চাকমারা মানুষ মারলে এই দেশে বিচার অয় না, বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে- পাকুয়াখালী গণহত্যা থেকে একমাত্র জীবিত বেঁচে আসা ইউনুস মিয়া

Yunus

বাংলাদেশের পার্বত্যচট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি সাক্ষরের পূর্ব পর্যন্ত অজস্র হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোন কোন হত্যাকান্ডের নৃসংশতা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যাগুলোকেও হারমানায়। পাকুয়াখালী ট্রাজেডি এই নৃসংশ গণহত্যাগুলোরই একটি। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়িতে ঘটে বর্বরতম এই ঘটনা। এই দিন পাকুয়াখালীতে শান্তিবাহিনী ঘটিয়েছিল পার্বত্য ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ড। ৩৫ জন নিরীহ বাঙালি কাঠুরিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে বিকৃত করেছিল তাদের প্রতিটি লাশ। সেদিন ঘটনাস্থল থেকে সৃষ্টিকর্তার অসীম করুণায় পালিয়ে আসতে পেরেছিল মুহাম্মদ ইউনুছ মিয়া নামের এক ভাগ্যবান। সেদিনের সেই মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা ইউনুছ মিয়ার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- সৈয়দ ইবনে রহমত।

প্রঃ কি করছিলেন?
উঃ গায়ে জ্বর, শুইয়া আছিলাম।

প্রঃ কতদিন যাবৎ জ্বর? ওষুধপত্র খাচ্ছেন না?
উঃ দুইদিন ধইরা জ্বর। ভাই, ওষুধপাতি খাইয়া কি অইব। জ্বরের লাগি ওষুধ খাইলেই কি আর না খাইলেই কি। এই বাড়ে-এই কমে, ওষুধ খাওন লাগব না, দুই দিন পরে এমনেই সাইরা যাইব।

প্রঃ আপনার কাছে আসার উদ্দেশ্য হলো পাকুয়াখালী হত্যাকান্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানা।
উঃ এইসব কইয়া লাভ কি? কতই তো কইলাম। আর্মি, পুলিশ, সিআইডির অফিসার, সাংবাদিক, আরো কতজনের লগে কইছি। কই, কিছুইতো অইল না। এইসব কইয়া আর মনের জ্বালাটা বাড়াইয়া লাভ কি?

প্রঃ আপনারা তো জানতেন যে, পাহাড়ে শান্তিবাহিনী আছে, তারা বাঙালির দেখা মাত্রই গুলি করে। তারপরও পাহাড়ে যাওয়ার সাহস পেলেন কিভাবে?
উঃ ভাই, শখ কইরা কেউ কী আর মরণের সামনে যায়? পেটের দায়ে যাওন লাগে। পাহাড়ে যাওন ছাড়া আর তো বাঁচনের পথ নাই। সামান্য জমি-জমা যা আছে এইডাও তো কোন বছর চাষ কইরা ঘরে তোলা যায় না। কাপ্তাই বান্ধের পানি আইসা ডুবাইয়া দেয়। তাই বাধ্য অইয়াই পাহাড়ে যাওন লাগে। আর পাকুয়াখালীর ঘটনার সময়তো কোন ভয় আছিল না। তখন শান্তিবাহিনীর লগে আমাদের চুক্তি আছিল। আমরা তাদেরকে ১ ফুট (এক ঘনফুট) গাছের বিনিময়ে ৪০/৫০ টাকা কইরা চান্দা দিতাম।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে কখন থেকে টাকার বিনিময়ে গাছ কাটার চুক্তি হয়েছিল?
উঃ পাকুয়াখালীর ঘটনার ৫/৬ বছর আগে একদিন বড় মাহিল্যার তক্তা নজরুল (লম্বা এবং হালকা পাতলা গড়নের কারণে তাকে লোকজন তক্তা নজরুল নামে চিনত) আমাদের কইল, পাহাড়ে গাছ কাটতে গেলে শান্তিবাহিনীরা আর বাঙালিরে গুলি করব না। কিন্তু তাদেরকে চান্দা দিতে অইব। তারপর থাইক্যা শুরু অইল গাছ কাটা। আগের থাইক্যাই চাকমাদের লগে নজরুল ভাইয়ের বালা সম্পর্ক আছিল। চাকমাদের বাড়ীতে মাঝে মধ্যে হে যাইত, আবার চাকমারাও হের বাড়ীতে আসা যাওয়া করত। এদের মধ্যে কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তারাই তক্তা নজরুলরে দিয়া চান্দার মাধ্যমে গাছ কাটার খবর দিছিল।

প্রঃ চাঁদা দিয়া যখন গাছ কাটতেন, তখন আপনাদের সাথে শান্তিবাহিনী কেমন আচরণ করত?
উঃ এমনিতে তারা কোন খারাপ আচরণ করত না। তবে তাদের আইন কানুন আছিল খুব কড়া। যেই দিন যা কইতো, তাই করতে অইতো। কেউ কথা না হুনলে মাইর-ধোর করতো, পাহাড়ে যাওন বন্ধ কইরা দিত।

প্রঃ আপনারা যেখানে গাছ কাটতে যেতেন, সেখানকার চাকমাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ আমরা যেখানে গাছ কাটতে যাইতাম সেখানে অনেক চাকমা বসবাস করত। এদের কেউ কেউ শান্তিবাহিনীও আছিল। তবে বেশির ভাগই ছিল আমাদের মতই সাধারণ মানুষ। তারাও আমাদের সাথে গাছ কাটত। স্থানীয় এইসব চাকমাদের লগে আমাদের বালা সম্পর্ক আছিল। তারা আমাদের ঈদ-পরবের সময় বেড়াইতে আইত। আমরাও বিজুর (চাকমাদের বাৎসরিক উৎসব) সময় তাদের বাড়ীতে বেড়াইতে যাইতাম। অনেক সময় পাহাড়ে কোন গন্ডগোলের ভাব থাকলে তারা আমাদেরকে আগেই জানাইয়া দিত।

প্রঃ শান্তিবাহিনীর সাথে স্থানীয় চাকমাদের সম্পর্ক কেমন ছিল?
উঃ শান্তিবাহিনীরা স্থানীয় চাকমাদের উপরেও অত্যাচার করতো, ওদের কাছ থাইকয়াও চান্দা নিত। সামান্য ভুল-ত্রুটি অইলে বা তাদের কথামতো না চললে মাইর-ধোর করতো। কতজনরে তো গুলি কইরা মাইরাও ফালাইছে। শান্তিবাহিনীর খাওন-খোরাক অনেক সময় বাজার থাইক্যা কিইন্যা পাহাড়ে গিয়া দিয় আইতে অইতো। তাই স্থানীয় চাকমারা কৌশলে শান্তিবাহিনীর কালেক্টরদেরকে বিপদে ফালাইয়া তাড়ানোর চেষ্টা করতো। কোন কোন সময় মদ-টদ খাওয়াইয়া মাইয়া সংক্রান্ত ঝামেলায় ফালাইতো, আবার কোন কোন সময় টাকা-পয়সার হিসাবে গোলমাল লাগাইয়া শান্তিবাহিনীর বড় অফিসারের কাছে নালিশ করতো। এমনও সময় গেছে যখন এক মাসের মধ্যে তিন-চারজন কালেক্টর বদল হইছে।

প্রঃ দুই মাসের চাঁদা বাকি পড়ায় শান্তিবাহিনী ব্যবসায়ীদেরকে একটা মিটিংয়ে ডেকেছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা না যাওয়ায় তারা ক্ষেপে গিয়ে এই হত্যাকান্ড চালিয়ে ছিল বলে অনেকে মনে করে। আপনারও কি তাই মনে হয়?
উঃ এইডা একটা ফালতু কথা। ব্যবসায়ীরা পাহাড়েও যায় না। পাহাড়ে গিয়া কখনো চান্দা দেয় না। পাহাড়ে যাই আমরা। কাঠ বলেন, বাঁশ বলেন, তার চান্দা প্রত্যেক দিন সন্ধ্যার সময় দিয়াই আনতে হইত। কোন দিনের চান্দাই বাকি থাকত না।

প্রঃ ব্যবসায়ীদের কথা বলছি-
উঃ ব্যবসায়ীরা তাদের মাল (কাঠ, বাঁশ) নেওনের সময় রাস্তায় রাস্তায় চান্দা দেয়। চান্দা ছাড়া ১ ফুট গাছ নেওনের ক্ষেমতাও ব্যবসায়ীদে নাই। চান্দা বাকী রাইখ্যা শান্তিবাহিনী গাছ নিতে দিছে এই কথা জীবনেও শুনি নাই। ব্যবসা করতে চাইলে তাদেরকে চান্দা দেওনই লাগবো। আর হেগোর লাইগ্যা আমাদের মতন গরীব মানুষেরে মারব ক্যান্?

প্রঃ এতগুলো মানুষকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পিছনে কি কারণ আছে বলে আপনার মনে হয়?
উঃ জানি না ভাই। কি জন্য যে মারল, হেইডাই তো কইতে পারি না। ওরা ভাই বিশ্বাসঘাতক, মীরজাফর, তক্তা নজরুলরে পর্যন্ত মাইরা ফালাইল। যে নিজে না খাইয়াও হেগোরে খাওয়াইছে, কত বিপদ থাইক্যা উদ্ধার করছে।

প্রঃ ঘটনার দিন পাহাড়ে গিয়ে সন্দেহজনক কিছু দেখেছিলেন?
উঃ ঐদিন আমার পোলাগো মোসলমানির (খৎনা করার) কথা আছিল। তাছাড়া শরীরটাও বেশি বালা আছিলনা। কিন্তু আলাল ভাই (স্ত্রীর বড় ভাই) কইল, পাহাড়ে যাওনের লাগি। একরকম জোরের মধ্যেই আমি আলাল ভাইয়ের লগে রওনা হইলাম। অফিস ছড়া দিয়া পাহাড়ে ঢুকলাম। কেচিং (একটা জায়গার নাম) থাইক্যা সামান্য উপরে একটা দোকান। দোকানে দেখলাম তিনজন শান্তিবাহিনী অস্ত্র নিয়া বইসা আছে। এইডাতে অবশ্য সন্দেহ করি নাই। এই রকমতো মাঝে মধ্যেই দেখতাম। আলাল ভাইয়ের সাথে গ্যানো চাকমার ছোটখাট ব্যবসা আছিল। আলাল ভাই তার জন্য কিছু টাকা নিয়া গেছিল। টাকা দেওনের লাগি আলাল ভাই যখন গ্যানো চাকমার সাথে কথা কইতেছিল তখন কালু চাকমা এবং তার সাথের কয়েকজন আইসা কইল, মিটিং আছে, ভিতরে যাইতে অইব। তখন আলাল ভাই কইল, গ্যানো বদ্দা, তোমার টাকা মিটিং থাইক্যা আসার সময় দিব। কিন্তু গ্যানো চাকমা, টাকাটা তখনই লইতে চাইছিল। কালু চাকমা আলাল ভাইরে কইল, যাওনের সময় দিয়া যাওনের লাইগ্যা।

প্রঃ প্রথম কখন বুঝতে পারলেন যে, কোন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা আছে?
উঃ কালু চাকমার সাথে কিছুদূর যাইতেই দেখি রাস্তার দুই পাশে চার জন করে মোট আট জন এসএম জি নিয়া বইসা আছে। আমরা কাছে যাওন মাত্রই আমাদেরকে ঘিরে ফালাইল। এই অবস্থা দেইখ্যাই আমার প্রথম মনে অইল যে, আজকে আমাদেরকে মাইরা ফালাইব। পকেট থাইক্যা টাকা পয়সা সব রাইখ্যা কালু চাকমা আর তার লগের একজন আমাদের হাত পিছ-মোড়া কইরা গাছের লতা দিয়া বানল। বান্ধার সময় কইল মিটিংয়ের জায়গা নিয়া বান ছাইড়া দিব। তখন আমি কইলাম ছাইড়াই যখন দিবা, তখন অত শক্ত কইরা বান্ধনের দরকার কী, আমরাতো পালাইতেছি না। আমিও হাত এমন ভাবে রাখলাম যাতে বান বেশি শক্ত না হয়।

প্রঃ আপনাদের বেঁধে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে গিয়ে কি দেখলেন?
উঃ ১৫/২০ মিনিট হাইট্টা ভিতরে যাওনের পর দেখলাম একাটা মেড়া গাছের লগে তক্তা নজরুলসহ ৪ জন বান্ধা। সামনেই অন্যান্য গাছের লগে আরো মানুষ বান্ধা। গুনে দেখলাম আমিসহ ২৯ জন। এলএমজি ও এসএমজি হাতে পাহাড়া দিতেছে ১৯ জন শান্তিবাহিনী। আর লাঠি, দা, কুইচ্যা মারা শিক হাতে আরো ১২ জন চাকমা আছে, এদের মধ্যে কয়েকজনরে আমি চিনি। তারা হল- লাম্পায়া চাকমা, ছিক্কা কারবারী, বলি চাকমা, শান্তিময় চাকমা, বাবুল চাকমা, গুলুক্যা চাকমা, তরুন চাকমা(কালেক্টর), কবির চাকমা, বাশি চাকমা, বিমল চাকমা এবং সমিতি রঞ্জন চাকমা। এক সময় শান্তিবাহিনীর একজন একটা খাতা ও কলম নিয়া আমাদের সবার নাম লিখল এবং কার কাছ থাইক্যা রাস্তায় কত টাকা এবং কি কি জিনিস পত্র রাখা হইছে তা লিখল।

প্রঃ বাঁধা অবস্থা থেকে আপনি পালালেন কিভাবে?
উঃ কিছুক্ষণ পর কালাপাকুইজ্যার ৫ জনরে গাছের থাইক্যা দড়ি খুইল্লা আরো সামনের দিকে লইয়া গেল। তাদের সাথে গেল ২ জন অস্ত্রধারী আর ৩ জন গেল দা, লাঠি, কুইচ্যা মারার শিক নিয়া। ১০/১২ মিনিট পর নজরুল ভাইসহ আরো ৫ জনরে নিয়া গেল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম নজরুল ভাই আর যাইতে চাইতেছে না। তখন একজন তারে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়া নিয়া গেল। তখনই বুঝলাম যে, লোকজনেরে সামনে নিয়া মাইরা ফালাইতেছে। কারণ নজরুল ভাইরে ঘাড়ে ধরা দূরের কথা. তার লগে গরম অইয়াও চাকমাদেরকে কথা কইতে কোন দিন দেহি নাই। তখন আমি একজনরে কইলাম, দাদা আমি একটু পেশাব করব। উনি এবং আরেক জন আমাকে একটু দূরে নিয়া গেল। পেশাবের ছল কইরা কিছুক্ষণ বইসা থাইক্যা মনে মনে ঠিক করছিলাম খাড়াইয়াই দৌড় দিমু। কিন্তু যখন খাড়াইলাম, তখন ঠাস কইরা বাঁকা একটা বাঁশের লগে মাথাটা বাড়ি লাগল। তখন আমার সাথের শান্তিবাহিনী দুইজন সর্তক হইয়া গেল। আমি মাথা হাতাইতে হাতাইতে আবার আগের জায়গায় আইলাম। আমারে আবার অন্যদের লগে বানল। তখন খুব লুকাইয়া লুকাইয়া আমি আমার হাতের বান খুইলা ফালাইলাম এবং কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেই জন্য হাতের নিচে চাইপ্যা রাখলাম। তারপর আল্লাহর নাম লইয়া দিলাম এক দৌড়।

কিন্তু সামনেই দেখি এলএমজি নিয়া একজন খাড়াইয়া রইছে। আমারে কইল, দৌড় দিবিনা, ব্রাশ কইরা দিমু, তখন আমি ডান পাশের ছড়ার দিকে লাফ দিলাম। লাফ দেয়ার সাথে সাথে ব্রাশ ফায়ারের শব্দ শুনলাম, আর শব্দ শুনতে শুনতেই গড়ায়ে পড়লাম নিচের দিকে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা গাছের গুড়ির দিকে গর্তমতো জাগা পাইলাম। সেইখানে বইসা মাথার উপরে জঙ্গল টাইন্যা ধইরা রাখলাম। ভয়ে তখন আমার বুকের মধ্যে এমন জোরে আওয়াজ অইতেছিল যে, মনে হইছিল এই শব্দ না জানি শান্তিবাহিনী শুইনা ফালায়। রাত হওয়ার পর ছড়া দিয়াই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। ছড়ার মধ্যে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও গলা পানি, আবার কোথাও সাঁতার। ঘন জঙ্গলে ভরা ছড়া দিয়ে চলবার মত কোন পথ নাই। তার উপর আবার নিশি অন্ধকার। ছড়ার মধ্যে ঠান্ডা পানি, বেতের কাঁটা, বিষাক্ত সাপ, হিংস্র প্রাণীর ভয়ও ছিল। কিন্তু তখন এক শান্তিবাহিনী ছাড়া আর কিছুকেই ভয় হচ্ছিল না। সারা রাত হেঁটে হেঁটে অবশেষে ভোরের দিকে পাহাড় থেকে বের হই।

প্রঃ ১১ তারিখ সেনাবাহিনীর লাশ উদ্ধারের কথা কিছু বলুন।
উঃ বাড়িতে আসার পর আর্মিরা যহন জানল যে আমাকেও শান্তিবাহিনী ধরে নিয়া গেছিল। তহন তারা আমাকে সাথে নিয়া গেল পথ দেখানোর জন্য। আমি তাদের পাহাড়ে নিয়া গেলাম। তক্তা নজরুলরে যেইখানে ঘাড়ে ধাক্কা দিছিল, সেইখান থাইকা আরেকটু সামনে গিয়া দেখলাম, বাম দিকে প্রায় এক-দেড়’শ গজ পাহাড়ের নিচে একটা বেড়া। নিচে নাইমা সেই বেড়া পার হইলাম। কিন্তু তারপর আর রাস্তার কোন চিহ্ন নাই। একটু দূরে দেখলাম, একটা কাঁচা বাঁশের কঞ্চি আধা ভাঙ্গা অবস্থায় ঝুইলা রইছে। কঞ্চিটা সরানোর পর একটা ছোট পথ পাইলাম। এই পথ দিয়া সামনে গিয়া দেখি সরাফদ্দি ভাইয়ের টুপিটা একটা কঞ্চির লগে বাইজ্যা রইছে। এরপর সেন্ডেল, মদের টেংকি, বেশ কয়ডা লাঠিও দেখলাম। তারপর দেখলাম আলাল ভাইয়ের লাশ। আরেকটু সামনে গিয়া দেখি বিশাল জায়গা জুইড়া লাশ আর লাশ। কেউরে চিনা যায় না। বন্দুকের সামনে যে চাকুটা (বেয়নেট) থাকে এইডা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া মারছে। লাঠি দিয়া পিটাইয়া, দা দিয়া কুবাইয়া, কুইচ্যা মারার শিক দিয়া পারাইয়া, চোখ তুইলা, আরো কতভাবে যে কষ্ট দিয়া মারছে তা কইয়া শেষ করুন যাইব না। ঐকথা মনে অইলে আইজো শরীরের পশম খাড়াইয়া যায়। ঐখানে লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের।

Pakuakhali-4

Pakuakhali-2

Pakuakhali-

pakuakhali-00

ছবি: পাকুয়াখালিতে নিহত কয়েকজন কাঠুরিয়ার লাশ

প্রঃ মানুষ মারা গিয়েছিল ৩৫ জন,  আপনি বলছেন লাশ পাওয়া যায় ২৮ জনের। বাকিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?
উঃ ঘটনার দিন আমি যাদেরকে বান্ধা অবস্থায় দেখছিলাম তাদের মধ্যে আমার পরিচিত আলী, দুলু দুই ভাইসহ ৪ জনের লাশ ঐখানে ছিল না। আর এমন তিনজনের লাশ পাইছি যারা ঐ দিন ঐখানে বান্ধা ছিল না। আমার মনে হয়, আমি পালানোর পরে আরো সাত জনরে শান্তিবাহিনীরা ধইরা নিয়া গেছিল। সাত জনরে মনে হয় অন্য কোন খানে নিয়া মারছে, আমরা তাদের লাশ খুইজ্জা বাইর করতে পারি নাই। আর বালা কইরা খুজবার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না।

প্রঃ শান্তিবাহিনী এতগুলো মানুষকে একসাথে হত্যা করল, অথচ তাদের কোন বিচার হল না। আপনারা কি সরকারের কাছে এর বিচার চান নাই?
উঃ আমরাতো বিচারের দাবী করছিই, আমি নিজে বাদী অইয়া মামলাও করছিলাম। তখন সরকারের মন্ত্রীরাও কইছিল বিচার করব। তদন্তও করছিল। হুনছি তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দিছে। কিন্তু সেই রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। দেখতে দেখতে আজ ১৪ বছর পার অইয়া গেল। কই, কিছুই তো অইল না। শুধু এইডাই না, শান্তিবাহিনী তো আরো অনেক বাঙালিরে মারছে। কোনডারই তো বিচা অয় নাই। চাকমারা মানুষ মারলে তো এই দেশে বিচার অয় না। বিচার অয় চাকমাদেরকে কেউ গালি দিলে, তার। আর অহন তো চুক্তি কইরা শান্তিবাহিনীরাই সরকার (সাবেক শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমা চুক্তির পর থেকে পার্বত্যচট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন) অইছে। তাইলে আর বিচার করব কেডা?

তারপরেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার দাবী, আপনার বাবাকেও মাইরা ফালাইছিল। বাবা হারানোর ব্যথা আপনি বুঝেন। আর আপনি সেই হত্যাকারীদের বিচার করেছেন। এই জন্য আপনাকেই বলি- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, পাকুয়াখালীতে যেসব সন্তান তাদের বাবাকে হারিয়েছে তারাও তাদের বাবা হত্যার বিচার চায়, যারা সেখানে ভাই হারিয়েছে তারা তাদের ভাই হত্যার বিচার চায়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছে তারা সন্তান হত্যাকারীর বিচার চায়, যেসব মহিলা স্বামী হারিয়েছে তারা স্বামী হত্যার বিচার চায়। কিন্তু তারা তো আর প্রধানমন্ত্রী হইয়া আত্বীয়-স্বজনদের হত্যাকারীর বিচার করতে পারব না। তাই এই হত্যাকান্ডের বিচার আপনাকেই করতে হইব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশে আদিবাসী বিষয়ে আরো পড়ুন:

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩

চাকমা রাজপরিবারের গোপন ইতিহাস

পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধ ধর্মের ভবিষ্যৎ-৩

বাংলাদেশে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ প্রচারণা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ প্রশ্নসাপেক্ষ

একের পর এক মটর সাইকেল চালক কেন টার্গেট হচ্ছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের

খাগড়াছড়ি সাড়ে ৬ বছরে ১৬ মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

খাগড়াছড়িতে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল চালক খুন, অপহরণ, গুম ও হামলা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই এখন নিত্যনৈতিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় সাড়ে ৬ বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত ৮জন মোটর সাইকেল চালক যাত্রীবেশীদের হাতে খুন হয়েছে। গুম হয়েছেন ৮জন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। অপহরণ হয়েছে অন্তত এক ডজন। এছাড়া অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরি হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যেমন বিচার পায়নি, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো ফিরে আসবে সে প্রতিক্ষায় আছে তাদের পরিবার- স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন পার করছে। সে সাথে একের পর এক মোটর সাইকেল চালক খন-গুমের ঘটনায় প্রায় অস্থির হয়ে আছে খাগড়াছড়ি।

এ সকল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে জেলায় দফায় দফায় হরতাল-অবরোধে উত্তাল হয়েছে। এছাড়াও মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের কাছ থেকে বিচারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে এ সকল হতভাগ্য মোটরসাইকেল চালকের জীবনে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি।

এদিকে একের পর এক মোটরসাইকেল চালকদের খুন, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।

খাগড়াছড়িতে যাত্রী পরিবহনের মোটরসাইকেল একটি জনপ্রিয় বাহন। ভূ প্রকৃতি এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। জেলায় অন্তত দুই হাজার বেকার যুবক ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু একের পর এক যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন চালকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত প্রায় ছয় বছরে ১৬ জন মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম হয়েছে। জেলার মহালছড়ি ছাদিকুল ইসলাম, মাটিরাঙার আজিজুল হাকিম শান্ত, আব্দুর রহিম, গুইমারা নিজাম উদ্দিন সোহাগ, দীঘিনালার শাহ আলম, আব্দুস সাত্তার, চান মিয়া ও সর্বশেষ পার্শ্ববর্তী লংগদু উপজেলার নুরুল ইসলাম নয়ন খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকায়।

লংগদুতে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়ি বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়ন হত্যাকান্ডটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসলেও অন্য হত্যাকান্ডগুলো তেমন কোন আলোচনায় আসেনি। একই সময় দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক আবুল কাশেম, মো: আলী, পানছড়ির হোসেন আলী, মানিকছড়ির মো: মোরশেদ, রাজিব কান্তি দে, গুইমারার রেজাউল করিম, আল আমীন ও শংকর দীর্ঘ দিন ধরে মোটরসাইকেলসহ নিখোঁজ রয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে খাগড়াছড়িতে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধার হয়েছে মাত্র কয়েকটি। প্রতিটি খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে।

সর্বশেষ গত ১ জুন খাগড়াছড়ির যৌথ খামার এলাকায় খুন হন লংগদু উপজেলার যুবলীগের নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তার এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরের দিন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ী ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

নিহত নয়নের ছোট ভাই লিটনের অভিযোগ ঐদিন সকালে তার বড় ভাই দুই পাহাড়ি যাত্রীকে নিয়ে খাগড়াছড়ি আসার পর নিখোঁজ হন। পরে সামাজিকে যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভাইয়ে লাশের সন্ধান পান।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো: আব্দুল হান্নান পার্বত্যনিউজকে জানান, নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যার ঘটনায় তার ভাই লিটন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে মামলা করেছেন। নয়ন হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিঘ্রই সু-সংবাদ পাবেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে (২৩) দুই উপজাতি মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিহত ছাদিকুলের নিহত ছাদিকুল ইসলামের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, দুই উপজাতি লোক ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে তার ভাইকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে তাকে ভাড়া করে নিয়ে যায়।

নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী দুপরে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রিছাং ঝর্না এলাকার দুর্গম পাহাড় থেকে মাটিরাযার মেটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত’র লাশ পুলিশ।

মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু পার্বত্যনিউজকে জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রী নিয়ে মাটিরাঙা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন মোটর সাইকেল চালক মো: আজিজুল হাকিম শান্ত। এ ঘটনায় ধন বিকাশ ত্রিপুরা নামে একজনকে আটকের পর তিনি ঘটনার সাথে জড়িত আরো দুই জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে জানিয়েছেন মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু। তবে শান্ত’র মোটরসাইকেলটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

নিখোঁজের একদিন পর ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক মো: আবদুর রহিমের (২৫) লাশ উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ। নিহত আবদুর রহিম বেলছড়ির ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর আলম এর ছেলে।

পুলিশ জানায়, এক সন্তানের জনক মো: আবদুর রহিম ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ১৭ সেপ্টেম্বর সে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়,কিন্তু রাতে সে বাড়ি ফিরেনি। পরের দিন বিকাল ৩টায় স্থানীয় নারী শ্রমিকরা লাকড়ি কুড়াতে গেলে বেলছড়ির হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গলে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বিজিবিকে খবর দেয়।

একই বছরের ৭ মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার ভৈরফা পাড়া এলাকায় শাহ আলম নামে এক মোটরসাইকেল চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহ আলমের লাশ উদ্ধার করে।

২০১৬ সালের ২৭ জন নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। স্থানীয় সমীর পালের ছেলে রাজিব দুপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মোটর সাইকেল চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা ময়িা‘র ছেলে মো: খলিলুর রহমান (২৭) কে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একই বছরের ৩০ জুলাই খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থেকে চন্দন ত্রিপুরা (২৪) নামে ভাড়ায় চালিত এক মোটরসাইকেলে চালককে অপহরণ করেছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। উপজেলার গামারীঢালা এলাকা থেকে  তাকে অপহরণ করা হয়। অপহৃত চালকের বাড়ি জেলা শহরের খাগড়াপুর হাদুক পাড়ায়।

২০১১ সালের ১০ জন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার জালিয়াপাড়ার মাহবুব নগর এলাকায় মোটরসাইকেল চালক নিজাম উদ্দিন সোহাগকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা। সে গুইমারা উপজেলার কালাপানি এলাকার বাসিন্দা সালেহ আহমেদের ছেলে।

পুলিশ জানায়, সোহাগ দুই যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পথে নির্মম এ ঘটনা ঘটে। সোহাগ মাহবুব নগর পৌছুলে যাত্রীবেশী হোন্ডা ছিনতাইকারী তাকে কুপিয়ে এবং জবাই করে লাশ রাস্তায় ফেলে হোন্ডা নিয়ে পালিয়ে যায়।

এছাড়া ২০১১ সালে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে জেলার দীঘিনালার কবাখালীর বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও চান মিয়া।

এদিকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী নিখোঁজ রয়েছেন। সে উপজেলার দক্ষিণ মিলনপুর গ্রামের হরমুজ আলীর পুত্র। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী মোছা ফাতেমা বেগম দীঘিনালা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম পার্বত্যনিউজকে জানান, তার স্বামী ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী বিকালে উপজেলার বাসটার্মিনাল থেকে একজন যাত্রী নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় যায়। এর পর থেকেই সে আর বাড়ি ফিরেনি। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম জানান, সংসারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি স্বামী নিখোঁজ থাকায় দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন তিনি। স্বামীকে উদ্ধারে প্রশাসনও কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে ফাতেমা বেগম।

২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন দীঘিনালার রশিকনগরে বাসিন্দা আবুল কাশেম পিসি।

আবুল কাশেম পিসির স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম পার্বত্যনিউজকে বলেন, নিখোঁজের পর স্বামীর লাশটাও পাননি তিনি। সংসারের এক মাত্র আয় সক্ষম স্বামী না থাকায় এক মেয়ে ও চার ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কোথাও থেকে কোন ধরনের সহযোগিতাও তিনি পাননি।

আবুল কাশেম পিসির ছেলে সাইদুর রহমান পিতার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানান প্রশাসনের কাছে।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন, জেলার পানছড়ি উপজেলার নিখোঁজ মোটর সাইকেল চালক হোসেন আলী। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির জিয়ানগর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে। তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি মাটিরাঙ্গা সদর ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের ব্রজেন্দ্র কার্বারী পাড়ার নির্জন এলাকা থেকে পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্বার করলেও হোসেন আলীর সন্ধান মেলেনি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে হোসেন আলী যাত্রী নিয়ে যায় । এর পর থেকে সে নিখোঁজ। এ ঘটনায় ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪জনকে। নিখোঁজ হোসেন আলীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ জুন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে।

২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী থেকে নিখোঁজ আছেন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক মো. মোরশেদ আলম। সে উপজেলার বড়ডলু মাস্টার পাড়ার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীনের পুত্র। মোরেশেদ আলম প্রতিদিনের ন্যায় গত ৬ ফেব্রুয়ারী সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রী পরিবহনে যান। কিন্তু ঐদিন রাতে বাড়ীতে ফিরে না আসায় থানায় সাধারন ডায়েরী করা হয়।

২০১২ সালে গুইমারা উপজেলার রেজাউল করিম, আল-আমীন ও শংকর যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। এখনো পর্যন্ত পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোটরসাইকেলগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন বিকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। ঘটনার প্রায় চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে আহত মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা মিয়ার ছেলে মো: খলিলুর রহমানকে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল চালক মো: খলিলুর রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, ঐদিন বিকাল ৪টার দিকে রিজেন ত্রিপুরা এক সহযোগিসহ মাটিরাঙ্গা বাজারে আসার কথা বলে চক্রপাড়া থেকে যাত্রী বেশে মোটর সাইকেলে উঠে চক্রপাড়া রহিমের টিলায় আসা মাত্র সেখানে থাকা আরো দুই পাহাড়ি যুবক গাড়ী থামাতে বলে। মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে মারধর তাকে গাছের সাথে বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অন্যকোন কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি সংসার চালান। কিন্তু সম্প্রতিককালে যাত্রীবেশি হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ফলে আতংকে দিন পার করছেন। নিহত ও গুম হওয়া পরিবারেও চলছে শোকের মাতম ও অভাব-অনটন।

বছরের পর বছর এভাবে একের পর এক মটর সাইকেল চালক খুন, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হচ্ছে কেন- জানতে চেয়েছিলাম অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম ফর চিটাগাং হিল ট্রাক্টসের সদস্য তাজুল ইসলাম নাজিমের কাছে। তিনি জানান, প্রধান কারণ উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজী। মটরসাইকেল চালকরা উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাদের খুন, গুম ও অপহরণের স্বীকার হতে হয়।

এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে। নাজিম বলেন, মটর সাইকেল চালকদের বেশিরভাগই বাঙালী। শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত বাঙালী যুবকেরা কোটা সুবিধার কারণে পাহাড়ী যুবকদের সাথে চাকরীর প্রতিযোগিতায় পেরে না উঠে বিকল্প কর্ম সংস্থান হিসাবে মটর সাইকেল চালায়। পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চায় না কোনো বাঙালী যুবক মটর সাইকেল চালাক।

সে কারণে তারা বিভিন্ন সময় বাঙালী মটর সাইকেল চালকদের যাত্রী না হবার জন্য পাহাড়ীদের প্রতি হুমকি, হুশিয়ারিও দিয়েছে। তাতে কাজ না হওয়ায় এই নির্যাতন।

মটর সাইকেল চালকদের যেহেতু যাত্রীদের ইচ্ছামত গভীর ও নির্জন পাহাড়ী অঞ্চলে যেতে হয়, তাই তাদের অপহরণ করা সহজ বলেও তিনি মনে করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ে পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। এরা সর্বত্র চাঁদাবাজি,খুন, গুম ও অপহরণ করে যাচ্ছে। অবৈধ উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে পাহাড়ে বার বার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। সমঅধিকার আন্দোলন সকল সকল জনগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে বলেও তিনি দাবী করেন।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান পুলিশের উপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, পুলিশের কাছে সবাই সমান। পুলিশ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল এ অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় বাহন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ কাজ করছে। তিনি মোটরসাইকেল চালকদের কোন যাত্রী পরিবহনের আগে যাত্রীর নাম ও কোথায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন ইত্যাদি রেজিষ্টারে লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার পরমর্শ দিয়ে বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজি বন্ধ ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর এসব ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। তিনি আইন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির এক পরিরহন ব্যবসায়ী পার্বত্যনিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মটর সাইকেল চালকদের একটা এসোসিয়েশন তৈরি করতে হবে। কোনো চালক যখন কোনো যাত্রী নেবে তখন সেই যাত্রীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও গন্তব্য এসোসিয়েশন অফিসে নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট জানিয়ে দেবে। এতে অপহরণ বা গুম কমে যাবে।

খাগড়াছড়িতে শুধু মোটরসাইকেল চালক নয়, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে এগিয়ে আসা জরুরী মনে করেন সচেতন মহল।

কক্সবাজারে ছুরিকাঘাতে ছাত্রলীগ নেতা খুন

খুন

নিজস্ব প্রতিনিধি:

কক্সবাজারের উখিয়ায় উপজেলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে মোহাম্মদ শাহিন (২১) নামে এক ছাত্রলীগ নেতা খুন হয়েছেন। নিহত শাহীন উখিয়া ডিগ্রী কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক এবং রাজাপালং ইউনিয়নের ফলিয়াপাড়ার মো. কালু হাজীর ছেলে।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে উখিয়া সদর স্টেশনের জামান হোটেলর সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে জানান উখিয়া থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান।

নিহতের স্বজনদের বরাত দিয়ে ওসি বলেন, উখিয়া হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত শিল্প ও বাণিজ্য মেলায় লোকজনের ভীড়ে শাহীনের সঙ্গে এক যুবকের ধাক্কা লাগে। এনিয়ে সেখানে তাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। মেলা থেকে বাড়ি ফেরার পথে উখিয়া স্টেশনের জামান হোটেলের সামনে ২/৩ জন যুবক শাহীনকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান মুরাদ বলেন, গুরুতর আহত অবস্থায় শাহীনকে হাসপাতালে আনা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ১১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তার শরীরের পেটে ও পিটে তিনটি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

উখিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মকবুল হোসেন মিথুন বলেন, বাণিজ্য মেলায় লোকজনের ভীড়ে উখিয়ার সিকদার পাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর (২২) ও সাগর (২০) নামের দুই যুবকের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতা শাহীনের ধাক্কা লাগে। এনিয়ে বাড়ী ফেরার পথে জাহাঙ্গীর ও সাগর সহ ২/৩ জন যুবক তাকে ছুরিকাঘাত করেছে।

নিহতের লাশ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে জানিয়ে ওসি হাবিবুর বলেন, ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

খাগড়াছড়িতে অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার

25-300x260

জেলা প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি:
খাগড়াছড়ি জেলা শহরের শহীদ কাদের সড়কস্থ য়ংড় বৌদ্ধ বিহার সম্মুখে অবস্থিত খোকন দত্তের (খোকন ড্রাইভার) মালিকানাধীন তিনতলা ভবনের কক্ষ থেকে আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে খাগড়াছড়ি সদর থানা পুলিশ। রুমের ভেতর থেকে পঁচা দূর্গন্ধ পেয়ে আজ শুক্রবার বিকেলে পার্শ্ববর্তী রুমের সদস্যরা বিষয়টি বাড়ির মালিক পক্ষকে জানালে মালিক পক্ষ সদর থানা পুলিশকে খবর দেয় । খবর পেয়ে সন্ধ্যায় পুলিশ এসে তালা ভেঙ্গে রুম থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করে।

পুলিশ লাশটি উদ্ধারের পর সুরতহাল রিপোর্ট শেষে ময়নাতদন্তের জন্য আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করেছে।  এদিকে ভবনের মালিক পক্ষের কেউই নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করতে না পারলেও স্থানীয়দের ধারণা নিহত যুবকের নাম মো: আরিফুল ইসলাম সাগর, তিনি কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। বাড়ীর মালিক পক্ষীয় সূত্রে জানা যায়, তিনতলা ভবনের উপরের তলায় কর্ণারের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়েছিল নিহত যুবক ও তার অপর এক রুমমেট মো. তাহের।

জানা যায়, নিহত যুবক জেলা শহরের নারিকেল বাগানস্থ একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে কর্মরত ছিল এবং তার রুমমেট তাহের ওয়ার্কশপের মালামাল সাপ্লাইয়ের ব্যবসায় জড়িত ছিল। গত ৮/১০ দিন থেকে তারা রুমে আসছেনা এবং কক্ষের বাইরে তালা ঝুঁলানো ছিল বলে জানায় পার্শ্ববর্তীরা।

সদর থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়,  নিহতের মাথার বাম পার্শ্বে সিমেন্টের রোলার দ্বারা আঘাতের দাগ পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে খুনী/খুনীরা মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাকে বালিশ চাপায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করে বাইরে তালা ঝুঁলিয়ে হত্যাকারী পালিয়ে গেছে।

খবর পেয়ে খাগড়াছড়ির সহকারী পুলিশ সুপার জয়নুল আবেদীন, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল আলমসহ জেলার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসংখ্য কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

প্রতিপক্ষের ব্রাশ ফায়ারে বাঘাইছড়িতে সন্তু লারমা গ্রুপের তিন নেতা নিহত

image্কিব

আলমগীর মানিক,রাঙামাটি:
প্রতিপক্ষের ব্রাশ ফায়ারে বাঘাইছড়ি সন্তু লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বাঘাইছড়ির  থানার সভাপতি প্রীতৃষ চাকমাসহ তিনজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার ভোর ছয় টার সময় এই ঘটনা ঘটে। বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন খেদারমারা ইউনিয়নের শীজক এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনায় অপর নিহতরা হলো, সহ-সাধারণ সম্পাদক নন্দ চাকমা ও যুব সমিতির নেতা জোতিষ চাকমা। বাঘাইছড়ি উপজেলা জেএসএস এর সাধারণ সম্পাদক বড়ঋষি চাকমা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।

রাঙামাটি জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান (ক্রাইম) ঘটনার ব্যাপারে সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের পুলিশ ঘটনাস্থলের দিকে গেছে তারা ফিরে না আসা পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

বাঘাইছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গোলাগুলি ও নিহতের খবর শুনেছি পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে। লাশ উদ্ধারের পর বিস্তারিত জানা যাবে।

স্থানীয় সুত্র থেকে জানাগেছে, মূলত আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার ভোরে জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সাথে ইউপিডিএফের বন্দুক যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। এলাকাটি সন্তু লারমা গ্রুপের দখলে ছিলো বলে জানাগেছে। এ ঘটনায় এলাকায় পাহাড়িদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজে পাশাপাশি থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিজিবির গুলিতে নিহত ২

Untitled-3 copy

কক্সবাজার সংবাদদাতা:

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিজিবি’র গুলিতে ২ বিএনপি কর্মী নিহত হয়েছে। এই সময়  অর্ধশত রাউন্ড গুলি চালায় বিজিবি। এতে আহত হয়েছে অর্ধশাধিক লোকজন। আহতদেরকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
নিহতরা হলেন, উপজেলা হালকাকারা ২ নং ওয়ার্ডের বাদশা এবং কাকারা এলাকার মিজানুর রহমান।

উল্লেখ্য, চকরিয়ায় বিএনপি-জামায়াত ও আওয়ামী লীগের পৃথক সমাবেশকে ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। শুক্রবার দুপুর ১২টায় চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ আদেশ দেন। বিকেলের দিকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় বেরিয়ে আসে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এর আগে আওয়ামীলীগের চকরিয়া উপজেলা সভাপতি জাফর আলমের নেতৃত্বে উপজেলার খুটাখালী সহ বিভিন্ন এলাকায় গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে।

 

বাঘাইছড়িতে আব্দুর রশিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সন্দেহের তীর সরকারদলীয় নেতৃবৃন্দের দিকে

Follow Up

আলমগীর মানিক, রাঙামাটি:
শুক্রবার বাঘাইছড়ি পৌর এলাকায় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে গুলিবিদ্ধ আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যার অবস্থার আরো অবনতি হওয়ায় তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে আব্দুর রশিদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার জের ধরে বাঘাইছড়িতে চলছে নানা সমীকরণ। এই ঘটনায় সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে জেএসএস’র দুই গ্রুপ ও ইউপিডিএফএর একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আর গুলিবিদ্ধ আব্দুর রশিদ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পিছনে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র এবং হাসপাতালে উপস্থিত বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য থেকে জানা গেছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই শুক্রবার বাঘাইছড়ি থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকার সময় আব্দুর রশিদ তার গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমা জানতেন বলে জানান। সে বিষয়টি হাসপাতালে উপস্থিত লোকজনের সামনে খুলে বলার সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জমির উদ্দিন তার মুখ চেপে ধরে বিষয়টি ধামা-চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ করে স্থানীয়রা। তারা দাবি করেন, জমির বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও আব্দুর রশিদের মুখের কথা এখন বাঘাইছড়ি পৌর এলাকায় সকলের মুখে মুখে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুর রশিদের সাথে একসময় ইউপিডিএফের বেশ সখ্যতা ছিল। রশিদ তাদের পক্ষ হয়ে বেশ কিছু কাজ করে দিতেন। কিন্তু ২০১২ সালের অক্টোবর মাসের ২৯ তারিখে বাঘাইছড়ি উপজেলা সদরের চৌমূহনী চত্ত্বরে ইউপিডিএফ নেতা ডা: সত্যরঞ্জন চাকমাকে গুলি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমার সাথে বাক-বিতন্ডা শুরু হয় বলে জানা গেছে। স্থানীয় বেশ কয়েকটি সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানাগেছে, ডা: সত্য রঞ্জন চাকমাকে গুলি করার ঘটনায় সন্তু লারমা সমর্থিত বেশ ক’জন কে আসামী করে বাঘাইছড়ি থানায় একটি মামলা করা হয়। যার নাম্বার-৩ তারিখ ২৯/১০/২০১২ ইং। এই মামলার সাক্ষী ছিলেন আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যা। তাই ধইন্যার উপর অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, যেন সে এই মামলায় কোনো ধরনের সাক্ষী না দেয়। আর এই কাজে তাকে চাপ প্রয়োগ করতেন রাঙামাটি জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বৃষকেতু চাকমাসহ যুবলীগের অপর একজন নেতা। যার ফলশ্রুতিতে গত চারদিন আগে বৃষকেতুসহ বেশ ক’জন নেতা সাজেক ইউনিয়নে একটি কেয়াংয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে থাকা আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে অশালীন ভাষায় গালি-গালাজ করেন এবং ধইন্যাকে এক প্রকার হুমকি-ধামকিও দেন বলে জানা গেছে দলীয় সূত্রে।

এরই এক পর্যায়ে বাঘাইছড়ির তুলাবান নামক স্থানে তাকে নামিয়েও দেন উপজেলা আওয়ামী লীগের এই কর্ণধার। এসময় গাড়িতে বেশ ক’জন নেতা ও সুশীল ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের কাছ থেকেও এই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাদের কাছে বিষয়টি অবহিত করেন আব্দুর রশিদ। পরে এই ঘটনার জেরে শনিবার বিকাল তিনটায় উপজেলা পরিষদ রেষ্ট হাউজে একটি বৈঠক হওয়ার কথাও ছিলো। কিন্তু পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে উপস্থিত না থেকে উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ সদস্য বৃষকেতু চাকমা রাঙামাটি শহরে চলে আসেন বলে জানাগেছে দলীয় সূত্রে।

এদিকে শুক্রবার বিকেলে বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় এবং রাত সাড়ে নয়টায় আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলির ঘটনায় গুরুত্বর আহত ধইন্যা বাঘাইছড়ি হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাতে কাতরাতে তাকে গুলি করার ঘটনায় জেলা পরিষদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বৃষকেতু চাকমা আগে থেকেই জানতেন বলে বলতে থাকলে উপজেলা যুবলীগের একজন নেতা ধইন্যাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেন বলে হাসপাতালে ঘটনার সময় উপস্থিত বেশ’কজন প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানাগেছে।

এদিকে আব্দুর রশিদ ওরফে ধইন্যাকে গুলি করে আহতের প্রতিবাদে শনিবার বিকাল ৩.৫০ টার সময় জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা)বাঘাইছড়ি থানা শাখার উদ্দোগে উপজলোর মুক্ত মঞ্চে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্টিত হয়েছে। এ সমাবেশে প্রধান অথিতি ছিলেন জেএসএস রাঙামাটি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক চিত্র বিকাশ চাকমা। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিপুলেশ্বর চাকমা।

বক্তারা ঘটনার তীব্র্র নিন্দা জানান এবং দোষী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবী জানিয়ে তিনদফা দাবিসহ আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এই ঘটনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বাঘাইছড়িতে অনিদিষ্টকালের জন্যে সড়ক ও নৌ-পথ অবরোধসহ কঠোর কমসুচি গ্রহন করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে এমএন লারমা সমর্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতি (জেএসএস)।
অপরদিকে বাঘাইছড়িতে সাম্প্রতিক এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে রোববার বাঘাইছড়ি বিজিবি জোনে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানাগেছে।

উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন বাবু পাড়া এলাকায় উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক বাঙ্গালী আহত হয়েছে। শুক্রবার রাত ১০টার সময় এই ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তির নাম আব্দুর রশিদ (৪০) ওরফে ধইন্যা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঘাইছড়ি পৌর মেয়রের বাসভবন সংলগ্ন এলাকা দিয়ে নিজ বসতঘরে যাওয়ার সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অর্তকিতভাবে হামলা চালায় আব্দুর রশিদের উপর। এসময় সন্ত্রাসীদের ব্রাশ ফায়ারে আব্দুর রশিদ গুরুত্বর আহত হয়। এসময় তার শরীরে গুলি লাগে। পরে স্থানীয়রা রশিদকে উদ্ধার করে বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন।