগরিকদেরও এই চুক্তিতে অবহেলা করে সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠি চাকমা আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সকল পদ উপজাতীয়দের এবং অন্যান্য পদেও উপজাতীয়দের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সকল ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও সুবিধায় উপজাতীয় জনগোষ্ঠিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের দায়িত্ব শুধু উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। অথচ একই কারণে বিপুল সংখ্যক বাঙালি উদ্বাস্তু হলেও তাদের এই চুক্তির আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি।

শান্তিবাহিনীর খুনী ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসীদের ক্ষমা করে তাদের ২০ দফা প্যাকেজের আওতায় পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও তাদের কারণে হতাহত হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাঙালিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়নি। তাদের স্বজনের হত্যার বিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ভূমি কমিশন আইনে শুধু শরণার্থীদের বা বাস্তচ্যুত উপজাতীয়দের জমি প্রত্যার্পনের পরিবর্তে সকল ভূমির বিরোধ নিষ্পত্তি এবং তা মীমাংসার ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেয়ায় সেখানকার বাঙালিরা ভূমিহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে উপনীত হয়েছে। এভাবে ছত্রে ছত্রে এই চুক্তিতে বাঙালিদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এমন একটা চুক্তি বাঙালিরা কেন মানবে বা তাদের মানতে বলা হবে? এ চুক্তিতো বাঙালীর আত্মহত্যার দলিল। কোনো মানুষ কি নিজে তার আত্মহত্যার সনদে স্বাক্ষর করতে পারে?

শুধু বাঙালি নয়, সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠিরও প্রতিনিধি নন। তার দল জনসংহতি সমিতি চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্ব করে না বা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল উপজাতীয় জনগোষ্ঠি জনসংহতি সমিতি করে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চারটি আঞ্চলিক সংগঠন রয়েছে। পার্বত্য জনসংহতি সমিতি তার একটি। বাকীরা জনসংহতি সমিতির(সন্তু) গ্রুপের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ও বিরোধী। কাজেই সন্তু লারমার সাথে বা জেএসএসের সাথে চুক্তি করে সন্তু বিরোধী এ সমস্ত উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনকে সেই চুক্তি মেনে নিতে বলা কতটা যুক্তি সঙ্গত তা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক সাধারণ পাহাড়ি, যারা কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের সাথে জড়িত নয়, কিন্তু হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ইত্যাদির কারণে সন্তু লারমা ও জনসংহতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও সমিতিকে ঘৃণা করে। তাদেরও জনসংহতি সমিতিকে প্রতিষ্ঠাদানকারী সন্তু লারমার সাথে কৃত চুক্তি মেনে নিতে বলা যুক্তিযুক্ত নয়।

হয়তো কেউ কেউ বলতে পারেন, তখন তো চারটি সংগঠন ছিল না। একটি সংগঠন ছিল- জনসংহতি সমিতি। এ কথা ঠিক যে, তখন চারটি আঞ্চলিক সংগঠন ছিল না। কিন্তু জনসংহতি সমিতি সম্পূর্ণভাবে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। কাজেই সরকার যখন জেএসএসের একটি অংশের সাথে সংলাপ করে তার সাথে চুক্তি করেছে, তখন অপর অংশ এর বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ নামে নতুন সংগঠনের জন্ম দিয়েছে। যারা শান্তিচুক্তির আলাপ ও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ছিলেন তারা আরেকটু সতর্ক হলে বিষয়টি এড়ানো যেতো। সন্তু লারমাও এ চুক্তির ব্যাপারে তার দলের প্রতিবাদী অংশের সাথে কোনোরূপ আলোপ-আলোচনা করা, তাদের মতামত নেয়া, তাদের পুনর্বাসনের আওতাভুক্ত করার কাজটি করেনি। কাজেই সন্তু লারমা অস্ত্র সমর্পণ করে পুনর্বাসিত হলেও তার বিরোধী অংশ অস্ত্র সমর্পণ না করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

অন্যদিকে সন্তু লারমা অংশের লোকেরাও সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর পূর্ণ আস্থাশীল হতে না পারায় শান্তিবাহিনীর একাংশকে ভারী ও উন্নত অস্ত্রসহ জঙ্গলে রেখে ভাঙাচোরা অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তিবাহিনী অফিসিয়ালি অবলুপ্ত করার ঘোষণা দিলেও কার্যত শান্তিবাহিনী বহাল থাকে। এই দুই অংশের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা শান্তিচুক্তির পর দুই দশকে নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বণ্দ্বে এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, নির্যাতন চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিভীষিকাময় জনপদে পরিণত করেছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পূর্বে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪৩ জন সদস্য নিহত হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ১৭৩, বিজিবি ৯৬, পুলিশ ৬৪, আনসার ভিডিপির ১০ জন। নিহত সেনা সদস্যদের মধ্যে অফিসার ৫ জন, জেসিও ৩ জন, বাকিরা সৈনিক। এছাড়াও দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ, ভূমিধস প্রভৃতি কারণে মারা গেছে আরো অনেকে। এর মধ্যে শান্তিচুক্তির পূর্বে শুধু ম্যালেরিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৬০ জন এবং পরে ৮১ জন মারা গেছে। উভয় কারণে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে শান্তিচুক্তির পরে পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট ৯৬ জন সদস্য মারা গেছে। এর মধ্যে শান্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে মারা গেছে ১১ জন, ৫ জন রাঙামাটির ভূমিধসে।

শান্তিচুক্তির পূর্বে নিরাপত্তা বাহিনী ১৬ শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে গ্রেনেড ৩৫৯টি, মর্টার ৭০টি, মাইন ১৩টি এবং অন্যান্য গোলাবারুদ সাড়ে ৪ লক্ষ। এক পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, শান্তিচুক্তির পরে ২০০৫ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৭৩০টি অস্ত্র ও ১ লক্ষ ৮৬ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা বাহিনী। শান্তিচুক্তির পূর্বে ১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ২৩৮ জন উপজাতি, ১০৫৭ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ১৮১ জন উপজাতি ও ৬৮৭ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ২৭৪ জন উপজাতি ও ৪৬৮ জন বাঙালি।

একই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শান্তিচুক্তির পরে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শান্তিবাহিনী কর্তৃক ৪৭৪ জন উপজাতি, ১৮৬ জন বাঙালি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৬৪৬ জন উপজাতি ও ৬৪২ জন বাঙালি। অপহরণের শিকার হয়েছে ৯১০ জন উপজাতি ও ৩৮৪ জন বাঙালি। এমতাবস্থায় শান্তিচুক্তিতে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সরকারের পক্ষে সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার সম্ভব হয়নি (আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস ও কৌশলগত ঝুঁকির কথা এখানে বিবেচিত হয়নি)। তবু শান্তিচুক্তির ২১ বছরে সরকার একটি ব্রিগ্রেডসহ ২৪০টি নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। দেখা গেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর যেসকল ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে, ওই সকল এলাকা উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পগুলোর অনেকগুলো বিভিন্ন নামে সন্ত্রাসীরা দখল করেছে। ফলে স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পুনরায় নিরাপত্তা ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানানো হয়েছে।

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন একপাক্ষিক বিষয় নয়, দ্বিপাক্ষিক। সন্তু লারমা অফিসিয়ালি শান্তিবাহিনী অবলুপ্ত ঘোষণা করলেও একথা সূর্যের মতো সত্য যে, শান্তিবাহিনী বিদ্যমান এবং এই বাহিনীর হাতে ভয়ানক মারণাস্ত্র রয়েছে। যে ব্যক্তি নিজে পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ করেননি তিনিই আবার সকল অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের দাবি করছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে শান্তিচুক্তি করেও সন্তু লারমা নিজে এখনো বাংলাদেশের জাতীয় নাগরিক পরিচয়পত্র গ্রহণ করেননি। প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় থেকেও তিনি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস পালন করেননি। সরকারকে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করার দাবি জানানোর পূর্বে তাকে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ছাড়তে হবে। কেননা, বাংলাদেশের সংবিধানে প্রাদেশিক কাঠামো বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। আঞ্চলিক সংগঠন যদি শান্তিচুক্তি মানতোই তাহলে তাদের মনে জুম্মল্যান্ডের স্বপ্ন কেন? জুম্মল্যান্ডের পতাকা, মানচিত্র, জাতীয় সঙ্গীত, প্রতীক, সেনাবাহিনী কেন?

অনেকেই জানেন, শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। এই রিটে উচ্চ আদালত শান্তিচুক্তির বিভিন্ন ধারাকে সংবিধান বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বর্তমানে এই রিটটির আপিল বিভাগে শুনানি চলমান রয়েছে। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আদালতের এই অবর্জাভেশনগুলোরও সমাধান হওয়া জরুরি। এ চুক্তিতে যে আঞ্চলিক পরিষদের কথা বলা হয়েছে, উচ্চ আদালত তাকে সংবিধান ও বাংলাদেশের এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর বৈশিষ্ট্য বিরোধী বলে আখ্যা দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে অঞ্চলভিত্তিক মন্ত্রণালয় গঠনের সুযোগ রাখা হয়নি। সংবিধানে অনগ্রসর জনগোষ্ঠির জন্য বিশেষ সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বিশেষ উপজাতীয় গোষ্ঠিকে নয়। আদালতের রায়ে এ বিষয়েও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কোনো পদ কোনো জাতির জন্য বারিত রাখার সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ পদগুলো বাঙালিদের জন্য বারিত করা হয়েছে। চুক্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব স্থানীয় সরকারকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। সাব ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদগুলোতে নিয়োগ ও বদলীর দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের হাতে দেয়ার কথা বলা হয়েছে এবং এসব পদে উপজাতীয়দের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ ধারা বাস্তবায়ন তো দূরেরর কথা, এ ধারার আওতায় ইতোমধ্যে মিশ্র পুলিশ সৃষ্টি করে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় পুলিশের আনুগত্য প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এসকল কারণেও সরকারের আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে।

আজ সময় এসেছে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। শান্তিচুক্তিতে বিদ্যমান অসংঙ্গতি, বৈষম্যমূলক বিধান ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ধারা বজায় রেখে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সময়ের প্রয়োজনে বাংলাদেশে সংবিধান যদি ১৭ বার সংশোধিত হতে পারে তবে শান্তিচুক্তি কেন যুগোপযোগী হতে পারবে না? এমনকি শান্তিচুক্তি দ্বারা গঠিত বিভিন্ন আইন ইতোমধ্যে একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। তাহলে শান্তিচুক্তি কেন আপডেইট করা যাবে না? এখানে সংশোধন শব্দটি পরিহার করে আপডেইট শব্দটি ব্যবহার করা হলো যার সুপ্রযুক্ত বাংলা হতে পারে যুগোপযোগীকরণ। সময়ের ব্যবধানে সন্তু লারমা নিজেও কিছু নতুন নতুন দাবি তুলেছেন, অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠিরও কিছু দাবি রয়েছে, বাঙালিদের দাবি রয়েছে। কাজেই সকলের দাবি আলোচনা করে সংবিধানের ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন দাবিগুলো বিবেচনা করে শান্তিচুক্তি যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের স্বার্থেই এই যুগোপযোগীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন সম্ভব।

প্রশ্ন হলো, শান্তিচুক্তি ও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? সংক্ষেপে উত্তর, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত হলেই কি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? উত্তর, কোনোভাবেই নয়। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিই এই শান্তিচুক্তির আওতার বাইরে রয়েছে। বেশিরভাগ জনগোষ্ঠিকে বাইরে রেখে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে? সন্তু লারমার চুক্তি প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু কিম্বা তরু চাকমাকে মেনে চলতে বললে তারা তা কখনোই মানবে না। কারণ তারা কেউ সন্তু লারমাকে মানেন না? অন্যদিকে শান্তিচুক্তি করে সন্তু লারমা পতাকা উড়িয়ে চলবেন, জেএসএস নেতারা সরকারি বিভিন্ন পদ-পদবী অলঙ্কৃত করে সুবিধা ভোগ করবেন আর প্রসীত বিকাশ খীসা, সুধাসিন্ধু, জলেয়াদের লোকেরা জঙ্গলে অনিশ্চিত জীবন কাটাবে যে চুক্তিতে সে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সে কারণে শান্তিচুক্তির যুগোপযোগীকরণে এদেরও অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

আমরা আন্তরিকভাবে মনে করি, সরকার যদি সন্তু লারমার সাথে আলোচনা করতে পারে তবে প্রসীত, সুধাসিন্ধু, তরুর সাথে আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়? তারা কী এমন করেছেন যা সন্তু লারমা করেননি? পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসন দাবি? সে তো সংবিধান মেনে চুক্তি করেও সন্তু লারমা দাবি করছে? হয়তো পূর্ণাঙ্গ শব্দটি ব্যবহার করেননি। কাজেই তারা পাপী হলে সন্তু লারমাকে পূণ্যবান ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

দীর্ঘদিন পুলিশ, র‌্যাব দিয়েও যা পারা যায়নি, বর্তমান সরকার আলোচনার মাধ্যমে সুন্দরবনের বনদস্যু, মহেশখালীর জলদস্যুদের সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসনের আওতায় অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনে সেসব এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। শুধু সুন্দরবন বা মহেশখালী নয়, বছর দুয়েক আগেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বান্দরবান রিজিয়ন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এমএনপির বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র সন্ত্রাসীর অস্ত্র সমর্পণ করিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উপর জোর দিয়ে বলেছেন, এ সমস্যার সামরিক সমাধান নেই। তাহলে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সংলাপ ও আলাপ-আলোচনার বিকল্প নেই। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেএসএসের(সন্তু) বাইরে বিদ্যমান সকল উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন ও তাদের সামরিক শাখার সাথে আলোচনা করে তাদের নায্য দাবিগুলো সংবিধানের আলোকে বিবেচনা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের এ সকল আঞ্চলিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আমার পেশাগত যেসব আলোচনার সুযোগ হয়েছিল তাতে আমি দেখেছি, তারা নিজেরাও সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে আগ্রহী এবং আলোচনায় বসলে তাদের নায্য দাবিগুলো বিবেচনা করলে সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী দাবিগুলোতে তারাও ছাড় দিতে প্রস্তুত বলেই আমার মনে হয়েছে। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্ধেক জনগোষ্ঠি বাঙালিদেরকে, তাদের স্বীকৃতি ও দাবিগুলোকেও শান্তিচুক্তির আওতাভুক্ত করে বিদ্যমান শান্তিচুক্তিকে যুগোপযোগী করা সময়ের দাবি। শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের স্বার্থে এর কোনো বিকল্পও নেই।

 লেখক: সম্পাদক, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ ও পার্বত্যনিউজ.কম, চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

Yunus

বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত অজস্র হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোন হত্যাকান্ডের নৃসংশতা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোকেও হারমানায়। পাকুয়াখালী ট্রাজেডি এই নৃসংশ গণহত্যাগুলোরই একটি। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ঘটিয়েছিল পার্বত্য ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় পালিয়ে আসতে পেরেছিল মুহাম্মদ ইউনুছ মিয়া নামের এক ভাগ্যবান। সেদিনের সেই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা ইউনুছ মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সৈয়দ ইবনে রহমত।

প্রঃ কি করছিলেন?
উঃ গায়ে জ্বর, শুইয়া আছিলাম।

প্রঃ কতদিন যাবৎ জ্বর? ওষুধপত্র খাচ্ছেন না?
উঃ দুইদিন ধইরা জ্বর। ভাই, ওষুধপাতি খাইয়া কি অইব। জ্বরের লাগি ওষুধ খাইলেই কি আর না খাইলেই কি। এই বাড়ে-এই কমে, ওষুধ খাওন লাগব না, দুই দিন পরে এমনেই সাইরা যাইব।

প্রঃ আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো পাকুয়াখালী হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানা।
উঃ এইসব কইয়া লাভ কি? কতই তো কইলাম। আর্মি, পুলিশ, সিআইডির অফিসার, সাংবাদিক, আরো কতজনের লগে কইছি। কই, কিছুইতো অইল না। এইসব কইয়া আর মনের জ্বালাটা বাড়াইয়া লাভ কি?

প্রঃ আপনারা তো জানতেন যে, পাহাড়ে শান্তিবাহিনী আছে, তারা বাঙালির দেখা মাত্রই গুলি করে। তারপরও পাহাড়ে যাওয়ার সাহস পেলেন কিভাবে?
উঃ ভাই, শখ কইরা কেউ কী আর মরণের সামনে যায়? পেটের দায়ে যাওন লাগে। পাহাড়ে যাওন ছাড়া আর তো বাঁচনের পথ নাই। সামান্য জমি-জমা যা আছে এইডাও তো কোন বছর চাষ কইরা ঘরে তোলা যায় না। কাপ্তাই বান্ধের পানি আইসা ডুবাইয়া দেয়। তাই বাধ্য অইয়াই পাহাড়ে যাওন লাগে। আর পাকুয়াখালীর ঘটনার সময়তো কোন ভয় আছিল না। তখন শান্তিবাহিনীর লগে আমাদের চুক্তি আছিল। আমরা তাদেরকে ১ ফুট (এক ঘনফুট) গাছের বিনিময়ে ৪০/৫০ টাকা কইরা চান্দা দিতাম।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে কখন থেকে টাকার বিনিময়ে গাছ কাটার চুক্তি হয়েছিল?
উঃ পাকুয়াখালীর ঘটনার ৫/৬ বছর আগে একদিন বড় মাহিল্যার তক্তা নজরুল (লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের কারণে তাকে লোকজন তক্তা নজরুল নামে চিনত) আমাদের কইল, পাহাড়ে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহিনীরা আর বাঙালিরে গুলি করব না। কিন্তু তাদেরকে চান্দা দিতে অইব। তারপর থাইক্যা শুরু অইল গাছ কাটা। আগের থাইক্যাই চাকমাদের লগে নজরুল ভাইয়ের বালা সম্পর্ক আছিল। চাকমাদের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে হে যাইত, আবার চাকমারাও হের বাড়ীতে আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তারাই তক্তা নজরুলরে দিয়া চান্দার মাধ্যমে গাছ কাটার খবর দিছিল।

প্রঃ চাঁদা দিয়া যখন গাছ কাটতেন, তখন আপনাদের সাথে শান্তিবাহিনী কেমন আচরণ করত?
উঃ এমনিতে তারা কোন খারাপ আচরণ করত না। তবে তাদের আইন কানুন আছিল খুব কড়া। যেই দিন যা কইতো, তাই করতে অইতো। কেউ কথা না হুনলে মাইর-ধোর করতো, পাহাড়ে যাওন বন্ধ কইরা দিত।

প্রঃ আপনারা যেখানে গাছ কাটতে যেতেন, সেখানকার চাকমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ আমরা যেখানে গাছ কাটতে যাইতাম সেখানে অনেক চাকমা বসবাস করত। এদের কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তবে বেশির ভাগই ছিল আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তারাও আমাদের সাথে গাছ কাটত। স্থানীয় এইসব চাকমাদের লগে আমাদের বালা সম্পর্ক আছিল। তারা আমাদের ঈদ-পরবের সময় বেড়াইতে আইত। আমরাও বিজুর (চাকমাদের বাৎসরিক উৎসব) সময় তাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতাম। অনেক সময় পাহাড়ে কোন গন্ডগোলের ভাব থাকলে তারা আমাদেরকে আগেই জানাইয়া দিত।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে স্থানীয় চাকমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ শান্তিবাহিনীরা স্থানীয় চাকমাদের উপরেও অত্যাচার করতো, ওদের কাছ থাইকয়াও চান্দা নিত। সামান্য ভুল-ত্রুটি অইলে বা তাদের কথামতো না চললে মাইর-ধোর করতো। কতজনরে তো গুলি কইরা মাইরাও ফালাইছে। শান্তিবাহিনীর খাওন-খোরাক অনেক সময় বাজার থাইক্যা কিইন্যা পাহাড়ে গিয়া দিয় আইতে অইতো। তাই স্থানীয় চাকমারা কৌশলে শান্তিবাহিনীর কালেক্টরদেরকে বিপদে ফালাইয়া তাড়ানোর চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মদ-টদ খাওয়াইয়া মাইয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ফালাইতো, আবার কোন কোন সময় টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল লাগাইয়া শান্তিবাহিনীর বড় অফিসারের কাছে নালিশ করতো। এমনও সময় গেছে যখন এক মাসের মধ্যে তিন-চারজন কালেক্টর বদল হইছে।

প্রঃ দুই মাসের চাঁদা বাকি পড়ায় শান্তিবাহিনী ব্যবসায়ীদেরকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না যাওয়ায় তারা ক্ষেপে গিয়ে এই হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল বলে অনেকে মনে করে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
উঃ এইডা একটা ফালতু কথা। ব্যবসায়ীরা পাহাড়েও যায় না। পাহাড়ে গিয়া কখনো চান্দা দেয় না। পাহাড়ে যাই আমরা। কাঠ বলেন, বাঁশ বলেন, তার চান্দা প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় দিয়াই আনতে হইত। কোন দিনের চান্দাই বাকি থাকত না।

প্রঃ ব্যবসায়ীদের কথা বলছি-
উঃ ব্যবসায়ীরা তাদের মাল (কাঠ, বাঁশ) নেওনের সময় রাস্তায় রাস্তায় চান্দা দেয়। চান্দা ছাড়া ১ ফুট গাছ নেওনের ক্ষেমতাও ব্যবসায়ীদে নাই। চান্দা বাকী রাইখ্যা শান্তিবাহিনী গাছ নিতে দিছে এই কথা জীবনেও শুনি নাই। ব্যবসা করতে চাইলে তাদেরকে চান্দা দেওনই লাগবো। আর হেগোর লাইগ্যা আমাদের মতন গরীব মানুষেরে মারব ক্যান্?

প্রঃ এতগুলো মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
উঃ জানি না ভাই। কি জন্য যে মারল, হেইডাই তো কইতে পারি না। ওরা ভাই বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর, তক্তা নজরুলরে পর্যন্ত মাইরা ফালাইল। যে নিজে না খাইয়াও হেগোরে খাওয়াইছে, কত বিপদ থাইক্যা উদ্ধার করছে।

প্রঃ ঘটনার দিন পাহাড়ে গিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?
উঃ ঐদিন আমার পোলাগো মোসলমানির (খৎনা করার) কথা আছিল। তাছাড়া শরীরটাও বেশি বালা আছিলনা। কিন্তু আলাল ভাই (স্ত্রীর বড় ভাই) কইল, পাহাড়ে যাওনের লাগি। একরকম জোরের মধ্যেই আমি আলাল ভাইয়ের লগে রওনা হইলাম। অফিস ছড়া দিয়া পাহাড়ে ঢুকলাম। কেচিং (একটা জায়গার নাম) থাইক্যা সামান্য উপরে একটা দোকান। দোকানে দেখলাম তিনজন শান্তিবাহিনী অস্ত্র নিয়া বইসা আছে। এইডাতে অবশ্য সন্দেহ করি নাই। এই রকমতো মাঝে মধ্যেই দেখতাম। আলাল ভাইয়ের সাথে গ্যানো চাকমার ছোটখাট ব্যবসা আছিল। আলাল ভাই তার জন্য কিছু টাকা নিয়া গেছিল। টাকা দেওনের লাগি আলাল ভাই যখন গ্যানো চাকমার সাথে কথা কইতেছিল তখন কালু চাকমা এবং তার সাথের কয়েকজন আইসা কইল, মিটিং আছে, ভিতরে যাইতে অইব। তখন আলাল ভাই কইল, গ্যানো বদ্দা, তোমার টাকা মিটিং থাইক্যা আসার সময় দিব। কিন্তু গ্যানো চাকমা, টাকাটা তখনই লইতে চাইছিল। কালু চাকমা আলাল ভাইরে কইল, যাওনের সময় দিয়া যাওনের লাইগ্যা।

প্রঃ প্রথম কখন বুঝতে পারলেন যে, কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে?
উঃ কালু চাকমার সাথে কিছুদূর যাইতেই দেখি রাস্তার দুই পাশে চার জন করে মোট আট জন এসএম জি নিয়া বইসা আছে। আমরা কাছে যাওন মাত্রই আমাদেরকে ঘিরে ফালাইল। এই অবস্থা দেইখ্যাই আমার প্রথম মনে অইল যে, আজকে আমাদেরকে মাইরা ফালাইব। পকেট থাইক্যা টাকা পয়সা সব রাইখ্যা কালু চাকমা আর তার লগের একজন আমাদের হাত পিছ-মোড়া কইরা গাছের লতা দিয়া বানল। বান্ধার সময় কইল মিটিংয়ের জায়গা নিয়া বান ছাইড়া দিব। তখন আমি কইলাম ছাইড়াই যখন দিবা, তখন অত শক্ত কইরা বান্ধনের দরকার কী, আমরাতো পালাইতেছি না। আমিও হাত এমন ভাবে রাখলাম যাতে বান বেশি শক্ত না হয়।

প্রঃ আপনাদের বেঁধে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে কি দেখলেন?
উঃ ১৫/২০ মিনিট হাইট্টা ভিতরে যাওনের পর দেখলাম একাটা মেড়া গাছের লগে তক্তা নজরুলসহ ৪ জন বান্ধা। সামনেই অন্যান্য গাছের লগে আরো মানুষ বান্ধা। গুনে দেখলাম আমিসহ ২৯ জন। এলএমজি ও এসএমজি হাতে পাহাড়া দিতেছে ১৯ জন শান্তিবাহিনী। আর লাঠি, দা, কুইচ্যা মারা শিক হাতে আরো ১২ জন চাকমা আছে, এদের মধ্যে কয়েকজনরে আমি চিনি। তারা হল- লাম্পায়া চাকমা, ছিক্কা কারবারী, বলি চাকমা, শান্তিময় চাকমা, বাবুল চাকমা, গুলুক্যা চাকমা, তরুন চাকমা(কালেক্টর), কবির চাকমা, বাশি চাকমা, বিমল চাকমা এবং সমিতি রঞ্জন চাকমা। এক সময় শান্তিবাহিনীর একজন একটা খাতা ও কলম নিয়া আমাদের সবার নাম লিখল এবং কার কাছ থাইক্যা রাস্তায় কত টাকা এবং কি কি জিনিস পত্র রাখা হইছে তা লিখল।

প্রঃ বাঁধা অবস্থা থেকে আপনি পালালেন কিভাবে?
উঃ কিছুক্ষণ পর কালাপাকুইজ্যার ৫ জনরে গাছের থাইক্যা দড়ি খুইল্লা আরো সামনের দিকে লইয়া গেল। তাদের সাথে গেল ২ জন অস্ত্রধারী আর ৩ জন গেল দা, লাঠি, কুইচ্যা মারার শিক নিয়া। ১০/১২ মিনিট পর নজরুল ভাইসহ আরো ৫ জনরে নিয়া গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নজরুল ভাই আর যাইতে চাইতেছে না। তখন একজন তারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া নিয়া গেল। তখনই বুঝলাম যে, লোকজনেরে সামনে নিয়া মাইরা ফালাইতেছে। কারণ নজরুল ভাইরে ঘাড়ে ধরা দূরের কথা. তার লগে গরম অইয়াও চাকমাদেরকে কথা কইতে কোন দিন দেহি নাই। তখন আমি একজনরে কইলাম, দাদা আমি একটু পেশাব করব। উনি এবং আরেক জন আমাকে একটু দূরে নিয়া গেল। পেশাবের ছল কইরা কিছুক্ষণ বইসা থাইক্যা মনে মনে ঠিক করছিলাম খাড়াইয়াই দৌড় দিমু। কিন্তু যখন খাড়াইলাম, তখন ঠাস কইরা বাঁকা একটা বাঁশের লগে মাথাটা বাড়ি লাগল। তখন আমার সাথের শান্তিবাহিনী দুইজন সর্তক হইয়া গেল। আমি মাথা হাতাইতে হাতাইতে আবার আগের জায়গায় আইলাম। আমারে আবার অন্যদের লগে বানল। তখন খুব লুকাইয়া লুকাইয়া আমি আমার হাতের বান খুইলা ফালাইলাম এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেই জন্য হাতের নিচে চাইপ্যা রাখলাম। তারপর আল্লাহর নাম লইয়া দিলাম এক দৌড়।

কিন্তু সামনেই দেখি এলএমজি নিয়া একজন খাড়াইয়া রইছে। আমারে কইল, দৌড় দিবিনা, ব্রাশ কইরা দিমু, তখন আমি ডান পাশের ছড়ার দিকে লাফ দিলাম। লাফ দেয়ার সাথে সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম, আর শব্দ শুনতে শুনতেই গড়ায়ে পড়লাম নিচের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের গুড়ির দিকে গর্তমতো জাগা পাইলাম। সেইখানে বইসা মাথার উপরে জঙ্গল টাইন্যা ধইরা রাখলাম। ভয়ে তখন আমার বুকের মধ্যে এমন জোরে আওয়াজ অইতেছিল যে, মনে হইছিল এই শব্দ না জানি শান্তিবাহিনী শুইনা ফালায়। রাত হওয়ার পর ছড়া দিয়াই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ছড়ার মধ্যে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি, আবার কোথাও সাঁতার। ঘন জঙ্গলে ভরা ছড়া দিয়ে চলবার মত কোন পথ নাই। তার উপর আবার নিশি অন্ধকার। ছড়ার মধ্যে ঠান্ডা পানি, বেতের কাঁটা, বিষাক্ত সাপ, হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল। কিন্তু তখন এক শান্তিবাহিনী ছাড়া আর কিছুকেই ভয় হচ্ছিল না। সারা রাত হেঁটে হেঁটে অবশেষে ভোরের দিকে পাহাড় থেকে বের হই।

প্রঃ ১১ তারিখ সেনাবাহিনীর লাশ উদ্ধারের কথা কিছু বলুন।
উঃ বাড়িতে আসার পর আর্মিরা যহন জানল যে আমাকেও শান্তিবাহিনী ধরে নিয়া গেছিল। তহন তারা আমাকে সাথে নিয়া গেল পথ দেখানোর জন্য। আমি তাদের পাহাড়ে নিয়া গেলাম। তক্তা নজরুলরে যেইখানে ঘাড়ে ধাক্কা দিছিল, সেইখান থাইকা আরেকটু সামনে গিয়া দেখলাম, বাম দিকে প্রায় এক-দেড়’শ গজ পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া। নিচে নাইমা সেই বেড়া পার হইলাম। কিন্তু তারপর আর রাস্তার কোন চিহ্ন নাই। একটু দূরে দেখলাম, একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি আধা ভাঙ্গা অবস্থায় ঝুইলা রইছে। কঞ্চিটা সরানোর পর একটা ছোট পথ পাইলাম। এই পথ দিয়া সামনে গিয়া দেখি সরাফদ্দি ভাইয়ের টুপিটা একটা কঞ্চির লগে বাইজ্যা রইছে। এরপর সেন্ডেল, মদের টেংকি, বেশ কয়ডা লাঠিও দেখলাম। তারপর দেখলাম আলাল ভাইয়ের লাশ। আরেকটু সামনে গিয়া দেখি বিশাল জায়গা জুইড়া লাশ আর লাশ। কেউরে চিনা যায় না। বন্দুকের সামনে যে চাকুটা (বেয়নেট) থাকে এইডা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া মারছে। লাঠি দিয়া পিটাইয়া, দা দিয়া কুবাইয়া, কুইচ্যা মারার শিক দিয়া পারাইয়া, চোখ তুইলা, আরো কতভাবে যে কষ্ট দিয়া মারছে তা কইয়া শেষ করুন যাইব না। ঐকথা মনে অইলে আইজো শরীরের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐখানে লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের।

Pakuakhali-4

Pakuakhali-2

Pakuakhali-

pakuakhali-00

ছবি: পাকুয়াখালিতে নিহত কয়েকজন কাঠুরিয়ার লাশ

প্রঃ মানুষ মারা গিয়েছিল ৩৫ জন,  আপনি বলছেন লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের। বাকিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উঃ ঘটনার দিন আমি যাদেরকে বান্ধা অবস্থায় দেখছিলাম তাদের মধ্যে আমার পরিচিত আলী, দুলু দুই ভাইসহ ৪ জনের লাশ ঐখানে ছিল না। আর এমন তিনজনের লাশ পাইছি যারা ঐ দিন ঐখানে বান্ধা ছিল না। আমার মনে হয়, আমি পালানোর পরে আরো সাত জনরে শান্তিবাহিনীরা ধইরা নিয়া গেছিল। সাত জনরে মনে হয় অন্য কোন খানে নিয়া মারছে, আমরা তাদের লাশ খুইজ্জা বাইর করতে পারি নাই। আর বালা কইরা খুজবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।

প্রঃ শান্তিবাহিনী এতগুলো মানুষকে একসাথে হত্যা করল, অথচ তাদের কোন বিচার হল না। আপনারা কি সরকারের কাছে এর বিচার চান নাই?
উঃ আমরাতো বিচারের দাবী করছিই, আমি নিজে বাদী অইয়া মামলাও করছিলাম। তখন সরকারের মন্ত্রীরাও কইছিল বিচার করব। তদন্তও করছিল। হুনছি তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে আজ ১৪ বছর পার অইয়া গেল। কই, কিছুই তো অইল না। শুধু এইডাই না, শান্তিবাহিনী তো আরো অনেক বাঙালিরে মারছে। কোনডারই তো বিচা অয় নাই। চাকমারা মানুষ মারলে তো এই দেশে বিচার অয় না। বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে, তার। আর অহন তো চুক্তি কইরা শান্তিবাহিনীরাই সরকার (সাবেক শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা চুক্তির পর থেকে পার্বত্যচট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন) অইছে। তাইলে আর বিচার করব কেডা?

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবী, আপনার বাবাকেও মাইরা ফালাইছিল। বাবা হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। আর আপনি সেই হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। এই জন্য আপনাকেই বলি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকুয়াখালীতে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে তারাও তাদের বাবা হত্যার বিচার চায়, যারা সেখানে ভাই হারিয়েছে তারা তাদের ভাই হত্যার বিচার চায়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছে তারা সন্তান হত্যাকারীর বিচার চায়, যেসব মহিলা স্বামী হারিয়েছে তারা স্বামী হত্যার বিচার চায়। কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হইয়া আত্বীয়-স্বজনদের হত্যাকারীর বিচার করতে পারব না। তাই এই হত্যাকান্ডের বিচার আপনাকেই করতে হইব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের কবরগুলোর একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।- সম্পাদক।)

আগামীকাল ভয়াল ২৯ এপ্রিল : উপজাতি সন্ত্রাসী কর্তৃক ভয়াবহ বাঙালি গণহত্যার এক কালো দিবস

সন্তোষ বড়ুয়া:

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন “শান্তিবাহিনী” কর্তৃক অসংখ্য বর্বরোচিত, নারকীয় ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিরা। কিন্তু কোন এক অলৌকিক কারণে বাঙালিদের উপর সন্ত্রাসীদের চালানো এসব নির্যাতনের চিত্র প্রচার মাধ্যমে তেমন স্থান পায়নি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্যাতনকারী উপজাতিরা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল বানিয়ে দেশে-বিদেশে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে যাচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা অত্যাচারিত।

কতিপয় উপজাতি সাইবার এক্টিভিস্ট এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ কর্তৃক অর্থের বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের উপর সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত এসব গণহত্যার সম্পর্কে বিদেশী ও দেশের মানুষকে ভুল বোঝানো হয়। এতে করে সর্বমহলে ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের আসলে উপজাতিরাই নির্যাতনের শিকার।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশিরভাগ গণহত্যা শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এই তথ্য এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী শান্তিবাহিনীর দালালদের কর্তৃক লুকানো হচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দেশে-বিদেশে সর্বত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে। স্বাভাবিকভাবে মানুষ সংখ্যালঘুদের কথা বিশ্বাস করে এবং ভাবে যে সংখ্যাগুরুরা তাদের নির্যাতন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষেত্রে এখানকার বাঙালিরাই উপজাতি সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত এবং অত্যাচারিত।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিুচুক্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি, বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ড।

কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির অন্বেষায় সরকার শান্তিচুক্তি করলেও সন্তু লারমার শান্তিবাহিনীর বিকল্প জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(সংস্কার), ইউপিডিএফ(প্রসীত) এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামক চারটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠিত হয়েছে। এই চার সংগঠন এখন পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তারা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কখন কার উপর তারা যমদূতের মতো আবির্ভূত হয় তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে পাহাড়ের মানুষ।

শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক অসংখ্য গণহত্যা চালানো হয়। তাদের এইসব গণহত্যার শিকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো। এমনকি শান্তিবাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ড থেকে রেহায় পায়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরাও।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম হল ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিলে সংঘটিত তিন তিনটি গণহত্যা। এগুলো হলো- পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

সেদিন দিবাগত রাত আনুমানিক ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত একযোগে চালানো হয় পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

এদিনে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং, চেঙ্গী, পানছড়ি, লতিবান, উল্টাছড়ি এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে; দীঘিনালা উপজেলার মেরুং, বোয়ালখালী, কবাখালী, দিঘীনালা, বাবুছড়া এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে এবং মাটিরাংগা উপজেলার তাইন্দং, তবলছড়ি, বর্ণাল, বেলছড়ি, আমতলি, গোমতি, মাটিরাংগা, গুইমারা এই ৮টি ইউনিয়নের ৩২৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে অগ্নিসংযোগসহ লুটতরাজ, হত্যা, বাঙালি নারীদের গণধর্ষণ ও পরে হত্যা করে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিলো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা।

মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যে তারা পানছড়ি এলাকায় ৮৫৩ জন, দিঘীনালা এলাকায় ৮৯৮ জন এবং মাটিরাঙ্গা এলাকায় ৬৮৯ জন নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালি নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতাকে হত্যা করে। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে, জবাই করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় বাঙালি মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

ওই ঘটনায় পানছড়ি এলাকায় আহত হয় ৫০০ জনের অধিক বাঙালি। ৬২৪০টি বাঙালিদের বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। দিঘীনালা এলাকায় আহত হয় ১২০০ জনের অধিক বাঙালি। ৭৩০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। মাটিরাঙ্গা এলাকায় আহত হয় ৮০০ জনের অধিক বাঙালি। ৯০৪৮টি বাড়ি উপজাতি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

তিনটি ঘটনাতে অপহরণ ও গুমের শিকার হয় কয়েক হাজার বাঙালি। সেদিন কতিপয় বাঙালি প্রাণে বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার বাঙালি পরিবার। ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখা এবং বেঁচে যাওয়া কিছু কিছু সাক্ষী আজো আছে। কিন্তু ঘটনার বীভৎসতার কথা মনে পড়লে আজও তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ গণহত্যা ও বাঙালী নিধনের কথা আজ ইতিহাসের অতলান্তে, স্মৃতির ধুলার পুরো আস্তরে ঢাকা পড়ে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবে তাদের প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে আজো পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অখণ্ড ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে টিকে আছে বাংলাদেশের মানচিত্রে।

লেখক: রাঙামাটি থেকে

অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?

  • মাহের ইসলাম

প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র কিছু দুষ্কৃতিকারী দুইজন মানুষকে অপহরণ করলে, সবারই খারাপ লাগার কথা, ভয় পাওয়ার কথা; এমনকি অপহৃতদের ক্ষতির আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর শত ভয়ভীতি এবং উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও, সমাজের কিছু বিবেকবান মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদ করবে; একই সাথে অপহরণকারীদের ধরতে এবং অপহৃতদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে সফলও হবে। অন্যদিকে, অনিষ্টের উৎকণ্ঠার পাশাপাশি, তাদের মঙ্গল কামনায় নীরবে প্রার্থনা এবং সরবে তাদের উদ্ধারের দাবী জানানো আমাদের সমাজে খুবই স্বাভাবিক।

এই স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোই একের পর এক ঘটে চলেছে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সংগঠনের দুই নারী নেত্রীর অপহরণকে কেন্দ্র করে। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২ তারিখে অপহৃত একজনের মায়ের করুণ ছবি সম্বলিত একটি নিউজ করেছে দেশেরই একটা শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক। এছাড়া অপহৃতদের উদ্ধারসহ ৫দফা দাবিতে ঢাকায় নারী-যুব-ছাত্র সংগঠনসমূহের প্রতিবাদী মশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে একই দিন সন্ধ্যায়।

ঘটনা যাদেরকে নিয়ে, সেই মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণের পর প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা থেকে জানা যায়, অস্ত্রের মুখে কিছু সন্ত্রাসী গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির সদরের কুতুকছড়ির উপর পাড়া গ্রাম থেকে  ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের এই দুই নেত্রীকে অপহরণ করে। ঐ সময় সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে ধর্মসিং চাকমা নামে একজন ইউপিডিএফ নেতা গুলিবিদ্ধও হয়েছে। সন্ত্রাসীরা এসময় একটি ঘরে আগুনও ধরিয়ে দেয়। এ অপহরণ ঘটনায় ২১জনকে আসামি করে রাঙামাটির কোতয়ালী থানায় একটি মামলা হয়েছে। তন্মধ্যে, নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে প্রধান আসামি এবং সদ্য গঠিত ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ, মশাল মিছিল, প্রেস ব্রিফিং করে অপহৃতদের উদ্ধারের দাবী জানানো হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ সমর্থিত তিন সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন যৌথভাবে ২১মার্চ খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।  এ কর্মসূচীতে তাদের সমর্থকেরা যথারীতি জ্বালাও – পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর, মারধোরের ঘটনা, পুলিশের উপর হামলা ইত্যাদি ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

অবরোধ চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক অটোরিক্সার চালক আহত হয়, অপর একটি অটোরিক্সায় ছোঁড়া ইটের আঘাতে দেড় বছরের একটি শিশুও আহত হয়। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে একাধিক গাড়িতে, মারধোর করা হয়েছে যাত্রী ও চালককে। পরিশেষে, অবরোধে হামলা ভাংচুরের দায়ে ইউপিডিএফ’র ৮০ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়; শেষ হওয়ার কথাও নয়। কারণ অপহৃতদের অদ্যাবধি উদ্ধার করা যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই আমরা খবরের কাগজে এই সংক্রান্ত সংবাদ পাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিনই তাদের উদ্ধারের দাবী জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে, অনেকেই যার যার সাধ্যানুযায়ী কিছু না কিছু করার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টা্তে ফেসবকে পোস্ট ও কমেন্টের ঝড় বইছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে, ইতোমধ্যেই অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং জন প্রতিনিধি  অপহরণসহ গুম, খুন, ধর্ষণের বিচারহীনতা এবং সরকারের নির্লিপ্ততার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং অবিলম্বে অপহৃত নেত্রীদ্বয়কে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বা ইমেইলে সংহতি জানিয়েছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু সবসময় আমাদের দেশের সবক্ষেত্রে ঘটে না। বিস্মিত হওয়ার বিষয়টি হলো এই যে, এমনকি এই পার্বত্য অঞ্চলেই অনেক অপহরণের পরেও ঢাকায় এমন আন্দোলন বা বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ কর্তৃক বিবৃতি স্বাক্ষর বা সংহতি প্রকাশ বা জাতীয় দৈনিকে সংবাদ দেখা যায় না। সহজ ভাষায়, আমাদের সমাজেরই কিছু তথাকথিত মানব দরদী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি এই দুই নারীর ক্ষেত্রে যে প্রতিক্রিয়া বা কর্মসূচী করছেন তা সকল অপহৃত নর বা নারীর জন্যে করেন না। অর্থাৎ, উনাদের কর্মকাণ্ড বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা দলের জন্যে এক রকম, আর অন্য সকল মানুষের জন্যে আরেক রকম।

আমি ইচ্ছে করেই শান্তি চুক্তির আগের সময়কার কথা বলছি না। ঢাকা ট্রিবিউন এর ২৭ জুলাই ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে গত ১৩ বছরে (২০০১ – ২০১৩) কমপক্ষে ৬৪০ জনকে অপহরণ করা হয়, তন্মধ্যে গুটিকয়েক ভাগ্যবান মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। ভেবে দেখতে পারেন, বিগত বছরগুলোতে কতবার বা কতজনের জন্যে এমন আয়োজন দেখেছেন, আজ যেমন দেখছেন এই দুই নেত্রীর জন্যে।  এই দুই নেত্রীর জন্য যে প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে আমি তার বিরোধীতা করছি না। বরং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক ঘটনাটি যখন অন্য অনেকের ক্ষেত্রে না ঘটে- তখন কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়! প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিক্রিয়ার আসল উদ্দেশ্য বা অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।  বর্তমান লেখার মূল উদ্দেশ্য সেটাই।

উদাহরণ স্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রতিকালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অপহরণের ঘটনার দিকে পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যেতে পারে।

১. চাঁদা না দেয়ায়  ২৭ মার্চ, ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়ি সদর থেকে মোবাইল অপারেটর রবি কোম্পানীর চার প্রকৌশলীকে অপহরণ করেছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখায় অপহরণের ঘটনাটি এতদিন প্রকাশ পায়নি। সংবাদে আরো জানা গেছে, অপহরণ করে কয়েক কোটি টাকা টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে অপহরণকারীরা। (পার্বত্যনিউজ, ৩ এপ্রিল ২০১৮)।

২. খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার ছদুরখীল এলাকায় মোবাইল ফোন কোম্পানীর চার টেকনিশিয়ানকে অপহরণ করা হয় ৬ মার্চ, ২০১৮ তারিখে। ইতিপূর্বে, চাঁদা না দেওয়ায় চাঁদাবাজরা কয়েকবার টাওয়ারের লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে, রবি টাওয়ারের মেরামতের  কাজে আসলে এই টেকনিশিয়ানদের অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। (পার্বত্যনিউজ, ৬ মার্চ ২০১৮)

৩. নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ একত্রে ৬২ জনকে অপহরণ করেছিল একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে। ‘অপহরণের ১৬২ দিন পর মুক্তি পেলেন ৩৫ জন’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোর ৩০ জুলাই ২০১৩ তে প্রকাশিত সংবাদ হতে আরো জানা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে রাঙামাটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে এদেরকে অপহরণ করা হয়। পরে নয়জন নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে মুক্তি দেয়। সংবাদ প্রকাশের দিনও আরো ১৫জন অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি ছিল।

৪.  ২০১৪ সালের নভেম্বরে লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়নের হারিহাবা নামক এলাকা থেকে অপহৃত হন বন বিভাগের তিনজন কর্মকর্তা। দৈনিক প্রথম আলোর ৮ নভেম্বর ২০১৪ তারিখের সংবাদ অনুসারে, তাদের মুক্তির বিনিময়ে অপহরণকারীরা ১৫লাখ টাকা দাবি করে। ৬ নভেম্বরে অপহৃত হওয়ার ১৯ দিন পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মধ্যে দিয়ে তাদের মুক্তি ঘটে।

৫. ২০১৩ সালের ৮ জুলাই বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা থেকে বি টেকনোলজির প্রকৌশলীসহ পাঁচজনকে অপহরণ করে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তীতে, দর কষাকষির এক পর্যায়ে, মুক্তিপণ ৪০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন কোটি টাকা দাবি করায় বি টেকনোলজির প্রতিনিধির সঙ্গে অপহরণকারীদের বৈঠক ভেস্তে যায়। (দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০১৩)।

৬. এক ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারকে তার দুই ডেনিস সহকর্মীসহ রাঙ্গামাটির গুনিয়াপাড়া থেকে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটজনের একদল সশস্ত্র পাহাড়ি  মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে। একই গাড়িতে থাকা আরো একজন বিদেশি এবং গাড়ির ড্রাইভারকে তারা ছেড়ে দেয় মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করার জন্যে।  কত টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে মাসাধিককাল পরে তারা মুক্তি পেয়েছিলেন, তা অবশ্য জানা যায় নি। (দি টেলিগ্রাফ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০১)।

৭. ডেনিশ সাহায্যকারী সংস্থা ডানিডাতে কর্মরত দুইজন বাংলাদেশিকে থানচির নিকটবর্তী এক গ্রাম থেকে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে অপহরণ করা হয়। (রয়টার্স, ১৩ জুলাই ২০০৭)।

৮. রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি থেকে একজন স্থানীয় গাইডসহ দুই বাঙ্গালী পর্যটককে অপহরণ করা হয় ২০১৫ এর ৩ অক্টোবর তারিখে। (ডেইলি সান, ১৩ অক্টোবর ২০১৫)।

৯. গুইমারা উপজেলার বাইল্যাছড়ি সাইনবোর্ড এলাকায় বাসের গতিরোধ করে, বাস থেকে স্বামীর পাশে বসে থাকা স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে। পরে ২০১৮ সালের মার্চে ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মী সজীব ত্রিপুরাকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার স্বীকারোক্তি হতে পুলিশ জানতে পারে যে, গৃহবধু ফাতেমা বেগমকে অপহরণ করে ইউপিডিএফের সদস্যরা মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। তার অপরাধ ছিলো সে বাঙালী ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে করেছে ধর্মান্তরিত হয়ে (পার্বত্যনিউজ, ৪ মার্চ ২০১৮)।

১০. খাগড়াছড়ি জেলা শহরের এক হাসপাতাল থেকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এর  দুই নেতাকে অস্ত্রের মূখে অপহরণ করা হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এই ঘটনায়  আঞ্চলিক একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা হয়। (পার্বত্যনিউজ, অক্টোবর ২২, ২০১৭)।

১১. নভেম্বর ২০১৭ তে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুই সদস্যকে মারধরের পর গুরুতর জখম অবস্থায় অপহরণ ও হরিনাথ পাড়া থেকে ইউপিডিএফ’র অপর এক সমর্থককে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া যায় ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি ইউনিটের সংগঠক মাইকেল চাকমার এক বিবৃতিতে।(পার্বত্যনিউজ, নভেম্বর ১৮, ২০১৭)।

১২. ১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর পোষ্টার লাগানোর সময় রাঙ্গামাটি থেকে ইউপিডিএফের  সাতজন কর্মীকে ২০০৯ এর ডিসেম্বরে অপহরণ করা হয়। এই ঘটনার পিছনে, জে এস এস এর সন্ত্রাসীরা এই অপহরণের সাথে জড়িত বলে ইউপিডিএফের পক্ষ হতে অভিযোগ করা হয়। (ডেইলি স্টার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৯)।

১৩. বিপক্ষ দলের হয়ে মিছিলে অংশ নেয়ায় নানিয়ারচরের ৫ জন ইউপি সদস্যসহ ২০ জনকে ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ তে অপহরণের অভিযোগ করা হয়। (পার্বত্যনিউজ, ডিসেম্বর ২২, ২০১৭)।

১৪. অতি সম্প্রতি, নব গঠিত ইউপিডিএফ ডেমোক্র্যাটিক এর তরফ হতে প্রকাশিত এক বুকলেটে ১৮ জন ইউপিডিএফ কর্মীর নাম ও ঠিকানা দেয়া হয়েছে। বুকলেটের দাবী অনুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত করায় এই ১৮ জনকে মেরেই ফেলা হয়েছে।

১৫. ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিলে এক ত্রিপুরা নারী চা শ্রমিক বাঙ্গালী ছেলেকে ভালবেসে পালিয়ে বিয়ে করার জের ধরে  পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত ফটিকছড়ির নাছিয়া চা বাগানের ১৯টি পরিবারের নারী ও শিশুসহ ৭৮ জনকে অপহরণ করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা।

১৬. ৫ জানুয়ারী ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ৩ জানুয়ারিতে জেএসএস এমএনলারমা গ্রুপের সমর্থিত খাগড়াছড়ি আসনের স্বতন্ত্রপ্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরার স্ত্রীসহ ৬জন নারী কর্মীকে জেলা সদরের গিরিফুল দক্ষিণ হেডম্যান পাড়া এলাকা হতে অপহরণ করা হয়ে। প্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা জানায়, পানছড়ি সড়কস্থ গিরিফুল এলাকায় তার স্ত্রী পারুমিতা চাকমা (পুতুলী), তার বউদি মেনকা ত্রিপুরা, তার শেলিকা অনুভা ত্রিপুরা এবং আরও ৩কর্মীসহ ভোট চাওয়ার জন্য গেলে ঘটনাস্থলে অপহরণের শিকার হয়। তিনি এ ঘটনায় ইউপিডিএফকে দায়ী করেন।

এরকম আরো অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ দেয়া যায়, কিন্তু তা পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারে বিধায় সে চেষ্টায় বিরত থাকা হলো।

শান্তি চুক্তির পরে গত ২০ বছরে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে পাহাড়িদের সংখ্যাই বেশি। আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতেই সবচেয়ে বেশি অপহরণ, হত্যা বা ধর্ষণের মতো অপরাধের শিকার হচ্ছে নিরীহ পাহাড়িরা। কিন্তু ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পায় না কখনই, তাই এই সব ঘটনার বেশির ভাগই রয়ে যায় সকলের অজ্ঞাতে। এসব অপহরণের কথা, অহরণের পর হত্যার কথা মিডিয়াতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব একটা আলোচিত হয় না।

অপহৃত দুই নেত্রী অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দলের হওয়ায় এবং অপহরণকারীদের দৌরাত্ম এখনো অতটা বাড়েনি বলেই হয়তবা আমরা এই ঘটনার কথা জানা গেছে। যদি এর ঊল্টোটা ঘটতো, অর্থাৎ চিরাচরিত প্রথার মতই প্রধান দুই আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ছোট দুই দলের নেতাদের অপহরণ করত, তাহলে যে আর যাই হোক এত মিছিল, প্রতিবাদের লোক পাওয়া যেত না- সেটা বুঝতে এতক্ষণে নিশ্চয় কারো দেরি হওয়ার কথা নয়।

উপরে যেসকল অপহরণের ঘটনার কথা আলোচিত হয়েছে, এরকম আরো অসংখ্য অপহরণের ঘটনায় এখন যাদের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি, বিবৃতি, কর্মসূচীতো দুরে থাকুক।

ভেবে দেখুন, দিনে দুপুরে সবার সামনে থেকে স্বামীর পাশে বসা গৃহবধুকে অপহরণ করার পরেও কিন্তু আমরা এই সকল নারীবাদী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কোন ধরনের বক্তৃতা বা বিবৃতি দেখিনি। কেউই তখন ফাতেমা বেগমকে উদ্ধার বা অপহরণকারীদের গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে রাজপথে একটি বারের জন্যেও মশাল মিছিলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। মামলা আছে, গ্রেফতারকৃত আসামির স্বীকারোক্তি আছে, অথচ বাকি অপরাধীদের গ্রেফতার বা শাস্তির দাবিতে কোন আওয়াজ নেই।

আজ যারা অপহৃত এই দুই নেত্রীকে নিয়ে এত কিছু বলছেন, এদের অনেকেই হয়ত সৈকত ভদ্র অথবা রেটিনা চাকমার সহযোদ্ধা ছিলেন; অথচ কী এক অদ্ভুত কারণে রেটিনা চাকমার অপহরণ ও তাকে নিলামে তুলে ধর্ষণ নিয়ে কেউ কখনই কিছু বলেননি এবং বলছেন ও না। দিপা ত্রিপুরার অপহরণকারী এবং যৌন নির্যাতনকারীদের ব্যাপারেও কেউ কিছু কখনই বলে না।

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া হাজারো জলজ্যান্ত অপহরণের ঘটনা থাকা সত্ত্বেও কী এক অদ্ভুত কারণে কিছু লোক প্রতি বছরই কল্পনা চাকমার বানোয়াট এক অপহরণের বিচার চায়! কারণটি অনুধাবনের ও খুঁজে বের করার ভার সচেতন পাঠকদের উপরই রইল!

♦ লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বপ্ন   

 

 তিমির মজুমদার

 আমার জন্ম বাংলাদেশের এক অভিশপ্ত অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত পাড়ায়।  অভিশপ্ত বলছি এ কারণে যে, এই এলাকার মানুষেরা নানাভাবে অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত। স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তি ও আনন্দ যে কি তা এই এলাকার মানুষেরা জানে না। তাই এখানকার যুব সম্প্রদায়কে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো হয় নতুন দেশ ‘জুম্মল্যান্ড’ এর।  কিন্তু সেই স্বপ্ন কবে বাস্তবায়ন হবে, আর কতটা ত্যাগ এখানকার মানুষকে করতে হবে তা আমরা কেউ জানি না।

স্বাধীনতার পরপরই আমাদের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য এলাকার স্বায়ত্বশাসন চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সেই দাবী তখন অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফলে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছিল এখানকার জনগোষ্ঠীর। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু ২০ বছর কেটে গেলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এখানকার বাসিন্দারা হতাশ। কাজেই এখানে বসবাসরতরা মনে করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের পথে পুণরায় পা বাড়ানোই মুক্তির একমাত্র উপায়।

কিন্তু আমাদের নেতৃত্ব এবং আমাদের জুম্মল্যান্ড সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম কতটা বাস্তবসম্মত? কেননা আমরা তো তাদের দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছি নিরন্তর।  এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি সত্যিই নেই?

১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই তারিখে বিলাইছড়ির তক্তানলার কাছে মালুমিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সকাল ১১ টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ টহলের উপর আক্রমণটি ছিল জেএসএস-এর সামরিক শাখা তথা শান্তিবাহিনীর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার পরবর্তী ইতিহাস- রক্তের হলি খেলার ইতিহাস। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার, এখানে পুণর্বাসিত বাঙ্গালী সেটেলারদের অত্যাচার এবং সর্বোপরি আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তথা শান্তিবাহিনীর অস্ত্রধারীদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় আমাদের জানা নেই। এক শান্তিবাহিনীর পরিবর্তে এখন অত্যাচারিত হচ্ছি জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এই চার দলের ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্রধারী দল কর্তৃক। তারা সকলে যদি স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তাহলে জুম্মল্যান্ড আর্মির (জেএলএ) সকল দল একত্রিত হতে পারছে না কেন?

স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত অস্ত্রের ঝনঝনানি এখানে নিরন্তর চলছে।  চলছে জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজীর এলাকা সম্প্রসারণের লড়াই। এরই মধ্যে প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার নিরীহ মানুষকে। আহত হয়েছে কমবেশী দশ হাজার এবং অপহরণ করা হয়েছে কমবেশী সাত হাজার মানুষ।  এর কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ পাহাড়ী জনগোষ্ঠী। সম্ভ্রমহানীর শিকার হয়েছে অসংখ্য বাঙ্গালী ও পাহাড়ী নারীরা। জুম্মল্যান্ড আর্মির সশস্ত্র যোদ্ধারা যেখানেই রাত্রিযাপন করে সেখানকার সকল কিছুই হয়ে যায় তাদের নিজস্ব। সেই পাড়া, বাড়ী বা ঘরের সকল মহিলারা হয়ে যায় তাদের খণ্ডকালীন সময়ের ‘স্ত্রী’। হায়রে স্বাধীনতার আন্দোলনের চরিত্রহীন নায়কেরা !

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শান্তিচুক্তির পূর্বে এখানকার মানুষদের উপর অনেক অত্যাচার করতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।  তাদের অত্যাচারে মাত্রা কমে এলেও যেসব রাত্রিতে আমাদের নিজস্ব সশস্ত্র সদস্যরা কোন পাড়ায় বা কোন বাড়ি/ঘরে কাটায় তারা হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতংক। যত্নে পালিত সবচেয়ে বড় ‘বন্য’(শুকর)টি তাদের জন্য উৎসর্গ করতে হবে।  সারা মাসের খাবার হিসেবে সংগৃহীত যা থাকে, তা তাদের রান্না করে খাওয়াতে হবে এবং সবশেষে ঘরের বা পাড়ার মহিলাদের হতে হবে তাদের দলের সকল সদস্যের শয্যাসঙ্গী।  সেটা যে কত ভয়ংকর তা কেবল ভূক্তভোগীরাই জানে। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দ করা যাবে না, কাউকে জানানো যাবে না। কেননা তারা তো ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত। তারা তো পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। তাছাড়া তাদের হাতে রয়েছে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র।

ব্যবসা বাণিজ্য, চাকুরী, কৃষিকাজ, ফলমূল, হাঁস মুরগী, ছাগল, গরু যা কিছুই বিক্রি করি না কেন তাদের দিয়ে দিতে হবে নির্দিষ্ট অংকের বিপুল পরিমাণ চাঁদা। না দিলে কি হবে? জীবন দিয়ে দেনা শোধ করতে হবে। এ কেমন স্বাধীনতার স্বপ্ন তারা দেখায়? এ তো স্বাধীনতা নয়, নিরন্তর অত্যাচার। এই অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আসলেই নেই?

একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তার নামে যা করছে তা আর আমরা সহ্য করতে পারছি না। তাহলে উপায় কি? এ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি কিন্তু কোন কুলকিনারা পাইনি। নিম্নলিখিত উপায়গুলো পাহাড়ে বসবাসরত সকলে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে দেখতে পারিঃ

প্রথমতঃ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেরা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা করার জন্য নিজ নিজ এলাকায়, নিজ নিজ পাড়ায়, প্রতিটি বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। রাত জেগে নিজেদের মধ্যে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয়পূর্বক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।  কথায় বলে ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ অথবা ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’।  সকলে মিলে চেষ্টা করলে নিপীড়ন নির্যাতন বন্ধ না হলেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

 দ্বিতীয়তঃ জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) যতদিন  পর্যন্ত একত্রিত না হয় ততদিন পর্যন্ত আমাদের সকলকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এসব দলগুলোকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কষ্ট করে আমরা যতটুকু উপার্জন করবো তা আমাদের পরিবারের জন্য। আমরা তার ভাগ কাউকে দেব না। একইভাবে বড় বড় ব্যবসায়ী, উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনে নিয়োজিত ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, ব্রিটিশ টোবাকো, কাঠ ব্যবসায়ী, বাস ও ট্রাক মালিক সমিতিসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। চলুন আমরা নিজ নিজ পাড়া, এলাকা, বাজার ইত্যাদিকে ‘চাঁদা মূক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করি। সংঘবদ্ধভাবে আমরা চাঁদাবাজীকে না বলি এবং কেউ যদি জোর করে চাঁদা আদায় করতে আসে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করি। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন আমাদের সকলের ঐকান্তিক সদিচ্ছা এবং একতাবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে সমতল ভূমিতে প্রচলিত ‘লাঠি ও বাঁশি’ পদ্ধতির প্রচলন করা যেতে পারে।

তৃতীয়তঃ সকল পরিস্থিতিতে নিজ নিজ এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। এদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে পাহাড়ী-বাঙ্গালী ভেদাভেদ আমাদেরকে কেবল দূর্বলই করবে। প্রত্যেককে একে অন্যের সামাজিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল আচরণ করতে হবে এবং একে অন্যের বিপদে আপদে এগিয়ে আসতে হবে।  একই এলাকায় কারও প্রতি কোন প্রকার অন্যায় ও অত্যাচার হলে সকলকে একযোগে তার প্রতিকার করতে এগিয়ে আসতে হবে।  তাহলে নিজেদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে যা এলাকায় নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

চতুর্থতঃ প্রত্যেককে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি হবার চেষ্টা করতে হবে। টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এর জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে । কৃষি, ফলজ, বনজ ইত্যাদি বৃক্ষরোপণ, হাঁস- মুরগী  পালন, ছাগল–গরু পালন, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষূদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প প্রভৃতিসহ নানা প্রকার অর্থনৈতিক কমকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া জীবন মানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা যে অবস্থায় আছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকে সে চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে।

পঞ্চমতঃ শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। প্রত্যেকের ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজে পাঠাবার কোন বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে যে ‘মানুষের মত দেখতে হলেই মানুষ হয় না; শিক্ষা ছাড়া মানুষকে কেউ মানুষ কয় না’।  আঞ্চলিক নেতৃত্ব আমাদের সন্তানদের মুর্খ করে রাখতে চায়। অথচ আমাদের দেয়া চাঁদার টাকায় তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজ অথবা বিদেশে লেখা পড়া করায়। তাদের এই চক্রান্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। শুধু পাশের হার ও জিপিএ ভিত্তিক শিক্ষা নয়; জীবনের বাস্তবতা ঘনিষ্ঠ শিক্ষা অর্জনের প্রতি জোর দিতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখা পড়া কারানোর পাশাপাশি সাবলম্বী হবার শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে তারা নিজ নিজ পরিবারকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করবে এবং মানুষের মত মানুষ হতে সচেষ্ট হবে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আধিবাসীরা স্বাধীনতার মুক্তি সম্পূর্ণভাবে  উপভোগ করতে পারছি না। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙ্গালী এবং জুম্ম লিবারেশন আর্মির  অত্যাচার এবং চাঁদাবাজীতে এখানকার জনগণের জীবন অতিষ্ট। এই অত্যাচার থেকে আমরা সকলেই মুক্তি চাই। বাংলাদেশ সরকারের উপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অবস্থা দৃষ্টে এখানকার সাধারণ মানুষ সত্যিই আশাহত।

(লেখক শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী এবং গবেষক)