এমএন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাহাড়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজী চলছে

সন্তোষ বড়ুয়া, রাঙামাটি থেকে:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্ত্র নারায়ন লারমার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় বেপরোয়া চাঁদাবাজী শুরু করেছে উপজাতীয় আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ। তিন পার্বত্য জেলায় অনুসন্ধান চালিয়ে, সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, আগামী ১০ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) এর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের এই দিনে তিনি নিজ দলের বিদ্রোহী সশস্ত্র শাখার গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এই দিনটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের একটি অংশ জুম্মজাতির শোক দিবস হিসেবে পালন করে ।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সকল নাগরিকদের কাছে জাতির পিতা “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব” হলেও, উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনের ঐ গ্রুপ দাবী করে এম এন লারমা তাদের  জাতির পিতা। কিন্তু, তারা যাকে তাদের জাতির পিতা বলে মান্য করে ৩৪ বছর পার হয়ে গেলেও তারা তাদের সেই জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচার চায়নি কখনও।

অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন উপজাতি ব্যক্তি খুন হলে অথবা ছোটখাট অনেক বিষয় নিয়ে তারা দেশে-বিদেশে সরকার, সেনাবাহিনী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের ঘাড়ে মিথ্যা দোষ চাপিয়ে নানান ধরণের প্রচার প্রচারণা চালালেও নিজ জাতির পিতা বলে খ্যাত এত বড় একজন নেতার হত্যাকারী কারা, তিনি কেন মারা গিয়েছিলেন, হত্যাকারীরা এখন কোথায় কি অবস্থায় আছে এ সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে তারা কখনই দাবি বা আন্দোলন করেনি। উপজাতিদের এই নীরবতা জনমনে প্রশ্ন এবং সন্দেহের উদ্রেক সৃষ্টি করে।

ইতিহাসের ঘটনাবলী থেকে জানা যায় যে, এম এন লারমা পাহাড়ি ছাত্র সমিতির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষিত তরুণদের সংগঠিত করেন এবং ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সাবেক সংসদ সদস্য মি. রোয়াজা ছিলেন উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং এম এন লারমা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনেও এম এন লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।

এম এন লারমা সংসদ সদস্য হিসাবে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিচালনাকালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতিসহ কতিপয় তরুণদের সাথে তার ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ১৯৭৩ সালে এম এন লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্রুপ গঠন করেন, পরে তা শান্তিবাহিনী রূপে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭৬ সালে ক্ষমতার লোভ, স্বার্থপরতা, দলীয় মতাদর্শসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। এ সময় এম এন লারমা চীনাপন্থী ও প্রীতি কুমার চাকমা ভারতপন্থী নীতি গ্রহণ করেন।

১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ রূপে দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সময় দলীয় কোন্দল চরম আকার ধারণ করে যার ফলে নিজেদের মধ্যে মারামারি আর হানাহানিতে শান্তিবাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়।

এই ঘটনার জের ধরেই ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর আন্তঃদলীয় কোন্দল আর ক্ষমতার লোভের বলি হিসেবে প্রতিপক্ষ প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র হামলায় নিহত হন এম এন লারমা।

এ প্রসংগে ১৮ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয় যে, “তথাকথিত শান্তিবাহিনীর প্রধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিহত হইয়াছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়া গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত্রে আমাদের রাংগামাটি সংবাদদাতা জানান, মি: লারমা গত ১০ই নভেম্বর সীমান্তের অপর পারে ভারতে ইমারা গ্রামে বাগমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যানপুর ক্যাম্পে প্রতিদ্বন্দ্বী শান্তিবাহিনীর ‘প্রীতি’ গ্রুপের সদস্যদের হামলায় নিহত হইয়াছেন”।

বিভিন্ন তথ্য বিবরণী এবং ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, শান্তিবাহিনীর ক্যাপ্টেন এলিনের নেতৃত্বে প্রীতিগ্রুপের আট-দশজনের একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড এম এন লারমা গ্রুপের শিবিরে সশস্ত্র অভিযান চালায়। উক্ত হামলায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাথে তার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অপর্ণা চরম চাকমা, কল্যানময় চাকমা ও স্বঘোষিত লেফটেনেন্ট রিপনসহ শান্তিবাহিনীর মোট আটজন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান।

ঘটনার পরপর প্রীতি কুমার চাকমা তার দলবল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় এম এন লারমা গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদেরকেও হত্যা করার জন্য খুঁজে বেড়াতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে একই দিনে প্রীতি গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা খাগড়াছড়ির তৎকালীন লতিবান পুলিশ ক্যাম্পের এক মাইল পূর্বে এম এন লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপরও আক্রমন চালায়। কিন্তু উক্ত আক্রমনে অবশ্য কেউ হতাহত হয়নি।

এম এন লারমার মৃত্যুর পর জনসংহতি সমিতির পূর্ণ নেতৃত্ব চলে যায় তার আপন ভাই সন্তু লারমার হাতে যিনি বর্তমানে জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান। সন্তু লারমার পাশাপাশি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য উপজাতি নেতার মধ্যে আছেন সাবেক শান্তিবাহিনী কমান্ডার ঊষাতন তালুকদার যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একজন নির্বাচিত সাংসদ এবং জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য। এম এন লারমার মৃত্যুর ৩৪ বছর হয়ে গেলেও জনসংহতি সমিতির নেতারা কখনই তাদের অবিসংবাদিত নেতা এম এন লারমার হত্যার বিচার চায়নি।

১০ নভেম্বর উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর একাংশ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু তারা তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে এই মৃত্যুর ইতিহাস চাপা দিয়ে রেখে শুধুমাত্র দিবসটিকে জুম্ম জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে। কারণ এই ঘটনার মধ্যে তাদের জাতিগত হিংস্রতা আর বিভেদের চিত্র প্রকাশ পায়।

তাই এই ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে তারা কৌশলে গোপন করে রাখে। প্রতি বছর এই দিবসকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতি  সশস্ত্র সংগঠণগুলোর চাঁদাবাজির তৎপরতা বেপরোয়াভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল শ্রেণী-পেশার সাধারণ উপজাতি ও বাঙালিরা ঐসব সশস্ত্র সংগঠনগুলোর হুমকির মুখে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। প্রাণভয়ে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

চলতি বছরও ১০ নভেম্বরকে সামনে রেখে পাহাড়ে চলছে ব্যাপক চাঁদাবাজি। বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি, যানবাহন মালিক সমিতি, ব্রিকফিল্ড সমিতি, জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, ব্যাংক, এনজিও, সরকারি/বেসরকারি অফিস ইত্যাদি থেকে চিঠি দিয়ে রশিদের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের চাঁদা আদায়ের এরকম একটি রশিদ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। মূলতঃ ১০ নভেম্বরকে পুঁজি করে উপজাতি সংগঠণগুলো ব্যাপক চাঁদাবাজি করে নিজেদেরকে আর্থিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট করছে। ১০ নভেম্বর এখন আর জুম্ম জাতির শোক দিবস নয় বরং অবৈধ চাঁদা আদায়ের বাণিজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পাহাড়ের স্থাণীয় ভূক্তভোগীরা জানান।

অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে

নিজাম উদ্দিন লাভলু:

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে তিনটি আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠন। জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের সশস্ত্র তৎপরতা ও চাঁদাবাজির কারণে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি বাঙালির মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা দিন দিন কমে যাচ্ছে। দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এ অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে একটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে সম্প্রতি রাঙামাটির লংগদুতে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে।

১৯৯৭ সালে সরকারের সাথে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউপিডিএফ। পরবর্তীতে জেএসএস’র একটি অংশ মূল দল থেকে ছুটে গিয়ে জেএসএস (সংস্কার) নামে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার নামে সংগঠনগুলো সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে। আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে গড়ে তুলছে টাকার পাহাড়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রেও তারা এখন সমৃদ্ধ।
বর্তমানে ৫১ ভাগ পাহাড়ি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ- গোষ্ঠী আর ৪৯ ভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন এ তিন জেলায়। শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে উপজাতি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটছিল। একপর্যায়ে প্রতিবেশীসুলভ ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কও গড়ে উঠে। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলোর লাগামহীন চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার কারণে এখানকার বাঙালি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস ক্রমশঃ বাড়ছে।
বাঙালিদের ধারণা, ঐ সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতায় পাহাড়িদের সবার সমর্থন আছে। অন্যদিকে, সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ পাহাড়িদের মধ্যে বাঙালিদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিয়ে শত্রু-ভাবাপন্ন করে তুলছে। এতে দিন দিন সাম্প্রদায়িক দূরত্ব বেড়ে চলেছে।

এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দারা জানিয়েছেন, শান্তিচুক্তির পর এলাকার মানুষ আশা করেছিল তাদের বসবাস হবে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, অশান্তির দাবানল বেড়েই চলেছে। অবাধ সশস্ত্র তৎপরতা আর লাগামহীন চাঁদাবাজিতে শান্তিচুক্তির প্রত্যাশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।

জানা যায়, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী বিবেচনায় পাহাড়ি জনসাধারণকে করের আওতা থেকে মুক্তি দিয়েছে সরকার। কর দিতে না হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদার হাত থেকে মুক্তি পাচ্ছে না পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ। বাঙালি কিংবা উপজাতি- সবাই এসব সন্ত্রাসীকে চাঁদা দিতে বাধ্য। বিভিন্ন ফসল, ফল ফলাদি, গবাদিপশু বেচাকেনায়ও চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। প্রকাশ্যে চিঠি দিয়েও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে তারা। প্রাণভয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের কাছে এসব চাঁদাবাজির বিষয়ে অভিযোগ করছে না কেউ। অভিযোগ এলেও প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে জড়িতরা।

নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ মাঝে-মধ্যে চাঁদাবাজদের আটক করলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। অভিযান কঠোর হলে নতুন উপায়ে চাঁদা আদায় করা হয়। এদিকে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা না দিলে হত্যা, অপহরণের পাশাপাশি নানাভাবে ক্ষতি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে উঠা ফলদ ও বনজ বাগানের মালিকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হয় মোটা অংকের চাঁদা। একরপ্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। তিনটি সংগঠনকেই পৃথক পৃথকভাবে চাঁদা পরিশোধ করতে হয়।

খাগড়াছড়ির রামগড়ের শুধুমাত্র পাতাছড়া ইউনিয়নেই প্রায় চার হাজার একর ফলদ ও বনজ বাগান আছে। এসব বাগানের মালিকদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ একাই চাঁদা আদায় করে বছরে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা। চাঁদা দেয়ার পরও নানা অজুহাতে হাজার হাজার ফলবান গাছ কেটে দেয়া হয়। বাগানের ফলফলাদি লুটে নেয়া হয়। এক বাগান মালিক বলেন, চাঁদা দিয়েও তারা পাহাড়ি সংগঠন দুটির কাছে জিম্মি।

রাঙামাটির নানিয়ারচর এলাকায়ও চাঁদার জন্য শত শত একর আনারস বাগান কেটে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ কারণে পার্বত্য এলাকার মানুষের মাঝে এখন বিরাজ করছে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর ‘চাঁদা আতঙ্ক’। পার্বত্য এলাকার সীমানা-লাগোয়া সমতল জেলায়ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো চাঁদাবাজিসহ সশস্ত্র তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়ির সীমানার পাশের ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র (সংস্কার) তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ঐ এলাকার সাতটি চা বাগানকে জিম্মি করে বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিনই পার্বত্য অঞ্চল থেকে উপজাতি সশস্ত্র গ্রুপ এক থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করছে। বছরশেষে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০০ কোটি।

চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস ও ইউপিডিএফের প্রায় পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। আদায় করা চাঁদার টাকা দিয়েই দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কাজ করে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পার্বত্য খাগড়াছড়ির এক ব্যবসায়ী বলেন, আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজি অহরহ ঘটছে। চাঁদাবাজিতে তারা কেউ পিছিয়ে নেই। কোনো পরিবহন মাল নিয়ে খাগড়াছড়ি ঢোকার সময় অথবা বের হওয়ার সময় চাঁদা দিতে হয়। একেক সময় তারা একেক স্থান থেকে চাঁদা তোলে। চাঁদা না দিলে গাড়ি থামিয়ে স্টাফদের মারধর করা হয়, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। চাঁদা না দেয়ায় সম্প্রতি বিআরটিসি’র একটি ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয় ইউপিডিএফ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউপিডিএফ-এর খাগড়াছড়ি ইউনিটে চাঁদাবাজির মাধ্যমে খুচরা খাত থেকে মাসিক আয় প্রায় ৪ কোটি টাকা। খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের অন্তর্গত প্রায় ৫টি সাবডিভিশন থেকে এ বিপুল পরিমাণ চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এছাড়াও ইউপিডিএফ’র আলাদা বার্ষিক চাঁদা শত কোটি টাকার উপরে।

গত ৯ ফেব্রুয়ারি ইউপিডিএফ’র সামরিক শাখার প্রধান প্রদীপন খীসার খাগড়াছড়ির বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৮০ লাখ টাকার সাথে প্রাপ্ত প্রায় দুই বস্তা নথিপত্র ঘেঁটে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার হওয়া নথির তথ্য মতে, খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের আওতায় ইউপিডিএফ’র বেশ কয়েকটি ডিভিশন ও সাব-ডিভিশন রয়েছে।

ডিভিশনগুলো হচ্ছে, সুবর্ণপুর ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম) ও রতœপুর ডিভিশন। খাগড়াছড়ি জেলায় ইউপিডিএফ’র সাব ডিভিশনগুলো হচ্ছে : তৃণভূমি সাব ডিভিশন (সাংগঠনিক নাম), বকুলতলা সাব ডিভিশন, বটতলা সাব ডিভিশন ও পূর্ণমিশন সাব ডিভিশন। প্রতিটি সাব ডিভিশনে মাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় হয়ে থাকে। এ সব ডিভিশনের দায়িত্বে আছেন একজন প্রধান, একজন সেক্রেটারি ও একজন কো-অর্ডিনেটর। ঐ এলাকায় উত্তোলিত চাঁদা সাংগঠনিক কাজে খরচের পর মাসশেষে কো-অডিনেটর কেন্দ্রীয় অর্থ বিভাগের প্রধান (সিসি)-এর কাছে প্রেরণ করে থাকেন।

ইউপিডিএফ’র আদায়কৃত অর্থের হিসেব তদারকির জন্য রয়েছে আলাদা শৃঙ্খলা তদারকি বিভাগ সিসি। রয়েছে মিশন হাইয়ার পরিচালক পোস্ট। ইউপিডিএফ আয়-ব্যয়ের হিসাব খুবই নিখুঁতভাবে করে থাকে। চাঁদা আদায়সহ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় কাজ করার জন্য চাঁদা কালেক্টর ও কমান্ডারদের রয়েছে মোটরসাইকেল। এছাড়া একেকজনের কাছে রয়েছে একাধিক মোবাইল সিম। ফোন করে চাঁদা পরিশোধের তাগাদা দেয়া হয়।

জানা যায়, মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলিও করা হয়। তারা সকলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করে। গত শুক্রবার রামগড়ের গৈয়াপাড়া এলাকায় আটক ইউপিডিএফের চাঁদা কালেক্টর জীবন চাকমা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, চাঁদাবাজির কাজে এলাকাভিত্তিক তাদের বাঙালি সোর্স রয়েছে। এদের মাধ্যমে তথ্য ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চাঁদা দাবি করা হয়।

নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্র জানায়, মাসিক খুচরা চাঁদার পাশাপাশি ইউপিডিএফ’র প্রতিটি সেক্টরে মোটা অংকের বাৎসরিক চাঁদা রয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন খাত, ফলদ ও বনজ বাগান, বিভিন্ন তামাক কোম্পানি, মোবাইল কোম্পানি, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কোম্পানি, স’ মিল ও চাকুরিজীবীদের কাছ থেকে ইউপিডিএফ বার্ষিক চাঁদা আদায় করে থাকে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দিবস ও উৎসব উপলক্ষে আলাদা চাঁদা আদায় করা হয়ে থাকে। এ টাকা নিয়মিত মাসিক আদায়কৃত ৪ কোটি টাকার বাইরে।

খাগড়াছড়ি সদরের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী বলেন, ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তি হওয়ার আগে পার্বত্য এলাকায় একমাত্র শান্তিবাহিনীকে চাঁদা দিতে হতো। চাঁদা নিয়ে ওরা ব্যবসায়ীদের নানাভাবে সহায়তাও করতো। আর এখন চাঁদা দিতে হয় তিন গ্রুপকে। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাবেক এক সদস্য জানান, পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ক্ষুদ্র চাষী থেকে শুরু করে সব পেশাজীবীকেই চাঁদা দিতে হয়। কিন্তু পাহাড়িরা ভয়ে এসব কথা প্রকাশ করে না।

পাহাড়ি বাঙালি জনগোষ্ঠীর নানা পেশাজীবীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প ও নিরাপত্তা পোস্ট প্রত্যাহার করার কারণে বিস্তীর্ণ এলাকা সশস্ত্র গ্রুপগুলোর নিরাপদ ও মুক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠেছে গ্রুপগুলো। এ অবস্থায় তুলে নেয়া নিরাপত্তা ক্যাম্পগুলো পুনঃস্থাপনের পাশাপাশি তিন জেলায় র‌্যাবের ইউনিট স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংগঠন পরিচালনা, অস্ত্র সংগ্রহ প্রভৃতির জন্য তিনটি সংগঠন ফান্ড গড়ে তোলার জন্য চাঁদা আদায় কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়। আর এ কারণে এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য গ্রহণকে কেন্দ্র করে সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব সংঘর্ষে তিন গ্রুপেরই অনেক সদস্য প্রাণ হারিয়েছে।

প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১০ এর জানুয়ারি হতে ২০১১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র মধ্যে ৫৪ বার সশস্ত্র সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে জেএসএস’র ১৯ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। ইউপিডিএফের নিহত হয় ১০ জন ও আহত হয় ৫ জন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সমগ্র রাঙামাটি জেলায়, খাগড়াছড়ি জেলার অল্প কিছু এলাকায় এবং বান্দরবানে জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য রয়েছে। অন্যদিকে ইউপিডিএফ-এর আধিপত্য রয়েছে সমগ্র খাগড়াছড়ি জেলা, রাঙামাটির কোনো কোনো এলাকা ও বান্দরবানের অল্প পরিমাণ এলাকায়। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে জেএসএস (সংস্কার)-এর মোটামুটি প্রভাব ও আধিপত্য থাকলেও রাঙামাটিতে অল্প পরিমাণে প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়।

সামরিক কাঠামোয় সংগঠনগুলোর সশস্ত্র উইং পরিচালিত হয়। কোম্পানি, প্লাটুন, পোস্ট, সাব-পোস্ট ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয় এলাকাকে। চাঁদা আদায়ের জন্য রয়েছে চাঁদা কালেক্টর। ক্যাপ্টেন বা মেজর পদবির সদস্যরা কোম্পানিগুলোর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে প্লাটুন কমান্ডার, পোস্ট বা সাব পোস্ট কমান্ডারও রয়েছে।

সশস্ত্র সদস্যরা বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর পোষাক পরিধান করে। ইউপিডিএফ তিন পার্বত্য জেলাকে জাগুয়া, ঈগল ও ড্রাগন নামে তিনটি কোম্পানিতে ভাগ করে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদার টাকার একটি বড় অংশ ব্যয় করা হয় অস্ত্র সংগ্রহে। অত্যাধুনিক সব অস্ত্র সংগ্রহ করে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তারা। জানা যায়, এম কে-১১, জার্মানির তৈরি এইচ কে-৩৩, রাশিয়ার জি-৩, একে-৪৭, একে-২২, এম-১৬ রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, চাইনিজ সাব মেশিনগান, এসবিবিএল বন্দুকের মতো অস্ত্র রয়েছে সংগঠনগুলোর হাতে। ভারতের মিজোরাম ও মিয়ানমার হতে এসব অত্যাধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করে তারা।

মিয়ানমারের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান লিবারেশন পার্টির (এএলপি) সহযোগিতায় এখানকার একটি পাহাড়ি সংগঠনের জন্য অস্ত্রের চালান আসার পথে ঐদেশের কারেন প্রদেশে সেগুলো ধরা পড়ে। গত ৯ ডিসেম্বরে আটক হওয়া ঐ চালানে ১৬টি একে-৪৭ রাইফেল ছিল বলে জানা যায়।

একইভাবে ভারতের মিজোরামেও একাধিকবার অস্ত্রের চালান ধরা পড়ে। ইউপিডিএফের কেন্দ্রীয় প্রচার শাখার প্রধান নিরন চাকমার মুঠোফোনের সুইচ কয়েকদিন ধরে অফ থাকায় চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার অভিযোগ সম্পর্কে তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

তবে নামপ্রকাশ না করার শর্তে ঐ সংগঠনের এক নেতা মুঠোফোনে বলেন, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তৎপরতার সাথে ইউপিডিএফকে জড়িয়ে যে ধরণের অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। জুম্মজাতির স্বাধিকারের জন্য আন্দোলন করছেন তারা। এ কঠিন আন্দোলন সংগ্রাম চালাতে টাকার প্রয়োজন। তাই তারা জনগণের কাছ থেকে কিছু চাঁদা সংগ্রহ করে। সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে ওই নেতা বলেন, সন্তু লারমার সন্ত্রাসীদের হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য তারা অস্ত্র বহন করে।

এদিকে, সমঅধিকার আন্দোলন নামে একটি বাঙালি সংগঠনের খাগড়াছড়ির এক নেতা নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বলেন, আওয়ামীলীগ যখনই ক্ষমতায় আসে পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠে। ওই নেতা আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিশেষ নীতির কারণে এখন পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধ্ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর জোরালো কোন অভিযান নেই। তাই সশস্ত্র গ্রুপগুলো এখন অনেকটা অবাধ ও নির্বিঘ্নে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে।

শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তিকে ঘিরে কাউখালীতে জেএসএস’র কোটি টাকার চাঁদাবাজী

%e0%a6%a4%e0%a6%95%e0%a6%b9%e0%a6%ac

পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট:

২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির ১৯ বছর পূর্তিকে ঘিরে কাউখালীতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও অংগসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এক কোটি টাকা টার্গেট নির্ধারণ করে গত এক মাস যাবৎ ম্যারাথন কর্মসূচীর মাধ্যমে এ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির ১৯ বছর পূর্তি। প্রতি বছর এ দিনে রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক শো’ডাউন করে থাকে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি। এ বছরও দিবসটি পালনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তাদের ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ।

এ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে শুধু কাউখালীতেই টার্গেট করা হয়েছে এক কোটি টাকা। এ টার্গেট পূরণ করতে চাঁদা আদায়ের ম্যারাথন কর্মসূচী হাতে নেয় তারা। এ লক্ষ্যে গত এক মাস যাবৎ কাউখালী ও এর আশেপাশের এলাকাগুলো চষে বেড়াচ্ছেন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতারা।

কোটি টাকা আদায়ে সংগঠনটি যেসব প্রতিষ্ঠানগুলো টার্গেট করেছে এর মধ্যে রয়েছে গাছ, বাঁশ, সরকারী চাকুরীজীবী, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্রিকফিল্ড। ইতোমধ্যেই উপজেলার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছ থেকে মাথাপিছু এক হাজার টাকা নির্ধারণ করে তা যথাসময়ে পাঠিয়ে দিতে মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

যথা সময়ে নির্ধারিত টাকা পাঠিয়ে দেয়া না হলে সেসব শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন দূর্গম অঞ্চলে কর্মরত স্কুল শিক্ষকরা। জীবনের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে বেশীরভাগ শিক্ষকই টাকা পৌঁছে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব শিক্ষকদের মতে পানিতে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই করা ঠিক হবেনা। আবার আতঙ্কিত অনেক শিক্ষক কাউখালী সেনা ক্যাম্পে মৌখিক অভিযোগও করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলমপতি, ঘাগড়া, বেতবুনিয়া ও ফটিকছড়ি ইউনিয়নের অসংখ্য শিক্ষক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বিষয়টি স্থানীয় সেনা ক্যাম্পকে অবগত করায় দাদারা ক্ষিপ্ত হয়েছেন।

উপজেলার সরকারী অফিসগুলো ঘুরে জানা গেছে, বেশীরভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে পদ ও পদবী হারে টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এসব সরকারী চাকুরীজিবীরা চাঁদা দেয়ার কথা স্বীকার করলেও নির্ধারিত চাঁদার পরিমাণ কত তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

কোটি টাকার লক্ষ পূরণের প্রধান টার্গেট হচ্ছে গাছ ও বাঁশ ব্যবসা। মৌসুমটি গাছ ও বাঁশ ব্যবসার হওয়ায় এসব ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা হবে অন্তত অর্ধ কোটি টাকা। এমন তথ্য পাওয়া গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে।

এছাড়াও তালিকায় রয়েছেন ঠিকাদার, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সড়কে চলাচলরত গাড়ীগুলো। তবে যেসব ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও সড়কে চলাচলরত গাড়ীগুলো জেএসএস থেকে বছর ব্যাপী টোকেন সংগ্রহ করেছেন তাদের কাছ থেকে চাঁদার পরিমাণ কম রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রধানের বক্তব্য বা নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় জেএসএস’র কেন্দ্রীয় তথ্য ও সহ প্রচার সম্পাদ সজীব চাকমার সাথে। তিনি জানান, সারাদেশে যেভাবে চলছে আমাদের নেতা কর্মীরাও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সেভাবে সহযোগিতা নিচ্ছে। এটাকে কোন ক্রমেই চাঁদাবাজি বলা যাবেনা।

তিনি আরো জানান, সবার সাথে আলোচনা স্বাপেক্ষে কর্মসূচী পালনের জন্য টাকা আদায় করা হচ্ছে। কাউকে জোর করে টাকা নেয়া হচ্ছেনা।

এ বিষয়ে জেএসএস কাউখালী উপজেলা সভাপতি সুবাষ চাকমার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এদিকে জেএসএস’র লাগামহীন চাঁদাবাজীর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, বাঙ্গালী ছাত্র পরিষদ কাউখালী উপজেলা শাখার সভাপতি মোঃ আব্দুল্লাহ তুহিন। তিনি জানান, জেএসএস’র চাঁদাবাজীর পরিধি আগের তুলনায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কোটি টাকা চাঁদার লক্ষ্য পূরণ করতে তারা এবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও টার্গেট করে অসহায় শিক্ষকদের হয়রানি করছে। তিনি জেএসএস’র চাঁদাবাজী বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

কাউখালী থানার ওসি আব্দুল করিম জানান, বিষয়টি আমি অনেকের মুখে শুনেছি। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ না করলে সেক্ষেত্রে আমাদের করার কিছু থাকে না।

বান্দরবানে চলছে জেএসএসের চাঁদাবাজির মহোৎসব(ভিডিও)

চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বান্দরবানে সন্তু লারমার নেতৃতাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) নীরবে চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। জেলার সাত উপজেলার শহরের বাইরে মুদি দোকান, কাট ব্যবসায়ী, ঠিকাদার,কৃষক, শ্রমিক, যানবাহন মালিক, সবাইকে চাঁদা দিয়ে নিজ নিজ পেশায় টিকে থাকতে হয়। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যই নয়, স্থানীয় উৎপাদিত কৃষিপণ্য এলাকার বাহিরে নিতে গেলেই জেএসএস সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয়।

এর আগে ব্যবসায়ীদের প্রকার ভেদে চাহিদা মত টাকা দিয়ে বাৎসরিক টোকেন নিতে হয়। অন্যথায় তাদের উপর নেমে আসে অপহরণের হুমকি ও শারীরিক নির্যাতন। ব্যবসা চালানো ও নিরাপত্তার কথা ভেবে নীরবে চাঁদা দিয়ে আসছে পাহাড়ের ব্যবসায়ীরা। জেএসএস’র চাঁদা যেন বৈধতা পেয়ে গেছে পাহাড়ে। প্রশাসন যেন সন্ত্রাসীদের বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয়দের অভিমত।

স্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও এলাকাবাসীর সূত্র জানায়, গত অর্থ বছরে সাত উপজেলার ব্রীক ফিল্ড, কাঠ ব্যাবসায়ী থেকে প্রতি ঘন ফুটে ৩৫ টাকা, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান থেকে ১০%, লাকড়ি ব্যবসায়ী, বাঁশ ব্যবসায়ী, তামাক চাষীদের থেকে প্রতি কানি (৪০শতক) ১৪ হাজার টাকা, বাস, জীপ, ট্রাক প্রকার ভেদে ৮ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

আর কাঠ কাঁটা মাঝি, কাঠের চালির মাঝি, মাছ ধরার জেলে, বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ী থেকে বাৎসরিক টোকেন নিতে হয়। এছাড়া কলা, আদা, মরিচ, ধান, , হলুদ, আনারস, লেবু, কমলা, কুমড়াসহ বিভিন্ন কৃষি পণ্য বাজার জাত করা কালে গরিব পাহাড়ী কৃষকদের চাঁদা দিতে হয়। এমনকি গবাদিপশু-পাখি বেচাকেনা করতে গিয়েও চাঁদা পরিশোধ করতে হয় স্থানয়িদের। অন্যথায় কোন কিছুই নয়। তবে এক্ষেত্রে পাহাড়ীদের থেকে বাঙ্গালীদের চাঁদার পরিমান একটু বেশী। আর চাঁদা আদায়ের দায়ীত্ব থাকে সশস্ত্র গ্রুপগুলো।

গোয়েন্দা সূত্র মতে, তিন পার্বত্য জেলায় জেএসএস’র পাঁচ হাজার সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। আর এ সশস্ত্র বাহিনী দেশের সেনা বাহিনীর আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। এদের মধ্য সিপাহী থেকে শুরু করে মেজর জেনারেল পর্যন্ত রয়েছে। তাদের মাসিক বেতন, রেশন ও নিরাপত্তা ঝুঁকিও দেয়া হয় আদায়কৃত চাঁদার টাকা থেকে।

গোয়েন্দা সূত্র মতে আরো জানা যায়, জেএসএস চাঁদাবাজির মাধ্যমে গত অর্থ বছরে বান্দরবান জেলা থেকে ৩০ কোটি টাকা আদায় করেছে। চলতি অর্থ বছরে এর পরিমান ৫০ কোটি টাকা আদায়ের নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এসব টাকায় তাদের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ দিতে মিয়ানমার বিদ্রোহী বাহিনী, চীন ও ভারত থেকে অবৈধ অস্ত্র গোলা বারুদ আনা হয়। জেএসএস’র সশস্ত্র বাহিনীর আদায় কারা চাঁদার টাকা দিয়ে অধিকার আদায়ের নামে দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আর বছরের পর বছর নীরবে চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন তিন পার্বত্য জেলার অসহায় মানুষ।

তিন পার্বত্য জেলায় দুর্গম ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পাহাড়ি এলাকা সন্ত্রাসীদের আস্তানা পর্যন্ত পৌঁছা কঠিন। এছাড়া পার্বত্য এলাকায় মোবাইল নেটওর্য়াক থাকায় নিরাপত্তা বাহিনী পৌছাঁর আগেই খবর পেয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নিরাপদস্থলে চলে যায়।

গত মাসে বান্দরবান আইনশৃঙ্খলা সভায় জেএসএস’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা থাকায় পুলিশ সুপার আওয়ামীলীগের নেতাদের তোপের মুখে পড়তে হয়। পরে পুলিশ তৎপর হয়ে আ’লীগ নেতা অপহৃরত মংপু মার্মার অপহরণকারী এজাহারভূক্ত কয়েকজন আসামীকে আটক করে। প্রায় দু-মাস হলেও অপহৃরত আ’লীগ নেতাকে উদ্ধার করতে পারেনি।

চাঁদা আদায়ের বিষয়ে বান্দরবান প্রেস ক্লাবে আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য কে এস মং বলেন, দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোও চাঁদা করে। পাহাড়ে সংগঠন চালাতে হলে শুভাকাঙ্ক্ষীদের থেকে চাঁদা নিতে হয়।

পার্বত্য এলাকায় পর্যটন শিল্প বিকাশে বাধা সশস্ত্র গ্রুপ

অস্থির পাহাড় দিশেহারা মানুষ- (শেষ)

সাজেক১

আবু সালেহ আকন, পার্বত্য অঞ্চল থেকে ফিরে:

সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এখন পাহাড়ের বিষফোঁড়া। শুধু খুন, জখম, অপহরণ, গুম ও চাঁদাবাজির মধ্যেই তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ নেই। দেশের পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্যও তারা এখন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পর্যটকদের প্রশ্ন, এভাবে ঘুরে বেড়াতে কার ভালো লাগে? অপর দিকে এই এলাকায় যাতে পর্যটকরা না আসেন সে জন্য আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বছরজুড়ে চালানো হয় অপপ্রচার।

সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ের সাথে জড়িত মৈতে লুসাই বলেন,

পর্যটন ব্যবসায় এখন ভয়াবহ ধস নেমেছে। তিনি বলেন, এই সময়ে অতীতের বছরগুলোতে মাসে ৭০-৮০ হাজার টাকার ওপরে ব্যবসায় করতেন। এখন তা নেমে এসেছে ১০ হাজারে। পর্যটকরা কেউ আর এই এলাকায় রাত কাটান না। দিনে এসে দিনেই তারা চলে যান।


আরো দেখুন:
  1. আবারও বাঘাইছড়িতে মালভর্তি ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন

  2. রাঙামাটির সাজেকে মালভর্তি ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন

  3. সাজেকে পর্যটকবাহী মাইক্রোবাস আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা

  4. পণ্যবোঝাই ট্রাকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের আগুন দেয়ার প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের মানববন্ধন

  5. রাঙামাটির সাজেকে গাড়ি চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা

  6. পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন খাত অচল করতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে


সাজেকে গিয়ে দেখা যায়, এই এলাকায় সরকারি ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে বেসরকারি ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প বিকাশে বেশ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বেশ কিছু কাঠের দোতলা বাড়ি উঠছে পর্যটকদের থাকার জন্য। স্থানীয় বাসিন্দারাই এই ঘরগুলো তৈরি করছেন।

দানিয়েল লুসাই বলেন,

এক সময় সারা বছর পর্যটকের এতটাই ভিড় লেগে থাকত যে মাঝেমধ্যে থাকার স্থান না পেয়ে তারা রাস্তার ওপর রাত কাটাতেন। স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতেও রুম ভাড়া করে পর্যটকরা অবস্থান করতেন। এখন আর সেই অবস্থা নেই। আস্তে আস্তে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ছে এই এলাকা।

bght

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে পর্যটকবাহী একটি গাড়ি পোড়ানো হয় সাজেকের রাস্তায়। এরপরই এ এলাকার পর্যটক শিল্পে অনেকটা স্থবিরতা নেমে আসে। ওই ঘটনার পর থেকে এখনো সাজেকে যারা যান তাদের পাহারা দিয়ে নেয়া হয়। যেসব পর্যটক সাজেকের উদ্দেশে যান তারা বাঘাইহাট সেনা চৌকি এলাকায় গিয়ে জড়ো হন। পরে তাদের সেখান থেকে সেনাবাহিনীর স্কর্ট দিয়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাজেকের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার বিকেলে সেনা পাহারায় তাদের শহরে ফিরতে হয়। যে কেউ ইচ্ছে করলেই এখন আর সাজেকে যেতে পারেন না, আবার সেখান থেকে ফিরেও আসতে পারেন না। নিরাপত্তা নিয়ে তাদের চলতে হয়। ৩৪ কিলোমিটারের এই দুর্গম পথটুকু পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

সাজেকের পর্যটন অ্যাসোসিয়েশনের প্রশাসক সিয়াতা লুসাই বলেন,

পাহাড়ে পর্যটন শিল্প বিকাশ রোধ করতে চাচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। তারা চায় না এই এলাকায় কোনো পর্যটক আসুক। তাতে তাদের অসুবিধা হয়। যত বেশি লোকসমাগম হবে ততই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সঙ্কুচিত হয়ে আসবে। এ আশঙ্কায় তারা চাচ্ছে না পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটুক।

সিয়াতা লুসাই বলেন,

এলাকার পর্যটন শিল্প বিকাশে সেনাবাহিনী অনেক কাজ করেছে। সুন্দর রাস্তাঘাট করে দিয়েছে। পানির ব্যবস্থা করেছে। চিকিৎসাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করেছে। মসজিদ-উপাসনালয় গড়ে তুলেছে। এলাকার শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে দিয়েছে। আর এই শিল্পের কারণে এখন এই এলাকার মানুষ দুই বেলা খেয়ে-পড়ে ভালো আছেন। আগে তারা পাহাড়ে জুম চাষ করতেন, গাছ কাটতেন, শিকার করতেন। তাতে দিন চলত না। না খেয়ে থাকতে হতো। পর্যটন শিল্পের বিকাশের পরই তারা কিছু উপার্জন করছেন। পর্যটকদের সেবা দিয়ে তাদের ভালোই উপার্জন হয়। এতে পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের সমস্যা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন বলেন, দুর্বৃত্তরা এখনো চাঁদা দাবি করে। প্রতিটি কটেজের মালিকের কাছে সন্ত্রাসীরা এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে।

সিয়েতা লুসাই বলেন,

এক সময় সাজেকে দিনে গড়ে ৩০০ পর্যটকবাহী গাড়ি আসত। এখন আসে ২০-২৫টা। রুইলুই জুনিয়র হাইস্কুলের শিক্ষক বোবিন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ি জনপদে পর্যটন শিল্পের যত বিকাশ ঘটবে ততই এলাকা উন্নত হবে। তিনি বলেন, রুইলুই এলাকায় পর্যটন শিল্পকেন্দ্রিক অনেক কিছ্ইু গড়ে উঠছে। তিনি যে স্কুলে চাকরি করেন সেখানে এখন ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ৮৫। অথচ এখানে এক সময় কোনো স্কুল ছিল না। পর্যটন শিল্প বিকাশের সাথে সাথে এখানে আরো অনেক কিছুই গড়ে উঠেছে।

নীলাচলে গিয়ে দেখা যায় সেখানেও পর্যটকদের তেমন ভিড় নেই। দু-একজন যারা এসেছেন তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, পর্যটকরা এসে সব এলাকায় নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে না। এখানে রয়েছে অপহরণ আতঙ্ক। অনেকেই অপহরণের শিকার হয়েছেন ইতঃপূর্বে। কেউ কেউ মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। ফলে যারা এখানে ঘুরতে আসেন তারাও কেবল শহর ও লোকালয়কেন্দ্রিক ঘোরাঘুরি করেন।

এ দিকে পাহাড়ে যাতে পর্যটকরা না যান সে কারণে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নানা অপপ্রচারও চালানো হয়। এমনকি কোনো কোনো দর্শনীয় স্থান বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যেমন স্বর্ণমন্দির গত ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে শিগগিরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। পর্যটকরা যাতে এই এলাকায় এসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।

১০ হাজারের বেশি সশস্ত্র সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পার্বত্য অঞ্চল

অস্থির পাহাড় দিশেহারা মানুষ (২)

ততততত

আবু সালেহ আকন, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফিরে:

জেএসএস ও ইউপিডিএফের ১০ হাজারের বেশি সন্ত্রাসী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তিন পার্বত্য জেলা। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, এরা সবাই নিজ নিজ সংগঠনের বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী। একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে যেরূপ পদ-পদবি রয়েছে এই সংগঠন দুটোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও তেমনি পদ-পদবি রয়েছে। তাদের বেতন স্কেলও রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের রয়েছে ঝুঁকি ভাতা।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেউ যদি নিহত বা আহত হয় তবে তাদের জন্য রয়েছে সংগঠনের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ। শুধু পাহাড়ি সন্ত্রাসীরাই নয়, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আগত কিছু সন্ত্রাসীও জেএসএস ও ইউপিডিএফের হয়ে কাজ করছে।

স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্য মতে তিন পার্বত্য জেলায় ১০ হাজারের ওপরে সশস্ত্র সন্ত্রাসী রয়েছে। এদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এদের মধ্যে বান্দরবান উপজেলাতেই রয়েছে পাঁচ হাজারের মতো সন্ত্রাসী। এদের মধ্যে কয়েকজন হলো এস মং ওরফে মেজর আশিষ, মনি চিং মার্মা, কে চিং মার্মা, সিলিপ ত্রিপুরা, ধং চং মার্মা, রাজেন্দ্র ত্রিপুরা, চায়নু মার্মা, হাচিং মার্মা, অঙ্গ মার্মা, কৃষ্ট, রাংকুনু ত্রিপুরা, নিমন্দ্র ত্রিপুরা, ছলেমুল ত্রিপুরা, অতিরাম, র‌্যাংকনো, বিক্রম, জন বাহাদুর, মারুং, সুমন দাস, নিমন্ত্র ত্রিপুরা, হামাজন ত্রিপুরা, লেনছন মেন্ডেলা, অংশৈপ্রু, সরেন্দ্র, নকুল, উইলিয়াম, মনিচিং, চাকনাই মুরং, অং কে জ, জেরী ত্রিপুরা।

কিছু বাঙালি নামের সশস্ত্র সন্ত্রাসীও রয়েছে। নামে বাঙালি হলেও তারা প্রতিবেশী মিয়ানমারের নাগরিক বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলো মনছুর রহমান, জাকির হোসেন, শাহ আলম ও আব্বাস উদ্দিন।

চাঁদাবাজী

স্থানীয় সূত্র জানায়, কোথাও কোথাও জেএসএস আবার কোথাও ইউপিডিএফের আধিপত্য পুরো পাহাড়ে। তবে জেএসএস আর ইউপিডিএফ যে-ই হোক তাদের কর্মকাণ্ড সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে চরম আতঙ্কের। বাঙালিদের চেয়েও পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা তাদের কাছে বেশি পণবন্দী।

এর কারণ হিসেবে জানা যায়, বাঙালিরা সাধারণত লোকালয়ে বসবাস করে। শহর কিংবা বাজারের আশপাশে দলবদ্ধ হয়ে এদের বসবাস। আর পাহাড়িরা গহিন অরণ্যে বসবাস করে। অনেক সময় দেখা যায় পাহাড়ের চূড়ায় হয়তো একাকী একটি বাড়িতে বসবাস করছে কোনো পাহাড়ি উপজাতি পরিবার। যে কারণে তাদের সন্ত্রাসীরা সহজেই টার্গেট করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এদের মূল কাজ হচ্ছে চাঁদাবাজি। বিভিন্ন সেক্টর থেকে এরা চাঁদা আদায় করে থাকে। নিবন্ধিত কোনো দল না হলেও পাহাড়ের জেলা উপজেলায় এই দু’টি সংগঠনের দলীয় কার্যালয় রয়েছে। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর শুধু বান্দরবান থেকেই জেএসএস ৩০ কোটি টাকার চাঁদা তুলেছে। এ বছর তাদের টার্গেট হলো ৫০ কোটি টাকা। এই দিয়েই দলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, রেশন, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি দেয়া হয়। এ ছাড়া পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্র ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে থাকে বলে একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি কর বা ভ্যাটের ন্যায় এখানে প্রকাশ্যে চলে চাঁদাবাজি। সামান্য কলার ব্যবসা থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা-বাণিজ্য, জেলে, খামার, ঠিকাদারি, উন্নয়নমূলক কাজ সব কিছু থেকে আদায় করা হয় চাঁদা। আর তা না দিলে নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে শুরু করে অপহরণ, খুন, ধর্ষণ হওয়ার শঙ্কা ভুক্তভোগীদের। প্রাণভয়ে মুখও খুলতে চান না তারা। স্বয়ং পুলিশ প্রশাসনও তাদের কাছে পণবন্দী বলে অভিযোগ।

রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি থানার ওসি মঞ্জুরুল আলম মোল্লা বলেন, গোপনেও কেউ চাঁদা দেয় কি না তা স্বীকার করে না। শুনি চাঁদা নেয়। কিন্তু কারা দেয় তার খোঁজ পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী কয়েকজন বলেন, চাঁদা যে দিচ্ছে তার হদিস পাওয়া যায় না।

সম্প্রতি পাহাড়ে বিভিন্ন পণ্যের ওপর ‘শান্তি চুক্তি’ সমর্থক জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফের আরোপ করা চাঁদার তালিকা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

চাঁদাবাজি

ওই তালিকা অনুযায়ী, গাছে প্রতি ঘনফুট ও বাঁশে প্রতি শ’ হিসেবে চাঁদা আদায় করা হয়। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট সেগুন গোল গাছে জেএসএসকে চাঁদা দিতে হয় বছরে ৪০ টাকা, ইউপিডিএফকে দিতে হয় ৫০ টাকা। এভাবে সেগুন রদ্দা, গামারী গোল-রদ্দা, লালি গোল-রদ্দার ওপর আলাদা আলাদা হারে চাঁদা ধার্য করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতি শ’ বাঁশে বছরে জেএসএস-ইউপিডিএফ উভয়েই চাঁদা আদায় করে ৫০০ টাকা করে। এভাবে বাইজ্জা বাঁশের জন্য রয়েছে আলাদা রেট। প্রথম শ্রেণীর মাছ ব্যবসায়ীদের জেএসএসকে বছরে চাঁদা দিতে হয় ৪০ হাজার, ইউপিডিএফকে ৫০ হাজার। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর ব্যবসায়ীদের পৃথক হারে গুনতে হয় চাঁদা।

তালিকা থেকে আরো জানা যায়, বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার জালের ওপর আলাদা আলাদা হারে বাৎসরিক (নয় মাসে বছর) চাঁদা আদায় করা হয়। কেসকি জাল থেকে জেএসএস আদায় করে ছয় হাজার টাকা, ইউপিডিএফ সাত হাজার। এভাবে ধর্ম জাল, টেংরা জাল, কুত্তা জাল, ভাসা জাল, টেইনা জাল, লুই জাল, নাইট জাল, বড়শির ওপর আলাদা হারে চাঁদা আদায় করে তারা। এ ছাড়া সব ধরনের জেলেদের বছরে চাঁদা দিতে হয় জেএসএসকে ৭০০, ইউপিডিএফকে ৫০০।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতি বাসিন্দাদেরও দিতে হয় বাৎসরিক চাঁদা। প্রতি উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য জেএসএস- ইউপিডিএফের ধার্যকৃত চাঁদা ৮০০ টাকা। মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস আদায় করে ৫০০ এবং ইউপিডিএফ ৬০০। নি¤œবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস ৩০০, ইউপিডিএফ ৪০০ টাকা চাঁদা আদায় করে।

এ চাঁদার আওতায় বাদ পড়েনি কলার কাঁদিও। প্রতি কাঁদি কলার জন্য বর্তমানে জেএসএসকে ছয় টাকা ও ইউপিডিএফকে দিতে হয় ১০ টাকা। এ ছাড়া গরু ও ছাগল বিক্রির ওপর যথাক্রমে জেএসএস ১২ ও ৬ শতাংশ এবং ইউপিডিএফ ২০০ ও ১০০ হারে চাঁদা আদায় করে। দু’টি মুরগি বিক্রি করলে দুই টাকা, চার টাকা চাঁদা দিতে হয়।

বিলাইছড়ির আওয়ামী লীগ নেতা প্রহরকান্তি চাকমা বলেন, চাঁদাবাজি আগের তুলনায় বেড়েছে। তবে ওই এলাকায় ইউপিডিএফ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। বান্দরবানের কিউচিং মারমা বলেন, দুর্বৃত্তদের চাঁদাবাজিতে পুরো পাহাড়ি অঞ্চল এখন অস্থির। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই এলাকার বনবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, চাঁদা না দিয়ে এখানে কারো বাস করা সম্ভব নয়। সাজেকের খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতা ময়তে লুসাই বলেন, অনেকবার তার কাছে চাঁদা চেয়েছে। কিন্তু তিনি দেননি। তিনি বলেন, একবার দিলেই ওরা সুযোগ পেয়ে যাবে। তখন বারবার চাইবে।

বাৎসরিক এ চাঁদা আদায় ছাড়াও বিভিন্ন দিবসকে সামনে রেখে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ইউপিডিএফ-জেএসএসসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চাঁদাবাজির শীর্ষে রয়েছে শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এর পরের অবস্থানে রয়েছে চুক্তির সমর্থক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। এদের অঙ্গ সংগঠন যেমন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইম্যান ফেডারেশন বিভিন্নভাবে পাহাড়ে চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি চুক্তি করে পাহাড়ে অনেক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু কিছু সশস্ত্র গ্রুপ চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ করে পাহাড়কে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে। তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

– সূত্র: নয়াদিগন্ত

উপজাতি চাঁদাবাজদের স্বর্গরাজ্য পাহাড়ি জনপদ

চাঁদাবাজি

মমিনুল ইসলাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম থেকে ফিরে:

চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এক দশমাংশের পার্বত্য জনপদ। সরকারি কর বা ভ্যাটের ন্যায় এখানে প্রকাশ্যে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি, এমনটিই জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র। বাঙালি-পাহাড়ি যেই হোক না কেন, কিছু করতে হলেই গুণতে হয় চাঁদা। উপজাতিদের সশস্ত্র গ্রুপগুলো চাঁদাবাজির মাধ্যমে দিনে আদায় করে এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

সামান্য কলার ছড়া থেকে শুরু করে, ব্যবসা-বাণিজ্য, জেলে, খামার, ঠিকাদারি, উন্নয়নমূলক কাজ সব কিছু থেকে আদায় করা হয় চাঁদা। আর তা না দিলে নির্যাতন, নিপীড়ন থেকে শুরু করে অপহরণ, খুন, ধর্ষণ হওয়ার শঙ্কা ভুক্তভোগীদের। প্রাণ ভয়ে মুখও খুলতে চান না তারা। স্বয়ং পুলিশ প্রশাসনও তাদের কাছে জিম্মি বলে অভিযোগ।

একটি গোয়েন্দা সূত্র বলছে, পুরো পার্বত্য অঞ্চলে (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) চাঁদা আদায়ে নিয়োজিত রয়েছে জেএসএস’র-ইউপিডিএফ’র পাঁচ হাজার সশস্ত্র প্রশিক্ষিত কর্মী। সরকারের করের ন্যায় বিভিন্ন জিনিসের ওপর মাসিক/বাৎসরিক নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায় করা হয় এবং রসিদও দেয়া হয়। ক্যাডার পর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব সশস্ত্র সদস্যের বেতন-ভাতাও দেয়া হয় বলে জানিয়েছে সূত্র।

চাঁদাবাজী

সম্প্রতি পাহাড়ে বিভিন্ন পণ্যের ওপর ‘শান্তি চুক্তি’ সমর্থক জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র আরোপ করা চাঁদার তালিকা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতে সাবেক ও বর্তমান রেটও উল্লেখ করা হয়েছে।

এ তালিকা মতে, গাছে প্রতি ঘনফুট ও বাঁশে প্রতি শ’ হিসেবে চাঁদা আদায় করা হয়। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট সেগুন গোল গাছে জেএসএসকে চাঁদা দিতে হয় বছরে ৪০টাকা, ইউপিডিএফকে দিতে হয় ৫০টাকা। এভাবে সেগুন রদ্দা, গামারী গোল-রদ্দা, লালি গোল-রদ্দার ওপর আলাদা আলাদা হারে চাঁদা ধার্য করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রতি শ’ বাঁশে বছরে জেএসএস-ইউপিডিএফ উভয়েই চাঁদা আদায় করে ৪০০ টাকা করে। এভাবে বাইজ্জা বাঁশের জন্য রয়েছে আলাদা রেট। প্রথম শ্রেণীর মাছ ব্যবসায়ীদের জেএসএসকে বছরে চাঁদা দিতে হয় ৪০ হাজার, ইউপিডিএফকে ৫০ হাজার। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির ব্যবসায়ীদের পৃথক হারে গুণতে হয় চাঁদা।

তালিকা থেকে আরও জানা যায়, বিভিন্ন ধরনের মাছ ধরার জালের ওপর আলাদা আলাদা হারে বাৎসরিক (নয় মাসে বছর) চাঁদা আদায় করা হয়। কেসকি জাল (১ হাজার বামের ওপর) থেকে জেএসএস আদায় করে ছয় হাজার টাকা, ইউপিডিএফ সাত হাজার। এভাবে ধর্ম জাল, টেংরা জাল, কুত্তা জলা, ভাসা জাল, টেইনা জাল, লুই জাল, নাইট জাল, বড়শির ওপর আলাদা হারে চাঁদা আদায় করে তারা। এছাড়া সব ধরনের জেলেদের বছরে চাঁদা দিতে হয় জেএসএসকে সাতশ, ইউপিডিএফকে পাঁচশ।

চাঁদাবাজী

পার্বত্য চট্রগ্রামে বসবাসরত উপজাতি বাসিন্দাদেরও দিতে হয় বাৎসরিক চাঁদা। প্রতি উচ্চবিত্ত পরিবারের জন্য জেএসএস- ইউপিডিএফ’র ধার্যকৃত চাঁদা আটশ টাকা। মধ্যবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস আদায় করে পাঁচশ এবং ইউপিডিএফ ছয়শ’। নি¤œবিত্ত পরিবার প্রতি জেএসএস তিনশ, ইউপিডিএফ চারশ টাকা চাঁদা আদায় করে।

এ চাঁদার আওতায় বাদ পড়েনি কলার ছড়াও। প্রতি ছড়ার জন্য বর্তমানে জেএসএস’কে ছয় টাকা ও ইউপিডিএফ’কে দিতে হয় ১০ টাকা। এছাড়া গরু ও ছাগল বিক্রির ওপর যথাক্রমে জেএসএস ১২ ও ৬ শতাংশ এবং ইউপিডিএফ দুইশ ও একশ হারে চাঁদা আদায় করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো চাঁদার এ অর্থ দিয়ে দেশ-বিদেশে বাঙালি বিদ্বেষী প্রচারণা ও তাদের অস্ত্র ভা-ারকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে থাকে।

বাৎসরিক এ চাঁদা আদায় ছাড়াও বিভিন্ন দিবসকে সামনে রেখে বেপরোয়া চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে ইউপিডিএফ-জেএসএস সহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে। প্রতি বছর ‘বৈসাবী’ উদযাপন কমিটির নামে ব্যক্তি বিশেষে দুই হাজার টাকা থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্তও চাঁদা আদায় হয়।

ইনকিলাব-এ প্রকাশিত খবরের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে চাঁদাবাজির শীর্ষে রয়েছে শান্তিচুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এরপরের অবস্থানে রয়েছে চুক্তির সমর্থক পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ক্যাডাররা। এদের অঙ্গ সংগঠন যেমন- পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইম্যান ফেডারেশন বিভিন্ন অপকৌশলে পাহাড়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।

চাঁদাবাজি

পাহাড়ের নিরীহ বাঙালিরাই মূলত সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির প্রধান টার্গেট। এর পরের অবস্থানে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলায় বসবাসরত ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এর মধ্যে প্রায় সকলকে চাঁদা দিতে বাধ্য হতে হলেও চাকমাদের কাছ থেকে চাঁদা দাবির তেমন ঘটনা শোনা যায় না।

স্থানীয়রা জানান, বাঁশ, বেত, কাঠ, ছন সংগ্রহ, বেচাকেনা ও পরিবহন, কৃষি-খামার, ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসা-বাণিজ্য, সড়ক ও নৌপথে মালামাল পরিবহন থেকে শুরু করে ঠিকাদারি, অবকাঠামো নির্মাণ কাজ সবকিছুর ওপর থেকেই জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি কলা, আদা, হলুদ, আনারস, লেবু, কমলা, খাদ্যশস্য চাষাবাদ, গবাদিপশু-পাখি বেচাকেনা করতে গিয়েও চাঁদা পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন পার্বত্য এলাকার বাসিন্দারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা জানান, এখানে অস্ত্রধারী জেএসএসের এতটাই প্রভাব ক্ষমতাসীন দলের লোক হয়েও তাদের পক্ষে চাঁদাছাড়া বসবাস করা অসম্ভব। নিরুপায় হয়ে দোকান-পাটও গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। তাদের কাছে পুলিশও জিম্মি বলে অভিযোগ তার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পার্বত্য চট্রগ্রামের উত্তর বন বিভাগের বাঘাইহাট রেঞ্জের এক বন কর্মকর্তা জানান, রাঙামাটিতে সাধারণ সরকার ছাড়াও অন্য একটি ‘সরকার’ কাজ করে। যেটাকে তারা কখনই উপেক্ষা করতে পারেন না। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও অবহিত বলে জানান তিনি।

২২ জুন পার্বত্য চট্রগ্রামের সংরক্ষিত মহিলা এমপি ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি চুক্তি করে পাহাড়ে অনেক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু কিছু সশস্ত্র গ্রুপ চাঁদাবাজি, খুন, অপহরণ করে পাহাড়কে অস্থিতীশীল করার পাঁয়তারা করছে। তিনি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বলে জানান।

জেএসএস’র মুখপাত্র ও সহপ্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, ‘জেএসএস’র বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা চাঁদাবাজিতে বিশ্বাসী নই। মানুষের সহযোগিতায় দল পরিচালিত হয়।’

অন্যদিকে, ইউপিডিএফ’র মুখপাত্র, প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। বলেন, ‘এ অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। তিনিও জানান, মানুষের সহযোগিতায় তাদের দল পরিচালিত হয়।

ফটিকছড়ি-লক্ষ্মীছড়ি সীমান্তের মানুষ ইউপিডিএফ’র অত্যাচার নির্যাতনে অতিষ্ঠ

Ramgarh 18.1.16 copy

ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

ইউপিডিএফ কমান্ডার অমর ও মিলন বাহিনীর চাঁদাবাজি আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ ফটিকছড়ি-লক্ষ্মীছড়ি সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ। চাঁদা না দেয়ায় তাদের হাতে খুন হয়েছে অন্তত অর্ধডজন ব্যবসায়ী ও নিরীহ মানুষ।

ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লক্ষ লক্ষ মানুষ অমর-মিলন চাকমা বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তারা পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ’র লক্ষীছড়ি-ফটিকছড়ি সীমান্তের আঞ্চলিক কমান্ডার। উপজাতীয় এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দূষ্কর্মের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে স্থানীয় বাঙ্গালী সোর্স।

আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বড় ধরণের কোন অভিযান পরিচালিত না হওয়ায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের অপকর্মের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাদের নির্যাতনের সর্বশেষ শিকার ফটিকছড়ির ব্র্যাক কর্ণফুলী চা বাগান ও বাগানের দুই ম্যানেজার। এর আগে তারা উক্ত এলাকায় অপহরনের পর হত্যা করেছে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে।

অনুসন্ধনে জানা যায়, লক্ষীছড়ির দুইদ্যেখোলা, বাইন্যেছোলা এলাকায় ইউপিডিএফ’র নেতৃত্ব দেয় কমান্ডার সমীর চাকমা ওরফে অমর চাকমা। বার্মাছড়ি এলাকায় ও রাঙ্গামাটির কাউখালীর এলাকায় নেতৃত্ব দেয় মিলন চাকমা।

এ দুই কমান্ডারের রয়েছে প্রায় ৫শ সদস্যের সশস্ত্র প্রশিক্ষিত বাহিনী। তৎমধ্যে শতাধিক নারী সদস্যও রয়েছে। তারা সেখানে ”পরিষদ” নামে পরিচিত।

পার্বত্য এলাকার পাশাপাশি ফটিকছড়ির সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন লেলাং, কর্ণফুলী চা বাগান, কাঞ্চনপুর, মানিকপুর, রক্তছড়ি, ট্যাকবাড়িয়া, সরকারী ঢেভা, নানুপুরের খিরাম, গামারীতলা, মধ্যছড়ি, দাঁতমারার বালুখালী,সোনারখীল,চাপাতলী,মনাইয়ার দোকান, গোইয়া পাড়া,চিত্তরামের দোকান, কালাপানি, নতুন বাজার,বড়ইতলী,বাগানবাজার, পাইন্দং, ভূজপুর, সাপমারা, নারায়ণহাট এলাকা, রাউজানের নন্দীরখীল, হলদিয়া, এয়াছিন নগর, ডাবুয়া গুলো তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এই এলাকা এক সময় পার্বত্য বিদ্রোহী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শান্তিবাহিনীর নির্যাতন চলতো। ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তির পর জম্ম নেয় পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী জোট ইউপিডিএফ। শান্তিচুক্তির পক্ষের জোট জেএসএস’র এক সময় এখানে অবস্থান থাকলেও, পরে তারা এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়। সীমান্তবর্তী বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী তাদের সাথে সব সময় বন্ধুত্ব সুলভ আচরণ করলেও তারা সব সময় বাঙ্গালী বিরোধী আচরণ করেছে।

জানা গেছে, ১৯৯৮ সালে প্রবীন ব্যবসায়ী এজাহার মিয়া কোম্পানীকে অপহরণ করে ইউপিডিএফ। নানুপুরের আওয়ামীলীগ নেতা সৈয়দ ওসমান গনি বাবু (বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান) দেন দরবার করে ছাড়িয়ে আনেন প্রায় একমাস অতিক্রম হবার পর।

চাঁদা আদায়ের সুবিধার্তে বার্মাছড়ি বাজার মধ্যছড়ি থেকে স্থানান্তর করে। ঐ সময়ে ফটিকছড়ি-গহিরার প্রায় ১৫ ব্যবসায়ীকে এক যোগে অপহরণ করে। মুক্তিপন দিয়ে ৩দিন পর তাদের ছাড়া হয়। ২০০৫ সালের পর থেকে পার্বত্য এলাকায় বাঙ্গালীদের ক্রয় করা গাছ বাগান, বাঁশ বাগান, কলা বাগান, হলুদ বাগান, আধা-রসুন বাগান ছেড়ে দিতে বাধ্য করছে।
২০১৪ সালের সেনাবাহিনীর সোর্স হয়ে কাজ করার অপরাধে খিরাম এলাকায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী ইউসুফকে। ২০১৩-১৪ সালে অন্ত:কোন্দলের দায়ে কাঞ্চন নগরের সরকারী ঢেভায় ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে দুই চাকমা জেএসএস কর্মীকে। ২০১৩ সালে দাঁতমারা এলাকায় হত্যা করা হয় অপর জেএসএস কর্মীকে।

২০১৩ সালে খিরামের বিএনপি নেতা আহমদ ছাপাকে অপহরণ করে মিলন চাকমা বাহিনী। একমাস আটক রাখার পর ৪ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ নিয়ে তাকে ছাড়া হয়। ২০১৫ সালে সর্তা বনবিটের কর্মচারী এজাহার মিয়া, হোসেন বলি ও আইয়ুব বলীকে গামরীতলা থেকে অপহরণ করা হয়। এক সপ্তাহ পরে তাদের ১৬ লক্ষ টাকা মুক্তিপনের বিনিময়ে ছাড়া হয়। ২০১৫ সালে পাইন্দং এলাকার এক প্রবাসীর শিশু সন্তানকে অপহরণ করে ৮ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়।

২০১৪-১৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে ধুরুং বনবিট, সর্তা বনবিট, নারায়ণহাট বনবিট, দাঁতমারা বনবিট, কর্ণফূলী চা বাগান, কাঞ্চন নগর রাবার বাগান, রাঙ্গামাটিয়া রাবার বাগানের লক্ষ লক্ষ টাকার মুল্যবান গাছ কেটে উজাড় করেছে। ২০১৫ সালে দাঁতমারার বালুখালী এলাকায় আজিজ সওদাগরের প্রায় কয়েক লক্ষ আগর গাছ কেটে ফেলে চাঁদা না দেয়ায়।

২০১৪-১৫ সালে ফটিকছড়ির রাঙ্গামাটিয়া, গোপালঘাটা, কাঞ্চনপুর, মানিকপুর, পাইন্দং, দাতমারা এলাকায় গণহারে শতাদিক বাঙ্গালীর ঘর ডাকাতি করে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা।

ইউপিডিএফ সন্ত্রসীদের আক্রমণের সর্বশেষ শিকার ফটিকছড়ির ব্র্যাক কর্ণফুলী চা বাগানের দুই ম্যানেজার শাহ নেওয়াজ ও ইলিয়াছ। ব্র্যাক কর্ণফুলী চা বাগান কর্তৃপক্ষ জানান, জাফরাবাদ, দুইধ্যাখোলা, ট্যাকবাড়িয়া, সরকারী ঢেবা, রক্তছড়ি, মানিকপুর এলাকার শত শত একর চা বাগানের ইজারাকৃত জমিতে কাজ করতে দিচ্ছেনা ইউপিডিএফ।

তারা জমিগুলো তাদের দাবী করে। কিন্তু কোন সমঝোতায় বসেনা। উল্টো চাঁদা দাবী করে। এ জন্য জাফরাবাদ এলাকায় প্রায় ৫ হাজার চা গাছ মরে যাচ্ছে।

ভূক্তভোগীরা জানায়, সীমান্তবর্তী এই সব এলাকার কৃষি জমিতে চাষ করতে, ফসল তুলতে, পাহাড়ী টিলাতে গাছ রোপ, কর্তন করতে ইউপিডিএফ’কে মোট অংকের চাঁদা দিতে হয়। নয়তো তারা শ্রমিকদের মারধর করে ধরে নিয়ে যায়। মুক্তিপন আদায় করে।

বাঁশ ব্যবসায়ী শামসুল আলম (৪২) বলেন, পাহাড়ী এলাকায় ব্যবসা করতে হলে প্রথমে ইউপিডিএফ’কে ১০-৫০ হাজার টাকা দিয়ে পাস নিতে হবে। আবার ঘাটে ঘাটে ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুল, হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ বিহার, ইউপিডিএফ ও জেএসএস’র নামে চাঁদাও দিতে হয়। এভাবে ২ হাজার টাকার বাঁশের চালি ফটিকছড়ি পৌঁছাতে লাগে ৩ হাজার টাকা চাঁদা। গাছ ব্যবসায়ী সেলিম উল্লাহ (৪৫) বলেন, পাহাড়ী এলাকায় গাছ বাগান কাটতে হলে বাগান অনুপাতে দিতে হয় চাঁদা। আবার গাছ ও লাকড়ি গাড়ি প্রতি চাঁদা। এক সিজনের জন্য পাশ পারমিট নিতেও হয়। ব্যতিক্রম হলে অপহরণ করে নির্যাতন করে। মুক্তিপন নেয়।

জীপ গাড়ির মালিক রাশেদুল আলম (৩৩) বলেন, জীপ, ট্রাক, ট্রলি গাড়ি পার্বত্য এলাকায় ঢুকলেই পাস নিতে হয়। না হয় ড্রাইভার কে আটক করে বেদম পিটুনি দেয়। গাড়ি নষ্ট করে দেয়।

কাঞ্চনপুরের কৃষক শিমুল মহাজন শম্ভু (৪৭) বলেন, আমাদের বাপ দাদার জোত সম্পত্তি গুলো বিগত ২-৩ বছর যাবৎ পরিষদ নামধারী উপজাতিরা দখল করছে। আমাদের তারা কৃষিকাজ করতে দিচ্ছেনা। চাষাবাদ করলে চাঁদা দাবী করে।

এদিকে এক শ্রেনীর বাঙ্গালীরা টাকার বিনিময়ে ইউপিডিএফ’র সোর্স হিসেবে কাজ করে। তাদের কারণে বাঙ্গালীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোন উদ্যোগ নিতে পারেনা। এই সোর্স গুলো চিহ্নিত করে বিচারের ব্যবস্থা করা দরকার।
ফটিকছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) বিদ্যুত কুমার বলেন, বাগানের দুই ম্যানেজারের উপর হামলার ঘটনায় এখনো কোন অভিযোগ পাইনি। এছাড়া চাঁদাবাজি বা খুনের ঘটনায় যারা ভূক্তভোগী তারা থানায় অভিযোগ করেন না।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ না পেলে কাজ করা সম্ভব হয় না বলে তিনি জানান।

সেনাবাহিনীর বাইন্যাছোলা ক্যাম্পের কর্পোরাল সরোয়ার বলেন, চা বাগানের ম্যানেজারের উপর সন্ত্রাসী হামলা, উপজাতিদের ঘর পোড়ানো এলাকা গুলোতে সেনাবাহিনীর টহল টিম জোরদার করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

এ ব্যাপারে ইউপিডিএফ’র প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা পার্বত্যনিউজকে বলেন, ইউপিডিএফ’র বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। একটি মহল ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ইউপিডিএফ’র বিরুদ্ধে এ ধরণের অভিযোগ করে থাকে সব সময়। ইউপিডিএফ’এ কোনো কমান্ডার নেই। সমীর চাকমা, অমর চাকমা ও মিলন চাকমা নামে ইউপিডিএফ’র কোনো কমান্ডার নেই।

সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও চাঁদাবাজি বরদাস্ত করা হবেনা- লে. কর্ণেল জিল্লুর রহমান

14.01

সিনিয়র রিপোর্টার:

মাটিরাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপুর্ণ হয়েছে উল্লেখ করে মাটিরাঙ্গা জোন অধিনায়ক লে. কর্ণেল মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান পিএসসি-জি বলেছেন, পাহাড়ের শান্তিু-শৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীসহ অন্যন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে। তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, পাহাড়ে কোন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মককান্ড ও চাঁদাবাজি বরদাস্ত করা হবেনা।

বৃহস্পতিবার সকালে মাটিরাঙ্গা জোন সদরে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারী, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলন ও মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মতবিনিমিয় সভায় মাটিরাঙ্গা পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. শামছুল হক, মেয়র মাটিরাঙ্গা পৌরসভার মেয়র আবু ইউসুফ চৌধুরী, মাটিরাঙ্গা উপজেলা চেয়ারম্যান মো. তাজুল ইসলাম তাজু, মাটিরাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) ইমরুল কায়েস, মাটিরাঙ্গা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শাহাদাত হোসেন টিটো, গুইমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেমং মারমা, মাটিরাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়াম্যান হিরনজয় ত্রিপুরা, মাটিরাঙ্গা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর কাউন্সিলর মো. আলাউদ্দিন লিটন প্রমূখ বক্তব্য রাখেন।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে ১৭ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারী‘র উপ-অধিনায়ক মেজর গোলাম মোর্শেদ, জোনাল স্টাফ অফিসার মেজর সাইফ, মেজর মো. তওসীফ ইসলাম সাচি, মাটিরাঙ্গা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবুল হোসেন ও মাটিরাঙ্গা পৌরসভার নবনির্বাচিত কাউন্সিলরসহ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারী, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক প্রতিনিধি ও গণ্যামন্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

অমিত সম্ভাবনার পার্বত্য চট্টগ্রাম : শান্তি, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

bri. gen. tofayel ahmed

ব্রি. জে. মো. তোফায়েল আহমেদ, পিএসসি

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সুপ্রাচীন কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক অবস্থানজনিত কারণে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখানকার জীবনযাত্রা সমতল এলাকার তুলনায় কঠিন ছিল বিধায় অতীতে খুব বেশিসংখ্যক লোকজন এই এলাকায় বাস করতে উৎসাহী হয়নি। বর্তমানে যেসব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আছেন তারা ইদানীং নিজেদের আদিবাসী বলে দাবী করেন এবং এদেশের কিছু মিডিয়া এবং বুদ্ধিজীবিগণ বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন না করে, জেনে অথবা না জেনে বিভিন্ন সময়ে এ শব্দের প্রতিধ্বনি করে যাচ্ছে। আদিবাসী হচ্ছে অষ্ট্রেলিয়ার এ্যাবোরেজিনিয়াস, নেটিভ আমেরিকান রেড ইন্ডিয়ান, ফ্রান্স ও স্পেন এর বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়া, জাপানের আইনু, আরব বেদুইন সম্প্রদায় ইত্যাদি যারা সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডে আদিকাল থেকে বসবাস করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের একদশমাংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় (১৩,২৯৫ বর্গ কিঃমিঃ/৫,১৩৩ বর্গ মাইল) যে মাত্র এক শতাংশ জনসংখ্যা (২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী ১৫,৯৮,২৯১ জন) বাস করছে তার ৪৭% বাঙালী, ২৬% চাকমা, ১২% মারমা এবং ১৫% অন্যান্য পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা সিনলুন, চিন, আরাকান, ত্রিপুরা, বার্মা এবং অন্যান্য এলাকা থেকে আনুমানিক মাত্র তিনশ থেকে পাঁচশ বছর পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে আবাস স্থাপন করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রথম আসে কুকীরা। পরবর্তীতে ত্রিপুরাগণ এবং ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে আসে আরাকানী গোত্রভুক্ত চাকমা ও মার্মা সম্প্রদায়। অথচ এদেশে বাঙালী বা তাদের পূর্বপুরুষগণ বসবাস করতে শুরু করেছে প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে। কাজেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিবাসী হবার দাবীর প্রশ্নটি এখানে অবান্তর এবং আবাসপত্তনের সময় হিসেব করলে বাঙালীরাই বাংলাদেশের আদিবাসী । আর পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অবাঙালীরা এদেশের সংবিধানের স্বীকৃতি অনুযায়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী।

দেশ বিভাগ ও মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিকা
কালের পরিক্রমায় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা দুইবার বড় ধরনের ভুল করে। প্রথমবার ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় তারা ভারতের অংশ হবার চেষ্টা করে এবং চাকমা নেতা কামিনী মোহন দেওয়ান ও স্নেহকুমার চাকমা রাঙ্গামাটিতে ভারতীয় এবং বোমাং রাজা বান্দরবনে বার্মার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। দ্বিতীয়বার ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বোমাং রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরী পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করে রাজাকার এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এর মধ্যে রাজা ত্রিদিব রায় যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে পাকিস্তানে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে কখনোই আর তিনি বাংলাদেশে ফেরৎ আসেননি। কিন্তু এর ব্যতিক্রম ছিলেন মং সার্কেলের রাজা মং প্রু সাইন। তিনিই একমাত্র রাজা যিনি মুক্তিযুদ্ধে আখাউড়া ও ভৈরব এলাকায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সেনাবাহিনীর কর্ণেল পদমর্যাদা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। রাজা মং প্রু সাইন নিজস্ব ৩৩টি অস্ত্র, ৪টি গাড়ী এবং অনেক অর্থ মুক্তিযুদ্ধের জন্য ব্যয় করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা মং রাজার ৮টি হাতি, ৭টি ঘোড়া, ১৭০টি মহিষ, ১৬৬৩টি গরু, গুদাম ঘরে রক্ষিত ৯০,০০০ আড়ি ধান, ২৭০০টি চেয়ারসহ অনেক মূল্যবান ফার্নিচার, দশহাজার অতিথিকে আপ্যায়ন করার মত সরঞ্জামাদি, ১৮টি পাওয়ারটিলার, ১০টি জেনারেটর, রাজ পরিবারের শত বছরের স্মৃতি বিজড়িত অজস্ত্র স্বর্ণালংকার ও কয়েক কোটি টাকার ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করে। উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে এতবড় ত্যাগ এবং অবদান রাখার পরও তাঁকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এখনও পর্যন্ত করা হয়নি। আশা করা যায়, মুক্তিযুদ্ধে তার এবং এই রাজপরিবারের অবদান যথাসময়ে মূল্যায়ন করা হবে।

কাপ্তাই ড্যাম ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল
১৯৬২ সালের কাপ্তাই ড্যাম অধ্যায় যে ন্যাক্কারজনকভাবে সমাধান করা হয়েছে তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে সত্যিই বিরল। হাজার হাজার মানুষ (তার মধ্যে অনেক বাঙালীও ছিল) যারা তাদের বসতবাড়ি হারালো অথচ তাদের যথাযথভাবে ক্ষতিপুরণ প্রদান এবং পূর্নবাসন করলো না তদানিন্তন পাকিস্তানি সরকার। ১৯৭০ সালে থেগামুখ, শুভলং এবং রাইনখিয়াং থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য অনেক পরিবারকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক একইভাবে যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হয়েছিল। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সেই পাকিস্তান সরকারের পক্ষেই অস্ত্র ধরলো ঐ পাহাড়ী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির বেশীর ভাগ  এবং হত্যা করলো ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের এই ভূমিকার কথা এদেশের আপামর জনসাধারণের ক’জনই বা জানে? এখন দেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য রাজাকারদের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই অপরাধে তারা অপরাধী কিনা সময়ই তা বলে দিবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী কার্যক্রম
মুক্তিযুদ্ধের ধকল কাটতে না কাটতেই এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৯৭৬ সালের ১৮ জুলাই বিলাইছড়ি থানার তক্তানালার কাছে মালু মিয়া পাহাড়ের নিকটে সকাল ১১টায় রাঙ্গামাটি থেকে আগত পুলিশ পেট্রোলের উপর আক্রমণ পরিচালনার মধ্য দিয়ে আরেকটি অসম যুদ্ধের সূচনা হয়। এর পরবর্তী ইতিহাস রক্তের হোলি খেলার ইতিহাস। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছিল অসংখ্য নিরীহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বাঙালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের। বর্তমানে একই ধরনের কার্যক্রম ইউপিডিএফ, জেএসএস এবং সংস্কারবাদী দলের সন্ত্রাসীরা সবাই মিলে করছে। তথ্য মতে, ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০৯৬ জনকে হত্যা, ১৮৮৭ জনকে আহত এবং ২১৮৮ জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর প্রায় এক তৃতীয়াংশ পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। নিরাপত্তা বাহিনীকেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষার জন্য বেশ চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। শুরু থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৫৩ জন প্রাণ দিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৪৫২ জন এবং ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২৫৫ জন।

শান্তিচুক্তি ও পরবর্তী অধ্যায়
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চুক্তির মাধ্যমে হত্যা, লুণ্ঠন, জ্বালাও, পোড়াও, নারী নির্যাতনসহ অসংখ্য সন্ত্রাসী কার্য়ক্রমের অবসান হবে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত জনসাধারণ ধারণা করেছিল। কিন্তু বর্তমানে কি দেখা যাচ্ছে? শুধু বাঙ্গালী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও অত্যাচারিত, নিপীড়িত এবং ভয়ংকর জিঘাংসার শিকার। জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী নামে গড়ে উঠা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মানুষদের কাছ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে জোর জবরদস্তি করে চাঁদা আদায় করে, আদায়কৃত চাঁদার টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে এবং সেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আরো বেশি চাঁদা আদায় করে। এ যেন এক সীমাহীন চলমান গোলক ধাঁধার বৃত্ত। এখানকার বিত্তহীন নিরীহ মানুষদের হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ফসল ধ্বংস, বাগান ধ্বংস, জ্বালাও-পোড়াও, ভয়ভীতি এবং নির্যাতন এখনও চলছে। ইদানীং পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় সংগঠিত সকল বিষয়ে তারা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, আদেশ নির্দেশ ও মিমাংসা না মানার জন্য ভয় ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে যা সংবিধান বিরোধী এবং দেশদ্রোহীতার নামান্তর। তারা পার্বত্য জনপদে সরকার ও প্রশাসনের একটি বিকল্প সরকার ও ছায়া প্রশাসন জোর করে এখানকার মানুষদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর প্রশাসন কখনো কখনো নিরুপায় হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নির্যাতন ও অত্যাচারের ভয়ে এই সব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এত অমিত সম্ভবনাময় এই অঞ্চল অথচ এখানে সকলে আসতে ভয় পায় কেন? কেন সকল উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের চাঁদা দিতে হয়? কেন কলা, কচু, মুরগি, ছাগল, শুকর, গরু বিক্রি থেকে শুরু করে ধানিজমি, বাগান সব কিছুর জন্য চাঁদা দিতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর কে দেবে ?

শান্তিচুক্তি বাস্ততবায়নের অগ্রগতি
একটি অর্ধেক পানি ভর্তি গ্লাসকে অর্ধেক পুর্ণ বা অর্ধেক খালি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। শান্তি চুক্তির সর্বমোট ৭২টি ধারার মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৫টি ধারার বেশীর ভাগ অংশ এবং অবশিষ্ট ৯টি ধারার বাস্তবায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি করেছিলেন এবং অবশ্যই তিনি তা বাস্তবায়ন করতে বদ্ধপরিকর। চুক্তি অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক ক্যাম্প ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে অথচ সন্ত্রাসীরা তাদের সকল অস্ত্র এখনও পর্যন্ত সমর্পন করেনি। কিন্তু পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত সাধারণ জনগন দাবী করেছে যে নিরাপত্তা বাহিনী এখান থেকে চলে গেলে তারা আরও বেশী নিরপত্তা ঝুকিতে আবর্তিত হবে। শান্তিচুক্তির সবচেয়ে জটিল যে বিষয়টি তা হচ্ছে ভুমি ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়ে ভুমি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং সেই কমিশন কাজ করছে। ভুমি কমিশনের প্রধান ছাড়া বাকী সকল সদস্যই পার্বত্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। বিষয়টির ব্যপকতা এবং জটিলতার কারণেই একটু বেশী সময় লাগছে সমাধান করতে। তবে প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙ্গালী উভয় পক্ষ খাগড়াছড়িতে ৩১০৫টি, রাঙ্গামাটিতে ৯৬৯টি এবং বান্দরবনে ৩৮৪টিসহ সর্বমোট ৪৪০৮টি ভুমি সংক্রান্ত মামলা করেছে। অগ্রগতি হিসেবে ইতোমধ্যে কমবেশী ৪০০০টি মামলার ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে, ৩৩টি মামলার শুনানী শেষ হয়েছে এবং বাকী মামলাগুলোর ব্যাপারে কার্যক্রম চলছে। দেখা গেছে, এখানকার সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো ভুমি সমস্যা সমাধান কার্যক্রমে সর্বদা বাধা প্রদান করে থাকে, কারণ ভূমি সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তাদের হাতে কোন ইস্যু থাকবেনা যা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের ট্রাম কার্ড। একইভাবে যে সকল বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ অবৈধভাবে প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশী জমি দখল করে আছেন তারাও চান না ভূমি সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক। এছাড়া আর একটি জটিলতা হলো, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যক্তিবর্গের ভূমির মালিকানার যথাযথ কাগজপত্র না থাকা। কারণ অতীতে তারা কোন প্রকার কাগজপত্র ব্যতিরেকেই জমি ভোগদখল করতো। এছাড়া শান্তিচুক্তির কিছু ধারা আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সেগুলোর সমাধানের বিষয়ে কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এখানে ভুলে গেলে চলবে না যে পৃথিবীর অনেক দেশে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হবার পরও তা নানান কারণে কার্যকর করা যায়নি বা সম্ভব হয়নি। উদাহরণ স্বরূপ সুদান (১৯৭২), সোমালিয়া (১৯৯০), এঙ্গোলা (১৯৯১ ও ১৯৯৪), রুয়ান্ডা (১৯৯৩), নর্দান আয়ারল্যান্ড ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কাজেই শান্তি চুক্তির অনিষ্পন্ন বিষয়াবলির সামধানের জন্য ধৈর্য্যচ্যুতি কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে বলে মনে হয় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও মানবতার কল্যাণে নিরাপত্তাবাহিনীর ভূমিকা  অনেকেই অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম সম্বন্ধে তেমনটা ওয়াকিবহাল নন। সন্ত্রাস দমন ও দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখন্ডতা নিশ্চিত করার সাথে সাথে নিরাপত্তা বাহিনী এই অশান্ত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জনগনের জন্য আবাসন স্থাপনে সহযোগীতা, স্থানীয় জনগনকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান এবং প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরাসরি ভুমিকা রাখা; শিল্প ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কুটির শিল্প স্থাপন; নিরাপদ হাইজিন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা; কৃষি, পশুপালন, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগী পালন, বৃক্ষ রোপন; ধর্মীয় ও বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান পালন, চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলা এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে নিরাপত্তাবাহিনীর সাফল্যের কথা কোন এক অজানা কারণে এদেশের মানুষ জানতে পারে না বা জানানো হয় না। আমাদের মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে তেমন কার্যকরী ভূমিকা নেয় না বলেই অভিযোগ রয়েছে। একটি বিষয় এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, পক্ষপাতহীন কার্যক্রমের জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসী ব্যক্তিবর্গ ছাড়া বাকী সকলের কাছে এখনও নিরাপত্তাবাহিনীই সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য।

সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের স্বপ্ন
পার্বত্য চট্টগ্রামের অঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাওয়া এবং স্বপ্নগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরী। অবস্থাদৃষ্টে তাদের চাহিদাগুলো নিম্নরূপ বলে প্রতীয়মান হয়:

শিক্ষার উন্নয়নে বাধা প্রদান

তাদের প্রথম স্বপ্ন সম্ভবতঃ এই এলাকার পশ্চাৎপদ মানুষদের মূর্খ করে রাখা। রাঙ্গামটিতে মেডিক্যাল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে বাধা প্রদান তার প্রমাণ। না হলে এখানকার নিরীহ জনগণ, যারা তাদের ভয়ে নিয়মিত চাঁদা দেয়, তাদের ছেলেমেয়রা স্কুল/কলেজে যেতে পারে না; অথচ তাদের দেয়া চাঁদার টাকায় সেই সব নেতানেত্রীদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া করে শহরের নামী দামী স্কুল/কলেজে এবং বিদেশে। সেসব নেতানেত্রীদের সন্তানেরা ইংরেজী মাধ্যমে লেখাপড়া করলেও তারা চান সাধারণ জনগণের সন্ত্রানেরা শুধুমাত্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব ভাষা শিখে এবং বাংলা ও ইংরেজী না শিখে জংগলের আরও গভীরে চলে যাক। এখানে মায়ের ভাষা ভুলে যাবার কথা বলা হচ্ছে না, প্রগতি ও অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছে। ভারতে সবাইকে কমপক্ষে ৩টি ভাষা শিখতে হয়। পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের ইচ্ছা, এখানকার জনগণ মূর্খ থাকলে তাদের পক্ষে শোষণ করা সহজ; যেমনটি তারা এতকাল ধরে করে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার এই এলাকার শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য অনেক কাজ করেছে। ১৯৭০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র ৬টি উচ্চ বিদ্যালয়/কলেজ ছিল যার বর্তমান সংখ্যা ৪৭৯টি। প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন প্রতি পাড়ায় পাড়ায়। এছাড়া ইতোমধ্যে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় (ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়েছে), একটি মেডিক্যাল কলেজ, ৫টি স্টেডিয়াম, ২৫টি হাসপাতাল এবং বর্তমানে ১৩৮২টি বিভিন্ন কটেজ ইন্ডাষ্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষার হার ১৯৭০ সালে মাত্র ২% শতাংশ ছিল যা বেড়ে এখন ৪৪.৬% হয়েছে। অবশ্য এই তথ্যে সন্তুষ্ট হবার কিছু নেই। এখানে বসবাসরত মানুষদের জন্য আরও অনেক কিছু করার দরকার ছিল এবং আরও অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। অনেক কিছুই করা সম্ভব হয়নি এখানকার তথাকথিত সেইসব কল্যাণকামী (?) নেতানেত্রী এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বাঁধার কারণে।

জনগণের থেকে জোর করে আদায় করা চাঁদার টাকায় আরাম আয়েশে দিনযাপন করা

এটি তাদের দ্বিতীয় স্বপ্ন এবং বর্তমানে নিষ্ঠুর বাস্তবতা। জানা গেছে, যে শুধুমাত্র মাটিরাঙ্গা থেকে বছরে ৩২ কোটি টাকার মত এবং সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বছরে কমবেশী ৪০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। কোথায় ব্যয় হয় সেই টাকা? কয়টা স্কুল, কয়টা কলেজ, কয়টা হাসপাতাল তৈরি করে দিয়েছে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংষ্কারবাদীরা? কত ফিট রাস্তা তারা এ পর্যন্ত নির্মাণ করে দিয়েছে? কি করেছে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত টাকা জবরদস্তী করে লুট করে নিয়ে? এখন সময় এসেছে এখানকার সন্ত্রাসী নেতাদের সম্পত্তির হিসাব নেয়ার কারণ জানা গেছে যে, নেতাদের অনেকেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, করেছেন বাড়ী/গাড়ী, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি। পাহাড়ে বসবারত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা সরকারকে কর প্রদান করে না। পক্ষান্তরে করের থেকে কয়েকগুণ বেশী চাঁদা দিতে বাধ্য হয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের। এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ সরকার সমতল ভূমির জনগণের কর থেকে অর্জিত অর্থ পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যয় করছে । পার্বত্য অঞ্চলে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিঃমিঃ রাস্তা ছিল। বাংলাদেশ সরকার নির্মাণ করেছে প্রায় ১,৫০০ কিঃমিঃ রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্টসহ সম্পন্ন করেছে অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম। কিন্তু রাস্তাঘাট ও ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণে এবং সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা সবসময়ে বাঁধা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজী এবং শ্রমিক অপহরণ ও বাঁধার সৃষ্টি না করলে উন্নয়ন কাজ আরও সহজে সম্পন্ন করা যেত। জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সকল নির্মাণ কাজে জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং সংস্কারবাদী সন্ত্রাসীদের যথাক্রমে ১০%, ৫% ও ৩% অথবা আরোও বেশী হারে চাঁদা দিতে হয়। এখানে কোন বিত্তশালী কিংবা দেশী বিদেশী কোম্পানী পুঁজি বিনিয়োগ করতে চান না কেন ? লক্ষীছড়ি থেকে বার্মাছড়ি পর্যন্ত রাস্তার কাজ বন্ধ করে ঠিকাদার কেন পালিয়ে গেলেন? এই অত্যাচার থেকে এখানে বসবাসরত নিরীহ মানুষদের কবে মুক্তি মিলবে ?

স্বায়ত্বশাসন তথা পৃথক জম্মুল্যান্ড গঠন  

পার্বত্য সন্ত্রাসীদের তৃতীয় দিবা কিংবা অলীক স্বপ্ন হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্বশাসিত প্রকারান্তরে স্বাধীন একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা যার নাম হবে ‘জম্মুল্যান্ড’। বর্তমান বিশ্বে দুই জার্মানী এক হলো, দুই কোরিয়া এক হতে চেষ্টা করেছে, ইন্ডিয়া সিকিমকে যুক্ত করে আরও বড় হয়েছে, সমগ্র ইউরোপ অভিন্ন মুদ্রা ব্যবহার করছে এবং পাসপোর্টবিহীনভাবে ইউরোপের সব দেশে চলাচল করছে, হংকং চীনের সাথে অঙ্গীভুত হয়েছে, স্কটল্যান্ডের জনগন পৃথক দেশ গঠনের বিরুদ্ধে গণভোট প্রয়োগ করেছে; অর্থাৎ সবাই যখন যুক্তভাবে শক্তিশালী হতে চেষ্টা করেছে তখন পার্বত্য সন্ত্রাসীরা চেষ্টা করছে এদেশ ভেঙ্গে ছোট করতে; প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমিকে টুকরো টুকরো করতে। তাদের স্বায়ত্বশাসন বা স্বাধীন ভূ-খন্ডের এই অলীক ও অবাস্তব স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না, হতে পারে না। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে প্রায় সব দেশ স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। কিন্তু লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ভূখণ্ডে নতুন করে আরেকটি দেশ তৈরী করা কখনোই সম্ভব হবে না। এখানে আরোও দুটি বিষয়ে আলোকপাত করা দরকারঃ

বর্তমান চাহিদামত নতুন ভূখণ্ড তথা ‘জম্মুল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠিত হলেও তাদের আরও এক বা একাধিকবার যুদ্ধ করতে হবে স্বতন্ত্র চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা ল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কারণ সবাই জানে যে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমাদের মধ্যে শিক্ষা, সুযোগ সুবিধা, জীবনযাত্রার মানের বিভিন্ন সূচকে রয়েছে বিশাল বৈষম্য। অপর বিষয়টি হলো: ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, এক সাগর রক্তের দামে কেনা এদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তথা রাজাকারদের কোন প্রচেষ্টা, এদেশের ১৬ কোটি মানুষ এবং এদেশের চৌকষ নিরাপত্তা বাহিনী সফল হতে দেবে কিনা তা বিবেচনার ভার পাঠকদের উপর থাকলো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠিকে বিতাড়িত করা

এখানকার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আরেকটি স্বপ্ন এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অর্থাৎ বাঙালী সম্প্রদায়কে এখান থেকে বিতাড়িত করা। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ আমেরিকাকে বলা হয় ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসীদের দেশ। আমেরিকাতে নেটিভদের বাদ দিলে শতকরা ৯৯% জনেরও বেশী মানুষ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে গিয়ে সেখানকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা ও ইউরোপে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠি একত্রে বসবাস করছে। এখানকার অনেক নেতা নেত্রীদের সন্তান ও আত্বীয়/স্বজনেরা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেন এর স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন কিংবা নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। তারা বাংলাদেশের যে কোন স্থানে বসতি স্থাপন করতে পারে এবং করছে। কিন্তু সমতলের বাংলাদেশীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করাতেই তাদের যত আপত্তি। তাদের এক অদ্ভুত দাবী। এখানে যার জন্ম হয়েছে, এই মাটির ধূলা মাখিয়ে যে বড় হয়েছে, এখানের বাতাসে যে নিশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ করে বেঁচে আছে, তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। কি অদ্ভুত এবং অবাস্তব আবদার। শান্তিচুক্তিতেও কিন্তু একথা লেখা নেই যে এখানে বসবাসরত বাঙালীদের এখান থেকে চলে যেতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দাবী মোটেই বাস্তব সম্মত নয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাসবাসরত জনসাধারনের করণীয় কি

একটু আগেই বলা হয়েছে যে এখানকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যরাও মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের ভয়ংকর জীঘাংসার শিকার। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাসরত সাধারণ মানুষদের ইচ্ছা অনিচ্ছায় কিছু যায় আসে না। তাদের পালন করতে হয় এখানকার নেতৃত্ব ও সন্ত্রাসীদের নির্দেশ। এই প্রসঙ্গে নিম্নের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে যেমন:

নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের নিশ্চিত করতে হবে

পৃথিবীর এমন কোন শক্তিশালী নিরাপত্তা বাহিনী নেই যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সকলকে নিরাপত্তা দিতে পারে। তাই এখানকার জনসাধারণের নিরাপত্তা নিজেদেরকে সম্মিলিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য নিজ নিজ এলাকায়, প্রতিটি বাজারে এবং পাড়ায় পাড়ায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যথার্থ তথ্য দিলে যে সব অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও দুস্কৃতিকারীরা এলাকায় শান্তি বিনষ্ট করছে তাদের আইনের হাতে সোপর্দ করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নিরাপত্তা বাহিনী সদা প্রস্তুত রয়েছে।

চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে

যেকোন ভাবে সকলকে নিয়মিত ও অনিয়মিত চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে এখানকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, মোবাইল কোম্পানী, আন্তঃজেলা বাসমালিক ও ব্যবসায়ীদেরকে সন্ত্রাসীদের চাঁদা প্রদান বন্ধ করতে হবে। তাহলেই তারা অস্ত্র কেনা এবং অন্যান্য দলীয় কার্যক্রম সম্পাদনে অর্থ যোগানের জটিলতায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পরবে। তাই নিজ নিজ পাড়া ও বাজার এলাকাকে চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাস মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজদের পাকড়াও করে আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। কারো একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব না হলেও সম্মিলিত ভাবে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের প্রতিরোধ করা সম্ভব।

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সচেষ্ট হতে হবে

টেকসই আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা বজায় এবং আত্মনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা শুধু “পাশের হার” এবং “জিপিএ”র হলে চলবে না। সত্যিকার অর্থে আত্মকর্মসংস্থান সম্ভব হবে এমন শিক্ষাগ্রহণ করতে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ও উৎসাহিত করতে হবে। আর এজন্য যা দরকার তা হচ্ছে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক। কৃষি, বৃক্ষরোপণ, পশুপালন, মাছ চাষ, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে সকলকে স্বাবলম্বী হতে চেষ্টা করতে হবে এবং জীবনযাত্রার মান এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট থাকতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম যে অবস্থায় আছে তার চেয়ে পরবর্তী প্রজন্ম যেন আরও ভালো থাকতে পারে এই চেষ্টা বজায় রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, সৃষ্টিকর্তা তাকেই সহযোগিতা করেন যিনি নিজেকে সাহায্য করতে সচেষ্ট থাকেন।

শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হবে                                                                 

সকলকে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বাংলাদেশের প্রধান শক্তিই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বাঙালী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টানসহ সকল ধর্মালম্বী ও সকল জাতি গোষ্ঠীদের পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতে হবে। কেউ যেন কখনই অন্য কারো কৃষ্টি, সভ্যতা, সামাজিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ইত্যাদিতে আঘাত না করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার
স্বাধীনতার পর ৪২ বছরে বাংলাদেশের অর্জন প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ ও সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য সমাধানে সময় নষ্ট করা কারও কাম্য হতে পারে না। অতীতের হানাহানী ও বিবাদভূলে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অগ্রসর হতে হবে। এখানকার ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠীর অধিকার, তাদের উত্তরাধিকারীদের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নতির অধিকার সুষমভাবে নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই। একই সাথে এখানে বসবাসরত অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালীরাও নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার। এই সমস্যার সমাধান তাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়ার মধ্যে নয় বরং উভয় পক্ষের স্বার্থ ও সম্প্রীতি রক্ষা করার মাধ্যমেই সম্ভব। এদেশের জনগণ কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত অর্থ নিজের পরিবারের জন্য ব্যয় করতে চায়। দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে পরে শান্তিতে জীবন যাপন করতে চায়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুশিক্ষা এবং উন্নত জীবন চায়। অসুস্থ্য হলে সুচিকিৎসা চায়। এই অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য অঞ্চলে মুষ্টিমেয় কিছু সন্ত্রাসী কর্তৃক সৃষ্ট অশান্তি ও অস্ত্রের ঝনঝনানী সমূলে উৎপাটন করে সকলে মিলে একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত জীবন যাপন করা এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্য বসবাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়াই সকলের স্বপ্ন। এদেশের অপার সম্ভাবনাময় পার্বত্য এলাকায় সকলে মিলে শান্তি ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করতে পারলে উন্নয়ন এবং উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত হতে বাধ্য।

 লেখক: কমান্ডার, ২৪ আর্টিলারি ব্রিগেড ও গুইমারা রিজিয়ন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী