বাংলাদেশের উপজাতীয়রা আদিবাসী নয় কেন?

মেহেদী হাসান পলাশ

আজ ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস। ১৯৮২ সালের এই দিনে ফ্রান্সের জেনেভা শহরে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিংয়ে ৯ আগস্টকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস হিসাবে নির্ধারণ করা হয় এবং ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সম্মেলনে এ দিবসকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস রূপে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে সারা বিশ্ব প্রতিবছর বিশ্বে ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বর্তমান বিশ্বে ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস- যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগ। বিশ্বের ৯০ টি দেশে এই ৩৭ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তারা বিশ্বের ৭ হাজার ভাষা ও ৫ হাজার স্বতন্ত্র সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। প্রত্যেক বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের একটি থিম থাকে। এ বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- “Indigenous peoples’ migration and movement.” বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর বাংলা করেছে, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দেশান্তর ও প্রতিরোধের সংগ্রাম’।বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিশ্বের এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অগ্রীম শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা জানাই।

২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা বাংলাদেশে নিজেদের আদিবাসী দাবী করে বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন শুরু করে।  পরবর্তীকালে তারা দেশের সমতলের বিভিন্ন উপজাতীয় ও তফসিলী জনগোষ্ঠীকেও এতে সামিল করে মোট ৪৫ টি মতান্তরে ৭৫ টি জনগোষ্ঠীকে একত্রে আদিবাসী আখ্যা দিয়ে করে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের স্বীকৃতি দাবী করে। কিন্তু বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী এই আদিবাসী দাবী শুরুতেই দেশের মধ্যে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। কারণ আভিধানিক ও নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞা অনুযায়ী আদিবাসী মানে আদিবাসিন্দা। আদিবাসী শব্দের ইংলিশ প্রতিশব্দ Indigenous people. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, “কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।” মর্গান বলেন, The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil…”. (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972).

সকল ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কেউই বাংলাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করছে না। তাদের সকলেই বর্হিবিশ্ব বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সময়। এই অনুপ্রবেশও স্মরণাতীত কাল পূর্বে ঘটে নাই। মাত্র ৫-৭ শত বছর পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার থেকে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উপরন্তু বাংলাদেশের এই উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের আদিনিবাস ভারত ও মিয়ানমারেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃত নয়।

অন্যদিকে বাংলাদেশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় মানব বসতির যেসব প্রত্নবস্তু, অবস্থান ও প্রমাণ পাওয়া গেছে তা খৃষ্টপূর্ব ১৬০০-৫০০ সালের পুরাতন। সেকারণে উপজাতিদের আদিবাসী আখ্যাদানকারী গবেষকগণ এখন ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও) কনভেনশন-১৬৯’র আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞার অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তফশিলী সম্প্রদায়কে আদিবাসী দাবি করছেন ও দাবি করতে উদ্বুদ্ধ করছেন।

এ বিষয়ে জাতিসংঘ ও এর অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে এ পর্যন্ত প্রধানত: তিনটি চার্টারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এগুলো হলো: ১৯৫৭ সালের ৫ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের অধিভূক্ত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ৪০তম অধিবেশনে প্রদত্ত-  Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107),  আইএলও’র ১৯৮৯ সালের ৭ জুন অনুষ্ঠিত ৭৬তম অধিবেশনে প্রদত্ত- Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169),  এবং ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে  The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples.

এখানে আইএলও’র প্রথম চার্টার দুটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চার্টার দুটির শিরোনাম হচ্ছে- Indigenous and Tribal Populations Convention. অর্থাৎ আদিবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠী বিষয়ক কনভেনশন। অর্থাৎ এই কনভেনশনটি আদিবাসী ও উপজাতি বিষয়ক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। কনভেনশনে পাস হওয়া ধারাগুলো একই সাথে আদিবাসী ও উপজাতি নির্ধারণ ও তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে। শুধু আদিবাসীদের নয়। অথচ বাংলাদেশে এই চার্টারকে আদিবাসীদের জন্য এক্সক্লুসিভ করে উপস্থাপন করা হয়।

এখানে উপজাতি ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)-  এর আর্টিকল ১ এর (a)তে ট্রাইবাল বা উপজাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘tribal peoples in independent countries whose social, cultural and economic conditions distinguish them from other sections of the national community, and whose status is regulated wholly or partially by their own customs or traditions or by special laws or regulations’. অর্থাৎ  একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্নতর যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচলিত তাদেরকে উপজাতি বলা হয়। এখন আইএলও’র এই সংজ্ঞাটি যদি আমরা বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, সাঁওতাল ও অন্যান্য সাবস্পেসিসসমূহের সাথে বিচার করি তাহলে পরিস্কার বোঝা যায় তারা উপজাতি। কেননা, ট্রাইব শব্দের বাংলা অর্থ উপজাতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতলববাজ বুদ্ধিজীবীরা আইএলও কনভেনশনের আর্টিকল ১-এ উপস্থাপিত ট্রাইবাল ডেফিনেশনটি সম্পূর্ণ চেপে গিয়ে শুধু ইনডিজিন্যাস পিপলের সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করে থাকেন।

এখন আমরা ইনডিজিন্যাস পিপলের সংজ্ঞাটি বিশ্লেষণ করবো।  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- এর আর্টিকল ১-এর (b)তে ইনডিডজিন্যাস পিপল বা আদিবাসীর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘peoples in independent countries who are regarded as indigenous on account of their descent from the populations which inhabited the country, or a geographical region to which the country belongs, at the time of conquest or colonization or the establishment of present state boundaries and who, irrespective of their legal status, retain some or all of their own social, economic, cultural and political institutions’.

অর্থাৎ আদিবাসী তারা যারা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধিকৃত হওয়া বা বর্তমান সীমানা নির্ধারণের পূর্বে বা উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস করছে। এবং যারা তাদের কিছু বা সকল নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার ও প্রতিষ্ঠানসমূহ ধরে রাখে।

আইএলও কর্তৃক উপজাতি ও আদিবাসী সংজ্ঞার মূল পার্থক্য হচ্ছে নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধিকৃত হওয়ার, বর্তমান সীমানা নির্ধারণের পূর্বে বা উপনিবেশ সৃষ্টি পূর্ব থেকে বসবাস। বাকি শর্তগুলো মোটামুটি উপজাতিদের মতোই। অর্থাৎ একজন উপজাতি আদিবাসী হবেন বা হবেন না উপরোক্ত শর্তের ভিত্তিতে।

এছাড়াও রয়েছে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ৬১তম অধিবেশনে The United Nations Declaration on the Rights of Indigenous Peoples চার্টার। এটি এক্সক্লুসিভলি আদিবাসীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট, উপজাতিদের নয়।

Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)-  ১৯৫৭ সালে পাস হলেও এ পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র ২৭টি দেশ এই কনভেশন র‌্যাটিফাই করেছে। ১৯৭২ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। বাংলাদেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করলেও তা ছিল বৈশ্বিক দৃষ্টিতে। কেননা, বাংলাদেশ কখনই এ দেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে তা স্বীকার করেনি। বাংলাদেশের বাইরে উপমহাদেশের পাকিস্তান ও ভারত এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। যদিও এরই মধ্যে ৮টি দেশ এই কনভেনশনকে নিন্দা করে তা থেকে বেরিয়ে গেছে। অন্যদিকে  Indigenous and Tribal Peoples Convention, 1989 (No. 169)- ১৯৮৯ পাস হলেও এখন পর্যন্ত বিশ্বের  মাত্র ২৩টি দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেছে। এরমধ্যে কনভেনশন-১০৭ থেকে বেরিয়ে আসা ৮টি দেশও রয়েছে। উপমাহদেশের একমাত্র নেপাল ছাড়া আর কোনো দেশ এই কনভেনশন র‌্যাটিফাই করেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানও Indigenous and Tribal Populations Convention, 1957 (No. 107)- র‌্যাটিফাই করলেও কনভেনশন-১৬৯ র‌্যাটিফাই করেনি। কনভেনশন- ১৬৯ অবশ্য ১০৭-এর মডিফিকেশন, তবুও তা আলাদা করে র‌্যাটিফিকেশন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কেননা, কনভেনশন-১৬৯ পাস হওয়ার পর কনভেনশন-১০৭ এর গুরুত্ব হারিয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক চার্টার কোনো দেশ র‌্যাটিফাই না করলে তা তার জন্য প্রযোজ্য নয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আইএলও কনভেনশন ১০৭ ও ১৬৯ যে দেশগুলো র‌্যাটিফাই করেছে তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকান ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশ যাদের প্রধান বা অন্যতম প্রধান জনগোষ্ঠী বা গোষ্ঠীগুলো আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত।

অন্যদিকে ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেয়া দেশগুলো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যাণ্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে আদিবাসীদের অধিকার রক্ষায় খুব সোচ্চার ও পৃষ্ঠপোষক দেশগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু নিজ দেশের জন্য আইএলও কনভেনশন ১০৭, ১৬৯ ও জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টারের সিগনেটরি বা ভোটদানকারী নয়। এ থেকেই নিজ দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের নিজেদের অবস্থান এবং অন্যদেশের ‘আদিবাসীদের’ জন্য কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণের কারণ ও মতলব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। উল্লিখিত চারটি দেশ শুধু ইউএন চার্টারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে তাই নয় বরং অধিবেশনে তাদের প্রতিনিধিরা এই চার্টারের প্রবল সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছে।

এখন বিবেচনা করা যাক, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না? তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক হবে। কারণ অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। বর্তমান সরকার নতুন সৃষ্ট ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে, সেটা যদি সফল হয় তাহলে রোহিঙ্গাদেরও কি বাংলাদেশের আদিবাসী বলা হবে? সাংস্কৃতিকভাবে রোহিঙ্গারাও তো বৈশিষ্টমণ্ডিত। একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যেসকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার? কারণ এই সংজ্ঞার উপাদানগুলো ইংলিশ OR  শব্দদ্বারা বা অথবা শব্দ দ্বারা বিভক্ত।

আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তর বঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে চাকমা, মারমা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধির ও গৌরবের ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। পাল রাজারা বাঙালি ছিলেন, যেমন ছিলেন মহামতি অতীশ দীপঙ্কর। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রি কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এখানকার মূল জনস্রোত, বাঙালি জনগোষ্ঠী।

সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক বিদগ্ধজনের মুখে শোনা যায়, উপজাতি বললে তারা যদি অপমানিত বোধ করে, হেয় বোধ করে এবং আদিবাসী বললে যদি খুশী হয় তাহলে তা বলতে দোষ কোথায়? ইতিহাসে যাই-ই থাক, শতকরা ৯৮ ভাগ একক বাঙালি জনগোষ্ঠীর দেশে আমরা আমাদের দেশের মুষ্টিমেয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি এইটুকু উদারতা কি দেখাতে পারি না? এই প্রশ্ন যেকোনো সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষের হৃদয় বিগলিত করতে বাধ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্বনামধন্য ভাইস চ্যান্সেলরও একবার একান্ত আলোচনায় আমার কাছে এই মত প্রকাশ করেছিলেন। প্রশ্নটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। কিন্তু গোল বাঁধিয়েছে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে আদিবাসী বিষয়ক একটি ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। আগেই বলা হয়েছে, এ ঘোষণাপত্র উপস্থাপন করলে ১৪৩টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে, ৪টি দেশ বিপক্ষে, ১১টি দেশ ভোট দানে বিরত এবং ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। ভোট দানে বিরত থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া দেশগুলো হচ্ছে- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘোষণাপত্রে সর্বমোট ৪৬টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদের বেশ কয়েকটি ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, সংবিধান ও আত্মপরিচয়ের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

একথা নিশ্চিত করে বলা যায়, যেসব ব্যক্তিবর্গ খুব সরলভাবে বা অসেচতন-উদারতায় উপজাতিদের আদিবাসী বলতে ইচ্ছুক/আগ্রহী তাদের অনেকেই হয়তো এই ঘোষণাপত্র পড়ে দেখেননি অথবা তার মর্মার্থ অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন (অবশ্য তারা মতলববাজদের কথা আলাদা)। নিম্নে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রের কিছু অনুচ্ছেদ নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

অনুচ্ছেদ-৩ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।

অনুচ্ছেদ-৪ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার উপভোগের বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ে তথা স্বশাসিত কার্যাবলীর অর্থায়নের পন্থা ও উৎস নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-৫ : আদিবাসী জনগণ যদি পছন্দ করে তাহলে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার রেখে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, আইনগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অক্ষুণ্ন রাখা ও শক্তিশালীকরণের অধিকার লাভ করবে।অনুচ্ছেদ-৬ : আদিবাসী ব্যক্তির জাতীয়তা লাভের অধিকার রয়েছে।

অনুচ্ছেদ-১৯ : রাষ্ট্র  আদিবাসীদের প্রভাবিত করতে পারে এমন আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পূর্বে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি নেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আন্তরিকত্ব সদিচ্ছার সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরের অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশের ভেতর কমপক্ষে ৪৫টি স্বায়ত্তশাসিত বা স্বশাসিত অঞ্চল ও সরকার ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এসব অঞ্চলে সরকার পরিচালনায় তারা নিজস্ব রাজনৈতিক কাঠামো, জাতীয়তা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আইনপ্রণয়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার পাবে। এবং এসব অঞ্চলের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিকার ও কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষণীয়, প্রকাশ্যে বলা না হলেও এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বতন্ত্র জাতীয়তার মধ্যে লুকানো রয়েছে স্বাধীনতার বীজ।

এই ঘোষণাপত্রে আদিবাসীদের ভূমির উপর যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তা আরো ভয়ানক। যেমন :

অনুচ্ছেদ-১০ : আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের ভূমি কিংবা ভূখণ্ড থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উৎখাত করা যাবে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বাধীন ও পূর্ববহিত সম্মতি ছাড়া কোনভাবে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা যাবে না এবং ন্যায্য ও যথাযথ ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সমঝোতা সাপেক্ষে স্থানান্তর করা হলেও, যদি কোন সুযোগ থাকে, পুনরায় তাদেরকে সাবেক এলাকায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অনুচ্ছেদ-২৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন, দখলীয় কিংবা অন্যথায় ব্যবহার্য কিংবা অধিগ্রহণকৃত জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের অধিকার রয়েছে।

২৬: ৩. রাষ্ট্র এসব জমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের আইনগত স্বীকৃতি ও রক্ষার বিধান প্রদান করবে। সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রথা, ঐতিহ্য এবং ভূমি মালিকানা ব্যবস্থাপনা মেনে সেই স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৭ :  রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আইন, ঐতিহ্য, প্রথা ও ভূমি মালিকানাধীন ব্যবস্থাপনার যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করবে।

অনুচ্ছেদ-২৮ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ যা তাদের ঐতিহ্যগতভাবে মালিকানাধীন কিংবা অন্যথায় দখলকৃত বা ব্যবহারকৃত এবং তাদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়া বেদখল, ছিনতাই, দখল বা ক্ষতিসাধন করা হয়েছে এসব যাতে ফিরে পায় কিংবা তা সম্ভব না হলে, একটা ন্যায্য, যথাযথ ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পায় তার প্রতিকার পাওয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রয়েছে।

২৮: ২. সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী স্বেচ্ছায় অন্য কোন কিছু রাজি না হলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গুণগত, পরিমাণগত ও আইনি মর্যাদার দিক দিয়ে সমান ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ অথবা সমান আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বা অন্য কোন যথাযথ প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

অনুচ্ছেদ-৩০ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায় সম্মতি জ্ঞাপন বা অনুরোধ ছাড়া ভূমি কিংবা ভূখ-ে সামরিক কার্যক্রম হাতে নেয়া যাবে না।

অনুচ্ছেদ-৩২ : ২. রাষ্ট্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদের উপর প্রভাব বিস্তার করে এমন কোন প্রকল্প অনুমোদনের পূর্বে, বিশেষ করে তাদের খনিজ, জল কিংবা অন্য কোন সম্পদের উন্নয়ন, ব্যবহার বা আহরণের পূর্বে স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি গ্রহণের জন্য তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ও সহযোগিতা করবে।

উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নিজস্ব আইনে নিজস্ব ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মুষ্টিমেয় চিহ্নিত উপজাতিরা দাবি করছে ঐতিহ্য ও প্রথাগত অধিকার বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল ভূমির মালিক তারা। একই অধিকার বলে সমতলের উপজাতীয় অধ্যুষিত এলাকার সকল ভূমির মালিকানা সেখানকার উপজাতীয়রা দাবি করবে। সেখানে যেসব ভূমি সরকারি ও ব্যক্তিগত মালিকানা (আদিবাসী নয়) রয়েছে তা ফেরত দিতে হবে বা তার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমনকি উপজাতীয়রা রাজি না হলে সমতল থেকে সমপরিমাণ সমগুরুত্বের ভূমি ফেরত দিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যেহেতু ঐ গোষ্ঠী সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানাচ্ছে, সেকারণে সেখান থেকে সকল সামরিক স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যেসব বাঙালি বসতি স্থাপন করেছে তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে। ইউএনডিপিসহ কিছু বৈদেশিক সংস্থা ইতোমেধ্যে প্রকাশ্যে এ দাবি তুলেছে।

ঘোষণাপত্রের ৩৬ অনুচ্ছেদটি আরো ভয়ানক।

অনুচ্ছেদ-৩৬ : ১. আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, বিশেষত্ব যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে তারা অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠী তথা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংক্রান্ত কার্যক্রমসহ যোগাযোগ, সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল উপজাতি জনগোষ্ঠীর মূল আবাস ভারত ও মিয়ানমার। সেখানে এখনো তাদের মূল জনগোষ্ঠী রয়ে গেছে। এখন বাংলাদেশে তাদের খণ্ডিত অংশ যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পায় তাহলে ভারতের সমগ্র সেভেন স্টিস্টার্স রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের বিপুল এলাকা আদিবাসী ল্যান্ড স্বীকৃতি পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। একই সাথে সীমান্তের উভয়পাড়ের অভিন্ন জনগোষ্ঠী যদি অভিন্ন রাজনৈতিক, সরকার কাঠামো কিংবা স্বাধীনতার দাবি তোলে তা আঞ্চলিক সমস্যায় রূপ নেবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবেশী ভারত সরকারের দৃষ্টিগোচর করতে পারে।  আদিবাসী জনগোষ্ঠী উল্লিখিত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে যা ৪২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান স্বাধীন করণে জাতিসংঘের ভূমিকা বিশ্বের দেশপ্রেমিক জনগণকে আতঙ্কিত করেছে। অধুনা পশ্চিম পাপুয়া নিউগিনিতেও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

যদিও ৪৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন আদিবাসীর দাবি এমন একটা জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চারিত হচ্ছে যারা ৪২ বছর ধরে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। কৌশলগত কারণে তারা স্বায়ত্তশাসনের কথা যতোটা উচ্চকিত করে স্বাধীনতার কথা ততোটা নয়। ফলে দেশের অধিকাংশ মানুষই রাষ্ট্রবিরোধী এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থাও রহস্যময় আবরণে সযত্নে ঢেকে রেখেছে দেশবিরোধী এই দুষ্টুক্ষত। কিন্তু যারা সচেতন, বিশেষ করে যারা সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহার করেন তাদের প্রতি আহ্বান একবারের জন্য হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীদের পরিচালিত প্রোফাইল, গ্রুপ ও পেইজগুলো ভিজিট করে দেখুন কী ভয়ানক রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে সেখানে। স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড গঠনের জন্য নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, মানচিত্র দিয়ে কিভাবে বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা সচেতনতার জন্য দেশবাসীর জানা উচিত।

পাঠকের জ্ঞাতার্থে সিএইচটি জুম্মল্যান্ড নামে তাদের পরিচালিত একটি পেইজের ঠিকানা এখানে দেয়া হলো :(https://www.facebook.com/pages/CHT-jummaland/327524104096965?fref=ts)।

শুধু ফেসবুক বা সামাজিক গণমাধ্যম নয়, পাহাড়ী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা নিউজ পোর্টাল খুলেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের প্রচার চালাচ্ছে। তাদের পরিচালিত অসংখ্য সাইটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, chtnews.com. এই সাইটে করুণালঙ্কার ভান্তে নামে জেএসএসের এক শীর্ষ নেতার ধারাবাহিক সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছে বেশ কয়েকদিন ধরে। বৌদ্ধ ভিক্ষুর বেশধারী এই ব্যক্তি নিজেকে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিচয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় তার কর্মতৎপরতার কথা বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অডিও-ভিডিও’র এই স্বাক্ষাৎকারে ভান্তে আরো জানিয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র তাদের হাতে রয়েছে। এখন তিনি শুধু ৫ লক্ষ গোলাবারুদ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এই পরিমাণ গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে পারলে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে স্বাধীন জুম্মল্যাণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই ভিক্ষু সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী তরুণ প্রজন্মকে তার সাথে একাত্ম হতে অহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আন্তর্জাতিক শক্তিকে তিনি পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাবেন বলেও জানিয়েছেন। কাজেই বাংলাদেশের উপজাতিদের আদিবাসী স্বীকৃতি কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়। এর সাথে জড়িত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, অস্তিত্ব, কর্তৃত্ব, ইতিহাস ও মর্যাদার প্রশ্ন।

সূত্র: পাক্ষিক পার্বত্যনিউজ, আগস্ট, ২০১৮ সংখ্যা।

♦ মেহেদী হাসান পলাশ: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ ও সহকারী সম্পাদক, দৈনিক ইনকিলাব।

email: palash74@gmail.com  


পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বিষয়ে লেখকের অন্যান্য লেখা

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- শেখ হাসিনা

pm news

স্টাফ রিপোর্টার:

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের টেকসই উন্নয়নের জন্য তাঁর সরকারের গৃহীত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথনৈতিক কার্যক্রমে গতি সঞ্চার হয়েছে। এতে এ অঞ্চলের জনগণের জন্য সুযোগ-সুবিধা বয়ে নিয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিশ্বাস করে যেখানে ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী নির্বিশেষে সকলেই সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তুলতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষ্যে সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শারীরিক প্রতিবন্ধী থেকে সকল সদস্যের উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

আজ প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে ছাত্রবৃত্তি বিতরণকালে তিনি একথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নে সরকারের সম্ভাব্য সকল সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

তিনি বলেন, সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকরা বাদ পড়ে যাওয়ায় এর আগে প্রকাশিত গেজেট সংশোধনের জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বিশেষ কার্যক্রমের অধীনে এ ছাত্রবৃত্তি প্রদান করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) মহাপরিচালক (প্রশাসন) কবির বিন আনোয়ার এবং সিলেট, মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজু দেশোয়ারা বক্তব্য রাখেন।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা সংবিধানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকারের কথা নিশ্চিত করা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা উপেক্ষিত হয়ে আসছে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কোন সরকার তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি অনেক স্কুল তাদের শিশুদের ভর্তি করেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকরা বাংলাদেশের নাগরিক, তাই তারা সত্যিকার নাগরিক হিসেবে দেশে বসবাস করবে এবং সকল অধিকার ভোগ করবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর সরকার বিশেষ সহযোগিতা কার্যক্রম চালু করে। তবে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসায় সহযোগিতা কার্যক্রম চরম বাধার সম্মুখীন হয়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় সহযোগিতা কার্যক্রম চালু করে। এই কার্যক্রমের আওতায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে অথনৈতিকভাবে উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁর সরকার তৃণমূল পর্যায়ে সুবিধাবঞ্চিত জনগণের অবস্থার উন্নয়নের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে যোগ্য নাগরিক ও দক্ষ পেশাদার হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে শিক্ষাবৃত্তি প্রাপ্তদের নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান।

এ বছর ৩৫০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২০ জন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে চেক গ্রহণ করেছে।

খবর- বাসস।

বাংলাদেশ নাগরিকের রাষ্ট্র, কোন আদিবাসীর নয়

FMHIS70015

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

রাষ্ট্রীয় সত্তা অর্জন পরবর্তী জাতিগঠণের (nation – building) নিরিখে বাংলাদেশ এখনও একটি অসম্পূর্ণ ও অপরিণত রাষ্ট্র। এমন মন্তব্য দুটো কারণনির্ভর। এক, বাঙালি ও বাংলাদেশী বিভাজন, যা অবশ্য পুরোটাই অভ্যন্তরীন রাজনীতির অনাকাংক্ষিত ফসল, এবং ইতিহাসবর্জিত। জাতীয়তাবাদ দীর্ঘ ও ধারাবাহিক ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তন ও আবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি; জাতীয়তাবাদের লেবেল তৈরি করে তা রাতারাতি কোন জনগোষ্ঠীর ওপর সেঁটে দেয়া সম্ভব নয়। দুই, প্রায় অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বাস বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলে (limitrophic region) যারা সাংবিধানিকভাবে নাগরিক হলেও জাতিসত্তার বিচারে স্বাতন্ত্র্যের দাবিদার। কিন্তু এমন নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যে অতিরিক্ত মাত্রা সংযোজন আন্তর্জাতিক মহল প্ররোচিত।

অন্যদিকে বাঙালি জাতিসত্তাকে এককভাবে গুরুত্ব দেয়ার অর্থ ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহকে অস্বীকার করা। জনান্তিকে শ্রুত মত অনুসারে এ সমস্যা সমাধানের জন্য বাঙালির পরিবর্তে বাংলাদেশী লেবেল বেছে নেয়া হয়েছিল; কিন্তু যা বালখিল্যসুলভ ও অনৈতিহাসিক।[1] কলমের এক মোচড়ে বা কারও এক কথায় হাজার বছরের ইতিহাস পাল্টে দেয়া যায় না। আর বাঙালিত্বের ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া আসলে গরিষ্ঠের ঔদ্ধত্যের ব্যাপার। (majoritarian arrogance), যা গণতন্ত্রের ধরণ হিসেবে নিন্দিত। বিকল্প কাংক্ষিত গণতন্ত্রের ধরণ বহুত্বভিত্তিক গণতন্ত্র (pluralist or polyarchic democracy)। কিন্তু এখনকার বাংলাদেশ মেধাশূন্য নেতৃত্ব ও সংস্কৃতিহীন রাজনীতির শিকার; ফলে কাজীর গরুর মতো আমাদের গণতন্ত্র- খাতায় আছে, গোয়ালে নেই; সংবিধানে আছে, বাস্তবে নেই।

এমন একটি অসম্পূর্ণ ও অপরিণত রাষ্ট্রব্যবস্থায় মেধাহীন নেতৃত্বের কারণে আদিবাসী প্রশ্নটি যে সংকট হয়ে উঠবে তা-ই স্বাভাবিক। বর্তমান নিবন্ধটির বক্তব্য আদিবাসী দাবিটির প্রশ্নবিদ্ধ সারবত্তা, ঐতিহাসিকতা এবং সে কারণে যৌক্তিক অসারতা নির্দেশ করা। শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইস্যুটির স্রষ্টা জাতিসংঘের নেতৃত্বে পশ্চিম দুনিয়া। শত শত বছর সারা পৃথিবী শোষণ করে স্ফীত হওয়া পুঁজিবাদী দুনিয়া এখন লগ্নি পুঁজির কারবারি। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সম্পর্কে তাদের এ বোধ ও অভিধা যে তাদের মানবিকতাবোধ উৎসারিত তা, বিশ্বাস করার মতো তথ্য- প্রমাণ আমাদের হাতে অপ্রতুল। বরং কোন্ উদ্দেশে আচম্বিতে এ অভিধার চয়ন তা তলিয়ে- খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নৃতত্ত্বের মূল থেকে বিষয়টির বিবেচনা শুরু করা যেতে পারে। সমস্যার শিকড় নিহিত ethnicity এবং nation এর দ্বৈততার (dichotomy) মধ্যে। সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বে ethnicity শব্দ ও সংশ্লিষ্ট ধারণার সূত্রপাত করেন জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবার (Max Weber)। তার সংজ্ঞায়নে ethnicity হল, “Those human groups that entertain a subjective belief in their common descent because of similarities of physical type or of customs or because of memories of colonization and migration; this belief must be important for group formation; furthermore, it does not matter whether an objective blood relationship exists..” ইংরেজ নৃবিজ্ঞানী এ্যান্থনী স্মিথ বলেন, “an ethnicity is group of human beings whose members identify with each other, usually on a presumed or real common heritage.”[2] রক্তসম্পর্কের বন্ধন ছাড়াও যে ethnicity-চেতনা গড়ে ওঠার অনেক বাস্তবিক ও ঐতিহাসিক কারণ আছে তা ম্যাক্স ভেবার স্বীকার করেন। অন্যদিকে nation- ও প্রায় সমধর্মী এক প্রপঞ্চ। দীর্ঘকাল একদল জনগোষ্ঠী এক ভূখণ্ডে অধিবাস করে অভিন্ন ঐতিহ্য ও চেতনার অধিকারী হলে তারা nation হয়। অর্থাৎ nation হলো, ঐতিহাসিক পরম্পরাভিত্তিক এক গোষ্ঠী মানুষের চেতনা (a state of mind)। পশ্চিম দুনিয়ায় জাতি-রাষ্ট্র (nation – state) গড়ে উঠতে থাকলে nation এবং ethnicity-র বৈপরীত্য পরিস্ফুট হয়। জাতি- রাষ্ট্রের ধারণা, এমন রাষ্ট্র সব ethnicity-র প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু লঘিষ্ঠ অন্যান্য ethnicity তা মনে করে নি। ফলে তারা কখনও সমতাভিত্তিক সাঙ্গীকরণ, (assimilation), কখনও স্বায়ত্তশাসন (autonomy) বা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা (independence) দাবি করেছে। সুতরাং মৌলিক সমস্যা হলো, nation – state শব্দযুগলের মধ্যে, যা এখন সেকেলে ও বাতিলযোগ্য। এখন হওয়া উচিত nation – state; কারণ সংখ্যায় ক্ষুদ্র হলেও ethnicity-র nation হবার সব বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গরিষ্ঠ ethnicity -র ঔদ্ধত্যে এমন ঐতিহাসিক সত্য বিস্মৃত হয়। এমন বিস্মৃতির শিকার যারা তাদেরকে স্বনামখ্যাত ইতিহাসবিদ বার্নার্ড লুইস (Bernard Lewis) বলেছেন blundering amnesiacs। বাংলাদেশসহ অনেক রাষ্ট্রই এখন blundering amnesiacs -এর মতো আচরণ করে। উপরন্তু, নৃতত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে উপজাতি (tribe) ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী (ethnic minority) বলা গ্রহণযোগ্য নয়; এরা ক্ষদ্র জাতিসত্তা (small national entities)। ক্ষুদ্রতা সংখ্যাবাচক, গুণবাচক নয়।

কিন্তু এ ক্ষুদ্রজাতিসত্তার আদিবাসীত্ব অযৌক্তিক এক সংকটের উৎস। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও যুক্তি এদের এমন অভিধার স্বীকৃতি দিতে নারাজ। আদিবাসী শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ indigenous, যার অর্থ the people regarded as the original inhabitants of an area (Oxford Advanced Learner’s Dictionary)। বুৎপত্তিগতভাবে আদিবাসী শব্দটির অর্থও অভিন্ন। নৃতত্তবিদ লুই মর্গান Louis Morgan) মনে করেন, ““The aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial. They are the sons of the soil.”[3] এখন প্রশ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের অধিবাস তারা কি ভূমিপুত্র হিসেবে দাবি করতে পারে? যদি না পারে তাহলে তারা আদিবাসী হয় কীভাবে? জাতিসংঘ এযাবতকালের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের পুঞ্জিত জ্ঞানকে নস্যাৎ করে যেন আদিবাসী নামের এক উদ্ভট (প্রায়োগিক বিচারে) শব্দ আবিষ্কার করেছে। সে কথায় পরে আসছি; এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্ত্বাসমূহের অতীত ইতিহাস সংক্ষেপে জানা যাক।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে ১৪ টি জনগোষ্ঠীর অধিবাসঃ ১. চাকমা; ২. মারমা; ৩. ত্রিপুরা; ৪. তঞ্চঙ্গা; ৫. লুশাই; ৬. পাংখো; ৭. খিয়াং; ৮. মারমা; ৯. মুরঙ; ১০. উচাই; ১১. বম; ১২. খুমি; ১৩. চাক ও ১৪. সুজে সাঁওতাল।[4] ইতিহাসের নিরিখে মোটা দাগে বললে, এরা কেউ ভূমিপূত্র নয়; সবাই বহিরাগত। কিন্তু স্বীকার্য, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এরা হয়ে গেছে ভূমিজ সন্তান। অতীতে এদের আদিবাস যেখানেই থাক, যেখান থেকে কোন কারণে তাদের আগমণ হোক না কেন ওরা বৃহত্তর বাঙালি সত্তার সংগে ভাগ করে নিয়েছে অভিন্ন বাসভূমি। একই অর্থে শংকর বাঙালি জাতির মিলিত ধারার মিথস্ক্রিয়ার ফসল আজকের বাঙালি জাতিকে কি অভিবাসী বলবো? নিশ্চয়-ই নয়। প্রাচীন ভারতবর্ষে বহিরাগত আর্যরা অভিবাসী থাকেনি, হয়েছে ভূমিলগ্ন সন্তান, গড়েছে সারা বিশ্বের বিমুগ্ধ বিস্ময়ের সভ্যতা- সংস্কৃতি। একই অর্থে বর্তমানের মার্কিন নাগরিক আর অভিবাসী নয়, তারা সবাই এক মহা melting pot- এ লীন হয়ে গেছে। কিন্তু এদের কাউকে তো আদিবাসী বলা হলো না। আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ১৭ সতকের গোড়া থেকে ইউরোপীয় অভিবাসন শুরু হয়। ঠিক একই সময়ে পার্বত্য জনপদবাসীদেরও অভিবাসন শুরু হয়। তাহলে অভিবাসী মার্কিনীদের আদিবাসী না বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীদের কেন আদিবাসী বলা হচ্ছে? ব্যাখ্যা বোধ হয় এই যে, মার্কিন মুল্লকে রেড ইন্ডিয়ান নামে আদিবাসী আছে। ওদের ক্ষেপিয়ে তুললে অশনি সংকেত অনিবার্য। সুতরাং বিশ্বপুঁজিবাদপোষিত বুদ্ধিজীবী- গবেষক সে দিকে পা মাড়ান নি। তারা আগ্রহী তৃতীয় দুনিয়ার দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর প্রতি। কারণ নানা ছলছুতোয় এমন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে পারলে পুঁজিবাদী অনুপ্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণের পথ সুগম হয়।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের আনাগোনা শুরু হয় ষোল শতক থেকে। এ সময়ে আসামের মিজোরাম থেকে কুকি নামের উলঙ্গ জনগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। এদের অনেকে এদিক Ñ সেদিক বিচরণ করে ফিরে যেত; কিন্তু কেউ কেউ বসতি গড়ে, যাদের পরবর্তী প্রজন্ম আজও বিদ্যমান। একই সময়ে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী খাগড়াছড়ি এলাকায় বন কেটে বসত গড়ে, এবং জুম চাষ শুরু করে। ১৬৬০-এর দিকে, অর্থাৎ সতের শতকের মাঝামাঝি চাকমাদের একটি দল আদিবাস আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে রামু থানার অদূরে সাময়িক অবস্থান নেয়। তারা পরে আরো গহীন অরণ্য আলী কদমের দিকে এবং রাঙামাটির দিকে যায় স্থায়িভাবে বাস করার জন্য। মগ বা মারমা জনগোষ্ঠীর অভিবাসন ঘটে ১৭৮৪Ñর দিকে। প্রায় একই সময়ে বোমাঙদেরও আগমন ঘটে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, আজ পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের অধিবাস তাদের অভিবাসন হয়েছিল ষোল থেকে আঠারো শতকের মধ্যে।

১৯৯৭-র ২ ডিসেম্বর যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় তা যে দীর্ঘ এবং প্রলম্বিত আলোচনার ফসল তার কোন পর্যায়েই আদিবাসী দাবির সপক্ষে কোন প্রসঙ্গ ওঠেনি, বা চুক্তিতেও শব্দবন্ধটি স্থান পায় নি। কিন্তু ২০০৭-এর জাতিসংঘ ঘোষণার পর থেকে আদিবাসী সংক্রান্ত দাবিটি শ্রুত হচ্ছে। জাতিসংঘের ঘোষণাটিতে এমন জনগোষ্ঠীর জন্য আকর্ষণীয় বেশ কিছু প্রসঙ্গ আছে। যেমন তাদের আতœঅধিকার, অভ্যন্তরীন ও স্থানীয় বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন, ভূমির ওপর অধিকার, নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা, সামরিক কার্যক্রম প্রত্যাহার; এবং এমন লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা। এছাড়াও প্রসঙ্গক্রমে আলোচ্য আই এল ও কনভেনশন। ’৫৭-র ১০৭ নং কনভেনশন বাংলাদেশ অনুমোদন করে ১৯৭২-এ। এ কনভেনশনের বিশেষ দিকগুলো ছিল:

– জনগোষ্ঠীসমূহকে জাতীয় মূল ধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে।

– তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাষ্ট্র সহায়ক হবে।

– ভূমির ওপর তাদের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে, যা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে।

– নিরাপত্তা বা আর্থ-সামাজিক উদ্দেশে রাষ্ট্র এমন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকার জমি ব্যবহার করতে পারবে, তবে এলাকার জনগণের মতামত প্রয়োজন হবে, এবং যথাযথ পুনর্বাসন / ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

-এমন জনগোষ্ঠী দেশের প্রচলিত এবং অভিন্ন আইনে বিচারযোগ্য হবেন।

বাংলাদেশের ’৭২-এর সংবিধানে এমন জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত দু’টি বিশেষ ধারা আছে। ২৩ ধারায় বলা হয়েছেঃ “রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন।” বোধগম্য যে, রাষ্ট্রীয় সামগ্রিক স্বার্থে আই এল ও কনভেনশন এমন ধারায় পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলিত হয় নি। কিন্তু ২৮ (৪) নং ধারায় ব্যাপকভাবে বলা আছে , “নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।” সংবিধানের এমন দিকনির্দেশনা এবং সরকার / রাষ্ট্রের বাস্তব ভূমিকার মধ্যে কোন ফারাক আছে কী না বা এমন জনগোষ্ঠী কোনভাবে নিগ্রহের শিকার হয়েছে কী না, তা প্রসঙ্গান্তরে বিবেচ্য হতে পারে; এবং সে ক্ষেত্রে পার্বত্য জনপদবাসী সহমর্মিতার দাবিদার হতে পারেন।

১৯৮৯-এর আই এল ও কনভেনশন-১৬৯ বাংলাদেশ সরকারের জন্য বিব্রতকর ছিল;  ফলে তা অনুমোদিত হয় নি। এ কনভেনশনে জনগোষ্ঠীসমূহকে প্রকারান্তরে আদিবাসী (পুরনো / চিরস্থায়ী) বলা হয়েছিল। উপরন্তু, ছিল:

– সব ক্ষেত্রেই তারা স্বতন্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে।

– তাদের আত্মপরিচয় তাদের নিজস্ব-আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে বিবেচিত হবে।

-এমন এলাকায় কোন খাস জমি থাকবে না। আর প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অভিমত প্রাধান্য পাবে।

উল্লেখ্য, এ কনভেনশন অনুমোদন করলে বাংলাদেশের আঞ্চলিক অখন্ডতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতো। বলা যেতে পারে, জাতিসংঘের ২০০৭-এর ঘোষণা এ কনভেনশনের সম্প্রসারণ মাত্র।

চূড়ান্ত মন্তব্য

পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অধিবাস তারা ইতিহাসের নিরিখে মূলত অভিবাসী। কিন্তু এখন অভিবাসী নয়, নাগরিক-বাংলাদেশের যে কোন নাগরিকের মতোই। কিন্তু তারা আদিবাসী, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোনটিই নয়, তারা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, এবং তা আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে। সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আর বড় জাতিসত্তা বাঙালি নিয়ে বাংলাদেশ। সুতরাং বাংলাদেশ মানচিত্রের ভেতর কোন গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক-নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি যুক্তিযুক্ত হলেও তার আত্মঅধিকার প্রয়োগের প্ররোচনা অনাকাংক্ষিত ও বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রসূত। একই সমান্তরালে বিবেচ্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের উন্নয়ন ঘাটতি ও অধিকার বঞ্চনার বিষয়সমূহ। সুতরাং মনে হয়, সংবিধান ও শান্তিচুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে বাইরের কোন দুরভিসন্ধি হালে পানি পাবে না। উপরন্তু, প্রয়োজন জনগোষ্ঠীসমূহের বাস্তবানুগ দৃষ্টিভঙ্গী ও ভূমিকা। অবশ্য সর্বাগ্রে অনুঘটকের ভূমিকা সরকারের-ই; এবং যাতে কোন ভ্রান্তি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কালক্ষেপন দেশ ও সরকারের জন্য আত্মবিনাশী হবে।


[1] বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য Syed Anwar Husain, Bangladesh, National Scenario, Foreign Policy and SAARC (Dhaka: Agamee Prokashoni, 2003.

[2] Max Weber, “Economy and Society” in Guenther Roth and Claus Wittich (eds.) Trans. Ephraim Fischof vol. 2. (Berkeley, University of California Press, 1998); Anthony D. Smith, The Ethnic Origins of Nations (Oxford: Blackwell, 1986).

 [3] Louis Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972.

[4] দ্রষ্টব্য Syed Anwar Husain, War and Peace in the Chittagong Hill Tracts (Dhaka: Agamee Prokashoni, 1999) P. 48. অবশ্য সুজে সাঁওতাল এ তালিকায় নেই, এদের সন্ধান পেয়েছি ২০০৭-এ ঐ এলাকায় তথ্যানুসন্ধান করতে গিয়ে।

♦ লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

(সত্যান্বেষণ-গবেষণা ও নন্দনচর্চা কেন্দ্র আয়োজিত “বাংলাদেশ : জাতীয় সংহতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের গণদৃষ্টি” শীর্ষক সেমিনারে উপস্থাপিত।)

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা উচিত – ড. আনিসুজ্জামান

DSC00120 copy

মেহেদী হাসান পলাশ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এমিরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা উচিত। তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে মানুষ মাত্রই অভিবাসী। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দা যারা নিজেদের আদিবাসী হিসাবে দাবী করছেন তারা কেউ বাংলাদেশের আদি বাসিন্দা হিসাবে দাবী করছেন না। তারা জাতিসংঘ ও আইএলও’র কনভেনশন অনুযায়ী দাবী করছেন। সেখানকার বাসিন্দারা ইংরেজ আমল থেকে কিছু সুবিধা পেয়ে আসছিলেন যা তারা এখন আবার দাবী করছেন। ইংরেজ আমলেও বাঙালীরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানে বসতি গড়েছে, তাতে কোনো সমস্যা হয়নি। পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই ড্যামের যথাযথ ক্ষতিপুরণ না পাওযায় তারা ক্ষুব্ধ হয়।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কোনো কোনো সার্কেল চীফ স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেও জনগণের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার সময় সমজাতীয়তার ধারণা প্রবল থাকায় সেখানে তাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব হয়নি। সেকারণে সেখানে ব্যাপকভাবে বাঙালী অভিবাসন হয়েছে। এর একটি রাজনৈতিক কারণ ছিল। এতে করে সেখানকার মূল জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। পাহাড়ীদের ভূমির কোনো কাগজপত্র নেই। তারা প্রজন্ম ধরে সেখানে প্রথাগত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে আসছে। কিন্তু সরকার বাঙালীদের অভিবাসন করেছে জমির কাগজপত্র দিয়ে। ফলে ভূমি সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যার সমাধান হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা বহুলাংশে সমাধান হয়ে যাবে।

আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের স্পেশাল সেমিনার কক্ষে ‘বাংলাদেশের সকল নৃগোষ্ঠীগত অখণ্ড জনগণসত্তা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে গণদৃষ্টিপাত’ শীর্ষক শাস্ত্রীয় সভায় ড. আনিসুজ্জামান প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপিকা ড. খুরশীদা বেগম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

ড. আনিসুজ্জামান আরো বলেন, আমি মনে করি না আঞ্চলিক পরিষদ ও স্বায়ত্বসাশনের দাবী সংবিধান বিরোধী। তবে যারা প্রদেশ দাবী করছে তারা সংবিধান বিরোধিতা করছে। তিনি রাষ্ট্র ও সরকারকে পাহাড়ীদের সমস্যা একটু সহানুভুতির দৃষ্টি দিয়ে বিবেচনার অনুরোধ করেন।

সভাপতির ভাষণে ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রে জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের সকল নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে পারষ্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। এদেশের ১৬ কোটি মানুষের লিগালিটি, ইন্টিগ্রিটি ও ডিগনিটি এক সূত্রে গাঁথা গেলে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।  

অনুষ্ঠানের প্রবন্ধকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ১৭শতকের গোড়া থেকে ইউরোপীয় অভিবাসন শুরু হয়। ঠিক একই সময়ে পার্বত্য জনপদবাসীদেরও অভিবাসন শুরু হয়। তাহলে অভিবাসী মার্কিনীদের আদিবাসী না বলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীদের কেন আদিবাসী বলা হচ্ছে? ব্যাখ্যা বোধ হয় এই যে, মার্কিন মুল্লুকে রেড ইন্ডিয়ান নামে আদিবাসী আছে। ওদের ক্ষেপিয়ে তুললে অশনি সংকেত অনিবার্য। সুতরাং বিশ্বপুঁজিবাদপোষিত বুদ্ধিজীবী-গবেষকগণ সে দিকে পা মাড়ান নি। তারা আগ্রহী তৃতীয় দুনিয়ার দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর প্রতি। কারণ নানা ছলছুতোয় এমন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে পারলে পুঁজিবাদী অনুপ্রবেশ ও নিয়ন্ত্রণের পথ সুগম হয়।

প্রফেসর আনোয়ার হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অধিবাস তারা ইতিহাসের নিরিখে মূলত অভিবাসী। কিন্তু এখন অভিবাসী নয়, নাগরিক-বাংলাদেশের যে কোন নাগরিকের মতোই। কিন্তু তারা আদিবাসী, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোনটিই নয়, তারা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, এবং তা আর্থ-সামাজিক- সাংস্কৃতিক মানদণ্ডে। সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আর বড় জাতিসত্তা বাঙালি নিয়ে বাংলাদেশ। সুতরাং বাংলাদেশ মানচিত্রের ভেতর কোন গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক- নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি যুক্তিযুক্ত হলেও তার আত্মঅধিকার প্রয়োগের প্ররোচণা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রসূত। একই সমান্তরালে বিবেচ্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের উন্নয়ন ঘাটতি ও অধিকার বঞ্চনার বিষয়সমূহ। সুতরাং মনে হয়, সংবিধান ও শান্তিচুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে বাইরের কোন দুরভিসন্ধি হালে পানি পাবে না। উপরন্তু প্রয়োজন জনগোষ্ঠীসমূহের বাস্তবানুগ দৃষ্টিভঙ্গী ও ভূমিকা। অবশ্য সর্বাগ্রে অনুঘটকের ভূমিকা সরকারেরই; এবং যাতে কোন ভ্রান্তি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ দেশ ও সরকারের জন্য আত্মবিনাশী হবে।

তিনি আরো বলেন, সরকার নিজেই সংবিধান লংঘন করে আছেন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদ গঠনের কোনো সুযোগ নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মুস্তাফিজুর রহমান তার প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশর প্রাচীন ভুমি ১৮ লক্ষ থেকে ১০ হাজার বছর আগে গঠিত হয়েছে। কাজেই সে সময় কি এখানে মানুষের বসতি ছিল না? ছিল। বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজার বছর আগে মানব বসতি গড়ে ওঠে। এর ইতিহাস এখনো সুনির্দিষ্ট না হলেও এখানে  আধুনিক যেসব বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা চলছে, এবং তা থেকে যেসব প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তা প্রাগৈতিহাসিক। এ সকল প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নবস্তু বিশ্লেষণ করে এ কথা বলা সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলা আগে পুন্ড্র, সমতট, গৌড়, বঙ্গ নানা নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু পুন্ড্র, গৌড়, সমতট টেকেনি। বঙ্গ টিকে গেছে। এ বঙ্গ কালক্রমে বাংলা নামে পরিচিত হয়েছে যার অধিবাসী আমরা বাঙালী। ওয়ারী বটেশ্বরে বাঙালী সভ্যতার ইতিহাস পাওয়া গেছে। সেখানে গুহা মানবের অস্তিত্ব পাওযা গেছে- তারা কারা ছিলেন? তারা আমাদেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন। আমাদের সত্য কথা বলতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ীদের আদিবাসী দাবী ঐতিহসিকভাবে সত্য নয় এবং এটা টিকবেও না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালযের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. খুরশীদা বেগম তার প্রবন্ধে বলেছেন, আদিবাসী বলতে অভিবাসী বোঝায় না। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী হচ্ছে আদিবাসী। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯৮.৫%-৯৯% হচ্ছে বাঙালী এবং বাকি ১-১.৫% হচ্ছে অর্ধশতাধিক গোষ্ঠীবদ্ধ নৃগোষ্ঠী। এখানে ৭০টির মতো নৃগোষ্ঠীর বসবাস।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম সমস্যা ভূমি দখল। এটা সারা বাংলাদেশেই রয়েছে। নৃগোষ্ঠী বিচারে তা হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের চেয়ে অনেক বেশী নৃগোষ্ঠী সমতলে রয়েছে। সমতলে বাঙালী ও ছোট নৃগোষ্ঠীগুলো একসাথে থাকতে পারলে পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন পারছেনা সেটা বিবেচনা করে দেখতে হবে। এর পেছনে কাদের ইন্ধন রয়েছে তা বের করতে হবে।

তিনি বলেন মুক্তিযুদ্ধে চাকমা রাজা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর চাকমা রাজা দেশত্যাগের আগে তার পরিবারকে কি নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল বা পাকিস্তানে বসে তার পরিবারের সাথে কিভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তা বিবেচনা করে দেখা দরকার। বাংলাদেশের ঝড়, বন্যা, মহামারী, দুর্দশা, লাঞ্ছনা, সীমান্ত হত্যা, কোনো বিপদে- বিপর্যয়ে চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় কেন কোনো কথা বলেন না তাও বিবেচনা করে দেখা দরকার। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা বিরোধীরা পিস কমিটি বা শান্তি কমিটি তৈরী করেছিল। তাদের নামানুসারেই পরে শান্তিবাহিনী তৈরী করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে জেএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা এমএন লারমা নিরোপেক্ষ ছিল। জাতির এমন ক্রান্তিকালে কারা নিরোপেক্ষ থাকতে পারে তা বিবেচনা করে দেখা উচিত। এর সাথে অনেক প্রশ্নের উত্তর নিহিত।

ড. খুরশীদা বলেন, তারা এমন এক সময় শান্তিবাহিনী তৈরী করে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল যখন দেশের মাটিতে শহীদের রক্তের দাগ শুকায়নি। নতুন জন্ম নেয়া একটি রাষ্ট্র নানা সমস্যা মোকাবেলা করে কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। তখন তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল। আমরা তাদের আত্ম পরিচয়ের সংগ্রামকে স্বীকার করি কিন্তু তার জন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয়া মেনে নেয়া যায়না। তাদের সংগ্রাম চলতে পারে কিন্তু তা রাষ্ট্রকে অতিক্রম করে নয়।

তিনি আরো বলেন, এক বিদেশী অধ্যাপক এসে জুম চাষের উপর ভিত্তি করে একটি জাতীর নাম দিয়ে গেলেন জুম্ম জাতি। তাহলে বাংলাদেশের ধান চাষী, পাট চাষীকে কি বলা যাবে? তাছাড়া সমতলের অনেক উপজাতি জুম চাষ করে থাকেন। তাদেরকে কিভাবে জুম্মজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করবেন?

পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালীর সংখ্যা ৪৮.৫৭%। কিন্তু সেখানে ব্যয়িত বৈদেশিক সহায়তার ৯৮% উপজাতিদের কল্যাণে ব্যয় হয়। মাত্র ২% বাঙালীদের জন্য ব্যয় হয়। বাঙালীদের কি দুঃখ কষ্ট বঞ্চনা নেই? মানবাধিকারের কথা বলে বৈষম্য করেন কিভাবে- প্রশ্ন করেন ড. খুরশীদা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৫০টি তথাকথিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার দিতে গেলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বলে কিছু থাকে না। কারণ সার্বভৌমত্ব বিভাজিত হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদ রক্ত দিয়েছে বিভাজিত সার্বভৌমত্বের জন্য নয়।

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

মেহেদী হাসান পলাশ, Mehadi Hassan Palash
 
মেহেদী হাসান পলাশ :
বান্দরবানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এনজিও ব্যুরো। নির্দেশ পাওয়ার পরপরই ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ও কার্যালয়ের আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। বান্দরবান ওয়ার্ল্ড ভিশন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়স্থ এনজিও ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বান্দরবান জেলায় ওয়ার্ল্ড ভিশন আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। সে পত্র মোতাবেক বান্দরবান শহরের বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ের যাবতীয় কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঠিক কি কারণে বান্দরবানে তার কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে কোনো পক্ষই মুখ খুলছে না।
ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক এই এনজিওটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্রিশ্চিয়ানাইজেশন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতায় উসকানী প্রদান, পক্ষপাতদুষ্টু কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ করে আসছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালী অধিবাসীরা। বিভিন্ন সরকারি ও গোয়েন্দা তদন্তে এর প্রমাণও মিলেছে। এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে সেসব রিপোর্টে। সে কারণে পার্বত্য বাঙালীরা দীর্ঘদিন ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ধরনের এনজিওর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার দাবি করে আসছিলো। ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবানে ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বা সরাসরি কর্মকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ তারই অংশ বলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি সূত্র উল্লেখ করেছে। শুধু ওয়ার্ল্ড ভিশন নয় পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাকেই সরকার একে একে নিয়ন্ত্রেণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
 
ওয়ার্ল্ড ভিশনের বান্দরবান এডিপি ম্যানেজার টিমথি উজ্জ্বল কান্তি সরকার জানান, আশির দশকের আগে থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশন বান্দরবান জেলায় জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নবায়ন না করে বরং  কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংস্থাটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এর ফলে ওই মেয়াদের (৩০ সেপ্টেম্বর) মধ্যেই আমরা বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেছি। তিনি আরো জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিরোধিতায় সরকার ওয়ার্ল্ড ভিশনের নবায়ন বন্ধ করে দিয়েছে। সরকার বলেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, তাই বাংলাদেশে সরাসরি সংস্থাটি কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তবে ওয়ার্ল্ড ভিশন স্থানীয় এনজিওর সাথে পার্টনারশীপে জনহিতকর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। জানা গেছে, ওয়ার্ল্ড ভিশনে ৮ জন কর্মকর্তা ও ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবক দিয়ে সীমিত আকারে বান্দরবান সদর উপজেলার সদর, কুহালং ও সুয়ালক এই তিনটি ইউনিয়ন ও বান্দরবান পৌরএলাকায় কৃষি বিষয়ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশু কল্যাণ ও দুর্যোগকালীন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করে আসছিল। এছাড়া বিভিন্ন এলাকার ১ হাজার ২৮০ জন ওয়ার্ল্ড ভিশনের স্পন্সর ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের অর্থিক ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে আসছিল।
গত মঙ্গলবার সরেজমিনে বাস স্টেশন এলাকায় অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সংস্থাটির আসবাবপত্র অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসময় দেখা যায়, ওই মাঠে প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মোতাবেক নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাই এসব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে।
এদিকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের সরাসরি কর্মকাণ্ড বান্দরবানে বন্ধ করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বান্দরবানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। একই সাথে তারা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত অন্যসব এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি কার্যক্রম শুধু বান্দরবান নয়, তিন পার্বত্য জেলাতেই বন্ধের দাবি জানিয়েছে। এ খবরে আলোচ্য বিষয় হলো, ওয়ার্ল্ড ভিশনের মতো একটি আন্তর্জাতিক এনজিও’র কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বলা সরকারি আদেশ, বড় মাপের একটি সিদ্ধান্ত। বর্তমান সরকার বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। জাতীয় স্বার্থে এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত।
 
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ বলে অভিহিত না করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপণ জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপণের ভাষার বলিষ্ঠতা ছিল লক্ষণীয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার নানা ষড়যন্ত্রের কথা সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশের উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়ার অন্তর্নিহিত কারণ সেখানে চিহ্নিত করে দেশবাসী বিশেষ করে গণমাধ্যমের সাথে সংশ্লিষ্টদের ‘আদিবাসী’ শব্দ পরিহার করার জন্য অনুরোধ করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বর্তমান সরকারের এ দুটি বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাঙালিরা সরাসরি সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু এর সুফল ঘরে তুলতে পারেনি সরকার। এর কারণ সরকারের কিছু উপদেষ্টা, মন্ত্রী, এমপি, আমলা, মহাজোটের শরীক কিছু নেতার বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড। সরকারের দায়িত্বশীল এসব ব্যক্তিবর্গ এমন কিছু বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের ভাবমর্যাদা উন্নত হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত। জনসংখ্যা সীমিত হলেও জনবৈচিত্র্য বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশের থেকে আলাদা। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতিতে বিশ্বে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। সমৃদ্ধ সম্পদে সে আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্নিহিত কক্সবাজার ও এর পদচুমে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান বিশ্বের দৃষ্টিতে লোভনীয়। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে বিশ্বশক্তির রয়েছে অনেক ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও লোলুপ দৃষ্টি। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সেনসেটিভ ভূখণ্ড এই পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেকারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের কাছে, বাংলাদেশের জনগণের কাছে, সরকারের কাছে আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। সঙ্গত কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনা হতে হবে সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত ও সুদুরপ্রসারী।
 
ooo 
 
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত, এডহক নীতি ও অনেকক্ষেত্রে খামখেয়ালীপনার ভিত্তিতে। প্রেসিডেন্ট এরশাদ গুচ্ছগ্রাম সৃষ্টির সময় যেমন পুনর্বাসনের কথা চিন্তা করেননি, ঠিক তেমনি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন তৈরির সময় ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রণীত একটি মৃত আইন- হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়ালকে জীবিত করেছেন। এমনকি এ আইন সৃষ্টিতে রাষ্ট্রিয় সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, কর্তৃত্ব ও সংবিধানকে সুবিবেচনা করা হয়নি। সে কারণেই শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা রিটে উচ্চ আদালত জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে “রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রবিরোধী বলে বাতিল করে দিয়েছেন। এরশাদের পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি করার জন্য কর্নেল অলি আহমদ ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে জেএসএস’র সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে যখন সেই শান্তিচুক্তি করেছে বিএনপি তাকে ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়ে তারা ক্ষমতায় গেলে তা বাতিল করার ঘোষণা দিয়ে প্রবল আন্দোলন করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও যখন শান্তিচুক্তি করেছে তখন সংবিধান ও সার্বভৌমত্বের চেয়ে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তিকেই হয়ত বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। ফলে আদালতের স্টে অর্ডারের স্যালাইন দিয়ে শান্তিচুক্তিকে এখন আইসিইউতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এদিকে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে কিন্তু ‘দেশ বিক্রির কালো চুক্তি’ বাতিল করেনি, বরং তারাই এচুক্তি সবচেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে।
 
‘আদিবাসী’ বিষয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্নস্তরে এক ধরনের সমর্থন ছিল সবসময়। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারেও এই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে ‘আদিবাসী’ কনসেপ্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগই। এ বিষয়ে ভারতীয় সমর্থন পাওয়ার ফলেই সরকারের পক্ষে এমন শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হয়েছে। আমাদের পার্বত্য নীতি স্পষ্ট হলে এমন অনেক আন্তর্জাতিক বন্ধু পাওয়া সম্ভব।(যদিও সিএইচটি নিয়ে ভারতের সব নীতিই আমাদের স্বার্থানুকূল হবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই)।  কিন্তু শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের নামে বিভিন্ন স্থান থেকে ঢালাওভাবে বহু নিরাপত্তা ক্যাম্প সরিয়ে নেয়ার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন কার্যত পাহাড়ী চাঁদাবাজ, অপহরণকারী ও সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্ধেক জনগোষ্ঠী বাঙালি। সেকারণে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদটি পাহাড়ীদের দখলে থাকলেও সচিব পদটিতে বাঙালি আমলার পদায়ন হয়েছে সব সময়। ফলে সরকারী কার্যক্রম ও নীতিতে এক ধরণের ভারসাম্য ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মন্ত্রীর পাশাপাশি সচিব পদেও পাহাড়ী পদায়ন করায় পার্বত্য মন্ত্রণালয় কার্যত, একটি ভারসাম্যহীন একপেশে সাম্প্রদায়িক মন্ত্রণালয়ে পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানে।
 
এভাবেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারী নীতি পরিবর্তন হয়। শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, সরকারি কর্মকর্তা পরিবর্তনের সাথে সাথেও সেখানে নীতির পরিবর্তন ঘটে। এক কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামে ২-৩ বছরের দায়িত্ব পালনকালে যে নীতি অনুসরণ করেন পরবর্তী কর্মকর্তা এসে তা সম্পূর্ণ উল্টে দেন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অগ্রগতি ও সহাবস্থান চরমভাবে ব্যাহত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন নিয়ে সাম্প্রতিক অস্থিরতা। আদালত শান্তিচুক্তির মৌলিক ধারাগুলোর বেশিরভাগই অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দেয়ার পর ভূমি কমিশনও অসাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাতিল হয়ে যাবে, এমনটাই মতামত ছিল দেশের প্রাজ্ঞ আইনজীবীদের। বর্তমান সরকারের কতিপয় ব্যক্তির অতি আগ্রহে যখন ভূমি কমিশন একতরফাভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন স্বভাবতই বাঙালিরা ভূমি কমিশন বাতিলের দাবিতে তীব্র আন্দালন গড়ে তোলে। সেসময় কোনো কোনো কর্মকর্তা মনে করলেন, সরকারেরও মুখ রক্ষা করা দরকার। ব্যাস, বাঙালিদের একটি অংশের হাতে ভূমি কমিশন সংস্কার প্রস্তাবের একটি ড্রাফট তুলে দিয়ে সরকারী কর্তৃপক্ষের সাথে বৈঠকে বসিয়ে দিলেন। ফলে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রিয় অখণ্ডতা, সংবিধান, সরকারি কর্তৃত্ব, আদালতের এখতিয়ার বিরোধী একটি প্রতিষ্ঠান বাতিল না হয়ে টিকে থাকার পথ তৈরি হলো। এ নিয়ে ইতোমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক নৈরাজ্য, বিভেদ ও দ্বন্দ্ব। এমনও দেখা গেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্বপালনকালে কোনো এক সরকারী কর্মকর্তা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভালবেসে এর উপর দুটি বই লিখে ফেলেন ছদ্মনামে। তথ্যবহুল ও গবেষণামূলক এই বইটি প্রচারে তখন সরকারীভাবে ব্যাপক প্রমোট করা হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে এ বইটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এ বইটিই অত্যন্ত মেধাবী এ কর্মকর্তার চাকুরী অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণায় প্রায় সকল সরকারী অফিসেই বইটি অনুসৃত হয়। এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভালবেসে কিছু করার ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যেও এক ধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে থাকে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতি না থাকার কুফল এটি।
 
সিএইচটি নিয়ে যে পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্র ভারতের সেভেন সিস্টার্সও তার অন্তর্ভূক্ত। সেটা বুঝতে পেরেই ভারত সরকার সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে পাশ্চাত্যের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সরাসরি কার্যক্রম বা ডাইরেক্ট একশন (ডাক) বন্ধ করে দিয়েছে।  সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করে ভারত সরকার বা ভারতীয় এনজিও। কিন্তু বাংলাদেশে এসব আন্তর্জাতিক এনজিও, দাতা সংস্থা ও মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের কার্যক্রম ও অর্থ পরিচালনার কোনো হিসেব বাংলাদেশ সরকারকে দেয় না। এমনকি তাদের মিটিংগুলোতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের ঢুকতে দেয় না। কেউ ঢুকলেও পরিচয় পেলে অপমান করে বের করে দেয়। সে ক্ষেত্রে বান্দরবানে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ ইতিবাচক। অন্যান্য এনজিও ও দাতা সংস্থার ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা কাম্য। অথচ একই সময়ে সরকারের কোনো কোনা মন্ত্রী ইউএনডিপির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুল বিতর্কিত দাতা সংস্থার কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধির জন্য ডিও লেটার পাঠাচ্ছে তাদের আবাসিক কার্যালয়ে এবং তা সাথে সাথে গৃহীতও হয়েছে। একটি স্থায়ী পার্বত্য নীতির অভাবেই এমনটি ঘটছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালি বিভেদের কথাই কেবল দেশবাসী জেনে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আট লক্ষাধিক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড়জোর হাজার দশেক লোক এই বিভেদের সাথে জড়িত। এরা ইউপিডিএফ, জেএসএস’র সন্ত্রাসী ও মতলববাজ এনজিও কর্মী। বাকি সকল উপজাতি সদস্য কিন্তু শান্তিপ্রিয়, পাহাড়ী বাঙালি সহাবস্থানে বিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক। কিন্তু মুষ্টিমেয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মুখে তারা বাধ্য হয় সন্ত্রাসীদের সেখানো বুলি প্রচার করতে, তাদের গাইডেড পথে চলতে। অথচ এই সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্র বিশেষে তারা বাঙালীদের থেকেও বেশি ঘৃণা করে। কারণ বাঙালিদের থেকে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসের/ চাঁদাবাজির শিকার। সিএইচটিতে কর্মরত এনজিও কর্মীরা নানা কায়দার বিভেদ ছড়িয়ে দিয়ে একটি বাঙালী বিদ্বেষী প্রজন্ম সৃষ্টি করতে অপচেষ্ট। অথচ এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক উপজাতিদের নিরাপত্তা দিয়ে, ভালবেসে কাছে টানা হয়নি কখনো।বরং উপজাতি বলে সন্ত্রাসীদের পাল্লায় তুলে কেবল দূরেই ঠেলে দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভেদের দশভূজা জাগ্রত কিন্তু শান্তির বীণাপাণি নিদ্রা যায়। কোনো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে সরকারী পৃষ্টপোষকতায় সম্প্রীতি মিছিল চোখে পড়লেও সরকারী লোকেরা যেভাবে সে মিছিল চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে তাতে সম্প্রীতির থেকে সংশয় চোখে পড়ে বেশী।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বিভ্রান্তি দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের মধ্যে বেশি। এদের বেশিরভাগই মনে করেন বাঙালি ও সেনাবাহিনী সেখানে যত সমস্যার মূল। সন্দেহ নেই, তাদের বিভ্রান্তি ভিত্তিহীন। কিন্তু সে বিভ্রান্তি অপনোদনের চেষ্টা রাষ্ট্রিয় পর্যায় থেকে কি যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে? ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে সেখানে মিডিয়া টিম পাঠানো হয়, বুদ্ধিজীবীদের কাউকে অনুরোধ করে লেখানো হয়। কিন্তু এ দেশের কতজন মানুষ জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের পাঠানো হয়েছে? কতজন জানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি অবস্থানের গুরুত্ব? কতজন জানে সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে আসলে কি করে? তাদের সেবা, ত্যাগ, কমিটমেন্টের কথা কতো জনের মাঝে তুলে ধরা হয়েছে? কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান নিয়ে বলিউডে অনেক সিনেমা হয়েছে, হলিউডের কথা বললে তো একটি বই লেখা হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর আত্মত্যাগের অনেক ঘটনা গল্প ও ছবিকে হার মানায়। কিন্তু তার কথা দেশের কতজন মানুষ জানে। একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি না থাকার কারণেই তা সম্ভব হয়নি।
 
কাজেই বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো এডহক সিদ্ধান্তে সমাধান না খুঁজে একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি প্রণয়নের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। সেখানে বসবাসকারী সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ,  সিভিল ও সামরিক প্রশাসন, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এ পার্বত্যনীতি প্রণয়ন করতে হবে- যা সব সরকার ও সব ব্যক্তির জন্য অনুসরণযোগ্য ক্ষেত্র বিশেষে বাধ্যতামূলক করতে হবে। এখনই সময়। কারণ লেটার ইজ বেটার দ্যান নেভার।  
Email:palash74@gmail.com, সৌজন্যে- দৈনিক ইনকিলাব। (ইষৎ পরিবর্তিত)

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে লেখকের আরো কিছু প্রবন্ধ

পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় দৃষ্টির মধ্যে রাখতে হবে

একটি স্থায়ী পার্বত্যনীতি সময়ের দাবী

বাংলাদেশে আদিবাসী বিতর্ক

আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভুল ব্যাখ্যা ও অপপ্রয়োগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ১

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ২

পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বাংলাদেশ নয়, বাঙালীরা কি মানুষ নন- ৩