আপত্তিকর অভিযোগে বান্দরবান খ্রীস্টান মিশনারীর ৬৫ ছাত্রীর হোস্টেল ত্যাগ

fatema rani church

জেলা প্রতিনিধি, বান্দরবান:

বান্দরবান পার্বত্য জেলার ফাতিমা রাণী ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক পরিচালিত খ্রীষ্টান মিশনারীর ৬৫ ছাত্রীর আকস্মিক হোস্টেল ত্যাগের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

তবে স্থানীয় অনেকের মতে এই সংখ্যা ৭১ জন। তবে চার্চ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনকে চার্চ হোস্টেলের রেজিস্টার দেখতে না দেয়ায় এ সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সূত্র মতে, চলে যাওয়া কযেকজন ছাত্রীকে চার্চ কর্তৃপক্ষ বুঝিয়ে ফেরত নিয়ে এসেছে। তবে এখনও ৬৫ ছাত্রী নিখোঁজ। ছাত্রীরা সবাই উপজাতি জনগোষ্ঠীর ও দরিদ্র। বিনা খরচে শিক্ষা ও থাকা খাওয়ার কথা বলে তাদের এখানে আনা হয়েছে।

গত ১৬ মার্চ সকাল সাড়ে চারটায় হাতমুখ ধোয়ার অযুহাতে ৬৫ ছাত্রী সাঙ্গু নদীতে গেলে তারা আর হোস্টেলে ফেরত আসেনি। এ ঘটনা বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ঘটনার রহস্য উন্মোচনের জন্য তদন্ত শুরু করে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কি কারণে তারা হোস্টেল ত্যাগ করেছে তা সম্পূর্ণ নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো সূত্র।  ঘটনাটি বেশ কয়েকদিন আগে ঘটলেও চার্চ কর্তৃপক্ষ নানা কৌশলে তা ধামাচাপাদিতে সক্ষম হয়।

চার্চ এলাকার বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ এ হোস্টেলটির ছাত্রীদের উপর বিভিন্ন রকম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। ফাতিমা রাণী চার্চের ফাদার এডমন পল পুরোহিত কর্তৃক হোস্টেলটিতে শিক্ষকতা করেন ব্রাদার প্রত্যয় পল ত্রিপুরা, সিলভেসটারসহ অনেকে। তাছাড়া চার্চটি এমন জায়গায় অবস্থিত যেখানে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। যার ফলে সেখানে কোন অনৈতিক বা অসামাজিক কর্মকান্ড ঘটলেও তা লোক চক্ষুর আড়ালে থেকে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় হোষ্টেল ছাত্রী এ প্রতিবেদককে জানান, ফাতিমা রাণী ক্যাথলিক চার্চের ফাদার এবং শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে হোস্টেলের ছাত্রীদের অসামাজিক কাজে বাধ্য করেন। অন্যথায় তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। তাছাড়া হোস্টেলে খাবার, সেবাসহ অন্যান্য বিষয়েও তারা অভিযোগ করেন। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে তারা হোস্টেল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্ত করতে গেলে চার্চ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসনকে নূনতম সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ করেছেন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দাসংস্থার একাধিক সূত্র। তারা জানান, এই চার্চের হোস্টেলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা আপত্তিকর অভিযোগের কথা শোনা গেছে। তবে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখায় বিষয়গুলো কখনোই তদন্ত করে বের করা সম্ভব হয়নি।

ফাতিমা রাণী ক্যাথলিক চার্চের ফাদার এডমন পল এর সাথে যোগাযোগ করতে গেলে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, আমরা এ ঘটনার ব্যাপারে শুনলেও এখনো পর্যন্ত লিখিত কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার বিষয়ে তদন্ত স্বাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বান্দরবান সেনাবাহিনীর জিএসটু মেজর মাহবুব মোর্শেদ পিএসসি, ইবি এ ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দূঃখজনক। তবে এ ঘটনার পেছনে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদেরকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলা প্রশাসক কে. এম তারিকুল ইসলাম জানান, ঘটনা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। এ বিষয় নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে হোষ্টেল কর্তৃপক্ষ জানায়, হোষ্টেল ত্যাগ করা ছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের নিয়ে চার্চ প্রাঙ্গনে আগামী ২৬ মার্চ চার্চের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে বৈঠকের কথা রয়েছে। সেখানে শুধুমাত্র চার্চ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন বলেও জানা যায়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

 Ferdous Ahmed Quarishi f

ড. ফে র দৌ স  আ হ ম দ  কো রে শী

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশের বাইরে যে ধরনের অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালানো হয়, সে বিষয়ে গত পর্বে কিছু লিখেছি। সামরিক-অসামরিক সংঘাতে সেখানে এযাবৎ অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, সে কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। কত মানুষ এযাবৎ প্রাণ হারিয়েছে তার একটা নির্ভরযোগ্য হিসাব হওয়া দরকার। ১৯৯৬ সালের এক সরকারি হিসাব অনুযায়ী সেখানে তখন পর্যন্ত সব মিলেয়ে ৮০০০ মানুষ সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ি, অপাহাড়ি উভয়ে রয়েছে। পরবর্তী বছরগুলোয় আরও কিছু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

এসব ঘটনাকে প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সেখানকার পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল করে তোলা কিংবা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে দূরে সরিয়ে নেয়ার কাজের সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তা কোন পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়।

কোন এলাকায় সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত শুরু হলে সেখানে রাষ্ট্র তার সর্বশক্তি নিয়ে প্রতিরোধে নেমে পড়ে। অপরদিকে বিদ্রোহীদের মদদ দেয়ার শক্তিরও অভাব হয় না। মাঝখানে বিপর্যস্ত হয় সাধারণ মানুষের জীবন। অবধারিতরূপে জন্ম নেয় নানা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তারা নিজ নিজ স্বার্থে পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। হত্যা, অগ্নিসংযোগ, নগদ লুণ্ঠন , জমি দখল চলতে থাকে।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে যা ঘটেছে বা ঘটছে, তাকে ‘গণহত্যা’ বা ethnic cleansing  বলে আখ্যায়িত করা, অথবা বাঙালিরা বা সেনাবাহিনীর লোকেরা সেখানে একের পর এক ‘গণহত্যা’ চালিয়ে যাচ্ছে, এ ধরনের প্রচারণা ভয়ঙ্কর রকমের অতিরঞ্জিত এবং নিতান্তই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। (আদমশুমারির হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অন্য অনেক জেলার চেয়ে বেশি)।

কোন পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতের উদ্ভব ঘটেছে তা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। এসব খুনোখুনি একতরফা হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে পৃথিবীর সর্বত্রই কমবেশি অনুরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়ে থাকে।

পৃথিবীর সর্বত্রই হয়ে থাকে বলে কি এই পরিস্থিতি নির্বিবাদে মেনে নিতে হবে? না। একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানিও কখনোই কাম্য হতে পারে না। আর সেজন্যই এ সংঘাতের অবসান ঘটাতে হবে। আর সংঘাতের অবসান ঘটাতে হলে তার মূলে যেতে হবে।

সংঘাতের মূল

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার মূলে রয়েছে তিনটি বিষয়।

ক. বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা বিধান

খ. সেখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার ও প্রত্যাশার সন্তোষজনক নিষ্পত্তি এবং

গ. বাংলাদেশের সার্বভৌম এলাকার সর্বত্র দেশের সব মানুষের অবাধ চলাচল, বসবাস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ অবারিত রাখা।

এ তিনটি বিষয়ের কোনটিকে বাদ দিয়ে বা পাশ কাটিয়ে কোন কার্যকর সমাধান পাওয়া যাবে না। সব পক্ষকেই সে কথা মনে রাখতে হবে। এবং তা মনে রেখেই সমস্যাটির সমাধান খুঁজতে হবে।

নারী নির্যাতন প্রসঙ্গ

সম্প্রদায়গত বিরোধে সবচেয়ে বেশি প্রচারণা পেয়ে থাকে ‘নারী নির্যাতন’। সাম্প্রদায়িক সংঘাতে নারীই হয়ে পড়ে দুর্বৃত্তপনার প্রধান শিকার। এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হওয়ার কোন কারণ দেখি না। তবে ১২ লাখ নারী-পুরুষ যদি কোন একটি অঞ্চলে বাস করে, সেখানে কোন নারীঘটিত অপরাধ ঘটবে না, তা আশা করা বাতুলতা। ঢাকা মহানগরী বা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতনের অসংখ্য রোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে। পার্বত্য এলাকা এর ব্যতিক্রম হতে পারে না। পাহাড়ি কর্তৃক পাহাড়ি নারী নির্যাতনের ঘটনাও কাগজে পড়ছি।

কাজেই নারী নির্যাতনের কোন ঘটনা ঘটলেই তাকে ‘পাহাড়ি-বাঙালি’ বিরোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। সেনাবাহিনীর কোন লোক যদি এ ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়, সেক্ষেত্রেও ‘সেনাবাহিনীর লোকেরা পাহাড়ি নারীদের নির্যাতন করছে’- এরকম ঢালাও প্রচারণা ঠিক নয়। পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যে কিংবা সেখানে কর্মরত সেনাবাহিনীর লোকদের মধ্যে অনেক বদমায়েশ নিশ্চিতরূপেই সুযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। প্রয়োজন তাদের চিহ্নিত করা এবং এ ধরনের অপরাধ ক্ষমাহীন দৃষ্টিতে দেখে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর কোন সদস্য যদি কর্মক্ষেত্রে কোন অপরাধ করে, তাহলে সেনাবাহিনীর সুস্বাস্থ্যের প্রয়োজনেই কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়িদের অভিযোগ, সেটা হচ্ছে না। এর জবাব সরকারকে দিতে হবে।

দলে দলে বৌদ্ধকে জোর করে মুসলমান বানানো হচ্ছে?

কিছুদিন আগে, ব্যাংককে কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষু একটি ‘মানব বন্ধন’ করেছেন। তাদের হাতে ব্যানারে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশে দলে দলে বৌদ্ধদের জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে’। ব্যাংককের সেই মানব বন্ধনে সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকজন চাকমাও ছিলেন। এ নিয়ে সেখানে একটি সেমিনারও আয়োজন করা হয়। সেই সেমিনারেও একই বক্তব্য তুলে ধরা হয়।

বিষয়টি নিয়ে আমি কিছু জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ‘ধর্মান্তর’ বলতে যা বোঝায় সেই নিরীখে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরের কোন আলামত দেখতে পাই না। ‘জোর করে’ মুসলমান বানাবার কোন দৃষ্টান্তই নেই। যে দু’-চারটি ঘটনা পাওয়া যায় তার সবই বিয়ে ও প্রেমঘটিত, যা হিন্দু-মুসলমান-ইহুদি-খ্রিস্টানেও অহরহ ঘটছে। বিয়ের কারণে ধর্মান্তর ব্যতিক্রমী ঘটনা। এক্ষেত্রে তা ধর্তব্য হতে পারে না। এর সংখ্যাও অতি নগণ্য।

ব্যাংককের ভিক্ষুরা তাহলে এই মিথ্যা প্রচারণায় অংশ নিলেন কেন? এ প্রচারণা এটাই প্রথম নয়। বহুকাল থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধদের ‘জোর করে মুসলমান বানিয়ে ফেলার’ প্রচারণা চলছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে খ্রিস্টান চার্চের অর্থায়নে পরিচালিত অসংখ্য সংস্থা কাজটি করে চলেছে। তারা কিছু চাকমা প্রচারকর্মীকে দুনিয়ার বিভিন্ন সভা-সমিতিতে হাজির করে এবং তাদের মুখ দিয়ে এ মিথ্যাটি রটনা করায়। দুনিয়ার মানুষ সরল মনে তা বিশ্বাস করছে এবং বাংলাদেশের প্রতি বিরূপ হচ্ছে।

খ্রিস্টান মিশনারিরা কেন এ কাজ করছে, এর উদ্দেশ্য বোধগম্য। তা নিয়ে গত পর্বে আমি আলোচনা করেছি। কিন্তু মহামতি বুদ্ধের অনুসারী সত্যান্বেষী ভিক্ষুগণ ভালো করে খবর না নিয়ে এমন একটি মিথ্যা প্রচারণায় শামিল হচ্ছেন, একেবারে রাস্তায় নেমে অযথা বাংলাদেশের দুর্নাম রটাচ্ছেন, এটা সত্যিই দুঃখজনক।

পাশাপাশি আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারিদের বহুমুখী তৎপরতায় কী হারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে, সে বিষয়টির দিকে এই বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ মনে হয় চোখ বন্ধ করে আছেন। এর কারণ আমার বোধগম্য নয়।

 বৌদ্ধ ধর্ম কি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে কিছু দেশী-বিদেশী সংগঠন, কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কিছু এনজিও’র ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সম্প্রতি ইউএনডিপি সেখানে বড়সড় বিনিয়োগে নেমেছে। এতে যুক্ত করা হয়েছে অনেক এনজিওকে, যারা অনেকটা প্রত্যক্ষেই খ্রিস্টীয়করণের কাজে নিয়োজিত। এদের অনেকগুলো দীর্ঘকাল ধরেই সেখানে কাজ করে আসছে।

আমাদের আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে ১৫ হাজার পাহাড়িকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে ফেলা হয়েছে। এতকাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা ও মারমা সমপ্রদায়ের মধ্যে তাদের সাফল্য ছিল না বললেই চলে। ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ চাকমা ও মারমাগণ তাদের ধর্মবিশ্বাসে অটল থেকেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে সে দেয়ালে ফাটল ধরেছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে বহু চাকমাকে ইতিমধ্যে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছে।

এটা এমনই এক প্রক্রিয়া যা একবার শুরু হলে তার গতিবেগ বাড়তেই থাকে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নাগা, মিজো, খাসিয়া, গারো, মণিপুরীদের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে। সেখানে প্রথম ১০০ বছরে খুব অল্প সংখ্যক পাহাড়ি খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। কিন্তু শেষদিকে মাত্র কয়েক দশকে উল্লিখিত সব ক’টি সম্প্রদায় প্রায় শতভাগ খ্রিস্টান হয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চাকমা-মারমারা কি সেই অভিঘাত ঠেকাতে পারবেন?

বাংলাদেশের মুসলমানদের অধিকাংশেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন বৌদ্ধ

পার্বত্য চট্টগামের ক্ষেত্রে একটু আশার দিক হচ্ছে বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের সুদৃঢ় ধর্মনিষ্ঠা। তবে রাজনৈতিক ডামাডোলে খ্রিস্টান মিশনারিরা এখন খুব সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে বৌদ্ধধর্মের দুর্গে ফাটল ধরাবার কাজ করছে। সেখানকার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্যের সুযোগ কাজে লাগানো হচ্ছে। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনসমষ্টিকে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের ধর্মীয় অবস্থানে যাতে কোন সমস্যার উদ্ভব না ঘটে, সেদিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে।

বাংলাদেশের মুসলমানদের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বৌদ্ধধর্মের আধিপত্যের যুগ। উত্তর ও মধ্য ভারতে লাখ লাখ বৌদ্ধ নিধনের প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সেখান থেকে এই বাংলায় সরে আসতে বাধ্য হন। এভাবেই এই বাংলায় সূচনা হয় বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগের। প্রায় হাজার বছর এই বাংলাদেশ ছিল সারা পৃথিবীর বৌদ্ধধর্মের মহাতীর্থ। ময়নামতী, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় সে ইতিহাস ধারণ করে আছে।

দশম ও একাদশ শতাব্দীতে কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন রাজাদের শুদ্ধি অভিযানের মুখে এবং এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কয়েক শতকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা দলে দলে মুসলমান হয়েছেন। নিশ্চিতরূপেই আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের বিশাল অংশের পূর্বপুরুষরা বৌদ্ধ ছিলেন। আজকের দিনেও এদেশে মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যে সংঘাতের কোন কারণ নেই।

সংখ্যাল্পতার কারণে আমাদের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দরকষাকষির ক্ষমতা খুব কম। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র্র ও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে স্বপ্রণোদিত হয়ে এদেশ থেকে বৌদ্ধধর্মের বিলুপ্তির ভিনদেশীয় প্রয়াস ঠেকাতে হবে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই তা করতে হবে। নইলে একদিকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ মারাত্মকভাবে বিপন্ন হবে, অপরদিকে আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী চিরতরে হারাবে তাদের ধর্ম ও কৃষ্টি। অতঃপর নিক্ষিপ্ত হবে ভয়াবহ নৈরাজ্যের ঘুর্ণিপাকে।

 লেখক : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক                                                                                                                                                                                                                                                                        shapshin@gtlbd.com

 পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

উপজাতীয় নওমুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান মিশনারিদের দৌরাত্ম্য

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

 

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

Ferdous Ahmed Quarishi f

ড. ফে র দৌ স  আ হ ম দ  কো রে শী
আমাদের আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারিরা ইতিমধ্যে ১৫ হাজার পাহাড়িকে খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলেছে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী সেখানে এখন ১৪৯টি এনজিও কাজ করছে।
আমাদের স্বাধীনতার সময় এই সমগ্র পার্বত্য এলাকায় ১৫ হাজার দূরে থাক, এক ডজন খ্রিস্টান ছিল কিনা সন্দেহ। বিষয়টা নিছক ধর্মপ্রচার হলে কিছু বলার ছিল না। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের ধর্মকথা শুনিয়ে যদি কিছু মানুষ মহামতি যিশুর শিক্ষায় দীক্ষিত হন, তাতে মানবজাতির অকল্যাণ হওয়ার কোন কারণ দেখি না। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যাটা অন্যত্র।
প্রথমত, খ্রিস্টীয়করণের এ প্রক্রিয়াটা নিছক ধর্মপ্রচার নয়। এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী ‘রাজনৈতিক’ এজেন্ডা। তদুপরি যে প্রক্রিয়ায় খ্রিস্টীয়করণ করা হয়, তাতে ন্যায়-অন্যায়ের কোন বাছবিচার থাকে না। দরিদ্র, অজ্ঞ ও পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোকে সেবার নামে কাছে টেনে, কিছু বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা বা নগদ সাহায্যের টোপ দিয়ে ধর্মান্তরিত করার চেয়ে বড় অধর্ম আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু যে বিপুলসংখ্যক এনজিও পার্বত্য জেলাগুলোতে কাজ করছে বলে আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, তারা সবাই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে সেই ‘কাজ’ই করছে।
দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়ায় দেশের মূল জনসমষ্টি থেকে ‘টার্গেট গ্রপ’ গুলোকে আলাদা করে ফেলার প্রয়াস চলতে থাকে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য নাগরিকের সঙ্গে তাদের একটা বৈরী অবস্থান সৃষ্টির কাজও চালানো হয় সুকৌশলে। দেশের কথিত ‘সুশীল সমাজ’-এর একাংশ ও কিছু সংগঠন এ কাজে লোকাল এজেন্ট বা কোলাবরেটর হিসেবে কাজ করে।

‘আদিবাসী’ আন্দোলনের পেছনে
এই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ ‘আদিবাসী’ আন্দোলন। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ অভিধার প্রথম দাবিদার বাংলার কৃষক। যাদের পূর্বপুরুষরা কমপক্ষে ৫ হাজার বছর আগে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার এই অববাহিকায় কৃষি-সভ্যতারেউন্মেষ ঘটিয়েছে এবং এই মাটি কামড়ে পড়ে থেকে প্রজেক্টের পর প্রজেক্ট এই মাটিতেই মিশে গেছে। যুগে যুগে তাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অন্য অনেক জাতি-উপজাতি-খণ্ডজাতি। সে কারণেই আজকের বাঙালি পৃথিবীর ‘অতি-শংকর’ মানবগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। সন্তু লারমার পূর্বপুরুষরা যদি আরও আগে এদেশে আসতেন, তাহলে তারাও এতদিনে এই ‘এক দেহে লীন’ হয়ে যেতেন।
আদিবাসীকে অবশ্যই আদিবাসী বলতে হবে। কিন্তু সন্তু লারমা চাকমা সম্প্রদায়কে ‘আদিবাসী’ বা ধনড়ৎরমরহধষ হিসেবে চিহ্নিত করতে চাইছেন কেন? চাকমা সম্প্র্রদায় বাংলাদেশ অঞ্চলে আগত জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে নবাগত। অপরদিকে এই জনগোষ্ঠী সমাজ-সংস্কৃতির অগ্রযাত্রার পরিমাপে একটি সুসভ্য মানবগোষ্ঠী। যারা মাত্র কয়েকশ’ বছর আগে আজকের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমতলভূমিতে এসে বসতি স্থাপন করে। একপর্যায়ে তারা সমতল চট্টগ্রামে রাজত্বও করেছে।
বস্তুত ‘আদিবাসী’ কেবল একটি শব্দমাত্র নয়। গোত্রীয় পদবিও নয়। কাদের আদিবাসী বলা হবে সে বিষয়টি জাতিসংঘ সনদে বিশদভাবে সংজ্ঞায়িত আছে। মূলত আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ভাগ্যবিড়ম্বিত আদি অধিবাসীদের বিষয়টি মাথায় রেখেই এ ধরনের জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার কথা ভাবা হয়েছে। যারা সুপ্রাচীনকাল থেকে ওই সব এলাকার বাসিন্দা ছিল এবং বিশ্বজনীন ধর্মবিশ্বাস ও জ্ঞানচর্চার বাইরে থেকে নিজ নিজ গণ্ডিতে বৃত্তবন্দি থেকেছে হাজার হাজার বছর। বাইরের শক্তিমান, প্রাগ্রসর ও অস্ত্রবলে বলীয়ান জনগোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচারে যাদের জাতিগত অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। সেজন্যই জাতিসংঘ সনদে (১৬৯) তাদের জন্য এবং অনুরূপ জাতিসত্তাগুলোর কিছু রক্ষাকবচ রাখা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো, বিশেষ করে, সেখানকার প্রধান তিন জনগোষ্ঠী- চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়কে সেভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই।
তারপরও তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করার জন্য এত প্রচেষ্টা কেন? বিশেষ করে ড্যানিডার মতো কিছু বড় এনজিও এ নিয়ে এত চাপ সৃষ্টি করছে কেন?
এর কারণ এই যে, তাদের একবার ‘আদিবাসী’ নামে অভিহিত করা গেলে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার ‘এবরিজিন’দের জাতিগত বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্য যেসব বিশেষ সুরক্ষা ও সুবিধা জাতিসংঘ নির্ধারণ করেছে সেগুলো দাবি করা যাবে। যেমনটি করা হয়েছে পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের ক্ষেত্রে। যার পরিণতি আমাদের চোখের সামনে। বাংলাদেশের জন্য তা নিশ্চিতরূপেই নানাবিধ জটিল সমস্যার উদ্ভব ঘটাবে। এ নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে অনেকবার লেখালেখি করেছি। কিন্তু অতীতের সরকার এবং সংশি¬ষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের নিদ্রাভঙ্গ হয়নি। সামান্য কিছু বিদেশী দান-খয়রাত পাওয়ার জন্য তারা এসব বিদেশী সংস্থাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ বিচরণের সুযোগ দিয়েছেন। যে সুযোগ কোন দেশীয় সেবা সংস্থাকে দেয়া হয়নি। দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে একটা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে, সেজন্য সাধুবাদ জানাচ্ছি।
বাংলাদেশ সরকার সম্প্র্রতি এসব ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে তাদের স্বকীয়তার স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এই কাজটি শুরুতেই করা হলে বিষয়টি নিয়ে এতটা পানি ঘোলা করার সুযোগ থাকত না।
প্রকৃত অর্থে আদিবাসী না হলে কেবল কারও বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি বা চাপের মুখে কোন জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোন সুযোগ এখন নেই। এই বাস্তবতা সংশি¬ষ্ট সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।

ফিরে আসছে কুখ্যাত ‘কুপল্যান্ড প্লান’?
এই উপমহাদেশ থেকে বৃটিশের বিদায় ঘণ্টা বাজার পর শেষ মরণ-কামড় হিসেবে চেষ্টা হয়েছিল বর্তমান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আমাদের তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের দক্ষিণাংশ এবং মিয়ানমারের সন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে একটি ‘ক্রাউন কলোনি’ গঠন করার। প্রস্তাব করা হয়েছিল : এই অঞ্চলটি উপমহাদেশের স্বাধীনতার আলোচনার বাইরে থাকবে এবং সরাসরি ব্রিটিশ শাসনে থেকে যাবে। চল্লিশের দশকে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে, ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায়, ভাইসরয়ের দফতরে এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টে। ব্রিটিশ আমলা রিজিনাল্ড কুপল্যান্ড এই পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। এজন্য একে ‘কুপল্যান্ড প্লান’ নামে অভিহিত করা হয়। তবে এর পেছনে আসল কুশীলব ছিল খ্রিস্টান চার্চ সম্প্র্রদায়। তাদের সূদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলটিকে আরও কিছুকাল সরাসরি ব্রিটিশ শাসনে রেখে সেখানে খ্রিস্টীয়করণের কাজটি সম্পন্ন করা। অতঃপর সেখানে একটি ‘খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা। বলা বাহুল্য তাদের হিসাব-নিকাশ ঠিকই ছিল। এলাকাটিকে আরও পঞ্চাশ বছর ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ শাসনে রাখা গেলে এতদিনে তাদের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতেই পারত, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আজকের পরিস্থিতির দিকে তাকালে তা অনুধাবন করা যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে আজ যেসব ‘তৎপরতা’ চলছে তা দৃষ্টে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি ‘কুপল্যান্ড প্লান’ এখনও বেঁচে আছে?

পূর্ব তিমুরের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের তুলনা
পশ্চিমের প্রচার মাধ্যম ও কিছু ‘বিশেষজ্ঞ’ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে লেখালেখিতে প্রায়ই এখানকার পরিস্থিতিকে ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। ইন্দোনেশিয়ার তিমুর দ্বীপের পূর্বাংশে ছিল কিছু পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী যারা ছিল অবহেলিত, ধর্মবিশ্বাসে এনিমিস্ট বা প্রকৃতি পূজারি। ইন্দোনেশিয়া মুসলমানপ্রধান দেশ হলেও এই পাহাড়ঘেরা অঞ্চলটিতে ইসলাম প্রচারে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সেই সুযোগ নিয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খ্রিস্টান চার্চ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো তারা সফলভাবে এখানকার প্রকৃতিপূজারি মানুষগুলোকে ব্যাপকভাবে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে সক্ষম হয়। তারপর শুরু হয়ে যায় আসল কাজ। এলাকাটিকে মূল ইন্দোনেশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার আন্দোলন। এর পেছনে অবশ্য একটি বিরাট বৈষয়িক স্বার্থও যুক্ত হয়Ñ দ্বীপটির দক্ষিণের সমুদ্রগর্ভের তেলসম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা। অস্ট্রেলিয়া এবং পশ্চিমের কিছু দেশ সেই লক্ষ্য সামনে রেখে সহায়তা দিয়েছে বিদ্রোহীদের। একপর্যায়ে বিদ্রোহীদের নেতাকে দেয়া হয় নোবেল শান্তি পুরস্কার। তারপর সেখানে জাতিসংঘ বাহিনী মোতায়েন। গণভোট এবং সবশেষে একটি নতুন খ্রিস্টান রাষ্ট্রের অবধারিত অভ্যুদয়। স্বাধীন ‘পূর্ব তিমুর’।
এ থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘পূর্ব তিমুর’-এর সঙ্গে একপর্যায়ে রেখে লেখালেখি ও প্রচারণার অর্থ বোধগম্য।
এই প্রচারণা চলছে দীর্ঘকাল ধরেই। একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। আশির দশকের মাঝামাঝি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একটি বিভাগে পিএইচডি গবেষণাপত্রের একটি প্রস্তাবনা জমা পড়ে ‘genocide in Chitagong Hill Tracts and East Timor’ শিরোনামে। সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক (যিনি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত) প্রস্তাবনাটি মানসম্মত নয় বলে নাকচ করে দেন এবং আমাকে সামনে পেয়ে বললেন, ‘আপনার দেশের ব্যাপার। ট্র্যাশ। পড়ে দেখতে পারেন।’ দেখলাম ড্রাফটের পাতায় পাতায় অসঙ্গতি এবং ভুল তথ্য। অধ্যাপকের বিরক্তির কারণ বুঝলাম।
স্পষ্টতই এটি ছিল কোন বিশেষ মহলের মদদে একটি উদ্দেশ্যমূলক উদ্যোগ। কিন্তু লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ওই গবেষণা প্রস্তাব নাকচ করে দিলে কী হবে, ওই গবেষক আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা জমা দিয়ে কয়েক বছর পর সেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তার সেই ‘জেনোসাইড’ তত্ত্ব পুস্তকাকারে প্রকাশিতও হয়েছে। সামান্য রদবদল করে। এ থেকেই বোঝা যাবে এই বিষয়টির মূল কত গভীরে।
কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। পার্বত্য চট্টগ্রাম আর পূর্ব তিমুর এক কথা নয়।

প্রচারণা ও বাস্তবতা
দুনিয়াজুড়ে আজ বাংলাদেশের এই পার্বত্য অঞ্চলটিকে নিয়ে ভীষণ মাতামাতি চলছে। অসংখ্য ওয়েবসাইটে চলছে নানাবিধ প্রচারণা। যার কোন কোনটিতে কিছু সত্যতা থাকলেও অধিকাংশই ভয়ানক রকমে অতিরঞ্জিত, কোন কোনটি ডাহা মিথ্যা। ‘একটা মিথ্যাকে হাজারবার বলা হলে তা সত্যে পরিণত হয়’- সেই লক্ষ্য নিয়ে এসব কাজ চলছে বলে মনে হয়।
প্রচারণা চলছে একতরফা। জবাব দেয়ার কেউ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে প্রচারণা বিশ্বজুড়ে চলছে তার মূল প্রতিপাদ্য চারটি :
(১) বহিরাগত বাঙালি এবং সেনাবাহিনীর লোকেরা সেখানে নির্বিচার ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে। সেখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে এটা করা হচ্ছে।
(২) সেখানে বাঙালি এবং সেনাবাহিনীর লোকেরা নিত্যদিন পাহাড়ি নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে।
(৩) সেখানে পাহাড়িদের জোর করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।
(৪) সেখানে এখন সেনা শাসন চলছে।

‘গণহত্যা’ প্রসঙ্গ
‘আড়াই লাখ চাকমাকে হত্যা’ করার গল্প : ৮০’র দশকের শেষদিকে একদিন বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করছি। ইংরেজিতে পাঠানো সংবাদ কিছু কাটছাঁট করে বাংলায় অনুবাদের কাজ। একটু পরেই ট্রান্সমিশন। সামনে একটা আইটেম দেখে চমকে উঠলাম- ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে এযাবৎ আড়াই লাখ চাকমাকে বাঙালিরা হত্যা করেছে!’
তখন সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমাদের মোট সংখ্যাই ছিল আড়াই লাখ। আমাকেই ওটা সম্প্র্রচার করতে হবে! আর মাত্র ১০ মিনিট পর। ছুটে গেলাম পাশের রুমে, বিভাগীয় প্রধানের কাছে। পিটার ম্যানগোল্ড তখন বাংলা বিভাগের প্রধান। বললাম, ‘পিটার, এটা কোথা থেকে এসেছে? আড়াই লাখ চাকমা মেরে ফেললে তো সেখানে আর কোন চাকমা থাকে না। সমস্যাই খতম। তোমরা অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকায় যেমন করেছ।’
পিটার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সব্বোনাশ! হাতে একদম সময় নেই। হারি আপ্! ওটা বাদ দিয়ে তুমি অন্য কোন আইটেম দিয়ে ট্রান্সমিশন শেষ করো।’
ট্রান্সমিশন শেষ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে সবাই বসলাম। পিটার আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘কিন্তু ওটা তো এসেছে খুব বড় জায়গা থেকে!’
জানলাম ওই দিনই সকালে বিবিসি বুশ হাউসের পাশের দালানে অবস্থিত একটি দূতাবাসে নেদারল্যান্ডস থেকে কয়েকজন এসেছিলেন একজন চাকমা ‘নেতা’কে সঙ্গে নিয়ে। তাদের প্রেস ব্রিফিং থেকেই এই ‘রিপোর্টে’র উৎপত্তি।
এভাবেই চলছে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণহত্যার নিরন্তর প্রচারণা।
(আগামীবারে : পার্বত্য চট্টগ্রামে কতজন পাহাড়ি মুসলমান হয়েছেন? বৌদ্ধধর্ম কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে?)

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com

 পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

উপজাতীয় নওমুসলিমদের ওপর খ্রিস্টান মিশনারিদের দৌরাত্ম্য

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা-বাঙ্গালী প্রত্যাহার ও খ্রিস্টান অঞ্চল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-১

Ferdous Ahmed Quarishi f

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

মাত্র বছর খানেক আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি তরফ থেকে কিছু উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছিল। খোদ তথ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিদেশীদের কোন এজেণ্ডা থাকতে পারে, তাদের ধর্ম ও কৃষ্টির সুরক্ষা দেয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য।’ অর্থমন্ত্রী এবং আইনমন্ত্রীও এ ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন। আইনমন্ত্রী সেখানে কর্মরত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যকলাপের যে চিত্র তুলে ধরেছেন তা যে কোন দেশপ্রেমিক মানুষকে চিন্তায় ফেলবে।

আমাদের দেশের এই অঞ্চলটির দিকে বিশেষ বিশেষ মহলের ‘নেক-নজর’ আছে শতাব্দীকাল আগ থেকেই। ইতিহাস ঘাঁটলেই তা বোঝা যায়। সত্তরের দশক থেকে এ ব্যাপারে অনেকবার লিখেছি। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্ণধাররা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কথিত ‘সিভিল সোসাইটি’ বিষয়টি বরাবর পাশ কাটিয়ে চলেছেন। উল্টো অনেকের বিরূপ মন্তব্য শুনেছি। দেরিতে হলেও এদিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে, তা কিছুটা স্বস্তির বিষয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরী- এই তিন প্রধান জনগোষ্ঠী তাদের ধর্মবিশ্বাস বা সমাজবদ্ধ জীবনধারার বিচারে অতিশয় সুসভ্য মানব সম্প্রদায়। চাকমা ও মারমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও গভীরভাবে ধর্মবিশ্বাসী। ত্রিপুরীরা মূলত হিন্দু। তাদের সবারই পারিবারিক ও সামাজিক জীবন সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। রাজনৈতিক বিপর্যয়ে বারংবার স্থানচ্যুত হয়ে এতকাল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও এখন অতি দ্রুত সামনে এগিয়ে আসছে। বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসা লক্ষ্য করার মতো। ইতিমধ্যেই এই সম্প্রদায়টি শিক্ষার হারের বিচারে দেশে শীর্ষস্থানে চলে এসেছে।

কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি

নানা কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতি আমার বিশেষ দুর্বলতা ও সহমর্মিতা রয়েছে। ১৯৬১-৬২ সালের দিকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে প্রকল্প এলাকায় নদীর পানি জমে বিশাল জলাধার তৈরি হয়, এতে চাকমা সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ তাদের জোতজমি হরিয়ে সর্বশান্ত হয়। পাকিস্তান সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করেছিল, সেটাও তাদের হাতে ঠিকভাবে পৌঁছেনি। এই ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়িদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে একটি প্রচারপত্র বিলি করেছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। লারমা তখন চট্টগ্রাম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। এই প্রচারপত্র বিলির অভিযোগে ‘ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলস’ (ডিপিআর)-এ তাকে গ্রেফতার করা হয়। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজেই চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। চাকমা ছাত্ররা লারমার মুক্তি দাবি করে একটি বিবৃতি দেয়ার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ধরণা দেন। কিন্তু কেউ সে সময় এ ব্যাপারে মুখ খুলতে চাননি।

তখনকার দিনে ইত্তেফাকের চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ছিলেন অগ্রজ-প্রতিম মঈনুল আলম। এখন তিনি কানাডায় অবসর জীবনে আছেন। তার অনুপ্রেরণায় আমি চট্টগ্রামের ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে চাকমা সম্প্রদায়ের সমস্যা তুলে ধরে এবং লারমার মুক্তির দাবি করে একটি বিবৃতি দিয়েছিলাম। বিবৃতিটি বেশ ফলাও করে দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছিল। (বিষয়টি ভুলেই গিয়েছিলাম। মঈনুল আলম ভাই কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীতে তার স্মৃতিকথায় এই বিবৃতিটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তাই আবার মনে পড়ে গেল।)

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে আমি যখন চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হই তখন ১০-১৫ জন চাকমা ছাত্র আমাদের সতীর্থ ছিল। এর মধ্যে একজন ছিল আরএল খিসা, সম্পর্কে মানবেন্দ্র লারমার চাচা। খিসা খুব ভালো কবিতা লিখত। কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে আমরা ‘অংকুর’ নামে একটি সাহিত্যপত্র বের করেছিলাম। খিসা ছিল এতে আমার অন্যতম সহযোগী। এতে তার একটা কবিতাও ছাপা হয়েছিল। সেবার গরমের ছুটিতে রাঙ্গামাটিতে তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য খিসা আমাদের কয়েকজনকে খুব পীড়াপীড়ি করেছিল। আমরা যাব বলে কথা দিয়েও শেষ মুহূর্তে যাওয়া হয়নি। সে জন্য খিসা খুব রাগ করেছিল। মন খারাপ করে একাই রাঙ্গামাটি গেল। কিন্তু আর ফিরে আসেনি। খবর এলো কাপ্তাই লেকে গোসল করতে নেমে সে ডুবে গিয়েছে।

খিসার মৃত্যুতে আমরা তার সহপাঠীরা খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম। সে ছাত্র-শিক্ষক সবারই প্রিয়পাত্র ছিল। কলেজ ছুটি দিয়ে শোকসভা হয়েছে। ওর হাস্যোজ্জ্বল মুখটা এখনও চোখে ভাসে। বলাবাহুল্য, সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমি মানবেন্দ্রর পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলাম অনেকটা খিসার কারণেই। আইয়ুবের সামরিক শাসনের ওই রুদ্ধশ্বাস দিনে এ ধরনের বিবৃতি দেয়া ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বৈকি। কয়েক মাস পর মানবেন্দ্রকে মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধরত বাঙালিরা চাকমাদের ঢালাওভাবে ‘রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই এই মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ নানাভাবে ঘটতে থাকে। এটা আমাকে ভীষণভাবে চিন্তিত করে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দেশবাংলায় ‘চাকমাদের কাছে টানো’ শিরোনামে একটি নিবন্ধে এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম।

দুর্ভাগ্যবশত আমাদের জাতীয় রাজনীতির শীর্ষস্থানীয়রা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি, জনমিতি ও কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে মাথা ঘামানো কখনই প্রয়োজন মনে করেননি। ফলে ১৯৭২-৭৪ সময়কালে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই এই এলাকাটি নিয়ে সংকট দানা বেঁধে ওঠে।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে লারমা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আমরা তার এবং বান্দরবানের সংসদ সদস্য চাই চ রোয়াজাসহ বিরোধী দলের সদস্যদের সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলাম বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে, তখনকার সাপ্তাহিক দেশবাংলা কার্যালয়ে। সেখানে লারমা তার বক্তৃতায় বাংলাদেশের একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের ভাষাতেই কথা বলেছেন। বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।

’৭৩ সালের শেষ দিকে অথবা ’৭৪ সালের প্রথম দিকে একদিন আমার অফিসে এলেন লারমা ও রোয়াজা। আমার টেবিলের পাশে তাদের দুটি হাতব্যাগ রেখে বললেন, ‘এগুলো থাকল’। তারা প্রায়ই এরকম করতেন। বললাম, ‘এত তাড়া কীসের? চা খেয়ে যাও’। দু’জনই প্রায় সমস্বরে বললেন, ‘শেখ সাহেবের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। বিকালে আসব তখন চা খাব।’ দু’জনের চোখে উৎসাহ-উত্তেজনার ছাপ। বললাম, ‘গুড লাক’! বিকাল চারটা/পাঁচটার দিকে তারা ফিরে আসেন। দু’জনেরই মুখ ভার। বললেন, ‘শেখ সাহেব আমাদের কোন কথা শুনলেন না, বললেন বাঙালি হয়ে যাও’।

লারমার সঙ্গে সেই শেষ দেখা। কিছুদিন পর জানলাম সে শান্তিবাহিনী গঠন করে জঙ্গলে চলে গেছে। তারই ধারাবাহিকতায় কিছুদিনের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার চাকমা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে অবস্থান নিয়েছে। সেখান থেকে প্রশিক্ষিত ও অস্ত্রসজ্জিত বিদ্রোহীরা বারংবার হানা দিয়েছে আমাদের সীমান্তে।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠী পড়ে গেল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও শান্তিবাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের মাঝখানে উভয় সংকটে।

‘শান্তিচুক্তি’ প্রসঙ্গে

১৯৯৭ সালে কথিত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কয়েক মাস আগে আমরা ঢাকায় তিন পার্বত্য জেলার লোকজনের একটা সমাবেশ আয়োজন করেছিলাম। ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে আয়োজিত ওই সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা থেকে প্রায় দুই/তিন হাজার প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছিলেন। আমাকে এতে সভাপতিত্ব করতে হয়েছিল । সমাবেশ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে একটা সুপারিশনামা তৈরি হয়েছিল। সমাবেশ শেষে মিছিলসহযোগে বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদকে সেই সুপারিশসংবলিত একটি স্মারকলিপি দেয়া হয়। ওতে মূল প্রতিপাদ্য ছিল :

(ক) পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জাতি-উপজাতির স্বকীয়তার ‘সাংবিধানিক স্বীকৃতি’ দিতে হবে;

(খ) তিন পার্বত্য জেলাকে দেশের অন্যান্য জেলার সমপর্যায়ে এবং সমমর্যাদায় রাখতে হবে।

পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি-অপাহাড়ি ভেদরেখা দূর করতে হলে উভয় পক্ষের সচেতন উপলব্ধি ও পরস্পর-নির্ভরশীলতার মনোভাব গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। দেশের বৃহত্তর জনসমষ্টিকে যেমন ওই এলাকার মানুষের আস্থা অর্জনে এগিয়ে যেতে হবে, তেমনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই সেদিন তিন পার্বত্য জেলার মানুষকে জড়ো করার চেষ্টা করেছিলাম।

আমার প্রত্যাশা ছিল পাহাড়ি-অপাহাড়ি উভয় পক্ষকে একত্রে বসানো। ওই সময় পাহাড়ি সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় অনেকের সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম। কিন্তু তাদের অনেকে কথা দিয়েও সমাবেশের দিন উপস্থিত হননি। সমাবেশে অংশ না নিলেও তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি সমাবেশ দেখতে এসেছিলেন। রাতে যোগাযোগ করলে কয়েকজন আমাকে বলেছিলেন, আরেকবার এ রকম উদ্যোগ নিলে তারা আসবেন।

অপরদিকে এই সমাবেশ যাদের দিয়ে আয়োজন করেছিলাম, তারা যেন সচেতনভাবেই পাহাড়িদের এড়িয়ে কেবল বাঙালিদের নিয়ে সভাস্থলে হাজির হয়েছেন। মনে হল তারা যেন পাহাড়িদের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করতেই বেশি আগ্রহী, যা আমাকে খুবই মর্মাহত করে। এ জন্য ওই সমাবেশে আমাকে প্রধান করে একটা কমিটি করার প্রস্তাব উঠলে তাতে সম্মত হইনি। সিদ্ধান্ত হয়, পাহাড়ি-বাঙালি উভয় পক্ষের অংশগ্রহণে আরেকটি সমাবেশ করে সেই কমিটি গঠন করা হবে। কিন্তু সেই কাজটি আর হয়নি। আমিও এই উদ্যোগ থেকে সরে যাই। তার কিছুদিন পরেই স্বাক্ষরিত হয় তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তি’।    

শান্তিচুক্তি, না চির-অশান্তির বিষবৃক্ষ?

এটা স্পষ্ট যে, সত্তরের দশকে বাংলাদেশের প্রায় ৫০ হাজার উপজাতীয় জনগণের ভারত গমনের ঘটনাটি আমাদের প্রতিবেশী ভারতীয় পক্ষের প্রত্যক্ষ মদদ ও উৎসাহ ছাড়া ঘটেনি। কিন্তু শ্রীলংকার তামিল বিদ্রোহের মতো এক্ষেত্রেও ভারতীয় পক্ষের এই পদক্ষেপ ছিল আত্মঘাতী। শ্রীলংকার ক্ষেত্রে যেমন অল্পদিনেই তামিল বিদ্রোহ বুমেরাং হয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তেমনি ওই সময় ত্রিপুরা ও মিজোরামে বাংলাদেশের উপজাতীয় বিদ্রোহীদের অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সাত বোন’-এর নাজুক অবস্থা আরও নাজুক করে তুলছিল। কথিত ‘জুমল্যান্ড’-এর সমীকরণে বহু পুরাতন ‘অপারেশন ব্রহ্মপুত্র’ নবরূপে আবির্ভাবের রাস্তা তৈরি হচ্ছিল।

সে জন্যই শেষ পর্যন্ত ভারতের নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ে এবং শ্রীলংকার মতো এক্ষেত্রেও তারা অ্যাবাউট টার্ন করলেন। নিজ প্রয়োজনেই তারা এটা করেছেন। তারই ফসল ‘শান্তিচুক্তি’।

৫০ হাজার চাকমা শরণার্থীকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে ফেরত পাঠিয়ে ভারত তার বালাই দূর করল বটে; কিন্তু বাংলাদেশকে গিলতে হল একটি অবাস্তবায়নযোগ্য চুক্তির আদলে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চির-অশান্তির বিষবৃক্ষ, যা এখন চুক্তি সম্পাদনকারী আওয়ামী লীগ, এমনকি ‘জনসংহতি সমিতি’র জন্যও, গলার কাঁটা; যার বিষময় ফল পাহাড়ি বা বাঙালি কারও জন্যই সুখকর হয়নি।

‘আদিবাসী’ প্রসঙ্গে আরও কিছু কথা

এ বিষয়টি নিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে এই কাগজেই আমার কিছু মন্তব্য তুলে ধরেছি। বাংলাদেশে কোন আদিবাসী নেই। এই ভূখণ্ডে যদি কোন জনগোষ্ঠী আদিবাসী, অর্থাৎ সুদূর অতীত থেকে বসবাসের দাবিদার হয়, তাহলে বাঙালি কৃষকই সেই দাবি করতে পারে, আর কেউ নয়। কারণ বাঙালি কৃষক এই ভূখণ্ডের মাটি কামড়ে পড়ে আছে কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর।

আসলে কে ‘আদিবাসী’ এটা ‘দাবি’ করার বিষয় নয়, ইতিহাস পর্যালোচনার বিষয়। যারা আদিবাসী তাদের অবশ্যই আদিবাসী বলতে হবে। কিন্তু যেসব জনগোষ্ঠী সাম্প্রতিক কয়েক শতকে এ অঞ্চলে বসবাস করতে এসেছে, তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার কোন সুযোগ নেই। যদিও তাদের নাগরিক সম-অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য।

কিছু বিদেশী সংস্থা তাদের বৈশ্বিক এজেন্ডার অংশ হিসেবে এখন সারা বিশ্বে ‘আদিবাসী’ ও ‘দলিত’ খুঁজে বেড়াচ্ছে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু এনজিও বাংলাদেশেও ‘আদিবাসী’, এমনকি ‘দলিত’ খোঁজার জন্য দূরবিন ও অণুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছে। কিছু পিছিয়ে থাকা মানবগোষ্ঠীকে প্রাগৈতিহাসিক জাদুঘরের বস্তু হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস লক্ষণীয়। সম্প্রতি সন্তু লারমা তাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। চাকমা সম্প্রদায়ের মতো একটি সুসভ্য জনগোষ্ঠীকে ধনড়ৎরমরহধষ হিসেবে আখ্যায়িত করতে হবে কেন? মং রাজা অং শে প্রু চৌধুরী স্পষ্ট করেই বলেছেন, তার মারমা সম্প্রদায় আদিবাসী নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে কর্মচঞ্চল করে তুলতে হবে

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বসবাসরত সব ক্ষুদ্র জাতি-উপজাতি ও ক্ষুদ্রজাতির প্রধান দাবিই হচ্ছে তাদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতি প্রদান করে তাদের জাতীয় জীবনের মূলধারায় সন্নিবিষ্ট করার বাস্তবসম্মত কার্যক্রম গ্রহণ করাই ছিল জরুরি। তা না করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের অনুসৃত বিভাজনের নীতির আদলে পার্বত্য জেলাগুলোকে অন্যান্য জেলা থেকে পৃথক সত্তা প্রদানের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যার ফলে একদিকে ওই এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে অন্যান্য জেলার মানুষকে ওই অঞ্চলে বহিরাগত ও অবাঞ্ছিত বিবেচনা করার পথ করে দেয়া হয়েছে।

বিলম্বে হলেও সম্প্রতি বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ‘আদিবাসী’ ইস্যুতেও সরকারের অবস্থান ইতিবাচক। তবে আরও আগে, বিশেষ করে ১৯৯৭ এর কথিত শান্তিচুক্তির আগে, উপরে উল্লিখিত সম্মেলনের সুপারিশ যদি কানে তোলা হতো তাহলে সম্ভবত তখনই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার একটা সমাধান বের হয়ে আসত।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতা এবং প্রতিরক্ষার কৌশলগত গুরুত্ব বিচারে এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের জন্য প্রাণ-ভোমরাসদৃশ। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে কোন ধরনের হেলাফেলা করার বা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য দায়িত্বহীন মন্তব্য করার অধিকার কারও নেই। এই অঞ্চলের মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে যেমন মূল্য দিতে হবে, তেমনি এই অঞ্চলকে ঘিরে দেশী-বিদেশী কোন মহলকেই পানি ঘোলা করার সুযোগ দেয়া যাবে না। এমনকি এ অঞ্চলের কোন জনসমষ্টিকেও নয়।

সব রাষ্ট্রকেই তার সীমান্ত এবং প্রান্তিক এলাকাগুলোর দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হয়। ভারত তার অরুণাচল, তেরাই এবং চীন ও পাকিন্তান সীমান্ত বরাবর জনবিরল অঞ্চলগুলোতে জনবসতি বাড়িয়ে সুদৃঢ় সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সামনেও কোন বিকল্প নেই।

তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোকে পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মচঞ্চল করে তুলতে হবে অতি দ্রুত। সেই উন্নয়নের ধারায় পাহাড়ি জনগণকে, যারা অন্যদের চেয়ে আগে সেখানে বসবাস শুরু করেছে, অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেইসঙ্গে তিন পার্বত্য জেলাকে দেশের অন্যান্য জেলার সমমর্যাদায় রাখতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনবিরল হলেও আয়তনে দেশের এক-দশমাংশ। জাতীয় উন্নয়ন বাজেটে সেই বাস্তবতার প্রতিফলন থাকা আবশ্যক। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এ এলাকার সব সমস্যার নিষ্পত্তি হতে পারে। আর তা হওয়া উচিত কোন বিদেশী এনজিও বা আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন ছাড়া, নিজস্ব অর্থায়নে। সে সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্ত।

লেখক: খ্যাতিমান সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, পিডিপি shapshin@gtlbd.com

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-২

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ