বিচ্ছেদে ক্ষুদ্ধ হয়ে কলেজ ছাত্রী ইতি চাকমাকে প্রেমিক রণি চাকমা খুন করে: আদালতে স্বীকারোক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি::

প্রেমে বিচ্ছেদ হওয়ায় সাবেক ক্ষুব্ধ প্রেমিক রণি চাকমার হাতে খুন হয় খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমা।

 

সোমবার বিকেল ৪টায় ডিবি পুলিশের হাতে আটক তুষার চাকমা(১৮) নামের এক খুনি খাগড়াছড়ির জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালতে ১৬৪ ধারায় এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।

হত্যাকাণ্ডে তুষার চাকমাসহ ৫ জন অংশ নিয়েছিল এবং ইতি চাকমার প্রেমিক রনি চাকমা তাকে হত্যা করে। ইতি চাকমাকে প্রথমে শ্বাসরোধ ও পরে জবাই করে হত্যা করা হয়।

তুষার চাকমা রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বালুঘাট এলাকার সুনীল চাকমার ছেলে। তুষারের মা নিরূপা চাকমা ইউপিডিএফ সমর্থিত সাজেক নারী সমাজ সংগঠনের নেত্রী।


এ সংক্রান্ত আরো খবর পড়ুন:

  1. ইতি চাকমা খুনের তদন্তে পুলিশ : আলোচনায় প্রেম পরকীয়া : আটক ১ : ফেসবুকে অপপ্রচার
  2. উপজাতীরাই ইতি চাকমাকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করেছে
  3. ইতি চাকমা’র খুনীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন
  4. ইতি চাকমার হত্যার প্রতিবাদে রাঙামাটিতে মানববন্ধন
  5. ইতি চাকমার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে বাঙালী ছাত্র পরিষদের মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ 

তুষার চাকমা জানান, খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইতি চাকমার সাথে সহপাঠী রনি চাকমার প্রেমের সর্ম্পক ছিল। রনি চাকমা নিয়মিত ইতি চাকমার কাছ থেকে টাকা নিত। কিন্তু রনির অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এই সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ইতি চাকমা।

এতে রনি চাকমা প্রতিশোধ নিতে তুষার চাকমাসহ ৫ জনকে সাথে নিয়ে ইতি চাকমার ভগ্নিপতির বাড়িতে তাকে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডে রনি চাকমাসহ ৩ জন সরাসরি অংশ নেয়। অপর দু’জন বাসার বাইরে পাহারায় ছিল।

এদিকে হত্যার পর ইতি চাকমার হত্যাকাণ্ড পাহাড়ী-বাঙালী দ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িক খাতে প্রবাহিত করার জন্য ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ সহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে। এ সব কর্মসূচীতে হত্যাকারীরা বক্তব্য দেন বলে জানান, আটক তুষার চাকমা।

হত্যাকারীরা ইতি চাকমা হত্যার জন্য বাঙালীদের দায়ী করেন। ইউপিডিএফ সমর্থিত পাহাড়ী বিভিন্ন অংশ সংগঠন এ হত্যাকাণ্ডে ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করে। যদিও বাঙালীরা এই অভিযোগ অস্বীকার করে পাহাড়ীদের দায়ী করে পাল্টা কর্মসূচী পালন করে।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ ফেব্রুয়ারী রাতে জেলা সদরের আরামবাগ এলাকায় ভগ্নিপতির ভাড়া বাসায় বোন ও ভগ্নিপতির অনুপস্থিতিতে গলা কেটে হত্যা করা হয় খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমাকে।

হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে চট্টগ্রাম বিভাগের সিআইডি’র সহযোগিতা নেয় খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ। অবশেষে রবিবার(১০ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৪টায় খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী স্কোয়ার এলাকা থেকে তুষার চাকমাকে আটক করা হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে এ অভিযানে অংশ নেন. খাগড়াছড়ি ডিবি পুলিশের পরিদর্শক(ওসি) আব্দুর রকিব। খাগড়াছড়ি সদর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) তারেক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান ও উপপরিদর্শক(এসআই) আব্দুল্লাহ আল মাসুদ।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান জানান, দীর্ঘ সাড়ে ৬ মাস পর এক খুনিকে আটকের মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকার খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইতি চাকমার হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হয়েছে। অন্য আসামীদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। শীঘ্রই বাকী আসামীদেরও গ্রেফতার করা হবে।

পৃথক তিপ্রাল্যান্ডের সমর্থনে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:(আপডেইট)

ভারতের ত্রিপুরায় পৃথক তিপ্রাল্যান্ড নামে রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষে চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন করা হয়েছে। ’বাংলাদেশ ত্রিপুরার্স’-এর  ব্যানারে খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সামনে বেলা ১১টার দিকে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

 

মানববন্ধনে খাগড়াছড়িতে বসবাসরত বিভিন্ন শ্রেণি পেশার ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শতাধিক লোক অংশগ্রহণ করে।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন এডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্র নয়ন ত্রিপুরা, পানছড়ি প্রতিনিধি মনিন্দ্রলাল ত্রিপুরা ও রনবিকাশ ত্রিপুরা।

এসময় বক্তারা বলেন, বিশ্বে জাতিসত্ত্বার ইতিহাসে ত্রিপুরা জাতির রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ছিলো ত্রিপুরাদের নিজস্ব রাষ্ট্র এবং তা শাসন করেছে সাড়ে তিন হাজার বছর। ত্রিপুরাদের রয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা ও সমৃদ্ধশালী ইতিহাস ।

ভারতের ত্রিপুরায় চলমান ত্রিপুরার এডিসি এলাকাকে নিয়ে স্বাধীন তিপ্রাল্যান্ড রাজ্য গঠনের দাবীকে ন্যায় সঙ্গত উল্লেখ করে বক্তারা আরো বলেন, ত্রিপুরার রাজনৈতিক দল আইপিএফটি’র এনসি দেববর্মা গোষ্ঠী তিপ্রাল্যান্ড করার যে আন্দোলন করছে তা গণতান্ত্রিক আন্দোলন। তাই বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত ত্রিপুরাদের সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারী ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীরাও এ আন্দোলনকে সমর্থন জানান।

স্বতন্ত্র স্বাধীন তিপ্রাল্যান্ড গঠন বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্য জানতে পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি আয়োজকদের সাথে আলাদা কথা বলতে চাইলে তারা আলাদা কোনো কথা বলতে রাজি হয় নি।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত খাগড়াছড়ির এডেভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা বলেন, মূল ত্রিপুরা ল্যাণ্ডের আয়তন ১০৪৯২ বর্গ কি.মি.। এর মধ্যে জেনারেল ল্যান্ড ৩৩৬৯.৩৫ বর্গ কি.মি.। এখানে বাঙালীসহ সবাই বাস করে। বাকি ৭১৩২.৬৫ বর্গ কি.মি. এলাকা ত্রিপুরা ট্রাইবাল অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের(টিটিএডিসি) মাধ্যমে শাসিত হয়।

এটি একটি স্বশাসিত এলাকা। এখানে ট্রাইবাল ছাড়া অন্য কেউ বসবাস করতে পারবে না এমন সংরক্ষণ আইন রয়েছে। এই এলাকা অনুন্নত হওয়ায় ভারতের সংবিধান অনুযায়ী তিপ্রাল্যান্ড নামে পৃথক একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য এসি দেববর্মার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন আন্দোলন চলে আসছে। বাংলাদেশের ত্রিপুরারা সেই আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করেছে মাত্র।

ত্রিপুরাদের কোন সংগঠন এই সংহতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি সাধারণ ত্রিপুরারা করেছে। কোনো সংগঠনের ব্যানারে নয়।

মানববন্ধনের বক্তৃতায় ও ফেস্টুনে স্বাধীন তিপ্রাল্যান্ডের কথা কেন বলা হয়েছে সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমি বিষয়টা সঠিক বলতে পারবো না। আয়োজকরা আমাকে সংহতি জানাতে বলায় আমি সংহতি প্রকাশ করেছি। ব্যানার, ফেস্টুনে কি লেখা ছিল তা দেখিনি।

তিনি আরো বলেন, সম্ভবত ‘পৃথক’ বোঝাতে ভুল করে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ শব্দ ব্যবহার করে থাকতে পারে। এরপরও বিস্তারিত জানতে চাইলে অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন।

মানববন্ধনের সঞ্চালক তন্ময় ত্রিপুরার মোবাইলে যোগাযোগ করলে সংযোগ পাওয়া যায়নি। তকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাগড়াছড়ির একটি আঞ্চলিক সংগঠন গোপনে এই মানববন্ধন আয়োজনে মদত দিয়েছে।

একের পর এক মটর সাইকেল চালক কেন টার্গেট হচ্ছে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের

খাগড়াছড়ি সাড়ে ৬ বছরে ১৬ মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম


নিজস্ব প্রতিবেদক, খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

খাগড়াছড়িতে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে ভাড়া চালিত মোটরসাইকেল চালক খুন, অপহরণ, গুম ও হামলা করে মোটরসাইকেল ছিনতাই এখন নিত্যনৈতিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত প্রায় সাড়ে ৬ বছরে খাগড়াছড়িতে অন্তত ৮জন মোটর সাইকেল চালক যাত্রীবেশীদের হাতে খুন হয়েছে। গুম হয়েছেন ৮জন। এদের মধ্যে একজন ছাড়া সকলেই খাগড়াছড়ির বাসিন্দা। অপহরণ হয়েছে অন্তত এক ডজন। এছাড়া অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরি হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক।

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার যেমন বিচার পায়নি, তেমনি নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো ফিরে আসবে সে প্রতিক্ষায় আছে তাদের পরিবার- স্বজনরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবার-পরিজন অভাব-অনটনে দিন পার করছে। সে সাথে একের পর এক মোটর সাইকেল চালক খন-গুমের ঘটনায় প্রায় অস্থির হয়ে আছে খাগড়াছড়ি।

এ সকল হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে জেলায় দফায় দফায় হরতাল-অবরোধে উত্তাল হয়েছে। এছাড়াও মানববন্ধন ও প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান এবং প্রশাসনের কাছ থেকে বিচারের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে এ সকল হতভাগ্য মোটরসাইকেল চালকের জীবনে খুন ও অপহরণের ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি।

এদিকে একের পর এক মোটরসাইকেল চালকদের খুন, অপহরণ ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারীদের মধ্যে আতংক দেখা দিয়েছে।

খাগড়াছড়িতে যাত্রী পরিবহনের মোটরসাইকেল একটি জনপ্রিয় বাহন। ভূ প্রকৃতি এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। জেলায় অন্তত দুই হাজার বেকার যুবক ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু একের পর এক যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও অস্ত্রের মুখে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন চালকদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত প্রায় ছয় বছরে ১৬ জন মোটরসাইকেল চালক খুন ও গুম হয়েছে। জেলার মহালছড়ি ছাদিকুল ইসলাম, মাটিরাঙার আজিজুল হাকিম শান্ত, আব্দুর রহিম, গুইমারা নিজাম উদ্দিন সোহাগ, দীঘিনালার শাহ আলম, আব্দুস সাত্তার, চান মিয়া ও সর্বশেষ পার্শ্ববর্তী লংগদু উপজেলার নুরুল ইসলাম নয়ন খুন হন খাগড়াছড়ি জেলা সদরের যৌথ খামার এলাকায়।

লংগদুতে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়ি বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নয়ন হত্যাকান্ডটি দেশব্যাপী আলোচনায় আসলেও অন্য হত্যাকান্ডগুলো তেমন কোন আলোচনায় আসেনি। একই সময় দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক আবুল কাশেম, মো: আলী, পানছড়ির হোসেন আলী, মানিকছড়ির মো: মোরশেদ, রাজিব কান্তি দে, গুইমারার রেজাউল করিম, আল আমীন ও শংকর দীর্ঘ দিন ধরে মোটরসাইকেলসহ নিখোঁজ রয়েছে।

এছাড়া একই সময়ে খাগড়াছড়িতে অন্তত অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু উদ্ধার হয়েছে মাত্র কয়েকটি। প্রতিটি খুন, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে পাহাড়ি সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে।

সর্বশেষ গত ১ জুন খাগড়াছড়ির যৌথ খামার এলাকায় খুন হন লংগদু উপজেলার যুবলীগের নেতা নুরুল ইসলাম নয়ন। তার এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে পরের দিন সেখানে প্রায় দুই শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ী ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

নিহত নয়নের ছোট ভাই লিটনের অভিযোগ ঐদিন সকালে তার বড় ভাই দুই পাহাড়ি যাত্রীকে নিয়ে খাগড়াছড়ি আসার পর নিখোঁজ হন। পরে সামাজিকে যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভাইয়ে লাশের সন্ধান পান।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো: আব্দুল হান্নান পার্বত্যনিউজকে জানান, নুরুল ইসলাম নয়ন হত্যার ঘটনায় তার ভাই লিটন বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামী করে মামলা করেছেন। নয়ন হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকারীদের গ্রেফতারের পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শিঘ্রই সু-সংবাদ পাবেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালক ছাদিকুল ইসলামকে (২৩) দুই উপজাতি মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে ভাড়া করে নিয়ে যাওয়ার পর ছাদিকুল ইসলাম নিখোঁজ হন। তিনদিন পর ১৩ এপ্রিল বিকালে রাঙামাটির নানিয়াচর উপজেলার ঘিলাছড়ি এলাকায় ছাদিকুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত লাশ মাটি চাপা দেওয়া অবস্থায় পাওয়া যায়।

নিহত ছাদিকুলের নিহত ছাদিকুল ইসলামের বড় ভাই রফিকুল ইসলাম পার্বত্যনিউজকে জানান, দুই উপজাতি লোক ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে তার ভাইকে রাঙ্গামাটির ঘিলাছড়ি উদ্দেশ্যে তাকে ভাড়া করে নিয়ে যায়।

নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী দুপরে খাগড়াছড়ি আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের রিছাং ঝর্না এলাকার দুর্গম পাহাড় থেকে মাটিরাযার মেটরসাইকেল চালক আজিজুল হাকিম শান্ত’র লাশ পুলিশ।

মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু পার্বত্যনিউজকে জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারী রাত ৯টার দিকে খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রী নিয়ে মাটিরাঙা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন মোটর সাইকেল চালক মো: আজিজুল হাকিম শান্ত। এ ঘটনায় ধন বিকাশ ত্রিপুরা নামে একজনকে আটকের পর তিনি ঘটনার সাথে জড়িত আরো দুই জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছে জানিয়েছেন মাটিরাঙা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাহদাত হোসেন টিটু। তবে শান্ত’র মোটরসাইকেলটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

নিখোঁজের একদিন পর ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার বেলছড়ি ইউনিয়নের হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গল থেকে মোটরসাইকেল চালক মো: আবদুর রহিমের (২৫) লাশ উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা থানা পুলিশ। নিহত আবদুর রহিম বেলছড়ির ২নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যানপাড়ার বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর আলম এর ছেলে।

পুলিশ জানায়, এক সন্তানের জনক মো: আবদুর রহিম ভাড়ায় মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো। ১৭ সেপ্টেম্বর সে বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়,কিন্তু রাতে সে বাড়ি ফিরেনি। পরের দিন বিকাল ৩টায় স্থানীয় নারী শ্রমিকরা লাকড়ি কুড়াতে গেলে বেলছড়ির হাজীপাড়া কবরস্থান এলাকার গভীর জঙ্গলে তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বিজিবিকে খবর দেয়।

একই বছরের ৭ মে সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার ভৈরফা পাড়া এলাকায় শাহ আলম নামে এক মোটরসাইকেল চালককে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে শাহ আলমের লাশ উদ্ধার করে।

২০১৬ সালের ২৭ জন নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে। স্থানীয় সমীর পালের ছেলে রাজিব দুপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় মোটর সাইকেল চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করেছে উপজাতীয় সন্ত্রাসীরা। ঘটনার চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা ময়িা‘র ছেলে মো: খলিলুর রহমান (২৭) কে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একই বছরের ৩০ জুলাই খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি থেকে চন্দন ত্রিপুরা (২৪) নামে ভাড়ায় চালিত এক মোটরসাইকেলে চালককে অপহরণ করেছেন অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। উপজেলার গামারীঢালা এলাকা থেকে  তাকে অপহরণ করা হয়। অপহৃত চালকের বাড়ি জেলা শহরের খাগড়াপুর হাদুক পাড়ায়।

২০১১ সালের ১০ জন খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলার জালিয়াপাড়ার মাহবুব নগর এলাকায় মোটরসাইকেল চালক নিজাম উদ্দিন সোহাগকে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসীরা। সে গুইমারা উপজেলার কালাপানি এলাকার বাসিন্দা সালেহ আহমেদের ছেলে।

পুলিশ জানায়, সোহাগ দুই যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পথে নির্মম এ ঘটনা ঘটে। সোহাগ মাহবুব নগর পৌছুলে যাত্রীবেশী হোন্ডা ছিনতাইকারী তাকে কুপিয়ে এবং জবাই করে লাশ রাস্তায় ফেলে হোন্ডা নিয়ে পালিয়ে যায়।

এছাড়া ২০১১ সালে যাত্রীবেশি সন্ত্রাসীদের হাতে জেলার দীঘিনালার কবাখালীর বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার ও চান মিয়া।

এদিকে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে দীঘিনালায় মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী নিখোঁজ রয়েছেন। সে উপজেলার দক্ষিণ মিলনপুর গ্রামের হরমুজ আলীর পুত্র। এ ঘটনায় মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী মোছা ফাতেমা বেগম দীঘিনালা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম পার্বত্যনিউজকে জানান, তার স্বামী ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ আলী বিকালে উপজেলার বাসটার্মিনাল থেকে একজন যাত্রী নিয়ে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় যায়। এর পর থেকেই সে আর বাড়ি ফিরেনি। নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ রয়েছে।

মোছা: ফাতেমা বেগম জানান, সংসারের একমাত্র উপার্জন ক্ষম ব্যক্তি স্বামী নিখোঁজ থাকায় দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন পার করছেন তিনি। স্বামীকে উদ্ধারে প্রশাসনও কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করে ফাতেমা বেগম।

২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হন দীঘিনালার রশিকনগরে বাসিন্দা আবুল কাশেম পিসি।

আবুল কাশেম পিসির স্ত্রী ছানোয়ারা বেগম পার্বত্যনিউজকে বলেন, নিখোঁজের পর স্বামীর লাশটাও পাননি তিনি। সংসারের এক মাত্র আয় সক্ষম স্বামী না থাকায় এক মেয়ে ও চার ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। কোথাও থেকে কোন ধরনের সহযোগিতাও তিনি পাননি।

আবুল কাশেম পিসির ছেলে সাইদুর রহমান পিতার হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে বিচারের দাবী জানান প্রশাসনের কাছে।

২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ আছেন, জেলার পানছড়ি উপজেলার নিখোঁজ মোটর সাইকেল চালক হোসেন আলী। সে পানছড়ি উপজেলার ৫নং উল্টাছড়ি ইউপির জিয়ানগর গ্রামের মনসুর আলীর ছেলে। তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি মাটিরাঙ্গা সদর ইউপির ৫নং ওয়ার্ডের ব্রজেন্দ্র কার্বারী পাড়ার নির্জন এলাকা থেকে পুলিশ পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্বার করলেও হোসেন আলীর সন্ধান মেলেনি।

পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার পার্বত্যনিউজকে জানান, ২০১৬ সালের ২৬ এপ্রিল বিকাল ৪টার দিকে হোসেন আলী যাত্রী নিয়ে যায় । এর পর থেকে সে নিখোঁজ। এ ঘটনায় ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪জনকে। নিখোঁজ হোসেন আলীর মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৭ জুন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার নিখোঁজ হন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক রাজিব কান্তি দে।

২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী থেকে নিখোঁজ আছেন মানিকছড়ির মোটরসাইকেল চালক মো. মোরশেদ আলম। সে উপজেলার বড়ডলু মাস্টার পাড়ার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীনের পুত্র। মোরেশেদ আলম প্রতিদিনের ন্যায় গত ৬ ফেব্রুয়ারী সকালে মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রী পরিবহনে যান। কিন্তু ঐদিন রাতে বাড়ীতে ফিরে না আসায় থানায় সাধারন ডায়েরী করা হয়।

২০১২ সালে গুইমারা উপজেলার রেজাউল করিম, আল-আমীন ও শংকর যাত্রী নিয়ে রামগড় যাওয়ার পর নিখোঁজ হন। এখনো পর্যন্ত পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোটরসাইকেলগুলোও উদ্ধার করতে পারেনি।

২০১৪ সালের ২ জুন বিকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় চালককে গাছের সাথে বেঁধে রেখে অভিনব কায়দায় মোটর সাইকেল ছিনতাই করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। ঘটনার প্রায় চার ঘন্টা পর রাত সাড়ে আটটার দিকে আহত মোটর সাইকল চালক চরপাড়ার মো: ধনা মিয়ার ছেলে মো: খলিলুর রহমানকে উদ্ধার করে মাটিরাঙ্গা উপজেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

মোটরসাইকেল চালক মো: খলিলুর রহমান পার্বত্যনিউজকে জানান, ঐদিন বিকাল ৪টার দিকে রিজেন ত্রিপুরা এক সহযোগিসহ মাটিরাঙ্গা বাজারে আসার কথা বলে চক্রপাড়া থেকে যাত্রী বেশে মোটর সাইকেলে উঠে চক্রপাড়া রহিমের টিলায় আসা মাত্র সেখানে থাকা আরো দুই পাহাড়ি যুবক গাড়ী থামাতে বলে। মোটরসাইকেল থামানো মাত্রই কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই সন্ত্রাসীরা তাকে মারধর তাকে গাছের সাথে বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায়।

দীঘিনালার মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, অন্যকোন কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি সংসার চালান। কিন্তু সম্প্রতিককালে যাত্রীবেশি হাতে মোটরসাইকেল চালক খুন, গুম ও মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ফলে আতংকে দিন পার করছেন। নিহত ও গুম হওয়া পরিবারেও চলছে শোকের মাতম ও অভাব-অনটন।

বছরের পর বছর এভাবে একের পর এক মটর সাইকেল চালক খুন, গুম, অপহরণ বা নিখোঁজ হচ্ছে কেন- জানতে চেয়েছিলাম অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম ফর চিটাগাং হিল ট্রাক্টসের সদস্য তাজুল ইসলাম নাজিমের কাছে। তিনি জানান, প্রধান কারণ উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদাবাজী। মটরসাইকেল চালকরা উপজাতীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাদের খুন, গুম ও অপহরণের স্বীকার হতে হয়।

এ ছাড়াও আরো কিছু কারণ রয়েছে। নাজিম বলেন, মটর সাইকেল চালকদের বেশিরভাগই বাঙালী। শিক্ষিত ও অর্ধ শিক্ষিত বাঙালী যুবকেরা কোটা সুবিধার কারণে পাহাড়ী যুবকদের সাথে চাকরীর প্রতিযোগিতায় পেরে না উঠে বিকল্প কর্ম সংস্থান হিসাবে মটর সাইকেল চালায়। পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো চায় না কোনো বাঙালী যুবক মটর সাইকেল চালাক।

সে কারণে তারা বিভিন্ন সময় বাঙালী মটর সাইকেল চালকদের যাত্রী না হবার জন্য পাহাড়ীদের প্রতি হুমকি, হুশিয়ারিও দিয়েছে। তাতে কাজ না হওয়ায় এই নির্যাতন।

মটর সাইকেল চালকদের যেহেতু যাত্রীদের ইচ্ছামত গভীর ও নির্জন পাহাড়ী অঞ্চলে যেতে হয়, তাই তাদের অপহরণ করা সহজ বলেও তিনি মনে করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলনের খাগড়াছড়ি জেলার শাখার সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ে পাহাড়িদের তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। এরা সর্বত্র চাঁদাবাজি,খুন, গুম ও অপহরণ করে যাচ্ছে। অবৈধ উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে পাহাড়ে বার বার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। সমঅধিকার আন্দোলন সকল সকল জনগোষ্ঠীর হয়ে কাজ করছে বলেও তিনি দাবী করেন।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান পুলিশের উপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়ে পার্বত্যনিউজকে বলেন, পুলিশের কাছে সবাই সমান। পুলিশ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল এ অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় বাহন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশ কাজ করছে। তিনি মোটরসাইকেল চালকদের কোন যাত্রী পরিবহনের আগে যাত্রীর নাম ও কোথায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন ইত্যাদি রেজিষ্টারে লিপিবদ্ধ করে যাওয়ার পরমর্শ দিয়ে বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসি ক্যামেরা বসানোর কাজ চলছে।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চাঁদাবাজি বন্ধ ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর এসব ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না। তিনি আইন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহবান জানান।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির এক পরিরহন ব্যবসায়ী পার্বত্যনিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মটর সাইকেল চালকদের একটা এসোসিয়েশন তৈরি করতে হবে। কোনো চালক যখন কোনো যাত্রী নেবে তখন সেই যাত্রীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও গন্তব্য এসোসিয়েশন অফিসে নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট জানিয়ে দেবে। এতে অপহরণ বা গুম কমে যাবে।

খাগড়াছড়িতে শুধু মোটরসাইকেল চালক নয়, সকল সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সকলকে এগিয়ে আসা জরুরী মনে করেন সচেতন মহল।

খাগড়াছড়িতে শুরু হচ্ছে পুলিশের কমান্ডো প্রশিক্ষণ

1468365225

বিশেষ প্রতিনিধি:

আগামী ৯ ফের্রুয়ারি থেকে খাগড়াছড়িতে শুরু হচ্ছে পুলিশের কমান্ডো প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল(আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ঐদিন বেলা সাড়ে ১১টায় খাগড়াছড়ি এপিবিএন ষ্পেশালাইজড ট্রেনিং সেন্টারে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। আর এটাই হবে বাংলাদেশ পুলিশে কমান্ডো ফোর্স তৈরির প্রথম কার্যক্রম। এর আগে কঠোর প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে সাধারণত সশস্ত্র বাহিনীতে কমান্ডো বা প্যারাকমান্ডো তৈরি করা হয়েছিল।

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দেশে বড় ধরনের জঙ্গি-সন্ত্রাসী হামলা কিংবা আপদকালীন যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নিয়মিতভাবে কমান্ডো প্রশিক্ষনের (ট্রেনিং) অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। এখানে কমান্ডো প্রশিক্ষনের ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বজায় রাখা হবে।

সূত্রটি জানায়, সাম্প্রতিক গুলশানের হলি আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া হামলাসহ সশস্ত্র জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীর সামর্থ বৃদ্ধির জন্যে অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামসহ সব ধরনের ‘লজিস্টিক সাপোর্ট’ দিয়ে পুলিশের কমান্ডো ফোর্সকে সুসজ্জিত করা হবে। যাতে তারা যে কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ট্রেনিং অ্যান্ড স্পোর্টস) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, কমান্ডো প্রশিক্ষণের মৌলিকত্ব বা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ বজায় রেখে ফেব্রুয়ারিতে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। খাগড়াছড়িতে পুলিশের বিশেষায়িত ট্রেনিং সেন্টারে হবে এ কমান্ডো প্রশিক্ষণ। নিয়মিতভাবেই চলবে এ কমান্ডো প্রশিক্ষণ।

এজন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে পুলিশ সদর দফতর। অত্যাধুনিক ও সুসজ্জিত এ কমান্ডো ফোর্সের কাজ হলো বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলাসহ দেশের যে কোনো স্থানে যে কোনো আপদকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। এজন্য তাদের শারীরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও পরিস্থিতি মোকাবিলার সব ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

সূত্র মতে, গত বছরের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ভারতে গিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের ৪০ সদস্য কমান্ডো প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে এক নারী সহকারী পুলিশ সুপারসহ পাঁচ নারী পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। এখন প্রশিক্ষিত ঐ সদস্যরা অন্যদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

এছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা কমান্ডো ট্রেনিংয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত এফবিআইসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডিএমপি’র বিশেষায়িত কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, সোয়াতসহ বিভিন্ন টিমের অভিজ্ঞ চৌকস অফিসাররা এ কমান্ডো প্রশিক্ষণ দেবেন।

পুলিশ সদর দফতরের প্রশিক্ষণ শাখার কর্মকর্তারা জানান, কমান্ডো অপারেশন মূলত বড় ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাস বা সংকটকালীন মুহূর্তে পরিচালনা করা হয়ে থাকে। যেমন গুলশানের হলি আর্টিজানে ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে কমান্ডো অপারেশন পরিচালিত হয়। সাধারণত কমান্ডো অপারেশন চারটি ভাগে হয়ে থাকে। কমান্ডো টিমের চারটি দল পৃথক দায়িত্ব পালন করে।

সাধারণত একদল মধ্যস্থতা (হোস্টেজ নেগোসিয়েশন) করে; আরেক দল প্রতিরক্ষার (ডিফেন্স) দায়িত্বে থাকে; আরেক দল সরাসরি অ্যাকশন পয়েন্টে এবং আরেক দল তাদের রিজার্ভ হিসেবে থাকে। এর বাইরেও স্থান-কালভেদে নতুন কৌশলে অপারেশন পরিচালনা করে থাকেন কমান্ডোরা। জানা যায়, কমান্ডো প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন মেট্রোপলিটন শহরে পদায়ন করা হবে। এতে স্থানীয়ভাবে তারা যে কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারবেন।

খাগড়াছড়িতে ৪ টি আগ্নেয়াস্ত্রসহ ইউপিপিএফ’র সামরিক প্রধান উজ্জল স্মৃতি চাকমাসহ আটক ৬

uzzal-smrity-chakma

নিজস্ব প্রতিবেদক:

খাগড়াছড়িতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও ধারালো অস্ত্রসহ ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র(ইউপিপিএফ)  সামরিক শাখার প্রধান উজ্জল স্মৃতি চাকমাসহ আটক ৬ জন আটক হয়েছে। উজ্জল স্মৃতি চাকমা ইউপিডিএফ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে খ্যাত। রবিবার দুপুরে জেলা শহরের পেরাছড়ার হেডম্যান পাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

আটক অন্যরা হচ্ছে রূপম চাকমা(২৫), রণি ত্রিপুরা(৩৬), সমাপন দেওয়ান(২৮), বাবুল মারমা(১৯) ও সন্ধিপন চাকমা(২০)।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক মো: আব্দুল হান্নান জানান, গোপন সংবাদের যৌথ বাহিনী দুপুর ১২টার দিকে হেডম্যান পাড়া এলাকায় ইউপিডিএফ আস্তানাটি ঘেরাও করে উজ্জল স্মৃতি চাকমাসহ ছয় জনকে আটক করে । এ সময় আরও বেশ কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পরে তাদের আস্তানা তল্লাসী করে একটি টুটু বোর রাইফেল, একটি পিস্তল, একটি দেশী বন্দুক, একটি পাইপগানসহ বিপুল পরিমাণ সামরিক পোশাক, ধারালো অস্ত্র, লিফলেট উদ্ধার হয়।

%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a7%8d%e0%a6%9c%e0%a6%b2-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%be

তার দাবী উজ্জল স্মৃতি চাকমা ইউপিডিএফ’র সামরিক শাখার প্রধান। তবে ইউপিডিএফ’র প্রচার ও প্রকাশনা শাখার প্রধান নিরণ চাকমা জানান, উজ্জল স্মৃতি ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সমন্বয়ক ও কেন্দ্রীয় নেতা।

এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত আরো কয়েকটি স্থানে অভিযান চলছে বলে জানা গেছে।

এদিকে স্থানীয় উজ্জলা দেবী চাকমা জানান, বাড়ীটি তার ছিল। ইউপিডিএফ’র সন্ত্রাসীরা কয়েক বছর আগে তাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে দখল করে নেয়।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউপিডিএফ’র প্রার্থী হিসেবে প্রসীত খিসার ডান হাত বলে খ্যাত অংশ নিয়ে ৬০ হাজার ৪১০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন।

এদিকে রবিবার বিকেলে ইউপিডিএফ’র খাগড়াছড়ি জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংগঠক প্রদীপন খীসা এক বিবৃতিতে এ গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আটকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দাবী করেছেন।

খাগড়াছড়িতে চাইনিজ এসএমজি ও জি-৩ রাইফেলের পর আরো একটি এম-১৬ রাইফেল উদ্ধার

total-arms

নিজস্ব প্রতিবেদক:

খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলায় গতকালের চাইনিজ সাব মেশিন গান ও জি-৩ রাইফেল উদ্ধারের পর শনিবার সকালে একই স্থান থেকে ৩৮ রাউন্ড গুলিসহ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আরো একটি এম-১৬ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে। পার্বত্যনিউজের মহালছড়ি প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এ নিয়ে মোট উদ্ধারের তালিকা হচ্ছে, একটি বিদেশী জি-৩ রাইফেল, একটি জি থ্রি রাইফেলের ম্যাগজিন, একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান, একটি চাইনিজ সাব মেশিনগানের ম্যাগজিন, একটি এম-১৬ রাইফেল, এম-১৬ রাইফেলের ম্যাগজিন ১ টি, এম-১৬ রাইফেলের গুলি ৩৮ রাউন্ড, ১৯ রাউন্ড জি থ্রি রাইফেলের গুলি, ৪৯ রাউন্ড চাইনিজ সাব মেশিন গানের গুলি, একটি ওয়াকিটকি সেট, একটি মোবাইল, একটি ব্যাগ  উদ্ধার করে।

জানা গেছে, শুক্রবারের বন্দুক যুদ্ধ ও তল্লাশীর পর সেনাবাহিনী সারারাত বন-পর্বত সঙ্কুল গহীন এলাকা কঠোরভাবে ঘেরাও করে রাখে এবং শনিবার সকালের আলো ফোটার সাথে সাথে আরো একদফা নিবিড় তল্লাশী শুরু করে এবং এ দফা তল্লাশীতে গুলি ভর্তি ম্যাগজিনসহ এম-১৬ রাইফেলটি পাওয়া যায়।

পার্বত্যনিউজ প্রতিনিধি রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয়দের বরাতে জানিয়েছে যে, সেনাবাহিনীর গুলিতে আরো একজন পাহাড়ী সন্ত্রাসী গুরুত্বর আহত হয়েছে। ঘটনাস্থলে আরো একটি যখমের আলামত রয়েছে। সম্ভবত সন্ত্রাসীরা তাদের আহত এ সদস্যকে সরিয়ে ফেলতে সমর্থ হয়।

hsfj

উল্লেখ্য, শুক্রবার ইতোপূর্বে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে যে, খাগড়াছড়িতে সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের মধ্যে সংঘটিত এক বন্দুকযুদ্ধে সামরিক পোশাক পরিহিত এক ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী মারা গেছে। এসময় একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান ও একটি জি থ্রি রাইফেল ও বিপুল পরিমাণ গুলি ও সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানিয়েছে, জেলার সদর উপজেলার কুতুকছড়িতে ইউপিডিএফ’র ১৫-২০ সদস্যের একটি সশস্ত্র দল দলীয় প্রধানের নেতৃত্বে গোপন বৈঠক করে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান যেমনঃ তাইন্দং, গঙ্গারাম, সাজেক, বঙগাতলী, ঘিলাছড়ি, হামুক্কুছড়া, কুতুকছড়ি, মাইলছড়ি, সিদ্ধিছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া যায়।

সূত্র মতে, গোপন বৈঠক শেষে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র দলটি গোপন আস্তানায় চলে যায়। আজ সন্ধ্যা ৬ টায় মহালছড়ি জোন সদর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল দাতকুপিয়া এবং ভুয়াছড়ি এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে গিয়ে ইউপিডিএফ’র সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানাটির সন্ধান পায় এবং যৌথবাহিনী সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা ঘিরে ফেলতে সক্ষম হয়।

যৌথবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। জবাবে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান দলটিও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলটি অন্ধকার পাহাড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

fdawt

এসময় দুই পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে সামরিক পোশাক পরিহিত ইউপিডিএফের এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনী তার কাছ থেকে একটি চাইনিজ সাব মেশিনগান (এসএমজি) উদ্ধার করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে বিনষ্ট করার লক্ষ্যে ভূমি দখল, বাঙ্গালী হটাও এবং তথাকথিত জুম্মল্যান্ড গঠনের চক্রান্ত নিয়ে বেশ কিছুদিন যাবত পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠনগুলো খুন, গুম, হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানান সশস্ত্র অপপ্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউপিডিএফ’র আজকের এই গোপন বৈঠক সেই গোপন অভিলাষ পূরণের অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ইউপিডিএফের প্রচার ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান নিরন চাকমা গণমাধ্যমকে তাদের সংগঠনের সাথে এ ধরণের কোনো সংঘর্ষের খবর অস্বীকার করেছেন।

সাজেক- বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক সংযোজন

সাজেক১

বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ

শাহজাহান কবির সাজু সাজেক থেকে ফিরে:

খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৬৯ কিলোমিটার। পথিমধ্যে নজরে আসবে দৃষ্টিনন্দন পাহাড়ী নদী কাচালং-মাচালং ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার দৃশ্য। সাজেক প্রবেশের দরজায় রয়েছে রুইলুই পাড়া। রুইলুইতে পাংখো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসতি। সড়কগুলো উন্নত কাঠামোর আদলে গড়া হলেও কোথাও কোথাও ভাঙ্গন ধরেছে।

রুইলুই পাড়ায় সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় পর্যটকদের জন্য বেশকিছু বিনোদনের মাধ্যম রাখা হয়েছে। এরমধ্যে হ্যারিজন গার্ডেন, ছায়াবীথি, রংধনু ব্রীজ, পাথরের বাগান উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য একাধিক বিশ্রামাঘার ও ক্লাবঘরও রয়েছে রুইলুই পাড়ায়। সাজেকের সবশেষ সীমানা কংলাক। কংলাক রুইলুই থেকে আরও দেড়ঘন্টার পায়ে হাঁটার পথ। কংলাকে পাংখোয়াদের নিবাস। পাংখোয়ারা সবসময় সবার উপরে থাকতে বিশ্বাসী তাই তারা সর্বোচ্চ চূড়ায় বসবাস করে। কংলাকের পরেই ভারতের মিজোরাম।

“সাজেক” রাঙামাটি জেলায় হলেও সড়ক পথে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম খাগড়াছড়ি বুক চিরে। এই সাজেকের কারণেই অনেকটা পাল্টে গেছে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। বিশেষ করে পরিবহন ও হোটেল ব্যবসা জমে উঠেছে বেশ। সাজেকের পর্যটকরা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে অবস্থানের ফলে হোটেলগুলোতে ভীড় লেগেই আছে। এছাড়াও হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্পে বোনা কাপড়-চোপড়ের দোকানেও নতুন নতুন অতিথিরা এসে করছে কেনাকাটা।

সাজেক পর্যটন স্পট শুধু স্থানীয় পর্যটনের উন্নতি ঘটায়নি বরং পুরো খাগড়াছড়ি জেলার পর্যটন সেক্টরকে বদলে দিয়েছে। সাজেক ভ্রমণের আগে বা পরে দুর দুরান্তের দর্শনার্থীরা দেখে যাচ্ছে খাগড়াছড়ি আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গপথ, রিসাং ঝর্ণা, হাজাছড়া ঝর্ণা, আলুটিলা তারেং, পানছড়ির শান্তিপুর অরণ্য কুটির বৌদ্ধ বিহার, শান্তিপুর রাবার ড্যাম, মানিকছড়ির রাজবাড়ি, রামগড়ের সীমান্তবর্তী চা-বাগান, মাইসছড়ির দেবতাপুকুর, মহালছড়ির এপিবিএন লেক, জেলা সদরের পানখাইয়াপাড়ার নিউজিল্যান্ড র্পাক ও জেলাপরিষদের হর্টিকালচার পার্ক ইত্যাদি।

সাজেক ২

খাগড়াছড়ি জেলা ছাড়াও রাঙামাটি ও বান্দরবানে রয়েছে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু এইসব পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে পেছনে ফেলে বর্তমানে দেশ সেরা পর্যটন স্পটের স্থান দখলে এগিয়ে চলছে সবুজের বুকে মেঘের রাজত্ব করা “সাজেক”।

চাঁন্দের গাড়ী চালক মো: আ: শুক্কুর জানান, সাজেকের ভাড়া এখন প্রতিনয়িত হচ্ছে। সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে কমপক্ষে শতাধিক গাড়ি গাড়ী সাজেক যাচ্ছে এ ছাড়াও প্রতিদিন ২০-৫০ গাড়ীতে ৩০০- ৫০০ পর্যটক আসা-যাওয়া করছে। সিজনে এটা অনেক বৃদ্ধি পায়। এই সাজেক চাঁন্দের গাড়ী মালিক ও চালকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন বলেও মুচকি হেসে জানান। এই সাজেক জমজমাট রেখেছে খাগড়াছড়ির আবাসিক হোটেল, খাবার হোটেল ও টেক্সটাইল দোকানগুলোর বানিজ্যেকে।

খাগড়াছড়ি গেষ্ট হাউস, হোটেল গাইরিংসহ কয়েকটি আবাসিকে গিয়ে জানা যায়, সাজেক রিসোর্টের কারণে অগ্রিম বুকিং করা শুরু হয়েছে দুর-দুরান্ত থেকে। খাবার হোটেল মনটানা, হোটেল ফেনী, হোটেল চিটাগাং, হোটেল ভতঘর সহ কয়েকটিতে গিয়ে জানা যায়, আমুল পরিবর্তনের খবর। সাজেকের পর্যটকরা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে অবস্থানের ফলেই হোটেলগুলোতে ভীড় লেগেই আছে বলে সূত্রে জানা যায়।

কুরবানীর ঈদের পর একসাথে বিপুল পরিমাণ পর্যটক আসায় খাগড়াছড়ি শহরের হোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউজে সঙ্কুলান না হওয়ায় অনেককে মুক্তস্থানে রাত কাটাতে হয়েছে। এছাড়াও হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্পে বুনা কাপড়-চোপড়ের দোকানেও নতুন নতুন অতিথিরা এসে কেনা কাটা করছে বলে দোকানীরা জানায়।

স্থানীয়দের মতে, খাগড়াছড়ির অন্যান্য পর্যটন স্পটগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা গেলে সাজেক বেড়াতে আসা পর্যটকদের যদি আরো ১/২ দিন খাগড়াছড়িতে রাখা যায় তবে এই জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে।

ঈদ পরবর্তী সাজেকে যে পর্যটকের বান ডেকেছিল তার রেশ এখনো রয়েছে। গাড়ী চালকদের যেন বসে থাকার সময় নেই। চাঁন্দের গাড়ীর চালক খোরশেদ, অজয় ত্রিপুরা, তাজুল ইসলাম জানায় বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক গাড়ী খাগড়াছড়ি থেকে ছুটে চলে সাজেকে। এই সাজেক চাঁন্দের গাড়ী মালিক ও চালকদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে তাদের মুচকি হাঁসি।

গহীন অরণ্যয় সবুজের বুক চিরে আঁকা বাঁকা সড়কে গাড়ীর হর্ণের শব্দে বাঘাইহাট থেকে সাজেক পর্যন্ত মুখরিত করছে প্রতিটি মুহুর্তে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছোট ছোট কোমলমতিরা দু’হাত তুলে অভিনন্দন জানাচ্ছে অচেনা অতিথিদের। অতিথিতারাও ফিরতি অভিনন্দন দিয়ে বলে দিচ্ছে- আমরা আবার আসিব।

সাজেক রিসোর্টে

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীর ভীড়ে তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই। বেশীর ভাগই পরিবার-পরিজন নিয়ে উপভোগে এসেছে পাহড়ের ঐতিহ্যবাহী বাহন চাঁন্দের গাড়ী চড়ে। হ্যাপি টং রিসোর্ট, য়ারুং রিসোর্ট, সজেক লুসাই কটেজ, সাজেক রিসোর্ট, মনিং ষ্টার হোটেল, মারতি অর্ডার হোটেল ম্যানেজারদের সাথে আলাপকালে জানায়, সিট খালি নেই আগামী ১০/১৫ দিন ইতিমধ্যে অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। হ্যালিপ্যাডের পাশে অবস্থিত ঝাড় ভোজ মিরিংজার “চিংলক, কংলাক, ও রুইলুই”তে বসার জায়গা নেই। সাজেকের বুকের মাঝ বরাবর রয়েছে প্রাক্তন মেম্বার “থাংগো লুসাই” এর লাল সবুজে ঘেরা বাঁশের তৈরী বাসভবন।

সাজেক প্রবেশের মাইল দু’য়েক আগে হাউসপাড়ার ঝর্ণাটিও বেশ মনোমুগ্ধকর। হাউস পাড়ার গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান। দোকানে বসা জুমিতা চাকমা, কুলসেন ত্রিপুরা, শুভ চাকমা জানায়, দীর্ঘ বছর পর এই সাজেকে মানুষের আগমন। তাই তারাও বেশ উপভোগ করে। তাছাড়া সাজেকের ছেলে-মেয়েরা এখন বিদ্যালয়মুখী হওয়াতেও খুশী অভিভাবক মহল। কয়েকজন অভিভাবক জানায়, ছেলে-মেয়েরা বিদ্যালয়ে পড়বে তা তারা কখনো ভাবেননি। কিন্তু সরকারের যুগোপযোগী একটি পদক্ষেপে আমাদের শিশুরা ভবিষ্যতে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে তা ভাবতেই ভালো লাগে।

তবে সাজেকের নৈসর্গিক সুন্দরের মাঝেও কিছু কিছু চিত্র দর্শনার্থীর মন খারাপ করে দেয়। যার মাঝে রয়েছে সাজেক রিসোর্টের বিপরীতে কয়েকটি ঝুপড়ির ঘর। এই জরাজীর্ণ ঘরগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে কয়েকটি পরিবার। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ নাজুক। ঝুপড়ির ঘরের আশপাশ এলাকায় অনেকেই রিসোর্ট বানিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তারা ঝুপড়ির ঘরে থাকলেও তাদের মন অনেক বড় বলে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় জানান দিয়ে বলল “দেকনা বাবু আমি সোলার লাগাইয়ে, ঘরে অকন বাত্তি জ্বলে”।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তৈরি সাজেক পর্যটন কেন্দ্র ও যাতায়াত সড়ক স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান পাল্টে দিয়েছে। গত জুনে প্রাপ্ত এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাজেকে মোট ৮ টি আবাসিক হোটেল আছে। এর মধ্যে ৬ টি বেসামরিক। বেসামরিক হোটেলগুলো হলো: হেপতং রিসোর্ট, আলো রিসোর্ট, মারতি রিসোর্ট, শাহারা রিসোর্ট, মাখুম রিসোর্ট, লুসাই লজিং। বর্তমানে আরো কয়েকটি রিসোর্ট চালু হয়েছে। এইসবগুলো রিসোর্ট বা আবাসিক হোটেলের মালিক স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দাগণ। এসব হোটেলের কর্মচারীরাও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর।

এসব হোটেলে প্রতিদিন গড়ে ১২০-১৫০ জন পর্যটক রাত্রিযাপন করে থাকে। পর্যটক প্রতি ৫০০ টাকা করে ধরলে প্রতিরাতে আবাসিক পর্যটকদের নিকট থেকে আয় হয় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা। আবার এসকল রিসোর্ট বা আবাসিক হোটেলের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এসব রেস্টুরেন্টে আবাসিক ও অনাবাসিক পর্যটকদের খাবার সরবরাহ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

সাজেকের পর্যটন খাতে ৫০ জন লোক সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর রুইলুই প্রজেক্টে ২৪ জন কর্মরত। এদের গড় আয় প্রতিদিন ২০০ টাকা। এসকল লোক আগে বেকার ছিলো বা জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতো। এ ছাড়াও পরোক্ষভাবে সাজেকের পর্যটন খাতে শতাধিক লোক জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

সাজেকে সেনাবাহিনী পরিচালিত দুইটি রিসোর্ট রয়েছে। একটি সাজেক রিসোর্ট, অন্যটি রুন্ময় রিসোর্ট। সাজেক রিসোর্টে ৪ টি রুম রয়েছে। যেগুলোর ভাড়া ১০ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে। রুন্ময় রিসোর্টে ৫ টি রুম রয়েছে। যেগুলোর ভাড়া  সাড়ে ৪ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের উত্তর-পূর্ব কূল ঘেঁষে রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালির পাশেই ভারতের মিজোরাম। বর্ষা মৌসুমে চিরসবুজ সাজেক সাদা মেঘে আচ্ছাদিত থাকে। এক কথায় সাজেককে মেঘের বাড়ি বললেও ভুল হবে না। অনেকে আবার সাজেককে বাংলার দার্জিলিং হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। সবমিলিয়ে সাজেক এক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির নাম।

বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অক্লান্ত প্রচেষ্ঠার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যন্ত স্থান করেছে নিয়েছে বর্তমানের সাজেক। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক পর্যটনের আদলে সাজেককে সৃজন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও সৌর বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা হয়েছে সাজেকে। এতে করে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে সেখানে।

সাজেকের অপরূপ সৌন্দর্যের বাহারী দৃশ্য উপভোগে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক সেনাপ্রধানসহ একাধিক সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা পরিদর্শন করেছেন। সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে সাজেককে জনসাধারণের সুবিধার্থে আরও বেশী দৃষ্টিনন্দন করতে কাজ করছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি উন্নত জীবনযাত্রার সাথে সংযুক্ত হচ্ছে সেখানে বসবাসরত পাংখোয়া, লুসাই ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানা কর্মসংস্থান ও আর্থিক কর্মে জড়িত থেকে তাদের জীবনমানের ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

কিন্তু এই ভূস্বর্গ নিয়ে দিন দিন বিতর্কের ঝড় বেড়েই চলছে। সম্প্রতি পর্যটক দম্পত্তির গাড়ী পোড়ানোর ঘটনায় পর্যটকরা ভূগছে নিরাপত্তাহীনতায়। বিশেষ করে রিজার্ভ ফরেষ্টের দু’পাশে অবৈধ বসতি ও স্থাপনা গড়ে ওঠায় নিরাপত্তা নিয়ে কানা-ঘুষা চলছে সব মহলে। এইসব অবৈধ বসতি ও স্থাপনা তুলে রাস্তার দু’ধার যদি পরিষ্কার রাখা যায় তাহলে নিরাপত্তা বাহিনীও বহু দুর থেকে আঁচ করতে পারবে সন্ত্রাসীদের অবস্থান। স্থানীয়দের দাবী সাজেকে বিদ্যুৎ, মোবাইল টাওয়ার ও সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারবে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সাজেক রিসোর্টের প্রচারণা প্রয়োজন বলে তাদের অভিমত।

যেভাবে যাবেন

ঢাকার আরামবাগ, ফকিরাপুল থেকে এসি/নন এসি বাসে খাগড়াছড়ি গিয়ে সেখান থেকে চাঁন্দের গাড়ি বা জিপে সাজেক যাওয়া যায়। সাজেকে সেনাবাহিনী পরিচালিত রিসোর্টগুলোতে থাকতে চাইলে আগে থেকে বুকিং করতে হয়। অনলাইন বুকিং করতে পারেন নিম্নের লিংক থেকে: http://rock-sajek.com/Accomodation-Sajek-Resort, http://rock-sajek.com/Accomodation-Runmoy

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তি ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে

সাখাওয়াত হোসেন

এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় সাত বছর পর পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম কয়েকটা দিন কাটাতে। গিয়েছি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে। খাগড়াছড়ি, কাপ্তাই, রাঙামাটি, বাঙ্গাল হালিয়া-বান্দরবান পাহাড়ি রাস্তা ধরে পৌঁছেছিলাম খাগড়াছড়ি থেকে বান্দরবান।

প্রায় এক যুগ আগে রাঙামাটি থেকে বান্দরবান যেতে হলে চট্টগ্রাম ঘুরে যেতে হতো। কাপ্তাই যেতে হলেও একইভাবে অথবা রাঙামাটি থেকে জলযানে কাপ্তাই পৌঁছাতে হতো। সময়ও লাগত অনেক। এই রাস্তাটি এখন তিনটি জেলাকেই সংযুক্ত করেছে। রাস্তাটির নির্মাণকাজ নব্বইয়ের দশকে শেষ হয়েছিল, কিন্তু তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের অশান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেটা খুব ব্যবহার করা হতো না। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টে যায়। ফলে এখন এ রাস্তা কার্যকর বলে বিবেচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার সর্বসাধারণের এখন চট্টগ্রাম ঘুরে নয়, সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর ২০০৮ এবং ২০০৯–এ নির্বাচন কমিশনের কাজে গিয়েছিলাম এই তিন জেলা সদরে। তারপর আর যাওয়া হয়নি। ১৯৯০-৯২-এ কর্তব্যরত ছিলাম বান্দরবান সেনা রিজিয়নে, কমান্ডার হিসেবে। ওই সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চলছিল। পার্বত্য চুক্তি অন্তত সে পরিস্থিতির ইতি টেনেছে।

১৯৯৭ সালে যে পার্বত্য চুক্তি বাংলাদেশের সরকার এবং পার্বত্য জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সম্পাদিত হয়েছিল, তার প্রচেষ্টা চলেছিল আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে। তবে সে প্রচেষ্টা তেমন ফলপ্রসূ না হলেও চুক্তির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ওই সময়ের সরকার এই চুক্তি সম্পাদন করে। অবশ্যই চুক্তি সম্পাদনের কৃতিত্বের দাবিদার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার। ওই সময়ে ওই চুক্তির বিরোধিতা করলেও পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টায় ছিল।

পার্বত্য চুক্তির পর যোগাযোগব্যবস্থার যে উন্নতি হয়েছে, তার সুফল পেতে শুরু করেছে এলাকার ১১টি ছোট-বড় নৃগোষ্ঠী। বর্তমানে প্রতিটি জেলা সদরের সঙ্গে সব উপজেলার সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে, যা এক দশক আগেও সম্ভব ছিল না।

হালে বান্দরবান জেলা সদরের সঙ্গে সবচেয়ে দুর্গম উপজেলা থানচির সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। থানচি থেকে আলীকদম, লামা উপজেলাও এখন অভ্যন্তরীণ সড়ক দিয়ে যুক্ত হয়েছে। বছর দুই আগেও এই দুই উপজেলা প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। বান্দরবান সদর থেকে কক্সবাজার সড়ক হয়ে যেতে হতো এই দুই উপজেলায়। সংক্ষেপে বলতে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে যেসব জায়গায় হেলিকপ্টার ছাড়া হাঁটাপথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দিনের পর দিন লেগে যেত, সেসব জায়গায় বর্তমানে কয়েক ঘণ্টায় পৌঁছাতে পেরেছি।

যোগাযোগ অবকাঠামোর সঙ্গে বাজারব্যবস্থার যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে দক্ষিণের জেলা বান্দরবানে পর্যটনের যে দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে, তা অচিন্তনীয় ছিল। নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে যে কয়েকটি জায়গা পর্যটনের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ সেসব জায়গায় প্রতিদিন শত শত লোকের পদচারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এদের সমাগম। পর্যটনকে কেন্দ্র করে আশপাশের উপজাতীয় গ্রামগুলোতে হস্তশিল্প গড়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র। এরই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়ভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

একই সঙ্গে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখরিত পার্বত্য চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটগুলো। চাকমা অধ্যুষিত রাঙামাটি জেলা পুরোনো ও বৃহত্তর জেলা শহর। যোগাযোগের ব্যবস্থা অন্যান্য জায়গার তুলনায় ভালো থাকলেও একটি মাত্র কলেজ ছিল সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে। তবে এ পর্যন্ত ওই জেলার ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭৯ জন (২০১১) জনসংখ্যার জন্য রয়েছে ২৯১টি সরকারি এবং ১২০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২২টি জুনিয়র স্কুল, ৬টি সরকারি ও ৪৫টি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ২টি সরকারি ও ১৩টি বেসরকারি কলেজ, ৭টি কারিগরি স্কুল, ১টি মেডিকেল কলেজ এবং হালে প্রতিষ্ঠিত কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নিয়ে জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের বিরোধিতা ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। বান্দরবান জেলায় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৩৫ জন (২০১১) জনসংখ্যার জন্য দুটি সরকারি ও দুটি বেসরকারি কলেজ এবং প্রায় হাজার খানেক প্রাথমিক স্কুলের মধ্যে একটি মুরং বা ম্রো আবাসিক হাইস্কুলও রয়েছে। অনুরূপভাবে খাগড়াছড়ি জেলার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।

একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতে শুধু রাঙামাটি বা কাপ্তাইকে ধারণায় নেওয়া হতো, এখন তেমন নেই। খাগড়াছড়ি, মংসার্কেল, ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ, রাঙামাটি চাকমা সার্কেল এবং বান্দরবান মারমা সংখ্যাগরিষ্ঠ বোমাং সার্কেল আলাদা আলাদা সত্তায় গড়ে উঠেছে। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন স্থানীয় নৃগোষ্ঠী নেতৃত্ব, যাদের বেশির ভাগ সহ-অবস্থানে উন্নয়নের পক্ষে।

এত সব উন্নয়নের ভিত পার্বত্য চুক্তি হলেও সম্ভব হয়েছে বিগত দিনগুলোতে শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলোর প্রচেষ্টায়। অতীতে যেমন ছিল, বর্তমানে সমগ্র দেশের তুলনায় সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। তবে ইউপিডিএফ নামে যে গোষ্ঠীটি পার্বত্য চুক্তির বিরোধী, তাদের তৎপরতা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বলপূর্বক চাঁদা তোলার ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনজীবন অতিষ্ঠ।

এত উন্নয়নের পরও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মনঃকষ্ট রয়ে গেছে। তার প্রধান কারণ ভূমি ব্যবস্থাপনা ও স্বত্বাধিকার নিয়ে। এখনো চলছে ভূমি জবরদখলের ঘটনা, যার সঙ্গে শুধু প্রভাবশালী বাংলা ভাষাভাষীরাই নয়, স্থানীয় প্রভাবশালী নৃগোষ্ঠীর নেতারাও রয়েছেন। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রধান সমস্যাও ভূমি–সংক্রান্ত, যা তিনটি আইনের, যার মধ্যে একটি স্থানীয় প্রচলিত প্রথাগত ডামাডোলে আরও জটিল হয়েছে। এ সংকট সহজে সমাধান হওয়ার নয়। যদিও চুক্তি মোতাবেক যেকোনো অধিগ্রহণের পূর্বানুমতি জেলা পরিষদের, তথাপি জেলা পরিষদ এ বিষয়ে অকার্যকর রয়েছে। সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি অন্তরায় নয়, অন্তরায় ভূমির বিষয়ে দ্বৈত বেসামরিক প্রশাসন। যেসব জায়গায় স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থাকার কথা, সেগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধা হয়ে রয়েছে।

পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোতে প্রথম নির্বাচনের পর আর নির্বাচন হয়নি, যার কারণে প্রায় ২৪টি বিষয় হস্তান্তরিত হলেও পরিষদ কার্যকর করতে পারছে না। জেলা পরিষদগুলো নির্বাচিত ও কার্যকর হলে চুক্তি বাস্তবায়নে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। একইভাবে কাউন্সিলের নির্বাচনও এখন হয়নি নানা জটিলতার কারণে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোকে ক্ষমতায়ন করলে অনেক ছোটখাটো সমস্যার সমাধান স্থানীয় পর্যায়েই সম্ভব। সে কারণেই অন্তত এসব পরিষদের নির্বাচনের অন্তরায়গুলো দূর করা আবশ্যক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় যথেষ্ট স্থিতিশীল। তবে নতুন উপসর্গ ইউপিডিএফের নামে সংঘটিত সশস্ত্র তৎপরতাকে রাজনৈতিক ও স্থানীয়ভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পার্বত্য চুক্তির পক্ষগুলো এবং যারা পক্ষের বাইরে রয়েছে সেসব জনগোষ্ঠীকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি যা এখন দৃশ্যমান, সেটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সবার কর্তব্য। ওই অঞ্চলের কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর মানুষগুলোর জীবনযাত্রা অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন প্রয়োজন। যেকোনো উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর, বিশেষ করে নৃগোষ্ঠীর মানুষদের সম্পৃক্ততা কাম্য। উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নয়, সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের মাধ্যমে অনেক জটিল বিষয়ের সুরাহা সম্ভব। আমার চাকরিকাল ১৯৯০-৯২-এর এতগুলো বছর পরও সাধারণ নাগরিক হিসেবে বান্দরবানে সর্বসাধারণের কাছ থেকে যে অভূতপূর্ব উষ্ণতা পেয়েছি, তাতে আমি নিশ্চিত যে আন্তরিক হলে সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা যেমন করা যায়, তেমনি ছোট-বড় সমস্যার সমাধানও সম্ভব।

এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

♦ সূত্র: প্রথম আলো

খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের উদ্যোগে দুস্থদের মাঝে বিনামূল্যে ঔষধ ও শীতবস্ত্র বিতরণ

Untitled-1

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি:

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তার পাশাপাশি আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তার পাশাপাশি পার্বত্যাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী-বাঙ্গালীদের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা ও অন্যান্য সেবা দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের উদ্যোগে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীদের মাঝে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা, ঔষধ ও গরীব-দুস্থদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে।

সকালে জেলা সদরের কৃষি গবেষণা এলাকার বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ঔষধ ও শীতবস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স ম মাহবুব উল আলম, এসজিপি, পিএসসি।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি সেনা জোনের অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. আতিক হাসান, ৫ ফিল্ড এ্যাম্বুলেন্সের অধিনায়ক লে. কর্ণেল হামিদ, রিজিয়নের জেনারেল স্টাফ অফিসার মেজর মো. নাসির উল হাসান খাঁন,  খাগড়াছড়ি সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. নুরুল আজম , সাধারণ সম্পাদক কানন আচার্য় ও খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু দাউদসহ প্রিন্ট ও ইলক্ট্রনিক মিডিয়ার কর্মরত সাংবাদিকবৃন্দ।

খাগড়াছড়ি সেনা রিজিয়নের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল স ম মাহবুব উল আলম বলেন, সেনাবাহিনীর কাজ শুধুমাত্র নিরাপত্তা দেয়া নয়, সামাজিকতার অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী এসব কাজ করে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, বড়পাড়া গ্রামসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ৫০০ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও বাঙ্গালীদের মাঝে কম্বল ও বিনামূল্যে ঔষধ বিতরণ করা হয়েছে।

মীরাক্কেলের প্রতিযোগী খাগড়াছড়ির কায়কোবাদের আজ জন্মদিন: কেক কেটে পালিত হবে আজকের পর্বে

পার্বত্যনিউজের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে মো কায়কোবাদ

কায়কোবাদ

পার্বত্যনিউজ প্রতিবেদন:

কোলকাতার জি বাংলা চ্যানেলে প্রচারিত ব্যাপক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান মীরাক্কেলে সিজন-নাইনের অন্যতম কৌতুক অভিনেতা বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি জেলার মো. কায়কোবাদের আজ জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে আজ প্রচারিত মীরাক্কেলে পারফর্ম করবেন কায়কোবাদ। আজকের অনুষ্ঠানের সেটে তার জন্মদিন বিশেষভাবে পালন করা হবে বলে পার্বত্যনিউজকে জানিয়েছেন কায়কোবাদ নিজেই।

মো. কায়কোবাদ তার পরিবার, জন্ম, শিক্ষা, কৌতুকের জগতে আসা, মীরাক্কেলে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কোলকাতা থেকে টেলিফোনে কথা বলেন পার্বত্যনিউজের সাথে।

কায়কোবাদের জন্ম ১৯৯৩ সালের ১৫ জানুয়ারী। বাড়ি খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার কাজীপাড়া গ্রামে। বাবা কবির হোসেন পেশায় ড্রাইভার, মা নুরুন্নাহার বেগম গৃহিনী। দুইভাই তিন বোনের সকলের বড় তিনি। পড়ালেখা শুরু করেন মাটিরাঙ্গা মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর মাটিরাঙা পাইলট হাইস্কুল পাশ করে খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাট্যকল্যা বিভাগে। বর্তমানে এই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তিনি। থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলে।

image-8ec70974d41d83e192c104f014fcb92f1aaf297d467c70c689344d918f2568da-V

অভিনয় ও কৌতুকের জগতে আসা প্রসঙ্গে মো. কায়কোবাদ বলেন, ছোটকাল থেকেই সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ও ভালবাসা। কলেজ লাইফে একক অভিনয়যেমন খুশী তেমন সাজো ‘র শীর্ষ পুরস্কার দুই বছরই তিনি পেয়েছিলেন। খাগড়াছড়ি থাকতে সৃজন থিয়েটারে কাজ করতেন। বর্তমানে এই থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক। এখন কোনো থিয়েটার বা অভিনয়ের সাথে সরাসরি না থাকলেও নাট্যকলার ছাত্র হিসাবে সিলেবাসের কাজগুলো করে যেতে হয়।

পার্বত্যনিউজের নিয়মিত পাঠক মো. কায়কোবাদ বলেন, বাংলাদেশের এনটিভির হা সো’র মাধ্যমে টেলিভিশনে পর্দায় আগমণ। হাসো’র সিজন থ্রিতে লাকি সেভেন পর্যায়ে পারফর্ম করতে সক্ষম হন তিনি। এরপর মীরাক্কেলে নাইনের চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাছাই পর্বে কোলকাতা থেকে চট্টগ্রাম আসেন গ্রুমার কৃষ্ণেন্দু, পলাশ অধিকারী ও জি বাংলার চিন্ময় মণ্ডল। সেখানে তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে টিকে ঢাকার গুলশানে ৩৪ জনের অডিশনেও অংশ নেন। ৩৪ জন থেকে চুড়ান্ত পর্বের জন্য ১০ জনের দলে টিকে কায়কোবাদ মীরাক্কেল সিজন নাইনে পারফর্ম করার সুযোগ পান।

বাংলাদেশের প্রতিযোগী হিসাবে কোলকাতার অনুষ্ঠান মীরাক্কেলে কেমন লাগছে জানতে চাইলে কায়কোবাদ বলেন, ভালবাসা কাকে বলে, কতো প্রকার ও কি কি এখানে না আসলে বুঝতে পারতাম না। এখানকার গ্রুমাররা এতো ভালবাসে বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের এটা বলে বোঝানো যাবে না। বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম মেলামেশায় কিছু সমস্যা চোখে পড়লেও এখানে তেমন কিছুই চোখে পড়ে না। একটা উদাহরণ দিই। বড়দিনের অনুষ্ঠানে স্যান্টা ক্লজের কেক কেটে আমি অর্নবদাকে খাওয়াতে গেলে তিনি আগে আমাকে খাওয়ান এবং আমার খাওয়া অংশটি তিনি পরে খান। এখানকার গ্রুমাররা অত্যন্ত আন্তরিক। এর বাইরে মীর ভাই, শুভঙ্কর দা’র আন্তরিকতা আমাদের মুগ্ধ করেছে। একটি কথা জানিয়ে রাখি, এখানে কিন্তু বাংলাদেশেরও দুইজন গ্রুমার আছেন। একজন ইশতিয়াক নাসির ও অন্যজন শাওন মজুমদার।

মীরাক্কেল

বাংলাদেশের শিল্পীরা মীরাক্কেলে এতো ভাল করে কিন্তু বাংলাদেশে কেন এমন অনুষ্ঠান হয় না এমন প্রশ্নের জবাবে কায়কোবাদ বলেন, বাংলাদেশে আমরা সব কিছু দ্রুত পেতে চাই। যেমন হা সো তে আমরা ৬ মাসের শুটিং একবারে করেছি। কিন্তু মীরাক্কেলে ১০-১২ দিন গ্রুমিংযের পর ১/২টা অনুষ্ঠানের শুটিং হয়। তাছাড়া অনুষ্ঠান যোদিন প্রচার হবে সেদিনে কোনো বিশেষ কিছু থাকলে, বিচারক কারা সেসব নানা বিষয় খেয়াল করে এখানে অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হয়। বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণেও বাংলাদেশে এমন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয় না।

কিন্তু বাংলাদেশের কোম্পানীগুলোই তো মীরাক্কেলের টাইটেল স্পন্সর, তাহলে আমরা কেন স্পন্সর পাই না জানতে চাইলে কায়কোবাদ বলেন, দেখেন মীরাক্কেল একটা বিপুল জনপ্রিযতা অর্জন করেছে। একটা জায়গা সৃষ্টি করেছে। আমি মীরাক্কেলে না আসলে আপনার মতো লোকের সাথে কি আমার কথা হতো? বিষয়গুলো এরকম। ফলে মীরাক্কেলের বাজেট সমস্যা নেই।

বিচারকরা বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ক্ষেত্রে কতোটা আন্তরিক জানতে চাইলে তিনি পার্বত্যনিউজকে বলেন, মীরাক্কেলে তিনজন বিচারক রয়েছে। পরাণ বন্দোপাধ্যায়, রণিদা ও শ্রী লেখা দি। উনারা বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের প্রতি খুবই আন্তরিক। আগের পর্বগুলোতে যারা পারফর্ম করেছেন যেমন আবু হেনা রণি, ইশতিয়াক নাসির, পরশ, শাওন মজুমদার, জামিল প্রমুখ ভাইয়েরা তাদের যোগ্যতা দিয়ে বিচারকদের মনে বাংলাদেশী প্রতিযোগীদের ক্ষেত্রে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টিতে সহায়তা করেছেন। তাছাড়া শুভঙ্কর দা নিজের বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের অনেক ভালবাসেন।

মীরাক্কেলের প্রাণ মীরের সাথে কাজ করতে কেমন লাগছে জানতে চাইলে কায়কোবাদ বলেন, মীরভাই একটা আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা। তার সাথে কাজ করতে পারা ভাগ্যের ব্যাপার। অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন মীরাক্কেল অনুষ্ঠান স্ক্রিপ্ট করে কাট কাট করে করা হয়। এটা একদম ঠিক নয়। এখানে সবগুলো ক্যামেরা একসাথে অন থাকে। যা কিছু হয় সবকিছু খুব স্বাভাবিক, ন্যাচারাল। মীরভাই তার নিজের মতো করে সবকিছু করে যান। তিনি কখন কি করবেন কেউ জানে না। যতো প্রকার পাগলামি হয়, তিনি ইনস্ট্যান্ট সবকিছু এমনভাবে করেন যা অবিশ্বাস্য।

মীরাক্কেলে আসার পর খাগড়াছড়ির লোকদের সাথে যোগাযোগ হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফ্যামিলি মেম্বার ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হয়। তবে আমি জানি খাগড়াছড়ির লোকেরা আমার উপর খুব খ্যাপা। কারণ মীরাক্কেলে আমার পরিচয় খাগড়াছড়ি না বলে চট্টগ্রাম বলা হয়। আমি তাদের কাছে বহুবার বলেছি আমার বাড়ি চট্টগ্রাম নয়, খাগড়াছড়ি। কিন্তু এখানকার লোকেরা খাগড়াছড়ি তেমন একটা চেনে না। তাই তারা আমাকে চট্টগ্রামের বাসিন্দা বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিষয়টা নিয়ে আমারও মনোকষ্ট রয়েছে। কিন্তু এখানে আমার কিছু করার নেই।

মীরাক্কেলে আপনার চুড়ান্ত লক্ষ্য কি জানতে চাইলে কায়কোবাদ বলেন, একটা সুযোগ যখন পেয়েছি দেশের জন্য ভাল কিছু করতে চাই। সবাইকে আমার জন্য দোয়া করতে বলবেন, যেন দেশের জন্য সম্মানজনক কিছু করে ফিরতে পারি।

জন্মদিন উপলক্ষে আজকের সেটে বিশেষ কিছু থাকবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, থাকবে। আজকের সেটে হয়তো গ্রুমারগণ কেক কেটে তার জন্মদিন পালন করবেন।

প্রসঙ্গান্তরে মো. কায়কোবাদ আরো জানান, দেশে থাকতে তিনি মোটামুটি নিয়মিতভাবে পার্বত্যনিউজ পড়তেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অসহায় ও অবহেলিত মানুষের জন্য পার্বত্যনিউজের ভূমিকারও প্রশংসা করেন তিনি।