ভালবেসে বাঙালী যুবক কমলের হাত ধরে পালালেও শেষ রক্ষা হলো না সোনাবী চাকমার

150751_137518686379416_969652262_n-300x200

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

ভালেবেসে বিয়ে করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে বাঙালী যুবক প্রেমিক কমলের হাত ধরে ঘর ছাড়লেও শেষ রক্ষা হয়নি প্রেমিকা সোনাবী চাকমার।

টানা তিন বছর  ভালবেসে মন দেয়া-নেয়ার পর বিয়ে করার শপথ নিয়ে ঘর ছাড়লেও নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার আগেই মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশের হাতে আটক হয়েছে ভিন্ন ধর্মের এ প্রেমিক যুগল। দু‘জনকেই মাটিরাঙ্গা থানায় পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়। তবে পুলিশের আগে স্থানীয় উপজাতীয় যুবকরা তাদের আটক করে বলে জানা যায়।

জানা গেছে, টানা তিন বছরের প্রেম করার পর পরস্পর বিয়ে করবে বলে প্রেমিক পানছড়ির লোগাং এর বাসিন্দা অবসর প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক খরভল্লব চক্রবর্তীর ছেলে পানছড়ি কলেজের ছাত্র কমলাশীষ চক্রবর্তীর (২০) হাত ধরে ঘর ছাড়ে পানছড়ির লোগাং এর বাবুরাপাড়ার চন্দ্র চাকমার মেয়ে লোগাং বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর ছাত্রী সোনাবী চাকমা (১৬)। খাগড়াছড়ি বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠে মাটিরাঙ্গা বাজারে আসা মাত্র স্থানীয় উপজাতীয় যুবকরা আটক করে বোরকাপড়া সোনাবী চাকমাকে।  প্রেমিক যুবক কমল হিন্দু ধর্মের। 

পরে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ একই গাড়ি থেকে আটক করে প্রেমিক কমলাশীষ চক্রবর্তীকে। বিষয়টি নিয়ে দিনভর উভয়ের পরিবারের মধ্যে দেনদরবারের পর প্রেমিক যুগলের স্ব স্ব পিতার জিম্মায় তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়।

জেএসএস-ইউপিডিএফ সন্ত্রাসের বলি: ভারতে আশ্রয় নিয়েছে ৩০ উপজাতীয় পরিবার

Indian-Paper-300x166

মো. আল আমিন:

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী দূর্গম নাড়াইছড়ি এলাকা থেকে উপজাতীয় কয়েক পরিবার সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে গেছে বলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)র নিকট দাবী করেছে বিএসএফ। এ ঘটনায় দুই পাহাড়ী সংগঠন জেএসএস-ইউপিডিএফ পরস্পর পরস্পকে দায়ী করেছে।

 

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বুধবার বিকালে নাড়াইছড়ি সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়েছে। তবে বৈঠকে বিএসএফ ভারতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর তালিকা দিতে পারেনি বলে দাবী করে বিজিবি সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবার পূনরায় বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের আধিপত্যের লড়াইয়ের বলি হচ্ছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ। দূর্গম এবং ভারত সীমান্তবর্তি হওয়ার কারণে নাড়াইছড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রনে নিতে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রায়ই বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ৩ মে নাড়াইছড়ি বাজারটি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পরে কিছু বাড়িও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিসংযোগের ঘটনার জন্য জেএসএস (সন্তু) এবং ইউপিডিএফ পরষ্পরকে দায়ী করে। দুই পক্ষই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার বাসিন্দাদের চাল-চলনসহ সকল কর্মকান্ড বন্ধ করে দেয়। ফলে খাদ্য সংকট দেখা দেয় এলাকাবাসীর মধ্যে। ফলে বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচাতে তারা ভারতে পালিয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় সূত্র দাবী করেছে উপজাতীয় জঙ্গী সংগঠনগুলোর সৃষ্ট অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে জীবন বাঁচাতেই তারা সীমান্ত অতিক্রম করেছে। সংশ্লিষ্ট বাবুছড়া ইউপি চেয়ারম্যান সুগতপ্রিয় চাকমা জানান, নাড়াইছড়িতে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে স্থানীয় মেম্বারের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না; আর বিষয়টি তিনি নিশ্চিত হতে পারেন নি।

অপরদিকে বিজিবি সূত্র পতাকা বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, প্রায় ৩০ পরিবার সীমান্ত অতিক্রম করেছে বলে দাবী করলেও তাদের তালিকা দিতে পারেনি বিএসএফ। শুক্রবারের বৈঠকে তালিকা দিতে বলা হয়েছে এবং সরেজমিনে খোঁজ করে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা চলছে।

দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলুল জাহিদ পাভেল পার্বত্যনিউজকে বিজিবি’র বরাত দিয়ে জানিয়েছেন শুক্রবার বিজিবি ও বিএসএফে’র পতাকা বৈঠকের কথা এবং তা সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন থেকে সকল ধরনের চেষ্টা চালিয়ে হচ্ছে।

এদিকে ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের প্রধান সমন্বয়ক প্রদীপন খীসা আজ বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপ দীঘিনালার নাড়েইছড়ি থেকে নিরীহ গ্রামবাসীদেরকে অস্ত্রের মুখে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে নিয়ে গিয়ে সেখানে তাদেরকে দিয়ে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

তিনি সন্তু গ্রুপের এই অপকর্মের নিন্দা জানিয়ে বলেন, সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ২১এপ্রিল ও ২৬ মে দুই দফায় নাড়েইছড়ির দেওয়ান পাড়া, থুলিছড়া, দজর-হোগেয়্যাতলি ও চোদ্দেংছড়া গ্রামের লোকজনকে জোর করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে নিয়ে যায়।

বিবৃতিতে আরও বলাহয়, নাড়েইছড়ি বাজার চৌধুরী মাচ্য চাকমাকে ২৪এপ্রিল সন্তু গ্রুপের এক কমান্ডারের লেখা চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আরো বলেন, “সন্তু গ্রুপ নাড়েইছড়ি এলাকার সাধারণ জনগণকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার ও দোকানপাট বন্ধ রাখার লিখিত নির্দেশ দেয় এবং নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে বলে হুমকী দেয়। এলাকার জনগণ তাদের সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করলে তারা ৩ মে নাড়েইছড়ি বাজার সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেয়। এর ফলে সেখানে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিলে এক মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়, যা দেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।”

প্রদীপন খীসা বলেন, সন্তু গ্রুপ পাহাড়ি গ্রামবাসীদেরকে ত্রিপুরায় নিয়ে গিয়ে তাদেরকে দিয়ে এই বলে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে যে, ইউপিডিএফ ও বিজিবির গুলি বর্ষণের কারণে তারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তিনি নাড়েইছড়ি এলাকার জনগণের এই দুর্দশার জন্য সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র জঙ্গীদের পোড়াবাড়ী নীতিকে দায়ী করে বলেন, ‘আন্দোলনের নামে তারা কেবল জনগণের হাড়ি পাতিল ভেঙে দিতে ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে ওস্তাদ। তারা জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম না করে বিনা কারণে নিজের ভাইকে গুলি করে হত্যা করছে। ইউপিডিএফ নেতা সন্তু লারমাকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ভুল পথ পরিহার করে কৃত অপরাধের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে শরীক হওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, খোঁজ নিয়ে জেনিছি ৩২ থেকে ৫০ পরিবার সীমান্ত অতিক্রম করেছে। গত ৩ মে নাইড়াছড়ি বাজার পুডে দেয় ইউপিডিএফ এই কারনেই তারা এলাকা ত্যাগ করেছে। ইউপিডিএফ নিজেদের দোষ চাপানোর জন্যই গণমাধ্যমে অন্য দলের নামে মিথ্যা-বানোয়াট বিবৃতি দেয়।
 
ত্রিপুরার পত্রিকায় সংবাদ
আগরতলা থেকে প্রকাশিত বিজনেস ষ্ট্যান্ডার্ড নামের ইংরেজী পত্রিকা বুধবার এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রচার করে। পত্রিকাটি দাবী করেছে, পার্বত্য খাগড়ছড়ি জেলার বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বি চাকমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের উপজাতীয় ২৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু সোমবার ভারতে পারি জমিয়েছে। সোমবার পরিবারগুলো সীমান্ত অতিক্রম করে গান্দাছড়া এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। বিষয়টি সেখানকার স্থানীয় কতৃপক্ষ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।

অপরদিকে, বাংলায় প্রকাশিত (ভারতীয়) দৈনিক সংবাদে, পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতি দাঙ্গা: শরণাথী  স্রোত গগুছড়ায়! এমন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। তবে একই সাথে পত্রিকাটির মূল ইস্যু আড়াল করে পুরো সমস্যাটি জাতিগত দাঙ্গা হিসেবে মন্তব্য করেছে।

পানছড়ি সেজেছে বৈসাবি সাজে: চলছে খুশীর জোয়ার

8-4-14 PIC

পানছড়ি প্রিতিনিধি, খাগড়াছড়ি:

পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি ঘিরে পানছড়ির সর্বত্র লেগেছে উৎসবের আমেজ।  প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় বাজছে উৎসবের সূর। ধনী-গরিব সকলের ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের প্রস্তুতি। আর যেন বসে থাকার সময় নেই, খুব কাছাকাছি তাই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাদের মাঝে বিরাজ করছে খুশীর জোয়ার। উৎসবের আনন্দে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আর মুসলিম যেন জাতিগত সব বিভেদ ভুলে মিলবে এক কাতারে- এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে? তাই পাহাড়ের এই উৎসব ভুলিয়ে দেয় জাতিগত বিভেদ। সবাই ভুলে যায় কে পাহাড়ী বা কে বাঙ্গালী। সবাই মেতে উঠে উৎসবের অনাবিল এক আনন্দ আয়োজনের জোয়ারে। তৈরী হয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। সব মিলে জাতিগত ভেদাভেদের শেকড়কে উপড়ে সকলের আন্তরিক উপস্থিতিতে আরো প্রানবন্ত হয়ে উঠে বৈ-সা-বি’ উৎসব।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই ও চাকমা সম্পদায়ের বিজু নিয়েই বৈ-সা-বি। আগামী ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে বৈ-সা-বি উৎসব। ১২এপ্রিল ফুল বিজুর মধ্যে সূচনা পর্ব শুরু হবে বৈ-সা-বি’র। ১৩ এপ্রিল নববর্ষের আগের দিন হারি বৈসু পালন করে বর্ষবরণ করবে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী আর নববর্ষের প্রথম দিন থেকে মারমা সম্প্রদায় সূচনা করে সাংগ্রাইয়ের।

এ নিয়ে উপজেলা সদর বাজারে কেনা কাটারও ধুম লগেছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের মনে লেগেছে খুশীর আমেজ সবার আবদার বাহারী ও রঙিন পোশাক  চাই। তাই উপজেলা সদর বাজারের দোকানগুলোতে লেগেছে কেনা-কাটার ধুম।  বাজারের নোয়াখালী মার্কেটের কসমেটিকস ও জুয়েলারী দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভীড়। তাই দোকানীরাও যেন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

বৈ-সা-বি’তে আরো জমজমাট চলছে পানছড়ি সবজি ও শুটকি বাজার। হরেক রকম তরকারী দিয়ে পাঁচন রাধতে কাঁচা সবজির জুড়ি নেই। যে যত বেশী সবজি দিতে পারবে ততই মজা তাই কাঁচা সবজি, সাথে কাঁচা কাঁঠাল ও শুটকি কেনা প্রতিযোগিতার দৃশ্যগুলো চোখে পড়ার মত। পানছড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ঝর্ণা চাকমার সাথে সবজি বাজারে আলাপকালে তিনি জানান কমপক্ষে ত্রিশটি কাঁচা সবজি মিশিয়ে পাঁচন রান্না করবেন।

এনিয়ে বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় আয়োজন চলছে বিভিন্ন খেলাধুলার। ঐতিহ্যবাহী খেলা-ধুলা নিয়ে মেতে উঠবে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষরা। তাই আনন্দের সীমা নেই চলছে খেলা-ধুলা প্রাথমিক প্রস্তুতি। সরেজমিনে পানছড়ি চৌধুরী পাড়ায় দেখা যায় ক্যাপ্রুচাই মারমা, ল্যাপ্রুচাই মারমা ও অংজ মারমারা  নববর্ষ  মারমা ভাষায় (নঅজ) প্রস্তুতি পর্ব সেরে নিচ্ছে। চেংগী নদীতে ফুল ভাসিয়ে (খিয়াংমা প্রেং রইতে) মারমা ভাষায় বর্ষ বরণ করার ওয়ার্মআপ করে নিচ্ছে উখেচিং চৌধুরী, মাসাতিং চৌধুরী, ম্রাসানু মারমা, পাইনুপ্রু মারমা, পেংক্রাচিং মারমা ও চোয়াপ্রু মারমারা। সেই সংগে থাকছে মারমাদের ঐতিহ্যবাহী “দ” খেলা “পানি” খেলা, “খুয়াং” খেলা।

এই বর্ষবরণে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাদের পাশাপাশি বাঙ্গালীরাও করে থাকে ব্যাপক আয়োজন। বিশেষ করে পাঁচন রান্নায় বাঙ্গালী বধুরাও যথেষ্ট পারদর্শী। সব মিলেয়ে এবারের বৈ-সা-বি’তে পানছড়ি যেন সাজছে এক বর্ণিল সাজে। যা শুরুর আগেই পাড়ায়-পাড়ায় বইছে আনন্দের জোয়ার। এ ব্যাপারে সকলের আন্তরিকতা সহযোগিতা কামনা করছেন পানছড়ির অভিজ্ঞ মহল।

সংগীতা চাকমা

সংগীতা চাকমা

এক.

বিয়ের পর প্রথমেই ওরা এসেছে সিলেট- তূর্যের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়। তূর্য-সংগীতাকে ওরা বেশ সাদরে গ্রহণ করেছে তূর্যের এই দূর সম্পর্কের মামারা। ‘ওমা! কত্তো সুইট!’  বলে তূর্যের মামাতো বোনেরা সংগীতার দু’ হাত ধরে ঘরে নিয়ে যায়। ‘হানিমুন কাটাতে সিলেট এসে গেছে! বাহ! কত প্ল্যান!’- বলে পাশ থেকে টিপ্পনি কাটে তূর্যের আরেক বোন। লজ্জায় লাল হয়ে উঠে নব বিবাহিতা সংগীতার মুখ।

জাফলং-সিলেট। দিগন্ত জুড়ে অনাবিল সৌন্দর্য খেলা করছে। চারপাশে ছোট-বড় নানা রঙের পাথর। দেখে মনে হবে যেন স্রষ্টা নিজের হাতে পাথরগুলোকে এভাবে নিখুঁত ভাবে সাজিয়ে রেখেছেন। একটু নাড়ালেই বুঝি উলট-পালট হয়ে যাবে সেসব। নীচের পাহাড়ের ঢালে কুলকুল ধ্বনিতে প্রবাহিত হচ্ছে স্বচ্ছ জলধারা।
আরও উপরের পাহাড় থেকে এই স্বর্গীয় সৌন্দর্য যেন কাশ্মীরের সৌন্দর্যকেও হার মানায়। উপরের ছোট্ট টং ঘর থেকে এ সব কিছু মুগ্ধ দৃষ্টিতে অবলোকন করছে তূর্য আর সংগীতা। সদ্য বিবাহিত দম্পত্তি ওরা।

শাহ জালাল আর শাহ পরানের মাজার, চা বাগান, সাস্ট- অনেক কিছু ওরা ঘুরলো এই ক’ দিনে। আজ ওরা এসেছে জাফলঙে। ওদেরকে এই পাহাড়ের চূড়ার টং ঘরে একা থাকতে দিয়ে তূর্যের মামাতো ভাই বোনেরা অন্য দিকে গেল। আবহাওয়াটাও আজ কেমন যেন রোমান্টিক। সংগীতাকে তূর্য বলেই ফেললো,

‘এই তোমার হাত দুটো মেল দেখি!’

 অবাক হয়ে গেল সংগীতা! বলে উঠলো, ‘কেন?!’

 ‘আহা! করোই না একটু!’ – তূর্যের কন্ঠে অধৈর্যের সুর। একই সাথে তূর্যের চোখেও যেন কেমন এক কোমল চাহনি দেখতে পেল সংগীতা। একেই সম্ভবত ভালোবাসা বলে। অগত্যা দুরু দুরু বুকে চোখ বন্ধ করে দু’ হাত মেলে দিল ও। পেছন থেকে সংগীতাকে জড়িয়ে ধরলো তূর্য আর কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল,

‘টাইটানিকের সিনটা নকল করলাম’!

‘তাই, না?’- বলে তূর্যের বুকে দমাদম কিল-ঘুষি মারতে লাগল সংগীতা। কোমল হাতের ঘুষি খেয়ে তূর্যের মুখে হাসি আর ধরে না। সেই হাসি দেখে আরেকবার মুগ্ধ হয় সংগীতা, মনে পড়ে ওর, এই হাসি আর এই কোমল চোখ দেখেই অচেনা-অজানা এক বাঙালি যুবক তূর্যের প্রেমে পড়েছিল ও। কেমন যেন অমোঘ আকর্ষণে এ দুটো চোখ ওকে তূর্যের সাথে বেঁধে ফেলেছিল  আষ্টেপৃষ্ঠে।

 img-thingব

দুই.

মুহূর্তেই তূর্যের চোখের চাহনির ভেতর দিয়েই একসাথে অনেক কথা মনে পড়ে যায় সংগীতার। ও রাঙ্গামাটির মেয়ে, চাকমা, সংগীতা চাকমা। বান্ধবীদের সাথে হেসেখেলেই দিন চলে যাচ্ছিল। অসম্ভব সুন্দরী আর মায়াবতী সংগীতার দিকে চোখ পড়েছিল তাদের পাড়ার অনেকেরই, কাউকেই পাত্তা দেয়নি ও। একদিন বলা নেই কওয়া নেই, পাড়ার হেডম্যানের একমাত্র ছেলের বিয়ের প্রস্তাব আসে সংগীতার বাবার কাছে। তখন সবে মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে সংগীতা। এই বয়সে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজী হননি ওর বাবা কমলকিরণ। মেয়েকে তিনি আরও পড়াতে চান। আর তা ছাড়া হেডম্যানের ছেলেটা পাড়ার বহু গরিব ঘরের মেয়ের সম্ভ্রমে থাবা দিয়েছে। হেডম্যানের ছেলে বলে কেউ কিছু বলতেও পারে না! কিন্তু কমলকিরণ হেডম্যানকে সরাসরি না করে দিলেন। তবুও হেডম্যান অনড়। কমলকিরণও কম প্রভাবশালী নয়। সন্তু লারমার সাথে খাতির আছে। ক’দিন আগে সন্তুকে ধরে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনে সুপারিশ করিয়ে বড় ছেলেকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়েছেন। সুপারিশের জন্য গেলে সন্তু একগাল হেসেছে!

হাসতে হাসতে বললো, ‘কমলকিরণ, তুমি তো দেখি কোন খবরই রাখো না! ছেলেকে উচ্চ শিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পাঠাবে, এর জন্য আমার সুপারিশের কি দরকার! গিয়ে দেখো, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন তোমার ছেলের নামের শেষের উপাধী আর চেহারা দেখেই ভিসা অ্যাপ্রুভ করে দেবে। না হয়, আমার কথা বললেই হবে!’ সত্যিই ছেলেকে ওরা খুব সহজেই ভিসা দিয়েছিল, ছেলে এখন অস্ট্রেলিয়ায় দিব্যি পড়াশুনা করছে। তবুও কমলকিরণের ধারণা, নিশ্চয়ই সন্তু অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনে ওর ছেলের জন্য সুপারিশ করেছে, নয়তো এত সহজে এই ছেলের ভিসা এপ্লাই অ্যাপ্রুভ হত না। হাইকমিশনের বিশেষ ব্যবস্থায় অস্ট্রেলিয়ান একটা ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তিও পেয়ে গেছে! এবং সেই জন্য সে সন্তুর কাছে চিরকৃতজ্ঞ। সন্তুকে সে কথা দিয়ে এসেছে, এবার থেকে সন্তুর টোকেন আদায়কারী যাতে আশেপাশের গাঁয়ের সকলের কাছ থেকে ভালো উপরি পায়, সেই দিকটা সে দেখবে।

তাই সংগীতাকে হেডম্যানের ছেলের হাত থেকে বাঁচাতে এতটুকুও বেগ পেতে হয়নি কমলকিরণকে। এদিকে ক্লাস নাইনের চঞ্চল আর মিষ্টি সংগীতা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হলো। কলেজে বান্ধবীরা সকলে এসে ঝাঁক বেঁধে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে নতুন ঝামেলা তৈরী হলো। রাঙ্গামাটি কলেজে হঠাৎ একদিন পাহাড়ি-বাঙালি উত্তেজনা সৃষ্টি হলো! কলেজে আসার পথে এক বাঙালি ছেলেকে মারধোর করেছে কারা যেন। কলেজের বাঙালি ছেলেরা সে জন্য উত্তেজিত। এদিকে পাহাড়ি ছেলেরাও থেমে নেই। পাশের কলেজ হোস্টেলটা কয়েক বছর ধরেই ওদের দখলে।

কলেজের ওপাশের দোতলা থেকে সংগীতা স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে হোস্টেলের পাশের জঙ্গলে মোটা মোটা লাঠি নিয়ে প্রস্তুত তার জাতি ভাইয়েরা। তাদেরকে কী কী যেন বলছিল সুগত দা। চাকমা ভাষায় বাঙাল খতমের শপথ নিচ্ছিল সবাই যেন। সংগীতা রাজনীতি বুঝে না, হানাহানি পছন্দ করে না। খুব ভয় পায় রক্ত আর অস্ত্রকে। একবার সন্তু কাকার সাথে সুগত দা এসেছিল তাদের বাসায়। সন্তু কাকার পাশের বডিগার্ডের ভয়ালদর্শন অস্ত্র দেখে তার মূর্ছা যাবার দশা। সন্তু কাকা হেসে হেসে অনেকবার গায়ে হাত বুলিয়ে অভয় দেবার চেষ্টা করলেন, তবুও উল্টো সংগীতা যেন আরও কুঁকড়ে যাচ্ছিল। এরপরেও বহুবার বিভিন্ন কারণে তাদের বাসায় এসেছিল সুগত দা।

হঠাৎ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠল কলেজ ক্যাম্পাস। সংগীতা আর ওদের বান্ধবীরা কেউই বের হতে পারছে না কলেজ থেকে। হঠাৎ করে কলেজ হোস্টেলের জঙ্গলের ওদিক থেকে মুহুর্মুহু কান্তাগুলি ছোড়া হল উল্টোদিকের শহীদ মিনারে কাছে অবস্থানরত বাঙালি ছেলেদের দিকে। একটা বাঙালি ছেলের মাথা ধরে হঠাৎ সঙ্গীরা হৈ হৈ করে চিৎকার শুরু করল, মাথা ফেটে গেছে ছেলেটার। বেশ কিছুক্ষণ ওখানেই রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা শুরু হল। ছেলেটার কপালে পট্টি বেঁধে একটা গাছের নীচে বসিয়ে রাখা হল। সংগীতাদের দোতলা থেকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ছেলেটাকে। কেমন যেন মায়াবী ছেলেটার চোখ, কী ভেবে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল সে ছেলেটার দিকে। হঠাৎ শুরু হয়ে গেল ইট-পাটকেল নিক্ষেপ! এ এক গগণবিদারী অবস্থা।

এরপরের অবস্থা যেন নরকের বিভীষিকাকেও হার মানায়। মুহুর্তের ভেতর মারামারি শুরু হয়ে গেল পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে। দা আর কিরিচ নিয়ে হল থেকে বের হলেন সুগত দা আর তার কিছু সঙ্গী। এরপর রীতিমত রক্তারক্তি কাণ্ড। ঐ ছেলেটার কপালের রক্ত কিছুতেই বন্ধ করা গেল না, ভয়ঙ্করভাবে রক্তে ভেসে গেল তার গোটা মুখ! ছেলেটা কি মারা যাবে? সেদিন আবারও মূর্ছা গেল সংগীতা। রক্ত সে একদমই সহ্য করতে পারে না। এরপর আর কিছু মনে নেই তার।

images

তিন.

তূর্যের বুকের ভেতর হঠাৎ করেই শিউরে উঠল সংগীতা। আর চিন্তা করতে ইচ্ছে করছে না তার। তূর্যও বুঝতে পারছে। তাই বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে তার প্রেয়সীর ভয়ার্ত মুখ। যেন শপথ করেছে, জগতের সব অপশক্তির কাছ থেকে দূরে রাখবে সে সংগীতাকে। বাসায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। তূর্যের মামাত বোন সোনিয়া আর সামিয়াদের সামনে একটু অপ্রস্তুত অবস্থায়ই পড়তে হলো ওদের। তা দেখে দৌড়ে ভাগলো সামিয়ারা। তবুও দ্রুত সামলে নিল ওরা। সন্ধ্যা নামছে জাফলং-এর বুকে। অপরূপ সুন্দর দূরের জাফলং এর পাহাড় রাশির মাঝে অস্তমিত সূর্যকে দেখে বারবার নিজ গ্রামের কথাই মনে পড়তে লাগল সংগীতার। নিজ গ্রামের কথা ভাবতে গিয়ে হঠাৎ করে নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস নেমে এল ওর।

সন্ধ্যার সাথে সাথে আস্তে আস্তে শীত নামছে। বছরের এই সময়টায় সিলেটে বেশ শীত পড়ে। জাফলং-এ রীতিমত হিমশীতল শীত। ইতোমধ্যেই ব্যাগ থেকে শীতের পোষাক পরে নিয়েছে ওরা দু’ জন। তবুও তূর্যের বুকের উষ্ণতা মিস করতে লাগল সংগীতা। সেটা আঁচ করতে পেরেই কিনা কি জানি, তূর্য শাল-চাঁদরটা সংগীতাসহ নিজের সাথে জড়িয়ে সংগীতার মাথা নিজের বাহুতে এলিয়ে নিয়ে একসাথে পথ চলতে শুরু করল। সংগীতা আরও একবার অনুভব করল, কিছুদিন আগেও অচেনা-অজানা থাকা এক বাঙালি যুবকের অসীম ভালোবাসা। নিজেকে আজ খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে ওর।

আজ ওরা এল মাধবকুন্ড ঝর্ণায়। অনেকবার ঝর্ণা দেখেছে সংগীতা, পাহাড়ি ছলছলে কলকলে ঝর্ণা। তবুও এসেছে সবার অনুরোধ না ফেলতে পেরে। বছরের এ সময়ে ঝর্ণায় তেমন একটা পানি থাকে না, এখানেও খুব নেই। ঝর্ণার উদ্দামতা দেখা যায় বর্ষায়। ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনটা বিষাদে ছেয়ে গেল সংগীতার। আবারও ফিরে গেল ভয়ঙ্কর আর মধুর স্মৃতিগুলো রোমন্থনে।

চার.

জ্ঞ্যান ফেরার পর সংগীতার আর কিছুই মনে নেই। শুধু মনে পড়ল মাথা ফেটে যাওয়া সেই বাঙালি ছেলেটার কথা। ঘন লাল রক্তও তার মায়াবী চোখ দুটোকে আলাদা করতে পারছিল না। এই চোখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল ও। এখন পর্যন্ত জ্ঞান ফেরার পর সেই চোখের কথাই ভালো করে মনে আছে ওর। হঠাৎ করে লজ্জা পেল সংগীতা, এসব কি ভাবছে সে! অচেনা-অজানা কোথাকার কোন বাঙালি ছেলে। মন থেকে দূর করে দিতে চাইল ভাবনাটা। কিন্তু এই ভাবনাতে কেমন যেন একটা পুলক আছে, এই পুলকের অস্তিত্ব আগে কখনও টের পায়নি ও! তাই ইচ্ছে সত্ত্বেও ভাবনাটাকে দূর করাতে পারল না সংগীতা।

এদিকে কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, জানাল ওর বান্ধবী কলি। কথাটা শুনে কিছুটা মনক্ষুন্নই হয়েছে যেন ও। কলেজে যেতে কেন যেন আনচান করছে ওর মন। কেমন আছে ঐ ছেলেটা কি জানি। ও কি সুস্থ হয়ে উঠেছে? আচ্ছা অচেনা এক ছেলের জন্য ওর এত দরদ উথলে উঠছে কেন? তাও আবার বাঙালি! ভাবা যায়! নিজেকে সতর্ক করল সে। কিন্তু নিজেই যেন সেই সতর্কবানীকে থোড়াই কেয়ার করল। কলেজে ওর যেতে হবেই হবে। কবে খুলবে কলেজটা?

ঠিক তিন দিন পরই সুখবরটা পেল সংগীতার কাছে, কলেজ খোলা হয়েছে। এই তিনটা দিন যেন তিনটা বছর ছিল সংগীতার কাছে। নিজে নিজেই খুশিতে কয়েকবার লাফ দিয়ে উঠেছে ও, বিষাদময় মুখে আনন্দের ফোয়ারা ফুটছে যেন। পরেরদিন বেশ দ্রুতই রেডি হয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হতে চাইল সংগীতা। বাঁধ সাধলেন বাবা, বললেন কলেজের পরিস্থিতি আরও শান্ত হোক। কলেজের পরিস্থিতি গোল্লায় যাক– মনে মনে ভাবল ও। কিন্তু বাবার কথার পেছনে একটি কথাও উচ্চারণ করতে পারল না সে। নিজের রুমে এসে ছোট্ট বালিকাদের মত ফুঁপিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ ও। আরও দুইদিন পর অনুমতি মিলল, এবার কলেজে যাওয়া যেতে পারে। নিজের কাছে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, ঐ অচেনা বাঙালি যুবকের প্রেমে পড়েছে সে।

এতদিনের সৃষ্ট বিরহ যে কখন প্রেমে রূপ নিয়েছে সেটা নিজেই সম্ভবত টের পায়নি এতদিন। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট- কথাটা আগেও অনেকবার শুনেছে ও। কিন্তু নিজের বেলায়ই সেটা রূপ নেবে এভাবে, সেটা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি ও। আজ যেন অনেকগুলো খুশির ছটা ওর মুখে যেন আছড়ে পড়ছে।

 2e51207bfcde3757d96e1cc4eb44bb54

পাঁচ.

অনেক উৎসাহ নিয়ে পরদিন কলেজে গেল ও। অকস্মাৎ মনের ভেতর একটা ভয় উঁকি দিয়ে উঠল। ঐ ছেলেটা আজ আসবে তো? সে আসলেই বা কি! সে তো জানে না সে ওকে ভালোবেসে ফেলেছে। আর জানলেই বা কি। সেও কি তাকে ভালোবাসবে? এরকম বহু প্রশ্ন জমা হতে লাগল তার মনে। বেশিদূর এগুতে হল না, ছেলেটিকে পাওয়া গেল বন্ধুদের সাথে আড্ডারত অবস্থায়। হাতে গিটারের টুং টাং, মসৃণ ঘন কালো চুলগুলো বাতাসের সাহায্যে বারবার ঢেকে দিচ্ছিল মায়াবী চোখ দুটোকে। তবে চোখের পাশের ব্যান্ডেজটা কিম্ভূতকিমাকার মনে হচ্ছে। আর তার হাসিটা এত সুন্দর কেন? তার সবকিছুই যেন ভালো লাগছে! প্রেমে পড়লে কি মানুষ এমন হয়ে যায়? মুগ্ধ চোখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল সে ছেলেটার দিকে।

আরে! এখনও ছেলে ছেলে মনে হচ্ছে কেন? ওর নামটাই তো জানা হল না। কী করা এখন? এই কিউট ছেলেটাকে তার চাইই চাই! কলির কথায় যেন সম্বিৎ ফিরে পেল ও।

‘কিরে তোকে এত অস্থির দেখাচ্ছে কেন? ভয় লাগছে?’ – কলির আন্তরিকতাপূর্ণ ডাক। আচ্ছা কলিকে কি ব্যাপারটা খুলে বলা যায়? ও আবার কাউকে বলে দেবে না তো? তাহলেই সর্বনাশ! মনের সাথে অনেকক্ষণ যুদ্ধ শেষে ও সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল, কলিকে সব খুলে বলবে সে।

‘কী!’ –সংগীতার কথা শুনে রীতিমত চিৎকার দিয়ে উঠল কলি!

‘তুই আর ছেলে পাসনি প্রেমে পড়ার?’ – কলির অবাক প্রশ্ন। কলির প্রতিক্রিয়া দেখে খুব ভয় পেয়ে গেছে সংগীতা। ও যদি আবার রেগে গিয়ে কাউকে বলে দেয়? কী ঘটবে চিন্তা করতেই মাথাটা ভনভন করতে লাগল ওর।

‘আমি তো ওকে ভালোবাসি, ভালোবাসা কি অপরাধ?’ – কলিকে সুধায় ও।

‘কিন্তু স্যাটেলার বাঙালিকে বাসা অপরাধ। তুই জানিস না এই কথা তোর বাবা অথবা পিসিপি’র ওরা শুনলে কী করবে? ঐ ছেলেকে আস্ত রাখবে ভেবেছিস?’ – কলি ওকে বুঝায়।

‘আমি জানি। আর জেনে শুনেই বিষপান করছি। আমি ওকে কতটুকু ভালোবাসলে এত বিপদকে তুচ্ছজ্ঞান করতে পারি, একবার ভেবে দেখ’ – সংগীতার মুখের কথা শুনে এবার দ্বিধায় পড়ে যায় কলি।

‘আমি তোকে ছাড়া আর কাউকে ভাবতেও পারছি না যে আমাকে হেল্প করবে। প্লিজ দোস্ত, একমাত্র তুইই পারবি আমার ভালোবাসা সত্যি করতে। বুদ্ধ তোর অনেক মঙ্গল করবে…প্লিজ’ – সংগীতার কন্ঠে আকুতি। সংগীতার চোখে এরকম আকুতি কখনও দেখেনি আগে। বড্ড মায়াবী আর সুইট মেয়েটা এরকম করে বললে পাষাণের হৃদয়ও গলে যাবে। কলিও গলে গেল, আর তা ছাড়া সংগীতাকে সে প্রচণ্ড ভালোবাসে! বান্ধবীর এ সময়ে আসলেই আর কেউ সাহায্য করতে পারবে না সে ছাড়া। সেও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, যত যা-ই হোক, সংগীতাকে সে সাহায্য করবেই। ভয়ঙ্কর এক বিপদে নিজেকে জড়িয়ে নিল নিজেকে – উপলব্ধি করল কলি। তবে এ বিপদে নিজেকে জড়িয়েও এক তৃপ্তি আছে।

‘আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে’– পেছন থেকে কলির কণ্ঠ শুনে ফিরে তাকাল ছেলেটি, চোখে সন্দেহ। ‘দেখুন তূর্য দা, আমাকে ভুল বুঝবেন না, একটা কথা বলার আছে আপনাকে আমার। যদি পারেন একটু কলেজের পেছন দিয়ে যে লেক পেরিয়ে একটা মাজার আছে, সেখানে আগামী কাল বিকেল ৪ টায় দেখা করতে পারবেন?’ সন্দেহে ভ্রু কুঁচকে উঠে তূর্যের। একে তো কয়েকদিন আগের পাহাড়ি-বাঙালি দাঙ্গা হল, এখনও সেই ক্ষতের দাগ এখনো শুকায়নি তার শরীর থেকে। স্বাভাবিকভাবেই যেখানে একটা পাহাড়ি মেয়ের সাথে এক বাঙালি ছেলে আসলে সমস্যা আর হুমকিতে পড়ার সম্ভাবনা ব্যাপক, সেখানে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে তো আরও বিপজ্জনক ব্যাপারটা। তার উপর পাহাড়ি মেয়েদের এই মুহূর্তে বিশ্বাস করাটাও কঠিন, কখন কোন ফাঁদে পড়ে যাই, ঠিক নেই – একসাথে অনেক দুশ্চিন্তাই মাথায় ভর করল তূর্যের!

‘আমি জানি আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছেন, তবুও বলছি প্লিজ…আসুন, আপনার কোন ক্ষতি হবে না…’  – তূর্যের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই হয়ত কলি অভয় দেয়ার চেষ্টা করল। তূর্য খেয়াল করল, মেয়েটাকে অমন মনে হচ্ছে না, ভদ্রই মনে হচ্ছে। তবুও চুড়ান্ত কথা দিতে কেমন যেন করছে ভেতরে।

 ‘কেন?’ – জিজ্ঞেস করল সে।

‘প্লিজ…বিলিভ মি…আমি সব বলব আপনাকে…কিন্তু এখানে বেশিক্ষণ কথা বলাটা ঠিক হচ্ছে না…ইতোমধ্যেই সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে অনেকে…’- আকুতি ঝরে পড়ল কলির কন্ঠে।

‘আচ্ছা দেখি…চেষ্টা করব আসতে…’- জানাল তূর্য।

‘কি!’ – শুনেই চমকে উঠল সাগর, তূর্যের জিগরি দোস্ত! চোখ দুটো গোল আলুর মত বড় করে আরও বলল,

‘তোর মাথা কি খারাপ হয়েছে নাকি রে?! তুই মামা নিজেও মরবি, আমারেও মারবি! কোথাকার কোন চাকমা মেয়ে তোরে ডাকছে, আর তুইও একেবারে…’ – সাগরের চোখে ভয় আর তিরস্কার!

‘আরেহ মামা! মেয়েটারে খারাপ মনে হয় নাই, ভালোই মনে হইলো। আর মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কোন কথাই বলতে চাচ্ছে।

‘ঐ যে কি জানি নাম…কলি…কলিরে চিনস না? ওই মেয়েটা’। -কলির পক্ষ নেয় তূর্য।

কলির কথা শুনে এবার দ্বিধায় পড়ে যায় সাগর। কলি মেয়েটা ভালো, বেশ ভদ্র। সবার সাথে অনেক হাসিখুশি থাকে, বাঙালি-পাহাড়ি নিয়ে সংকোচ নেই – কয়েকদিন লুকিয়ে লক্ষ্য করার ফল এসব অনুসিদ্ধান্ত! মেয়েটাকে কেমন যেন ভালো লাগে সাগরের। অবশ্য ভয়ে কাউকে বলেনি, এমনকি নিজের বন্ধুদেরও না। কিন্তু কলি তূর্যের সাথে দেখা করতে চায় কেন? তবে কি কলি তূর্যকে পছন্দ করে?! হায় আল্লাহ! ধুর! কি সব বাজে চিন্তাভাবনা মাথায় আসছে – ভেবে নিজের উপর বিরক্ত হল সাগর। মেয়েটা কী বলতে চায় শুনা উচিৎ।

 ‘ওকে…বাট সতর্ক থাকতে হবে…পোলাপাইনরে দিয়া আগে থেকে রেকি করিয়ে রাখতে হবে…তারপর পাহারার ব্যাবস্থা করতে হবে’ – সাগর এখনও বিশ্বাস করতে রাজী না।

‘নাহ! দোস্ত! চাক্কুগো আনাগোনা দেখলাম না’ – ফোনে জানাল সায়েম, তূর্য আর সাগরের বন্ধু। সায়েম, তালহা আর রনি গিয়েছিল মাজারটা রেকি করতে! এটা একসময় মাজার থাকলেও এখন একটা প্রাসাদ! কে যেন চারদিকে কাপ্তাই লেকের বিশাল জলরাশির মাঝের ছোট্ট দ্বীপটাতে বিকট এক প্রাসাদ নির্মাণ করেছে, একেবারে সাদা ফকফকা! জায়গাটা ভয়াবহ সুন্দর। লেকের নীল জলরাশির ওপাশে ক্যান্টনম্যান্টের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। কলি সেখানেই দেখা করতে বলেছিল তূর্যকে। মেয়েটার চেহারার আকুতি দেখে যেতে রাজী হয়েছে তূর্য। আর ঝুঁকি জেনেও, কৌতুহল তাদেরকে তাড়িয়ে ফিরল। যাবেই তারা, দেখতে চায় কী আছে এই আকস্মিক ও রহস্যময় আমন্ত্রণে। বিপদ এলেও সই।

সেই দ্বীপটাতে যাওয়ার সমস্ত পথে নজর রাখছে তূর্যের বিচ্ছু বন্ধুগুলো। নাহ! সন্দেহজনক কিছুই পেলনা তারা। যাওয়ার অনুমতি দিল তূর্যকে, সাথে যাবে সাগর। কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা দেবে তারা আর বাকীদের কেউ পাহারা দেবে, কেউ বা আশেপাশে অবস্থান নেবে। বিপদে পড়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এই দ্বীপের একপাশে লেকের জলরাশির পরই রাঙ্গামাটি আর্মি ক্যান্টনমেন্টের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। আধাঘন্টা পরপরই সেনাবাহিনীর দ্রুতগামী স্পিডবোট টহল দিচ্ছে। স্যাবোটাজের প্ল্যান থাকলে এই জায়গাটা বেছে নিত না সুগতের চ্যালাফ্যালাগুলো।

বিকেল ৩ টায় পূর্ব-পরিকল্পনামত কলি এসে ডেকে নিয়ে গেল সংগীতাকে। আজকে প্রাণভরে সেজেছে ও। অনেক সুন্দর লাগছে, সেটা নিজেও জানে সংগীতা। একটু লুকিয়ে যেতে হবে, কারও চোখে পড়লে সমস্যা। বাসা থেকে এক বান্ধবীর বাসায় যাবে বলে বেরিয়েছে। কলেজটা বিকেল চারটার রোদে খাঁ খাঁ করছে। পাহাড়ি-বাঙালি সমস্যাটার পর ছাত্রাবাসটা বন্ধ হয়ে আছে আপাতত। তাই আপাতত কারও চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কলেজে ঢুকবে, এমন সময় হঠাৎ করে সামনে পড়ে গেল সুগত দা! ঘটনার আকস্মিকতায় ভয় পেয়ে গেছে সংগীতা আর কলি।

সুগতও কিছুটা অবাক, তবুও তাকিয়ে একটা ভেতো হাসি দিয়ে কই যাচ্ছে তারা জানতে চাইল। থতমত করে কলিই জবাব দিল, সামনে একটা ফ্রেন্ড তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। সুগত দা কিছু সন্দেহ করেছে বলে মনে হল না। তবে লোকটার চোখ আর হাসিটার দিকে তাকাতে পারে না সংগীতা। কেমন যেন নিষ্ঠুরতা খেলা করে সেখানে। গতকালও একবার তাদের বাসায় এসেছে সে। যাই হোক, এই সুন্দর সময়ে এসব মন থেকে জোর করে দূর করে দিতে চাইল সংগীতা, এমনিতেই তূর্যের সামনে দাঁড়াতে হবে বলে কাঁপছে বুকটা, তার উপর নতুন ভীতি। তবুও আপাতত একটা প্যারা থেকে বাঁচা গেল বলে রক্ষে।

ছয়.

এই মেয়েটিকে দেখলেই ভেতরের এক পশু যেন জেগে উঠে সুগত চাকমার মনে। হিংস্র, বন্য এক পশু। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না সে। কমলবাবুর বাসায় এখন নিত্য আসা যাওয়া করে, কারণে-অকারণে। কেন আসা যাওয়া করে, সেটা কেবল সে নিজেই বুঝে, এমনটা ভাবা ভুল হবে। অথচ, মূল কাজে এগুতে পারল না একটুও। সুগতের এখন যে প্রভাব, ভবিষ্যৎ নিশ্চিত উজ্জ্বল, একথা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়। এই বয়সে রাঙামাটি কলেজের পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বা পিসিপি’র সভাপতি। ভবিষ্যতে যে জনসংহতি সমিতি’র ভালো পোস্টে যাবে, এটা সুগতও ভালো বোঝে। সন্তু বাবুও ভালো চোখেই দেখে।

নতুন এলাকায় রশিদ আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছে। এই বয়সে এমন দায়িত্ব সাধারণতঃ দেয়া হয় না। কলেজেও দাপট দেখানো যাচ্ছে, বাঙ্গাল-বিরোধী সেন্টিমেন্ট দারুণ ভাবে কাজে লাগছে। কলেজ কর্তৃপক্ষও এখন তার কথা মেনে চলতে বাধ্য হয়। কলেজে সকলে ইউনিফর্ম পরে যাবে – কর্তৃপক্ষের এমন নায্য সিদ্ধান্তও গায়ের জোরে ঠেকিয়ে নিজের প্রভাবের প্রমাণ দিয়েছে আরেকবার। তার নিজ এলাকা রাজস্থলিতেও বেশ প্রভাব-বলয় তৈরী করেছে। চাইলেই টাকা, নারী, অস্ত্র – সব পাচ্ছে।

সাংবাদিকদের সাথেও ভালো খাতির। ডিসি অফিসের নিরাপত্তা সংক্রান্ত মিটিং-এ অংশ নিয়েছে বেশ কয়েকবার। বোঝায় যাচ্ছে প্রশাসনও তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এখনই পাক্কা পলিটিসিয়ান হয়ে উঠছে সে। কমলকিরণের মত পাবলিককে তোয়াজ না করলে কিচ্ছু আসে যাবে না সুগতর। কিন্তু মেয়েটা তো কমল বাবুরই। সমস্যাটা সেটাই। নাহ! কমলবাবুর উপর নির্ভর করার কী দরকার? নিজেই তো কাজে নেমে পড়ে যেতে পারে। আর কারও বেলায় এত দেরী করেনি সুগত। এর বেলায় একটু রয়ে সয়ে শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা শালার পাত্তাই দিচ্ছে না। আঙ্গুল বাঁকা করতে হবে – আঞ্চলিক পরিষদের গেস্ট হাউজের দিকে যেতে যেতে ভাবছে সে।

 সাত.

নির্জন ছোট্ট দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছে তূর্য আর সাগর। প্রায় ১৫ মিনিট হতে চলল ৪ টার পর, এখনও কোন খবর নেই। সময় যাচ্ছে না যেন! হঠাৎ করে মনে হল একটা ডিঙ্গি নৌকা এদিকেই আসছে। হ্যাঁ, সেখানে পাহাড়ি ড্রেস পরা দুইজন মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আসবে তো কেবল কলি, সাথে আরেকজন কে? আস্তে আস্তে চেহারাটা স্পষ্ট হল তূর্যের কাছে। এই মেয়েটাকে আগেও দেখেছে সে! এই তো সেই মেয়েটা! সেদিন সংঘর্ষের সময় রক্তাক্ত অবস্থায় যখন, গাছের নীচে বসে ছিল তূর্য, তখন এই মেয়েটাই তো নিস্পলক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ করে অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছিল! এই মিষ্টি চেহারা কি ভুলা যায়?

ডিঙ্গি থেকে নামল ওরা দু’ জন। এসেই কলি ক্ষমা প্রার্থনার সুরে বলল,

‘দেরি হওয়ার জন্য সরি’।

‘না ঠিক আছে। সমস্যা নেই’ – বলে ওকে আশ্বস্ত করল সাগর। তূর্যের সেদিকে খেয়াল নেই। সে তাকিয়ে আছে পাশের মেয়েটার দিকে, মেয়েটা মাথা নিচু করে আছে। গালে যেন লজ্জায় রক্ত জবার মত লাল আভা ফুটে উঠেছে। তূর্যের এমন অবস্থা বুঝতে পেরে বিব্রত সাগর, গলা পরিস্কার করার শব্দ করে বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনল সে তূর্যকে।

‘চলুন প্রাসাদের ওদিকটায় যাই?’ – বলে পরিবেশটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল কলি।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। চলুন – বলে পথ দেখাল যেন সদ্য দুনিয়াতে ফিরে আসা তূর্য! সেটা দেখে নিঃশব্দে মুচকি হেসে উঠল সংগীতা।

‘তো আসল কথা শুরু করি?’- বলল বিপদের আশংকায় উদ্বিগ্ন সাগর।

‘হ্যা…ইয়ে…আসলে কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না…’ – বলল কলি।

‘শুরু করুন শুরু থেকে। সিজারকে এই কথাই তো বলেছিলেন কিং অভ হার্টজ’ – কলির মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে বলল তূর্য। আড়চোখে দেখছে সংগীতাকে বারবার। আর সংগীতা এখনও মুখ তুলে চাইতে পারেনি একবারও।

‘আসলে ব্যপারটা শুরু হয়েছে সেদিনের গোন্ডগোলের দিন থেকে…’ – কলি বলতে শুরু করল।

‘কোন ব্যাপারটা?’ – জানতে চাইল সাগর।

‘আসলে সেদিনের গোন্ডগোলের পর থেকে আমার বান্ধবী সংগীতা তূর্য দাদাকে পছন্দ করে ফেলেছে, সেটা এখন রূপ নিয়েছে অব্যক্ত ভালোবাসায়…’ – এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল কলি। সাথে সাথে আশেপাশটা যেন আরও নীরব হয়ে গেছে, কারও মুখে কোন কথা নেই, শুধু মেহেদি পরা শুভ্র দু’ হাত দিয়ে মায়াবী মুখখানা ঢেকে ফেলেছে সংগীতা। একটা নীরব বোমা পড়েছে যেন স্থানটিতে। কথা বন্ধ হয়ে গেছে সাগর আর তূর্যের।

‘তূর্য দা, আমার বান্ধবী আপনাকে পাগলের মত ভালোবাসে। ওকে ভুলভাবে নেবেন না। শত বাঁধার মুখে পড়বে জেনেও আপনার ভালোবাসার হেমলক সে গ্রহণ করেছে। প্লিজ, তাঁকে ফিরিয়ে দেবেন না…’ – কলির কন্ঠ ভারী হচ্ছে কেন যেন। থ হয়ে গেল তূর্য কিছুক্ষণের জন্য! এসব কী হল! এমনভাবে সবকিছু হাতের কাছে ধরা দেবে ভাবতে পারেনি সে। স্বপ্ন দেখছে না তো? তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,

‘হ্যাঁ, আমি রাজী সংগীতা, আমি থাকতে চাই তোমার শুভ্র হাতখানি ধরে সারাজীবন’।

কিন্তু এত্ত সহজে বলতে ইচ্ছে করছে না! একটু ভারী হতে হবে, কিন্তু ভাষার যেন তখন ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। আর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে সংগীতার, সাড়া দেবে তো তূর্য? আচমকা সংগীতার মনে হলো, ওর কোমল হাতখানি রুক্ষ আর কঠোর কিছুর স্পর্শ পাচ্ছে। হ্যাঁ, ওর হাত ধরে ওরই সামনে হাটু গেড়ে বসে তূর্য বলেই ফেলল,

‘আমি ভালোবাসি তোমায়’। সামান্য কয়েকটা শব্দ, কিন্তু রীতিমত রোমাঞ্চের কম্পন বইয়ে দিল সংগীতার শরীরজুড়ে, চোখ দিয়ে কিছুটা অশ্রুও কি নয়? সেই অশ্রু ফোটা তূর্যের আঙুল মুছে দিল, এখন কি আর কাঁদার সময়?

il_570xN.445443508_5h5v

আট.

‘কী ভাবছ?’ – বলে ঘোরের জগত থেকে সংগীতাকে চমকে দিয়ে বের করে আনল তূর্য। ‘না কিছু না’– বলে স্মিত হাসল ও। বাবা-মা’কে ছেড়ে পালিয়ে এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে হয়তো মন টিকছে না সংগীতার, বারবার তাদের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে – এমনটা ভেবে সংগীতাকে অনেক সাপোর্ট দিচ্ছে তূর্য। সবসময় পাশেপাশে থাকছে। ‘চলো লক্ষীটি, যাওয়ার সময় হয়েছে’–  বলে সংগীতাকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল তূর্য।

আজ পহেলা ফাল্গুন। শীত শেষ, কিন্তু শীতের আমেজ রয়ে গেছে। সিলেট এমসি কলেজে জোড়ায় জোড়ায় ললনারা বাসন্তি শাড়ি পড়ে ফাল্গুন উদযাপনে এসেছে। এর মধ্যে সংগীতাকে যেন তাদের মাঝে বিশেষভাবেই আলাদা করা গেল। বাঙালি ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ, বাঙালি নারীদের যেই পোষাকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে, সেই শাড়ি পড়ে আজ এদিকে ঘুরতে এসেছে সংগীতা, সাথে তূর্য। মেয়েটাকে শাড়িতে অদ্ভুদ সুন্দর লাগছে– সংগীতাকে নতুন করে আবিস্কার করে তূর্য ভেতরে ভেতরে শিহরিত হলো। বলেও দিল তাকে কথাটি, লজ্জায় লাল হয়ে গেছে সংগীতার ফর্সা গাল।

চিবুক ধরে মুখটা তুলতেই যেন ক’টা অশ্রুফোটা দেখল তূর্য তার চোখে, জানে এই জল দুঃখের নয় বরং অপরিমেয় সুখের। মুছে দিল সে যত্ন করে প্রিয়তমার অশ্রুফোঁটা। বিশেষ করে অন্য জাতির হওযা সত্ত্বেও তুর্যের আত্মীয় স্বজনরা যে এতটা সহজে, এতটা আন্তরিকতার সাথে সংগীতাকে গ্রহণ করে নিয়েছে এটাই তাকে সবচেয়ে বেশী আপ্লুত করছে। শুধু আত্মীয় স্বজন কেন, মোবাইলে সে তুর্যের বাবা মায়ের সাথে কথা বলেছে। তুর্যই বলিয়ে দিয়েছে। খুব সহজে তারা সংগীতকে তাদের পরিবারের একজন হিসাবে মেনে নিয়েছে। এত সুখ কেন এই ধরায়? এত বেশি সুখ সহ্য হচ্ছে না যেন, আবার ভয়ও হয় সংগীতার এই সুখ কখনও হারিয়ে ফেলতে হয় যদি।

নয়.

নিজের রুমে সংগীতা। তূর্য কী কাজে যেন বাইরে গেছে। আবার মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা। অনেক চাইলেও এই সুখ-দুঃখে ভরা স্মৃতি রোমন্থন করতে ইচ্ছে করছে তার।…

সুগতের মনে হল, এইবার সময় এসেছে। একটু বাজিয়ে দেখতে হবে মেয়েটাকে। নয়তো আঙুল বাঁকা না করে উপায় নেই। মেয়েটা আগুনের মত, পাগল করে দিচ্ছে। চ্যালাপ্যালাদের কথাটা বলল সে। সবাই খুব মজা পেল। হেসে হেসে সমর্থন দিল। আজ সে সংগীতাকে শুভলং যাবার প্রস্তাব দেবে। শুভলং-এ কটেজের মালিকগুলো সব তার পরিচিত। একবার মেয়েটাকে বাগাতে পারলে হয়….।

এদিকে সায়েম কিছুতেই ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে বা মানতে রাজী নয়। তার ধারনা তূর্যসহ সকলকে ফাঁসাতে এটা চাকমাদের একটা চাল। ঐ মেয়েটা কমলকিরণ বাবুর মেয়ে সেটাও স্মরণ করিয়ে দিল, যার সাথে সন্তুর বেশ খাতির আছে বলে শোনা যায়।

‘তুই কি বলতে চাচ্ছিস, কমলকিরন বাবু আমাদের ধরার জন্য নিজের মেয়েকে লেলিয়ে দেবে?’ –প্রশ্ন ছুড়ল তালহা।

‘আর কমলকিরণ বাবু তো রাঙামাটি সদরের লোক না, কয়েকদিন আগের ঝামেলায় তার কোন সম্পৃক্ততাও নেই। সে তো জেএসএস– এর কোন পদে টদেও নেই। সে এসবে নাক গলাতে যাবে কেন?’ – তালহাকে যুক্তিপূর্ণ সমর্থন দিল রনি। সবাই মিলে আলোচনা করছে। সায়েম, তূর্য, সাগর, তালহা, রনি, আবরার আর ফারুক।

‘আমি এত কিছু বুঝি না মামা, আমি ওরে ভালোবাসি ব্যস! ও ভালবাসলেই হইলো, ও কার মেয়ে সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না। আমার মনে হয় ও আমারে ভালোবাসে, ওর মুখের দিকে তাকিয়েই আমি বিশ্বাস করছি। আই লাভ হার, শি লাভস মি, দ্যাটস অল। তোরা পারলে হেল্প মি আউট, নয়তো বাদ দে, প্রয়োজনে আমি একাই নরকে যাব’– তূর্যের সোজাসাপ্টা জবাব।

‘আমি কি তোরে সেটা বলছি? তুই নরকে গেলে আমরা যাব না, এইটা তুই ভাবলি ক্যামনে? – সায়েমের সুরে অভিমান। মুচকি হাসল তূর্য লুকিয়ে, ফাঁদে ফেলা গেছে ওদেরকে। ও জানত বন্ধুরা ওর ভালোর জন্যই বলছে, কিন্তু একটা পার্ট নিল আর কি!

‘তাহলে পরশু সংগীতার সাথে সুখিনীলগঞ্জ দেখা করব, তোরা গার্ড দিবি’ – চোখেমুখে ষড়যন্ত্রের ভাব এনে বলল তূর্য!

‘তাই রে! এই জন্যই এত পার্ট নিচ্ছিস নারে ব্যাটা?’– সবাই তেড়ে এল ওকে ধরতে। তূর্য পালিয়ে বাঁচে!

দশ.

‘সংগীতা ইদু এজ’– ডাক শুনে তাকাল সংগীতা। দেখল সুগত দা’র সাথের একটা ছেলে ডাকছে ওকে। হঠাৎ করে ভয় পেল ওর। দেখেছে নাকি ওকে তূর্যের সাথে আবার! ভয়ে ভয়ে গেল সামনে। ‘হেইল্লা শুভলং যাবা নাহি?’– জিজ্ঞেস করল আরেকজন। ‘নো জেইম’- বলেই হন হন করে চলে গেল ও। একই সাথে অবাক ও অপমানিত বোধ করল সুগত। চ্যালাপ্যালাদের সামনে একটা মেয়ে ওকে এভাবে দাম না দিয়ে চলে যাবে ভাবতে পারেনি! লাল হয়ে উঠল ওর মুখ! মুখ দিয়ে ছুটল অশ্রাব্য ক’টা গালি! মেয়েটার উপর নজর রাখতে বলে দিল দুইজনকে।

সংগীতার একটু ভয় লাগছে, সুখীনীলগঞ্জ চিড়িয়াখানাও ঝুকিপূর্ণ। দু’য়েকটা পাহাড়ি ঘরও আছে। তবু আশা, তূর্যরা একটা ব্যবস্থা করবেই। ভয়ে ভয়েই গেল সুখীনীলগঞ্জ। পরনে বাঙালি ড্রেস দু’জনের। আসার সময় ব্যাপক সতর্ক ছিল ওরা, কেউ ওদেরকে লক্ষ্য করেছে বলে মনে হল না। দেখাও হল তূর্যের সাথে। কিন্তু সময়টা ভয়েই উপভোগ করতে পারছিল না তারা, যদিও তূর্যের সকল বন্ধু পাহারা দিচ্ছে বাইরে। চিড়িয়াখানাটা পাহাড়ের ঢালে, পাহাড়ের একেবারে নীচের দিকের একটি সিটে বসে রইল ওরা। দুজনের আড়ষ্ঠতা এখনও কাটেনি। তবুও সময়টা স্মৃতিময়ই ছিল। মধুর অনুভুতি। এত সহজে দুই জাতির দুই ধর্মের দুটি প্রাণ এত দ্রুত এত কাছে এসে গেল ভাবতেই অবাক লাগে তার। এর নামই বোধ হয় ভালবাসা- যা অসাধ্যকে সাধ্য করেছে যুগে যুগে।

 এরপর ঝামেলা বাঁধার আগে চলেই গেল দু’জন। কিন্তু ওরা জানে না, ঝামেলার মাত্র শুরু।

 চিড়িয়াখানার প্রহরী নিরন বাবু সংগীতার বাবাকে ভালোভাবেই চিনতেন, ইনফ্যাক্ট তারা একই সাথে পড়েছেনও, সংগীতাকেও চেনে সে। একটা বাঙালি ছেলের সাথে ওকে দেখে ঠিক মেনে নিতে পারলেন না উনি। সুগত ছেলেটাও যে কি করে না! এসব ব্যাপারে ওদেরই তো মাথা ঘামানো উচিৎ বেশি। নিরন বাবু সিদ্ধান্ত নিল কমলকিরণকে না বলে তার চাচাত ভাইয়ের ছেলে সুগতকে বলবে। মগদা বাঙ্গাল বেশি বাড় বেড়েছে!

‘ও আচ্ছা!’– নিরনবাবুর কথা শুনে কী যেন বুঝল সুগত। মনে মনে ভেবে নিল, এই জন্যই ওকে এভাবে অপমান করে চলে গেল মেয়েটা, বাঙ্গালের প্রেমে মজেছে! সেদিন বিকেল চারটায় কলেজে মেয়ে দুটোকে সেজেগুজে এভাবে দেখেই সন্দেহ করা উচিৎ ছিল তার। আফসোস করতে লাগল সুগত। ছেলেটার মুখের একটা বর্ণনা চাইল সুগত। বলল বটে নিরনবাবু, কিন্তু একইসাথে সুগতকে একগাদা ভৎসর্না করল নিরন বাবু! নেতা হয়ে কেন এসব নজরে রাখে না, সেজন্য তিরস্কারও করল বেশ! সব নিরবে হজম করল সে! এবং তার যদি ভুল হয়ে না থাকে, ছেলেগুলো সাগর, সায়েম, তূর্যদের দল। আর ছেলেটা তূর্যই হবে! এই শালাগুলো একেকটা বদমাস! অনেকবার চেষ্টা করেছে সুগত, কিন্তু ঘাড় নোয়াতে পারেনি। অন্য বাঙালি ছেলেগুলোর মত চুপচাপ সব সহ্য  করতে রাজী নয় তারা। আগে থেকেই রাগ ছিল, বিশেষ করে সেদিনের দাঙ্গায় এই ছেলেগুলোর কারণেই তাদের প্ল্যানে ক্যাচাল লেগে যায়! কলেজ হোস্টেলের দখল তারা হারায় এই ছেলেগুলোর কারণে! রাগে মাথা ঝিমঝিম করছে তার।

তূর্যের অনার্স ফাইনাল শেষ! রেজাল্ট দেবে যে কোন মূহুর্তে। তবে তার আগেই কোনেএকটা চাকুরি খুঁজতে বের হতে হবে। ঢাকায় বড় ভাইয়ের কাছে উঠবে বলে ভাবছে সে। কিন্তু সংগীতাকে ছেড়ে যেতেও ইচ্ছে করছে না! কিন্তু নতুন স্বপ্নের কাঠগড়ায় এখন ও, তাই স্বপ্ন ভঙ্গের বদলে পূরণ করতে চাইলে, এটাই করতে হবে, একটু কঠোর হতেই হবে। কিন্তু ওকে কীভাবে জানাবে বুঝতে পারছে না। সাথে বন্ধুদেরও জানাতে খারাপ লাগছে। কিন্তু জানাতেই হবে।

সংগীতার পা দুরু দুরু করে কাঁপছে, যেন পায়ের নীচে ভূমিকম্প হচ্ছে, যে কোন সময় পড়ে যেতে পারে ও। সুগত আর তার পাণ্ডারা এসেছে ওদের ক্লাসে। এসেই সংগীতাকে সতর্ক করে দিয়েছে সুগত, সব জানে সে! তূর্যের লাশও খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে সিনেমার ভিলেনের মত সোজা ভাষায় জানিয়ে দিল সে। একথা বলেই সুগত চলে গেল সামনে থেকে। সুগতের হুমকিকে কথার কথা ভাবলে ভুল করবে– এই কথা ভালো করেই জানে সংগীতা। প্রয়োজনে সিনেমার ভিলেনের মতই নৃশংস হতে বাঁধবে না তার হাত। ফুপিয়ে কাঁদছে সংগীতা। নিজের জন্য নয়, তূর্যকে মেরে ফেলবে বলেছে ওরা-সেজন্যে।

sun shire on my shoulders

বাবা-মা জানার আগেই ব্যাপারটার একটু ফয়সালা হওয়া উচিৎ। তূর্যের সাথে আরেক জায়গায় দেখা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল সে। ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখল, ডিসি’র বাংলোর ওদিকের পলওয়েল পার্কে দেখা করবে ওরা। কলির মাধ্যমে সায়েমকে সিদ্ধান্তটা জানিয়েও দিল। এমন আকস্মিক ডাকার কারণ শুনে হন্তদন্ত হয়ে পার্কে চলে এল তূর্য। মুখ বাঁধা এক মেয়ে এসে তার হাত ধরল, স্পর্শে সহজেই বুঝতে সময় লাগল সে-ই সংগীতা। সোজা বলল,

:আমাকে বিয়ে করতে পারবে? এমন হঠাৎ প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পড়ল তূর্য। মুখে বলল,

:অবশ্যই!

 :এখন, দুই দিনের মধ্যে? – সংগীতার তাগাদা।

তূর্য ভালোবাসে সংগীতাকে, নিজের পৌরুষত্ব বাধ্য করল ওকে হ্যাঁ বলতে। কিন্তু এখনও জানে না কী হতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সংগীতা। অবশেষে আমতা আমতা করে বলল,

:এরপর আমাকে খাওয়াবা কী, রাখবা কই? কী ভেবে যেন হুট করে তূর্য বলল,

:‘আমি ঢাকায় যাবো কিছুদিনের জন্য। ভাইয়ার ফার্মে জব করব। তোমার সাথে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ করব। তবে বিয়েটা সেরে রাখব। সেটা কেউ জানবে না তুমি, আমি, কলি আর আমার বন্ধুরা ছাড়া। এরপর তুমি প্রিপারেশন নিতে থাকবে। সময় হলে আমাকে জানাবে। আমি তোমাকে নিতে আসব, একসাথে চলে যাব সিলেট। সেখানে আমার এক মামা থাকেন, আমি নিশ্চিত উনি মেনে নেবেনই আমাদের। এরপর ওখানে সপ্তাহ দু’য়েক থেকে চলে আসব ঢাকায়। সংসার করব দুইজন’।

শুনে উৎফুল্ল হলেও ভেতরে চাপা ভয়টা এখনও আছে সংগীতার। ওরা কেউই জানে না কি সব আবোলতাবোল বকছে দু’জনেই। মুখে বলা সম্ভব সহজেই, কিন্তু বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে না সহজে।

বিছানায় বসে বসে কথাগুলো ভাবছে সংগীতা। এরপর পুরোই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ হয়ে গেল। ও ভেবে ভেবে পুরোই অবাক হয়! প্রেম হবার মাত্র এক মাসের মাথায় এই কমিটমেন্ট! এরপর ঠিক পাঁচ মাস পর সেটা পূরণও করেছে তূর্য। তূর্যের মা কেবল ব্যাপারটা জানত, সংগীতাকে একপলক দেখেই ওনার খুব পছন্দ হয়েছে।

তূর্য চলে যাবার পর খুশী হয়েছিল সুগত, এবার বাগে পাওয়া গেছে মেয়েটাকে। সুগতর ধারণা তার ভয়েই পালিয়ে ভেগেছে ব্যাটা বাঙ্গাল! তবুও কিছুটা সন্দেহও ছিল, বলা তো যায় না মেয়েটিকে পালিয়ে নিয়ে যেতে পারে ছেলেগুলো। কিন্তু দুয়েক মাসেও কিছু না ঘটায়, পাহারায় ঢিল দিল সুগতরা। আর এদিকে সুগতদের উপর নজর ছিল সাগরদের, সংগীতাকে খুব আগলে রাখত ওরা। ওদের কারণে সুগতও কেন যেন আগে বাড়েনি আর!

কিন্তু এখন মায়ের জন্য মন কাঁদছে সংগীতার। সিলেটে আসার পর মা’র সাথে কথা হয়েছে ক’বার, মা কেঁদেছে। কিন্তু এখন নতুন উদ্বেগের কথা শোনা যাচ্ছে। সুগত ছেলেটা খুবই উগ্র হয়ে উঠেছে। তূর্যের বন্ধু সাগর, সায়েম আর রনিকে হেনস্থা করেছে সে, মারামারি বাঁধিয়েছে বেশ কয়েকবার। কলির উপরও চড়াও হয়েছে বেশ কয়েকবার! কিন্তু বাঙালি ছেলেরা সেটা রুখে দেয়। ইদানিং বাবা-মা’কেও খুব হূমকি দিচ্ছে। ওদের কারণেই নাকি সংগীতা লাই পেয়েছে। অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজও করেছে। বাবাকে আল্টিমেটাম দিয়েছে সুগত। কোন কাজেই লাগল না বাবার ‘সন্তু কানেকশন’। ঘটনার পর সন্তু লারমা ওর বাবার সাথে দেখাই করতে চায়নি।

এগারো.

ঠিক তিন দিন পর, একটা টেলিফোন আসল সংগীতার। তূর্য লক্ষ্য করল, সংগীতার চেহারা যেন বরফের মত সাদা হয়ে গেছে। হঠাৎ করে মোবাইলটা পড়ে গেল সংগীতার হাত থেকে, থপ করে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে পড়ে গেল নীচে। পাথর হয়ে গেছে যেন সংগীতা। বারবার ওর গাল ধরে নাড়া দিচ্ছে তূর্য। কিন্তু কোন সাড়াই নেই। চিৎকার করে ওর কাজিনদের ডাকল তূর্য। মোবাইলে কার সাথে কথা বলছিল সংগীতা? চেক করে দেখা গেল, ওটা কলির নাম্বার। আবার কল ব্যাক করে কলির কথা শুনে তূর্যও স্তম্ভ হয়ে গেল! একি বলছে কলি! মানুষ এত নির্মম আর পাষণ্ড হয় কী করে?

অস্ত্রের মুখে আর কমলকিরণের পূর্বশত্রু হেডম্যানের সাথে হাত করে বিচার সাজিয়ে সুগত সংগীতার বাবা-মা’কে ন্যাড়া করে পুরো এলাকা ঘুরিয়েছে! তাদের গলায় জুতোর মালা পরাতেও ভুলেনি ঐ পিশাচের দল! এলাকায় একঘরে ঘোষণা করা হয়েছে তাদের। কলি এত কথা বলেনি, কিন্তু অতীত ঘটনাগুলো থেকেই এসব উপলব্ধি করে নিল তূর্য। তাই বলে কমলকিরণকেও? তার তো সন্তু লারমার সাথে পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। উফফফ! আর ভাবতে পারছে না তূর্য! সংগীতাকে নিয়ে দ্রুত ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সংগীতার দিকে সামিয়াদের নজর রাখতে বলে, তড়িঘড়ি করে ডাক্তার আনতে চলে গেল সে।


♦ গল্পটিতে উল্লিখিত সকল চরিত্র ও সংগঠনের নাম কাল্পনিক।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরারা ভারতীয় বংশোদ্ভূত!

kk

ডেস্ক নিউজ:

মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠী ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ভারতের উত্তরপূর্বাংশ বা দক্ষিণপূর্ব এশীয় তিব্বতি-বার্মা ভাষীদের চেয়ে তিব্বতি-বার্মা ভাষাভাষী এসব বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতের মূল ভূখণ্ডের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট উপাদান বিদ্যমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) ও সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি) এর একটি যৌথ গবেষণায় এ তথ্য  বেরিয়ে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নুরুন নাহার গাজী সুলতানা ও   সিএসআইআরের কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজের নেতৃত্বাধীন এ গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘পিএলওএস ওয়ান’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

সিএসআইআর-সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলেকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি)-এর কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজ বলেন, আমরা বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নৃ-গোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা) বংশগতি নিয়ে বিস্তর বিশ্লেষণ চালিয়েছি যারা তিব্বতি-বার্মা ভাষা বর্গের একটি  শাখা ভাষা কথা বলেন। ভারত ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী তিব্বতি-বার্মাভাষীদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে তাদের তথ্যের তুলনা করেছি। আমরা দেখতে পেয়েছি যে, ভারতের উত্তরপূর্বাংশ বা দক্ষিণপূর্ব এশীয় তিব্বতি-বার্মা ভাষীদের চেয়ে তিব্বতি-বার্মা ভাষাভাষী এসব বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতের মূল ভূখণ্ডের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ভারতীয়দের পূর্বপুরুষদের যথেষ্ট উপাদান তাদের মধ্যে বিদ্যমান।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, সিনো-তিব্বতীয় ভাষা পরিবারের একটি ভাষা হচ্ছে তিব্বতো-বার্মা ভাষা। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার উচুভূমিতে ও মায়ানমারের (পূর্বে বার্মা নামে পরিচিত ছিল) নিম্নভূমিতে তিব্বতো-বার্মা বর্গের ৪০০টি ভাষা প্রচলিত। প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ বার্মিজ ভাষায় ও ৮০ লাখ মানুষ তিব্বতি ভাষা কথা বলে।

নুরুন নাহার ‍গাজী সুলতানা ও থাঙ্গারাজের নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো বংশগতির সকল উপাদান (মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ, ওয়াই ক্রোমোজোম ও অটোজম) ব্যবহার করে বাংলাদেশের নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও সাদৃশ্যে নিয়ে গবেষণা চালালেন।

বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল পূর্ব ভারত, উত্তর ও পূর্বাঞ্চল উত্তরপূর্ব ভারত দিয়ে ঘেরা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল কিছুটা মায়ানমারের সীমান্তের সঙ্গে লাগোয়া। কুমারাস্বামী থাঙ্গারাজ বলেন, বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থানই তুলে ধরে যে, এটি (বাংলাদেশ) ভাষা সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল।

তিনি জানান, বাংলাদেশের চতুর্দিকে বাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ওপর পুরোপুরিভাবে গবেষণা চালানো হলেও উপকূল ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীগুলোর উদ্ভব ও সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চালানো হয়নি। ভারত ও মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসব নৃ-গোষ্ঠীর স্থানান্তর সম্পর্কেও বলা হয়েছে তাদের গবেষণায়।

দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশীয় জনগণের ওপর চালানো বংশগতি গবেষণাটিতে দেখা গেছে, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে ভারতে খুব সম্প্রতি তিব্বতো-বার্মাভাষীদের বিস্তরণ হয়েছে।

সূত্র: বাংলানিউজ

বাঘাইছড়িতে আব্দুর রশিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সন্দেহের তীর সরকারদলীয় নেতৃবৃন্দের দিকে

Follow Up

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি:
শুক্রবার বাঘাইছড়ি পৌর এলাকায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে গুলিবিদ্ধ আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যার অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে আব্দুর রশিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার জের ধরে বাঘাইছড়িতে চলছে নানা সমীকরণ। এই ঘটনায় সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে জেএসএস’র দুই গ্রুপ ও ইউপিডিএফএর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আর গুলিবিদ্ধ আব্দুর রশিদ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পিছনে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র এবং হাসপাতালে উপস্থিত বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই শুক্রবার বাঘাইছড়ি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকার সময় আব্দুর রশিদ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমা জানতেন বলে জানান। সে বিষয়টি হাসপাতালে উপস্থিত লোকজনের সামনে খুলে বলার সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জমির উদ্দিন তার মুখ চেপে ধরে বিষয়টি ধামা-চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করে স্থানীয়রা। তারা দাবি করেন, জমির বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও আব্দুর রশিদের মুখের কথা এখন বাঘাইছড়ি পৌর এলাকায় সকলের মুখে মুখে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুর রশিদের সাথে একসময় ইউপিডিএফের বেশ সখ্যতা ছিল। রশিদ তাদের পক্ষ হয়ে বেশ কিছু কাজ করে দিতেন। কিন্তু ২০১২ সালের অক্টোবর মাসের ২৯ তারিখে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের চৌমূহনী চত্ত্বরে ইউপিডিএফ নেতা ডা: সত্যরঞ্জন চাকমাকে গুলি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমার সাথে বাক-বিতন্ডা শুরু হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় বেশ কয়েকটি সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানাগেছে, ডা: সত্য রঞ্জন চাকমাকে গুলি করার ঘটনায় সন্তু লারমা সমর্থিত বেশ ক’জন কে আসামী করে বাঘাইছড়ি থানায় একটি মামলা করা হয়। যার নাম্বার-৩ তারিখ ২৯/১০/২০১২ ইং। এই মামলার সাক্ষী ছিলেন আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যা। তাই ধইন্যার উপর অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, যেন সে এই মামলায় কোনো ধরনের সাক্ষী না দেয়। আর এই কাজে তাকে চাপ প্রয়োগ করতেন রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বৃষকেতু চাকমাসহ যুবলীগের অপর একজন নেতা। যার ফলশ্রুতিতে গত চারদিন আগে বৃষকেতুসহ বেশ ক’জন নেতা সাজেক ইউনিয়নে একটি কেয়াংয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে থাকা আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে অশালীন ভাষায় গালি-গালাজ করেন এবং ধইন্যাকে এক প্রকার হুমকি-ধামকিও দেন বলে জানা গেছে দলীয় সূত্রে।

এরই এক পর্যায়ে বাঘাইছড়ির তুলাবান নামক স্থানে তাকে নামিয়েও দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের এই কর্ণধার। এসময় গাড়িতে বেশ ক’জন নেতা ও সুশীল ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের কাছ থেকেও এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাদের কাছে বিষয়টি অবহিত করেন আব্দুর রশিদ। পরে এই ঘটনার জেরে শনিবার বিকাল তিনটায় উপজেলা পরিষদ রেষ্ট হাউজে একটি বৈঠক হওয়ার কথাও ছিলো। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে উপস্থিত না থেকে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমা রাঙামাটি শহরে চলে আসেন বলে জানাগেছে দলীয় সূত্রে।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় এবং রাত সাড়ে নয়টায় আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলির ঘটনায় গুরুত্বর আহত ধইন্যা বাঘাইছড়ি হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাতে কাতরাতে তাকে গুলি করার ঘটনায় জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বৃষকেতু চাকমা আগে থেকেই জানতেন বলে বলতে থাকলে উপজেলা যুবলীগের একজন নেতা ধইন্যাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেন বলে হাসপাতালে ঘটনার সময় উপস্থিত বেশ’কজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানাগেছে।

এদিকে আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে গুলি করে আহতের প্রতিবাদে শনিবার বিকাল ৩.৫০ টার সময় জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা)বাঘাইছড়ি থানা শাখার উদ্দোগে উপজলোর মুক্ত মঞ্চে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্টিত হয়েছে। এ সমাবেশে প্রধান অথিতি ছিলেন জেএসএস রাঙামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক চিত্র বিকাশ চাকমা। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিপুলেশ্বর চাকমা।

বক্তারা ঘটনার তীব্র্র নিন্দা জানান এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে তিনদফা দাবিসহ আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এই ঘটনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাঘাইছড়িতে অনিদিষ্টকালের জন্যে সড়ক ও নৌ-পথ অবরোধসহ কঠোর কমসুচি গ্রহন করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে এমএন লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি (জেএসএস)।
অপরদিকে বাঘাইছড়িতে সাম্প্রতিক এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে রোববার বাঘাইছড়ি বিজিবি জোনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানাগেছে।

উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন বাবু পাড়া এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক বাঙ্গালী আহত হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তির নাম আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘাইছড়ি পৌর মেয়রের বাসভবন সংলগ্ন এলাকা দিয়ে নিজ বসতঘরে যাওয়ার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অর্তকিতভাবে হামলা চালায় আব্দুর রশিদের উপর। এসময় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে আব্দুর রশিদ গুরুত্বর আহত হয়। এসময় তার শরীরে গুলি লাগে। পরে স্থানীয়রা রশিদকে উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন।

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে একজন গুলিবিদ্ধের ঘটনায় প্রশাসনকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম

আলমগীর মানিক,রাঙ্গামাটি:
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন বাবু পাড়া এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক বাঙ্গালী আহত হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তির নাম আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘাইছড়ি পৌর মেয়রের বাসভবন সংলগ্ন এলাকা দিয়ে নিজ বসতঘরে যাওয়ার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অর্তকিতভাবে হামলা চালায় আব্দুর রশিদের উপর। এসময় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে আব্দুর রশিদ গুরুত্বর আহত হয়। এসময় তার শরীরে গুলি লাগে। পরে স্থানীয়রা রশিদকে উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন।

এদিকে উপজেলা সদরে সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে প্রশাসনকে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে এমএন লারমা সমর্থিত জনসংহতি সমিতি। গণ মাধ্যম কর্মীদের কাছে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়,
গত ১৮ অক্টোবর রাত অনুমানিক ৯.৩০ ঘটিকা সময়ে জনসংহতি সমিতি(সন্তু)সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাডার বিপ্লব চাকমার নেতৃত্তে বেশ কয়েকজন অস্ত্রধারী ভারী অস্ত্র নিয়ে উপজেলার প্রান কেন্দ্রে এবং বিজিবি জোন থেকে ৫০ গজ দূরে তাদের প্রতিপক্ষ সন্দেহে সাধারন পথচারিদের উপর যে গুলি বর্ষন করা হয়েছে এবং এতে আব্দুর রশীদ নামে একজন নিরীহ বাঙালি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)’র পক্ষ থেকে আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এবং এ ঘটনার সাথে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারসহ নিম্নে লিখিত দাবীগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যে প্রশাসনের কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি।

দাবীগুলো হচ্ছে-১। বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরে জেএসএস (সন্তু) সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাডার কতৃক গুলিবিদ্ধ হওয়া অত্র খেদারমারা ইউপি শাখার সদস্য বিপিন চন্দ্র চাকমা, ও ডা: সত্য রঞ্জন চাকমাসহ বেশ কয়েক জনকে হত্যা চেষ্টাকারী প্রমেশ চাকমা, বড়রিচি চাকমা, শশাংক মিত্র চাকমা, ত্রিদ্বীব চাকমা ও বিপ্লব চাকমাকে দ্রুত গ্র্রেফতার করতে হবে। ২. জনসংহতি সমিতির(এমএন লারমা)নিরপরাধ সদস্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ৩.বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরে এ ঘটনার মত ন্যাক্কার জনক ও নিন্দনীয় ঘটনা যাহাতে না ঘটে এ ব্যপারে প্রশাসনের তরফ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিধান করতে হবে। এ দাবীগুলো আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে কাযকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আমরা বাঘাইছড়িতে অনিদিষ্টকালের জন্যে সড়ক ও নৌ-পথ অবরোধসহ কঠোর কমসুচি গ্রহন করতে বাধ্য থাকবো।

এদিকে এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ ১৯ অক্টোবর ২০১৩ শনিবার বিকাল ৩.৫০ ঘটিকার সময় জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা)বাঘাইছড়ি থানা শাখার উদ্দোগে উপজলোর মুক্ত মঞ্চে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্টিত হয়। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয়ের সম্মিলিত এ সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জেএসএস রাঙামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক চিত্র বিকাশ চাকমা। সভাপতিত্ব করেন বিপুলেশ্বর চাকমা। বক্তারা, ঘটনার তীব্র্র নিন্দা জানান। এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবী জানানো হয়।

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ :
বান্দরবানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনজিও ব্যুরো। নির্দেশ পাওয়ার পরপরই ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ও কার্যালয়ের আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। বান্দরবান ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়স্থ এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বান্দরবান জেলায় ওয়ার্ল্ড ভিশন আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সে পত্র মোতাবেক বান্দরবান শহরের বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক কি কারণে বান্দরবানে তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো পক্ষই মুখ খুলছে না।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক এই এনজিওটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় উসকানী প্রদান, পক্ষপাতদুষ্টু কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী অধিবাসীরা। বিভিন্ন সরকারি ও গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে সেসব রিপোর্টে। সে কারণে পার্বত্য বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ধরনের এনজিওর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করে আসছিলো। ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবানে ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বা সরাসরি কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ তারই অংশ বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র উল্লেখ করেছে। শুধু ওয়ার্ল্ড ভিশন নয় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাকেই সরকার একে একে নিয়ন্ত্রেণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবান এডিপি ম্যানেজার টিমথি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, আশির দশকের আগে থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বান্দরবান জেলায় জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নবায়ন না করে বরং  কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর ফলে ওই মেয়াদের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যেই আমরা বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আরো জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতায় সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার বলেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাই বাংলাদেশে সরাসরি সংস্থাটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তবে ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় এনজিওর সাথে পার্টনারশীপে জনহিতকর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশনে ৮ জন কর্মকর্তা ও ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সীমিত আকারে বান্দরবান সদর উপজেলার সদর, কুহালং ও সুয়ালক এই তিনটি ইউনিয়ন ও বান্দরবান পৌরএলাকায় কৃষি বিষয়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও দুর্যোগকালীন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করে আসছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ২৮০ জন ওয়ার্ল্ড ভিশনের স্পন্সর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থিক ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছিল।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সংস্থাটির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসময় দেখা যায়, ওই মাঠে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাই এসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সরাসরি কর্মকাণ্ড বান্দরবানে বন্ধ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বান্দরবানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। একই সাথে তারা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অন্যসব এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এ খবরে আলোচ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিও’র কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা সরকারি আদেশ, বড় মাপের একটি সিদ্ধান্ত। বর্তমান সরকার বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। জাতীয় স্বার্থে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
 
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত না করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপণের ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার নানা ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সেখানে চিহ্নিত করে দেশবাসী বিশেষ করে গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের ‘আদিবাসী’ শব্দ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বর্তমান সরকারের এ দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সরাসরি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর সুফল ঘরে তুলতে পারেনি সরকার। এর কারণ সরকারের কিছু উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, মহাজোটের শরীক কিছু নেতার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড। সরকারের দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তিবর্গ এমন কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। জনসংখ্যা সীমিত হলেও জনবৈচিত্র্য বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সম্পদে সে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজার ও এর পদচুমে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বের দৃষ্টিতে লোভনীয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বশক্তির রয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও লোলুপ দৃষ্টি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সেনসেটিভ ভূখণ্ড এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেকারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কাছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুদুরপ্রসারী।
 
ooo 
 
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এডহক নীতি ও অনেকক্ষেত্রে খামখেয়ালীপনার ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির সময় যেমন পুনর্বাসনের কথা চিন্তা করেননি, ঠিক তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তৈরির সময় ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি মৃত আইন- হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়ালকে জীবিত করেছেন। এমনকি এ আইন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, কর্তৃত্ব ও সংবিধানকে সুবিবেচনা করা হয়নি। সে কারণেই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটে উচ্চ আদালত জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছেন। এরশাদের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে জেএসএস’র সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন সেই শান্তিচুক্তি করেছে বিএনপি তাকে ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষমতায় গেলে তা বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে প্রবল আন্দোলন করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও যখন শান্তিচুক্তি করেছে তখন সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের চেয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তিকেই হয়ত বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে আদালতের স্টে অর্ডারের স্যালাইন দিয়ে শান্তিচুক্তিকে এখন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে কিন্তু ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বাতিল করেনি, বরং তারাই এচুক্তি সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে।
 
‘আদিবাসী’ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে এক ধরনের সমর্থন ছিল সবসময়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও এই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগই। এ বিষয়ে ভারতীয় সমর্থন পাওয়ার ফলেই সরকারের পক্ষে এমন শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের পার্বত্য নীতি স্পষ্ট হলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক বন্ধু পাওয়া সম্ভব।(যদিও সিএইচটি নিয়ে ভারতের সব নীতিই আমাদের স্বার্থানুকূল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই)।  কিন্তু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে ঢালাওভাবে বহু নিরাপত্তা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন কার্যত পাহাড়ী চাঁদাবাজ, অপহরণকারী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেকারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদটি পাহাড়ীদের দখলে থাকলেও সচিব পদটিতে বাঙালি আমলার পদায়ন হয়েছে সব সময়। ফলে সরকারী কার্যক্রম ও নীতিতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মন্ত্রীর পাশাপাশি সচিব পদেও পাহাড়ী পদায়ন করায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যত, একটি ভারসাম্যহীন একপেশে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানে।
 
এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী নীতি পরিবর্তন হয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের সাথে সাথেও সেখানে নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২-৩ বছরের দায়িত্ব পালনকালে যে নীতি অনুসরণ করেন পরবর্তী কর্মকর্তা এসে তা সম্পূর্ণ উল্টে দেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও সহাবস্থান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা। আদালত শান্তিচুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বেশিরভাগই অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়ার পর ভূমি কমিশনও অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে, এমনটাই মতামত ছিল দেশের প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের। বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অতি আগ্রহে যখন ভূমি কমিশন একতরফাভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন স্বভাবতই বাঙালিরা ভূমি কমিশন বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দালন গড়ে তোলে। সেসময় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করলেন, সরকারেরও মুখ রক্ষা করা দরকার। ব্যাস, বাঙালিদের একটি অংশের হাতে ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের একটি ড্রাফট তুলে দিয়ে সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসিয়ে দিলেন। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা, সংবিধান, সরকারি কর্তৃত্ব, আদালতের এখতিয়ার বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠান বাতিল না হয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি হলো। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক নৈরাজ্য, বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। এমনও দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বপালনকালে কোনো এক সরকারী কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালবেসে এর উপর দুটি বই লিখে ফেলেন ছদ্মনামে। তথ্যবহুল ও গবেষণামূলক এই বইটি প্রচারে তখন সরকারীভাবে ব্যাপক প্রমোট করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বইটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ বইটিই অত্যন্ত মেধাবী এ কর্মকর্তার চাকুরী অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় প্রায় সকল সরকারী অফিসেই বইটি অনুসৃত হয়। এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভালবেসে কিছু করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতি না থাকার কুফল এটি।
 
সিএইচটি নিয়ে যে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ভারতের সেভেন সিস্টার্সও তার অন্তর্ভূক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সরকার সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সরাসরি কার্যক্রম বা ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বন্ধ করে দিয়েছে।  সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত সরকার বা ভারতীয় এনজিও। কিন্তু বাংলাদেশে এসব আন্তর্জাতিক এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কার্যক্রম ও অর্থ পরিচালনার কোনো হিসেব বাংলাদেশ সরকারকে দেয় না। এমনকি তাদের মিটিংগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ঢুকতে দেয় না। কেউ ঢুকলেও পরিচয় পেলে অপমান করে বের করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যান্য এনজিও ও দাতা সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাম্য। অথচ একই সময়ে সরকারের কোনো কোনা মন্ত্রী ইউএনডিপির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল বিতর্কিত দাতা সংস্থার কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধির জন্য ডিও লেটার পাঠাচ্ছে তাদের আবাসিক কার্যালয়ে এবং তা সাথে সাথে গৃহীতও হয়েছে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতির অভাবেই এমনটি ঘটছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদের কথাই কেবল দেশবাসী জেনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আট লক্ষাধিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড়জোর হাজার দশেক লোক এই বিভেদের সাথে জড়িত। এরা ইউপিডিএফ, জেএসএস’র সন্ত্রাসী ও মতলববাজ এনজিও কর্মী। বাকি সকল উপজাতি সদস্য কিন্তু শান্তিপ্রিয়, পাহাড়ী বাঙালি সহাবস্থানে বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। কিন্তু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য হয় সন্ত্রাসীদের সেখানো বুলি প্রচার করতে, তাদের গাইডেড পথে চলতে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাঙালীদের থেকেও বেশি ঘৃণা করে। কারণ বাঙালিদের থেকে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসের/ চাঁদাবাজির শিকার। সিএইচটিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা নানা কায়দার বিভেদ ছড়িয়ে দিয়ে একটি বাঙালী বিদ্বেষী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে অপচেষ্ট। অথচ এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়ে, ভালবেসে কাছে টানা হয়নি কখনো।বরং উপজাতি বলে সন্ত্রাসীদের পাল্লায় তুলে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভেদের দশভূজা জাগ্রত কিন্তু শান্তির বীণাপাণি নিদ্রা যায়। কোনো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সম্প্রীতি মিছিল চোখে পড়লেও সরকারী লোকেরা যেভাবে সে মিছিল চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে তাতে সম্প্রীতির থেকে সংশয় চোখে পড়ে বেশী।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে বেশি। এদের বেশিরভাগই মনে করেন বাঙালি ও সেনাবাহিনী সেখানে যত সমস্যার মূল। সন্দেহ নেই, তাদের বিভ্রান্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু সে বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা রাষ্ট্রিয় পর্যায় থেকে কি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে? ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে সেখানে মিডিয়া টিম পাঠানো হয়, বুদ্ধিজীবীদের কাউকে অনুরোধ করে লেখানো হয়। কিন্তু এ দেশের কতজন মানুষ জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে? কতজন জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অবস্থানের গুরুত্ব? কতজন জানে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কি করে? তাদের সেবা, ত্যাগ, কমিটমেন্টের কথা কতো জনের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে? কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে বলিউডে অনেক সিনেমা হয়েছে, হলিউডের কথা বললে তো একটি বই লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের অনেক ঘটনা গল্প ও ছবিকে হার মানায়। কিন্তু তার কথা দেশের কতজন মানুষ জানে। একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
 
কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো এডহক সিদ্ধান্তে সমাধান না খুঁজে একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি প্রণয়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ,  সিভিল ও সামরিক প্রশাসন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এ পার্বত্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে- যা সব সরকার ও সব ব্যক্তির জন্য অনুসরণযোগ্য ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখনই সময়। কারণ লেটার ইজ বেটার দ্যান নেভার।  
Email:palash74@gmail.com, সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব। (ইষৎ পরিবর্তিত)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

 

উপজাতিরা নয় বাঙালিরাই আদিবাসী – একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রফেসর ড. আবদুর রব

আদিবাসী, উপজাতি, ক্ষুুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী, পাহাড়ী, পার্বত্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূরাজনীতি বিশ্লেষক প্রফেসর ড, আবদুর রব বলেছেন, এদেশে ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী উপজাতীয় জাতিসত্তাগুলো আমাদেরই অংশ, বাংলাদেশের নাগরিক, বাংলাদেশী। এদেশের সম্পদে-সম্মানে, বিপদে-সুদিনে, সমৃদ্ধিতে-সৌহার্দ্যে সবকিছুতেই তাদের রয়েছে সমান অধিকার। কিন্তু তারা কোনোক্রমেই এদেশের আদিবাসী হতে পারে না। এটা নিতান্ত অবৈজ্ঞানিক ও ভুল তত্ত্ব। এদেশের অকাট-মূর্খ পণ্ডিতদের (জ্ঞানপাপী) জানিয়ে দেয়া উচিত, কারা উপজাতি (Tribals) আর কারা আদিবাসী (Aboriginals) আর একই সঙ্গে তথাকথিত মানবাধিকারের ধ্বজাধারী বিদেশি আদিবাসী শক্তির এজেন্ট এনজিও চক্রকেও আদিবাসী উপজাতীয় বির্তক না ছড়াতে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দেয়া উচিত। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও মাত্র কিছুদিন পূর্বে এসব জাতিতাত্ত্বিক বিভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদ উস্কে দেয়ার জন্য অনেকগুলো খ্রিস্টবাদী এনজিও চক্রকে ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে ভারতীয় সরকার।

প্রশ্ন : আদিবাসী ও উপজাতি বিতর্কের কারণ কি?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : উপজাতি এবং আদিবাসী। আদিবাসী বলতে ইংরেজিতে Aboriginals বা   indigenous people-ও  বলে। উপজাতি হলো Tribe এটা উপনিবেশিক শব্দ। আমাদের দেশে বাঙালি মূলধারার বাইরে যারা আছে তারা আদিবাসী নয়। তাদের আমরা উপজাতি  বলতেও নারাজ। বরং তাদেরকে বলা যেতে পারে ethnic বা নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী ।

নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস’রা হচ্ছেÑ ‘কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil।’ প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…’ (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, খর্বাকৃতির স্ফীত চ্যাপ্টা নাক কুঁকড়ানো কেশবিশিষ্ট কৃষ্ণবর্ণের ‘বুমেরাংম্যান’রা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী বা যথার্থ এবোরিজিন্যালস। তারা ওখানকার ভূমিপুত্রও বটে। ঠিক একইভাবে মাউরি নামের সংখ্যালঘু পশ্চাৎপদ প্রকৃতিপূজারী নিউজিল্যান্ডের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সেখানকার আদিবাসী। আমেরিকার বিভিন্ন নামের মঙ্গোলীয় ধারার প্রাচীন জনগোষ্ঠী যাদেরকে ভুলক্রমে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ (উত্তর আমেরিকা) বলা হয় এবং সেন্ট্রাল আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় ইনকা, আজটেক, মায়ান, আমাজানসহ আরো অসংখ্য ক্ষুদ্র বিল্প্তু কিংবা সঙ্কটাপন্ন (Extinct or Endangered Groups) জনগোষ্ঠীকে সঠিক ‘এবোরিজিন্যালস’ বলে চিহ্নিত করা যায়। তথাকথিত সভ্য সাদা, ইউরোপীয় নতুন বসতি স্থাপনকারী অভিবাসীরা (A New Settlers and Immegrants) ঐসব মহাদেশের আদিবাসীদের নির্মম বিদ্বেষ, হিংস্র প্রবঞ্চনা, লোভ আর স্বার্থপর আগ্রাসনের দ্বারা আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডসহ অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোসহ সেন্ট্রাল ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ব্রিটিশ, স্প্যানিশ, ফরাসি, পর্তুগীজ প্রভৃতি উপনিবেশবাদী শক্তি বিগত ৩/৪টি শতক ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরতার সাথে জাতিগত নির্মূল তৎপরতার মাধ্যমে (Ethnical Cleansing) এসব মুক্ত স্বাধীন আমেরিকান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে পৃথিবী থেকে প্রায় নির্মূল করে দিয়েছে। আজ ঐ শ্বেতাঙ্গ মার্কিন, ব্রিটিশ, অস্ট্রেলীয় এবং ইউরোপীয় তথাকথিত সুশিক্ষিত, ধ্বজাধারী সাবেক উপনিবেশবাদীদের নব্য প্রতিনিধিরা তাদের নব্য উপনিবেশবাদী অর্থাৎ তথাকথিত মুক্ত অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা পশ্চাৎপদ রাষ্ট্রসমূহের জন্য ‘আদিবাসী সংরক্ষণ’ (Conservation of Aboriginal)-এর ধুয়া তুলে তাদের অর্থের মদদপুষ্ট এনজিও এবং মিশনারী চক্রের সুনিপুণ প্রচারণায় ও ষড়যন্ত্রে উপজাতিগুলোর জন্য মায়াকান্না শুরু করেছে। আরম্ভ করেছে ভয়ানক সূক্ষ্ম সম্প্রসারণবাদী ষড়যন্ত্র আর আধিপত্যবাদী চাণক্য চাল।

এসব উপজাতি, আদিবাসী কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর এই মায়াকান্নার পেছনে মূলত ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক, ভূ-অর্থনীতিক এবং সর্বোপরি আধিপত্যবাদী স্বার্থই প্রবলভাবে কাজ করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় প্রকৃত আদিবাসীদের তারা যেখানে গণহত্যা, জাতিগত নির্মূলসাধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস করে দিয়েছে। সেখানে তারা এখন ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন সম্ভাবনাময় স্বাধীনচেতা উঠতি শক্তিÑ বিশেষ করে ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতে এসব  উপজাতি (Tribals) ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পক্ষে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন, জাতিসত্তার বিকাশ, আদিবাসী সংরক্ষণ’ ইত্যাদির কথা বলে ভাষাগত, বর্ণগত, ধর্মগত, সাংস্কৃতিক বিভাজন ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার প্রেক্ষাপট তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীদের ঐ হীন চক্রান্তের ফলশ্রুতিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ইত্যাদি এককালীন ঔপনিবেশিক শক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ও আজ্ঞাবহ জাতিসংঘের (ইউএনও) সহযোগিতায় বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার যৌক্তিক সার্বভৌম অঞ্চল তিমুর দ্বীপের পূর্বাঞ্চলকে (ইস্ট-তিমুর) বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ইস্ট-তিমুরের এই বিচ্ছিন্নতার পেছনে আসলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাজ করেছে এবং এখানেও আদিবাসী, উপজাতি ইত্যাদি বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে সর্বনাশা খ্রিস্টবাদী এনজিও চক্র, মিশনারি গ্রুপ এবং তথাকথিত মানবাধিকার সংরক্ষণ (Human Rights Activists) চক্র। এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র (Emerging Tiger of Asia) ২০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপের কাছের দক্ষিণেই হালকা জনসংখ্যা অধ্যুষিত শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান অধ্যুষিত অস্ট্রেলিয়াসহ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং অস্ট্রেলিয়া এই কৌশলগত ও অবস্থানগত দুর্বলতাকে চিরতরে দূর করাতেই খ্রিস্টবাদী পরাশক্তিসমূহ জাতিসংঘকে ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে স্বাধীন করে দেয়। আর ঐ একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশেও একই খ্রিস্টবাদী সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের আধিপত্যবাদী ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে (Geo-Political and Strategical Interests) সংরক্ষণ ও চরিতার্থ করার জন্য তাদের সেই কৌশলকে বাস্তবায়িত করতে চাচ্ছে। এ জন্য তারা বেছে নিয়েছে দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা, মার্মা, ত্রিপুরা, মগসহ বিভিন্ন বসতি স্থাপনকারী উপজাতীয় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে। একই সাথে এই সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের অর্থপুষ্ট এনজিও চক্র বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন : সিলেটের খাসিয়া, মণিপুরী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের গারো, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরের বনাঞ্চলের কুচ রাজবংশীয় বহিরাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে এদেশের আদিবাসী বলে প্রচার-প্রপাগাণ্ডা চালাতে শুরু করেছে এবং এর মাধ্যমে এদের এসব সংশ্লিষ্ট বৃহদায়তনের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ভূমিপুত্র (Son of the Soil) বলে প্রতিষ্ঠিত করার এক হীন চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত যে বাংলাদেশে বসবাসরত কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়। বরং তারা পার্শ্ববর্তী কিংবা বিভিন্ন দূরবর্তী স্থান থেকে দেশান্তরী হয়ে এদেশের নানা স্থানে অভিবাসিত হয়ে ক্রমে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করে আসছে। কিন্তু কোনোক্রমেই বাংলাদেশে বসবাসকারী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, খাসিয়া কিংবা কুচ রাজবংশীয় সাঁওতালরা এদেশের আদিবাসী হতে পারে না।

প্রশ্ন: তাহলে বাংলাদেশে  আদিবাসী কারা?

প্রফেসর ড. আবদুর রব :  বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরা। কারণ তারাই প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি-প্রমাণও রয়েছে। প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড ধারার বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র বা শংকর জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত সেখানে ককেশীয়, মঙ্গোলীয়, অস্ট্রিক জাতিধারার সাথে ভেড্ডাইট, নিগ্রোয়েড, দ্রাবিড়ীয় এবং অন্যান্য বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ ও নৃতাত্ত্বিক মিথষ্ক্রিয়া সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশে সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অনুদঘাটিত ও অজানা এবং স্মরণাতীতকালের হাজার হাজার বছর আগে থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই নদীবিধৌত পলল সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তাদেরকে অর্থাৎ বাঙালিরাই  Son of the Soil বা আদিবাসী বলা যায়। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষকবৃন্দই এ ব্যাপারে একমত।

প্রশ্ন: এ দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো যে আদিবাসী নয় এর প্রমাণ কি?

প্রফেসর আবদুর রব : বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়Ñ তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Huchinson (1906) T H Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬), J. Jaffa (1989) এবং N Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়। তারা সবাই একবাক্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়দের নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হবার যুক্তি-প্রমাণ ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

খোদ চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগংএ লিখেছেন, ‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে  বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’ এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। একথা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে। তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনার বা পরিস্থিতির কারণে আশপাশের দেশ থেকে বিভিন্ন ুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতি বহির্ভূত অন্য সকল উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো এবং কুকিরা মূল ‘কুকি’ উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে, “A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate”. (Lewin, 1869, p. 28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা।

ব্যোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করে। খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতার ফলে এদের অধিকাংশই বর্তমানে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। লুসাইরাও এখন অধিকাংশই খ্রিস্টান। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য একটি বড় জনগোষ্ঠী মুরং। এদের বেশির ভাগই এখন পর্যন্ত প্রকৃতি পূজারী এবং এদের কোনো ধর্মগ্রন্থও নেই (Bernot, 1960) চাকমারা এখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও ভাষার দিক দিয়ে তারা ত্রিপুরা, মারমা বা অন্য যে কোনো পার্বত্য জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এদের ভাষা এখন অনেকটা বাংলা ভাষার কাছাকাছি। মারমা (মগ)গণ আরাকানী বর্মীয় উপভাষায় কথা বলে এবং ত্রিপুরাগণ ত্রিপুরি তিব্বতিধর্মী উপভাষায় কথা বলে। বিভিন্ন খ্রিস্টান মিশনারি সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের ধর্মপ্রচারের জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত-সংলগ্ন মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরার বেশিরভাগ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ঐ অঞ্চলে ঐসব বিচ্ছিন্ন ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে খ্রিস্টধর্মের ছত্রছায়ায় একত্রিত করে বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশে ভারত-বাংলাদেশের এই পার্বত্য ভূ-রাজনৈতিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্বাংশের যুক্তরাষ্ট্রে ও পাশ্চাত্য শক্তি ইসরাইলের মতো একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

শুধুমাত্র ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান। এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহরীতি, আত্মীয়তা সম্পর্কে (Keenship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টনরীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত (Denise and Bernot, 1957)। পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলোর প্রায় সবাই যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতি স্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছ। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেব এদেশে প্রবেশ করেছে (Hutchinson, 1909, Bernot, 1960 and Risley, 1991)। বর্তমানেও এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992)। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙামাটি অঞ্চলে বাস করে। মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামে দণিাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দল বেঁধে থাকে। ম্রো, খ্যাং, খুমী এবং মুরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা। বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলোর সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসাবস করে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মণিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা। ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর-দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুণ্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রামণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মণিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া জয়ন্তী পাহাড়, মণিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অšে¦ষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে। নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না। ঠিক একইভাবে, ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানরা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড।  কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের আদিবাসী হতে পারে না। আরো বলা যায়, মাত্র ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’, সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোনো কোনো নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমনÑ ছোট নাগপুরের বীরভূম, সীঙভূম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চলÑ যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেব স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে।

একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বাসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকামণ্ডিত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ ও রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এরা সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেব বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলগুলোর আদিবাসী বা ভূমিপত্র হিসেব চিহ্নিত হতে পারে না। উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে একীভূত (Assemilated) হয়ে গেছে। এটা দোষের কিছু না বরং ভালো। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায়  এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম তথা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোন্ বিবেচনায় ুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।

প্রশ্ন: : আদিবাসী ইস্যু নিয়ে বর্তমানে হৈচৈ-এর কারণ কি?

প্রফেসর আবদুর রব : আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেছি। তারপরও আরো একটু বলার তাগিদ অনুভব করছি। এর উত্তরে আমি বলবো তিমুরের দিকে চোখ তুলেন। পূর্ব তিমুর হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিকে থেকে ইন্দোনেশিয়ার জন্য। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিমরাষ্ট্র। বিশ কোটি জনসংখ্যার দেশ। এরমধ্যে ১৮ কোটি মুসলমান। এ মুসলমান দেশের উপস্থিতি মাত্র তিনকোটি মানুষের দেশ অস্ট্রেলিয়া হুমকি মনে করে। কারণ অস্ট্রেলিয়ার উত্তরেই হলো ইন্দোনেশিয়া। আর অস্ট্রেলিয়ার নিকটতম দ্বীপ হলো তিমুর। ইস্ট তিমুর ছিল পুর্তগীজ কলোনি আর ওয়েস্ট তিমুর ছিল দাজ কলোনি। গোটা ইন্দোনেশিয়া দাজ শুধু ওয়েস্ট তিমুর ছিল পুর্তগীজ। এই ইস্ট তিমুরের জনগণকে খ্রিস্টান করে ফেলে তারা। আর ওয়েস্ট তিমুরসহ গোটা ইন্দোনেশিয়া মুসলমান। বালিতে কিছু হিন্দু আছে। পুর্তগীজরা চলে যাওয়ার পর তিমুর ইন্দোনেশিয়ার সাথে থাকতো পারতো। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া জিও পলিটিকসের মাধ্যমে এখাকার জনগণকে সংগঠিত করে বিদ্রোহকে উস্কে দিয়েছে। কারণ এখানে স্বাধীন ইন্দোনেশিয়া থাকলে যে কোন সময় ঘনবসতিপূর্ণ মুসলমানরা অস্ট্রেলিয়া দখল করে নিতে পারে এ আতংকে তারা এ ভূ-রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে জাতিসংঘের ব্যানারে খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করে,  ইউরোপের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর সাহায্যে পূর্বতিমুর নামে স্বাধীন খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এখন সে রাষ্ট্র পাহারা দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান সেনাবাহিনী। সুতরাং ভূরাজনৈতিক কারণ এখানে নৃতাত্ত্বিক কারণের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ঠিক একইভাবে দেখুন সুদান বহুজাতি তাত্ত্বিক দেশ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আফ্রিকার একটি বড় দেশ। সেটার দারফুর অংশে উপজাতির ভিত্তিতে মুসলমানদের বিভাজন সৃষ্টি করেছে। তারপর সবচেয়ে সম্পদ সমৃদ্ধ দক্ষিণ সুদান যেখানে রয়েছে তেল সমৃদ্ধ অ্যাবে অঞ্চল। এ অঞ্চলে আমেরিকার সিআইএ ও ইসরাইল অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। আশপাশের খ্রিস্ট রাষ্ট্রগুলো জনবল ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উস্কে দিয়ে গণভোটের নাটক মঞ্চস্থ করে স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরির নামে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। অপর দিকে পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেমন ফিলিপাইনের মুরোদের মিন্দানাও, সেখানে গোটা মিন্দানাও এর একটা অংশজুড়ে তারা। একক সংখ্যাগরিষ্ঠ তারা এখনকার কয়েকটা রাজ্যে যেমন সুলু মিন্দানাও, কিন্তু সেখানে তারা কোন স্বাধীনতা দিচ্ছে না। কাশ্মীরেও স্বাধীনতা দিচ্ছে না। ভাষা তাত্ত্বিক নৃতাত্ত্বিক সবদিক দিয়ে কাশ্মীরীরা আলাদা। সেখানে জাতিসংঘ ডাবলস্ট্যান্ডার্ড করছে। এভাবে চেচনিয়া, মিন্দানাওসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতিসংঘ ডাবলস্ট্যান্ডার্ড করছে। এসব দেশে গণভোট হলে সবাই স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দিবে। আমাদের পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে পূর্ব তিমুর ও সুদানের মতো ভয়ংকর খেলা চলছে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগ তাদের গত টার্মে শান্তিচুক্তি করেছে, এতে কতটুকু লাভ ক্ষতি হয়েছে?

প্রফেসর আবদুর রব : আওয়ামী লীগের শান্তিচুক্তি অবশ্যই জনমতের প্রতিফলন নয়। ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগ এ কাজ করেছে তা ঠিক। কিন্তু এ বিষয়ের ওপর গণভোট হলে অবশ্যই ৯০ ভাগ মানুষ বিরুদ্ধে ভোট দিতো। এ চুক্তি আমাদের অস্তিত্ব সংবিধান ও স্বার্থের বিরুদ্ধে। এ চুক্তির কিছু কিছু ধারা এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার দু’বার ক্ষমতায় আসার পরও। পারবেও না। শান্তিচুক্তি যেদিন বাস্তবায়িত হবে সেদিন এখনকার অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাস্তহারা হবে। তাদেরে সন্তু লারমার সন্ত্রাসীরা বের করে দিবে। এ চুক্তি আমাদের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ৩৬,৩৮ ও ৪২ নং ধারার সাথে সাংঘর্ষিক।

প্রশ্ন: সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের যে সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার নিয়েছে, তা কতটা যুক্তিসংগত।

প্রফেসর আবদুর রব : সেনাবাহিনী এদেশের রক্ষক। সংবিধান অনুযায়ী সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনী সমূহ দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, আগ্রাসন প্রতিরোধ করবে। এখানে দুস্কৃতিকারীদের দু’টি গ্রুপ হয়ে গেছে তারা নিজেরা নিজেরা মারামারি হানাহানি করছে। প্রায় প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে, রক্ত ঝরছে। সন্তু লারমা গ্রুপ আর মানবেন্দ্র লারমার গ্রুপ শান্তিচুক্তির পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধ করছে।

এ অস্থিরতা এবং এদের রক্ষা করতে সেখানে সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। তাছাড়া এখানে আমাদের সীমান্ত আছে। এটা বিচ্ছিন্নতাবাদপ্রবণ এলাকা। এখান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার আমাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।

এমনও রিপোর্ট আছে দেশের বাইরে থেকে ট্রেনিং নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা ঢুকছে। তাদের হাতে হাজার হাজার অস্ত্র আছে। এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে এসব অস্ত্রে ভারতের ট্রেডমার্ক রয়েছে। অতএব এমন একটা অঞ্চলে সেনাবাহিনী থাকতেই হবে। যদি সিলেটে, ঢাকায়, রাজশাহীতে সেনাবাহিনী থাকতে পারে সেখানে পারবে না কেন? এটা তো আরো গুরুত্বপূর্ণ ও বিপন্ন এলাকা। আমাদের দেশের দশভাগের একভাগ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য, আমাদের পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বনজ খনিজ সম্পদের নিরাপত্তার এবং উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অুণœ পাবর্ত্য অঞ্চলে সেনাবাহিনী থাকা জরুরি। সর্বোপরি সেখানে যারা বসবাস করছেন তারাও আমাদের দেশের সম্মানিত নাগরিক তাদের নিরাপত্তা দেয়া আামদের পবিত্র দায়িত্ব। সুতরাং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সংবিধানের অধীনেই সেনাবাহিনী এখানে থাকবে। যত সংখ্যক প্রয়োজন এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যা করা দরকার করবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ভারত তার ১৪ লাখ সেনা সদস্যের ৬ লাখই কাশ্মীরে রেখেছে, ৪ লাখ রেখেছে উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে। সেদেশে এ নিয়ে কেউ কোন কথা বলছে না। অথচ বাংলাদেশের বিদেশি মদদপুষ্ট একশ্রেণীর মিডিয়া এ নিয়ে হৈচৈ করে। এখান থেকে সেনাপ্রত্যাহর বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

প্রশ্ন : উপজাতিদেরকে আলাদা রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে আনার কোন প্রকল্প জাতিসংঘের আছে কি?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : ব্রিটিশের ১৮৯৯ অথবা ১৯০০সালের একটি এ্যাক্ট ছিল যে চট্টগ্রাম পাবর্ত্য অঞ্চলকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া হবে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা তাদের শাসন কাজের সুবিধার জন্য এ এ্যাক্ট জারি করেছিল। আমাদের স্বাধীন দেশে আমরা বাংলাদেশের সকল নাগরিক সমান মর্যাদার অধিকারী। যারা সেই এ্যাক্টের আলোকে দেশের কোন অঞ্চলের অথবা অধিবাসীর আলাদা গুরুত্বের কথা বলেন তারা ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে মূর্খের মতো এ কথা বলেন। সুতরাং এটার কোন ভিত্তি নেই। স্বাধীন দেশ চলবে তার সংবিধান অনুযায়ী। ঐ এ্যাক্টের দোহাই দিয়ে তাদের আলাদা স্ট্যাটাস দেয়া যায় না। বাংলাদেশ পৃথিবীর ঘন জনবসতি পূর্ণ দেশ। চট্টগ্রাম পাবর্ত্য এলাকা দেশের এক দশমাংশ অর্থাৎ ১৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার বা ৫ হাজার বর্গ মাইল। এখানে মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বসবাস করে। দেশের জনসংখ্যা অনুসারে সেখানে দুই কোটি মানুষ বসবাস করতে পারে।

 প্রশ্ন : আমার প্রশ্ন ছিলে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন আছে কিনা?

প্রফেসর ড. আবদুর রব :  আছে , তবে সেটা বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয় কারণ এখানে কোন আদিবাসী নেই। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, ভারত, নিউজিল্যান্ডসহ যেসব দেশে আদিবাসী আছে তাদের জন্য। তবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়, আলাদা স্ট্যাটাস দেয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীরা আদিবাসী  হিসেবে কোথাও স্বীকৃত নয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। কোন সরকারই করেনি। এরা আদিবাসী হলে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা মানতাম, কিন্তু আসলে এরা তো আদিবাসী নয়। বাংলাদেশে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাÑ যারা প্রোটো-অস্ট্রোলয়েড (proto Astroloid) নামের আদি জনধারার অংশ বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the Soil বলে দাবি করতে পারে। তাছাড়া আর কেউ আদিবাসী নয়। সুতরাং জাতিসংঘের এ রেজুলেসন আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

কিছুদিন আগে জাতিসংঘের একজন রিপোর্টার এদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কে অনির্ভরযোগ্য কোন উৎসসূত্র থেকে ইতিহাস ঐতিহ্য, রাজনীতি, নৃতাত্ত্বিক বিষয় না জেনে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তা পক্ষপাতদুষ্ট, অজ্ঞানতা প্রসূত এবং ভুল। তিনি কিছু বিদেশী মদদপুষ্ট এনজিও এর প্রকাশিত বই ও বিভিন্ন সোর্স থেকে ভুল তথ্য পেয়ে তা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ রিপোর্ট দিয়েছেন। তাদের সঠিকভাবে দালিলিক তথ্য প্রমাণ দিয়ে বুঝাতে হবে। আসল বিষয়টি তাদের সামনে উপস্থান করতে হবে। যাদের তারা আদিবাসী বলছে আসলে তারা সেটেলার। তার কথার প্রতিবাদ করাও হচ্ছে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এর প্রতিবাদ করে বলেছেন বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই।

আমিও বলছি বাংলাদেশে অভিবাসী এসব ক্ষুদ্রজনগোষ্ঠী আমাদের সমান নাগরিক সুবিধা সম্মান পাবে। জাতিসংঘের এ রেজুলেশন যেসব দেশে প্রকৃত আদিবাসী আছে তাদের জন্য।  কিন্তু কিছুতেই জাতিসংঘ ঘোষিত বাড়তি সুবিধা পেতে পারে না । কারণ তারা আদিবাসী নয়  অভিবাসী, বিভিন্ন দেশ থেকে এ দেশে এসেছে। শান্তিচুক্তিতে যে দেয়া হয়েছে সেটাও ভুল।

প্রশ্ন : কিছুদিন আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি রিপোর্ট দেয়া হয়েছে সরকারের নিকট, পাবর্ত্য এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র চলছে, বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : সেনাবাহিনীর মেধাবী কর্মকর্তাগণ যে রিপোর্ট দিয়েছেন, অবশ্যই তা গুরুত্বপূর্ণ। তারা যে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করেছেন তা মোকাবেলায় অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। শান্তি বাহিনীর সদস্যরা ভারতে ট্রেনিং নিচ্ছে এবং সেখান থেকে অস্ত্রশস্ত্র পায়। শান্তিবাহিনীর সদস্যরা ভারত থেকে এসে পুর্নবাসিত হয়েছে। তাদের হাতেও হাজার হাজার বাঙালি এবং ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর লোক মারা গেছে। আগে ষড়যন্ত্র হয়েছে এখনো হচ্ছে। শান্তি বাহিনীর সন্তু লারমা এখনো বিচ্ছিন্নতাবাদ চাচ্ছে। এদের উস্কে দিচ্ছে বিদেশিরা। কারণ এখানে খ্রীস্টান মিশনারীদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে চলছে। কিন্তু ইসলামের দাওয়াতের কাজ নেই। যদিও বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছানো। কিন্তু সরকার এমন অবস্থার সৃষ্টি করে রেখেছে যে সেখানে তাবলীগ জামায়াতের কাজও নিষিদ্ধ। যদিও মুসলমানদেরকে এ এলাকায় মিশনারি কাজ করতে দেয়া গণতন্ত্রেরও দাবি, কিন্তু সরকার তা করতে দিচ্ছে না। খ্রিস্টান মিশনারিরা হাসপাতাল চার্চ প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন জাতিসংঘের ইউএনডিপির আবরণে পাশ্চাত্য খ্রীস্টান এনজিও ধর্মান্তরের কাজ করছে। ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করছে। এখানকার মিজোরাম, মণিপুরের, নাগাল্যান্ড ৯০/ ৮০ ভাগ খ্রিস্টান। বাংলাদেশের এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর সেটেলারদের খ্রিস্টান করে এখানে এরা একটা খ্রিস্টান রাষ্ট্র করার পরিকল্পনা করছে। সেনাবাহিনী সে দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছে। পূর্ব তিমুরের মতো অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। এ বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন করতে সেনাবাহিনী এ্যাকশনে গেলে তারা বলবে অত্যাচার নির্যাতন করছে। কিন্তু আমি বলছি শুধু পাবর্ত্য কেন দেশের রাজশাহী, সিলেট যে কোন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সেনা বাহিনী কঠোর হাতে দমন করবে, এটাই স্বাভাবিক। তখন উচিত সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করা। এমন কি ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর নাগরিককেও দেশের অখণ্ডতার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

প্রশ্ন: একশ্রেণীর মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করছে, এরা কারা?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : এক কথায় বললে এরা মূর্খ। এদের কারো এনথ্রোপলজি, সোসোলজি, ইতিহাস, ভূগোল এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও আদিবাসী উপজাতি সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। আর যারা জেনে বুঝে এ কাজ করছে তারা বিভিন্ন পারিতোষিক,বৃত্তি, উচ্চ বেতনের চাকরি প্রভৃতির লোভে করছে। প্রিন্ট ইলেকট্রনিক মিডিয়া, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা এনজিও কর্মীসহ বিভিন্ন  শ্রেণীর প্রভাবশালীরা লোভের বশে দেশের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এমন মিথ্যাচার করছে।

প্রশ্ন: দেশবাসীর উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কি?

প্রফেসর ড. আবদুর রব : চট্টগ্রামের পাবর্ত্য এলাকা আমদের মোট ভূ-খণ্ডের দশভাগের একভাগ। এ এলাকায় জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদকে যারা উস্কে দিতে তারা জানে না ওখানে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যার অর্ধেক ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী-ভাষাতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও জাতিতাত্ত্বিক তিন দিক থেকেই অভিবাসী। বাংংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো  এখানকার  আদিবাসীও বাঙালিরা। তবে আমি মনে করি সকল নাগরিকের মতো এ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরাও বাংলাদেশের নাগরিক বাংলাদেশী। তারাও প্রত্যেক বাংলাদেশীর মতো সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করবে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত আমাদের এদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র পবিত্র দায়িত্ব তাদেরও। বনজ সম্পদ, গ্যাসসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ, পানি সম্পদ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অফুরন্ত সম্পদের ভাণ্ডার এ এলাকায় পর্যটন শিল্প, স্কুল কলেজ নির্মাণ, হাসপাতাল, বিভিন্ন একাডেমী , ক্যাডেট কলেজ ও মসজিদ মাদরাসা নির্মাণ করে আরো ব্যাপক জনবসতি গড়ে তুলতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় লেবাননের মাত্র একটি ভ্যালি বেকাভ্যালি যেখানে বাস করে ৪৮ লাখ, এর আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার।  আমাদের পার্বত্য  এলাকার আয়তন ১৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার, অথচ এখানে বাস করে মাত্র ১৩ থেকে ১৫ লাখ লোক। এখানে চেংগুভ্যালি, সাংগুভ্যালি, মাতামুহুরিভ্যালি, কাচালংভ্যালিসহ ১২/১৩টি ভ্যালি আছে। ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য এটা একটা সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বার। এ এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন রিসোর্ট নির্মাণ করলে বাংলাদেশ বিশ হাজার কোটি টাকা অর্জন করতে পারবে। আমাদের বাজেটের পাঁচ ভাগের এক ভাগ এখান থেকে আসতে পারে বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন।

সূত্র: সোনার বাংলা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

পাহাড়ি তরুণীদের অর্ধশত নগ্ন ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে: অভিভাবকরা আতঙ্কে

পাহাড়ি তরুণীদের অর্ধশত নগ্ন ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে: অভিভাবকরা আতঙ্কে, (পাহাড়ি. তরুণী, নগ্ন,  ভিডিও, ইন্টারনেট, প্রেম, মোবাইল, পাহাড়ী)

পার্বত্য নিউজ ডেস্ক:

পাহাড়ি তরুণীদের অর্ধশত নগ্ন ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে ইন্টারনেটে: অভিভাবকরা আতঙ্কে

পাহাড়ের তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পর গোপন ক্যামেরায় অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্য সম্মতির ভিত্তিতে বা গোপনে ধারণ করে ফুটেজ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মোবাইলে-ইন্টারনেটে। এভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে পার্বত্য রাঙ্গামাটি এলাকার অর্ধশত তরুণী স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী হতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে এলাকা ছেড়ে দূরে কোথাও আত্মগোপনে চলে গেছেন। একের পর এক প্রতারণার ঘটনা ফাঁস হওয়ায় আতংক ছড়িয়ে পড়ছে গোটা পার্বত্য এলাকায়। মেয়ের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। অপকর্মের হোতারা ঘটনা ঘটিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা নিজেরাই মোবাইলের ব্লুট্রুথের মাধ্যমে সেগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে বিপাকে পড়ছে সংশ্লিষ্ট তরুণী এবং তাদের পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক শ্রীলংকান কর্মকর্তা চাকরি শেষে রাঙামাটি ছেড়ে যাওয়ার পর শ্রীলংকা থেকে রাঙ্গামাটিতে তার পরিচিতদের ইমেইলে একটি ভিডিও ফুটেজ এবং কিছু স্টিল ছবি পাঠায়। সেখানে রাঙ্গামাটি শহরের একজন চাকমা গৃহবধূর সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্কের বেশ খোলামেলা দৃশ্য রয়েছে। এই ছবি এবং ফুটেজ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এক মোবাইল থেকে আরেক মোবাইলে। বেকায়দায় পড়া গৃহবধূটি আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হয়।

এরপর শহরের চম্পকনগর এলাকার একটি অভিজাত পরিবারের এক মেয়ের ওয়েব ক্যামেরায় নিজের পরিচিত কারো সামনে নগ্ন হওয়ার দৃশ্য সম্বলিত একটি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ঘটনাটি বেশ সাড়া ফেলে শহরে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে মেয়েটির পরিবার শিক্ষিত এবং সচেতন হওয়ায় তারা ইউটিউব/ফেসবুকসহ বিভিন্ন সাইটে যোগাযোগ করে ফুটেজটি প্রচার কিছুটা বন্ধ করতে সক্ষম হন। পরে মেয়েটিকে গোপনে অন্যত্র বিয়ে দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েক মাস আগে পর পর রাঙ্গামাটি পার্বত্য এলাকার কয়েকজন পাহাড়ি তরুণীর ভিডিও ফুটেজ বের হয় । এর মধ্যে শহরের তিনটি অভিজাত পরিবারের তিন মেয়ের ফুটেজ নিয়েই আলোচনা ছিলো বেশি। এদের মধ্যে রাজপরিবারের মেয়ে যেমন আছে, তেমনি একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার মেয়েও আছে। আবার স্কুলপড়ুয়া দুই পাহাড়ি কিশোরীর ছবি এবং ফুটেজও আছে। এইসব ফুটেজের বেশিরভাগই পাহাড়ি তরুণ-তরুণীদের। তবে সম্প্রতি আবার তোলপাড় সৃষ্টি হয় গত সপ্তাহে পর পর পাওয়া দুইটি ফুটেজ নিয়ে। এই দুইটি ফুটেজের তরুণীরা পাহাড়ী হলেও অপরাধীরা বাঙালি। একটি ঘটনায় অভিযুক্ত তরুণ রাঙ্গামাটি শহরের হাসপাতাল এলাকার বাসিন্দা এবং ফুটেজ প্রকাশের পর ঘটনার শিকার মেয়েটি নিজেই বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা করে প্রতারক প্রেমিকের বিরুদ্ধে। মামলা হওয়ার পর প্রথমবারের মতো এই ধরনের ঘটনার তদন্তে নামে পুলিশ। পুলিশী তৎপরতায় প্রতারক প্রেমিক পালিয়ে গেলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা।

রাঙ্গামাটি শহরের রাজবাড়ী এলাকার একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেয়েটির ঘটনার পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তার পুরো পরিবার।পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে এই ঘটনাটির পুরো ভিডিওটি ধারণা করা হয় কলেজগেট এলাকার মোটেল জর্জ নামের আবাসিক হোটেলের একটি কক্ষে। এ প্রসঙ্গে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা নাসিরউদ্দিন শরীফ বলেন, আমরা ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার জন্য তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছি এবং একই সাথে অপরাধীকে আটক করার জন্য অভিযান অব্যাহত আছে।

একই সপ্তাহে রাঙ্গামাটি বনরুপা এলাকার এক মোবাইল বিক্রেতার সাথে শহরের এক সুন্দরী চাকমা তরুণীর কিছু স্থির ছবি প্রকাশ পায়। শিক্ষিতা এই সুন্দরী মেয়েটিকে বখাটে এই তরুণের পটিয়ে ফেলার ঘটনায় বিস্মিত হন সবাই।

ট্রাইবেল আদাম নামক এলাকার এক তরুণ-তরুণীর ‘মোটর সাইকেল সেক্স’ এর ফুটেজটিও সাড়া ফেলে সর্বত্র। এগুলো ছাড়াও জাতিসংঘের একটি সহযোগী সংস্থায় চাকরিরত দুই পাহাড়ি সহকর্মীর ভিডিও ফুটেজ, একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ছবি, ঢাকার একটি বাসায় পাঁচজন পাহাড়ি তরুণীর ব্যক্তিগত কিছু মুহূর্তের ছবি, ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত রাঙ্গামাটির এক মারমা তরুণী মডেল -এর ব্যক্তিগত জীবনের ছবি এখন ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল থেকে মোবাইলে।

এই মুহূর্তে অর্ধশত তরুণীর স্থির ছবি বা ফুটেজ শত শত যুবকের হাতে হাতে আছে। এসব ফুটেজ ও ছবির একটি বড় অংশই গোপনে ধারণ করা। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সম্মতির ভিত্তিতেই করা।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ নিরূপা দেওয়ান বলেন, পাহাড়ি সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিজ্ঞানেও সমৃদ্ধ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেয়েরা। তবে কেবল শিক্ষিত হলেই হবে না, সেই সাথে মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তিনি বলেন- মোবাইল ফোন ব্যবহারের একটি নীতিমালা থাকা জরুরী আর এসব সামাজিক অপরাধ নির্মূলে প্রশাসনিক উদ্যোগের অনেক বেশি প্রয়োজন। আর সবচে বেশি প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মাসুদ উল হাসান বলেন, সারাদেশে মোবাইল এবং ভিডিও ক্যামেরায় যে পর্ণোগ্রাফির গোপন ব্যবসা চলে তার থেকে পার্বত্য এই শহরও ব্যতিক্রম নয়। আমাদের কাছে একাধিক অভিযোগ এসেছে, আমি রাঙামাটির সকল থানার ওসিকে নিয়ে এই বিষয়ে বৈঠক করেছি। ইতিমধ্যে আমরা ভিডিও ফুটেজ এবং স্থির ছবি দেখে অভিযুক্তদের সনাক্ত করেছি, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে এই বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি অনেক বেশি জরুরী বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সূত্র: সামহোয়ার ব্লগ/কৈ মাছের প্রাণ

Read the news in English

Pornography of tribal girls are spread in internet: parents perplexed

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও কিছু বিষয়

পর্ণো ছবিতে বনানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়ের ছাত্রী ও তার বন্ধুরা!

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

বাংলাদেশে আদিবাসী নিয়ে বাড়াবাড়ি ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

রাঙামাটিতে উপজাতীয় গৃহবধুর নগ্নছবি তুলে ব্লাকমেইল করে ২ লাখ টাকা দাবি: ১ প্রতারক গ্রেফতার

পুরুষ ফাঁসানো এক সুন্দরী শিক্ষিকার দিনকাল

কাজের মেয়ের সঙ্গে শিল্পী আরেফিন রুমির অবৈধ সম্পর্কের ছবি ফেসবুকে

কাজের মেয়ের সাথে শিল্পী আরেফিন রুমির প্রকাশিত অশ্লীল ছবিটি সঠিক নয়