পার্বত্য চট্টগ্রাম কি পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদান এর মত স্বাধীন জুম্মল্যান্ড হবে?

 

তিমির মজুমদার

 পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় ভারতের অংশ হতে চেয়েছিল। তদানীন্তন চাকমা নেতা কামিনীমোহন দেওয়ান এবং স্নেহকুমার চাকমা রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় পতাকা এবং বোমাং রাজা বান্দরবানে বার্মার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। একই ভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা সার্কেল চিফ ত্রিদিব রায় (বর্তমান চাকমা সার্কেল চিফ দেবাশীষ রায়ের বাবা) এবং বোমাং  সার্কেল চিফ মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের অনতিবিলম্ব পর হতেই তারা অস্ত্র সমর্পণ না করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হবার জন্য সাংগঠনিক ও সামরিক শক্তি অর্জন করতে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা সংক্ষেপে ‘পিসিজেএসএস’ অথবা ‘জেএসএস’ নামে আঞ্চলিক দল গঠন করে এবং এই দলের সামরিক শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ নাম দিয়ে অদ্যাবধি পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাখার চেষ্টায় লিপ্ত আছে।

গত ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত প্রচেষ্টায় জেএসএস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার সিংহভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন আংশিকভাবে সম্পন্ন হলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছেনা; এই অজুহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অশান্ত করার পাঁয়তারা করে চলছে স্থানীয় একটি গোষ্ঠী। ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে একটি নতুন দেশ গঠন করার ষড়যন্ত্রে  লিপ্ত রয়েছে তারা।

একই প্রেক্ষাপটে যদি ‘পূর্ব তিমুর’ কিংবা ‘দক্ষিণ সুদান’ এর দিকে দৃষ্টিপাত করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে মাত্র ২০ বছরের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে ইস্ট তিমুরকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরী করা হয়েছে। মাত্র ৬০–৭০ বছরের প্রচেষ্টায় দক্ষিণ সুদানকে জাতিসংঘের নেতৃত্বে সুদান থেকে আলাদা করে স্বাধীন দেশ হিসেবে নতুন দেশ তৈরী করা হয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একই ধরণের ষড়যন্ত্র চলছে না তো ?

কাকতালীয়ভাবে দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন ১৩,২৯৫ বর্গ কিলোমিটার এবং পূর্ব তিমুরের আয়তন ১৪,৫০০ বর্গ কিলোমিটার যা প্রায় কাছাকাছি। ১৯৭৫ সালে পূর্ব তিমুরে ক্যাথলিক খ্রিস্টান এর জনসংখ্যার হার ছিল ৩০–৪০% যা ৯০ দশকে ৯০% পৌঁছায়। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, যে তিন পার্বত্য জেলায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৫২,৬৯৯ জন ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কিন্তু শুধুমাত্র ২০১৪–১৫ সালে সর্বমোট ৫০৬টি পরিবারের ২,২২২ জন ধর্মান্তরিত হয় এবং ২০১৫–১৬ সালে এ সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বমোট ১,৬৮৯টি পরিবারের ৫,৬৮৯ জন ধর্মান্তরিত হয়েছেন বলে জানা যায়। একই সাথে ২০১০ সালে তিন পার্বত্য জেলায় চার্চ এর সংখ্যা ছিল সর্বমোট ২০৯টি যা ২০১৫ সালে বেড়ে ২৫৭টিতে গিয়ে পৌঁছেছে। কিছু এনজিও এবং মিশনারী অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষা সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ধর্মান্তকারীদের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সাহায্য করছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বলা হচ্ছে যে, খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে অজীবন তারা যাবতীয় সুবিধা পেতে থাকবে এবং কেউ তাদের জায়গা জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। দরিদ্রতার সুযোগ এবং জমির স্থায়ী মালিকানার লোভ  দেখিয়ে সহজ সরল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের ব্যাপকহারে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরকরণ করা হচ্ছে। কাজেই প্রতি বছরে এই সংখ্যা তিনগুণ হিসেবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে সেদিন আর বেশী দূরে নয় যখন পার্বত্য এলাকার একটি বৃহৎ জনসংখ্যা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ভূক্ত হয়ে যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এমন ভাবনার কারণ কি? প্রথমতঃ মুক্তিযুদ্ধের পর হতে অদ্যাবধি চলমান  সশস্ত্র সংগ্রাম; দ্বিতীয়তঃ অনলাইন ও বিভিন্ন মিডিয়ার প্রচার প্রচারণা; তৃতীয়তঃ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের  দাবীর পক্ষে ক্রমশঃ কতিপয় দেশী ও বিদেশী বুদ্ধিজীবীদের জোরালো সমর্থন এবং চতুর্থতঃ কিছু সংখ্যক বিদেশী এনজিও এবং দাতাগোষ্ঠীর একপেশে ও একনিষ্ঠ সমর্থন।

একইভাবে এর বিপক্ষে কোনরকম প্রচার প্রচারণা না করা এবং মিডিয়া ও সুশীল সমাজের চুপচাপ থাকা প্রকারান্তরে এসকল আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদী দলসমূহের দাবীর পক্ষে সমর্থন দেবারই নামান্তর। এখানে উল্লেখ্য যে, ইতোমধ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা তাদের দেশের নাম, পতাকা, মুদ্রা ইত্যাদি কি এবং কেমন হবে তা তৈরী করে ফেলেছে এবং অনলাইন ও মিডিয়ার কল্যাণে সেগুলো ব্যাপক পরিচিতি করাতে সক্ষম হয়েছে।

অনলাইন প্রচার প্রচারণা এবং বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও চাকুরীর জন্য বিদেশে গমন করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সামনে ব্যানার ফ্যাস্টুনসহ র‍্যালি, মানববন্ধন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ইত্যাদি নানারকম কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং তাদের দাবীর স্বপক্ষে নিরন্তর জনমত সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

ইতোমধ্যে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র কাছে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সমর্থন চেয়ে ইমেইল করা হয়েছে বলে জানা যায়। যিনি ইমেইলটি করেছেন তিনি নিজেকে ‘মাইনরিটি কংগ্রেস পার্টি’র আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা, ক্যাপ্টেন ‘শচীন কর্মকার’ বলে দাবী করেছেন। ভারতের পূর্ব সীমানা  সংলগ্ন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তাদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সহায়তা চেয়েছে।

একইভাবে বাংলাদেশে কর্মরত কিছু এনজিও, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং ‘Peace Campaign Group’ ইত্যাদি বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতায় লিপ্ত বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নবাদী তথা জেএসএস, ইউপিডিএফ, জেএসএস (সংস্কার) ইত্যাদি দলসমূহ চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে যার পরিমাণ বাৎসরিক প্রায় সাড়ে চারশত কোটি টাকার মত।  সেই অর্থের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই তারা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করেছে বলে জানা গেছে। আদায়কৃত অর্থের আর একটি বড় অংশ তাদের দাবী দাওয়ার পক্ষে প্রচার প্রচারণা  এবং জনমত সৃষ্টির জন্য ব্যয় করছে বলে জানা যায়। ‘Peace Campaign Group’ নামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাংগঠনটি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ও দাতা গোষ্ঠীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে দাবী করেছে যে, বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনী মিলে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে ‘ইসলামিকরণ’ চালাচ্ছে এবং বাংলাদেশ একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে।

এদিকে ইউএনডিপি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙালীদের মাথা পিছু পাঁচ লক্ষ টাকা করে প্রদান করে বাংলাদেশের অন্য কোন স্থানে স্থানান্তরের জন্য একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেবার খবর পাওয়া গেছে। এই কৌশলে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বাঙ্গালীদের বিতাড়িত  করতে পারলে সেখানে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন অনেক সহজতর হবে বলে অনুমেয়।

অতএব সাধু সাবধান । এখনই তৎপর না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখন্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি হুমকি হতে পারে। প্রাণপ্রিয় এই মাতৃভূমির প্রতিটি ইঞ্চির সাথে মিশে রয়েছে অনেক রক্ত ও ত্যাগ। আমরা সবাই বড়  ভালোবাসি আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে। কাজেই এদেশের ভূখণ্ডে যারা স্বাধীন জুম্ম ল্যান্ডের পতাকা উড়াবার স্বপ্ন দেখছেন, এদেশের স্বাধীনচেতা দামাল ছেলেরা তা বাস্তবায়ন হতে দেবে বলে মনে হয় না।

 (লেখক: শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী)

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বপ্ন   

 

 তিমির মজুমদার

 আমার জন্ম বাংলাদেশের এক অভিশপ্ত অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত পাড়ায়।  অভিশপ্ত বলছি এ কারণে যে, এই এলাকার মানুষেরা নানাভাবে অত্যাচারিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত। স্বাধীনতার প্রকৃত মুক্তি ও আনন্দ যে কি তা এই এলাকার মানুষেরা জানে না। তাই এখানকার যুব সম্প্রদায়কে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো হয় নতুন দেশ ‘জুম্মল্যান্ড’ এর।  কিন্তু সেই স্বপ্ন কবে বাস্তবায়ন হবে, আর কতটা ত্যাগ এখানকার মানুষকে করতে হবে তা আমরা কেউ জানি না।

স্বাধীনতার পরপরই আমাদের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পার্বত্য এলাকার স্বায়ত্বশাসন চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের সেই দাবী তখন অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। ফলে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছিল এখানকার জনগোষ্ঠীর। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু ২০ বছর কেটে গেলেও শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এখানকার বাসিন্দারা হতাশ। কাজেই এখানে বসবাসরতরা মনে করেন, সশস্ত্র সংগ্রামের পথে পুণরায় পা বাড়ানোই মুক্তির একমাত্র উপায়।

কিন্তু আমাদের নেতৃত্ব এবং আমাদের জুম্মল্যান্ড সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম কতটা বাস্তবসম্মত? কেননা আমরা তো তাদের দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছি নিরন্তর।  এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি সত্যিই নেই?

১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই তারিখে বিলাইছড়ির তক্তানলার কাছে মালুমিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সকাল ১১ টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ টহলের উপর আক্রমণটি ছিল জেএসএস-এর সামরিক শাখা তথা শান্তিবাহিনীর প্রথম আত্মপ্রকাশ। তার পরবর্তী ইতিহাস- রক্তের হলি খেলার ইতিহাস। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচার, এখানে পুণর্বাসিত বাঙ্গালী সেটেলারদের অত্যাচার এবং সর্বোপরি আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী তথা শান্তিবাহিনীর অস্ত্রধারীদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের কোন উপায় আমাদের জানা নেই। এক শান্তিবাহিনীর পরিবর্তে এখন অত্যাচারিত হচ্ছি জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এই চার দলের ভিন্ন ভিন্ন অস্ত্রধারী দল কর্তৃক। তারা সকলে যদি স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় কাজ করে তাহলে জুম্মল্যান্ড আর্মির (জেএলএ) সকল দল একত্রিত হতে পারছে না কেন?

স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত অস্ত্রের ঝনঝনানি এখানে নিরন্তর চলছে।  চলছে জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) এর মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজীর এলাকা সম্প্রসারণের লড়াই। এরই মধ্যে প্রাণ দিতে হয়েছে প্রায় ত্রিশ হাজার নিরীহ মানুষকে। আহত হয়েছে কমবেশী দশ হাজার এবং অপহরণ করা হয়েছে কমবেশী সাত হাজার মানুষ।  এর কমপক্ষে এক তৃতীয়াংশ পাহাড়ী জনগোষ্ঠী। সম্ভ্রমহানীর শিকার হয়েছে অসংখ্য বাঙ্গালী ও পাহাড়ী নারীরা। জুম্মল্যান্ড আর্মির সশস্ত্র যোদ্ধারা যেখানেই রাত্রিযাপন করে সেখানকার সকল কিছুই হয়ে যায় তাদের নিজস্ব। সেই পাড়া, বাড়ী বা ঘরের সকল মহিলারা হয়ে যায় তাদের খণ্ডকালীন সময়ের ‘স্ত্রী’। হায়রে স্বাধীনতার আন্দোলনের চরিত্রহীন নায়কেরা !

নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা শান্তিচুক্তির পূর্বে এখানকার মানুষদের উপর অনেক অত্যাচার করতো। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।  তাদের অত্যাচারে মাত্রা কমে এলেও যেসব রাত্রিতে আমাদের নিজস্ব সশস্ত্র সদস্যরা কোন পাড়ায় বা কোন বাড়ি/ঘরে কাটায় তারা হয়ে ওঠে মূর্তিমান আতংক। যত্নে পালিত সবচেয়ে বড় ‘বন্য’(শুকর)টি তাদের জন্য উৎসর্গ করতে হবে।  সারা মাসের খাবার হিসেবে সংগৃহীত যা থাকে, তা তাদের রান্না করে খাওয়াতে হবে এবং সবশেষে ঘরের বা পাড়ার মহিলাদের হতে হবে তাদের দলের সকল সদস্যের শয্যাসঙ্গী।  সেটা যে কত ভয়ংকর তা কেবল ভূক্তভোগীরাই জানে। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দ করা যাবে না, কাউকে জানানো যাবে না। কেননা তারা তো ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বাধীনতার সংগ্রামে লিপ্ত। তারা তো পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। তাছাড়া তাদের হাতে রয়েছে ভয়ংকর সব আগ্নেয়াস্ত্র।

ব্যবসা বাণিজ্য, চাকুরী, কৃষিকাজ, ফলমূল, হাঁস মুরগী, ছাগল, গরু যা কিছুই বিক্রি করি না কেন তাদের দিয়ে দিতে হবে নির্দিষ্ট অংকের বিপুল পরিমাণ চাঁদা। না দিলে কি হবে? জীবন দিয়ে দেনা শোধ করতে হবে। এ কেমন স্বাধীনতার স্বপ্ন তারা দেখায়? এ তো স্বাধীনতা নয়, নিরন্তর অত্যাচার। এই অত্যাচার থেকে পরিত্রাণের উপায় কি আসলেই নেই?

একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত জনসাধারণের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেনি। আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপত্তার নামে যা করছে তা আর আমরা সহ্য করতে পারছি না। তাহলে উপায় কি? এ নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি কিন্তু কোন কুলকিনারা পাইনি। নিম্নলিখিত উপায়গুলো পাহাড়ে বসবাসরত সকলে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে দেখতে পারিঃ

প্রথমতঃ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেরা নিশ্চিত করতে হবে। আর এটা করার জন্য নিজ নিজ এলাকায়, নিজ নিজ পাড়ায়, প্রতিটি বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। রাত জেগে নিজেদের মধ্যে পাহারার ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সমন্বয়পূর্বক কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।  কথায় বলে ‘দশের লাঠি একের বোঝা’ অথবা ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’।  সকলে মিলে চেষ্টা করলে নিপীড়ন নির্যাতন বন্ধ না হলেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

 দ্বিতীয়তঃ জেএসএস, ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ(গণতান্ত্রিক) এবং জেএসএস (সংস্কার) যতদিন  পর্যন্ত একত্রিত না হয় ততদিন পর্যন্ত আমাদের সকলকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে এসব দলগুলোকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, কষ্ট করে আমরা যতটুকু উপার্জন করবো তা আমাদের পরিবারের জন্য। আমরা তার ভাগ কাউকে দেব না। একইভাবে বড় বড় ব্যবসায়ী, উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদনে নিয়োজিত ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, ব্রিটিশ টোবাকো, কাঠ ব্যবসায়ী, বাস ও ট্রাক মালিক সমিতিসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। চলুন আমরা নিজ নিজ পাড়া, এলাকা, বাজার ইত্যাদিকে ‘চাঁদা মূক্ত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করি। সংঘবদ্ধভাবে আমরা চাঁদাবাজীকে না বলি এবং কেউ যদি জোর করে চাঁদা আদায় করতে আসে তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করি। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ প্রতিরোধ করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন আমাদের সকলের ঐকান্তিক সদিচ্ছা এবং একতাবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে সমতল ভূমিতে প্রচলিত ‘লাঠি ও বাঁশি’ পদ্ধতির প্রচলন করা যেতে পারে।

তৃতীয়তঃ সকল পরিস্থিতিতে নিজ নিজ এলাকায় শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। এদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। এখানে পাহাড়ী-বাঙ্গালী ভেদাভেদ আমাদেরকে কেবল দূর্বলই করবে। প্রত্যেককে একে অন্যের সামাজিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল আচরণ করতে হবে এবং একে অন্যের বিপদে আপদে এগিয়ে আসতে হবে।  একই এলাকায় কারও প্রতি কোন প্রকার অন্যায় ও অত্যাচার হলে সকলকে একযোগে তার প্রতিকার করতে এগিয়ে আসতে হবে।  তাহলে নিজেদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে যা এলাকায় নিরাপত্তা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

চতুর্থতঃ প্রত্যেককে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি হবার চেষ্টা করতে হবে। টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়ন এর জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় রাখতে হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে । কৃষি, ফলজ, বনজ ইত্যাদি বৃক্ষরোপণ, হাঁস- মুরগী  পালন, ছাগল–গরু পালন, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষূদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প প্রভৃতিসহ নানা প্রকার অর্থনৈতিক কমকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া জীবন মানের উন্নয়ন সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা যে অবস্থায় আছি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকে সে চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে।

পঞ্চমতঃ শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে হবে। প্রত্যেকের ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজে পাঠাবার কোন বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে যে ‘মানুষের মত দেখতে হলেই মানুষ হয় না; শিক্ষা ছাড়া মানুষকে কেউ মানুষ কয় না’।  আঞ্চলিক নেতৃত্ব আমাদের সন্তানদের মুর্খ করে রাখতে চায়। অথচ আমাদের দেয়া চাঁদার টাকায় তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজ অথবা বিদেশে লেখা পড়া করায়। তাদের এই চক্রান্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। শুধু পাশের হার ও জিপিএ ভিত্তিক শিক্ষা নয়; জীবনের বাস্তবতা ঘনিষ্ঠ শিক্ষা অর্জনের প্রতি জোর দিতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখা পড়া কারানোর পাশাপাশি সাবলম্বী হবার শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শিক্ষা অর্জনের সাথে সাথে তারা নিজ নিজ পরিবারকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করবে এবং মানুষের মত মানুষ হতে সচেষ্ট হবে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আধিবাসীরা স্বাধীনতার মুক্তি সম্পূর্ণভাবে  উপভোগ করতে পারছি না। বাংলাদেশ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী, বাঙ্গালী এবং জুম্ম লিবারেশন আর্মির  অত্যাচার এবং চাঁদাবাজীতে এখানকার জনগণের জীবন অতিষ্ট। এই অত্যাচার থেকে আমরা সকলেই মুক্তি চাই। বাংলাদেশ সরকারের উপর আস্থা রাখতে চাই। কিন্তু বিগত বছরগুলোর অবস্থা দৃষ্টে এখানকার সাধারণ মানুষ সত্যিই আশাহত।

(লেখক শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন কর্মী এবং গবেষক)

জুম্মল্যান্ডের অজানা গল্প এবং সামারি

জেনারেল ইব্রাহীম

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

নোটশিট ও সামারি
দু’টি শব্দ এখানে লিখলাম। একটি শব্দ ‘সারসংক্ষেপ’, ইংরেজিতে সামারি। আরেকটি শব্দ ‘নোটশিট’। এই দু’টি শব্দের সাথে সরকারি চাকরিজীবীরা নিবিড়ভাবে পরিচিত। নোটশিট মানে ছাপানো কাগজ, যেখানে অফিসের কর্মকর্তারা কোনো বিষয়ে বা প্রস্তাবে তাদের মন্তব্য লিখে ওপরের দিকে পাঠান এবং আবার ওপরের দিক থেকে নিচের দিকে পাঠান। সামরিক বাহিনীসহ সরকারি অফিসে এ ধরনের কাগজ এবং এ ধরনের নোট লেখা সুপ্রচলিত। সামরিক বাহিনীতে নোটশিট না বলে অনেক সময় বলা হয় মাইনিউটস (বা মিনিটস) লেখা তথা মিনিট-শিটে লেখা। নোট মানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। কারণ জ্যেষ্ঠ স্টাফ অফিসার বা অতি জ্যেষ্ঠ দায়িত্বশীলদের হাতে এত সময় থাকে না যে, তারা সব বিষয়ে বিস্তারিত শুনবেন বা পড়বেন। কোন কোন বিষয়ে বিস্তারিত জানা উচিত এবং কোন কোন বিষয়ে সারমর্ম বা সামারি জানলেই চলবে, এই সিদ্ধান্তটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকেই নিতে হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ এবং চলমান সন্ত্রাস ও সন্ত্রাস দমনের চেষ্টা প্রসঙ্গে আমার একটি প্রস্তাব এই কলামের শেষ অনুচ্ছেদে উপস্থাপন করছি; কিন্তু কেন করছি সেটি ব্যাখ্যা করার জন্য ইতিহাস থেকে একটি গল্প তুলে ধরলাম।

খাগড়াছড়িতে ব্রিগেড কমান্ডার হলাম
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হঠাৎই জানানো হলো, আমাকে রাঙ্গামাটি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব থেকে খাগড়াছড়ি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বে বদলি করা হয়েছে। ডিসেম্বরের ২০ তারিখ আমি খাগড়াছড়ি ব্রিগেডের দায়িত্ব নিয়েছিলাম এবং সাত দিন পর ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ রাঙ্গামাটি ব্রিগেডের দায়িত্ব অন্যের বরাবরে হস্তান্তর করেছিলাম। ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিবাহিনী নামক জঙ্গি দল বা সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত কর্মকাণ্ডের উত্তাপ চরমে ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে দু-মুখী চেষ্টা চলছিল। একমুখী চেষ্টা হলো নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের যথাসম্ভব দমন করা। আরেকমুখী চেষ্টা ছিল, শান্তিবাহিনীর সাথে শান্তি স্থাপনের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। আমার আগে যিনি খাগড়াছড়ির ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন তিনি প্রক্রিয়াটি শুরু করে গিয়েছিলেন; কিন্তু আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সময়েই তিনি বদলি হয়ে যান। অতএব ওই অভিনব গুরুদায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ে। দায়িত্বটি কী? দায়িত্বটি হলো, শান্তি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করা, পরিবেশ অব্যাহত রাখা এবং আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া।

বিস্তারিত বর্ণনা আমার লেখা দ্বিতীয় বইয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে বা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পদক্ষেপগুলোর বিবরণ ও মূল্যায়ন এই বইয়ে আমি লিপিবদ্ধ করেছি। বইয়ের নাম : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন’। বইটির প্রকাশক আহমেদ মাহমুদুল হক; প্রকাশনী সংস্থার নাম মওলা ব্রাদার্স (০২-৭১৭৫২২৭)।

শান্তিবাহিনীর দাবিনামা : জুম্মল্যান্ড
সংক্ষেপে স্মৃতিচারণ করি। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিবাহিনীর সাথে চতুর্থ আনুষ্ঠানিক আলোচনা বৈঠক হয়। হাবভাব দেখে বুঝলাম, শান্তিবাহিনী আরেক দফা রক্তারক্তি করবে। উদ্দেশ্য, সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেন, সরকার তাদের দাবিনামা মেনে নেয়। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারির কথা বলছি। দাবিনামাটি ছিল পাঁচ দফা। পাঁচ দফার পুরোটাই এখানে লিখব না, স্থানাভাবে। শুধু প্রথম দফা লিখলাম। ‘বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙ্গামাটি। দু’টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে; ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।’

শান্তিবাহিনীর পাঁচ দফা দাবিনামা ছিল অনেকটাই ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ কর্তৃক পাকিস্তান সরকারের বরাবরে উপস্থাপিত ছয় দফা দাবিনামার অতি-কিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ। পাঁচ দফা দাবিনামা মেনে নেয়া মানে ছিল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অঙ্কন করা। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ বছর যাবৎ শান্তিবাহিনী সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই প্রথমবার, ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এসে তারা লিখিতভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করেছিল। দাবিগুলো সংবিধানবহির্ভূত হওয়ার কারণে, বাংলাদেশ সরকার তথা সরকারের প্রতিনিধিদল ওই দাবিনামার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছিল, সেহেতু শান্তিবাহিনী উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আরেকবার একটি বড় আকারের রক্তাক্ত নাটক তারা মঞ্চস্থ করবে। আমার সামরিক অভিজ্ঞতার আলোকে এবং গোয়েন্দাদের মূল্যায়নের পরিপ্রেক্ষিতে আমিও উপসংহারে এলাম যে, শান্তি বাহিনী আসলেই আরো একবার বড় রকমের রক্তপাত ঘটাবে।

রক্তারক্তি এবং প্রেসিডেন্টের সফর
এটি ১৯৮৮-এর মার্চের শেষ এবং এপ্রিলের শুরুর কথা। আমি আমার মূল্যায়ন বা ফোরকাস্ট ওপরোস্থ কর্তৃপক্ষ এবং সরকারকে জানালাম। পরিষ্কার বললাম, সেটি ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের মজুদ নেই। ১৯৮৮ সালের এপ্রিল মাসের ২৪ তারিখ, রমজান মাসের আট বা নয় এরকম একটি তারিখ; এশার নামাজের পর শুরু হলো শান্তিবাহিনীর আক্রমণ। ঘটনাক্রমে কিন্তু একান্তই অপরিকল্পিতভাবে, তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিভিশনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ম. হামিদ ক্যামেরাসহ খাগড়াছড়িতে অবস্থান করছিলেন, পর্যটনমুখী একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানানোর জন্য। ২৪ এপ্রিল রাত এবং পরবর্তী দু-তিন দিনের সব সন্ত্রাসী তৎপরতা বিটিভি ক্যামেরাবন্দী করে এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করে। শান্তিবাহিনীর আক্রমণে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বাঙালিদের হতাহত হওয়ার খবর জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গার কারণে পাহাড়ি মানুষের হতাহতের খবরও জনগণ পেতেন না। পাহাড়ি মানুষ সীমান্তের অপর পারে শরণার্থী হওয়ার খবরও জনগণ পেতেন না। এই প্রথমবার, বিটিভির বদৌলতে বাংলাদেশের আপামর জনগণ শান্তিবাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে কম হোক বেশি হোক, ভালো হোক মন্দ হোক, একটি ধারণা পেলো। শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে ওইরূপ আগ্রাসী কর্মকাণ্ড পরবর্তী দিনগুলোতেও অব্যাহত ছিল।

ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ সরকার মানসিকভাবে চাপের মধ্যে পড়ে। চাপটি কী? পার্বত্য চট্টগ্রামে এত রক্তারক্তি কেন হচ্ছে? শান্তিবাহিনীর হাতে এত বাঙালি কেন মরছে? সরকার কী করছে? সেনাবাহিনী কী করছে? ইত্যাদি। এই প্রেক্ষাপটে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পরিস্থিতি সরেজমিন দেখার জন্য এবং মূল্যায়নের জন্য খাগড়াছড়ি সফরে আসেন। ওই দিন পর্যন্ত প্রায় চল্লিশটি বাঙালি গ্রাম শান্তিবাহিনীর গুলি ও আগুন-আক্রমণের শিকার হয়েছিল, শতাধিক বাঙালি নিহত হয়েছিল, শত শত বাঙালি আহত হয়েছিল, শত শত উপজাতীয় মানুষ ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্টের সফরের তারিখটি ছিল ৫ মে ১৯৮৮। প্রেসিডেন্টের সাথে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতিকুর রহমান এবং চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল আব্দুস সালামও ছিলেন। এলাকা ঘুরে, রাষ্ট্রপতি তার দলবলসহ খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে আসেন। আমাদের অপারেশনস রুমে বসেন। আংশিকভাবে উত্তেজিত (ইংরেজিতে : এনয়ড), আংশিকভাবে বিমর্ষ রাষ্ট্রপতি জানতে চান শুনতে চান, কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? এই কলামের সম্মানিত পাঠক, এবার আলাপন বা ডায়ালগ অনুসরণ করুন। কথাবার্তা সব না, কিন্তু বেশির ভাগ ইংরেজিতে হয়েছিল। পাঠকের জন্য বাংলায় লিখলাম।

প্রেসিডেন্টকে ব্রিফিং দিতে দুই ঘণ্টা
প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘ইবরাহিম, বলো এসব কী হচ্ছে? হোয়াট দ্য হেল ইজ হ্যাপেনিং? হোয়াই সো মেনি পিপল আর বিইং কিলড? হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুইং?’ মানে : এত লোক মারা যাচ্ছে কেন? তোমরা কী করছ? কী ঘটছে? কর্নেল ইবরাহিম বলল, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনি এবং আমরা সবাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করি যে, অনেক কম মারা গিয়েছে। আরো অনেক বেশি মারা যেতে পারত; কিন্তু আমরা বাঁচাতে পারিনি এটাই বাস্তবতা, আমি দুঃখিত।’ প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘পুরো জাতি উদ্বিগ্ন, আমাকে জবাব দিতে হচ্ছে। ইউ হ্যাভ টু এক্সপ্লেইন হোয়াই ইউ ফেইলড?’ আমি বললাম, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আমি অবশ্যই ব্যাখ্যা করব; আমাকে সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট : ‘ঠিক আছে তুমি বলো, তোমাকে বিশ মিনিট সময় দিলাম।’ ইবরাহিম : ‘স্যার, আমি বিশ মিনিট সময়ে বলব না। কারণ, আমি বিশ মিনিটে বলে সারতে পারব না। আপনি আমাকে অন্তত দুই ঘণ্টা সময় দিন।’ প্রেসিডেন্ট যুগপৎ আশ্চর্য এবং রাগান্বিত হয়ে আমাকে বললেন, ‘তুমি স্টাফ কলেজের ডিএস (ইন্সট্রাক্টর) ছিলে; তুমি সামারি করা শিখিয়েছ ছেলেদের; আর এখন তুমি বলছ, তুমি বিশ মিনিটে বলতে পারবে না। কেন পারবে না? তুমি আমাকে সামারি বলো।’

আমি আবারো বিনীতভাবে উত্তর দিলাম যে, ‘আমি অবশ্যই সামারি করতে পারি কিন্তু আমি এখন করব না, কারণ সামারিতে সমাধান হবে না।’ প্রেসিডেন্টের সাথে তার সামরিক সচিব উপস্থিত ছিলেন; র‌্যাংক ব্রিগেডিয়ার; আমার থেকে এমনিতেও সিনিয়র এবং আমার সুপরিচিত। প্রেসিডেন্টের হয়ে, প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী তৎকালীন সামরিক সচিব আমাকে বললেন, টঙ্গী খালের ওপরে দ্বিতীয় ব্রিজ উদ্বোধনের অনুষ্ঠান আছে; প্রেসিডেন্টকে ওখানে যেতে হবে। অতএব তোমাকে দুই ঘণ্টা সময় দেয়া যাবে না (পাঠকের জন্য একটু ডাইভারশন। ঢাকা মহানগর থেকে উত্তর দিকে উত্তরা মডেল টাউন এবং টঙ্গী শিল্প শহরের মধ্যে সীমানা হলো টঙ্গী খাল। ওই খালের উপরে পুরনো একটি ব্রিজ ছিল। পুরনো ব্রিজ ট্রাফিক সামলাতে পারে না বিধায় সরকার একটি নতুন ব্রিজ বানিয়েছিল; ওই নতুন ব্রিজটির উদ্বোধনের কথাটিই বলা হচ্ছে)।

আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বললাম : ‘স্যার, আপনিই ঠিক করুন, টঙ্গী খালের ওপর ব্রিজ উদ্বোধন করবেন, নাকি আমার কাছ থেকে ব্রিফিং শুনবেন? ব্রিজ উদ্বোধন অন্য কোনো মাননীয় মন্ত্রী করলেও ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে অসুবিধা হবে না; কিন্তু আজ যদি পার্বত্য পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা আপনার বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী শোনেন, তাতে কিন্তু আপনার চাহিদা মিটবে না।’ প্রেসিডেন্ট এরশাদ গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘দুই ঘণ্টা সময়ই তোমাকে দিলাম। আমাকে যেহেতু ঢাকা ফেরত যেতে হবে, সময় হিসাব করেই ব্রিফিং শেষ করবে।’

সামারি কেন করিনি?
এরপর আমি ঘড়ির কাঁটা ধরে, ম্যাপের সামনে দাঁড়িয়ে মহামান্য প্রেসিডেন্টকে দুই ঘণ্টাব্যাপী একটি ব্রিফিং দিলাম। স্থান খাগড়াছড়ি সেনানিবাসে অবস্থিত ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের অপারেশন্স রুম; তারিখ ৫ মে ১৯৮৮; সময় অপরাহ্ণ সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টা। ব্রিফিংয়ের মধ্যে ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার ব্যাপ্তি, সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগগুলো, সমস্যা বাড়ানোর জন্য শান্তিবাহিনীর প্রচেষ্টা, শান্তিবাহিনীর প্রতি প্রতিবেশী ভারতের সমর্থনের ব্যাপ্তি, শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও দুর্বলতা, বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা, বাঙালিদের নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলো এবং আমার পক্ষ থেকে সুপারিশমালা। দুই ঘণ্টাব্যাপী ব্রিফিং শোনার পর রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও হতাশা মিশ্রিত মন্তব্য শুনে, আমি দুষ্টুমি করতে বাধ্যই হয়েছিলাম। সিরিয়াস কণ্ঠে বললাম, ‘স্যার, আপনি এত কিছু জানতেন না; কারণ আপনি সব সময় সামারি শুনেছেন। সামারি শুনলে ওইটিই আপনি জানবেন যেটি সামারি-করনেওয়ালা আপনাকে জানায়। এর বাইরে যা কিছু সব আপনার অগোচরে থেকে যাবে।’ প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ‘আমি সব কিছু একলা সামলাতে পারব না, সরকারকে পূর্ণাঙ্গভাবে জড়িত হতে হবে।’ অতএব, প্রেসিডেন্টের আদেশে ১৯৮৮ সালের মে মাসের ৮ তারিখ বিকেলবেলা বঙ্গভবনে, সেনাসদরের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির ওপর একটি ব্রিফিং দেয়া হয়। কেবিনেটের সব সদস্য, সরকারের সব সচিব, ঢাকা অঞ্চলের সব জেনারেল এবং ডিআইজি ও ওপরস্থ সব পুলিশ অফিসার সেই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট পূর্ণ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকে পাঁচ মিনিট করে সূচনা বক্তব্য রেখেছিলেন : মহামান্য প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী প্রধান মহোদয় এবং চট্টগ্রামের মাননীয় জিওসি। বাকি এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম আমি। আরো একটি ক্ষুদ্র স্মৃতির উল্লেখ করছি।

বেগম জিয়াকে ব্রিফিং
১৯৯১ সালের শুরুর দিকে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তিনিও পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি বোঝার জন্য সেনাসদরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্টাফ অফিসাররা আমাকে বারবার বলেছিলেন, ইবরাহিম, সংক্ষেপে বলবে। দেড় ঘণ্টা সময় দেয়া হয়েছিল। আমাদের বক্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বসহ বাস্তবে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদ সাহেব প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও বলেছিলেন, ‘আমি তো এত কিছু জানতাম না।’ বেগম জিয়ার তো আগের থেকে কোনো কিছু জানার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সে জন্যই তার স্টাফ অফিসারদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে বেগম জিয়া দীর্ঘ সময় ব্রিফিং শুনেছেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব সম্পাদন করেছিলেন। বঙ্গভবনের ব্রিফিং বা বেগম জিয়ার প্রতি (১৯৯১) ব্রিফিংয়ের বিবরণ দেয়া আজকের কলামের উদ্দেশ্য নয়।

দৃষ্টি আকর্ষণ : বর্তমান সরকারপ্রধান
আজকের কলামের উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই মর্মে যে, দু’টি বিষয়ে তিনি যেন সামারি-নির্ভর হয়ে না চলেন। এখন প্রথম বিষয়টির উল্লেখ করছি। গতকাল ৯ আগস্ট ছিল তথাকথিত ‘আদিবাসী’ দিবস। স্থানের অভাবে, সময়ের অভাবে, শক্তির অভাবে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের অন্তর্নিহিত বিপদগুলো নিয়ে লিখতে পারছি না বা বলারও সুযোগ পাচ্ছি না। অনুমান করছি, কেউ না কেউ আপনাকে নিশ্চয়ই বলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি মোটেই শান্তিময় নয়। আট-দশ দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধিত হলো। আমার মতে, সংশোধনীর কারণে সমস্যা বাড়বে। যা হোক, বিবেচনা সরকার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার এই মুহূর্তের ক্রাক্স বা চুম্বক অংশ হলো একটি প্রশ্ন এবং তার উত্তর। প্রশ্নটি হলো : ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিরা থাকবে কি থাকবে না? যদি থাকে, তাহলে কতসংখ্যক ও কোন কোন শর্তে?’ এই অপ্রিয় প্রশ্নটি আড়াল করেই সব ডামাডোল।

দ্বিতীয় বিষয় : চলমান উগ্রবাদ বা চরমবাদ বা এক্সট্রিমিজম বা মিলিটেন্সি বা টেরোরিজম বা জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস প্রসঙ্গ (যেই নামেই ডাকি না কেন)। সরকার অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে; সরকার তথা সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সরকারের দফতর-অধিদফতর, পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাব ইত্যাদি অনেকেই বিভিন্ন প্রকারের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। ঘোষিতভাবে, ওই পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্ত্রাস দমন বা দমনের সহায়তা। আমি আশা করব, এ প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান সামারি-নির্ভর হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করবেন না। সরকারপ্রধান যেন বিস্তারিত জানতে আগ্রহী হন, এই অনুরোধ করছি। কারণ, যা কিছু হবে, সব কিছুর দায়দায়িত্ব সরকারপ্রধানের ওপরেই পড়বে। সরকারপ্রধান যেহেতু সরকার চালাচ্ছেন, সেহেতু তিনি অজস্র বিষয়ে অবশ্যই সামারি শুনবেন এবং সিদ্ধান্ত দেবেন; এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সন্ত্রাস দমন বা জঙ্গি দমনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো দেয়ার আগে এক বা একাধিকবার মেহেরবানি করে পূর্ণ বিষয়টি যেন তিনি জানতে চেষ্টা করেন এবং আবারো পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সামারি-নির্ভর যেন তিনি না হন।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ইমেইল : mgsmibrahim@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সামাজিক গণমাধ্যমে 

পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞমহলের মতে, অচিরেই এ প্রবণতা রোধ করতে না পারলে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী সম্প্রদায়ের আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্যহীন ও প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন হয়ে

 

57f71831319799c944bfed08f266c4f4a05d487823a70601dd369a4e4e83b1fc

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট :

হঠাৎ করেই ওয়েবসাইট, ব্লগ ও সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে  পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের বাংলাদেশ, বাঙালী, সেনাবাহিনী ও সরকার বিরোধী, বিদ্বেষমূলক, হিংসাপরায়ণ, সাম্প্রদায়িক ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে পার্বত্যবাসী বিশেষ করে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশ, বাঙালী ও সরকার বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিজ্ঞমহলের মত।

এর সর্বশেষ প্রমাণ গত ২১ ফেব্রুয়ারি মাটিরাঙ্গায় অপহৃত এক বাঙালী যুবকের লাশ উদ্ধারের পর দুপুর থেকে একাধিক ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে একটি অস্পষ্ট পুরাতন ছবি, সেনাবাহিনী ও বাঙালিদের জড়িয়ে নাম সর্বস্ব কিছু নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের লিংক শেয়ার করা হয়। সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক এসব ছবি ও নিউজের লিংকগুলো এক আইডি থেকে অন্য আইডিতে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে একজনের ওয়াল থেকে অন্যজনের ওয়াল, ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপে ভাসতে থাকে এসব ছবি ও সংবাদগুলো।

ড়ড়ড়

এছাড়া, অন্য এক ফেসবুক আইডি থেকে ঘটনার স্থান, সময় গোপন রেখে উস্কানিমূলক একটি স্ট্যাটাস দেয়। ওই আইডির উস্কানিমূলক স্ট্যাটাসটি অন্যান্য ব্যবহারকারীরা লাইক ও শেয়ার দিয়ে ছড়ানোর চেষ্টা করে। এতে করে পার্বত্যাঞ্চলে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। তাদের উস্কানিতে প্রলুবদ্ধ হয়ে অনেক সাধারণ পাহাড়ীও এসব পোস্ট শেয়ার করে কিংবা নিজেদের ওয়ালে নানা অসত্য ঘটনা লিখে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করে।

ওই সকল স্ট্যাটাসে বাঙালী ও সেনাবাহিনী পাহাড়ীদের গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধোর করছে, গুলি করছে, কুপিয়ে জখম করছে দাবি করে পাহাড়ীদের সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানানো হয়। এমনকি পাহাড়ীদের আহত হওয়ার পুরাতন ছবি পোস্ট করে তাদের হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে, রক্ত প্রয়োজন ইত্যাদি প্রচারণা চালানো হয়। রক্তের জন্য মোবাইল নম্বরও দেয়া হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, যেখানে কেউ আহতই হয়নি এমনকি কোন পাহাড়ীর উপর হামলার ঘটনাও ঘটেনি সেখানে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আনার খবর মূলত সম্প্রদায়িক্ দাঙ্গা লাগানোর অপকৌশল ভিন্ন অন্য কিছু ছিল না বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

ড়

এসব প্রচারণায় খাগড়াছড়িতে ও মাটিরাঙ্গায় পাহাড়ী-বাঙালী প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয় ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগার উপক্রম হয়- যা সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও পুলিশের সতর্কাবস্থানের কারণে এড়ানো সম্ভব হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রায় অর্ধ শতাধিক পেইজ ও গ্রুপ রয়েছে ফেসবুকে। এসকল পেইজ, গ্রুপ ও আইডি থেকে প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ, সরকার, বাঙালী, প্রশাসন ও সেনাবাহিনী বিরোধী হিংসাত্মক, বিদ্বেষমূলক, সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে এবং সৌহার্দ্য, সহাবস্থান, শান্তি ও সম্প্রীতি বিরোধী প্রচারণা চালানো হয়। এসকল প্রচারণা প্রায়শঃ বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংবিধান ও রাষ্ট্র্দ্রোহী উপাদান থাকে। এছাড়াও সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে তা প্রতিহত করার পক্ষে প্রচারণা চালানো হয় এসব পেইজ থেকে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, এসব প্রচারণায় বিভিন্ন বিদেশী শক্তিকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ, দাতা সংস্থাগুলোকে বাংলাদেশে সাহায্য বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানিয়ে প্রচারণা চালিয়ে, গণস্বাক্ষর ও গণ পিটিশন সংগ্রহ করে পাশ্চাত্য  রাষ্ট্রসমূহ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহে আবেদন করা হয়। বাংলাদেশ ভেঙে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের পক্ষে জনমতও গঠন করা হয় এসকল প্রচারণায়। এছাড়াও ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী নানা আপত্তিকর মন্তব্য ও ছবি পোস্ট করা হয়ে থাকে।

cht book 5

মূলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলো ও তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসীরা এই প্রচারণার সাথে জড়িত। এর সাথে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টিতে ইন্ধনদানকারী বেশকিছু এনজিও কর্মীদের সংশ্লিষ্টতাও রয়েছে বলে জানা গেছে।

পাহাড়ের সচেতন মহলের মতে, পাহাড়ের সাধারণ ও নিরীহ পাহাড়ীরা এ সকল প্রচারণা সাথে জড়িত না থাকলেও তারাই এর প্রধান শিকার ও টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ ও শান্তি প্রিয় পাহাড়ীদের মধ্যে, বিশেষ করে উঠতি পাহাড়ী তরুণ, যুবক ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশ, বাঙালী, সরকার ও প্রশাসন বিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ও আবেগী প্রচারণার ফাঁদে পড়ে পাহাড়ের সাধারণ তরুণ ও যুবকদের মনেও বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে তথাকথিত স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞমহলের মতে, অচিরেই এ প্রবণতা রোধ করতে না পারলে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী সম্প্রদায়ের আগামী প্রজন্ম গড়ে উঠবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি আনুগত্যহীন ও প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন হয়ে।

তাদের মতে, সরকার সামাজিক গণমাধ্যমে ব্যাপক মনিটরিং করলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন পাহাড়ীদের এহেন সংবিধান ও রাষ্ট্রবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, বিদ্বেষ ও উষ্কানীমূলক প্রচারণা বন্ধ করার ব্যাপারে তেমন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, আনুগত্য, পার্বত্য চট্টগ্রামে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহাবস্থান, শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এ ধরনের হেট ট্রেইট ক্যাম্পেইন অচিরেই বন্ধ করা জরুরী।

মাটিরাঙ্গার ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্প্রীতির বন্ধন বিনষ্ট করতে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা অপপ্রচার ও উস্কানি ছড়িয়েছিল। উস্কানিদাতাদের খুঁজে বের করতে মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

জেলা পুলিশ সুপার মো. মজিদ আলী জানান, মাটিরাঙাসহ অন্যান্য ঘটনায় উস্কানিদাতাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাদের শনাক্ত করতে মাঠে কাজ করছে প্রশাসন।