ঐতিহাসিক ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস আজ

 

926vvvvvvvvvvvvvvvvvvv

ভূষণছড়া গণহত্যা পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ ইবনে রহমত

৩১ মে, ভূষণছড়া গণহত্যা দিবস। পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ এবং  ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডটি হচ্ছে ভূষণছড়া গণহত্যা। ১৯৮৪ সালের এই দিনে রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার
ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙ্গালীরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) -এর অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনীর হাতে অসংখ্যবার পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিরা গণহত্যার শিকার হয়েছে। শান্তিবাহিনীর হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রাজনগর গণহত্যা, পাকুয়াখালী ট্রাজেডি, মাটিরাঙ্গা গণহত্যা, ভূষণছড়া গণহত্যা উল্লেখযোগ্য। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক শত বছরের ইতিহাস ঘাটলেও ভূষণছড়া গণহত্যার মতো এত বড় ধ্বংসযজ্ঞের আর কোন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনকি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী পাষণ্ডরাও এখানে এমন জঘন্যতম ঘটনার জন্ম দেয়নি। যে ঘটনার মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ে হত্যা করা হয়েছে চার শতাধিক নিরস্ত্র নিরীহ মানুষ । এবং আহত করা হয়েছে আরও সহস্রাধিক মানুষ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে একটি জনপদ।

১৯৮৪ সালের ৩০ মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত সময়ে অর্থাৎ ৩১ মে সংঘটিত পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় ভূষণছড়া গণহত্যা। এর সাথে সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি রিপোর্টের পর্যালোচনা সচেতন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে চাই । এই পর্যালোচনার জন্য যে  সব
রির্পোটগুলোর সাহায্য  নেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো: BANGLADESH TODAY, 16-30 JUNE 1984-এ প্রকাশিত  Moinuddin Nasser-এর ‘Massacre at Bhushanchara’ শীর্ষক নিবন্ধ, BANGLADESH ECONOMIST, 1 July 1984: Vol-2 -এ প্রকাশিত জনাব Ali Murtaza -এর ‘Massacre at dawn’ শীর্ষক নিবন্ধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক ১০টি বইয়ের প্রণেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং গবেষক জনাব আতিকুর রহমান এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “বিলম্বিত পার্বত্য ঘটনা: ভূষণছড়া গণহত্যা – ১ ও ২”।

সেদিন আসলে কি ঘটেছিল আমরা তার আভাস পেতে পারি জনাব Ali Murtaza  এর রিপোর্টের ভূমিকা থেকেই। তিনি শুরুতেই একটি দৃশ্য বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-

The beheaded body of a young  woman Rizia Khatun was found lying at proabari para of Bhushanchara settlement with her dead body in the position of suckling her bosom. Both hands of yet another baby were found severed. Yet another infant was see cut by half. A seven day old boy was bayoneted to death in front of his parents.

এবার ভূষণছড়া গণহত্যা সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা যাক জনাব, Moinuddin Nasser এর লেখা থেকে-

A group of about 150 members of the shanti Bahinin headed by one Major Moni Shawpan Dewan , Launched the attack on the BDR camp and Bangali Settlers at the Bhusnanchara union of Barkal upojela in the early hours of May 31.

The insurgents, including their female cadres, in two groups launched the armed attack at 4 a. m. which continued till 8.30 a. m. They abruptly opened fire and killed the youth, women, children, elderly people and even the livestock. From three rehabilitation zones at Bhusnachra union under Barkal uppojela about 186 dead bodies of men, women, youths and babies were recovered till the writing of this report. It is learnt that a large number of corpses which could not be recovered were getting decomposed in the area. It is recorded that a total of about 500 people including BDR personnel, were injured in the raid, According to a reliable source, several BDR personnel were also killed.

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের মাজারের একাংশ

ভূষণছড়া গণহত্যায় শাহাদাত বরণকারীদের কবরগুলোর একাংশ

আতিকুর রহমান সাহেবের লেখায় ফুটে উঠেছে ঘটনার ভয়ঙ্কররূপ। তিনি লিখেছেন-

‘‘কলা বন্যা, গোরস্থান, ভূষণছড়া, হরিণা হয়ে ঠেকামুখ সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিরাট এলাকা জুড়ে সন্ধ্যা থেকে আপতিত হয় ভয়াল নিস্তদ্ধতা। কুকুর শিয়ালেরও সাড়া শব্দ নেই। আর্মি, বিডিআর, ভিডিপি সদস্যরাও ক্যাম্পে বন্দি। অতর্কিত পূর্ব দিক থেকে প্রথম ধ্বনিত হয়ে উঠল একটি গুলির শব্দ। তৎপরই ঘটনাবলীর শুরু। চুতর্দিকে ঘর-বাড়ীতে আগুন লেলিহান হয়ে উঠতে লাগল। উত্থিত হতে লাগল আহত নিহত অনেক লোকের ভয়াল চিৎকার এবং তৎসঙ্গে গুলির আওয়াজ , জ্বলন্ত গৃহের বাঁশ ফোটার শব্দ, আর আক্রমণকারীদের উল্লাস মূখর হ্রেসা ধ্বনি। এভাবে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, আর্তচিৎকার ও উল্লাসের ভিতর এক দীর্ঘ গজবি রাতের আগমন ও যাপনের শুরু। চিৎকার, আহাজারী ও মাতমের ভিতর  সুর্যোদয়ে জেগে উঠলো পর্য্যুদস্তজনপদ। হতভাগা জীবিতরা আর্তনাদে ভরিয়ে তুললো গোটা পরিবেশ। অসংখ্য আহত ঘরে ও বাহিরে লাশে লাশে ভরে আছে পোড়া ভিটা। এতো লাশ, এতো রক্ত আর এতো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এক অর্ধরাতের ভিতর এলাকাটি বিরান। অদৃষ্ট পূর্ব নৃশংসতা। অভাবিত নিষ্ঠুরতা। ওয়ারলেসের মাধ্যমে এই ধবংসাত্মাক দুর্ঘটনার কথা স্থানীয় বিডিআর ও আর্মি কর্তৃপক্ষ ঊর্ধ্বমহলে অবহিত করে। শুরু হয় কর্তৃপক্ষীয় দৌড় ঝাপ আগমন ও পরিদর্শন । চললো লাশ কবরস্থ  করার পালা ও ঘটনা লুকানোর প্রক্রিয়া। ঘটনাটি যে কত ভয়াবহ, মর্মন্তুদ আর অমানবিক এবং শান্তিবাহিনী যে কত হিংস্র পাশবিক চরিত্র সম্পন্ন মানবতা বিরোধী সাপ্রদায়িক সংগঠন তা প্রচারের সুযোগটাও পরিহার করা হলো। খবর প্রচারের উপর জারি করা হলো নিষেধাজ্ঞা। ভাবা হলো: জাতীয়ভাবে ঘটনাটি বিক্ষোভ ও উৎপাতের সূচনা ঘটাবে। দেশ জুড়ে উপজাতীয়রা হবে বিপন্ন।

ঘটনার ভয়াবহতা আর সরকারী নিস্ক্রিয়তায় ভীত সস্ত্রস্ত অনেক সেটালারই স্থান ত্যাগ করে পালালো। পলাতকদের ঠেকাতে পথে ঘাটে, লঞ্চে, গাড়িতে, নৌকা ও সাম্পানে চললো তল্লাশী ও আটকের প্রক্রিয়া। তবু নিহত আর পলাতকরা মিলে সংখ্যার প্রায় অর্ধেকই হলো ঐ জনপদ থেকে লাপাত্তা। শুরু হলো জীবিতদের মাধ্যমে লাশ টানা ও কবরস্থ করার তোড়জোড়। খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাই নেই্ চারিদিকে কেবল পঁচা লাশের দুর্গন্ধ, পালাবারও পথ নেই। নিরূপায় জীবিতরা, লাশ গোজানো ছাড়া আর কোন কাজ নেই ।  দয়া পরবশ কর্তৃপক্ষ, কিছু আর্থিক সহযোগীতায় এগিয়ে এলেন । এটাকে দয়া বলা ছাড়া উপায় কি?”

বরকল ভূষণছড়া এবং প্রিতিছড়ায় সেদিন কোন মানুষকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। জীবিত পাওয়া যায়নি  কোন পোষা প্রাণীকেও। Nasser সাহেবের রিপোর্টের সাথে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় অগ্নিদগ্ধ বিরান ভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র কুকুর। আর ছবির ক্যাপশন এ লেখা আছে-

Bhushanchara: Only the Dog was left Alive.

শান্তিবাহিনীর পাশবিক আক্রমণে সেদিন, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা আজো পাওয়া যায়নি। নিখোঁজদের সংখ্যা এবং তাদের পরবর্তী অবস্থা জানা যায়নি। তা ছাড়া ঘটনার ভয়াবহতায় যে সব বাঙ্গালী পার্বত্য এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে তাদের কি পরিমাণ আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছে তারও সঠিক হিসাব পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু প্রতিবেদকদের প্রতিবেদন থেকে নিহতদের সংখ্যার একটা ধারণা পাওয়া যায়। যা আৎকে উঠার মতোই বিরাট এক সংখ্যা।

Nasser  সাহের তার রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৬ জনের লাশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আবার তিনি আশঙ্কা করেন যে মৃতের সংখ্যা কোনভাবেই  ৪ শতকের কম হবে না। কেননা বরকলের ১৬০০ পরিবারের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার সেদিন আক্রান্ত হয়েছে। আর আক্রান্তদের মধ্যে ১০০টি পরিবার সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এই পরিসংখ্যানের সত্যতার সমর্থন মিলে আতিক সাহেবের লেখা থেকেও। তিনি দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান শেষে নিহতদের নাম ঠিকানা সম্বলিত যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে ৩৭০ জনের পরিচিতি তুলে ধরেছেন। Murtaza সাহেবও আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা বিভিন্ন স্থানে পাওয়া লাশের সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। তাঁর এই আশঙ্কার কারণ হিসাবে তিনি লিখেছেন-\

During my visit prittisara river even after five days of the incident, I found five bodies on the bank. The settlers told me that several other bodies still in the forest around that area.

ভূষণছড়া গণহত্যার কুখ্যাত নায়কের পরিচিত তুলে ধরতে গিয়ে Moinuddin Nasser  সাহেব লিখেছেন-

Major Moni Shawpan Dewan of the Priti group who was supposed to be the leader of the insurgents in this attack was student of Rangamati Govt. High school After liberation he went to continue his studies at Luthiana University of India/ Securing a Scholarship from the India Government, but he joined the Shanti Bahini without completing studies.

দুঃখজনক হলেও নির্মম সত্য এই যে, ভূষণছড়া গণহত্যা সহ অসংখ্য বর্বরোচিত ঘটনার শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙ্গালীরা। কিন্তু বাঙ্গালীদের উপর সন্ত্রাসী কর্তৃক সংঘটিত এসব নির্যাতনের চিত্র আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমতো দূরের কথা দেশীয় প্রচার মাধ্যমেও স্থান পায়নি। দেশে তখন সামরিক শাসন ও সংবাদ প্রচারের উপর সেন্সরর ব্যবস্থা আরোপিত থাকায় এবং পাহাড়ের অভ্যন্তরে যাতায়াত ও অবস্থান নিরাপদ না হওয়ায় অধিকাংশ গণহত্যা ও নিপীড়ন খবর হয়ে পত্র পত্রিকায় স্থান পায়নি। আর এই সুযোগে নির্যাতনকারী উপজাতীয়রা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল করে নিজেদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছে বিশ্বব্যাপী। এতে দুনিয়াব্যাপী ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের উপজাতীয়রাই নির্যাতনের শিকার। যার ফলে দেশ এবং সরকারের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী সেনাবাহিনীর চরিত্রেও কলঙ্ক আরোপিত হয়েছে।

পার্বত্য অঞ্চলের বাঙ্গালীরা একদিকে নির্মম হত্যাকন্ডের শিকার হবে অন্যদিকে উপজাতীয়দের অপপ্রচারে নির্যাতনকারী হিসেবে পরিচিত হবে আর সরকার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে এমন ব্যবস্থা চিরদিন চলতে পারে না । তাই সরকারের আশু কর্তব্য হচ্ছে মেজর মনি স্বপনদের বিচারের কাঠ গড়ায় দাঁড় করানো। উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে ভূষণছড়া গণহত্যাসহ পার্বত্য অঞ্চলের সকল হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের প্রকৃত বিচারের মাধ্যমেই পার্বত্য অঞ্চলের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা সম্ভব। এর মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে তথাকথিত শান্তিুচুক্তি করে জেএসএস তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি। বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ডও। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌড়াত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব বিচার ব্যবস্থাও। আমেরিকার মত প্রবল শক্তিধর সেনাবাহিনীও যখন ইরাকে বন্দী নির্যাতন করে পার পায়নি। আমাদের দেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা বিরোধীদের মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডের বিচার চলছে। তা হলে, স্বাধীন দেশে পার্বত্য অঞ্চলে যারা হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছে তাদের কেন বিচার হবে না? ভূষণছড়া গণহত্যা কি
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নয়?

পার্বত্যাঞ্চলের এসব অপরাধীর বিচারের ব্যাপারে কোন প্রকার বাধা থাকতে পারে না। আর থাকলেও তাকে ন্যায় সঙ্গত বাধা হিসাবে আখ্যায়িত করার কোন সুযোগ নেই। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা উন্নয়ন করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা সন্ত্রাসীরা ক্ষমার দৃষ্টিকে কখনই সরকারের উদার দৃষ্টি ভঙ্গি হিসাবে দেখে না। তারা একে সরকারে দুর্বলতা হিসাবেই গ্রহণ করে থাকে। এবং সঠিক পথে ফিরে আসার পরিবর্তে  তারা  বরং  আরো বেশি করে অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার  উৎসাহ বোধ করে। সব শেষে আতিক সাহেবের ভাষাতেই বলতে চাই-

‘‘এই নৃশংসতা বিনা বিচারে পার পেয়ে গেলে, এটি অপরাধ ও দন্ডনীয় কুকর্ম বলে নজির  স্থাপিত হবে না। এটা হবে আরেক নিন্দনীয় ইতিহাস।’’

 

(কৈফিয়ত: ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তম হত্যাকান্ড: ভূষণছড়া গণহত্যা’ শিরোনামে লেখাটি অতীতে কয়েকটি গণমাধ্যমে মোহাম্মদ ইউছুফ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পার্বত্য নিউজ ডটকম কেন একই লেখা সৈয়দ ইবনে রহমতের নামে প্রকাশ করলো-প্রশ্নটি ওঠা অত্যন্ত ন্যায্য। ২০০৫ সালে বাঙালী অন্তপ্রাণ এক তরুণ রচনায় উল্লিখিত বিভিন্ন সোর্সের সাহায্য নিয়ে ভূষণছড়া হত্যাকাণ্ডের উপর একটি প্রবন্ধ তৈরী করে ফেলে। জীবনের প্রথম জাতীয় পত্রিকায় লেখা পাঠানোর আগে সংশয়াবদ্ধ তরুণটি নিজের নামের স্থানে মোহম্মদ ইউছুফ লিখে পাঠায় দৈনিক ইনকিলাবে। ইনকিলাবে লেখাটি আমারই সম্পাদনায় প্রকাশ হয়। পরে আরো অন্যান্য কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। লেখাটি যে এতো বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পাবে তরুণটির পক্ষে তৎকালে জানা সম্ভব ছিলনা। ফলে নিজের নামটি দেবার কোনো আগ্রহ ছিলনা অন্তঃমূখী এই মেধাবী তরুণের। এখনো নেই। আমি নিজে থেকে যখন তার কাছে লেখকের আসল পরিচয় জানতে চাইলাম তখন বেরিয়ে এলো প্রকৃত সত্য ঘটনা। এখন আমার দায়িত্ব পড়লো সেই তরুণকে তার প্রাপ্য কৃতিৃত্বটুকু ফিরিয়ে দেয়া। সেই তরুণই আজকের লেখক সৈয়দ ইবনে রহমত। এ লেখার মধ্যদিয়েই তার সাথে আমার পরিচয় আর আজকে ইনকিলাবে ও পার্বত্য নিউজডটকমে আমার সহকর্মী, সহমর্মী ও সহযোদ্ধা।- সম্পাদক।)

আগামীকাল ভয়াল ২৯ এপ্রিল : উপজাতি সন্ত্রাসী কর্তৃক ভয়াবহ বাঙালি গণহত্যার এক কালো দিবস

সন্তোষ বড়ুয়া:

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন “শান্তিবাহিনী” কর্তৃক অসংখ্য বর্বরোচিত, নারকীয় ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিরা। কিন্তু কোন এক অলৌকিক কারণে বাঙালিদের উপর সন্ত্রাসীদের চালানো এসব নির্যাতনের চিত্র প্রচার মাধ্যমে তেমন স্থান পায়নি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্যাতনকারী উপজাতিরা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল বানিয়ে দেশে-বিদেশে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে যাচ্ছে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা অত্যাচারিত।

কতিপয় উপজাতি সাইবার এক্টিভিস্ট এবং তথাকথিত সুশীল সমাজ কর্তৃক অর্থের বিনিময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের উপর সন্তু লারমার শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত এসব গণহত্যার সম্পর্কে বিদেশী ও দেশের মানুষকে ভুল বোঝানো হয়। এতে করে সর্বমহলে ধারণা জন্মেছে যে, পার্বত্যাঞ্চলের আসলে উপজাতিরাই নির্যাতনের শিকার।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশিরভাগ গণহত্যা শান্তিবাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এই তথ্য এখন বিচ্ছিন্নতাবাদী শান্তিবাহিনীর দালালদের কর্তৃক লুকানো হচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দেশে-বিদেশে সর্বত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে। স্বাভাবিকভাবে মানুষ সংখ্যালঘুদের কথা বিশ্বাস করে এবং ভাবে যে সংখ্যাগুরুরা তাদের নির্যাতন করছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, পার্বত্য চট্রগ্রামের ক্ষেত্রে এখানকার বাঙালিরাই উপজাতি সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত এবং অত্যাচারিত।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিুচুক্তি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) তথা শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি আসেনি, বন্ধ হয়নি হত্যাকাণ্ড।

কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির অন্বেষায় সরকার শান্তিচুক্তি করলেও সন্তু লারমার শান্তিবাহিনীর বিকল্প জেএসএস(সন্তু), জেএসএস(সংস্কার), ইউপিডিএফ(প্রসীত) এবং ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) নামক চারটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠিত হয়েছে। এই চার সংগঠন এখন পাহাড়ের সকল জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তারা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কখন কার উপর তারা যমদূতের মতো আবির্ভূত হয় তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে পাহাড়ের মানুষ।

শান্তিচুক্তির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক অসংখ্য গণহত্যা চালানো হয়। তাদের এইসব গণহত্যার শিকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো। এমনকি শান্তিবাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ড থেকে রেহায় পায়নি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরাও।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম হল ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিলে সংঘটিত তিন তিনটি গণহত্যা। এগুলো হলো- পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

সেদিন দিবাগত রাত আনুমানিক ৯টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত একযোগে চালানো হয় পানছড়ি গণহত্যা, দিঘীনালা গণহত্যা ও মাটিরাঙা গণহত্যা।

এদিনে খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং, চেঙ্গী, পানছড়ি, লতিবান, উল্টাছড়ি এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে; দীঘিনালা উপজেলার মেরুং, বোয়ালখালী, কবাখালী, দিঘীনালা, বাবুছড়া এই ৫টি ইউনিয়নের ২৪৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে এবং মাটিরাংগা উপজেলার তাইন্দং, তবলছড়ি, বর্ণাল, বেলছড়ি, আমতলি, গোমতি, মাটিরাংগা, গুইমারা এই ৮টি ইউনিয়নের ৩২৫টি গ্রামের প্রত্যেকটি বাঙালি গ্রামে অগ্নিসংযোগসহ লুটতরাজ, হত্যা, বাঙালি নারীদের গণধর্ষণ ও পরে হত্যা করে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিলো সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এর সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসীরা।

মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের মধ্যে তারা পানছড়ি এলাকায় ৮৫৩ জন, দিঘীনালা এলাকায় ৮৯৮ জন এবং মাটিরাঙ্গা এলাকায় ৬৮৯ জন নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালি নারী, শিশু, আবাল-বৃদ্ধ বনিতাকে হত্যা করে। হাত-পা বেঁধে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে, দা-দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে, জবাই করে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নানা ভাবে কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল এই অসহায় বাঙালি মানুষগুলোকে। প্রতিটি লাশকেই বিকৃত করে সেদিন চরম অমানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা।

ওই ঘটনায় পানছড়ি এলাকায় আহত হয় ৫০০ জনের অধিক বাঙালি। ৬২৪০টি বাঙালিদের বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। দিঘীনালা এলাকায় আহত হয় ১২০০ জনের অধিক বাঙালি। ৭৩০৪টি বাড়ি লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয় উপজাতি সন্ত্রাসীরা। মাটিরাঙ্গা এলাকায় আহত হয় ৮০০ জনের অধিক বাঙালি। ৯০৪৮টি বাড়ি উপজাতি সন্ত্রাসীদের কর্তৃক লুটতরাজ করে সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়া হয়।

তিনটি ঘটনাতে অপহরণ ও গুমের শিকার হয় কয়েক হাজার বাঙালি। সেদিন কতিপয় বাঙালি প্রাণে বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার বাঙালি পরিবার। ঘটনাটি স্বচক্ষে দেখা এবং বেঁচে যাওয়া কিছু কিছু সাক্ষী আজো আছে। কিন্তু ঘটনার বীভৎসতার কথা মনে পড়লে আজও তাদের চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ গণহত্যা ও বাঙালী নিধনের কথা আজ ইতিহাসের অতলান্তে, স্মৃতির ধুলার পুরো আস্তরে ঢাকা পড়ে অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবে তাদের প্রাণ ও রক্তের বিনিময়ে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে আজো পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অখণ্ড ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে টিকে আছে বাংলাদেশের মানচিত্রে।

লেখক: রাঙামাটি থেকে

অপহরণের প্রতিবাদ: মানবিক, বাণিজ্যিক, না রাজনৈতিক?

  • মাহের ইসলাম

প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র কিছু দুষ্কৃতিকারী দুইজন মানুষকে অপহরণ করলে, সবারই খারাপ লাগার কথা, ভয় পাওয়ার কথা; এমনকি অপহৃতদের ক্ষতির আশঙ্কায় উৎকণ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর শত ভয়ভীতি এবং উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও, সমাজের কিছু বিবেকবান মানুষ এই ঘটনার প্রতিবাদ করবে; একই সাথে অপহরণকারীদের ধরতে এবং অপহৃতদের উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, অনেক ক্ষেত্রে সফলও হবে। অন্যদিকে, অনিষ্টের উৎকণ্ঠার পাশাপাশি, তাদের মঙ্গল কামনায় নীরবে প্রার্থনা এবং সরবে তাদের উদ্ধারের দাবী জানানো আমাদের সমাজে খুবই স্বাভাবিক।

এই স্বাভাবিক ব্যাপারগুলোই একের পর এক ঘটে চলেছে পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সংগঠনের দুই নারী নেত্রীর অপহরণকে কেন্দ্র করে। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২ তারিখে অপহৃত একজনের মায়ের করুণ ছবি সম্বলিত একটি নিউজ করেছে দেশেরই একটা শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক। এছাড়া অপহৃতদের উদ্ধারসহ ৫দফা দাবিতে ঢাকায় নারী-যুব-ছাত্র সংগঠনসমূহের প্রতিবাদী মশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে একই দিন সন্ধ্যায়।

ঘটনা যাদেরকে নিয়ে, সেই মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণের পর প্রায় ১৫ দিন পার হয়ে গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঘটনার যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা থেকে জানা যায়, অস্ত্রের মুখে কিছু সন্ত্রাসী গত ১৮ মার্চ রাঙামাটির সদরের কুতুকছড়ির উপর পাড়া গ্রাম থেকে  ইউপিডিএফ সমর্থিত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের এই দুই নেত্রীকে অপহরণ করে। ঐ সময় সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া গুলিতে ধর্মসিং চাকমা নামে একজন ইউপিডিএফ নেতা গুলিবিদ্ধও হয়েছে। সন্ত্রাসীরা এসময় একটি ঘরে আগুনও ধরিয়ে দেয়। এ অপহরণ ঘটনায় ২১জনকে আসামি করে রাঙামাটির কোতয়ালী থানায় একটি মামলা হয়েছে। তন্মধ্যে, নানিয়াচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে প্রধান আসামি এবং সদ্য গঠিত ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা ওরফে বর্মাকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে।

এ ঘটনার প্রতিবাদে পার্বত্য অঞ্চলের পাশাপাশি ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ সমাবেশ, মশাল মিছিল, প্রেস ব্রিফিং করে অপহৃতদের উদ্ধারের দাবী জানানো হয়েছে। বলাবাহুল্য যে, প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ সমর্থিত তিন সংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন যৌথভাবে ২১মার্চ খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে অবরোধ কর্মসূচি পালন করে।  এ কর্মসূচীতে তাদের সমর্থকেরা যথারীতি জ্বালাও – পোড়াও, গাড়ি ভাংচুর, মারধোরের ঘটনা, পুলিশের উপর হামলা ইত্যাদি ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

অবরোধ চলাকালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক অটোরিক্সার চালক আহত হয়, অপর একটি অটোরিক্সায় ছোঁড়া ইটের আঘাতে দেড় বছরের একটি শিশুও আহত হয়। ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে একাধিক গাড়িতে, মারধোর করা হয়েছে যাত্রী ও চালককে। পরিশেষে, অবরোধে হামলা ভাংচুরের দায়ে ইউপিডিএফ’র ৮০ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়; শেষ হওয়ার কথাও নয়। কারণ অপহৃতদের অদ্যাবধি উদ্ধার করা যায়নি। প্রায় প্রতিদিনই আমরা খবরের কাগজে এই সংক্রান্ত সংবাদ পাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিনই তাদের উদ্ধারের দাবী জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে, অনেকেই যার যার সাধ্যানুযায়ী কিছু না কিছু করার চেষ্টা করছেন। এই চেষ্টা্তে ফেসবকে পোস্ট ও কমেন্টের ঝড় বইছে।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে, ইতোমধ্যেই অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং জন প্রতিনিধি  অপহরণসহ গুম, খুন, ধর্ষণের বিচারহীনতা এবং সরকারের নির্লিপ্ততার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এবং অবিলম্বে অপহৃত নেত্রীদ্বয়কে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন বা ইমেইলে সংহতি জানিয়েছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বাভাবিক ব্যাপার কিন্তু সবসময় আমাদের দেশের সবক্ষেত্রে ঘটে না। বিস্মিত হওয়ার বিষয়টি হলো এই যে, এমনকি এই পার্বত্য অঞ্চলেই অনেক অপহরণের পরেও ঢাকায় এমন আন্দোলন বা বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ কর্তৃক বিবৃতি স্বাক্ষর বা সংহতি প্রকাশ বা জাতীয় দৈনিকে সংবাদ দেখা যায় না। সহজ ভাষায়, আমাদের সমাজেরই কিছু তথাকথিত মানব দরদী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি এই দুই নারীর ক্ষেত্রে যে প্রতিক্রিয়া বা কর্মসূচী করছেন তা সকল অপহৃত নর বা নারীর জন্যে করেন না। অর্থাৎ, উনাদের কর্মকাণ্ড বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা দলের জন্যে এক রকম, আর অন্য সকল মানুষের জন্যে আরেক রকম।

আমি ইচ্ছে করেই শান্তি চুক্তির আগের সময়কার কথা বলছি না। ঢাকা ট্রিবিউন এর ২৭ জুলাই ২০১৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে গত ১৩ বছরে (২০০১ – ২০১৩) কমপক্ষে ৬৪০ জনকে অপহরণ করা হয়, তন্মধ্যে গুটিকয়েক ভাগ্যবান মুক্তিপণের বিনিময়ে ফিরে আসতে পেরেছিলেন। ভেবে দেখতে পারেন, বিগত বছরগুলোতে কতবার বা কতজনের জন্যে এমন আয়োজন দেখেছেন, আজ যেমন দেখছেন এই দুই নেত্রীর জন্যে।  এই দুই নেত্রীর জন্য যে প্রতিক্রিয়া দেখানো হচ্ছে আমি তার বিরোধীতা করছি না। বরং এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিক ঘটনাটি যখন অন্য অনেকের ক্ষেত্রে না ঘটে- তখন কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়! প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিক্রিয়ার আসল উদ্দেশ্য বা অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।  বর্তমান লেখার মূল উদ্দেশ্য সেটাই।

উদাহরণ স্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্প্রতিকালে ঘটে যাওয়া কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অপহরণের ঘটনার দিকে পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যেতে পারে।

১. চাঁদা না দেয়ায়  ২৭ মার্চ, ২০১৮ তারিখে খাগড়াছড়ি সদর থেকে মোবাইল অপারেটর রবি কোম্পানীর চার প্রকৌশলীকে অপহরণ করেছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। বিষয়টি কঠোরভাবে গোপন রাখায় অপহরণের ঘটনাটি এতদিন প্রকাশ পায়নি। সংবাদে আরো জানা গেছে, অপহরণ করে কয়েক কোটি টাকা টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে অপহরণকারীরা। (পার্বত্যনিউজ, ৩ এপ্রিল ২০১৮)।

২. খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার ছদুরখীল এলাকায় মোবাইল ফোন কোম্পানীর চার টেকনিশিয়ানকে অপহরণ করা হয় ৬ মার্চ, ২০১৮ তারিখে। ইতিপূর্বে, চাঁদা না দেওয়ায় চাঁদাবাজরা কয়েকবার টাওয়ারের লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পরে, রবি টাওয়ারের মেরামতের  কাজে আসলে এই টেকনিশিয়ানদের অপহরণ করে সন্ত্রাসীরা। (পার্বত্যনিউজ, ৬ মার্চ ২০১৮)

৩. নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ একত্রে ৬২ জনকে অপহরণ করেছিল একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে। ‘অপহরণের ১৬২ দিন পর মুক্তি পেলেন ৩৫ জন’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোর ৩০ জুলাই ২০১৩ তে প্রকাশিত সংবাদ হতে আরো জানা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শেষে ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে রাঙামাটি থেকে বাড়ি ফেরার পথে এদেরকে অপহরণ করা হয়। পরে নয়জন নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে মুক্তি দেয়। সংবাদ প্রকাশের দিনও আরো ১৫জন অপহরণকারীদের হাতে জিম্মি ছিল।

৪.  ২০১৪ সালের নভেম্বরে লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়নের হারিহাবা নামক এলাকা থেকে অপহৃত হন বন বিভাগের তিনজন কর্মকর্তা। দৈনিক প্রথম আলোর ৮ নভেম্বর ২০১৪ তারিখের সংবাদ অনুসারে, তাদের মুক্তির বিনিময়ে অপহরণকারীরা ১৫লাখ টাকা দাবি করে। ৬ নভেম্বরে অপহৃত হওয়ার ১৯ দিন পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মধ্যে দিয়ে তাদের মুক্তি ঘটে।

৫. ২০১৩ সালের ৮ জুলাই বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা থেকে বি টেকনোলজির প্রকৌশলীসহ পাঁচজনকে অপহরণ করে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরবর্তীতে, দর কষাকষির এক পর্যায়ে, মুক্তিপণ ৪০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন কোটি টাকা দাবি করায় বি টেকনোলজির প্রতিনিধির সঙ্গে অপহরণকারীদের বৈঠক ভেস্তে যায়। (দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০১৩)।

৬. এক ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারকে তার দুই ডেনিস সহকর্মীসহ রাঙ্গামাটির গুনিয়াপাড়া থেকে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটজনের একদল সশস্ত্র পাহাড়ি  মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ করে। একই গাড়িতে থাকা আরো একজন বিদেশি এবং গাড়ির ড্রাইভারকে তারা ছেড়ে দেয় মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করার জন্যে।  কত টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে মাসাধিককাল পরে তারা মুক্তি পেয়েছিলেন, তা অবশ্য জানা যায় নি। (দি টেলিগ্রাফ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০১)।

৭. ডেনিশ সাহায্যকারী সংস্থা ডানিডাতে কর্মরত দুইজন বাংলাদেশিকে থানচির নিকটবর্তী এক গ্রাম থেকে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে অপহরণ করা হয়। (রয়টার্স, ১৩ জুলাই ২০০৭)।

৮. রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি থেকে একজন স্থানীয় গাইডসহ দুই বাঙ্গালী পর্যটককে অপহরণ করা হয় ২০১৫ এর ৩ অক্টোবর তারিখে। (ডেইলি সান, ১৩ অক্টোবর ২০১৫)।

৯. গুইমারা উপজেলার বাইল্যাছড়ি সাইনবোর্ড এলাকায় বাসের গতিরোধ করে, বাস থেকে স্বামীর পাশে বসে থাকা স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে। পরে ২০১৮ সালের মার্চে ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মী সজীব ত্রিপুরাকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার স্বীকারোক্তি হতে পুলিশ জানতে পারে যে, গৃহবধু ফাতেমা বেগমকে অপহরণ করে ইউপিডিএফের সদস্যরা মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। তার অপরাধ ছিলো সে বাঙালী ছেলেকে ভালবেসে বিয়ে করেছে ধর্মান্তরিত হয়ে (পার্বত্যনিউজ, ৪ মার্চ ২০১৮)।

১০. খাগড়াছড়ি জেলা শহরের এক হাসপাতাল থেকে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এর  দুই নেতাকে অস্ত্রের মূখে অপহরণ করা হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এই ঘটনায়  আঞ্চলিক একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করা হয়। (পার্বত্যনিউজ, অক্টোবর ২২, ২০১৭)।

১১. নভেম্বর ২০১৭ তে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার কমলছড়িতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুই সদস্যকে মারধরের পর গুরুতর জখম অবস্থায় অপহরণ ও হরিনাথ পাড়া থেকে ইউপিডিএফ’র অপর এক সমর্থককে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া যায় ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি ইউনিটের সংগঠক মাইকেল চাকমার এক বিবৃতিতে।(পার্বত্যনিউজ, নভেম্বর ১৮, ২০১৭)।

১২. ১১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর পোষ্টার লাগানোর সময় রাঙ্গামাটি থেকে ইউপিডিএফের  সাতজন কর্মীকে ২০০৯ এর ডিসেম্বরে অপহরণ করা হয়। এই ঘটনার পিছনে, জে এস এস এর সন্ত্রাসীরা এই অপহরণের সাথে জড়িত বলে ইউপিডিএফের পক্ষ হতে অভিযোগ করা হয়। (ডেইলি স্টার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৯)।

১৩. বিপক্ষ দলের হয়ে মিছিলে অংশ নেয়ায় নানিয়ারচরের ৫ জন ইউপি সদস্যসহ ২০ জনকে ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ তে অপহরণের অভিযোগ করা হয়। (পার্বত্যনিউজ, ডিসেম্বর ২২, ২০১৭)।

১৪. অতি সম্প্রতি, নব গঠিত ইউপিডিএফ ডেমোক্র্যাটিক এর তরফ হতে প্রকাশিত এক বুকলেটে ১৮ জন ইউপিডিএফ কর্মীর নাম ও ঠিকানা দেয়া হয়েছে। বুকলেটের দাবী অনুযায়ী, দলের সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত করায় এই ১৮ জনকে মেরেই ফেলা হয়েছে।

১৫. ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিলে এক ত্রিপুরা নারী চা শ্রমিক বাঙ্গালী ছেলেকে ভালবেসে পালিয়ে বিয়ে করার জের ধরে  পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত ফটিকছড়ির নাছিয়া চা বাগানের ১৯টি পরিবারের নারী ও শিশুসহ ৭৮ জনকে অপহরণ করে পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা।

১৬. ৫ জানুয়ারী ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ৩ জানুয়ারিতে জেএসএস এমএনলারমা গ্রুপের সমর্থিত খাগড়াছড়ি আসনের স্বতন্ত্রপ্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরার স্ত্রীসহ ৬জন নারী কর্মীকে জেলা সদরের গিরিফুল দক্ষিণ হেডম্যান পাড়া এলাকা হতে অপহরণ করা হয়ে। প্রার্থী মৃনাল কান্তি ত্রিপুরা জানায়, পানছড়ি সড়কস্থ গিরিফুল এলাকায় তার স্ত্রী পারুমিতা চাকমা (পুতুলী), তার বউদি মেনকা ত্রিপুরা, তার শেলিকা অনুভা ত্রিপুরা এবং আরও ৩কর্মীসহ ভোট চাওয়ার জন্য গেলে ঘটনাস্থলে অপহরণের শিকার হয়। তিনি এ ঘটনায় ইউপিডিএফকে দায়ী করেন।

এরকম আরো অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ দেয়া যায়, কিন্তু তা পাঠকদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারে বিধায় সে চেষ্টায় বিরত থাকা হলো।

শান্তি চুক্তির পরে গত ২০ বছরে, পাহাড়ি-বাঙ্গালী মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় হাজার দেড়েক মানুষ অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে পাহাড়িদের সংখ্যাই বেশি। আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতেই সবচেয়ে বেশি অপহরণ, হত্যা বা ধর্ষণের মতো অপরাধের শিকার হচ্ছে নিরীহ পাহাড়িরা। কিন্তু ভয়ে তারা মুখ খুলতে সাহস পায় না কখনই, তাই এই সব ঘটনার বেশির ভাগই রয়ে যায় সকলের অজ্ঞাতে। এসব অপহরণের কথা, অহরণের পর হত্যার কথা মিডিয়াতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব একটা আলোচিত হয় না।

অপহৃত দুই নেত্রী অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দলের হওয়ায় এবং অপহরণকারীদের দৌরাত্ম এখনো অতটা বাড়েনি বলেই হয়তবা আমরা এই ঘটনার কথা জানা গেছে। যদি এর ঊল্টোটা ঘটতো, অর্থাৎ চিরাচরিত প্রথার মতই প্রধান দুই আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ছোট দুই দলের নেতাদের অপহরণ করত, তাহলে যে আর যাই হোক এত মিছিল, প্রতিবাদের লোক পাওয়া যেত না- সেটা বুঝতে এতক্ষণে নিশ্চয় কারো দেরি হওয়ার কথা নয়।

উপরে যেসকল অপহরণের ঘটনার কথা আলোচিত হয়েছে, এরকম আরো অসংখ্য অপহরণের ঘটনায় এখন যাদের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তাদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায়নি, বিবৃতি, কর্মসূচীতো দুরে থাকুক।

ভেবে দেখুন, দিনে দুপুরে সবার সামনে থেকে স্বামীর পাশে বসা গৃহবধুকে অপহরণ করার পরেও কিন্তু আমরা এই সকল নারীবাদী, মানবাধিকার কর্মী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কোন ধরনের বক্তৃতা বা বিবৃতি দেখিনি। কেউই তখন ফাতেমা বেগমকে উদ্ধার বা অপহরণকারীদের গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে রাজপথে একটি বারের জন্যেও মশাল মিছিলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। মামলা আছে, গ্রেফতারকৃত আসামির স্বীকারোক্তি আছে, অথচ বাকি অপরাধীদের গ্রেফতার বা শাস্তির দাবিতে কোন আওয়াজ নেই।

আজ যারা অপহৃত এই দুই নেত্রীকে নিয়ে এত কিছু বলছেন, এদের অনেকেই হয়ত সৈকত ভদ্র অথবা রেটিনা চাকমার সহযোদ্ধা ছিলেন; অথচ কী এক অদ্ভুত কারণে রেটিনা চাকমার অপহরণ ও তাকে নিলামে তুলে ধর্ষণ নিয়ে কেউ কখনই কিছু বলেননি এবং বলছেন ও না। দিপা ত্রিপুরার অপহরণকারী এবং যৌন নির্যাতনকারীদের ব্যাপারেও কেউ কিছু কখনই বলে না।

চোখের সামনে ঘটে যাওয়া হাজারো জলজ্যান্ত অপহরণের ঘটনা থাকা সত্ত্বেও কী এক অদ্ভুত কারণে কিছু লোক প্রতি বছরই কল্পনা চাকমার বানোয়াট এক অপহরণের বিচার চায়! কারণটি অনুধাবনের ও খুঁজে বের করার ভার সচেতন পাঠকদের উপরই রইল!

♦ লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।


মাহের ইসলামের আরো লেখা পড়ুন

  1. পার্বত্য চট্টগ্রামে অপপ্রচার: মুদ্রার অন্য দিক
  2. মারমা দুই বোন, অপপ্রচার এবং ডিজিটাল যুগের দুর্বলতা
  3. পাহাড়িদের সরলতা কি গুটিকয়েকজনের ক্রীড়নক: প্রেক্ষিত বিলাইছড়ি ইস্যু
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীঃ নির্দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দোষী
  5. মিথুন চাকমার প্রতি সহানুভুতি কি অবিচার ?
  6. দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় চেতনা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে অপপ্রচার বন্ধে কোনো ছাড় নয়
  7. ইমতিয়াজ মাহমুদ- মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শেখান(ভিডিও)

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বপ্ন   

 

 তিমির মজুমদার

 আমার জন্ম বাংলাদেশের এক অভিশপ্ত অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত পাড়ায়।  অভিশপ্ত বলছি এ কারণে যে, এই এলাকার মানুষেরা নানাভাবে অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত। স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তি ও আনন্দ যে কি তা এই এলাকার মানুষেরা জানে না। তাই এখানকার যুব সম্প্রদায়কে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো হয় নতুন দেশ ‘জুম্মল্যান্ড’ এর।  কিন্তু সেই স্বপ্ন কবে বাস্তবায়ন হবে, আর কতটা ত্যাগ এখানকার মানুষকে করতে হবে তা আমরা কেউ জানি না।

স্বাধীনতার পরপরই আমাদের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য এলাকার স্বায়ত্বশাসন চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সেই দাবী তখন অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফলে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছিল এখানকার জনগোষ্ঠীর। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু ২০ বছর কেটে গেলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এখানকার বাসিন্দারা হতাশ। কাজেই এখানে বসবাসরতরা মনে করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের পথে পুণরায় পা বাড়ানোই মুক্তির একমাত্র উপায়।

কিন্তু আমাদের নেতৃত্ব এবং আমাদের জুম্মল্যান্ড সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম কতটা বাস্তবসম্মত? কেননা আমরা তো তাদের দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছি নিরন্তর।  এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি সত্যিই নেই?

১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই তারিখে বিলাইছড়ির তক্তানলার কাছে মালুমিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সকাল ১১ টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ টহলের উপর আক্রমণটি ছিল জেএসএস-এর সামরিক শাখা তথা শান্তিবাহিনীর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার পরবর্তী ইতিহাস- রক্তের হলি খেলার ইতিহাস। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার, এখানে পুণর্বাসিত বাঙ্গালী সেটেলারদের অত্যাচার এবং সর্বোপরি আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তথা শান্তিবাহিনীর অস্ত্রধারীদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় আমাদের জানা নেই। এক শান্তিবাহিনীর পরিবর্তে এখন অত্যাচারিত হচ্ছি জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এই চার দলের ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্রধারী দল কর্তৃক। তারা সকলে যদি স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তাহলে জুম্মল্যান্ড আর্মির (জেএলএ) সকল দল একত্রিত হতে পারছে না কেন?

স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত অস্ত্রের ঝনঝনানি এখানে নিরন্তর চলছে।  চলছে জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজীর এলাকা সম্প্রসারণের লড়াই। এরই মধ্যে প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার নিরীহ মানুষকে। আহত হয়েছে কমবেশী দশ হাজার এবং অপহরণ করা হয়েছে কমবেশী সাত হাজার মানুষ।  এর কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ পাহাড়ী জনগোষ্ঠী। সম্ভ্রমহানীর শিকার হয়েছে অসংখ্য বাঙ্গালী ও পাহাড়ী নারীরা। জুম্মল্যান্ড আর্মির সশস্ত্র যোদ্ধারা যেখানেই রাত্রিযাপন করে সেখানকার সকল কিছুই হয়ে যায় তাদের নিজস্ব। সেই পাড়া, বাড়ী বা ঘরের সকল মহিলারা হয়ে যায় তাদের খণ্ডকালীন সময়ের ‘স্ত্রী’। হায়রে স্বাধীনতার আন্দোলনের চরিত্রহীন নায়কেরা !

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শান্তিচুক্তির পূর্বে এখানকার মানুষদের উপর অনেক অত্যাচার করতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।  তাদের অত্যাচারে মাত্রা কমে এলেও যেসব রাত্রিতে আমাদের নিজস্ব সশস্ত্র সদস্যরা কোন পাড়ায় বা কোন বাড়ি/ঘরে কাটায় তারা হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতংক। যত্নে পালিত সবচেয়ে বড় ‘বন্য’(শুকর)টি তাদের জন্য উৎসর্গ করতে হবে।  সারা মাসের খাবার হিসেবে সংগৃহীত যা থাকে, তা তাদের রান্না করে খাওয়াতে হবে এবং সবশেষে ঘরের বা পাড়ার মহিলাদের হতে হবে তাদের দলের সকল সদস্যের শয্যাসঙ্গী।  সেটা যে কত ভয়ংকর তা কেবল ভূক্তভোগীরাই জানে। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দ করা যাবে না, কাউকে জানানো যাবে না। কেননা তারা তো ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত। তারা তো পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। তাছাড়া তাদের হাতে রয়েছে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র।

ব্যবসা বাণিজ্য, চাকুরী, কৃষিকাজ, ফলমূল, হাঁস মুরগী, ছাগল, গরু যা কিছুই বিক্রি করি না কেন তাদের দিয়ে দিতে হবে নির্দিষ্ট অংকের বিপুল পরিমাণ চাঁদা। না দিলে কি হবে? জীবন দিয়ে দেনা শোধ করতে হবে। এ কেমন স্বাধীনতার স্বপ্ন তারা দেখায়? এ তো স্বাধীনতা নয়, নিরন্তর অত্যাচার। এই অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আসলেই নেই?

একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তার নামে যা করছে তা আর আমরা সহ্য করতে পারছি না। তাহলে উপায় কি? এ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি কিন্তু কোন কুলকিনারা পাইনি। নিম্নলিখিত উপায়গুলো পাহাড়ে বসবাসরত সকলে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে দেখতে পারিঃ

প্রথমতঃ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেরা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা করার জন্য নিজ নিজ এলাকায়, নিজ নিজ পাড়ায়, প্রতিটি বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। রাত জেগে নিজেদের মধ্যে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয়পূর্বক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।  কথায় বলে ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ অথবা ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’।  সকলে মিলে চেষ্টা করলে নিপীড়ন নির্যাতন বন্ধ না হলেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

 দ্বিতীয়তঃ জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) যতদিন  পর্যন্ত একত্রিত না হয় ততদিন পর্যন্ত আমাদের সকলকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এসব দলগুলোকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কষ্ট করে আমরা যতটুকু উপার্জন করবো তা আমাদের পরিবারের জন্য। আমরা তার ভাগ কাউকে দেব না। একইভাবে বড় বড় ব্যবসায়ী, উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনে নিয়োজিত ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, ব্রিটিশ টোবাকো, কাঠ ব্যবসায়ী, বাস ও ট্রাক মালিক সমিতিসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। চলুন আমরা নিজ নিজ পাড়া, এলাকা, বাজার ইত্যাদিকে ‘চাঁদা মূক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করি। সংঘবদ্ধভাবে আমরা চাঁদাবাজীকে না বলি এবং কেউ যদি জোর করে চাঁদা আদায় করতে আসে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করি। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন আমাদের সকলের ঐকান্তিক সদিচ্ছা এবং একতাবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে সমতল ভূমিতে প্রচলিত ‘লাঠি ও বাঁশি’ পদ্ধতির প্রচলন করা যেতে পারে।

তৃতীয়তঃ সকল পরিস্থিতিতে নিজ নিজ এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। এদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে পাহাড়ী-বাঙ্গালী ভেদাভেদ আমাদেরকে কেবল দূর্বলই করবে। প্রত্যেককে একে অন্যের সামাজিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল আচরণ করতে হবে এবং একে অন্যের বিপদে আপদে এগিয়ে আসতে হবে।  একই এলাকায় কারও প্রতি কোন প্রকার অন্যায় ও অত্যাচার হলে সকলকে একযোগে তার প্রতিকার করতে এগিয়ে আসতে হবে।  তাহলে নিজেদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে যা এলাকায় নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

চতুর্থতঃ প্রত্যেককে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি হবার চেষ্টা করতে হবে। টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এর জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে । কৃষি, ফলজ, বনজ ইত্যাদি বৃক্ষরোপণ, হাঁস- মুরগী  পালন, ছাগল–গরু পালন, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষূদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প প্রভৃতিসহ নানা প্রকার অর্থনৈতিক কমকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া জীবন মানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা যে অবস্থায় আছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকে সে চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে।

পঞ্চমতঃ শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। প্রত্যেকের ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজে পাঠাবার কোন বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে যে ‘মানুষের মত দেখতে হলেই মানুষ হয় না; শিক্ষা ছাড়া মানুষকে কেউ মানুষ কয় না’।  আঞ্চলিক নেতৃত্ব আমাদের সন্তানদের মুর্খ করে রাখতে চায়। অথচ আমাদের দেয়া চাঁদার টাকায় তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজ অথবা বিদেশে লেখা পড়া করায়। তাদের এই চক্রান্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। শুধু পাশের হার ও জিপিএ ভিত্তিক শিক্ষা নয়; জীবনের বাস্তবতা ঘনিষ্ঠ শিক্ষা অর্জনের প্রতি জোর দিতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখা পড়া কারানোর পাশাপাশি সাবলম্বী হবার শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে তারা নিজ নিজ পরিবারকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করবে এবং মানুষের মত মানুষ হতে সচেষ্ট হবে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আধিবাসীরা স্বাধীনতার মুক্তি সম্পূর্ণভাবে  উপভোগ করতে পারছি না। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙ্গালী এবং জুম্ম লিবারেশন আর্মির  অত্যাচার এবং চাঁদাবাজীতে এখানকার জনগণের জীবন অতিষ্ট। এই অত্যাচার থেকে আমরা সকলেই মুক্তি চাই। বাংলাদেশ সরকারের উপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অবস্থা দৃষ্টে এখানকার সাধারণ মানুষ সত্যিই আশাহত।

(লেখক শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী এবং গবেষক)

অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে

নিজাম উদ্দিন লাভলু:

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে তিনটি আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠন। জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির কারণে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এ অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে সম্প্রতি রাঙামাটির লংগদুতে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে।

১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউপিডিএফ। পরবর্তীতে জেএসএস’র একটি অংশ মূল দল থেকে ছুটে গিয়ে জেএসএস (সংস্কার) নামে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠনগুলো সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে গড়ে তুলছে টাকার পাহাড়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেও তারা এখন সমৃদ্ধ।
বর্তমানে ৫১ ভাগ পাহাড়ি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠী আর ৪৯ ভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন এ তিন জেলায়। শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটছিল। একপর্যায়ে প্রতিবেশীসুলভ ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠে। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলোর লাগামহীন চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার কারণে এখানকার বাঙালি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস ক্রমশঃ বাড়ছে।
বাঙালিদের ধারণা, ঐ সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতায় পাহাড়িদের সবার সমর্থন আছে। অন্যদিকে, সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে বাঙালিদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে শত্রু-ভাবাপন্ন করে তুলছে। এতে দিন দিন সাম্প্রদায়িক দূরত্ব বেড়ে চলেছে।

এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তির পর এলাকার মানুষ আশা করেছিল তাদের বসবাস হবে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, অশান্তির দাবানল বেড়েই চলেছে। অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।

জানা যায়, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বিবেচনায় পাহাড়ি জনসাধারণকে করের আওতা থেকে মুক্তি দিয়েছে সরকার। কর দিতে না হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ। বাঙালি কিংবা উপজাতি- সবাই এসব সন্ত্রাসীকে চাঁদা দিতে বাধ্য। বিভিন্ন ফসল, ফল ফলাদি, গবাদিপশু বেচাকেনায়ও চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়েও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে তারা। প্রাণভয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের কাছে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ করছে না কেউ। অভিযোগ এলেও প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা।

নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ মাঝে-মধ্যে চাঁদাবাজদের আটক করলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। অভিযান কঠোর হলে নতুন উপায়ে চাঁদা আদায় করা হয়। এদিকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা না দিলে হত্যা, অপহরণের পাশাপাশি নানাভাবে ক্ষতি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে উঠা ফলদ ও বনজ বাগানের মালিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় মোটা অংকের চাঁদা। একরপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। তিনটি সংগঠনকেই পৃথক পৃথকভাবে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়।

খাগড়াছড়ির রামগড়ের শুধুমাত্র পাতাছড়া ইউনিয়নেই প্রায় চার হাজার একর ফলদ ও বনজ বাগান আছে। এসব বাগানের মালিকদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ একাই চাঁদা আদায় করে বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা। চাঁদা দেয়ার পরও নানা অজুহাতে হাজার হাজার ফলবান গাছ কেটে দেয়া হয়। বাগানের ফলফলাদি লুটে নেয়া হয়। এক বাগান মালিক বলেন, চাঁদা দিয়েও তারা পাহাড়ি সংগঠন দুটির কাছে জিম্মি।

রাঙামাটির নানিয়ারচর এলাকায়ও চাঁদার জন্য শত শত একর আনারস বাগান কেটে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ কারণে পার্বত্য এলাকার মানুষের মাঝে এখন বিরাজ করছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ‘চাঁদা আতঙ্ক’। পার্বত্য এলাকার সীমানা-লাগোয়া সমতল জেলায়ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো চাঁদাবাজিসহ সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়ির সীমানার পাশের ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র (সংস্কার) তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ঐ এলাকার সাতটি চা বাগানকে জিম্মি করে বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিনই পার্বত্য অঞ্চল থেকে উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপ এক থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। বছরশেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি।

চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস ও ইউপিডিএফের প্রায় পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। আদায় করা চাঁদার টাকা দিয়েই দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কাজ করে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পার্বত্য খাগড়াছড়ির এক ব্যবসায়ী বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজি অহরহ ঘটছে। চাঁদাবাজিতে তারা কেউ পিছিয়ে নেই। কোনো পরিবহন মাল নিয়ে খাগড়াছড়ি ঢোকার সময় অথবা বের হওয়ার সময় চাঁদা দিতে হয়। একেক সময় তারা একেক স্থান থেকে চাঁদা তোলে। চাঁদা না দিলে গাড়ি থামিয়ে স্টাফদের মারধর করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। চাঁদা না দেয়ায় সম্প্রতি বিআরটিসি’র একটি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয় ইউপিডিএফ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি ইউনিটে চাঁদাবাজির মাধ্যমে খুচরা খাত থেকে মাসিক আয় প্রায় ৪ কোটি টাকা। খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের অন্তর্গত প্রায় ৫টি সাবডিভিশন থেকে এ বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এছাড়াও ইউপিডিএফ’র আলাদা বার্ষিক চাঁদা শত কোটি টাকার উপরে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইউপিডিএফ’র সামরিক শাখার প্রধান প্রদীপন খীসার খাগড়াছড়ির বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৮০ লাখ টাকার সাথে প্রাপ্ত প্রায় দুই বস্তা নথিপত্র ঘেঁটে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া নথির তথ্য মতে, খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের আওতায় ইউপিডিএফ’র বেশ কয়েকটি ডিভিশন ও সাব-ডিভিশন রয়েছে।

ডিভিশনগুলো হচ্ছে, সুবর্ণপুর ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম) ও রতœপুর ডিভিশন। খাগড়াছড়ি জেলায় ইউপিডিএফ’র সাব ডিভিশনগুলো হচ্ছে : তৃণভূমি সাব ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম), বকুলতলা সাব ডিভিশন, বটতলা সাব ডিভিশন ও পূর্ণমিশন সাব ডিভিশন। প্রতিটি সাব ডিভিশনে মাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এ সব ডিভিশনের দায়িত্বে আছেন একজন প্রধান, একজন সেক্রেটারি ও একজন কো-অর্ডিনেটর। ঐ এলাকায় উত্তোলিত চাঁদা সাংগঠনিক কাজে খরচের পর মাসশেষে কো-অডিনেটর কেন্দ্রীয় অর্থ বিভাগের প্রধান (সিসি)-এর কাছে প্রেরণ করে থাকেন।

ইউপিডিএফ’র আদায়কৃত অর্থের হিসেব তদারকির জন্য রয়েছে আলাদা শৃঙ্খলা তদারকি বিভাগ সিসি। রয়েছে মিশন হাইয়ার পরিচালক পোস্ট। ইউপিডিএফ আয়-ব্যয়ের হিসাব খুবই নিখুঁতভাবে করে থাকে। চাঁদা আদায়সহ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় কাজ করার জন্য চাঁদা কালেক্টর ও কমান্ডারদের রয়েছে মোটরসাইকেল। এছাড়া একেকজনের কাছে রয়েছে একাধিক মোবাইল সিম। ফোন করে চাঁদা পরিশোধের তাগাদা দেয়া হয়।

জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলিও করা হয়। তারা সকলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করে। গত শুক্রবার রামগড়ের গৈয়াপাড়া এলাকায় আটক ইউপিডিএফের চাঁদা কালেক্টর জীবন চাকমা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, চাঁদাবাজির কাজে এলাকাভিত্তিক তাদের বাঙালি সোর্স রয়েছে। এদের মাধ্যমে তথ্য ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চাঁদা দাবি করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানায়, মাসিক খুচরা চাঁদার পাশাপাশি ইউপিডিএফ’র প্রতিটি সেক্টরে মোটা অংকের বাৎসরিক চাঁদা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাত, ফলদ ও বনজ বাগান, বিভিন্ন তামাক কোম্পানি, মোবাইল কোম্পানি, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কোম্পানি, স’ মিল ও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ বার্ষিক চাঁদা আদায় করে থাকে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দিবস ও উৎসব উপলক্ষে আলাদা চাঁদা আদায় করা হয়ে থাকে। এ টাকা নিয়মিত মাসিক আদায়কৃত ৪ কোটি টাকার বাইরে।

খাগড়াছড়ি সদরের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী বলেন, ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হওয়ার আগে পার্বত্য এলাকায় একমাত্র শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিতে হতো। চাঁদা নিয়ে ওরা ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সহায়তাও করতো। আর এখন চাঁদা দিতে হয় তিন গ্রুপকে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক এক সদস্য জানান, পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র চাষী থেকে শুরু করে সব পেশাজীবীকেই চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু পাহাড়িরা ভয়ে এসব কথা প্রকাশ করে না।

পাহাড়ি বাঙালি জনগোষ্ঠীর নানা পেশাজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প ও নিরাপত্তা পোস্ট প্রত্যাহার করার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিরাপদ ও মুক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে গ্রুপগুলো। এ অবস্থায় তুলে নেয়া নিরাপত্তা ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি তিন জেলায় র‌্যাবের ইউনিট স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠন পরিচালনা, অস্ত্র সংগ্রহ প্রভৃতির জন্য তিনটি সংগঠন ফান্ড গড়ে তোলার জন্য চাঁদা আদায় কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর এ কারণে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য গ্রহণকে কেন্দ্র করে সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব সংঘর্ষে তিন গ্রুপেরই অনেক সদস্য প্রাণ হারিয়েছে।

প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০ এর জানুয়ারি হতে ২০১১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র মধ্যে ৫৪ বার সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে জেএসএস’র ১৯ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। ইউপিডিএফের নিহত হয় ১০ জন ও আহত হয় ৫ জন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সমগ্র রাঙামাটি জেলায়, খাগড়াছড়ি জেলার অল্প কিছু এলাকায় এবং বান্দরবানে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য রয়েছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ-এর আধিপত্য রয়েছে সমগ্র খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙামাটির কোনো কোনো এলাকা ও বান্দরবানের অল্প পরিমাণ এলাকায়। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য থাকলেও রাঙামাটিতে অল্প পরিমাণে প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়।

সামরিক কাঠামোয় সংগঠনগুলোর সশস্ত্র উইং পরিচালিত হয়। কোম্পানি, প্লাটুন, পোস্ট, সাব-পোস্ট ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয় এলাকাকে। চাঁদা আদায়ের জন্য রয়েছে চাঁদা কালেক্টর। ক্যাপ্টেন বা মেজর পদবির সদস্যরা কোম্পানিগুলোর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে প্লাটুন কমান্ডার, পোস্ট বা সাব পোস্ট কমান্ডারও রয়েছে।

সশস্ত্র সদস্যরা বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পোষাক পরিধান করে। ইউপিডিএফ তিন পার্বত্য জেলাকে জাগুয়া, ঈগল ও ড্রাগন নামে তিনটি কোম্পানিতে ভাগ করে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদার টাকার একটি বড় অংশ ব্যয় করা হয় অস্ত্র সংগ্রহে। অত্যাধুনিক সব অস্ত্র সংগ্রহ করে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তারা। জানা যায়, এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ সাব মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুকের মতো অস্ত্র রয়েছে সংগঠনগুলোর হাতে। ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমার হতে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করে তারা।

মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) সহযোগিতায় এখানকার একটি পাহাড়ি সংগঠনের জন্য অস্ত্রের চালান আসার পথে ঐদেশের কারেন প্রদেশে সেগুলো ধরা পড়ে। গত ৯ ডিসেম্বরে আটক হওয়া ঐ চালানে ১৬টি একে-৪৭ রাইফেল ছিল বলে জানা যায়।

একইভাবে ভারতের মিজোরামেও একাধিকবার অস্ত্রের চালান ধরা পড়ে। ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় প্রচার শাখার প্রধান নিরন চাকমার মুঠোফোনের সুইচ কয়েকদিন ধরে অফ থাকায় চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

তবে নামপ্রকাশ না করার শর্তে ঐ সংগঠনের এক নেতা মুঠোফোনে বলেন, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার সাথে ইউপিডিএফকে জড়িয়ে যে ধরণের অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। জুম্মজাতির স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন করছেন তারা। এ কঠিন আন্দোলন সংগ্রাম চালাতে টাকার প্রয়োজন। তাই তারা জনগণের কাছ থেকে কিছু চাঁদা সংগ্রহ করে। সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে ওই নেতা বলেন, সন্তু লারমার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা অস্ত্র বহন করে।

এদিকে, সমঅধিকার আন্দোলন নামে একটি বাঙালি সংগঠনের খাগড়াছড়ির এক নেতা নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, আওয়ামীলীগ যখনই ক্ষমতায় আসে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ওই নেতা আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিশেষ নীতির কারণে এখন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধ্ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর জোরালো কোন অভিযান নেই। তাই সশস্ত্র গ্রুপগুলো এখন অনেকটা অবাধ ও নির্বিঘ্নে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে।

জেএসএস সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজীতে অতিষ্ঠ বান্দরবানবাসী (ভিডিওসহ)

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পার্বত্য চট্টগ্রাম।‌ পর্যটন ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্রময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য দেশ ও দেশের বাহিরে এ অঞ্চলের পরিচিতি রয়েছে। অথচ একটি স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের হীন উদ্দেশ্য সাধনকল্পে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লগ্ন থেকে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অশান্ত করে তুলেছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর করা হয় শান্তিচুক্তি। কিন্তু স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। অস্ত্র ও ভয়ভীতির মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

তাদের অস্ত্রের হুমকির মুখে সাধারণ উপজাতি সম্প্রদায় ও পাহাড়ি-বাঙালি উভয়ই ভীত-সন্ত্রস্ত। এ স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিসিজেএসএস) ও ইউনাইটড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ) নামে আঞ্চলিক দল গঠনের অন্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে) ত্রাসের রাজ্য কায়েম করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শান্তিবাহিনী এই দলগুলোর সামরিক শাখা রয়েছে।

শান্তিচুক্তির পর শান্তিবাহিনী বিলুপ্ত হয়েছে বলে প্রচার রয়েছে। এখন স্থানীয় জনগনের কাছে তারা ‘ভেতর পার্টি’ বলে পরিচিত। গভীর জঙ্গলের ভেতরে তাদের সশস্ত্র অবস্থান ও কার্যকলাপ পরিচালিত হয় বলে তারা ‘ভেতর পার্টি’ নামে নিজেদের পরিচয় দিয়ে থাকে।  যার ফলশ্রুতিতে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপকে চাঁদা দিতে হয়।

মুরগি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে গরু ব্যবসায়ী ও কাঠ ব্যবসায়ীকেও। এমনকি পাহাড়ের সাধারণ উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়কেও তাদের কষ্টার্জিত অর্থ পাহাড়ের এ সন্ত্রাসীদের দিতে হয়। সরকারি, বেসরকারি ও এনজিওর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প হতে চাঁদা দিতে হয় জেএসএস এর সশস্ত্র গ্রুপের চাঁদাবাজদের। সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাদের উপর হত্যা, অপহরণ, মারপিঠ ও ধর্ষণসহ নানা অত্যাচার করা হয়।

JSS Report3

সম্প্রীতির বান্দরবান হিসেবে পরিচিত পার্বত্য জেলাটিকেও অশান্ত করে তুলতে জেএসএস নামক দলটির সশস্ত্র গ্রুপ। বান্দরবানে সাতটি উপজেলায় তাদের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে। ফলে, পাহাড়ের সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীমহলের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত একটির পর একটি অভিযোগ আসতে থাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট। সম্প্রীতির বান্দরবানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজকে।

গত ৪ ডিসেম্বর ২০১৬ থানচিতে জেএসএস এর নামে সন্তু লারমার কথা বলে চাঁদাবাজি করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে তিন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। তারা হল-ম্যান ক্রোই ম্রো, রেং হাই ম্রো ও মাংয়া ম্রো। তার মধ্যে ২জন কারাগারে রয়েছে। আটককৃত সন্ত্রাসীরা জিজ্ঞাসাবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে চাঁদাবাজি সম্পর্কে বিস্ময়কর তথ্য দেয় বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।

তারা জানায়, অনেকের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আদায় করে তারা জয়সেন, উত্তম চাকমা ও সাইক্লোন চাকমাকে (তারা রাঙামাটি থেকে চাঁদাবাজির জন্য নিয়োগকৃত) দেয়। থানচি বাজারে বিভিন্ন অংকে চাঁদাবাজি করে, যেমন: পাবলিক পরিবহন হতে ১০,০০০(দশ হাজার টাকা, কলা ও কাঠবাহী গাড়ি থেকে ৫,০০০(পাঁচ হাজার টাকা), মটরসাইকেল হতে ২,৫০০(দুই হাজার পাঁচশত টাকা)হারে মাসিক চাঁদা আদায়ের জন্য লিফলেট বিতরণ করে ও চাঁদাবাজি করে। স্থানীয় জেএসএস নেতা, থানচি উপজেলার পরিষদের শীর্ষ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় এ চাঁদাবাজি হয়ে থাকে বলে জানান তারা।

এদিকে গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৬ রোয়াংছড়ি উপজেলা থেকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী আটক করে আরেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও চাঁদবাজ পরান/আপন তঞ্চঙ্গাকে। উক্ত সন্ত্রাসী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও বিস্ময়কর তথ্য দেয়। সে জানায়, সমস্ত বান্দরবানে তাদের সশস্ত্র গ্রুপ চাঁদাবাজি ও অপহরণ করে থাকে। রোয়াংছড়িতে একটি চাঁদাবাজির শক্তিশালী নেটওর্য়াক রয়েছে।

পরান তঞ্চঙ্গা, রুপন তঞ্চঙ্গা, প্রীতিসেন তঞ্চঙ্গা, অনীল তঞ্চঙ্গা, অপু তঞ্চঙ্গা, অনুপম তঞ্চঙ্গার নেতৃত্বে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ রোয়াংছড়ি উপজেলা থেকে বান্দরবান জেলার চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীদলের শীর্ষ নেতা এস মং (ছদ্মনাম ও রাঙ্গামাটি হতে আগত) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্ববধানে সকল ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ও বাঙালীর নিকট হতে চাঁদা আদায় করে থাকে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে খুন ও অপহরণের মতো ঘটনায় স্বীকার হতে হয় পাহাড়ি সাধারণ জনগোষ্ঠীকে। পরান তঞ্চঙ্গার তথ্য মতে, উক্ত চাঁদাবাজির টাকা পিসিজেএস এর কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতার পিএসের নিকট প্রেরণ করা হয়। যে টাকা থেকে পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, পার্টিকে শক্তিশালী করা, অস্ত্র ক্রয় এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লবিং, মিডিয়া লবিং এর কাজে ব্যবহার করা হয়।

গত ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬ আলীকদম উপজেলার দশ কিলো এলাকা হতে চাঁদাবাজির অপরাধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আটক করে কেতং ত্রিপুরা, ক্যমং ত্রিপুরা ও ছবিরাম ত্রিপুরাকে। আটককৃত সন্ত্রাসীদের একইদিনে প্রেরণ করা হয় জেল হাজতে। কেতং ও ক্যমং ত্রিপুরার নিকট অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রয়েছে বলে সূত্রে জানা যায়।

গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সুয়ারাং পাড়ায় চাঁদা আদায়কালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটক করা হয় আরও ৩ জন চাঁদাবাজ। তারা হলো, মংত্রচি মার্মা ওরফে রেচিং মার্মা, ম্যানথক ম্রো ও ম্যানপং ম্রোকে।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা থানচি-আলীকদম সড়কের ১০কিলো, ১৫কিলো, ১৬কিলো ও ২৬কিলো এলাকায় চাঁদাবাজি করে। আটক হওয়ার সময় ম্যানপং ম্রো এর নিকট রাইফেলের গুলি পাওয়া যায়।

গত ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬ ম্যাংপাই ম্রো বোথা ম্রো নামক ব্যক্তির কাছ থেকে রাইফেলের গুলি থানচি উপজেলা জেএসএস এর সভাপতি চষা থোয়াই মার্মার(পক্ সে) ভাই এর নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য তার ব্যাগে নিয়ে যায়। ম্যানপং ম্রো বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।

এদিকে গত তিন ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ৪ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি কর্তৃক রোয়াংছড়ি উপজেলার নোয়াপতং ইউনিয়নের বাগমারা ভিতরপাড়ার কারবারী মং শৈ থুই মার্মা অপহরণ করা হয়। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বর্ণিত ব্যক্তিকে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি করেও মেলেনি তার সন্ধান। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার নোয়পতং ইউনিয়নের বাঘমারা ভিতর পাড়ায় অস্ত্রধারী ৪ সন্ত্রাসী অস্ত্রের মুখে বাঘমারা ভিতরপাড়া কার্বারী (পাড়া প্রধান) মংশৈথুই মারমাকে (৪২) অপহরণ করে নিয়ে গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আশপাশের এলাকাগুলোতে অভিযান চালানো করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী বাথোয়াই মার্মা বলেন, রাত নয়টার দিকে অস্ত্রধারী সন্ত্রসীরা কারবারীকে ডেকে আনতে আমাকে পাঠায়। তারা এসময় নিজেদেরকে শান্তি বাহিনীর (জেএসএস) লোক পরিচয় দেয়।

অপহৃত কারবারী মংশৈথুই’র ছোট বোন মা চ থুই বলেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রসীরা আমার ভাইকে হাত ও চোখ বেঁধে পাহাড়ি পথ ধরে জঙ্গলের দিকে মারতে মারতে নিয়ে যায়। কিন্তু আমরা কোন প্রতিবাদ করতে পারিনি। এসময় তারা নিরাপত্তা বাহিনীকে ঘটনা সম্পর্কে না জানাতেও নির্দেশ দেয়। তবে ঘটনার পর আমরা পার্শ্ববর্তী সেনাক্যাম্পে বিষয়টি অবহিত করি।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হ্লাথোয়হ্রী মারমা জানান, ইউপি নির্বাচনের পর থেকে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলে আসছে আওয়ামী লীগের। এ ঘটনার জের ধরে জনসংহতি সমিতির লোকজন পাড়া কারবারিকে অপহরণ করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পরবর্তিতে গত ৫ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে বেথছড়া এলাকায় ওই কারবারীকে অসুস্থ্য অবস্থায় পাওয়া যায়। এতে সন্দেহজনকভাবে অনেকে আটক করা হলেও এখনো প্রকৃত অপহরণকারীদের খুঁজে বের করতে বিভিন্নভাবে তল্লাশি চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ তারিখ আলীকদম উপজেলার রূপসি পাড়া ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ এলাকায় জেএসএস এর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গমন করলে চাঁদাবাজরা বর্ণিত দলকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়ে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও পাল্টা গুলি করে। এতে জেএসএস এর একজন সশস্ত্র চাঁদাবাজ পূর্ণরতন চাকমা নিহত হয়। জেএসএস এর নিহত সন্ত্রাসীর পরনে ছিল জেএসএস দলের জলপাই কালার পোশাক।

ািু্বক-280x300

সূত্র জানিয়েছে, লামা থানার অন্তর্গত রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্প থেকে আনুমানিক ৮ কি.মি. দুরে অবস্থিত নাইক্ষ্যংমুখ পাড়ায় সপ্তাহ খানেক আগে জেএসএস(মূল) দলের সাধন চাকমা ওরফে ওমাং গ্রুপের সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবী করে। সোমবার তাদের চাঁদা নেয়ার নির্ধারিত দিন ছিল।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল সোমবার ঘটনাস্থলের আশেপাশে গোপনে অবস্থান নেয়। এদিকে বিকাল চারটার দিকে জেএসএস সন্ত্রাসীদের ১৫ জনের একটি দল এসএমজি, এলএমজির মতো ভয়ঙ্কর আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে চাঁদা আদায় করতে নাইক্ষ্যংমুখ পাড়ায় আগমন করে। এসময় তারা কাছের সেনাবাহিনী অবস্থান টের পেয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

সেনাবাহিনীও পাল্টা জবাবে গুলিবর্ষণ শুরু করলে সন্ত্রাসীরা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে যায়। এসময় ১৫ মিনিটব্যাপী বন্দুকযুদ্ধে উভয় পক্ষ আনুমানিক ৩০০ রাউন্ড গুলি বিনিময় করে। সেনাবাহিনীর গুলিতে পুর্ণ রতন চাকমা(২৮) নামের এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনা স্থলেই নিহত হয়। সে রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার হিরারচর গ্রামের রঙ্গু চাকমার পুত্র।

এদিকে গত ১৮ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সামরিক শাখার থার্ড ইন কমান্ড ও বান্দরবান জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত  ধনবিকাশ চাকমা (৬০) ওরফে উ মংকে তার ‍দুই সহযোগীসহ আটক করেছে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। রোববার (১৯ মার্চ) ভোরে তাদের চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে আটক করা হয়েছে।

17361743_1279388035508316_5742224790216268162_n

সূত্রে জানা গেছে, র‌্যাব-৭ এর ডিএডি মো. শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি টিম রবিবার বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকায় ডিউটিরত থাকাকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে, বান্দরবান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখার একটি দল খুন, গুম, অপহরণ ও চাঁদাবাজির বিপুল পরিমাণ টাকাসহ মাইক্রোবাসে করে চট্টগ্রামের দিকে আসছে।

এ খবরের ভিত্তিতে ডিএডি মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হাটহাজারী থানাধীন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন নিউ শাহজাহান হোটেলের সামনে চেকপোস্ট বসিয়ে গাড়ি তল্লাশী শুরু করে।এই তল্লাশীকালে বিকাল সাড়ে চারটার দিকে চট্টগ্রামের দিক থেকে একটি কালো রঙের মাইক্রোবাস আসতে থাকলে তারা থামানোর সঙ্কেত দেয়। এতে মাইক্রোবাসটি চেকপোস্টের সামনে থামে এবং গাড়ির দরজা খুলে তিন/চারজন যাত্রীবেশী জেএসএস সন্ত্রাসীরা বেরিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে।

এসময় র‌্যাব সদস্যরা তাদের চেজ করে আটক করতে সক্ষম হয়। আটককৃতরা হলো, ধনবিকাশ চাকমা, পিতা- মৃত বীরেন্দ্র চাকমা, মাতা- মায়াবী চাকমা, বাড়ি- পানখাইয়া পাড়া, খাগড়াছড়ি; প্রেম রঞ্জন চাকমা(৩২), পিতা- সুন্দর মণি চাকমা, বাড়ি- পূনর্বাসন পাড়া, বান্দরবান সদর এবং রুবেল বাবু তঞ্চঙ্গা, পিতা- রাজ্য মোগহন তঞ্চঙ্গা, বাড়ি- বিলাইছড়ি রাঙামাটি।’

সূত্রমতে, আটককালে ধনবিকাশ চাকমার হাতে রক্ষিত কালো রঙের একটি ব্যাগ ও সকলের পোশাকের বিভিন্ন পকেট তল্লাশী করে ১ হাজার টাকা, ৫০০ টাকা ও ১০০ টাকার বেশ কয়েকটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। এসব বান্ডিলে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা পাওয়া যায়।

গ্রেফতারকৃতরা র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে নিজেদের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখার সদস্য বলে স্বীকার করে এবং আটককৃত টাকা বান্দরবান থেকে জনসংহতি সমিতির নামে খুন, অপহরণ, গুমের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির মাধ্যমে আয় করা বলে র‌্যাবের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে।

 গত বান্দরবান সদর উপজেলায় সুয়ালক ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ তিন সন্ত্রাসীকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন, রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের রিটু চাকমা (৩৪), বান্দরবান বলিপাড়ার অমল চাকমা ও টংকাবতীর শান্তি চাকমা। এসময় তাদের কাছ থেকে ৮ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশী পিস্তল ও ৫ রাউন্ড গুলিসহ একটি দুই নলা বন্ধুক উদ্ধার করা হয়।

বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় জানান, সুয়ালক ইউনিয়নের ভাগ্যকুল এলাকার সামশুর রহমানের মাছের প্রজেক্টের পাশের ঝিরিতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে স্থানীয়দের সহায়তায় মঙ্গলবার রাতে অস্ত্রসহ চাঁদাবাজ তিন সন্ত্রাসীকে আটক করে। অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারে এলোপাতারী গুলি করে। এসময় পুলিশের গুলিতে রিটু চাকমা আহত হন।

তিনি জানান, এ তিন সন্ত্রাসী দীর্ঘ দিন ধরে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি কাজে লিপ্ত রয়েছে। ১ মার্চ থেকে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়ে আসছে।

টংকাবতী একাধিক স্থানীয়রা জানান, জেএসএস’র কালেক্টর রিটু চাকমার নেতৃত্বে দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও চাঁদাবাজি চলে আসছে। কেউ তার বিরুদ্ধাচরণ করলে মারধরের স্বীকার হন। পুলিশ সূত্র জানা গেছে, অভিযানে সদর থানার পরির্দশক মো. রফিক উল্লাহসহ ৫ পুলিশ সদস্য আহত হন।

নীলগিরি, নীলাচল, শৈল প্রপাত, মেঘলা, বগা লেক, চিম্বুক ভ্যালি, তাজিং ডং, কেওকারাডং, বড় পাথর প্রভৃতি পর্যটন কেন্দ্র সম্বলিত বাংলাদেশের অত্যন্ত সৌন্দর্য মণ্ডিত জেলা বান্দরবান উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএসের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী, খুন, ধর্ষণ, অপহরণে বিপন্ন।

তবে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই সন্ত্রাস নির্মূলে তৎপর রয়েছে। তাদের তৎপরতায় সম্প্রতি বেশ কিছু জেএসএস সন্ত্রাসী আটক হওয়ায় অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এই অভিযান চলমান থাকলে বান্দরবানে জেএসএস সন্ত্রাসীদের আস্তানা নির্মূল অনেকাংশেই সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জেলাবাসী।

তাদের মতে, পার্বত্য বান্দরবান জেলায় জেএসএসের সশস্ত্র গ্রুপ ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে সকলস্তরের পাহাড়ি উপজাতি ও বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা সম্প্রীতি রক্ষা ও পর্যটন বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। কাজেই এখনই সময় জেএসএস এর সন্ত্রাসীদের অপকর্ম ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার।

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিকে ঘিরে কাউখালীতে জেএসএস’র কোটি টাকার চাঁদাবাজী

%e0%a6%a4%e0%a6%95%e0%a6%b9%e0%a6%ac

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পূর্তিকে ঘিরে কাউখালীতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও অংগসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক কোটি টাকা টার্গেট নির্ধারণ করে গত এক মাস যাবৎ ম্যারাথন কর্মসূচীর মাধ্যমে এ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তি। প্রতি বছর এ দিনে রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক শো’ডাউন করে থাকে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি। এ বছরও দিবসটি পালনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তাদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ।

এ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে শুধু কাউখালীতেই টার্গেট করা হয়েছে এক কোটি টাকা। এ টার্গেট পূরণ করতে চাঁদা আদায়ের ম্যারাথন কর্মসূচী হাতে নেয় তারা। এ লক্ষ্যে গত এক মাস যাবৎ কাউখালী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলো চষে বেড়াচ্ছেন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

কোটি টাকা আদায়ে সংগঠনটি যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো টার্গেট করেছে এর মধ্যে রয়েছে গাছ, বাঁশ, সরকারী চাকুরীজীবী, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্রিকফিল্ড। ইতোমধ্যেই উপজেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছ থেকে মাথাপিছু এক হাজার টাকা নির্ধারণ করে তা যথাসময়ে পাঠিয়ে দিতে মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

যথা সময়ে নির্ধারিত টাকা পাঠিয়ে দেয়া না হলে সেসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দূর্গম অঞ্চলে কর্মরত স্কুল শিক্ষকরা। জীবনের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বেশীরভাগ শিক্ষকই টাকা পৌঁছে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব শিক্ষকদের মতে পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা ঠিক হবেনা। আবার আতঙ্কিত অনেক শিক্ষক কাউখালী সেনা ক্যাম্পে মৌখিক অভিযোগও করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলমপতি, ঘাগড়া, বেতবুনিয়া ও ফটিকছড়ি ইউনিয়নের অসংখ্য শিক্ষক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি স্থানীয় সেনা ক্যাম্পকে অবগত করায় দাদারা ক্ষিপ্ত হয়েছেন।

উপজেলার সরকারী অফিসগুলো ঘুরে জানা গেছে, বেশীরভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে পদ ও পদবী হারে টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এসব সরকারী চাকুরীজিবীরা চাঁদা দেয়ার কথা স্বীকার করলেও নির্ধারিত চাঁদার পরিমাণ কত তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

কোটি টাকার লক্ষ পূরণের প্রধান টার্গেট হচ্ছে গাছ ও বাঁশ ব্যবসা। মৌসুমটি গাছ ও বাঁশ ব্যবসার হওয়ায় এসব ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা হবে অন্তত অর্ধ কোটি টাকা। এমন তথ্য পাওয়া গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

এছাড়াও তালিকায় রয়েছেন ঠিকাদার, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সড়কে চলাচলরত গাড়ীগুলো। তবে যেসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও সড়কে চলাচলরত গাড়ীগুলো জেএসএস থেকে বছর ব্যাপী টোকেন সংগ্রহ করেছেন তাদের কাছ থেকে চাঁদার পরিমাণ কম রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বক্তব্য বা নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় জেএসএস’র কেন্দ্রীয় তথ্য ও সহ প্রচার সম্পাদ সজীব চাকমার সাথে। তিনি জানান, সারাদেশে যেভাবে চলছে আমাদের নেতা কর্মীরাও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সেভাবে সহযোগিতা নিচ্ছে। এটাকে কোন ক্রমেই চাঁদাবাজি বলা যাবেনা।

তিনি আরো জানান, সবার সাথে আলোচনা স্বাপেক্ষে কর্মসূচী পালনের জন্য টাকা আদায় করা হচ্ছে। কাউকে জোর করে টাকা নেয়া হচ্ছেনা।

এ বিষয়ে জেএসএস কাউখালী উপজেলা সভাপতি সুবাষ চাকমার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জেএসএস’র লাগামহীন চাঁদাবাজীর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি মোঃ আব্দুল্লাহ তুহিন। তিনি জানান, জেএসএস’র চাঁদাবাজীর পরিধি আগের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোটি টাকা চাঁদার লক্ষ্য পূরণ করতে তারা এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও টার্গেট করে অসহায় শিক্ষকদের হয়রানি করছে। তিনি জেএসএস’র চাঁদাবাজী বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

কাউখালী থানার ওসি আব্দুল করিম জানান, বিষয়টি আমি অনেকের মুখে শুনেছি। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ না করলে সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু থাকে না।

সন্তু লারমার সফরের প্রতিবাদে বান্দরবানে বাঙালী সংগঠনগুলোর কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি

সন্তু লারমা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পার্বত্য জন সংহতি সমিতির সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান  সন্তু লারমার আগমনের প্রতিবাদে রবিবার বান্দরবানে বাঙ্গালী সংগঠনগুলো কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।


সফরসূচিতে কোন রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও শুধুমাত্র বোমাং সার্কেল চিফ উচ প্রু চৌধুরীর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য বান্দরবানে তিন দিনের সফরে আসছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা।

সূত্র জানায়, রবিবার বান্দরবান-চন্দ্রঘোনা সড়ক পথ হয়ে বিকালে সন্তুু লারমার বান্দরবান এসে উন্নয়ন বোর্ড রেষ্ট হাউজে রাত্রি যাপন করার কথা রয়েছে। এসময় তার সফরসঙ্গী হিসাবে জেএসএস নেতাদের থাকার অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার সকাল ১০ টায় বোমাং সার্কেল চিফ উচ প্রু চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে সন্তুু লারমার। ঐ বৈঠকে জেএসএস’র সতস্ত্র বাহিনীর সাথেও বৈঠক করবেন বলে গোপন সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় সড়কপথে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে বান্দরবান ত্যাগ করার কথা রয়েছে তার। এসময় বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে মতবিনিময় করার কথা রয়েছে।

এদিকে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী আলকাছ আল মামুন ভুঁইয়া জানান, ‘পার্বত্য নাগরিক পরিষদ ও বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের গড ফাদার সন্তু লারমার সফরকে কেন্দ্র করে আমরা কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচির ঘোষণা করেছি।’

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থানীয় সূত্রগুলো, সন্তু লারমার বান্দরবান আগমনের হেতু অনুসন্ধান করছে। শুধু বোমাং সার্কেল চিফের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্য তিনি বান্দরবানে তিনদিনের সফরে আসছেন- একথা স্থানীয় সচেতন নাগরিকরাও মানতে নারাজ।

সচেতন নাগরিকরা জানান, আওয়ামীলীগ নেতা মংপুকে অপহরণের পর থেকে সরকারী দল পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আর্কষণ করলে বান্দরবানে বেকাদায় রয়েছে সন্তুু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। জেএসএস’র শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যা মামলা হওয়ায় গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছে সবাই।

এরপর থেকে বান্দরবানে জেএসএস’র কোন কর্মসূচি কয়েক মাস যাবৎ নেই বললে চলে। এরই মধ্যে জেএসএসের অফিসগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী অপারেশন চালিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য নথিপত্র পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে। পরীক্ষার পর নিরাপত্তা বাহিনী এগুলো ফেরত দিতে চাইলেও ফেরত নেয়ার জন্য জেএসএসের কোনো নেতাকর্মীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, জেএসএস’র নেতা কর্মীদের চাঙ্গা ও তাদের শহরে প্রতিস্থাপন করতেই সন্তুু লারমা বান্দরবানে সফরে আসছেন। সফরকালীন সময়ে তার বান্দরবানে জেএসএস নেতাদের সাথে বৈঠক করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য বান্দরবান জেএসএসের একাধিক নেতার টেলিফোনে কল করা হলেও কারো সংযোগ পাওয়া যায়নি।

বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমা গ্রেফতার

%e0%a6%ac%e0%a7%9c-%e0%a6%8b%e0%a6%b7%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%be

নিজস্ব প্রতিবেদক:

একাধিক হত্যা মামলার আসামী রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বড় ঋষি চাকমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর চার নেতাকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার রাঙামাটি জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট রোকন উদ্দিন কবির এর আদালতে বাঘাইছড়ি থানায় দায়ের করা অবসর প্রাপ্ত সার্জেন্ট মুকুল চাকমা হত্যা মামলায় আত্মসমর্পন করে জামিন চাইলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে আসামীদের জেল হাজতে প্রেরণ করে।

বাকি আসামীরা হলেন উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি প্রভাত কুমার চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক ত্রিদিপ কুমার চাকমা (প্রকাশ দীপ) এবং সার্বাতলী ইউপি মেম্বার অজয় চাকমা।

উল্লেখ্য গত ৩০ মে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মুকুল চাকমা অপহৃত হয়। তার বাড়ি রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির মারিস্যায়। সাবেক সেনা সার্জেন্ট হওয়ার কারণে স্থানীয় জেএসএস’র তার প্রতি অভিযোগ ছিলো, ‘তিনি সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করেন। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন’।

গত ২৩ জুন সরেজমিন পরিদর্শনে মুকুল কান্তির মেয়ে নমিসা চাকমার সাথে কথা বলেছিলেন পার্বত্যনিউজের প্রতিনিধিসহ ঢাকা থেকে যাওয়া একটি সাংবাদিক টিম। নমিসা চাকমা মিডিয়া টিমকে বলেন, ‘জেএসএস’র লোকজন বাবাকে সন্দেহ করতো। তারা ভাবতো তাদের অপকর্মের সব তথ্য বাবা সেনাবাহিনীকে দিয়ে দেয়।’ আর একারণেই গত ৬ মে বাড়ির কাছেই বসেই মুকুল কান্তিকে মারধর করে স্থানীয় জেএসএস নেতা বিস্তার চাকমা। এই ঘটনার পর মুকুলবাড়ি ছেড়ে খাগড়াছড়ি গিয়ে থাকতেন।

risi-chakma-rangamati-bagha-copy

মুকুল কান্তির স্ত্রী সাধনা চাকমা মিডিয়া টিমকে বলেন, গত ৩০ মে বিকেলে মোবাইলে ফোন করে তার স্বামীকে ডেকে নেয় প্রভাত কুমার চাকমা ওরফে কাকলি বাবু। সে জেএসএস উপজেলা কমিটির সভাপতি বলে জানান সাধনা। তিনি বলেন, ৬ মেযে মারধর করা হয়েছিলো তার একটি মিট মিমাংসার কথা বলে তার স্বামীকে ডাকা হয়। তাকে ডেকে উগছড়ির লাইল্যেঘোনার বক্কা চাকমার দোকানে নেয়া হয়। সেখান থেকে মুকুল একবার তার স্ত্রীকে ফোন করে বলেন, সেখানে প্রভাত চাকমা, আবিস্কার চাকমা, ত্রিদিব চাকমা এবং বিস্তার চাকমা আছে। তাদের সাথে তিনি কথা বলছেন।

৩০ মে রাত সাড়ে ৮ টার দিকে এই কথা হয়। ফিরতে দেরী হওয়ায় সাধনা রাত ৯ টার দিকে আবারো তার স্বামীকে ফোন দেন। কিন্তু এবার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাতে আরো কয়েকবার ফোন দিয়েছেন, কিন্তু মোবাইল বন্ধ। সেই থেকেই নিখোঁজ মুকুল। তিন/চারদিন পরে একবার ফোনটি খোলা পাওয়া গিয়েছিলো, কেউ ফোন ধরেনি। তারপর থেকে আর কোন সংযোগ মেলেনি। এদিকে, ঘটনার পর বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়। থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করতে থাকে।

নমিসা চাকমা বলেন, ওসি সরাসরি বলে দেন, ‘ওরা হলো সম্রাট। ওদের সাথে পারবা না। ওদের সাথে ঝামেলা করো না। মামলা করো না। মামলা করার যখন সময় হবে তখন বলবো।’ থানায় গেলে এই বলে প্রতিবারই বিদায় করে দেয়া হয় সাধনা চাকমা এবং তার মেয়েকে। শেষ পর্যন্ত এই পরিবার ২০ জুন একটি সাধারণ ডায়েরী করতে সক্ষম হন। এরপরও তারা অসংখ্যা বার মামলা করতে গেলে পুলিশ তাদেরকে নানা কথা বলে বিদায় করে দেয়। সাধারণ ডায়েরী করার পরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হুমকী দেয়া হয়।৪/৫ জন মুখোশধারী লোক তাদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসে। এরপর পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নেন।

নাসিরাবাদ মহিলা কলেজের অনার্সের ছাত্রী নমিসা চাকমা গত ২৩ জুন মিডিয়া টিমকে আরো বলেন, তার মা এবং তারা দুই বোন এখন আর বাড়িতে যেতে পারছেন না। তাদের কোনই নিরাপত্তা নেই। এদিকে, গত ৩ জুুলাই বিকেলেও সার্জেন্ট মুকুলের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় এই ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয় নি। তবে ১ মাস পর পুলিশ নমিসা চাকমার দায়ের করা পুরাতন মামলা এজহার হিসাবে গ্রহণ করে পূর্বের তারিখে।

মুকুল কান্তি চাকমার মেয়ে নমিসা চাকমা বাদি হয়ে দায়ের করা এই মামলার তারিখ ৪/৭/২০১৬। মামলার নং- জি আর ২৩৭/১৬। মামলায় বড়ঋষি চাকমাসহ ৮ জনকে আসামী করা হয় যার ১ নম্বর আসামী ছিলেন বড় ঋষি চাকমা। উচ্চ আদালত থেকে অন্তবর্তী জামিনে ছিলেন তিনি। জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার রাঙামাটির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ্দীন কবিরের আদালতে আত্মসমর্পন করেন বড় ঋষি চাকমাসহ ৪ জন।  আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর না করে ৪ জনকেই জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বড়ঋষি চাকমার নামে আরো একটি হত্যা রয়েছে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থানায়। এই মামলাটি একটি হত্যা মামলা। যার নাম্বর হলো-৫, তারিখ ২০/০৯/২০১২ । ধারা-৩০২/৩৪ জিআর ২৮৩/২০১২।

দীঘিনালা উপজেলার ইউপিডিএফ এর তৎকালীন সমন্বয়ক কিশোর চাকমা বাদী হয়ে মোট ১১জনকে আসামী করে এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

Yunus

বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত অজস্র হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোন হত্যাকান্ডের নৃসংশতা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোকেও হারমানায়। পাকুয়াখালী ট্রাজেডি এই নৃসংশ গণহত্যাগুলোরই একটি। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ঘটিয়েছিল পার্বত্য ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় পালিয়ে আসতে পেরেছিল মুহাম্মদ ইউনুছ মিয়া নামের এক ভাগ্যবান। সেদিনের সেই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা ইউনুছ মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সৈয়দ ইবনে রহমত।

প্রঃ কি করছিলেন?
উঃ গায়ে জ্বর, শুইয়া আছিলাম।

প্রঃ কতদিন যাবৎ জ্বর? ওষুধপত্র খাচ্ছেন না?
উঃ দুইদিন ধইরা জ্বর। ভাই, ওষুধপাতি খাইয়া কি অইব। জ্বরের লাগি ওষুধ খাইলেই কি আর না খাইলেই কি। এই বাড়ে-এই কমে, ওষুধ খাওন লাগব না, দুই দিন পরে এমনেই সাইরা যাইব।

প্রঃ আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো পাকুয়াখালী হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানা।
উঃ এইসব কইয়া লাভ কি? কতই তো কইলাম। আর্মি, পুলিশ, সিআইডির অফিসার, সাংবাদিক, আরো কতজনের লগে কইছি। কই, কিছুইতো অইল না। এইসব কইয়া আর মনের জ্বালাটা বাড়াইয়া লাভ কি?

প্রঃ আপনারা তো জানতেন যে, পাহাড়ে শান্তিবাহিনী আছে, তারা বাঙালির দেখা মাত্রই গুলি করে। তারপরও পাহাড়ে যাওয়ার সাহস পেলেন কিভাবে?
উঃ ভাই, শখ কইরা কেউ কী আর মরণের সামনে যায়? পেটের দায়ে যাওন লাগে। পাহাড়ে যাওন ছাড়া আর তো বাঁচনের পথ নাই। সামান্য জমি-জমা যা আছে এইডাও তো কোন বছর চাষ কইরা ঘরে তোলা যায় না। কাপ্তাই বান্ধের পানি আইসা ডুবাইয়া দেয়। তাই বাধ্য অইয়াই পাহাড়ে যাওন লাগে। আর পাকুয়াখালীর ঘটনার সময়তো কোন ভয় আছিল না। তখন শান্তিবাহিনীর লগে আমাদের চুক্তি আছিল। আমরা তাদেরকে ১ ফুট (এক ঘনফুট) গাছের বিনিময়ে ৪০/৫০ টাকা কইরা চান্দা দিতাম।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে কখন থেকে টাকার বিনিময়ে গাছ কাটার চুক্তি হয়েছিল?
উঃ পাকুয়াখালীর ঘটনার ৫/৬ বছর আগে একদিন বড় মাহিল্যার তক্তা নজরুল (লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের কারণে তাকে লোকজন তক্তা নজরুল নামে চিনত) আমাদের কইল, পাহাড়ে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহিনীরা আর বাঙালিরে গুলি করব না। কিন্তু তাদেরকে চান্দা দিতে অইব। তারপর থাইক্যা শুরু অইল গাছ কাটা। আগের থাইক্যাই চাকমাদের লগে নজরুল ভাইয়ের বালা সম্পর্ক আছিল। চাকমাদের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে হে যাইত, আবার চাকমারাও হের বাড়ীতে আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তারাই তক্তা নজরুলরে দিয়া চান্দার মাধ্যমে গাছ কাটার খবর দিছিল।

প্রঃ চাঁদা দিয়া যখন গাছ কাটতেন, তখন আপনাদের সাথে শান্তিবাহিনী কেমন আচরণ করত?
উঃ এমনিতে তারা কোন খারাপ আচরণ করত না। তবে তাদের আইন কানুন আছিল খুব কড়া। যেই দিন যা কইতো, তাই করতে অইতো। কেউ কথা না হুনলে মাইর-ধোর করতো, পাহাড়ে যাওন বন্ধ কইরা দিত।

প্রঃ আপনারা যেখানে গাছ কাটতে যেতেন, সেখানকার চাকমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ আমরা যেখানে গাছ কাটতে যাইতাম সেখানে অনেক চাকমা বসবাস করত। এদের কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তবে বেশির ভাগই ছিল আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তারাও আমাদের সাথে গাছ কাটত। স্থানীয় এইসব চাকমাদের লগে আমাদের বালা সম্পর্ক আছিল। তারা আমাদের ঈদ-পরবের সময় বেড়াইতে আইত। আমরাও বিজুর (চাকমাদের বাৎসরিক উৎসব) সময় তাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতাম। অনেক সময় পাহাড়ে কোন গন্ডগোলের ভাব থাকলে তারা আমাদেরকে আগেই জানাইয়া দিত।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে স্থানীয় চাকমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ শান্তিবাহিনীরা স্থানীয় চাকমাদের উপরেও অত্যাচার করতো, ওদের কাছ থাইকয়াও চান্দা নিত। সামান্য ভুল-ত্রুটি অইলে বা তাদের কথামতো না চললে মাইর-ধোর করতো। কতজনরে তো গুলি কইরা মাইরাও ফালাইছে। শান্তিবাহিনীর খাওন-খোরাক অনেক সময় বাজার থাইক্যা কিইন্যা পাহাড়ে গিয়া দিয় আইতে অইতো। তাই স্থানীয় চাকমারা কৌশলে শান্তিবাহিনীর কালেক্টরদেরকে বিপদে ফালাইয়া তাড়ানোর চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মদ-টদ খাওয়াইয়া মাইয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ফালাইতো, আবার কোন কোন সময় টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল লাগাইয়া শান্তিবাহিনীর বড় অফিসারের কাছে নালিশ করতো। এমনও সময় গেছে যখন এক মাসের মধ্যে তিন-চারজন কালেক্টর বদল হইছে।

প্রঃ দুই মাসের চাঁদা বাকি পড়ায় শান্তিবাহিনী ব্যবসায়ীদেরকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না যাওয়ায় তারা ক্ষেপে গিয়ে এই হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল বলে অনেকে মনে করে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
উঃ এইডা একটা ফালতু কথা। ব্যবসায়ীরা পাহাড়েও যায় না। পাহাড়ে গিয়া কখনো চান্দা দেয় না। পাহাড়ে যাই আমরা। কাঠ বলেন, বাঁশ বলেন, তার চান্দা প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় দিয়াই আনতে হইত। কোন দিনের চান্দাই বাকি থাকত না।

প্রঃ ব্যবসায়ীদের কথা বলছি-
উঃ ব্যবসায়ীরা তাদের মাল (কাঠ, বাঁশ) নেওনের সময় রাস্তায় রাস্তায় চান্দা দেয়। চান্দা ছাড়া ১ ফুট গাছ নেওনের ক্ষেমতাও ব্যবসায়ীদে নাই। চান্দা বাকী রাইখ্যা শান্তিবাহিনী গাছ নিতে দিছে এই কথা জীবনেও শুনি নাই। ব্যবসা করতে চাইলে তাদেরকে চান্দা দেওনই লাগবো। আর হেগোর লাইগ্যা আমাদের মতন গরীব মানুষেরে মারব ক্যান্?

প্রঃ এতগুলো মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
উঃ জানি না ভাই। কি জন্য যে মারল, হেইডাই তো কইতে পারি না। ওরা ভাই বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর, তক্তা নজরুলরে পর্যন্ত মাইরা ফালাইল। যে নিজে না খাইয়াও হেগোরে খাওয়াইছে, কত বিপদ থাইক্যা উদ্ধার করছে।

প্রঃ ঘটনার দিন পাহাড়ে গিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?
উঃ ঐদিন আমার পোলাগো মোসলমানির (খৎনা করার) কথা আছিল। তাছাড়া শরীরটাও বেশি বালা আছিলনা। কিন্তু আলাল ভাই (স্ত্রীর বড় ভাই) কইল, পাহাড়ে যাওনের লাগি। একরকম জোরের মধ্যেই আমি আলাল ভাইয়ের লগে রওনা হইলাম। অফিস ছড়া দিয়া পাহাড়ে ঢুকলাম। কেচিং (একটা জায়গার নাম) থাইক্যা সামান্য উপরে একটা দোকান। দোকানে দেখলাম তিনজন শান্তিবাহিনী অস্ত্র নিয়া বইসা আছে। এইডাতে অবশ্য সন্দেহ করি নাই। এই রকমতো মাঝে মধ্যেই দেখতাম। আলাল ভাইয়ের সাথে গ্যানো চাকমার ছোটখাট ব্যবসা আছিল। আলাল ভাই তার জন্য কিছু টাকা নিয়া গেছিল। টাকা দেওনের লাগি আলাল ভাই যখন গ্যানো চাকমার সাথে কথা কইতেছিল তখন কালু চাকমা এবং তার সাথের কয়েকজন আইসা কইল, মিটিং আছে, ভিতরে যাইতে অইব। তখন আলাল ভাই কইল, গ্যানো বদ্দা, তোমার টাকা মিটিং থাইক্যা আসার সময় দিব। কিন্তু গ্যানো চাকমা, টাকাটা তখনই লইতে চাইছিল। কালু চাকমা আলাল ভাইরে কইল, যাওনের সময় দিয়া যাওনের লাইগ্যা।

প্রঃ প্রথম কখন বুঝতে পারলেন যে, কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে?
উঃ কালু চাকমার সাথে কিছুদূর যাইতেই দেখি রাস্তার দুই পাশে চার জন করে মোট আট জন এসএম জি নিয়া বইসা আছে। আমরা কাছে যাওন মাত্রই আমাদেরকে ঘিরে ফালাইল। এই অবস্থা দেইখ্যাই আমার প্রথম মনে অইল যে, আজকে আমাদেরকে মাইরা ফালাইব। পকেট থাইক্যা টাকা পয়সা সব রাইখ্যা কালু চাকমা আর তার লগের একজন আমাদের হাত পিছ-মোড়া কইরা গাছের লতা দিয়া বানল। বান্ধার সময় কইল মিটিংয়ের জায়গা নিয়া বান ছাইড়া দিব। তখন আমি কইলাম ছাইড়াই যখন দিবা, তখন অত শক্ত কইরা বান্ধনের দরকার কী, আমরাতো পালাইতেছি না। আমিও হাত এমন ভাবে রাখলাম যাতে বান বেশি শক্ত না হয়।

প্রঃ আপনাদের বেঁধে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে কি দেখলেন?
উঃ ১৫/২০ মিনিট হাইট্টা ভিতরে যাওনের পর দেখলাম একাটা মেড়া গাছের লগে তক্তা নজরুলসহ ৪ জন বান্ধা। সামনেই অন্যান্য গাছের লগে আরো মানুষ বান্ধা। গুনে দেখলাম আমিসহ ২৯ জন। এলএমজি ও এসএমজি হাতে পাহাড়া দিতেছে ১৯ জন শান্তিবাহিনী। আর লাঠি, দা, কুইচ্যা মারা শিক হাতে আরো ১২ জন চাকমা আছে, এদের মধ্যে কয়েকজনরে আমি চিনি। তারা হল- লাম্পায়া চাকমা, ছিক্কা কারবারী, বলি চাকমা, শান্তিময় চাকমা, বাবুল চাকমা, গুলুক্যা চাকমা, তরুন চাকমা(কালেক্টর), কবির চাকমা, বাশি চাকমা, বিমল চাকমা এবং সমিতি রঞ্জন চাকমা। এক সময় শান্তিবাহিনীর একজন একটা খাতা ও কলম নিয়া আমাদের সবার নাম লিখল এবং কার কাছ থাইক্যা রাস্তায় কত টাকা এবং কি কি জিনিস পত্র রাখা হইছে তা লিখল।

প্রঃ বাঁধা অবস্থা থেকে আপনি পালালেন কিভাবে?
উঃ কিছুক্ষণ পর কালাপাকুইজ্যার ৫ জনরে গাছের থাইক্যা দড়ি খুইল্লা আরো সামনের দিকে লইয়া গেল। তাদের সাথে গেল ২ জন অস্ত্রধারী আর ৩ জন গেল দা, লাঠি, কুইচ্যা মারার শিক নিয়া। ১০/১২ মিনিট পর নজরুল ভাইসহ আরো ৫ জনরে নিয়া গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নজরুল ভাই আর যাইতে চাইতেছে না। তখন একজন তারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া নিয়া গেল। তখনই বুঝলাম যে, লোকজনেরে সামনে নিয়া মাইরা ফালাইতেছে। কারণ নজরুল ভাইরে ঘাড়ে ধরা দূরের কথা. তার লগে গরম অইয়াও চাকমাদেরকে কথা কইতে কোন দিন দেহি নাই। তখন আমি একজনরে কইলাম, দাদা আমি একটু পেশাব করব। উনি এবং আরেক জন আমাকে একটু দূরে নিয়া গেল। পেশাবের ছল কইরা কিছুক্ষণ বইসা থাইক্যা মনে মনে ঠিক করছিলাম খাড়াইয়াই দৌড় দিমু। কিন্তু যখন খাড়াইলাম, তখন ঠাস কইরা বাঁকা একটা বাঁশের লগে মাথাটা বাড়ি লাগল। তখন আমার সাথের শান্তিবাহিনী দুইজন সর্তক হইয়া গেল। আমি মাথা হাতাইতে হাতাইতে আবার আগের জায়গায় আইলাম। আমারে আবার অন্যদের লগে বানল। তখন খুব লুকাইয়া লুকাইয়া আমি আমার হাতের বান খুইলা ফালাইলাম এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেই জন্য হাতের নিচে চাইপ্যা রাখলাম। তারপর আল্লাহর নাম লইয়া দিলাম এক দৌড়।

কিন্তু সামনেই দেখি এলএমজি নিয়া একজন খাড়াইয়া রইছে। আমারে কইল, দৌড় দিবিনা, ব্রাশ কইরা দিমু, তখন আমি ডান পাশের ছড়ার দিকে লাফ দিলাম। লাফ দেয়ার সাথে সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম, আর শব্দ শুনতে শুনতেই গড়ায়ে পড়লাম নিচের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের গুড়ির দিকে গর্তমতো জাগা পাইলাম। সেইখানে বইসা মাথার উপরে জঙ্গল টাইন্যা ধইরা রাখলাম। ভয়ে তখন আমার বুকের মধ্যে এমন জোরে আওয়াজ অইতেছিল যে, মনে হইছিল এই শব্দ না জানি শান্তিবাহিনী শুইনা ফালায়। রাত হওয়ার পর ছড়া দিয়াই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ছড়ার মধ্যে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি, আবার কোথাও সাঁতার। ঘন জঙ্গলে ভরা ছড়া দিয়ে চলবার মত কোন পথ নাই। তার উপর আবার নিশি অন্ধকার। ছড়ার মধ্যে ঠান্ডা পানি, বেতের কাঁটা, বিষাক্ত সাপ, হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল। কিন্তু তখন এক শান্তিবাহিনী ছাড়া আর কিছুকেই ভয় হচ্ছিল না। সারা রাত হেঁটে হেঁটে অবশেষে ভোরের দিকে পাহাড় থেকে বের হই।

প্রঃ ১১ তারিখ সেনাবাহিনীর লাশ উদ্ধারের কথা কিছু বলুন।
উঃ বাড়িতে আসার পর আর্মিরা যহন জানল যে আমাকেও শান্তিবাহিনী ধরে নিয়া গেছিল। তহন তারা আমাকে সাথে নিয়া গেল পথ দেখানোর জন্য। আমি তাদের পাহাড়ে নিয়া গেলাম। তক্তা নজরুলরে যেইখানে ঘাড়ে ধাক্কা দিছিল, সেইখান থাইকা আরেকটু সামনে গিয়া দেখলাম, বাম দিকে প্রায় এক-দেড়’শ গজ পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া। নিচে নাইমা সেই বেড়া পার হইলাম। কিন্তু তারপর আর রাস্তার কোন চিহ্ন নাই। একটু দূরে দেখলাম, একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি আধা ভাঙ্গা অবস্থায় ঝুইলা রইছে। কঞ্চিটা সরানোর পর একটা ছোট পথ পাইলাম। এই পথ দিয়া সামনে গিয়া দেখি সরাফদ্দি ভাইয়ের টুপিটা একটা কঞ্চির লগে বাইজ্যা রইছে। এরপর সেন্ডেল, মদের টেংকি, বেশ কয়ডা লাঠিও দেখলাম। তারপর দেখলাম আলাল ভাইয়ের লাশ। আরেকটু সামনে গিয়া দেখি বিশাল জায়গা জুইড়া লাশ আর লাশ। কেউরে চিনা যায় না। বন্দুকের সামনে যে চাকুটা (বেয়নেট) থাকে এইডা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া মারছে। লাঠি দিয়া পিটাইয়া, দা দিয়া কুবাইয়া, কুইচ্যা মারার শিক দিয়া পারাইয়া, চোখ তুইলা, আরো কতভাবে যে কষ্ট দিয়া মারছে তা কইয়া শেষ করুন যাইব না। ঐকথা মনে অইলে আইজো শরীরের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐখানে লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের।

Pakuakhali-4

Pakuakhali-2

Pakuakhali-

pakuakhali-00

ছবি: পাকুয়াখালিতে নিহত কয়েকজন কাঠুরিয়ার লাশ

প্রঃ মানুষ মারা গিয়েছিল ৩৫ জন,  আপনি বলছেন লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের। বাকিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উঃ ঘটনার দিন আমি যাদেরকে বান্ধা অবস্থায় দেখছিলাম তাদের মধ্যে আমার পরিচিত আলী, দুলু দুই ভাইসহ ৪ জনের লাশ ঐখানে ছিল না। আর এমন তিনজনের লাশ পাইছি যারা ঐ দিন ঐখানে বান্ধা ছিল না। আমার মনে হয়, আমি পালানোর পরে আরো সাত জনরে শান্তিবাহিনীরা ধইরা নিয়া গেছিল। সাত জনরে মনে হয় অন্য কোন খানে নিয়া মারছে, আমরা তাদের লাশ খুইজ্জা বাইর করতে পারি নাই। আর বালা কইরা খুজবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।

প্রঃ শান্তিবাহিনী এতগুলো মানুষকে একসাথে হত্যা করল, অথচ তাদের কোন বিচার হল না। আপনারা কি সরকারের কাছে এর বিচার চান নাই?
উঃ আমরাতো বিচারের দাবী করছিই, আমি নিজে বাদী অইয়া মামলাও করছিলাম। তখন সরকারের মন্ত্রীরাও কইছিল বিচার করব। তদন্তও করছিল। হুনছি তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে আজ ১৪ বছর পার অইয়া গেল। কই, কিছুই তো অইল না। শুধু এইডাই না, শান্তিবাহিনী তো আরো অনেক বাঙালিরে মারছে। কোনডারই তো বিচা অয় নাই। চাকমারা মানুষ মারলে তো এই দেশে বিচার অয় না। বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে, তার। আর অহন তো চুক্তি কইরা শান্তিবাহিনীরাই সরকার (সাবেক শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা চুক্তির পর থেকে পার্বত্যচট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন) অইছে। তাইলে আর বিচার করব কেডা?

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবী, আপনার বাবাকেও মাইরা ফালাইছিল। বাবা হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। আর আপনি সেই হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। এই জন্য আপনাকেই বলি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকুয়াখালীতে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে তারাও তাদের বাবা হত্যার বিচার চায়, যারা সেখানে ভাই হারিয়েছে তারা তাদের ভাই হত্যার বিচার চায়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছে তারা সন্তান হত্যাকারীর বিচার চায়, যেসব মহিলা স্বামী হারিয়েছে তারা স্বামী হত্যার বিচার চায়। কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হইয়া আত্বীয়-স্বজনদের হত্যাকারীর বিচার করতে পারব না। তাই এই হত্যাকান্ডের বিচার আপনাকেই করতে হইব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ