image_pdfimage_print

ভারত ভাগের ৬৯ বছর পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসন দিবস পালন করে পাহাড়ী একটি গ্রুপ

%e0%a6%85%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%a4

(৩)

মেহেদী হাসান পলাশ :

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তার আগের দিন জন্ম হয়েছে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। ভারত বিভাগে স্যার সিরিল র‌্যাড ক্লিফের বিভাজন রেখা অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে। কিন্তু সেই ভাগ মেনে নিতে পারেনি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা সম্প্রদায়ের একটি গ্রুপ।

স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে এদিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকে বাংলাদেশের রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু পাকিস্তান রেজিমেন্টের বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা এ ঘটনার ২ দিন পর রাঙামাটি থেকে ভারতের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে। সেই থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ব পাকিস্তানের। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয় পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ড নিয়ে। সে হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি পাকিস্তানভুক্ত না হতো তাহলে তা বাংলাদেশেও অন্তর্ভুক্ত হতে ব্যর্থ হতো। ভারত ভাগের ৬৯ বছর পর হলেও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক সংগঠন ও তাদের শাখা সংগঠনগুলো পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের রাঙামাটি থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভারতীয় পতাকা নামিয়ে দেয়ার দিন ১৭ আগস্টকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসন দিবসরূপে পালন করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছর থেকে ভারতে অবস্থিত চাকমা উপজাতিরা এদিনকে ব্লাক ডে বা কালো দিবস হিসেবে পালন করে থাকে।


এই সিরিজের আগের লেখাগুলো

  1. ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন: সরকারের মর্যাদা কর্তৃত্ব ও এখতিয়ার ক্ষুণ্ন হতে পারে
  2. ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন বৈষম্যমূলক ও বাঙালি বিদ্বেষী

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ ও এর বিভিন্ন শাখা সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, যুব ফ্রন্ট, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এর নেতৃবৃন্দ প্রতিবছর ১৭ আগস্টকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসন দিবস পালন করে থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এই কর্মসূচী পালিত হয়। ইউপিডিএফ সমর্থিত বলে পরিচিত স্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিএইচটিনিউজ.কমে (chtnews.com) প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

২০ আগস্ট ২০১৬ তারিখে সিএইচটিনিউজ.কমে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়: “পাকিস্তান কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসনের ৬৯তম বার্ষিকী উপলক্ষে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), ঢাকা শাখার উদ্যোগে ১৯ আগস্ট শুক্রবার বিকাল ৫টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কার্জন হল মাঠে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে’’। উক্ত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন পিসিপি ঢাকা শাখার সভাপতি রোনাল চাকমা। সভায় মূল আলোচক ছিলেন ইউপিডিএফ-এর কেন্দ্রীয় সদস্য নতুন কুমার চাকমা।

এছাড়াও আলোচনা করেন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের যুগ্ম-সম্পাদক বরুণ চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভানেত্রী নিরূপা চাকমা, পিসিপির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বিনয়ন চাকমা, সাধারণ সম্পাদক বিপুল চাকমা। সভা পরিচালনা করেন পিসিপি ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক রিয়েল ত্রিপুরা।

সভায় ইউপিডিএফ নেতা নতুন কুমার চাকমা তাঁর বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগ্রাসন দিবসের বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৪৭ সালের ভারত স্বাধীনতা আইন’ (১৮ জুলাই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত) মোতাবেক দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহ নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু ও অমুসলিমদের নিয়ে ভারত রাষ্ট্র গঠিত হয়।

সে সময়ে শতকরা ৯৮ ভাগের বেশি অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দিতে চাইনি। দেশ ভাগের সময় তৎকালীন জনসমিতির সাধারণ সম্পাদক স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজধানী রাঙামাটিতে ব্রিটেনের ইউনিয়ন জ্যাক-এর পরিবর্তে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। তৎকালীন ইংরেজ জেলা প্রশাসক কর্ণেল জি. এল. হাইড নিজেও উক্ত পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে পতাকায় স্যালুট করেন। পরে কর্ণেল হাইড নিজের দপ্তরেও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। অন্যদিকে বন্দরবান সদরে বোমাং রাজ পরিবারের উদ্যোগে উত্তোলিত হয় বার্মার পতাকা।

ভারত-পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত হওয়ার পর ১৭ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশটি পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করে দিয়ে ম্যাপে প্রদর্শিত হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পরবর্তীতে ২০ আগস্ট পাকিস্তানের বালুচ রেজিমেন্ট এক সশস্ত্র আগ্রাসন চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম দখল করে নেয়। রাঙামাটি ও বান্দরবান থেকে নামিয়ে দেয় স্থানীয় অধিবাসীদের উত্তোলিত পতাকা। সূচনা হয় আগ্রাসী অপশক্তির দখলদারিত্বের নতুন ইতিহাস। এই দখলদারিত্বের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশদের পর পাকিস্তানি শাসকরা যে শোষণ-নির্যাতনের জোয়াল পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল তা আজ ৬৯ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশ আমলেও জারি রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পতাকা উত্তোলন যে কোন সাধারণ নিছক একটি ঘটনা ছিল না তা ১৯ আগস্ট ডিসি বাংলোতে ডিসি কর্ণেল হাইড-এর উপস্থিতিতে চাকমা রাজাসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকটিই তার প্রমাণ। উক্ত বৈঠক থেকে বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশনের প্রধান সিরিল র‌্যাডক্লিফ-এর পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত না মানার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এসময় তিনি তৎকালীন জনসমিতির নেতৃত্ব পাকিস্তানের দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি বলেও মন্তব্য করেন।

ইউপিডিএফ নেতা ছাত্র ও যুব সমাজের উদ্দেশ্যে বলেন, বিশ্বের বুকে সম্মান-মর্যাদার সহিত মাথা উঁচু করে বাঁচতে হলে অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে অবশ্যই সকলকে সংগ্রামী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আলোচনা সভায় ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেন। শুধু ঢাকা নয়, খাগড়াছড়ি সদরেও একই দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান করে সংগঠনটি।

সিএইচটিনিউজের ২০ আগস্ট ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, ‘নব্য বেলুচ রেজিমেন্ট সম্পর্কে সজাগ হোন! ধর্মের লেবাসধারী পাকিস্তানি চরদের প্রতিরোধ করুন’ এই শ্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তান আগ্রাসনের ৬৯ বছর উপলক্ষে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ) ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন জেলা কমিটির উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

২০ আগস্ট সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে অনুষ্ঠিত সভায় পিসিপি’র জেলা সাধারণ সম্পাদক সুনীল ত্রিপুরার সঞ্চালনায় ডিওয়াইএফ জেলা সভাপতি লালন চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ইউপিডিএফ’র সংগঠক রিকো চাকমা ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন জেলা দপ্তর সম্পাদক দ্বিতীয়া চাকমা। এতে প্রধান আলোচক ছিলেন পিসিপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক অলকেশ চাকমা।

বক্তারা বলেন, ২০ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীদের জন্য একটি অভিশপ্ত দিন বা ‘কাল দিবস’। ১৯৪৭ সালের এই দিনে হানাদার বাহিনী ‘বেলুচ রেজিমেন্ট’ সশস্ত্র আগ্রাসনের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা গুঁড়িয়ে দিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে জোর-জবরদস্তিমূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। একই অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, ২০ আগস্ট, ২০১২ সালে খাগড়াছড়িতে, রামগড়ে, ২০ আগস্ট, ২০১৩ সালে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে, ২০ আগস্ট ২০১৪ সালে ঢাকায়, ১৯ আগস্ট ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম, ঢাকা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন স্থানে এ দিবস পালন করে।

তবে বাংলাদেশে পিসিপি দিনটিকে আগ্রাসন দিবস হিসেবে পালন করে আসলেও এ বছর থেকে সারা ভারতে দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া।

২০১৬ সালের ২৪-২৫ মার্চ আসামের গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার প্রথম জাতীয় অধিবেশনে এই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে সমগ্র ভারতের চাকমা জনগোষ্ঠী প্রতি বছর ১৭ আগস্টকে ব্লাক ডে পালনের আহ্বান ঘোষণা দেন। সে মোতাবেক ১৭ আগস্ট ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো বিশেষ করে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল এবং দিল্লী, বেঙ্গালুরুসহ যেসব রাজ্যে চাকমা জনগোষ্ঠী বসবাস করে তারা একসাথে ব্লাক ডে বা কালো দিবস পালন করে।

সেভেন সিস্টার্স থেকে প্রকাশিত গণমাধ্যমসহ ভারতের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে ফলাও করে চাকমাদের এই ব্লাক ডে পালনের খবর ফলাও করে প্রচার করা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের যুগশঙ্খ পত্রিকায় প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘সংস্থার ত্রিপুরা কমিটির পক্ষ থেকে গত ১৭ আগস্ট) আগরতলায় প্রেস ক্লাবের সামনে কালো দিবস পালনের অঙ্গ হিসেবে একটি ধর্ণা কর্মসূচী নেওয়া হয়। এখানে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এ উপলক্ষে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচী গ্রহণ করেছে চাকমারা।

পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়,‘বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে নিজেদের মূল ভূখণ্ড বলেই মনে করে থাকে চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষজন। কিন্তু তাদের জোর করে সেই ভূখ- থেকে উৎখাত করা হয়েছে’ বলে অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধেই তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচী গ্রহণ করে ‘চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’ আহ্বান জানায় ‘ব্লাক ডে’ পালনের। সংগঠনের পক্ষ থেকে এই দিবস পালনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, এবছর থেকে প্রতি বছর উত্তর-পূর্ব ভারতে বসবাসকারী চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকেদের দ্বারা ১৭ আগস্ট দিনটি কালো দিবস হিসেবে প্রতিপালিত হবে।

এই সিদ্ধান্তটি ঘোষিত হয়েছে গত ২৪-২৫ মার্চ আসামের গৌহাটিতে অনুষ্ঠিত চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার প্রথম জাতীয় অধিবেশনে। সেই ঘোষণা অনুযায়ী কালো দিবসটি একযোগে পালিত হয় আসাম, মিজোরাম, অরুণাচল ও ত্রিপুরায়। এছাড়া এই দিনটি কলকাতা, নয়া দিল্লী, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালুরু ইত্যাদি শহরেও প্রবাসী ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মসূত্রে বসবাসকারী সেখানকার চাকমাদের উদ্যোগে পালিত হয়েছে।

কালো দিবস পালনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সংগঠনের নেতৃত্বরা জানিয়েছেন, ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্টের রাতটি ছিল সমগ্র চাকমা জনসমাজের পক্ষে চরম দুঃস্বপ্নময় রাত এবং আরও একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা। সেদিন থেকে আজ অবধি ৭০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও চাকমা সমাজ যে প্রশ্নটির সদুত্তর খুঁজে ফেরে, সেই প্রশ্নটি হচ্ছে, কোন্ নীতি অনুসরণ করে বেঙ্গল বাউন্ডারী কমিশন ৯৮.৫ শতাংশ অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা দিয়েছিল।

ভারতের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে শান্তি বিকাশ চাকমা বলেন, “The Chakmas, living in other parts across the country, like Bangalore, Mumbai and Delhi, will also observe the day in a similar manner.”

দিবসটি পালনের প্রেক্ষাপট হিসেবে তিনি বলেন, on August 17, in 1947, when the rest of India had been celebrating the new-found independence, the Baloch regiment of the Pakistani army had invaded Chittagong Hill Tracts and pulled down the Indian flag raised atop the Chakma king’s royal palace in Rangamati.

 “According to the Partition formula, the Chittagong Hill Tracts, which had 97.5 percent population of the indigenous communities, should have been included in India and this is what the Buddhist tribals had been hoping for. Even the late king Tridib Roy had raised the Indian flag atop the royal palace but it was pulled down by the officers of the Baloch regiment on August 17,” said Chakma.

নর্থ ইস্ট টুডে পত্রিকায় এ সংক্রান্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ““The Chakma community of the Northeast earlier asked Prime Minister Narendra Modi to raise the issue of alleged human rights violation against the Chakma community in the Chittagong Hill Tract. “

 প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত ভাগের ৬৯ বছর পরও কেন বাংলাদেশ-ভারতের চাকমারা একত্রে ১৭ আগস্টকে কালো দিবস ও পাকিস্তান আগ্রাসন দিবস পালন করছে কেন? কি এর তাৎপর্য? এর মধ্য দিয়ে তারা জাতিকে এবং বাংলাদেশ ও ভারতে জনগণ, সরকার ও বিশ্ববাসীকে কি বার্তা দিতে চাইছে?

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম বীরপ্রতীক এ প্রসঙ্গে ইনকিলাবকে বলেন, ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে একটি পরিকল্পনা ছিল, আসামের লে. গভর্ণর রেন্যাল্ড কুপল্যান্ডের নেতৃত্বে একটি ক্রাউন কলোনী করা হবে, যেখানে বর্তমান ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশের উত্তর-পূর্ব অংশ এবং বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম জড়িত থাকবে। যেখানে মিয়ানমারের বর্তমান রাখাইন প্রদেশ জড়িত থাকবে। তথা বঙ্গোপসাগরের নীল পানি ও হিমালয়ের পাদদেশ হয়ে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে এই রাষ্ট্রের সীমানা। এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন হয় নাই।

কিন্তু বাস্তবায়নের সকল উপাত্ত তখন যেমন বিদ্যমান ছিলো, এখনো বিদ্যমান আছে। সেখানে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশনের কারণে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়া জনগোষ্ঠীর হার ৭০%- ৯০% পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যক্তিগণ সেই অংশের প্রতি হাঁ বা না জানালেও ’৪৭ সালে তারা ভারতে থাকতে চেয়েছিলেন। স্নেহ কুমার চাকমার নেতৃত্বে রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা উড়িয়েছিলেন। এখন আমার নিকট আশ্চর্য ঠেকছে যে বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশ সেই সাতচল্লিশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে। এর উত্তর আমার কাছে হুবহু জানা নেই যে তারা কি চায়? বিচ্ছিন্নতা, না বাংলাদেশের অংশ? এর উত্তর তাদেরকে দিতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াদুদ ভুইয়া ইনকিলাবকে এ প্রসঙ্গে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তু রয়েই গেছে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। সাতচল্লিশে ভারত ভাগের সময় পাকিস্তানকেও মেনে নিতে পারেনি, বাংলাদেশকেও মেনে নিতে পারেনি। একই গোষ্ঠী বর্তমান প্রজন্মকে ১৯৭১ সালের পাকিস্তান প্রেমকে ভুলিয়ে দিয়ে সাতচল্লিশের চেতনায় ফিরিয়ে নেয়ার অপচেষ্টা চলছে।

১৯৭১ সালে তাদের গুরুজনেরা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তান আর্মিকে সহায়তা করেছিল। আজকের প্রজন্মের একটি অংশ ১৯৪৭ ফেরত যেতে চাইছে। ১৯৪৭ সালে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ ভারতের সাথে থাকতে চেয়ে ভারতের পতাকা উড়িয়েছিল।

এতে কি বোঝা যায়, দেশের জনগণ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। তারা কি বিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতে যেতে চায়? এটার মানে কি তারা ভারত বা বাংলাদেশের সাথে না মিশে গিয়ে আলাদা কোনো রাষ্ট্র করতে চায়? এটা বোঝা দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সাথে যখন কৌশলগত বাঙালী খেদাও আন্দোলন যুক্ত হয়েছে তখন দেশের সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকগণ শঙ্কিত হয়ে পারে না।

পার্বত্য বাঙালী নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলকাছ আল মামুন ভুইয়া ইনকিলাবকে বলেন, এর মাধ্যমে তারা যে বাংলাদেশ আজো মেনে নিতে পারেনি বরং অন্য একটি দেশে মিশে যেতে চায় তা পরিষ্কার বোঝা যায়।

এ ব্যাপারে ইউপিডিএফ’র বক্তব্য জানতে তাদের প্রচার ও প্রকাশনা শাখার প্রধান নিরন চাকমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাদের কেউ এ ধরনের কর্মসূচীর সাথে জড়িত নয়। তখন সিএইচটি নিউজে প্রকাশিত সংবাদ ও অনুষ্ঠানে উপস্থিত তাদের নেতৃবৃন্দের নাম পড়ে শোনালে ‘এ বিষয়ে আপনার সাথে কোনো কথা বলতে চাই না’ বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বড়ঋষি চাকমা গ্রেফতার

%e0%a6%ac%e0%a7%9c-%e0%a6%8b%e0%a6%b7%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%be

নিজস্ব প্রতিবেদক:

একাধিক হত্যা মামলার আসামী রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান বড় ঋষি চাকমাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর চার নেতাকে জেল হাজতে পাঠিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার রাঙামাটি জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট রোকন উদ্দিন কবির এর আদালতে বাঘাইছড়ি থানায় দায়ের করা অবসর প্রাপ্ত সার্জেন্ট মুকুল চাকমা হত্যা মামলায় আত্মসমর্পন করে জামিন চাইলে আদালত জামিন না মঞ্জুর করে আসামীদের জেল হাজতে প্রেরণ করে।

বাকি আসামীরা হলেন উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি প্রভাত কুমার চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক ত্রিদিপ কুমার চাকমা (প্রকাশ দীপ) এবং সার্বাতলী ইউপি মেম্বার অজয় চাকমা।

উল্লেখ্য গত ৩০ মে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মুকুল চাকমা অপহৃত হয়। তার বাড়ি রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির মারিস্যায়। সাবেক সেনা সার্জেন্ট হওয়ার কারণে স্থানীয় জেএসএস’র তার প্রতি অভিযোগ ছিলো, ‘তিনি সেনাবাহিনীর পক্ষে কাজ করেন। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করেন’।

গত ২৩ জুন সরেজমিন পরিদর্শনে মুকুল কান্তির মেয়ে নমিসা চাকমার সাথে কথা বলেছিলেন পার্বত্যনিউজের প্রতিনিধিসহ ঢাকা থেকে যাওয়া একটি সাংবাদিক টিম। নমিসা চাকমা মিডিয়া টিমকে বলেন, ‘জেএসএস’র লোকজন বাবাকে সন্দেহ করতো। তারা ভাবতো তাদের অপকর্মের সব তথ্য বাবা সেনাবাহিনীকে দিয়ে দেয়।’ আর একারণেই গত ৬ মে বাড়ির কাছেই বসেই মুকুল কান্তিকে মারধর করে স্থানীয় জেএসএস নেতা বিস্তার চাকমা। এই ঘটনার পর মুকুলবাড়ি ছেড়ে খাগড়াছড়ি গিয়ে থাকতেন।

risi-chakma-rangamati-bagha-copy

মুকুল কান্তির স্ত্রী সাধনা চাকমা মিডিয়া টিমকে বলেন, গত ৩০ মে বিকেলে মোবাইলে ফোন করে তার স্বামীকে ডেকে নেয় প্রভাত কুমার চাকমা ওরফে কাকলি বাবু। সে জেএসএস উপজেলা কমিটির সভাপতি বলে জানান সাধনা। তিনি বলেন, ৬ মেযে মারধর করা হয়েছিলো তার একটি মিট মিমাংসার কথা বলে তার স্বামীকে ডাকা হয়। তাকে ডেকে উগছড়ির লাইল্যেঘোনার বক্কা চাকমার দোকানে নেয়া হয়। সেখান থেকে মুকুল একবার তার স্ত্রীকে ফোন করে বলেন, সেখানে প্রভাত চাকমা, আবিস্কার চাকমা, ত্রিদিব চাকমা এবং বিস্তার চাকমা আছে। তাদের সাথে তিনি কথা বলছেন।

৩০ মে রাত সাড়ে ৮ টার দিকে এই কথা হয়। ফিরতে দেরী হওয়ায় সাধনা রাত ৯ টার দিকে আবারো তার স্বামীকে ফোন দেন। কিন্তু এবার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাতে আরো কয়েকবার ফোন দিয়েছেন, কিন্তু মোবাইল বন্ধ। সেই থেকেই নিখোঁজ মুকুল। তিন/চারদিন পরে একবার ফোনটি খোলা পাওয়া গিয়েছিলো, কেউ ফোন ধরেনি। তারপর থেকে আর কোন সংযোগ মেলেনি। এদিকে, ঘটনার পর বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়। থানা পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করতে থাকে।

নমিসা চাকমা বলেন, ওসি সরাসরি বলে দেন, ‘ওরা হলো সম্রাট। ওদের সাথে পারবা না। ওদের সাথে ঝামেলা করো না। মামলা করো না। মামলা করার যখন সময় হবে তখন বলবো।’ থানায় গেলে এই বলে প্রতিবারই বিদায় করে দেয়া হয় সাধনা চাকমা এবং তার মেয়েকে। শেষ পর্যন্ত এই পরিবার ২০ জুন একটি সাধারণ ডায়েরী করতে সক্ষম হন। এরপরও তারা অসংখ্যা বার মামলা করতে গেলে পুলিশ তাদেরকে নানা কথা বলে বিদায় করে দেয়। সাধারণ ডায়েরী করার পরে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হুমকী দেয়া হয়।৪/৫ জন মুখোশধারী লোক তাদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসে। এরপর পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র গিয়ে আশ্রয় নেন।

নাসিরাবাদ মহিলা কলেজের অনার্সের ছাত্রী নমিসা চাকমা গত ২৩ জুন মিডিয়া টিমকে আরো বলেন, তার মা এবং তারা দুই বোন এখন আর বাড়িতে যেতে পারছেন না। তাদের কোনই নিরাপত্তা নেই। এদিকে, গত ৩ জুুলাই বিকেলেও সার্জেন্ট মুকুলের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় এই ঘটনায় পুলিশ মামলা নেয় নি। তবে ১ মাস পর পুলিশ নমিসা চাকমার দায়ের করা পুরাতন মামলা এজহার হিসাবে গ্রহণ করে পূর্বের তারিখে।

মুকুল কান্তি চাকমার মেয়ে নমিসা চাকমা বাদি হয়ে দায়ের করা এই মামলার তারিখ ৪/৭/২০১৬। মামলার নং- জি আর ২৩৭/১৬। মামলায় বড়ঋষি চাকমাসহ ৮ জনকে আসামী করা হয় যার ১ নম্বর আসামী ছিলেন বড় ঋষি চাকমা। উচ্চ আদালত থেকে অন্তবর্তী জামিনে ছিলেন তিনি। জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় মঙ্গলবার রাঙামাটির সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ্দীন কবিরের আদালতে আত্মসমর্পন করেন বড় ঋষি চাকমাসহ ৪ জন।  আদালত তাদের জামিন মঞ্জুর না করে ৪ জনকেই জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বড়ঋষি চাকমার নামে আরো একটি হত্যা রয়েছে খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থানায়। এই মামলাটি একটি হত্যা মামলা। যার নাম্বর হলো-৫, তারিখ ২০/০৯/২০১২ । ধারা-৩০২/৩৪ জিআর ২৮৩/২০১২।

দীঘিনালা উপজেলার ইউপিডিএফ এর তৎকালীন সমন্বয়ক কিশোর চাকমা বাদী হয়ে মোট ১১জনকে আসামী করে এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

Yunus

বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত অজস্র হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোন হত্যাকান্ডের নৃসংশতা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোকেও হারমানায়। পাকুয়াখালী ট্রাজেডি এই নৃসংশ গণহত্যাগুলোরই একটি। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ঘটিয়েছিল পার্বত্য ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় পালিয়ে আসতে পেরেছিল মুহাম্মদ ইউনুছ মিয়া নামের এক ভাগ্যবান। সেদিনের সেই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা ইউনুছ মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সৈয়দ ইবনে রহমত।

প্রঃ কি করছিলেন?
উঃ গায়ে জ্বর, শুইয়া আছিলাম।

প্রঃ কতদিন যাবৎ জ্বর? ওষুধপত্র খাচ্ছেন না?
উঃ দুইদিন ধইরা জ্বর। ভাই, ওষুধপাতি খাইয়া কি অইব। জ্বরের লাগি ওষুধ খাইলেই কি আর না খাইলেই কি। এই বাড়ে-এই কমে, ওষুধ খাওন লাগব না, দুই দিন পরে এমনেই সাইরা যাইব।

প্রঃ আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো পাকুয়াখালী হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানা।
উঃ এইসব কইয়া লাভ কি? কতই তো কইলাম। আর্মি, পুলিশ, সিআইডির অফিসার, সাংবাদিক, আরো কতজনের লগে কইছি। কই, কিছুইতো অইল না। এইসব কইয়া আর মনের জ্বালাটা বাড়াইয়া লাভ কি?

প্রঃ আপনারা তো জানতেন যে, পাহাড়ে শান্তিবাহিনী আছে, তারা বাঙালির দেখা মাত্রই গুলি করে। তারপরও পাহাড়ে যাওয়ার সাহস পেলেন কিভাবে?
উঃ ভাই, শখ কইরা কেউ কী আর মরণের সামনে যায়? পেটের দায়ে যাওন লাগে। পাহাড়ে যাওন ছাড়া আর তো বাঁচনের পথ নাই। সামান্য জমি-জমা যা আছে এইডাও তো কোন বছর চাষ কইরা ঘরে তোলা যায় না। কাপ্তাই বান্ধের পানি আইসা ডুবাইয়া দেয়। তাই বাধ্য অইয়াই পাহাড়ে যাওন লাগে। আর পাকুয়াখালীর ঘটনার সময়তো কোন ভয় আছিল না। তখন শান্তিবাহিনীর লগে আমাদের চুক্তি আছিল। আমরা তাদেরকে ১ ফুট (এক ঘনফুট) গাছের বিনিময়ে ৪০/৫০ টাকা কইরা চান্দা দিতাম।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে কখন থেকে টাকার বিনিময়ে গাছ কাটার চুক্তি হয়েছিল?
উঃ পাকুয়াখালীর ঘটনার ৫/৬ বছর আগে একদিন বড় মাহিল্যার তক্তা নজরুল (লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের কারণে তাকে লোকজন তক্তা নজরুল নামে চিনত) আমাদের কইল, পাহাড়ে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহিনীরা আর বাঙালিরে গুলি করব না। কিন্তু তাদেরকে চান্দা দিতে অইব। তারপর থাইক্যা শুরু অইল গাছ কাটা। আগের থাইক্যাই চাকমাদের লগে নজরুল ভাইয়ের বালা সম্পর্ক আছিল। চাকমাদের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে হে যাইত, আবার চাকমারাও হের বাড়ীতে আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তারাই তক্তা নজরুলরে দিয়া চান্দার মাধ্যমে গাছ কাটার খবর দিছিল।

প্রঃ চাঁদা দিয়া যখন গাছ কাটতেন, তখন আপনাদের সাথে শান্তিবাহিনী কেমন আচরণ করত?
উঃ এমনিতে তারা কোন খারাপ আচরণ করত না। তবে তাদের আইন কানুন আছিল খুব কড়া। যেই দিন যা কইতো, তাই করতে অইতো। কেউ কথা না হুনলে মাইর-ধোর করতো, পাহাড়ে যাওন বন্ধ কইরা দিত।

প্রঃ আপনারা যেখানে গাছ কাটতে যেতেন, সেখানকার চাকমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ আমরা যেখানে গাছ কাটতে যাইতাম সেখানে অনেক চাকমা বসবাস করত। এদের কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তবে বেশির ভাগই ছিল আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তারাও আমাদের সাথে গাছ কাটত। স্থানীয় এইসব চাকমাদের লগে আমাদের বালা সম্পর্ক আছিল। তারা আমাদের ঈদ-পরবের সময় বেড়াইতে আইত। আমরাও বিজুর (চাকমাদের বাৎসরিক উৎসব) সময় তাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতাম। অনেক সময় পাহাড়ে কোন গন্ডগোলের ভাব থাকলে তারা আমাদেরকে আগেই জানাইয়া দিত।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে স্থানীয় চাকমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ শান্তিবাহিনীরা স্থানীয় চাকমাদের উপরেও অত্যাচার করতো, ওদের কাছ থাইকয়াও চান্দা নিত। সামান্য ভুল-ত্রুটি অইলে বা তাদের কথামতো না চললে মাইর-ধোর করতো। কতজনরে তো গুলি কইরা মাইরাও ফালাইছে। শান্তিবাহিনীর খাওন-খোরাক অনেক সময় বাজার থাইক্যা কিইন্যা পাহাড়ে গিয়া দিয় আইতে অইতো। তাই স্থানীয় চাকমারা কৌশলে শান্তিবাহিনীর কালেক্টরদেরকে বিপদে ফালাইয়া তাড়ানোর চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মদ-টদ খাওয়াইয়া মাইয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ফালাইতো, আবার কোন কোন সময় টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল লাগাইয়া শান্তিবাহিনীর বড় অফিসারের কাছে নালিশ করতো। এমনও সময় গেছে যখন এক মাসের মধ্যে তিন-চারজন কালেক্টর বদল হইছে।

প্রঃ দুই মাসের চাঁদা বাকি পড়ায় শান্তিবাহিনী ব্যবসায়ীদেরকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না যাওয়ায় তারা ক্ষেপে গিয়ে এই হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল বলে অনেকে মনে করে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
উঃ এইডা একটা ফালতু কথা। ব্যবসায়ীরা পাহাড়েও যায় না। পাহাড়ে গিয়া কখনো চান্দা দেয় না। পাহাড়ে যাই আমরা। কাঠ বলেন, বাঁশ বলেন, তার চান্দা প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় দিয়াই আনতে হইত। কোন দিনের চান্দাই বাকি থাকত না।

প্রঃ ব্যবসায়ীদের কথা বলছি-
উঃ ব্যবসায়ীরা তাদের মাল (কাঠ, বাঁশ) নেওনের সময় রাস্তায় রাস্তায় চান্দা দেয়। চান্দা ছাড়া ১ ফুট গাছ নেওনের ক্ষেমতাও ব্যবসায়ীদে নাই। চান্দা বাকী রাইখ্যা শান্তিবাহিনী গাছ নিতে দিছে এই কথা জীবনেও শুনি নাই। ব্যবসা করতে চাইলে তাদেরকে চান্দা দেওনই লাগবো। আর হেগোর লাইগ্যা আমাদের মতন গরীব মানুষেরে মারব ক্যান্?

প্রঃ এতগুলো মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
উঃ জানি না ভাই। কি জন্য যে মারল, হেইডাই তো কইতে পারি না। ওরা ভাই বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর, তক্তা নজরুলরে পর্যন্ত মাইরা ফালাইল। যে নিজে না খাইয়াও হেগোরে খাওয়াইছে, কত বিপদ থাইক্যা উদ্ধার করছে।

প্রঃ ঘটনার দিন পাহাড়ে গিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?
উঃ ঐদিন আমার পোলাগো মোসলমানির (খৎনা করার) কথা আছিল। তাছাড়া শরীরটাও বেশি বালা আছিলনা। কিন্তু আলাল ভাই (স্ত্রীর বড় ভাই) কইল, পাহাড়ে যাওনের লাগি। একরকম জোরের মধ্যেই আমি আলাল ভাইয়ের লগে রওনা হইলাম। অফিস ছড়া দিয়া পাহাড়ে ঢুকলাম। কেচিং (একটা জায়গার নাম) থাইক্যা সামান্য উপরে একটা দোকান। দোকানে দেখলাম তিনজন শান্তিবাহিনী অস্ত্র নিয়া বইসা আছে। এইডাতে অবশ্য সন্দেহ করি নাই। এই রকমতো মাঝে মধ্যেই দেখতাম। আলাল ভাইয়ের সাথে গ্যানো চাকমার ছোটখাট ব্যবসা আছিল। আলাল ভাই তার জন্য কিছু টাকা নিয়া গেছিল। টাকা দেওনের লাগি আলাল ভাই যখন গ্যানো চাকমার সাথে কথা কইতেছিল তখন কালু চাকমা এবং তার সাথের কয়েকজন আইসা কইল, মিটিং আছে, ভিতরে যাইতে অইব। তখন আলাল ভাই কইল, গ্যানো বদ্দা, তোমার টাকা মিটিং থাইক্যা আসার সময় দিব। কিন্তু গ্যানো চাকমা, টাকাটা তখনই লইতে চাইছিল। কালু চাকমা আলাল ভাইরে কইল, যাওনের সময় দিয়া যাওনের লাইগ্যা।

প্রঃ প্রথম কখন বুঝতে পারলেন যে, কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে?
উঃ কালু চাকমার সাথে কিছুদূর যাইতেই দেখি রাস্তার দুই পাশে চার জন করে মোট আট জন এসএম জি নিয়া বইসা আছে। আমরা কাছে যাওন মাত্রই আমাদেরকে ঘিরে ফালাইল। এই অবস্থা দেইখ্যাই আমার প্রথম মনে অইল যে, আজকে আমাদেরকে মাইরা ফালাইব। পকেট থাইক্যা টাকা পয়সা সব রাইখ্যা কালু চাকমা আর তার লগের একজন আমাদের হাত পিছ-মোড়া কইরা গাছের লতা দিয়া বানল। বান্ধার সময় কইল মিটিংয়ের জায়গা নিয়া বান ছাইড়া দিব। তখন আমি কইলাম ছাইড়াই যখন দিবা, তখন অত শক্ত কইরা বান্ধনের দরকার কী, আমরাতো পালাইতেছি না। আমিও হাত এমন ভাবে রাখলাম যাতে বান বেশি শক্ত না হয়।

প্রঃ আপনাদের বেঁধে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে কি দেখলেন?
উঃ ১৫/২০ মিনিট হাইট্টা ভিতরে যাওনের পর দেখলাম একাটা মেড়া গাছের লগে তক্তা নজরুলসহ ৪ জন বান্ধা। সামনেই অন্যান্য গাছের লগে আরো মানুষ বান্ধা। গুনে দেখলাম আমিসহ ২৯ জন। এলএমজি ও এসএমজি হাতে পাহাড়া দিতেছে ১৯ জন শান্তিবাহিনী। আর লাঠি, দা, কুইচ্যা মারা শিক হাতে আরো ১২ জন চাকমা আছে, এদের মধ্যে কয়েকজনরে আমি চিনি। তারা হল- লাম্পায়া চাকমা, ছিক্কা কারবারী, বলি চাকমা, শান্তিময় চাকমা, বাবুল চাকমা, গুলুক্যা চাকমা, তরুন চাকমা(কালেক্টর), কবির চাকমা, বাশি চাকমা, বিমল চাকমা এবং সমিতি রঞ্জন চাকমা। এক সময় শান্তিবাহিনীর একজন একটা খাতা ও কলম নিয়া আমাদের সবার নাম লিখল এবং কার কাছ থাইক্যা রাস্তায় কত টাকা এবং কি কি জিনিস পত্র রাখা হইছে তা লিখল।

প্রঃ বাঁধা অবস্থা থেকে আপনি পালালেন কিভাবে?
উঃ কিছুক্ষণ পর কালাপাকুইজ্যার ৫ জনরে গাছের থাইক্যা দড়ি খুইল্লা আরো সামনের দিকে লইয়া গেল। তাদের সাথে গেল ২ জন অস্ত্রধারী আর ৩ জন গেল দা, লাঠি, কুইচ্যা মারার শিক নিয়া। ১০/১২ মিনিট পর নজরুল ভাইসহ আরো ৫ জনরে নিয়া গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নজরুল ভাই আর যাইতে চাইতেছে না। তখন একজন তারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া নিয়া গেল। তখনই বুঝলাম যে, লোকজনেরে সামনে নিয়া মাইরা ফালাইতেছে। কারণ নজরুল ভাইরে ঘাড়ে ধরা দূরের কথা. তার লগে গরম অইয়াও চাকমাদেরকে কথা কইতে কোন দিন দেহি নাই। তখন আমি একজনরে কইলাম, দাদা আমি একটু পেশাব করব। উনি এবং আরেক জন আমাকে একটু দূরে নিয়া গেল। পেশাবের ছল কইরা কিছুক্ষণ বইসা থাইক্যা মনে মনে ঠিক করছিলাম খাড়াইয়াই দৌড় দিমু। কিন্তু যখন খাড়াইলাম, তখন ঠাস কইরা বাঁকা একটা বাঁশের লগে মাথাটা বাড়ি লাগল। তখন আমার সাথের শান্তিবাহিনী দুইজন সর্তক হইয়া গেল। আমি মাথা হাতাইতে হাতাইতে আবার আগের জায়গায় আইলাম। আমারে আবার অন্যদের লগে বানল। তখন খুব লুকাইয়া লুকাইয়া আমি আমার হাতের বান খুইলা ফালাইলাম এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেই জন্য হাতের নিচে চাইপ্যা রাখলাম। তারপর আল্লাহর নাম লইয়া দিলাম এক দৌড়।

কিন্তু সামনেই দেখি এলএমজি নিয়া একজন খাড়াইয়া রইছে। আমারে কইল, দৌড় দিবিনা, ব্রাশ কইরা দিমু, তখন আমি ডান পাশের ছড়ার দিকে লাফ দিলাম। লাফ দেয়ার সাথে সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম, আর শব্দ শুনতে শুনতেই গড়ায়ে পড়লাম নিচের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের গুড়ির দিকে গর্তমতো জাগা পাইলাম। সেইখানে বইসা মাথার উপরে জঙ্গল টাইন্যা ধইরা রাখলাম। ভয়ে তখন আমার বুকের মধ্যে এমন জোরে আওয়াজ অইতেছিল যে, মনে হইছিল এই শব্দ না জানি শান্তিবাহিনী শুইনা ফালায়। রাত হওয়ার পর ছড়া দিয়াই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ছড়ার মধ্যে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি, আবার কোথাও সাঁতার। ঘন জঙ্গলে ভরা ছড়া দিয়ে চলবার মত কোন পথ নাই। তার উপর আবার নিশি অন্ধকার। ছড়ার মধ্যে ঠান্ডা পানি, বেতের কাঁটা, বিষাক্ত সাপ, হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল। কিন্তু তখন এক শান্তিবাহিনী ছাড়া আর কিছুকেই ভয় হচ্ছিল না। সারা রাত হেঁটে হেঁটে অবশেষে ভোরের দিকে পাহাড় থেকে বের হই।

প্রঃ ১১ তারিখ সেনাবাহিনীর লাশ উদ্ধারের কথা কিছু বলুন।
উঃ বাড়িতে আসার পর আর্মিরা যহন জানল যে আমাকেও শান্তিবাহিনী ধরে নিয়া গেছিল। তহন তারা আমাকে সাথে নিয়া গেল পথ দেখানোর জন্য। আমি তাদের পাহাড়ে নিয়া গেলাম। তক্তা নজরুলরে যেইখানে ঘাড়ে ধাক্কা দিছিল, সেইখান থাইকা আরেকটু সামনে গিয়া দেখলাম, বাম দিকে প্রায় এক-দেড়’শ গজ পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া। নিচে নাইমা সেই বেড়া পার হইলাম। কিন্তু তারপর আর রাস্তার কোন চিহ্ন নাই। একটু দূরে দেখলাম, একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি আধা ভাঙ্গা অবস্থায় ঝুইলা রইছে। কঞ্চিটা সরানোর পর একটা ছোট পথ পাইলাম। এই পথ দিয়া সামনে গিয়া দেখি সরাফদ্দি ভাইয়ের টুপিটা একটা কঞ্চির লগে বাইজ্যা রইছে। এরপর সেন্ডেল, মদের টেংকি, বেশ কয়ডা লাঠিও দেখলাম। তারপর দেখলাম আলাল ভাইয়ের লাশ। আরেকটু সামনে গিয়া দেখি বিশাল জায়গা জুইড়া লাশ আর লাশ। কেউরে চিনা যায় না। বন্দুকের সামনে যে চাকুটা (বেয়নেট) থাকে এইডা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া মারছে। লাঠি দিয়া পিটাইয়া, দা দিয়া কুবাইয়া, কুইচ্যা মারার শিক দিয়া পারাইয়া, চোখ তুইলা, আরো কতভাবে যে কষ্ট দিয়া মারছে তা কইয়া শেষ করুন যাইব না। ঐকথা মনে অইলে আইজো শরীরের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐখানে লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের।

Pakuakhali-4

Pakuakhali-2

Pakuakhali-

pakuakhali-00

ছবি: পাকুয়াখালিতে নিহত কয়েকজন কাঠুরিয়ার লাশ

প্রঃ মানুষ মারা গিয়েছিল ৩৫ জন,  আপনি বলছেন লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের। বাকিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উঃ ঘটনার দিন আমি যাদেরকে বান্ধা অবস্থায় দেখছিলাম তাদের মধ্যে আমার পরিচিত আলী, দুলু দুই ভাইসহ ৪ জনের লাশ ঐখানে ছিল না। আর এমন তিনজনের লাশ পাইছি যারা ঐ দিন ঐখানে বান্ধা ছিল না। আমার মনে হয়, আমি পালানোর পরে আরো সাত জনরে শান্তিবাহিনীরা ধইরা নিয়া গেছিল। সাত জনরে মনে হয় অন্য কোন খানে নিয়া মারছে, আমরা তাদের লাশ খুইজ্জা বাইর করতে পারি নাই। আর বালা কইরা খুজবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।

প্রঃ শান্তিবাহিনী এতগুলো মানুষকে একসাথে হত্যা করল, অথচ তাদের কোন বিচার হল না। আপনারা কি সরকারের কাছে এর বিচার চান নাই?
উঃ আমরাতো বিচারের দাবী করছিই, আমি নিজে বাদী অইয়া মামলাও করছিলাম। তখন সরকারের মন্ত্রীরাও কইছিল বিচার করব। তদন্তও করছিল। হুনছি তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে আজ ১৪ বছর পার অইয়া গেল। কই, কিছুই তো অইল না। শুধু এইডাই না, শান্তিবাহিনী তো আরো অনেক বাঙালিরে মারছে। কোনডারই তো বিচা অয় নাই। চাকমারা মানুষ মারলে তো এই দেশে বিচার অয় না। বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে, তার। আর অহন তো চুক্তি কইরা শান্তিবাহিনীরাই সরকার (সাবেক শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা চুক্তির পর থেকে পার্বত্যচট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন) অইছে। তাইলে আর বিচার করব কেডা?

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবী, আপনার বাবাকেও মাইরা ফালাইছিল। বাবা হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। আর আপনি সেই হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। এই জন্য আপনাকেই বলি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকুয়াখালীতে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে তারাও তাদের বাবা হত্যার বিচার চায়, যারা সেখানে ভাই হারিয়েছে তারা তাদের ভাই হত্যার বিচার চায়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছে তারা সন্তান হত্যাকারীর বিচার চায়, যেসব মহিলা স্বামী হারিয়েছে তারা স্বামী হত্যার বিচার চায়। কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হইয়া আত্বীয়-স্বজনদের হত্যাকারীর বিচার করতে পারব না। তাই এই হত্যাকান্ডের বিচার আপনাকেই করতে হইব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

কল্পনা চাকমা কি বেঁচে আছেন?

kalpona chakma

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

কল্পনা চাকমা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। ১২ জুন ১৯৯৬ সালে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির নিউ লাইল্লাঘোনা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে অপহৃত হয় কল্পনা চাকমা। অপহরণের সময় আঞ্চলিক সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। রাজনীতি, আন্দোলন ও নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। ফলে তার অপহরণ ঘটনা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো জোরদার আন্দোলন গড়ে তোলে। অপহরণের পরদিন কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন।

সে সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কমিশন ৯৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেও এ অপহরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে সরকার সেই তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশও করেনি। মামলা দায়েরের ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করে তা দাখিল করা হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে।সব মিলিয়ে এ ঘটনার তদন্ত হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে দুবার তদন্ত করেছে সিআইডি। তাতে দু’বারই নারাজি আবেদন করে কল্পনা চাকমার পরিবার।

images

সর্বশেষ রাঙামাটির পুলিশ সুপার আমেনা বেগমের দেয়া তদন্ত রিপোর্টও প্রত্যাখ্যান করে মামলার বাদী। অপহরণের পর থেকে মামলার বাদী ও পাহাড়ি সংগঠনগুলো অপহরণের জন্য এক সেনা কর্মকর্তা লে. ফেরদৌস ও তিনজন ভিডিপি সদস্যকে দায়ী করে। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছরের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের নাম না আসায় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবী জানিয়ে নারাজি আবেদন দিয়ে যাচ্ছেন মামলার বাদী। বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন।

রাঙামাটির বর্তমান পুলিশ সুপার সাইদ তারিকুল হাসানের কাছে এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি আবারো বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন। আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত কাজ চলছে। আদালত যেসকল বিষয়ে আলাদা আলাদা করে অবজারভেশন নিয়ে তদন্ত করতে বলেছে আমরা সেগুলো তদন্ত করছি। এটি অনেক পুরাতন মামলা। তাই সময় লাগছে’।

কল্পনা চাকমার অপহরণের তদন্ত নিয়ে যেমন দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। তেমনি জিইয়ে থাকার সুযোগে একটি মহল এই মামলাকে সামনে রেখে গত ২০ বছর ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালী ও সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে দেশে বিদেশে ব্যাপক প্রপাগাণ্ডা চালিয়েছে যার বেশিরভাগই মিথ্যা।

Kalpana-Chakma-poster-in-Bengali

উদাহরণ স্বরূপ, চলছি বছর জুন মাসের শুরু থেকে পাহাড়ীদের বিভিন্ন ওয়েব সাইট ও ফেসবুক পেইজে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কল্পনা চাকমার বিচার দাবীতে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির লক্ষে ‘ফটো একশন’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগোসহ কল্পনা চাকমার ছবি হাতে নিয়ে তা পাঠাতে বলা হয়েছে। কিন্তু এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট খুঁজে এ ধরনের কোনো ক্যাম্পেইনের খবর পাওয়া যায়নি।  অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, একটি মহল থেকে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের লোগো ও কল্পনা চাকমা ছবি দিয়ে একটি এ্যাপ তৈরী করা হয়েছে। এ্যাপটিতে নিজের ছবি লাগিয়ে পোস্ট করলে আয়োজকরা বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে এমনেস্টির লোগোসহ ব্যাক্তির ছবির সাথে কল্পনা চাকমার ছবি প্রচার করছে। অথচ এই প্রপাগাণ্ডায় ব্যবহার করা হচ্ছে এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নাম।

প্রশ্ন হচ্ছে, কল্পনা চাকমা কোথায়? তিনি কি আদৌ অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি সেনাবাহিনীর সদস্য কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি স্বজন বা পরিচিত কারো দ্বারা অপহৃত হয়েছিলেন? তিনি কি মারা গেছেন? তিনি কি বেঁচে আছেন? বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন? — এমন প্রশ্ন বিগত ২০ বছর ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

পার্বত্যনিউজের তরফে এসকল প্রশ্নের সমাধান খুঁজতে গিয়ে বিগত ২০ বছরের অনেক তথ্য, উপাত্ত, প্রমাণ, রিপোর্ট, বর্ণণা আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে হয়। এই মামলা নিয়ে কাজ করেছেন, শুরু থেকে মামলা পর্যবেক্ষণ করেছেন এমন কিছু লোকের সাথেও কথা হয়।


এ সংক্রান্ত আরো খবর পড়ুন


রাঙামাটি জেলার একজন আইনজীবী শুরু থেকেই কল্পনা চাকমা অপহরণের ঘটনাবলীর উপর নজর রেখেছিলেন।  নিরাপত্তার কারণে না প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্যনিউজকে বলেন, কল্পনা চাকমার অপহরণ তদন্ত করতে গেলে ঘটনার সময় বিচার করা জরুরী। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙ্গামাটি জেলায় পাহাড়ী সংগঠনগুলো নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে তাদের অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ী গণপরিষদ কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য বিজয় কেতন চাকমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে (প্রজাপতি মার্কা) দাঁড় করায়। তার পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য তাদের প্রকাশ্য সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), পাহাড়ী গণপরিষদ (পিজিপি) ও হিল উইমেন ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ)কে নির্দেশ দেয়। অপরদিকে রাঙামাটিতে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী দীপংকর তালুকদারের পক্ষে নাগরিক কমিটিসহ বেশিরভাগ ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙ্গালী জনগন সমর্থন দেয় এবং প্রচারণায় নামে । তৎকালীন শান্তিবাহিনীর দোসর পিসিপি, পিজিপি ও এইচডব্লিউএফ দীপংকর  তালুকদারের জনপ্রিয়তায় শঙ্কিত হয়ে তার সমর্থক বিভিন্ন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ উপজাতীয়দের হুমকি দেয়া ও হয়রানি করা শুরু করে ।

kalpana-chakma_1_808

পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা সেসময় সমগ্র পার্বত্যাঞ্চলে প্রায় ৩৫ জন আওয়ামীলীগ সমর্থককে নির্বাচনের আগে ও পরে অপহরণ করে । এদিকে কল্পনা চাকমা আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর হয়ে প্রচার কাজ চালাচ্ছিলেন যদিও তিনি হিল উইমেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদিকা ছিলেন। এসব মিলিয়ে ঘটনাটি তাদের উপদলীয় কোন্দলের সৃষ্টি করেছিল এবং তাকে উক্ত প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকবার হুমকিও দিয়েছিল। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে কল্পনা চাকমাকে অপহরণের নাটক সাজিয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি ভোটের পূর্বের রাতে তাৎক্ষণিক একটি ইস্যু তৈরি করে নির্বাচনে জনমতকে তাদের পক্ষে নিয়ে যাবার অপচেষ্টা চালিয়েছিল।

উক্ত ঘটনার আকষ্মিকতায় এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল যে, প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের তথ্য মতে, পাহাড়ী ভোটাররা সকাল ৮ ঘটিকায় ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ভোট দেয়া থেকে বেশ কিছুক্ষণ বিরত থাকেন। ঐ সময় প্রার্থী নির্বাচনে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বিলম্ব করেন বলেও জানা যায়।

পুরাতন তথ্য বিশ্লেষণ করে ওই আইনজীবী আরো জানান, এরপর ১৭ জুন ১৯৯৬ তারিখ পাহাড়ী গণপরিষদ, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন ফেডারেশন কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর একটি স্বারকলিপি প্রেরণ করে। কল্পনা চাকমার অপহরণের জন্য সংগঠনগুলো তৎকালীন উগলছড়ি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার লে. ফেরদৌসকে দায়ী করেন। সংগঠনগুলোর ভাষ্য মতে, ঐদিন দিবাগত রাতে উক্ত কর্মকর্তাসহ নিরাপত্তাবাহিনীর ৮/৯ জন সদস্য উগলছড়ি আর্মি ক্যাম্প থেকে নিউ লাইল্লাঘোনায় এসে জোরপূর্বক কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে।

kalpona chakma 1

ঘটনার সময় খাগড়াছড়িতে কর্মরত ছিলেন এমন একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা পার্বত্যনিউজকে বলেন, লে. ফেরদৌস কচুছড়ি আর্মি ক্যাম্পে ক্যাম্প কমান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন । তিনি ১১ জুন ১৯৯৬ তারিখে কচুছড়ি সেনা ক্যাম্প থেকে একটি টহল দলকে নেতৃত্ব দিয়ে উগলছড়ি সেনা ক্যাম্পে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিউটির জন্য আসেন। তার সাথে আরও তিনজন কর্মকর্তা উগলছড়ি ক্যাম্পে রাত্রিযাপন করেন । ফেরদৌস তার টহলদল ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিয়ে ১২ জুন ১৯৯৬ তারিখ সকাল সাতটায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে ক্যাম্প থেকে পোলিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান।

তিনি আরো বলেন, লে. ফেরদৌস শান্তিবাহিনীর অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক কয়েকটি অপারেশন পরিচালনা করেন । ঘটনার কিছুদিন পূর্বে বাঘাইছড়ি ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সম্রাট সুর চাকমার বাড়ীতে অবৈধ চাঁদা আদায়কারীদের অবস্থানের খবর পেয়ে তিনি একটি তল্লাশী অভিযান চালান । এছাড়াও তিনি আরেকটি অপারেশন চালিয়ে পিসিপির দুইজন অবৈধ চাঁদাবাজকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেন । এরপর থেকে সম্রাট সুর চাকমা ও পিসিপি লে. ফেরদৌসকে শায়েস্তা করার জন্য নানা চেষ্টা করে আসছিলেন। তার এই অপারেশন কার্যক্রমে দিশেহারা হয়ে শান্তিবাহিনী ও পিসিপি তার পেট্রোল এর উপর বেশ কয়েকবার এম্বুশ করেও তার কোন ক্ষতি করতে পারেনি। দুঃসাহসিক ও নিবেদিত প্রাণ এই কর্মকর্তা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার অপারেশনাল কর্মকাণ্ড নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছিলেন।  উপায়ান্তর না দেখে উক্ত অফিসার তথা সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করার ভিন্ন পথ খুঁজে নেয় পাহাড়ী সন্ত্রাসীরা। তারা মিথ্যা অভিযোগ ও অপপ্রচারের অস্ত্র ব্যবহার করার পরিকল্পনা ফাঁদে।

তবে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আলকাস আল মামুন ভুঁইয়া পার্বত্যনিউজকে বলেন, আমরা শুনেছিলাম, কল্পনা চাকমার তৎকালীন প্রেমিক ও পরবর্তীতে স্বামী অরুণ বিকাশ চাকমা ভারতের অরুণাচল প্রদেশের ভারতীয় যুব কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তারা উভয়েই দূরসম্পর্কের আত্মীয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু তাদের প্রেমের ব্যাপারে পারিবারিক বাঁধা থাকায় অরুণ বিকাশ কল্পনাকে অপহরণ করে বলে বিভিন্ন সূত্র অবগত করে। আর এই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছিল তৎকালীন শান্তিবাহিনী আর পিসিপি’র সদস্যরা। তিনি বলেন, কল্পনা চাকমার প্রেমিক পিসিপি’র সহযোগিতায় এই অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি তার পরিবারের সকলেই অবগত।

ঘটনার পর তদন্ত করতে গিয়ে কল্পনা চাকমার বাড়ীতে তার পরিধেয় বস্ত্র, বইপুস্তক ও নিত্য ব্যবহার্য কোন সামগ্রী খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে তিনি অপহৃত হয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করে নিরাপত্তা বাহিনীকে জড়িয়ে একটি ইস্যু তৈরি করেছেন । এ যাবত পরিচালিত কোন তদন্তেই কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছেন এমন কোন আলামত পাওয়া যায়নি। পাওয়া যায়নি কথিত অপহরণের সাথে নিরাপত্তাবাহিনীর সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ।

Kalpana Chakma 10

কল্পনা চাকমার অপহরণ ঘটনা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র তদন্ত করেছিল তৎকালীন মানবাধিকার কমিশন। এ তদন্তের বিষয়ে ১৯৯৬ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তদন্তের নানা তথ্য, উপাত্ত, ভিডিও প্রদর্শন করেন। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার বলেছেন, “পূর্ব পরিকল্পিতভাবে তারই লোকজন দ্বারা কল্পনা চাকমা নিখোঁজ রয়েছে।  লে. ফেরদৌস অথবা অন্য কোনো সামরিক বাহিনীর সদস্যই যে, এই ঘটনার সাথে জড়িত নয় তা কল্পনা চাকমার মা, আত্মীয় স্বজন ও স্থানীয় জনগণের বক্তব্যে প্রকাশ পায়। তিনি আরো বলেন, কল্পনা চাকমা বর্তমানে ত্রিপুরা রাজ্যের গণ্ডাছড়া মহকুমার শুক্রে নামক স্থানে অবস্থান করছে। ….বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত প্রতিবেদন পাঠ করেন, সংগঠনের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও জাতীয় সমন্বয়কারী এডভোকেট কে এম হক কায়সার। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসোসিয়েট প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, সাইফুল ইসলাম দিলদার, মুনির উদ্দীন খান, সুপ্রীম কোর্টের এডভোকেট ইতরাত আমিন, মানবাধিকার গবেষণা সহকারী সাহেলা পারভীন লুনা। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণসহ লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, কল্পনা চাকমা শেষ কবে মার সাথে যোগাযাগ করেছে, এই প্রশ্নের জবাবে মা বাধনী চাকমা জানান, নিখোঁজ হওয়ার পর দুই বার যোগাযোগ করেছে, এবং সর্বশেষে যোগাযোগ হয়েছে ১ আগস্ট ’৯৬। এতে প্রমাণিত হয় যে, কল্পনা চাকমা বেঁচে আছেন এবং কোথায় আছেন তা তার মা বেশ ভাল ভাবেই জানেন।”(দৈনিক মিল্লাত ৯ আগস্ট, ১৯৯৬)।

এ প্রেস কনফারেন্সের পরদিন ৯ আগস্ট ১৯৯৬ সালে বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টের শিরোনাম দেখা যেতে পারে। ‘মায়ের স্বীকারোক্তি কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়’- দৈনিক মিল্লাত, ‘কল্পনা চাকমা এখন ত্রিপুরায়: মা’র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার’- দৈনিক দিনকাল, ‘কল্পনা চাকমা জীবিত এবং কোথায় আছেন তা তার মা ভালভাবেই জানেন’- দৈনিক ইনকিলাব, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায় আছেন, অপহরণ সাজানো নাটকঃ মানবাধিকার কমিশনের তথ্য প্রকাশ’- দৈনিক পূর্বকোণ, ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ভাষ্য কল্পনা চাকমা ত্রিপুরায়’- দৈনিক ভোরের কাগজ, ‘কল্পনা চাকমা ভারতে আছেন’- দৈনিক সংগ্রাম, ‘সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা ভারতের ত্রিপুরায়।। অপহরণ ঘটনার সাথে সামরিক বাহিনী জড়িত নয়’- দৈনিক আজাদী, ‘অবশেষে রহস্য ফাঁস কল্পনা চাকমা ভারতে’- দৈনিক দেশজনতা, ‘মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ পরিকল্পিতভাবে কল্পনা চাকমাকে নিখোঁজ রাখা হয়েছে’- দৈনিক সবুজ দেশ, ‘সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশন, কল্পনা চাকমা এখনো বেঁচে আছেন’- দৈনিক লাল সবুজ, ‘কল্পনা চাকমা ত্রিপুরার গঙ্গাছড়া এলাকায় রয়েছে।। মানবাধিকার কমিশন’- দৈনিক সকালের খবর, `Kalpana Chakma Traced, living in Tripura’- The New Nation.

কল্পনা চাকমাকে গঠিত একটি তদন্ত কমিটির সদস্য ভারতের অরুণাচলে অবস্থিত কল্পনা চাকমার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি কল্পনা চাকমাকে বাংলাদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন।  কল্পনা চাকমা ফিরতি চিঠিতে তাকে জানান, তিনিও দেশে ফিরতে আগ্রহী। কিন্তু তিনি দেশে ফিরলে তাকে পাহাড়ীদের পক্ষ থেকে হত্যা করা হতে পারে আশঙ্কা করেন।

প্রকৃতপক্ষে কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে একটি মিস্টিরিয়াস ক্যারেক্টার। প্রকৃতপক্ষে তিনি অপহৃত হয়েছেন, পালিয়ে গিয়েছেন, ধর্ষিতা হয়েছিলেন, মারা গিয়েছেন নাকি বেঁচে আছেন এ নিয়ে রয়েছে রহস্যের বিশাল ধুম্রজাল। দেশের স্বার্থে, পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, জাতীয় মর্যাদার স্বার্থে এই রহস্যের উদঘাটন জরুরী। কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা ঝুলে থাকা জাতির জন্য কল্যাণকর হচ্ছে না। তাই দ্রুত গতিতে এই মামলার তদন্ত ও বিচারকাজ সমাপ্ত করে এই ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান জরুরী।

কাভার্ড ভ্যান থামিয়ে ছিনতাইকালে দুই উপজাতীয় পুলিশ সদস্যকে জনতা কর্তৃক গণধোলাই

ছিনতাই

আব্দুল হামিদ, বাইশারী প্রতিনিধি:

বাইশারী-ঈদগড় সড়কে রাবার ভর্তি কাভার্ড ভ্যান থামিয়ে ছিনতাইকালে দুই পুলিশ সদস্যকে জনতা কর্তৃক গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ২৮ জানুয়ারী রাত আনুমানিক ৮টা ৩০মিনিটের সময় রামু উপজেলার ঈদগড় ইউনিয়নের করলিয়ামুরা রাস্তার মাথা নামক স্থানে।

স্থানীয় লোকজন জানান,বাইশারী থেকে সন্ধা ৭টার দিকে রাবার ভর্তি একটি কাভার্ড ভ্যান সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পের দুই সদস্য নায়েক শান্তি লাল চাকমা ও অপরজন কনেষ্টবল অনুপম চাকমা যার নং (১০৪), লাঠি হাতে কাভার্ড ভ্যান নাম্বার চট্র মেট্রো-ড-১৬৯১ থামিয়ে ছিনতাই ও ড্রাইভারকে মারধর করার সময় শোরগোল চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে উদ্ধারের সময় তারা জনতাকে উল্টো লাঠি দিয়ে আঘাত করলে জনতা কর্তৃক গণধোলাই দিয়ে আটক করে।

কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার মো:রফিক জানান, সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ মটর সাইকেল নিয়ে দুই ব্যক্তি তার গাড়ির গতিরোধ করে একজন গাড়ির ভিতরে উঠে আমাকে নিচে নামিয়ে টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার পর মারধর শুরু করে।

ঐসময় পার্শ¦বর্তী এলাকার লোকজন বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ আনিছুর রহমানকে খবর দিলে দ্রুত সঙ্গীয় ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে এবং তাদের হাতে থাকা লাঠি ও কোমরে থাকা ৪ লিটার বাংলা চোলাই মদ জব্দ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা উভয়ে নিজেকে পুলিশ সদস্য বলে পরিচয় দেয়।

ঐমুহুর্তে ঘটনাটি ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ আবুল হাসেমকে মোবাইল ফোনে জানালে তাদেরকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

এবিষয়ে ঈদগড় পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ আবুল হাসেম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানান, দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আইনে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরো বলেন,উক্ত দুই পুলিশ সদস্য অনুমতিবিহীন উক্ত স্থানে গিয়ে এঘটনা ঘটিয়েছে।

এবিষয়ে বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রের আনিছুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তাদের তিনি ঘটনাস্থল থেকে লাঠি ও মদের বোতলসহ উদ্ধার করে।

এবিষয়ে রামু থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল মজিদের নিকট মুটোফোনে জানতে চাইলে তিনি ঘটনাটি শুনেছেন বলে নিশ্চিত করেন এবং সরেজমিনে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

বিষয়টি মুঠোফোনে চট্রগ্রাম রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স কমান্ন্টডেন্ট এর নিকট জানতে চাইলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান।

ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা আদিবাসী নয়

chakma

আশিক জামান 

প্রতিবছর ৯ আগস্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন করা হয়। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়ে থাকে। আদিবাসীদের অধিকার এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে দাবি দাওয়া উত্থাপিত হয়। উত্থাপিত দাবির যৌক্তিকতা নিরূপণে ‘আদিবাসী’ কারা সে বিষয়ে সম্যক ধারণা আবশ্যক। নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসী বা ‘এবোরিজিন্যালস হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা Son of the soil. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী, আদিবাসী হচ্ছে, কোন স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই। মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…(Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

আদিবাসী বিষয়ে আভিধানিক সংজ্ঞার বাইরে জাতিসংঘের তরফ থেকে একটি সংজ্ঞা আমরা পেয়ে থাকি। এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো : ১৯৫৭ সালের ০৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107); আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169) এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples. এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে Indigenous and Tribal Populations Convention.  অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি সংশ্লিষ্ট । কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। Indigenous and Tribal Peoples Convention 1989-এ আদিবাসীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে: আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া ও উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে। এবার আসা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই বাংলাদেশে আদিবাসী। কারণ তারাই আদি জনধারার অংশ। বাংলাদেশের তারাই একমাত্র আদিবাসী এবং Son of the soil বলে দাবি করতে পারে। এর পেছনে অনেক জাতিতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও প্রমাণ রয়েছে। বাঙালি নামের বাংলাদেশের এই আদিবাসীরা যদিও একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত যেখানে বহু জানা-অজানা আদি জনধারার সংমিশ্রণ সাধিত হয়েছে। তবুও যেহেতু এসব জনগোষ্ঠীর এদেশ সুস্পষ্ট অস্তিত্বের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে অজানা এবং স্মরণাতীতকাল থেকে এদের পূর্বপুরুষরা এই সমভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করেছে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই একমাত্র তারাই অর্থাৎ বাঙালিরাই Son of the soil বা আদিবাসী। বিশ্বের তাবৎ শীর্ষস্থানীয় নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষক এ ব্যাপারে একমত।

বাংলাদেশে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কেন আদিবাসী নয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর আগমনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য ত্রিপুরা রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জুয়া রুপা (বীর রাজা) আরাকান রাজাকে পরাজিত করে রাঙ্গামাটিতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা সুলা সান্দ্র (Tsula Tsandra, 951-957 A.D) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আবার দখল করে নেন। ১২৪০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা পুনরায় এটিকে উদ্ধার করেন। সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ (১৩৩৮-১৩৪৯) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ অধিকার করেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের কারনে ১৪১৮ সালে চাকমা রাজা মেয়ান শ্লী (Mowan Tsni) বর্মা হতে বিতাড়িত হয়ে আলীকদমে একজন মুসলিম রাজকর্মচারীর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি (রাজকর্মচারী) রামু এবং টেকনাফে চাকমাদের বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। পার্বত্য এলাকায় সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করে কুকী গোত্রের (লসাই, পাংখু, মোরো, খুমি) উপজাতীয়রা। তাদের আগমন ঘটে উত্তর-পূর্ব দিক (সিনলুই ও চীন) হতে। এরপর ভারতের ত্রিপুরা এবং পার্শ্ববর্তী প্রদেশ হতে ত্রিপুরা গোত্রীয় বিভিন্ন উপজাতীয় (ত্রিপুরা, মরং, তংচংগা ও রিয়াং) আসে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানী গোত্র (চাকমা ও মগ) এ এলাকায় আগমন করে। কিন্তু সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকান-বার্মা যুদ্ধের সময় মগরা তাদের এ এলাকা ছেড়ে উত্তর দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করে। উত্তর দিকে আরকানী গোত্রদের আগমনের ফলে কুকীরা উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়। সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হতে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের আদিবাসী নয়।

একইভাবে ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সমতলের উপজাতীয় সম্প্রদায় যেমন সাঁওতাল, গারো, হাজং, মনিপুরী প্রভৃতির বাংলাদেশে আগমনের ইতিহাস তিন-চারশ’ বছরের বেশি নয়। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, সাঁওতাল সম্প্রদায় রেল সম্প্রসারণের কাজে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ভারতের উড়িষ্যা ও বিহার অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আসে। কাজেই উপযুক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় আভিধানিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই এখানকার স্বদেশজাত বা ভূমিপুত্র বা আদিবাসী নয়। প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Hutchison (1960), TH Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা, Jaffa (1989) Ges  Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, উপ-জাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গুলো আদিবাসী নয়। তারা সবাই একবাক্যে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীয়রা নিকট অতীতের কয়েক দশক থেকে নিয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে এদেশে স্থানান্তরিত হয়ে অভিবাসিত হয়েছে।

খোদ চাকমা পন্ডিত অমরেন্দ্র লাল খিসা অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রাক্ট চিটাগাং-এ লিখেছেন, তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ-তিনশ’ বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়েন উত্তর দিকে রাঙ্গামাটি এলাকায়। এর প্রমাণ ১৯৬৬ বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি প্রকাশিত দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান লোকসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই বাঙালি এবং বাকি অর্ধেক বিভিন্ন মঙ্গোলীয় গোষ্ঠীভুক্ত উপজাতীয় শ্রেণীভুক্ত। এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে উপজাতি জনগোষ্ঠীর বাইরের ভূমিপুত্র বাঙালিরা বসবাস করে আসছে তবে জনবসতি কম হওয়ায় বিভিন্ন ঘটনা বা পরিস্থিতির কারণে আশপাসের দেশ থেকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন এসে বসতি স্থাপন করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি জাতিবহির্ভূত অন্য সব উপজাতীয় গোষ্ঠীই এখানে তুলনামূলকভাবে নতুন বসতি স্থাপনকারী। এখানকার আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ম্রো, খ্যাং, পাংখো, কুকিরা মূল কুকি উপজাতির ধারাভুক্ত। ধারণা করা হয়, এরা প্রায় ২শ’ থেকে ৫শ’ বছর আগে এখানে স্থানান্তরিত হয়ে আগমন করে। চাকমা রাজা দেড়শ’ থেকে ৩শ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ দিকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin 1869)।

প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি.এইচ. লেইউইনের মতে \”A greater portion of the hill at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago for Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate.\” (Lewin, 1869, P-28)। পার্বত্য অঞ্চলের মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সালে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে। (Shelley, 1992 and Lewin, 1869)। এরা ধর্মে বৌদ্ধ মতাবলম্বী। এরা তিনটি ধারায় বিভক্ত। যেমন : জুমিয়া, রোয়াং ও রাজবংশী মারমা। বোমরা মায়ানমার-চীন পর্বত থেকে নিয়ে তাশন পর্যন্ত বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আগমন করে। শুধু ভাষাতাত্ত্বিক বিবেচনায়ই নয়, বরং অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখেও দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐসব মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল এবং বিস্তর অনৈক্য বর্তমান।এদের এক একটি জনগোষ্ঠীর বিবাহ রীতি, আত্মীয়তা সম্পর্ক (Keenship Relations), সম্পত্তির মালিকানা বণ্টন রীতি এবং উত্তরাধিকার প্রথা, জন্ম ও মৃত্যুর সামাজিক ও ধর্মীয় কৃত্যাদি বা অন্যান্য সামাজিক প্রথা এবং রীতি এক এক ধরনের এবং প্রায় প্রত্যেকটি আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত (Denise and Bernot, 1957)।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় সবাই যুদ্ধবিগ্রহ এবং হিং¯্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতিস্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছে। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাৎধাবন করে আক্রমণকারী হিসেবে এদেশে প্রবেশ করেছে (Huchinson 1909, Bernot 1960 and Risley 1991) | বর্তমানে এদের পরস্পরের মধ্যে প্রচুর রেষারেষি এবং দ্বন্দ্ব বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায় (Belal, 1992) । পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জনসংখ্যার বণ্টনচিত্রও সমান নয়। এরা গোষ্ঠী ও জাতিতে বিভক্ত হয়ে সারা পার্বত্য অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তবে কোনো কোনো স্থানে বিশেষ করে শহরাঞ্চলে মিশ্র জনসংখ্যা দৃষ্টিগোচর হয়। চাকমারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের চাকমা সার্কেলে কর্ণফুলী অববাহিকা এবং রাঙ্গামাটি অঞ্চলে বাস করে।

মগরা (মারমা) পার্বত্য চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশের বোমাং এবং মং সার্কেলে বাস করে। ত্রিপুরা (টিপরা)গণ পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি সার্কেলে অর্থাৎ চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল সকল স্থানেই ছড়িয়ে থাকলেও নিজেরা দলবেঁধে থাকে। ¤্রাে, থ্যাং, খুমী এবং মরং বোমাং সার্কেলের বাসিন্দা। বাংলাভাষী বাঙালি অভিবাসীরা সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লেও এদের বেশিরভাগই দলবদ্ধভাবে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রামগড় প্রভৃতি শহরাঞ্চলে বসবাস করে। বাকি বাঙালি জনসংখ্যা এখানকার উর্বর উপত্যকাগুলো সমভূমিতে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের বাদ দিলে এখন আসে এদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট-মৌলভীবাজারের খাসিয়া, মনিপুরী, পাত্র (পাত্তর) গোষ্ঠীর কথা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল অঞ্চলের গারোদের কথা এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুরের কুচ রাজবংশী সাঁওতাল, ওরাও ও মুন্ডাদের কথা। এদের সবাই সংখ্যার দিক বিচারে খুব নগণ্য ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মনিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া-জয়ন্তী পাহাড়, মনিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অন্বেষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে।

নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে জাতি সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না। ঠিক একইভাবে ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড। কোনোক্রমেই ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের তারা আদিবাসী নয়।

আরো বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে ৬০-৭০ কিংবা একশ’-সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোন নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমন: ছোট নাগপুরের বীরভুম, সীঙভুম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চল যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুন্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেবে স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে। একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকাম-িত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ-রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এর সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেবে বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে না।

উল্লেখ্য, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের নি¤œবর্ণের হিন্দুদের সাথে ও স্থানীয় অন্যান্য বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে কুচ রাজবংশীদের অনেকে সমসংস্কৃতিকরণ প্রক্রিয়ার (Acculturation Process) মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একীভূত (Assimilated) হয়ে গেছে। মানবিক বিবেচনার মহানুভবতায় এদেশে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও স্বীয় জাতি, ভাষা, ধর্ম অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের পূর্ণ অধিকার এবং সম্মান নিয়ে সবাই স্বকীয়তায় সমান্তরাল চলতে পারে বা মিশে যেতে পারে। কিন্তু কোনো বিবেচনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণ বাংলাদেশের আদিবাসী নয়।বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীরা আদিবাসী হিসেবে কোথাও স্বীকৃত নয়। সরকার তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে না। এরা আদিবাসী হলে অবশ্যই জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে আমরা মানতাম। বাংলাদেশে বাঙালি ও বাংলা ভাষাভাষীরাই আদি জনধারার অংশ। তাছাড়া আর কেউ আদিবাসী নয়।

কাজেই জাতিসংঘ ও আইএলওর সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের উপজাতি জনগোষ্ঠীদের আদিবাসী বানানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ওইসব কনভেনশন ও চার্টার অনুযায়ী ট্রাইবাল বা উপজাতির যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা বিচার করেই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো উপজাতি। একই কারণে আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘ চার্টার বাংলাদেশের উপজাতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃত আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষিত হোক এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়িত হোক, এই আমাদের কামনা।

বাংলাদেশের ‘আদিবাসি’ সঙ্কট

মোস্তফা জব্বার

মোস্তাফা জব্বার

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহের প্রতি আমার নিজের দারুণ রকমের সহানুভূতি ও সমর্থন রয়েছে। যেহেতু তারা পশ্চাপদ জনগোষ্ঠী সেহেতু তাদের অধিকার ও অগ্রগতি এই রাষ্ট্রের প্রাধান্য তালিকায় থাকা উচিত। সেজন্যই নিজের ক্ষমতায় যা সম্ভব তার সবই আমি এদের জন্য করে যাচ্ছি। বহু বছর আগেই আমি স্বেচ্ছায় ও বিনা পারিশ্রমিকে চাকমাদের বর্ণমালাকে কম্পিউটারে প্রয়োগ করেছি। সন্তু লারমা নিজে আমার সেই সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেন। দীপঙ্কর তালুকদারও ছিলেন সেই অনুষ্ঠানে। যদিও পরে আমি কম্পিউটারে চাকমা বর্ণের ব্যবহার নিয়ে হতাশ হয়েছি তবুও আমি এখনও সুযোগ পেলে আমাদের উপজাতীয় সকল ভাষাকে আধুনিক যন্ত্রে ব্যবহার উপযোগী করতে সচেষ্ট থাকবো। তবে আমার শঙ্কা হলো, আমাদের উপজাতীয়রা নিজেরাই তাদের ভাষার প্রতি দরদী নন। নিজের বাড়িতে তারা হয়তো তাদের ভাষা ব্যবহার করেন। কিন্তু নিজের ভাষার লিপি তারা চেনেননা। আমি চাকমা বর্ণ চেনে এমন তরুণ খোজে পাইনি। আমার ধারনা, আমাদের উপজাতীয়রা ভাষার লিপি প্রশ্নে লাতিন হরফের আগ্রাসনের শিকার হয়ে পড়েছে। একদিন তারা নিজেদের হরফের বদলে লাতিন লিপি ব্যবহার করবে। অথচ প্রযুক্তিগতভাবে এখন তার প্রয়োজন নাই।

যাহোক, আমাদের উপজাতীয়দের ভাষাসহ সকল নৃতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষা করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটি পবিত্র দায়িত্ব বলে আমি মনে করি। এমনকি তাদেরকে অন্তত প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ দেয়া উচিত বলেও আমি মনে করি। সেই চেষ্টাও আমি করেছি। উপজাতীয় শিশুরা যাতে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে তার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও আনন্দ মাল্টিমিডিয়ার রাঙ্গামাটি শাখার সহায়তায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সকল পাঠ্যপুস্তককে চাকমা, মারমা ও ম্রো ভাষায় সফটওয়্যারে রূপান্তর করেছি আমি। আমি দৃঢ়তার সাথে এই জনগোষ্ঠীর ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন, বিকাশ ও সংরক্ষণে বিশ্বাস করি। এদের জীবনধারাকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সকলেরই উচিত সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা। রাষ্ট্রের উচিত তাদেরকে আমানতের মতো রক্ষা করা।

কিন্তু সাম্প্রতিককালে এটি ধারণা করার কারণ ঘটছে যে, এই ক্ষুদ্র জাতিগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিষয়টি আপাতদৃষ্টে খুব নিরীহ মনে হলেও ছোট একটি শব্দের মধ্য দিয়ে আঙ্গুল ওঠছে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে। দেশের কিছু বুদ্ধিজীবি এবং রাজনৈতিক নেতাও জেনে বা না জেনে সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হচ্ছেন। যে শব্দটি নিয়ে এই অপকর্মের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে সেই শব্দটি ‘আদিবাসি’।

৯ আগস্ট সারা দুনিয়াতে ‘আদিবাসি’ দিবস পালিত হয়ে থাকে। আমাদের শহীদ মিনারে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পত্রিকায় নিবন্ধ ও টেলিভিশনে টকশো’র আয়োজন করে দিনটি বাংলাদেশে পালিত হয়। ২০১৪ সালে এর ব্যতিক্রম হয়নি। ১৫ সালেও হয়তো তাই হবে। তবে আদিবাসীদের কথা বলতে গিয়ে কেউ কেউ একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেন যেটি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য হুঁমকি হয়ে দাঁড়ায়। আমরা কারও কারও মুখে শুনে আসছি যে, আদিবাসীদের জন্য প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের মতো আন্দোলন করা হবে। সন্তু লারমা একথা বলেছেন ২০১৪ সালে।

২০১২ সালেও সন্তু লারমা হুঙ্কার দিয়েছিলেন। তিনি যুদ্ধ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কার বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ সেটি তিনি না বললেও অতীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের কথা স্মরণ করলে তার বক্তব্যে আমরা শঙ্কিত না হয়ে পারিনা। তবে সুখবর হলো যে, গত তিন বছরে তিনি তেমন কিছু করেননি।

বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবিদের একটি অংশ জোরেশোরে বলার চেষ্টা করছে যে, বাংলাদেশের যাদেরকে আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি বা উপজাতি বা ছোট ছোট নৃগোষ্ঠী বলি তারা ‘আদিবাসি’। সংবিধানে তাদেরকে ‘আদিবাসি’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেবার জন্য তারা দারুণভাবে নাখোশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার দল আওয়ামী লীগ ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বাণী উদ্ধৃত করে এটি দেখানো হচ্ছে যে, এই রাজনৈতিক শক্তিটি অতীতে এদেরকে ‘আদিবাসি’ বলে চিহ্নিত করলেও, না সংশোধিত সংবিধানে, না তাদের এখনকার বক্তব্যে ‘আদিবাসি’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। ক্ষোভটা তাদের ওখানেই।

বিষয়টি এতোদিন আমাদের দৃষ্টি তেমনভাবে আকর্ষণ করেনি। প্রকৃতার্থে ‘আদিবাসি’ শব্দটি নিয়ে আমরা তেমন সিরিয়াসলি চিন্তাও করিনি। বিশেষ করে কথায় কথায় আমরা আমাদের দেশের উপজাতি বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতি স্বত্ত্বাসমূহকে ‘আদিবাসি’ বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করিনি। কিন্তু যখনই আমরা লক্ষ্য করলাম যে, সংবিধানে তাদেরকে ‘আদিবাসি’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা নাখোশ হয়েছে তখনই ‘আদিবাসি’ শব্দের অর্থ সন্ধান করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সংজ্ঞা অনুসারে আদিবাসি হলো তারা; peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present states boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions.”

আমরা যদি এই ইংরেজি বাক্যটির বাংলা মর্মার্থ করি তবে এটি এমন দাড়াবে; আদিবাসি হলো তারা যারা দেশের ঔপনিবেশিকতা সৃষ্টির সময়ে দখলদারদের চাইতে গোষ্ঠিগত কারণে আলাদা ছিলো।

আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা সেই অর্থে আদিবাসি। কারণ যখন আমেরিকায় ঔপনিবেশ স্থাপন করা হয় তখন রেড ইন্ডিয়ানরা কেবল স্বতন্ত্র ছিলোনা এখনও স্বতন্ত্র। শুধু তাই নয়, ওরা আগ্রাসনকারীদের চাইতে জীবনধারার দারুনভাবে পশ্চাদপদ। লক্ষ্যনীয় যে, দেশটিকে রেড ইন্ডিয়ানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। খুব সঙ্গত কারণেই তাদেরকে আদিবাসির সংজ্ঞায় ফেলা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে যারা নিজেদেরকে এই সংজ্ঞায় ফেলতে চাইছে তাদের অবস্থা কি রেড ইন্ডিয়ানদের মতো?

প্রথমত বাংলাদেশের উপজাতিসমূহ কি আদিবাসি? বাস্তবতা হচ্ছে হিমালয়ের পাদদেশের নিচু, সমতল বা জলাভূমির এই অঞ্চলে বাঙ্গালিরা বসবাস করে ৪ হাজার বছরেরও আগে থেকে। বিক্রমপুর, ওয়ারি বটেশ্বর বা সোনারগা কিংবা মহাস্থানগড় থেকে প্রাপ্ত প্রমাণাদি এসব বিষয় নিশ্চিত করে।

এখানকার উঁচু ভূমি বা পাহাড় অঞ্চলে হয়তো তারও আগে সামান্য সংখ্যক কোচ, হাজং, গারো ইত্যাদি জনগোষ্ঠীরও বসবাস ছিলো। তবে এসব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ বসবাস করতো গারো পাহাড়ে যে পাহাড়টি এখন ভারতের অংশ। গারো পাহাড় থেকে যেসব উপজাতি সমতল ভূমিতে নেমে আসে তাদের কেউ কেউ মধুপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চলের বাংলাদেশ অংশে বা ময়মনসিংহের গারো পাহাড় অঞ্চলে বাস করে। তবে এই নিম্নভূমিটি, যার নাম বাংলাদেশ, তাতে বাঙ্গালিরা বসবাস করার আগে কোচ-হাজং-গারো-সাওতালরা বসবাস শুরু করে তেমন কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। বরং বাঙ্গালিরা বসবাস করার পরে এইসব উপজাতিরা হয়তো সমতল ভূমিতে বসবাস করা শুরু করে থাকতে পারে। সমতল ভূমি বিবেচনায় এছাড়াও কক্সবাজার ও পটুয়াখালিতে রাখাইন সম্প্রদায় রয়েছে। তারা তাদের জীবনাচারে প্রায় বাঙ্গালিতে পরিণত হয়েছে। নিজের বাড়িতে নিজেদের ভাষায় কথা বলা ছাড়া এদের অন্য ক্ষেত্রে খুব একটা পশ্চাদপদতা নেই। ওদের মাঝে যারা দেশের প্রধান জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে তারা বাংলাও চমৎকারভাবে বলতে পারে। ছোট একটি দেশ হিসেবে এদের শিক্ষার, অর্থনীতির বা রাজনীতির সুযোগ দেশের প্রধান জনগোষ্ঠী বাঙ্গালীদের চাইতে মোটেই কম নয়।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান উপজাতি চাকমাদের আদি বাসস্থান আরাকান। ত্রিপুরাদের আদি বসবাস ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। সেই অর্থে ওরা কেউ বাংলাদেশের আদিবাসি নয়। এর মানে এসব জনগোষ্ঠীর আবাস দখল করে আমরা বাঙালীরা বাংলাদেশ গড়িনি। তবুও বাংলাদেশে ওরা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী। উপজাতিদের জন্য বাংলাদেশে শিক্ষা ও চাকুরিতে নানা কোটা আছে। প্রধানত চাকমারা সেই কোটা ব্যাপকভাবে ব্যবহারও করে। ফলে তাদের সম্পর্কে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বা বা নৃগোষ্ঠী অভিধাটি মোটেই বিভ্রান্তিকর নয়। বরং এদেরকে আইএলওর সংজ্ঞা অনুসারে আদিবাসি বলাটা কোনভাবেই সঠিক নয়।

২০১২ সালের ৯ আগস্ট ৭১ টেলিভিশনে প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে মেজর জেনারেল (অব) ইব্রাহিম স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আইএলও কনভেনশন অনুসারে আদিবাসি হিসেবে স্বীকৃতি দেবার পর তাদেরকে আত্ম নিয়ন্ত্রণ অধিকার দিতে হবে। এর মানে তারা দাবি করতে পারবে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা স্বায়ত্বশাসন পেতে পারে। এমনকি যদি তারা মনে করে যে, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকবে না বা ভারতেও যোগ দেবে না তবে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে পারবে। যদি তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকেও তবে তারা যে অঞ্চলে বাস করে সেই অঞ্চলের ভুমির মালিকানা রাষ্ট্রের হবেনা।

আমরা জানি যে, আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে দেশের যে কোন অঞ্চলে ভূমির মালিক হতে পারবো। কিন্তু বাস্তবতা হলো আমি পার্বত্য তিন জেলায় জমির মালিক হতে পারবোনা। ওখানে আমাকে জমি কিনতে দেয়া হবেনা। অন্যদিকে একজন উপজাতি দেশের যে কোন স্থানে ভূমির মালিক হতে পারবে। এটি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমার প্রতি বৈষম্য। আমি মনে করি পাহাড়ে বা সমতলে যেসব ক্ষুদ্র জাতি আছে তাদের ভূমি সংক্রান্ত যেসব জটিলতা আছে সেটির মীমাংসা হওয়া উচিত ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে যেসব ক্ষুদ্র জাতিগুলো জমির মালিকানা নিশ্চিত করেননি তাদের ভূমির মালিকানার বিষয়টি মীমাংসা করার পর পার্বত্য জেলাসমূহে বাঙ্গালীদের জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোন নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়। এটি সংবিধান পরিপন্থী।

আমি মনে করি যে, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিস্বত্ত্বাসমূহকে নামে আদিবাসি বলাতে আমাদের তেমন আপত্তি করার বিষয় নাও হতে পারে। ক্ষুদ্র জাতি বা আদিবাসি হিসেবে ডাকডাকি করাতে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু যদি এই প্রশ্নটি ওঠে যে তাদেরকে আত্ম নিয়ন্ত্রণাধিকার বা স্বায়ত্ত্ব শাসন বা স্বাধীনতা দিতে হবে তবে সেটি হবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। যদি এই দাবি ওঠে যে এদের জমির ওপর রাষ্ট্রের মালিকানা থাকবেনা তবে সেটিও হবে রাষ্ট্রের অধিকারের বিরোধিতা।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের নাগরিকদের মাঝে কোন ধরনের বৈষম্য যাতে না থাকে সেটিও দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে পারে। কিন্তু এজন্য কোন জনগোষ্ঠীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেনা কিংবা কোন জনগোষ্ঠীকে এমন কোন সুযোগ দিতে পারেনা যা রাষ্ট্রের অন্য জনগোষ্ঠী পায়না। সকল নাগরিকের সমানাধিকার নিশ্চিত করাটাই রাষ্ট্রের মুল দায়িত্ব। এক দেশে দুই আইন কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। আবার পশ্চাদপদ জাতি বলে তাদের নিজেদের সম্পদ রক্ষার অধিকার থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত করা যায়না।

আমি ধারনা করি যে, আমাদের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর সাধারণ মনোভাব হলো বাংলাদেশের মুল জনগোষ্ঠী বাঙ্গালীদের সাথে সহযোগিতামুলকভাবে বসবাস করা। তবে তারা অবশ্যই চাইবেন যে, তাদের ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র ও মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে। তাদের পিছিয়ে পড়ার জন্য রাষ্ট্র তাদেরকে বিশেষ সুবিধা যেমন কোটা বা অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু আদিবাসি নামে আখ্যায়িত হয়ে তারা নিশ্চয়ই একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি জানাতে চায় না। আমরা কামনা করবো দেশের সাধারণ নাগরিকদেরকে আদিবাসি শব্দের বেড়াজালে বিভ্রান্ত করা থেকে বিরত থাকা হবে। আমি এটাও আশা করি যে, কেউ এদেরকে জিম্মি করে তথাকথিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করবে না। আমি তাদেরকে সাংবিধানিকভাবে আদিবাসি বলতেও রাজী-কিন্তু তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের আন্দালন হলে সেটি কঠোরভাবে দমন করার পক্ষে-কারণ কোন রাষ্ট্রই রাষ্ট্রদ্রোহিতাকে মেনে নিতে পারে না। (ঢাকা, আগস্ট ২০১৫)

♦ লেখক: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ-এর প্রণেতা ॥  ই-মেইল: mustafajabbar@gmail.com ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net  

চাকমা: আদিবাসী নয় বহিরাগত

আবদুস সাত্তার

আবদুস সাত্তার

পার্বত্য চট্রগ্রামে উপজাতিদের মধ্যে চাকমা, মগ, মুরং, কুকি, বনজোগী, পাঙ্খো, লুসাই, তংচঙ্গা, টিপরা (ত্রিপুরা) এবং সেন্দুজ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। টিপরারা হিন্দুধর্মাবলম্বী, মগ ও চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং অপরাপর জাতির মধ্যে কেউ কেউ  নিজেদেরকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে স্বীকার করলেও ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক জীবনের রীতিনীতিতে তাদের বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্রগ্রাম পূর্বে চট্রগ্রামের সাথে যুক্ত ছিল। পাহাড়ি জাতিদের আলাদা বৈশিষ্ট্যের দাবিতে ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের ১ আগস্ট পার্বত্য চট্রগ্রাম স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা লাভ করে।[i]

চাকমারা কোথা থেকে এখানে এসেছে এবং এদের উৎপত্তিই-বা কোথায়, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মনে আসে। উপজাতিদের উদ্ভব ও বসতি বিস্তার সম্পর্কে সবকিছু জানা সম্ভব না হলেও এ সম্পর্কে আমাদের মন সব সময়েই কৌতূহলী ও উৎসুক। চাকমা জাতি যে এককালে ব্রক্ষ্মদেশে ছিল, সে সম্বন্ধে কর্নেল ফেইরী আলোকপাত করেছেন।[ii] ব্রক্ষ্মদেশে পুরাবৃত্ত ‘চুইজং ক্য থং’ এবং আরাকান কাহিনী ‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ নামক গ্রন্থদ্বয়েও অনুরূপ উল্লেখ রয়েছে।

‘দেঙ্গাওয়াদি আরেদফুং’ গ্রন্থেও বর্ণনা অনুযায়ী ৪৮০ মগাব্দে (খ্রীষ্টীয় ১১১৮-১৯ সালে) চাকমাদের সর্বপ্রথম উল্লেখ পরিদৃষ্ট হয়। ‘‘ এ সময়ে পেগো (আধুনিক পেগু) দেশে আলং চিছু নামে জনৈক রাজা ছিলেন। পশ্চিমের বাঙালিদিগের সহিত মিলিত হয়ে চাকমাগণ তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ উপস্থিত করে। পেগো রাজা স্বীয় প্রধানমন্ত্রী কোরেংগরীকে সেনাপতি পদে বরণ করিয়া যুদ্ধার্থে প্রেরণ করিলেন। তিনি যুদ্ধ স্থলে উপনীত হইলে একটি সারসপক্ষী একখানি মৃত প্রাণীর চর্ম মুখে লইয়া তাঁহার সম্মুখে পতিত হইল। তিন তাহাকে ধরিয়া রাজার শিবিরে লইয়া গেলেন এবং বুঝিয়া দিলেন যে, এই সারস বাঙালি ও চর্মখানি-চাকমা, উভয়ের মিত্রতা ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের এই যুদ্ধে নিশ্চয়ই বাঙালি ও চাকমাগণ এই সারসের ন্যায় বশ্যতা স্বীকার করিবে।

‘‘রাজা মন্ত্রীর এহেন যুক্তিগর্ভ আশ্বাস বাক্যে অতিশয় আহলাদিত হইয়া তাহাকে একটি হস্তী উপহার প্রদান করেন। অনন্তর হঠাৎ চতুর্দিকে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিল, পবিত্র ‘মহামুনি’ মূর্তি স্বেদসিক্ত হইলেন। ঘন ঘন অশনি নিপাত, অকাল বৃষ্টি সমন্তাৎ হাহাকার পড়িয়া গেল। রাজা যুদ্ধে ক্ষান্ত হইয়া এই অমঙ্গল শান্তির নিমিত্ত পুরোহিতকে শতমুদ্রা প্রদান করিলেন।

‘‘ এই ঘটনার বহুকাল পরে আনালুম্বা নামক পেগু রাজার শাসন সময়ে পুনরায় বাঙালি ও চাকমাগণ মিলিয়া উত্থিত হয়। রাজা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য লইয়া দাম্বাজিয়াকে সেনাপতি করিয়া পাঠাইলেন। দাম্বাজিয়া যাত্রা করিয়া সম্মুখে দেখিলেন একটি বক ও একটি কাক ঝগড়া করিতেছে, অবশেষে বক কাকের ডানা ভাঙ্গিয়া দিল। তিনি রাজার নিকট আসিয়া ইহা বিবৃত ককরিলেন। মন্ত্রী বুঝিয়া দিলেন, এই কাক বাঙালি এবং বক আমরা। ইহা দ্বারা সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছে, এই যুদ্ধে আমাদের জয়লাভ নিশ্চিত। ‘‘সেনাপতি অমিত-উৎসাহে যুদ্ধারম্ভ করিলেন। পাঁচদিন অবিরাম যুদ্ধের পর বাঙালি ও চাকমাগণ পলায়ন করে।’’[iii]

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত রাজমালায়ও[iv] একই কথার প্রতিধ্বনি বর্তমান। এ সম্বন্ধে ১৭৮৭ খ্রীস্টাব্দের ২জুন তারিখে চট্রগ্রামের তদানীন্তন শাসনকর্তাকে লিখিত ব্রক্ষ্মরাজের একটি চিঠির উদ্ধৃতি থেকেই আমাদের বক্তব্যের যথার্থতার কিছুটা প্রমাণ মিলবে:

‘আমরা পরস্পর এতদিন বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ ছিলাম এবং এক দেশের অধিবাসীরা অন্য দেশের অধিবাসীদের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে পারতো। …ত্রুটি নামে এক ব্যক্তি আমাদের সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে গিয়ে আপনার সাম্রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে জোরপূর্বক আনার ইচ্ছে আমাদের ছিল না বলেই তাকে ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ করে আমরা আপনাদের কাছে বিনয়সহকারে চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু আপনারা তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করেন। আমাদের সাম্রাজ্যের পরিধি নেহাৎ কম নয় এবং ত্রুটি তার অবাধ্য আচরণে আমাদের রাজশক্তির অবমাননা ও শান্তি ভঙ্গ করেছে।…ডোমকান, চাকমা, কিরুপা, লেইস, মুরং এবং অন্যান্য জাতির লোকও আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে ও আপনাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে তারা সীমান্তবর্তী উভয়দেশের অধিবাসীদের উপর অত্যাচার ও লুটতরাজ করেছে। তাছাড়া, তারা নাফ নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের একজন খ্রীস্টানকে হত্যা করে তার যথাসর্বস্ব হরণ করে নিয়ে গেছে। এই কথা শুনে আমি একদল সৈন্য নিয়ে সীমান্ত এলাকায় এসেছি তাদের ধরে নেবার জন্যে। যেহেতু, তারা আমাদের সাম্রাজ্যের অধিবাসী এবং আমাদের রাজশক্তির অবমাননা করে বর্তমানে ডাকাতি বৃত্তি গ্রহণ করেছে। …তাদেরকে আশ্রয় দেয়া আমাদের পক্ষে মোটেই সমীচীন নয় এবং মগরা যারা আরাকান থেকে পালিয়ে গিয়েছে, তাদেরকেও ফেরত পাঠাতে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন। এতে আমাদের পরস্পরেরর বন্ধুত্বসূত্র আরও দৃঢ় হবে এবং দুই দেশের পথিক এবং ব্যবসায়ীরাও ডাকাতির হাত থেকে অব্যাহতি পাবে।… মোহাম্মদ ওয়াসিমের মারফত এই চিঠি পাঠাচ্ছি। চিঠি পেয়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা করবেন এবং অনুগ্রহ করে চিঠিটার উত্তরও তাড়াতাড়ি দিবেন।…’

এ চিঠির উত্তরে কি বলা হয়েছিল তা অবশ্য আমাদের প্রতিপাদ্য নয়, তবে চিঠিটার ঐতিহাসিক মূল্য যে যথেষ্ট তাতে সন্দেহ নেই। এ থেকে চাকমারা কি করে ব্রক্ষ্মদেশ থেকে চট্রগ্রামে আগমন করেছিল তার হদিস পাওয়া যায়।

শাসন ব্যবস্থার সুবিধার জন্য বেঙ্গল গভর্নমেন্ট ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দের পহেলা সেপ্টেম্বর[v] এই বিস্তৃত পার্বত্যভূমিকে তিনটি সার্কেল যথা: চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল ও মঙ সার্কেলে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক সার্কেলের জন্য একজন রাজা বা প্রধান নিযুক্ত করেন। চাকমা সার্কেলের (২৪২১ বর্গমাইল) রাজা রাঙামাটিতে, বোমাং সার্কেলের (২০৬৪ বর্গমাইল) রাজা বান্দরবানে, এবং মঙ সার্কেলের (৬৫৩ বর্গমাইল) রাজা রামগড় মহকুমার মানিকছড়িতে  অবস্থান করেন। উল্লিখিত জাতিদের মধ্যে চাকমারা সংখ্যার দিক থেকে রাঙামাটিতেই সর্বাধিক এবং অন্যান্য জায়গায়ও এদেরকে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় দেখা যায়।

পার্বত্য চট্রগ্রামের এসব উপজাতি যে এখানকার ভূমিজ সন্তান নয় তা আমাদের উপরোক্ত আলোচনা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, উপমহাদেশের আদিম অধিবাসী মাত্রই বাইরে থেকে এখানে আগমন করেছে এবং ভাষাতত্ত্ববিদরাও বিভিন্ন আদিম জাতির ভাষা বিশ্লেষণ করে একই কথার সমর্থন জানিয়েছেন। ‘সুদূর অতীতে অন্যান্য ভূখণ্ডের মত এই উপমহাদেশের মাটিতেও হয়তো এক শ্রেণীর দ্বিপদ বৃক্ষচর প্রাণী নিতান্ত জন্তুদশা থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে নরদশা লাভ করেছে।’ নৃতত্ত্ববিদ ড. জে এইচ হাটনও[vi] এখানকার আদি অধিবাসী সম্বন্ধে এই মতপোষণ করেন এবং তাঁর ধারণা ক্রমবিবর্তন ও বিভিন্ন সময়ের বংশানুক্রমিক রক্তের মিশ্রণে এইসব আদি মানব নিজেদের আদিম অবস্থা হারিয়ে ফেলেছে[vii]

পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের বেলায় এই যুক্তি আংশিক সত্য। এদের ধর্ম ভাষ্য আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক জীবনের রীতিনীতি বিভিন্ন ধর্মের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাদের আদিম বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে বের করা অসম্ভব।

চাকমারা মূলত কি ছিল কিংবা কোন জাতি থেকে এদের উৎপত্তি, সে বিষয়টি জানা নিতান্ত কষ্টসাধ্য হলেও অনুসন্ধানের অপেক্ষা রাখে। কোনও জাতির সঠিক পরিচয় নির্ণয়ে সে জাতির অতীত ইতিহাস অনেকটা সহায়ক। ইতিহাসের অভাবে সেসব মানবগোষ্ঠির আকৃতি-প্রকৃতি, বেশ-ভূষা, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-কর্ম, ভাব-ভাষা ইত্যাদির সাথে সম্যক পরিচয় কিংবা তাদের কালস্থায়ী পরিবেশের গূঢ় উবলব্ধি না থাকলে সেসব জাতি সম্বন্ধে কিছু বলা সম্ভব নয়।

স্যার রিজলীর মতে, ব্রক্ষ্ম ভাষার ‘সাক’ বা ‘সেক’ জাতি থেকে চাকমাদের উৎপত্তি। ক্যাপ্টেন লুইন বলেন:

‘…the name chakma is given to this tribe in general by the inhabitants of the Chittagong District, and the largest and dominant section of the tribe recognizes this as its rightful appellation. It is also sometimes spelt Tsakma or Tsak, or as it called in Burmese Thek’[viii].

এই মন্তব্যে চাকমা কথাটি যে মূলত পার্বত্য চট্রগ্রামের নয় সম্ভবত এ কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।

আরাকানের প্রাচীন রাজধানী রামাবতী নগরের নিকটবর্তী অঞ্চলে এই সাক বা সেক জাতি এককালে খুব প্রবল ও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তাদের সাহায্যে ব্রক্ষ্মরাজ ন্যা সিং ন্যা থৈন ৩৫৬ মগাব্দে (৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দ) সিংহাসন অধিকার করেছিলেন।

কর্নেল ফেইরী এর মতে[ix], তখন সেই অঞ্চলে পশ্চিম দেশের বিভিন্ন লোক বাণিজ্য উপলক্ষ্যে আগমন করে এবং পরিশেষে উপনিবেশ স্থাপন করে। তাদের উপাধি ছিল ‘সাক’ বা ‘সক’।

কেউ কেউ অনুমান করেন, তখন আরব-ইরান তুরস্ক  থেকে বহু মুসলমান সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যর উদ্যেশে আগমন করে এবং তাদের অনেকেই দেশে ফিরে না গিয়ে সে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। অতএব বোঝা যাচ্ছে, এইসব সাক বা সেক শব্দ ইসলামি শব্দের অপভ্রংশ।

এখনও ব্রক্ষ্মদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী স্থানে এই সাক সম্প্রদায় দেখা যায়। ধর্মীয় রীতিনীতিতে তাদের সাথে পার্বত্য চট্রগ্রামের চাকমাদের মিল না খাকলেও আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে চাকমারা সাকদেরই উত্তর পুরুষ। মগদের মতে, চাকমারা মুঘলদের বংশধর[x]। কোন এক সময়ে মুঘলরা আরাকান রাজ্যের হাতে পরাজয়বরণ করে; ফলে বহু মূঘল সৈন্য বন্দিদশায় আরাকানে অবস্থান করতে বাধ্য হয়। আরাকান রাজ তাদেরকে স্বদেশের মেয়েদের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হবার আদেশ জানিয়ে আরাকানেই অন্তরীণ করে রাখেন। এসব মুঘল সৈন্যদের ঔরসে এবং আরাকানি নারীদের গর্ভে যে জাতির উদ্ভব হয়েছিল তারাই ‘সেক’ বা ‘সাক’।

জে. পি. মিলস্-ও একই মত পোষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘‘চাকমাগণ মগনারী ও মুঘল সৈন্যদের সমন্বরজাত। সপ্তদশ শতাব্দীতে চাকমাদের অনেকেই মুঘল ধর্ম গ্রহণ করে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং তখনকার চাকমা প্রধানগণও মুসলমানী নাম ধারণ করেন। অতঃপর সেখানে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ফলে তারা হিন্দু ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয় এবং হিন্দু ধর্ম অন্তর্হিত হয়[xi]।’’

ক্যাপ্টেন হার্বার্ট লুইন এর মন্তব্যেও এই উক্তির সমর্থন মিলে। তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন চাকমারা মুঘলদের বংশধর না হলেও এককালে এরা মুসলমান ছিল। কালের বিবর্তনে হয়তো ধর্মীয় ধারা পরিবর্তিত হয়েছে। এই মন্তব্যের সমর্থনে শ্রী সতীশচন্দ্র ঘোষ প্রতিপন্ন করেছেন যে, ‘১৭১৫ খ্রীষ্টাব্দ হতে ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত জামুল খাঁ, সেরমুস্ত খাঁ, সের দৌলত খাঁ, জান বক্স খাঁ, জব্বার খাঁ, টব্বার খাঁ, ধরম বক্স খাঁ প্রভৃতি চাকমা ভূপতিবর্গ ‘খাঁ’ উপাধি পরিগ্রহ করতেন। তদানুসষঙ্গিক ইহাও উল্লিখিত হইতে পারে যে, এই সময়ে তাঁহাদের কুলবধূগণেরও ‘বিবি’ খেতাব প্রচলিত ছিল। এখনও অশিক্ষিত সাধারণে ‘সালাম’ শব্দে অভিবাদন করে এবং আশ্চর্য বা খেদসূচক আবেগে ‘খোদায়’ নাম স্বরণ করিয়া থাকে[xii]।’

কেউ কেউ অনুমান করেন তখন মুসলিম (মুঘল শাসন) শাসনের প্রাধান্য ছিল বলে চাকমা রাজারা তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য মুসলমানী নাম, ‘খা’ খেতাব[xiii] ইত্যাদি গ্রহণ করেছিলেন, ফলে তাদের চাল-চলনে মুসলমানী ভাব এবং কথা-বার্তায়ও অনেক আরবী-ফারসি শব্দ প্রবেশ করেছিল।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, ‘খাঁ’ উপাধি গ্রহণের বেলায় এই মতবাদ কতকটা শিথিল বলে ধরা যেতে পারে; কেননা, মধ্যপ্রদেশের কোন কোন স্থানে হিন্দুরাজাদের মধ্যেও ‘খাঁ’ খেতাব পরিলক্ষিত হয় এবং বাংলাদেশেরও কোন কোন হিন্দু পরিবারের ‘খাঁ’ পদবী দেখা যায়। কিন্তু মুসলমানী নাম আচার-ব্যবহার এবং কথা-বার্তায় ইসলামী ভাবগ্রহণ করে এভাবে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেবার প্রমাণ একমাত্র চাকমা সমাজেই দেখা গেছে। অনুরূপ দৃষ্টান্ত দুনিয়ার আর কোন জাতির ইতিহাসে দেখা যায় না।

প্রসঙ্গত আরও উল্লেখযোগ্য যে, চাকমা রাজাদের মুদ্রার প্রতিকৃতি খাস ফরাসী ভাষায় উৎকীর্ণ ছিল। মুদ্রাগুলোর মধ্যে একটিতে খোদিত আছে ‘আল্লাহ রাব্বী’[xiv]। এমনকি চাকমা রাজাদের কামানগুলোও ‘ফতেহ খাঁ’ ‘কালু খাঁ’ নামে পরিচিত।

‘শ্রী শ্রী জয়কালী জয়নারায়ণ                      জব্বর খাঁ ১১৬৩’

[রাজা জব্বর খাঁর আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ (১১৬৩ মগাব্দ) মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জান বখশ্ খাঁ                                       জামেনদার’

[চাকমা রাজা জান বখ্শ খাঁ জমিদারের আমলের ফারসিতে উৎকীর্ণ মুদ্রার প্রতিকৃতি]

চাকমা রাজাদের মধ্যে শের দৌলত খাঁর (১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ) উপসনা পদ্ধতি ছিল খাঁটি ইসলামী ভাবধারার সম্ভূত এবং মারেফতের শিক্ষাই ছিল তার সাধনার প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। সেই সাধনার বলে তিনি এতদূর উন্নীত হয়েছিলেন বলে জানা যায় যে, নিজের নাড়ীভূড়ি পর্যন্ত বের করে পানিতে পরিষ্কার করে পুনরায় তা যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারতেন। গৃহের এক নিভৃত কক্ষে তিনি আরাধনায় রত থাকতেন। তাঁর উপাসনাকালে কেউ যাতে তাঁর গৃহে প্রবেশ না করে এমন নির্দেশও দেওয়া থকতো। কিন্তু একদিন তাঁর স্ত্রী কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে সেই সাধনা কক্ষের ছিদ্র পথে  দৃষ্টি দিতেই দেখতে পান যে, রাজা তাঁর নিজের অন্ত্র বের করে পরিষ্কার করছেন। এই দৃশ্য অবলোকন করে রাণী অবাক হয়ে চীৎকার দিয়ে ওঠেন, ফলে রাজার ধ্যান ভেঙে যায়। কথিত আছে তিনি সবগুলো অন্ত্র যথাস্থানে সংস্থাপন করতে পারেননি, যার ফলে তিনি উম্মাদ হয়ে যান। এ সম্পর্কে এখনও চাকমা সমাজে একটা গান প্রচলিত আছে:

   মুনি দরবেশ ধ্যান করে

  পাগলা রাজা আপন চিৎ-কল্জা খৈ-নাই স্যান গরে।

[সাধু-দরবেশ যেমন ধ্যান ধরে থাকে, সেই রকম পাগলা রাজা নিজের কলজে বের করে স্নান করাতেন]

এ ছাড়াও চাকমা রাজারা যে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন তার আরও অনেক প্রমাণ উপস্থিত করা যায়।

চাকমা রাজমহিষী প্রীমতী কালিন্দী রাণী প্রথমদিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইসলামের অনেক অনুশাসনও তিনি মেনে চলতেন। রাজানগরে বিরাট মসজিদ তাঁর নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মসজিদ তদারক ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুসল্লিদের ইমামত করার জন্য তিনি একজন মৌলানা নিযুক্ত করেন। কথিত আছে, রাণী সেই মৌলানার কাছ থেকে অনেক সময় ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সম্পর্কে জ্ঞান সংগ্রহ করতেন। চাকমা রাজ পরিবারের মহিলাদের অবরোধ প্রথা প্রচলিত ছিল। ইসলাম ধর্মের প্রতি বিশেষ বিশ্বাসী থাকা সত্ত্বেও শ্রীমতী কালিন্দী রাণী পরবর্তীকালে ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তন করেন। তিনি প্রথমে হিন্দু ধর্ম এবং পরিশেষে বৌদ্ধ ধর্মগ্রহণ করেন।

এসব প্রমাণাদি থেকে অনুমিত হয় যে, চাকমারা হয়ত বা মুসলমান ছিল। মুঘল বংশধর না হলেও এরা যে ব্রক্ষ্ম দেশের সাক বা সেক জাতির (ইসলামী শায়েখ বা শেখ থেকে) অন্তর্ভুক্ত ছিল তা অনুমান করা যায়।

কিন্তু চাকমাদের নিজেদের মতে, উপরোক্ত যুক্তিসমূহ সর্বৈব মিথ্যা। মুসলমানী নাম গ্রহণ এবং তাদের মধ্যে মুসলিম প্রভাবের কারণ সম্পর্কে তারা শুধু এই বলতে চায় যে, অতীতকালে কোন এক চাকমা রাজা জনৈক মুসলমান নবাব কন্যার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেন। সেই নবাব কন্যার প্রভাবে চকমা রাজ ইসলামী ভাবধারার সমর্থক হয়ে ওঠে। যার ফলে পরবর্তীকালে তাঁদের নামকরণ উপাধি গ্রহণ আচার-ব্যবহার প্রভৃতিতেও ইসলামী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়[xv]। এক সময় চাকমা সমাজে কোনও রমণীর মৃত্যু ঘটলে তাকে রীতিমত কাফন পরিবৃত করে উত্তর শিয়রে কবরস্থ করা হতো এরূপ ঘটনাও বিরল নয়।

কোন জাতির আদি পরিচয় উদঘাটনে প্রাচীন সংস্কারের দান অপরিসীম। এ দিক দিয়ে বিচার করলে চাকমাদের এই যুক্তি অনেকটা শিথিল মনে হয়। কিন্তু চাকমারা কোনক্রমেই মানতে রাজি নয় যে, তারা কোনকালে মুসলমান ছিল। চাকমারাজ শ্রী ভুবনমোহন রায় (মৃত্যু ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দ) দেখাতে চেয়েছেন যে, চাকমারা আসলে শাক্য বংসম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর[xvi]। পুরাকালে যে তাঁরা পৈতাধারী ক্ষত্রিয় ছিলেন- একথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

মগভাষায় ‘শাক্য’ অর্থ ‘সাক’ আর যারা রাজবংশম্ভূত তাঁদেরকে বলা হয় ‘সাকমাং’ (মাং রাজা অর্থে)। এই ‘সাকমাং’ থেকে ‘চাকমা’। এই বিশেষ কথাটির উপর চাকমারা সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে থাকেন। চাকমাদের এই নিজস্ব মতামত এবং মগদের এই ভাষাগত অর্থের পরিপ্রেক্ষিতেই তারা প্রমাণ করতে চান যে, তাঁরা শাক্য বংশম্ভূত মহামুনি বুদ্ধের বংশধর।

চাকমা জাতির আদি উৎস সম্পর্কে চাকমা সমাজে দুটি পুরাকাহিনী প্রচলিত আছে- ‘রাধামহন-ধনপতি’ উপাখ্যান এবং ‘চাটিগাঁ ছাড়া’। এই কাহিনী দুটি মূলত এক এবং দ্বিতীয়টি প্রথমটির দ্বিতীয় অধ্যায় মাত্র। উক্ত কাহিনীতে রাজা সাধ্বিংগিরির উল্লেখ রয়েছে। রাজা সাধ্বিংগিরি চম্পকনগরে (মতান্তরে চম্পানগরে) বাস করতেন। এই চম্পক বা চম্পা থেকে না-কি চাকমা জাতির নামকরণ করা হয়েছে। সেকালে চম্পনগরে বিজয়গিরি হরিশচন্দ্র নামে আরও দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন। তাঁরা সবাই চন্দ্রবংশীয় ক্ষত্রিয়। চাকমারা নিজেদের এঁদেরই বংশধর বলে দাবি করে। ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’ অবশ্য উক্ত কাহিনী দুটি সম্বন্ধে মতভেদ রয়েছে।

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, এই চম্পকনগর বা চম্পানগরের ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ উপস্থিত করা যায় কি-না। কেউ কেউ অনুমান করেন, চম্পানগর বিহারে অবস্থিত। আবার চীনা পর্যটক ফা-হিয়েনের (৪২৯ খ্রীষ্টাব্দ) বর্ণনায় পাওয়া যায় চম্পানগর ছিল তখনকার সময়ে ভাগলপুরের কর্ণপুর রাজ্যের রাজধানী। ক্যাপ্টেন থমাস হার্বার্ট লুইন বলেন, চম্পানগর মালাক্কার নিকটবর্তী একটি শহর।’ এ থেকে কেউ কেউ ধারণা করে থাকেন যে, চাকমারা ‘মালয় বংশজ’। অবশ্য এ সম্পর্কেও মতভেদ রয়েছে।

ত্রিপুরার ইতিবৃত্ত ‘রাজমালায়’য় চম্পা বা চম্পকনগরের সরাসরি কোন উল্লেখ নাই। তবে চাকমা সমাজে প্রচলিত একটি গানে চম্পানগর নয় নুর নগরের উল্লেখ রয়েছে। গানটির রচনাকাল জানা যায়নি, তবে চাকমা রাজাদের কেউ হয়তো একবার নিজ দেশ ছেড়ে ব্রক্ষ্ম দেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠার ফলে দেশে ফিরে আসার অভিলাষ জ্ঞাপন করে তাঁরা ছড়া কেটে গান করতেন (আনুমানিক ৭০০ মগাব্দ):

ডোমে বাজায় দোল্ দগর          ফিরে যাইয়ম্ নুরনগর

(বাদ্যকেরা ঢোল-ডগরা বাজায়। আমাদের নুরনগর ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়)

এই নুরনগর পার্বত্য ত্রিপুরায় অবস্থিত। চাকমারা আগে (বর্তমানেও আছে) পার্বত্য ত্রিপুরায় ছিল। ত্রিপুরা জেলায় অবস্থিত গোমতী নদীর উৎস সম্বন্ধে যে আখ্যান প্রচলিত আছে চাকমা সমাজে এখনও তা পবিত্র জ্ঞান করা হয়। পার্বত্য ত্রিপুরার সাথে চাকমাদের যোগসূত্র প্রাচীনকাল থেকেই। বস্তুত, এই নুরনগরই আসলে চম্পানগর কি-না তাও অবশ্য গবেষণার বিষয়।

সুতরাং এসব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে একটা জাতির আসল পরিচয় উদঘাটন সম্ভব নয়। চাকমাদের ধর্মভাবের পরিবর্তন সম্পর্কে প্রসঙ্গত আরও একটি প্রমাণ উপস্থিত করা যায়। নিম্নে কয়েকজন চাকমা রাজার নাম এবং তাঁদের সিংহাসন লাভের সময়কাল উল্লেখ করা হলো:

জব্বার খান ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দ

বেল্লাল খান ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দ

জালাল খান ১৭০৬ খ্রীষ্টাব্দ

শেরমুস্ত খান ১৭৩১ খ্রীষ্টাব্দ

শের দৌলত খান ১৭৫৪ খ্রীষ্টাব্দ

জান বখ্স খান ১৭৮২ খ্রীষ্টাব্দ

ধরম বখ্স খান ১৮১৮ খ্রীষ্টাব্দ ইত্যাদি।

শেষের নামটির ‘ধরম’ (সংস্কৃত) কথাটি সম্ভবত বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং ‘বখ্স কথাটি খাঁটি ফরাসি ভাষার শব্দ।

‘ফতেহ্ খাঁ ১১৩৩’- [চাকমা রাজা ফতেহ্ খাঁর আমলের (১১৩৩ হিজরী) ফরাসীতে উৎকীর্ণ মুদ্রা]

‘শুকদের রায় ১২১০ হিজরী’ [চাকমা রাজা শুকদের রায় (১২১০ হিজরী) এর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘জয়কালী সহায় ধরম্ বখ্শ খাঁ’ [রাজা ধরম বখ্শ খাঁর আমলের মুদ্রার প্রতিকৃতি]

‘সিংহ চিহ্নিত চাকমা মুদ্রা’

ধরম বখশের স্ত্রী শ্রীমতী কালিন্দী রাণী এই সময়েই হিন্দু ভাবাপন্ন হন। পূর্বে চাকমা রাজাদের মুদ্রায় আরবী ফারসী শব্দের প্রতিকৃতি ‘আল্লাহ’ ‘খোদা’ ইত্যাদি লেখা থাকতো; কিন্তু এই ধরম বখ্শ খান তাঁর মুদ্রার মধ্যে ‘জয়কালী সহায়’ খুদিত করেন।

পরে শ্রীমতী কালিন্দী রাণী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এবং রাজানগরে বাংলা ১২৭৬ সালের ৮ চৈত্র ‘মহামুনি’ সংস্থাপন করেন। মন্দিরগাত্রে সর্বসাধারণের জ্ঞাপনার্থে একটি প্রস্তরফলক স্থাপিত হয়। নিম্নে প্রস্তর ফলকটির হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

শ্রী শ্রী ভোক্ত

ফড়া

বিজ্ঞাপন

সর্বসাধারণের অবগতার্থে এ বিজ্ঞাপন প্রচার করিতেছি যে, অত্র চট্রগ্রামস্থ পার্বত্যাধিপতি আদৌ রাজা শেরমস্থ খাঁ তৎপর রাজা শুকদের রায় অতঃপর রাজা সের দৌলত খাঁ পরে রাজা জানবকস্ খাঁ অপরে রাজা টর্বর খাঁ অনন্তর রাজা জব্বর খাঁ আর্য্যপুত্র রাজা ধরম বকস্ খাঁ তৎসহধর্মিনী আমি শ্রীমতী কালিন্দী রাণী আপোন অদৃষ্ট সাফল্যাভিলাসে তাহানদ্বিগের প্রতি কৃতাজ্ঞাতাসূচক নমস্কার প্রদান করিলাম যদিও পূর্ববর্তীর ধর্মার্থে বৌদ্ধ ধর্মের শ্রীবৃদ্ধিসাধন জন্য দ্বিগদ্বেসিয় অনেকানেক ষুধিগণ কর্তৃক সাস্ত্রানুসারে ১২৭৬ বাংলার ৮ই চৈত্র দিবস অত্র রাজানগর মোকামে স্থলকুল রত্নাকর ‘চিঙ্গঁ’ সংস্থাপন হইয়াছে তাহাতে আজাবধি বিনা করে বৌদ্ধধর্মাবলম্বি ঠাকুর হইতে পারিবেক উল্যেকিত পৃণ্যক্ষেত্রের দক্ষিণাংশে শ্রী শ্রী ছাইক্য মুনি স্থাপিত হইয়া তদুপলক্ষ্যে প্রত্যেক সনাখেরিতে মহাবিষুর যে সমারোহ হইয়া থাকে ঐ সমারোহতে ক্রয়-বিক্রয় করণার্থে যে সমস্ত দোকানি ব্যাপারি আগমন করে ও মঙ্গলময় মুনি দর্শনে যে যাত্রিক উপনিত হয়, তাহারার দ্বিগ হইতে কোন প্রকারের মহাষুল অর্থাৎ কর গ্রহণ করা জাইবেক না ইদানিক কি করে বা করায় তব এই জর্ন্মে ঐ জর্ন্মে এবং জর্ন্মে জর্ন্মে মহাপতিকিপাত্র পরিগণিত হইবেন।

কিমাধিক মিতি … কালিন্দী রাণী

শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর হস্তলিপি

শ্রীমতী কালিন্দী রাণী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন এই অনুশাসন লিপির প্রতিটি অক্ষর তিনি যথাযথ প্রতিপালন করে গিয়েছেন। শ্রীমতী কালিন্দী রাণীর সময়ই চাকমারা পুরোপুরি বৌদ্ধ ধর্মের শাসনে চলে যায়।

চাকমাদের আদি উৎস নির্ণয় সম্পর্কে যেসব যুক্তি ও প্রমাণাদির উল্লেখ করা হয়েছে তার সঙ্গে তার ধর্মীয় বিষয়াদিও জড়িত। পাহাড়ি জাতি মাত্রই অপেক্ষাকৃত সরল। এদের মনোভাবও বিশেষ কোমল। এ কারণে তাদের ধর্মবিশ্বাসেও স্থৈর্য লক্ষ্য করা যায় না। বর্তমানে অবশ্য মিশনারীদের প্রচেষ্টায় অনেক পাহাড়ি সম্প্রদায়ও খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছে; কাজেই প্রবহমান ধর্মনীতির উপর নির্ভর করে কোন জাতির উৎস নির্ণয় সবক্ষেত্রে সঠিক ও নিরাপদ নয়।

তথ্যসূত্র

[i]  Vide Bengal Govt. Act XXIII dt. 1.8.1860.

[ii] Colonel Phayre : The History of Burma, p 39.

[iii]  দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং, পৃ ১৭-১৯।

[iv]  ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং’, এবং ‘রাজমালা’র বর্ণণায় যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। শুধুমাত্র রাজা-বাদশাহদের নামের মধ্যে কিছু কিছু তফাৎ দেখা যায়। যথা: রাজমালা দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফং অরুণযুগ (চাকমা-রাজা ৬৯৬ মগাব্দ) ইয়াংজ (৬৯৬ মগাব্দ) মইসাং রাজা প্রি ৯৮ মংছুই রাজা প্রি ১১২ মারিক্যা রাজা প্রি ৫৭ মরেক্যজ রাজা প্রি ৫৫ জনু রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৩৯ চনুই রাজা(৮৮০ মগাব্দ) প্রি ৫৮ সাজেম্বী(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ২৩ সাজাইয়ু(৮৮১ মগাব্দ) প্রি ৫৯ ইত্যাদি।

[v]  Vide letter No. 1985/797 LR dt. 1. 9. 1881.

[vi] সুবোধ ঘোষ: ভারতের আদিবাসী(উদ্ধৃত), ‍পৃ ৪।

[vii] Census Report Of Bengal 1931.

[viii] T. H. Lewin: The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein, p. 62.

[ix] Colonel Phayre: Journal of Asiatic Society of Bengal, No. 145, 1844, pp. 201-202.

[x] সতীশ চন্দ্র ঘোষ: চাকমা জাতি, পৃ ৫।

[xi]  J. P. Mills: Notes on a Tour: In the Chittagong Hill Tracts in 1926:  Census of India 1931.

[xii]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬।

[xiii]  ড. দীনেশ চন্দ্র সেন: ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’। ‘সেকালের উপাধিগুলি কিছু অদ্ভুত রকমের ছিল।‘পুরন্দর খাঁ’ ‘গুণরাজ খাঁ’ এসব রাজদত্ত খেতাব।’

[xiv]  সতীশ চন্দ্র ঘোষ: প্রাগুক্ত, পৃ ৬৯।

[xv]  শ্রী মাধবচন্দ্র চাকমাধর্মী: শ্রী শ্রী রাজনামা, পৃষ্ঠা, ভূমিকা e/o.

[xvi] ভুবন মোহন রায়: চাকমা রাজবংশের ইতিহাস,(১৯১৯) পৃ ৩৭।

♦ আবদুস সাত্তার: কবি, গবেষক ও আরণ্য জনপদের লেখক।

পাকুয়াখালি গণহত্যা: মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-১

আতিকুর রহমান:

আজ পাকুয়াখালী গণহত্যার শোকাবহ স্মৃতি সম্বলিত দিন- ৯ সেপ্টেম্বর।  ১৯৯৬ সালের এই দিনে একদল নিরীহ বাঙ্গালী শ্রমজীবী লোককে বিনা কারণে নির্মমভাবে কুপিয়ে আর অঙ্গচ্ছেদ করে, অতি নৃশংসতার সাথে, শান্তিবাহিনী নামীয় উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা জনমানবহীন গহীন অরণ্যের ভিতর হত্যা করে। এই নিরীহ লোকদের সংখ্যা ছিলো মোট ৩৫ জন। শ্রমই ছিলো তাদের জীবিকা নির্বাহের উপায়। রুজি- রোজগারের সহজ বিকল্প কোন উপায় না থাকায় বনের গাছ, বাঁশ আহরণেই তারা বাধ্য ছিলো।

বনই হলো সন্ত্রাসী শান্তিবাহিনীর আখড়া। জীবিকার তাগিদে ঐ হিংস্র সন্ত্রাসীদের সাথে শ্রমিকরা গোপন সমঝোতা গড়ে তুলতে বাধ্য হয়। তারা সন্ত্রাসীদের নিয়মিত চাঁদা ও আহরিত গাছ, বাঁশের জন্য মোটা অংকের সালামী দিতো। অনেক সময় মজুরীর বিনিময়ে শান্তিবাহিনীর পক্ষেও গাছ, বাঁশ কাটতো, এবং তা খরিদ বিক্রির কাজে মধ্যস্ততা করতো। ব্যবসায়ীরাও তাদের মাধ্যমে শান্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ ও লেনদেন সমাধা করতো। জীবিকার স্বার্থে তারা ছিলো রাজনীতিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক শ্রমিক মাত্র।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-২

 

শান্তিবাহিনীর রেশন, ঔষধ, পণ্য ও লেনদেন সংক্রান্ত যোগাযোগ ও আদান-প্রদান এদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। ঐ বাহিনীর অনেক গোপন ক্যাম্পে তাদের প্রয়োজনে আনাগোনা এবং ওদের কোন কোন সদস্যের ও শ্রমিক ঠিকানায় যাতায়াত ছিলো। এই যোগাযোগের গোপনীয়তা উভয়পক্ষ থেকেই বিশ্বস্ততার সাথে পালন করা হতো। উভয় পক্ষই প্রয়োজন বশতঃ পরস্পরের প্রতি ছিলো বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল। এরূপ আন্তরিক সম্পর্কের কারণে পরস্পরের মাঝে বৈঠক ও যোগাযোগ নিঃসন্দেহে ও স্বাভাবিকভাবে ঘটতো। এ হেতু ৯ সেপ্টেম্বরের আগে মাহাল্যা অঞ্চলের নিকটবর্তী পাকুয়াখালি এলাকায় শান্তিবাহিনীর সাথে বৈঠকের জন্য নিহত ব্যক্তিদের ডাকা হয়। আহুত ব্যক্তিরা নিঃসন্দেহেই তাতে সাড়া দেয় এবং বৈঠকস্থলে গিয়ে পৌঁছে।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-৩

ঘটনাস্থল পাকুয়াখালি হলো, মাহাল্যাবন বীটভুক্ত বেশ কিছু ভিতরে পূবদিকে গহীন বন ও পাহাড়ের ভিতর জনমানবহীন অঞ্চল। মাহাল্যাসহ এতদাঞ্চল হলো উত্তরের বাঘাইছড়ি থানা এলাকা। আহুত লোকজন হলো দক্ষিণের ও নিকটবর্তী লংগদু থানা এলাকার বাসিন্দা। তাদের কিছু লোক হলো আদি স্থানীয় বাঙ্গালী আর অবশিষ্টরা হাল আমলের বসতি স্থাপনকারী। এই সময়কালটাও ছিলো শান্ত নিরূপদ্রব। স্থানীয়ভাবে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বিরোধ নিয়ে তখন কোন উত্তাপ উত্তেজনা ছিল না। এমন শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রতিশোধমূলক ও হিংসাত্মক কোন দুর্ঘটনা ঘটার কার্যকারণ ছিলো অনুপস্থিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চাঁদাবাজি ছিনতাই অগ্নিসংযোগ হত্যা উৎপীড়ন অহরহই ঘটে। তার কার্যকারণও থাকে। রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনা ছাড়াও স্বার্থগত রেষারেষি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ইত্যাদি জাতিগত প্রতিশোধ পরায়ণতাকে সহিংসতার কারণ রূপে ভাবা যায়। কিন্তু আলোচ্য সময়টিতে অনুরূপ পরিবেশ ছিলো না। তাই সম্পূর্ণ অভাবিতভাবে নৃশংস ঘটনাটি ঘটে যায়। খবর পাওয়া গেলোঃ বৈঠকের জন্য উপস্থিত শ্রমিকদের একজন বাদে অপর কেউ জীবিত নেই, নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। হাহাকারে ছেয়ে গেলো গোটা এলাকা। তাদের খোঁজে সেনা, পুলিশ, বিডিআর, আনসার ও পাবলিকদের যৌথ তল্লাসী অভিযানে পাকুয়াখালির পাহাড় খাদে পাওয়া গেলো ২৮টি বিকৃত লাশ। বাকিরা চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে। এখনো তাদের সন্ধান মিলেনি। পালিয়ে প্রাণে বাঁচা একজনই মাত্র আছে যে এই গণহত্যা খবরের সূত্র।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-৪

এটি কার্যকারণহীন নির্মম গণহত্যা। এটি মানবতার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত নৃশংস অপরাধ। ন্যায় বিচার ও মানবতা হলো বিশ্ব সভ্যতার স্তম্ভ। জাতিসংঘ এ নীতিগুলো পালন করে। তাই তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জার্মানদের হাতে গণহত্যার শিকার ইহুদীদের পক্ষে এখনো বিচার অনুষ্ঠিত হয়। এখনো ঘোষিত অপরাধীদের পাকড়াও করা হয়ে থাকে। অধুনা যুগোস্লাভিয়ায় অনুষ্ঠিত গৃহযুদ্ধে গণহত্যার নায়কদের পাকড়াও, বিচার অনুষ্ঠান ও শাস্তি বিধানের প্রক্রিয়া চলছে। কম্বডিয়ায় অনুষ্ঠিত পলপট বাহিনীর গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াটিও জাতিসংঘ ও কম্বডিয়া সরকারের প্রক্রিয়াধীন আছে। এই বিচার তালিকায় পাকুয়াখালি, ভূষণছড়া ইত্যাদি গণহত্যাগুলো অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য। সভ্য জগতে উদাহরণ স্থাপিত হওয়া দরকার যে, মানবতার বিরুদ্ধে অনুষ্ঠিত প্রতিটি অপরাধ অবশ্যই বিচার্য। সংশ্লিষ্ট দেশ ও জাতি তা অবহেলা করলেও জাতিসংঘ তৎপ্রতি অবিচল।

স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার দাবী-দাওয়ার পক্ষে, পরিচালিত রাজনীতি, আন্দোলন ও সশস্ত্র তৎপরতায়, নির্বিচারে গণহত্যা কোন মতেই অনুমোদন যোগ্য নয়। এখন স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশে গণহত্যার অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখা দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রামে এরূপ বিচারযোগ্য ঘটনা অনেকই আছে ও তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। সাধারণ ক্ষমার আওতা থেকে গণহত্যার অপরাধটি অবশ্যই বাদ যাবে।

 

পাকুয়াখালী গণহত্যা ছবি-১

পার্বত্য ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে, আমার নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ হলোঃ এই পর্বতাঞ্চলের প্রতিটি দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, হত্যা ও পীড়নের অগ্রপক্ষ হলো জনসংহতি সমিতি ও তার অঙ্গ সংগঠন শান্তিবাহিনী। বাঙ্গালীরা তাতে পাল্টাকারী পক্ষ মাত্র। এমতাবস্থায় জনসংহতি সমিতি নেতৃবৃন্দ হলেন আসল অপরাধী। মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠনে তাদের নির্দেশ ও অনুমোদন না থাকলে, তারা প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে অবশ্যই দমাতেন বা শাস্তি দিতেন। পাকুয়াখালি ঘটনা তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়নি, অনুরূপ অস্বীকৃতি আমলযোগ্য নয়। কারণ অনুরূপ ঘটনা ঘটাবার দ্বিতীয় কোন প্রতিষ্ঠান এই সময় অত্রাঞ্চলে উপস্থিত নেই। ভুক্তভোগীপক্ষ একমাত্র তাদেরকেই তজ্জন্য দায়ী করে। তাদের অস্বীকারের অর্থ নিজেদের সংগঠনভুক্ত অপরাধীদের অপরাধ ঢাকা। সুতরাং জনসংহতি নেতৃবৃন্দই অপরাধী।

এখন গণহত্যার অভিযোগটি বিদ্রোহী সংগঠনের প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয লারমার উপরই পতিত হয়। তিনি অপরাধী না নির্দোষ তা বিচার প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

আমরা আইন-শৃংখলা মান্যকারী সাধারণ মানুষ, সরকারের কাছে এই দাবী করছি- পাক্যুয়াখালি সহ অন্যান্য গণহত্যার বিচার হোক। আন্তর্জাতিক আইন হলো: গণহত্যা ক্ষমাযোগ্য নয়। যদি পাক্যুয়াখালি, ভূষণছড়া ও অন্যান্য ঘটনাকে গণহত্যা রূপে ধরে নিতে সন্দেহ থাকে, তা হলে আন্তর্জাতিক মানে এর যথার্থতা যাচাই করা হোক। আমরা বিচার চাই, অবিচার নয়।

সন্তু বাবু এখন সরকারের নিরাপদ পক্ষপুটে আশ্রিত। তাই বলে তাকে অভিযুক্ত করা যাবে না, এমন পক্ষপাতিত্ব ন্যায় বিচারের বিরোধী। সন্তু বাবু নিজেকে নিরপরাধ মনে করলে, সরকারের পক্ষপুট ছেড়ে বিচার প্রক্রিয়ার কাছে নিজেকে সোপর্দ করুন। নিরপরাধ স্বজাতি হত্যার অনেক অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ঝুলে আছে। অধিকার আদায়ের সংগ্রাম মানে তো, মানুষ হত্যার অবাধ লাইসেন্স লাভ নয়। মানবতাবাদী সংগঠনের হিসাব মতে, তাদের হাতে অন্ততঃ ত্রিশ হাজার স্থানীয় অধিবাসীর প্রাণনাশ ঘটেছে। এটি গুরুতর অভিযোগ।

এ সংক্রান্ত আরো লেখা:

‘চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে’- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

১৭ বছর ধরে ফাইলবন্দি পাকুয়াখালীর ৩৫ কাঠুরিয়ার নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার

আগামীকাল ৯ সেপ্টেম্বর পাকুয়াখালী ট্রাজেডি দিবসঃ ১৭ বছরেও বিচার না হওয়া এক গণহত্যার শোকগাঁথা

ভালবেসে বাঙালী যুবক কমলের হাত ধরে পালালেও শেষ রক্ষা হলো না সোনাবী চাকমার

150751_137518686379416_969652262_n-300x200

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

ভালেবেসে বিয়ে করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে বাঙালী যুবক প্রেমিক কমলের হাত ধরে ঘর ছাড়লেও শেষ রক্ষা হয়নি প্রেমিকা সোনাবী চাকমার।

টানা তিন বছর  ভালবেসে মন দেয়া-নেয়ার পর বিয়ে করার শপথ নিয়ে ঘর ছাড়লেও নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার আগেই মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশের হাতে আটক হয়েছে ভিন্ন ধর্মের এ প্রেমিক যুগল। দু‘জনকেই মাটিরাঙ্গা থানায় পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়। তবে পুলিশের আগে স্থানীয় উপজাতীয় যুবকরা তাদের আটক করে বলে জানা যায়।

জানা গেছে, টানা তিন বছরের প্রেম করার পর পরস্পর বিয়ে করবে বলে প্রেমিক পানছড়ির লোগাং এর বাসিন্দা অবসর প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক খরভল্লব চক্রবর্তীর ছেলে পানছড়ি কলেজের ছাত্র কমলাশীষ চক্রবর্তীর (২০) হাত ধরে ঘর ছাড়ে পানছড়ির লোগাং এর বাবুরাপাড়ার চন্দ্র চাকমার মেয়ে লোগাং বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেনীর ছাত্রী সোনাবী চাকমা (১৬)। খাগড়াছড়ি বাস টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠে মাটিরাঙ্গা বাজারে আসা মাত্র স্থানীয় উপজাতীয় যুবকরা আটক করে বোরকাপড়া সোনাবী চাকমাকে।  প্রেমিক যুবক কমল হিন্দু ধর্মের। 

পরে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ একই গাড়ি থেকে আটক করে প্রেমিক কমলাশীষ চক্রবর্তীকে। বিষয়টি নিয়ে দিনভর উভয়ের পরিবারের মধ্যে দেনদরবারের পর প্রেমিক যুগলের স্ব স্ব পিতার জিম্মায় তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়।